মেট্রোরেলে প্রেম (পর্ব ৯)

মেট্রোরেলে প্রেম (পর্ব ৯)
(কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য)
——————————————– রমিত আজাদ

“তোমার দেশ কোথায়?” প্রশ্নটা রাখলো নয়নের ট্যাক্সিচালক। উনাকে ট্যাক্সিচালক কতটুকু বলা যাবে সে বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা যায়। এখানে অনেকেই পার্ট-টাইম ট্যাক্সি চালায় বাড়তি কিছু আয়ের উদ্দেশ্যে। তারা অল্পশিক্ষিত প্রফেশনাল ট্যাক্সিচালক নয়। একটু আগেই এই বৃদ্ধ নিজের পরিচয় দিয়েছেন যে, তিনি একজন রিটায়ার্ড স্কুল প্রিন্সিপাল। তাই নয়নও ইজ্জত দিয়ে কথা বলছে তার সাথে।

নয়ন: বাংলাদেশ।
বৃদ্ধ: তোমরা মুসলমান তাই না?
নয়ন: জ্বী।
বৃদ্ধ: জানি তোমাদের বাংলাদেশ সম্পর্কে। দুই রহমানের দেশ। নয়ন বুঝতে পারলো যে, তিনি মরহুম দুই সাবেক রাস্ট্রপ্রধানদের সারনেইম-এর বলছেন।
নয়ন: জ্বী, সেই দেশই।
বৃদ্ধ: আচ্ছা, তোমাদের দেশে বহুবিবাহ প্রচলিত তাই না?
নয়ন: জ্বি না, আবার জ্বী।
বৃদ্ধ: মানে কি।
নয়ন: আমাদের ধর্ম অনুযায়ী চারটা পর্যন্ত বিবাহ এ্যালাউড। তবে সামাজিকভাবে সেই রীতি উঠে গিয়েছে। এখন সবার মাত্র একটা করেই স্ত্রী।
বৃদ্ধ: একেবারেই নেই?
নয়ন: তা বলা যাবে না। শিক্ষিত সমাজে একেবারেই নেই। তবে গ্রামে-গঞ্জে এখনও আছে কিছু কিছু।
বৃদ্ধ: আচ্ছা।
এবার নয়ন তাকে ধরে বসলো। দাদা আপনাদের দেশে কি বহুবিবাহ প্রচলিত নেই? বৃ্দ্ধ আড়চোখে তাকালো তার দিকে। এরপর হেসে ফেলে বললো,
বৃদ্ধ: নেই আবার! ভিন্ন ফর্মে আছে। ঘরে ও কাগজ-কলমে অফিসিয়ালী একটা বৌ-ই থাকে। আর ইন রিয়েলিটি একজন রুশ পুরুষের বৌ-এর কোন অভাব নেই। এই অফিসে একটা, এই সিঙ্গেল মাদার একজন, এই সুগার বেবি একটা, বেয়াইন বৌ একটা, আরো কত কি?
নয়ন: বেয়াইন বৌ? এটাতো আজ প্রথম শুনলাম।
বৃদ্ধ: হা হা হা। বন্ধুর বিয়েতে স্বাক্ষী হয়েছে। ওদিকে কন্যা পক্ষ থেকে স্বাক্ষী হয়েছে একটা তরুণী। ব্যাস এরপর তারা দুজনও হয়ে গেলো প্রেমিক-প্রেমিকা মানে ঐ আনঅফিসিয়াল বৌ-জামাই আরকি।

নয়ন বইতে পড়েছে যে, ফ্রান্সে চিরকালই এই রীতি ছিলো। অভিজাত পরিবারের পুরুষগুলো ঘরের বৌ-য়ের পাশাপাশি একাধিক আন-অফিসিয়াল বৌ রাখতো। আবার অভিজাত নারীরাও ঘরের জামাইয়ের পাশাপাশি একাধিক পুরুষের সাথে বসবাস করতো। এমনকি ফরাসীর অগ্নিপুরুষ খ্যাত সাহিত্যিক ভল্টেয়ার-এরও প্রেমিকা ছিলো অন্য আরেকজনার স্ত্রী। মেয়েটির নাম ছিলো এমিলি (Émilie)। এমিলির স্বামী ছিলো Marquis Florent-Claude du Chastellet-Lomont। বিবাহিতা অবস্থায় এমিলির প্রেম হয় ভল্টেয়ারের সাথে। পদার্থবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে এমিলির। সেই সময়ে ফ্রান্সে বিদগ্ধ মহলে নারীদের মূল্যায়ন করা হতো না। তাই এমলির কাজের স্বীকৃতি দিতে চায়নি ফরাসী বিজ্ঞান সমাজ। তবে এমিলির হয়ে বেশ লড়েছিলেন খ্যাতিমান ভল্টেয়ার। এমিলি ফ্রান্সে নারীশিক্ষার প্রসার নিয়েও সংগ্রাম করেছিলেন, যেটা সে সময়ে ফ্রান্সে প্রচলিত ছিলো না। ভল্টেয়ার ছাড়াও এমিলির যৌন সম্পর্ক ছিলো আরো একজন খ্যাতিমান ব্যাক্তির সাথে যিনি ছিলেন কবি Jean François de Saint-Lambert এবং এই সম্পর্কের ফলাফল হিসাবে তিনি গর্ভবতী হন। কিন্তু দুঃখজনক হলো, সন্তান প্রসব করার সময়ে মাত্র ৪২ বৎসর বয়সে এমিলি মৃত্যুবরণ করেন।


ঘরে ফিরে নয়ন টিভি সেট অন করলো। একসময় রাশিয়ায় অল্পকিছু টিভি চ্যানেল ছিলো, তাও সবই সরকারী ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিই সুতরাং সঙ্গত কারণেই কঠোরভাবে বোরিং! তবে পরিবর্তনের হাওয়ায় এখন অনেক অনেক প্রাইভেট চ্যানেল হয়েছে। এখন আবার দারুণ ইন্টারেস্টিং ও সেইসাথে নিদারুণ খোলামেলা। ইদানিং এ্যাডাল্ট ফিল্মের নামে যে সকল সিনেমা দেখানো হয় এইসব চ্যানেলে সেগুলো পর্ণোগ্রাফি-র খুব কাছাকাছি। যৌবনের প্রারম্ভে পর্ণোগ্রাফির প্রতি আসক্তি ছিলো নয়নের। থাকাটাই স্বাভাবিক বোধহয়। হা হা হা, একটা স্মৃতি মনে পড়ে গেলো নয়নের। আঠারো-উনিশ বছর বয়স হবে নয়নের তখন। বন্ধুদের সাথে বসে ঢাকার ধানমন্ডির এক বন্ধু বাড়ীতে আড্ডা দিচ্ছিলো নয়ন। কিছুক্ষণ পর বাড়ীর মুরুব্বীরা একে একে সবাই বাইরে বা কাজে চলে গেলো। থাকলেন শুধু বন্ধুর বৃদ্ধা নানী। তা তিনি তো তার ঘরেই আছেন। খুব ভালো সুযোগ, এই সুযোগে নয়নের বন্ধু লুকিয়ে রাখা পর্ণোগ্রাফি-র ক্যাসেট-টি চালু করলো ভিসিআর নামক যন্ত্রটিতে। ব্যাস মনের আনন্দে তারা দেখতে লাগলো নর-নারীর আদি-রসাত্মক কাহিনী। কোথাও সাদা, কোথাও কালো, কোথাওবা সাদা-কালো একসাথে, আরও কত কি? সেই বয়সে ফ্যান্টাসীরও অভাব নাই কোন! হঠাৎ কারেন্ট গেলো চলে। এটা তো মহাবিভ্রাট! কারেন্ট চলে গেল এই যন্ত্রে ক্যাসেট-টি আটকা পড়ে যায়। বিশ্বপ্রেমিক এরশাদ কাকুর দেশে কারেন্ট গেলে কখন যে আসে তার আর নাই ঠিক। একঘন্টা পরেও আসতে পারে, তিন ঘন্টা পরেও আসতে পারে। এর মধ্যে যদি মুরুব্বীরা ফিরে আসেন তাহলে আর ইজ্জ্বত থাকবে না। কি করা যায়? বাঁচার এক চিন্তা মাথায় এলো। কলাবাগানে আরেক বন্ধুর বাড়ী ছিলো। সেখানে গিয়ে ভিসিআর চালু করে ঐ ক্যাসেট বের করতে হবে। বগলদাবা করে তারা ঘর থেকে বের হতে গেলো। যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়! হঠাৎ নানী এসে বলেন, “ভিসিআর লই কই যাও?” বন্ধু চমকে উঠে বলে, “না নানী, ভিসিআর নষ্ট হই গেছে। যাই সারি আনি।” তারা গেলো কলাবাগানে, সেখানে ভিসিআর চালু করে ক্যাসেট বের করে তারপর ফিরে এলো বাড়ীতে। তারপরেও বোধহয় শেষ রক্ষা হলো না! রাতে নানী সেই বন্ধুর মাকে বলে, “বিকালে তো তোমার ভিসিআর নষ্ট হই গেছিল। নাতি যাই ঠিক করি আনছে।” মা একটু ভাবলো, তারপর বললো, “কারেন্ট চলি গেছিল নি?” নানী বললেন, “হ। কারেন্ট তো গেছিল গা।” মায়ের মুখে চিন্তার ছাপ পড়লো! তবে তিনি এই নিয়ে আর কিছু বললেন না।

নয়ন ভাবলো। আচ্ছা কি ইতিহাস এই পর্ণোগ্রাফীর? অনেক কাল আগে একটি গল্প পড়েছিলো নয়ন অভিনেত্রী ক্যামেলিয়ার প্রকৃত পিতা শামসুদ্দীন আবুল কালাম-এর লেখা সম্ভবত ‘ইভিনিং ইন প্যারিস’ নামক গল্পটিতে। স্ত্রীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের পর শামসুদ্দীন আবুল কালাম ইতালির রোমে নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করতেন। উনার মৃত্যুও হয় নিঃসঙ্গ অবস্থায়। ‘ইভিনিং ইন প্যারিস’ গল্পে তিনি লিখেছিলেন যে ইউরোপের পাবলিক সিনেমা হলগুলিতে খোলামেলাই দেখানো হয় পর্ণোগ্রাফী টাইপ সিনেমা। বাংলাদেশের সিনেমা হল ও বিটিভি-তে তখন চলতো কঠোর সেন্সর! তাই সেই সুযোগ বাংলাদেশে তখন ছিলো না। তবে ভিসিআর নামক প্রযুক্তিটি উন্মুক্ত হওয়ায়, নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও অবাধেই পর্ণোগ্রাফী দেখা হতো বাড়ীতে বাড়ীতে। তবে ভিডিও লাইব্রেরীগুলোতে রেইড দিতো পুলিশ। ধরা পড়লে শাস্তির ব্যবস্থা ছিলো। এই নিয়ে কৌতক লেখা হলো পত্রিকায়: পুলিশে রেইডের ভয়ে কমার্শিয়াল ভিডিও লাইব্রেরীতে পর্ণো-র ক্যাসেটগুলোতে অন্য কিছি লিখে রাখতো তারা। এরকম একটা ক্যাসেটে লেখা ছিলো ‘বিবাহ অনুষ্ঠান-১৫’। যাহোক এলাকায় কারো বিয়ের অনুষ্ঠানের ভিডিও করেছিলো ঐ লাইব্রেরী মানে দোকান। তারা যখন ক্যাসেট চাইতে এলো, অনভিজ্ঞ নতুন কর্মচারিটি ভুলবশত: দিয়ে দিলো ‘বিবাহ অনুষ্ঠান-১৫’ লেখা ক্যাসেট-টি, যেটা মূলত ছিলো পর্ণোগ্রাফীর ক্যাসেট। তা ঘরে নিয়ে সবাই যখন তা দেখতে বসেছে, দৃশ্য দেখে নানী-দাদীরা চোখ ঢেকে বলে, “ছি! ছি! ছি! আগে তো শুধু বিয়ের অনুষ্ঠান ভিডিও করতো। এখন তো দেখছি বাসর রাতও ভিডিও করে! ছি! ছি! ছি!”

গ্রীক ‘পর্ণো’ শব্দটির অর্থ গণিকাবৃত্তি। আর ‘গ্রাফ’ মানে ছবি। এইভাবে ‘পর্ণোগ্রাফী’ শব্দের অর্থ ‘গণিকাবৃত্তি-র ছবি বা রেকর্ড’। এই ধরনের ছবি বা ভাস্কর্যের Depiction যে সেই প্রাচীনকাল থেকেই সারা পৃথিবীতে ছিলো, ওপেন মঞ্চেও দেখানো হতো এসব, এই বিষয়ে আগেই লিখেছি। আধুনিক ফ্রান্সে তো নগ্নিকাদের ছবি আঁকা উচ্চতর শিল্পের পর্যায়ে ছিলো। তবে চলচ্চিত্রে এটা এসেছে ১৮৯৫ সালে চলচ্চিত্র আবিস্কৃত ও প্রচলিত হওয়ার পরে নিঃসন্দেহে )। ঘটনাটা ঘটেছে ১৮৯৬ সালে, দু’জন চলচ্চিত্র পরিচালক Eugène Pirou এবংAlbert Kirchner-এর নির্মিত Le Coucher de la Mariée ছবিতে, যেখানে একটি স্ট্রিপটীজ মানে নারীর বিবস্ত্র হওয়া প্রদর্শিত হয়েছিলো। এই সাহসী সিনেমার পর ফরাসী চলচ্চিত্র নির্মাতারা বুঝতে পারলেন যে, সিনেমার চাটনি হিসাবে নারীর বিবস্ত্রীকরণ দেখানো যেতে পারে, এবং এটে মুনাফাও আসবে বেশ। এই শুরু হয়ে গেলো। তবে শতভাগ পর্ণোগ্রাফী ফিল্ম মানে যেখানে ইন্টারকোর্স-এর সবটাই দেখানো হয় তা প্রথম দিকে নিষিদ্ধই ছিলো। তবে ১৯৬৯ সালে ডেনমার্কে পর্ণোগ্রাফী-র উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেয়া হয়। আর এতে এই খাতে ইনভেস্টমেন্টের বিস্ফোরণ হয়। তবে তখনও অন্যান্য দেশে ‘পর্ণোগ্রাফী’-র উপর নিষেধাজ্ঞা চলতে থাকে। তারপরেও ১৯৬৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘Blue Movie’ ছবিটি নির্মিত হয় যেখানে যৌন ইন্টারকোর্স খোলাখুলিভাবেই দেখানো হয়। আর এই সিনেমা দেখে অনুপ্রাণিত হয়েই নির্মিত হয়েছিলো আরেকটি বিতর্কিত ও ঝড় তোলা যৌন ছবি ‘Last Tango in Paris’।

সোভিয়েত মুল্লুকে ‘পর্ণোগ্রাফী’ শতভাগ নিষিদ্ধ ছিলো। পোস্ট-সোভিয়েট যুগে সেই নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। এরপর বিভিন্ন মেট্রো স্টেশনের কিওস্কে ‘পর্ণোগ্রাফী’-র ক্যাসেট বেশ খোলাখুলিই বিক্রি হতে শুরু করে। মাঝে মাঝে ক্ষুদে দোকানগুলোর প্রদর্শগবাক্ষেও বেশ ঘটা করে প্রদর্শিত হতো সচিত্র ‘পর্ণোগ্রাফী’-র ক্যাসেট।

নগ্ন সে, নগ্ন সে, নগ্ন সে, নগ্ন সে নয়তো;
কাপড়টি পড়েছিলো খাটো করে হয়তো।
এতে কি সে হয়ে গেলো একেবারে নগ্ন?
যদিও বা কেউ কেউ তাকে দেখে মগ্ন!

এ যুগের হালচাল, প্রগতিতে বেসামাল!
সেই হাওয়া ঝাপটায়, বসনের কি আকাল!
লোভনীয় শরীরের কিছুটা তো দেখালে!
কাপড়ের আধিকতা, বড্ড তো সেকেলে!

কাপড়ের কমতি, ফ্যাশনের দাবী তা;
হু হু করে বাড়ছে, সেই প্রতিযোগিতা!
শ্লীল আর অশ্লীল নবরূপ পেতে চায়,
দেহে নেই নগ্নতা, নগ্নতা চিন্তায়!!!
———————————————— রমিত আজাদ


রচনাতারিখ: ২৭শে অক্টোবর, ২০২১ সাল
রচনাসময়: রাত ০১টা ২৭মিনিট

Love in Metrorail ( 9 )
——————- Ramit Azad

আগের পর্বগুলি
https://www.facebook.com/ramit.azad/posts/10225410331061662

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.