শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন

জয়নুল আবেদিনের যেমন ছিলেন একজন শিল্পী তেমনি ছিলেন এদেশের আধুনিক শিল্পকলা আন্দোলনের পথিকৃৎ। তাঁর মানবিক গুণাবলির জন্যেও তিনি বিখ্যাত ছিলেন। প্রচণ্ড শক্তিশালী এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল এক শিল্পী জয়নুল আবেদিন। শিল্পকলাকে কখনই তিনি সাধারণ জীবনের বাইরের কোন বিষয় বলে গণ্য করেননি। “শিল্পের জন্য শিল্প” এমন আদর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না জয়নুল আবেদিন। আবার প্রপাগন্ডা আর্টেও তিনি বিশ্বাস করতেন না। শিল্প জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, এটাই ছিল তাঁর দর্শন। তাঁর কাছে শিল্প হচ্ছে জীবনেরই এক প্রকাশ আর এর উদ্দেশ্য হলো মানব সমাজকে সমৃদ্ধ ও সুন্দর করে তোলা। সমাজে সুন্দরের প্রতিষ্ঠার আগেই অবশ্য সেখান থেকে সব ধরনের কদর্যতা অপসারণ আবশ্যক। এসব কদর্যতার মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও দৃশ্যমান অসমতা। জয়নুল তাঁর চার দশকের সুদীর্ঘ শৈল্পিক জীবনে একাগ্রভাবে শুধু সেই সামগ্রিক ও সমন্বিত পরিবেশটিরই প্রতিষ্ঠায় নিবিষ্ট ছিলেন যার মাধ্যমে সম্ভব হয় অথপূর্ণ নন্দনচর্চার অব্যাহত প্রয়াস। তাঁর শিল্প সব সময়েই সাধারণ মানুষের কথা বলেছে। তিনি নিজেও উঠে এসেছেন তাদের মধ্য থেকেই। তাদের জীবন, তাদের অন্তহীন সংগ্রাম, তাদের আশা ও আকাঙ্ক্ষা সব কিছুই তিনি অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে তাঁর কাজের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। গ্রামীণ দরিদ্র খেটে খাওয়া মানুষ ও বাংলার নিসর্গ ছিল তাঁর অতি প্রিয় বিষয়।

জন্ম ও বংশ পরিচয়

জয়নুল আবেদিন ১৯১৪ সনের ২৯শে ডিসেম্বর বর্তমান বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। (সরকারি নথিপত্রে তাঁর জন্ম তারিখ অবশ্য ১৮ই নভেম্বর, ১৯১৪)। বাবার নাম তমিজউদ্দিন আহমেদ এবং মা জয়নাবুন্নেছা। বাবা ছিলেন পুলিশের সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর। তিনি ছিলেন পিতামাতার দ্বিতীয় সন্তান এবং জ্যেষ্ঠ পুত্র।

 

শিক্ষা জীবন ও শৈশব

ময়মনসিংহে তাঁর জীবনের শুরুতেই তিনি শৈল্পিক প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে বহু দূরের সেই শহর কলকাতায় গিয়ে শিল্পকলা শেখার দীর্ঘ এবং কঠিন ছাত্রজীবন শুরু না করা পযর্ন্ত স্বস্তি পাচ্ছিলেন না জয়নুল আবেদিন। ১৯৩০ সালে বাড়ি থেকে পালিয়ে বন্ধুদের সাথে কলকাতা গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস দেখতে যান। ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৮ সন পযর্ন্ত তিনি কলাকাতার সরকারি আর্ট স্কুলের ছাত্র ছিলেন। ১৯৩৩ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগেই স্কুলের সাধারণ পড়ালেখার পাট চুকিয়ে কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস-এ ভর্তি হন। ১৯৩৮ সালে কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টসের ড্রইং এ্যান্ড পেইন্টিং ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

ব্রহ্মপুত্র নদের প্লাবন অববাহিকার অত্যন্ত শান্ত সুনিবিড় ও রোমান্টিক পরিবেশে তিনি বেড়ে উঠেছেন। তাঁর শৈশব এবং তারুণ্যের প্রধানতম অর্জন ছিল বলতে গেলে এই প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের অভিজ্ঞতা। তাঁর শৈল্পিক মানসিকতা নির্মাণে প্রকৃতির প্রভাব ছিল অসামান্য ও সুদূরপ্রসারী। তিনি বলতে ভালোবাসতেন, “নদীই আমার শ্রেষ্ঠতম শিক্ষক”।

শৈশবে তাঁর ওপর প্রকৃতির প্রভাব এবং কলকাতায় আর্ট স্কুলে ইউরোপীয় একাডেমিক বাস্তববাদী ধারার শিল্পাঙ্কন পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ তরুণ জয়নুল আবেদিনকে গ্রামীণ নিসর্গশিল্পী হিসেবে গড়ে তোলে। একাডেমিক ধারার সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও তিনি বিহারের সাঁওতাল পরগনা ও ময়মনসিংহের নিসর্গ দৃশ্যের ওপর বেশ কিছু স্মরণীয় স্কেচ এবং জলরং চিত্র এঁকেছেন।

 

কর্মজীবন

১৯৩৮ সালে শেষ বর্ষের ছাত্র থাকাকালীন সময়েই কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টসের শিক্ষক হিসেবে নিযুক্তি পান। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর তৎকালীন পাকিস্তানের প্রদেশ পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকার আরমানিটোলায় অবস্থিত নর্মাল স্কুলে আর্ট শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং শ্বশুরালয় ১২ নম্বর আবদুল হাদী লেনে বসবাস করতে থাকেন।

১৯৪৮ সালে ঢাকাতে প্রদেশের প্রথম আর্ট স্কুল, গভর্নমেন্ট ইন্সটিটিউট অব আর্টস প্রতিষ্ঠার যাবতীয় পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন। এতে তাঁর কয়েকজন শিল্পী সহযোগীও উদ্যোগী ভূমিকা রাখেন। জয়নুল আবেদিন ইন্সটিটিউটের প্রথম ‘প্রিন্সিপাল ডেজিগনেট’ হন এবং পাকিস্তানের রাজধানী করাচীতে কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য ও প্রকাশনা বিভাগের মুখ্য নকশাবিদ হিসেবে যোগদানের জন্যে ৩রা আগস্ট, ১৯৪৮, করাচীর পথে ঢাকা ত্যাগ করেন। করাচী থাকাকালীন সময়ের উল্লেখযোগ্য কাজ, “কায়েদে আজমের মাজারের পথে।”

শিল্পী হিসেবে তাঁর খ্যাতি, অসাধারণ সাংগঠনিক মেধা, তৎকালীন শিল্পী সহকর্মী ও বন্ধুদের সহযোগিতা এবং কতিপয় বাঙালী সরকারী কর্মকর্তার সাহায্য ইত্যাদি সব কিছু মিলিয়েই সম্ভব হয়েছিল ১৯৪৮ সনে দেশের প্রথম আর্ট স্কুলের প্রতিষ্ঠা।তখন এর নাম ছিল ‘গভর্মেন্ট ইনস্টিটিউট অফ আর্ট’ পুরাতন ঢাকার জনসন রোডে অবস্থিত ন্যাশনাল মেডিকেল স্কুল ভবনে দুটো কক্ষে গভর্নমেন্ট ইন্সটিটিউট অব আর্টস-এর ক্লাস শুরু হয় নভেম্বর মাসে। শিল্পী আনোয়ারুল হক অস্থায়ী প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৯ সালে ২৮শে ফেব্রুয়ারি তারিখে জয়নুল করাচী থেকে ঢাকায় ফেরেন এবং ১লা মার্চ ইন্সটিটিউটের প্রথম স্থায়ী প্রিন্সিপাল হিসেবে কার্যভার গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমীর সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯৭৪ সন পর্যন্ত এই পদে বহাল থাকেন। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর অন্যতম উপদেষ্টা মনোনীত হন। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়াস্থ ‘কংগ্রেস ফর ওয়ার্ল্ড ইউনিটি’র সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় অধ্যাপক নিযুক্ত হন এবং আমৃত্যু এই পদে অধিষ্ঠিত থাকেন।

 

পারিবারিক জীবন

১৯৪৬ সালে জয়নুল আবেদিন ঢাকা নিবাসী তৈয়ব উদ্দিন আহমদের কন্যা জাহানারা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। জয়নুল আবেদিন তিন পুত্রের জনক। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র সাইফুল আবেদিন (টুটুল) স্থপতি। বর্তমানে তিনি আমেরিকা প্রবাসী। দ্বিতীয় পুত্র খায়রুল আবেদিন (টুকুন), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোল বিষয়ে এম.এ এবং কনিষ্ঠ পুত্র মঈনুল আবেদিন (মিতু) প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পানি-সম্পদ প্রকৌশল বিদ্যায় স্নাতক।

 

১৯৪৩-এর বাংলার দুর্ভিক্ষ ও জয়নুল আবেদিন

images cover13

তিনি ১৯৩৮ সনে নিখিল ভারত চিত্র প্রদর্শনীতে গভর্নরের স্বর্ণপদক লাভ করেন। এ পুরস্কার ছিল ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদ নিয়ে আঁকা তাঁর একগুচ্ছ জলরং ছবির জন্যে। এরপর আরো কিছুকাল পর্যন্ত জয়নুল আবেদিন প্রাকৃতিক পরিবেশেরই এক রোমান্টিক রূপকার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি তখন ছিলেন এক অরাজনৈতিক ব্যক্তি, একজন বিশ্বস্ত নিসর্গশিল্পী। কিন্তু ১৯৪৩-এর বাংলার দুর্ভিক্ষ জয়নুল আবেদিনকে একেবারে বদলে দেয়। গ্রাম-বাংলার রোমান্টিক নিসর্গশিল্পীকে রূপান্তরিত করে ফেলে এক দুর্দান্ত বিদ্রোহী ব্যক্তিত্বে। অতঃপর সারাটি জীবনই বিক্ষুব্ধ থেকে গেছেন তিনি।

দুর্ভিক্ষ শুরু হওয়ার পরপরই জয়নুল তাঁদের ময়মনসিংহের বাড়িতে ফিরে যান। সেখানেও দুর্ভিক্ষের যে মর্মান্তিক দৃশ্যাবলি দেখতে পান তাতে তিনি ভীষণভাবে ব্যথিত হন এবং আবার কলকাতায় ফিরে আসেন। কিন্তু দুর্ভিক্ষপীড়িত দুস্থ মানবতা যেন সে যাত্রায় তাঁর সঙ্গী হয়ে আসে। তেতাল্লিশের কলকাতা মহানগরে ঘটেছে মানবতার চরম অবমাননা। ডাস্টবিনের উচ্ছিষ্ট থেকে খাদ্যান্বেষণে তীব্র প্রতিযোগিতা চলেছে মানুষ আর কুকুরের মধ্যে। ঊনত্রিশ বছর বয়স্ক জয়নুল এ রকম অমানবিক দৃশ্যে প্রচণ্ডভাবে মর্মাহত হন, আতঙ্কে শিউরে ওঠেন, আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কিন্তু সে আবেগ তিনি কাজে লাগান সেসব দৃশ্যাবলির শিল্পরূপ দিতে। অন্যভাবে বলা যায় সেই আবেগই তাঁকে তাড়িত করে, বাধ্য করে অমানবিক পরিস্থিতির এক মানবিক নির্মাণে। তিনি রাতদিন শুধু কলকাতার দুর্ভিক্ষের সেসব নারকীয় দৃশ্যাবলির স্কেচ করতে থাকেন।

জয়নুল তখন আর্ট স্কুলের একজন শিক্ষক, তাঁর আয় সামান্য। দুর্ভিক্ষের বাজারে উন্নতমানের শিল্পসামগ্রী তখন যেমন ছিল দুর্লভ তেমনি দুর্মূল্য। সে কারণে তিনি বেছে নেন শুধু কালো কালি আর তুলি। শুকনো তুলিতে কালো চীনা কালির টানে স্কেচ করতে থাকেন অতি সাধারণ সস্তা কাগজের ওপর। ব্যবহার করেছেন কার্টিজ পেপার। এসব কাগজ ছিল ঈষৎ পীত বর্ণের। এমনকি তিনি প্যাকেজিং কাগজও ব্যবহার করেছেন। সাধারণ স্বল্পমূল্যের এসব অঙ্কন সামগ্রী ব্যবহার করে তিনি যে শিল্প সৃষ্টি করলেন তাই পরিণত হলো অমূল্য সম্পদে। এমন এক অসাধারণ শক্তিশালী অঙ্কন শৈলীর মাধ্যমে তিনি দুর্ভিক্ষের করুণ বাস্তব দৃশ্যাবলি চিত্রায়িত করলেন, যার কোন পূর্ব দৃষ্টান্ত উপমহাদেশের চিত্রঐতিহ্যে ছিল না। জয়নুলের দুর্ভিক্ষের স্কেচগুলো দেখার পর “ভারতের নাইটিঙ্গেল” শ্রীমতি সরোজিনি নাইডু মন্তব্য করেছিলেন, “সব চাইতে মর্মস্পর্শী ও আবেগময় বর্ণনার চাইতেও তাঁর এসব ছবির আবেদন অধিকতর”। সমসাময়িক এক শ্রদ্ধাভাজন শিল্পসমালোচক ছিলেন ও.সি. গাঙ্গুলী। ১৯৪৪ সনে তিনি জয়নুলের দুর্ভিক্ষের ড্রইং সম্পর্কে লিখেছেন, “তাঁর এসব নির্মম তুলির টানের দুঃসাহসিকতার মধ্যে একাধারে ছিল স্বতঃস্ফূর্ততা ও সততা এবং তার সাথে আবার যুক্ত হয়েছিল আপোসহীন বাস্তবতা, যা কিনা বাংলার আধুনিক শিল্পীদের কাজে একেবারেই বিরল এক বৈশিষ্ট্য। তাঁর এই অসাধারণ কাজের মাধ্যমে তিনি আধুনিক চিত্রকালার এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করলেন। জয়নুলের ড্রইংগুলো ১৯৪৩-এর বাংলার ইতিহাসের ক্ষেত্রে এক অমূল্য বিশ্বস্ত দলিল হয়ে থাকলো। মানব জীবনের শোচনীয় পরিণতির মধ্যেও সৌন্দর্যের পূজারী হিসেবে এই শিল্পী বাংলার বিদ্যমান সস্তা ভাবপ্রবণ নিম্ন পর্যায়ের চিত্রধারাকে উন্নীত করলেন এক সম্মানজনক স্তরে”। জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষের স্কেচগুলো শুধুমাত্র সমাজ বাস্তবতার স্মারক হিসেবেই নয়; বরং যুগপৎভাবে এগুলোর শৈল্পিক উৎকর্ষতার জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ। ও.সি. গাঙ্গুলির বস্তনিষ্ঠ মূল্যায়নের সাথে আমরা আরো যোগ করতে পারি ১৯৫২ সনে প্রদত্ত প্রখ্যাত বৃটিশ শিল্পসমালোচক স্যার এরিখ নিউটনের মন্তব্য, “এগুলো অত্যন্ত চমৎকার ড্রইং, এগুলোর মধ্যে সেই অসম্ভব ব্যাপরটিই ঘটেছে, এক অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের”।

Shilparcho_Joynul_Abedin_bathingRebelCowAbedin

তাঁর দুর্ভিক্ষের চিত্রমালার মাধ্যমেই জয়নুল আবেদিন চিহ্নিত হলেন বাংলার শিল্পকলার প্রথম সমাজ বাস্তবতার শিল্পী হিসেবে। এটা অবশ্যই এক আশ্চর্য ঘটনা যে জয়নুলের আরেক সমকালীন মুসলমান, কাজী নজরুল ইসলামও মাত্র দু’দশক আগে ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন শোষিত নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠ হিসেবে তাঁর বিখ্যাত “বিদ্রোহী” কবিতার মাধ্যমে। নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী ছিলেন, রাজনৈতিক চেতনায় এবং তাঁর কাব্যে। তিনি বৃটিশ রাজের বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠ উচ্চকিত করেছেন আবার অন্যদিকে তৎকালীন কবিতায় প্রভাবশালী রাবীন্দ্রিক বলয় ভেঙেছেন। জয়নুল আবেদিনও তাঁর সমসাময়িক প্রতিপত্তিশালী ভারতীয় নব্য ধ্রুপদী ধারার চিত্র ধারার বাইরে অবস্থান করতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। এই ধারাটির প্রবর্তন করেছিলেন আবার ঠাকুর পরিবারের আরেক ব্যক্তিত্ব, রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অবনীন্দ্রনাথের অত্যন্ত শীতল ও রীতিবদ্ধ নব্য ধ্রুপদী ধারা কিংবা “বেঙ্গল স্কুলের” চিত্রধারার চাইতে পাশ্চাত্যের বাস্তবতাভিত্তিক চিত্রধারাই প্রথম থেকে জয়নুল আবেদিনের অধিকতর পছন্দ ছিল। এরই ফলশ্রুতিতে দুর্ভিক্ষ নিয়ে চিত্রমালার শক্তিশালী বাস্তববাদী-প্রতীকী স্কেচগুলো বেরিয়ে এসেছে বলে মনে হয়।

বিদ্রোহী কবির মতোই জয়নুল আবেদিনও মানবতাবাদ ও সমাজতন্ত্রের পক্ষে ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ নিয়ে সে বছরই কলকাতায় যে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল তাতে জয়নুল তাঁর দুর্ভিক্ষ নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। কম্যুনিস্ট পার্টির মুখপত্র The People’s War পত্রিকায় ১৯৪৫ সনের ২১শে জানুয়ারি সংখ্যায় জয়নুলের ওপর একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। এতে জয়নুলকে “এক তরুণ বাঙালি মুসলমান” হিসেবে পরিচয় করানো হয়। সাথে ছিল তাঁর একটি ফটোগ্রাফ এবং দুর্ভিক্ষ চিত্রমালার তিনটি ছবির প্রতিলিপি। কাগজটি তাঁর সম্বন্ধে লিখেছিল, “বাঙলার ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পীসংঘের একজন সদস্য জয়নুল। এই সংঘটি সমগ্র বাংলার সকল শিল্পী ও লেখকের এ রকম একটি প্রতিষ্ঠান যার প্রধান কর্তব্যই ছিল সমস্যাতাড়িত জনগণকে সাহায্য করা। আর এতে কোন সন্দেহ নেই যে, সে সকল সময়েই এঁদেরই একজন অগ্রণী সদস্য থাকবে।” জয়নুল সম্পর্কে পত্রিকাটির মূল্যায়ন বস্তুতই অত্যন্ত সঠিক ছিল একথা পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়েছে।

 

শিল্প আন্দোলনের কর্ণধার

১৯৪৭ সনে উপমহাদেশে দুটো স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হলো, তারপর জয়নুল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র পাকিস্তানের অন্যতম প্রদেশ পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকায় চলে আসেন। তিনি কলকাতা আর্ট স্কুলে তাঁর চাকরিটি ছেড়ে ঢাকায় এসে নর্মাল স্কুলের অঙ্কন শিক্ষকের কাজ পান। কিন্তু তখন থেকেই তিনি এদেশে শিল্প আন্দোলন শুরুর গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখনকার সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবায় তাঁর এই উদ্যোগটি ছিল রীতিমতো বিপ্লবাত্মক ঘটনা। তাঁর শিল্পী হিসেবে খ্যাতি, অসাধারণ সাংগঠনিক মেধা, তৎকালীন শিল্পী সহকর্মী ও বন্ধুদের সহযোগিতা এবং কতিপয় বাঙালি সরকারি কর্মকর্তার সাহায্য ইত্যাদি সব কিছু মিলিয়েই সম্ভব হয়েছিল ১৯৪৮ সনে এদেশের প্রথম আর্ট স্কুলের প্রতিষ্ঠা। তখন এর নাম ছিল “গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস”। এই ইনস্টিটিউটকে গড়ে তোলার গুরুদায়িত্ব তিনি গ্রহণ করেন এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষরূপে। মাত্র দু’কামরার সেই ইনস্টিটিউটটিকে ১৯৫৬ সনের মধ্যেই তিনি এক অতি চমৎকার আধুনিক প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করেন। পরবর্তীকালে এটি পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় এবং স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। (আরো পরে মহাবিদ্যালয়টি সরকারি নিয়ন্ত্রণ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হস্তান্তরিত হয় এবং এর বর্তমান পরিচয় চারুকলা ইনস্টিটিউট নামে)। কলেজ ক্যাম্পাসের নকশা নির্মাণে জয়নুল আবেদিন বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ স্থপতি মাজহারুল ইসলামকেই দায়িত্ব দিয়েছিলেন। চারুকলা কলেজ/ইনস্টিটিউটের ক্যাম্পাসের যে নান্দনিকতা তা এদেশের ক্যাম্পাস স্থাপত্যের এক মানদণ্ড হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে।

ইতিমধ্যে ১৯৫১-৫২তে জয়নুল আবেদিন সরকারি বৃত্তি নিয়ে এক বছরের জন্যে ইংল্যান্ডে যান। সেখানে অবস্থানকালে তিনি বিভিন্ন চারুকলা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন। তিনি তাঁর নিজের শিল্পকর্মের প্রদর্শনীও করেন। তাঁর কাজ ইংল্যান্ডের বিদগ্ধজনের অকুণ্ঠ প্রশংসা অর্জন করে। তাঁর এই ইংল্যান্ড ভ্রমণটি শুধুমাত্র যে তাঁকে পাশ্চাত্য জগতে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল তাই নয়, এতে করে তাঁর দৃষ্টি আরো প্রসারিত হয় এবং সম্ভবত এর মাধ্যমেই বাংলাদেশের চারুকলা চর্চা শুরু থেকেই এক প্রাণবন্ত আধুনিকতার চরিত্র গ্রহণ করতে পেরেছিল। আবেদিনের এই ইউরোপ ভ্রমণ তাঁকে বাংলার সমৃদ্ধ লোকশিল্পের মর্যাদা ও গুরুত্ব সম্পর্কেও বিশেষভাবে সচেতন করে তোলে। জয়নুল তাঁর ছাত্রাবস্থায় ও তারুণ্যে যদিও অবনীন্দ্রনাথের নব্য-ধ্রুপদী ধারা কিংবা যামিনী রায়ের বাংলার লোক-ঐতিহ্যসমৃদ্ধ শিল্পশৈলীর প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন না, তবে ‘৫২তে বিলেত থেকে ফিরে এসে তিনি এদেশের স্থানীয় শিল্প-ঐতিহ্যের সাথে পাশ্চাত্যের আধুনিক শিল্প-আন্দোলন ও কৌশলাদির সমন্বয় সাধনে ব্রতী হন। ইতিমধ্যে তিনি নানান অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। তৎকালীন বিদ্যমান রাজনৈতিক আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি থেকেই তিনি বাঙালি সংস্কৃতির ওপর বৈরী পশ্চিম পাকিস্তানি আধিপত্যবাদী মনোভাব সম্পর্কে সচেতন হন। তিনি তখন থেকেই চিত্রকলায় এক ধরনের আধুনিক বাঙালিত্ব ফুটিয়ে তোলার পক্ষে সুস্পষ্ট ও জোরালো মত ব্যক্ত করতে থাকেন। তাঁর এই মানসিকতা তাঁর নিজের কাজের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়েছে। ১৯৫১ সনে এবং এর অব্যবহিত পরে আঁকা তাঁর ছবিতে একটি অসাধারণ আঙ্গিকের পরিচয় পাওয়া যায়। এই আঙ্গিকের প্রাথমিক পর্যায়ে দেখা যায়, জয়নুল গ্রাম বাংলার অতি সাধারণ প্রাত্যহিক অথচ অত্যন্ত প্রতীকী গুরুত্বসম্পন্ন দৃশ্যাবলি এঁকেছেন। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ চিত্রমালার সেই তুলির বলিষ্ঠতা ও সাবলীলতা আবার প্রাণ পেয়েছে এ সময়ের কাজে। অধিকাংশ কাজ জলরং বা গোয়াশে করা। ব্যবহৃত জলরংঙের বৈশিষ্ট্য হালকা এবং অনুজ্জ্বল, তুলির টান এবং কম্পোজিশন বা স্পেস ব্যবহার অত্যন্ত প্রাচ্যধর্মী। অন্যদিকে বিষয় উপস্থাপনা ও ড্রইং পাশ্চাত্য-বাস্তবধর্মী। এভাবে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের এক অপরূপ সমন্বয় ঘটেছে তাঁর শিল্পকর্মে। তাঁর “ঝড়” শীর্ষক ছবিটি এক অসাধারণ কাজ। এতে বাংলাদেশের কালবৈশাখীর আকস্মিকতা ও উদ্দামতা ধরা পড়েছে অতি চমৎকারভাবে। বিন্যাসের সংক্ষিপ্ততায় ছবিটি আকর্ষণীয়। একইভাবে আরেকটি সুন্দর জলরং ছবি “মই দেয়া”। তবে এই সিরিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্ভবত মাঝারি সাইজের একটি জলরং, যার শিরোনাম “বিদ্রোহী”। পরবর্তী সময়ে এটি একটি প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে। একটি অবাধ্য গাভী ষাড়ের মতো প্রচণ্ড শক্তিতে তার বাঁধন ছিঁড়ে ছুটে যাচ্ছে। তুলির টানের শক্তি ও সাবলীলতা অসাধারণ। ক্ষিপ্রতার সাথে আঁকা হলেও ছবিতে বিভিন্ন অংশের সূক্ষ উপস্থাপনায় চরম মুন্সিয়ানা ধরা পড়ে। পাকানো দড়ি কিংবা গরুটির পায়ের খুর, এসবের ডিটেলস লক্ষণীয়। এই আঙ্গিকে তিনি ছবি এঁকেছনে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে। সুগঠিত সুন্দর সাঁওতাল নরনারীকে বিষয় করে চিত্তাকর্ষক ছবিও এঁকেছেন।

এর পরপরই ‘৫২-৫৩তে জয়নুল গড়ে তোলেন এক চমৎকার নতুন ঢং, যাকে “আধুনিক বাঙালি ঢং” বলা চলে। এই ঢঙের কাজের সাথে যামিনী রায়ের ছবির ঢঙের সামঞ্জস্য দেখা যায়। জয়নুলের এই ঢঙের কাজে বাংলার লোক-শিল্পের নানা মটিফ এবং রং বিন্যাসের প্রভাবও লক্ষণীয়। তাঁর এ সময়ের কাজগুলোকে রোমান্টিক মেজাজের বলে চিহ্নিত করা যায়। বছর কয়েক আগে জয়নুল বিয়ে করেছেন, তাঁর সন্তানদের জন্ম হয়েছে এরই মাঝে। তাঁর ঢঙের ছবি সবই অবয়বভিত্তিক, তবে তাঁর এই ঢঙের ছবি সবই অবয়বভিত্তিক, তবে তাঁর নিজস্ব নতুন আঙ্গিকেই উপস্থাপিত। আধাবিমূর্ত, জ্যামিতিক ফর্মে নির্মিত হয়েছে মানব-মানবীর শরীর। অনেক ক্ষেত্রে প্রথাগত পারসপেকটিভের শর্ত মানা হয়নি। জলরং, গোয়াশ এবং তেলরং, নানা মাধ্যমে আঁকা ছবির এক সাধারণ বৈশিষ্ট্য উজ্জ্বল প্রাথমিক রঙের ব্যবহার। ছবিগুলো আকারে আয়তনে ছোট বা মাঝারি। অধিকাংশ ছবি মহিলাদের জীবনযাপন নিয়ে, এসব ছবিতে পল্লী-রমণীগণ নদীর ঘাটে যাচ্ছে জল আনতে বা স্নান করতে। অনাবিল প্রশান্তিতে প্রসাধানে নিযুক্ত, একক, যুগল কিংবা ত্রয়ী মহিলার চিত্র। মা ও শিশুও রয়েছে। গ্রামীণ কর্মী পুরুষের জীবনও ধরা পড়েছে এই সময়কার কাজে। একটি গোটা সিরিজ গড়ে উঠেছে এসব ছবি নিয়ে। এগুলোর মধ্যে কিছু স্মরণীয় কাজ হলো ‘নৌকোর গুণটানা’, ‘পল্লী-রমণী’, ‘আয়না নিয়ে বধূ’, ‘একাকী বনে’, ‘পাইন্যার মা’, ‘মা ও শিশু’, ‘তিন পল্লী রমণী’, ‘মুখ চতুষ্টয়’ ইত্যাদি।

জয়নুলের এই ‘আধুনিক বাঙালি’ রীতির কাজগুলো দেখে একজন বৃটিশ শিল্পসমালোচক, রিচার্ড উইলসন, ১৯৫৫ সনে লিখেছেন, “এক হিসেবে বলতে হয় তাঁর এসব কাজ পাক-ভারতীয় চিত্রকলার আধুনিক যুগে উত্তরণের সূচনা করেছে। ভারত ও পাকিস্তানের তিনিই প্রথম শিল্পী যিনি অত্যন্ত সফলতার সাথে বিমূর্ত চিত্রকালার টেকনিক ও স্থানীয় ঐতিহ্যের সমন্বয় ঘটাতে পেরেছেন, অনুকরণের ওপর মোটেও গুরুত্ব দেননি।”

 

সংগ্রামী জয়নুল

জয়নুল আবেদিন অবশ্য তাঁর এই শিল্প আঙ্গিকটি খুব বেশি দিন ধরে রাখেননি। পঞ্চাশ দশকের শেষ ভাগেই তিনি বরং ফিরে যান তাঁর প্রথম পযার্য়ের বাস্তবধর্মী আঙ্গিকে যার বৈশিষ্ট্য ছিল গতিময় ও শক্তিশালী রেখা। মাঝে মধ্যে তিনি বিমূর্ত প্রকাশবাদী আঙ্গিকে কিছু ছবি এঁকেছেন তবে তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য ছিল বাংলার খেটে খাওয়া কর্মীমানুষের জীবন সংগ্রামের ছবি আঁকাতেই। ১৯৫৯ সনে আঁকা “সংগ্রাম” শিরোনামে তাঁর বিশাল তেলরঙের একটি কাজ এই ধারারই প্রতীক। এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে গরুর গাড়ির এক চালককে প্রাণপণ শক্তিতে কাদার মধ্যে আটকে পড়া তার গাড়িটিকে ঠেলে তুলতে। চালকের এই সংগ্রাম, এক নিঃসঙ্গ একক মানুষের সংগ্রাম। এ যেনো সিসিফাসের সংগ্রাম। এ সংগ্রামের কোন শেষ নেই।

১৯৬৯ সনের গণ-আন্দোলন তৎকালীন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। স্বৈরশাসনের শুরু ১৯৫৮ সনের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। বাংলাদেশে (অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে) বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির দাবিই ছিল গণ-আন্দোলনের মূল কথা। তখন এদেশের চিত্রশিল্পীরাও জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ হন এবং ১৯৭০ সনের ফেব্রুয়ারি মাসে আর্ট কলেজে “নবান্ন” শীর্ষক এক বিশাল প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। আপাদমস্তক এক বাঙালি জাতীয়তাবাদী, জয়নুল, বাংলার মানুষের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। শহীদ মিনারের সামনে প্রদর্শনের জন্যে তিনি ব্যানার এঁকেছেন, ২১শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিনগুলোর জন্যে প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছেন, লিখেছেনও এগুলোতে, আর মিছিলেও তিনি অংশ নিয়েছেন। এমনকি তিনি জননেতা মাওলানা ভাসানীর সাথে ১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারি মাসে ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত বিশাল জনসভায় ভাষণও দিয়েছেন। এভাবে দেখা যায় জয়নুল ছিলেন তাঁর সমকালীন মেক্সিকোর শিল্পী ডেভিড সিকিওরসের ভাষার সেই “বিপ্লবী সমাজবাদী শিল্পী”। উল্লেখ্য, সিকিওরসের সাথে জয়নুলের দেখা হয়েছিল সিকিওরসের দেশ মেক্সিকোতে। জয়নুল ১৯৫৬-৫৭ সালে বিশ্ব ভ্রমণের এক পর্যায়ে মেক্সিকো বেড়াতে গিয়ে সিকিওরসের সাথে দেখা করেন।

১৯৬৮ সনের ‘নবান্ন’ প্রদর্শনীতে এরই জন্যে বিশেষভাবে আঁকা ৬৫ ফুট দীর্ঘ একটি স্ক্রল চিত্র নিয়ে নেতৃত্ব দেন জয়নুল আবেদিন। স্ক্রলের কাগজের প্রস্থ ছিল ৪ফুট। কালো চীনা কালি, জলরং আর মোম ব্যবহার করেছেন স্ক্রলটি আঁকতে। এই চিত্রমালায় তিনি তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস। “সোনার বাংলা”-র সুখ ও শান্তির দিনের চিত্র দিয়ে শুরু, তারপর ঔপনিবেশিক শাসনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত বাংলার ক্রম-নিঃস্বতার পরিণতি, চরম দারিদ্র্যাবস্থা, দুর্ভিক্ষ এবং অবধারিতভাবে দুঃখী দরিদ্র মানুষের গ্রামত্যাগী হয়ে শহরমুখী যাত্রা। এ এক মহা আলেখ্য।

স্পর্শকাতর দৃশ্যাবলি, হৃদয় স্পর্শী উপস্থাপনা, অত্যন্ত সহজ সরল আঙ্গিক ও ঢং অথচ অসাধারণ তার আবেদন। হাজার হাজার মানুষ ‘নবান্ন’ প্রদর্শনীতে এসে এই ছবি দেখেছে। পরে তাঁর শান্তিনগরের বাড়িতে গিয়েও অনেকে দেখেছে। তাঁর বাড়ি ছিল যেনো এক খোলামেলা জাদুঘর। সবার ছিল অবারিত প্রবেশাধিকার। তিনি দর্শকদের উৎসাহ দিতেন ‘নবান্ন’ দীর্ঘচিত্রের এক প্রান্তে তাঁদের নিজের নাম সই করতে। অসংখ্য দর্শক তাদের নামের স্বাক্ষর রেখেছে ছবিটিতে। এভাবে তিনি মানুষকে তাঁর শিল্পকলার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। এদের মধ্যে যেমন ছিলেন দেশ ও বিদেশের নামিদামি মানুষ, তেমনি ছিল বাংলার সাধারণ মানুষ।

জয়নুল আবেদিন ছিলেন মুক্তিকামী মানুষ। স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্যে যাঁরা সংগ্রাম করেন তাঁদের সবার সাথেই একাত্মতা জানাতে উৎসাহী ছিলেন তিনি। ১৯৭০ সনে যখন তাঁর বয়স প্রায় ৫৬, তিনি আরব লীগের আমন্ত্রণে ছুটে যান মধ্যপ্রাচ্যের সমর ক্ষেত্রে। আল-ফাতাহ গেরিলাদের সাথে চলে যান যুদ্ধফ্রন্টে। সেখানে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি আঁকেন, তাঁর সেসব ছবির প্রদর্শনী হয় একাধিক আরব দেশে। মুক্তিযোদ্ধারা তাতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।

প্যালেস্টাইন থেকে দেশে ফিরতে না ফিরতে জয়নুলের নিজের দেশেই এক প্রলয়ঙ্করী ঝড় আঘাত হানে দেশের উপকূলীয় এলাকায়। তিন লক্ষাধিক মানুষ এই ঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ হারায়। প্রচণ্ড মানসিক ধাক্কা খান জয়নুল আবেদিন। কিন্তু বসে না থেকে একটি রিলিফ টিমের সাথে ছুটে যান দুর্যোগাক্রান্ত এলাকায়। দুঃখী জনগণের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। পরে তিনি সেখানকার মর্মস্পর্শী দৃশ্যাবলির কিছু কিছু তুলে ধরেন তাঁর তুলিতে, কালিতে। ‘নবান্ন’ আঙ্গিকেই আকেঁন আবার একটি দীর্ঘচিত্র বা স্ক্রল। ‘মনপুরা ৭০’ শীর্ষক এই স্ক্রলটি ছিল ৩০ ফুট দীর্ঘ। কালো কালি এবং মোম সহযোগে আঁকা হয়েছে স্ক্রলের ছবি। এতে দেখানো হয়েছে স্তূপীকৃত লাশের দৃশ্য। এ ছবির সামনে দাঁড়িয়ে জয়নুল দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে বলতেন “আমরা শুধু মৃত্যুতেই একতাবদ্ধ হই” । তবে স্ক্রলটির একেবারে শেষ প্রান্তে শিল্পী স্থাপন করেন এক বলিষ্ঠ পুরুষকে। এখনো জীবিত এবং মাথা নিচু করে বসে আছে ধ্বংসস্তূপ থেকে বাঙালির সম্ভাব্য পুনরুত্থানের প্রতীক হিসেবে।

সত্তরের ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত সেরে উঠতে না উঠতেই শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। নিজ দেশে বন্দি জীবন কাটাতে বাধ্য হলেন জয়নুল। পালিয়ে পালিয়ে বেড়ালেন কিন্তু সবর্ক্ষণই তাঁর দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা আঁকড়ে ধরে রাখলেন।

মুক্তিযুদ্ধ জয়নুলের মনে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিজয় অর্জনের পর পরই তিনি পুর্ণোদ্যমে লেগে যান শিল্পচর্চা সংগঠনের কাজে। এবারে লোকশিল্প তাঁর কাছে প্রাধান্য পেতে থাকে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার জয়নুল আবেদিনকে দায়িত্ব দেন বাংলাদেশের সংবিধানটির অঙ্গ সজ্জার জন্যে। তিনি প্রবল উৎসাহের সাথে কাজটি সমাধা করেন। তাঁকে সাহায্য সহযোগিতা করেন আরো কয়েকজন শিল্পী। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক সংকট তাঁকে অত্যন্ত ব্যথিত করে। তাঁর কর্মচাঞ্চল্যে কিছুটা ভাটা পড়তে থাকে। তাঁর মন খারাপ হতে থাকে। সুপুরুষ স্বাস্থ্যবান দীর্ঘদেহী জয়নুলের স্বাস্থ্য দ্রুত ভেঙে পড়তে থাকে। তিনি যেন বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর সময় দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। তিনি ছুটলেন তাঁর আজীবন লালিত স্বপ্ন “লোকশিল্প জাদুঘর” প্রতিষ্ঠার কাজে। তাঁর ইচ্ছে ছিল এই জাদুঘরে সংরক্ষিত হবে দেশের মূল্যবান লোকশিল্প, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এখান থেকেই নতুন প্রেরণা পাবে। জয়নুল তাঁর নিজের শিল্পকর্ম সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের জন্যেও একটি চিত্রশালা প্রতিষ্ঠার কথা ভেবেছেন। এসব কাজের মন্যে সরকার সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেছিলেন। প্রয়োজনীয় কিছু অর্থ মঞ্জুরিও দিয়েছিলেন। কঠোর পরিশ্রম করে এ দুটো প্রতিষ্ঠানেরই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার শুরুটা তিনি তাঁর মৃত্যুর আগেই দেখে যেতে পেরেছেন।

দীর্ঘ ছ’মাস ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সরকার দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পীর চিকিৎসার জন্যে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মাত্র ৬২ বছর বয়সেই তাঁর জীবনাবসান হলো। অবশ্য জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি আঁকার কাজ অব্যাহত রাখেন। ১৯৭৬ সনের ২৮শে মে তারিখে তাঁর মৃত্যুর মাত্র ক’দিন আগে হাসপাতালে শুয়ে তিনি তাঁর নিজস্ব ঢঙে শেষ ছবিটি আঁকেন, দুটো মুখ, বলিষ্ঠ মোটা রেখায়, কালো কালি আর মোম ব্যবহার করে।

Abedin1971painting200px-The_struggle

সোনারগাঁও-এ লোকশিল্প জাদুঘর প্রতিষ্ঠা

জয়নুল আবেদিনের ঐকান্তিক প্রচেস্টায় নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে লোকশিল্প জাদুঘর স্থাপিত হয়। এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও গুরুত্ব রয়েছে। ঢাকা থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত সোনারগাঁও একসময়ে বাংলার অন্যতম রাজধানী শহর ছিল। মোঘল আমলে এই অঞ্চল প্রসিদ্ধ ছিল মসলিম কাপড় তৈরির কেন্দ্র হিসেবে। এখনো এ অঞ্চলে সুন্দর সুন্দর হাতের কাজ হয়, তাঁতের কাপড় তৈরি হয়।

 

নিজস্ব সংগ্রহশালা

জয়নুল আবেদিনের জন্ম সাধারণ পরিবারে। তিনি জীবনযাপনও করেছেন সাধারণ বাঙালির মতোই। সরল কিন্তু আত্মবিশ্বাসী জয়নুল সমাজের শক্তিধর ব্যক্তিত্ব এবং দরিদ্র চাষী সবার সাথেই অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দে মেলামেশা করতে পারতেন। তারাও যেনো তাঁকে আপন মানুষ মনে করতেন। তিনি ছিলেন এক অসাধারণ মজলিশি মানুষ, অক্লান্ত আড্ডা দিতে পারতেন। তাঁর কথা বলার ভঙ্গিটি ছিল একেবারেই নিজস্ব ও অননুকরণীয়। ময়মনসিংহের আঞ্চলিকতার টান ছিল ভাষায়। তিনি ছিলেন যেমন আমুদে, তেমনি রসিক। তিনি ভালোবাসতেন শিশুদের, ভালোবাসতেন ভালো খাবার, বিশেষ করে গ্রামবাংলার খাবার। তিনি ছিলেন চা প্রেমিক এবং ধূমপানে আসক্ত। নিরবচ্ছিন্নভাবে সিগারেট খেতেন। এই অভ্যাসই হয়তো শেষে তাঁর কাল হয়েছিল। তিনি প্রকৃতির সবকিছুই ভালোবাসতেন, শুধু কাক পছন্দ করতেন না। অথচ কাকের ছবিই বার বার তাঁর হাতের তুলির পরশে কী জীবন্ত রূপ পেয়েছে। তাঁর কাছে কাক ছিল “সুযোগ সন্ধানী চালাকদের প্রতীক।”

জয়নুল তাঁর নিজের ছবির গ্যালারির স্থান নির্বাচন করেন ময়মনসিংহে তাঁর অতি প্রিয় ব্রহ্মপুত্র নদের তীরের একটি পুরাতন ভবনে। এটাই তাঁর জন্যে স্বাভাবিক ছিল। ময়মনসিংহ তাঁর নিজের জেলা।১৯৭৫ সালে ময়মনসিংহে জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালাটি প্রতিষ্ঠা করেন। এখানকার নৈসর্গিক পরিবেশই গড়ে তুলেছিল তাঁর শিল্প মানস, এখানকার জেলা বোর্ডই কলকাতায় তাঁর শিল্পকলা শিক্ষাকালের প্রথম পর্যায়ের অতি জরুরি বৃত্তিটি দিয়ে তাঁকে উৎসাহিত করেছিল। তাঁর মা নিজের গলার হার বিক্রি করে সেই দূরের অচেনা শহর কলকাতায় ছেলেকে আর্ট স্কুলে পড়তে যেতে সাহায্য করেছেন। তাঁর বাবা ছিলেন ময়মনসিংহে কর্মরত ছোট দারোগা। অনেক কষ্টে তিনি ছেলের জন্যে মাসে মাত্র দশটি টাকা পাঠাতে পারতেন। সেই তিরিশের দশকেও এটা খুব সামান্য পরিমাণ টাকাই ছিল। তখন ময়মনসিংহ জেলা বোর্ড আর্থিক সাহায্য না করলে প্রায় অসম্ভব হতো জয়নুলের শিল্প-শিক্ষা গ্রহণ। কলেজের অধ্যক্ষ মুকুল দে-র জোর সুপারিশে কাজ হয়েছিল। জেলা বোর্ড জয়নুলকে মাসিক পনেরো টাকা করে বৃত্তি অনুমোদন করেছিল। এতে করে আর্ট স্কুলের জীবনটা তাঁর কিছুটা হলেও দুশ্চিন্তামুক্ত হয়েছিল।

জয়নুল আবেদিন তাঁর এসব ঋণের কথা ভোলেননি কখনও। সুযোগ পেলেই ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করেছেন। তিনি যখন তৃতীয় বর্ষের ছাত্র তখন থেকেই জয়নুল পত্র-পত্রিকার অঙ্গসজ্জা করে যে সামান্য আয় করতেন তা দিয়েই তাঁর পিতার অস্বচ্ছল পরিবারে আর্থিক অবদান রেখেছেন। তাঁর মাকে দিয়েছেন শুধু ভালোবাসা। তাঁর জন্মস্থান ময়মনসিংহকে উপহার দিয়েছেন একটি আর্ট গ্যালারি আর বাংলাদেশের জনগণকে দিয়েছেন তাঁর সারা জীবনের শিল্পকর্মের বৃহৎ সম্ভার। এসবের মধ্যে মহামূল্যবান দুর্ভিক্ষ চিত্রমালার অধিকাংশ স্কেচও রয়েছে। তাঁর এই শিল্পসম্ভার বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের জয়নুল গ্যালারিতে সংরক্ষিত।

 

পুরস্কার ও সম্মাননা

১৯৫১ সালে পাকিস্তান সরকারের বৃত্তি নিয়ে ইংল্যান্ড, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণ করেন। লন্ডনের স্লেড স্কুল অব আর্টস-এ কাজ করেন এবং তখন রয়েল ইন্ডিয়া, পাকিস্তান এ্যান্ড সিলোন সোসাইটির উদ্যোগে তাঁর পেইন্টিং এবং ড্রইং-এর এক প্রদর্শনী হয় (৩-৮ ডিসেম্বর, ১৯৫১)। লন্ডনের বার্কলী গ্যালারিতে পেইন্টিং এবং ড্রইং-এর প্রদর্শনী (১৪-২৬) জানুয়ারি, ১৯৫২)। এই প্রদর্শনীর আয়োজক ছিলেন লন্ডনস্থ পাকিস্তান হাইকমিশনার। এরিখ নিউটন প্রমুখের প্রশংসা। বেলজিয়াম, প্যারিস, আঙ্কারা ও ইস্তাম্বুলে ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনী। ইউনেস্কো আয়োজিত ও ভেনিসে আর্ট কনফারেন্সে যোগদান করেন। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তানের লাহোর শহরের আলহামরায় (১৪-২১ সেপ্টেম্বর) প্রদর্শনী, আয়োজক ছিল লাহোরের মেয়ো স্কুল অব আর্ট এবং পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিল।

১৯৫৫ সালে পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিলে আয়োজিত করাচীতে তাঁর চিত্রকলার প্রদর্শনী। জাপানের টোকিও শহরে দামারু গ্যালারিতে সপ্তাহব্যাপী প্রদর্শনী (অক্টোবর)। আয়োজক জাপানিজ ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন এবং মাইনিচি পাবলিকেশন্স। ১৯৫৬ সালে রকফেলার ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে বর্ষব্যাপী বিশ্ব ভ্রমণে যান এবং জাপান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং ইউরোপ ভ্রমণ করেন। ১৯৫৭ সালের ৮-২৯ এপ্রিল ওয়াশিংটন ডিসি’র স্মিথরোনিয়ান ইন্সটিটিউশনে তাঁর ৫২টি চিত্রকর্মের প্রদর্শনী করেন। ১৯৫৯ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট কর্তৃক সৃজনশীল কাজের জন্যে দেশের সর্বোচ্চ পদক “প্রাইড অব পারফরমেন্স” লাভ করেন। পাকিস্তান সরকার কর্তৃক “হিলাল-ই-ইমতিয়াজ” শীর্ষক বেসামরিক উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৬১ সালে সোভিয়েত সরকার কর্তৃক আমন্ত্রিত সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমণ করেন এবং সেখানে তাঁকে স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। ১৯৬৫ সালে পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি চারুকলা বিভাগ খোলার জন্যে সে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আমন্ত্রিত হয়ে সেখানে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে সাতমাস কাটান এবং বিভাগটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৬ সালে ইরানের তেহরানে আরসিডি দেশসমূহের (পাকিস্তান, ইরান ও তুরস্ক) দ্বিবার্ষিক চিত্র প্রদর্শনীতে বিচারকর্মগুলীর সদস্য হিসেবে কাজ করেন।

১৯৭০ সালে আরব লীগের আমন্ত্রণে মধ্যপ্রাচ্য সফরে যান এবং ফাত্তাহ গেরিলা মুক্তি যোদ্ধাদের সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে যান। মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহিত করার জন্যে গেরিলা যোদ্ধাদের ওপর আঁকা তাঁর ছবির প্রদর্শনী করেন বিভিন্ন আরব শহরে। ১৯৭১ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে জননেতা মাওলানা ভাসানী আয়োজিত ময়মনসিংহের এক জনসভায় জয়নুল ভাষণ দেন। জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সংগঠিত বাঙালিদের অসহযোগ আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণার প্রতীক হিসেবে “হিলাল-ই-ইমতিয়াজ” উপাধি বর্জন করেন।

১৯৭৩ সালে ভারতে বাংলাদেশের চিত্রকলার প্রদর্শনী উপলক্ষে শিল্পীদলের নেতৃত্ব দান করেন। ১৯৭৪ সালে ভারত সরকারের রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে ভারত পরিভ্রমণ করেন। এবছরই তিনি ভারতের দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সম্মানজনক ডি লিট ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে সে দেশ ভ্রমণ করেন। বাংলাদেশে চারুকলার উন্নয়নে জয়নুল আবেদিন তাঁর অবদানের যথার্থ স্বীকৃতি পেয়েছেন “শিল্পাচার্য” সম্বোধনে। এ শিরোপা তাঁকে উপহার দিয়েছে তাঁরই দেশের গুণমুগ্ধ ও কৃতজ্ঞ জনগণ।

আজীবন জয়নুল আবেদিন ছিলেন জনগণের শিল্পী এবং জনগণেরেই মানুষ। আবার তাঁকেই দেশ-বিদেশের রাষ্ট্রনায়ক এবং পণ্ডিতগণ অতি উঁচু দৃষ্টিতে দেখতেন। তাঁর অসাধারণ শিল্প-প্রতিভা এবং তাঁর মহৎ মানবিক গুণাবলির জন্যে তিনি বহু পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন, সরকার এবং জনগণের কাছ থেকে পেয়েছেন সম্মান। রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে তিনি অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন।

তথ্য ও ছবি সূত্র – আর্ট অব বাংলাদেশ সিরিজ; জয়নুল আবেদিন, প্রকাশ-১৯৯৭-জুন। লেখক-নজরুল ইসলাম। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত।

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.