শিশুদের জিয়া

শিশুদের জিয়া
————– ডঃ রমিত আজাদ

দিনটি ছিল মহান একুশে ফেব্রুয়ারী। শহীদ মিনারের ঠিক উল্টা দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা বাগানে, একটি আড়াই বছরের শিশুকে মালি বা পিওন ধমকা ধমকি করছে, ফুল ধরেছে বলে। বাবা-মা মালিকে বোঝাতে পারছে না। তারপর আমি এগিয়ে গেলাম, “কি হয়েছে, আপনি বাচ্চাটাকে ধমকাচ্ছেন কেন?” বলল, “বাচ্চাটা ফুল ছিড়ছে তাই”। আমি বললাম, “ফুল তো ছিড়ে নাই, ধরেছে মাত্র”। ছোট শিশুটির বাবা বলল, “ওর তো মাত্র আড়াই বছর বয়স, একটু ফুল ধরে দেখতে চেয়েছে”। সেই মালি/পিওন বলল, “না, এখানে ফুলে হাত দেয়া নিষেধ, ফুল থাকবে সবাই দেখবে”। আমি বললাম, “ছোট বাচ্চা, এগুলো তো আর বুড়োদের জন্য না। বাচ্চারা দেখবে, হাসবে, খেলবে। ওদের জন্যই তো সবকিছু। পিওনটা গজগজ করতে করতে চলে গেল। এই হলো আমাদের দেশের সামগ্রিক অবস্থা, শিশুদের প্রতি আবেগ, নজর, ভালোবাসার অনেক অভাব।

কিন্তু এই আমাদের দেশেই এমন একজন রাষ্ট্রপতি ছিলেন, যিনি বুঝতে পেরেছিলেন, শিশুদের ভালো না বসলে দেশ বা জাতিকে ভালোবাসা হয়না। যেকোন জাতি গঠনের শুরু করতে হবে শিশুদেরকে দিয়ে। তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতি হলেন জিয়াউর রহমান। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, জাতির ভবিষ্যৎ হলো শিশুরা। যে কোন জাতি গঠন শিশুদেরকে দিয়েই শুরু করতে হবে। সেই উদ্দেশ্যেই তিনি বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেন।
১। শিশুদের সাংস্কৃতিক ও নানা জাতীয় মেধা চর্চার জন্য শিশু এ্যকাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন,
২। দেশের প্রতিটি বৃহত্তর জেলায় এ্যকাডেমির শাখা স্থাপন করেন,
৩। শিশুদের সাংস্কৃতিক প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে নতুন কুঁড়ি নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন, যা বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচার হতো। পরবর্তিকালে অনেক সুখ্যাত শিল্পি ঐ নতুন কুঁড়িরই প্রডাক্ট,
৪। সারাদেশে মেধাবী শিশু ছাত্রদের অনুপ্রেরণা দেয়ার লক্ষ্যে তাদের জন্য একটি সম্মেলনের আয়োজন করেন এবং সশরীরে সেখানে উপস্থিত হয়ে তাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করেন। সেই সম্মেলনে অংশগ্রহনকারী মেধাবী শিশুদের জন্য দিনটি ছিল স্মরণীয়,
৫। মেধাবী শিশুদের (ধনী হোক দরিদ্র হোক) লালণের নিমিত্তে নির্মিত সামরিক মেরিট স্কুল ক্যাডেট কলেজের সংখ্যা চারটি থেকে আটটিতে উন্নিত করেন,
৬। সুস্থ অর্থবহ ও উন্নত চলচিত্রের নির্মানের লক্ষ্যে তিনি রাষ্ট্রীয় অনুদানের ব্যবস্থা করেন। এই সময়ে বেশ কিছু ভালো ভালো শিশু চলচিত্র নির্মিত হয়, যেমন- ছুটির ঘন্টা, ডুমুরের ফুল, ডানপিটে ছেলেটি, অশিক্ষিত, এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী, ইত্যাদি,
সেই সময় বিটিভিতেও খুব সুন্দর সুন্দর শিশুতোষ অনুষ্ঠান হতো। এরমধ্যে একটি ধারাবাহিক নাটক ছিল, ‘রোজ রোজ’।
৭। জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালকে বাংলাদেশ শিশু বর্ষ ঘোষণা করেন। পুরো বছর জুড়ে সারাদেশে নানা রকম কর্মকান্ড হয়।
৮। শিশু পার্ক – সেনাবাহিনীর চাকুরী জীবনে তিনি জার্মানীতে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। সেই সময় তিনি নিশ্চয়ই সেখানকার অত্যাধুনিক শিশু পার্কগুলো দেখেছিলেন। তাছাড়া রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়েও তিনি একাধিক দেশ সফর করেছিলেন এবং সেসব দেশের শিশুপ্রেম ভালোভাবে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি তাই ঢাকাতে একটি অত্যাধুনিক শিশু পার্ক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিলেন। যেই চাওয়া সেই কাজ, খুব দ্রুতই কাজ শেষ করে ১৯৭৯ সালে উদ্ধোধন করলেন ‘ঢাকা শিশু পার্ক’। হুমড়ি খেয়ে পড়ল শুধু শিশুরা নয় পুরো ঢাকা শহর। শিশু, কিশোর, যুবা এমনকি প্রৌঢ়-বৃদ্ধরাও বাদ যায়নি। আমাদের কল্পনাতেই ছিলনা এমন কিছু একেবারে বাস্তব রূপে ধরা দিল। এই পার্ক দেখে প্রতিটি শিশুরই মনে হয়েছিল, এ যেন এক রূপকথার জগৎ।
এই পার্ক নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনাও আছে।
এক পাগলাটে যুবক, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী একটি আভ্যন্তরীণ বিমান হাইজ্যাক করে খেলনা পিস্তল দিয়ে। তারপর পাইলটকে বাধ্য করে বিমানটি কলকাতায় নিয়ে যেতে। কি আর করা? পাইলট তো আর বুঝতে পারেনি যে, সেটা খেলনা পিস্তল। যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে ছিনতাইকারীর কথাই শোনে। ছিনতাইকারীর কাছে তার দাবী শুনতে চাইলে সে বলে, “ঢাকার শিশু পার্কটি চরম বিলাসিতা, বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে এমন পার্কের প্রয়োজন নেই। আমি পার্কটি বন্ধ করার দাবী জানাচ্ছি”। এত সুন্দর একটা পার্ক, যা দেখে শিশুরা আনন্দে ভাসছে সেটা সে বন্ধ করার দাবী জানালো! এই একটা সমস্যা। আমরা কোন ভালো কিছুকে খুব সহজে গ্রহন করতে পারিনা।
৯। শিশুদের অধ্যায়নের সুবিধার্থে শাহবাগের পাবলিক লাইব্রেরীর পাশেই তিনি একটি শিশু গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন।

জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় এলেন তখন আমি পাঁচ পেরিয়ে ছয় বছরে পা রেখেছি। পত্রিকায় উনার বড় মাপের একটা ছবি দেখলাম, এটা মনে আছে। তার কিছুকাল পরে শুনলাম, তিনি ঢাকার মগবাজার, মধুবাগে আসবেন। ব্যাস প্রবল উৎসাহ পড়ে গেল। নির্দিষ্ট দিনে পথের পাশে দাঁড়িয়ে গেলাম। কিছু সময় অপেক্ষা করার পর দেখলাম, খোলা জীপে সামরিক পোষাকে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি, ধীরে ধীরে আমাকে অতিক্রম গেল জিপটি । এই প্রথম চোখের সামনে দেখলাম, সুদর্শন, সুপুরুষ, জনপ্রিয় এই রাষ্ট্রপতিকে। সেই ভালোলাগার অনুভূতি আমি কোনদিন ভুলব না। সম্ভবতঃ আরো একবছর পর তিনি আরেকবার এলেন
ঢাকার মগবাজার, মধুবাগে। আমি তখন মগবাজার টি এন্ড টি স্কুলের ছাত্র। স্কুলটির অবস্থা শোচনীয় ছিল। হেডমাস্টার দেখলেন এই তো সুযোগ, তিনি এক ফন্দি আটলেন। রাষ্ট্রপতি যাওয়ার পথে স্কুলের ছাত্র শিক্ষক মিলে তাঁর পথ আটকাবে যাতে কিছু অনুদান পাওয়া যায়। করলেনও তাই। রাষ্ট্রপতির গাড়ি বহরের সামনে ছিল মটর সাইকেল আরোহী গার্ডরা। তারা মৃদু হেসে থেমে গেলেন। একটু পর একটা জীপ এসে থামলো। তার পিছনে বাকী গাড়ীগুলোও থামলো। এর মধ্যে একটি ছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গাড়ী। এসময় জিয়াউর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন যে, শিশুদের অনেকেই উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছে উনার সাথে হ্যান্ডশেক করার জন্য। তিনি তার ডান হাতটি জানালার বাইরে বের করে দিলেন। বেশ কয়েকজন ছুটে গেল উনার সাথে হাত মিলানোর জন্য। আমিও ছুটে গিয়ে উনার সাথে হাত মিলিয়েছিলাম। সেই অনুভূতি আমি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মনে রাখবো।

খোলা জীপ থেকে একজন সুঠামদেহী সেনা কর্মকর্তা নেমে এসে কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন, “এভাবে রাষ্ট্রপতির গতি রোধ করা যায়না, আপনারা সরে দাঁড়ান”। পায়ে পায়ে সরে গেল সবাই। কিন্তু জিয়াউর রহমান ঘটনাটি মনে রেখেছিলেন, এবং পরে তিনি আমদের স্কুলের জন্য অনুদান পাঠিয়েছিলেন।

তৃতীয়বার উনাকে দেখেছিলাম, বাংলাদেশ শিশু বর্ষ ১৯৭৯ সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে, ঢাকা স্টেডিয়ামে। অনুষ্ঠানটি বর্নাঢ্য হয়েছিল, এবং স্বয়ং রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি তাকে আরো প্রানবন্ত করেছিল।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শিশুপ্রেমের আরেকটি ঘটনা আমি শুনেছিলাম আরেকজনার কাছ থেকে। তিনি বর্তমানে একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য্য। সে সময় জিয়াউর রহমান রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না। ছিলেন সেনা উপ-প্রধান ও বাংলাদেশ ক্যাডেট কলেজ সমূহের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে কি একটা মনমালিন্য হলো সিনিয়র জুনিয়রদের মধ্যে। মোটামুটি সিরিয়াস পর্যায়েই দাঁড়ালো। প্রিন্সিপাল বললেন আগামীকাল এর বিহিত করবেন। সবাই বুঝতে পারছিল, সিভিয়ার এ্যকশন নেবেন প্রিন্সিপাল, দু’য়েকজনকে কলেজ থেকে উইথড্রও করতে পারেন। প্রমাদ গুনছিল অনেকেই।

পরদিন সকালে হাউজের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল ক্যাডেটরা, এরকম সময় তারা বিস্মিত হয়ে দেখলো, ‘চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, সারা বাংলাদেশের উপ-সেনাপ্রধান ও ক্যাডেট কলেজ সমূহের দন্ডমুন্ডের কর্তা জিয়াউর রহমান। সংবাদ পেয়ে তিনি নিজেই চলে এসেছেন। তিনি কিছুক্ষণ প্রিন্সিপালের সাথে কথা বললেন, তারপর জুনির ক্লাসের (ক্লাস এইট অথবা নাইন) এই গোলযোগের রিং লিডারদের ডেকে সামনে দাঁড় করালেন। উনার হাতে ছিল একটা কেইন, আপন পিতার মত শাসনের সুরে তাদের তিরষ্কার করলেন এবং তাদের প্রত্যেকের পিঠে মৃদু চালালেন তার কেইন। আর সিনিয়রদেরও বাদ দিলেন না। তাদের আলাদা করে ডেকে নিয়ে গেলেন প্রিন্সিপালের রূমে, এবং সেখানে তাদেরকেও তিরষ্কার ও সাবধান করে দিলেন।

নিজের সন্তানদেরও কোন প্রশ্রয় দেননি তিনি। পত্রিকায় পড়েছিলাম, একবার তারেক রহমান বায়না ধরেছিল, বাবার সাথে বিদেশ সফরে যাবে। পিতা জিয়া সরাসরি নিষেধ করে দিয়েছিলেন। এরকম নিয়ম নেই, সুতরাং এটা কখনোই সম্ভব নয়। তারেক তখন বলল যে, নেপালের রাজা যখন বাংলাদেশ সফরে এলেন, তখন তাঁর সাথে তো তার ছেলে ছিল। ভীষণ রাগান্বিত হয়ে জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, “তোমরা কোন রাজা-বাদশার ছেলে নও”।

‘এমন একটি পৃথিবী কল্পনা করুন যেখানে কোন শিশু নেই, সেই পৃথিবীতে কি অফিস-আদালত কাজ করবে? ট্রেন চলবে? বিমান উড়বে? পেটের দায়ে সবই হবে হয়তো। কিন্তু এই সব কিছুর কোন অর্থ থাকবে না। কারণ আমরা যা কিছু করি, সবই ভবিষ্যতের জন্য করি, আর ভবিষ্যত মানেই শিশুরা।’

আমি শিশু হিসাবে তাঁকে যেমন দেখেছি। তাতে মনে হয়েছে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, উপরের কথাগুলোর মর্মার্থ বুঝতে পেরেছিলেন। আর তাই শিশুদের জন্য তিনি যতদূর সম্ভব অবদান রাখার চেস্টা করেছেন।

শিশু জিয়ার নাম ছিল কমল। আজ সেই কমলের জন্মদিন। আসুন আমরা সবাই মিলে তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

যেদিন তুমি এসেছিলে ভবে
কেঁদেছিলে তুমি আর হেসেছিল সবে
এমন জীবন ভবে করিবে গঠন
মরনে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন ।

মন্তব্য করুন..

১ মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

*

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.