Categories
অনলাইন প্রকাশনা

সমস্যাটা কি ভাষায়, না সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে?

সমস্যাটা কি ভাষায়, না সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে?

হিন্দি ও ঊর্দু দুটি ভাষাই আমি অল্প বয়স থেকেই বুঝতে পারি। বলতে পারি কম, মূলতঃ প্রাকটিসের অভাবে। লিখতে ও পড়তে পারিনা। ঐ দুটি ভাষা আমি জানি বলে আমার কাছে কখনোই নিজেকে ছোট মনে হয়নি। বরং ঐ ভাষা দুটি জানার কারণে আমি অনেক সুন্দর সুন্দর গান ও শায়ের বুঝতে পেরেছি। ইদানিং তাদের অনুবাদও করি। অনেক সুন্দর সুন্দর ম্যুভি বুঝে দেখে উপভোগ করতে পেরেছি। ‘লগন’ ও ‘নিকাহ’ সিনেমা দুইটি আমার মনে চিরকালের জন্য দাগ কেটে আছে। এখন আফসোস হয়, কেন ঐ ভাষা দুটি পড়তে শিখলাম না, তাহলে অারো অনেক কিছুই পড়তে পারতাম।
ফারসী ও আরবী না জানায়ও আমার মনে আফসোস রয়েছে, কারণ ঐ দুইটি ভাষায় লিখিত হয়েছে কালজয়ী অনেক বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্য গ্রন্থ। যা আমি সরাসরি পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।

রুশ ভাষা বুঝতে, বলতে, লিখতে ও পড়তে পারি। এর দ্বারা আমি যারপরনাই উপকৃত হয়েছি, হচ্ছি। অনেক অনেক বই আমি পড়তে পারছি ঐ ভাষা জানার বদৌলতে। সেই জ্ঞানের আলোর কিছুটা বিতরণও করতে পারছি।
ইংরেজী ভাষা জানা থাকায় উপকৃত হচ্ছি সব চাইতে বেশি, কারণ গত দুইশত বছর যাবৎ এই ভাষাটির প্রভাব সব চাইতে বেশী থাকায়, এই ভাষায় লিখিত আধুনিক গ্রন্থগুলির সংখ্যা সম্ভবত সবচাইতে বেশী।

আমি লক্ষ্য করে দেখেছি যে কিছু কিছু শব্দ বাংলা, হিন্দি ও ঊর্দু তিনটি ভাষাতেই রয়েছে (অরিজিন কোনটি সেটা সব সময় নিরুপন করা যায়না বা প্রয়োজনও মনে করি না)। আবার কিছু কিছু শব্দ অনেক ভাষাতেই রয়েছে যেমন ‘আজাদ’ শব্দটি ফারসী, তাতার, তুর্কী ভাষা সহ মধ্য এশিয়ার অনেক ভাষাতেই রয়েছে।

প্রতিটি ভাষারই স্বকীয়তা রয়েছে। সেই স্বকীয়তার দুর্বলতা ও সবলতা দুই-ই রয়েছে। আজ আমাকে একজন জিজ্ঞাসা করলেন,” ইংরেজী Vary শব্দটির বাংলা অনুবাদ কি হবে?” আমি এক শব্দে তার অনুবাদ করতে পারলাম না। এরকম আরো অনেক শব্দই রয়েছে। তাহলে ঐ শব্দগুলি যেহেতু প্রচলিত ও বোধগম্য তাই যদি শব্দগুলি
আমরা সরাসরি ঐ ভাষা থেকেই ব্যবহার করি সমস্যা কোথায়? অন্যান্য ভাষার দ্বারা যদি আমার ভাষা প্রভাবিত হয়, তাতে আমার ভাষার সমৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশী। আমাদের বাংলা ভাষায় প্রচুর বিদেশী শব্দ রয়েছে, এর মধ্যে ফারসী শব্দই রয়েছে কয়েক হাজার। এরা বাংলা ভাষাকে করেছে সমৃদ্ধ ও চলিষ্ণু।

এবার আসি সংস্কৃতি প্রসঙ্গে। অন্য কোন দেশ জাতি বা গোষ্ঠির সংস্কৃতি দ্বারা যদি আমি/আমরা প্রভাবিত হই, সেটা ভালো না মন্দ? প্রশ্নটা খুব সম্ভবত জটিল। তবে এই প্রভাব যুগ যুগ ধরে যে চলছে এটা অনস্বীকার্য। অন্য সবকিছুর মতো সংস্কৃতিও পরিবর্তনশীল। সরলভাবে বলা যায় যে, অন্যদের সংস্কৃতির মধ্যে যদি ভালো কিছু থাকে তা গ্রহন করতে অসুবিধা নাই। তবে ভালো-মন্দের ক্রাইটেরিয়াগুলো কে/কারা কিভাবে ঠিক করবে সেটাও একটা বড় প্রশ্ন।

আমার ছোট বেলায় মনে পড়ে কোন হিন্দি ম্যুভির নাম-গন্ধও ছিলো না। তবে মুরুব্বীদের কাছ থেকে দিলিপ কুমার নার্গিসদের নাম শুনেছিলাম। হতে পারে যে উনাদের সময়ে পেক্ষাগৃহে কিছু কিছু হিন্দি ম্যুভি চলেছে। তবে আশির দশকে আগমন হয় ভিসিআর প্রযুক্তির আর তার হাত ধরে বাংলাদেশে ঢোকে বোম্বাইয়া ফিল্মের রঙিন কল্পকথা। প্রশ্নটা হলো যে, ঐ প্রযুক্তির হাত ধরে তো অন্যান্য ভিনদেশী ফিল্মও ঢুকতে পারতো, সেটা হলো না কেন? স্রেফ স্রেফ উত্তর, হিন্দি ফিল্মি কাহিনী, গান, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের গায়ের রং-ঢং আবেগ ইত্যাদি আমাদের সংস্কৃতির খুব কাছাকাছিই ছিলো, তাই দর্শকদের ঝোঁকটা ঐ দিকেই বেশী ছিলো। আর ভাষাটা? হ্যাঁ, হিন্দি ভাষাটাও আমাদের বাংলা ভাষার কাছাকাছিই তাই শুরুতে কিছুটা আঁকাবাঁকা মনে হলেও কিছুদিন শোনার পর সবাই-ই বুঝতে শুরু করে, যেটা ফারসী বা সিংহলী, বা তামিল ভাষার ক্ষেত্রে হওয়া সম্ভব ছিলো না। ঊর্দু ফিল্মও ঢোকে কিছু, তবে বেশিরভাগ দর্শকই ঊর্দু আর হিন্দির পার্থক্য করতে পারতো না, একই মনে করতো।

ঐ হিন্দি ফিল্মি জগতে সংস্কৃতিগত পার্থক্য যেটা আমরা লক্ষ্য করেছিলাম তা হলো তাদের নায়িকাদের পোষাকের ঢং। অমন আঁটশাট ও কিছুটা সংক্ষিপ্ত পোষাকের প্রচলন তখন আমাদের দেশে ছিলো না। এবং সেই সময়ের প্রেক্ষিতে ওগুলোকে আমাদের দেশে বেহায়া পোষাকই মনে করা হতো। হিন্দি ফিল্মের নাচ-গানের ভঙ্গিও আমাদের কাছে ছিলো দৃষ্টিকটু ও অশালীন। নায়ক-নায়িকার আলিঙ্গন ও চুম্বন দৃশ্যও খুব বেশরম মনে হতো আমাদের কাছে। তাই হিন্দি ছবি মুরুব্বিদের সামনে ও পারিবারিক পরিবেশে তখন দেখা সম্ভব হতো না, বা বিব্রতকর মনে হতো।

আস্তে আস্তে গুটি গুটি পায়ে পারিবারিক পরিবেশে হিন্দি ফিল্ম দেখা শুরু হলো। ঐ সকল দৃশ্যও গা সওয়া হতে শুরু হলো। যেই পোষাকের ঢং এক সময় আমাদের দেশে বেহায়া-বেশরম মনে করা হতো সেইসব পোষাকও প্রচলিত হতে শুরু করলো আমাদের রক্ষণশীল সমাজেও। র‍্যাগিং নামক বিষয়টি আমাদের দেশে প্রায় ছিলো না। এখন তো শুনি সবখানেই আছে। হিন্দি ফিল্ম থেকেই আমদানীকৃত এটা। আর এগুলোই বোধহয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন!

এখন কি করবো আমরা? কিতাব লিখে একটি ছাঁচে ঢেলে দিয়ে আমাদের সংস্কৃতিকে বিধিবদ্ধ করে ফেলবো? (যাতে তা আর পরিবর্তিত না হয়) না কি তাকে মুক্তি দিয়ে ছেড়ে দেব, নদীর মতো এঁকেবেঁকে চলে যাক সেদিকে খুশী? কঠিন সওয়াল!

—————————————- রমিত আজাদ

তারিখ: ১২ই জানুয়ারী, ২০১৮
সময়: রাত ২ টা ৪৫ মিনিট

ফেইসবুকে লিখেছিলাম

মন্তব্য করুন..

By ডঃ রমিত আজাদ

মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনুলোতে, অজস্র তরুণ কি অসম সাহসিকতা নিয়ে দেশমাতৃকাকে রক্ষা করেছিল!
ব্যাটা নিয়াজী বলেছিলো, “বাঙালী মার্শাল রেস না”। ২৫শে মার্চের পরপরই যখন লক্ষ লক্ষ তরুণ লুঙ্গি পরে হাটু কাদায় দাঁড়িয়ে অস্র হাতে প্রশিক্ষন নিতে শুরু করল, বাঙালীর এই রাতারাতি মার্শাল রেস হয়ে যাওয়া দেখে পাকিস্তানি শাসক চক্র রিতিমত আহাম্মক বনে যায়।
সেই অসম সাহস সেই পর্বত প্রমাণ মনোবল আবার ফিরে আসুক বাংলাদেশের তরুণদের মাঝে। দূর হোক দুর্নীতি, হতাশা, গ্লানি, অমঙ্গল। আর একবার জয় হোক বাংলার অপরাজেয় তারুণ্যের।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.