হ্যাপী নিউ ইয়ার ২০২২ (পর্ব -২)

হ্যাপী নিউ ইয়ার ২০২২ (পর্ব -২)
——————————————- রমিত আজাদ

আমি থার্ড ইয়ারে উঠে লক্ষ্য করলাম যে, ১৭/১৮ বৎসর বয়সের ছোটখাটো গড়নের তানিয়া নামের মেয়েটির শরীরটা ধীরে ধীরে ভরাট হতে শুরু করলো। মনে হলো ও যেন কিছুটা লম্বাও হলো (যদিও ওটা আমি শিওর না)! মুখভাবে কি এলো আমি জানিনা, হতে পারে এটা ম্যাচুরিটির বিউটি! কিন্তু মনে হলো ওর সৌন্দর্য্যের জেল্লা যেন বেড়েই চলছে। অতীতে ওর ‘চিক বোন’-এ দুই-একটা স্পট ছিলো, সেটাও আর থাকলো না। কিন্তু ওর চেহারা ও চাউনিতে যে ইনোসেন্স ছিলো, সেটা রয়েই গেলো!

একদিন আড্ডায় বসে সহপাঠিরা আলাপ করছিলাম। তো ছেলেদের একান্ত আলাপগুলো তো মেয়েদেরকে নিয়েই হবে!
সাশা: বুঝলি, আমাদের সহপাঠিনীদের সকলেরই বোধহয় এতদিনে বয়ফ্রেন্ড হয়ে গেছে।
মিশা: কয়েকজনের তো বিয়েই হয়ে গেলো!
আলবার্ট: ইন্টারেস্টিং হলো যাদের বিয়ে হয়েছে, তারা কিন্তু আমাদের সহপাঠিদেরকেই বিয়ে করেছে।
আলেগ: আনিয়া-র তো এখনো বিয়ে হয়নাই তাইনা?
আমরা আড়চোখে আলেগের দিকে তাকালাম। আনিয়ার সাথে তো আলেগেরই প্রেম ছিলো ফার্স্ট ইয়ারে থাকতে। যতদূর জানি তাদের মধ্যে দৈহিক সম্পর্কও ছিলো! তারপর কি হলো জানি না, দীর্ঘাঙ্গীনী আনিয়াকে দেখলাম একটা অপেক্ষাকৃত বয়স্ক লোকের সাথে ঘোরাফেরা করছে। তবে আনিয়া মেয়েটি ভদ্র এবং বেশ সুন্দরী।
আমি: আলেগ, আনিয়াকে তো মাঝে মাঝে একজন পুরুষের সাথে দেখি।
আলেগ: শুনেছি। তা ওরা বিয়ে করে না কেন? আনিয়া থার্ড ইয়ারে পড়ে, এখন তো ওর বিয়ের সময় হয়ে গিয়েছে!
আমি ওকে কি বলবো ঠিক বুঝলাম না। আনিয়া বিয়ে করে না কেন, তার আমি কি জানি? যাইহোক, আমি এই প্রশ্নের জবাবে আপাতত: মৌনতা অবলম্বন করলাম।
সাশা: যাইহোক আর তাই তাই হোক। আমাদের ক্লাসের বেশিরভাগ মেয়েরই ফ্রেন্ডশিপ হয়ে গিয়েছে। পুরুষের সান্নিধ্য-সুখ তারা পেয়ে গিয়েছে। তবে, তানিয়াকে নিয়ে কথা আছে।
আমি: তানিয়াকে নিয়ে কি কথা? ওর তো কখনো কোন বয়ফ্রেন্ড দেখি নাই!
সাশা: সেটাই তো। (রহস্য করে বললো)
আমি: কি?
সাশা: হা হা হা! মেয়েটা এখনো ভার্জিন!
আমি: (বিরক্ত হয়ে) তা তুই কি করে বুঝলি? চেক করেছিস নাকি?
সাশা: চেক করা লাগে না। ওর চেহারা দেখলেই তো বোঝা যায়।

আমি ভাবনায় পড়ে গেলাম। চেহারা দেখে কি করে এই বৈশিষ্ট্য বোঝা যায়?

পাঁচ তলার যেই রুমটাতে আমি রাজার হালে একা একা থাকতাম, ওর উল্টা দিকেই ছিলো একটা বড় ফাঁকা জায়গা। বিল্ডিং-এর প্রতিটি ফ্লোরেই এমনটা রয়েছে। এটা ডরমিটরি কনস্ট্রাকশনের নিয়ম, ওরকম একটা ফাঁকা জায়গা ইমার্জেন্সি কেইসে খুব কাজে লাগে। কিন্তু আপাতত: অ-ইমার্জেন্সি কেইসে ঐ জায়গাটা যেই পারপাজে ইউজ করা হলো, তা আমার জন্য কিছুটা বিরক্তিকরই ছিলো! উইকএন্ডে ওখানে নিয়মিত ডিসকো-টেকা আয়োজিত হতে শুরু হলো। শুক্রবার রাতেই এগারোটার পর থেকেই শুরু হতো নাচ-গান, চলতো ভোর অবধি। উচ্চ সাউন্ডবক্সের আওয়াজে আমার শান্তিতে ঘুমের বারোটা বাজতো! আমি দুইএকসময় বেরিয়ে, স্বল্প সময়ের জন্য রূপসীদের নাচ দেখতাম এইটুকুই। পার্টিসিপেট করতাম না কখনো। গার্লফ্রেন্ড নাই, কেউ নাই, কার সাথে কি নাচবো? যার-তার সাথে নাচতে আমার ভালো লাগতো না! বাই দ্যা ওয়ে তানিয়াকেও ওখানে কখনো দেখি নাই, যদিও ওর পাশের রুমটাই তানিয়ার।

নাচঘর তো দূরের কথা, ওকে তো করিডোরে বের হতেই দেখতাম না খুব একটা। মেয়েটা মনে হয় শুধু পড়ালেখা নিয়েই থাকে! তবে কিচেনে দেখতাম মাঝে মাঝে। খুব মনযোগ দিয়ে রান্না করতো! কিচেনে দেখা হলে আমি ওর সাথে টুকটাক কথা বলতাম। যেমন, “হ্যালো! কেমন আছো?” উত্তরে
তানিয়া বলতো, “হ্যালো! ভালো আছি।”
আমি: কি রান্না করছো?
তানিয়া: রাতের খাবার।

ব্যাস এই টুকটাক আলাপের বেশি হতো না।

এর মধ্যে একদিন ‘ফ্যাকাল্টি ডে’ হলো। ফিজিক্স ফ্যাকাল্টি-টার নামডাক ছিলো। সব ইন্টেলিজেন্টরা ঐ সাবজেক্টে পড়তো, তাই ক্রীড়া-সংস্কৃতি ইত্যাদি প্রতিযোগিতায়ও ভালো করতো এই ফ্যাকাল্টি। তাই ‘ফ্যাকাল্টি ডে’-টা বেশ ঘটা করেই পালন করা হতো। দুপুর বেলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচাইতে বড় অডিটোরিয়ামে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলো। রেক্টর, ডীন ও অন্যান্য অধ্যাপক-রা অতিথি ছিলেন। স্থানীয় ফটকাবাজ সংসদ সদস্যটাও এসেছিলেন। বন্দর নগরী ওদেসার ‘ওদেসা বিশ্ববিদ্যালয়’ থেকেও কিছু স্টুডেন্ট এসেছিলো অনুষ্ঠানে অংশ নিতে। আমি গিয়ে বসলাম দোতলার গ্যালারীতে। অনুষ্ঠান জমকালোভাবে শুরু হলো। বেশ উপভোগ্য, হঠাৎ দেখলাম তানিয়া মঞ্চে উপস্থিত। আর দুজন তরুনীর সাথে সে নাচছে! এমন ইনট্রোভার্ট মেয়েটির একেবারে মঞ্চে উপস্থিতি দেখে আমি তো অবাক! মনযোগ দিয়ে দেখতে লাগলাম ও কি করে। একটা হালকা পিংক কালারের টপস ও হালকা নীল রঙের স্কার্ট পড়েছিলো তানিয়া। ওকে আমি সব সময়ই গোড়ালী অব্দি লং স্কার্টে দেখেছি। তবে আজ দেখলাম খাটো স্কার্টে! কিন্তু সেটা মিনিস্কার্ট ছিলো না। ছিলো হাটু অব্দি স্কার্ট। কুঁচি দেয়া কাপড়। স্কার্টের নিচে এই প্রথম দেখলাম ওর দুধে-আলতা রঙের সুন্দর পদযুগল! ক্লাসিকাল গানের তালে তালে মেয়েটি নাচলো-ও খুব সুন্দর! আমি তো রীতিমত মুগ্ধ!

অনুষ্ঠান শেষে আমি যখন ডরমিটরিতে ফিরছিলাম তখন দেখলাম প্রচন্ড বাতাস বইছে শহরে। আমার তখন কবি এন্ড্রু ইয়াং-এর ‘এ উইন্ডি ডে’ কবিতাটি মনে পড়লো। স্টুডেন্ট টাউনের মেইন রোডে এসে কিছুদূরে দেখলাম তানিয়া ও আমাদের ক্লাসের আরো দুইএকজন তরুণী দাঁড়িয়ে আছে ঐ পথে। বোধহয় ওরা ডরমিটরিতে যাচ্ছে। কিন্তু বেয়ারা বাতাস ওদের সমস্যা সৃষ্টি করছে। তানিয়াকে দেখলাম শক্ত হাতে ওর স্কার্ট-টি ধরে রেখেছে। আমার ওর জন্য মায়াও লাগলো, আবার মনে মনে হাসিও পেলো। বেচারি ঐ একটা দিনই অমন খাটো স্কার্ট পড়েছে, আর ঐদিনই কিনা এলো বেয়াড়া উইন্ডি ডে! আমার মনে পড়লো যে, কোন এক উইন্ডি ডে-তে আমি একটি বাস স্টপেজ থেকে নেমে কোথাও যাচ্ছিলাম পায়ে হেটে। আমার সামনে কিছুটা দূরত্বে হেটে যাচ্ছিলো একজন তরুণী। তার পরনেও ছিলো হাটু অব্দি খাটো স্কার্ট। সামান্য ভারী শরীরের ছিলো তরুণীটি। হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া এসে মেয়েটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার স্কার্ট উড়িয়ে নিলো। বেয়াড়া বাতাসে স্কার্ট উড়ে অন্তর্বাস দৃশ্যমান হয়েছিলো তার! সাদা রঙের অন্তর্বাসটি কয়েক সেকেন্ডের জন্য দৃষ্টি কেড়েছিলো আমার। পুরো দৃশ্যটাকে ‘মেরিলিন মনরো’ বা ‘সোফিয়া লোরেন’-এর সেই দমকা হাওয়া দৃশ্যের একটা লাইভ রেপ্লিকা বললে ভুল হবে না! সাথে সাথে তরুণীটি স্কার্ট সামলে পিছনে তাকালো। দেখলো যে, ঐ পথে আমি ছাড়া আর কোন দর্শক ছিলো না। আমার বিব্রত আঁখির দৃষ্টিতে সেও হয়তো বিব্রত হয়েছিলো!

আজ কি খাটো স্কার্ট পড়া তানিয়ার কপালে এমন টাইপ কোন দৃশ্য রয়েছে? দেখলাম যে না, তানিয়া হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে রাখলো তার স্কার্ট, যাতে কিছুতেই উড়তে না পারে তার নীল রঙের বাহারী স্কার্ট-টি। আমার কিন্তু ভীষণ ইচ্ছে করছিলো যেন ওর স্কার্ট উড়ে যায়। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে অপেক্ষাও করেছিলাম। কিন্তু খুব সতর্ক ছিলো তানিয়া। বুঝলাম মেয়েটি আসলেই শালীন। তানিয়া শক্ত হাতে স্কার্ট সামলে ধীরে ধীরে ডরমিটরিতে পৌঁছে গেলো।


সামার এই দেশে বেশিদিন থাকে না। উষ্ণতার দুই কি তিনমাস দ্রুতই পার হয়ে যায়। তারপর নেমে আসে তুহীন শীত! আর ঐ শীতে চাইলেও কেউ আর পথেঘাটে মিনিস্কার্ট, খাটোস্কার্ট পড়তে পারবে না! শীতের সময়টায় এখানে এক ধরনের ডিপ্রেশন কাজ করে! এম্নিতেই প্রচন্ড ঠান্ডা, তার উপরে আকাশ চব্বিশ ঘন্টা থাকে মেঘে ঢাকা, এতটাই অন্ধকার থাকে যে দিন আর রাতের পার্থক্য খুব একটা বোঝা যায় না। জীবন বন্দি হয়ে যায় ঘরের ভিতরে। ইয়াংদের লাইফ একরকম, কিন্তু বয়স্কদের অনেকেই এই ওয়েদারে খুব আপসেট হয়ে পড়ে!

হয়তো শীতকালের এই ডিপ্রেশনের কথা ভেবেই ইউরোপীয়রা একটা অজুহাত বের করেছে ফুর্তিফার্তি করার। এর নাম ‘নিউ ইয়ার সেলিব্রেশন’! বছরের এমন একটা সময়ে জুলিয়ান অথবা গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নওরোজ পালিত হয়, যখন ইউরোপীয় তুহিন শীত একেবারে তুঙ্গে। আমাদের ছাত্রদের তখন অটাম সেমিস্টার শেষ হয়ে শীতের এক্সাম সেশন চলে। আর এক্সাম সেশনের শেষের দিকে পহেলা জানুয়ারীতে ঠাঁই পায় এই নিউ ইয়ার সেলিব্রেশন।

এ্যাস্ট্রোনমিকালি দেখলে অবশ্য নতুন বৎসর শুরু হয় ২২শে ডিসেম্বর থেকে। ২১শে ডিসেম্বর হলো উত্তর গোলার্ধে সবচাইতে ছোট দিন, আর সবচাইতে বড় রাত। একর্ডিংলি, বাইশে ডিসেম্বর থেকে দিনের দৈর্ঘ্য বড় হতে থাকে। তাহলে ওটাই তো প্রকৃত অর্থে বৎসরের প্রথম দিন বা নতুন বছরের শুরু। কিন্তু সেই জুলিয়াস সিজারের আমলে যখন ক্যালেন্ডার তৈরী করা হয়েছিলো তখন হয়তো ঐ বিষয়টি মাথায় রাখা হয়নি।

সমাজতান্ত্রীক সোভিয়েতের ভূমিতে অর্থোডক্স ক্রিশ্চিয়ানিটি একসময় খুব জমকালো ছিলো। তখন ঘটা করে পালন করা হতো ত্রাণকর্তা যীশুর জন্মদিন ‘মেরি ক্রিসমাস’। তবে তারা এটা পালন করতো ২৫শে ডিসেম্বর নয়, বরং সাতই জানুয়ারী, মানে বারো দিন পরে। কেন? সে আলাপ আরেকদিন হবেক্ষণ। নাস্তিক কম্যুনিস্ট স্বৈরশাসকরা ক্ষমতাসীন হলে, তারা ধর্মীয় প্রভাব খর্ব করে। তারা তথাকথিত সার্বজনীন একটি উৎসবের দিন প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে পহেলা জানুয়ারীটাকেই বেছে নেয়। কিন্তু হাজার বছরের হৃদয়ের ঐতিহ্যকে তো আর অত সহজে মুছে ফেলা যায় না! তাই দেখা গেলো ‘মেরি ক্রিসমাস’-এর অনেক উপাদানই স্থান পেলো এই নিউ ইয়ার সেলিব্রেশনে। যার অন্যতম হলো গৃহের মধ্যে ‘সাজানো ট্রি’।

দেখা গেলো যে পহেলা জানুয়ারী আসার দশ-বারোদিন আগে থেকেই রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিক্রি হতে শুরু হয় ‘ফার-ট্রি’। আর বিক্রি হতে শুরু হয় ‘ফার-ট্রি’ সাজানোর নানান সরঞ্জাম। প্রত্যেকের পারিবারিক ঘর এ্যাপার্টমেন্ট যেমন রমিত হয় ডেকোরেটেড ফার-ট্রি দিয়ে; তেমনি বিভিন্ন অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও রমিত হয় ফার-ট্রি দিয়ে। এটাই সোভিয়েত ভূমিতে নিউ ইয়ার সেলিব্রেশনের প্রধান আইকোন! ও হ্যাঁ, আরো আছে ‘দেদ মারোজ (সান্টা ক্লাউস) ও স্নিগুরোচকা (বরফ-কুমারী)।

(এই গল্পের চরিত্রগুলো কাল্পনিক)

রচনাতারিখ: ০১লা জানুয়ারী, ২০২২ সাল
রচনাসময়: রাত ০৩টা ০২ মিনিট

Happy New Year

———– Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.