হ্যাপী নিউ ইয়ার ২০২২ (পর্ব -৩)

হ্যাপী নিউ ইয়ার ২০২২ (পর্ব -৩)
——————————————- রমিত আজাদ

‘ঈদ আসছে’, ‘ঈদ আসছে’, বলে একটা আমেজ ও আনন্দ যেমন আছে আমাদের বাংলাদেশে। তেমনি সোভিয়েত দেশে ঐ আমেজ ও আনন্দ-টি হলো ‘নিউ ইয়ার আসছে’, ‘নিউ ইয়ার আসছে’। এই সোভিয়েত দেশের প্রথম নিউ ইয়ারটি পালন করেছিলাম, এখানে পা রাখার চার মাস পরে। সেই থার্টি ফার্স্ট নাইটে অর্ধ মাতাল অবস্থায় জড়ানো কন্ঠে এক বাংলাদেশী সিনিয়র ভাই আমাকে/আমাদেরকে বলেছিলো, “বন্ধু-বান্ধব সবাই মিলে হৈ-চৈ করে নিউ ইয়ার পালন করছো? ভালো! তবে এটা কিন্তু এই দেশের নিউ ইয়ারের মূল আনন্দ না। তোমরা আরেকটু বড় বা পরিপক্ক হলে বুঝতে পারবে যে, এই দেশে নিউ ইয়ার ঠিক কিভাবে পালন করতে হয়। নিউ ইয়ার বা থার্টি ফার্স্ট নাইটের আসল মজাটা যে কি এই দেশে, তা তখন উপলদ্ধি করতে পারবে। আরে ইউরোপে এসেছ, এখানকার মজা না নিলে কি আর হয়!”

উনার কথার মর্মার্থ ঐ রাতে ঠিক ধরতে পারছিলাম না। তিনি যে কিসের ইঙ্গিত দিলেন, বা কি শেখানোর চেষ্টা করলেন, তাও বুঝি নাই। তবে হ্যাঁ, যেহেতু উনার কথাটা অমর বাণী হয়ে মাথায় গেঁথে গিয়েছিলো, তাই কিছুকাল পরে তা অনুধাবন করতে পেরেছিলাম। এখানে নিউ ইয়ার সেলিব্রেশন পারিবারওয়ালাদের জন্য একটা পারিবারিক ইভেন্ট। সবাই যার যার পারিবারিক পরিবেশেই ওটা পালন করেন। তবে অবিবাহিত ইয়াংদের ক্ষেত্রে সেটা একেবারেই ভিন্ন ব্যাপার! সেই সাথে যুক্ত হয় সিঙ্গেল মাদার, ডিভোর্সী, এক্সট্রা-মেরিটাল এ্যাফেয়ার্সওয়ালা, ও এই জাতীয় অন্যান্যরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমিটরিগুলোতে একচিত্র। জায়গাটাই তো তারুণ্যের মেলা! কাউকে কাউকে দেখতাম পরীক্ষা শেষ করে আগে আগে নিজ গ্রামে বা শহরে চলে যেত, বাবা-মা পরিবারের সাথে নিউ ইয়ার পালন করার জন্য। অনেকটা আমাদের দেশে ঈদ পালনের মতন। অনেকে আসতো অনেক অনেক দূর থেকে (সোভিয়েত দেশটা বিশাল! একটা মহাদেশের সমান) তারা চাইলেও বাড়ী যেতে পারতো না। বাজেটের ব্যাপার আছে, সময়ের ব্যাপার আছে, ইত্যাদি। আর যারা বাড়ী যাওয়ার সামর্থ-সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যেত না, তারা ডরমিটরিতে থেকে যেত স্রেফ হুল্লোড় করার উদ্দেশ্যে। নাচ, গান, খানা ও সেইসাথে পিনা সব ব্যবস্থাই থাকতো। খারকোভ শহরের ছাত্রছাত্রী যারা ঐ শহরেরই অধিবাসী, তারা থার্টি ফার্স্ট নাইটে কেউ ডরমিটরিতে আসতো, কেউ আসতো না। ইউজুয়ালী হুল্লোরে ছেলেমেয়াগুলাই আসতো; আর চুপচাপ ছেলেমেয়েগুলা আসতো না, তারা বাড়ীতেই বাবা-মার সাথে পালন করতো নিউ ইয়ার। আবার হুল্লোরেদের মধ্যেও প্রকারভেদ আছে। একদল মদ ও শারীরিক মত্ততায় মাত্রাতিরিক্ত মাত্রায় ডুবে যেত ঐ রাত্রে; আরেকদল যা করতো মাত্রা বজায় রেখেই করতো।

শীতকালীন এক্সাম সেশন-টা বেশ কষ্টকর ছিলো! সারা সেমিষ্টার হাসো খেলো যাই করো, পরীক্ষার সময় চোখের জল, নাকের জল সব একাকার হয়ে যেত। এর মধ্যে নিউ ইয়ার নিয়ে প্ল্যান-প্রোগ্রাম করা একটু মুশকিল-ই ছিলো! তবুও ক্লাসরুমে সহপাঠিদের অবিরাম প্রশ্ন ছিলো একে অপরকে, “এই, নিউ ইয়ার কোথায় করবি?” “আমি তো বাড়ী যাবো।” আমি এখানেই থাকবো।” ডরমিটরিতেই পালন করবি? নাকি অন্য কোথাও?” “আমি তো ডরমিটরিতেই পালন করবো।” “আমি যাবো বন্ধুর ডরমিটরিতে”, ইত্যাদি, ইত্যাদি।

আমাদের ডরমিটরিতে একটা মজার পার্ট ছিলো ‘কার্নিভাল’। অর্থাৎ থার্টি ফার্স্ট নাইটে যার যেমন খুশী তেমন সাজো। ঐ সাজো আসো নাচঘরে। সে এক মজার অনুষ্ঠান হতো। বিভিন্নজন বিভিন্ন সাজে আসতো। কেউ আসতো পাখী সেজে, কেই মৌমাছি সেজে, কেউ আসতো রোমান সৈন্যের বেশে, কেউ বা আবার কলম্বাস হয়ে, ইত্যাদি। কম্যুনিস্ট শাসনামলে লেনিন-স্ট্যালিন ছিলো সিরিয়াস ব্যাপার, দেবতাতুল্য! তাদের নিয়ে কেউ উপহাস করলে খবর ছিলো! তার লাইফ হেল হয়ে যাওয়াটা ছিলো সুনিশ্চিত! আর কম্যুনিজম-এর পতনের পর হলো ঠিক উল্টাটা। তাদেরকে নিয়েই উপহাস করা হলো সব চাইতে বেশি! সিটি সেন্টারে, শহরের আনাচে কানাচে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে, ডরমিটরিতে, ডরমিটরিতে, লেনিনের মূর্তি দিয়ে ছিলো ভরা। কম্যুনিস্ট-রা যীশুর আইকন ছুঁড়ে তাকে প্রতিস্থাপিত করেছিলো নতুন এক দেবতা দিয়ে। উদ্দেশ্য ছিলো একটা ডগমা তৈরী করে তাদের শাসন-কে চিরস্থায়ী করা। হায়রে তারা চিরায়ত দর্শন ভুলে যায়, ‘নাথিং ইজ পার্মানেন্ট ইন দিস ওয়ার্লড। চেইঞ্জ ইজ দ্যা ওনলি পার্মানেন্ট।’ দেখা গেলো সত্তর বছর ধরে শত চেষ্টা করেও তারা ঐ ডগমাকে চিরস্থায়ী করতে পারেনি। মিখাইল গর্বাচেভ-এর এক বক্তৃতার মধ্য দিয়ে অবসান হয়েছিলো প্রতারণার উপর টিকে থাকা রক্তাক্ত কম্যুনিস্ট শাসনব্যবস্থার। আর তার পরপরই নগর-বন্দর-শহর-গ্রামে যত লেনিনের মুর্তি ছিলো সব হাতুরী-শাবল দিয়ে ভাঙতে শুরু করলো ক্রুদ্ধ জনতা। একেই বলে জনতার রোষ! কোন একটি টাইম পিরিয়ডে জনতা চাপে পড়ে চুপ করে থাকলেও, কিছুই ভুলে যায় না; বরং সব ক্রোধ-ই পুষে রাখে; আর একদিন তার আউটবার্স্ট হয়! যা বলছিলাম, ঐ কার্নিভালের সাজ; হ্যাঁ কেউ কেউ লেনিন-স্তালিন-কার্ল মার্কস সেজেও উপস্থিত হয় কার্নিভালে। এখন আর তারা দেবতুল্য নয়, ক্ষেত্রবিশেষে হাস্যকরও।


শুরু হয়ে গেলো শীতকালীন পরীক্ষা সেশন। ঘোরাঘুরি, আড্ডাবাজি, হাসি-তামাশা বন্দ! এখন তিন সপ্তাহব্যাপী দিবারাত্রী শুধু পড়ালেখা পড়ালেখা ও পড়ালেখা! চোখের জল, নাকের জল সব এক হোক! ঘুম হারাম হোক, পড়তেই হবে। পরীক্ষা পাশ করতেই হবে। ক্লাসমেটরা বলে, “কি করবা নিউ ইয়ারে?” আমি বলি, “কিছু একটা করবো ভাই। তবে আগে পরীক্ষার কামড়া-কামড়িটা শেষ হোক!” ওরা হাসে। একদিন বাঙালী কয়েকজন ছোটবড় ভাই আসলো আমার রুমে বেড়াতে, “ভাই, কি করবেন নিউ ইয়ারে?” আমি বলি, “ভাই ফোর্থ ইয়ারের ফিজিক্স পড়া! পরীক্ষার জ্বালায় বাঁচিনা। নিউ ইয়ার এখন মাথা থেকে আউট।” উনারা হাসলেন! বললেন, “ঠিকআছে ভাই, চলে আসেন আমাদের ডরমিটিরিতে কিরণ ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা ঐ দিকটায় একটা বড় আয়োজন করেছি। আপনাকে চাঁদা দিতে হবে না। দাওয়াত দিলাম।” আমি বললাম, “দাওয়াতের জন্য ধন্যবাদ। পারলে আসবো। আমার এখানেও আপনাদের দাওয়াত দিলাম। আমি কোন আয়োজন করতে পারবো কিনা জানি না। তাও দাওয়াত দিলাম আসেন।” উনারা হেসে বলেন, “আরে আপনাকে কিছু করতে হবে না। ঈদের দিনে আপনি আমাদের অনেক খাইয়েছিলেন। আমাদের মনে আছে। তাই নিউ ইয়ার-টায় আমরা আপনাকে খাওয়াবো।”

আমি জানি। আমি ওনাদের প্রোগ্রামে না যেতে পারলেও তাদের কেউ কেউ ঐ রাতে আমার রুমে বেড়াতে আসবেন। মনের টানেই আসেন তারা। তাই আমাকে সামান্য হলেও আয়োজন কিছু করতে হবে।

ডিসেম্বরের ত্রিশ তারিখ রাত্রী:

আমার রুমে প্রবেশ করলো হৃদয়ের বন্ধু সাশা।
সাশা: কিরে এত মনমরা কেন?
আমি: মনমরা? না খুব টায়ার্ড ও চিন্তিত।
সাশা: কিসের চিন্তা?
আমি: কাল ইলেকট্রনিক্স-এর উপর পরীক্ষা। মাথামুন্ডু কিছুই পড়া হচ্ছে না। আর অংকগুলোও বিদঘুটে! কি যে করবো?
সাশা: আমি তো পড়ালেখায় লবডংকা! তাই তোকে কোন হেল্প করতে পারলাম না। শুধু দোয়া করি। তবে,
আমি: তবে কি?
সাশা: প্রফেসর এফিমচিক (উনার নিক নেইম, আমাদের দেয়া) লোক খুব মাই ডিয়ার। পাশ করিয়ে দেবেন শেষতক। চিন্তা করিস না।
আমি: তিনি মাই ডিয়ার?
সাশা: দেখিশ না ক্লাসে কত হাসি- ঠাট্টা করেন!
আমি: হুম। তাহলে হয়তো উৎরে যাবো।

আমার দুশ্চিন্তা কিছুটা কমলো।

থার্টি ফার্স্ট ডে:

সকাল দশটায় পরীক্ষা শুরু। এখানকার রীতি অনুযায়ী রিটেন পরীক্ষার পরে হবে ভাইভা। ঐ ভাইভা-টাই আসল। ওর উপর ভিত্তি করেই স্যার গ্রেড দেবেন। ইলেকট্রনিক্স সাবজেক্ট-টাকে যত সহজ মনে করেছিলাম মোটেও অত সহজ নয়! ভীষণ বদখত! প্রিপারেশন যা নিয়ে নিয়েছে তাতে অবস্থা ভালো না। এখন স্যারের দয়াই ভরস! স্যার তো সরল মানুষ, আশা করি পরীক্ষায় তেমন কষ্ট দেবেন না!

আমার ক্লাসরুমে ঢুকতে একটু দেরী হলো। কিন্তু ভিতরে ঢুকে আমি যে পরিবেশ পেলাম তা একেবারেই গুমোট! এত সহজ-সরল স্যারের পরীক্ষায় তো এমন গুমোট পরিবেশ হওয়ার কথা না! তাহলে ব্যাপার-স্যাপার কি? একটু পরেই ব্যাপার-স্যাপার টের পেলাম! কঠিন কঠিন সব অংক দিয়ে প্রশ্ন ভরা। তার উপর মৌখিক পরীক্ষায় বাঘা-বাঘা সব প্রশ্ন করে ছাত্রদেরকে নাস্তানাবুদ করছেন আমাদের স্যার। দিমা সব পরীক্ষায় গ্রেড ‘এক্সিলেন্ট’ পায়। আজ স্যার ভাইভা নেয়ার পর তাকে বলেন, “এই পড়ালেখা করে পরীক্ষা দিতে এসেছ? তোমাকে তো আমি পাশের বেশী কিছু দিতে পারবো না। ভালো গ্রেড-এর আশা ত্যাগ করো!” দিমার তো কান্নাকাটি অবস্থা! বলে, “জ্বী স্যার। তাই-ই দেন। আমি যাই।” স্যার বলেন, “তাই দেব বললেই হলো? আমি জানি তুমি ভালো ছাত্র। যাও ওখানে বসে অংকটা সল্ভ করে নিয়ে এসো। সল্ভ করতে পারলে বেটার গ্রেড দেয়ার চিন্তা করবো।” একটু পরে দেখলাম যেই-ই স্যারের কাছে ভাইভা দিতে যায়, তাকেই স্যার কাঁদিয়ে ছাড়েন! আমি মনে মনে ভাবি, ‘হায় কি অবস্থা! ক্লাসরুমে সহজ-সরল স্যারটির পরীক্ষার হলে এত রুদ্রমূর্তি কেন?’ বেশ কিছু সময় লিখিত পরীক্ষায় ব্যয় করার পর আমি গেলাম স্যারের কাছে মৌখিক পরীক্ষা দিতে। স্যার আমার খাতা উল্টে-পাল্টে দেখে বললেন, “থিওরো তো ভালো-ই লিখেছেন। তা অংকের এই হাল কেন? এই অংকটা হয়নাই। যান ওখানে বসে অংকটা সল্ভ করেন।” আমি মনে মনে ভাবি, এই অংক আমার বাবা তো দূরের কথা দাদাও সল্ভ করতে পারবেন কিনা সন্দেহ!

কিছুক্ষণ পর স্যার আবার আমাকে ডাকলেন, “কি অংক সল্ভড হয়েছে?” আমি বলি, “জ্বিনা।” স্যার বলেন, “তাহলে করলেন কি এতক্ষণ?” আমি বললাম, “অংকটা বুঝতে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু মনে হলো যে, এই অংক আমার মরহুম দাদাজানও সল্ভ করতে পারবেন না।” স্যার বাঁকা চোখে আমার দিকে তাকালেন। তারপর আঙুল দিয়ে একটা জায়গা দেখিয়ে বললেন, “এটা ভালো করে লক্ষ্য করুন। তারপর আবার বসেন অংকটা সমাধান করতে।” আমি আমার সীটে ফিরে ঐ জায়গা টা দেখলাম। হঠাৎ মাথায় ক্লিক করলো; বুঝলাম, ইয়েস এখানে এইভাবে সমাধান করতে হবে। কিন্তু অংকের বাকি পার্ট-টা আর সল্ভ করতে পারলাম না।

এদিকে দেখলাম, দিমাকে স্যার ‘এক্সিলেন্ট’ গ্রেড দিলেন না। ‘গুড’ গ্রেড দিয়ে ছেড়ে দিলেন। দিমা কাঁদোকাঁদো হয়ে বেরিয়ে গেলো! পিছন থেকে একজন সহপাঠি ফিসফিস বললো, “এই বেচারা আজ থার্টি-ফার্স্ট নাইট উপলক্ষে না, মনের দুঃখে মদ খেয়ে বেহুশ হবে!” আমরা মুখ টিপে হাসলাম। পর মুহূর্তেই আবার বিষন্ন হলাম নিজের কথা ভেবে।

একটু পর স্যার আমার কাছে আসলেন, “কি ব্যাপার অংক সমাধান হয়েছে।” তারপর আমার খাতার দিকে তাকিয়ে বললেন, “হুম, এই পার্ট-টা সমাধান হয়েছে। এর পরের পার্ট-টা এখন সমাধান করতে শুরু করুন।” আমি বললাম, “স্যার আমাকে ছেড়ে দিলে হয় না?” স্যার অগ্নিচোখে আমার দিকে তাকালেন। আমি চুপ মেরে গেলাম। তারপর কলম আর কাগজ নিয়ে নতুন করে গুতাগুতি করতে শুরু করলাম। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম যে আমি পরের পার্ট-টাও সমাধান করতে পারলাম।

একবার দেখলাম তানিয়া স্যারের কাছে মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে গেলো। ও কোন গ্রেড পেয়েছে বুঝলাম না। তবে, তাকে বিষন্ন-ই দেখলাম। কিন্তু ওকে দেখে দুঃখী না সুখী বোঝার তো উপায় নেই। ও বেশিরভাগ সময়ই শান্ত ও ভাবলেশহীন থাকে। যাকগে তানিয়াকে নিয়ে আমার চিন্তার দরকার নাই। আপনে বাঁচলে তারপর তো বাপের নাম! আর তানিয়াতো আমার কেউ-ই না!

স্যার আবারো আমার দিকে আসলেন। বললেন, “রাইট, পরের পার্টটাও সমাধান হয়েছে। এবার সামনে আগান। পুরো অংকটাই সল্ভ করতে হবে কিন্তু।” আমি মনে মনে ভাবি, ‘এই থার্টি-ফার্স্ট দিনে আমার কি হাল হলো!” সামনে যে আমার জন্য আরো ভয়াবহতা অপেক্ষা করছিলো তা তখনো বুঝি নাই!”

আমি লক্ষ্য করলাম থার্টি-ফার্স্ট দিন গড়িয়ে আস্তে আস্তে সন্ধ্যা হচ্ছে। আমি গতকাল কিছু বাজার করে রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম, আজ পরীক্ষার পরে আরো কিছু কেনাকাটা করবো। সামান্য কিছু হলেও আয়োজন তো করতে হবে, নিউ ইয়ার তো! কিন্তু এই ক্লাসরুমে সরল আর পরীক্ষার হলে রুদ্রমুর্তি স্যারের পাল্লায় পরে আমার থার্টি-ফার্স্ট নাইটের দফা রফা হয়ে যাচ্ছে!

ধীরে ধীরে সব সহপাঠীরাই পরীক্ষা দিয়ে একে একে বের হয়ে যেতে থাকলো, একসময় আবিষ্কার করলাম যে পরীক্ষার হলে আছি শুধু স্যার আর আমি। এ’ কোন কপাল। স্যারের হাতে এখন আমার জন্য অফুরন্ত সময়! আমাকে বললেন, “কি, কতদূর আগালেন?” আমি, উৎকন্ঠিত স্বরে, “স্যার। আমাকে ছেড়ে দেয়া যায় না?”

কয়েকপাতা ব্যাপী দীর্ঘ জটিল অংকটির এক একটা ধাপ শেষ হয় আর স্যার আমাকে বাহবা দিয়ে বলেন, সামনে আগান। একসময় আমি বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলাম যে, আমার দাদাও সমাধান করতে পারবেন না বলে যে অংকটি-কে আমি মনে করেছিলাম, সেই জটিল অংকটির পুরোটাই আমি সমাধান করতে পারলাম। কে যাদুকর? আমি না স্যার? স্যার যাদুকর, আমি শিষ্য! এক সময় স্যার বললেন, “গুড! দেখেছেন, আপনি মেধাবী কম না। শুধু কনফিডেন্সের অভাব ছিলো। শেষ পর্যন্ত অংকটা আপনি সমাধান করতে পারলেন কিন্তু!”

বুঝলাম ক্লাসেরিমে স হজ-সরল, পরীক্ষার হলে রুদ্রমুর্তি স্যার আসলে একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক যিনি ছাত্রদের মধ্যে কনফিডেন্স সৃষ্টি করে তাকে আত্মপ্রত্যায়ী করে তুলতে পারেন! ধন্যবাদ স্যার।

আমি পরীক্ষা দিয়ে যখন বিশ্ববিদ্যালয় ভবনের বাইরে বের হলাম রাত তখন আট-টার মত বাজে। চারিদিকে জনমানব নাই। এই বিশেষ আনন্দের রাত্রিতে জ্ঞানচর্চা করে সর্বশেষ যেই প্রাণীটি বিশ্ববিদ্যালয় নামক জ্ঞানমন্দিরটির বাইরে বের হলাম, সেটা সম্ভবত আমি। নিজ ডরমিটরি পর্যন্ত যেতে এখনো পাঁচ কিলোমিটার বাকি।

শিকেয় বুঝি উঠলো আমার এই বছরের থার্টি-ফার্স্ট নাইট!

(চলবে)

———————————————————

রচনাতারিখ: ০২রা জানুয়ারী, ২০২২ সাল
রচনাসময়: রাত ১২টা ০২ মিনিট

Happy New Year 2022
————— Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.