হ্যাপী নিউ ইয়ার ২০২২ (পর্ব -৪)

হ্যাপী নিউ ইয়ার ২০২২ (পর্ব -৪)
——————————————- রমিত আজাদ

থার্টি-ফার্স্ট নাইট। বাজে রাত আট-টা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের বিশাল স্কয়ারটির পাশ থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত স্টুডেন্ট’স টাউন পর্যন্ত কোন ট্রান্সপোর্ট আদৌ পাওয়া যাবে কিনা, এই নিয়ে চিন্তিত আমি পথে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আপাতত কোন ট্যাক্সি বা প্রাইভেট কার চোখে পড়ছে না। ইদানিং ভাড়ায় চালিত ট্যাক্সি খুব কমে গিয়েছে। দুইএকটা পাওয়া গেলেও তারা মিটারে যেতে চায় না! বিশাল দাম হাঁকে! সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর এক ধরনের ক্রাইসিস শুরু হয়েছে। ক্রাইসিস-টা অর্থনৈতিক থেকে শুরু করে নানামুখী। সমাজতান্ত্রীক ভাবধারায় বিশ্বাসী অনেকেই আমাকে টিপ্পনী কেটে বলে, “কি ভাই? আপনারা তো গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। তা গণতন্ত্র আসার পর, এই দেশের অবস্থা দেখেছেন?” তাদেরকে বোঝাতে কষ্ট হয় যে, একটা সিস্টেম থেকে আরেকটা সিস্টেমে উত্তরণের সময় কিছুটা প্রসব বেদনা তো হবেই। সেই স্কুল জীবনে আমরা যখন এক ক্লাস থেকে আরেক ক্লাসে উঠতাম, তখন নতুন ক্লাসরুমে ঢুকেও কি কিছু নতুন সমস্যার মুখোমুখী হতাম না? কিংবা বাড়ী পাল্টানোর সময় আগে ও পরে কয়েকটা দিন কষ্ট কি করতে হয় না? যাহোক, আপাতত কোন ট্রান্সপোর্ট আমার চোখে পড়ছে না, হঠাৎ হঠাৎ সাঁই করে দুই একটা গাড়ী চলে যাচ্ছে। তারা হাত তুললেও থামবে না। তাছাড়া আমিও ভাবছি ওদের গাড়ীতে উঠবো না। থার্টি-ফার্স্ট নাইট-এ পশ্চিমা বিশ্বের মাটিতে স্বয়ং শয়তান নেমে আসে। অনেকের কাছেই থার্টি-ফার্স্ট নাইট মানে মদ খেয়ে বুঁদ হওয়া। বাইচান্স আমি যদি কোন মাতালের গাড়ীতে উঠি, তাহলে বিপদে পড়তে পারি। তার চাইতে এই পাঁচ কিলোমিটার হেটে যাওয়াই ভালো। এই পথে হেটে যাওয়ার অভ্যাস আছে আমার। এখানকার ফুটপাত-রাস্তাঘাট খুব ভালো ও পরিচ্ছন্ন! হাটার জন্য খুবই উপযোগী। তবে একটু সাবধান থাকতে হবে। রাস্তাঘাটেও টাল-টক্কর ঘোরাঘুরি করে! ছিনতাইকারীও থাকে।

কিছু না পেয়ে আমি হাটতে শুরু করলাম। ‘জিরঝিনস্কি স্কয়ার’-টা পার হয়ে মিলিটারি ইউনিভার্সিটির পাশ দিয়ে লেনিন এ্যাভিনিউতে উঠলাম। এ দেশে সব শহরেই একটি করে লেনিন এ্যাভিনিউ আছে। জনগণকে লেনিন-মুখী করার জন্য এই ব্যবস্থা! রাস্তাঘাট, স্থাপনার ‘লেনিন’ নামকরণ থেকে শুরু করে শত শত ‘লেনিন-মুর্তি’ নির্মান পর্যন্ত কিইনা করেছে তারা! উঠতে-বসতে শুধু লেনিন আর লেনিন! সোভিয়েত-এর পতনের পর শুনতে পাচ্ছি যে, এইসব নাম পরিবর্তন করা হবে। জিরঝিনস্কি ছিলো সোভিয়েত গেস্টাপো এনকেভেদে (পরবর্তিতে ‘কেজিবি’)-র মূলনায়ক; মানে নিজ দেশের জনতাকে ধ্বংস, নিপীড়ন-নির্যাতন-এর মূলনায়ক। কত নিরপরাধ ও দেশপ্রেমিক মানুষ যে গুম, খুন, জেল, জুলুমে পড়েছে এই ‘এনকেভেদে’-র হাতে তা গুণে শেষ করা যাবে না। অথচ সেই জিরঝিনস্কি-র নামেই নামকরণ করা হয়েছে খারকোভ শহরের কেন্দ্রীয় স্কয়ারটির। সেই স্কয়ারটির বুকের উপরেই আবার হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছে লেনিন-এর মুর্তি! পরিবর্তনের হাওয়ায় ইদানিং প্রস্তাবনা উঠেছে যে, স্কয়ার-টির নাম পরিবর্তন করে ‘স্বাধীনতা স্কয়ার’ করা হোক। লেনিনের মুর্তিও সরিয়ে ফেলার কথাবার্তা চলছে।

এ্যাভিনিউ-এর চওড়া ফুটপাত ধরে হাটছিলাম। আমার সামনে দিয়ে হঠাৎ চলে গেলো একটি যুগল, বরফ-বুড়ো (সান্টা-ক্লাউস) ও স্নিগুরোচকা (তুষার-কুমারী)। যেন বুড়ো দাদা তার নাতনী-কে সাথে নিয়ে যাচ্ছেন। তারা আমাকে নিউ-ইয়ারের শুভেচ্ছা জানিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “স্নোভিম গোদোম (হ্যাপী নিউ ইয়ার)!” আমিও হেসে উত্তর দিলাম, “স্নোভিম গোদোম!” উনারা হাসতে হাসতে চলে গেলেন। এটা করা হয়, কোন একটি যুগল সান্টা-ক্লাউস ও তুষার-কুমারী সেজে পথে বের হয়ে,মানুষদেরকে এভাবে আনন্দ দেয়। এটা কখনো হয় ব্যাক্তি উদ্যোগে। কখনো কোন ক্লাব-সংগঠনের পক্ষ থেকে। সিটি-কর্তৃপক্ষেরও কিছু অবদান থাকে। নতুন বছরের আগমণ উপলক্ষে মানুষকে আনন্দ দেয়া হয়। আবার ইদানিং কিছু কমার্শিয়াল কোম্পানীও এটা করে। শিশুদের বাবা-মা-রা ঐ কোম্পানী-কে টাকা দেয়। কোম্পানী শিশুদের জন্য পাঠিয়ে দেয় সান্টা-ক্লাউস-কে কিছু উপহার সামগ্রী দিয়ে। শিশুরা জানে না যে, তাদের পিতা-মাতাই গাটের পয়সা খরচ করে এই ব্যবস্থা করেছে। তারা ভাবে যে সত্যি-সত্যিই সেই সাইবেরিয়ায় বনভূমী থেকে সান্টা-ক্লাউস এসেছে তাদের জন্য উপহার নিয়ে।

নিজের মনে পথ চলছিলাম। সহসা একটা ট্রলিবাস আমার সামনে থেমে গেলো। আমার ডরমিটরির পথেই যাচ্ছে। আলিবাবার রূপকথার মত বাসের দরজা অটোমেটিক খুলে গেলো আমার সামনে। আমি নিঃশব্দে উঠে গেলাম বাহনটিতে। এই দেশের এই বিষয়টিকে আমি ভালোবাসি, তা হলো ওদের সরকারী ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম। এটা এতটাই ভালো যে মানুষের পথচলার কষ্ট বলে কিছু নাই!

বাসের মধ্যে নারী-পুরুষ অনেককেই দেখলাম নিউ-ইয়ারের সাঁজে। তারা মাথায় অথবা গলায় জড়ি ঝুলিয়ে রেখেছে। বাসের দেয়ালেও জড়ি ঝুলানো আছে। জীবনযাত্রার মান উঁচু হওয়ায় ও রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভালো হওয়ায়, এদেশের মানুষগুলো এম্নিতেই দেখতে খুব সুন্দর, আজ তাদের সবাইকে আরো বেশি সুন্দর লাগছিলো। একে অপরের সাথে খুব সুন্দর হেসে কথা বলছিলো, একে অপরকে নিউ ইয়ারের শুভেচ্ছা জানাচ্ছিলো। তবে দুই-একটা মাতালও উঠেছিলো বাসে, রাত বারোটা বাজার আগেই তারা শরাব পান করে ঘোরের মধ্যে আছে। তারা চারপাশে কি স্বর্গ দেখছে, নাকি নরক দেখছে তা আমি জানিনা। আপাতত বাসটা আমার প্রয়োজনীয় স্টপেজে থামলে আমি সেখান থেকে নেমে গেলাম। নামার সময় বাস-চালককে একটা ধন্যবাদ দিলাম। আমাকে দেখে সে বাস থামিয়েছিলো, এরকম ভদ্রতা আজকাল কম দেখা যায়!

ডরমিটরিতে পৌঁছে শুরু করে দিলাম রান্না-বান্না। ব্রেড ছিলো, মুরগীর মাংসের রোস্ট করলাম, রাশান অলিভিয়া সালাদ বানালাম, ডেজার্ট আইটেম হিসাবে বানালাম পুডিং। এদেশের মানুষ পুডিং-এর সাথে কম পরিচিত তাই তারা এটা পছন্দ করে বেশ। কেক, বিস্কুট, ফ্রুটস, ইত্যাদি কেনাই ছিলো। ভেবে রেখেছিলাম যে আজ চটপটি বানাবো কিন্তু তার কাঁচামাল কেনা হয়নি, সকাল দশটা থেকে রাত আট-টা পর্যন্ত পরীক্ষার গোলকধাঁধায় পড়ে।

এই করতে করতে রাত প্রায় এগারোটার কাছাকাছি বেজে গেলো। ছিলাম রান্নাঘরে। উচ্চস্বরে মিউজিক শোনা যাচ্ছে চতুর্দিকে। সবচাইতে জোর মিউজিকটি আসছিলো আমাদের ডরমিটরির ডিসকোটেকা থেকে। মোটামুটিভাবে রাত সারে-এগারোটা থেকেই নাচগান শুরু হবে। নাচের মাঝেই থার্টি-ফার্স্ট নাইট শেষ হয়ে ফার্স্ট জানুয়ারী আসবে। পুরাতন বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হবে। আতশবাজি পোড়ানো হবে। সিটি সেন্টারসহ শহরের কয়েকটি জায়গায় এটা করা হয় সরকারী উদ্যোগে। তাছাড়া ব্যাক্তি উদ্যোগেও আতশবাজি পোড়ানো হয়ে থাকে। আমার অভিজ্ঞতায় আতশবাজি সংক্রান্ত অগ্নিকান্ডের কোন দুর্ঘটনার কথা শুনি নাই এ’যাবৎকাল। তবে অন্যান্য দেশে এরকম দুর্ঘটনার নিউজ শুনেছি। পশ্চিম-ইউরোপের কোন একটি দেশে আতশবাজি সংক্রান্ত অগ্নিকান্ডে একটি ছোট শহরের বিশাল এলাকা পুড়ে যাওয়ার সংবাদ-ও শুনেছি।

আমার রান্না করা খাবারগুলো কিচেনের কমোন টেবিলের উপরে রেখেছিলাম। রান্নার চুলার দিকে মনযোগ দিয়ে দেখছি। পিছনে কারো হাটার শব্দ শুনলাম। মনে মনে ভাবলাম, হাটুক, কতজনই তো হাটে! হঠাৎ মনে হলো যে সে আমার বাটি থেকে কিছু খাচ্ছে! এ কি অসভ্যতা! মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো! ঘুরে তাকালাম, কিন্তু যাকে দেখলাম, তাতে আমার রাগ করা তো দূরের কথা; মন খুশীতে ভরে উঠলো! আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মুস্তাহা। আমারই ব্যাচমেইট। ঢাকাতে আমারই এলাকার ছেলে। থাকে সেই সুদূর মস্কোতে, ওখান থেকে চলে এলো! আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলে মুস্তাহা, “কিরে, কাবাব-টাবাব বানাইয়া অস্থির! মজা হয়েছে তোর কাবাব!”
আমি: বেড়াতে চলে আসছিস! ভেরি গুড! কবে আসলি মস্কো থেকে?
মুস্তাহা: আজই বিকালে আসলাম।
আমি জানি যে, খারকোভে আসলে ও কিরণ ভাইয়ের রুমেই থাকে। কিরণ ভাই ওর বুজম ফ্রেন্ড। এবার কিচেনের রুমের দরজায় কিরণ ভাইকে দেখলাম। তিনি বললেন, “নিউ ইয়ার। সবাই মিলে আনন্দ না করলে হয়? মুস্তাহা আজ এসেছে মস্কো থেকে, নিয়ে আসলাম তোমার এখানে।

আমি হেসে বললাম, “খুব ভালো করেছেন। আমার তো একা একা ভীষণ বোরিং লাগছিলো। চলেন রুমে যাই।”
কিরণ ভাই: চলো।
আমি: আমরা তিনজন একসাথেই নিউ ইয়ার করছি আজ তাহলে?
কিরণ ভাই: না না। আমরা আবার ফিরে যাবো, আমাদের ডরমিটরিতে। আমি জাস্ট ওকে নিয়ে তোমার সাথে দেখা করতে এলাম।
আমি: সেকি?
মুস্তাহা: না রে দোস্ত। কিরণের ওখানেই সব আয়োজন হয়েছে। তোর সাথে দেখা করতে এলাম। নিউ ইয়ারের শুভেচ্ছা বিনিময় আর কি।
আমি: ওকে চল রুমে যাই।

রুমে গিয়ে ওদেরকে কিছু খেতে দিলাম। মুস্তাহা একটা মদের বোতল বের করলো ব্যাগ থেকে। টেবিলের উপর ড়েখে বললো, “ঢালি?”
আমি: তোরা খেলে খা। আমি তো মদ খাইনা।
মুস্তাহা: তুই খাস না আমি জানি। আজ শুভ উদ্বোধন কর।
আমি: নারে দোস্ত।
মুস্তাহা মেজাজ দেখিয়ে বললো, “তুই সত্যিই খাবি না?
আমি বললাম, “নারে, আমি খাই-ই না।”
মনে মনে ভাবলাম, মুস্তাহা রাগলে ভীষণ রাগে। এখন ও রেগে গেলে কেলেংকারী হবে! কি করে ওকে শান্ত করা যায়? আমাকে অবাক করে ও হেসে উঠলো! বললো। “নারে দোস্ত। জোর করে আমি কিছু করি না। তুই মদ খাস না, এটা একটা ভালো অভ্যাস! বজায় রাখ।”
আমিও ওর কথায় প্রশান্তি পেলাম।
ওরা কিছুক্ষণ আমার রুমে কাটিয়ে। চলে গেলো।

ওদেরকে বিদায় জানাতে আমি করিডোরে বেরিয়ে ডরমিটরির নিচতলা পর্যন্ত গেলাম। দেখলাম ইতিমধ্যেই সবাই নানা সাজে ঘোরাঘুরি করছে। কার্নিভাল বোধহয় শুরু হয়ে গিয়েছে। একটি মেয়েকে দেখলাম নেটের পাখা লাগিয়ে প্রজাপতি সেজেছে! মেয়েটি খুবই ছোটখাটো, দেখতে টীনএজার মেয়ের মত লাগে। ওকে ঐ প্রজাপতির সাজে সুন্দর মানিয়েছে!

কয়েক বছর যাবৎ শুরু হয়েছে নতুন বছরের চাইনিজ প্রতীক নিয়ে মাতামাতি। ঐ বছরটা ছিলো ছাগোলের এই বছরটা হবে বাঘের ইত্যাদি, ইত্যাদি। এবারের বছরটা বোধহয় ড্রাগনের বছর। তাই বিশালদেহী এক ছেলে ড্রাগোন সেজেছে। তাকে অনেকে বাহবা দিচ্ছে!

নিচতলা থেকে আমি আবার সিঁড়ি বেয়ে পাঁচতলায় উঠলাম। ঐ যে বলেছিলাম, আমার রুমের ঠিক উল্টাদিকেই আয়োজিত হয়েছে নতুন বছরের কার্নিভাল প্রোগ্রাম। ইতিমধ্যে অনেকেই নাচতে শুরু করেছে সেখানে। সবাই নানা সাজে। হঠাৎ করে একঝলক একজনকে দেখলাম যে ‘শাড়ী পড়া সাজে’! এই ইউরোপ দেশে কার মনে এই সখ জাগলো আবার। একেবারে বাঙালী বা উপমহাদেশীয় রমণীর সাজে! বাঙালী ছেলে হিসাবে শাড়ীর প্রতি দুর্বলতা আছে আমার। জানতে ইচ্ছা করছিলো, কে ওটা? করিডোরের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়েছিলো সে, তাই তার পিছনটাই শুধু দেখলাম, মুখটা দেখতে পেলাম না। সুতরাং বোঝার উপায় ছিলো না যে, কে ছিলো ওটা। তবে দেহের গঠন ও দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা দেখে তাকে খুব চেনা চেনা মনে হলো!

(চলবে)

(এই গল্পের চরিত্রগুলো কাল্পনিক)

Happy New Year 2022 (3)
————— Ramit Azad

পূর্বের পর্বের লিংক

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.