হ্যাপী নিউ ইয়ার ২০২২ (পর্ব – ৬)

হ্যাপী নিউ ইয়ার ২০২২ (পর্ব – ৬)
——————————————- রমিত আজাদ

“আমার টার্গেট হলো বিদেশী জামাই।” বললো ওলগা। “ওসব তৈমুর-টৈমুর আমার চলবে না। আমি আর এই এ্যাবনর্মাল দেশে থাকতে চাই না।”
আমি হেসে বললাম, “তাহলে আমাকে বিয়ে করো। আমি তো একজন বিদেশী।”
ওলগা: তোমাকে আমার পছন্দ হয়। কিন্তু তোমাকে আমি বিয়ে করবো না।
আমি: (আবারো মুচকি হেসে বললাম) বুঝলাম না! পছন্দ হয়, কিন্তু বিয়ে করবা না। এটা আবার কোন হিসাব?

আমি মনে মনে বেশ কৌতুক অনুভব করলাম। ওলগা রূপসী হলেও আমার ওতে কোন ইন্টারেস্ট নাই। এই একটা আশ্চর্য্য ব্যাপার! দেখা যায় যে, কোন একটি মেয়ের রূপ-সৌন্দর্য্য সবই আছে, অথচ তার প্রতি হৃদয় টানে না! কেন যে এমন হয়? এর সায়েন্টিফিক কোন ব্যাখ্যা আছে কি? থাকলেও বোধহয় আপাতত ভৌত বিজ্ঞান দ্বারা এর ব্যাখ্যা করার মত অতদূর পৌঁছাতে পারে নি মানবজাতির জ্ঞান। কে যেন একবার আমাকে হরমন-টরমন কি সব বুঝিয়েছিলো! ব্লাডগ্রুপের মত হরমন-এরও গ্রুপ থাকে। কোন একটা মেয়েকে দেখে কোন একটা ছেলের চিত্ত চঞ্চল হয়ে উঠলো; এর মানে হলো এই যে, ঐ ছেলের সাথে ঐ মেয়ের হরমন কোড ম্যাচ করেছে, ইত্যাদি। আমি অবশ্য উনার ব্যাখ্যার আগামাথা কিছুই বুঝি নাই! যাকগে, আমি ফিজিক্সের লোক, বায়োলজি আমার কম্ম নয়! মনোবিদ্যা তো নয়ই!

ওলগা: সাদা রঙের ছেলেদেরকে আমার পছন্দ হয় না। ওটা পৌরুষের কালার না। আবার আফ্রিকান কালো রঙটাও এলিগেন্ট না। পুরুষ মানুষ হতে হবে ‘স্মোগলি’ মানে শ্যামবর্ণ। তোমার গায়ের রঙ শ্যামবর্ণ। তোমার হাসিটাও চমৎকার! অত সুন্দর ফকফকে সাদা দাঁত কোথায় পেলে?
আমি: হাসি? কেমন আমার হাসি?
ওলগা: তোমার হাসি খুব নির্মল! চোখের রঙ বাদামী-কালো, মাথার চুলের রঙ কালো। ছিপছিপে মেদহীন গড়ন! সব মিলিয়ে সুন্দর!
আমি: তাহলে আর কি! আমাকেই বিয়ে করে ফেলো। (আবারো মনে মনে হাসলাম আমি)
ওলগা: কৌতুক করো আমার সাথে, না? শোন, তুমি আমেরিকান বা ইউরোপীয়ান নও। আমার টার্গেট ইউরোপ-আমেরিকা। তুমি ঐ দেশী ছেলে হলে এতদিনে আমি ঝাপিয়ে পড়তাম!
আমি: হুম! আমার কপালটা তাহলে খারাপ! ভুল জায়গায় জন্ম নিয়েছি!
ওলগা: এনিওয়ে, আমাকে না হলেও চলবে। ভালো মেয়ে তুমি পেয়ে যাবে। ওটা নিয়ে চিন্তা করোনা। আচ্ছা, এইটা কি খেলাম বলতো?
আমি: কাবাব।
ওলগা: খুব ঝাল!
আমি: আমিতো ঝাল যথাসম্ভব কম দিয়েছি।
ওলগা: তারপরেও ঝাল!
আমি: নাও, তাহলে লিমোনেড খাও।
মিষ্টি লিমোনেড খেয়ে শান্ত হলো ওলগা। ডিভানে আরো হেলান দিয়ে একেবারে গা এলিয়ে দিলো সে। ওর খাটো স্কার্ট গলে ভরাট ফর্সা পা দুটো বেরিয়ে এলো! আমি একবার ঐদিকে তাকালাম, পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলাম। টিভি পর্দার দিকে তাকিয়ে ওলগা বললো, “কোন চ্যানেল চলছে?”
আমি: চ্যানেল ওয়ান। রাশিয়ান-টা।
ওলগা: চ্যানেল ‘তনিস’ চালাও তো।
আমি: চালালাম (রিমোটে টিপ দিলাম)।
ওলগা: গুড। দেখো এখানে একটা ফিল্ম চলছে।
আমি: কি ফিল্ম?
ওলগা: দারুণ ফিল্ম! এই সিনেমায় কি ভীষণ প্রেম যে দেখায়! সত্যিকারের প্রেম! নিখাদ প্রেম! এই ছবি দেখে আমি শুধু আবেগ আপ্লুত হই। আমার জীবনে কেন আসে না অমন প্রেম?
আমি: (আবারো কৌতুক করে) আমি যদি তোমাকে ঐরকম করে ভালোবাসি, তুমি কি আমার হবে?
ওলগা: নাহ্‌!
আমি: কেন?
ওলগা: কারণ, আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবাসো না। যা বলছো ওগুলো সব কৌতুক!
আমি: তাই?
ওলগা: হুম! মেয়েদের একটা প্রকৃতি প্রদত্ত গুণ আছে। মেয়েরা ছেলেদের মনের কথা পড়তে পারে।
এবার আমি নীরব রইলাম। কারণ, আমি জানি ও ঠিকই গেইজ করেছে।

ওলগা: সিনেমাটায় একজন ইয়াং পাদ্রী একটা অনাথ বালিকাকে এনে পেলেপুষে বড় করে। তারপর বড় হলে মেয়েটাকে বিয়ে দেয়। কিন্তু মেয়েটার জামাইটা এমনই শয়তান যে, মেয়েটাকে ভীষণ কষ্ট দেয়!
আমি: দুঃখজনক! মেয়েটা এম্নিতেই অনাথ, তার উপর আবার তাকে কষ্ট দেয়া!
ওলগা: তারপর পাদ্রী-টা মেয়েটাকে আবার তার বাড়ীতে নিয়ে আসে। ওভাবে শয়তান স্বামীর হাত থেকে রেহাই পায় মেয়েটা।
আমি: ভালো। এখানেই কাহিনী শেষ?
ওলগা: আরে নাহ্‌! এখানেই কাহিনী শুরু।
আমি: মানে কি?
ওলগা: বুঝলে। ছোট মেয়েটাকে পেলেপুষে বড় করেছে ইয়াং পাদ্রীটা। কিন্তু ততদিনে পাদ্রীটাকে ভালোবেসে ফেলেছে মেয়েটা।
আমি: ক্যাথলিক চার্চের পাদ্রীদের তো বিয়ে করা হারাম।
ওলগা: আরে সেখানেই তো ক্লাইমেক্স!
আমি: বলো।
ওলগা: আসলে পরে পাদ্রিটাও মেয়েটাকে ভালোবেসে ফেলেছিলো। কিন্তু পাদ্রীদের তো ভালোবাসা নিষেধ। তাই সে কিছুই প্রকাশ করে নাই। মেয়েটাকে অন্য ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে দিলো।
আমি: তারপর তো দেখলাম যে, ওর স্বামীটা শয়তান!
ওলগা: হুম। তারপর মেয়েটা যখন সেই পাদ্রীর বাড়ীতে ফেরত চলে এলো। তখন আর তারা কেউই নিজেদের ইমোশনকে আড়াল করতে পারলো না। বুঝলে তো, একই বাড়ীতে একাকী দু’জন নারী-পুরুষ। দুজন দুজনাকে পাগোলের মত ভালোবাসতে শুরু করলো! শুরু হলো এক অসম ও ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ প্রেমের কাহিনী!
আমি: তারপর পরিণতি কি হলো?
ওলগা: পরিণতি আমি তোমাকে বলবো না। তুমি ফিল্মটা দেখে পরিণতি জেনে নিও।

আমি কিছু সময় ওলগার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ওলগাও আমার দিকে তাকালো। এই পারস্পরিক দৃষ্টির একটা মিনিং আছে। আমার চোখের ভাষা ওলগা বুঝতে পারলো। আস্তে করে সে ডিভান থেকে উঠে এলো। এগিয়ে দিলো তার দ্রাক্ষাসম টুকটুকে দুটি অধর। আমি নীরবে ওর অধরের কানে আমার অধরের ভাষা বলতে যাবো, ঠিক এসময়ই কে যেন দরজা খুলে রুমে ঢুকে পড়লো। মুহুর্তেই ছিটকে গেলাম আমরা দুজন দুইদিকে। দুই জোড়া অধরের মিলন আর হলো না!

দেখলাম, রুমের দরজায় সবুজ দাঁড়িয়ে।

সবুজ: আরে ওলগা দেখছি। হ্যাপী নিউ ইয়ার!
ওলগা: (বিরস বদনে) হ্যাপী নিউ ইয়ার!

আমি মনে মনে বলি, “ব্যাটা বেরসিক! আর সময় পেলিনা। এক মিনিট পরে আসলেও তো পারতি!”
পরে অবশ্য বুঝেছিলাম যে, কোন এক অদৃশ্য শক্তি ঐ রাতে আমার আর ওলগার অধর জোড়া দুইটিকে মিলতে দেয়নি। ভালোই হয়েছিলো একদিক থেকে!

ওলগা বললো, “আমি আজ যাই তাহলে।”
আমি: কোথায় যাবে এত রাত্রে?
ওলগা: বাড়ী যাবো না, এত রাত্রে। দেখি নীচতলায় ওরা আছে হয়তো।

চলে গেলো ওলগা।

সবুজ: (একটু চিন্তিত হয়ে) আমি কি আপনাদের ডিস্টার্ব করলাম?
আমি: নাহ্‌! কি ডিস্টার্ব?
সবুজ: না, মানে। আপনারা কি……..?
আমি: কোন কিছুই না। বসো।
সবুজ: কফি বানাই এক কাপ? লালপানি টেনে টেনে টায়ার্ড, একটু কফি খাবো এখন।
আমি: বানাও। তোমার নাচ কেমন চলছে?
সবুজ: নাচ? ভালো তো। আছে তো ওখানে অনেক রূপসী! আপনি এই রুমে আটকে আছেন কেন? যান ডান্সফ্লোরে, নাচুন।
আমি: ঠিক আছে। কফি খেতে থাকো তুমি। আমি একটু দেখি বাইরে গিয়ে কি অবস্থা।

আমি রুম থেকে বেরিয়ে, করিডোরে দাঁড়ালাম। চলছে নাচ, কখনো দ্রুত লয়ের মিউজিক, কখনো স্লো-মিউজিক। যখন দ্রুত লয়ের মিউজিক হয় তখন যে যার মত লম্ফ-ঝম্ফ দিয়ে নাচে। আর যখন ধীর লয়ের মিউজিক/গান হয় (ইউজুয়ালী রোমান্টিক গান) তখন আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে জোড়ায় জোড়ায় নাচে সবাই। ইউজুয়ালী ছেলেরাই মেয়েদেরকে ইনভাইট করে। ঐ মেয়ে রাজী থাকলে সে হাত বাড়িয়ে ছেলেটির হাত ধরে। তারপর আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে নাচে। মেয়ে কোন ছেলেকে ইনভাইট করে এই ধরনের কেইস রেয়ার। তারপরেও ঘটে। ইউজুয়ালী বেশিরভাগ মেয়েই যে কোন ছেলের ইনভাইটেশনেই নাচতে রাজী হয়। এটা তো শুধুই নাচ, এর বেশি কিছু নয় (যদিও কখনো কখনো এই নাচের মধ্যেই আবার এটা-সেটা ঘটে!) মাঝে মাঝে কিছু কিছু কনজারভেটিভ মেয়ে থাকে যারা যারতার সাথে নাচে না। দুই একজনার সাথেই কেবল নাচে। তখন একটা কম্পিটিশনের মতন শুরু হয়! জেদী পুরুষগুলা গিয়ে গিয়ে ঐ মেয়েটাকেই বারবার নাচে ইনভাইট করতে থাকে। সবাই তাকিয়ে দেখে যে, কার ইনভাইটেশন গ্রহণ করলো মেয়েটি। কার সাথে সে নাচলো! সেই পুরুষকে বিজয়ী পুরুষও বলা যেতে পারে!

পুরুষের এই বৈশিস্ট্যটি ইন্টারেস্টিং, কোন মেয়ে সহজেই রাজী হয়ে গেলে (প্রেম, মিলন বা অন্য কিছুতে) তার প্রতি আর অত ইন্টারেস্ট ফীল করে না পুরুষ। কিন্তু কোন মেয়ের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হলে, জেদের বশে তার কাছে বারবার যায়! মনে তার রোখ চাপে যে, মেয়েটিকে আমি জয় করবোই!

নাতাশা নামে একটি মেয়ে আছে। নতুন এসেছে ডরমিটরিতে। ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। মেয়েটা অত একটা সুন্দরী বলা যাবে না। কিন্তু মুডি। তাই অনেক ছেলেই তার পিছনে ছুটে। এই মুহুর্তে একটা ভিন্ন দৃশ্য দেখছি ডান্স ফ্লোরে। সেকেন্ড ইয়ারের ইউরা-র সাথে নাচছে নাতাশা। ইউরা ছেলেটা হ্যান্ডসাম! এখন চলছে, স্লো-ডান্স। দুজন-দুজনাকে গভীরভাবে আলিঙ্গন করে আছে। ডান্স ফ্লোরের আলো-আঁধারীতে ওদের ক্লোজনেস দেখা যাচ্ছে। কিছু একটা হচ্ছে মনে হলো। ইতিমধ্যে, আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে মেক্সিকোর আলেখান্দ্রো। আমাকে নীচু স্বরে বললো, “দেখছিস?”
আমি: কি?
আলেখান্দ্রো: আরে দেখ ভালো করে ঐ দৃশ্যটা!

এবার আমি ভালো করে দৃষ্টি দিলাম। হুম দেখার মত দৃশ্যই বটে। নাতাশা ও ইউরা নাচের মধ্যে খুব বেশি ক্লোজ হয়ে গিয়েছে। ইউরা তখন নাতাশার জামার ভিতরে হাত ঢুকিয়ে ওর স্তন স্পর্শ করছে! নাতাশার মুখভঙ্গি দেখে মনে হলো যে, সে বেশ উপভোগ করছে বিষয়টা! বুঝলাম, নিউ ইয়ারের সাথে সাথে তাদেরও পূর্বরাগের আগমণ ঘটেছে!

ওদিকে দেখলাম, কেভিন আর আলোনাও গভীর আলিঙ্গনে নাচছে। আলোনাও ডরমিটরিতে নতুন। সেও ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী। তবে নাতাশার সাথে আলোনার পার্থক্য হলো যে, আলোনা এই ডরমিটরিতে সেরা রূপসী হিসাবে নাম করেছে! মেয়েটা আসলেই আগুন সুন্দরী। এদিকে ডরমিটরিতে আছেন এক আদু ভাই, নাম তার কেভিন। আজ দশ বছর যাবৎ তিনি পড়ালেখা করছেন, এই ফ্যাকাল্টিতে; কিন্তু এখনো পাশ করতে পারেননি। এদিকে ছয় বছরেই তো বিশ্ববিদ্যালয় সমাপ্ত হয়ে যাওয়ার কথা! তিনি হলেন সুদুর আটলান্টিক মহাসাগরের একটি দ্বীপ রাষ্ট্রের নাগরিক। আফ্রিকান বংশোদ্ভুত তাই গায়ের রঙ আবলুশ কালো। দেহের গঠন ভালো, তবে অমন আহামরি কোন হ্যান্ডসাম না। তার মাতৃভাষা খুব সম্ভবত ইংরেজী, তাই চমৎকার ইংরেজী বলতে পারে। তার সাথে আমি ইউজুয়ালী ইংরেজীতেই কথা বলি, রুশ বলি না। তবে আমি লক্ষ্য করেছি যে, কেভিন রুশ ভাষাও খুব ফ্লুয়েন্টলি বলে। আমি কেভিনের মধ্যে কখনোই কোন পৌরুষ সৌন্দর্য্য খুজে পাইনি, কিন্তু কিভাবে যেন নাম করে ফেলেছে নারীমহলে! শোনা যায় যে, মেয়েরা তার জন্য পাগোল! একটা রূপসী মেয়ের পিছনে যেমন ছেলেরা ছোটে; কেভিনের পিছনে তেমনি মেয়েরা ছোটে! জনশ্রুতি রয়েছে যে কেভিনের প্রেমিকার সংখ্যা একশত ছাড়িয়েছে! তবে কেভিনও আবার যারতার সাথে ডীপ রিলেশন করে না! বেছে বেছেই করে। এই যেমন তার এবারের আকর্ষণ হলো এই আলোনা। দুজনার বয়সের পার্থক্য অনেক! কেভিন ও আলোনা পাশাপাশি দাঁড়ালে বাপ-বেটি মনে হয়। তারপরেও কেভিনকে বেছে নিয়েছে আলোনা! বুঝলাম না, কেন? ওরকম আগুন সুন্দরী রূপসী টীন-এইজড মেয়েটা তো একটা ইয়াং হ্যান্ডসাম ছেলেকে খুব ইজিলিই পেত, তাহলে হোয়াই কেভিন? এমনও হতে পারে যে, আলোনা তার বান্ধবীদেরকে দেখাতে চেয়েছে যে, ‘দেখেছো আমি নামজাদা লেডি-কিলার কেভিনের বান্ধবী হতে পেরেছি!”

আমাকে একবার ইয়েমেন-এর রশিদ বলেছিলো, “জানিস, কেভিন-এর একটা অতিন্দ্রীয় ক্ষমতা আছে! সে কিছু একটা ব্ল্যাক-ম্যাজিক-ট্যাজিক জানে। ঐ দিয়ে বশ করে ফেলে মেয়েদেরকে।” তার উত্তরে আমি বলেছিলাম, “ঐসব হাবিজাবি আমার কাছে বলতে এসো না। কেভিন গুপ্তকেশের ব্ল্যাক-ম্যাজিক জানে!”
রশিদ: বিশ্বাস হয় না?
আমি: না, হয় না। আমি নিজে ম্যাজিক জানি। বহুবার স্টেজ শোও করেছি! জ্যোতিষবিদ্যাও জানি, নিউমারালজিও জানি। এসবের পিছনে আমি অনেক ছুটেছি। অবশেষে জেনেছি যে বুজরুকি আছে, কিন্তু ব্ল্যাক-ম্যাজিক নামে কোন হিন্দি-চুলও নাই!
রশিদ: তাহলে কেভিন এত এত মেয়ে পটায় কিভাবে?
আমি: ওটা নিছক প্রচারণা! নারী মহলে ওর নামডাক হয়েছে। তাতে ওর কাটতি বেড়েছে! আর আমি ভালো করে খেয়াল করে দেখেছি যে, ওর কাছে কোন ভালো মেয়ে আসে না। ওসব বাজারী মেয়ে ধরে এত গর্বের কি আছে?
রশিদ: (একটু ভ্যাবলা হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললো) কিন্তু ও খুব ইন্টেলিজেন্ট শুনেছি!
আমি: ঐ যে বললাম না, হিন্দি-চুলের ইন্টেলিজেন্ট! দশ বছর ধরে যে বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করতে পারেনা, সেই আদু ভাই আমার কত্ত বড় ইন্টেলিজেন্ট! তাই না?

আমার কথা শুনে সেদিন দমে গিয়েছিলো রশিদ।

রিয়াদ এসে নিঃশব্দে আমার পাশে দাঁড়ালো। প্যালেস্টাইনের সন্তান রিয়াদ। দেশছাড়া মানুষটি থাকে সিরিয়াতে। সেই যে জায়োনিস্টদের দ্বারা বিতাড়িত হয়েছিলো নিজ মাতৃভূমি থেকে, সেই থেকে তাদের পরিবার আশ্রয় নিয়েছে, সিরিয়ার রাজধানী দামেষ্ক শহরে। বয়সে ও লেখাপড়ায় তিনি আমার সিনিয়র। আমি যখন ফার্স্ট ইয়ারে তখন থেকেই তিনি আমাকে বিশেষ স্নেহ করেন। তিনি একসময় আমাকে বেশ মোরাল সাপোর্ট দিয়েছিলেন। অনেকে বলেন আমাকে দেখতে উনার ভাইয়ের মত লাগে! একবার তো এক আরব ভদ্রলোক বলেই বসলেন, “আরে রিয়াদ, তোমার ছোট ভাইও চলে এসেছে এই দেশে? বাহ বেশ ভালো তো! কি নাম তোমার ভাই?” উনার কথা শুনে, আমরা তো হাসতে হাসতে মরি! রিয়াদ ভাইয়ের আচার আচরণ বাংলাদেশীদের মতই। অবশ্য ধর্মীয় কারণে আমাদের সাথে আরবদের কালচারাল অনেক মিল এম্নিতেই রয়েছে! এই রিয়াদ ভাই ভীষণ হ্যান্ডসাম! আবার বেশ ভদ্রও। উনাকে ইন্টেলিজেন্ট-ও বলা যায়, রাশিয়া-ইউক্রেইণে ফিজিক্স নিয়ে পড়ছেন ও রেগুলার পরীক্ষা পাশ করছেন, ইন্টেলিজেন্ট তো বটেই। কেভিনের সাথে কথা বলে তাকে আমার বিশেষ বেকুব ছাড়া আর কিছুই মনে হয় নাই! তবে কেভিন চালু মাল, নিজের অজ্ঞতা ঢাকতে জানে! ওদিকে রিয়াদ ভাই-কে সাদাসিধাই বলা যায়। অত ভাব তিনি দেখান না। তবে কেভিন ও রিয়াদের মধ্যে একটা মিল আছে। তারা দুজনাই মেয়েধরা! কিন্তু, এখানেও পার্থক্য বিদ্যমান। কেভিন যেখানে বাজারী মেয়েধরে চলে, রিয়াদ ভাই সেখানে বেছে বেছে তুখোড় মেয়েগুলোকেই ধরে। উনার নারী রুচীর আমি প্রশংসা না করে পারি না। আর খুব অল্প সময়েই যাদুর মত প্রভাবিত করে ফেলে যে কোন রূপসী নারীকে। আমি একাধিকবার উনার এই গুণ (দোষ)-টার নজীর দেখেছি! ফার্স্ট-ইয়ারে থাকতে তিনি আমাকে মেয়েধরার কিছু কোড শিখিয়েছিলেন। আমি অবশ্য সেগুলোর তাত্ত্বিক জ্ঞানকে আর ব্যবহারিক কাজে লাগাইনি! দেখি সামনে কখনো কাজে লাগানো যায় কিনা!

রিয়াদ ভাই: ভালোই চলছিলো রাতটা, হঠাৎ মেজাজ খিচড়ে গেলো আমার।
আমি: কেন? কি হলো আবার?
রিয়াদ ভাই: হারামজাদা কেভিন!
আমি: (অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম! কেভিন আবার কি করলো? কেভিন বেকুব ও মেয়েবাজ হলেও তাকে এ্যাগ্রেসিভ কখনো দেখিনি) কি করলো আবার কেভিন?
রিয়াদ ভাই: এটা ভাই ডান্স ফ্লোর। আজ নিউ ইয়ারের রাত্রী। সবাই খুশিমত নাচবে, তাই তো?
আমি: বিলকুল সহি বাত! তা হলোটা কি?
রিয়াদ ভাই: আমি নাচে ইনভাইট করলাম আলোনা-কে। আলোনাও নাচলো আমার সাথে। তারপরই তো গোলমাল!
আমি: (ঘটনা জটিল মনে হলো!) কি গোলমাল?
রিয়াদ ভাই: আমার দিকে কেভিন তাকালো কটমট করে! তারপর মাফিয়া-মস্তানের মত আঙুল দিয়ে ইশারা করে বুঝিয়ে দিলো, ‘উহু মোটেও না। আমার বান্ধবীর সাথে নাচবে না।’

এবার আমি মনে মনে হাসলাম! বেশ কৌতুক অনুভব করলাম! লেগে গেছে দুই মেয়েধরার মধ্যে! একবার ভাবলাম, ‘কি দরকার ছিলো ভাই তোমার কেভিনের বান্ধবীর সাথে নাচার? বুঝলাম যে, অর্ধনগ্ন রূপসী আলোনাকে আজ রাতে টীন-এইজড পর্ণো-তারকার মত লাগছিলো! তাই দেখে কি তুমি নিজেকে সামলাতে পারো নাই? নাকি নিজের হ্যাডোম দেখাতে গিয়েছ? আবার ভাবলাম, কি দোষ রিয়াদ ভাইয়ের? নিউ ইয়ারের রাত্রী, ডান্স ফ্লোর তো ওপেন! যে যার সাথে পারে নাচবে, ঐ মেয়ের আপত্তি না থাকলেই হলো; এটাই তো এই দেশের রীতি! ইউক্রেইণকে কি বাংলাদেশ পেয়েছে নাকি? দেখলাম, উভয় সংকট, রিয়াদ ভাইকে দোষী-নির্দোষ দুটাই ভাবা যায়! আবার মনে মনে খুশিই হলাম যে, রিয়াদ ভাই এটা করেছে! উচিৎ শিক্ষা পেয়েছে কেভিন, ‘ব্যাটা ব্ল্যাক-ম্যাজিক মারাও! কোথায় এখন তোমার ব্ল্যাক-ম্যাজিক? রিয়াদ ভাই একটু নাচলো তোমার বান্ধবীর সাথে, আর অমনি তুমি অস্থির হয়ে গেলে? কই কাজে লাগাও দেখি তোমার ব্ল্যাক-ম্যাজিক! হিন্দি-চুলের ব্ল্যাক-ম্যাজিক! ব্যাটা বাটপার কোথাকার!

আমি: রিয়াদ ভাই। আসো আমার রুমে।
রিয়াদ ভাই: চলো।

উনাকে আমার রুমে এনে গরম গরম কফি খাওয়ালাম। সাথে মিষ্টি পুডিং ও অন্যান্য খাবার।

রিয়াদ ভাই: কই, মাছ রান্না করো নাই আজকে?
আমি: না ভাইয়া। আজ আর মাছ রান্না করি নাই।

রিয়াদ ভাই মাছের ভীষণ ভক্ত! আরবদের বেশিরভাগই মাছের ভক্ত। মরুভূমির দেশে মাছ পাওয়া যায় না। তাই মাছ সেখানে ডেলিকেট! রিয়াদ ভাই, মাঝে মাঝেই আমার রুমে আসেন মাছ খেতে। মাঝে মাঝে নিজেই মাছ কিনে এনে আমাকে বলেন রাধো, দুই ভাইয়ে মিলে খাই। একবার আনলেন
বিশাল বড় একটা মাছ। বৈকাল হৃদের মাছ নাকি। মাছের ডিমই হয়েছিলো কয়েক কেজি। আমরা কয়েকদিন ধরে খেয়েছিলাম ঐ মাছ।

আমার রুমে খেয়েদেয়ে, কথাবার্তা বলে ঠান্ডা হলেন রিয়াদ ভাই। রিয়াদ ভাইটা মোটামুটি ব্যালেন্সড। অন্যান্য আরবদের মতন বা বরিশাইল্লাদের মতন রগচটা নন। অন্য কোন আরব হলে আজ কেভিনের সাথে মারামারিই লেগে যেত! বেশ কিছু সময় কাটিয়ে চলে গেলেন রিয়াদ ভাই। আমি আবার একা হয়ে গেলাম। ওদিকে বাইরে মোহনীয় মিউজিক বেজেই চলছে!

আমি ঠিক জানি না, রাত আনুমানিক কয়টা বাজে। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালেই জানা যেত, কিন্তু আমার তখন তা ইচ্ছা করছিলো না। নিউ ইয়ারের রাত হলো সেই রাত, যে রাতে কেউ ঘুমায় না। জেগে থাকে সারা রাত। নাচগান, আনন্দ, ফুর্তি করে! বাইরে তাই চলছিলো। ডান্সফ্লোর থেকে অবিরাম গানের সুর ও শব্দ ভেসে আসছিলো; আর জানালার বাইরে থেমে থেমে জ্বলে উঠছিলো আতশবাজি! আমার ঘুম ঘুম লাগছিলো। কিন্তু এতকিছুর মধ্যে ঘুমানো যায় না। অবশেষে আমি রুমের বাইরে গেলাম।

ডান্সফ্লোরের সামনের করিডোরে দাঁড়ালাম। এখন নাচঘরে লোকজন কিছু কমে এসেছে। কেউ কেউ হয়তো টায়ার্ড হয়ে চলে গিয়েছে; কোন কোন জোড়া কপোত-কপোতী নাচতে নাচতে রুমে চলে গিয়েছে, বাকি রাতটা একান্তে উপভোগ করতে! যারা রয়েছে তাদের মধ্যে ওলগা-কে দেখলাম না। রিয়াদ, কেভিন, আলোনা কেউই নাই। আলেখান্দ্রোকে দেখলাম আছে। সবুজকেও দেখলাম একপাশে। হঠাৎ শাড়ী পড়া মেয়েটিকে স্পষ্ট দেখলাম। আরে ও তো আর কেউই না, ও যে আমাদের ক্লাসের তানিয়া! বাহ! শাড়ীতে তো দারুণ লাগছে ওকে। কপালে টিপও তো দিয়েছে দেখছি!

রুশ-ইউক্রেণীয় মেয়েকে শাড়ীতে এত সুন্দর মানাবে, আমি তা স্বপ্নেও ভাবিনি! আমি মুগ্ধ হয়ে দেখলাম! তখন দ্রুত লয়ের নাচ চলছিলো, তানিয়া অনেকটা একা একাই নাচছিলো। আশেপাশে ছিলো দুই-একজন। তানিয়া চেষ্টা করছিলো, উপমহাদেশীয় ঢংয়ে নাচতে। অতটা না পারলেও, খারাপ হচ্ছিলো না ওর উচ্চাঙ্গ নৃত্য! ভাবলাম, তানিয়া কি ভারতীয় সিনেমার ভক্ত?

একটু পরে স্লো-মিউজিক বাজতে শুরু করলো। এবার তানিয়া একপাশে দেয়ালের কাছে সরে এলো। একটি ছেলে এগিয়ে গেলো ওকে বল নাচে ইনভাইট করতে। বিনয় ভরে তাকে রিফিউজ করলো তানিয়া। এরপরে আরেকটা ছেলে গেলো, তানিয়া তাকেও রিফিউজ করলো। এরপর গেলো আলেখান্দ্রো। ভাবলাম এবার হয়তো নাচে রাজি হবে তানিয়া, দক্ষিণ আমেরিকার ছেলেমেয়েগুলো নাচে পারদর্শী! কিন্তু আলেখান্দ্রোকেও ভদ্রভাবে রিফিউজ করলো তানিয়া। আমি ভাবলাম, বেশ মুডি মেয়েতো!

কখন যে সবুজ আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি।
সবুজ: (মদিরার প্রভাবে কিছুটা জড়ানো কন্ঠে) ভাইয়া, যান নাচেন।
আমি: কোথায় নাচবো?
সবুজ: শাড়ীওয়ালীর সাথে নাচেন যান।
আমি: তানিয়ার সাথে?
সবুজ: হুম। ওতো আজ শাড়ী পড়ে এসেছে। আমি কয়েকবার চেষ্টা করেছিলাম ওর সাথে নাচতে। রাজি হয় না।
আমি: তাই?
সবুজ: হুম আপনি যান। নাচে ইনভাইট করেন ওকে।

ততক্ষণে আমার মনেও ওর সাথে নাচার ইচ্ছা হলো। কিন্তু ভাবলাম, যেভাবে তানিয়া সবাইকে ফিরিয়ে দিচ্ছে তাতে আমি গেলে না আবার রিফিউজড হই! বেইজ্জতি হবে তা হলে! কিন্তু কোন এক অদৃশ্য শক্তি আমাকে ওর দিকে টেনে নিয়ে গেলো!

খুব রোমান্টিক একটা স্লো-মিউজিক গান বাজছে। ততক্ষণে অনেক কাপল-ই খুব ঘনিষ্ট হয়ে নাচতে শুরু করেছে। বাকিরা দেয়ালের কাছ ঘেষে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ধীর গতিতে তানিয়ার দিকে এগিয়ে গেলাম। কাছাকাছি হতে তানিয়া আমার দিকে চোখ তুলে তাকালো। আমি ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে মৃদু হাসলাম!

(চলবে)

(এই গল্পের চরিত্রগুলো কাল্পনিক)

রচনাতারিখ: ১০ই জানুয়ারী, ২০২২ সাল
রচনাসময়: দুপুর ০২টা ১৮ মিনিট

Happy New Year 2022 (6)
————— Ramit Azad

পূর্বের পর্বের লিংক:

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.