হ্যাপী নিউ ইয়ার ২০২২ (পর্ব -১)

হ্যাপী নিউ ইয়ার ২০২২ (পর্ব -১)
——————————————- রমিত আজাদ

মেয়েটিকে প্রথম দেখায় একদম রূপসী মনে হয়নি! একরকম অসুন্দরীই মনে হয়েছিলো। ১৭/১৮ বছর বয়সের রুশ বা ইউক্রেণীয় মেয়েরা হয় একেবারে সদ্য প্রস্ফুটিত শিশিরে ভেজা গোলাপের মতন মনোরম! ওদের মধ্যে যারা সুন্দরী, তারা তো লা জওয়াব! আর বাকিরাও যথেষ্ট সুন্দরী। আমার এক বন্ধু বলেছিলো, “বোম্বাইয়া ফিল্মের নায়িকা হেমা মালিনি-মন্দাকিনীরা রাশিয়া-ইউক্রেইণে এলে ভাত পাবে না!” বন্ধুর কথার মধ্যে ভেজাল ছিলো না এক ফোটাও! ওদের চাইতে অনেকে বেশি ধারালো চেহারার মেয়ে এই দেশের পথে-প্রান্তরেই দেখা যায়। অথচ এই মেয়েটি রূপসী নয়! কেন? পরে অবশ্য জেনেছি যে, মেয়েটি গ্রামের মেয়ে ছিলো, আর সব দেশের গ্রামের মেয়েদের মতই, এখানকার গ্রামের মেয়েরা অতটা আকর্ষণীয়া হয় না। আরো পরে জেনেছি (এটা ব্রাকেটে লিখলাম, এবং ধরে নেবেন যে কানে কানে বলছি; ভার্জিন মেয়েদের সাজগোজে মনযোগ থাকে কম, তাই তারা রূপসী হলেও সেটা ফুটিয়ে তুলতে পারে না। কার জন্য সাজবে তারা?)

আমি নিজে রূপবান তরুণ নয় মোটেও! কিন্তু ঐ যে স্বার্থপর পুরুষ, নিজের বেল নাই কোন, কিন্তু মেয়েদের রূপের বিচার করতে গিয়ে একেবারে ষোলআনা! তাই ঐ মেয়েটির দিকে কখনো তাকাতাম না! তবে খেয়াল করতাম যে, সবগুলো ক্লাসেই মেয়েটা একেবারে প্রথম বেঞ্চিতে বসে; আর লেখাপড়ায় সেইরকম সিরিয়াস! আরেকটি বিষয় খেয়াল করলাম যে ও খুব বেশি বন্ধুদের সাথে মেলামেশা করে না। কোন ছেলে বন্ধু তো ওর দেখলামই না, আর মেয়ে বন্ধু যে কয়জন আছে, তারাও লিমিটেড। কথাও বলে কম! তাও আবার মেপে মেপে। খুব সাবধানে কথা বলে যেন কারো মনে আঘাত না লাগে, এবং বাড়তি কিছু যেন বলে না ফেলে। আমি ভাবতাম, ওকি কনফিডেন্স-এর অভাবে ভোগে?

মেয়েটির গায়ের রঙ নিঃসন্দেহে দুধে-আলতা! এটা বাংলাদেশে ব্যাপার হলেও, এখানে কোন ব্যাপার না! এই দেশে সবার রঙই দুধে-আলতা! এবার পাঠকরা প্রশ্ন করতে পারেন যে, আমি দুধের মধ্যে আলতা মিশিয়ে কখনো দেখেছি কিনা যে, ঐ কম্বিনেশনের রঙটি কেমন হয়? উত্তরে বলবো, “ইয়েস”। বিজ্ঞানের ছাত্রতো, এক্সপেরিমেন্ট করতে ভালো লাগে। তাই ঐ এক্সপেরিমেন্ট করে আমি দেখেছি যে, রঙটা কেমন হয়। মেয়েটির হাইট পাঁচফুট তিন ইঞ্চি হতে পারে। আবারো এই দেশের হিসাবে মেয়েটি দীর্ঘাঙ্গিনী নয়! ফিগার? জানি না। ঐ বয়সে মেয়েদের শরীরের বাঁকের দিকে তাকাতাম না। হতে পারে যে কাজটা অশ্লীল মনে হতো, হতে পারে যে উনিশ বছর বয়সের আমি তখনও অতটা ম্যাচিয়ুরড হইনি। পরিপক্ক বয়সের হলে অবশ্যই দেহের প্রতিটি বাঁকই খুঁতে খুঁতে দেখতাম। পৌরাণিক নায়িকাদের মত সামনে পিছনে কতটা ভারী তা দৃষ্টিস্কেলে মাপার চেষ্টা করতাম। আর একটি বিষয় হলো যে, হাল ফ্যাশনের মেয়েদের মত ও, অতটা টাইট-ফিট বা সংক্ষিপ্ত পোশাক-আশাক পড়তো না। তাই ওর দেহের বাক অতটা চোখেও পড়তো না! গ্রামের মেয়ে বলেই হয়তো পোশাকের শালীনতা বজায় রাখতো। অবশ্য পরে বুঝেছি যে ও মানুষ হিসাবেই যথেষ্ট শালীন ছিলো।

আর একটি বিষয় লক্ষ্য করলাম যে, ও বেশিরভাগ সময়ই আরেকটি মেয়ের সাথে বসতো। ঐ মেয়েটিও ওর মতই ছোট-খাটো গড়নের ছিলো। তবে বন্ধু মেয়েটি যথেষ্ট রূপবতী ছিলো। দুজনাই ছিলো খারকোভ শহরের বাইরের মেয়ে, তাই তারা দুজনাই থাকতো ডরমিটরিতে। আমি অবশ্য জানতাম না যে, তারা দুজনা ডরমিটরির একই রুমে থাকে, নাকি ভিন্ন ভিন্ন রুমে? তবে এইটুকু জানতাম যে তারা, আমি যে ডরমিটরিতে থাকি তার পাঁচ তলায় থাকে। আমি থাকতাম দোতলায়।

এবার পাঠকদের নিশ্চয়ই জানার আগ্রহ হয়েছে যে, মেয়েটির নাম কি? আমার কিন্তু সে আগ্রহ হয়েছিলো না। মেয়েটি তো রূপসী ছিলো না, আমার নজর তো সে কাড়েনি, তো তার নাম দিয়ে আমার কাম কি? হ্যাঁ, বন্ধু মেয়েটির নাম আমি জেনে নিয়েছিলাম; তার নাম লেনা। ইয়েলেনা-কে ওরা সংক্ষেপে লেনা বলে। বলুক, আমার লেনা নামটাই বেশি সুন্দর লাগে। নদীর নামে নাম। অনেকটা আমাদের দেশের ‘মেঘনা’ বা ‘সুরমা’-র মত। লেনা মেয়েটি হাসতো বেশি, আর অসুন্দরী মেয়েটি হাসতো কম। কেন? জানিনা। সিরিয়াস মেয়ে হয়তো। লেনা ছিলো এক্সট্রোভার্ট টাইপের মেয়ে, অসুন্দরী মেয়েটি-কে ইনট্রোভার্ট-ই মনে হত। পরে অবশ্য জেনেছি যে, এই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই ইউনিক, কারো সাথে কারো তুলনা করার দরকার নেই। তুলনা হয়ও না।

যাহোক নামের কথা বলছিলাম। একদিন কোন এক ক্লাসে স্যার উপস্থিত হতে পারেননি। খ্যাতিমান এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকরা ভীষণ সিনসিয়ার, ক্লাসের কোন গাফিলতি উনারা করেন না। তার মানে স্যার আজ অসুস্থ তাই ক্লাস নিতে আসতে পারেননি। মাত্র ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি তাই তখনও অতটা লায়েক হয়ে উঠি নাই! তাই সুবোধ বালক-বালিকার মত আমরা কিছুক্ষণ বিশ/বাইশ তলা বিশাল দৈত্যাকৃতি দালানের করিডোরে ঘোরাঘুরি করলাম। তারপর গেলাম ক্যান্টিনে কফি পান করতে। গল্পগুজব করলাম। পাঠকরা যদি ভাবেন যে বিদেশীরা খুব ভদ্রলোক তারা শুধু গল্পই করে, বাঙালীদের মত কোন গুজব করে না, তাহলে ভুল করবেন, এই কাজে তারাও সিদ্ধহস্ত! ছেলেরা একসাথে বসলে নিঃসন্দেহে মূল আলোচনাটি হয় মেয়েদের-কে নিয়ে। ঐ বয়সী মেয়েরা একত্রিত হলে কি নিয়ে আলোচনা করে, তা আমি জানতাম না; তবে শুনেছি যে ছেলেরা যা নিয়ে আলাপ করে, মেয়েরাও ঐ তাই নিয়েই আলাপ করে; মানে ছেলে আর প্রেম ইত্যাদি আর কি।

এদিকে খেয়াল করলাম যে, ঐ অসুন্দরী মেয়েটি আজ আসেনি। লেনা মেয়েটি একাই ছিলো। ভাবলাম, তাহলে কি স্যারের মতন ওরও আজ অসুখ করেছে?

তা গল্প ও গুজব করতে করতে দেড়টি ঘন্টা মানে একটি ক্লাসের লেংথ-টাইম পেরিয়ে গেল। তারপর আমরা ছুটলাম পরবর্তি ক্লাসে। এই ক্লাসটি লেকচার ক্লাস, তার মানে অনেকগুলি গ্রুপ একসাথে হয়ে একটা লেকচার-থিয়েটারে বা হলরুমে জড়ো হয়। এখানে মঞ্চে উঠে বক্তৃতা করেন অপেক্ষাকৃত বয়স্ক কোন তুখোড় অধ্যাপক। মাঝে মাঝে এ্যাকাডেমী অব সায়েন্স-এর মেম্বার-বিজ্ঞানীও এই ধরনের ক্লাস নেন।

কিচির-মিচির করতে করতে আমরা শ’দুয়েক ছেলেমেয়ে বিশাল হলরুমটিতে বসে গেলাম। মিনিট দশেক ব্রেক-টাইম পাওয়া যায়, দুটি ক্লাসের মধ্যে। সবাই ক্লাসরুমে ঢুকে বসতে বসতে এই সময়টা পার হয়ে যায়। আমি লক্ষ্য করলাম যে, আজ ক্লাসের প্রথম দিকের একটি বেঞ্চিতে লেনা একাই বসলো। ওর পাশের সীট-টায় কেউ বসলো না। বুঝলাম, অসুন্দরী মেয়েটা আজ নিশ্চয়ই অসুস্থ, তাই আসতে পারেনি। লেনা-কে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলে হয়তো জানা যাবে। কিন্তু লেনার সাথেও আমার পরিচয় নেই, তাই কোন জিজ্ঞাসা করতে পারলাম না। গিয়ে ওর সাথে পরিচিত হলেই হয়, কিন্তু আমার কেমন যেন বাধো বাধো করতে লাগলো। তার উপর আবার যদি ঐ মেয়েটির খোঁজ নেই, তাতে অন্য কিছুও মনে করে বসতে পারে।

মেক্সিকোর খোরখে (জর্জ নামটিকে স্প্যানিশ ভাষায় ‘খোরখে’ বলে) ছেলেটি বেশ ফ্রী! সব মেয়ের সাথেই গিয়ে গিয়ে কথা বলে। মেয়েরাও ওর সাথে সাবলীল। খোরখে-কে দেখেছি মাঝে মাঝে লেনা ও ঐ মেয়েটির সাথে কথা বলতে। দেড় ঘন্টার ক্লাসে পয়তাল্লিশ মিনিট পর ব্রেক-টাইম হয় পাঁচ মিনিটের জন্য। এতে ব্রেইন-এর বিশ্রাম হয়, একটু রিলাক্স হয়। উপরন্তু, যারা লেট করেছে, তারা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে; ব্রেক-টাইমে ক্লাসে ঢুকে যায়। জেনারেল ফিজিক্সের জ্ঞানী শিক্ষক ইলেকট্রিসিটি ও সেমিকন্ডাক্টরের উপর একটা শক্ত ক্লাস নিচ্ছিলেন। ব্রেক-টাইমে দেখলাম আট-দশজন স্টুডেন্ট-এর সাথে ঐ মেয়েটিও ঢুকলো। আশ্বস্ত হলাম, ওর অসুখ করে নাই।

তাহলে আজ ও এত লেট করলো কেন বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে? যাহোক, কত ঘটনাই তো ঘটে! আমি তো মাঝে মাঝে ক্লাসেই আসি না! দেখলাম ও যথারীতি গিয়ে বসলো লেনার পাশে। লেনা চতুর হাসি নিয়ে ওকে বললো, “তানিয়া, তুমি আজ ক্লাসে আসো নাই!? আজ তো ক্লাসে অনেক ইমপর্টেন্ট অংক-টংক করানো হয়েছে!” জানলাম, অসুন্দরী কিন্তু লক্ষী ঐ মেয়েটির নাম, তানিয়া।

লেনার কথা শুনে তানিয়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেলো।
তানিয়া: খুব ইমপর্টেন্ট ক্লাস মিস করে ফেলেছি?!
লেনা: অবশ্যই।
তানিয়া: কিন্তু, আমি যখন বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলাম, ওরা যে বললো, আজ ঐ সেমিনার ক্লাসটি হয়নি?
লেনা: (তার খাতা খুলে দেখালো। আবারো মুচকী হাসলো) ক্লাস হয়নি কে বলে? তাহলে এই অংকগুলো কোথা থেকে এলো?
খাতার অংকগুলো দেখে তানিয়ার মুখ আবারো ফ্যাকাশে হয়ে এলো। একবার খাতার দিকে, একবার লেনার মুখের দিকে তাকায়। কিন্তু কিছু সময় পরে লেনার মুখের এক্সপ্রেশন দেখে ওর সন্দেহ হলো!
তানিয়া: না না, কোন ক্লাস-ট্লাস হয়নাই। তুমি বানিয়ে বানিয়ে বলছো।
লেনা: তাহলে খাতার অংকগুলা কি মিথ্যা?

এবার তানিয়া এগিয়ে গেলো খোরখে-র দিকে। বললো, “খোরখে, তুমি সত্যি করে বলতো। আজ কি সেমিনার ক্লাস-টা হয়েছিলো?” লেনা দৌড়ে গেলো খোরখে-র দিকে বললো, “খোরকে, বলো বলো, আজকে ক্লাসটা যে হয়েছে ওকে বলো।” খোরখে পরলো দোটানায়, দুদিক থেকে দুই তরুণী ওকে মিনতি করছে! ও এখন কার মন রাখবে? সত্যি বললে লেনা ক্ষেপবে; মিথ্যা বললে তানিয়ার মন খারাপ হবে! খোরখে অতঃপর কিছুই না বলে শুধু লাজুক হাসতে থাকলো।

হ্যাঁ, তানিয়ার নামটা এভাবেই জেনেছিলাম।


ওটা ছিলো ফার্স্ট ইয়ারের কথা। সবাই তখন ছিলো নেইভ! সবার বয়স ছিলো কম। পড়ালেখা ছাড়া আর তেমন কিছুই বুঝতাম না। আস্তে আস্তে আমাদের বয়স বাড়লো, বাড়লো অভিজ্ঞতা। আমরা প্রতি বছর প্রমোশন পেয়ে পেয়ে নতুন নতুন ইয়ারে উঠতে লাগলাম। সেইসাথে আমাদের ব্যাক্তি জীবনও পাল্টাতে লাগলো। মেয়েদের অনেকের বয়ফ্রেন্ড হলো। ছেলেদের হলো গার্লফ্রেন্ড। আমাদের সহপাঠীদের মধ্য থেকেই দুই-একটা কাপল-এর বিয়েও হলো।

সেকেন্ড ইয়ারে থাকতে লেনাকে একদিন দেখলাম এক বয়ফ্রেন্ড-এর কোমর জড়িয়ে ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে এলো। তার কিছুদিন পরে তাদের বিয়ে হলো। লেনা ডরমিটরি ছেড়ে শ্বশুড় বাড়ীতে গিয়ে থাকতে শুরু করলো। তানিয়া তখন অনেকটাই একা হয়ে গেলো।

ফোর্থ ইয়ারে যখন মাত্র উঠলাম, ডরমিটরির বাঁজখাই নারী কমান্ডেন্ট (ইন-চার্জ) এসে আমাকে বলে, “আপনাকে এই রুম পাল্টাতে হবে। আমি আপনাকে পাঁচতলায় একটা রুম দিবো।” এই মহিলা টিকে আমি দুই চোখে দেখতে পারতাম না; এবং উল্টাটাও; আমাকে সে বোধহয় চারচোখেও দেখতে পারতো না। আমি বললাম, “কি সমস্যা?”

নারী কমান্ডেন্ট: (তেলে বেগুনে জ্বলে) সমস্যা কিছু নাই। ডরমিটরিতে নানান চেইঞ্জ হচ্ছে। রুম তো কিছু অদল-বদল করতেই হবে। আপনাকে পাঁচতলায় একটি টু-সিটেড রুমে পাঠানো হবে।
আমি: টু-সিটেড? আমার সাথে কে থাকবে?
নারী কমান্ডেন্ট: যে খুশী সে থাকবে। সেটা আমার ব্যাপার। দেখি কাকে পাঠানো যায়!
আমি: ওসব চলবে না। আমি ঐ রুমে একাই থাকবো।
নারী কমান্ডেন্ট: না, তা হবে না। আইন আছে না? আইন অনুযায়ী চলতে হবে।

আমি মনে মনে বলি, “ওরে আমার আইন মারানি! নিজে দুর্নীতি করো গন্ডায় গন্ডায়; আর আমাকে এসেছো আইন শেখাতে? সমাজতান্ত্রীক দেশের আইন আমি জানি। যেখানে বাক-স্বাধীনতা বলে কিছু নাই সেখানে কালো টাকায় কথা কয়! কমান্ডেন্ট পুরোহিতের দৌড় কোন মন্দির পর্যন্ত সেটাও আমি জানি। স্টুডেন্ট টাউনের কর্মকর্তাকে গিয়ে কিছু টাকাকড়ি দিয়ে আসলেই হবে। কর্মকর্তা নির্দেশ দিয়ে দেবে, ‘ওকে একা এক রুমে থাকতে দাও।’ অমনি সুরসুর করে কমান্ডেন্ট আমাকে অনুমতি দিতে বাধ্য হবে। যদি কর্মকর্তায় কাজ না হয়, তাহলে আরেকটু উপরে যেতে হবে, খরচ আরেকটু বেশি করতে হবে। অথবা কোন ট্রিক খাটাতে হবে। এই অল্প বয়সেই আমি শিখে গিয়েছি, গণতন্ত্রহীনতা বা স্বৈরাচারের সুযোগ কিভাবে নেয়া যায়। যেই দেশে গণতন্ত্র ও বাক-স্বাধীনতা নেই, সেই দেশে নৈতিকতাও নেই। তবে হ্যাঁ নৈতিকতার বুলি আছে বেশ!’

গেলাম আমি স্টুডেন্ট টাউনের কর্মকর্তার কাছে। মোটাসোটা চল্লিশোর্ধ বয়সের কর্মকর্তা আমার দিকে তাকিয়ে মাপার চেষ্টা করলেন। মনে মনে ভাবলেন, এর কাছ থেকে কত টাকা ঘুষ নিয়ে কাজটা করা যায়। আবার হয়তো একটু চিন্তাও করলেন, যার তার কাছ থেকে ঘুষ নেয়া আবার ঠিক-ও না। কাজ তো বুঝেশুনে করতে হবে। হঠাৎ তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনাকে আমি আগে কোথায় দেখেছি বলেন তো?” আমি বললাম, “মিটিং-এ। সিটি গভর্নমেন্টের মিটিং-এ।”
কর্মকর্তা: ও হ্যাঁ। তাই তো! আপনি বিদেশী ছাত্রদের সংগঠনের নেতা না?
আমি: জ্বী। বিদেশী ছাত্রনেতা।
কর্মকর্তা কিছুটা বিরস বদনে বললেন, “আচ্ছা। আপনি দুইদিন পরে একটু আসেন। দেখি আপনার জন্য কি করা যায়।”
আমি বুঝলাম, কর্মকর্তা আমার কাছ থেকে কোন ঘুষ নেবে না। এটা কোনভাবে সিটি গভর্নমেন্টের কানে গেলে তার বিপদও হতে পারে। অতএব আমাকে অন্য পথে যেতে হবে।
যাহোক, শেষ পর্যন্ত, আমি আমার ব্যবস্থা করে নিয়েছিলাম। টু-সিটেড রুমে একা থাকার ব্যবস্থা করেছিলাম। তবে কোন ঘুষ না দিয়ে ভিন্ন পথে এবং আইনত:। তবে হ্যাঁ, প্রভাব কিছুটা খাটাতে হয়েছিলো। দুনিয়াটাই তো এই! ‘প্রভাব যার, মুল্লুক তার’।


অবশেষে গ্রীস্মের কোন এক তপ্ত দুপুরে, পাঁচতলার একটি রুমে আমি স্থানান্তরিত হলাম। অদ্ভুতভাবে রুমটি আমার পছন্দ হলো। প্রথমত: এই রুমটি থেকে অনেক বড় খোলা আকাশ দেখা যায়! দ্বিতীয়ত: রুমটির জানালার পাশেই একটা ঝাকরা গাছ আছে, সেই গাছ থেকে পাখির কিচির-মিচির শোনা যায়! তৃতীয়ত: রুমটির বিশাল জানালা দিয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটাই দেখা যায়। চতুর্থত: পাঁচতলায় উঠে আমি আবিষ্কার করলাম যে, আমার রুমটি-র বিপরীত দিকে ঠিক দুইটি রুম পরে, তানিয়ার থাকার রুম। এবং আমরা একই কমোন কিচেন ব্যবহার করবো।

পাঠকরা নিশ্চয়ই অবাক হয়ে ভাবছেন; যে মেয়েটিকে, মানে আমার সহপাঠিনীটিকে আমি ফার্স্ট ইয়ার থেকে অসুন্দর ভাবতে শুরু করেছি। তাকে কাছাকাছি রুমে থাকতে দেখে আমি এতটা আনন্দিত হলাম কেন?

হ্যাঁ, এটাই প্রকৃতির খেলা! যাকে একসময় অল্পবয়সে আমার অসুন্দর মনে হয়েছিলো, আমার চোখের সামনেই ধীরে ধীরে সে যেন ক্রমশ: রূপসী হয়ে উঠতে শুরু করলো! তিনটি বছর পেরিয়ে যাবার পর আমার মনে হতে লাগলো, তানিয়া তো ভীষণ রূপবতী!

ওকে নিয়ে নিউ ইয়ার সেলিব্রেশনে আমার একটি চমৎকার স্মৃতি রয়েছে!

(চলবে)

(এই গল্পের চরিত্রগুলো কাল্পনিক)

রচনাতারিখ: ৩১শে ডিসেম্বর, ২০২২১ সাল
রচনাসময়: রাত ১০টা ৪৯ মিনিট

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.