Categories
অনলাইন প্রকাশনা

প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে কিছুক্ষণ – পর্ব ১১

প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে কিছুক্ষণ – পর্ব ১১
————————- ড. রমিত আজাদ

প্রাক্তন প্রেমিকার ম্যারেজ এনিভার্সারির ছবিতে লাইক দিতে কি ভালো লাগে?
ফেসবুকের দিকে তাকিয়ে দেখলাম তানিয়া ও তার স্বামীর যুগল ছবি, সেই বিয়ের দিনে তোলা, নীচে লেখা যে আজ তাদের ম্যারেজ এনিভার্সারী। এই ছবিতে আমি লাইক দেই কি করে?

আমাকে একবার একজন বলেছিলেন যে, তিনি নাকি তার প্রাক্তন প্রেমিকার বিয়েতে উপহার নিয়ে দাওয়াত খেয়ে এসেছিলেন। এই দৃশ্যটা আমি কিছুতেই কল্পনা করতে পারিনা, চোখের সামনে আমার প্রেমিকার বিয়ে হচ্ছে, সে অন্য একজনার বাহুলগ্না হতে যাচ্ছে, এটি সম্ভবত বিশ্বের সবচাইতে যন্ত্রণাদায়ক দৃশ্যের মধ্যে একটি। ঐ ভদ্রলোকের নার্ভ হয়তো খুবই শক্ত। আমিও আমার নার্ভ খুব শক্ত মনে করতাম একসময়, কিন্তু আজ আমার মনে হচ্ছে, আমার নার্ভ অতটা শক্ত নয়।

আজ একটা বিয়েতে এ্যাটেন্ড করে এলাম। আমার এক বন্ধুর ছোট ভাইয়ের বিয়ে ছিলো। অবশ্য বর-কনে দুজনকেই আমি আগে থেকেই চিনতাম। বন্ধুর বাসায় যখন গিয়েছি তখন মাঝে মাঝে ওদের দেখেছি। আমার অফিসেও ওরা দুজনে এসেছিলো একবার। ওদের জুটিটাকে দেখে আমার ভালো লেগেছিলো বেশ, মনে হতো ওরা খুব সুখী। তখন থেকেই মনে মনে দোয়া করতাম যেন ওদের সম্পর্কের পরিনতি হয় মিলনের। নিজেকে দিয়ে বিরহের কষ্টটা বুঝি আমি। আজ সেটা ঘটেছে, ওদের দুজনার বিয়ে হয়েছে। বিয়ে বাড়ীতে ঢুকে দেখলাম, বর এখনো আসেনি, শুধু কনে একা বসে আছে মঞ্চে। আমার একটু খটকা লাগলো, ঠিক পার্টি সেন্টারে এসেছি কি? কনের দিকে তাকিয়ে তাকে রিকোগনাইজ করতে পারলাম না। আমি যাকে আগে দেখেছি সেই মেয়ের সাথে কনের চেহারার পার্থক্য অনেক। তারপর আরো ভালোভাবে চেনার চেষ্টা করলাম, হ্যাঁ মেয়েটির হাইট, গড়ন সবই মিলে যাচ্ছে, কিন্তু চেহারাটা মিলছে না! আরেকবার ভালো করে দেখলাম, নাহ মিলাতে পারছি না! কনফিউজড হয়ে গেলাম। আমি ঠিক বিয়েবাড়ীতেই ঢুকেছি কিনা, বিষয়টা নিশ্চিত করা দরকার। অপরের বিয়ের অনুষ্ঠানে ঢুকে খেয়ে আসলে সেটা লজ্জার বিষয় হবে! এরমধ্যে পাশ থেকে একজন আমাকে বললেন, “স্লামালাইকুম স্যার।” দেখলাম আমার অফিসেরই একজন। আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালাম। তিনি বললেন, “তৃণা আমার ভাগ্নি”। এবার আশ্বস্ত হলাম, আমি ঠিক বিয়েবাড়ীতেই ঢুকেছি তাহলে। এবার নিজের মনেই বুঝলাম, আজকালকার বিউটি পার্লারগুলো বেশ এক্সপার্ট, মেকআপ দিয়ে মানুষের চেহারাই পাল্টে দিতে পারে। আমি বেশ কৌতুক অনুভব করলাম, তার মানে কেউ যদি পার্লারে গিয়ে বলে, “আমাকে নায়িকা ববিতার মুখশ্রীটি বানিয়ে দিন”, তারা তা পারবে বোধহয়!

যাহোক, বিয়ের সুস্বাদু সব খাবার-দাবার খাওয়ার পর। আমি আরেকবার মঞ্চের দিকে গেলাম। এবার বর-কনে দুজনেই আছে। কনে বাঙালী ট্রেডিশনাল লাল শাড়ীতে থাকলেও, বরের পরনে ইউরোপীয় স্যুট, যদিও সুদর্শন বরকে ঐ পোষাকে চমৎকার লাগছিলো, তারপরেও আমার মনে হলো বাঙালী বিয়েতে শেরওয়ানী-পাগড়ীতেই বর-কে ভালো লাগে। ওদের দুটিকে পাশাপাশি বসা অবস্থায় খুব সুন্দর লাগছিলো। চমৎকার মানিয়েছে জুটিটাকে। খুব সুখী মনে হচ্ছিলো ওদের দুজনকে। এই স্বর্গীয় দৃশ্যটি আমার ভালো লাগার কথাই ছিলো, কিন্তু আমার হঠাৎ করে খুব ঈর্ষা হলো! ওরাতো পারলো, ভালোবাসাকে চিরস্থায়ী করতে। আমি তো পারিনি। যে নারী আমার বাহুলগ্না হতে চেয়েছিলো, আমি তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছিলাম, তাই আজ সে অন্যের বাহুলগ্না!

একটা গান মনে মনে কেবল বাজে
‘কোন এক সন্ধ্যায় হাজার আতশবাজি আর সাঁনাইয়ের সুরে, তোমায় নিয়ে গেছে আমার কাছ থেকে দূরে বহুদূরে’।
———-XXX——–

শিউলি আর আমি মুখোমুখি বসে আছি একটি রেস্টুরেন্টে। ওর আজকের পড়নের পোষাকটি খুবই উত্তেজক সেমি ট্রান্সপারেন্ট জামাটির উর্ধ্বাংশের অনেকটাই অনাবৃত। শইউলিকে একা দোষ দিয়ে লাভ নেই। ঢাকার গুলশানের অভিজাত এই রেস্টুরেন্টে বসে থাকা অনেক ললনারই অনুরুপ পোষাক দেখলাম, এটাই হালফ্যাশন!

অনেকগুলো বছর আগের একটা ঘটনা মনে পড়লো। কোন এক জায়গায় আমি দাঁড়িয়ে আছি, সেখানে দুই বন্ধু এসে পরস্পরের সাথে দেখা করলো। আমি একপাশে দাঁড়িয়ে তাদের কথপোকথন শুনছিলাম
১ম বন্ধু: কিরে একেবারে ট্রান্সপারেন্ট শার্ট পড়ে এসেছিস! ভিতরে তো গেঞ্জিও নাই!
২য় বন্ধু: আরে এটাই তো এখনকার ফ্যাশন।
১ম বন্ধু: কিসের ফ্যাশন?
২য় বন্ধু: এই যে সুঠাম বুকটা দেখা যাচ্ছে!
১ম বন্ধু: ও। তাহলে প্যান্ট-টাও ট্রান্সপারেন্ট পড়। জিনিসটা দেখা যাবে সুন্দর!

আমাদের আজকের প্ল্যান একসাথে খাবার খেয়ে ওকে নিয়ে আমার বনানীর এ্যাপার্টমেন্ট-টায় যাবো। খাবার খেতে খেতে শিউলির সাথে কথা হচ্ছিলো।
শিউলি: আচ্ছা, ধরেন এরকম কোন আইন হলো যে, কারো মোবাইলে যদি নগ্ন নারীর ছবি পাওয়া যায়, তাহলে তার জরিমানা শাস্তি ইত্যাদি হবে। সেটা কেমন হয়?
আমি: এর মধ্যে খারাপ কি আছে?
শিউলি: অপ্রাপ্ত বয়স্করা নাকি আজকাল এর উপর খুব ঝুঁকে পড়েছে। স্কুলেও লুকিয়ে লুকিয়ে এসব দেখে, নিজেদের মধ্যে এইসব ছবি বিনিময় করে।
আমি: তুমি চাচ্ছো এগুলো বন্ধ হোক?
শিউলি: অনেকেই চায়। এজন্য শাস্তির বিধান-আইন হলে তারা আর তা করবে না।
আমি: অপ্রাপ্ত বয়স্ক মানে হলো তার ম্যাচুরিটি নাই। অর্থাৎ ভালো-মন্দের বোধ নাই। অপ্রাপ্ত-অবুঝদের শাস্তির বিধান হয় কি করে?
শিউলি: তাইতো! তাহলে?
আমি: অপ্রাপ্ত বয়স্করা যদি কোন অপরাধ করে তাহলে তাদেরকে সংশোধনী কেন্দ্রে পাঠানো যেতে পারে।
শিউলি: ও। আর প্রাপ্ত বয়স্করা যদি এই অপরাধ করে?
আমি: কোন অপরাধ?
শিউলি: এই যে, মোবাইল টেলিফোনে নগ্ন নারীর ছবি রাখা।
আমি: প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য এটা আদৌ অপরাধ নাকি?
শিউলি: তাহলে?
আমি: প্রাপ্ত বয়স্ক মানেই তো একটি নির্দিষ্ট বয়স পার হয়ে এইসব বিষয় উপভোগ করার অধিকার পাওয়া।
শিউলি: জ্বী।
আমি: দেখো নগ্ন নারীদেহের প্রতি যার আকর্ষণ নেই সে কি আদৌ পুরুষ মানুষ?
শিউলি: অবশ্যই না। নারী হিসাবে আমি তো তাকে হিজরা শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করবো।
আমি: আমিও সে কথাই বলছি। পুরুষ মানেই যার নারীর নগ্নতা-সৌন্দর্যের উপর আকর্ষণ রয়েছে। আর ওখান থেকেই তো বাকী সব কিছু।
শিউলি: বাকী সব কিছু মানে?
আমি: মানে সেখান থেকেই কোন এক তরুনীর প্রতি তার অনুরক্তি। তারপর ভালোলাগা-ভালোবাসা, সেই প্রণয় থেকে পরিনয়, তারপর যৌনতা, পরিশেষে সন্তান, মানে পরবর্তি প্রজন্ম। এভাবেই টিকে যায় বংশগতি, জীবনের ধারাবাহিকতা।
শিউলি: রাইট। তাহলে তো এ’ধরনের আইন তৈরীর কোন যৌক্তিকতা নাই।
আমি: আমি তো তাই মনে করি।
শিউলি: আচ্ছা, খাওয়া তো শেষ, চলেন এখন যাই।
আমি: কোথায়?
শিউলি: বারে? আমরা না ঠিক করলাম আজ রাতটা আপনার বনানীর এ্যাপার্টমেন্টে কাটাবো?
সেই প্ল্যান নিয়েই বেরিয়েছিলাম। কিন্তু কেন যেন ইচ্ছেটা হঠাৎ করে আমার উবে গেলো। আমি শিউলিকে বললাম
আমি: চলো তোমাকে বাড়ী পৌঁছে দেই।
———-XXX———-

জান্নাত: স্যার, কারো গোপন কথা প্রকাশ করে দেয়া কি ঠিক?
আমি: অবশ্যই ঠিক না। তবে হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?
জান্নাত: রিসেন্টলি কে নাকি গোপন কথা ফাঁস করে দিয়েছে। এই নিয়ে এখন সোসাল মিডিয়ায় তোলপাড় হচ্ছে যে, বিষয়টি তার তো জানার কথা নয়, তিনি জানলেন কি করে?
আমি: ও হো। হা হা হা!!!
জান্নাত: হাসছেন যে স্যার!
আমি: এ’ প্রসঙ্গে পুরাতন একটা কথা মনে পড়ে গেলো।
আমরা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বলতাম, “তোমার সিক্রেট এটাতো পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের সিক্রেট!” কারণ, একজন একটা কথা অপরজনকে বলে দিয়ে বলতো, “খুবই গোপনীয়, কাউকে বলবি না কিন্তু!” সে আবার কথা পেটে রাখার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আরেকজনকে কথাটা ফাঁস করে দিয়ে বলতো, “খুবই গোপনীয়, কাউকে বলবি না কিন্তু!” এভাবে বিষয়টা সবারই জানা হয়ে যেত।
জান্নাত: ও। এটাকেই বলে বোধহয় ওপেন সিক্রেট?
আমি: তাই হবে হয়তো।
আমার পুরাতন একটা কথা মনে পড়লো,
একজন খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ গিয়েছেন মস্কোতে। পঞ্চাশোর্ধ ব্যাক্তি তারপরেও সাধ-আহলাদ তখনো শেষ হয়নি। তাই আমার একজন ধনী ব্যবসায়ী বন্ধুকে ইনিয়ে-বিনিয়ে বললো, “এখানে কি কিছু সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাবেনা?” বন্ধুটি সাথে সাথেই বুঝে গেলো যে কি ধরনের সুযোগ-সুবিধা তিনি চাচ্ছেন। ব্যবসায়ী মানুষ নানাবিধ পারপাজে সুযোগ-সুবিধা যোগাড় করতে ওস্তাদ। দ্রুত ঐ খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ-এর জন্য সুযোগ-সুবিধা যোগাড় করে দিলেন। দামী হোটেল কক্ষে যখন চেতনায় সমৃদ্ধ রাজনীতিবিদ মহাশয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে শুরু করেন। আমার বন্ধুটি তখন ওখান থেকে আমাকে ফোন দিয়ে বসলো, “দোস্ত ঘটনা কি জানিস?” আমি বললাম, “কি হলো আবার?”
ব্যবসায়ী বন্ধু: মিঃ এক্ক্স-কে তো চিনিস?
আমি: হ্যাঁ, চেতনা সমৃদ্ধ খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ।
ব্যবসায়ী বন্ধু: সেই রাজনীতিবিদ মহাশয় এই মুহূর্তে আমার সামনের হোটেল কক্ষটিতে বসে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন।
আমি অট্টহাসি দিলাম। আসলে এরকম কিছু অভিজ্ঞতা আমারও আছে।
আমি: তা তুই বেচারার এই সিক্রেট বিষয়টা আমাকে ফোন করে জানাচ্ছিস কেন?
বন্ধু: না মানে, আমি আসলে কথাটা কাউকে না বলে শান্তি পাচ্ছিলাম না। তাই ঘনিষ্ট বন্ধু হিসাবে তোকে ফোন দিয়ে জানলাম। এখন একটু রিল্যাক্স লাগছে।
———-XXX———-

কম্পিউটার স্ক্রীনে ভেসে উঠলো তানিয়ার মেসেজ
তানিয়া: লাইনে আছো?
রাত এখন দুটা। তারমানে ওর স্বামী দেশে নাই। অথবা বাড়ীতে নাই। তারপরেও নিশ্চিত হবার জন্যে ফিরতি মেসেজ লিখলাম
আমি: ফোন করবো?
তানিয়া: করো।
আমি ওকে কল দিলাম। ওপাশ থেকে,

তানিয়া: হ্যালো। কেমন আছো?
আমি: ভালো। তুমি?
তানিয়া: আমি ভালোই আছি।
আমি: তোমার জামাই ঘরে নাই?
তানিয়া: ঘরে নাই, দেশেও নাই। ঘরে থাকলে তো আর তোমার সাথে ফোনালাপ করতাম না।
আমি: বলো।
তানিয়া: কি বলবো? তুমি বলো।
আমি: কয়েকদিন আগে একটা বিয়ে খেতে গিয়েছিলাম বুঝলে।
তানিয়া: কার বিয়ে?
এখানে আমি হোচট খেলাম। ঐ বিয়েটার কথা তানিয়াকে বলা ঠিক হবেনা। দুজন তরুণ-তরুণী ভালোবেসে বিয়ে করতে সমর্থ হয়েছে, এই কাহিনী তানিয়াকে বললে ও মনে কষ্ট পেতে পারে। আমি চুপ মেরে গেলাম।
তানিয়া: বললে না কার বিয়ে? কি বিষয়?
আমি: না মানে কিছুনা। মানে পরিচিত একজনার বিয়ে আরকি।
তানিয়া: তা কি হয়েছে সেখানে? তুমি হঠাৎ করে ঐ বিয়ের কথা আমাকে বলতে চাইলে কেন?
আমি: না মানে হয়েছে কি। মেয়েটা এমনভাবে সেজেছে যে ওকে দেখে আমি চিনতেই পারিনি।
তানিয়া: ও হো হো! হ্যাঁ, আজকাল পার্লারগুলো খুব এক্সপার্ট। মেকআপ দিয়ে চেহারাই পাল্টে দেয়। কেউ যদি চায় সুচিত্রা সেনের চেহারা করবে, পার্লারগুলো তা করতে পারবে।
আমি: হ্যাঁ, আমারও সেরকমই মনে হচ্ছিলো।
তানিয়া: তা ওদের বিয়ে কি ভালোবাসার।
আমি: (আমার সত্যি কথা বলতে ইচ্ছে করছিলো না) না, বাবা-মা ঠিক করে দিয়েছে। এ্যারেঞ্জড ম্যারেজ।
তানিয়া: এ্যারেঞ্জড? তাহলে তো ওদের আজকের অনুভূতি খুব ভালো ছিলো না।
আমি: ভালো থাকবে না কেন?
তানিয়া: ভেবে দেখোতো। হয়তো মেয়েটার ভালোবাসার কেউ ছিলো, অথচ বাবা-মা জোর করে অন্য একটা ছেলের সাথে বিয়ে দিচ্ছে। আহারে মেয়েটার জন্য আমার মায়া হচ্ছে!
আমি: আমি আর বলতে পারলাম না যে ওদের বিয়েটা ভালোবাসার। একবার যখন মিথ্যে বলেই ফেলেছি!
তানিয়া: তোমরা সবাই ওখানে হাসি-আনন্দ করলে! ধুমধাম করলে! আর মেয়েটার কথা ভেবে দেখো। কেমন তোলপাড় হয়েছে ওর বুকে! ও হয়তো বারবার ভাবছিলো ওর ভালোবাসার ছেলেটির কথা। যার সাথে এই জনমে আর ঘর করা হবে না। ভালোবাসে না এমন একজনকে নিয়েই জীবনটা কাটিয়ে দিতে হবে! এর চাইতে দু:খের আর কি হতে পারে?
আমি: হ্যাঁ, আর ওর ভালোবাসার ছেলেটাও হয়তো অনেক মনকষ্টে ভুগবে।
তানিয়া: (অনেকটাই রাগত সুরে) ছেলেটা মনকষ্টে ভুগবে? তাই মনে হয় তোমার?

আমি বুঝলাম আলোচনা সেনসেটিভ পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। আমি নিজেও আর এখন মানসিকভাবে ভালো ফীল করছি না।
আমি: তানিয়া, আমি এখন টেলিফোনটা রাখি। আরেকদিন কথা হবে।

আমি ওকে যে কথাটা ওকে অনেকদিন যাবৎ বলতে চাচ্ছি, সে কথাটা আজও বলা হলো না।

তারিখ: ২৮ জানুয়ারী, ২০১৭
সময়: সকাল ৩টা ৩০ মিনিট

(চলবে)

কেন আমি ওকে ভুলে যাবো?
———— ড. রমিত আজাদ

আমাকে অনেকেই প্রশ্ন করে, “এখনো ওকে ভুলতে পারলে না?”
আমি পাল্টা প্রশ্ন করি, “কেন আমি ওকে ভুলে যাবো?”

আমি তো অভিনয় করিনি, না করেছি প্রতারণা,
আমি তো মিথ্যে বলিনি, না করেছি ছলনা,
এই স্নায়ু শুধু তো স্নায়ু নয়, নয় শুধু প্রাণ-রসায়ন,
এই দেহ শুধু তো দেহ নয়, এখানে আরো আছে মন।

সেই মন থেকেই তো বলেছিলাম, “ভালোবাসি”,
কৃষ্ণচূড়ার বনে ঝড় তুলে, বাজিয়েছিলাম বাঁশী।
ঢেউ আসে ঢেউ যায়, বেলাভূমী সরেনা বরং গড়ে,
দিন আসে দিন যায়, ভালোবাসে কমেনা বরং বাড়ে।

হৃদয়ের ক্ষত, সেও কি বাড়ে? বাড়লে বাড়ুক!
সমস্ত হৃদপিন্ডটাকে ক্ষতবিক্ষত ঝাঁঝরা করুক!

আমার দেহটাকেও দুমরে-মুচড়ে ভেঙে ফেলো,
ভাঙতে ভাঙতে ঋষী কণাদের বর্ণিত
অণু-পরামাণুতে নিয়ে যাও।
কিন্তু আত্মা? তাকে কি ভাঙা যায়?

না।
এই আত্মা সেই আত্মা, যাকে কাটা যায়না, ছেঁড়া যায়না,
আগুনে দহন করা যায় না, বায়ু দ্বারা আর্দ্র করা যায় না।
সেই আত্মায় সত্তা হয়ে মিশে আছে ও,
কেন আমি ওকে ভুলে যাবো?

XXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXX

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

অনারারি ডক্টরেট ডিগ্রী কোন শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়

অনারারি ডক্টরেট ডিগ্রী কোন শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়:

While they’re a nice recognition and probably look good hanging on the wall, honorary degrees are not ‘real’ degrees; in other words, being awarded an honorary degree is not the same as earning an actual doctorate. In fact, an honorary degree is a degree honoris causa, Latin for ‘for the sake of the honor’.
It is recommended that such degrees be listed in one’s CV as an award, and not in the education section

অনারারি ডক্টরেট ডিগ্রী কোন শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসাবে বিবেচিত হয়না। এই কারনে কারো জীবন বৃত্তান্তে অনারারি ডক্টরেট ডিগ্রী-কে award সেকশনে অন্তভুর্ক্ত করতে বলা হয় এডুকেশন সেকশনে অন্তভুর্ক্ত করতে নিষেধ করা হয়। অনেকেই অনারারি ডক্টরেট ডিগ্রী হিসাবে নামের পূর্বে Dr. ব্যবহার করতে চায়, কিন্তু অনেক বিশ্ববিদ্যালয় সেটা করতে নিষেধ করে বরং তার জায়গায় HonD ব্যবহার করতে বলে।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

বিতর্ক কিন্তু ঝগড়া নয়!

বিতর্ক কিন্তু ঝগড়া নয়!
——– ড. রমিত আজাদ

‘জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতা’ নামে একটি প্রতিযোগিতা প্রবর্তিত হয়েছিলো জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের শাসনামলে। অল্প সময়ের মধ্যেই অনুষ্ঠানটি প্রচন্ড জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলো। আমার মনে আছে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে আমরা পরিবারের সবাইকে নিয়ে সাদাকালো টিভি পর্দার সামনে উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করতাম অনুষ্ঠানটি উপভোগ করার জন্যে। নিখাদ বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান ‘ছায়াছন্দ’ দেখার জন্য দর্শকদের আগ্রহ যতটুকু থাকতো, নিখাদ শিক্ষামূলক ‘জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতা’ দেখার জন্য দর্শকদের আগ্রহ থাকতো ততটুকুই। আমি তখন নিতান্তই বালক, কিন্তু ঐ প্রতিযোগিতা দেখে আমি ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম, এবং পরবর্তিকালে স্কুল-কলেজ জীবনে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন করে পুরষ্কারও পেয়েছিলাম। আমার মত আরো অনেকেই ছিলেন।

কেন এই বিতর্ক প্রতিযোগিতা প্রবর্তিত হয়েছিলো? কারণ বিতর্কের অপর নাম ‘বাক স্বাধীনতা’, বৃটিশ ও পাকিস্তান শাসনামলে আমাদের কোন বাক স্বাধীনতা ছিলো না, কেননা আমরা নিজ দেশে পরাধীন ছিলাম। জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের শাসনামলে ‘বাক স্বাধীনতা’ ছিলো বলেই বিতর্ক প্রতিযোগিতা প্রবর্তিত হয়েছিলো। আরো একটি কারণ ছিলো দেশের মানুষদেরকে বি-তর্ক (বিশেষ নিয়মে তর্ক) করতে শেখানো, কারণ এই দেশের মানুষ বি-তর্কের চাইতে অহেতুক তর্ক (যার অপর নাম ‘ঝগড়া’) করতেই বেশী অভ্যস্ত ছিলো। বিতর্কের কিছু তরিকা আছে, তার মধ্যে কয়েকটি হলো তথ্য, উপাত্ত ও যুক্তির ভিত্তিতে কথা বলা; বিপক্ষ গ্রুপকে তার পূর্ণ বক্তব্য উপস্থাপন করতে দেয়া, বাক-পটুতা দিয়ে ইমোশনাল কথাবার্তা বলে শ্রোতাদের প্রভাবিত না করে র‍্যাশনাল কথার উপর জোর দেয়া, অপরপক্ষের যুক্তি খন্ডনপূর্বক নিজ যুক্তি উপস্থাপন করা, এক কথার মধ্যে অপ্রাসঙ্গিক ও অসঙ্গতিপূর্ণ অন্য কথা টেনে না আনা, বিজ্ঞজনদের কথা মনযোগ দিয়ে শোনা, ইত্যাদি।

ফেসবুক ও ব্লগে কিছু লোকের মন্তব্য দেখে আমার খুব আফসোস হয় যে, এই জাতির অনেকেই এখনো বি-তর্ক করতে শেখেনি।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা – ৩

গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা – ৩
——————————————- ড. রমিত আজাদ

Rationale of the study ও Objective of the study:

গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র-এ একটা প্রশ্ন খুবই কমোন Rationale of the study ও Objective of the study এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য কি?
আমি প্রথমে এই দুটি বিষয়ের বাংলা অর্থ বলছি, তারপর বাংলা ও ইংরেজী মিলিয়ে তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করছি।
Rationale শব্দটির অর্থ ‘যুক্তিসহ ব্যাখ্যা’, ‘যৌক্তিক কারণ’ ও ‘যৌক্তিক ভিত্তি’ ইত্যাদি; আর Objective শব্দটির অর্থ ‘উদ্দেশ্য’।

এবার Rationale ও Objective-এর সংজ্ঞায়ন করছি

Rationale: A set of reasons or logical basis for a research. কোন একটি গবেষণা করার জন্য এক ঝাঁক কারণ বা যৌক্তিক ভিত্তি।
Objective: A thing aimed at. যে দিকে লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে।
যেমন: রাত জেগে পড়ে পড়ে ইলেকট্রিক বিল খরচ করার যৌক্তিকতা (Rationale) হলো পরীক্ষা পাশ করার উদ্দেশ্য (Objective) অর্জন।

Rationale: The reason of the research. গবেষণাটি করার কারণ।
Objective: The purpose of the research. গবেষণাটি করার উদ্দেশ্য।

এক কথায় বললে, ‘Rationale হলো Objective সিদ্ধির কারণ’।

Objective is the end product, while Rationale is the starting point. Objective হলো শেষ, আর Rationale হলো শুরু।

Research topic: ঢাকা শহরের যানজট নিরসন
Rationale of the study: অসহনীয় যানজটে ঢাকা শহরের মানুষের জীবন ত্রাহী ত্রাহী, সমস্যাটি এতই প্রকট যে এই নিয়ে গবেষণা করার যৌক্তিকতা আছে।
Objective of the study: এই গবেষণা সঠিকভাবে হলে এর প্রাপ্ত ফলাফল ব্যবহার করে ঢাকা শহরের মানুষদের যানজট থেকে মুক্তি দেয়াই হলো গবেষণাটির Objective।

Rationale: কোন একটি টপিক কেন গবেষণাযোগ্য এবং তা পূর্ববর্তি গবেষণাগুলোতে অথবা সমাজে আরো কতটুকু তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে এই বিষয়ের সংক্ষিপ্ত যৌক্তিক ব্যাখ্যাই হলো Rationale।
Objective: এই গবেষণার চূড়ান্ত লক্ষ্য কি সেটাই হলো Objective।

Research topic: জীবন কি কেবল জীব থেকেই হয়?
Rationale of the study: চারপাশে ছোট বড় অনেক রকমের জীবন দেখতে পাই, কিন্তু আমরা নিশ্চিত নই যে তাদের উৎপত্তি কি কেবল জীব থেকেই, না কি নির্জীব থেকেও জীবের উৎপত্তি হতে পারে? এই জ্ঞান অর্জনের যৌক্তিকতা রয়েছে। এটা একটি গবেষণাযোগ্য টপিক।
Objective of the study: গবেষণাটি সফলভাবে সম্পন্ন হলে আমরা নিশ্চিতভাবে জানতে পারবো যে, নির্জীব থেকে জীবের উৎপত্তি হয় কিনা। এটা আমাদের মানবজাতির জ্ঞানভান্ডারকে সমৃদ্ধ করবে। এই জ্ঞান ব্যবহার করে তা আমরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ব্যবহার করতে পারবো।
Method: এই গবেষণাটি করার জন্য আমি দুটা কাঁচের জার নিলাম ও তাতে কিছু পানি ঢাললাম। এবার ১নং জারে কিছু জীবানু রাখলাম ও ২ নং জারে কিছু রাখলাম না। এরপর দুটি জারকেই পুরোপুরি সিলড করে দিলাম।
Result: কিছুদিন পরে জার দুইটি খুললাম। দেখলাম ১ নং জারটিতে জীবানুর পরিমান বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু ২নং জারটিতে কোন জীবনেরই উদ্ভব হয়নি।
Findings: কেবলমাত্র জীব থেকেই জীবের উৎপত্তি হয়।

Categories
গল্প

গল্পটি বিরহের নয়

গল্পটি বিরহের নয়
———— ড. রমিত আজাদ

“ভাইজান হুমহুম কুমীর আইছে”।
আমাকে এসে জানালো কাজের মেয়ে।
আমি: কি! কে এসেছে?
কাজের মেয়ে: হুমহুম কুমীর।
আমি: বুঝলাম না।
কাজের মেয়ে: একটা লোক আইছে, তার নাম কয় ‘হুমহুম কুমীর’।
আমি: ও আচ্ছা। ঠিকআছে তুই যা। আমি দেখছি।
আমি দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। ভেজানো দরজা খুলে দেখলাম মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক দাঁড়ানো।

আমি: আপনি?
ভদ্রলোক: আমার নাম হুমায়ুন কবীর।
বুঝলাম। আমাদের কাজের মেয়েটি উনার নাম ঠিকমতো ধরতে পারেনি। পারার কথাও আসলে না। দশ/বরো বছরের মেয়েটি গ্রাম থেকে এসেছে। পিতা-মাতা দরিদ্র বলে লেখাপড়ার কোন সুযোগ পায়নি। সামান্য খাওয়া-থাকার জন্য এই বয়সে ঘরবাড়ী বাবা-মা ছেড়ে ঢাকা এসেছে কাজ করতে। ও মাঝে মাঝে ওর বাড়ির যে দারিদ্রের বর্ণনা দেয় তাতে চোখ ফেটে জল আসে।
আমি: জ্বী, বলুন।
হুমায়ুন কবীর: আপনি কি ড. সাজ্জাদ খান?
আমি: জ্বী।
হুমায়ুন কবীর: আপনি কি একজন এক্স ক্যাডেট?
আমি: জ্বী। (ভদ্রলোক এখনো দরজায় দাঁড়িয়ে। আমি একটু চিন্তায় পড়ে গেলাম। অপরিচিত ব্যাক্তিটি আমার কাছে ঠিক কি চাইছে আমি বুঝলাম না)
হুমায়ুন কবীর: আপনি কি রাশিয়ায় থাকেন।
আমি: জ্বী। কিন্তু আপনি ঠিক কি বিষয়ে? (উনি আমার সম্পর্কে তথ্য নিয়ে এসেছেন বুঝলাম। কিন্তু বিষয়টা কি তিনি তা তখনো বলেননি)
হুমায়ুন কবীর: না মানে, আমার মেয়েটাও একজন এক্স ক্যাডেট। ওর পড়ালেখার বিষয়ে কিছু আলাপ করতে চাইছিলাম আরকি।
এভাবে প্রথম দেখায় একজন অপিরিচিত লোককে, আপন ভাবার কোন কারণ নেই কিন্তু, উনার মেয়ে এক্স ক্যাডেট শুনেই আমার মুখে হাসি ফুটে গেলো।
আমি: আসুন, ভিতরে আসুন।

আমাদের এপার্টমেন্টের ড্রয়িংরুমে নিয়ে বসালাম উনাকে। জানালার কাছের সোফাটিতে একটু হেলান দিয়ে বসলেন তিনি। কিছুটা শ্রান্ত মনে হলো উনাকে। খুব সম্ভবত অনেক দূর থেকে এসেছেন, অবশ্য আজকাল ট্রাফিক জ্যামের কারণে, ঢাকার ভিতরেও এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যেতেও কয়েক ঘন্টা লাগে!

আমি: আপনি কি খুব দূর থেকে এসেছেন?
হুমায়ুন কবীর: জ্বী, সাভার থেকে এসেছি।
আমি: ও।
কাজের মেয়েকে ডেকে বললাম, “উনাকে চা, নাস্তা দাও”।
হুমায়ুন কবীর: না না ব্যাস্ত হবেন না। আমি নাস্তা খেয়ে বেড়িয়েছি।
আমি: নাস্তা খেয়ে বেড়িয়েছেন তো সেই কখন। এতটা পথ জার্নি করে এসেছেন এখনো কি আর এনার্জী আছে।
হুমায়ুন কবীর: না, মানে তার পরেও, অপরিচিত ঘর। (একটু লজ্জ্বা পেলেন কবীর সাহেব)
আমি: অপিরিচিতের কি আছে? আমরা ক্যাডেটরা সবাই ভাই-ভাই।
হুমায়ুন কবীর: জ্বী আমি জানি। এজন্যেই আপনার কাছে ছুটে আসা।
আমি: ভাষাণী হুজুরের কাছে কেউ দেখা করতে গেলে তিনি প্রথমে কোন কথা বলতেন না। প্রথমেই খেতে দিতেন। খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে তারপর কথা বলতেন।
হুমায়ুন কবীর সাহেব হঠাৎ আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর উনার চোখ নরম হয়ে এলো।
হুমায়ুন কবীর: ভাষাণী হুজুরের কথা আপনারা জানেন? আজকালকার কেউ তো উনার নামই মনে রাখেনাই!
আমি: জ্বী, নিজ চোখে তো দেখিনি। তবে বইয়ে পড়েছি। মুরুব্বীদের কাছ থেকে শুনেছি।
হুমায়ুন কবীর: আমি নিজ চোখেই উনাকে দেখছি।
আমি: তাই?
হুমায়ুন কবীর: জ্বী। উনার এক ভাতিজা আমার সহপাঠী ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেইভাবে হুজুর আমাকে চিনতেন। একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে হাটছি, হঠাৎ ঘাঁড়ের উপরে একটা লাঠির স্পর্শ অনুভব করলাম। আমি তো ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, মারামারি লেগে গেলো কিনা! তারপর পিছনে তাকিয়ে দেখি হুজুর। আমরা উনাকে হুজুর-ই বলতাম।
আমি: জ্বী, আমি শুনেছি, উনাকে সবাই হুজুর ডাকতেন।
হুমায়ুন কবীর: হুজুর আমাকে বলেন, “তোর মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হয়েছেনা?” আমি বললাম, “জ্বী”। হুজুর বলেন, “চল আমার সাথে চল”। আমি বলি, “কোথায় হুজুর?” হুজুর বললেন, “সন্তোষ।” আমি ভাবলাম সন্তোষ যাবো কিভাবে? হুজুর আমার মনের ভাব বুঝে বললেন, “বাইরে গাড়ী দাঁড়ানো আছে, তুই আমার সাথেই চল”।
আমি: ইন্টারেস্টিং! তারপর?
হুমায়ুন কবীর: আমরা তখন উনার একান্ত ভক্ত। আর উনার কথা অমান্য করবো এত সাহস আমাদের ছিলো না। উনার সাথে গাড়ীতে চড়ে সোজা সন্তোষে গিয়ে নামলাম।
আমি: মজার ঘটনা। হুজুর কি রাজনৈতিক পারপাজে আপনাকে নিয়ে গিয়েছিলেন, নাকি জাস্ট বেড়াতে।
হুমায়ুন কবীর: দুটার কোনটাই না। ওখানে যাওয়ার পর প্রথমেই ভাত খাওয়ালেন। হুজুর সবাইকেই প্রথমেই খাওয়াতেন। উনি বলতেন, “মানুষে কত দূর-দূরান্ত থেইকা আমার সাথে দেখা করতে আসে। কোন সময়ে কি খাইয়া বাইর হইছে কে জানে? আগে খাউক। প্যাটটা ঠান্ডা করুক তারপরে কথা হইবো।”
আমি: জ্বী, আমিও সেরকমই শুনেছি।

ইতিমধ্যে ভিতর থেকে চা-নাস্তা নিয়ে এলো কাজের মেয়ে কোহিনূর। অন্যান্য খাবারের মধ্যে একটা রাশিয়ান আইটেম ছিলো, ওটার নাম ‘স্মিতানা’। আমি মস্কো থেকে আসার সময় বেশ কিছু নিয়ে এসেছি। কোন গেস্ট আসলে দেই।

আমি: নিন, নাস্তা নিন।
খেতে খেতে কবীর সাহেব স্মৃতি চারণ করলেন। রাজনীতি বা বেড়ানো কোন কারণেই হুজুর আমাকে সন্তোষে নিয়ে যাননি। খাওয়ার পরে তিনি আমাকে উনার কলেজে নিয়ে গেলেন। তারপর বললেন, “এই কলেজে তোকে চাকরী দিলাম। পড়াবি”।
আমি তো তাজ্জব! মাস্টার্স-এর পরে চাকরী নিয়ে আমি একটু দুশ্চিন্তায়ই ছিলাম। সে সময়ে চাকরী-বাকরীর সমস্যা ছিলো। আর হুজুর একেবারে হাতে চাকরী তুলে দিলেন। আমি হুজুরের পায়ে হাত দিয়ে সালাম দিলাম। হুজুর মাথায় বুলিয়ে বললেন, “আরেকটা দায়িত্ব তোকে দিতে চাই”। আমি বললাম, “বলেন হুজুর”। হুজুর বললেন, “মেয়ে হোস্টেলের সুপারভাইজার-এর দায়িত্বটাও তোকে নিতে হবে”। আমি তো লাফ দিয়ে উঠলাম, “এটা কি বলেন হুজুর? আমি আন-ম্যারেড মানুষ, আমাকে এই দায়িত্ব দিচ্ছেন, ম্যারেড কাউকে দিতেন”। হুজুরের কথার উপর কোন কথা ছিলনা, কিন্তু এই বিষয়ে আমি একটু মরিয়া হয়েই বলে ফেলেছিলাম। হুজুর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোকেই কাজটা করতে হবে, ম্যারেডগুলা আরো বেশী শয়তান হয়”।
এবার আমি হেসে ফেললাম। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার বশে প্রাজ্ঞ হুজুর খুব একটা ভুল বলেননি।

আমি: তারপর?
হুমায়ুন কবীর: তারপর কয়েক বছর ওখানে চাকরী করি। হুজুর ইন্তেকাল করার পর আমি ওখান থেকে চলে এলাম।
আমি: এখন কি করেন?
হুমায়ুন কবীর: আমি ব্যাংকে চাকরী করতাম। রিসেন্টলি রিটায়ার করেছি, এখন একটা ছোটখাট ব্যবসা করছি।
আমি: ও। তা আমার কাছে কি মনে করে?
হুমায়ুন কবীর: ঐ যে বলেছিলাম। আমার মেয়েটা এক্স ক্যাডেট।
আমি: তারপর?
হুমায়ুন কবীর: মানে এইচ.এস.সি. পাশ করেছে। এখন হায়ার এডুকেশন করবে। তা ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু আমরা চাই ও বিদেশে লেখাপড়া করুক।
আমি একটু অবাক হলাম। আমাদের দেশের বেশীরভাগ পরিবারই চায়না মেয়ে বিদেশে লেখাপড়া করুক। তারপরেও কাউকে কাউকে দেখেছি দেশে কোথাও চান্স না পেলে তখন বিদেশের কথা চিন্তা করতে। আর ইনি দেখছি উল্টা দেশে ভালো ইউনিভার্সিটিতে চান্স পাওয়ার পরও তিনি মেয়েকে বিদেশে পড়তে পাঠাতে চাচ্ছেন।
আমি: আপনার মেয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে কোন সাবজেক্টে ভর্তি হয়েছে?
হুমায়ুন কবীর: ফার্মাসী।
আমি: বাহ! ভালো সাবজেক্টতো, এরপরেও আর বিদেশে পড়তে পাঠানোর কি আছে?
হুমায়ুন কবীর: না ভাই। দেশে কি ভালো পড়ালেখা আছে? আমি নিজে তো পড়েছি, মান জানি। আমার মেয়ে বিদেশে গিয়ে উচ্চ মানের লেখাপড়া করুক।
আমি: আপনি কি তাকে রাশিয়া পাঠানোর চিন্তা ভাবনা করছেন?
হুমায়ুন কবীর: ঠিক ধরেছেন। এ জন্যই আপনার কাছে আসা।
আমি: আপনি কি চাচ্ছেন, আমি ওকে রাশিয়ায় পড়ার ব্যবস্থা করে দেই?
হুমায়ুন কবীর: না ভাই, আপনাকে কিছু করতে হবেনা। সে ব্যবস্থা হয়ে গেছে।

আমি: বুঝলাম না!
হুমায়ুন কবীর: ঢাকার রাশান কালচারাল সেন্টারের মাধ্যমে একটা স্কলারশীপ হয়ে গেছে। মেয়ে আমার ডাক্তারীতে চান্স পেয়েছে মস্কোতে।
আমি: তাহলে আমার কাজ কি হবে?
হুমায়ুন কবীর: ভাই, আমাদের দেশের কারবার। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই-ই বলে, ‘না যাওয়ার দরকার নাই, ভালো হবেনা, এখানেই পড়ুক।’ শুনেছি আপনি ওখানে পড়ালেখা করেছেন অনেক বছর ধরে ওখানে আছেন, তাই আপনার কাছ থেকে আসল সংবাদ জানতে এসেছি, আপনার পরামর্শটাও কাজে দেবে। তাছাড়া ক্যাডেট ভাই হিসাবে আপনি নিশ্চয়ই ওকে ভালো পরামর্শই দেবেন। আপনারা ক্যাডেটরা তো একে অপরের ভালো বই মন্দ চান না।
আমি: (হেসে ফেলে বললাম) আপনি রিলায়েবল পথই ধরেছেন।

স্মিতানা খেতে খেতে কবীর সাহেব জানতে চাইলেন,
হুমায়ুন কবীর: বাহ, এটাতো খুব মজার। কি খাচ্ছি ভাই এটা?
আমি: রাশান ভাষায় স্মিতানা বলে, ইংরেজীতে sour cream বলে।
হুমায়ুন কবীর: খুব পুষ্টিকর মনে হচ্ছে।
আমি: জ্বী খুবই পুষ্টিকর।
হুমায়ুন কবীর: এই খেয়ে খেয়েই কি রাশানরা এত উঁচা-লম্বা হয়?
আমি হেসে ফেললাম।
আমি: জ্বী এরকম অনেকে পুষ্টিকর খাবার-দাবারই ওখানে আছে। এই বিষয়ে ওরা খুব সচেতন!
হুমায়ুন কবীর: রাশিয়ার খাবার-দাবার তাহলে ভালোই! আচ্ছা পাড়া-প্রতিবেশীরা আমকে এতটা নিরুৎসাহিত করছে কেন বলেন তো?
আমি: আপনি যখন মেয়েকে ক্যাডেটে পাঠিয়েছিলেন তখন কি তারা উৎসাহ দিয়েছিলো?
হুমায়ুন কবীর: নাহ। তখনও নিরুৎসাহিত করছিলো। বলেছিলো এতটুকু মেয়ে ক্যাডেটে পাঠাবেন, কত কষ্ট হবে, আর্মীর শাসন ভাই!
আমি: পরে কি দেখলেন?
হুমায়ুন কবীর: ভালো। আমার মেয়েতো খুশী। বলে, “ক্যাডেটের মত ভালো হয়ইনা”।
আমি: পাড়া-প্রতিবেশীদের ছেলেমেয়ে কেউ ক্যাডেট কলেজে পড়েছিলো?
হুমায়ুন কবীর: না ভাই। পরীক্ষা দিয়েছিলো কেউ কেউ চান্স পায়নাই।
আমি: এটাই কারণ। হিংসা-ঈর্ষা।
হুমায়ুন কবীর: জ্বী, ভাই ঠিক বলেছেন। আমাদের দেশের মানুষ ঐ হিংসাটাই করতে পারে ভালো।
যাহোক আমার একটা প্রশ্ন।
হুমায়ুন কবীর: কি প্রশ্ন?
আমি: এই যে আপনি মেয়েকে বিদেশে পাঠাতে চাচ্ছেন, আপনার স্ত্রী কি বিষয়টা জানেন? উনার কি মত আছে?
হুমায়ুন কবীর: আরে, ওর মাই-ই তো আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছে। উনার উৎসাহই তো বেশী! মেয়েকে যে ক্যাডেট কলেজে পাঠালাম, আপনার কি ধারনা, আমার খুব ইচ্ছা ছিলো কলিজার টুকরা মেয়েকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দেব? ওর মাই-ই তখন আমাকে বুঝিয়েছিলো, মেয়েকে স্মার্ট বানাতে হনে ক্যাডেটে পাঠাও। এখন ওর মা বলছেন, “ক্যাডেট কলেজ যেহেতু সাকসেসফুললি শেষ করেছে, বিদেশেও সাকসেসফুল হবে”।
এবার আমার অবাক হওয়ার পালা। মা তো বেশ দূরদর্শী! একেই বলে প্রগতিশীলতা।
আমি: তা আপনার স্ত্রী কি কিছু করেন?
হুমায়ুন কবীর: করেন মানে? উনি তো আমার চাইতেও বেশী পড়ালেখা। একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীতে চাকরী করেন অনেক টাকা বেতন পান।
বুঝলাম ভদ্রলোক স্ত্রীর গুনমুগ্ধ।
আমি: আমি আমার মতামত বলতে পারি।
হুমায়ুন কবীর: সেটাই বলেন।
আমি: রাশিয়ার পড়ালেখা খুবই ভালো। আমেরিকা বা ইংল্যান্ডের চাইতে কোন অংশে কম নয়। আপনার মেয়ে যদি ওখানে পড়ার সুযোগ পায়, সেটা হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। আপনি ওকে মস্কো পাঠিয়ে দিন।
হুমায়ুন কবীর: ভাই এটা জানতেই এসেছিলাম। তাহলে নিয়ত করি?
আমি: জ্বী করেন।
হুমায়ুন কবীর: আমি ভাই ভাষানী হুজুরের ভক্ত, হুজুরের শিক্ষা অনুযায়ী কোনদিন সৎপথ থেকে অসৎ পথে যাইনাই। আমার টাকা-পয়সা তাই তেমন নাই। রিটায়ারমেন্ট বেনিফিট হিসাবে কিছু টাকা পেয়েছিলাম, ওটা দিয়েই ব্যবসা করি। সেখান থেকেই কাটছাট করে কিছু টাকা ম্যানেজ করে মেয়েটাকে পাঠাবো। দোয়া করবেন।
আমি: খরচা তো তেমন নেই। স্কলারশীপ পেয়েছে তো।
হুমায়ুন কবীর: জ্বী, আলহামদুলিল্লাহ! তারপরেও প্লেন ভাড়া। পথ খরচা। এছাড়াও শুনেছি মাসে মাসে কিছু কিছু হাত খরচাও নাকি দিতে হয়?
আমি: জ্বী, তা দিতে হবে। টিউশন ফী নাই কোন, বই ফ্রী, হোস্টেল ফ্রী, চিকিৎসা ফ্রী। তবে স্টাইপেন্ড যা দেয় তা বেশী নয়, তাই মাসিক কিছু খরচা দিতে হবে, আনুমানিক পঞ্চাশ ডলারের মত।
হুমায়ুন কবীর: পঞ্চাশ ডলার দিতে পারবো, কষ্ট হলেও দেব। তাও মেয়েটা উন্নত দেশে পড়ুক।
আমি: আপনার কি একটাই সন্তান?
হুমায়ুন কবীর: না ছেলে আছে, আরেকটা। ক্লাশ টেনে পড়ে।
আমি: কোথায়? নারায়নগঞ্জে?
হুমায়ুন কবীর: নাহ! নারায়নগঞ্জে পড়াবো কেন? মেয়েটাকে ক্যাডেটে পড়িয়েছি আর ছেলেটাকে পড়াবো না?
আমি: ছেলেও ক্যাডেট?
হুমায়ুন কবীর: জ্বী, সিলেট ক্যাডেটে পড়ে।
আমি: ওহ! ভালোই তো আমার কলেজে পড়ে।
হুমায়ুন কবীর: জ্বী, ওর কাছ থেকেই তো আপনার কথা শুনেছি।
আমি: ওর কাছ থেকে? আমার কথা? ওরা আমাকে চিনবে কি করে? আমি তো পাস আউট করেছি অনেক বছর আগে!
হুমায়ুন কবীর: জ্বী, চেনে। স্যারদের কাছ থেকে আপনার নাম শুনেছে। ওদের ভাইস প্রিন্সিপাল কেমিস্ট্রির দোহা স্যার আপনার কথা নাকি খুব বলে। বলেন, “আমাদের ছেলে মস্কোতে ইউনিভার্সিটির প্রফেসর, বুঝতে পেরেছ!”
এবার আমার চোখ ছলছল করে উঠলো। দোহা স্যার আমাকে খুব স্নেহ করতেন। অথচ, আমি কলেজ ছাড়ার পরে আর উনার সাথে দেখা করার সুযোগ পাইনাই। কিন্তু স্যার ঠিকই আমার খোঁজ রেখেছে।
আসলে সব স্যাররাই এত বেশী বাৎসল্যপ্রেমী ছিলেন, আমাদেরকে নিজের ছেলেদের মতই দেখতেন। আমরা যখন ক্লাশ সেভেনে স্যাররা তখন জয়েন করলেন। আমরাই উনাদের প্রথম সন্তানদের মত। তাই হয়তো আমাদেরকেই বেশী মনে রেখেছেন।
আমি: স্যার এখন ভাইস-প্রিন্সিপাল জানতাম না। আমি অল্প কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে দেশে এসেছি। দেখি এর মধ্যে একবার কলেজে গিয়ে উনার সাথে দেখা করা যায় কিনা।
হুমায়ুন কবীর: দেখা করে আসেন না। উনি তো খুব ভালো মানুষ।

আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হুমায়ুন কবীর সাহেব উঠে গেলেন। উনাকে বিদায় দিয়ে আমি আরো কিছুক্ষণ ড্রয়িংরূমে বসে রইলাম। চোখের সামনে থেকে ধীরে ধীরে সব সরে যেতে থাকলো। ভেসে উঠলো সিলেট ক্যাডেট কলেজ, প্রবল বৃষ্টি, প্রিন্সিপাল স্যারের পিতৃসুলভ স্নেহময় কিন্তু কড়াকড়ি চেহারা, প্যারেড গ্রাউন্ড, খেলার মাঠ, ক্লাসরূমে স্যারদের জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা ও লালন-পালন, অডিটোরিয়ামে নাটক বা ডিবেট কম্পিটিশন, ডাইনিং হলের ইমপ্রুভড ডিনার, বৃষ্টির মধ্যে লুকিয়ে কলেজ গার্ডেন থেকে পেয়ারা চুরি করতে গিয়ে গার্ডের হাতে ধরা পড়া, তারপর একদফা প্রিফেক্টদের হাতে পানিশমেন্ট-আরেকদফা স্যারদের বকুনি, ভাইস-প্রিন্সিপাল স্যার ভর্ৎসনা করে বলতেন, “চুরি করো, কিন্তু ধরা পড়লে কেন? এজন্যই পানিশমেন্ট হবে”। মনে মনে হাসি পেল স্যারের উপদেশ বাণী মনে করে। পাশাপাশি চোখটাও ছলছল করে উঠলো, অনেকগুলো বছর ধরে বিদেশে আছি, অনেকের সাথেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। স্যারদের সাথে যোগাযোগটা রাখা জরুরী, আমাদের জীবন উনারা গড়ে তুলেছেন, উনাদের জন্যে আর কিছু করতে না পারি, অন্ততপক্ষে কৃতজ্ঞতাটা স্বীকার করা উচিৎ। হঠাৎ আমার খেয়াল হলো, হুমায়ুন কবীর সাহেবের কাছ থেকে দোহা স্যারের টেলিফোন নাম্বারটা নেয়া হয়নি, নেয়া উচিৎ ছিলো।
———— X X X ————-

ল্যান্ডফোনটা বেজে উঠলো। আম্মু নামাজ পড়ছেন আব্বু ঘরে নেই অতঃপর আমি টেলিফোনটা ধরলাম।
আমি: হ্যালো।
ওপাশ থেকে: কে সাজ্জাদ?
আমি: হ্যাঁ। কে বলছেন?
ওপাশ থেকে: আমি তুষার।
আমি: কোন তুষার?
তুষার: আরে তোর ক্যাডেট কলেজ ফ্রেন্ড তুষার। আমাকে চিনলি না?
আমি: সরি দোস্ত। অনেকদিন পরে তো, তাই চট করে ভয়েস রিকোগনাইজ করতে পারিনি।
তুষার: তুই এসেছিস, কই আমার সাথে তো যোগাযোগ করলি না।
আমি: আরে কমপ্লেইন রাখ। পাঁচ বছর পর এসেছি। সব যোগাযোগ ক্ষীণ।
তুষার: মোবাইলে কল দিতি।
আমি: দোস্ত, মোবাইলের যুগ শুরু হলো মাত্র। সবার কাছে তো এখনো মোবাইল নাই। ল্যান্ড ফোনের অভ্যাসটা এখনো রয়ে গেছে। আমার ডায়েরী হারিয়ে ফেলেছি তাই টেলিফোন নাম্বারগুলাও নাই। ই-মেইল তো করেছিলাম, পাস নাই?
তুষার: পেয়েছি তো। ই-মেইল মারফতই তো জানতে পারলাম তুই এসেছিস। তাই ফোন দিলাম।
আমি: তা তুইও তো দশ দিন পরে ফোন দিলি। এতোদিন কোথায় ছিলি।
তুষার: আরে ভাই কমপ্লেইন রাখ। দেশে এখন অনেক চেইঞ্জ হয়েছে। কর্পোরেট কালচার শুরু হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে এত ব্যাস্ত থাকি যে বৌ-এর জন্যও টাইম বের করতে কষ্ট হয়।
আমি: হা হা হা। তা, বৌ-কে তাহলে কি অন্য কেউ টাইম দেয়?
তুষার: হা হা হা। নাহ দোস্ত। রাশিয়ান বৌতো আর না। নামাজ-রোজা করে। আমাকে রেখে অন্য কাউকে সময় দেয়ার মতো মেয়ে না।
আমি: তোর কি ধারণা রাশিয়ান মেয়েরা সব ঐরকম?
তুষার: আরে থাক দোস্ত। নেভার মাইন্ড। আমি জানি সব জায়গায়ই ভালো-মন্দ আছে। এখন বল আমাদের গেট টুগেদার কবে?
আমি: আমি তো ই-মেইল দিলাম। শাহেদ বললো একটা জিটি-র ব্যবস্থা করবে, কিন্তু এখনো তো কিছু জানালো না।
তুষার: ওয়েল, শাহেদ যখন বলেছে, তখন করবেই। হয়তো সবার সাথে আলাপ করে নিতে সময় লাগছে। বুঝলি না দেশে এখন সবাই ব্যাস্ত। যাহোক তোর এখন টাইম আছে?
আমি: কেন বলতো।
তুষার: আমি তোদের গুলশানের ঐদিকেই আসছি। এই ফাঁকে তোর সাথে দেখাটা সেরে ফেলি।
আমি: কোথায় আসবি?
তুষার: তুই গুলশান দুই নাম্বার গোল চক্করের ওখানে দাঁড়াবি আমি তোকে গাড়ীতে তুলে নেবো।
আমি: ওকে। আমি রেডি হয়ে আসছি।
—————-XXX———————

ঠিক আমার সামনে এসে কালো রঙের একটা দামী গাড়ী থামলো। ভেতর থেকে কেউ একজন বললো, “সাজ্জাদ উঠে পড়”। আমি দেখলাম গাড়ীর পিছনের সিটে তুষার বসা। চটপট উঠে গেলাম গাড়িতে। আমার দিকে খুশী মনে তাকালো তুষার,
তুষার: অনেকদিন পরে দেখা দোস্ত। তুইতো দেখছি সেই আগের মতই আছিস!
আমি: তুইও আগের মতই আছিস তবে চেহারার মধ্যে একটা বিজনেস ম্যাগনেট, বিজনেস ম্যাগনেট ভাব এসেছে!
তুষার: আর কি দোস্ত! চাকরী-বাকরীতে না ঢুকে বিজনেস শুরু করলাম। ঝামেলা আছে তবে মালপানি ভালৈ কামাই। গোলামী করে লাভ আছে বল?
আমি: নাহ, গোলামী করার চাইতে ব্যবসা করাই ভালো। তুই ঠিকই করেছিস।
তুষার: থ্যাংক ইউ দোস্ত। ইনসপাইরেশন পেলাম। অনেকে এখনো বলে, “ক্যাডেট কলেজের ছেলে আর্মীতে গেলে না কেন?” আর্মীতে গেলে কি হলো বলতো? এখন মেজর থাকতাম। কত টাকা আর বেতন হতো? তার উপর হাজারটা রেস্ট্রিকশন! ক্যাডেট লাইফে তো আমরা দেখেছি এসব। তার চাইতে মাল কামাচ্ছি স্বাধীন জীবন যাপন করছি, ভালোই আছি।
আমি: তা আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি?
তুষার: আমার একটা এ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। এক বিশাল বড় বিজনেস ম্যাগনেট বস-এর সাথে। খুব বনেদী-রে, সেই পাকিস্তান আমল থেকে জাত ব্যবসা। গুলশানেই অফিস।
আমি: তা উনার সাথে দেখা করবি তো আমাকে ওখানে নিয়ে যাচ্ছিস কেন?
তুষার: সময় পাওয়া যায়না দোস্ত। গাড়ীতে যেতে যেতে যতক্ষণ কথা হয়। উনার সাথে দেখা করে তারপর একটু আমরা দুজনে রেস্টুরেন্টে বসবো, লাঞ্চটা করি একসাথে।
আমি: ওকে। গুড প্ল্যান। তোদের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ঢাকায় ওয়েস্টার্নাইজেশন ভালোই হচ্ছে। তা আমাকে উনার সাথে আর দেখা করানোর দরকার নাই। আমি গাড়ীতে বসলাম। আর তুই দেখা করে আসলি, সময় লাগবে?
তুষার: আরে না সময় বেশী লাগবে না। বিগ শট-রা কি আর অত সময় দেয়? তুই চল আমার সাথে ফাঁকে বসকেও একটু দেখিয়ে নিয়ে গেলাম তোর মতো মস্কো ইউনিভার্সিটির প্রফেসর আমার বন্ধু আছে।
আমি: তার কি খুব দরকার আছে?
তুষার: এটা এম্নিই বললাম দোস্ত। ব্যবসার সাথে এর সম্পর্ক নেই। তবে বিগ শট নিজেই আমেরিকায় লেখাপড়া করেছে।
আমি: বলিস কি? দেশের বড়লোক ব্যবসায়ীরা তো অত বেশী লেখাপড়া করে না।
তুষার: না রে দোস্ত। দিন পাল্টেছে। আসল ব্যবসায়ী ছিলেন উনার বাবা। উনি অত লেখাপড়া ছিলেন না। বস তো বাপের গদিতে বসেছেন, উনি ঠিকই আমেরিকা থেকে লেখাপড়া করে এসেছেন।
আমি: কারা এরা?
তুষার: তুই আমরান গ্রুপের নাম শুনিস নি?
আমি: হ্যাঁ। অবশ্যই শুনেছি, ওরা তো খুব বনেদী! (স্মৃতিতে ঝিলিক দিয়ে উঠলো একটি বিষয়)
তুষার: ঐ আমরান সাহেবের ছেলে জামরান সাহেব। উনার কাছেই যাচ্ছি।
———-XXX———-

বিশাল বড় গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রীর অফিস। বিশ তলা বিল্ডিং-এর পনের তলায় বসেন এর এম.ডি. জামরান সাহেব। আমরা রিসিপশনে গেলে তারা তুষার-কে দেখে সালাম দিলো। বুঝলাম তুষারের এই অফিসে রেগুলার যাতায়াত আছে তাই তারা ওকে চেনে। লিফটে চড়ে উঠে গেলাম পনের তলায়। লিফটে উঠতে উঠতে প্রশ্ন করলাম
আমি: উনাদের অফিস মতিঝিলে ছিলো না?
তুষার: হ্যাঁ, আমরান সাহেব ঐ অফিসেই বসতেন। অফিসটা এখনো আছে। তবে জামরান সাহেব বসেন গুলশানে। বুঝলি না সেই আমলে মতিঝিল টপে ছিলো তাই আমরান সাহেবের অফিস ছিলো মতিঝিলে। এখন দিন পাল্টেছে গুলশান আর কেবলই রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া নাই, পাশাপাশি অঘোষিত কমার্শিয়াল এরিয়া হয়েছে। এখানে বসলে একদিকে স্ট্যাটাস হয় আরেকদিকে জ্যাম ঠেলে মতিঝিল পর্যন্ত যাওয়ার ঝামেলাটা থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়।
আমি: উনাদের বাড়ীটা গুলশানে না?
তুষার: হ্যাঁ, গুলশানেই।
এরপর তুষার হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বললো
তুষার: তুই উনাদেরকে চিনিস নাকি?
আমি: (একটু ভেবে) নাহ।
ততক্ষণে লিফট পৌঁছে গেলো পনের তলায়।
রিসিপশনিস্ট এক সুন্দরী তরুণী। স্মার্ট লুকিং শাড়ী বা কামিস পড়া নয়, ইউরোপীয়ান মেয়েদের মত সাজ-পোষাক। বোধহয় আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলো তুষারের জন্য। সালাম দিয়ে ভিতরে নিয়ে গেলো।
দরজা ঠেলে জামরান সাহেবের রুমে ঢুকলাম। এত বড় গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রীজ-এর মালিক, উনার রূমটা অনেক বড় হবে ভেবেছিলাম। কিন্তু সেই তুলনায় ছোটই মনে হলো। হয়তো এর পিছনে উনার কোন লজিক থাকতে পারে।
তুষার: স্লামালাইকুম স্যার।
জামরান সাহেব: ওয়া আলাইকুম সালাম। (তারপর আমার দিকে তাকালেন)
তুষার: আমার বন্ধু প্রফেসর মস্কোর একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়।
এবার উনার মুখে হাসি দেখলাম। বেশ খাতির করে বললেন
জামরান সাহেব: ভালো ভালো, বসেন।
আমি: স্লামালাইকুম জামরান ভাই।
এবার উনার মুখে একটু চিন্তার ছায়া দেখতে পেলাম। সেটা কি আমার মুখে স্যার না শুনে ভাই শুনে? না কি অন্য কোন কারণে তা বোঝা গেল না। তবে তিনি সময় নিয়ে আমার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন
জামরান সাহেব: আপনাকে কি আগে কোথাও দেখেছি?
আমি উনার মস্তিষ্ক ভারাক্রান্ত করতে চাইলাম না। বললাম
আমি: আমি তো দেশে পড়ালেখা করিনাই প্রায় সারা জীবন বিদেশেই।
জামরান সাহেব: হ্যাঁ, তাই তো। আপনার সাথে ওভাবে দেখা হওয়ার কথা নয় আমার। আর ইস্ট ইউরোপের দিকে যাই নাই কখনো আমি। আমেরিকায় পড়েছি, ওয়েস্টে ঘুরেছি অনেক।
তুষার: জ্বী স্যার। আর ওতো ঐদিকেই থাকে। একবার ঘুরে আসেন না মস্কো থেকে।
জামরান সাহেব: ইচ্ছা আছে। কাজে ব্যাস্ত থাকি, সময় করে উঠতে পারিনা। অফিসেও বেশ কিছু রিফর্ম করছি ধীরে ধীরে। আব্বা উনার সময়ে যেই ব্যবসা করেছিলেন সেটা ছিলো অনেক কিছু, কিন্তু এখন দিন পাল্টেছে। আমাদেরকেও আধুনিকায়ন করতে হবে। আর সেটা দরকারও। (এরপর আমার দিকে তাকিয়ে) রাশিয়ার ওদিকে ব্যবসাপাতির খবর কি?
আমি: জ্বী ভালো। ওরা তো আগে ব্যবসা করতো না, এখন তো ভালোই ব্যবসা করছে!
জামরান সাহেব: হ্যাঁ, আমিও তেমন শুনেছি। একদল বাঙালী নাকি ইলেকট্রনিক্স-এর ব্যবসা করে লাল হয়ে গিয়েছে?
আমি: জ্বী, তা হয়েছে। আরো অন্যান্য ব্যবসাও করছে বাংলাদেশীরা।
জামরান সাহেব: দেখি, একসময় ঐদিকে ব্যবসা এক্সপ্লোর করার চেষ্টা করবো। আপনার কার্ড দিন একটা।
এরপর তুষার ও জামরান সাহেব নিজেদের ব্যবসার কথা বললো কিছুক্ষণ। মিনিট পনেরো আলোচনা করার পর আমরা উনার রুম থেকে বের হলাম। রিসিপসনিস্টকে ধন্যবাদ বলে বড় হলরুম দিয়ে হেটে ফ্লোর থেকে বের হওয়ার দরজার দিকে যাচ্ছিলাম হঠাৎ একজনার মুখোমুখি হলাম। দামী শাড়ী পরিহিতা অভিজাত চেহারার ভদ্রমহিলা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন
ভদ্রমহিলা: সাজ্জাদ না?
আমি উনার দিকে তাকিয়ে ভালো করে চেনার চেষ্টা করলাম, এবং চিনলাম। জামরান সাহেবের ছোট বোন মৌলি।
আমি: মৌলি?
মৌলি: হ্যাঁ, আমিই।
আমি: এতগুলো বছর পরে চিনলে কি করে?
মৌলি: তুমিও তো আমাকে চিনেছ!
আমি: প্রথম তো তুমি আমাকে চিনেছ। আর এই অফিসে তোমার উপস্থিতি অস্বাভাবিক কিছু না, তাই বুঝে নিলাম।
মৌলি: তোমার চেহারা তেমন পাল্টায় নি। বয়সের ছাপ পড়েছে, এটাই শুধু। আর তাছাড়া ………
আমি: কি?
মৌলি: না, কিছু না। তুমি এখানে কি করে?
আমি: (তুষারকে দেখিয়ে) আমার বন্ধু তুষার। ব্যবসা করেন, তোমার ভাইয়ার সাথে যোগাযোগ আছে ভালো।
তুষার: স্লামালাইকুম।
মৌলি: জ্বী, ওয়ালাইকুম। আপনারা চা খেয়েছেন?
আমি: না, চা খাইনি। দরকার নেই। আমরা এখন লাঞ্চে যাবো তো।
মৌলি: ভাইয়া যে কি করে! চা না খাইয়েই তোমাদের ছেড়ে দিলো!
আমি: না না, ঠিক আছে। এখন তো দুপুর, চায়ের সময় তো আর না।
মৌলি: তা ঠিক। এক কাজ করো। আমার সাথে লাঞ্চ করো।
আমি: আরে না না। ব্যস্ত হয়োনা।
মৌলি: এতদিন পরে ছেলেবেলার বন্ধুকে পেলাম আর একটু ব্যাস্ত হবো না?
আমাদের কথোপকথন শুনে তুষারকে একেবারে তাজ্জব দেখলাম। ওর বিস্ময় ভাঙানোর জন্য, আমি বললাম
আমি: তুষার, আমরা পূর্বপরিচিত। ছোটবেলায় এক স্কুলে পড়েছি।
তুষার: তুই না বললি…..।
আমি চোখের ইশারায় ওকে থামিয়ে দিলাম।
মৌলি: আমাদের অফিসে লাঞ্চ তেমন স্ট্যান্ডার্ড না। চলো বাইরে কোথাও রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসি।
তুষার: তাহলে আপনারা দুজন কোথাও বসুন। আমি না হয় চলি। আমাদের এইসব কথ
মৌলি: সেকি! আপনিও আমাদের সাথে থাকবেন। আপনার সুবাদেই তো ওকে এতদিন পরে দেখতে পেলাম!
সেদিনের লাঞ্চটা আমরা গুলশানের একটা রেস্টুরেন্টে সারলাম। মৌলি আমার ল্যান্ড ফোন ও অস্থায়ী মোবাইল নাম্বার দুটাই নিলো।
———-XXX———-

লাঞ্চ-এর পর গাড়ীতে যেতে যেতে
তুষার: ব্যাপারটা তুই বেমালুম চেপে গিয়েছিলি?
আমি: কোনটা?
তুষার: এই যে, খ্যাতিমান শিল্পপতি আমরান সাহেবের কন্যা, জামরান সাহেবের বোন তোর বান্ধবী।
আমি: না রে। ব্যাপারটা ওরকম নয়। আমি ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার আগে একটা স্কুলে পড়তাম, ওখানে আমরা দুজনে একসাথে পড়েছি। ঐটুকুই। স্কুল ছাড়ার পর ওর সাথে আমার দেখা হয়েছিলো দুই-একবার তাও রাস্তা-ঘাটে-মার্কেটে হঠাৎ করে। আমে ওকে মনে ছিলো।
তুষার: এত বড় ধনী ব্যাক্তির মেয়ে ভুলে যাওয়ার কথা না।
আমি: সেই বারো-তেরো বছর বয়সের কথা! ওর যে আমাকে মনে থাকবে তা আমি এক্সপেক্ট করিনি।
তুষার: এখন তো দেখছিস ঠিকই মনে রেখেছে।
আমি: মেয়েটা খুব সিম্পল ছিলো রে! অত ধনী ব্যাক্তির মেয়ে, একছটাক অহংকারও ছিলো না।
তুষার: আমারও দেখে তাই মনে হলো।
আমি: ওর বিয়ে-শাদির ব্যাপার কিছু জানিস?
তুষার: হঠাৎ বিয়ের প্রশ্ন? কি বিয়ে করবি নাকি ওকে!
আমি: আরে ধুর, কি যে বলিশ? আমার বিয়ের কথা আসে কিসে? জাস্ট কিউরিসিটি। এতদিনে নিশ্চয়ই বিয়ে শাদী হয়ে গিয়েছে। কে হাসবেন্ড কি পরিচয় জানতে ইচ্ছে করছে, এই আরকি।
তুষার: হ্যাঁ, পুরুষালী কিউরিসিটি। যাহোক আমার সাথে উনার পরিচয় ছিলোনা, তাই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারবো না। শুনেছি বিবাহিতা। এইটুকুই।
আমি: ও।
তুষার: তোর কি মন খারাপ হয়ে গেলো?
আমি: কি যে বলিশ? ওর সাথে কি আমার প্রেম ছিলো নাকি? মন খারাপ হওয়ার কি আছে?
হঠাৎ করেই আমার কিছু পুরনো স্মৃতি জেগে উঠলো। স্কুলের কম্পাউন্ডে দোলনায় দোল খাওয়া, স্লিপারির সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে সাই করে পিছলে নীচে নামা। ফুটবল ভালো খেলতাম আমি। গোল দিলে ও পাশে দাঁড়িয়ে জোড়ে জোড়ে তালি দিত!
———-XXX———-

কিছুদিনের ছুটি নিয়ে দেশে এসেছি। আমাদের দেশে দেখা না করলে আত্মীয়-স্বজনরা খুব মাইন্ড করেন। তাই নিজের কাজ সারার পর উনাদের সাথে একে একে দেখা করতে লাগলাম। এর মধ্যে একদিন একটা ঘটনা ঘটলো। বাসার ল্যান্ডফোনটা বেজে উঠলে আমি ধরলাম। ওপাশ থেকে একটা বয়স্ক কন্ঠস্বর ভেসে এলো
ওপাশ থেকে: সাজ্জাদ সাহেব বাসায় আসেন?
আমি: জ্বি বলছি।
ওপাশ থেকে: আমার নাম মাওলানা আবদুল করিম। আপনার সাথে একদিন দেখা করতে চাই।
মাওলানা আবদুল করিম: কি বিষয়ে বলুন।
ওপাশ থেকে: আমার ছেলেটা, রাশিয়ায় পড়তে যাবে। এই নিয়ে একটু আপনার সাথে কথা বলতাম।
আমি: জ্বী, টেলিফোনেই বলুন মাওলানা সাহেব।
মাওলানা সাহেব: টেলিফোনে কি আর সিরিয়াস বিষয়ে আলাপ করা যায়? আপনি এজাজত দিলে, দেখা করতাম।
আমি: আমার ঠিকানা জানেন?
মাওলানা সাহেব: জ্বী জানি।
আমি: তাহলে আজ বিকালে চলে আসুন।

ঐদিন বিকালে পায়জামা-পাঞ্জাবী টুপি মাথায় বয়স্ক এক মাওলানা সাহেব বাসায় এসে উপস্থিত।
আমি: বলুন মাওলানা সাহেব আপনার কি খেদমত করতে পারি?
মাওলানা সাহেব: ভাই আপনি প্রফেসর মানুষ, আমার কি খেদমত করবেন। আমারই তো উচিৎ আপনার খেদমত করা।
আমি: লজ্জা দেবেন না চাচা। আপনি আমার মুরুব্বী।
মাওলানা সাহেব: আমি একটা ছোটখাট চাকরী করি। অফিসের ভিতরে ছোটখাট ইমামতিও করি। আমাদের অফিসের বস একজন রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার। স্যার মানুষ খুবই ভালো। উনার স্মার্টনেস, আচার-আচরণ, বুদ্ধি সবকিছু দেখে আমি খুব মুগ্ধ হই তখনই ঠিক করলাম আমার ছোট ছেলেটাকে ক্যাডেট কলেজে দিবো। আর্মী অফিসার বানাবো।
আমি: তারপর?
মাওলানা সাহেব: উপর ওয়ালা আমার দোয়া কবুল করেছিলেন। ছেলেটাকে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে পড়াইছি।
আমি: ও কি পাশ করে গেছে?
মাওলানা সাহেব: জ্বী, পাশ করে গেছে।
আমি: এখন কি করছে?
মাওলানা সাহেব: সেটাই বলতে চাই। আমার সখ ছিলো সে আর্মী অফিসার হবে মেজর সাব-কর্ণেল সাব হবে, আমাদের বড় সাহেবের মতন স্মার্ট হবে। আর সে কিনা আমার ইচ্ছার কোন মূল্য দিলো না!
আমি: (উনাকে সান্তনা দেয়ার জন্য বললাম) জ্বী, বাবার ইচ্ছার তো মূল্য দেয়া উচিৎ।
মাওলানা সাহেব: তা ভাই সে আমার কোন কথাই শুনলো না। বলে, “আর্মীতে ঘোড়ার ডিম আছে! ছয় বছর প্যারেড করেছি, আর দরকার নাই। আর্মী কোন মেধাবী লোকের জায়গা না।” আমি ভাবছিলাম ক্যাডেট কলেজে পড়ে ওর আর্মীর দিকে মন যাবে, আর এই দেখি উল্টা হইয়া গেলো! বলেন তো ভাই, এইগুলা কোন বুদ্ধিমান লোকের কথা? আরে ভাই বাংলাদেশে আর্মীর চাকরী তো সোনার হরিণ। দেশের হাজার হাজার ছেলে ঐ চাকরীর স্বপ্ন দেখে, আর তুই পায়ে ঠেলিস। আপনিই বলেন ভাই ও আর্মী অফিসার হলে তো ওরই ভালো হতো। ওর সাথে এলাকায় চোখ তুলে কথা বলতে কেউ সাহস পেত। দশটা লোকে আমাকে দেখলে মেজর সাহেবের বাবা বলে সালাম দিতো না? তুই কি ডিওএইচএস-এ প্লট পেয়ে একটা আলীশান বাড়ী তুলতে পারতি না? কোন ইমাম-মাওলানা-প্রফেসরে এত কিছু পায়?
একটানে অনেকগুলো কথা বলে ফেললেন তিনি। বুঝলাম মনের খেদ সব বের করছেন।
আমি উনার ব্যাথা আর উস্কে দিলাম না, কারণ আমি জানি তিনি যা বলছেন, বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ওটাই বাস্তবতা। আমাকে একবার আমাদের কলেজের এক শিক্ষক বলেছিলেন আমি তোমাদের পড়িয়ে যা না পাই, আমার ছাত্ররা তার চাইতে অনেক বেশী কিছু পায়!
আমি: তা এখন ও কি করছে?
মাওলানা সাহেব: রেজাল্ট সে ভালো করছে খুব। দুইবারই স্ট্যান্ড করছে। এখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হইছে, ‘ল’-ডিপার্টমেন্টে।
আমি: ভালোই তো ‘ল’-ডিপার্টমেন্টে চান্স পাওয়া তো খুব কঠিন। ও যেহেতু ঐ ডিপার্টমেন্টে কোয়ালিফাই করেছে সাবাশ। এখন মনোযোগ দিয়ে পড়ুক।
মাওলানা সাহেব: বলে যে, ব্যারিস্টার হবে। ডক্টর সাব হয়ে জ্ঞানী-গুনী বুদ্ধিজীবি হবে।
আমি: ভালোই তো। ওর স্বপ্ন টার্গেট রেখে যদি আগায় হয়তো সে ভালো করবে।
মাওলানা সাহেব: আমি ওকে বলি, “ঠিক আছে ‘ল’ পড়তেছিস ভালো কথা শেষ করে বিসিএস দে, পুলিশ হ। তাহলেও তো জোর হয়। একদিন তুই আইজি হবি”। কি ভাই ভুল বলেছি?
আমি: (বুঝলাম, উনার চিন্তা-ভাবনা ঐ লাইনে। হয়তো দেশের সাধারণ মানুষরা উনার মতই ভাবে) না না আপনি ঠিক বলেছেন। তা আমার কাছে কি বিষয়ে এসেছিলেন?
মাওলানা সাহেব: এখন মাথায় অন্য ভুত চেপেছে। বলে দেশে পড়ালেখা ভালো না, সে বিদেশে পড়তে যাবে। বস্তা বস্তা চিঠি বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়েছে।
(আমি মনে মনে ভাবলাম, ছেলের চিন্তা-ভাবনা তো যথেষ্ট অগ্রসর!)
আমি: তারপর?
মাওলানা সাহেব: এখন ঢাকায় একটা এজেন্সির সাথে যোগাযোগ করেছে। ওরা আমার ছেলেকে রাশিয়ায় স্কলারশিপ করে দিতে পারবে। বিনিময়ে তাদের কিছু টাকা দিতে হবে।
আমি: ভালো এজেন্সী তো?
মাওলানা সাহেব: এই জন্যই আপনার কাছে আসা। বাংলাদেশে তো হায় হায় কোম্পানীর অভাব নাই কোন। তা সেই এজেন্সী ওয়ালারা আপনার নাম ঠিকানা টেলিফোন নাম্বার দিলো। বললো আপনি নাকি ওদের চেনেন। এই জন্যই আপনার কাছে আসা।
আমি: ও আচ্ছা। এইসব বিষয়ে আমিও সতর্ক থাকি ফ্রডের অভাব নাই কোন। তা ওরা কারা?
মাওলানা সাহেব: ‘এক্স-ওয়াই ইন্টারন্যাশনাল’, সেলিম সাহেব মালিক।
আমি: হ্যাঁ, ওদের চিনি আমি। সেলিম আমার বন্ধু, রাশিয়াতেই লেখাপড়া করেছে।
মাওলানা সাহেব: রাশিয়ান বৌ নাকি উনার?
আমি: জ্বী, রাশিয়ান বৌ।
মাওলানা সাহেব: বৌ কি মুসলমান হইছে?
আমি: তা বলতে পারবো না।
মাওলানা সাহেব: বিধর্মী বিয়ে করছে এইটা খারাপ কিছু না, তবে উনার কর্তব্য বৌটাকে মুসলমান বানানো।
আমি: সেটা উনাদের ব্যাপার।
মাওলানা সাহেব: হ্যাঁ, তা ঠিক। তবে কি কোরানের আয়াত আছে ……….।
আমি: মাওলানা আঙ্কেল, আমি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রফেসর হলেও, কোরান শরীফ পুরোটাই আমার বাংলা অর্থসহ পড়া আছে। আমি আয়াতগুলো জানি। এখন আপনি আমার কাছে কি জানতে চান বলেন?
মাওলানা সাহেব: আজকালকার শিক্ষিতরা তো কোরান শরীফ পড়েনা। আপনি কোরান পড়েছেন শুনে ভালো লাগলো। যাহোক, আমি জানতে চাই ঐ কোম্পানী ঠিক আছে তো?
আমি: হ্যাঁ, ঠিক আছে। ওরা আগেও অনেককে পাঠিয়েছে।
মাওলানা সাহেব: হ্যাঁ, আমাকে বলেছে। আরেকটা বিষয়
আমি: বলুন।
মাওলানা সাহেব: আমি তো দেশ-বিদেশে যাইনাই। সাধারণ মানুষ ঐ সুযোগ কখনো হয়নাই। বায়তুল্লাহ শরীফ দেখার ইচ্ছা আছে, জানি না হবে কিনা। তা, রাশিয়া দেশটা কেমন? পড়া লেখা তো ভালো হবে বুঝিই, না হলে তো আর এত বড় সুপার পাওয়ার হয়নাই।
এবার আমার মনে হলো মাওলানা সাহেব লজিকাল চিন্তা-ভাবনা করতে জানেন।
আমি: জ্বী, আপনি ঠিকই ধরেছেন। ওখানকার লেখাপড়া ভালো।
মাওলানা সাহেব: আমি তো জানলাম। তা আপনাকে আরেকটু কষ্ট দিতে চাই। মার ছেলেটাকে নিয়ে আপানার কাছে একটু আসবো। ওকে কিছু এলেম দেবেন। ওরও কিছু জানার ইচ্ছা আছে হয়তো।
———-XXX———-

রাতের দিকে মোবাইলে একটা টেলোফোন কল পেলাম
আমি: কি খবর মৌলি?
মৌলি: তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছ?
আমি: না।
মৌলি: কি করো?
আমি: (আমি একটু চিন্তিত হলাম। এত রাতে হঠাৎ ওর ফোন) বই পড়ছি।
মৌলি: তোমার বই পড়ার স্বভাব আর গেলো না, তাইনা?
আমি: (আমি হেসে ফেললাম) আচ্ছা, এতোগুলো বছর আগের কথা। তোমাট এখনো সব মনে পড়ে?
মৌলি: হ্যাঁ, মনে পড়ে। তুমি গল্প পড়ে পড়ে এসে, আমাদেরকে সেইসব গল্প বলতে, আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম।
আমি: তাই?
মৌলি: তোমার মনে নাই?
আমি: মনে আছে।
মৌলি: তুমি যেদিন স্কুল ছেড়ে চলে গেলে, সেদিন আমাদের সবার মন খারাপ হয়ে গিয়েছিলো।
আমি: আমার সৌভাগ্য। আমার তো মনে হয়েছিলো, আমাকে সবাই দ্রুতই ভুলে যাবে।
মৌলি: না দ্রুত কেউ ভোলেনি। আমরা পরেও তোমার কথা আলাপ করেছি। আমাদের ক্লাসে আর গল্প শোনানোর কেউ ছিলো না। নাটক করার কেউ ছিলোনা, ফুটবল মাঠ কাঁপানোর কেউ ছিলোনা। নাদিয়াকে মনে পড়ে?
আমি: না মনে পড়ে না।
মৌলি: ছিলো একটা মেয়ে আমাদের সাথে। তোমার কথা অনেক বলতো। হয়তো তোমার প্রতি দুর্বলতা ছিলো।
আমি: ঐ বয়সে আবার দুর্বলতা কিসের?
মৌলি: তোমার কি ধারনা, ঐ বয়সে দুর্বলতা হয়না?
আমি: হয় নাকি?
আমার প্রশ্নে মৌলি চুপ করে রইলো।
আমি: আচ্ছা তোমার কথা তো ঐদিন আর জানা হলো না। তোমার ছেলেমেয়ে কয়জন? স্বামীর পরিচয় কি?
মৌলি: সাজ্জাদ সাহেব সাথে ছিলেন তাই পার্সোনাল বিষয়ে আর আলাপ তুলিনি।
আমি: আমিও তাই। তা এখন আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।
মৌলি: কাল ফ্রী আছো?
আমি: ছুটিতে এসেছি। সবসময়ই ফ্রী।
মৌলি: তাহলে কাল আসো। খথা হবে।
আমি: কোথায়?
মৌলি: ঐ রেস্টুরেন্ট-টাতেই এসো। রাত নয়টায়, খেয়াল থাকবে?
আমি: হু, খেয়াল থাকবে। তবে, রাতে? তোমার বাসায় সমস্যা হবেনা?
মৌলি: (একটু রেগে গেল মনে হয়) আমার বাসা দিয়ে তোমার কি দরকার? তোমাকে রাত নয়টায় আসতে বলেছি, রাত নয়টায়ই আসবে। বুঝলে।
ওর এই রূপটি আমার পরিচিত। বিশাল ধনী মানুষের একমাত্র কন্যা, কোনদিন কোন অভাব-অনটন-সমস্যা দেখেনি। সব সময়ই চেয়েই পেয়ে অভ্যস্ত। তাই স্কুলে আমাদের সাথেও ও হঠাৎ করেই রেগে উঠে বলতো, ‘এরকমই করতে হবে বুঝলে’।
আমি: ওকে স্যার। কাল দেখা হবে।
———-XXX———-

আমার বাড়ীতে একই দিনে একই সময়ে দুটা পরিবার এসে উপস্থিত। একটা পরিবার হুমায়ুন কবীর সাহেবের আরেকটা পরিবার মাওলানা আবদুল করিম সাহেবের। হুমায়ুন কবীর সাহেবের সাথে এসেছেন উনার গুণী স্ত্রী ও উনার মেয়ে। আর মাইলানা সাহেবের সাথে এসেছেন উনার ছেলে।

আমি: হুমায়ুন কবীর সাহেব বলেন কি জানতে চান?
হুমায়ুন কবীর: আজকে আমি আর কোন কথা বলবো না। উনাকে সব বলেন (নিজের স্ত্রী-কে দেখিয়ে দিলেন)
আমি: ম্যাডাম, আপনার কথা উনার কাছ থেকে শুনেছি। মাল্টিন্যাশনালে জব করছেন শুনলাম।
মিসেস হুমায়ুন কবীর: জ্বী। আমার মেয়ে নদীকে বিদেশে পড়াতে চাই। রাশিয়ায় স্কলারশীপ হয়েছে। আপনার অনেক প্রশংসা শুনলাম। তাই আপনার কাছে আসলাম পরামর্শের জন্য।
উনার কথাবার্তা খুবই সুন্দর ও উনিই বেশ স্মার্ট। প্রথম দেখায়ই বেশ ইমপ্রেসিভ মনে হলো।
হুমায়ুন কবীর: তার আগে ভাই একটা কথা কই। আমার নদীর চাচা, খেইপা গেছে।
আমি: কেন খেপলো?
হুমায়ুন কবীর: আজকে সকাল বেলা বাসায় আইসা চিল্লাচিল্লি। কয়, ‘আমার ভাতিঝি-রে রাশিয়ায় পড়তে দিমুনা।’
নদী: ভাইয়া আমি পজেটিভ ডিসিশন নিয়েই ফেলেছিলাম চাচা হঠাৎ এসে গোলামাকল শুরু করলো।ভাইয়া ওখানে গেলে কি ভালো হবে?
ক্যাডেটদের এই একটা বিষয় যখনই শোনে এক্স-ক্যাডেট, বাপের বয়সী লোককেও ভাইয়া বলে।
আমি: এরকম কথা কেন বল্লেন?
হুমায়ুন কবীর: কয়। রাশিয়ায় কোন পড়ালেখা হয় নাকি? অরা তো জ্বরের ওষুধই দিতে জানেনা। মাইনষে রাস্তায় পইরা মইরা থাকে।
আমি: এসব তিনি কি বলেন? নদীর চাচা কি আপনার ছোট না বড়?
হুমায়ুন কবীর: আরে বড় ভাই। আমার সম্বন্ধী লাগে। শালা হইলে আমি পাত্তা দিতাম নাকি? এখন তো পড়ছি বিপদে।
মাওলানা সাহেব: আপনার সম্বন্ধীর লেখাপড়া কতদূর?
হুমায়ুন কবীর: (একটু দমে গেলেন) জ্বী, বিএ পাশ।
মাওলানা সাহেব: ধুর! বিএ পাশের ভাত আছে এই জমানায়? এই জন্যই উল্টাপাল্টা বলে।
মাওলানা সাহেবের কথা শুনে নদীর মায়ের মুখটা একটু কালো হয়ে গেলো। মাওলানা সাহেব আরো বললেন
মাওলানা সাহেব: যেই দেশ আমেরিকা-বিলাতের সাথে টক্কর দেয়, তাদের লেখাপড়া খারাপ হইতে পারে? আপনার সম্বন্ধীর আইডিয়া নাই কোন।
আমি মনে মনে খুশী হলাম মাওলানা সাহেবের যৌক্তিক কথা শুনে। লাভই হলো, আমাকে আর কিছু বলতে হলো না।
আমি: পরিচয় করিয়ে দেই। ইনি হুমায়ুন কবীর সাহেব ব্যাংকে চাকুরী করতেন এখন রিটায়ার করে ব্যবসা করছেন। আর ইনি মাওলানা আবদুল করিম চাকুরী করছেন, এই উনার ছেলে নাম ………।
মাওলানা সাহেব: ওর নাম সাগর।
আমি: সাগর, তোমার আব্বার তো খুব ইচ্ছা ছিলো তুমি আর্মীতে যাবে। তা তুমি রাজী হলে না যে?
সাগর: আমি আব্বাকে বললাম “আর্মীতে কি আছে বলেন? ওখানে গিয়ে হবেইটাবা কি? তাছাড়া আমাদের জাতির কি কোন বীরত্বের ইতিহাস আছে?
আমি: তুমি আর্মীতে যাবে কি যাবে না। সেটা তোমার ব্যাপার। তবে আমাদের জাতির কোন বীরত্বের ইতিহাস নাই এটা আমি মানতে পারলাম না।
সাগর: আমাদের আবার কি বীরত্ব? আলেকজান্ডার তো বিশ্ব জয় করেছিলো। আমরা কি করেছিলাম?
আমি: ঐ আলেকজান্ডার আমাদের বাঙালীদের কাছে এসে এমন মার খেয়েছিলো যে আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি।
সাগর: বুঝলাম না? সে তো পাঞ্জাব থেকে ফিরে গিয়েছিলো।
আমি: গ্রীসের দরবারী ইতিহাসে ওরকমই লেখা হয়। কিন্তু মূল ঘটনা ভিন্ন। আলেকজান্ডারের সৈন্যদের মোকাবেলা হয়েছিলো আমাদের গঙ্গাঋদ্ধি জাতির সাথে। গঙ্গাঋদ্ধি আমাদের বাঙালীদেরই প্রাচীন নাম। সেই যুদ্ধে আলেকজান্ডার হারে, এবং ধাওয়া খেটে তার সৈন্যরা দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পালিয়ে যায়।
সাগর: কি বলেন?
আমি: ইয়েস। এরপর আলেকজান্ডার-এর আর দেশে ফেরা হয়নি। পথিমধ্যে বিষ প্রয়োগে তাকে হত্যা করা হয়। অর্থাৎ, এইভাবে পরাজয়ের গ্লানিটাকে ধামাচাপা দেয়া হয়েছে।
সাগর: ইন্টারেস্টিং!
আমি: আরো আছে আমাদের বীরত্বের ইতিহাস। বর্তমান জর্জিয়া রাষ্ট্র যেটা রাশিয়ার পাশেই। ওখানে কোলচিন ওয়ার নামে একটি যুদ্ধ হয়েছিলো ঐ যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন আমাদের সেনাপতি দাতিস। সেই দাতিস-এর কাহিনী লেখা আছে পূরাণ “Argonautika”-তে।
সাগর: এটা সত্যিই গর্বের।
আমি: বিজয় সিংহ-এর নাম শুনেছ।
সাগর: না।
আমি: ‘আমাদের ছেলে বিজয় সিংহ, লঙ্কা করিয়া জয়, সিংহল নামে রেখে গেলো নিজ শৌর্যের পরিচয়!’
সাগর: মানে কি এই কবিতার?
আমি: আমাদের বাংলার রাজপুত্র বিজয় সিংহ-ই বর্তমান শ্রীলঙ্কা বা প্রাচীন সিংহলের প্রতিষ্ঠাতা।
সাগর: কবেকার ঘটনা?
আমি: তিনি গৌতম বুদ্ধের সমসাময়ীক। এরকম আরো অনেক বীরত্বের কাহিনী আছে আমাদের পূর্বপুরুষদের তোমাকে আরেকদিন বলবো।
আমি: নদী, সাগরও তোমার মতো এক্স ক্যাডেট।
নদী ও সাগর পরস্পরের দিকে চাইলো। এবার সাগর কথা বলে উঠলো
সাগর: তুমি কি এমজিসিসি-র?
নদী: হ্যাঁ। তুমি কোন কলেজের?
সাগর: আমি জেসিসি-র।
নদী: ও তাই? ওয়াহিদ স্যারকে পেয়েছ তোমরা?
সাগর: হ্যা, পেয়েছি, তাহমিনা ম্যাডাম-কে তোমরা পেয়েছ না?
হঠাৎ করেই অচেনা দুজন তরুণ-তরুনী পরস্পরের সাথে এমনভাবে কথা বলতে শুরু করলো যেন অনেক দিনের চেনা। কেবলমাত্র ক্যাডেট পরিচয়েই এটা সম্ভব।
———-XXX———-

গুলশানের অভিজাত রেস্টুরেন্ট-টির আলো-আঁধারী পরিবেশে আমরা দু’জন বসলাম। মৌলিকে শেষ দেখেছিলাম তেরো বছর বয়সে। প্রজাপতির মত চঞ্চল একটি কিশোরী ছিলো। আজ পূর্ণাঙ্গ নারী রূপে ওকে অপরুপা লাগছে।

মৌলি: আজ সারাদিন কি করলে?
আমি: তেমন কিছু না। তবে ইমপর্টেন্ট একটা কাজ করলাম।
মৌলি: কি কাজ?
আমি: দু’জন রশিয়াতে পড়তে যাবে আমার কাছে এসেছিলো পরামর্শ করার জন্য।
মৌলি: কি পরামর্শ দিলে?
আমি: আমার সাথে আলাপ করে তারা কনভিন্সড হলো। ঠিক করেছে ওখানে পড়তে যাবে।
মৌলি: তোমার সাথে আলাপ করেই কনভিন্সড হয়ে গেলো ছেলে দুটা?
আমি: প্রথমত ছেলে দুইটা না, একটা ছেলে আর একটা মেয়ে।
মৌলি: ইন্টারেস্টিং! মেয়েটাকে বিদেশে পাঠাতে রাজী হলো বাবা-মা? অবশ্য আমিওতো বিদেশেই পড়েছি।
আমি: তুমি কোন দেশে পড়েছ?
মৌলি: ব্যাচেলর ডিগ্রীটা বাংলাদেশ থেকেই নিয়েছি, বুয়েট থেকে। তারপর বিয়ের পর মাস্টার্স-টা আমেরিকায় করেছি।
আমি: তোমার স্বামীর ব্যাপারে তো কিছু জানা হলো না।
মৌলি আমার দিকে তাকালো। স্বাভাবিক তাকানো নয়, তবে অনুভূতিটা ঠিক ধরতে পারলাম না।
মৌলি: ওদেরকে কনভিন্স করলে কি করে?
আমি: আসলে ওরা আগে থেকেই ঠিক করেছিলো মস্কোতে পড়বে। সামান্য দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিলো সেটা দূর করতেই আমার কাছে এসেছিলো। একটা বিষয় ওখানে কাজ করেছে।
মৌলি: কি বিষয়?
আমি: ওরা দু’জনেই এক্স ক্যাডেট, তাই আমার কথা সবই ওরা বিনা বাক্যব্যায়ে মেনে নিয়েছে।
মৌলি: ও। হ্যাঁ, তোমাদের ক্যাডেটদের এই ভ্রাতৃত্ববোধটা দারুন! তা কবে যাচ্ছে ওরা?
আমি: ওখানে ফার্স্ট সেপ্টেম্বর থেকে ক্লাস শুরু হয়। তার আগে আগেও যাবে আরকি।
মৌলি: দুজনেই মস্কোতে পড়বে?
আমি: হ্যাঁ।
মৌলি: দেখো, মস্কোতে গিয়ে নদী যেন আবার সাগরের বুকে ঝাঁপিয়ে না পড়ে!
আমি: হা হা হা! তাইতো, বিষয়টা তো আমার মাথায় আসেনি। দেখা যাক, কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।
মৌলি: ভালোবেসে বিয়ে করাটা খুব আনন্দের তাইনা?
আমি: বলতে পারবো না।
মৌলি: কেন, তোমার বিয়ে কি ভালোবাসার নয়?
আমি: আমিতো বিয়েই করিনি।
মৌলি: কি!!!
আমি: বিয়ে করিনি জনাবা।
মৌলি: কেন বিয়ে করোনি?
আমি: আজব প্রশ্ন!
মৌলি: আজবের কি আছে? সব কিছুর পিছনেই কারণ থাকে। তোআমর বিয়ে না করার পিছনে কি কোন কারণ নেই?

মৌলি ভুল বলেনি। কারণ ছাড়া ঘটন হয়না। আমার এত বয়সে বিয়ে না করার পিছনেও একটা কারণ আছে। তবে কারণটা আমি মৌলিকে বলতে চাইছি না।

আমি: তোমার ব্যাপারে বলো।
মৌলি: (মৌলি এবার করুণ চোখে আমার দিকে তাকালো) আমার বিয়ে হয়েছিলো ঢাকায়। নিজে পছন্দ করিনি, বাবা বিয়ে দিয়েছিলেন, উনার মতই এক ব্যবসায়ীর ছেলের সাথে। আমার বাবাকে তো চিনতে জাঁদরেল লোক ছিলেন। আমি প্রেম-ট্রেম কিছু করলে উনি মেনে নিতেন না। তাই ইয়াং লাইফে আমি সব সময় সংযতই ছিলাম।
আমি: তারপর?
মৌলি: বিয়ের পর আমি আমেরিকা যাই মাস্টার্স-টা করতে। আমার স্বামীও আমার সাথে যায়। ওখানে আমাদের মেয়েটার জন্ম হয়।
আমি: ভালো।
মৌলি: না সবকিছু ভালো নয়। বাচ্চাটা হওয়ার পর আমি মেয়েটাকে নিয়ে ভীষণ ব্যাস্ত হয়ে পড়ি। বিদেশ-বিঁভুয়ে বুঝতেই পারো আমাকে একাই সব সামলাতে হয়েছে। এদিকে আমার স্বামীর সম্পর্ক হয় একটা স্প্যানিশ-আমেরিকান মেয়ের সাথে। মেয়েটি সুন্দরী-স্মার্ট। উত্তেজক পোষাক-আষাক পড়তো। আমার স্বামী লোভ সামলাতে পারেনি। তারপর আমাকে ছেড়ে ওকেই বিয়ে করে।
ভীষণ বিমর্ষ লাগলো মৌলিকে। একে তো ভীষণ ধনী, তার উপর সুন্দরী; এরকম মেয়ে বিমর্ষ হলে দেখতে ভালো লাগে না। কেমন যেন মানায়না!
আমি: সরি! আমি জানতাম না।
মৌলি: সরি বলার কিছু নাই। আমরা এখন ম্যাচিউরড। এই বিষয়গুলোকে স্বাভাবিকভাবেই নিতে পারি। আজকাল এরকমতো আকছাড়ই হচ্ছে!
আমি: তারপরেও একটা সংসার ভেঙে যাওয়ার কথা শুনলে দুঃখ লাগে!
মৌলি: আমি এরপর ঢাকা চলে আসি। বাবার ব্যবসার একটা অংশ আমি দেখি। মেয়েটা আমার সাথেই আছে।
আমি: কি নাম তোমার মেয়ের?
মৌলি: আনিকা।
আমি: সুন্দর নাম।
মৌলি: তুমি মস্কো ফিরে যাচ্ছো কবে?
আমি: সাতদিন পরে।
মৌলি: আমাকে তোমার ই-মেইল, আর ওখানকার টেলিফোন নাম্বার দাওতো।
———-XXX———-

কাহিনীর পরবর্তি ঘটনা মস্কোতে।
আমি সেখানে একটি এ্যাপার্টমেন্টে থাকতাম। এ্যাপার্টমেন্ট-টি ছিলো মস্কোর অভিজাত এলাকায় ও মোটামুটি সুন্দর। একজন অধ্যাপক হিসাবে লেখালেখি জ্ঞান চর্চা করে আমার একক জীবন ভালোই কাটছিলো ওখানে। তবে সাগর নদী আসার পর আমার একক জীবনে মাঝে মাঝে ঢেউ লাগতে শুরু করলো। ওরা ডরমিটরিতে থেকে থেকে থেকে একঘেয়ে বোধ করতো, তাই মাঝে মাঝে উইক-এন্ডে আরো বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আমার এ্যাপার্টমেন্টে বেড়াতে আসতো। আমার নিঃসঙ্গ জীবনে ওদের উপস্থিতি ভালো লাগতে শুরু করলো। এরপর মাঝে মাঝে আমিই ওদের দাওয়াত দিতাম। একবার কোরবাণী ঈদে দাওয়াত দিলাম। নদী, সাগর, বকুল, মতিন, রূপালী, মেজবাহ সহ আরো দশ-বারোজন উপস্থিত। ওরা বললো, ভাইয়া আপনি বসে বসে বই পড়েন, আপনাকে কোন কাজ করতে হবে না। আমরাই রান্না-বান্না করছি। কোথায় সব মাল-ম্যাটেরিয়াল? আমি বললাম, “সব রান্না ঘরেই আছে, সব সময় যেমন থাকে। তোমরা কাজ ভাগ করে নিয়ে করতে থাকো। তবে আমি আজ বসে থাকবো না, আমি আর সাগর মিলে কোরবাণীর মাংসটা ভাগ করি তোমরা সবাই এক ব্যাপ করে পাবে।”
লাফ দিয়ে উঠলো মেজবাহ, “কি বলেন? কোরবাণী করেছেন নাকি?”
আমি: হ্যাঁ। করেছি। তোমরা আসবে একটা দেশের আমেজ আনতে হবে না। এখানকার গরু অনেক বড় বড় হয়, প্রত্যেকেই অনেক কেজি করে মাংস পাবে।
এরপর আমরা কাজে লেগে গেলাম। মাঝখানে নদী আমাদের দুজনার জন্য দুকাপ কফি বানিয়ে আনলো।
আমি: ওদেরকে দিয়েছ?
নদী: ওদেরটা ওরা বানিয়ে খাবে। আমি আপনার আর সাগরের জন্য আনলাম।
সাগর: থ্যাংক ইউ মিস নদী।

রকমারী মজাদার রান্না শেষে। সবাই মজা করে খেলাম। এরপর দেখি ওদের কয়েক জন আমার বিছানায় বেশ আরাম করে তেরা-বেকা হয়ে শুয়ে পড়লো। মতিন বলে, “ঈদের খাওয়াটা বেশী হয়ে গেলো। একটি বিশ্রাম নেই ভাইয়া।”
আমি বললাম, “নাও, বিশ্রাম নাও।” সাগরের হাতে দেখলাম একটা খেলনা পিস্তল, ওখান থেকে প্লাস্টিকের গুলি বের হয়। ও ওটা নিয়ে এদিকে গুলি করে করে ওদিকে গুলি করে। আমি হাসলাম, যদিও ইউনিভার্সিটিতে পড়ে, কিন্তু ছেলেমানুষী পুরোপুরো দূর হয়নি তখনও।
আমি বললাম, “টিভি চালিয়ে দেই দেখো।”
নদী: এখানে টিভিতে এতো এতো চ্যানেল যে কোন চ্যানেল দেখবে এই নিয়ে ঝগড়া লেগে যেতে পারে।
আমি: তুমি কোন চ্যানেলটা দেখতে চাও?
নদী: ‘সনি’ টিভি চালান।
সাগর: নাহ। ইন্ডিয়ান চ্যানেল দেখবো না।
নদী; কি হয় দেখলে?
আমি: সাগর মেয়েদের কথার মূল্য দিতে হয় বেশী। অতএব, নদীর পছন্দই থাক।
সাগর দেখলাম রেগে নদীর দিকে তাকালো। ওর হাতের খেলনা পিস্তল দিয়ে ফট করে একটা গুলি করে দিলো নদীর হাতে। নদী মনে হলো ব্যাথা পেয়েছে। কিন্তু আমার উপস্থিতিতে কিছু বলতেও পারছে না, কটমট করে সাগরের দিকে একটু তাকালো শুধু।

আমি মাঝে মাঝে ওদের খোঁজ নিতাম। জানলাম পড়ালেখা ভালোই করছে ওরা দুজন। সাগর পড়ছে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং আর নদী পড়ছে ডাক্তারী। সাকসেসফুলী ওরা ব্যাচেলর ডিগ্রী কমপ্লিট করলো। তারপর মাস্টার্স-এও এ্যাডমিশন নিলো।

একদিন নদী হঠাৎ আমাকে টেলিফোন করে বসলো।
আমি: হ্যালো নদী।
নদী: ভাইয়া।
আমি: কি, কোন সমস্যা?
নদী: আব্বা ফোন করেছেন বাংলাদেশ থেকে।
আমি: ভালো কথা। এটা জানানোর জন্য আমাকে ফোন করার কি আছে?
নদী: দেশে আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।
আমি: ও। তা তুমি কি মানসিকভাবে প্রস্তুত আছো?
নদী: না।
আমি: ছেলে কি ঠিক?
নদী: জানিনা। আব্বা বলেছেন, দেশে গেলে বিয়ে ঠিক করবেন। আপাতত: একমাসের জন্য দেশে ডেকে পাঠিয়েছেন।
আমি: কোন ছেলে, কি বিষয়, কিছুই কি জানোনা?
নদী: আমার এক আত্মীয়ের কাছ থেকে শুনেছি। বিসিএস ক্যাডার একটা ছেলেকে আব্বা পছন্দ করেছেন।
আমি: এভাবে অচেনা-অজানা একজনকে হুট করে বিয়ে করতে তুমি রাজী?
নদী: না, রাজী না।
আমি: তাহলে?
নদী: জানি না, কি যে হবে?
নদীর বিষয়টা আমার কাছেও ভালো লাগলো না। এরকম আগেও দেখেছি। বাংলাদেশ থেকে বাবা-মা মেয়েকে বিদেশে পড়তে পাঠায়। তারপর হুট করেই একদিন বলে, “অমুকের সাথে তোমার বিয়ে ঠিক করেছি চলে এসো”। তাদের ধারনা তারা একজন মানুষকে না, একটা রোবট-কে পাঠিয়েছেন। যার কাজ ঐদেশের বিশ্ববিদ্যালয় নামক কারখানায় ঢুকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বের হয়ে আসা। তারপর দেশে গর্ব করে বলবো আমার মেয়ে বিদেশ থেকে ডিগ্রী নেয়া, আর সেই তকমা দিয়ে কোন এক বিগ-শটের সাথে তার বিয়ে দিয়ে দেয়া। একবারের জন্যও ভাবেনা যে মেয়েটা একটা মানুষ, সে ঐদেশে অনেকগুলা বছর কাটিয়েছে, তার এই চলার পথে হয়তো সে কাউকে মন দিয়ে ফেলেছে, সেই খোঁজ আগে নেইনা কেন!

আমি নদীর টেলোফোনটা রাখতেই মৌলির টেলিফোনট পেলাম
আমি: হ্যালো মৌলি।
মৌলি: একটা সংবাদ আছে।
আমি: বলো।
মৌলি: আমার মেয়েটা এ-লেভেল পাশ করেছে। খুব ভালো রেজাল্ট হয়েছে।
আমি: কনগ্রাচুলেশনস। টেলিফোনে তো আর মিষ্টি চাওয়া যাবেনা। দেশে আসলে মিষ্টি খাবো।
মৌলি: দেশে আসছো নাকি তুমি?
আমি: হ্যাঁ, ভাবছি এই সামারেই দেশে যাবো।
মৌলি: চলে আসো, অনেকদিন তোমাকে দেখিনা।
আমি: তোমার সুসংবাদটা শুনে ভালো লাগলো।
মৌলি: পাশাপাশি একটা দুসংবাদও আছে।
আমার বুকটা ধড়াস করে উঠলো। দুসংবাদ যখন আসে সবদিক থেকেই আসে। নদীর সংবাদটির পর এবার মৌলি কিছু বলবে।
আমি: কি হয়েছে?
মৌলি: আনিকা-র বাবা ফোন করেছিলো।
আমি: কি চায়?
মৌলি: সে চায় মেয়ে তো পাশ করেছে, এবার তার কাছে আমেরিকায় গিয়ে পড়ুক।
আমি: তুমি আপত্তি জানালে না?
মৌলি: বলে, “মেয়ে কি তোমার একার?”

———-XXX———-

সামারে বাংলাদেশে এলাম। একদিন পরেই ভাবলাম আর সব কাজ পরে হবে আগে নদীর বাবার সাথে একটু দেখা করি। উনাদেরকে একটু বুঝিয়ে বলি। মেয়েটার মনের ব্যাপারটা যাতে উনারা আমলে নেন, এভাবে সবকিছুতেই ম্যাটেরিয়াল লাভ-লোকসান দেখলে হয়?

সেদিন রাতে মৌলির সাথে দেখা করলাম ঐ একই রেস্টুরেন্টে। অনেকগুলো বছর পর আবারো সেই আলো-আঁধারী পরিবেশে দুজনার বসা। ওর রূপ কমেনি কিছুই, শুধু বয়সের ছাপটা একটু বেড়েছে। একটা নীল রঙের শাড়ী পড়ে এসেছে। নীল রং আমার প্রিয়, এটা জেনেই কি ঐ রঙের শাড়ী পড়েছে? একবার ভাবলাম প্রশ্নটা করি, তারপর ভাবলাম, নাহ, প্রশ্নটা করা ঠিক হবে না।

আমি: কি ঠিক করলে?
মৌলি: কিসের?
আমি: তোমার মেয়েকে নিয়ে।
মৌলি: আমার মেয়ে আমি দেব না। ও চায় তো মামলা করুক।
আমি: আমেরিকা থেকে আর কি মামলা করবে।
মৌলি: ওদের ফ্যামিলিটা খুব শয়তান। তুমি তো মাস্টারী নিয়ে থাকো জানোনা। বড়লোকরা ভালো মানুষ হয় না।
আমি: কি বলো?
মৌলি: ভালো মানুষ এতো এতো টাকা করতে পারে না। অনেক অনেক টাকা করতে হলে অনেক অনেক শয়তান হতে হয়।

একবার মনে মনে ভাবলাম ওকে জিজ্ঞেস করি তুমিওতো ভীষণ বড়লোক। তুমি কি শয়তান? এবার আমার হাসি পেল, তবে হাসিটা মনে মনে হাসলাম, এমন প্রশ্ন এই অপ্সরীকে করা যাবে না। হাজার হোক আমার ছেলেবেলার বন্ধু।
আমি: তা এখন কি করবে?
মৌলি: মেয়ে আমার সাথেই থাকবে। এখানেই প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়াবো, বিদেশেও পাঠাবো না। বিদেশে গেলেই আমার হাতছাড়া হয়ে যাবে।
আমি: হ্যাঁ ভালো সিদ্ধান্তই নিয়েছ।
মৌলি: আচ্ছা ঐ মেয়েটার কি হলো?
আমি: কোন মেয়েটা?
মৌলি: ঐ যে মস্কোতে পড়ে। বাবা-মা জোর করে ওকে কোন বদমাশের সাথে বিয়ে দিতে চাইছে!
আমি: ও হো! ছেলেটি বদমাশ কিনা জানিনা। তবে নদীর অপরিচিত। আমি দেশে এসেছি যখন, ভাবছি ওর বাবা-মার সাথে একবার কথাটা পারবো।
মৌলি: কথা বলে দেখো। মেয়েটার জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে জানো।
আমি: তোমার খারাপ লাগার কি আছে? তুমি তো আর ওকে চেনোনা।
মৌলি: মেয়েদের দুঃখ তুমি বুঝবে না। আমি আমার সাথে তুলনা করে বলছি। মেয়েটার জীবন যেন আমার মতো না হয়। ও ওর ভালোবসার ছেলেটাকেই বিয়ে করুক।
আমি: সমস্যা এখানেও একটা আছে।
মৌলি: কি সমস্যা?
আমি: ওর ভালোবাসার কোন ছেলে আছে কি না, আমি জানিনা।
মৌলি: ও, সেটাও তো প্রশ্ন। জানো, হয়তো আছে, মনে মনে আছে, আমার মতই কাউকে বলতে পারেনি কখনো।
আমি: তোমার কি পছন্দের কেউ ছিলো?
মৌলি অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো।
মৌলি: ছিলো, কিন্তু সেকথা ছেলেটিকে বলার সুযোগ পাইনি কখনো। তাই সে জানতে পারেনি। যখন জানানোর সুযোগ পেলেম ততদিনে অনেক দেরী হয়ে গেছে।

এর মধ্যে আমার মোবাইল ফোনটি বেজে উঠলো।
আমি: হ্যালো কে বলছেন।
নদী: ভাইয়া আমি নদী।
আমি: তুমি দেশে নাকি?
নদী: হ্যাঁ সাতদিন হয় এসেছি।
আমি: গুড। তা তোমার বিয়ে?
নদী: আগামী শুক্রবার।
আমার মনটা খারাপ হয়ে গেলো।
আমি: ও। সব ঠিক?
নদী: জ্বী, সব ঠিক। আপনাকে দাওয়াত দেয়ার জন্য ফোন দিলাম।
আমি: ঐ ছেলেটির সাথে? ঐ যে বিসিএস ক্যাডার?
নদী: না।
মৌলি উদগ্রীব হয়ে আমাদের কথা শুনছে।
আমি: তাহলে?
নদী: সাগরের সাথে?
আমি: হোয়াট?
নদী: জ্বী। সাগরের সাথেই। আমি বাবা-মা-কে কনভিন্স করতে পেরেছি।
আমি: সাবাশ মেয়ে! আমি আসছি তোমাদের বিয়েতে। আমার সাথে আরেকজন থাকবে, তোমার আপত্তি নেইতো?
নদী: কিসের আপত্তি? যাকে খুশী সাথে নিয়ে আসবেন। কাকে আনবেন?
আমি: সেটা, আসলেই দেখতে পাবে।

মৌলি: (হাসিমুখে বললো) কি হলো? মেয়েটি কি তার পছন্দের ছেলেটাকে বিয়ে করতে পেরেছে?
আমি: ইয়েস। ওয়েল ডান লেডী।

মৌলি যেন অনেকদিন পরে একটি সুসংবাদ শুনলো এইভাবে আমার দিকে তাকালো। আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম,
“মাই ডিয়ার মৌলি, হ্যাপী এন্ড। গল্পটি বিরহের নয়!”

তারিখ: ১৭ই জানুয়ারী, ২০১৭
সময়: দুপুর ১২ ঘন্টা ২২ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

তোমারি দিওয়ানী

তোমারি দিওয়ানী
—– কৈলাশ খের
অনুবাদ – রমিত আজাদ

প্রেমের প্রগাঢ় পদাঘাত করেছে এমনি আঘাত
যে, এই আমি আজ হয়েছি উন্মাদ।
প্রি়য়ে তোমাকে ভালোবেসেই যাবো এমনি
যে, এই আমি খোদকেই দিব কোরবানি।
পরোয়া না করি আর স্বত জিন্দেগানী,
জেনে যায় জানুক তা আজ নিখিল ধরণী।
অকারণেই আজি অপার বিস্ময়!
হারিয়েছি তোমাতে মদীয় হৃদয়!

হারিয়েছি তোমাতে মদীয় হৃদয়!
হারিয়েছি মন, চলেছি কোথায়!
তোমার মধু নাম জপে জপেই বাঁচবো,
তোমার মধু নাম জপে জপেই মরবো।
তোমারি নিমিত্তে আমি আজি,
সর্ব বৃত্তিতেই রয়েছিগো রাজী।
প্রিয় একি করিয়াছ তুমি?
মরিয়াছি আমি, ধ্বসিয়াছি আমি!
তোমারি দিওয়ানী, তোমারি দিওয়ানী।

প্রেমের উচ্ছাস যখন সীমানা ছাড়ায়,
প্রেমিক তখন স্বেচ্ছায় মরণেরে আঁকড়ায়।
প্রেমের যাদু মাথা ঝুঁকিয়ে বলে,
যতই লাগাও বাধ তব জাঙ্গালে
কোন এক পথ রব দেবেই খুলে।
এটাই প্রেমের মর্জি!
এটাই রবের মর্জি।

তোমাকে ছাড়া কি জীবন হতে পারে?
আমি তো আর এত স্বার্থপর নইরে।
প্রিয় একি করিয়াছ তুমি?
মরিয়াছি আমি, ধ্বসিয়াছি আমি!
তোমারি দিওয়ানী, তোমারি দিওয়ানী।

হ্যাঁ আমি এক বর্ণিল দিওয়ানী,
হ্যাঁ আমি এক বর্ণিল দিওয়ানী।
হ্যাঁ আমি অদ্ভুত, আমি পেয়েছি স্বর্গীয় সুখ,
আমি গাই, আমি বাজাই, আমি তুষ্টি সর্বজনে।
তদুপরী আমি রই অমিশুক দূরত্বে নির্জনে।

মরিয়াছি আমি, ধ্বসিয়াছি আমি!
তোমারি দিওয়ানী, তোমারি দিওয়ানী।

(নুসরাত ফতেহ আলী-র গাওয়া এই গানটি আমাকে আবেগ আপ্লুত করে। জানিনা কেন, গানটির ভাষা মাধুর্য, নাকি সুরের যাদু, নাকি গানের অর্থ! যাই হোক শেষ পর্যন্ত অনুবাদটি করেই ফেললাম। দোষত্রুটি থাকলে ক্ষমা করবেন ও সংশোধন করে দেবেন। শত হলেও আমি পেশাদার অনুবাদক নই!)

তারিখ: ৮ই জানুয়ারী, ২০১৭
সময়: ভোর ৪ টা ২ মিনিট

TERI DEEWANI
—— KAILASH KHER

Preet Ki Lath Mohe Aaisi Laagi
Ho Gayi Main Matwaari
Bal Bal Jaaun Apane Piya Ko
He Main Jaaun Vaari Vaari
Mohe Sudh Budh Naa Rahi Tan Mann Ki
Yeh Toh Jaane Duniya Saari
Bebas Aur Laachar Phiru Main
Haari Main Dil Haari

The kick of love has hit me such
i have become crazy
I keep loving by beloved
I can sacrifice myself for my beloved
I dont care about myself anymore
This is known to the whole world
I wonder without any reason
I have lost my heart
তেরি দিওয়ানী
—– কৈলাশ খের
অনুবাদ – রমিত আজাদ

প্রেমের প্রগাঢ় পদাঘাত করেছে এমনি আঘাত
যে, এই আমি আজ হয়েছি উন্মাদ।
প্রি়য়ে তোমাকে ভালোবেসেই যাবো এমনি
যে, এই আমি খোদকেই দিব কোরবানি।
পরোয়া না করি আর স্বত জিন্দেগানী,
জেনে যায় জানুক তা আজ নিখিল ধরণী।
অকারণেই আজি অপার বিস্ময়!
হারিয়েছি তোমাতে মদীয় হৃদয়!

Haari Main Dil Haari
Tere Naam Se Jee Loon
Tere Naam Se Jee Loon
Tere Naam Se Marr Jaaun
Tere Naam Se Marr Jaaun
Teri Jaan Ke Sadke Mein Kuchh Aaisa Kar Jaaun
Tune Kya Kar Dala Marr Gayi Main Mitt Gayi Main
Ho Ji Ha Ji Ho Gayi Main
Teri Deewani Deewani
Teri Deewani Deewani

I have lost my heart
I have lost my heart
i live by your name
i die with your name
i live with your name
i die with your name
for your sake i could do anything
what have you done i have been shattered and destroyed
i have become i have become
yours crazily crazily

হারিয়েছি তোমাতে মদীয় হৃদয়!
হারিয়েছি মন, চলেছি কোথায়!
তোমার মধু নাম জপে জপেই বাঁচবো,
তোমার মধু নাম জপে জপেই মরবো।
তোমারি নিমিত্তে আমি আজি,
সর্ব বৃত্তিতেই রয়েছিগো রাজী।
প্রিয় একি করিয়াছ তুমি?
মরিয়াছি আমি, ধ্বসিয়াছি আমি!
তোমারি দিওয়ানী, তোমারি দিওয়ানী।

Ishq Junoon Jab Hadh Se Badh Jaaye
Ishq Junoon Jab Hadh Se Badh Jaaye
Haste Haste Aashiq Suli Chadh Jaaye
Ishq Ka Jaadu Sara Chadha Kara Bole
Ishq Ka Jaadu Sara Chadha Kara Bole
Khoob Laga Lo Pehre Raste Rab Khole

Yahi Ishq Di Marzi Hain
Yahi Rab Di Marzi Hain
Yahi Ishq Di Marzi Hain
Yahi Rab Di Marzi Hain

প্রেমের উচ্ছাস যখন সীমানা ছাড়ায়,
প্রেমিক তখন স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে আঁকড়ায়।
প্রেমের যাদু মাথা ঝুঁকিয়ে বলে,
যতই লাগাও বাধ তব জাঙ্গালে
কোন এক পথ রব দেবেই খুলে।
এটাই প্রেমের মর্জি!
এটাই রবের মর্জি ।

when passion of love crosses the limit
lover embraces death wilingly
the magic of love spins the head
you can search a lot but god will open all ways
this is the will of love
this is the will of god

Tere Bin Jeena Kaisa
Haan Khudgarzi Hai
Tune Kya Kar Dala Marr Gayi Main Mitt Gayi Main
Ho Ji Ha Ji Ho Gayi Main
Teri Deewani Deewani
Teri Deewani Deewani
Teri Deewani Deewani
Teri Deewani Deewani

What is life without you?
I am not so selfish.
what have you done i have been shattered and destroyed
i have become i have become
yours crazily crazily

তোমাকে ছাড়া কি জীবন হতে পারে?
আমি তো এত স্বার্থপর নইরে।
প্রিয় একি করিয়াছ তুমি?
মরিয়াছি আমি, ধ্বসিয়াছি আমি!
তোমারি দিওয়ানী, তোমারি দিওয়ানী।

He Main Rang Rangeeli Deewani
He Main Rang Rangeeli Deewani
Ke Main Albeli Main Mastani
Gaaun Bajaaun Sabko Rijhaaun
He Main Deen Dhram Se Begaani
Ke Main Deewani Main Deewani

I am a colourful crazy lover.
I am strange, I am in your bliss.
I sing, I play, I please everyone,
Yet I am so distant from everyone.

হ্যাঁ আমি এক বর্ণিল দিওয়ানী,
হ্যাঁ আমি এক বর্ণিল দিওয়ানী,
হ্যাঁ আমি অদ্ভুত, আমি পেয়েছি স্বর্গীয় সুখ,
আমি গাই, আমি বাজাই, আমি তুষ্টি সর্বজনে।
তদুপরী আমি রই অমিশুক দূরত্বে নির্জনে।

Tere Naam Se Jee Loon Tere Naam Se Marr Jaaun
Tere Naam Se Jee Loon Tere Naam Se Marr Jaaun
Tere Jaan Ke Sadke Mein Kuchh Aaisa Kar Jaaun
Tune Kya Kar Dala Marr Gayi Main Mitt Gayi Main
Ho Ri Ha Ri Ho Gayi Main

Teri Deewani Deewani
Teri Deewani Deewani
Teri Deewani Deewani
Teri Deewani Deewani…

(নুসরাত ফতেহ আলী-র গাওয়া এই গানটি আমাকে আবেগ আপ্লুত করে। জানিনা কেন, গানটির ভাষা মাধুর্য, নাকি সুরের যাদু, নাকি গানের অর্থ! যাই হোক শেষ পর্যন্ত অনুবাদটি করেই ফেললাম। দোষত্রুটি থাকলে ক্ষমা করবেন ও সংশোধন করে দেবেন। শত হলেও আমি পেশাদার অনুবাদক নই!)

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

ডেমোক্রেসি-র টুকিটাকি

ডেমোক্রেসি-র টুকিটাকি:
—- ড. রমিত আজাদ

নির্বাচিত শাসক পদ্ধতি আমাদের উপমহাদেশে অনেক আগে থেকেই প্রচলিত ছিলো। যতদূর জানা যায় মহামতি বুদ্ধের পিতা শুদ্ধোধন এমন একজন নির্বাচিত শাসক ছিলেন।
গ্রিসে এই নির্বাচন পদ্ধতি প্রচলিত হয়েছে আরো পরে। তার আগে বলি ডেমোক্রেসি-র এটিমোলজি। এখানে দুটি গ্রীক শব্দ আছে, ‘দেমোস’ মানে সাধারণ মানুষ আর ‘ক্রাটোস’ মানে শাসন, অর্থাৎ ডেমোক্রেসি মানে হলো সাধারণ মানুষের শাসন। গ্রীসে অভিজাত (এরিস্টোক্রেট) ও সাধারণ (দেমোস)-দের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়, এবং এতে প্রচুর হতাহত হয় ও দেশে অরাজকতা নেমে আসে। এই অরাজকতার হাত থেকে দেশকে উদ্ধার করতে দার্শনিক ও শাসক সোলন একটি রিফর্ম আনেন, যাতে দেমোস-দের স্বার্থের দিকেও নজর রাখা হয়। সেই থেকে গ্রিসে ডেমোক্রেসি বিষয়টি চালু হয়। সংঘর্ষ ও রক্তপাত ঠেকানোর জন্য অনেকটা বাধ্য হয়েই রিফর্মটি করতে হয়েছিলো সোলন-কে। তারপর একসময় চালু হয় নির্বাচন পদ্ধতি (সেই পদ্ধতির অবশ্য রকমফেরও ছিলো)।
এদিকে মহাজ্ঞানী সক্রেটিস ছিলেন ডেমোক্রেসির ঘোরতর বিরোধী। তিনি মনে করতেন কেবলমাত্র জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে শাসক নির্বাচিত করা যেতে পারেনা, বরং রাষ্ট্র পরিচালনা করার ভার তাকেই দিতে হবে যার সেই গুনাগুন ও দক্ষতা রয়েছে। তার শিষ্য প্লেটো ডেমোক্রেসি-র বিপরীতে ‘ফিলোসফার কিং’ ও ‘রিপাবলিক’-এর ধারণার রূপরেখা দিয়েছিলেন।
রোমান রিপাবলিকে একধরনের শাসক নির্বাচনের একটি ব্যবস্থা ছিলো, তবে সেখানে ওয়েটি ভোটের সিস্টেম ছিলো। মেধাবী ও পড়ুয়া কিশোর ব্রুটাস প্লেটোর রিপাবলিক পড়ে প্রভাবিত হয়েছিলেন, এবং রাষ্ট্র যে একজন ‘এনলাইটেন্ড ডিক্টেটর’ কর্তৃক পরিচালিত হওয়া উচিত এমন ধারনা মাথায় ঢুকিয়েছিলেন কনসুল জুলিয়াস সিজারের মাথায়। পরবর্তিতে জুলিয়াস সিজার রোমের ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পর প্রচলিত পদ্ধতিকে পরোয়া না করে প্রতাপশালী ডিক্টেটর-এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। তবে এটাই তার কাল হয়, তিনি সিনেটরদের রোষে পড়েন। সিজার রিপাবলিক ধ্বংস করছে এমন অভিযোগে তার বিরূদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয় ও শেষ পর্যন্ত সেই ব্রুটাস-এর নেতৃত্বেই সিনেটরদের একটি গ্রুপ সিজার-কে হত্যা করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো ডিক্টেটরশীপের অবসান ঘটিয়ে ‘রিপাবলিক’ পদ্ধতিকে পূণঃপ্রতিষ্ঠা করা।

সপ্তম শতকে ইসলামী খেলাফতে খোলাফায়ে রাশেদীন-এর খলিফারা নির্বাচিত ছিলেন।
অস্টম শতকে ইমাম জয়নাল আবেদীন রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-রিসালা-আল-হুকুক’ (অধিকারশাস্ত্র) মানবাধিকারের উপর রচিত প্রথম গ্রন্থ।
অস্টম শতকে বাংলার শাসক গোপাল-ও নির্বাচিত শাসক ছিলেন।
১০৫৯ সালের আগে পোপ সিলেকসন-এর কোন সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি ছিলোনা। তবে 1276 সাল থেকে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি পোপ নির্বাচিত হতে শুরু করেন।
পনেরো-ষোল শতকে আমেরিকার Iroquois Nation-এর মধ্যে ডেমোক্রেটিক সোসাইটি ছিলো।
সতেরো শতকের দিকে ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় কিছু কিছু নির্বাচন হতে শুরু করে।
বৃটেনে প্রথম পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭০৭ সালে, তবে সেখানে ভোট দিতো টোটাল পপুলেশনের মাত্র তিন পারসেন্ট।
১৭৮৯ সালে ইলেকটোরাল কলেজের ভোটে জর্জ ওয়াশিংটন স্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
ফ্রান্সে ১৭৮৯ সালে adopt করা হয় the Declaration of the Rights of Man and of the Citizen এবং ১৭৯২ সালে ফ্রান্সে short-lived একটি National Convention নির্বাচিত হয়েছিলো, সেখানে সব পুরুষরা ভোট দিয়েছিলো (নারীদের ভোটাধিকার ছিলোনা)।

১৮৪৮ সালে ঐতিহাসিক ফরাসী বিপ্লবের পর ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় অনুরূপ বিপ্লব হতে শুরু করে ও গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবী ওঠে।

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পিছনে ইমানুয়েল কান্ট-এর বিখ্যাত লেখা What is Enlightenment? প্রবন্ধটির ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হয়। এছাড়া ভল্টেয়ারের দর্শন ও সাহিত্যকর্মেরও অবদান রয়েছে।

পরিশেষে ১৮৬৩ সালে মার্কিন রাষ্ট্রপ্রধান আব্রাহাম লিংকন উনার ঐতিহাসিক Gettysburg Address (1863)-এ আধুনিক গণতন্ত্রের সংজ্ঞায়ন করেন নিম্নরূপে – “government of the people, by the people, for the people, shall not perish from the earth”।
আমাদের বাংলায় প্রথম পার্লামেন্ট নির্বাচন (বঙ্গীয় আইন পরিষদের নির্বাচন) হয় ১৯৩৭ সালে বৃটিশ শাসনামলেই এবং সেখানে নির্বাচিত হয়ে বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শের-ই-বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক।

হিটলার গণতন্ত্র পছন্দ করতেন না, তিনি বলেছিলেন, “গণতন্ত্র এমন একটা পদ্ধতি যেখানে মানুষের চারিত্রিক গুনাবলীর কোন মূল্যায়ন হয়না, যা হয় তা হলো, এক শ্রেণীর অযোগ্য-অপদার্থের সংখ্যাগরিষ্টতার প্রাধান্য”।

প্রাচীন গ্রীসে ডেমোক্রেসি বলতে যা বোঝাতো আধুনিক যুগে এসে তা অনেক বেশী সম্প্রসারিত হয়েছে। এখন আমরা গণতন্ত্র বলতে বুঝি ১। বাক স্বাধীনতা, ২। চিন্তার স্বাধীনতা, ৩। মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ৪। নিজ পছন্দ অনুযায়ী দার্শনিক ধর্মীয় রাজনৈতিক মতাদর্শ বেছে নেয়ার স্বাধীনতা, ৫। মানবাধিকার ৬। ন্যায়বিচার ৭। নির্বাচন, ৮। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, ৯। সংবিধান, ১০। নির্বাচিত পার্লামেন্ট, ১১। নির্বাচিত সরকার। (উল্লেখ্য: নির্বাচন নিয়ে আপাতত: কোন বিতর্ক নেই, তবে নির্বাচন পদ্ধতি কেমন হবে সেই নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে ও বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিভিন্ন নির্বাচন পদ্ধতি রয়েছে।

যারা সমাজে ও দেশে উপরোক্ত এগারোটি বিষয় নিশ্চিত করতে চান নিজের ও অপরের জন্য, তারাই গণতন্ত্রে বিশ্বাসী।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা – ২

গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা – ২
————————- ড. রমিত আজাদ

দুনিয়াতে কত যে জ্ঞান!

গত ২৩ ও ২৪ ডিসেম্বর ছিলো 12th Global Engineering, Science and Technology Conference। নিজে পেপার প্রেজেন্ট করলাম, সেশন চেয়ার হিসাবে অন্যদের পেপার প্রেজেন্টেশন শুনলাম। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের সাথে নলেজ শেয়ার করলাম। মুরুব্বী বিজ্ঞানী ড. ইউসুফ ও ড. জিয়াউল হক স্যারের মূল্যবান বক্তব্য শুনলাম। কত কিছু যে নতুন শিখলাম! কত নতুন নতুন জ্ঞানের সাথে যে পরিচিত হলাম! সেইসব অভিজ্ঞতাগুলোর টুকরো টুকরো কথা ও নিজের কিছু কথা মিলিয়ে লেখাটি লিখছি।

মিথ, ফিলোসফি ও সায়েন্স:
প্রশ্ন: সমদ্রের জল লবণাক্ত কেন?
উত্তর:
মিথ – অনেক অনেক কাল আগে একটা বাটি ছিলো, বাটিটি ডান দিকে ঘুরিয়ে যা চাওয়া হতো তাই পাওয়া যেত। আর বাটিটি বাম দিকে ঘুরিয়ে তা বন্ধ করা যেত। এক লোক খুব ভালো ছিলো, কিন্তু সে খুব গরীব ছিলো। একদিন তার বদান্যতায় মুগ্ধ হয়ে দেবতা তাকে ঐ বাটিটি উপহার দিলো। সেই ভালো মানুষটি ঐ বাটিটি ব্যবহার করে ধনী হয়ে গেলো। তবে সে কখনো প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঐ বাটিটি ঘুরিয়ে নিতো না। একবার এক হিংসুটে ও লোভী লোক লুকিয়ে লুকিয়ে বিষয়টা দেখে ফেললো। তবে সে শুধু অর্ধেকটা দেখেছিলো, অর্থাৎ বাটিটি ডান দিকে ঘুরিয়ে যা চাওয়া যায় তাই পাওয়া যায়, এটুকুই শুধু দেখেছিলো। একদিন হিংসুটে লোকটি ভালো লোকের কাছ থেকে বাটিটি চুরি করলো। তারপর তাকে আর পায় কে? সে উল্লাসে মেতে উঠলো – এবার সে পৃথিবীর সবচাইতে ধনী ব্যাক্তিতে পরিণত হবে! সে ঐ বাটিটি নিয়ে একটা নৌকায় চড়ে সমুদ্রের গভীরে চলে গেলো, ভাবলো এখানে আর কেউ তাকে দেখতে পাবে না, বাটিটি ঘুরিয়ে সে তার খেয়াল-খুশী মতো সোনা-রূপা হীরা-জহরৎ চাইবে। ইতিমধ্যে নৌকা বাইতে বাইতে সে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলো, তাই ভাবলো আগে খেয়ে নেই, মজা করে খাওয়ার জন্য প্রথমে তার লবণের কথা মনে পড়লো। বাটিটি ডান দিকে ঘুরিয়ে সে লবণ চাইলো। বাটি উপচে লবণ পড়তে থাকলো। লোকটি যেহেতু বাটিটি বন্ধ করার উপায় জানতো না, তাই লবণ ধীরে ধীরে নৌকা ভরিয়ে ফেললো। লোকটি যতই বলে “থাম থাম”, বাটিটি কিছুতেই থামেনা। একসময় নৌকা লবণে ভরে নৌকা ডুবে লোকটি মারা গেলো, আর বাটিটি চলে গেলো সমুদ্রের গভীর তলদেশে। সেই বাটিটি থেকে আজ হাজার হাজার বছর ধরে লবণ বেরুচ্ছে তাই সমদ্রের জল লবণাক্ত।

ফিলোসফি – গ্রীক দার্শনিক এম্পিডোক্লেস (৪৯০ – ৪৩০ খ্রীষ্টপূর্ব) বলেছিলেন, “সমুদ্র হলো পৃথিবীর ঘাম (The Fragments, Book1, p.179)”। দার্শনিক এনাক্সিমেন্ডার ও ডায়োজেনেস বলেছিলেন, “পৃথিবী প্রথমে ক্লেদ (moisture) দ্বারা বেষ্টিত ছিলো, এই moisture-এর কিছু অংশ পরবর্তিতে সমুদ্র গঠন করেছিলো।” এনাক্সাগোরাস বলেছিলেন যে, “Just as water strained through ashes becomes salt, so the sea owes its saltness to the mixture of earth with similar properties.”

বিজ্ঞান – কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর বুকে প্রবাহিত নদীগুলো কিছু মাত্রায় লবণ বহন করে সমুদ্রের বুকে ফেলছে। কোটি কোটি বছর ধরে জমা হতে হতে সমুদ্রের জল আজ লবণাক্ত। সমুদ্রের জল সৌরতাপে যদিও বাষ্পীভূত হয় কিন্তু ঘনত্বের কারণে সমুদ্রের লবণ সমুদ্রের বুকেই রয়ে যায়। এই কারণেই সমুদ্রের জল লবণাক্ত।

উপরের উদাহরণ দিয়ে দেখালাম মিথ, ফিলোসফি ও সায়েন্স-এর মধ্যকার পার্থক্য। মিথ কোনরূপ যৌক্তিকতা ছাড়াই মনগড়া গাল-গপ্পের মাধ্যমে কোন জীবন-জিজ্ঞাসার উত্তর দিয়ে থাকে। ফিলোসফি ঐ প্রশ্নের উত্তর অভিজ্ঞতার আলোকে যৌক্তিকভাবে দেয়ার চেষ্টা করে। তবে সেই ব্যাখ্যার গ্রহনযোগ্যতা ইমপিরিকালী ভেরিফাই করেনা। আর বিজ্ঞান যৌক্তিকভাবে প্রদত্ত ব্যাখ্যা এক্সপেরিমেন্টালী ভেরিফাই না করে তাকে স্বীকৃতি দেয়না। প্রমান ছাড়া বিজ্ঞান কোন কিছুই গ্রহন করেনা।

প্রাচীনকালে ছিলো মিথ, তারপর এলো ফিলোসফি আর তারপর আধুনিক যুগকে ডোমিনেট করছে বিজ্ঞান।

একটা অফ-টপিক: আমাদের দেশে ইদানিং মিথ-এর পরিমান আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটা প্রগতিশীলতা নয়, পশ্চাদপদতা।

সায়েন্স আর রিসার্চের জন্ম একই সাথে বলা যায়। সায়েন্স ছাড়া রিসার্চ হয়না, আর রিসার্চ ছাড়া সায়েন্স হয়না।

রিসার্চ-এর একটা বড় উদ্দেশ্য হলো নতুন নতুন জ্ঞান তৈরী করা। যে জাতি নতুন নতুন জ্ঞান তৈরী করতে পারেনা তারা অনেকটাই বাধ্য হয় অন্যান্য জাতিকে অনুসরন করতে। গবেষণা ও জাতীয় উন্নয়ন মোটামুটি প্রতিশব্দ।

ড. জিয়াউল হক স্যার বললেন,

১। রবীন্দ্রনাথ তার ‘গোরা’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার আগে মোট এগারোবার লিখেছিলেন। অর্থাৎ তিনি প্রথমবার লিখে সন্তুষ্ট হতে পারেননি, তাই আরো দশবার তাকে সংশোধন-পরিবর্তন-পরিবর্ধন ইত্যাদি করতে হয়েছে। একটি উপন্যাসকে যদি প্রকাশনার আগে দশবার সংশোধন করতে হয় তাহলে একটা গবেষণাপত্রকে প্রকাশনার আগে কতবার সংশোধন করতে হবে! ভেবে দেখুন।
২। একটি গবেষণাপত্রকে একটি উপন্যাসের মতই ইন্টারেস্টিং হতে হবে। একটি উপন্যাসের একটি পাতা পড়ার পর যেমন পরবর্তি পাতাটি পড়ার আগ্রহ জাগে, পরবর্তি পাতাটি পড়ার পর যেমন তার পরবর্তি পাতাটি পড়ার জন্য মন আকুলি-বিকুলি করে, একইভাবে একটি গবেষণাপত্র-এর একটি পাতা পড়ার পর যেন পরবর্তি পাতাটি পড়ার আগ্রহ জাগে, তারপর তার পরের পাতাটি, তারপর, তারপর, এভাবে একজন পাঠক যেন পূর্ণ আগ্রহ নিয়ে গবেষণাপত্রটির শেষ পর্যন্ত পড়েন। তাহলে গবেষণাপত্রটিকে সফল বলা যেতে পারে।
৩। রিসার্চ কোশ্চেন – কোশ্চেন আর রিসার্চ কোশ্চেন-এর মধ্যে পার্থক্য আছে। কোশ্চেন হলো আপনি কেমন আছেন? কি দিয়ে ভাত খেয়েছেন? কোথায় যান? ইত্যাদি, আর রিসার্চ কোশ্চেন হলো সেই কোশ্চেন যার উত্তর দিতে হলে রিসার্চ করতে হবে। রিসার্চ করার পরে সেই প্রশ্নটির উত্তর দেয়া যাবে। উদাহরণ: আমাদের চট্টগ্রাম বন্দরটি অন্য কোন দেশকে ব্যবহার করতে দিলে আমাদের কি লাভ হবে? রিসার্চ না করে এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া যাবে না।

ড. ইউসুফ স্যার বললেন,
‘মালেশিয়ান এয়ারলাইন্স’ ‘বাংলাদেশ বিমানের’ মতই একটি দুর্বল প্রতিষ্ঠান ছিলো। একবার এক গবেষক তার পিএইচডি ডিসার্টেশনের টপিক করলেন ‘মালেশিয়ান এয়ারলাইন্স’-কে নিয়ে। এবং তার ঐ অভিসন্দর্ভপত্রে তিনি ‘মালেশিয়ান এয়ারলাইন্স’-এর যাবতীয় দোষ-ত্রুটি দুর্বলতা সমস্যা ইত্যাদি বিস্তারিত তুলে ধরলেন। এবং পাশাপাশি কিভাবে এর সমাধান ও উন্নয়ন করা যা্য তা উল্লেখ করলেন। এই গবেষণাপত্র প্রকাশিত হওয়ার পরে মালেয়শীয় সরকার ও এয়ারলাইন্স বিষয়টির দিকে নজর দিলো এবং সেই মোতাবেক যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহন করে সমস্যাগুলোর সমাধান করলো ও তার উন্নয়ন করলো। এভাবেই গবেষণা কোন কিছুকে আমূল পাল্টে দিতে পারে।

Literature Review (পূর্ববর্তি জ্ঞানসমূহ পর্যালোচনা):
গবেষণা শুরু করার আগে গবেষককে অনেক বই-পত্রিকা-জার্নাল-সাইট ইত্যাদি অনেক কিছু পড়তে হবে নিম্নোক্ত উদ্দেশ্যেগুলিতে
1. ইতিপূর্বে এই নিয়ে কেউ কাজ করেছে কি না?
2. পূর্বে যারা এই জাতীয় টপিক নিয়ে যারা রিসার্চ করেছে তাদের উইকনেসই হলো বর্তমানে যিনি রিসার্চ করবেন তার স্ট্রেংথ।
3. আগের গবেষকের রিসার্চ গ্যাপ থাকলে তা পূর্ণ করা।
4. অথর-দের নাম ধরে ধরে উল্লেখ করতে হবে। উনারা কি করেছেন ও কি করেন নাই মোটামুটি বিস্তারিত বলতে হবে।

Why:

একটি মজার ঘটনা:
টমাস আলভা এডিসন-কে ট্রেনের টিকেট চেকার এসে বললো —
চেকার: ইয়োর টিকেট প্লিজ।
এডিসন: হোয়াই?
চেকার: (বিস্মিত ও বিরক্ত হয়ে, আরো উচ্চকন্ঠে বললো) শো মি ইয়োর টিকেট।
এডিসন: হোয়াই?
এবার চেকারের ধৈর্য্যের বাধ ভেঙে গেলো। সে এডিসনের কান বরাবর একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলো।
আবারো এডিসন প্রশ্ন করলেন,
এডিসন: হোয়াই?

ঘটনাটির মোরাল হলো – গবেষক সর্বক্ষণই কেবল প্রশ্ন করবেন ‘হোয়াই?’ ‘হোয়াই?’ ‘হোয়াই?’
(প্রফেসর জিয়াউল হক স্যারের কাছ থেকে মজার ঘটনাটি শোনা)

Limitation of a research paper (গবেষণাপত্রটির সীমাবদ্ধতা):
১। আমি রিসার্চটি এই হতে এই পর্যন্ত করেছি, এর আগে বা পরে করিনি। যেমন, ব্রহ্মপুত্র নদীর স্রোত চীন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে গিয়েছে, গবেষক কেবল ভারতের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত অংশটুকু নিয়ে কাজ করেছে, চীন ও বাংলাদেশ অংশটুকু নিয়ে কাজ করেননি – এটা লিমিটেশন। অথবা ঐ নদীর স্রোত নিয়ে কাজ করেছেন ২০০১ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত, তার আগে বা পরের সময় নিয়ে কাজ নিয়ে কাজ করেননি – এটা লিমিটেশন।
২। গবেষক এই এই তথ্য যোগাড় করতে পেরেছেন, এই এই তথ্য যোগাড় করতে পারেননি, তাই কেবলমাত্র প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণা করতে হয়েছে – এটা লিমিটেশন।
৩। এ্যানথ্রোপমেট্রিক্স হিসাবে কেবলমাত্র ককেশিয়ানদের ডাটাগুলোই ব্যবহার করা হয়েছে, নিগ্রোয়িড বা অস্ট্রেলয়িডদের ডাটা ব্যবহার করা হয়নি – এটা লিমিটেশন।

Justification (ন্যায্যতা প্রতিপাদন):
1. কোন একটি রিসার্চ-এ নির্দিষ্ট স্থান, নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট ক্ষেত্র সিলেক্ট করা হয়। প্রশ্নটা হলো নির্দিষ্ট ওটাই সিলেক্ট করা হলো কেন? এই বিষয়টি যুক্তি দিয়ে জাস্টিফাই করতে হবে।

Research মানে search:
আমাদের দেশে কিছু কিছু কনফারেন্সে দেখা যায় যে, কেউ একটি প্রজেক্ট করেছে সেটাকে তারা রিসার্চ হিসাবে উপস্থাপন করছে। কিন্তু আদতে সেটাকে রিসার্চ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হবে না। এ’ প্রসঙ্গে একটা উপমা দেয়া যায় – কোন এক ব্যাক্তি বিশাল বড় একটি জাহাজ তৈরী করলো। সে যদি ঐ জাহাজ তৈরীর স্টেটমেন্ট-টি লেখে, এটা কোন রিসার্চ হিসাবে স্বীকৃতি পাবেনা, যদিও সে একটি বড় পরিশ্রমের ও প্রয়োজনীয় কাজ করেছে। কারণ সে সেখানে সার্চ করে নতুন কিছু উদ্ঘাটন করেনি। কিন্তু যদি সে এটা উদ্ভাবন করতো যে, কি করে আরো ভালো বা উন্নত একটি জাহাজ তৈরী করা যায়, তাহলে সেটা রিসার্চ হিসাবে স্বীকৃতি পেত।

I am different:
একটি রিসার্চ পেপারকে হতে হবে different।
একটি কবিতা আছে,
I am different from my head to my toes
I am different from my eyes to my nose
(Kaylynn)
সেরকম একটি রিসার্চ পেপার-কে অন্যান্য পেপার থেকে different হতে হবে মোটামুটি সব দিক থেকেই।

————————————– X——————–X———————————————

গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা – ১
(নিম্নের লিংকে)

গবেষণা পদ্ধতি শাস্ত্র সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা