আবীরে অভিসার মম (Repost) (Ramit Azad)

আবীরে অভিসার মম –

———————————– রমিত আজাদ

শারমিন-কে প্রথম দেখেছিলাম বিদেশের মাটিতে।

ইউনিভার্সিটির ক্যাফেতে। এই ক্যাফেতে দিনের একটা সময় বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীদের আড্ডা বসে। আড্ডা হয় জমজমাট, কখনো রাজনীতি, কখনো সাহিত্য, কখনো বা সায়েন্স-এর সিরিয়াস আলাপ। যদি কোন বাংলাদেশী ছাত্রী আসরে না থাকে, তখন আশেপাশে থাকা ঐ দেশীয় স্বল্পবসনা রূপসী তরুণীদের দৈহিক রূপ-সৌন্দর্য্য নিয়েও আলাপ-সালাপ হয়। আদতে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইভেন বিদেশেই বাংলাদেশী ছাত্রীদের সংখ্যা নিতান্তই অপ্রতুল! পার্সেন্টেজের হিসাবে টেনেটুনে তিন পার্সেন্ট হতে পারে। প্রগতিশীল পিতামাতার খুব সাহসী কন্যারাই কেবল বিদেশে পড়তে যায়। আবার আমাদের এক বন্ধু খেদ-কৌতুক করে বলতো, “আরে ধুর কিসের প্রগতিশীল! মাইয়া  অসুন্দর হইলে বাপ-মায় এই দেশে পড়তে পাঠাইয়া দেয়, যাতে এইখান থেইকা একটা কোয়ালিফাইড জামাই জোগাড় করতে পারে!” ওর কথা শুনে আমরা মাথা নেড়ে হাসতাম। আসলে, এই দেশীয় মেয়েদের সাথে তুলনা করা যাবে না, ওরা সব আগুন সুন্দরী! আর এই রূপসী বিদেশিনীরা বান্ধবী হিসাবে সহজলভ্য বলে, বাঙালী ছেলেরা তাদের নিয়েই ব্যাস্ত থাকতো বেশি। স্বদেশী ললনাদের চুজ করে ধন্য হওয়ার প্রবণতা খুব একটা ছিলো না।

কোন এক সামারের বিকালে ক্যাফেতে ঢুকে দেখলাম, বাংলাদেশী ছাত্রদের প্রায় কেউই নাই। শুধু খালেক ভাই বসা, উনার সাথে একটা অপরিচিত বাংলাদেশী মেয়ে বসে আছে। আমি একটু সংকোচ নিয়ে ওখানে গিয়ে বসলাম। খালেক ভাই একগাল হেসে বললেন, “এই যে আসিফ এসো। পরিচয় করিয়ে দেই। এই হলো শারমিন, আর এই হলো আসিফ।”

আমি: ঠিক চিনতে পারলাম না তো?

খালেক ভাই: আমার কাজিন। এই ইউনিভার্সিটিতে ফিফথ ইয়ারে পড়ে।

আমি: জ্বী, কি বললেন? এই ইউনিভার্সিটিতে? ফিফথ ইয়ারে পড়ে? আর আমি এতকাল দেখলামই না!

খালেক ভাই রহস্য করে হাসলেন।

খালেক ভাই: জানতাম তুমি এই প্রশ্ন করবা। সায়েন্টিস্ট মানুষ, মাথা ভরা শুধু প্রশ্ন!

আমি: না, মানে। উনাকে তো কখনো দেখি নাই আগে।

খালেক ভাই: আরে ‘উনাকে’ না ‘ওকে’। তোমার ছোট তো।

আমি: হুম!

আমরা কথাই বলে যাচ্ছি। মেয়েটি কিন্তু চুপ করেই আছে।

খালেক ভাই: আসলে ও ছিলো অন্য শহরে। ব্যাচেলর ডিগ্রী কমপ্লিট করলো সেখানে। ব্যাস, মাস্টার্স-এ ওকে এখানে নিয়ে এলাম।

আমি: স্কলারশীপ না কি সেলফ ফাইনান্স?

খালেক ভাই: আপাতত সেলফ ফাইনান্স-এই ভর্তি করিয়েছি। দেখি, স্কলারশীপ করানো যায় কিনা!

এরপর, খালেক ভাই উঠে কাউন্টারে কফি আনতে গেলেন।

এবার আমি মেয়েটার দিকে তাকালাম। সংকোচ না করেই বলছি। শারমিনকে আমার পছন্দ হয় নি। একেবারেই আটপৌরে একটা বাঙালী মেয়ের মত দেখতে-শুনতে। এতগুলো বছর বিদেশে আছে, কোন জৌলুস-ই নেই! গায়ের রঙ ফর্সা নয়, শ্যামলা বলা যাবে হয়তো। গড়নে ছোট-খাট, হাইট কম, পাঁচ ফুটের একটু বেশি হবে। স্লিম ফিগার। দেহের বিশেষ ঢেউগুলোতে স্ফিতি নাই কোন! মেকআপ ভালো করতে পারে না। উচ্ছল নয়, চুপচাপ মনে হলো। এটাকে আনস্মার্টও বলা যেতে পারে। সন্দেহ হলো, খুব সম্ভবত ঢাকার নয়, মফস্বলের মেয়ে।

আমি: কি নাম যেন?

শারমিন: শারমিন শিকদার।

আমি: ও, আমি আসিফ।

শারমিন: জ্বী।

আমি: তুমি বাংলাদেশে কোথায় থাকো?

শারমিন: নাটোরে।

আমি যা সন্দেহ করেছিলাম ঠিক তাই। মফস্বলের মেয়ে। নাটোর শুনলেই ‘বনলতা সেন’ কবিতার কথা মনে পড়ে। শারমিন-কে মোটেও কল্পনার ‘বনলতা সেন’-এর সাথে তুলনা করা যাবে না। মুখ তার মোটেও শ্রাবস্তির কারুকার্য নয়! একেবারেই সাদা-মাটা! মেয়েটা মাঝে মাঝে নীচ দিকে তাকাচ্ছে। তাতে তাকে মুখচোরা বলে মনে হলো।

আমি: আমি এখানে পিএইচডি করছি।

শারমিন: কোন সাবজেক্ট?

আমি: ফিজিক্স।

শারমিন: ও।

অন্য কেউ হলে হৈ চৈ করে বলতো, “ও বাবা, এত কঠিন সাবজেক্ট! পড়েন কিভাবে?” ইত্যাদি, ইত্যাদি। শারমিন শুধু আস্তে করে ‘ও’ বললো। বুঝলাম, মেয়েটা একেবারেই মুখচোরা!

আমি: তুমি কোন সাবজেক্টে পড়ছো?

শারমিন: পলিটোলজি।

এটাও আমার পছন্দ হলো না। আর্টস-এর ছাত্রী। তার মানে মাথায় ঘিলু কম! তাছাড়া ‘পলিটোলজি’ পড়তে বিদেশে আসার দরকার কি? তার মানে ঐ-ই হয়তো, বাবা-মা বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে, যাতে এখানে কোয়ালিফাইড একটা জামাই যোগাড় করতে পারে। ওর প্রতি আমি আর কোন আগ্রহ অনুভব করলাম না।

খালেক ভাই তিনকাপ কফি নিয়ে এসে টেবিলে বসলেন।

——————————————

এরপর শারমিনকে ক্যাম্পাসে এখানে ওখানে অনেকবার দেখেছি। কিন্তু তেমন আলাপ-সালাপ করি নাই কখনো। আসলে কোন আকর্ষণ-ই অনুভব করি নাই। এদিকে খালেক ভাইকে দেখতাম আমাকে দেখলেই বারবার শারমিন-এর প্রসঙ্গ টেনে কথা বলতেন, “বুঝলে, ওর বাবা-মা আমাকে বলেছিলো, শারমিন-এর বিদেশে লেখাপড়া করার খুবই সখ। ওকে একটু বাইরে পড়ার ব্যবস্থা করে দাও।” তা নিজের কাজিন ব্যবস্থা না করি কিভাবে। তখন অন্য শহরে ভর্তির ব্যবস্থা হলো। যাহোক, সফলভাবে ব্যাচেলর ডিগ্রীটাতো পাশ করেছে, এরপর এখন রাজধানীতে নিয়ে এলাম। আশা করি ভালো করবে। তারপর দেশে ফিরে একটা চাকরি-বাকরির ব্যবস্থা তো হবেই।” আমি এই প্রসঙ্গে উনার সাথে কথা না বাড়িয়ে হু হা করতাম শুধু।

মাস দুইয়েক পরে, একটা বাংলাদেশী অনুষ্ঠানের আয়োজন হলো। বেশ সরগরম অবস্থা ক্যাম্পাসে। সবাই অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যাস্ত। আয়োজক-রা আমাকে এসে ধরলো, “আপনাকে কিন্তু অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করতেই হবে।” আমি বললাম, “ওকে, করবো। তা সাথে কে থাকবে?” সেলিম বলে, “কে আবার, মিতা থাকবে। সব সময় তো ও-ই আপনার সাথে উপস্থাপনা করে।” আমি বললাম, “ওকে। মিতা ইজ ওকে।”

অনুষ্ঠানের দু’দিন আগে খালেক ভাই আমার রুমে আসলেন। বলেন,

খালেক ভাই: এই তুমি নাকি এই অনুষ্ঠানে একটা স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করবে?

আমি: জ্বী, সেরকমই প্লান আছে।

খালেক ভাই: দাও তোমার কবিতাটার কপি দাও।

আমি: (বিস্মিত হয়ে) কপি দিয়ে আপনি কি করবেন?

খালেক ভাই: আরে দাওনা। মনে করো, তোমার বাংলা কবিতাটার যদি একটা এই দেশীয় ভাষার অনুবাদ সাথে হয়, দারুণ হবে না?

আমি: জ্বী, ঠিক বুঝলাম না।

খালেক ভাই: আরে। তুমি বাংলায় কবিতাটা আবৃত্তি করলা। তারপর কেউ একজন সেটা স্থানীয় ভাষায় অনুবাদ করে দিলো। বেশ হবে না?

আমি: (একটু চিন্তা করে) ডিপেন্ডস! অনুবাদ-টা যদি ভালো হয়। আর যে অনুবাদ পড়বে, সে যদি ভালোভাবে পাঠ করতে পারে। তাহলে তো ভালোই হয়। কিন্তু, যদি  অনুবাদ ও পাঠ ভালো না হয়, তাহলে কিন্তু ফ্লপ যাবে!

খালেক ভাই: আরে সেই নিয়ে ভেবো না। আমি ব্যবস্থা করেছি। সে জন্যই তো কবিতাটা চাইছি।

আমি: কি ব্যবস্থা?

খালেক ভাই: অভিজিৎ-কে তো চেনো? ঐ যে কোলকাতার অভিজিৎ।

আমি: হু দেখেছি। ফাজিল একটা! আমাকে প্রথম দেখায়-ই তুমি করে বললো, অথচ আমি ওর সিনিয়র!

খালেক ভাই: আরে না। ও ভাব দেখিয়ে ওরকম করে নাই। কোলকাতাওয়ালারা, একে-ওকে এম্নিতেই তুমি করে বলে।

আমি: সে যাক! তারপর?

খালেক ভাই: অভিজিৎ-তো লিঙ্গুয়েস্টিকস-এর উপর লেখাপড়া করে। ও ভালো অনুবাদ করতে পারবে।

আমি: বুঝলাম। তা পাঠ কে করবে?

খালেক ভাই: কে আবার? শারমিন পাঠ করবে।

নাম শুনেই আমি ঘাবড়ে গেলাম।

খালেক ভাই: ওকে বলে রেখেছি। একটু পরেই তোমার রুমে আসবে। তুমি একটু চা বসাও।

আমি এখন পড়লাম ফাঁপড়ে! শারমিন-কে আমার রুমেই নিয়ে আসছে!

এরই মধ্যে দরজায় নক করার শব্দ পেলাম। খালেক ভাই-ই উঠে দরজা খুলে দিলো, “আরে আসো শারমিন আসো। তোমার জন্যই তো আমরা অপেক্ষা করছি।”

শারমিন ধীর ও লাজুক পায়ে ভিতরে ঢুকলো।

শারমিন: (মৃদু কন্ঠে) স্লামালাইকুম।

আমি: ওয়ালাইকুম সালাম। বসো।

ও একটা চেয়ারে চুপচাপ বসলো।

আমি তিনকাপ চা ও বিস্কুট ফোল্ডিং টেবিলের উপর রাখলাম।

খালেক ভাই: কি শারমিন পারবে না, পাঠ করতে?

আমি শারমিন-এর দিকে তাকালাম। শারমিন, কোন কথা না বলে শুধু মাথা নাড়ালো।

আমি একটু ভালো করে ওকে দেখলাম। বাঙালী পোষাক সালোয়ার-কামিজ পড়েছে। তেমন ফ্যাশনেবল না। শ্যামলা আটপৌরে মুখে মেকআপ খুব হালকা। ঠোটে লাল রঙ মেখেছে খুব কড়া করে! এটা মফস্বলি সাজ! আমার ওকে আবারো ভালো লাগলো না। মনে মনে ভাবলাম, খালেক ভাইয়ের মতলব-টা কি?

—————————————————————————–

রচনাতারিখ: ২৮শে জুলাই, ২০২১ সাল

রচনাসময়: রাত ১২টা ৪৭ মিনিট

XXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXX

আবীরে অভিসার মম -২

———————————– রমিত আজাদ

মনেপ্রাণে চাইলাম, শারমিন যেন আমার কবিতার অনুবাদক হয়ে অনুষ্ঠানে ওটা পাঠ না করে।

ক্যাফেতে বসে বসে কফি খেতে খেতে ওটাই ভাবছিলাম। একটু সামনের দিকে চোখ গেলো। আমার দিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছেন খালেক ভাই। একটু ভালো করে তাকালাম, সাথে কি কেউ আছে? নাহ্‌, সাথে কেউ নাই, তিনি একাই। তিনি এসে নীরবে আমার পাশে বসলেন। এতদিন খালেক ভাইকে আমার ভালো-ই লাগতো। আমাদের মধ্যে একটা মধুর সম্পর্কও ছিলো। যদিও অনেকে উনাকে পিছে পিছে ধান্দাবাজ বলে! আমার কখনো সেরকম মনে হয়নি। এত লিস্ট আমার সাথে কখনোই তিনি কোন ধান্দাবাজি করেননি। কিন্তু ইদানিং তা মনে হতে শুরু করেছে। তাই আমি চুপচাপ রইলাম।

খালেক ভাই: কি ছোটভাই কেমন আছো?

আমি: জ্বী, ভালো আছি। (কিছুটা নির্লিপ্ত থাকার চেষ্টা করলাম)

খালেক ভাই: গবেষণা কেমন চলছে?

আমি: জ্বী, ভালোই চলছে।

খালেক ভাই: তুমি তো আবার বিজ্ঞানীর পাশাপাশি কবিও।

আমি উনার দিকে তাকিয়ে নির্মল হাসলাম। নিজের প্রশংসা শুনতে কার না ভালো লাগে? এরপর ফট করে মনে পড়ে গেলো উনার অনুবাদ উদ্যোগের কথা। আমি একেবারে চুপ মেরে গেলাম। মনে মনে ভাবছি, দেখি বর্ষার ঝিলের জল কোথায় গিয়ে গড়ায়?

খালেক ভাই: বুঝলা, আমার কপালটা ভালো না!

আমি: কেন ভাই কি হলো আবার?

খালেক ভাই: ভাবছিলাম  অভিজিৎ ব্যাটারে দিয়া তোমার কবিতাটা অনুবাদ করামু। তা কাউয়া উড়াল দিছে!

আমি তড়াক করে উঠলাম! ভাবছি, কি বলে? কি হলো?

আমি: জ্বী, কি বিষয়? (কন্ঠস্বর আবারও নির্লিপ্ত রাখার চেষ্টা করলাম)

খালেক ভাই: ঘটি ব্যাটা, রাজধানী ছাইড়া কোন শহরে জানি গেছে। বান্ধবীর বাড়ীত গেছে মনে হয়। এক সপ্তাহ-দশদিন পরে আসবো।

আমি: তারপর?

খালেক ভাই: তার আর পর কি? তোমার কবিতা আর অনুবাদ হইলো না, শারমিনও আর পাঠ করতে পারবে না।

উনার কথা শুনে আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। আমার মনের ভিতরে নাইটেঙ্গেল পাখী গান গেয়ে উঠলো – “এমন মজা হয় না, মিটলো আমার বায়না!’

আমি দ্রুত এক কাপ কফি কিনে খালেক ভাইকে আপ্যয়ন করলাম।

—————————————————————————————–

অনুষ্ঠানের দিন বেশ ঝামেলা হলো! এই ঝামেলাটা বাংলাদেশীদের অনুষ্ঠানে সবসময়ই হয়, সেটা আমি দেশেও দেখেছি, বিদেশেও দেখেছি। শিল্পীদেরকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে একটা সিকোয়েন্স তালিকা তৈরী করা হয়েছিলো। প্রথমে কার গান, তারপর কার নাচ, এরপর কার আবৃত্তি, ইত্যাদি। সবার সম্মতি নিয়েই এটা করা হলো, কিন্তু অনুষ্ঠানের দিন, হঠাৎ করে দুইএকজন বেঁকে বসলো, “না ভাই, আমার গানটা আগে দিতে হবে।” অথবা, “না ভাই আমার কবিতাটা তালিকায় পাঁচ নম্বর থেকে তিন নম্বরে নিয়ে আসেন।” এরকম ছেলেমানুষি ও গোয়ার্তুমি বাহানা। মিমাংসা করতে না পেরে অবশেষে সভাপতি এলো আমার কাছে, “ভাই আমি আর পারলাম না। আপনি এখন ওদেরকে বোঝান।” আমি জানি, এটা ট্যাকল করা খুবই কঠিন! যদি ওদের মন না যোগাই, তাহলে বলবে, “তাইলে আমি গেলাম, আজ আর গান গাইবো না।” অনিচ্ছা সত্ত্বেও এগিয়ে গেলাম। ঘাড়ত্যাড়া শিল্পীদের জটলা-র দিকে যেই আমি গেলাম, অমনি সবাই চুপ মেরে গেলো। বাংলাদেশীদের এই একটা ভালো দিক আবার আছে, সিনিয়র এবং কোয়ালিফাইডদের-কে সম্মান করে। দেশে এই কথাটাকে ‘ভয় করা’ বলে, বাট ঠিক না, ‘ভয়’ না এটা ‘সম্মান’। যাহোক আমি তাদের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে, সব মিটমাট করলাম।

 অনুষ্ঠান ভালো-ই চলছিলো। হঠাৎ আরেকটা সমস্যা হলো। একজন জুনিয়র ছেলে দৌড়ে এসে আমাকে বললো, “সুবীর-দা চলে যেতে চাইছেন। উনি গান গাইবেন না” আমি বললাম, “সেকি ব্যাপার! উনি এত সুন্দর গান গান, উনাকে না হলে আমাদের চলবে? উনি চলে যেতে চাইছেন কেন?” ছেলেটি বললো, “প্রধান অতিথি নাকি অনুষ্ঠানের শেষ পর্যন্ত থাকবেন না। তা সুবীরদার গান দিয়েই তো অনুষ্ঠান শেষ করার কথা ছিলো। এখন সুবীর-দা বলছেন, “প্রধান অতিথিকেই যদি গান শোনাতে না পারলাম, তাহলে আর আমার গান গাওয়ার দরকারটা কি?”” আমরা আলাপ করতে করতেই সুবীর-দা স্টেজের পাশের পর্দার আড়ালে থাকা আমার দিকে এগিয়ে এসে বললেন, “আমি তাহলে যাই। আপনারা অনুষ্ঠান করে.” আমি বললাম, “সেকি সুবীরদা, আপনার গান ছাড়া অনুষ্ঠানটাই তো মাটি হবে!” সুবীরদা বলেন, “তাহলে আমাকে এখনি গাইতে সুযোগ দেন।”  এতক্ষণে অনুষ্ঠানের সভাপতি-ও এসে গিয়েছিলো। আমার দিকে তাকালো, আমি মাথা ঝুঁকালাম। অতঃপর আমি নিরুপায় হয়ে তখনি স্টেজে গিয়ে ঘোষণা দিলাম, “এবার আপনাদের উদ্দেশ্যে গান নিয়ে আসছেন গায়ক সুবীর বিশ্বাস।” আশেপাশে মৃদু গুঞ্জন শোনা গেলেও, একটু পর তা থেমে গেলো। সুবীর-দার গানের কন্ঠ চমৎকার, গানের সুরে সবাই হারিয়ে গেলো!

যা ঘটেছে, তার জন্য আমাকে অনুষ্ঠানের পরে ভালো কথা শুনতে হবে বুঝতে পারলাম। তারপরেও ঐ মূহুর্তে স্পট ডিসিশান নেয়া ছাড়া আমার আর কোন উপায় ছিলো না। রাজনীতি এতটাই কঠিন!

যাহোক, অনুষ্ঠান হলো। উপস্থাপনা আবৃত্তি সবই হলো। তবে খালেক ভাই আর শারমিন রইলেন দর্শকদের সারিতে। অনুষ্ঠান শেষে অনেকেই এসে আমাকে আভিনন্দন জানালেন। আমি চোখের কোনা দিয়ে দেখতে পেলাম, খালেক ভাই শারমিনকে নিয়ে আমার দিকে আসছে। আমি উনারা আসার আগেই দ্রুত ওখান থেকে কেটে পড়লাম।

তিনতলার সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে যাবো, হঠাৎ অনুষ্ঠানের সভাপতি ও আরো তিনজন আমার দিকে এগিয়ে এলো। আমি বুঝলাম যে, সুবীরদার ঘটনাটা নিয়ে এখন একপশলা হবে। মনে মনে প্রস্তুতি নিলাম। ওরা আমাকে এসে বললো, “ভাইয়া। বেশ ভালোভাবে পরিস্থিতি ট্যাকেল করেছেন। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আমরা ওদের সাথে পারছিলাম না।”

যাক বাঁচা গেলো, আমি ভাবছিলাম, ঝড় শুরু হবে!

তাদের একজন বললো, “এবার ভাইয়া আরেকটা উপকার করতে হবে।” আমি বললাম, “আবার কি?”

সভাপতি: নিচে আপ্যায়নের খাবারের প্যাকেট ডিস্ট্রিবিউট করা হবে। আপনি একটু ওখানে থাকবেন প্লিজ।

আমি: মানে কি?

সভাপতি: ঐ খাবারের প্যাকেট ডিস্ট্রিবিউশন নিয়েও অনেক সময় ঝামেলা হয়। বাঙালী, বোঝেন তো; বিদেশে আসলেও হাভাতে স্বভাবটা যায় না। এত বিলাসিতার মধ্যেও, খাবার নিয়ে অনেকে গোলমাল করে। আপনি শুধু একটু পাশে দাঁড়িয়ে থাকবেন। তাহলে আর কেউ গোলমাল করতে সাহস পাবে না।

আমি ভাবলাম আবারো কঠিন দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে আমাকে। তারপর ভাবলাম, ওদের রিকোয়েস্ট রাখা উচিৎ। তাছাড়া গোলমাল হলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে সম্মান থাকবে না। এর আগে আফগানিস্তানের একটা অনুষ্ঠানে গোলমাল হয়েছিলো, এই নিয়ে কর্তৃপক্ষ খুব বিব্রত ও নাখোশ ছিলো!

আমি তাই করলাম। খাবারের প্যাকেট ডিস্ট্রিবিউশন-এর দায়িত্বে যারা আছে, তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। লক্ষ্য করলাম আমি থাকাতে, কেউই কোন হৈচৈ করছে না।  অছাত্র অনেকেই আমাকে সালামও দিলো। এর আগে একটা দুর্যোগের সময়, আমি ওদের অনেকেরই পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম, সেটা হয়তো তারা মনে রেখেছে। আমি মনে মনে ভাবলাম, ‘রিয়েলী লাভ দিস কালচার।’ সম্মান করা বিষয়টি আমাদের সমাজ থেকে এখনো যায় নি।

লাইনের শেষের দিকে দেখলাম, খালেক ভাই ও শারমিন এগিয়ে আসছে। আমি উনাদের দেখে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকলাম। খালেক ভাই কাছে এসে বলেন, “এক্সিলেন্ট ম্যান! সুন্দর উপস্থাপনা হয়েছে। সুন্দর আবৃত্তি হয়েছে!” শারমিন কিছু বললো না। লক্ষ্য করলাম আজও ওর পরনে আটপৌরে সালোয়ার-কামিজ! আবারো খুব সাদামাটা মনে হলো ওকে। খালেক ভাইয়ের কথা শুনে, আমি শুকনো হাসি হাসলাম শুধু।

ডিসট্রিবিউশন শেষ হলে দেখলাম, ভলান্টিয়ারস, সভাপতি ও আমার জন্য আর খাবার কিছু অবশিষ্ট রইলো না। ইতিমধ্যেই সব শেষ হয়ে গিয়েছে। এমন হতে পারে যে দুই-একজন প্যাকেট বেশি নিয়েছে, আবার দর্শক হিসাবের চাইতে বেশি হয়েছে সেটাও হতে পারে। তারপরেও আমরা সবাই খুশী থাকলাম, এটলিস্ট মসৃনভাবে সব কিছু শেষ হয়েছে। বিরিয়ানীর ঘ্রাণ নাকে নিয়ে, খালিপেটে ডরমিটরির দিকে এগিয়ে গেলাম আমরা কজন।

——————————————————————————-

আজ ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে খোদ ইউনিভার্সিটিরই কোন একটা অনুষ্ঠান আছে। কি অনুষ্ঠান, আমি জানি না। তবে অনেককেই লক্ষ্য করলাম আনুষ্ঠানিক পোষাকে বিল্ডিংয়ের একতলায় ও গার্ডেনে ঘোরাঘুরি করছে।

আমি ক্যাফেতে ঢুকে দেখলাম বাংলাদেশী কয়েকজন অলরেডি ওখানে বসে আছে।

আমি: কি ভাই, কি অনুষ্ঠান আজকে?

সেলিম: জানি না।

সুমন: সুন্দরী প্রতিযোগিতা হবে।

আমি তাই নাকি? তা কি আয়োজন?

সুমন: গতবারের মতই হবে, নানান দেশের সুন্দরী ছাত্রীরা নিজেদেরকে মঞ্চে প্রদর্শন করবে। তারপর তাদের মধ্যে থেকে একজনকে ‘মিস ইউনিভার্সিটি’ ঘোষণা করা হবে।

সেলিম: (লোভাতুর কন্ঠে) গতবারের মতই মেয়েরা টু-পিস সুইম স্যুটে দাঁড়াবে নাকি?

আমি: গতবার তুমি অনুষ্ঠানে গেছিলা নাকি?

সেলিম: হু, টিকিট যোগাড় করে রেখেছিলাম আগে থেকেই। তা এইবার যে কোন আওয়াজ পাইলাম না?

সুমন: কি দেখায় রূপসীরা?

সেলিম: টু-পিস সুইম স্যুট পড়লে যা দেখা যায় সবই দেখায়! তবে এই দেশী মেয়েগুলাকেই বেশী সুন্দর লাগে! ওদের ফিগার ভালো, স্বাস্থ্য ভালো, স্কিন কালারও অনবদ্য!

ইতিমধ্যে দেখলাম খালেক ভাই এগিয়ে আসলেন। আমাদের পাশে বসে বললেন

খালেক ভাই: কি মিঞারা অনুষ্ঠানে যাইবা নাকি?

আমি: আপনে বুড়া বয়সে এই অনুষ্ঠানে যাইবেন? দেশে ভাবীর কানে যদি সংবাদ যায়?

খালেক ভাই গত বছর দেশে গিয়ে বিয়ে করে এসেছেন। উনার পড়ালেখা শেষ হয়েছে দুই বছর হয়, এখন নামকা ওয়াস্তে একটা কোর্সে ভর্তি হয়ে, আসল কাজ মানে ব্যবসা করছেন। তা উনার তো বয়স অনুযায়ী বিয়ে করা ফরজ-ই হয়ে গিয়েছিলো। এখানে বিদেশী মেয়েদের সাথে যতই লটর-পটর করুক না কেন, বিয়ে ঠিকই দেশে গিয়ে দেশী মেয়েকে করেছেন।

খালেক ভাই: কি অনুষ্ঠান? কিসের বুড়া মানুষ? কি বলো তোমরা?

আমি: ‘মিস ইউনিভার্সিটি’ সুন্দরী প্রতিযোগিতা হবে নাকি?

খালেক ভাই: দুরো! ভূয়া কথা কে কয়? আজকে আফ্রিকান দেশ ‘ককক’-এর প্রেসিডেন্ট-কে হনারারি ডক্টরেট দেয়া হবে। সেই অনুষ্ঠান।

এবার আমরা সবাই সমস্বরে হেসে উঠলাম।

সুমন: এখন থেকে কি উনার নামের পাশে ডক্টর লাগানো হবে?

আমি: আরে নাহ্‌! হনারারি ডক্টরেট কোন শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়। ওটা একটা এ্যাওয়ার্ড মাত্র। যখন সম্মানসূচক ডক্টরেট দেয়া হয় তখনই উনাদেরকে বলা হয় যে, উনারা উনাদের জীবনবৃত্তান্তে ওটা যেন কিছুতেই এডুকেশন সেকশনে না রাখেন, বরং এ্যাওয়ার্ড সেকশনে রাখেন। এবং নামের আগে যেন ডক্টর ব্যবহার না করেন।

সুমন: ও! বুঝলাম।

এরমধ্যে কখন যে শারমিন এসে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি। হঠাৎ করেই এক মিটার দূরে ওর দিকে চোখ গেলো। আমি অনেকটা বিস্মিতই হলাম। আমার চোখ যে শুধু ওর দিকে গেলো তাই না, ওখানে চোখটা আটকেই গেলো! এই প্রথম ওকে শাড়ী পড়া দেখলাম! নীল রঙের প্রাধান্যওয়ালা একটা প্রিন্টেড শাড়ী পড়েছে ও। শাড়ীর পাড়টাতে গোল্ডেন কালারের কারুকাজ। সাথে গাঢ় নীল রঙের ব্লাউজ। মেকআপ-টাও বেশ মানানসই মনে হলো। যেটা আগে কখনো দেখিনি, আজ ও আই শ্যাডোও ইউজ করেছে হালকা আশমানী রঙের। শ্যামলা রঙা, ছোটখাটো গড়নের, স্লিম শারমিন-কেও যে এতটা সুন্দর লাগতে পারে তা আমি কল্পনাতেও ভাবিনি! একবার ভাবলাম, ওকে কি সত্যিই সুন্দর লাগছে, নাকি আমার চোখে কোন ঘোর লেগেছে?

সুমন: বসো শারমিন।

শারমিন বসলো। শাড়ী পড়ে বসার ভঙ্গিমাটা ভিন্ন।

সেলিম: আমি সবার জন্য কফি নিয়া আসি। বিল দেন আসিফ ভাই।

আমি: বিল দেব আমি?

সেলিম: বারে, এত সুন্দর স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করলেন, সবাই ধন্য ধন্য করলো। সেলিব্রেট করতে, আমাদেরকে খাওয়াবেন না?

সুমন: ঠিক কথা। দেশের কোন ইউনিভার্সিটিতে হলে তো এতদিনে বেশ কয়েকটি প্রেমপত্র পেয়ে যেতেন!

আমি লাজুক শব্দে হেসে উঠলাম। বললাম,

আমি: যাও, তোমাদের মুখ বন্ধ করতে তো এখন খাওয়াতেই হয়। শুধু কফি না, এক পিস করে পপি সিডের বানও নিয়ে এসো।

খালেক ভাই: গুড বয়!

আমি শারমিন-এর দিকে তাকিয়ে বললাম।

আমি: কি ব্যাপার শারমিন? আজ হঠাৎ শাড়ী পড়লে?

শারমিন আস্তে আস্তে বললো,

শারমিন: ঐ যে, ভিতরে অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠান আছে। আমাকে ওখানে দাওয়াত প্লাস কিছু কাজ দিয়েছে। কর্তৃপক্ষই শাড়ী পড়ে আসতে বলেছে।

আমি: ও আচ্ছা।

খালেক ভাই: কেমন লাগতেছে আমার বোনকে?

আমি: (কন্ঠটা একটু উঁচুতে তুলে) লা জওয়াব খালেক ভাই! একেবারে মাথা ঘুরে যাওয়ার মত অবস্থা!

চমকে উঠে আমার দিকে তাকালো শারমিন!

হঠাৎ করে এই কথা বলে আমিও অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম! ‘মাথা ঘুরে যাওয়া’ টার্ম-টা ব্যবহার করা ঠিক হয় নাই বোধহয়!

শারমিন দুই ঠোট মৃদু ফাঁক করে অস্ফুট শব্দ করে বিস্মিত স্বরে বললো, “মাথা ঘুরে যাওয়ার মত!”

আমি এতটাই বিব্রত হলাম যে, কি করবো ভেবে পেলাম না। কথা কাটানোর মতও কোন কথা আপাততঃ খুঁজে পাচ্ছিলাম না! শুধু আরেকবার শারমিন-এর দিকে তাকালাম। ও আমার দিকেই তাকিয়ে আছে।

আজ হঠাৎ ওকে অনেকটাই অচেনা মনে হলো!

(চলবে)

———————————————————

রচনাতারিখ: ২৯শে জুলাই, ২০২১ সাল

রচনাসময়: রাত ১২টা ৩৭ মিনিট

XXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXX

আবীরে অভিসার মম – ৩

———————————– রমিত আজাদ

মেয়েরা অপেক্ষা করে, ছেলেরা কখন একটু মুখের কথায় ইঙ্গিত দিবে, তার পরপরই তারা নদীর মত ছুটে সাগরের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়বে। বিষয়টা আমি জানি। বয়স তো আর কম হলো না! এ্যাট লিস্ট বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রছাত্রীদের চাইতে তো বয়স বেশি। অভিজ্ঞতাবিহীন শূণ্য জীবনও নয়! তবে যে কোন মেয়েকেই তো আর সেই ইঙ্গিত দেয়া যায় না। আর বাংলাদেশী মেয়েদের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সাবধান থাকতে হয়! বাংলাদেশী সমাজের এই একটা বিষয় আছে, বিদেশী মেয়েদের সাথে যত খুশী লটর-পটর করো, কুছ পরোয়া নেহি! কেউ তো কিছু বলবেই না, উল্টা পৌরুষের বাহবা দিবে। কিন্তু ভুলেও যদি বাঙালী মেয়ের সাথে কিছু করেছ, ব্যাস পড়লে আটকা! তারপর তাকে বিদায় দিতে চাও, অত সহজ নয়! সিনিয়র থেকে শুরু করে বন্ধুবান্ধব পর্যন্ত যেচে এসে কথা শুনিয়ে যাবে, “কাজটা ভালো করছ না! ও তো আর বিদেশী নয়, বাঙালী মেয়ে। প্রেম করার আগে সিরিয়াসলি ভাবা উচিৎ ছিলো! ইত্যাদি ইত্যাদি।”

আজ আমাকে খুব সাবধান থাকতে হচ্ছে। চন্দ্রিকা আমার রুমে এসে বসেছে সেই রাত এগারোটায়, এখন বাজে রাত একটা কিন্তু যাওয়ার কোন নাম নেই!

চন্দ্রিকা একটা বাংলাদেশী মেয়ে, সে ইউনিভার্সিটির ফাইনাল ইয়ারে পড়ে। চেহারা-ছবির দিক থেকে সেও একটা আটপৌরে মেয়ে। তবে শারমিন-এর চাইতে চটপটে বা স্মার্ট! থাকে আমার ডরমিটরির উল্টা দিকের ডরমিটরিতে। দালান দুটি বাগানের এপাশ-ওপাশ। আমার রুমে সন্ধ্যার দিকে একবার এসে বললো, “আপনার কাছে নাকি পুরাতন ইন্ডিয়ান সিনেমার কিছু গানের ক্যাসেট আছে? আমাকে ক্যাসেট দেবেন?” আমি বললাম, “আছে, দেব।” ও বললো, “এখন থাক, আমি কিছুক্ষণ পরে এসে নিয়ে যাবো।”

সেই কিছুক্ষণ আর শেষ হয় না। আমি অনেকক্ষণ ওর জন্য অপেক্ষা করলাম। তারপর ভাবলাম ‘লেট হার গু টু হেল!’ একথা সত্য যে, একটা ইয়াং মেয়ের সাথে কথাবার্তা বলতে ভালো-ই লাগে, তাই বলে চন্দ্রিকা এমন আহামরি কোন সুন্দরী নয়! গায়ের রঙও শ্যামলা। লোকে হয়তো আমাকে বর্ণবাদি বলে ঠাওরাতে পারে কিন্তু, আমি কোন বর্ণবাদি নই। ‘বর্ণবাদ’ মানে হলো গাত্রবর্ণ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় বা সামাজিকভাবে ডিসক্রিমিনেট করা। আমি সেটা করিনা।

তবে আমাদের বাংলাদেশে মেয়েদের গাত্রবর্ণ নিয়ে বেশিরভাগ ছেলেদের মধ্যেই একটা পক্ষপাতিত্ব কাজ করে, এই বাস্তবতাটাই সত্য।

লক্ষ্য করে দেখবেন যে, আমাদের কবি সাহিত্যিকরাও রূপসী মেয়ে বলতে ‘দুধে-আলতা রঙ’, ‘সোনা রঙ’, ‘কাঞ্চণ বর্ণ’, ‘কাঁচা-হলুদ বর্ণ’ টাইপের পরিভাষাগুলো ব্যবহার করেছেন। তাই হয়তো সর্বসাধারণের মধ্যেও সৌন্দর্য্যের সংজ্ঞায়নে ঐ বিষয়টি প্রচলিত হয়ে গিয়েছে! ইউরোপেও কিন্তু মেয়েরা শ্যামবর্ণের পুরুষদের অধিক রূপবান মনে করে!

যা বলছিলাম, চন্দ্রিকা ক্যাসেট নিতে আসবে বলে সেই যে উধাও হলো! আর কোন নাম-গন্ধ নেই! এরপর আমি নিজের কাজ করতে শুরু করলাম। তারপর রাত দশটার দিলে গেলাম উচ্ছল-এর রুমে। উচ্ছল আর উত্তাল একরুমে থাকে। ওরা আর চন্দ্রিকা ক্লাসমেট। ঐ রুমে গিয়ে দেখি চন্দ্রিকা ওখানে বসে আছে। তা হতেই পারে, বন্ধুদের রুমে বসে আড্ডা দিচ্ছে দিক। আমি ওকে বললাম, “কি ব্যাপার, তুমি না গানের ক্যাসেট নিতে আমার রুমে আসবে?” যেই না, আমি এই কথা বলেছি, অমনি সে উল্টা ঘুরে উচ্ছল আর উত্তাল-এর দিকে পিঠ দিয়ে, আমার দিকে তাকিয়ে নীরবে ঠোটে আঙুল দিয়ে ‘চুপ চুপ’ এর ইশারা করলো। ‘টিনের চালে কাক, আমি তো অবাক!’ কি ব্যাপার এই মেয়ে সহসা এই ইশারা করছে কেন? আমি কি ওকে কোন নিবেদন করেছি? আমি তো সাদা মনেই জোর কন্ঠেই ক্যাসেটের কথাটা ওকে বললাম। কিন্তু ও এমন লুকিয়ে-চুড়িয়ে ‘চুপচুপ’ ইশারা করছে কেন? এর মধ্যে লুকোচুরির কি আছে? ওকি উচ্ছল আর উত্তাল-কে জানাতে চায় না যে, ও আজ আমার রুমে আসবে? কেন? আমি আর ঐ রুমে বেশি কথা না বলে, একটা ভাবনা নিয়ে আমার নিজের রুমে চলে এলাম।

রাত এগারোটার দিকে চন্দ্রিকা এলো আমার রুমে। ডরমিটরিতে এটা কোন রাত নয়। আমরা আরো বেশি রাত জাগি। কিন্তু আজই প্রথম ও এত রাতে আমার রুমে এলো। রুমে ঢুকে বেশ সাবলীল ভঙ্গিতে সোফায় বসলো। তারপর বললো, “কই দেখান তো দেখি, আপনার কাছে কি কি গানের ক্যাসেট আছে?” আমি বললাম, “শ্রীদেবীর গান দেখবে?” চন্দ্রিকা বললো, “দেখান।”

আমি গানের ক্যাসেট-টা ভিসিআর-এ চালু করলাম। ও বসে বসে দেখছে। মাঝে মাঝে টুকটাক কমেন্ট করছে। তারপর আরেকটা ক্যাসেট চালাতে বললো। আমি অমিতাভের একটা গানের ক্যাসেট চালু করলাম। ফাঁকে চা-কফি বানালাম। গান দেখার পাশি টুকটাক গল্প করছি। ওর সাথে আমার গল্প খুব একটা জমে না। আমার মনে হয়, ওর আলোচনার জ্ঞান অত সমৃদ্ধ নয়! এভাবে বেজে গেলো রাত একটা! কিন্তু ওর নিজ রুমে যাওয়ার কোন নাম নেই। এখানকার ডরমিটরিতে, এভাবে এত রাতে এসে মেয়েরা থেকে যায় একটা বিশেষ উদ্দেশ্যে। তবে সেটা আগে থেকেই বলা-কওয়া, পরিকল্পনা করা থাকে। কখনো-সখনো আকস্মিক-ও হয়, তবে তার হার কম। এভাবে যুগলের বিনোদনে বিদেশের ডরমিটরিতে উইক-এন্ডগুলো কাটে উল্লসিত। কিন্তু চন্দ্রিকা কি আজ ঐ মতলবেই এলো নাকি? যেই মতলবেই আসুক, আমি এর মধ্যে নাই। বাংলাদেশী মেয়েদের সাথে সাবধান থাকা ভালো। সাবধানের মার নাই। সোয়া একটার দিকে চন্দ্রিকা উঠে দাঁড়ালো। দুটা গানের ক্যাসেট হাতে নিয়ে বিরস বদনে বললো, “আমি তবে এখন যাই?” আমি এই কথার অপেক্ষাই করছিলাম, দ্রুতই বললাম, “যাবে, আচ্ছা যাও। গুড নাইট। ভালো থেকো।” খুব হতাশার ভঙ্গিতে হেটে বের হলো চন্দ্রিকা। আমিও হাফ ছেড়ে বাঁচলাম!

——————————————————————————-

পরদিন ভারতীয় বাঙালীদের একটা অনুষ্ঠান ছিলো ইউনিভার্সিটির অডিটোরিয়ামে। অনুষ্ঠানটা পূজার। তবে এই পূজাটা ভারতের অন্যান্য অংশে হয় না, মূলত বাঙালী-রাই করে। আমরা সবাই দল বেধে গেলাম ওখানে। বাংলাদেশী শিল্পীরাও গান গাইবে ওখানে।  অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে চা খেতে বসলাম। শুরু হলো গপ্পো।

খালেক ভাই: কলিকাতার বাঙালী মেয়েগুলা সাঁজগোজ করে বেশি। ওদের পোশাকেও জড়তা কম।

সেলিম: ওরা প্রেমিকা হিসাবেও ইন্টারেস্টিং হয়!

আমি: কিসে ইন্টারেস্টিং?

সেলিম: না মানে ওরা আমাদের মতো কনজারভেটিভ না তো। তাই অভিজ্ঞতাও থাকে বেশি। সুতরাং জায়গামত ইন্টারেস্টিং।

সুমন: অভিজ্ঞতাবলে?

খালেক ভাই: শোন মিঞারা। প্রেমিকার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাটা ব্যাপার না। প্রেমিক যদি খেলায় দক্ষ হয়, তাহলে যেকোন প্রেমিকার সাথেই ভালো খেলতে পারে। আর অভিজ্ঞতা বেশি হলে সমস্যাও হতে পারে, অন্যের শেখানো খেলার টেকনিক যে তোমার সাথে ম্যাচ করবে, এই গ্যারান্টি আছে কি?

উনার আদিরসাত্মক কথা শুনে সবাই সমস্বরে হেসে উঠলাম!

হঠাৎ দেখি দরজা দিয়ে শারমিন প্রবেশ করছে। গলা খাঁকারি দিয়ে সবাই চুপ মেরে গেলাম। কলিকাতার মেয়েদের সামনে যে আলাপ করা যায়, বাংলাদেশী মেয়েদের সামনে সেই আলাপ করা যায় না। আমাদের কালচার ভিন্ন!

শারমিন এসে খালেক ভাইয়ের পাশে বসলো। ওর পড়নে আবারো শাড়ী। এবারের শাড়িটি সম্ভবত কারুকার্য খচিত জামদানী। আমি ভরাট চোখে ওর দিকে তাকালাম। জানি না শারমিন খেয়াল করছে কিনা। তবে শাড়ী পরিহিতা শারমিন-কে দেখে আমার একটা কবিতা মনে পড়লো।

অভিসারে শাড়ি

——————— রমিত আজাদ

পছন্দের এক পোশাক শাড়ি;

হোক ষোড়শী নয় কিশোরী, পড়লে শাড়ি, তবেই নারী।

যখন হতাম অভিসারী, আসতো নারী, জড়িয়ে শাড়ি!

নারী হলো পুরুষ মনের মহান উপহার,

দৃষ্টি হবে, মুগ্ধ হবো; এই তো অভিসার!

শাড়িই যদি না পড়লো, আমার প্রেমিকা!

কেমন করে মুগ্ধ হবো, কানন বালিকা?

ঝলকে উঠে চমকায় রঙ মিষ্টি গালের কূপ।

ইন্দ্রজালী ঐ পোশাকে উপচে পড়ে রুপ!

জামদানি হোক নওভারী হোক, কিংবা মহিশুরী;

সব শাড়িতেই মানাবে তায়, মেঘনা পারের নারী!

প্রেয়সী মোর ঢাকাই তাঁতেও পরী বাধনহারা!

শাড়ির মায়ায় যাই হারিয়ে, প্রেমিক মাতোয়ারা!

মন মোহনায় সব প্রেয়সীই ছুটে আসা নদী,

সাগর আমি কেমনে হবো, শাড়ি না পাই যদি?

ডুববে নদী সাগর জলে, মিলবে ঢেউয়ে ঢেউয়ে,

শাড়ির ঢেউয়েই দুলবে হৃদয়, আকাশ ছুঁয়ে ছুঁয়ে!

শাড়ির সাথে নারীর আছে প্রাচীন যোগাযোগ,

‘শাড়ি ছাড়া নয় অভিসার’, আমার অনুরোধ!

প্রেয়সীরা আসতো যে তাই, শাড়ির শোভায় সেজে,

ভালোবাসার পান্না হিরে পেতাম শাড়ির ভাজে।

———————————————————————–

এরপর থেকে শারমিন-এর সাথে এখানে ওখানে দেখা হতো। তবে অত গভীর কথা হয়নি কখনো। ওর চলাফেরা ও পোশাকে-আশাকে একটা পরিবর্তন এসেছে বলে আমার মনে হলো। ইদানিং বেশ হাল-ফ্যাশনের প্যান্ট-শার্ট, স্কার্ট-টপস ও অন্যান্য ইউরোপীয় পোশাক বেশ ফ্যাশনেবল ভঙ্গিতে পড়তে শুরু করেছে। আগের চাইতে চটপটে হয়েছে বলেও মনে হলো। 

আমার রুমেও দুইএকবার এসেছিলো। আমি শারমিনের সাথে কথাবার্তা বলেছি তবে একটা লিমিট রেখে। ঐ যে বললাম, বাংলাদেশী মেয়েদের ক্ষেত্রে সাবধান থাকতে হয়। আর সিরিয়াস কোন রিলেশনের কথা যদি বলি, তাহলে বলবো ওকে এখনো ঐ দৃষ্টি দিয়ে দেখা শুরু করেনি। বেশ কিছু বিষয় আছে, যা ভাসা ভাসা হওয়া ঠিক না, ভিতর থেকে আসতে হয়ে।

এভাবে দেখতে দেখতে দু’টা বছর কেটে গেলো। আমি পিএইচডি-র ডিফেন্স নিয়ে ভীষণ ব্যাস্ত হয়ে গেলাম। আর কারো সাথে দেখা করা তো দূরের কথা, কথা বলারও সময় পেলাম না।

একদিন শুনলাম, মাস্টার্স-এর ডিফেন্স হয়ে গেছে। আমাদের সার্কেলের সবাই পাশ করেছে শারমিন সহ। রাস্তায় একদিন শারমিন-এর সামনে দেখা হলো, আমি ওকে অভিনন্দন জানালাম। ও জানতে চাইলো, আমার ডিফেন্স কবে? আমি বললাম, একমাস পরে।

শারমিন: তারপর কি করবেন?

আমি: সেপ্টেম্বরের দিকে দেশে চলে যাওয়ার ইচ্ছা আছে। ওখানেই সেটেল করবো। তুমি কি করবে?

শারমিন: আমিও আগস্টের দিকে বাংলাদেশে চলে যাবো।

আমি: ভালো। খালেক ভাইতো এখানেই থাকবেন, তাই না?

শারমিন: না। ভাইয়াও বাংলাদেশে চলে যাবে। ব্যবসা গুটিয়ে আনছেন।

আমি: স্ট্রেঞ্জ! ঠিক আছে খালেক ভাইয়ের সাথে আলাপ করবো নে। আমার ডিফেন্সে এসো কিন্তু।

শারমিন: জ্বী অবশ্যই আসবো।

————————————————————————-

আমার পিএইচডি ডিফেন্সের আগের দিন দেখলাম হৈচৈ অবস্থা! দুপুর বেলা খালেক ভাই দলবল নিয়ে উপস্থিত।

খালেক ভাই: আমরা থাকতে তোমার চিন্তা কি?

আমি: কিসের?

খালেক ভাই: বারে। কাল তোমার ডিফেন্স। তারপরে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন আছে না!

আমি: ও আচ্ছা। জ্বী। কাজের চাপে আমি সব ভুলেই গিয়েছিলাম।

খালেক ভাই: তোমাকে ভাবতে হবে না। আমরাই রান্না-বান্না আর বাকি কাজ করবো। তুমি চুপচাপ ইউনিভার্সিটিতে চলে যেও।

আমি: আচ্ছা। এই নিন টাকা। (উনার হাতে কয়েক শত ডলার ধরিয়ে দিলাম)

খালেক ভাই: বিরিয়ানী হবে, দেশী কিছু আইটেম হবে। বাকীটা ইউরোপিয়ান ডিশ। ঠিকআছে?

আমি: আপনারা যা ভালো মনে করেন।

——————————————————————————

পরদিন ঠিকঠাক মতন ডিফেন্স হলো। সব মিলিয়ে আট ঘন্টার মামলা। আমি এত উৎকন্ঠা আর চাপে ছিলাম যে, কোনদিকে খেয়াল ছিলো না।

যখন ডিফেন্স শেষ হওয়ার পর সবাই আমাকে অভিনন্দন জানাতে আসলো, তখন দেখলাম বাংলাদেশী আমার সব বন্ধুরাই এসেছে। বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে দু’জন ডিপ্লোম্যাট এলেন। অছাত্র ভাইদের-ও চারপাঁচজন এলেন। একজন যা বললেন, তাতে আমার চোখে পানি চলে এলো। তিনি বললেন, “ভাইজান, আমরা নাইলে নানা কারণে পড়ালেখা করতে পারিনাই। এখন বিদেশের মাটিতে কিছু একটা কইরা খাই। তাই বইলা আপনারা বাংলাদেশী ভাইরা যারা মেধাবী আছেন তাদের আমরা খুবই ভালোবাসি। আপনারাই তো দেশের ভবিষ্যৎ। দেশে গিয়া দ্যাশের জন্য কিছু করবেন অবশ্যই, যদি কোন কিছু লাগে আমাদের জানাইবেন, আমরা সামর্থের মধ্যে সাহায্য করমু।”

বাংলাদেশীদের দেশপ্রেম অতুলনীয়! তারপরেও আমরা নানাবিধ কারণে পিছিয়ে আছি! দোষটা মোটেও আমজনতার না, ঘাপলা অন্য কোথাও।

এরপর ডিনার অনুষ্ঠান চললো অনেকক্ষণ। তবে এখানে সামারের দিন গুলি খুব বড় তাই বাইরে আঁধার নামছিলো না। দেশি-বিদেশি ছাত্রছাত্রী, অধ্যাপক ও অন্যান্যরা সবাই প্রাণখুলে গল্পসল্প করছিলেন। চমৎকার কাটলো সন্ধ্যাটা! শারমিনও ছিলো। আজ ও এসেছিলো জমকালো একটা সালোয়ার-কামিজ পড়ে। একবার আমার এক বিদেশী বন্ধু শারমিন-কে দেখিয়ে জানতে চাইলো, “মেয়েটি কে?” আমি কপট হেসে বললাম, “কি? পছন্দ হয়েছে?” ও হেসে বললো, “চারপাশে শ্বেতাঙ্গিনী দেখে দেখে টায়ার্ড, এই শ্যামবর্ণের মেয়েটি বেশ মিষ্টি!” ওর কথায় কেন জানিনা আমি একটু ঈর্ষান্বিত হলাম।

(চলবে)

——————————————————————————————–

রচনাতারিখ: ২৯শে জুলাই, ২০২১ সাল

রচনাসময়: রাত ১১টা ০৯ মিনিট

XXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXX

আবীরে অভিসার মম – ৪

———————————– রমিত আজাদ

সাঁজগোজ একটা মেয়েকে পাল্টে ফেলে। রাশিয়ান একটা সিনেমায় দেখেছিলাম যে, এক নারী সে কোন সাঁজগোজ না করে আটপৌরে পোশাক পড়ে চলাফেরা করতো। তখন তাকে দেখতে অনেকটা পুরুষালী লাগতো; আকর্ষণীয়া দেখানোর তো প্রশ্নই ওঠেনা। আবার সেই একই নারী যখন সাঁজগোজ করতে শুরু করলো, মানানসই পোশাক-আশাক পড়তে শুরু করলো, তখন তাকেই ভীষণ আকর্ষণীয়া মনে হতে লাগলো। আমি মাঝে মাঝে ভাবি শারমিনের সাথে কি এরকম কিছু ঘটেছে? প্রথমদিকে যখন আমি ওকে দেখেছিলাম, তখন হয়তো ও নিজেকে গুটিয়ে রাখতো; মানানসই সাঁজপোশাক করতে জানতো না, বা পারতো না। আবার ভাবি, নাকি এটা আমার চোখ? আমার চোখ দু’টি হয়তো আগে তাকে একভাবে দেখেছে, এখন তাকে আরেকভাবে দেখছে! যেমন ছোটবেলায় কচুরীপানার ফুলকে আমার তেমন সুন্দর কিছু মনে হয় নাই। পরবর্তি জীবনে একবার ময়মনসিংহের এক গ্রামে দেখলাম পুকুর ভরা কচুরীপানার ফুল। ঠিক ঐ মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিলো যে, এ এক  অবর্ণনীয় স্বর্গীয় সৌন্দর্য্য!

আগস্ট মাসের কোন এক বিকালে শারমিন ও খালেক ভাই আমার রুমে আসলেন।

খালেক ভাই: বিদায় নিতে আসলাম ভাই।

আমি: কবে দেশে যাচ্ছেন?

খালেক ভাই: আগামী পরশু দিনের ফ্লাইটে।

আমি: ও আচ্ছা। বসেন একসাথে একটু চা-নাস্তা খাই।

খালেক ভাই: বানাও চা। এটাই হয়তো তোমার হাতে বানানো শেষ চা খাওয়া হবে।

শারমিন: এটা কি বলছেন ভাইয়া? শেষ চা খাওয়া হবে কেন?

আমি: তাই তো! আমাদের কি এই জীবনে আর দেখা হবে না নাকি?

খালেক ভাই: না মানে, আমি এই দেশের কথা বলছিলাম, আরকি।

আমি: ও আচ্ছা। আমিও তো সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ফিরবো। ওখানে গেলে দেখা হবে আশা করি।

শারমিন: জ্বী, নিশ্চয়ই হবে।

আমি: বাই দ্যা ওয়ে। আপনার ঢাকার ঠিকানাটা দিন তো।

এবার খালেক ভাইয়ের মুখটা কালো হলো।

খালেক ভাই: ভাইরে আমরা তো আর তোমার মত ঢাকার বাসিন্দা নই। মফস্বলের মানুষ। এখন ঢাকায় গেলে বাড়ী-টাড়ী ভাড়া করতে হবে। তুমিই বরং তোমার বাসার ঠিকানা দাও। আমি যোগাযোগ করবো নে।

আমি উনাদেরকে আমার বাসার ঠিকানা ও টেলিফোন নাম্বার দিলাম।

খালেক ভাই: আমি অবশ্যই যোগাযোগ করবো।

————————————————————————

সেপ্টেম্বরের কোন এক বিকালে আমার দেশে যাওয়ার ফ্লাইট ঠিক হয়ে গেলো। আমি সবকিছু গোছগাছ করে নিলাম। এরমধ্যে পরিচিতরা মাঝে মাঝে আসতো বিদায় নিতে। ফ্লাইটের আগের দিনে ব্যবসায়ী আলম এলেন আমার রুমে। তিনি বয়সে আমার চাইতে কিছু ছোট হবেন। এই দেশী মেয়ে বিয়ে করে এখানেই থেকে গেছেন। ব্যবসা করছেন।

আলম: ভাইজান, দেশে চলে যাচ্ছেন? কাল আপনার ফ্লাইট?

আমি: জ্বী, আপনি কি করে জানলেন?

আলম: শুনলাম, বাঙালীদের কাছ থেকে।

আমি: ও আচ্ছা।

আলম: এখান থেকে এয়ারপোর্ট যাবেন কি করে?

আমি: একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে নিবো।

আলম: ট্যাক্সি ভাড়া করা লাগবে না। আমি দিবো গাড়ী।

আমি: জ্বী, মানে?

আলম: মানে, আমি আমার গাড়ীতে করে আপনাকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেব।

আমি: জ্বী, আমি এতটা আশা করি নাই। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

পরদিন আলম সত্যি সত্যিই এলেন। নিজে গাড়ী চালিয়ে আমাকে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিলেন। শুধু পৌঁছে দেয়াই নয়, শেষ পর্যন্ত আমার সাথে ছিলেন। ইমিগ্রেশনে প্রবেশের আগে আমি উনাকে প্রশ্ন করলাম, “এই শেষ দিনে আপনি আমার জন্য অনেক কিছু করলেন! এতটা কেন করলেন?” তিনি উত্তরে বললেন, “আমি বোকা নই। কিছুটা বুদ্ধি মাথায় আছে। আমার মন বলে আপনি এক সময় নামী-দামী মানুষ হবেন। সেদিন যদি কোন প্রয়োজনে আপনার কাছে যাই, ফিরিয়ে দেবেন না যেন!”

উনার কথা শুনে আমি হেসে ফেললাম। উনাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বিদায় নিলাম।

প্লেনটি যখন মাটি ছেড়ে আকাশে উঠে গেলো, তখন আমি উপর থেকে নীচের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, এতগুলি বছর যেই দেশটিতে কাটলো, সেই দেশের মাটির সাথে সম্পর্ক আপাততঃ শেষ।”

—————————————————————————————–

দেশে ফিরলাম অনেকগুলো বছর পরে। তাই আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, এর-ওর সাথে দেখা সাক্ষাৎ ও দাওয়াত খেতে খেতে বাতাসের মত কেটে গেলো বেশ কিছুদিন। বিদেশের কথা একেবারে ভুলেই গেলাম। সেটা আবার মনে করিয়ে দিলো, একটা টেলিফোন কল।

আমি: হ্যালো, কে বলছেন?

: আরে চিনতে পারছো না?

আমি: একটু নামটা বলতে হবে, কাইন্ডলি।

: আমি তোমার খালেক ভাই।

আমি: কোন খালেক ভাই?

পরিবেশ পাল্টে গেলে অনেক সময় চেনা মানুষকেও অচেনা মনে হয়!

: ওমা! দেশে এসে আমাদেরকে ভুলেই গেলে? আরে আমি আমি খালেএএএক ভাই। তোমার আগের মাসে দেশে ফিরলাম।

আমি এবার বুঝতে পারলাম কে। একটু লজ্জ্বাই পেলাম!

আমি: সরি খালেক ভাই। পরিবেশ পাল্টে গেছে তো, হঠাৎ রিকোগনাইজ করতে সমস্যা হয়েছে। রিয়েলী সরি। তারপর বলেন।

খালেক ভাই: বলাবলির কিছু নাই। বাসায় চলে আসো সরাসরি। ওখানেই কথা হবে।

আমি: গুড। ঠিকানা দেন।

খালেক ভাই: লেখো, ককক, মহাখালী, ঢাকা। আমার বাসায় কোন টেলিফোন নাই। অফিসের ফোন নাম্বারটা লেখ।

আমি: মহাখালীতে বাসা ভাড়া নিয়েছেন? বেশ তো ভালো-ই হলো। আমি গুলশানে থাকি। আমার বাসা থেকে কাছেই হলো।

খালেক ভাই: হ্যাঁ, ফিজিকালি পাশাপাশি এলাকা। তবে মেন্টালি বহুদূর!

এই নিয়ে আমি আর খালেক ভাইয়ের সাথে কথা বাড়ালাম না। ঠিক হলো আগামীকাল বিকালে আমি উনার বাসায় যাবো।

——————————————————————————–

পরদিন খুঁজেপেতে গেলাম খালেক ভাইয়ের বাসায়। মহাখালীর একটু ভিতরের দিকে একটা গলির ভিতরে একটা বিল্ডিং। চারতলা হবে বোধহয়। কোন লিফট নাই। সরু সিঁড়ি দিয়ে হেটে আমি  তিনতলায় উঠলাম। একটা দরজায় কলিংবেল টিপলাম। দরজা খোলার পর যাকে দেখলাম, সে শারমিন। ঘরের সাদাসিদা পোষাকে দাঁড়িয়ে থাকা শারমিন, আমাকে দেখে মিষ্টি করে হাসলো। আমিও ওকে দেখে হাসলাম। পড়নের কাপড় আটপৌরে, তবে সামান্য প্রসাধন করেছে হয়তো! তারপর দেখলাম না, কিছুই করে নাই। সেই শ্যামবর্ণ শারমিন! জাস্ট চোখে কাজল দেয়া।

শারমিন: আসুন। ভিতরে আসুন।

আমি ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বললাম, “খালেক ভাই কোথায়?”

শারমিন: আছে। জাস্ট বাইরে গেলো। এক্ষুনি চলে আসবে। ভাবী ভিতরে আছেন।

আমি ভিতরে বাচ্চার কান্নার শব্দ পেলাম। শারমিন বললো, “জ্বী, খালেক ভাইয়ের ছেলে।”

আমি: ও আচ্ছা।

শারমিন: বসেন।

আমি রুমটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম। আসবাবপত্র বলতে তেমন কিছু নাই। কোন সোফাসেট, টি-টেবল কিছুই নাই, জাস্ট কয়েকটা চেয়ার পাতা। আমি তার একটায় বসলাম। শারমিন আমার উল্টা দিকে একটা চেয়ারে বসলো।

আমি: কেমন আছো?

শারমিন: ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?

আমি জবাব দেয়ার আগেই কলিং বেল বেজে উঠলো। দরজা দিয়ে ঢুকেই প্রবল হাসি দিয়ে হুল্লোড় করে উঠলেন খালেক ভাই, “ওরে বাব্বা ডক্টর সাহেব এসেছেন আমাদের বাড়ীতে, তাও আবার গুলশান থেকে! ফাহমিদা, আসো দেখে যাও, কে এসেছে।”

আমি: আরে অত ব্যস্ত হবেন না, খালেক ভাই। তাছাড়া ভাবী তো বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত আছেন।

খালেক ভাই: আরে কোন ব্যস্ত না। তুমি আমাদের ঘরের মানুষ। আসতো।

আমাকে হাত টানতে টানতে ভিতরের ঘরে নিয়ে গেলেন। বুঝলাম ঘরটা খুব ছোট, সম্ভবত দুই বেডের একটা ফ্লাট।

আমি একটু সংকোচেই ভিতরের রুমটায় গেলাম। ততক্ষণে ভাবী উঠে দাঁড়িয়েছেন। কোলে একটা বাচ্চা। আমি উনাকে সালাম দিলাম। ভাবী সালামের উত্তর দিলেন।

ভাবী: আপনার কথা অনেক শুনেছি। আসলে গল্প শুনে আমি আপনাকে কয়েক বছর যাবৎই চিনি।

আমি: আপনাদের বিয়ে হলো তো বছর দেড়েক বা দুই বছর হতে পারে, আমার কথা অনেক বছর ধরে কি করে শুনবেন?

ভাবী লাজুক হেসে বললেন। আমরা আসলে কাজিন। দুজন দুজনাকে আগে থেকেই চিনতাম।

আমি: ও আচ্ছা। তা খালেক ভাই, আপনি তাহলে প্রেম করেই বিয়ে করেছেন।

আমার কথা শুনে খালেক ভাই হেসে উঠলো, ভাবী লাজুক হলেন।

ভাবী: আপনাদের ঢাকা শহরে ব্যাপার-স্যাপার একরকম, আমাদের মফস্বল-গ্রামে আত্মীয়দের মধ্যেই বিয়ে-শাদি হয় বেশি। প্রেম-ট্রেম কিছু না। গার্জিয়ান লেভেলেই আলাপ চলে।

খালেক ভাই: কথা কম। এখন চা বানাও। ছোটভাইকে আপ্যায়ন করতে হবে।

এই বলে হাতের ব্যাগগুলো এগিয়ে দিলেন শারমিন-এর দিকে। বুঝলাম, এগুলো কিনতেই খালেক ভাই বাইরে গিয়েছিলেন। আমি হাতের মিষ্টির বাক্সটি ভাবীর হাতে তুলে দিলাম।

এই রুমেও দেখলাম আসবাবপত্র কম। একটা বিছানা, একটা আলমারী, দুটা চেয়ার, আর একটা ড্রেসিং টেবিল। হুম, আর কিছু না হোক, ড্রেসিং টেবিল থাকাটা জরুরী, যে বাড়ীতে দুইজন রমনী আছে!

ভাবী আর শারমিন, রান্নাঘরে চলে গেলো। আমি আর খালেক ভাই বসলাম।

আমি: ভাবীকে আর বাচ্চা নিয়ে কষ্ট দিচ্ছেন কেন? চা তো আমরাই বানাতে পারি।

খালেক ভাই: আরে চা বানানো তো আর কষ্টের কিছু না। বাকি সব আমি রেডিমেড কিনে এনেছি। চা শারমিন-ই বানাবে। ফাহমিদা বলেটলে দেবে আরকি। আমার বাড়ীতে তুমি চা বানাবা কেন?

আমি: বারে, এই না বললেন, আমি ঘরের ছেলে। এখন আবার ফর্মালিটিজ করছেন কেন?

খালেক ভাই হাসলেন।

আমি: ডোন্ট মাইন্ড। শারমিন কি আপনাদের সাথেই থাকে?

খালেক ভাই: আমরা তিন ভাই। আমাদের কোন বোন নাই। শারমিন আমাদের আপন বোনের মতই। তাছাড়া বাড়ীতে ওদের আর আমাদের বাসা পাশাপাশিই। ফাহমিদা আমাদের একটু দূরের কাজিন। তবে ওদের বাড়ীও আমাদের বাড়ী থেকে খুব বেশী দূরে নয়।

আমি: ও আচ্ছা।

খালেক ভাই: শারমিন-এর এখন ঢাকা থাকাটা জরুরী। ওর জন্য চাকরী-বাকরী খুঁজছি। তোমার চাকরীর কি খবর?

আমি: আব্বার ব্যবসায় বসার ইচ্ছা নাই আমার। আপাতত: আমিও চাকুরী খুঁজছি।

সেদিনকার বিকালটা সুন্দর কেটেছিলো, খালেক ভাইয়ের বাসায়।

————————————————————————————————-

মাসখানেক পর আমি একটি চাকুরীতে জয়েন করলাম।

আমার মা ধরে বসলেন, “এতদিন তো চাকুরীর দোহাই দিয়েছিস। এখন তো চাকরীও হলো, তুই বিয়ে করবি না?”

আমি: মা, আরো কিছুদিন যাক না।

মা: তোর এই আরো কিছুদিন কবে শেষ হবে বল তো?

আমি: বলবো।

মা: কানাডা-য় গিয়ে নওরীন-এর বিয়ে হয়ে গিয়েছে। না হলে হয়তো ওর সাথেই কিছু একটা হতো।

আমি মায়ের দিকে তাকাতেই মা চুপ করে গেলেন।

অনেকেরই ধারনা যে, আমার খালাতো বোন নওরীন-এর সাথে আমার প্রেম ছিলো। যেটা আসলে ঠিক কথা নয়। আমরা দু’জন কাজিন, সেই সুবাদে আমাদের কত জায়গায়ই তো কত দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। কিন্তু কোনদিনই দু’জনা বসে একবারের জন্যও মন খুলে কথা বলা হয়নি। প্রেম তো অনেক পরের কথা! কিছু কিছু ভুল ধারনা সমাজের মধ্যে কি করে যে গড়ে ওঠে, আমি জানি না।

মা: আচ্ছা। ঐ বিদেশে তোর সাথে কারো প্রেম হয়নি তো? যাকে তুই বিয়ে করতে চাস, কিন্তু আমাদের বলছিস না?

আমি: না মা, এমন কোন বিদেশী মেয়ে নাই। থাকলে আমি বলতাম।

মা: বাংলাদেশী কোন মেয়ে? ওখানে পড়তো?

আমি মায়ের দিকে তাকালাম। কি উত্তর দিবো ঠিক বুঝতে পারলাম না। আপাতত: হ্যাঁ বা না, কোন উত্তরই আমার কাছে নেই।

মা আবার বললেন, “যদি, এমন কেউ থেকে থাকে বলে ফেল। যেই হোক, আমরা আপত্তি করবো না। জানিস তো আমাদের কোন অহংকার নাই। আমরা লিবারাল। জাস্ট মেয়েটা যেন পড়ালেখা জানা হয়, আর কিছু না।

আমি এবারও চুপ থাকলাম।

———————————————————————–

আমার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো। ইতিমধ্যে একটা মোবাইল কিনে ফেলেছি। বাবা অনেক আগেই একটা দিতে চেয়েছিলো, আমি নেই নি। চাকুরীতে প্রথম মাসের বেতন পেয়ে কিনলাম। বাকি টাকা দিয়ে মা আর বাবা-র জন্য উপহার কিনলাম। বড় বোন বিদেশে থাকেন, উনার জন্য উপহার কিনে রেখে দিলাম। দেশে আসলে দিবো। আরো একটা উপহার কিনে রেখে দিলাম, তবে যার জন্য কিনলাম তাকে আমি চিনি না। যেদিন চেনা হবে, সেদিন দেবো। আমাকে হয়তো রোমান্টিক ভাবতে পারেন। হ্যাঁ, আমি রোমান্টিক-ই!

একদিন মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো।

আমি: হ্যালো কে বলছেন?

খালেক ভাই: আমি খালেক।

আমি: ও আচ্ছা খালেক ভাই। কেমন আছেন?

খালেক ভাই: ভালো। চাকুরীতে জয়েন করেছো শুনলাম।

আমি: জ্বী। আমার মোবাইল নাম্বার কোথায় পেলেন?

খালেক ভাই: তোমার বাসায় ফোন করেছিলাম। তোমার আম্মা দিলেন।

আমি: ও আচ্ছা।

আরো কিছু কথার পর আমি বললাম।

আমি: সেদিন আপনার বাড়ীতে খুব সুন্দর সময় কেটেছে। আপনাকে আর ভাবীকে অনেক  অনেক ধন্যবাদ। এবার আপনারা আসুন না আমাদের বাড়ীতে।

খালেক ভাই: ছোট বাচ্চা নিয়ে আমাদের বেশ অসুবিধা হয়। কোথাও গেলেও বেশি সময় থাকতে পারি না।

আমি: ঠিকআছে, বিকাল টাইমে আসেন, অল্প কিছু সময় কাটালেন। তাছাড়া আপনাদের বাড়ী তো আমাদের বাড়ী থেকে খুব দূরে নয়!

খালেক ভাই: ঠিক আছে। নেক্সট শুক্রবার হলে কেমন হয়?

আমি: পারফেক্ট!

খালেক ভাই: তোমার বাসার ঠিকানা তো আমার কাছে আছেই।

আমি: আমি এসে নিয়ে যাবো নে, আপনাদেরকে। আপনাদের সাথে ছোট্ট বাচ্চা আছে। আমি আসলে হেল্প হবে, আর চিনে চিনে আমার বাড়ীতে আসতে হবে না।

খালেক ভাই: আচ্ছা, তাহলে তুমি বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে এসো।

আমি: ওকে।

——————————————————————–

আমি পরবর্তি শুক্রবার খালেক ভাইদের বাড়ীতে গেলাম। চাইলে বাবার গাড়ীটা নিয়ে আসতে পারতাম, তাহলে সুবিধাই হতো। কিন্তু আমার সেটা ভালো লাগে না। নিজের গাড়ী হলে তখন দেখা যাবে। আমি একটা তিনচাকার সিএনজি নিয়ে গেলাম। আবারো গলির ভিতরের সেই বাড়ীটার তিনতলায় উঠে কলিংবেল টিপলাম। এবারও শারমিন দরজা খুললো। বাহ্‌! মনোরম সাঁজগোজ করে সুন্দর দাঁড়িয়ে আছে শারমিন।

“আসুন, ভিতরে আসুন।” বললো শারমিন। তবে কন্ঠস্বর মলিন মনে হলো।

আমি ভিতরে ঢুকে একটা চেয়ারে বসলাম। বললাম, “তাড়াতাড়ি চলো।”

বেডরুম থেকে খালেক ভাই আসলেন। কিছুটা বিধ্বস্ত মনে হলো উনাকে। আমি বললাম, “চলেন, খালেক ভাই। ভাবী কোথায়? ভিতরে?”

খালেক ভাই: (মনমরা স্বরে) নারে ভাই, আমরা আজ যেতে পারবো না। বাচ্চাটার হঠাৎ জ্বর উঠেছে!

আমি: কি বলেন?

খালেক ভাই: ডাক্তারের কাছে যেতে হবে এখন।

আমি: ও, তাহলে আমি আজ যাই।

খালেক ভাই: এত আশা করে এসেছিলে। আমারই ভুল হয়ে গিয়েছে। তোমাকে একটা ফোন করা উচিৎ ছিলো। তা আমার বাসায় তো কোন ফোন নাই। আশেপাশের ফোনফ্যাক্সের দোকান থেকে ফোন করা যেত। টেনশনে আমার আসলে মাথা কাজ করে নাই।

আমি: আচ্ছা। থাক তাহলে আজকে। আপনারা ডাক্তারের কাছে যান।

খালেক ভাই: আচ্ছা শোন, আমি আর ফাহমিদা বাচ্চা নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাই। তুমি শারমিনকে নিয়ে তোমার বাসায় যাও। বেচারী বেড়াতে যাওয়ার আশা করে ছিলো।

আমি: জ্বী, এটাও করা যায়। আপনারা সবাই একসাথে গেলেই ভালো হতো। ঠিকআছে তাহলে আপাততঃ আমি আজ শুধু শারমিনকে নিয়েই যাই, আরেকদিন আপনারাও আসবেন।

শারমিন আমার দিকে তাকালো।

—————————————————————————-

বাইরে নেমে আমি শারমিনকে বললাম। এখান থেকে একটা বেবিট্যাক্সি নিয়ে যাওয়া যায়, আবার রিকশায়ও যাওয়া যায়। তুমি কোনটা প্রেফার করো? শারমিন ক্ষীনকন্ঠে বললো, “আপনি যেটা ভালো মনে করেন।”

আমি: আমার কাছে গাড়ীর চাইতেও রিকশাটাই বেশি ভালো লাগে। খোলামেলা বাহন, আস্তে ধীরে বাতাস কেটে কেটে যায়।

শারমিন: চলেন তাহলে রিকশায়।

আমরা দু’জন একটা রিকশায় উঠলাম। অপ্রশস্ত রিকশায় দু’জনে গা ঘেষে বসলাম। শারমিনের সাথে এই প্রথম আমি এত ক্লোজলি বসেছি। মহাখালী টু গুলশান বাতাস কেটে কেটে হালকা গতিতে যেতে লাগলো রিকশা। সেই বাতাসে শারমিন-এর প্রসাধনীর সুবাস আমার নাকে এসে লাগলো। মাঝে মাঝে তার চুল উড়ে এসে আমার গায়ে পড়ছে। শারমিন খুব একটা কথা বলছে না। বোধহয় জড়তা অনুভব করছে। মাঝে মাঝে দু’পাশে তাকাচ্ছে। রিকশাটা মহাখালী ছেড়ে গুলশানের রাস্তায় উঠলো। শারমিন বললো, “এটা কোন রাস্তা?” আমি বললাম, “এটা গুলশান এ্যাভিনিউ। আগে কখনো এই রাস্তায় আসোনি?” শারমিন বললো, “না।” বুঝলাম ঢাকা নগরী ও ভালো চেনে না।

(চলবে)

——————————————————————

রচনাতারিখ: ৩১শে জুলাই, ২০২১ সাল

রচনাসময়: রাত ০২টা ৫৯ মিনিট

XXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXX

আবীরে অভিসার মম -৫

———————————– রমিত আজাদ

যে মেয়েটিকে বিদেশের মাটিতে খুব সহজেই পেতে পারতাম হয়তো। যাকে একসময় অনেক সহজলভ্যই মনে হয়েছিলো।  অথচ আমি যাকে দূরে ঠেলেছিলাম, আজ সেই মেয়েটির গায়ে গা ঘেষে বসে, এতটা অন্তরঙ্গতায় আমার শরীরে বারবার শিহরণ জাগছিলো! হিউম্যান সাইকোলজি এতটাই বিচিত্র!

গুলশান এক নম্বর গোল চক্কর পেরিয়ে, গুলশান দুই নম্বর গোল চক্কর ছাড়িয়ে আরো উত্তরে এগিয়ে গেলো রিকশাটি। ঢাকা শহরে যে কয়টি দীর্ঘ এ্যাভিনিউ আছে, তার সবই দক্ষিণ-উত্তর বরাবর, পূর্ব-পশ্চিম বরাবার উল্লেখযোগ্য কোন এ্যাভিনিউ নেই! তাই হয়তো যোগাযোগের বেহাল অবস্থা! চলার পথে শারমিন চারপাশে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। মফস্বলের মেয়ে সরাসরি চলে গিয়েছিলো ইউরোপে, ঢাকা নগরী তার দেখা হয়নি। ইউরোপীয় গ্রান্ড নগরীগুলোর সাথে তুলনা করলে ঢাকা হয়তো তেমন কিছুই না! তবুও শারমিন-এর কাছে এটা তার মাতৃভূমির রাজধানী শহর, যাকে সে চেনে না। আমি মাঝে মাঝে তাকে দুই-একটা জায়গা চিনিয়ে দিচ্ছিলাম। আর ও শুধু মাথা নেড়ে বলছিলো, “জ্বী”, “আচ্ছা”, এই জাতীয় ছোটছোট শব্দগুলি। গুলশান এ্যাভিনিউ-এর শেষ মাথায় এসে বাম দিকে একটা পার্ক দেখে শারমিন জানতে চাইলো, “ওটা কি?”

আমি: এটা গুলশান লেক পার্ক। ভিতরে একটা লেক আছে।

শারমিন: কত বড়?

আমি: বেশি বড় নয়, তবে সুন্দর। অভিজাতদের বেড়ানোর জায়গা। বিকালে হাটার জায়গা।

একবার ভাবলাম, ওকে নিয়ে ওখানে একটু ঘুরে আসবো নাকি? তারপর ভাবলাম না থাক। আজ বাড়ীতেই যাই।

——————————————————————————-

আমাদের বিল্ডিংটার প্রবেশ পথে পেল্লায় বড় গেইট আছে। সেখানে ইউনিফর্মধারী গার্ড আছে। তারা দু’জন আমাদের দেখে লম্বা সালাম দিলো। শারমিন আমার দিকে তাকালো, বোঝা গেলো যে এতটা ফর্মালিটিজে ও অভ্যস্ত নয়। গ্রাউন্ড ফ্লোরের লম্বা গ্যারেজটি পার হয়ে, এক মাথায় সিঁড়ি। শারমিন সোজা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলো। আমি ডাকলাম, “শারমিন, এদিকে আসো।” শারমিন থেমে আমার দিকে তাকালো। আমি আঙুল দিয়ে দেখালাম, বললাম “লিফট আছে, আমরা লিফটে যাবো। শারমিন আরেকবার আমার দিকে তাকালো। সম্ভবত ও এতকিছু আশা করেনি।

ইতিমধ্যে আরেকজন ভদ্রলোক এসে লিফটের জন্য অপেক্ষা করছিলো। আমাদের দু’জনকে দেখে তিনি আর লিফটে উঠলেন না। কাপলকে লিফট ছেড়ে দেয়ার কার্টেসিটা কেউ কেউ দেখিয়ে থাকেন। লিফটের ভিতরে শুধু আমরা দু’জন। শারমিন আবারো আমার দিকে তাকালো। এই দৃষ্টিটার কোন অর্থ আমি আপাতত খুঁজতে চাইলাম না। বললাম, “টপ ফ্লোরে আমরা থাকি।”

কলিং বেল টিপলে, বুয়া এসে দরজা খুলে দিলো। আমি শারমিন-কে নিয়ে ড্রইং রুমে বসলাম। শারমিন নীরবে সুদৃশ্য সোফাসেটে বসলো। ওকে বেশ সংকুচিত মনে হচ্ছিলো। আমি বললাম, “জানালার সামনে এসো, এখান থেকে সুন্দর দৃশ্য দেখা যাবে।” ও উঠে এসে, জানালার সামনে দাঁড়ালো। জানালার বাইরের দৃশ্য দেখে শারমিন হতবাক হলো! বললো, “এত্ত সুন্দর!” ঢাকার এ পাশটা বেশ সবুজ। তাছাড়া টপ ফ্লোর হওয়াতে অনেক দূরতক দেখা যাচ্ছে। সাধারণ আবাসিক এলাকাগুলোতে, গায়ে গা লাগানো বাড়ীর জানালা দিয়ে এরকম দৃশ্য কল্পনাই করা যায় না!

এরপর ওকে আমাদের পারিবারিক লাইব্রেরীটাতে নিয়ে গেলাম। আমার বই পাগল মায়ের নিজ হাতে গড়া লাইব্রেরীটা দেখে ওর চোখ কপালে উঠে গেলো! “এত্ত এত্ত বই!”

আমি: হ্যাঁ। আমার মায়ের নিজ হাতে গড়া। আমার বোনও প্রচুর বই কিনেছেন। উনার হাত ধরে আমি ছোটবেলায় একুশের বইমেলায় যেতাম।

শারমিন: আপনার বড় বোন আছে?

আমি: হ্যাঁ, আছে। তবে এখন আর এই বাড়ীতে থাকেন না। তিনি বিদেশে থাকেন।

কাজের বুয়া এসে জানালো, নাস্তা রেডী। মা, আমাদেরকে ডাইনিং টেবিলে ডাকছেন। আমি শারমিনকে নিয়ে ডাইনিং রুমের দিকে এগিয়ে গেলাম। মা সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। বললেন, “টেবিলে বসো তোমরা।”

মা: কি নাম তোমার, মা?

শারমিন: শারমিন।

মা: বেশ মিষ্টি নাম তো! পুরো নাম কি?

শারমিন: শারমিন শিকদার।

মা: তোমরা কি শিকদার বংশ?

শারমিন: জ্বী।

মা: কি করেন তোমার আব্বু?

শারমিন: জ্বী, ব্যবসা করেন।

মা: আর মা কি কিছু করেন?

শারমিন: জ্বী, স্থানীয় মেয়েদের স্কুলে পড়ান।

মা: ভালো ভালো। টিচারের মেয়ে, গুড। তা তুমি কি আসিফের সাথে লেখাপড়া করেছ?

শারমিন: জ্বী না। উনি আমার অনেক সিনিয়র। তবে আমরা একই ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া করেছি।

মা: ও আচ্ছা। কোন সাবজেক্ট?

শারমিন: পলিটোলজি।

মা: ভালো। তা, এখন কি কিছু করছো?

শারমিন: জ্বীনা, চাকরী খুঁজছি।

মা: ও আচ্ছা। দোয়া করি চাকরী হয়ে যাবে।

মা আমার দিকে তাকালেন। আমি মাথা নাড়লাম “না” জানালাম। মা কি বলতে চেয়েছেন আমি বুঝতে পেরেছি। মা চোখের ইশারায় আমাকে বলতে চেয়েছিলেন যে, “তোর বাবাকে বললেই তো ওর একটা চাকরী হয়ে যায়।” কিন্তু আমি সেটা চাইনা। শারমিন ওর মত করেই চাকরী খুঁজুক। তাছাড়া ………..।

মা: কতদিন হয় ঢাকায় এসেছ?

শারমিন: অল্প কয়েকমাস।

মা: তাহলে এতদিন আমাদের বাড়ীতে এলে না কেন?

শারমিন: বাড়ী চিনতাম না তো! তাছাড়া আমি পথঘাটও চিনি না।

মা: এটা কেমন কথা হলো মা? তুমি ইউরোপে লেখাপড়া করে পাশ করতে পারলে, আর ঢাকায় পথঘাট চিনবে না? তা কি হয়?

শারমিন: আমি সত্যিই ঢাকায় পথঘাট চিনি না।

মা: চিনতে হবে কেন? চিনে আসতে পারার কথা বলছি। তুমি কি বাংলা-ইংরেজী পড়তে পারো না?

শারমিন: লজ্জ্বা পেয়ে। জ্বী, তাতো পারিই।

মা: ব্যাস তাহলেই তো হলো। আমাদের দেশে প্রতিটি দোকানের উপর সাইনবোর্ড থাকে। সেখানে এলাকার নাম ও ঐ দোকানের ঠিকানা লেখা থাকে। তা পড়লেই তো তুমি বুঝতে পারবে তুমি কোথায় আছো। কোথায় যেতে হবে। বি স্মার্ট!

শারমিন: জ্বী। কিন্তু আমার ভয় লাগে!

মা: কিসের ভয়?

শারমিন: রাস্তাঘাটে যদি কোন অঘটন ঘটে। আমি ভয় পাই!

মা: কাম অন! আমাদের দেশের মানুষ অত খারাপ নয়। দিনের আলোয় রাস্তাঘাটে অত সমস্যা নাই। তুমি লেখাপড়া জানা মেয়ে, কদিন পরে চাকরী-বাকরী করবে। তোমাকে তো ঢাকায় চলাফেরা করতে শিখতে হবে!

শারমিন: (সুবোধ বালিকার মত বললো) জ্বী আচ্ছা!

মা: বিয়ে-শাদীর কোন কথাবার্তা চলছে?

আমি: মা। এটা তো ওদের ফ্যামিলির ব্যাপার, তুমি জানতে চাইছো কেন?

মা: তুই থামতো। আমি জানতে চাই।

শারমিন: (আরো লজ্জ্বা পেয়ে) আমি জানিনা, বাবা-মা কিছু করছেন কিনা!

মাকে মনে হলো বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ওকে দেখছেন!

———————————————————————————————-

সন্ধ্যার আগে আগে বের হয়ে গেলাম, ওকে মহাখালী পৌঁছে দিতে। তবে যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। সন্ধ্যার আবছায়া আলোয় রিকশায় চড়ে আবারো আমরা দুজন যাচ্ছি। এবার শারমিন কি আমার সাথে আরেকটু ক্লোজ হয়ে বসলো? ভাবলাম, নাও হতে পারে, হয়তো এই রিকশাটাই বেশি অপ্রসস্ত!

শারমিন: ঢাকার এই দিকটা রাতেও সুন্দর!

আমি: হ্যাঁ, অভিজাত এলাকা। অনেক ইমপর্টেন্ট অফিস-আদালত আছে।

শারমিন: খুব সুন্দর আপনাদের বাসাটা! দেয়ালের পেইন্টিংগুলা অনেক দামী তাই না?

আমি: দামী হবে নিশ্চয়ই। তাবে আমাদেরকে তো আর কিনতে হয়নি।

শারমিন: মানে?

আমি: আমার মা তো একজন চিত্রশিল্পী।

শারমিন পাশ ফিরে চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকালো! বললো, “উনি চিত্রশিল্পী?”

আমি: হ্যাঁ। ঢাকার আর্ট কলেজ থেকে পাশ করেছেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন-এর সরাসরি ছাত্রী ছিলেন।

শারমিন অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালো। মনে হলো ও আজ বারবার শুধু অবাকই হচ্ছে!

আমি: কি অবাক হলে?

শারমিন: আমি আগে কখনো কোন চিত্রশিল্পী-কে দেখিনি।

আমি: এখন শুধু দেখলেই না। কথাও বললে।

শারমিন: আমার খুব ভালো লেগেছে আপনাদের ডাইনিং টেবিলে বসে খাওয়ার সময়টা। এত সাজানো-গোছানো ছিলো সবকিছু! একটা বাড়ীর পরিবেশ যে এত সুন্দর হতে পারে তা আমি কখনো ভাবিনি!

———————————————————————————————

কিছুদিন চাকরী নিয়ে ভীষণ ব্যাস্ত হয়ে পড়লাম। শারমিন, খালেক ভাই, সবাইকেই ভুলে গেলাম। হঠাৎ একদিন একটা ফোন কল পেলাম। উত্তাল কল করেছে। এখন সে বাংলাদেশেই আছে। একটা সরকারী চাকুরী করছে।

উত্তাল: ভাইজান, কেমন আছেন।

আমি: ভালো আছি ভাইয়া, তুমি কেমন আছো?

উত্তাল: আমি ভালো আছি, ভাইজান।

আমি: গুড!

উত্তাল: ভাইজান, আপনাদের জন্য মন পোড়ে, তাই একটা ব্যবস্থা করলাম।

আমি: মন পোড়ে ভালো কথা। শুনে খুশী হলাম। তা কি ব্যবস্থা করলে?

উত্তাল: আগামী শুক্রবার বিকালে একটা প্রোগ্রামের আয়োজন করেছি। আমরা সবাই থাকবো, আপনিও আমন্ত্রিত।

আমি: থ্যাংক ইউ। আমিও কাজে ডুবে গিয়েছিলাম। একটু সবার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করলে ভালো লাগবে।

উত্তাল: তা ভাইজান, উচ্ছাস, সেলিম, সুমন,……….., সবাই আসবে, শুধু খালেক ভাই আসতে পারবে না, ব্যাস্ত। তবে শারমিন আসবে।

আমি: ভালো কথা। আমাকে প্রোগ্রামের ঠিকনাটা এসএমএস করে দিও।

উত্তাল: আপনাকে একটা কাজ করতে হবে।

আমি: কি কাজ?

উত্তাল: অনুষ্ঠান হবে ধানমন্ডিতে। আমার বাড়ীর ছাদে। শুনেছি, আপনার বাসা থেকে এখানে আসার পথে শারমিনদের বাসা পড়বে।

আমি: হ্যাঁ, মোটামুটি তাই।

উত্তাল: তাহলে, আপনি ঐদিন আসার পথে শারমিনকে নিয়ে আসবেন। ঠিকআছে।

আমি: তুমি তো আমাকে ঝামেলায় ফেললে!

উত্তাল: আপনাকে বলতাম না। কিন্তু খালেক ভাই আসবেন না। আবার শারমিনও একা একা আসতে পারবে না। এখন কি আর করা? আপনার তো পথেই পড়বে।

আমি: ঠিকআছে। ওকে বলা আছে?

উত্তাল: আমি খালেক ভাইকে বলে দেব।

আমি” ওক্কে।

———————————————————————

মা: শোন।

আমি: জ্বী, আম্মা।

মা: আচ্ছা ঐদিন যে মেয়েটা এসেছিলো, শারমিন না নাম?

আমি: জ্বী। কি ব্যাপার?

মা: না। কিছু না। তুই কি কিছু বলবি?

আমি: আমি কি বলবো?

মা: কিছু কি বলার আছে?

আমি: কি বলার থাকবে?

মা: মেয়েটির ব্যাপারে তোর কিছুই কি বলার নেই?

আমি: না মা, আমার কিছুই বলার নেই। তবে তুমি চিত্রশিল্পী শুনে ওর চোখ কপালে উঠে গিয়েছিলো!

মা হেসে ফেললেন।

আমি: তোমার বাড়ীটা ওর খুব পছন্দ হয়েছে।

মা: খুব বেশি পছন্দ হয়েছে?

আমি: তাই তো মনে হলো। বললো, এত সুন্দর বাড়ী নাকি ও আগে কখনো দেখেনাই।

মা: ওকি এই বাড়ীতে থেকে যেতে চায়?

মা’র কথায় কিছু একটা ইঙ্গিত আছে। আমি সেই ইঙ্গিত-টা আপাততঃ ধরতে চাই না। আমি নির্লিপ্ত রইলাম।

মা: ও! মেয়েটা দেখতে-শুনতে মোটামুটি, এভারেজ বলা যায়। তবে অতটা স্মার্ট না! একটু সংকুচিত মনে হলো। তবে লেখাপড়া জানা মেয়ে, চাকরী-বাকরী করলে চালাক-চতুর হয়ে যাবে!

আমি: হবে হয়তো।

আমার এহেন নির্লিপ্ততা দেখে মা আর কথা বাড়ালেন না।

আমিও মাকে কিছু বলতে চাইলাম না। আমি নিজেই অনেকটাই সন্দিহান!

—————————————————————————————

পরবর্তি শুক্রবার। আমি মহাখালীতে শারমিনদের বাড়ীর দিকে রওয়ানা হলাম। আগের দিন টেলিফোনে খালেক ভাইয়ের সাথে আলাপ হয়েছে। খালেক ভাই বললেন, “আমি যেতে পারবো না। তুমি পথে শারমিনকে বাড়ী থেকে নিয়ে যেও। ও রেডী হয়ে থাকবে।”

আমি বের হওয়ার সময় মা বললেন, “আজ গাড়ীটা একদম ফ্রী। তোর বাবা আমাজাদের গাড়ীতে চড়ে কোন একটা প্রোগ্রামে গিয়েছে ঐ গাড়ীতেই ফিরবে। তুই গাড়ীটা নিয়ে যা।”

আমি: থাক, আমি কিছু একটায় চড়ে চলে যাবো নে।

মা: বললাম না, গাড়ীটা শুধু শুধুই বসে আছে। তুই একটু আরাম করে যা তো। ফিরতে রাত হবে?

আমি: মনে হয় রাত হবে। সবাই মিলে ছাদে আড্ডা দেবে। সময় তো লাগবেই। কালও তো উইক-এন্ড।

মা: শারমিন থাকবে ঐ প্রোগ্রামে?

আমি বুঝলাম না, মাকে ঠিক কি জবাব দেব। আমি যে পথে ওকে নিয়েই ঐ  অনুষ্ঠানে যাবো এটা মাকে বলিনি। শারমিনকে নিয়ে আমি সন্দিহান, তাই ওকে নিয়ে মাকে কোন ইঙ্গিত দিতে চাই না।

আমি: থাকার কথা।

মা: আচ্ছা। যা তাহলে।

——————————————————-

ঐ গলির ভিতরে গাড়ী ঢোকে না, তাই ড্রাইভারকে মেইন রোডের উপর থাকতে বললাম। খালেক ভাইকে যেই সময় বলেছিলাম, হিসাবের চাইতে তার বেশ অনেকটা সময় আগে ওখানে পৌঁছে গেলাম। আসলে আমি তো আর ভাবিনি যে গাড়ীতে চড়ে আসবো, আমার হিসাব ছিলো রিকশার সময়ের। আমি হেটে ভিতরে ঢুকে গেলাম। গলির ভিতরে গায়ে গা লাগানো বাড়ীগুলো! শারমিনদের বিল্ডিংয়ের সরু সিঁড়ি বেয়ে আমি উপরে উঠে গেলাম। দরজায় পৌঁছে কলিং বেল টিপলাম, এক মিনিট পার না হতেই দরজা খোলার শব্দ শুনলাম। ও তাহলে শারমিন রেডি হয়েই ছিলো। ভালোই হলো, এখুনি ওকে নিয়ে নিচে নেমে যাবো।

দরজা খুলে শারমিন একগাল হাসলো। আমিও হাসলাম, তবে কিসের যেন অভাব মনে হলো!

শারমিন: আসেন ভিতরে আসেন।

আমি: তুমি রেডী?

শারমিন: ভিতরে আসেন তো।

আমি ভিতরে ঢুকলাম।

শারমিন: বসেন।

আমি বসাবসির কি আছে। নিচে গাড়ী দাঁড়িয়ে আছে, তাড়াতাড়ি চলো।

শারমিন: (একটু বিব্রত হয়ে) ট্যাক্সি, নাকি আপনাদের নিজেদের গাড়ী?

আমি: আমাদের নিজেদের গাড়ী।

শারমিন: তাহলে একটু অপেক্ষা করেন।

আমি: তুমি কি রেডী না?

শারমিন: আপনার আসার কথা কখন? আর আপনি একঘন্টা আগে চলে এসেছেন।

আমি: তাই নাকি?

শারমিন” হ্যাঁ, তাই। আমি এখনও রেডীই হতে পারি নাই।

আমি এতক্ষণে বুঝলাম, কিসের অভাব। শারমিন এখনো পুরোপুরি সাঁজগোজ করেনি।

আমি হেসে ফেললাম। সরি, সময়ের হিসাব ঠিক রাখতে পারিনি। ঠিকআছে, তুমি রেডী হও, আমি বসলাম। খালেক ভাইকে এই রুমে পাঠিয়ে দাও। ভাবী নিশ্চয়ই বাচ্চা নিয়ে ব্যাস্ত?

শারমিন: ভাইয়া, ভাবী, বাচ্চা, কেউই বাসায় নেই।

আমি: মানে?

শারমিন: এই জন্যই তো। উনারা আত্মীয় বাড়ীতে গিয়েছেন। ভাবীর দিকের আত্মীয়, আগে থেকেই প্রোগ্রাম ছিলো, তাই খালেক ভাই আজকের প্রোগ্রামটাতে যেতে পারছেন না।

আমি এতক্ষণে বুঝলাম, বাড়ীটা খুব নির্জন কেন মনে হচ্ছিলো!

আমি: তাহলে বাড়ীতে তুমি এখন একা?

শারমিন: হ্যাঁ, একদম একা। আপনি বসেন। আমি ঐ রুমে সাঁজগোজটা কমপ্লিট করি।

আমি: আচ্ছা।

আমি কিছুক্ষণ এই রুমটাতে একটা চেয়ারে বসে রইলাম। এই ফ্লাটের চারদিকেই বদ্ধ। জানালাগুলোও নামকা ওয়াস্তে খুললে হয়তো পাশের দালানের জানালা দেখা যাবে। তাই সবগুলি জানালাই বন্ধ। তারউপর পর্দা টানা। অপেক্ষার সময়টায় জানালা দিয়ে যে একটু বাইরের দৃশ্য দেখবো, সেই জো-ও নেই। মোবাইল ফোনটা হাতে নিলাম, ওখানে কিছু করে সময় কাটাই। মেয়েদের তো সাঁজতে অনেক সময় লাগে! শারমিন-এর যে কতক্ষণ লাগে কে জানে? কিন্তু মোবাইলে ঘাটাঘাটি করতে আমার ভালো লাগে না। এই রুমে বইপত্র-ও কিছু নাই, যে নেড়েচেড়ে দেখবো।

আমি চুপচাপ বসে আছি। মাঝে মাঝে ঐ রুমে টুংটাং শব্দ শুনতে পাচ্ছি। ড্রেসিং টেবিলে শারমিন কিছু করছে। হয়তো নেইল পালিশের শিশিটা তুলছে, হয়তো কাঁচের চুড়িগুলো পড়ছে। এখন বাড়ীটাতে কেউ নেই, শুধুই আমরা দুজন! আমি এই রুমে অপেক্ষায়, শারমিন ঐ রুমে সাঁজছে।

দুটি রুমের মাঝখানে একটি দরজা আছে। শারমিন চাইলে দরজাটা বন্ধ করে, এট লিস্ট দরজাটা ভিজিয়ে ঐ রুমের ভিতরে বসে সাঁজগোঁজ করতে পারতো। কিন্তু ও সেটা না করে, দরজা খোলা রেখেই ঐ রুমে সাঁজছে। কেন? ওকি আমার সাথে নিজেকে নিরাপদ মনে করে? নাকি আমাকে ওর খুব কাছের মানুষ মনে করে? নাকি?

আমার ঘোর লাগলো! আমি ধীর পায়ে হেটে ঐ রুমে ঢুকলাম। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে শারমিন সাঁজছে। বাইরে বেড়ানোর সালোয়ার কামিজ-টা ইতিমধ্যে পড়ে ফেলেছে, বেশ জমকালো, আর টাইট ড্রেসটা। আপাতত, বুকের উপরে ওড়না নেই। আয়নায় শারমিন আমাকে দেখলো। এখন দুজন দুজনকে দেখছি আয়নায়। ঠোটে লিপস্টিক দেয়া শেষ করে, শারমিন আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো। আমিও মৃদু হাসলাম। তারপর চিরুনীটা নিয়ে শারমিন তার দীঘল কালো চুল আঁচড়াতে শুরু করলো। এই টাইট জমকালো পোশাকে ওর শরীরের প্রতিটি বাঁকই যেন খুব স্পষ্ট! এদিক সেদিক দুলে দুলে হাত উঠানামা করিয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিলো। এই প্রসাধনরত নারী ভঙ্গিমায় কি এক মাদকতা অনুভব করলাম। আমি কিছুটা সময় দাঁড়িয়ে ওর প্রসাধন দেখলাম। এ সময় শারমিন আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু মৃদু হাসছিলো। হাসিটার মধ্যে অনেক কিছুই আছে, যার অন্যতম হলো প্রশ্রয়! আমাদের কারো মুখেই কোন কথা নেই। আমি ওর দিকে আরো কিছুটা এগিয়ে গেলাম। শারমিন একটুও পিছালো না, বা সরে দাঁড়ালো না! এগুতে এগুতে আমি ওর খুব কাছাকাছি চলে এলাম। আমাদের মধ্যেকার দূরত্ব এখন গানিতিক হিসাবে শূণ্য না হলেও, ‘টেন্ডস টু জিরো’, মানে শূণ্যের খুব কাছাকাছি। বাড়ীতে আর কেউ নেই, শুধুই আমরা দু’জন, পরিস্থিতি পুরোটাই অনুকূলে, আমি কি ওকে একটু ছুঁয়ে দেখবো?

—————————————————–

আমি কি তোমার নগ্ন কায়ায় বুলিয়েছি কভু হাত?

স্বপ্নসুধায় মধুমাস তিথি, জারুল ঝরানো রাত!

বেগুনী শোভায় কর পরশে শিহরীত তমা নিশি,

উঠিয়াছে ঝড়, কেঁপে থরথর, উতলা নিঝুম শশী।

অপ্সরা তার নিঃশ্বাস রেখে ছেয়ে ছিলো ছায়াপথ,

স্বপ্নবিলাসী খোলসে বসিয়া উড়িছে আলোর রথ।

জারুল ফুলের গন্ধসুবাসী রূপসীর দু’টি বৃন্ত,

কোমলতা ছুঁয়ে মায়াবী চূড়ার, অমানিশা অবিশ্রান্ত।

কুমারী জারুল চিত্রিত পটে বিস্মৃত নদীতট,

নিপতিত ফুল, বেগুনী জারুল, সাজিয়েছে মেঠোপথ।

দুঃখবিলাসী স্মৃতির আখরে, অবিনাশী মধুমাস,

তরু উদ্যানে, পুষ্পের সারি, নারীর ইশারা বাস।

——————————————————————

রচনাতারিখ: ০১লা আগস্ট, ২০২১ সাল

রচনাসময়: রাত ১২টা ৩৪ মিনিট

XXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXXX

Love Meeting

——– Ramit Azad

May be art of 1 person, sitting and indoor

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.