Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প সুকুমার রায়

পাগলা দাশু

— সুকুমার রায়

আমাদের স্কুলের যত ছাত্র তাহাদের মধ্যে এমন কেহই ছিল না, যে পাগলা দাশুকে না চিনে। যে লোক আর কাহাকেও জানে না, সেও সকলের আগে দাশুকে চিনিয়া ফেলে। সেবার এক নতুন দারোয়ান আসিল, একেবারে আন্‌‌কোরা পাড়াগেঁয়ে লোক, কিন্তু প্রথম যখন সে পাগলা দাশুর নাম শুনিল, তখনই আন্দাজে ঠিক করিয়া লইল যে, এই ব্যক্তিই পাগলা দাশু। কারণ মুখের চেহারায়, কথাবার্তায়, চাল-চলনে বোঝা যাইত যে তাহার মাথায় একটু ‘ছিট’ আছে। তাহার চোখ দুটি গোল গোল, কান দুটি অনাবশ্যক রকমের বড়, মাথায় একবস্তা ঝাঁকড়া চুল। চেহারাটা দেখিলেই মনে হয়—

ক্ষীণদেহ খর্বকায় মুণ্ডু তাহে ভারি
যশোরের কই যেন নরমূর্তিধারি।

সে যখন তাড়াতাড়ি চলে অথবা ব্যস্ত হইয়া কথা বলে, তখন তাহার হাত পা ছোঁড়ার ভঙ্গী দেখিয়া হঠাৎ কেন জানি চিংড়িমাছের কথা মনে পড়ে।

সে যে বোকা ছিল তাহা নয়। অঙ্ক কষিবার সময়, বিশেষত লম্বা লম্বা গুণ-ভাগের বেলায় তাহার আশ্চর্য মাথা খুলিত। আবার এক এক সময় সে আমাদের বোকা বানাইয়া তামাশা দেখিবার জন্য এমন সকল ফন্দি বাহির করিত যে, আমরা তাহার বুদ্ধি দেখিয়া অবাক হইয়া থাকিতাম।

‘দাশু’ অর্থাৎ দাশরথি, যখন প্রথম আমাদের ইস্কুলে ভরতি হয়, তখন জগবন্ধুকে আমাদের ‘ক্লাশের ভালো ছেলে’ বলিয়া সকলে জানিত। সে পড়াশোনায় ভালো হইলেও, তাহার মতো অমন একটি হিংসুটে ভিজেবেড়াল আমরা আর দেখি নাই। দাশু একদিন জগবন্ধুর কাছে কি একটা ইংরাজি কথার মানে জিজ্ঞাসা করিতে গিয়াছিল। জগবন্ধু তাহাকে খামখা দুকথা শুনাইয়া বলিল, “আমার বুঝি আর খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই ? আজ একে ইংরাজি বোঝাব, কাল ওর অঙ্ক কষে দেব, পরশু আর একজন আসবেন আর এক ফরমাইস নিয়ে— ঐ করি আর কি !” দাশু সাংঘাতিক চটিয়া বলিল, “তুমি তো ভারি ছ্যাঁচড়া ছোটলোক !” জগবন্ধু পণ্ডিত মশায়ের কাছে নালিশ করিল, “ঐ নতুন ছেলেটা আমায় গালাগালি দিচ্ছে।” পণ্ডিত মহাশয় দাশুকে এমনি ধমক দিয়া দিলেন যে বেচারা একেবারে দমিয়া গেল।

আমাদের ইংরাজি পড়াইতেন বিষ্টুবাবু। জগবন্ধু তাঁহার প্রিয় ছাত্র। পড়াইতে পড়াইতে যখনই তাঁহার বই দরকার হয়, তিনি জগবন্ধুর কাছে বই চাহিয়া লন। একদিন তিনি পড়াইবার সময় ‘গ্রামার’ চাহিলেন, জগবন্ধু তাড়াতাড়ি তাহার সবুজ কাপড়ের মলাট দেওয়া ‘গ্রামার’ খানা বাহির করিয়া দিল। মাস্টার মহাশয় বইখানি খুলিয়াই হঠাৎ গম্ভীর হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “বইখানা কার ?” জগবন্ধু বুক ফুলাইয়া বলিল, “আমার”। মাস্টার মহাশয় বলিলেন, “হুঁ— নতুন সংস্করণ বুঝি ? বইকে-বই একেবারে বদলে গেছে।” এই বলিয়া তিনি পড়িতে লাগিলেন— ‘যশোবন্ত দারোগা— লোমহর্ষক ডিটেকটিভ নাটক।’ জগবন্ধু ব্যাপারখানা বুঝিতে না পারিয়া বোকার মতো তাকাইয়া রহিল। মাস্টার মহাশয় বিকট রকম চোখ পাকাইয়া বলিলেন, “এই সব জ্যাঠামি বিদ্যে শিখছ বুঝি ?” জগবন্ধু আম্‌তা আম্‌তা করিয়া কি যেন বলিতে যাইতেছিল, কিন্তু মাস্টার মহাশয় এক ধমক দিয়া বলিলেন, “থাক্‌ থাক্‌, আর ভালমানুষি দেখিয়ে কাজ নেই— ঢের হয়েছে।” লজ্জায় অপমানে জগবান্ধুর দুই কান লাল হইয়া উঠিল— আমরা সকলেই তাহাতে বেশ খুশি হইলাম। পরে জানা গেল যে, এটিও দাশু ভায়ার কীর্তি, সে মজা দেখিবার জন্য উপক্রমণিকার জায়গায় ঠিক ঐরূপ মলাট দেওয়া একখানা বই রাখিয়া দিয়াছিল।

দাশুকে লইয়া আমরা সর্বদাই ঠাট্টাতামাশা করিতাম এবং তাহার সামনেই তাহার বুদ্ধি ও চেহারা সম্বন্ধে অপ্রীতিকর সমালোচনা করিতাম। তাহাতে একদিনও তাহাকে বিরক্ত হইতে দেখি নাই। এক এক সময়ে সে নিজেই আমাদের মন্তব্যের উপর রঙ চড়াইয়া নিজের সম্বন্ধে নানারকম অদ্ভুত গল্প বলিত। একদিন সে বলিল, “ভাই, আমাদের পাড়ায় যখন কেউ আমসত্ত্ব বানায় তখনই আমার ডাক পড়ে। কেন জানিস ?” আমরা বলিলাম, “খুব আমসত্ত্ব খাস বুঝি ?” সে বলিল, “তা নয়। যখন আমতত্ত্ব শুকোতে দেয়, আমি সেইখানে ছাদের উপর বার দুয়েক চেহারাখানা দেখিয়ে আসি। তাতেই, ত্রিসীমানার যত কাক সব ত্রাহি ত্রাহি করে ছুটে পালায় কাজেই আর আমসত্ত্ব পাহারা দিতে হয় না।”

একবার সে হঠাৎ পেন্টেলুন পরিয়া স্কুলে হাজির হইল। ঢল্‌ঢলে পায়জামার মতো পেন্টেলুন আর তাকিয়ার খোলের মতো কোট পরিয়া তাহাকে যে কিরূপ অদ্ভুত দেখাইতেছিল, তাহা সে নিজেই বুঝিতেছিল এবং তাহার কাছে ভারি একটা ব্যাপার বলিয়া বোধ হইতেছিল। আমরা জিজ্ঞাসা করিলাম, “পেন্টেলুন পরেছিস্‌ কেন ?” দাশু এক গাল হাসিয়া বলিল, “ভালো ইংরাজি শিখব ব’লে।” আর একবার সে খামখা নেড়া মাথায় এক পট্টি বাঁধিয়া ক্লাশে আরম্ভ করিল এবং আমরা সকলে তাহা লইয়া ঠাট্টা তামাশা করায় যারপরনাই খুশি হইয়া উঠিল। দাশু আদপেই গান গাহিতে পারে না, তাহার যে তালজ্ঞান বা সুরজ্ঞান একেবারে নাই, একথা সে বেশ জানে। তবু সেবার ইনস্পেক্টার সাহেব যখন ইস্কুল দেখিতে আসেন, তখন আমাদের খুশি করিবার জন্য চিৎকার করিয়া গান শুনাইয়াছিল। আমরা কেহ ওরূপ করিলে সেদিন রীতিমত শাস্তি পাইতাম, কিন্তু দাশু ‘পাগলা’ বলিয়া তাহার কোনো শাস্তি হইল না।

একবার ছুটির পরে দাশু অদ্ভুত এক বাক্স লইয়া ক্লাসে হাজির হইল। মাস্টার মহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি দাশু, ও বাক্সের মধ্যে কি আছে ?” দাশু বলিল, “আজ্ঞে, আমার জিনিসপত্র।” জিনিসপত্রটা কিরূপ হইতে পারে, এই লইয়া আমাদের মধ্যে বেশ একটা তর্ক হইয়া গেল। দাশুর সঙ্গে বই, খাতা, পেনসিল, ছুরি সবই তো আছে, তবে আবার জিনিসপত্র কি বাপু? দাশুকে জিজ্ঞাসা করিলাম, সে সোজাসুজি কোনো উত্তর না দিয়া বাক্সটিকে আঁকড়াইয়া ধরিল এবং বলিল, “খবরদার, আমার বাক্স তোমরা কেউ ঘেঁটো না।” তাহার পর চাবি দিয়া বাক্সটাকে একটুখানি ফাঁক করিয়া, সে তাহার ভিতর দিয়া কি যেন দেখিল, এবং ‘ঠিক আছে’ বলিয়া গম্ভীরভাবে মাথা নাড়িয়া বিড় বিড় করিয়া হিসাব করিতে লাগিল। আমি একটুখানি দেখিবার জন্য উঁকি মারিতে গিয়াছিলাম— অমনি পাগলা মহা ব্যস্ত হইয়া তাড়াতাড়ি চাবি ঘুরাইয়া বাক্স বন্ধ করিয়া ফেলিল।

ক্রমে আমাদের মধ্যে তুমুল আলোচনা আরম্ভ হইল। কেহ বলিল, “ওটা ওর টিফিনের বাক্স— ওর মধ্যে খাবার আছে।” কিন্তু একদিনও টিফিনের সময় তাহাকে বাক্স খুলিয়া কিছু খাইতে দেখিলাম না। কেহ বলিল, “ওটা বোধ হয় ওর মানি-ব্যাগ— ওর মধ্যে টাকা পয়সা আছে, তাই ও সর্বদা কাছে কাছে রাখতে চায়। আর একজন বলিল, “টাকা পয়সার জন্য অত বড় বাক্স কেন ? ও কি ইস্কুলে মহাজনী কারবার খুলবে নাকি ?”

একদিন টিফিনের সময় দাশু হঠাৎ ব্যস্ত হইয়া, বাক্সের চাবিটা আমার কাছে রাখিয়া গেল আর বলিল, “ওটা এখন তোমার কাছে রাখো, দেখো হারায় না যেন। আর আমার আসতে যদি একটু দেরি হয়, তবে তোমরা ক্লাশে যাবার আগে ওটা দারোয়ানের কাছে দিও।” এই বলিয়া বাক্সটি দারোয়ানের জিম্মায় রাখিয়া বাহির হইয়া গেল। তখন আমাদের উৎসাহ দেখে কে! এতদিনে সুবিধা পাওয়া গিয়াছে, এখন দারোয়ানটা একটু তফাৎ গেলেই হয়। খানিক বাদে দারোয়ান তাহার রুটি পাকাইবার লোহার উনানটি ধরাইয়া, কতকগুলি বাসনপত্র লইয়া কলতলার দিকে গেল। আমরা এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম, দারোয়ান আড়াল হওয়া মাত্র, আমরা পাঁচ-সাতজনে তাহার ঘরের কাছে সেই বাক্সের উপর ঝুঁকিয়া পড়িলাম। তাহার পর আমি চাবি দিয়া বাক্স খুলিয়া দেখি বাক্সের মধ্যে বেশ ভারি একটা কাগজের পোঁটলা ন্যাকড়ার ফালি দিয়া খুব করিয়া জড়ানো। তাড়াতাড়ি পোঁটলার প্যাঁচ খুলিয়া দেখা গেল, তাহার মধ্যে একখানা কাগজের বাক্স— তাহার ভিতর আর একটা ছোট পোঁটলা। সেটি খুলিয়া একখানা কার্ড বাহির হইল, তাহার এক পিঠে লেখা, ‘কাঁচকলা খাও’ আর একটি পিঠে লেখা ‘অতিরিক্ত কৌতুহল ভালো নয়।’ দেখিয়া আমরা এ-উহার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিতে লাগিলাম। সকলের শেষে একজন বলিয়া উঠিল, “ছোকরা আচ্ছা যা হোক, আমাদের বেজায় ঠকিয়েছে।” আর একজন বলিল, “যেমন ভাবে বাঁধা ছিল তেমনি করে রেখে দাও, সে যেন টেরও না পায় যে আমরা খুলেছিলাম। তাহলে সে নিজেই জব্দ হবে।” আমি বলিলাম, “বেশ কথা। ও আস্‌‌লে পরে তোমরা খুব ভালোমানুষের মতো বাক্সটা দেখাতে বলো আর ওর মধ্যে কি আছে, সেটা বার বার করে জানতে চেয়ো।” তখন আমরা তাড়াতাড়ি কগজপত্রগুলি বাঁধিয়া, আগেকার মতো পোঁটলা পাকাইয়া বাক্সে ভরিয়া ফেলিলাম।

বাক্সে চাবি দিতে যাইতেছি, এমন সময় হো হো করিয়া একটা হাসির শব্দ শোনা গেল— চাহিয়া দেখি পাঁচিলের উপরে বসিয়া পাগলা দাশু হাসিয়া কুটিকুটি। হতভাগা এতক্ষণ চুপি চুপি তামাশা দেখিতেছিল। তাখন বুঝিলাম আমার কাছে চাবি দেওয়া, দারোয়ানের কাছে বাক্স রাখা, টিফিনের সময় বাহিরে যাওয়ার ভান করা এ সমস্ত তাহার শয়তানি। খামখা আমাদের আহাম্মক বানাইবার জন্যই সে মিছিমিছি এ কয়দিন ক্রমাগত একটা বাক্স বহিয়া বেড়াইতেছে।

সাধে কি বলি ‘পাগলা দাশু ?’

Categories
ইজি পাবলিকেশনস ইপুস্তকসমূহ(eBooks) জীবনী ও স্মৃতিকথা

ড. রমিত আজাদ এর প্রকাশিত ইপুস্তক “১৯৮১ সালের ৩০শে মে, একটি নক্ষত্রের ঝরে পড়া, শোকে মূহ্যমান জাতি”

আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বিশিষ্ট লেখক ড. রমিত আজাদ এর একটি ইপস্তক আমরা প্রকাশ করেছি । ইপস্তকটির নাম ”১৯৮১ সালের ৩০শে মে, একটি নক্ষত্রের ঝরে পড়া, শোকে মূহ্যমান জাতি” ” ।

এ ইপুস্তকটি ইজি পাবলিকেশনসে প্রকাশিত লেখকের ২য় ইপুস্তক ।

ইপুস্তক(eBook)টি সরাসরি ডাউনলোড করুন আর উপভোগ করুন বাংলাদেশের একজন সফল রাস্ট্র নায়কের সত্য ইতিহাস ।

ডাউনলোড লিংকঃ http://allfreebd.com/dr-ramit-azad-ebooks/

ইজি পাবলিকেশনসে সকল ধরনের ইপুস্তক প্রকাশ ও ডাউনলোড করুন বিনামূল্যে ।

বিস্তারিতঃ

ইপুস্তক প্রকাশ সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন ।

পুস্তক প্রকাশ সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন ।

 

–ইজি পাবলিকেশনস্ প্রকাশক ।

Categories
ইজি পাবলিকেশনস ইপুস্তকসমূহ(eBooks) উপন্যাস

ড. রমিত আজাদ এর প্রকাশিত ইপুস্তক ‘বিষন্ন বিরিওজা’

আমরা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বিশিষ্ট লেখক ড. রমিত আজাদ এর একটি ইপস্তক আমরা প্রকাশ করেছি । ইপস্তকটির নাম ”বিষন্ন বিরিওজা (পর্ব ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮ ও ৯)” ।

ইপুস্তক(eBook)টি সরাসরি ডাউনলোড করুন আর উপভোগ করুন অসাধারণ গল্প ।

ডাউনলোড লিংকঃ http://allfreebd.com/dr-ramit-azad-ebooks/

ইজি পাবলিকেশনসে সকল ধরনের ইপুস্তক প্রকাশ ও ডাউনলোড করুন বিনামূল্যে ।

বিস্তারিতঃ

ইপুস্তক প্রকাশ সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন ।

পুস্তক প্রকাশ সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন ।

 

–ইজি পাবলিকেশনস্ প্রকাশক ।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা জীবনী ও স্মৃতিকথা নির্মলেন্দু গুণ বিনোদন সৃজনশীল প্রকাশনা

আমাদের ছোট নদী

–নির্মলেন্দু গুণ

গ্রামের দক্ষিণ-পূর্ব দিক ঘেঁষে ছোট্ট নদী ধলাই দূষণ আর মানুষের লোভের ফাঁদে পড়ে আমাদের অনেক নদীই আজ শ্রীহীন। স্মৃতির প্রিয় স্রোতস্বিনী হারিয়েছে তাঁর সোনালি যৌবন। এই আয়োজন আদতে বাংলাদেশের সব বিপদাপন্ন নদ-নদীর জন্য এক শোকগাথা। বর্ষায় ফুটে ওঠে বাংলাদেশের নদ-নদীর সত্যিকার রূপ। তাই বর্ষার প্রারম্ভেই নদী নিয়ে আমাদের এই আয়োজন।

‘আমি এখন পড়ি যে ভাই বারহাট্টা হাইস্কুলে,
একে অন্যে থাকি হেথায় ভাই বন্ধু বলে।
এই স্কুলটি অবস্থিত কংশ নদের তীরে,
আমাদের বাড়ি হইতে দেড় মাইল উত্তরে।’

এটি হচ্ছে আমার রচিত প্রথম কবিতা। আমার ছেলেবেলা গ্রন্থে কবিতাটির জন্মকথা বর্ণিত হয়েছে। তা ছাড়া, বহু সাক্ষার‌্যাকারে আমি এই কবিতার জন্মকথা বলেছি। বলতে হয়েছে। তাই সেই পুরোনো কাহিনি আর বলছি না। আমার কবিতার কথা বাদ দিয়ে এই সুযোগে বরং পৃথিবীর প্রথম কবিতাটির জন্মকথা বলি।

মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ।

এই বাক্যটিকেই পৃথিবীর আদিকবিতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর রচয়িতা হচ্ছেন বাল্মীকি। বিশ্ব-কবিসম্রাট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত-অভিনীত বাল্মীকিপ্রতিভা দ্রষ্টব্য। কবি হওয়ার আগে বাল্মীকি ছিলেন ‘দস্যু রত্নাকর’ হিসেবে খ্যাত। তিনি ডাকাতি করতে ভালোবাসতেন। মহর্ষি নারদের কৃপায় তিনি কবিত্বশক্তি লাভ করেন এবং বনের ভেতরে বৃক্ষশাখায় মিথুনরত পাখি নিধনকারী ব্যাধকে অভিশাপ দিয়ে অনেকটা নিজের অজান্তেই এই বাক্য উচ্চারণ করে বসেন। এই পঙিক্তকেই বলা হয় পৃথিবীর প্রথম কাব্যপঙিক্ত বা কবিতা। আদিকাব্যপঙিক্ত, আদিকাব্য।
প্রশ্ন উঠতে পারে, আমার জীবনের প্রথম কবিতাটির সঙ্গে ‘কংশ’ নদের সম্পর্কসূত্রটি না হয় পাওয়া গেল, কিন্তু পৃথিবীর প্রথম কবিতার বা তার রচয়িতা হঠার‌্যা-কবি বাল্মীকির সম্পর্ক কোথায়? সেখানে তো ‘আমাদের ছোট নদী’র কথা নেই। আমি বলছি, আছে। একটু ধৈর্য ধরতে হবে। আছে এইখানে যে, ‘মা নিষাদ’ রচনা করার সময় বাল্মীকি তমসা নদী-তীরবর্তী এক গভীর অরণ্যে বাস করতেন। বাল্মীকির নদী তমসা, আমার নদী কংশ। প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও, আমি তাই বাল্মীকি ও আমার জীবনের মধ্যে একটা মিল খুঁজে পাচ্ছি। মিলটা হচ্ছে নদীর মিল।
নদীসংখ্যা বিচারে আমি মনে হয় আদিকবির চেয়ে এগিয়ে রয়েছি। বাল্মীকির নদী ছিল একটি, আমার নদীসংখ্যা হচ্ছে দুই। পাঠকের সন্দেহ ভঞ্জনের জন্য বর্তমান রচনার মধ্যে আমার নদীযুগলের প্রামাণ্য আলোকচিত্র উপস্থাপিত হলো। যিনি আমার গ্রামে গিয়ে আমার দুই প্রিয় নদীর ছবি তুলে আমাকে পাঠিয়েছেন, তাঁকে অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। খুব সুন্দর ছবি হয়েছে। ছবি হচ্ছে স্মৃতির টনিক। কত কথাই যে মনে পড়ল ওই নদীর ছবি দেখে! আমার দুটো উপন্যাস আছে। কিশোর উপন্যাস কালো মেঘের ভেলা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য রচিত উপন্যাস দেশান্তর। এই দুই উপন্যাসেই ধলাই নদীর প্রসঙ্গ এসেছে, ধলাই নদীর বর্ষাকালীন রূপের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু কবিতায় নয় কেন? মনে হয়, কোনো অব্যাখ্যাত অজানা কারণে আমার কবিতা দখল করে নিয়েছিল কংশ; ধলাই তা পছন্দ করেনি। অভিমানে দূরে সরে যাওয়া ধলাই ফিরে এসেছে আমার উপন্যাসে।
‘সব গ্রামেই তো আর নদী নেই, আমাদের গ্রামে আছে, তাই আমাদের বুকে ভয়।’ ১৯৭১ সালে এই কবিতাটি লেখার সময় আমি ধলাইকেই মনে রেখেছিলাম। আমার গ্রামের দক্ষিণ ও পূর্ব সীমানা ছুঁয়ে বয়ে যাওয়া নদীটি আমার কবিতায় না এলেও আমার ছেলেবেলায় ওই নদীর বর্ণনা যথাযথ মর্যাদায় লিপিবদ্ধ হয়েছে।

‘আমাদের গ্রামের দক্ষিণ-পূর্ব দিক ঘেঁষে একটি ছোট্ট নদী আছে। নাম ধলাই। এটি কংশ থেকে বেরিয়ে আসা ধনাইখালির একটি শাখা। আমাদের গ্রামের দক্ষিণ-পূর্ব দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গিয়ে মিশেছে রাজাখালি নদীর সঙ্গে। ঐ নদীতীরেই গাঁয়ের শ্মশান। আমাদের পূর্ব-পুরুষদের জায়গার অভাব ছিলো না বলে শ্মশানের জন্য অনেকটা জায়গা তাঁরা ছেড়ে দিয়েছিলেন। নদীতীরের ঐ উদ্বৃত্ত জায়গাটাকে আমরা খেলার মাঠে পরিণত করেছিলাম। মাঠটি ছিলো ত্রিকোনাকৃতির। একটু অসুবিধা হলেও আমরা ঐ রকম মাঠে খেলতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। মাঠটি ছিলো খুবই উঁচু, বৃষ্টির দিনেও মাঠে জল জমতো না, কাদা হতো না, ফলে আমরা প্রাণ ভরে ঐ মাঠে ফুটবল খেলতে পারতাম।’
(আমার ছেলেবেলা: পৃ-৬২)

এরশাদ সাহেব তাঁর শাসনামলে মাঠটি সরকারি দখলে নিয়ে সেখানে গুচ্ছগ্রাম বানিয়েছেন। এটি কখনোই সরকারি খাসজমি ছিল না, ছিল আমাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া দেবোত্তর সম্পত্তি। গ্রামের কিছু গৃহহীন মানুষ সেখানে আশ্রয় পেয়েছে বলে তখন আমি আর প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করিনি। মনে মনে করেছি। এখনো করি।
ধলাই নদীর ছবিগুলো দেখছি আমাদের শ্মশানঘাট থেকেই তোলা হয়েছে। মন্দ নয়, ধলাইয়ের ছবিতে সওয়ার হয়ে আমাদের গ্রামের শ্মশানঘাটের ছবিটিও ‘ছুটির দিনে’তে ছাপা হয়ে থেকে গেল।

রবীন্দ্রনাথ ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে-বাঁকে / বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে…’ বলে যে কবিতাটি লিখেছেন, সেটি একটি চমর‌্যাকার কবিতা। কোনোই সন্দেহ নেই। কিন্তু আমি ভাবছি, যে নদীর গ্রীষ্মকালীন দৈন্যদশার নিখুঁত চিত্র তিনি এঁকেছেন তাঁর কবিতায়, সেটি তাঁর নিজের নদী ছিল না। নিজের নদীকে নিয়ে এমন কবিতা লেখা যায় না। আসলে তিনি তো জন্মসূত্রে কোনো নদী পাননি। মাইকেল পেয়েছিলেন কপোতাক্ষ, জীবনানন্দ ধানসিড়ি। ভাগ্যিস, শিলাইদহে এসেছিলেন তিনি। তাই পদ্মাকে পেয়েছিলেন বুকের মাঝে, আপন করে। আমার সে রকম সমস্যা নেই। আমার উত্তরে কংশ, দক্ষিণে ধলাই। এই দুই নদের মাঝখানের সমতটে আমার জন্মের বসতি। গ্রীষ্মকালে এই দুই ছোট নদীর দৈন্যজলদশা আমিও দেখেছি বটে, কিন্তু আমি আমার ধলাই বা কংশকে সেভাবে আঁকিনি। আমি কংশকে তুলনা করেছি সমুদ্রের সঙ্গে।

‘একবার এসেই দেখুন কংশ নদের সাথে সমুদ্রের বেশ মিল আছে।
হাসবেন না, দোহাই, আমাদের গাঁয়ের লোকেরা খুব কষ্ট পাবে।
একবার এসেই দেখুন নিজ চোখে, কংশ কোনো যা তা নদী নয়,
রীতিমতো, বেগবান—বেশ চওড়া-সওড়া। না, এর জল
সাধারণ নদীর মতোন এত মিঠা নয়, একটু লবণ লবণ ভাব আছে।
দুর্গা বিসর্জনে গিয়ে এর লবণজলের স্বাদে আমি বারবার আঁতকে উঠেছি—
আরে, এ তো শুধু নদী নয়, এ যে সমুদ্রের ছদ্মবেশী রূপ।
কোনো দিন কাউকে বলিনি, শুধু সুদূর শৈশব থেকে মনে-মনে
মিলিয়েছি বারহাট্টার সাথে কক্সবাজার, কংশের সাথে বঙ্গোপসাগর।’

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো ।
Categories
অনলাইন প্রকাশনা খ্রীষ্টধর্মীয় ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা

বড়দিন বা খ্রিষ্টমাস(Merry Christmas)

বড়দিন বা খ্রিষ্টমাস (ইংরেজি: Christmas বা Christmas Day) একটি বাৎসরিক খ্রিষ্টীয় উৎসব। ২৫ ডিসেম্বর তারিখে যিশু খ্রিষ্টের জন্মদিন উপলক্ষ্যে এই উৎসব পালিত হয়।এই দিনটিই যিশুর প্রকৃত জন্মদিন কিনা তা জানা যায় না। আদিযুগীয় খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস অনুসারে, এই তারিখের ঠিক নয় মাস পূর্বে মেরির গর্ভে প্রবেশ করেন যিশু। সম্ভবত, এই হিসাব অনুসারেই ২৫ ডিসেম্বর তারিখটিকে যিশুর জন্মতারিখ ধরা হয়। অন্যমতে একটি ঐতিহাসিক রোমান উৎসব অথবা উত্তর গোলার্ধের দক্ষিণ অয়নান্ত দিবসের অনুষঙ্গেই ২৫ ডিসেম্বর তারিখে যিশুর জন্মজয়ন্তী পালনের প্রথাটির সূত্রপাত হয়।বড়দিন বড়দিনের ছুটির কেন্দ্রীয় দিন এবং খ্রিষ্টধর্মে বারো দিনব্যাপী খ্রিষ্টমাসটাইড অনুষ্ঠানের সূচনাদিবস।

বড়দিন

প্রকৃতিগতভাবে একটি খ্রিষ্টীয় ধর্মানুষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও, একাধিক অ-খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ও মহাসমারোহে বড়দিন উৎসব পালন করে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে উৎসবের আয়োজনে প্রাক-খ্রিষ্টীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ বিষয়ভাবনার সমাবেশও দেখা যায়। উপহার প্রদান, সংগীত, খ্রিষ্টমাস কার্ড বিনিময়, গির্জায় ধর্মোপাসনা, ভোজ, এবং খ্রিষ্টমাস বৃক্ষ, আলোকসজ্জা, মালা, মিসলটো, যিশুর জন্মদৃশ্য, এবং হলি সমন্বিত এক বিশেষ ধরনের সাজসজ্জার প্রদর্শনী আধুনিককালে বড়দিন উৎসব উদযাপনের অঙ্গ। কোনো কোনো দেশে ফাদার খ্রিষ্টমাস (উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও আয়ারল্যান্ডে সান্টাক্লজ) কর্তৃক ছোটোদের জন্য বড়দিনে উপহার আনার উপকথাটি বেশ জনপ্রিয়।

উপহার প্রদানের রীতিটি সহ বড়দিন উৎসবের নানা অনুষঙ্গ খ্রিষ্টান ও অ-খ্রিষ্টানদের অর্থনীতিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই উৎসব উপলক্ষ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয়ের একটি বিশেষ মরসুম চলে। বিগত কয়েকটি শতাব্দীতে বিশ্বে বিভিন্ন অঞ্চলে বড়দিনের অর্থনৈতিক প্রভাবটি ধীরে ধীরে প্রসারিত হতে দেখে গেছে। ভারত ও বাংলাদেশে বড়দিন একটি রাষ্ট্রীয় ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়।

ব্যুৎপত্তিঃ

খ্রিষ্টের নামের আদ্যক্ষর X বা চি; একটি হিব্রু প্রতীকচিহ্নে

ইংরেজি খ্রিষ্টমাস (Christmas) শব্দটি “খ্রিষ্টের মাস (উৎসব)” শব্দবন্ধটির যুগ্ম অর্থ থেকে উৎসারিত। শব্দটির ব্যুৎপত্তি ঘটে মধ্য ইংরেজি Christemasse ও আদি ইংরেজি Cristes mæsse শব্দ থেকে। শেষোক্ত শব্দটির প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায় ১০৩৮ সালের একটি রচনায়। “Cristes” শব্দটি আবার গ্রিক Christos এবং “mæsse” শব্দটি লাতিন missa (পবিত্র উৎসব) শব্দ থেকে উদগত। প্রাচীন গ্রিক ভাষায় Χ (চি) হল Christ বা খ্রিষ্ট শব্দের প্রথম অক্ষর। এই অক্ষরটি লাতিন অক্ষর X-এর সমরূপ। ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে তাই এই অক্ষরটি খ্রিষ্ট শব্দের নামসংক্ষেপ হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু হয়। এই কারণে খ্রিষ্টমাসের নামসংক্ষেপ হিসেবে এক্সমাস কথাটি চালু হয়।

আকাদেমি বিদ্যার্থী বাংলা অভিধানে যিশু খ্রিষ্টের জন্মোৎসব খ্রিষ্টমাস উৎসবটিকে বাংলায় বড়দিন আখ্যা দেওয়ার কারণটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে: “২৩ ডিসেম্বর থেকে দিন ক্রমশ বড়ো এবং রাত ছোটো হতে আরম্ভ করে”।

 

উদযাপনঃ

বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রেই বড়দিন একটি প্রধান উৎসব তথা সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। এমনকি অ-খ্রিষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ কয়েকটি দেশেও মহাসমারোহে বড়দিন উদযাপিত হতে দেখা যায়। কয়েকটি অ-খ্রিষ্টান দেশে পূর্বতন ঔপনিবেশিক শাসনকালে বড়দিন উদযাপনের সূত্রপাত ঘটেছিল। অন্যান্য দেশগুলিতে সংখ্যালঘু খ্রিষ্টান জনসাধারণ অথবা বৈদেশিক সংস্কৃতির প্রভাবে বড়দিন উদযাপন শুরু হয়। তবে চীন (হংকং ও ম্যাকাও বাদে), জাপান, সৌদি আরব, আলজেরিয়া, থাইল্যান্ড, নেপাল, ইরান, তুরস্ক ও উত্তর কোরিয়ার মতো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দেশে বড়দিন সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয় না।

অধিকাংশ দেশে প্রতি বছর বড়দিন পালিত হয় ২৫ ডিসেম্বর তারিখে। তবে রাশিয়া, জর্জিয়া, মিশর, আর্মেনিয়া, ইউক্রেন ও সার্বিয়ার মতো কয়েকটি ইস্টার্ন ন্যাশানাল চার্চ ৭ জানুয়ারি তারিখে বড়দিন পালন করে থাকে। কারণ এই সকল চার্চ ঐতিহ্যশালী জুলিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে থাকে; জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ২৫ ডিসেম্বর প্রামাণ্য জর্জিয়ান ক্যালেন্ডারের ৭ জানুয়ারি তারিখে পড়ে।

সারা বিশ্বে, সাংস্কৃতিক ও জাতীয় ঐতিহ্যগত পার্থক্যের পরিপ্রেক্ষিতে বড়দিন উৎসব উদযাপনের রূপটিও ভিন্ন হয়ে থাকে। জাপান ও কোরিয়ার মতো দেশে খ্রিষ্টানদের সংখ্যা আনুপাতিকভাবে কম হলেও বড়দিন একটি জনপ্রিয় উৎসব। এই সব দেশে উপহার প্রদান, সাজসজ্জা, ও খ্রিষ্টমাস বৃক্ষের মতো বড়দিনের ধর্মনিরপেক্ষ দিকগুলি গৃহীত হয়েছে।

 

যিশুর জন্মোৎসবঃ

শিশু যিশুর বন্দনা (Adorazione del Bambino) (১৪৩৯-৪৩); ফ্লোরেনটাইন চিত্রকর ফ্রা অ্যাঞ্জেলিকো কৃত ম্যুরাল

খ্রিষ্টধর্মে খ্রিষ্টমাস বা বড়দিন হল যিশুর জন্মোৎসব। খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, আদি বাইবেলর ত্রাণকর্তা-সংক্রান্ত একাধিক ভবিষ্যদবাণীতে বলা হয়েছে যে কুমারী মেরির গর্ভে তাঁদের মসিহা বা ত্রাণকর্তার জন্ম হবে। নূতন নিয়ম বা নূতন বাইবেলের মথিলিখিত সুসমাচার (মথি ১: ১৮ – ২: ১২) এবং লূকলিখিত সুসমাচার (লূক ১: ২৬ – ২: ৪০)-এ বর্ণিত যিশুর জন্মকাহিনী খ্রিষ্টমাস উৎসবের মূলভিত্তি। এই উপাখ্যান অনুসারে, স্বামী জোসেফের সাহচর্যে বেথলেহেম শহরে উপস্থিত হয়ে মেরি যিশুর জন্ম দেন। জনপ্রিয় ধারণা অনুযায়ী, একটি আস্তাবলে গবাদি পশু পরিবৃত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন যিশু। যদিও বাইবেলের উপাখ্যানে আস্তাবল বা গবাদি পশুর কোনো উল্লেখই নেই। যদিও লূকলিখিত সুসমাচারে (লূক ২: ৭) একটি যাবপাত্রের উল্লেখ আছে: “আর তিনি আপনার প্রথমজাত পুত্র প্রসব করিলেন, এবং তাঁহাকে কাপড়ে জড়াইয়া যাবপাত্রে শোয়াইয়া রাখিলেন, কারণ পান্থশালায় তাঁহাদের জন্য স্থান ছিল না।” যিশুর জন্ম-সংক্রান্ত প্রথম দিকের চিত্রগুলিতে গবাদি পশু ও যাবপাত্র পরিবৃত একটি গুহায় যিশুর জন্মদৃশ্য দর্শানো হয়েছে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, এটি বেথলেহেমের চার্চ অফ দ্য নেটিভিটির অভ্যন্তরে। এক স্বর্গদূত বেথলেহেমের চারিপার্শ্বস্থ মাঠের মেষপালকদের যিশুর জন্ম সম্বন্ধে অবহিত করেন। এই কারণে তাঁরাই সেই দিব্য শিশুকে প্রথম দর্শন করার সৌভাগ্য অর্জন করেন।

অনেক খ্রিষ্টানই মনে করেন, যিশুর জন্ম আদি বাইবেলের ত্রাণকর্তা-সংক্রান্ত ভবিষ্যদবাণীগুলিকে পূর্ণতা দেয়। মথিলিখিত সুসমাচার অনুসারে, কয়েকজন ম্যাজাই (জ্যোতিষী) স্বর্ণ, গন্ধতৈল ও ধূপ নিয়ে শিশুটিকে দর্শন করতে যান। কথিত আছে, একটি রহস্যময় তারা তাঁদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। সাধারণভাবে বেথলেহেমের তারা নামে পরিচিত এই তারাটি ছিল প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে ইহুদিদের রাজার জন্মবার্তার ঘোষক। ম্যাজাইদের আগমনের স্মরণে পালিত হয় ৬ জানুয়ারির এপিফেনি উৎসব। কোনো কোনো চার্চে এই ৬ জানুয়ারিতেই আনুষ্ঠানিকভাবে বড়দিন উৎসব সমাপ্ত হয়।

খ্রিষ্টানরা নানাভাবে বড়দিন উদযাপন করে থাকে। এগুলির মধ্যে বর্তমানে গির্জার উপাসনায় যোগ দেওয়া সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অন্যতম জনপ্রিয় প্রথা বলে বিবেচিত হয়। এছাড়াও রয়েছে অন্যান্য বিভিন্ন উপাসনা পদ্ধতি ও জনপ্রিয় রীতিনীতি। বড়দিনের পূর্বে যিশুর জন্মোৎসব উপলক্ষ্যে ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চ নেটিভিটি উপবাস পালন করে থাকে; অন্যদিকে পাশ্চাত্য খ্রিষ্টধর্মে অধিকাংশ চার্চে অ্যাডভেন্ট পালন করা হয়। বড়দিনের সর্বশেষ প্রস্তুতিটি নেওয়া হয় খ্রিষ্টমাস পূর্বসন্ধ্যায়।

বড়দিন উৎসব পর্বের অন্যতম অঙ্গ হল গৃহসজ্জা ও উপহার আদানপ্রদান। কোনো কোনো খ্রিষ্টীয় শাখাসম্প্রদায়ে ছোটো ছেলেমেয়েদের দ্বারা খ্রিষ্টের জন্মসংক্রান্ত নাটক অভিনয় এবং ক্যারোল গাওয়ার প্রথা বিদ্যমান। আবার খ্রিষ্টানদের কেউ কেউ তাঁদের গৃহে পুতুল সাজিয়ে খ্রিষ্টের জন্মদৃশ্যের ছোটো প্রদর্শনী করে থাকেন। এই দৃশ্যকে নেটিভিটি দৃশ্য বা ক্রিব বলে। এই ধরনের প্রদর্শনী উৎসবের মুখ্য আকর্ষণ হয়ে ওঠে। কোথাও কোথাও লাইভ নেটিভিটি দৃশ্য ও ট্যাবলো ভাইভ্যান্টও অনুষ্ঠিত হয়; এই জাতীয় অনুষ্ঠানে অভিনেতা ও জন্তুজানোয়ারের সাহায্যে যিশুর জন্মদৃশ্যের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়।

চিত্রশিল্পে যিশুর জন্মদৃশ্য ফুটিয়ে তোলার ঐতিহ্যটি সুদীর্ঘ। এই সকল দৃশ্যে মেরি, জোসেফ, শিশু যিশু, স্বর্গদূত, মেষপালক এবং যিশুর জন্মের পর বেথলেহেমের তারার সাহায্যে পথ চিনে তাঁকে দর্শন করতে আসা বালথাজার, মেলকোয়ার ও ক্যাসপার নামক তিন জ্ঞানী ব্যক্তির চিত্র অঙ্কন করা হয়।

বিভিন্ন সংস্কার

টরেন্টোর খ্রিষ্টমাস প্যারেডে সান্টাক্লজ

যে সকল দেশে খ্রিষ্টান সংস্কার প্রবল, সেখানে দেশজ আঞ্চলিক ও লোকসংস্কৃতির সঙ্গে মিলনের ফলে বড়দিন উদযাপনে নানা বৈচিত্র্য চোখে পড়ে। অনেক খ্রিষ্টানের কাছে ধর্মীয় উপাসনায় অংশ নেওয়া এই উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। উল্লেখ্য, বড়দিন ও ইস্টারের মরসুমেই গির্জায় জনসমাগম হয় সর্বাধিক।

অনেক ক্যাথলিক দেশে খ্রিষ্টমাসের পূর্বদিন ধর্মীয় শোভাযাত্রা বা কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়। অন্যান্য দেশে সান্টাক্লজ ও অন্যান্য মরসুমি চরিত্রদের নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। এই মরসুমের অন্যতম বহুলপ্রচলিত বৈশিষ্ট্য হল পারিবারিক সম্মেলন ও উপহার আদানপ্রদান। অধিকাংশ দেশেই বড়দিন উপলক্ষ্যে উপহার আদানপ্রদান হয়; আবার কোনো কোনো দেশে এই প্রথাটির জন্য বেছে নেওয়া হয় ৬ ডিসেম্বরের সেন্ট নিকোলাস ডে বা ৬ জানুয়ারির এপিফেনির দিনগুলি।

ইংল্যান্ডের খ্রিষ্টমাস পুডিং

অনেক পরিবারেই বড়দিন উপলক্ষ্যে বিশেষ পারিবারিক ভোজসভা আয়োজিত হয়। ভোজসভার খাদ্যতালিকা অবশ্য এক এক দেশে এক এক রকমের হয়। সিসিলি প্রভৃতি কয়েকটি অঞ্চলে খ্রিষ্টমাসের পূর্বসন্ধ্যায় যে ভোজসভা আয়োজিত হয় তাতে পরিবেশিত হয় বারো রকমের মাছ। ইংল্যান্ড ও ইংরেজি সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবান্বিত দেশগুলিতে সাধারণ বড়দিন ভোজসভার পদে দেখা যায় টার্কি (উত্তর আমেরিকা থেকে আনীত), আলু, শাকসবজি, সসেজ ও গ্রেভি; এছাড়াও থাকে খ্রিষ্টমাস পুডিং, মিন্স পাই ও ফ্রুট কেক। পোল্যান্ড, পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য দেশ ও স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলের ভোজে মাছের উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়; তবে এই সব অঞ্চলে ভেড়ার মাংসের মতো অত্যধিক-চর্বিওয়ালা মাংসের ব্যবহারও বাড়ছে। জার্মানি, ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়ায় হাঁস ও শূকরের মাংস বেশ জনপ্রিয়। এছাড়া প্রায় সারা বিশ্বেই গোমাংস, হ্যাম ও মুরগির যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। ফিলিপিনসের ভোজসভার প্রধান খাদ্য হল হ্যাম।

বিশেষ ধরনের টার্ট ও কেকের সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ ডেসার্টও তৈরি হয় খ্রিষ্টমাস উপলক্ষ্যে: ফ্রান্সে bûche de Noël বা ইতালিতে panettone। মিষ্টি আর চকোলেট সারা বিশ্বেই জনপ্রিয়। খ্রিষ্টমাসের বিশেষ মিষ্টিগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য জার্মান স্টোলেন, মারজিপান কেক বা ক্যান্ডি এবং জামাইকান রাম ফ্রুট কেক। উত্তর দেশগুলিতে শীতকালে যে অল্প কয়েকটি ফল পাওয়া যায় তার মধ্যে কমলালেবু খ্রিষ্টমাসের বিশেষ খাদ্য হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে পরিচিত।

সাজসজ্জা

বড়দিনের জন্য সুসজ্জিত একটি বাড়ি

বড়দিন উপলক্ষ্যে বিশেষ ধরনের সাজসজ্জার ইতিহাসটি অতি প্রাচীন। প্রাক-খ্রিষ্টীয় যুগে, রোমান সাম্রাজ্যের অধিবাসী শীতকালে চিরহরিৎ বৃক্ষের শাখাপ্রশাখা বাড়ির ভিতরে এনে সাজাত। খ্রিষ্টানরা এই জাতীয় প্রথাগুলিকে তাদের সৃজ্যমান রীতিনীতির মধ্যে স্থান দেয়। পঞ্চদশ শতাব্দীর লন্ডনের একটি লিখিত বর্ণনা থেকে জানা যায়, এই সময়কার প্রথানুসারে খ্রিষ্টমাস উপলক্ষ্যে প্রতিটি বাড়ি ও সকল গ্রামীণ গির্জা “হোম, আইভি ও বে এবং বছরের সেই মরসুমের যা কিছু সবুজ, তাই দিয়েই সুসজ্জিত করে তোলা হত।” প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, হৃদয়াকার আইভিলতার পাতা মর্ত্যে যিশুর আগমনের প্রতীক; হলি প্যাগান (অখ্রিষ্টান পৌত্তলিক) ও ডাইনিদের হাত থেকে রক্ষা করে; এর কাঁটার ক্রুশবিদ্ধকরণের সময় পরিহিত যিশুর কণ্টকমুকুট এবং লাল বেরিগুলি ক্রুশে যিশুর রক্তপাতের প্রতীক।

খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দীতে রোমে নেটিভিটি দৃশ্য প্রচলিত ছিল। ১২২৩ সালে সেন্ট ফ্রান্সিস অফ আসিসি এগুলিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। এরপর শীঘ্রই তা সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। সমগ্র খ্রিষ্টান বিশ্বে স্থানীয় প্রথা ও প্রাপ্ত দ্রব্যাদির অনুষঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সাজসজ্জার প্রথা চালু রয়েছে। ১৮৬০-এর দশকে শিশুদের হাতে নির্মিত কাগজের শিকলের অনুপ্রেরণায় প্রথম বাণিজ্যিক খ্রিষ্টমাস সজ্জা প্রদর্শিত হয়।

খ্রিষ্টমাস বৃক্ষ ও চিরহরিৎ শাখাপ্রশাখার ব্যবহার দক্ষিণ অয়নান্তকে ঘিরে প্যাগান প্রথা ও অনুষ্ঠানগুলির খ্রিষ্টীয়করণের ফলস্রুতি; এক ধরনের প্যাগান বৃক্ষপূজা অনুষ্ঠান থেকে এই প্রথাটি গৃহীত হয়েছিল। ইংরেজি ভাষায় “Christmas tree” শব্দটির প্রথম লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায় ১৮৩৫ সালে। শব্দটি গৃহীত হয়েছিল জার্মান ভাষা থেকে। মনে করা হয়, আধুনিক খ্রিষ্টমাস বৃক্ষের প্রথাটির সূচনা ঘটেছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর জার্মানিতে।[২৪] যদিও অনেকের মতে, এই প্রথাটি ষোড়শ শতাব্দীতে মার্টিন লুথার চালু করেছিলেন। প্রথমে তৃতীয় জর্জের স্ত্রী রানি শার্লোট এবং পরে রানি ভিক্টোরিয়ার রাজত্বকালে আরও সফলভাবে প্রিন্স অ্যালবার্ট জার্মানি থেকে ব্রিটেনে এই প্রথাটির আমদানি করেন। ১৮৪১ সাল নাগাদ খ্রিষ্টমাস বৃক্ষের প্রথাটি সমগ্র ব্রিটেনে যথেষ্ট প্রসার লাভ করেছিল। ১৮৭০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণও খ্রিষ্টমাস বৃক্ষের প্রথাটি গ্রহণ করে। খ্রিষ্টমাস বৃক্ষ আলোকসজ্জা ও গহনার দ্বারা সুসজ্জিত করা হয়।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে পোইনসেটিয়া নামে মেক্সিকোর একটি দেশজ বৃক্ষ খ্রিষ্টমাস প্রথার সঙ্গে যুক্ত হয়। অন্যান্য জনপ্রিয় হলিডে গাছ হল হলি, মিসলটো, লাল অ্যামারিলিস, ও খ্রিষ্টমাস ক্যাকটাস। খ্রিষ্টমাস বৃক্ষের সঙ্গে মালা ও চিরসবুজ পত্রসজ্জায় সজ্জিত এই সব গাছ দিয়েও বাড়ির অভ্যন্তর সাজানো হয়ে থাকে।

ইউরোপিয়ান হলি, প্রথাগত খ্রিষ্টমাস সজ্জা

অস্ট্রেলিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং ইউরোপে বাড়ির বাইরে আলোকসজ্জা, এবং কখনও কখনও আলোকিত স্লেজ, স্নোম্যান, ও অন্যান্য খ্রিষ্টমাস চরিত্রের পুতুল সাজানোর প্রথা রয়েছে। পুরসভাগুলিও এই সাজসজ্জার পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে। রাস্তার বাতিস্তম্ভে খ্রিষ্টমাস ব্যানার লাগানো হয় এবং টাউন স্কোয়ারে স্থাপন করা হয় খ্রিষ্টমাস বৃক্ষ।

পাশ্চাত্য বিশ্বে ধর্মনিরপেক্ষ বা ধর্মীয় খ্রিষ্টমাস মোটিফ সহ উজ্জ্বল-রঙা রোলকরা কাগজ উৎপাদিত হয় উপহারের মোড়ক হিসেবে ব্যবহারের জন্য। এই মরসুমে অনেক গৃহে খ্রিষ্টমাস গ্রামের দৃশ্যরচনার প্রথাও লক্ষিত হয়। অন্যান্য প্রথাগত সাজসজ্জার অঙ্গ হল ঘণ্টা, মোমবাতি, ক্যান্ডি ক্যান, মোজা, রিদ ও স্বর্গদূতগণ।

অনেক দেশে নেটিভিটি দৃশ্যের উপস্থাপনা বেশ জনপ্রিয়। এই সব দেশে জনসাধারণকে সম্পূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত নেটিভিটি দৃশ্য সৃজনে উৎসাহিত করা হয়। কোনো কোনো পরিবারে যেসকল দ্রব্য বা পুতুল দিয়ে এই দৃশ্য রচিত হয়, সেগুলিকে উত্তরাধিকার সূত্রে মূল্যবান পারিবারিক সম্পত্তি মনে করা হয়। ৫ জানুয়ারির পূর্বসন্ধ্যায় দ্বাদশ রজনীতে খ্রিষ্টমাস সাজসজ্জা খুলে নেওয়া হয়। খ্রিষ্টমাসের প্রথাগত রংগুলি হল পাইন সবুজ (চিরহরিৎ), তুষার ধবল ও হৃদয় রক্তবর্ণ।

 

খ্রিষ্টমাস সঙ্গীত কনসার্টের এক ট্রাম্পেটার

 

নিকিফোরোস নিট্রাস অঙ্কিত ক্যারোল (১৮৭২)

 

১৮৭০ সালের একটি খ্রিষ্টমাস কার্ড

সান্টাক্লজ ও অন্যান্য উপহার প্রদানকারী

অনেকের মতে, সিন্টারক্লাস বা সেন্ট নিকোলাস হলেন সান্টাক্লজের উৎস

অনেক দেশেই বড়দিন বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে উপহার আদানপ্রদানের মরসুম। বড়দিন ও উপহার আদানপ্রদানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত একাধিক খ্রিষ্টীয় ও পৌরাণিক চরিত্রের উদ্ভবের সঙ্গেও বড়দিন উৎসব অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। এঁরা হলেন ফাদার খ্রিষ্টমাস বা সান্টাক্লজ, পেরে নোয়েল, ও ওয়েনাকসম্যান; সেন্ট নিকোলাস বা সিন্টারক্লাস; ক্রাইস্টকাইন্ড; ক্রিস ক্রিঙ্গল; জৌলুপুক্কি; বাব্বো নাতালে; সেন্ট বাসিল; এবং ফাদার ফরেস্ট।

আধুনিককালে এই চরিত্রগুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় হল লাল পোষাক পরিহিত পৌরাণিক উপহার প্রদানকারী সান্টাক্লজ। সান্টাক্লজের উৎস একাধিক। সান্টাক্লজ নামটি ডাচ সিন্টারক্লাস নামের অপভ্রংশ; যার সাধারণ অর্থ সেন্ট নিকোলাস। খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর নিকোলাস ছিলেন অধুনা তুরস্কের মিরার বিশপ। অন্যান্য সন্তসুলভ অবদানগুলির পাশাপাশি শিশুদের পরিচর্যা, দয়া ও উপহার প্রদানের জন্য তিনি খ্যাতনামা ছিলেন। অনেক দেশে তাঁর সম্মানে ৬ ডিসেম্বর উপহার আদানপ্রদানের মাধ্যমে উৎসব পালিত হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, বিশপের পোষাক পরিহিত নিকোলাস তাঁর সহকারীদের সহায়তায় বিগত এক বছরে শিশুদের আচরণের খোঁজখবর নিতেন; তারপর স্থির করতেন সেই শিশু উপহার পাওয়ার যোগ্য কিনা। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে সেন্ট নিকোলাসের নাম নেদারল্যান্ডে পরিচিতি লাভ করে এবং মধ্য ও দক্ষিণ ইউরোপে তাঁর নামে উপহার আদানপ্রদানের ঐতিহ্য চালু হয়ে যায়। সংস্কার আন্দোলনের সময় অনেক প্রোটেস্টান্ট উপহার প্রদানকারীর চিরাচরিত চরিত্রটি বর্জন করে শিশু খ্রিষ্ট (Christ Child) বা Christkindl (ইংরেজি অপভ্রংশে ক্রিস ক্রিঙ্গল) চরিত্রটির আমদানি করেন এবং উপহার প্রদানের তারিখটি ৬ ডিসেম্বর থেকে বদলে হয় খ্রিষ্টমাস পূর্বসন্ধ্যা।

যদিও সান্টাক্লজের আধুনিক রূপকল্পটির সৃষ্টি হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে। এই রূপান্তরের পশ্চাতে ছয়জন মুখ্য অবদানকারী ছিলেন। এঁদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ওয়াশিংটন আরভিং এবং জার্মান-আমেরিকান কার্টুনিস্ট টমাস ন্যাস্ট (১৮৪০–১৯০২)। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের পর নিউ ইয়র্কের অধিবাসীরা শহরের অ-ইংরেজ অতীতের কিছু প্রতীক ফিরিয়ে আনার পক্ষে মত প্রকাশ করেন। প্রকৃতপক্ষে নিউ ইয়র্ক শহরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ডাচ ঔপনিবেশিক শহর নিউ আমস্টারডাম নামে এবং ডাচ সিন্টারক্লাস ঐতিহ্যটি সেন্ট নিকোলাস নামে সেখানে পুনরাবিষ্কৃত হয়েছিল। ১৮০৯ সালে নিউ ইয়র্ক হিস্টোরিকাল সোসাইটি আনুষ্ঠানিকভাবে ইতিহাস স্মরণ করে Sancte Claus-কে নিউ ইয়র্ক শহরের ডাচ নাম নিউ আমস্টারডামের পৃষ্ঠপোষক সন্ত বা প্যাট্রন সেন্ট ঘোষণা করেন। ১৮১০ সালের প্রথম আমেরিকান উপস্থিতিতে সান্টাক্লজকে বিশপের আলখাল্লায় অঙ্কন করা হয়েছিল। যদিও নতুন শিল্পীরা তাঁর চিত্রাঙ্কনের ভার নিলে, সান্টাক্লজের পোষাকেও ধর্মনিরপেক্ষতার স্পর্শ লাগে। ১৮৬৩ সাল থেকে ন্যাস্ট প্রতি বছর সান্টাক্লজের ছবি আঁকতেন। ১৮৮০-এর দশকে ন্যাস্টের সান্টা তার আধুনিক রূপটি পরিগ্রহ করে। এই রূপটি সম্ভবত ইংরেজ ফাদার খ্রিষ্টমাসের আদলে আঁকা হয়েছিল। ১৯২০-এর দশকে বিজ্ঞাপননির্মাতাদের সৌজন্যে এই রূপটিই স্থায়িত্ব লাভ করে।

সান্টাক্লজ সারা বিশ্বে লক্ষ্মী ছেলেমেয়েদের উপহার প্রদান করার জন্য খ্যাতিলাভ করেছেন

সান্টাক্লজ চরিত্রটির পূর্বসূরি ফাদার খ্রিষ্টমাস হাস্যরসিক, নাদুসনুদুস ও দাড়িওয়ালা ব্যক্তি। তিনি বড়দিনের শুভ চেতনার প্রতীক। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমভাগের ইংল্যান্ডে ফাদার খ্রিষ্টমাসে লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায়। অবশ্য সে সময় ছেলেমেয়েদের উপহার প্রদানের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক ছিল না। তিনি সংযুক্ত ছিলেন বড়দিনের আমোদপ্রমোদ ও মাতলামির সঙ্গে। ভিক্টোরিয়ান ব্রিটেনে সান্টার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে তাঁর চরিত্রটি পুনঃসৃজিত হয়। এই পথে ফ্রান্সে গড়ে ওঠে পেরে নোয়েল চরিত্রটিও। ইতালিতে সান্টাক্লজের ভূমিকাটি পালন করে বাব্বো নাতালে; এদেশে উপহার প্রদানকারী চরিত্রটি হলেন লে বাফানা। তিনি এপিফেনির পূর্বসন্ধ্যায় উপহার নিয়ে আসেন। কথিত আছে, লা বেফানা শিশু যিশুর জন্য উপহার আনতে বেরিয়েছিলেন; কিন্তু তিনি পথ হারিয়ে ফেলেন। এখন তিনি সব শিশুর জন্যই উপহার নিয়ে আসেন। কোনো কোনো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অনুসারে সান্টাক্লজের সঙ্গী হলেন নেচ রুপরেক বা কালো পিটার। অন্যান্য গল্প অনুসারে, এলফেরা উপহার প্রস্তুত করে। সান্টাক্লজের স্ত্রীর নাম দেওয়া হয়েছে মিসেস ক্লজ।

সেন্ট নিকোলাসের সান্টায় রূপান্তরিত হওয়ার আমেরিকান কাহিনিটির কিছু বিরোধিতাও ধ্বনিত হতে শোনা যায়। দাবি করা হয় সেন্ট নিকোলাস সোসাইটি ১৮৩৫ সালের পূর্বে স্থাপিত হয়নি; যা আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্তত পঞ্চাশ বছর পরের ঘটনা। সর্বোপরি, চার্লস জোনস কৃত নিউ আমস্টারডামের “শিশুসাহিত্য পুস্তক, সাময়িকপত্র ও পত্রিকা”র গবেষণায় সেন্ট নিকোলাস বা সিন্টারক্লাসের কোনো উল্লেখ নেই। যদিও ১৯৭৮ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত জোনসের গবেষণার প্রতি সকল বিশেষজ্ঞ আস্থা রাখেন না। নিউ ব্রানসউইক থিওলজিক্যাল সেমিনারির হাওয়ার্ড জি. হেজম্যান হাডসন ভ্যালির আদি বসতির সিন্টারক্লাস সংস্কৃতির আদলে নিউ ইয়র্কের সিন্টারক্লাস সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যটিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়ার মতো কিছু লাতিন আমেরিকান দেশের সাম্প্রতিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অনুসারে, সান্টা খেলনা প্রস্তুত করে যিশুকে তা দেন; যিশুই বাড়ি বাড়ি ঘুরে ছেলেমেয়েদের সেই খেলনা উপহার দিয়ে যান। এই বিশ্বাস ঐতিহ্যগত ধর্মীয় বিশ্বাস ও আমেরিকা থেকে আমদানিকৃত সান্টা সংস্কৃতির এক মেলবন্ধনের প্রয়াস।

অল্টো আদিগে/সাদতিরোল (ইতালি), অস্ট্রিয়া, চেক রিপাবলিক, দক্ষিণ জার্মানি, হাঙ্গেরি, লেচেনস্টেইন, স্লোভাকিয়া ও সুইজারল্যান্ডে ক্রাইস্টকাইন্ড (চেক ভাষায় Ježíšek, হাঙ্গেরিয়ান ভাষায় Jézuska, স্লোভাক ভাষায় Ježiško) উপহার প্রদান করেন। জার্মান সেন্ট নিকোলাউস ও ওয়েনাকসম্যান চরিত্রদুটি এক নয়। ওয়েনাকসম্যান আধুনিক সান্টার জার্মান সংস্করণ। সেন্ট নিকোলাউস নেচ রুপরেকের সহযোগিতায় ৬ ডিসেম্বর ক্যান্ডি, নাটবাদাম ও ফলের মতো ছোটো ছোটো উপহার নিয়ে আসেন।

 

Categories
অনলাইন প্রকাশনা খ্রীষ্টধর্মীয় ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা

খ্রিস্টমাসের খোশখবর

–গৌরী মিত্র

বাইবেলে লেখা নেই যিশুর জন্মদিন কবে। রোমান ক্যাথলিক চার্চের যাজকরা যিশুর জন্মদিন হিসেবে পঁচিশে ডিসেম্বরকে নির্দিষ্ট করেছিলেন। জন্মদিনপালন, উৎসব আয়োজন শুরু হয়েছিল চতুর্থ শতকের আগে নয়। রোমান জুলিয়ান ক্যালেণ্ডার অনুযায়ী ডিসেম্বর মাসে ছিল ‘স্যাটারনালিয়া’ উৎসবের আয়োজন। স্যাটার্ন মানে কৃষির অধিদেবতার পুজো। উৎসব শুরু হত সতেরোই ডিসেম্বর, চলত সাত দিন। এর সঙ্গেই রোমানরা জুড়ে দিয়েছিল খ্রিস্টমাস— পঁচিশে ডিসেম্বরে।

খ্রিস্টধর্মীয়দের মধ্যে এই উৎসবের আয়োজন শুরু হয়ে যায় পয়লা ডিসেম্বর থেকেই এখন। পঁচিশে ডিসেম্বর— যিশুর জন্মদিনের বারো দিন পরে আসে ‘এপিথ্যানি’। যিশুর দীক্ষা নেওয়ার দিন। সদ্যোজাত যিশুর জন্য উপহার এনেছিলেন তিন জন মহাজ্ঞানী পুরুষ এই দিন। এই সব স্মরণের উৎসব হল টুয়েলফথ নাইট বা এপিফ্যানি। যিশুর জন্মস্থান জেরুজালেমের ‘চার্চ অব নেটিভিটি’তে খ্রিস্টমাস উৎসব পালিত হয় সাড়ম্বরেই। ক্যাথলিকদের উদযাপিত উৎসবে যিশুর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বহু আদি ধর্মনির্ভর কানুন। প্রোটেস্ট্যান্টরা যিশুকেই স্মরণে রেখে চার্চে বাতি জ্বালায়, প্রার্থনা করে, গান গায়। ফ্রান্স, ইটালি, গ্রিস, স্পেন, জার্মান, চিন, জাপান— সর্বত্র এখন খ্রিস্টমাসের উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকে দেশীয় কিছু প্রথাও। মেক্সিকোয় এ উৎসব উপলক্ষে ‘লস পাসটোরেস’ অর্থাৎ ‘দ্য শেফার্ডস’ নামক নাট্যানুষ্ঠানটি অভিনব।

 

খ্রিস্টমাস উপলক্ষে কেক, পেসট্রি খাওয়া, উপহার বিনিময়, খ্রিস্টমাস কার্ড মানে শুভেচ্ছাপত্র প্রেরণ— এ সব শুরু হয়েছে উনিশ শতকে। ১৮৪৩ সালে এক ইংরেজ আর্টিস্ট জন ক্যালট হার্সলে প্রথম বানিয়েছিলেন খ্রিস্টমাস কার্ড। তাতে লেখা হয়েছিল— এ মেরি খ্রিস্টমাস অ্যাণ্ড এ হ্যাপি নিউ ইয়ার টু ইউ। খ্রিস্টমাস ট্রি, ‘সাইলেন্ট নাইট, হোলি নাইট’ ক্যারল— এ সব এসেছিল জার্মানদের সৌজন্যে।

খ্রিস্টধর্মী জার্মান যাজক উইনফ্রেড এক গভীর বনে দেখেছিলেন— এক ওক গাছে রজ্জুবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে এক বালক। বৃষ্টি, বজ্রের দেবতা থরের পায়ে বলি দেওয়ার জন্য বালককে বেঁধে রাখা হয়েছিল। উইনফ্রেড সে ওক গাছ সমূলে উৎপাটিত করলে সেখানে গজিয়ে উঠেছিল এক সুদৃশ্য ফার গাছ— দি ট্রি অব লাইফ। জার্মান ধর্মসংস্কারক মার্টিন লুথার জ্যোৎস্নারাতে অপরূপ সুন্দর হয়ে থাকতে দেখেছিলেন এক ডুমুর গাছকে। তিনি মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন— এটি হল খ্রিস্টমাস ট্রি, চিরসবুজ— সিম্বল অব লাইফ। উর্বরতার প্রতীক।

সান্টাক্লস ছাড়া খ্রিস্টমাস জমে? সান্টাক্লস কোনও কাল্পনিক চরিত্র নয়। চতুর্থ শতকে নিকোলাস নামে এক ব্যক্তি জন্মেছিলেন তুরস্কে। রোমান দেবতা ভায়ানার বেদিতে তিনি মাথা নোয়াননি বলে রোমান সম্রাট ভায়োক্লিসিয়ান তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পরবর্তী রোমান সম্রাটের দয়ায় নিকোলাস মুক্ত হয়েছিলেন। তুরস্কের মাইরা শহরের একটি চার্চে বিশপ পদে থাকার সময়ে তিনি ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াতেন অপরাধীদের খোঁজে। দুঃখী-দরিদ্রদের খোঁজে। অপরাধীদের তিনি দণ্ড দিতেন। কিন্তু দরিদ্র মানুষেরা তাঁর কাছ থেকে পেত অর্থ, খাদ্য, বস্ত্র। সেন্ট নিকোলাস মারা গিয়েছিলেন ৬ ডিসেম্বর। অনেক দেশেই এই ৬ ডিসেম্বর নিকোলাসকে মনে রেখেই ছোটদের উপহার দেওয়ার রেওয়াজ আছে। সেন্ট নিকোলাস ইউরোপের বিভিন্ন জনজীবনে বিভিন্ন নাম পেয়েছেন: ক্রিস ক্রিঞ্‌টল, সিন্টার ক্লাস, কোথাও পেরে নোয়েল, পাপাই নোয়েল। রাশিয়ায় গ্রাণ্ড ফাদার ফ্রস্ট, ইটালিতে লা বাফানা। লা বাফানা এক যাদুকর যিনি ঝাঁটায় চড়ে ঘুরে বেড়ান আর ছোটদের উপহার দেন এপিফ্যানিতে। আসলে দেশের উপকথা, লোককথা অনুসারে চরিত্রটি পেয়েছে বিশেষত্ব। নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্কে ‘সেইন্ট লুসিয়া’— আসোর রানিই উপহারদাতা। উত্তর গোলার্ধের মানুষেরা লুসিয়াকে শ্রদ্ধা করে, তাঁর কল্যাণে ছ’মাস রাতের জীবনে পথ হারায় না মানুষ। লাল টুকটুকে জামা গায়ে, মুখ ভর্তি লম্বা সাদা দাড়ি, পিঠে উপহারের থলি — সান্টাক্লস বলতে এখন সবাই একেই চেনে। এমন বিশ্বজনীন রূপ কী করে হল? ইউরোপের মানুষরা যখন আমেরিকায় গিয়েছিল তখন তাদের সঙ্গে এসেছিল খ্রিস্টমাস, আর সেই সঙ্গে সিন্টার ক্লাস নামক উপহারদাতাও।

১৮২৬ সালে নিউ ইয়র্কের এক পত্রিকায় ক্লিমেন্ট ক্লার্ক মুর লিখেছিলেন একটি কবিতা— এ ভিজিট ফ্রম সেইন্ট নিকোলাস। সেটি পড়ে বিশিষ্ট আর্টিস্ট টমাস নাস্ট এঁকেছিলেন নিকোলাসের মনকাড়া অনেক ছবি। সেই ছবির সিন্টার ক্লাস অর্থাৎ সান্টা ক্লসই অনবদ্য হয়ে রইল।

উত্তর গোলার্ধ, দক্ষিণ গোলার্ধ— দু জায়গায় খ্রিস্টমাসের আয়োজন দু রকমের। উত্তরে ডিসেম্বরে অনেক জায়গায় বরফে ঢেকে যায়। গাছপালায় তুষার! খ্রিস্টমাস মানেই ‘হোয়াইট খ্রিস্টমাস’। আর দক্ষিণের দেশগুলোয়? এ সময় গ্রীষ্মকাল। খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে সবাই আতসবাজি পোড়ায়, রাতের তারা দেখে। সমুদ্রের ধারে নাচগান করে।

‘খ্রিস্টমাস বক্স’, না হলে উৎসব ব্যর্থ। যিশু দরিদ্রের দুঃখমোচন করতে চেয়েছিলেন। ইউরোপ, আমেরিকায় সব শহরে, পথের মোড়ে সাজানো থাকে বাক্স। বাক্সের গায়ে লেখা থাকে— ‘হেল্প পুয়োর’ অথবা ‘শেয়ার ইয়োর জয়েস উইথ আদারস’। বাক্সয় দরিদ্র বন্ধুর জন্য কিছু দিলে খ্রিস্টমাসের উৎসব পূর্ণাঙ্গ হয়। যিশুও খুশি হন।

সৌজন্যঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, ৬ পৌষ ১৪০৯ রবিবার ২২ ডিসেম্বর ২০০২

Categories
১৯৫২) অনলাইন প্রকাশনা ইতিহাস মুক্তিযুদ্ধ-(১৯৭১) সৃজনশীল প্রকাশনা

রিপোর্ট ১৯৭১

– আসাদ চৌধুরী

প্রাচ্যের গানের মতো শোকাহত, কম্পিত, চঞ্চল
বেগবতী তটিনীর মতো স্নিগ্ধ, মনোরম
আমাদের নারীদের কথা বলি, শোনো।
এ-সব রহস্যময়ী রমণীরা পুরুষের কণ্ঠস্বর শুনে
বৃক্ষের আড়ালে স’রে যায়-
বেড়ার ফোঁকড় দিয়ে নিজের রন্ধনে
তৃপ্ত অতিথির প্রসন্ন ভোজন দেখে
শুধু মুখ টিপে হাসে।
প্রথম পোয়াতী লজ্জায় অনন্ত হ’য়ে
কোঁচরে ভরেন অনুজের সংগৃহীত কাঁচা আম, পেয়ারা, চালিতা-
সূর্য্যকেও পর্দা করে এ-সব রমণী।

অথচ যোহরা ছিলো নির্মম শিকার
সকৃতজ্ঞ লম্পটেরা
সঙ্গীনের সুতীব্র চুম্বন গেঁথে গেছে-
আমি তার সুরকার- তার রক্তে স্বরলিপি লিখি।

মরিয়ম, যীশুর জননী নয় অবুঝ কিশোরী
গরীবের চৌমুহনী বেথেলহেম নয়
মগরেবের নামাজের শেষে মায়ে-ঝিয়ে
খোদার কালামে শান্তি খুঁজেছিলো,
অস্ফুট গোলাপ-কলি লহুতে রঞ্জিত হ’লে
কার কী বা আসে যায়।
বিপন্ন বিস্ময়ে কোরানের বাঁকা-বাঁকা পবিত্র হরফ
বোবা হ’য়ে চেয়ে দ্যাখে লম্পটের ক্ষুধা,
মায়ের স্নেহার্ত দেহ ঢেকে রাখে পশুদের পাপ।
পোষা বেড়ালের বাচ্চা চেয়ে-চেয়ে নিবিড় আদর
সারারাত কেঁদেছিলো তাহাদের লাশের ওপর।

এদেশে যে ঈশ্বর আছেন তিনি নাকি
অন্ধ আর বোবা
এই ব’লে তিন কোটি মহিলারা বেচারাকে গালাগালি করে।

জনাব ফ্রয়েড,
এমন কি খোয়াবেও প্রেমিকারা আসে না সহজ পায়ে চপল চরণে।
জনাব ফ্রয়েড, মহিলারা
কামুকের, প্রেমিকের, শৃঙ্গারের সংজ্ঞা ভুলে গ্যাছে।
রকেটের প্রেমে পড়ে ঝ’রে গ্যাছে
ভিক্টোরিয়া পার্কের গীর্জার ঘড়ি,
মুসল্লীর সেজদায় আনত মাথা
নিরপেক্ষ বুলেটের অন্তিম আজানে স্থবির হয়েছে।
বুদ্ধের ক্ষমার মূর্তি ভাঁড়ের মতন
ভ্যাবাচেকা খেয়ে প’ড়ে আছে, তাঁর
মাথার ওপরে
এক ডজন শকুন মৈত্রী মৈত্রী ক’রে
হয়তো বা উঠেছিলো কেঁদে।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা কবিতা সৃজনশীল প্রকাশনা

বিজয় দিবস(ছড়া)

–acharjee

১.
হানাদারের কবল থেকে
দেশ করেছে মুক্ত যারা
বুকের তাজা রক্ত ঢেলেই
আনলো বিজয় দিবস তারা।

বিজয়ের এই মহান দিনে
তাদের স্মঁরি শ্রদ্ধাভরে
নিজের জীবন তুচ্ছে যারা
শহীদ হলো দেশের তরে।

২.
লক্ষ প্রাণের দামে পেলাম স্বাধীনতার দেখা
“সোনার বাংলা” এই কথাটি রক্ত দিয়ে লেখা।
ভালবাসি মুক্ত বাতাস
মুক্ত মাটি, মুক্ত আকাশ
মুক্ত স্বাধীন নদী যেন রূপালী এক রেখা।
আঁকতে স্বাধীন দেশের ছবি
যুদ্ধে যারা হারায় সবই
তাদের কাছেই দেশপ্রেমের এই মূলমন্ত্র শেখা-
রাখবো অটুট পেলাম যখন স্বাধীনতার দেখা।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা ইতিহাস কাজী নজরুল ইসলাম গবেষণামূলক প্রকাশনা জীবনী ও স্মৃতিকথা সৃজনশীল প্রকাশনা

কাজী নজরুল ইসলাম এর ধর্ম বিশ্বাস

দেশে-বিদেশে

কাজী নজরুল ইসলাম এর ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। নজরুল অসংখ্য হামদ, নাত লিখেছেন; সাথে সাথে হিন্দু ধর্ম নিয়ে অসংখ্য কবিতা, গান লিখেছেন। তাই অনেকে সন্দেহ পোষণ করেন, উনি প্রকৃতই হিন্দু ধর্ম বিশ্বাস করতেন কিনা? নিজেরা ব্যাখ্যা দেবার আগে সবচেয়ে ভালো হয় নজরুল এ বিষয়ে কী বলেছেন সেটা পর্যালোচনা করা। কেউ কোনো সাহিত্য রচনা করে থাকলে সে বিষয়ে তিনি কি বলেছেন সেই ব্যাখ্যাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য। সেই ব্যাখ্যার দ্বারা যদি প্রমাণিত হয় সেটা ইসলাম-বিরোধী তাহলে অবশ্যই সেটা ইসলাম-বিরোধী।

কালী পূজা

অনেকে অভিযোগ করে থাকেন নজরুল কালি পূজা করেছেন এবং অভিযোগটা আসে মুসলিমদের থেকেই। ‘অতীত দিনের স্মৃতি’ বই এর ৪২ পৃষ্ঠায় লেখক নিতাই ঘটক উল্লেখ করেছেন, “সীতানাথ রোডে থাকাকালীন কবিকে হিন্দুশাস্ত্র বিশেষভাবে চর্চা করতে দেখেছি। অনেকে বলেন কালীমূর্তি নিয়ে কবি মত্ত হয়েছিলেন- একথা ঠিক নয়। আমি কখনো তাঁকে এভাবে দেখিনি।” হিন্দুরাই বলছেন নজরুল পূজা করেননি, যদিও সেটা হয়ে থাকলে হিন্দুদেরই খুশী হবার কথা ছিল বেশী। এখানে একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য; তা হোলো, হিন্দুধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করা আর কালীপূজা করা এক জিনিস নয়।

হিন্দু ধর্ম বিষয়ক লেখা

এখন আমরা দেখব নজরুল হিন্দু ধর্ম বিষয়ক কবিতা, গান কেনো লিখেছিলেন। নজরুল বলেছেন, “আমি হিন্দু-মুসলমানের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী। তাই তাদের কুসংস্কারে আঘাত হানার জন্যই মুসলমানী শব্দ ব্যবহার করি, বা হিন্দু দেব-দেবীর নাম নিই। অবশ্য এর জন্য অনেক জায়গায় আমার সৌন্দর্যের হানি হয়েছে। তবু আমি জেনে শুনেই তা করেছি।” [শব্দ-ধানুকী নজরুল ইসলাম, শাহাবুদ্দিন আহমদ, পৃষ্ঠা ২৩৬,২৩৭]

এখানে নজরুল স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন হিন্দু মুসলমানের মিলনের জন্য তিনি এ কাজ করেছেন। তখনকার রাজনৈতিক আবহাওয়া সম্বন্ধে যাদের ধারণা আছে তারা জানেন কি প্রচণ্ড হিন্দু মুসলিম বিরোধ তখন বিরাজমান ছিল।

১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ই ডিসেম্বর রবিবার কলিকাতা এলবার্ট হলে বাংলার হিন্দু-মুসলমানের পক্ষ থেকে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বিপুল সমারোহ ও আন্তরিকতা সহকারে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। সেখানে তিনি বলেন, “কেউ বলেন, আমার বাণী যবন, কেউ বলেন, কাফের। আমি বলি ও দুটোর কিছুই নয়। আমি শুধুমাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি। [নজরুল রচনাবলী – ৮, পৃষ্ঠা ৩, ৫]

ধর্মবিশ্বাস

কেউ হয়ত বলবেন, হিন্দু মুসলিম এর মিলনের জন্য উনি না হয় এমন লিখেছেন, কিন্তু এতে প্রমাণিত হয়না যে তিনি ইসলাম ধর্ম বিশ্বাস করতেন। হ্যাঁ কথা ঠিক। এর উত্তর নজরুল দিয়েছেন তাঁর ‘আমার লীগ কংগ্রেস’ প্রবন্ধের ৬১ পৃষ্ঠায় “আমার আল্লাহ নিত্য-পূর্ণ -পরম- অভেদ, নিত্য পরম-প্রেমময়, নিত্য সর্বদ্বন্দ্বাতীত। ‘ইসলাম’ ধর্ম এসেছে পৃথিবীতে পূর্ণ শান্তি সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে – কোরান মজিদে এই মাহাবাণীই উত্থিত হয়েছে। ···এক আল্লাহ ছাড়া আমার কেউ প্রভূ নাই। তাঁর আদেশ পালন করাই আমার একমাত্র মানবধর্ম। আল্লাহ লা-শরিক, একমেবাদ্বিতীয়ম। আল্লাহ আমার প্রভু, রসূলের আমি উম্মত, আল-কোরআন আমার পথ-প্রদর্শক। আমার কবিতা যাঁরা পড়ছেন, তাঁরাই সাক্ষী: আমি মুসলিমকে সঙ্ঘবদ্ধ করার জন্য তাদের জড়ত্ব, আলস্য, কর্মবিমূখতা, ক্লৈব্য, অবিশ্বাস দূর করার জন্য আজীবন চেষ্টা করেছি।”

১৯৪০ সালে কলিকাতায় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতিরি ঈদ-সম্মেলনে প্রদত্ত সভাপতির অভিভাষণ নজরুল বলেছিলেন, “ইসলাম জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম বলে সকলের শ্রদ্ধা অর্জন করতে পেরেছে।” [নজরুল রচনাবলী – (৭) পৃষ্ঠা ৩৩]

এই লেখার মাধ্যমে নজরুল নিজেকে মুসলমান হিসেবে প্রকাশ করেছেন।

ইসলামের পক্ষে কলম পরিচালনা করা

মৌলভী তরিকুল আলম কাগজে এক প্রবন্ধ লিখে বললেন কোরবানীতে অকারণে পশু হত্যা করা হয়; এমন ভয়াবহ রক্তপাতের কোনো মানে নাই। নজরুল তার জওয়াবে লিখলেন ‘কোরবানী’ কবিতা। তাতে তিনি বললেন-

ওরে, হত্যা নয়, এ সত্যগ্রহ শক্তির উদ্বোধন,
দুর্বল ভীরু চুপ রহো, ওহো খামখা ক্ষুদ্ধ মন।
…..এই দিনই মীনা ময়দানে
…..পুত্র স্নেহের গর্দানে
……ছুরি হেনে খুন ক্ষরিয়ে নে
রেখেছে আব্বা ইবরাহীম সে আপনা রুদ্র পণ,
ছি,ছি, কেঁপো না ক্ষুদ্র মন।
[নজরুল স্মৃতিচারণ, নজরুল একাডেমী পৃষ্ঠা ৪৩৯ ]

ইসলামের বিপক্ষে আক্রমণ হলে সেটার প্রতিবাদস্বরূপ নজরুল কবিতা লিখেছিলেন। ব্যাপারটা বিস্ময়ের বৈকি। যে কবিকে “কাফের” ফতোয়া দেয়া হয়েছে তিনি-ই কিনা ইসলামের পক্ষে কলম ধরেছেন!!!

মুসলমানের সমালোচনা করে কবিতা লিখা

আরো একটি অভিযোগ করা হয়, সেটা হোলো নজরুল আলেমদের সমালোচনা করেছেন, যেমন:

মৌ-লোভী যত মোলভী আর মোল্লারা কন হাত নেড়ে
দেব-দেবী নাম মুখে আনে সবে তাও পাজীটার যাত মেড়ে।

এখানে মৌলভীদের নজরুল “মৌ লোভী” বলেছেন। যারা এতে অসন্তুষ্ট তাদের এই কবিতাটা হয়ত নজরে পড়েনি:

শিক্ষা দিয়ে দীক্ষা দিয়ে
…. ঢাকেন মোদের সকল আয়েব
পাক কদমে সালাম জানাই
….নবীর নায়েব, মৌলভী সাহেব।

এখানে মৌলভী সাহেবদের নজরুল সালাম জানিয়েছেন। দুটোর মধ্যে আসলে কোনো বিরোধ নেই। বর্তমান সমাজে এটাই বাস্তব। আলেমদের মধ্যেও ভালো-খারাপ দু-ধরণের পরিস্হিতি বিদ্যমান। দুটোই নজরুল ফুটিয়ে তুলেছেন। আর মুসলমানদের দোষ-ত্রুটি থাকলে সেটা বলার মধ্যে দোষের কিছু নেই। ইব্রাহিম খাঁ-র চিঠির জবাবে নজরুল সেটাই বলেছেন, “যাঁরা মনে করেন-আমি ইসলামের বিরুদ্ধবাদী বা তার সত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছি, তাঁরা অনর্থক এ ভুল করেন। ইসলামের নামে যে সব কুসংস্কার মিথ্যা আবর্জনা স্তুপীকৃত হয়ে উঠেছে তাকে ইসলাম বলে না মানা কি ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযান? এ ভুল যাঁরা করেন, তাঁরা যেন আমার লেখাগুলো মন দিয়ে পড়েন দয়া করে-এ ছাড়া আমার আর কি বলবার থাকতে পারে?” [ইসলাম ও নজরুল ইসলাম, শাহাবুদ্দিন আহমেদ, পৃষ্ঠা ৯৫]

আরো একটি অভিযোগ

অনেকে আরো একটি অভিযোগ করেন, নজরুল প্রথম দিকে হিন্দুদের খুশী করার জন্য হিন্দু ধর্ম নিয়ে কবিতা লিখেছেন, পরবর্তীতে মুসলমানদের খুশী করার জন্য ইসলাম বিষয়ক কবিতা লিখেছেন। বিষয়টি তথ্য বিভ্রাট ছাড়া আর কিছু নয়। নজরুলের প্রথম কাব্যগ্রন্হ অগ্নিবীণা-য় ১২টি কবিতার মধ্যে ৭টি কবিতা ইসলাম-বিষয়ক। নজরুল তাঁর সমগ্র জীবনে ছিলেন অকুতোভয়। জীবনে কখনও তিনি কাউকে খুশী করার জন্য বা কাউকে ভয় করার কারণে সত্য গোপন করেননি। সুতরাং হিন্দুদের খুশী করার জন্য নিজের নীতি বিসর্জন দিবেন এটা চিন্তাই করা যায় না। এখানে আমরা একটি পরিসংখ্যান দিয়ে দেখব নজরুল তাঁর সাহিত্য জীবনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ইসলাম বিষয়ক লেখা লিখেছেন:

** ‘মোসলেম ভারত’-এ প্রকাশিত তাঁর প্রথম কবিতাটি ছিল ‘শাত- ইল আরব’ (মে,১৯২০)
** দ্বিতীয় কবিতা ‘খেয়াপরের তরণী’ (জুলাই ১৯২০)
** ‘কোরবানী’ ১৩২৭-এর ভাদ্রে (আগস্ট, ১৯২০)
** ‘মোহরাম’ ছাপা হয় ১৩২৭-এর আশ্বিনে (সেপ্টেম্বর ১৯২০)
** ১৯২২-এর অক্টোবরে নজরুলের যে ‘অগ্নি-বীণা’ কাব্য প্রকাশিত হয় তার ১২টি কবিতার মধ্যে ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘বিদ্রোহী’, ‘রক্তস্বরধারিণী মা’ আগমনী’, ‘ধূমকেতু’ এই পাঁচটি কবিতা বাদ দিলে দেখা যায় বাকি ৭টি কবিতাই মুসলিম ও ইসলাম সম্পর্কিত। (১৯২২)
** আরবী ছন্দের কবিতা (১৯২৩)
** ১৯২৪-এ প্রকাশিত তাঁর ‘বিষের বাঁশীর প্রথম কবিতা ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজ-দহম’ (আবির্ভাব-তিরোভাব) (১৯২৪)
** খালেদ কবিতা (১৯২৬)
** উমর ফারুক কবিতা সওগাতে প্রকাশিত (১৯২৭)
** জিন্জির কাব্যগ্রন্হ প্রকাশ (১৯২৮)
** রুবাইয়াত ই হাফিজ প্রকাশ (১৯৩০)
** কাব্য আমপারা (১৯৩৩)
** জুলফিকার ইসলামিক কাব্যগ্রন্হ প্রকাশ (১৯৩২)
** মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লে আলা ও যাবি কে মদিনায় নাত এ রসুল প্রকাশ (১৯৩৩)
** তওফীক দাও খোদা ইসলামে নাত এর রসুল প্রকাশ (১৯৩৪)
** মক্তব সাহিত্য প্রকাশ (১৯৩৫)
** ফরিদপুর জালা মুসলিম ছাত্র সম্মিলনীতে “বাংলার মুসলিমকে বাঁচাও” অভিভাষণ পাঠ (১৯৩৬)
** ‘সেই রবিউল আউয়ালের চাদ’ নাত এর রসুল প্রকাশ (১৯৩৭)
** ‘ওরে ও মদিনা বলতে পারিস’ নাত এর রসুল প্রকাশ (১৯৩৮)
** দীওয়ান ই হাফিজ এর ৯টি গজল অনুবাদ এবং নির্ঝর কাব্যগ্রন্হে প্রকাশ (১৯৩৯)
** নতুন চাঁদ (১৯৩৯)
** খোদার রহম চাহ যদি নবিজীরে ধর নাত এর রসুল প্রকাশ (১৯৪০)
** মরুভাস্কর ( অসুস্হ হবার পরে প্রকাশিত ১৯৫০)
** রুবাইয়াত ই ওমর খৈয়াম (১৯৫৮)

সাহিত্যিক জীবনের প্রথম (১৯২০-১৯৪১) থেকে শেষ পর্যন্ত নজরুল অজস্র ধারায় ইসলাম বিষয়ক লেখা লিখে গিয়েছেন উপরের পরিসংখ্যান সেটাই প্রমাণ করে।

কিছু উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান

১। নজরুল বাংলা ভাষায় সর্বাধিক “হামদ-নাত” এর রচয়িতা।
২। গ্রামোফোন কোম্পানী থেকে নজরুলের হামদ-নাত যখন বের হোতো, তখন মাঝে মাঝে রেকর্ডের ওপর “পীর-কবি নজরুল” লেখা থাকত।
৩। বাংলা ভাষায় যারা হামদ-নাত রচনা করে গেছেন, তাদের মধ্যে একই সাথে হিন্দু এবং ইসলাম ধর্ম উভয় বিষয়ে পারদর্শী কেউ ছিলনা, একমাত্র ব্যতিক্রম নজরুল।
৪। একাধিক আরবী-ছন্দ নিয়ে নজরুলের অসংখ্য কবিতা আছে, বাংলা ভাষার আরও এক প্রতিভাবান কবি ফররুখ আহমদ এ বিষয়ে কারিশমা দেখাতে পারেনি।
৫। ইরানের কবি হাফিজ আর ওমর খৈয়ামের যতজন ‘কবি’ অনুবাদক আছেন তার মধ্যে নজরুল একমাত্র মূল ফারসী থেকে অনুবাদ করেছেন, বাকী সবাই ইংরেজীর থেকে।
৬। “ফারসী” এবং “আরবী”তে নজরুল এর জ্ঞান ছিল পাণ্ডিত্যের পর্যায়ে।
৭। গ্রামোফোন কম্পানি থেকে “ইসলামি গান” নজরুলের পূর্বে আর কেউ গায়নি।

মুজাফফর আহমদ ও নজরুল

নজরুলের তরুণ জীবনের কমুনিস্ট হয়ে যাওয়া বন্ধু কমরেড মুজাফফর আহমদ তাঁকে কমুনিজমে নিতে ব্যর্থ হন। তাঁর স্বপ্ন সফল হয়নি। ১৯৬৬ খৃস্টাব্দের ২রা আগস্ট কবি আবদুল কাদিরের কাছে লেখা এক চিঠির শেষে তিনি লিখেছেন,

“নজরুল যে আমার সঙ্গে রাজনীতিতে টিকে রইল না; সে যে আধ্যাত্নিক জগতে প্রবেশ করল তার জন্যে অবশ্য আমার মনে খেদ নেই। যদিও আমি বহু দীর্ঘ বৎসর অনুপস্থিত ছিলেম তবুও আমার মনে হয় আমি হেরে গেছি।”

তিনি আরো বলেছেন, “আমি তাকে যত বড় দেখতে চেয়েছিলেম তার চেয়েও সে অনেক, অনেক বড় হয়েছে।”

(নজরুল একাডেমী পত্রিকাঃ ৪র্থ বর্ষঃ ১ম সংখ্যাঃ পৃষ্ঠাঃ ১৬৪)

নজরুল জীবনের শেষ অধ্যায়

নজরুলের জীবনের একমাত্র সাক্ষাৎকার যেটা উনি ১৯৪০ সনে দিয়েছিলেন, চিরদিনের জন্য অসুস্হ হয়ে যাবার কিছুদিন আগে- সেখানে উনি বলেছিলেন,

“মুসলমানরা যে একদিন দুনিয়াজোড়া বাদশাহি করতে সমর্থ হয়েছিল সে তাদের ইমানের বলে। আজ আমরা ইমান হারিয়ে ফেলেছি। ইমানের প্রকৃত অর্থ ‘পরিপূর্ণরূপে আত্মসমর্পন’। ভারতে রাজা-বাদশাদের দ্বারা ইসলাম জারি হয় নাই। আর মানুষের মঙ্গলের বিধান করেছেন আউলিয়া ‘পীর’ বোজর্গান। সারা ভারতে হাজার আউলিয়ার মাজার কেন্দ্র করে আজো সেই শান্তির কথা আমরা শুনতে পাই। আমি মওলানা আকরম খাঁ ও মৌলবি ফজলুর হক সাহেবকে বলেছিলাম যে, আসুন, আপনারা সমস্ত ত্যাগ করে হজরত ওমর (রাঃ) ও আবুবকরের (রাঃ) আদর্শ সামনে রেখে সমাজে লাগি, আমি আমার সব কিছু ছেড়ে কওমের খেদমতে লাগতে রাজি আছি।” [অতীত দিনের স্মৃতি, সম্পাদনা – আব্দুল মান্নান সৈয়দ পৃষ্ঠা ১৯২,১৯৩]

 

কিছু উল্লেখযোগ্য স্মৃতিচারণ

দুটি ঘটনা দিয়ে আজকের লেখা শেষ করছি।

প্রথম ঘটনা:

নজরুল স্মৃতিচারণ বই-এ ৩১৭ পৃষ্ঠায় লেখক খান মুহম্মদ সালেক বলেন, “১৯৩৯ সালের ৫ আগষ্ট। কোলকাতা বেকার হোষ্টেলে নবীনবরণ অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি করে আনা হয়েছে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী নলিনীরঞ্জন সরকারকে। বিশিষ্ট অতিথি ছিলেন নজরুল ইসলাম আর আব্বাস উদ্দীন। অনুষ্ঠান শেষে কবিকে চা-পানের জন্য নিয়ে যাওয়া হলো হোস্টেলের কমনরুমে। কিছু ছাত্র আমাদের ঘিরে দাঁড়িয়েছিল। তারা এক টুকরো করে কাগজ কবির সামনে ধরছে আর আবদার জানাচ্ছে কিছু লিখে দেবার জন্য। কবি একটা পেন্সিল হাতে নিলেন। তারপর একজনকে লিখে দিলেন, ‘আল্লাহু আকবর।’ আর একজনকে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসলুল্লাহ।’ আবার কাউকে লিখলেন, ‘খোদাকে চেনো, খোদাকে চিনবে।’ আমিও এক টুকরো কাগজ বের করে সামনে ধরলাম। তিনি লিখলেন, ‘যারা ধৈর্যশীল খোদা তাদের সহায়।’ তাঁর এ ধরণের উক্তি থেকে মনে হয়েছিল তিনি কোন পীর-দরবেশ বা অলি আউলিয়ার কাছে বাইয়াত গ্রহণ করছেন।”

দ্বিতীয় ঘটনা:

শিল্পী আব্বাসউদ্দিন একদিন অনেক খোঁজাখুঁজি করে নজরুলকে না পেয়ে সকালে তার বাসায় গেলেন। বাসায় গিয়ে দেখলেন নজরুল গভীর মনোযোগ দিয়ে কি যেন লিখছেন। নজরুল ইশারায় আব্বাসউদ্দিনকে বসতে বললেন। আব্বাস উদ্দিন অনকেক্ষণ বসে থাকার পর জোহরের নামাজের সময় হলে তিনি উসখুস করতে লাগলেন। নজরুল বললেন, “কি তাড়া আছে, যেতে হবে?” আব্বাসউদ্দিন বললেন, “ঠিক তাড়া নেই, তবে আমার জোহরের নামাজ পড়তে হবে। আর এসেছি একটা ইসলামি গজল নেবার জন্য। গজল না নিয়ে আজ যাওয়া হচ্ছে না।” [নজরুলকে যেহেতু বাউন্ডেলে স্বভাবের কারণে পাওয়া যেত না, তাই সবাই এইভাবে লেখা আদায় করত] নামাজ পড়ার কথা শুনে নজরুল তাড়াতাড়ি একটি পরিস্কার চাদর তার ঘরের আলমারি থেকে বের করে বিছিয়ে দিলেন। এরপর আব্বাস উদ্দিন যথারীতি জোহেরর নামাজ শেষ করার সাথে সাথে নজরুল আব্বাসউদ্দিনের হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “এই নাও তোমার গজল।” আব্বাস উদ্দিন বিস্ময়ের সাথে দেখলেন তার নামাজ পড়তে যে সময় লেগেছে ঠিক সেই সময়ের মধ্যে নজরুল সম্পূর্ণ একটি নতুন গজল লিখে ফেলেছেন। নীচে গজলটি দেয়া হলো:

হে নামাজী আমার ঘরে নামাজ পড় আজ
দিলাম তোমার চরণ তলে হৃদয় জায়নামাজ।

আমি গোনাহগার বে-খবর
নামাজ পড়ার নাই অবসর
তব, চরণ-ছোওয়ার এই পাপীরে কর সরফরাজ
হে নামাজী আমার ঘরে নামাজ পড় আজ।

তোমার অজুর পানি মোছ আমার পিরহান দিয়ে
আমার এই ঘর হউক মসজিদ তোমার পরশ নিয়ে;
যে শয়তান ফন্দিতে ভাই
খোদার ডাকার সময় না পাই
সেই শয়তান থাক দূরে (শুনে) তকবীরের আওয়াজ
হে নামাজী আমার ঘরে নামাজ পড় আজ।

আমার লেখার উদ্দেশ্য এই নয় যে, নজরুল আদর্শ মুসলমান ছিলেন কিংবা তিনি অনুসরণীয়- এটা প্রচার করা। বরং আমার লেখার উদ্দেশ্য হোলো, নজরুল বিশ্বাসে সম্পূর্ণরূপে মুসলিম ছিলেন যেটা অনেকেই সঠিকভাবে জানেন না। আশাকরি উপরের আলোচনা আমাদের নতুন করে সেটাই ভাবতে শেখাবে। এরপরও অনেকে থাকবে যারা বিদ্বেষ ছড়াবে, তাদের সম্বন্ধে নজরুল বলেছেন:

উহারা প্রচার করুক হিংসা বিদ্বেষ আর নিন্দাবাদ
আমরা বলিব, “সাম্য শান্তি এক আল্লাহ জিন্দাবাদ।”

==============================================

পরিশিষ্ট: নজরুলের কিছু ইসলাম বিষয়ক কবিতা

বিষয়: ইসলাম

আল্লাহ আমার প্রভু, আমার নাহি নাহি ভয়
আমার নবী মোহাম্মদ, যাহার তারিফ জগৎময়।
আমার কিসের শঙ্কা,
কোরআন আমার ডঙ্কা,
ইসলাম আমার ধর্ম, মুসলিম আমার পরিচয়।

কলেমা আমার তাবিজ, তৌহীদ আমার মুর্শিদ
ঈমান আমার বর্ম, হেলাল আমার খুর্শিদ।

‘আল্লাহ আক্‌বর’ ধ্বনি
আমার জেহাদ বাণী
আখের মোকাম ফেরদৌস্‌ খোদার আরশ যেথায় রয়
আল্লাহ আমার প্রভু, আমার নাহি নাহি ভয়।

বিষয়: রিজিক

আহার দিবেন তিনি, রে মন
জীব দিয়েছেন যিনি
তোরে সৃষ্টি করে তোর কাছে যে
আছেন তিনি ঋণী।

বিষয়: রেসালত

চলে আন্‌জাম
দোলে তান্‌জাম
খোলে হুর পরী মরি ফিরদৌসের হাম্মাম!
টলে কাঁখের কলসে কওসর ভর, হাতে ‘আব্‌-জম-জম্‌-জাম্‌’।
শোন্‌ দামাম কামান্‌ তামাম্‌ সামান্‌
নির্ঘোষি কার নাম
পড়ে ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহে সাল্‌লাম!’

বারেক মুখে নিলে যাঁহার নাম
চিরতরে হয় দোজখ্‌ হারাম,
পাপীর তরে দস্তে যাহার, কওসরের পিয়ালা
হের আজ আরশে এলেন মোদের নবী কম্‌লীওয়ালা।

বিষয়: কালেমা শাহাদত

এসমে আজম হ’তে কদর ইহার,
পায় ঘরে ব’সে খোদা আর রসুলের দীদার
তাহার হ্রদয়াকাশে
সাত বেহেশ্‌ত ভাসে
খোদার আরশে হয় আখেরে গতি
কলেমা শাহাদাতে আছে খোদার জ্যোতি
ঝিনুকের বুকে লুকিয়ে থাকে যেমন মোতি।

বিষয়: কোরবানী

আল্লার নামে, ধর্মেরও নামে, মানব জাতির লাগি
পুত্রেরে কোরবানী দিতে পারে, আছে কেউ হেন ত্যাগী?
সেই মুসলিম থাকে যদি কেউ, তসলিম কবি তারে,
ঈদগাহে গিয়া তারি সার্থক হয় ডাকা আল্লারে।
অন্তরে ভোগী বাইরে যে যোগী, মুসলমান সে নয়,
চোগা চাপাকানে ঢাকা পড়িবে না সত্য সে পরিচয়!

বিষয়: জাকাত

দে জাকাত, দে জাকাত, তোরা দে রে জাকাত
দিল্‌ খুলবে পরে – ওরে আগে খুলুক হাত।

বিষয়: আরাফাত ময়দান

দুখের সাহারা পার হ’য়ে আমি
চলেছি কাবার পানে
পড়িব নামাজ মারেফাতের
আরাফাত ময়দানে।

বিষয়: বেহেশত

সেথা হর্দম খুশির মৌজ,
তীর হানে কালো আখির ফৌজ,
পায়ে পায়ে সেথা আর্জি পেশ,
দিল চাহে সদা দিল্‌-আফরোজ,
পিরানে পরান বাধা সেথায়
আয়, বেহেশতে কে যাবি, আয়।

বিষয়: জাগরণমূলক কবিতা

মোরা আসহাব কাহাফের মত
হাজারো বছর শুধু ঘুমাই,
আমাদের কেহ ছিল বাদশাহ
কোনো কালে তারি করি বড়াই,

জাগি যদি মোরা, দুনিয়া আবার
কাঁপিবে চরণে টালমাটাল
দিকে দিকে পুন জ্বলিয়া উঠেছে
দ্বীন ই ইসলামি লাল মশাল।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা ইতিহাস কবিতা কাজী নজরুল ইসলাম জীবনী ও স্মৃতিকথা সৃজনশীল প্রকাশনা

বিদ্রোহীর প্রতি দ্রোহের শ্রদ্ধাঞ্জলি

–বন্ধু বাংলা
“আমার দেশের সকল মাতা কাঁদবে আমার তরে / ভাববে তাদের আপন ছেলে গেছে দেশান্তরে//”

বৃদ্ধ নজরুলএক নজরুল ভক্ত (!) বলেন, নজরুল আল্লার অলি ছিলেন। ভাবছি অদুর ভবিষ্যতে এই মোসলেম সমাজে হুমায়ুন আজাদ ও অলি হয়ে যাবে!!!

নেতাজি সুভাস চন্দ্র বলছিলেন, “যুদ্ধে আমরা নজরুলের গান গাইব, তেমনি জেলখানায় আমরা নজরুলের গান গাইব”। নজরুল যাতে নজরুল না হয়ে উঠতে পারে সে জন্য এদেশের কিছু মোসলমান কবি – সাহিত্যিক কম চেষ্টা করে নাই। বিদ্রোহী কবিতার সেই চরণ ;

বৃদ্ধ নজরুল

 

 

 

 

 

“ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া, খোদার আসন আরশ ছেদিয়া, উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর!”

বা,

“ধরি বাসুকির ফণা জাপটি‘, ধরি স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি‘”

বা

“পূজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল মূর্খরা সব শোন/ মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোন“

এমন হাজারো সাহসী উচ্চারণ আর সাম্যবাদীতার কারণে “আম জনতা মুসলমান!”; নজরুলকে কাফির বলতে দ্বিধা করে নাই।

আজ নজরুল উপেক্ষিত , কারণ নজরুলের প্রচার মানে সাম্যবাদীতার প্রচার,

নজরুলের প্রচার মানে অসাম্প্রদায়িকতার প্রচার,

নজরুলের প্রচার মানে সর্বহারার প্রচার।

তরুণ নজরুল

তরুণ নজরুলসমাজের বৈষম্যের কথা উল্লেখ করলেও রবীন্দ্রনাথের একটা বুর্জুয়া চরিত্র ছিল; সে তুলনায় নজরুল একজন প্রকৃত বিশুদ্ধ সর্বহারা কবি। তবে রবীন্দ্রনাথকে হিন্দু বা নজরুল কে মুসলমান রূপে চিহ্নিত করা মানে দুজনকেই অপমান করা। কারণ দুজন দুইরকম শ্রেণী থেকে আগত, তাই চেতনাগত পার্থক্য থাকাটাও খুবই স্বাভাবিক। রবি যদি হয় ভাবের-প্রেমের চেতনা, তবে নজরুল ঠিক এর বিপরীত; যা নজরুল নিজেই বলেছেন;

“আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শ্মশান,

আমি অবসান নিশাবসান !

আমি ইন্দ্রানী-সূত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য

মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য। [বিদ্রোহীঃ অগ্নিবীণা]

তাই তুলনা করাটাই বোকামি!!! তবে হ্যা আমার কাছে রবীন্দ্রনাথের চেয়ে নজরুল অনেক কাছের একান্ত আপনার, সর্বহারার ভাই আরেক সর্বহারা। যেহেতু;

১। “রাজার প্রাসাদ উঠেছে প্রজার জমাট রক্ত ইটে,

ডাকু ধনিকের কারখানা চলে নাশ করি কোটি ভিটে;

দিব্যি পেতেছে খল কল-ওয়ালা মানুষ পেষানো কল,

আঁখ পেষা হয়ে বাহির হতেছে ভূখারী মানব দল। [চোর ডাকাতঃ সর্বহারা]

২।“যত শ্রমিক শুষে নিংড়ে প্রজা

রাজা উজির মারছে মজা

আমরা মরি বয়ে তাদের বোঝা (রে)

এবার জুজুর দল ঐ হুজুর দলে

দলবি রে আয় মজুর দলে

দলবি রে আয় মজুর দল

ধর হাতুরী তোল কাঁধে শাবল্ ॥ [শ্রমিকের গানঃ সর্বহারা]

জয় হোক মেহনতি শ্রমিক কৃষক সর্বহারার। জয় হোক সাম্যবাদের।

আজ ২৪শে মে কবি নজরুলের ১৩৩ তম জন্মদিনে আসুন; নজরুলকে ধারণ করি আমাদের মননে, মগজে, চেতনায়।।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা কৌতুক বিনোদন ব্যঙ্গকৌতুক

জটিল হাসিঁর কৌতুক

রাজনীতিবিদদের নিয়ে হাসির কৌতুক । না দেখলে মিস করবেন । দেখার জন্য  উপরের ভিডিওতে ক্লিকি করুন

Categories
Publications অনলাইন প্রকাশনা ইজি পাবলিকেশনস নির্দেশিকা

কিভাবে ইজি পাবলিকেশনসে বা হীরামন ম্যাগাজিনে নিবন্ধণ করতে পারবেন

নিবন্ধণ করুন আর প্রকাশ করতে থাকুন আপনার সৃজনশীল আর গবেষণা ধর্মী সকল লেখা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আর সহজে ।

পাসওয়ার্ড এর ইমেইল না পেলে আমাদের ইমেইল করুন পাসওয়ার্ড এর জন্যঃ email2epub@gmail.com

অথবা আমাদের ফেসবুক পেজে লিখুনঃ  https://www.facebook.com/pages/Easy-Publications

 

www.bdeasy.com                                     ——————-                     www.hiramon.com

Categories
অনলাইন প্রকাশনা কবিতা সৃজনশীল প্রকাশনা

আছে আমার হৃদয় আছে ভরে

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আছে আমার হৃদয় আছে ভরে,
এখন তুমি যা খুশি তাই করো।
এমনি যদি বিরাজ’ অন্তরে
বাহির হতে সকলই মোর হরো।
সব পিপাসার যেথায় অবসান
সেথায় যদি পূর্ণ করো প্রাণ,
তাহার পরে মরুপথের মাঝে
উঠে রৌদ্র উঠুক খরতর।

এই যে খেলা খেলছ কত ছলে
এই খেলা তো আমি ভালবাসি।
এক দিকেতে ভাসাও আঁখিজলে,
আরেক দিকে জাগিয়ে তোল’ হাসি।
যখন ভাবি সব খোয়ালাম বুঝি
গভীর করে পাই তাহারে খুঁজি,
কোলের থেকে যখন ফেল’ দূরে
বুকের মাঝে আবার তুলে ধর’।

রেলপথ। ই.আই.আর.
২১ আষাঢ় ১৩১৭

কাব্যগ্রন্থঃ গীতাঞ্জলি

Categories
অনলাইন প্রকাশনা কবিতা সৃজনশীল প্রকাশনা

আকাশতলে উঠল ফুটে

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
আকাশতলে উঠল ফুটে
আলোর শতদল।
পাপড়িগুলি থরে থরে
ছড়ালো দিক্-দিগন্তরে,
ঢেকে গেলো অন্ধকারের
নিবিড় কালো জল।
মাঝখানেতে সোনার কোষে
আনন্দে, ভাই, আছি বসে –
আমায় ঘিরে ছড়ায় ধীরে
আলোর শতদল।

আকাশেতে ঢেউ দিয়ে রে
বাতাস বহে যায়।
চার দিকে গান বেজে ওঠে,
চার দিকে প্রাণ নেচে ছোটে,
গগনভরা পরশখানি
লাগে সকল গায়।
ডুব দিয়ে এই প্রাণ-সাগরে
নিতেছি প্রাণ বক্ষ ভরে,
ফিরে ফিরে আমায় ঘিরে
বাতাস বহে যায়।

দশ দিকেতে আঁচল পেতে
কোল দিয়েছে মাটি।
রয়েছে জীব যে যেখানে
সকলকে সে ডেকে আনে,
সবার হাতে সবার পাতে
অন্ন সে দেয় বাঁটি।
ভরেছে মন গীত গন্ধে,
বসে আছি মহানন্দে,
আমায় ঘিরে আঁচল পেতে
কোল দিয়েছে মাটি।

আলো, তোমায় নমি, আমার
মিলাক অপরাধ।
ললাটেতে রাখো আমার
পিতার আশীর্বাদ।
বাতাস, তোমায় নমি, আমার
ঘুচুক অবসাদ।
সকল দেহে বুলিয়ে দাও
পিতার আশীর্বাদ।
মাটি, তোমায় নমি, আমার
মিটুক সর্ব সাধ।
গৃহ ভরে ফলিয়ে তোলো
পিতার আশীর্বাদ।

পৌষ ১৩১৬
কাব্যগ্রন্থঃ গীতাঞ্জলি
রচনা সংখ্যাঃ ৪৮

Categories
অনলাইন প্রকাশনা কবিতা সৃজনশীল প্রকাশনা

অমন আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
অমন   আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে
চলবে না।
এবার   হৃদয় মাঝে লুকিয়ে বোসো,
কেউ    জানবে না, কেউ বলবে না।
বিশ্বে তোমার লুকোচুরি,
দেশ বিদেশে কতই ঘুরি –
এবার   বলো আমার মনের কোণে
দেবে ধরা, ছলবে না।
আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে
চলবে না।

জানি আমার কঠিন হৃদয়
চরণ রাখার যোগ্য সে নয় –
সখা,    তোমার হাওয়া লাগলে হিয়ায়
তবু কি প্রাণ গলবে না।

না হয় আমার নাই সাধনা,
ঝরলে তোমার কৃপার কণা
তখন    নিমেষে কি ফুটবে না ফুল
চকিতে ফল ফলবে না।
আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে
চলবে না।

বোলপুর, ১১ ভাদ্র ১৩১৬
কাব্যগ্রন্থঃ গীতাঞ্জলি
রচনা সংখ্যাঃ ২৩