Categories
অনলাইন প্রকাশনা আত্ম উন্নয়ন বিনোদন ভালবাসা/প্রণয়লীলা সৃজনশীল প্রকাশনা

আজিমের বউ

– কাজী আনোয়ার হোসেন

১.

আপন মনে গুনগুন সুর ভাঁজছে মিতা শাহনাজ, তৈরি হচ্ছে স্কুলের জন্য। কাল একটু রাত জেগে পরীক্ষার খাতাগুলো দেখে রাখায় সকালে কাজের চাপ একদম নেই। সদ্য পাটভাঙা, লালপেড়ে, সুন্দর একটা সুতির ছাপা শাড়ি পরেছে ও আজ; আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এলোখোঁপায় গোটা কয়েক কাঁটা গুঁজে নিয়ে পাউডারের পাফ বুলাচ্ছে নাকে-মুখে। মর্নিং শিফটে বাচ্চাদের দুটো ক্লাস নিয়ে ফিরে আসবে, গোসল-খাওয়া সারবে বাসায়, তারপর আবার ডে শিফটে সেভেন-এইটের দুটো ক্লাস নেবে দুটো থেকে চারটে পর্যন্ত। ব্যস, ছুট্টি। খাতা-কলম, র‌্যাপিড রিডার, সবুজ সাথী, ড্রইংবক্স সব ওর বুটিক-ব্যাগে পুরে ওটা কাঁধে ঝুলাতে যাবে, এমনি সময় ঝনঝন শব্দে বাজল টেলিফোন। কেন জানি ওর মনটা আগাম গাইল: হয়তো খারাপ কোনও খবর। ভয়ে ভয়ে রিসিভার কানে তুলল ও। ‘কে কও? মিতা?’ নানীজির কাঁপা গলা। এই রসিক বৃদ্ধাকে ওর ভারি পছন্দ। এ-শহরে টিচার হয়ে এসে প্রথম ছয়টা মাস পেয়িং গেস্ট হিসেবে ছিল ও এঁদের পরিবারে, বিশেষ করে এঁর মধুর, ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে। এখনও নানীজির বাড়িতে যখন-তখন ওর অবাধ যাতায়াত। ও-বাড়ির সবকিছুতে ওকে থাকতেই হবে, কোনও অনুষ্ঠানে যদি না যায়, নানীজি নিজে চলে আসেন নিতে। মিতার সাড়া পাওয়ামাত্র রেলগাড়ি ছুটালেন নানীজি। ‘কী বিয়াপার, মিতা, ভুইলা গেছো নিকি আমাগো? আহো না যে? অসুক-বিসুক অইল নিকি আবার? এক সাপ্তা গেল গা, পাত্তাই নাই!’ প্রথমে বাঁধা-ধরা অনুযোগ সেরে নিয়ে এইবার শুরু করলেন নানীজি পুরো খবর, ‘এইদিকের গটনা জানো না, মিতা? আজিম তো আইতাছে। সইন্ধ্যার গাড়িতে আইব, আগামী কাইল।’ একটু ইতস্তত করলেন তিনি, তারপর বলে ফেললেন আসল খবর, ‘বউ নিয়া আইতাছে আজিম।…কী কইলা?…হ, বউ নিয়া। ঢাকা থেইকা ফোন করছিল আমারে কাইল অনেক রাইতে। হাতে এক্কেরে সময় নাই। কও দেহি, তারাহুরা কইরা আমরা অহন কী ব্যবস্তা করি! বাড়ির হগলতে এক্কেরে পেরেশান হইয়া পড়ছে। আইজ বিকালে পারিবারিক মীটিন। তুমি আইজ ইসকুল থেইকা সিদা আমাগো এইহানে আইসা পড়ো। হগলতে মিলা বুদ্দি-পরামশ্য কইরা দেহি কী করা যায়।…কী কইলা?…হ, এই বাড়ির হগলতে তো থাকবই, কয়জন আপ্তীয়-স্বজনরেও ডাকুম।…কী কইলা?…পিট্টি লাগামু কইলাম! তুমি আপ্তীয়রও বেশি, তুমি একটুও দেরি করবা না, মিতা। একটা আয়োজন করতে হইলে…’ বলেই চললেন নানীজি। বাড়িঘর গোছগাছ করা, নাতি-নাতবৌয়ের জন্য সুন্দর করে একটা ঘর সাজানো, বাড়ির বাইরের আলোকসজ্জা, খানাপিনার ব্যবস্থা, ডেকোরেটরের সঙ্গে কথা বলা-হ্যাঁ, অনেক কাজ পড়ে রয়েছে, সময় কম। রিসিভার কানে ধরে জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে আছে মিতা। বাগানের লাল-নীল-হলুদ ফুলগুলো রঙ হারিয়ে কেমন মলিন হয়ে গেছে, এক রঙ অন্য রঙে মিলেমিশে ঝাপসা। ফোন ছেড়ে জানালার সিক ধরল মিতা। মনে হচ্ছে কণ্ঠনালীর কাছে এসে লাফাচ্ছে হৃৎপিণ্ডটা, চিন্তাগুলো অস্পষ্ট। ধীরে ধীরে কিছুটা রঙ ফিরে এলো ফুলে, মাতালের মত ঢলাঢলি কমল ওদের। মাথাটা একটু পরিষ্কার হয়ে আসতে নির্জলা, নিষ্ঠুর, বাস্তব সত্যটা স্পষ্ট হয়ে উঠল ওর কাছে: ব্যাপারটা ঘটল তা হলে, বিয়ে করে ফেলল আজিম। ভয় ছিল, এমনটা হতে পারে-কিন্তু সত্যি সত্যি ঘটেই গেল! আগে থেকে বলল না, মানসিক প্রস্তুতি নেওয়ার একটু সুযোগও দিল না ওকে! একটু ভাবল না ওর কথা! সঙ্গে-সঙ্গে উত্তর এলো নিজেরই মন থেকে। কেন ভাববে? বিরাট ব্যবসায়ীর একমাত্র পুত্র, নিজেও গতবছর এমবিএ পাশ করে নেমে পড়েছে ব্যবসায়, অল্পদিনের মধ্যেই দাঁড় করিয়ে ফেলেছে আলাদা নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান; উনত্রিশ বছরের তরতাজা, স্বাস্থ্যবান যুবক; যেমন দেখতে-শুনতে, তেমনি ছোট-বড় সবার সঙ্গে ভদ্র, স্বতঃস্ফূর্ত, মিষ্টি ব্যবহার; পরিবারের সবার আদরের ধন, চোখের মণি, কলজের টুকরো-সে কেন ওর মত সাধারণ এক স্কুল টিচারের কথা ভাবতে যাবে? কিন্তু তা হলে আগে যেখানে ঢাকা থেকে বছরে একবার বেড়াতে আসত, গত দেড়টা বছর প্রতিমাসেই ছুটে এসেছে কেন ও নানা-বাড়িতে? আর এসেই কেন হই-হই করে খোঁজ করেছে মিতার? ছুটির কটা দিন ওর সঙ্গে হাসি-গল্পে মহানন্দে কাটিয়ে দিয়ে কেন প্রতিবার মন খারাপ করে ফিরে গেছে ঢাকায়? এর উত্তর জানা নেই মিতার। ও অবশ্য বরাবর ভদ্র দূরত্ব বজায় রেখেছে, এরকম একটা ভয় ছিল বলেই তীক্ষ্ন উপস্থিতবুদ্ধির কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে রেখেছে নিজেকে, সহজ বন্ধুত্ব হিসেবে হালকা করে দেখেছে সম্পর্কটাকে। বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেছে ওরা নদীর তীর ধরে অনেক, অনেকদূর-কিন্তু হাত ধরেনি কেউ কারও। মুখ ফুটে কেউ বলেনি কিছু। কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে মিতা, মনের গভীরে কোন আশাই দানা বাঁধেনি ওর? ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস পড়ল।-না, তা বলতে পারবে না। যাক, এখন কিছুতেই কিছু এসে যায় না। টেনিসনের লাইনটা মনে পড়ছে: ‘সুখের দিনগুলো স্মরণ করলে চরমে পৌঁছবে তোমার দুঃখ।’ ভুলে যাও, ভুলে যাও।

২.

স্কুলের ঘণ্টা পড়তেই সচকিত হলো মিতা। কর্তব্য যখন বেদনার কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়ে বলে: ‘আরে, দূর, বাদ দাও তো! কাজ পড়ে আছে না তোমার!’ তখন সে-কথায় কান দেওয়াই ভালো। বেরিয়ে পড়ল ইতি। ইঁট বসানো সরু পথের ওপর ঘন হয়ে বিছিয়ে রয়েছে ইউক্যালিপ্টাসের শুকনো ঝরা পাতা। একটু এগিয়ে বামে বাঁক নিয়ে একশো গজ গেলেই স্কুল। দু’বছর হলো বিধবা মাকে গ্রামের বাড়িতে রেখে চাকরি নিয়ে এসেছে ও এখানে। এখন মনে হয় কত যুগ ধরে যেন আছে ও এই শহরে। ছোট্ট একটা মেয়ে ইউক্যালিপ্টাসের ফরসা গায়ে হেলান দিয়ে অপেক্ষা করছিল তার প্রিয় আপার জন্য, মিতা কাছে আসতেই দৌড়ে এসে ভেজা-ভেজা কচি হাত দিয়ে ধরল ওর হাত। ‘আচ্ছা, মিতাপা, ঘাসফড়িংগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে কোথায় যায়?’ ‘আমি জানি না তো, বেনু সোনা।’ আনমনে জবাব দিল মিতা। অতীতে চলে গেছে ওর মন। বি.এ. পাশ করে চাকরি নিয়ে ও যখন পাকশিতে আসে, ওর তখন তেইশ, আজিমের সাতাশ। একমাসও হয়নি নানীজির বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হিসেবে আছে, এমনি সময়ে ঢাকা থেকে এলো সবার প্রিয়, পরিবারের হিরো আজিম আহমেদ। এসেই সন্ধ্যায় দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ‘ভউ’ করে ওকে ভয় দেখিয়ে নতুন মানুষ দেখে নিজেই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। লজ্জায় লাল। দৃশ্যটা মনে পড়ায় হাসি এসে গেল ঠোঁটে। মিতার হাসি দেখে ছোট্ট মেয়েটা ওর হাতটা নিয়ে নিজের গালে ঠেকাল। ‘আচ্ছা, আপা, তুমি লাল রসগোলা বানাতে পারো?’ ‘না, সোনা।’ ছোটবেলায় মা হারিয়ে আজিম আর ওর বড় বোন শান্তা নানীবাড়িতে মানুষ হয়েছে সাত-আট বছর। তারপর ওদের বাবা এনাম আহমেদ দুজনকে ঢাকায় নিয়ে যান। শান্তার বিয়ে হয়ে যায় সেই বছরই, আজিম মন দেয় লেখাপড়ায়। কিন্তু নানীবাড়ির হাসিখুশি খোলামেলা পরিবেশের আকর্ষণে প্রতি বছরই গরমের ছুটিতে ছুটে চলে আসে ও এখানে। গত সতেরো বছর ধরে এর কোন হেরফের হয়নি। কিন্তু মিতার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর থেকে প্রায় প্রতি মাসেই এসেছে ও পাকশিতে, হাসি-গল্পে মাতিয়ে দিয়ে গেছে সবাইকে। গল্প করতে গিয়ে দুজনেই আবিষ্কার করেছে অদ্ভুত মিল রয়েছে ওদের দুজনের রুচিতে, চিন্তায়, মন-মানসিকতায়। ‘মিতাপা, আমার জন্মদিন জুলাই নাকি জুনমাসে ভুলে গেছি।’ ‘ভাল করেছ, সোনা।’ গত বছর এমবিএ পাশ করে বাবার ব্যবসায় যোগ না দিয়ে নিজেই আলাদা ব্যবসায় নেমে এক বছরে অনেক উন্নতি করেছে আজিম। গত ছ’টা মাস প্রতিবার যখন এসেছে, ওর জন্য কিছু না কিছু উপহার নিয়ে এসেছে, ওর কাছে সেটা ভাল লাগলে মনে হয়েছে ধন্য হয়ে গেছে আজিম। নানাবাড়ির জমজমাট গল্পের আসরে ইদানীং মাঝেমাঝেই মামা-মামী-খালা-খালুরা ওর বিয়ের প্রসঙ্গ তুলেছেন, আজিম কোন জবাব দেয়নি, লাজুক হেসেছে, আর চোরা চোখে তাকিয়েছে মিতার দিকে। ‘আচ্ছা, আপা, এই শহরে কি বাঘ আছে?’ ‘না, সোনা।’ ‘ভালুক?’ ‘নাহ্!’ এই তো কদিন আগে হঠাৎ আজিমের একটা দীর্ঘ চিঠি এলো মিতার বাসার ঠিকানায়। ওতে নানান কথার শেষে লেখা ছিল কী যেন বলবে ও মিতাকে আগামীবার পাকশি এসে। এখন বোঝা গেল কী বলতে চেয়েছিল। অথচ ও ভেবেছিল, হয়তো…রাগ হচ্ছে মিতার নিজের ওপর, আঘাত লাগছে আত্মসম্মানে, কেন খুশি হয়ে উঠেছিল ওর গোটা অ¯স্তিত্ব? কী ভেবে? ভাগ্যিস কোন উত্তর লিখে নিজেকে খেলো করে ফেলেনি ও! ক্লাসে পৌঁছে রুটিন কাজের মধ্যে কিছুটা স্ব¯স্তি খুঁজে পেল মিতা। প্রথমেই ব্যাগটা ডেস্কের ওপর নামিয়ে বই-খাতা বের করে সাজিয়ে রাখল। গত কদিন ধরেই ছাত্র-ছাত্রীদের ‘কাজলা দিদি’ কবিতাটি মুখস্থ করাচ্ছে, বলল, ‘জাহাঙ্গির, যেটুকু শিখিয়েছি খাতা না দেখে বলো তো শুনি!’ সোৎসাহে শুরু করল জাহাঙ্গির: বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই, মাগো, আমার শোলক-বলা কাজলা দিদি কই? এটুকু বলতেই উঠে দাঁড়াল বেনু। ‘আপা, আমি বলি?’ ‘ওর বলা হয়ে যাক, বেনু, তারপর। কেমন?’ বেনুর আবৃত্তি শেষ হতেই ‘গুড’ বলে চক নিয়ে ব্যাকবোর্ডের সামনে গিয়ে দাঁড়াল ইতি। আজ আরও দুটো চরণ লিখল: ভুঁইচাঁপাতে ভরে গেছে শিউলি গাছের তল, মাড়াসনে মা, পুকুর থেকে আনবি যখন জল।

৩.

প্রায় সবাই হাজির। দোতলায় নানীজির শোবার ঘরে কেউ চেয়ারে, কেউ লম্বা বেঞ্চে, কেউ খাটে, কেউ টুলে-যে যেখানে পেরেছে বসেছে। মিতা পৌঁছতে ওকে ডেকে নিজের ইজিচেয়ারের পাশে একটা গদি আঁটা মোড়ায় বসালেন নানীজি। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল আলোচনা। ছোটখালার ইচ্ছে সামনের আঙিনায় প্যান্ডেল টাঙানো হোক। মেজোখালার ইচ্ছে শহরের সবাইকে দাওয়াত করা হোক। মেজো মামা আপত্তি করলেন: ভোজ লাগানোর কোন দরকার নেই, বিয়ে হয়ে গেছে, এখন শুধু আত্মীয়-বন্ধুদের নিয়ে চা-বিস্কিটের একটা সম্বর্ধনা হলেই যথেষ্ট। নানীজি বললেন: মোরগ পোলাওয়ের লগে আর কী-কী থাকবো, হেইটা নিয়া চিন্তা করো। বড়খালা বললেন: টিকিয়া, বোরহানী আর খাসীর কালিয়া। আর মুরগীর রোস্ট-জিভ টেনে বলল ছোট্ট ইরিনা। এইবার ছোটরা কাঁইমাই শুরু করল। পুবের বড় বেডরূমটা সাজানো হবে আজিম ভাই আর ভাবীর জন্য। ফুলের দায়িত্ব থাকবে অলকের ওপর, কাগজ-কাটা সাজসজ্জার ভার নিতু ভাবীর ওপর। সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকবে ছোটখালু। কেনা-কাটা, প্যান্ডেল, বাবুর্চি-বেয়ারা এসবের ভার নিলেন বড়মামা। ‘ডিনার সেট, পেট, গাস এসব ভাড়া না করে নানুর আলমারি থেকে-’ এর বেশি আর বলতে পারল না মেজখালার মেয়ে নাসিমা; বাঙাল ভাষায় ফুঁসে উঠলেন নানীজি। ‘খবরদার! আমার কইলজা হাতরাইয়া কিছু যদি বাইর করবি, নলী বাইঙ্গা ফালামু কোলাম!’ ‘ধরতে পারলে তো!’ বলল অলক। ‘দৌড়ে তুমি পারবে আমাদের সঙ্গে?’ হাসলেন নানীজি, তারপর ভুরু কুঁচকে কপট রাগ দেখিয়ে বললেন, ‘আলমারিতে চোখ দিবি না, ব্যস, কোইয়া দিলাম!’ ‘আচ্ছা, চায়নিজ করলে কেমন হয়?’ নতুন এক প্রস্তাব তুলল বড়খালার ছোটমেয়ে রুবি। ‘হল ভাড়া নিয়ে-’ ‘খুব খারাপ হয়,’ জবাব এলো তারই মায়ের কাছ থেকে। ‘কেন?’ জানতে চাইল তাঁর আরেক মেয়ে। ‘আমি তো উপর-নিচ করতে-’ বলতে নিয়েছিলেন নানীজি, কিন্তু কথা শেষ করবার আগেই প্রস্তাব উইথড্র করে নিল রুবি। ‘আমি ভাবছিলাম, যদি ঢাকার পশ্ এলাকার আল্ট্রা মডার্ন মেয়ে হয়,’ ব্যাখ্যা দিল রুবি, ‘তা হলে আমরা ভাবীকে দেখিয়ে দিতে পারতাম, এখানে আমরাও খুব একটা পিছিয়ে নেই।’ নতুন আইডিয়া খেলল তরুণ ফটোগ্রাফার বাবলুর মাথায়: ‘গেটের ওপর আজিম ভাইয়ের একটা ছবি এনলার্জ করে টানিয়ে দিলে কেমন হয়?’ ‘খুব ভাল হয়,’ বলল মিতা। ‘কাবাবঘরের গেটে যেমন খাসীর ছবি টাঙানো থাকে, তাই না?’ সবাই হো-হো করে হেসে ওঠায় লজ্জা পেয়ে মিতা আপারই আঁচল তলায় লুকাল বাবলু। ওর পিঠে হাত বুলিয়ে দিল মিতা। চা-নাস্তার ফাঁকে-ফাঁকে ঘণ্টা দুয়েক আলোচনা, হাসি-তামাশা আর গল্প-গুজব চলল, সবার সঙ্গে সমান তালে আড্ডা দিল মিতাও। প্রত্যেককে যার-যার দায়িত্ব বেঁটে দিলেন নানীজি, এমন কি ছোট্ট ইরিনাও পেল একটা পান-সুপারী সাজানো থালার দায়িত্ব। মিতার ওপর পড়ল বাদাম-পেস্তা দেওয়া শরবত তৈরি করা এবং সবাই ঠিক মত পেল কিনা দেখবার দায়িত্ব। পরদিন দুপুরে আসবে কথা দিয়ে বাসায় ফিরে গেল ও।

৪.

পরদিন শুক্রবার। স্কুল নেই। সন্ধের আগেই নানীজির প্রশস্ত রান্নাঘরের কোণে টেবিলের উপর রাখা একটা কল লাগানো ড্রামে কুচি করা বাদাম-পেস্তা দেওয়া মিষ্টি দইয়ের শরবত বানিয়ে ফেলল মিতা। বড় দেখে তিনটে বরফের চাঁই ছাড়ল ওতে। বর-কনে পৌঁছে গেলেই গাসে-গাসে ঢালা হবে শরবত। তখনও ওর হাজির থাকতে হবে, কারণ কল খুলে ঢালার আগে বড় হাতা দিয়ে আচ্ছামত গুলাতে হবে, দেখতে হবে মিষ্টি ঠিক হয়েছে কি না। কাপড় পাল্টে আসছি বলে ঘরে ফিরে বিছানায় লুটিয়ে পড়ল মিতা। কিচ্ছু ভাল লাগছে না, উঠে দাঁড়াবারও শক্তি নেই শরীরে। বুক ভেঙে উঠে আসতে চাইছে কাঁপা-কাঁপা দীর্ঘশ্বাস। আধঘণ্টা শিথিল ভঙ্গিতে পড়ে থেকে, নিজেকে চোখ রাঙিয়ে অনেক কষ্টে তুলল ও বিছানা থেকে। শথ ভঙ্গিতে সাদামাঠা একটা শাড়ি পরল ও, কাজল দিল চোখে, মুখে হালকা পাউডার বুলিয়ে, কপালে ছোট্ট একটা লাল টিপ পরেই রওনা হলো আলো-ঝলমল বাড়িটার দিকে। অভ্যাগতরা আসতে শুরু করেছেন। দূর থেকে ট্রেনের সিটি কানে আসতেই ধক্ করে উঠল মিতার বুকের ভিতরটা। ওই, আসছে ওরা! বড় মামা গাড়ি নিয়ে গেছেন ওদের আনতে। ওর ইচ্ছে হলো ঝোপে-জঙ্গলে কোথাও লুকিয়ে পড়ে, এমন কোথাও, যেখান থেকে ওদেরকে দেখা যায়, কিন্তু ওকে কেউ দেখতে না পায়। মাথা নেড়ে বাজে চিন্তা দূর করে দিল মিতা। এখন ভেঙে পড়লে চলবে না, মনটাকে শক্ত করে নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য তৈরি থাকতে হবে। কেউ যেন ঘুণাক্ষরেও টের না পায় ওর ভিতরে কী চলছে। গম্-গম্ করছে বাড়িটা ঠিক বিয়ে-বাড়ির মতই। সবাই চারদিকে এমন ভাবে ছুটোছুটি করছে, যেন পিঁপড়ের বাসায় খোঁচা দিয়েছে কেউ। ‘আরে, মিতা আপা! তুমি এতক্ষণে আসছ?’ নিচতলার বারান্দায় উঠতেই বলল ছোটখালার বড় মেয়ে ঝর্না, ‘সেই কখন থেকে পাগল হয়ে খুঁজছে নানু তোমাকে! জলদি ওপরে যাও, নইলে চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করবে তোমার নানীজি!’

৫.

প্রাচীন বাড়িটাকে আর চেনাই যাচ্ছে না। ছোটরা সত্যিই সুন্দর করে সাজিয়েছে কাগজের ফুল আর নকশা দিয়ে। সিঁড়ির ধাপে আর ল্যান্ডিঙে আলপনা আঁকা হয়েছে। সুন্দর লাগছে। দোতলায় উঠে গেল মিতা। সিঁড়ি বেয়ে পিলপিল করে উঠছে-নামছে উৎসবের বাহারি সাজ-পোশাক পরা নানান বয়েসী চেনা-অচেনা অসংখ্য ছেলেমেয়ে। ওকে দেখে মিষ্টি করে হাসলেন ছোটখালা। ‘বাহ্! ভারি সুন্দর লাগছে তো তোমাকে আজ!’ মৃদু হেসে পাশ কাটাল মিতা। নানীজির কাছে যেতে হাত ধরে বসালেন তিনি পাশে। কেন খোঁজ করছেন জিজ্ঞেস করায় বললেন, ‘কী কইলা?’ ‘আমাকে খুঁজছিলেন বলে?’ ‘হ।’ ‘কেন?’ কেন খুঁজছিলেন মনে নেই নানীজির। নিজ দায়িত্বের কথা ভেবে সচকিত হলো মিতা। ‘আমার একটা টুল দরকার ছিল যে, নানীজি। ওর ওপর চড়ে শরবত ঘুঁটতে হবে ঢালার সময়।’ ‘ঠিক কইছ। তোমার বড়খালা আছে রান্নাঘরে, অরে কইলেই একটা টুলের ব্যবস্তা কইরা দিব।’ রান্নাঘরে চলে এলো মিতা। টেবিলের ধারে একটা টুল রাখা, তার ওপর বসেই অপেক্ষা করছেন বড়খালা ওর জন্য। ওকে দেখেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল তাঁর চোখদুটো। ‘দারুণ লাগছে তোমাকে, মিতা!’ ওর চিবুক স্পর্শ করে আঙুলে চুমো খেলেন বড়খালা। ‘আজিমটা একটা আস্ত গাধা! কাছের মানুষটাকে মনে ধরল না, হুট করে বিয়ে করে বসল কোথাকার কোন্ মেয়েকে। অথচ আমরা সবাই জানি একমাত্র তোমাকেই সত্যি-সত্যি মানায় ওর পাশে।’ ‘শরবতটা এখন একবার ভাল করে ঘুঁটে বরফ দিয়ে রাখলে হতো না, খালা? মিষ্টি ঠিক হয়েছে কি না কে জানে!’ টুল ছেড়ে উঠে পড়লেন বড়খালা। ‘ঠিক বলেছ। তুমি নাড়ো, আমি একটা গাসে নিয়ে চেখে দেখি।’ টুলে উঠে দাঁড়াল মিতা ইয়া বড় এক কাঠের ঘুঁটনি নিয়ে। বড়-বড় আরও কয়েকটা বরফের চাকা ছাড়া হলো টবে। মিনিট পাঁচেক ঘাঁটাঘাঁটির পর চেখে দেখা গেল মিষ্টি বেশি লাগছে, তার মানে বরফ গললে একদম ঠিক হবে। আবার ঢাকনা বন্ধ করে রাখা হলো, সার্ভ করবার আগে আবার একবার ঘাঁটতে হবে, ব্যস। এবার দোতলার বারান্দায় চলে এলো মিতা বড়খালার সঙ্গে। এখান থেকে দেখা যাবে বর-কনেকে গেট দিয়ে ঢুকবার সময়। ফুলের তোড়া নিয়ে তিন-চারটে বাচ্চা মেয়ে দাঁড়িয়েছে গেটের দু’পাশে। বিরিয়ানী আর টিকিয়ার গন্ধ ভেসে আসছে নীচ থেকে।

৬.

বড়মামার গাড়ির টানা হর্ন শুনে বুক কাঁপতে শুরু করল মিতার। দোয়া-দরুদ পড়ে ফুঁ দিল বুকে, যাতে ভেঙে পড়ে সবার সামনে বেইজ্জত না হয়। গেটে এসে থামল গাড়ি। ওই তো, নামছে আজিম! সেই ঋজু, সুঠাম দেহ, চিতানো বুক, ব্যাকব্রাশ করা চুল; সেই স্বতঃস্ফূর্ত, উজ্জ্বল হাসি। আর পাশে-ওহ্, ভারী মিষ্টি তো মেয়েটা!-ঠিক যেন ফুটফুটে এক লালপরী। বয়সটা যদিও একটু কম-টেনেটুনে বড়জোর সতেরো হবে। কমনীয় চেহারাটা টুকটুকে লাল কাতান শাড়িতে কেবল সুন্দর না, অপূর্ব সুন্দর লাগছে দেখতে। ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল মিতার নিজেরই অজান্তে। চট্ করে ঘাড় ফিরিয়ে চাইলেন বড়খালা। মনটা শক্ত করল মিতা। দায়িত্বের কথা মনে পড়ল ওর। আজিম তখন মামা-খালুদের সালাম করে পরিচিতদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে। মিষ্টি হাসি মুখে নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে ওর বউ। মুখ নাড়া দেখে কেন যেন মনে হলো আজিম জিজ্ঞেস করল: মিতা কই? মিতা আসেনি? তারপর হাতের ইশারায় এগোতে বলল বউকে। হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে মিতার, গরম ভাপ বেরোতে চাইছে দুই গাল আর কান দিয়ে। ও জানে না, ওর হিংসে করবার কোন কারণই নেই: ওর ফরসা গালের লালচে আভা, কোমর ছাড়িয়ে নেমে যাওয়া মেঘবরণ চুল, আর কাজল-কালো আয়ত চোখ এ-মুহূর্তে ওকে নববধূর চেয়ে অনেক-অনেক বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এগিয়ে আসছে আজিম বউ নিয়ে। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়তে চাইছে ওদের ওপর। কী যেন বলল আজিম, হো-হো করে হেসে উঠল সবাই। খালা-খালুরা হাসছে, হাসছে মামা-মামীরাও, হেসে গড়িয়ে পড়ছে ছোটদের দল। কে যেন বলল, ‘একদম মায়ের চেহারা!’ এখনি খোঁজ পড়বে শরবতের। রান্নাঘরের দিকে ছুটল মিতা। সাদামাঠা শাড়ি পরে চলে এসেছে ও, লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছে ভাবতে যে, একটু পরেই ওর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে আজিম ওর বউকে। হাসবে মেয়েটা মেকাপবিহীন মিতার গ্রাম্যতা দেখে। হাসুক, সাধারণ এক স্কুল টিচার আর কত ভাল কাপড় পরবে। রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে আজিমের গমগমে গলা শুনতে পেল মিতা, ‘মিতা কোথায়? মিতাকে দেখছি না যে! মিতা গেল কোথায়?’ কে কী উত্তর দিল শোনার জন্য অপেক্ষা না করে হাঁটবার গতি বাড়িয়ে দিল মিতা। দৌড়ে পালিয়ে এলো রান্নাঘরের নিরাপদ আশ্রয়ে। ওখানে অলক আর রুবিকে দেখে বলল, ‘আমি শরবত গুলাচ্ছি, তোমরা কলটা ছেড়ে দিয়ে ট্রে-র গাসগুলো ভরে নিয়ে ছুট দাও, ঠিকাছে? দেখো, কেউ যেন বাদ না পড়ে।’ ছুটল ওরা ট্রে-ভর্তি শরবতের গাস নিয়ে। টুলের ওপর দাঁড়িয়ে শরবত গুলাতে গুলাতে আরও কয়েকবার আজিমের গলা শুনতে পেল মিতা। ‘মিতা গেল কই? কোথায় মিতা?’ ক্রমেই কাছে চলে আসছে গলাটা। কোথাও লুকাতে পারলে হতো, ভাবছে মিতা। কিন্তু তার আগেই দেখল নীল জিন্স পরা একজোড়া পা ব্যস্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছে রান্নাঘরের দিকে।

৭.

মাথা নিচু করে ঢুকল আজিম রান্নাঘরের মেয়েলি-সাইজ দরজা দিয়ে। টুলের ওপর দাঁড়ানো মিতাকে দেখল আপাদমস্তক। একগাল হেসে বলল, ‘কি ব্যাপার, মিতা? সারা বাড়ি খুঁজে কোত্থাও পাচ্ছি না তোমাকে! শেষে নানু বলল: দেখ্ গিয়ে, রান্নাঘরে থাকতে পারে। আমি এলাম, খুঁজে মরছি তোমাকে, আর এখানে লুকিয়ে রয়েছ তুমি?’ ‘লুকিয়ে কোথায়?’ বলল মিতা। ‘আমি তো সম্বর্ধনার কাজে ব্যস্ত!’ আরেক টুকরো বরফ ড্রামে ফেলবে কি না ভাবছিল ও, কথা বলতে গিয়ে হাত ফসকে পড়ে গেল ওটা ড্রামে। ‘এইয-যাহ্! আজিম ভাই, এতবড় বরফের চাঁই তো পানসে করে দেবে শরবত!’ বরফ তুলতে গিয়ে মিতার গায়ে ছিটকে এলো শরবত। হা-হা করে হেসে উঠল আজিম। ‘তোমার হাতের তৈরি শরবত, কিচ্ছু ভেবো না, মিষ্টিই থাকবে।’ এই বলে রুমাল বের করে সোৎসাহে মুছিয়ে দিল ও মিতার হাত, শাড়ি, কপাল। হঠাৎ মিতার চোখে চোখ পড়ল আজিমের। চট্ করে হাতটা ছেড়ে দিয়ে আড়ষ্ট ভঙ্গিতে হাসল ও। ‘তোমার চিঠি পেয়েছি,’ টুল থেকে নেমে বলল মিতা। ‘কী বলতে চেয়েছিলে বুঝতে পেরেছি। সত্যিই, দারুণ! অপূর্ব সুন্দরী মেয়েটা!’ ‘সত্যিই! তাই না?’ বলল আজিম। ‘যেমন দেখতে, তেমনি ওর ব্যবহার, চালচলন। ঠিক যেন মাঝবয়েসী গিন্নি একটা। আমি পাকশি আসছি শুনে কিছুতেই ছাড়ল না। এখন চুটিয়ে গল্প করছে নানীদের সঙ্গে। কিন্তু-হোয়াট ডু ইউ মীন বাই বুঝতে পেরেছি? কী বুঝতে পেরেছ? তুমি জানতে তোমার জন্যে কী নিয়ে ছুটে আসছি আমি ঢাকা থেকে?’ ‘ছুটে আসছ…আমার জন্যে! মানে?’ ‘অনেক ভেবে দেখলাম, মিতা। মাঝে হাসপাতালে ছিলাম বেশ কিছুদিন। এতদিন ভেবেছিলাম আমাদের সম্পর্কটা বুঝি শুধুই বন্ধুত্বের, কিন্তু হাসপাতালের বেডে শুয়ে-শুয়ে হঠাৎ বুঝতে পারলাম, তোমাকে আমার চাই-ই চাই। বুঝে গেছি, তোমাকে ছাড়া সত্যিই আমি বাঁচব না, মিতা।’ কিন্তু ততদিনে যা হবার হয়ে গেছে, বিয়ে করে বসেছে একটা কচি মেয়েকে। মিতা বুঝতে পারছে আজিমের মনের অবস্থাটা। যখন পরিষ্কার বুঝল সব, তখন দেরি হয়ে গেছে অনেক। আজিমের একটা হাত ধরল মিতা। নরম চোখে চাইল ওর চোখে। বলল, ‘এসব কথা থাক, আজিম ভাই। আর কখনও উচ্চারণ কোরো না একথা। আমিও কি ছাই জানতাম তুমি আমার কী ছিলে? এখন মন থেকে ঝেড়ে ফেলো সব স্মৃতি। সব এখন অতীত। ভুলেও ভেবো না আর, কী হতে পারত। তুমি-’ ‘এসব কী বলছ তুমি, মিতা?’ তাজ্জব হয়ে গেছে আজিম। ফ্যাকাসে হয়ে গেছে ওর হাসিখুশি মুখটা। ‘বলছি, বিয়ের পর এসব নিয়ে আর ভাবতে নেই।’ এতক্ষণে হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল আজিমের মুখ। বলল, ‘অ্যাঁ? বিয়ের পর মানে? কে বলেছে আমি বিয়ে করেছি? তুমিও বুঝি তাই বিশ্বাস করেছ?’ ‘কেন? করোনি বিয়ে?’ দিশেহারা মিতার চেহারা। হাসি আসছে, কিন্তু মিতার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে মন খুলে হাসতেও পারছে না আজিম। বলল, ‘মউ? মউয়ের কথা বলছ? ও তো আমার আপন ভাগ্নী!’ ‘কী বললে?’ ‘তাই তো! সঙ্গে মউকে নিয়ে আসছি বলায় নানু শুনেছে বউকে নিয়ে আসছি। ও হলো শান্তা আপুর মেয়ে, এসএসসি দিয়ে বসে ছিল, চেপে ধরল মামার সঙ্গে ও-ও যাবে ওর মা’র নানীবাড়ি। গেটের কাছে সবার ভুল ভেঙে দেওয়ায় কি রকম হাসির হুলোড় উঠল-তুমি শোনোনি?’ শুনেছে, কিন্তু বুঝতে পারেনি মিতা। হঠাৎ করে বড্ডো দুর্বল বোধ করছে, অবশ লাগছে শরীরটা। আজিমের চোখে চোখ রেখেই নামিয়ে নিল দৃষ্টি। ওর চিবুক ধরে মুখটা উঁচু করল আজিম, কিন্তু চোখ তুলল না মিতা। নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘কী এনেছ আমার জন্যে?’ পকেট থেকে ছোট্ট একটা বাক্স বের করল আজিম, লাজুক ভঙ্গিতে হাসছে। বাক্সটা খুলতেই বেরিয়ে পড়ল বড়সড় হীরে বসানো ঝকঝকে একটা সোনার আংটি। ওটা দেখেই কাঁপা শ্বাস টেনে দম আটকে ফেলল মিতা। ওর বামহাতটা তুলে নিল আজিম তার শক্ত, পুরুষালি হাতে। ‘দিই পরিয়ে?’ বলে অনুমতির অপেক্ষা না করেই পরিয়ে দিল ওটা মিতার অনামিকায়। দুটো দিনের অসহ্য মানসিক চাপ আর সামলাতে পারল না মিতা, ডুকরে কেঁদে উঠে মুখ লুকাল আজিমের বুকে।

৮.

এমনি সময়ে রান্নাঘরে ঢুকলেন নানীজি। ‘অই, ছ্যারা! কী করছত অরে? আমার মিতা কান্দে ক্যান?’ ‘আমি কিচ্ছু করিনি, নানু। বিশ্বাস করো। এইটা পরিয়ে দিতেই কেঁদে উঠল!’ মিতার হাতের দিকে চাইলেন নানীজি। ‘আংটি! কীয়ের আংটি?’ ভুরুজোড়া কপালে তুললেন নানীজি। তারপর একগাল হাসলেন। ‘আইচ্ছা! এই বিয়াপার? আমিও তো এরই লেইগা নিচে নামলাম। আমরা আইজই কামটা সাইরা ফালাইতে চাই।’ নানীজির পিছন থেকে কথা বলে উঠলেন মেজো মামা, ‘কিন্তু ওদের বাপ-মাকে না জানিয়ে…’ চমকে ঘাড় ফিরিয়ে দেখল ওরা পুরো ব্যাটেলিয়ান নানুর পিছনে খাড়া। চট্ করে সরে দাঁড়াল মিতা। ‘খলিল, তুই চুপ র্ক! অই, ফজল, তুই লৌরায়া গিয়া কাজী সাবেরে লইয়া আয়। শুব কামে জলি জলি! ঘর রেডি, সাজানি কমপিলিট, খানাপিনা তৈয়ার, আমরা হ¹লতে হাজির-তাইলে আর দেরি কীয়ের?’ মায়ের আদেশ পেয়ে ছুটলেন বড় মামা। ‘আর খলিল, যা তো, বাপ-বাবুর্চিগো কইয়া দে, অহনি জানি খাওনটি বাইরা না ফালায়।’ ছুটলেন মেজো মামাও। ছোটখালা বললেন, ‘কিন্তু, মা, এই কাপড়ে মিতার বিয়ে হবে কী করে? ফটো উঠলে কেমন দেখাবে?’ ‘আরে রাখ্! তগো বাবলু ক্যামেরাম্যান আর কী ফোটু তুলব! আর, এই কাপড়ে বিয়া হইব মাইনি? আমার বেনারসি পইরা বিয়া হইব মিতার। নাত-বৌয়ের লেইগা আলাদা কইরা গয়না রাইখা দিছি না-হেইটি পইরা বিয়া হইব।’ একটু চিন্তায় পড়লেন নানীজি, ‘অহন এই ছ্যারারে কী পরাই? মনে অইতাসে কইত্তে বাদাইম্যা একটারে দইরা আইনা আমোগো রাজকইন্যার লগে-’ ‘এক কাজ করলেই তো হয়,’ বুদ্ধি জোগাল রুবি। ‘নানার শেরোয়ানি আর পাগড়ি দেখেছিলাম না, নানু, তোমার স্টীলের আলমারিতে?’ ‘ঠিক কইছে তো ছেমরি!’ সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। নানীজি হুকুম করলেন, ‘এইবার পোলা আর মাইয়ার দল ফারাক যাও। পোলারা এই ছ্যারারে লইয়া যাওগা, ঠিকঠাক মথন রেডি কইরা আনবা। রাইত আটটায় বিয়া। আমরা আমাগো মাইয়া লইয়া দোতালায় গেলাম।’ হই-হই করে আজিমকে ঘিরে ধরল ছোটরা। ছোটমামার নেতৃত্বে চলল ওরা দহলিজঘরের দিকে। ঘাড় ফিরিয়ে মামা বললেন, ‘মা, হাতে বেশি সময় নেই; আমাদের আচকান-পাগড়ি পাঠিয়ে দিয়ো তাড়াতাড়ি।’ গলা নামিয়ে আজিমকে বললেন, ‘তোর বাপকে একটা খবর দেওয়া দরকার ছিল না?’ ‘বলেই এসেছি, মামা। বাবা বলল: তোর মামারা আছেন ওখানে, কোনও অসুবিধে হবে না; এই সুযোগে আমি আরও দুটো টাকা কামিয়ে নিই।’ ‘দুলাভাইয়ের খালি সবতেই ঠাট্টা!’ ‘আসলে মাইল্ড একটা স্ট্রোক হয়ে গেছে তো, বেশি নড়াচড়া নিষেধ।’

৯.

অবাক লাগছে মিতার, মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখছে জেগে-জেগে। সবাই মিলে সত্যিসত্যিই ওকে রাজকন্যে বানিয়ে দিল আধ ঘণ্টার মধ্যে। বড়খালা ওর চিবুক নেড়ে কপালে চুমু দিলেন। নানীজির বিয়ের বেনারসি একদম নতুন হয়ে আছে। দারুণ মানিয়েছে গহনাগুলোও। বিয়ের আসরে ওকে দেখে প্রথমে চিনতেই পারেনি আজিম, হাঁ করে চেয়ে ছিল বোকার মত। ঠিক আটটায় বিয়ে হয়ে গেল ওদের। সবাই তৃপ্তির সঙ্গে খেয়েদেয়ে ঢেকুর তুলে ইরিনার থালা থেকে পান তুলে নিয়ে যে-যার বাড়ি চলে গেল। সব শেষ হয়ে গেলে সন্তুষ্টচিত্তে হাসলেন নানীজি। ভাবলেন, তাঁকেও কি এই শাড়ি পরে এমনই সুন্দর লেগেছিল আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে? বিড়বিড় করে আপনমনে বললেন, ‘কী কপাল! পাইয়া গেলাম মনের মথন নাত-বৌ! কিন্তুক, আসলেই কি ‘মউ’রে ‘বউ’ হুনছিলাম?’ দুষ্টু হাসি খেলে গেল তাঁর ঠোঁটে।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা বিনোদন ভালবাসা/প্রণয়লীলা যৌন জ্ঞান ও সম্পর্ক সৃজনশীল প্রকাশনা

ব্যতিক্রমী-নির্লজ্জ উলঙ্গ বিয়ে !

 
“শুভ বিবাহ” শব্দটা শুনলেই যেনো সবার মনটা আনচান করে উঠে। বর-কণে, উৎসব-আনন্দ সহ অনেক কিছুই মিশে রয়েছে বিবাহ শব্দটির মধ্যে। বিয়ে একটি মানবিক বিষয়। মানুষ যখন প্রাপ্ত বয়স্ক হয়ে উঠে তখন সে তার জৈবিক চাহিদা মেটানো ও পারিবারিক কাঠামো তৈরি করার জন্য ধর্মীয় রীতি নীতি অনুযায়ী বিয়ে করে থাকে। মানুষের জন্ম লগ্ন থেকে শুরু করে আজ অবধি বিশ্বে বিয়ে প্রথা প্রচলিত আছে এবং থাকবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নিয়মে বিবাহ সম্পন্ন করা হয়। বিয়েকে ঘিরে উৎসব আমেজও বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম। বিয়েতে সাধারণত বিয়ের দিন বর ও কণে উভয়ই ঐতিহ্যগত ও ধর্মীয়ভাবে ঝলমলে পোশাক পরিধান করে থাকে। বর্তমান আধুনিক সমাজে প্রত্যেকটা বিষয় পরিবর্তন হচ্ছে ঠিক তেমনি বিয়ের উৎসবেও এসেছে অনেক পরিবর্তন ও নতুনত্ব। আধুনিক এই বিশ্বে মানুষ সব কিছুতেই একটু ব্যতিক্রম খোজার চেষ্টা করে। ফলে পৃথিবী আধুনিক হচ্ছে নাকি অসভ্য হচ্ছে সেটাও একটি মূল্যবান প্রশ্ন। আপনারা হয়তো ভাবছেন বিয়ের অনুষ্ঠানে আবার সভ্য-অসভ্যের কথা আসছে কেন? আসছে এই কারণে যে, বিয়েতে ব্যতিক্রম আনার জন্য মানুষ সভ্যতার চূড়ান্ত সীমা লংঘন করে ফেলছে। আপনি কি কল্পনা করতে পারেন যে, একটি বিয়ে অনুষ্ঠান চলছে আর সেখানে বর কণে পুরো উলঙ্গ হয়ে বসে আছে। হয়তো এমন অবস্থা কল্পনাও করতে পারছেন না। কিন্তু এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে জ্যামাইকাতে। আর এই ঘটনাটি বেশ সমালোচনার জন্ম দিয়েছে বিশ্ব ব্যাপী।
২০১২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারী তারিখে জ্যামাইকার সমুদ্র সৈকতে আয়োজন করা হয়েএক নগ্ন বিয়ের উৎসব। যে বিয়ের অনুষ্ঠানে বিয়ে পড়ানো হয় ৯ জোড়া বর কনেকে। যে অনুষ্ঠানটি ছিল খুবই রুচিহীন ও সমালোচনা মুখর। এ দিন বিয়ের অনুষ্ঠানে বর-কণের পায়ে দামি জুতা, হাতে রিস্টব্যান্ড এবং গলায় টাই আর নেকলেস থাকলেও তাদের শরীরে ছিল না কোনও পোশাক। শরীরে কোনও পোশাক না থাকলেও যথারীতি কনেদের অনেকের মাথায়ই ছিল ঘোমটা বা অবগুণ্ঠন! আবার দু-একজন কণে মুকুট বা হ্যাটও পরেছিলেন। উলঙ্গ বর-কনেরা যাতে সহজেই সবার চোখে পড়ে সেজন্য তাদের দেহে বাড়তি সৌন্দর্য ও উজ্জ্বলতা বাড়াতে তাদের শরীরে ব্যবহার করা হয়েছিল উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করার পেইন্ট! আর কনেদের হাতে লাগানো হয়েছিল লাল, সাদা আর হলুদ রংয়ের বাহারি ফুল।
নয়টি নগ্ন জুটির আলোচিত-সমালোচিত এ গণবিয়ে অনুষ্ঠিত হয় জামাইকার নেগ্রিল সমুদ্র সৈকতে উন্মুক্ত আকাশের নিচে। এমন নির্লজ্জ ও উদ্ভট নগ্ন বিয়ের আয়োজন করেছিল ‘দ্য হেডোনিজম টু রিসোর্ট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করার পাশাপাশি এই প্রতিষ্ঠানটি একই সঙ্গে বহন করেছে এই নয় জুটির নগ্ন হয়ে বিয়ে করার যাবতীয় খরচও।
নগ্ন বিয়ের এই অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে অংশগ্রহণকারীদের বাছাই করার জন্য ‘কেন তোমরা নগ্নতার মধ্য দিয়ে দাম্পত্য জীবন শুরু করতে চাও?’ এ প্রশ্নটিসহ আরও কয়েকটি প্রশ্ন করা হয়। এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তরদাতার মধ্য থেকে প্রাথমিকভাবে বাছাই করা হয় ১০০ জুটিকে। পরে এদের মধ্য থেকে বাছাই করা হয় ভাগ্যবান সেরা ১০ জুটিকে। যাদের প্রদান করা হয় নগ্ন বিয়ের বিশেষ সুযোগ। আনন্দের বিষয় এই যে, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য মোট ১০টি জুটি নির্বাচন করা হলেও পরে একটি জুটির শুভবুদ্ধির উদয় হলে তারা এই অনুষ্ঠান থেকে তাদের নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। ফলে অনুষ্ঠানটি নয়টি জুটিকে নিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।
নগ্ন বিয়েতে অংশ গ্রহণ করে এই নয় জুটি নিজেদেরকে সৌভাগ্যবান ভেবেছে। অবশ্য বিশ্বের বিবেকবান মানুষরা ভেবেছে তারাই সমাজের সবচেয়ে নিকৃষ্ট জীব। এই বিয়েকে ঘিরে জ্যামাইকা সহ সমগ্র বিশ্বে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিবেকবান মানুষেরা আশা করেন আধুনিকতা বা ব্যতিক্রমতার নামে ভবিষ্যতে কেউ যেনো আর কোনও দিন এই ধরনের নির্লজ্জ কাজে অংশ গ্রহণ বা আয়োজন না করে।
– (সুমন)
Categories
অনলাইন প্রকাশনা জীবনী ও স্মৃতিকথা ভুতুরে গল্প সৃজনশীল প্রকাশনা

একটা ভূতের গল্প

একটা ভূতের গল্প

——–মুহম্মদ জাফর ইকবাল

আমি তখন ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি, হোস্টেলে থাকি। বাবা কুমিল্লার ডিএসপি, ঠাকুরপাড়ায় বিশাল দোতলা বাসা। বাসার সামনে মাঠ, পাশে পুকুর। হোস্টেলে থাকতে থাকতে যদি মন কেমন কেমন করে, তাহলে বিআরটিসির বাসে করে কুমিল্লায় বাসায় চলে আসি। এক-দুই দিন থেকে আবার ফিরে যাই।
সেরকমভাবে আমি হুট করে কুমিল্লা এসেছি, আমি একা নই, আমার সঙ্গে আমার কলেজের বেশ কয়েকজন বন্ধু আছে। আমার বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, বাসায় এসে দেখি সেও আছে। বাসায় অনেক মানুষ থাকলে যা হয় তাই হলো, সারা দিন গল্পগুজবে কেটে গেল। আমাদের বাসায় গল্পগুজব হলে ঘুরেফিরে সেটা ভূতের গল্পে গিয়ে জায়গা নেয়। আমার বাবার এসব ব্যাপারে খুব কৌতূহল, তাই বাসাভর্তি ভূত-প্রেত, জ্যোতিষচর্চা এসবের বই। আমরা সব ভাইবোন জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে হাত দেখেছি, প্ল্যানচেট করে চক্রে বসে ভূত নামিয়েছি। কাজেই এবারও গল্পগুজব ভূতের গল্পে আটকা পড়ে গেল। তখন আমার কলেজের বন্ধুরা বড় ভাই হুমায়ূন ভাইকে ধরে বসল, তাদের ভূত এনে দেখাতে হবে। হুমায়ূন আহমেদ রাজি হলো—ঠিক হলো রাত ১২টায় চক্রে বসা হবে।
সময় কাটানোর জন্য আমি আর আমার বন্ধুবান্ধব সেকেন্ড শো সিনেমা দেখতে গিয়েছি। আমরা যে খুব সিনেমার পোকা তা নয়, কিন্তু বড় ভাইয়ের উৎসাহে গিয়েছি, ভালো ছবি নাকি দেখাচ্ছে।
রাতে বাসায় ফেরার পর ভূত নামানোর জন্য আমরা চক্রে বসেছি। দোতলা বাসার নিচের তলায় কেউ থাকে না, সেখানে একটা বড় ঘর পরিষ্কার করা হয়েছে। মেঝেতে পরিষ্কার চাদর বিছানো হয়েছে, আমরা সবাই হাত-মুখ ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে গোল হয়ে বসেছি। বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ ঘরের চারকোনায় চারটা মোমবাতি জ্বালিয়ে দিল, মোমবাতির মৃদু আলোতে একটা ভৌতিক পরিবেশ চলে এসেছে। আমরা কেউ জোরে কথা বলছি না। হুমায়ূন আহমেদ আমাদের ফিসফিস করে নিয়মকানুন বলে দিল, ‘তোমরা কেউ ভয় পাবে না। প্রেতাত্মা যদি চলে আসে, আমাদের কারও ওপর সেটা ভর করবে। তার সঙ্গে শান্তভাবে কথা বলবে।’
আমার এক বন্ধু জিজ্ঞেস করল, ‘এসেছে কি না কেমন করে বুঝব?’
‘অনেকভাবে বোঝা যায়। হয়তো মোমবাতিগুলো নিভে যাবে। হয়তো ঘরে একটা তীব্র গন্ধ পাবে, ঘরটা শীতল হয়ে যাবে। হয়তো কেউ একজন থরথর করে কাঁপতে থাকবে।’
তার থমথমে গলার স্বর শুনেই আমাদের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়।
হুমায়ূন আহমেদ বলল, ‘তোমরা সবাই এখন পরকাল নিয়ে চিন্তা করো, মৃত কোনো মানুষের আত্মাকে আহ্বান করো।’
আমরা গোল হয়ে বসে অন্যের হাত ধরে মৃত মানুষের আত্মাকে আহ্বান করতে থাকি, ঘরের ভেতরে আমাদের নিঃশ্বাস ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। হঠাৎ একটা বিচিত্র ব্যাপার ঘটতে থাকে, মোমবাতিগুলো হঠাৎ করে নিভু নিভু হয়ে যায় আর একসঙ্গে সব মোমবাতি নিভে গেল।
বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ ফিসফিস করে বলল, ‘এসেছে! কেউ একজন এসেছে! কিছু একটা এসেছে। কেউ ভয় পাবে না।’
তখন ভয়ে হাত-পা আমাদের শরীরের ভেতর সেঁধিয়ে যাচ্ছে। আর কী আশ্চর্য, ঠিক তখন শুনতে পেলাম বাসার পাশে যে গাছ, সেই গাছের ডাল নড়তে শুরু করেছে, জানালার মাঝে গাছের ডালগুলো জীবন্ত প্রাণীর মতো হুটোপুটি খাচ্ছে। আমরা ভয় পেয়ে আর্তচিৎকার করে উঠি, ‘কী হচ্ছে? কিসের শব্দ?’
হুমায়ূন আহমেদ বলল, ‘চলো। বাইরে গিয়ে দেখি।’
আমাদের কারও বাইরে যাওয়ার সাহস নেই, তার পরেও হুমায়ূন আহমেদের পিছু পিছু বাইরে এলাম। আবছা অন্ধকার, কোথাও বাতাস নেই, তার মাঝে শুধু একটা গাছের ডাল জীবন্ত প্রাণীর মতো নড়ছে, হুটোপুটি খাচ্ছে। ভয়ে আতঙ্কে অস্থির হয়ে আমরা একজন আরেকজনকে ধরে কাঁপছি। বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ বলল, ‘ভয় পাবে না। কেউ ভয় পাবে না—হক ভাইকে ডেকে তুলে আনি।’
হক ভাইয়ের পুরো নাম আবদুল হক, বাবার অফিসের অর্ডারলি, বাসার সামনে ছোট একটা আলাদা টিনের ঘরে থাকেন। ধর্মভীরু মানুষ, কারও সাতেপাঁচে নেই। আমাদেরও মনে হলো, এই আতঙ্কময় মুহূর্তে তাঁকে ডেকে আনলে মন্দ হয় না, আমরা তাঁর ঘরের কাছে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিলাম আর সঙ্গে সঙ্গে একটা বিচিত্র ব্যাপার ঘটল। হক ভাই দরজা খুলে গুলির মতো বের হয়ে এলেন, গোঙাতে গোঙাতে এগিয়ে এলেন। আমরা ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছে হক ভাই, কী হয়েছে?’
হক ভাই কথা বলতে পারেন না, ভয়ে থরথর করে কাঁপছেন, অনেক কষ্ট করে বললেন, ‘আ আ আমার ঘরে…’
‘আপনার ঘরে কী?’
‘আমার ঘরে একটা মানুষ। ঘরের ছাদের সমান লম্বা। নিচু হয়ে তাকিয়ে আছে। হায় আল্লাহ!’
ঠিক তখন হঠাৎ করে গাছের ডাল ভয়ংকরভাবে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল, তারপর হঠাৎ চারদিক নীরব হয়ে গেল। হুমায়ূন আহমেদ কাঁপা গলায় বলল, ‘আমার মনে হয় একটা খারাপ প্রেতাত্মা চলে এসেছে, আমরা আর কিছু না করে এখানেই শেষ করে দিই।’
আমরা মাথা নাড়লাম, ‘হ্যাঁ। আর কিছু করার দরকার নেই।’
‘যার যার মতো গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। কাউকে কিছু বলার দরকার নেই।’
আমি ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ওপরে গেলাম, গরমের দিন। ফ্যান চালিয়ে ভাইবোনেরা মেঝেতে শুয়ে ঘুমিয়ে আছে। আমি গুটিসুটি মেরে তাদের দুই দিকে ঠেলে একটু জায়গা করে শুয়ে পড়লাম।
ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি আমাদের কাউকে চেনা যায় না। ভয়ে আতঙ্কে একেকজনের উদ্ভ্রান্ত চেহারা, উষ্কখুষ্ক চুল, চোখ গর্তে ঢুকে গেছে, রক্তশূন্য ফ্যাকাশে মুখ।
আমরা ঢাকায় ফিরে এলাম। আমার অন্য বন্ধুদের কথা জানি না, কিন্তু আমি পাকাপাকিভাবে ভীতু হয়ে গেলাম। রাতে ঘুমাতে পারি না, চোখ বন্ধ করলেই মনে হয় মাথার কাছে ছাদের সমান লম্বা একটা মানুষ তীব্র চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, চোখ দুটো ধকধক করে জ্বলছে।
যারা ভূতের গল্প শুনতে পছন্দ করে, তাদের জন্য বলছি, গল্পের বাকি অংশটুকু পড়ার প্রয়োজন নেই। এখন পর্যন্ত যেটুকু বলা হয়েছে, তার প্রতিটি অক্ষর সত্যি—অবিশ্বাস্য হতে পারে, কিন্তু সত্যি।

অনেক দিন পর বাসার সবার সঙ্গে কথা হচ্ছে, আমি কী একটা প্রসঙ্গে সহজ-সরল হক ভাইকে নিয়ে একটা কথা বলেছি। আমার মা মুখ টিপে হাসলেন, বললেন, ‘হক ভাইকে বেশি সহজ-সরল মনে হচ্ছে? অ্যাকটিং দেখে তো সেটা বলিসনি!’
‘অ্যাকটিং!’ আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কিসের অ্যাকটিং?’
তখন সবাই হি হি করে হাসতে শুরু করে। সেই ভয়ংকর ভৌতিক রাতটি ছিল হুমায়ূন আহমেদের নেতৃত্বে বাসার সবার সম্মিলিত একটা ষড়যন্ত্রের ঘটনা। আমাদের জোর করে সেকেন্ড শো সিনেমা দেখতে পাঠিয়ে বাসায় ব্যবস্থা করা হয়েছে। গাছের ডালের সঙ্গে দড়ি বেঁধে দোতলায় ভাইবোনেরা সেটা ধরে টেনে গাছ নড়িয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের পরিচালনায় হক ভাই অনবদ্য অভিনয় করেছেন।
আমি আমতা আমতা করে বললাম, ‘মোমবাতি? মোমবাতি কেমন করে নিভে গেল?’
হুমায়ূন আহমেদ হাসল, ‘খুবই সোজা। মোমবাতির সুতাটা কেটে রাখা হয়েছে। ঠিক সময়মতো নিভে গেছে।’
আমি হতবাক হয়ে হুমায়ূন আহমেদ আর তার বিশাল ষড়যন্ত্রীর দল আমার বাবা-মা ভাইবোনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
হুমায়ূন আহমেদের এ রকম গল্প একটি-দুটি নয়, শত শত! জীবনটা একঘেয়ে হলে সেটা মেনে নিতে হবে কে বলেছে? জীবনটাকে চোখের পলকে রঙিন করা যায়, চমকপ্রদ করা যায়—তার মতো সেটা কে পারত?
কেউ না।