Categories
অনলাইন প্রকাশনা ইতিহাস জীবনী ও স্মৃতিকথা শিক্ষা এবং ভাষা

ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার। বর্তমানে যেটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরী বিভাগ সেটিই বিশ্ববিদ্যালয় শুরুর দিকে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল গ্রন্থাগার হিসেবে। সেই গ্রন্থাগারে একজন বইপাগল, শান্ত, সৌম্য, শুভ্র-শ্মশ্রুমণ্ডিত ব্যক্তি মোটা ফ্রেমের চশমা পরে ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো ডুবে আছেন মোটা মোটা বইয়ের গুরুগম্ভীর লেখার জ্ঞান সমুদ্রে। দুপুর গড়িয়ে পড়ন্ত বিকেলে পশ্চিমের রক্তিম সূর্য যখন তার লাল আভা মিলিয়ে দিয়েছে নীলিমায়, তখনও তিনি পড়েই চলেছেন। আর ততক্ষণে গ্রন্থাগারের দারোয়ান তালা লাগিয়ে চলে গেছে।

ঢাকার চকবাজারের লাগোয়া বেগমবাজার। বেগমবাজারের দক্ষিণ উপপ্রান্তে জনাকীর্ণ পথের কোণাকুণি জায়গাটায় একখানি দ্বিতল পাকাবাড়ি, নাম ‘পেয়ারা ভবন’। বাড়িটির মাঝখান দিয়ে একটা সরু করিডর। করিডর দিয়ে সামনের দিকে এগুলে সিঁড়ি বেয়ে সোজা দোতালায় ওঠা যায়। নিচ তলায় একটি পড়ার ঘর এবং লাইব্রেরী। সেখানে বিভিন্ন ভাষার হরেক রকমের অসংখ্য বই। বাংলা, ইংরেজী, জার্মান, ফরাসী, ল্যাটিন, হিব্র, আরবী, ফার্সী, উর্দূ, হিন্দী, আসামীয়, উড়িয়া, মারাঠি, তামিল, গুজরাটি, সিংহলীসহ দেশী-বিদেশী নানা ভাষার লক্ষ লক্ষ শব্দ বন্দী হয়ে আছে সেই বইগুলিতে। আর বইগুলি থরে থরে সাজানো আছে আলমারীতে ও শেলফে এবং প্রত্যেকটি বই আচার্যের বহু বিনিদ্র রজনীর পড়াশুনার সাক্ষর বহন করছে। যিনি হামেশা বলতেন ‘দেখো, ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার না হলে কেউ লেখক হতে পারে না। হতে পারে না গবেষক ও পণ্ডিত। লেখক ও সাহিত্যিক হওয়ার পূর্বশর্ত হলো মূল্যবান গ্রন্থের সংগ্রহশালা।’

এতক্ষণ যাঁর কথা বলছি তিনি এশিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষাতত্ত্ববিদ, জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি ছিলেন একাধারে ভাষাবিদ, গবেষক, লোকবিজ্ঞানী, অনুবাদক, পাঠসমালোচক, সৃষ্টিধর্মী সাহিত্যিক, কবি, ভাষাসৈনিক এবং একজন খাঁটি বাঙালি মুসলিম ও দেশপ্রেমিক। জ্ঞানপ্রদীপ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন বাংলা ভাষার গবেষণায় অদ্বিতীয়। তিনি ছিলেন একটি কাল, একটি শতাব্দী, একটি জাতি, একটি সংস্কৃতি; অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক, ধর্মবেত্তা ও সূফীসাধক।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৮৮৫ সালের ১০ জুলাই শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার পেয়ারা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । তিনি ছিলেন বাবা-মার পঞ্চম সন্তান। তাঁর বাবা মফিজ উদ্দিন আহমদ ছিলেন ইংরেজ আমলে সরকারি জরিপ বিভাগের একজন কর্মকর্তা। শহীদুল্লাহ মাতা হরুন্নেছা খাতুনের শিক্ষার প্রতি ছিল প্রচণ্ড আগ্রহ। তিনি বাড়িতে তাঁর পরিবার ও পেয়ারা গ্রামের অন্যান্য মহিলাদের শিক্ষা দিতেন। প্রথম দিকে মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নাম রাখা হয় মুহম্মদ ইব্রাহীম। কিন্তু পরবর্তীকালে পিতার পছন্দে আকিকা করে তাঁর নাম পুনরায় রাখা হয় মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। পরিবারে তিন বোন ও চার ভাইয়ের মধ্যে শহীদুল্লাহ ছোটবেলায় ছিলেন দারুণ আমুদে ও আত্মভোলা। বাড়ীর সবাই আদর করে তাঁকে ডাকত ‘সদানন্দ’ বলে। গ্রামের পাঠশালায় পণ্ডিত মশাইরা তাঁকে ডাকতেন ‘সিরাজ দৌল্লাহ’ নামে। কিন্তু তিনি নিজের নাম রেখেছিলেন ‘জ্ঞানানন্দ সংগ্রামী’।

ছোটবেলায় ঘরোয়া পরিবেশে শহীদুল্লাহ উর্দু, ফার্সী ও আরবি শেখেন এবং গ্রামের পাঠশালায় সংস্কৃত পড়েন। পাঠশালার পড়া শেষ করে ভর্তি হন হাওড়া জেলা স্কুলে। স্কুলের ছাত্র থাকতেই বই পড়ার এবং নানা বিষয়ে জানার প্রতি ছিল তাঁর দারুণ নেশা। হাওড়া স্কুলের স্বনামখ্যাত ভাষাবিদ আচার্য হরিনাথ দের সংস্পর্শে এসে শহীদুল্লাহ ভাষা শেখার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। স্কুলজীবন থেকেই তিনি আরবী-ফার্সী-উর্দুর পাশাপাশি হিন্দি ও উড়িয়া ভাষা পড়তে শিখেছিলেন। ১৯০৪ সালে হাওড়া জেলা স্কুল থেকে তিনি কৃতিত্ত্বের সাথে সংস্কৃতসহ প্রবেশিকা পাশ করেন। এরপর কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে থেকে ১৯০৬ সালে এফ.এ পাশ করেন। অসুস্থতার কারণে অধ্যয়নে সাময়িক বিরতির পর তিনি কলকাতা সিটি কলেজ থেকে সংস্কৃতে অনার্সসহ বিএ পাস করেন ১৯১০ সালে। বাঙালি মুসলমান ছেলেদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম অনার্স নিয়ে পাস করেন।

সংস্কৃতিতে অনার্স পাস করার পর সংস্কৃত নিয়ে উচ্চতর পড়াশুনা করতে চাইলে তৎকালীন হিন্দু পণ্ডিতগণ তাঁকে পড়াতে অস্বীকার করেন। ফলে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯১২ সালে এ বিভাগের প্রথম ছাত্র হিসেবে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এর দু বছর পর ১৯১৪ সালে তিনি আইনশাস্ত্রে বিএল ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯২৬ সালে তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য ইউরোপ গমন করেন। বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শণ চর্যাপদাবলি বিষয়ে গবেষণা করে ১৯২৮ সালে তিনি প্যারিসের সোরবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। এ বছরই ধ্বনিতত্ত্বে মৌলিক গবেষণার জন্যে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপ্লোমা লাভ করেন।

আঠারো শতকের মুসলিম সমাজ, পারিবারিক ঐতিহ্য ও পৈত্রিক পেশা থেকে বেরিয়ে ব্যতিক্রমী মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভাষা ও জ্ঞানচর্চায় ব্রতী হন। ভাষাবিজ্ঞানের প্রায় সকল ক্ষেত্রেই তিনি সচ্ছন্দে বিচরণ করেছেন, আয়ত্ত করেছিলেন বাইশটি ভাষা। তিনি বাংলা, উর্দু, ইংরেজী, হিন্দী, সংস্কৃত, পালি, আসাম, উড়িয়া, আরবী, ফার্সী, হিব্র, আবেস্তান, ল্যাটিন,তিব্বর্তী, জার্মান, ফরাসী, প্রাচীন সিংহলী, পশতু, মুন্ডা, সিন্ধী, মারহাটী, মৈথালী ইত্যাদি ভাষা জানলেও ভাষার ব্যাপারে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে তিনি সানন্দে বলতেন, আমি বাংলা ভাষাই জানি।

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯১৪ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে সিতাকুন্ডু উচ্চ বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি কিছুদিন ওকালতি প্র্যাকটিস করেন। তিনি বশিরহাট মিউনিসিপ্যালিটির ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর দিনেশ চন্দ্র সেনের অধীনে শরৎচন্দ্র লাহিরী রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করেন। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে সে বছরের ২ জুন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগে প্রভাষক পদে স্থায়ী চাকুরিতে যোগদান করেন। একইসঙ্গে নিখরচে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষক নিযুক্ত হন। ১৯২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত মুসলিম সাহিত্য-সমাজের সভাপতি নিযুক্ত হন। পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে ১৯২৮ সালে দেশে ফিরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগে প্রভাষকের এবং সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষকের পূর্বপদে যোগদান করেন। ১৯৩৪ সালে তিনি রীডার পদে পদোন্নতি লাভ করেন। একই বছর তিনি সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ এবং পরে ১৯৩৭ সালে স্বতন্ত্র বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। ১৯৪৪ সালের ৩০ জুন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে রীডার ও অধ্যক্ষ হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। অবসর গ্রহণের পর তিনি বগুড়া আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং একইসাথে উক্ত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও ছয় বছর কলা অনুষদের ডীন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা বিভাগে বাংলা সাহিত্য ও বাংলা ভাষা গড়ে তোলার জন্য মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে আমন্ত্রণ জানানো হলে তিনি সেখানে যোগদান করেন। ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন শেষে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে (ফরাসি ভাষার) খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের অস্থায়ী প্রাধ্যক্ষের এবং ফজলুল হক হলের প্রাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর ইমেরিটাস নিযুক্ত হন। অধ্যাপনার বাইরে তিনি করাচির উর্দু উন্নয়ন সংস্থার উর্দু অভিধান প্রকল্প, ঢাকায় বাংলা একাডেমীর ‘পূর্ব পাকিস্তান ভাষার আদর্শ অভিধান প্রকল্প’ এবং ইসলামি বিশ্বকোষ প্রকল্পে সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিশনের সদস্য, ইসলামিক একাডেমীর কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য, বাংলা একাডেমীর বাংলা পঞ্জিকার তারিখ বিন্যাস কমিটির সভাপতি, আদমজি সাহিত্য পুরস্কার ও দাউদ সাহিত্য পুরস্কার কমিটির স্থায়ী চেয়ারম্যান ছিলেন। এছাড়া তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সম্পাদক ছিলেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সভা ও সম্মলনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। মাদ্রাজে Seminar on Traditional Culture in South-East Asia -তে তিনি UNESCO -র প্রতিনিধিত্ব করেন এবং এর চেয়ারম্যান মনোনীত হন।

১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ উর্দূকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশ করেন। এর প্রতিবাদে প্রথম লেখনী ধারণ করে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধে বলেন, ‘পাকিস্তান ডোমিনিয়নের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসীদের মাতৃভাষা বিভিন্ন, যেমন পশতু, বেলুচি, পাঞ্জাবী, সিন্ধী এবং বাংলা; কিন্তু উর্দূ পাকিস্তানের কোন অঞ্চলেই মাতৃভাষা রূপে চালু নয়। … যদি বিদেশী ভাষা বলিয়া ইংরেজী ভাষা পরিত্যক্ত হয়,তবে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ না করার পক্ষে কোন যুক্তি নাই। যদি বাংলা ভাষার অতিরিক্ত কোন দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা গ্রহণ করিতে হয়, তবে উর্দূ ভাষার দাবী বিবেচনা করা কর্তব্য। … বাংলাদেশের কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দূ বা হিন্দী ভাষা গ্রহণ করা হইলে, ইহা রাজনৈতিক পরাধীনতারই নামান্তর হইবে। ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ পাকিস্তানের প্রদেশসমূহের বিদ্যালয়ে শিক্ষার বাহনরূপে প্রাদেশিক ভাষার পরিবর্তে উর্দূ ভাষার স্বপক্ষে যে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন আমি একজন শিক্ষাবিদরূপে উহার তীব্র প্রতিবাদ জানাইতেছি।’

এই প্রতিবাদ অচিরেই ছড়িয়ে পড়ে শুরু করেছিল রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের। শহীদুল্লাহ রয়ে গেলেন বিতর্কের কেন্দ্রে। ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতির অভিভাষণে তিনি বলেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশী সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোন আদর্শের কথা নয়; এটি একটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙ্গালীত্বের এমন ছাপ রেখে দিয়েছেন যে মালল-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি দাড়িতে ঢাকবার কোন জো-টি নেই।’ ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা দিবসে বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের ছাত্রদের আহ্বানে তিনি হাসিমুখে এগিয়ে এসে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারী ছাত্রজনতার মাঝে সশরীরে উপস্থিত থেকে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করেছেন তিনি; এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে পুলিশী হামলায় টিয়ার গ্যাসে নিগৃহীত হয়েছেন।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জীবন-দর্শনের ভিত্তি ছিল ইসলামী বিশ্বাস। তিনি যেমন পারিবারিকভাবে ইসলামিক পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠেছেন, ঠিক তেমনি তাঁর সাংসারিক জীবন এবং কর্মক্ষেত্রের সর্বত্র ইসলামের প্রতিফলন ঘটেছিল। তিনি কখনো ধর্মীয় রাজনীতি, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা এবং ধর্মের অপব্যবহারকে প্রশ্রয় দেননি। স্বধর্মে নিষ্ঠাবান থেকে তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রচেষ্টা করে গেছেন আজীবন। ১৯৫০ সালে ঢাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে তা প্রতিরোধ করার আহ্বান জানিয়ে সুধীজনেরা যে বিবৃতি দিয়েছিলেন তার খসড়া ছিল তাঁরই রচনা। বছরের শেষ দিকে ‘আঞ্জুমান-ই-ইশা আৎ-ই-ইসলাম’ নামে ইসলাম প্রচার সমিতি গঠন করেন তিনি।

বাঙালি মুসলমান সমাজে নারীর ধর্মসম্মত অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি অত্যন্ত উদযোগী ছিলেন। তাঁর মতে, পর্দা দুরকম এক রকম হলো- ইসলামিক পর্দা, সেটি হচ্ছে মুখ হাত-পা ছাড়া সর্বাঙ্গ ঢেকে রাখা, আর এক রকম হলো- অনৈসলামিক পর্দা, সেটি মেয়েদের চার দেয়ালের মধ্যে চিরজীবনের জন্যে কয়েদ করে রাখে। ইসলামি পর্দায় বাইরের খোলা হাওয়ায় বেরুনো কিংবা অন্যের সঙ্গে দরকারি কথাবার্তা বলা মানা নয়; তবে অনৈসলামী পর্দায় এসব হবার জো নেই। সবার প্রাণপণ চেষ্টা করতে হবে এই অনৈসলামীক পর্দা সরিয়ে দিতে। তা না হলে সবার নারীহত্যার মতো মহাপাপ হবে। নারী যে মসজিদে যেতে পারে, পুরুষের ইমামতিতে নামাজ আদায় করতে পারে এবং শুধু প্রাচীন আরবে নয়, মুসলিম আমলের বাংলাদেশেও যে এ প্রথা প্রচলিত ছিল-তিনি তার প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন এবং ঢাকায় মেয়েদের জামাতে তিনিই প্রথম ইমামতি করেছিলেন।

তাঁর দীর্ঘ জীবনে তৎকালীন পরিবর্তনশীল সামাজিক রুচির যে ধারা চলছিল তার সাথে তিনি সহ-অবস্থান নীতি গ্রহণ করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষক থাকাকালীন তিনি ছাত্রদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন। আবার Traditional culture of east Pakistan গ্রন্থে তিনি Folk Dance, Folk Music I Folk Arts সম্পের্ক প্রবন্ধ লিখেছেন; শুধু তাই নয়, একটি প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, “Educated and talented dancers of our country can draw profitable on this indeginous dances and add new colour and life to the art of dancing.”

স্বদেশী আন্দোলনের সময় চারদিকে যখন বিদেশী পণ্য বর্জনের ডাক শুরু হয়ে গেছে। ঠিক তখন থেকেই তিনি সাহেবী প্যান্ট-কোর্ট ছেড়ে দিয়ে খদ্দর কাপড়ের আচকান, পায়জামা ও পাঞ্জাবী পরিধান শুরু করে দিলেন। তিনি মনে করতেন, দেশী জিনিষ ব্যবহার করলে দেশে পয়সাটা থাকে আর বিদেশী জিনিস ব্যবহারে দেশের পয়সাটা বিদেশে চলে যাবে।

জ্ঞানতাপস এই শিক্ষাবিদ নিজে যেমন আজীবন জ্ঞান সাধনা করেছেন, তেমনি শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষার প্রচার ও প্রসারে নিজকে আত্মনিয়োগ করেছেন। আমাদের দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার একজন কঠোর সমালোচক ছিলেন তিনি। তৎকালীন সরকারের অনুমোদিত নিউস্কীম মাদ্রাসা, ওল্ডস্কীম মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষা এই তিন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর মতে, এই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষাক্ষেত্রে কেবল গণ্ডগোলই সৃষ্টি করেছে এবং মুসলমান সমাজে অনৈক্য এনেছে। এই শিক্ষাব্যবস্থায় মুষ্টিমেয় মানুষের অধিকার তিনি কখনো মেনে নিতে পারেননি। তাই শিক্ষার কথা যখনই বলেছেন তখনই তিনি সার্বজনীন শিক্ষার অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা ঘোষণা করেছেন। দেশের প্রতিটি নাগরিকের ষোলো বৎসর বয়স পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার প্রবর্তন করা সরকারের আশু কর্তব্য বলে তিনি বিবেচনা করতেন। মাদ্রাসা শিক্ষার বর্তমান প্রণালীকে তিনি সময় ও শক্তির অপচয় বলে মনে করতেন। শিক্ষাক্ষেত্রে যে একটিমাত্র ব্যবস্থার পরিকল্পনা তাঁর ছিল, সেখানে ধর্মশিক্ষার একটা বিশিষ্ট স্থান ছিল।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর একটি নিজস্ব আসন আছে। এই দুই ক্ষেত্রেই তিনি কিছু মৌলিক ধারণার পরিচয় দিয়েছেন। ১৯২০ সাল থেকে নানা প্রবন্ধ লিখে তিনি নিজের যে বক্তব্য তুলে ধরতে থাকেন তার চূড়ান্ত ও ধারাবহিক রূপ দেখা যায় তাঁর ‘বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত’ (১৯৫৬) গ্রন্থে।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এক স্বতন্ত্র ধর্মী গবেষক ছিলেন। তাঁর গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল জটিল দিকের গ্রন্থিমোচন এবং নবতর ব্যাখ্যা। বাংলা লোকসাহিত্যের প্রতিও তিনি বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। গবেষণাগ্রন্থের পাশাপাশি তিনি সাহিত্য এবং শিশু সাহিত্যের অনেক মৌলিক গ্রন্থও রচনা করেন। তিনি বেশ কয়েকটি গ্রন্থ অনুবাদ ও সম্পাদনা করেন। বাংলার গঠন অনুসারে তিনিই প্রথম ১৯৪৩ সালে বাংলা ব্যাকরণ রচনায় হাত দেন । তাঁর অবিস্মরণীর কৃতিত্ত্ব হলো বাংলা একাডেমী থেকে দু খণ্ডে প্রকাশিত ‘বাংলা ভাষার আঞ্চলিক অভিধান’ সম্পাদনা। তিনিই প্রথম ১৯৪০ সালে ভারতের মুসলিম শিক্ষা কংগ্রেসে পূর্ব বাংলায় ভাষা চর্চা উন্নয়ন ও গবেষণার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রস্তাব করেন। ১৯৪৮ সালে ঢাকার কার্জন হলে অনুষ্ঠিত পূর্ববঙ্গ সম্মেলনে তিনি সেই প্রতিষ্ঠানের নাম ‘বাংলা একাডেমী’ রাখার প্রস্তাব করেন।

ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর বহু মননশীল ও জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ নানা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা তিনি সম্পদনা করেছেন। তিনি আল এসলাম পাত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক (১৯২৫) ও বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক (১৯২৮-২১) হিসেবে যোগ্যতার প্রমাণ দেন। তাঁরই সম্পদনা ও প্রকাশনায় মুসলিম বাংলার প্রথম শিশু পত্রিকা আঙ্গুর (১৯২০) আত্মপ্রকাশ করে। এছাড়াও তিনি ইংরেজী মাসিক পত্রিকা দি পীস (১৯২৩), বাংলা মাসিক সাহিত্য পত্রিকা বঙ্গভূমি (১৯৩৭) এবং পাক্ষিক তকবীর (১৯৪৭) সম্পাদনা করেন। ১৯২২ সাল থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলা ও ইংরেজী ভাষায় প্রকাশিত পাক্ষিক ও মাসিক জার্নাল সম্পাদনা করেন।

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর স্ত্রীর নাম মরগুবা খাতুন। তিনি সাত পুত্র ও দুই কন্যার জনক। মাহযূযা খাতুন, আবুল ফযল মুহম্মদ সফীয়্যুল্লাহ, মাসব্দরা খাতুন, আবুল কালাম মোস্তফা ওলিয়্যুল্লাহ, আবুল করম মাহমুদ যকীয়্যুল্লাহ, আবুল জামার মহামেদ তকীয়্যুল্লাহ, আবুল বয়ান মুজতাবা নকীয়্যুল্লাহ, আবুল ফসল মুতাওয়াক্কিল ববীয়্যুল্লাহ, আবুল খায়ের মুর্তজা বশীরুল্লাহ।

তিনি ছিলেন আজীবন ছাত্র এবং আজীবন শিক্ষক। সারাটি জীবন শুধু জ্ঞানের পিছু ছুটেছেন এবং জ্ঞান বিলিয়ে দিয়েছেন সবার মাঝে। অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁ ও আবুল কাশেম সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে তিনি মিরপুরে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলা কলেজ। মানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণেই শিক্ষক তিনি; একই কারণে দেশপ্রেমিক এবং মনেপ্রাণে বাঙালী।

জীবনভর ভাষা ও সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ এই জ্ঞানতাপস পাকিস্তান সরকার কর্তৃক ‘প্রাইড অফ পারফরম্যান’ এবং ১৯৬৭ সালে ফরাসী সরকার তাঁকে ‘নাইট অফ দি অর্ডারস অফ আর্ট লেটার্স’ পদকে ভূষিত করেন। ১৯৭০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী সরকার তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করেন।

আজীবন উদ্যমী এই মানুষটি সর্বদা ছিলেন কর্মচঞ্চল। ১৯৬৭ সালে ২৭ ডিসেম্বর প্রথম সেরিব্রাল থ্রম্বোসিসে আক্রান্ত হন এই জ্ঞানানন্দ প্রবাদপুরুষ। জীবন সায়াহ্নে যখন হাসপাতালের বিছানায়, তখন ডান হাতের লেখার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। খুব দুঃখিত হয়ে বললেন, ‘ভাল হয়ে নিই, আমার বাম হাতে লেখার অভ্যাস করবো।’ ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই সুদীর্ঘ কর্মজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে তাঁর। ঐতিহাসিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল সংলগ্ন মূসা খাঁন মসজিদের পশ্চিম পাশে র্তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।

সংক্ষিপ্ত জীবনীঃ

নাম: মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

পিতা: মফিজ উদ্দিন আহমদ

মাতা: হুরুন্নেছা খাতুন

স্ত্রী: মরগুবা খাতুন

সন্তান-সন্ততি: সাত পুত্র ও দুই কন্যার জনক। শিক্ষা: ১৯০৪ সালে হাওড়া জেলা স্কুল থেকে তিনি কৃতিত্ত্বের সাথে সংস্কৃতসহ প্রবেশিকা পরীক্ষা পাশ করেন। এরপর ১৯০৬ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে থেকে এফ.এ পাশ করেন। তিনি কলকাতা সিটি কলেজ থেকে সংস্কৃতে অনার্সসহ বিএ পাস করেন ১৯১০ সালে। এরপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালেয় তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯১২ সালে এ বিভাগের প্রথম ছাত্র হিসেবে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এর দু বছর পর ১৯১৪ সালে তিনি আইনশাস্ত্রে বিএল ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯২৬ সালে তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য ইউরোপ গমন করেন। বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শণ চর্যাপদাবলি বিষয়ে গবেষণা করে ১৯২৮ সালে তিনি প্যারিসের সোরবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।

পত্রিকা ও সম্পাদনা: ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর বহু মননশীল ও জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ নানা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা তিনি সম্পদনা করেন। তিনি আল এসলাম পাত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক (১৯২৫)ও বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক (১৯২৮-২১)হিসেবে যোগ্যতার প্রমাণ দেন। তাঁরই সম্পদনা ও প্রকাশনায় মুসলিম বাংলার প্রথম শিশু পত্রিকা আঙ্গুর (১৯২০)আত্মপ্রকাশ করে। এছাড়াও তিনি ইংরেজী মাসিক পত্রিকা দি পীস (১৯২৩),বাংলা মাসিক সাহিত্য পত্রিকা বঙ্গভূমি (১৯৩৭)এবং পাক্ষিক তকবীর (১৯৪৭)সম্পাদনা করেন। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি বাংলা ও ইংরেজী ভাষায় প্রকাশিত পাক্ষিক ও মাসিক জার্নাল সম্পাদনা করেন।

তাঁর প্রকাশনা গুলি হলো:

গবেষণাগ্রন্থ: সিদ্ধা কানুপার গীত ও দোহা (১৯২৬), বাংলা সাহিত্যের কথা (১ম খণ্ড ১৯৫৩, ২য় খণ্ড ১৯৬৫), বৌদ্ধ মর্মবাদীর গান (১৯৬০) ।

ভাষাতত্ত্ব: ভাষা ও সাহিত্য (১৯৩১), বাংলা ব্যাকরণ (১৩৬৫ বঙ্গাব্দ), বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত (১৯৬৫) । প্রবন্ধ-পুস্তক: ইকবাল (১৯৪৫), আমাদের সমস্যা (১৯৪৯), বাংলা আদব কি তারিখ (১৯৫৭), Essay on Islam (1945), Traditional culture in East Pakistan (মুহম্মদ আবদুল হাই-এর সঙ্গে তাঁর যুগ্ম-সম্পাদনায় রচিত; ১৯৬১) ।

গল্পগ্রন্থ: রকমারী (১৯৩১) ।

শিশুতোষ গ্রন্থ: শেষ নবীর সন্ধানে, ছোটদের রাসূলুল−াহ (১৯৬২), সেকেলের রূপকথা (১৯৬৫) ।

অনুবাদ গ্রন্থ: দাওয়ানে হাফিজ (১৯৩৮), অমিয়শতক (১৯৪০),রুবাইয়াত-ই-ওমর খয়্যাম (১৯৪২),শিকওয়াহ ও জাওয়াব-ই-শিকওয়াহ (১৯৪২),বিদ্যাপতিশতক (১৯৪৫), মহানবী (১৯৪৬), বাই অতনা মা (১৯৪৮), কুরআন প্রসঙ্গ (১৯৬২),মহররম শরীফ (১৯৬২),অমর কাব্য (১৯৬৩), ইসলাম প্রসঙ্গ (১৯৬৩), Hundred Sayings of the Holly Prophet (1945), Buddist Mystic Songs (1960)।

সংকলন: পদ্মাবতী (১৯৫০), প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে শেষ নবী (১৯৫২), গল্প সংকলন (১৯৫৩), তাঁর গবেষণামূলক গ্রন্থ ও প্রবন্ধের সংখ্যা প্রায় ৪০টি। এছাড়া তিনি ৪১টি পাঠ্যবই লিখেছেন, ২০টি বই সম্পাদনা করেছেন। বাংলা সাহিত্যের উপর তাঁর লিখিত প্রবন্ধের সংখ্যা ৬০টিরও বেশি। ভাষাতত্ত্বের উপর রয়েছে তার ৩৭টি রচনা। অন্যান্য বিষয়ে বাংলা ইংরেজী মিলিয়ে সংখ্যা দাঁড়ায় ২৮০টি। এ ছাড়া তিনি তিনটি ছোটগল্প এবং ২৯টি কবিতা ও লিখেছেন।

সম্মাননা: জীবনভর ভাষা ও সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ এই জ্ঞানতাপস পাকিস্তান সরকার কর্তৃক ‘প্রাইড অফ পারফরম্যান’। ১৯৬৭ সালে ফরাসী সরকার তাঁকে ‘নাইট অফ দি অর্ডারস অফ আর্ট লেটার্স’ পদকে ভূষিত করেন।১৯৭০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী সরকার তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করেন। এছাড়া তিনি আদমজী ও দাউদ সাহিত্য পুরস্কার কমিটির স্থায়ী সভাপতিরূপে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন।

কর্মজীবন: মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কর্মজীবন বহুধা বিভাজিত। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে সে বছরের ২ জুন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগে প্রভাষক পদে স্থায়ী চাকুরিতে যোগদান করেন। একইসঙ্গে নিখরচে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষক বা হাউজ টিউটর নিযুক্ত হন। ১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং বিভাগীয় প্রধান ও কলা অনুষদের ডীন হিসেবে ছয় বছর দায়িত্ব পালন করেন।

১৯২৩ সালের গ্রীষ্মকালে ‘মালাকান’ রাজপুতদের মধ্যে ইসলাম প্রচারের জন্য রাজপুতনা গমন করেন। বছরের শেষ দিকে ‘আঞ্জুমান-ই-ইশা আৎ-ই-ইসলাম’ নামে ইসলাম প্রচার সমিতি গঠন করেন। ১৯২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত মুসলিম সাহিত্য-সমাজের সভাপতি নিযুক্ত হন। ১৯২৬ সনের সেপ্টেম্বরে তিনি ইউরোপে উচ্চ শিক্ষার জন্য গমন করেন। দু বছর অধ্যয়নের পর উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে ১৯২৮ সনে ঢাকায় ফিরে এসে তিনি বাংলা ও সংস্কৃতের প্রভাষকের পূর্ব পদে যোগদান করেন এবং সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষকের দায়িত্ব পুনর্বার গ্রহণ করেন। ১৯৩২ সালে তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের অস্থায়ী প্রাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩৪ সালে তিনি রীডার পদে পদোন্নতি লাভ করেন এবং সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত থাকেন। ১৯৩৭ সালে সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগ স্বতন্ত্র দুই বিভাগে পরিণত হয়। মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। ১৯৪০ সালে তিনি ফজলুল হক হলের প্রাধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। ১৯৪৪ সালের ৩০ জুন শহীদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ থেকে রীডার ও অধ্যক্ষ হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে (ফরাসি ভাষার)খণ্ডকালীন অধ্যাপক (১৯৫৩-৫৫) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপরে তিনি খণ্ডকালীন হিসেবে ১৯৪৮ সালে ও ১৯৫৫ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। ১৯৫৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে ১৯৫৫ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা বিভাগ চালু হয়। এখানে বাংলা সাহিত্য ও বাংলা ভাষা গড়ে তোলার জন্য মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং এ বছরই তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন।কিছুদিন পরেই তিনি কলা বিভাগের ডীন হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন শেষে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি বগুড়া আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রফেসর ইমেরিটাস নিযুক্ত হন। অধ্যাপনার বাইরে তিনি করাচির উর্দু উন্নয়ন সংস্থার উর্দু অভিধান প্রকল্প (১৯৫৯-৬০), ঢাকায় বাংলা একাডেমীর ‘পূর্ব পাকিস্তান ভাষার আদর্শ অভিধান প্রকল্প’ (১৯৬০) এবং ইসলামি বিশ্বকোষ প্রকল্প-এ (১৯৬১-৬৪) সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিশনের সদস্য (১৯৬৩-৬৪), ইসলামিক একাডেমীর কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য (১৯৬৩-৬৪), বাংলা একাডেমীর বাংলা পঞ্জিকার তারিখ বিন্যাস কমিটির সভাপতি, আদমজি সাহিত্য পুরস্কার ও দাউদ সাহিত্য পুরস্কার কমিটির স্থায়ী চেয়ারম্যান ছিলেন। এছাড়াও তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সম্পাদক (১৯১১) ছিলেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সভা ও সম্মলনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সেগুলির মধ্যে উলে−খযোগ্য দ্বিতীয় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলন (১৯১৭), ঢাকায় মুসালিম সাহিত্য সমাজ সম্মেলন (১৯২৬), কলকাতায় নিখিল বঙ্গ মুসলিম যুবক সম্মেলন (১৯২৮), হায়াদ্রাবাদে নিখিল ভারত প্রাচ্যবিদ্যা সম্মেলন (ভাষাতত্ত্ব শাখা,১৯৪১) এবং পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলন (১৯৪৮)। মাদ্রাজে Seminar on Traditional Culture in South-East Asia-তে তিনি UNESCO-র প্রতিনিধিত্ব করেন এবং এর চেয়ারম্যান মনোনীত হন।

তথ্যসূত্র:

১. সংসদ বাঙালা চরিতাবিধান; সাহিত্য সংসদ;

২. আচার্য সুনীত কুমার চট্টোপাধ্যায়; বাংলা সাহিত্যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ.বাংলাপিডিয়া, এশিয়াটিক সোসাইটি;

৩.চরিতাবিধান, বাংলা একাডেমি;

৪. ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও আমি; মাহযূযা হক, ২০০০ প্রকাশিত।

গবেষক:হোসাইন মোঃ আল-জুনায়েদ

Categories
অনলাইন প্রকাশনা ইতিহাস গবেষণামূলক প্রকাশনা বিজ্ঞান

পৃথিবীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস – ১

পৃথিবীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস – ১
—————— ডঃ রমিত আজাদ

ভূমিকাংশ
লক্ষ লক্ষ বৎসর আগে মানুষ এই পৃথিবীতে এসেছে এবং আদিম মানুষ সম্ভবত পশু-পাখীর মতই প্রকৃতির দেয়া খাদ্য ও আশ্রয় অবলম্বন করে যাযাবরের জীবন যাপন করে বহুকাল ধরে জীবন সংগ্রাম করেছে। তারপর একসময় সে আগুনের ব্যবহার শিখে সৃষ্টিশীল হয়েছে, কৃষি আবিস্কার করে স্থায়ী বাসভুমি গড়ে তুলেছে। কালের স্রোতে উন্নততর জীবন ধারনের ঊপায়ই কেবল আবিষ্কার করে নাই, পাশাপাশি তার বুদ্ধি শ্রম ও বিবেক খাটিয়ে চারপাশের জগৎটিকে জানতে ও বুঝতে চেষ্টা করেছে। তার নিজের প্রয়োজনে অনেক কিছুকে বদলে দেবারও চেষ্টা করেছে। এই বিশাল বিশ্বব্রহ্মান্ডের অতি ক্ষুদ্র একটি গ্রহ পৃথিবীর পরে ঠিক কবে কোন ক্ষণে কিভাবে মানুষের আগমণ ঘটেছিল তা এখনো চুলচেরাভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি সত্য কিন্তু সে চেষ্টায় ভাটাও পরেনি কখনো। অতীতে মানুষ কেমন ছিল, তাদের জীবন কেমন কাটত, বর্তমানে প্রাপ্ত নানাবিধ তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে তার যুক্তিপূর্ণ অনুসন্ধানই ইতিহাস।

ইতিহাসের নানা দিক আছে – ভৌগলিক ইতিহাস, জীব-বৈচিত্রের ইতিহাস, নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস, রাজনৈতিক ইতিহাস, দর্শনের ইতিহাস, ধর্মীয় ইতিহাস, সাহিত্যের ইতিহাস, সামাজিক ইতিহাস, বিজ্ঞানের ইতিহাস অর্থনৈতিক ইতিহাস, আবার পৃথিবী জুড়ে নানাবিধ সামাজিক পরিবর্তনের পিছনে রয়েছে নানাবিধ দর্শনের প্রভাবের ইতিহাস, ইত্যাদি। এরা সকলে ইতিহাসের এক একটি অংশ হলেও সামগ্রিকভাবেও পৃথিবীর ইতিহাসকে দেখা প্রয়োজন। এই সিরিজে এই সব কিছুকে সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করব। পাঠকদের গঠনমূলক সমালোচনা আশা করছি।

শুরু করছি প্রাগৈতিহাসিক যুগ দিয়েঃ

প্রাগৈতিহাসিক যুগ
বিশ্বের ইতিহাস মুলতঃ হোমো স্যাপিয়েন্সের অতীত অভিজ্ঞতার স্মৃতি। ইতিহাস লিখতে গেলে লিখতে-পড়তে জানতে হবে। তাই লিখিত ইতিহাস সংরক্ষিত হয়েছে মানুষ লিখতে শেখার পর থেকে। কিন্তু তার আগেও তো মানবজাতি এই পৃথিবীতে বিচরণ করেছে কয়েক লক্ষ বছর, সেই সময়ের অভিজ্ঞতা জানব কেমন করে? এই যুগটিকে বলা হয় প্রাগৈতিহাসিক অর্থাৎ ইতিহাসেরও আগের যুগ। নিঃসন্দেহে এই যুগের কোন লিখিত রেকর্ড নেই। সেই সময়ের প্রাপ্ত বিভিন্ন পেন্টিং, অঙ্কন, ভাস্কর্য, এবং অন্যান্য হস্তনির্মিত নিদর্শন পাঠ করে অনেক তথ্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। বিংশ শতাব্দি থেকে প্রাগৈতিহাসিক যুগের গবেষণা অপরিহার্য বিবেচনা করা হয়েছে, কেননা একদিকে তা যেমন সেই সময়ের আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে জানার জন্য অত্যাবশ্যকীয় অন্যদিকে তা না করলে সাব সাহারান আফ্রিকা, পূর্ব এবং কলম্বিয়ান আমেরিকার মত গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতাগুলোও বাদ পরে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। কোন এক কালে পশ্চিমা ঐতিহাসিকরা কেবলমাত্র পশ্চিমী বিশ্বের উপরই মনোযোগ নিবদ্ধ করেছিলেন এবং যা কিছু শুরু করতেন শুরু করতেন প্রাচীন গ্রীস থেকে। কিন্তু সময়ের বিচারে গ্রীক সভ্যতা সিন্ধু ও ব্যাবিলনীয় সভ্যতা থেকে অনেক নবীন। এমনকি অস্ট্রেলিয়ান অ্যাবোরিজিনরা এবং নিউজিল্যান্ডের মাওরিরা তাদের ইতিহাস মৌখিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করে রেখেছিলো ইউরোপীয়দের সাথে তাদের যোগাযোগ হওয়ার অনেক আগে থেকেই।

বৃটিশ ইতিহাসবিদ E. H. Carr বলেছেন, ‘প্রাগৈতিহাসিক এবং ঐতিহাসিক এর মধ্যে প্রভেদ রেখা আমরা অতিক্রম করেছি যখন মানুষ শুধুমাত্র বর্তমানে বাস করা বন্ধ করেছে, এবং সচেতনভাবে তাদের অতীত এবং তাদের ভবিষ্যতের উভয়েই আগ্রহী হয়ে উঠেছে। ইতিহাস আরম্ভ হয় ঐতিহ্যের হস্তান্তরের মধ্যে দিয়ে; আর ঐতিহ্য মানে অতীত অভ্যাস ও অনুশীলনগুলোকে পরিবহণ করে ভবিষ্যতের মধ্যে ঠেলে দেয়া। অতীতের রেকর্ড ভবিষ্যত প্রজন্মের সুবিধার জন্যই সংরক্ষণ করে রাখা প্রয়োজন।’

(চলবে)

Categories
অনলাইন প্রকাশনা ইতিহাস শিশু

শিশুদের জিয়া

শিশুদের জিয়া
————– ডঃ রমিত আজাদ

দিনটি ছিল মহান একুশে ফেব্রুয়ারী। শহীদ মিনারের ঠিক উল্টা দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা বাগানে, একটি আড়াই বছরের শিশুকে মালি বা পিওন ধমকা ধমকি করছে, ফুল ধরেছে বলে। বাবা-মা মালিকে বোঝাতে পারছে না। তারপর আমি এগিয়ে গেলাম, “কি হয়েছে, আপনি বাচ্চাটাকে ধমকাচ্ছেন কেন?” বলল, “বাচ্চাটা ফুল ছিড়ছে তাই”। আমি বললাম, “ফুল তো ছিড়ে নাই, ধরেছে মাত্র”। ছোট শিশুটির বাবা বলল, “ওর তো মাত্র আড়াই বছর বয়স, একটু ফুল ধরে দেখতে চেয়েছে”। সেই মালি/পিওন বলল, “না, এখানে ফুলে হাত দেয়া নিষেধ, ফুল থাকবে সবাই দেখবে”। আমি বললাম, “ছোট বাচ্চা, এগুলো তো আর বুড়োদের জন্য না। বাচ্চারা দেখবে, হাসবে, খেলবে। ওদের জন্যই তো সবকিছু। পিওনটা গজগজ করতে করতে চলে গেল। এই হলো আমাদের দেশের সামগ্রিক অবস্থা, শিশুদের প্রতি আবেগ, নজর, ভালোবাসার অনেক অভাব।

কিন্তু এই আমাদের দেশেই এমন একজন রাষ্ট্রপতি ছিলেন, যিনি বুঝতে পেরেছিলেন, শিশুদের ভালো না বসলে দেশ বা জাতিকে ভালোবাসা হয়না। যেকোন জাতি গঠনের শুরু করতে হবে শিশুদেরকে দিয়ে। তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতি হলেন জিয়াউর রহমান। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, জাতির ভবিষ্যৎ হলো শিশুরা। যে কোন জাতি গঠন শিশুদেরকে দিয়েই শুরু করতে হবে। সেই উদ্দেশ্যেই তিনি বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেন।
১। শিশুদের সাংস্কৃতিক ও নানা জাতীয় মেধা চর্চার জন্য শিশু এ্যকাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন,
২। দেশের প্রতিটি বৃহত্তর জেলায় এ্যকাডেমির শাখা স্থাপন করেন,
৩। শিশুদের সাংস্কৃতিক প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে নতুন কুঁড়ি নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন, যা বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচার হতো। পরবর্তিকালে অনেক সুখ্যাত শিল্পি ঐ নতুন কুঁড়িরই প্রডাক্ট,
৪। সারাদেশে মেধাবী শিশু ছাত্রদের অনুপ্রেরণা দেয়ার লক্ষ্যে তাদের জন্য একটি সম্মেলনের আয়োজন করেন এবং সশরীরে সেখানে উপস্থিত হয়ে তাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করেন। সেই সম্মেলনে অংশগ্রহনকারী মেধাবী শিশুদের জন্য দিনটি ছিল স্মরণীয়,
৫। মেধাবী শিশুদের (ধনী হোক দরিদ্র হোক) লালণের নিমিত্তে নির্মিত সামরিক মেরিট স্কুল ক্যাডেট কলেজের সংখ্যা চারটি থেকে আটটিতে উন্নিত করেন,
৬। সুস্থ অর্থবহ ও উন্নত চলচিত্রের নির্মানের লক্ষ্যে তিনি রাষ্ট্রীয় অনুদানের ব্যবস্থা করেন। এই সময়ে বেশ কিছু ভালো ভালো শিশু চলচিত্র নির্মিত হয়, যেমন- ছুটির ঘন্টা, ডুমুরের ফুল, ডানপিটে ছেলেটি, অশিক্ষিত, এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী, ইত্যাদি,
সেই সময় বিটিভিতেও খুব সুন্দর সুন্দর শিশুতোষ অনুষ্ঠান হতো। এরমধ্যে একটি ধারাবাহিক নাটক ছিল, ‘রোজ রোজ’।
৭। জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালকে বাংলাদেশ শিশু বর্ষ ঘোষণা করেন। পুরো বছর জুড়ে সারাদেশে নানা রকম কর্মকান্ড হয়।
৮। শিশু পার্ক – সেনাবাহিনীর চাকুরী জীবনে তিনি জার্মানীতে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। সেই সময় তিনি নিশ্চয়ই সেখানকার অত্যাধুনিক শিশু পার্কগুলো দেখেছিলেন। তাছাড়া রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়েও তিনি একাধিক দেশ সফর করেছিলেন এবং সেসব দেশের শিশুপ্রেম ভালোভাবে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি তাই ঢাকাতে একটি অত্যাধুনিক শিশু পার্ক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিলেন। যেই চাওয়া সেই কাজ, খুব দ্রুতই কাজ শেষ করে ১৯৭৯ সালে উদ্ধোধন করলেন ‘ঢাকা শিশু পার্ক’। হুমড়ি খেয়ে পড়ল শুধু শিশুরা নয় পুরো ঢাকা শহর। শিশু, কিশোর, যুবা এমনকি প্রৌঢ়-বৃদ্ধরাও বাদ যায়নি। আমাদের কল্পনাতেই ছিলনা এমন কিছু একেবারে বাস্তব রূপে ধরা দিল। এই পার্ক দেখে প্রতিটি শিশুরই মনে হয়েছিল, এ যেন এক রূপকথার জগৎ।
এই পার্ক নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনাও আছে।
এক পাগলাটে যুবক, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী একটি আভ্যন্তরীণ বিমান হাইজ্যাক করে খেলনা পিস্তল দিয়ে। তারপর পাইলটকে বাধ্য করে বিমানটি কলকাতায় নিয়ে যেতে। কি আর করা? পাইলট তো আর বুঝতে পারেনি যে, সেটা খেলনা পিস্তল। যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে ছিনতাইকারীর কথাই শোনে। ছিনতাইকারীর কাছে তার দাবী শুনতে চাইলে সে বলে, “ঢাকার শিশু পার্কটি চরম বিলাসিতা, বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে এমন পার্কের প্রয়োজন নেই। আমি পার্কটি বন্ধ করার দাবী জানাচ্ছি”। এত সুন্দর একটা পার্ক, যা দেখে শিশুরা আনন্দে ভাসছে সেটা সে বন্ধ করার দাবী জানালো! এই একটা সমস্যা। আমরা কোন ভালো কিছুকে খুব সহজে গ্রহন করতে পারিনা।
৯। শিশুদের অধ্যায়নের সুবিধার্থে শাহবাগের পাবলিক লাইব্রেরীর পাশেই তিনি একটি শিশু গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন।

জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় এলেন তখন আমি পাঁচ পেরিয়ে ছয় বছরে পা রেখেছি। পত্রিকায় উনার বড় মাপের একটা ছবি দেখলাম, এটা মনে আছে। তার কিছুকাল পরে শুনলাম, তিনি ঢাকার মগবাজার, মধুবাগে আসবেন। ব্যাস প্রবল উৎসাহ পড়ে গেল। নির্দিষ্ট দিনে পথের পাশে দাঁড়িয়ে গেলাম। কিছু সময় অপেক্ষা করার পর দেখলাম, খোলা জীপে সামরিক পোষাকে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি, ধীরে ধীরে আমাকে অতিক্রম গেল জিপটি । এই প্রথম চোখের সামনে দেখলাম, সুদর্শন, সুপুরুষ, জনপ্রিয় এই রাষ্ট্রপতিকে। সেই ভালোলাগার অনুভূতি আমি কোনদিন ভুলব না। সম্ভবতঃ আরো একবছর পর তিনি আরেকবার এলেন
ঢাকার মগবাজার, মধুবাগে। আমি তখন মগবাজার টি এন্ড টি স্কুলের ছাত্র। স্কুলটির অবস্থা শোচনীয় ছিল। হেডমাস্টার দেখলেন এই তো সুযোগ, তিনি এক ফন্দি আটলেন। রাষ্ট্রপতি যাওয়ার পথে স্কুলের ছাত্র শিক্ষক মিলে তাঁর পথ আটকাবে যাতে কিছু অনুদান পাওয়া যায়। করলেনও তাই। রাষ্ট্রপতির গাড়ি বহরের সামনে ছিল মটর সাইকেল আরোহী গার্ডরা। তারা মৃদু হেসে থেমে গেলেন। একটু পর একটা জীপ এসে থামলো। তার পিছনে বাকী গাড়ীগুলোও থামলো। এর মধ্যে একটি ছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গাড়ী। এসময় জিয়াউর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন যে, শিশুদের অনেকেই উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছে উনার সাথে হ্যান্ডশেক করার জন্য। তিনি তার ডান হাতটি জানালার বাইরে বের করে দিলেন। বেশ কয়েকজন ছুটে গেল উনার সাথে হাত মিলানোর জন্য। আমিও ছুটে গিয়ে উনার সাথে হাত মিলিয়েছিলাম। সেই অনুভূতি আমি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মনে রাখবো।

খোলা জীপ থেকে একজন সুঠামদেহী সেনা কর্মকর্তা নেমে এসে কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন, “এভাবে রাষ্ট্রপতির গতি রোধ করা যায়না, আপনারা সরে দাঁড়ান”। পায়ে পায়ে সরে গেল সবাই। কিন্তু জিয়াউর রহমান ঘটনাটি মনে রেখেছিলেন, এবং পরে তিনি আমদের স্কুলের জন্য অনুদান পাঠিয়েছিলেন।

তৃতীয়বার উনাকে দেখেছিলাম, বাংলাদেশ শিশু বর্ষ ১৯৭৯ সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে, ঢাকা স্টেডিয়ামে। অনুষ্ঠানটি বর্নাঢ্য হয়েছিল, এবং স্বয়ং রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি তাকে আরো প্রানবন্ত করেছিল।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শিশুপ্রেমের আরেকটি ঘটনা আমি শুনেছিলাম আরেকজনার কাছ থেকে। তিনি বর্তমানে একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য্য। সে সময় জিয়াউর রহমান রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না। ছিলেন সেনা উপ-প্রধান ও বাংলাদেশ ক্যাডেট কলেজ সমূহের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে কি একটা মনমালিন্য হলো সিনিয়র জুনিয়রদের মধ্যে। মোটামুটি সিরিয়াস পর্যায়েই দাঁড়ালো। প্রিন্সিপাল বললেন আগামীকাল এর বিহিত করবেন। সবাই বুঝতে পারছিল, সিভিয়ার এ্যকশন নেবেন প্রিন্সিপাল, দু’য়েকজনকে কলেজ থেকে উইথড্রও করতে পারেন। প্রমাদ গুনছিল অনেকেই।

পরদিন সকালে হাউজের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল ক্যাডেটরা, এরকম সময় তারা বিস্মিত হয়ে দেখলো, ‘চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, সারা বাংলাদেশের উপ-সেনাপ্রধান ও ক্যাডেট কলেজ সমূহের দন্ডমুন্ডের কর্তা জিয়াউর রহমান। সংবাদ পেয়ে তিনি নিজেই চলে এসেছেন। তিনি কিছুক্ষণ প্রিন্সিপালের সাথে কথা বললেন, তারপর জুনির ক্লাসের (ক্লাস এইট অথবা নাইন) এই গোলযোগের রিং লিডারদের ডেকে সামনে দাঁড় করালেন। উনার হাতে ছিল একটা কেইন, আপন পিতার মত শাসনের সুরে তাদের তিরষ্কার করলেন এবং তাদের প্রত্যেকের পিঠে মৃদু চালালেন তার কেইন। আর সিনিয়রদেরও বাদ দিলেন না। তাদের আলাদা করে ডেকে নিয়ে গেলেন প্রিন্সিপালের রূমে, এবং সেখানে তাদেরকেও তিরষ্কার ও সাবধান করে দিলেন।

নিজের সন্তানদেরও কোন প্রশ্রয় দেননি তিনি। পত্রিকায় পড়েছিলাম, একবার তারেক রহমান বায়না ধরেছিল, বাবার সাথে বিদেশ সফরে যাবে। পিতা জিয়া সরাসরি নিষেধ করে দিয়েছিলেন। এরকম নিয়ম নেই, সুতরাং এটা কখনোই সম্ভব নয়। তারেক তখন বলল যে, নেপালের রাজা যখন বাংলাদেশ সফরে এলেন, তখন তাঁর সাথে তো তার ছেলে ছিল। ভীষণ রাগান্বিত হয়ে জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, “তোমরা কোন রাজা-বাদশার ছেলে নও”।

‘এমন একটি পৃথিবী কল্পনা করুন যেখানে কোন শিশু নেই, সেই পৃথিবীতে কি অফিস-আদালত কাজ করবে? ট্রেন চলবে? বিমান উড়বে? পেটের দায়ে সবই হবে হয়তো। কিন্তু এই সব কিছুর কোন অর্থ থাকবে না। কারণ আমরা যা কিছু করি, সবই ভবিষ্যতের জন্য করি, আর ভবিষ্যত মানেই শিশুরা।’

আমি শিশু হিসাবে তাঁকে যেমন দেখেছি। তাতে মনে হয়েছে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, উপরের কথাগুলোর মর্মার্থ বুঝতে পেরেছিলেন। আর তাই শিশুদের জন্য তিনি যতদূর সম্ভব অবদান রাখার চেস্টা করেছেন।

শিশু জিয়ার নাম ছিল কমল। আজ সেই কমলের জন্মদিন। আসুন আমরা সবাই মিলে তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

যেদিন তুমি এসেছিলে ভবে
কেঁদেছিলে তুমি আর হেসেছিল সবে
এমন জীবন ভবে করিবে গঠন
মরনে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন ।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা ইতিহাস

ভয়ঙ্কর এক সংখ্যার জন্ম, নিষ্ঠুর এক খুনের গল্প


৫ম খ্রিস্টপূর্বাব্দের শেষভাগ

“আচ্ছা, সবাই বলে ভ্রাতৃগোষ্ঠির সদস্যরাই তাকে মেরে আইওনিয়ান সাগরে তার লাশ ফেলে দিয়েছিল! গুরু নিজেই নাকি নির্দেশ দিয়েছিলেন এ কাজে?” উদ্বিগ্নতা আর তীব্র কৌতূহলে মেয়েটি জানতে চায় যুবকের কাছে।
“হশ্‌শ্‌…”মুখে তর্জনী রেখে দ্রুত চারদিকে তাকায় যুবক।

অস্তগামী সূর্যের ম্লান আলোয় ভরে গেছে গাঢ় সবুজ জলপাই অরণ্য, খেলা করছে বৃক্ষশাখা আর পত্রপল্লবের ছায়া। মাঝেমাঝে আইওনিয়ান সাগরের বুক থেকে ভেসে আসছে দমকা হাওয়া, তার তোড়ে জায়গা বদল করে আলো-ছায়া। না, কোথাও কাউকে দেখা যাচ্ছে না।

তবু অ্যাডোনিয়াকে সাবধান করে ফিলোক্রেটস, “আস্তে কথা বলো, কে কী শুনে ফেলে, বিপদে পড়ব আমরা।”
গলার স্বর নামিয়ে ফিসফিসিয়ে প্রশ্ন করে অ্যাডোনিয়া, “কিন্তু এ কি সত্যি?”
“আরে না, তা হবে কেন?” তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে ফিলোক্রেটস। “সাগরে ঝড় উঠেছিল সেদিন, আর সে দাঁড়িয়ে ছিল জাহাজের খোলা জায়গায়। প্রচণ্ড এক ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে যায় তাকে।”
“সে একাই কেন দাঁড়াতে গেলো খোলা জায়গায়?” প্রশ্ন করে অ্যাডোনিয়া, সন্দেহ দূর হয় না তার। “আর, বছরের এ সময় ঝড়ের কথা তো কখনো শোনে না কেউ, মাছরাঙা দিন [halcyon days] চলছিল তখন!”

“অ্যাডো, গুরু কেন এ কাজের নির্দেশ দিতে যাবেন? সত্যানুসন্ধানী মানুষ তিনি, কেবল সত্যেরই লেনদেন করেন। একটি সংখ্যা আবিষ্কারের জন্য কেন মানুষ খুন করাবেন তিনি?” ফিলোক্রেটসের গলার স্বর দৃঢ় হয়ে উঠে।
“কারণ গুরুর সারা জীবনের দর্শন আর শিক্ষার ভীত দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছিল সংখ্যটি। তিনি কঠোরভাবে চেয়েছিলেন তা গুপ্ত থাকুক, কিন্তু সে প্রকাশ করে দিয়েছে।”

“আমি তা বিশ্বাস করি না, অ্যডো। তুমি জানো, তাঁর কাছে বিদ্যাশিক্ষার বিনিময়ে আমাকে প্রতিদিন তিন অবোলি [oboli] করে দিতেন! এরকম অদ্ভুত শিক্ষক, যিনি পড়ানোর বিনিময়ে ছাত্রকেই পারিশ্রমিক দেন, আর একজন খুঁজে পাবে না তুমি। এ ধরণের মানুষ কখনো কাউকে হত্যা করতে পারেন না। আমি তাকে চিনি বলেই, জন্মভূমি সামোস ছেড়ে কেবল তাঁর দর্শন শেখার জন্য ক্রোটন এসেছি।” এক টানে বলতে থাকে ফিলোক্রেটস, একটু উষ্ণ তার গলা।
খানিক পর আর্দ্র হয় যুবকের কণ্ঠ। “অবশ্য তা না হলে তোমাকেও পাওয়া হতো না,” অ্যাডোনিয়ার কাঁধে দু’হাত রেখে আলতো করে তার কপোল ঘষে দেয় ফিলোক্রেটস। সোনালি অলকগুচ্ছ নড়ে উঠে মেয়েটির, ভূমধ্যসাগরের গাঢ় নীল জলরাশির মতো চোখ মেলে গভীর ভালোবাসা আর মায়ায় গণিতপাগল স্বামীর দিকে চেয়ে থাকে সে।
এর এক বছর আগের কথা।

চমৎকার করে কেটে, মসৃণভাবে লেপে দেয়া অর্ধবৃত্তাকার মাটির ঢিবি— সেমিসার্কেল (semicircle)। ব্যাস লাইন বরাবর ঝুলছে ভারী পর্দা। অর্ধবৃত্তের ধার ঘেঁষে ইতোমধ্যেই সমবেত হয়েছে অনেক তরুণ-তরুণী, ভ্রাতৃগোষ্ঠির সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ শাখা ম্যাথমেটিকোই (Mathematici)’র অন্তর্ভুক্ত তারা, অর্জন করেছে স্বচক্ষে গুরুকে দেখা ও তাঁর ভাষণ শোনার বিরল কৃতিত্ব। এর আগে তারা ছিল ভ্রাতৃগোষ্ঠির আরেকটি শাখা অ্যাকৌজমেটিকোই (Acusmatici)’র সদস্য, তিন বছর তীব্র কৌতূহলে শুধু গুরুর ভাষণই শুনে গিয়েছিল, পর্দার আড়ালের মানুষটি দেখতে পায়নি কখনো, কারণ তার জন্য আগে যোগ্যতা অর্জন করতে হয়।

গভীর উদ্দীপনায় অপেক্ষা করছে ম্যাথমেটিকোইয়ের সদস্যগণ, দিনের পর দিন তারা এভাবেই অপেক্ষা করে আসছে গুরুর আগমনক্ষণটিতে। আজকে কী নিয়ে কথা বলবেন গুরু ভাবতে থাকে তারা, আর পরিকল্পনা করে আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে কীভাবে নিজেদের যোগ্যতা মেলে ধরবে।

বাজনা বেজে উঠে অর্ধবৃত্তের অভ্যন্তরে, শোনা যায় জনপ্রিয় গ্রিসীয় সঙ্গীত, পর্দা সরে যায় দু’পাশে। সাদা আলখেল্লা পরিহিত, পায়ে সোনালি পাদুকা, আর মাথায় গ্রিসীয় ফুলের মুকুট, জলপাইয়ের পাতা গোঁজা তাতে, রাজকীয় মহিমায় প্রবেশ করেন সৌম্য চেহারা মানুষটি—পীথাগোরাস, সেমিসার্কেলের শিক্ষক, ভ্রাতৃগোষ্ঠির প্রতিষ্ঠাতা, তাঁর সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় দর্শনের প্রচারক।

 

“কেমন আছ তোমরা, হে অভিমন্ত্রিত [initiated] সত্যব্রতগণ?” দু’হাত প্রসারিত করে হাস্যপ্রোজ্জ্বল মুখে জানতে চান পীথাগোরাস।
“চমৎকার, হে মহান গুরুদেব!” সমস্বরে বলে উঠে সবাই।
“তোমরা হচ্ছ নির্বাচিতগণ,” শান্তস্বরে বলেন পীথাগোরাস,”তোমরা পরিহার করবে সব ধরণের উগ্রবাদিতা। সর্বোতপ্রচেষ্টায় তোমাদেরকে অপসারণ করতে হবে, এবং ছিন্ন করতে হবে অগ্নি ও তরবারির মাধ্যমে, এবং আরো নানাবিধ উপায়ে, দেহ থেকে অসুস্থতা, আত্মা থেকে অজ্ঞানতা, উদর থেকে ভোগবিলাস, নগরী থেকে অরাজকতা, পরিবার থেকে বিভেদ, এবং সকল ক্ষেত্রে বাহুল্য।”
“জী, গুরুদেব।” সবার হৃদয়ে গেঁথে থাকে বাণীটি।

পীথাগোরাসের নেতৃত্বে ভ্রাতৃগোষ্ঠির সদস্যগণ অতঃপর মেতে উঠে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোচনায়, নিয়ন্ত্রিত বিতর্কে, প্রশ্নোত্তরে। কেটে যায় বেশ কয়েক ঘন্টা, শেষ হয় প্রথম পর্বের আলোচনা।

অপরাহ্নে, অড্রিয়াটিক সাগর থেকে উঠে আসা বর্ষবায়ু (etesian wind) যখন বয়ে যাচ্ছিল আয়োনিয়ার উপর, দলটি আবার সমবেত হয়, এবার আলোচনার বিষয়বস্তু অতিন্দ্রীয় শাস্ত্র (esoterica)।
“আপনার জীবনের কথা বলে আমাদের সম্মানিত করুন, হে গুরুদেব।” লুকানিয়া থেকে আগত কমনীয় চেহারার মেয়েটি, ঈসারা (Aesara) তার নাম, উঠে দাঁড়িয়ে অনুরোধ করে; তীব্র কৌতূহলে নড়েচড়ে বসে সবাই।

স্মিতহাস্যে আলখেল্লাটি ঠিক করে নেন পীথাগোরাস। মনে তাঁর ভীড় করে কত না স্মৃতি—নদী, দরিয়া আর পথের অন্তহীন বয়ে চলা, নগর ও বন্দরসমূহের শান-শওকত, উত্থান-পতন, নানা জাতির মানুষ, দেহ ও মনে তাদের হরেক রঙের খেলা; সম্মোহিত হয়ে যান দার্শনিক কয়েক মুহূর্তের জন্য।

“সাতচল্লিশতম অলিম্পিয়াডের প্রাক্কালে জন্ম আমার। আমার বাবা নেসারকাস (Mnesarchus) ছিলেন ফিনিশিয়ার [Lebanon] বন্দরনগরী টায়ারের (Tyre) মুক্তা ব্যবসায়ী, মা ঈজিয়ানতীরে সামোস নগরীর (Samos) মেয়ে পার্থেনাস। সামোসের ভয়ানক দুর্ভিক্ষে বাবা একদা প্রচুর খাদ্শস্য দিয়ে সাহায্য করেছিলেন, ফলে নগরীর অধিকর্তাগণ কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাঁকে সামোসের নাগরিকত্ব দান করেন।

আমি যখন মাতৃগর্ভে, মা’কে নিয়ে বাবা পার্নেসাস পর্বতের পাদদেশে ডেলফাই’র(Delphi) দৈববাণীর মন্দিরে গমন করেন, এপোলোর সন্ন্যাসিনী পীথিয়ার (Pythia, Pythoness) ওরাকল শুনতে। পীথিয়া আমার পিতাকে তাঁর জাহাজের জন্য অনুকূল বাণিজ্যবায়ুর ভবিষ্যতবাণী ব্যক্ত করে, এবং সুসংবাদ প্রদান করে আমার আগমনের, যা বাবা তখনও জানতেন না। ডেলফাই থেকে টায়ারে ফেরার পথে সিডন (Sidon) বন্দরে আমার জন্ম হয়। বাবা-মা খুশিতে সন্ন্যাসিনীর নামানুসারে আমার নাম রাখেন পীথাগোরাস—পীথিয়া’র মতো কথা বলে যে।

জগতকে জানার অদম্য স্পৃহা আমার উপর ভর করে সেই শৈশবেই, বাবার বাণিজ্য অভিযাত্রায় প্রায়ই তাঁর সহযাত্রী হতাম আমি। এভাবে ঈজিয়ান, এশিয়া মাইনর এবং ফিনিশিয়ার তীরে হাঁটতে হাঁটতে বড় হতে থাকি আমি।

maveric11

আমার বিদ্যাশিক্ষার জন্য শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নিয়োগ করেন বাবা। ছেলেবেলায়ই শামদেশের (Syria) বিদ্বজ্জনদের কাছে দীক্ষা লাভ করি আমি, সংস্পর্শে আসি আমার প্রিয় শিক্ষক ফেরেকাইদেসের (Pherekydes)।

অষ্টদশ বর্ষ বয়স পূর্ণ হলে আমি গমন করি মাইলিটাস নগরে, গ্রিক জ্ঞানের পুরোধা বৃদ্ধ থেলিজ (Thales) ও তাঁর ছাত্র অ্যানাক্সিম্যান্ডরের (Anaximander) সাহচর্য লাভ করি। পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভের জন্য থেলিজ আমাকে কৃষ্ণ ও লোহিত মৃত্তিকার দেশে (Khemet-Deshret) গমন করতে উদ্বুদ্ধ করেন।

দূরদেশ গমনের প্রস্তুতি নেয়ার জন্য সিডন বন্দরে ফিরে আসি আমি, এখানে আরো কিছুকাল বিবলস ও টায়ারের যাবতীয় অতিন্দ্রীয় শাস্ত্রে অভিমন্ত্রিত হই। তারপর শুভ এক দিনে কারমেলাস পর্বতের পাদদেশে কৃষ্ণ ও লোহিত মৃত্তিকার দেশ মিশরগামী এক জাহাজে আরোহণ করি আমি।

মিশরের ফারাও আমাসিস (Ahmose II) এবং তাঁর গ্রিক স্ত্রী রদোপেস [Rodhopes, ইনি প্রাচীনতম সিন্ডারেলা, যার উপর ভিত্তি করেই পৃথিবীর নানা দেশে সিন্ডারেলা কাহিনী ছড়িয়েছে এবং ঈশপ যাকে রূপকথা শোনাতেন] আমাকে সাদরে গ্রহণ করেন। ফারাওয়ের প্রাসাদে কিছুদিন কাটানোর পর তাঁর রাজ্যের উচ্চ পুরোহিতদের কাছে দীক্ষা নেবার অভিপ্রায় ব্যক্ত করি আমি, রাজা তখন আমাকে একটি সুপারিশনামা লিখে পাঠিয়ে দেন মেমফিসের মন্দিরে ও পিরামিডে।

কিন্তু জ্ঞান-বিজ্ঞানে উৎকর্ষ মিশরীয়রা চূড়ান্ত রকমের গোপনীয়তা অবলম্বন করত তাদের জ্ঞান-সাধনায়, যেরকম করে গিয়েছিল ত্রিভূবনের জ্ঞানী থোথ-হার্মিস-ট্রাইম্যাজিস্টাস। তিন দিবস তিন রজনী আমি অতিবাহিত করি পাথরের শবাধারে (sarcophagus), মিশমিশে অন্ধকার এক গুপ্ত প্রকোষ্ঠে, আলোর প্রতীক্ষায়। আস্তে আস্তে আলোড়িত হতে থাকে শরীর আমার, বাড়তে থাকে হৃদস্পন্দন, ধীরে ধীরে চেতনা হারাই আমি। আমি অনুভব করি আলো, ভাসতে থাকে সত্তা আমার, অনন্তকালের গর্ভে, ফিনিক্স পাখির মতো উড়তে থাকে আমার আত্মা। চারপাশে প্রাণের স্পন্দন অনুভব করি আমি, অবলোকন করি আকার ও সংখ্যা।

“তুমি এখানে, পুনরুজ্জীবিত, অনুভব করেছ মহান রহস্য। মৃত্যুকে পরাভূত করেছ তুমি, অর্জন করেছ মৃত্যুঞ্জয়তা।” তিন দিন পরে উচ্চ পুরোহিত সঞ্চিসের গলার স্বরে জাগরণ আসে আমার। “এসো, অভিমন্ত্রিতদের গৌরব উদযাপন কর। তুমি হয়েছ আমাদেরই একজন, লাভ করেছ নবজন্ম।”

২২ বছর মিশরে কাটাই আমি, আয়ত্ত করি তাদের জ্যামিতিক জ্ঞান, সান্নিধ্যে আসি দড়ি-প্রসারণকারীদের (rope stretcher)। প্রতিবছর নীল নদের বন্যায় ভেসে যেত জমির খাড়া আল, ফারাও তখন নীলের অববাহিকায় পাঠাতেন দড়ি-প্রসারণকারীদের, কতটুকু জমি কমে গেল তা পরিমাপ করতে। পরিমাপের কাজে সূক্ষ্মভাবে সমকোণ বানানোর প্রয়োজন হতো তাদের, এর জন্য সমান দূরত্বে তৈরি করা ১২টি গিঁটের দড়ি নিত তারা। তারপর মাঝ থেকে এমনভাবে ৩ গিঁট নিত, যাতে একপাশে ৪গিঁট ও অন্যপাশে ৫ গিঁট থাকে এবং তাদের প্রান্ত জোড়া দিয়ে একটি ত্রিভুজ সৃষ্টি করা যায়, যা সবসময় সমকোণ সৃষ্টি করে। অন্য কোনো ভাবে গিঁট নিলে কখনো সমকোণ হতো না।

maveric21

ফারাও আমাসিস। আহ্‌, কী দূরদর্শী প্রতাপান্বিত সম্রাটই না ছিলেন তিনি! বয়স হয়েছিল বেশ, অন্তিম শয়ানে তখন, তারপরও রণকৌশল সাজিয়ে গেছেন তিনি, রাজধানী মেমফিসের চারপাশে গড়ে তুলেছেন কঠিন প্রতিরক্ষাবেষ্টনী। দক্ষিণ-পশ্চিম আনাতোলিয়া’র (Turkey) কারিয়া এবং গ্রিস থেকে ভাড়াটে সৈন্য এনে শক্তিশালী করে তুলেছিলেন সেনাদল, মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন সামোসের পলিক্রেটিজকে, যাতে পলিক্রেটিজের বিশাল নৌবহর গাজা থেকে পেলুসিয়াম (Pelusium) পর্যন্ত সঙ্কীর্ণ মরুপথটিতে অরক্ষিত পার্সি বাহিনীর উপর শাম সাগর (Syrian Sea) থেকে ভয়ঙ্কর আক্রমণ চালায়।

যুদ্ধ শুরু হবার কিছু দিন পূর্বে বিশ্বাঘাতকতা করে পলিক্রেটিজ। ক্যাম্বাইসিজের পক্ষে যোগ দেয় তার নৌবহর, বিনা বাধায় পার্সি সৈন্যদল পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে পৌঁছে যায় পেলুসিয়াম উপসাগরের তীরে। আর এ সময় মারা যান বৃদ্ধ আমাসিস, সিংহাসনে আরোহণ করেন সামতিক—সে কেবল কয়েক মাসের জন্য। পেলুসিয়ামে পরাজিত হয় মিশরবাহিনী, ক্যাম্বাইসিজ অগ্রসর হতে থাকেন আরো পশ্চিমে, হেলিওপলিসের পতন ঘটিয়ে পৌঁছে যান রাজধানী মেমফিসের সদর দরজায়। কয়েক মাস অবরোধের পর ভেঙে পড়ে মেমফিস।

পারস্যরাজ আমাকে বন্দি করে ব্যাবিলনে (Babylon) নিয়ে আসেন, কিন্তু রহস্যময়ভাবে মুক্তভাবে সেখানে চলাচল করতে দেন। অপ্রত্যাশিত সুযোগটি আমি কাজেই লাগাই জ্ঞান সাধনায়—প্রাচ্যদেশীয় জ্ঞানীদের (magi) কাছে দীক্ষালাভ করি অতিন্দ্রীয় শাস্ত্রে, আয়ত্ত করি ক্যালডীয় (Caldean) পুরোহিতদের ধর্মাচার, অর্জন করি নক্ষত্র-অবলোকনকারীদের (star-gazer) গণিত ও জ্যোতির্জ্ঞান। সমকোণী ত্রিভুজ নিয়ে এদেরও ছিল সুতীব্র আকর্ষণ যা আমাকেও তীব্র আলোড়িত করে।

maveric31

আনুমানিক ১৮০০-১৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের একটি ব্যাবিলনীয় শিলাখণ্ড যেখানে কীলক-লিখনের (cuneiform) সাহায্যে ২-এর বর্গমূলের মান ৬০-ভিত্তিক (sexagesimal) পদ্ধতিতে নির্ণয় করা হয়েছে; দশমিক পদ্ধতিতে রূপান্তর করলে বর্গমূলটির মান দশমিকের পর ৫-ঘর পর্যন্ত সঠিক হয়। সৌজন্যে, উইকিপিডয়া

 

এক যুগ কাটাই আমি ব্যাবিলনে। পারস্যরাজ ক্যাম্বাইসিজ ও গ্রিক স্বৈরাচারী (tyrant) পলিক্রেটিজের মৃত্যু হয় ইত্যবসরে, ফলে সামোস ফিরে আসি আমি। তারপর ক্রিট দ্বীপে কিছু দিন আইনশাস্ত্র অধ্যয়ন করে আবার সামোসে ফিরে একটি বিদ্যালয় চালু করার মনঃস্থির করি।

আহ্‌, সামিয়ানবাসীরা ছিল খুব ব্যস্ত, বিদ্যাশিক্ষার মতো অগুরুত্বপূর্ণ কাজে তাদের সময় ছিল অপ্রতুল। সামগ্রিক বিবেচনা করে চলে আসি ক্রোটন, এখানেই আদিষ্ট আমি, আর সব দার্শনিকের মতো, যারা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন দূরদেশে। তবে সামোসে পেয়েছি আমি নক্ষত্র এক, তোমাদেরই একজন সে, তোমাদের মতোই আলোকিত, প্রিয় ফিলোক্রেটজ।

“এ-ই হচ্ছে আমার গল্প, হে স্বর্গীয় আলোর দিশারীগণ, হে নির্বাচিত অভিমন্ত্রিতগণ।” পীথাগোরাস শেষ করেন তাঁর কাহিনী, সসম্ভ্রমে সবাই তাকায় ফিলোক্রেটজের দিকে।

সূর্য ডুবে গেছে পশ্চিমাকাশে, ধীরে ধীরে শীতল হয়ে উঠে ভূমধ্যসাগরীয় রাত। “জগতের সবই সংখ্যা, পূর্ণসংখ্যা, যাদের রয়েছে বাস্তব, স্বকীয় অস্তিত্ব।” রহস্যময়ভাবে বলে উঠেন পীথাগোরাস। “সংখ্যা-ই জীবন, সংখ্যা-ই মরণ, সংখ্যা গড়েছে জগত-সংসার। মহাবিশ্বের সবকিছুই পূর্ণসংখ্যায় পরিমাপযোগ্য (commensurable), এমনকি শরীর বলো, আত্মা বলো, ন্যায়বিচার বলো, সবই সংখ্যা।

যেকোনো দুটি সংখ্যাকে তোমরা সর্বদা সুবিধামতো তৃতীয় একটি ক্ষুদ্রতর সংখ্যার পূর্ণ গুণিতক আকারে প্রকাশ করতে পার। যেমন ধরো, ক্রোটনের বাজার থেকে ৫ ড্রাকমা ২ অবোলি দিয়ে কিছু জলপাই কিনলে তুমি, সম পরিমাণ জলপাই কিনলে সামোস থেকে ৪ ড্রাকমা ৪ অবোলি দিয়ে। তাহলে অবোলি হিসেবে তুমি পেলে দুটি সংখ্যা:
৩২ [অবোলি] ও ২৮ [অবোলি], যেহেতু ১ ড্রাকমা=৬ অবোলি।

এখন তুমি যদি একটি ক্ষুদ্রতর সংখ্যা, ১৬ [অবোলি] নাও, তাহলে মূল সংখ্যা দু’টি কিন্তু পরিপূর্ণ বিভাজ্য তথা পূর্ণ গুণিতক হচ্ছে না, কারণ ৩২÷১৬=পূর্ণ সংখ্যা, কিন্তু ২৮÷১৬=পূর্ণ সংখ্যা নয়।

এবার তুমি আরেকটু ক্ষুদ্রতর সংখ্যা নিয়ে চেষ্টা কর: ধরো, ১৪। না, এবারও দুটি পূর্ণ গুণিতক হচ্ছে না। কিন্তু এভাবে ক্ষুদ্রতর সংখ্যাটি কমিয়ে যেতে থাক, এক সময় দেখবে সেটি ৪ ধরলে দুটি সংখ্যাই পূর্ণ বিভাজ্য হচ্ছে: ৩২÷৪=৮, ২৮÷৪=৭। ৪ হচ্ছে ৩২ ও ২৮-এর সাধারণ পরিমাপক (common measure)।

আবার তুমি যদি ড্রাকমা হিসেব করো, তাহলে সংখ্যা দুটি:
৫ ও ১/৩ [ড্রাকমা] এবং ৪ ও ২/৩ [ড্রাকমা]।

এখন তুমি যদি ক্ষুদ্রতর সংখ্যাটি নাও ১/৩, তাহলে আগের মতো ভাগফল হিসেবে পাচ্ছ দুটি পূর্ণ সংখ্যা:
(৫ ও ১/৩)÷১/৩=১৫ ও ১=১৬
(৪ ও ২/৩)÷১/৩=১২ ও ২=১৪

জ্যামিতিকভাবে বললে, ৩২ ও ২৮ যদি দুটি রেখাংশ হয়, তাহলে ৪ মাপের রেখাংশটি তাদের সাধারণ পরিমাপক। এভাবে ২, ১, ১/২, ১/৪… প্রভৃতিও তাদের সাধারণ পরিমাপক হবে।

আবার ৫ ও ১/৩ এবং ৪ ও ২/৩ দুটি রেখাংশ হলে, তাদের সাধারণ পরিমাপক হবে ১/৩, ১/৬, ১/৯…এসব মানের রেখাংশ।

maveric41

এভাবে ক্ষুদ্রতর সংখ্যাটি যত ক্ষুদ্র নেবে, এক সময় না এক সময় সেটি দিয়ে মূল সংখ্যাদ্বয়কে ভাগকরলে ভাগফল হিসেবে পূর্ণ সংখ্য পাবেই— মহাবিশ্বের সবকিছুই পূর্ণ সংখ্যায় পরিমাপযোগ্য।

“না, এ সত্য নয়, জগতের সবকিছুই এভাবে পূর্ণ সংখ্যায় প্রকাশযোগ্য নয়। অনেক সংখ্যাযুগল আছে দুনিয়ায় যাদের এরূপ তৃতীয় কোনো সাধারণ পরিমাপক পাওয়া যাবে না, তা যত চেষ্টাই করাই হোক, আর পরিমাপকটি যত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রই নেয়া হোক না কেন।

আতঙ্কে শিউরে উঠল ভ্রাতৃগোষ্ঠির সদস্যগণ। প্রখর রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে ভয়ানক বজ্রপাতেও এতটা চমকে উঠত না তারা। গুরুর সামনে উচ্চকণ্ঠ হয় না তারা, তাঁর শিক্ষাকে অস্বীকার করা তাদের ভয়ানক দুঃস্বপ্নেরও অতীত; আর এ তো স্পষ্ট বিদ্রোহ, ভ্রাতৃগোষ্ঠির বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত, তাদের সামগ্রিক জীবনাচারণকে অস্বীকার। কে সে দুরাত্মা, পাপিষ্ঠ! আক্রোশে ফেটে পড়তে উন্মুখ ভ্রাতৃগোষ্ঠির সদস্যগণ।

“কে, কে বলেছে এ কথা?” কঠোর থমথমে মুখে প্রশ্ন করেন পীথাগোরাস।
“আমি, হিপ্যাসাস।” মেটাপানটামের (Metapontum) যুবকটি বলে। গত কয়েক দিন অস্থির সময় কেটেছে। আবিষ্কারটির ভয়ঙ্করতায় প্রথমে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল সে, কেঁপে উঠেছিল তার অন্তরাত্মা। তারপরও নানা ভাবে পরীক্ষা করে দেখেছে সে—না, সে-ই ঠিক, পীথাগোরাসের সংখ্যাই জগতের সব সংখ্যা নয়। শেষ পর্যন্ত সহ্য করতে না পেরে উচ্চারণ করেই ফেলেছে সত্যটির কথা।
“তুমি জান কী উচ্চারণ করেছে তুমি? এর কী প্রমাণ আছে তোমার কাছে? প্রমাণ করতে না পারলে তার পরিণতি সম্পর্কে ধারণা আছে?” পীথাগোরাস দৃঢ়কণ্ঠে বলেন।
“হ্যাঁ, প্রমাণ আমি করতে পারব। আপনার সমকোণী ত্রিভুজেই লুকিয়ে আছে তা।” ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে হিপ্যাসাসের।
“উঠে এসো এখানে, প্রমাণ কর।”

ভীড় সরিয়ে সেমিসার্কেলে উঠে হিপ্যাসাস। নানা রঙের বালি ও নূড়িপাথর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একজন সহকারী। মাটিতে একটি বর্গক্ষেত্র আঁকে হিপ্যাসাস, তারপর নীল বালি ছিটিয়ে রঙিন করে তার বাহুগুলো, আর একটি সবুজ কর্ণ তৈরি করে।
“আপনার কথামতো বাহু-রেখাংশ AB এবং কর্ণ-রেখাংশ AC পরস্পর পরিমাপযোগ্য (commensurable), অর্থাৎ তৃতীয় আরেকটি ক্ষুদ্রতর রেখাংশ তাদের উভয়কে পূর্ণ সংখ্যায় ভাগ করতে পারবে, তাই না?” প্রশ্ন করে হিপ্যাসাস।

maveric51

“হ্যাঁ, তাই।” ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করে বলেন পীথাগোরাস, স্পষ্টতই এ ধরণের আচরণ, বিশেষ করে শিষ্যদের কাছ থেকে, একেবারে অকল্পনীয়।
“ধরে নেই, তৃতীয় সেই ক্ষুদ্রতর রেখাংশটির মান m। অতএব, AB ও AC উভয়ে m-এর সাপেক্ষে পরিমেয়, যেখানে m হতে পারে অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি সংখ্যা। বোঝার সুবিধার্থে ধরে নেই, AC=1000m, AB=707m, যদিও পরে আমরা দেখব আমার পদ্ধতিতে 1000 বা 707-এর কোনো ভূমিকা নেই।”
বর্গের কর্ণ যদি ১০ হস্ত হয়, বাহু তার মোটামুটি ৭ হস্ত; ১০০০ হলে মোটামুটি ৭০০, মনে মনে হিসেব করেন পীথাগোরাস। “ঠিক আছে।” বলেন তিনি।

“এবার কর্ণ AC থেকে AB-এর সমান করে AB1 অংশ কেটে নেই। CB1 কে বাহু ধরে আরেকটি বর্গ আঁকি।” বর্গক্ষেত্রটিকে হিপ্যাসাস এবার লালচে বালি দিয়ে স্পষ্ট করেন। পিনপতন নীরবতা সেমিসার্কেলে, কী একটা আঁচ করার চেষ্টা করছেন পীথাগোরাস, কপালে বয়সরেখাগুলোতে ভাঁজ পড়তে শুরু করছে।

maveric61

“এখন ছোট বর্গের বাহু, CB1=1000m-707m=293m (=EB1)।
ত্রিভুজ ABE এবং ত্রিভুজ AB1E সর্বসম, কারণ এরা সমকোণী ত্রিভুজ যেখানে দুটি করে বাহু সমান: AB=AB1, AE সাধারণ বাহু।
ফলে EB1=EB=293m, এবং
ছোট বর্গের কর্ণ, CE=707m-293m=414m।
অতএব আমরা পাচ্ছি, ছোট বর্গের বাহু ও তার কর্ণ পরস্পর m-এর সাপেক্ষে পরিমাপযোগ্য।” হিপ্যাসাস একটি বিরতি নেন।

মৃদু গুঞ্জন উঠে সেমিসার্কেলের চারপাশে, এ-তো ঠিকই আছে, সমস্যা কোথায়! হিপ্যাসাস আবার তার চিত্রে মনোযোগ দেয়, CE রেখাংশ থেকে CB1 এর সমান করে CB2 অংশ কেটে নিয়ে আগের মতো ক্ষুদ্রতর একটি বর্গক্ষেত্র অঙ্কন করে, এবারেরটি বেগুনি বর্ণের।

maveric71

“আগের মতোই আমরা বলতে পারি, বেগুনি বর্গের বাহু এবং তার কর্ণও m-এর সাপেক্ষে পরিমাপযোগ্য, তা m-এর যত গুণিতকই হোক না কেন? তবে আগের বর্গদুটোর চেয়ে এখানে গুণিতকের মান কম হবে, তাই না?” হিপ্যাসাস প্রশ্ন করে।
“হ্যাঁ।” পীথাগোরাস সায় দেন, স্বর তার ক্ষীণ, যুক্তিশাস্ত্রের কোন শাখা দিয়ে হিপ্যাসাস অগ্রসর হচ্ছে, তা ধরতে পেরেছেন তিনি।
“এভাবে m-এর সাপেক্ষে কর্ণ ও বাহুতে গুণিতকের মান কমতে থাকবে। আমি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর বর্গ এঁকে যেতে থাকব, এক সময় এমন এক বর্গ পাব যার বাহু ও কর্ণ m-রেখাংশটির চেয়েও ছোট হয়ে যাবে, ফলে বাহু ও কর্ণ m-এর সাপেক্ষে আর পরিমাপযোগ্য হবে না।”

খানিক থেমে আবার বলে হিপ্যাসাস, “এখন কথা হলো m কত ছোট হতে পারে। আমি সুবিধার জন্য m-কে এমন ধরেছি যে প্রথম বর্গের কর্ণ 1000m ও বাহু 707m হয়। কিন্তু m যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন, তা নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের হবে, কিন্তু আমি এভাবে অসীম সংখ্যক ক্ষুদ্রতর বর্গ আঁকতে পারব, যখন বর্গের বাহু নির্দিষ্ট mটি থেকে এক সময় ছোট হবে।”

“অতএব, যুক্তিশাস্ত্রের রিডাকশিও এড অ্যাবসার্ডাম (reductio ad absurdum) এর ব্যাতিরেকী প্রমাণের (proof by contradiction) মাধ্যমে আমি প্রমাণ করলাম, এক সময় এমন বর্গ আঁকাও সম্ভব যার বাহু ও কর্ণ কোনোভাবেই সাধারণ কোনো পরিমাপকের সাপেক্ষে পরিমেয় নয়! কিন্তু এ তো স্ববিরোধী কথা, কারণ সকল বর্গেরই কর্ণ ও বাহু একই আনুপাতিক সম্পর্কে থাকার কথা।
তার মানে বর্গের বাহু ও কর্ণ আসলেই কখনো পরস্পর পরিমেয় নয়—বাহু পূর্ণ সংখ্যায় পরিমেয় হলে কর্ণ পরিমেয় হবে না, আবার কর্ণ পরিমেয় হলে বাহু হবে না। বর্গের বাহু যদি ১ হয়, তার কর্ণ হয় ২-এর বর্গমূল, এবং ১ যেহেতু পরিমেয়, ২-এর বর্গমূল কখনো চূড়ান্ত পরিমেয় নয়। একে দুটি পূর্ণ সংখ্যার কোনো অনুপাতে প্রকাশ করা যায় না। এটি একেবারেই নতুন ধরণের সংখ্যা, মহান পীথাগোরাস! ”

গভীর নিঃস্তব্ধতা নেমে আসে সেমিসার্কেলে। আইওনিয়ান সাগর থেকে পাক খেতে খেতে সাদা কুয়াশা ছড়িয়ে পরে ভুখণ্ডে, শীতলতর হয় ভূমধ্যসাগরীয় রাত। হিপ্যাসাসের যুক্তি বুঝতে পেরেছেন তিনি, কিন্তু এখনই সামলে নেয়া প্রয়োজন ব্যাপারটি, নয়তো ভ্রাতৃগোষ্ঠির ভাঙন ঠেকাতে পারবে না কেউ!
“তুমি অশুভ অযৌক্তিক (irrational) এক সংখ্যার কথা বললে, হিপ্যাসাস। আমি আরো পরীক্ষা করে দেখব তোমার প্রমাণ, তবে উদ্ধত, অমার্জিত আচরণের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে তোমাকে। আগামীকাল প্রত্যূষেই জাহাজে করে ক্রোটন ত্যাগ করবে তুমি, আমার নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত মেটাপানটাম আসার চেষ্টা করবে না এবং কোথাও প্রকাশও করবে না অশুভ সংখ্যাটির কথা।” সভা ত্যাগ করেন পীথাগোরাস।

“এ-ই হচ্ছে হিপ্যাসাসের গল্প, ভয়ঙ্কর অমূলদ সংখ্যার জন্মের গল্প।” বিবর্ণ পোশাক পরিহিত মানুষটি, চোখে তার অপার্থিব আনন্দ-আভা, চারপাশে মানুষের ভীড়, বলতে লাগল। দীনহীন এক চারণকবি সে—পথে-প্রান্তরে বর্ণনা করে গণিতের উপাখ্যান, গণিতই মহান গীতিকবিতা তার কাছে, আনন্দ-বেদনা হাসি-কান্নার গৌরবগাঁথা।
“সহজ-সরল ভাষায় নিজের মতো করে এ উপাখ্যান বর্ণনা করার চেষ্টা করেছি; এতে আছে ইতিহাস, আছে কিংবদন্তি, পুরাকালের পরম কথা, যার সত্য-মিথ্যা আজ হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। মানুষ হিসেবে আমারও রয়েছে সীমাবদ্ধতা, ভুল-ত্রুটি নিজ গুণে মার্জনা করবেন।” দু’হাত জোড় করে বুকের কাছে রাখে সে।
“হিপ্যাসাসের শেষ পর্যন্ত কী হলো!” উৎসুক জনতা জানতে চায়।
“গুরুর আদেশে পরদিনই সমুদ্রযাত্রা করে সে। তারপর হঠাৎই হারিয়ে যায় ভূমধ্যসাগরের বুকে, কেউ তাকে আর দেখেনি কোনো দিন! শান্ত মাছরাঙা দিন [halcyon days] ছিল সেদিন, কিন্তু কেউ বলে ঝড়ে ভেসে গেছে সে, কেউ বলে ভ্রাতৃগোষ্ঠির সদস্যরা খুন করে লাশ তার ফেলে দিয়েছে সাগরে।”

“শান্তি পাক হিপ্যাসাসের আত্মা, সুখে থাকুক জগতের সব মানুষ।” মাটি থেকে কাপড়ের ঝোলাটি তুলে নেয় চারণকবি, জনপদটি পেছনে ফেলে দিগন্তজোড়া সবুজ মাঠে নেমে পড়ে সে, এগিয়ে যেতে থাকে নতুন আরেক জনপথের সন্ধানে, যারা গণিতের প্রতি ভালোবাসা মমতায় তাকে থামিয়ে দেবে চলার পথে, গভীর আগ্রহে শুনতে চাইবে প্রাচীন মানুষদের কথা— জ্ঞানের মধ্যেই যারা খুঁজে পেয়েছেন জীবনের মহত্তম অর্থ, পরিশুদ্ধতম আনন্দ।