Categories
অনলাইন প্রকাশনা আনিসুল হক খেলাধুলা জীবনী ও স্মৃতিকথা বিনোদন সৃজনশীল প্রকাশনা

ক-য়ে ক্রিকেট খ-য়ে খেলা

---আনিসুল হক

 

স্ত্রী সন্তানসম্ভবা। হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। স্বামী আছেন আরেক শহরে। তিনি হাসপাতালে ফোন করলেন। ‘আমি ৭ নম্বর কেবিনের পেসেন্টের হাজব্যান্ড। কী অবস্থা বলেন তো এখন?’

যিনি ফোন ধরেছেন তিনি তখন বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলা দেখছেন টেলিভিশনে। শুধু তিনি একা দেখছেন তা-ই নয়, হাসপাতালের আরও অনেক দর্শনার্থী, কর্মচারীও ভিড় করে টেলিভিশন দেখছেন। তাই তিনি অবস্থার বর্ণনা দিলেন, ‘খুব ভালো অবস্থা। আমরা দুজনকে আউট করেছি। এরই মধ্যে একজন ডাক। লাঞ্চের আগেই আরেকজনকে আউট করা যাবে, চিন্তা করবেন না।’

স্বামী বেচারা ডাকের মানে যদি হাঁস বুঝে থাকেন, তাহলে তাঁর জ্ঞান হারানো ছাড়া আর কী-ই বা করার থাকবে?

এবার শুনুন একটা সত্যিকারের হাসপাতালের গল্প। বাংলাদেশ-ভারত খেলা হচ্ছে। ঢাকার একটা বড় বেসরকারি হাসপাতালের লবিতে বড় একটা টেলিভিশন স্থাপন করা হয়েছে। রাত বাড়ছে। এই লবিতে বসে যাঁরা খেলা দেখছেন তাঁরা সবাই গুরুতর রোগীদের আত্মীয়স্বজন। কারও বাবাকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছে, কারও ছেলের অ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশন হয়েছে, কারও বা স্বামীর ক্যানসার। এঁদের সবারই মন খারাপ করার জন্য বাস্তব পরিস্থিতি আর কারণ রয়েছে। কিন্তু সেই বাস্তবতা ভুলে তাঁরা হাততালি দিয়ে উঠছেন। একটু আগেও তাঁদের মন বড়ো খারাপ ছিল। ভারত ৩৭০ করেছে। রানটা ডিঙোনো প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ব্যাট করতে নেমে ইমরুল কায়েস দারুণ পেটাচ্ছেন। রানের গড় খুব ভালো। একটা করে চার হচ্ছে আর তাঁরা সোল্লাসে চিৎকার করে উঠছেন। একটু পরে ইমরুল কায়েস আউট হয়ে গেলেন। খেলার গতি থিতিয়ে এল। সাকিব আল হাসান আউট হওয়ার পরে বোঝা গেল, আর আশা নেই। এই দর্শকদের মধ্যে নেমে এল চরম হতাশা। ‘আমরা আপনার বাবার ভেন্টিলেটর খুলে নিতে যাচ্ছি,’ ডাক্তার বললেন এক দর্শনার্থী তরুণকে। বাবার যে বাঁচার আশা আর নেই, ছেলে সেটা আগে থেকেই জানে। নেই, তবুও তো এখনো আছেন। একটু পরে বাবা থাকবেন না। এরপরে বলতে হবে, ছিলেন। বাবা অতীতকাল হয়ে যাবেন। ‘ভেন্টিলেটর খুলে নিতে যাচ্ছি’—এ কথা শোনার পরও তরুণটির আফসোস তার বাবার জন্য নয়, বাংলাদেশের আরেকটা খেলোয়াড়ের আউট হওয়া নিয়ে। ইস, নাইম যদি থাকত! ও তো ছক্কা মারতে জানে। ওর নামই না ছক্কা-নাইম!

সত্যিকারের এই গল্প শুনে আমার নিজের চোখটাও ছলছল করে ওঠে। এটা কি ক্রিকেটের জন্য আমাদের ভালোবাসা, নাকি দেশের জন্য?

কেমন অদ্ভুত না ব্যাপারটা! ক্রিকেট তো একটা খেলাই। খেলায় জয়-পরাজয় থাকবে। সেটা বড় নয়, আসল লক্ষ্য হলো আনন্দ। কিন্তু সেই খেলা আমাদের কীভাবে এ রকম ঘোরতর নিমজ্জনের মধ্যে নিয়ে যায়! আপন-পর ভুলিয়ে দেয়। প্রিয়জনের মৃত্যুর ব্যথা ভুলিয়ে দেয় প্রিয় দলের সাফল্য বা ব্যর্থতা। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল না হয় নিজের দেশের দল, আমাদের বহু ব্যর্থতার দেশে একটুখানি সাফল্যের আশ্বাস, জীবনের নানা মাঠে মার খেতে খেতে একটুখানি বিজয়ের সম্ভাবনা, কিন্তু বিশ্বকাপ ফুটবলে যে আমরা মেতে উঠি ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনাকে নিয়ে, প্রিয় দল হেরে গেলে এই দেশে অন্তত চার-পাঁচজন মারা যান হূদ্যন্ত্র বন্ধ হয়ে, তার কী মানে?

মনটা একটু আর্দ্র হয়ে উঠল কি? আচ্ছা আচ্ছা, এবার তাহলে একটা কৌতুক। ২০০৭ সাল। বাংলাদেশের সঙ্গে হেরে গেছে শিরোপা-প্রত্যাশী ভারত। তারপর শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে বিশ্বকাপ থেকেই। ধোনি আর বাইরে বেরোতে পারছেন না। তিনি একটা পারলারে গিয়ে মাথায় লম্বা চুল লাগালেন। কপালে টিপ, ঠোঁটে রঞ্জিনী বুলিয়ে, ওড়না দিয়ে মাথা ঢেকে মেয়ে সেজে তিনি উঠেছেন ট্রেনে। এ সময় তাঁর পাশে আরেকজন তরুণী এসে বসল। সে তাঁকে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি ধোনি?’ ধোনি আঁতকে উঠলেন, ‘কী করে টের পেলেন?’

‘আরে, টের পাব না? আমি তো শেবাগ।’

ক্রিকেট নিয়ে বিখ্যাত সাহিত্যিকেরা কী কী লিখেছেন? এ কথা বললে আমার বন্ধু ক্রীড়ালেখক উৎপল শুভ্র নিশ্চয়ই আমাকে মারতে আসবেন। বলবেন, ক্রিকেট নিজেই সাহিত্য, সাহিত্যিকদের লেখার অপেক্ষায় ক্রিকেট বসে নেই! কথা সত্য, ক্রিকেট নিয়ে লেখা হয়েছে লাখ লাখ পাতা, সেসব ক্রিকেট-সাহিত্য বলেই গণ্য। কাজেই ক্রিকেট-লেখকেরা নিজেরাই সাহিত্যিক। কথাটা যে সত্য, তা তো শুভ্রর নিজের লেখা পড়লেই বোঝা যায়। রবীন্দ্রনাথ ক্রিকেট নিয়ে কি কিছু লিখেছিলেন? শুভ্র বলেছেন, বল নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কিছু উক্তি পাওয়া যায়, যেমন, ‘বল দাও মোরে বল দাও।’ কিন্তু সেটা ফুটবল না ক্রিকেট নিয়ে সে বিষয়ে পণ্ডিতেরা এখনো স্থিরমত হতে পারেননি। কিন্তু বাঙালির জীবনে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কি কিছু কল্পনা করা যায়? ২০১১ সালের বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত দিয়ে। আমরা প্রাণভরে গেয়েছি, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’ ফলে এখানেও রবীন্দ্রনাথ। তবে বাংলা ক্রিকেট-সাহিত্য কিংবা ক্রিকেট-সাংবাদিকতায় রবীন্দ্রনাথের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে একটা কাহিনি অন্তত পাওয়া যাচ্ছে ইন্টারনেটে। বরিয়া মজুমদার নামে একজন লিখেছেন আনন্দবাজার পত্রিকায় ক্রিকেট-সাংবাদিকতা শুরুর দিনগুলোর কথা। বাংলা ক্রিকেট-সাংবাদিকতার পথিকৃৎ ব্রজরঞ্জন রায় আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকদের রাজি করালেন ক্রিকেটের জন্য স্থান বরাদ্দ করতে। ব্রজরঞ্জন লিখবেন বিনিপয়সায়, বলাইবাহুল্য। পত্রিকার উদ্যোক্তারা রাজি হলেন। কিন্তু ব্রজরঞ্জন পড়লেন মুশকিলে। এই ক্রিকেটীয় পরিভাষাগুলোর তর্জমা কী হবে? উপায়ান্তর না দেখে তিনি দেখা করতে গেলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথ নাকি তাঁকে প্রচণ্ড উৎসাহ দিয়েছিলেন, অভয় দিয়েছিলেন। ‘তুমি বাংলা করতে আরম্ভ করে দাও, পরিভাষা আবিষ্কার করতে থাকো, আজকে তুমি যা লিখতে শুরু করবে, একদিন তা-ই প্রমিত বলে চালু হয়ে যাবে।’ রবীন্দ্রনাথ এই কনসালটেন্সির জন্য কোনো পয়সা নেননি, বরিয়া মজুমদার আমাদের জানাচ্ছেন। রবীন্দ্রনাথের এই আশ্বাসের পরও যে কেন ব্রজরঞ্জন আমাদের এলবিডব্লিউর একটা বাংলা প্রতিশব্দ উপহার দিলেন না! হয়তো সেটা হতে পারত ‘উপূপা’ (উইকেটের পূর্বেই পা)। কট বিহাইন্ডের বাংলা হতে পারত ‘পাছে ধরা’ বা ‘পিছে ধরা’। স্লিপের বাংলা কি হতে পারত পিচ্ছিল বা পিছলা? কিন্তু তা হয়নি, অগত্যা আমাদের ইংরেজি দিয়েই চালাতে হচ্ছে।

বাংলা ভাষার হাল জমানার লেখক-কবিরা ক্রিকেট নিয়ে প্রচুর লিখছেন। সম্ভবত লিখতে বাধ্য হচ্ছেন। শামসুর রাহমান ক্রিকেটানুরাগী ছিলেন, নির্মলেন্দু গুণ তো এখন প্রায় পেশাদার ক্রিকেট (ও ফুটবল) লেখক। ওই বাংলায় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় প্রমুখের ক্রিকেট-লেখার খ্যাতি আছে।

অন্তত একজন নোবেল বিজয়ী লেখকের ক্রিকেটপ্রীতি বহুল প্রচারিত। তিনি হ্যারল্ড পিন্টার (১৯৩০-২০০৮)। নাট্যকার, চিত্রনাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা, কবি। ব্রিটিশ নাটকের সবচেয়ে অগ্রগণ্য প্রতিনিধি হিসেবে ২০০৫ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনি ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেট খেলেছেন, গেইটি ক্রিকেট ক্লাবের সভাপতি ছিলেন, ছিলেন ইয়র্কশায়ার ক্রিকেট ক্লাবের আজীবন সমর্থক। তিনি বলেছিলেন, ‘ক্রিকেট আমার জীবনের প্রধান অবসেশনগুলোর একটা। আমি সারাক্ষণই ক্রিকেট খেলি, দেখি, পড়ি।’ ক্রিকেট নিয়ে তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান উক্তিটা হলো, ‘আমি এ রকম ভাবতে চাই যে ঈশ্বর এই পৃথিবীতে যা কিছু সৃজন করেছেন, তার মধ্যে সবচেয়ে মহান সৃষ্টি হলো ক্রিকেট। এটা সেক্সের চেয়ে মহত্তর, যদিও সেক্স জিনিসটাও কম ভালো নয়।’ কথাটা ভাবার মতো। একই কথা আমিও বলতে পারতাম, কিন্তু সেটা ক্রিকেট নিয়ে নয়, ফুটবল নিয়ে। ফুটবলের সঙ্গে ওই ব্যাপারটার বেশি মিল, কিন্তু ক্রিকেটের সঙ্গে যদি তাকে তুলনা করতে হয়, তাহলে বলতে হয়, তাতে কেবল শরীরী আশ্লেষ জড়িত নয়, আছে হূদয়পুরের জটিলতাও, ফুটবল হয়তো নিছকই কামনার ব্যাপার, ক্রিকেট হয়তো প্রেমপূর্ণ কামনা। নাটকের লোক পিন্টার বলেছেন, ‘ক্রিকেট আর নাটকের মধ্যে অনেক মিল। যখন কেউ স্লিপে একটা ক্যাচ মিস করে, যখন আম্পায়ার একটা এলবিডব্লিউর আবেদন নাকচ করে দেন, তখন যে উত্তেজনাটা তৈরি হয় সেটা ঠিক যেন মঞ্চনাটকেরই উত্তেজনা।’ পিন্টারের কাছে দুই প্লেই এক, খেলা অর্থে প্লে আর নাটক অর্থে প্লে। তাই তো, ব্যাপারটা তো আগে খেয়াল করিনি। আমিও তো তাহলে খেলোয়াড়, কারণ আমিও তো প্লে লিখেছি। সেটা ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু ছোটবেলায় ক্রিকেট খেলিনি। টেনিস বল দিয়ে ছয় চারা বা আমরা বলতাম কিংকং, সেটা খেলেছি প্রচুর। আর খেলতাম ফুটবল। এর কারণটা অর্থনৈতিক। ৩৫ টাকা দিয়ে একটা ৩ নম্বর ফুটবলই আমাদের পাড়ার ছেলেদের পক্ষে কেনা বড় কঠিন ছিল। ফুটবল তো জাম্বুরা দিয়েও খেলা যায়, কচুরিপানার শুকনো বৃন্ত দিয়ে পোঁটলা বানালেও খুব ভালো ফুটবল হতো আমাদের সময়। কিন্তু ক্রিকেট খেলতে আয়োজনটা করতে হতো বেশি। কাঠের তক্তা কাটো, উইকেট বানাও, পিচ বানাও। না, আমরা ক্রিকেট খেলিনি তেমন। তখন জানতাম, রাজার খেলা ক্রিকেট, খেলার রাজা ক্রিকেট। আমাদের ছোটবেলার খেলার মাঠের সঙ্গীসাথিদের কেউই তো রাজার ছেলে ছিল না। সেই ক্রিকেট কি এখন প্রজার খেলা হয়ে উঠেছে? বাংলাদেশে ক্রিকেট বিশ্বকাপ নিয়ে পথে পথে মানুষের হুল্লোড় দেখে ক্রিকইনফো লিখেছে, এটা হলো পিপলস ওয়ার্ল্ড কাপ। মানুষের বিশ্বকাপ। লিখেছে, বাংলাদেশ বিশ্বকাপকে তার আত্মা ফিরিয়ে দিয়েছে। শুনতে ভালোই লাগছে। ক্রিকেট এই উপমহাদেশে এনেছিল ব্রিটিশ প্রভুরা, প্রথমে তারা এটা খেলত একঘেঁয়েমি কাটাতে, তারপর— উত্তর-ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিকরা যেমন বলছেন—তারা খেলত, ন্যাটিভদের আলাদা হিসেবে চিহ্নিত করার সুবিধার জন্যে, তারপর তারা স্থানীয়দেরকেও খেলাটা শেখাতে লাগল, তখন উদ্দেশ্যটা ছিল ‘বাদামি সাহেব’ তৈরি করা। এখন উত্তর-ঔপনিবেশিক কালে, সাহেবদের ‘জেন্টলমেন’স গেম্স’-কে বস্তিতে নামিয়ে এনেছে প্রাক্তন অনেক কলোনি, আর বনেদি ক্রিকেটের বিশ্বকাপকে বাংলাদেশ করে তুলেছে সকলের বিশ্বকাপ, গণমানুষের সার্বজনীন উৎসব। বাংলাদেশের মাধ্যমেই শুরু হোক গণতন্ত্রের পথে ক্রিকেটের যাত্রা, রাজার খেলা হয়ে উঠুক সবার খেলা, সাধারণের, নিম্নবর্গেরও।

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১১