Categories
অনলাইন প্রকাশনা আত্ম উন্নয়ন ইসলামধর্মীয় খ্রীষ্টধর্মীয় গবেষণামূলক প্রকাশনা ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা বৌদ্ধধর্মীয় হিন্দুধর্মীয়

আমাদের ধর্ম ও সৌহার্দতা

— সাকি বিল্লাহ্

 

ইদানিং কালে একটা ব্যাপার লক্ষ্যনীয়, কিছু অতি উচ্চমর্গীয় বা উচ্চবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ বলছে, জীব হত্যা বা ভক্ষণ করা যাবে না, গো হত্যা বন্ধ করতে হবে ইত্যাদি । যারা বলেন তারা জীব হত্যার বিপক্ষে অথবা নিরামিষভোজী বলা যেতে পারে ।

ভাল কথা ।

তবে বিষয়টা নিয়ে বাংলাদেশী বিজ্ঞানী (আমাদের গৌরব) জগদীশ চন্দ্র বসু স্যারের কথা মনে পড়ে গেল । গাছের প্রাণ আছে এবং তারাও মানুষ বা অন্যান্য প্রাণীর মত সকল জৈবিক কাজ করতে পারে এটা তিনি-ই প্রথম প্রমাণ করেছেন । বলা বাহুল্য তিনি একজন হিন্দু (বেদান্ত) ছিলেন ।

 

ডা. জাকির নায়েকের মত তাহলে বলতে হয় গাছের তো প্রাণ আছে তাহলে তাদেরও তো খাওয়া যাবে না । মনুষ্য জাতি তাহলে কি খাবে? বরং জীব হত্যার চাইতে গাছ হত্যা আরো বেশি শাস্তিযোগ্য অপরাধ । জীবের চাইতে গাছ বেশি কস্ট সহ্য করে যেমন, সে কথা বা শব্দ অথবা নড়াচড়া করতে পারে না, ধরুন আপনার দুইজন ভাই আছে, একজনের শারীরিক কোন সমস্যা নাই আর অন্য জনের শরীর পক্ষাঘাতগ্রস্ত বা বিকলাঙ্গ, কথা বলতে পারে না, চলতে পারে না, খাবার দিতে হয় সেলাইনের মাধ্যমে, কানে শোনে না; এই দুই ভাই এর ভিতর যদি সুস্থ ভাইকে কোন খুনী হত্যা করে তাহলে আপনি যতটুকু কষ্ট পাবেন তার চাইতে অসুস্থ বোবা ভাইকে হত্যা করলে অনেক বেশি কষ্ট পাবেন এটাই স্বাভাবিক বরং আদালতে গিয়ে আপনি বিচারকের কাছে বলবেন, আমার অসহায় প্রতিবন্ধী ভাইকে বিনা কারনে হত্যা করা হয়েছে তাই এর দৃস্টান্ত মূলক শাস্তি চাই ।

 

গাছের বেলায়ও তাই, পশু হত্যার চাইতে গাছ হত্যা করা আরো বড় অপরাধ(নিরামিষভোজীদের মতে যেহেতু জীব হত্যা পাপ) । তাহলে জীবন রক্ষার জন্য আমরা জীব হত্যা করবো নাকি গাছ হত্যা করবো সেটা একটা বিবেচ্য বিষয় ।

 

জ্ঞানীরা চুপ থাকে আর মূর্খরা তর্ক করে ।

বাঘ কখনও ঘাস বা লতাপাতা খেয়ে জীবন ধারণ করতে পারবে না, অন্যদিকে হরিণ তৃনভোজী প্রাণী । বাঘকে বেঁচে থাকতে হলে মাংস খেতে হবে আর হরিণ খাবে তৃণজাতীয় উদ্ভিদ এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম । তেলাপোকা সর্বভূক প্রাণী মানে সে সব কিছু খেতে পারে অনেকটা মানুষের মত । যেসকল প্রাণী সব কিছু খেতে পারে তাদের পৃথিবীতে টিকে থাকার সম্ভাবনা বেশি থাকে ।

ছোটবেলায় বই পুস্তকে সবাই পড়েছেন খাদ্য শৃঙ্খল বা খাদ্য চক্র । কে কাকে খাবে সেটা প্রাকৃতিক ভাবে নিয়ন্ত্রিত আরো স্পষ্টভাবে বলতে গেলে স্রস্টার দ্বারা নির্ধারিত ।

 

স্রস্টা যদি বাঘের উপর সুবিচার করে তাহলে হরিণকে জীবন দিয়ে বাঘের ক্ষুধা তথা জীবন বাঁচাতে হবে আর যদি হরিণের উপর দয়া করে তাহলে হরিণের জীবন বাঁচে কিন্তু বাঘের জীবন বিপন্ন হবে । তাই স্রস্টা একটি খাদ্যচক্র তৈরী করে দিয়েছেন আর সে চক্রে মানুষও একটি জীব । সে মাংশ খাবে অথবা গাছ খাবে এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার বা ধর্মীয় ব্যাপার । তবে বিজ্ঞানীদের মতে মানুষের বুদ্ধির বিকাশ হয় আগুনে ঝলসে যাওয়া মাংস খাওয়ার পর থেকে । মাংসে বেশ কিছু ভিটামিন ও অন্যান্য উপকারী উপদান আছে যেগুলো উদ্ভিদ থেকে পাওয়া যায় না, যেমন ভিটামিন বি-১২, ক্রিয়েটিন, কারনোসাইন, ওমেগা-৩( DHA & EPA), বিশেষ কিছু এমাইনো এসিড(প্রোটিন) ইত্যাদি ।

অনেক সময় নিরামিষভোজীদের শরীরে উপরোক্ত খাদ্য উপাদানগুলোর অভাব দেখা দেয় আর তখন তারা স্বরনাপন্ন হয় ডাক্তারের কাছে, ডাক্তার তাদের কৃত্তিম যে ভিটামিন বা খনিজ উপাদানের বড়ি বা ট্যাবলেট দিয়ে থাকে তা আসলে তৈরী হয় এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার গাঁজন প্রক্রিয়ায় আর কিছু আসে মাছ ও পশু থেকে । আর এই ভিটামিন বড়ি গুলো তৈরী করা হয় বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান দ্বারা; যেহেতু আপনার মস্তিষ্ক ও শরীর ঠিক রাখতে হলে এই ভিটামিন গুলো প্রয়োজন, তাই হয় সরাসরি প্রাণীর মাংস খেয়ে বা কৃত্তিম ভিটামিন খেয়ে (যা ব্যাকটেরিয়া ও প্রাণী হতে আসে) আপনাকে সুস্থ থাকতে হবে । যদি কৃত্তিম ভিটামিন বড়ি খান তাহলে ক্যানসার, কিডনির সমস্যা, স্নায়ুবিক দুর্বলতাসহ নানা ধরনের প্রদাহ দেখা দিতে বাধ্য । আবার উভয় ক্ষেত্রেই কিন্তু পশু হত্যা হচ্ছে ।

 

মূল প্রসঙ্গে ফেরা যাক, কে কি খাবে না খাবে এটা যার যার ব্যাক্তিগত বিষয় তবে অন্যেরা কি খাবে না খাবে তা নিয়েও হাস্যকর কাজ বা মন্তব্য করা উচিত নয় ।

 

হাজার বছর ধরে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানদের নিয়ে একসাথে বসবাস করা আমাদের এই বাংলাদেশ আর বাঙ্গালী সংস্কৃতি ।

এখানে কিছু কুচক্রী ধর্মীয় সৌহার্দ নস্ট করার অপচেস্টা করছে, আমাদের উচিত ঐসকল মানুষদের এড়িয়ে চলা । ১৯৪৭ সনে যখন দেশ ভাগ হয় তখন, পাকিস্তানী ও ভারতীয় কিছু স্বার্থাণ্বেষী রাজনীতিবিদ আমাদের দেশটাকে চিরে টুকরো টুকরো করে দিয়েছিল ধর্মীয় দাঙ্গা লাগিয়ে । হাজার হাজার বছরের বাংলাদেশকে, ছিন্নভিন্ন করে দেয়া হল । সেভেন সিস্টার নামে যে অংশগুলো বাংলার সাথে ছিল সেগুলো সমেত যদি দেশ হয় তাহলে তা পাকিস্তান কিংবা ভারতের চাইতে আকারে অনেক বড় হয়ে যায় তাই ব্যাপারটা গান্ধী কিংবা জিন্নাহ কেউই মেনে নিতে পারেনি । শেরে বাংলা অবিভক্ত বাংলাদেশ এর কথা উপস্থাপন করলেও তা ধোপে টেকেনি ।

 

ভারতে কিছুদিন পর পরই হিন্দু মুসলিম দাঙ্গায় নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায় । দুস্ট রাজনীতিবিদদের হিংসাকে চরিতার্থ করতে ধর্মযুদ্ধ একটি হাতিয়ার মাত্র ।

বাংলাদেশে সকল ধর্মের মানুষ একসাথে কোন ধরনের সমস্যা ছাড়াই ভালভাবে থাকছে, চাকুরী করছে, ব্যাবসা করছে এটা কিছু হিংসুকের বিশেষত প্রতিবেশী দেশগুলোর সহ্য হচ্ছে না । আমাদের কিছু দালালদের মাথা কিনে তাদের দিয়ে দেশের মানুষের ভাই ভাই সম্পর্ক নস্ট করার অপচেস্টা চালানো হচ্ছে । সে অপচেস্টাকে কিছুতেই সমর্থন করা যায় না ।

বাংলাদেশের মানুষ শান্তি প্রিয় এবং সকল ধর্মের মানুষ আমরা সবাই বাংলাদেশী এটাই হোক আমাদের প্রথম পরিচয় । আর সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, যার যার ধর্ম তার তার কাছে । নিজের ধর্মকে সবাই বড় মনে করে তাতে দোষের কিছু না কিন্তু অন্যের ধর্মকে ছোট করা ক্ষমাহীন অপরাধ ।

যে অন্যের ধর্মকে শ্রদ্ধা করতে জানে না সে নিজের ধর্মকেও শ্রদ্ধা করতে শেখেনি ।

 

তাই সকল ধর্মের বাঙ্গালীদের বলছি, অন্যের ধর্মকে শ্রদ্ধা করুন তাহলে সে বা তারাও আপনার ধর্মকে শ্রদ্ধা করতে শিখবে আর মনুষ্যরূপী শয়তান হতে সাবধান থাকবেন যারা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে কারণ ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করা হয়েছে প্রায় সকল ধর্মেই । ইসলাম ধর্মেও আছে তোমরা কখনও ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না বা অবিশ্বাসীদের সাথে কুতর্কে লিপ্ত হইও না ।

 

পরিশেষে কোরআ’নের আলোকে ধর্ম ও আমাদের সৌহার্দতা নিয়ে কিছু আয়াত উপস্থাপন করছি যাতে বিষয়টা আরো সুস্পস্ট হয়ঃ

সূরা আল বাক্বারাহ এর ২৫৬ নাম্বার আয়াতে উল্লেখ আছে,

“দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি বা বাধ্য-বাধকতা নেই। নিঃসন্দেহে হেদায়াত গোমরাহী থেকে পৃথক হয়ে গেছে। এখন যারা গোমরাহকারী ‘তাগুত’দেরকে মানবে না এবং আল্লাহ‘তে বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে ধারণ করে নিয়েছে সুদৃঢ় হাতল যা ভাংবার নয় । আর আল্লাহ সবই শুনেন এবং জানেন।” ।

এ ছাড়াও কোরআ’নের বিভিন্ন আয়াতে উল্লেখ আছে,

“আহবান করো সকলকে তোমার বিধাতা প্রতিপালকের পথে- পান্ডিত্যপূর্ণ সুন্দরতম বাগ্মীতার সাথে। আর যুক্তি প্রমাণ দিয়ে আলোচনা করো তাদের সাথে এমনভাবে, যা সর্বোত্তম (এবং সে আহবান হতে হবে এমন হৃদ্যতাপূর্ণ যেন কোন পাষাণ হৃদয়ের কাছেও তা গ্রহণযোগ্য হয়)।” আল কুর’আন (১৬:১২৫)

“…যারা ধর্ম সম্পর্কে নানা মতের সৃষ্টি করেছে ও বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে তাদের কোন কাজের দায়িত্ব তোমার নেই, তাদের বিষয় আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত।…” –আল কোরআন (সুরা আনআমঃ১৫৯)

“…হে কিতাবিগণ! তোমরা তোমাদের ধর্ম নিয়ে অন্যায় ভাবে বাড়াবাড়ি করোনা…” –আল কোরআন (সুরা মায়িদাঃ৭৭)

“…(ধর্ম সম্পর্কে) বিদ্রূপকারীদের বিরুদ্ধে আমিই (আল্লাহ) আপনার জন্য
যথেষ্ট…” –আল কোরআন (সুরা হিজরঃ৯৫)

“…যদি তারা আত্মসমর্পণ (আল্লাহর কাছে) করে তবে নিশ্চয়ই তারা পথ পাবে। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তোমার কাজ তো কেবল প্রচার করা। আল্লাহর দৃষ্টিতে রয়েছে সকল বান্দা।”–আল কোরআন
(সুরা আল ইমরানঃ২০)

“…তারপর ওরা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তোমার কর্তব্য তো শুধুমাত্র স্পষ্ট বাণী পৌঁছে দেয়া…”–আল কোরআন (সুরা নাহলঃ৮২)

“…তুমি মানুষকে হিকমত ও সৎ উপদেশ দিয়ে তোমার প্রতিপালকের (আল্লাহর)পথে ডাক এবং তাদের সাথে ভালভাবে আলোচনা কর। তাঁর (আল্লাহর) পথ ছেড়ে যে বিপথে যায় তার সম্পর্কে আল্লাহ্ই ভাল জানেন, আর যে সৎ পথে আছে তা-ও তিনিই ভাল করে জানেন”
– আল কোরআন (সুরা নাহলঃ১২৫)

“…তোমাদের কাজ তো কেবল প্রচার করা, আর হিসাব-নিকাশ তো আমার কাজ…” –আল কোরআন (সুরা রাদঃ৪০)

“…আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য এবাদতের নিয়ম কানুন নির্ধারিত করে দিয়েছি যা ওরা পালন করে… তুমি ওদেরকে তোমার প্রতিপালকের দিকে ডাক… ওরা যদি তোমার সাথে তর্ক করে তবে বল, ‘তোমরা যা কর সে সম্পর্কে আল্লাহ্ ভাল করেই জানেন। তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করছ আল্লাহ্ কিয়ামতের দিন সে বিষয়ে তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেবেন…” –আল কোরআন (সুরা হজঃ৬৭-৬৯)

 

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, কোরআ’নে কঠোরভাবে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং কাউকে ইসলাম সম্পর্কে বোঝাতে হলে বিনয়ী হতে বলা হয়েছে । যদি কেউ ইসলামকে বিদ্রুপ করে, বিমুখ হয় বা কেউ নাস্তিকতা প্রদর্শন করে তাহলে তার ব্যাপারে আল্লাহ নিজে ব্যাবস্থা নিবেন বলে হুঁশিয়ারী করে দিয়েছেন তথাপি আমাদের ভিতর কিছু অতি উৎসাহী কট্টর পন্থী আছে যারা কোরআ’ন তথা আল্লাহর বানীকে মানতে নারাজ । যদিও আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন অন্য ধর্মের মানুষদের সাথে বিনয়ী হতে তবুও তারা তাদের প্রতি কঠোর ।

পাঠকগণ নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিবেন কোনটা ভাল আর কোনটা খারাপ আমি শুধু সবাইকে স্বরণ করিয়ে দিলাম যে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি কোন সুফল বয়ে আনতে পারে না ।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা খ্রীষ্টধর্মীয় ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা

বড়দিন বা খ্রিষ্টমাস(Merry Christmas)

বড়দিন বা খ্রিষ্টমাস (ইংরেজি: Christmas বা Christmas Day) একটি বাৎসরিক খ্রিষ্টীয় উৎসব। ২৫ ডিসেম্বর তারিখে যিশু খ্রিষ্টের জন্মদিন উপলক্ষ্যে এই উৎসব পালিত হয়।এই দিনটিই যিশুর প্রকৃত জন্মদিন কিনা তা জানা যায় না। আদিযুগীয় খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস অনুসারে, এই তারিখের ঠিক নয় মাস পূর্বে মেরির গর্ভে প্রবেশ করেন যিশু। সম্ভবত, এই হিসাব অনুসারেই ২৫ ডিসেম্বর তারিখটিকে যিশুর জন্মতারিখ ধরা হয়। অন্যমতে একটি ঐতিহাসিক রোমান উৎসব অথবা উত্তর গোলার্ধের দক্ষিণ অয়নান্ত দিবসের অনুষঙ্গেই ২৫ ডিসেম্বর তারিখে যিশুর জন্মজয়ন্তী পালনের প্রথাটির সূত্রপাত হয়।বড়দিন বড়দিনের ছুটির কেন্দ্রীয় দিন এবং খ্রিষ্টধর্মে বারো দিনব্যাপী খ্রিষ্টমাসটাইড অনুষ্ঠানের সূচনাদিবস।

বড়দিন

প্রকৃতিগতভাবে একটি খ্রিষ্টীয় ধর্মানুষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও, একাধিক অ-খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ও মহাসমারোহে বড়দিন উৎসব পালন করে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে উৎসবের আয়োজনে প্রাক-খ্রিষ্টীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ বিষয়ভাবনার সমাবেশও দেখা যায়। উপহার প্রদান, সংগীত, খ্রিষ্টমাস কার্ড বিনিময়, গির্জায় ধর্মোপাসনা, ভোজ, এবং খ্রিষ্টমাস বৃক্ষ, আলোকসজ্জা, মালা, মিসলটো, যিশুর জন্মদৃশ্য, এবং হলি সমন্বিত এক বিশেষ ধরনের সাজসজ্জার প্রদর্শনী আধুনিককালে বড়দিন উৎসব উদযাপনের অঙ্গ। কোনো কোনো দেশে ফাদার খ্রিষ্টমাস (উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও আয়ারল্যান্ডে সান্টাক্লজ) কর্তৃক ছোটোদের জন্য বড়দিনে উপহার আনার উপকথাটি বেশ জনপ্রিয়।

উপহার প্রদানের রীতিটি সহ বড়দিন উৎসবের নানা অনুষঙ্গ খ্রিষ্টান ও অ-খ্রিষ্টানদের অর্থনীতিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই উৎসব উপলক্ষ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয়ের একটি বিশেষ মরসুম চলে। বিগত কয়েকটি শতাব্দীতে বিশ্বে বিভিন্ন অঞ্চলে বড়দিনের অর্থনৈতিক প্রভাবটি ধীরে ধীরে প্রসারিত হতে দেখে গেছে। ভারত ও বাংলাদেশে বড়দিন একটি রাষ্ট্রীয় ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়।

ব্যুৎপত্তিঃ

খ্রিষ্টের নামের আদ্যক্ষর X বা চি; একটি হিব্রু প্রতীকচিহ্নে

ইংরেজি খ্রিষ্টমাস (Christmas) শব্দটি “খ্রিষ্টের মাস (উৎসব)” শব্দবন্ধটির যুগ্ম অর্থ থেকে উৎসারিত। শব্দটির ব্যুৎপত্তি ঘটে মধ্য ইংরেজি Christemasse ও আদি ইংরেজি Cristes mæsse শব্দ থেকে। শেষোক্ত শব্দটির প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায় ১০৩৮ সালের একটি রচনায়। “Cristes” শব্দটি আবার গ্রিক Christos এবং “mæsse” শব্দটি লাতিন missa (পবিত্র উৎসব) শব্দ থেকে উদগত। প্রাচীন গ্রিক ভাষায় Χ (চি) হল Christ বা খ্রিষ্ট শব্দের প্রথম অক্ষর। এই অক্ষরটি লাতিন অক্ষর X-এর সমরূপ। ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে তাই এই অক্ষরটি খ্রিষ্ট শব্দের নামসংক্ষেপ হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু হয়। এই কারণে খ্রিষ্টমাসের নামসংক্ষেপ হিসেবে এক্সমাস কথাটি চালু হয়।

আকাদেমি বিদ্যার্থী বাংলা অভিধানে যিশু খ্রিষ্টের জন্মোৎসব খ্রিষ্টমাস উৎসবটিকে বাংলায় বড়দিন আখ্যা দেওয়ার কারণটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে: “২৩ ডিসেম্বর থেকে দিন ক্রমশ বড়ো এবং রাত ছোটো হতে আরম্ভ করে”।

 

উদযাপনঃ

বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রেই বড়দিন একটি প্রধান উৎসব তথা সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। এমনকি অ-খ্রিষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ কয়েকটি দেশেও মহাসমারোহে বড়দিন উদযাপিত হতে দেখা যায়। কয়েকটি অ-খ্রিষ্টান দেশে পূর্বতন ঔপনিবেশিক শাসনকালে বড়দিন উদযাপনের সূত্রপাত ঘটেছিল। অন্যান্য দেশগুলিতে সংখ্যালঘু খ্রিষ্টান জনসাধারণ অথবা বৈদেশিক সংস্কৃতির প্রভাবে বড়দিন উদযাপন শুরু হয়। তবে চীন (হংকং ও ম্যাকাও বাদে), জাপান, সৌদি আরব, আলজেরিয়া, থাইল্যান্ড, নেপাল, ইরান, তুরস্ক ও উত্তর কোরিয়ার মতো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দেশে বড়দিন সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয় না।

অধিকাংশ দেশে প্রতি বছর বড়দিন পালিত হয় ২৫ ডিসেম্বর তারিখে। তবে রাশিয়া, জর্জিয়া, মিশর, আর্মেনিয়া, ইউক্রেন ও সার্বিয়ার মতো কয়েকটি ইস্টার্ন ন্যাশানাল চার্চ ৭ জানুয়ারি তারিখে বড়দিন পালন করে থাকে। কারণ এই সকল চার্চ ঐতিহ্যশালী জুলিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে থাকে; জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ২৫ ডিসেম্বর প্রামাণ্য জর্জিয়ান ক্যালেন্ডারের ৭ জানুয়ারি তারিখে পড়ে।

সারা বিশ্বে, সাংস্কৃতিক ও জাতীয় ঐতিহ্যগত পার্থক্যের পরিপ্রেক্ষিতে বড়দিন উৎসব উদযাপনের রূপটিও ভিন্ন হয়ে থাকে। জাপান ও কোরিয়ার মতো দেশে খ্রিষ্টানদের সংখ্যা আনুপাতিকভাবে কম হলেও বড়দিন একটি জনপ্রিয় উৎসব। এই সব দেশে উপহার প্রদান, সাজসজ্জা, ও খ্রিষ্টমাস বৃক্ষের মতো বড়দিনের ধর্মনিরপেক্ষ দিকগুলি গৃহীত হয়েছে।

 

যিশুর জন্মোৎসবঃ

শিশু যিশুর বন্দনা (Adorazione del Bambino) (১৪৩৯-৪৩); ফ্লোরেনটাইন চিত্রকর ফ্রা অ্যাঞ্জেলিকো কৃত ম্যুরাল

খ্রিষ্টধর্মে খ্রিষ্টমাস বা বড়দিন হল যিশুর জন্মোৎসব। খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, আদি বাইবেলর ত্রাণকর্তা-সংক্রান্ত একাধিক ভবিষ্যদবাণীতে বলা হয়েছে যে কুমারী মেরির গর্ভে তাঁদের মসিহা বা ত্রাণকর্তার জন্ম হবে। নূতন নিয়ম বা নূতন বাইবেলের মথিলিখিত সুসমাচার (মথি ১: ১৮ – ২: ১২) এবং লূকলিখিত সুসমাচার (লূক ১: ২৬ – ২: ৪০)-এ বর্ণিত যিশুর জন্মকাহিনী খ্রিষ্টমাস উৎসবের মূলভিত্তি। এই উপাখ্যান অনুসারে, স্বামী জোসেফের সাহচর্যে বেথলেহেম শহরে উপস্থিত হয়ে মেরি যিশুর জন্ম দেন। জনপ্রিয় ধারণা অনুযায়ী, একটি আস্তাবলে গবাদি পশু পরিবৃত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন যিশু। যদিও বাইবেলের উপাখ্যানে আস্তাবল বা গবাদি পশুর কোনো উল্লেখই নেই। যদিও লূকলিখিত সুসমাচারে (লূক ২: ৭) একটি যাবপাত্রের উল্লেখ আছে: “আর তিনি আপনার প্রথমজাত পুত্র প্রসব করিলেন, এবং তাঁহাকে কাপড়ে জড়াইয়া যাবপাত্রে শোয়াইয়া রাখিলেন, কারণ পান্থশালায় তাঁহাদের জন্য স্থান ছিল না।” যিশুর জন্ম-সংক্রান্ত প্রথম দিকের চিত্রগুলিতে গবাদি পশু ও যাবপাত্র পরিবৃত একটি গুহায় যিশুর জন্মদৃশ্য দর্শানো হয়েছে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, এটি বেথলেহেমের চার্চ অফ দ্য নেটিভিটির অভ্যন্তরে। এক স্বর্গদূত বেথলেহেমের চারিপার্শ্বস্থ মাঠের মেষপালকদের যিশুর জন্ম সম্বন্ধে অবহিত করেন। এই কারণে তাঁরাই সেই দিব্য শিশুকে প্রথম দর্শন করার সৌভাগ্য অর্জন করেন।

অনেক খ্রিষ্টানই মনে করেন, যিশুর জন্ম আদি বাইবেলের ত্রাণকর্তা-সংক্রান্ত ভবিষ্যদবাণীগুলিকে পূর্ণতা দেয়। মথিলিখিত সুসমাচার অনুসারে, কয়েকজন ম্যাজাই (জ্যোতিষী) স্বর্ণ, গন্ধতৈল ও ধূপ নিয়ে শিশুটিকে দর্শন করতে যান। কথিত আছে, একটি রহস্যময় তারা তাঁদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। সাধারণভাবে বেথলেহেমের তারা নামে পরিচিত এই তারাটি ছিল প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে ইহুদিদের রাজার জন্মবার্তার ঘোষক। ম্যাজাইদের আগমনের স্মরণে পালিত হয় ৬ জানুয়ারির এপিফেনি উৎসব। কোনো কোনো চার্চে এই ৬ জানুয়ারিতেই আনুষ্ঠানিকভাবে বড়দিন উৎসব সমাপ্ত হয়।

খ্রিষ্টানরা নানাভাবে বড়দিন উদযাপন করে থাকে। এগুলির মধ্যে বর্তমানে গির্জার উপাসনায় যোগ দেওয়া সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অন্যতম জনপ্রিয় প্রথা বলে বিবেচিত হয়। এছাড়াও রয়েছে অন্যান্য বিভিন্ন উপাসনা পদ্ধতি ও জনপ্রিয় রীতিনীতি। বড়দিনের পূর্বে যিশুর জন্মোৎসব উপলক্ষ্যে ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চ নেটিভিটি উপবাস পালন করে থাকে; অন্যদিকে পাশ্চাত্য খ্রিষ্টধর্মে অধিকাংশ চার্চে অ্যাডভেন্ট পালন করা হয়। বড়দিনের সর্বশেষ প্রস্তুতিটি নেওয়া হয় খ্রিষ্টমাস পূর্বসন্ধ্যায়।

বড়দিন উৎসব পর্বের অন্যতম অঙ্গ হল গৃহসজ্জা ও উপহার আদানপ্রদান। কোনো কোনো খ্রিষ্টীয় শাখাসম্প্রদায়ে ছোটো ছেলেমেয়েদের দ্বারা খ্রিষ্টের জন্মসংক্রান্ত নাটক অভিনয় এবং ক্যারোল গাওয়ার প্রথা বিদ্যমান। আবার খ্রিষ্টানদের কেউ কেউ তাঁদের গৃহে পুতুল সাজিয়ে খ্রিষ্টের জন্মদৃশ্যের ছোটো প্রদর্শনী করে থাকেন। এই দৃশ্যকে নেটিভিটি দৃশ্য বা ক্রিব বলে। এই ধরনের প্রদর্শনী উৎসবের মুখ্য আকর্ষণ হয়ে ওঠে। কোথাও কোথাও লাইভ নেটিভিটি দৃশ্য ও ট্যাবলো ভাইভ্যান্টও অনুষ্ঠিত হয়; এই জাতীয় অনুষ্ঠানে অভিনেতা ও জন্তুজানোয়ারের সাহায্যে যিশুর জন্মদৃশ্যের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়।

চিত্রশিল্পে যিশুর জন্মদৃশ্য ফুটিয়ে তোলার ঐতিহ্যটি সুদীর্ঘ। এই সকল দৃশ্যে মেরি, জোসেফ, শিশু যিশু, স্বর্গদূত, মেষপালক এবং যিশুর জন্মের পর বেথলেহেমের তারার সাহায্যে পথ চিনে তাঁকে দর্শন করতে আসা বালথাজার, মেলকোয়ার ও ক্যাসপার নামক তিন জ্ঞানী ব্যক্তির চিত্র অঙ্কন করা হয়।

বিভিন্ন সংস্কার

টরেন্টোর খ্রিষ্টমাস প্যারেডে সান্টাক্লজ

যে সকল দেশে খ্রিষ্টান সংস্কার প্রবল, সেখানে দেশজ আঞ্চলিক ও লোকসংস্কৃতির সঙ্গে মিলনের ফলে বড়দিন উদযাপনে নানা বৈচিত্র্য চোখে পড়ে। অনেক খ্রিষ্টানের কাছে ধর্মীয় উপাসনায় অংশ নেওয়া এই উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। উল্লেখ্য, বড়দিন ও ইস্টারের মরসুমেই গির্জায় জনসমাগম হয় সর্বাধিক।

অনেক ক্যাথলিক দেশে খ্রিষ্টমাসের পূর্বদিন ধর্মীয় শোভাযাত্রা বা কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়। অন্যান্য দেশে সান্টাক্লজ ও অন্যান্য মরসুমি চরিত্রদের নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। এই মরসুমের অন্যতম বহুলপ্রচলিত বৈশিষ্ট্য হল পারিবারিক সম্মেলন ও উপহার আদানপ্রদান। অধিকাংশ দেশেই বড়দিন উপলক্ষ্যে উপহার আদানপ্রদান হয়; আবার কোনো কোনো দেশে এই প্রথাটির জন্য বেছে নেওয়া হয় ৬ ডিসেম্বরের সেন্ট নিকোলাস ডে বা ৬ জানুয়ারির এপিফেনির দিনগুলি।

ইংল্যান্ডের খ্রিষ্টমাস পুডিং

অনেক পরিবারেই বড়দিন উপলক্ষ্যে বিশেষ পারিবারিক ভোজসভা আয়োজিত হয়। ভোজসভার খাদ্যতালিকা অবশ্য এক এক দেশে এক এক রকমের হয়। সিসিলি প্রভৃতি কয়েকটি অঞ্চলে খ্রিষ্টমাসের পূর্বসন্ধ্যায় যে ভোজসভা আয়োজিত হয় তাতে পরিবেশিত হয় বারো রকমের মাছ। ইংল্যান্ড ও ইংরেজি সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবান্বিত দেশগুলিতে সাধারণ বড়দিন ভোজসভার পদে দেখা যায় টার্কি (উত্তর আমেরিকা থেকে আনীত), আলু, শাকসবজি, সসেজ ও গ্রেভি; এছাড়াও থাকে খ্রিষ্টমাস পুডিং, মিন্স পাই ও ফ্রুট কেক। পোল্যান্ড, পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য দেশ ও স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলের ভোজে মাছের উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়; তবে এই সব অঞ্চলে ভেড়ার মাংসের মতো অত্যধিক-চর্বিওয়ালা মাংসের ব্যবহারও বাড়ছে। জার্মানি, ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়ায় হাঁস ও শূকরের মাংস বেশ জনপ্রিয়। এছাড়া প্রায় সারা বিশ্বেই গোমাংস, হ্যাম ও মুরগির যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। ফিলিপিনসের ভোজসভার প্রধান খাদ্য হল হ্যাম।

বিশেষ ধরনের টার্ট ও কেকের সঙ্গে সঙ্গে বিশেষ ডেসার্টও তৈরি হয় খ্রিষ্টমাস উপলক্ষ্যে: ফ্রান্সে bûche de Noël বা ইতালিতে panettone। মিষ্টি আর চকোলেট সারা বিশ্বেই জনপ্রিয়। খ্রিষ্টমাসের বিশেষ মিষ্টিগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য জার্মান স্টোলেন, মারজিপান কেক বা ক্যান্ডি এবং জামাইকান রাম ফ্রুট কেক। উত্তর দেশগুলিতে শীতকালে যে অল্প কয়েকটি ফল পাওয়া যায় তার মধ্যে কমলালেবু খ্রিষ্টমাসের বিশেষ খাদ্য হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে পরিচিত।

সাজসজ্জা

বড়দিনের জন্য সুসজ্জিত একটি বাড়ি

বড়দিন উপলক্ষ্যে বিশেষ ধরনের সাজসজ্জার ইতিহাসটি অতি প্রাচীন। প্রাক-খ্রিষ্টীয় যুগে, রোমান সাম্রাজ্যের অধিবাসী শীতকালে চিরহরিৎ বৃক্ষের শাখাপ্রশাখা বাড়ির ভিতরে এনে সাজাত। খ্রিষ্টানরা এই জাতীয় প্রথাগুলিকে তাদের সৃজ্যমান রীতিনীতির মধ্যে স্থান দেয়। পঞ্চদশ শতাব্দীর লন্ডনের একটি লিখিত বর্ণনা থেকে জানা যায়, এই সময়কার প্রথানুসারে খ্রিষ্টমাস উপলক্ষ্যে প্রতিটি বাড়ি ও সকল গ্রামীণ গির্জা “হোম, আইভি ও বে এবং বছরের সেই মরসুমের যা কিছু সবুজ, তাই দিয়েই সুসজ্জিত করে তোলা হত।” প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, হৃদয়াকার আইভিলতার পাতা মর্ত্যে যিশুর আগমনের প্রতীক; হলি প্যাগান (অখ্রিষ্টান পৌত্তলিক) ও ডাইনিদের হাত থেকে রক্ষা করে; এর কাঁটার ক্রুশবিদ্ধকরণের সময় পরিহিত যিশুর কণ্টকমুকুট এবং লাল বেরিগুলি ক্রুশে যিশুর রক্তপাতের প্রতীক।

খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দীতে রোমে নেটিভিটি দৃশ্য প্রচলিত ছিল। ১২২৩ সালে সেন্ট ফ্রান্সিস অফ আসিসি এগুলিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। এরপর শীঘ্রই তা সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। সমগ্র খ্রিষ্টান বিশ্বে স্থানীয় প্রথা ও প্রাপ্ত দ্রব্যাদির অনুষঙ্গে বিভিন্ন ধরনের সাজসজ্জার প্রথা চালু রয়েছে। ১৮৬০-এর দশকে শিশুদের হাতে নির্মিত কাগজের শিকলের অনুপ্রেরণায় প্রথম বাণিজ্যিক খ্রিষ্টমাস সজ্জা প্রদর্শিত হয়।

খ্রিষ্টমাস বৃক্ষ ও চিরহরিৎ শাখাপ্রশাখার ব্যবহার দক্ষিণ অয়নান্তকে ঘিরে প্যাগান প্রথা ও অনুষ্ঠানগুলির খ্রিষ্টীয়করণের ফলস্রুতি; এক ধরনের প্যাগান বৃক্ষপূজা অনুষ্ঠান থেকে এই প্রথাটি গৃহীত হয়েছিল। ইংরেজি ভাষায় “Christmas tree” শব্দটির প্রথম লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায় ১৮৩৫ সালে। শব্দটি গৃহীত হয়েছিল জার্মান ভাষা থেকে। মনে করা হয়, আধুনিক খ্রিষ্টমাস বৃক্ষের প্রথাটির সূচনা ঘটেছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর জার্মানিতে।[২৪] যদিও অনেকের মতে, এই প্রথাটি ষোড়শ শতাব্দীতে মার্টিন লুথার চালু করেছিলেন। প্রথমে তৃতীয় জর্জের স্ত্রী রানি শার্লোট এবং পরে রানি ভিক্টোরিয়ার রাজত্বকালে আরও সফলভাবে প্রিন্স অ্যালবার্ট জার্মানি থেকে ব্রিটেনে এই প্রথাটির আমদানি করেন। ১৮৪১ সাল নাগাদ খ্রিষ্টমাস বৃক্ষের প্রথাটি সমগ্র ব্রিটেনে যথেষ্ট প্রসার লাভ করেছিল। ১৮৭০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণও খ্রিষ্টমাস বৃক্ষের প্রথাটি গ্রহণ করে। খ্রিষ্টমাস বৃক্ষ আলোকসজ্জা ও গহনার দ্বারা সুসজ্জিত করা হয়।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে পোইনসেটিয়া নামে মেক্সিকোর একটি দেশজ বৃক্ষ খ্রিষ্টমাস প্রথার সঙ্গে যুক্ত হয়। অন্যান্য জনপ্রিয় হলিডে গাছ হল হলি, মিসলটো, লাল অ্যামারিলিস, ও খ্রিষ্টমাস ক্যাকটাস। খ্রিষ্টমাস বৃক্ষের সঙ্গে মালা ও চিরসবুজ পত্রসজ্জায় সজ্জিত এই সব গাছ দিয়েও বাড়ির অভ্যন্তর সাজানো হয়ে থাকে।

ইউরোপিয়ান হলি, প্রথাগত খ্রিষ্টমাস সজ্জা

অস্ট্রেলিয়া, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং ইউরোপে বাড়ির বাইরে আলোকসজ্জা, এবং কখনও কখনও আলোকিত স্লেজ, স্নোম্যান, ও অন্যান্য খ্রিষ্টমাস চরিত্রের পুতুল সাজানোর প্রথা রয়েছে। পুরসভাগুলিও এই সাজসজ্জার পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে। রাস্তার বাতিস্তম্ভে খ্রিষ্টমাস ব্যানার লাগানো হয় এবং টাউন স্কোয়ারে স্থাপন করা হয় খ্রিষ্টমাস বৃক্ষ।

পাশ্চাত্য বিশ্বে ধর্মনিরপেক্ষ বা ধর্মীয় খ্রিষ্টমাস মোটিফ সহ উজ্জ্বল-রঙা রোলকরা কাগজ উৎপাদিত হয় উপহারের মোড়ক হিসেবে ব্যবহারের জন্য। এই মরসুমে অনেক গৃহে খ্রিষ্টমাস গ্রামের দৃশ্যরচনার প্রথাও লক্ষিত হয়। অন্যান্য প্রথাগত সাজসজ্জার অঙ্গ হল ঘণ্টা, মোমবাতি, ক্যান্ডি ক্যান, মোজা, রিদ ও স্বর্গদূতগণ।

অনেক দেশে নেটিভিটি দৃশ্যের উপস্থাপনা বেশ জনপ্রিয়। এই সব দেশে জনসাধারণকে সম্পূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত নেটিভিটি দৃশ্য সৃজনে উৎসাহিত করা হয়। কোনো কোনো পরিবারে যেসকল দ্রব্য বা পুতুল দিয়ে এই দৃশ্য রচিত হয়, সেগুলিকে উত্তরাধিকার সূত্রে মূল্যবান পারিবারিক সম্পত্তি মনে করা হয়। ৫ জানুয়ারির পূর্বসন্ধ্যায় দ্বাদশ রজনীতে খ্রিষ্টমাস সাজসজ্জা খুলে নেওয়া হয়। খ্রিষ্টমাসের প্রথাগত রংগুলি হল পাইন সবুজ (চিরহরিৎ), তুষার ধবল ও হৃদয় রক্তবর্ণ।

 

খ্রিষ্টমাস সঙ্গীত কনসার্টের এক ট্রাম্পেটার

 

নিকিফোরোস নিট্রাস অঙ্কিত ক্যারোল (১৮৭২)

 

১৮৭০ সালের একটি খ্রিষ্টমাস কার্ড

সান্টাক্লজ ও অন্যান্য উপহার প্রদানকারী

অনেকের মতে, সিন্টারক্লাস বা সেন্ট নিকোলাস হলেন সান্টাক্লজের উৎস

অনেক দেশেই বড়দিন বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে উপহার আদানপ্রদানের মরসুম। বড়দিন ও উপহার আদানপ্রদানের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত একাধিক খ্রিষ্টীয় ও পৌরাণিক চরিত্রের উদ্ভবের সঙ্গেও বড়দিন উৎসব অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। এঁরা হলেন ফাদার খ্রিষ্টমাস বা সান্টাক্লজ, পেরে নোয়েল, ও ওয়েনাকসম্যান; সেন্ট নিকোলাস বা সিন্টারক্লাস; ক্রাইস্টকাইন্ড; ক্রিস ক্রিঙ্গল; জৌলুপুক্কি; বাব্বো নাতালে; সেন্ট বাসিল; এবং ফাদার ফরেস্ট।

আধুনিককালে এই চরিত্রগুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় হল লাল পোষাক পরিহিত পৌরাণিক উপহার প্রদানকারী সান্টাক্লজ। সান্টাক্লজের উৎস একাধিক। সান্টাক্লজ নামটি ডাচ সিন্টারক্লাস নামের অপভ্রংশ; যার সাধারণ অর্থ সেন্ট নিকোলাস। খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর নিকোলাস ছিলেন অধুনা তুরস্কের মিরার বিশপ। অন্যান্য সন্তসুলভ অবদানগুলির পাশাপাশি শিশুদের পরিচর্যা, দয়া ও উপহার প্রদানের জন্য তিনি খ্যাতনামা ছিলেন। অনেক দেশে তাঁর সম্মানে ৬ ডিসেম্বর উপহার আদানপ্রদানের মাধ্যমে উৎসব পালিত হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, বিশপের পোষাক পরিহিত নিকোলাস তাঁর সহকারীদের সহায়তায় বিগত এক বছরে শিশুদের আচরণের খোঁজখবর নিতেন; তারপর স্থির করতেন সেই শিশু উপহার পাওয়ার যোগ্য কিনা। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে সেন্ট নিকোলাসের নাম নেদারল্যান্ডে পরিচিতি লাভ করে এবং মধ্য ও দক্ষিণ ইউরোপে তাঁর নামে উপহার আদানপ্রদানের ঐতিহ্য চালু হয়ে যায়। সংস্কার আন্দোলনের সময় অনেক প্রোটেস্টান্ট উপহার প্রদানকারীর চিরাচরিত চরিত্রটি বর্জন করে শিশু খ্রিষ্ট (Christ Child) বা Christkindl (ইংরেজি অপভ্রংশে ক্রিস ক্রিঙ্গল) চরিত্রটির আমদানি করেন এবং উপহার প্রদানের তারিখটি ৬ ডিসেম্বর থেকে বদলে হয় খ্রিষ্টমাস পূর্বসন্ধ্যা।

যদিও সান্টাক্লজের আধুনিক রূপকল্পটির সৃষ্টি হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে। এই রূপান্তরের পশ্চাতে ছয়জন মুখ্য অবদানকারী ছিলেন। এঁদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ওয়াশিংটন আরভিং এবং জার্মান-আমেরিকান কার্টুনিস্ট টমাস ন্যাস্ট (১৮৪০–১৯০২)। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের পর নিউ ইয়র্কের অধিবাসীরা শহরের অ-ইংরেজ অতীতের কিছু প্রতীক ফিরিয়ে আনার পক্ষে মত প্রকাশ করেন। প্রকৃতপক্ষে নিউ ইয়র্ক শহরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ডাচ ঔপনিবেশিক শহর নিউ আমস্টারডাম নামে এবং ডাচ সিন্টারক্লাস ঐতিহ্যটি সেন্ট নিকোলাস নামে সেখানে পুনরাবিষ্কৃত হয়েছিল। ১৮০৯ সালে নিউ ইয়র্ক হিস্টোরিকাল সোসাইটি আনুষ্ঠানিকভাবে ইতিহাস স্মরণ করে Sancte Claus-কে নিউ ইয়র্ক শহরের ডাচ নাম নিউ আমস্টারডামের পৃষ্ঠপোষক সন্ত বা প্যাট্রন সেন্ট ঘোষণা করেন। ১৮১০ সালের প্রথম আমেরিকান উপস্থিতিতে সান্টাক্লজকে বিশপের আলখাল্লায় অঙ্কন করা হয়েছিল। যদিও নতুন শিল্পীরা তাঁর চিত্রাঙ্কনের ভার নিলে, সান্টাক্লজের পোষাকেও ধর্মনিরপেক্ষতার স্পর্শ লাগে। ১৮৬৩ সাল থেকে ন্যাস্ট প্রতি বছর সান্টাক্লজের ছবি আঁকতেন। ১৮৮০-এর দশকে ন্যাস্টের সান্টা তার আধুনিক রূপটি পরিগ্রহ করে। এই রূপটি সম্ভবত ইংরেজ ফাদার খ্রিষ্টমাসের আদলে আঁকা হয়েছিল। ১৯২০-এর দশকে বিজ্ঞাপননির্মাতাদের সৌজন্যে এই রূপটিই স্থায়িত্ব লাভ করে।

সান্টাক্লজ সারা বিশ্বে লক্ষ্মী ছেলেমেয়েদের উপহার প্রদান করার জন্য খ্যাতিলাভ করেছেন

সান্টাক্লজ চরিত্রটির পূর্বসূরি ফাদার খ্রিষ্টমাস হাস্যরসিক, নাদুসনুদুস ও দাড়িওয়ালা ব্যক্তি। তিনি বড়দিনের শুভ চেতনার প্রতীক। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমভাগের ইংল্যান্ডে ফাদার খ্রিষ্টমাসে লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায়। অবশ্য সে সময় ছেলেমেয়েদের উপহার প্রদানের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক ছিল না। তিনি সংযুক্ত ছিলেন বড়দিনের আমোদপ্রমোদ ও মাতলামির সঙ্গে। ভিক্টোরিয়ান ব্রিটেনে সান্টার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে তাঁর চরিত্রটি পুনঃসৃজিত হয়। এই পথে ফ্রান্সে গড়ে ওঠে পেরে নোয়েল চরিত্রটিও। ইতালিতে সান্টাক্লজের ভূমিকাটি পালন করে বাব্বো নাতালে; এদেশে উপহার প্রদানকারী চরিত্রটি হলেন লে বাফানা। তিনি এপিফেনির পূর্বসন্ধ্যায় উপহার নিয়ে আসেন। কথিত আছে, লা বেফানা শিশু যিশুর জন্য উপহার আনতে বেরিয়েছিলেন; কিন্তু তিনি পথ হারিয়ে ফেলেন। এখন তিনি সব শিশুর জন্যই উপহার নিয়ে আসেন। কোনো কোনো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অনুসারে সান্টাক্লজের সঙ্গী হলেন নেচ রুপরেক বা কালো পিটার। অন্যান্য গল্প অনুসারে, এলফেরা উপহার প্রস্তুত করে। সান্টাক্লজের স্ত্রীর নাম দেওয়া হয়েছে মিসেস ক্লজ।

সেন্ট নিকোলাসের সান্টায় রূপান্তরিত হওয়ার আমেরিকান কাহিনিটির কিছু বিরোধিতাও ধ্বনিত হতে শোনা যায়। দাবি করা হয় সেন্ট নিকোলাস সোসাইটি ১৮৩৫ সালের পূর্বে স্থাপিত হয়নি; যা আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্তত পঞ্চাশ বছর পরের ঘটনা। সর্বোপরি, চার্লস জোনস কৃত নিউ আমস্টারডামের “শিশুসাহিত্য পুস্তক, সাময়িকপত্র ও পত্রিকা”র গবেষণায় সেন্ট নিকোলাস বা সিন্টারক্লাসের কোনো উল্লেখ নেই। যদিও ১৯৭৮ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত জোনসের গবেষণার প্রতি সকল বিশেষজ্ঞ আস্থা রাখেন না। নিউ ব্রানসউইক থিওলজিক্যাল সেমিনারির হাওয়ার্ড জি. হেজম্যান হাডসন ভ্যালির আদি বসতির সিন্টারক্লাস সংস্কৃতির আদলে নিউ ইয়র্কের সিন্টারক্লাস সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যটিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।

ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়ার মতো কিছু লাতিন আমেরিকান দেশের সাম্প্রতিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অনুসারে, সান্টা খেলনা প্রস্তুত করে যিশুকে তা দেন; যিশুই বাড়ি বাড়ি ঘুরে ছেলেমেয়েদের সেই খেলনা উপহার দিয়ে যান। এই বিশ্বাস ঐতিহ্যগত ধর্মীয় বিশ্বাস ও আমেরিকা থেকে আমদানিকৃত সান্টা সংস্কৃতির এক মেলবন্ধনের প্রয়াস।

অল্টো আদিগে/সাদতিরোল (ইতালি), অস্ট্রিয়া, চেক রিপাবলিক, দক্ষিণ জার্মানি, হাঙ্গেরি, লেচেনস্টেইন, স্লোভাকিয়া ও সুইজারল্যান্ডে ক্রাইস্টকাইন্ড (চেক ভাষায় Ježíšek, হাঙ্গেরিয়ান ভাষায় Jézuska, স্লোভাক ভাষায় Ježiško) উপহার প্রদান করেন। জার্মান সেন্ট নিকোলাউস ও ওয়েনাকসম্যান চরিত্রদুটি এক নয়। ওয়েনাকসম্যান আধুনিক সান্টার জার্মান সংস্করণ। সেন্ট নিকোলাউস নেচ রুপরেকের সহযোগিতায় ৬ ডিসেম্বর ক্যান্ডি, নাটবাদাম ও ফলের মতো ছোটো ছোটো উপহার নিয়ে আসেন।

 

Categories
অনলাইন প্রকাশনা খ্রীষ্টধর্মীয় ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা

খ্রিস্টমাসের খোশখবর

–গৌরী মিত্র

বাইবেলে লেখা নেই যিশুর জন্মদিন কবে। রোমান ক্যাথলিক চার্চের যাজকরা যিশুর জন্মদিন হিসেবে পঁচিশে ডিসেম্বরকে নির্দিষ্ট করেছিলেন। জন্মদিনপালন, উৎসব আয়োজন শুরু হয়েছিল চতুর্থ শতকের আগে নয়। রোমান জুলিয়ান ক্যালেণ্ডার অনুযায়ী ডিসেম্বর মাসে ছিল ‘স্যাটারনালিয়া’ উৎসবের আয়োজন। স্যাটার্ন মানে কৃষির অধিদেবতার পুজো। উৎসব শুরু হত সতেরোই ডিসেম্বর, চলত সাত দিন। এর সঙ্গেই রোমানরা জুড়ে দিয়েছিল খ্রিস্টমাস— পঁচিশে ডিসেম্বরে।

খ্রিস্টধর্মীয়দের মধ্যে এই উৎসবের আয়োজন শুরু হয়ে যায় পয়লা ডিসেম্বর থেকেই এখন। পঁচিশে ডিসেম্বর— যিশুর জন্মদিনের বারো দিন পরে আসে ‘এপিথ্যানি’। যিশুর দীক্ষা নেওয়ার দিন। সদ্যোজাত যিশুর জন্য উপহার এনেছিলেন তিন জন মহাজ্ঞানী পুরুষ এই দিন। এই সব স্মরণের উৎসব হল টুয়েলফথ নাইট বা এপিফ্যানি। যিশুর জন্মস্থান জেরুজালেমের ‘চার্চ অব নেটিভিটি’তে খ্রিস্টমাস উৎসব পালিত হয় সাড়ম্বরেই। ক্যাথলিকদের উদযাপিত উৎসবে যিশুর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বহু আদি ধর্মনির্ভর কানুন। প্রোটেস্ট্যান্টরা যিশুকেই স্মরণে রেখে চার্চে বাতি জ্বালায়, প্রার্থনা করে, গান গায়। ফ্রান্স, ইটালি, গ্রিস, স্পেন, জার্মান, চিন, জাপান— সর্বত্র এখন খ্রিস্টমাসের উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকে দেশীয় কিছু প্রথাও। মেক্সিকোয় এ উৎসব উপলক্ষে ‘লস পাসটোরেস’ অর্থাৎ ‘দ্য শেফার্ডস’ নামক নাট্যানুষ্ঠানটি অভিনব।

 

খ্রিস্টমাস উপলক্ষে কেক, পেসট্রি খাওয়া, উপহার বিনিময়, খ্রিস্টমাস কার্ড মানে শুভেচ্ছাপত্র প্রেরণ— এ সব শুরু হয়েছে উনিশ শতকে। ১৮৪৩ সালে এক ইংরেজ আর্টিস্ট জন ক্যালট হার্সলে প্রথম বানিয়েছিলেন খ্রিস্টমাস কার্ড। তাতে লেখা হয়েছিল— এ মেরি খ্রিস্টমাস অ্যাণ্ড এ হ্যাপি নিউ ইয়ার টু ইউ। খ্রিস্টমাস ট্রি, ‘সাইলেন্ট নাইট, হোলি নাইট’ ক্যারল— এ সব এসেছিল জার্মানদের সৌজন্যে।

খ্রিস্টধর্মী জার্মান যাজক উইনফ্রেড এক গভীর বনে দেখেছিলেন— এক ওক গাছে রজ্জুবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে এক বালক। বৃষ্টি, বজ্রের দেবতা থরের পায়ে বলি দেওয়ার জন্য বালককে বেঁধে রাখা হয়েছিল। উইনফ্রেড সে ওক গাছ সমূলে উৎপাটিত করলে সেখানে গজিয়ে উঠেছিল এক সুদৃশ্য ফার গাছ— দি ট্রি অব লাইফ। জার্মান ধর্মসংস্কারক মার্টিন লুথার জ্যোৎস্নারাতে অপরূপ সুন্দর হয়ে থাকতে দেখেছিলেন এক ডুমুর গাছকে। তিনি মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন— এটি হল খ্রিস্টমাস ট্রি, চিরসবুজ— সিম্বল অব লাইফ। উর্বরতার প্রতীক।

সান্টাক্লস ছাড়া খ্রিস্টমাস জমে? সান্টাক্লস কোনও কাল্পনিক চরিত্র নয়। চতুর্থ শতকে নিকোলাস নামে এক ব্যক্তি জন্মেছিলেন তুরস্কে। রোমান দেবতা ভায়ানার বেদিতে তিনি মাথা নোয়াননি বলে রোমান সম্রাট ভায়োক্লিসিয়ান তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পরবর্তী রোমান সম্রাটের দয়ায় নিকোলাস মুক্ত হয়েছিলেন। তুরস্কের মাইরা শহরের একটি চার্চে বিশপ পদে থাকার সময়ে তিনি ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াতেন অপরাধীদের খোঁজে। দুঃখী-দরিদ্রদের খোঁজে। অপরাধীদের তিনি দণ্ড দিতেন। কিন্তু দরিদ্র মানুষেরা তাঁর কাছ থেকে পেত অর্থ, খাদ্য, বস্ত্র। সেন্ট নিকোলাস মারা গিয়েছিলেন ৬ ডিসেম্বর। অনেক দেশেই এই ৬ ডিসেম্বর নিকোলাসকে মনে রেখেই ছোটদের উপহার দেওয়ার রেওয়াজ আছে। সেন্ট নিকোলাস ইউরোপের বিভিন্ন জনজীবনে বিভিন্ন নাম পেয়েছেন: ক্রিস ক্রিঞ্‌টল, সিন্টার ক্লাস, কোথাও পেরে নোয়েল, পাপাই নোয়েল। রাশিয়ায় গ্রাণ্ড ফাদার ফ্রস্ট, ইটালিতে লা বাফানা। লা বাফানা এক যাদুকর যিনি ঝাঁটায় চড়ে ঘুরে বেড়ান আর ছোটদের উপহার দেন এপিফ্যানিতে। আসলে দেশের উপকথা, লোককথা অনুসারে চরিত্রটি পেয়েছে বিশেষত্ব। নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্কে ‘সেইন্ট লুসিয়া’— আসোর রানিই উপহারদাতা। উত্তর গোলার্ধের মানুষেরা লুসিয়াকে শ্রদ্ধা করে, তাঁর কল্যাণে ছ’মাস রাতের জীবনে পথ হারায় না মানুষ। লাল টুকটুকে জামা গায়ে, মুখ ভর্তি লম্বা সাদা দাড়ি, পিঠে উপহারের থলি — সান্টাক্লস বলতে এখন সবাই একেই চেনে। এমন বিশ্বজনীন রূপ কী করে হল? ইউরোপের মানুষরা যখন আমেরিকায় গিয়েছিল তখন তাদের সঙ্গে এসেছিল খ্রিস্টমাস, আর সেই সঙ্গে সিন্টার ক্লাস নামক উপহারদাতাও।

১৮২৬ সালে নিউ ইয়র্কের এক পত্রিকায় ক্লিমেন্ট ক্লার্ক মুর লিখেছিলেন একটি কবিতা— এ ভিজিট ফ্রম সেইন্ট নিকোলাস। সেটি পড়ে বিশিষ্ট আর্টিস্ট টমাস নাস্ট এঁকেছিলেন নিকোলাসের মনকাড়া অনেক ছবি। সেই ছবির সিন্টার ক্লাস অর্থাৎ সান্টা ক্লসই অনবদ্য হয়ে রইল।

উত্তর গোলার্ধ, দক্ষিণ গোলার্ধ— দু জায়গায় খ্রিস্টমাসের আয়োজন দু রকমের। উত্তরে ডিসেম্বরে অনেক জায়গায় বরফে ঢেকে যায়। গাছপালায় তুষার! খ্রিস্টমাস মানেই ‘হোয়াইট খ্রিস্টমাস’। আর দক্ষিণের দেশগুলোয়? এ সময় গ্রীষ্মকাল। খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে সবাই আতসবাজি পোড়ায়, রাতের তারা দেখে। সমুদ্রের ধারে নাচগান করে।

‘খ্রিস্টমাস বক্স’, না হলে উৎসব ব্যর্থ। যিশু দরিদ্রের দুঃখমোচন করতে চেয়েছিলেন। ইউরোপ, আমেরিকায় সব শহরে, পথের মোড়ে সাজানো থাকে বাক্স। বাক্সের গায়ে লেখা থাকে— ‘হেল্প পুয়োর’ অথবা ‘শেয়ার ইয়োর জয়েস উইথ আদারস’। বাক্সয় দরিদ্র বন্ধুর জন্য কিছু দিলে খ্রিস্টমাসের উৎসব পূর্ণাঙ্গ হয়। যিশুও খুশি হন।

সৌজন্যঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, ৬ পৌষ ১৪০৯ রবিবার ২২ ডিসেম্বর ২০০২