Categories
অনলাইন প্রকাশনা আত্ম উন্নয়ন ইসলামধর্মীয় খ্রীষ্টধর্মীয় গবেষণামূলক প্রকাশনা ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা বৌদ্ধধর্মীয় হিন্দুধর্মীয়

আমাদের ধর্ম ও সৌহার্দতা

— সাকি বিল্লাহ্

 

ইদানিং কালে একটা ব্যাপার লক্ষ্যনীয়, কিছু অতি উচ্চমর্গীয় বা উচ্চবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ বলছে, জীব হত্যা বা ভক্ষণ করা যাবে না, গো হত্যা বন্ধ করতে হবে ইত্যাদি । যারা বলেন তারা জীব হত্যার বিপক্ষে অথবা নিরামিষভোজী বলা যেতে পারে ।

ভাল কথা ।

তবে বিষয়টা নিয়ে বাংলাদেশী বিজ্ঞানী (আমাদের গৌরব) জগদীশ চন্দ্র বসু স্যারের কথা মনে পড়ে গেল । গাছের প্রাণ আছে এবং তারাও মানুষ বা অন্যান্য প্রাণীর মত সকল জৈবিক কাজ করতে পারে এটা তিনি-ই প্রথম প্রমাণ করেছেন । বলা বাহুল্য তিনি একজন হিন্দু (বেদান্ত) ছিলেন ।

 

ডা. জাকির নায়েকের মত তাহলে বলতে হয় গাছের তো প্রাণ আছে তাহলে তাদেরও তো খাওয়া যাবে না । মনুষ্য জাতি তাহলে কি খাবে? বরং জীব হত্যার চাইতে গাছ হত্যা আরো বেশি শাস্তিযোগ্য অপরাধ । জীবের চাইতে গাছ বেশি কস্ট সহ্য করে যেমন, সে কথা বা শব্দ অথবা নড়াচড়া করতে পারে না, ধরুন আপনার দুইজন ভাই আছে, একজনের শারীরিক কোন সমস্যা নাই আর অন্য জনের শরীর পক্ষাঘাতগ্রস্ত বা বিকলাঙ্গ, কথা বলতে পারে না, চলতে পারে না, খাবার দিতে হয় সেলাইনের মাধ্যমে, কানে শোনে না; এই দুই ভাই এর ভিতর যদি সুস্থ ভাইকে কোন খুনী হত্যা করে তাহলে আপনি যতটুকু কষ্ট পাবেন তার চাইতে অসুস্থ বোবা ভাইকে হত্যা করলে অনেক বেশি কষ্ট পাবেন এটাই স্বাভাবিক বরং আদালতে গিয়ে আপনি বিচারকের কাছে বলবেন, আমার অসহায় প্রতিবন্ধী ভাইকে বিনা কারনে হত্যা করা হয়েছে তাই এর দৃস্টান্ত মূলক শাস্তি চাই ।

 

গাছের বেলায়ও তাই, পশু হত্যার চাইতে গাছ হত্যা করা আরো বড় অপরাধ(নিরামিষভোজীদের মতে যেহেতু জীব হত্যা পাপ) । তাহলে জীবন রক্ষার জন্য আমরা জীব হত্যা করবো নাকি গাছ হত্যা করবো সেটা একটা বিবেচ্য বিষয় ।

 

জ্ঞানীরা চুপ থাকে আর মূর্খরা তর্ক করে ।

বাঘ কখনও ঘাস বা লতাপাতা খেয়ে জীবন ধারণ করতে পারবে না, অন্যদিকে হরিণ তৃনভোজী প্রাণী । বাঘকে বেঁচে থাকতে হলে মাংস খেতে হবে আর হরিণ খাবে তৃণজাতীয় উদ্ভিদ এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম । তেলাপোকা সর্বভূক প্রাণী মানে সে সব কিছু খেতে পারে অনেকটা মানুষের মত । যেসকল প্রাণী সব কিছু খেতে পারে তাদের পৃথিবীতে টিকে থাকার সম্ভাবনা বেশি থাকে ।

ছোটবেলায় বই পুস্তকে সবাই পড়েছেন খাদ্য শৃঙ্খল বা খাদ্য চক্র । কে কাকে খাবে সেটা প্রাকৃতিক ভাবে নিয়ন্ত্রিত আরো স্পষ্টভাবে বলতে গেলে স্রস্টার দ্বারা নির্ধারিত ।

 

স্রস্টা যদি বাঘের উপর সুবিচার করে তাহলে হরিণকে জীবন দিয়ে বাঘের ক্ষুধা তথা জীবন বাঁচাতে হবে আর যদি হরিণের উপর দয়া করে তাহলে হরিণের জীবন বাঁচে কিন্তু বাঘের জীবন বিপন্ন হবে । তাই স্রস্টা একটি খাদ্যচক্র তৈরী করে দিয়েছেন আর সে চক্রে মানুষও একটি জীব । সে মাংশ খাবে অথবা গাছ খাবে এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার বা ধর্মীয় ব্যাপার । তবে বিজ্ঞানীদের মতে মানুষের বুদ্ধির বিকাশ হয় আগুনে ঝলসে যাওয়া মাংস খাওয়ার পর থেকে । মাংসে বেশ কিছু ভিটামিন ও অন্যান্য উপকারী উপদান আছে যেগুলো উদ্ভিদ থেকে পাওয়া যায় না, যেমন ভিটামিন বি-১২, ক্রিয়েটিন, কারনোসাইন, ওমেগা-৩( DHA & EPA), বিশেষ কিছু এমাইনো এসিড(প্রোটিন) ইত্যাদি ।

অনেক সময় নিরামিষভোজীদের শরীরে উপরোক্ত খাদ্য উপাদানগুলোর অভাব দেখা দেয় আর তখন তারা স্বরনাপন্ন হয় ডাক্তারের কাছে, ডাক্তার তাদের কৃত্তিম যে ভিটামিন বা খনিজ উপাদানের বড়ি বা ট্যাবলেট দিয়ে থাকে তা আসলে তৈরী হয় এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার গাঁজন প্রক্রিয়ায় আর কিছু আসে মাছ ও পশু থেকে । আর এই ভিটামিন বড়ি গুলো তৈরী করা হয় বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান দ্বারা; যেহেতু আপনার মস্তিষ্ক ও শরীর ঠিক রাখতে হলে এই ভিটামিন গুলো প্রয়োজন, তাই হয় সরাসরি প্রাণীর মাংস খেয়ে বা কৃত্তিম ভিটামিন খেয়ে (যা ব্যাকটেরিয়া ও প্রাণী হতে আসে) আপনাকে সুস্থ থাকতে হবে । যদি কৃত্তিম ভিটামিন বড়ি খান তাহলে ক্যানসার, কিডনির সমস্যা, স্নায়ুবিক দুর্বলতাসহ নানা ধরনের প্রদাহ দেখা দিতে বাধ্য । আবার উভয় ক্ষেত্রেই কিন্তু পশু হত্যা হচ্ছে ।

 

মূল প্রসঙ্গে ফেরা যাক, কে কি খাবে না খাবে এটা যার যার ব্যাক্তিগত বিষয় তবে অন্যেরা কি খাবে না খাবে তা নিয়েও হাস্যকর কাজ বা মন্তব্য করা উচিত নয় ।

 

হাজার বছর ধরে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানদের নিয়ে একসাথে বসবাস করা আমাদের এই বাংলাদেশ আর বাঙ্গালী সংস্কৃতি ।

এখানে কিছু কুচক্রী ধর্মীয় সৌহার্দ নস্ট করার অপচেস্টা করছে, আমাদের উচিত ঐসকল মানুষদের এড়িয়ে চলা । ১৯৪৭ সনে যখন দেশ ভাগ হয় তখন, পাকিস্তানী ও ভারতীয় কিছু স্বার্থাণ্বেষী রাজনীতিবিদ আমাদের দেশটাকে চিরে টুকরো টুকরো করে দিয়েছিল ধর্মীয় দাঙ্গা লাগিয়ে । হাজার হাজার বছরের বাংলাদেশকে, ছিন্নভিন্ন করে দেয়া হল । সেভেন সিস্টার নামে যে অংশগুলো বাংলার সাথে ছিল সেগুলো সমেত যদি দেশ হয় তাহলে তা পাকিস্তান কিংবা ভারতের চাইতে আকারে অনেক বড় হয়ে যায় তাই ব্যাপারটা গান্ধী কিংবা জিন্নাহ কেউই মেনে নিতে পারেনি । শেরে বাংলা অবিভক্ত বাংলাদেশ এর কথা উপস্থাপন করলেও তা ধোপে টেকেনি ।

 

ভারতে কিছুদিন পর পরই হিন্দু মুসলিম দাঙ্গায় নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায় । দুস্ট রাজনীতিবিদদের হিংসাকে চরিতার্থ করতে ধর্মযুদ্ধ একটি হাতিয়ার মাত্র ।

বাংলাদেশে সকল ধর্মের মানুষ একসাথে কোন ধরনের সমস্যা ছাড়াই ভালভাবে থাকছে, চাকুরী করছে, ব্যাবসা করছে এটা কিছু হিংসুকের বিশেষত প্রতিবেশী দেশগুলোর সহ্য হচ্ছে না । আমাদের কিছু দালালদের মাথা কিনে তাদের দিয়ে দেশের মানুষের ভাই ভাই সম্পর্ক নস্ট করার অপচেস্টা চালানো হচ্ছে । সে অপচেস্টাকে কিছুতেই সমর্থন করা যায় না ।

বাংলাদেশের মানুষ শান্তি প্রিয় এবং সকল ধর্মের মানুষ আমরা সবাই বাংলাদেশী এটাই হোক আমাদের প্রথম পরিচয় । আর সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, যার যার ধর্ম তার তার কাছে । নিজের ধর্মকে সবাই বড় মনে করে তাতে দোষের কিছু না কিন্তু অন্যের ধর্মকে ছোট করা ক্ষমাহীন অপরাধ ।

যে অন্যের ধর্মকে শ্রদ্ধা করতে জানে না সে নিজের ধর্মকেও শ্রদ্ধা করতে শেখেনি ।

 

তাই সকল ধর্মের বাঙ্গালীদের বলছি, অন্যের ধর্মকে শ্রদ্ধা করুন তাহলে সে বা তারাও আপনার ধর্মকে শ্রদ্ধা করতে শিখবে আর মনুষ্যরূপী শয়তান হতে সাবধান থাকবেন যারা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে কারণ ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করা হয়েছে প্রায় সকল ধর্মেই । ইসলাম ধর্মেও আছে তোমরা কখনও ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না বা অবিশ্বাসীদের সাথে কুতর্কে লিপ্ত হইও না ।

 

পরিশেষে কোরআ’নের আলোকে ধর্ম ও আমাদের সৌহার্দতা নিয়ে কিছু আয়াত উপস্থাপন করছি যাতে বিষয়টা আরো সুস্পস্ট হয়ঃ

সূরা আল বাক্বারাহ এর ২৫৬ নাম্বার আয়াতে উল্লেখ আছে,

“দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি বা বাধ্য-বাধকতা নেই। নিঃসন্দেহে হেদায়াত গোমরাহী থেকে পৃথক হয়ে গেছে। এখন যারা গোমরাহকারী ‘তাগুত’দেরকে মানবে না এবং আল্লাহ‘তে বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে ধারণ করে নিয়েছে সুদৃঢ় হাতল যা ভাংবার নয় । আর আল্লাহ সবই শুনেন এবং জানেন।” ।

এ ছাড়াও কোরআ’নের বিভিন্ন আয়াতে উল্লেখ আছে,

“আহবান করো সকলকে তোমার বিধাতা প্রতিপালকের পথে- পান্ডিত্যপূর্ণ সুন্দরতম বাগ্মীতার সাথে। আর যুক্তি প্রমাণ দিয়ে আলোচনা করো তাদের সাথে এমনভাবে, যা সর্বোত্তম (এবং সে আহবান হতে হবে এমন হৃদ্যতাপূর্ণ যেন কোন পাষাণ হৃদয়ের কাছেও তা গ্রহণযোগ্য হয়)।” আল কুর’আন (১৬:১২৫)

“…যারা ধর্ম সম্পর্কে নানা মতের সৃষ্টি করেছে ও বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে তাদের কোন কাজের দায়িত্ব তোমার নেই, তাদের বিষয় আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত।…” –আল কোরআন (সুরা আনআমঃ১৫৯)

“…হে কিতাবিগণ! তোমরা তোমাদের ধর্ম নিয়ে অন্যায় ভাবে বাড়াবাড়ি করোনা…” –আল কোরআন (সুরা মায়িদাঃ৭৭)

“…(ধর্ম সম্পর্কে) বিদ্রূপকারীদের বিরুদ্ধে আমিই (আল্লাহ) আপনার জন্য
যথেষ্ট…” –আল কোরআন (সুরা হিজরঃ৯৫)

“…যদি তারা আত্মসমর্পণ (আল্লাহর কাছে) করে তবে নিশ্চয়ই তারা পথ পাবে। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তোমার কাজ তো কেবল প্রচার করা। আল্লাহর দৃষ্টিতে রয়েছে সকল বান্দা।”–আল কোরআন
(সুরা আল ইমরানঃ২০)

“…তারপর ওরা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তোমার কর্তব্য তো শুধুমাত্র স্পষ্ট বাণী পৌঁছে দেয়া…”–আল কোরআন (সুরা নাহলঃ৮২)

“…তুমি মানুষকে হিকমত ও সৎ উপদেশ দিয়ে তোমার প্রতিপালকের (আল্লাহর)পথে ডাক এবং তাদের সাথে ভালভাবে আলোচনা কর। তাঁর (আল্লাহর) পথ ছেড়ে যে বিপথে যায় তার সম্পর্কে আল্লাহ্ই ভাল জানেন, আর যে সৎ পথে আছে তা-ও তিনিই ভাল করে জানেন”
– আল কোরআন (সুরা নাহলঃ১২৫)

“…তোমাদের কাজ তো কেবল প্রচার করা, আর হিসাব-নিকাশ তো আমার কাজ…” –আল কোরআন (সুরা রাদঃ৪০)

“…আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য এবাদতের নিয়ম কানুন নির্ধারিত করে দিয়েছি যা ওরা পালন করে… তুমি ওদেরকে তোমার প্রতিপালকের দিকে ডাক… ওরা যদি তোমার সাথে তর্ক করে তবে বল, ‘তোমরা যা কর সে সম্পর্কে আল্লাহ্ ভাল করেই জানেন। তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করছ আল্লাহ্ কিয়ামতের দিন সে বিষয়ে তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেবেন…” –আল কোরআন (সুরা হজঃ৬৭-৬৯)

 

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, কোরআ’নে কঠোরভাবে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং কাউকে ইসলাম সম্পর্কে বোঝাতে হলে বিনয়ী হতে বলা হয়েছে । যদি কেউ ইসলামকে বিদ্রুপ করে, বিমুখ হয় বা কেউ নাস্তিকতা প্রদর্শন করে তাহলে তার ব্যাপারে আল্লাহ নিজে ব্যাবস্থা নিবেন বলে হুঁশিয়ারী করে দিয়েছেন তথাপি আমাদের ভিতর কিছু অতি উৎসাহী কট্টর পন্থী আছে যারা কোরআ’ন তথা আল্লাহর বানীকে মানতে নারাজ । যদিও আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন অন্য ধর্মের মানুষদের সাথে বিনয়ী হতে তবুও তারা তাদের প্রতি কঠোর ।

পাঠকগণ নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিবেন কোনটা ভাল আর কোনটা খারাপ আমি শুধু সবাইকে স্বরণ করিয়ে দিলাম যে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি কোন সুফল বয়ে আনতে পারে না ।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গবেষণামূলক প্রকাশনা

বেনারসি শাড়ি ও জন্মনিরোধক বেলুন পর্ব ২

১৬৬৬ সালের সমীক্ষায় দেখা গেল ইংরেজদের জন্মহার কমে যাচ্ছে। ক্যাথলিক তাত্ত্বিক লিওনার্দো লেসিয়াস এ জন্য অনৈতিক কনডম ব্যবহারকে দায়ী করলেন।

 

নারী কনডমের ব্যবহারও বেশ পুরনো। মেয়েরা এক ধরনের বিষ মাখানো কনডম ব্যবহার করে ধর্ষণকারীদের প্রতিরোধ করার জন্য। একবার এ বিষ নাজুক অঙ্গে লাগলে ধর্ষণকারী যন্ত্রণায় আর এগোতে পারত না।

 

একালের কনডম ল্যাটেক্স ও পলিইউরেথেইন থেকে তৈরি হয়। আর পিচ্ছিল পদার্থের সঙ্গে থাকে শুক্র বিধ্বংসী ননঅক্সিনল-৯। কনডম ওয়াটার প্রম্নফ, ইলাস্টিক এবং টেকইস।

কনডমের বাহারি ব্যবহারের একটি উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পানীয় জল পরিবহন। এটি বহন করা সহজ। একটি সুনির্মিত ফুল সাইজ কনডম প্রায় ১২ লিটার পানি ধারণ করতে পারে। তবে পানিভর্তি কনডম পরিবহনের সময় অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়।

 

যেকোনও ছোট আকৃতির ইলেকট্রনিক সামগ্রীর পানির ভেতরে বা তলদেশে ব্যবহারের জন্য তা কনডমের ভেতর ঢুকিয়ে নেওয়া হয়। মাইক্রোফোনের ব্যবহার বিশেষভাবে উলেস্নখ করার মতো। বিবিসি এই ব্যবহারকে সুপরিচিত করিয়েছে। কেইপ টাউনে ফুটবল খেলোয়াড়রা মাঠে নামার সময় কনডম নিয়ে নামে। মোজা যথাস্থানে চেপে ধরে রাখার জন্য তারা মোজার ওপর কনডম পরে নেয়। আফ্রিকায় ফুটবলারদের মধ্যে ব্যবহার আরও বাড়ছে।

 

জুতোর বর্ণ উজ্জ্বল করতে বেনারসি তাঁতিদের মতো কনডমের লুব্রিক্যান্ট দিয়ে জুতো পালিশ করা হয়। এই পদ্ধতিটি বেশ বাজার পেয়েছে। জুতোর চাকচিক্য ধরে রাখার জন্য ধুলোবালি কিংবা কাদামাটি অতিক্রম করার সময়, জুতোর উপরে দুপায়ে দুই কনডম পরে নিলেই ব্যাস। পার্টিতে ঢোকার সময় কনডম খুলে নিলেই মনে হবে জুতো এইমাত্র ব্রাশ করা হয়েছে। কঙ্গোতে ৩টি কনডমের দাম ৯ সেন্ট আর জুতোর পালিশের দাম ৬০ সেন্ট।

 

কম্বোডিয়া কনডমের লুব্রিকেণ্ট যৌনকর্মীসহ বিভিন্ন পেশার মেয়েরা মুখে মেখে থাকে- তাতে শোনা যায় ব্রণ হয় না। চুলকানিতেও তা কাজে লাগে বলে নাম্বার ওয়ান প্লাস ব্র্যান্ড কনডমের চাহিদা অনেক বেশি।

 

বিভিন্ন ধরনের প্যাথলজিক্যাল টেস্ট বিশেষ করে ইউরিন টেস্টের সময় কনডমে মূত্র বহনের নজির রয়েছে। এমনকি মৃত্তিকাবিজ্ঞানীরাও কনডমের ভেতর নমুনা মাটি পরীক্ষার জন্য পরিবহন করেছেন বলে শোনা গেছে।

 

দক্ষিণ আফ্রিকায় নগ্ন জল ভ্রমণে বের হলে ক্যানডিরু নামের ক্যাটফিশের আক্রমণ থেকে শিশ্নকে রক্ষা করতে কনডম পরিধানের পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। এই কাটফিশ মূত্রগন্ধের ভক্ত। কাজেই সহজেই টার্গেট শনাক্ত করতে পারে।

 

কনডমের ভেতর চোলাই মদ রাখার নজির ভারতে আছে। ফেনসিডিল পাচার ও সরবরাহে বাংলাদেশে এর ব্যবহার হচ্ছে কি না দেখা দরকার।

 

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় বন্দুকের ব্যারেল সুরক্ষার জন্য কনডম ব্যবহার হতো। এর ভেতর বিস্ফোরক রাখার নজিরও আছে।

 

ট্রান্স ভ্যাজাইনাল আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষায় ডিটেকটরকে কনডমে ঢুকিয়ে নেওয়া হয়। কোকেন চোরাচালানে কনডমের ব্যাপক ব্যবহার ধরা পড়েছে। আলেকজান্ডার সোলঝেনিৎসিনের লেখায় সোভিয়েত গুলাগের একটি চিত্র : কয়েদির মুখে কনডম ঢুকিয়ে সিরিঞ্জের সাহায্যে ভেতরে প্রায় তিন লিটার কড়া এলকোহল ঢুকানো হতো। কনডমের মুখ কৌশলে দাঁতে আটকে রাখতে হতো। ভরে গেলে সহকয়েদিরা তা বের করে পানি মিশিয়ে সাত লিটার কড়া ভদকা তৈরি করত। ব্যাপারটা খুব বিপজ্জনক এবং ফেটে গেলে জীবন সংহারক হলেও কয়েদিরা তা করত। আফ্রিকানদের তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ একবার দাবি জানাল, সব সাদা, ঘিয়ে, ধূসর কনডম নষ্ট করে ফেল। আমরা কালো কালো কনডম চাই।

 

বাজারে এসেছে ম্যাডোনা কনডম। ম্যাডোনা কনডমে ঘর সাজানোর কাজও হচ্ছে। ২০০৩ সালে চীন তৈরি করেছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কনডম। হলুদ পিভিসি (পলিভাইনিল ক্লোরাইড) কনডমটির উচ্চতা ৮০ মিটার এবং ব্যাস ১শ মিটার।

Categories
গবেষণামূলক প্রকাশনা প্রকৌশল ও বিজ্ঞান বিনোদন

বেনারসি শাড়ি ও জন্মনিরোধক বেলুন পর্ব ১

জন্ম নিরোধক বেলুন ‘ডিলাক্স নিরোধ’-এর বিজ্ঞাপন ভারতের শহরে ও গ্রামে- পেয়ার হুয়া, একরারহুয়া, পেয়ার সে ফের কোই ডরতা হ্যায় দিল (প্রেম হয়েছে, সম্মতিও দিয়েছে, তাহলে অন্তরে আর ভয় কিসের?)। সুতরাং পঞ্চাশ পয়সায় তিনটি কিনে এখনই মাঠে নেমে পড়ুন।

মূল্য যত কম, অভাব তত বেশি- অর্থনীতির মূল সূত্রে আঘাত করছে অতি সস্তা জন্মনিরোধক কনডম। এই লক্ষণ কেবল ভারতে নয়, অন্যান্য দেশেও, বাংলাদেশেও।

 

কনডমের বিচিত্র চাহিদা। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ও শিল্পের চাকা ঘোরাতে। জন্মনিরোধক কনডম প্রচলনের প্রথম পর্যায়ে এর অন্যতম ব্যবহার দেখা যেত বেলুন হয়ে আকাশে ওড়ার মধ্য দিয়ে।

পশ্চিম থেকে অনুদান হিসাবে আসা কনডমকেও এক সময় সন্দেহের চোখে দেখা হত- আমাদের জনবল কমিয়ে দেওয়ার পশ্চিমা ষড়যন্ত্র হিসাবে। নিরোধকবিরোধী ধর্মীয় অনুশাসনও ছিল- ক্যাথলিক ‘আপত্তি’ এখনও রয়েই গেছে। সুতরাং মূল কাজকে পাশ কাটিয়ে অন্য কাজে লাগাতে সমস্যা কী? ভর্তুকি দিয়ে সরবরাহ করা এই বেলুনের ‘বেলুন হিসাবে’ ব্যবহার রোধ করা খুব একটা সহজ কাজ ছিল না। ছেলেমেয়ে ঘিয়ে রঙের বেলুন ফুলিয়ে সুতোয় বেঁধে আকাশে ওড়াচ্ছে, আর বাবা-মা ও বিবাহযোগ্য ভাইবোন বিব্রত হচ্ছে- এটা ছিল গত শতকের ষাট ও সত্তর দশকের একটি সাধারণ চিত্র। ভর্তুকির বেলুন কিংবা বিনামূল্যে পাওয়া বেলুন দু-চার পয়সায় বিক্রি করতে পারলেও মন্দ কী- সুতরাং মুদি দোকানদারও একটি বাড়তি বাজার পেয়ে যায়। বেলুনটা টেকসই, দামটা কম এবং দোকানদারও বেচতে রাজি- সুতরাং শখ করে প্রাইমারি স্কুলের ছাত্রও দু-একটা কিনে নিয়েছে।

 

একবার ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কের কাছে ভাওয়াল বনাঞ্চলে আবিষ্কৃত হয় বিপুল পরিমাণ কনডম। বিতরণের ঝামেলা এড়াতেই পরিবার পরিকল্পনা কর্মী জঙ্গলে ফেলে এসেছে। আর নিশ্চয় পূর্ণ বিতরণ ও ব্যবহারের প্রতিবেদন সরকারের কাছে দাখিল করা হয়েছে। পুরুষ প্রাণী এসবের সঠিক ব্যবহার জানলে অরণ্যে অনেক আগেই প্রাণীর জন্য হাহাকার পড়ে যেত।

এই নিবন্ধটি জন্ম-শাসন কিংবা ঘাতক ব্যাধি এইডস প্রতিরোধে কনডমের ভূমিকা নিয়ে নয়- কনডমের অপব্যবহার ও বিচিত্র ব্যবহার নিয়ে।

বেনারসি উপাখ্যান

ভারতের সিল্ক রাজধানী বারানসি শহরে কনডমের চাহিদা সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। চাহিদা বিবাহিত সক্ষম দম্পতি এবং অবিবাহিত জোড়ের মোট চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি। কেবল বেনারসি শাড়ির পেছনে প্রতিদিন ব্যবহার করা হচ্ছে ৬ লাখ কনডম। তাঁতে মাকুর চলাচল অবাধ করতে গিয়ে তাঁতিরা ব্যবহার করছে কনডমের পিচ্ছিল লুব্রিক্যান্ট। প্রতিটি তাঁতের প্রতিদিনের চাহিদা চার থেকে পাঁচটি কনডম। পিচ্ছিলকারক এই তরলের একটি বিশেষ গুণ হচ্ছে দামি শাড়িতে এটা কোনও ধরনের দাগ রেখে যায় না।

 

প্রথম দিকে কনডমের ব্যবহার চুপিসারে হলেও এখন তা প্রকাশ্য চর্চা হিসাবে স্বীকৃত হয়েছে। একটি শাড়িতে, একজন দক্ষ তাঁতি মনে করেন, চৌদ্দটির বেশি কনডম লাগা উচিত নয়।

 

ভারতীয় বেনারসি শাড়িতে শরীর পেঁচানো একজন বাংলাদেশি সুন্দরী রমণী একবার কি ভেবে দেখবেন তার শাড়িতে রয়েছে চৌদ্দটি কনডমের স্পর্শ।

 

বেনারসির চাহিদা কমার কোনও লক্ষণ নেই। তাঁতের সংখ্যাও বাড়ছে। কেবল ভারানাস শহরে তাঁতের সংখ্যা দুই লক্ষ। তাঁতিদের মতে এমন সসত্মা ও নিদাগ লুব্রিক্যান্ট আর নেই। বিবিসি কনডম ও বেনারসি শাড়ি নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রামাণ্য চিত্রও প্রদর্শন করেছে। চিত্রটির নাম কনডম ঘোরায় শিল্পের চাকা। এক সময় বাংলাদেশ থেকেও ভারতে কনডম চোরাচালান হয়েছে। তাঁতিরা বরাবরই আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসাবে বড় ধরনের মজুদ নিশ্চিত করে। সরকার আইনি হস্তক্ষেপও তেমন কাজে আসছে না।

 

বারানসির তাঁতি বাঁচাও আন্দোলনের একজন অন্যতম আহ্বায়ক মাহফুজ আলম বলেছেন- সরকারের অফিসাররা সতর্ক হলে শাড়িতে কনডমের ব্যবহার কমবে। তারাই পরিবার পরিকল্পনা কর্মীদের বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে সরাবরাহ করে থাকে কিন’ মনিটর করে না।

 

কর্মীরা এনে দোকানে বিক্রি করে দেয় আর তাঁতিরা দশ টাকায় এক ডজন রেটে দোকান থেকে কিনে নেয়। কাজেই পুলিশ দিয়ে তাঁতিদের হয়রানি করার কোনও মানে নেই।

 

পুরনো প্রজন্মের তাঁতিরা অবশ্য কনডম হাতে নিতে চায় না। কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে এ নিয়ে কোনও সংস্কার নেই। লাভ হলেই হলো। তাঁতিদের কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন রমণীরা কনডমের ব্যবহারটা জেনে গেলে হয়তো শাড়ির বাজার ধসে যেতে পারে। বাস্তবতা হচ্ছে ভারতের শিক্ষিত মহিলারা ব্যাপারটা জেনে গেছে। কিন্তু বাজার সঙ্কুচিত হয়নি।

 

বাহারি ব্যবহার

কনডম গবেষকদের ধারণা হাজার বছর আগেই কনডম ব্যবহার হয়েছে কিন্তু ভিন্ন উদ্দেশ্যে। অরণ্যচারী মানুষ বনে-বাদাড়ে ঘুমিয়ে পড়লে বিষাক্ত কীট-পতঙ্গ যাতে এই নাজুক অঙ্গটির ক্ষতি সাধন না করতে পারে সে জন্য শিশ্ন-পেঁচানো ছাল-বাকল ব্যবহার করত। নদী পারাপারের প্রয়োজনে কিংবা মাছ ধরার সময় জোঁকের হাত থেকে এই অঙ্গটি রক্ষার প্রয়োজনে এ ধরনের পোশাকের ব্যবহার হতো।

 

চারশ বছর আগেও ছাগলের অন্ত্র থেকে তৈরি কনডম যৌন প্রয়োজনেই ব্যবহার করা হতো বলে মনে করা হয়। গ্যাব্রিয়েল ফ্যালোপ্পিওর লেখা সিফিলিস বিষয়ক একটি অভিসন্দর্ভে উল্লেখ করা হয়েছে লিলেনের খাপ একটি বিশেষ রাসায়নিক দ্রবণে চুবিয়ে যৌনকর্মের সময় তা ব্যবহার করলে সিফিলিসের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। এই খাপটি ওপরে একটি রিবন দিয়ে বাঁধা হতো। চীনে তৈলাক্ত সিল্ক পেপারে কনডম তৈরি হতো।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গবেষণামূলক প্রকাশনা বিজ্ঞান

গবেষণা পদ্ধতি শাস্ত্র সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা

গবেষণা পদ্ধতি শাস্ত্র সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা
————————————————————————- ডঃ রমিত আজাদ

বাংলা গবেষণা শব্দটি এসেছে সংস্কৃত গবেষ শব্দ থেকে। ঋগবেদে প্রাপ্ত এই শব্দটির অর্থ অন্বেষণ বা অনুসন্ধান। গবেষণা = গবেষ + অণ + আ । ইংরেজী Research শব্দটির ব্যুৎপত্তি ফরাসী recerche থেকে, যার অর্থ বিস্তারিত অনুসন্ধান। আবার Research মানে Re-search অর্থাৎ পুনরায় অনুসন্ধান, এভাবেও ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। আমরা কোন কিছুর অনুসন্ধান করছি, প্রথমবার অনুসন্ধান করার পর পাওয়া গেলনা, তাহলে পুনরায় অনুসন্ধান করতে হবে, আবারও যদি না পাওয়া যায়, আবারও অনুসন্ধান করতে হবে, এভাবে যতক্ষণ পর্যন্ত পাওয়া না যায় ততক্ষণ পর্যন্ত অনুসন্ধান চলবে।

Method শব্দটির অর্থ পদ্ধতি, উপায়, প্রক্রিয়া, রীতি, কার্যপদ্ধতিইত্যাদি। Logy শব্দটির ব্যুৎপত্তি গ্রীক logos থেকে যার অর্থ কথা, শব্দ, আলোচনা, ইত্যাদি। জ্ঞানের অনেক শাখার নামের শেষেই এই Logy শব্দটি পাওয়া যায় (যেমন: Biology, zoology, sociology ইত্যাদি। জীব সংক্রান্ত আলোচনা – Biology, প্রাণী সংক্রান্ত আলোচনা -zoology, সমাজ সংক্রান্ত আলোচনা – sociology ইত্যাদি )। বাংলা ভাষায় এর অনুবাদ বিদ্যা বা শাস্ত্র হতে পারে। সেই হিসাবে Research Methodology -র বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র’।

কি নিয়ে আলোচনা করে এই শাস্ত্র তা তার নামেই বোঝা যাচ্ছে। এককথায় বলা যায় যে কি পদ্ধতিতে গবেষণা করা হয় মূলতঃ তা নিয়েই আলোচনা করা হয় এই শাস্ত্রে। তবে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার আগে গবেষণা কি এবং গবেষণার গুরুত্ব কি এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা প্রয়োজন।

গবেষণা হলো নতুন তথ্য আবিষ্কার করে বর্তমান জ্ঞান বৃদ্ধি বা সংশোধনের নিমিত্তে পদ্ধতিগত অনুসন্ধানী প্রক্রিয়া। গবেষণার মাধ্যমে সত্যের অনুসন্ধান করা হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত সত্যকে না পাওয়া যায় ততক্ষণ পর্যন্ত অবিরাম এই খোঁজ চলতেই থাকে। সত্যকে জেনে সেই সত্যকে প্রকাশ করার সাহসিকতাই গবেষণা। সত্য খুঁজে না পেয়ে মিথ্যা বলা বা সত্য খুঁজে পেয়েও উদ্দেশ্যমূলকভাবে সত্যকে গোপন করে মিথ্যা প্রকাশ করা গবেষণা নয়। গবেষণার তিনটি ধাপ রয়েছে: প্রথমটি – প্রশ্ন উত্থাপন করা, দ্বিতীয়টি – প্রশ্নের উত্তর তথ্য সংগ্রহ, এবং তৃতীয়টি প্রশ্নের প্রাপ্ত উত্তরটি যথাযথভাবে উপস্থাপন করা। যেকোন গবেষণায় নতুনত্ব (novelty) থাকতেই হবে। অর্থাৎ ইতিপূর্বে মানবজাতির জানা ছিলোনা এমন সত্য আবিষ্কার এখানে থাকতেই হবে। নতুনত্ব (novelty) না থাকলে সেটাকে গবেষণা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া যায়না। গবেষণা হলো সেই নিয়মাবদ্ধ (systematic) পথ যেখানে চলে আমরা নিজেদেরকে শিক্ষিত করে তুলি।

ধর্মবিশ্বাস ও বিজ্ঞান উভয়ের মতেই এই জগৎের সর্বশেষ সন্তান হলো মানুষ। তাহলে জগতে যা ঘটার তার প্রায় সবটুকুই ঘটে গিয়েছে মানবজা্তির আগমনের আগে। একারণেই মানব জাতির জ্ঞানভান্ডার এত ক্ষুদ্র। জগৎ-সংসার সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রকাশ করে মানুষ প্রথমে যেটা করতে পারে তা হলো ধারণা। কিন্তু ধারণার সাথে বাস্তবের মিল থাকবে এমন নিশ্চয়তা দেয়া অসম্ভব। বাস্তস সত্যটি কি এটা জানার একমাত্র পথটিই হলো গবেষণা। গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল আমকে যাচাই করে দেবে সত্যের সাথে আমাদের ধারণার কতটুকু মিল বা অমিল আছে। একারণেই বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের বলেছেন, “সকল গবেষণাই হলো মানুষের ধারনার (idea) জগৎ ও প্রতিভাস (phenomena)-এর জগৎের মধ্যকার পার্থক্য (gap) কমিয়ে আনা।

মানবজীবনে গবেষণার গুরুত্ব:
মানবজীবনে গবেষণার গুরুত্ব কি বলার আগে আসুন আলোচনা করি মানব জীবনের উদ্দেশ্য কি? এই নিয়ে অনাদিকাল থেকেই দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা আলোচনা করে গেছেন ও যার যার দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে গেছেন। জ্ঞানগর্ভ আলোচনার সেই মহাসাগর সেঁচে যে দুটো মুক্তা তুলে আনা যায় তা হলো ১। মানবজীবনের দৈনন্দিন জীবনের আরাম-আয়েশগুলো বৃদ্ধি করা (অন্যকথায় মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দূর করা), ২। সৃষ্টির রহস্য উদঘাটন করা (জীবনের অর্থ খুঁজে বের করা)। এই মহান দুটি কর্তব্য সাধনে গবেষণার কোন বিকল্প নেই।

মনে করি কোন একটি এলাকায় কোন একটি অজানা রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। মহামারীর আকার ধারণ করে তা বহু মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। আমাদের করণীয় কি? নিঃসন্দেহে এই ভয়াবহতার হাত থেকে সকলকে উদ্ধার করাই আমাদের কর্তব্য। এটা করতে হলে আমাদের প্রথমে রোগের কারণ খুঁজে বের করতে হবে, তারপর কি করে তা দমন করা যায় সেই উপায় আবিষ্কার করতে হবে। এই সব কিছু গবেষণা করেই করা সম্ভব। এক সময় আহত মানুষের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে তার গায়ে পশুর রক্ত দেয়া হতো, এতে রোগীর মৃত্যু হতো। তারপর মানুষের রক্ত দেয়া শুরু হলো। সেখানে দেখা গেলো কিছু মানুষ বেঁচে যায় আবার কিছু মানুষ মরে যায়। কেন? তবে আশার আলো দেখা গেলো যে কিছু মানুষ বেঁচে যাচ্ছে। অর্থাৎ মানুষের শরীরে মানুষের রক্ত দান করে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। এখন প্রয়োজন জানা যারা মারা যাচ্ছে তারা মারা যাচ্ছে কেন? অনেক অনুসন্ধানের পরে মানুষের ব্লাড গ্রুপ সম্পর্কে জানা গেলো । গবেষণার ফলেই এটা সম্ভব হয়েছে। এই সেদিনও ডায়রিয়ায় গ্রামের পর গ্রাম নিস্চিহ্ন হয়ে যেত। কিন্তু বাঙালী ডাক্তারদের অক্লান্ত সাধনা গবেষনার ফলে আবিষ্কৃত ওরস্যালাইনের কল্যাণে আজ ডায়রিয়া জীবনবিনাশী কোন অসুখই নয়।

যেমন আমাদের রয়েছে বিদেশ নির্ভরতা ও স্বদেশ বিপর্যয়। কেন এই নির্ভরতা ও বিপর্যয়? পাশাপাশি এ’ থেকে উত্তরণের পথ কি? এইগুলো বুঝতে হলে ও উত্তরণ পেতে হলে প্রয়োজন যথাযথ গবেষণার। স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরেও আমরা বাংলাদেশীরা উন্নয়নের মুখ দেখতে পাচ্ছি না। অগ্রগতির ধারা অত্যন্ত শ্লথ। কেন? এটা বুঝতে হলেও প্রয়োজন গবেষনার। আবার অনেকে এর জন্য জাতীয় রাজনীতিকেই দায়ী করে থাকেন। সেক্ষেত্রে গতানুগতিক রাজনীতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে কি করে যুগপোযোগী রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা যায় সেটা আবিষ্কার করতে হলেও প্রয়োজন গবেষণার। এককথায় যেকোন সমস্যা formulate (সূত্রাকারে বা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা) করা, তার সমাধান খুঁজে বের করা ও তা প্রকাশ্যে উপস্থাপন করা এই পুরো পদ্ধতিটিই গবেষণা। গবেষণা ছাড়া উদ্ভুত যে কোন সমস্যা বোঝা যেমন সম্ভব না তেমনি তা সমাধান করাও সম্ভব না।


কি নিয়ে আলোচনা করে গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্রঃ

যে শাস্ত্র পাঠ করলে গবেষণা ও গবেষণা পদ্ধতি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করা যায় তাকেই গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র বলে। গবেষণা যথেচ্ছভাবে করা যায়না, একটি নির্দিষ্ট নিয়মনীতি মনে তা করতে হয়। উদাহরণ স্বরূপ বলতে পারি, চা তৈরী করতে গেলে চা পাতা, চিনি, পানি, কেতলি ও চুলা লাগে এটা আমরা জানি। এখন যদি আমরা চুলায় প্রথমে কেতলি রাখি, তারপর তা উত্তপ্ত হওয়ার পর সেখানে চায়ের পাতা ফেলি, তা পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার পর চিনি দেই, চিনি গলে কটকটি হয়ে যাওয়ার পর সেখানে পানি ঢালি, তবে ঐ চা খাওয়ার যোগ্য হবে না। চা তৈরীর যথানিয়মে প্রথমে চুলায় কেতলি, তারপর পানি, পানি ফোটার পর চা পাতা ও চিনি দিয়ে প্রস্তুত করলেই পরিবেশনযোগ্য চা তৈরী হবে। অনুরূপভাবে যথানিয়মে গবেষণা করলেই গবেষণার ফলাফল পাওয়া যাবে ও প্রাপ্ত ফল মানবজাতির জন্য উপকারী হবে।

ছাত্র-ছাত্রীরা কেন গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র অধ্যায়ন করবে?
ছাত্র-ছাত্রীরা কেন গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র অধ্যায়ন করবে? – বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এমন প্রশ্ন দেখা দেয়না, কারণ স্কুল জীবন থেকেই গবেষণাগার দেখে তারা অভ্যস্ত। বিজ্ঞান ও গবেষণা এই দুটি শব্দ অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত এই ধারণা তাদের মধ্যে বদ্ধমূল। কিন্তু বাংলাদেশের মত দরিদ্র ও পশ্চাদপদ দেশে অ-বিজ্ঞান ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে এমন প্রশ্ন ব্যপকভাবে প্রচলিত। তাদেরকে বলতে চাই সমস্যা নাই বা অজানা নাই এমন কোন জ্ঞানের শাখা আমাদের জগৎে নাই। সমস্যা থাকলেই তা সনাক্ত করা, তার কারণ ও সমাধান খুঁজে বের করা জরুরী, অন্যথায় সেই শাখার উন্নয়ন থমকে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞানের (বিজ্ঞান,অ-বিজ্ঞানযে কোন জ্ঞান) সর্বচ্চো বিদ্যাপিঠ, এর মূল উদ্দেশ্য দুইটি ১। জ্ঞান দান করা, ২। নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। এই নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন গবেষণা। ব্যবসায় প্রশাসনের ছাত্র-ছাত্রীদের বলবো, অগ্র-পশ্চাৎ না ভেবে ব্যবসায় বিনিয়োগ করা সম্পুর্নই নির্বুদ্ধিতা। “উত্তম ব্যবসার সূত্রপাতই হয় উত্তম গবেষণার মধ্যে দিয়ে।” একারণেই গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র অধ্যায়ন করা ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য অত্যন্ত জরুরী।

গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র অধ্যায়নের পূর্বশর্তঃ
গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র অধ্যায়নের আগে কয়েকটি বিষয়ে দখল থাকা জরুরী ১। দর্শন, ২। গণিত, ৩। পরিসংখ্যান, ৪। বিজ্ঞান ৫। ভাষাজ্ঞান

গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র একাধারে দর্শন ও বিজ্ঞান:

বাংলা দর্শন শব্দটির ইংরেজী অনুবাদ Philosophy। ইউরোপীয় ভাষাগুলোতে এই শব্দটিই প্রচলিত আছে। দর্শন (philosophy) জ্ঞানের অন্যতম প্রাচীন একটি শাখা। ফিলোসফি শব্দটির প্রথম ব্যবহার করেছিলেন গ্রিক চিন্তাবিদ ও গণিতজ্ঞ পিথাগোরাস। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ অব্দের দিকে শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয়। পিথাগোরাস নিজেকে প্রাজ্ঞ ভাবতেন না, বরং প্রজ্ঞার অনুরাগী ভাবতেন। তিনিই ফিলোসফি শব্দটি ব্যবহার করেন love ফোর wisdom তথা প্রজ্ঞার প্রতি অনুরাগ অর্থে। দর্শনের সংজ্ঞা হিসেবে এই বিষয়টিকেই গ্রহণ করা যায়। আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে দর্শন প্রজ্ঞার এমন একটি ধারা যা, মানুষের কিভাবে জীবন নির্বাহ করা উচিত (নীতিবিদ্যা); কোন ধরনের বস্তুর অস্তিত্ব রয়েছে এবং তাদের প্রকৃতি কি (অধিবিদ্যা); প্রকৃত জ্ঞান বলতে কোন জিনিসটিকে বোঝায় এবং কারণ প্রদর্শনের সঠিক নীতিগুলো কি কি (যুক্তিবিদ্যা); এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে।

দর্শন শব্দটির ইংরেজি অনুবাদ philosophy । ফিলোসফি শব্দটি এসেছে প্রাচীন গ্রিক ভাষা থেকে। গ্রিক ভাষায় φιλοσοφία (philosophía) শব্দটি দুটি শব্দ থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। শব্দ দুটি হল: φίλο (ফিলো: অনুরাগ, ভালোবাসা ) এবং σοφία (সোফিয়া: প্রজ্ঞা)। এ থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায়, দর্শনের সাথে মূল সম্পর্ক হচ্ছে প্রজ্ঞার, আরও নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, প্রজ্ঞার প্রতি ভালোবাসার। জ্ঞান এবং প্রজ্ঞা এক জিনিস নয়। ঘটনা ও তথ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ও নির্ভুল ধারণা থেকে জ্ঞান লাভ করা যায়, কিন্তু দার্শনিক (যিনি দর্শন চর্চা করেন তাকেই দার্শনিক বলা হয়) কেবল তথ্যগত জ্ঞানের উপর নির্ভর করেন না। দর্শনের প্রধান কাম্য বিষয় প্রজ্ঞা। প্রজ্ঞার অনুসন্ধান ও চর্চার মাধ্যমেই দর্শন বিকাশ লাভ করে। পিথাগোরাস সারা জীবন প্রজ্ঞার সাধনা করেছেন, কখনও জ্ঞানের গরিমা অনুভব করেননি। এজন্য তিনি দার্শনিক হিসেবে বিদগ্ধ। দর্শনের জন্য যে প্রজ্ঞা কাম্য তার মধ্যে রয়েছে, অন্তর্দৃষ্টি, দৃষ্টিভঙ্গির অভ্রান্ততা, বিচারের ভারসাম্য ও বিশ্লেষণের সামঞ্জস্য।

বিজ্ঞান (ইংরেজি: Science) হচ্ছে বিশ্বের যাবতীয় ভৌত বিষয়াবলী পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ, যাচাই, নিয়মসিদ্ধ, বিধিবদ্ধ ও গবেষণালদ্ধ পদ্ধতি যা জ্ঞানকে তৈরিপূর্বক সুসংগঠিত করার কেন্দ্রস্থল। ল্যাটিন শব্দ সায়েনটিয়া থেকে ইংরেজি সায়েন্স শব্দটি এসেছে, যার অর্থ হচ্ছে জ্ঞান। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান শব্দটির অর্থ বিশেষ জ্ঞান। ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার ফলে কোন বিষয়ে প্রাপ্ত ব্যাপক ও বিশেষ জ্ঞানের সাথে জড়িত ব্যক্তি বিজ্ঞানী, বিজ্ঞানবিদ কিংবা বৈজ্ঞানিক নামে পরিচিত হয়ে থাকেন।
সকল বিজ্ঞানই জ্ঞান কিন্তু সকল জ্ঞানই বিজ্ঞান নয়। বিজ্ঞান হলো বিশেষ জ্ঞান, বিশেষত্বটি কোথায়? বিজ্ঞানের জ্ঞানটি হলো সেই জ্ঞান যা ‘মেথড অব ইনভেস্টিগেশন’ নামক একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে অর্জিত। তথা জ্ঞানটি পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণিত। বিজ্ঞান প্রমাণ ছাড়া কোন কিছু গ্রহন করেনা।

গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্রে একদিকে যেমন রয়েছে প্রজ্ঞার প্রতি অনুরাগ রেখে গভীর দৃষ্টিকোন থেকে গবেষণার টপিকটি বোঝা, জানা ও অপরকে জানানো। আবার রয়েছে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ব্যখ্যা বিশ্লেষণ পূর্বক প্রমাণ সহ তা উপস্থাপন করা। এই হিসাবে গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্র একাধারে দর্শন ও বিজ্ঞান।

গবেষণায় দর্শনের গুরুত্বঃ

পূর্বেই বলেছিগবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্রে রয়েছে প্রজ্ঞার প্রতি অনুরাগ রেখে গভীর দৃষ্টিকোন থেকে গবেষণার টপিকটি বোঝা, জানা ও অপরকে জানানো। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে চাই গবেষণা উত্তর প্রাপ্ত একটি বড় ডিগ্রীর নাম PhD বা Doctor of Philosophy । অর্থাৎ সেখানে গবেষক উল্লেখ করছেন What is his philosophy।


গবেষণায় বিজ্ঞানের গুরুত্বঃ

পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে লদ্ধ সুশৃঙ্খল ও সুসংবদ্ধ জ্ঞানই হলো বিজ্ঞান। প্রাচীনকালে বিজ্ঞানে পরীক্ষণের মাধ্যমে প্রমাণের বিষয়টি বাধ্যতামূলকভাবে ছিলোনা। এটি প্রবর্তনের পুরো কৃতিত্বই মুসলিম বিজ্ঞানীদের। Islamic Golden Age -এ এটা প্রবর্তিত হয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন আল হাইয়াম (Al Hazen), আল বিরুনী, ইবনে সিনা, ওমর খৈয়ামের মত পলিম্যাথরা। মুসলিম বিজ্ঞানীদের পথ অনুসরণ করে ষোড়শ শতাব্দিতে ইউরোপে একটি মেথড চালু করেন Galileo Gallelei। এই মেথডের নাম Method of Investigation। মেথডটি নিম্নরূপ ১। পর্যবেক্ষণ (observation), ২। বৈজ্ঞানিক অনুমান (hypothesis), ৩। আইন/তত্ত্ব (law/theory), ৪। যাচাই (verification) ।
অর্থাৎ কোন একটি প্রাকৃতিক প্রতিভাস (Natural Phenomenon) প্রথমে পর্যবেক্ষণ করা হবে। উদাহরণ স্বরূপ নিলাম যে একটি হাতে ধরা পেন্সিল ছেড়ে দিলাম, আমি পর্যবেক্ষণ করলাম যে পেন্সিলটি নিচে পড়ে যায়। এখন মনে প্রশ্ন জাগলো যে, কেন পেন্সিলটি পড়ে গেল। এরপর আসে বৈজ্ঞানিক অনুমান (hypothesis), আমি মনে মনে একটি ব্যখ্যা অনুমান করলাম যে, পেন্সিলটি যেহেতু উপরে গেলনা, বা সামনে পিছনে ডানে বায়ে কোনদিকেই গেলনা, গেলো কেবল নিচের দিকে তাহলে পতনের কারণটি নিচেই কোথাও আছে। এর পরবর্তি ধাপ আইন/তত্ত্ব, সেই অনুযায়ী গবেষক তত্ত্ব তৈরী করতে পারে যে, নিচের পৃথিবী যে কোন অবজেক্টকে তার দিকে টানে। অনুরূপ একটি আইনও তৈরী করা যেতে পারে (স্যার আইজাক নিউটন ও রবার্ট হুক মহাকর্ষ আইন নামে এই আইন অনেক আগেই প্রতিষ্ঠা করেছেন)। ব্যাস অনেক সাবজেক্টই এই তৃতীয় ধাপটিতে এসে থেমে যায়। কিন্তু বিজ্ঞান এখানে থেমে থাকেনা। চতুর্থ অর্থাৎ যাচাই (verification) ধাপটিও বিজ্ঞানের জন্য বাধ্যতামূলক। আইনটি/তত্ত্বটি পরীক্ষার দ্বারা ১০০% প্রমাণিত হতে হবে। যদি তা না হয় তবে তাকে বিজ্ঞান বলা যাবেনা, আর যদি প্রমাণিত হয় তখন সেই জ্ঞানটি বিজ্ঞান। এবার বিজ্ঞান হিসাবে তার প্রচার-প্রসার করা যাবে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যপুস্তকের অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।


গবেষণায় গণিতের গুরুত্বঃ

রাশিয়ার সাথে মহাকাশযুদ্ধে একের পর এক পরাজয়ের পর আমেরিকার বিজ্ঞানে ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিশাল পরিবর্তন আসলো। এ প্রসঙ্গে চমস্কি বলেছেনঃ
“এই বিশাল পরিবর্তন ঘটলো অনেকটা ১৯৬০ সালের দিকে দেশে বিজ্ঞান ও গণিতে শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে। স্পুটনিক স্ফুলিঙ্গের মতো কাজ করে যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষায় বেশ পরিমাণ সম্পৃক্ততার সৃষ্টি হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই এম, আই, টি-তে এমন সব ছাত্র আসতে শুরু করলো যারা অনেক বেশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এই সময়েই এম, আই, টি-তে পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। চিরায়ত প্রকৌশল শিক্ষাব্যবস্থার অবক্ষয় শুরু হয়ে গেলো। যে প্রকৌশল বিভাগগুলো পিছনে পড়ে ছিলো তারা সাধারণত বিজ্ঞানশিক্ষাসূচীকে হুবুহু নকল করা শুরু করলো। সুতরাং বিদ্যুৎ প্রকৌশল বিভাগে আপনি কিভাবে বিদ্যুৎবর্তনী একত্র করতে হয় তা আর শিখবেন না, আপনি শিখবেন প্রয়োজনীয় পদার্থবিজ্ঞান এবং গণিত যা পদার্থবিজ্ঞান এবং গণিত বিভাগে শিখানো হয় তার থেকে খুব আলাদা নয়। একই কথা সত্য বিমান চালনা ও যন্ত্রকৌশল সম্পর্কেও। এটা তাই একটা বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে গেলো, প্রকৌশলভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় আর নয়।”

গণিত নিঃসন্দেহে বিজ্ঞান তবে গণিতের জন্ম প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের জন্মের অনেক আগে। এই কারণে গণিতকে অনেকে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞান বলে। ঐ দৃষ্টিকোণে গণিত হল আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞান আর প্রাকৃতিক বিজ্ঞান হল পরীক্ষণমূলক বিজ্ঞান। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সাথে গণিতের মিল-অমিল উভয়ই রয়েছে। গণিত একদিক থেকে পরীক্ষণমূলক বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে, উভয়টিই একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে পদ্ধতিগত অধ্যয়ন করে। আর পার্থক্য হচ্ছে, পরীক্ষণমূলক বিজ্ঞানে পরীক্ষণের মাধ্যমে প্রমাণ করা হলেও গণিতে কোন কিছু প্রতিপাদন করা হয় আগের একটি সূত্রের (প্রায়োরি) উপর নির্ভর করে। এই আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞান, যার মধ্যে পরিসংখ্যান এবং যুক্তিবিদ্যাও পড়ে, অনেক সময়ই পরীক্ষণমূলক বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তাই পরীক্ষণমূলক বিজ্ঞানে উন্নতি করতে হলে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞানের প্রসার আবশ্যক। কিভাবে কোন কিছু কাজ করে (প্রাকৃতিক বিজ্ঞান) তা বুঝতে হলে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞানের কাছে হাত পাতা ছাড়া উপায় নেই। ব্যবসা সংক্রান্ত গবেষণায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে (decision making) গণিতের কোন বিকল্প নেই। এ কারণে গবেষণায় গণিতের গুরুত্ব অপরিসীম।

বিজ্ঞান একটি প্রস্তাবিত মডেল নিয়ে কাজ করে। এই মডেলটি হতে পারে সিমুলেশন, গাণিতিক বা রাসায়নিক সূত্র । বিজ্ঞান এবং গণিত উভয়েই মডেল, অভ্যন্তরীণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে এবং falsifiable (disproof করতে সক্ষম) হতে হবে । গণিতে, একটি বিবৃতি (statement) প্রমাণিত নাও হতে পারে, সেই পর্যায়ে তাকে বলা হয় অনুমান (hypothesis); কিন্ত যখনই বিবৃতিটি প্রমাণিত হবে তখনই তা অমরত্ব পাবে। কিছু কিছু গণিতবিদ এই কাজে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন।

গাণিতিক কাজ এবং বৈজ্ঞানিক কাজ একে অপরকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, সময়ের প্রযুক্তিগত ধারণা বিজ্ঞানে উদ্ভুত হয়েছিলো, এবং সময়হীনতা (timelessness) ছিলএকটি গাণিতিক বিষয়। কিন্তু আজ, Poincaré conjecture প্রমাণিত হয়েছে সময়কে গাণিতিক ধারণা হিসাবে ব্যবহার করে।
গাণিতিক পদ্ধতি ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান পদ্ধতি দ্বয়ের মধ্যে মিল-অমিল নিচের টেবিলে দেখানো হলো।
Mathematical method
Scientific method

1. বোঝা (Understanding)
অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ থেকে চরিত্রায়ন (Characterization from experience and observation)

2. বিশ্লেষণ (Analysis)
হাইপোথিসিস: প্রস্তাবিত ব্যাখ্যা (Hypothesis: a proposed explanation)

3. সংশ্লেষ (Synthesis)
সিদ্ধান্তগ্রহণ: হাইপোথিসিস থেকে ভবিষ্যদ্বাণী (Deduction: prediction from the hypothesis)
4. (পর্যালোচনা / প্রসারিত করা)
Review/Extend
টেস্ট এবং পরীক্ষা (Test and experiment)

Mathematical method
১। বোঝা (Understanding)
২। বিশ্লেষণ (Analysis)
৩। সংশ্লেষ (Synthesis)
৪। (পর্যালোচনা / প্রসারিত করা)
Review/Extend

Scientific method
১। অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ থেকে চরিত্রায়ন (Characterization from experience and observation)
২। হাইপোথিসিস: প্রস্তাবিত ব্যাখ্যা (Hypothesis: a proposed explanation)
৩। সিদ্ধান্তগ্রহণ: হাইপোথিসিস থেকে ভবিষ্যদ্বাণী (Deduction: prediction from the hypothesis)
৪। টেস্ট এবং পরীক্ষা (Test and experiment)

গবেষণায় পরিসংখ্যানের গুরুত্বঃ
পরিসংখ্যান হলো সেই বিজ্ঞান যে অনিশ্চয়তার জগৎে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। আমরা বসবাসই করি মোটামুটিভাবে অনিশ্চয়তার জগৎে। আর ভবিষ্যৎ পুরোটাই অনিশ্চিত। অথচ নিয়তি এমনই যে আমরা প্রতিনিয়ত ভবিষ্যৎের দিকেই এগিয়ে চলছি। তাই এই যেকোন গবেষণার ভবিষ্যদ্বাণীতে পরিসংখ্যানের কোন বিকল্প নেই।

উপাত্ত সংগ্রহ, তার বিন্যাস ও উপস্থাপন ছাড়া গবেষণা করা সম্ভব না। আবার যেকোন হাইপোথিসিস তৈরি করে তা আবার টেস্ট করাও প্রয়োজন। এ’সবই পরিসংখ্যান। তদুপরি গবেষণার একটি শর্ত হলো বর্ণনা। বর্ণনা কোন একটি বিষয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেতে সাহায্য করে। এই বর্ণনার ক্ষেত্রে বর্ণনামূলক পরিসংখ্যান (Descriptive Statistics) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্রের ইতিহাসঃ

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির বিকাশের ইতিহাস ও বিজ্ঞানের ইতিহাস অবিচ্ছেদ্য। প্রাচীন মিশরীয় নথি ঘেটে জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত ও চিকিৎসা শাস্ত্রে প্রায়োগিক পদ্ধতির ব্যব হারের বর্ণনা পাওয়া যায়। খ্রীষ্টপূর্ব ৭ম শতাব্দীর , ব্যবিলনের রাজা Nebuchadnezzar একটি ইহুদি বন্দী ছিলো ড্যানিয়েল নামে। তিনি একটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা সম্পন্ন করেছিলেন, যেখানে ছিলো হাইপোথিসিস , একটি নিয়ন্ত্রণ গ্রুপ (control group), একটি প্রয়োগ দল (treatment group), এবং একটি উপসংহার। পরীক্ষা শেষে ড্যানিয়েল এর অনুমান সত্য প্রমাণিত হয়।

খ্রীষ্টপূর্ব আনুমানিক ৭৫০-এ পৃথিবীর প্রথম দার্শনিক মহাজ্ঞানী কপিল পৌরাণিক বর্ণনা বাদ দিয়ে যৌক্তিক বিশ্লেষণ (logical reasoning) বিষয়টির প্রবর্তন করেন। উনার প্রবর্তিত দর্শনের নাম সাংখ্য দর্শন। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে এই সাংখ্য দর্শন সম্পর্কে উল্লেখ আছে। এরপর খ্রীষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক থালেস (thales) প্রাকৃতিক ঘটনাবলি ( natural phenomena)র ব্যাখ্যায় অতিপ্রাকৃত ধর্মীয় বা পৌরাণিক ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। দার্শনিক প্লেটো কর্তৃক বিকশিত deductive reasoning ছিলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি (scientific method) প্রতিষ্ঠায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। যতদূর জানা যায় অভিজ্ঞতালদ্ধতা (Empiricism) অ্যারিস্টট্ল দ্বারা প্রাথমিকভাবে বিধিবদ্ধ হয়েছে। অ্যারিস্টট্ল বিশ্বাস করতেন যে, ধ্রুব সত্য (universal truth) কেবল মাত্র induction-এর মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব। তবে সত্যিকার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বিকাশের ক্ষেত্রে অ্যারিস্টট্লকে কৃতিত্ব দেয়া যাবেনা। উনার লিখিত “On the Heavens” এবং “Physics”-এ সংশোধনযোগ্য ত্রুটি ছিলো।

গাণিতিক গবেষণায় ভারত উপমহাদেশের আর্যভট্ট, বরাহমিহির, ব্রহ্মগুপ্ত, ভাষ্কর ও শ্রীধরের নাম উল্লেখযোগ্য।

৬১০ খ্রীষ্টাব্দে নবীজি (সঃ)-র নবুওত প্রাপ্তির সাথে সাথে শুরু হয় ইসলামের স্বর্ণযুগ (Islamic Golden Age)। ইসলামিক ডক্ট্রাইনে প্রভাবিত ও উৎসাহিত হয়ে মুসলমানরা শুরু করে নতুন ধারার জ্ঞান চর্চা। সারা পৃথিবীর জ্ঞান সংগ্রহ করে তারা তা বিকশিত করতে শুরু করে। খ্যাতিমান মুসলিম দার্শনিক ও বিজ্ঞানী আল হাইয়াম (Alhazen) আলোকবিজ্ঞান ও শরীরবিজ্ঞান নিয়ে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। আলোকবিজ্ঞান সংক্রান্ত তার বিখ্যাত গ্রন্থের নাম অপটিক্স (Optics ), যা ১০২১ সালে রচিত। এইভাবে তিনিই হয়ে ওঠেন বৈজ্ঞানিক মেথড (scientific method)-এর পথপ্রদর্শক। তিনি বুঝতে পারেন যে পরীক্ষা এবং পরিমাপের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের প্রয়োজন আছে, যা একটি উচ্চমান সম্পন্ন উপসংহারে পৌছাতে সাহায্য করবে। কোন তত্ত্বকে পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণে (empirically)-র বিষয়টি মুসলিম বিজ্ঞানীরাই প্রথম চালু করেন। এর ফলে অতীতের অনেক তত্ত্বই বাতিল হয়ে যায়। একই যুগের অন্যান্য মুসলিম polymathগণ গণিত, দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা ও রসায়ন ও জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অভূতপূর্ব অবদান রাখেন। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য নামগুলো হলো আল বিরুণী, আল খাওয়ারিজিমী, ওমর খৈয়াম, আল কিন্দি, ইবনে সিনা, তকি আল দ্বীন, ইবনে সাহিল, আল তুসি, প্রমূখ।

এর আরও কয়েক শতাব্দী পরে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ইউরোপের রজার বেকন, রেঁনে দেকার্ত, গ্যালিলিও, ও ফ্রান্সিস বেকনের নাম উল্লেখযোগ্য। বিজ্ঞান ও গবেষণায় নব্যযুগের সূচনা হয় স্যার আইজাক নিউটনের পদার্থবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।

গবেষকের মূল্যায়নঃ
শিক্ষকদের অবহেলা করে যেমন শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়, তেমনি গবেষকের মূল্যায়ন না করে গবেষণা সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে যে, যথেষ্ট মেধা ছাড়া গবেষণা করা অসম্ভব। যে দেশ বা প্রতিষ্ঠান গবেষণা করতে চাইবে তাকে পর্যাপ্ত নজর দিতে হবে গবেষকের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করনে। কেবলমাত্র তখনই মেধাবীরা এই পেশায় আসতে উৎসাহী হবে। পাশাপাশি একজন গবেষককে আরও যা দিতে হবে, তা হলো

১। গবেষকের অবাধ স্বাধীনতা, ২। সতীর্থ বিজ্ঞানীদের সাথে নিবীড় সম্পর্ক (cross-functional team work), ৩। বিজ্ঞান শিক্ষা ও গণিত শিক্ষার গভীর সম্পৃক্ততা (the power of mathematics and natural science).

উল্লেখ্য যে, উন্নত সবগুলো দেশই তার নিজ দেশ তো বটেই উপরন্তু পৃথিবীর সব দেশ থেকেই মেধাবী গবেষকদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদের দেশে টেনে আনে।

বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন দেশে গবেষণাঃ
একটা কথা প্রচলিত আছে, ‘বুদ্ধিমান ব্যক্তি সেই যে নিজের লিমিটেশন বোঝে।’ অনুরূপভাবে বলবো বুদ্ধিমান দেশ সেই যে গবেষণার গুরুত্ব বোঝে। উন্নত যেকোন দেশের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই দেখা যাবে যখনই দেশটি গবেষণায় ব্যাপক মনযোগ দিয়েছে তখনই ঐ দেশটি তরতর করে উপরে উঠে গিয়েছে। উন্নত সবগুলো দেশই গবেষণা ও গবেষকের যথাযথ মূল্যায়ন করে থাকে। গএকথা সত্য যে এক্ষেত্রে কোন কোন দেশ ফলিত গবেষণায় (applied research) অধিক গুরুত্ব দেয়, কোন কোন দেশ মৌলিক গবেষণায় (basic research) অধিক গুরুত্ব দেয়, আবার কোন কোন দেশ যে কোন প্রকার গবেষণাকেই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে (যেমন রাশিয়া, জার্মানী, জাপান)। গবেষণায় যে সকল রাষ্ট্র বিপুল অর্থ ব্যায় করে থাকে এমন টপ টেন রাষ্ট্রের তালিকা নিচে দেয়া হলো।

(Expenditure in billion USD)
1 United States 405.3 2.7% 2011 [2]
2 China 296.8 1.97% 2012 [3]
3 Japan 160.3 3.67% 2011 [4]
4 Germany 69.5 2.3% 2011 [2]
5 South Korea 55.8 3.74% 2011 [4]
6 France 42.2 1.9% 2011 [2]
7 United Kingdom 38.4 1.7% 2011 [2]
8 India 36.1 0.9% 2011 [2]
9 Canada 24.3 1.8% 2011 [2] 1
0 Russia 23.8n1 1.0% 2011

এমন ৭২টি দেশের তালিকায় ভারত ও পাকিস্তানের নাম থাকলেও বাংলাদেশের নাম নেই।


উপসংহারঃ

উপসংহারে বলবো যে, গবেষণার উদ্দেশ্য প্রকৃত সত্য উদঘাটন। সেই গবেষণা সব সময়ই হতে হবে উচ্চমান সম্পন্ন ও উপকারী। একটি সার্থক গবেষণা কেবলমাত্র তখনই সম্ভব যখন গবেষণা পদ্ধতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান থাকবে। গবেষণা পদ্ধতিশাস্ত্রই এই পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান দিতে সক্ষম।

তথ্যসূত্র:
1. http://en.wikipedia.org/wiki/Scientific_method
2. http://en.wikipedia.org/wiki/History_of_scientific_method
3. http://www.socialresearchmethods.net/kb/contents.php
4. http://krishaamer.com/2009/05/15/research-investigation-methods/

(ইতঃপূর্বে প্রকাশিত)

Categories
অনলাইন প্রকাশনা আত্ম উন্নয়ন খাদ্য ও স্বাস্থ্য গবেষণামূলক প্রকাশনা চিকিত্সাশাস্ত্র এবং বিজ্ঞান

কি খাচ্ছি? ফল, খাবার নাকি বিষ? পর্ব-১ (একটি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ)

কি খাচ্ছি? ফল, খাবার নাকি বিষ? পর্ব-১ (একটি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ)

–সাকি বিল্লাহ্

আসলে একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে এটা বোঝা খুবই কঠিন বিষয় যে কোন ফলে বা খাবারে বিষ আছে আর কোনটাতে নেই ।

ধারাবাহিক এ পর্বে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান দিয়ে আলোচনা করব বিভিন্ন খাবার ও ফল নিয়ে; কোন কোন খাবার বা ফলে কি কি বিষাক্ত রং বা কেমিক্যাল মেশানো হচ্ছে আর এর প্রতিকার কি?

আজকের আলোচ্য বিষয় “তরমুজ”:

তরমুজ সবারই প্রিয় সবজী জাতীয় ফল । প্রচন্ড এই গরমে আমরা তরমুজ খাব এটাই স্বাভাবিক কিন্তু এক শ্রেনীর অসাধু ব্যাবসায়ী তরমুজ পরিপক্ক না হওয়ার আগেই বাজারজাত করছে আর অপরিপক্ক তরমুজের রং সাদা হতে লাল করার জন্য বা স্বাদে মিস্টি করার জন্য ইনজেকশন বা ঔষধসুচেঁর মাধ্যমে দিচ্ছে বিভিন্ন কেমিক্যাল ।

তরমুজের রং লাল করার জন্য দেয়া হচ্ছে কৃত্রিম রং বাইক্সিন বা রেড ডাই -২(bixin dye or red dye-2) এবং মিস্টি করার জন্য দেয়া হচ্ছে সোডিয়াম সাইক্লোমেট(sodium cyclamate) ও স্যাকারিন ( Sacharin) ১০:১ হারে । যা সাধারণ চিনির চাইতে ৩০-৫০ গুন বেশি মিস্টি আর শুধু স্যাকারিনের ক্ষেত্রে যা ৫০০-৭০০ গুন । আজকাল বেশির ভাগ ভোগ্য পন্যেও দেয়া হচ্ছে এ কেমিক্যাল যা এক দীর্ঘ মেয়াদী বিষ বা স্লো পয়জন ।

এবার চলুন দেখি এ বাইক্সিন ডাই, রেড ডাই-২, স্যাকারিন বা সোডিয়াম সাইক্লোমেট খেলে কি কি ক্ষতি হতে পারে মানব শরীরে ।

#সোডিয়াম সাইক্লোমেটঃ দীর্ঘদিন এ বিষ খেলে মানুষের নিম্নোক্ত প্রদাহ হতে বাধ্য,

১. ব্লাডার(মুত্রথলি) ক্যান্সার

২. টিউমার

৩. পুরুষ্ত্ব বিনস্ট হওয়া(Male fertility System or Sperm Problem)

৪. উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধি পাবে

৫. মহিলাদের ব্রেস্ট ক্যান্সার হতে পারে

ইত্যাদি ।

#স্যাকারিনঃ দীর্ঘদিন স্যাকারিন খেলে যা যা ক্ষতি হতে বাধ্য,

১. অস্থিরতাঃ বিশেষত হাত ও পা কাঁপা যা ইংরেজীতে restless leg or hand syndrome বলে

২. মাথা ও পেশীতে ব্যাথা অনুভূত হওয়া

৩. পার্কিনসন্স ডিজিজ (Parkinson’s disease)

পার্কিনসনের অসুখের লক্ষণ:

– মাসল শক্ত হয়ে যাওয়া।
– হাত-পা কাঁপা।
– চলা-ফেরার গতি স্লথ যাওয়া।
– হাঁটা-চলার ধরণ পাল্টে যাওয়া।
– ব্যালেন্সের অভাব – ফলে মাঝে মাঝে মাটিতে পড়ে যাওয়া, ইত্যাদি।

৪. জয়েন্ট পেইন বা অস্থিসংযোগ স্থলে ব্যাথা

৫. বিষন্নতা বা depression ইত্যাদি

সর্বশেষে আসা যাক কৃত্রিম রং বাইক্সিন ডাই বা রেড ডাই-২ বা bixin dye or red dye-2

#বাইক্সিন ডাইঃ

১. কিডনী প্রদাহ বাড়বে এবং কিডনী নস্ট হয়ে যেতে পারে

২. ব্লাডার বা মুত্রথলিতে পাথর হতে পারে

৩. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পাবে

৪. অনিদ্রা বা insomnia হতে পারে

৫. শরীরের বিভিন্ন অংশে এলার্জি দেখা দিতে পারে

এবার আসুন আমরা কিভাবে এ ধরনের কেমিক্যাল দেয়া তরমুজ থেকে বেঁচে থাকতে পারব,

১. তরমুজ কৃষকের ক্ষেত থেকে সরাসরি আহরন করা যেতে পারেঃ এ ক্ষেত্রে কৃষকের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ রাখতে পারেন আর ১০-১৫ দিনের তরমুজ একসাথে কিনে নিয়ে আসতে পারেন নিজেই অথবা কয়েকজন বন্ধু ও আত্মীয় একসাথে; দামও অনেক কম পড়বে (গড়ে ১০০ তরমুজ এর দাম পড়বে ১০০০/- থেকে ১৫০০/- টাকা) প্রতিটি ১০ থেকে ১৫ টাকার মধ্যে আর পাঠিয়ে দিতে পারেন কোন মালবাহী বাস বা ট্রাকে, এক্ষেত্রে অনেকে এসএ পরিবহনের সাহায্য নিয়ে থাকেন ।

২. সরকারকে আরো কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে

৩. সাধারণ মানুষদের কাছে স্বল্পমূল্যে পরীক্ষন যন্ত্র, পরীক্ষা করার কেমিক্যাল বা উপাদান ও তাদের প্রসিক্ষণ দেয়া যেতে পারে যাতে করে বাজারে যেকোন পন্য কেনার আগে নিজেই তা যাচাই করে নিতে পারেন ।

৪.  এ ক্ষেত্রে সাইখ সিরাজ ভাই বা তৃতীয়কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অর্গানিক কোন ফার্ম খুলতে পারেন যেখানে প্রাকৃতিকভাবে সব ফসল উৎপাদিত হবে । আর ঘোষণা করা হবে কেউ কোন ধরনের কৃত্রিম কেমিক্যাল এর প্রমান পেলে তাকে ১ কোটি টাকা পুরষ্কার দেয়া হবে ।

এবং ৫. সকল ব্যাবসায়ী ভাইবোন ও সাধারণ মানুষদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং সর্বোপরি ব্যাবসায়ীদের সততা বোধ জাগ্রত করতে হবে বিভিন্ন টিভি এডের মাধ্যমে ।

এ বছর আমি তরমুজ খাওয়া বাদ দিয়েছি । সামনের বছর উপরের ১ নং উপদেশ গ্রহন করব বলে মনস্থির করেছি । কেমিক্যাল মুক্ত ফল ও খাবার খান, সবাই ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন ।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা আত্ম উন্নয়ন গবেষণামূলক প্রকাশনা বিজ্ঞান সৃজনশীল প্রকাশনা

জ্ঞানদীপন (Enlightenment) কি? এই প্রশ্নের উত্তর (পর্ব – ২)

—————— মূলঃ ইমানুয়েল কান্ট
(কোনিগ্সবার্গ, প্রুশিয়া, ৩০শে সেপ্টেম্বর, ১৭৮৪ সাল)

——————অনুবাদঃ ডঃ রমিত আজাদ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর থেকে)

১ম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন ।

কোন একটি বিশেষ পদক্ষেপ আইন হিসাবে গৃহিত হবে কি না তা পরীক্ষা করতে চাইলে, আমাদের শুধু জনতাকে (বা কোন জাতিকে) প্রশ্ন করতে হবে তারা ঐ আইনটি নিজের উপর প্রয়োগ করতে পারবে কিনা? ঐ আইনটিকে একটি সংক্ষিপ্ত সময়কালের জন্য চালু করা যেতে পারে, যতক্ষণ পর্যন্ত না শ্রেয়তর শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত না হয়। এর মানে, প্রত্যেক নাগরিককে, প্রথমতঃ ধর্মযাজকদেরকে স্বাধীনতা দিতে হবে যাতে তারা সর্বসমক্ষে মন্তব্য করতে পারেন, অর্থাৎ নিজের লেখায় তারা যেন প্রচলিত প্রতিষ্ঠানগুলির সমালোচনা করতে পারেন। এদিকে নব্য প্রতিষ্ঠিত শৃঙ্খলাগুলো (আইনগুলো) ভাল থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না জনতার দৃষ্টিভঙ্গির উন্নয়ন হয় ও প্রমাণ করে, যেখানে সর্বসম্মতিক্রমে রাজমুকুটের কাছে কোন প্রস্তাব দেবে। এই ঘটনা সেই ধর্মসভাকে নিরাপদ রাখার পথ খুঁজবে যারা একমতে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে বদলাতে চায়, তাদেরকে যারা পুরাতণকে ধরে রাখতে চায়, তাদের বাধা না দিয়ে। কিন্তু কোন একটি স্থায়ী ধর্মীয় সংবিধানের বিষয়ে সম্মত হওয়া একেবারেই অসম্ভব (এমনকি একটি ব্যক্তির একক জীবনকালের জন্যও) যাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়না। কারণ তা মানব জাতির উর্ধ্বঃমুখী প্রগতিকে থমকে দেবে, এবং তা হবে নিষ্ফল ও পরবর্তি প্রজন্মগুলির জন্য ক্ষতিকারক। একজন মানুষ যে বিষয় সম্পর্কে জানা তার কর্তব্য সে বিষয় সম্পর্কে নিজেকে জ্ঞানদীপ্ত করা থেকে সাময়ীকভাবে বিরত রাখতে পারে। কিন্তু জ্ঞানদীপন সম্পুর্ণরূপে বন্ধ রাখা তা সে নিজের জন্যই হোক বা পরবর্তি প্রজন্মের জন্যই হোক, এর অর্থ হবে মানবজাতির পবিত্র অধিকার পদদলিত করা।

কিন্তু কোন জাতি যা নিজের জন্য গ্রহন বা আরোপ করতে পারেনি রাজা তা আরোপ করার অধিকার আরো কম রাখে। যেহেতু তার বিধান কর্তৃত্ব নির্ভর করে জনতার সমন্বিত অভিলাষের উপর। যখন পর্যন্ত রাজা দেখবেন যে সকল সত্য অথবা কল্পিত উন্নয়ন রাজ-আইনের সাথে অসঙ্গতিপুর্ণ নয়, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি তার প্রজাদের তাদের মুক্তির জন্যে যা যা করতে হয় তাই করতে দেবেন, কারণ এতে তার কিছু যায় আসে না।

উনার দায়িত্ব হলো কেউ যেন অন্যের কাজে (মুক্তির জন্য) বাধা দিতে না পারে সেই দিকে লক্ষ্য রাখা। তিনি তার Highness-কেই ক্ষতিগ্রস্ত করবেন যদি তিনি ঐ সকল কাজে নাক গলান, যেখানে তিনি তার রাজসভা (সরকার)-কেই পূর্ণ বিশ্বস্ততার সাথেই এই দায়িত্ব দিয়েছেন। আর যখন তিনি এটা তার নিজস্ব উচ্চ বিবেচনার ভিত্তিতে করেন তখন তিনি ভর্ৎসনা কামাই করেনঃ Caesar non est supra Grammaticos (Caesar is not superior to the grammarian)। এবং নিজের Highness-এর ক্ষতি আরো বেশী হবে তখনই যখন নিজের দেশে জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রীয় আধ্যাত্মিক স্বৈরতন্ত্র’-কে প্রতিষ্ঠা (সমর্থন) করবেন (সেই স্বৈরতন্ত্র যদি হয় কতিপয় নিপীড়কের)।

যদি প্রশ্ন করা হয় যে, “বর্তমানে কি আমরা জ্ঞানদীপ্ত যুগে বসবাস করছি?” উত্তর হবে, “না, তবে আমরা জ্ঞানদীপনের যুগে বসবাস করছি।” এখন যেমন আছে তাতে আমাদের আরো অনেক পথ পারি দিতে হবে, সেই সময় পর্যন্ত পৌঁছাতে যখন মানুষ তার উপলদ্ধিকে আত্মবিশ্বাসের সাথে ব্যবহার করতে পারবে, এবং বাইরের অভিভাবকত্ব (নির্দেশনা) ছাড়াই ধর্মীয় বিষয়ও খুব ভালো বুঝবে। তবে আমাদের কাছে এখন স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে যে, ঐ অভিমুখে মুক্তভাবে কাজ করার পথ এখন পরিষ্কার আছে, এবং স্ব-প্রসূত অপরিপক্কতা থেকে বেরিয়ে এসে জ্ঞানদীপ্ত হওয়ার বাধাগুলো ধীরে ধীরে কমে আসছে। এই হিসাবে বর্তমান যুগ জ্ঞানদীপনের যুগ, ফ্রেডরিকের শতাব্দী।

যে যুবরাজ জানেনা যে ধর্মীয় বিষয়ে জনতার প্রতি তার কর্তব্য কি, কিন্তু জনতাকে সে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে, এইরূপে সেই যুবরাজ যদি গৌরাবান্বিত ধর্মীয় সহনশীলতার খেতাব ফিরিয়ে দেয়, সেই যুবরাজই জ্ঞানদীপ্ত। সেই যুবরাজই বর্তমান জনতা ও তাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের কৃতজ্ঞতা পাওয়ার যোগ্য, কারণ তিনিই মানবজাতিকে অপরিপক্কতা থেকে মুক্তি দিয়েছেন। এবং তিনিই সকল মানুষকে স্বাধীনতা ও সুযোগ দিয়েছেন তাদের নিজ নিজ বুদ্ধিকে (যুক্তিকে) স্ববিবেকে ব্যবহার করার। এমন রাষ্ট্রনায়কের দেশে ধর্মযাজকরা নিজ ধর্মীয় কর্তব্যের কোন ক্ষতিসাধন না করেই শিক্ষিত মানুষের মত নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গী ও মতামত প্রকাশ্যে ব্যক্ত করতে পারেন, যদি সেটা কোন না কোন ভাবে অর্থডক্স ডকট্রাইন থেকে পৃথক পৃথক হয়েও থাকে। এবং একইভাবে অন্যেরাও মত প্রকাশ করতে পারে, যারা কোন প্রকার পেশাগত কর্তব্যের দ্বারা শৃঙ্খলিত নয়। স্বাধীনতা (Freedom)-র এই স্পিরিট বাইরের দেশগুলোতেও কাজ করতে শুরু করেছে, এমনকি সে সমস্ত দেশেও যেখানে তাদের বহিঃবাধাসমূহের সাথে সংগ্রাম করতে হচ্ছে (এই বাধাসমুহ সেই দেশগুলোর সরকার কর্তৃকই আরোপিত)। ঐ সরকারকে বুঝতে হবে যে, তাদের সামনেই এমন উদাহরণ আছে যে, ঐ জাতীয় ফ্রীডমে জনতার ঐক্য বা নিরাপত্তা বিপন্ন হওয়া কোন কারণই নেই। জনতা নিজেরাই অজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষমতা রাখে, যদিনা কেউ জোরপূর্বক (বা কৌশলে) তাদেরকে ঐ অজ্ঞতায় ধরে রাখে।

আমি জ্ঞানদীপনের ফোকাল পয়েন্ট (Focal point) হিসাবে ধর্মের বিষয়গুলোকে চিত্রিত করেছি, অর্থাৎ স্ব-প্রসুত অপরিপক্কতা থেকে মানুষের বেরিয়ে আসা। এটা প্রথমত এই কারণে যে, শিল্পকলা ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আমাদের শাসকদের তাদের প্রজাদের উপর অভিভাবকত্বের ভূমিকার উপর কিছু অনুমান করার আগ্রহ নেই। দ্বিতীয়তঃ ধর্মের ক্ষেত্রে অপরিপক্কতা শুধু অনিষ্টকারীই নয়, আবমাননাকরও। কিন্তু যে রাষ্ট্রপ্রধান ফ্রীডমকে আনুকুল্য দিলেন শিল্পকলায়, বিজ্ঞানে এমনকি আরো অন্যান্য বিষয়ে, যেহেতু তিনি বুঝতে পারলেন যে এতে কোন ক্ষতি নাই। এমনকি তার (রাষ্ট্রপ্রধানের) ব্যবস্থাপনায়ও কোন ক্ষতি হবেনা, যদি তিনিতার প্রজাদের নিজস্ব যুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করার সুযোগ দেন, এবং জনগণ যদি আইন ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের বিষয়ে খোলাখুলি চিন্তাভাবনা করতে শুরু করেন এবং বর্তমান চলমান আইনব্যবস্থাপনার প্রকাশ্য সমালোচনাও করেন। আমাদের সামনে এমন চমৎকার উদাহরণ রয়েছে, যেখানে একজন রাজাও আমরা যাকে সশ্রদ্ধ প্রশংসা করতে পারবো এমন গুনাগুন অর্জন করতে পারেননি। কিন্তু একজন শাসক যিনি নিজেই জ্ঞানদীপ্ত এবং যার কোন জুজুর (ভুতের) ভয় নাই, এবং যার হাতে রয়েছে একটি সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী যারা জনতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে, এবং তাই বলতে পারবে যা বলার সাহস কোন প্রজাতন্ত্রের হয়নিঃ “তর্ক করো, যে কোন বিষয়ে, যত খুশি পারো, কিন্তু মান্য করো।’

এটি মানব কর্মের একটি অপ্রত্যাশিত প্যটার্ন আমাদের সামনে উন্মোচিত করে (এবং আমরা যখন তাদেরকে সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করবো) তখন মনে হবে যে তারা কূটাভাসিক (paradoxical)। উচ্চ মাত্রার নাগরিক স্বাধীনতা (civil freedom) অধিকতর সুবিধাজনক বুদ্ধিগত স্বাধীনতা (intellectual freedom)-র চাইতে, যদিও তা অনতিক্রম্য বাধা সৃষ্টি করে। বিপরীতক্রমে নিম্নমাত্রার নাগরিক স্বাধীনতা বুদ্ধিগত স্বাধীনতাকে পূর্ণমাত্রায় বিকশিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট প্রসস্ত জায়গা করে দেয়। যেহেতু প্রকৃতি একটি শক্ত খোলসের মধ্যে একটি ভ্রূণ সৃষ্টি করেছে, যার যত্ন সে নিজেই নিচ্ছে, ‘চিন্তার স্বাধীনতার দিকে ঝোঁক ও ডাক’ এই ভ্রূণটিই ক্রিয়া করছে জনতার মানসিকতার উপর, যার গুনে জনতা ধীরে ধীরে তার কর্মের স্বাধীনতায় আরো সক্ষম হয়ে উঠছে। এমনকি এটা সরকারের নীতিমালায়ও প্রভাব ফেলছে, যারা অবশেষে নিজের লাভের জন্যই বুঝতে পেরেছে যে, মানুষকে যন্ত্রের চাইতেও বড় কিছু মনে করে মানুষ হিসাবেই মর্যাদা দিতে হবে।

(সমাপ্ত)

(ইমানুয়েল কান্ট-এর সংক্ষিপ্ত জীবনীঃ প্রখ্যাত জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট ১৭২৪ খ্রিস্টাব্দের ২২ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। কান্টের জন্মস্থান পূর্ব প্রুসিয়ার কোনিগসবের্গে, যা বর্তমানে রাশিয়ার অন্তর্গত ও কালিনিনগ্রাদ নামে পরিচিত। ইউরোপের আলোকিত যুগের শেষ গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক হিসেবে স্বীকৃত তিনি। তার যুক্তি ছিল প্রাকৃতিক বিধির সমন্বয়েই মানুষের উপলব্ধি বিগঠিত, যা নৈতিকতারও উত্স। সমসাময়িক চিন্তাধারায় তার অপরিসীম প্রভাব ছিল, বিশেষ করে অধিবিদ্যা, নীতিশাস্ত্র, রাজনৈতিক দর্শন এবং কান্তিবিদ্যায়। কান্টের একটি প্রধান সৃষ্টি ক্রিটিক অব পিওর রিজনের উদ্দেশ্য ছিল যুক্তিকে অভিজ্ঞতার সঙ্গে একত্রিত করে তার দৃষ্টিতে গতানুগতিক দর্শন এবং অধিবিদ্যার ব্যর্থতাগুলো অতিক্রম করা। বস্তুর বাহ্যিক অভিজ্ঞতার বিষয়টি তিনি অন্তঃসারশূন্য তত্ত্ব হিসেবে দেখতেন এবং এ ধরনের পর্যবেক্ষণের যুগের অবসান আশা করতেন।
কান্টের জন্ম একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে। তার বাবা ছিলেন ঘোড়ার জিনের ব্যবসায়ী।
কান্ট প্রথম একটি পাইটিস্ট স্কুলে লেখাপড়া করেন। ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে তিনি কনিসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। স্কুল জীবনেই তার নিয়মানুবর্তিতা, সময়নিষ্ঠা, মিতব্যয়িতা ও কঠোর পরিশ্রমের অভ্যাস গড়ে ওঠে। ল্যাতিন ও গ্রিক ভাষায় দখলসহ গণিত, ভূগোল ও পদার্থবিদ্যায় ব্যাপক ব্যুত্পত্তি অর্জন করেন। ১৮০৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রুশিয়ার কনিসবার্গে পরলোকগমন করেন তিনি।)

Categories
অনলাইন প্রকাশনা আত্ম উন্নয়ন গবেষণামূলক প্রকাশনা বিজ্ঞান সৃজনশীল প্রকাশনা

জ্ঞানদীপন (Enlightenment) কি? এই প্রশ্নের উত্তর (পর্ব – ১)

—————— মূলঃ ইমানুয়েল কান্ট
(কোনিগ্সবার্গ, প্রুশিয়া, ৩০শে সেপ্টেম্বর, ১৭৮৪ সাল)

——————অনুবাদঃ ডঃ রমিত আজাদ

(খ্যাতিমান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট লিখেছিলেন জার্মান ভাষায়, আমি পড়েছি ইংরেজীতে, সেখান থেকে আবার বাংলায় অনুবাদ করেছি, অর্থাৎ এটি অনুবাদের অনুবাদ। অনুবাদের কাজটা খুব কঠিন, আমি নিজে ভাষাবিদ্যা বা দর্শন কোনটারই এক্সপার্ট নই, তাই নিজেকে এই অনুবাদের যোগ্য মনে করিনা। তারপরেও কাজটি করলাম। মনে হলো অনুবাদটি হওয়া উচিৎ। ইংরেজী Enlightenment শব্দটির অর্থ আলোকায়ন বা জ্ঞানদীপন দুটোই হতে পারে, আমি জ্ঞানদীপনটিই ব্যবহার করলাম। পাঠকদের অনুরোধ করবো অনুবাদের ত্রুটি বা দুর্বলতা পেলে, তা নিজ গুনে ক্ষমা করে সঠিকটি আমাকে জানাবেন আমি সংশোধন করে নেবো।)

(আরেকটি কথাঃ এখানে আমি নিজস্ব কোন মতামত প্রকাশ করিনি, কান্টের লেখাটির অনুবাদ করেছি মাত্র।)

জ্ঞানদীপন হলো মানুষের স্ব-প্রসুত (Self-incurred) অপরিপক্কতা (Immaturity) থেকে বাইরে বেরিয়ে আসা (Emergence), আর অপরিপক্কতা হলো অন্যের অভিভাবকত্ব ছাড়া নিজের উপলদ্ধি (Understanding)-কে ব্যবহার করতে না পারার অক্ষমতা। এই অপরিপক্কতা স্ব-প্রসুত হবে যদি এর কারণ উপলদ্ধির অভাব না হয়ে অন্যের অভিভাবকত্ব ছাড়া তা ব্যবহার করার সমাধান-ক্ষমতা বা সাহসের অভাব থাকে। এইরূপে জ্ঞানদীপনের ব্রত হলো Sapere aude! – নিজের উপলদ্ধিকে ব্যবহার করার পৌরুষ রাখো।

যদিও প্রকৃতি দীর্ঘকাল মানবজাতিকে বহিস্থঃ (Alien) অভিভাবকত্ব থেকে মুক্ত রেখেছিলো, তৎসত্তেও ভীরুতা ও কাপুরুষতার কারণে এক বিশাল সংখ্যক মানুষের দল সানন্দেই অপরিপক্ক থেকে গেলো। ঠিক একই কারণে কোন একটি পক্ষের (গোষ্ঠি, দল, চক্র) পক্ষে অন্যের উপর অভিভাবকত্ব করা খুব সহজ হয়ে গিয়েছে। অপরিপক্ক হওয়া এতই সহজ!

একটি পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেখুনঃ আমার জায়গায় আমার উপলদ্ধির জন্য যদি একটি বই থাকে, আমার বিবেক জাগ্রত করার জন্য যদি একজন আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা থাকেন, আমার দৈনন্দিন খাদ্য তালিকা বেধে দেয়ার জন্যে যদি একজন ডাক্তার থাকেন, ইত্যাদি, ইত্যাদি, তাহলে আমাকে আর কোন কষ্টই করতে হবে না। আমার আর চিন্তা করার কোন প্রয়োজন থাকবে না, যতদিন পর্যন্ত আমি তাদের পারিশ্রমিক দেয়ার সামর্থ্য রাখবো, ততদিন পর্যন্ত আমার পক্ষ হয়ে এই ক্লান্তিকর কাজগুলি তারাই করে যাবেন।

যে সকল অভিভাবকরা দয়াপরবশ হয়ে সুপারভিসনের দায়িত্ব নিয়েছেন, তারা খুব শীগগীরই দেখতে পাবেন যে, মানবজাতির বিশাল অংশটিই (স্ত্রীলোকগণ সহ) পরিপক্ক হওয়াটাকে কেবল কঠিনই মনে করে না, উপরন্তু তাকে অতিমাত্রায় বিপজ্জনকও মনে করে।

এখন এই বিপদ আসলে তত বড় নয়, আদতে কয়েকবার পতনের পর তারা ঠিকই হাটতে শিখবে। কিন্তু এই জাতীয় উদাহরণ সাধারণতঃ ভীতিকর যা তাদের পরবর্তি প্রয়াসগুলো নিতে ভীতির সঞ্চার করবে।

এভাবে প্রত্যেক পৃথক ব্যক্তিসত্তার জন্যে অপরিপক্কতা থেকে বাইরে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে, যা তার দ্বিতীয় প্রকৃতি (second nature)-তে পরিণত হয়েছে। এবং সে এই প্রকৃতি নিয়ে এমনভাবে বড় হয়েছে যে, সাময়িকভাবে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষমতা তার নেই, অর্থাৎ নিজের উপলদ্ধি সে কাজে লাগাতে পারছে না, কারণ এই প্রচেষ্টা করার অনুমতি তাকে কখনোই দেয়া হয়নি।

Dogma ও formula ইত্যাদিই হলো যৌক্তিক ব্যবহারের mechanical instrument, অথবা নিজের প্রকৃতি প্রদত্ত ক্ষমতার ক্ষতিকর অপব্যবহার – যা হলো স্থায়ী অপরিক্কতার বল ও চেইন। যদি কেউ তা ছুঁড়ে ফেলেও দেয়, তারপরেও তার পক্ষে একটি সরু পরিখার উপর দিয়ে লম্ফ দেয়াও খুব অনিশ্চিত হবে, যেহেতু সে এই জাতীয় মুক্ত চলাচলে একেবারেই অনভ্যস্ত। এভাবে খুব অল্প সংখ্যক মানুষই আছেন যারা নিজেদের মস্তিষ্ককে কর্ষণ করে অপরিপক্কতা থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করতে পেরেছেন, এবং সাহসিকতার সাথে ঐ পথে নিরন্তর চলতে পেরেছেন।

এই সম্ভাবনা বেশি, এমনকি প্রায় অনিবার্য্য যে জনতা নিজেই নিজেকে জ্ঞানদীপ্ত করবে, যদি তাকে স্বাধীনতা (freedom) দেয়া হয়। সব সময়ই জনতার মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক অভিভাবক পাওয়া যাবে যারা মুক্তচিন্তা করেন, যারা অপরিপক্কতার জোয়াল কাঁধ থেকে ফেলে দিয়েছেন এবং তারা ব্যক্তি মূল্যায়নের ও তাদের প্রতি সকল মানবের কর্তব্যবোধ সম্পর্কে যৌক্তিক শ্রদ্ধাবোধ-এর স্পিরিটের গুরুত্ব সম্পর্কে প্রচারণা চালাবে এবং জনতাকে মুক্ত চিন্তা করার ডাক দেবে। এটা উল্লেখ্য যে এই জনতা যাদের কাধে একদিন জোয়াল চেপেছিলো তারা ঐ অভিভাবকদেরই কারো কারো দ্বারা (যারা জ্ঞানদীপ্ত হয়নি) প্রয়োজনানুরুপভাবে আন্দোলিত হবে। কুসংস্কার সঞ্চালিত করে দেয়া অত্যন্ত ক্ষতিকর কেননা যারা এটা চালু করেছিলো একসময় এটা তাদের (অথবা তাদের উত্তরপুরুষদের) দিকে প্রতিশোধ হয়ে ফিরে আসতে পারে। এভাবে একটি জনতা জ্ঞানদীপ্ত হতে পারে ধীরে ধীরে। কোন স্বেচ্ছাচারী স্বৈরতন্ত্র ও জুলুমবাজ ক্ষমতালোভী শাসকের দমন-পীড়নের যুগের ইতি টানতে পারে একটি বিপ্লব। তবে বিপ্লবের মাধ্যমে মানুষের চিন্তাধারায় একটা সত্যিকারের সংস্কার আসবে না। বরং তা জনতার যে বিশাল অংশটি চিন্তাভাবনা করেনা তাদের নিয়ন্ত্রণের জন্যে প্রতিস্থাপিত কিছু নতুন কুসংস্কারের জন্ম দেবে।

জ্ঞানদীপনের জন্য মূলত যা দরকার তা হলো স্বাধীনতা (freedom)। এবং কারো বুদ্ধিকে (যুক্তিকে) সর্বজনের ব্যবহারযোগ্য করে তোলার স্বাধীনতাটি হলো সবচাইতে অক্ষতিকর স্বাধীনতা। কিন্তু আমার চতুর্দিকে আমি কেবলই চিৎকার শুনতে পাইঃ ” তর্ক করোনা! সেনাপতি বলেন, “তর্ক করোনা, প্যারেডে মিলো”, কর-কর্মকর্তা বলেন, “তর্ক করোনা, কর দাও”, ধর্মযাজক বলেন, “তর্ক করোনা, বিশ্বাস করো!” (কেবল একজন শাসক আছেন, যিনি বলেন, তর্ক করো যত খুশি, যা নিয়ে খুশি, কিন্তু মান্য করো!)

এই সব কিছুর মানে হলো সর্বক্ষেত্রে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোন ধরণের নিষেধাজ্ঞা জ্ঞানদীপনকে প্রতিরোধ করে, কোন ধরণের নিষেধাজ্ঞা জ্ঞানদীপনকে নিবারণ না করে তাকে উত্তরণ করে? আমি উত্তর দিচ্ছিঃ সর্বজনের মধ্যে মানুষের বুদ্ধির (যুক্তির) ব্যবহার (public use of reason) উন্মুক্ত হওয়া উচিৎ, এবং সেটাই মানুষকে জ্ঞানদীপ্ত করতে পারবে। কিন্তু বুদ্ধির (যুক্তির) ব্যক্তিগত ব্যবহার (private use of reason) প্রায়শঃই নিষিদ্ধ হওয়া উচিৎ। যাতে জ্ঞানদীপনের উন্নয়ন বাধাপ্রাপ্ত না হয়। সর্বজনের মধ্যে মানুষের বুদ্ধির (যুক্তির) ব্যবহার (public use of reason) বলতে আমি বুঝি যা যেকোন শিক্ষিত ব্যক্তি তৈরী করতে পারে যেকোন পাঠক মানবের জন্য। আর বুদ্ধির (যুক্তির) ব্যক্তিগত ব্যবহার (private use of reason) মানে হলো যা কোন একজন ব্যক্তি বাস্তবায়ন করে থাকেন কোন একটি দফতর বা মহলের স্বার্থে কারণ তিনি ঐ মহলের বিশ্বস্ত।

এখন কিছু বিষয় আছে যা জনরাষ্ট্রের (commonwealth)-এর স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, সেখানে আমাদের এমন কোন মেকানিজম খুঁজে বের করতে হবে যেখানে কমনওয়েলথ-এর কিছু সদস্যের আচরণ হবে নিষ্ক্রিয়, যেন, কোন কৃত্রিম কমন চুক্তির দ্বারা তারা সরকার কর্তৃক নিযুক্ত হতে পারে জনতার স্বার্থে (অথবা নিদেনপক্ষে তাদের অকার্যকর করা থেকে নিরস্ত করতে পারবে)

এটা নিঃসন্দেহে অনুমোদনযোগ্য নয় কতগুলি বিষয়ে তর্ক করা যেমনঃ আনুগত্য আবশ্যক। যে পর্যন্ত কোন স্বতন্ত্র ব্যক্তি যে ঐ মেশিনের অংশ হিসাবে ক্রিয়ারত এবং নিজেকে ঐ কমনওয়েলথ-এর একজন পূর্ণাঙ্গ সদস্য বলে মনে করে এমনকি নিজেকে বিশ্বজনীন (Cosmopolitan) সদস্য মনে করে এবং একজন শিক্ষিত মানুষ (A man of learning) হিসাবে তিনি তার লেখার মাধ্যমে জনতাকে উদ্দেশ্য করে, সত্যিকার অর্থে, তিনি পারবেন তার নিয়োগ কর্তার ক্ষতি না করেও তার সাথে দ্বিমত পোষণ করতে। কিন্তু ঐ অফিসার যদি নিয়োগ কর্তার কাছ থেকে আদেশ পাওয়ার পরও ঐ আদেশের যথাযোগ্যতা বা সঙ্গতি সম্পর্কে খোলামেলা বিতর্কে উপনিত হয়, এটা হবে ক্ষতিকর। তাকে আনুগত্যই প্রকাশ করতে হবে। কিন্ত একজন শিক্ষিত মানুষ হিসাবে সামরিক পেশার ত্রুটিগুলি সম্পর্কে মন্তব্য করা থেকে তিনি বিরত থাকতে পারেন না। আর সেই ত্রুটিগুলো বিচারের জন্য জনসমক্ষে তুলে ধরাও বন্ধ করতে পারেনা।

একজন নাগরিক তার উপর আরোপিত কর দিতে অস্বীকার করতে পারেন না। এই জাতীয় কর আরোপের স্ব-অনুমেয় সমালোচনা যিনি করবেন, জুলুম হিসাবে তার শাস্তি হতে পারে, যা আবার গণ-অবাধ্যতার জন্ম দেবে। আবার সেই নাগরিক তার নাগরিক দায়িত্ব লঙ্ঘন করে না যদি, একজন শিক্ষিত মানুষ হিসাবে তিনি এই অর্থনৈতিক অবিচারের বিরুদ্ধে তার মতামত জনসমক্ষে উপস্থাপন করেন। একইভাবে একজন গীর্জার পাদ্রী তার ধর্মসভা ও ছাত্রদেরকে ঐ চার্চের ডকট্রাইন অনুযায়ী পথপ্রদর্শনা দিতেই বাধ্য থাকেন, যেহেতু ঐ শর্ত অনুযায়ীই তাকে চাকুরীতে নিয়োগ দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু একজন পন্ডিত ব্যক্তি হিসাবে ডকট্রাইনগুলোর ত্রুটি সম্পর্কে তার নিজস্ব চিন্তাধারা জনসমক্ষে তুলে ধরতে ধর্মীয় ও যাজকীয় বিষয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো ব্যবস্থার প্রস্তাব করতে একদিকে বাধ্য আরেকদিকে সম্পূর্ণ স্বাধীন। আর এতে বিবেকের দংশনে দংশিত হওয়ার কিছু নাই। আমি; অথবা তিনি গীর্জার একজন সাধক হিসাবে যা শিখান তা হলো অন্য কেউ তাকে যা শিখানোর জন্য প্রেসক্রাইব করে দিয়েছে। তিনি নিজ বিবেচনায় যা বোঝেন তা শিখানোর ক্ষমতা বা স্বাধীনতা তাকে দেয়া হয়নি। তিনি বলবেন আমাদের গীর্জা এই এই বিষয় শিক্ষা দেয়, এবং এর পিছনে এই হলো আমাদের যুক্তি। তারপর তিনি তার ধর্মসভার জন্য এক্সট্রাক্ট করেন যতদূর সম্ভব ব্যবহারিক অর্ঘ ঐ অবস্থান থেকে যাকে সে দন্ডাজ্ঞা দেবেনা, কিন্তু তা প্রচার করতে সে বাধ্য, যেহেতু একথা কেউ হলপ করে বলতে পারবে না যে তার মধ্যে সত্য নিহিত নাই। যে কোন অবস্থায়ই ধর্মের সারমর্মের বিরোধীতা করে এমন কিছু ঐ ডকট্রাইনগুলোতে উপস্থিত নাই। যদি তিনি তেমন মনেই করতেন তবে তিনি তার বিবেকের দংশনে ঐ দায়িত্ব পালন করতে পারতেন না ও অচিরেই ইস্তফা দিতেন। এইভাবে কোন ধর্মযাজকের জ্ঞানবুদ্ধি যা ধর্মসভার সামনে ব্যবহৃত হয় তা স্বকীয় (private), যেহেতু ধর্মসভা সে যত বড়ই হোক না কেন, একটি ঘরোয়া সমাবেশের বেশি কিছু নয়। এই দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে, একজন ধর্মযাজক হিসাবে তিনি মোটেও স্বাধীন নন, বিপরীতপক্ষে একজন জ্ঞানী ব্যক্তি হিসাবে যিনি জনতাকে সম্ভাষণ করে লেখা লিখছেন এমন ধর্মযাজক তার যুক্তির Public use করছেন, এবং নিজের মনের কথা বলছেন। আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে তিনি সমাজের অভিভাবক হবেন, তিনি অপরিপক্ক (immature) হবেন এটা একেবারেই এ্যাবসার্ড।

যাজকদের একটি সমাজ, উদাহরণস্বরূপ যাজকীয় সন্মেলন (Synod ) অথবা পূজনীয় প্রেসবিটরী (Presbytery), (ডাচরা যেমন বলে থাকে) সদস্যদের উপর সর্বকালীন অভিভাবকত্ব পেতে এবং তাদের মাধ্যমে পুরো জনগণের উপর অভিভাবকত্ব পেতে, কিছু অসংশোধনীয় ডকট্রাইন পালন করতে বাধ্য থাকবেন কি?

আমার উত্তরঃ এটা অসম্ভব, এই জাতীয় চুক্তি স্বাক্ষর মানবজাতিকে পরবর্তিকালীন জ্ঞানদীপন থেকে বিরত রাখে, যা একেবারেই অকার্যকর, যদি তা সর্বচ্চো ক্ষমতার দ্বারা ও অনুমোদিত হয় বা কোন জাঁকজমকপূর্ণ শান্তিচুক্তির মাধ্যমেও গৃহিত হয়। একটি যুগ আরেকটি যুগকে এমন অবস্থানে নিতে বাধ্য করতে পারেনা যে, সে তার জ্ঞানকে সংশোধন ও প্রসারিত করতে পারবে না, বিশেষ করে সেই বিষয়ে যেখানে জ্ঞানদীপনের পথে অগ্রসর হওয়া যাবেনা। এটা হবে মানব প্রকৃতির বিরুদ্ধে একটা অপরাধ, যার মূল প্রথমত নিহিত রয়েছে এই প্রগতীতে। পরবর্তি প্রজন্মের পূর্ণ অধিকার রয়েছে এই জাতীয় সিদ্ধান্তগুলোকে খারিজ করার ও অবৈধ ঘোষণা করার।

(চলবে)

(ইমানুয়েল কান্ট-এর সংক্ষিপ্ত জীবনীঃ প্রখ্যাত জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট ১৭২৪ খ্রিস্টাব্দের ২২ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। কান্টের জন্মস্থান পূর্ব প্রুসিয়ার কোনিগসবের্গে, যা বর্তমানে রাশিয়ার অন্তর্গত ও কালিনিনগ্রাদ নামে পরিচিত। ইউরোপের জ্ঞানদীপনের যুগের শেষ গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক হিসেবে স্বীকৃত তিনি। তার যুক্তি ছিল প্রাকৃতিক বিধির সমন্বয়েই মানুষের উপলব্ধি বিগঠিত, যা নৈতিকতারও উৎস। সমসাময়িক চিন্তাধারায় তার অপরিসীম প্রভাব ছিল, বিশেষ করে অধিবিদ্যা, নীতিশাস্ত্র, রাজনৈতিক দর্শন এবং কান্তিবিদ্যায়। কান্টের একটি প্রধান সৃষ্টি ‘ক্রিটিক অব পিওর রিজন’-এর উদ্দেশ্য ছিল যুক্তিকে অভিজ্ঞতার সঙ্গে একত্রিত করে তার দৃষ্টিতে গতানুগতিক দর্শন এবং অধিবিদ্যার ব্যর্থতাগুলো অতিক্রম করা। বস্তুর বাহ্যিক অভিজ্ঞতার বিষয়টি তিনি অন্তঃসারশূন্য তত্ত্ব হিসেবে দেখতেন এবং এ ধরনের পর্যবেক্ষণের যুগের অবসান আশা করতেন। কান্টের জন্ম একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে। তার বাবা ছিলেন ঘোড়ার জিনের ব্যবসায়ী। কান্ট প্রথম একটি পাইটিস্ট স্কুলে লেখাপড়া করেন। ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে তিনি কনিসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। স্কুল জীবনেই তার নিয়মানুবর্তিতা, সময়নিষ্ঠা, মিতব্যয়িতা ও কঠোর পরিশ্রমের অভ্যাস গড়ে ওঠে। ল্যাতিন ও গ্রিক ভাষায় দখলসহ গণিত, ভূগোল ও পদার্থবিদ্যায় ব্যাপক ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। ১৮০৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি প্রুশিয়ার কনিসবার্গে পরলোকগমন করেন তিনি।)

২য় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন ।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গবেষণামূলক প্রকাশনা বিনোদন ভালবাসা/প্রণয়লীলা সৃজনশীল প্রকাশনা

যে জেলার মেয়ে বিয়ের জন্য ভালো

১) যশোর-খুলনার মেয়েরা অনেক সুন্দরী। যশোরের মেয়েরা কুটনামিতে খুব ওস্তাদ হয়, প্রচুর মিথ্যা কথা বলে। আর শ্বশুরবাড়ীর লোকজন সহ্যই করতে পারেনা। পরকিয়াতেও ওস্তাদ যশোরের মেয়েরা। (আংশিক ব্লগারদের মতামত।)
২) চট্টগ্রামের মেয়েরা বাইরের জেলাদের ছেলেদের ব্যাপারে আগ্রহী নয়। কিছুটা কনজারভেটিভ।

৩) সিলেটী মেয়েরা পর্দানশীল বেশী। সিলেটি মেয়েরা সাধারণত বাইরের জেলা তে বিয়ে করতে যায় না। আত্মীয়দের মধ্যে থাকতে পছন্দ করে। সিলেটী মেয়েরা ছ্যাচড়া। (আংশিক ব্লগারের মতামত।)

) পুরার ঢাকার মেয়েরা খুবই দিলখোশ। ঢাকার অন্য এলাকার মেয়েরা জগাখিচুরি

৫) খুলনার মেয়েরা স্বামী অন্ত প্রাণ। খুলনার মেয়েরা নাকি ফ্যামিলির ব্যাপারে একটু সিরিয়াস টাইপের হয় ৷(আংশিক ব্লগারের মতামত।)

৬) উত্তর বঙের মেয়েরা কোমলমতী হয় এবং বেকুব ও আনক্রিয়েটিভ ।(আংশিক ব্লগারের মতামত।)

৭) বরিশালের মেয়েরা একটু ঝগড়াটে, ভালো রাঁধুনী, ন্যাচালার সুন্দরী , সংসারী এবং স্বামীভক্ত। কিন্তু বরিশাল থেকে সাবধান, যতই সুন্দর হোক, জীবন বরবাদ করে দেবে। (ব্লগারদের মতামত।)

৮) ময়মনসিংহের মেয়েরা একটু বোকাসোকা, কেউবা বদমাইশ।কেউ কেউ স্মার্ট এবং ডেয়ারিং (আংশিক ব্লগারের মতামত।)

৯) সিরাজগন্জের মেয়েরা ভালো, যদি শান্তিতে ঘর করতে চান। (ব্লগারদের মতামত।)

১০) বগুড়ার মেয়েরা ঝাল। (ব্লগারদের মতামত।)

১১) কুষ্টিয়ার মেয়েরা অহংকারী, কিন্তু সেই তুলনায় গুনবতী নয়। মননশীল, রুচিসম্পন্ন। যাকে ভালবাসে সত্যিকারের ভালবাসে, কোন রাখঢাক নাই।

১২) বি বাড়িয়ার মেয়েরা পলটিবাজ কিন্তু পতিভক্ত ও সংসারী (ব্লগারদের মতামত।)

১৩)  রাজশাহীর মেয়েরা একটু লুজ । (ব্লগারদের মতামত।)

১৪) পাবনার মেয়েরা কুটনা হয়ে থাকে।(ব্লগারদের মতামত।)

১৫) জামালপুরের মেয়েরা বেশি স্মার্ট এবং ডেয়ারিং।এই জেলায় সুন্দরীদের ঘনত্ব বেশি।(ব্লগারদের মতামত।)

১৬) নোয়াখালী: বাবা-মা অথবা আত্মীয়-স্বজনদেরকে ভুলতে চাইলে নোয়াখালীর মেয়েদের তুলনা নেই । বেশির ভাগ মেয়ে কারো কথার নিছে থাকতে চায়না । এরা চরম কুটনা হয়। তবে তারা শশুড়বাড়ির জন্য করতে চাইলে নিজের সব দিয়ে করে, না করলে নাই!(ব্লগারদের মতামত।)

১৭) ফরিদপুরের মেয়েরা চোরা স্বভাবের।ওদের মত কুটিল প্যাচের মানুষ খুব কমই হয়।(ব্লগারদের মতামত।)

১৮) কুমিল্লার মেয়েরা শ্বশুরবাড়ির মানুষদের পছন্দ করেনা।কুমিল্লার মেয়েরা সুন্দরী, অনেক দায়িত্বশীল, তবে সংসারে প্রভাব বিস্তার করতে বেশি পছন্দ করে।(ব্লগারদের মতামত।)

১৯) টাংগাইলের মেয়েরা খুব ভাল হয়, বান্ধুবী হিসেবেতো বটেই, পাত্রী হিসেবেও। .এ অঞ্চলের মাইয়াগুলো দুনিয়ার বজ্জাত… তবে বান্ধবী হিসাবে ভালু..একটু দিলখোলা টাইপের (ব্লগারদের মতামত।)

২০) মাদারিপুরের মেয়েরা খুবই কিউট, খুব খরচে, জামাইয়ের পকেট ফাকা করতে উস্তাদ।(ব্লগারদের মতামত।)

২১) চাঁদপুরের মেয়েরা মানুষ হিসেবে খুবই ভালো, অথিতিপরায়াণ।তাদের সরল ভালবাসায় আপনি মুগ্ধ হবেন। আর শ্বশুরবাড়ী চাঁদপুর হলে ইলিশ নিয়ে চিন্তা করতে হবে না । আর আসল কথা হলো চাঁদপুরে লোকের মাথায় প্যাচ জিলাপীর থেকেও বেশী। চাদপুরের মেয়েরা ছেলে ঘুরাতে ওস্তাদ। (ব্লগারদের মতামত।)

২২) দিনাজপুরের মেয়েরা যে খুব সুন্দরী হয়।(ব্লগারদের মতামত।)

২৩) চাপাই নবাবগঞ্জের মানুষ সরল মনের অধিকারী। (ব্লগারদের মতামত।)

২৪) গাজীপুরের মেয়েরা খুব ই ভাল, মিশুক এবং রসিক ।এখাঙ্কার মেয়েরা জেদী, লাজুক ,মিডিয়াম সুন্দর, মিডিয়াম স্মার্ট এবং সংস্কৃতি মনা।(ব্লগারদের মতামত।)

২৫)  নরসিংদীর মেয়েরা উড়াল পঙ্খীর মতো তাদের মন আর চলার ঢং । (ব্লগারদের মতামত।)

২৬) কিশোরগঞ্জের মেয়েরা একটু বোকাসোকা আর ডেয়ারিং প্রকৃতির। মিশুক, বন্ধুপাগল বা বন্ধুপ্রেমী হয়। স্বামী ভক্ত হয় তবে এমনও হতে পারে যে সারাজীবন বউয়ের দ্বারা নিগৃহীত হওয়া; অসম্ভব কিছু না।

আপনাদের মতামত থাকলে কমেন্ট অপশনে লিখতে পারেন…

Categories
অনলাইন প্রকাশনা ইতিহাস কাজী নজরুল ইসলাম গবেষণামূলক প্রকাশনা জীবনী ও স্মৃতিকথা সৃজনশীল প্রকাশনা

কাজী নজরুল ইসলাম এর ধর্ম বিশ্বাস

দেশে-বিদেশে

কাজী নজরুল ইসলাম এর ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। নজরুল অসংখ্য হামদ, নাত লিখেছেন; সাথে সাথে হিন্দু ধর্ম নিয়ে অসংখ্য কবিতা, গান লিখেছেন। তাই অনেকে সন্দেহ পোষণ করেন, উনি প্রকৃতই হিন্দু ধর্ম বিশ্বাস করতেন কিনা? নিজেরা ব্যাখ্যা দেবার আগে সবচেয়ে ভালো হয় নজরুল এ বিষয়ে কী বলেছেন সেটা পর্যালোচনা করা। কেউ কোনো সাহিত্য রচনা করে থাকলে সে বিষয়ে তিনি কি বলেছেন সেই ব্যাখ্যাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য। সেই ব্যাখ্যার দ্বারা যদি প্রমাণিত হয় সেটা ইসলাম-বিরোধী তাহলে অবশ্যই সেটা ইসলাম-বিরোধী।

কালী পূজা

অনেকে অভিযোগ করে থাকেন নজরুল কালি পূজা করেছেন এবং অভিযোগটা আসে মুসলিমদের থেকেই। ‘অতীত দিনের স্মৃতি’ বই এর ৪২ পৃষ্ঠায় লেখক নিতাই ঘটক উল্লেখ করেছেন, “সীতানাথ রোডে থাকাকালীন কবিকে হিন্দুশাস্ত্র বিশেষভাবে চর্চা করতে দেখেছি। অনেকে বলেন কালীমূর্তি নিয়ে কবি মত্ত হয়েছিলেন- একথা ঠিক নয়। আমি কখনো তাঁকে এভাবে দেখিনি।” হিন্দুরাই বলছেন নজরুল পূজা করেননি, যদিও সেটা হয়ে থাকলে হিন্দুদেরই খুশী হবার কথা ছিল বেশী। এখানে একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য; তা হোলো, হিন্দুধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করা আর কালীপূজা করা এক জিনিস নয়।

হিন্দু ধর্ম বিষয়ক লেখা

এখন আমরা দেখব নজরুল হিন্দু ধর্ম বিষয়ক কবিতা, গান কেনো লিখেছিলেন। নজরুল বলেছেন, “আমি হিন্দু-মুসলমানের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী। তাই তাদের কুসংস্কারে আঘাত হানার জন্যই মুসলমানী শব্দ ব্যবহার করি, বা হিন্দু দেব-দেবীর নাম নিই। অবশ্য এর জন্য অনেক জায়গায় আমার সৌন্দর্যের হানি হয়েছে। তবু আমি জেনে শুনেই তা করেছি।” [শব্দ-ধানুকী নজরুল ইসলাম, শাহাবুদ্দিন আহমদ, পৃষ্ঠা ২৩৬,২৩৭]

এখানে নজরুল স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন হিন্দু মুসলমানের মিলনের জন্য তিনি এ কাজ করেছেন। তখনকার রাজনৈতিক আবহাওয়া সম্বন্ধে যাদের ধারণা আছে তারা জানেন কি প্রচণ্ড হিন্দু মুসলিম বিরোধ তখন বিরাজমান ছিল।

১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ই ডিসেম্বর রবিবার কলিকাতা এলবার্ট হলে বাংলার হিন্দু-মুসলমানের পক্ষ থেকে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বিপুল সমারোহ ও আন্তরিকতা সহকারে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। সেখানে তিনি বলেন, “কেউ বলেন, আমার বাণী যবন, কেউ বলেন, কাফের। আমি বলি ও দুটোর কিছুই নয়। আমি শুধুমাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি, গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি। [নজরুল রচনাবলী – ৮, পৃষ্ঠা ৩, ৫]

ধর্মবিশ্বাস

কেউ হয়ত বলবেন, হিন্দু মুসলিম এর মিলনের জন্য উনি না হয় এমন লিখেছেন, কিন্তু এতে প্রমাণিত হয়না যে তিনি ইসলাম ধর্ম বিশ্বাস করতেন। হ্যাঁ কথা ঠিক। এর উত্তর নজরুল দিয়েছেন তাঁর ‘আমার লীগ কংগ্রেস’ প্রবন্ধের ৬১ পৃষ্ঠায় “আমার আল্লাহ নিত্য-পূর্ণ -পরম- অভেদ, নিত্য পরম-প্রেমময়, নিত্য সর্বদ্বন্দ্বাতীত। ‘ইসলাম’ ধর্ম এসেছে পৃথিবীতে পূর্ণ শান্তি সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে – কোরান মজিদে এই মাহাবাণীই উত্থিত হয়েছে। ···এক আল্লাহ ছাড়া আমার কেউ প্রভূ নাই। তাঁর আদেশ পালন করাই আমার একমাত্র মানবধর্ম। আল্লাহ লা-শরিক, একমেবাদ্বিতীয়ম। আল্লাহ আমার প্রভু, রসূলের আমি উম্মত, আল-কোরআন আমার পথ-প্রদর্শক। আমার কবিতা যাঁরা পড়ছেন, তাঁরাই সাক্ষী: আমি মুসলিমকে সঙ্ঘবদ্ধ করার জন্য তাদের জড়ত্ব, আলস্য, কর্মবিমূখতা, ক্লৈব্য, অবিশ্বাস দূর করার জন্য আজীবন চেষ্টা করেছি।”

১৯৪০ সালে কলিকাতায় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতিরি ঈদ-সম্মেলনে প্রদত্ত সভাপতির অভিভাষণ নজরুল বলেছিলেন, “ইসলাম জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম বলে সকলের শ্রদ্ধা অর্জন করতে পেরেছে।” [নজরুল রচনাবলী – (৭) পৃষ্ঠা ৩৩]

এই লেখার মাধ্যমে নজরুল নিজেকে মুসলমান হিসেবে প্রকাশ করেছেন।

ইসলামের পক্ষে কলম পরিচালনা করা

মৌলভী তরিকুল আলম কাগজে এক প্রবন্ধ লিখে বললেন কোরবানীতে অকারণে পশু হত্যা করা হয়; এমন ভয়াবহ রক্তপাতের কোনো মানে নাই। নজরুল তার জওয়াবে লিখলেন ‘কোরবানী’ কবিতা। তাতে তিনি বললেন-

ওরে, হত্যা নয়, এ সত্যগ্রহ শক্তির উদ্বোধন,
দুর্বল ভীরু চুপ রহো, ওহো খামখা ক্ষুদ্ধ মন।
…..এই দিনই মীনা ময়দানে
…..পুত্র স্নেহের গর্দানে
……ছুরি হেনে খুন ক্ষরিয়ে নে
রেখেছে আব্বা ইবরাহীম সে আপনা রুদ্র পণ,
ছি,ছি, কেঁপো না ক্ষুদ্র মন।
[নজরুল স্মৃতিচারণ, নজরুল একাডেমী পৃষ্ঠা ৪৩৯ ]

ইসলামের বিপক্ষে আক্রমণ হলে সেটার প্রতিবাদস্বরূপ নজরুল কবিতা লিখেছিলেন। ব্যাপারটা বিস্ময়ের বৈকি। যে কবিকে “কাফের” ফতোয়া দেয়া হয়েছে তিনি-ই কিনা ইসলামের পক্ষে কলম ধরেছেন!!!

মুসলমানের সমালোচনা করে কবিতা লিখা

আরো একটি অভিযোগ করা হয়, সেটা হোলো নজরুল আলেমদের সমালোচনা করেছেন, যেমন:

মৌ-লোভী যত মোলভী আর মোল্লারা কন হাত নেড়ে
দেব-দেবী নাম মুখে আনে সবে তাও পাজীটার যাত মেড়ে।

এখানে মৌলভীদের নজরুল “মৌ লোভী” বলেছেন। যারা এতে অসন্তুষ্ট তাদের এই কবিতাটা হয়ত নজরে পড়েনি:

শিক্ষা দিয়ে দীক্ষা দিয়ে
…. ঢাকেন মোদের সকল আয়েব
পাক কদমে সালাম জানাই
….নবীর নায়েব, মৌলভী সাহেব।

এখানে মৌলভী সাহেবদের নজরুল সালাম জানিয়েছেন। দুটোর মধ্যে আসলে কোনো বিরোধ নেই। বর্তমান সমাজে এটাই বাস্তব। আলেমদের মধ্যেও ভালো-খারাপ দু-ধরণের পরিস্হিতি বিদ্যমান। দুটোই নজরুল ফুটিয়ে তুলেছেন। আর মুসলমানদের দোষ-ত্রুটি থাকলে সেটা বলার মধ্যে দোষের কিছু নেই। ইব্রাহিম খাঁ-র চিঠির জবাবে নজরুল সেটাই বলেছেন, “যাঁরা মনে করেন-আমি ইসলামের বিরুদ্ধবাদী বা তার সত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছি, তাঁরা অনর্থক এ ভুল করেন। ইসলামের নামে যে সব কুসংস্কার মিথ্যা আবর্জনা স্তুপীকৃত হয়ে উঠেছে তাকে ইসলাম বলে না মানা কি ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযান? এ ভুল যাঁরা করেন, তাঁরা যেন আমার লেখাগুলো মন দিয়ে পড়েন দয়া করে-এ ছাড়া আমার আর কি বলবার থাকতে পারে?” [ইসলাম ও নজরুল ইসলাম, শাহাবুদ্দিন আহমেদ, পৃষ্ঠা ৯৫]

আরো একটি অভিযোগ

অনেকে আরো একটি অভিযোগ করেন, নজরুল প্রথম দিকে হিন্দুদের খুশী করার জন্য হিন্দু ধর্ম নিয়ে কবিতা লিখেছেন, পরবর্তীতে মুসলমানদের খুশী করার জন্য ইসলাম বিষয়ক কবিতা লিখেছেন। বিষয়টি তথ্য বিভ্রাট ছাড়া আর কিছু নয়। নজরুলের প্রথম কাব্যগ্রন্হ অগ্নিবীণা-য় ১২টি কবিতার মধ্যে ৭টি কবিতা ইসলাম-বিষয়ক। নজরুল তাঁর সমগ্র জীবনে ছিলেন অকুতোভয়। জীবনে কখনও তিনি কাউকে খুশী করার জন্য বা কাউকে ভয় করার কারণে সত্য গোপন করেননি। সুতরাং হিন্দুদের খুশী করার জন্য নিজের নীতি বিসর্জন দিবেন এটা চিন্তাই করা যায় না। এখানে আমরা একটি পরিসংখ্যান দিয়ে দেখব নজরুল তাঁর সাহিত্য জীবনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ইসলাম বিষয়ক লেখা লিখেছেন:

** ‘মোসলেম ভারত’-এ প্রকাশিত তাঁর প্রথম কবিতাটি ছিল ‘শাত- ইল আরব’ (মে,১৯২০)
** দ্বিতীয় কবিতা ‘খেয়াপরের তরণী’ (জুলাই ১৯২০)
** ‘কোরবানী’ ১৩২৭-এর ভাদ্রে (আগস্ট, ১৯২০)
** ‘মোহরাম’ ছাপা হয় ১৩২৭-এর আশ্বিনে (সেপ্টেম্বর ১৯২০)
** ১৯২২-এর অক্টোবরে নজরুলের যে ‘অগ্নি-বীণা’ কাব্য প্রকাশিত হয় তার ১২টি কবিতার মধ্যে ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘বিদ্রোহী’, ‘রক্তস্বরধারিণী মা’ আগমনী’, ‘ধূমকেতু’ এই পাঁচটি কবিতা বাদ দিলে দেখা যায় বাকি ৭টি কবিতাই মুসলিম ও ইসলাম সম্পর্কিত। (১৯২২)
** আরবী ছন্দের কবিতা (১৯২৩)
** ১৯২৪-এ প্রকাশিত তাঁর ‘বিষের বাঁশীর প্রথম কবিতা ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজ-দহম’ (আবির্ভাব-তিরোভাব) (১৯২৪)
** খালেদ কবিতা (১৯২৬)
** উমর ফারুক কবিতা সওগাতে প্রকাশিত (১৯২৭)
** জিন্জির কাব্যগ্রন্হ প্রকাশ (১৯২৮)
** রুবাইয়াত ই হাফিজ প্রকাশ (১৯৩০)
** কাব্য আমপারা (১৯৩৩)
** জুলফিকার ইসলামিক কাব্যগ্রন্হ প্রকাশ (১৯৩২)
** মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লে আলা ও যাবি কে মদিনায় নাত এ রসুল প্রকাশ (১৯৩৩)
** তওফীক দাও খোদা ইসলামে নাত এর রসুল প্রকাশ (১৯৩৪)
** মক্তব সাহিত্য প্রকাশ (১৯৩৫)
** ফরিদপুর জালা মুসলিম ছাত্র সম্মিলনীতে “বাংলার মুসলিমকে বাঁচাও” অভিভাষণ পাঠ (১৯৩৬)
** ‘সেই রবিউল আউয়ালের চাদ’ নাত এর রসুল প্রকাশ (১৯৩৭)
** ‘ওরে ও মদিনা বলতে পারিস’ নাত এর রসুল প্রকাশ (১৯৩৮)
** দীওয়ান ই হাফিজ এর ৯টি গজল অনুবাদ এবং নির্ঝর কাব্যগ্রন্হে প্রকাশ (১৯৩৯)
** নতুন চাঁদ (১৯৩৯)
** খোদার রহম চাহ যদি নবিজীরে ধর নাত এর রসুল প্রকাশ (১৯৪০)
** মরুভাস্কর ( অসুস্হ হবার পরে প্রকাশিত ১৯৫০)
** রুবাইয়াত ই ওমর খৈয়াম (১৯৫৮)

সাহিত্যিক জীবনের প্রথম (১৯২০-১৯৪১) থেকে শেষ পর্যন্ত নজরুল অজস্র ধারায় ইসলাম বিষয়ক লেখা লিখে গিয়েছেন উপরের পরিসংখ্যান সেটাই প্রমাণ করে।

কিছু উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান

১। নজরুল বাংলা ভাষায় সর্বাধিক “হামদ-নাত” এর রচয়িতা।
২। গ্রামোফোন কোম্পানী থেকে নজরুলের হামদ-নাত যখন বের হোতো, তখন মাঝে মাঝে রেকর্ডের ওপর “পীর-কবি নজরুল” লেখা থাকত।
৩। বাংলা ভাষায় যারা হামদ-নাত রচনা করে গেছেন, তাদের মধ্যে একই সাথে হিন্দু এবং ইসলাম ধর্ম উভয় বিষয়ে পারদর্শী কেউ ছিলনা, একমাত্র ব্যতিক্রম নজরুল।
৪। একাধিক আরবী-ছন্দ নিয়ে নজরুলের অসংখ্য কবিতা আছে, বাংলা ভাষার আরও এক প্রতিভাবান কবি ফররুখ আহমদ এ বিষয়ে কারিশমা দেখাতে পারেনি।
৫। ইরানের কবি হাফিজ আর ওমর খৈয়ামের যতজন ‘কবি’ অনুবাদক আছেন তার মধ্যে নজরুল একমাত্র মূল ফারসী থেকে অনুবাদ করেছেন, বাকী সবাই ইংরেজীর থেকে।
৬। “ফারসী” এবং “আরবী”তে নজরুল এর জ্ঞান ছিল পাণ্ডিত্যের পর্যায়ে।
৭। গ্রামোফোন কম্পানি থেকে “ইসলামি গান” নজরুলের পূর্বে আর কেউ গায়নি।

মুজাফফর আহমদ ও নজরুল

নজরুলের তরুণ জীবনের কমুনিস্ট হয়ে যাওয়া বন্ধু কমরেড মুজাফফর আহমদ তাঁকে কমুনিজমে নিতে ব্যর্থ হন। তাঁর স্বপ্ন সফল হয়নি। ১৯৬৬ খৃস্টাব্দের ২রা আগস্ট কবি আবদুল কাদিরের কাছে লেখা এক চিঠির শেষে তিনি লিখেছেন,

“নজরুল যে আমার সঙ্গে রাজনীতিতে টিকে রইল না; সে যে আধ্যাত্নিক জগতে প্রবেশ করল তার জন্যে অবশ্য আমার মনে খেদ নেই। যদিও আমি বহু দীর্ঘ বৎসর অনুপস্থিত ছিলেম তবুও আমার মনে হয় আমি হেরে গেছি।”

তিনি আরো বলেছেন, “আমি তাকে যত বড় দেখতে চেয়েছিলেম তার চেয়েও সে অনেক, অনেক বড় হয়েছে।”

(নজরুল একাডেমী পত্রিকাঃ ৪র্থ বর্ষঃ ১ম সংখ্যাঃ পৃষ্ঠাঃ ১৬৪)

নজরুল জীবনের শেষ অধ্যায়

নজরুলের জীবনের একমাত্র সাক্ষাৎকার যেটা উনি ১৯৪০ সনে দিয়েছিলেন, চিরদিনের জন্য অসুস্হ হয়ে যাবার কিছুদিন আগে- সেখানে উনি বলেছিলেন,

“মুসলমানরা যে একদিন দুনিয়াজোড়া বাদশাহি করতে সমর্থ হয়েছিল সে তাদের ইমানের বলে। আজ আমরা ইমান হারিয়ে ফেলেছি। ইমানের প্রকৃত অর্থ ‘পরিপূর্ণরূপে আত্মসমর্পন’। ভারতে রাজা-বাদশাদের দ্বারা ইসলাম জারি হয় নাই। আর মানুষের মঙ্গলের বিধান করেছেন আউলিয়া ‘পীর’ বোজর্গান। সারা ভারতে হাজার আউলিয়ার মাজার কেন্দ্র করে আজো সেই শান্তির কথা আমরা শুনতে পাই। আমি মওলানা আকরম খাঁ ও মৌলবি ফজলুর হক সাহেবকে বলেছিলাম যে, আসুন, আপনারা সমস্ত ত্যাগ করে হজরত ওমর (রাঃ) ও আবুবকরের (রাঃ) আদর্শ সামনে রেখে সমাজে লাগি, আমি আমার সব কিছু ছেড়ে কওমের খেদমতে লাগতে রাজি আছি।” [অতীত দিনের স্মৃতি, সম্পাদনা – আব্দুল মান্নান সৈয়দ পৃষ্ঠা ১৯২,১৯৩]

 

কিছু উল্লেখযোগ্য স্মৃতিচারণ

দুটি ঘটনা দিয়ে আজকের লেখা শেষ করছি।

প্রথম ঘটনা:

নজরুল স্মৃতিচারণ বই-এ ৩১৭ পৃষ্ঠায় লেখক খান মুহম্মদ সালেক বলেন, “১৯৩৯ সালের ৫ আগষ্ট। কোলকাতা বেকার হোষ্টেলে নবীনবরণ অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি করে আনা হয়েছে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী নলিনীরঞ্জন সরকারকে। বিশিষ্ট অতিথি ছিলেন নজরুল ইসলাম আর আব্বাস উদ্দীন। অনুষ্ঠান শেষে কবিকে চা-পানের জন্য নিয়ে যাওয়া হলো হোস্টেলের কমনরুমে। কিছু ছাত্র আমাদের ঘিরে দাঁড়িয়েছিল। তারা এক টুকরো করে কাগজ কবির সামনে ধরছে আর আবদার জানাচ্ছে কিছু লিখে দেবার জন্য। কবি একটা পেন্সিল হাতে নিলেন। তারপর একজনকে লিখে দিলেন, ‘আল্লাহু আকবর।’ আর একজনকে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসলুল্লাহ।’ আবার কাউকে লিখলেন, ‘খোদাকে চেনো, খোদাকে চিনবে।’ আমিও এক টুকরো কাগজ বের করে সামনে ধরলাম। তিনি লিখলেন, ‘যারা ধৈর্যশীল খোদা তাদের সহায়।’ তাঁর এ ধরণের উক্তি থেকে মনে হয়েছিল তিনি কোন পীর-দরবেশ বা অলি আউলিয়ার কাছে বাইয়াত গ্রহণ করছেন।”

দ্বিতীয় ঘটনা:

শিল্পী আব্বাসউদ্দিন একদিন অনেক খোঁজাখুঁজি করে নজরুলকে না পেয়ে সকালে তার বাসায় গেলেন। বাসায় গিয়ে দেখলেন নজরুল গভীর মনোযোগ দিয়ে কি যেন লিখছেন। নজরুল ইশারায় আব্বাসউদ্দিনকে বসতে বললেন। আব্বাস উদ্দিন অনকেক্ষণ বসে থাকার পর জোহরের নামাজের সময় হলে তিনি উসখুস করতে লাগলেন। নজরুল বললেন, “কি তাড়া আছে, যেতে হবে?” আব্বাসউদ্দিন বললেন, “ঠিক তাড়া নেই, তবে আমার জোহরের নামাজ পড়তে হবে। আর এসেছি একটা ইসলামি গজল নেবার জন্য। গজল না নিয়ে আজ যাওয়া হচ্ছে না।” [নজরুলকে যেহেতু বাউন্ডেলে স্বভাবের কারণে পাওয়া যেত না, তাই সবাই এইভাবে লেখা আদায় করত] নামাজ পড়ার কথা শুনে নজরুল তাড়াতাড়ি একটি পরিস্কার চাদর তার ঘরের আলমারি থেকে বের করে বিছিয়ে দিলেন। এরপর আব্বাস উদ্দিন যথারীতি জোহেরর নামাজ শেষ করার সাথে সাথে নজরুল আব্বাসউদ্দিনের হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “এই নাও তোমার গজল।” আব্বাস উদ্দিন বিস্ময়ের সাথে দেখলেন তার নামাজ পড়তে যে সময় লেগেছে ঠিক সেই সময়ের মধ্যে নজরুল সম্পূর্ণ একটি নতুন গজল লিখে ফেলেছেন। নীচে গজলটি দেয়া হলো:

হে নামাজী আমার ঘরে নামাজ পড় আজ
দিলাম তোমার চরণ তলে হৃদয় জায়নামাজ।

আমি গোনাহগার বে-খবর
নামাজ পড়ার নাই অবসর
তব, চরণ-ছোওয়ার এই পাপীরে কর সরফরাজ
হে নামাজী আমার ঘরে নামাজ পড় আজ।

তোমার অজুর পানি মোছ আমার পিরহান দিয়ে
আমার এই ঘর হউক মসজিদ তোমার পরশ নিয়ে;
যে শয়তান ফন্দিতে ভাই
খোদার ডাকার সময় না পাই
সেই শয়তান থাক দূরে (শুনে) তকবীরের আওয়াজ
হে নামাজী আমার ঘরে নামাজ পড় আজ।

আমার লেখার উদ্দেশ্য এই নয় যে, নজরুল আদর্শ মুসলমান ছিলেন কিংবা তিনি অনুসরণীয়- এটা প্রচার করা। বরং আমার লেখার উদ্দেশ্য হোলো, নজরুল বিশ্বাসে সম্পূর্ণরূপে মুসলিম ছিলেন যেটা অনেকেই সঠিকভাবে জানেন না। আশাকরি উপরের আলোচনা আমাদের নতুন করে সেটাই ভাবতে শেখাবে। এরপরও অনেকে থাকবে যারা বিদ্বেষ ছড়াবে, তাদের সম্বন্ধে নজরুল বলেছেন:

উহারা প্রচার করুক হিংসা বিদ্বেষ আর নিন্দাবাদ
আমরা বলিব, “সাম্য শান্তি এক আল্লাহ জিন্দাবাদ।”

==============================================

পরিশিষ্ট: নজরুলের কিছু ইসলাম বিষয়ক কবিতা

বিষয়: ইসলাম

আল্লাহ আমার প্রভু, আমার নাহি নাহি ভয়
আমার নবী মোহাম্মদ, যাহার তারিফ জগৎময়।
আমার কিসের শঙ্কা,
কোরআন আমার ডঙ্কা,
ইসলাম আমার ধর্ম, মুসলিম আমার পরিচয়।

কলেমা আমার তাবিজ, তৌহীদ আমার মুর্শিদ
ঈমান আমার বর্ম, হেলাল আমার খুর্শিদ।

‘আল্লাহ আক্‌বর’ ধ্বনি
আমার জেহাদ বাণী
আখের মোকাম ফেরদৌস্‌ খোদার আরশ যেথায় রয়
আল্লাহ আমার প্রভু, আমার নাহি নাহি ভয়।

বিষয়: রিজিক

আহার দিবেন তিনি, রে মন
জীব দিয়েছেন যিনি
তোরে সৃষ্টি করে তোর কাছে যে
আছেন তিনি ঋণী।

বিষয়: রেসালত

চলে আন্‌জাম
দোলে তান্‌জাম
খোলে হুর পরী মরি ফিরদৌসের হাম্মাম!
টলে কাঁখের কলসে কওসর ভর, হাতে ‘আব্‌-জম-জম্‌-জাম্‌’।
শোন্‌ দামাম কামান্‌ তামাম্‌ সামান্‌
নির্ঘোষি কার নাম
পড়ে ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহে সাল্‌লাম!’

বারেক মুখে নিলে যাঁহার নাম
চিরতরে হয় দোজখ্‌ হারাম,
পাপীর তরে দস্তে যাহার, কওসরের পিয়ালা
হের আজ আরশে এলেন মোদের নবী কম্‌লীওয়ালা।

বিষয়: কালেমা শাহাদত

এসমে আজম হ’তে কদর ইহার,
পায় ঘরে ব’সে খোদা আর রসুলের দীদার
তাহার হ্রদয়াকাশে
সাত বেহেশ্‌ত ভাসে
খোদার আরশে হয় আখেরে গতি
কলেমা শাহাদাতে আছে খোদার জ্যোতি
ঝিনুকের বুকে লুকিয়ে থাকে যেমন মোতি।

বিষয়: কোরবানী

আল্লার নামে, ধর্মেরও নামে, মানব জাতির লাগি
পুত্রেরে কোরবানী দিতে পারে, আছে কেউ হেন ত্যাগী?
সেই মুসলিম থাকে যদি কেউ, তসলিম কবি তারে,
ঈদগাহে গিয়া তারি সার্থক হয় ডাকা আল্লারে।
অন্তরে ভোগী বাইরে যে যোগী, মুসলমান সে নয়,
চোগা চাপাকানে ঢাকা পড়িবে না সত্য সে পরিচয়!

বিষয়: জাকাত

দে জাকাত, দে জাকাত, তোরা দে রে জাকাত
দিল্‌ খুলবে পরে – ওরে আগে খুলুক হাত।

বিষয়: আরাফাত ময়দান

দুখের সাহারা পার হ’য়ে আমি
চলেছি কাবার পানে
পড়িব নামাজ মারেফাতের
আরাফাত ময়দানে।

বিষয়: বেহেশত

সেথা হর্দম খুশির মৌজ,
তীর হানে কালো আখির ফৌজ,
পায়ে পায়ে সেথা আর্জি পেশ,
দিল চাহে সদা দিল্‌-আফরোজ,
পিরানে পরান বাধা সেথায়
আয়, বেহেশতে কে যাবি, আয়।

বিষয়: জাগরণমূলক কবিতা

মোরা আসহাব কাহাফের মত
হাজারো বছর শুধু ঘুমাই,
আমাদের কেহ ছিল বাদশাহ
কোনো কালে তারি করি বড়াই,

জাগি যদি মোরা, দুনিয়া আবার
কাঁপিবে চরণে টালমাটাল
দিকে দিকে পুন জ্বলিয়া উঠেছে
দ্বীন ই ইসলামি লাল মশাল।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গবেষণামূলক প্রকাশনা পরিবেশ ও বন

বিলুপ্তির পথে বাংলাদেশের হাতি

বাংলাদেশ বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম। আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা অনেক বেশি। তার পরও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে আছে আমাদের বন্য প্রাণী। যদিও সরকারিভাবে বলা হয়, আমাদের বনের পরিমাণ মোট আয়তনের ১৬ শতাংশ; কিন্তু গবেষণা গ্রন্থ ‘স্টোলেন ফরেস্ট’ থেকে জানা যায়, আসলে মাত্র ৬ শতাংশ বন কার্যকরভাবে টিকে আছে। তাও আবার বছরে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ হারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। বনের যখন এ করুণ অবস্থা, সে তুলনায় বন্য প্রাণীর সংখ্যা এখনো আশাব্যঞ্জক। বাংলাদেশের আবহাওয়া, বিশেষ করে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বায়ুর চাপ, ঋতুচক্র, পানি ও মাটির উপাদান বন্য প্রাণীর জন্য উপযোগী হওয়ায় ৫৬ হাজার বর্গমাইল আয়তনের ছোট এ দেশটি জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। জীববৈচিত্র্যের তালিকায় স্তন্যপায়ী হাতির উপস্থিতি বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে বিশেষ স্থান করে দিয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট নানা কারণে সারা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশেও জীববৈচিত্র্য এখন হুমকির মুখে। বাড়তে থাকা জনসংখ্যার চাপ, ব্যাপক হারে বন উজাড়, বন্য প্রাণী শিকার, নদীর নাব্যতা এবং ভারসাম্যহীন পরিবেশই বন্য প্রাণীকে বিপন্নতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আর এসব কারণে অন্য বহু প্রাণীর মতো বাংলাদেশে বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে হাতি। বাংলাদেশের বনাঞ্চলে হাতির সংখ্যা মাত্র ১৯৬ থেকে ২২৭টি। আর এদের বিচরণ দেশের ১১টি বন বিভাগে। একসময় ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রামে হাতি দেখতে পাওয়া যেত; কিন্তু হাতির সেই বিস্তীর্ণ বিচরণস্থল ক্রমেই সংকুচিত হয়ে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য জেলায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। আইইউসিএনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বন বিভাগের চট্টগ্রাম দক্ষিণ অঞ্চলে হাতি আছে ৩০ থেকে ৩৫টি, কক্সবাজার উত্তর ও দক্ষিণ বিভাগ মিলিয়ে আছে ৮২ থেকে ৯৩টি, বান্দরবানে আছে ১২ থেকে ১৫টি এবং লামা বিভাগে আছে ৩৫ থেকে ৪০টি। এ ছাড়া কক্সবাজার উত্তর বিভাগে আরো ৭ থেকে ৯টি এবং দক্ষিণ বিভাগে ৩০ থেকে ৩৫টি হাতি রয়েছে। আর অভিবাসী হাতির সংখ্যা ৮৪ থেকে ১০০টি। হাতি কমে যাওয়ার ৯টি কারণও আইইউসিএনের গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বনভূমি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া, খাদ্যাভাব, চলাচলের রাস্তা কমে যাওয়াসহ নানা কারণে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের হাতি। হাতি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার বড় কারণ হচ্ছে চোরা শিকারিদের অপতৎপরতা। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত শুধু পার্বত্য বান্দরবান ও কক্সবাজারের ছয়টি উপজেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চলে দাঁত ও হাড়গোড়ের জন্য ৩২টি হাতি হত্যা করা হয়। ২০১০ সাল পর্যন্ত এই হত্যার তালিকা আরো দীর্ঘ হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। গহিন অরণ্যে ফাঁদ পেতে, বিষ খাইয়ে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারিরা হাতির দাঁত ও হাড় সংগ্রহ করে তা উচ্চমূল্যে বিদেশে পাচার করছে। বাংলাদেশের অনেক বন্য প্রাণী হারিয়ে গেছে। হারিয়ে যেতে বসেছে অনেক প্রাণী। হাতি এসব প্রাণীর মধ্যে প্রধানতম। আর নির্বিচার শিকার হাতি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার মূল কারণ। বাংলাদেশ হাতিসহ অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অনুকূল বিচরণ এলাকা হলেও বর্তমানে প্রাকৃতিক বনের এ প্রাণীগুলোর সবই দেশ থেকে নিদারুণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে শুরু করেছে। স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের এই সর্বনাশা বিলুপ্তি আমাদের পরিবেশ-প্রতিবেশ ব্যবস্থায় সৃষ্টি হতে চলেছে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির।
আজিজুর রহমান (কালেরকণ্ঠ)

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গবেষণামূলক প্রকাশনা চিকিত্সাশাস্ত্র এবং বিজ্ঞান বিজ্ঞান বিনোদন বিবর্তন

মানুষের কোন নিষ্ক্রিয় অঙ্গ নেই

মানুষের কোন নিষ্ক্রিয় অঙ্গ নেই

 

দাবীটি ভ্রান্ত। মনবদেহে অজস্র নিষ্ক্রিয় অঙ্গের (vestigial organ) অস্তিত্ব আছে, যেগুলো একসময় আমাদের পূর্বপুরুষদের কাজে লাগলেও এখন আর লাগে না। এখন এগুলো একান্ত অবান্তর। মানুষের দেহেই এমন শতাধিক বিলুপ্তপ্রায় অঙ্গাদির অস্তিত্ব আছে।

 

১) এপেনডিক্স

ভারমিফর্ম এপেনডিক্স আসলে সিকাম নামক একটি অঙ্গের অবশিষ্টাংশ, যা মূলত তৃণভোজী প্রাণীদের দেহে অবস্থিত থাকে এবং এই অঙ্গে বসবাসকারী ব্যাক্টেরিয়াগুলো উদ্ভিদ কোষের সেলুলোস প্রভৃতি উপাদান পরিপাকে সাহায্য করে। এই অঙ্গ মূলত সেসব মাংসাশী প্রাণীর দেহে পাওয়া যায় যারা একটু হলেও উদ্ভিদ ভক্ষণ করে।মানুষের তৃণভোজী পূর্বপুরুষেরা এই অঙ্গকে উদ্ভিদ হজম করার কাজে ব্যবহার করত। প্রাচীন নরবানর যেমন অস্ট্রালোপিথেকাস রবাস্টাস তৃণ সহ সেলুলোজ জাতীয় খাদ্য প্রচুর পরিমাণে গ্রহণ করত। এখনো শিম্পাঞ্জীরা মাংশাসী নয়। কিন্তু মানুষ খাদ্যাভাস বদল করে লতা পাতার পাশাপাশি একসময় মাংশাসী হয়ে পড়ায় দেহস্থিত এই অংগটি ধীরে ধীরে একসময় অকেজো এবং নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। তাই এখন অ্যাপেন্ডিক্স আমাদের কাজে না লাগলেও রেখে দিয়ে গেছে আমাদের জন্য ‘বিবর্তনের সাক্ষ্য’। এটি এখন আমাদের কোন উপকারে আসে না, বরং, এপেন্ডিক্সের প্রদাহজনিত এপেন্ডিসাইটিস রোগের বড় উস হচ্ছে এই এপেন্ডিক্স। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এপেন্ডিক্স নামের প্রত্যঙ্গটি না থাকলে মানুষের কোন সমস্যা হয় না। কিন্তু এপেন্ডিক্স থাকলে সারা জীবনে অন্ততঃ ৭% সম্ভাবনা থেকে যায় এপেন্ডিসাইটিসে আক্রান্ত হবার।

চিত্রঃ অ্যাপেন্ডিক্স দেহের কোনই কাজে লাগে না, বরং বর্তমানে অ্যাপেন্ডিসাইটিস রোগের বড় উসই হল এই অ্যাপেন্ডিক্স।

 

২) পুচ্ছ অস্থি

Coccyx অথবা পুচ্ছ অস্থি হারানো লেজের অবশিষ্টাংশ। প্রত্যেক স্তন্যপারী প্রাণীরই তাদের বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার কোন না কোন পর্যায়ে এই লেজ ধারণ করে; মানুষের এমব্রায়োজেনেসিসে ১৪ থেকে ২২তম পর্যায়ে ৪ সপ্তাহ ধরে মানবভ্রুণে এই লেজ পরিলক্ষিত হয়। ৩১-৩৫ দিন বয়স্ক মানবভ্রুণে এই লেজ সবচেয়ে সুপ্রত্যক্ষ হয়।  মানবদেহের মেরুদন্ডের একদম নীচে থেকে যাওয়া  এই হাড়টি আমাদের কোন কাজেই আসে না। আমাদের আদি প্রাইমেট পূর্বপুরুষেরা গাছের ডালে ঝুলে ভারসাম্য বজায় রাখার কাজে একে ব্যবহার করত।  মানুষের জন্য এটি এখন আর ভারসাম্য রক্ষা আর চলিষ্ণুতার কাজে ব্যবহৃত হয় না, তবে পেশির সাথে হাড়ের সংযুক্তি স্থাপনের স্থান হওয়ার কারণেই হয়ত এই অস্থিটির আর অধঃপতন ঘটেনি।

পুচ্ছ অস্থি ছাড়াও, লেজবিশিষ্ট মানব শিশু প্রকৃতিতে মাঝে মধ্যেই জন্ম নিতে দেখা যায়। এটা বিবর্তনের কারনেই ঘটে। কারণ, কোন অংগ লুপ্ত হয়ে গেলেও জনপুঞ্জের জীনে ফেনোটাইপ বৈশিষ্ট্য হিসেবে ডিএনএ সেই তথ্য রেখে দেয়। তার পুনঃপ্রকাশ ঘটতে পারে বিরল কিছু ক্ষেত্রে। ব্যপারটিকে বিবর্তনের পরিভাষায় বলে । ১৮৮৪ সাল থেকে চিকিসা সাহিত্যে এরকম তেইশটি ঘটনা প্রতিবেদিত হয়েছে।

চিত্রঃ মানবদেহের মেরুদন্ডের একদম নীচে থেকে যাওয়া  এই হাড়টি আমাদের কোন কাজেই আসে না।

৩) আঁক্কেল দাঁত

আঁক্কেল দাঁত মানুষের পূর্বপুরুষেরা উদ্ভিদ কলা চর্বণে ব্যবহার করত।সাধারণত বলা হয়ে থাকে যে মানুষের পূর্বপুরুষের বহু দন্ত বিশিষ্ট দীর্ঘকায় চোয়াল ছিল, উদ্ভিদ কোষের সেলুলোস হজমের দুর্বলতার জন্য এই বড় বড় চোয়াল খেসারত দিত। মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তিত হলে প্রাকৃতিক নির্বাচন ছোট চোয়ালকেই নির্বাচিত করেছিল, তবুও এই বাড়তি দাঁতগুলো এখনো বিদ্যমান রয়ে গিয়েছে।

৪) কান নাড়ানোর পেশী

Macaque বানর সহ অনেক বানরের কর্ণপেশী মানুষের থেকে উন্নত, তাই তারা তাদের কান নাড়িয়ে সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সাবধানতা অবলম্বন করতে পারে। মানুষ, ওরাংওটাং এবং শিম্পাঞ্জীর মত অন্য প্রাইমেটদের কর্ণপেশী যসামান্য উন্নত এবং অকার্যকর।যে পেশী কর্ণের সাথে যুক্ত কিন্তু কান নাড়াতে পারে না, সেই পেশী নিঃসন্দেহে অকার্যকর। মানুষের ক্ষেত্রে কেউ কেউ বিবর্তনীয় ধারাবাহিকতায় বিলুপ্তপ্রায় অঙ্গের প্রমাণ হিসেবে তাদের কান যেকোন দিকে নাড়াতে পারেন। যেমন, বাংলাদেশের কৌতুক শিল্পী রবিউল কান নাড়াতে পারতেন।   এ ছাড়া প্রাইমেটের একটি নতুন বৈশিষ্ট্য বিবর্তিত হয়েছে আর সেটা হল  আণুভূমিক তলে মাথা ঘোরানোর ক্ষমতা।এক কাঠামোর কাজ এভাবেই আরেক কাঠামোর কাছে হস্তান্তরিত হয়।

৫) চোখের নিক্টিটেটিং ঝিল্লি

চোখের ভেতরে এক কোণায় plicasemilunarisনামক একটি পেঁচানো কলা রয়েছে। এটা nictitating     membrane বা “তৃতীয় নেত্রপল্লব” এর অবশিষ্টাংশ যা পাখি, সরিসৃপ ও মস্যের চোখে উপস্থিত রয়েছে।এই ঝিল্লি দৃষ্টিশক্তিকে অক্ষুন্ন রেখেই চোখকে রক্ষা করে ও আর্দ্র করে।এটা স্তন্যপায়ীদের মধ্যে খুবই দুর্লভ, প্রধানত মনোট্রিম এবং মারসুপিয়ালদের মধ্যে পাওয়া যায়। এর সাথে সংযুক্ত পেশিগুলোও অবশিষ্টাংশ। আফ্রিকান ও আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ানদের plicasemilunarisঅন্যদের থেকে খানিকটা বড়। শুধুমাত্র  CalabarAngwantibo প্রজাতির প্রাইমেটদের কার্যকরি নিক্টিটেটিং ঝিল্লি রয়েছে।

৬) পুরুষের স্তনবৃন্ত

স্তন এবং স্তনবৃন্ত মূলতঃ দরকার মেয়েদের। পুরুষদের এটা কোন কাজে আসে না। অথচ সকল পুরুষদের দেহে বিবর্তনের সাক্ষ্য হিসবে রয়ে গেছে স্তনবৃন্তের চিহ্ন।

৭) পুরুষদের ইউটেরাস

পুরুষদেহের অভ্যন্তরে সুপ্ত এবং অব্যবহার্য অবস্থায় স্ত্রী-জননতন্ত্রের অস্তিত্ব আছে।

৮) ঘ্রাণসংক্রান্ত

শিকারী প্রাণীদের হাত থেকে পালানো এবং খাদ্য অনুসন্ধানের জন্য ঘ্রাণশক্তি অনেক প্রাণীর কাছে প্রয়োজনীয় হলেও মানুষের জন্য তা তেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ না, মানুষকে খুব কম সময়ই শিকারী প্রাণী নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়েছে এবং প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ কৃষিকাজের মাধ্যমে খাদ্য আহরণ করে এসেছে। ঘ্রাণের প্রতি সংবেদনশীলতা মানুষ থেকে মানুষে ভিন্ন হয়, যা সাধারণত অবশিষ্টাংশ বৈশিষ্ট্যগুলোর ক্ষেত্রে ঘটে। দক্ষিণ আমেরিকা, আমেরিকান ইন্ডিয়ান এবং আফ্রিকান মানুষদের ঘ্রাণশক্তি অনেক তীব্র, অনেকে অন্ধকারে গায়ের গন্ধ দিয়ে পরিচয় শনাক্ত করতে পারে। ঘ্রাণশক্তিকে অবশ্যই অবশিষ্টাংশ বলা যায় না কারণ এটি মানুষকে বিষাক্ত গ্যাসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে, তবে এত উন্নত ঘ্রাণশক্তি আসলেই মানুষের দরকার নেই। এখানে লক্ষণীয় যে কোন বৈশিষ্ট্য উপকারী হওয়া সত্ত্বেও তা ধীরে ধীরে মলিন হয়ে যেতে পারে যদি তার সাথে সংস্লিষ্ট জিনগুলোর উপর কোন নির্বাচনী চাপ কাজ না করে।

৯) ব্যবহার সংক্রান্ত : লোমকূপ ফুলে ওঠা কিংবা হিক্কা তোলা

মানুষের মধ্যে কিছু ভেসটিজিয়াল ব্যবহার এবং প্রতিবর্তী ক্রিয়া রয়েছে। শীতে বা ভয়ে আমাদের শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে। তখন আমাদের দেহের লোমকূপ ফুলে ওঠে। আমাদের পূর্বপুরুষেরা তাদের গায়ের কেশর, লোম বা পালক ফুলিয়ে বিপদ থেকে আত্মরক্ষা করার উপায় খুঁজত। এই আলামত বিবর্তনের কারণেই আমাদের মধ্যে রয়ে গেছে।

চাপের মধ্যে থাকলে মানুষের রোম খাড়া হয়ে যায়, যা আসলে একটা অবশিষ্টাংশ প্রতিবর্তী ক্রিয়া। মানুষের রোমশ পূর্বপুরুষ লোম খাড়া করলে তাদেরকে বিকটাকার ও ভয়ংকর দেখাত, এতে করে শিকারী প্রাণীরা সহজেই ভয় পেয়ে যেত। লোম খাড়া করে বাড়তি বায়ুর স্তর আটকে ফেলা যায়, এতে করে দেহকে গরম রাখা যায়। মানুষের শরীরে লোম যেহেতু অনেক কম, তাই ঠান্ডা লাগলে লোম খাড়া হয়ে যাওয়াটাকে অবশিষ্টাংশ বলা যায়।

Palmer grasp reflexকে মানবশিশুদের অবশিষ্টাংশ প্রতিবর্তী ক্রিয়া বলা হয়। মানবশিশু হাতের কাছে যাই পায় তাই ব্যাপক শক্তির সাথে আকড়ে ধরে।১৯৩২ সালের একটি গবেষণা মতে ৩৭% শিশু রড থেকে ঝুলতে পারে, যে কাজটা একজন পূর্ণ  বয়স্ক মানুষের সম্পন্ন করতে বেশ অনুশীলন করা লাগে। এসব শিশুরা কিন্তু তাদের মায়ের শরীর আঁকড়ে ধরতে ব্যর্থ হয়। এই আঁকড়ে ধরার প্রবনতাটা পায়ের মধ্যেও লক্ষিত হয়। শিশুরা যখন বসে থাকে, তাদের পরিগ্রাহী পা প্রাপ্তবয়স্ক শিম্পাঞ্জীদের মত ভেতর দিকে বেঁকানো অবস্থায় থাকে। প্রাচীন পূর্বপুরুষদের গায়ে আঁকড়ে ধরার মত যথেষ্ট লোম ছিল যার কারণে মা শিকারীদের হাত থেকে পালানোর সময় শিশুটি ঠিকই তাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে পারত।

শুধু রোমকূপ ফুলে ওঠা কিংবা শিশুদের হাতের রিফ্লেক্সই নয়, বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন আমরা যে খাবার দ্রুত খেতে গিয়ে অনেক সময়ই হিক্কা তুলি সেটাও আসলে আমরা মস জাতীয় পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত হয়েছি তার একটি উজ্জ্বল সাক্ষ্য।  সেই ব্যাপারটিই স্পষ্ট করেছেন অধ্যাপক নীল সুবিন তার সায়েন্টিফিক আমেরিকানে লেখা ‘দিস ওল্ড বডি’ (জানুয়ারি, ২০০৯) নামের একটি প্রবন্ধে।

চিত্রঃ দ্রুত খেতে গিয়ে অনেক সময়ই হিক্কা তুলি সেটা আসলে  মস জাতীয় পূর্বপুরুষের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

১০) বিলুপ্তপ্রায় বংশগতীয় ধারা

মানুষের মধ্যে এখনও অনেক অবশিষ্টাংশ আণবিক কাঠামো রয়েছে যা এখন অকার্যকর হলেও অন্য প্রজাতির সাথে সাধারণ উত্তরসূরিতা নির্দেশ করতে পারে। উদাহরণস্বরুপ, L-gulonolactone oxidase জিনটি বেশিরভাগ স্তন্যপায়ীদের  মধ্যে কার্যকর, এটি একটি  এনজাইম উপন্ন করে যা ভিটামিন সিকে সংশ্লেষ করে। মানুষ এবং অন্যসব প্রাইমেটদের মধ্যে একটি পরিব্যক্তি(mutation) এই জিনটিকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। জিনটার অবশিষ্টাংশ মানব জিনোমে “ছদ্মজিন” নামক এক বিলুপ্তপ্রায় বংশগতীয় ধারা (ভেসটিজিয়াল জেনেটিক সিকোয়েন্স)  হিসেবে বিদ্যমান রয়ে গিয়েছে।

উপরে উল্লিখিত অঙ্গগুলোর বাইরেও  মানব দেহে বহু বিলুপ্তপ্রায় অঙ্গের অস্তিত্ব রয়েছে। Robert Wiedersheim ১৮৯৩ সালে মানবদেহে ৮৬টি বিলুপ্তপ্রায় অঙ্গ শনাক্ত করে The Structure of Man: an index to his past history শিরোনামের একটি বই প্রকাশ করেন। বিলুপ্তপ্রায় অঙ্গগুলো বিবর্তনের পক্ষে অত্যন্ত জোরালো সাক্ষ্য।

 

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গবেষণামূলক প্রকাশনা বিজ্ঞান বিনোদন বিবর্তন

যদি বানর সদৃশ জীব থেকে একসময় মানুষের বিবর্তন ঘটে থাকে তাহলে এখন কেনো তা আর ঘটছে না?

যদি বানর সদৃশ জীব থেকে একসময়  মানুষের বিবর্তন ঘটে থাকে তাহলে এখন  কেনো তা আর ঘটছে না?

 

অনেক বিবর্তনই মিউটেশনের মত আকষ্মিক প্রক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল। আবার শুধু মিউটেশন বা জেনেটিক রিকম্বিনেশনের মত ব্যাপারগুলো তো ঘটলেই হবে না, তাকে আবার নির্দিষ্ট কোন সময়ের পরিবেশে সেই জীবকে টিকে থাকার জন্য বাড়তি সুবিধা যোগাতে হবে যার ফলে তা সমস্ত জিন পুল বা জনসমষ্টিতে ছড়িয়ে পড়তে পারবে। যেমন, প্রায় ৬০-৮০ লক্ষ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষের মধ্যে যে মিউটেশন বা পরিব্যক্তিগুলো ঘটেছিল এবং তার ফলে সেই সময়ের পরিবেশের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের যেভাবে বিবর্তন হয়েছিলো তা আবার একইভাবে ঘটা এবং তার সাথে সাথে পারিপার্শ্বিকতাসহ অন্যান্য সবগুলো ফ্যাক্টরের সংযোগ বা সমন্বয় আবার একই রকমভাবে হওয়া প্রায় অসম্ভব। এজন্যই বিখ্যাত বিবর্তনবিদ বিজ্ঞানী জে. গুলড তার ‘ওয়ান্ডারফুল লাইফ’ বই তে বলেছিলেন যে, বিবর্তনের টেপটি যদি রিওয়াইন্ড করে আবার নতুন করে চালানো হয় তাহলে ফলাফল কখনই এক হবে না।  অনেকেই জানেন, বিজ্ঞানী ল্যাপ্লাস সেই আঠারো শতকের শেষ দিকে আস্থার সাথে ডিটারমিনিজম বা নিশ্চয়তাবাদের পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন; তিনি বলেছিলেন, প্রতিটি কণার অবস্থান ও গতি সংক্রান্ত তথ্য যদি  জানা যায়, তবে ভবিষ্যতের দশা সম্বন্ধে আগেভাগেই ভবিষ্যদ্বাণী করা যাবে। কিন্তু বৈশ্বিক জটিলতার প্রকৃতি (nature of universal complexity) তাঁর সে উচ্চাভিলাসী স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দেয়। ইতিহাসের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অনাকাংক্ষিত বিশৃংখলা আর অভূতপূর্ব জটিলতা যার ফলশ্রুতিতে প্রতি মিনিটেই জন্ম নেয় নানা ধরনের নাটকীয় অনিশ্চয়তা।  কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর প্রকৃতি পরিবেশ যে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে তার চিহ্ন আমরা পরিষ্কারভাবে দেখতে পাই প্রকৃতির এবং জীবের বিবর্তনের ইতিহাসে, এটি সত্য, কিন্তু এই প্রাকৃতিক পরিবর্তনগুলো যদি অন্যভাবে ঘটতো তাহলে জীবের বিবর্তনের ধারাও যে অন্যরকম হত তাতে কোন সন্দেহই নেই।  মানুষের উৎপত্তির ব্যাপারটাই ধরা যাক। এটি সৌভাগ্যপ্রসূত হাজার খানেক ঘটনার সমন্বয় ছাড়া কখনই ঘটতে পারতো না। ঘটনাগুলো যদি অন্যরকম ভাবে ঘটতো, তাহলে হয়তো শেষ পর্যন্ত এ পৃথিবীতে কোন ‘মানবীয় সত্ত্বা’র উন্মেষ ঘটতো না। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি ঘটনা পর্যালোচনা করা যাক:

 

(ক) আমাদের পূর্বসূরী বহুকোষী জীবগুলো যদি ৫৩ কোটি বছর আগে ক্যাম্বরিয়ান বিস্ফোরণের সময় উত্তপ্ততা আর তেজস্ক্রিয়তাসহ নানা উৎপাত সহ্য করে টিকে না থাকতো,  তবে হয়তো পরবর্তীতে কোন মেরুদন্ডী প্রাণীর জন্ম হত না।

 

(খ)  সেই লোব ফিন বিশিষ্ট মাছগুলো যারা দেহের কেন্দ্রীয় অক্ষ বরাবর নিজস্ব ওজনকে বহন করার ক্ষমতা রাখে, সেগুলোর বিবর্তন এবং বিকাশ না ঘটলে মেরুদন্ডী প্রাণীগুলোর ডাঙ্গায় উঠে আসা সম্ভব হতো না। আবার সেই সময়ে যদি তাপমাত্রার ওঠানামার এবং বরফ যুগ শুরু হওয়ার ফলে পানির উচ্চতা কমে না যেত তাহলে হয়তো ডাঙ্গার প্রাণীগুলোর বিকাশ এভাবে ঘটতে পারতো না।

 

(গ)  সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে এক বিশাল উল্কাপিন্ড পৃথিবীতে আছড়ে পরে বিশালাকার ডায়নোসরগুলোর অবলুপ্তির কারণ না ঘটাতো, তাহলে হয়ত সেই সময়ের নগন্য স্তন্যপায়ী জীবগুলো আর বিকশিত হওয়ার সুযোগ পেত না, বরং ডায়নোসরদের প্রবল প্রতাপের সাথে প্রতিযোগিতা করে বিকশিত হবার সুযোগ পেত না।

 

(ঘ) যদি আফ্রিকার গহীন অরণ্যে বিশ থেকে চল্লিশ লক্ষ বছর আগে আমাদের পুর্বপুরুষের দেহের ভিতরে পরিবর্তন না ঘটতো এবং সেই পরিবর্তনগুলোকে টিকিয়ে রাখার জন্য তারা তখনকার সেই পরিবেশগত সুবিধাগুলো না পেত, তাহলে হয়তো তারা দু’পায়ের উপর ভর করে দাঁড়াবার আর চলবার মত সুগঠিত হতে পারত না,  আজকে মানুষের বিবর্তনও ঘটতো না, আমরাও আজকে আর এখানে থাকতাম না।

 

কাজেই দেখা যাছে পুরো মানব বিবর্তনটিই দাড়িয়ে আছে অনেকগুলো আকষ্মিক ঘটনার সমন্নয়ে।  বিবর্তনের পুরো প্রক্রিয়াটা আবার প্রথম থেকে চালানো গেলেও সে ‘দৈবাৎ ঘটে যাওয়া’ ঘটনাগুলো একের পর এক ঘটবেই, এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারেনা।

Sources:

# Stephen Jay Gould, Wonderful Life: The Burgess Shale and the Nature of History, W. W. Norton & Company, 1990

# Gould, SJ, 1994, The evolution of life on earth, Scientific American, October issue.

# বন্যা আহমেদ, বিবর্তনের পথ ধরে, অবসর, ২০০৭ (পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত ২০০৮), পৃষ্ঠা ২৩৩

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গবেষণামূলক প্রকাশনা চিকিত্সাশাস্ত্র এবং বিজ্ঞান প্রকৌশল ও বিজ্ঞান বিজ্ঞান বিনোদন বিবর্তন

তেজস্ক্রিয় ডেটিং দিয়ে কীভাবে ফসিলের সঠিক বয়স নির্ধারণ করা যায়?

তেজস্ক্রিয় ডেটিং দিয়ে কীভাবে ফসিলের সঠিক বয়স নির্ধারণ করা যায়?  

 

 

সুনির্দিষ্টভাবে সময় নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন একধরণের ভূতাত্ত্বিক ঘড়ির, যা আমাদেরকে বলে দিবে পৃথিবীর বিভিন্ন শিলাস্তরের কবে তৈরি হয়েছিলো আর কোন প্রাণী বা উদ্ভিদের ফসিলটির বয়সই বা কত। আর বিজ্ঞানীরা সেটাই খুঁজে পেলেন বিভিন্ন ধরণের তেজস্ক্রিয় (Radioactive) পদার্থের মধ্যে, এই ভূতাত্ত্বিক ঘড়িগুলোকে বলা হয় রেডিওমেট্রিক ঘড়ি। কারণ, তারা প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয়তার মাপ থেকে আমাদেরকে সময়ের হিসেব বলে দেয়। পদার্থের তেজস্ক্রিয়তার ব্যাপারটা ঠিকমত বুঝতে হলে আমাদেরকে একটু জীববিদ্যার আঙিনা পেরিয়ে পদার্থবিদ্যা ও রসায়নবিদ্যার উঠোনে পা রাখতে হবে। আধুনিক বিজ্ঞান আজকে এমনি এক অবস্থায় চলে এসেছে যে, তার এক শাখা আরেক শাখার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে, কোন এক শাখার মধ্যে গণ্ডিবদ্ধ থেকে পুরোটা বোঝা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে যাই হোক, চলুন দেখা যাক, এত যে আমরা অহরহ তেজস্ক্রিয়তা, তেজস্ক্রিয় ক্ষয় (Radioactive decay) অথবা রাসায়নিক বা নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার কথা শুনি তার মুলে আসলে কি রয়েছে। চট করে, খুব সংক্ষেপে, একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক অণু পরমাণুর গঠন এবং তাদের মধ্যে ঘটা বিভিন্ন বিক্রিয়া এবং তেজস্ক্রিয়তার মূল বিষয়টির উপর।

 

উনবিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্তও কিন্তু আমরা ভেবে এসেছি যে, কোন পদার্থের পরমাণু অবিভাজ্য, তাকে আর কোন মৌলিক অংশে ভাগ করা যায় না। একশোটির মত মৌলিক পদার্থ রয়েছে – লোহা, সোনা, অক্সিজেন, ক্লোরিন বা হাইড্রোজেনের মত মৌলিক পদার্থগুলোর পরমাণুই হচ্ছে তার সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম অংশ, একে আর ছোট অংশে ভেঙ্গে ফেলা সম্ভব নয়। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান আমাদেরকে নিয়ে গেছে জ্ঞানের এক নতুন দিগন্তে। আমরা এখন জানি যে, প্রত্যেকটি মৌলিক পদার্থের পরমাণুই ইলেকট্রন, প্রোটন এবং নিউট্রনের সমন্বয়ে তৈরি। পরমাণুর মাঝখানে কেন্দ্রে রয়েছে নিউক্লিয়াস যা প্রোটন এবং নিউট্রনের সমন্বয়ে তৈরি আর তার চারপাশের অক্ষে ঘুরছে ইলেকট্রনগুলো। নিউট্রনের কোন চার্জ নেই, সে নিরপেক্ষ, ইলেকট্রন ঋণাত্মক আর প্রোটন ধনাত্মক চার্জবিশিষ্ট। সাধারণতঃ একটি পরমাণুতে ইলেকট্রন, প্রোটনের সংখ্যা  সমান থাকে বলে তাদের ধনাত্মক এবং ঋণাত্মক চার্জ কাটাকাটি হয়ে তার মধ্যে নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। মৌলিক পদার্থগুলোর বৈশিষ্ট্যের মধ্যে আমরা যে  আকাশ পাতাল পার্থক্য দেখি তার কারণ আর কিছুই নয়, তাদের পরমাণুর ভিতরে  ইলেকট্রন, প্রোটন এবং নিউট্রনের সংখ্যার তারতম্য। অর্থাৎ সোনার পরমাণু বা নিউক্লিয়াস কিন্তু সোনা দিয়ে তৈরি নয়, তাদের মধ্যে সোনার কোন নাম গন্ধও নেই। অক্সিজেন বা হাইড্রোজেন বলুন, সোনা বলুন, রূপা বলুন, হেলাফেলা করা তামা বা সীসাই বলুন সব মৌলিক পদার্থই এই তিনটি মুল কণা, ইলেকট্রন, প্রোটন এবং নিউট্রনের সমন্বয়েই গঠিত। লোহার সাথে সোনার পার্থক্যের কারণ এই নয় যে তার নিউক্লিয়াস সোনার মত দামী বা চকচকে কণা দিয়ে তৈরি! এর কারণ তাদের পরমাণুর ভিতরে এই মুল কণাগুলোর সংখ্যার পার্থক্য- সোনার নিউক্লিয়াসে রয়েছে ৭৯টি প্রোটন এবং ১১৮টি নিউট্রন; আর ওদিকে লোহার নিউক্লিয়াসে রয়েছে ২৬টি প্রোটন এবং ৩০টি নিউট্রন। একই ধরণের ব্যাপার দেখা যায় আমাদের ডিএনএ-এর গঠনের ক্ষেত্রেও। মানুষ, ঘোড়া, ফুলকপি বা আরশোলার জিনের উপাদানে তাদের আলাদা আলাদা কোন বিশেষ বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যাবে না, তারা সবাই ডিএনএ-এর সেই চারটি নিউক্লিওটাইডের (A=adenine, G= guanine, C=cytosine T=thymine) বিভিন্ন  রকমফেরে তৈরি।

চিত্র : পরমাণুর গঠন

আমাদের চারদিকে আমরা যে সব পদার্থ দেখি তার বেশীরভাগই যৌগিক পদার্থ, সাধারণভাবে বলতে গেলে বিভিন্ন মৌলিক পদার্থগুলোর মধ্যে ইলেকট্রন বিনিময়ের ফলে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমেই এই যৌগিক পদার্থগুলোর উৎপত্তি হয়। একটা ইলেকট্রন কণা শুষে নিয়ে একটা প্রোটন কণা  নিউট্রনে পরিণত হয়ে যেতে পারে, আবার ঠিক উলটোভাবে একটা নিউট্রন তার ভিতরের একটি ঋণাত্মক চার্জ বের করে দিয়ে পরিণত হতে পারে প্রোটন কণায়। কিন্তু  শুনতে যতটা সোজা সাÌটা শোনাচ্ছে  ব্যাপারটা আসলে কিন্তু ঠিক সেরকম নয়। এ ধরণের পরিবর্তন সম্ভব শুধুমাত্র নিউক্লিয়ার বা পারমাণবিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে। এর জন্য প্রয়োজন হয় বিশাল পরিমাণ শক্তির, আর তাই যে কোন পারমাণবিক বিক্রিয়া থেকে যে শক্তি নির্গত হয় তার সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়ার কোন তুলনাই করা সম্ভব নয়। সাধারণ বোমার চেয়ে নিউক্লিয়ার বোমা বহুগুণ শক্তিশালী। হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের ভয়াবহতা তাই আমাদেরকে স্তম্ভিত করে দেয়। নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার ফলে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের গঠন বদলে যায়, কিন্তু রাসায়নিক বিক্রিয়ায় নিউক্লিয়াসের কোন পরিবর্তন ঘটে না। আর ঠিক এ কারণেই সেই আরবীয় আ্যলকেমিষ্টরা বহু শতকের চেষ্টায়ও অন্য ধাতুকে সোনায় পরিণত করতে পারেননি, কারণ এর জন্য প্রয়োজন ছিলো নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার। প্রায় হাজার বছর আগে, সে সময়ে পরমাণুর গঠন বা পারমাণবিক বিক্রিয়ার কথা জানা না থাকায় তারা রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমেই মৌলিক ধাতুর পরিবর্তনের ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলেন যুগ যুগ ধরে ।

 

 

প্রত্যেকটি মৌলিক পদার্থের নিউক্লিয়াসেই নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রোটন কণা থাকে, আর নিউক্লিয়াসে প্রোটনের এই সংখ্যাকে বলে পারমাণবিক সংখ্যা (atomic number) যা দিয়ে মুলতঃ মৌলিক পদার্থের বেশীরভাগ রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারিত হয় (পরোক্ষভাবে একে ইলেকট্রনের সংখ্যাও বলা যেতে পারে কারণ  সাধারণভাবে পরামাণুর কক্ষ পথে বিপরীত চার্জবিশিষ্ট ইলেকট্রনের সংখ্যাও সমান থাকে)।  ইলেকট্রনের তুলনায় প্রোটন এবং নিউট্রনের ভার অপেক্ষাকৃত অনেক বেশী, তাই কোন পদার্থের ভর সংখ্যা (mass number) মাপা হয় তার প্রোটন এবং নিউট্রনের সংখ্যা দিয়ে। যেমন ধরুন, সাধারণত কার্বনের নিউক্লিউয়াসে ৬টি প্রোটন এবং ৬টি নিউট্রন থাকে, তাই তার ভর সংখ্যা  হচ্ছে ১২, একে বলে কার্বন-১২। সাধারণভাবে নিউক্লিউয়াসে নিউট্রনের সংখ্যা প্রোটনের সংখ্যার সমান বা কয়েকটা বেশী থাকে।  কিন্তু আবার কখনও কখনও কোন কোন পদার্থের নিউক্লিয়াসে সমান সংখ্যক প্রোটন থাকলেও তাদের বিভিন্ন ভার্শনের মধ্যে নিউট্রনের সংখ্যায় ভিন্নতা দেখা যায়। যেমন, কার্বন-১৩ এ রয়েছে ৭টি নিউট্রন আর কার্বন-১৪এ থাকে ৮টি নিউট্রন, যদিও তাদের প্রত্যেকেরই প্রোটনের সংখ্যা সেই ৬টিই। আর মৌলিক পদার্থগুলোর মধ্যে যখন প্রোটনের সংখ্যা সমান থাকে কিন্তু নিউট্রনের সংখ্যায় তারতম্য দেখা যায় তখন তাদেরকে বলা হয় আইসোটোপ (Isotope)।  তেজস্ক্রিয় ক্ষয় এবং তেজস্ক্রিয় ডেটিং বুঝতে হলে এই আইসোটোপের ব্যাপারটা ভালো করে বোঝা দরকার। এই আইসোটোপগুলোরই কোন কোনটা প্রকৃতিতে অস্থিত অবস্থায় থাকে এবং তারা ধীরে ধীরে ক্ষয়ের মাধ্যমে  নিজেদের নিউক্লিয়াসের গঠনের পরিবর্তনের মাধ্যমে আরেক মৌলিক পদার্থে রূপান্তরিত হয়। আইসোটোপের এই অস্থিরতারই আরেক নাম হচ্ছে ‘রেডিওআ্যকটিভিটি’ বা ’তেজস্ক্রিয়তা’। আর যে পদ্ধতিতে ক্ষয় হতে হতে তারা আরেক পদার্থে পরিণত হয় তাকেই বলে ‘তেজস্ক্রিয় ক্ষয়’।  যেমন ধরুন, সীসার ৪টি সুস্থিত,  কিন্তু ২৫টি অস্থিত আইসোটোপ আছে, আর এই ২৫টি অস্থিত আইসোটোপই হচ্ছে তেজস্ক্রিয় পদার্থ। আবার ইউরেনিয়ামের সবগুলো আইসোটোপই অস্থিত এবং তেজস্ক্রিয়। আর আমাদের এই পরম ডেটিং পদ্ধতির মুল চাবিকাঠিই হচ্ছে পদার্থের এই তেজস্ক্রিয় বৈশিষ্ট্য এবং তার ফলশ্রুতিতে ঘটা তেজস্ক্রিয় ক্ষয়।

 

 

এই তেজস্ক্রিয় ক্ষয় ঘটতে পারে বিভিন্নভাবে। আলফা এবং বেটা ক্ষয়ের কথা অনেক শুনি আমরা।   আলফা ক্ষয়ের সময় আইসোটোপটি একটা আলফা কণা (দু’টো প্রোটন এবং দু’টো নিউট্রনের সমন্বয়ে তৈরি এই আলফা কণা) হারায় তার নিউক্লিয়াস থেকে। অর্থাৎ তার ভরসংখ্যা ৪ একক কমে গেলেও  পারমাণবিক সংখ্যা বা প্রোটনের সংখ্যা কমছে মাত্র ২ একক। কিন্তু এর ফলাফল কি দাঁড়াচ্ছে? আর কিছুই নয়, নিউক্লিয়াসের গঠনের পরিবর্তন হয়ে আইসোটোপটি এক মৌলিক পদার্থ থেকে আরেক মৌলিক পদার্থে পরিণত হয়ে যাচ্ছে।

 

একটা উদাহরণ দিলে বোধ হয় ব্যাপারটা আরেকটু খোলাসা হবে – আলফা ক্ষয়ের ফলে ইউরেনিয়াম ২৩৮ (৯২ টি প্রোটন এবং ১৪৬ নিউট্রনের সমন্বয়ে তৈরি এই মৌলিক পদার্থটি) পরিণত হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন এক মৌলিক পদার্থ থোরিয়াম ২৩৪-এ (৯০ টি প্রোটন এবং ১৪৪ নিউট্রনের সমন্বয়ে তৈরি)। ওদিকে আবার বেটা ক্ষয়ের ক্ষেত্রে কিন্তু ঘটে আরেক ঘটনা। আইসোটোপের পরমাণু থেকে একটি ইলেকট্রন বের করে দিয়ে নিউক্লিয়াসের ভিতরের একটি নিউট্রন প্রোটনে পরিণত হয়ে যায়। আরও বিভিন্ন ধরণের প্রক্রিয়ায় তেজস্ক্রিয় ক্ষয় ঘটতে পারে। তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের মুলে রয়েছে বিভিন্ন আইসোটোপের ভিতরের নিউক্লিয়াসের গঠনের পরিবর্তন বা পারমাণবিক পরিবর্তন এবং তার ফলশ্রুতিতেই এক মৌলিক পদার্থ থেকে আরেক নতুন মৌলিক পদার্থে রূপান্তরিত হয় – এই ব্যাপারটা বোধ হয় এতক্ষণে আমাদের কাছে বেশ পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। আর যেহেতু ভূত্বকের বিভিন্ন শিলাস্তরে বিভিন্ন ধরনের আইসোটোপ পাওয়া যায় তাই এই তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে শিলা বা ফসিলের বয়স নির্ধারণ করা হয়। চলুন তাহলে দেখা যাক কিভাবে এই তেজস্ক্রিয় আইসোটোপগুলোকে ভূতাত্ত্বিক ঘড়ি হিসেবে ব্যবহার করে পৃথিবী এবং তার প্রাণের বিবর্তনের ধারাবাহিক ইতিহাসের চিত্রটিকে বিজ্ঞানীরা কালি কলমে পরিষ্কারভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।

 

বিভিন্ন শিলার মধ্যে বিভিন্ন ধরণের খনিজ পদার্থ বিদ্যমান থাকে, আর এই খনিজ পদার্থের মধ্যেই থাকে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপগুলো। আধুনিক তেজস্ক্রিয় ডেটিং পদ্ধতিগুলোর মধ্যে ইউরেনিয়াম-সিরিজ ডেটিং বহুলভাবে ব্যবহৃত। তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়াম-২৩৮ ক্ষয় হতে হতে সীসা-২০৬ এ পরিণত হয় সুদীর্ঘ সাড়ে চারশো কোটি বছরে। এক এক করে, পূর্বনির্ধারিত একটি নির্দিষ্ট হারে এই তেজস্ক্রিয় আইসোটোপগুলো নতুন এক স্থিত এবং অতেজস্ক্রিয় পদার্থে পরিণত হয়ে যেতে থাকে। দীর্ঘ সময়ের বিস্তৃতিতে ঘটতে থাকলেও এই ক্ষয় কিন্তু ঘটে একটি সুনির্দিষ্ট হারে, আর সেখানেই লুকিয়ে রয়েছে আমাদের রেডিওমেট্রিক বা তেজস্ক্রিয় ডেটিং পদ্ধতির জীয়নকাঠি। অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য এই ক্ষয়ের হার মাপার জন্য আইসোটোপের হাফ-লাইফ বা অর্ধ-জীবন -এর হিসাবটি ব্যবহার করা হয়।  বিজ্ঞানীরা প্রথমে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে, কোন এক আইসোটোপের নমুনার পরমাণুর অর্ধেকাংশের ক্ষয় হয়ে যেতে কত সময় লাগবে তার হিসেবটা বের করে ফেলেন। আইসোটোপের অর্ধ-জীবনের ব্যাপারটা একটা উদাহরণের মধ্যমে ব্যাখ্যা করে দেখা যাক: ধরুন, কোন একটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ’ক’ -এর অর্ধ-জীবন এক লাখ বছর, সে ধীরে ধীরে তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের মাধ্যমে মৌলিক পদার্থ ‘ক‘ থেকে ‘খ’ এ পরিণত হয় এবং এক লাখ বছরের শুরুতে পরমাণুর সংখ্যা ছিলো ১০০০। এখন প্রথম এক লাখ বছর বা এক অর্ধ-জীবন পার করে দেওয়ার পর আমরা আইসোটোপটিকে কি অবস্থায় দেখতে পাবো? আইসোটোপ ‘ক’ -এর ১০০০ পরমাণুর অর্ধেক ৫০০ পরমাণু এখনও সেই আগের অবস্থা ‘ক’ তেই রয়ে গেছে আর বাকী অর্ধেক বা ৫০০ পরমাণু ’খ’তে পরিণত হয়ে গেছে।  তাহলে কি ২ লাখ বছর ’ক’ -এর সবটাই ‘খ’ তে পরিণত হয়ে যাবে? না, অর্ধ-জীবনের হিসেবের কায়দাটা বেশ সোজা হলেও ঠিক এরকম সরলরৈখিক নয়। দুই লাখ বছর পরে দেখা যাবে যে, ‘ক’ -এর অবশিষ্ট ৫০০ পরমাণুর অর্ধেক অর্থাৎ আরও ২৫০টি ‘খ’ তে পরিণত হয়ে ’খ’ -এর পরমাণুর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৫০ এ, আর তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের ফলশ্রুতিতে ‘ক’ তে এখন অবশিষ্ট রয়েছে ২৫০টি পরমাণু। তারপর তিন লাখ বছর পর ‘খ’ -এর পরমাণুর সংখ্যা এসে দাঁড়াবে ৮৭৫ এ। এখন ধরুন, তিন লাখ বছর পর আজকে এখানে দাঁড়িয়ে একজন বিজ্ঞানী খুব সহজেই বের করে ফেলতে পারবেন এই আইসোপটিসহ শিলাটির বয়স কত। আর তার জন্য তাকে জানতে হবে দু’টো তথ্য: আইসোটোপ ’ক’ -এর অর্ধ-জীবন কত (বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যেই তার বিস্তারিত তালিকা তৈরি করে রেখেছেন), আর  ওই শিলায় ‘ক’ এবং ‘খ’ -এর পরিমাণের আনুপাতিক হার কত।

 

 

ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি ইত্যাদির ফলশ্রুতিতে ভূপৃষ্ঠে লাভা নির্গত হয়। লাভা যে মুহূর্তে ঠাণ্ডা এবং শক্ত হয়ে কেলাসিত হতে শুরু করে,  তখন থেকেই ঘুরতে শুরু করে এই তেজস্ক্রিয় ঘড়ির কাঁটা। তখন থেকেই ক্রমাগতভাবে নির্দিষ্ট হারে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ এবং ক্ষয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়, নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে এই তেজস্ক্রিয় মৌলিক পদার্থগুলো রূপান্তরিত হতে শুরু করে আরও সুস্থিত অন্য কোন মৌলিক পদার্থে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া যখন চলতে থাকে তখন আংশিকভাবে রূপান্তরিত পদার্থটির অংশটিও শিলাস্তরে ভিতরেই রয়ে যায়। তাই এদের দু’টোর পরিমাণের আনুপাতিক হার নির্ধারণ করা কোন কঠিন কাজ নয়। যেমন ধরুন, পটাসিয়াম-৪০ যখন সুস্থিত আর্গন-৪০ এ পরিণত হতে থাকে, তখন আর্গন-৪০ লাভার কেলাসের মধ্যে গ্যাসের আকারে আটকে থাকে। বিভিন্ন শিলার মধ্যে বহুল পরিমাণে পটাসিয়াম-আর্গন পাওয়া যায় বলে বিজ্ঞানীরা বহুলভাবে পটাসিয়াম-আর্গন ডেটিং পদ্ধতি ব্যবহার করেন। ইউরেনিয়াম সিরিজের ডেটিং -এর কথা আগেই উল্লেখ করেছিলাম। ইউরেনিয়াম ২৩৮ -এর অর্ধ-জীবন সাড়ে চারশো কোটি বছর, পটাসিয়াম ৪০ -এর হচ্ছে  ১৩০ কোটি বছর, ইউরেনিয়াম ২৩৫ -এর ৭৫ কোটি বছর, ওদিকে আবার কার্বন ১৫ -এর অর্ধ-জীবন হচ্ছে মাত্র ২.৪ সেকেন্ড। এত বিশাল সময়ের পরিসরে বিস্তৃত অর্ধ- জীবন সম্পন্ন তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলো রয়েছে বলেই বিজ্ঞানীরা আজকে একটি দু’টি নয়, বহু রকমের তেজস্ক্রিয় ডেটিং বা অন্যান্য ডেটিং -এর সাহায্য নিতে পারেন কোন ফসিলের বয়স নির্ধারণের জন্য। ফসিলের আপেক্ষিক বয়স সম্পর্কে একটা ধারণা করতে পারলে সেই অনুযায়ী প্রযোজ্য ডেটিং পদ্ধতিটা ব্যবহার করেন তারা।  বিভিন্ন পদ্ধতিতে ক্রস-নিরীক্ষণ করে তবেই তারা নিশ্চিত হন ফলাফল সম্পর্কে। আর তার ফলেই সম্ভব হয়ে ওঠে এত সুনির্দিষ্টভাবে এত প্রাচীন সব ফসিলের বয়স নির্ধারণ করা।  চলুন দেখা যাক বিভিন্ন ধরণের ডেটিং পদ্ধতি ব্যবহার করে কি করে ফসিলের বয়স বের করা হয়।

 

 

অনেক শিলাস্তরে বিশেষ করে আগ্নেয় শিলাস্তরে প্রচুর পরিমাণে ইউরেনিয়াম, পটাসিয়াম জাতীয় তেজস্ক্রিয় পদার্থ পাওয়া যায়। আবার পাললিক শিলার মধ্যে তেমন কোন তেজস্ক্রিয় পদার্থের অস্তিত্বই থাকে না। কিন্তু আমরা জানি যে, আগ্নেয় শিলায় ফসিল সংরক্ষিত হয় না, ফসিল পাওয়া যায় শুধু পাললিক শিলাস্তরে। তাহলে পাললিক শিলাস্তরের এই ফসিলগুলোর বয়স কিভাবে নির্ধারণ করা হয়? এক্ষেত্রে আপেক্ষিক এবং পরম দু’টো পদ্ধতিই ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রথমে পাললিক শিলা স্তরের উপরে এবং নীচে যে আগ্নেয় শিলাস্তর দু’টো তাকে স্যান্ডুইচের মত আটকে রেখেছে, তাদের বয়স নির্ধারণ করা হয়। এখান থেকে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন যে মধ্যবর্তী পাললিক শিলাস্তরে সংরক্ষিত ফসিলের বয়স এই দুই আগ্নেয় শিলাস্তরের বয়সের মাঝামাঝিই হবে। এখন যদি দেখা যায় যে, ফসিলটির নিজের মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণে তেজস্ক্রিয় পদার্থ আটকে গেছে তাহলে তেজস্ক্রিয় ডেটিং -এর মাধ্যমে ফসিলটির বয়স সরাসরিই নির্ধারণ করা যেতে পারে। সরাসরি ফসিলের বয়স হিসেব করার জন্য তেজস্ক্রিয় ডেটিং পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রেডিও-কার্বন ডেটিং হচ্ছে অত্যন্ত বহুলভাবে ব্যবহৃত আরেকটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতি দিয়ে শিলাস্তরের বয়স নয়, ফসিলের মধ্যে মৃত টিস্যুরই বয়স সরাসরি নির্ধারণ করে ফেলা যায়। কয়েক হাজার বছরের অর্থাৎ ভূতাত্ত্বিক সময়ের বিচারে অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক কালের ইতিহাস জানার জন্য এই পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে মানুষ এবং তার পূর্বপুরুষদের ফসিলের বয়স নির্ধারণে ব্যাপকভাবে রেডিও কার্বন ডেটিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।

 

 

সাধারণত আমরা প্রকৃতিতে যে কার্বনের কথা শুনি তার প্রায় সবটাই সুস্থিত আইসোটোপ কার্বন ১২। তবে খুবই সামান্য পরিমাণে হলেও অস্থিত কার্বন-১৪ -এর অস্তিত্বও দেখতে পাওয়া যায় প্রকৃতিতে। কসমিক রেডিয়েশন বা বিচ্ছুরণের ফলে বায়ুমণ্ডলে অনবরতই একটি নির্দিষ্ট হারে সুস্থিত নাইট্রোজেন ১৪ থেকে এই কার্বন-১৪ তৈরি হতে থাকে। এই কার্বন-১৪ -এর অর্ধ-জীবন  হচ্ছে ৫,৭৩০ বছর, অর্থাৎ প্রতি ৫৭৩০ বছরে কার্বন-১৪ -এর অর্ধেকাংশ তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের মাধ্যমে নাইট্রোজেন-১৪ এ রূপান্তরিত হয়। কার্বন-১৪ -এর অর্ধ-জীবন এত ছোট যে, খুবই অল্প পরিমাণে হলেও ক্রমাগতভাবে নাইট্রোজেন ১৪ থেকে কার্বন ১৪ তৈরি হতে না থাকলে প্রকৃতিতে এর অস্তিত্ব বেশীদিন টিকে থাকতে পারতো না। যাই হোক, এর উৎপত্তি এবং ক্ষয়ের হার ধ্রুব হওয়ার কারণে প্রকৃতিতে কার্বন-১২ আর কার্বন-১৪ -এর আনুপাতিক হার সব সময় সমান থাকে। এই দুই রকমের কার্বন আইসোটোপই বায়ুমণ্ডলে রাসায়নিক-ভাবে অক্সিজেনের সাথে যুক্ত হয়ে কার্বন ডাই অক্সাইডে পরিণত হয়ে যায়। উদ্ভিদ তার খাদ্য তৈরির জন্য এই কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে, আর ওদিকে প্রাণীকুল গ্রহণ করে উদ্ভিদকে তার খাদ্য হিসেবে, আবার তারাই হয়তো পরিণত হয় অন্য কোন প্রাণীর খাদ্যে। উদ্ভিদ যেহেতু কার্বন-১২ আর কার্বন-১৪ দিয়ে তৈরি উভয় কার্বন ডাই অক্সাইডই গ্রহণ করে তাই সমগ্র ফুড চেইন বা খাদ্য শৃঙ্খল জুড়েই এই দুই কার্বন আনুপাতিক হারে সমানভাবেই বিরাজ করে। বায়ুমন্ডল থেকে উদ্ভিদে, উদ্ভিদ থেকে প্রাণীর দেহে সঞ্চারিত হয় এই কার্বন ১২ এবং কার্বন ১৪। কিন্তু এই চক্রের সব কিছুই বদলে যায় যেই মাত্র প্রাণী বা উদ্ভিদের মৃত্যু ঘটে, সে আর নতুন কোন কার্বন ১৪ গ্রহণ করতে পারে না, তখন তার দেহে বিদ্যমান কার্বন-১৪ একটি নির্দিষ্ট হারে নাইট্রোজেন ১৪ এ রূপান্তরিত হতে থাকে। সুতরাং একটা মৃত জীবের দেহে কার্বন-১২ -এর তুলনায় কার্বন ১৪ -এর পরিমাণ আনুপাতিক হারে কমে যেতে শুরু করে। আর সে কারণেই ফসিলের দেহে বিদ্যমান কার্বন-১২ এবং কার্বন-১৪ -এর এই আনুপাতিক হার হিসেব করে সহজেই তার বয়স নির্ধারণ করে ফেলা যায়। তবে রেডিও কার্বন ডেটিং পদ্ধতি দিয়ে শুধুমাত্র অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক  কালের ফসিলের বয়স নির্ধারণ করা সম্ভব, ৩০ হাজার থেকে খুব বেশী হলে ৫০ হাজার বছরের পুরনো ফসিলের বয়স বের করা সম্ভব এই পদ্ধতিতে। আমরা আগেই দেখেছি, কার্বন-১৪ -এর অর্ধ-জীবন ভূতাত্ত্বিক সময়ের অনুপাতে খুবই ক্ষুদ্র, মাত্র ৫৭৩০ বছর ৬। তাই, ৩০-৫০ হাজার বছরের চেয়েও পুরনো ফসিলে যে অতি সামান্য পরিমাণে কার্বন ১৪ বিদ্যমান থাকে তা দিয়ে আর যাই হোক সঠিকভাবে তার বয়স নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে কয়েক হাজার বছরের ফসিলের ডেটিং -এর জন্য এই পদ্ধতির জুড়ি মেলা ভার।

 

তাহলে দেখা যাছে যে, তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলোর এই সুনির্দিষ্ট অর্ধ-জীবনের ব্যাপারটি আমাদের সামনে শিলাস্তরের এবং ফসিলের বয়স বের করার এই অনবদ্য সুযোগের দরজাটি খুলে দিয়েছে। বহু আগে থেকেই ধারণা করে আসলেও ১৯২০ সালের দিকেই প্রথম তেজস্ক্রিয় ডেটিং পদ্ধতি ব্যবহার করে দেখানো হয়েছিলো যে, পৃথিবীর বয়স কয়েকশো কোটি বছর। তারপর থেকে বিজ্ঞানীরা নানাভাবেই নানা রকমের তেজস্ক্রিয় পদ্ধতিতে ভূতাত্ত্বিক বয়স নির্ধারণের উপায় বের করেছেন। আর শুধু তেজস্ক্রিয় ডেটিং ই তো নয়, এর সাথে সাথে আরও বিভিন্ন ধরণের আধুনিক পদ্ধতিও আবিষ্কার করা হয়েছে পৃথিবীর এই মহাযাত্রার সময়কাল নির্ধারণের জন্য। যেমন ধরুন, বিজ্ঞানীরা এখন জানেন যে, পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র প্রায়শই তার দিক পরিবর্তন করে। ‘প্রায়শ’ বলতে আমাদের সাধারণ হিসেবে নয়, ভূতাত্ত্বিক বিশাল সময়ের তুলনায় ‘প্রায়শই’ বোঝানো হচ্ছে এখানে। গত এক কোটি বছরে পৃথিবী নাকি মোট ২৮২ বার উত্তর থেকে দক্ষিণে এবং দক্ষিণ থেকে উত্তরে তার চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক পরিবর্তন করেছে। আর তার সাথে সাথে আমাদের পৃথিবীর অভ্যন্তরের আগ্নেয়গিরির গলিত শিলার ভিতরের খনিজ পদার্থগুলোও কম্পাসের মতই দিক পরিবর্তন করে এবং তার একটা সুনির্দিষ্ট রেকর্ড রেখে দেয়। তারপর যখন এই লাভাগুলো শক্ত হয়ে শিলাস্তরে পরিণত হয় তখন এই রেকর্ডগুলো অবিকৃত অবস্থায় ওইভাবেই থেকে যায়। এ থেকেও ভূতত্ত্ববিদেরা অনেক শিলাস্তরেরই আপেক্ষিক বয়স নির্ধারণ করতে পারেন। এছাড়া আরও মজার মজার ধরণের কিছু ডেটিং পদ্ধতি রয়েছে, যেমন ধরুন, বড় বড় গাছের কাণ্ডে যে রিং বা বৃত্ত তৈরি হয় তার মাধ্যমেও উদ্ভিদের ফসিলের বা কাঠের বয়স বের করে ফেলা সম্ভব। বাৎসরিক বৃদ্ধির ফলে গাছের গোঁড়ায় যে স্তর বা বৃক্ষ-বৃত্তের সৃষ্টি হয় তা এক ধরণের প্রাকৃতিক নিয়ম মেনেই ঘটে, আর  এর থেকেই বিজ্ঞানীরা হিসেব করে বের করতে পারেন তার বয়স। এরকম আরও বহু ধরণের ডেটিং পদ্ধতি রয়েছে, নীচের ছবিটিতে (চিত্র ৭.৫) এরকম বিভিন্ন ধরণের ডেটিং পদ্ধতি এবং তাদের দিয়ে কোন কোন সময়ের সীমা নির্ধারণ করা যায় তার একটা সংক্ষিপ্ত তালিকা দেওয়া হল। এখন আর আমাদের একটি বা দু’টি ডেটিং পদ্ধতির উপর নির্ভর করে শিলাস্তর বা ফসিলের বয়স নির্ধারণ করার প্রয়োজন হয় না।

চিত্র: পরমাণুর গঠন বিভিন্ন রেঞ্জের সময়ের জন্য বিভিন্ন ধরণের ডেটিং পদ্ধতি

 

আমাদের হাতে আছে বহু রকমের পদ্ধতি যা দিয়ে কোন একটা ফলাফলকে বারবার বিভিন্নভাবে ক্রস চেক বা নিরীক্ষণ করে নিতে পারি। পদ্ধতিগুলো শুধু যে বৈজ্ঞানিক তাইই নয়, প্রয়োজন এবং গুরুত্ব অনুযায়ী বিজ্ঞানীরা এত রকমের পদ্ধতি ব্যবহার করেন যে, এর ফলাফলের সঠিকত্ব নিয়ে আর দ্বিমত বা সন্দেহ প্রকাশ করার তেমন অবকাশ থাকে না। খ্রিষ্টীয় ধর্মাবলম্বী বিভিন্ন রক্ষণশীল দলগুলো এখনও যখন বাইবেলের সেই ছয় হাজার বছরের পৃথিবীর সৃষ্টির ইতিহাস নিয়ে হইচই করেন এবং এই ডেটিং পদ্ধতিগুলোকে ভুল বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রচারণায় লিপ্ত হন তখন তাদের অজ্ঞতা দেখে স্তম্ভিত হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কি বা করার থাকে? উট পাখীর মত বালিতে মাথা গুঁজে পড়ে থাকলেই তো আর বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যাবে না। সত্যকে মেনে নিয়ে জ্ঞানের সীমাকে প্রসারিত করাই হচ্ছে মানব সভ্যতার রীতি, এভাবেই আমরা এগিয়েছি।

 

 

# উত্তরটি বন্যা আহমেদ, বিবর্তনের পথ ধরে (পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত ২০০৮) হতে সংগৃহীত


# Dawkins, R, 2004, The Ancestor’s tale, Houghton Miffin Company, NY, Boston: USA, pp 516-523.

# TM Berra, 1990, Evolution and the Myth of Creationism, Stanford,University Press, Stanford, California, pp 36-37.

# C Stringer and Andrews P, The Complete Wrold of Human Evolution,  Thames and Hudson Ltd, London, p 32, 2005,

Categories
অনলাইন প্রকাশনা আত্ম উন্নয়ন গবেষণামূলক প্রকাশনা চিকিত্সাশাস্ত্র এবং বিজ্ঞান ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা বিজ্ঞান বিবর্তন ভালবাসা/প্রণয়লীলা

বিবর্তন যৌনতা বা সেক্সের উদ্ভবকে ব্যাখ্যা করতে পারে না

বেশ কয়েকটি বিষয়কে ‘সেক্স’ এর উদ্ভবের কারণ হিসবে ধরা যেতে পারে। 

১) যদি অযৌনপ্রজনের মাধ্যমে বংশ বৃদ্ধি হতে থাকে, তাহলে জনপুঞ্জে কোন ভ্যারিয়েশন থাকে না। ফলে কোন এক সময় বাজে মিউটেশনের ফসল হিসেবে কোন একটায় মড়ক লাগলে পুরো প্রজাতিতে তা ছড়িয়ে পড়বে আর প্রজাতি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। পরীক্ষায় দেখা গেছে যে এই ব্যাপারটা অনেক ক্ষেত্রেই সত্য। 

২) যৌন প্রজনন জীবজগতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে জেনেটিক প্রকরণ বা ভিন্নতা তৈরি করে বলে মনে করা হয়, যা বিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি। এর ফলে জনপুঞ্জে উন্নত বৈশিষ্ট্যের বিস্তার ঘটে। 

৩) যৌন প্রজনন প্রজন্মে খারাপ মিউটেশনেরর লোড কমিয়ে আনে। 

৪) বিভিন্ন প্যারাসাইটিক আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

যৌনতার উপত্তি হয়েছে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন বছর আগে। এর উপত্তির কারণ নিয়ে নানা মুনির নানা মত আছে। এর মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী একটি অনুকল্প হল  রেড কুইন প্রকল্প। অনুকল্পটি নিয়ে অল্প কথায় বলতে গেলে বলা যায় – যৌনসঙ্গমের মাধ্যমে যে সন্তানটি শেষপর্যন্ত উপন্ন হয়, ব্যক্তিগত স্তরে তার জিনের গঠণ তার বাবা-মার জিনের গঠণের মিশ্রণ হয়। এতে করে কোন জীবাণু তার বাবা-মাকে আক্রান্ত করতে পারলেও তাকে আক্রান্ত করতে বেগ পেতে হয়। একটা অনেকটা ব্যাংক ভল্টের পাসওয়ার্ডের মতো। পাসওয়ার্ড সবসময় অপরিবর্তিত রাখলে যেকোন চোর কোন এক সময় পাসওয়ার্ডটি হ্যাক করে ফেলতে পারে। কিন্তু পাসওয়ার্ড সবসময় পরিবর্তন করলে তস্করের পক্ষে পাসওয়ার্ড হ্যাক করা কঠিন হয়ে পড়ে। সেক্স ব্যাপারটিও যৌনপ্রজ প্রাণীদেরও একই ধরণের নিরাপত্তা প্রদান করে। যৌনতার কারণে জিনমিশ্রণের ফলশ্রুতি হিসেবে আমাদের (অর্থা যৌনপ্রজ প্রাণীদের) শরীরের পাসওয়ার্ড বারংবার পরিবর্তিত হতে থাকে, একারণে জীবাণুর পক্ষে আমাদের শরীরের প্রতিরোধ হ্যাক করা কঠিন হয়ে পড়ে। ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হ্যান্স ব্রিমারম্যান তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, যৌনতার উদ্ভব ছাড়া দেহের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে পারতো না। রেডকুইন তত্ত্ব অনুযায়ী যৌনতার উদ্ভবের কারণ ওটাই, এবং তা বিবর্তন তত্ত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। 

 

Sources:

# Wuethrich, Bernice, 1998. Why sex? Putting theory to the test. Science 281: 1980-1982.

# Davies, E. K., A. D. Peters and P. D. Keightley, 1999. High frequency of cryptic deleterious mutations in Caenorhabditis elegans. Science 285: 1748-1751.

# Sá Martins, J. S., 2000. Simulated coevolution in a mutating ecology. Physical Review E 61(3): R2212-R2215.

# Barton, N. H. and B. Charlesworth, 1998. Why sex and recombination? Science 281: 1986-1990.

# Matt Ridley, The Red Queen: Sex and the Evolution of Human Nature, Harper Perennial, 2003

# Bremermann HJ, The adaptive significance of sexuality. In: The evolution of sex and its conse- quences (Stearns SC, ed). Basel: Birkhauser; 135-161, 1987.

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গবেষণামূলক প্রকাশনা প্রকৌশল ও বিজ্ঞান বিজ্ঞান

রহস্যময় মহাবিশ্ব ও চিরন্তন জীবন জিজ্ঞাসা-১,২ ,৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮ ও ৯

রহস্যময় মহাবিশ্ব ও চিরন্তন জীবন জিজ্ঞাসা -১,২ ,৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮ ও ৯
——– ডঃ রমিত আজাদ

রহস্যময় মহাবিশ্ব ও চিরন্তন জীবন জিজ্ঞাসা -১
——– ডঃ রমিত আজাদ

অপার রহস্যে ঘেরা আমাদের এই মহাবিশ্ব। আর তার মধ্যে রহস্যময় একটি সত্তা আমরা – ‘মানুষ’। এই দু’য়ের সম্পর্কও কম রহস্যময় নয়। মহাবিশ্বের বিবর্তন বা বিকাশের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ ফলাফল মানুষ, সেই মানুষই আবার গভীর আগ্রহ নিয়ে অধ্যয়ন ও পর্যবেক্ষণ করছে তার চারপাশের মহাবিশ্বটিকে। কি এই মহাবিশ্ব? আমরা কারা? কি সম্পর্ক মহাবিশ্বের সাথে আমাদের অথবা আমাদের সাথে মহাবিশ্বের? কোথা থেকে এল এই মহাবিশ্ব? তারপর থেকে ক্রমাগত কি ঘটছে? এর শেষ কোথায়? এই সব প্রশ্ন ঘুরে ফিরে মানুষের মস্তিস্ক থেকে হৃদয় আর হৃদয় থেকে মস্তিস্ক পর্যন্ত। এইসব চিরন্তন জীবন জিজ্ঞাসার যতটুকু উত্তর এ যাবতকাল আমাদের জানা হয়েছে দর্শন ও বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোন থেকে। সেইসব উত্তর ধারাবাহিকভাবে দেয়ার চেষ্টা করব আমার এই সিরিজে।

পাঠকদের অনুরোধ করব গঠনমূলক সমালোচনা করতে। আমার দেয়া কোন তথ্য যদি ভুল হয়, অনুগ্রহপূর্বক সঠিক তথ্য দিয়ে আমাকে সাহায্য করবেন।

প্রথমেই শুরু করছি গত দু’একমাসের উত্তপ্ত সংবাদ, ঈশ্বর কণা নামে ক্ষ্যত হিগস বোসন নিয়ে। কি এই হিগ্স বোসন? কেন একে নিয়ে এত হইচই? এই সংক্রান্ত আলোচনার গভীরে যেতে হলে প্রথমে শুরু করতে হবে বস্তু (matter) সংক্রান্ত আলোচনা দিয়ে।

যেকোন দর্শনের বিদ্যালয়ের জন্য বস্তুর ধারণাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস-দর্শনের বিকাশের ধারায় বস্তুর ধারণা একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে। সকল অস্তিত্ববান জিনিসের উৎস অনুসন্ধানের ধারায় দার্শনিকরা তাকে কখনো দেখেছেন পানিতে (দার্শনিক থালেস), কখনো দেখেছেন বাতাসে (দার্শনিক এ্যানেক্সিমেনেস), আবার কখনো দেখেছেন আগুনে (দার্শনিক হেরাক্লিটাস)। এদিকে দার্শনিক এমপেডোক্লেস বিশ্বাস করতেন সবকিছুর উৎস চারটি – আগুন, পানি, বাতাস এবং মাটি। আবার আমাদের উপমহাদেশের দার্শনিকরা বলেছেন পঞ্চভুতের (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুত, ব্যোম – মাটি, পানি, আগুন, বাতাস, আকাশ) কথা।

ইতিমধ্যে খ্রীষ্টেপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস এবং লুসিপাস বস্তুকে বোঝার জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন পদক্ষেপ নেন। তারা এই ধারণার অবতারনা করেন যে এই পৃথিবীর সবকিছু এমনকি মানুষের মন , ক্ষুদ্রতম, সরলতম, অবিভাজ্য এবং অদৃশ্য কণা দ্বারা গঠিত, তাঁরা এর নাম দেন পরমাণু (Atom) । যা গতিশীল অবস্থায় স্থানে অবিরত যুক্ত হচ্ছে, ভাঙছে এবং অবস্থান পরিবর্তন করছে। আমাদের উপমহাদেশে একই ধারণা দিয়েছিলেন ঋষি কণাদ। ডেমোক্রিটাস তার জীবনের কিছু সময় পারস্যে কাটিয়েছিলেন। এমনও হতে পারে যে কণাদের ধারণাটিই তিনি প্রচার করেছিলেন।

প্রাচীন গ্রীস এবং রোম-এর দার্শনিকগণ এই ধারণাটিকে বিকশিত করেন মধ্যযুগ পর্যন্ত। এরপর উদ্ভব হয় নতুন দার্শনিক ঐতিহ্যের, যার নাম স্কলাস্টিকস। স্কলাস্টিকস দর্শনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল একটি ধর্মীয় গ্রন্থে এর দ্ব্যর্থহীন ব্যাখ্যা প্রদান করে ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ করা । এই রীতি চলে চতুর্থ থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত, এবং এই সময়কালে বস্তুর ধারণা নিয়ে গবেষণা ও চিন্তাভাবনা কার্যত বন্ধই থেকে যায়।

পরবর্তিতে ইসলামের স্বর্ণযুগে (Islamic Golden Age) মুসলিম দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরাও বস্তুর ধারণা নিয়ে ব্যপক কাজ করেন। ইউরোপীয় বিজ্ঞানী ল্যাভয়সীয়ের ‘ভরের নিত্যতার সুত্রের’ আবিস্কারের যে স্বীকৃতি রয়েছে, তার কয়েক শতাব্দী আগেই মুসলিম পন্ডিত আল বিরুনী (১১শ শতাব্দী) এই নীতি আবিস্কার করেছিলেন। ল্যাভয়সীয়ে মুসলিম রসায়নবিদ এবং পদার্থবিদদের একজন শিষ্য ছিলেন এবং প্রায়ই তিনি মুসলিম বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন বইয়ের রেফারেন্স দিতেন। মুসলিম বিজ্ঞানী আল হাইয়াম (১১শ শতাব্দী), যাকে আধুনিক আলোক বিজ্ঞানের জনক বলা হয়, তিনি আলো সম্পর্কে বলেছিলেন যে, আলো এক প্রকার কণিকার স্রোত।ইতিমধ্যে মুসলিম স্পেনের তলেদো ও কর্ডোভার জ্ঞানকেন্দ্রগুলোর আলো অন্ধকার ইউরোপে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এই আলোই পরবর্তিতে জন্ম দেয় ইউরোপীয় রেনেসাঁর।

১৬ থেকে ১৮ শতাব্দীর মধ্যে আবার বস্তুকে সঠিকভাবে বুঝতে পারার বিষয়টি জরুরী হয়ে ওঠে। ইতিমধ্যে বৈজ্ঞানিক ধারণা লক্ষণীয়ভাবে প্রসারিত হয়, এবং স্যার আইজাক নিউটনের প্রতিষ্ঠিত বলবিজ্ঞান তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির উপর সর্বাধিক প্রভাব বিস্তার করে। কেউ কখনো পরমাণু দেখেনি, এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে মনে করা হয় যে, বস্তু হলো আমাদের চারপাশের বিভিন্ন জিনিস এবং কায়ার সত্তা, যা বলবিজ্ঞানের আইন মেনে চলে (ফ্রান্সিস বেকন, থমাস হব্স এবং জন টল্যান্ড)। এই নিবন্ধে আরো যোগ করা প্রয়োজন যে বিশুদ্ধরূপে মানসিক প্রত্যাশা গুলো ছাড়া আর সকল প্রকার ফর্মেশনই বলবিজ্ঞানের অধীনস্থ আইন হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত বলে মনে করা হয়েছিল। বলবিজ্ঞানীয় বস্তুবাদ অনুযাযী, মানসিক বিষয় ছাড়া আর কোন ফর্মেশনই থাকতে পারেনা যা বলবিজ্ঞানের আইনগুলোর অধীন হবে না । ১৮শতাব্দীর ফরাসি জড়বাদী (লা মেতর, হেলভেসিয়াস, দিদেরত, এবং বিশেষভাবে হলবাখ)-দের দ্বারা বষ্তুর ধারণার গুরুত্বপূর্ণ নতুন রূপরেখা তৈরী হয়, যারা পূর্ববর্তী দর্শনের সংকীর্ণতাকে অতিক্রম করতে পেরেছিলেন। যে চিন্তাবিদরা এই চিন্তন প্রবণতা ধরে রেখেছিলেন তারা সবসময়ই এই বিষয়ে সচেতন ছিলেন যে বলবিজ্ঞান সর্ব প্রকারের গতির বহুরূপত্ব বর্ণনা করতে পারেনা। হলবাখ (Holbach) বলেছিলেন, বস্তু হলো তাই, যা কোন না কোন ভাবে আমাদের অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। সম্ভবত: এই বিবৃতিটিই বস্তুর ধারণার আধুনিক রূপ ।

রুশ রাষ্ট্রনায়ক ও দার্শনিক ভ. ই. লেনিন বস্তুর নিম্নরূপ সংজ্ঞা দিয়েছিলেন।বস্তু হলো সেই দার্শনিক প্রত্যয় যা বস্তুগত সত্য, যা মানুষ তার অনুভূতির দ্বারা বুঝতে পারে, এবং যার প্রতিলিপি করা যায়, যার ছবি তোলা যায় ও যা আমাদের অনুভূতিতে প্রতিফলিত হয়, আবার তা আমাদের অনুভূতির উপর একেবারেই নির্ভরশীল না হয়ে স্বাধীনভাবে অস্তিত্ববান।
(Matter is a philosophical category denoting the objective reality which is given to man by his sensations, and which is copied, photographed and reflected by our sensations, while existing independently of them.)
প্রথম দিকে সংজ্ঞাটি সুন্দর মনে হলেও পরে এর ভুল ধরা পড়ে। Matter is a philosophical category- এই কথাটি স্ববিরোধী। মানে কি দাঁড়ালো, matter হলো non-matter? কথিত আছে লেনিন নিজেই পরে এই ভুলটি লক্ষ্য করেছিলেন।

আমরা ইতিমধ্যে বস্তুর সংজ্ঞা সম্পর্কে অনেক বলেছি, কিন্তু কি আমাদের আলোচনা থেকে কোন বাস্তবসম্মত উপসংহার টানতে ব্যর্থ হয়েছে. পদার্থবিজ্ঞান বিংশ শতাব্দী শুরু করে একটি সংকটের মধ্যে দিয়ে। 1897 সালে পরীক্ষামূলকভাবে ইলেক্ট্রন আবিষ্কৃত হয়। এর দ্বারা বোঝা যা্য যে, পরমাণুর গঠন অত্যন্ত জটিল। স্পষ্টত: প্রমাণীত হয় যে পরমাণু কয়েকটি কণা, যেমন ইলেকট্রন প্রোটন (পরমাণুর কেন্দ্রস্থিত অংশের ধনাত্মক আধানযুক্ত ক্ষুদ্র কণিকা) এবং নিউট্রন-এর দ্বারা গঠিত। কিন্তু তাদের পারস্পরিক ক্রিয়া সংক্রান্ত পরবর্তী গবেষণাগুলো পদার্থবিজ্ঞানকে কানাগলিতে নিয়ে যায়।
শক্তির (energy) সংরক্ষণ নীতি, যা কিনা বস্তুর সংরক্ষণ নীতির ভিত্তি স্বরূপ, তা হলো প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের একটি মৌলিক মতবাদ। যদি আপনি প্রতিটি ২০ গ্রাম ভরের দুইটি স্বর্ণমুদ্রা নেন, এবং তদেরকে গলিয়ে একটি ধাতুপিণ্ড তৈরী করেন, আদর্শ অবস্থায় সেই ধাতুপিণ্ডটির ওজন হওয়ার কথা ৪০ গ্রাম। কিন্তু মৈলিক কণিকার জগতে প্রায়শঃই এই নিয়মের ব্যাত্যয় ঘটে। দুইটি কণিকার মিথস্ক্রিয়ায় একটি তৃতীয় কণিকার জন্ম হয়, এবং যার ভর প্রথম দুইটি কণিকার ভরের যোগফলের তুলনায় লক্ষণীয়ভাবে কম হয়। এই অবস্থাটি প্রকৃতিবিজ্ঞানীদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়, কেননা তা পদার্থবিজ্ঞানের নীতিগুলোর পরিপন্থী বলে মনে হতে থাকে। বিজ্ঞানীরা এই মনে করতে শুরু করেন যে, বস্তু কোনরূপ আলামত (trace) ছাড়াই অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে । এভাবে দার্শনিক জড়বাদ তার মৌলিকত্বের গভীরতা হারিয়ে ফেলে।

পরে অবশ্য আরও বিস্তারিত ভৌত পরিমাপ এই দেখায় যে, দুইটি কণিকার মিথষ্ক্রিয়ায় শুধুমাত্র একটি তৃতীয় কণিকা নয়, বরং ফোটন নামক একটি চতুর্থ কণিকারও জন্ম হয়। এটি আলোর কণিকা যা প্রাথমিকভাবে একটি বস্তুর উপাদান হিসেবে অজানা ছিল। এই ফোটনের ভর হিসাবের মধ্যে এনে পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক আইনগুলো পুনঃস্থাপিত হয়। তার মানে ঘটনাটি বস্তুর বিলীন হওয়া ছিলনা, বরং আমাদের জ্ঞাত বিষয়গুলোর বিলীন হওয়া ছিল। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের পরবর্তী আবিষ্কারগুলোও আমাদের দার্শনিক ধারণা এইভাবে প্রসারিত ও সুস্পষ্ট করে যে, বস্তু শুধুমাত্র পদার্থ রূপেই থাকেনা, যেমনটি আমরা আগে ভাবতাম, বরং ক্ষেত্র (field) রূপেও থাকে। আলো একটি নির্দিষ্ট রূপ যাকে পদার্থও বলা যাবেনা আবার কায়াও বলা যাবেনা।আলো এতকাল যাবৎ জ্ঞাত বস্তুগুলোর মত স্থানে কোন নির্দিষ্ট সীমা দখল করেনা, কিন্তু তা ক্ষেত্র নামে বস্তুর একটি নির্দিষ্ট রূপ। আজকের প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ইতিমধ্যে আরো কিছু ক্ষেত্রের কথা জানে, এগুলো হলো – পারমাণবিক, মহাকর্ষীয় এবং ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক। বর্তমানে আমরা আরো জানি যে, আলোর দ্বৈত সত্তা রয়েছে। আলো একই সাথে তরঙ্গ ও কণিকার মত আচরন করে। পদার্থ, শক্তি, কণিকা ও ক্ষেত্র এরা সকলেই বস্তুর রূপভিন্নতা।
বস্তুর গুনাগুন বলেতে বোঝানো হয় তার বৈশিষ্ট্যকে, যা ছাড়া কোন বস্তু টিকে থাকতে পারেনা। বস্তুর মূল বৈশিষ্ট্যের মধ্যে প্রাথমিকভাবে ধরা যায় গতি, স্থান, সময় এবং প্রতিফলন ।

পরবর্তি সিরিজে পদার্থ, শক্তি, কণিকা, ক্ষেত্র, ইত্যাদি বস্তুর রূপভিন্নতা নিয়ে এবং এর পাশাপাশি স্থান, সময় অর্থাৎ বস্তুর গুনাগুন নিয়ে আলোচনা করব।

 

রহস্যময় মহাবিশ্ব ও চিরন্তন জীবন জিজ্ঞাসা -২

গত পর্বে বস্তু (matter) সম্পর্কে কিছু আলোচনা হয়েছে। এই পর্বে আলোচনা করব গতি নিয়ে।

গতি
গতি কথাটিকে আপাতভাবে সরল মনে হলেও এর দার্শনিক ব্যাখ্যা কিন্তু অত সহজ নয় আর দৈনন্দিন ধারণা থেকে একেবারেই ভিন্ন।
আমরা সাধারনতঃ বলে থাকি যে, একটি অবজেক্ট অন্য একটি অবজেক্টের সাপেক্ষে অবস্থান পরিবর্তন করলেই তাকে গতি বলা হয়। বলবিজ্ঞান-এর দৃষ্টিকোণ থেকে এটা সত্য, কিন্তু দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে অপর্যাপ্ত। প্রকৃতপক্ষে একটি নির্দিষ্ট অবজেক্ট-এর বাইরে অন্যান্য অবজেক্ট-এর অস্তিত্ব আছে, কিন্তু বস্তুর বাইরে কোন কিছুরই অস্তিত্ব নেই। গতির দার্শনিক ব্যখ্যার আলঙ্কারিক উপমা নিম্নের ঘটনায় দেখা যেতে পারে – গ্যাস আয়তনের বৃদ্ধি দেখা যায় যখন একটি শিশু বায়বীয় বা তরল মাধ্যমে একটি রবার বেলুন ফোলায়।

একটি হ্রদে পানির স্রোত মিশ্রিত হওয়া যদি আমরা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে আমরা স্পস্টভাবে দেখতে পাবো যে, হ্রদের পানির গতি কোন শূণ্যতা (vacuum) সৃস্টি করেনা। ইতিপূর্বে দখলকৃত পানির স্রোতকে তাৎক্ষণিকভাবেই নতুন পানির স্রোত দখল করে নেবে। বস্তুর গতি বলতে বিচ্ছিন্ন (isolated) কোন কিছু বোঝানো যাবেনা; কোন একটি পরমাণু, গ্রহ অথবা গ্যালাক্সির অবস্থানের পরিবর্তন সবসময়ই প্রতিবেশী কোন বস্তুর অবস্থানের পরিবর্তনের সাথে সম্পর্কিত/সহগামী।
এটা উল্লেখযোগ্য যে, পরম শূণ্যতা (absolute vacuum) বলে কিছুই নেই।পুরো মহাবিশ্বই (Universe) পদার্থ (substance), কণিকা (particle) অথবা ক্ষেত্র (field) দ্বারা পরিপূর্ণ। পাশাপাশি একথা বলার অপেক্ষাই রাখেনা যে মহাবিশ্বের প্রতিটি বিন্দুতেই সদাবিরাজমান মহাকর্ষ ক্ষেত্র (gravitational field)। বস্তুর ঘনতম মিশ্রণ হলো একটি বহুল পরিচিত জ্যোতিস্ক (astronomical object) যার নাম ব্ল্যাক হোল।
বস্তুর গতি মানে তার ঘনত্ব (density), গঠন (composition), সম্পৃক্তি (saturation) এবং ঘনীভবন (concentration)-এর নিম্নসীমা থেকে ঊর্ধ্ব সীমা এবং তদ্বিপরীত ঊর্ধ্ব সীমা থেকে নিম্নসীমা পর্যন্ত অবিরাম পরিবর্তন । এই পথ স্বাভাবিকভাবেই সরলরৈখিক নয়, বরং নানা প্রকৃতির কখনো বৃত্তাকার, কখনো বিপরীতমুখী, পাশাপাশি ত্বরান্বিত (accelerated) অথবা মন্দিত (retarded) পরিবর্তন ।

দর্শন শাস্ত্রে গতির কতগুলো ধর্ম রয়েছে। এগুলো হলো বস্তুগততা (materiality), পরমতা (absoluteness) এবং সুনির্দিস্টতা (concreteness)। গতির বস্তুগততা মানে আমরা বুঝব যেখানে বস্তু নাই, সেখানে গতিও নাই। গতি কেবলমাত্র বস্তুরই ধর্ম। উধাহরণস্বরূপ, পথচারী, ইলেকট্রন, পিস্টন, ধুমকেতু এরা সকলেই গতিশীল এবং সকলেই বস্তু । গতির পরমতা বলতে আমরা এই বুঝব যে, গতিহীন কোন বস্তু হয়না। বস্তু মাত্রই গতিশীল। সকল বস্তু সকল অবস্থাতেই সর্বদাই গতিশীল। স্থিতি একটি আপেক্ষিকতা মাত্র, পরম স্থিতি বলে কিছু নেই।

গতির তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম হলো সুনির্দিস্টতা। বিষয়টি হলো এমন যে, যে কোন বস্তুর গতির প্রকৃতি ও রূপ নির্ভর করে বস্তুটির গঠনের উপর। গতি চিরন্তন বটে তবে তা কখনো সুনির্দিস্ট কখনো আপেক্ষিক রূপে দেখা দেয়। গতির বাহক (carrier) এবং মৌলিক আইনের (fundamental laws) উপর নির্ভর করে গতির বিভিন্ন রূপ দেখা যায়। যেমন, যান্ত্রিক (mechanical) (বাহক – মনুষের দ্বারা পরিমাপযোগ্য, অর্থাৎ অতি ক্ষুদ্র নয় আবার অতি বৃহৎ নয় এমন কায়া; আইন – নিউটনীয় (চিরায়ত) বলবিদ্যার আইন)। ভৌত (physical) অর্থাৎ তাপীয় (thermal), বৈদ্যুতিক (electrical), আলো ইত্যাদি ( বাহক – অণু, পরমাণু, ইলেকট্রন ইত্যাদি ক্ষুদ্র কণিকা, আইন – আনবিক পদার্থবিদ্যা, কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ইত্যাদি ক্ষুদ্র কণিকার বিজ্ঞানের আইন), জৈবিক (biological) (বাহক – জীব, আইন – প্রাকৃতিক নির্বাচন (natural selection) অর্থাৎ পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াবার আইন)। মনস্তাত্ত্বিক (psychological) (বাহক – মস্তিস্ক এবং স্নায়ু), সামাজিক (social) ( বাহক – মানুষ এবং মানব সমাজ, আইন – সমাজবিদ্যার আইন)

এদিকে ৯০-এর দশকের ধারণাগুলো অনুযায়ী আমরা জানি যে, বিজ্ঞান যে সকল গতির প্রকারভেদের কথা বলে তার সাথে উপরের ৬টি প্রকারের পুরোপুরি মিল খুঁজে পাওয়া যায়না, বরং তা একটি বহুবিধ শাখা-প্রশাখা সম্বলিত বৃক্ষের সাথে তুলনীয়। পদার্থবিজ্ঞানীরা ভূবিজ্ঞান (geology), সাইবারনেটিক্স (cybernetics), গতির ইনফর্মেশন রূপ এবং মৌলিক কণিকা গুলোর গতি অধ্যয়ন করছে। বর্তমানে এমন সব বস্তুরও সন্ধান পাওয়া গি্যেছে যার উৎস ও গতির প্রকৃতি অন্ধকারাচ্ছন্ন। এর উজ্জ্বল উদাহরণ কোয়াজার (quasar)।

 

রহস্যময় মহাবিশ্ব ও চিরন্তন জীবন জিজ্ঞাসা -৩

প্রথম পর্বে বস্তু (matter) সম্পর্কে কিছু আলোচনা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা করা হয়েছে গতি (motion) নিয়ে। এবারের পর্বে আলোচনা করব স্থান ও কাল (space and time) নিয়ে।

স্থান ও কাল

স্থান কি ও কাল কি এই জিজ্ঞাসাও মানুষের চিরন্তন। মানব জ্ঞান ও মানব জাতির ইতিহাসে এটি মৌলিক প্রশ্ন সমূহের একটি। মানব ইতিহাসের গতিধারায় স্থান ও কালের ধারনাও পাল্টেছে বহুবার। বস্তুর এই গুনাগুন (attributes) দুইটিকে সম্মিলিত ভাবেই অধ্যয়ন করা হয়।

স্থানের প্রকৃতি, গুনাবলী ও অস্তিত্বের ধরণ নিয়ে বিতর্ক চলছে সেই অনাদিকাল থেকে। যেমন প্লেটোর ট্রিটিজ (treatise) Timaeus অথবা সক্রেটিসের khora (অর্থাত্ “স্থান”), অথবা এরিস্টটলের (ডেল্টা বইয়ের IV নং অধ্যয় ) topos (অর্থাৎ জায়গা)-এর সংজ্ঞা, অথবা ১১ তম এর শতাব্দীর আরব polymath আলহাজেন-এর “স্থান সম্পর্কিত ডিসকোর্স (Qawl fi al-Makan)”-এর মধ্যে “স্থানের জ্যামিতিক ধারণা” “space qua extension” হিসাবে আলোচিত হয়েছে।

রেনেসাঁ-র যুগেও এই সকল চিরায়ত দার্শনিক প্রশ্নগুলো আলোচিত হয়েছে । তারপর ১৭ শতাব্দীতে বিশেষত চিরায়ত বলবিজ্ঞানের প্রথম যুগে তাদেরকে পূণর্বিন্যাসও করা হয়েছে। স্যার আইজাক নিউটনের মতে, স্থান হচ্ছে পরম – অর্থাৎ স্থান স্থায়ীভাবে এবং স্বাধীনভাবে চিরকাল ছিল ও আছে। সেই স্থানে বস্তু থাকুক বা না থাকুক তার উপর স্থান নির্ভরশীল না।

গ্রীক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস এবং এপিকুরাস মনে করতেন স্থান হলো সমসত্ত্ব (homogenous) ও অসীম শূণ্যতা, যা কম বেশী পরমাণু দ্বারা পরিপূর্ণ।

অন্যান্য প্রাকৃতিক দার্শনিকরা, যাদের মধ্যে Gottfried Leibniz-এর নাম উল্লেখযোগ্য, তিনি ভেবেছিলান যে স্থান হচ্ছে বস্তুর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের একটি সংগ্রহ, যা নির্ধারিত হচ্ছে একে অপরের থেকে তাদের দূরত্ব এবং দিকবিন্যাস দ্বারা। ১৮ শতাব্দীর দার্শনিক ও ধর্মতত্ত্ববিদ জর্জ বার্কলে তার রচনা “Towards a New Theory of Vision” – এ “স্থানিক গভীরতার দৃশ্যমানতা” (visibility of spatial depth) সম্পর্কে নতুন ধরনের বিবৃতি প্রদান করেন।
পরবর্তীতে, অধিবিদ্যাবিদ (meta-physician) ইমানুএল কান্ট বলেন স্থান বা সময় কাউকেই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যভাবে (empirically) হৃদয়ঙ্গম করা যাবে না, তারা একটি পদ্ধতিগত কাঠামোর উপাদান যা মানুষ তার সকল অভিজ্ঞতা কাঠামোগত করার জন্য ব্যবহার করে থাকে।

উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে গণিতবিদরা অ-ইউক্লিডিয় জ্যামিতি নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন, যেখানে স্থান আর সমতল নয় বরং বক্র।
আমাদের এ যাবৎকাল যা জানা আছে তার মধ্যে সময় সম্পর্কে লিখিত প্রাচীনতম লেখাটি মিশরীয় চিন্তাবিদ প্টাহহোটেপ (Ptahhotep (c. 2650–2600 BCE))-এর তিনি বলেছিলেন: “Do not lessen the time of following desire, for the wasting of time is an abomination to the spirit.” আর্যদের প্রাচীনতম গ্রন্থ বেদ (খ্রীস্টপূর্ব ২০০০ সালে লিখিত বলে ধারণা করা হয়)-এ বিশ্বতত্ব (cosmology)-এর বর্ণনা রয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে এই মহাবিশ্ব চক্রাকেরে বারংবার সৃস্টি, বিকাশ, ধ্বংস ও পূনর্জন্মের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি চক্রের বয়স ৪৩২০০০০ (তেতাল্লিশ লক্ষ বিশ হাজার ) বছর ।

গ্রীকরা যেমন ধারণা করেছিল যে, এই মহাবিশ্বের রয়েছে অসীম অতীত এবং এর কোন শুরু নাই। গ্রীকদের বিপরীতে মধ্যযুগীয় দার্শনিক ও ধর্মতত্ববিদরা এই ধারণা বিকশিত করেন যে, মহাবিশ্বের একটি সসীম অতীত ও প্রারম্ভ রয়েছে । এই দৃস্টিভঙ্গী উৎস হলো তিনটি আব্রাহামীক ধর্ম (Abrahamic religions): ইহুদী, খ্রীস্টান ও ইসলাম ধর্ম। যে সকল দার্শনিক এই ধারণাকে বিকশিত করেন তারা হলেন, খ্রীস্টান দার্শনিক জন ফিলিপোনাস, ইহুদী দার্শনিক সাদীয়া গাওন, মুসলিম দার্শনিক আল কিন্দি, আল গাজ্জালী প্রমুখ। অসীম অতিতের ধারণার বিপরীতে তারা দুইটি যুক্তি ব্যব হার করেন, প্রথমতঃ “সত্যিকারের অসীম বলে কোন কিছু থাকা সম্ভব না”। যা বলে “ঘটনসমুহের (events) অসীম সময়গত ক্রমাগত প্রত্যাবর্তনই হলো সত্যিকারের অসীম” (An infinite temporal regress of events is an actual infinite.”), ” “ঘটনসমুহের অসীম সময়গত ক্রমাগত প্রত্যাবর্তনের কোন অস্তিত্ব নেই (∴ An infinite temporal regress of events cannot exist)”
দ্বিতীয় যুক্তিটি হলো, ” সত্যিকারের অসীমকে পরবর্তীকালীন যোগ দ্বারা সম্পন্ন করা সম্ভব না (An actual infinite cannot be completed by successive addition.”)। ড্বিতীয় যুক্তিটি খ্যাতিমান হয়ে ওঠে ইমানুয়েল কান্ট যখন তাকে তার নিবন্ধ the first antinomy concerning time – এ ব্যবহার করেন।১১ শতকের শুরুতে মুসলিম বিজ্ঞানী আল হাজেন (Ibn al-Haytham (Alhacen or Alhazen) তার গ্রন্থ ‘আলোকবিজ্ঞান’-এ স্থান উপলদ্ধি ও তার জ্ঞানতত্ব বিষয়ক প্রয়োগ (space perception and its epistemological implications ) নিয়ে আলোচনা করেন। পূর্বে স্থানের দৃষ্টিগত যে উপলদ্ধি ছিল, আল হাজেনের পরীক্ষামূলক প্রমাণের পরে সেই ধারনা বদলে যায়। তিনি টলেমি ও ইউক্লিডের স্বজ্ঞাজনিত স্থান উপলদ্ধি ( intuitiveness of spatial perception )-কে একবাক্যে বাতিল করেন, তিনি বলেন, পারস্পরিক সম্পর্ক স্থির করার লক্ষ্যে, আকৃতি ও দূরত্ব সম্পর্কে বাস্তব ধারণা না থাকলে দৃষ্টি আমাদেরকে প্রায় কিছুই বলতে পারবে না (Without tangible notions of distance and size for correlation, sight can tell us next to nothing about such things.”

দক্ষিণ আমেরিকার ইনকারা স্থান ও কাল-কে একীভূত (single concept) মনে করত, তারা স্থান-কাল-এর একটি নাম দি্যেছে, পাচা (pacha), আন্ডিজ পর্বতমালার অধিবাসীরা এখনো এই ধারণাই পোষণ করে।

নিউটন-লেইবনিজ স্থান-কাল বিতর্কঃ
স্থান ও কাল নিজে নিজেই সত্যিকার অবজেক্ট (real objects ) নাকি তারা সত্যিকার অবজেক্ট সমূহের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক এই নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল দুই খ্যাতিমান বিজ্ঞানী স্যার ইসাক নিউটন ( Isaac Newton ) ও গটফ্রীড লেইবনিজ (Gottfried Leibniz)-এর মধ্যে। স্যার ইসাক নিউটন মনে করতেন স্থান ও কাল বস্তুর উপর নির্ভরশীল নয়। স্থান আরও যথাযথভাবে বললে চরম স্থান হলো একটি শূণ্য আধার যা নানাবিধ কায়া (body) ধারণ করে। এই আধার (স্থান) গতিহীন, অবিরাম ও সকল বিন্দুতে ও সকল দিকে সমসত্ত্ব (homogeneous)। এখানে কায়াগুলো থাকে তবে কায়াগুলো স্থানকে অথবা স্থান কায়াগুলোকে কোনভাবেই প্রভাবিত করেনা। একইভাবে সময় হলো পরম যা কোন কিছুর উপর নির্ভরশীল নয়। সময়ের তীর অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে বহমান। স্থান যেমন কায়ার আধার সময় তেমনি ঘটনার আধার । নিউটন আরো মনে করতেন স্থান ও কাল পরস্পরের উপর নির্ভরশীল নয়।

পক্ষান্তরে স্যার আইজাক নিউটনের ধারণা বা তত্ত্বের বিরোধী আর একটি ধারণা বা তত্ত্ব প্রতিস্ঠিত হয় এরিস্টটলের শিক্ষার উপর ভিত্তি করে। এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠা করেন গটফ্রীড লেইবনিজ । এই ধারণা অনুযায়ী স্থান ও কাল বস্তু থেকে বিচ্ছিন্ন নয় বরং তার উপর নির্ভরশীল। স্থান হলো কিছু কায়ার মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক ও কাল হলো কিছু ঘটনার মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক । যেখানে কায়া নাই সেখানে স্থান নাই এবং যেখানে ঘটনা নাই সেখানে কাল নাই। মহাবিশ্বের আবির্ভাবের সাথে সাথে জন্ম হয়েছে স্থান ও কালের। আবার মহাবিশ্ব কোন দিন যদি তীরোভুত হয়ে যায়, তার সাথে সাথে স্থান ও কাল-ও তীরোভূত হবে।

এদিকে জগৎবিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন যার আপেক্ষিকতত্ত্ব (Theory of Relativity) নামের বৈপ্লবিক চিন্তাভাবনা বিজ্ঞানের জগতে সূচনা করেছে এক নতুন যুগের, তিনি স্থান ও কাল সম্পর্কে দিয়েছেন আরো একটি নতুন ধারণা। পরবর্তি পর্বে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

 

রহস্যময় মহাবিশ্ব ও চিরন্তন জীবন জিজ্ঞাসা -8

প্রথম পর্বে বস্তু (matter) সম্পর্কে কিছু আলোচনা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা করা হয়েছে গতি (motion) নিয়ে। তৃতীয় পর্বে আলোচনা করা হয়েছে স্থান ও কাল (space and time) নিয়ে, ইতিহাসের গতিধারায় নিউটন-লেইবনিজ বিতর্ক পর্যন্ত। এবারে পর্বে আলোচনা করব স্থান ও কাল সংক্রান্ত আলবার্ট আইনস্টাইনের বৈপ্লবিক চিন্তাধারা নিয়ে।

আলবার্ট আইনস্টাইনের স্থান ও কাল

প্রাচীন গ্রীক দার্শনিক ও বিজ্ঞানী এরিস্টটল বলেছিলেন, “বিশুদ্ধ চিন্তার সাহায্যেই মহাবিশ্ব নিয়ন্ত্রণকারী সকল আইন খুঁজে বের করা সম্ভব”। অর্থাৎ তাকে পরীক্ষার সাহায্যে প্রমাণের কোন প্রয়োজন নেই। ইসলামের স্বর্ণযুগে (Islamic golden age) মুসলিম বিজ্ঞানীরা পরীক্ষার সাহায্যে প্রমাণের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। আরো অনেক পরে গ্যালিলিও ইউরোপীয় বিজ্ঞানে পরীক্ষার সাহায্যে প্রমাণের বিষয়টির প্রচলন করেন। স্থান ও কালের ধারণায়ও তত্ত্বের পাশাপাশি পরীক্ষাণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে শুরু করে। স্থান-কালের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আরেকটি বিষয়, সেটি হলো আলোর চলাচল। এক সময় মনে করা হতো আলোর বেগ অসীম। গ্রীক দার্শনিক এমপেডোক্লেস (Empedocles) প্রথম দাবী করেন যে, আলোর গতি সসীম। তিনি যুক্তি প্রদান করেন যে, আলো গতিশীল কোন একটা কিছু, তাই অন্যান্য গতিশীল কায়ার মত তারও ভ্রমণ করার জন্য কিছু সময় প্রয়োজন। পক্ষান্তরে এরিস্টটল বলেছিলেন কোন কিছুর উপস্থিতিতে আলো হয়, সুতরাং আলো গতিশীল কিছু নয়। আধুনিক আলোক বিজ্ঞানের জনক মুসলিম পন্ডিত আল হাজেন (আল হাইয়াম) বলেছিলেন আলো অত্যন্ত উচ্চ গতি সম্পন্ন তবে তার বেগ সসীম। এবং মাধ্যম ভেদে আলোর গতির তারতম্য হয়, ঘন মাধ্যমে কম ও হালকা মাধ্যমে বেশী। তিনি আরো বলেছিলেন আলো একটি বস্তু, সুতরাং তার সঞ্চারণের জন্যে সময়ের প্রয়োজন। ১১ শতকে আল বিরুনী আলোর বেগের সসীমতা সম্পর্কে একমত প্রকাশ করেন। তিনি আরো লক্ষ্য করেন যে আলোর বেগ শব্দের বেগের চাইতে বেশী। ১৬৭৬ সালে আলোর বেগ প্রথম বারের মত পরিমাপ করেন ডেনমার্কের বিজ্ঞানী রোমার (Roemer)। উনার পরিমাপ অনুযায়ী আলোর বেগ প্রতি সেকেন্ডে এক লক্ষ চল্লিশ হাজার মাইল, যা আধুনিক যুগে পরিমিত এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল থেকে খুব দূরে নয়।

আলোর সঞ্চালন সম্পর্কে সঠিক তথ্য ১৮৬৫ সালের পূর্বে আবিস্কৃত হয়নি। সেই সময় বৃটিশ পদার্থবিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল ( James Clerk Maxwell) বিদ্যুত ও চুম্বক সম্পর্কিত প্রচলিত আংশিক তত্ত্বগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করতে সমর্থ হন। ম্যাক্সওয়েলের সাড়া জাগানো সমীকরঙুলো ভবিষ্যদ্বানী করেছিল যে সম্মিলিত বিদ্যুত-চুম্বক () ক্ষেত্রে একটি চাঞ্চল্য হওয়া সম্ভব যা সরোবরের তরঙ্গের সাথে তুলনীয়। সেই তরঙ্গটি স্থির দ্রুতিতে (Constant speed) চলমান হবে। এবার সেই দ্রুতিটি কিসের সাপেক্ষে নির্ণিত হবে সেটি একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। এর ভিত্তিতে অনুমান করা হয় ইথার নামক একটি বস্তু আছে যা সর্বত্র বিরাজমান। আলোক তরঙ্গ এই ইথারের মধ্য দিয়ে চলে।

গ্যালিলিও-র বেগের সংযোগ (বিয়োজন) সুত্র অনুযায়ী, পরস্পরের দিকে ধেয়ে আসা দুটি চলমান কায়ার আপেক্ষিক বেগ এই দুটি কায়ার পৃথক পৃথক বেগের যোগফলের সমান হবে, আর পরস্পরের থেকে দূরে সরে যাওয়া দুটি চলমান কায়ার আপেক্ষিক বেগ এই দুটি কায়ার পৃথক পৃথক বেগের বিয়োগফলের সমান হবে। অর্থাৎ, দুটি ট্রেনের পৃথক পৃথক বেগ যদি হয় যথাক্রমে ৩০ ও ৪০ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টায়, তাহলে
তারা পরস্পরের দিকে ধেয়ে আসলে কোন একটি ট্রেনের যাত্রীর কাছে মনে হবে অপর ট্রেনটি তাকে প্রতি ঘন্টায় (৪০ + ৩০) ৭০ কিলোমিটার বেগে অতিক্রম করছে। পক্ষান্তরে, প্রথম ট্রেনটিকে যদি দ্বিতীয় ট্রেনটি পিছন থেকে অতিক্রম করে তবে তা প্রতি ঘন্টায় (৪০-৩০) = ১০ কিলোমিটার বেগে অতিক্রম করবে। আলোর বেগের ক্ষেত্রে গিয়ে এই নিয়মের ব্যতিক্রম দেখা গেল। ১৮৮৭ সালে আলবার্ট মাইকেলসন ( Albert Michelson) ও এডওয়ার্ড মর্লি (Edward Morley) অতি যত্ন সহকারে একটি পরীক্ষা করেন তারা পৃথিবীর গতির অভিমুখে আলোর বেগ ও পৃথিবীর গতির অভিমুখের সমকোণে আলোর বেগের তুলনা করেন। গ্যালিলিও-র বেগের সংযোগ (বিয়োজন) সুত্র অনুযায়ী যা ভিন্ন ভিন্ন হওয়ার কথা, সেখানে তারা বিস্ময়ের সাথে দেখলেন দুটি বেগই অভিন্ন। যা ইতিহাসে মাইকেলসন-মর্লি পরীক্ষা নামে খ্যাত হয়ে আছে।

১৮৮৭ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত সাল পর্যন্ত ইতিহাসে মাইকেলসন-মর্লি পরীক্ষার নানা রকম ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়। যে সকল বিজ্ঞানী এই ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন হেনড্রিক লোরেন্টজ ( Hendrik Lorentz)। কিন্তু সুইজারল্যান্ডের প্যাটেন্ট অফিসের একজন অখ্যাত কেরাণী ১৯০৫ সালে প্রকাশিত একটি বিখ্যাত গবেষণাপত্রে দেখিয়ে দেন যে, পরম কাল (absolute time)-এর ধারণা ত্যাগ করলেই এই ঘটনা ব্যাখ্যা করা যায়। এই অখ্যাত কেরাণীর নাম আলবার্ট আইনস্টাইন। এই নতুন তত্ত্ব যা পৃথিবী জুড়ে সাড়া ফেলে দেয় তা আজ আপেক্ষিক তত্ত্ব (theory of relativity) নামে পরিচিত। আপেক্ষিক তত্ত্বের উল্লেখযোগ্য ফলশ্রুতি হলো স্থান ও কাল সম্পর্কে আমাদের চিন্তাধারায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন। নিউটনের তত্ত্ব অনুসারে একটি স্থান থেকে স্থানে যদি আলোকের একটি স্পন্দন (pulse) পাঠানো যায়, তাহলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে তার ভ্রমণকাল সম্পর্কে মতৈক্য হবে। কারণ কাল পরম। পক্ষান্তরে আপেক্ষিক তত্ত্ব অনুযায়ী পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে তার ভ্রমণকাল ভিন্ন ভিন্ন হবে কেননা আলোর বেগ ধ্রুব । একইভাবে আলো কতটা দূরত্ব অতিক্রম করেছে সেটাও পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে ভিন্ন ভিন্ন হবে। অন্যকথায় আপেক্ষিক তত্ত্ব পরম কাল ও পরম স্থানের ধারণাকে শেষ করে দিয়েছে।

স্থান ও কাল যে পরম নয়, সেকথা আলবার্ট আইনস্টাইনের পাশাপাশি এরনস্ট ম্যাক্স (Ernst Mach (German pronunciation: [ˈɛɐnst ˈmax]) (February 18, 1838 – February 19, 1916))-ও বলেছিলেন।

নিউটনীয় বলবিদ্যা (চিরায়ত বলবিদ্যা) যা তিন শত বছর যাবৎ বিজ্ঞান ও দর্শনের জগতে প্রভাব বিস্তার করে ছিল, এবং আমরা ধরেই নিয়েছিলাম যে এই রহস্যময় জগতের প্রায় পুরোটাই আমরা বুঝে ফেলেছি, মাইকেলসন-মর্লি পরীক্ষার পর স্পষ্ট বোঝা গেল যে, চিরায়ত বলবিদ্যারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এবং এই রহস্যময় জগতকে যতটুকু না মনে করেছিলাম তার চাইতেও অনেক বেশী রহস্যে ভরা। অন্ততপক্ষে চিরায়ত বলবিদ্যা সবকিছু ব্যাখ্যা করতে পারেনা। আলোর দ্রুতি সম্পন্ন অথবা তার কাছাকাছি দ্রুতি সম্পন্ন কায়াগুলোর প্রতিভাস (Phenomenon) ব্যখ্যা করতে চিরায়ত বলবিদ্যা ব্যর্থ। এই বিষয়টি ব্যখ্যায় আপেক্ষিক তত্ত্ব সাফল্য প্রদর্শন করে। যদিও অনেকেই মনে করেন যে মাইকেলসন-মর্লি পরীক্ষার ব্যাপারটি আইনস্টাইনের জানা ছিলনা, তিনি বিচ্ছিন্নভাবেই তত্ত্বটি প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯০৫ সালে প্রতিস্ঠিত আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব ছিল সমবেগ (uniform velocity) সম্পন্ন কায়াসমুহ নিয়ে। এই আপেক্ষিক তত্ত্বের নাম পরবর্তিতে দেয়া হয়েছিল বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব (special theory of relativity)। এরপর তিনি অসমবেগ বা ত্বরণ (acceleration) নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন। মহাকর্ষ বল এই ত্বরণের আওতাভুক্ত। বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বের সাথে নিউটনীয় মহাকর্ষীয় তত্ত্বের অসঙ্গতি ছিল। নিউটনীয় মহাকর্ষীয় তত্ত্ব অনুযায়ী বিভিন্ন কায়ার মধ্যে আকর্ষণ বল দুরত্বের উপর নির্ভরশীল, সময়ের উপর নয়। একটি কায়াকে যদি সরানো হয় তখন অন্য কায়াটির উপর প্রযুক্ত বলের তাৎক্ষণিক পরিবর্তন হবে। একে দূরক্রিয়া (action at a distance) বলা হয়। অর্থাৎ যত দূরেই থাকুক না ক্রিয়া হবে তাৎক্ষণিক। অন্যকথায় মহাকর্ষীয় ক্রিয়া অসীম গতিতে চলমান। কিন্তু বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বের দাবী অনুযায়ী আলোর দ্রুতিই সর্বচ্চো। মহাকর্ষীয় ক্রিয়ার দ্রুতি আলোর দ্রুতি অপেক্ষা বেশী হতে পারবে না। তাকে হতে হবে হয় আলোর দ্রুতির সমান অথবা কম।

১৯০৭ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত আইনস্টাইন চেষ্টা করেছেন এমন একটি মহাকর্ষীয় তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে যার সাথে বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্বের সঙ্গতি থাকবে। শেষে ১৯১৫ সালে তিনি নতুন আরো একটি বৈপ্লবিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন যার নাম সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General theory of relativity)। এই বৈপ্লবিক প্রস্তাব অনুযায়ী, মহাকর্ষীয় বল অন্যান্য বলের মত নয়। আগে যেরকম অনুমান করা হয়েছিল স্থান-কাল সেরকম সমতল নয়, বরং এটা বক্র অথবা বঙ্কিম (Warped)। তার কারণ স্থান-কাল-এ ভর ও শক্তির বন্টন। আইনস্টাইনের মতে মহাকর্ষ এরই ফলশ্রতি। যেকোন গুরুভর সম্পন্ন কায়া (massive body) তার চতুর্দিকের স্থান-কাল-কে বক্র করে ফেলে। পৃথিবী যে সুর্যের চতুর্দিকে বঙ্কিম কক্ষে ঘরছে তার কারণ মহাকর্ষ নামক বল নয়, বরং সে বঙ্কিম স্থানে সরলপথের নিকটতম পথ অনুসরণ করে। সেই পথের নাম জিওডেসিক (geodesic)। এভাবে সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্বের গুনে আমরা স্থান সম্পরকে নতুন জ্ঞান পেলাম যে, তা বক্র। পাশাপাশি সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব এও বলে যে গুরুভর সম্পন্ন কায়ার কাছাকাছি সময়ের গতি হয় শ্লথ। এই দুটো স্টেটমেন্টই পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণিত।

পরবর্তী দশকগুলিতে স্থান-কাল সম্পর্কে এই নতুন বোধ আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কীয় ধারনায় বিপ্লব এনেছে। আমাদের প্রাচীন ধারণা ছিল: মহাবিশ্ব মূলতঃ অপরিবর্তনীয়। তার অস্তিত্ব চিরকাল ছিল এবং চিরকাল থাকবে। এর জায়গায় বর্তমান ধারণা: মহাবিশ্ব গতিশীল ও প্রসারমান। সীমিতকাল পূর্বে তার শুরু এবং ভবিষ্যতে সীমিতকাল পরে তার শেষও হতে পারে।
স্থান-কাল সম্পর্কে বিজ্ঞান আপাততঃ এখানে এসে থেমে গেলেও। এই আলোচনা এখানেই শেষ না। এই বিষয়ে দার্শনিকদের আরো কিছু বলার আছে। বিষয়টি নিয়ে আমি পরবর্তী পর্বে আলোচনা করব।

 

রহস্যময় মহাবিশ্ব ও চিরন্তন জীবন জিজ্ঞাসা -৫

প্রথম পর্বে বস্তু (matter) সম্পর্কে কিছু আলোচনা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা করা হয়েছে গতি (motion) নিয়ে। তৃতীয় পর্বে আলোচনা করা হয়েছে স্থান ও কাল (space and time) নিয়ে, ইতিহাসের গতিধারায় নিউটন-লেইবনিজ বিতর্ক পর্যন্ত। চতুর্থ পর্বে আলোচনা করা হয়েছে স্থান ও কাল সংক্রান্ত আলবার্ট আইনস্টাইনের বৈপ্লবিক চিন্তাধারা নিয়ে। এবারের পর্বে আলোচনা করব স্থান-কাল সংক্রান্ত আরো কিছু দর্শন নিয়ে।

স্থান-কাল সংক্রান্ত আরো কিছু দর্শন

দর্শন শাস্ত্র বলে ‘স্থান-কাল হলো বস্তুর অস্তিত্বের একটি রূপ’ (Space-time is the form of existence of matter )। কিন্তু এর অর্থ কি? এর ব্যখ্যা প্রাথমিকভাবে উপমার দ্বারা করা যেতে পারে। আমরা সবাই ভালোবাসা, ঘৃণা, বন্ধুত্ব এই বিষয়গুলোর সাথে পরিচিত। এখন প্রশ্ন হলো একটি কলম বা একটি গোলাপের চারার মত কি ভালোবাসার স্বাধীন সত্তা আছে? অবশ্যই নয়। ভালোবাসা হলো দুই বা ততোধিক মানুষের মধ্যে আবেগগত সম্পর্ক। যেখানে মানুষ নাই বা কোন জীবন্ত সত্তা নাই সেখানে ভালোবাসাও নাই। অনুরূপভাবে সমাজের বাইরে কি অপরাধ সংঘটিত হয়? অবশ্যই নয়। অপরাধ সমাজেরই একটি বৈশিষ্ট্য। যেখানে সমাজ নাই সেখানে অপরাধ নাই। সুতরাং দুই ধরণের বিশেষ্য আছে, এক ধরনের সুনির্দিষ্ট কিছু অবজেক্টকে বোঝায় যার স্বাধীন সত্তা আছে, আর দ্বিতীয় ধরণটির স্বাধীন সত্তা নাই সে অবজেক্টগুলোর মধ্যেকার পারস্পরিক সম্পর্ক। যেমন, ভালোবাসা, শৃংখলা, শ্রদ্ধা, ইত্যাদি।

স্থান ও কালের ধারণা ঐ দ্বিতীয় ধরণের মধ্যে পরে। বস্তুর অনুপস্থিতিতে স্থান ও কাল স্বাধীনভাবে টিকে থাকতে পারেনা। যেখানে বস্তু নাই সেখানে স্থান ও কাল কোনটাই নাই। স্থান হলো কতগুলো কায়ার মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক। যেমন চার দেয়ালে ঘেরা একটি কক্ষে যদি দশটি চেয়ার থাকে। তবে সেই স্থানটি ঐ অবজেক্টগুলো দ্বারাই গঠিত।দুটি দেয়ালকে যদি পরস্পর থেকে দূরে সরিয়ে নেই, অথবা চেয়ারগুলোর সজ্জাকে যদি পরিবর্তন করি। তাহলে স্থানও পরিবর্তিত হয়ে যাবে। আমার স্ত্রী প্রায়ই আমাদের ঘরের আসবাবপত্রের সজ্জ্বা পরিবর্তন করেন। যতবারই তিনি এটা করেন ততবারই আমার মনে হয় জায়গাটি বদলে গিয়েছে। একইভাবে সময় হলো কিছু ঘটনার মধ্যেকার পারস্পরিক সম্পর্ক। যেমন এক মিনিট বলতে আমরা কি বুঝি? যদি ঐ কক্ষটিতে একটি দেয়াল ঘড়ি থাকে তাহলে ঘড়িটির সেকেন্ডের কাটার ১২টার ঘরে থাকার প্রথম ঘটনা ও একবার ঘুরে এসে পুনরায় ১২টার ঘরে আসার দ্বিতীয় ঘটনা, এই দুটি ঘটনার মধ্যেকার পারস্পরিক সম্পর্কই এক মিনিট। উপরন্তু সময় হলো গতির ফলাফল। উপরের ঘটনা দুটি ঘটানোর জন্য সেকেন্ডের কাটাকে গতিশীল হতে হয়েছিল। এখন ঐ কক্ষে যদি ঐ ঘড়িটি ছাড়া আর কোনই ঘড়ি না থাকে আর সেকেন্ডের কাটার বেগ যদি কম হয় (চলতি কথায় স্লো হয়), তাহলে এবার মিনিটগুলোর আকৃতি হবে বড়। উল্টোভাবে বেগ যদি বেশী হয় (চলতি কথায় ফাস্ট হয়), তাহলে মিনিটগুলোর আকৃতি হবে ছোট। পৃথিবী যখন নিজ অক্ষের চতুর্দিকে একবার ঘুরে আসে সেটাকে আমরা বলি একদিন। আবার সুর্যের চারদিকে একবার ঘুরে আসলে তাকে বলি এক বৎসর। এইসব উদাহরণ থেকে স্পস্ট বোঝা যায় যে ঘটনার উপর ও গতির উপর সময় নির্ভর করে। যেখানে গতি নাই সেখানে সময়ও নাই।

স্থান ও কাল হলো গতির সরাসরি ফলাফল। গতি যেমন সময়ের জন্ম দেয় তেমনি স্থান (কতগুলো কায়ার মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক)-কেও অবিরাম পরিবর্তিত করে। স্থান ও কাল উভয়েরই একটি একক ভিত্তি (Single foundation) রয়েছে। আর তা হলো গতিশীল বস্তু (Moving matter)। তারা হলো একটি Single common basis-এর দুটি ভিন্ন manifestation। এইভাবে কেবল পদার্থবিজ্ঞান নয়, দর্শনশাস্ত্রেও ধরা হয় স্থান ও কালের একটিই মাত্র মৌলিক উৎস রয়েছে, আর সেটি হলো বস্তুর গতি (Movement of matter)।

স্থান ও কালের আরো দুটি ধর্ম হলো পরমত্ব (absoluteness ) ও আপেক্ষিকতা ( relativity)। পরমত্ব বলতে বোঝায় বস্তুর উপর স্থান ও কালের পরম নির্ভরতা, অর্থাৎ বস্তু না থাকলে স্থানও নাই কালও নাই। আর আপেক্ষিকতা বলতে বোঝায় স্থান ও কালের ধর্ম ও বৈশিষ্ট্য নির্ভর করে যে বস্তুগুলো স্থান ও কালকে সৃষ্টি করছে তাদের প্রকৃতির উপর। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান তিন ধরনের স্থান ও কালকে অধ্যয়ন করে। ক্ষুদ্র (micro- ), বৃহৎ (macro- ), অতিবৃহৎ (mega-) জগৎ (world)। macro-world যেখানে আমরা বসবাস করছি সেখানে স্থান ত্রিমাত্রিক, micro- world অর্থাৎ ক্ষুদ্র কণিকার জগৎ সেখানে স্থান বহুমাত্রিক (তিন কি চারের অধিক মাত্রা আছে), অতিবৃহৎ (mega-world) জগৎ গ্রহ-নক্ষত্র-ধুমকেতু ইত্যাদির জগতে সর্বাধিক প্রভাব বিস্তারকারী মিথস্ক্রিয়া (interaction) হলো মহাকর্ষ (gravitation), এই মহাকর্ষ স্থানকে বাঁকিয়ে ফেলে, যা পূর্বেই বলা হয়েছে।

আধুনিক দর্শনে আরো কিছু সময়ের ধরণের কথাও বলা হচ্ছে যেমন, Biological time, geological time, historical time, time of chemical changes ইত্যাদি। আবার সময়ের হিসাবেরও নানা উপায় আছে যেমন এই আমরাই একই সাথে সৌর ও চন্দ্র ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে থাকি। আবার স্পেনীয়রা দক্ষিণ আমেরিকা দখলের পর দেখেছিল যে তাদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ইতিমধ্যে ৪১ তম শতাব্দী চলছে। তারপর খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল যে তারা শুক্র গ্রহীয় (Venusian) ক্যালেন্ডার ব্যবহার করছে। অপেক্ষার সময় যায় ধীরে আর আনন্দের সময় যায় দ্রুত, এটা Biological time-এর একটা উদাহরণ। আলো আঁধারীর ধোকা দি্যে মুরগীকে ২৪ ঘন্টায় ২ বার ডিম পারানো যায়। আমাদের কাছে যেটা এক দিন মুরগীর কাছে সেটা দুই দিন। এটাও Biological time-এর একটা উদাহরণ। এমন আরো অনেক কিছু।

আরো একটি ইন্টারেস্টিং আলোচনা হলো বিশ্ব জুড়ে নানাবিধ সংস্কৃতি ও শিল্পের ক্যাটাগোরী হিসাবে স্থান ও কাল। পরবর্তী পর্বে এই বিষয়ে আলোচনা করা হবে।

 

রহস্যময় মহাবিশ্ব ও চিরন্তন জীবন জিজ্ঞাসা -৬

প্রথম পর্বে বস্তু (matter) সম্পর্কে কিছু আলোচনা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা করা হয়েছে গতি (motion) নিয়ে। তৃতীয় পর্বে আলোচনা করা হয়েছে স্থান ও কাল (space and time) নিয়ে, ইতিহাসের গতিধারায় নিউটন-লেইবনিজ বিতর্ক পর্যন্ত। চতুর্থ পর্বে আলোচনা করা হয়েছে স্থান ও কাল সংক্রান্ত আলবার্ট আইনস্টাইনের বৈপ্লবিক চিন্তাধারা নিয়ে।
পঞ্চম পঞ্চম পর্বের আলোচনা করা হয়েছে স্থান-কাল সংক্রান্ত আরো কিছু দর্শন নিয়ে।
এবারের পর্বে আলোচনা করব বিশ্ব জুড়ে নানাবিধ সংস্কৃতি ও শিল্পের ক্যাটাগোরী হিসাবে স্থান ও কাল নিয়ে।

বিশ্ব জুড়ে নানাবিধ সংস্কৃতি ও শিল্পের ক্যাটাগোরী হিসাবে স্থান ও কাল

বিশ্ব জুড়ে উদ্ভুত ও টিকে থাকা সকল সংস্কৃতির ভিত্তির সাথে স্থান ও কালের গভীর ও মৌলিক সম্পর্ক রয়েছে। এইভাবে, দুজন ভিন্ন ভিন্ন ব্যাক্তির স্থান ও কাল সম্পর্কে যদি ভিন্ন ভিন্ন ধারণা থেকে থাকে, তবে নিশ্চিত থাকুন যে, তাদের সংস্কৃতিগত দৃস্টিভঙ্গীও ভিন্ন ।

এখান থেকে উদ্ভুত হয় একটি নতুন সমস্যা বা প্রশ্নের: একটি নির্দিষ্ট স্থান-কালের সংস্কৃতিতে বসবাসকারী মানুষ কি করে ভিন্ন কাঠামোর অন্য একটি স্থান-কালের সংস্কৃতিকে বুঝতে পারবে? একজন এটা কেবলমাত্র তখনই করতে পারে যখন সে নিজস্ব সংস্কৃতির সুনির্দিষ্টতা (specifics) এবং অসার্বজনীনতা (Non-universality) বিমূর্ততার মধ্যে দিয়ে অনুধাবন করতে পারে।

সাংস্কৃতিক সময় (Cultural time) বলতে আমরা এই বুঝব যে, কিছু ঘটনাবলীর (events) Standard movements যা মানুষের দ্বারা পূর্বনির্ধারিত, এবং ঘটনাগুলো ঘটেছে মানুষেরই তৈরী বিশেষ পরিবেশে। নানাবিধ সময়ে নানাবিধ মানুষ সৃষ্টি করেছে বিভিন্ন সাংস্কৃতি-কালীক আদর্শ (Cultural-temporal standards )। যার ফল হয়েছে বিভিন্ন যুগ ও মেটাযুগের (Epoch) পরিবর্তন, যা মূলতঃ ছিল একটি কালীক সংস্কৃতি থেকে আরেকটি কালীক সংস্কৃতিতে উত্তরণ। মানবজাতির ইতিহাসে আপাতঃদৃষ্টিতে তিন ধরনের সাংস্কৃতি-কালীক আদর্শ একে অপরকে পুনস্থাপিত করেছে – কাল কখনো বদ্ধ চক্র (Closed circle), কখনো বিন্দু (Point ), আবার কখনো রেখা (line)। আসুন এই বিষয়ে এবার বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।

আধুনিক যুগের মানুষেরা মনে করে সাংস্কৃতিক সময় অতীত থেকে বর্তমান হয়ে ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছে। আবার আমাদের দূর পূর্বপুরুষরা যারা প্রাচীন সংস্কৃতিসমুহ সৃষ্টি করেছেন, তারা কালের সম্পুর্ণ ভিন্ন মডেল গ্রহন করেছিলেন। অস্ট্রেলীয় এ্যবরিজিন, প্রাচীন চীন, ও প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশে কালকে চক্রাকার ও বদ্ধ জ্ঞান করা হয়েছিল।

এটা বলের অপেক্ষা রাখেনা যে, আধুনিক আমরা ও আমাদের পূর্বপুরুষেরা পৃথিবী নামক এই একই গ্রহের অধিবাসী। তারপরেও তাদের বুঝতে পারা (Understanding ) ও সংস্কৃতিগত উপলদ্ধি (perception) ছিল আমাদের থেকে একেবারেই ভিন্ন।

কালের চক্রাকার মডেল তৈরীর কারণ নিম্নরূপ হতে পারে। প্রথমতঃ তাদের দৈনন্দিন জীবনে তারা প্রতিদিন মুখোমুখী হতেন বিভিন্ন ঘটানাবলীর যারা ছিল চক্রাকার এবং দৈবাৎ (Random) অর্থাৎ অপরিক্রমশীল (Non-recurring)। দ্বীতিয়তঃ কিছু ঘটনাবলী আছে যারা Non-recurring ফলতঃ সহজে মনে রাখার মত নয়। এই কারণে তাদেরকে বোঝাও শক্ত ছিল। অপরপক্ষে, দিন ও রাতের অবিরাম পরিক্রমা (recurrence), চক্রাকারে চাঁদের কলার পূর্ণতা ও ক্ষয়। জোয়ার ভাটার চক্র, ঋতুচক্র, ইত্যাদি অসংখ্য প্রাকৃতিক চক্র ছিল তাদের কাছে সহজে অনুধাবনযোগ্য। এ কথা সকলেই জানি যে, প্রাচীন যুগের মানুষের সময় পরিমাপের জন্য আধুনিক যুগের মত এত সুক্ষ্ম যন্ত্রপাতি ছিলনা। তাই অনিবার্য্যভাবেই তাদেরকে নির্ভর করতে হতো biological time-এর উপর। (আমার দাদার দেরাজ নামের একজন ভৃত্য ছিলেন, আমি তাকে প্রশ্ন করা মাত্রই তিনি ঘড়ি না দেখেই নিখুঁতভাবে সময় বলে দিতেন, এটা পারতেন কারণ তিনি তার দেহের অভ্যন্তরস্থ biological time-এর সাহায্য নিতেন)।

চক্রাকার সময়ে ভবিষ্যৎ অজানা কিছু নয়। অবাক হবার কিছু নাই যে প্রাচীন ভাষাগুলোতে ‘ভবিষ্যৎ’ বলে কোন শব্দ ছিল না, ছিল কেবল অতীত ও বর্তমান । ‘ভবিষ্যৎ’ শব্দটির উদ্ভব অনেক পরে।

চক্রাকার সময় মডেলের ছাপ আধুনিক যুগেও আছে। যেমন আমরা প্রতি বছর জন্মদিন পালন করি। ঐদিনটি এমনভাবে উদযাপন করি যেন সে নতুন কেউ, আজই জন্ম নিল। অথবা নববর্ষকে এমনভাবে বরণ করি যেন সবকিছুই নতুনভাবে শুরু হতে যাচ্ছে।

আবার প্রাচীন মিশরীয়রা সূর্য ও চন্দ্রগ্রহন হিসাব করতে পারত না। প্রতিটি গ্রহণই তাদের কাছে ছিল অপ্রত্যাশিত। উল্কাপাতের মতই ভয়ংকর এবং দৈবাৎ। তাই তারা সূর্য ও চন্দ্রগ্রহনকে ভয় পেত। তা তাদের মনে কঠিন অনুরণন সৃষ্টি করত।

ইউরোপ মহাদেশের মানুষ বহু শতাব্দী যাবৎ বুঝতে পারেনি যে কোন পথ (route) ধরে ঘটনাবলী চলমান। এবং তারা গঠন করতে ব্যর্থ হয়েছিল উপযোগী একটি Time Matrix , যেখানে সবগুলো ঘটনাবলীকে একটি ধারাবাহিকতায় রাখা যেতে পারে । ফলে যেকোন ঘটনাকেই বর্তমানে ঘটেছে বলে ধরে নিতে হয়েছে। এটাই হলো ‘point time’। (উদাহরণস্বরূপ, আমাদের দেশে কিছু মানুষ আছে যারা বর্তমানকেই সবকিছু মনে করে যাবতীয় দুর্নীতি করে থাকে, ভবিষ্যৎের কথা ভাবেই না।) এটাকে সময়ের punctate idea-ও বলে।

প্রাচীন গ্রীকদের সংস্কৃতি সময়ের punctate idea দ্বারা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ছিল। গ্রীকরা universally extended time-কে কল্পনা করতে পারত না। এটাকে এইভাবে উপমা টেনে ব্যাখ্যা করা যায় যে, একটি ফুটবল ম্যাচের প্রথমার্ধের পর ফলাফল যদি হয় ৪:০। আমরা স্পস্টই বুঝতে পারি যে চূড়ান্ত ফলাফল কি হবে। একজন প্রাচীন গ্রীকের কাছে এই ৪:০ স্কোর কোন অর্থবহন করেনা। তার মতে বাকী অর্ধাংশের পর যেকোন ফলাফলই হতে পারে, তার সাথে প্রথমার্ধের কোনই সম্পর্ক নাই। কালের যেকোন মুহূর্তে ঘটনা যেকোন দিকেই মোড় নিতে পারে। এটাই হলো কালের punctate approach ।

 

রহস্যময় মহাবিশ্ব ও চিরন্তন জীবন জিজ্ঞাসা -৭

রথম পর্বে বস্তু (matter) সম্পর্কে কিছু আলোচনা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা করা হয়েছে গতি (motion) নিয়ে। তৃতীয় পর্বে আলোচনা করা হয়েছে স্থান ও কাল (space and time) নিয়ে, ইতিহাসের গতিধারায় নিউটন-লেইবনিজ বিতর্ক পর্যন্ত। চতুর্থ পর্বে আলোচনা করা হয়েছে স্থান ও কাল সংক্রান্ত আলবার্ট আইনস্টাইনের বৈপ্লবিক চিন্তাধারা নিয়ে।
পঞ্চম পঞ্চম পর্বের আলোচনা করা হয়েছে স্থান-কাল সংক্রান্ত আরো কিছু দর্শন নিয়ে।

ষষ্ঠ পর্বে আলোচনা করেছি বিশ্ব জুড়ে নানাবিধ সংস্কৃতি ও শিল্পের ক্যাটাগোরী হিসাবে কাল নিয়ে।
এবারের পর্বে আলোচনা করব বিশ্ব জুড়ে নানাবিধ সংস্কৃতি ও শিল্পের ক্যাটাগোরী হিসাবে স্থান নিয়ে।

আসুন এবার আমরা স্থান ও প্রাসঙ্গিক পরিবর্তন সংক্রান্ত সংস্কৃতিগত ধারণা (cultural concept) গুলো নিয়ে আলোচনা করব। গ্রীকদের সৃষ্ট স্থানের punctate ধারণা অনেক আগেই বিস্মৃত হয়ে গিয়েছে। এই ধারণা পরবর্তি দুটি সংস্কৃতি স্থান মডেল (cultural space model)-এর দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। স্মরণাতীত কাল থেকেই পাথরে খোদাই করে ছবি আঁকা হতো। আবার শিশুরাও চিত্রাংকন করত। এগুলো প্রাচ্যের সংস্কৃতিরও বৈশিষ্ট্য। চিত্রাংকনে Perspective Representation বলে একটি ধারণা আছে: একটি সমতলের উপরে (যেমন কগজ অথবা ক্যনভাস) কোন ছবির যেমনটি চোখে দেখেছি তেমনি করে মোটামুটি উপস্থাপন। এই জাতীয় চিত্রের দুটো বৈশিষ্ট্য হলো ১। অবজেক্ট যত দূরে হবে, আকৃতি তত ছোট হবে। ২। দৃষ্টি বরাবর লাইনগুলো ছোট হতে হবে এবং দৃষ্টির আড়াআড়ি লাইনগুলো বড় হবে।

প্রাচ্যের সংস্কৃতির অপর বৈশিষ্ট্ চিত্রাংকনে Pre-perspective Representation-এ স্থানের উপস্থাপন নিম্নরূপ হতে পারে, ইদাহরণস্বরূপ, চার দেয়াল বিশিষ্ট একটি কক্ষকে যখন কোন ক্যানভাসে আঁকা হয়, তখন তাকে একদিক থেকে দেখা তিনটি দেয়াল সম্পন্ন কক্ষ হিসাবে আঁকা হয়। যদিও, বাস্তবে আমরা এক দৃষ্টিতে দুটার বেশী দেয়াল দেখিনা। অনেক সময় কেবল একটি দেয়ালও দেখি। এই পদ্ধতিতে ছবি আঁকা হতো ১৩ শতক পর্যন্ত।

১৪ শতক থেকে শিল্পিরা ভিন্নভাবে আঁকতে শুরু করলেন। এবার তারা ছবি আঁকতে শুরু করলেন একটি জানালার মত করে যার ভিতর দিয়ে দৃষ্টি মেলে সপাচে-কে দেখা যাবে Volumetric-ভাবে, সমতলভাবে নয়। জানালার ষধারণাটি প্রচীনকালেও ছিল। তবে ইউরোপে মধ্য ১৪ শতকে এই ধারণা খ্রীষ্টধর্মের দ্বারা প্রসারিত হয়, প্রাচ্য সংস্কৃতির সাথে তার সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে, কেননা খ্রীষ্টধর্মের নিজেও প্রাচ্য দর্শন।

একটি জটিল Cultural-intelectual-religious প্রক্রিয়া Pre-perspective চিত্রাঙ্কনকে linear-perspective চিত্রাঙ্কনে নিয়ে আসে। linear-perspective চিত্রাঙ্কনে আলোককে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় মনে হবে যেন সেটা পেইন্টিং-এর চতুষ্কোন থেকে দর্শকের আঁখিতে প্রবেশ করছে। এই জাতীয় চিত্রাঙ্কনে আলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। এটা ঐ দর্শনের সাথে জড়িত যে ইশ্বর প্রথম দিবসেই আলো সৃষ্টি করেছেন। এভাবে linear-perspective চিত্রাঙ্কন একটি পবিত্র চিত্রে পরিণত হয়। এই চিত্রাঙ্কন Parallel-meridian coordinate তথা গুরুত্বপূর্ণ ভৌগলিক মানচিত্র তৈরী করতে সাহায্য করে। যা পরর্তিতে ইউরোপবাসীদের বৃহৎ ভৌগলিক আবিষ্কারে (আমারিকা, ভারত উপমাহাদেশ ও অস্ট্রেলিয়া গমণের সমুদ্রপথ) উদ্ধুদ্ধ করে।

বিভিন্ন ধরনের স্থানকে স্বাতন্ত্রমন্ডিত করা সম্ভব হয়েছিল এই পর্যবেক্ষণ করে যে তারা ঠিক কিভাবে Co-arranged। অর্থাৎ তারা কি Pre-perspective না linear-perspective চিত্রাঙ্কন পদ্ধতিতে প্রদর্শিত।

এদিকে যুগের পর যুগ Cultural space-ও নানাভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। বহু বহু বছর মানুষ নিজেকে প্রকৃতির খুব কাছাকাছি ভাবত। তাই প্রাকৃতিক পরিবেশ ছিল Cultural space-এর একটি বিরাট অংশ জুড়ে। এবং এটাই প্রদর্শিত হয়েছে ফোকলোর, চিত্রকলা ও সঙ্গিতে। বাংলাদেশ বলি আর ইউরোপ বলি সবখানেই একটি মানব চিত্রের পিছনের পটভূমিতে ছিল নৈসর্গিক দৃশ্য। উজ্জ্বল উদাহরণ দ্যা ভিঞ্চির ‘মোনালিসা’। বিশ শতকের দিকে এসে Cultural space পরিবর্তিত হয়। এখন আমরা পটভূমিতে দেখতে পাই ইন্ডাস্ট্রি, বহুতল ভবন ইত্যাদি। বিশ শতকের শুরুতে চিত্রকলা এমন এক নতুন রূপ নেয় যা অতীতে কখনোই ছিল না। আবার ইদানিং ঐ যান্ত্রিকতায় ক্লান্ত হয়ে, ওখান থেকে সরে আসার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মানুষ আবার বেশী বেশী করে আঁকতে শুরু করেছে বাগান, গৃহপালিত পশুপাখী, গ্রামাঞ্চল, ইত্যাদি। বলতে শুরু করেছে, ‘ফিরিয়ে দাও অরণ্য, লওহে নগর’।

কোলাহল মুখর দিবস পেরিয়ে এসেছে নিঝুম রাত,
রহস্য নেমেছে শস্যক্ষেতে ঘন কূয়াশায় চেপে,
শীতল হাওয়া মেঘের চিরেছে বুক,
ঝরিয়ে শিশির ভিজিয়েছে ঘাস,
বৃক্ষের কানে কানে ঝি ঝি-দের সুর,
শুনিয়েছে উচ্ছাস!
মেঘ, কুয়াশা, আকাশ, নদী আর এই স্থবির মাটি,
একান্তই অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠে,
চোখের পাতা জুড়ে হাসে, নতুন স্বপ্ন ছায়া,
প্রকৃতির একি অপরূপ মায়া!!!

রহস্যময় মহাবিশ্ব ও চিরন্তন জীবন জিজ্ঞাসা – ৮

প্রথম পর্বে বস্তু (matter) সম্পর্কে কিছু আলোচনা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা করা হয়েছে গতি (motion) নিয়ে। তৃতীয় পর্বে আলোচনা করা হয়েছে স্থান ও কাল (space and time) নিয়ে, ইতিহাসের গতিধারায় নিউটন-লেইবনিজ বিতর্ক পর্যন্ত। চতুর্থ পর্বে আলোচনা করা হয়েছে স্থান ও কাল সংক্রান্ত আলবার্ট আইনস্টাইনের বৈপ্লবিক চিন্তাধারা নিয়ে।
পঞ্চম পঞ্চম পর্বের আলোচনা করা হয়েছে স্থান-কাল সংক্রান্ত আরো কিছু দর্শন নিয়ে।

ষষ্ঠ পর্বে আলোচনা করেছি বিশ্ব জুড়ে নানাবিধ সংস্কৃতি ও শিল্পের ক্যাটাগোরী হিসাবে কাল নিয়ে।
সপ্তম পর্বে আলোচনা করেছি বিশ্ব জুড়ে নানাবিধ সংস্কৃতি ও শিল্পের ক্যাটাগোরী হিসাবে স্থান নিয়ে।
এবারের অর্থাৎ অষ্টম পর্বে আলোচনা করব মহাবিশ্বের কণিকা জগৎ নিয়ে।

মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রতম গঠন একক

পদার্থের যেসব মৌলিক উপাদানে জগৎ তৈরী হয়েছে তাদের নাগাল পাওয়ার আকাঙ্খা এই জগতের মতই পুরণো। কিন্তু বহু বহু শতাব্দী ধরে এই বিষয়টি জ্ঞানী ব্যাক্তিদের পন্ডিতি তর্ক আশ্রয় করেছিল। প্রাচীন যুগেই এ্যটোমিসম নামে একটি Natural Philosophy বিকশিত হয়েছিল। যেই দর্শন বলেছিল প্রকৃতি জগৎ দু’টি মৌলিক অংশ দ্বারা গঠিত – এ্যটম ও শূণ্যতা। এ্যটম (অতম – যাকে আর ভাঙা যায়না)। গুজরাটী ঋষি ও দার্শনিক কণাদ, খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে প্রথম এই ধারণা দেন। এই নি্যে একটি মজার গল্প প্রচলিত আছে। একদিন কণাদ হাতে খাবার নি্যে হাটছিলেন, তারপর তিনি খাবার আঙুল দিয়ে ভাঙতে শুরু করলেন। ভাঙতে ভাঙতে একটা পর্যায়ে এসে আর ভাঙতে পারছিলেন না। সেখান থেকেই উনার মনে ধারণা আসে যে, মাহাবিশ্বকেও ভাঙতে ভাঙতে এমন একটি ক্ষুদ্র অংশে নিয়ে আসা যাবে যাকে আর ভাঙা যাবেনা। তিনি তার নাম দিয়েছিলেন অণু। ঋষি কণাদ ছিলেন বৈশেশিকা দর্শন বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। এই দর্শন বিদ্যালয় বিশ্বাস করত যে, অণু অবিভাজ্য, এইরূপে অমর (eternal)। তারা আরো বিশ্বাস করত যে, অণু খালি চোখে দেখা যায়না, এবং তা হঠাৎ আবির্ভুত হয় এবং হঠাৎ তীরোহিত হয়।

বৈশেশিকা দর্শন বিদ্যালয় বলত যে, একই পদার্থের অণুগুলো মিলে দ্বিঅণু ও ত্রিঅণু পদার্থ তৈরী করে। কণাদ আরো বলেন যে, প্রভাবকের (যেমন তাপ) প্রভাবে বিভিন্ন অণু সংযুক্ত হয়ে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটায়। মৃন্ময় পাত্রের কালো হয়ে যাওয়া ও ফলের পেকে ওঠা ইত্যাদি ঘটনাকে তিনি উদাহরণস্বরূপ উপস্থাপন করেন।

বৌদ্ধ এ্যটোমিজমের দুইটি ধাপ রয়েছে এক, খ্রীষ্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দীতে তারা বলেন উপাদানের উপর নির্ভর করে চার ধরনের অণু রয়েছে, প্রত্যেকটি উপাদানের আবার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যেমন দৃঢ়তা ও গতি; দুই, খ্রীষ্টিয় পঞ্চম-সপ্তম শতাব্দীতে বৌদ্ধ দার্শনিক দিগনাগ (পঞ্চম শতাব্দী) ও ধর্মকীর্তি (সপ্তম শতাব্দী) এ্যাটম সম্পর্কে কিছু বলেছিলেন। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বৌদ্ধ দার্শনিক ধর্মকীর্তি দিগনাগের ধারণাকে এগিয়ে নিয়ে বলেন অণু হলো বিন্দু-আকৃতির (point-sized), স্থিতিকালহীন (durationless) ও শক্তি দ্বারা গঠিত। ধর্মকীর্তি momentary atom সম্পর্কেও বলেছিলেন, অর্থাৎ যা চকিতেই অস্তিত্ববান হয় আবার চকিতেই হারিয়ে যায়।

এ্যটোমিজমের বৌদ্ধ ধারণাকে বর্ণনা করতে গিয়ে রুশ ইন্ডোলজিস্ট ফিওদর শেরবাত্স্কি (Stcherbatsky (১৮৮৬-১৯৪২)) বলেছেন – The Buddhists denied the existence of substantial matter altogether. Movement consists for them of moments, it is a staccato movement, momentary flashes of a stream of energy… “Everything is evanescent,” … says the Buddhist, because there is no stuff … Both systems [Sānkhya and later Indian Buddhism] share in common a tendency to push the analysis of Existence up to its minutest, last elements which are imagined as absolute qualities, or things possessing only one unique quality. They are called “qualities” (guna-dharma) in both systems in the sense of absolute qualities, a kind of atomic, or intra-atomic, energies of which the empirical things are composed. Both systems, therefore, agree in denying the objective reality of the categories of Substance and Quality, … and of the relation of Inference uniting them. There is in Sānkhya philosophy no separate existence of qualities. What we call quality is but a particular manifestation of a subtle entity. To every new unit of quality corresponds a subtle quantum of matter which is called guna “quality”, but represents a subtle substantive entity. The same applies to early Buddhism where all qualities are substantive … or, more precisely, dynamic entities, although they are also called dharmas (“qualities”).

গ্রীক এ্যটোমিজম:
কোন চূড়ান্ত অবিভাজ্য বস্তু আছে কি?
(Is there an ultimate, indivisible unit of matter?)

প্লেটো বা এরিস্টটলের আগেই। গ্রীক দার্শনিক লুসিপাস ও তার ছাত্র ডেমোক্রিটাস অণুর ধারণা দিয়েছিলেন। ডেমোক্রিটাস সক্রেটিস ও সোফিস্টদের সমসাময়ীক ছিলেন। ডেমোক্রিটাসের মতে এ্যটম জ্যমিতিকভাবে নয় তবে ভৌতভাবে অবিভাজ্য। দুটি এ্যটমের মধ্যে আছে শূণ্য স্থান (empty space)। এ্যটম ধ্বংসযোগ্য নয় (indestructible), সে সর্বদাই গতিশীল, এ্যটম সমূহের সংখ্যা অসীম, এবং তা বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে। এই প্রকারভেদ নির্ভর করে তার অবয়ব (shape) ও আকৃতির (size) উপর। আধুনিক বিজ্ঞানে ডেমোক্রিটাসের এই ধারণার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই, বিজ্ঞানের ভাষ্য অনুযাযী, ১১২ টি মৌলিক পদার্থের প্রত্যেকটির এ্যটমই ভিন্ন ভিন্ন আকৃতির। ডেমোক্রিটাস আরো বলেছিলেন যে, এ্যটমের প্রকারভেদ তাপ (heat)-এর উপর নির্ভর করে, যেমন গোলকাকৃতি (spherical) এ্যটম সব চাইতে বেশী উত্তপ্ত, যার দ্বারা আগুন গঠিত, আর এ্যটম ও ভর সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন যে, এ্যটম ভরের উপর নির্ভরশীল – ভর যত বেশী এ্যটমটিও তত বড়। ঠিক এখনেই এ্যটমিজমের কনট্রাডিকশন ধরা পড়ে। একদিকে বলা হচ্ছে এ্যটমই ক্ষুদ্রতম গঠন একক, আবার অপরদিকে বলা হচ্ছে যে, তা ভরের উপর নির্ভরশীল। যদি ভরের উপর নির্ভরশীলই হবে তাহলে এ্যটমের মৌলিকত্ব থাকল কোথায়?

গ্রীক দার্শনিক হেরাক্লিটাস বলেছিলেন যে, একই নদীতে দুবার অবগাহন করা যায়না, অর্থাৎ জগৎ-সংসার পরিবর্তনশীল; অন্যদিকে দার্শনিক পারমেনিডাস বিশ্বাস করতেন পরিবর্তন বাস্তব কিছু নয় তা হচ্ছে মায়া (illusion)।

পারমেনিডাস গতি, পরিবর্তন ও শূণ্যতা (void) ইত্যাদিকে অস্বীকার করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, অস্তিত্ববান সবকিছুই অনন্য (single) চারপাশে যা কিছু আছে তা সবই অপরিবর্তনীয় ভর (এই ধারণাকে বলা হয় অনন্যবাদ বা monism ), এবং গতি, পরিবর্তন সবই মায়া। পারমেনিডাস sensory experience-কে অস্বীকার করেন এবং বলেন মহাবিশ্বকে বোঝার সঠিক পথ হচ্ছে abstract reasoning। প্রথমতঃ তিনি বিশ্বাস করতেন যে শূণ্যতা (void) বলে এমন কিছু নেই যাকে আমরা nothing বলতে পারি, (আবার শূণ্যতা যদি something হয় তবে সেটা শূণ্যতা নয়)। এর ফল দাঁড়ালো এই যে, গতি বলে কিছু নাই কারণ কোন কিছুকে চলাচল করতে হলে তার শূণ্যতার প্রয়োজন হবে।

তিনি আরো বলেন যে অবিভাজ্য একটি এককের প্রয়োজন আছে, যদি সেটা manifold হয়, তাহলে void-এরও প্রয়োজন দেখা দেয় যা তাদেরকে বিভাজন করবে, কিন্তু ইতিপূর্বেই উল্লেখ করেছি যে তিনি void-এ বিশ্বাস করতেন না। ডেমোক্রিটাস পারমেনিডাসের বেশীরভাগ আরগুমেন্টই মেনে নেন, তবে পরিবর্তন একটি মায়া, এই ধারণাটি তিনি মেনে নিতে পারেননি। তিনি মনে করতেন পরিবর্তন বাস্তব, আর যদি তা না হয়, তবে মায়া কি সেটা আগে বোঝার প্রয়োজন আছে। এভাবে তিনি void-কে সমর্থন করেন এবং বলেন যে মহাবিশ্ব অনেক পারমেনিডিয়ান সত্তার দ্বারা গঠিত, যারা void-এর মধ্যে গতিশীল, আর void অসীম।

এ্যটমকে অস্বীকার:
প্লেটো ডেমোক্রিটাসের এ্যটমিজমের প্রয়োজনহীনতার আভাস দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, মহাবিশ্ব চিরকালিন (eternal) নয়, একে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই সৃষ্টির একাংশ হলো চারটি উপাদান আগুন, মাটি, পানি এবং বাতাস। তিনি আরো মনে করতেন যে, এই উপাদানগুলো প্রত্যেকেই জ্যমিতিকভাবে ঘনবস্তু। এরিষ্টটল মনে করতেন যে এই চারটি উপাদান এ্যটম দ্বারা সৃষ্ট নয় বরং তারা নিরবিচ্ছিন্ন (continuous)। এই উপাদানগুলোর উপর দুটা বল (force) ক্রিয়াশীল: মহাকর্ষ – মাটি ও পানির ডুবে যাওয়ার প্রবনতা, এবং লঘুত্ব – বাতাস এবং আগুনের উপরে ওঠার প্রবণতা। আমরা মহাবিশ্বের উপাদানগুলোকে পদার্থ এবং বলে বিভাজন আজও ব্যবহার করি।

এরিষ্টটলের বিশ্বাস মতে পদার্থ নিরবিচ্ছিন্ন, ফলে তাকে বিভাজন করা যায় এবং এই বিভাজনের কোন শেষ নাই। এমন কোন পদার্থ কণিকা পাওয়া সম্ভব না যাকে ভাগ করা যায়না। এদিকে ডেমোক্রিটাস বিশ্বাস করতেন যে পদার্থ বহু প্রকার দানাদার পরমানুর দ্বারা গঠিত। গ্রীক ভাষায় এ্যটম (atom) শব্দের অর্থ অবিভাজ্য। এই দ্বন্দ্ব শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলেছে, তবে কোন পক্ষেই বাস্তব কোন প্রমান পাওয়া যায়নি।

১৮০৩ সালে বৃটিশ বিজ্ঞানী জন ডালটন দেখালেন যে, রাসায়নিক যৌগ গুলো সব সময়ই একটি বিশেষ অনুপাতে মিশ্রণের ফলে হয়। এ তথ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় পরমাণু গুলোর বিশেষ বিশেষ এককে গোষ্ঠিবদ্ধ হওয়া। এগুলির নাম তিনি দি্যেছিলেন অণু (molecule)। তারপরেও এ্যটোমিষ্টদের সপক্ষে চরম মিমাংশা হয়নি। একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌত সাক্ষ্য উপস্থিত করেছিলেন জগৎ বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনষ্টাইন। বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের গবেষণাপত্রম প্রকাশের কয়েক সপ্তাহ আগে ১৯০৫ সালে তিনি দেখিয়েছিলেন যে, ব্রাউনীয় গতিকে (Brownian motion) একটি তরল পদার্থের অনুগুলির সাথে ধুলিকণার সংঘর্ষ দিয়ে ব্যখ্যা করা যায়। একটি তরল পদার্থে ভাসমান ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধুলিকণার এলোমেলো এবং ইতস্তত বিক্ষিপ্ত গতিকে বলা হয় ব্রাউনীয় গতি।

আবার এই পরমাণু আসলে অবিভাজ্য নয়, এই সন্দেহ এর ভিতরেই দানা বাধতে শুরু করেছিল।

রহস্যময় মহাবিশ্ব ও চিরন্তন জীবন জিজ্ঞাসা-৯

প্রথম পর্বে বস্তু (matter) সম্পর্কে কিছু আলোচনা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা করা হয়েছে গতি (motion) নিয়ে। তৃতীয় পর্বে আলোচনা করা হয়েছে স্থান ও কাল (space and time) নিয়ে, ইতিহাসের গতিধারায় নিউটন-লেইবনিজ বিতর্ক পর্যন্ত। চতুর্থ পর্বে আলোচনা করা হয়েছে স্থান ও কাল সংক্রান্ত আলবার্ট আইনস্টাইনের বৈপ্লবিক চিন্তাধারা নিয়ে।
পঞ্চম পঞ্চম পর্বের আলোচনা করা হয়েছে স্থান-কাল সংক্রান্ত আরো কিছু দর্শন নিয়ে।

ষষ্ঠ পর্বে আলোচনা করেছি বিশ্ব জুড়ে নানাবিধ সংস্কৃতি ও শিল্পের ক্যাটাগোরী হিসাবে কাল নিয়ে।
সপ্তম পর্বে আলোচনা করেছি বিশ্ব জুড়ে নানাবিধ সংস্কৃতি ও শিল্পের ক্যাটাগোরী হিসাবে স্থান নিয়ে।
অষ্টম পর্বে আলোচনা করা হয়েছে মহাবিশ্বের কণিকা জগৎ নিয়ে। এবারের অর্থাৎ নবম পর্বে ও আলোচনা করব মহাবিশ্বের কণিকা জগৎ নিয়ে তবে তার উল্লেখযোগ্য অংশ গ্রীক অ্যটোমিজম এখানে প্রাধান্য পেয়েছে।

পারমেনিডাস ও এম্পিডক্লিস কর্তৃক প্রবর্তিত অনন্যবাদ (monism) ও বহুত্ববাদ (Polyism) মধ্যে সমন্বয় সাধনের প্রচেষ্টাই ডেমোক্রিটাস বা লুসিপাস-কে অ্যাটমিসম তত্ত্বে উপনিত করে। তারা বিশ্বাস করতেন যে, সবকিছুই পরমাণু দ্বারা গঠিত। এই পরমাণু জ্যমিতিকভাবে না হলেও বস্তুগতভাবে অবিভাজ্য। পরামাণুর পরস্পরের মধ্যে শূণ্যস্থান আছে, পরমাণু অবিনশ্বর, পরমাণু সবসময়ই গতিশীল, এবং ভবিষ্যতেও গতিশীল থাকবে।পরমাণুর সংখ্যা অসংখ্য, এমনকি এরা বিভিন্ন প্রকারের। কিন্তু এদের মধ্যে পার্থক্য শুধু আকার ও ভরের। এরিস্টটলের দাবী করেন, পরমাণুবাদীদের মতে তাপের তারতম্য অনুসারে পরমাণু বিভিন্ন হয়। যেমন গোলাকার পরমাণু। এই গোলাকার পরমাণু সবচেয়ে উত্তপ্ত হওয়ার কারণে আগুন সৃষ্টি করে। ভরের তারতম্য অনুসারে পরমাণুর মধ্যেও যে বিভিন্নতার সৃষ্টি হয় সে প্রসঙ্গে ডেমোক্রিটাসের উক্তি উল্লেখ করে এরিস্টটল বলেন, ‘যে পরমাণু যত বেশি অবিভাজ্যতা অতিক্রম করে সেই পরমাণু তত বেশি ভরবিশিষ্ট হয়’। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, পরমাণুবাদীদের মতবাদে পরমাণু সত্যিই ভরবিশিষ্ট ছিল কি-না তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। (পরমাণু ভরের উপর নির্ভর করে, আবার পরমাণু ক্ষুদ্রতম গঠন একক, এই দুইটি ধারণা পরস্পর বিরোধী)।

পরমাণুবাদে ডিটারমিনিজম এবং প্রোবাবিলিটি: প্রাচীনকালে পরমাণুবাদীদের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ অভিযোগ ছিল, তাঁরা জগতের সকল ঘটনাকেই সম্ভাবনার ফল হিসাবে ব্যাখ্যা করতেন। কিন্তু প্রকৃত সত্যটি হচ্ছে তারা কঠোর নিয়ন্ত্রণবাদী। তাঁরা বিশ্বাস করতেন জগতের প্রতিটি ঘটনাই প্রাকৃতিক নিয়মানুসারে ঘটে। কোন ঘটনাই কোন কারণ ব্যাতীত শুধু সম্ভাবনার দ্বারা সংঘটিত হতে পারে – একথা ডেমোক্রিটাস সুস্পষ্টভাবে অস্বীকার করেন। অস্তিত্ব নিয়ে লুসিপাসের সন্দেহ থাকলেও তিনি একথা বলেছিলেন বলে জানা যায়: ‘শূণ্য থেকে কিছুই সংঘটিত হয়না, কোন কারণ বা অনিবার্যতার ফলেই সবকিছু সংঘটিত হয়’। তবে একথা সত্য যে জগত আদিতে যে রূপে ছিল বর্তমানেও সেরূপ অবস্থায় থাকার কারণ সম্পর্কে তিনি কোন ব্যাখ্যা দেননি। আর এ কারণেই হয়তো জগৎ ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু জগৎ একবার সৃষ্টি হওয়ার পর এর পুনর্বিকাশ যান্ত্রিক নিয়ম দ্বারা অপরিবর্তনীয়রূপে স্থির ছিল।পরমাণুর আদি গতি নির্দেশ না করার জন্য এরিস্টটল সহ অন্যান্য দার্শনিকগণ লুসিপাস ও ডেমোক্রিটাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করেন। কিন্তু এই কারণ নির্দেশ না করার ক্ষেত্রে ছিল।পরমাণুবাদীগণ তাদের সমালোচকদের চেয়ে অধিকতর যৌক্তিক মনোভাবাপন্ন ছিলেন। কার্য-কারণ অবশ্যই কোন না কোন জায়গা থেকে শুরু হবে, এবং যেখান থেকেই শুরু হোক না কেন আদি কারণের কোন কারণ নির্দেশ করা যায়না।

সক্রেটিস, প্লেটো এবং এরিস্টটল উদ্দেশ্য বা পরিণতি কারণের সাহায্যে জগতের ব্যাখ্যা দেয়ার চেস্টা করেছেন, কিন্তু পরমাণুবাদীগণ এসব ধারনার সাহায্য ব্যতীতই জগতের ব্যাখ্যা দেয়ার চেস্টা করেছেন। কোন ঘটনার পরিণতি কারণ ভবিষ্যতের এমন একটি ফল যার জন্য ঘটনাটি সংঘটিত হয়। এই ধারণা মানুষের কার্যাবলীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কেন দর্জি কাপড় সেলাই করেন? মানুষের বস্ত্রের প্রয়োজন তাই। এসব ক্ষেত্রে বস্তুসমুহ যে উদ্দেশ্য সাধন করে সেই উদ্দেশ্যের দ্বারাই বস্তুসমুহের ব্যাখ্যা করা যায়। কোন ঘটনা সম্পর্কে আমরা যখন কেন প্রশ্নটি করি, তখন আমরা নিম্নের দুটি বিষয়ের যেকোন একটিকে বোঝাতে পারি: ‘এই ঘটনা কি উদ্দেশ্যসাধন করেছিল? অথবা ‘পূর্ববর্তি কোন কোন অবস্থা এই ঘটনা ঘটিয়েছিল?’ প্রথমোক্ত প্রশ্নটি একটি উদ্দেশ্যবাদী ব্যাখ্যা, অর্থাৎ পরিনতি কারণ দ্বারা ব্যাখ্যা। উপোরক্ত দুটি প্রশ্নের মধ্যে বিজ্ঞানের কোন প্রশ্নটি করা উচিৎ, বা বিজ্ঞানের দুটি প্রশ্নই করা উচিৎ কি-না একথা কিভাবে অগ্রিম জানা সম্ভব হতে পারে তা আমাদের জানা নেই। কিন্তু অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা গিয়েছে যে, যান্ত্রিক প্রশ্ন বৈজ্ঞানিক জ্ঞানে উপনিত করে কিন্তু উদ্দেশ্যমূলক প্রশ্ন তা করেনা। পরমাণুবাদীগণ যান্ত্রিক প্রশ্নটিই করেছিলেন, এবং এর একটি যান্ত্রিক উত্তরও দিয়েছিলেন।

একথা অনুমান করা ঠিক হবেনা যে, পরমাণুবাদিদের মতবাদের পক্ষে ব্যবহৃত তাঁদের যুক্তিসমূহ সম্পুর্ণ অভিজ্ঞতাভিত্তিক। আধুনিক যুগে রসায়নবিজ্ঞানের তথ্যাবলীকে ব্যাখ্যা করার জন্য পরমাণুতত্বকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। কিন্তু এই তথ্য গ্রীকদের জানা ছিলনা। সেই যুগে অভিজ্ঞতাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ও যৌক্তিক যুক্তির মধ্যে সুস্পষ্ট কোন পার্থক্য ছিল না। একথা সত্য যে পারমেনিডাস পর্যবেক্ষিত ঘটনাকে অবজ্ঞার চোখে দেখেছেন। কিন্তু এম্পিডক্লিস ও এনাক্সেগোরাস তাদের অধিবিদ্যার বেশীরভাগই পানি-ঘড়ি এবং ঘুর্ণায়মান বালতির পর্যবেক্ষণের সাথে সম্পর্কিত করেন। মুসলিম বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের আগে কেউই সম্ভবতঃ সন্দেহ করেননি যে, পর্যাপ্ত যুক্তি ও পর্যবেক্ষণের সমন্বয়ে একটি সম্পূর্ণ অধিবিদ্যা এবং বিশ্বতত্ব প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।পরমাণুবাদীগণ এমন একটি প্রকল্পের গুরুত্ব আরোপ করেন যে কারণে দুহাজার বছরের অধিককাল পরে এ বিষয়ে কিছু প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু সে সময়ে তাদের এই বিশ্বাস একটি সুদৃঢ় ভিত্তির অভাবে পরিত্যক্ত হয়েছিল।

লুসিপাস পারমেনিডাসের যুক্তির সঙ্গে গতি ও পরিবর্তনের সুস্পষ্ট তথ্যাবলির সমন্বয় সাধনের পন্থা আবিষ্কারের উদ্যোগ গ্রহন করেন। এ প্রসঙ্গে এরিস্টটল বলেন, “কোন উন্মাদ ব্যাক্তি তার ইন্দ্রিয়-প্রত্যক্ষণ থেকে একথা অনুমান করবে না যে, আগুন এবং বরফ এক বস্তু। কিন্তু কিছু মানুষ অভ্যাসবশতঃই যা সঠিক এবং যাকে সঠিক বলে মনে হয় – এই দুয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য না দেখার মত পাগলামি করে থাকে”।

অবশ্য লুসিপাস মনে করেন যে, তিনি তার মতবাদকে ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষণের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করেছেন। তিনি বস্তূর অস্তিত্বশীল হওয়া এবং বস্তূর তিরোহিত হওয়া বা বস্তূর গতি এবং বস্তূর বহুত্বের ধরণা বিলোপের পক্ষপাতি নন। তিনি এসব বিষয়কে প্রত্যক্ষণের অন্তর্গত বলে মনে করেন। অপরদিকে, তিনি একত্ববাদীদের সাথে ঐক্যমত প্রকাশ করে বলেন, শূণ্যস্থান ব্যতীত কোন গতি থাকতে পারেনা। ফলশ্রতিতে যে মতবাদের উদ্ভব হয় তাকে তিনি নিম্নরূপে ব্যক্ত করেনঃ শূণ্যস্থান হলো অ-সত্বা এবং অস্তিত্বশীল বস্তুর কোন অংশই অ-সত্বা নয়; কারণ সঠিক অর্থে অস্তিত্বশীল বস্তু একটি অনপেক্ষ পূর্ণস্থান। অবশ্য এই পূর্ণস্থান (Filled space) এক নয়, বরং এই পূর্ণস্থান সংখ্যার দিক থেকে অসংখ্য অসীম। পরিমাণের সূক্ষতার কারণে এরা অদৃশ্যমান। অসংখ্য পূর্ণস্থান শূণ্যস্থানে বিচরণ করে (কারণ শূণ্যস্থান আছে) । একত্রিত হয়ে এরা বস্তুর অস্তিত্ব লাভে সাহায্য করে, আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে এরা বস্তুর অবসান ঘটায়। অধিকন্তু সংযোগের সুযোগ পেলেই এরা কাজ শুরু করে এবং কাজের ফলাফল ভোগও করে। একত্রিত হয়েই এরা কোন কিছু সৃষ্টি করে এবং পরস্পর একত্রিত হয়। অপরপক্ষে প্রকৃত এক থেকে কখনোই বহুত্বের সৃষ্টি হতে পারেনা, কিংবা প্রকৃত বহু থেকে ‘এক’-এরও সৃষ্টি হতে পারেনা।

এখন দেখা যাবে যে, একটি বিষয়ে সকলেই একমত হবে যে, পূর্ণস্থান (Filled space)-এ কোন গতি থাকতে পারেনা। কোন বস্তু শুধু শূণ্যস্থানেই গতিশীল হতে পারে। পূর্ণস্থানে বড়জোড় আবর্তনশীল (rotational) গতি থাকতে পারে। সেই সময়ে গ্রীকদের মনে হয়েছিল যে, কোন ব্যাক্তিকে হয় পারমেনিডাসের অপর্বর্তনীয় জগৎকে নীরবে মেনে নিতে হবে অথবা শূণ্যস্থানকে স্বীকার করতে হবে।

এই পর্যায়ে, অ-সত্বার বিরুদ্ধে পারমেনিডাসের যুক্তিসমূহ পূর্ণস্থানের বিরুদ্ধে যৌক্তিকভাবে অখন্ডনীয় বলে মনে হয়। যেখানে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই বলে মনে হয়, সেখানে বায়ুর অস্তিত্ব আছে – এই মতবাদ আবিষ্কারের দ্বারা তার যুক্তিসমূহকে পূণরায় বলবৎ করা হয় (এই উদাহরণ যুক্তি ও পর্যবেক্ষণের একটি বিভ্রান্তির সংমিশ্রণ যা সাধারণভাবে প্রচলিত ছিল )। যদি বলি শূণ্যস্থান আছে তাহলে শূণ্যস্থান অ-সত্বা নয়, অনুরূপভাবে অ-সত্বা শূণ্যস্থান নয়। পরমাণবাদীদের মতে, একথা চিন্তা করা যতই কঠিন হোক না কেন, শূণ্যস্থান থাকতেই হবে।

উপরোক্ত সমস্যার পরবর্তি ইতিহাস আরো ইন্টারেস্টিং, পরবর্তি পর্বে এই বিষয়ে আলোচনা করা হবে।

(চলবে)

ছোট ছোট বালুকণা বিন্দু বিন্দু জল,
গড়ি তোলে মহাদেশ সাগর অতল

সাহায্যকারী গ্রন্থঃ
১। From Thales to Plato
২। Greek Mathematics
৩। History of Western Philosophy: Bertrand Russel