Categories
অনলাইন প্রকাশনা আইন কানুন আত্ম উন্নয়ন গল্প জীবনী ও স্মৃতিকথা সাকি বিল্লাহ্ সৃজনশীল প্রকাশনা

তিতা কথাঃ পর্ব-১০ অভাবে চোর আর স্বভাবে চোর !!!

— সাকি বিল্লাহ্
 
সকালে সংবাদপত্রটা হাতে নিলাম, না আমাদের দেশের না । জার্মানীর একটা পত্রিকা । শিরোনাম হচ্ছে “রাস্তায় গাড়ী দুর্ঘটনায় কুকুর নিহত”
এবার আসি আমাদের দেশের পত্রিকাগুলোর শিরোনামে,
“১১ ঘন্টায় রাজধানীতে দুই জোড়া খুন”
“বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও মাদকের ছোবল”
“অপারেশন হিট ব্যাকঃ বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন সাত লাশের চারটিই শিশুর”
“পুরনো রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের অনাগ্রহ”
“খাদ্যদ্রব্যের লাগাম ছাড়া দামে জনজীবন বিপর্যয়ের মুখে”
“শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ, পানি দূষণ, যানজট, লোডশেডিং সমস্যায় শহরজীবন দুর্বিষহ”
 
এ রকম ভয়ঙ্কর পরিস্থিতে বাংলাদেশ আগে কখনও পড়েছে বলে আমার মনে পড়ে না । তারপরও অনেক অন্ধ সরকার পন্থীরা বলে বেড়াচ্ছে দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে আছে(!) । একটা দেশ কতটা ভাল অবস্থায় আছে তা তার সংবাদ শিরোনামগুলো দেখলেই আসলে বোঝা যায় ।
যে দেশের মানুষদের নিয়ে আমরা স্বপ্ন দেখি তার একটা বড় অংশ অত্যন্ত নির্দয় এবং সুযোগ পেলে তাদের ভয়ঙ্কর রুপটা দেখিয়ে দেয় ।
দুমাস আগে একজন খুব কাছের মানুষের হঠাৎ পরিবর্তন দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম । ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার উপর বা দুদিন আগে খালেদা জিয়ার উপর আক্রমন দেখে সত্যিই অবাক হই মানুষরুপী জানোয়ারদের জন্য; আমরা আসলে সভ্য কবে হব ।
 
এ ধরনের মানুষের নির্মমতা দেখে কিছুটা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম কিছুদিন আগে । ছোটবেলার একটা ঘটনা মনে পড়ল,
তখন যতদূর মনে পড়ে সবেমাত্র ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে ভর্তি হয়েছি । একদিন সকাল ৫টার দিকে একজন চোর ধরা পড়ল । তিন রাস্তার মাথায় বিদ্যুতের খুটিঁর সাথে তাকে অত্যন্ত নির্মমভাবে শক্ত করে বাঁধা হল । এর মধ্যে যে যেভাবে পেরেছে তাকে বেধরক মারধর, লাথি, কিল, ঘুসি দিয়ে আধ মরা করে ফেলেছে । মানুষের শোরগোল শুনে বাসা থেকে বের হতে গেলাম, মা বললেন, “বাবা, ছেলেটাকে মারধর করিস না”, আমি বললাম, কোন ছেলেটা? মা বললেন, মানে চোর ছেলেটা, সেও তো কোন মায়ের সন্তান, হয়ত অভাবের তাড়নায় চুরি করেছে”
-কি বলব, বুঝতে পারলাম না
 
ইতোমধ্যে শুনতে পেলাম, চোরটা এক গ্লাস পানি পান করতে চাইলো । কেউ একজন বলল, ওকে পানি দেয়া যাবে না, কেউ বলল, ওর চোখ উপরে ফেলতে হবে, কেউ বলল, হাত পা ভেঙ্গে দিলে আর চুরি করতে পারবে না । আমার একমাত্র খালার বাড়ী আর আমাদের বাড়ী পাশাপাশি । খালা আর মা দুজনেরই অসহায় মানুষদের প্রতি মমত্ববোধটা অনেক বেশি । খালা আর মা দুজনেই বললেন চোরটাকে ছেড়ে দিতে । এরই মধ্যে আমার মা দেখি এক গ্লাস পানি হাতে আমাকে বললেন চোরটাকে দিয়ে আসতে, অবাক না হয়ে পারলাম না; একই রক্তে মাংসের মানুষ আমরা অথচ কেউ বলছে চোর টাকে পানি না দিয়ে, বরং চোখ উপরে ফেলতে আর কেউ পানি হাতে বলছে চোরটাকে পুলিশে দিতে বা ছেড়ে দিতে ।
পানির গ্লাস হাতে সামনে গেলাম, আমাকে পানির গ্লাস হাতে দেখে আমাদের বাড়ীর এক ভাড়াটিয়া খুবই বিরক্ত হলেন, উনার হাতে ছোটখাট একটা বাঁশের টুকরো, মারমুখী পৈশাচিক একটা ভয়ঙ্কর চেহারা নিয়ে উনি দাড়িয়ে আছেন । অন্যরা তেমন কিছু বলল না, শুধু উনি বললেন, আরে চোরকে এত সমাদর করার দরকার কি, শালায় গত মাসে আমার মোবাইল চুরি করছে আজকে আরেকজনেরটা চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ছে, ওর জান শেষ করে ফেলতে হবে মারতে মারতে” ।
 
অবাক হয়ে সেই লোকটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, সমাজে কত বড় বড় চোর প্রতিনিয়ত চুরি করে যাচ্ছে, হলমার্কস, ডেসটিনি, শেয়ার বাজার, ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ, ঘুষ, কালোবাজারি, ভোট চুরি, গম চুরি, গরীবদের ত্রান চুরি, আরো কত ধরনের চুরি ।
ক্ষুধার তাড়নায় যারা চুরি করে তারা তো অভাবে পড়ে করে, আর যাদের টাকা পয়সা বা খাবার দাবারের অভাব নেই তারা করে আসলে নিকৃস্ট স্বভাবের কারনে । অভাবে চুরি করা মানুষগুলোকে আমরা সুযোগ পেলে মেরে আধমরা করে ফেলি বা চোখ উপরে ফেলি কিন্তু যারা স্বভাবে চোর তাদের বেলায় সবাই নির্জীব ।
 
পানি পান করার পর চুরির অপবাদে দুস্ট ছেলেটা কিছুটা প্রাণ ফিরে পেল । সবাইকে উদ্দেশ করে বলল, ভাই, আমাকে পুলিশে দেন । জনসমাবেশের একজন বলল, তার আগে তোকে মেরে হাত পা ভেঙ্গে ফেলতে হবে । বাকী সবাই বলল, হ্যাঁ একদম ঠিক । আবারও একজন বলে উঠল, এর চাইতে ভাল হবে চোখ তুলে ফেললে তাহলে আর চুরি করতে পারবে না ” । ভয়ঙ্কর নির্মম কথায় হতবাক না হয়ে পারা যায় না ।
ফাঁসির আসামী যখন বুঝতে পারে, তার ফাঁসি নিশ্চিত তখন সে কিছুক্ষণের জন্য নির্বাক হয়ে যায়, আর একটা সময় সে আর কোন উপায় নেই ভেবে মৃত্যুর জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নিতে থাকে । এক সময় সে এ বিষয়টা মেনে নেয় । ফাঁসির মঞ্চে অত্যন্ত শান্তভাবেই সে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় । তার হাত বাঁধতে গিয়েও কোন সমস্যা হয় না কিন্তু যখন তার মুখে কালো কাপড়ে দিয়ে ঢেকে দেয়া হয় তখন সে শেষ বারের মত বাঁচার আদিম প্রবৃত্তিতে শেষ চেস্টা করতে থাকে ।
মানুষের আচড়ন আসলে সত্যিই ব্যতিক্রম ।
 
চোর যখন বুঝতে পারল তার মার খাওয়া নিশ্চিত বা চোখ উপরে ফেলা নিশ্চিত তখন এক পর্যায়ে সে সবাইকে অনুরোধ করলে, ভাই, আস্তে মাইরেন । ”
তবে এই নির্মমতা আমার অভিজ্ঞতায় তৃতীয় বিশ্বের মানুষদের ভিতর সবচাইতে বেশি । বাঙ্গালী জাতি হিসেবে আমরা আসলে এতটা নির্মম ছিলাম না । ব্রিটিশদের দুশ বছরের নির্মম অত্যাচারে, ইংরেজদের কৃত্তিম দুর্ভিক্ষের পর বিরাট ধনী জাতি থেকে যখন রাতারাতি গরীব হয়ে গেলাম আমরা তখন থেকেই আসলে আমাদের স্বভাব আর চরিত্র খারাপ হতে থাকে । কথায় আছে অভাবে স্বভাব নস্ট । আর যাদের স্বভাব একবার নস্ট হয় তখন অবস্থা ভাল হলেও স্বভাবটা থেকে যায় ।
 
ইতোমধ্যে আমার খালা ও মা সবাইকে বললেন কোন ধরনের মারধর না করতে, আর পুলিশকে ফোন করা হয়েছে । পুলিশ এসে চোরকে থানায় নিয়ে গেল । পুলিশের চোর নিধনে বর্থ্যতায় কেউ কেউ বললেন, আপনারা থাকতেও চুরি হয়, শান্তিতে কেউ ঘুমাতে পারে না । একজন পুলিশ অফিসার স্বগৌরবে বলে উঠলেন, দু একটারে চোখ উপরে দিয়ে পরে আমাদের ডাকবেন; দেখবেন চুরি বন্ধ হয়ে গেছে ।” আইন রক্ষাকারী একজন মানুষ যদি এ ধরনের উস্কানীমূলক কথা বলে তাহলে সে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সহজেই অনুমেয় ।
 
কিন্তু যারা দিব্যি কোটি টাকা চুরি করে যাচ্ছে তাদের তো কেউ কিছু করতে পারছে না বা করছেও না । ভয়ঙ্কর মানসিকতার এইসকল মানুষ গুলো আসলে দেখতে মানুষ হলেও এরা পশুর চাইতে অধম ।
এরা সুযোগ পেলে নির্মম হয়ে যায় আর অভাব না থাকলেও স্বভাবের কারণে সারাজীবন চুরি করতেই থাকে, তাই “কেউ অভাবে চোর আর কেউ স্বভাবে চোর” !
Categories
গল্প

গল্পটি বিরহের নয়

গল্পটি বিরহের নয়
———— ড. রমিত আজাদ

“ভাইজান হুমহুম কুমীর আইছে”।
আমাকে এসে জানালো কাজের মেয়ে।
আমি: কি! কে এসেছে?
কাজের মেয়ে: হুমহুম কুমীর।
আমি: বুঝলাম না।
কাজের মেয়ে: একটা লোক আইছে, তার নাম কয় ‘হুমহুম কুমীর’।
আমি: ও আচ্ছা। ঠিকআছে তুই যা। আমি দেখছি।
আমি দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। ভেজানো দরজা খুলে দেখলাম মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক দাঁড়ানো।

আমি: আপনি?
ভদ্রলোক: আমার নাম হুমায়ুন কবীর।
বুঝলাম। আমাদের কাজের মেয়েটি উনার নাম ঠিকমতো ধরতে পারেনি। পারার কথাও আসলে না। দশ/বরো বছরের মেয়েটি গ্রাম থেকে এসেছে। পিতা-মাতা দরিদ্র বলে লেখাপড়ার কোন সুযোগ পায়নি। সামান্য খাওয়া-থাকার জন্য এই বয়সে ঘরবাড়ী বাবা-মা ছেড়ে ঢাকা এসেছে কাজ করতে। ও মাঝে মাঝে ওর বাড়ির যে দারিদ্রের বর্ণনা দেয় তাতে চোখ ফেটে জল আসে।
আমি: জ্বী, বলুন।
হুমায়ুন কবীর: আপনি কি ড. সাজ্জাদ খান?
আমি: জ্বী।
হুমায়ুন কবীর: আপনি কি একজন এক্স ক্যাডেট?
আমি: জ্বী। (ভদ্রলোক এখনো দরজায় দাঁড়িয়ে। আমি একটু চিন্তায় পড়ে গেলাম। অপরিচিত ব্যাক্তিটি আমার কাছে ঠিক কি চাইছে আমি বুঝলাম না)
হুমায়ুন কবীর: আপনি কি রাশিয়ায় থাকেন।
আমি: জ্বী। কিন্তু আপনি ঠিক কি বিষয়ে? (উনি আমার সম্পর্কে তথ্য নিয়ে এসেছেন বুঝলাম। কিন্তু বিষয়টা কি তিনি তা তখনো বলেননি)
হুমায়ুন কবীর: না মানে, আমার মেয়েটাও একজন এক্স ক্যাডেট। ওর পড়ালেখার বিষয়ে কিছু আলাপ করতে চাইছিলাম আরকি।
এভাবে প্রথম দেখায় একজন অপিরিচিত লোককে, আপন ভাবার কোন কারণ নেই কিন্তু, উনার মেয়ে এক্স ক্যাডেট শুনেই আমার মুখে হাসি ফুটে গেলো।
আমি: আসুন, ভিতরে আসুন।

আমাদের এপার্টমেন্টের ড্রয়িংরুমে নিয়ে বসালাম উনাকে। জানালার কাছের সোফাটিতে একটু হেলান দিয়ে বসলেন তিনি। কিছুটা শ্রান্ত মনে হলো উনাকে। খুব সম্ভবত অনেক দূর থেকে এসেছেন, অবশ্য আজকাল ট্রাফিক জ্যামের কারণে, ঢাকার ভিতরেও এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যেতেও কয়েক ঘন্টা লাগে!

আমি: আপনি কি খুব দূর থেকে এসেছেন?
হুমায়ুন কবীর: জ্বী, সাভার থেকে এসেছি।
আমি: ও।
কাজের মেয়েকে ডেকে বললাম, “উনাকে চা, নাস্তা দাও”।
হুমায়ুন কবীর: না না ব্যাস্ত হবেন না। আমি নাস্তা খেয়ে বেড়িয়েছি।
আমি: নাস্তা খেয়ে বেড়িয়েছেন তো সেই কখন। এতটা পথ জার্নি করে এসেছেন এখনো কি আর এনার্জী আছে।
হুমায়ুন কবীর: না, মানে তার পরেও, অপরিচিত ঘর। (একটু লজ্জ্বা পেলেন কবীর সাহেব)
আমি: অপিরিচিতের কি আছে? আমরা ক্যাডেটরা সবাই ভাই-ভাই।
হুমায়ুন কবীর: জ্বী আমি জানি। এজন্যেই আপনার কাছে ছুটে আসা।
আমি: ভাষাণী হুজুরের কাছে কেউ দেখা করতে গেলে তিনি প্রথমে কোন কথা বলতেন না। প্রথমেই খেতে দিতেন। খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে তারপর কথা বলতেন।
হুমায়ুন কবীর সাহেব হঠাৎ আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর উনার চোখ নরম হয়ে এলো।
হুমায়ুন কবীর: ভাষাণী হুজুরের কথা আপনারা জানেন? আজকালকার কেউ তো উনার নামই মনে রাখেনাই!
আমি: জ্বী, নিজ চোখে তো দেখিনি। তবে বইয়ে পড়েছি। মুরুব্বীদের কাছ থেকে শুনেছি।
হুমায়ুন কবীর: আমি নিজ চোখেই উনাকে দেখছি।
আমি: তাই?
হুমায়ুন কবীর: জ্বী। উনার এক ভাতিজা আমার সহপাঠী ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেইভাবে হুজুর আমাকে চিনতেন। একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে হাটছি, হঠাৎ ঘাঁড়ের উপরে একটা লাঠির স্পর্শ অনুভব করলাম। আমি তো ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, মারামারি লেগে গেলো কিনা! তারপর পিছনে তাকিয়ে দেখি হুজুর। আমরা উনাকে হুজুর-ই বলতাম।
আমি: জ্বী, আমি শুনেছি, উনাকে সবাই হুজুর ডাকতেন।
হুমায়ুন কবীর: হুজুর আমাকে বলেন, “তোর মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হয়েছেনা?” আমি বললাম, “জ্বী”। হুজুর বলেন, “চল আমার সাথে চল”। আমি বলি, “কোথায় হুজুর?” হুজুর বললেন, “সন্তোষ।” আমি ভাবলাম সন্তোষ যাবো কিভাবে? হুজুর আমার মনের ভাব বুঝে বললেন, “বাইরে গাড়ী দাঁড়ানো আছে, তুই আমার সাথেই চল”।
আমি: ইন্টারেস্টিং! তারপর?
হুমায়ুন কবীর: আমরা তখন উনার একান্ত ভক্ত। আর উনার কথা অমান্য করবো এত সাহস আমাদের ছিলো না। উনার সাথে গাড়ীতে চড়ে সোজা সন্তোষে গিয়ে নামলাম।
আমি: মজার ঘটনা। হুজুর কি রাজনৈতিক পারপাজে আপনাকে নিয়ে গিয়েছিলেন, নাকি জাস্ট বেড়াতে।
হুমায়ুন কবীর: দুটার কোনটাই না। ওখানে যাওয়ার পর প্রথমেই ভাত খাওয়ালেন। হুজুর সবাইকেই প্রথমেই খাওয়াতেন। উনি বলতেন, “মানুষে কত দূর-দূরান্ত থেইকা আমার সাথে দেখা করতে আসে। কোন সময়ে কি খাইয়া বাইর হইছে কে জানে? আগে খাউক। প্যাটটা ঠান্ডা করুক তারপরে কথা হইবো।”
আমি: জ্বী, আমিও সেরকমই শুনেছি।

ইতিমধ্যে ভিতর থেকে চা-নাস্তা নিয়ে এলো কাজের মেয়ে কোহিনূর। অন্যান্য খাবারের মধ্যে একটা রাশিয়ান আইটেম ছিলো, ওটার নাম ‘স্মিতানা’। আমি মস্কো থেকে আসার সময় বেশ কিছু নিয়ে এসেছি। কোন গেস্ট আসলে দেই।

আমি: নিন, নাস্তা নিন।
খেতে খেতে কবীর সাহেব স্মৃতি চারণ করলেন। রাজনীতি বা বেড়ানো কোন কারণেই হুজুর আমাকে সন্তোষে নিয়ে যাননি। খাওয়ার পরে তিনি আমাকে উনার কলেজে নিয়ে গেলেন। তারপর বললেন, “এই কলেজে তোকে চাকরী দিলাম। পড়াবি”।
আমি তো তাজ্জব! মাস্টার্স-এর পরে চাকরী নিয়ে আমি একটু দুশ্চিন্তায়ই ছিলাম। সে সময়ে চাকরী-বাকরীর সমস্যা ছিলো। আর হুজুর একেবারে হাতে চাকরী তুলে দিলেন। আমি হুজুরের পায়ে হাত দিয়ে সালাম দিলাম। হুজুর মাথায় বুলিয়ে বললেন, “আরেকটা দায়িত্ব তোকে দিতে চাই”। আমি বললাম, “বলেন হুজুর”। হুজুর বললেন, “মেয়ে হোস্টেলের সুপারভাইজার-এর দায়িত্বটাও তোকে নিতে হবে”। আমি তো লাফ দিয়ে উঠলাম, “এটা কি বলেন হুজুর? আমি আন-ম্যারেড মানুষ, আমাকে এই দায়িত্ব দিচ্ছেন, ম্যারেড কাউকে দিতেন”। হুজুরের কথার উপর কোন কথা ছিলনা, কিন্তু এই বিষয়ে আমি একটু মরিয়া হয়েই বলে ফেলেছিলাম। হুজুর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোকেই কাজটা করতে হবে, ম্যারেডগুলা আরো বেশী শয়তান হয়”।
এবার আমি হেসে ফেললাম। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার বশে প্রাজ্ঞ হুজুর খুব একটা ভুল বলেননি।

আমি: তারপর?
হুমায়ুন কবীর: তারপর কয়েক বছর ওখানে চাকরী করি। হুজুর ইন্তেকাল করার পর আমি ওখান থেকে চলে এলাম।
আমি: এখন কি করেন?
হুমায়ুন কবীর: আমি ব্যাংকে চাকরী করতাম। রিসেন্টলি রিটায়ার করেছি, এখন একটা ছোটখাট ব্যবসা করছি।
আমি: ও। তা আমার কাছে কি মনে করে?
হুমায়ুন কবীর: ঐ যে বলেছিলাম। আমার মেয়েটা এক্স ক্যাডেট।
আমি: তারপর?
হুমায়ুন কবীর: মানে এইচ.এস.সি. পাশ করেছে। এখন হায়ার এডুকেশন করবে। তা ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু আমরা চাই ও বিদেশে লেখাপড়া করুক।
আমি একটু অবাক হলাম। আমাদের দেশের বেশীরভাগ পরিবারই চায়না মেয়ে বিদেশে লেখাপড়া করুক। তারপরেও কাউকে কাউকে দেখেছি দেশে কোথাও চান্স না পেলে তখন বিদেশের কথা চিন্তা করতে। আর ইনি দেখছি উল্টা দেশে ভালো ইউনিভার্সিটিতে চান্স পাওয়ার পরও তিনি মেয়েকে বিদেশে পড়তে পাঠাতে চাচ্ছেন।
আমি: আপনার মেয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে কোন সাবজেক্টে ভর্তি হয়েছে?
হুমায়ুন কবীর: ফার্মাসী।
আমি: বাহ! ভালো সাবজেক্টতো, এরপরেও আর বিদেশে পড়তে পাঠানোর কি আছে?
হুমায়ুন কবীর: না ভাই। দেশে কি ভালো পড়ালেখা আছে? আমি নিজে তো পড়েছি, মান জানি। আমার মেয়ে বিদেশে গিয়ে উচ্চ মানের লেখাপড়া করুক।
আমি: আপনি কি তাকে রাশিয়া পাঠানোর চিন্তা ভাবনা করছেন?
হুমায়ুন কবীর: ঠিক ধরেছেন। এ জন্যই আপনার কাছে আসা।
আমি: আপনি কি চাচ্ছেন, আমি ওকে রাশিয়ায় পড়ার ব্যবস্থা করে দেই?
হুমায়ুন কবীর: না ভাই, আপনাকে কিছু করতে হবেনা। সে ব্যবস্থা হয়ে গেছে।

আমি: বুঝলাম না!
হুমায়ুন কবীর: ঢাকার রাশান কালচারাল সেন্টারের মাধ্যমে একটা স্কলারশীপ হয়ে গেছে। মেয়ে আমার ডাক্তারীতে চান্স পেয়েছে মস্কোতে।
আমি: তাহলে আমার কাজ কি হবে?
হুমায়ুন কবীর: ভাই, আমাদের দেশের কারবার। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই-ই বলে, ‘না যাওয়ার দরকার নাই, ভালো হবেনা, এখানেই পড়ুক।’ শুনেছি আপনি ওখানে পড়ালেখা করেছেন অনেক বছর ধরে ওখানে আছেন, তাই আপনার কাছ থেকে আসল সংবাদ জানতে এসেছি, আপনার পরামর্শটাও কাজে দেবে। তাছাড়া ক্যাডেট ভাই হিসাবে আপনি নিশ্চয়ই ওকে ভালো পরামর্শই দেবেন। আপনারা ক্যাডেটরা তো একে অপরের ভালো বই মন্দ চান না।
আমি: (হেসে ফেলে বললাম) আপনি রিলায়েবল পথই ধরেছেন।

স্মিতানা খেতে খেতে কবীর সাহেব জানতে চাইলেন,
হুমায়ুন কবীর: বাহ, এটাতো খুব মজার। কি খাচ্ছি ভাই এটা?
আমি: রাশান ভাষায় স্মিতানা বলে, ইংরেজীতে sour cream বলে।
হুমায়ুন কবীর: খুব পুষ্টিকর মনে হচ্ছে।
আমি: জ্বী খুবই পুষ্টিকর।
হুমায়ুন কবীর: এই খেয়ে খেয়েই কি রাশানরা এত উঁচা-লম্বা হয়?
আমি হেসে ফেললাম।
আমি: জ্বী এরকম অনেকে পুষ্টিকর খাবার-দাবারই ওখানে আছে। এই বিষয়ে ওরা খুব সচেতন!
হুমায়ুন কবীর: রাশিয়ার খাবার-দাবার তাহলে ভালোই! আচ্ছা পাড়া-প্রতিবেশীরা আমকে এতটা নিরুৎসাহিত করছে কেন বলেন তো?
আমি: আপনি যখন মেয়েকে ক্যাডেটে পাঠিয়েছিলেন তখন কি তারা উৎসাহ দিয়েছিলো?
হুমায়ুন কবীর: নাহ। তখনও নিরুৎসাহিত করছিলো। বলেছিলো এতটুকু মেয়ে ক্যাডেটে পাঠাবেন, কত কষ্ট হবে, আর্মীর শাসন ভাই!
আমি: পরে কি দেখলেন?
হুমায়ুন কবীর: ভালো। আমার মেয়েতো খুশী। বলে, “ক্যাডেটের মত ভালো হয়ইনা”।
আমি: পাড়া-প্রতিবেশীদের ছেলেমেয়ে কেউ ক্যাডেট কলেজে পড়েছিলো?
হুমায়ুন কবীর: না ভাই। পরীক্ষা দিয়েছিলো কেউ কেউ চান্স পায়নাই।
আমি: এটাই কারণ। হিংসা-ঈর্ষা।
হুমায়ুন কবীর: জ্বী, ভাই ঠিক বলেছেন। আমাদের দেশের মানুষ ঐ হিংসাটাই করতে পারে ভালো।
যাহোক আমার একটা প্রশ্ন।
হুমায়ুন কবীর: কি প্রশ্ন?
আমি: এই যে আপনি মেয়েকে বিদেশে পাঠাতে চাচ্ছেন, আপনার স্ত্রী কি বিষয়টা জানেন? উনার কি মত আছে?
হুমায়ুন কবীর: আরে, ওর মাই-ই তো আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছে। উনার উৎসাহই তো বেশী! মেয়েকে যে ক্যাডেট কলেজে পাঠালাম, আপনার কি ধারনা, আমার খুব ইচ্ছা ছিলো কলিজার টুকরা মেয়েকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দেব? ওর মাই-ই তখন আমাকে বুঝিয়েছিলো, মেয়েকে স্মার্ট বানাতে হনে ক্যাডেটে পাঠাও। এখন ওর মা বলছেন, “ক্যাডেট কলেজ যেহেতু সাকসেসফুললি শেষ করেছে, বিদেশেও সাকসেসফুল হবে”।
এবার আমার অবাক হওয়ার পালা। মা তো বেশ দূরদর্শী! একেই বলে প্রগতিশীলতা।
আমি: তা আপনার স্ত্রী কি কিছু করেন?
হুমায়ুন কবীর: করেন মানে? উনি তো আমার চাইতেও বেশী পড়ালেখা। একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীতে চাকরী করেন অনেক টাকা বেতন পান।
বুঝলাম ভদ্রলোক স্ত্রীর গুনমুগ্ধ।
আমি: আমি আমার মতামত বলতে পারি।
হুমায়ুন কবীর: সেটাই বলেন।
আমি: রাশিয়ার পড়ালেখা খুবই ভালো। আমেরিকা বা ইংল্যান্ডের চাইতে কোন অংশে কম নয়। আপনার মেয়ে যদি ওখানে পড়ার সুযোগ পায়, সেটা হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। আপনি ওকে মস্কো পাঠিয়ে দিন।
হুমায়ুন কবীর: ভাই এটা জানতেই এসেছিলাম। তাহলে নিয়ত করি?
আমি: জ্বী করেন।
হুমায়ুন কবীর: আমি ভাই ভাষানী হুজুরের ভক্ত, হুজুরের শিক্ষা অনুযায়ী কোনদিন সৎপথ থেকে অসৎ পথে যাইনাই। আমার টাকা-পয়সা তাই তেমন নাই। রিটায়ারমেন্ট বেনিফিট হিসাবে কিছু টাকা পেয়েছিলাম, ওটা দিয়েই ব্যবসা করি। সেখান থেকেই কাটছাট করে কিছু টাকা ম্যানেজ করে মেয়েটাকে পাঠাবো। দোয়া করবেন।
আমি: খরচা তো তেমন নেই। স্কলারশীপ পেয়েছে তো।
হুমায়ুন কবীর: জ্বী, আলহামদুলিল্লাহ! তারপরেও প্লেন ভাড়া। পথ খরচা। এছাড়াও শুনেছি মাসে মাসে কিছু কিছু হাত খরচাও নাকি দিতে হয়?
আমি: জ্বী, তা দিতে হবে। টিউশন ফী নাই কোন, বই ফ্রী, হোস্টেল ফ্রী, চিকিৎসা ফ্রী। তবে স্টাইপেন্ড যা দেয় তা বেশী নয়, তাই মাসিক কিছু খরচা দিতে হবে, আনুমানিক পঞ্চাশ ডলারের মত।
হুমায়ুন কবীর: পঞ্চাশ ডলার দিতে পারবো, কষ্ট হলেও দেব। তাও মেয়েটা উন্নত দেশে পড়ুক।
আমি: আপনার কি একটাই সন্তান?
হুমায়ুন কবীর: না ছেলে আছে, আরেকটা। ক্লাশ টেনে পড়ে।
আমি: কোথায়? নারায়নগঞ্জে?
হুমায়ুন কবীর: নাহ! নারায়নগঞ্জে পড়াবো কেন? মেয়েটাকে ক্যাডেটে পড়িয়েছি আর ছেলেটাকে পড়াবো না?
আমি: ছেলেও ক্যাডেট?
হুমায়ুন কবীর: জ্বী, সিলেট ক্যাডেটে পড়ে।
আমি: ওহ! ভালোই তো আমার কলেজে পড়ে।
হুমায়ুন কবীর: জ্বী, ওর কাছ থেকেই তো আপনার কথা শুনেছি।
আমি: ওর কাছ থেকে? আমার কথা? ওরা আমাকে চিনবে কি করে? আমি তো পাস আউট করেছি অনেক বছর আগে!
হুমায়ুন কবীর: জ্বী, চেনে। স্যারদের কাছ থেকে আপনার নাম শুনেছে। ওদের ভাইস প্রিন্সিপাল কেমিস্ট্রির দোহা স্যার আপনার কথা নাকি খুব বলে। বলেন, “আমাদের ছেলে মস্কোতে ইউনিভার্সিটির প্রফেসর, বুঝতে পেরেছ!”
এবার আমার চোখ ছলছল করে উঠলো। দোহা স্যার আমাকে খুব স্নেহ করতেন। অথচ, আমি কলেজ ছাড়ার পরে আর উনার সাথে দেখা করার সুযোগ পাইনাই। কিন্তু স্যার ঠিকই আমার খোঁজ রেখেছে।
আসলে সব স্যাররাই এত বেশী বাৎসল্যপ্রেমী ছিলেন, আমাদেরকে নিজের ছেলেদের মতই দেখতেন। আমরা যখন ক্লাশ সেভেনে স্যাররা তখন জয়েন করলেন। আমরাই উনাদের প্রথম সন্তানদের মত। তাই হয়তো আমাদেরকেই বেশী মনে রেখেছেন।
আমি: স্যার এখন ভাইস-প্রিন্সিপাল জানতাম না। আমি অল্প কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে দেশে এসেছি। দেখি এর মধ্যে একবার কলেজে গিয়ে উনার সাথে দেখা করা যায় কিনা।
হুমায়ুন কবীর: দেখা করে আসেন না। উনি তো খুব ভালো মানুষ।

আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হুমায়ুন কবীর সাহেব উঠে গেলেন। উনাকে বিদায় দিয়ে আমি আরো কিছুক্ষণ ড্রয়িংরূমে বসে রইলাম। চোখের সামনে থেকে ধীরে ধীরে সব সরে যেতে থাকলো। ভেসে উঠলো সিলেট ক্যাডেট কলেজ, প্রবল বৃষ্টি, প্রিন্সিপাল স্যারের পিতৃসুলভ স্নেহময় কিন্তু কড়াকড়ি চেহারা, প্যারেড গ্রাউন্ড, খেলার মাঠ, ক্লাসরূমে স্যারদের জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা ও লালন-পালন, অডিটোরিয়ামে নাটক বা ডিবেট কম্পিটিশন, ডাইনিং হলের ইমপ্রুভড ডিনার, বৃষ্টির মধ্যে লুকিয়ে কলেজ গার্ডেন থেকে পেয়ারা চুরি করতে গিয়ে গার্ডের হাতে ধরা পড়া, তারপর একদফা প্রিফেক্টদের হাতে পানিশমেন্ট-আরেকদফা স্যারদের বকুনি, ভাইস-প্রিন্সিপাল স্যার ভর্ৎসনা করে বলতেন, “চুরি করো, কিন্তু ধরা পড়লে কেন? এজন্যই পানিশমেন্ট হবে”। মনে মনে হাসি পেল স্যারের উপদেশ বাণী মনে করে। পাশাপাশি চোখটাও ছলছল করে উঠলো, অনেকগুলো বছর ধরে বিদেশে আছি, অনেকের সাথেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। স্যারদের সাথে যোগাযোগটা রাখা জরুরী, আমাদের জীবন উনারা গড়ে তুলেছেন, উনাদের জন্যে আর কিছু করতে না পারি, অন্ততপক্ষে কৃতজ্ঞতাটা স্বীকার করা উচিৎ। হঠাৎ আমার খেয়াল হলো, হুমায়ুন কবীর সাহেবের কাছ থেকে দোহা স্যারের টেলিফোন নাম্বারটা নেয়া হয়নি, নেয়া উচিৎ ছিলো।
———— X X X ————-

ল্যান্ডফোনটা বেজে উঠলো। আম্মু নামাজ পড়ছেন আব্বু ঘরে নেই অতঃপর আমি টেলিফোনটা ধরলাম।
আমি: হ্যালো।
ওপাশ থেকে: কে সাজ্জাদ?
আমি: হ্যাঁ। কে বলছেন?
ওপাশ থেকে: আমি তুষার।
আমি: কোন তুষার?
তুষার: আরে তোর ক্যাডেট কলেজ ফ্রেন্ড তুষার। আমাকে চিনলি না?
আমি: সরি দোস্ত। অনেকদিন পরে তো, তাই চট করে ভয়েস রিকোগনাইজ করতে পারিনি।
তুষার: তুই এসেছিস, কই আমার সাথে তো যোগাযোগ করলি না।
আমি: আরে কমপ্লেইন রাখ। পাঁচ বছর পর এসেছি। সব যোগাযোগ ক্ষীণ।
তুষার: মোবাইলে কল দিতি।
আমি: দোস্ত, মোবাইলের যুগ শুরু হলো মাত্র। সবার কাছে তো এখনো মোবাইল নাই। ল্যান্ড ফোনের অভ্যাসটা এখনো রয়ে গেছে। আমার ডায়েরী হারিয়ে ফেলেছি তাই টেলিফোন নাম্বারগুলাও নাই। ই-মেইল তো করেছিলাম, পাস নাই?
তুষার: পেয়েছি তো। ই-মেইল মারফতই তো জানতে পারলাম তুই এসেছিস। তাই ফোন দিলাম।
আমি: তা তুইও তো দশ দিন পরে ফোন দিলি। এতোদিন কোথায় ছিলি।
তুষার: আরে ভাই কমপ্লেইন রাখ। দেশে এখন অনেক চেইঞ্জ হয়েছে। কর্পোরেট কালচার শুরু হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে এত ব্যাস্ত থাকি যে বৌ-এর জন্যও টাইম বের করতে কষ্ট হয়।
আমি: হা হা হা। তা, বৌ-কে তাহলে কি অন্য কেউ টাইম দেয়?
তুষার: হা হা হা। নাহ দোস্ত। রাশিয়ান বৌতো আর না। নামাজ-রোজা করে। আমাকে রেখে অন্য কাউকে সময় দেয়ার মতো মেয়ে না।
আমি: তোর কি ধারণা রাশিয়ান মেয়েরা সব ঐরকম?
তুষার: আরে থাক দোস্ত। নেভার মাইন্ড। আমি জানি সব জায়গায়ই ভালো-মন্দ আছে। এখন বল আমাদের গেট টুগেদার কবে?
আমি: আমি তো ই-মেইল দিলাম। শাহেদ বললো একটা জিটি-র ব্যবস্থা করবে, কিন্তু এখনো তো কিছু জানালো না।
তুষার: ওয়েল, শাহেদ যখন বলেছে, তখন করবেই। হয়তো সবার সাথে আলাপ করে নিতে সময় লাগছে। বুঝলি না দেশে এখন সবাই ব্যাস্ত। যাহোক তোর এখন টাইম আছে?
আমি: কেন বলতো।
তুষার: আমি তোদের গুলশানের ঐদিকেই আসছি। এই ফাঁকে তোর সাথে দেখাটা সেরে ফেলি।
আমি: কোথায় আসবি?
তুষার: তুই গুলশান দুই নাম্বার গোল চক্করের ওখানে দাঁড়াবি আমি তোকে গাড়ীতে তুলে নেবো।
আমি: ওকে। আমি রেডি হয়ে আসছি।
—————-XXX———————

ঠিক আমার সামনে এসে কালো রঙের একটা দামী গাড়ী থামলো। ভেতর থেকে কেউ একজন বললো, “সাজ্জাদ উঠে পড়”। আমি দেখলাম গাড়ীর পিছনের সিটে তুষার বসা। চটপট উঠে গেলাম গাড়িতে। আমার দিকে খুশী মনে তাকালো তুষার,
তুষার: অনেকদিন পরে দেখা দোস্ত। তুইতো দেখছি সেই আগের মতই আছিস!
আমি: তুইও আগের মতই আছিস তবে চেহারার মধ্যে একটা বিজনেস ম্যাগনেট, বিজনেস ম্যাগনেট ভাব এসেছে!
তুষার: আর কি দোস্ত! চাকরী-বাকরীতে না ঢুকে বিজনেস শুরু করলাম। ঝামেলা আছে তবে মালপানি ভালৈ কামাই। গোলামী করে লাভ আছে বল?
আমি: নাহ, গোলামী করার চাইতে ব্যবসা করাই ভালো। তুই ঠিকই করেছিস।
তুষার: থ্যাংক ইউ দোস্ত। ইনসপাইরেশন পেলাম। অনেকে এখনো বলে, “ক্যাডেট কলেজের ছেলে আর্মীতে গেলে না কেন?” আর্মীতে গেলে কি হলো বলতো? এখন মেজর থাকতাম। কত টাকা আর বেতন হতো? তার উপর হাজারটা রেস্ট্রিকশন! ক্যাডেট লাইফে তো আমরা দেখেছি এসব। তার চাইতে মাল কামাচ্ছি স্বাধীন জীবন যাপন করছি, ভালোই আছি।
আমি: তা আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি?
তুষার: আমার একটা এ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। এক বিশাল বড় বিজনেস ম্যাগনেট বস-এর সাথে। খুব বনেদী-রে, সেই পাকিস্তান আমল থেকে জাত ব্যবসা। গুলশানেই অফিস।
আমি: তা উনার সাথে দেখা করবি তো আমাকে ওখানে নিয়ে যাচ্ছিস কেন?
তুষার: সময় পাওয়া যায়না দোস্ত। গাড়ীতে যেতে যেতে যতক্ষণ কথা হয়। উনার সাথে দেখা করে তারপর একটু আমরা দুজনে রেস্টুরেন্টে বসবো, লাঞ্চটা করি একসাথে।
আমি: ওকে। গুড প্ল্যান। তোদের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ঢাকায় ওয়েস্টার্নাইজেশন ভালোই হচ্ছে। তা আমাকে উনার সাথে আর দেখা করানোর দরকার নাই। আমি গাড়ীতে বসলাম। আর তুই দেখা করে আসলি, সময় লাগবে?
তুষার: আরে না সময় বেশী লাগবে না। বিগ শট-রা কি আর অত সময় দেয়? তুই চল আমার সাথে ফাঁকে বসকেও একটু দেখিয়ে নিয়ে গেলাম তোর মতো মস্কো ইউনিভার্সিটির প্রফেসর আমার বন্ধু আছে।
আমি: তার কি খুব দরকার আছে?
তুষার: এটা এম্নিই বললাম দোস্ত। ব্যবসার সাথে এর সম্পর্ক নেই। তবে বিগ শট নিজেই আমেরিকায় লেখাপড়া করেছে।
আমি: বলিস কি? দেশের বড়লোক ব্যবসায়ীরা তো অত বেশী লেখাপড়া করে না।
তুষার: না রে দোস্ত। দিন পাল্টেছে। আসল ব্যবসায়ী ছিলেন উনার বাবা। উনি অত লেখাপড়া ছিলেন না। বস তো বাপের গদিতে বসেছেন, উনি ঠিকই আমেরিকা থেকে লেখাপড়া করে এসেছেন।
আমি: কারা এরা?
তুষার: তুই আমরান গ্রুপের নাম শুনিস নি?
আমি: হ্যাঁ। অবশ্যই শুনেছি, ওরা তো খুব বনেদী! (স্মৃতিতে ঝিলিক দিয়ে উঠলো একটি বিষয়)
তুষার: ঐ আমরান সাহেবের ছেলে জামরান সাহেব। উনার কাছেই যাচ্ছি।
———-XXX———-

বিশাল বড় গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রীর অফিস। বিশ তলা বিল্ডিং-এর পনের তলায় বসেন এর এম.ডি. জামরান সাহেব। আমরা রিসিপশনে গেলে তারা তুষার-কে দেখে সালাম দিলো। বুঝলাম তুষারের এই অফিসে রেগুলার যাতায়াত আছে তাই তারা ওকে চেনে। লিফটে চড়ে উঠে গেলাম পনের তলায়। লিফটে উঠতে উঠতে প্রশ্ন করলাম
আমি: উনাদের অফিস মতিঝিলে ছিলো না?
তুষার: হ্যাঁ, আমরান সাহেব ঐ অফিসেই বসতেন। অফিসটা এখনো আছে। তবে জামরান সাহেব বসেন গুলশানে। বুঝলি না সেই আমলে মতিঝিল টপে ছিলো তাই আমরান সাহেবের অফিস ছিলো মতিঝিলে। এখন দিন পাল্টেছে গুলশান আর কেবলই রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া নাই, পাশাপাশি অঘোষিত কমার্শিয়াল এরিয়া হয়েছে। এখানে বসলে একদিকে স্ট্যাটাস হয় আরেকদিকে জ্যাম ঠেলে মতিঝিল পর্যন্ত যাওয়ার ঝামেলাটা থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়।
আমি: উনাদের বাড়ীটা গুলশানে না?
তুষার: হ্যাঁ, গুলশানেই।
এরপর তুষার হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বললো
তুষার: তুই উনাদেরকে চিনিস নাকি?
আমি: (একটু ভেবে) নাহ।
ততক্ষণে লিফট পৌঁছে গেলো পনের তলায়।
রিসিপশনিস্ট এক সুন্দরী তরুণী। স্মার্ট লুকিং শাড়ী বা কামিস পড়া নয়, ইউরোপীয়ান মেয়েদের মত সাজ-পোষাক। বোধহয় আগে থেকেই অপেক্ষা করছিলো তুষারের জন্য। সালাম দিয়ে ভিতরে নিয়ে গেলো।
দরজা ঠেলে জামরান সাহেবের রুমে ঢুকলাম। এত বড় গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রীজ-এর মালিক, উনার রূমটা অনেক বড় হবে ভেবেছিলাম। কিন্তু সেই তুলনায় ছোটই মনে হলো। হয়তো এর পিছনে উনার কোন লজিক থাকতে পারে।
তুষার: স্লামালাইকুম স্যার।
জামরান সাহেব: ওয়া আলাইকুম সালাম। (তারপর আমার দিকে তাকালেন)
তুষার: আমার বন্ধু প্রফেসর মস্কোর একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়।
এবার উনার মুখে হাসি দেখলাম। বেশ খাতির করে বললেন
জামরান সাহেব: ভালো ভালো, বসেন।
আমি: স্লামালাইকুম জামরান ভাই।
এবার উনার মুখে একটু চিন্তার ছায়া দেখতে পেলাম। সেটা কি আমার মুখে স্যার না শুনে ভাই শুনে? না কি অন্য কোন কারণে তা বোঝা গেল না। তবে তিনি সময় নিয়ে আমার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন
জামরান সাহেব: আপনাকে কি আগে কোথাও দেখেছি?
আমি উনার মস্তিষ্ক ভারাক্রান্ত করতে চাইলাম না। বললাম
আমি: আমি তো দেশে পড়ালেখা করিনাই প্রায় সারা জীবন বিদেশেই।
জামরান সাহেব: হ্যাঁ, তাই তো। আপনার সাথে ওভাবে দেখা হওয়ার কথা নয় আমার। আর ইস্ট ইউরোপের দিকে যাই নাই কখনো আমি। আমেরিকায় পড়েছি, ওয়েস্টে ঘুরেছি অনেক।
তুষার: জ্বী স্যার। আর ওতো ঐদিকেই থাকে। একবার ঘুরে আসেন না মস্কো থেকে।
জামরান সাহেব: ইচ্ছা আছে। কাজে ব্যাস্ত থাকি, সময় করে উঠতে পারিনা। অফিসেও বেশ কিছু রিফর্ম করছি ধীরে ধীরে। আব্বা উনার সময়ে যেই ব্যবসা করেছিলেন সেটা ছিলো অনেক কিছু, কিন্তু এখন দিন পাল্টেছে। আমাদেরকেও আধুনিকায়ন করতে হবে। আর সেটা দরকারও। (এরপর আমার দিকে তাকিয়ে) রাশিয়ার ওদিকে ব্যবসাপাতির খবর কি?
আমি: জ্বী ভালো। ওরা তো আগে ব্যবসা করতো না, এখন তো ভালোই ব্যবসা করছে!
জামরান সাহেব: হ্যাঁ, আমিও তেমন শুনেছি। একদল বাঙালী নাকি ইলেকট্রনিক্স-এর ব্যবসা করে লাল হয়ে গিয়েছে?
আমি: জ্বী, তা হয়েছে। আরো অন্যান্য ব্যবসাও করছে বাংলাদেশীরা।
জামরান সাহেব: দেখি, একসময় ঐদিকে ব্যবসা এক্সপ্লোর করার চেষ্টা করবো। আপনার কার্ড দিন একটা।
এরপর তুষার ও জামরান সাহেব নিজেদের ব্যবসার কথা বললো কিছুক্ষণ। মিনিট পনেরো আলোচনা করার পর আমরা উনার রুম থেকে বের হলাম। রিসিপসনিস্টকে ধন্যবাদ বলে বড় হলরুম দিয়ে হেটে ফ্লোর থেকে বের হওয়ার দরজার দিকে যাচ্ছিলাম হঠাৎ একজনার মুখোমুখি হলাম। দামী শাড়ী পরিহিতা অভিজাত চেহারার ভদ্রমহিলা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন
ভদ্রমহিলা: সাজ্জাদ না?
আমি উনার দিকে তাকিয়ে ভালো করে চেনার চেষ্টা করলাম, এবং চিনলাম। জামরান সাহেবের ছোট বোন মৌলি।
আমি: মৌলি?
মৌলি: হ্যাঁ, আমিই।
আমি: এতগুলো বছর পরে চিনলে কি করে?
মৌলি: তুমিও তো আমাকে চিনেছ!
আমি: প্রথম তো তুমি আমাকে চিনেছ। আর এই অফিসে তোমার উপস্থিতি অস্বাভাবিক কিছু না, তাই বুঝে নিলাম।
মৌলি: তোমার চেহারা তেমন পাল্টায় নি। বয়সের ছাপ পড়েছে, এটাই শুধু। আর তাছাড়া ………
আমি: কি?
মৌলি: না, কিছু না। তুমি এখানে কি করে?
আমি: (তুষারকে দেখিয়ে) আমার বন্ধু তুষার। ব্যবসা করেন, তোমার ভাইয়ার সাথে যোগাযোগ আছে ভালো।
তুষার: স্লামালাইকুম।
মৌলি: জ্বী, ওয়ালাইকুম। আপনারা চা খেয়েছেন?
আমি: না, চা খাইনি। দরকার নেই। আমরা এখন লাঞ্চে যাবো তো।
মৌলি: ভাইয়া যে কি করে! চা না খাইয়েই তোমাদের ছেড়ে দিলো!
আমি: না না, ঠিক আছে। এখন তো দুপুর, চায়ের সময় তো আর না।
মৌলি: তা ঠিক। এক কাজ করো। আমার সাথে লাঞ্চ করো।
আমি: আরে না না। ব্যস্ত হয়োনা।
মৌলি: এতদিন পরে ছেলেবেলার বন্ধুকে পেলাম আর একটু ব্যাস্ত হবো না?
আমাদের কথোপকথন শুনে তুষারকে একেবারে তাজ্জব দেখলাম। ওর বিস্ময় ভাঙানোর জন্য, আমি বললাম
আমি: তুষার, আমরা পূর্বপরিচিত। ছোটবেলায় এক স্কুলে পড়েছি।
তুষার: তুই না বললি…..।
আমি চোখের ইশারায় ওকে থামিয়ে দিলাম।
মৌলি: আমাদের অফিসে লাঞ্চ তেমন স্ট্যান্ডার্ড না। চলো বাইরে কোথাও রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসি।
তুষার: তাহলে আপনারা দুজন কোথাও বসুন। আমি না হয় চলি। আমাদের এইসব কথ
মৌলি: সেকি! আপনিও আমাদের সাথে থাকবেন। আপনার সুবাদেই তো ওকে এতদিন পরে দেখতে পেলাম!
সেদিনের লাঞ্চটা আমরা গুলশানের একটা রেস্টুরেন্টে সারলাম। মৌলি আমার ল্যান্ড ফোন ও অস্থায়ী মোবাইল নাম্বার দুটাই নিলো।
———-XXX———-

লাঞ্চ-এর পর গাড়ীতে যেতে যেতে
তুষার: ব্যাপারটা তুই বেমালুম চেপে গিয়েছিলি?
আমি: কোনটা?
তুষার: এই যে, খ্যাতিমান শিল্পপতি আমরান সাহেবের কন্যা, জামরান সাহেবের বোন তোর বান্ধবী।
আমি: না রে। ব্যাপারটা ওরকম নয়। আমি ক্যাডেট কলেজে যাওয়ার আগে একটা স্কুলে পড়তাম, ওখানে আমরা দুজনে একসাথে পড়েছি। ঐটুকুই। স্কুল ছাড়ার পর ওর সাথে আমার দেখা হয়েছিলো দুই-একবার তাও রাস্তা-ঘাটে-মার্কেটে হঠাৎ করে। আমে ওকে মনে ছিলো।
তুষার: এত বড় ধনী ব্যাক্তির মেয়ে ভুলে যাওয়ার কথা না।
আমি: সেই বারো-তেরো বছর বয়সের কথা! ওর যে আমাকে মনে থাকবে তা আমি এক্সপেক্ট করিনি।
তুষার: এখন তো দেখছিস ঠিকই মনে রেখেছে।
আমি: মেয়েটা খুব সিম্পল ছিলো রে! অত ধনী ব্যাক্তির মেয়ে, একছটাক অহংকারও ছিলো না।
তুষার: আমারও দেখে তাই মনে হলো।
আমি: ওর বিয়ে-শাদির ব্যাপার কিছু জানিস?
তুষার: হঠাৎ বিয়ের প্রশ্ন? কি বিয়ে করবি নাকি ওকে!
আমি: আরে ধুর, কি যে বলিশ? আমার বিয়ের কথা আসে কিসে? জাস্ট কিউরিসিটি। এতদিনে নিশ্চয়ই বিয়ে শাদী হয়ে গিয়েছে। কে হাসবেন্ড কি পরিচয় জানতে ইচ্ছে করছে, এই আরকি।
তুষার: হ্যাঁ, পুরুষালী কিউরিসিটি। যাহোক আমার সাথে উনার পরিচয় ছিলোনা, তাই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারবো না। শুনেছি বিবাহিতা। এইটুকুই।
আমি: ও।
তুষার: তোর কি মন খারাপ হয়ে গেলো?
আমি: কি যে বলিশ? ওর সাথে কি আমার প্রেম ছিলো নাকি? মন খারাপ হওয়ার কি আছে?
হঠাৎ করেই আমার কিছু পুরনো স্মৃতি জেগে উঠলো। স্কুলের কম্পাউন্ডে দোলনায় দোল খাওয়া, স্লিপারির সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে সাই করে পিছলে নীচে নামা। ফুটবল ভালো খেলতাম আমি। গোল দিলে ও পাশে দাঁড়িয়ে জোড়ে জোড়ে তালি দিত!
———-XXX———-

কিছুদিনের ছুটি নিয়ে দেশে এসেছি। আমাদের দেশে দেখা না করলে আত্মীয়-স্বজনরা খুব মাইন্ড করেন। তাই নিজের কাজ সারার পর উনাদের সাথে একে একে দেখা করতে লাগলাম। এর মধ্যে একদিন একটা ঘটনা ঘটলো। বাসার ল্যান্ডফোনটা বেজে উঠলে আমি ধরলাম। ওপাশ থেকে একটা বয়স্ক কন্ঠস্বর ভেসে এলো
ওপাশ থেকে: সাজ্জাদ সাহেব বাসায় আসেন?
আমি: জ্বি বলছি।
ওপাশ থেকে: আমার নাম মাওলানা আবদুল করিম। আপনার সাথে একদিন দেখা করতে চাই।
মাওলানা আবদুল করিম: কি বিষয়ে বলুন।
ওপাশ থেকে: আমার ছেলেটা, রাশিয়ায় পড়তে যাবে। এই নিয়ে একটু আপনার সাথে কথা বলতাম।
আমি: জ্বী, টেলিফোনেই বলুন মাওলানা সাহেব।
মাওলানা সাহেব: টেলিফোনে কি আর সিরিয়াস বিষয়ে আলাপ করা যায়? আপনি এজাজত দিলে, দেখা করতাম।
আমি: আমার ঠিকানা জানেন?
মাওলানা সাহেব: জ্বী জানি।
আমি: তাহলে আজ বিকালে চলে আসুন।

ঐদিন বিকালে পায়জামা-পাঞ্জাবী টুপি মাথায় বয়স্ক এক মাওলানা সাহেব বাসায় এসে উপস্থিত।
আমি: বলুন মাওলানা সাহেব আপনার কি খেদমত করতে পারি?
মাওলানা সাহেব: ভাই আপনি প্রফেসর মানুষ, আমার কি খেদমত করবেন। আমারই তো উচিৎ আপনার খেদমত করা।
আমি: লজ্জা দেবেন না চাচা। আপনি আমার মুরুব্বী।
মাওলানা সাহেব: আমি একটা ছোটখাট চাকরী করি। অফিসের ভিতরে ছোটখাট ইমামতিও করি। আমাদের অফিসের বস একজন রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার। স্যার মানুষ খুবই ভালো। উনার স্মার্টনেস, আচার-আচরণ, বুদ্ধি সবকিছু দেখে আমি খুব মুগ্ধ হই তখনই ঠিক করলাম আমার ছোট ছেলেটাকে ক্যাডেট কলেজে দিবো। আর্মী অফিসার বানাবো।
আমি: তারপর?
মাওলানা সাহেব: উপর ওয়ালা আমার দোয়া কবুল করেছিলেন। ছেলেটাকে ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে পড়াইছি।
আমি: ও কি পাশ করে গেছে?
মাওলানা সাহেব: জ্বী, পাশ করে গেছে।
আমি: এখন কি করছে?
মাওলানা সাহেব: সেটাই বলতে চাই। আমার সখ ছিলো সে আর্মী অফিসার হবে মেজর সাব-কর্ণেল সাব হবে, আমাদের বড় সাহেবের মতন স্মার্ট হবে। আর সে কিনা আমার ইচ্ছার কোন মূল্য দিলো না!
আমি: (উনাকে সান্তনা দেয়ার জন্য বললাম) জ্বী, বাবার ইচ্ছার তো মূল্য দেয়া উচিৎ।
মাওলানা সাহেব: তা ভাই সে আমার কোন কথাই শুনলো না। বলে, “আর্মীতে ঘোড়ার ডিম আছে! ছয় বছর প্যারেড করেছি, আর দরকার নাই। আর্মী কোন মেধাবী লোকের জায়গা না।” আমি ভাবছিলাম ক্যাডেট কলেজে পড়ে ওর আর্মীর দিকে মন যাবে, আর এই দেখি উল্টা হইয়া গেলো! বলেন তো ভাই, এইগুলা কোন বুদ্ধিমান লোকের কথা? আরে ভাই বাংলাদেশে আর্মীর চাকরী তো সোনার হরিণ। দেশের হাজার হাজার ছেলে ঐ চাকরীর স্বপ্ন দেখে, আর তুই পায়ে ঠেলিস। আপনিই বলেন ভাই ও আর্মী অফিসার হলে তো ওরই ভালো হতো। ওর সাথে এলাকায় চোখ তুলে কথা বলতে কেউ সাহস পেত। দশটা লোকে আমাকে দেখলে মেজর সাহেবের বাবা বলে সালাম দিতো না? তুই কি ডিওএইচএস-এ প্লট পেয়ে একটা আলীশান বাড়ী তুলতে পারতি না? কোন ইমাম-মাওলানা-প্রফেসরে এত কিছু পায়?
একটানে অনেকগুলো কথা বলে ফেললেন তিনি। বুঝলাম মনের খেদ সব বের করছেন।
আমি উনার ব্যাথা আর উস্কে দিলাম না, কারণ আমি জানি তিনি যা বলছেন, বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ওটাই বাস্তবতা। আমাকে একবার আমাদের কলেজের এক শিক্ষক বলেছিলেন আমি তোমাদের পড়িয়ে যা না পাই, আমার ছাত্ররা তার চাইতে অনেক বেশী কিছু পায়!
আমি: তা এখন ও কি করছে?
মাওলানা সাহেব: রেজাল্ট সে ভালো করছে খুব। দুইবারই স্ট্যান্ড করছে। এখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হইছে, ‘ল’-ডিপার্টমেন্টে।
আমি: ভালোই তো ‘ল’-ডিপার্টমেন্টে চান্স পাওয়া তো খুব কঠিন। ও যেহেতু ঐ ডিপার্টমেন্টে কোয়ালিফাই করেছে সাবাশ। এখন মনোযোগ দিয়ে পড়ুক।
মাওলানা সাহেব: বলে যে, ব্যারিস্টার হবে। ডক্টর সাব হয়ে জ্ঞানী-গুনী বুদ্ধিজীবি হবে।
আমি: ভালোই তো। ওর স্বপ্ন টার্গেট রেখে যদি আগায় হয়তো সে ভালো করবে।
মাওলানা সাহেব: আমি ওকে বলি, “ঠিক আছে ‘ল’ পড়তেছিস ভালো কথা শেষ করে বিসিএস দে, পুলিশ হ। তাহলেও তো জোর হয়। একদিন তুই আইজি হবি”। কি ভাই ভুল বলেছি?
আমি: (বুঝলাম, উনার চিন্তা-ভাবনা ঐ লাইনে। হয়তো দেশের সাধারণ মানুষরা উনার মতই ভাবে) না না আপনি ঠিক বলেছেন। তা আমার কাছে কি বিষয়ে এসেছিলেন?
মাওলানা সাহেব: এখন মাথায় অন্য ভুত চেপেছে। বলে দেশে পড়ালেখা ভালো না, সে বিদেশে পড়তে যাবে। বস্তা বস্তা চিঠি বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়েছে।
(আমি মনে মনে ভাবলাম, ছেলের চিন্তা-ভাবনা তো যথেষ্ট অগ্রসর!)
আমি: তারপর?
মাওলানা সাহেব: এখন ঢাকায় একটা এজেন্সির সাথে যোগাযোগ করেছে। ওরা আমার ছেলেকে রাশিয়ায় স্কলারশিপ করে দিতে পারবে। বিনিময়ে তাদের কিছু টাকা দিতে হবে।
আমি: ভালো এজেন্সী তো?
মাওলানা সাহেব: এই জন্যই আপনার কাছে আসা। বাংলাদেশে তো হায় হায় কোম্পানীর অভাব নাই কোন। তা সেই এজেন্সী ওয়ালারা আপনার নাম ঠিকানা টেলিফোন নাম্বার দিলো। বললো আপনি নাকি ওদের চেনেন। এই জন্যই আপনার কাছে আসা।
আমি: ও আচ্ছা। এইসব বিষয়ে আমিও সতর্ক থাকি ফ্রডের অভাব নাই কোন। তা ওরা কারা?
মাওলানা সাহেব: ‘এক্স-ওয়াই ইন্টারন্যাশনাল’, সেলিম সাহেব মালিক।
আমি: হ্যাঁ, ওদের চিনি আমি। সেলিম আমার বন্ধু, রাশিয়াতেই লেখাপড়া করেছে।
মাওলানা সাহেব: রাশিয়ান বৌ নাকি উনার?
আমি: জ্বী, রাশিয়ান বৌ।
মাওলানা সাহেব: বৌ কি মুসলমান হইছে?
আমি: তা বলতে পারবো না।
মাওলানা সাহেব: বিধর্মী বিয়ে করছে এইটা খারাপ কিছু না, তবে উনার কর্তব্য বৌটাকে মুসলমান বানানো।
আমি: সেটা উনাদের ব্যাপার।
মাওলানা সাহেব: হ্যাঁ, তা ঠিক। তবে কি কোরানের আয়াত আছে ……….।
আমি: মাওলানা আঙ্কেল, আমি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রফেসর হলেও, কোরান শরীফ পুরোটাই আমার বাংলা অর্থসহ পড়া আছে। আমি আয়াতগুলো জানি। এখন আপনি আমার কাছে কি জানতে চান বলেন?
মাওলানা সাহেব: আজকালকার শিক্ষিতরা তো কোরান শরীফ পড়েনা। আপনি কোরান পড়েছেন শুনে ভালো লাগলো। যাহোক, আমি জানতে চাই ঐ কোম্পানী ঠিক আছে তো?
আমি: হ্যাঁ, ঠিক আছে। ওরা আগেও অনেককে পাঠিয়েছে।
মাওলানা সাহেব: হ্যাঁ, আমাকে বলেছে। আরেকটা বিষয়
আমি: বলুন।
মাওলানা সাহেব: আমি তো দেশ-বিদেশে যাইনাই। সাধারণ মানুষ ঐ সুযোগ কখনো হয়নাই। বায়তুল্লাহ শরীফ দেখার ইচ্ছা আছে, জানি না হবে কিনা। তা, রাশিয়া দেশটা কেমন? পড়া লেখা তো ভালো হবে বুঝিই, না হলে তো আর এত বড় সুপার পাওয়ার হয়নাই।
এবার আমার মনে হলো মাওলানা সাহেব লজিকাল চিন্তা-ভাবনা করতে জানেন।
আমি: জ্বী, আপনি ঠিকই ধরেছেন। ওখানকার লেখাপড়া ভালো।
মাওলানা সাহেব: আমি তো জানলাম। তা আপনাকে আরেকটু কষ্ট দিতে চাই। মার ছেলেটাকে নিয়ে আপানার কাছে একটু আসবো। ওকে কিছু এলেম দেবেন। ওরও কিছু জানার ইচ্ছা আছে হয়তো।
———-XXX———-

রাতের দিকে মোবাইলে একটা টেলোফোন কল পেলাম
আমি: কি খবর মৌলি?
মৌলি: তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছ?
আমি: না।
মৌলি: কি করো?
আমি: (আমি একটু চিন্তিত হলাম। এত রাতে হঠাৎ ওর ফোন) বই পড়ছি।
মৌলি: তোমার বই পড়ার স্বভাব আর গেলো না, তাইনা?
আমি: (আমি হেসে ফেললাম) আচ্ছা, এতোগুলো বছর আগের কথা। তোমাট এখনো সব মনে পড়ে?
মৌলি: হ্যাঁ, মনে পড়ে। তুমি গল্প পড়ে পড়ে এসে, আমাদেরকে সেইসব গল্প বলতে, আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম।
আমি: তাই?
মৌলি: তোমার মনে নাই?
আমি: মনে আছে।
মৌলি: তুমি যেদিন স্কুল ছেড়ে চলে গেলে, সেদিন আমাদের সবার মন খারাপ হয়ে গিয়েছিলো।
আমি: আমার সৌভাগ্য। আমার তো মনে হয়েছিলো, আমাকে সবাই দ্রুতই ভুলে যাবে।
মৌলি: না দ্রুত কেউ ভোলেনি। আমরা পরেও তোমার কথা আলাপ করেছি। আমাদের ক্লাসে আর গল্প শোনানোর কেউ ছিলো না। নাটক করার কেউ ছিলোনা, ফুটবল মাঠ কাঁপানোর কেউ ছিলোনা। নাদিয়াকে মনে পড়ে?
আমি: না মনে পড়ে না।
মৌলি: ছিলো একটা মেয়ে আমাদের সাথে। তোমার কথা অনেক বলতো। হয়তো তোমার প্রতি দুর্বলতা ছিলো।
আমি: ঐ বয়সে আবার দুর্বলতা কিসের?
মৌলি: তোমার কি ধারনা, ঐ বয়সে দুর্বলতা হয়না?
আমি: হয় নাকি?
আমার প্রশ্নে মৌলি চুপ করে রইলো।
আমি: আচ্ছা তোমার কথা তো ঐদিন আর জানা হলো না। তোমার ছেলেমেয়ে কয়জন? স্বামীর পরিচয় কি?
মৌলি: সাজ্জাদ সাহেব সাথে ছিলেন তাই পার্সোনাল বিষয়ে আর আলাপ তুলিনি।
আমি: আমিও তাই। তা এখন আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।
মৌলি: কাল ফ্রী আছো?
আমি: ছুটিতে এসেছি। সবসময়ই ফ্রী।
মৌলি: তাহলে কাল আসো। খথা হবে।
আমি: কোথায়?
মৌলি: ঐ রেস্টুরেন্ট-টাতেই এসো। রাত নয়টায়, খেয়াল থাকবে?
আমি: হু, খেয়াল থাকবে। তবে, রাতে? তোমার বাসায় সমস্যা হবেনা?
মৌলি: (একটু রেগে গেল মনে হয়) আমার বাসা দিয়ে তোমার কি দরকার? তোমাকে রাত নয়টায় আসতে বলেছি, রাত নয়টায়ই আসবে। বুঝলে।
ওর এই রূপটি আমার পরিচিত। বিশাল ধনী মানুষের একমাত্র কন্যা, কোনদিন কোন অভাব-অনটন-সমস্যা দেখেনি। সব সময়ই চেয়েই পেয়ে অভ্যস্ত। তাই স্কুলে আমাদের সাথেও ও হঠাৎ করেই রেগে উঠে বলতো, ‘এরকমই করতে হবে বুঝলে’।
আমি: ওকে স্যার। কাল দেখা হবে।
———-XXX———-

আমার বাড়ীতে একই দিনে একই সময়ে দুটা পরিবার এসে উপস্থিত। একটা পরিবার হুমায়ুন কবীর সাহেবের আরেকটা পরিবার মাওলানা আবদুল করিম সাহেবের। হুমায়ুন কবীর সাহেবের সাথে এসেছেন উনার গুণী স্ত্রী ও উনার মেয়ে। আর মাইলানা সাহেবের সাথে এসেছেন উনার ছেলে।

আমি: হুমায়ুন কবীর সাহেব বলেন কি জানতে চান?
হুমায়ুন কবীর: আজকে আমি আর কোন কথা বলবো না। উনাকে সব বলেন (নিজের স্ত্রী-কে দেখিয়ে দিলেন)
আমি: ম্যাডাম, আপনার কথা উনার কাছ থেকে শুনেছি। মাল্টিন্যাশনালে জব করছেন শুনলাম।
মিসেস হুমায়ুন কবীর: জ্বী। আমার মেয়ে নদীকে বিদেশে পড়াতে চাই। রাশিয়ায় স্কলারশীপ হয়েছে। আপনার অনেক প্রশংসা শুনলাম। তাই আপনার কাছে আসলাম পরামর্শের জন্য।
উনার কথাবার্তা খুবই সুন্দর ও উনিই বেশ স্মার্ট। প্রথম দেখায়ই বেশ ইমপ্রেসিভ মনে হলো।
হুমায়ুন কবীর: তার আগে ভাই একটা কথা কই। আমার নদীর চাচা, খেইপা গেছে।
আমি: কেন খেপলো?
হুমায়ুন কবীর: আজকে সকাল বেলা বাসায় আইসা চিল্লাচিল্লি। কয়, ‘আমার ভাতিঝি-রে রাশিয়ায় পড়তে দিমুনা।’
নদী: ভাইয়া আমি পজেটিভ ডিসিশন নিয়েই ফেলেছিলাম চাচা হঠাৎ এসে গোলামাকল শুরু করলো।ভাইয়া ওখানে গেলে কি ভালো হবে?
ক্যাডেটদের এই একটা বিষয় যখনই শোনে এক্স-ক্যাডেট, বাপের বয়সী লোককেও ভাইয়া বলে।
আমি: এরকম কথা কেন বল্লেন?
হুমায়ুন কবীর: কয়। রাশিয়ায় কোন পড়ালেখা হয় নাকি? অরা তো জ্বরের ওষুধই দিতে জানেনা। মাইনষে রাস্তায় পইরা মইরা থাকে।
আমি: এসব তিনি কি বলেন? নদীর চাচা কি আপনার ছোট না বড়?
হুমায়ুন কবীর: আরে বড় ভাই। আমার সম্বন্ধী লাগে। শালা হইলে আমি পাত্তা দিতাম নাকি? এখন তো পড়ছি বিপদে।
মাওলানা সাহেব: আপনার সম্বন্ধীর লেখাপড়া কতদূর?
হুমায়ুন কবীর: (একটু দমে গেলেন) জ্বী, বিএ পাশ।
মাওলানা সাহেব: ধুর! বিএ পাশের ভাত আছে এই জমানায়? এই জন্যই উল্টাপাল্টা বলে।
মাওলানা সাহেবের কথা শুনে নদীর মায়ের মুখটা একটু কালো হয়ে গেলো। মাওলানা সাহেব আরো বললেন
মাওলানা সাহেব: যেই দেশ আমেরিকা-বিলাতের সাথে টক্কর দেয়, তাদের লেখাপড়া খারাপ হইতে পারে? আপনার সম্বন্ধীর আইডিয়া নাই কোন।
আমি মনে মনে খুশী হলাম মাওলানা সাহেবের যৌক্তিক কথা শুনে। লাভই হলো, আমাকে আর কিছু বলতে হলো না।
আমি: পরিচয় করিয়ে দেই। ইনি হুমায়ুন কবীর সাহেব ব্যাংকে চাকুরী করতেন এখন রিটায়ার করে ব্যবসা করছেন। আর ইনি মাওলানা আবদুল করিম চাকুরী করছেন, এই উনার ছেলে নাম ………।
মাওলানা সাহেব: ওর নাম সাগর।
আমি: সাগর, তোমার আব্বার তো খুব ইচ্ছা ছিলো তুমি আর্মীতে যাবে। তা তুমি রাজী হলে না যে?
সাগর: আমি আব্বাকে বললাম “আর্মীতে কি আছে বলেন? ওখানে গিয়ে হবেইটাবা কি? তাছাড়া আমাদের জাতির কি কোন বীরত্বের ইতিহাস আছে?
আমি: তুমি আর্মীতে যাবে কি যাবে না। সেটা তোমার ব্যাপার। তবে আমাদের জাতির কোন বীরত্বের ইতিহাস নাই এটা আমি মানতে পারলাম না।
সাগর: আমাদের আবার কি বীরত্ব? আলেকজান্ডার তো বিশ্ব জয় করেছিলো। আমরা কি করেছিলাম?
আমি: ঐ আলেকজান্ডার আমাদের বাঙালীদের কাছে এসে এমন মার খেয়েছিলো যে আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি।
সাগর: বুঝলাম না? সে তো পাঞ্জাব থেকে ফিরে গিয়েছিলো।
আমি: গ্রীসের দরবারী ইতিহাসে ওরকমই লেখা হয়। কিন্তু মূল ঘটনা ভিন্ন। আলেকজান্ডারের সৈন্যদের মোকাবেলা হয়েছিলো আমাদের গঙ্গাঋদ্ধি জাতির সাথে। গঙ্গাঋদ্ধি আমাদের বাঙালীদেরই প্রাচীন নাম। সেই যুদ্ধে আলেকজান্ডার হারে, এবং ধাওয়া খেটে তার সৈন্যরা দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পালিয়ে যায়।
সাগর: কি বলেন?
আমি: ইয়েস। এরপর আলেকজান্ডার-এর আর দেশে ফেরা হয়নি। পথিমধ্যে বিষ প্রয়োগে তাকে হত্যা করা হয়। অর্থাৎ, এইভাবে পরাজয়ের গ্লানিটাকে ধামাচাপা দেয়া হয়েছে।
সাগর: ইন্টারেস্টিং!
আমি: আরো আছে আমাদের বীরত্বের ইতিহাস। বর্তমান জর্জিয়া রাষ্ট্র যেটা রাশিয়ার পাশেই। ওখানে কোলচিন ওয়ার নামে একটি যুদ্ধ হয়েছিলো ঐ যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন আমাদের সেনাপতি দাতিস। সেই দাতিস-এর কাহিনী লেখা আছে পূরাণ “Argonautika”-তে।
সাগর: এটা সত্যিই গর্বের।
আমি: বিজয় সিংহ-এর নাম শুনেছ।
সাগর: না।
আমি: ‘আমাদের ছেলে বিজয় সিংহ, লঙ্কা করিয়া জয়, সিংহল নামে রেখে গেলো নিজ শৌর্যের পরিচয়!’
সাগর: মানে কি এই কবিতার?
আমি: আমাদের বাংলার রাজপুত্র বিজয় সিংহ-ই বর্তমান শ্রীলঙ্কা বা প্রাচীন সিংহলের প্রতিষ্ঠাতা।
সাগর: কবেকার ঘটনা?
আমি: তিনি গৌতম বুদ্ধের সমসাময়ীক। এরকম আরো অনেক বীরত্বের কাহিনী আছে আমাদের পূর্বপুরুষদের তোমাকে আরেকদিন বলবো।
আমি: নদী, সাগরও তোমার মতো এক্স ক্যাডেট।
নদী ও সাগর পরস্পরের দিকে চাইলো। এবার সাগর কথা বলে উঠলো
সাগর: তুমি কি এমজিসিসি-র?
নদী: হ্যাঁ। তুমি কোন কলেজের?
সাগর: আমি জেসিসি-র।
নদী: ও তাই? ওয়াহিদ স্যারকে পেয়েছ তোমরা?
সাগর: হ্যা, পেয়েছি, তাহমিনা ম্যাডাম-কে তোমরা পেয়েছ না?
হঠাৎ করেই অচেনা দুজন তরুণ-তরুনী পরস্পরের সাথে এমনভাবে কথা বলতে শুরু করলো যেন অনেক দিনের চেনা। কেবলমাত্র ক্যাডেট পরিচয়েই এটা সম্ভব।
———-XXX———-

গুলশানের অভিজাত রেস্টুরেন্ট-টির আলো-আঁধারী পরিবেশে আমরা দু’জন বসলাম। মৌলিকে শেষ দেখেছিলাম তেরো বছর বয়সে। প্রজাপতির মত চঞ্চল একটি কিশোরী ছিলো। আজ পূর্ণাঙ্গ নারী রূপে ওকে অপরুপা লাগছে।

মৌলি: আজ সারাদিন কি করলে?
আমি: তেমন কিছু না। তবে ইমপর্টেন্ট একটা কাজ করলাম।
মৌলি: কি কাজ?
আমি: দু’জন রশিয়াতে পড়তে যাবে আমার কাছে এসেছিলো পরামর্শ করার জন্য।
মৌলি: কি পরামর্শ দিলে?
আমি: আমার সাথে আলাপ করে তারা কনভিন্সড হলো। ঠিক করেছে ওখানে পড়তে যাবে।
মৌলি: তোমার সাথে আলাপ করেই কনভিন্সড হয়ে গেলো ছেলে দুটা?
আমি: প্রথমত ছেলে দুইটা না, একটা ছেলে আর একটা মেয়ে।
মৌলি: ইন্টারেস্টিং! মেয়েটাকে বিদেশে পাঠাতে রাজী হলো বাবা-মা? অবশ্য আমিওতো বিদেশেই পড়েছি।
আমি: তুমি কোন দেশে পড়েছ?
মৌলি: ব্যাচেলর ডিগ্রীটা বাংলাদেশ থেকেই নিয়েছি, বুয়েট থেকে। তারপর বিয়ের পর মাস্টার্স-টা আমেরিকায় করেছি।
আমি: তোমার স্বামীর ব্যাপারে তো কিছু জানা হলো না।
মৌলি আমার দিকে তাকালো। স্বাভাবিক তাকানো নয়, তবে অনুভূতিটা ঠিক ধরতে পারলাম না।
মৌলি: ওদেরকে কনভিন্স করলে কি করে?
আমি: আসলে ওরা আগে থেকেই ঠিক করেছিলো মস্কোতে পড়বে। সামান্য দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিলো সেটা দূর করতেই আমার কাছে এসেছিলো। একটা বিষয় ওখানে কাজ করেছে।
মৌলি: কি বিষয়?
আমি: ওরা দু’জনেই এক্স ক্যাডেট, তাই আমার কথা সবই ওরা বিনা বাক্যব্যায়ে মেনে নিয়েছে।
মৌলি: ও। হ্যাঁ, তোমাদের ক্যাডেটদের এই ভ্রাতৃত্ববোধটা দারুন! তা কবে যাচ্ছে ওরা?
আমি: ওখানে ফার্স্ট সেপ্টেম্বর থেকে ক্লাস শুরু হয়। তার আগে আগেও যাবে আরকি।
মৌলি: দুজনেই মস্কোতে পড়বে?
আমি: হ্যাঁ।
মৌলি: দেখো, মস্কোতে গিয়ে নদী যেন আবার সাগরের বুকে ঝাঁপিয়ে না পড়ে!
আমি: হা হা হা! তাইতো, বিষয়টা তো আমার মাথায় আসেনি। দেখা যাক, কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।
মৌলি: ভালোবেসে বিয়ে করাটা খুব আনন্দের তাইনা?
আমি: বলতে পারবো না।
মৌলি: কেন, তোমার বিয়ে কি ভালোবাসার নয়?
আমি: আমিতো বিয়েই করিনি।
মৌলি: কি!!!
আমি: বিয়ে করিনি জনাবা।
মৌলি: কেন বিয়ে করোনি?
আমি: আজব প্রশ্ন!
মৌলি: আজবের কি আছে? সব কিছুর পিছনেই কারণ থাকে। তোআমর বিয়ে না করার পিছনে কি কোন কারণ নেই?

মৌলি ভুল বলেনি। কারণ ছাড়া ঘটন হয়না। আমার এত বয়সে বিয়ে না করার পিছনেও একটা কারণ আছে। তবে কারণটা আমি মৌলিকে বলতে চাইছি না।

আমি: তোমার ব্যাপারে বলো।
মৌলি: (মৌলি এবার করুণ চোখে আমার দিকে তাকালো) আমার বিয়ে হয়েছিলো ঢাকায়। নিজে পছন্দ করিনি, বাবা বিয়ে দিয়েছিলেন, উনার মতই এক ব্যবসায়ীর ছেলের সাথে। আমার বাবাকে তো চিনতে জাঁদরেল লোক ছিলেন। আমি প্রেম-ট্রেম কিছু করলে উনি মেনে নিতেন না। তাই ইয়াং লাইফে আমি সব সময় সংযতই ছিলাম।
আমি: তারপর?
মৌলি: বিয়ের পর আমি আমেরিকা যাই মাস্টার্স-টা করতে। আমার স্বামীও আমার সাথে যায়। ওখানে আমাদের মেয়েটার জন্ম হয়।
আমি: ভালো।
মৌলি: না সবকিছু ভালো নয়। বাচ্চাটা হওয়ার পর আমি মেয়েটাকে নিয়ে ভীষণ ব্যাস্ত হয়ে পড়ি। বিদেশ-বিঁভুয়ে বুঝতেই পারো আমাকে একাই সব সামলাতে হয়েছে। এদিকে আমার স্বামীর সম্পর্ক হয় একটা স্প্যানিশ-আমেরিকান মেয়ের সাথে। মেয়েটি সুন্দরী-স্মার্ট। উত্তেজক পোষাক-আষাক পড়তো। আমার স্বামী লোভ সামলাতে পারেনি। তারপর আমাকে ছেড়ে ওকেই বিয়ে করে।
ভীষণ বিমর্ষ লাগলো মৌলিকে। একে তো ভীষণ ধনী, তার উপর সুন্দরী; এরকম মেয়ে বিমর্ষ হলে দেখতে ভালো লাগে না। কেমন যেন মানায়না!
আমি: সরি! আমি জানতাম না।
মৌলি: সরি বলার কিছু নাই। আমরা এখন ম্যাচিউরড। এই বিষয়গুলোকে স্বাভাবিকভাবেই নিতে পারি। আজকাল এরকমতো আকছাড়ই হচ্ছে!
আমি: তারপরেও একটা সংসার ভেঙে যাওয়ার কথা শুনলে দুঃখ লাগে!
মৌলি: আমি এরপর ঢাকা চলে আসি। বাবার ব্যবসার একটা অংশ আমি দেখি। মেয়েটা আমার সাথেই আছে।
আমি: কি নাম তোমার মেয়ের?
মৌলি: আনিকা।
আমি: সুন্দর নাম।
মৌলি: তুমি মস্কো ফিরে যাচ্ছো কবে?
আমি: সাতদিন পরে।
মৌলি: আমাকে তোমার ই-মেইল, আর ওখানকার টেলিফোন নাম্বার দাওতো।
———-XXX———-

কাহিনীর পরবর্তি ঘটনা মস্কোতে।
আমি সেখানে একটি এ্যাপার্টমেন্টে থাকতাম। এ্যাপার্টমেন্ট-টি ছিলো মস্কোর অভিজাত এলাকায় ও মোটামুটি সুন্দর। একজন অধ্যাপক হিসাবে লেখালেখি জ্ঞান চর্চা করে আমার একক জীবন ভালোই কাটছিলো ওখানে। তবে সাগর নদী আসার পর আমার একক জীবনে মাঝে মাঝে ঢেউ লাগতে শুরু করলো। ওরা ডরমিটরিতে থেকে থেকে থেকে একঘেয়ে বোধ করতো, তাই মাঝে মাঝে উইক-এন্ডে আরো বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আমার এ্যাপার্টমেন্টে বেড়াতে আসতো। আমার নিঃসঙ্গ জীবনে ওদের উপস্থিতি ভালো লাগতে শুরু করলো। এরপর মাঝে মাঝে আমিই ওদের দাওয়াত দিতাম। একবার কোরবাণী ঈদে দাওয়াত দিলাম। নদী, সাগর, বকুল, মতিন, রূপালী, মেজবাহ সহ আরো দশ-বারোজন উপস্থিত। ওরা বললো, ভাইয়া আপনি বসে বসে বই পড়েন, আপনাকে কোন কাজ করতে হবে না। আমরাই রান্না-বান্না করছি। কোথায় সব মাল-ম্যাটেরিয়াল? আমি বললাম, “সব রান্না ঘরেই আছে, সব সময় যেমন থাকে। তোমরা কাজ ভাগ করে নিয়ে করতে থাকো। তবে আমি আজ বসে থাকবো না, আমি আর সাগর মিলে কোরবাণীর মাংসটা ভাগ করি তোমরা সবাই এক ব্যাপ করে পাবে।”
লাফ দিয়ে উঠলো মেজবাহ, “কি বলেন? কোরবাণী করেছেন নাকি?”
আমি: হ্যাঁ। করেছি। তোমরা আসবে একটা দেশের আমেজ আনতে হবে না। এখানকার গরু অনেক বড় বড় হয়, প্রত্যেকেই অনেক কেজি করে মাংস পাবে।
এরপর আমরা কাজে লেগে গেলাম। মাঝখানে নদী আমাদের দুজনার জন্য দুকাপ কফি বানিয়ে আনলো।
আমি: ওদেরকে দিয়েছ?
নদী: ওদেরটা ওরা বানিয়ে খাবে। আমি আপনার আর সাগরের জন্য আনলাম।
সাগর: থ্যাংক ইউ মিস নদী।

রকমারী মজাদার রান্না শেষে। সবাই মজা করে খেলাম। এরপর দেখি ওদের কয়েক জন আমার বিছানায় বেশ আরাম করে তেরা-বেকা হয়ে শুয়ে পড়লো। মতিন বলে, “ঈদের খাওয়াটা বেশী হয়ে গেলো। একটি বিশ্রাম নেই ভাইয়া।”
আমি বললাম, “নাও, বিশ্রাম নাও।” সাগরের হাতে দেখলাম একটা খেলনা পিস্তল, ওখান থেকে প্লাস্টিকের গুলি বের হয়। ও ওটা নিয়ে এদিকে গুলি করে করে ওদিকে গুলি করে। আমি হাসলাম, যদিও ইউনিভার্সিটিতে পড়ে, কিন্তু ছেলেমানুষী পুরোপুরো দূর হয়নি তখনও।
আমি বললাম, “টিভি চালিয়ে দেই দেখো।”
নদী: এখানে টিভিতে এতো এতো চ্যানেল যে কোন চ্যানেল দেখবে এই নিয়ে ঝগড়া লেগে যেতে পারে।
আমি: তুমি কোন চ্যানেলটা দেখতে চাও?
নদী: ‘সনি’ টিভি চালান।
সাগর: নাহ। ইন্ডিয়ান চ্যানেল দেখবো না।
নদী; কি হয় দেখলে?
আমি: সাগর মেয়েদের কথার মূল্য দিতে হয় বেশী। অতএব, নদীর পছন্দই থাক।
সাগর দেখলাম রেগে নদীর দিকে তাকালো। ওর হাতের খেলনা পিস্তল দিয়ে ফট করে একটা গুলি করে দিলো নদীর হাতে। নদী মনে হলো ব্যাথা পেয়েছে। কিন্তু আমার উপস্থিতিতে কিছু বলতেও পারছে না, কটমট করে সাগরের দিকে একটু তাকালো শুধু।

আমি মাঝে মাঝে ওদের খোঁজ নিতাম। জানলাম পড়ালেখা ভালোই করছে ওরা দুজন। সাগর পড়ছে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং আর নদী পড়ছে ডাক্তারী। সাকসেসফুলী ওরা ব্যাচেলর ডিগ্রী কমপ্লিট করলো। তারপর মাস্টার্স-এও এ্যাডমিশন নিলো।

একদিন নদী হঠাৎ আমাকে টেলিফোন করে বসলো।
আমি: হ্যালো নদী।
নদী: ভাইয়া।
আমি: কি, কোন সমস্যা?
নদী: আব্বা ফোন করেছেন বাংলাদেশ থেকে।
আমি: ভালো কথা। এটা জানানোর জন্য আমাকে ফোন করার কি আছে?
নদী: দেশে আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।
আমি: ও। তা তুমি কি মানসিকভাবে প্রস্তুত আছো?
নদী: না।
আমি: ছেলে কি ঠিক?
নদী: জানিনা। আব্বা বলেছেন, দেশে গেলে বিয়ে ঠিক করবেন। আপাতত: একমাসের জন্য দেশে ডেকে পাঠিয়েছেন।
আমি: কোন ছেলে, কি বিষয়, কিছুই কি জানোনা?
নদী: আমার এক আত্মীয়ের কাছ থেকে শুনেছি। বিসিএস ক্যাডার একটা ছেলেকে আব্বা পছন্দ করেছেন।
আমি: এভাবে অচেনা-অজানা একজনকে হুট করে বিয়ে করতে তুমি রাজী?
নদী: না, রাজী না।
আমি: তাহলে?
নদী: জানি না, কি যে হবে?
নদীর বিষয়টা আমার কাছেও ভালো লাগলো না। এরকম আগেও দেখেছি। বাংলাদেশ থেকে বাবা-মা মেয়েকে বিদেশে পড়তে পাঠায়। তারপর হুট করেই একদিন বলে, “অমুকের সাথে তোমার বিয়ে ঠিক করেছি চলে এসো”। তাদের ধারনা তারা একজন মানুষকে না, একটা রোবট-কে পাঠিয়েছেন। যার কাজ ঐদেশের বিশ্ববিদ্যালয় নামক কারখানায় ঢুকে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বের হয়ে আসা। তারপর দেশে গর্ব করে বলবো আমার মেয়ে বিদেশ থেকে ডিগ্রী নেয়া, আর সেই তকমা দিয়ে কোন এক বিগ-শটের সাথে তার বিয়ে দিয়ে দেয়া। একবারের জন্যও ভাবেনা যে মেয়েটা একটা মানুষ, সে ঐদেশে অনেকগুলা বছর কাটিয়েছে, তার এই চলার পথে হয়তো সে কাউকে মন দিয়ে ফেলেছে, সেই খোঁজ আগে নেইনা কেন!

আমি নদীর টেলোফোনটা রাখতেই মৌলির টেলিফোনট পেলাম
আমি: হ্যালো মৌলি।
মৌলি: একটা সংবাদ আছে।
আমি: বলো।
মৌলি: আমার মেয়েটা এ-লেভেল পাশ করেছে। খুব ভালো রেজাল্ট হয়েছে।
আমি: কনগ্রাচুলেশনস। টেলিফোনে তো আর মিষ্টি চাওয়া যাবেনা। দেশে আসলে মিষ্টি খাবো।
মৌলি: দেশে আসছো নাকি তুমি?
আমি: হ্যাঁ, ভাবছি এই সামারেই দেশে যাবো।
মৌলি: চলে আসো, অনেকদিন তোমাকে দেখিনা।
আমি: তোমার সুসংবাদটা শুনে ভালো লাগলো।
মৌলি: পাশাপাশি একটা দুসংবাদও আছে।
আমার বুকটা ধড়াস করে উঠলো। দুসংবাদ যখন আসে সবদিক থেকেই আসে। নদীর সংবাদটির পর এবার মৌলি কিছু বলবে।
আমি: কি হয়েছে?
মৌলি: আনিকা-র বাবা ফোন করেছিলো।
আমি: কি চায়?
মৌলি: সে চায় মেয়ে তো পাশ করেছে, এবার তার কাছে আমেরিকায় গিয়ে পড়ুক।
আমি: তুমি আপত্তি জানালে না?
মৌলি: বলে, “মেয়ে কি তোমার একার?”

———-XXX———-

সামারে বাংলাদেশে এলাম। একদিন পরেই ভাবলাম আর সব কাজ পরে হবে আগে নদীর বাবার সাথে একটু দেখা করি। উনাদেরকে একটু বুঝিয়ে বলি। মেয়েটার মনের ব্যাপারটা যাতে উনারা আমলে নেন, এভাবে সবকিছুতেই ম্যাটেরিয়াল লাভ-লোকসান দেখলে হয়?

সেদিন রাতে মৌলির সাথে দেখা করলাম ঐ একই রেস্টুরেন্টে। অনেকগুলো বছর পর আবারো সেই আলো-আঁধারী পরিবেশে দুজনার বসা। ওর রূপ কমেনি কিছুই, শুধু বয়সের ছাপটা একটু বেড়েছে। একটা নীল রঙের শাড়ী পড়ে এসেছে। নীল রং আমার প্রিয়, এটা জেনেই কি ঐ রঙের শাড়ী পড়েছে? একবার ভাবলাম প্রশ্নটা করি, তারপর ভাবলাম, নাহ, প্রশ্নটা করা ঠিক হবে না।

আমি: কি ঠিক করলে?
মৌলি: কিসের?
আমি: তোমার মেয়েকে নিয়ে।
মৌলি: আমার মেয়ে আমি দেব না। ও চায় তো মামলা করুক।
আমি: আমেরিকা থেকে আর কি মামলা করবে।
মৌলি: ওদের ফ্যামিলিটা খুব শয়তান। তুমি তো মাস্টারী নিয়ে থাকো জানোনা। বড়লোকরা ভালো মানুষ হয় না।
আমি: কি বলো?
মৌলি: ভালো মানুষ এতো এতো টাকা করতে পারে না। অনেক অনেক টাকা করতে হলে অনেক অনেক শয়তান হতে হয়।

একবার মনে মনে ভাবলাম ওকে জিজ্ঞেস করি তুমিওতো ভীষণ বড়লোক। তুমি কি শয়তান? এবার আমার হাসি পেল, তবে হাসিটা মনে মনে হাসলাম, এমন প্রশ্ন এই অপ্সরীকে করা যাবে না। হাজার হোক আমার ছেলেবেলার বন্ধু।
আমি: তা এখন কি করবে?
মৌলি: মেয়ে আমার সাথেই থাকবে। এখানেই প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়াবো, বিদেশেও পাঠাবো না। বিদেশে গেলেই আমার হাতছাড়া হয়ে যাবে।
আমি: হ্যাঁ ভালো সিদ্ধান্তই নিয়েছ।
মৌলি: আচ্ছা ঐ মেয়েটার কি হলো?
আমি: কোন মেয়েটা?
মৌলি: ঐ যে মস্কোতে পড়ে। বাবা-মা জোর করে ওকে কোন বদমাশের সাথে বিয়ে দিতে চাইছে!
আমি: ও হো! ছেলেটি বদমাশ কিনা জানিনা। তবে নদীর অপরিচিত। আমি দেশে এসেছি যখন, ভাবছি ওর বাবা-মার সাথে একবার কথাটা পারবো।
মৌলি: কথা বলে দেখো। মেয়েটার জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে জানো।
আমি: তোমার খারাপ লাগার কি আছে? তুমি তো আর ওকে চেনোনা।
মৌলি: মেয়েদের দুঃখ তুমি বুঝবে না। আমি আমার সাথে তুলনা করে বলছি। মেয়েটার জীবন যেন আমার মতো না হয়। ও ওর ভালোবসার ছেলেটাকেই বিয়ে করুক।
আমি: সমস্যা এখানেও একটা আছে।
মৌলি: কি সমস্যা?
আমি: ওর ভালোবাসার কোন ছেলে আছে কি না, আমি জানিনা।
মৌলি: ও, সেটাও তো প্রশ্ন। জানো, হয়তো আছে, মনে মনে আছে, আমার মতই কাউকে বলতে পারেনি কখনো।
আমি: তোমার কি পছন্দের কেউ ছিলো?
মৌলি অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো।
মৌলি: ছিলো, কিন্তু সেকথা ছেলেটিকে বলার সুযোগ পাইনি কখনো। তাই সে জানতে পারেনি। যখন জানানোর সুযোগ পেলেম ততদিনে অনেক দেরী হয়ে গেছে।

এর মধ্যে আমার মোবাইল ফোনটি বেজে উঠলো।
আমি: হ্যালো কে বলছেন।
নদী: ভাইয়া আমি নদী।
আমি: তুমি দেশে নাকি?
নদী: হ্যাঁ সাতদিন হয় এসেছি।
আমি: গুড। তা তোমার বিয়ে?
নদী: আগামী শুক্রবার।
আমার মনটা খারাপ হয়ে গেলো।
আমি: ও। সব ঠিক?
নদী: জ্বী, সব ঠিক। আপনাকে দাওয়াত দেয়ার জন্য ফোন দিলাম।
আমি: ঐ ছেলেটির সাথে? ঐ যে বিসিএস ক্যাডার?
নদী: না।
মৌলি উদগ্রীব হয়ে আমাদের কথা শুনছে।
আমি: তাহলে?
নদী: সাগরের সাথে?
আমি: হোয়াট?
নদী: জ্বী। সাগরের সাথেই। আমি বাবা-মা-কে কনভিন্স করতে পেরেছি।
আমি: সাবাশ মেয়ে! আমি আসছি তোমাদের বিয়েতে। আমার সাথে আরেকজন থাকবে, তোমার আপত্তি নেইতো?
নদী: কিসের আপত্তি? যাকে খুশী সাথে নিয়ে আসবেন। কাকে আনবেন?
আমি: সেটা, আসলেই দেখতে পাবে।

মৌলি: (হাসিমুখে বললো) কি হলো? মেয়েটি কি তার পছন্দের ছেলেটাকে বিয়ে করতে পেরেছে?
আমি: ইয়েস। ওয়েল ডান লেডী।

মৌলি যেন অনেকদিন পরে একটি সুসংবাদ শুনলো এইভাবে আমার দিকে তাকালো। আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম,
“মাই ডিয়ার মৌলি, হ্যাপী এন্ড। গল্পটি বিরহের নয়!”

তারিখ: ১৭ই জানুয়ারী, ২০১৭
সময়: দুপুর ১২ ঘন্টা ২২ মিনিট

Categories
গল্প

পরমাণু গল্পঃ অভিনেতা। শঙ্কর দেবনাথ

কী চাই?
ভোট।
হবে না।
কেন?
নেতারা নষ্ট।
আমি নেতা নই।
তবে?
অভিনেতা।

Categories
গল্প

পরমাণু গল্প

গল্পের ভেতরে সাপ শুয়ে থাকে। সংগোপনে।
রাত বাড়ে।
গল্প ঘুমোলে কবিতা জাগে।
সাপ ফণা তোলে। বিষ ঢালে।
ডালে ফুটফুটে ফুল হাসে।

Categories
গল্প

পরমাণু গল্প

মুখ ঘামে।
কথারা থামে।

রাত্রি নামে।
যাত্রীহীন।

চোখ শুধু চেয়ে থাকে।

শব্দরা নিঃশব্দে প্রেম মাখে।
মনে।
কোণে।

কবিতা ডাকে।
– এসো!

কবি বলে।
– এভাবেই—
ভালোবেসো!

Categories
গল্প

পরমাণু গল্প

গল্পের ভেতরে সাপ শুয়ে থাকে।

সংগোপনে।

রাত বাড়ে।

গল্প ঘুমোলে কবিতা জাগে।
সাপ ফণা তোলে।
বিষ ঢালে।

ডালে ফুট ফুটে ফুল ফোটে।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প বঙ্গিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বিনোদন ব্যঙ্গকৌতুক

কমলাকান্তের জবানবন্দী (জোবানবন্দী)

–বঙ্গিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

–প্রথম প্রকাশ- বঙ্গদর্শন, ফাল্গুন সংখ্যা, ১২৮৮ বঙ্গাব্দ

বঙ্কিমের বিখ্যাত রম্যব্যঙ্গ সংকলন ‘কমলাকান্তের দপ্তর’-এর সর্বশেষ রচনার নির্বাচিত অংশ।

মূলপাঠে (বঙ্কিমের দেয়া নাম) রচনাটির নাম ছিলো ‘কমলাকান্তের জোবানবন্দী’। সংকলিত অংশের নামের বানানে একটু পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘কমলাকান্তের জবানবন্দী’।

এটি একটি নকশা জাতীয় রচনা।

চরিত্র

কমলাকান্ত- প্রধান চরিত্র। আফিংখোর। ব্রাহ্মণ। পুরো নাম- শ্রীকমলাকান্ত চক্রবর্তী। বয়স-৫১ বছর ২ মাস ১৩ দিন। বাসা নেই, কোন পেশাও নেই।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও উদ্ধৃতি

এজলাসে, প্রথামত মাচানের উপর হাকিম বিরাজ করিতেছেন। হাকিমটি একজন দেশী ধর্মাবতার- পদে গৌরবে ডেপুটি।

কমলাকান্ত আসামী নহে- সাক্ষী।

মোকদ্দমা গরুচুরি।

ফরিয়াদী প্রসন্ন গোয়ালিনী।

————–

সেই আফিঙ্গখোর কমলাকান্তের অনেক দিন কোন সম্বাদ পাই নাই। অনেক সন্ধান করিয়াছিলাম, অকস্মাৎ সম্প্রতি একদিন তাহাকে ফৌজদারী আদালতে দেখিলাম। দেখি যে, ব্রাহ্মণ এক গাছতলায় বসিয়া, গাছের গুঁড়ি ঠেসান দিয়া, চক্ষু বুজিয়া ডাবায় তামাকু টানিতেছে। মনে করিলাম, আর কিছু না, ব্রাহ্মণ লোভে পড়িয়া কাহার ডিবিয়া হইতে আফিঙ্গ চুরি করিয়াছে-অন্য সামগ্রী কমলাকান্ত চুরি করিবেনা-ইহা নিশ্চিত জানি। নিকটে একজন কালোকোর্ত্তা কনষ্টেবলও দেখিলাম। আমি বড় দাঁড়াইলাম না-কি জানি যদি কমলাকান্ত জামিন হইতে বলে। তফাতে থাকিয়া দেখিতে লাগিলাম যে, কাণ্ডটা কি হয়।

কিছুকাল পরে কমলাকান্তের ডাক হইল। তখন একজন কনষ্টেবল রুল ঘুরাইয়া তাহাকে সঙ্গে করিয়া এজ্লাসে লইয়া গেল। আমি পিছু পিছু গেলাম। দাঁড়াইয়া, দুই একটি কথা শুনিয়া ব্যাপারখানা বুঝিতে পারিলাম।

এজ্লাসে, প্রথমত মাচানের উপর হাকিম বিরাজ করিতেছেন। হাকিমটি একজন দেশী ধর্ম্মাবতার-পদে ও গৌরবে ডিপুটি। কমলাকান্ত আসামী নহে-সাক্ষী। মোকদ্দমা গরুচুরি। ফরিয়াদি সেই প্রসন্ন গোয়ালিনী।

কমলাকান্তকে সাক্ষীর কাটরায় পূরিয়া দিল। তখন কমলাকান্ত মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিল। চাপরাশী ধমকাইল- “হাস কেন?”

কমলাকান্ত যোড়হাত করিয়া বলিল. “বাবা, কার ক্ষেতে ধান খেয়েছি যে, আমাকে এর ভিতর পূরিলে?”

চাপরাশী মহাশয় কথাটা বুঝিলেন না। দাড়ি ঘুরাইয়া বলিলেন, “তামাসার জায়গা এ নয় –হলফ পড়।”

কমলাকান্ত বলিল, “পড়াও না বাপু।”

একজন মুহুরি তখন হলফ পড়াইতে আরম্ভ করিল। বলিল, “বল আমি পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষ জানিয়া…”

কমলাকান্ত। (সবিস্ময়ে) কি বলিব?

মুহুরি। শুন্‌তে পাও না-“পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষ জেনে__”

কমলা। পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষ জেনে! কি সর্বনাশ!

হাকিম দেখিলেন, সাক্ষীটা কি একটা গণ্ডগোল বাধাইতেছে। জিজ্ঞাসা করিলেন, “সর্বনাশ কি?”

কমলা। পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষ জেনেছি-এ কথাটা বল্‌তে হবে?

হাকিম। ক্ষতি কি? হলফের ফারমই এই।

কমলা। হুজুর সুবিচারক বটে। কিন্তু একটা কথা বলি কি, সাক্ষ্য দিতে দিতে দুই একটা ছোট রকম মিথ্যা বলি, না হয় বলিলাম-কিন্তু গোড়াতেই একটা বড় মিথ্যা বলিয়া আরম্ভ করিব, সেটা কি ভাল?

হাকিম। এর আর মিথ্যা কথা কি?

কমলাকান্ত মনে মনে বলিল, “তত বুদ্ধি থাকিলে তোমার কি এ পদবৃদ্ধি হইত?” প্রকাশ্যে বলিল, “ধর্ম্মাবতার, আমার একটু একটু বোধ হইতেছে কি যে, পরমেশ্বর ঠিক প্রত্যক্ষের বিষয় নয়। আমার চোখের দোষই হউক, আর যাই হউক; কখনও ত এ পর্য্যন্ত পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষ দেখিতে পাইলাম না। আপনারা বোধ হয় আইনের চসমা নাকে দিয়া তাঁহাকে প্রত্যক্ষ দেখিতে পারেন-কিন্তু আমি যখন তাঁহাকে এ ঘরের ভিতর প্রত্যক্ষ পাইতেছি না-তখন কেমন করিয়া বলি-আমি পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষ জেনে__”

ফরিয়াদীর উকিল চটিলেন-তাঁহার মূল্যবান সময়, যাহা মিনিটে মিনিটে টাকা প্রসব করে, তাহা এই দরিদ্র সাক্ষী নষ্ট করিতেছে। উকীল তখন গরম হইয়া বলিলেন, “সাক্ষী মহাশয়!” Theological Lecture টা ব্রাহ্মসমাজের জন্য রাখিলে ভাল হয় না? এখানে আইনের মতে চলিতে মন স্থির করুন।”

কমলাকান্ত তাঁহার দিকে ফিরিল। মৃদু হাসিয়া বলিল, “আপনি বোধ হইতেছে উকীল।”

উকীল । (হাসিয়া) কিসে চিনিলে?

কমলা। বড় সহজে। মোটা চেন আর ময়লা শামলা দেখিয়া। তা মহাশয়! আপনাদের জন্য এ Theological Lecture নয়। আপনারা পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষ দেখেন স্বীকার করি-যখন মোয়াক্কেল আসে।

উকীল সরোষে উঠিয়া হাকিমকে বলিলেন, “I ask the protection of the Court against the insults of this witness.”

কোর্ট বলিলেন, “O Baboo! the witness is your own witness, and you are at liberty to send him away if you like.”

এখন কমলাকান্তকে বিদায় দিলে উকীল বাবুর মোকদ্দমা প্রমাণ হয় না-সুতরাং উকীল বাবু চুপ করিয়া বসিয়া পড়িলেন। কমলাকান্ত ভাবিলেন, এ হাকিমটা জাতিভ্রষ্ট-পালের মত নয়।

হাকিম গতিক দেখিয়া, মুহুরিকে আদেশ করিলেন যে, “ওথের প্রতি সাক্ষীর objection আছে-উহাকে simple affirmation দাও।” তখন মুহুরি কমলাকান্তকে বলিল, “আচ্ছা, ও ছেড়ে দাও-বল, আমি প্রতিজ্ঞা করিতেছি-বল |”

কমলা। কি প্রতিজ্ঞা করিতেছি, সেটা জানিয়া প্রতিজ্ঞাটা করিলে ভাল হয় না?

মুহুরি হাকিমের দিকে চাহিয়া বলিল, “ধর্ম্মাবতার! সাক্ষী বড় সেরকশ্ |”

উকীল বাবু হাঁকিলেন, “Very obstructive.”

কমলা। (উকীলের প্রতি) শাদা কাগজে দস্তখত করিয়া লওয়ার প্রথাটা আদালতের বাহিরে চলে জানি-ভিতরেও চলিবে কি?

উকীল । শাদা কাগজে কে তোমার দস্তখত লইতেছে?

কমলা। কি প্রতিজ্ঞা করিতে হইবে, তাহা না জানিয়া, প্রতিজ্ঞা করা, আর কাগজে কি লেখা হয় তাহা না দেখিয়া, দস্তখত করা, একই কথা।

হাকিম তখন মুহুরিকে আদেশ করিলেন যে, “প্রতিজ্ঞা আগে ইহাকে শুনাইয়া দাও-গোলমালে কাজ নাই |” মুহুরি তখন বলিল, “শোন, তোমাকে বলিতে হইবে যে, আমি প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে, আমি যে সাক্ষ্য দিব, তাহা সত্য হইবে, আমি কোন কথা গোপন করিব না-সত্য ভিন্ন আর কিছু হইবে না |”

কমলা। ওঁ মধু মধু মধু।

মুহুরি। সে আবার কি?

কমলা। পড়ান, আমি পড়িতেছি।

কমলাকান্ত তখন আর গোলযোগ না করিয়া প্রতিজ্ঞা পাঠ করিল। তখন তাঁহাকে জিজ্ঞাসাবাদ করিবার জন্য উকীল বাবু গাত্রোত্থান করিলেন, কমলাকান্তকে চোখ রাঙ্গাইয়া বলিলেন, “এখন আর বদ্‌মায়েশি করিও না-আমি যা জিজ্ঞাসা করি, তার যথার্থ উত্তর দাও। বাজে কথা ছাড়িয়া দাও |”

কমলা। আপনি যা জিজ্ঞাসা করিবেন, তাই আমাকে বলিতে হইবে? আর কিছু বলিতে পাইব না?

উকীল । না।

কমলাকান্ত তখন হাকিমের দিকে ফিরিয়া বলিলেন, “অথচ আমাকে প্রতিজ্ঞা করাইলেন যে, ‘কোন কথা গোপন করিব না |’ ধর্ম্মাবতার, বে-আদবি মাফ হয়! পাড়ায় আজ একটা যাত্রা হইবে, শুনিতে যাইব ইচ্ছা ছিল; সে সাধ এইখানেই মিটিল। উকীল বাবু অধিকারী-আমি যাত্রার ছেলে, যা বলাইবেন, কেবল তাই বলিব; যা না বলাইবেন, তা বলিব না। যা না বলাইবেন, তা কাজেই গোপন থাকিবে। প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের অপরাধ লইবেন না |”

হাকিম। যাহা আবশ্যক বিবেচনা করিবে, তাহা না জিজ্ঞাসা হইলেও বলিতে পার।

কমলাকান্ত তখন সেলাম করিয়া বলিল, “বহুৎ খুব |” উকীল তখন জিজ্ঞাসাবাদ আরম্ভ করিলেন, “তোমার নাম কি?”

কমলা। শ্রী কমলাকান্ত চক্রবর্ত্তী।

উকীল । তোমার বাপের নাম কি?

কমলা। জোবানবন্দীর আভ্যুদয়িক আছে না কি?

উকীল গরম হইলেন, বলিলেন, “হুজুর! এ সব Contempt of Court.” হুজুর, উকীলের দুর্দ্দশা দেখিয়া নিতান্ত অসন্তুষ্ট নন-বলিলেন, “আপনারই সাক্ষী |” সুতরাং উকীল আবার কমলাকান্তের দিকে ফিরিলেন, বলিলেন, “বল। বলিতে হইবে |”

কমলাকান্ত পিতার নাম বলিল। উকীল তখন জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কি জাতি?”

কমলা। আমি কি একটা জাতি?

উকীল । তুমি কোন্ জাতীয়।

কমলা। হিন্দু জাতীয়।

উকীল । আঃ! কোন্ বর্ণ?

কমলা। ঘোরতর কৃষ্ণবর্ণ।

উকীল । দূর হোক ছাই! এমন সাক্ষীও আনে! বলি তোমার জাত আছে?

কমলা। মারে কে?

হাকিম দেখিলেন, উকীলের কথায় হইবে না। বলিলেন, “ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, কৈয়বর্ত্ত, হিন্দুর নানা প্রকার জাতি আছে জান ত-তুমি তার কোন জাতির ভিতর?”

কমলা। ধর্ম্মাবতার! এ উকীলের ধৃষ্টতা! দেখিতেছেন আমার গলায় যজ্ঞোপবীত, নাম বলিয়াছি চক্রবর্ত্তী-ইহাতেও যে উকীল বুঝেন নাই যে, আমি ব্রাহ্মণ, ইহা আমি কি প্রকারে জানিব?

হাকিম লিখিলেন, “জাতি ব্রাহ্মণ |” তখন উকীল জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোমার বয়স কত?”

এজ্লাসে একটা ক্লক ছিল-তাহার পানে চাহিয়া হিসাব করিয়া কমলাকান্ত বলিল, “আমার বয়স একান্ন বৎসর, দুই মাস, তের দিন, চারি ঘণ্টা, পাঁচ মিনিট ___”

উকীল । কি জ্বালা! তোমার ঘণ্টা মিনিট কে চায়?

কমলা। কেন, এইমাত্র প্রতিজ্ঞা করাইয়াছেন যে, কোন কথা গোপন করিব না।

উকীল । তোমার যা ইচ্ছা কর! আমি তোমায় পারি না। তোমার নিবাস কোথা?

কমলা। আমার নিবাস নাই।

উকীল । বলি, বাড়ী কোথা?

কমলা। বাড়ী দূরে থাক, আমার একটা কুঠারীও নাই।

উকীল । তবে থাক কোথা?

কমলা। যেখানে সেখানে।

উকীল । একটা আড্ডা ত আছে?

কমলা। ছিল, যখন নসী বাবু ছিলেন। এখন আর নাই।

উকীল । এখন আছ কোথা?

কমলা। কেন, এই আদালতে।

উকীল । কাল ছিলে কোথা?

কমলা। একখানা দোকানে।

হাকিম বলিলেন, “আর বকাবকিতে কাজ নাই-আমি লিখিয়া লইতেছি, নিবাস নাই। তারপর?

উকীল । তোমার পেশা কি?

কমলা। আমার আবার পেশা কি? আমি কি উকীল না বেশ্যা যে, আমার পেশা আছে?

উকীল । বলি, খাও কি করিয়া?

কমলা। ভাতের সঙ্গে ডাল মাখিয়া, দক্ষিণ হস্তে গ্রাস তুলিয়া, মুখে পুরিয়া গলাধঃকরণ করি।

উকীল । সে ডাল ভাত জোটে কোথা থেকে?

কমলা। ভগবান্ জোটালেই জোটে, নইলে জোটে না।

উকীল । কিছু উপার্জ্জন কর?

কমলা। এক পয়সাও না।

উকীল । তবে কি চুরি কর?

কমলা। তাহা হইলে ইতিপূর্ব্বেই আপনার শরণাগত হইতে হইত। আপনি কিছু ভাগও পাইতেন।

উকীল তখন হাল ছাড়িয়া দিয়া, আদালতকে বলিলেন, “আমি এ সাক্ষী চাহি না। আমি ইহার জোবানবন্দী করাইতে পারিব না |”

প্রসন্ন বাদিনী, উকীলের কোমর ধরিল; বলিল, “এ সাক্ষী ছাড়া হইবে না। এ বামন সত্য কথা বলিবে, তাহা আমি জানি-কখনও মিছা বলে না। উহাকে তোমরা জিজ্ঞাসা করিতে জান না-তাই ও অমন করিতেছে। ও বামনের আবার পেশা কি? ও এর বাড়ী ওর বাড়ী খেয়ে বেড়ায়, ওকে জিজ্ঞাসা করিতেছ, উপার্জ্জন কর! ও কি বলবে?”

উকীল তখন হাকিমকে বলিল, “লিখুন, পেশা ভিক্ষা |”

এবার কমলাকান্ত রাগিল, “কি? কমলাকান্ত চক্রবর্ত্তী ভিক্ষোপজীবী? আমি মুক্তকণ্ঠে হলফের উপর বলিতেছি, আমি কখনও কাহারও কাছে এক পয়সা ভিক্ষা চাই না |”

প্রসন্ন আর থাকিতে পারিল না-সে বলিল, “সে কি ঠাকুর! কখন আফিঙ্গ চেয়ে খাও নাই?”

কমল। দূর মাগি ধেমো গোয়ালার মেয়ে! আফিঙ্গ কি পয়সা! আমি কখন একটি পয়সাও কাহারও কাছে ভিক্ষা লই নাই।

হাকিম হাসিয়া বলিলেন, “কি লিখিব কমলাকান্ত?”

কমলাকান্ত নরম হইয়া বলিল, “লিখুন, পেশা ব্রাহ্মণভোজনের নিমন্ত্রণ-গ্রহণ” সকলে হাসিল-হাকিম তাই লিখিয়া লইলেন।

তখন উকীল মহাশয় মোকদ্দমায় প্রবৃত্ত হইলেন। জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কি ফরিয়াদীকে চেন?”

কমল। না।

প্রসন্ন হাঁকিল, “সে কি ঠাকুর! চিরটা কাল আমার দুধ দই খেলে, আজ বল চিনি না?”

কমলাকান্ত বলিল, “তোমার দুধ দই চিনি না, এমন কথা ত বল্‌তেছি না-তোমার দুধ দই বিলক্ষণ চিনি। যখনই দেখি এক পোয়া দুধে তিন পোয়া জল, তখনই চিনিতে পারি যে, এ প্রসন্ন গোয়ালিনীর দুধ; যখনই দেখ্‌তে পাই যে, ঘোলের চেয়ে দই ফিকে, তখনই চিনতে পারি যে, এ প্রসন্নময়ীর দুধ। দুধ দই চিনি নে?”

প্রসন্ন নথ ঘুরাইয়া বলিল, “আমার দুধ দই চেন, আর আমায় চিনিতে পার না?”

কমলাকান্ত বলিল, “মেয়েমানুষকে কে কবে চিনিতে পেরেছে, দিদি? বিশেষ, গোয়ালার মেয়ের কাঁকালে যদি দুধের কেঁড়ে থাকিল, তবে কার বাপের সাধ্য তাকে চিনে উঠে?”

উকীল তখন আবার সওয়াল করিতে লাগিলেন, “বুঝা গেল; তুমি বাদিনীকে চেন-উহার সঙ্গে তোমার কোন সম্বন্ধ আছে?”

কমল। মন্দ নয়-এত গুণ না থাকিলে কি উকীল হয়!

উকীল । তুমি আমার কি গুণ দেখিলে?

কমল। বামনের ছেলে গোয়ালার মেয়েতেও আপনি একটা সম্বন্ধ খুঁজিয়া বেড়াইতেছেন।

উকীল । এমন সম্বন্ধ কি হয় না? কে জানে তুমি ওর পোষ্যপুত্র কি না?

কমল। ওর নয়, কিন্তু ওর গাইয়ের বটে।

উকীল । বুঝা গেল, তোমার সঙ্গে বাদিনীর একটা সম্বন্ধ আছে, একেবারে সাফ বলিলেই হইত-এত দুঃখ দাও কেন? এখন জিজ্ঞাসা করি, তুমি এ মোকদ্দমার কি জান?

কমল। জানি যে, এ মোকদ্দমায় আপনি উকীল, প্রসন্ন ফরিয়াদী, আমি সাক্ষী আর এই নেড়ে আসামী।

উকীল । তা নয়, গোরুচুরির কি জান?

কমল। গোরুচুরির আমার বাপ-দাদাও জানে না। বিদ্যাটা আমায় শিখাইবেন?-আমার দুধ দধির বড় দরকার।

উকীল । আঃ-বলি গোরুচুরি দেখিয়াছ?

কমল। একদিন দেখিয়াছিলাম। নসী বাবুর একটা বক্‌না-এক বেটা মুচি-

উকীল । কি যন্ত্রণা! বলি, প্রসন্ন গোয়ালিনীর গোরু যখন চুরি যায়, তখন তুমি দেখিয়াছ?

কমল। না-চোর বেটার এত বুদ্ধি হয় নাই যে, আমাকে ডাকিয়া সাক্ষী রাখিয়া গোরুটা চুরি করে। তাহা হইলে আপনারও কাজে সুবিধা হইত, আমারও কাজের সুবিধা হইত।

প্রসন্ন দেখিল, উকীলকে টাকা দেওয়া সার্থক হয় নাই –তখন আপনার হাতে হাল লইবার ইচ্ছায়, উকীলের কাণে কাণে বলিয়া দিল, “ও বামুন সে সব কিছুর সাক্ষী নয়-ও কেবল গোরু চেনে |”

উকীল মহাশয় তখন কূল পাইলেন। গর্জ্জিয়া উঠিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি গোরু চেন?”

কমলাকান্ত মধুর হাসিয়া বলিল, “আহা চিনি বই কি-নহিলে কি আপনার সঙ্গে এত মিষ্টালাপ করি?”

হাকিম দেখিলেন, সাক্ষী বড় বাড়াবাড়ি করিতেছে-বলিলেন, “ও সব রাখ |” প্রসন্ন গোয়ালীর শামলা গাই আদালতের সম্মুখে মাঠে বাঁধা ছিল-দেখা যাইতেছিল। ডিপুটি বাবু সেই দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি এই গোরুটিকে চেন?”

কমলাকান্ত যোড়হাত করিয়া বলিল, “কোন্ গোরুটি, ধর্ম্মাবতার?”

হাকিম বলিলেন, “কোন্ গোরুটি কি? একটি বই ত সাম্‌নে নাই?”

কমল। আপনি দেখিতেছেন, একটি-আমি দেখিতেছি অনেকগুলি।

হাকিম বিরক্ত হইয়া বলিলেন, “দেখিতে পাইতেছ না-ঐ শামলা?”

কমলাকান্ত শামলা গাইয়ের দিকে না চাহিয়া উকীলের শামলার প্রতি চাহিল। বলিল, “এ শামলাও চুরির না কি?”

কমলাকান্তের নষ্টামি হাকিম আর সহ্য করিতে পারিলেন না-বলিলেন, “তুমি আদালতের কাজের বড় বিঘ্ন করিতেছ-Contempt of Court জন্য তোমার পাঁচ টাকা জরিমানা |”

কমলাকান্ত আভূমিপ্রণত সেলাম করিয়া যোড়হাত করিয়া বলিল, “বহুৎ খুব হুজুর! জরিমানা আদায়ের ভার কার প্রতি?”

হাকিম। কেন?

কমল। কিরূপে আদায় করিবেন, সে বিষয়ে তাঁহাকে কিছু উপদেশ দিব।

হাকিম। উপদেশের প্রয়োজন কি?

কমল। ইহলোকে ত আমার নিকট জরিমানা আদায়ের কোন সম্ভাবনা নাই- তিনি পরলোকে যাইতে প্রস্তুত কি না জিজ্ঞাসা করিব।

হাকিম। জরিমানা না দিতে পার, কয়েদ যাইবে।

ক। কত দিনের জন্য, ধর্ম্মাবতার?

হাকিম। জরিমানা অনাদায়ে এক মাস কয়েদ।

কমল। দুই মাস হয় না?

হাকিম। বেশী মিয়াদের ইচ্ছা কর কেন?

কমল। সময়টা কিছু মন্দ পড়িয়াছে-ব্রাহ্মণভোজনের নিমন্ত্রণ আর তেমন সুলভ নয়-জেলখানায় যাহাতে মাস দুই ব্রাহ্মণভোজনের নিমন্ত্রণ হয়, সে ব্যবস্থা যদি আপনি করেন, তবে গরীব ব্রাহ্মণ উদ্ধার পায়।

এরূপ লোককে জরিমানা বা কয়েদ করিয়া কি হইবে? হাকিম হাসিয়া বলিলেন, “আচ্ছা, তুমি যদি গোল না করিয়া সোজা জোবানবন্দী দাও, তবে তোমার জরিমানা মাপ করা যাইতে পারে। বল-ঐ গোরু তুমি চেন কি না?”

হাকিম তখন একজন কনষ্টেবলকে আদেশ করিলেন যে গোরুর নিকট গিয়া প্রসন্নের গাই দেখাইয়া দেয়। কনষ্টেবল তাহাই করিল। বিষণ্ণ উকীল বাবু তখন জিজ্ঞাসা করিলেন, “ঐ গোরু তুমি চেন?”

কমল। সিংওয়ালা গোরু-তাই বলুন।

উকীল । তুমি বল কি?

কমল। আমি বলি শামলাওয়ালা-তা যাক্-আমি ও সিংওয়ালা গোরুটা চিনি। বিলক্ষণ আলাপ আছে।

উকীল । ও কার গোরু?

কমল। আমার।

উকীল । তোমার!

কমল। আমারই।

হরি হরি! প্রসন্নের মুখ শুকাইল! উকীল দেখিল, মোকদ্দমা ফাঁসিয়া যায়। প্রসন্ন তখন তর্জ্জন গর্জ্জন করিয়া বলিল, “তবে রে বিটলে! গোরু তোমার!”

কমলাকান্ত বলিল, “আমার না ত কার! আমি ওর দুধ খেয়েছি, ওর দই খেয়েছি-ওর ঘোল খেয়েছি, ওর ছানা খেয়েছি-ওর মাখন খেয়েছি, ওর ননী খেয়েছি-ও গোরু আমার হলো না, তুই বেটী পালিস্ ব’লে কি তোর বাবার গোরু হলো!”

উকীল অতটা বুঝিলেন না। বলিলেন, “ধর্ম্মাবতার, witness hostile! permission দিন আমি ওকে cross করি |”

কমল। কি? আমায় cross করিবে?

উকিল। হাঁ করিব।

কমল। নৌকায়, না সাঁকো বেঁধে?

উকিল। সে আবার কি?

কমল। বাবা! কমলাকান্ত-সাগর পার হও, এত বড় হনূমান্ তুমি আজও হও নাই।

এই বলিয়া কমলাকান্ত চক্রবর্ত্তী রাগে গর্ গর্ করিয়া কাটরা হইতে নামিয়া যায়-চাপরাশী ধরিয়া আবার কাটরায় পূরিল। তখন কমলাকান্ত আলু থালু হইয়া নিশ্চেষ্ট হইল-বলিল, “কর বাবা ক্রস্ কর!-আমি অগাধ সমুদ্রে পড়িয়া আছি-যে ইচ্ছা লম্ফ দাও-‘অপামিবাধারমনুত্তরঙ্গং!-উকিল মহাশয়! এ প্রশান্ত মহাসমুদ্র তরঙ্গ বিক্ষেপ করে না আপনি স্বচ্ছন্দে উল্লম্ফন করুন |”

উকীল তখন কোর্টকে বলিলেন, “ধর্ম্মাবতার, দেখা যাইতেছে যে, এ ব্যক্তি বাতুল; ইহাকে আর ক্রস্ করিবার প্রয়োজন নাই। বাতুল বলিয়া ইহার জবানবন্দী পরিত্যক্ত হইবে। ইহাকে বিদায় দেওয়া হউক |”

হাকিম কমলাকান্তের হাত হইতে নিষ্কৃতি পাইলে বাঁচেন, বিদায় দিতে প্রস্তুত, এমত সময়ে প্রসন্ন হাত যোড় করিয়া আদালতে নিবেদন করিল, “যদি হুকুম হয়, তবে আমি স্বয়ং উহাকে গোটা কত কথা জিজ্ঞাসা করি, তার পর বিদায় দিতে হয়, দিবেন |”

হাকিম কৌতূহলী হইয়া অনুমতি দিলেন। প্রসন্ন তখন কমলাকান্তের প্রতি চাহিয়া বলিল, “ঠাকুর! মৌতাতের সময় হয়েছে না?”

কমল। মৌতাতের আবার সময় কি রে বেটী –“অজরামরবৎ প্রাজ্ঞঃ বিদ্যাং নেশ্চাঞ্চ চিন্তয়েৎ |”

প্রসন্ন । অং বং এখন রাখ –এখন মৌতাত করিবে?

কমল। দে!

প্রসন্ন । আচ্ছা, আগে আমার কথার উত্তর দাও –তার পর সে হবে।

কমল। তবে জল্‌দি জল্‌দি বল – জল্‌দি জল্‌দি জবাব দিই।

প্রসন্ন । বলি, গোরু কার?

কমল। গোরু তিন জনের; গোরু প্রথমে বয়সে গুরুমহাশয়ের; মধ্যবয়সের স্ত্রীজাতির; শেষ বয়সে উত্তরাধিকারীর; দড়ি ছিঁড়িবার সময়ে কারও নয়।

প্রসন্ন । বলি, ঐ শামলা গাই কার?

কমল। যে ওর দুধ খায় তার।

প্রসন্ন । ও গোরু আমার কি না?

কমল। তুই বেটী কখন ওর এক বিন্দু দুধ খেলি নে, কেবল বেচে মর্‌লি, গোরু তোর হলো? ও গোরু যদি তোর হয়, তবে বাঙ্গাল বেঙ্কের টাকাও আমার। দে বেটী, গোরুচোরকে ছেড়ে দে-গরীবের ছেলে দুধ খেয়ে বাঁচুক।

হাকিম দেখিলেন, দুই জনে বড় বাড়াবাড়ি করিতেছে-আদালত মেছো-হাটা হইয়া উঠিল। তখন উভয়কে ধমক দিয়া জিজ্ঞাসাবাদ নিজহস্তে লইলেন। জিজ্ঞাসা করিলেন, “প্রসন্ন এই গোরুর দুধ বেচে?”

কমল। আজ্ঞে, হাঁ।

“উহার গোহালে এই গোরু থাকে?”

কমল। ও গোরুও থাকে, আমিও কখন কখন থাকি।

“ওই খাওয়ায়?”

কমল। উভয়কে।

বাদিনীর উকীল তখন বলিলেন, “আমার কার্য্য সিদ্ধ হইয়াছে-আমি উহাকে জিজ্ঞাসা করিতে চাই না”। এই বলিয়া তিনি উপবেশন করিলেন। তখন আসামীর উকীল গাত্রোত্থান করিলেন। দেখিয়া কমলাকান্ত জিজ্ঞাসা করিলেন, “আবার তুমি কে?”

আসামীর উকীল বলিলেন, “আমি আসামীর পক্ষে তোমাকে ক্রস্ করিব”।

কমল। একজন ত ক্রস্ করিয়া গেল, আবার তুমি কুমার বাহাদুর এলে না কি?

উকীল । কুমার বাহাদুর কে?

কমল। রাজপুত্রকে চেন না? ত্রেতা যুগে আগে ক্রস্ করিলেন, পবনাঙ্গজ মহাশয়। তার পর ক্রস্ করিলেন, কুমার বাহাদুর।20

উকীল । ও সব রাখ-তুমি গোরু চেন বলেছ-কিসে চেন?

কমল। কখন শিঙ্গে-কখন শামলায়!

উকীল রাগিয়া উঠিয়া, গর্জ্জন করিয়া টেবিল চাপড়াইয়া বলিলেন, “তোমার পাগলামি রাখ-তুমি এই গোরু চিনিতে পারিতেছ কিসে?”

কমল। ঐ হাম্বা-রবে।

উকীল হতাশ হইয়া বলেন, “Hopeless” উকীল মহাশয় বসিয়া পড়িলেন-আর জেরা করিবেন না। কমলাকান্ত বিনীতভাবে বলিল, “দড়ি ছেঁড় কেন বাবা?”

উকীল আর জেরা করিবেন না দেখিয়া হাকিম কমলাকান্তকে বিদায় দিলেন। কমলাকান্ত উর্দ্ধ্বশ্বাসে পলাইল। আমি কিছু কাজ সারিয়া বাহিরে আসিয়া দেখিলাম যে, কমলাকান্ত থেলো হুঁকা হাতে করিয়া বসিয়া আছে-চারি দিকে লোক জমিয়াছে-প্রসন্নও সেখানে আসিয়াছে। কমলাকান্ত তাহাকে তিরস্কার করিতেছে আর বলিতেছে, “তোর মঙ্গলার বাঁটের দিব্য, তোর দুধের কেঁড়ের দিব্য, তোর ঘোলমউনির দিব্য, তোর ফাঁদি-নথের দিব্য, তুই যদি চোরকে গোরু ছেড়ে না দিস্!”

আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “চক্রবর্ত্তী মহাশয়! চোরকে গোরু ছাড়িয়া দিবে কেন?”

কমলাকান্ত বলিল, “পূর্ব্বকালে মহারাজ শ্যেনজিৎকে এক ব্রাহ্মণ বলিয়াছিল যে, ‘বৎস, গোপস্বামী ও তস্কর, ইহাদের মধ্যে যে ধেনুর দুগ্ধ পান করে, সেই তাহার যথার্থ অধিকারী। অন্যের তাহার উপর মমতা প্রকাশ করা বিড়ম্বনা মাত্র।21 এই হলো ভীষ্মদেব ঠাকুরের Hindu Law, আর ইহাই ইউরোপের International Law। যদি সভ্য এবং উন্নত হইতে চাও, তবে কাড়িয়া খাইবে। গো শব্দে ধেনুই বুঝ, আর পৃথিবীই বুঝ, ইনি তস্করভোগ্যা। সেকন্দর হইতে রণজিৎ সিংহ পর্য্যন্ত সকল তস্করই ইহার প্রমাণ। Right of Conquest যদি একটা right হয়, তবে Right of theft, কি একটা right নয়? অতএব, হে প্রসন্ন নামে গোপকন্যে! তুমি আইনমতে কার্য্য কর। ঐতিহাসিক রাজনীতির অনুবর্ত্তী হও। চোরকে গোরু ছাড়িয়া দাও |”

এই বলিয়া কমলাকান্ত সেখান হইতে চলিয়া গেল। দেখিলাম, মানুষটা নিতান্ত ক্ষেপিয়া গিয়াছে।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প সুকুমার রায়

হারকিউলিস

-সুকুমার রায়

মহাভারতে যেমন ভীম, গ্রীস দেশের পুরাণে তেমনই হারকিউলিস। হারকিউলিস দেবরাজ জুপিটারের পুত্র কিন্তু তার মা এই পৃথিবীরই এক রাজকন্যা, সুতরাং তিনিও ভীমের মত এই পৃথিবীরই মানুষ, গদাযুদ্ধে আর মল্লযুদ্ধে তাঁর সমান কেহ নাই। মেজাজটি তাঁর ভীমের চাইতেও অনেকটা নরম, কিন্তু তাঁর এক একটি কীর্তি এমনি অদ্ভুত যে, পড়িতে পড়িতে ভীম, অর্জুন, কৃষ্ণ আর হনুমান এই চার মহাবীরের কথা মনে পড়ে।

হারকিউলিসের জন্মের সংবাদ যখন স্বর্গে পৌঁছিল, তখন তাঁর বিমাতা জুনো দেবী হিংসায় জ্বলিয়া বলিলেন, “আমি এই ছেলের সর্বনাশ করিয়া ছাড়িব।” জুনোর কথামত দুই প্রকান্ড বিষধর সাপ হারকিউলিসকে ধ্বংস করিতে চলিল। সাপ যখন শিশু হারকিউলিসের ঘরে ঢুকিল, তখন তাহার ভয়ঙ্কর মূর্তি দেখিয়া ঘরসুদ্ধ লোকে ভয়ে আড়ষ্ট হইয়া গেল, কেহ শিশুটিকে বাঁচাইবার জন্য চেষ্টা করিতে পারিল না। কিন্তু হারকিউলিস নিজেই তাঁর দুইখানি কচি হাত বাড়াইয়া সাপ দুটার গলায় এমন চাপিয়া ধরিলেন যে, তাহাতেই তাদের প্রাণ বাহির হইয়া গেল। জুনো বুঝিলেন, এ বড় সহজ শিশু নয়! বড় হইয়া হারকিউলিস সকল বীরের গুরু বৃদ্ধ চীরনের কাছে অস্ত্রবিদ্যা শিখিতে গেলেন। চীরন জাতিতে সেন্টর—তিনি মানুষ নন। সেন্টরদের কোমর পর্যন্ত মানুষের মত, তার নীচে একটা মাথাকাটা ঘোড়ার শরীর বসান। চীরনের কাছে অস্ত্রবিদ্যা শিখিয়া হারকিউলিস অসাধারণ যোদ্ধা হইয়া উঠিলেন। তখন তিনি ভাবিলেন, ‘এইবার পৃথিবীটাকে দেখিয়া লইব।’

হারকিউলিস পৃথিবীতে বীরের উপযুক্ত কাজ খুঁজিতে বাহির হইয়াছেন, এমন সময় দুটি আশ্চর্য সুন্দর মূর্তি তাঁর সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। হারকিউলিস দেখিলেন দুটি মেয়ে—তাদের একজন খুব চঞ্চল, সে নাকে-চোখে কথা কয়, তার দেমাকের ছটায় আর অলঙ্কারের বাহারে যেন চোখ ঝলসাইয়া দেয়। সে বলিল, “হারকিউলিস, আমাকে তুমি সহায় কর, আমি তোমায় ধন দিব, মান দিব, সুখে স্বচ্ছন্দে আমোদের আহ্লাদে দিন কাটাইবার উপায় করিয়া দিব।” আর একটি মেয়ে শান্তশিষ্ট, সে বলিল, “আমি তোমাকে বড় বড় কাজ করিবার সুযোগ দিব, শক্তি দিব, সাহস দিব। যেমন বীর তুমি তার উপযুক্ত জীবন তোমায় দিব।” হারকিউলিস খানিক চিন্তা করিয়া বলিলেন, “আমি ধন মান সুখ চাই না—আমি তোমার সঙ্গেই চলিব। কিন্তু তোমার পরিচয় জানিতে চাই।” তখন দ্বিতীয় সুন্দরী বলিল, “আমার নাম পুন্য। আজ হইতে আমি তোমার সহায় থাকিলাম।”

তারপর কত বৎসর হারকিউলিস দেশে দেশে কত পুন্য কাজ করিয়া ফিরিলেন—তাঁর গুণের কথা আর বীরত্বের কথা চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল। থেবিসের রাজা ক্রয়ন্‌ তাঁর সঙ্গে তাঁর কন্যা মেগারার বিবাহ দিলেন। হারকিউলিস নিজের পুন্য ফলে কয়েক বৎসর সুখে কাটাইলেন।

কিন্তু বিমাতা জুনোর মনে হারকিউলিসের এই সুখ কাঁটার মত বিঁধিল। তিনি কী চক্রান্ত করিলেন, তাহার ফলে একদিন হারকিউলিস হঠাৎ পাগল হইয়া তাঁর স্ত্রী পুত্র সকলকে মারিয়া ফেলিলেন। তারপর যখন তাঁর মন সুস্থ হইল, যখন তিনি বুঝিতে পারিলেন যে পাগল অবস্থায় কি সর্বনাশ করিয়াছেন, তখন শোকে অস্থির হইয়া এক পাহাড়ের উপরে নির্জন বনে গিয়া তিনি ভাবিতে লাগিলেন, ‘আর বাঁচিয়া লাভ কি?’

হারকিউলিস দুঃখে বনবাসী হইয়াছেন, এদিকে জুনো ভাবিতেছেন, ‘একনও যথেষ্ট হয় নাই।’ তিনি দেবতাদের কুমন্ত্রণা দিয়া এই ব্যবস্থা করাইলেন যে, এক বৎসর সে আর্গসের দুর্দান্ত রাজা ইউরিসথিউসের দাসত্ব করিবে।

হারকিউলিস প্রথমে এই অন্যায় আদেশ পালন করিতে রাজী হন নাই—কিন্তু দেবতার হুকুম লঙ্ঘন করিবার উপায় নাই দেখিয়া, শেষে তাহাতেই সম্মত হইলেন। রাজা ইউরিসথিউস্‌ ভাবিলেন, এইবার হারকিউলিসকে হাতে পাওয়া গিয়াছে। ইহাকে দিয়া এমন সব অদ্ভুত কাজ করাইয়া লইব, যাহাতে আমার নাম পৃথিবীতে অমর হইয়া থাকিবে।

নেমিয়ার জঙ্গলে এক দুর্দান্ত সিংহ ছিল, তার দৌরাত্মে দেশের লোক অস্থির হইয়া পড়িয়াছিল। রাজা ইউরিসথিউস্‌ বলিলেন, ‘যাও হারকিউলিস! সিংহটাকে মারিয়া আইস।” হারকিউলিস সিংহ মারিতে চলিলেন। “কোথায় সেই সিংহ?” পথে যাকে জিজ্ঞাসা করেন সেই বলে, “কেন বাপু সিংহের হাতে প্রাণ দিবে? সে সিংহকে কি মানুষে মারিতে পারে? আজ পর্যন্ত যে-কেহ সিংহ মারিতে গিয়াছে সে আর ফিরে নাই।” কিন্তু হারকিউলিস ভয় পাইলেন না। তিনি একাকী গভীর বনে সিংহের গহ্বরে ঢুকিয়া, সিংহের টুঁটি চাপিয়া তাহার প্রাণ বাহির করিয়া দিলেন। তারপর সেই সিংহের চামড়া পরিয়া তিনি রাজার কাছে সংবাদ দিতে ফিরিলেন।

রাজা বলিলেন, “এবার যাও লের্নার জলাভুমিতে। সেখানে হাইড্রা নামে সাতমুণ্ড সাপ আছে, তাহার ভয়ে লোকজন দেশ ছাড়িয়া পলাইতেছে। জন্তুটাকে না মারিলে ত আর চলে না।” হারকিউলিস তৎক্ষণাৎ সাতমুণ্ড জানোয়ারের সন্ধানে বাহির হইলেন।

লের্নার জলাভুমিতে গিয়া আর সন্ধান করিতে হইল না, কারণ, হাইড্রা নিজেই ফোঁস ফোঁস শব্দে আকাশ কাঁপাইয়া তাঁকে আক্রমণ করিতে আসিল। হারকিউলিস এক ঘায়ে তার একটা মাথা উড়াইয়া দিলেন—কিন্তু, সে কি সর্বনেশে জানোয়ার—সে একটা কাটা মাথার জায়গায় দেখিতে দেখিতে সাতটা নূতন মাথা গজাইয়া উঠিল। হারকিউলিস দেখিলেন, এ জন্তু সহজে মরিবা নয়। তিনি তাঁহার সঙ্গী ইয়োলাসকে বলিলেন, “একটা লোহা আগুনে রাঙাইয়া আন ত।” তখন জ্বলন্ত গরম লোহা আনাইয়া তারপর হাইড্রার এক একটা মাথা উড়াইয়া কাটা জায়গায় লোহার ছ্যাঁকা দিয়া পোড়াইয়া দেওয়া হইল। কিন্তু এত করিয়াও নিস্তার নাই, শেষ একটা মাথা আর কিছুতেই মরিতে চায় না—সাপের শরীর হইতে একেবারে আলগা হইয়াও সে সাংঘাতিক হাঁ করিয়া কামড়াইতে আসে। হারকিউলিস তাহাকে পিটিয়া মাটিতে পুঁতিয়া, তাহার উপর প্রকাণ্ড পাথর চাপা দিয়া তবে নিশ্চিন্ত হইতে পারিলেন। ফিরিবার আগে হারকিউলিস সে সাপের রক্তে কতগুলা তীরের মুখ ডুবাইয়া লইলেন, কারণ, তাঁহার গুরু চীরণ বলিয়াছেন—হাইড্রার রক্তমাখা তীর একেবারে অব্যর্থ মৃত্যুবাণ।

হারকিউলিস ইউরিসথিউসের দেশে ফিরিয়া গেলে পর, কিছুদিন বাদেই আবার তাঁর ডাক পড়িল। এবারে রাজা বলিলেন, “সেরিনিয়ার হরিণের কথা শুনিয়াছি, তার সোনার শিং, লোহার পা, সে বাতাসের আগে ছুটিয়া চলে। সে হরিণ আমার চাই—তুমি তাহাকে জীবন্ত ধরিয়া আন।” হারকিউলিস আবার চলিলেন। কত দেশ দেশান্তর, কত নদী সমুদ্র পার হইয়া, দিনের পর দিন সেই হরিণের পিছন ঘুরিয়া ঘুরিয়া, শেষে উত্তরের ঠান্ডা দেশে বরফের মধ্যে হরিণ যখন শীতে অবশ হইয়া পড়িল, তখন হারকিউলিস সেখান হইতে তাকে উদ্ধার করিয়া রাজার কাছে হাজির করিলেন।

ইহার পর রাজা হুকুম দিলেন, এরিম্যান্থাসের রাক্ষসবরাহকে মারিতে হইবে। সে বরাহ খুবই ভীষ্ণ বটে, কিন্তু তাকে মারিতে হারকিউলিসের বিশেষ কোন ক্লেশ হইবার কথা নয়। তা ছাড়া, বরাহ পলাইবার পাত্র নয়, সুতরাং তার জন্য দেশ বিদেশ ছুটিবারও দরকার হয় না। হারকিউলিস সহজেই কার্যোদ্ধার করিতে পারিতেন, কিন্তু মাঝ হইতে একদল হতভাগা সেন্টর আসিয়া তাঁর সহিত তুমুল ঝগড়া বাধাইয়া বসিল। হারকিউলিস তখন সেই হাইড্রার রক্ত-মাখান বিষবাণ ছুঁড়িয়া তাদের মারিতে লাগিলেন। এদিকে বৃদ্ধ চীরণের কাছে খবর গিয়াছে যে, হারকিউলিস নামে কে একটা মানুষ আসিয়া সেন্টরদের মারিয়া শেষ করিল। চীরণ তখনই ঝগড়া থামাইবার জন্য ব্যস্ত হইয়া দৌড়িয়া আসিতেছেন, এমন সময়, হঠাৎ করিয়া হারকিউলিসের একটা তীর ছুটিয়া তাঁর গায়ে বিঁধিয়া গেল। সকলে হায় হায় করিয়া উঠিল, হারকিউলিসও অস্ত্র ফেলিয়া ছুটিয়া আসিলেন। সেন্টরেরা অনেকরকম ঔষধ জানে, হারকিউলিসও তাঁর গুরুর কাছে অস্ত্রাঘাতের নানারকম চিকিৎসা শিখিয়াছেন—কিন্তু সে বিষবাণ এমন সাংঘাতিক, তার কাছে কোন চিকিৎসাই খাটিল না। চীরণ আর বাঁচিলেন না। এবার হারকিউলিস তাঁর কাজ সারিয়া, নিতান্ত বিষন্ন মনে গুরুর কথা ভাবিতে ভাবিতে দেশে ফিরিলেন।

হারকিউলিস একা সেন্টরদের যুদ্ধে হারাইয়াছেন, এই সংবাদ চারিদিকে রাষ্ট্র হইয়া পড়িল। সকলে বলিল, “হারকিউলিস না জানি কর বড় বীর! এমন আশ্চর্য কীর্তির কথা আমরা আর শুনি নাই।” আসলে কিন্তু হারকিউলিসের বড় বড় কাজ এখনও কিছুই করা হয় নাই—তাঁর কীর্তির পরিচয় সবেমাত্র আরম্ভ হইয়াছে।

বরাহ মারিয়া হারকিউলিস অল্পই বিশ্রাম করিবার সুযোগ পাইলেন—কারণ তারপরেই এলিস নগরের রাজা আগিয়াসের গোয়ালঘর সাফ করিবার জন্য তাঁহার ডাক পড়িল। আগিয়াসের প্রকান্ড গোয়ালঘরে অসংখ্য গরু, কিন্তু বহু বৎসর ধরিয়া সে ঘর কেহ ঝাঁট দেয় না, ধোয় না—সুতরাং তাহার চেহারাটি তখন কেমন হইয়াছিল, তাহা কল্পনা করিয়া দেখ। গোয়ালঘরের অবস্থা দেখিয়া হারকিউলিস ভাবনায় পড়িলেন। প্রকান্ড ঘর, তাহার ভিতর হাঁটিয়া দেখিতে গেলেই ঘণ্টাখানেক সময় যায়। সেই ঘরের ভিতর হয়ত বিশ বৎসরের আবর্জনা জমিয়াছে—অথচ একজন মাত্র লোকে তাকে সাফ করিবে। ঘরের কাছ দিয়া আলফিউস নদী স্রোতের জোরে প্রবল বেগে বহিয়া চলিয়াছে—হারকিউলিস ভাবিলেন—’এই ত চমৎকার উপায় হাতের কাছেই রহিয়াছে!’ তিনি তখন একাই গাছ পাথরের বাঁধ বাঁধিয়া স্রোতের মুখ ফিরাইয়া, নদীটাকে সেই গোয়ালঘরের উপর দিয়া চালাইয়া দিলেন। নদী হু হু শব্দে নূতন পথে বহিয়া চলিল, বিশ বৎসরের জঞ্জাল মুহূর্তের মধ্যে ধুইয়া সাফ হইয়া গেল। তারপর দেখানকার নদী সেখানে রাখিয়া তিনি দেশে ফিরিলেন।

এদিকে ক্রীটদ্বীপে আর এক বিপদ দেখা দিয়াছে। জলের দেবতা নেপচুন সে দেশের রাজাকে এক প্রকান্ড ষাঁড় উপহার দিয়া বলিয়াছেন, “এই জন্তুটিকে তুমি দেবতার নামে উৎসর্গ করিয়া বলি দাও।” কিন্তু ষাঁড়টি এমন সুন্দর যে, তাকে বলি দিতে রাজার মন সরিল না—তিনি তার বদলে আর একটি ষাঁড় আনিয়া বলির কাজ সারিলেন। নেপচুন সমুদ্রের নীচে থাকিয়াও এ সমস্তই জানিতে পারিলেন। তিনি তাঁর ষাঁড়কে আদেশ দিলেন, “যাও! এই দুষ্ট রাজার রাজ্য ধ্বংস কারিয়া ইহার অবাধ্যতার সাজা দাও।” নেপচুনের আদেশ সেই সর্বনেশে ষাঁড় পাগলের মত চারিদিকে ছুটিয়া সারাটি রাজ্য উজাড় করিয়া ফিরিতেছে। একে দেবতার ষাঁড়, তার উপর যেমন পাহাড়ের মত দেহখানি, তেমনই আশ্চর্য তার শরীরের তেজ—কাজেই রাজ্যের লোক প্রাণভয়ে দেশ ছাড়িয়া পলাইবার জন্য ব্যস্ত। এমন জন্তুকে বাগাইবার জন্য ত হারকিউলিসের ডাক পড়িবেই। হারকিউলিসও অতি সহজেই তাকে শিং ধরিয়া মাটিতে আছড়াইয়া একেবারে পোঁটলা বাঁধিয়া রাজসভায় নিয়া হাজির করিলেন। রাজা ইউরিসথিউসের মেয়ে বাপের বড় আদুরে। সে একদিন আবদার ধরিল তাকে হিপোলাইটের চন্দ্রহার আনিয়া দিতে হইবে। হিপোলাইট এসেজন্‌দের রানী। এসেজন্‌দের দেশে কেবল মেয়েদেরই রাজত্ব। বড় সর্বনেশে মেয়ে তারা— সর্বদাই লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত, পৃথিবীর কোন মানুষকে তারা ডরায় না। কিন্তু হারকিউলিসকে তারা খুব খাতির সম্মান করিয়া তাদের রানীর কাছে লইয়া গেল। হারকিউলিস তখন রানীর কাছে তার প্রার্থনা জানাইলেন। রানী বলিলেন, “আজ তুমি খাও-দাও, বিশ্রাম কর, কাল অলঙ্কার লইতে আসিও।” হারকিউলিসের সৎমা জুনো দেবী দেখিলেন, নেহাৎ সহজেই বুঝি এবারের কাজটা উদ্ধার হইয়া যায়। তিনি নিজে এসেজন্‌ সাজিয়া এসেজন্‌ দলে ঢুকিয়া, সকলকে কুমন্ত্রণা দিতে লাগিলেন। তিনি বলিলেন, “এই যে লোকটি রানীর কাছে অলঙ্কার ভিক্ষা করিতে আসিয়াছে ইহাকে তোমরা বড় সহজ পাত্র মনে করিও না। আসলে কিন্তু এ লোকটা আমাদের রানীকে বন্দী করিয়া লইয়া যাইতে চায়। অলঙ্কার-টলঙ্কার ওসকল মিথ্যা কথা—কেবল তোমাদের ভুলাইবার জন্য।” তখন সকলে রুখিয়া একেবারে মার মার শব্দে হারকিউলিসকে আক্রমণ করিল। হারকিউলিস একাকী গদা হাতে আত্মরক্ষা করিতে লাগিলেন। অনেকক্ষণ যুদ্ধের পর এসেজন্‌রা বুঝিল, হারকিউলিসের সঙ্গে পারিয়া উঠা তাহাদের সাধ্য নয়। তখন তাহারা রানীর চন্দ্রহার হারকিউলিসকে দিয়া বলিল, “যে অলঙ্কার তুমি চাহিয়াছিলে, এই লও। কিন্তু তুমি এদেশে আর থাকিতে পাইবে না।” হারকিউলিসের কাজ উদ্ধার হইয়াছে, তাঁর আর থাকিবার দরকার কি? তিনি তখনই তাদের নমস্কার করিয়া ফিরিয়া আসিলেন।

ইউরিসথিউস্‌ মহা সন্তুষ্ট হইয়া বলিলেন, “হারকিউলিস! আমি তোমার উপর বড় সন্তুষ্ট হইলাম। তুমি আমার জন্য আটটি বড় কাজ করিলে, এখন আর চারিটি কাজ করিলে তোমার ছুটি। প্রথম কাজ এই যে, স্টাইমফেলাসের সমুদ্রতীরে যে বড় বড় লৌহমুখ পাখি আছে, সেগুলোকে মারিতে হইবে।” হারকিউলিস হাইড্রার রক্তমাখা বিষাক্ত তীর ছুঁড়িয়া সহজেই পাখিগুলাকে মারিয়া শেষ করিলেন। ইহার পর তিনি রাজার হুকুমে গেরিয়ানিস নামে এক দৈত্যের গোয়াল হইতে তার গরুর দল কাড়িয়া আনিলেন। পথে ক্যাকাস্‌ নামে এক কদাকার দৈত্য কয়েকটা গরু চুরি করিবার চেষ্টা করিয়াছিল। হারকিউলিস তাকে তার বাসা পর্যন্ত তাড়া করিয়া, শেষে গদার বাড়িতে তাহার মাথা গুঁড়াইয়া দেন।

পশ্চিমের দেবতা সন্ধ্যাতারার মেয়েদের নামে হেস্‌পেরাইদিস্‌। লোকে বলিত, তাদের বাগানে আপেল গাছে সোনার ফল ফলে। একদিন রাজা সেই ফল হারকিউলিসের কাছে চাহিয়া বসিলেন। এমন কঠিন কাজ হারলিউলিস আর করেন নাই। ফলের কথা সকলেই জানে, কিন্তু কোথায় যে সে ফল, আর কোথায় যে সে আশ্চর্য বাগান, কেউ তাহা বলিতে পারে না। হারকিউলিস দেশ-বিদেশ ঘুরিয়া কেবলই জিজ্ঞাসা করিয়া ফিরিতে লাগিলেন, কিন্ত কেউ তার জবাব দিতে পারে না। কত দেশের কত রকম লোকের সঙ্গে তাঁর দেখা হইল, সকলেই বলে, “হাঁ, সেই ফলের কথা আমরাও শুনিয়াছি, কিন্তু কোথায় সে বাগান তাহা জানি না।” এই রূপে ঘুরিতে ঘুরিতে একদিন হারকিউলিস এক নদীর ধারে আসিয়া দেখিলেন, কয়েকটি মেয়ে বসিয়া ফুলের মালা গাঁথিতেছে। হারকিউলিস বলিলেন, “ওগো, তোমরা হেস্‌পেরাইডিসের বাগানের কথা জান? সেই যেখানে আপেল গাছে সোনার ফল ফলে?” মেয়েরা বলিল, “আমরা নদীর মেয়ে, নদীর জলে থাকি—আমরা কি দুনিয়ার খবর রাখি? আসল খবর যদি চাও তবে বুড়ার কাছে যাও।” হারকিউলিস বলিলেন, “কে বুড়া? সে কোথায় থাকে?” মেয়েরা বলিল, “সমুদ্রের থুড়্‌থুড়ে বুড়া, যার সবুজ রঙের জটা, যার গায়ে মাছের মত আঁশ, যার হাত-পাগুলো হাঁসের মত চ্যাটাল— সে বুড়া যখন তীরে ওঠে তখন যদি তাকে ধরতে পার, তবে সে তোমায় বলিতে পারিবে পৃথিবীর কোথায় কি আছে। কিন্তু খবরদার! বুড়া বড় সেয়ানা, তাকে ধরিতে পারিলে খবরটা আদায় না করিয়া ছেড়ো না।” হারকিউলিস তাদের অনেক ধন্যবার দিয়া বুড়ার খবর লইতে চলিলেন। সমুদ্রের তীরে তীরে খুঁজিতে খুঁজিতে একদিন হারকিউলিস দেখিলেন, শ্যাওলার মত পোশাক পরা কে একজন সমুদ্রের ধারে ঘুমাইয়া রহিয়াছে। তাহার সবুজ চুল আর গায়ের আঁশেই তার পরিচয় পাইয়া হারকিউলিস এক লাফে তাহার হাত ধরিয়া বলিলেন, “বুড়া! হেস্‌পেরাইডিসের বাগানের সন্ধান বল, নহিলে তোমায় ছাড়িব না।” এই বলিতে না বলিতেই বুড়া তাঁর সামনেই কোথায় মিলাইয়া গেল, তার জায়গায় একটা হরিণ কোথা হইতে আসিয়া দেখা দিল। হারকিউলিস বুঝিলেন এসব বুড়ার শয়তানী, তাই তিনি খুব মজবুত করিয়া হরিণের ঠ্যাং ধরিয়া থাকিলেন। হরিণটা তখন একটা পাখি হইয়া করুণ স্বরে আর্তনাদ আর ছট্‌-ফট্‌ করিতে লাগিল। হারকিউলিস তবু ছাড়িলেন না। তখন পাখিটা একটা তিন-মাথাওয়ালা কুকুরের রূপ ধরিয়া তাঁকে কামড়াইতে আসিল। হারকিউলিস তখন থার ঠাংটা আরও শক্ত করিইয়া চাপিয়া ধরিলেন। তাতে কুকুরটা চিৎকার করিয়া গেরিয়ানের মূর্তিতে দেখা দিল। গেরিয়ান শরীরটা মানুষের মত, কিন্তু তার ছয়টি পা। এক পা হারকিউলিসের মুঠোর মধ্যে, সেইটা ছাড়াইবার জন্য সে পাঁচ পায়ে লাথি ছুঁড়িতে লাগিল।

তাহাতেও ছাড়াইতে না পারিয়া সে প্রকান্ড অজগর সাজিয়া হারকিউলিসকে গিলিতে আসিল। হারকিউলিস ততক্ষণে ভয়ানক চটিয়া গিয়াছেন, তিনি সাপটাকে এমন টুটি চাপিয়া ধরিলেন যে, প্রাণের ভয়ে বুড়া তাহার নিজের মূর্তি ধরিয়া বাহির হইল। বুড়া হাঁপাইতে হাঁপাইতে বলিল, “তুমি কোথাকার অভদ্র হে! বুড়া মানুষের সঙ্গে এরকম বেয়াদবি কর।” হারকিউলিস বলিলেন, “সে কথা পরে হইবে, আগে আমার প্রশ্নের জবাব দাও।” বুড়া তখন বেগতিক দেখিয়া বলিল, “যার কাছে গেলে তোমার কাজটি উদ্ধার হইবে, আমি তার সন্ধান বলিতে পারি। এইদিকে আফ্রিকার সমুদ্রতীর ধরিয়া বরাবর চলিয়া যাও, তাহা হইলে তুমি এটলাস দৈত্যের দেখা পাইবে। এমন দৈত্য আর দ্বিতীয় না। দিনের পর দিন বৎসরের পর বৎসর সমস্ত আকাশটিকে ঘাড়ে করিয়া সে ঠায় দাঁড়াইয়া আছে। এক মুহূর্ত তাহার কোথাও যাইবার যো নাই, তাহা হইলে আকাশ ভাঙ্গিয়া পৃথিবীর উপর পাড়িবে। মেঘের উপরে কোথায় আকাশ পর্যন্ত তাহার মাথা উঠিয়া গিয়াছে, সেখান হইতে দুনিয়ার সবই সে দেখিতে পায়। সে যদি খুশী মেজাজে থাকে, তবে হয়ত তোমার সোনার ফলের কথা বলিতে পারে।” হারকিউলিস তাঁর গদা ঘুরাইয়া বলিলেন, “যদি খুশী মেজাজে না থাকে, তবুও সোনার ফলের কথা তাকে বলাইয়া ছাড়িব। সমুদ্রের বুড়ার কাছে এটলাসের খবর আদায় করিয়া হারকিউলিস তাহার কথা মত আফ্রিকার উপকূল ধরিয়া পশ্চিম মুখে চলিতে লাগিলেন। চলিতে চলিতে কত পাহাড় নদী, কত সহর গ্রাম পার হইয়া, তিনি এক অদ্ভুত দেশে আসিলেন। সেখানে মানুষগুলো অসম্ভবরকম বেঁটে। শত্রুর ভয় তাদের এতই বেশী যে, তাহাদের দেশ রক্ষার জন্য তারা এক দৈত্যের সঙ্গে বন্ধুতা করিয়া, তারই উপর পাহারা দিবার ভার রাখিয়াছে। এই দৈত্যের নাম এন্টিয়াস—পৃথিবী তার মা।

দূর হইতে হারলিউলিসকে গদা ঘুরাইয়া আসিতে দেখিয়া, বামনদের মধ্যে মহা হৈ-চৈ বাধিয়া গেল। তারা চিৎকার করিয়া এন্টিয়াসকে সাবধান করিয়া দিল। এন্টিয়াসও তাহাই চায়। তার ভয়ে বহুদিন পর্যন্ত লোকজন কেউ সে দিকে ঘেঁষে না, তাই হারকিউলিসকে দেখিয়াই সে একেবারে গদা উঠাইয়া “মার্‌ মার্‌” করিয়া তাঁহাকে আক্রমণ করিল। হারকিউলিসও তৎক্ষণাৎ তার গদা এড়াইয়া, এক বাড়িতে তাকে মাটিতে আছড়াইয়া ফেলিলেন। কিন্তু কি আশ্চর্য! মাটিতে পড়িবামাত্র তার তেজ যেন দ্বিগুণ বাড়িয়া গেল। সে আবার উঠিয়া ভীষণ তেজে হারকিউলিসকে মারিতে উঠিল। হারকিউলিস আবার তাকে ঘাড়ে ধরিয়া মাটিতে পাড়িয়া ফেলিলেন, কিন্তু মাটি ছোঁয়ামাত্র আবার তার অসম্ভব তেজ বাড়িয়া গেল, সে আবার হুঙ্কার দিয়া লাফাইয়া উঠিল। হারকিউলিস ত জানে না যে পৃথিবীর বরে মাটি ছুঁইলেই তাহার তেজ বাড়ে। তিনি বার বার তাকে নানারকম মারপ্যাঁচ দিয়া মাটিতে ফেলেন, বার বারই কোথা হইতে তার নূতন তেজ দেখা দেয়। তখন তিনি দৈত্যটাকে ঘাড়ে ধরিয়া শূন্যে তুলিয়া দুই হাতে তাকে এমন চাপিয়া ধরিলেন যে, সেই চাপের চোটে তার দম বাহির হইয়া প্রাণসুদ্ধ উড়িয়া গেল। তখন তার দেহটাকে তিনি পাহাড় পর্বত ডিঙ্গাইয়া কোথায় ছুঁড়িয়া ফেলিলেন, তাহার আর কোন খোঁজই পাওয়া গেল না।

তখন বামনেরা সবাই মিলিয়া ভয়ানক কোলাহল আর কান্নাকাটি জুড়িয়া দিল। কেহ, “হায় হায়” করিয়া চুল ছিঁড়িতে লাগিল, কেহ প্রাণভয়ে ছুটাছুটি করিতে লাগিল, কেহ আস্ফালন করিয়া বলিল, “এস, আমরা সকলে ইহার প্রতিশোধ লই।” হারকিউলিস তাদের বলিলেন, “ভাইসকল, তোমাদের সঙ্গে আমার কোন ঝগড়া নাই। ওই হতভাগা খামখা আমাকে মারিতে আসিয়াছিল, তাই উহাকে যৎকিঞ্চিৎ সাজা দিয়াছি। তোমাদের আমি কোন অনিষ্ট করিতে চাই না।” এই বলিয়া তিনি লম্বা লম্বা পা ফেলিয়া, সেখান হইতে সেই সোনার আপেলের সন্ধানে এটলাস দৈত্যের খবর লাইতে চলিলেন।

এই ভাবে পথ চলিতে চলিতে শেষে হারকিউলিস সত্য সত্যই এটলাসের দেখা পাইলেন। সেই সমুদ্রের বুড়া যেমন বর্ণনা করিয়াছিল, ঠিক সেইরকমভাবে সেই বিরাট দৈত্য আকাশটাকে মাথায় লইয়া দাঁড়াইয়া আছে। হারকিউলিসকে দেখিয়া সে মেঘের ডাকের মত গম্ভীর গলায় বলিল, “আমি এটলাস—আমি আকাশকে মাথা ধরিয়া রাখি—আমার মত আর কেউ নাই।” হারকিউলিস তাকে নমস্কার করিয়া বলিলেন, “আপনার সন্ধানে আমি দেশ-বিদেশ ঘুরিয়াছি—এখন আমার একটি প্রশ্ন আছে, সেইটি জিজ্ঞাসা করিতে চাই।” দৈত্য বলিল, “এই আকাশের নীচে মেঘের উপরে থাকিয়া আমার চোখ সব দেখে, সব জানে—যাহা জানিতে চাও আমাকে জিজ্ঞাসা কর।” হারকিউলিস বলিলেন, “তবে বলিয়া দিন, হেস্‌পেরাইডিসের বাগানে যে সোনার ফল ফলে, সেই ফল আমি কেমন করিয়া পাইতে পারি।” দৈত্য হইলেও এটলাসের মেজাজটি বড় ভাল। সে বলিল, “তাহাতে আর মুশকিল কি? এই আকাশটাকে তুমি একটুক্ষণ ধরিয়া রাখ, আমি এখনই তোমায় সেই ফল আনিয়া দিতেছি।” হারকিউলিস ভাবিলেন, “এ বড় চমৎকার কথা। কত কীর্তি সঞ্চয় করিয়াছি, কিন্তু আকাশটাকে ঠেকাইয়া অক্ষয় কীর্তি রাখিবার এমন সুযোগ আর কোনদিন পাইব না।” তাই তিনি দৈত্যের কথায় তৎক্ষণাৎ রাজী হইলেন।

কত হাজার হাজার বছর এটলাসের ঘাড়ে আকাশের ভার চাপান রহিয়াছে, শীত গ্রীষ্ম, রোদ বৃষ্টি সব সহিয়া বেচারা সেই বোঝা মাথায় রাখিয়া আসিতেছে। এতদিন পরে হারকিউলিসের কৃপায় সে একটু জিরাইয়া লইবার সুযোগ পাইল। মনের আনন্দে সে খু খানিকটা লাফাইয়া, মাটিতে গড়াগড়ি দিয়া, তারপর লম্বা পা ফেলিয়া চক্ষের নিমেষে হেস্‌পেরাইডিসের বাগানে গিয়া হাজির। সেখানে ‘ড্রেগন’ মারিয়া বাগান খুঁজিয়া সোনার আপেল তুলিয়া আনিতে তার একটুও বিলম্ব হইল না। তখন তাহার মনে হঠাৎ এক কুবুদ্ধি জাগিল। সে ভাবিল, কেন আর মিছামিছি আকাশের বোঝা লইয়া থাকি। এই মানুষটার উপরেই এখন আকাশের ভার দিলেই হয়। এই ভাবিয়া সে হারকিউলিসকে বলিল, “ওহে পৃথিবীর মানুষ, তোমার গায়ে ত বেশ শক্তি দেখিতেছি। এখন হইতে তুমিই আকাশটাকে ঠেকাইবার ভার লও না কেন? আমি বরং তোমার রাজার কাছে আপেলগুলা দিয়া আসি!”

হারকিউলিস দেখিলেন, বেগতিক! এ হতভাগা একটুক্ষণ ছুটি পাইয়া আর কাজে ফিরিতে চায় না। তিনি একটু চালাকি করিয়া বলিলেন, “তবে ভাই একটু আকাশটাকে ধর ত, আমার এই সিংহচর্মটিকে কাঁধের উপর ভাল করিয়া পাতিয়া লই।” বোকা দৈত্য তাড়াতাড়ি ফলগুলা রাখিয়া, আবার নিজের কাঁধ দিয়া আকাশটাকে আগলইয়া ধরিল। হারকিউলিসও তৎক্ষণাৎ ফলগুলা উঠাইয়া লইয়া, দৈত্যকে এক লম্বা নমস্কার দিয়া সেখান হইতে সরিয়া পড়িলেন। দৈত্য বেচারা ব্যাপারটা কিছুই বুঝিতে না পারিয়া, ফ্যাল্‌ফ্যাল্‌ করিয়া তাকাইয়া রহিল।

এত পরিশ্রম করিয়া সোনার ফল আনিয়াও হারকিউলিসের দাসত্ব ঘুচিল না। রাজা ইউরিসথিউস্‌ বলিলেন, “আর একটি কাজ তোমায় করিতে হইবে—তুমি পাতালে গিয়া যমের কুকুর সারবেরাস্‌কে বাঁধিয়া আন।” হারকিউলিস পাতালে গিয়া, সেই ভীষণমূর্তি কুকুরকে ধরিয়া রাজার সম্মুখে হাজির করিলেন। তার তিন মাথায় তিনটি মুখ, সেই মুখ দিয়া বিষ ঝরিয়া পড়িতেছে, নাকে চোখে আগুনের মত ধোঁয়া— তার মূর্তি দেখিয়া ভয়ে রাজার প্রাণ উড়িবার উপক্রম হইল—তিনি একটা জালার মধ্যে ঢুকিয়া চীৎকার করিতে লাগিলেন—”ওটাকে শীঘ্র সরাইয়া লও।” হারকিউলিস তখন আবার যেখানকার কুকুর সেইখানে রাখিয়া আসিলেন।

এতদিনে হারকিউলিস তাঁর স্বাধীনতা ফিরিয়া পাইলেন। তখন তিনি নিজের ইচ্ছামত ত্রিভুবন ঘুরিয়া আরও অদ্ভুত কাজ করিয়া ফিরিতে লাগিলেন। কত বড় বড় যুদ্ধে সাহায্য করিয়া, কত বীরত্বের কীর্তিতে যোগ দিয়া তিনি আপনার আশ্চর্য শক্তির পরিচয় দিতে লাগিলেন। পাহাড় উপড়াইয়া জিব্রাল্টার প্রণালীর পথ খুলিয়া তিনি সমুদ্রের সঙ্গে সমুদ্র জুড়িয়া দিলেন। সুন্দরী আলসেবিটস নিজের প্রাণ দিয়া স্বামীকে অমর করিতে চাহিয়াছিলেন, হারকিউলিস যমের সহিত যুদ্ধ করিয়া সেই আলসেবিটসকে মৃত্যুর গ্রাস হইতে কাড়িয়া আনিলেন।

এইরূপ ঘুরিতে ঘুরিতে একদিন ঈনিয়ুসের সুন্দরী কন্যা ডেয়ানীরাকে দেখিয়া হারকিউলিস তাকে বিবাহ করিতে চাহিলেন। কিন্তু, কোথা হইতে এক জলদেবতা আসিয়া তাহাতে গোল বাধাইয়া দিল। সে বলিল, “ঈনিয়ুস আমাকে কন্যা দান করিবেন বলিয়াছেন, তুমি কোথাকার কে যে মাঝ হইতে দাবী বসাইতে আসিয়াছ?” তখন ডেয়ানীরার অনুমতি লইয়া হারকিউলিস জলদেবতার সহির দ্বন্দযুদ্ধ বাধাইয়া দিলেন। সে এই অদ্ভুত দেবতা, আপন ইচ্ছামত চেহারা বদলায়। প্রথমেই হারকিউলিসের কাছে খুব খানিক চড়চাপড় খাইয়া, সে ষাঁড়ের মূর্তি ধরিয়া তাঁকে গুঁতাইতে আসিল। হারকিউলিস তখন তার শিং ভাঙ্গিয়া দিলেন; সে পলাইয়া আবার আর এক মূর্তিতে ফিরিয়া আসিল। এইরূপ বহুক্ষণ যুদ্ধের পর হারকিউলিস তাকে এমন কাবু করিয়া ফেলিলেন যে, প্রাণের দায়ে সে দেশ ছাড়িয়া চম্পট দিল।

তারপর হারকিউলিস ডেয়ানীরাকে বিবাহ করিয়া তাঁহার সঙ্গে দেশ ভ্রমণে বাহির হইলেন। কত রাজ্য কত দেশ ঘুরিয়া, একদিন তাঁরা এক প্রকাণ্ড নদীর ধারে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। নদীতে ভয়ানক স্রোত দেখিয়া হারকিউলিস ডেয়ানীরাকে পার করিবার উপায় ভাবিতেছেন; এমন সময়ে নেসাস নামে এক বুড়া সেন্টর (মানুষ-ঘোড়া) আসিয়া বলিল, “আমি এই মেয়েটিকে পিঠে করিয়া পার করিয়া দিব।” ডেয়ানীরা সেন্টরের পিঠে চড়িয়া নদী পার হইলেন, হারকিউলিসও একহাতে তাঁহার তীর ধনুক জল হইতে উঠাইয়া, আর একহাতে ঢেউ ঠেলিয়া পার হইতে লাগিলেন। নদীর ওপারে গিয়া হতভাগা নেসাস ভাবিল, “আহা! এমন সুন্দরী মেয়ে কেন এই মানুষটার সঙ্গে ঘুরিয়া বেড়ায়? তাহার চাইতে ইহাকে লইয়া আমাদের দেশে পলাইয়া যাই না?” এই ভাবিয়া সে ডেয়ানীরাকে লইয়া এক ছুট্‌ দিল। ডেয়ানীরার চিৎকারে হারকিউলিস মাথা তুলিয়া চাহিলেন, এবং তৎক্ষণাৎ জলের ভিতর হইতে তীর ছুঁড়িয়া নেসাসের মর্মভেদ করিয়া ফেলিলেন। মরিবার সময় দুষ্ট সেন্টর অত্যন্ত ভাল মানুষের মত অনেক আনুতাপ করিয়া ডেয়ানীরাকে বলিয়া গেল, “আমার ঘাড়ের উপর হইতে এই জামাটি খুলিয়া তুমি রাখিয়া দাও। যদি তোমার স্বামীর ভালবাসা কোনদিন কমিতে দেখ, তবে এই জামা তাহাকে পরাইলেই তার সমস্ত ভালবাসা আবার ফিরিয়া আসিবে।” ডেয়ানীরা তাকে অনেক ধন্যবাদ দিয়া জামাটি পরম যত্নে লুকাইয়া রাখিলেন। ততক্ষণে হারকিউলিসও নদী পার হইয়া আসিয়াছেন, দুইজনে আবার চলিতে লাগিলেন।

তারপর কত বৎসর কাটিয়া গেল। একদিন কি একটা কাজের জন্য দূর দেশের এক রাজসভায় হারকিউলিসের যাওয়া দরকার হইল। তিনি ডেয়ানীরাকে রাখিয়া সেই যে বাহির হইলেন, তারপর কত দিন গেল, কত মাস গেল, হারকিউলিস আর ফিরিলেন না। ডেয়ানীরা ব্যস্ত হইয়া উঠিলেন, ভাবিতে লাগিলেন, “তবে কি হারকিউলিস আমায় ভুলিয়া গেলেন? আর কি তিনি আমায় ভালবাসেন না?” তিনি দূত পাঠাইলেন, তারা আসিয়া বলিল, “হারকিউলিস বেশ ভালই আছেন—রাজসভায় নানা আমোদ-প্রমোদে তাঁর দিন কাটিতেছে।” শুনিয়া ডেয়ানীরা সেই সেন্টরের দেওয়া জামাটি বাহির করিলেন। সোনার মত ঝক্‌ঝকে জামা, সেন্টরের মৃত্যু সময়ে রক্তে ভিজিয়া গিয়াছিল—কিন্তু এখন তাহাতে রক্তের চিহ্নমাত্র নাই। সেই জামা তিনি লাইকাস নামে এক দূতকে দিয়া হারকিউলিসের কাছে পাঠাইয়া দিলেন— ভাবিলেন তাহা হইলে হারকিউলিসকে শীঘ্র ফিরিয়া পাইবেন। জামার কাহিনী ত হারকিউলিস জানেন না, সেন্টরের রক্তে যে তাহা বিষাক্ত হইয়া আছে, এরূপ সন্দেহই তাঁর মনে জাগিল না, তিনি নিশ্চিন্ত মনে সেই জামা পরিলেন। জামা পরিবামাত্র তাঁর সর্বাঙ্গ জ্বলিতে লাগিল, তাঁর শিরায় শিরায় যেন আগুনের প্রবাহ ছুটিতে লাগিল। তিনি তাড়াতাড়ি জামা ছাড়াইতে গিয়া দেখেন যে সর্বনাশ, জামা তাঁহার শরীরের মধ্যে বসিয়া গিয়াছে; গায়ের চামড়া উঠিয়া আসে, তবু জামা ছাড়িতে চায় না। রাগে ও যন্ত্রণায় পাগল হইয়া তিনি দূতকে ধরিয়া সমুদ্রে ছুঁড়িয়া ফেলিলেন। তারপর সেন্টরের বিষ এড়াইবার উপায় নাই দেখিয়া তিনি তার অনুচরদের ডাকিয়া বলিলেন, “তোমরা শীঘ্র কাঠ আন, আগুন জ্বাল, আমি এখন মরিতে ইচ্ছা করি।” শুনিয়া সকলে কাঁদিতে লাগিল, কেহ চিতা জ্বালাইতে প্রস্তুত হইল না। তখন তিনি আপন হাতে গাছ উপ্‌ড়াইয়া প্রকাণ্ড চিতা জ্বালাইয়া তাহাতে শুইলেন এবং তাঁর এক বন্ধুকে বলিলেন, “তুমি যদি আমার বন্ধু হও, তবে আমার কথা শুনিয়া এই চিতায় আগুন দাও। বন্ধুতার পুরস্কারস্বরূপ আমার বিষমাখান অব্যর্থ তীরগুলি তোমায় দিলাম।”

তারপর চিতায় আগুন দেওয়া হইল, দেবতারা জয়গান করিয়া তাঁহাকে স্বর্গের দেবতাদের মধ্যে ডাকিয়া লইলেন, এবং তাঁহাকে অমর করিয়া আকাশের নক্ষত্রদের মধ্যে রাখিয়া দিলেন।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প সুকুমার রায়

বুদ্ধিমান শিষ্য

–সুকুমার রায়

এক মুনি, তাঁর অনেক শিষ্য। মুনিঠাকুর তাঁর পিতৃশ্রাদ্ধে এক মস্ত যজ্ঞের আয়োজন করলেন। সে যজ্ঞ এর আগে মুনির আশ্রমে আর হয়নি। তাই তিনি শিষ্যদের ডেকে বললেন, “আমি এক যজ্ঞের আয়োজন করেছি, সে যজ্ঞ তোমরা হয়তো আর কোথাও দেখবার সুযোগ পাবে না, কাজেই যজ্ঞের সব কাজ কর্ম বিধি ব্যবস্থা বেশ মন দিয়ে দেখো। নিজের চোখে সব ভালো ক’রে না দেখলে শুধু পুঁথি পড়ে এ যজ্ঞ করা সম্ভব হবে না।”

মুনিঠাকুরের আশ্রমে বেড়ালের ভারি উৎপাত; যজ্ঞের আয়োজন সব ঠিক হচ্ছে, এর মধ্যে বেড়ালগুলো এসে জ্বালাতন আরম্ভ করেছে- এটাতে মুখ দেয়, ওটা উল্‌টে ফেলে, কিছুতেই তাদের সামলানো যায় না। তখন মুনিঠকুর রেগে বললেন, “বেড়ালগুলোকে ধরে ঐ কোণায় বেঁধে রেখে দাও তো।” অমনি নয়টা বেড়ালকে ধরে সভার এক পাশে খোঁটায় বেঁধে রাখা হল। তারপর ঠিক সময় বুঝে যজ্ঞ আরম্ভ হল। শিষ্যেরা সব সভার সাজসজ্জা, আয়োজন, যজ্ঞের সব ক্রিয়া-কাণ্ড, মন্ত্রোচ্চারণের নিয়ম ইত্যাদি মন দিয়ে দেখতে আর শুনতে লাগল। নির্বিঘ্নে অতি সুন্দররূপে মুনিঠাকুরের যজ্ঞ সম্পন্ন হল।

কিছুকাল পরে শিষ্যদের একজনের বাবা মারা গেলেন। শিষ্যের ভারি ইচ্ছা তার পিতৃশ্রাদ্ধে সেও ঐ রকম সুন্দর যজ্ঞের আয়োজন করে। সে গিয়ে তার গুরুকে ধরল। তিনি বললেন, “আচ্ছা, সব আয়োজন করতে থাক, আমি এসে যজ্ঞের পুরোহিত হব।” শিষ্য মহা সন্তুষ্ট হয়ে যজ্ঞের সব ঠিকঠাক করতে লাগল।

ক্রমে যজ্ঞের দিন উপস্থিত। মুনিঠাকুর সশিষ্য শ্রাদ্ধের সভায় উপস্থিত; ঠিক নিয়ম মতো যজ্ঞের সমস্ত ব্যবস্থা প্রস্তুত হয়েছে কিন্তু শিষ্যটি তখনও সভাস্থলে এসে বসছে না, কেবল ব্যস্তভাবে ঘোরাঘুরি করছে। এদিকে যজ্ঞের সময় প্রায় উপস্থিত দেখে মুনিঠাকুরও ক্রমে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। তিনি শিষ্যকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আর বিলম্ব কেন? সবই তো প্রস্তুত, যজ্ঞের সময়ও উপস্থিত, এই বেলা সভায় এস।” শিষ্য বলল, “আজ্ঞে একটা আয়োজন বাকি রয়ে গেছে, সেইটা নিয়ে ভারি মুশকিলে পড়েছি।” মুনি বললেন, “কই, কিছুরই তো অভাব দেখছি না।” শিষ্য বলল, “আজ্ঞে চারটে বেড়াল কম পড়েছে।” মুনি বললেন, “সে কি রকম?” শিষ্য মুখ কাঁচুমাচু ক’রে বলল, “ঐ যে আপনার যজ্ঞে দেখলাম ঈশান কোণে নয়টা বেড়াল বাঁধা রয়েছে। আমাদের এ গ্রামে অনেক খুঁজে পাঁচটার বেশি পাওয়াই গেল না, কাজেই আর বাকি চারটার জন্য পাশের গ্রামে লোক গিয়েছে; তারা এই এসে পড়ল ব’লে।” শুনে গুরুর তো চক্ষুস্থির! তিনি বললেন, “আরে বুদ্ধিমান! কোনটা যজ্ঞের অঙ্গ আর কোনটা নয় তাও বিচার করতে শেখনি? আশ্রমের বেড়ালগুলি উৎপাত করছিল তাই বেঁধে রেখেছিলাম, তোমার এখানে কোনো উৎপাত ছিল না, তুমি আবার গায়ে পড়ে উৎপাত সংগ্রহ করতে গিয়েছ? বসে পড়, বসে পড়, আর বেড়াল ধরে কাজ নেই। এখন যজ্ঞটা নির্বিঘ্নে শেষ হয়ে যাক্‌।”

শিষ্য নিজের আহাম্মকিতে লজ্জিত হয়ে অপ্রস্তুত ভাবে সভার মধ্যে বসে পড়ল।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প সুকুমার রায়

ব্যাঙের সমুদ্র দেখা

–সুকুমার রায়

(জাপানী গল্প)

গ্রামের ধারে কবেকার পুরান এক পাতকুয়োর ফাটলের মধ্যে কোলাব্যাং তার পরিবার নিয়ে থাকত। গ্রামের মেয়েরা সেখানে জল তুলতে এসে যেসব কথাবার্তা বলত কোলাব্যাং তার ছেলেদের সেইসব কথা বুঝিয়ে দিত—আর ছেলেরা ভাবত ‘ইস্‌! বাবা কত জানে!’

একদিন সেই মেয়েরা সমুদ্রের কথা বলতে লাগল। ব্যাঙের ছানারা জিজ্ঞাসা করল—”হ্যাঁ বাবা! সমুদ্র কাকে বলে?” ব্যাং খানিক ভেবে বলল, “সমুদ্র? সে একরকম জন্তুর নাম।” তখন একটা ছানা বলল—”ওরা যে বলছিল সমুদ্র খুব ভয়ানক বড় হয়, আর তার মধ্যে অনেক জল থাকে—আর লোকেরা সাঁতার কেটে তা পার হতে পারে না।” তখন কোলাব্যাং মুশকিলে পড়ল। সে গাছপালা দেখেছে, বাড়িঘর দেখেছে—মানুষ কুকুর ঘটি বাটি নানারকম জিনিসপত্র দেখেছে, আর ছেলেবেলায় অনেকরকম জিনিসের গল্প শুনেছে। কিন্তু সমুদ্রের কথা ত কখন শোনেনি! তখন সে ভাবল সমুদ্রের কথা একটু খোঁজ করে দেখতে হবে।

পরদিন সকালে উঠেই কোলাব্যাং তার ছাতা পোঁটলা নিয়ে বলল, “আমি সমুদ্রের সন্ধান করতে যাচ্ছি।” তার গিন্নী কত কাঁদল, ছেলেরা নানারকম সুর করে তাকে বারণ করল কিন্তু কোলাব্যাং বলল, “না, এতে আমার জ্ঞানলাভ হবে—তোমরা বাধা দিও না।” এই বলে সে পাতকুয়ো থেকে উঠে একটা মাঠের দিকে চলল। ব্যাং বাইরে এসেই দেখে মানুষ কুকুর গরু তারা কেউ তার মতো লাফিয়ে লাফিয়ে চলে না—তাই দেখে সে ভাবল ‘লাফিয়ে চললে সবাই আমায় বেকুব ভাববে।’ এই ভেবে সে হেঁটে হেঁটে চলতে লাগল। কিন্তু অমন করে চলে ত তার অভ্যাস নেই—খানিক গিয়েই তার ভারই পরিশ্রম বোধ হল।

মাঠের ওপারে আর এক গ্রামের কাছে এক গর্তের মধ্যে মেতে ব্যংদের বাসা ছিল। মেটে ব্যাঙেরাও সমুদ্রের কথা শুনেছে, তাই তাদের মধ্যে একজন বেরিয়েছে সমুদ্রটা দেখতে। মাঝখানে দুই ব্যাঙের দেখা হল। কোলাব্যাং বলল, “আমি ফাটল-কুয়োর কোলাব্যাং, যাচ্ছি সমুদ্রে।” মেটে ব্যাং বলল, “আমি মেঠো-ব্যাং, আমিও যাচ্ছি সমুদ্রে।” তখন তাদের ভারি ফূর্তি হল।

কিন্তু সমুদ্রে যাবার পথ ত তারা জানে না। মাঠের মধ্যে একটা মস্ত ঢিপি ছিল; মেটে ব্যাং বলল, “ওর উপরে উঠে দেখি ত কিছু দেখা যায় কিনা।”

এই বলে তারা অনেক কষ্টে সেই ঢিপির উপর চড়ে সেখান থেকে একটা গ্রাম দেখতে পেল। মেটে ব্যাং বলল, “আরে দুর ছাই! এরকম ত ঢের দেখেছি! আমার বাড়ির কাছেই ত অমন আছে।” কোলাব্যাং বলল, “তাই ত! আমিও ছেলেবেলা থেকে ওরকম কত দেখেছি। সব জায়গাই দেখছি একরকম। মিছামিছি আমরা হেঁটে মরলাম।”

তখন তারা ভারই বিরক্ত হয়ে বাড়ি ফিরে গেল। কোলাব্যাং তার ছানাদের বলল, “সমুদ্র টমুদ্র কিছু নেই—ওসব মিছে কথা!”

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প সুকুমার রায়

পাগলা দাশু

— সুকুমার রায়

আমাদের স্কুলের যত ছাত্র তাহাদের মধ্যে এমন কেহই ছিল না, যে পাগলা দাশুকে না চিনে। যে লোক আর কাহাকেও জানে না, সেও সকলের আগে দাশুকে চিনিয়া ফেলে। সেবার এক নতুন দারোয়ান আসিল, একেবারে আন্‌‌কোরা পাড়াগেঁয়ে লোক, কিন্তু প্রথম যখন সে পাগলা দাশুর নাম শুনিল, তখনই আন্দাজে ঠিক করিয়া লইল যে, এই ব্যক্তিই পাগলা দাশু। কারণ মুখের চেহারায়, কথাবার্তায়, চাল-চলনে বোঝা যাইত যে তাহার মাথায় একটু ‘ছিট’ আছে। তাহার চোখ দুটি গোল গোল, কান দুটি অনাবশ্যক রকমের বড়, মাথায় একবস্তা ঝাঁকড়া চুল। চেহারাটা দেখিলেই মনে হয়—

ক্ষীণদেহ খর্বকায় মুণ্ডু তাহে ভারি
যশোরের কই যেন নরমূর্তিধারি।

সে যখন তাড়াতাড়ি চলে অথবা ব্যস্ত হইয়া কথা বলে, তখন তাহার হাত পা ছোঁড়ার ভঙ্গী দেখিয়া হঠাৎ কেন জানি চিংড়িমাছের কথা মনে পড়ে।

সে যে বোকা ছিল তাহা নয়। অঙ্ক কষিবার সময়, বিশেষত লম্বা লম্বা গুণ-ভাগের বেলায় তাহার আশ্চর্য মাথা খুলিত। আবার এক এক সময় সে আমাদের বোকা বানাইয়া তামাশা দেখিবার জন্য এমন সকল ফন্দি বাহির করিত যে, আমরা তাহার বুদ্ধি দেখিয়া অবাক হইয়া থাকিতাম।

‘দাশু’ অর্থাৎ দাশরথি, যখন প্রথম আমাদের ইস্কুলে ভরতি হয়, তখন জগবন্ধুকে আমাদের ‘ক্লাশের ভালো ছেলে’ বলিয়া সকলে জানিত। সে পড়াশোনায় ভালো হইলেও, তাহার মতো অমন একটি হিংসুটে ভিজেবেড়াল আমরা আর দেখি নাই। দাশু একদিন জগবন্ধুর কাছে কি একটা ইংরাজি কথার মানে জিজ্ঞাসা করিতে গিয়াছিল। জগবন্ধু তাহাকে খামখা দুকথা শুনাইয়া বলিল, “আমার বুঝি আর খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই ? আজ একে ইংরাজি বোঝাব, কাল ওর অঙ্ক কষে দেব, পরশু আর একজন আসবেন আর এক ফরমাইস নিয়ে— ঐ করি আর কি !” দাশু সাংঘাতিক চটিয়া বলিল, “তুমি তো ভারি ছ্যাঁচড়া ছোটলোক !” জগবন্ধু পণ্ডিত মশায়ের কাছে নালিশ করিল, “ঐ নতুন ছেলেটা আমায় গালাগালি দিচ্ছে।” পণ্ডিত মহাশয় দাশুকে এমনি ধমক দিয়া দিলেন যে বেচারা একেবারে দমিয়া গেল।

আমাদের ইংরাজি পড়াইতেন বিষ্টুবাবু। জগবন্ধু তাঁহার প্রিয় ছাত্র। পড়াইতে পড়াইতে যখনই তাঁহার বই দরকার হয়, তিনি জগবন্ধুর কাছে বই চাহিয়া লন। একদিন তিনি পড়াইবার সময় ‘গ্রামার’ চাহিলেন, জগবন্ধু তাড়াতাড়ি তাহার সবুজ কাপড়ের মলাট দেওয়া ‘গ্রামার’ খানা বাহির করিয়া দিল। মাস্টার মহাশয় বইখানি খুলিয়াই হঠাৎ গম্ভীর হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “বইখানা কার ?” জগবন্ধু বুক ফুলাইয়া বলিল, “আমার”। মাস্টার মহাশয় বলিলেন, “হুঁ— নতুন সংস্করণ বুঝি ? বইকে-বই একেবারে বদলে গেছে।” এই বলিয়া তিনি পড়িতে লাগিলেন— ‘যশোবন্ত দারোগা— লোমহর্ষক ডিটেকটিভ নাটক।’ জগবন্ধু ব্যাপারখানা বুঝিতে না পারিয়া বোকার মতো তাকাইয়া রহিল। মাস্টার মহাশয় বিকট রকম চোখ পাকাইয়া বলিলেন, “এই সব জ্যাঠামি বিদ্যে শিখছ বুঝি ?” জগবন্ধু আম্‌তা আম্‌তা করিয়া কি যেন বলিতে যাইতেছিল, কিন্তু মাস্টার মহাশয় এক ধমক দিয়া বলিলেন, “থাক্‌ থাক্‌, আর ভালমানুষি দেখিয়ে কাজ নেই— ঢের হয়েছে।” লজ্জায় অপমানে জগবান্ধুর দুই কান লাল হইয়া উঠিল— আমরা সকলেই তাহাতে বেশ খুশি হইলাম। পরে জানা গেল যে, এটিও দাশু ভায়ার কীর্তি, সে মজা দেখিবার জন্য উপক্রমণিকার জায়গায় ঠিক ঐরূপ মলাট দেওয়া একখানা বই রাখিয়া দিয়াছিল।

দাশুকে লইয়া আমরা সর্বদাই ঠাট্টাতামাশা করিতাম এবং তাহার সামনেই তাহার বুদ্ধি ও চেহারা সম্বন্ধে অপ্রীতিকর সমালোচনা করিতাম। তাহাতে একদিনও তাহাকে বিরক্ত হইতে দেখি নাই। এক এক সময়ে সে নিজেই আমাদের মন্তব্যের উপর রঙ চড়াইয়া নিজের সম্বন্ধে নানারকম অদ্ভুত গল্প বলিত। একদিন সে বলিল, “ভাই, আমাদের পাড়ায় যখন কেউ আমসত্ত্ব বানায় তখনই আমার ডাক পড়ে। কেন জানিস ?” আমরা বলিলাম, “খুব আমসত্ত্ব খাস বুঝি ?” সে বলিল, “তা নয়। যখন আমতত্ত্ব শুকোতে দেয়, আমি সেইখানে ছাদের উপর বার দুয়েক চেহারাখানা দেখিয়ে আসি। তাতেই, ত্রিসীমানার যত কাক সব ত্রাহি ত্রাহি করে ছুটে পালায় কাজেই আর আমসত্ত্ব পাহারা দিতে হয় না।”

একবার সে হঠাৎ পেন্টেলুন পরিয়া স্কুলে হাজির হইল। ঢল্‌ঢলে পায়জামার মতো পেন্টেলুন আর তাকিয়ার খোলের মতো কোট পরিয়া তাহাকে যে কিরূপ অদ্ভুত দেখাইতেছিল, তাহা সে নিজেই বুঝিতেছিল এবং তাহার কাছে ভারি একটা ব্যাপার বলিয়া বোধ হইতেছিল। আমরা জিজ্ঞাসা করিলাম, “পেন্টেলুন পরেছিস্‌ কেন ?” দাশু এক গাল হাসিয়া বলিল, “ভালো ইংরাজি শিখব ব’লে।” আর একবার সে খামখা নেড়া মাথায় এক পট্টি বাঁধিয়া ক্লাশে আরম্ভ করিল এবং আমরা সকলে তাহা লইয়া ঠাট্টা তামাশা করায় যারপরনাই খুশি হইয়া উঠিল। দাশু আদপেই গান গাহিতে পারে না, তাহার যে তালজ্ঞান বা সুরজ্ঞান একেবারে নাই, একথা সে বেশ জানে। তবু সেবার ইনস্পেক্টার সাহেব যখন ইস্কুল দেখিতে আসেন, তখন আমাদের খুশি করিবার জন্য চিৎকার করিয়া গান শুনাইয়াছিল। আমরা কেহ ওরূপ করিলে সেদিন রীতিমত শাস্তি পাইতাম, কিন্তু দাশু ‘পাগলা’ বলিয়া তাহার কোনো শাস্তি হইল না।

একবার ছুটির পরে দাশু অদ্ভুত এক বাক্স লইয়া ক্লাসে হাজির হইল। মাস্টার মহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি দাশু, ও বাক্সের মধ্যে কি আছে ?” দাশু বলিল, “আজ্ঞে, আমার জিনিসপত্র।” জিনিসপত্রটা কিরূপ হইতে পারে, এই লইয়া আমাদের মধ্যে বেশ একটা তর্ক হইয়া গেল। দাশুর সঙ্গে বই, খাতা, পেনসিল, ছুরি সবই তো আছে, তবে আবার জিনিসপত্র কি বাপু? দাশুকে জিজ্ঞাসা করিলাম, সে সোজাসুজি কোনো উত্তর না দিয়া বাক্সটিকে আঁকড়াইয়া ধরিল এবং বলিল, “খবরদার, আমার বাক্স তোমরা কেউ ঘেঁটো না।” তাহার পর চাবি দিয়া বাক্সটাকে একটুখানি ফাঁক করিয়া, সে তাহার ভিতর দিয়া কি যেন দেখিল, এবং ‘ঠিক আছে’ বলিয়া গম্ভীরভাবে মাথা নাড়িয়া বিড় বিড় করিয়া হিসাব করিতে লাগিল। আমি একটুখানি দেখিবার জন্য উঁকি মারিতে গিয়াছিলাম— অমনি পাগলা মহা ব্যস্ত হইয়া তাড়াতাড়ি চাবি ঘুরাইয়া বাক্স বন্ধ করিয়া ফেলিল।

ক্রমে আমাদের মধ্যে তুমুল আলোচনা আরম্ভ হইল। কেহ বলিল, “ওটা ওর টিফিনের বাক্স— ওর মধ্যে খাবার আছে।” কিন্তু একদিনও টিফিনের সময় তাহাকে বাক্স খুলিয়া কিছু খাইতে দেখিলাম না। কেহ বলিল, “ওটা বোধ হয় ওর মানি-ব্যাগ— ওর মধ্যে টাকা পয়সা আছে, তাই ও সর্বদা কাছে কাছে রাখতে চায়। আর একজন বলিল, “টাকা পয়সার জন্য অত বড় বাক্স কেন ? ও কি ইস্কুলে মহাজনী কারবার খুলবে নাকি ?”

একদিন টিফিনের সময় দাশু হঠাৎ ব্যস্ত হইয়া, বাক্সের চাবিটা আমার কাছে রাখিয়া গেল আর বলিল, “ওটা এখন তোমার কাছে রাখো, দেখো হারায় না যেন। আর আমার আসতে যদি একটু দেরি হয়, তবে তোমরা ক্লাশে যাবার আগে ওটা দারোয়ানের কাছে দিও।” এই বলিয়া বাক্সটি দারোয়ানের জিম্মায় রাখিয়া বাহির হইয়া গেল। তখন আমাদের উৎসাহ দেখে কে! এতদিনে সুবিধা পাওয়া গিয়াছে, এখন দারোয়ানটা একটু তফাৎ গেলেই হয়। খানিক বাদে দারোয়ান তাহার রুটি পাকাইবার লোহার উনানটি ধরাইয়া, কতকগুলি বাসনপত্র লইয়া কলতলার দিকে গেল। আমরা এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম, দারোয়ান আড়াল হওয়া মাত্র, আমরা পাঁচ-সাতজনে তাহার ঘরের কাছে সেই বাক্সের উপর ঝুঁকিয়া পড়িলাম। তাহার পর আমি চাবি দিয়া বাক্স খুলিয়া দেখি বাক্সের মধ্যে বেশ ভারি একটা কাগজের পোঁটলা ন্যাকড়ার ফালি দিয়া খুব করিয়া জড়ানো। তাড়াতাড়ি পোঁটলার প্যাঁচ খুলিয়া দেখা গেল, তাহার মধ্যে একখানা কাগজের বাক্স— তাহার ভিতর আর একটা ছোট পোঁটলা। সেটি খুলিয়া একখানা কার্ড বাহির হইল, তাহার এক পিঠে লেখা, ‘কাঁচকলা খাও’ আর একটি পিঠে লেখা ‘অতিরিক্ত কৌতুহল ভালো নয়।’ দেখিয়া আমরা এ-উহার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিতে লাগিলাম। সকলের শেষে একজন বলিয়া উঠিল, “ছোকরা আচ্ছা যা হোক, আমাদের বেজায় ঠকিয়েছে।” আর একজন বলিল, “যেমন ভাবে বাঁধা ছিল তেমনি করে রেখে দাও, সে যেন টেরও না পায় যে আমরা খুলেছিলাম। তাহলে সে নিজেই জব্দ হবে।” আমি বলিলাম, “বেশ কথা। ও আস্‌‌লে পরে তোমরা খুব ভালোমানুষের মতো বাক্সটা দেখাতে বলো আর ওর মধ্যে কি আছে, সেটা বার বার করে জানতে চেয়ো।” তখন আমরা তাড়াতাড়ি কগজপত্রগুলি বাঁধিয়া, আগেকার মতো পোঁটলা পাকাইয়া বাক্সে ভরিয়া ফেলিলাম।

বাক্সে চাবি দিতে যাইতেছি, এমন সময় হো হো করিয়া একটা হাসির শব্দ শোনা গেল— চাহিয়া দেখি পাঁচিলের উপরে বসিয়া পাগলা দাশু হাসিয়া কুটিকুটি। হতভাগা এতক্ষণ চুপি চুপি তামাশা দেখিতেছিল। তাখন বুঝিলাম আমার কাছে চাবি দেওয়া, দারোয়ানের কাছে বাক্স রাখা, টিফিনের সময় বাহিরে যাওয়ার ভান করা এ সমস্ত তাহার শয়তানি। খামখা আমাদের আহাম্মক বানাইবার জন্যই সে মিছিমিছি এ কয়দিন ক্রমাগত একটা বাক্স বহিয়া বেড়াইতেছে।

সাধে কি বলি ‘পাগলা দাশু ?’

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প সুকুমার রায়

নন্দলালের মন্দ কপাল

— সুকুমার রায়

 

নন্দলালের ভারি রাগ, অঙ্কের পরীক্ষায় মাস্টার তাহাকে গোল্লা দিয়াছেন। সে যে খুব ভালো লিখিয়াছিল তাহা নয়, কিন্তু তা বলিয়া একেবারে গোল্লা দেওয়া কি উচিত ছিল? হাজার হোক সে একখানা পুরা খাতা লিখিয়াছিল তো ! তার পরিশ্রমের কি কোনো মূল্য নাই? ঐ যে ত্রৈরাশিকের অঙ্কটা, সেটা তো তার প্রায় ঠিক‌‌ই হ‌‌ইয়াছিল, কেবল একটুখানি হিসেবের ভুল হওয়াতে উত্তরটা ঠিক মেলে নাই। আর ঐ যে একটা ডেসিমাল অঙ্ক ছিল, সেটাতে গুণ করিতে গিয়া সে ভাগ করিয়া বসিয়াছিল, তাই বলিয়া কি একটা নম্বরও দিতে নাই? আরও অন্যায় এই যে, এই কথাটা মাস্টার মহাশয় ক্লাশের ছেলেদের কাছে ফাঁস করিয়া ফেলিয়াছেন। কেন? আর একবার হরিদাস যখন গোল্লা পা‌‌ইয়াছিল, তখন তো সে কথাটা রাষ্ট্র হয় নাই !

সে যে ইতিহাসের একশোর মধ্যে পঁচিশ পা‌‌ইয়াছে, সেটা বুঝি কিছু নয়? খালি অঙ্ক ভালো পারে নাই বলিয়াই তাহাকে লজ্জিত হ‌‌ইতে হ‌‌ইবে? সব বিষয়ে যে সকলকে ভালো পারিতে হ‌‌ইবে তাহারি বা অর্থ কি? স্বয়ং নেপোলিয়ান যে ছেলেবেলায় ব্যাকরণে একেবারে আনাড়ী ছিলেন, সে বেলা কি? তাহার এই যুক্তিতে ছেলেরা দমিল না, এবং মাস্টারের কাছে এই তর্কটা তোলাতে তাঁহারাও যে যুক্তিটাকে খুব চমৎ‌কার ভাবিলেন, এমন বোধ হ‌‌ইল না। তখন নন্দলাল বলিল, তাহার কপাল‌‌ই মন্দ— সে নাকি বরাবর তাহা দেখিয়া আসিয়াছে।

সেই তো যেবার ছুটির আগে তাহাদের পাড়ায় হাম দেখা দিয়াছিল, তখন বাড়িসুদ্ধো সকলেই হামে ভুগিয়া দিব্যি মজা করিয়া স্কুল কামাই করিল, কেবল বেচারা নন্দলালকেই নিয়মমতো প্রতিদিন স্কুলে হাজিরা দিতে হ‌‌ইয়াছিল। তারপর যেমন ছুটি আরম্ভ হ‌‌ইল, অমনি তাহাকে জ্বরে আর হামে ধরিল— ছুটির অর্ধেকটাই মাটি ! সেই যেবার সে মামার বাড়ি গিয়াছিল, সেবার তাহার মামাতো ভাই‌‌য়েরা কেহ ছিল না- ছিলেন কোথাকার এক বদমেজাজি মেশো, তিনি উঠিতে বসিতে কেবল ধমক আর শাসন ছাড়া আর কিছুই জানিতেন না। তাহার উপর সেবার এমন বৃষ্টি হ‌‌ইয়াছিল, একদিনও ভালো করিয়া খেলা জমিল না, কোথাও বেড়ানো গেল না। এই জন্য পরের বছর যখন আর সকলে মামার বাড়ি গেল তখন সে কিছুতেই যা‌‌ইতে চাহিল না। পরে শুনিল সেবার নাকি সেখানে চমৎ‌কার মেলা বসিয়াছিল, কোন রাজার দলের সঙ্গে পঁচিশটি হাতি আসিয়াছিল, আর বাজি যা পোড়ানো হ‌‌ইয়াছিল সে একেবারে আশ্চর্যরকম ! নন্দলালের ছোট ভাই যখন বার বার উৎ‌সাহ করিয়া তাহার কাছে এই সকলের বর্ণনা করিতে লাগিল, তখন নন্দ তাহাকে এক চড় মাড়িয়া বলিল, “যা যা ! মেলা বক্‌‌বক্‌‌ করিসনে !” তাহার কেবল মনে হ‌‌ইতে লাগিল সেবার সে মামার বাড়ি গিয়াও ঠকিল, এবার না গিয়াও ঠকিল ! তাহার মতো কপাল-মন্দ আর কেহ‌‌ নাই।

স্কুলেও ঠিক তাই। সে অঙ্ক পারে না- অথচ অঙ্কের জন্য দুই-একটা প্রা‌‌ইজ আছে- এদিকে ভুগোল ইতিহাস তাহার কণ্ঠস্থ কিন্তু ঐ দুইটার একটাতেও প্রাইজ নাই। অবশ্য সংস্কৃতেও সে নেহাত কাঁচা নয়, ধাতু প্রত্যয় বিভক্তি সব চট্‌‌পট্‌‌ মুখস্থ করিয়া ফেলে- চেষ্টা করিলে কি পড়ার ব‌‌ই আর অর্থ-পুস্তকটাকেও সড়গড় করিতে পারে না? ক্লাশের মধ্যে ক্ষুদিরাম একটু আধটু সংস্কৃত জানে- কিন্তু তাহা তো বেশি নয়। নন্দলাল ইচ্ছা করিলে কি তাহাকে হারা‌‌ইতে পারে না? নন্দ জেদ করিয়া স্থির করিল, ‘একবার ক্ষুদিরামকে দেখে নেব। ছোকরা এ বছর সংস্কৃতের প্রাইজ পেয়ে ভারি দেমাক করছে— আবার অঙ্কের গোল্লার জন্য আমাকে খোঁটা দিতে এসেছিল। আচ্ছা, এবার দেখা যাবে।’

নন্দলাল কাহাকেও কিছু না জানাইয়া সেইদিন হ‌‌ইতেই বাড়িতে ভয়ানক ভাবে পড়িতে শুরু করিল। ভোরে উঠিয়াই সে ‘হসতি হসত হসন্তি’ শুরু করে, রাত্রেও ‘অস্তি গোদাবরী তীরে বিশাল শল্মলীতরু’ বলিয়া ঢুলিতে থাকে। কিন্তু ক্লাশের ছেলেরা এ কথার বিন্দুবিসর্গও জানে না। পণ্ডিত মহাশয় যখন ক্লাশে প্রশ্ন করেন, তখন মাঝে মাঝে উত্তর জানিয়াও সে চুপ করিয়া মাথা চুলকা‌‌ইতে থাকে, এমন কি কখনো ইচ্ছা করিয়া দুই-একটা ভুল বলে, পাছে ক্ষুদিরাম তাহার পড়ার খবর টের পাইয়া আরও বেশি করিয়া পড়ায় মন দিতে থাকে। তাহার ভুল উত্তর শুনিয়া ক্ষুদিরাম মাঝে মাঝে ঠাট্টা করে, নন্দলাল তাহার কোনো জবাব দেয় না; কেবল ক্ষুদিরাম যখন নিজে যখন এক-একটা ভুল করে, তখন সে মুচকি মুচকি হাসে, আর ভাবে, ‘পরীক্ষার সময় অম্নি ভুল করলেই এবার ওঁকে সংস্কৃতের প্রাইজ আর পেতে হবে না।’

ওদিকে ইতিহাসের ক্লাশে নন্দলালের প্রতিপত্তি কমিতে লাগিল। কারণ, ইতিহাস আর ভুগোল নাকি এক রকম শিখিলেই পাশ করা যায়— তাহার জন্য নন্দর কোনো ভবনা নাই। তাহার সমস্ত মনটা রহিয়াছে ঐ সংস্কৃত পড়ার উপরে— অর্থাৎ‌ সংস্কৃত প্রাইজটার উপরে ! একদিন মাস্টার মহাশয় বলিলেন, “কি হে নন্দলাল, আজকাল বুঝি বাড়িতে কিছু পড়াশুনা কর না? সব বিষয়েই সে তোমার এমন দুর্দশা হচ্ছে তার অর্থ কি?” নন্দ আর একটু হ‌‌ইলেই বলিয়া ফেলিত, “আজ্ঞে সংস্কৃত পড়ি” কিন্তু কথাটাকে হঠাৎ‌ সামলা‌‌ইয়া “আজ্ঞে সংস্কৃত— না সংস্কৃত নয়” বলিয়াই সে থতমত খাইয়া গেল। ক্ষুদিরাম তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল, “ক‌‌ই সংস্কৃতও তো কিছু পারে না।” শুনিয়া ক্লাশসুদ্ধ ছেলে হাসিতে লাগিল। নন্দ একটু অপ্রস্তুত হ‌‌ইল বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিল— ভাগ্যিস্‌‌ তাহার সংস্কৃত পড়ার কথাটা ফাঁস হ‌‌ইয়া যায় নাই।

দেখিতে দেখিতে বছর কাটিয়া আসিলে, পরীক্ষার সময় প্রায় উপস্থিত। সকলে পড়ার কথা, পরীক্ষার কথা আর প্রাইজের কথা বলাবলি করিতেছে, এমন সময় একজন জিজ্ঞাসা করিল, “কি হে! নন্দ এবার কোন প্রাইজটা নিচ্ছ?” ক্ষুদিরাম নন্দর মতো গলা করিয়া ঘাড় নাড়িয়া বলিল, “আজ্ঞে সংস্কৃত— না সংস্কৃত নয়।” সকলে হাসিল, নন্দও খুব উৎ‌সাহ করিয়া সেই হাসিতে যোগ দিল। মনে ভাবিল, ‘বাছাধন, এ হাসি আর তোমার মুখে বেশিদিন থকছে না।’

যথাসময়ে পরীক্ষা আরম্ভ হ‌‌ইল এবং যথাসময়ে শেষ হ‌‌ইল। পরীক্ষার ফল জানিবার জন্য সকলে আগ্রহ করিয়া আছে, নন্দও রোজ নোটিশবোর্ডে গিয়া দেখে, তাহার নামে সংস্কৃত প্রাইজ পাওয়ার কোনো বিজ্ঞাপন আছে কিনা। তারপর একদিন হেডমাস্টার মহাশয় এক তাড়া কাগজ ল‌‌ইয়া ক্লাশে আসিলেন, আসিয়াই গম্ভীর ভাবে বলিলেন, এবার দুই-একটা নতুন প্রাইজ হয়েছে আর অন্য বিষয়েও কোনো কোনো পরিবর্তন হয়েছে।” এই বলিয়া তিনি পরীক্ষার ফলাফল পড়িতে লাগিলেন। তাহাতে দেখা গেল, ইতিহাসের জন্য কে যেন একটা রূপার মেডেল দিয়াছেন। ক্ষুদিরাম ইতিহাসে প্রথম হ‌‌ইয়াছে, সে-ই ঐ মেডেলটা ল‌‌ইবে। সংস্কৃতে নন্দ প্রথম, ক্ষুদিরাম দ্বিতীয়— কিন্তু এবার সংস্কৃতে কোনো প্রাইজ নাই।

হায় হায় ! নন্দর অবস্থা তখন শোচনীয় ! তাহার ইচ্ছা হ‌‌ইতেছিল সে ছুটিয়া গিয়া ক্ষুদিরামকে কয়েকটা ঘুঁষি লাগাইয়া দেয়। কে জানিত এবার ইতিহাসের জন্য প্রাইজ থাকিবে, আর সংস্কৃতের জন্য থাকিবে না। ইতিহাসের মেডেলটা তো সে অনায়াসেই পাইতে পারিত। কিন্তু তাহার মনের কষ্ট কেহ বুঝিল না— সবাই বলিল, “বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েছে— কেমন করে ফাঁকি দিয়ে নম্বর পেয়েছে।” দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া নন্দ বলিল, “কপাল মন্দ!”

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প সুকুমার রায়

আজব সাজা

— সুকুমার রায়

 

“পণ্ডিতমশাই, ভোলা আমায় ভ্যাংচাচ্ছে।” “না পণ্ডিতমশাই, আমি কান চুলকাচ্ছিলাম, তাই মুখ বাঁকা দেখাচ্ছিল !” পণ্ডিতমশাই চোখ না খুলিয়াই অত্যন্ত নিশ্চিন্ত ভাবে বলিলেন, “আঃ ! কেবল বাঁদরামি ! দাঁড়িয়ে থাক।” আধমিনিট পর্যন্ত সব চুপচাপ। তারপর আবার শোনা গেল, “দাঁড়াচ্ছিস না যে ?” “আমি দাঁড়াব কেন ?” “তোকেই তো দাঁড়াতে হবে।” “যাঃ আমায় বলেছে না আর কিছু ! গণশাকে জিগ্‌‌গেস কর ? কিরে গণশা, ওকে দাঁড়াতে বলেছে না ?” গণেশের বুদ্ধি কিছুটা মোটা, সে আস্তে আস্তে উঠিয়া গিয়া পণ্ডিতমশাইকে ডাকিতে লাগিল, “পণ্ডিতমশাই ! ও পণ্ডিতমশাই !”

পণ্ডিতমশাই বিরক্ত হ‌‌ইয়া বলিলেন, “কি বলছিস বল্‌‌ না।” গণেশচন্দ্র অত্যন্ত ব্যাকুলভাবে জিজ্ঞাসা করিল, “কাকে দাঁড়াতে বলেছেন, পণ্ডিতমশাই ?” পণ্ডিতমশাই কট্‌‌মটে চোখ মেলিয়াই সাংঘাতিক ধমক দিয়া বলিলেন, “তোকে বলেছি, দাঁড়া।” বলিয়াই আবার চোখ বুজিলেন।

গণেশচন্দ্র দাঁড়াইয়া রহিল। আবার মিনিটখানেক সব চুপচাপ। হঠাৎ‌ ভোলা বলিল, “ওকে এক পায়ে দাঁড়াতে বলেছিল না ভাই ?” গণেশ বলিল, “কক্ষনো না, খালি দাঁড়াতে বলেছে।” বিশু বলিল, “এক আঙুল তুলে দেখিয়েছিল, তার মানেই এক পায়ে দাঁড়া।” পণ্ডিতমশাই যে ধমক দিবার সময় তর্জনী তুলিয়াছিলেন, এ কথা গণেশ অস্বীকার করিতে পারিল না। বিশু আর ভোলা জেদ করিতে লাগিল, “শিগগির এক পায়ে দাঁড়া বলছি, তা না হলে এক্ষুণি বলে দিচ্ছি।”

গণেশ বেচারা ভয়ে ভয়ে তাড়াতাড়ি এক পা তুলিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। অমনি ভোলা আর বিশুর মধ্যে তুমুল তর্ক বাঁধিয়া গেল। এ বলে ডান পায়ে দাঁড়ানো উচিত, ও বলে, না, আগে বাঁ পা। গণেশ বেচারার মহা মুশকিল ! সে আবার পণ্ডিতমশাইকে জিজ্ঞাসা করিতে গেল, “পণ্ডিতমশাই, কোন্‌‌ পা ?”

পণ্ডিতমশাই তখন কি যেন একটা স্বপ্ন দেখিয়া অবাক হ‌‌ইয়া নাক ডাকাইতেছিলেন। গণেশের ডাকে হঠাৎ‌ তন্দ্রা ছুটিয়া যাওয়ায় তিনি সাংঘাতিক রকম বিষম খাইয়া ফেলিলেন। গণেশ বেচারা তার প্রশ্নের এ রকম জবাব একেবারেই কল্পনা করে নাই, সে ভয় পাইয়া বলিল, “ঐ যা কি হবে ?” ভোলা বলিল, “দৌড়ে জল নিয়ে আয়।” বিশু বলিল, “শিগ্‌‌গির মাথায় জল দে।” গণেশ এক দৌড়ে কোথা হ‌‌ইতে একটা কুঁজা আনিয়া ঢক্‌‌ঢক্‌‌ করিয়া পণ্ডিতমশায়ের টাকের উপর জল ঢালিতে লাগিল। পণ্ডিতমশায়ের বিষম খাওয়া খুব চট্‌‌পট্‌‌ থামিয়া গেল, কিন্তু তাঁহার মুখ দেখিয়া গণেশের হাতে জলের কুঁজা ঠক্‌‌ঠক্‌‌ করিয়া কাঁপিতে লাগিল।

ভয়ে সকলেই খুব গম্ভীর হ‌‌ইয়া রহিল, খালি শ্যামলাল বেচারার মুখটাই কেমন যেন আহ্লাদি গোছের হাসি হাসি মতো, সে কিছুতেই গম্ভীর হ‌‌ইতে পারিল না। পণ্ডিতমশায়ের রাগ হঠাৎ‌ তার উপরেই ঠিক্‌‌রাইয়া পড়িল। তিনি বাঘের মতো গুম্‌‌গুমে গলায় বলিলেন, “উঠে আয় !” শ্যামলাল ভয়ে কাঁদ কাঁদ হ‌‌ইয়া বলিল, “আমি কি করলাম? গণশা জল ঢাল্‌‌ল, তা আমার দোষ কি?” পণ্ডিতমশাই মানুষ ভালো, তিনি শ্যামলালকে ছাড়িয়া গণ্‌‌শার দিকে তাকাইয়া দেখেন তাহার হাতে তখনও জলের কুঁজা। গণেশ কোনো প্রশ্নের অপেক্ষা না করিয়াই বলিয়া ফেলিল, “ভোলা আমাকে বলেছিল।” ভোলা বলিল, “আমি তো খালি জল আনতে বলেছিলম। বিশু বলেছিল, মাথায় ঢেলে দে।” বিশু বলিল, “আমি কি পণ্ডিতমশায়ের মাথায় দিতে বলেছি? ওর নিজের মাথায় দেওয়া উচিত ছিল, তাহলে বুদ্ধিটা ঠাণ্ডা হত।”

পণ্ডিতমশাই খানিকক্ষণ কটমট করিয়া সকলের দিকে তাকাইয়া তারপর বলিলেন, “যা ! তোরা ছেলেমানুষ তাই কিছু বললাম না। খবরদার আর অমন করিসনে।” সকলে হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল, কিন্তু পণ্ডিতমশাই কেন যে হঠাৎ‌ নরম হ‌‌ইয়া গেলেন কেহ তাহা বুঝিল না। পণ্ডিতমশায়ের মনে হঠাৎ‌ যে তাঁর নিজের ছেলেবেলার কোন দুষ্টুমির কথা মনে পড়িয়া গেল, তাহা কেবল তিনি‌‌ই জানেন।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প সুকুমার রায়

এক বছরের রাজা

–সুকুমার রায়

এক ছিলেন সওদাগর— তাঁর একটি সামান্য ক্রীতদাস তাঁর একমাত্র ছেলেকে জল থেকে বাঁচায়। সওদাগর খুশি হয়ে তাকে মুক্তি তো দিলেনই, তা ছাড়া জাহাজ বোঝাই ক’রে নানা রকম বাণিজ্যের জিনিস তাকে বকশিশ দিয়ে বললেন, “সমুদ্র পার হয়ে বিদেশে যাও— এই সব জিনিস বেচে যা টাকা পাবে, সবই তোমার।” ক্রীতদাস মনিবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে জাহাজে চড়ে রওনা হল বাণিজ্য করতে।

কিন্তু বাণিজ্য করা আর হল না। সমুদ্রের মাঝখানে তুফান উঠে জাহাজটিকে ভেঙ্গে-চুরে জিনিসপত্র লোকজন কোথায় যে ভাসিয়ে নিল, তার আর খোঁজ পাওয়া গেল না।

ক্রীতদাসটি অনেক কষ্টে হাবুডুবু খেয়ে, একটা দ্বীপের চড়ায় এসে ঠেকল। সেখানে ডাঙ্গায় উঠে সে চারিদিকে চেয়ে দেখল, তার জাহাজের চিহ্নমাত্র নাই, তার সঙ্গের লোকজন কেউ নাই। তখন সে হতাশ হয়ে সমুদ্রের ধারে বালির উপর বসে পড়ল। তারপর যখন সন্ধ্যা হয়ে এল, তখন সে উঠে দ্বীপের ভিতর দিকে যেতে লাগল। সেখানে বড় বড় গাছের বন— তারপর প্রকাণ্ড মাঠ, আর তারই ঠিক মাঝখানে চমৎকার শহর। শহরের ফটক দিয়ে মশাল হাতে মেলাই লোক বার হচ্ছে। তাকে দেখতে পেয়েই সেই লোকেরা চীৎকার ক’রে বলল, “মহারাজের শুভাগমন হোক। মহারাজ দীর্ঘজীবী হউন।” তারপর সবাই তাকে খাতির ক’রে জমকালো গাড়িতে চড়িয়ে প্রকাণ্ড এক প্রাসাদে নিয়ে গেল। সেখানের চাকরগুলো তাড়াতাড়ি রাজপোশাক এনে তাকে সাজিয়ে দিল।

সবাই বলছে, ‘মহারাজ’,’মহারাজ’, হুকুম মাত্র সবাই চট্‌পট্‌ কাজ করছে, এসব দেখেশুনে সে বেচারা একেবারে অবাক। সে ভাবল সবই বুঝি স্বপ্ন— বুঝি তার নিজেরই মাথা খারাপ হয়েছে তাই এরকম মনে হচ্ছে। কিন্তু ক্রমে সে বুঝতে পারল সে জেগেই আছে আর দিব্যি জ্ঞানও রয়েছে, আর যা যা ঘটছে সব সত্যিই। তখন সে লোকদের বলল, “এ কি রকম হচ্ছে বল তো? আমি তো এর কিছুই বুঝছি না। তোমরা কেনই বা আমায় ‘মহারাজ’ বলছ আর কেনই বা এমন সম্মান দেখাচ্ছ?”

তখন তাদের মধ্যে থেকে এক বুড়ো উঠে বলল, “মহারাজ, আমরা কেউ মানুষ নই— আমরা সকলেই প্রেতগন্ধর্ব— যদিও আমাদের চেহারা ঠিক মানুষের মতো। অনেক দিন আগে আমরা, ‘মানুষ রাজা’ পাবার জন্য সবাই মিলে প্রার্থনা করেছিলাম; কারণ মানুষের মতো বুদ্ধিমান আর কে আছে? সেই থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের মানুষ রাজার অভাব হয়নি। প্রতি বৎসরে একটি ক’রে মানুষ এইখানে আসে আর আমরা তাকে এক বৎসরের জন্য রাজা করি। তার রাজত্ব শুধু ঐ এক বৎসরের জন্যই। বৎসর শেষ হলেই তাকে সব ছাড়তে হয়। তাকে জাহাজে ক’রে সেই মরুভূমির দেশে রেখে আসা হয়, সেখানে সামান্য ফল ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় না— আর সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে বালি না খুঁড়লে এক ঘটি জলও মেলে না। তারপর আবার নূতন রাজা আসে— এই রকমে বৎসরের পর বৎসর আমাদের চলে আসছে।”

তখন দাসরাজা বললেন, “আচ্ছা বল তো— এর আগে তোমাদের রাজারা কি রকম স্বভাবের লোক ছিলেন?” বুড়ো বলল, “তাঁরা সবাই ছিলেন অসাবধান আর খামখেয়ালি। সারাটি বছর সবাই শুধু জাঁকজমক আমোদে আহ্লাদে দিন কাটাতেন— বছর শেষে কি হবে সে কথা ভাবতেন না।”

নতুন রাজা মন দিয়ে সব শুনলেন, বছরের শেষে তাঁর কি হবে এই কথা ভেবে ক’দিন তাঁর ঘুম হল না।

তারপর সে দেশের সকলের চেয়ে জ্ঞানী আর পণ্ডিত যারা, তাদের ডেকে আনা হল, আর রাজা তাদের কাছে মিনতি ক’রে বললেন, “আপনারা আমাকে উপদেশ দিন— যাতে বছর শেষে এই সর্বনেশে দিনের জন্য প্রস্তুত হতে পারি।”

তখন সবচেয়ে প্রবীণ বৃদ্ধ যে, সে বলল, “মহারাজ, শূন্য হাতে আপনি এসেছিলেন, শূন্য হাতেই আবার সে দেশে যেতে হবে— কিন্তু এই এক বছর আপনি আমাদের যা ইচ্ছা তাই করাতে পারেন। আমি বলি— এই বেলা রাজ্যের ওস্তাদ লোকদের সে দেশে পাঠিয়ে, সেখানে বাড়ি ক’রে, বাগান ক’রে, চাষবাসের ব্যবস্থা ক’রে চারিদিক সুন্দর করে রাখুন। ততদিনে ফলে ফুলে দেশ ভরে উঠবে, সেখানে লোকের যাতায়াত হবে। আপনার এখানকার রাজত্ব শেষ হতেই সেখানে আপনি সুখে রাজত্ব করবেন। বৎসর তো দেখতে দেখতে চলে যাবে, অথচ কাজ আপনার ঢের; কাজেই বলি, এই বেলা খেটে-খুটে সব ঠিক ক’রে নিন।” রাজা তখনই হুকুম দিয়ে লোকলস্কর, জিনিসপত্র, গাছে চারা, ফলের বীজ, আর বড় বড় কলকব্জা পাঠিয়ে, আগে থেকে সেই মরুভূমিকে সুন্দর ক’রে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখলেন।

তারপর বছর যখন ফুরিয়ে এল, তখন প্রজারা তাঁর ছত্র মুকুট রাজদণ্ড সব ফিরিয়ে নিল, তাঁর রাজার পোশাক ছাড়িয়ে এক বছর আগেকার সেই সামান্য কাপড় পরিয়ে, তাঁকে জাহাজে তুলে সেই মরুভূমির দেশে রেখে এল। কিন্তু সে দেশ আর এখন মরুভূমি নেই— চারিদিকে ঘর বাড়ি, পথ ঘাট, পুকুর বাগান। সে দেশ এখন লোকে লোকারণ্য। তারা সবাই এসে ফুর্তি ক’রে শঙ্খ ঘণ্টা বাজিয়ে তাঁকে নিয়ে সিংহাসনে বসিয়ে দিল। এক বছরের রাজা সেখানে জন্ম ভরে রাজত্ব করতে লাগলেন।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা উপন্যাস গল্প জীবনী ও স্মৃতিকথা বিনোদন ভয়ংকর(হরর) ভালবাসা/প্রণয়লীলা ভুতুরে গল্প সৃজনশীল প্রকাশনা

বিষন্ন বিরিওজা-৫,৬,৭,৮ ও ৯

—ডঃ রমিত আজাদ

বিষন্ন বিরিওজা – ৫

 

(পূর্ব প্রকাশিতের পর থেকে) :::::::: অন্যান্য (বিষন্ন বিরিওজা’র ১,২,৩ ও ৪ )পর্বগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন

বিকেল বেলাটায় আমার মনটা খুব বিষন্ন হয়ে ওঠে। আমি জানিনা কেন। সত্যিই জানিনা। ছেলেবেলার কোন ঘটনা কি এর সাথে জড়িত? আমি অনেক মনে করার চেষ্টা করেছি। কিছুতেই মনে করতে পারিনি। অবচেতন মনে কি কিছু রয়ে গেছে? কে জানে!

আগেই বলেছি যে আমার রূমটা ছিল অনেকটা ক্লাবের মত। দেশী-বিদেশী বহু বন্ধুরা আমার রূমে আসতো। ডরমিটরির বাইরে থেকেও আসতো। অথচ ঠিক বিকালটায় কেউই আসতো না। কেন? কে জানে! এটাও একটা আশ্চর্য্য ব্যাপার। সামারের দিনগুলোতে বাইরে কোথাও না বেরোলে আমি একাই থাকতাম। বই পড়তাম অথবা টিভি দেখতাম। কখনো কখনো
জানালায় দাঁড়িয়ে শিশুর মত ঘন নীল আকাশে মেঘের বর্ণচ্ছটা দেখতাম।

কোন কোন দিন খুব বেশী মন খারাপ হলে হুমায়ুন আহমেদের ‘ইরিনা’ পড়তাম। চমৎকার একটা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লিখেছেন উনি। উনার বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী সমগ্র – ১, আমি দেশ থেকে নিয়ে এসেছিলাম। বইটার ভূমিকায় উনি লিখেছিলেন, রাশিয়ান বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী পড়ে তিনি ভীষণ প্রভাবিত হয়ে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লেখার সিদ্ধান্ত নেন। রাশিয়ান বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী যে দুর্দান্ত সেটা আমি আগেও জানতাম। হুমায়ুন আহমেদের লেখা পড়ার আগেই আমি পড়েছিলাম ‘রুশ বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী’ নামে একটি বই। বেশ কয়েকটি গল্প ছিল সেখানে। বইয়ের প্রতিটি গল্পই অসাধারণ। আমি অভিভুত হয়ে গিয়েছিলাম। যাহোক সেগুলোর অনুকরণে লেখা হুমায়ুন আহমেদের লেখাগুলো, যেমন – ইরিনা, তোমাদের জন্য ভালোবাসা, তারা তিনজন, ইত্যাদি ভালোই হয়েছে। অনেকে উনার লেখার গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আমি সাধারণ পাঠক অত তত্বকথা বুঝিনা। হুমায়ুন আহমেদের লেখাগুলো পড়তে ভালো লাগে তাই পড়ি। উনার ‘সবাই গেছে বনে’ তো ভীষণ টাচি। বিদেশে আসার পর মনে হলো আমি ঐ গল্পের মধ্যেই প্রবেশ করেছি। মনে হয় আমেরিকার ফার্গোর মত ইউক্রেনের খারকভও বরফে আকন্ঠ ডুবে আছে। গল্পের নায়িকা চঞ্চল মালিশার মতো প্রজাপতির পাখায় উড়ে সব মেয়েরা আমার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

টুক টুক টুক। দরজায় নক করার শব্দ শুনতে পেলাম। এই পড়ন্ত বিকালে আমার রুমে কখনোই কেউ আসেনা। ভুল শুনছি নাতো? কান খাড়া করলাম। আবারো শুনলাম, টুক টুক টুক। নাহ্‌ ঠিকই আছে, শব্দটা আমার দরজায়ই। কেউ এসেছে। কে? সাশা? খালেদ? বাঙালীদের কেউ? যেই আসুক, ভালোই। গল্প করা যাবে। গল্প করে আমার বিষন্ন মনটা কিছুটা হলেও হালকা হবে।

দরজা খুলে সামনে যাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম, তাতে রীতিমতো অবাকই হলাম। যিনি ইতিপূর্বে আমার রূমে কখনোই আসেননি। এবং এর আগে তার সাথে আমার কুশল বিনিময় ছাড়া আর কোন আলাপই হয়নি। তার উপর তিনি পুরুষ নন, বরং একজন লাজুকলতা রমনী। রমনী বলা কি ঠিক হচ্ছে? সে তো নিতান্তই বালিকা, সদ্য যৌবনপ্রাপ্তা। মনে মনে আমি যার নাম দিয়েছিলাম, ‘বার্চ বনের প্রণরেনী’।

তাতিয়ানাঃ আমি কি ভিতরে আসতে পারি?
রিনরিনে মিস্টি কন্ঠ তাতিয়ানার। অনেকটাই বিস্মিত স্বরে বললাম

আমিঃ অবশ্যই, অবশ্যই।
তাতিয়ানাঃ অবশ্যই, অবশ্যই বলছো কিন্তু পথ তো ছেড়ে দিচ্ছ না।
আমিঃ ওহ্‌, সরি।
আমি দরজা থেকে সরে দাঁড়ালাম। লাস্যময়ী ভঙ্গিতে হেটে গিয়ে, লাবণ্য-লালিত মরালিনির ভঙ্গিতে ডিভানে গিয়ে বসলো তাতিয়ানা। আমি ডিভানে ওর পাশে না বসে, ওর থেকে সামান্য দূরত্বে একটা চেয়ারে বসলাম।

আমিঃ তোমার কি সাহায্যে আসতে পারি বলো?
তাতিয়ানাঃ তেমন কিছু না তোমার রূমে ‘প্রোস্তা মারিয়া’ দেখতে এসেছি। চোখে কৌতুক নাচিয়ে বললো তাতিয়ানা।

আমিঃ ও আচ্ছা। ঠিক আছে চ্যানেল চেইন্জ করে দিচ্ছি। দশ মিনিট পরে শুরু হবে বোধহয়।
তাতিয়ানাঃ দা, ইয়েসলি মোঝনা (ইয়েস প্লিজ)। (বলে ও মিস্টি করে হাসলো)।
‘প্রোস্তা মারিয়া’ একটি ল্যাটিন আমেরিকান টেলি সিরিয়াল। এখন বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেনে। এই সময়টাতে চারিদিকে খুব শুনসান থাকে, কারণ সবাই টিভি সেটের সামনে। বিশেষতঃ মেয়েরা।

‘প্রোস্তা মারিয়া’ একটি ভালোবাসার গল্প। মেক্সিকোর কাহিনী। সদ্য যৌবনপ্রাপ্তা তরুণী গ্রাম থেকে শহরে এসেছে ভাগ্যান্বেষণে। একটি বাড়িতে অনেকটাই পরিচারিকার কাজ নেয়, মারিয়া নামের মেয়েটি। তাঁর রূপ-সৌন্দর্য্য সরলতা এই সব কিছুতে মুগ্ধ হয়ে গৃহকর্তার তরুণ ছেলেটি মারিয়ার প্রেমে পড়ে যায়। ধীরে ধীরে তা গভীর সম্পর্কে রূপ নেয়। কিন্তু তাদের মধ্যে ছিল সামাজিক শ্রেণী বৈষম্যের ব্যারিয়ার। তাই তাদের সম্পর্ক কোন স্থায়ী পরিণতি বা হ্যাপী এন্ডের দিকে যেতে পারেনা। বরং এই সম্পর্কের কথা জানাজানি হয়ে গেলে মারিয়াকে সেই বাড়ি ছাড়তে হয়। কিন্তু ইতিমধ্যে তার গর্ভে এসেছে গৃহকর্তার তরুণ ছেলের সন্তান। বাইরে এসে মারিয়ার শুরু হলো কঠিন জীবন সংগ্রাম। ভালোবাসার কাছে পরাজিত কিন্তু প্রবল মনোবল সম্পন্ন সিঙ্গল মাদার মারিয়া এই সংগ্রামে বিজয়ী হয়। ‘প্রোস্তা মারিয়া (সাধারণ মারিয়া) থেকে সে হয়ে ওঠে অসাধারণ মারিয়া। এই নিয়েই মূলতঃ টেলি-সিরিয়ালটির কাহিনী। রাশিয়ানরা ফিল্ম জগতে বস্‌ হলেও, এই জাতীয় টেলি-সিরিয়াল তাদের দেশে প্রচলিত ছিলনা। তাছাড়া তাদের দেশের সমাজ জীবনের সাথে ল্যাটিন আমেরিকার সমাজ জীবন খাপ খায়না। কিন্তু তার পরেও এই আনইউজুয়াল সিরিয়ালটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এখানে। সবাই বেশ গোগ্রাসে গিলছে।

আমিঃ তোমার ‘প্রোস্তা মারিয়া’ ভালো লাগে?
তাতিয়ানাঃ হু, খুব ভালো লাগে। বাড়ীতে থাকতে একটা এপিসোডও মিস করি নাই। ডরমিটরিতে আসার পর দুয়েকটা মিস হয়ে গিয়েছে। আজ ভাবলাম তোমার কাছে যাই।

আমিঃ তোমার বাড়ি কোথায়?
তাতিয়ানাঃ গ্রামে, এখান থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে হবে।
আমিঃ তুমি গ্রামে থাকো?
তাতিয়ানাঃ হু, একদম গ্রামের মেয়ে। জানো গ্রামের মেয়েরা …………..।
কথা শেষ হওয়ার আগেই সিরিয়াল শুরু হয়ে গেল। আর তাতিয়ানার মনযোগ ঐদিকে চলে গেলো। আমি কফি বানাতে শুরু করলাম। দুকাপ কফি বানিয়ে ফোল্ডিং টেবিল খুলে, একটি কাপ ওর সামনে রাখলাম। ও আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে ধন্যবাদ জানালো। আমি কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে চুপচাপ ওকে দেখতে লাগলাম।

রাশিয়া-ইউক্রেনের মেয়েরা প্রায় সবাইই চোখ ধাঁধানো সুন্দরী হয়। তাতিয়ানা মেয়েটি সেই তুলনায় দেখতে তেমন সুন্দরী নয়।
অল্পবয়সী বলে একটা লাবণ্য আছে মাত্র। কাঁচা বয়সে নারী দেহের বাঁকগুলোর দিকে নজর যেতনা আমার, এখন যায়। তাতিয়ানা একমনে সিরিয়াল দেখছিলো। এই সুযোগে আমি ভালো করে ওকে দেখলাম। কাজটা কি এথিকাল? মনে হয় না। কিন্তু তারপরেও এটা ঘটে। পুরুষের চোখ নারীর দেহের বাঁকগুলোর দিকে বার বার চলে যায়। ওর পরনে ছিলো একটি লং স্কার্ট, আর টপস্‌। টাইট ফিট না, আবার ঢিলে-ঢালাও নয়। তাতিয়ানার শরীর পুরুষ্টু নয়, একে ভাদ্রের ভরা নদী বলা যাবেনা। হালকা গড়ন। তার দেহের বাঁকগুলো তেমন আকর্ষনীয় নয়। অল্প বয়সের কারণে স্বাভাবিক লাবণ্য থাকলেও ওর দেহের দীপ্তি সৌরভে মনে নেশা ধরানোর কিছু নেই।

হঠাৎ লুবনার কথা মনে হলো। লুবনার দেহের বাঁকগুলো কেমন? মনে করার চেষ্টা করলাম। না কিছুতেই মনে পড়ছে না। বুঝলাম মনে পড়ার কথাও না। লুবনাকে যখন দেশে রেখে এসেছি, তখন আমার কাঁচা বয়স ছিলো। ঐ বয়সে নারী দেহের বাঁকগুলোর দিকে নজর যেত না। বরং সবসময়ই মনে হয়েছে পূর্ণ রূপলালিত্যে ও যেন একটি প্রস্ফুটিত গোলাপ, একরাশ রজনীগন্ধার প্রশান্তি। আর লুবনাকে আমি ভালোবাসি। যাকে ভালোবাসি তাকে নিয়ে ওসব কথা ভাবা যায়না বোধহয়। অন্ততপক্ষে আমি কখনো ভাবিনি। ওকে আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখি। ও লুবনা, আমার লুবনা এটাই আমার কাছে সব। আর কোন কিছুই আমার কাছে কোন গুরুত্ব বহন করেনা।

ঐদিন টেলিসিরিয়াল দেখে ও চলে যায়। আর কোন কথা হয়নি। পরদিন বিকেলে আবারো যথারীতি আমার মন খুব খারাপ। বিশাল কাঁচের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আকাশে মেঘের খেলা দেখছিলাম। জানালার ডানপাশের বিরিওজা গাছটির পাতাগুলো গ্রীস্মের মাতাল বাতাসে তির তির করে কাঁপছিলো। কিছুটা দূরে ডরমিটরির একদল ছেলে মেয়ে ভলিবল খেলছিলো। সামারে এই একটা মজা, আউটডোর গেমস বেশ ভালো জমে। লেনা নামের একটি স্বাস্থ্যবতী সুন্দরী মেয়ে খুব ভালো খেলছিলো। ছেলেরাও পেরে উঠছিলো না। এই মেয়েটি সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে গত বছর যখন ও প্রথম ডরমিটরিতে আসে, ওর রূপের ঝলকানী দেখে অনেক পুরুষই নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। আমরা দর্শকরা আগ্রহ নিয়ে দেখছিলাম, শেষ পর্যন্ত মেয়েটিকে কে পায়। শেষমেশ যা হলো তাতে আমি হতাশই হয়েছিলাম। মেয়েটি অবশেষে ধরা দিয়েছিলো বিবাহিত একজন পুরুষের কাছে। তার সাথেই এখনো আছে। বিবাহিত পুরুষ আলেগ স্ত্রী নিয়ে আমাদের ডরমিটরিতেই থাকতো। প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর আলেগের স্ত্রী বাবার বাড়ী চলে গিয়েছিলো। আলেগ একা ডরমিটরিতে, সেই সময়েই লেনার সাথে আলেগের সম্পর্ক হয়। এরপর আর আলেগের স্ত্রীকে ডরমিটরিতে দেখিনি। লোকমুখে শুনছি তাদের মধ্যে ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে। আলেগ এখন লেনার সাথে লিভ টুগেদার করছে। সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে কি কি সব ঘটে! এসব দেখলে মন খারাপ হয়ে যায়।

টুক টুক টুক দরজায় নক করার শব্দ পেলাম। কে এলো এই ভর বিকেলে? দরজা খুলে দেখলাম গতকালকের তাতিয়ানা মুখে হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

তাতিয়ানাঃ কি হলো? আজও পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছো! ঢুকতে দেবেনা?
আমিঃ ও, হ্যাঁ, এসো এসো ভিতরে এসো। (অপ্রস্তুত হয়ে বললাম )।
গতকালের চাইতে কম জড়তা নিয়ে ও গিয়ে বসলো ডিভানে।
তাতিয়ানাঃ টিভি সেট অফ যে?
আমিঃ ও, না, মানে কিছু দেখছি না তো।
তাতিয়ানাঃ কি করো রূমে বসে বসে? বোর ফীল করোনা।
আমিঃ উঁ কিছুটা। মানে এখন কিছু করার নাই তো।
তাতিয়ানাঃ প্রোস্তা মারিয়া শুরু হতে আর পনের মিনিট বাকী। টিভি সেটটা অন করো।
আমিঃ ও হ্যাঁ, অন করছি। (আমি টিভি অন করলাম)
তাতিয়ানাঃ তোমার মন খারাপ মনে হচ্ছে?

আমি কৌতুক করার জন্য বললাম

আমিঃ মন খারাপ ছিলো তবে তোমাকে দেখে মন ভালো হয়ে গিয়েছে।
তাতিয়ানাঃ উঃ ফাজলামো না?
আমিঃ না, ফাজলামো হবে কেন? এমন সুন্দরী এক তরুনীকে দেখলে কোন ছেলের মন ভালো হয়না বলো?
মুহুর্তের মধ্যে ওর মুখে খুশীর ঝলক ছড়িয়ে পড়লো। কপট রাগ দেখিয়ে বললো
তাতিয়ানাঃ তুমি জোক করছো!
আমি ভাবলাম, এই মিথ্যে কথাটা বলা ঠিক হয়নি। ও সিরিয়াসলি নিলে তো কাজটা ভালো হবে না। পরমুহুর্তেই ভাবলাম। নাহ্ সিরিয়াসলি নেবেই বা কেন? দুদিনের মাত্র পরিচয়। তাছাড়া এদেশের মেয়েরা অত আবেগ প্রবন বলে মনে হয়না।

আমিঃ ইউনিভার্সিটিতে কেমন লাগছে?
তাতিয়ানাঃ ভালো।
আমিঃ কি ভালো?
তাতিয়ানাঃ সব ভালো।
আমিঃ তোমার বাড়ীর চাইতেও ভালো?
তাতিয়ানাঃ বাড়ী, না। মানে বাড়ী আর ডর্ম দুটা দুরকম। আমি আাসলে এর আগে ‘টেখ্‌নিকুমে’ পড়তাম। (টেখ্‌নিকুম হলো টেকনিকাল স্কুল যেখানে ক্লাস এইট শেষ করার পর ভর্তি হয় এবং তিন বছরের জন্য ভোকেশনাল ট্রেনিং ও পড়ালেখা করে। এটা শেষ করার পর একজন টেকনিশিয়ানের পেশায় যোগ দিতে পারে, আবার কেউ চাইলে ইউনিভার্সিটিতেও ভর্তি হতে পারে)

আমিঃ ও, কোথায় পড়তে।
তাতিয়ানাঃ এই খারকভেই। সালতাভকা এলাকায় আমার হোস্টেল ছিলো।
আমিঃ তাহলে তো তুমি খারকভে নতুন না।
তাতিয়ানাঃ না, নতুন না। কিন্তু ওখানকার হোস্টেলের পরিবেশ ভালো ছিল না। সেই হিসাবে এই ডরমিটরি অনেক সুন্দর।
আমিঃ কি খারাপ ছিলো ওখানে?
তাতিয়ানাঃ ওখানকার হোস্টেলে ম্যানেজমেন্ট খারাপ ছিল। কোন সিকিউরিটি ছিলো না। মাঝে মাঝে স্থানীয় লোকজন হোস্টেলে ঢুকে মেয়েদের ডিস্টার্বও করতো।
আমিঃ কি বলো? (আস্চর্য্য হয়ে বললাম আমি। অবশ্য এই জাতীয় কথাবার্তা আমি আগেও শুনেছি)।
তাতিয়ানাঃ হ্যাঁ, এরকমই। আমাদের দেশে তো মেয়েদের সম্মান বলে কিছু নেই!

আমি মনে মনে একটা দীর্গশ্বাস ফেললাম। দেশে থাকতে তথাকথিত প্রগতিশীলদের বক্তব্য শুনতাম। বাংলাদেশে মেয়েদের সম্মান বলে কিছু নাই। বাংলাদেশ তথা মুসলিম সমাজে নারীরা বন্দি। আর পাশ্চাত্যে নারীরা মুক্ত স্বাধীন। এখানে এসে চোখের সামনে যা দেখেছি ও দেখছি তার সাথে ঐ ধারণার কোন মিলই খুঁজে পাইনি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পট পরিবর্তনের পর পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। ইদানিং নারী একেবারেই এনজয়মেন্টের ইনস্ট্রুমন্ট হয়ে গিয়েছে। জায়গায় জায়গায় নাইট ক্লাব জেন্টেলম্যান্‌স ক্লাব খোলা হয়েছে। বৈধ-অবৈধ ব্রথেল খোলা হয়েছে। পর্নো পত্রিকায় দেশ ছেয়ে গেছে। এসব জায়গায় স্ট্রীপ শো থেকে শুরু করে নানা কর্মে মেয়েদের ব্যবহার করা হচ্ছে। পত্র-পত্রিকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ওপেনলি এইসব কাজে মেয়ে যোগারের বিজ্ঞাপন দেয়া হচ্ছে, ‘উচ্চ আয়ের সুযোগ আছে, কমপ্লেক্সহীন মেয়ে চাই’। এই কমপ্লেক্সহীন বলতে তারা কি বোঝাতে চাইছে? লজ্জাহীন, জড়তাহীন, নির্লজ্জ? তারা কি এই বোঝাতে চাইছে যে, লজ্জা-হায়া থাকা খারাপ, আনস্মার্টনেস? হায়রে!

আশ্চর্য দর্শন এই যে, মহিলা যখন
বিমানে বিমানবালা হয়ে মানুষের সেবা করে, তাদের সামনে ট্রে সাজিয়ে পরিবেশন করে এবং তাদের কামাসক্ত দৃষ্টিতে বিদ্ধ হয় তখন তা হয় ‘স্বাধীনতা’। পক্ষান্তরে সে যদি নিজের ঘরে নিজের জন্য, স্বামী ও সন্তানের জন্য, পিতামাতার জন্য খাবার রান্না করে তাহলে তা পরাধীনতা। এই আশ্চর্য দর্শনে নারীকে ভুলিয়ে বণিক সম্প্রদায় তাকে ব্যবহার করেছে বাণিজ্যিক স্বার্থে। তাকে বানানো হয়েছে প্রদর্শনীর বস্তু। সেলসগার্ল দরকার তো মহিলা হতে হবে, পণ্য বিক্রির প্রয়োজন তো মহিলারই বিক্রি করতে হবে। যেন তার রূপ- সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মানুষ পণ্য ক্রয় করে। তার প্রতিটি অঙ্গ খোলা বাজারের পণ্যে পরিণত হয়েছে। যে কোন মেলায় মেয়েদের ডেকোরেশন পিস হিসাবে দাঁড় করিয়ে রাখা হয় স্টলে। ইউরোপের কিছু কিছু এক্সিবিশনে তো একেবারে টু পিস পরিয়েও দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। ধনী বসের সেক্রেটারি হতে হবে সুন্দরী তরুনী, এমন কোনো বিজ্ঞাপন পাওয়া যাবে না, যাতে নারীর ছবি নেই। সেই সব ছবিতে নারীর পোষাক দিন দিনই সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছে। নারীকে পণ্য বানিয়ে নিজেরা অর্থ উপার্জন করছে। এর নাম দিয়েছে নারী স্বাধীনতা।

টেলিসিরিয়ালটি শেষ হওয়ার পর, গতকালের মত তাতিয়ানা সাথেসাথে উঠে গেল না। বুঝলাম ও আরো কিছু সময় বসতে চাইছে। বললাম

আমিঃ আর এক কাপ কফি খাই আমরা?
তাতিয়ানাঃ উ, না কফি না। কফি খেলাম তো। চা দিতে পারবে?
এমনভাবে বললো যেন আমরা অনেক দিনের বন্ধু। চা খেতে খেতে ও বললো

তাতিয়ানাঃ বাহ্‌, বেশ টেস্টি চা তো!
আমিঃ হ্যাঁ, আমাদের দেশের চা। আমি দেশ থেকে আনিয়েছি।
তাতিয়ানাঃ ও তাই। তোমাদের দেশে টেস্টি চা হয় আমি জানি।
আমিঃ কোথা থেকে জানলে?
তাতিয়ানাঃ জানি তো। ইন্ডিয়া, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা এসমস্ত দেশের চা খুব ভালো। আমাদের ক্রাসনাদার চা কোনরকম। আমার কাছে একেবারে পানসে লাগে। ইন্ডিয়ান চা আগে অনেক খেয়েছি। বাংলাদেশের চা এই প্রথম খেলাম।
ইত্যাদি আরো কিছু হালকা আলাপ-আলোচনার পর ও বিদায় নিলো।

পরদিন ক্লাস শেষে। ভাবলাম ডরমিটরিতে না গিয়ে একটু কোথাও ঘুরতে যাই। সামার ভ্যাকেশন তো কয়েকদিন আগে শেষ হয়ে গিয়ে এখন পুরো দমে ক্লাস শুরু হয়ে গিয়েছে। ভ্যাকেশন টাইমে যখন-তখন যেখানে-সেখানে বেড়ানো যেত। এখন তো নিজের ক্লাস রয়েছে, কারো রূমে যদি বেড়াতে যেতে চাই তারও ক্লাস আছে। তাই বিকেলটাই, বেড়ানোর জন্য ব্যবহার করতে হয়। যতদিন সামারের উষ্ণতা আছে, তারপর তো আবার ঠান্ডা শুরু যাবে তখন আর এত আরামে ঘোরাঘুরি করা যায়না। কোথায় যাব? কবীর ভাইদের ওখানে যাই। শহরের ঐ দিকটা আমার ভালো লাগে। তারপর হঠাৎ তাতিয়ানার কথা মনে হলো। মেয়েটা যদি, আমার রূমে এসে ফিরে যায়! বেচারী টেলিসিরিয়ালটা খুব পছন্দ করে। তারপর আবার ভাবলাম। ওর কথা ভেবে কি হবে? আমি আমার কথা ভাবি। ওর টিভি দেখা নিয়ে আমার চিন্তা কি, ও তো আর আমার বান্ধবী না। তারপর আবার মন খারাপ হলো, বান্ধবী-অবান্ধবীর ব্যপার না। জাস্ট মানুষ হিসাবে, মেয়েটা আশা নিয়ে টিভি দেখতে এলো, আর আমি রূমে নেই, ওর মন খারাপ হতে পারে। একটু দ্বিধা-দন্দ্বের মধ্যে পড়ে গেলাম। শেষ পর্যন্ত রূমে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

বাসস্ট্যান্ড থেকে নেমে আধা কিলোমিটারের মতো হেটে ডরমিটরিতে আসতে হয়। এই রাস্তাটা বেশ সুন্দর। আরো সামারে ঝাকড়া পাতায় ভরা গাছ-গাছালী। তার মধ্যে চোখ ধাঁধানো সব সুন্দরীরা নানা রকম বাহারী পোষাকে সজ্জ্বিত। কেউ মিনি স্কার্ট পড়া, কেউ টাইট প্যান্ট আর হাতা কাটা গেন্জী পড়া, কেউ কেউ হাফপ্যান্ট পড়াও আছে। একটি মেয়েকে দেখলাম লং স্কার্ট পড়া। মিশরের আহমেদের কথা মনে পড়লো। আমার সিনিয়র ফ্রেন্ড। উনি এখানে আন্ডারগ্রেড করেননি। দেশ থেকে পাশ করে, এখানে পি, এইচ, ডি, করতে এসেছেন। বেশ পরহেজগার। একদিন বললেন, ” আজ একটা মেয়েকে দেখলাম, উপরে গা ঢাকা সুন্দর টপস, নীচে লং স্কার্ট পড়া, আমি ভাবলাম বাহ্‌ বেশ তো মেয়েটি। কি সুন্দর পুরো গা ঢাকা কাপড় পড়েছে! তারপর মেয়েটি পিছন ফিরলে দেখলাম, স্কার্টটির পিছন দিকে প্রায় পুরোটাই কাটা। পায়ের প্রায় ৮০ পার্সেন্টই দেখা যাচ্ছে।” বেশ হাসি লেগেছিলো আহমেদের কথা শুনে।

রূমে এসে ভাতটাত খেয়ে একটা গল্পের বই নিয়ে শুয়ে শুয়ে পড়তে বসলাম। কিছুক্ষণ পড়ার পর। বাইরে হালকা আওয়াজ শুনতে পেলাম। ওরা ভলিবল খেলতে শুরু করেছে। যাক আমি বইটার মধ্যা ডুবে গেলাম। বইটা কিছুদিন আগে যোগার করেছি। কিছু ছোটগল্পের সমাহার। রবীন্দ্রনাথের লেখা কয়েকটি ছোটগল্প আছে। এরমধ্যে একটা ছিলো প্রেমের গল্প, একটি মেয়ের প্রতি একটি ছেলের আকুলি-বিকুলি মনের ভাবকে এত চমৎকার ভাষা মাধুর্য্য দিয়ে তিনি লিখেছেন। যা পড়ে মুগ্ধ হওয়া তো স্বাভাবিকই, উপরন্তু এই গল্প পড়ে যে কারোরই প্রেম করতে ইচ্ছে হবে। গল্পটা পড়ে মনে আবেশ ছড়িয়ে গেল। এরপর ঘড়ির দিকে তাকালাম। বিকাল ছয়টা। ওহ্‌ এসময় তো তাতিয়ানার আসার কথা। না ঠিক কথা বলে কিছু নেই। গত দুদিন এসেছিলো। তাই ভাবছিলাম আজও টিভি দেখতে আসবে হয়তো। আরো আধ ঘন্টা অপেক্ষা করলাম। না ও আসছে না। কি হলো? প্রোস্তা মারিয়া দেখবে না? একবার ভাবলাম, আমি টিভি সেটটা অন করি। একা একাই দেখি। তার পরমুহুর্তে আর ইচ্ছে হলোনা। টিভি আর অন করলাম না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওদের ভলিবল খেলা দেখলাম। ভরাট শরীর নিয়ে লেনা দৌড়াদৌড়ি করছে। ওর প্রেমিক বা হাফ-জামাইও খেলছে। কে জানে, জানালায় দাঁড়িয়ে অনেকেই হয়তো লেনাকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। যাক আমার অতশত চিন্তা করার দরকার নাই। ডিভানে বসে বসে আরো কয়েকটি ছোটগল্প পড়লাম। ইতিমধ্যে, উত্তর গোলার্ধের দীর্ঘ বিকেল গড়িয়ে অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। আমি জানালায় দাঁড়িয়ে সাঁঝের রঙের রঙিন আকাশ দেখতে লাগলাম। এখানে সামারে সাঁঝের আকাশে বাংলাদেশের আকাশের মতই নানা রঙের বর্ণচ্ছটা থাকে। এই সুন্দর দৃশ্যপট আমার দারুন লাগে। গানটা শোনার জন্য ক্যাসেট প্লেয়ারটা চালু করলাম। শুরু হলো, ‘সাঁঝের রঙের রঙিন আকাশ, সূর্যটা চায় যে বিদায়…।” কয়েকটা গানের পর শুরু হলো,

‘কি যেন শব্দ হতে ফিরে তাকালাম,
দেখি ঝড়ের বাতাস,
অকাল বাদলের একটু আভাস,
আমি পথ হারালাম একা ঘুরে ঘুরে,
তুমি তখন অনেক দূরে।
প্রতীক্ষা ছিলো সারা বিকেল জুড়ে,”

হঠাৎ মেজাজটা তিরিক্ষি হয়ে গেল। সে কি তাতিয়ানা আসে নাই বলে। আমি কি ওর জন্য প্রতীক্ষা করেছি? দুরো ওর জন্য প্রতীক্ষা করতে যাবো কোন দুঃখে, ও আমার বান্ধবী না, কিছু না, দেখতেও আকর্ষণিয় না। ওর কি প্রতিক্ষা করবো!

টুক টুক টুক। এই রাত নয়টার সময় আবার কে এলো? দরজা খুলে দেখি, তাতিয়ানা দাঁড়িয়ে আছে।

ভালোবাসা কাকে বলে?
আমার না যদি থাকে সুর, তোমার আছে তুমি তা দেবে,
তোমার গন্ধ হারা ফুল আমার কাছে সুরভী নেবে,
এরই নাম প্রেম, এরই নাম প্রেম,
জীবনে যা গৌরবও হয় মরণেও নেই পরাজয়,
চোখের স্মৃতির মণিদ্বীপ মনের আলোয় কভু কি নেভে?
এরই নাম প্রেম, এরই নাম প্রেম,
দুজনেই দুজনাতে মুগ্ধ, দুজনার রূপে কত সুন্দর,
দুজনার গীতালীর ছন্দে, তন্ময় দুজনার অন্তর,
এর কাছে স্বর্গ সুধার বেশী আছে মূল্য কি আর,
আমার দেবতা সেও তাই, প্রেমের কাঙাল পেয়েছি ভেবে,
এরই নাম প্রেম, এরই নাম প্রেম।

 

 

বিষণ্ন বিরিওজা – ৬

তাতিয়ানাঃ কই? আজও পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছো? ভিতরে ঢুকতে দাও।
আমিঃ ও হ্যাঁ হ্যাঁ, আসো ভিতরে আসো। (বিব্রত হয়ে বললাম আমি)
বিন্দুমাত্র জড়তাহীন, সাবলীল ভঙ্গিতে ডিভানে গিয়ে বসলো ও।

তাতিয়ানাঃ কি করো?
আমিঃ কিছুনা।
তাতিয়ানাঃ টিভি দেখছো? সেট তো অন করা আছে?
আমিঃ আঁ, হ্যাঁ, সেট অন করা আছে। জাস্ট অন আর কি। আমি মনোযোগ দিয়ে কিছু দেখছিলাম না।
তাতিয়ানাঃ একা একা খারাপ লাগেনা?
আমিঃ একা মানে, না। রূমে একা থাকতেই ভালো লাগে। রূমমেট না থাকাই ভালো। গত কয়েক বছর ধরে আমি একাই আছি। শুধু প্রথম বছর রূমমেট ছিল। নানা ঝামেলা হয়।
তাতিয়ানাঃ কি ঝামেলা হয়?
আমিঃ এই তো। একসাথে থাকার অনেক ঝামেলা। রান্নাবান্না, বাজারঘাট, মেস বিল, গেস্ট, বন্ধুবান্ধব, ঘুমের টাইম সবকিছু নিয়েই মিসম্যাচিং। সেই থেকে মনমালিন্য, ইত্যাদি। তার চাইতে একাই ভালো।
তাতিয়ানাঃ তোমার রূমমেইট কি রাতে মেয়ে নিয়ে আসতো? তারপর বলতো, “আজ রাতটা তুমি অন্য কোথাও কাটাও, আমি ওকে নিয়ে এখানে থাকবো”, এরকম?
তাতিয়ানার চোখে দুষ্টু হাসি চিকচিক করছে। আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। ভাবলাম ও হঠাৎ এরকম কথা বলছে কেন? কথা ঘোরানোর জন্য বললাম

আমিঃ আজ প্রোস্তা মারিয়া দেখতে এলেনা যে?
তাতিয়ানাঃ তুমি আমার জন্যে অপেক্ষা করেছিলে?
কি উত্তর দেব ঠিক বুঝতে পারছিলাম না।
আমিঃ না, মানে প্রতিদিনই তো আসো। তাছাড়া তুমি বলেছিলে, সিরিজটা তুমি পছন্দ করো, কোনো এপিসোড মিস করতে চাওনা।
তাতিয়ানাঃ মিস করিনি তো।
আমিঃ মানে?
রিনরিনে শব্দ করে মিষ্টি হেসে বললো
তাতিয়ানাঃ তুমি বোধহয় প্রোস্তা মারিয়া রেগুলার দেখোনা।
আমিঃ না সেরকম উৎসাহ নিয়ে তো কখনোই দেখিনি। তোমার সাথেই যা দেখা।
তাতিয়ানাঃ আমার সাথে তো মাত্র তিনদিন দেখলে। যাহোক, আজ মারিয়া দেখায় না।
আমিঃ মানে?
তাতিয়ানাঃ সপ্তাহে দুইদিন মারিয়া বন্ধ।
আমিঃ ও তাই? কি কি বারে বন্ধ?
তাতিয়ানাঃ আজ সোমবার, আর কাল মঙ্গলবার। বাকী পাঁচদিন চলে।
আমিঃ ও। তাহলে তো তুমি আমার এখানে দুইদিন আসবে না।
তাতিয়ানা আবারো চোখে কৌতুক নাচিয়ে বললো।
আমিঃ এই কনক্লুশন ড্র করছো কেন? আজতো মারিয়া দেখায়নি, কিন্তু আমি তো এসেছি।
আমিঃ ও, হ্যাঁ।
তাতিয়ানাঃ কি হ্যাঁ?
আমিঃ কিছুনা।
তাতিয়ানাঃ কিছুনা কি? কিছু কি বলতে চাইছিলে?
আমি ঠিক ধরতে পারছিলাম না, কথা কোনদিক থেকে কোনদিক চলে যায়। নাহ্, চিন্তাভাবনা না করে কথা বলা যাবেনা। প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য আমি বললাম
আমিঃ এসো কফি খাই।
তাতিয়ানাঃ তুমি ডিনার করেছো?
আমিঃ না।
তাতিয়ানাঃ তাহলে কফি কি খাবে? আগে ডিনার করো। রাত সাড়ে নয়টার মতো বাজে।
আমিঃ উঁ, ডিনার আমি একটু লেটেই করি, তুমি খাবে আমার সাথে?
তাতিয়ানাঃ এত রাতে কি খাবো? আমরা রাশানরা রাত আটটার মধ্যেই ডিনার সেরে ফেলি জানোনা?
আমিঃ তা জানি। কিন্তু তোমার সামনে একা একা খাই কি করে?
তাতিয়ানাঃ তাহলে আমি চলে যাই।
আমি একটা সংকটে পড়লাম। ওকে চলে যেতে বলি কি করে? এটা অভদ্রতা হবে, তাছাড়া কেন যেন ওর সাথে কথা বলতে ভালোও লাগছিলো। আবার ওর সামনে খাওয়াটাও তো ঠিক হবে না।
আমিঃ না থাক, আমি পরেই ডিনার করবো। এখন বরং কফি খাই।
তাতিয়ানাঃ তার চেয়ে তুমি বরং ডিনার করো। আমি যাই। তবে মন খারাপ করোনা। একেবারে যাচ্ছি না। ঠিক আধাঘন্টা পরে ফিরে আসছি। আশা করি ততোক্ষণে তোমার ডিনার করা হয়ে যাবে।
আমিঃ কষ্ট করে আসলে, আবার যাবে, আবার আসবে!
তাতিয়ানাঃ ভারি আশ্চর্য্য কথা! আমি কি শত কিলোমিটার দূর থেকে আসা যাওয়া করি নাকি? আমি তো এই ফ্লোরে তোমার পাশের রূমেই থাকি।
আমিঃ ও হ্যাঁ, তাইতো।
তাতিয়ানাঃ তাইইতো। থাকো, ডিনার করে আমি ফিরে আসলে পরে একসাথে কফি খাবো।
একটি লাস্যময় ভঙ্গিতে ডিভান থেকে উঠে, দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল তাতিয়ানা। আমি চোরা চোখে দেখলাম। মেয়েটি আর দশটা রাশান মেয়ের মত চোখ ধাঁধানো সুন্দরী নয় সত্য, কিন্তু মেয়ে তো। তাই মেয়েলী ভঙ্গিমা, দৃষ্টি, চলন, কথা বলার ধরন, ইত্যাদি আর দশটা মেয়ের মতই নজর কাড়া। অন্ততপক্ষে আমার কাছে তো তাই মনে হয়।
আমি গতকাল রান্না করে রাখা খাবার ফ্রীজ থেকে বের করে নিয়ে, গরম করার জন্য কিচেনের দিকে গেলাম। পিক আওয়ারে আট টা চুলাই বিজি হয়ে যায়, তবে এখন হবে না। তারপরেও একটা চুলা বিজি পেলাম। আমারই মতো কেউ হয়তো। একটা মাইক্রোওয়েভ ওভেন থাকলে ভালো হতো। দ্রুত গরম করা যেত। কিনে নেব নাকি একটা? পরক্ষণেই ভাবলাম, না দরকার নাই। মাইক্রোওয়েভ ওভেন ভালো জিনিস না। মাইক্রোওয়েভ ওভেনে গরম করা খাবার ক্ষতিকর হয়। ইলেকট্রোম্যগনেটিক ওয়েভ যে কি ক্ষতি করতে পারে নিজে ফিজিসিস্ট হয়ে আমি তা জানি। যে কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নে একসময় তা মার্কেট থেকে তুলে নেয়া হয়েছিলো।
ডিনার খেতে খেতে ভাবছি। আধঘন্টা পর আসবে বললো। আসতেই পারে। সত্যিই তো, শত মাইল দূর থেকে তো আর আসে না। দুটা রূম পরেই থাকে। ছেলেমেয়ে এক হোস্টেলে থাকার এই ইউরোপীয় সিস্টেমটায় আমি প্রথমে একটু ধাক্কা খেয়েছিলাম সত্য, কিন্তু সেই আমিই মাসখানেক পরে উপলদ্ধি করেছিলাম যে এটা ভালো। প্রথম যখন এই দেশে আসি, ল্যাংগুয়েজ কোর্সে আমরা বিশজন বাঙালী ছিলাম। আমাদের কিছু বাঙালী বন্ধু বলেছিলো, ” আরে সালা, হেভি সিস্টেম তো, ইউরোপে আইছি তো যত বেশী ফুর্তি করন যায়। পোলা-মাইয়া এক হোস্টেলে দিয়া তো দশ ডিগ্রী বেশী সুবিধা দিয়া দিল।” আমি অবশ্য সেই মতে বলছি না। বিষয়টার পজেটিভ দিক রয়েছে। আমাদের ব্যাচে নুরুন্নবী বলে একজন ছিল। নোয়াখালী বাড়ী। সেই কারণেই হয়তো একটু ধর্মভীরু। আমাদের মধ্যে ও সবচাইতে বেশী চঞ্চল ছিলো যদিও কিন্তু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে কোন গাফিলতি করতো না। ও একদিন বললো, “এই যে এখানে ছেলেমেয়ে এক হোস্টেলে থাকে এটা ভালো রে। নারী-পুরুষের মধ্যে যত বেশী দূরত্ব সৃস্টি করা হয়, পরস্পরকে বুঝতেও তত বেশী সমস্যা হয়। এই দূরত্ব কমিয়ে আনলেই বরং নারী-পুরুষ সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।” আমি বলেছিলাম, “এতে বেলেল্লাপনার সম্ভাবনা বেড়ে যায়না কি?” নুরুন্নবী বলেছিলো, “এখানে তো সবাই ম্যাচিউরড্, ভালো-মন্দের ফারাক তো সবাইই বোঝ. কিছু করলে নিজ দায়িত্বেই করবে”।

আমি ডিনার শেষ করে কফি তৈরীর জন্য ইলেকট্রিক কেট্লটা বসালাম। চিনি ও গুড়া কফির পটটা টেবিলের উপর রাখলাম। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালাম, দশটা পনের মিনিট বাজে। টুক, টুক, টুক, দরজায় নকের আওয়াজ। নিশ্চিত ছিলাম, এটা তাতিয়ানা। তাই নিজে দরজা না খুলে, একটু উচ্চস্বরে বললাম,
আমিঃ ইয়েস, কামইন।
কফির কাপ সাজানো নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম তাই দরজার দিকে তাকাইনি।
“রিমন”।
মেয়েলী কন্ঠের ডাক, তবে তাতিয়ানার কন্ঠস্বর নয়। আরে ঝামেলা! এত রাতে আবার কোন মেয়ে এলো! তাকিয়ে দেখি দাঁড়িয়ে আছে আমার ক্লাসমেট অপরূপ সুন্দরী ইরিনা।
আমি ওর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম।
ইরিনা, আমার আর কফি টেবিলের দিকে তাকিয়ে বললো,
ইরিনাঃ কেউ আসবে?
আমি কি উত্তর দেব বুঝতে পারছিলাম না।
আমিঃ বস ইরিনা।
ইরিনাঃ কফি খাওয়াবে।
আমি অনেকটাই অপ্রস্তুত। বুঝতে পারছি না কি বলবো। ইরিনা আয়েশী ভঙ্গিতে ডিভানে বসে গেল।
ইরিনাঃ খাওয়াও তাহলে কফি।
আমিঃ উঁ, হ্যা, ওয়েট, বানাচ্ছি।
এসময় খোলা দরজা দিয়ে গটগট করে ঢুকে গেল তাতিয়ানা। ওর হাতে কাগজের ছোট্ট একটা প্যাকেট। ভিতরে ঢুকে ডিভানে ইরিনাকে দেখে আর আমার হাতে কফির কাপ দেখে, বেশ অপ্রতিভ হয়ে গেল তাতিয়ানা, মনে হলো যেন একটা ধাক্কা খেয়েছে। তাতিয়ানা অনেকটা আহত ভঙ্গিতে বললো
তাতিয়ানাঃ আমি তাহলে যাই ।
আমি আরও সংকটাপন্ন হয়ে বললাম
আমিঃ না, না যাবে কেন? বসো।
তাতিয়ানাঃ না, মানে তোমরা কফি খাও তাহলে। আমি যাই।
ইরিনাকে দেখলাম বেশ কৌতুহলী হয়ে ওকে অবসার্ভ করছে।
আমিঃ না, তুমি বসো। আমরা তিনজনে মিলেই কফি খাবো।
তাতিয়ানা আমার দিকে কাগজের প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিলো।
আমিঃ কি এটা?
তাতিয়ানাঃ ফ্রেশ বিনের কফির গুড়া। এই মাত্র গুড়ো করে এনেছি।
আমিঃ ওহ্, দারুন তো! আই লাইক ইট।
তাতিয়ানাঃ লাইক ইট তো বলছো, কিন্তু খাও তো, সাধারণ কফি।
আমিঃ আরে এটাও তো বিন থেকে করা।
তাতিয়ানাঃ কি করে জানলে? গুড়া করার সময় তুমি ছিলে?
ইরিনাঃ এই কৌটার গুলোয় ভেজাল থাকে বলে অনেকে মনে করে, তাই অনেকে কফি বিন কিনে নিজের হাতে গুড়া করে খায়।
তাতিয়ানাঃ আর এটার টেস্টও বেশী।
আমিঃ ও। তাহলে আমি বানাই।
কফি বানানো হলে কফির খুব সুন্দর মিষ্টি গন্ধে ঘর ভরে গেল। আরও একটা মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছিলাম। কেউ একজন কড়া পারফিউম ব্যবহার করেছে হয় তাতিয়ানা নয়তো ইরিনা।
আমি লক্ষ্য করলাম ওরা দুজন নিজেদের মধ্যে কোন কথা বলছিলো না। টুকটাক দুএকটা কথা আমি বলছিলাম। আর তার ফাঁকে ফাঁকে ওরা দুজন দুজনকে দেখছিলো। কফি খাওয়া শেষ হলে। তাতিয়ানা বললো
তাতিয়ানাঃ আমি তাহলে যাই।
আমি কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। আবার ইরিনা তখনো বসে আছে। যাওয়ার কথা মুখেই আনছে না। অবশেষে বললাম।
আমিঃ আচ্ছা যাও, ভালো থেক।
তাতিয়ানাঃ গুড নাইড।
সেকি হতাশ হয়ে বললাম জানিনা। তাতিয়ানা চলে যাওয়ার পর। চোখে কৌতুক নাচিয়ে ইরিনা বললো।

ইরিনাঃ মেয়েটি কে?
আমি শীতল কন্ঠস্বরে বললাম।
আমিঃ এই তো। এই ফ্লোরেই থাকে।
ইরিনাঃ কই আগে তো কখনো দেখি নাই।
আমিঃ ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী, মাত্র এসেছে।
ইরিনাঃ ও তাই বলো। (মুখে আরো কৌতুক এনে বললো) তোমাদের মধ্যে কি কিছু চলছে?
আমিঃ (বিরক্ত হয়ে বললাম) কি চলবে? মেয়েটা তো এই সেদিন এলো।
রিনরনে হেসে ইরিনা বললো।
ইরিনাঃ তুমি চিরকালের বোকাই রয়ে গেলে রিমন।

আমিঃ কেন?
ইরিনাঃ তোমাকে সেই ফার্স্ট ইয়ার থেকে দেখে আসছি। মেয়েদের মনের কথা বুঝতে পারো না।
আমিঃ এমন কথা বলছো কেন?
ইরিনাঃ তোমার রেগিনার কথা মনে আছে?
আমিঃ আছে। রেগিনা আবার কি হলো?
ইরিনাঃ রেগিনা কিন্তু তোমাকে ভীষণ পছন্দ করতো। অথচ তুমি সেটা ধরতেও পারোনি।

আমিঃ জানিনা।
ইরিনাঃ আকসানা তো তোমার পিছনে ঘুরে ঘুরে হয়রান হয়ে, অবশেষে রোমানকে বিয়ে করলো। আহা বেচারী! রিমনকে না পেয়ে রোমানকে পেল।
আকসানার কথা শুনে আমি একটু শক্ত হয়ে গেলাম। আকসানা এই হোস্টেলেই থাকতো। মাঝে মধ্যে আমার রুমে আসতো, চা খেয়েছি গল্প-গুজব হয়েছে। এর বেশী তো কিছু ছিলনা! দুবছর আগে ওর বিয়ে হয়ে শ্বশুড় বাড়ীর এ্যাপার্টমেন্টে উঠে গিয়েছে। আকসানা বাইরের শহরের, ছেলেটা খারকভেরই।

আমিঃ আকসানা তো কখনো কিছু বলেনি।
ইরিনাঃ সমস্যাটা তো ওখানেই। তোমার মতো ছেলে মেয়েদের মনের কথা বুঝতে পারেনা, তোমাকে বলতে হয়। মেয়েরা কি সব কিছু মুখ ফুটে বলতে পারে?
আমিঃ অনেকেই তো বলে।
ইরিনাঃ না অনেকেই না, কেউ কেউ বলে। সেই কেউ কেউ-এর দলে আকসানা ছিল না। তোমাদের দেশের মেয়েদের চাইতে আমাদের জড়তা হয়তো কম, তারপরেও আমরা মেয়ে কিন্তু।
আমিঃ আকসানা বললেই পারতো।
ইরিনাঃ তা হয়তো পারতো। কিন্তু তোমার দৃষ্টিতে শীতলতা দেখে আর কিছু বলতে চায়নি।
আমি বেশ বিব্রত হলাম। কথাবার্তা কেমন যেন হচ্ছে। হৃদয় ঘটিত বিষয় নিয়ে এমন আক্রমণাত্মক কথা আমাকে ইতিপূর্বে আর কেউ বলেনি। আকসানার বিষয়টা কখনো ঘুণা্ক্ষরেও টের পাইনি। তাছাড়া টের পেলেও যে কিছু হতো তাও তো না।

উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ইরিনা বললো।
ইরিনাঃ দেখো, এই মেয়েটিকে আবার নিরাশ করোনা যেন।
আমি কোন কিছু বলার কোন ভাষাই খুঁজে পেলাম না।

ইরিনাঃ আমি আসলে কফি খেতে আসিনি, তোমার কাছে এসেছিলাম ল্যাবের খাতাটা নিতে। গত ল্যাব ক্লাসে আমি এ্যাটেন্ড করতে পারিনি।

আমি তাড়াতাড়ি ওকে খাতাটা বের করে দিলাম। আপদ বিদায় হলে বাঁচি।
ইরিনা চলে যাবার পর, কিছু সময় বসে রইলাম। মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে ছিলো। ইরিনা যেসব কথা বললো, তাতে মেজাজ ঠিক থাকার কথা না। রেগিনা আমাদের দুবছরের সিনিয়র ছিলো। পাশ করে ওর সিটিতে চলে গেছে। এই ডরমিটরিতেই থাকতো। আমাকে তার ভালো লাগতো তাতো আমি জানতাম না। আকসানার বিষয়টাও জানতাম না। আসলে ওদের ব্যাপারে আমার আগ্রহ কিছু ছিল না। কিন্তু অন্যেরা কি জানতো? না জানলে ইরিনা এতো কথা বললো কি করে? সর্বনাশ!
যাকগে যা হয়েছে হয়েছে। আমি তো আর কিছু করি নাই। অনেক রাত হয়েছে ঘুমানোর প্রস্তুতি নেয়া দরকার। ডিভানটা খুলে বিছানাটা গুছালাম। শুতে যাব এমন সময় আবারো। টুক, টুক, টুক, দরজায় নক হলো। আবার কে এলো এত রাতে? এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেখলাম। খুব সুন্দর সেজেগুজে তাতিয়ানা দাঁড়িয়ে আছে।

তুমি না হয় রহিতে কাছে
কিছুক্ষণ আরো নাহয় রহিতে কাছে
আরো কিছু কথা নাহয় বলিতে মোরে
এই মধুক্ষণ মধুময় হয়ে নাহয় উঠিত ভরে।।
সুরে সুরভীতে নাহয় ভরিত বেলা
মোর এলো চুল লয়ে বাতাস করিত খেলা।
ব্যাকুল কত না বকুলের কুড়ি
রয়ে রয়ে যেত ঝরে
ওগো নাহয় রহিতে কাছে।।
কিছু দিয়ে নিয়ে ওগো মোর মনময়
সুন্দরতর হতো নাকি বলো
একটু ছোঁয়ার পরিচয়।
ভাবের লীলায় নাহয় ভরিত আঁখি
আমারে নাহয় আরো কাছে নিতে ডাকি।
নাহয় শোনাতে মরমের কথা
মোর দুটি হাত ধরে
ওগো নাহয় রহিতে কাছে।।

বিষণ্ন বিরিওজা – ৭

রাত এখন দশটার উপরে। আমি ঘুমানোর প্রস্ততি নিয়ে শুয়েই পরেছিলাম প্রায়। এসময় আমার দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে অপরূপ সাজগোজ করে আসা চপলমতি একটি তন্বী শ্বেতাঙ্গিনী তরুণী। আগে অনেকবারই ভেবেছি, মেয়েটি সুন্দরী নয়, কিন্তু এই মুহুর্তে প্রসাধনের গুন তাকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। চোখ ফেরানো গেলেও কয়েক মুহুর্তের জন্য চোখ আটকে যাবে নিঃসন্দেহে। মেয়েটিকে এত রাতে এই সাজে রূমে ঢুকতে দেয়া ঠিক হবে কি? আমার স্থবিরতা দেখে ও তার স্বভাবসুলভ মিষ্টি হসে বললো,

তাতিয়ানাঃ আবারো পথ আটকে আছো! ঢুকতে দেবেনা?
আমি আরেকবার ভাবলাম এত রাতে এই সাজে মেয়েটাকে ঢুকতে দিলে লোকে কি বলবে? পরক্ষণেই আবার নিজের চিন্তায় নিজেরই হাসি পেলো, আমি কি বাংলাদেশে বসে আছি? এই ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে নারী-পুরুষ অবাধ সম্পর্কের দেশে বসে আমি এই কথা ভাবছি। এখানে তো এটা চা-বিস্কুট খাওয়ার মতই একটা সাধারণ ঘটনা। এই মুহুর্তেই দেখা যাবে এই ডরমিটরিতে অনেকেই বান্ধবীকে নিয়ে শুয়ে পরেছে। বান্ধবীতো ভালো অনেক সময় দেখা যায় আজই পরিচয় হলো এমন কারো সাথেই অবলীলায় রাত কাটিয়ে দিচ্ছে। আমার তাহলে ওকে ঢুকতে দিতে সমস্যা কি? ভিতর থেকেও কোন একটি চালিকা শক্তি আমাকে বলছিলো, “আসুক না মেয়েটা”। মৃদু স্বরে, “এসো” বলে দরজা ছেড়ে দাড়ালাম।

নিভৃত রাতে আমার ঘরে উপস্থিত হয়েছে সেই মেয়েটি, মনে মনে যার নাম আমি দিয়েছিলাম বার্চ বনের প্রণরেনী।আমি আরেকটু ভালো করে তাতিয়ানার দিকে তাকালাম। ও পোষাক পাল্টে এসেছে। কিছুক্ষণ আগে ওর পরনে ছিল ট্রাউজার আর শার্ট। আর এখন ওর পরনে হাটুর উপরে তোলা স্কার্ট, তবে মিনি স্কার্ট নয়। আর টাইট টপস। এই পোষাক অনেকটাই আবেদন ফুটিয়ে তোলে। অবশ্য এখানে এটা স্বাভাবিক পোষাকই। শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম বলে ডিভানটা আমি ইতিমধ্যেই টেনে বেড বানিয়ে ফেলেছি। তার উপর বেডশীট ও ব্লাংকেটও ছড়ানো ছিলো। তাতিয়ানা প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলো, কোথায় বসবে। তারপর ডিভানেই বসে গেল। তবে পিঠ হেলান দেয়া যাবেনা বলে ও পায়ের উপর পা তুলে বসলো। স্কার্টের সাইজের কারণে এম্নিতেই হাটুর নীচের অংশ খোলা ছিলো, পা তুলে বসাতে আরো কিছুটা অনাবৃত হলো। ওর নীল চোখে ঘন কালো কাজল দিয়েছে। চোখের পাতার উপরে নীল ব্লাশন। কালোও নয় আবার সোনালীও নয় মাঝামাঝি একটা রঙের দীর্ঘ চুলগুলো পরিপাটি করে সাজানো। মুখে হালকা মেকআপের ছাপ। ঠোটে গোলাপী রঙের লিপস্টিক। সব কিছুই মানিয়েছে বেশ। মনে হচ্ছে প্রগলভা এই মেয়েটির ঠোট ভরা মধু, গাল ভরা লালিত্য। পুরুষ মনকে প্রলুদ্ধ করার জন্য যথেস্ট। হয়তো অনেককেই প্রলুদ্ধ করেছে। কে জানে কার কাছে ও ধরা দিয়েছে। নাকি কারো কাছেই ধরা দেয়নি?
তাতিয়ানাঃ কি দেখ?
আমি যদিও ওকেই দেখছিলাম। কিন্তু সেটা বলতে না চেয়ে বললাম,
আমিঃ দেখছি চাঁদটিকে।
তাতিয়ানা পাশ ফিরে তাকালো। সত্যিই জানালার বাইরে রাতের আকাশে এক ফালি চাঁদ দেখা যাচ্ছে। তার নীচে শহরের একাংশ। অসংখ্য বাতির তীব্র বিদ্যুৎ আলো জ্বলজ্বল করছে। সারি করে লাগানো গাছগুলি দাঁড়িয়ে আছে কালো মুর্তির মতো। আর তার সামনে বার্চ বনের প্রণরেনী। একে কি স্বপ্নপূরী আর তার রাজকন্যার সাথে তুলনা করবো?

তাতিয়ানাঃ (কপট অভিমান করে) চাঁদের মধ্যে দেখার কি আছে?
আমিঃ তোমাদের এই শীতপ্রধান দেশে তো সারা বছর চাঁদ দেখা যায়না। বছরের যে কয়মাস চাঁদ দেখা যায় সেই কয়মাস চাঁদটাকে খুব সুন্দর মনে হয়। দুর্লভের প্রতি বাড়তি আকর্ষণ আরকি।
তাতিয়ানাঃ উঁ, তুমি আছো চাঁদের সৌন্দর্য্য নিয়ে!
আমিঃ চাঁদকে ইর্ষা করোনা, ও অবুঝ।
তাতিয়ানাঃ কাব্য করছ? তুমি কি কবিতা লেখো?
আমিঃ লিখতাম একসময়।
তাতিয়ানাঃ (উৎফুল্ল হয়ে বললো)কবিতা লিখতে, বেশ তো! ছেড়ে দিলে কেন?
আমিঃ মনে হলো কিছু হচ্ছে না, নিম্নমান।
তাতিয়ানাঃ তাও লেখা উচিৎ ছিলো। ধীরে ধীরে মান বাড়তো। আচ্ছা আমাকে দেখাবে তোমার কবিতা।
আমিঃ তুমি কিছু বুঝবে নাতো। ওগুলোতো বাংলায় লেখা।

এরপর আমার দিকে হালকা কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,
তাতিয়ানাঃ ঐ মেয়েটি কি তোমার বান্ধবী?
আমিঃ কে?
তাতিয়ানাঃ যে মেয়েটি এসেছিলো।
আমিঃ বান্ধবী হলে তো রাতে থেকে যেত, চলে যেত না।
তাতিয়ানাঃ যাহ্, কি যে বলো!
আমিঃ না, জোক করলাম। ও আমার বান্ধবী নয় ক্লাসমেট

তাতিয়ানাঃ তোমার বান্ধবী আছে?
আমিঃ না।
তাতিয়ানাঃ ফাইনাল ইয়ারে পড়ো, এখনো না!
আমিঃ সেরকমই।
তাতিয়ানাঃ নাকি ছিলো, কাট-আপ হয়ে গিয়েছে?
আমিঃ না থাকলে কাট-আপ হবে কোত্থেকে?
তাতিয়ানা আমার চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকালো, তারপর চোখ নামিয়ে নিলো, তারপর আবার তাকিয়ে লাজুক কন্ঠে বললো,
তাতিয়ানাঃ বান্ধবী করতে ইচ্ছে হয়না?
আমি ঠিক কি উত্তর দেব বুঝতে না পেরে চুপ করে রইলাম।
তাতিয়ানা আবার বললো,

তাতিয়ানাঃ ইয়াং ছেলে বান্ধবী না থাকাটাই তো অস্বাভাবিক। (তারপর মুখ ফসকে বলে ফেলা কথাটায় বিব্রত হয়ে আবার বললো) না মানে এটা অবশ্য তোমার ব্যাপার।
আমি ওর সাথে কৌতুক করার জন্য বললাম।

আমিঃ কেউ তো তাকালো না আমার দিকে। তাই বেচারা এত নিঃসঙ্গ।
তাতিয়ানাঃ মনে তো হয়না, কেউ তাকায়নি। খুব সম্ভবতঃ তোমার দেখার চোখ নেই।
আমিঃ হ্যা, চোখে কিছুটা সমস্যা আছে বোধহয়।
তাতিয়ানাঃ ডরমিটরিতে তোমার রেপুটেশন আছে।
আমিঃ (অবাক হয়ে বললাম) কিসের রেপুটেশন?
তাতিয়ানাঃ সবাই বলে, তুমি খুব ভালো ।
আমিঃ ও বাবা এর মধ্যে সবার সাথে কথা বলে ফেলেছ!
তাতিয়ানাঃ (হেসে ফেললো তাতিয়ানা) সবাই না হলেও যে কয়জনার সাথে কথা হয়েছে, তারা তো তোমাকে ভালো বলেছে।
আমিঃ ওদের সাথে আবার আমার সম্পর্কে জানতে চাইলে কেন?
তাতিয়ানা হঠাৎ মাথা নীচু করে ফেললো। মনে হচ্ছিলো ও ঠিক কি উত্তর দেবে বুঝতে পারছিলো না। আমি প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য বললাম

আমিঃ তোমার বয়ফ্রেন্ড আছে তাতিয়ানা?
তাতিয়ানাঃ (অনেকটা আক্ষেপের স্বরে বললো) না।
আমিঃ ছিলো বোধহয়, তাই না?
তাতিয়ানাঃ (তাতিয়ানা আরেকটু খেদ টেনে বললো) ছিলো, সে ছিলো। এখন কেউ নেই।

এই মুহুর্তে ওকে আমার দুঃখী মনে হলো। বুঝলাম, তাতিয়ানার মন চিরকালের একজনকে খুঁজে ফিরছে। সেই সন্ধানী মনের তন্বি দেহটিকে কি নিরালায় ছুঁয়ে দেখবো? তাতিয়ানার বয়সটা এত কম, যেন সদ্য ফোটা একটি প্রস্ফুটিত ম্যাগনোলিয়া। হাতদুটো অধীর হয়ে উঠছে। ভাবলাম ওর সর্বাঙ্গে স্পর্শ বুলিয়ে তার তপ্ত মাধুর্য্য সমস্ত দেহমন দিয়ে অনুভব করি।
জানিনা আমার মনের কথা বুঝতে পারলো কিনা তাতিয়ানা।

তাতিয়ানাঃ কিছু বলবে?
আমিঃ তোমার ঘুম পাচ্ছেনা তাতিয়ানা?
তাতিয়ানাঃ তুমি ঘুমাবে?
আমিঃ হু, তুমি চলে গেলেই ঘুমাবো।
তাতিয়ানা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো, মুখের ভাব বলছে, “আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছ!”
অনেকটা আহত ব্যাথিত হয়ে তাতিয়ানা উঠে দাঁড়ালো।
তাতিয়ানাঃ আমি আজ যাই তাহলে?
আমিঃ আচ্ছা, কাল দেখা হবে।
যে ভঙ্গিতে ও দরজার দিকে হেটে গেল, তা বলছে, ‘আমার সাজ, পোষাক, প্রসাধন সবই বৃথা গেল।

তাতিয়ানা চলে যাবার পর আমিও কিছু সময় স্থবির বসে রইলাম। আমার জানালা গলে চাঁদের আলোর সাথে সাথে ডরমিটরির কোন রূম থেকে চাইকোভ্স্কীর সুর ভেসে এলো। বিমুর্ত এই সুর আনন্দ, বেদনা, হতাশা যে কোন মুহুর্তকেই অপরূপ করে তোলে। নারী-পুরুষের অন্তরঙ্গতায় এই সুর যেন এক অদ্ভুত আবেশ সৃষ্টি করে।

নয়ন ভরা জল গো তোমার, আচল ভরা ফুল,
ফুল নেব না অশ্রু নেব ভেবে হই আকুল।
মালা যখন গেঁথে ছিলে পাওয়ার সাধ যে জাগে,
মোর বিরহে কাঁদো যখন, আরো ভালো লাগে।

বিষণ্ন বিরিওজা – ৮

একটি পুরনো দিনের টুডোর ফোকস্ ভাগেন গাড়ীতে চড়ে যাচ্ছি আমি। যে রাস্তায় চল্‌ছি সেটা পাহাড়ি হতে পারে, বন্ধুর পথে প্রচন্ড ঝাঁকুনি খেতে খেতে যাচ্ছে গাড়িটি। কিছুদূর এগিয়ে যাবার পর ছোটখাট একটি টিলার পাশে এসে মোড় ঘোরালো ড্রাইভার। তার পরপরই রাস্তাটা নাক বরাবর, সোঁজা তীব্র গতিতে ছুটে চললো গাড়ী। হঠাৎ একটা অদ্ভুত সন্দেহ জাগলো আমার মনে। বাঁকের পর বাঁক ঘুরে মনে হলো একই পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে গাড়িটা। কেন? ভাবলাম ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করি। পরক্ষণেই মন থেকে বাতিল করে দিলাম চিন্তাটা। সহসা একটি বাঁকের কাছে এসে প্রচন্ড ঝাঁকুনি খেয়ে থেমে গেল গাড়িটা। ও ও ও ও ও……… পিলে কাঁপানো শব্দ করে পাহাড়, বন, নদী, সব দিক থেকে ধেয়ে এলো খাঁকি পোষাক পড়া একদল সসস্ত্র সৈন্য। ধক করে উঠল হৃৎপিন্ডটা। ড্রাইভারকে ডাকতে গিয়ে দেখলাম সিটে কেউ নেই, যেন ভোজবাজির মতো উধাও হয়ে গিয়েছে। এদিকে ক্রমশই এগিয়ে আসছে সৈন্যরা। বিপন্ন আমাকে ঐ মুহূর্তে একরাশ এলোমেলো দুশ্চিন্তা ঘিরে ধরলো, কারা ওরা? সৈন্য? কোন দেশের সৈন্য? আমার দিকে তেড়ে আসছে কেন? আমাকে মারতে চায়? আমাকে মেরে ওদের কি লাভ? ভাবতে ভাবতে ওরা আমার খুব কাছে চলে এলো, এত কাছে তারপরেও ওদের কারো মুখ দেখতে পাচ্ছিনা, মনে হচ্ছে ওদের মুখের জায়গাটা অদৃশ্য। কেন? কিন্তু এ মুহূর্তে চিন্তা করারও সময় নেই। আমাকে বাঁচতে হবে। দ্রুত গাড়ির দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে পড়লাম, দিকবিদিক জ্ঞানশূণ্য হয়ে ছুটতে লাগলাম। এতগুলো সৈন্যের সাথে আমি দৌড়ে পারব? তারপরেও ছুটছি, আমার পিছন পিছন ওরাও ছুটছে। ওদের থেকে অনেকটা দূরে চলে এসেছি, নিজেকে সামান্য নিরাপদ মনে হলো। হঠাৎ আমার সামনের মাঠ ফুরে বেরিয়ে এলো আরো কিছু সৈন্য । আমি সর্বশক্তি নিয়োগ করে ডান দিকে ছুটলাম । মনে হচ্ছে আমার চতুর্দিকেই বিপদ, কোথায় ছুটছি, কি করছি, কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। হঠাৎ বড় একটি গাছের সাথে ধাক্কা খেলাম। তারপর সব ফাঁকা। কেউ নেই। আমি মিটমিট করে চোখ খুললাম। জানালা গলে সোনালী রোদ আমার চোখে এসে পড়ছে। ভোর হয়ে গেছে। এতক্ষণ যা দেখছিলাম সব দুস্বপ্ন। আমার গায়ের স্লিপিং স্যুট ঘামে ভিজে চপচপ করছে। হৃৎপিন্ডের ধুকধুকানী এখনো আছে। আশ্চর্য্য! এই স্বপ্নটি আমিআগেও অনেকবার দেখেছি। একই স্বপ্ন বারবার দেখি কেন?

বিছানা ছেড়ে তখনো উঠতে পারিনি, আমার চোখের ঘুম ভেঙেছে কিন্তু শরীর তখনো ঘুমাচ্ছে। আরো কিছুক্ষণ শুয়ে রইলাম। গতরাতের কথা মনে পড়লো। তাতিয়ানার চলে যাওয়ার দৃশ্যটা মনে করে একটু ব্যাথিত হলাম। মেয়েটা কি মনে খুব দুঃখ পেয়েছে? কি জানি? কিন্তু আমি ঐ মুহূর্তে ওকে গ্রহণ করতে পারছিলাম না। অনেকগুলো আবেগ আমাকে ঘিরে ধরেছিলো। যদিও আমি অনেক দিন যাবৎ এদেশে আছি, কিন্তু এখনো আমি ওদের সাথে একাত্ম হতে পারিনি। আমি মদ খাইনা, তাই মদের আসরে আমার বসা হয়না। আর আমি ঐ আসরে বসে যদি না খাই, তাহলে ওরাও অস্বস্তি বোধ করে, তার থেকে না বসাই ভালো। যখন-তখন যেকোন মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করিনা। নারী-পুরুষ সম্পর্কটাকে আমার কাছে অত্যন্ত সিরিয়াস বলে মনে হয় এখানে নিছক ফানের কিছু নেই। নারী-পুরুষ সম্পর্কটা হওয়া উচিৎ পবিত্র, যাকে ভালোবাসোনা তাকে শয্যাসঙ্গিনীও করা যায়না। বাংলাদেশী ও মুসলিম টাবুও বোধহয় আমার মধ্যে কাজ করছিলো কাল রাতে। এদেশে আসার পর অবাধ মেলামেশা করছে সব দেশের ছেলেমেয়েরাই। সেই তালিকায় বাংলাদেশীরাও পিছিয়ে নেই। কিন্তু আমি এখন পর্যন্ত কোন মেয়ের সাথেই সম্পর্কে যাইনি। ঐ বোধগুলো কাজ করে বলেই বোধহয়। আবারো লুবনার কথা মনে হলো। অনেকগুলো বছর ওকে দেখিনা!

ইউনিভার্সিটিতে আজকে চারটি ক্লাস আছে। সবগুলো ক্লাসই ইমপর্ট্যান্ট, কোনটাই মিস দেয়া যাবেনা। ব্রেকফাস্ট করতে বসলাম। চা, ডিম পোচ, বাটার মাখানো ব্রেড টোস্ট আর কিছু পিচ ফল, এই ছিলো খাদ্য তালিকা। খুব মামুলি! যাক, স্টুডেন্টের ব্রেকফাস্ট কি আর রাজকীয় হবে? হঠাৎ অনেক বছর আগে পত্রিকায় পড়া একটা ঘটনা মনে পড়ল, “একদিন শুক্রবার ভোরে প্রেসিডেন্ট জিয়া নাশতা খাচ্ছিলেন ।
আয়োজন সামান্য-
চারটা লাল আটার রুটি, দুই পিস বেগুন ভাজি, একটা সিদ্ধ ডিম !

জিয়ার সঙ্গে নাশতার টেবিলে বসেছেন তাঁর বন্ধু এবং সহযোদ্ধো জেনারেল মঞ্জুর ।
জেনারেল মঞ্জুর বিস্মিত হয়ে বললেন, এই আপনার নাশতা ?
প্রেসিডেন্ট জিয়া বললেন, হতদরিদ্র একটি দেশের প্রেক্ষিতে এই নাশতা কি যথেষ্ট না? ”

ব্রেকফাস্ট সারার পর ধীরে ধীরে হেটে হেটে বাসস্ট্যান্ডের দিকে গেলাম। মিনিট পাঁচেক বাসের জন্য দাঁড়িয়ে মনে হলো, নাহ্‌, হেটে হেটেই ইউনিভার্সিটিতে চলে যাই। আমাদের আশি বছরের বৃদ্ধ অংকের টিচার আগ্রানোভিচ যদি হেটে হেটে এখান থেকে ইউনিভার্সিটিতে যেতে পারেন টগবগে তরুণ হয়ে আমি পারব না? আতাকারা ইয়ারোশা থেকে জিরজিন্‌স্কি স্কোয়ার পর্যন্ত দুইকিলোমিটারের মত পথটা খুব মনোরম। বিশেষত সামারে। চার লেনের চওড়া পিচ ঢালা সড়কের দুপাশে ঢালাই করা চওড়া ফুটপাত। পথের দুপাশে চার সারিতে সুন্দর করে লাগানো বার্চের সারি। শীতকালে এই গাছগুলোতে কোন পাতা থাকেনা একেবারেই ন্যাড়া। আর গ্রীস্ম আসার সাথে সাথে দু’একদিনের মধ্যেই কার্টুন ছবির মত দ্রুত পাতা গজিয়ে বড় হয়ে পাতায় পাতায় ভরে ঝাঁকড়া হয়ে ওঠে, তখন আর বিশ্বাসই করতে ইচ্ছে হয়না যে, এই দুদিন আগেও তারা একদম ন্যাড়া ছিলো। এখন সেপ্টেম্বর মাস। ক্যালেন্ডারের হিসাবে ফল সিজন। গাছের পাতায় পাতায় হলুদ ছোপ সেই সিজনের আগমনী ধ্বনী জানাচ্ছে। আর কিছুদিন পর পাতাগুলো পুরোপুরি হলুদ হয়ে ঝরতে শুরু করবে। এজন্য ইউক্রেণীয় ভাষায় এই ঋতুর নাম ‘লিস্তাপাদ’, মানে ‘পাতাঝরা’। এদেশে জনসংখ্যা কম তাই রাস্তাঘাটে অসহনীয় ভীড় থাকেনা। মনোরম ফুটপাত দিয়ে আমি এবং আমার মত দুএকজন হেটে হেটে যাচ্ছিলো। বার্চের পাতায় একটানা ঝিরঝির শব্দ তুলে চলছে দক্ষিণা হাওয়া। তার মাঝে মাঝে কিছু কিছু টোপল গাছ। এই গাছগুলোতে গ্রীস্মকালে এক ধরনের তুলা হয় আর বাতাসে খসে সারা শহরময় উড়তে থাকে মনে হয় যেন গ্রীস্মের ভর দুপুরে তুষারপাত হচ্ছে। এই নিয়ে একটা গল্প প্রচলিত আছে, কোন এক জারের রাণী জারকে বললো, “আমি তুষারপাত খুব পছন্দ করি কিন্তু গ্রীস্ম ঋতুতে তুষারপাত হয়না, তুমি জার, আমার জন্যে গ্রীস্মে তুষারপাতের ব্যবস্থা করতে পারোনা?” রাণীর ভালোবাসায় সিক্ত রাজা ভেবে ভেবে তখন এই বুদ্ধি করলেন, দেশব্যাপি টপোল গাছ লাগিয়ে দিলেন, আর প্রখর রৌদ্রের গ্রীস্মেও তখন উড়ন্ত টুকরো টুকরো তুলাগুলো তুষারপাতের দৃশ্যের অবতারনা করলো। আহা ভালোবাসা! নারীর আবদার পুরুষকে কত কিছুই না করিয়ে ছাড়ে!

দিনের বেলাটা ইউনিভার্সিটির ক্লাসরূমেই কাটলো। আমাদের ক্লাসে আবার একটা ইন্টারেস্টিং ঘটনা চলছে। সের্গেই আর লেনার মধ্যে চলছে প্রেম। এদিকে আমাদেরই ক্লাসমেট ইয়াকোভ লেনার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। সের্গেই আর লেনা ক্লাসরূমে বসে পাশাপাশি, আর তার ঠিক পিছনেই বসে ইয়াকোভ। ভার্সিটির করিডোরে সের্গেই আর লেনা পাশাপাশি হেটে যায়, আর তাদের পিছনে পিছনে হাটে ইয়াকোভ। সাশা ঠাট্টা করে বলছিলো, “ভেরি ইন্টারেস্টিং, শুধু এই দৃশ্য দেখার জন্যই আমার ইউনিভার্সটিতে আসতে মজা লাগে।” বিকালে ক্লাস শেষ হলো। রূমে ফিরতে ইচ্ছা করছিলো না। তাতিয়ানার কথা মনে হলো। ও যদি আসে? না, আজ প্রোস্তা মারিয়া হবেনা। সুতরাং এই কারণে ও আাসবে না। আমি আর রুমে ফিরলাম না। আলেক্সিয়েভ্‌কা স্টুডেন্টস টাউনের ট্রলিবাসে চড়ে বসলাম। উদ্দেশ্য, কবীর ভাইয়ের রূমে যাব।

কবীর ভাইদের ডরমিটরির গেটেই দেখা হলো আশরাফ ভাইয়ের সাথে। সাথে একটি মেয়ে। মেয়ে বলা বোধহয় ঠিক হলো না, কারণ সে কিছুটা বয়স্ক। এ্যারাউন্ড থার্টি হবে। অবশ্য আশরাফ ভাইও ঐ বয়সীই। আমাকে দেখে আশরাফ ভাই একটু লাজুক হাসলেন।
আশরাফ ভাইঃ আমাদের ডরমিটরিতে বেড়াতে এসেছেন? ওয়েল কাম, ওয়েল কাম। কবীর উপরে আছে, চলে যান। আমি এই আসছি।
বুঝলাম মহিলাটিকে এগিয়ে দিতে যাচ্ছে।

কবীর ভাই আমাকে পেয়ে ভীষণ খুশী। কফি চড়িয়ে দিলেন। প্যাকেট খুলে তস্তরীতে বিস্কিট ছড়িয়ে দিলেন। দুটি আপেল স্লাইস করে কাটলেন। ঐ খেতে খেতে গল্প শুরু করলাম। এর মধ্যে উপর তলা থেকে শিশির ভাই এসে উপস্থিত হলেন। কিছুক্ষণ পর বিরাট বড় একটা তরমুজ নিয়ে আশরাফ ভাই ঢুকলেন।
আশরাফ ভাইঃ বাসস্ট্যান্ডে দেখলাম, বিক্রি হচ্ছে, নিয়ে এলাম। এখানকার তরমুজ তো খুব মিষ্টি হয়, আসুন সবাই মিলে মজা করে খাই।
কবীর ভাইঃ ক্লাস তো শুরু হয়ে গেল। কেমন চলছে দিনকাল?
আমিঃ হ্যাঁ, এতোদিন ভ্যাকেশন ছিলো, মজায় ছিলাম। এখন তো আবার ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল।
আশরাফ ভাইঃ নতুন ইয়ার শুরু, ডরমিটরিতে নতুনা মেয়েরা এসেছা না?
আমিঃ (মুচকি হেসে) তাতো এসেছেই। আপনার কি খবর?
আশরাফ ভাইয়ের আমাকে এড়ানোর কিছু নাই, কারণ একটু আগেই আমি তাকে একজনার সাথে দেখেছি। তিনি তাই খোলাখুলি বললেন,
আশরাফ ভাইঃ ঐ যে মহিলা একজনকে দেখলেন রঙ্গ-রস করতে এসেছিলো।
আমিঃ তা রঙ্গ-রস হলো?
কবীর ভাইঃ (টিপ্পনী কেটে) রঙ্গ হয়েছে রস হয়নি।
হাঃ হাঃ হাঃ করে সবাই কোরাসে হাসলাম। আশরাফ ভাই লজ্জা পেয়ে গেলেন।
আশরাফ ভাইঃ ও তো বয়স্ক। ডিভোর্সড লেডি, ছোট একটা মেয়ে আছে। আপনার ওখানে তো ফার্স্ট ইয়ারের ফ্রেস মেয়ে আসার কথা।
আমিঃ তা তো এসেছেই।
শিশির ভাইঃ ছেলেপেলেরা তো তাহলে বেশ রঙ্গ-রস করছে।
আশরাফ ভাইঃ ছেলেপেলেদের কথা বাদ দেন। রিমন ভাই কি রঙ্গ-রস করছেন তাই বলেন।
আমিঃ (আমি হতাশ সুরের ভান করে বললাম) আমি কিছুই করছি না।
শিশির ভাইঃ কি বলেন সুযোগ পেয়েও করছেন না?
আশরাফ ভাইঃ সুযোগ এসেছে?
আমিঃ (রহস্য করে বললাম) হু, একটা মেয়ে আছে।
আশরাফ ভাইঃ বলেন কি? ফার্স্ট ইয়ার?
আমিঃ ইয়েস।
আশরাফ ভাইঃ খুব সুন্দরী?
আমি (হতাশার ভঙ্গি করে) নাহ্‌! নিতান্তই অসুন্দরী।
কবীর ভাইঃ তা কি করে হয়? এদেশের সব মেয়েই তো সুন্দরী।
আমিঃ মাই ব্যাড লাক। যে দু’একটা অসুন্দরী আছে, মেয়েটি তার তালিকায়।
আশরাফ ভাইঃ রিমন ভাই কি মেয়েটিকে বাতিলের খাতায় লিখে রেখেছেন?
আমিঃ মেয়েটির জন্য কি আপনার মনে দরদ জাগছে?
আশরাফ ভাইঃ ওকে দেখিনিতো।
আমিঃ আসেন একদিন দেখে যান। পছন্দ হলে প্রোপোজ করবেন।
লাজুক হাসলেন আশরাফ ভাই।
আশরাফ ভাইঃ ঠিক আছে আসবো একদিন, দেখে যাবো। তারমধ্যে আপনি একটু দেখেশুনে রাখুন। দেখবেন অন্য কেউ যাতে আবার ট্রাম্প করে না ফেলে।
আমিঃ আরে আশরাফ ভাই ট্রাম্প করলেই বা অসুবিধা কি? ট্রাম্পের উপর দিয়ে আবার ওভার ট্রাম্প করা যায়।
হাঃ হাঃ হাঃ । সবাই আরেক দফা কোরাসে হাসলো।
গল্পে গল্পে কখন যে বেলা শেষ হয়ে গেছে টের পাইনি। হঠাৎ কবীর ভাইয়ের রূম থেকে দেখলাম দূরে টিলা আর বনের উপর অস্ত যাচ্ছে লাল সূর্যটা। ধীরে ধীরে খারকভ শহরের উপর নেমে আসছে ঘন অন্ধকার। দ্রুত উঠে পড়লাম।

ট্রলিবাসটি ছুটে চলছে আতাকারা ইয়ারোশার স্টুডেন্টস টাউনের দিকে মাঝখানে ছয়টি স্টপেজ। স্টপেজগুলেতে বাস থামলে যাত্রীরা ওঠানামা করছে। অন্ধকারে আর বাসের বিশাল কাঁচের জানালা গলে প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগ নাই। যা উপভোগ করা যায় তা হলো, রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া আর স্ট্রীট ল্যাম্পগুলোর তীব্র আলোর ঝলকানি। এদেশেই প্রথম নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট স্থাপিত হয়। অতি ক্ষুদ্র পরমাণুর ভিতরে নিহিত রয়েছে অপরিসীম শক্তি। মানুষ রপ্ত করেছে সেই শক্তি বের করে আনার কায়দা। কি করবে সেই শক্তি দিয়ে সেটা শাসকের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে। এই পৃথিবীতে পারমানবিক শক্তি ব্যবহারের প্রথম সিদ্ধান্তটি ছিল মানুষের বিরুদ্ধে। পরমানু থেকে প্রবল শক্তি বাইরে বের করে আনা সম্ভব এটা তখন অনেকেরই জানা হয়ে গেছে। সেই সময় পৃথিবী জুড়ে চলছিলো ভয়াবহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল। চলছে শক্তির লড়াই, কে করবে পৃথিবী শাসন? কে হবে বিশ্বের দন্ডমুন্ডের কর্তা? তাই জার্মানী, জাপান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইত্যাদি বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে চলছে প্রতিযোগিতা কে প্রথম অর্জন করতে পারবে পরমানু থেকে শক্তি বাইরে বের করে আনার প্রযুক্তি। সর্বপ্রথম এই প্রযুক্তি অর্জন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ব্যাস ব্রহ্মাস্র চলে এলো হাতে। আর যায় কোথায়। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো মার্কিন সরকার,জাপানী জনগণের বিরূদ্ধে ব্যবহার করা হবে এই ব্রহ্মাস্র। পরমাণুর প্রবল শক্তিতে ছাড়খার হয়ে যাবে জাপানী জনগণ। হাহাকার করে উঠলো বিজ্ঞানীদের অন্তরাত্মা। এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে তারা এই প্রযুক্তি অর্জনে দিবারাত্রি পরিশ্রম করেননি। বারংবার তারা আর্জি করেন, সরকার যেন কিছুতেই তা ধ্বংসাত্মক কাজে ব্যবহার না করে। তাদের শত অনুনয় সত্বেও, মানবজাতির এত বড় একটি অর্জন প্রথম ব্যবহার করা হলো মানবজাতির বিরুদ্ধেই। বিশ্ববাসী হতবাক হয়ে দেখলো হিরোসিমা আর নাগাসাকির তান্ডবলীলা। মুহুর্তেই ঝরে গিয়েছিলো এক লক্ষ চল্লিশ হাজার নিরিহ নিরাপরাধ প্রাণ। এই প্রযুক্তি অর্জনকারী দ্বিতীয় রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম সফল প্রয়োগ ছিলো শান্তিপূর্ণ কাজে। তারা প্রতিষ্ঠা করেছিলো পৃথিবীর প্রথম নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট। অল্পতেই পাওয়া যাচ্ছে অফুরন্ত বিদ্যুৎ শক্তি। তাই এনার্জি ক্রাইসিসের কোন ধারণাই এদেশে নাই। বরং নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে তারা পশ্চিম ইউরোপে বিদ্যুৎ রপ্তানীও করে থাকে।

ডরমিটরিতে ঢোকার পথে সাশার সাথে দেখা হলো।
সাশাঃ আরে রিমন, তুমি বাইরে ছিলে?
আমিঃ হ্যাঁ, আমাকে খুঁজছিলে?
সাশাঃ একবার গিয়েছিলাম তোমার রুমে। জাস্ট ঢুঁ মারা আরকি। কেমন আছো জানতে।
আমিঃ চল, রূমে যাই।
সাশাঃ না থাক। দেখা তো হলোই। এখন রাত হয়ে গিয়েছে।
সেই রাতে আমার রূমে আর কেউ আসলো না।

পরদিন ক্লাশ শেষ করে কোথাও না গিয়ে সরাসরি রূমে চলে এলাম। কেন? সে কি তাতিয়ানা যাতে আমার রূমে ‘প্রোস্তা মারিয়া’ দেখতে পারে সেজন্যই? কি জানি? যাহোক তাড়াতাড়ি লাঞ্চ শেষ করে, রূমটা একটু গোছগাছ করে নিলাম। টিভি সেটটা অন করে রাখলাম। সেখানে রাশিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর একটা ডকুমেন্টারী ফিল্ম চলছে। রাজনীতিতে আমার আগ্রহ প্রচন্ড। মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলাম। প্রি ও পোস্ট সোভিয়েত রাজনীতির উপর ডকুমেন্টারিটি। বেশ ইন্টারেস্টিং। এক পর্যায়ে জর্জিয়া প্রজাতন্ত্রের রাজধানী তিবিলিসির ১৯৮৯ সালের নয়ই এপ্রিল ট্রাজেডি দেখালো। সেখানে এন্টি-সোভিয়েত মুভমেন্টে সমাবেশ ও অনশনরত মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো কম্যুনিস্ট পার্টির তল্পিবাহক সোভিয়েত আর্মি। এই অনশনের ফুটেজ দেখে আমার আরেকটি ঘটনা মনে পড়লো। ১৯৮১ সালের গোঁড়ার দিককার কথা। আমি তখন নিতান্তই বালক। হঠাৎ পত্র-পত্রিকায় দেখলাম এক কিশোরকে নিয়ে ভীষণ হৈচৈ। লন্ডনের জেলে কয়েকজন আইরিশ কয়েদি আমরণ অনশন করছে। পত্র-পত্রিকায় খবর এটুকুই। আর একটু বিস্তারিত জানা গেল আরও দুদিন পর। আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির (আইআরএ) গ্রেপ্তারকৃত যে যোদ্ধারা অনশন করছিল তাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছেলেটির নাম ববি স্যান্ডস। বয়স মাত্র সতের! সেই সতের বছরের কিশোর অনশণ করছিল রাজবন্দী ঘোষণার দাবীতে! থ্যাচার সরকার তাদের গ্রেপ্তার করেছিল ‘সন্ত্রাসী’ বলে। তারা সেটি মানতে নারাজ। তাদের দাবী তারা আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির সদস্য, এবং ব্রিটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতার দাবীতে। সুতরাং তারা রাজবন্দী কেন নয়? কিন্তু মার্গারেট থ্যাচার সরকার কিছুতেই ওই আইআরএ যোদ্ধাদের রাজবন্দীর মর্যাদা দেবেনা। টানা অনশন করতে করতে একসময় মৃত্যুবরণ করলেন ববি স্যান্ডস। ওই কিশোরের মৃত্যুর পর পরই সারা বিশ্বে এ নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। একের এর পর এক আরও কয়েকজন বন্দীর মৃত্যু হয়েছিল। ঐ রকম এক সুদর্শন কিশোরের সাদাকালো ছবি খবরের কাগজে দেখে আমি অনেকক্ষণ চোখ ফেরাতে পারিনি। একইসাথে ব্যাথিত ও অভিভুত হয়েছিলাম। ও তারুণ্য কি তোমার দুর্বার শক্তি কেমন অনায়াসেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলে! কিন্তু লৌহমানবী খ্যাত থ্যাচারের লৌহহৃদয় তাতে এতটুকুও গলেনি। শেষ পর্যন্ত তাদের রাজবন্দীর ‘মর্যাদা’ দেয়া হয়নি।

ডকুমেন্টারী ফিল্মটা শেষ হওয়ার পর কিছু বিজ্ঞাপন হলো। এক সময় সোভিয়েত টিভিতে কোন বিজ্ঞাপন ছিল না। এখন বেশ চটকদার চটকদার রকমারী বিজ্ঞাপন হয়। বিজ্ঞাপন শেষে প্রোস্তা মারিয়া শুরু হলো। মারিয়া দেখায় আমার তেমন কোন আগ্রহ নেই তারপরেও আজ কেন জানিনা দেখতে শুরু করলাম। দশ মিনিট পার হয়ে গেল, ভাবলাম একটু চা খাওয়া যাক। ইলেকট্রিক কেট্লটা হাতে নিয়ে দেখলাম, খালি। পানি আনতে পাশের বাথরূমে যাওয়া প্রয়োজন। সেই উদ্দেশ্যে দরজা খুলতেই দেখলাম তাতিয়ানা দঁড়িয়ে আছে। নক করতে উদ্যত হচ্ছিলো। কেন জানিনা আমার মনটা খুশিতে ভরে উঠলো। আমি কি ওর জন্য অপেক্ষা করছিলাম? না, কখনোই না, আমার মন বলছে, না। তাহলে ওকে দেখে আমি খুশী হলাম কেন? আবার মন তীব্র প্রতিবাদ করে উঠলো। কিছুতেই আমি ওকে দেখে খুশী হইনি। ওকে দেখে খুশী হবো কেন? ও আমার কে?

আজ সাদাসিদা পোষাকে আছে ও। প্রসাধনও নেই কোন। ডিভানে বসে একমনে ‘প্রোস্তা মারিয়া’ দেখছে। ফিল্মের এক জায়গায় বিয়ের প্রসঙ্গ এসেছিলো। ছেলে নিজে মেয়ে পছন্দ করেছে, কিন্তু বাবা মা রাজী হচ্ছে না। কারণ মেয়ের পরিবারের অর্থনৈতিক স্ট্যাটাস ছেলের পরিবারের চাইতে অনেক নীচে। আমি এক সময় ভাবতাম এই কালচারটা কেবল ভারত উপমহাদেশের সমাজেই রয়েছে। পরে আমার আরব বন্ধুদের সাথে আলোচনা করে জেনেছিলাম, ওদের দেশেও একই ব্যাপার। একবার আমার এক সিরিয়ান বন্ধু, বললো, এবারের ছুটিতে ও দেশে গিয়ে এনগেজমেন্ট করে এসেছে। আমি ওকে অভিনন্দন জানিয়ে জানতে চাইলাম, “মেয়ে কেমন?” ও উত্তর দিলো, “আমাদের দেশে মেয়েকে যত না দেখা হয়, তার চাইতে বেশি দেখা হয় মেয়ের পরিবারকে”। ল্যাটিন আমেরিকান টেলে-সিরিয়ালগুলোর কল্যাণে জানলাম, ওখানেও একই অবস্থা। একবার মার্কিনী এক ফিল্মেও এই বিষয়টি দেখে বেশ অবাক হয়েছিলাম। রাশিয়াতে এই সমস্যাটি এখনো নেই। সমাজতন্ত্রের কল্যাণে, অর্থনৈতিকভাবে সবাই সমান হওয়াতে, এই সামাজিক স্তরজনিত সমস্যা কম ছিলো। তবে সুশিক্ষিত ভদ্র পরিবার ও নিম্নমানের পরিবার এই বিষয়টি আছে।

সিরিয়াল শেষ হলে তাতিয়ানা আমাকে প্রশ্ন করলো
তাতিয়ানাঃ তোমাদের দেশে বিয়ের পদ্ধতি কি? এ্যারেন্জড ম্যরেজ না লাভ ম্যারেজ?
আমিঃ দুটোই আছে। তোমাদের দেশে বিয়ের একটাই পদ্ধতি – নিজের পছন্দ বা ভালোবাসার বিয়ে।
তাতিয়ানাঃ হু। তবে আজকাল প্রচুর হিসেবের বিয়ে হচ্ছে।
আমিঃ হিসেবের বিয়ে মানে?
তাতিয়ানাঃ মানে ছেলে মেয়েরা হিসেব করে, এই বিয়েটা করে কতটুকু লাভ হবে।
আমিঃ তাই?
তাতিয়ানাঃ হ্যাঁ। এখন দেশের সমাজ কাঠামোর পরিবর্তন হয়েছে। ধনী-গরীব বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। তাই বিয়ের মধ্যেও টাকা-পয়সা ব্যাপারটা চলে এসেছে।
আমিঃ ও, জানতাম না।
তাতিয়ানাঃ মেয়েরা বিশেষতঃ টাকাওয়ালা ছেলে খোঁজে। তারপর সেরকম পেলে তাকে নানাভাবে জালে আটকানোর চেষ্টা করে।
আমিঃ তোমার কি মনে হয়? কোনটা ভালো, এ্যারেন্জড ম্যরেজ না লাভ ম্যারেজ?
তাতিয়ানাঃ নিজের পছন্দের বিয়ে হলেই ভালো কারণ সেটা ভালোবাসার বিয়ে, মনের মানুষটাকে নিয়েই তো ঘর বাঁধতে ইচ্ছা হয়।
আমিঃ তোমাদের দেশের অনেকেই একাধিক সম্পর্কের পর বিয়ে করে, সেই বিয়েটা কি আদৌ ভালোবাসার?
তাতিয়ানাঃ লুবোভ প্রিখোদিত ই উখোদিত।
আমিঃ মানে কি?
তাতিয়ানাঃ ভালোবাসা আসে আর যায়।
আমিঃ এটা কেমন কথা? ভালোবাসা কি এতোই ঠুনকো?
তাতিয়ানা হেসে ফেললো। গত পরশু রাতের ঘটনার পর থেকে এই পর্যন্ত ওকে খুব গম্ভীর দেখছিলাম। মুক্তোর মতো দাত বের করে এই হঠাৎ হাসির ঝলক খুব ভালো লাগলো। যেন অনেকক্ষণের গুমোট বাতাস উড়িয়ে নিয়ে গেল।
তাতিয়ানাঃ না। কথাটা আমাদের দেশে প্রচলিত আছে। অনেকে বলে আমি বিশ্বাস করিনা। ভালোবাসা ভালোবাসাই তা ঠুনকো হবে কেন?
আমিঃ তবে একটি বিষয় কি জানো? ভালোবাসলেই ঘর বাধা যায়না।
তাতিয়ানাঃ কেন?
আমিঃ অনেক সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, আইনগত জটিলতা থাকে।
তাতিয়ানাঃ ও। পৃথিবীতে কেন এতো জটিলতা বলতো? (ওর হতাশ কন্ঠ প্রকাশ পেল)
আমিঃ এ্যারেন্জড ম্যরেজের সুবিধা হলো, বিবাহোত্তর জীবনে টাকা একটা বড় ফ্যক্টর হয়ে দেখা দেয়, তাই সেটা নিশ্চিত করা জরুরী, বিয়ের আগে বিশাল আবেগ থাকে, কিন্তু বৈবাহিক জীবনের একটা পর্যায়ের পরে সেটা তিরোহিত হয়।
তাতিয়ানাঃ তুমি তাই মনে করো?
আমিঃ ঠিক বলতে পারবো না। আমার বাস্তব কোন অভিজ্ঞতা নেই তো। বই-পত্র, নাটক-নভেলে যা দেখি।
তাতিয়ানাঃ ভালোবাসা দিয়ে কি দুজন-দুজনের অভাবগুলোকে পুরণ করা যায়না?
আমিঃ জানিনা। যায় হয়তো। এই নিয়ে একটা গান আছে আমাদের ভাষায়।
তাতিয়ানাঃ কি গান? (ভীষণ উৎসাহিত হয়ে উঠে বললো তাতিয়ানা)
আমিঃ আমার না যদি থাকে সুর, তোমার আছে তুমি তা দেবে,
তোমার গন্ধ হারা ফুল আমার কাছে সুরভী নেবে,
এরই নাম প্রেম, এরই নাম প্রেম, ………………..।
তাতিয়ানাঃ (দ্বিগুন উৎসাহ নিয়ে) তোমার কাছে আছে গানটি? শোনাবে আমাকে। অনুবাদও করে দিও প্লিজ
আমি কিংবদন্তির বাঙালী গায়ক মান্না দে’-র গাওয়া গানটি চালিয়ে দিলাম।
” কি অদ্ভুত সুন্দর সুর” উচ্ছাস প্রকাশ করে। গভীর আবেগে তা শুনতে লাগলো বাংলাদেশ থেকে হাজার যোজন মাইল দূরে বসে থাকা এক ইউক্রেণীয় তরুণী।

আমার না যদি থাকে সুর, তোমার আছে তুমি তা দেবে,
তোমার গন্ধ হারা ফুল আমার কাছে সুরভী নেবে,
এরই নাম প্রেম, এরই নাম প্রেম,
জীবনে যা গৌরবও হয় মরণেও নেই পরাজয়,
চোখের স্মৃতির মণিদ্বীপ মনের আলোয় কভু কি নেভে?
এরই নাম প্রেম, এরই নাম প্রেম,
দুজনেই দুজনাতে মুগ্ধ, দুজনার রূপে কত সুন্দর,
দুজনার গীতালীর ছন্দে, তন্ময় দুজনার অন্তর,
এর কাছে স্বর্গ সুধার বেশী আছে মূল্য কি আর,
আমার দেবতা সেও তাই, প্রেমের কাঙাল পেয়েছি ভেবে,
এরই নাম প্রেম, এরই নাম প্রেম।

বিষণ্ন বিরিওজা – ৯

বাহ্ মেয়েটিতো সুন্দর!” বেশ উচ্ছসিত হয়ে বললেন আশরাফ ভাই। পাশে বসে মুচকি হাসলেন শিশির ভাই।
ডিভানের এক পাশে চুপচাপ বসে ছিলো তাতিয়ানা। ও বাংলা বোঝেনা তাই আমাদের সুবিধা হচ্ছিলো। এদেশে এটাকে অভদ্রতা মনে করা হয়, যখন ভিনদেশী একজন বা কয়েকজনার উপস্থিতিতে কেউ কেউ তার মাতৃভাষা বা এমন কোন ভাষায় কথা বলে যা সবাই বুঝতে পারেনা। কিন্তু আমরা বাঙালীরা অত ভদ্রতা বুঝিনা। সমানে অন্যদের সামনে বাংলায় কথা বলে যাচ্ছি। অন্যে যে আমার কথাটা বুঝতে পারছে না,সে বিব্রত বোধ করতে পারে, এটা চিন্তা না করে বরং এটার সুযোগই নেই বেশীর ভাগ সময়ে।

আশরাফ ভাই আর শিশির ভাই, আমার রুমে এসেছিলেন বেড়াতে। আধ ঘন্টা তক গল্প-গুজব করার পর এক পর্যায়ে তাতিয়ানা এসে ঢুকলো আমার রূমে। সাদা টপস আর কালো স্কার্ট পরিহিতা তাতিয়ানাকে আমার খুব সাদাসিদে মনে হচ্ছিলো। যার সম্বন্ধে আমি ইতিমধ্যেই উনাদেরকে বলেছি, ‘অসুন্দর’। সেই মেয়েটিকেই আশরাফ ভাই সুন্দরী আখ্যা দিলেন! আসলে পছন্দের রকমফের হয়।একবার রাশিয়ার ভ্লাদিমির শহরে বেড়াতে গিয়েছিলাম। একটি উঁচু টিলায় বসে শহরের বুক চিরে চলে যাওয়া ছোট একটি নদীর সৌন্দর্য্য উপভোগ করছিলাম। এসময় দুটি রুশ মেয়ে এগিয়ে এসে আমার পাশে বসা ভ্লাদিমিরে অধ্যয়নরত আমার বন্ধুটির সাথে কুশল বিনিময় করলো। দুজনাই ইউনিভার্সিটিতে সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী। এদের মধ্যে একজন ছিলো দীর্ঘাঙ্গী, প্যান্ট শার্ট পরা, অপরজন ছিলো মাঝারী গরনের, পরনে স্কার্ট। ওরা চলে যাওয়ার পর আমার বন্ধুটি বললো, “কেমন দেখলি ঐ মেয়েটিকে?”
আমিঃ কোন মেয়েটি?
বন্ধুঃ স্কার্ট পড়া মেয়েটি।
আমিঃ হাসিখুশী।
বন্ধুঃতা ঠিক আছে। কিন্তু দেখতে কেমন?
আমিঃ হু, মোটামুটি। (দায়সারা গোছের উত্তর দিলাম)
বন্ধুঃ সুন্দর না, তাইনা?
আমিঃ হ্যাঁ, তাই। এবার সত্যি কথাটা বললাম।
বন্ধুঃ অথচ, এক ইন্ডিয়ান ছেলে ওর জন্য পাগল। ছেলেটি খুব ভদ্র। মেয়েটিকে ভীষণ ভালোবাসে। মেয়েটির জন্য ও কেঁদেছে পর্যন্ত। ওর বক্তব্য, “এতো সুন্দর মেয়ে আমি জীবনে কখনো দেখিনি”।
আমি ভাবলাম, এজন্যই বোধহয় গান রচিত হয়েছে, ‘যার নয়নে যারে লাগে ভালো!’

আশরাফ ভাইরা চলে যাওয়ার পর আমি কিছুক্ষণ টিভি দেখলাম। কালকে একটা ক্লাস টেস্ট হবে, পড়তে ইচ্ছা করছিলো না। ফাইনাল ইয়ারে এসে আর ক্লাস টেস্টে কোন টেস্ট পাইনা। টিভিতে চলা এ্যমেরিকান ফিল্মটি বোগাস মনে হলো। সব এক ধাঁচের। ক্রাইম, খুন, গাড়ী ভাঙা, টাকা আর সেক্স। এই হলো এ্যামেরিকান ফিল্মের মাল-মশল্লা! কফি তেস্টা পেলো। ইলেকট্রিক কেটলটা অন করলাম।

টুক টুক টুক, তাতিয়ানা হতে পারে। আজকাল দিনে দুবারও আসে। যা ভেবেছিলাম তাই। তাতিয়ানাই। পোষাক পাল্টে এসেছে। পরনে হালকা খাটো সাদা শার্ট আর কালো রঙের মিনি স্কার্ট। যথারিতি সিডাকটিভ পোষাক। ও কি আমাকে সিডিউস করার জন্য এই পোষাক পড়েছে? বুঝিনা। হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। এখানে তো ঐ পোষাক স্বাভাবিক। এই মুহুর্তে করিডোরে অনেক মেয়েকেই ঐ পোষাকে দেখা যাবে।

আমিঃ বসো।
তাতিয়ানাঃ কি করছো?
আমিঃ কিছুনা। টিভি দেখার চেষ্টা করছিলাম। বোগাস এ্যামেরিকান ফিল্ম।
তাতিয়ানাঃ অন্য চ্যনেলে দেখো কি আছে।
আমিঃ মুড নাই।
তাতিয়ানাঃ তাহলে গান শোন।
আমিঃ গান? হ্যাঁ, গান শোনা যায়।
তাতিয়ানাঃ তাহলে চালাও।
আমিঃ ওকে
এই বলে আমি ক্যাসেট প্লেয়ারের সুইচ অন করতে গিয়ে থেমে গেলাম।
তাতিয়ানাঃ কি ব্যাপার?
আমিঃ না থাক।
তাতিয়ানাঃ কেন?
আমিঃ এখানে তুমি আছো।
তাতিয়ানাঃ আমি থাকাতে গান শুনতে অসুবিধা কি?
আমিঃ আমি তো বাংলা গান শুনি। তুমি তো বুঝবে না। শুধু শুধু বোর ফীল করবে।
তাতিয়ানাঃ ওহো, এই ব্যাপার! না তোমাদের গানের অর্থ আমি বুঝিনা সত্য, কিন্তু সুর খুব ভালো লাগে।
আমিঃ একটা গান শুনেই সুর ভালো লেগে গেল?
তাতিয়ানাঃ একটা গান? না একটা গান না। আমি আগেও তোমাদের দেশের গান অনেক শুনেছি।
আমি সরু চোখে ওর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম
আমিঃ আমার আগেও আরো কারো কাছে আমাদের গান শুনেছ নাকি?
তাতিয়ানাঃ (হেসে ফেললো) না, কারো কাছে নয়। আমি ইন্ডিয়ান ফিল্ম দেখি মাঝে মাঝে। সেখানে তো অনেক গান থাকে। গান ছাড়া তো কোন ফিল্ম করতে পারোনা তোমরা।
আমিঃ কোথায় দেখো ইন্ডিয়ান ফিল্ম?
তাতিয়ানাঃ টিভিতে তো দেখায়। তাছাড়া আাদের গ্রামের সিনেমা হলেও আসে মাঝে মাঝে।
আমিঃ ও।
তাতিয়ানাঃ আচ্ছা তোমাদের ফিল্মগুলো গান ছাড়া হয়না, না?
আমিঃ তুমি তো ইন্ডিয়ান ফিল্মের কথা বললে। আমি তো ইন্ডিয়ান না, বাংলাদেশী।
তাতিয়ানাঃ জানি তোমাদের ভিন্ন ভিন্ন দেশ, কিন্তু আমার কাছে তোমাদের একই রকম মনে হয়। ইন্ডিয়ান বাংলাদেশীতে পার্থক্য কি খুব বেশী?
আমিঃ কিছু পার্থক্য তো আছেই। তা নইলে আলাদা আলাদা দেশ হবে কেন?
তাতিয়ানাঃ সে বোধহয় আমাদের ইউক্রেন আর রাশিয়ার মতো।
আমিঃ হতে পারে। ফিল্মে গানের কথা যেটা বলছো, ওটা কিন্তু হিন্দি ছবির আগে বাংলা ফিল্মেই প্রথম এসেছে।
তাতিয়ানাঃ তাই?
আমিঃ যতদূর জানি, প্লে-ব্যাক বিষয়টি, মানে নেপথ্যে গায়ক-গায়িকা গান গাইবে, আর পর্দায় নায়ক-নায়িকা লীপ মিলাবে এই বিষয়টি পৃথিবীতেই প্রথম চালু করা হয় বাংলা সিনেমায়।
তাতিয়ানাঃ তাই? তোমাদের সিনেমায়?
আমিঃ হ্যাঁ, তবে তখন ফিল্ম ঢাকায় চিত্রায়িত হতোনা, হতো কোলকাতায়।
তাতিয়ানাঃ ইন্টারেস্টিং। আমাদের রুশ কিছু ছবিতেও তো প্লে-ব্যাক রয়েছে।
আমিঃ আমি দেখেছি। বিখ্যাত ছবি ‘কাভখাজকাইয়া প্লেননিত্সা’, ‘ইরোনিয়া সুদবি ইলি এস লিওগকিম পারোম’, ইত্যাদি ছবিগুলেতে প্লে-ব্যাক আছে।
তাতিয়ানাঃ তাইতো। তার মানে এটা আমরা তোমাদের কাছ থেকে শিখেছি?
আমিঃ তাইতো মনে হয়। বাই দ্য বাই। আমি কিন্তু তোমাদের টিভিতে একটা প্রোগ্রাম দেখেছিলাম, ‘সিনেমার গান’ নামে।
তাতিয়ানাঃ হ্যাঁ, এক সময় খুব জনপ্রিয় ছিলো ঐ প্রোগ্রাম।
আমিঃ আমাদের দেশেও ‘ছায়াছন্দ’ নামে ঐরকম একটি প্রোগ্রাম খুবই জনপ্রিয় ছিলো।
তাতিয়ানাঃ ইন্টারেস্টিং, দেখতে পারলে ভালো লাগতো।
আমিঃ দেখবে?
তাতিয়ানাঃ কিভাবে?
আমিঃ ভিডিও চালিয়ে দেই।
তাতিয়ানাঃ ক্যাসেট আছে?
আমিঃ আছে।
তাতিয়ানাঃ চালাও তাহলে।
আমি গীতমালার একটি ক্যাসেট হাতে নিলাম, এখানে কিছু বাংলা ও হিন্দি গান রয়েছে। ভিডিওটার কাছে গিয়ে বললাম

আমিঃ না আজ থাক
তাতিয়ানাঃ (অনেকটাই ক্ষিপ্ত হয়ে) আজ থাকবে কেন? আশা দিয়ে এভাবে নিরাশ করো! দিস ইজ ভেরি ব্যাড।
আমিঃ না, নিরাশ করতে চাচ্ছিনা। মানে আজ অনেক রাত হয়ে গেছে।
তাতিয়ানাঃ কি হয়েছে তাতে? আমি কি হাজার মাইল দূরে থাকি নাকি?
আমিঃ কাছেই থাকো (একটু দমে গিয়ে বললাম)
তাতিয়ানাঃ তোমার ফ্লোরেই তো থাকি। আর দুটো রূম পরে। গভীর রাত হলেই বা সমস্যা কি?
আমিঃ না, তার পরেও।
তাতিয়ানাঃ তার আবার পর কি? এখানে কি আমার বাবা-মা আছে যে, আমার ফিরতে দেরী হলে তাদের রাতে ঘুম হবে না? ডরমিটরিতে তো আমরাই রাজা।
ওর এতো মারমুখো কথায় আমি আর, বাধা দিতে পারলাম না। ভিডিওটা অন করে দিলাম। গীতমালা বা ছায়াছন্দ চলতে শুরু করলো। তাতিয়ানাকে দেখলাম বেশ মুগ্ধ হয়ে দেখছে।
তাতিয়ানাঃ আচ্ছা এখানে যেমন দেখায়, তোমাদের দেশে প্রেমিক-প্রেমিকা কি সত্যিই এমন নাচ-গান করে?
আমিঃ সব্বোনাশ! রাস্তা-ঘাটে এরকম নাচ গান করলে রক্ষে আছে?
তাতিয়ানাঃ কেন কেন, কি অসুবিধা?
আমিঃ পাবলিক ধাওয়া দেবে।
তাতিয়ানাঃ বুঝলাম না!
আমিঃ মানে এরকম হয়না। আমাদের কালচারে নেই। এটা কেবলই সিনেমা।
তাতিয়ানাঃ ও, স্বপ্নের জগৎ!
আমিঃ তবে তোমরা এদিক থেকে এগিয়ে আছো।
তাতিয়ানাঃ কি রকম?
আমিঃ তোমাদের এখানে ডিসকো-টেকা হয়। সেখানে নাচ-গান করো। প্রেমিক-প্রেমিকা একে অপরের সান্যিধ্যে এসে ক্লোজ ড্যান্স করতে পারো।
তাতিয়ানা মৃদু হেসে বললো
তাতিয়ানাঃ তুমি ডিসকোতে যাওনা?
আমিঃ খুব কম।
তাতিয়ানাঃ তোমাকে দেখিনি কখনো।
আমিঃ কম যাই, তাই দেখোনি।
তাতিয়ানা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে, একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বললো
তাতিয়ানাঃ চলোনা নেক্সট স্যটারডেতে যাই।
আমিও একটু চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লাম। কি উত্তর দেব। এই মেয়েটির সাথে আমি নিজেকে জড়াতে চাইনা। একটু থেমে ক্ষীণ স্বরে উত্তর দিলাম
আমিঃ দেখি।

ঐরাতে তাতিয়ানা আরো একঘন্টা আমার রূমে বসে সিনেমার গান শুনেছিলো। তারপর চলে যাওয়ার জন্য নড়েচড়ে বসে বললো
তাতিয়ানাঃ খুব রোমান্টিক, তোমাদের এই গানগুলো!
ও উঠে দাঁড়াতেই বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো।
তাতিয়ানাঃ বাহ্ বৃষ্টি! তোমাদের দেশে তো অনেক বৃষ্টি হয়, তাই না?
আমিঃ হ্যাঁ আমাদের দেশে ঝম-ঝম বর্ষা নামে। ঝিলের বুকে শাপলা ফোটে। উথাল-পাতাল জোছনায় ভরে যায় চারিদিক। হালের দুপাশে দিগন্তজোড়া ধান ক্ষেত, তার উপর দিয়ে হু হু করে বয়ে যায় দুরন্ত হাওয়া!

তাতিয়ানা গভীর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো, জানিনা ও কি ভাবছে।

তাতিয়ানা উঠে দাঁড়ালো। আমি ভাবলাম চলে যাবে তাই উঠে দাঁড়িয়েছে। আমিও উঠে দাঁড়াতে যাব, এসময় ও আবার বসে পড়লো।
তাতিয়ানাঃ কি ধরনের ফিল্ম পছন্দ কর তুমি?
আমিঃ সব রকমই।
তাতিয়ানাঃ তাই হয় নাকি?
আমিঃ কেন হবে না?
তাতিয়ানাঃ সবার কি সব পছন্দ হয়? এই ধর রঙ , তোমার কি সব রঙই পছন্দ?
আমিঃ না।
তাতিয়ানাঃ এই দেখো, কোন একটি বিশেষ রংয়ের প্রতিই তোমার দুর্বলতা রয়েছে।
আমিঃ না ঠিক তাও নয়। কোন একটি বিশেষ রংয়ের প্রতি নয়, কিছু কিছু রং ভালো লাগে। যেমন আকাশী, ম্যাজেন্টা, বেগুনী।
তাতিয়ানাঃ তাইতো বলছি, সব ভালো লাগতে পারেনা। ভালো হলেও না। আবার ধরো ফুল, ফুল সবই তো সুন্দর, তারপরেও নিশ্চয়ই কোন একটি ফুল তোমার বেশি ভালো লাগে?
আমিঃ হ্যাঁ, তবে আবারও সেই, একটি নয় কয়েকটি ফুল আমার ভালো লাগে।
তাতিয়ানাঃ কোন কোন ফুল ভালো লাগে তোমার?
আমিঃ আমার ভালো লাগার ফুলগুলো দিয়ে তোমার বাগান ভরিয়ে দিতে চাও নাকি?
তাতিয়ানাঃ যাহ্ (লজ্জ্বা পেয়ে গেল তাতিয়ানা)। এম্নিই জানতে চাইছি।
আমিঃ আমার যে ফুলগুলো ভালো লাগে, তার কিছু তোমাদের দেশে আছে, আর কিছু কেবল আমাদের দেশেই আছে।
তাতিয়ানাঃ তোমাদের দেশে বুঝি অনেক ফুল ফোটে?
আমিঃ হ্যাঁ, তাতো ফোটেই। ট্রপিকাল কান্ট্রি। আবহাওয়া ভালো।
তাতিয়ানাঃ তাহলে নিশ্চয়ই তোমাদের দেশ পুরোটাই ফুল দিয়ে সাজানো অদ্ভুত সুন্দর একটা দেশ।
এবার আমার দীর্ঘনিশ্বাস ফেলার পালা। আমার দেশ সাজালে-গোছালে অবশ্যই অদ্ভুত সুন্দর একটা দেশ হওয়ার কথা। কিন্ত বিধাতা আমাদের যা দিয়েছেন, তার কিছুই আমরা কাজে লাগাতে পারিনি! রুচিবোধ বলে তো কিছুই আমাদের নেই। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রতিটি শহর একেবারে ডাস্টবিন বানিয়ে রেখেছি। আর এদের সামান্য যা আছে, তাই দিয়েই এরা স্বর্গ রচনা করেছে।

তাতিয়ানাঃ কই বললে না তো তোমার কোন কোন ফুল ভালো লাগে?
আমিঃ আমার দেশের ফুলের মধ্যে, রজনীগন্ধা, কৃষ্ণচূড়া, বাগানবিলাস, কামিনী, কাঠ গোলাপ, অলকানন্দা, মাধবীলতা, ডালিয়া। তোমার দেশের মধ্যে যেগুলো আমার দেশেও পাওয়া যায়, লিলি, জেসমিন, গ্লাডিওলাস, ক্রিসেনথিমাম। যা তোমার দেশে পাওয়া যায় কিন্তু আমার দেশে নেই, যেমন কারনেশন, টিউলিপ।
তাতিয়ানাঃ ওরে বাব্বা! কোন ফুলই তো বাদ রাখলে না।
আমিঃ অনেকটা সেরকমই হয়ে গেল।
তাতিয়ানাঃ আসলে কি জানো?
আমিঃ কি?
তাতিয়ানাঃ তোমার মনটা খুব সুন্দর! সুন্দর মনের মানুষরা ফুল প্রিয় হয়।
আমিঃ তাই? (একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললাম আমি)
তাতিয়ানাঃ আমি প্রথম দিন যেদিন তোমার রূমে ঢুকেছি সেদিনই লক্ষ্য করেছি, তোমার ঘর ভরা ফুল। এখানে সেখানে ফুলদানী আর তাতে নানা রংয়ের ফুল। তোমার পর্দার প্রিন্টেও খুব সুন্দর ফুলের ছবি তোলা। ডিভানের কাভারটাও ছোট ছোট চমৎকার ফুলের প্রিন্ট।
আমিঃ থাক থাক আর বলতে হবেনা। প্রশংসা বেশি হয়ে যাচ্ছে।
তাতিয়ানা: তোমাদের দেশে গোলাপ নেই গোলাপের কথা বললে না যে?
আমিঃ ও, গোলাপ! আসলে গোলাপ খুব কমোন একটা ফুল। আমি একে অসুন্দর বলবো না। গোলাপ তো সুন্দরই। তবে খুব কমোন হওয়ায় বোধহয় এর প্রতি আসক্তি কমে গিয়েছে।
তাতিয়ানাঃ গোলাপের প্রতি আসক্তি কমিও না।
আমিঃ কেন?
তাতিয়ানাঃ প্রিয়জনকে গোলাপই উপহার দিতে হয়।
আমি হেসে ফেললাম।
আমিঃ আচ্ছা ঠিকআছে, কোনদিন প্রিয়জন হলে আমি গোলাপই উপহার দেব।
হঠাৎ খুব করুণ চোখে আমার দিকে তাকালো তাতিয়ানা। আমি একটি বিব্রত হয়ে গেলাম। ওর দৃষ্টি হঠাৎ বদলে গেলো কেন?
তাতিয়ানাঃ তারপর ফিল্ম? ফিল্ম সম্পর্কে তো কিছু বললে না?
আমিঃ তুমি বলো। তোমার কি ধরনের ফিল্ম ভালো লাগে?
তাতিয়ানাঃ উঁ, হরর মুভি ভালো লাগে। তবে সবচাইতে বেশি ভালো লাগে রোমান্টিক মুভি।
আমিঃ আমি সব মুভিই দেখি, তবে ক্লাসিকাল মুভিগুলো বেশী ভালো লাগে।
তাতিয়ানাঃ তোমার দেশে টিভিতে এ্যরোটিকা দেখায়?
আমিঃ না।
তাতিয়ানাঃ কেন?
আমিঃ মুসলমানদের দেশ। টিভিতে এ্যরোটিকা দেখানো আন এথিকাল মনে করা হয়।
তাতিয়ানাঃ আমাদের দেশেও এগুলো একসময় আন-এথিকাল মনে করা হতো। এখন আর কোন বাছ-বিচার নাই। সবই দেখায়।
আমিঃ হ্যাঁ ইদানিং সবকিছুই লাগামহীন হয়ে গেছে।
তাতিয়ানাঃ তোমার দেশে টিভিতে পর্নোগ্রাফি দেখায়?
আমিঃ এ্যরোটিকাই দেখায় না, পর্নো তো অনেক দূরের কথা।
তাতিয়ানাঃ ও তাইতো, এ্যরোটিকা না দেখালে পর্নোতো অনেক দূরের কথা। ভিডিওতে পর্নো দেখা আইনসিদ্ধ?
আমিঃ আইনসিদ্ধ না। তবে চলছে। এই বিষয়ে কোন কড়াকড়ি নেই।
তাতিয়ানাঃ তুমি দেশে থাকতে পর্নোগ্রাফি দেখেছ?
একটু ফাঁপড়ে পড়ে গেলাম, কি উত্তর দেব! মেয়েটা এমন প্রশ্ন করছে কেন?
তাতিয়ানাঃ উত্তর না দিতে চাইলে থাক।
দেখলাম ওর চোখে কৌতুক চিকচিক করছে।
——————– *** ———————————–

টুক টুক টুক দরজায় নক করার শব্দ। তাতিয়ানাই হবে। এখন ও ‘প্রোস্তা মারিয়া’ দেখা ছাড়াও দিনে কয়েকবার আসে। গল্পগুজব করে। আমিও এতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। ‘প্রোস্তা মারিয়া’ ছাড়া বাকী সময়টুকুতে ওর জন্য আর বিশেষভাবে অপেক্ষা করি না। বাইরে নিজের কোন কাজ থাকলে বের হয়ে যাই। এই সময় তাতিয়ানা আসলেও আমাকে না পেলে ফিরে যায়, আবার আসে।

আমি “কাম ইন বলে দরজার দিকে চোখ রাখলাম।” দরজা ঠেলে যে ভিতরে ঢুকলো সে তাতিয়ানা তো নয়ই, এমনকি আমার বন্ধু-বান্ধবদেরও কেউ নয়। দীর্ঘকায় একজন সুপুরুষ ঢুকলেন তাও ইউনিফর্ম পড়া। ইউনিফর্মটির দিকে লক্ষ্য করলাম। পুলিশের ইউনিফর্মও নয়, মিলিটারির ইউনিফর্মও নয়। তাহলে কার ইউনিফর্ম?

ইউনিফর্মধারীঃ স্দ্রাভস্তভুইচে (সুস্থ থাকুন)!
আমিঃ স্দ্রাভস্তভুইচে!
উনার পিছনে পিছনে ডরমিটরির কমান্ড্যন্ট ঢুকলো। এবার আমার মেজাজ একটু তিরিক্ষি হলো। কোন ঝামেলা পাকাতে এসেছে নাকি?
আমিঃ আপনি?
ইউনিফর্মধারীঃ (সরল হাসি হেসে বললেন) না, কিছুনা। জাস্ট দেখতে এসেছি।
আমিঃ কি দেখতে এসেছেন?
ইউনিফর্মধারীঃ সব ঠিক আছে কিনা।
আমি (আরও অবাক হয়ে) কি ঠিক আছে?
ইউনিফর্মধারীঃ আমি ফায়ার ব্রিগেডের লোক। এটা আমাদের দায়িত্ব।
এবার বুঝতে পারলাম। ফায়ার ব্রিগেডের ইন্সপেকটর। রুটিন চেক আপ-এ এসেছে। এখানে অনেক ভালো কিছু আছে। প্রতিটি বাড়ী নির্মিত হয় যথাযথ বিল্ডিং কোড মেনে। তাই এখানকার কন্সট্রাকশন বেশ নিরাপদ।
একটি বাড়ী নির্মানের সময় ফায়ার ব্রিগেডের অনুমোদনেরও প্রয়োজন পড়ে। তারপর ফায়ার ব্রিগেডের ইন্সপেক্টররা নিয়মিত পরিদর্শন করেন সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা? আগুন লেগে যাওয়ার মত ঝুঁকিপূর্ণ এমন কিছু থাকলে তা সাথে সাথে সরিয়ে ফেলেন বা সমাধানের ব্যবস্থা করেন। কেউ অগ্নি সংক্রান্ত আইন অমান্য করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়। তবে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই জনগন নিজেদের প্রয়োজনেই সচেতনভাবে এইসব আইন মেনে চলে। আমি মনে মনে ভাবলাম। দেশে থাকতে বিল্ডিং কন্সট্রাকশনে ও ইন্সপেকশনে যে ফায়ার ব্রিগেডেরও যে ভূমিকা থাকে এটা জানতামই না। আর কখনো কোন ফায়ার ব্রিগেডের ইন্সপেকটরকে দেখি নাই বাসা বাড়ী ইন্সপেকশন করতে।
ইউনিফর্মধারীঃ না ঠিকই আছে। (বলে আর একবার সরল হাসি হাসলেন)
আমিঃ আপনাকে ধন্যবাদ।
ইউনিফর্মধারীঃ আপনার ফার্নিচারগুলো ঠিকঠাক মতো রাখা আছে। অতিরিক্ত দাহ্য কোন পদার্থও দেখছি না।
আমিঃ ও, ধন্যবাদ।
ইউনিফর্মধারীঃ ভালো কথা। আপনার রুমে কি রান্নার হিটার আছে?
আমিঃ না। রান্নার হিটার লাগবে কেন? ফ্লোরে তো দুইটা কিচেন আছে।
ইউনিফর্মধারীঃ ঠিক। কেউ যাতে রূমে রান্না না করে এইজন্যই এই ব্যবস্থা।
আমিঃ আর কিছু?
ইউনিফর্মধারীঃ না। ও আচ্ছা। আপনার রূমের ফায়ার এলার্মটা একটু চেক করি।
এখানে প্রত্যেকটা রূমেই ফায়ার এলার্ম থাকে। দুর্ঘটনা বশতঃ আগুন লেগে গেলে বা লাগার সম্ভাবনা দেখা গেলে সাথে সাথে এলার্ম বেজে ওঠে।

ইউনিফর্মধারীঃ না। সবই ঠিক আছে। ইউ আর এ গুড বয়।
আমি হাসলাম ।
বিল্ডিং কোড কথাটি দেশে থাকতে শুনেছি বলে মনে পড়েনা। আইনে আছে নিশ্চয়ই। তবে ব্যাপক জনগনের মধ্যে প্রচলিত নেই। গায়ে গা লাগানো ঘিন্জি দালান-কোঠা তো খুবই বিপজ্জনক। কিন্তু এই বিষয়ে সরকারি কোন পদক্ষেপের কথা কখনো শুনিনি। পুরোনো ঢাকার পর নতুন ঢাকাতেও একের পর এক ঘিন্জি এলাকা গড়ে উঠতে শুরু করেছে। অথচ কারো কোন ভ্রুক্ষেপই নেই। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় একবার ঢাকার রামপুরা, মগবাজার, মালিবাগ সহ বেশ কিছু এলাকায় বড় বড় চওড়া লিংক রোড ও অন্যান্য রাস্তা তৈরী করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছিলো। কিন্তু উনি শহীদ হওয়ার পর এই সব পরিকল্পনাও শহীদ হয়ে যায়। তখন কাজটা করা অনেক সহজ হতো, কারণ উঁচুতলা কোন ভবন তখন ঐ সব এলাকায় ছিলনা শতকরা নব্বই ভাগই ছিলো একতলা বা টিনের ঘর। এরপর এরশাদের শাসনামলে শহরের পরিবেশ, যোগাযোগ কোনকিছুর কোন সুদুরপ্রসারী চিন্তাভাবনা না করেই সরু রাস্তা, আঁকা-বাঁকা অলি-গলির পাশে ব্যঙের ছাতার মত গড়ে উঠতে থাকে বহুতল ভবন। পুকুর ভরাট করে কখনো অনুমতিহীন আর কখনো ঘুষ দিয়ে অনুমতি নিয়ে তৈরী করা হয় অট্টালিকা। এরকম বেশ কিছু দালান ধ্বসে পড়ারও সংবাদ পাওয়া যায়। এসবের দায়ভাগ কেউ নিয়েছে বলে শুনিনি। উদ্ধার তৎপরতায়ও সরকারের উৎসাহ ছিলোনা কোন। হায়রে আমার দেশ! মানুষের জীবনের কি কোন মূল্য নেই? নাকি ইকোনোমিক্সের ডিমান্ড-সাপ্লাই থিওরী কাজ করছে। মানুষের সাপ্লাই এত বেশী হয়ে গিয়েছে যে, মূল্য কমে গিয়েছে অনেক। রেসিডেন্সিয়াল এরিয়ায় একের পর এক গড়ে উঠেছে গার্মেন্টস থেকে শুরু করে নানা ধরনের মিল-কারখানা। উন্নত দেশগুলোতে যেখানে রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া, কমার্শিয়াল এরিয়া, ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়া ভিন্ন ভিন্ন, এবং অগ্র পশ্চাৎ অনেক চিন্তা ভাবনা করে এগুলো তৈরী করা হয়, সেখানে আমাদের দেশে হলো ডালে-চালে খিচুড়ী।

কোন একটি দুর্ঘটনায় উদ্ধার তৎপরতাও আশাব্যন্জক নয়। হঠাৎ আমার ফিলিপাইনের একটি মর্মান্তিক ঘটনার কথা মনে পড়লো। ১৯৮১ সালের ১৭ নভেম্বরের কথা। ফিলিপাইনের রাষ্ট্রক্ষমতায় তখন ছিলো জান্তা ফার্দিনান্দ মার্কোস। দেশের জনগণের কাছে যার কোন জনপ্রিয়তাই ছিলনা। তারপরেও বহাল তবিয়তে সিংহাসনে বসে ছিলো খুটির জোড়ে। একবার তার খ্যাতির লক্ষ্যে ভাবলেন, তাক লাগানো একটি ফিল্ম সেন্টার তৈরী করবেন তিনি। যথারীতি শুরু করলেন ব্যয়বহুল ‘ম্যানিলা চলচ্চিত্র কেন্দ্র’-এর নির্মাণ। নির্মাণ চলাকালীন সময়ে তিনি এবং তার রূপসী স্ত্রী ইমেল্দা মার্কোস কয়েকদফা নির্মাণ পরিকল্পনা পরিবর্তন করেন। এর ফলে একদিকে যেমন কাজে বারবার বাধা আসছিলো আবার সেই বাধা মেক-আপ করার জন্য আসন্ন ফিল্ম ফেস্টিভালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে লক্ষ্য করে বেধে দেয়া সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার জন্য তাড়াহুড়োও করা হচ্ছিলো প্রচুর। এসময় দুর্ভাগ্যবশত একটি scaffold ধ্বসে পড়ে, আর শ্রমিকরা পতিত হয় ভেজা সিমেন্টের মধ্যে যার উপরে ধ্বসে পড়েছিলো ভারী ভারী ইস্পাতের বার। অনেকেরই জীবন্ত কবর হয় ওখানে। বেঁচে থাকা অনেকেই ট্র্যাপ্টড হয়ে যায় । যেহেতু মৃতদেহ ও জীবিতদের উদ্ধার করতে যথেস্ট সময়ের প্রয়োজন ছিলো, তাই ইমেল্দা মার্কোস নির্দেশ দিলো, “উদ্ধার করার প্রয়োজন নেই, দেহগুলোকে সিমেন্ট দিয়ে ঢেকে দাও। কন্সট্রাকশন ওয়ার্ক চলুক।” এই দুর্ঘটনায় ১৬৯ জন মারা যায়। এবং তাদের দেহাবশেষ ঐ ইমারতেই রয়ে যায়। এই ভয়াবহতা ও নির্মমতার সংবাদ সকল ম্যানিলাবাসীই জানতো। কিন্তু প্রেসিডেন্ট মার্কোসের নির্দেশে ফিলিপিনি কোন সংবাদ মাধ্যেমেই তা প্রচারিত হয়নি। হায়রে নিস্ঠুরতা! স্বৈরাচার থাকলে যা হয় আরকি!!

ঐ অভিশপ্ত ভবনটির চারপাশ দিয়ে ভয়ে কেউ হাটতে চাইতো না। লোকে বলতো, নিহত হতভাগ্য শ্রমিকদের আত্মার দীর্ঘশ্বাস শোনা যায় ওখানে। পুরো ভবনের বাতাস ভারী হয়ে থাকে অকালে ঝরে পড়া অতৃপ্ত আত্মাদের চাপা কান্নার শব্দে। এর ফল অবশ্য ক্ষমতার দাপটে অন্ধ মার্কোস পরিবার পেয়েছিলো। কয়েক বৎসর পরে এই সাধারণ মানুষগুলোই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ক্ষমতা থেকে ফেলে দিয়েছিলো ফার্দিনান্দ মার্কোস ও ইমেল্দা মার্কোসকে। ক্ষমতার জোরে অনেকেই অনেক কিছু করে আর বেমালুম ভুলে যায় ইতিহাসের শিক্ষা যে, ‘ক্ষমতা চিরকাল থাকেনা’।

—————————————————– ***———————————————

টুক টুক টুক দরজায় নক করার শব্দ। তাতিয়ানাই হবে। এখন রাত নয়টা বাজে। এসময় আজকাল তাতিয়ানাই বেশী আসে। দরজা ঠেলে তাতিয়ানা ঢুকলো।

আমিঃ কেমন আছো?
তাতিয়ানাঃ (বিষন্ন কন্ঠে) বোরিং।
আমিঃ কেন বোরিং কেন?
তাতিয়ানাঃ (আবারও মন খারাপ করা গলায়) জীবনটাই বোধহয় বোরিং।
আসলে ও ভুল কিছু বলছে না। মাঝে মাঝে আমারও খুব বোরিং লাগে। কিন্তু ঐ কথা না বলে ওকে শান্তনাই দেয়া উচিৎ।
আমিঃ ডরমিটরিতে বোধহয় তোমার ভালো লাগছে না। কয়েকদিনের জন্য বাড়ীতে চলে যাও। গ্রামের শান্ত নির্জন পরিবেশে ভালো লাগবে।
তাতিয়ানাঃ বাড়ীতেও বোরিং!
আমিঃ বাড়ীতেও বোরিং?
তাতিয়ানাঃ তার উপরে অনেক কাজ।
আমিঃ কি কাজ?
তাতিয়ানাঃ (একটু ক্ষুদ্ধ হয়ে), অনেক।
আমিঃ যেমন।
তাতিয়ানাঃ যেমন, ঘরে দুইটা গরু আছে। দিনে দুইবার করে ওদের দুধ দোয়াতে হয়।
আমিঃ হাঃ, হাঃ, হাঃ, (আমি হেসে ফেললাম)। তাহলে তো অনেক কাজই বলতে হবে।
আমার সাথে সাথে তাতিয়ানাও লাজুক হাসলো।

তারপর ভাবলাম। মেয়েটির বোরিং লাগে কেন? লাগতেই পারে। আমারও তো মাঝে মাঝে ভীষণ বোরিং লাগে। মাঝে মাঝে এই জীবন তো অর্থহীনই মনে হয়। গতকাল রাতেও তো এমন হয়েছিলো। রাত বারোটার পর চুপচাপ ডরমিটরির বাইরে বেরিয়ে এসেছিলাম। ঠিক মাথার উপরে চাঁদ হাসছিলো। চাঁদটাকে খুব বিমর্ষ মনে হচ্ছিলো। আসলে চাঁদ নয় আমিই বিমর্ষ ছিলাম। বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক সাইফুল ইসলাম স্যারের কথা মনে পড়লো। উনি বলেছিলেন, “তোমার মনের অবস্থার মতই মনে হয় চারপাশের প্রকৃতিটাকে। যদি তুমি উৎফুল্ল থাকো, দিঘীর ঢেউয়ে চাঁদের খন্ড-বিখন্ড প্রতিফলন দেখে মনে হবে, ‘বাহ্! চাঁদটা কেমন হেসে কুটি কুটি যাচ্ছে’। আর তুমি যদি দুঃখ ভাড়াক্রান্ত থাকো, তোমার মনে হবে, ‘আমার দুঃখে চাঁদটা ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে’। গতরাতে আমিও এমনি বিষণ্ন হয়ে পড়েছিলাম। এ বিষাদ বোধহয় মানুষের চিরকালের চিরন্তন চিত্তবৃত্তি। যেমন উইলিয়াম শেক্সপীয়র প্রশ্ন করেছিলেন, “হোয়াই আই এ্যাম সো স্যাড?” মানুষের অক্ষমতা আর অপূর্ণতার বেদনাই কি এই বিষাদের কারণ?

ওহ্! এইতো উত্তর পেয়েছি। তাতিয়ানার কোন অপূর্ণতা রয়েছে। কি সেই অপূর্ণতা?

আমিঃ তাতিয়ানা, তোমার কি কোন অপূর্ণতা রয়েছে?
দপ করে জ্বলে উঠলো তাতিয়ানার দৃষ্টি।
তাতিয়ানাঃ কি অর্থে?
আমিঃ না, মানে তোমাকে মাঝে মাঝে খুব বিমর্ষ লাগে তাই।

দৃষ্টি নামিয়ে নিলো তাতিয়ানা। কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারলো না। একি সেই চিরন্তন নারী? ধ্যানস্তদ্ধ গভীর অরণ্যে, কম্পিত তারার তিমিরে আদিকাল থেকে কাকে যেন খুঁজে ফিরছে। সেই আকাঙ্খার নিবৃত্তি হবে কি কোন কালে? নাকি ঐ চাঁদের মতই বড় একাকী ও নিঃসঙ্গ রয়ে যাবে চিরকাল?


(চলবে)


বঁধু, মিটিলনা সাধ

বঁধু, মিটিলনা সাধ ভালোবাসিয়া তোমায়
তাই আবার বাসিতে ভালো আসিব ধরায়।
আবার বিরহে তব কাঁদিব
আবার প্রণয় ডোরে বাঁধিব
শুধু নিমেষেরি তরে আঁখি দুটি ভ’রে
তোমারে হেরিয়া ঝ’রে যাব অবেলায়।
যে গোধূলি-লগ্নে নববধূ হয় নারী
সেই গোধূলি-লগ্নে বঁধু দিল আমারে গেরুয়া শাড়ি
বঁধু আমার বিরহ তব গানে
সুর হয়ে কাঁদে প্রাণে প্রাণে
আমি নিজে নাহি ধরা দিয়ে
সকলের প্রেম নিয়ে দিনু তব পায়।।