Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ২০

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ২০
——————————————————- রমিত আজাদ

ভ্যাকুয়াম শক্তি:
গত পর্বে ভ্যাকুয়াম শক্তির (vacuum energy) কথা বলেছিলাম। জানি এটা অনেকের কাছেই বোধগম্য নয় বা জটিল। যেমনটি আমার কাছে ছিলো অল্প বয়সে। তবে নবম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় আমি স্থিতিশক্তি (potential energy) সম্পর্কে জেনেছিলাম। সেই সাথে গতি শক্তি (kinetic energy) সম্পর্কেও জেনেছিলাম, যার ফর্মুলাটা ছিলো K.E. = 1/2 (mv2)। প্রসঙ্গত বলি যে, শক্তির যে সংজ্ঞা আমাকে নবম শ্রেণীতে পড়ানো হয়েছিলো, সেটা আমার পছন্দ হয়নি। ‘কাজ করার সামর্থ্যকে শক্তি বলে’ – কেমন যেন গোঁজামিল মনে হয়েছিলো! আবার স্থিতিশক্তি (potential energy)-কেও এ্যাবস্ট্রাক্ট মনে হয়েছিলো; তবে গতি শক্তি (kinetic energy)-কে রিয়েলিস্টিক মনে হয়েছিলো। তবে আমাদের কলেজের শ্রদ্ধেয় প্রিন্সিপাল কমান্ডার আবুল হোসেন মিঞা স্যার (ফিজিক্সের শিক্ষক) একবার আমাদের ক্লাস এইটে বলেছিলেন, “মনে রেখো ‘শক্তি’ হলো তা, যা কোন কিছুকে নাড়াতে পারে”। খুব সহজে ও এক কথায় বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ঐ বয়সের উপযোগী করে। পরবর্তিতে শক্তির যে সংজ্ঞাটি আমার পছন্দ হয়েছিলো বা এখনো ভালো লাগে সেটা আমি শিখেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে ‘ফিলোসফি’ ক্লাসে। শক্তি হলো ‘গতির পরিমাপ’ (measurement of motion)। কোন একটা বডি কতটুকু গতিশীল তার পরিমাপ-টাই হলো শক্তি। এবার মনে প্রশ্ন জাগে, চোখের সামনেই তো একটা গতিশিল বডি-কে স্থির হয়ে যেতে দেখি; যেমন কোন কিছুকে হাত থেকে ছেড়ে দিলেই সে নিচে পড়ে গিয়ে স্থির হয়ে যায়। অথবা ফ্লোর থেকে কোন কিছুকে তুলে কোন একটা আলমারির তাকে রাখলে সে তখন স্থির হয়ে যায়। এবার প্রশ্ন জাগতে পারে যে, গতির জন্য বডিটার মধ্যে যে শক্তিটা ছিলো, স্থির হওয়ার পর সেই শক্তিটা গেলো কোথায়? শক্তিটা কি তার মধ্যে জমা হয়ে গেলো? কিন্তু সে তো তখন আর গতিশীল নেই? আবার ফ্লোরের উপরে থাকা বডিটার স্থিতিশক্তি ধরা হয় শূন্য, কিন্তু উচ্চতায় রাখা বডিটার স্থিতিশক্তি অশূন্য ধরা হয় এবং তার গাণিতিক মান নির্নয় করতে উচ্চতাকে ব্যবহার করা হয়; কেন? পরে অবশ্য বুঝেছিলাম যে বিষয়টা আপেক্ষিক, একটা ফিল্ডে কোন একটা বডি ঐ ফিল্ডের প্রভাবে তার অবস্থানের কারণে অন্য কোন একটা বডির সাপেক্ষে যে শক্তি ধারন করে তাকে স্থিতিশক্তি বলে। তবে তা পরিমাপ করার জন্য আসলে দুইটা পয়েন্ট দরকার; কোন একটা ক্ষেত্রে বডিটিকে এক পয়েন্ট থেকে আরেক পয়েন্টে নিতে যে শক্তি খরচ করতে হয় তাই হলো, ঐ দুইটা পয়েন্টের মধ্যে স্থিতিশক্তির পার্থক্য; এটা মোর রিয়েলিস্টিক। পৃথিবীর মহাকর্ষ ক্ষেত্রে ভূপৃষ্ঠের উপর স্থিতিশক্তি শূন্য ধরা হয়, এবং উচ্চতায় তাকে mgh মানে বল ও উচ্চতার গুনন-এর মোট মান ধরা হয়। যা মূলত: ভূপৃষ্ঠের কোন বিন্দুতে স্থিতিশক্তি ও উচ্চতায় কোন বিন্দুতে স্থিতিশক্তি এই দুইয়ের স্থিতিশক্তি পার্থক্য।

এখান থেকে নিশ্চয়ই বোঝা গেলো যে স্থিতিশক্তি ক্ষেত্রের উপর নির্ভরশিল ও ক্ষেত্রবিশেষে তার পরিমাপনের সূত্রও ভিন্ন ভিন্ন হবে। যেমন বিদ্যুত ক্ষেত্রে স্থিতিশক্তিকে আবার মহাকর্ষ ক্ষেত্রের সূত্র দিয়ে পরিমাপন করা যাবে না। সেখানে তাকে ভিন্ন সূত্র দিয়ে পরিমাপন করতে হবে। চুম্বক ক্ষেত্রে আবার আরো ভিন্ন, ইত্যাদি।

এবার আসি ভ্যাকুয়াম শক্তি বিষয়ে। ভ্যাকুয়ামকেও ক্ষেত্র বলা যায়। স্থানের সকল বিন্দুতে সকল সম্ভাব্য স্পন্দক গুলির যোগফল একটি অসীম মানকে নির্দেশ করে। একে দূর করতে বলা যেতে পারে যে শক্তির পার্থক্য‌ই শুধুমাত্র ভৌত ভাবে পরিমাপযোগ্য, কয়েক শতাব্দী ধরে চিরায়ত বলবিদ্যায় স্থিতিশক্তির ধারনা করা হয়েছে। ভ্যাকুয়াম ফিল্ডে দুইটি বিন্দুর শক্তির পার্থক্য নির্নয় করা যাবে। ভ্যাকুয়াম শক্তিকে ভার্চুয়াল কণার সাহায্যেও ব্যাখ্যা করা যায় (ভ্যাকুয়াম ফ্লাকচুয়েশন বলা হয়) যেগুলি শূন্যস্থানে অনবরত উৎপন্ন ও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কয়েক শতাব্দী আগে বৌদ্ধ দার্শনিক Dignāga ও Dharmakīrti এই একই কথা বলেছিলেন যে, শূন্যতা থেকে ফট করে অণু তৈরী হয়, আবার তা শূন্যতায় মিলিয়েও যায়। এগুলি সাধারণত কণা-প্রতিকণা জোড়ায় উৎপন্ন হয় ও মুহূর্তের মধ্যেই পুর্নবিলয় ঘটে। তবুও এই কণাগুলি ধ্বংস হবার আগে আন্তঃক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে যা ফেইনম্যান চিত্র দিয়ে দেখানো যায়।

ভ্যাকুয়াম শক্তির বেশ কিছু তাৎপর্য রয়েছে। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে ডাচ্ পদার্থবিদ হেনরিখ ক্যাসিমির ও ডির্ক পোল্ডার, কাছাকাছি থাকা দুটি ধাতব পাতের মধ্যে তাদের মধ্যকার স্থানের ভ্যাকুয়াম শক্তির অনুনাদের কারণে একটি দুর্বল আকর্ষণ বল থাকার কথা ভবিষ্যতবাণী করেন। একে ক্যাসিমির ক্রিয়া বলে ও এটি পরীক্ষামূলক ভাবে প্রমাণিত। একারণে মনে করা হয় যে ইলেকট্রন, চৌম্বক ক্ষেত্র ইত্যাদি পরিচিত ধারণা গুলির মতো ভ্যাকুয়াম শক্তিও বাস্তব।

ভ্যাকুয়াম শক্তিতে এর সাথে অবদান রাখে কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্বের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিসাম্য ভঙ্গন। তবে এই জটিল আলোচনা এই প্রবন্ধে করবো না।

ভ্যাকুয়াম ফ্লাকচুয়েশন সর্বদা কনা-প্রতিকনা জোড়ায় উৎপন্ন হয়। স্টিফেন হকিংয়ের মতানুসারে, কৃষ্ণগহ্বর এর ঘটনা দিগন্তের কাছে এই ভার্চুয়াল কনা-প্রতিকনা উৎপাদনের মাধ্যমে হকিং বিকিরণ সম্ভব হতে পারে। এই কণা জোড়ার একটি যদি কৃষ্ণ গহ্বরের ভিতরে আকৃষ্ট হয়, তবে অপরটি একটি ‘বাস্তব’ কণা রূপে তার ভর/শক্তি বাইরের মহাশূন্যে বিকিরিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ক্ষয়ের মাধ্যমে কৃষ্ণগহ্বরটির অবলুপ্তি হতে পারে। এই সময়কাল কৃষ্ণগহ্বরটির ভরের সমানুপাতিক তবুও বৃহৎ মাপের কৃষ্ণগহ্বর গুলির ক্ষেত্রে ১০ টু দা পাওয়ার ১০০ বছরের মতো হতে পারে।

যাইহোক, যেসব কণা বা ক্ষেত্র এমন ঘনত্ব যুক্ত ভ্যাকুয়াম শক্তির জন্ম দেয়, যে তা প্রসারমাণ মহাবিশ্বের তত্ত্বে প্রয়োজনীয়, তাদের সঠিক প্রকৃতি এখনও একটি রহস্য।

এডিংটন, আইনস্টাইন, ওপেনহাইমার ও কৃষ্ণবিবর:
চন্দ্রশেখরের গাণিতিক বর্ণনা ও উদ্ভাবনা অনুযায়ী বৃহৎ ভরের একটি তারকা চুপসাতে চুপসাতে প্রায় শূন্য আয়তনে পৌঁছে যাবে, এবং তার ঘনত্ব হবে প্রায় অসীম। এটা পড়ে এডিংটন রীতিমত shocked হন, এবং কিছুতেই তা মেনে নিতে পারছিলেন না। এদিকে আলবার্ট আইনস্টাইন-ও ১৯৩৯ সালে একটি গবেষণাপত্রে দাবী করেছিলেন যে তারকা চুপসে গিয়ে শূন্য আয়তনে পৌঁছাবে না। তিনি এটাকে বাস্তবসম্মত মনে করতে পারেননি।

তাহলে ‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব’ অনুযায়ী চুপসে যেতে থাকা তারকাটির কি হবে? এই প্রশ্নের সমাধান করেছিলেন তরুণ মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট ওপেনহাইমার। কিন্তু ঐ গবেষণা বিজ্ঞান মহলে ঝড় তোলার আগেই পৃথিবীতে শুরু হয়ে গেলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝড়। এক জাতির উপর আরেক জাতির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে উঠে পড়ে লাগলো সমগ্র বিশ্ব। আর এমন ডামাডোলে যা হবার তাই হলো, রাজনীতিবিদরা তাদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে শুরু করলো বৈজ্ঞানিকদের। এমন বৃহৎ যুদ্ধে ব্যাপক বিধ্বংসী মারনাস্ত্র নির্মান করতে উঠে পড়ে লাগলো বিভিন্ন জাতি। জার্মানী, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র কেউই পিছিয়ে থাকলো না; সকলেই সমানতালে ‘ব্যাপক বিধ্বংসী মারনাস্ত্র নির্মান’-এর প্রতিযোগীতায় নেমে পড়লো। বিজ্ঞানী ওপেনহাইমারও জড়িয়ে পড়লেন মার্কিন ‘পরমাণু বোমা প্রকল্প’-এ। বলা হয় যে, প্রকল্পটি প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে আটকে পড়েছিলো একটি সমস্যায় যেটা সমাধান করা যাচ্ছিলো না। তরুণ বিজ্ঞানী ওপেনহাইমার-ই ওটা সমাধান করে প্রকল্পটি কমপ্লিট করেছিলেন।

অবশেষে দুর্ঘটনাটি ঘটলো, সমগ্র বিশ্ববাসী ন্যাক্কারজনকভাবে দেখলো মানব কর্তৃক মানব হত্যার অন্যতম বৃহৎ ঘটনা হিরোশিমা ও নাগাসাকি-তে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে ইংরেজ রাজনীতিবিদ উইনস্টন চার্চিল সৃষ্ট কৃত্রিম দুর্ভিক্ষে বাংলায় প্রাণ গিয়েছিলো চল্লিশ লক্ষ মানুষের। আর হিরোশিমা-নাগাসাকিতে অল্প সময়েই নিহত হয়েছিলো দুইলক্ষাধিক মানুষ। বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড পরমাণুর অভ্যন্তরস্থ শক্তি-কে কাজে লাগানোর সম্ভাবনাকে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু হিরোশিমা-নাগাসাকি’র কুখ্যাত হত্যাকান্ড সারা পৃথিবীকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো পরমাণুর অভ্যন্তরস্থ শক্তির বিপুলতাকে।

তাই যুদ্ধের পর বিজ্ঞানীরা ব্যাস্ত হয়ে পড়েছিলেন পরমাণুর অভ্যন্তরস্থ বিষয়ের গবেষণায়। যেটাকে আমরা স্মল স্কেল রিসার্চ বলি। তাই ‘তারকার চুপসে যাওয়ার’ বিষয়টি নিয়ে গবেষণা বিজ্ঞানীরা তখন ভুলেই গিয়েছিলেন। তবে ১৯৬০ সালের দিকে লার্জ স্কেল গবেষণা মানে মহাকাশ নিয়ে গবেষণায় উৎসাহ আবার বৃদ্ধি পেল। রবার্ট ওপেনহাইমারের গবেষণা তখন পুনরাবিষ্কৃত হয় ও বিস্তৃতি লাভ করে।

(চলবে)

রচনাতারিখ: ১১ই নভেম্বর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ০১টা ২৭মিনিট

পূর্ববর্তি পর্বগুলো:
https://www.bdeasy.com/

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৯

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৯

——————————————————- রমিত আজাদ

শূণ্যস্থান আদৌ শূণ্য কি?

বাংলা ভাষায় ‘মহাশূণ্য’ শব্দটাই শুনে এসেছি ছোটবেলা থেকেই। ইংরেজীতে তাকে বলে ‘স্পেইস’। তারপর জানলাম রাশিয়ান-রা তাকে বলে ‘কসমস’। অবশ্য ‘কসমস’ শব্দটা অনেক ভাষায়ই প্রচলিত আছে।  ‘মহাশূণ্য’ শব্দটা এক ধরনের ভুল ধারনার সৃষ্টি করে। এটা শুনলে মনে হতে পারে যে মাথার উপরের ঐ জায়গাটিতে বিপুল শূণ্যতা, ওখানে কিছুই নেই। আসলে কিন্তু তা নয়। ওখানে অনেক কিছুই আছে। মাথার উপরে তাকালেই তো কত গ্রহ, নক্ষত্র, উল্কা, ধুমকেতু, ইত্যাদি দেখা যায়। এবার প্রশ্ন হতে পারে যে জ্যোতিষ্কগুলোর মধ্যবর্তি জায়গা কি শূণ্য নয়? উত্তর: না সেখানেও এ্যাবসোলুট শূণ্যতা নেই।

কি আছে তাহলে সেখানে? খেয়াল করুন যে, ঐ কোটি কোটি মাইল দূরের সূর্য থেকে আলো কিন্তু আমাদের পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। নক্ষত্রগুলো থেকেও তো আলো আসে। তাহলে মধ্যবর্তি জায়গায় এ্যাটলিস্ট আলো আছে, মানে তরঙ্গ আছে, মানে ফোটন আছে, মানে এনার্জী আছে।

তাছাড়াও আছে, গ্যাস, ধুলা, চার্জিত কণিকা প্রবাহ, কসমিক রে, ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন, গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড, নিউট্রিনো। আরো আছে ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জী। তারপর যা নিয়ে আগে আলোচনা করেছি সেই হিগস ফিল্ড।

আরো ইন্টারেস্টিং যা আছে তা হলো, Vacuum energy (also called vacuum fluctuations or zero-point energy)। এটা হলো পার্টিকেল ও এন্টিপার্টিকেল-এর একটা সাগর। এই জোড়ায় জোড়ায় তাদের জন্ম হয়, আবার তারা মিলিয়ে যায়।

আমার সুপারভাইজার ড. পিঝ-কে প্রশ্ন করেছিলাম যে, “স্যার, মহাবিশ্ব আসলো কোথা থেকে?” তিনি উত্তরে বলেছিলেন  বলেছিলেন যে, “Vacuum থেকে”। আমি ভাবলাম যে, Vacuum মানে তো শূণ্যতা, তবে কি শূণ্যতা থেকে আসলো? আবারো বললাম, “শূণ্যতায় তো কিছু নাই। তা ওখানে থেকে আবার আসে কি করে?” তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “(Vacuum fluctuations থেকে”। আমি হতবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, “মানে কি? শূণ্যতা ফ্লাকচুয়েট করে কিভাবে?” তিনি বলেছিলেন, “যে কোন ভৌত রাশিই ফ্লাকচুয়েট করে।” সত্যি বলতে কি সেইদিন ঐ কথার আমি কিছু বুঝি নাই। যাহোক এখন যেটা বুঝি যে, এই   Vacuum সেই Vacuum না। ভৌত Vacuum-ও কিছু একটা, যা ফ্লাকচুয়েট করে।

 ভ্যাকুয়াম শক্তির খুব বাস্তব প্রভাব রয়েছে কারণ এটি বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রগুলিকে দুর্বল করে বা স্ক্রীন করে। ভ্যাকুয়াম ওঠানামা (Vacuum fluctuations) কিছু বহিরাগত, অরক্ষিত, তাত্ত্বিক নিদর্শন নয়। বরং ভ্যাকুয়াম ওঠানামা অনেক নিত্যদিনের ঘটনার জন্য মৌলিক। আপনার ডিভিডি মেশিনের মতো লেজারগুলিও ভ্যাকুয়াম ওঠানামার অস্তিত্বের উপর নির্ভর করে। আপনি যখন কোনও উপাদান সঠিকভাবে সেট আপ করেন তখন একটি লেজার রশ্মি তৈরি করা হয় যাতে আপনি সুসংহত আলো নির্গমনগুলির একটি শৃঙ্খল বিক্রিয়া (chain reaction) পান। এই শৃঙ্খল বিক্রিয়া ভ্যাকুয়াম ওঠানামা দ্বারা শুরু করা হয়। তেমনি, তেজস্ক্রিয় ক্ষয় যেমন কার্বন -১ in-তে অভিজ্ঞ যা প্রত্নতাত্ত্বিকেরা উপকরণগুলির তারিখ নির্ণয় করতে ব্যবহার করেন, ভ্যাকুয়াম ওঠানামার মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। ক্যাসিমির প্রভাবের মাধ্যমে ভ্যাকুয়াম শক্তি পরিমাপ করা যেতে পারে: দুটি অব্যাহত ধাতব গোলক একসাথে খুব কাছাকাছি নিয়ে আসে এবং ভ্যাকুয়াম শক্তি তাদের আকর্ষণ করার কারণ করে। যখন তাদের ব্যবধান যথেষ্ট ছোট হয়, ভ্যাকুয়াম শক্তির কারণে আকর্ষণটি মহাকর্ষীয় এবং তড়িৎ চৌম্বকীয় প্রভাবগুলির উপর প্রাধান্য পায়। ভ্যাকুয়াম শক্তি হাইড্রোজেন শক্তির স্তরে Lamb shift স্থানান্তরকেও তৈরি করে। ভ্যাকুয়াম শক্তি মূলধারার পদার্থবিজ্ঞানের একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি।

এর পরে, হিগস ক্ষেত্র-ও সর্বত্র বিদ্যমান এবং এটিই অনেকগুলি কণাকে তাদের ভর দেয়। ভর-শক্তি সংরক্ষণের কারণে, ভর-শক্তি কোনও বন্ধ সিস্টেমে তৈরি বা ধ্বংস করা যায় না। ফলস্বরূপ, যখন হিগস ক্ষেত্র কোনও কণাকে ভর দেয়, সে তখন  vacuum থেকেই শক্তি নিয়ে এটি করে।

কৃষ্ণবিবর:

এবার আসি এবারের নোবেল প্রাইজ টপিকে। আমাদের গ্যালাক্সিটি একটা স্পাইরাল শেইপড গ্যালাক্সি। এটার শেইপ-টা কি কোন আকস্মিকতা? নাকি সঙ্গত কারণেই শেইপটি ওরকম হয়েছে? আমার বন্ধু রায়হান কিবরিয়া একদিন কথায় কথায় বললেন, “গ্যালাক্সির কেন্দ্রে একটা কৃষ্ণবিবর আছে।” আমি প্রশ্ন করলাম, “কি করে বোঝা গেলে?” রায়হান বললো, “তা নইলে শেইপটা স্পাইরাল হত না।” আমার মাথায় হঠাৎ স্ট্রাইক করলো। তাইতো, ‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব’ বলে, যেকোন ম্যাসিভ বডি তার চারপাশের স্থানটাকে বাঁকিয়ে দেয়। তার মানে কোন সোলার সিস্টেম বা কোন গ্যালাক্সির শেইপ কিন্তু এম্নি এম্নিই সৃষ্ট নয়। তার মধ্যকার বডিগুলো-ই তার শেইপটা তৈরী করে। তাহলে এই যে আমাদের গ্যালাক্সির শেইপটা স্পাইরাল, এবং তার আবার একটি কেন্দ্রও রয়েছে, এটাও অব্যাখ্যায়িত বা আকস্মিক নয়। ঐ কেন্দ্রে এমন কিছু আছে, যা তাকে স্পাইরাল বানিয়েছে। এবং তা একটা ম্যাসিভ বডি হওয়ারই কথা। স্টিফেন হকিং তার পপুলার বুক ‘কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’-এ লিখেছেন, “আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অনেক বড় একটা কৃষ্ণবিবরের  অস্তিত্ত্বের কিছু সাক্ষ্য আমাদের রয়েছে। সেই কৃষ্ণবিবরের ভর আমাদের সূর্যের ভরের চাইতে একলক্ষ গুণ বেশি।”  কি সেই সাক্ষ্য? কোন একটা কৃষ্ণবিবরে কোন তারকার পতন হলে, পড়তে পড়তে তারকাটি ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, তখন সেখান থেকে বিকিরণ হয়। হকিং লিখেছেন, “আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অত্যন্ত ঘন সন্নিবিষ্ট বেতার তরঙ্গ ও  অবলোহিত রস্মির উৎসের ব্যাখ্যা এর ভিত্তিতে দেয়া যেতে পারে।”

আইনস্টাইন কি ব্ল্যাক হোল-এর কথা বলেছিলেন?

আলবার্ট আইনস্টাইন-এর সার্বিক আপেক্ষিকতা তত্ত্বের মধ্যেই আছে কৃষ্ণবিবরের কথা। তবে তিনি নিজেও এটাকে মানতে পারেন নি। এই বিষয়ে বলা হয় যে, The concept that explains black holes was so radical, in fact, that Einstein, himself, had strong misgivings. He concluded in a 1939 paper in the Annals of Mathematics that the idea was “not convincing” and the phenomena did not exist “in the real world.”

বিজ্ঞানে আবিষ্কারগুলোর একটা ধারাবাহিকতা রয়েছে। যখনই বিজ্ঞান কোন জটিল সমস্যার মুখোমুখি হয় অথবা কোন সংকটে পড়ে তখনই দেখা যায় কোন না কোন বিজ্ঞানী আবির্ভূত হয়ে ঐ সমস্যাটার সমাধান করে দেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে একদিকে যেমন পদার্থবিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ চলছিলো, অন্যদিকে আবার প্রাসঙ্গিক নিত্য নতুন সমস্যা বা প্রশ্নেরও উদ্ভব হচ্ছিলো। আলবার্ট আইনস্টাইন তত্ত্ব দিলে সেই তত্ত্বের আবার ইমপিরিকাল প্রমাণের প্রয়োজন পড়ে, যা সম্পাদন করেছিলেন আর্থার এডিংটন। এদিকে অনেক বিজ্ঞানীই আবার এই তত্ত্বের ফার্দার স্টাডি-র দিকে ঝুঁকে পড়েন।

১৯১০ সালে লাহোরে জন্ম হয় এক তামিল শিশুর। পিতামাতা তার নাম রাখলেন সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর।

মাদ্রাজের প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক পড়ার জন্য ভর্তি হন ১৯২৫ সালে। স্নাতক কোর্সের শেষ বছর ১৯২৯ সালে তিনি Arnold Sommerfeld-এর লেকচারে অনুপ্রাণিত হয়ে রচনা করেন জীবনের প্রথম গবেষণাপত্র ‘কম্পটন স্ক্যাটারিং অ্যান্ড নিউ স্ট্যাটিস্টিকস’। চন্দ্রশেখরের গবেষণাপত্রটি তার শিক্ষকদের মুগ্ধ করেছিল। তারপর চন্দ্রশেখর ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি পান।

ক্যামব্রিজে যাওয়ার পথে ভারত থেকে জাহাজে করে ব্রিটেন পর্যন্ত দীর্ঘ ভ্রমণে তিনি অলস সময় না কাটিয়ে এক বিস্ময়কর কাজ করে ফেলেন। তিনি জানতেন যে, ট্রিনিটি কলেজে তার সুপারভাইজার হবেন পদার্থবিজ্ঞানী রালফ ফাউলার। তাই জাহাজে বসে ফাউলারের বৈজ্ঞানিক কাজগুলো পড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

ফাউলার এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীদের শ্বেত বামন তারকায় ডিজেনারেট ইলেকট্রন গ্যাস নিয়ে লেখাগুলো পড়তে গিয়ে একটি যুগান্তকারী বিষয় অনুধাবন করেন চন্দ্রশেখর। তিনি দেখলেন যে, সবাই এ ব্যাপারটিকে চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখার চেষ্টা করেছেন। তিনি দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা ব্যবহার করেন ডিজেনারেট ইলেকট্রন গ্যাস স্টাডি করতে। মাত্র ২০ বছর বয়সেই জাহাজে বসে তিনি জীবনের অন্যতম সেরা কাজটি করে ফেলেন, যার সূত্র ধরেই তিনি পরবর্তিতে নোবেল পুরস্কার  অর্জন করেছিলেন।

কাজটি কি ছিলো?

আগেও কয়েকবার লিখেছি যে, একটি তারকা সব বিক্রিয়া সম্পন্ন করে জ্বালানী শেষ করার পর তার কি হবে? তখন সেখানে থাকবে বিপূল পরিমানে হিলিয়াম এ্যাটম। তারা কি ঐ অবস্থায়ই থেকে যাবে? ঘটনা হলো যে তাদের ভরের বিশালত্ব তাদের মধ্যেই জন্ম দেবে বিপুল পরিমাণে মহাকর্ষ। তখন তারকাটি ক্রমাগত সঙ্কুচিত হতে থাকবে। কতদূর পর্যন্ত? সেটা নির্ভর করবে তারকাটির ভরের উপর। তারকার ভর যত বেশি হবে, কেন্দ্রমুখী মহাকর্ষ বল তত বেশি হবে এবং তারকাটি তত বেশি সঙ্কুচিত হবে।

সঙ্কুচিত হয়ে সে পরিণত হবে ‘শ্বেত বামন’-এ। এখানেই শেষ? এমনটা আগে মনে করা হলেও পরে বোঝা গেল যে, না এখানেই শেষ নয়। প্রচন্ড টানে এ্যাটমগুলোর নিউক্লিয়াসের চতুর্দিকে ঘূর্ণায়মান ইলেকট্রনগুলো ঢুকে মিশে যাবে প্রোটনের সাথে।

আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের রুশ সহপাঠী মিশা-কে বলেছিলাম যে, ইলেকট্রনের ভর খুব কম, কিন্তু নিউট্রন ও প্রোটনের ভর সমান সমান। তখন সে খুব কনফিডেন্টলি আমাকে বলেছিলো যে, “না, তাদের ভর সমান সমান নয়। একটু পার্থক্য আছে, আর সেই পার্থক্যটা হলো একটা ইলেকট্রনের ভরের।”

আমি: মানে কি?

মিশা: মানে হলো একটা প্রোটনের ভর ও একটা ইলেকট্রনের ভর যোগ করলে, একটা নিউট্রনের ভর হয়।

আমি তড়াক করে উঠেছিলাম। এটা গুরুত্বপূর্ণ ইনফর্মেশন। তবে ওর কথায় অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে, বই খুলে দেখলাম। দেখলাম, মিশা কথা ঠিকই বলেছে। সেখানে আরো পড়লাম যে, নিউট্রন আসলে ইলেকট্রন মিশ্রিত প্রোটন। এই যুক্তিটা আমার মনে ধরলো। দুইয়ে দুইয়ে চার মিললো। তাইতো, ইলেকট্রন ও প্রোটনের পরস্পর বিপরীত চার্জ আছে। আবার নিউট্রনের কোন চার্জ নাই বা চার্জ নিউট্রাল, কিন্তু যখন জানলাম যে নিউট্রন আসলে ইলেকট্রন মিশ্রিত প্রোটন, তখন বুঝলাম পজেটিভ ও নেগেটিভ মিলে তো নিউট্রাল হবেই।

তাহলে এইভাবে কোন শ্বেত বামন-এর ভর যদি ১.৪ সৌরভরের সমান বা তার চেয়ে কম হয় তাহলে তা শ্বেত বামন-ই রয়ে যাবে। কিন্তু তার বেশি হলে  পরিণতি হবে ভিন্ন। জ্বালানি নিঃশেষ হবার পর কোনো তারকার ভর ‘চন্দ্রশেখর সীমা’-র বেশি হলে এর পরিণতি দু’রকম হতে পারে।

১. তারকাটি একটি নিউট্রন তারকায় পরিণত হতে পারে, যার ঘনত্ব অস্বাভাবিকভাবে বেশি হবে। সাধারণ নিউট্রন তারকার ঘনত্ব প্রতি বর্গ সেন্টিমিটারে ৫০০ মিলিয়ন মেট্রিক টন হয়।

২. তারকাটি একটি কৃষ্ণবিবরে পরিণত হতে পারে। যার কেন্দ্রে থাকবে মহাকর্ষীয় সিঙ্গুলারিটি, এর ঘনত্ব হবে অসীম বা  অসীমের কাছাকাছি।

সিঙ্গুলারিটি হচ্ছে এমন একটি বিন্দু যার আয়তন শূন্য-এর কাছাকাছি, ভর এবং ঘনত্ব অসীমের কাছাকাছি! এই বিন্দুতে সময় এবং স্থান অসীমভাবে বেঁকে যায় এবং পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো সেখানে অচল। সাধারণত কোনো তারকার সমগ্র ভর প্রবল মহাকর্ষের টানে সঙ্কুচিত হয়ে আয়তন প্রায় শূন্য হয়ে গেলে সিঙ্গুলারিটির সৃষ্টি হয়। চন্দ্রশেখর যদিও তারকার পরিণতি হিসেবে ‘নিউট্রন তারা’ কিংবা কৃষ্ণবিবর, কোনোটির কথাই বলেননি। তথাপি তিনি সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন যে, চন্দ্রশেখর সীমার অধিক ভর সম্পন্ন একটি ক্রমাগত ধ্বসে পড়তে থাকা তারকার সিঙ্গুলারিটি সৃষ্টি ঠেকানোর মতো কোনো বল তখনো আবিষ্কৃত হয়নি।

চন্দ্রশেখরের এই বিস্ময়কর আবিষ্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন সেসময়কার প্রতিষ্ঠিত সকল জ্যোতির্বিদ। তখনকার জ্যোতির্বিদদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী স্যার আর্থার এডিংটন তো সরাসরি বলেই দিয়েছিলেন যে, সিঙ্গুলারিটি তথা অসীম ঘনত্বের কোনো বিন্দুর অস্তিত্ব অসম্ভব। তার বিশ্বাস ছিল, এমন কোনো অনাবিষ্কৃত বল বা বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব রয়েছে, যা আসলে সিঙ্গুলারিটির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মজার ব্যাপার হলো, চন্দ্রশেখরের গাণিতিক হিসাব নিকাশের সাথে কেউই অমত প্রকাশ করতে পারছিলেন না। কিন্তু শূন্য আয়তনে অসীম ভরের ব্যাপারটাই কেউ মেনে নিতে পারছিলেন না।

ক্যামব্রিজে একসময় তার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিলেন না। কিন্তু চন্দ্রশেখর বিশ্বাস করতেন, তিনি সঠিক। তাই ভগ্নহৃদয়ে ক্যামব্রিজ ছেড়ে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমান। এই বিশ্ববিদ্যালয়েই পরবর্তী জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। চন্দ্রশেখর সীমার পর আর কোনো বড় সাফল্য না পেলেও বামন তারকা বিষয়ক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা তিনি প্রকাশ করেছিলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

ধীরে ধীরে দুয়ে দুয়ে চার মিলতে লাগলো এবং জ্যোতির্বিদরা অনুধাবন করতে লাগলেন যে, এডিংটন ভুল আর চন্দ্রশেখরই সঠিক। তবে প্রক্রিয়াটি এত শ্লথ ছিল যে এমন যুগান্তকারী আবিষ্কারের স্বীকৃতি পেতে চন্দ্রশেখরকে অপেক্ষা করতে হয় ৩০টি বছর! ১৯৮৩ সালে উইলিয়াম ফাউলারের সাথে চন্দ্রশেখরকেও পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।

চন্দ্রশেখর সীমা হল স্থিতিশীল শীতল শ্বেত বামন তারকার সম্ভাব্য সর্বোচ্চ ভর। ভর এর চাইতে বেশি হলে তারকাটি চুপসে কৃষ্ণবিবরে পরিণত হবে। সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর দেখান যে, একটি শ্বেত বামন তারকার জন্য ভরের মান ১.৪১ সৌরভর এর সমান। এবং এই পর্যায়ে তারাটি ঘূর্ণায়মান হবে। তাঁর নামানুসারে এই সীমার নামকরণ করা হয়েছে ‘চন্দ্রশেখর সীমা’। তবে দ্রুত এবং বিভিন্ন অংশে ভিন্ন ভিন্ন ঘূর্ণন হার বিশিষ্ট তারার জন্য ডুরিসেন(১৯৭৫) দেখান যে, এই ভরের মান ৩ সৌরভরের সমান হতে পারে। শ্বেত বামন তারার ভর বেশি হলে মহাকর্ষ একে সংকুচিত করে ফেলতে চায়। ফলে এর অন্তর্গত ইলেকট্রনগুলি উচ্চতর শক্তিদশায় পৌছে এবং এদের গতিবেগ বাড়ার সাথে সাথে চাপও বাড়তে থাকে। পদার্থের এধরনের পরিস্থিতিকে বলে অপজাত অবস্থা (Degenerate Matter)।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করে পারছি না।

চন্দ্রশেখরের এই বিস্ময়কর আবিষ্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন সেসময়কার প্রতিষ্ঠিত সকল জ্যোতির্বিদ। তাদের মধ্যে একজন হলেন স্যার আর্থার এডিংটন। কথিত আছে যে, কেউ একজন এডিংটন-কে বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে আপেক্ষিকতত্ত্ব বোঝেন কেবল তিনজন”, এডিংটন বিস্মিত হয়ে ভাবছিলেন, “হু ইজ দ্যা থার্ড ম্যান?” আইনস্টাইন ও এডিংটন-এর পর চন্দ্রশেখরই ছিলেন সেই তৃতীয় ব্যাক্তি। তখনকার জ্যোতির্বিদদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী স্যার আর্থার এডিংটন তো সরাসরি বলেই দিয়েছিলেন যে, সিঙ্গুলারিটি তথা অসীম ঘনত্বের কোনো বিন্দুর অস্তিত্ব অসম্ভব। উনার বিশ্বাস ছিল, এমন কোনো অনাবিষ্কৃত বল বা বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব রয়েছে, যা আসলে সিঙ্গুলারিটির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মজার ব্যাপার হলো, চন্দ্রশেখরের গাণিতিক হিসাব নিকাশের সাথে কেউই অমত প্রকাশ করতে পারছিলেন না। কিন্তু উনার কথাও আবার তারা মানতে পারছিলেন না। অবশ্য আইনস্টাইনের ক্ষেত্রেও কিন্তু সেটাই হয়েছিলো।

ক্যামব্রিজে সেইসময় উনারর পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ না থাকলেও, চন্দ্রশেখর কিন্তু বিশ্বাস করতেন, তিনি সঠিক। তাই ভগ্নহৃদয়ে ক্যামব্রিজ ছেড়ে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমান। এই বিশ্ববিদ্যালয়েই পরবর্তী জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। চন্দ্রশেখর সীমার পর আর কোনো বড় সাফল্য না পেলেও বামন তারকা বিষয়ক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা তিনি প্রকাশ করেছিলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে।

ধীরে ধীরে দুয়ে দুয়ে চার মিলতে লাগলো এবং জ্যোতির্বিদরা অনুধাবন করতে লাগলেন যে, এডিংটন ভুল আর চন্দ্রশেখরই সঠিক। তবে প্রক্রিয়াটি এত ধীর গতির ছিল যে এমন যুগান্তকারী আবিষ্কারের স্বীকৃতি পেতে চন্দ্রশেখরকে অপেক্ষা করতে হয় বহু বছর! ১৯৮৩ সালে উইলিয়াম ফাউলারের সাথে চন্দ্রশেখরকেও পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।

(চলবে)

—————————————————————-

রচনাতারিখ: ১০ই নভেম্বর, ২০২০ সাল

সময়: রাত ০২টা ৫৯মিনিট

পূর্ববর্তি পর্বগুলো:

https://www.bdeasy.com/
Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৮

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৮
——————————————————- রমিত আজাদ

ঘটনা দিগন্ত (Event Horizon):

ছাদে উঠুন বা পাহাড়ে উঠুন অথবা উঁচু কোন জায়গায় উঠে দাঁড়ান; আপনার চোখের দৃষ্টি প্রসারিত হতে হতে অনেক দূর যাবে, এই যাওয়ার কি কোন শেষ আছে? জ্বী, একটা শেষ আছে। অনেক অনেক দূরে যেখানে মাটি ও আকাশ মিলে একটা রেখা হয়েছে, তার নাম ‘দিগন্ত রেখা’, এর পরে কি আপনি আর কিছু দেখতে পান? না, দেখতে পান না। এর আগে যা যা আছে বা ঘটছে আপনি সবই দেখতে পাবেন, কিন্তু ঐ দিগন্ত রেখার ওপাশে যা আছে বা ঘটছে, তা আর আপনি দেখতে পাবেন না। এই রেখাকে ‘ঘটনা দিগন্ত’-ও বলতে পারি। মানে, এমন এক দিগন্ত আছে, যার এপাশের সব কিছু দেখা সম্ভব, কিন্তু ওপাশের কিছুই দেখা সম্ভব না। এভাবে ফিজিক্সেও Event Horizon আছে, যা ‘স্থান-কাল’-কে দুইটি এলাকায় ভাগ করে; একপাশে সব তথ্যই সর্বদিকে নিরন্তর প্রবাহোত হচ্ছে, আর অপরপাশের কোন তথ্যই বাইরে আসতে পারছে না। মহাবিশ্বের Event Horizon-এর উৎস বা কারণ হলো অতি উচ্চমাত্রার মহাকর্ষ। একটি কৃষ্ণবিবর তার চারপাশে এমন একটি ‘ঘটনা দিগন্ত’ তৈরী করে। যার কারণে কৃষ্ণবিবর-এর আভ্যন্তরিন কোন ঘটনাই আমরা দেখতে পাবো না। ( অনেকটা সমাজতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী বদ্ধ রাষ্ট্রগুলোর মত, যাদের বাইরে থেকে ভিতরের কিছুই দেখা যায় না!)

‘স্থান-কাল’ সুস্থির, নাকি অস্থির?
আমি আমার জীবনে যখন প্রথমবার জানতে পেরেছিলাম যে ‘স্থান-কাল’ কোন চরম শূণ্যতা নয়, বরং সেও একটা কিছু, তখন ভীষণ অবাক হয়েছিলাম! আবার যখন পড়লাম ও জানলাম যে স্থান-কাল কোন একটা কাপড়, কাগজ বা ধাতুর মত বাঁকাওথয়ে যেতে পারে, তখন বিস্ময়ের আর সীমা ছিলো না! প্রথমটায় ভেবেছিলাম যে এটা হয়তো গণিতের কোন হেয়ালী! তারপর জানলাম আইনস্টাইন প্রথম যখন এই নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন, তখন অনেক বড় বড় বিজ্ঞানীরাও আমার মতন ভেবেছিলেন। কিন্তু এডিংটন যখন পরীক্ষার দ্বারাই এর প্রমাণ পেলেন, এরপর কি আর কোন কথা থাকে?

এখন আসি আরো বিস্ময়কর কথায়। ছোটবেলায় একবার ঢাকা থেকে নদীপথে পটুয়াখালী গিয়েছিলাম। অমন ভ্রমণ আমি জীবনে বহুবারই করেছি, সেটা কথা নয়; আমার মনে যে নদীভ্রমণ-টা বেশি দাগ কেটেছে আমি সেটার কথা বলছি। ঐ নদীভ্রমণকালে বালক আমি বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেছিলাম যে, শান্ত পানির বুকের উপর একটা বড় জাহাজ দাঁড়ালে সে পানির ক্ষেত্রটিকে কেমন বাঁকিয়ে ফেলে! তারপর যখন জাহাজটি চলতে শুরু করে তখন সে পুরো পানির ক্ষেত্রটিকে (নদীটিকে) উত্তাল করে ফেলে। সেই উত্তালতার একটি অংশকে আমরা ঢেউ হিসাবে দেখতে পাই। আবার লক্ষ্য করেছিলাম যে, পানির সেই উত্তালতা আবার আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বা চলমান ডিঙ্গিনৌকা বা ছোট ছোট নৌযানগুলোকেও দোলাতে বা নাড়াতে থাকে। আমাদের চারপাশের স্থান-কালের দশাও হয় তাই; সূর্য বা আরো বড় কোন বডি তার চারপাশের স্থান-কালকে বাঁকিয়ে ফেলে, স্থান-কালের মধ্য দিয়ে চলমান বডিগুলো তার চারপাশের স্থান-কালকে উত্তাল করে ফেলে ও ঢেউয়ের সৃষ্টি করে (যেই ঢেউ-এর নাম মহাকর্ষ তরঙ্গ), এবং এই উত্তালিত স্থান-কাল আবার তার মধ্যে থাকা অন্যান্য বডিগুলোর অবস্থান ও চলাচলকে প্রভাবিত করে! তার মানে হলো যে, স্থান-কাল সুস্থির নয়, বরং অস্থির!

এবার নিশ্চয়ই বোঝা গেলো যে, স্থান-কাল যেমন ঘটনাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়, তেমনি ঘটনাগুলোও স্থান-কাল দ্বারা প্রভাবিত হয়। অতএব মহাজাগতিক ঘটনাগুলো বোঝা বা ব্যাখ্যা-বর্ণনা করা সম্ভব নয়, যদি স্থান-কাল সম্পর্কে ধারনা না থাকে।

অনেকেই প্রশ্ন করে থাকেন যে, ‘মহাবিশ্বের বাইরে কি আছে বা কি ঘটছে?’ আপাতত বলবো যে, মহাবিশ্বের বাইরে যেহেতু স্থান-কাল নাই, তাই সেখানে কি আছে বা কি ঘটছে এই বিষয়ে কথা বলাটা একরকম অর্থহীন!

তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে মহাবিশ্ব অনাদি ও অনন্ত নয়, যেমনটি বলেছিলেন দার্শনিক এরিষ্টটল। আপাতত বোঝা যাচ্ছে যে, ইমাম গাজ্জ্বালীই সঠিক বলেছিলেন, উনার রচিত গ্রন্থ ‘তাহাফুত আল ফালাসিফা’-তে যে, মহাবিশ্বের একটা শুরু আছে, বর্তমানে তা সতত পরিবর্তনশীল, এবং মহাবিশ্বের একটি শেষও আছে।

(চলবে)

রচনাতারিখ: ০৯ই নভেম্বর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ০১টা ৪৫মিনিট

পূর্ববর্তি পর্বগুলো:
https://www.bdeasy.com/

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৭

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৭
——————————————————- রমিত আজাদ

মহাকর্ষ বল দুর্বল, নাকি সবল?

আমি আমার জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি যে, সবকিছুরই কোন না কোন সীমাবদ্ধতা থাকে। অন্যকথায়, সবকিছুরই ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুইটা দিক আছে। আমি একজন খুব দীর্ঘকায় শক্তিশালী ব্যাক্তিকে চিনতাম। দেখে মনে হত এইরকম মাসলম্যান-কে দিয়ে বড়সড় মাস্তানী করা যাবে, অথচ সে ছিলো ভীষণ ভীতু! আবার আরেকজন পুরুষ ছিলো বিশাল-লম্বা চওড়া! কিন্তু বদনাম ছিলো যে, তার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটি খুবই ছোট, এবং তিনি ক্রীড়ায় পারঙ্গমও নন, এইরকম নানাবিধ উদাহরণ টানা যায়। এবার পদার্থবিজ্ঞানের কথাই বলি এই যে চারটি মৌলিক বল-এর মধ্যে সবচাইতে শক্তিশালী/সবল যে বল-টা তার নাম সবল পারমানবিক বল (Strong nuclear force)। অথচ তার ‘রেঞ্জ অব এ্যাকশন’ খুবই কম। এতই কম যে সে অতি ক্ষুদ্র পরমাণুর ব্যাস-এর বাইরে আর প্রভাব ফেলতে পারে না। এমনকি বৃহৎ পরমাণুর সীমানারেখায়-ও সে খুব টালমাটাল অবস্থায় থাকে; বিষয়টা এমন যে ওটাকে একটু টোকা দিলেই ভেঙে যাবে। ইউরেনিয়াম পরমাণু এমন একটি। এদিকে বিদ্যুৎ-চুম্বক বল সবলতার দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও, সে নিজে দুই প্রকারের, পজেটিভ ও নেগেটিভ; মানে হলো তারা আকৃষ্ট-বিকৃষ্ট দুটাই করতে পারে তাই অনেকগুলো চার্জ একত্রিত হলে একে অপরকে কাটাকাটি করে নিজেদের মোট বল (Net force) খুব কম, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে শূণ্যও হয়ে যায়; যেমন আপনার-আমার শরীরে অগণিত ইলেকট্রন ও প্রোটন থাকলেও, তাদের সংখ্যা সমান বা প্রায় সমান হওয়ার দরুণ আমরা কিন্তু মোটেও চার্জড নই, বরং চার্জ নিউট্রাল বা শূণ্য চার্জ । আবার মহাকর্ষ বল সবচাইতে দুর্বল কিন্তু তার ‘রেঞ্জ অব এ্যাকশন’ অসীম! এবং তার কোন পজেটিভ ও নেগেটিভ নাই। তার আছে কেবলই আকর্ষণ, মানে হলো ভরযুক্ত অনেকগুলো বডি একত্রিত হলে তাদের সন্মিলিত (summation) বল শুধু যোগই হবে (বিয়োগ নয়)। এভাবে যেখানে বিপুল পরিমানে ভরযুক্ত কণিকা/পদার্থ আছে তাদের সন্মিলিত বল এতটাই বেশি যে তা আর সব প্রকার বলকে ছাড়িয়ে যাবে! আর এটাই ঘটে থাকে মৃত তারকাদের ক্ষেত্রে। আর এই কারণেই মহাকর্ষ বল মহাবিশ্বের বিবর্তন-কে নিয়ন্ত্রণ করে। পাঠকরা নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝতে পারছেন যে, কেন এত শত বিজ্ঞানী গবেষণারত আছেন মহাকর্ষ বল নিয়ে।

আমার মাস্টার্স-এর থিসিস পেপার ছিলো ‘কসমোলজি’-র উপর। ঐ পেপার লিখতে গিয়ে প্রথম শুনেছিলাম, পেইনরৌজ ও হকিং-এর নাম, আমার সুপারভাইজার ড. ভ. ম. পিঝ-এর মুখে। ড. পিঝ-ই আমাদেরকে ‘কোয়ান্টাম মেকানিক্স’ এবং ‘গ্রাভিটেশন ও কসমোলজি’ পড়িয়েছিলেন। পরবর্তিতে জেনেছিলাম যে, ১৯৭০ সালে স্টিফেন হকিং গবেষণা করেছিলেন কৃষ্ণবিবর ও তার চারপাশের বিপুল রাক্ষুসে মহাকর্ষ ক্ষেত্র নিয়ে। এই করতে গিয়ে তিনি কোয়ান্টাম ফিজিক্সের তত্ত্ব ও সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (মহাকর্ষ তত্ত্ব) দুটাকেই টেনেছিলেন। যা ছিলো ভবিষ্যতের ‘কোয়ান্টাম মহাকর্ষ তত্ত্ব’-এর ছায়া।

আলোকের গতি যদি অসীম হতো:

এই নিয়ে আগেও আলোচনা করেছি। আলোকের গতি যদি অসীম হতো তাহলে আমাদের চোখের বিভিন্ন ঘটনা দেখার যেমন কোন আগে-পরে মানে ধারাবাহিকতা থাকতো না, সবকিছুই ভীষণ এলোমেলো দেখা যেত; তেমনি মহাবিশ্বের কোন বলই তাকে প্রভাবিত করতে পারতো না! কিন্তু আল হাইয়াম যখন বলেই ফেললেন যে আলোর গতিবেগ সসীম এবং বিজ্ঞানী রোমার যখন পরীক্ষার দ্বারাই প্রমাণ করলেন যে আলোর গতিবেগের সুনির্দিষ্ট সীমারেখে রয়েছে, তখন আর সন্দেহ রইলো না যে, আলোকের গতিবেগ প্রভাবিত হতে পারবে। কোন বলের কি রকম প্রভাব আলোর উপর থাকবে সেটা অবশ্য পরবর্তী গবেষণার বিষয়।

মহাকর্ষ কি সত্যিই আলোকে আকর্ষণ করে?
ফোটন নামক কণিকাটির কোন ভর নাই। না থাকারই কথা, কারণ সে পিস্তলের গুলি বা মোটর দানা-র মত মোটেও নয়। আসলে সে ‘প্যাকেট অব এনার্জি’; এনার্জি বা শক্তির কি আর ভর থাকে? আর তাই যদি হবে তাহলে নিউটনীয় মহাকর্ষ ক্ষেত্র তো তাকে টেনে ধরে রাখতে পারবে না! ধরুন, আমরা যদি উপর দিকে একটা গুলি ছুঁড়ে মারি সে কি গতিবেগ কমে কমে একসময় শূণ্য বেগ হয়ে তারপর আবার নীচের দিকে নামতে শুরু করবে না? কিন্তু আমরা যখন কোন শক্তিশালী টর্চ থেকে আলো ছুঁড়ে মারি, কই সে তো আর নীচের দিকে নামে না? নামে না তার কারণই হলো যে, টর্চ থেকে ছোড়া জিনিসটি গুলির মত ভরসম্পন্ন নয়, বরং একটা ভরবিহীন জিনিস।

পরবর্তি প্রশ্নটা হলো, তাহলে এই যে বারবার বলা হচ্ছে যে কৃষ্ণবিবর আলো-কে টেনে তার ভিতর এমনভাবে নিয়ে যায় যে সে আর ওখান থেকে বের হতে পারে না; এই কথার মানে কি? আলো তো মোটরদানা নয়, সে তো ‘ভরবিহীন’ তাহলে কৃষ্ণবিবর তাকে টানবে কি করে? বিষয়টি হলো যে, মহাকর্ষ যদি নিউটনীয় মহাকর্ষ হয়, তাহলে কিন্তু তার আলোকে আকর্ষণ করার কথা না মোটেও। কারণ নিউটনীয় মহাকর্ষ শুধু ভরযুক্ত বডিকেই আকর্ষণ করতে পারে। কিন্তু আমরা ইতিমধ্যেই বলেছি যে, মহাকর্ষ বিজ্ঞান নিউনীয় বিজ্ঞানের গন্ডি পেরিয়ে আরো উন্নত বা অধিকতর ব্যাপক বিজ্ঞানের আওতাভুক্ত হয়েছে, যা আলবার্ট আইনস্টাইনের অবদান। তিনি মহাকর্ষ আরো উন্নত বিজ্ঞানের সাহায্যে ব্যাখ্যা ও বর্ণনা করেছেন যার নাম general relativity। আর এই নতুন বিজ্ঞান অনুযায়ী মহাকর্ষের কারণ হলো ‘স্থান-কালের বক্রতা’। আলো চলে সোজা পথে কথাটা পুরোপুরি ঠিক না, বরং বলতে হবে যে আলো চলে তার সামনে থাকা সব চাইতে সরল পথটি ধরে। যেমন ধরেন, আপনি মোটর গাড়ী চালিয়ে ঢাকা থেকে পূবাইল যেতে চান, ঢাকা থেকে পূবাইল যদি কোন নাক বরাবর সোজা পথ থাকে, আপনি সময়, শ্রম ও জ্বালানী বাঁচানোর জন্য ঐ পথেই যাবেন। কিন্তু পথ যদি থাকে একটিই এবং সেটি ধনুকের মত বাঁকা, তখন আপনি ঐ পথে যেতেই বাধ্য হবেন। আলোও তেমনি যখন সূর্য বা অন্য কোন মহাকাশীয় ম্যাসিভ বডির পাশ দিয়ে যেতে চায়, ঐ পথটিই বাঁকা। তাই আলো-কে বাধ্য হয়েই ঐ বাঁকা পথটি ধরেই যেতে হবে ( অনেকটা কবি জসীমউদ্দীনের সেই রাখাল ছেলের মত, যে বাঁকা গাঁয়ের পথটি ধরে যায়)। এবার আসুন কৃষ্ণবিবর-এর মত ম্যাসিভ বডির আলোর উপর প্রভাব বিষয়ে। এই দুনিয়ায় কিছু প্যাঁচালো ব্যাক্তি আছে যারা সোজা সমাজটাকে ভীষণ বাঁকা বানিয়ে ফেলে। একবার তাদের পাল্লায় পড়লে আর ঐ বাঁকা পথ থেকে বের হওয়া যায় না! একটি কৃষ্ণবিবর-ও তেমনি তার চারদিকের স্থান-কাল-কে এমনভাবে বাঁকা বানায় যে কৃষ্ণবিবর-এর আওতায় থাকা কোন আলোক রশ্মি আর ঐ বাঁকা পথ পেরিয়ে বাইরে আসতে পারে না! মানে কি? মানে হলো যদি কোন আলো কৃষ্ণবিবর থেকে বাইরে আসতে চায়ও তাহলে স্থান-কাল-এর প্রচন্ড বক্রতার কারণে, সে আবার ঐ কৃষ্ণবিবর-এই ফিরে যায়। ছোট বেলায় বাগাডুলি খেলতাম; দেখতাম কোন কোন মার্বেল কাঠি দিয়ে ছুঁড়ে মারার পর সে নানা পথ ঘুরে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসতো! কৃষ্ণবিবর-এ আলো ফিরে আসার ঘটনাটা এর সাথে উপমেয়। আবার বাইরের কোন উৎস থেকে যদি আলো গিয়ে কৃষ্ণবিবর-এ পড়ে সেও ওখানে ট্র‍্যাপড হয়ে যায়! আর এই অর্থেই বলা হয় যে, কৃষ্ণবিবর সত্যিকার অর্থেই কৃষ্ণ!

কৃষ্ণবিবর কতটুকু কৃষ্ণ?
“আপনার দেশী ছাতাটির রঙ কি?” “কালো”। কালো মানে তো রঙের অনুপস্থিতি তার মানে সেখানে কোন রঙ নাই! তবে কি ঐ ছাতাটিকে দেখা যাবে না? উত্তর: ছাতাটিকে দেখা যাবে, আবার দেখা যাবে না। হেয়ালী হয়ে গেলো তাই না? আমাদের কলেজে একজন বড় ভাই ছিলেন, উনার গায়ের রঙ ছিলো মিচমিচে কালো। ভালোমানুষ বড় ভাইটিকে আমরা বলতাম, “ভাইজান, আপনি যে কালার কালা, আপনারে তো মশাও খুইজা পাইবো না! আপনের বাপের কিছু টাকা সাশ্রয় হইলো।” বিনয়ী মানুষটি আমাদের কথা শুনে হাসতেন। এখন কথা হলো, উনাকে কি আসলেই দেখা যায় না? দেখা না গেলে আমরা উনাকে চিনতাম কিভাবে? দিনের আলোয় উনাকে ভালো-ই দেখা যেত। তবে রাতের ঘুটুঘুটে অন্ধকারে তিনি একরকম বিলিনই থাকতেন! উনাকে কি মশা আসলেই খুঁজে পেত না? জ্বিনা, মশা উনাকে ঠিকই খুঁজে পেত; কারণ উনাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য মশার আরো অনেক মেকানিজমই ছিলো। রাতের অন্ধকারে উনাকে দেখা না গেলেও, উনার গায়ের ঘ্রাণ, উনার নাসিকার ধ্বনি এবং আরো অনেক বৈশিষ্ট্যই উনার আছে যার সাহায্যে উনাকে ডিটেক্ট করা যাবে। কৃষ্ণবিবর-এর ব্যাপারটাও ঐরকমই। কৃষ্ণবিবর রাতের অন্ধকারে বিলিন হলেও, তার এমন কিছু ভৌত বৈশিষ্ট্য আছে যার সাহায্যে তাকে ডিটেক্ট করা যাবে। আপাতত: তার কিছুই বলছি।

একটি কৃষ্ণবিবর-এর ভিতরের আলো তার বাঁকা পথ পেরিয়ে আর কিছুতেই বাইরে আসতে পারবে না, একথা সত্য তবে, কৃষ্ণবিবর-এর কাছাকাছি চলে আসা কিছু আলো যারা ট্র্যাপড হয়নি, তারা কিন্তু পাশ কাটিয়ে চলে যাবে। আর সেই পাশ কাটানোটা বিশেষ রকমের হবে। যেমন, ঐ মিচমিচে কালো বড় ভাই রাতের অন্ধকারে মাঠের কোথাও দাঁড়িয়ে আছেন, আপনি তাকে দেখতে পাচ্ছেন না; হঠাৎ কেউ একটা টেনিস বল ছুঁড়ে মারলো, এবং বলটি সোজা না গিয়ে ঐ ভাইয়ের গায়ে লেগে ডিরেকশন চেইঞ্জ করে আরেকদিকে চলে গেলো; এবার আপনি কি সুস্পষ্টই বুঝতে পারবেন না যে, ওখানে কেউ দাঁড়িয়ে আছে? এভাবেই কৃষ্ণবিবর-এর পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া আলোকরশ্মিগুলোকে স্টাডি করে বোঝা যায় যে, ওখানে একটি কৃষ্ণবিবর আছে।

আরো একটি বিষয়: মনে করেন যে কোন এক অমাবশ্যার রাতে ঐ মিচমিচে কালো বড়ভাইটি, আপনার গ্রামের মাঠের মাঝখানে বসে আছেন। ঘুটঘুটে অন্ধকারে উনাকে দেখা না গেলেও, কোন এক কারণে যদি উনাকে ঘিরে একদিল জ্বোনাকী উড়তে ও ঘুরতে থাকে, আপনি নির্ঘাৎ টের পাবেন যে ওখানে কেউ আছে। আবার তিনিই যদি একটা জ্বলন্ত সিগারেট টানতে থাকেন, তাহলে সিগারেটের আগুনের নড়াচড়া দেখেও উনার উপস্থিতি টের পাওয়া যাবে। একইভাবে, আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে একটা কৃষ্ণবিবর আছে, যার দিকে সবচাইতে শক্তিশালী টেলিস্কোপ-টি তাক করলেও কালো রঙের কৃষ্ণবিবরটি দেখা যাবে না। কিন্তু বিবরটি এতটাই ম্যাসিভ ও মহাকর্ষ সম্পন্ন যে তাকে ঘিরে অনেকগুলি তারকাই ঘূর্ণায়মান। ঐ ভাস্বর তারকাগুলির ঘূর্ণন দেখেই বাস্তবিক প্রমাণিত হয়েছে যে, কৃষ্ণবিবরের উপস্থিতি ওখানে রয়েছে।

(চলবে)


রচনাতারিখ: ০৭ই নভেম্বর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ১১টা ০৭মিনিট

পূর্ববর্তি পর্বগুলো:
https://www.bdeasy.com/

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

ব্যার্থ প্রতিশ্রুতি

ব্যার্থ প্রতিশ্রুতি
———————– রমিত আজাদ

কথা তো দিয়েছিলাম; তুমিও তো দিয়েছিলে কথা!
তবে কেন হারালো সে কথাগুলো? হৃদয়ে হানিলো ব্যাথা!
হারিয়েছে কথাগুলো তাইতো এখনো নির্ঘুম কাটে রাত।
মৌন গগনে দেখিছে রজনী, আমাদের পরিতাপ!

শরতের রঙে তোমাদের দেশে, রঙিন হয়েছে শাখা,
আমাদের দেশে নামিছে হিমানী, কূয়াশা মেলিছে পাখা।
রঙের বারতা কোথায় পশিল? রাঙালো কি সমীরন?
শীতল সমীরে উষ্ণতা কোথা? অযথাই তাই জাগরণ!

তুমি যবে যাও নদীতটে একা, তটিনীর জলে পাও কি গো দেখা?
হারানো দিনের অভিসারী ছবি, শুয়ে আছো মোর কোলে রেখে মাথা!
স্বয়ংবরা তুমি সঁপেছিলে মন, রচেছিলে গৃহ দেখিয়া স্বপন,
সেই ঘর আর হয় নাই গড়া! স্বপ্ন মুছিলো অপয়া পবন।

কি পেলে জাগিয়া এত এত রাত, শুকানো পুষ্পে লুটায় কি চাঁদ?
কেবলি লুটায় অস্থির তনু, কাতর স্মৃতির অধীর অতনু।
আমার বাসনা নিভিয়া গিয়াছে, উবিয়াছে সব সাধ!

নিরাশা তিথিতে দেখিছে তোমারে মৌন বিরহী চাঁদ!

রচনাতারিখ: ৬ই নভেম্বর, ২০২০ সাল
সময়: ভোর ০৪টা ০১ মিনিট

False promises
———————– Ramit Azad

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

রত্নমণির তনুর শোভা

রত্নমণির তনুর শোভা
———————————– রমিত আজাদ

শরৎ রাঙা রঙিন পথে উঠলো হেসে কোন পরী?
তার দেশে আজ ভোট হয়েছে, নির্বাচনের ফুলঝুড়ি!
ভোট রেখে সে হাটলো পথে, কোন গাঙে যায় তার তরী?
টুকটুকে লাল উত্তরি তার, রূপের বাহার প্রাণ জুড়ি!

ঠোট পালিশও রক্তপলাশ, যেমন বাহার বৃক্ষ শাখে!
পাতায় পাতায় রঙ লেগেছে, মনের রঙেও ঢেউ জাগে!
জামার সাথে মাথায় টুপি, চুল বিনুনী হর শতেক,
হোক না সে এক বঙ ললনা, এখন সে তো মেমসাহেব।

শরৎ ঋতুর মধুর ছোঁয়ায় সবুজ পাহাড় হয় হলুদ,
গাছে গাছে রঙ মেখেছে, রঙ তুলিতে রঙের দুত!
রত্নমণির তনুর শোভা, সৌরভিত জরিন ধূপে,

আকাশ ছোঁয়া পাহাড় চূড়া, আত্মহারা পরীর রূপে!

রচনাতারিখ: ৫ই নভেম্বর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ০২টা ৩৪ মিনিট

Her Autumn Beauty
————————- Ramit Azad

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

দিলে আমার মহানবী

দিলে আমার মহানবী
——————– রমিত আজাদ

দিলে আমার মহানবী,
হেরার গুহায় ধ্যানের ছবি,
নিখিল ভূবন মজে আছে
তাহারও প্রেমে;
হায়রে তাহারও প্রেমে!

জ্বীন, ফেরেশতা, গাছের পাতা,
রবি, শশী, ক্ষিতিমাতা;
পড়িছে দরূদ তারা ক্ষণে ক্ষণে!
আহা ক্ষণে ক্ষণে!

নদী, সায়র শরাব পিয়ে,
মরুর ধুলা রঙ ছড়িয়ে,
গাহিছে প্রশংসা গীতি
দিনে ও রাতে।
আহা দিনে ও রাতে!

পাপীরা যখন মদের নেশায়,
মেতে ছিলো গুনাহ্‌ জলসায়।
অন্ধকারে ছিলো ডুবে
জাহেলিয়াতে!
হায় হায় জাহেলিয়াতে!

সত্যবাদী দ্বীনের নেতা,
অমর বাণী, মধুর কথা;
বলিয়াছেন সেই জমানায়
মানবের পথে!

তাহার ডাকে দিলো সাড়া,
চন্দ্র, সূরুয, গ্রহ, তারা;
আরো দিলেন সাড়া যত
মুমীন ও দ্বীনদার!

প্রভুর বাণী লয়ে লয়ে,
মক্কা থেকে তায়েফ হয়ে,
কষ্ট-ব্যাথা পীড়ন সয়ে,
করিলেন প্রচার।

বাধা বিপদ সব পেরিয়ে
মদিনারই মরুদ্যানে,
ন্যায়ের বাইত দাঁড় করাতে
গড়িলেন মসজিদ।
আহা গড়িলেন মসজিদ!

আযানেরই সুর উঠিলো,
গাহিলেন বেলাল।
রৌশন হইলো জমিন-আশমান,
নাচিলো হেলাল।
আহা নাচিলো হেলাল।

মক্কাজয়ী বীরের নেতা,
ভুলে গিয়ে অতীত ব্যাথা,
যুদ্ধজয়ী দিগবিজয়ী,
করিলেন ক্ষমা।
আহা করিলেন ক্ষমা।

তোমার নবী, আমার নবী,
নিখিল ধরার মহানবী,
হয়ে গেলেন সবার মনের
ভূবনজয়ী বিশ্বনবী!


রচনাতারিখ: ৩রা নভেম্বর, ২০২০ সাল
সময়: দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৬

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৬
——————————————————————————- রমিত আজাদ

আমি বা আমরা কেন ফোটন বা আলোর মত প্রবাহিত হই না। আলোক তরঙ্গ বা ফোটন যাই বলি না কেন, তার কোন ‘ভর’ নাই। তাই সে অবিরাম প্রবাহিত হচ্ছে। কিন্তু আমাদের রয়েছে ভর। তাই আমাদের ঐভাবে প্রবাহিত হওয়া সম্ভব না। আমাদের গায়ের মধ্যে রয়েছে অগণিত এ্যাটম, এ্যাটমগুলোর মধ্যে রয়েছে মৌলিক কণিকাত্রয়ী ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন। এই সাব-এ্যাটমিক কণিকা-গুলোর ভর-হীন হওয়ার কথা ছিলো, কিন্তু তারা ভরহীন নয়। কেন? এই বিষয়টা ব্যাখ্যা করার জন্য একটা থিওরী-র দরকার ছিলো। বিজ্ঞানী হিগস সেই থিওরীটিই দিয়েছেন। সব পার্টিকেলের ভর নাই, যাদের ভর নাই, তারা ‘হিগস পার্টিকেল’-এর সাথে ইন্টারএ্যাক্ট করে না; যেমন হয়তো ‘নিউট্রিনো (neutrino)। তবে যাদের ভর আছে যেমন, ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন; তারা ‘হিগস পার্টিকেল’-এর সাথে ইন্টারএ্যাকশন থেকেই ভর-টা পায়। এইভাবে বলা যায় যে ‘হিগস পার্টিকেল’ বা ‘হিগস ফিল্ড’ রয়েছে সমগ্র মহাবিশ্ব জুড়ে। তাই ভরসম্পন্ন পার্টিকেলগুলো গতিশীল অবস্থায় ‘হিগস পার্টিকেল’ বা ‘হিগস ফিল্ড’-এর সাথে ইন্টারএ্যাক্ট করে ‘ভর’ পায়।

গত পর্বে যেমনটা ব্যাখ্যা করেছিলাম যে একটা ভীড়ের মধ্যে দিয়ে চলার সময় আপনি বাধাপ্রাপ্ত হবেন বেশি, আর অল্পকিছু মানুষের মধ্য দিয়ে চলার সময় আপনি বাধা পাবেন কম। এভাবে প্রথম ক্ষেত্রে আপনার ‘ভর’ বেশি, ও দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আপনার ‘ভর’ কম।

পরবর্তি প্রশ্ন, ‘এই ‘হিগস পার্টিকেল’ বা ‘হিগস ফিল্ড’ এলো কোথা থেকে?’ এর উত্তর এখনো জানা নাই। হয়তো বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণ-এর মুহূর্তে এই ফিল্ডটি তৈরী হয়েছে। হতে পারে যে ‘হিগস ফিল্ড’ মহাবিশ্বের ইনফ্লেশন প্রসেস-এর একটা অংশ। হিগস ফিল্ড একটি না একাধিক সেটাও আমরা জানি না।

দ্বিতীয় প্রশ্ন, ‘হিগস বোজন আবিষ্কারের সাথে সাথে কি পার্টিকেল ফিজিক্স কমপ্লিট হয়েছে?’ উত্তর, “না, হয় নি। যেমন একটা বিস্ময় হলো নিউট্রিনো। তাদের ভর আছে, কিন্তু আপাত:দৃষ্টিতে তারা হিগস পার্টিকেল-এর সাথে ইন্টারএ্যাক্ট করে কোন ‘ভর’ পায় না। এই সমস্যাটি এখনও অসমাধিত।”

তৃতীয় প্রশ্ন, ‘হিগস বোজন এত হালকা কেন?’ উত্তর, “হতে পারে যে আরো কয়েক রকমের হিগস পার্টিকেল আছে। আপাতত কেবল এক ধরনের হিগস পার্টিকেল আবিস্কৃত হয়েছে।”

হিগস পার্টিকেল আবিষ্কারের সাথে সাথে ‘স্ট্যান্ডার্ড মডেল’-এর জট খুলেছে; কিন্তু ‘স্ট্যান্ডার্ড মডেল’ আবার ‘কসমিক পাজেল’-এর চূড়ান্ত অধ্যয় নয়। মডেলটি আসলে শুধু দৃশ্যমান matter-কেই বর্ণনা করে। কিন্তু এই বিশাল মহাবিশ্বে দৃশ্যমান matter হলো, মাত্র এক-পঞ্চমাংশ; আর বাকীটা সবই dark matter।

(Immediately following the announcement, Professor Olga Botner, Member of the Nobel Committee for Physics, was interviewed by freelance journalist Joanna Rose regarding the 2013 Nobel Prize in Physics.)

কি বুঝলাম? ক্রাইম-এর উৎস যেমন করাপশন, ভরের উৎস তেমনি ‘হিগস বোজন’।

দার্শনিক ডেমোক্রিটাস তাহলে স্ববিরোধী কথা বলেন নাই। কারণ ‘হিগস ফিল্ড’ কনসেপ্টে ভর ঐ কণিকা-র ভিতরে থাকে না, ভর-এর কারণ কণিকার বাইরে। আবারতো সেই-ই দাঁড়ালো যে, গতিই ভরের মূল কারণ। তবে হ্যাঁ, কোন পার্টিকেলের উপর গতির প্রভাবটা এককভাবে হচ্ছেনা, সেখানে ‘হিগস বোজন’-ও অংশ নিচ্ছে।

‘বোজন (boson) নামক কণিকা টাইপটির সাথে একজন বাঙালী বিজ্ঞানীর নাম জড়িত; তিনি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানিন্তন অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসু। কি করে তিনি বোজন কণিকা আবিষ্কার করেছিলেন, কি করে উনার নাম বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের সাথে জড়িত হয়েছিলো, সেই কথা আরেকদিন বলবো।

মহাকর্ষ ও কোয়ান্টাম ফিজিক্স:

নিউটনীয় পাদার্থবিজ্ঞান বা ক্লাসিকাল পদার্থবিজ্ঞান-এর দুর্বলতা থেকে জন্ম নিয়েছিলো দুইটা নতুন বিজ্ঞান – ১। আপেক্ষিক পদার্থবিজ্ঞান, ২। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান। দুইটার আওতা আবার দুই রকম। আপেক্ষিক পদার্থবিজ্ঞান-এর জনক আলবার্ট আইনস্টাইন কাজ করেছিলেন লার্জ স্কেল নিয়ে। আর কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান যার মূল জনক ম্যাক্স প্লাঙ্ক তিনি কাজ করেছিলেন অতি ক্ষুদ্রের জগত নিয়ে।

লার্জ স্কেল বা অতি বৃহৎ নিয়ে কাজ করতে করতে আইনস্টাইনের গিয়ে ঠেকলেন মহাকর্ষে! মহাকর্ষ ও তার জ্যামিতি এবং অন্যান্য বিষয় বলতে বলতে একসময় তিনি predict করলেন gravitational wave-এর। খুব সম্ভবত তিনি মহাকর্ষের কোয়ান্টাম কারেকশন-এর কথাও বলেছিলেন। এটা ছিলো ১৯১৬ সাল। এবার প্রশ্ন আসে, যেহেতু প্রতিটি মৌলিক বলই কোন না কোন কণিকার আদান-প্রদান, সেই সূত্রে বিদ্যুৎ-চুম্বক তরঙ্গ অন্যকথায় ‘বিদ্যুৎ-চুম্বক বল’ যদি হয় ‘ফোটন’ নামক কণিকার এক্সচেঞ্জ; তাহলে ‘মহাকর্ষ তরঙ্গ’ মানে ‘মহাকর্ষ বল’ কোন কণিকার এক্সচেঞ্জ? ১৯২৭ সালে Oskar Klein বলেছিলেন quantum theory of gravity-এর কথা। এরপর ত্রিশের দশকের শুরুর দিকে L´eon Rosenfeld মহাকর্ষের কোয়ান্টাম তত্ত্বের উপর টেকনিকাল গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। আর ‘গ্রাভিটন’ নামক কণিকাটির কথা প্রথম বলেছিলেন সোভিয়েত বিজ্ঞানীদ্বয় Dmitrii Ivanovich Blokhintsev এবং FM Gal’perin। এই গ্রাভিটন (graviton) হলো মহাকর্ষ বলের আদান-প্রদানের কণিকা। কি বুঝলাম? আগের মতই অতি বৃহতের আলোচনা গিয়ে নামলো অতি ক্ষুদ্রের আলোচনায়! তবে কি এই মহাবিশ্বে ক্ষুদ্রকে বুঝলেই বৃহৎ-কে বোঝা যাবে? (আপাতত কোভিড-১৯ নামক এক ক্ষুদ্র তো আমাদের জীবন ঝালাপালা করে দিচ্ছে!) যাহোক আপাতত complete theory of quantum gravity নির্মিত হয় নাই। অথবা যেমন রিলেটিভিস্টিক ফিজিক্স, তেমনি কোয়ান্টাম ফিজিক্স দুইটাই অপূর্ণ রয়ে গিয়েছে; তাই এদের দুজনার সন্মিলন এখনো সম্ভব হচ্ছে না।

(চলবে)


রচনাতারিখ: ৩১শে অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ০১টা ০৪ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৫

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৫
——————————————————- রমিত আজাদ

খুব ছোটবেলায় আমার বড় বোন আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, “বল তো, আমরা পৃথিবীর কোথায় থাকি?” তখন তিনি ঢাকার হলিক্রস কলেজের মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। আমি উনাকে উত্তর দিয়েছিলাম যে, “আমরা পৃথিবীর ভিতরে থাকি।” তিনি মুচকি হেসে বলেছিলেন যে, “না, আমরা পৃথিবীর উপরে থাকি।” আমি হতবাক হয়ে, উনার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলাম! তারপর তিনি একটা গ্লোব হাতে নিয়ে পৃথিবী, ভূপৃষ্ঠ ও তার উপরে আমাদের থাকা ও চলাফেরা বিষয়টি বুঝিয়েছিলেন। তিনি বুঝিয়েছিলেন যে পৃথিবীর বাইরেটা শূণ্যতা, এই কারণেই তো আমরা মাথার উপরে আকাশ দেখি। তারপর আমি বিষয়টি বুঝেছিলাম, কিন্তু সেই সাথে আরেকটি প্রশ্ন আমাকে চেপে ধরেছিলো, ‘তাহলে আমরা ঐ শূণ্যতায় বা আকাশে পড়ে যাইনা কেন?’

আপনি একটা ফুটবল হাতে নিন। তারপর তার উপর কিছু একটা স্থির রাখুন। এরপর ফুটবলটিকে ঘোরান। কি হবে? ঐ বডি-টি ফুটবলের উপর থেকে ছিটকে পড়ে যাবে। তাহলে ঘূর্ণায়মান পৃথিবী থেকে আমরা বা অন্য কিছু ছিটকে মহাশূণ্যে চলে যাই না কেন?

এমন প্রশ্নই সেই পঞ্চম শতকে করেছিলেন দক্ষিণ এশীয় গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ আর্যভট্ট। ঘূর্ণায়মান পৃথিবী থেকে কোন কিছু ছিটকে মহাশূণ্যে চলে না যাওয়ার কারণ হিসাবে তিনি একটি ‘বল’-কে সনাক্ত করেছিলেন, যা আমাদেরকে টেনে পৃথিবীপৃষ্ঠে ধরে রাখে। পরবর্তিতে গণিতবিদ এবং জ্যোতির্বিদ ব্রহ্মগুপ্ত ষষ্ঠ শতকে ঐ বল-এর নাম দিয়েছিলেন ‘গুরুত্‌ভাকর্ষণ।

আমার গত পর্বের লেখা পড়ে একজন সুহৃদ পাঠক জানতে চেয়েছিলেন যে মহাকর্ষ কি ‘বল’ না ‘জ্যামিতি’? ঐ প্রশ্নটা আমিই এক সময়ে নিজেকে করতাম। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একরকম ধরেই নিয়েছিলাম যে ওটা জ্যামিতিই, তাই মহাকর্ষ বলকে অন্য বলগুলোর সাথে একীভূত করা যাচ্ছে না। কিন্তু মহাকর্ষ তরঙ্গ বাস্তবে ডিটেক্ট হওয়ার পর তো অন্য সন্দেহ দানা বাঁধছে! যাহোক, এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আলোচনা করা যাবে, তবে তার আগে চার্জ ও ‘ভর’ নিয়ে আরো কিছু আলোচনা করা যাক।

চার্জ ও ভর:
কৌতুক প্রচলিত আছে যে কোন ছাত্রকে অধ্যাপক প্রশ্ন করেছিলেন, “চার্জ কাহাকে বলে?” ছাত্র মাথা চুলকে সংকোচ করে বলেছিলো, “আমি তো স্যার জানতাম। তা এখন ভুলে গিয়েছি।” এবার অধ্যাপক আফসোস করে বললেন, “হায়রে! পৃথিবীতে একমাত্র তুমিই জানতে যে চার্জ কি, আর তুমিই তা ভুলে গেলে!” আসলে চার্জ যে কি তা আমরা কেউই জানি না। শুধু এইটুকুই জানি যে ইলেকট্রন ও প্রোটনের গায়ে কিছু একটা থাকে যা অন্য ইলেকট্রন বা প্রোটনকে প্রভাবিত করতে পারে, ওটাই চার্জ (ইলেকট্রিক চার্জ)। আপাতত এটাকে fundamental property of a matter বলা হচ্ছে। ইন্টারেস্টিং হলো যে একটা প্রোটনের গায়ে যতটুকু চার্জ থাকে, তার চাইতে প্রায় দুই হাজার গুণ ছোট পুঁচকে একটা ইলেকট্রনের ভিতর ততটুকুই চার্জ থাকে! শুধু সাইনটা বিপরীত, একটা প্লাস ও আরেকটা মাইনাস। আরেকটি বিষয় হলো, যে কোন কারণেই হোক, কোন একটি কণিকা-য় চার্জ-এর পরিমান ধ্রুব।

আর ‘ভর’? গ্রীক এ্যাটোমিজমের জনক ডেমোক্রিটাস বলেছিলেন যে মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রতম গঠন একক হলো ‘এ্যাটম’। সেই তিনিই আবার বলেছিলেন, ‘ভর’-এর উপর নির্ভর করে নানান রকমের ‘এ্যাটম’ হয়। কি বোঝা গেল? সেলফ কনট্রাডিকশন! এ্যাটম যদি ক্ষুদ্রতম গঠন একক হয়, তাহলে তার তো আর কারো উপর নির্ভর করার কথা না! আবার ‘ভর’-এর উপরই যদি এ্যাটম নির্ভরশীল হয় তাহলে ঐ ‘ভর’-ই তো ক্ষুদ্রতম গঠন একক। যাহোক, কয়েক বছর আগে ‘হিগস বোজন’ (অপর নাম ‘ইশ্বর কণা’) নিয়ে বেশ হৈ চৈ হয়েছে। সেই কণিকা ডিটেক্টেড-ও হয়েছে এবং ২০১৩ সালে Peter W. Higgs নোবেল পুরষ্কার বিজয়ীও হয়েছেন।

হিগস বোজন সংক্রান্ত আলোচনা জটিল ও সময়সাপেক্ষ। এই প্রবন্ধে সেই বিস্তারিত আলোচনায় যাব না। তবে একটা উপমা টেনে সামান্য বোঝানো যাবে। প্রথমত এখানে ‘ভর’-কে ‘হিগস ফিল্ড’ ও গতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়। হ্যাঁ ঘুরে ফিরে পদার্থবিজ্ঞানের সব আলোচনায় ঐ গতিই আসছে। গতিই আসলে চরম সত্য! তা ভর-কে ব্যাখ্যা করা হয়, গতির প্রতি রেসিটেন্স দিয়ে। মানে, যে বডি গতিশীল হতে গিয়ে যত বেশী রেজিটেন্স পায়, সেই বডিটি ভরে তত বেশি ভারী! এবার মনে করুন যে, একটি হলঘরে এক ঝাঁক তরুণ রয়েছে। তারা প্রত্যেকে এক একটা ‘হিগস বোজন’ কণা। এবং তাদের উপস্থিতিতে ঘরটি একটি ‘হিগস ফিল্ড’। হঠাৎ সেখানে এক জনপ্রিয় রূপসী তরুণী নায়িকা-র আগমণ হলো (সেও একটি ‘হিগস বোজন’ কণিকা)। নায়িকাটি যখন তরুণদের দিকে এগিয়ে গেলো, সে অদৃশ্যভাবেই তাদেরকে আকর্ষণ করছে। ধীরে ধীরে তার চারদিকে তরুণদের ঘনত্ব বেড়ে গেলো, কেউ আসে অটোগ্রাফ নিতে, কেউ আসে তার সাথে কথা বলে ধন্য হতে! এভাবে তরুণীটির চারদিকে তরুণদের ঘনত্ব বেড়ে গেলে, তরুণীটির চলাচলে সমস্যা হবে, মানে সে চলতে গিয়ে বেশি বাধাপ্রাপ্ত হব. এইভাবে তরুণীটির ভর হবে বেশি। এবার মনে করেন, ঐ একই ঘরে অপর একজন তরুণী নায়িকার আগমণ হলো, যে ততটা রূপসী ও জনপ্রিয় নয়। এবার কি তার চারদিকে অত বেশী তরুণের সমাগম হবে? অবশ্যই নয়। তাহলে দ্বিতীয় তরুণীটির চলাচলে বাধা বেশি হবে না, অতএব ঐ ফিল্ডে তার ‘ভর’ কম।

‘ভর’ বনাম ‘চার্জ’-এ আরেকটি ইন্টারেস্টি বিষয় হলো, ‘ভর’ না থাকলে ‘চার্জ’ থাকতে পারবে না (‘চার্জ’ ভরের উপরে ভর করে!); কিন্তু চার্জ না থাকলেও ‘ভর’ ঠিকই থাকতে পারবে।

এছাড়া চার্জ দুইরকম তাই সেখানে আকর্ষণ ও বিকর্ষণ দুইটা ঘটনাই আছে। কিন্তু ভর কেবল একরকম, তাই সেখানে কেবল আকর্ষণ বলই আছে। এই আকর্ষণ বল থাকার কারণেই একটি মৃত নক্ষত্র চুপসে যায়; এবং চুপসাতে চুপসাতে কোন কোন নক্ষত্র পরিণত হয় কৃষ্ণবিবরে।

(চলবে)


রচনাতারিখ: ২৯শে অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ১১টা ৪৫ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৪

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৪
——————————————————- রমিত আজাদ

আলোচনার এই পর্যায়ে মনে হবে যে সবকিছুর মূলে ঐ আলো (দৃশ্যমান হোক, আর অদৃশ্য হোক)!
আলোর গতিবেগ যে কোনভাবেই সসীম ও ধ্রুব। আর আলোকের গতিবেগ ধ্রুব রাখতে গিয়ে সে ‘পথের দৈর্ঘ্য’ এমনকি সময়কেও পাল্টে ফেলছে। এর ফলে স্থান-কাল আর স্থির থাকছে না (যেমনটি মনে করতেন দার্শনিক এরিস্টটল ও বিজ্ঞানী গ্যালিলিও এবং নিউটন)! স্থান-কালও আর সবকিছুর মতই ডাইনামিক বা গতিশীল হয়ে যাচ্ছে!

১৬৮৯ সালে স্যার আইজাক নিউটন বলেছিলেন, “I will not define time, space, place and motion, as being well known to all.” আর ১৯৭৩ সালে জন হুইলার (John Archibald Wheeler) বললেন, “Space tells matter how to move. Matter tells space how to curve.” কি বুঝলাম? ‘স্থান-কাল’-এর মত বিজ্ঞানও ধ্রুব নয়, বরং চলমান!

ভর-শক্তি বনাম স্থান-কাল বক্রতা:

নবম শ্রেণীতে একটা প্রাকৃতিক আইন পড়েছিলাম, যার নাম হুক-এর আইন (Hooke’s law)। কোন একটা স্প্রিং-কে টানতেও বল প্রয়োগ করতে হয়, সংকুচিত করতেও বল প্রয়োগ করতে হয়। বল প্রয়োগ যত বেশি এই সংকোচন প্রসারণও তত বেশি। আপেক্ষিক তত্ত্ব আমাদেরকে শেখালো ‘ভর-শক্তি’ স্থান-কাল-কে বাঁকা করে ফেলে। এই ভর-শক্তি যত বেশি, বক্রতাও তত বেশি। Mass-energy curves space-time — a new version of Hooke’s law.

এই প্রবন্ধের আওতায় এত সময় যাবৎ সম্ভবত শুধু ‘ভর’-এর কথাই লিখেছি শক্তির কথা তেমন লিখি নাই। যাহোক, আপাতত লিখছি যে, আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব যেমন গতির ব্যাখ্যা-বর্ণনা করতে গিয়ে স্থান ও কাল-কে একীভূত করে ‘স্থান-কাল’ (space-time) বানিয়ে ফেলেছে; তেমনি এই আপেক্ষিক তত্ত্ব ‘ভর’ ও ‘শক্তি’-কেও একীভূত করে ‘ভর-শক্তি’ (mass-energy) বানিয়ে ফেলেছে। আধুনিক বিশ্বে যিনি বিজ্ঞান জানেন না তিনিও জামার বুকে E = mc2 লেখা নিয়ে ঘুরে বেড়ান। আলবার্ট আইনস্টাইন দেখিয়েছিলেন যে, কোন বডির জড় ভর (inertial mass) তার অন্তর্গত শক্তির পরিমানের সমানুপাতিক। এইভাবে যে কোন ভরকেই শক্তিতে রূপান্তরিত করা যায়। এটা যে সম্ভব তা আর ল্যাবরেটরিতে গিয়ে দেখানোর দরকার নাই। গুণধর মার্কিন রাজনীতিবিদরা বিজ্ঞানীদের হাজারো নিষেধ সত্ত্বেও, ভর-কে শক্তিতে রূপান্তরিত করে জাপানের সাজানো-গোছানো দুইটি শহরকে গোটা অধিবাসী সমেত বিধ্বংস করেছিলো! এইভাবে একটা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে হতবাক বিশ্ব মানবতা দেখেছিলো ও জেনেছিলো ভর-শক্তির রূপান্তর সম্ভব। বিজ্ঞানীরা মেধা খাটিয়ে প্রযুক্তি তৈরী করেন আর রাজনীতিবিদরা প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে তার অপব্যবহার করে, এটা একেবারেই নতুন কিছু নয়!

বিশেষ ও সার্বিক আপেক্ষিকতত্ত্বের গুরুত্ব:
১। এই তত্ত্ব ফিজিক্সে বৈপ্লবিক নবযুগের সূচনা করেছে।
২। এই নতুন পদার্থবিজ্ঞান আমাদের মহাবিশ্বকে নতুনভাবে দেখতে শিখিয়েছে।
৩। আধুনিক প্রযুক্তি বিশেষত স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে ব্যাপক অবদান রেখেছে।
৪। মহাকর্ষ তরঙ্গ-কে শেষতক আবিষ্কার করেই ছেড়েছে।
৫। মহাকর্ষ তরঙ্গ ও আলোক তরঙ্গ (বিদ্যুৎ-চুম্বক তরঙ্গ) এক নয়, তবে তাদের উভয়ের চরম গতিবেগটা একই, মানে 186,000 miles per second।
৬। আরেকটি আকর্ষণীয় বিষয় হলো তরঙ্গের ব্যবহার। একসময় শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে অনেক কিছুই করা হয়েছে। তারপর এলো অদৃশ্য আলোক তরঙ্গ। তা ব্যবহার করে এখন আমরা যোগাযোগ প্রযুক্তিতে কি না করছি? এমনকি ওভেনে খাবারও গরম করছি। সঙ্গতকারণেই প্রশ্ন রাখা যায় যে, মহাকর্ষ তরঙ্গ ব্যবহার করে কি কি করা যেতে পারে? উত্তরে বলবো, মহাকর্ষ তরঙ্গ তো মাত্র আবিষ্কৃত হলো, তাই কিছুটা সময় সবুর করতে হবে। কালক্রমে তার বহুবিধ ব্যবহার নিশ্চয়ই হবে। আপাতত যা বলতে পারি তা হলো, মহাকর্ষ তরঙ্গ আবিষ্কৃত হওয়ার পর আমরা মহাবিশ্বকে স্টাডি করার একটা নতুন পথ খুঁজে পেলাম। এখন আমরা এমন অনেক মহাজাগতিক ঘটনা সনাক্ত করতে পারছি যা দৃশ্যমান আলোর দ্বারা করা সম্ভব ছিলো না, যেমন কৃষ্ণবিবরের সংঘর্ষ!

আলোর gravitational bending-কে পরীক্ষার দ্বারা নিশ্চিত করেছিলেন Arthur Eddington। এইভাবে সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব নিউটনের universal gravitation-কে প্রতিস্থাপিত করে। Newton ও Eddington দুজনই ছিলেন ইংরেজ। পক্ষান্তরে আইনস্টাইন ছিলেন জার্মান। ১৯১৯ সাল ছিলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির ঠিক পরের বৎসর। ইংল্যান্ডে তখন এন্টি-জার্মান সেন্টিমেন্ট তুঙ্গে! এমন সময়েও এডিংটন কর্তৃক আইনস্টাইনের তত্ত্ব প্রমাণ করার ঘটনা এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দিয়ে উদার কন্ঠে পারশিক মুসলিম কবি ও বিজ্ঞানী ওমার খৈয়ামের সুরে রুবাই পাঠ করা এই বোঝায় যে ‘বিজ্ঞান ঐ নোংরা রাজনীতির উর্ধ্বে!’

তারপরেও কথা থাকে। অনেকের ধারনা যে বিজ্ঞানীরা দোষ-ত্রুটির উর্ধ্বে কোন মহামানব। তাই কি? উনারা জ্ঞানে ও মেধায় অসাধারণ হতে পারেন তবে, আদিকালের পৌরাণিক দেব-দেবীদের মতন উনারাও ঈর্ষা ও প্রতিহিংসাপরায়ন, এমনকি সংকীর্ণমনাও হয়ে থাকেন! পরবর্তি পর্বের আলোচনায় আমি তার কিছু কিছু উল্লেখ করবো!

(চলবে)


রচনাতারিখ: ২৯শে অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ১২টা ০৭ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৩

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৩
——————————————————- রমিত আজাদ

সময় প্রসারণ:

বডি না থাকলে কোন স্থান নাই, বডি থাকলেই কেবল স্থান আছে। একাধিক বডির মধ্যকার সম্পর্কটাই স্থান। বডিরাই স্থান তৈরী করে। তাহলে বডির প্রকৃতি বা ধর্মের উপর ভিত্তি করে স্থানের প্রকৃতি ও ধর্ম হবে এটাই তো যৌক্তিক। দার্শনিক-রা কিন্তু কথাগুলো কয়েক হাজার বছর আগেই বলেছিলেন। তবে মানব চর্চিত ও প্রতিষ্ঠিত সাবজেক্টগুলোর মধ্যে বিজ্ঞান যেহেতু নবীনতম তাই এই নিয়ে কাজ করার সুযোগ তার এসেছে অনেক পরে। অবশেষে বিজ্ঞান পদ্ধতিগতভাবেই আবিষ্কার করেছে যে, কোন একটি বডি তার চারপাশের স্থানটিকে বাকিয়েও দিতে পারে!

ইতিপূর্বে কয়েকবার লিখেছি যে স্থান (space) আর সময় (time) আলাদা কিছু নয়, তারা পরস্পর সম্পর্কিত। তাহলে ম্যাসিভ বডি বা তার মহাকর্ষ যদি স্থানকে বাঁকিয়ে দিতে পারে, সেইভাবে সময়ও প্রভাবিত হবে নিশ্চয়ই। হিসাবে করে দেখা গেলো যে, তাই-ই হয়। বাঁকানো স্থান সময়কে প্রসারিত (time dilation) করে। ঠিক যেমনটি দেখা গিয়েছিলো ‘বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব’-এর ক্ষেত্রে!

বিষয়টির ব্যাখ্যা মোটামুটি সহজেই দেয়া যায় যে, ম্যাসিভ বডি (অন্য কথায় তার মহাকর্ষ) যেহেতু তার চারপাশের স্থানটিকে বাঁকিয়ে ফেলে, অতএব আলোর সিগনাল-কে মানে আলোকরশ্মি-কে যেতে হবে বাঁকা পথ ধরে। আর দৈনন্দিন জীবন ও ইউক্লিডিও জ্যামিতি থেকে আমরা জানি যে, কোন কিছু সোজা পথ দিয়ে যেতে যত সময় নেয়, সে বাঁকা পথ ধরে গেলে তার চাইতে বেশি সময় নেবে। অতএব আলোকরশ্মি যখন কোন ম্যাসিভ বডির পাশ দিয়ে যাবে তখন ঐ পথ ভ্রমণ করতে সে সময় নেবে বেশি (মহাকর্ষ ক্ষেত্রের অনুপস্থিতিতে ভ্রমণের সময়টা লাগতো কম), এটাই time dilation। এই নিয়ে এখন আর কোন বিতর্ক নাই, বহু সংখ্যক পরীক্ষা করে তা প্রমাণিতও হয়েছে।

মহাকর্ষ তরঙ্গ:
এই নিয়ে আমি একটি বিষদ প্রবন্ধ তিনবছর আগে লিখেছিলাম তাই এখানে আর তার পুণরাবৃত্তি করতে চাই না। এই প্রবন্ধেও কিছু আগে তার উল্লেখ করেছি। আপাতত সংক্ষেপে বলবো, যে কোন ফিল্ডের ডিসটার্বেন্স হতেই পারে, ডিসটার্বেন্স হলেই তা তরঙ্গায়িত হয়। অনুরুপভাবে, মহাকর্ষ ক্ষেত্রের ডিসটার্বেন্স হলে যে তরঙ্গের জন্ম হবে তার নাম মহাকর্ষ তরঙ্গ (gravitational wave)। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালীন সময়ে, এই gravitational wave আদৌ খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা, এই নিয়ে সন্দেহের কথাই বেশি বলা হতো। এমনকি ২০০৭ সালে আমার কথা হয়েছিলো বাংলাদেশী পদার্থবিজ্ঞানী ড. মফিজউদ্দিন-এর সাথে (মরহুম)। তিনি আমাকে এই নিয়ে তার গবেষণার কথা বলছিলেন, আমি উনাকে ইন্টারাপ্ট করে বলেছিলাম, “এটা তো থিওরেটিকাল কথাবার্তা! গাণিতিক এক্সপ্রেশন! কিন্তু, বাস্তবে এই জাতীয় তরঙ্গ খুঁজে পাওয়ার কোন সম্ভাবনা কি আছে? বিজ্ঞানীরাই তো বলে যে, মহাকর্ষ একটা বল, নাকি জ্যামিতি বোঝা ভার!” আমি কথাগুলো এমন জোর দিয়ে বলেছিলাম যে, তিনি মন খারাপ করেছিলেন।

যাহোক, ২০১৬ সালে লিগো টীম গবেষণা করে মহাকর্ষ তরঙ্গ সনাক্ত করতে সমর্থ হয়েছিলেন (On 11 February 2016, the LIGO teams announced the direct discovery of a gravitational wave matching the signal predicted from the collision of two black holes)। এইটি প্রকাশিত হওয়ার পর আমি খুব এক্সাইটেড হয়েছিলাম, এবং আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সহপাঠী, বন্ধুবান্ধব পদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপকদের সাথে এই নিয়ে আলাপ করেছিলাম। ঐ একই বছরের মার্চ, আমি সিলেট ক্যাডেট কলেজের মাননীয় অধ্যাক্ষ কমান্ডার সাইফুর রহমান কর্তৃক আমন্ত্রিত হয়েছিলাম, উনার কলেজে (সেটা আমারও ‘আলমা মাতের’) বিশেষ অতিথি হিসাবে বক্তৃতা দেয়ার জন্য। আমার মনে পড়ে যে, সেই অনুষ্ঠানে একজন ক্যাডেট তখন আমাকে gravitational wave সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলো। সদ্য আবিষ্কৃত এই ওয়েভটি সম্পর্কে আমি তখন তাদেরকে যতদূর পারি বুঝিয়েছিলাম।

তারপর ২০১৭ সালে ঐ লিগো টীম-কে ফিজিক্সে নোবেল প্রাইজ দেয়া হয়েছিলো। (The 2017 Nobel Prize in Physics has been awarded to three key players in the development and ultimate success of the Laser Interferometer Gravitational-wave Observatory (LIGO). One half of the prize was awarded jointly to Caltech’s Barry C. Barish, the Ronald and Maxine Linde Professor of Physics, Emeritus and Kip S.) এরপর আমি এই নিয়ে ‘এবারের নোবেল পুরষ্কার (পদার্থবিজ্ঞান ২০১৭)’ নামে একটি প্রবন্ধ রচনা করি।

চলবে)


রচনাতারিখ: ২৮শে অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: বিকাল ০৫টা ০৫ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১২

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১২
———————————————– রমিত আজাদ

গত পর্বে লিখেছিলাম যে, কোন ম্যাসিভ বডি (যেমন সূর্য) তার চারপাশের স্থানটিকেই বাঁকা করে ফেলে। মহাকর্ষ ক্ষেত্রের গাণিতিক বর্ণনা করতে গিয়ে এমনটাই পেয়েছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইন। এত বড় একটি কথা (বৈপ্লবিক কথাই হোক আর পাগোলের প্রলাপই হোক) হজম করা খুব কঠিন হচ্ছিলো, সাধারণ মানুষের কাছে তো বটেই এমনকি বিজ্ঞানীদের কাছেও। এটা পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণ করা সম্ভব কেবল তখনই যখন সূর্যের ওপাশে দৃশ্যমান তারকাগুলিকে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। সূর্যের দিকে তাকালে চোখ ঝলসে যায়, তা ওপাশের তারকা আর দেখবো কি করে?! কিন্তু ঐ যে লিখেছিলাম যে, সব রহস্য সমাধানেরই কোন একটা পথ উপরওয়ালা খোলা রাখেন। আমাদের এই পৃথিবীর একটি সার্বক্ষণিক সঙ্গী রয়েছে। অন্যান্য গ্রহের তুলনায় সঙ্গীর সংখ্যা কম, মাত্র একটিই; কিন্তু পৃথিবীর এই সঙ্গীটি আবার আকারে বড়! তাই সে সাগর-নদীতে জোয়ার-ভাটা সহ নানা কাজে পৃথিবীবাসীকে সাহায্য করে। সেই সঙ্গীটির নাম চাঁদ। চাঁদ নামক উপগ্রহটি আকারে এমন ও পৃথিবী থেকে এমন একটি দূরত্বে রয়েছে যে, মাঝে মাঝে সে একটি চাকতি রূপে সূর্যকে ঢেকে ফেলতে পারে। সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদ সকলেই গতিশীল ও ঘূর্ণায়মান। ঘুরতে ঘুরতে তারা অনেক সময় এক সরলরেখায় উপস্থিত হয় এমনভাবে যে চাঁদটির অবস্থান হয় সূর্য ও পৃথিবীর ঠিক মাঝখানে। ঢেকে যায় সূর্য, পৃথিবীতে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার! এই প্রতিভাসের নাম সূর্যগ্রহণ। এই প্রাকৃতিক প্রতিভাস-কে প্রাচীনকালে অশুভ মনে করা হতো। যাহোক, আলবার্ট আইনস্টাইনের গবেষণা প্রকাশিত হওয়ার পর এই প্রতিভাসই বিজ্ঞান মহলে আশীর্বাদের মত মনে হলো। আইনস্টাইনের গবেষণা প্রকাশিত হওয়ার পর পরবর্তি সূর্যগ্রহণে সুযোগ আসলো, উনার তত্ত্বকে পরীক্ষার দ্বারা (Empirically) প্রমাণ করার।

১৯৮০ সালে (সম্ভবত ফেব্রুয়ারী মাসে) বাংলাদেশ একটি দীর্ঘ সূর্যগ্রহণ দেখা গিয়েছিলো (কয়েক ঘন্টা দীর্ঘায়ীত হয়েছিলো)। আমার মনে পড়ে যে আমরা শিশুরা এক্স-রে রিপোর্ট চোখে দিয়ে সেই সূর্যগ্রহণ প্রত্যক্ষ করেছিলাম। ঐ সূর্যগ্রহণ-এর সময় বেশ একটা উৎসব উৎসব ভাব হয়েছিলো সারা দেশে। সেইদিন পূর্ণ সূর্যগ্রহণ হওয়ার পর পর অনেককেই দেখলাম দূরবীন চোখে দিয়ে ঐ দিকে তাকাচ্ছে! আমি ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলাম। আমার বড় ভাই কবীর আহমেদ বললেন, “এরকম সময়ে আকাশে তারা দেখা যায়।” কথাটা আমাকে স্ট্রাইক করেছিলো। তাইতো, আকাশ তো অন্ধকারই হয়ে এসেছে, এরকম সময়ে আকাশে তারা দেখা যেতেই পারে।

ঠিক এই জাতীয় সুযোগেরই সদ্বব্যবহার করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। কথিত আছে যে, সেই আলবার্ট আইনস্টাইনের জটিল আপেক্ষিকতার তত্ত্ব বুঝতে পেরেছিলেন শুধু আরেকজন, উনার নাম এডিংটন (Arthur Stanley Eddington)। তাই এই তত্ত্বের ব্যবহারিক প্রমাণ নিয়ে উৎসাহ উনারই ছিলো সবচাইতে বেশি।

প্রসঙ্গত বলে রাখি যে কোন জ্যোতিষ্কের পাশ দিয়ে চলার পথে আলো বেঁকে যেতে পারে এই বিষয়ে আসলে প্রথম গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলোনে বিজ্ঞানী সোল্ডনার (Soldner) ১৮০৪ সালে। তিনি আল হাইয়াম ও নিউটনের আলোক কণিকা তত্ত্বকে ভিত্তি করে দেখিয়েছিলেন যে কোন ম্যাসিভ জ্যোতিষ্কের মহাকর্ষের টানে আলোর কণিকা স্রোত ক্রমাগত আকৃষ্ট হয়ে আলোকপথ বেঁকে যাবে। তিনি ঐ ডিফ্লেকশন-এর হিসাবও করেছিলেন। তিনি এও বলেছিলেন যে সূর্যের কাছাকাছি থাকা ফিক্সড স্টারগুলোকে পর্যবেক্ষণ করলে বিচ্যুত আলো দেখা যাবে। যেহেতু অত আগে এই ধরনের গবেষণা-পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব ছিলো না, তাই উনার গবেষণা নিয়ে আলোচনা আর বেশিদূর আগায় নাই।

যাহোক আর্থার এডিংটন-এর এক্সপিডিশন নিয়ে কথা হচ্ছিলো। ১৯১৯ সালের ২৯শে মে দু’টি এক্সপিডিশনের আয়োজন করা হয়। একটি আটলান্টিক মহাসাগরের এপাশে পশ্চিম আফ্রিকার দ্বীপ Príncipe-এ, এবং অপরটি মহাসাগরের ওপাড়ে ব্রাজিলের সোব্রাল শহরে। এক্সপিডিশন দুইটির লক্ষ্য ছিলো, সূর্যের কাছাকাছি থাকা তারকাগুলো থেকে পৃথিবীতে আসা আলোক রশ্মির বিচ্যুতি পরিমাপ করা। অবশ্য এই ডিফ্লেকশনের মান তাত্ত্বিকভাবে ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছিলো আলবার্ট আইনস্টাইনের গবেষণাপত্রে ১৯১১ ও ১৯১৫ সালে।

Príncipe-এর এক্সপিডিশনের সদস্য ছিলেন দু’জন বিজ্ঞানী Eddington এবং Edwin Turner Cottingham। উনারা কেমব্রিজ অবজারভেটরি-র সদস্য ছিলেন। আর ব্রাজিল এক্সপিডিশনের সদস্য ছিলেন গ্রীনউইচ অবজারভেটরির Andrew Crommelin এবং Charles Rundle Davidson।

Principe এক্সপিডিশনের ফলাফলটি ছিলো চমকপ্রদ। বেশ ঝড়-ঝঞ্ঝার পর উনারা ছবি তুলতে সক্ষম হন। যদিও মেঘমালা কিছু সমস্যার সৃষ্টি করেছিলো, তারপরেও তোলা ছবিগুলোর মধ্যে শেষ কয়েকটি ছবি বেশ কাজের ছিলো। এর মধ্যে একটি প্লেটের ছবি থেকে প্রাপ্ত ফলাফল আইনস্টাইনের গবেষণার সাথে একমত হয়।

১৯১৯ সালের নভেম্বর মাসে রয়াল সোসাইটির সভায় এই ফলাফল ঘোষিত হয়। Royal Astronomical Society কর্তৃক আয়োজিত একটি ভোজসভায় এডিংটন এই নিয়ে প্রাণ খুলে একটি রুবাই আবৃত্তি করেন, যা ছিলো কালজয়ী জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও কবি ওমার খৈয়াম-এর রুবাইয়ের অনুকরণে। রুবাইটি নিম্নরূপ:

Oh leave the Wise our measures to collate
One thing at least is certain, light has weight
One thing is certain and the rest debate
Light rays, when near the Sun, do not go straight.

— Arthur Stanley Eddington, RAS dinner

(প্রজ্ঞাময়-এর হাতে ছেড়ে দিলাম আমাদের পরিমাপগুলোর তুলনা-মানানা,
আলোর ওজন আছে, অন্ততপক্ষে এইটির দিতে পারি নিশ্চয়তা।
বাকীটা বিতর্ক হলেও একটি বিষয়ের আছে নিশ্চয়তা,
আলোক রশ্মি, যখন সূর্যের কাছাকাছি, তখন আর সে সোজা পথে চলেনা।)

  • আর্থার এডিংটন

চলবে)


রচনাতারিখ: ২৭শে অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ১১টা ২৯ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১১

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১১
————————————————————– রমিত আজাদ

‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General Theory of Relativity):
গত পর্বে লিখেছিলাম যে, ‘বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব নির্মান শেষ হওয়ার পর আইনস্টাইন লক্ষ্য করেছিলেন যে স্যার নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব, নবনির্মিত বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব-এর সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ। অতএব প্রয়োজন দেখা দিলো একটি সঙ্গতিপূর্ণ আপেক্ষিক মহাকর্ষতত্ত্ব নির্মান করার। এরপর তিনি নির্মান করলেন সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব। কি আছে এই সার্বিক তত্ত্বে?

একটি চুম্বকের চারদিকে একটি এলাকা জুড়ে তার প্রভাব আমরা দেখতে পাই। যেই প্রভাবে চুম্বক অপর একটি চুম্বককে অথবা কোন চৌম্বক-পদার্থকে আকর্ষণ-বিকর্ষণ করে। এই প্রভাবটিরই নাম দেয়া হয়েছে ক্ষেত্র (field)। চুম্বকের চারদিকের ক্ষেত্রকে বলি চুম্বক ক্ষেত্র। মানবের চোখে ক্ষেত্রটি অদৃশ্য। একইভাবে একটি চার্জের চারদিকেও একটি ক্ষেত্র থাকে যা অন্য কোন চার্জকে প্রভাবিত করে। এই ক্ষেত্রের নাম বিদ্যুৎ ক্ষেত্র (electric field)। এবার লক্ষ্য করুন যে, পৃথিবীর চারদিকেও কিছু একটা আছে, যার প্রভাবে ভরসম্পন্ন যেকোন কিছু পৃথিবীর দিকে চলে আসে। এটাও একটা ক্ষেত্র, যার নাম দেয়া হলো মহাকর্ষ ক্ষেত্র (gravitational field)।

১৯১৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন কিছু ক্ষেত্র সমীকরণ উপস্থাপন করেছিলেন (Einstein field equations)। এই সমীকরণগুলো এই বোঝালো যে বস্তু (matter) ও বিকিরণ (radiation) দ্বারা স্থান ও কাল কিভাবে প্রভাবিত হয়। হ্যাঁ স্থান-এর আলোচনা বা গণিত আসলে জ্যামিতি না এসে পারেই না। অপরদিকে পূর্বেই আলোচনা করেছি যে STR আসার পর স্পষ্টই বোঝা গেলো যে স্থান ও কাল পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। সুতরাং স্থান ও কাল উভয়ের আলোচনাতেই জ্যামিতি আসবে। কোন জ্যামিতি? কয়েক হাজার বছর ধরে পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি। পৃথিবীর সব গুলো সভ্যতাতেই জ্যামিতির অবদান রয়েছে, সব দেশেই জ্যামিতিবিদরা ছিলেন। তাই কোন দেশে প্রথম জ্যামিতির উদ্ভব হয়েছে এটা সুনিশ্চিত করে বলা যাবে না। তবে গ্রীসে জ্যামিতির উপর কালজয়ী গ্রন্থ লিখেছিলেন ইউক্লিড, তাই ঐ জ্যামিতি ইউরোপে ‘ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি’ নামে পরিচিত হয়। এই জ্যামিতিতে যা কিছু আলোচিত হয়েছে, সব আলোচিত হয়েছে সমতল পৃষ্ঠে। সমতল পৃষ্ঠ ছাড়াও যে অন্যরকম পৃষ্ঠ হতে পারে তা হয়তো তখন ভাবাই হয় নাই! ‘ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি’-তে বেশ কয়েকটি পস্টুলেট আছে, যা কোন প্রমাণ ছাড়াই মেনে নেয়া হয়েছিলো। এদের মধ্যে পঞ্চম পস্টুলেট-টি (যার অপর নাম সমান্তরাল পস্টুলেট) প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন অনেকেই (আল হাইয়াম, ওমার খৈয়াম, আল দ্বীন তুসি, প্রমুখ), কিন্তু তা প্রমাণ করা সম্ভব হয় নাই। হঠাৎ করে বক্রপৃষ্ঠ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখা গেলো যে ঐ পস্টুলেট-টি সঠিক নয়। কালক্রমে উনিশ শতকের দিকে নির্মিত হয় ‘নন-ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি’। এখানে অনেক গণিতবিদেরই অবদান রয়েছে। আমি আপাতত জার্মান গণিতবিদ রিমান (Bernhard Riemann)-এর নামই উল্লেখ করবো।

আইনস্টাইনের সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব-এর মূল আলচ্য ছিলো মহাকর্ষ ক্ষেত্র। ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা আসলে, স্থান ও কাল নিয়ে আলোচনা আসবেই। স্থান-কাল নিয়ে আলোচনায় আসবে জ্যামিতি। আর যথাযথ জ্যামিতি বাছাই করতে গিয়ে আইনস্টাইন দেখলেন যে রিমানীয় জ্যামিতিই (Riemannian Geometry) এই ক্ষেত্রে সবচাইতে বেশি প্রযোজ্য। উনাকে আইডিয়াটি দিয়েছিলেন উনার বন্ধু মার্সেল গ্রসমান (Marcel Grossmann)। ফলে বোঝা গিয়েছিলো যে মহাকর্ষ ক্ষেত্রের সাথে স্থান-কালের বক্রতার সম্পর্ক রয়েছে। গাণিতিকভাবে দেখা গেলো যে, শক্তিশালী মহাকর্ষ ক্ষেত্রের কাছে আসলে আলোর চলার পথ বেঁকে যায়। কিন্তু আমরা তো জানি যে, আলো সরলপথে চলে। তাহলে কি কোন মহাকর্ষ ক্ষেত্রের কাছে ঐ চলার পথটাই বাঁকা? হ্যাঁ, আইনস্টাইনের ‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব ওটাই বলেছিলো যে, সূর্য বা ওরকম ম্যাসিভ কোন বডি তার চারপাশের স্থানটিকেই বাঁকিয়ে ফেলে, এটাকেই বৈজ্ঞানিকভাবে বলা হয় স্থান-কাল বক্রতা (space-time curvature)।

‘স্থান’ যা কিনা সাদা চোখে একটা শূণ্যতা ছাড়া আর কিছুই না, তা আবার বেঁকেও যেতে পারে! আইনস্টাইনের এই বৈপ্লবিক কথাটিকে তখন অনেকের কাছেই পাগোলের প্রলাপ বলে মনে হয়েছিলো!

ইতিপূর্বে কয়েকবার বলেছি যে তাত্ত্বিক বিজ্ঞান যাই বলুক না কেন, পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কখনোই মেনে নেয়া হয় না। তাই যে সকল বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের গাণিতিক উপস্থাপনায় চমৎকৃত হয়েছিলেন, তারা চাইলেন এর পরীক্ষালদ্ধ প্রমাণ। কি করে সম্ভব? সূর্যের ওপাশে অনেক তারকা আছে, যাদের আলো পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। তাহলে ঐ আলো সূর্যের পাশ দিয়ে আসার সময় সূর্য কর্তৃক বাঁকানো পথটি ধরে আসবে (কবি জসীমউদ্দীনের সেই ‘রাখাল ছেলে’-র মত)। কিন্তু সমস্যা হলো যে, দিবালোকে তারকা দেখা সম্ভব না, তাও আবার সূর্যের ওপাশের তারকা। কিন্তু পথ তো একটি থাকতেই হবে! সৃস্টিকর্তা রহস্য যেমন রেখেছেন, আবার সেই রহস্য সমাধানের পথও রেখেছেন। কি সেই পথ?

(চলবে)

রচনাকাল: ২৭শে অক্টোবর, ২০২০ সাল
রচনাসময়: বিকাল ০১টা ৫৮ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১০

কৃষ্ণবিবর ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কারপর্ব ১০

—————————————————– রমিত আজাদ

গত পর্বে কবি ও বিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল-এর অবদান নিয়ে আলোচনা করা হয় নি। যাহোক খুব সংক্ষেপে বলবো যে, ১৮৬৫ সালে তিনি আবিষ্কার করেছিলেন যে, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড (যা পানির ফিল্ডের মতই)-কে যদি ডিস্টার্ব করা হয় (যেমন কোন শান্ত পুকুর-কে যদি একটা ঢিল ছুঁড়ে ডিস্টার্ব করা হয়) তবে সেই ডিস্টার্বেন্সটি ঐ ফিল্ডের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়বে এবং ক্রমশঃ সামনের দিকে অগ্রসর হবে (যেমনটি পানির ফিল্ডে ঢেউ তৈরী হয়ে ছড়িয়ে পড়ে); ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড-এ উদ্ভুত ঢেউ-এর নাম ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ। ম্যাক্সওয়েল এও দেখালেন যে, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ একটি সুনির্দিষ্ট বেগে সঞ্চালিত হবে। আশ্চর্য্যজনকভাবে ঐ বেগ-এর মান, আলোকের বেগের মানের সাথে মিলে গিয়েছিলো।

প্রসঙ্গত বলে রাখি যে আপনাদের কারো বাড়ীতে যদি পুরাতন রঙিন টেলিভিশন থাকে, তার পর্দার কোন এক কোনায় একটি ম্যাগনেট ধরুন, দেখবেন যে আলোর রঙ কিভাবে পাল্টে যায়! এরকমই কাজ করা হয়েছিলো আলোর ক্ষেত্রে। একটি শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে আলোক রশ্মিকে পাঠানো হয়েছিলো, এবং পর্যবেক্ষিত হয়েছিলো যে, সেই আলো এঁকেবেকে যায়। তার মানে হলো, আলোর বিদ্যুৎ-চুম্বক ধর্ম রয়েছে। পরবর্তিতে অবশ্য স্পষ্টই প্রমাণিত হয়েছিলো যে, আলো আর বিদ্যুৎ-চুম্বক তরঙ্গ একই। জাস্ট, ‘বিদ্যুৎ-চুম্বক তরঙ্গ’-এর দৃশ্যমান অংশটিই রঙিন বা সাদা আলো হিসাবে আমাদের চোখে ধরা দেয়।

স্যার আইজাক নিউটন ও আপেলের গল্পটি আর নতুন করে বলার কিছু নাই। তার মানে হলো পৃথিবী যে একটি বলে কোন কিছুকে তার দিকে টানে এই নিয়ে ভাবনা থেকেই স্যার নিউটনের বিজ্ঞান গবেষণা শুরু। যারা রিসার্চ মেথডোলজির কোর্স করেছেন তারা জানেন যে, ‘বৃন্ত থেকে বিচ্যুত একটি আপেল কেন দশ দিকের নয় দিকে না গিয়ে কেবল নিম্নাভিমুখী হয়?’ এইটি একটি স্ট্যান্ডার্ড ‘রিসার্চ কোশ্চেন’। এই আলোচনার মোদ্দাকথা হলো যে, স্যার নিউটন গ্রাভিটেশন নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা করেছিলেন। এবং কালজয়ী ‘ইউনিভার্সাল ল অব গ্রাভিটেশন’-টি উনারই নির্মিত (যদিও হুক-ও কাজটি করেছিলেন)

একাদশ শতকে মুসলিম বিজ্ঞানী আল বিরুনী স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন যে পৃথিবীর মত অন্যান্য জ্যোতিষ্কগুলোরও ভর ও মহাকর্ষ (gravity) আছে। তিনি এই পর্যায়ে দার্শনিক এরিস্টটলের সমালোচনা করেছিলেন এই কারণে যে, দার্শনিক এরিস্টটল মনে করতেন, অন্যান্য জ্যোতিষ্কগুলোর ভর ও মহাকর্ষ নাই।

দ্বাদশ শতকে আবুল বারাকাত আল বাগদাদী (Abu’l-Barakāt al-Baghdādī) ভূপৃষ্ঠে মুক্তভাবে পড়ন্ত বস্তুর ‘অভিকর্ষজ ত্বরণ’-এর ব্যাখ্যারও প্রস্তাবনা দিয়েছিলেন, এইভাবে আল বাগদাদী  এরিস্টটল প্রস্তাবিত fundamental dynamic law (যার ভাষ্য হলো ধ্রুব বল প্রযুক্ত থাকলে সমগতিবেগ থাকবে)-কে বাতিল করেছিলেন। ষোড়শ শতকে আল বিরজান্দি (Al-Birjandi) পৃথিবীর ঘূর্ণনকে ব্যাখ্যা করেছিলেন।

যাহোক, যা আলোচনা করছিলাম যে, স্যার নিউটনের ক্লাসিকাল গ্রাভিটেশন-এর সাথে আইনস্টাইনের নব-নির্মিত ‘বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব’ একমত হতে পারছিলো না। কেননা, STR দেখিয়েই দিয়েছে যে, আলোকের গতিবেগের চাইতে বেশি কোন গতিবেগ হতে পারে না; এমনকি কোন মিথষ্ক্রিয়া বা বল-এর গতিবেগও নয়। সুতরাং STR অনুযায়ী মহাকর্ষ বলের গতিবেগও আলোকের গতিবেগের চাইতে বেশি হতে পারবে না। অথচ স্যার নিউটনের বর্ণিত গ্রাভিটেশনাল ফোর্স-এর গতিবেগ অসীম!

ব্যাস ‘বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব’ নির্মিত হওয়ার পর প্রয়োজন দেখা দিলো ঐ একই আলোকে মানে আপেক্ষিক তত্ত্ব-এর আলোকে ‘মহাকর্ষ তত্ত্ব’-কে ব্যাখ্যা করার। অতঃপর গুরুত্বপূর্ণ ঐ কাজটিতে হাত দিয়ে আলবার্ট আইনস্টাইন ১৯১৫ সালে নির্মান করলেন ‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General Theory of Relativity)।

(চলবে)

—————————————————–

রচনাকাল: ২৫শে অক্টোবর, ২০২০ সাল

রচনাসময়: বিকাল ৪টা ৫৫ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৯

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৯

———————————————————– রমিত আজাদ

বিজ্ঞান আসলে পূর্ণাঙ্গ কিছু না। বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বিজ্ঞান নির্মিত হয় মানবজাতির অভিজ্ঞতার আলোকে। তাই অভিজ্ঞতার কমতি থাকলে বিজ্ঞানেও অপূর্ণতা থাকাটাই স্বাভাবিক। বিজ্ঞান চলমান। বিজ্ঞানের অন্যতম উদ্দেশ্যে, মানুষের অভিজ্ঞতাগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখা।

গত পর্বে ‘নিউটনীয় মেকানিক্স’ ও তার অনুসারী সনাতন তাপ গতিবিদ্যা-এর দুইটি ব্যার্থতার কথা আমি উল্লেখ করেছি। (আরো রয়েছে অবশ্য) ঐ দুইটি ব্যার্থতা থেকেই জন্ম নিয়েছিলো দুইটি নতুন বিজ্ঞানের – ১। আপেক্ষিক বলবিজ্ঞান (Relativistic Mechanics) ও ২। কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান (Quantum Mechanics)।

এটা বোঝাই গিয়েছিলো যে চিরায়ত বলবিজ্ঞান (Classical Mechanics) যেহেতু ঐসব প্রতিভাস ব্যাখ্যা করতে ব্যার্থই হচ্ছে, অতএব নতুন বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

আমার এই লেখায় আমি কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়ে আলোচনা খুব একটা করবো না। যেহেতু আমাদের আলোচনার মূল বিষয় ‘কৃষ্ণবিবর’ ও এবারের নোবেল পুরষ্কার; এর সাথে রিলেটিভিস্টিক মেকানিক্সের সম্পর্কই বেশী।

‘বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব (Special Theory of Relativity):

মাইকেলসন ও মোরলের পরীক্ষায় এটাই প্রমাণিত হলো যে আলোকের গতিবেগ, আলোর উৎস বা পর্যবেক্ষকের গতির উপর মোটেও নির্ভরশীল নয়। মানে, গ্যালিলিও-নিউটনের আপেক্ষিক বেগের সংযোজন-বিয়োজন সূত্র আলো মেনে চলে না। বিজ্ঞানের কথা সুস্পষ্ট যে, পরীক্ষার দ্বারা যা প্রমাণিত হলো তাই মেনে নিতে হবে, ওটাই সত্য (যদি পরীক্ষায় ভুল না থাকে)। এর থেকে কি বোঝা গেলো? এর থেকে এই বোঝা গেলো যে, শূণ্য মাধ্যমে আলোকের বেগ ধ্রুব, আর যেহেতু উৎস বা পর্যবেক্ষকের গতির উপর নির্ভর করে সে বৃদ্ধি পায় না, তাহলে ঐ বেগই সর্বচ্চো।

তবে এতকাল নিউটনীয় বলবিদ্যা যে সকল গতিকে ব্যাখ্যা করেছিলেন সেগুলি কি? সেগুলি হলো স্বল্প গতি। সেই নিউটনের সময়ে পৃথিবীর দ্রুততম গতি সম্ভবত ছিলো চিতা (cheetah)-র গতি (১০৯ কিলোমিটার/ঘন্টা)। তখন তো ট্রেন বা বিমান কোনটাই ছিলো না। ঐ মাপের গতির ব্যাখ্যায় নিউটনীয় বলবিদ্যা সফল ছিলো, কিন্তু আলোকের গতিবেগ, যা ঐ তুলনায় বহু বহু গুণ বেশি তার ব্যাখ্যা নিয়ে নিউটন ভাবেননি। গ্যালিলিও অবশ্য একবার আলোকের গতিবেগ মাপতে গিয়ে ব্যার্থ হয়ে, সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে আলোকের গতিবেগ অসীম। মোদ্দা কথা হলো যে স্বল্প গতির ব্যাখ্যায় নিউটনীয় মেকনিক্স সফল, অতিদ্রুত গতির ব্যাখ্যায় নিউটনীয় মেকনিক্স অকার্যকর।

কিন্তু আলোকের গতি মানে অতিদ্রুত গতি নিয়ে কাজ যেহেতু বিজ্ঞানীরা শুরুই করে দিয়েছেন তাহলে ঐ দায়িত্ব কোন বিজ্ঞান নেবে? অতঃপর প্রয়োজন দেখা দিলো নতুন বিজ্ঞান সৃষ্টির। এবং দায়িত্বটি নিলেন বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন। এই নতুন বিজ্ঞানের নাম তিনি দিলেন ‘বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব’ (Special Theory of Relativity – সংক্ষেপে STR)। ‘আপেক্ষিক তত্ত্ব’ টার্মটির আগে ‘বিশেষ’ কথাটা কেন জুড়ে দেয়া হলো? কারণ, কিছুকাল পরে তিনি আরো একটি  ‘আপেক্ষিক তত্ত্ব’ ইনট্রোডিউস করেছিলেন যার নাম ‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব’ (General Theory of Relativity), এই নিয়ে পরে আলোচনা করা হবে। আপাতত:  ‘বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব’ বিশেষত্বটি কোথায় সেটা বলছি; এই তত্ত্ব কেবল এমন গতি নিয়ে আলোচনা করে যেখানে কোন বডির গতি সমবেগ (uniform); মানে বডিটির বেগ বাড়েও না, কমেও না, মানে কোন ত্বরণ নাই।

এই বিজ্ঞান অতীতের অনেক ধারনাই পাল্টে দিলো এবং বিশ্বজগৎ সম্পর্কে আমাদেরকে সম্পুর্ণ নতুন ধারনা দিলো। আমার এই আর্টিকেলের ক্ষুদ্র পরিসরে অত কথা বলা সম্ভব নয়, আপাতত STR-এর  সামান্য কয়েকটি অবদান উল্লেখ করছি। যেমন STR আমাদেরকে দিয়েছে সর্বকালের সেরা সমীকরণগুলোর অন্যতম E=mc^2। STR পাল্টে দিয়েছে স্থান ও কাল সম্পর্কিত সনাতনী চিন্তাভাবনা। বুঝিয়েছে যে স্থান ও কাল নিজে থেকে কিছু নয়, বরং বস্তু বা ম্যাটারেরই বৈশিস্ট্য। এমনকি স্থান ও কাল-কে সংযুক্ত করে দিয়েছে নতুন ধারনা – ‘স্থান-কাল’। আবার তারা উভয়েই যে গতির উপর নির্ভরশীল সেটাও আমাদেরকে গাণিতিকভাবে বুঝিয়েছে। এবং গতির উপর নির্ভর করে হতে পারে স্থানের ‘দৈর্ঘ্যের সংকোচন’ (length contraction), হতে পারে ‘সময়ের প্রসারণ (time dilation), কারো কাছে সময় খুব দীর্ঘ, কারো কাছে সময় খুব ছোট; কারো জীবনে পার হয়েছে দীর্ঘ দশ বছর, এদিকে গতির কারণে কারো জীবনে ঐ একই ইন্টারভালে পার হয়েছে মাত্র এক বৎসর! । শুধু তাই নয়, পদার্থের যেই ভর নিয়ে আমি প্রবন্ধের প্রথম পর্বে আলোচনা করেছিলাম, সেই ‘ভর’-কেও STR আপেক্ষিক বলছে। মানে বডির গতির উপর নির্ভর করে তার ‘ভর’ কম-বেশি হতে পারে। যে চুম্বক ক্ষেত্র বা বলকে এতকাল যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করা যায়নি, তাকেও ব্যাখ্যা করেছে STR। গতি যে কতভাবে বডি, পর্যবেক্ষক, স্থান, কাল, ক্ষেত্র, ইত্যাদিকে প্রভাবিত করতে পারে তা STR না আসলে বোঝা বা জানা যেত না। আইনস্টাইন তার কালজয়ী কাজগুলো প্রথম প্রকাশ করেছিলেন ১৯০৫ সালে। এই সালটিকে ল্যাটিন ভাষায় ‘অ্যানাস মিরাবিলিস’ অর্থাৎ ‘অলৌকিক বছর’ বলা হয়।

(অনেকেই মনে করে থাকেন যে আলবার্ট আইনস্টাইনের এই গবেষণা বা কাজগুলো মূলত: তার প্রথম স্ত্রী মিলেভা ম্যারিক -এর কাজ, যা আলবার্ট আইনস্টাইনের নামেই প্রচারিত হয়েছে। যাহোক, এই প্রবন্ধের আওতায় আর আলোচনাটি টানবো না।)

ব্যাপক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General Theory of Relativity):

মুসলিম পলিম্যাথ আল বিরুনী সফলভাবে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ নির্ণয় করেছিলেন। কিভাবে? তিনি কি একটা ফিতা নিয়ে মাটির উপর থেকে পৃথিবীর কেন্দ্র পর্যন্ত ঢুকেছিলেন? অবশ্যই না। সেটা সম্ভবও না। তবে কি তিনি গোলাকার পুরো পৃথিবীটা একবার ঘুরে এসেছিলেন, তারপর পরিধির মাপ থেকে ব্যাসার্ধ করেছিলেন? না তাও না। তিনি ভ্রমণ করেছিলেন সত্য, তবে পুরো পৃথিবী ঘুরে আসেননি। কাজটা প্রথম করেছিলো ম্যাগিলান, তা আল বিরুনীর মৃত্যুর কয়েকশত বছর পরে। তবে পলিম্যাথ আল বিরুনী কিভাবে তা করেছিলেন? বিজ্ঞানের জন্ম হয়েছে বেশি বছর হয় নি, কিন্তু জ্যামিতির জন্ম হয়েছে নগর সভ্যতার জন্ম হওয়ারও পূর্বে। একদিকে যথার্থ জ্যামিতি যেমন মানব মস্তিষ্ক ছাড়া আর কোথাও থাকতে পারে না, আরেকদিকে এই জ্যামিতি মহাবিশ্বে অধিকতর বাস্তব। মানবদেহের পড়ন থেকে শুরু করে নক্ষত্রের গড়ন ও ঘূর্ণন পর্যন্ত সবই জ্যামিতি। আল বিরুনী বুঝতে পেরেছিলেন যে জ্যামিতির যথাযথ ব্যবহারই পারবে সফলভাবে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ বের করতে। এর জন্য উনার প্রয়োজন ছিলো, একটি পর্বত চূড়া ও তার পাদদেশে লম্বা সমতলভূমি। ঐতিহাসিক কাজটি তিনি করেছিলেন এগারো শতকে আধুনিক পাকিস্তানের নন্দনা নামক জায়গায়।

আল বেরুনীর গণনা থেকে এই প্রতীয়মান হয় যে মহাবিশ্বের অনেক রহস্যই সফলভাবে সমাধান করা যায় জ্যামিতির প্রয়োগ করে। বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনও মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করার প্রধান হাতিয়ার হিসাবে জ্যামিতিকেই বেছে নিয়েছিলেন।

কোন বডির সমবেগ ছাড়াও আরেকটি গতিবেগ রয়েছে, আর তা হলো ত্বরান্বিত গতিবেগ। বডির সমবেগ নিয়ে কাজ শেষ হওয়ার পর আলবার্ট আইনস্টাইন এই ত্বরান্বিত গতিবেগ নিয়ে কাজ করা শুরু করেন।

‘ত্বরণ’ শব্দটির সাথে আমি প্রথম পরিচিত হই নবম শ্রেণীতে। বুঝলাম, গাড়ীতে এক্সিলারেটরে চাপ দিলে গতিবেগ বাড়ে কেন। আসলে কোন বডির গতিবেগ বৃদ্ধি পাওয়াটাই হলো ত্বরণ। এরপর শিখলাম ‘অভিকর্ষজ ত্বরণ’ (acceleration due to gravity), মানে পৃথিবীতে কোন বডি-কে উপর থেকে ছেড়ে দিলে, তার গতিবেগ ক্রমাগত বাড়তেই থাকে এবং যখন সে ভূপৃষ্ঠে আঘাত হানে তখন তার গতিবেগ সর্বচ্চো। এবার বুঝলাম যে, ফুটবল খেলার সময় বলটা যদি অল্প উপর থেকে মাথায় পড়ে তখন কোন ব্যাথা পাইনা, কিন্তু যখন অনেক উপর থেকে বলটি মাথায় পড়ে, তখন বেশ ব্যাথা অনুভূত হয়। অনুরূপভাবে বলা যায় যে, (উপরওয়ালার দয়া কামনা করি) যদি কেউ একতলার ছাদ থেকে পড়ে, তাহলে বড় জোর হাত পা ভাঙে; কিন্তু দশ তলার ছাদ থেকে পড়লে আর আর রক্ষা নাই!

উপরের আলোচনা থেকে এই বুঝলাম যে মহাকর্ষের সাথে ত্বরণের একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিজ্ঞানী আইনস্টাইনও এটা ধরতে পেরেছিলেন, তাই তিনি মহাকর্ষের ব্যাখ্যা করার জন্য ত্বরণ-কে বিবেচনা করে একটা নতুন আপেক্ষিক তত্ত্ব-এর জন্ম দেন, যার নাম ‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General Theory of Relativity)’। আর এই ব্যাখ্যায় তিনি গাণিতিক টুল হিসাবে জ্যামিতিকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন সবচাইতে বেশি।

পরবর্তি পর্বে ‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General Theory of Relativity)’ নিয়ে আলোচনা করা হবে।

—————————————————–

রচনাকাল: ২৫শে অক্টোবর, ২০২০ সাল

রচনাসময়: রাত ২টা ৫৫ মিনিট