Categories
অনলাইন প্রকাশনা জীবনী ও স্মৃতিকথা বাবা/মা, পরিবার ও সন্তান শিশু সৃজনশীল প্রকাশনা

বাবা বিশ্বাসঘাতক কি?

বাবা বিশ্বাসঘাতক কি?
————- ডঃ রমিত আজাদ

গতকাল আমার এগারো বছরের ছেলেটিকে আর্কিমিডিসের কাহিনী পড়ে শোনাচ্ছিলাম। জ্ঞানী বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস অভূতপূর্ব বিজ্ঞানকে ব্যবহার কেমন শিক্ষা দিয়েছিলেন ভেজাল মুকুট বানানো ঠগ স্যকরাকে। আর কেমন জব্দ করেছিলেন মহাপরাক্রমশালী রোমান সৈন্যবাহিনীকে। আর্কিমিডিস তার স্প্রিং কামানের সাহায্যে বড় বড় পাথর ছুঁড়ে ছুঁড়ে ক্ষত-বিক্ষত করেছিলেন রোমানদের জাহাজ; লিভার, কপিকলের সাহায্যে শূণ্যে তুলে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন পেল্লায় জাহাজগুলোকে, আর অবতল আয়নার সাহায্যে পুড়িয়ে ছাই করেছিলেন জাহাজের পাল মাস্তুল সব। আমার ছেলেটি এই কাহীনি শুনে বারবার রোমাঞ্চিত হচ্ছিলো

ছেলেঃ ও বাবা! একজন মানুষ পুরো একটি বাহিনীর সাথে লড়েছিলো! কি সাংঘাতিক!
আমিঃ হ্যাঁ বাবা, জ্ঞান পেশীর চাইতেও শক্তিশালী।
ছেলেঃ তারপর বাবা? রোমানরা যুদ্ধে হেরে ফেরৎ চলে গিয়েছিলো?
আমি হতাশ হয়ে বলললাম
আমিঃ না বাবা। কিছু বিশ্বাসঘাতকদের কারণে, শেষ পর্যন্ত রোমানরা সিরাকিউজে প্রবেশ করেছিলো। আর এক রোমান সৈন্যের হাতে জ্ঞানী আর্কিমিডিস নিহত হয়েছিলেন।

এমন মহান বিজ্ঞানীর হত্যাকান্ডে ব্যাথিত হয়ে ছেলে চোখ বড় বড় প্রশ্ন করলো
ছেলেঃ বাবা বিশ্বাসঘাতক কি?
আমি একটু থমকে গেলাম। কি জবাব দেব?
আমিঃ কিছু লোক আছে, যারা নিজের দেশকে অন্য দেশের কাছে বিকিয়ে দেয়। ফলে তাদের নিজেদের দেশ অন্যের দখলে চলে যায়।
ছেলে আরও বড় চোখ করে দ্বিগুন অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো
ছেলেঃ ওরা এরকম কেন করে?
এতটুকু শিশুর এই প্রশ্ন শুনে আমি স্থবির হয়ে গেলাম। ঠিক কি উত্তর দেব বুঝতে পারছিলাম না। সত্যিই তো ওরা এরকম করে কেন?

Categories
অনলাইন প্রকাশনা আত্ম উন্নয়ন পরিবেশ ও বন সৃজনশীল প্রকাশনা

গুরুচন্ডালী-১: “প্রাত ভ্রমন, আমি ও কয়েকটি কাকতাড়ুয়া”

শিরোনামঃ গুরুচন্ডালী-১: “প্রাত ভ্রমন, আমি ও কয়েকটি কাকতাড়ুয়া”

উপ-শিরোনামঃ “আবারও প্রাতভ্রমন (জগিং) ও কিছু কথা (চলিত ও সাধুভাষায় লিখিত(গুরুচন্ডালী))

পূর্বে সামুতে ও টেকটিউনসে লিখিতাম কিন্তু সরকার যেইভাবে বাকরুদ্ধ করিয়া রাখিতে চাহিতেছে তাহাতে ফেসবুকে লিখা ছাড়া আর গতি নাই । তাই এইখানেই এখন থেকে লিখিব বলিয়া ঠিক করিলাম । তথাপি ইজি পাবলিশনসেও এর একখানা কপি প্রকাশ করিলাম ।

সকাল ৫ টায় ঘুম থেকে উঠিয়া দন্ত মাজন শেষে মা’কে বলিলাম, “দরজাটা বন্ধ করিয়া দাও, আমি প্রাতভ্রমনে যাইতেছি” । মা বলিলেন, “দেশের অবস্থা ভাল না এত সকালে জগিং না করিলে কি নয়? আবার তুই ইন্টারনেটে কি সব যা-তা লিখিস, না জানি কবে তোকে পুলিশ ধরিয়া লইয়া যায়” ।

মা জানেন আমি কারো বাধ্য নই, সেনানিবাসের মহাবিদ্যালয়ের(কলেজ) কঠোর নিয়মই আমাকে বশ করিতে পারে নাই আর মামুলি কয়েকটা পুলিশ কি করিবে ! হস্তে সময় কম কারন আগে আগে না বাহির হইলে পরে সুরজ খানা পূব গগনে উদিত হইলে আর রক্ষা নাই, প্রাতভ্রমন এইখানেই শেষ করিয়া বাসায় ফিরিতে হইবে নতুবা গা গরম হইয়া শরীরে পানিশূন্যতা তৈয়ার হইতে পারে ।

আমি বলিলাম, “পুলিশের তো আর কোন কাজকর্ম নাই আমার মতন একটা কানামাছিকে ধরিয়া নিয়া যাইবে, উহাদের কোন লাভ হইবে বলিয়া আমার ধারনা হয় না, যদিওবা ধরিয়া নিয়া যায় তাহা হইলে বড়জোড় কানামাছি কানামাছি খেলা ছাড়া আর কোন কিছু করিতে পারিবে বলিয়া মনে হয় না” । মা কিছুটা বিরক্ত হইয়া, “ঠিক আছে কথা না বাড়াইয়া সাবধানে যাস, গেটের চাবি তোর বাবার কাছে, নীচে মনে হয় ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ পাঠ করিতেছেন” । আমি বলিলাম, “না দরকার হইবে না, আমার কাছে একখানা চাবি আছে । তুমি ঠান্ডা পানি দিয়া দুইখানা রুটি তৈয়ার করিও আর একটা অর্ধ ভাঁজা (হাফ পোজ) ডিম রাখিও যদি শরীর ভাল বোধ করো, আমি প্রাতভ্রমন শেষে নাস্তা সারিব আর যদি শরীর অসুস্থবোধ করো তাহা হইলে বুয়াকে তৈয়ার করিতে বলিও” ।

 

বুয়ার তৈয়ারী খাবার আমি ইদানিং জোরপূর্বক গলাধকরণ করাৱবার চেষ্টা করিতেছি কারন আমি জমিদারের নাতি বৈকি । বশিরউদ্দিন খান (পরে সরকার নাম ধারন করেন) আমার বাবার নানা, যিনি ভাওয়াল(জয়দেবপুর ও গাজীপুর) রাজার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, নথিপত্র ঘাটিলে এখনও গাজীপুর আদালতের ভাওয়াল যাদুঘরে তাহার নাম ও প্রমান পাওয়া যাইবে । তাহার মেয়ে মোসাঃ হাছনা খানম কালীগঞ্জ জমিদার পচাব্দী গাজী’র ছেলে এম,এ, ওহাব সরকার(পরে মুনসী নাম ধারন করেন) এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন । পচাব্দী গাজী ও বশিরউদ্দিন সরকার উভয়ই বিভিন্ন পরগনায় ভাওয়াল রাজার নিকট হইতে জমিদারী পাইয়া ছিলেন এবং ওনারা আমার শ্রদ্ধেয় প্র-পিতামহদ্বয় । ব্রিটিশ আমলে জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হইলে আমার দাদাজান এম,এ,ওহাব সরকার, সরকারী ল্যান্ডলর্ড নিযুক্ত হন (বর্তমানে পূর্বাচল টাউন)। সরকারী কাজ করার দরুন তাহার নামের পরে সরকার যুক্ত হয় কিন্তু পরবর্তীতে মসজিদে ইমামতি করার কারনে তাহা পরিবর্তিত হইয়া মুনসী প্রচলিত হয় । মানুষের ধান ক্ষেতে ঘোড়া দৌড়ানোই তাহার সারাদিনের রুটিন ছিল কিন্তু পরে তিনি অনুতপ্ত হইয়া কলকাতা হইতে ডাক্তারী পড়িয়া মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন ।তাহার গুণকীর্তন করা আমার উদ্দেশ্য নহে বরং নিজের পরিচিতিও এইখানে তুলিবার ইচ্ছা ছিল না কিন্তু কেন বলিলাম তাহা বোধ করি নিচের বাক্যগুলি পাঠে বুঝিতে পারা যাইবে ।জমিদারের নাতি হইয়া জমিদারী দেখানো আমি পছন্দ করি না কিন্তু বলার উদ্দেশ্য হইতেছে জমিদাররা ছিল অত্যাচারী আবার অনেকে কথায় কথায় বলে আমার দাদা জমিদার ছিল কিন্তু বাস্তবিক কোন প্রমাণ দিতে বলিলে বলে অনেক জমি ছিল আমার দাদার তাই জমিদার কিন্তু জমিদারী আমলে সাধারণ কাহারও নিজের জমি ছিল বলিয়া আমার ধারনা নাই; সকল জমিই জমিদারদের ছিল আর বাকিরা তার ভোগ দখলের খাজনা দিত অতি উচ্চহারে, তাই জমিদার পরিচয় দিয়া নিজেকে বড় ভাবিবার কোন অবসর আমি পাই নাই কারন জমিদারগণ অতিব অত্যাচারী ছিলেন । অন্যদিকে যেহেতু আমাদের দেশে বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষই ব্যাবসা করিতে আসিত আবার অনেকে বিবাহ করিয়া থাকিয়া যাইত তাই বার জাতের রক্ত মিশিয়া আমাদিগকের রক্ত একখান ষান্ডার কিংবা জোঁকের রক্তে পরিনত হইয়াছে যাহার কারনে না চাইলেও মানুষকে কষ্ট দিতে স্বীয় রক্তবিন্দু গুলি টগবগ টগবগ করিতে থাকে ।

যাহা হোক মূল বিষয়ে আসা যাক,

বাসা হইতে ইজতেমা ময়দান খুব বেশি দূরবর্তী নহে । ইজতেমা ময়দান মোট ১৬০ একর জমি বা ৭০ লক্ষ বর্গফুটের এক বিশাল মাঠ, একপাশে উত্তরা আধুনিক শহর ও অন্যপাশে বাংলাদেশের প্রথম শিল্পনগরী টংগী(যাহার গোড়া পত্তন হয় ব্রিটিশ আমলের শেষের দিকে ); মধ্যিখানে কোলঘেঁষে বয়ে গেছে তুরাগ নদী যার ৩০ বছর পূর্বেকার নাম ছিল কহর দরিয়া । এই নদীতেই প্রাত ভ্রমন শেষে স্নান করিতেন এক সময়কার মহারানী সোনাবানু, তাহার কিছু ধ্বংসাবশেষ ও রুপকথা মানুষের মুখে এখনও শুনিতে পাওয়া যায় ।

হাটিতে লাগিলাম, অবশেষে ইজতেমার প্রধান গেইটে প্রবেশ করিলাম, পিচঢালা পথ সোজা মাঠ পর্যন্ত চলিয়া গেছে, একপাশে বাটা সু কোম্পানী লিমিটেড অন্যপাশে আশরাফ টেক্সটাইল মিলস, এক সময় এই প্রধান ইজতেমার রাস্তায় সারিবদ্ধ কড়ই গাছ ছিল পাশে ছিল আশরাফ টেক্সটাইলের পুকুর । দিনগুলি আজ কোথায় হারাইয়া গেল তাহাই ভাবিতে লাগিলাম, সেই পুকুরে কত গোসল করিয়াছি, মাঝে মাঝে দারোয়ানকে ফাকিঁ দিয়া বড়শির ছিপ ফেলিয়া কত মাছও ধরিয়াছি আর আজ সেইখানে এক সুবিশাল মার্কেট ‘আশরাফ সেতু’ । যাহাই হোক হাটিতে লাগিলাম কারন এই পিচঢালা পথে দৌড়ানো বোকামি হইবে কারন হোচট খাইলে পুরো রক্তারক্তি হইতে বাধ্য । সামনেই রাস্তাটা শেষ হইল, কিছু দাড়ি টুপির আর আরবের পোষাক পরিচ্ছদে ঢাকা বুজুর্গান চোখে আসিল, তাহারা মেছওয়াক করিতেছিল মনে হয় এইমাত্র নামাজ শেষ করিয়া মেছওয়াক করিতেছে । জানি না এই সত্য কথা টা লেখা ঠিক হইবে কিনা, ইহাদের ব্যাপারে?, ইহারা সর্বদা এইরূপ মেছওয়াক বা দন্তমাজন করিয়া থাকেন নিবারক নিম গাছ দিয়া কিন্তু তাহার পরও আমি দেখিয়াছি তাহাদের মধ্যে বেশিরভাগেরই মুখে দুর্গন্ধ, তাই তীব্র আতঁর জাতীয় সুগন্ধী মাখিয়া থাকেন সর্বক্ষণ; শাক দিয়া জ্যান্ত মাছ ঢাকিবার প্রয়াস আরকি । মেছওয়াক করা সুন্নত বৈকি কিন্তু তার মানে এ্ই না যে ব্রাশ আর টুথপেষ্ট ব্যাবহার করিলে তাহা সুন্নত হইবে না বা ব্রাশ ব্যাবহার করা হারাম । আসুন দেখি কেনই বা সুন্নত বলা যাইবে না, মহানবী(সাঃ) একজন অতি উচ্চ পর্যায়ের বিজ্ঞানী ছিলেন, তিনি মেছওয়াক করিতে বলিয়াছেন গাছের ডাল দিয়া আর আধুনিক সময়ে উহার সংস্করণ হইল ব্রাশ আর টুথপেষ্ট; যাহা মেছওয়াকেরই ভিন্নরুপ, এক হিসাবে বলিতে পারেন তিনি ব্রাশের আবিষ্কারক । কেহ যদি আযান দেওয়ার জন্য মাইক ব্যাবহার করিতে পারেন, মসজিদে আলোর জন্য বৈত্যুতিক বাতি আর আরামের জন্য পাখা বা এসি ব্যাবহার করিতে পারেন, দ্রুত যাতাওয়াতের জন্যে ঘোড়া না ব্যাবহার করিয়া যানবাহন ব্যাবহার করিতে পারেন, যোগাযোগের জন্য কবুতর ব্যাবহার না করিয়া মোবাইল ব্যাবহার করিতে পারেন, খড়ম না পরিয়া জুতা পরিতে পারেন, হজ্জ্বের জন্য উট ব্যাবহার না করিয়া উড়োজাহাজ ব্যাবহার করিতে পারেন তাহা হইলে কেন ব্রাশ ব্যাবহার করা যাইবে না?? যাই হোক কাহারো সাথে কুতর্কে যাইতে চাহি না । “ইহা যার যার বুঝ, দাড়ি ফেলিয়া রাখিয়াছে মোছ” । আবার আরেক ব্যাপার উপস্থিত হইল, মোছ বা গোফ রাখিব নাকি দাড়ি? আমাদের দেশের অনেকেই আমার সাথে একমত হইবেন না জানি তবে আমি দাড়ি বা গোফ এর ব্যাপারে বিশদ গবেষণা করিয়া দেখিয়াছি আরবদের হিংস্র মাংসাসী ও রাজকীয় প্রাণী হইতেছে সিংহ । সিংহের দাড়িসদৃশ কেশর থাকে যাহা পুরুষত্বের ধারক বলিয়া আরবে হাজার বছর ধরিয়া চলিয়া আসিতেছে । পূর্বে দাড়ি ছাড়া পুরুষদের লেজকাটা বানর বলিয়া ধারনা করা হইত । তাহলে আমাদের সংস্কৃতি কি বলে?? আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি ঘাটাইলে যা পাওয়া যাইবে তাহা হইল আমাদের সমগ্র বাংলাদেশেই এক সময় সবর্ত্র বিচরণ করিয়া বেড়াইত এখনকার রাজকীয় বাঘ রয়েল বেঙ্গল টাইগার, বলাবাহুল্য ইহাদের দাড়ি নাই তবে যেহেতু বিড়াল প্রজাতি তাই গোফ আছে যাহা হাজার বছর ধরিয়া আমাদের পুরুষগন পুরুষত্ব দেখাইবার জন্য গোফ রাখিয়া আসিতেছেন এই বাঘের গোফের অনুকরণে । আসলে দাড়ি বা গোফ কিংবা মেছওয়াক কোনটাই আমার উদ্দেশ্য নহে, যাহার যা করিতে মন চায় সে উহাই করুক তাতে অন্যের এত ভাবনার বিষয় কেন? যাহা হোক, হুজুরকে পাশ কাটাইয়া জগিং শুরু করিলাম । আমাকে দেখিয়া তাহার চোখমুখ কুঞ্চিত হইয়া গেল, হয়ত মনে মনে ভাবিতেছে, “ইহারা জাহান্নামের খড়ি, সাত সকালে নামাজ না পড়িয়া ইংরেজ ফিরীঙ্গীদের লেবাসে(পোষাকে) আসিয়াছে পবিত্র ময়দানে ফালাফালি করিতে” আমি অন্যদিকে চোখ ফিরাইয়া নিলাম কারন আমি নিয়মিত না হইলেও প্রায়শই নামাজ আদায় করি । যাহাই হোক, শ্লথ গতিতে দৌড়াইয়া নদীর তীরে কিছুক্ষণ থামিয়া আবার হাটিতে লাগিলাম । নদীর মিশকালো জল ও নাক ঝাঁঝালো গন্ধে নাসারন্ধ্র বন্ধ হইবার যোগাড় । দম বন্ধ করিয়া আবার হাটিতে লাগিলাম হঠাৎ লক্ষ্য করিলাম একজন মাঝি বা জেলে ডিঙ্গি নৌকা সমেত নদীর কিনারায় কি যেন করিতেছেন, ভাবিলাম এই জলে মাছ কিভাবে ধরিবে, মাছ তো দূরে থাকিবে এই নদীতে এখন ব্যাঙও পাইবে না, তাহা হইলে সে কি করিতেছে?? অত্যন্ত উৎসাহের সহিত নিকটে গেলাম, সে একজন মাঝি না তবে মহিলা মাঝি বা জেলে বলা যাবে কিনা বুঝিতে পারিলাম না কারন সে মাছ না ধরিয়া বিভিন্ন বোতল ও আবর্জনা কুড়াইতেছিল (ধরিতেছিল) । হয়ত ভবিষ্যতে তাহার নাম হইবে মাঝি বা জেলে কিন্তু সংজ্ঞা খানা বদলাইয়া এইরকম হইবে: জেলে ও মাঝির সংজ্ঞাঃ “যাহারা নৌকায় চড়িয়া খাল বিলে বা পুকুরে (পূর্বে নদী ছিল) পুনঃব্যাবহার করা যায় এমন সব আবর্জনা ছিপ বা জাল দিয়া ধরিয়া থাকেন উহাদের মাঝি বা জেলে বলা হয়, যেমন পদ্মা বিলের মাঝি বা জেলে, তুরাগ  খালের মাঝি বা জেলে কিংবা বুড়ীগঙ্গা পুকুরের মাঝি বা জেলে ইত্যাদি” ।

প্রাতভ্রমন আর কি করিব, মনখানা সাত সকালেই খারাপ হইয়া গেল, মহিলা মাঝি আমাকে দেখিয়া কিছুটা অপ্রস্তুত হইয়া বলিল, “কিছু বলিবা বাবাজি?” আমি উত্তর দিলাম, “না চাচী, দূর থাকিয়া দেখিয়া ভাবিয়াছিলাম আপনি মাছ ধরিতে ব্যস্ত কিন্তু কাছে আসিয়া যাহা দেখিলাম তাহা মানিয়া লইতে পারিতেছি না” ।

মহিলা উত্তর দিলেন, “কি আর করিব বাবাজি, এই দেশে কত গুলা কুত্তা আর শকুনের জাতেরে প্রতিবার ভোট দেই আর ক্ষমতায় আইলে গরীব মানুষের কথা, নদীগুলার কথা সব ভুইল্যা যায়” ।

আমি মাথা নাড়িয়া সায় দিলাম আর মুখে বললাম, “হুম্, আচ্ছা আপনি কাজ করেন আমি যাই”, বলে সামনে হাটতে থাকলাম ।

বিশাল মাঠ, দুবার চক্কর দিলাম আজকে, প্রায় ৫ থেকে ৬ কি.মি. হাটার সমান হবে । পূর্বপাশে সোর্ড ব্লেড ফ্যাক্টরী ও সোনাবানুর শেষ ধ্বংসাবশেষ, সম্মুখে হাটিতে থাকলাম, কিছু শালিক আর দাড় কাক সোর্ড ব্লেড ফ্যাক্টরীর ভিতরের কাঁঠাল গাছে বসিয়া ডাকিতেছে । ছোট বেলায় এই মাঠে কত অজানা পাখি দেখিয়াছি তাহার অনেকগুলো আর দেখি না, উহাদের মধ্যে ঘুঘু, বক, চিল, শঙ্খচিল, মাছরাঙা, দোয়েল, কোকিল আরো কত পাখি ছিল অনেকগুলার নাম জানিতাম না । আর এখন শুধুই কাক আর শালিক কিংবা চড়ুই; ভাবিতে ভীষণ কষ্ট লাগিল শৈশবে এই নদীতে ঝিনুক কুড়াইতাম মুক্তা পাওয়ার আশায় আজ ঝিনুক তো দূরে থাকিবে পানি টুকুও ধ্বংস হইয়াছে ।

তুরাগ নদীর এক সময়কার নাম ‘কহর দরিয়া’ ছিল বৈকি, তবে অনেকেই নদী, নদ আর দরিয়ার মধ্যে পার্থক্য বুঝিয়া উঠিতে পারে না, তাহাদের জন্য বলিতে হয় নদ বলতে বোঝায় যাহা হইতে দ্বীতিয় কোন স্রোত বা শাখা নদীর জন্ম হয় নাই যেমন ব্রহ্মপুত্র একটি নদ, অন্যদিকে নদী বলিতে বোঝায় যাহার থাকিয়া এক বা একাধিক নদ/নদীর জন্ম হইয়াছে যেমন পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ইত্যাদি, আবার যেসকল নদীতে বছরের সব ঋতুতে পানির স্রোত থাকে উহাদের দরিয়া বলা হইয়া থাকে । তবে ইহা নিয়া নানান মুনীষির নানান মতবিভেদ রহিয়াছে ।

বাংলাদেশে সর্বমোট ৮০০ এর উপরে নদ-নদী থাকিলেও ভারতের পানি চুরির কারণে তাহা ক্রমশ কমিতেছে । এই তুরাগ নদী এক সময় স্রোতস্বিনী ছিল সারা বছর তাই এর নাম ছিল কহর দরিয়া কিন্তু আজ নিথর কালো বিষের পেয়ালা মাত্র । ভারত আমাদের নদ/নদী গুলি যেইভাবে ধ্বংস করিয়া দিতেছে তাহার বিরুদ্ধে বর্তমানে বা অতীতে কোন রাজনীতিবিদ কিংবা মন্ত্রী আমলা কেহই কিছু করিতে পারিতেছেন না ।

মোটা অংকের টাকা খাইয়া অনেক পুলিশ কিংবা হর্তাকর্তারা দেদারসে দূষিত পানি আমাদের নদীতে ফালাইতে দ্বিধাবোধ করিতেছেন না, অন্যদিকে ভারত পানি বন্ধ দিয়া ৬৮ টা খাল খনন করিয়া পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, বিহার ও অন্যান্য রাষ্ট্রে চাষভাষ করিয়া তাদের অর্থনীতি স্বচ্ছল করিতেছে বৈকি, এহেন সমস্যা যেনো কাহারও চক্ষুগোচর হয় না, বিশেষত গণমাধ্যম ও রাজনীতিবিদ’দের ।

কিছুদূর হাটিতেই একখানা তিলা-ঘুঘু চোখে পড়িল; বাটার সংরক্ষিত বনের ভিতরের এক দেবদারু গাছে । মনে কিছুটা আশার সঞ্চার হইল ভাবিলাম এখনও আমাদের ঘুরিয়া দাড়াইবার সুযোগ আছে, এই দেশের নদী, প্রাকৃতিক বন আর পশুপাখিদের বাঁচাইবার নিমিত্তে এখনও সময় আছে । জানি আপনারা বলিবেন, শুধুমাত্র একটা লেখা দিয়া আর কি হইবে, তবে আমি বলিব আর কিছু না হোক কিছু লোক যাহারা আমার লেখা অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে পাঠ করিয়াছেন তাহাদের কেউ কেউ যদি মনেপ্রাণে মাতৃভূমির পরিবেশ, নদ-নদী ও পশুপাখি বাচাইবার নিমিত্তে চিপস খাওয়ার পর উহার প্যাকেটটা ডাস্টবিনে ফেলে ইহাই-বা কম কিসের ।

তাহা ছাড়া আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ কলকারখানায় চাকুরী করেন বা করবেন অথবা কলকাখানার ব্যাবসা করেন বা করবেন; তখন আমার এই একখানা লেখা পড়িয়া থাকিলে অন্তত নদী বা পরিবেশ দূষিত হয় এইরূপ কর্ম হইতে বিরত থাকিবেন আশা করি এবং অন্য কাউকে করিতে দেখিলে তাহা ফিরাইবার চেষ্টা করিবেন, যাহাতে কয়েকটি কাক না সাজিয়া কাকতাড়ুয়া হইয়া সকল কাকনামের ধারক কুলাঙ্গারদের দেশ থাকিয়া তাড়াইতে পারি ।

পাঠককে অশেষ ধন্যবাদ।

——–সাকি বিল্লাহ্

 

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গবেষণামূলক প্রকাশনা পরিবেশ ও বন

বিলুপ্তির পথে বাংলাদেশের হাতি

বাংলাদেশ বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম। আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা অনেক বেশি। তার পরও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে আছে আমাদের বন্য প্রাণী। যদিও সরকারিভাবে বলা হয়, আমাদের বনের পরিমাণ মোট আয়তনের ১৬ শতাংশ; কিন্তু গবেষণা গ্রন্থ ‘স্টোলেন ফরেস্ট’ থেকে জানা যায়, আসলে মাত্র ৬ শতাংশ বন কার্যকরভাবে টিকে আছে। তাও আবার বছরে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ হারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। বনের যখন এ করুণ অবস্থা, সে তুলনায় বন্য প্রাণীর সংখ্যা এখনো আশাব্যঞ্জক। বাংলাদেশের আবহাওয়া, বিশেষ করে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বায়ুর চাপ, ঋতুচক্র, পানি ও মাটির উপাদান বন্য প্রাণীর জন্য উপযোগী হওয়ায় ৫৬ হাজার বর্গমাইল আয়তনের ছোট এ দেশটি জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। জীববৈচিত্র্যের তালিকায় স্তন্যপায়ী হাতির উপস্থিতি বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে বিশেষ স্থান করে দিয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট নানা কারণে সারা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশেও জীববৈচিত্র্য এখন হুমকির মুখে। বাড়তে থাকা জনসংখ্যার চাপ, ব্যাপক হারে বন উজাড়, বন্য প্রাণী শিকার, নদীর নাব্যতা এবং ভারসাম্যহীন পরিবেশই বন্য প্রাণীকে বিপন্নতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আর এসব কারণে অন্য বহু প্রাণীর মতো বাংলাদেশে বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে হাতি। বাংলাদেশের বনাঞ্চলে হাতির সংখ্যা মাত্র ১৯৬ থেকে ২২৭টি। আর এদের বিচরণ দেশের ১১টি বন বিভাগে। একসময় ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রামে হাতি দেখতে পাওয়া যেত; কিন্তু হাতির সেই বিস্তীর্ণ বিচরণস্থল ক্রমেই সংকুচিত হয়ে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য জেলায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। আইইউসিএনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বন বিভাগের চট্টগ্রাম দক্ষিণ অঞ্চলে হাতি আছে ৩০ থেকে ৩৫টি, কক্সবাজার উত্তর ও দক্ষিণ বিভাগ মিলিয়ে আছে ৮২ থেকে ৯৩টি, বান্দরবানে আছে ১২ থেকে ১৫টি এবং লামা বিভাগে আছে ৩৫ থেকে ৪০টি। এ ছাড়া কক্সবাজার উত্তর বিভাগে আরো ৭ থেকে ৯টি এবং দক্ষিণ বিভাগে ৩০ থেকে ৩৫টি হাতি রয়েছে। আর অভিবাসী হাতির সংখ্যা ৮৪ থেকে ১০০টি। হাতি কমে যাওয়ার ৯টি কারণও আইইউসিএনের গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বনভূমি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া, খাদ্যাভাব, চলাচলের রাস্তা কমে যাওয়াসহ নানা কারণে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের হাতি। হাতি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার বড় কারণ হচ্ছে চোরা শিকারিদের অপতৎপরতা। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত শুধু পার্বত্য বান্দরবান ও কক্সবাজারের ছয়টি উপজেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চলে দাঁত ও হাড়গোড়ের জন্য ৩২টি হাতি হত্যা করা হয়। ২০১০ সাল পর্যন্ত এই হত্যার তালিকা আরো দীর্ঘ হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। গহিন অরণ্যে ফাঁদ পেতে, বিষ খাইয়ে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারিরা হাতির দাঁত ও হাড় সংগ্রহ করে তা উচ্চমূল্যে বিদেশে পাচার করছে। বাংলাদেশের অনেক বন্য প্রাণী হারিয়ে গেছে। হারিয়ে যেতে বসেছে অনেক প্রাণী। হাতি এসব প্রাণীর মধ্যে প্রধানতম। আর নির্বিচার শিকার হাতি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার মূল কারণ। বাংলাদেশ হাতিসহ অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অনুকূল বিচরণ এলাকা হলেও বর্তমানে প্রাকৃতিক বনের এ প্রাণীগুলোর সবই দেশ থেকে নিদারুণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে শুরু করেছে। স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের এই সর্বনাশা বিলুপ্তি আমাদের পরিবেশ-প্রতিবেশ ব্যবস্থায় সৃষ্টি হতে চলেছে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির।
আজিজুর রহমান (কালেরকণ্ঠ)

Categories
অনলাইন প্রকাশনা কবিতা বিনোদন ভালবাসা/প্রণয়লীলা সৃজনশীল প্রকাশনা

নাবিক

নাবিক
–জীবনানন্দ দাশ

কবে তব হৃদয়ের নদী
বরি নিল অসম্বৃত সুনীল জলধি!
সাগর-শকুন্ত-সম উল্লাসের রবে
দূর সিন্ধু-ঝটিকার নভে
বাজিয়া উঠিল তব দুরন্ত যৌবন!
পৃথ্বীর বেলায় বসি কেঁদে মরে আমাদের শৃঙ্খলিত মন!
কারাগার-মর্মরের তলে
নিরাশ্রয় বন্দিদের খেদ-কোলাহলে
ভ’রে যায় বসুধার আহত আকাশ!
অবনত শিরে মোরা ফিরিতেছি ঘৃণ্য বিধিবিধানের দাস!
-সহস্রের অঙুলিতর্জন
নিত্য সহিতেছি মোরা-বারিধির বিপ্লব-গর্জন
বরিয়া লয়েছ তুমি, তারে তুমি বাসিয়াছ ভালো;
তোমার পক্ষরতলে টগ্‌বগ্ করে খুন-দুরন্ত, ঝাঁঝালো!-
তাই তুমি পদাঘাতে ভেঙে গেলে অচেতন বসুধার দ্বার,
অবগুণ্ঠিতার
হিমকৃষ্ণ অঙুলির কঙ্কাল-পরশ
পরিহরি গেলে তুমি-মৃত্তিকার মদ্যহীন রস
তুহিন নির্বিষ নিঃস্ব পানপাত্রখানা
চকিতে চূর্ণিয়া গেলে-সীমাহারা আকাশের নীল শামিয়ানা
বাড়ব-আরক্ত স্ফীত বারিধির তট,
তরঙ্গের তুঙ্গ গিরি, দুর্গম সঙ্কট
তোমারে ডাকিয়া নিল মায়াবীর রাঙা মুখ তুলি!
নিমেষে ফেলিয়া গেলে ধরণীর শূন্য ভিক্ষাঝুলি!
প্রিয়ার পাণ্ডুর আঁখি অশ্রু-কুহেলিকা-মাখা গেলে তুমি ভুলি!
ভুলে গেলে ভীরু হৃদয়ের ভিক্ষা, আতুরের লজ্জা অবসাদ,-
অগাধের সাধ
তোমারে সাজায়ে দেছে ঘরছাড়া ক্ষ্যাপা সিন্দবাদ!
মণিময় তোরণের তীরে
মৃত্তিকায় প্রমোদ-মন্দিরে
নৃত্য-গীত-হাসি-অশ্রু-উৎসবের ফাঁদে
হে দুরন্ত দুর্নিবার-প্রাণ তব কাঁদে!
ছেড়ে গেলে মর্মন্তুদ মর্মর বেষ্টন,
সমুদ্রের যৌবন-গর্জন
তোমারে ক্ষ্যাপায়ে দেছে, ওহে বীর শের!
টাইফুন্-ডঙ্কার হর্ষে ভুলে গেছ অতীত-আখের
হে জলধি পাখি!
পে তব নাচিতেছে ল্যহারা দামিনী-বৈশাখী!
ললাটে জ্বলিছে তব উদয়াস্ত আকাশের রতœচূড় ময়ূখের টিপ,
কোন্ দূর দারুচিনি লবঙ্গের সুবাসিত দ্বীপ
করিতেছে বিভ্রান্ত তোমারে!
বিচিত্র বিহঙ্গ কোন্ মণিময় তোরণের দ্বারে
সহর্ষ নয়ন মেলি হেরিয়াছ কবে!
কোথা দূরে মায়াবনে পরীদল মেতেছে উৎসবে-
স্তম্ভিত নয়নে
নীল বাতায়নে
তাকায়েছ তুমি!
অতি দূর আকাশের সন্ধ্যারাগ-প্রতিবিম্বে প্রস্ফুটিত সমুদ্রের
আচম্বিত ইন্দ্রজাল চুমি
সাজিয়াছ বিচিত্র মায়াবী!
সৃজনের জাদুঘর-রহস্যের চাবি
আনিয়াছ কবে উন্মোচিয়া
হে জল-বেদিয়া!
অল্য বন্দর পানে ছুটিতেছ তুমি নিশিদিন
সিন্ধু বেদুঈন!
নাহি গৃহ, নাহি পান্থশালা-
লক্ষ লক্ষ ঊর্মি-নাগবালা
তোমারে নিতেছে ডেকে রহস্যপাতালে-
বারুণী যেথায় তার মণিদীপ জ্বালে!
প্রবাল-পালঙ্ক-পাশে মীননারী ঢুলায় চামর!
সেই দুরাশার মোহে ভুলে গেছ পিছুডাকা স্বর
ভুলেছ নোঙর!
কোন্ দূর কুহকের কূল
লক্ষ্য করি ছুটিতেছে নাবিকের হৃদয়-মাস্তুল
কে বা তাহা জানে!
অচিন আকাশ তারে কোন্ কথা কয় কানে কানে!

Categories
অনলাইন প্রকাশনা কবিতা বিনোদন ভালবাসা/প্রণয়লীলা সৃজনশীল প্রকাশনা

ঘোড়া

ঘোড়া
–জীবনানন্দ দাশ

আমরা যাইনি মরে আজও – তবু কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়:
মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে;
প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন – এখনও ঘাসের লোভে চরে
পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর ‘পরে।

আস্তাবলের ঘ্রাণ ভেসে আসে একভিড় রাত্রির হাওয়ায়;
বিষন্ন খড়ের শব্দ ঝরে পড়ে ইস্পাতের কলে;
চায়ের পেয়ালা ক’টা বেড়ালছানার মতো – ঘুমে-ঘেয়ো
কুকুরের অস্পষ্ট কবলে

হিম হয়ে নড়ে গেল ও – পাশের পাইস্-রেস্তরাঁতে,
প্যারাফিন-লন্ঠন নিভে গেল গোল আস্তাবলে।
সময়ের প্রশান্তির ফুঁয়ে;
এইসব নিওলিথ – স্তব্ধ তার জ্যোৎস্নাকে ছুঁয়ে।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা কবিতা বিনোদন ভালবাসা/প্রণয়লীলা সৃজনশীল প্রকাশনা

হায় চিল

হায় চিল
–জীবনানন্দ দাশ

হায় চিল, সোনালী ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর কেঁদোনাকো উড়ে উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে!
তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে।
পৃথিবীর রাঙ্গা রাজকন্যাদের মতো সে যে চলে গেছে রূপ নিয়ে দূরে;
আবার তাহারে কেন ডেকে আনো?
কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!

হায় চিল, সোনালী ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর কেঁদোনাকো উড়ে উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে!

Categories
অনলাইন প্রকাশনা কবিতা বিনোদন ভালবাসা/প্রণয়লীলা সৃজনশীল প্রকাশনা

স্মৃতি

স্মৃতি
জীবনানন্দ দাশ
থমথমে রাত, আমার পাশে বসল অতিথি-
বললে, আমি অতীত ক্ষুধা-তোমার অতীত স্মৃতি!
-যে দিনগুলো সাঙ্গ হল ঝড়বাদলের জলে,
শুষে গেল মেরুর হিমে, মরুর অনলে,
ছায়ার মতো মিশেছিলাম আমি তাদের সনে;
তারা কোথায়?-বন্দি স্মৃতিই কাঁদছে তোমার মনে!
কাঁদছে তোমার মনের খাকে, চাপা ছাইয়ের তলে,
কাঁদছে তোমার স্যাঁত্সেঁতে শ্বাস-ভিজা চোখের জলে,
কাঁদছে তোমার মূক মমতার রিক্ত পাথার ব্যেপে,
তোমার বুকের খাড়ার কোপে, খুনের বিষে ক্ষেপে!
আজকে রাতে কোন্ সে সুদূর ডাক দিয়েছে তারে,-
থাকবে না সে ত্রিশূলমূলে, শিবের দেউলদ্বারে!
মুক্তি আমি দিলেম তারে-উল্লাসেতে দুলে
স্মৃতি আমার পালিয়ে গেল বুকের কপাট খুলে
নবালোকে-নবীন উষার নহবতের মাঝে।
ঘুমিয়েছিলাম, দোরে আমার কার করাঘাত বাজে!
-আবার আমায় ডাকলে কেন স্বপনঘোরের থেকে!
অই লোকালোক-শৈলচূড়ায় চরণখানা রেখে
রয়েছিলাম মেঘের রাঙা মুখের পানে চেয়ে,
কোথার থেকে এলে তুমি হিম সরণি বেয়ে!
ঝিম্‌ঝিমে চোখ, জটা তোমার ভাসছে হাওয়ার ঝড়ে,
শ্মশানশিঙা বাজল তোমার প্রেতের গলার স্বরে!
আমার চোখের তারার সনে তোমার আঁখির তারা
মিলে গেল, তোমার মাঝে আবার হলেম হারা!
-হারিয়ে গেলাম ত্রিশূলমূলে, শিবের দেউলদ্বারে;
কাঁদছে স্মৃতি-কে দেবে গো-মুক্তি দেবে তারে!

Categories
অনলাইন প্রকাশনা কবিতা বিনোদন ভালবাসা/প্রণয়লীলা সৃজনশীল প্রকাশনা

সে

সে
–জীবনানন্দ দাশ

আমাকে সে নিয়েছিলো ডেকে;
বলেছিলোঃ ‘এ নদীর জল
তোমার চোখের মত ম্লান বেতফল;
সব ক্লান্তি রক্তের থেকে
স্নিগ্ধ রাখছে পটভূমি;
এই নদী তুমি।’

‘এর নাম ধানসিঁড়ি বুঝি?’
মাছরাঙাদের বললাম;
গভীর মেয়েটি এসে দিয়েছিলো নাম।
আজো আমি মেয়েটিকে খুঁজি;
জলের অপার সিঁড়ি বেয়ে
কোথায় যে চলে গেছে মেয়ে।

সময়ের অবিরল শাদা আর কালো
বনানীর বুক থেকে এসে
মাছ আর মন আর মাছরাঙাদের ভালোবেসে
ঢের আগে নারী এক – তবু চোখ ঝলসানো আলো
ভালোবেসে ষোলো আনা নাগরিক যদি
না হয়ে বরং হতো ধানসিঁড়ি নদী।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা কবিতা বিনোদন ভালবাসা/প্রণয়লীলা সৃজনশীল প্রকাশনা

বনের চাতক-মনের চাতক

বনের চাতক-মনের চাতক
—জীবনানন্দ দাশ

বনের চাতক বাঁধল বাসা মেঘের কিনারায়-
মনের চাতক হারিয়ে গেল দূরের দুরাশায়!
ফুঁপিয়ে ওঠে কাতর আকাশ সেই হতাশার ক্ষোভে-
সে কোন্ বোঁটের ফুলের ঠোঁটের মিঠা মদের লোভে
বনের চাতক-মনের চাতক কাঁদছে অবেলায়!

পুবের হাওয়ায় হাপর জ্বলে, আগুনদানা ফাটে!
কোন্ ডাকিনীর বুকের চিতায় পচিম আকাশ টাটে!
বাদল-বৌয়ের চুমার মৌয়ের সোয়াদ চেয়ে চেয়ে
বনের চাতক-মনের চাতক চলছে আকাশ বেয়ে,
ঘাটের ভরা কলসি ও-কার কাঁদছে মাঠে মাঠে!

ওরে চাতক, বনের চাতক, আয় রে নেমে ধীরে
নিঝুম ছায়া-বৌরা যেথা ঘুমায় দীঘি ঘিরে,
“দে জল!” ব’লে ফোঁপাস কেন? মাটির কোলে জল
খবর-খোঁজা সোজা চোখের সোহাগে ছল্‌ছল্ !
মজিস নে রে আকাশ-মরুর মরীচিকার তীরে!
মনের চাতক, হতাশ উদাস পাখায় দিয়ে পাড়ি
কোথায় গেলি ঘরের কোণের কানাকানি ছাড়ি?
ননীর কলস আছে রে তার কাঁচা বুকের কাছে,
আতার ক্ষীরের মতো সোহাগ সেথায় ঘিরে আছে!
আয় রে ফিরে দানোয়-পাওয়া, আয় রে তাড়াতাড়ি।

বনের চাতক, মনের চাতক আসে না আর ফিরে,
কপোত-ব্যথা বাজায় মেঘের শকুনপাখা ঘিরে!
সে কোন্ ছুঁড়ির চুড়ি আকাশ-শুঁড়িখানায় বাজে!
চিনিমাখা ছায়ায় ঢাকা চুনীর ঠোঁটের মাঝে
লুকিয়ে আছে সে-কোন্ মধু মৌমাছিদের ভিড়ে!

Categories
অনলাইন প্রকাশনা কবিতা বিনোদন ভালবাসা/প্রণয়লীলা সৃজনশীল প্রকাশনা

বেদিয়া

বেদিয়া
–জীবনানন্দ দাশ

চুলিচালা সব ফেলেছে সে ভেঙে, পিঞ্জরহারা পাখি!
পিছুডাকে কভু আসে না ফিরিয়া, কে তারে আনিবে ডাকি?
উদাস উধাও হাওয়ার মতন চকিতে যায় সে উড়ে,
গলাটি তাহার সেধেছে অবাধ নদী-ঝর্ণার সুরে;
নয় সে বান্দা রংমহলের, মোতিমহলের বাঁদী,
ঝোড়ো হাওয়া সে যে, গৃহপ্রাঙ্গণে কে তারে রাখিবে বাঁধি!
কোন্ সুদূরের বেনামী পথের নিশানা নেছে সে চিনে,
ব্যর্থ ব্যথিত প্রান্তর তার চরণচিহ্ন বিনে!
যুগযুগান্ত কত কান্তার তার পানে আছে চেয়ে,
কবে সে আসিবে ঊষর ধূসর বালুকা-পথটি বেয়ে
তারই প্রতীক্ষা মেগে ব’সে আছে ব্যাকুল বিজন মরু!
দিকে দিকে কত নদী-নির্ঝর কত গিরিচূড়া-তরু
ঐ বাঞ্ছিত বন্ধুর তরে আসন রেখেছে পেতে
কালো মৃত্তিকা ঝরা কুসুমের বন্দনা-মালা গেঁথে
ছড়ায়ে পড়িছে দিগ্‌দিগন্তে ক্ষ্যাপা পথিকের লাগি!
বাবলা বনের মৃদুল গন্ধে বন্ধুর দেখা মাগি
লুটায়ে রয়েছে কোথা সীমান্তে শরৎ উষার শ্বাস!
ঘুঘু-হরিয়াল-ডাহুক-শালিখ-গাঙচিল-বুনোহাঁস
নিবিড় কাননে তটিনীর কূলে ডেকে যায় ফিরে ফিরে
বহু পুরাতন পরিচিত সেই সঙ্গী আসিল কি রে!
তারই লাগি ভায় ইন্দ্রধনুক নিবিড় মেঘের কূলে,
তারই লাগি আসে জোনাকি নামিয়া গিরিকন্দরমূলে।
ঝিনুক-নুড়ির অঞ্জলি ল’য়ে কলরব ক’রে ছুটে
নাচিয়া আসিছে অগাধ সিন্ধু তারই দুটি করপুটে।
তারই লাগি কোথা বালুপথে দেখা দেয় হীরকের কোণা,
তাহারই লাগিয়া উজানী নদীর ঢেউয়ে ভেসে আসে সোনা!
চকিতে পরশপাথর কুড়ায়ে বালকের মতো হেসে
ছুড়ে ফেলে দেয় উদাসী বেদিয়া কোন্ সে নিরুদ্দেশে!
যত্ন করিয়া পালক কুড়ায়, কানে গোঁজে বনফুল,
চাহে না রতন-মণিমঞ্জুষা হীরে-মাণিকের দুল,
-তার চেয়ে ভালো অমল উষার কনক-রোদের সীঁথি,
তার চেয়ে ভালো আলো-ঝল্মল্ শীতল শিশিরবীথি,
তার চেয়ে ভালো সুদূর গিরির গোধূলি-রঙিন জটা,
তার চেয়ে ভালো বেদিয়া বালার ক্ষিপ্র হাসির ছটা!
কী ভাষা বলে সে, কী বাণী জানায়, কিসের বারতা বহে!
মনে হয় যেন তারই তরে তবু দুটি কান পেতে রহে
আকাশ-বাতাস-আলোক-আঁধার মৌন স্বপ্নভরে,
মনে হয় যেন নিখিল বিশ্ব কোল পেতে তার তরে!

Categories
অনলাইন প্রকাশনা কবিতা বিনোদন ভালবাসা/প্রণয়লীলা সৃজনশীল প্রকাশনা

আমি কবি-সেই কবি

আমি কবি-সেই কবি
–জীবনানন্দ দাশ

 

আমি কবি-সেই কবি-
আকাশে কাতর আঁখি তুলি হেরি ঝরা পালকের ছবি!
আন্‌মনা আমি চেয়ে থাকি দূর হিঙুল-মেঘের পানে!
মৌন নীলের ইশারায় কোন্ কামনা জাগিছে প্রাণে!
বুকের বাদল উথলি উঠিছে কোন্ কাজরীর গানে!
দাদুরী-কাঁদানো শাঙন-দরিয়া হৃদয়ে উঠিছে দ্রবি!

স্বপন-সুরার ঘোরে
আখের ভুলিয়া আপনারে আমি রেখেছি দিওয়ানা ক’রে!
জন্ম ভরিয়া সে কোন্ হেঁয়ালি হল না আমার সাধা-
পায় পায় নাচে জিঞ্জির হায়, পথে পথে ধায় ধাঁধা!
-নিমেষে পাসরি এই বসুধার নিয়তি-মানার বাধা
সারাটি জীবন খেয়ালের খোশে পেয়ালা রেখেছি ভ’রে!

ভুঁয়ের চাঁপাটি চুমি
শিশুর মতন, শিরীষের বুকে নীরবে পড়ি গো নুমি!
ঝাউয়ের কাননে মিঠা মাঠে মাঠে মটর-ক্ষেতের শেষে
তোতার মতন চকিতে কখন আমি আসিয়াছি ভেসে!
-ভাটিয়াল সুর সাঁঝের আঁধারে দরিয়ার পারে মেশে,-
বালুর ফরাশে ঢালু নদীটির জলে ধোঁয়া ওঠে ধূমি!

বিজন তারার সাঁঝে
আমার প্রিয়ের গজল-গানের রেওয়াজ বুঝি বা বাজে!
প’ড়ে আছে হেথা ছিন্ন নীবার, পাখির নষ্ট নীড়!
হেথায় বেদনা মা-হারা শিশুর, শুধু বিধবার ভিড়!
কোন্ যেন এক সুদূর আকাশ গোধূলিলোকের তীর
কাজের বেলায় ডাকিছে আমারে, ডাকে অকাজের মাঝে!

Categories
অনলাইন প্রকাশনা কবিতা বিনোদন ভালবাসা/প্রণয়লীলা সৃজনশীল প্রকাশনা

অস্তচাঁদে

অস্তচাঁদে
—জীবনানন্দ দাশ
ভালোবাসিয়াছি আমি অস্তচাঁদ, -ক্লান্ত শেষপ্রহরের শশী!
-অঘোর ঘুমের ঘোরে ঢলে যবে কালো নদী-ঢেউয়ের কলসী,
নিঝ্ঝুম বিছানার পরে
মেঘবৌ’র খোঁপাখসা জোছনাফুল চুপে চুপে ঝরে,-
চেয়ে থাকি চোখ তুলে’-যেন মোর পলাতকা প্রিয়া
মেঘের ঘোমটা তুলে’ প্রেত-চাঁদে সচকিতে ওঠে শিহরিয়া!
সে যেন দেখেছে মোরে জন্মে জন্মে ফিরে’ ফিরে’ ফিরে’
মাঠে ঘাটে একা একা, -বুনোহাঁস-জোনাকির ভিড়ে!
দুশ্চর দেউলে কোন্-কোন্ যক্ষ-প্রাসাদের তটে,
দূর উর-ব্যাবিলোন-মিশরের মরুভূ-সঙ্কটে,
কোথা পিরামিড তলে, ঈসিসের বেদিকার মূলে,
কেউটের মতো নীলা যেইখানে ফণা তুলে উঠিয়াছে ফুলে,
কোন্ মনভুলানিয়া পথচাওয়া দুলালীর মনে
আমারে দেখেছে জোছনা-চোর চোখে-অলস নয়নে!
আমারে দেখেছে সে যে আসরীয় সম্রাটের বেশে
প্রাসাদ-অলিন্দে যবে মহিমায় দাঁড়ায়েছি এসে-
হাতে তার হাত, পায়ে হাতিয়ার রাখি
কুমারীর পানে আমি তুলিয়াছি আনন্দের আরক্তিম আঁখি!
ভোরগেলাসের সুরা-তহুরা, ক’রেছি মোরা চুপে চুপে পান,
চকোরজুড়ির মতো কুহরিয়া গাহিয়াছি চাঁদিনীর গান!
পেয়ালায়-পায়েলায় সেই নিশি হয় নি উতলা,
নীল নিচোলের কোলে নাচে নাই আকাশের তলা!
নটীরা ঘুমায়েছিল পুরে পুরে, ঘুমের রাজবধূ-
চুরি করে পিয়েছিনু ক্রীতদাসী বালিকার যৌবনের মধু!
সম্রাজ্ঞীর নির্দয় আঁখির দর্প বিদ্রূপ ভুলিয়া
কৃষ্ণাতিথি-চাঁদিনীর তলে আমি ষোড়শীর উরু পরশিয়া
লভেছিনু উল্লাস-উতরোল!-আজ পড়ে মনে
সাধ-বিষাদের খেদ কত জন্মজন্মান্তের, রাতের নির্জনে!

আমি ছিনু ‘ক্রবেদুর’ কোন্ দূর ‘প্রভেন্স্’-প্রান্তরে!
-দেউলিয়া পায়দল্-অগোচর মনচোর-মানিনীর তরে
সারেঙের সুর মোর এমনি উদাস রাত্রে উঠিত ঝঙ্কারি!
আঙুরতলায় ঘেরা ঘুমঘোর ঘরখানা ছাড়ি
ঘুঘুর পাখনা মেলি মোর পানে আসিল পিয়ারা;
মেঘের ময়ূরপাখে জেগেছিল এলোমেলো তারা!
-‘অলিভ’ পাতার ফাঁকে চুন চোখে চেয়েছিল চাঁদ,
মিলননিশার শেষে-বৃশ্চিক, গোক্ষুরাফণা, বিষের বিস্বাদ!

স্পেইনের ‘সিয়েরা’য় ছিনু আমি দস্যু-অশ্বারোহী-
নির্মম-কৃতান্ত-কাল-তবু কী যে কাতর, বিরহী!
কোন্ রাজনন্দিনীর ঠোঁটে আমি এঁকেছিনু বর্বর চুম্বন!
অন্দরে পশিয়াছিনু অবেলার ঝড়ের মতন!
তখন রতনশেজে গিয়েছিল নিভে মধুরাতি,
নীল জানালার পাশে-ভাঙা হাটে-চাঁদের বেসাতি।
চুপে চুপে মুখে কার পড়েছিনু ঝুঁকে!
ব্যাধের মতন আমি টেনেছিনু বুকে
কোন্ ভীরু কপোতীর উড়ু-উড়ু ডানা!
-কালো মেঘে কেঁদেছিল অস্তচাঁদ-আলোর মোহানা!

বাংলার মাঠে ঘাটে ফিরেছিনু বেণু হাতে একা,
গঙ্গার তীরে কবে কার সাথে হয়েছিল দেখা!
‘ফুলটি ফুটিলে চাঁদিনী উঠিলে’ এমনই রূপালি রাতে
কদমতলায় দাঁড়াতাম গিয়ে বাঁশের বাঁশিটি হাতে!
অপরাজিতার ঝাড়ে- নদীপারে কিশোরী লুকায়ে বুঝি!-
মদনমোহন নয়ন আমার পেয়েছিল তারে খুঁজি!
তারই লাগি বেঁধেছিনু বাঁকা চুলে ময়ূরপাখার চূড়া,
তাহারই লাগিয়া শুঁড়ি সেজেছিনু-ঢেলে দিয়েছিনু সুরা!
তাহারই নধর অধর নিঙাড়ি উথলিল বুকে মধু,
জোনাকির সাথে ভেসে শেষরাতে দাঁড়াতাম দোরে বঁধু!
মনে পড়ে কি তা!-চাঁদ জানে যাহা, জানে যা কৃষ্ণাতিথির শশী,
বুকের আগুনে খুন চড়ে-মুখ চুন হয়ে যায় একেলা বসি!

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গবেষণামূলক প্রকাশনা চিকিত্সাশাস্ত্র এবং বিজ্ঞান বিজ্ঞান বিনোদন বিবর্তন

মানুষের কোন নিষ্ক্রিয় অঙ্গ নেই

মানুষের কোন নিষ্ক্রিয় অঙ্গ নেই

 

দাবীটি ভ্রান্ত। মনবদেহে অজস্র নিষ্ক্রিয় অঙ্গের (vestigial organ) অস্তিত্ব আছে, যেগুলো একসময় আমাদের পূর্বপুরুষদের কাজে লাগলেও এখন আর লাগে না। এখন এগুলো একান্ত অবান্তর। মানুষের দেহেই এমন শতাধিক বিলুপ্তপ্রায় অঙ্গাদির অস্তিত্ব আছে।

 

১) এপেনডিক্স

ভারমিফর্ম এপেনডিক্স আসলে সিকাম নামক একটি অঙ্গের অবশিষ্টাংশ, যা মূলত তৃণভোজী প্রাণীদের দেহে অবস্থিত থাকে এবং এই অঙ্গে বসবাসকারী ব্যাক্টেরিয়াগুলো উদ্ভিদ কোষের সেলুলোস প্রভৃতি উপাদান পরিপাকে সাহায্য করে। এই অঙ্গ মূলত সেসব মাংসাশী প্রাণীর দেহে পাওয়া যায় যারা একটু হলেও উদ্ভিদ ভক্ষণ করে।মানুষের তৃণভোজী পূর্বপুরুষেরা এই অঙ্গকে উদ্ভিদ হজম করার কাজে ব্যবহার করত। প্রাচীন নরবানর যেমন অস্ট্রালোপিথেকাস রবাস্টাস তৃণ সহ সেলুলোজ জাতীয় খাদ্য প্রচুর পরিমাণে গ্রহণ করত। এখনো শিম্পাঞ্জীরা মাংশাসী নয়। কিন্তু মানুষ খাদ্যাভাস বদল করে লতা পাতার পাশাপাশি একসময় মাংশাসী হয়ে পড়ায় দেহস্থিত এই অংগটি ধীরে ধীরে একসময় অকেজো এবং নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। তাই এখন অ্যাপেন্ডিক্স আমাদের কাজে না লাগলেও রেখে দিয়ে গেছে আমাদের জন্য ‘বিবর্তনের সাক্ষ্য’। এটি এখন আমাদের কোন উপকারে আসে না, বরং, এপেন্ডিক্সের প্রদাহজনিত এপেন্ডিসাইটিস রোগের বড় উস হচ্ছে এই এপেন্ডিক্স। গবেষণায় দেখা গেছে যে, এপেন্ডিক্স নামের প্রত্যঙ্গটি না থাকলে মানুষের কোন সমস্যা হয় না। কিন্তু এপেন্ডিক্স থাকলে সারা জীবনে অন্ততঃ ৭% সম্ভাবনা থেকে যায় এপেন্ডিসাইটিসে আক্রান্ত হবার।

চিত্রঃ অ্যাপেন্ডিক্স দেহের কোনই কাজে লাগে না, বরং বর্তমানে অ্যাপেন্ডিসাইটিস রোগের বড় উসই হল এই অ্যাপেন্ডিক্স।

 

২) পুচ্ছ অস্থি

Coccyx অথবা পুচ্ছ অস্থি হারানো লেজের অবশিষ্টাংশ। প্রত্যেক স্তন্যপারী প্রাণীরই তাদের বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ার কোন না কোন পর্যায়ে এই লেজ ধারণ করে; মানুষের এমব্রায়োজেনেসিসে ১৪ থেকে ২২তম পর্যায়ে ৪ সপ্তাহ ধরে মানবভ্রুণে এই লেজ পরিলক্ষিত হয়। ৩১-৩৫ দিন বয়স্ক মানবভ্রুণে এই লেজ সবচেয়ে সুপ্রত্যক্ষ হয়।  মানবদেহের মেরুদন্ডের একদম নীচে থেকে যাওয়া  এই হাড়টি আমাদের কোন কাজেই আসে না। আমাদের আদি প্রাইমেট পূর্বপুরুষেরা গাছের ডালে ঝুলে ভারসাম্য বজায় রাখার কাজে একে ব্যবহার করত।  মানুষের জন্য এটি এখন আর ভারসাম্য রক্ষা আর চলিষ্ণুতার কাজে ব্যবহৃত হয় না, তবে পেশির সাথে হাড়ের সংযুক্তি স্থাপনের স্থান হওয়ার কারণেই হয়ত এই অস্থিটির আর অধঃপতন ঘটেনি।

পুচ্ছ অস্থি ছাড়াও, লেজবিশিষ্ট মানব শিশু প্রকৃতিতে মাঝে মধ্যেই জন্ম নিতে দেখা যায়। এটা বিবর্তনের কারনেই ঘটে। কারণ, কোন অংগ লুপ্ত হয়ে গেলেও জনপুঞ্জের জীনে ফেনোটাইপ বৈশিষ্ট্য হিসেবে ডিএনএ সেই তথ্য রেখে দেয়। তার পুনঃপ্রকাশ ঘটতে পারে বিরল কিছু ক্ষেত্রে। ব্যপারটিকে বিবর্তনের পরিভাষায় বলে । ১৮৮৪ সাল থেকে চিকিসা সাহিত্যে এরকম তেইশটি ঘটনা প্রতিবেদিত হয়েছে।

চিত্রঃ মানবদেহের মেরুদন্ডের একদম নীচে থেকে যাওয়া  এই হাড়টি আমাদের কোন কাজেই আসে না।

৩) আঁক্কেল দাঁত

আঁক্কেল দাঁত মানুষের পূর্বপুরুষেরা উদ্ভিদ কলা চর্বণে ব্যবহার করত।সাধারণত বলা হয়ে থাকে যে মানুষের পূর্বপুরুষের বহু দন্ত বিশিষ্ট দীর্ঘকায় চোয়াল ছিল, উদ্ভিদ কোষের সেলুলোস হজমের দুর্বলতার জন্য এই বড় বড় চোয়াল খেসারত দিত। মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তিত হলে প্রাকৃতিক নির্বাচন ছোট চোয়ালকেই নির্বাচিত করেছিল, তবুও এই বাড়তি দাঁতগুলো এখনো বিদ্যমান রয়ে গিয়েছে।

৪) কান নাড়ানোর পেশী

Macaque বানর সহ অনেক বানরের কর্ণপেশী মানুষের থেকে উন্নত, তাই তারা তাদের কান নাড়িয়ে সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সাবধানতা অবলম্বন করতে পারে। মানুষ, ওরাংওটাং এবং শিম্পাঞ্জীর মত অন্য প্রাইমেটদের কর্ণপেশী যসামান্য উন্নত এবং অকার্যকর।যে পেশী কর্ণের সাথে যুক্ত কিন্তু কান নাড়াতে পারে না, সেই পেশী নিঃসন্দেহে অকার্যকর। মানুষের ক্ষেত্রে কেউ কেউ বিবর্তনীয় ধারাবাহিকতায় বিলুপ্তপ্রায় অঙ্গের প্রমাণ হিসেবে তাদের কান যেকোন দিকে নাড়াতে পারেন। যেমন, বাংলাদেশের কৌতুক শিল্পী রবিউল কান নাড়াতে পারতেন।   এ ছাড়া প্রাইমেটের একটি নতুন বৈশিষ্ট্য বিবর্তিত হয়েছে আর সেটা হল  আণুভূমিক তলে মাথা ঘোরানোর ক্ষমতা।এক কাঠামোর কাজ এভাবেই আরেক কাঠামোর কাছে হস্তান্তরিত হয়।

৫) চোখের নিক্টিটেটিং ঝিল্লি

চোখের ভেতরে এক কোণায় plicasemilunarisনামক একটি পেঁচানো কলা রয়েছে। এটা nictitating     membrane বা “তৃতীয় নেত্রপল্লব” এর অবশিষ্টাংশ যা পাখি, সরিসৃপ ও মস্যের চোখে উপস্থিত রয়েছে।এই ঝিল্লি দৃষ্টিশক্তিকে অক্ষুন্ন রেখেই চোখকে রক্ষা করে ও আর্দ্র করে।এটা স্তন্যপায়ীদের মধ্যে খুবই দুর্লভ, প্রধানত মনোট্রিম এবং মারসুপিয়ালদের মধ্যে পাওয়া যায়। এর সাথে সংযুক্ত পেশিগুলোও অবশিষ্টাংশ। আফ্রিকান ও আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ানদের plicasemilunarisঅন্যদের থেকে খানিকটা বড়। শুধুমাত্র  CalabarAngwantibo প্রজাতির প্রাইমেটদের কার্যকরি নিক্টিটেটিং ঝিল্লি রয়েছে।

৬) পুরুষের স্তনবৃন্ত

স্তন এবং স্তনবৃন্ত মূলতঃ দরকার মেয়েদের। পুরুষদের এটা কোন কাজে আসে না। অথচ সকল পুরুষদের দেহে বিবর্তনের সাক্ষ্য হিসবে রয়ে গেছে স্তনবৃন্তের চিহ্ন।

৭) পুরুষদের ইউটেরাস

পুরুষদেহের অভ্যন্তরে সুপ্ত এবং অব্যবহার্য অবস্থায় স্ত্রী-জননতন্ত্রের অস্তিত্ব আছে।

৮) ঘ্রাণসংক্রান্ত

শিকারী প্রাণীদের হাত থেকে পালানো এবং খাদ্য অনুসন্ধানের জন্য ঘ্রাণশক্তি অনেক প্রাণীর কাছে প্রয়োজনীয় হলেও মানুষের জন্য তা তেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ না, মানুষকে খুব কম সময়ই শিকারী প্রাণী নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়েছে এবং প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ কৃষিকাজের মাধ্যমে খাদ্য আহরণ করে এসেছে। ঘ্রাণের প্রতি সংবেদনশীলতা মানুষ থেকে মানুষে ভিন্ন হয়, যা সাধারণত অবশিষ্টাংশ বৈশিষ্ট্যগুলোর ক্ষেত্রে ঘটে। দক্ষিণ আমেরিকা, আমেরিকান ইন্ডিয়ান এবং আফ্রিকান মানুষদের ঘ্রাণশক্তি অনেক তীব্র, অনেকে অন্ধকারে গায়ের গন্ধ দিয়ে পরিচয় শনাক্ত করতে পারে। ঘ্রাণশক্তিকে অবশ্যই অবশিষ্টাংশ বলা যায় না কারণ এটি মানুষকে বিষাক্ত গ্যাসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে, তবে এত উন্নত ঘ্রাণশক্তি আসলেই মানুষের দরকার নেই। এখানে লক্ষণীয় যে কোন বৈশিষ্ট্য উপকারী হওয়া সত্ত্বেও তা ধীরে ধীরে মলিন হয়ে যেতে পারে যদি তার সাথে সংস্লিষ্ট জিনগুলোর উপর কোন নির্বাচনী চাপ কাজ না করে।

৯) ব্যবহার সংক্রান্ত : লোমকূপ ফুলে ওঠা কিংবা হিক্কা তোলা

মানুষের মধ্যে কিছু ভেসটিজিয়াল ব্যবহার এবং প্রতিবর্তী ক্রিয়া রয়েছে। শীতে বা ভয়ে আমাদের শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে। তখন আমাদের দেহের লোমকূপ ফুলে ওঠে। আমাদের পূর্বপুরুষেরা তাদের গায়ের কেশর, লোম বা পালক ফুলিয়ে বিপদ থেকে আত্মরক্ষা করার উপায় খুঁজত। এই আলামত বিবর্তনের কারণেই আমাদের মধ্যে রয়ে গেছে।

চাপের মধ্যে থাকলে মানুষের রোম খাড়া হয়ে যায়, যা আসলে একটা অবশিষ্টাংশ প্রতিবর্তী ক্রিয়া। মানুষের রোমশ পূর্বপুরুষ লোম খাড়া করলে তাদেরকে বিকটাকার ও ভয়ংকর দেখাত, এতে করে শিকারী প্রাণীরা সহজেই ভয় পেয়ে যেত। লোম খাড়া করে বাড়তি বায়ুর স্তর আটকে ফেলা যায়, এতে করে দেহকে গরম রাখা যায়। মানুষের শরীরে লোম যেহেতু অনেক কম, তাই ঠান্ডা লাগলে লোম খাড়া হয়ে যাওয়াটাকে অবশিষ্টাংশ বলা যায়।

Palmer grasp reflexকে মানবশিশুদের অবশিষ্টাংশ প্রতিবর্তী ক্রিয়া বলা হয়। মানবশিশু হাতের কাছে যাই পায় তাই ব্যাপক শক্তির সাথে আকড়ে ধরে।১৯৩২ সালের একটি গবেষণা মতে ৩৭% শিশু রড থেকে ঝুলতে পারে, যে কাজটা একজন পূর্ণ  বয়স্ক মানুষের সম্পন্ন করতে বেশ অনুশীলন করা লাগে। এসব শিশুরা কিন্তু তাদের মায়ের শরীর আঁকড়ে ধরতে ব্যর্থ হয়। এই আঁকড়ে ধরার প্রবনতাটা পায়ের মধ্যেও লক্ষিত হয়। শিশুরা যখন বসে থাকে, তাদের পরিগ্রাহী পা প্রাপ্তবয়স্ক শিম্পাঞ্জীদের মত ভেতর দিকে বেঁকানো অবস্থায় থাকে। প্রাচীন পূর্বপুরুষদের গায়ে আঁকড়ে ধরার মত যথেষ্ট লোম ছিল যার কারণে মা শিকারীদের হাত থেকে পালানোর সময় শিশুটি ঠিকই তাকে আঁকড়ে ধরে রাখতে পারত।

শুধু রোমকূপ ফুলে ওঠা কিংবা শিশুদের হাতের রিফ্লেক্সই নয়, বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন আমরা যে খাবার দ্রুত খেতে গিয়ে অনেক সময়ই হিক্কা তুলি সেটাও আসলে আমরা মস জাতীয় পূর্বপুরুষ থেকে বিবর্তিত হয়েছি তার একটি উজ্জ্বল সাক্ষ্য।  সেই ব্যাপারটিই স্পষ্ট করেছেন অধ্যাপক নীল সুবিন তার সায়েন্টিফিক আমেরিকানে লেখা ‘দিস ওল্ড বডি’ (জানুয়ারি, ২০০৯) নামের একটি প্রবন্ধে।

চিত্রঃ দ্রুত খেতে গিয়ে অনেক সময়ই হিক্কা তুলি সেটা আসলে  মস জাতীয় পূর্বপুরুষের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

১০) বিলুপ্তপ্রায় বংশগতীয় ধারা

মানুষের মধ্যে এখনও অনেক অবশিষ্টাংশ আণবিক কাঠামো রয়েছে যা এখন অকার্যকর হলেও অন্য প্রজাতির সাথে সাধারণ উত্তরসূরিতা নির্দেশ করতে পারে। উদাহরণস্বরুপ, L-gulonolactone oxidase জিনটি বেশিরভাগ স্তন্যপায়ীদের  মধ্যে কার্যকর, এটি একটি  এনজাইম উপন্ন করে যা ভিটামিন সিকে সংশ্লেষ করে। মানুষ এবং অন্যসব প্রাইমেটদের মধ্যে একটি পরিব্যক্তি(mutation) এই জিনটিকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। জিনটার অবশিষ্টাংশ মানব জিনোমে “ছদ্মজিন” নামক এক বিলুপ্তপ্রায় বংশগতীয় ধারা (ভেসটিজিয়াল জেনেটিক সিকোয়েন্স)  হিসেবে বিদ্যমান রয়ে গিয়েছে।

উপরে উল্লিখিত অঙ্গগুলোর বাইরেও  মানব দেহে বহু বিলুপ্তপ্রায় অঙ্গের অস্তিত্ব রয়েছে। Robert Wiedersheim ১৮৯৩ সালে মানবদেহে ৮৬টি বিলুপ্তপ্রায় অঙ্গ শনাক্ত করে The Structure of Man: an index to his past history শিরোনামের একটি বই প্রকাশ করেন। বিলুপ্তপ্রায় অঙ্গগুলো বিবর্তনের পক্ষে অত্যন্ত জোরালো সাক্ষ্য।

 

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গবেষণামূলক প্রকাশনা বিজ্ঞান বিনোদন বিবর্তন

যদি বানর সদৃশ জীব থেকে একসময় মানুষের বিবর্তন ঘটে থাকে তাহলে এখন কেনো তা আর ঘটছে না?

যদি বানর সদৃশ জীব থেকে একসময়  মানুষের বিবর্তন ঘটে থাকে তাহলে এখন  কেনো তা আর ঘটছে না?

 

অনেক বিবর্তনই মিউটেশনের মত আকষ্মিক প্রক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল। আবার শুধু মিউটেশন বা জেনেটিক রিকম্বিনেশনের মত ব্যাপারগুলো তো ঘটলেই হবে না, তাকে আবার নির্দিষ্ট কোন সময়ের পরিবেশে সেই জীবকে টিকে থাকার জন্য বাড়তি সুবিধা যোগাতে হবে যার ফলে তা সমস্ত জিন পুল বা জনসমষ্টিতে ছড়িয়ে পড়তে পারবে। যেমন, প্রায় ৬০-৮০ লক্ষ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষের মধ্যে যে মিউটেশন বা পরিব্যক্তিগুলো ঘটেছিল এবং তার ফলে সেই সময়ের পরিবেশের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের যেভাবে বিবর্তন হয়েছিলো তা আবার একইভাবে ঘটা এবং তার সাথে সাথে পারিপার্শ্বিকতাসহ অন্যান্য সবগুলো ফ্যাক্টরের সংযোগ বা সমন্বয় আবার একই রকমভাবে হওয়া প্রায় অসম্ভব। এজন্যই বিখ্যাত বিবর্তনবিদ বিজ্ঞানী জে. গুলড তার ‘ওয়ান্ডারফুল লাইফ’ বই তে বলেছিলেন যে, বিবর্তনের টেপটি যদি রিওয়াইন্ড করে আবার নতুন করে চালানো হয় তাহলে ফলাফল কখনই এক হবে না।  অনেকেই জানেন, বিজ্ঞানী ল্যাপ্লাস সেই আঠারো শতকের শেষ দিকে আস্থার সাথে ডিটারমিনিজম বা নিশ্চয়তাবাদের পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন; তিনি বলেছিলেন, প্রতিটি কণার অবস্থান ও গতি সংক্রান্ত তথ্য যদি  জানা যায়, তবে ভবিষ্যতের দশা সম্বন্ধে আগেভাগেই ভবিষ্যদ্বাণী করা যাবে। কিন্তু বৈশ্বিক জটিলতার প্রকৃতি (nature of universal complexity) তাঁর সে উচ্চাভিলাসী স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দেয়। ইতিহাসের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অনাকাংক্ষিত বিশৃংখলা আর অভূতপূর্ব জটিলতা যার ফলশ্রুতিতে প্রতি মিনিটেই জন্ম নেয় নানা ধরনের নাটকীয় অনিশ্চয়তা।  কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর প্রকৃতি পরিবেশ যে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে তার চিহ্ন আমরা পরিষ্কারভাবে দেখতে পাই প্রকৃতির এবং জীবের বিবর্তনের ইতিহাসে, এটি সত্য, কিন্তু এই প্রাকৃতিক পরিবর্তনগুলো যদি অন্যভাবে ঘটতো তাহলে জীবের বিবর্তনের ধারাও যে অন্যরকম হত তাতে কোন সন্দেহই নেই।  মানুষের উৎপত্তির ব্যাপারটাই ধরা যাক। এটি সৌভাগ্যপ্রসূত হাজার খানেক ঘটনার সমন্বয় ছাড়া কখনই ঘটতে পারতো না। ঘটনাগুলো যদি অন্যরকম ভাবে ঘটতো, তাহলে হয়তো শেষ পর্যন্ত এ পৃথিবীতে কোন ‘মানবীয় সত্ত্বা’র উন্মেষ ঘটতো না। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি ঘটনা পর্যালোচনা করা যাক:

 

(ক) আমাদের পূর্বসূরী বহুকোষী জীবগুলো যদি ৫৩ কোটি বছর আগে ক্যাম্বরিয়ান বিস্ফোরণের সময় উত্তপ্ততা আর তেজস্ক্রিয়তাসহ নানা উৎপাত সহ্য করে টিকে না থাকতো,  তবে হয়তো পরবর্তীতে কোন মেরুদন্ডী প্রাণীর জন্ম হত না।

 

(খ)  সেই লোব ফিন বিশিষ্ট মাছগুলো যারা দেহের কেন্দ্রীয় অক্ষ বরাবর নিজস্ব ওজনকে বহন করার ক্ষমতা রাখে, সেগুলোর বিবর্তন এবং বিকাশ না ঘটলে মেরুদন্ডী প্রাণীগুলোর ডাঙ্গায় উঠে আসা সম্ভব হতো না। আবার সেই সময়ে যদি তাপমাত্রার ওঠানামার এবং বরফ যুগ শুরু হওয়ার ফলে পানির উচ্চতা কমে না যেত তাহলে হয়তো ডাঙ্গার প্রাণীগুলোর বিকাশ এভাবে ঘটতে পারতো না।

 

(গ)  সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে এক বিশাল উল্কাপিন্ড পৃথিবীতে আছড়ে পরে বিশালাকার ডায়নোসরগুলোর অবলুপ্তির কারণ না ঘটাতো, তাহলে হয়ত সেই সময়ের নগন্য স্তন্যপায়ী জীবগুলো আর বিকশিত হওয়ার সুযোগ পেত না, বরং ডায়নোসরদের প্রবল প্রতাপের সাথে প্রতিযোগিতা করে বিকশিত হবার সুযোগ পেত না।

 

(ঘ) যদি আফ্রিকার গহীন অরণ্যে বিশ থেকে চল্লিশ লক্ষ বছর আগে আমাদের পুর্বপুরুষের দেহের ভিতরে পরিবর্তন না ঘটতো এবং সেই পরিবর্তনগুলোকে টিকিয়ে রাখার জন্য তারা তখনকার সেই পরিবেশগত সুবিধাগুলো না পেত, তাহলে হয়তো তারা দু’পায়ের উপর ভর করে দাঁড়াবার আর চলবার মত সুগঠিত হতে পারত না,  আজকে মানুষের বিবর্তনও ঘটতো না, আমরাও আজকে আর এখানে থাকতাম না।

 

কাজেই দেখা যাছে পুরো মানব বিবর্তনটিই দাড়িয়ে আছে অনেকগুলো আকষ্মিক ঘটনার সমন্নয়ে।  বিবর্তনের পুরো প্রক্রিয়াটা আবার প্রথম থেকে চালানো গেলেও সে ‘দৈবাৎ ঘটে যাওয়া’ ঘটনাগুলো একের পর এক ঘটবেই, এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারেনা।

Sources:

# Stephen Jay Gould, Wonderful Life: The Burgess Shale and the Nature of History, W. W. Norton & Company, 1990

# Gould, SJ, 1994, The evolution of life on earth, Scientific American, October issue.

# বন্যা আহমেদ, বিবর্তনের পথ ধরে, অবসর, ২০০৭ (পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত ২০০৮), পৃষ্ঠা ২৩৩

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গবেষণামূলক প্রকাশনা চিকিত্সাশাস্ত্র এবং বিজ্ঞান প্রকৌশল ও বিজ্ঞান বিজ্ঞান বিনোদন বিবর্তন

তেজস্ক্রিয় ডেটিং দিয়ে কীভাবে ফসিলের সঠিক বয়স নির্ধারণ করা যায়?

তেজস্ক্রিয় ডেটিং দিয়ে কীভাবে ফসিলের সঠিক বয়স নির্ধারণ করা যায়?  

 

 

সুনির্দিষ্টভাবে সময় নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন একধরণের ভূতাত্ত্বিক ঘড়ির, যা আমাদেরকে বলে দিবে পৃথিবীর বিভিন্ন শিলাস্তরের কবে তৈরি হয়েছিলো আর কোন প্রাণী বা উদ্ভিদের ফসিলটির বয়সই বা কত। আর বিজ্ঞানীরা সেটাই খুঁজে পেলেন বিভিন্ন ধরণের তেজস্ক্রিয় (Radioactive) পদার্থের মধ্যে, এই ভূতাত্ত্বিক ঘড়িগুলোকে বলা হয় রেডিওমেট্রিক ঘড়ি। কারণ, তারা প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয়তার মাপ থেকে আমাদেরকে সময়ের হিসেব বলে দেয়। পদার্থের তেজস্ক্রিয়তার ব্যাপারটা ঠিকমত বুঝতে হলে আমাদেরকে একটু জীববিদ্যার আঙিনা পেরিয়ে পদার্থবিদ্যা ও রসায়নবিদ্যার উঠোনে পা রাখতে হবে। আধুনিক বিজ্ঞান আজকে এমনি এক অবস্থায় চলে এসেছে যে, তার এক শাখা আরেক শাখার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে, কোন এক শাখার মধ্যে গণ্ডিবদ্ধ থেকে পুরোটা বোঝা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে যাই হোক, চলুন দেখা যাক, এত যে আমরা অহরহ তেজস্ক্রিয়তা, তেজস্ক্রিয় ক্ষয় (Radioactive decay) অথবা রাসায়নিক বা নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার কথা শুনি তার মুলে আসলে কি রয়েছে। চট করে, খুব সংক্ষেপে, একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক অণু পরমাণুর গঠন এবং তাদের মধ্যে ঘটা বিভিন্ন বিক্রিয়া এবং তেজস্ক্রিয়তার মূল বিষয়টির উপর।

 

উনবিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্তও কিন্তু আমরা ভেবে এসেছি যে, কোন পদার্থের পরমাণু অবিভাজ্য, তাকে আর কোন মৌলিক অংশে ভাগ করা যায় না। একশোটির মত মৌলিক পদার্থ রয়েছে – লোহা, সোনা, অক্সিজেন, ক্লোরিন বা হাইড্রোজেনের মত মৌলিক পদার্থগুলোর পরমাণুই হচ্ছে তার সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম অংশ, একে আর ছোট অংশে ভেঙ্গে ফেলা সম্ভব নয়। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান আমাদেরকে নিয়ে গেছে জ্ঞানের এক নতুন দিগন্তে। আমরা এখন জানি যে, প্রত্যেকটি মৌলিক পদার্থের পরমাণুই ইলেকট্রন, প্রোটন এবং নিউট্রনের সমন্বয়ে তৈরি। পরমাণুর মাঝখানে কেন্দ্রে রয়েছে নিউক্লিয়াস যা প্রোটন এবং নিউট্রনের সমন্বয়ে তৈরি আর তার চারপাশের অক্ষে ঘুরছে ইলেকট্রনগুলো। নিউট্রনের কোন চার্জ নেই, সে নিরপেক্ষ, ইলেকট্রন ঋণাত্মক আর প্রোটন ধনাত্মক চার্জবিশিষ্ট। সাধারণতঃ একটি পরমাণুতে ইলেকট্রন, প্রোটনের সংখ্যা  সমান থাকে বলে তাদের ধনাত্মক এবং ঋণাত্মক চার্জ কাটাকাটি হয়ে তার মধ্যে নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। মৌলিক পদার্থগুলোর বৈশিষ্ট্যের মধ্যে আমরা যে  আকাশ পাতাল পার্থক্য দেখি তার কারণ আর কিছুই নয়, তাদের পরমাণুর ভিতরে  ইলেকট্রন, প্রোটন এবং নিউট্রনের সংখ্যার তারতম্য। অর্থাৎ সোনার পরমাণু বা নিউক্লিয়াস কিন্তু সোনা দিয়ে তৈরি নয়, তাদের মধ্যে সোনার কোন নাম গন্ধও নেই। অক্সিজেন বা হাইড্রোজেন বলুন, সোনা বলুন, রূপা বলুন, হেলাফেলা করা তামা বা সীসাই বলুন সব মৌলিক পদার্থই এই তিনটি মুল কণা, ইলেকট্রন, প্রোটন এবং নিউট্রনের সমন্বয়েই গঠিত। লোহার সাথে সোনার পার্থক্যের কারণ এই নয় যে তার নিউক্লিয়াস সোনার মত দামী বা চকচকে কণা দিয়ে তৈরি! এর কারণ তাদের পরমাণুর ভিতরে এই মুল কণাগুলোর সংখ্যার পার্থক্য- সোনার নিউক্লিয়াসে রয়েছে ৭৯টি প্রোটন এবং ১১৮টি নিউট্রন; আর ওদিকে লোহার নিউক্লিয়াসে রয়েছে ২৬টি প্রোটন এবং ৩০টি নিউট্রন। একই ধরণের ব্যাপার দেখা যায় আমাদের ডিএনএ-এর গঠনের ক্ষেত্রেও। মানুষ, ঘোড়া, ফুলকপি বা আরশোলার জিনের উপাদানে তাদের আলাদা আলাদা কোন বিশেষ বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া যাবে না, তারা সবাই ডিএনএ-এর সেই চারটি নিউক্লিওটাইডের (A=adenine, G= guanine, C=cytosine T=thymine) বিভিন্ন  রকমফেরে তৈরি।

চিত্র : পরমাণুর গঠন

আমাদের চারদিকে আমরা যে সব পদার্থ দেখি তার বেশীরভাগই যৌগিক পদার্থ, সাধারণভাবে বলতে গেলে বিভিন্ন মৌলিক পদার্থগুলোর মধ্যে ইলেকট্রন বিনিময়ের ফলে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমেই এই যৌগিক পদার্থগুলোর উৎপত্তি হয়। একটা ইলেকট্রন কণা শুষে নিয়ে একটা প্রোটন কণা  নিউট্রনে পরিণত হয়ে যেতে পারে, আবার ঠিক উলটোভাবে একটা নিউট্রন তার ভিতরের একটি ঋণাত্মক চার্জ বের করে দিয়ে পরিণত হতে পারে প্রোটন কণায়। কিন্তু  শুনতে যতটা সোজা সাÌটা শোনাচ্ছে  ব্যাপারটা আসলে কিন্তু ঠিক সেরকম নয়। এ ধরণের পরিবর্তন সম্ভব শুধুমাত্র নিউক্লিয়ার বা পারমাণবিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে। এর জন্য প্রয়োজন হয় বিশাল পরিমাণ শক্তির, আর তাই যে কোন পারমাণবিক বিক্রিয়া থেকে যে শক্তি নির্গত হয় তার সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়ার কোন তুলনাই করা সম্ভব নয়। সাধারণ বোমার চেয়ে নিউক্লিয়ার বোমা বহুগুণ শক্তিশালী। হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের ভয়াবহতা তাই আমাদেরকে স্তম্ভিত করে দেয়। নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার ফলে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের গঠন বদলে যায়, কিন্তু রাসায়নিক বিক্রিয়ায় নিউক্লিয়াসের কোন পরিবর্তন ঘটে না। আর ঠিক এ কারণেই সেই আরবীয় আ্যলকেমিষ্টরা বহু শতকের চেষ্টায়ও অন্য ধাতুকে সোনায় পরিণত করতে পারেননি, কারণ এর জন্য প্রয়োজন ছিলো নিউক্লিয়ার বিক্রিয়ার। প্রায় হাজার বছর আগে, সে সময়ে পরমাণুর গঠন বা পারমাণবিক বিক্রিয়ার কথা জানা না থাকায় তারা রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমেই মৌলিক ধাতুর পরিবর্তনের ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলেন যুগ যুগ ধরে ।

 

 

প্রত্যেকটি মৌলিক পদার্থের নিউক্লিয়াসেই নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রোটন কণা থাকে, আর নিউক্লিয়াসে প্রোটনের এই সংখ্যাকে বলে পারমাণবিক সংখ্যা (atomic number) যা দিয়ে মুলতঃ মৌলিক পদার্থের বেশীরভাগ রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারিত হয় (পরোক্ষভাবে একে ইলেকট্রনের সংখ্যাও বলা যেতে পারে কারণ  সাধারণভাবে পরামাণুর কক্ষ পথে বিপরীত চার্জবিশিষ্ট ইলেকট্রনের সংখ্যাও সমান থাকে)।  ইলেকট্রনের তুলনায় প্রোটন এবং নিউট্রনের ভার অপেক্ষাকৃত অনেক বেশী, তাই কোন পদার্থের ভর সংখ্যা (mass number) মাপা হয় তার প্রোটন এবং নিউট্রনের সংখ্যা দিয়ে। যেমন ধরুন, সাধারণত কার্বনের নিউক্লিউয়াসে ৬টি প্রোটন এবং ৬টি নিউট্রন থাকে, তাই তার ভর সংখ্যা  হচ্ছে ১২, একে বলে কার্বন-১২। সাধারণভাবে নিউক্লিউয়াসে নিউট্রনের সংখ্যা প্রোটনের সংখ্যার সমান বা কয়েকটা বেশী থাকে।  কিন্তু আবার কখনও কখনও কোন কোন পদার্থের নিউক্লিয়াসে সমান সংখ্যক প্রোটন থাকলেও তাদের বিভিন্ন ভার্শনের মধ্যে নিউট্রনের সংখ্যায় ভিন্নতা দেখা যায়। যেমন, কার্বন-১৩ এ রয়েছে ৭টি নিউট্রন আর কার্বন-১৪এ থাকে ৮টি নিউট্রন, যদিও তাদের প্রত্যেকেরই প্রোটনের সংখ্যা সেই ৬টিই। আর মৌলিক পদার্থগুলোর মধ্যে যখন প্রোটনের সংখ্যা সমান থাকে কিন্তু নিউট্রনের সংখ্যায় তারতম্য দেখা যায় তখন তাদেরকে বলা হয় আইসোটোপ (Isotope)।  তেজস্ক্রিয় ক্ষয় এবং তেজস্ক্রিয় ডেটিং বুঝতে হলে এই আইসোটোপের ব্যাপারটা ভালো করে বোঝা দরকার। এই আইসোটোপগুলোরই কোন কোনটা প্রকৃতিতে অস্থিত অবস্থায় থাকে এবং তারা ধীরে ধীরে ক্ষয়ের মাধ্যমে  নিজেদের নিউক্লিয়াসের গঠনের পরিবর্তনের মাধ্যমে আরেক মৌলিক পদার্থে রূপান্তরিত হয়। আইসোটোপের এই অস্থিরতারই আরেক নাম হচ্ছে ‘রেডিওআ্যকটিভিটি’ বা ’তেজস্ক্রিয়তা’। আর যে পদ্ধতিতে ক্ষয় হতে হতে তারা আরেক পদার্থে পরিণত হয় তাকেই বলে ‘তেজস্ক্রিয় ক্ষয়’।  যেমন ধরুন, সীসার ৪টি সুস্থিত,  কিন্তু ২৫টি অস্থিত আইসোটোপ আছে, আর এই ২৫টি অস্থিত আইসোটোপই হচ্ছে তেজস্ক্রিয় পদার্থ। আবার ইউরেনিয়ামের সবগুলো আইসোটোপই অস্থিত এবং তেজস্ক্রিয়। আর আমাদের এই পরম ডেটিং পদ্ধতির মুল চাবিকাঠিই হচ্ছে পদার্থের এই তেজস্ক্রিয় বৈশিষ্ট্য এবং তার ফলশ্রুতিতে ঘটা তেজস্ক্রিয় ক্ষয়।

 

 

এই তেজস্ক্রিয় ক্ষয় ঘটতে পারে বিভিন্নভাবে। আলফা এবং বেটা ক্ষয়ের কথা অনেক শুনি আমরা।   আলফা ক্ষয়ের সময় আইসোটোপটি একটা আলফা কণা (দু’টো প্রোটন এবং দু’টো নিউট্রনের সমন্বয়ে তৈরি এই আলফা কণা) হারায় তার নিউক্লিয়াস থেকে। অর্থাৎ তার ভরসংখ্যা ৪ একক কমে গেলেও  পারমাণবিক সংখ্যা বা প্রোটনের সংখ্যা কমছে মাত্র ২ একক। কিন্তু এর ফলাফল কি দাঁড়াচ্ছে? আর কিছুই নয়, নিউক্লিয়াসের গঠনের পরিবর্তন হয়ে আইসোটোপটি এক মৌলিক পদার্থ থেকে আরেক মৌলিক পদার্থে পরিণত হয়ে যাচ্ছে।

 

একটা উদাহরণ দিলে বোধ হয় ব্যাপারটা আরেকটু খোলাসা হবে – আলফা ক্ষয়ের ফলে ইউরেনিয়াম ২৩৮ (৯২ টি প্রোটন এবং ১৪৬ নিউট্রনের সমন্বয়ে তৈরি এই মৌলিক পদার্থটি) পরিণত হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন এক মৌলিক পদার্থ থোরিয়াম ২৩৪-এ (৯০ টি প্রোটন এবং ১৪৪ নিউট্রনের সমন্বয়ে তৈরি)। ওদিকে আবার বেটা ক্ষয়ের ক্ষেত্রে কিন্তু ঘটে আরেক ঘটনা। আইসোটোপের পরমাণু থেকে একটি ইলেকট্রন বের করে দিয়ে নিউক্লিয়াসের ভিতরের একটি নিউট্রন প্রোটনে পরিণত হয়ে যায়। আরও বিভিন্ন ধরণের প্রক্রিয়ায় তেজস্ক্রিয় ক্ষয় ঘটতে পারে। তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের মুলে রয়েছে বিভিন্ন আইসোটোপের ভিতরের নিউক্লিয়াসের গঠনের পরিবর্তন বা পারমাণবিক পরিবর্তন এবং তার ফলশ্রুতিতেই এক মৌলিক পদার্থ থেকে আরেক নতুন মৌলিক পদার্থে রূপান্তরিত হয় – এই ব্যাপারটা বোধ হয় এতক্ষণে আমাদের কাছে বেশ পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। আর যেহেতু ভূত্বকের বিভিন্ন শিলাস্তরে বিভিন্ন ধরনের আইসোটোপ পাওয়া যায় তাই এই তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে শিলা বা ফসিলের বয়স নির্ধারণ করা হয়। চলুন তাহলে দেখা যাক কিভাবে এই তেজস্ক্রিয় আইসোটোপগুলোকে ভূতাত্ত্বিক ঘড়ি হিসেবে ব্যবহার করে পৃথিবী এবং তার প্রাণের বিবর্তনের ধারাবাহিক ইতিহাসের চিত্রটিকে বিজ্ঞানীরা কালি কলমে পরিষ্কারভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন।

 

বিভিন্ন শিলার মধ্যে বিভিন্ন ধরণের খনিজ পদার্থ বিদ্যমান থাকে, আর এই খনিজ পদার্থের মধ্যেই থাকে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপগুলো। আধুনিক তেজস্ক্রিয় ডেটিং পদ্ধতিগুলোর মধ্যে ইউরেনিয়াম-সিরিজ ডেটিং বহুলভাবে ব্যবহৃত। তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়াম-২৩৮ ক্ষয় হতে হতে সীসা-২০৬ এ পরিণত হয় সুদীর্ঘ সাড়ে চারশো কোটি বছরে। এক এক করে, পূর্বনির্ধারিত একটি নির্দিষ্ট হারে এই তেজস্ক্রিয় আইসোটোপগুলো নতুন এক স্থিত এবং অতেজস্ক্রিয় পদার্থে পরিণত হয়ে যেতে থাকে। দীর্ঘ সময়ের বিস্তৃতিতে ঘটতে থাকলেও এই ক্ষয় কিন্তু ঘটে একটি সুনির্দিষ্ট হারে, আর সেখানেই লুকিয়ে রয়েছে আমাদের রেডিওমেট্রিক বা তেজস্ক্রিয় ডেটিং পদ্ধতির জীয়নকাঠি। অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য এই ক্ষয়ের হার মাপার জন্য আইসোটোপের হাফ-লাইফ বা অর্ধ-জীবন -এর হিসাবটি ব্যবহার করা হয়।  বিজ্ঞানীরা প্রথমে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে, কোন এক আইসোটোপের নমুনার পরমাণুর অর্ধেকাংশের ক্ষয় হয়ে যেতে কত সময় লাগবে তার হিসেবটা বের করে ফেলেন। আইসোটোপের অর্ধ-জীবনের ব্যাপারটা একটা উদাহরণের মধ্যমে ব্যাখ্যা করে দেখা যাক: ধরুন, কোন একটি তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ’ক’ -এর অর্ধ-জীবন এক লাখ বছর, সে ধীরে ধীরে তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের মাধ্যমে মৌলিক পদার্থ ‘ক‘ থেকে ‘খ’ এ পরিণত হয় এবং এক লাখ বছরের শুরুতে পরমাণুর সংখ্যা ছিলো ১০০০। এখন প্রথম এক লাখ বছর বা এক অর্ধ-জীবন পার করে দেওয়ার পর আমরা আইসোটোপটিকে কি অবস্থায় দেখতে পাবো? আইসোটোপ ‘ক’ -এর ১০০০ পরমাণুর অর্ধেক ৫০০ পরমাণু এখনও সেই আগের অবস্থা ‘ক’ তেই রয়ে গেছে আর বাকী অর্ধেক বা ৫০০ পরমাণু ’খ’তে পরিণত হয়ে গেছে।  তাহলে কি ২ লাখ বছর ’ক’ -এর সবটাই ‘খ’ তে পরিণত হয়ে যাবে? না, অর্ধ-জীবনের হিসেবের কায়দাটা বেশ সোজা হলেও ঠিক এরকম সরলরৈখিক নয়। দুই লাখ বছর পরে দেখা যাবে যে, ‘ক’ -এর অবশিষ্ট ৫০০ পরমাণুর অর্ধেক অর্থাৎ আরও ২৫০টি ‘খ’ তে পরিণত হয়ে ’খ’ -এর পরমাণুর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৫০ এ, আর তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের ফলশ্রুতিতে ‘ক’ তে এখন অবশিষ্ট রয়েছে ২৫০টি পরমাণু। তারপর তিন লাখ বছর পর ‘খ’ -এর পরমাণুর সংখ্যা এসে দাঁড়াবে ৮৭৫ এ। এখন ধরুন, তিন লাখ বছর পর আজকে এখানে দাঁড়িয়ে একজন বিজ্ঞানী খুব সহজেই বের করে ফেলতে পারবেন এই আইসোপটিসহ শিলাটির বয়স কত। আর তার জন্য তাকে জানতে হবে দু’টো তথ্য: আইসোটোপ ’ক’ -এর অর্ধ-জীবন কত (বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যেই তার বিস্তারিত তালিকা তৈরি করে রেখেছেন), আর  ওই শিলায় ‘ক’ এবং ‘খ’ -এর পরিমাণের আনুপাতিক হার কত।

 

 

ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি ইত্যাদির ফলশ্রুতিতে ভূপৃষ্ঠে লাভা নির্গত হয়। লাভা যে মুহূর্তে ঠাণ্ডা এবং শক্ত হয়ে কেলাসিত হতে শুরু করে,  তখন থেকেই ঘুরতে শুরু করে এই তেজস্ক্রিয় ঘড়ির কাঁটা। তখন থেকেই ক্রমাগতভাবে নির্দিষ্ট হারে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ এবং ক্ষয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়, নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে এই তেজস্ক্রিয় মৌলিক পদার্থগুলো রূপান্তরিত হতে শুরু করে আরও সুস্থিত অন্য কোন মৌলিক পদার্থে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া যখন চলতে থাকে তখন আংশিকভাবে রূপান্তরিত পদার্থটির অংশটিও শিলাস্তরে ভিতরেই রয়ে যায়। তাই এদের দু’টোর পরিমাণের আনুপাতিক হার নির্ধারণ করা কোন কঠিন কাজ নয়। যেমন ধরুন, পটাসিয়াম-৪০ যখন সুস্থিত আর্গন-৪০ এ পরিণত হতে থাকে, তখন আর্গন-৪০ লাভার কেলাসের মধ্যে গ্যাসের আকারে আটকে থাকে। বিভিন্ন শিলার মধ্যে বহুল পরিমাণে পটাসিয়াম-আর্গন পাওয়া যায় বলে বিজ্ঞানীরা বহুলভাবে পটাসিয়াম-আর্গন ডেটিং পদ্ধতি ব্যবহার করেন। ইউরেনিয়াম সিরিজের ডেটিং -এর কথা আগেই উল্লেখ করেছিলাম। ইউরেনিয়াম ২৩৮ -এর অর্ধ-জীবন সাড়ে চারশো কোটি বছর, পটাসিয়াম ৪০ -এর হচ্ছে  ১৩০ কোটি বছর, ইউরেনিয়াম ২৩৫ -এর ৭৫ কোটি বছর, ওদিকে আবার কার্বন ১৫ -এর অর্ধ-জীবন হচ্ছে মাত্র ২.৪ সেকেন্ড। এত বিশাল সময়ের পরিসরে বিস্তৃত অর্ধ- জীবন সম্পন্ন তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলো রয়েছে বলেই বিজ্ঞানীরা আজকে একটি দু’টি নয়, বহু রকমের তেজস্ক্রিয় ডেটিং বা অন্যান্য ডেটিং -এর সাহায্য নিতে পারেন কোন ফসিলের বয়স নির্ধারণের জন্য। ফসিলের আপেক্ষিক বয়স সম্পর্কে একটা ধারণা করতে পারলে সেই অনুযায়ী প্রযোজ্য ডেটিং পদ্ধতিটা ব্যবহার করেন তারা।  বিভিন্ন পদ্ধতিতে ক্রস-নিরীক্ষণ করে তবেই তারা নিশ্চিত হন ফলাফল সম্পর্কে। আর তার ফলেই সম্ভব হয়ে ওঠে এত সুনির্দিষ্টভাবে এত প্রাচীন সব ফসিলের বয়স নির্ধারণ করা।  চলুন দেখা যাক বিভিন্ন ধরণের ডেটিং পদ্ধতি ব্যবহার করে কি করে ফসিলের বয়স বের করা হয়।

 

 

অনেক শিলাস্তরে বিশেষ করে আগ্নেয় শিলাস্তরে প্রচুর পরিমাণে ইউরেনিয়াম, পটাসিয়াম জাতীয় তেজস্ক্রিয় পদার্থ পাওয়া যায়। আবার পাললিক শিলার মধ্যে তেমন কোন তেজস্ক্রিয় পদার্থের অস্তিত্বই থাকে না। কিন্তু আমরা জানি যে, আগ্নেয় শিলায় ফসিল সংরক্ষিত হয় না, ফসিল পাওয়া যায় শুধু পাললিক শিলাস্তরে। তাহলে পাললিক শিলাস্তরের এই ফসিলগুলোর বয়স কিভাবে নির্ধারণ করা হয়? এক্ষেত্রে আপেক্ষিক এবং পরম দু’টো পদ্ধতিই ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রথমে পাললিক শিলা স্তরের উপরে এবং নীচে যে আগ্নেয় শিলাস্তর দু’টো তাকে স্যান্ডুইচের মত আটকে রেখেছে, তাদের বয়স নির্ধারণ করা হয়। এখান থেকে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন যে মধ্যবর্তী পাললিক শিলাস্তরে সংরক্ষিত ফসিলের বয়স এই দুই আগ্নেয় শিলাস্তরের বয়সের মাঝামাঝিই হবে। এখন যদি দেখা যায় যে, ফসিলটির নিজের মধ্যে যথেষ্ট পরিমাণে তেজস্ক্রিয় পদার্থ আটকে গেছে তাহলে তেজস্ক্রিয় ডেটিং -এর মাধ্যমে ফসিলটির বয়স সরাসরিই নির্ধারণ করা যেতে পারে। সরাসরি ফসিলের বয়স হিসেব করার জন্য তেজস্ক্রিয় ডেটিং পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রেডিও-কার্বন ডেটিং হচ্ছে অত্যন্ত বহুলভাবে ব্যবহৃত আরেকটি পদ্ধতি। এই পদ্ধতি দিয়ে শিলাস্তরের বয়স নয়, ফসিলের মধ্যে মৃত টিস্যুরই বয়স সরাসরি নির্ধারণ করে ফেলা যায়। কয়েক হাজার বছরের অর্থাৎ ভূতাত্ত্বিক সময়ের বিচারে অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক কালের ইতিহাস জানার জন্য এই পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে মানুষ এবং তার পূর্বপুরুষদের ফসিলের বয়স নির্ধারণে ব্যাপকভাবে রেডিও কার্বন ডেটিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।

 

 

সাধারণত আমরা প্রকৃতিতে যে কার্বনের কথা শুনি তার প্রায় সবটাই সুস্থিত আইসোটোপ কার্বন ১২। তবে খুবই সামান্য পরিমাণে হলেও অস্থিত কার্বন-১৪ -এর অস্তিত্বও দেখতে পাওয়া যায় প্রকৃতিতে। কসমিক রেডিয়েশন বা বিচ্ছুরণের ফলে বায়ুমণ্ডলে অনবরতই একটি নির্দিষ্ট হারে সুস্থিত নাইট্রোজেন ১৪ থেকে এই কার্বন-১৪ তৈরি হতে থাকে। এই কার্বন-১৪ -এর অর্ধ-জীবন  হচ্ছে ৫,৭৩০ বছর, অর্থাৎ প্রতি ৫৭৩০ বছরে কার্বন-১৪ -এর অর্ধেকাংশ তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের মাধ্যমে নাইট্রোজেন-১৪ এ রূপান্তরিত হয়। কার্বন-১৪ -এর অর্ধ-জীবন এত ছোট যে, খুবই অল্প পরিমাণে হলেও ক্রমাগতভাবে নাইট্রোজেন ১৪ থেকে কার্বন ১৪ তৈরি হতে না থাকলে প্রকৃতিতে এর অস্তিত্ব বেশীদিন টিকে থাকতে পারতো না। যাই হোক, এর উৎপত্তি এবং ক্ষয়ের হার ধ্রুব হওয়ার কারণে প্রকৃতিতে কার্বন-১২ আর কার্বন-১৪ -এর আনুপাতিক হার সব সময় সমান থাকে। এই দুই রকমের কার্বন আইসোটোপই বায়ুমণ্ডলে রাসায়নিক-ভাবে অক্সিজেনের সাথে যুক্ত হয়ে কার্বন ডাই অক্সাইডে পরিণত হয়ে যায়। উদ্ভিদ তার খাদ্য তৈরির জন্য এই কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে, আর ওদিকে প্রাণীকুল গ্রহণ করে উদ্ভিদকে তার খাদ্য হিসেবে, আবার তারাই হয়তো পরিণত হয় অন্য কোন প্রাণীর খাদ্যে। উদ্ভিদ যেহেতু কার্বন-১২ আর কার্বন-১৪ দিয়ে তৈরি উভয় কার্বন ডাই অক্সাইডই গ্রহণ করে তাই সমগ্র ফুড চেইন বা খাদ্য শৃঙ্খল জুড়েই এই দুই কার্বন আনুপাতিক হারে সমানভাবেই বিরাজ করে। বায়ুমন্ডল থেকে উদ্ভিদে, উদ্ভিদ থেকে প্রাণীর দেহে সঞ্চারিত হয় এই কার্বন ১২ এবং কার্বন ১৪। কিন্তু এই চক্রের সব কিছুই বদলে যায় যেই মাত্র প্রাণী বা উদ্ভিদের মৃত্যু ঘটে, সে আর নতুন কোন কার্বন ১৪ গ্রহণ করতে পারে না, তখন তার দেহে বিদ্যমান কার্বন-১৪ একটি নির্দিষ্ট হারে নাইট্রোজেন ১৪ এ রূপান্তরিত হতে থাকে। সুতরাং একটা মৃত জীবের দেহে কার্বন-১২ -এর তুলনায় কার্বন ১৪ -এর পরিমাণ আনুপাতিক হারে কমে যেতে শুরু করে। আর সে কারণেই ফসিলের দেহে বিদ্যমান কার্বন-১২ এবং কার্বন-১৪ -এর এই আনুপাতিক হার হিসেব করে সহজেই তার বয়স নির্ধারণ করে ফেলা যায়। তবে রেডিও কার্বন ডেটিং পদ্ধতি দিয়ে শুধুমাত্র অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক  কালের ফসিলের বয়স নির্ধারণ করা সম্ভব, ৩০ হাজার থেকে খুব বেশী হলে ৫০ হাজার বছরের পুরনো ফসিলের বয়স বের করা সম্ভব এই পদ্ধতিতে। আমরা আগেই দেখেছি, কার্বন-১৪ -এর অর্ধ-জীবন ভূতাত্ত্বিক সময়ের অনুপাতে খুবই ক্ষুদ্র, মাত্র ৫৭৩০ বছর ৬। তাই, ৩০-৫০ হাজার বছরের চেয়েও পুরনো ফসিলে যে অতি সামান্য পরিমাণে কার্বন ১৪ বিদ্যমান থাকে তা দিয়ে আর যাই হোক সঠিকভাবে তার বয়স নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে কয়েক হাজার বছরের ফসিলের ডেটিং -এর জন্য এই পদ্ধতির জুড়ি মেলা ভার।

 

তাহলে দেখা যাছে যে, তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলোর এই সুনির্দিষ্ট অর্ধ-জীবনের ব্যাপারটি আমাদের সামনে শিলাস্তরের এবং ফসিলের বয়স বের করার এই অনবদ্য সুযোগের দরজাটি খুলে দিয়েছে। বহু আগে থেকেই ধারণা করে আসলেও ১৯২০ সালের দিকেই প্রথম তেজস্ক্রিয় ডেটিং পদ্ধতি ব্যবহার করে দেখানো হয়েছিলো যে, পৃথিবীর বয়স কয়েকশো কোটি বছর। তারপর থেকে বিজ্ঞানীরা নানাভাবেই নানা রকমের তেজস্ক্রিয় পদ্ধতিতে ভূতাত্ত্বিক বয়স নির্ধারণের উপায় বের করেছেন। আর শুধু তেজস্ক্রিয় ডেটিং ই তো নয়, এর সাথে সাথে আরও বিভিন্ন ধরণের আধুনিক পদ্ধতিও আবিষ্কার করা হয়েছে পৃথিবীর এই মহাযাত্রার সময়কাল নির্ধারণের জন্য। যেমন ধরুন, বিজ্ঞানীরা এখন জানেন যে, পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র প্রায়শই তার দিক পরিবর্তন করে। ‘প্রায়শ’ বলতে আমাদের সাধারণ হিসেবে নয়, ভূতাত্ত্বিক বিশাল সময়ের তুলনায় ‘প্রায়শই’ বোঝানো হচ্ছে এখানে। গত এক কোটি বছরে পৃথিবী নাকি মোট ২৮২ বার উত্তর থেকে দক্ষিণে এবং দক্ষিণ থেকে উত্তরে তার চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক পরিবর্তন করেছে। আর তার সাথে সাথে আমাদের পৃথিবীর অভ্যন্তরের আগ্নেয়গিরির গলিত শিলার ভিতরের খনিজ পদার্থগুলোও কম্পাসের মতই দিক পরিবর্তন করে এবং তার একটা সুনির্দিষ্ট রেকর্ড রেখে দেয়। তারপর যখন এই লাভাগুলো শক্ত হয়ে শিলাস্তরে পরিণত হয় তখন এই রেকর্ডগুলো অবিকৃত অবস্থায় ওইভাবেই থেকে যায়। এ থেকেও ভূতত্ত্ববিদেরা অনেক শিলাস্তরেরই আপেক্ষিক বয়স নির্ধারণ করতে পারেন। এছাড়া আরও মজার মজার ধরণের কিছু ডেটিং পদ্ধতি রয়েছে, যেমন ধরুন, বড় বড় গাছের কাণ্ডে যে রিং বা বৃত্ত তৈরি হয় তার মাধ্যমেও উদ্ভিদের ফসিলের বা কাঠের বয়স বের করে ফেলা সম্ভব। বাৎসরিক বৃদ্ধির ফলে গাছের গোঁড়ায় যে স্তর বা বৃক্ষ-বৃত্তের সৃষ্টি হয় তা এক ধরণের প্রাকৃতিক নিয়ম মেনেই ঘটে, আর  এর থেকেই বিজ্ঞানীরা হিসেব করে বের করতে পারেন তার বয়স। এরকম আরও বহু ধরণের ডেটিং পদ্ধতি রয়েছে, নীচের ছবিটিতে (চিত্র ৭.৫) এরকম বিভিন্ন ধরণের ডেটিং পদ্ধতি এবং তাদের দিয়ে কোন কোন সময়ের সীমা নির্ধারণ করা যায় তার একটা সংক্ষিপ্ত তালিকা দেওয়া হল। এখন আর আমাদের একটি বা দু’টি ডেটিং পদ্ধতির উপর নির্ভর করে শিলাস্তর বা ফসিলের বয়স নির্ধারণ করার প্রয়োজন হয় না।

চিত্র: পরমাণুর গঠন বিভিন্ন রেঞ্জের সময়ের জন্য বিভিন্ন ধরণের ডেটিং পদ্ধতি

 

আমাদের হাতে আছে বহু রকমের পদ্ধতি যা দিয়ে কোন একটা ফলাফলকে বারবার বিভিন্নভাবে ক্রস চেক বা নিরীক্ষণ করে নিতে পারি। পদ্ধতিগুলো শুধু যে বৈজ্ঞানিক তাইই নয়, প্রয়োজন এবং গুরুত্ব অনুযায়ী বিজ্ঞানীরা এত রকমের পদ্ধতি ব্যবহার করেন যে, এর ফলাফলের সঠিকত্ব নিয়ে আর দ্বিমত বা সন্দেহ প্রকাশ করার তেমন অবকাশ থাকে না। খ্রিষ্টীয় ধর্মাবলম্বী বিভিন্ন রক্ষণশীল দলগুলো এখনও যখন বাইবেলের সেই ছয় হাজার বছরের পৃথিবীর সৃষ্টির ইতিহাস নিয়ে হইচই করেন এবং এই ডেটিং পদ্ধতিগুলোকে ভুল বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রচারণায় লিপ্ত হন তখন তাদের অজ্ঞতা দেখে স্তম্ভিত হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কি বা করার থাকে? উট পাখীর মত বালিতে মাথা গুঁজে পড়ে থাকলেই তো আর বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যাবে না। সত্যকে মেনে নিয়ে জ্ঞানের সীমাকে প্রসারিত করাই হচ্ছে মানব সভ্যতার রীতি, এভাবেই আমরা এগিয়েছি।

 

 

# উত্তরটি বন্যা আহমেদ, বিবর্তনের পথ ধরে (পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত ২০০৮) হতে সংগৃহীত


# Dawkins, R, 2004, The Ancestor’s tale, Houghton Miffin Company, NY, Boston: USA, pp 516-523.

# TM Berra, 1990, Evolution and the Myth of Creationism, Stanford,University Press, Stanford, California, pp 36-37.

# C Stringer and Andrews P, The Complete Wrold of Human Evolution,  Thames and Hudson Ltd, London, p 32, 2005,