Categories
অনলাইন প্রকাশনা

ভাইরালে তার মাইরালা মন

ভাইরালে তার মাইরালা মন
———————————- রমিত আজাদ

টিনের চালে ঢিল পড়িলে বুঝবে আমার ডাক,
এই ডাকাতে ঘাপলা হলে, পাঠিয়ে দেব কাক।
পাতিকাকের ঝাঁকের ভীড়ে যেমন আছে থাক,
চাতক পাখীর মতই অধীর একখানা দাঁড়কাক!

বসন্ত দিন রং ছড়ালে কোকিল ডাকে ডাকবো কুহু,
ডাক শুনিলেই বুঝে নিও, প্রেমের সমীর বইছে হুহু!
আরো পারি করতে নকল শেয়াল মামার হুক্কা হুয়া,
তবে সে ডাক শুনলে চাচা বুঝতে পারে শব্দ ভুয়া!

চুঙ্গা ফুকার দিনতো কবেই ফুরিয়ে গেছে গাঁয়ের পথেই,
ঢোল পিটিয়ে ডাকার রেওয়াজ গত হলো তাহার সাথেই!
কৃষ্ণরাধা বংশী সুরে কদম তলায় বাঁজিয়ে বাঁশি,
ডাকটা মধুর হোকনা দূরে, করতে পারি তোমায় খুশি!

মুঠোফোনে ডাকার আবার, রিস্ক রয়েছে একশো খানা,
আঁড়িপেতে রেকর্ড করে নেট ছড়িয়ে দিচ্ছে হানা!
ভাইরালে তার মাইরালা মন, প্রেমের মুখে মাররে ছাই,

প্রাইভেসি আজ উঠলো শিকেয় প্রেম করাতেও শান্তি নাই!

রচনাতারিখ: ২রা জানুয়ারী, ২০২১
রচনাসময়: রাত ১২টা ১৩ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

পাগলার গোলে ঘোল

পাগলার গোলে ঘোল
———————————— রমিত আজাদ

পাগল দেখে পাগল বল, তোমরা কোন পাগল?
সব পাগলের সেরা পাগল, সেয়ানা পাগল!
ভক্তরা তার নামে পাগল, ভক্তিরসে ভাসে,
পাগল বেশে ভেক ধরে সে, মনে মনে হাসে!

সেয়ান পাগলার মুখে মধু অন্তরে গরল,
বুঝানোর মেথড জটিল, হিসাব তার সরল!
জটিল মেথড না বুঝে সব হয়েছে পাগল,
সেয়ান পাগলায় হিসাব কইরা খাওয়াইছে যে ঘোল!

ঘোল খাইয়া সব ঘুরতে আছে পাগলের পাশে,
সেয়ান পাগলায় এইসব দেইখা মিটিমিটি হাসে!
মাঝে মাঝে পাগলায় বাধায়, বিষম গন্ডগোল;
তারই মধ্যে ঘুরপাক খাইয়া সকলে পাগল!

ভক্তরা তার ভাত না পাইলেও লাফায় আধমরা,
সেয়ান পাগলার ভাতের থালা বারো মাসই ভরা।
ঢোলে বাড়ি পড়লে সবাই নিজের ঘরে দেয় অনল!

সব পাগলের সেরা পাগল, সেয়ানা পাগল!

রচনাতারিখ: ২৩শে নভেম্বর, ২০২০
রচনাসময়: রাত ০২টা ৩২ মিনিট

The Cunning Mad

————————— Ramit Azad

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কলিকালের ভেলকিবাজি

কলিকালের ভেলকিবাজি
———————————- রমিত আজাদ

কোনটা প্রলাপ, কোনটা বিলাপ? কোনটা কথা? বলতে থাকো;
ঘাস-বিচালী বাঁশ দিয়া তাই, হইলো খাড়া কাষ্ঠসাঁকো!
ভেক ধরিয়া সেয়ান পাগোল বিল সেচিয়া মৎস্য নিলো।
ঠোঁট মিলাইয়া বোবায় তবু মঞ্চে গিয়া ভাষণ দিলো!

অন্ধব্যাটায় চশমা লাগায়, জন্ম কালায় ঘন্টি বাজায়,
লোকের ঘরে আগুন দিয়া, তালকানাটায় বাসর সাজায়।
বাইট্টারে কও চাঁন ধরিতে, বকেরে দাও থালায় ভাত,
কলশী ভরা তারি দিয়া, যাত্রাপালায় দেও দাওয়াত!

ঘরভাঙা এক পোড় কপালী, নও জোয়ানীর প্রেম শিখায়!
শিয়াল মামায় মুরগী নিয়া, প্রেমের ঘাটে নাও ভিড়ায়।
মূর্খ তাহার পাঠশালাতে পরীক্ষা নেয় অভিজ্ঞতার,
ঘাসের চাষের উদ্বোধনে আসর জমে লাখ জনতার!

ওলট-পালট মেঠো পথে মাতাল হাটে শীস দিয়া,
চিন্তা বিহীন ফুর্তি ওয়ালায় ডিগবাজী দেয় মদ পিয়া।
লাগ ভেলকি, লাগ ভেলকি, চোখের তারায় নেশার আগ!

এই গেরামের ভেলকিবাজি ভাল্লাগে না? যা তুই ভাগ!

রচনাতারিখ: ২১শে নভেম্বর, ২০২০ সাল
রচনাসময়: রাত ৪টা ২৩ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

অসময়ে বৃষ্টি এলে?

অসময়ে বৃষ্টি এলে?
————————— রমিত আজাদ

চোখ জুড়ে তার স্বপ্ন সুধা, হাত বাড়ালেই যায় মিলিয়ে!
এমন দিনে বৃষ্টি এলো, ঝরলো বারি, মন ভুলিয়ে।
বৃষ্টি এলো বন মাতিয়ে, জমকালো সাজ, মেঘলা আকাশ;
ঝরছে পাতা, আশান্বিতা, ঠান্ডা হাওয়ায় শীতের আভাস।

বৃষ্টি তুমি পথ ভেজালে, মন মাতালে, মৃত্তিকা গায় মিষ্টি সুবাস;
বৃষ্টি তোমার জলের ফোটায়, দৃষ্টি ছোটে; মত্ত হলো ঝড়ের বাতাস।
বৃষ্টি তোমার ছলাকলায়, হৃদয় দোলায়, মন ময়ূরী বানভাসী হয়;
ভাবটা এমন মেঘ কেঁদেছে বৃষ্টি হয়ে, ছুটছে নদী মেঘের ছায়ায়।

বর্ষা গেলো সেই কবে যে, এর পরে তো শরৎ গেলো;
হেমন্তের এই শুষ্ক দিনে, হঠাৎ করেই বৃষ্টি এলো!
কাশফুল আর ঘাসফুলেরা এমনতরো চায়নি যেন!
চোখ জুড়ে তাই জিজ্ঞাসা এক, এই অবেলায় বৃষ্টি কেন?

প্রতীক্ষা সে প্রতিজ্ঞাতে ছিলোই যেন নিখিল ভুবন,
পূবের পবন বন ছুঁয়েছে, সংকোচে তাই মন শিহরণ।
হোক না প্রকাশ অসময়ে, তাও তো তাহার আসা হলো,

বৃষ্টি তোমার আসার আশায়, থাকবো না তা হয়কি বলো?

রচনাতারিখ: ২১শে নভেম্বর, ২০২০ সাল
রচনাসময়: রাত ৩টা ১৬ মিনিট

When it rains untimely!
———————– Ramit Azad

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

পরের ঘরে আগ লাগাইয়া

পরের ঘরে আগ লাগাইয়া
——————————– রমিত আজাদ

আমার ঘরে আগ লাগাইয়া, রইলা তুমি ঘুমাইয়া;
ফিরিবে ফিরিবে আগুন তোমারে জাগাইয়া।
পরের ঘরে আগুন দিয়া থাকবা তুমি কোন সুখে?
এই আগুন লাগবে আবার, তোমার অসার দীন বুকে!

আমার দিলে দুখ কান্দাইয়া হাসলা তুমি ধুমাইয়া,
জাইনা রাইখো একদিন তুমি চোখ মুছিবা লুকাইয়া!
আইজকা তোমার শরীল গরম, টাকার গরল খ্যামোতায়;
সব হারাইয়া একদিন তুমি ঘুরবা রাস্তায় কোন মজায়?

কান্দে মতিন, কান্দে যতিন, রাইতে কান্দে কুত্তার ছায়!
দিনে কান্দে জাউল্যা মাতবর, চউক্ষের পানি গাঙে যায়!
ফজল মিঞায় আবোল-তাবোল বইকা চলে সারাক্ষণ,
ইমাম সাবে জিকির করেন, হাত তুইলাছে আকুল মন!

দীন-ভিখারি করলা যাগো, তাগো দিলের বদ দোয়ায়,
ভাইসা যাইবা আন্ধার রাইতে, অশরীরির ত্রাস ছোঁয়ায়।
উপরওয়ালায় ছাইড়া দেয় না, সময় শুধু মাইপা দেয়;

সময় পাইয়াও মাফ না চাইলে, ঐ দুনিয়ায় নাই উপায়!

রচনাতারিখ: ২০শে নভেম্বর, ২০২০ সাল
রচনাসময়: রাত ০১টা ৫৫ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

পুরুষ দিবসে

পুরুষ দিবসে
——————– রমিত আজাদ

আমি একলা আছি জেনেই তুমি একলা এসেছিলে,
একলা পেয়েও সেদিন তোমায়, চাইনি কোন ছলে!
কুণ্ঠিত এক পুরুষ সেদিন একলা ঘরেই ছিনু,
সুযোগ পেয়েও তাই মাখিনি, নও ষোড়শীর রেণু!

প্রথম প্রেমের বানভাসী মন, নও জোয়ানীর টানে,
আমার যাওয়া-আসার পথে থাকতে বাতায়নে।
আড়চোখে তাই দেখে নিতাম, সদ্য ফোটা ফুল,
আবেগ মাখা ঐ বয়সে ভাসতো মনের কূল!

আমার মুখের কথা হতো তোমার গলার মালা,
তোমার কথার যাদুর সুরে কর্ণে সুধা ঢালা।
তৃষ্ণাতুরা ছিলে তুমি মন তিয়াসী উমা,
ঝলমলানো ভোরের শিশির, একাকিনী ঝুমা।

একলা থাকার অমন দিনে উঠলো আবেগ রাশি,
একলা থাকা আমরা দুজন, চাইলে দিতাম ফাঁসি!
ইচ্ছে হলেই হয়তো সেদিন বান ভাসাতো কূল।

আজ ভেবে যাই, কেন সেদিন না করিলাম ভুল?

রচনাতারিখ: ২০শে নভেম্বর, ২০২০ সাল
রচনাসময়: রাত ১২টা ৫৮ মিনিট

Happy Men’s Day
——————— Ramit Azad

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কবির প্রেমে পইড়ো না কেউ

কবির প্রেমে পইড়ো না কেউ
———————————– রমিত আজাদ

কাব্য লিখি, রুবাই বানাই, পয়সা আমার নাই,
বৌ তো আমার কান্দে নিতি, হাঁড়িতে ভাত নাই!
“কোন সে মরার পদ্য লেখো? পাঠ করো ছাইপাশ?
পোলায় উপাস, মাইয়ায় উপাস কান্দে বারো মাস!”

“কোন যাদুতে তোমার প্রেমে খাইছি হাবুডুবু?
অভাব নামের নদীতে আজ ডুইবা মরি তবু!
তোমার কথার ছন্দ সুধায়, দেখছিলাম তো মধু!
এখন বুঝি ওসব কথায় বিষই ছিলো শুধু!”

সুন্দরী সেই বান্ধবী আজ কবির ঘরের বধু,
সব ছেড়ে সে ধরছিলো হাত, দেইখা চোখে ধুধু!
এখন তাহার ঘোর ভাঙিছে, অভাব তাড়নায়;
‘কার ঘরে সে শরণ নিলো, চক্ষু গেলো হায়!’

কবি এক ভয়াল ওঁঝা, টানে পিরিত পথে,
আসলে সে নিজের তালে, ছোটে ভাবের রথে!
কবিতা সব সস্তা কথা, ফাঁকা বুলির ফুলঝাড়া।

কবির প্রেমে পইড়ো না কেউ, বুইঝ্যো মাইয়ারা।

রচনাতারিখ: ১৯শে নভেম্বর, ২০২০ সাল
রচনাসময়: রাত ০৩টা ০১ মিনিট

Do Not Fall in Love of a Poet
———————————— Ramit Azad

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কার জমীনে ঘর বান্ধাইছো?

কার জমীনে ঘর বান্ধাইছো?
——————————————- রমিত আজাদ

কার জমীনে ঘর বান্ধাইছো? কার গাছেরই কাঠ দিয়া?
কার খ্যাতেরই খর বিছাইয়া চাল বানাইয়াছো ঘর ছাইয়া?
কার ঝাঁড়েরই বাঁশ কাটিয়া বানছো বেড়া, সাইড নিয়া,
হিসাব কইরা ভিটার মাটি, ডাইকো তারে মন দিয়া!

যার ত্যালে তায় জ্বালছো পিদিম, পাইছো আলো আন্ধারে,
তার শোকরে হইয়ো গুজার, আমরা যাহার বান্দারে!
যার গাছেরই ফল খাইয়াছো, মাখছো ভাতে সবজীরে,
তার জিকিরে দিল ভিজাইয়ো, তুইলা দুইখান কবজি রে!

নাচলো অলি দিনের শোভায়, রাইতে জ্বোনাক ঝলমলায়,
মৎস্য শামুক সায়র জুড়ে ঢেউয়ের তালে ছলছলায়।
যার ফুলে তায় ছুটলো সুবাস তোমার ভিটার শান্ত বায়,
চাঁদ সূরুয আর লক্ষ তারায়, তার মহিমায় গুণগুণায়!

ধার কইরা তার জায়গা-জমিন, ঋণ নিয়া তার মাল-দৌলত,
দেহের ভিতর জান বাঁচাইলা, চইরা খাইলা এই জগত।
সাত মহলা বাদশাহী তাজ, করবে না কেউ অসীম ভোগ,

একদিনেই তা ধ্বইসা দিবেন, শেষ বিচারের বিচারক।

রচনাতারিখ: ১৯শে নভেম্বর, ২০২০ সাল
রচনাসময়: রাত ০২টা ১১ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

অনিয়মের অভিসার

অনিয়মের অভিসার
—————– রমিত আজাদ

সে খুব গোপনেই এসেছিলো,
এসেছিলো সন্ধ্যা নামার পরে।
তখন আঁধার সব কিছু ঢেকে ফেলেছে!
তার চোখের উতলা অঞ্জনের মতই কৃষ্ণাভা চারিপাশ।
উৎসুক চোখগুলো চাইলেও আর কিছু দেখতে পাবে না!
তাছাড়া কোভিড মহামারীর ভয়ে,
পুরো নগরীটিই ছিলো গৃহবন্দী!

স্ট্রীট ল্যাম্পের আবছা আলোয়,
একটা প্রাণী হেটে গেলেও ভয়ে কেউ তাকাতো না,
ঐ ছায়ামূর্তির দিকে।
যেন সান্ধ্য আইনে থমকে যাওয়া স্থবিরতায়
সাক্ষাৎ যমদূত আনাগোনা করছে,
তাকালেই চোখ গলে রক্তে প্রবেশ করবে!

আমি তখন রূপের তীর্থে এক চাতকী পথিক,
অফুরাণ লঘুভারে অনুরাগী, নিবিড় তিয়াসী।
আমরা দু’জন নিশ্চিন্তেই হাটছিলাম
নগরীর জনশূন্য রাজপথে।
কোভিড মহামারীর ভয়ে ফাঁকা হয়ে যাওয়া পথঘাটে
কেউ ছিলো না আড়চোখে তাকানোর!
কেউ ছিলো না ঘটনা রটনা করার।

ঐ আঁধারে আমরা কোন সবুজ ঘাস দেখিনি,
কোন সাদা কাশ-ও দেখিনি।
নিয়মের ছকে বাঁধা জীবনের ছোটাছুটিও দেখিনি।
নৈমত্তিক যানজট?
একেবারেই উবে গিয়েছিলো, মহামারির আতংকে!
বৃক্ষ-পল্লবে শিশির জমেছিলো কিনা জানি না।
তবে তার আঁখিতারায় শবনমের আবেশ ছিলো!

নগরীর মোলায়েম মাটি ফুঁড়ে খাড়া উঠে যাওয়া
ভুতুরে অট্টালিকাগুলোকে ছাড়িয়ে,
একবার চাঁদ দেখতে চেয়েছিলাম,
আকাশপানে তাকিয়ে আবিষ্কার করলাম,
আজ আকাশ মেঘলা।
একটু পরে টিপটিপ বৃষ্টি নামলো!
প্রকৃতির কি এক খেয়াল!
বৃষ্টি চাইলে চাঁদ পাবে না;
চাঁদ চাইলে বৃষ্টি পাবে না।
আজ আমি চাঁদই দেখতে চেয়েছিলাম
তারপর ভাবলাম, থাক চাঁদ দেখে আর কি হবে?
চাঁদ তো আমার পাশেই হাটছে!

আমি বৃষ্টি আর চাঁদ একসাথে পেলাম।

রচনাতারিখ: ১৭ই নভেম্বর, ২০২০ সাল
রচনাসময়: রাত ০২টা ৫৬ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ২০

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ২০
——————————————————- রমিত আজাদ

ভ্যাকুয়াম শক্তি:
গত পর্বে ভ্যাকুয়াম শক্তির (vacuum energy) কথা বলেছিলাম। জানি এটা অনেকের কাছেই বোধগম্য নয় বা জটিল। যেমনটি আমার কাছে ছিলো অল্প বয়সে। তবে নবম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় আমি স্থিতিশক্তি (potential energy) সম্পর্কে জেনেছিলাম। সেই সাথে গতি শক্তি (kinetic energy) সম্পর্কেও জেনেছিলাম, যার ফর্মুলাটা ছিলো K.E. = 1/2 (mv2)। প্রসঙ্গত বলি যে, শক্তির যে সংজ্ঞা আমাকে নবম শ্রেণীতে পড়ানো হয়েছিলো, সেটা আমার পছন্দ হয়নি। ‘কাজ করার সামর্থ্যকে শক্তি বলে’ – কেমন যেন গোঁজামিল মনে হয়েছিলো! আবার স্থিতিশক্তি (potential energy)-কেও এ্যাবস্ট্রাক্ট মনে হয়েছিলো; তবে গতি শক্তি (kinetic energy)-কে রিয়েলিস্টিক মনে হয়েছিলো। তবে আমাদের কলেজের শ্রদ্ধেয় প্রিন্সিপাল কমান্ডার আবুল হোসেন মিঞা স্যার (ফিজিক্সের শিক্ষক) একবার আমাদের ক্লাস এইটে বলেছিলেন, “মনে রেখো ‘শক্তি’ হলো তা, যা কোন কিছুকে নাড়াতে পারে”। খুব সহজে ও এক কথায় বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ঐ বয়সের উপযোগী করে। পরবর্তিতে শক্তির যে সংজ্ঞাটি আমার পছন্দ হয়েছিলো বা এখনো ভালো লাগে সেটা আমি শিখেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে ‘ফিলোসফি’ ক্লাসে। শক্তি হলো ‘গতির পরিমাপ’ (measurement of motion)। কোন একটা বডি কতটুকু গতিশীল তার পরিমাপ-টাই হলো শক্তি। এবার মনে প্রশ্ন জাগে, চোখের সামনেই তো একটা গতিশিল বডি-কে স্থির হয়ে যেতে দেখি; যেমন কোন কিছুকে হাত থেকে ছেড়ে দিলেই সে নিচে পড়ে গিয়ে স্থির হয়ে যায়। অথবা ফ্লোর থেকে কোন কিছুকে তুলে কোন একটা আলমারির তাকে রাখলে সে তখন স্থির হয়ে যায়। এবার প্রশ্ন জাগতে পারে যে, গতির জন্য বডিটার মধ্যে যে শক্তিটা ছিলো, স্থির হওয়ার পর সেই শক্তিটা গেলো কোথায়? শক্তিটা কি তার মধ্যে জমা হয়ে গেলো? কিন্তু সে তো তখন আর গতিশীল নেই? আবার ফ্লোরের উপরে থাকা বডিটার স্থিতিশক্তি ধরা হয় শূন্য, কিন্তু উচ্চতায় রাখা বডিটার স্থিতিশক্তি অশূন্য ধরা হয় এবং তার গাণিতিক মান নির্নয় করতে উচ্চতাকে ব্যবহার করা হয়; কেন? পরে অবশ্য বুঝেছিলাম যে বিষয়টা আপেক্ষিক, একটা ফিল্ডে কোন একটা বডি ঐ ফিল্ডের প্রভাবে তার অবস্থানের কারণে অন্য কোন একটা বডির সাপেক্ষে যে শক্তি ধারন করে তাকে স্থিতিশক্তি বলে। তবে তা পরিমাপ করার জন্য আসলে দুইটা পয়েন্ট দরকার; কোন একটা ক্ষেত্রে বডিটিকে এক পয়েন্ট থেকে আরেক পয়েন্টে নিতে যে শক্তি খরচ করতে হয় তাই হলো, ঐ দুইটা পয়েন্টের মধ্যে স্থিতিশক্তির পার্থক্য; এটা মোর রিয়েলিস্টিক। পৃথিবীর মহাকর্ষ ক্ষেত্রে ভূপৃষ্ঠের উপর স্থিতিশক্তি শূন্য ধরা হয়, এবং উচ্চতায় তাকে mgh মানে বল ও উচ্চতার গুনন-এর মোট মান ধরা হয়। যা মূলত: ভূপৃষ্ঠের কোন বিন্দুতে স্থিতিশক্তি ও উচ্চতায় কোন বিন্দুতে স্থিতিশক্তি এই দুইয়ের স্থিতিশক্তি পার্থক্য।

এখান থেকে নিশ্চয়ই বোঝা গেলো যে স্থিতিশক্তি ক্ষেত্রের উপর নির্ভরশিল ও ক্ষেত্রবিশেষে তার পরিমাপনের সূত্রও ভিন্ন ভিন্ন হবে। যেমন বিদ্যুত ক্ষেত্রে স্থিতিশক্তিকে আবার মহাকর্ষ ক্ষেত্রের সূত্র দিয়ে পরিমাপন করা যাবে না। সেখানে তাকে ভিন্ন সূত্র দিয়ে পরিমাপন করতে হবে। চুম্বক ক্ষেত্রে আবার আরো ভিন্ন, ইত্যাদি।

এবার আসি ভ্যাকুয়াম শক্তি বিষয়ে। ভ্যাকুয়ামকেও ক্ষেত্র বলা যায়। স্থানের সকল বিন্দুতে সকল সম্ভাব্য স্পন্দক গুলির যোগফল একটি অসীম মানকে নির্দেশ করে। একে দূর করতে বলা যেতে পারে যে শক্তির পার্থক্য‌ই শুধুমাত্র ভৌত ভাবে পরিমাপযোগ্য, কয়েক শতাব্দী ধরে চিরায়ত বলবিদ্যায় স্থিতিশক্তির ধারনা করা হয়েছে। ভ্যাকুয়াম ফিল্ডে দুইটি বিন্দুর শক্তির পার্থক্য নির্নয় করা যাবে। ভ্যাকুয়াম শক্তিকে ভার্চুয়াল কণার সাহায্যেও ব্যাখ্যা করা যায় (ভ্যাকুয়াম ফ্লাকচুয়েশন বলা হয়) যেগুলি শূন্যস্থানে অনবরত উৎপন্ন ও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কয়েক শতাব্দী আগে বৌদ্ধ দার্শনিক Dignāga ও Dharmakīrti এই একই কথা বলেছিলেন যে, শূন্যতা থেকে ফট করে অণু তৈরী হয়, আবার তা শূন্যতায় মিলিয়েও যায়। এগুলি সাধারণত কণা-প্রতিকণা জোড়ায় উৎপন্ন হয় ও মুহূর্তের মধ্যেই পুর্নবিলয় ঘটে। তবুও এই কণাগুলি ধ্বংস হবার আগে আন্তঃক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে যা ফেইনম্যান চিত্র দিয়ে দেখানো যায়।

ভ্যাকুয়াম শক্তির বেশ কিছু তাৎপর্য রয়েছে। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে ডাচ্ পদার্থবিদ হেনরিখ ক্যাসিমির ও ডির্ক পোল্ডার, কাছাকাছি থাকা দুটি ধাতব পাতের মধ্যে তাদের মধ্যকার স্থানের ভ্যাকুয়াম শক্তির অনুনাদের কারণে একটি দুর্বল আকর্ষণ বল থাকার কথা ভবিষ্যতবাণী করেন। একে ক্যাসিমির ক্রিয়া বলে ও এটি পরীক্ষামূলক ভাবে প্রমাণিত। একারণে মনে করা হয় যে ইলেকট্রন, চৌম্বক ক্ষেত্র ইত্যাদি পরিচিত ধারণা গুলির মতো ভ্যাকুয়াম শক্তিও বাস্তব।

ভ্যাকুয়াম শক্তিতে এর সাথে অবদান রাখে কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্বের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিসাম্য ভঙ্গন। তবে এই জটিল আলোচনা এই প্রবন্ধে করবো না।

ভ্যাকুয়াম ফ্লাকচুয়েশন সর্বদা কনা-প্রতিকনা জোড়ায় উৎপন্ন হয়। স্টিফেন হকিংয়ের মতানুসারে, কৃষ্ণগহ্বর এর ঘটনা দিগন্তের কাছে এই ভার্চুয়াল কনা-প্রতিকনা উৎপাদনের মাধ্যমে হকিং বিকিরণ সম্ভব হতে পারে। এই কণা জোড়ার একটি যদি কৃষ্ণ গহ্বরের ভিতরে আকৃষ্ট হয়, তবে অপরটি একটি ‘বাস্তব’ কণা রূপে তার ভর/শক্তি বাইরের মহাশূন্যে বিকিরিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ক্ষয়ের মাধ্যমে কৃষ্ণগহ্বরটির অবলুপ্তি হতে পারে। এই সময়কাল কৃষ্ণগহ্বরটির ভরের সমানুপাতিক তবুও বৃহৎ মাপের কৃষ্ণগহ্বর গুলির ক্ষেত্রে ১০ টু দা পাওয়ার ১০০ বছরের মতো হতে পারে।

যাইহোক, যেসব কণা বা ক্ষেত্র এমন ঘনত্ব যুক্ত ভ্যাকুয়াম শক্তির জন্ম দেয়, যে তা প্রসারমাণ মহাবিশ্বের তত্ত্বে প্রয়োজনীয়, তাদের সঠিক প্রকৃতি এখনও একটি রহস্য।

এডিংটন, আইনস্টাইন, ওপেনহাইমার ও কৃষ্ণবিবর:
চন্দ্রশেখরের গাণিতিক বর্ণনা ও উদ্ভাবনা অনুযায়ী বৃহৎ ভরের একটি তারকা চুপসাতে চুপসাতে প্রায় শূন্য আয়তনে পৌঁছে যাবে, এবং তার ঘনত্ব হবে প্রায় অসীম। এটা পড়ে এডিংটন রীতিমত shocked হন, এবং কিছুতেই তা মেনে নিতে পারছিলেন না। এদিকে আলবার্ট আইনস্টাইন-ও ১৯৩৯ সালে একটি গবেষণাপত্রে দাবী করেছিলেন যে তারকা চুপসে গিয়ে শূন্য আয়তনে পৌঁছাবে না। তিনি এটাকে বাস্তবসম্মত মনে করতে পারেননি।

তাহলে ‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব’ অনুযায়ী চুপসে যেতে থাকা তারকাটির কি হবে? এই প্রশ্নের সমাধান করেছিলেন তরুণ মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট ওপেনহাইমার। কিন্তু ঐ গবেষণা বিজ্ঞান মহলে ঝড় তোলার আগেই পৃথিবীতে শুরু হয়ে গেলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝড়। এক জাতির উপর আরেক জাতির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে উঠে পড়ে লাগলো সমগ্র বিশ্ব। আর এমন ডামাডোলে যা হবার তাই হলো, রাজনীতিবিদরা তাদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে শুরু করলো বৈজ্ঞানিকদের। এমন বৃহৎ যুদ্ধে ব্যাপক বিধ্বংসী মারনাস্ত্র নির্মান করতে উঠে পড়ে লাগলো বিভিন্ন জাতি। জার্মানী, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র কেউই পিছিয়ে থাকলো না; সকলেই সমানতালে ‘ব্যাপক বিধ্বংসী মারনাস্ত্র নির্মান’-এর প্রতিযোগীতায় নেমে পড়লো। বিজ্ঞানী ওপেনহাইমারও জড়িয়ে পড়লেন মার্কিন ‘পরমাণু বোমা প্রকল্প’-এ। বলা হয় যে, প্রকল্পটি প্রায় শেষ পর্যায়ে এসে আটকে পড়েছিলো একটি সমস্যায় যেটা সমাধান করা যাচ্ছিলো না। তরুণ বিজ্ঞানী ওপেনহাইমার-ই ওটা সমাধান করে প্রকল্পটি কমপ্লিট করেছিলেন।

অবশেষে দুর্ঘটনাটি ঘটলো, সমগ্র বিশ্ববাসী ন্যাক্কারজনকভাবে দেখলো মানব কর্তৃক মানব হত্যার অন্যতম বৃহৎ ঘটনা হিরোশিমা ও নাগাসাকি-তে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে ইংরেজ রাজনীতিবিদ উইনস্টন চার্চিল সৃষ্ট কৃত্রিম দুর্ভিক্ষে বাংলায় প্রাণ গিয়েছিলো চল্লিশ লক্ষ মানুষের। আর হিরোশিমা-নাগাসাকিতে অল্প সময়েই নিহত হয়েছিলো দুইলক্ষাধিক মানুষ। বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড পরমাণুর অভ্যন্তরস্থ শক্তি-কে কাজে লাগানোর সম্ভাবনাকে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু হিরোশিমা-নাগাসাকি’র কুখ্যাত হত্যাকান্ড সারা পৃথিবীকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো পরমাণুর অভ্যন্তরস্থ শক্তির বিপুলতাকে।

তাই যুদ্ধের পর বিজ্ঞানীরা ব্যাস্ত হয়ে পড়েছিলেন পরমাণুর অভ্যন্তরস্থ বিষয়ের গবেষণায়। যেটাকে আমরা স্মল স্কেল রিসার্চ বলি। তাই ‘তারকার চুপসে যাওয়ার’ বিষয়টি নিয়ে গবেষণা বিজ্ঞানীরা তখন ভুলেই গিয়েছিলেন। তবে ১৯৬০ সালের দিকে লার্জ স্কেল গবেষণা মানে মহাকাশ নিয়ে গবেষণায় উৎসাহ আবার বৃদ্ধি পেল। রবার্ট ওপেনহাইমারের গবেষণা তখন পুনরাবিষ্কৃত হয় ও বিস্তৃতি লাভ করে।

(চলবে)

রচনাতারিখ: ১১ই নভেম্বর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ০১টা ২৭মিনিট

পূর্ববর্তি পর্বগুলো:
https://www.bdeasy.com/

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৯

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৯

——————————————————- রমিত আজাদ

শূণ্যস্থান আদৌ শূণ্য কি?

বাংলা ভাষায় ‘মহাশূণ্য’ শব্দটাই শুনে এসেছি ছোটবেলা থেকেই। ইংরেজীতে তাকে বলে ‘স্পেইস’। তারপর জানলাম রাশিয়ান-রা তাকে বলে ‘কসমস’। অবশ্য ‘কসমস’ শব্দটা অনেক ভাষায়ই প্রচলিত আছে।  ‘মহাশূণ্য’ শব্দটা এক ধরনের ভুল ধারনার সৃষ্টি করে। এটা শুনলে মনে হতে পারে যে মাথার উপরের ঐ জায়গাটিতে বিপুল শূণ্যতা, ওখানে কিছুই নেই। আসলে কিন্তু তা নয়। ওখানে অনেক কিছুই আছে। মাথার উপরে তাকালেই তো কত গ্রহ, নক্ষত্র, উল্কা, ধুমকেতু, ইত্যাদি দেখা যায়। এবার প্রশ্ন হতে পারে যে জ্যোতিষ্কগুলোর মধ্যবর্তি জায়গা কি শূণ্য নয়? উত্তর: না সেখানেও এ্যাবসোলুট শূণ্যতা নেই।

কি আছে তাহলে সেখানে? খেয়াল করুন যে, ঐ কোটি কোটি মাইল দূরের সূর্য থেকে আলো কিন্তু আমাদের পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। নক্ষত্রগুলো থেকেও তো আলো আসে। তাহলে মধ্যবর্তি জায়গায় এ্যাটলিস্ট আলো আছে, মানে তরঙ্গ আছে, মানে ফোটন আছে, মানে এনার্জী আছে।

তাছাড়াও আছে, গ্যাস, ধুলা, চার্জিত কণিকা প্রবাহ, কসমিক রে, ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন, গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড, নিউট্রিনো। আরো আছে ডার্ক ম্যাটার, ডার্ক এনার্জী। তারপর যা নিয়ে আগে আলোচনা করেছি সেই হিগস ফিল্ড।

আরো ইন্টারেস্টিং যা আছে তা হলো, Vacuum energy (also called vacuum fluctuations or zero-point energy)। এটা হলো পার্টিকেল ও এন্টিপার্টিকেল-এর একটা সাগর। এই জোড়ায় জোড়ায় তাদের জন্ম হয়, আবার তারা মিলিয়ে যায়।

আমার সুপারভাইজার ড. পিঝ-কে প্রশ্ন করেছিলাম যে, “স্যার, মহাবিশ্ব আসলো কোথা থেকে?” তিনি উত্তরে বলেছিলেন  বলেছিলেন যে, “Vacuum থেকে”। আমি ভাবলাম যে, Vacuum মানে তো শূণ্যতা, তবে কি শূণ্যতা থেকে আসলো? আবারো বললাম, “শূণ্যতায় তো কিছু নাই। তা ওখানে থেকে আবার আসে কি করে?” তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “(Vacuum fluctuations থেকে”। আমি হতবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, “মানে কি? শূণ্যতা ফ্লাকচুয়েট করে কিভাবে?” তিনি বলেছিলেন, “যে কোন ভৌত রাশিই ফ্লাকচুয়েট করে।” সত্যি বলতে কি সেইদিন ঐ কথার আমি কিছু বুঝি নাই। যাহোক এখন যেটা বুঝি যে, এই   Vacuum সেই Vacuum না। ভৌত Vacuum-ও কিছু একটা, যা ফ্লাকচুয়েট করে।

 ভ্যাকুয়াম শক্তির খুব বাস্তব প্রভাব রয়েছে কারণ এটি বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রগুলিকে দুর্বল করে বা স্ক্রীন করে। ভ্যাকুয়াম ওঠানামা (Vacuum fluctuations) কিছু বহিরাগত, অরক্ষিত, তাত্ত্বিক নিদর্শন নয়। বরং ভ্যাকুয়াম ওঠানামা অনেক নিত্যদিনের ঘটনার জন্য মৌলিক। আপনার ডিভিডি মেশিনের মতো লেজারগুলিও ভ্যাকুয়াম ওঠানামার অস্তিত্বের উপর নির্ভর করে। আপনি যখন কোনও উপাদান সঠিকভাবে সেট আপ করেন তখন একটি লেজার রশ্মি তৈরি করা হয় যাতে আপনি সুসংহত আলো নির্গমনগুলির একটি শৃঙ্খল বিক্রিয়া (chain reaction) পান। এই শৃঙ্খল বিক্রিয়া ভ্যাকুয়াম ওঠানামা দ্বারা শুরু করা হয়। তেমনি, তেজস্ক্রিয় ক্ষয় যেমন কার্বন -১ in-তে অভিজ্ঞ যা প্রত্নতাত্ত্বিকেরা উপকরণগুলির তারিখ নির্ণয় করতে ব্যবহার করেন, ভ্যাকুয়াম ওঠানামার মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। ক্যাসিমির প্রভাবের মাধ্যমে ভ্যাকুয়াম শক্তি পরিমাপ করা যেতে পারে: দুটি অব্যাহত ধাতব গোলক একসাথে খুব কাছাকাছি নিয়ে আসে এবং ভ্যাকুয়াম শক্তি তাদের আকর্ষণ করার কারণ করে। যখন তাদের ব্যবধান যথেষ্ট ছোট হয়, ভ্যাকুয়াম শক্তির কারণে আকর্ষণটি মহাকর্ষীয় এবং তড়িৎ চৌম্বকীয় প্রভাবগুলির উপর প্রাধান্য পায়। ভ্যাকুয়াম শক্তি হাইড্রোজেন শক্তির স্তরে Lamb shift স্থানান্তরকেও তৈরি করে। ভ্যাকুয়াম শক্তি মূলধারার পদার্থবিজ্ঞানের একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি।

এর পরে, হিগস ক্ষেত্র-ও সর্বত্র বিদ্যমান এবং এটিই অনেকগুলি কণাকে তাদের ভর দেয়। ভর-শক্তি সংরক্ষণের কারণে, ভর-শক্তি কোনও বন্ধ সিস্টেমে তৈরি বা ধ্বংস করা যায় না। ফলস্বরূপ, যখন হিগস ক্ষেত্র কোনও কণাকে ভর দেয়, সে তখন  vacuum থেকেই শক্তি নিয়ে এটি করে।

কৃষ্ণবিবর:

এবার আসি এবারের নোবেল প্রাইজ টপিকে। আমাদের গ্যালাক্সিটি একটা স্পাইরাল শেইপড গ্যালাক্সি। এটার শেইপ-টা কি কোন আকস্মিকতা? নাকি সঙ্গত কারণেই শেইপটি ওরকম হয়েছে? আমার বন্ধু রায়হান কিবরিয়া একদিন কথায় কথায় বললেন, “গ্যালাক্সির কেন্দ্রে একটা কৃষ্ণবিবর আছে।” আমি প্রশ্ন করলাম, “কি করে বোঝা গেলে?” রায়হান বললো, “তা নইলে শেইপটা স্পাইরাল হত না।” আমার মাথায় হঠাৎ স্ট্রাইক করলো। তাইতো, ‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব’ বলে, যেকোন ম্যাসিভ বডি তার চারপাশের স্থানটাকে বাঁকিয়ে দেয়। তার মানে কোন সোলার সিস্টেম বা কোন গ্যালাক্সির শেইপ কিন্তু এম্নি এম্নিই সৃষ্ট নয়। তার মধ্যকার বডিগুলো-ই তার শেইপটা তৈরী করে। তাহলে এই যে আমাদের গ্যালাক্সির শেইপটা স্পাইরাল, এবং তার আবার একটি কেন্দ্রও রয়েছে, এটাও অব্যাখ্যায়িত বা আকস্মিক নয়। ঐ কেন্দ্রে এমন কিছু আছে, যা তাকে স্পাইরাল বানিয়েছে। এবং তা একটা ম্যাসিভ বডি হওয়ারই কথা। স্টিফেন হকিং তার পপুলার বুক ‘কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’-এ লিখেছেন, “আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অনেক বড় একটা কৃষ্ণবিবরের  অস্তিত্ত্বের কিছু সাক্ষ্য আমাদের রয়েছে। সেই কৃষ্ণবিবরের ভর আমাদের সূর্যের ভরের চাইতে একলক্ষ গুণ বেশি।”  কি সেই সাক্ষ্য? কোন একটা কৃষ্ণবিবরে কোন তারকার পতন হলে, পড়তে পড়তে তারকাটি ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, তখন সেখান থেকে বিকিরণ হয়। হকিং লিখেছেন, “আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে অত্যন্ত ঘন সন্নিবিষ্ট বেতার তরঙ্গ ও  অবলোহিত রস্মির উৎসের ব্যাখ্যা এর ভিত্তিতে দেয়া যেতে পারে।”

আইনস্টাইন কি ব্ল্যাক হোল-এর কথা বলেছিলেন?

আলবার্ট আইনস্টাইন-এর সার্বিক আপেক্ষিকতা তত্ত্বের মধ্যেই আছে কৃষ্ণবিবরের কথা। তবে তিনি নিজেও এটাকে মানতে পারেন নি। এই বিষয়ে বলা হয় যে, The concept that explains black holes was so radical, in fact, that Einstein, himself, had strong misgivings. He concluded in a 1939 paper in the Annals of Mathematics that the idea was “not convincing” and the phenomena did not exist “in the real world.”

বিজ্ঞানে আবিষ্কারগুলোর একটা ধারাবাহিকতা রয়েছে। যখনই বিজ্ঞান কোন জটিল সমস্যার মুখোমুখি হয় অথবা কোন সংকটে পড়ে তখনই দেখা যায় কোন না কোন বিজ্ঞানী আবির্ভূত হয়ে ঐ সমস্যাটার সমাধান করে দেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে একদিকে যেমন পদার্থবিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ চলছিলো, অন্যদিকে আবার প্রাসঙ্গিক নিত্য নতুন সমস্যা বা প্রশ্নেরও উদ্ভব হচ্ছিলো। আলবার্ট আইনস্টাইন তত্ত্ব দিলে সেই তত্ত্বের আবার ইমপিরিকাল প্রমাণের প্রয়োজন পড়ে, যা সম্পাদন করেছিলেন আর্থার এডিংটন। এদিকে অনেক বিজ্ঞানীই আবার এই তত্ত্বের ফার্দার স্টাডি-র দিকে ঝুঁকে পড়েন।

১৯১০ সালে লাহোরে জন্ম হয় এক তামিল শিশুর। পিতামাতা তার নাম রাখলেন সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর।

মাদ্রাজের প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক পড়ার জন্য ভর্তি হন ১৯২৫ সালে। স্নাতক কোর্সের শেষ বছর ১৯২৯ সালে তিনি Arnold Sommerfeld-এর লেকচারে অনুপ্রাণিত হয়ে রচনা করেন জীবনের প্রথম গবেষণাপত্র ‘কম্পটন স্ক্যাটারিং অ্যান্ড নিউ স্ট্যাটিস্টিকস’। চন্দ্রশেখরের গবেষণাপত্রটি তার শিক্ষকদের মুগ্ধ করেছিল। তারপর চন্দ্রশেখর ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি পান।

ক্যামব্রিজে যাওয়ার পথে ভারত থেকে জাহাজে করে ব্রিটেন পর্যন্ত দীর্ঘ ভ্রমণে তিনি অলস সময় না কাটিয়ে এক বিস্ময়কর কাজ করে ফেলেন। তিনি জানতেন যে, ট্রিনিটি কলেজে তার সুপারভাইজার হবেন পদার্থবিজ্ঞানী রালফ ফাউলার। তাই জাহাজে বসে ফাউলারের বৈজ্ঞানিক কাজগুলো পড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

ফাউলার এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীদের শ্বেত বামন তারকায় ডিজেনারেট ইলেকট্রন গ্যাস নিয়ে লেখাগুলো পড়তে গিয়ে একটি যুগান্তকারী বিষয় অনুধাবন করেন চন্দ্রশেখর। তিনি দেখলেন যে, সবাই এ ব্যাপারটিকে চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখার চেষ্টা করেছেন। তিনি দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা ব্যবহার করেন ডিজেনারেট ইলেকট্রন গ্যাস স্টাডি করতে। মাত্র ২০ বছর বয়সেই জাহাজে বসে তিনি জীবনের অন্যতম সেরা কাজটি করে ফেলেন, যার সূত্র ধরেই তিনি পরবর্তিতে নোবেল পুরস্কার  অর্জন করেছিলেন।

কাজটি কি ছিলো?

আগেও কয়েকবার লিখেছি যে, একটি তারকা সব বিক্রিয়া সম্পন্ন করে জ্বালানী শেষ করার পর তার কি হবে? তখন সেখানে থাকবে বিপূল পরিমানে হিলিয়াম এ্যাটম। তারা কি ঐ অবস্থায়ই থেকে যাবে? ঘটনা হলো যে তাদের ভরের বিশালত্ব তাদের মধ্যেই জন্ম দেবে বিপুল পরিমাণে মহাকর্ষ। তখন তারকাটি ক্রমাগত সঙ্কুচিত হতে থাকবে। কতদূর পর্যন্ত? সেটা নির্ভর করবে তারকাটির ভরের উপর। তারকার ভর যত বেশি হবে, কেন্দ্রমুখী মহাকর্ষ বল তত বেশি হবে এবং তারকাটি তত বেশি সঙ্কুচিত হবে।

সঙ্কুচিত হয়ে সে পরিণত হবে ‘শ্বেত বামন’-এ। এখানেই শেষ? এমনটা আগে মনে করা হলেও পরে বোঝা গেল যে, না এখানেই শেষ নয়। প্রচন্ড টানে এ্যাটমগুলোর নিউক্লিয়াসের চতুর্দিকে ঘূর্ণায়মান ইলেকট্রনগুলো ঢুকে মিশে যাবে প্রোটনের সাথে।

আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের রুশ সহপাঠী মিশা-কে বলেছিলাম যে, ইলেকট্রনের ভর খুব কম, কিন্তু নিউট্রন ও প্রোটনের ভর সমান সমান। তখন সে খুব কনফিডেন্টলি আমাকে বলেছিলো যে, “না, তাদের ভর সমান সমান নয়। একটু পার্থক্য আছে, আর সেই পার্থক্যটা হলো একটা ইলেকট্রনের ভরের।”

আমি: মানে কি?

মিশা: মানে হলো একটা প্রোটনের ভর ও একটা ইলেকট্রনের ভর যোগ করলে, একটা নিউট্রনের ভর হয়।

আমি তড়াক করে উঠেছিলাম। এটা গুরুত্বপূর্ণ ইনফর্মেশন। তবে ওর কথায় অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে, বই খুলে দেখলাম। দেখলাম, মিশা কথা ঠিকই বলেছে। সেখানে আরো পড়লাম যে, নিউট্রন আসলে ইলেকট্রন মিশ্রিত প্রোটন। এই যুক্তিটা আমার মনে ধরলো। দুইয়ে দুইয়ে চার মিললো। তাইতো, ইলেকট্রন ও প্রোটনের পরস্পর বিপরীত চার্জ আছে। আবার নিউট্রনের কোন চার্জ নাই বা চার্জ নিউট্রাল, কিন্তু যখন জানলাম যে নিউট্রন আসলে ইলেকট্রন মিশ্রিত প্রোটন, তখন বুঝলাম পজেটিভ ও নেগেটিভ মিলে তো নিউট্রাল হবেই।

তাহলে এইভাবে কোন শ্বেত বামন-এর ভর যদি ১.৪ সৌরভরের সমান বা তার চেয়ে কম হয় তাহলে তা শ্বেত বামন-ই রয়ে যাবে। কিন্তু তার বেশি হলে  পরিণতি হবে ভিন্ন। জ্বালানি নিঃশেষ হবার পর কোনো তারকার ভর ‘চন্দ্রশেখর সীমা’-র বেশি হলে এর পরিণতি দু’রকম হতে পারে।

১. তারকাটি একটি নিউট্রন তারকায় পরিণত হতে পারে, যার ঘনত্ব অস্বাভাবিকভাবে বেশি হবে। সাধারণ নিউট্রন তারকার ঘনত্ব প্রতি বর্গ সেন্টিমিটারে ৫০০ মিলিয়ন মেট্রিক টন হয়।

২. তারকাটি একটি কৃষ্ণবিবরে পরিণত হতে পারে। যার কেন্দ্রে থাকবে মহাকর্ষীয় সিঙ্গুলারিটি, এর ঘনত্ব হবে অসীম বা  অসীমের কাছাকাছি।

সিঙ্গুলারিটি হচ্ছে এমন একটি বিন্দু যার আয়তন শূন্য-এর কাছাকাছি, ভর এবং ঘনত্ব অসীমের কাছাকাছি! এই বিন্দুতে সময় এবং স্থান অসীমভাবে বেঁকে যায় এবং পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলো সেখানে অচল। সাধারণত কোনো তারকার সমগ্র ভর প্রবল মহাকর্ষের টানে সঙ্কুচিত হয়ে আয়তন প্রায় শূন্য হয়ে গেলে সিঙ্গুলারিটির সৃষ্টি হয়। চন্দ্রশেখর যদিও তারকার পরিণতি হিসেবে ‘নিউট্রন তারা’ কিংবা কৃষ্ণবিবর, কোনোটির কথাই বলেননি। তথাপি তিনি সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন যে, চন্দ্রশেখর সীমার অধিক ভর সম্পন্ন একটি ক্রমাগত ধ্বসে পড়তে থাকা তারকার সিঙ্গুলারিটি সৃষ্টি ঠেকানোর মতো কোনো বল তখনো আবিষ্কৃত হয়নি।

চন্দ্রশেখরের এই বিস্ময়কর আবিষ্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন সেসময়কার প্রতিষ্ঠিত সকল জ্যোতির্বিদ। তখনকার জ্যোতির্বিদদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী স্যার আর্থার এডিংটন তো সরাসরি বলেই দিয়েছিলেন যে, সিঙ্গুলারিটি তথা অসীম ঘনত্বের কোনো বিন্দুর অস্তিত্ব অসম্ভব। তার বিশ্বাস ছিল, এমন কোনো অনাবিষ্কৃত বল বা বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব রয়েছে, যা আসলে সিঙ্গুলারিটির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মজার ব্যাপার হলো, চন্দ্রশেখরের গাণিতিক হিসাব নিকাশের সাথে কেউই অমত প্রকাশ করতে পারছিলেন না। কিন্তু শূন্য আয়তনে অসীম ভরের ব্যাপারটাই কেউ মেনে নিতে পারছিলেন না।

ক্যামব্রিজে একসময় তার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিলেন না। কিন্তু চন্দ্রশেখর বিশ্বাস করতেন, তিনি সঠিক। তাই ভগ্নহৃদয়ে ক্যামব্রিজ ছেড়ে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমান। এই বিশ্ববিদ্যালয়েই পরবর্তী জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। চন্দ্রশেখর সীমার পর আর কোনো বড় সাফল্য না পেলেও বামন তারকা বিষয়ক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা তিনি প্রকাশ করেছিলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

ধীরে ধীরে দুয়ে দুয়ে চার মিলতে লাগলো এবং জ্যোতির্বিদরা অনুধাবন করতে লাগলেন যে, এডিংটন ভুল আর চন্দ্রশেখরই সঠিক। তবে প্রক্রিয়াটি এত শ্লথ ছিল যে এমন যুগান্তকারী আবিষ্কারের স্বীকৃতি পেতে চন্দ্রশেখরকে অপেক্ষা করতে হয় ৩০টি বছর! ১৯৮৩ সালে উইলিয়াম ফাউলারের সাথে চন্দ্রশেখরকেও পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।

চন্দ্রশেখর সীমা হল স্থিতিশীল শীতল শ্বেত বামন তারকার সম্ভাব্য সর্বোচ্চ ভর। ভর এর চাইতে বেশি হলে তারকাটি চুপসে কৃষ্ণবিবরে পরিণত হবে। সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর দেখান যে, একটি শ্বেত বামন তারকার জন্য ভরের মান ১.৪১ সৌরভর এর সমান। এবং এই পর্যায়ে তারাটি ঘূর্ণায়মান হবে। তাঁর নামানুসারে এই সীমার নামকরণ করা হয়েছে ‘চন্দ্রশেখর সীমা’। তবে দ্রুত এবং বিভিন্ন অংশে ভিন্ন ভিন্ন ঘূর্ণন হার বিশিষ্ট তারার জন্য ডুরিসেন(১৯৭৫) দেখান যে, এই ভরের মান ৩ সৌরভরের সমান হতে পারে। শ্বেত বামন তারার ভর বেশি হলে মহাকর্ষ একে সংকুচিত করে ফেলতে চায়। ফলে এর অন্তর্গত ইলেকট্রনগুলি উচ্চতর শক্তিদশায় পৌছে এবং এদের গতিবেগ বাড়ার সাথে সাথে চাপও বাড়তে থাকে। পদার্থের এধরনের পরিস্থিতিকে বলে অপজাত অবস্থা (Degenerate Matter)।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করে পারছি না।

চন্দ্রশেখরের এই বিস্ময়কর আবিষ্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন সেসময়কার প্রতিষ্ঠিত সকল জ্যোতির্বিদ। তাদের মধ্যে একজন হলেন স্যার আর্থার এডিংটন। কথিত আছে যে, কেউ একজন এডিংটন-কে বলেছিলেন, “এই পৃথিবীতে আপেক্ষিকতত্ত্ব বোঝেন কেবল তিনজন”, এডিংটন বিস্মিত হয়ে ভাবছিলেন, “হু ইজ দ্যা থার্ড ম্যান?” আইনস্টাইন ও এডিংটন-এর পর চন্দ্রশেখরই ছিলেন সেই তৃতীয় ব্যাক্তি। তখনকার জ্যোতির্বিদদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী স্যার আর্থার এডিংটন তো সরাসরি বলেই দিয়েছিলেন যে, সিঙ্গুলারিটি তথা অসীম ঘনত্বের কোনো বিন্দুর অস্তিত্ব অসম্ভব। উনার বিশ্বাস ছিল, এমন কোনো অনাবিষ্কৃত বল বা বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব রয়েছে, যা আসলে সিঙ্গুলারিটির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মজার ব্যাপার হলো, চন্দ্রশেখরের গাণিতিক হিসাব নিকাশের সাথে কেউই অমত প্রকাশ করতে পারছিলেন না। কিন্তু উনার কথাও আবার তারা মানতে পারছিলেন না। অবশ্য আইনস্টাইনের ক্ষেত্রেও কিন্তু সেটাই হয়েছিলো।

ক্যামব্রিজে সেইসময় উনারর পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ না থাকলেও, চন্দ্রশেখর কিন্তু বিশ্বাস করতেন, তিনি সঠিক। তাই ভগ্নহৃদয়ে ক্যামব্রিজ ছেড়ে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমান। এই বিশ্ববিদ্যালয়েই পরবর্তী জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। চন্দ্রশেখর সীমার পর আর কোনো বড় সাফল্য না পেলেও বামন তারকা বিষয়ক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা তিনি প্রকাশ করেছিলেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে।

ধীরে ধীরে দুয়ে দুয়ে চার মিলতে লাগলো এবং জ্যোতির্বিদরা অনুধাবন করতে লাগলেন যে, এডিংটন ভুল আর চন্দ্রশেখরই সঠিক। তবে প্রক্রিয়াটি এত ধীর গতির ছিল যে এমন যুগান্তকারী আবিষ্কারের স্বীকৃতি পেতে চন্দ্রশেখরকে অপেক্ষা করতে হয় বহু বছর! ১৯৮৩ সালে উইলিয়াম ফাউলারের সাথে চন্দ্রশেখরকেও পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়।

(চলবে)

—————————————————————-

রচনাতারিখ: ১০ই নভেম্বর, ২০২০ সাল

সময়: রাত ০২টা ৫৯মিনিট

পূর্ববর্তি পর্বগুলো:

https://www.bdeasy.com/
Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৮

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৮
——————————————————- রমিত আজাদ

ঘটনা দিগন্ত (Event Horizon):

ছাদে উঠুন বা পাহাড়ে উঠুন অথবা উঁচু কোন জায়গায় উঠে দাঁড়ান; আপনার চোখের দৃষ্টি প্রসারিত হতে হতে অনেক দূর যাবে, এই যাওয়ার কি কোন শেষ আছে? জ্বী, একটা শেষ আছে। অনেক অনেক দূরে যেখানে মাটি ও আকাশ মিলে একটা রেখা হয়েছে, তার নাম ‘দিগন্ত রেখা’, এর পরে কি আপনি আর কিছু দেখতে পান? না, দেখতে পান না। এর আগে যা যা আছে বা ঘটছে আপনি সবই দেখতে পাবেন, কিন্তু ঐ দিগন্ত রেখার ওপাশে যা আছে বা ঘটছে, তা আর আপনি দেখতে পাবেন না। এই রেখাকে ‘ঘটনা দিগন্ত’-ও বলতে পারি। মানে, এমন এক দিগন্ত আছে, যার এপাশের সব কিছু দেখা সম্ভব, কিন্তু ওপাশের কিছুই দেখা সম্ভব না। এভাবে ফিজিক্সেও Event Horizon আছে, যা ‘স্থান-কাল’-কে দুইটি এলাকায় ভাগ করে; একপাশে সব তথ্যই সর্বদিকে নিরন্তর প্রবাহোত হচ্ছে, আর অপরপাশের কোন তথ্যই বাইরে আসতে পারছে না। মহাবিশ্বের Event Horizon-এর উৎস বা কারণ হলো অতি উচ্চমাত্রার মহাকর্ষ। একটি কৃষ্ণবিবর তার চারপাশে এমন একটি ‘ঘটনা দিগন্ত’ তৈরী করে। যার কারণে কৃষ্ণবিবর-এর আভ্যন্তরিন কোন ঘটনাই আমরা দেখতে পাবো না। ( অনেকটা সমাজতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী বদ্ধ রাষ্ট্রগুলোর মত, যাদের বাইরে থেকে ভিতরের কিছুই দেখা যায় না!)

‘স্থান-কাল’ সুস্থির, নাকি অস্থির?
আমি আমার জীবনে যখন প্রথমবার জানতে পেরেছিলাম যে ‘স্থান-কাল’ কোন চরম শূণ্যতা নয়, বরং সেও একটা কিছু, তখন ভীষণ অবাক হয়েছিলাম! আবার যখন পড়লাম ও জানলাম যে স্থান-কাল কোন একটা কাপড়, কাগজ বা ধাতুর মত বাঁকাওথয়ে যেতে পারে, তখন বিস্ময়ের আর সীমা ছিলো না! প্রথমটায় ভেবেছিলাম যে এটা হয়তো গণিতের কোন হেয়ালী! তারপর জানলাম আইনস্টাইন প্রথম যখন এই নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন, তখন অনেক বড় বড় বিজ্ঞানীরাও আমার মতন ভেবেছিলেন। কিন্তু এডিংটন যখন পরীক্ষার দ্বারাই এর প্রমাণ পেলেন, এরপর কি আর কোন কথা থাকে?

এখন আসি আরো বিস্ময়কর কথায়। ছোটবেলায় একবার ঢাকা থেকে নদীপথে পটুয়াখালী গিয়েছিলাম। অমন ভ্রমণ আমি জীবনে বহুবারই করেছি, সেটা কথা নয়; আমার মনে যে নদীভ্রমণ-টা বেশি দাগ কেটেছে আমি সেটার কথা বলছি। ঐ নদীভ্রমণকালে বালক আমি বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেছিলাম যে, শান্ত পানির বুকের উপর একটা বড় জাহাজ দাঁড়ালে সে পানির ক্ষেত্রটিকে কেমন বাঁকিয়ে ফেলে! তারপর যখন জাহাজটি চলতে শুরু করে তখন সে পুরো পানির ক্ষেত্রটিকে (নদীটিকে) উত্তাল করে ফেলে। সেই উত্তালতার একটি অংশকে আমরা ঢেউ হিসাবে দেখতে পাই। আবার লক্ষ্য করেছিলাম যে, পানির সেই উত্তালতা আবার আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বা চলমান ডিঙ্গিনৌকা বা ছোট ছোট নৌযানগুলোকেও দোলাতে বা নাড়াতে থাকে। আমাদের চারপাশের স্থান-কালের দশাও হয় তাই; সূর্য বা আরো বড় কোন বডি তার চারপাশের স্থান-কালকে বাঁকিয়ে ফেলে, স্থান-কালের মধ্য দিয়ে চলমান বডিগুলো তার চারপাশের স্থান-কালকে উত্তাল করে ফেলে ও ঢেউয়ের সৃষ্টি করে (যেই ঢেউ-এর নাম মহাকর্ষ তরঙ্গ), এবং এই উত্তালিত স্থান-কাল আবার তার মধ্যে থাকা অন্যান্য বডিগুলোর অবস্থান ও চলাচলকে প্রভাবিত করে! তার মানে হলো যে, স্থান-কাল সুস্থির নয়, বরং অস্থির!

এবার নিশ্চয়ই বোঝা গেলো যে, স্থান-কাল যেমন ঘটনাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়, তেমনি ঘটনাগুলোও স্থান-কাল দ্বারা প্রভাবিত হয়। অতএব মহাজাগতিক ঘটনাগুলো বোঝা বা ব্যাখ্যা-বর্ণনা করা সম্ভব নয়, যদি স্থান-কাল সম্পর্কে ধারনা না থাকে।

অনেকেই প্রশ্ন করে থাকেন যে, ‘মহাবিশ্বের বাইরে কি আছে বা কি ঘটছে?’ আপাতত বলবো যে, মহাবিশ্বের বাইরে যেহেতু স্থান-কাল নাই, তাই সেখানে কি আছে বা কি ঘটছে এই বিষয়ে কথা বলাটা একরকম অর্থহীন!

তাই যদি হয়ে থাকে তাহলে মহাবিশ্ব অনাদি ও অনন্ত নয়, যেমনটি বলেছিলেন দার্শনিক এরিষ্টটল। আপাতত বোঝা যাচ্ছে যে, ইমাম গাজ্জ্বালীই সঠিক বলেছিলেন, উনার রচিত গ্রন্থ ‘তাহাফুত আল ফালাসিফা’-তে যে, মহাবিশ্বের একটা শুরু আছে, বর্তমানে তা সতত পরিবর্তনশীল, এবং মহাবিশ্বের একটি শেষও আছে।

(চলবে)

রচনাতারিখ: ০৯ই নভেম্বর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ০১টা ৪৫মিনিট

পূর্ববর্তি পর্বগুলো:
https://www.bdeasy.com/

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৭

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৭
——————————————————- রমিত আজাদ

মহাকর্ষ বল দুর্বল, নাকি সবল?

আমি আমার জীবনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি যে, সবকিছুরই কোন না কোন সীমাবদ্ধতা থাকে। অন্যকথায়, সবকিছুরই ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুইটা দিক আছে। আমি একজন খুব দীর্ঘকায় শক্তিশালী ব্যাক্তিকে চিনতাম। দেখে মনে হত এইরকম মাসলম্যান-কে দিয়ে বড়সড় মাস্তানী করা যাবে, অথচ সে ছিলো ভীষণ ভীতু! আবার আরেকজন পুরুষ ছিলো বিশাল-লম্বা চওড়া! কিন্তু বদনাম ছিলো যে, তার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটি খুবই ছোট, এবং তিনি ক্রীড়ায় পারঙ্গমও নন, এইরকম নানাবিধ উদাহরণ টানা যায়। এবার পদার্থবিজ্ঞানের কথাই বলি এই যে চারটি মৌলিক বল-এর মধ্যে সবচাইতে শক্তিশালী/সবল যে বল-টা তার নাম সবল পারমানবিক বল (Strong nuclear force)। অথচ তার ‘রেঞ্জ অব এ্যাকশন’ খুবই কম। এতই কম যে সে অতি ক্ষুদ্র পরমাণুর ব্যাস-এর বাইরে আর প্রভাব ফেলতে পারে না। এমনকি বৃহৎ পরমাণুর সীমানারেখায়-ও সে খুব টালমাটাল অবস্থায় থাকে; বিষয়টা এমন যে ওটাকে একটু টোকা দিলেই ভেঙে যাবে। ইউরেনিয়াম পরমাণু এমন একটি। এদিকে বিদ্যুৎ-চুম্বক বল সবলতার দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও, সে নিজে দুই প্রকারের, পজেটিভ ও নেগেটিভ; মানে হলো তারা আকৃষ্ট-বিকৃষ্ট দুটাই করতে পারে তাই অনেকগুলো চার্জ একত্রিত হলে একে অপরকে কাটাকাটি করে নিজেদের মোট বল (Net force) খুব কম, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে শূণ্যও হয়ে যায়; যেমন আপনার-আমার শরীরে অগণিত ইলেকট্রন ও প্রোটন থাকলেও, তাদের সংখ্যা সমান বা প্রায় সমান হওয়ার দরুণ আমরা কিন্তু মোটেও চার্জড নই, বরং চার্জ নিউট্রাল বা শূণ্য চার্জ । আবার মহাকর্ষ বল সবচাইতে দুর্বল কিন্তু তার ‘রেঞ্জ অব এ্যাকশন’ অসীম! এবং তার কোন পজেটিভ ও নেগেটিভ নাই। তার আছে কেবলই আকর্ষণ, মানে হলো ভরযুক্ত অনেকগুলো বডি একত্রিত হলে তাদের সন্মিলিত (summation) বল শুধু যোগই হবে (বিয়োগ নয়)। এভাবে যেখানে বিপুল পরিমানে ভরযুক্ত কণিকা/পদার্থ আছে তাদের সন্মিলিত বল এতটাই বেশি যে তা আর সব প্রকার বলকে ছাড়িয়ে যাবে! আর এটাই ঘটে থাকে মৃত তারকাদের ক্ষেত্রে। আর এই কারণেই মহাকর্ষ বল মহাবিশ্বের বিবর্তন-কে নিয়ন্ত্রণ করে। পাঠকরা নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝতে পারছেন যে, কেন এত শত বিজ্ঞানী গবেষণারত আছেন মহাকর্ষ বল নিয়ে।

আমার মাস্টার্স-এর থিসিস পেপার ছিলো ‘কসমোলজি’-র উপর। ঐ পেপার লিখতে গিয়ে প্রথম শুনেছিলাম, পেইনরৌজ ও হকিং-এর নাম, আমার সুপারভাইজার ড. ভ. ম. পিঝ-এর মুখে। ড. পিঝ-ই আমাদেরকে ‘কোয়ান্টাম মেকানিক্স’ এবং ‘গ্রাভিটেশন ও কসমোলজি’ পড়িয়েছিলেন। পরবর্তিতে জেনেছিলাম যে, ১৯৭০ সালে স্টিফেন হকিং গবেষণা করেছিলেন কৃষ্ণবিবর ও তার চারপাশের বিপুল রাক্ষুসে মহাকর্ষ ক্ষেত্র নিয়ে। এই করতে গিয়ে তিনি কোয়ান্টাম ফিজিক্সের তত্ত্ব ও সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (মহাকর্ষ তত্ত্ব) দুটাকেই টেনেছিলেন। যা ছিলো ভবিষ্যতের ‘কোয়ান্টাম মহাকর্ষ তত্ত্ব’-এর ছায়া।

আলোকের গতি যদি অসীম হতো:

এই নিয়ে আগেও আলোচনা করেছি। আলোকের গতি যদি অসীম হতো তাহলে আমাদের চোখের বিভিন্ন ঘটনা দেখার যেমন কোন আগে-পরে মানে ধারাবাহিকতা থাকতো না, সবকিছুই ভীষণ এলোমেলো দেখা যেত; তেমনি মহাবিশ্বের কোন বলই তাকে প্রভাবিত করতে পারতো না! কিন্তু আল হাইয়াম যখন বলেই ফেললেন যে আলোর গতিবেগ সসীম এবং বিজ্ঞানী রোমার যখন পরীক্ষার দ্বারাই প্রমাণ করলেন যে আলোর গতিবেগের সুনির্দিষ্ট সীমারেখে রয়েছে, তখন আর সন্দেহ রইলো না যে, আলোকের গতিবেগ প্রভাবিত হতে পারবে। কোন বলের কি রকম প্রভাব আলোর উপর থাকবে সেটা অবশ্য পরবর্তী গবেষণার বিষয়।

মহাকর্ষ কি সত্যিই আলোকে আকর্ষণ করে?
ফোটন নামক কণিকাটির কোন ভর নাই। না থাকারই কথা, কারণ সে পিস্তলের গুলি বা মোটর দানা-র মত মোটেও নয়। আসলে সে ‘প্যাকেট অব এনার্জি’; এনার্জি বা শক্তির কি আর ভর থাকে? আর তাই যদি হবে তাহলে নিউটনীয় মহাকর্ষ ক্ষেত্র তো তাকে টেনে ধরে রাখতে পারবে না! ধরুন, আমরা যদি উপর দিকে একটা গুলি ছুঁড়ে মারি সে কি গতিবেগ কমে কমে একসময় শূণ্য বেগ হয়ে তারপর আবার নীচের দিকে নামতে শুরু করবে না? কিন্তু আমরা যখন কোন শক্তিশালী টর্চ থেকে আলো ছুঁড়ে মারি, কই সে তো আর নীচের দিকে নামে না? নামে না তার কারণই হলো যে, টর্চ থেকে ছোড়া জিনিসটি গুলির মত ভরসম্পন্ন নয়, বরং একটা ভরবিহীন জিনিস।

পরবর্তি প্রশ্নটা হলো, তাহলে এই যে বারবার বলা হচ্ছে যে কৃষ্ণবিবর আলো-কে টেনে তার ভিতর এমনভাবে নিয়ে যায় যে সে আর ওখান থেকে বের হতে পারে না; এই কথার মানে কি? আলো তো মোটরদানা নয়, সে তো ‘ভরবিহীন’ তাহলে কৃষ্ণবিবর তাকে টানবে কি করে? বিষয়টি হলো যে, মহাকর্ষ যদি নিউটনীয় মহাকর্ষ হয়, তাহলে কিন্তু তার আলোকে আকর্ষণ করার কথা না মোটেও। কারণ নিউটনীয় মহাকর্ষ শুধু ভরযুক্ত বডিকেই আকর্ষণ করতে পারে। কিন্তু আমরা ইতিমধ্যেই বলেছি যে, মহাকর্ষ বিজ্ঞান নিউনীয় বিজ্ঞানের গন্ডি পেরিয়ে আরো উন্নত বা অধিকতর ব্যাপক বিজ্ঞানের আওতাভুক্ত হয়েছে, যা আলবার্ট আইনস্টাইনের অবদান। তিনি মহাকর্ষ আরো উন্নত বিজ্ঞানের সাহায্যে ব্যাখ্যা ও বর্ণনা করেছেন যার নাম general relativity। আর এই নতুন বিজ্ঞান অনুযায়ী মহাকর্ষের কারণ হলো ‘স্থান-কালের বক্রতা’। আলো চলে সোজা পথে কথাটা পুরোপুরি ঠিক না, বরং বলতে হবে যে আলো চলে তার সামনে থাকা সব চাইতে সরল পথটি ধরে। যেমন ধরেন, আপনি মোটর গাড়ী চালিয়ে ঢাকা থেকে পূবাইল যেতে চান, ঢাকা থেকে পূবাইল যদি কোন নাক বরাবর সোজা পথ থাকে, আপনি সময়, শ্রম ও জ্বালানী বাঁচানোর জন্য ঐ পথেই যাবেন। কিন্তু পথ যদি থাকে একটিই এবং সেটি ধনুকের মত বাঁকা, তখন আপনি ঐ পথে যেতেই বাধ্য হবেন। আলোও তেমনি যখন সূর্য বা অন্য কোন মহাকাশীয় ম্যাসিভ বডির পাশ দিয়ে যেতে চায়, ঐ পথটিই বাঁকা। তাই আলো-কে বাধ্য হয়েই ঐ বাঁকা পথটি ধরেই যেতে হবে ( অনেকটা কবি জসীমউদ্দীনের সেই রাখাল ছেলের মত, যে বাঁকা গাঁয়ের পথটি ধরে যায়)। এবার আসুন কৃষ্ণবিবর-এর মত ম্যাসিভ বডির আলোর উপর প্রভাব বিষয়ে। এই দুনিয়ায় কিছু প্যাঁচালো ব্যাক্তি আছে যারা সোজা সমাজটাকে ভীষণ বাঁকা বানিয়ে ফেলে। একবার তাদের পাল্লায় পড়লে আর ঐ বাঁকা পথ থেকে বের হওয়া যায় না! একটি কৃষ্ণবিবর-ও তেমনি তার চারদিকের স্থান-কাল-কে এমনভাবে বাঁকা বানায় যে কৃষ্ণবিবর-এর আওতায় থাকা কোন আলোক রশ্মি আর ঐ বাঁকা পথ পেরিয়ে বাইরে আসতে পারে না! মানে কি? মানে হলো যদি কোন আলো কৃষ্ণবিবর থেকে বাইরে আসতে চায়ও তাহলে স্থান-কাল-এর প্রচন্ড বক্রতার কারণে, সে আবার ঐ কৃষ্ণবিবর-এই ফিরে যায়। ছোট বেলায় বাগাডুলি খেলতাম; দেখতাম কোন কোন মার্বেল কাঠি দিয়ে ছুঁড়ে মারার পর সে নানা পথ ঘুরে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসতো! কৃষ্ণবিবর-এ আলো ফিরে আসার ঘটনাটা এর সাথে উপমেয়। আবার বাইরের কোন উৎস থেকে যদি আলো গিয়ে কৃষ্ণবিবর-এ পড়ে সেও ওখানে ট্র‍্যাপড হয়ে যায়! আর এই অর্থেই বলা হয় যে, কৃষ্ণবিবর সত্যিকার অর্থেই কৃষ্ণ!

কৃষ্ণবিবর কতটুকু কৃষ্ণ?
“আপনার দেশী ছাতাটির রঙ কি?” “কালো”। কালো মানে তো রঙের অনুপস্থিতি তার মানে সেখানে কোন রঙ নাই! তবে কি ঐ ছাতাটিকে দেখা যাবে না? উত্তর: ছাতাটিকে দেখা যাবে, আবার দেখা যাবে না। হেয়ালী হয়ে গেলো তাই না? আমাদের কলেজে একজন বড় ভাই ছিলেন, উনার গায়ের রঙ ছিলো মিচমিচে কালো। ভালোমানুষ বড় ভাইটিকে আমরা বলতাম, “ভাইজান, আপনি যে কালার কালা, আপনারে তো মশাও খুইজা পাইবো না! আপনের বাপের কিছু টাকা সাশ্রয় হইলো।” বিনয়ী মানুষটি আমাদের কথা শুনে হাসতেন। এখন কথা হলো, উনাকে কি আসলেই দেখা যায় না? দেখা না গেলে আমরা উনাকে চিনতাম কিভাবে? দিনের আলোয় উনাকে ভালো-ই দেখা যেত। তবে রাতের ঘুটুঘুটে অন্ধকারে তিনি একরকম বিলিনই থাকতেন! উনাকে কি মশা আসলেই খুঁজে পেত না? জ্বিনা, মশা উনাকে ঠিকই খুঁজে পেত; কারণ উনাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য মশার আরো অনেক মেকানিজমই ছিলো। রাতের অন্ধকারে উনাকে দেখা না গেলেও, উনার গায়ের ঘ্রাণ, উনার নাসিকার ধ্বনি এবং আরো অনেক বৈশিষ্ট্যই উনার আছে যার সাহায্যে উনাকে ডিটেক্ট করা যাবে। কৃষ্ণবিবর-এর ব্যাপারটাও ঐরকমই। কৃষ্ণবিবর রাতের অন্ধকারে বিলিন হলেও, তার এমন কিছু ভৌত বৈশিষ্ট্য আছে যার সাহায্যে তাকে ডিটেক্ট করা যাবে। আপাতত: তার কিছুই বলছি।

একটি কৃষ্ণবিবর-এর ভিতরের আলো তার বাঁকা পথ পেরিয়ে আর কিছুতেই বাইরে আসতে পারবে না, একথা সত্য তবে, কৃষ্ণবিবর-এর কাছাকাছি চলে আসা কিছু আলো যারা ট্র্যাপড হয়নি, তারা কিন্তু পাশ কাটিয়ে চলে যাবে। আর সেই পাশ কাটানোটা বিশেষ রকমের হবে। যেমন, ঐ মিচমিচে কালো বড় ভাই রাতের অন্ধকারে মাঠের কোথাও দাঁড়িয়ে আছেন, আপনি তাকে দেখতে পাচ্ছেন না; হঠাৎ কেউ একটা টেনিস বল ছুঁড়ে মারলো, এবং বলটি সোজা না গিয়ে ঐ ভাইয়ের গায়ে লেগে ডিরেকশন চেইঞ্জ করে আরেকদিকে চলে গেলো; এবার আপনি কি সুস্পষ্টই বুঝতে পারবেন না যে, ওখানে কেউ দাঁড়িয়ে আছে? এভাবেই কৃষ্ণবিবর-এর পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া আলোকরশ্মিগুলোকে স্টাডি করে বোঝা যায় যে, ওখানে একটি কৃষ্ণবিবর আছে।

আরো একটি বিষয়: মনে করেন যে কোন এক অমাবশ্যার রাতে ঐ মিচমিচে কালো বড়ভাইটি, আপনার গ্রামের মাঠের মাঝখানে বসে আছেন। ঘুটঘুটে অন্ধকারে উনাকে দেখা না গেলেও, কোন এক কারণে যদি উনাকে ঘিরে একদিল জ্বোনাকী উড়তে ও ঘুরতে থাকে, আপনি নির্ঘাৎ টের পাবেন যে ওখানে কেউ আছে। আবার তিনিই যদি একটা জ্বলন্ত সিগারেট টানতে থাকেন, তাহলে সিগারেটের আগুনের নড়াচড়া দেখেও উনার উপস্থিতি টের পাওয়া যাবে। একইভাবে, আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে একটা কৃষ্ণবিবর আছে, যার দিকে সবচাইতে শক্তিশালী টেলিস্কোপ-টি তাক করলেও কালো রঙের কৃষ্ণবিবরটি দেখা যাবে না। কিন্তু বিবরটি এতটাই ম্যাসিভ ও মহাকর্ষ সম্পন্ন যে তাকে ঘিরে অনেকগুলি তারকাই ঘূর্ণায়মান। ঐ ভাস্বর তারকাগুলির ঘূর্ণন দেখেই বাস্তবিক প্রমাণিত হয়েছে যে, কৃষ্ণবিবরের উপস্থিতি ওখানে রয়েছে।

(চলবে)


রচনাতারিখ: ০৭ই নভেম্বর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ১১টা ০৭মিনিট

পূর্ববর্তি পর্বগুলো:
https://www.bdeasy.com/

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

ব্যার্থ প্রতিশ্রুতি

ব্যার্থ প্রতিশ্রুতি
———————– রমিত আজাদ

কথা তো দিয়েছিলাম; তুমিও তো দিয়েছিলে কথা!
তবে কেন হারালো সে কথাগুলো? হৃদয়ে হানিলো ব্যাথা!
হারিয়েছে কথাগুলো তাইতো এখনো নির্ঘুম কাটে রাত।
মৌন গগনে দেখিছে রজনী, আমাদের পরিতাপ!

শরতের রঙে তোমাদের দেশে, রঙিন হয়েছে শাখা,
আমাদের দেশে নামিছে হিমানী, কূয়াশা মেলিছে পাখা।
রঙের বারতা কোথায় পশিল? রাঙালো কি সমীরন?
শীতল সমীরে উষ্ণতা কোথা? অযথাই তাই জাগরণ!

তুমি যবে যাও নদীতটে একা, তটিনীর জলে পাও কি গো দেখা?
হারানো দিনের অভিসারী ছবি, শুয়ে আছো মোর কোলে রেখে মাথা!
স্বয়ংবরা তুমি সঁপেছিলে মন, রচেছিলে গৃহ দেখিয়া স্বপন,
সেই ঘর আর হয় নাই গড়া! স্বপ্ন মুছিলো অপয়া পবন।

কি পেলে জাগিয়া এত এত রাত, শুকানো পুষ্পে লুটায় কি চাঁদ?
কেবলি লুটায় অস্থির তনু, কাতর স্মৃতির অধীর অতনু।
আমার বাসনা নিভিয়া গিয়াছে, উবিয়াছে সব সাধ!

নিরাশা তিথিতে দেখিছে তোমারে মৌন বিরহী চাঁদ!

রচনাতারিখ: ৬ই নভেম্বর, ২০২০ সাল
সময়: ভোর ০৪টা ০১ মিনিট

False promises
———————– Ramit Azad

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

রত্নমণির তনুর শোভা

রত্নমণির তনুর শোভা
———————————– রমিত আজাদ

শরৎ রাঙা রঙিন পথে উঠলো হেসে কোন পরী?
তার দেশে আজ ভোট হয়েছে, নির্বাচনের ফুলঝুড়ি!
ভোট রেখে সে হাটলো পথে, কোন গাঙে যায় তার তরী?
টুকটুকে লাল উত্তরি তার, রূপের বাহার প্রাণ জুড়ি!

ঠোট পালিশও রক্তপলাশ, যেমন বাহার বৃক্ষ শাখে!
পাতায় পাতায় রঙ লেগেছে, মনের রঙেও ঢেউ জাগে!
জামার সাথে মাথায় টুপি, চুল বিনুনী হর শতেক,
হোক না সে এক বঙ ললনা, এখন সে তো মেমসাহেব।

শরৎ ঋতুর মধুর ছোঁয়ায় সবুজ পাহাড় হয় হলুদ,
গাছে গাছে রঙ মেখেছে, রঙ তুলিতে রঙের দুত!
রত্নমণির তনুর শোভা, সৌরভিত জরিন ধূপে,

আকাশ ছোঁয়া পাহাড় চূড়া, আত্মহারা পরীর রূপে!

রচনাতারিখ: ৫ই নভেম্বর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ০২টা ৩৪ মিনিট

Her Autumn Beauty
————————- Ramit Azad