Categories
অনলাইন প্রকাশনা

রত্নমণির তনুর শোভা

রত্নমণির তনুর শোভা
———————————– রমিত আজাদ

শরৎ রাঙা রঙিন পথে উঠলো হেসে কোন পরী?
তার দেশে আজ ভোট হয়েছে, নির্বাচনের ফুলঝুড়ি!
ভোট রেখে সে হাটলো পথে, কোন গাঙে যায় তার তরী?
টুকটুকে লাল উত্তরি তার, রূপের বাহার প্রাণ জুড়ি!

ঠোট পালিশও রক্তপলাশ, যেমন বাহার বৃক্ষ শাখে!
পাতায় পাতায় রঙ লেগেছে, মনের রঙেও ঢেউ জাগে!
জামার সাথে মাথায় টুপি, চুল বিনুনী হর শতেক,
হোক না সে এক বঙ ললনা, এখন সে তো মেমসাহেব।

শরৎ ঋতুর মধুর ছোঁয়ায় সবুজ পাহাড় হয় হলুদ,
গাছে গাছে রঙ মেখেছে, রঙ তুলিতে রঙের দুত!
রত্নমণির তনুর শোভা, সৌরভিত জরিন ধূপে,

আকাশ ছোঁয়া পাহাড় চূড়া, আত্মহারা পরীর রূপে!

রচনাতারিখ: ৫ই নভেম্বর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ০২টা ৩৪ মিনিট

Her Autumn Beauty
————————- Ramit Azad

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

দিলে আমার মহানবী

দিলে আমার মহানবী
——————– রমিত আজাদ

দিলে আমার মহানবী,
হেরার গুহায় ধ্যানের ছবি,
নিখিল ভূবন মজে আছে
তাহারও প্রেমে;
হায়রে তাহারও প্রেমে!

জ্বীন, ফেরেশতা, গাছের পাতা,
রবি, শশী, ক্ষিতিমাতা;
পড়িছে দরূদ তারা ক্ষণে ক্ষণে!
আহা ক্ষণে ক্ষণে!

নদী, সায়র শরাব পিয়ে,
মরুর ধুলা রঙ ছড়িয়ে,
গাহিছে প্রশংসা গীতি
দিনে ও রাতে।
আহা দিনে ও রাতে!

পাপীরা যখন মদের নেশায়,
মেতে ছিলো গুনাহ্‌ জলসায়।
অন্ধকারে ছিলো ডুবে
জাহেলিয়াতে!
হায় হায় জাহেলিয়াতে!

সত্যবাদী দ্বীনের নেতা,
অমর বাণী, মধুর কথা;
বলিয়াছেন সেই জমানায়
মানবের পথে!

তাহার ডাকে দিলো সাড়া,
চন্দ্র, সূরুয, গ্রহ, তারা;
আরো দিলেন সাড়া যত
মুমীন ও দ্বীনদার!

প্রভুর বাণী লয়ে লয়ে,
মক্কা থেকে তায়েফ হয়ে,
কষ্ট-ব্যাথা পীড়ন সয়ে,
করিলেন প্রচার।

বাধা বিপদ সব পেরিয়ে
মদিনারই মরুদ্যানে,
ন্যায়ের বাইত দাঁড় করাতে
গড়িলেন মসজিদ।
আহা গড়িলেন মসজিদ!

আযানেরই সুর উঠিলো,
গাহিলেন বেলাল।
রৌশন হইলো জমিন-আশমান,
নাচিলো হেলাল।
আহা নাচিলো হেলাল।

মক্কাজয়ী বীরের নেতা,
ভুলে গিয়ে অতীত ব্যাথা,
যুদ্ধজয়ী দিগবিজয়ী,
করিলেন ক্ষমা।
আহা করিলেন ক্ষমা।

তোমার নবী, আমার নবী,
নিখিল ধরার মহানবী,
হয়ে গেলেন সবার মনের
ভূবনজয়ী বিশ্বনবী!


রচনাতারিখ: ৩রা নভেম্বর, ২০২০ সাল
সময়: দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৬

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৬
——————————————————————————- রমিত আজাদ

আমি বা আমরা কেন ফোটন বা আলোর মত প্রবাহিত হই না। আলোক তরঙ্গ বা ফোটন যাই বলি না কেন, তার কোন ‘ভর’ নাই। তাই সে অবিরাম প্রবাহিত হচ্ছে। কিন্তু আমাদের রয়েছে ভর। তাই আমাদের ঐভাবে প্রবাহিত হওয়া সম্ভব না। আমাদের গায়ের মধ্যে রয়েছে অগণিত এ্যাটম, এ্যাটমগুলোর মধ্যে রয়েছে মৌলিক কণিকাত্রয়ী ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন। এই সাব-এ্যাটমিক কণিকা-গুলোর ভর-হীন হওয়ার কথা ছিলো, কিন্তু তারা ভরহীন নয়। কেন? এই বিষয়টা ব্যাখ্যা করার জন্য একটা থিওরী-র দরকার ছিলো। বিজ্ঞানী হিগস সেই থিওরীটিই দিয়েছেন। সব পার্টিকেলের ভর নাই, যাদের ভর নাই, তারা ‘হিগস পার্টিকেল’-এর সাথে ইন্টারএ্যাক্ট করে না; যেমন হয়তো ‘নিউট্রিনো (neutrino)। তবে যাদের ভর আছে যেমন, ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন; তারা ‘হিগস পার্টিকেল’-এর সাথে ইন্টারএ্যাকশন থেকেই ভর-টা পায়। এইভাবে বলা যায় যে ‘হিগস পার্টিকেল’ বা ‘হিগস ফিল্ড’ রয়েছে সমগ্র মহাবিশ্ব জুড়ে। তাই ভরসম্পন্ন পার্টিকেলগুলো গতিশীল অবস্থায় ‘হিগস পার্টিকেল’ বা ‘হিগস ফিল্ড’-এর সাথে ইন্টারএ্যাক্ট করে ‘ভর’ পায়।

গত পর্বে যেমনটা ব্যাখ্যা করেছিলাম যে একটা ভীড়ের মধ্যে দিয়ে চলার সময় আপনি বাধাপ্রাপ্ত হবেন বেশি, আর অল্পকিছু মানুষের মধ্য দিয়ে চলার সময় আপনি বাধা পাবেন কম। এভাবে প্রথম ক্ষেত্রে আপনার ‘ভর’ বেশি, ও দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আপনার ‘ভর’ কম।

পরবর্তি প্রশ্ন, ‘এই ‘হিগস পার্টিকেল’ বা ‘হিগস ফিল্ড’ এলো কোথা থেকে?’ এর উত্তর এখনো জানা নাই। হয়তো বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণ-এর মুহূর্তে এই ফিল্ডটি তৈরী হয়েছে। হতে পারে যে ‘হিগস ফিল্ড’ মহাবিশ্বের ইনফ্লেশন প্রসেস-এর একটা অংশ। হিগস ফিল্ড একটি না একাধিক সেটাও আমরা জানি না।

দ্বিতীয় প্রশ্ন, ‘হিগস বোজন আবিষ্কারের সাথে সাথে কি পার্টিকেল ফিজিক্স কমপ্লিট হয়েছে?’ উত্তর, “না, হয় নি। যেমন একটা বিস্ময় হলো নিউট্রিনো। তাদের ভর আছে, কিন্তু আপাত:দৃষ্টিতে তারা হিগস পার্টিকেল-এর সাথে ইন্টারএ্যাক্ট করে কোন ‘ভর’ পায় না। এই সমস্যাটি এখনও অসমাধিত।”

তৃতীয় প্রশ্ন, ‘হিগস বোজন এত হালকা কেন?’ উত্তর, “হতে পারে যে আরো কয়েক রকমের হিগস পার্টিকেল আছে। আপাতত কেবল এক ধরনের হিগস পার্টিকেল আবিস্কৃত হয়েছে।”

হিগস পার্টিকেল আবিষ্কারের সাথে সাথে ‘স্ট্যান্ডার্ড মডেল’-এর জট খুলেছে; কিন্তু ‘স্ট্যান্ডার্ড মডেল’ আবার ‘কসমিক পাজেল’-এর চূড়ান্ত অধ্যয় নয়। মডেলটি আসলে শুধু দৃশ্যমান matter-কেই বর্ণনা করে। কিন্তু এই বিশাল মহাবিশ্বে দৃশ্যমান matter হলো, মাত্র এক-পঞ্চমাংশ; আর বাকীটা সবই dark matter।

(Immediately following the announcement, Professor Olga Botner, Member of the Nobel Committee for Physics, was interviewed by freelance journalist Joanna Rose regarding the 2013 Nobel Prize in Physics.)

কি বুঝলাম? ক্রাইম-এর উৎস যেমন করাপশন, ভরের উৎস তেমনি ‘হিগস বোজন’।

দার্শনিক ডেমোক্রিটাস তাহলে স্ববিরোধী কথা বলেন নাই। কারণ ‘হিগস ফিল্ড’ কনসেপ্টে ভর ঐ কণিকা-র ভিতরে থাকে না, ভর-এর কারণ কণিকার বাইরে। আবারতো সেই-ই দাঁড়ালো যে, গতিই ভরের মূল কারণ। তবে হ্যাঁ, কোন পার্টিকেলের উপর গতির প্রভাবটা এককভাবে হচ্ছেনা, সেখানে ‘হিগস বোজন’-ও অংশ নিচ্ছে।

‘বোজন (boson) নামক কণিকা টাইপটির সাথে একজন বাঙালী বিজ্ঞানীর নাম জড়িত; তিনি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানিন্তন অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসু। কি করে তিনি বোজন কণিকা আবিষ্কার করেছিলেন, কি করে উনার নাম বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের সাথে জড়িত হয়েছিলো, সেই কথা আরেকদিন বলবো।

মহাকর্ষ ও কোয়ান্টাম ফিজিক্স:

নিউটনীয় পাদার্থবিজ্ঞান বা ক্লাসিকাল পদার্থবিজ্ঞান-এর দুর্বলতা থেকে জন্ম নিয়েছিলো দুইটা নতুন বিজ্ঞান – ১। আপেক্ষিক পদার্থবিজ্ঞান, ২। কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান। দুইটার আওতা আবার দুই রকম। আপেক্ষিক পদার্থবিজ্ঞান-এর জনক আলবার্ট আইনস্টাইন কাজ করেছিলেন লার্জ স্কেল নিয়ে। আর কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান যার মূল জনক ম্যাক্স প্লাঙ্ক তিনি কাজ করেছিলেন অতি ক্ষুদ্রের জগত নিয়ে।

লার্জ স্কেল বা অতি বৃহৎ নিয়ে কাজ করতে করতে আইনস্টাইনের গিয়ে ঠেকলেন মহাকর্ষে! মহাকর্ষ ও তার জ্যামিতি এবং অন্যান্য বিষয় বলতে বলতে একসময় তিনি predict করলেন gravitational wave-এর। খুব সম্ভবত তিনি মহাকর্ষের কোয়ান্টাম কারেকশন-এর কথাও বলেছিলেন। এটা ছিলো ১৯১৬ সাল। এবার প্রশ্ন আসে, যেহেতু প্রতিটি মৌলিক বলই কোন না কোন কণিকার আদান-প্রদান, সেই সূত্রে বিদ্যুৎ-চুম্বক তরঙ্গ অন্যকথায় ‘বিদ্যুৎ-চুম্বক বল’ যদি হয় ‘ফোটন’ নামক কণিকার এক্সচেঞ্জ; তাহলে ‘মহাকর্ষ তরঙ্গ’ মানে ‘মহাকর্ষ বল’ কোন কণিকার এক্সচেঞ্জ? ১৯২৭ সালে Oskar Klein বলেছিলেন quantum theory of gravity-এর কথা। এরপর ত্রিশের দশকের শুরুর দিকে L´eon Rosenfeld মহাকর্ষের কোয়ান্টাম তত্ত্বের উপর টেকনিকাল গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। আর ‘গ্রাভিটন’ নামক কণিকাটির কথা প্রথম বলেছিলেন সোভিয়েত বিজ্ঞানীদ্বয় Dmitrii Ivanovich Blokhintsev এবং FM Gal’perin। এই গ্রাভিটন (graviton) হলো মহাকর্ষ বলের আদান-প্রদানের কণিকা। কি বুঝলাম? আগের মতই অতি বৃহতের আলোচনা গিয়ে নামলো অতি ক্ষুদ্রের আলোচনায়! তবে কি এই মহাবিশ্বে ক্ষুদ্রকে বুঝলেই বৃহৎ-কে বোঝা যাবে? (আপাতত কোভিড-১৯ নামক এক ক্ষুদ্র তো আমাদের জীবন ঝালাপালা করে দিচ্ছে!) যাহোক আপাতত complete theory of quantum gravity নির্মিত হয় নাই। অথবা যেমন রিলেটিভিস্টিক ফিজিক্স, তেমনি কোয়ান্টাম ফিজিক্স দুইটাই অপূর্ণ রয়ে গিয়েছে; তাই এদের দুজনার সন্মিলন এখনো সম্ভব হচ্ছে না।

(চলবে)


রচনাতারিখ: ৩১শে অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ০১টা ০৪ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৫

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৫
——————————————————- রমিত আজাদ

খুব ছোটবেলায় আমার বড় বোন আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, “বল তো, আমরা পৃথিবীর কোথায় থাকি?” তখন তিনি ঢাকার হলিক্রস কলেজের মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। আমি উনাকে উত্তর দিয়েছিলাম যে, “আমরা পৃথিবীর ভিতরে থাকি।” তিনি মুচকি হেসে বলেছিলেন যে, “না, আমরা পৃথিবীর উপরে থাকি।” আমি হতবাক হয়ে, উনার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলাম! তারপর তিনি একটা গ্লোব হাতে নিয়ে পৃথিবী, ভূপৃষ্ঠ ও তার উপরে আমাদের থাকা ও চলাফেরা বিষয়টি বুঝিয়েছিলেন। তিনি বুঝিয়েছিলেন যে পৃথিবীর বাইরেটা শূণ্যতা, এই কারণেই তো আমরা মাথার উপরে আকাশ দেখি। তারপর আমি বিষয়টি বুঝেছিলাম, কিন্তু সেই সাথে আরেকটি প্রশ্ন আমাকে চেপে ধরেছিলো, ‘তাহলে আমরা ঐ শূণ্যতায় বা আকাশে পড়ে যাইনা কেন?’

আপনি একটা ফুটবল হাতে নিন। তারপর তার উপর কিছু একটা স্থির রাখুন। এরপর ফুটবলটিকে ঘোরান। কি হবে? ঐ বডি-টি ফুটবলের উপর থেকে ছিটকে পড়ে যাবে। তাহলে ঘূর্ণায়মান পৃথিবী থেকে আমরা বা অন্য কিছু ছিটকে মহাশূণ্যে চলে যাই না কেন?

এমন প্রশ্নই সেই পঞ্চম শতকে করেছিলেন দক্ষিণ এশীয় গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ আর্যভট্ট। ঘূর্ণায়মান পৃথিবী থেকে কোন কিছু ছিটকে মহাশূণ্যে চলে না যাওয়ার কারণ হিসাবে তিনি একটি ‘বল’-কে সনাক্ত করেছিলেন, যা আমাদেরকে টেনে পৃথিবীপৃষ্ঠে ধরে রাখে। পরবর্তিতে গণিতবিদ এবং জ্যোতির্বিদ ব্রহ্মগুপ্ত ষষ্ঠ শতকে ঐ বল-এর নাম দিয়েছিলেন ‘গুরুত্‌ভাকর্ষণ।

আমার গত পর্বের লেখা পড়ে একজন সুহৃদ পাঠক জানতে চেয়েছিলেন যে মহাকর্ষ কি ‘বল’ না ‘জ্যামিতি’? ঐ প্রশ্নটা আমিই এক সময়ে নিজেকে করতাম। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একরকম ধরেই নিয়েছিলাম যে ওটা জ্যামিতিই, তাই মহাকর্ষ বলকে অন্য বলগুলোর সাথে একীভূত করা যাচ্ছে না। কিন্তু মহাকর্ষ তরঙ্গ বাস্তবে ডিটেক্ট হওয়ার পর তো অন্য সন্দেহ দানা বাঁধছে! যাহোক, এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আলোচনা করা যাবে, তবে তার আগে চার্জ ও ‘ভর’ নিয়ে আরো কিছু আলোচনা করা যাক।

চার্জ ও ভর:
কৌতুক প্রচলিত আছে যে কোন ছাত্রকে অধ্যাপক প্রশ্ন করেছিলেন, “চার্জ কাহাকে বলে?” ছাত্র মাথা চুলকে সংকোচ করে বলেছিলো, “আমি তো স্যার জানতাম। তা এখন ভুলে গিয়েছি।” এবার অধ্যাপক আফসোস করে বললেন, “হায়রে! পৃথিবীতে একমাত্র তুমিই জানতে যে চার্জ কি, আর তুমিই তা ভুলে গেলে!” আসলে চার্জ যে কি তা আমরা কেউই জানি না। শুধু এইটুকুই জানি যে ইলেকট্রন ও প্রোটনের গায়ে কিছু একটা থাকে যা অন্য ইলেকট্রন বা প্রোটনকে প্রভাবিত করতে পারে, ওটাই চার্জ (ইলেকট্রিক চার্জ)। আপাতত এটাকে fundamental property of a matter বলা হচ্ছে। ইন্টারেস্টিং হলো যে একটা প্রোটনের গায়ে যতটুকু চার্জ থাকে, তার চাইতে প্রায় দুই হাজার গুণ ছোট পুঁচকে একটা ইলেকট্রনের ভিতর ততটুকুই চার্জ থাকে! শুধু সাইনটা বিপরীত, একটা প্লাস ও আরেকটা মাইনাস। আরেকটি বিষয় হলো, যে কোন কারণেই হোক, কোন একটি কণিকা-য় চার্জ-এর পরিমান ধ্রুব।

আর ‘ভর’? গ্রীক এ্যাটোমিজমের জনক ডেমোক্রিটাস বলেছিলেন যে মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রতম গঠন একক হলো ‘এ্যাটম’। সেই তিনিই আবার বলেছিলেন, ‘ভর’-এর উপর নির্ভর করে নানান রকমের ‘এ্যাটম’ হয়। কি বোঝা গেল? সেলফ কনট্রাডিকশন! এ্যাটম যদি ক্ষুদ্রতম গঠন একক হয়, তাহলে তার তো আর কারো উপর নির্ভর করার কথা না! আবার ‘ভর’-এর উপরই যদি এ্যাটম নির্ভরশীল হয় তাহলে ঐ ‘ভর’-ই তো ক্ষুদ্রতম গঠন একক। যাহোক, কয়েক বছর আগে ‘হিগস বোজন’ (অপর নাম ‘ইশ্বর কণা’) নিয়ে বেশ হৈ চৈ হয়েছে। সেই কণিকা ডিটেক্টেড-ও হয়েছে এবং ২০১৩ সালে Peter W. Higgs নোবেল পুরষ্কার বিজয়ীও হয়েছেন।

হিগস বোজন সংক্রান্ত আলোচনা জটিল ও সময়সাপেক্ষ। এই প্রবন্ধে সেই বিস্তারিত আলোচনায় যাব না। তবে একটা উপমা টেনে সামান্য বোঝানো যাবে। প্রথমত এখানে ‘ভর’-কে ‘হিগস ফিল্ড’ ও গতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়। হ্যাঁ ঘুরে ফিরে পদার্থবিজ্ঞানের সব আলোচনায় ঐ গতিই আসছে। গতিই আসলে চরম সত্য! তা ভর-কে ব্যাখ্যা করা হয়, গতির প্রতি রেসিটেন্স দিয়ে। মানে, যে বডি গতিশীল হতে গিয়ে যত বেশী রেজিটেন্স পায়, সেই বডিটি ভরে তত বেশি ভারী! এবার মনে করুন যে, একটি হলঘরে এক ঝাঁক তরুণ রয়েছে। তারা প্রত্যেকে এক একটা ‘হিগস বোজন’ কণা। এবং তাদের উপস্থিতিতে ঘরটি একটি ‘হিগস ফিল্ড’। হঠাৎ সেখানে এক জনপ্রিয় রূপসী তরুণী নায়িকা-র আগমণ হলো (সেও একটি ‘হিগস বোজন’ কণিকা)। নায়িকাটি যখন তরুণদের দিকে এগিয়ে গেলো, সে অদৃশ্যভাবেই তাদেরকে আকর্ষণ করছে। ধীরে ধীরে তার চারদিকে তরুণদের ঘনত্ব বেড়ে গেলো, কেউ আসে অটোগ্রাফ নিতে, কেউ আসে তার সাথে কথা বলে ধন্য হতে! এভাবে তরুণীটির চারদিকে তরুণদের ঘনত্ব বেড়ে গেলে, তরুণীটির চলাচলে সমস্যা হবে, মানে সে চলতে গিয়ে বেশি বাধাপ্রাপ্ত হব. এইভাবে তরুণীটির ভর হবে বেশি। এবার মনে করেন, ঐ একই ঘরে অপর একজন তরুণী নায়িকার আগমণ হলো, যে ততটা রূপসী ও জনপ্রিয় নয়। এবার কি তার চারদিকে অত বেশী তরুণের সমাগম হবে? অবশ্যই নয়। তাহলে দ্বিতীয় তরুণীটির চলাচলে বাধা বেশি হবে না, অতএব ঐ ফিল্ডে তার ‘ভর’ কম।

‘ভর’ বনাম ‘চার্জ’-এ আরেকটি ইন্টারেস্টি বিষয় হলো, ‘ভর’ না থাকলে ‘চার্জ’ থাকতে পারবে না (‘চার্জ’ ভরের উপরে ভর করে!); কিন্তু চার্জ না থাকলেও ‘ভর’ ঠিকই থাকতে পারবে।

এছাড়া চার্জ দুইরকম তাই সেখানে আকর্ষণ ও বিকর্ষণ দুইটা ঘটনাই আছে। কিন্তু ভর কেবল একরকম, তাই সেখানে কেবল আকর্ষণ বলই আছে। এই আকর্ষণ বল থাকার কারণেই একটি মৃত নক্ষত্র চুপসে যায়; এবং চুপসাতে চুপসাতে কোন কোন নক্ষত্র পরিণত হয় কৃষ্ণবিবরে।

(চলবে)


রচনাতারিখ: ২৯শে অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ১১টা ৪৫ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৪

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৪
——————————————————- রমিত আজাদ

আলোচনার এই পর্যায়ে মনে হবে যে সবকিছুর মূলে ঐ আলো (দৃশ্যমান হোক, আর অদৃশ্য হোক)!
আলোর গতিবেগ যে কোনভাবেই সসীম ও ধ্রুব। আর আলোকের গতিবেগ ধ্রুব রাখতে গিয়ে সে ‘পথের দৈর্ঘ্য’ এমনকি সময়কেও পাল্টে ফেলছে। এর ফলে স্থান-কাল আর স্থির থাকছে না (যেমনটি মনে করতেন দার্শনিক এরিস্টটল ও বিজ্ঞানী গ্যালিলিও এবং নিউটন)! স্থান-কালও আর সবকিছুর মতই ডাইনামিক বা গতিশীল হয়ে যাচ্ছে!

১৬৮৯ সালে স্যার আইজাক নিউটন বলেছিলেন, “I will not define time, space, place and motion, as being well known to all.” আর ১৯৭৩ সালে জন হুইলার (John Archibald Wheeler) বললেন, “Space tells matter how to move. Matter tells space how to curve.” কি বুঝলাম? ‘স্থান-কাল’-এর মত বিজ্ঞানও ধ্রুব নয়, বরং চলমান!

ভর-শক্তি বনাম স্থান-কাল বক্রতা:

নবম শ্রেণীতে একটা প্রাকৃতিক আইন পড়েছিলাম, যার নাম হুক-এর আইন (Hooke’s law)। কোন একটা স্প্রিং-কে টানতেও বল প্রয়োগ করতে হয়, সংকুচিত করতেও বল প্রয়োগ করতে হয়। বল প্রয়োগ যত বেশি এই সংকোচন প্রসারণও তত বেশি। আপেক্ষিক তত্ত্ব আমাদেরকে শেখালো ‘ভর-শক্তি’ স্থান-কাল-কে বাঁকা করে ফেলে। এই ভর-শক্তি যত বেশি, বক্রতাও তত বেশি। Mass-energy curves space-time — a new version of Hooke’s law.

এই প্রবন্ধের আওতায় এত সময় যাবৎ সম্ভবত শুধু ‘ভর’-এর কথাই লিখেছি শক্তির কথা তেমন লিখি নাই। যাহোক, আপাতত লিখছি যে, আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব যেমন গতির ব্যাখ্যা-বর্ণনা করতে গিয়ে স্থান ও কাল-কে একীভূত করে ‘স্থান-কাল’ (space-time) বানিয়ে ফেলেছে; তেমনি এই আপেক্ষিক তত্ত্ব ‘ভর’ ও ‘শক্তি’-কেও একীভূত করে ‘ভর-শক্তি’ (mass-energy) বানিয়ে ফেলেছে। আধুনিক বিশ্বে যিনি বিজ্ঞান জানেন না তিনিও জামার বুকে E = mc2 লেখা নিয়ে ঘুরে বেড়ান। আলবার্ট আইনস্টাইন দেখিয়েছিলেন যে, কোন বডির জড় ভর (inertial mass) তার অন্তর্গত শক্তির পরিমানের সমানুপাতিক। এইভাবে যে কোন ভরকেই শক্তিতে রূপান্তরিত করা যায়। এটা যে সম্ভব তা আর ল্যাবরেটরিতে গিয়ে দেখানোর দরকার নাই। গুণধর মার্কিন রাজনীতিবিদরা বিজ্ঞানীদের হাজারো নিষেধ সত্ত্বেও, ভর-কে শক্তিতে রূপান্তরিত করে জাপানের সাজানো-গোছানো দুইটি শহরকে গোটা অধিবাসী সমেত বিধ্বংস করেছিলো! এইভাবে একটা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে হতবাক বিশ্ব মানবতা দেখেছিলো ও জেনেছিলো ভর-শক্তির রূপান্তর সম্ভব। বিজ্ঞানীরা মেধা খাটিয়ে প্রযুক্তি তৈরী করেন আর রাজনীতিবিদরা প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে তার অপব্যবহার করে, এটা একেবারেই নতুন কিছু নয়!

বিশেষ ও সার্বিক আপেক্ষিকতত্ত্বের গুরুত্ব:
১। এই তত্ত্ব ফিজিক্সে বৈপ্লবিক নবযুগের সূচনা করেছে।
২। এই নতুন পদার্থবিজ্ঞান আমাদের মহাবিশ্বকে নতুনভাবে দেখতে শিখিয়েছে।
৩। আধুনিক প্রযুক্তি বিশেষত স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে ব্যাপক অবদান রেখেছে।
৪। মহাকর্ষ তরঙ্গ-কে শেষতক আবিষ্কার করেই ছেড়েছে।
৫। মহাকর্ষ তরঙ্গ ও আলোক তরঙ্গ (বিদ্যুৎ-চুম্বক তরঙ্গ) এক নয়, তবে তাদের উভয়ের চরম গতিবেগটা একই, মানে 186,000 miles per second।
৬। আরেকটি আকর্ষণীয় বিষয় হলো তরঙ্গের ব্যবহার। একসময় শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে অনেক কিছুই করা হয়েছে। তারপর এলো অদৃশ্য আলোক তরঙ্গ। তা ব্যবহার করে এখন আমরা যোগাযোগ প্রযুক্তিতে কি না করছি? এমনকি ওভেনে খাবারও গরম করছি। সঙ্গতকারণেই প্রশ্ন রাখা যায় যে, মহাকর্ষ তরঙ্গ ব্যবহার করে কি কি করা যেতে পারে? উত্তরে বলবো, মহাকর্ষ তরঙ্গ তো মাত্র আবিষ্কৃত হলো, তাই কিছুটা সময় সবুর করতে হবে। কালক্রমে তার বহুবিধ ব্যবহার নিশ্চয়ই হবে। আপাতত যা বলতে পারি তা হলো, মহাকর্ষ তরঙ্গ আবিষ্কৃত হওয়ার পর আমরা মহাবিশ্বকে স্টাডি করার একটা নতুন পথ খুঁজে পেলাম। এখন আমরা এমন অনেক মহাজাগতিক ঘটনা সনাক্ত করতে পারছি যা দৃশ্যমান আলোর দ্বারা করা সম্ভব ছিলো না, যেমন কৃষ্ণবিবরের সংঘর্ষ!

আলোর gravitational bending-কে পরীক্ষার দ্বারা নিশ্চিত করেছিলেন Arthur Eddington। এইভাবে সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব নিউটনের universal gravitation-কে প্রতিস্থাপিত করে। Newton ও Eddington দুজনই ছিলেন ইংরেজ। পক্ষান্তরে আইনস্টাইন ছিলেন জার্মান। ১৯১৯ সাল ছিলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির ঠিক পরের বৎসর। ইংল্যান্ডে তখন এন্টি-জার্মান সেন্টিমেন্ট তুঙ্গে! এমন সময়েও এডিংটন কর্তৃক আইনস্টাইনের তত্ত্ব প্রমাণ করার ঘটনা এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দিয়ে উদার কন্ঠে পারশিক মুসলিম কবি ও বিজ্ঞানী ওমার খৈয়ামের সুরে রুবাই পাঠ করা এই বোঝায় যে ‘বিজ্ঞান ঐ নোংরা রাজনীতির উর্ধ্বে!’

তারপরেও কথা থাকে। অনেকের ধারনা যে বিজ্ঞানীরা দোষ-ত্রুটির উর্ধ্বে কোন মহামানব। তাই কি? উনারা জ্ঞানে ও মেধায় অসাধারণ হতে পারেন তবে, আদিকালের পৌরাণিক দেব-দেবীদের মতন উনারাও ঈর্ষা ও প্রতিহিংসাপরায়ন, এমনকি সংকীর্ণমনাও হয়ে থাকেন! পরবর্তি পর্বের আলোচনায় আমি তার কিছু কিছু উল্লেখ করবো!

(চলবে)


রচনাতারিখ: ২৯শে অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ১২টা ০৭ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৩

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১৩
——————————————————- রমিত আজাদ

সময় প্রসারণ:

বডি না থাকলে কোন স্থান নাই, বডি থাকলেই কেবল স্থান আছে। একাধিক বডির মধ্যকার সম্পর্কটাই স্থান। বডিরাই স্থান তৈরী করে। তাহলে বডির প্রকৃতি বা ধর্মের উপর ভিত্তি করে স্থানের প্রকৃতি ও ধর্ম হবে এটাই তো যৌক্তিক। দার্শনিক-রা কিন্তু কথাগুলো কয়েক হাজার বছর আগেই বলেছিলেন। তবে মানব চর্চিত ও প্রতিষ্ঠিত সাবজেক্টগুলোর মধ্যে বিজ্ঞান যেহেতু নবীনতম তাই এই নিয়ে কাজ করার সুযোগ তার এসেছে অনেক পরে। অবশেষে বিজ্ঞান পদ্ধতিগতভাবেই আবিষ্কার করেছে যে, কোন একটি বডি তার চারপাশের স্থানটিকে বাকিয়েও দিতে পারে!

ইতিপূর্বে কয়েকবার লিখেছি যে স্থান (space) আর সময় (time) আলাদা কিছু নয়, তারা পরস্পর সম্পর্কিত। তাহলে ম্যাসিভ বডি বা তার মহাকর্ষ যদি স্থানকে বাঁকিয়ে দিতে পারে, সেইভাবে সময়ও প্রভাবিত হবে নিশ্চয়ই। হিসাবে করে দেখা গেলো যে, তাই-ই হয়। বাঁকানো স্থান সময়কে প্রসারিত (time dilation) করে। ঠিক যেমনটি দেখা গিয়েছিলো ‘বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব’-এর ক্ষেত্রে!

বিষয়টির ব্যাখ্যা মোটামুটি সহজেই দেয়া যায় যে, ম্যাসিভ বডি (অন্য কথায় তার মহাকর্ষ) যেহেতু তার চারপাশের স্থানটিকে বাঁকিয়ে ফেলে, অতএব আলোর সিগনাল-কে মানে আলোকরশ্মি-কে যেতে হবে বাঁকা পথ ধরে। আর দৈনন্দিন জীবন ও ইউক্লিডিও জ্যামিতি থেকে আমরা জানি যে, কোন কিছু সোজা পথ দিয়ে যেতে যত সময় নেয়, সে বাঁকা পথ ধরে গেলে তার চাইতে বেশি সময় নেবে। অতএব আলোকরশ্মি যখন কোন ম্যাসিভ বডির পাশ দিয়ে যাবে তখন ঐ পথ ভ্রমণ করতে সে সময় নেবে বেশি (মহাকর্ষ ক্ষেত্রের অনুপস্থিতিতে ভ্রমণের সময়টা লাগতো কম), এটাই time dilation। এই নিয়ে এখন আর কোন বিতর্ক নাই, বহু সংখ্যক পরীক্ষা করে তা প্রমাণিতও হয়েছে।

মহাকর্ষ তরঙ্গ:
এই নিয়ে আমি একটি বিষদ প্রবন্ধ তিনবছর আগে লিখেছিলাম তাই এখানে আর তার পুণরাবৃত্তি করতে চাই না। এই প্রবন্ধেও কিছু আগে তার উল্লেখ করেছি। আপাতত সংক্ষেপে বলবো, যে কোন ফিল্ডের ডিসটার্বেন্স হতেই পারে, ডিসটার্বেন্স হলেই তা তরঙ্গায়িত হয়। অনুরুপভাবে, মহাকর্ষ ক্ষেত্রের ডিসটার্বেন্স হলে যে তরঙ্গের জন্ম হবে তার নাম মহাকর্ষ তরঙ্গ (gravitational wave)। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালীন সময়ে, এই gravitational wave আদৌ খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা, এই নিয়ে সন্দেহের কথাই বেশি বলা হতো। এমনকি ২০০৭ সালে আমার কথা হয়েছিলো বাংলাদেশী পদার্থবিজ্ঞানী ড. মফিজউদ্দিন-এর সাথে (মরহুম)। তিনি আমাকে এই নিয়ে তার গবেষণার কথা বলছিলেন, আমি উনাকে ইন্টারাপ্ট করে বলেছিলাম, “এটা তো থিওরেটিকাল কথাবার্তা! গাণিতিক এক্সপ্রেশন! কিন্তু, বাস্তবে এই জাতীয় তরঙ্গ খুঁজে পাওয়ার কোন সম্ভাবনা কি আছে? বিজ্ঞানীরাই তো বলে যে, মহাকর্ষ একটা বল, নাকি জ্যামিতি বোঝা ভার!” আমি কথাগুলো এমন জোর দিয়ে বলেছিলাম যে, তিনি মন খারাপ করেছিলেন।

যাহোক, ২০১৬ সালে লিগো টীম গবেষণা করে মহাকর্ষ তরঙ্গ সনাক্ত করতে সমর্থ হয়েছিলেন (On 11 February 2016, the LIGO teams announced the direct discovery of a gravitational wave matching the signal predicted from the collision of two black holes)। এইটি প্রকাশিত হওয়ার পর আমি খুব এক্সাইটেড হয়েছিলাম, এবং আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সহপাঠী, বন্ধুবান্ধব পদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপকদের সাথে এই নিয়ে আলাপ করেছিলাম। ঐ একই বছরের মার্চ, আমি সিলেট ক্যাডেট কলেজের মাননীয় অধ্যাক্ষ কমান্ডার সাইফুর রহমান কর্তৃক আমন্ত্রিত হয়েছিলাম, উনার কলেজে (সেটা আমারও ‘আলমা মাতের’) বিশেষ অতিথি হিসাবে বক্তৃতা দেয়ার জন্য। আমার মনে পড়ে যে, সেই অনুষ্ঠানে একজন ক্যাডেট তখন আমাকে gravitational wave সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলো। সদ্য আবিষ্কৃত এই ওয়েভটি সম্পর্কে আমি তখন তাদেরকে যতদূর পারি বুঝিয়েছিলাম।

তারপর ২০১৭ সালে ঐ লিগো টীম-কে ফিজিক্সে নোবেল প্রাইজ দেয়া হয়েছিলো। (The 2017 Nobel Prize in Physics has been awarded to three key players in the development and ultimate success of the Laser Interferometer Gravitational-wave Observatory (LIGO). One half of the prize was awarded jointly to Caltech’s Barry C. Barish, the Ronald and Maxine Linde Professor of Physics, Emeritus and Kip S.) এরপর আমি এই নিয়ে ‘এবারের নোবেল পুরষ্কার (পদার্থবিজ্ঞান ২০১৭)’ নামে একটি প্রবন্ধ রচনা করি।

চলবে)


রচনাতারিখ: ২৮শে অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: বিকাল ০৫টা ০৫ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১২

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১২
———————————————– রমিত আজাদ

গত পর্বে লিখেছিলাম যে, কোন ম্যাসিভ বডি (যেমন সূর্য) তার চারপাশের স্থানটিকেই বাঁকা করে ফেলে। মহাকর্ষ ক্ষেত্রের গাণিতিক বর্ণনা করতে গিয়ে এমনটাই পেয়েছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইন। এত বড় একটি কথা (বৈপ্লবিক কথাই হোক আর পাগোলের প্রলাপই হোক) হজম করা খুব কঠিন হচ্ছিলো, সাধারণ মানুষের কাছে তো বটেই এমনকি বিজ্ঞানীদের কাছেও। এটা পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণ করা সম্ভব কেবল তখনই যখন সূর্যের ওপাশে দৃশ্যমান তারকাগুলিকে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। সূর্যের দিকে তাকালে চোখ ঝলসে যায়, তা ওপাশের তারকা আর দেখবো কি করে?! কিন্তু ঐ যে লিখেছিলাম যে, সব রহস্য সমাধানেরই কোন একটা পথ উপরওয়ালা খোলা রাখেন। আমাদের এই পৃথিবীর একটি সার্বক্ষণিক সঙ্গী রয়েছে। অন্যান্য গ্রহের তুলনায় সঙ্গীর সংখ্যা কম, মাত্র একটিই; কিন্তু পৃথিবীর এই সঙ্গীটি আবার আকারে বড়! তাই সে সাগর-নদীতে জোয়ার-ভাটা সহ নানা কাজে পৃথিবীবাসীকে সাহায্য করে। সেই সঙ্গীটির নাম চাঁদ। চাঁদ নামক উপগ্রহটি আকারে এমন ও পৃথিবী থেকে এমন একটি দূরত্বে রয়েছে যে, মাঝে মাঝে সে একটি চাকতি রূপে সূর্যকে ঢেকে ফেলতে পারে। সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদ সকলেই গতিশীল ও ঘূর্ণায়মান। ঘুরতে ঘুরতে তারা অনেক সময় এক সরলরেখায় উপস্থিত হয় এমনভাবে যে চাঁদটির অবস্থান হয় সূর্য ও পৃথিবীর ঠিক মাঝখানে। ঢেকে যায় সূর্য, পৃথিবীতে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার! এই প্রতিভাসের নাম সূর্যগ্রহণ। এই প্রাকৃতিক প্রতিভাস-কে প্রাচীনকালে অশুভ মনে করা হতো। যাহোক, আলবার্ট আইনস্টাইনের গবেষণা প্রকাশিত হওয়ার পর এই প্রতিভাসই বিজ্ঞান মহলে আশীর্বাদের মত মনে হলো। আইনস্টাইনের গবেষণা প্রকাশিত হওয়ার পর পরবর্তি সূর্যগ্রহণে সুযোগ আসলো, উনার তত্ত্বকে পরীক্ষার দ্বারা (Empirically) প্রমাণ করার।

১৯৮০ সালে (সম্ভবত ফেব্রুয়ারী মাসে) বাংলাদেশ একটি দীর্ঘ সূর্যগ্রহণ দেখা গিয়েছিলো (কয়েক ঘন্টা দীর্ঘায়ীত হয়েছিলো)। আমার মনে পড়ে যে আমরা শিশুরা এক্স-রে রিপোর্ট চোখে দিয়ে সেই সূর্যগ্রহণ প্রত্যক্ষ করেছিলাম। ঐ সূর্যগ্রহণ-এর সময় বেশ একটা উৎসব উৎসব ভাব হয়েছিলো সারা দেশে। সেইদিন পূর্ণ সূর্যগ্রহণ হওয়ার পর পর অনেককেই দেখলাম দূরবীন চোখে দিয়ে ঐ দিকে তাকাচ্ছে! আমি ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলাম। আমার বড় ভাই কবীর আহমেদ বললেন, “এরকম সময়ে আকাশে তারা দেখা যায়।” কথাটা আমাকে স্ট্রাইক করেছিলো। তাইতো, আকাশ তো অন্ধকারই হয়ে এসেছে, এরকম সময়ে আকাশে তারা দেখা যেতেই পারে।

ঠিক এই জাতীয় সুযোগেরই সদ্বব্যবহার করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। কথিত আছে যে, সেই আলবার্ট আইনস্টাইনের জটিল আপেক্ষিকতার তত্ত্ব বুঝতে পেরেছিলেন শুধু আরেকজন, উনার নাম এডিংটন (Arthur Stanley Eddington)। তাই এই তত্ত্বের ব্যবহারিক প্রমাণ নিয়ে উৎসাহ উনারই ছিলো সবচাইতে বেশি।

প্রসঙ্গত বলে রাখি যে কোন জ্যোতিষ্কের পাশ দিয়ে চলার পথে আলো বেঁকে যেতে পারে এই বিষয়ে আসলে প্রথম গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলোনে বিজ্ঞানী সোল্ডনার (Soldner) ১৮০৪ সালে। তিনি আল হাইয়াম ও নিউটনের আলোক কণিকা তত্ত্বকে ভিত্তি করে দেখিয়েছিলেন যে কোন ম্যাসিভ জ্যোতিষ্কের মহাকর্ষের টানে আলোর কণিকা স্রোত ক্রমাগত আকৃষ্ট হয়ে আলোকপথ বেঁকে যাবে। তিনি ঐ ডিফ্লেকশন-এর হিসাবও করেছিলেন। তিনি এও বলেছিলেন যে সূর্যের কাছাকাছি থাকা ফিক্সড স্টারগুলোকে পর্যবেক্ষণ করলে বিচ্যুত আলো দেখা যাবে। যেহেতু অত আগে এই ধরনের গবেষণা-পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব ছিলো না, তাই উনার গবেষণা নিয়ে আলোচনা আর বেশিদূর আগায় নাই।

যাহোক আর্থার এডিংটন-এর এক্সপিডিশন নিয়ে কথা হচ্ছিলো। ১৯১৯ সালের ২৯শে মে দু’টি এক্সপিডিশনের আয়োজন করা হয়। একটি আটলান্টিক মহাসাগরের এপাশে পশ্চিম আফ্রিকার দ্বীপ Príncipe-এ, এবং অপরটি মহাসাগরের ওপাড়ে ব্রাজিলের সোব্রাল শহরে। এক্সপিডিশন দুইটির লক্ষ্য ছিলো, সূর্যের কাছাকাছি থাকা তারকাগুলো থেকে পৃথিবীতে আসা আলোক রশ্মির বিচ্যুতি পরিমাপ করা। অবশ্য এই ডিফ্লেকশনের মান তাত্ত্বিকভাবে ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছিলো আলবার্ট আইনস্টাইনের গবেষণাপত্রে ১৯১১ ও ১৯১৫ সালে।

Príncipe-এর এক্সপিডিশনের সদস্য ছিলেন দু’জন বিজ্ঞানী Eddington এবং Edwin Turner Cottingham। উনারা কেমব্রিজ অবজারভেটরি-র সদস্য ছিলেন। আর ব্রাজিল এক্সপিডিশনের সদস্য ছিলেন গ্রীনউইচ অবজারভেটরির Andrew Crommelin এবং Charles Rundle Davidson।

Principe এক্সপিডিশনের ফলাফলটি ছিলো চমকপ্রদ। বেশ ঝড়-ঝঞ্ঝার পর উনারা ছবি তুলতে সক্ষম হন। যদিও মেঘমালা কিছু সমস্যার সৃষ্টি করেছিলো, তারপরেও তোলা ছবিগুলোর মধ্যে শেষ কয়েকটি ছবি বেশ কাজের ছিলো। এর মধ্যে একটি প্লেটের ছবি থেকে প্রাপ্ত ফলাফল আইনস্টাইনের গবেষণার সাথে একমত হয়।

১৯১৯ সালের নভেম্বর মাসে রয়াল সোসাইটির সভায় এই ফলাফল ঘোষিত হয়। Royal Astronomical Society কর্তৃক আয়োজিত একটি ভোজসভায় এডিংটন এই নিয়ে প্রাণ খুলে একটি রুবাই আবৃত্তি করেন, যা ছিলো কালজয়ী জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও কবি ওমার খৈয়াম-এর রুবাইয়ের অনুকরণে। রুবাইটি নিম্নরূপ:

Oh leave the Wise our measures to collate
One thing at least is certain, light has weight
One thing is certain and the rest debate
Light rays, when near the Sun, do not go straight.

— Arthur Stanley Eddington, RAS dinner

(প্রজ্ঞাময়-এর হাতে ছেড়ে দিলাম আমাদের পরিমাপগুলোর তুলনা-মানানা,
আলোর ওজন আছে, অন্ততপক্ষে এইটির দিতে পারি নিশ্চয়তা।
বাকীটা বিতর্ক হলেও একটি বিষয়ের আছে নিশ্চয়তা,
আলোক রশ্মি, যখন সূর্যের কাছাকাছি, তখন আর সে সোজা পথে চলেনা।)

  • আর্থার এডিংটন

চলবে)


রচনাতারিখ: ২৭শে অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ১১টা ২৯ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১১

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১১
————————————————————– রমিত আজাদ

‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General Theory of Relativity):
গত পর্বে লিখেছিলাম যে, ‘বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব নির্মান শেষ হওয়ার পর আইনস্টাইন লক্ষ্য করেছিলেন যে স্যার নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব, নবনির্মিত বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব-এর সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ। অতএব প্রয়োজন দেখা দিলো একটি সঙ্গতিপূর্ণ আপেক্ষিক মহাকর্ষতত্ত্ব নির্মান করার। এরপর তিনি নির্মান করলেন সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব। কি আছে এই সার্বিক তত্ত্বে?

একটি চুম্বকের চারদিকে একটি এলাকা জুড়ে তার প্রভাব আমরা দেখতে পাই। যেই প্রভাবে চুম্বক অপর একটি চুম্বককে অথবা কোন চৌম্বক-পদার্থকে আকর্ষণ-বিকর্ষণ করে। এই প্রভাবটিরই নাম দেয়া হয়েছে ক্ষেত্র (field)। চুম্বকের চারদিকের ক্ষেত্রকে বলি চুম্বক ক্ষেত্র। মানবের চোখে ক্ষেত্রটি অদৃশ্য। একইভাবে একটি চার্জের চারদিকেও একটি ক্ষেত্র থাকে যা অন্য কোন চার্জকে প্রভাবিত করে। এই ক্ষেত্রের নাম বিদ্যুৎ ক্ষেত্র (electric field)। এবার লক্ষ্য করুন যে, পৃথিবীর চারদিকেও কিছু একটা আছে, যার প্রভাবে ভরসম্পন্ন যেকোন কিছু পৃথিবীর দিকে চলে আসে। এটাও একটা ক্ষেত্র, যার নাম দেয়া হলো মহাকর্ষ ক্ষেত্র (gravitational field)।

১৯১৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন কিছু ক্ষেত্র সমীকরণ উপস্থাপন করেছিলেন (Einstein field equations)। এই সমীকরণগুলো এই বোঝালো যে বস্তু (matter) ও বিকিরণ (radiation) দ্বারা স্থান ও কাল কিভাবে প্রভাবিত হয়। হ্যাঁ স্থান-এর আলোচনা বা গণিত আসলে জ্যামিতি না এসে পারেই না। অপরদিকে পূর্বেই আলোচনা করেছি যে STR আসার পর স্পষ্টই বোঝা গেলো যে স্থান ও কাল পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। সুতরাং স্থান ও কাল উভয়ের আলোচনাতেই জ্যামিতি আসবে। কোন জ্যামিতি? কয়েক হাজার বছর ধরে পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি। পৃথিবীর সব গুলো সভ্যতাতেই জ্যামিতির অবদান রয়েছে, সব দেশেই জ্যামিতিবিদরা ছিলেন। তাই কোন দেশে প্রথম জ্যামিতির উদ্ভব হয়েছে এটা সুনিশ্চিত করে বলা যাবে না। তবে গ্রীসে জ্যামিতির উপর কালজয়ী গ্রন্থ লিখেছিলেন ইউক্লিড, তাই ঐ জ্যামিতি ইউরোপে ‘ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি’ নামে পরিচিত হয়। এই জ্যামিতিতে যা কিছু আলোচিত হয়েছে, সব আলোচিত হয়েছে সমতল পৃষ্ঠে। সমতল পৃষ্ঠ ছাড়াও যে অন্যরকম পৃষ্ঠ হতে পারে তা হয়তো তখন ভাবাই হয় নাই! ‘ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি’-তে বেশ কয়েকটি পস্টুলেট আছে, যা কোন প্রমাণ ছাড়াই মেনে নেয়া হয়েছিলো। এদের মধ্যে পঞ্চম পস্টুলেট-টি (যার অপর নাম সমান্তরাল পস্টুলেট) প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন অনেকেই (আল হাইয়াম, ওমার খৈয়াম, আল দ্বীন তুসি, প্রমুখ), কিন্তু তা প্রমাণ করা সম্ভব হয় নাই। হঠাৎ করে বক্রপৃষ্ঠ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখা গেলো যে ঐ পস্টুলেট-টি সঠিক নয়। কালক্রমে উনিশ শতকের দিকে নির্মিত হয় ‘নন-ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতি’। এখানে অনেক গণিতবিদেরই অবদান রয়েছে। আমি আপাতত জার্মান গণিতবিদ রিমান (Bernhard Riemann)-এর নামই উল্লেখ করবো।

আইনস্টাইনের সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব-এর মূল আলচ্য ছিলো মহাকর্ষ ক্ষেত্র। ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা আসলে, স্থান ও কাল নিয়ে আলোচনা আসবেই। স্থান-কাল নিয়ে আলোচনায় আসবে জ্যামিতি। আর যথাযথ জ্যামিতি বাছাই করতে গিয়ে আইনস্টাইন দেখলেন যে রিমানীয় জ্যামিতিই (Riemannian Geometry) এই ক্ষেত্রে সবচাইতে বেশি প্রযোজ্য। উনাকে আইডিয়াটি দিয়েছিলেন উনার বন্ধু মার্সেল গ্রসমান (Marcel Grossmann)। ফলে বোঝা গিয়েছিলো যে মহাকর্ষ ক্ষেত্রের সাথে স্থান-কালের বক্রতার সম্পর্ক রয়েছে। গাণিতিকভাবে দেখা গেলো যে, শক্তিশালী মহাকর্ষ ক্ষেত্রের কাছে আসলে আলোর চলার পথ বেঁকে যায়। কিন্তু আমরা তো জানি যে, আলো সরলপথে চলে। তাহলে কি কোন মহাকর্ষ ক্ষেত্রের কাছে ঐ চলার পথটাই বাঁকা? হ্যাঁ, আইনস্টাইনের ‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব ওটাই বলেছিলো যে, সূর্য বা ওরকম ম্যাসিভ কোন বডি তার চারপাশের স্থানটিকেই বাঁকিয়ে ফেলে, এটাকেই বৈজ্ঞানিকভাবে বলা হয় স্থান-কাল বক্রতা (space-time curvature)।

‘স্থান’ যা কিনা সাদা চোখে একটা শূণ্যতা ছাড়া আর কিছুই না, তা আবার বেঁকেও যেতে পারে! আইনস্টাইনের এই বৈপ্লবিক কথাটিকে তখন অনেকের কাছেই পাগোলের প্রলাপ বলে মনে হয়েছিলো!

ইতিপূর্বে কয়েকবার বলেছি যে তাত্ত্বিক বিজ্ঞান যাই বলুক না কেন, পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কখনোই মেনে নেয়া হয় না। তাই যে সকল বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের গাণিতিক উপস্থাপনায় চমৎকৃত হয়েছিলেন, তারা চাইলেন এর পরীক্ষালদ্ধ প্রমাণ। কি করে সম্ভব? সূর্যের ওপাশে অনেক তারকা আছে, যাদের আলো পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়। তাহলে ঐ আলো সূর্যের পাশ দিয়ে আসার সময় সূর্য কর্তৃক বাঁকানো পথটি ধরে আসবে (কবি জসীমউদ্দীনের সেই ‘রাখাল ছেলে’-র মত)। কিন্তু সমস্যা হলো যে, দিবালোকে তারকা দেখা সম্ভব না, তাও আবার সূর্যের ওপাশের তারকা। কিন্তু পথ তো একটি থাকতেই হবে! সৃস্টিকর্তা রহস্য যেমন রেখেছেন, আবার সেই রহস্য সমাধানের পথও রেখেছেন। কি সেই পথ?

(চলবে)

রচনাকাল: ২৭শে অক্টোবর, ২০২০ সাল
রচনাসময়: বিকাল ০১টা ৫৮ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১০

কৃষ্ণবিবর ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কারপর্ব ১০

—————————————————– রমিত আজাদ

গত পর্বে কবি ও বিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল-এর অবদান নিয়ে আলোচনা করা হয় নি। যাহোক খুব সংক্ষেপে বলবো যে, ১৮৬৫ সালে তিনি আবিষ্কার করেছিলেন যে, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড (যা পানির ফিল্ডের মতই)-কে যদি ডিস্টার্ব করা হয় (যেমন কোন শান্ত পুকুর-কে যদি একটা ঢিল ছুঁড়ে ডিস্টার্ব করা হয়) তবে সেই ডিস্টার্বেন্সটি ঐ ফিল্ডের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়বে এবং ক্রমশঃ সামনের দিকে অগ্রসর হবে (যেমনটি পানির ফিল্ডে ঢেউ তৈরী হয়ে ছড়িয়ে পড়ে); ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড-এ উদ্ভুত ঢেউ-এর নাম ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ। ম্যাক্সওয়েল এও দেখালেন যে, ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ একটি সুনির্দিষ্ট বেগে সঞ্চালিত হবে। আশ্চর্য্যজনকভাবে ঐ বেগ-এর মান, আলোকের বেগের মানের সাথে মিলে গিয়েছিলো।

প্রসঙ্গত বলে রাখি যে আপনাদের কারো বাড়ীতে যদি পুরাতন রঙিন টেলিভিশন থাকে, তার পর্দার কোন এক কোনায় একটি ম্যাগনেট ধরুন, দেখবেন যে আলোর রঙ কিভাবে পাল্টে যায়! এরকমই কাজ করা হয়েছিলো আলোর ক্ষেত্রে। একটি শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে আলোক রশ্মিকে পাঠানো হয়েছিলো, এবং পর্যবেক্ষিত হয়েছিলো যে, সেই আলো এঁকেবেকে যায়। তার মানে হলো, আলোর বিদ্যুৎ-চুম্বক ধর্ম রয়েছে। পরবর্তিতে অবশ্য স্পষ্টই প্রমাণিত হয়েছিলো যে, আলো আর বিদ্যুৎ-চুম্বক তরঙ্গ একই। জাস্ট, ‘বিদ্যুৎ-চুম্বক তরঙ্গ’-এর দৃশ্যমান অংশটিই রঙিন বা সাদা আলো হিসাবে আমাদের চোখে ধরা দেয়।

স্যার আইজাক নিউটন ও আপেলের গল্পটি আর নতুন করে বলার কিছু নাই। তার মানে হলো পৃথিবী যে একটি বলে কোন কিছুকে তার দিকে টানে এই নিয়ে ভাবনা থেকেই স্যার নিউটনের বিজ্ঞান গবেষণা শুরু। যারা রিসার্চ মেথডোলজির কোর্স করেছেন তারা জানেন যে, ‘বৃন্ত থেকে বিচ্যুত একটি আপেল কেন দশ দিকের নয় দিকে না গিয়ে কেবল নিম্নাভিমুখী হয়?’ এইটি একটি স্ট্যান্ডার্ড ‘রিসার্চ কোশ্চেন’। এই আলোচনার মোদ্দাকথা হলো যে, স্যার নিউটন গ্রাভিটেশন নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা করেছিলেন। এবং কালজয়ী ‘ইউনিভার্সাল ল অব গ্রাভিটেশন’-টি উনারই নির্মিত (যদিও হুক-ও কাজটি করেছিলেন)

একাদশ শতকে মুসলিম বিজ্ঞানী আল বিরুনী স্পষ্টভাবেই বলেছিলেন যে পৃথিবীর মত অন্যান্য জ্যোতিষ্কগুলোরও ভর ও মহাকর্ষ (gravity) আছে। তিনি এই পর্যায়ে দার্শনিক এরিস্টটলের সমালোচনা করেছিলেন এই কারণে যে, দার্শনিক এরিস্টটল মনে করতেন, অন্যান্য জ্যোতিষ্কগুলোর ভর ও মহাকর্ষ নাই।

দ্বাদশ শতকে আবুল বারাকাত আল বাগদাদী (Abu’l-Barakāt al-Baghdādī) ভূপৃষ্ঠে মুক্তভাবে পড়ন্ত বস্তুর ‘অভিকর্ষজ ত্বরণ’-এর ব্যাখ্যারও প্রস্তাবনা দিয়েছিলেন, এইভাবে আল বাগদাদী  এরিস্টটল প্রস্তাবিত fundamental dynamic law (যার ভাষ্য হলো ধ্রুব বল প্রযুক্ত থাকলে সমগতিবেগ থাকবে)-কে বাতিল করেছিলেন। ষোড়শ শতকে আল বিরজান্দি (Al-Birjandi) পৃথিবীর ঘূর্ণনকে ব্যাখ্যা করেছিলেন।

যাহোক, যা আলোচনা করছিলাম যে, স্যার নিউটনের ক্লাসিকাল গ্রাভিটেশন-এর সাথে আইনস্টাইনের নব-নির্মিত ‘বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব’ একমত হতে পারছিলো না। কেননা, STR দেখিয়েই দিয়েছে যে, আলোকের গতিবেগের চাইতে বেশি কোন গতিবেগ হতে পারে না; এমনকি কোন মিথষ্ক্রিয়া বা বল-এর গতিবেগও নয়। সুতরাং STR অনুযায়ী মহাকর্ষ বলের গতিবেগও আলোকের গতিবেগের চাইতে বেশি হতে পারবে না। অথচ স্যার নিউটনের বর্ণিত গ্রাভিটেশনাল ফোর্স-এর গতিবেগ অসীম!

ব্যাস ‘বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব’ নির্মিত হওয়ার পর প্রয়োজন দেখা দিলো ঐ একই আলোকে মানে আপেক্ষিক তত্ত্ব-এর আলোকে ‘মহাকর্ষ তত্ত্ব’-কে ব্যাখ্যা করার। অতঃপর গুরুত্বপূর্ণ ঐ কাজটিতে হাত দিয়ে আলবার্ট আইনস্টাইন ১৯১৫ সালে নির্মান করলেন ‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General Theory of Relativity)।

(চলবে)

—————————————————–

রচনাকাল: ২৫শে অক্টোবর, ২০২০ সাল

রচনাসময়: বিকাল ৪টা ৫৫ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৯

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৯

———————————————————– রমিত আজাদ

বিজ্ঞান আসলে পূর্ণাঙ্গ কিছু না। বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বিজ্ঞান নির্মিত হয় মানবজাতির অভিজ্ঞতার আলোকে। তাই অভিজ্ঞতার কমতি থাকলে বিজ্ঞানেও অপূর্ণতা থাকাটাই স্বাভাবিক। বিজ্ঞান চলমান। বিজ্ঞানের অন্যতম উদ্দেশ্যে, মানুষের অভিজ্ঞতাগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখা।

গত পর্বে ‘নিউটনীয় মেকানিক্স’ ও তার অনুসারী সনাতন তাপ গতিবিদ্যা-এর দুইটি ব্যার্থতার কথা আমি উল্লেখ করেছি। (আরো রয়েছে অবশ্য) ঐ দুইটি ব্যার্থতা থেকেই জন্ম নিয়েছিলো দুইটি নতুন বিজ্ঞানের – ১। আপেক্ষিক বলবিজ্ঞান (Relativistic Mechanics) ও ২। কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞান (Quantum Mechanics)।

এটা বোঝাই গিয়েছিলো যে চিরায়ত বলবিজ্ঞান (Classical Mechanics) যেহেতু ঐসব প্রতিভাস ব্যাখ্যা করতে ব্যার্থই হচ্ছে, অতএব নতুন বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

আমার এই লেখায় আমি কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়ে আলোচনা খুব একটা করবো না। যেহেতু আমাদের আলোচনার মূল বিষয় ‘কৃষ্ণবিবর’ ও এবারের নোবেল পুরষ্কার; এর সাথে রিলেটিভিস্টিক মেকানিক্সের সম্পর্কই বেশী।

‘বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব (Special Theory of Relativity):

মাইকেলসন ও মোরলের পরীক্ষায় এটাই প্রমাণিত হলো যে আলোকের গতিবেগ, আলোর উৎস বা পর্যবেক্ষকের গতির উপর মোটেও নির্ভরশীল নয়। মানে, গ্যালিলিও-নিউটনের আপেক্ষিক বেগের সংযোজন-বিয়োজন সূত্র আলো মেনে চলে না। বিজ্ঞানের কথা সুস্পষ্ট যে, পরীক্ষার দ্বারা যা প্রমাণিত হলো তাই মেনে নিতে হবে, ওটাই সত্য (যদি পরীক্ষায় ভুল না থাকে)। এর থেকে কি বোঝা গেলো? এর থেকে এই বোঝা গেলো যে, শূণ্য মাধ্যমে আলোকের বেগ ধ্রুব, আর যেহেতু উৎস বা পর্যবেক্ষকের গতির উপর নির্ভর করে সে বৃদ্ধি পায় না, তাহলে ঐ বেগই সর্বচ্চো।

তবে এতকাল নিউটনীয় বলবিদ্যা যে সকল গতিকে ব্যাখ্যা করেছিলেন সেগুলি কি? সেগুলি হলো স্বল্প গতি। সেই নিউটনের সময়ে পৃথিবীর দ্রুততম গতি সম্ভবত ছিলো চিতা (cheetah)-র গতি (১০৯ কিলোমিটার/ঘন্টা)। তখন তো ট্রেন বা বিমান কোনটাই ছিলো না। ঐ মাপের গতির ব্যাখ্যায় নিউটনীয় বলবিদ্যা সফল ছিলো, কিন্তু আলোকের গতিবেগ, যা ঐ তুলনায় বহু বহু গুণ বেশি তার ব্যাখ্যা নিয়ে নিউটন ভাবেননি। গ্যালিলিও অবশ্য একবার আলোকের গতিবেগ মাপতে গিয়ে ব্যার্থ হয়ে, সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে আলোকের গতিবেগ অসীম। মোদ্দা কথা হলো যে স্বল্প গতির ব্যাখ্যায় নিউটনীয় মেকনিক্স সফল, অতিদ্রুত গতির ব্যাখ্যায় নিউটনীয় মেকনিক্স অকার্যকর।

কিন্তু আলোকের গতি মানে অতিদ্রুত গতি নিয়ে কাজ যেহেতু বিজ্ঞানীরা শুরুই করে দিয়েছেন তাহলে ঐ দায়িত্ব কোন বিজ্ঞান নেবে? অতঃপর প্রয়োজন দেখা দিলো নতুন বিজ্ঞান সৃষ্টির। এবং দায়িত্বটি নিলেন বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন। এই নতুন বিজ্ঞানের নাম তিনি দিলেন ‘বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব’ (Special Theory of Relativity – সংক্ষেপে STR)। ‘আপেক্ষিক তত্ত্ব’ টার্মটির আগে ‘বিশেষ’ কথাটা কেন জুড়ে দেয়া হলো? কারণ, কিছুকাল পরে তিনি আরো একটি  ‘আপেক্ষিক তত্ত্ব’ ইনট্রোডিউস করেছিলেন যার নাম ‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব’ (General Theory of Relativity), এই নিয়ে পরে আলোচনা করা হবে। আপাতত:  ‘বিশেষ আপেক্ষিক তত্ত্ব’ বিশেষত্বটি কোথায় সেটা বলছি; এই তত্ত্ব কেবল এমন গতি নিয়ে আলোচনা করে যেখানে কোন বডির গতি সমবেগ (uniform); মানে বডিটির বেগ বাড়েও না, কমেও না, মানে কোন ত্বরণ নাই।

এই বিজ্ঞান অতীতের অনেক ধারনাই পাল্টে দিলো এবং বিশ্বজগৎ সম্পর্কে আমাদেরকে সম্পুর্ণ নতুন ধারনা দিলো। আমার এই আর্টিকেলের ক্ষুদ্র পরিসরে অত কথা বলা সম্ভব নয়, আপাতত STR-এর  সামান্য কয়েকটি অবদান উল্লেখ করছি। যেমন STR আমাদেরকে দিয়েছে সর্বকালের সেরা সমীকরণগুলোর অন্যতম E=mc^2। STR পাল্টে দিয়েছে স্থান ও কাল সম্পর্কিত সনাতনী চিন্তাভাবনা। বুঝিয়েছে যে স্থান ও কাল নিজে থেকে কিছু নয়, বরং বস্তু বা ম্যাটারেরই বৈশিস্ট্য। এমনকি স্থান ও কাল-কে সংযুক্ত করে দিয়েছে নতুন ধারনা – ‘স্থান-কাল’। আবার তারা উভয়েই যে গতির উপর নির্ভরশীল সেটাও আমাদেরকে গাণিতিকভাবে বুঝিয়েছে। এবং গতির উপর নির্ভর করে হতে পারে স্থানের ‘দৈর্ঘ্যের সংকোচন’ (length contraction), হতে পারে ‘সময়ের প্রসারণ (time dilation), কারো কাছে সময় খুব দীর্ঘ, কারো কাছে সময় খুব ছোট; কারো জীবনে পার হয়েছে দীর্ঘ দশ বছর, এদিকে গতির কারণে কারো জীবনে ঐ একই ইন্টারভালে পার হয়েছে মাত্র এক বৎসর! । শুধু তাই নয়, পদার্থের যেই ভর নিয়ে আমি প্রবন্ধের প্রথম পর্বে আলোচনা করেছিলাম, সেই ‘ভর’-কেও STR আপেক্ষিক বলছে। মানে বডির গতির উপর নির্ভর করে তার ‘ভর’ কম-বেশি হতে পারে। যে চুম্বক ক্ষেত্র বা বলকে এতকাল যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করা যায়নি, তাকেও ব্যাখ্যা করেছে STR। গতি যে কতভাবে বডি, পর্যবেক্ষক, স্থান, কাল, ক্ষেত্র, ইত্যাদিকে প্রভাবিত করতে পারে তা STR না আসলে বোঝা বা জানা যেত না। আইনস্টাইন তার কালজয়ী কাজগুলো প্রথম প্রকাশ করেছিলেন ১৯০৫ সালে। এই সালটিকে ল্যাটিন ভাষায় ‘অ্যানাস মিরাবিলিস’ অর্থাৎ ‘অলৌকিক বছর’ বলা হয়।

(অনেকেই মনে করে থাকেন যে আলবার্ট আইনস্টাইনের এই গবেষণা বা কাজগুলো মূলত: তার প্রথম স্ত্রী মিলেভা ম্যারিক -এর কাজ, যা আলবার্ট আইনস্টাইনের নামেই প্রচারিত হয়েছে। যাহোক, এই প্রবন্ধের আওতায় আর আলোচনাটি টানবো না।)

ব্যাপক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General Theory of Relativity):

মুসলিম পলিম্যাথ আল বিরুনী সফলভাবে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ নির্ণয় করেছিলেন। কিভাবে? তিনি কি একটা ফিতা নিয়ে মাটির উপর থেকে পৃথিবীর কেন্দ্র পর্যন্ত ঢুকেছিলেন? অবশ্যই না। সেটা সম্ভবও না। তবে কি তিনি গোলাকার পুরো পৃথিবীটা একবার ঘুরে এসেছিলেন, তারপর পরিধির মাপ থেকে ব্যাসার্ধ করেছিলেন? না তাও না। তিনি ভ্রমণ করেছিলেন সত্য, তবে পুরো পৃথিবী ঘুরে আসেননি। কাজটা প্রথম করেছিলো ম্যাগিলান, তা আল বিরুনীর মৃত্যুর কয়েকশত বছর পরে। তবে পলিম্যাথ আল বিরুনী কিভাবে তা করেছিলেন? বিজ্ঞানের জন্ম হয়েছে বেশি বছর হয় নি, কিন্তু জ্যামিতির জন্ম হয়েছে নগর সভ্যতার জন্ম হওয়ারও পূর্বে। একদিকে যথার্থ জ্যামিতি যেমন মানব মস্তিষ্ক ছাড়া আর কোথাও থাকতে পারে না, আরেকদিকে এই জ্যামিতি মহাবিশ্বে অধিকতর বাস্তব। মানবদেহের পড়ন থেকে শুরু করে নক্ষত্রের গড়ন ও ঘূর্ণন পর্যন্ত সবই জ্যামিতি। আল বিরুনী বুঝতে পেরেছিলেন যে জ্যামিতির যথাযথ ব্যবহারই পারবে সফলভাবে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ বের করতে। এর জন্য উনার প্রয়োজন ছিলো, একটি পর্বত চূড়া ও তার পাদদেশে লম্বা সমতলভূমি। ঐতিহাসিক কাজটি তিনি করেছিলেন এগারো শতকে আধুনিক পাকিস্তানের নন্দনা নামক জায়গায়।

আল বেরুনীর গণনা থেকে এই প্রতীয়মান হয় যে মহাবিশ্বের অনেক রহস্যই সফলভাবে সমাধান করা যায় জ্যামিতির প্রয়োগ করে। বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনও মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করার প্রধান হাতিয়ার হিসাবে জ্যামিতিকেই বেছে নিয়েছিলেন।

কোন বডির সমবেগ ছাড়াও আরেকটি গতিবেগ রয়েছে, আর তা হলো ত্বরান্বিত গতিবেগ। বডির সমবেগ নিয়ে কাজ শেষ হওয়ার পর আলবার্ট আইনস্টাইন এই ত্বরান্বিত গতিবেগ নিয়ে কাজ করা শুরু করেন।

‘ত্বরণ’ শব্দটির সাথে আমি প্রথম পরিচিত হই নবম শ্রেণীতে। বুঝলাম, গাড়ীতে এক্সিলারেটরে চাপ দিলে গতিবেগ বাড়ে কেন। আসলে কোন বডির গতিবেগ বৃদ্ধি পাওয়াটাই হলো ত্বরণ। এরপর শিখলাম ‘অভিকর্ষজ ত্বরণ’ (acceleration due to gravity), মানে পৃথিবীতে কোন বডি-কে উপর থেকে ছেড়ে দিলে, তার গতিবেগ ক্রমাগত বাড়তেই থাকে এবং যখন সে ভূপৃষ্ঠে আঘাত হানে তখন তার গতিবেগ সর্বচ্চো। এবার বুঝলাম যে, ফুটবল খেলার সময় বলটা যদি অল্প উপর থেকে মাথায় পড়ে তখন কোন ব্যাথা পাইনা, কিন্তু যখন অনেক উপর থেকে বলটি মাথায় পড়ে, তখন বেশ ব্যাথা অনুভূত হয়। অনুরূপভাবে বলা যায় যে, (উপরওয়ালার দয়া কামনা করি) যদি কেউ একতলার ছাদ থেকে পড়ে, তাহলে বড় জোর হাত পা ভাঙে; কিন্তু দশ তলার ছাদ থেকে পড়লে আর আর রক্ষা নাই!

উপরের আলোচনা থেকে এই বুঝলাম যে মহাকর্ষের সাথে ত্বরণের একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিজ্ঞানী আইনস্টাইনও এটা ধরতে পেরেছিলেন, তাই তিনি মহাকর্ষের ব্যাখ্যা করার জন্য ত্বরণ-কে বিবেচনা করে একটা নতুন আপেক্ষিক তত্ত্ব-এর জন্ম দেন, যার নাম ‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General Theory of Relativity)’। আর এই ব্যাখ্যায় তিনি গাণিতিক টুল হিসাবে জ্যামিতিকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন সবচাইতে বেশি।

পরবর্তি পর্বে ‘সার্বিক আপেক্ষিক তত্ত্ব (General Theory of Relativity)’ নিয়ে আলোচনা করা হবে।

—————————————————–

রচনাকাল: ২৫শে অক্টোবর, ২০২০ সাল

রচনাসময়: রাত ২টা ৫৫ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

পুষ্প-রূপসী মৌন কেন?

Malare Mounama (মালারে মৌনামা)

পুষ্প-রূপসী মৌন কেন?

মূল গীতিকার: ভাইরামথু (তামিল ভাষায়)
বাংলা অনুবাদ: রমিত আজাদ

:ও পুষ্প-রূপসী প্রিয়তমা, কেন তোমার এত মৌনতা?
তুমি কি নীরবতা ছাড়া আর কিছুই জানো না?
:ফুলরা কি কথা বলে?
আর যদি কথা বলতেই শুরু করে, তাহলে কি আর তাকে থামানো যাবে?

:আমি কি এই কায়া ও আত্মা নিয়ে এতকাল কেবল আধাআধি বেঁচে ছিলাম?
:তার মানে কি এই যে, আমাকে পেয়ে তুমি বাকী অর্ধেক জীবনটা খুঁজে পেলে?

:এখন মনের গভীরে ভীষণ শান্তি!
:তবুও হৃদয়ে কেন কিছু ক্ষত আজি?

:এক অবর্ণনীয় আনন্দ এখন মনের গভীরে বইছে!
:কেন এখন আমার হৃদয় দুলতে শুরু করছে?

:আমি কি তোমার হাত ধরতে পারি?
:তুমি চাইলে করতে পারো আরো কিছু বেশি ।
:তুমি কি এখন আমাকে তোমার বুকে চেপে ধরতে পারবে?

:ও ফুল্ল-রূপসী প্রিয়তমা, কেন তোমার এত নীরবতা?
তুমি কি নীরবতা ছাড়া আর কিছুই জানো না?
:ফুলরা কি কথা বলে?
আর যদি কথা বলতেই শুরু করে, তাহলে কি আর সে থামবে?

:আমি চোখ বুঁজে এই সব কিছু স্বপ্নে দেখছিলাম!
:আর আমি বাতাসের মত এসে, খুব ধীরে ধীরে তোমার চোখ খোলালাম।

:ওহ বাতাস, আমাকে কোন খেলায় ধাবিত করো না।
:ওহ, সুন্দর ফুল, আমাকে দূরে সরিয়ে দিও না।
:ওহ বাতাস, আমাকে কোন খেলায় ধাবিত করো না।
:ওহ, সুন্দর ফুল, আমাকে দূরে সরিয়ে দিও না।

:ওহ, আমার প্রিয়তম! ওহ, আমার সাথী!
:ওহ, আমার আত্মার অস্তিত্ব!
:তুমি সেই অত্যুত্তম যে আমাকে, নতুন সতেজ জীবন এনে দিয়েছ।

:ও পুষ্প-রূপসী প্রিয়তমা, কেন তোমার এত মৌনতা?
তুমি কি মৌনতা ছাড়া আর কিছুই জানো না?
:ফুলরা কি কথা বলে?

আর যদি কথা বলতেই শুরু করে, তাহলে কি আর তাকে থামানো যাবে?


Malare Mounama Mouname Vedhama
Malargal Pesuma Pesinal Ooyuma Anbe
Oh, woman, so tender like a flower!
Hey, why the silence? Is being silent all you know?
Do the blossoms speak?
However, when they begin, will they stop? Ah, my darling!

:ও ফুল্ল-রূপসী প্রিয়তমা, কেন তোমার এত নীরবতা?
তুমি কি নীরবতা ছাড়া আর কিছুই জানো না?
:ফুলরা কি কথা বলে?
আর যদি কথা বলতেই শুরু করে, তাহলে কি আর তাকে থামানো যাবে?

Padhi Jeevan Kondu Dhegam Vazhndhu Vandhadho
Meedhi Jeevan Unnai Partha Podhu Vandhadho
Was I only half alive with this body of mine, before?
So, you got the rest of your life after seeing me, then?

:আমি কি এই কায়া ও আত্মা নিয়ে এতকাল কেবল আধাআধি বেঁচে ছিলাম?
:তার মানে কি এই যে, আমাকে পেয়ে তুমি বাকী অর্ধেক জীবনটা খুঁজে পেলে?

Edho Sugam Ulloorudhe
Enoo Manam Thalladudhe
There is some comfort deep within.
Wonder why there is some distortion at heart in spite?

:এখন মনের গভীরে ভীষণ শান্তি!
:তারপরেও হৃদয়ে কেন কিছু ক্ষত আছে?

Edho Sugam Ulloorudhe
Enoo Manam Thalladudhe
An indescribable pleasure is flowing within now!
Why is the heart starting to wave now?

এক অবর্ণনীয় আনন্দ এখন মনের গভীরে বইছে!
কেন এখন আমার হৃদয় দুলতে শুরু করছে?

Viralgal Thodava
Virundhai Perava
Marboodu Kangal Moodava
Could I hold your hand?
You could go beyond that and feast upon love.
Could you embrace me on closer to your chest now?

:আমি কি তোমার হাত ধরতে পারি?
:তুমি চাইলে আরো বেশি কিছু করতে পারো।
:তুমি কি এখন আমাকে তোমার বুকে চেপে ধরতে পারবে?

Malare Mounama, Malargal Pesuma
Oh, flower-like beautiful woman! Why have you embraced silence?
Do the flowers actually speak?

:ও ফুল্ল-রূপসী প্রিয়তমা, কেন তোমার এত নীরবতা?
তুমি কি নীরবতা ছাড়া আর কিছুই জানো না?
:ফুলরা কি কথা বলে?
আর যদি কথা বলতেই শুরু করে, তাহলে কি আর তাকে থামানো যাবে?

Kanavu Kandu Endhan Kangal Moodi Kidandhen
Katrai Pola Vandhu Kangal Mella Thirandhen
I’ve been in a dreaming all this with my eyes closed.
And, like the wind, I came and slowly made you open your eyes.

:আমি চোখ বুঁজে এই সব কিছু স্বপ্নে দেখছিলাম!
:আর আমি বাতাসের মত এসে, খুব ধীরে ধীরে তোমার চোখ খোলালাম।

Katre Enai Killadhiru
Poove Ennai Thalladhiru
Katre Enai Killadhiru
Poove Ennai Thalladhiru
Oh wind, don’t trigger me into some play.
Oh, lovely flower, just don’t push me away.
Yeah, wind, please don’t pinch me!
Oh floweret, don’t give me a push!

:ওহ বাতাস, আমাকে কোন খেলায় ধাবিত করো না।
:ওহ, সুন্দর ফুল, আমাকে দূরে সরিয়ে দিও না।
:ওহ বাতাস, আমাকে কোন খেলায় ধাবিত করো না।
:ওহ, সুন্দর ফুল, আমাকে দূরে সরিয়ে দিও না।

Uravil Urave
Uyirin Uyire
Pudhu Vazhkai Thandha Vallale
Oh,, my sweetheart! Oh, my partner!
The existence in my soul!
You are the wonderful one who brought me a new, afresh life.

:ওহ, আমার প্রিয়তম! ওহ, আমার সঙ্গী!
:ওহ, আমার আত্মার অস্তিত্ব!
:তুমি সেই অত্যুত্তম যে আমাকে, নতুন সতেজ জীবন এনে দিয়েছ।

Malare Mounama Mouname Vedhama
Malargal Pesumaa A Pesinal Ooyuma Anbe
Oh beautiful woman, Why have you taken-up silence?
And just being silent, is that all you know to do?
Do the flowers really speak? If yes, oh darling, would they ever stop?

:ও ফুল্ল-রূপসী প্রিয়তমা, কেন তোমার এত নীরবতা?
তুমি কি নীরবতা ছাড়া আর কিছুই জানো না?
:ফুলরা কি কথা বলে?
আর যদি কথা বলতেই শুরু করে, তাহলে কি আর তাকে থামানো যাবে?


Song Name: Malare Mounama (Tamil)
Album/Movie: Karnaa (1995)
Singer(s): S. P. Balasubrahmanyam, S. Janaki Lyrics
Writer(s): Vairamuthu
Music Director(s): Vidyasagar
Actor(s): Arjun Sarja, Ranjitha, Vineetha

(ইংরেজী অনুবাদ ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা)
https://lyricsraag.com/malare-mounama-translation-karnaa-movie/


তারিখ: ২৪শে অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ২টা ২৭ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

Malare Mounama (মালারে মৌনামা)

Malare Mounama (মালারে মৌনামা)

ফুল্ল-রূপসী নীরব কেন?

মূল গীতিকার: ভাইরামথু (তামিল ভাষায়)
বাংলা অনুবাদ: রমিত আজাদ

:ও ফুল্ল-রূপসী প্রিয়তমা, কেন তোমার এত নীরবতা?
তুমি কি নীরবতা ছাড়া আর কিছুই জানো না?
:ফুলরা কি কথা বলে?
আর যদি কথা বলতেই শুরু করে, তাহলে কি আর তাকে থামানো যাবে?

:আমি কি এই কায়া ও আত্মা নিয়ে এতকাল কেবল আধাআধি বেঁচে ছিলাম?
:তার মানে কি এই যে, আমাকে পেয়ে তুমি বাকী অর্ধেক জীবনটা খুঁজে পেলে?

:এখন মনের গভীরে ভীষণ শান্তি!
:তারপরেও হৃদয়ে কেন কিছু ক্ষত আছে?

:এক অবর্ণনীয় আনন্দ এখন মনের গভীরে বইছে!
:কেন এখন আমার হৃদয় দুলতে শুরু করছে?

:আমি কি তোমার হাত ধরতে পারি?
:তুমি চাইলে আরো বেশি কিছু করতে পারো।
:তুমি কি এখন আমাকে তোমার বুকে চেপে ধরতে পারবে?

:ও ফুল্ল-রূপসী প্রিয়তমা, কেন তোমার এত নীরবতা?
তুমি কি নীরবতা ছাড়া আর কিছুই জানো না?
:ফুলরা কি কথা বলে?
আর যদি কথা বলতেই শুরু করে, তাহলে কি আর তাকে থামানো যাবে?

:আমি চোখ বুঁজে এই সব কিছু স্বপ্নে দেখছিলাম!
:আর আমি বাতাসের মত এসে, খুব ধীরে ধীরে তোমার চোখ খোলালাম।

:ওহ বাতাস, আমাকে কোন খেলায় ধাবিত করো না।
:ওহ, সুন্দর ফুল, আমাকে দূরে সরিয়ে দিও না।
:ওহ বাতাস, আমাকে কোন খেলায় ধাবিত করো না।
:ওহ, সুন্দর ফুল, আমাকে দূরে সরিয়ে দিও না।

:ওহ, আমার প্রিয়তম! ওহ, আমার সঙ্গী!
:ওহ, আমার আত্মার অস্তিত্ব!
:তুমি সেই অত্যুত্তম যে আমাকে, নতুন সতেজ জীবন এনে দিয়েছ।

:ও ফুল্ল-রূপসী প্রিয়তমা, কেন তোমার এত নীরবতা?
তুমি কি নীরবতা ছাড়া আর কিছুই জানো না?
:ফুলরা কি কথা বলে?

আর যদি কথা বলতেই শুরু করে, তাহলে কি আর তাকে থামানো যাবে?

Malare Mounama Mouname Vedhama
Malargal Pesuma Pesinal Ooyuma Anbe
Oh, woman, so tender like a flower!
Hey, why the silence? Is being silent all you know?
Do the blossoms speak?
However, when they begin, will they stop? Ah, my darling!

:ও ফুল্ল-রূপসী প্রিয়তমা, কেন তোমার এত নীরবতা?
তুমি কি নীরবতা ছাড়া আর কিছুই জানো না?
:ফুলরা কি কথা বলে?
আর যদি কথা বলতেই শুরু করে, তাহলে কি আর তাকে থামানো যাবে?

Padhi Jeevan Kondu Dhegam Vazhndhu Vandhadho
Meedhi Jeevan Unnai Partha Podhu Vandhadho
Was I only half alive with this body of mine, before?
So, you got the rest of your life after seeing me, then?

:আমি কি এই কায়া ও আত্মা নিয়ে এতকাল কেবল আধাআধি বেঁচে ছিলাম?
:তার মানে কি এই যে, আমাকে পেয়ে তুমি বাকী অর্ধেক জীবনটা খুঁজে পেলে?

Edho Sugam Ulloorudhe
Enoo Manam Thalladudhe
There is some comfort deep within.
Wonder why there is some distortion at heart in spite?

:এখন মনের গভীরে ভীষণ শান্তি!
:তারপরেও হৃদয়ে কেন কিছু ক্ষত আছে?

Edho Sugam Ulloorudhe
Enoo Manam Thalladudhe
An indescribable pleasure is flowing within now!
Why is the heart starting to wave now?

এক অবর্ণনীয় আনন্দ এখন মনের গভীরে বইছে!
কেন এখন আমার হৃদয় দুলতে শুরু করছে?

Viralgal Thodava
Virundhai Perava
Marboodu Kangal Moodava
Could I hold your hand?
You could go beyond that and feast upon love.
Could you embrace me on closer to your chest now?

:আমি কি তোমার হাত ধরতে পারি?
:তুমি চাইলে আরো বেশি কিছু করতে পারো।
:তুমি কি এখন আমাকে তোমার বুকে চেপে ধরতে পারবে?

Malare Mounama, Malargal Pesuma
Oh, flower-like beautiful woman! Why have you embraced silence?
Do the flowers actually speak?

:ও ফুল্ল-রূপসী প্রিয়তমা, কেন তোমার এত নীরবতা?
তুমি কি নীরবতা ছাড়া আর কিছুই জানো না?
:ফুলরা কি কথা বলে?
আর যদি কথা বলতেই শুরু করে, তাহলে কি আর তাকে থামানো যাবে?

Kanavu Kandu Endhan Kangal Moodi Kidandhen
Katrai Pola Vandhu Kangal Mella Thirandhen
I’ve been in a dreaming all this with my eyes closed.
And, like the wind, I came and slowly made you open your eyes.

:আমি চোখ বুঁজে এই সব কিছু স্বপ্নে দেখছিলাম!
:আর আমি বাতাসের মত এসে, খুব ধীরে ধীরে তোমার চোখ খোলালাম।

Katre Enai Killadhiru
Poove Ennai Thalladhiru
Katre Enai Killadhiru
Poove Ennai Thalladhiru
Oh wind, don’t trigger me into some play.
Oh, lovely flower, just don’t push me away.
Yeah, wind, please don’t pinch me!
Oh floweret, don’t give me a push!

:ওহ বাতাস, আমাকে কোন খেলায় ধাবিত করো না।
:ওহ, সুন্দর ফুল, আমাকে দূরে সরিয়ে দিও না।
:ওহ বাতাস, আমাকে কোন খেলায় ধাবিত করো না।
:ওহ, সুন্দর ফুল, আমাকে দূরে সরিয়ে দিও না।

Uravil Urave
Uyirin Uyire
Pudhu Vazhkai Thandha Vallale
Oh,, my sweetheart! Oh, my partner!
The existence in my soul!
You are the wonderful one who brought me a new, afresh life.

:ওহ, আমার প্রিয়তম! ওহ, আমার সঙ্গী!
:ওহ, আমার আত্মার অস্তিত্ব!
:তুমি সেই অত্যুত্তম যে আমাকে, নতুন সতেজ জীবন এনে দিয়েছ।

Malare Mounama Mouname Vedhama
Malargal Pesumaa A Pesinal Ooyuma Anbe
Oh beautiful woman, Why have you taken-up silence?
And just being silent, is that all you know to do?
Do the flowers really speak? If yes, oh darling, would they ever stop?

:ও ফুল্ল-রূপসী প্রিয়তমা, কেন তোমার এত নীরবতা?
তুমি কি নীরবতা ছাড়া আর কিছুই জানো না?
:ফুলরা কি কথা বলে?
আর যদি কথা বলতেই শুরু করে, তাহলে কি আর তাকে থামানো যাবে?


Song Name: Malare Mounama (Tamil)
Album/Movie: Karnaa (1995)
Singer(s): S. P. Balasubrahmanyam, S. Janaki Lyrics
Writer(s): Vairamuthu
Music Director(s): Vidyasagar
Actor(s): Arjun Sarja, Ranjitha, Vineetha

(ইংরেজী অনুবাদ ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা)
https://lyricsraag.com/malare-mounama-translation-karnaa-movie/


তারিখ: ২৪শে অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ২টা ২৭ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৮

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৮

———————————————– রমিত আজাদ

আধুনিক বিজ্ঞানের জনক আল হাইয়াম (Al Hazen)। উনার লেখা কালজয়ী গ্রন্থের নাম ‘কিতাব আল মানাজির’ (Kitāb al-Manāẓir; Latin: De Aspectibus or Perspectiva)। যার বাংলা অর্থ হবে ‘আলোকবিজ্ঞান গ্রন্থ’। বেসিকালি তখনই ফিজিক্স বা পদার্থবিজ্ঞানের জন্ম হয়ে গিয়েছিলো। তারপর ইবনে সাহিল, আল বিরুণী, ওমার খৈয়াম, প্রমুখদের নাম তো আসেই। তার কয়েক শতাব্দী পরে অন্ধকার যুগ অতিক্রম করে ইউরোপ যখন রেনেসাঁয় পা রাখলো, তখনকার প্রথম বিজ্ঞানী গ্যালিলিও-কে বলা যেতে পারে, আর ঠিক তার পরপরই এলেন স্যার আইজাক নিউটন। যদিও তিনি তার কালজয়ী বইটির নামে ‘সায়েন্স’ শব্দটি ব্যবহার না করে ‘ফিলোসফি’ শব্দটিই ব্যবহার করেছিলেন। উনার বইয়ের নাম Philosophiæ Naturalis Principia Mathematica। এই বইটিতে লিপিবদ্ধ বিজ্ঞানটিকে এখন আমরা বলি, ‘নিউটনিয়ান মেকানিক্স’ বা ‘ক্লাসিকাল মেকানিক্স’। কেন? হ্যাঁ, এই বইটি পুরো পৃথিবী জুড়ে প্রভাব বিস্তার করেছিলো সুদীর্ঘ তিনশত বছর। মানবের অজানা অনেক কিছু, বিশেষত বডিগুলোর গতি সংক্রান্ত সব প্রশ্নেরই নিখুঁত উত্তর দেয়া যাচ্ছিলো, এই বিজ্ঞানের সাহায্য। রেলগাড়ী থেকে বিমান পর্যন্ত, চাঁদ থেকে শুরু করে নক্ষত্র পর্যন্ত সবকিছুর গতিরই সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেয়া যাচ্ছিলো অকপটে।

হঠাৎ করেই উনবিংশ শতকের শেষদিকে ও বিংশ শতকের গোড়ার দিকে বেশ কিছু সমস্যার মুখোমুখি হলেন বিজ্ঞানীরা। এমন কিছু সমস্যা যার কোন সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব হচ্ছিলো না নিউটনের বিজ্ঞান ব্যবহার করে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তাকে সাংঘর্ষিকই মনে হচ্ছিলো!

ম্যাক্স প্লাংক খুব প্রতিভাবান ছাত্র ছিলেন, তাই তার শিক্ষক তাকে ফিজিক্স পড়তে নিষেধ করেছিলেন। কারণ ঐ শিক্ষকের ধারনা ছিলো যে ফিজিক্স নামক বিজ্ঞানটি কমপ্লিট হয়ে গিয়েছে, সেখানে আর নতুন কিছুই দেয়ার বা আবিষ্কার করার নাই। আসলে কিন্তু তা ছিলো না; ঠিক ঐ সময়ে দুইটি বড় সমস্যা বিজ্ঞানীদের বিশাল মাথাব্যাথা ছিলো – একটি হলো ‘কৃষ্ণবস্তু বিকিরণ’-এর কোন সঠিক ব্যাখ্যা দিতে না পারা, আর দ্বিতীয়টি হলো ‘আলোকের গতিবেগ আপেক্ষিক গতিতে বেগের যোজন-বিয়োজন সূত্র মেনে চলে না।

ইথার সমস্যা:

একসময় আমাদের চেনা তরঙ্গগুলো ছিলো শব্দতরঙ্গ, পানিতরঙ্গ ইত্যাদি। তাদের সঞ্চালনের জন্য যে গ্যাসীয়, তরল বা কঠিন মাধ্যমের প্রয়োজন হয় তা আমরা স্বচক্ষেই দেখেছিলাম। সেখান থেকেই এই ধারণা জন্মেছিলো যে আলো নামক নব্য আবিষ্কৃত বিদ্যুৎ-চুম্বক তরঙ্গ-ও নিশ্চয়ই কোন না কোন মাধ্যমের মধ্য দিয়ে সঞ্চালিত হয়। হাইপোথিটিকালী তার নাম দেয়া হয়েছিলো ‘ইথার’। তবে ঐ যে বিজ্ঞানে সবকিছুই পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণিত হতে হবে। তাই মাইকেলসন ও মোরলে নামক দুইজন বিজ্ঞানী নেমে গেলেন তা প্রমাণ করতে। কিন্তু ফল হলো উল্টা। নানাভাবে পরীক্ষা করে যে ফল পাওয়া গেল তা রীতিমত বিস্ময়কর! মহাবিশ্বে ‘ইথার’-এর কোনো অস্তিত্ব নাই! তার মানে কি? তার মানে হলো আলোক নামক বিদ্যুৎ-চুম্বক তরঙ্গ সঞ্চালিত হওয়ার জন্য কোন মাধ্যমের প্রয়োজন হয় না। মানে, ঐ যে দূরের সূর্যটা ওখান থেকে যে আলো আমাদের পৃথিবীতে এসে পৌছায় তা আদৌ কোন মাধ্যমের মধ্য দিয়েই সঞ্চালিত হয় না। দূরের লক্ষ লক্ষ তারকাদের শরীর থেকে যে আলো আমাদের পৃথিবীতে এসে পৌছায়, তারাও কোন মাধ্যম ছাড়াই এতদূর পথ অতিক্রম করে। ঠিক এখান থেকেই আরো একটা সিদ্ধান্তে আসা হলো তা হলো আলোকের গতিবেগ উৎস বা পর্যবেক্ষকের গতির উপর মোটেও নির্ভরশীল নয়। এই বিষয়ে এই আর্টিকেলের প্রথম পর্বেই বলেছিলাম।

কৃষ্ণবস্তু বিকিরণ সমস্যা:

কৃষ্ণবস্তু বা কালো বডি নিয়ে ইতিপূর্বে দুইএকবার বলেছি। এও বলেছি যে কালো মানেই হলো রঙের শূণ্যতা। মানে যে বডির রঙ কালো, বুঝতে হবে যে ঐ বডির উপর কোন আলো পড়লে সে নিজগুণে সব আলো শোষণ করে নেয়, কোন প্রকার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের রঙিন আলোই সে বিকিরণ করে না। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে কৃষ্ণবস্তু আদর্শ তাপ বিকিরণকারী বস্তুতে পরিণত হয়। অর্থাৎ রঙিন আলো বিকিরণ না করলেও অদৃশ্য আলো সে বিকিরণ করবে। অর্থাৎ তারা যে বিদ্যুৎচুম্বক বিকিরণ নিঃসরণ করে তার বর্ণালি সরাসরি তাদের তাপমাত্রার সাথে সম্পর্কিত। ৭০০ কেলভিন (৪৩০° সেলসিয়াস) বা আরও কম তাপমাত্রার কৃষ্ণবস্তুগুলো রঙিন দৃশ্যমান তরঙ্গদৈর্ঘ্যে খুবই  অল্প পরিমাণে বিকিরণ করে। সেই কারণেই এদেরকে কালো দেখায়। অবশ্য এই তাপমাত্রার উপরে কৃষ্ণবস্তু থেকে দৃশ্যমান তরঙ্গদৈর্ঘ্যে বিকিরণ হয়। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে এই বিকিরণ লাল রং থেকে শুরু হয়ে কমলা, হলুদ এবং সাদা রংয়ের তরঙ্গদৈর্ঘ্যে ঘটে এবং শেষ হয় গিয়ে নীল রংয়ে। এর নাম আলট্রাভায়োলেট ক্যাটাসট্রোফ। এটাই গবেষণাগারে প্রাপ্ত পরীক্ষণের ফলাফল। এবার ঝামেলা যা তা হলো, নিউটনীয় মেকানিক্স-এর থিওরী অনুযায়ী এমনটা হওয়ার নয়। পরীক্ষার ফলাফল থিওরীকে সরাসরি বিরোধিতা করে! কেন?

কি বলবো? আমাদের চোখের সামনে যা দেখছি তা ভুল? নাকি নিউটন-এর ব্যাখ্যা ভুল। Stoic দর্শনে আট-টি মূল নীতি রয়েছে; তাদের মধ্যে দুইটি হলো ১। প্রকৃতি জগতে যা কিছু ঘটে সবই র‍্যাশনাল মানে যৌক্তিক, ২। পুরো মহাবিশ্বই নিয়ন্ত্রিত হয় Law of reason দ্বারা। তাহলে অর্থ কি দাঁড়ালো? না চারপাশে আমরা যা দেখছি বা অনুভব করছি, তা ভুল দেখছি না বা অনুভব করছি না। এবার তবে বলতে হবে, স্যার আইজাক নিউটনের বিজ্ঞান তা ব্যাখ্যা করতে ব্যার্থ হচ্ছে।

এই ব্যর্থতার কি ব্যাখ্যা হতে পারে? আর আমাদেরই বা করণীয় কি থাকতে পারে? এই পর্যায়ে বিজ্ঞানীরা গভীর ভাবনায় পড়ে গেলেন!

চলবে)

—————————————————————-

রচনাতারিখ: ২৩শে অক্টোবর, ২০২০ সাল

সময়: রাত ১১টা ৩৬ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৭

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৭

———————————————– রমিত আজাদ

গত পর্বে রঙ সম্পর্কে লিখেছিলাম। সেখানে আলোর ভিজিবল স্পেকট্রাম ও ‘বেনীআসহকলা’ বা চেনা রঙ-এর সাথে আলো ও তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সম্পর্ক বিষয়ে আলোকপাত করেছিলাম। আরো লিখেছিলাম যে, এমন আলোও আছে যা মানব নয়ন দেখতে পায়না।

আমাদের কলেজে আমার ইমিডিয়েট সিনিয়র ব্যাচের জাকির ভাইয়ের মুখ থেকে ‘ইনফ্রারেড’ কথাটা প্রথম শুনেছিলাম। বিকালের আকাশ লাল দেখায় কেন? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তিনি ইনফ্রারেড টার্মটি বলেছিলেন। ওটা আমার মনে গেথেছিলো। বুঝতে পেরেছিলাম যে, আকাশের রঙ বদলানোর সাথে আলোকতরঙ্গের ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। এরপর জেনেছিলাম যে, রাতের আকাশ কালো রঙের হয় কেন?  যাহোক ইনফ্রারেড মানে ‘অবলোহিত’, মানে লাল-এর চাইতে কম। কি কম? কম্পাঙ্ক বা ফ্রিকোয়েন্সি কম, মানে কিছু আলো আছে যাদের তরঙ্গদৈর্ঘ্য লাল রঙের আলোর চাইতে বেশি, তারা হলো অবলোহিত, মাইক্রোওয়েভ, রাডার ও বেতার তরঙ্গ। এদের তরঙ্গদৈর্ঘ্য রঙিন আলোর চাইতে বেশি হলেও মানব নয়ন তা দেখতে পায়না। অন্যদিকে রয়েছে  অতিবেগুনী রশ্মি (ultraviolet rays) যার তরঙ্গদৈর্ঘ্য রঙিন আলোর চাইতে ছোট, আরো ছোট তরঙ্গরা হলো এক্স-রে ও গামা রে। এবারেও ঐ একই কথা, মানব নয়ন তাদের দেখতে পায়না।

মানব নয়ন দেখতে পাক বা না পাক, তারা কিন্তু আছে। যদিওবা বাইরের জগতের সাথে যোগাযোগ করার জন্য মানব দেহযন্ত্রে কেবল পাঁচটি চ্যানেল (পঞ্চইন্দ্রিয়) আছে, কিন্তু এর বাইরেও মানুষের রয়েছে অতিব শক্তিশালী একটা  অস্ত্র, তার নাম মানব-মস্তিষ্ক। খুব সম্ভবত মহাবিশ্বে এটাই সবচাইতে জটিল অবজেক্ট! এই  অস্ত্র নানাভাবে ব্যবহার করে মানুষ তার পঞ্চইন্দ্রিয় দেখতে পায়না, এমন সবকিছুর অস্তিত্বও টের পায়। তারকারা যে দৃশ্যমান আলো নির্গত করে তা তো বোধগম্যই। কিন্তু মহাবিশ্বে এমন সব অবজেক্ট আছে যারা অদৃশ্য আলোর উৎসার ঘটায়, আর মানব-মস্তিষ্ক নানা কৌশলে ঐ অদৃশ্য আলোর উপস্থিতি টের পায় ও ঐসব অবজেক্টগুলোর অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে পারে।

মাইক্রোওয়েভ ওভেনে খাবার গরম হয় কেন? হু হু, সুইচ অন করার পর ওভেনের ভিতরে খাবার বাটি ঘুরতে থাকে, আর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তা খাবার গরম করে ফেলে! কোথা থেকে এলো এই তাপ? উত্তর দিচ্ছি। তাপ মানে কি? তাপ মানে শক্তি। তাহলে ঐ ওভেনে অদৃশ্য কোন শক্তি তৈরী হচ্ছে, যা খাবারকে গরম করে। আবার নাম তার মাইক্রোওয়েভ, মানে সেই অদৃশ্য আলোক তরঙ্গ। তাহলে কি দাঁড়ালো? আলোক তরঙ্গ এক প্রকার শক্তি? আমি আরেকটু সঠিক করে বলি, আলোক তরঙ্গ (যে কোন তরঙ্গই) শক্তি বহন করে।

এবার আসুন আলোক কণিকা ‘ফোটন’-এর আলোচনায়। ‘ফোটন’ শব্দটি অবশ্য প্রথম শুনেছিলাম বায়োলজি-তে। সেখানে সালোক-সংশ্লেষণ পদ্ধতি আলোচনার সময় লিখেছিলো যে গাছ সূর্যালোক থেকে ‘ফোটন’ নামক কণিকা সংগ্রহ করে। তখন আমার মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিলো, সূর্যালোকের মধ্যে  ‘ফোটন’ নামক কণিকা আছে? যাহোক, কিছুদিনের মধ্যেই জেনেছিলাম যে, আলোক কণিকার নামই ‘ফোটন’। ফোটনের যে কোন ভর নাই, আমাদের সেকথা জোর দিয়ে বলেছিলেন আমাদের পদার্থবিজ্ঞানের জনপ্রিয় শিক্ষক জনাব সারোয়ার হোসেন স্যার। এবার আমার খটকা, ‘কণিকা’ আছে কিন্তু তার ‘ভর’ নাই মানে কি? কণিকা কি মোটর দানার মত কিছু একটা নয়? উত্তর, না নয়। আলোর কণিকাটি আদৌ মোটর দানার মত কিছু নয়। ওটা একটা প্যাকেট। কিসের প্যাকেট? এনার্জি মানে শক্তির প্যাকেট। প্যাকেট বলেই তাকে কণিকা-বৎ মনে হয়, কিন্তু সে যে শক্তি এটাই সত্য।

সেন্ট্রাল টেন্ডেন্সি:

এবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করতে চাই। সেটা হলো কেন্দ্রীয় প্রবণতা (central tendency)। খুব ছোটবেলায় কোন একটি বইয়ে গ্যালিলিও সম্পর্কে পড়েছিলাম যে, তিনি নাকি বলেছিলেন যে ‘সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে নয়, বরং পৃথিবীই সূর্যের চারিদিকে ঘোরে’। এই কথা বলার পর নাকি খ্রীষ্টান গীর্জার পাদ্রীরা উনাকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছিলো। তবে  গ্যালিলিও ক্ষমা চাইলে উনাকে মাফ করে দেয়া হয়। আমি বড় কাউকে প্রশ্ন করে জানতে চেয়েছিলাম যে, গ্যালিলিও যদি টেলিস্কোপ দিয়ে ওটা দেখেই থাকে, তাহলে তো তাই সত্য; তাহলে আবার তিনি মাফ চাইতে গেলেন কেন? সেই বড়ভাই বলেছিলেন, “মাফ চেয়েছিলেন বেঁচে থাকার জন্য, জান বাঁচানো ফরজ।” উনার কথা শুনে একদিকে হাসি পেয়েছিলো, আরেকদিকে, খটকাও লেগেছিলো, গ্যালিলিও কি কাপুরুষ ছিলেন?  (তখন জর্ডানো ব্রুনো সম্পর্কে কিছু জানতাম না)

সপ্তম শ্রেণীতে থাকতে সৌরজগতের মানচিত্র আঁকা শিখতে বাধ্য করেছিলেন পিতৃতুল্য হাসান স্যার। তিনি ভূগোলের শিক্ষক ছিলেন। ঐ ম্যাপ আঁকতে গিয়ে টের পেয়েছিলাম যে, এত বড় সৌরজগতের কেন্দ্রে রয়েছে বিশালাকার সূর্য, আর তাকে ঘিরে ঘুরছে তার ছেলেপুলে সব গ্রহগুলো। আবার নাতি-নাতনির মত আছে উপগ্রহগুলো। এই উপগ্রহগুলো ঘুরছে তাদের নিজ নিজ গ্রহের চারিদিকে, আর গ্রহগুলো তাদেরকে সাথে নিয়েই সূর্যের চারিদিকে ঘুরছে। ইন্টারেস্টিং বিষয়টি হলো যে, সবগুলো গ্রহই প্রায় একই সমতলে ঘুরছে, উল্টা দিক থেকে কোন গ্রহের ঘূর্ণন নাই। কেন? তার সম্ভাব্য কারণ আমাদেরকে বুঝিয়েছিলেন ভূগোলের অপর শিক্ষক মাসউদ হাসান স্যার। এই মানচিত্র থেকে একটা জিনিস একেবারেই মাথায় গেঁথে গিয়েছিলো তা হলো ‘সেন্ট্রাল টেন্ডেন্সি’। কোন একটা কিছুকে কেন্দ্র করে অন্যদের ঘোরা।

এরপর পরমাণু বা এ্যাটমের গঠন স্টাডি করতে গিয়ে জেনেছিলাম যে, ঐ ক্ষুদ্র জগতেও রয়েছে  ‘সেন্ট্রাল টেন্ডেন্সি’। একটি পরমাণুর কেন্দ্রে রয়েছে নিউক্লিয়াস, আর তাকে ঘিরেই ঘুরছে সব ইলেকট্রনগুলো। আরো পড়লাম যে, জীবদেহ কোষেও নিউক্লিয়াস নামক একটা সেন্টার রয়েছে। যেকোন প্রাণীর ডিমই হলো একটি বড় কোষ। ডিমের কুসুমটাই হলো সেই কেন্দ্র। মহাবিশ্বে ক্ষুদ্র থেকে শুরু করে বৃহৎ পর্যন্ত, নির্জীব থেকে শুরু করে জীবন্ত পর্যন্ত সবকিছুর মধ্যে এত মিল কেন? এই প্রশ্নও ঐ বয়সে আমাকে ভাবিয়েছিলো!

বিমান রায় স্যার আমাদের পরিসংখ্যানের শিক্ষক হয়ে এলেন একাদশ শ্রেণীতে। মাত্র বিশ্ববিদ্যালয় সমাপ্ত করা সুদর্শন ও বিনয়ী একজন তরুণ শিক্ষক। শুরু থেকেই তিনি ছাত্রদেরকে খুব আপন করে নিয়েছিলেন। স্ট্যাটিসটিকস পড়াতে গিয়ে স্যার আমাদের বললেন এই দুনিয়ায় বহু জায়গাতেই রয়েছে ‘সেন্ট্রাল টেন্ডেন্সি’; তেমনি স্ট্যাটিসটিকস-এর ডাটাগুলোরও  ‘সেন্ট্রাল টেন্ডেন্সি’ রয়েছে। আমি আরো একবার বিস্মিত হয়েছিলাম!

একবার এক  সায়েন্স ফিকশনে পড়েছি, সেন্ট্রাল টেন্ডেন্সি সম্পর্কে। সৌরজগতের সেন্টারে সূর্য। গ্যালাক্সির সেন্টারে কিছু একটা, এভাবে মহাবিশ্বের সেন্টারেও কিছু একটা আছে। তারপর ভাবলাম বইয়ে তো পড়েছি সৌরজগতের যেমন কেন্দ্র আছে যার চারদিকে গ্রহগুলি ঘোরে এ্যাটমেরও তেমনি কেন্দ্র আছে যার চারদিকে ইলেকট্রনগুলো ঘোরে।  অতি বিশালের জগতের সাথে  অতি ক্ষুদ্রের জগতের এই মিলটাকে একদিকে যেমন ভীষণ ছন্দময় মনে হয়েছিলো, আরেকদিকে তেমনি বিপুল রহস্যময় মনে হলো। মিল আছে কেন? আলবার্ট আইনস্টাইনের সেই কালজয়ী বাণিটি মনে পড়লো, “দ্যা মোস্ট ইনকমপ্রেহেনসিভ থিং ইন দিস ওয়ার্লড ইজ ইট ইজ কমপ্রিহেনসিভ।’ হ্যাঁ, তাইতো, সবকিছু ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে কেন? নাও তো করা যেত! মহাবিশ্বের সবকিছুই অতি সুশৃঙ্খল তাই? মহাবিশ্বের সবকিছু কঠিন গণিত মেনে চলে কেন? বাংলার সন্তান জ্ঞানী কপিল তো সংখ্যা বলতে যুক্তিকেই বুঝিয়েছেন। তারপর গ্রীক পিথাগোরাস বলেছিলেন, “ঈশ্বর একজন ভালো গণিতবিদ”।

(চলবে)

—————————————————————-

রচনাতারিখ: ২৩শে অক্টোবর, ২০২০ সাল

সময়: রাত ০৯টা ০২ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৬

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৫

———————————————– রমিত আজাদ

দ্বৈততার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই মানবজাতি ইনট্রোডিউস করেছিলো ‘সায়েন্স’ বা ‘বিজ্ঞান’ নামক একটি জ্ঞানশাখার। কিন্তু সেই বিজ্ঞানেই যখন দ্বৈততা এসে হাজির হয়, তখন কি করণীয়? হ্যাঁ, আলোর দ্বৈততা দেখে বিজ্ঞানীরা একটা ক্রাইসিসের মধ্যেই পড়েছিলেন। এবং এখান থেকে উত্তরণের একটা পথ খুঁজছিলেন তারা। অবশেষে একজন প্রতিভাবান বিজ্ঞানী সেই উত্তরণ ঘটালেন। উনার নাম লুইস ডে ব্রগলী। তিনি দেখালেন যে ‘কণিকা’-দের তরঙ্গ ধর্ম থাকে। এই পর্যায়ে তিনি ইলেকট্রন নিয়ে ভাবছিলেন। তী ভাবছিলেন যে আলো যদি একইসাথে কণিকা ও তরঙ্গ ধর্ম প্রদর্শন করতে পারে, তাহলে ইলেকট্রন নামক কণিকাটিও কি তরঙ্গধর্মে প্রদর্শন করবে? একটি কণিকাকে ‘ভরবেগ’ দ্বারা ক্যারেকটারাইজ করা যায়, আবার তরঙ্গ-কে ক্যারেকটারাইজ করা হয় ‘ওয়েভলেংথ’ দ্বারা। লুইস ডে ব্রগলী ভাবলেন হয়তো মহাবিশ্বের সবকিছুই একইসাথে কণিকা ও তরঙ্গ ধর্ম প্রদর্শন করে। তিনি পরিশেষে, ‘ভরবেগ’ ও ‘ওয়েভলেংথ’ এর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্যুক্ত সমীকরণও নির্মান করেন। এইভাবে দেখা গেলো যে, ওয়েভ-পার্টিকেল ডুয়ালিটি ন্যাচারাল ও বৈজ্ঞানিকভাবেই ব্যাখ্যাযোগ্য। লুইস ডে ব্রইলী-র গাণিতিক তত্ত্বটি পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণিত হওয়ার পর তিনি নোবেল পুরষ্কার পান ১৯২৯ সালে। (প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে চাই, বিজ্ঞানের যে কোন তত্ত্ব যতক্ষণ পর্যন্ত না ইমপিরিকালি মানে পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত ঐ তত্ত্বকে স্বীকৃতি দেয়া হয় না, এবং ঐ তত্ত্বের জনক-কে নোবেল পুরষ্কার-ও দেয়া হয় না ) তবে এখানে একটা সতর্কতার প্রয়োজন আছে, উনার ব্যাখ্যাটি যেন আবার সরাসরি ‘নিউটনীয় মেকানিক্সে’ এ্যাপ্লাই করে না বসি। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, একটা পর্যায়ে ‘নিউটনীয় মেকানিক্স’-এর ফেইলিওর থেকেই কিন্তু দুটি নতুন মেকানিক্স – ‘কোয়ান্টাম মেকানিক্স’ ও ‘রিলেটিভিস্টিক মেকানিক্স’-এর জন্ম হয়েছিলো।

তবে ঐ প্রহেলিকাটা রয়েই গেলো; আলো কি কোন একটি দানাদার ‘কণিকা’? তাই যদি হয়, তাহলে ইলেকট্রন বা প্রোটনের মত তার কোন ‘ভর’ নাই কেন? প্রশ্নটির উত্তর আমার কাছে রয়েছে। তবে এই নিয়ে আলোচনা পরে করবো। আপাতত এইটুকু বলছি যে ভরসম্পন্ন ও ভরবিহীন দুই ধরনের কণিকা-ই রয়েছে। একইসাথে রয়েছে চার্জসম্পন্ন ও চার্জবিহীন কণিকা। ভরবিহীন কণিকাদের ন্যাচার কি, এবং কেন তারা ভরবিহীন এই আলোচনা পরে করবো।

রঙ:

খুব ছোটবেলায় আমার সৌভাগ্য হয়েছিলো টানা কয়েকবছর দুইটি দালান নির্মান দেখার।  অত কাছ থেকে ঐ দালান নির্মান দেখে আমি বেশ কিছু জিনিস ঐ শিশু বয়সেই শিখেছিলাম; যেমন ‘পরিমাপন’। রাজমিস্ত্রী বা কাঠমিস্ত্রী অথবা রডমিস্ত্রীরা যখন মাপজোকের কাজ করতেন আমি কাছে দাঁড়িয়ে তা বোঝার চেষ্টা করতাম। রডমিস্ত্রীদের দেখতাম খুব মনযোগ দিয়ে মেপে মেপে ছাদে রডবাধাইয়ের কাজটা করতেন। ঐ রডমিস্ত্রীদের আমার কাছে অন্যান্যদের চাইতে কামেল মনে হতো। আবার লক্ষ্য করতাম যে, ছাদ ঢালাইয়ের ঠিক আগে আগে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব আসতেন। উনাকে দেখে একেবারে তটস্থ হয়ে যেত রডমিস্ত্রীরা। তিনিও মনযোগ দিয়ে পুরো কাজটা দেখতেন। একটু ভুল পেলেই ভীষণ ধমক দিতেন মিস্ত্রীদের। বুঝতাম, বাঘের উপর দিয়ে টাগও থাকে! ইলেকট্রিকমিস্ত্রীদের কাজও দেখতাম, উনাদের কাজটা অত বুঝতাম না। এখন আমার কাছে ‘কোয়ান্টাম মেকেনিক্স’ যেমন তেমনি তখন ইলেকট্রিকমিস্ত্রীদের কাজটা আমার কাছে মারেফতি টাইপ মনে হতো। কারণ কারেন্ট তো আর দেখা যায় না, উনারা কানেকশন-টানেকশন দেয়ার পর, সুইচ টিপলেই কেবল বাতিটা জ্বলতো, বা ফ্যানটা ঘুরতো; তারের মধ্যে দিয়ে অদৃশ্য ওটা কি যায় তা আমি ভাবতাম। তবে ঐ অদৃশ্য কিছু প্রবাহিত হওয়ার জন্য তার যে দুইটা লাগে এটা বেশ খেয়াল করেছি। মাঝে-সাঝে তিনটা তারের সমাহারও দেখতাম, তৃতীয় তারটির ব্যবহার আমার কাছে বাহুল্য মনে হতো; উনারা ওটাকে আর্থিং বলতেন। বাল্বের উপর বাহারী শেড দেখে বুঝতাম যে, ওটার সাথে কারেন্ট বিজ্ঞানের কোন সম্পর্ক নাই; ওটা না থাকলেও বাল্ব জ্বলবে। তবে ঐ বাহারী শেড দেয়া হয় নান্দনিকতার জন্য। মানে বিজ্ঞান ও আর্ট পাশাপাশি চলে!

বাড়ী নির্মিত হওয়ার পর ফিনিশিং-এ দেখলাম নানা রকম রঙের ব্যবহার। বাহারী বিভিন্ন রঙে ভরে গিয়েছিলো বাড়ী।  আমি নিজেও রঙ কিনতে দুইএকবার রঙের দোকানে গিয়েছিলাম। সেখানে ফ্লোর থেকে সিলিং পর্যন্ত নানান ধরনের রঙ দেখতাম। দুনিয়াতে যে কত প্রকারের রঙ হয় ও ওদের যে আবার কত বাহারী নাম আছে তাও দেখতাম। এক নীলেরই বোধহয় কয়েক ধরনের রূপভিন্নতা দেখেছিলাম। সেগুলোর আবার পৃথক পৃথক নামও আছে (নেভী ব্লু, প্রুশিয়ান ব্লু, সাফিয়ার ব্লু, মিডনাইট ব্লু, ইত্যাদি)। ওগুলোকে ডিসটেম্পার বলা হতো। রঙ মিস্ত্রীরা ওখান থেকে নিয়ে নিয়ে দেয়ালে রঙ করতেন। সেই থেকে আমার ধারনা হয়েছিলো যে, রঙ হলো নানা প্রকার কেমিকাল। পরবর্তিতে একবার ‘দৈনিক বাংলা’ নামক দৈনিক পত্রিকায় ছোটদের পাতায় একটা সায়েন্স আর্টিকেলে পড়লাম যে, আলো আসলে কি। (তখন দৈনিক পত্রিকাগুলোতে সায়েন্স আর্টিকেল খুব একটা ছাপা হতো না; আনফরচুনেটলি তখনকার সাংবাদিকতা বিজ্ঞানের চাইতে খেলার খবর ও সিনেমার খবরকে গুরুত্ব দিতো বেশি!) সেই আর্টিকেল পড়ে আমি প্রথমবারের মত জেনেছিলাম যে, রঙের সাথে আলোর একটা সম্পর্কে রয়েছে। সেখানে এমনটি লেখা ছিলো, ‘ আলোর সাতটি রঙ রয়েছে। কোন একটা বস্তুতে আলো পতিত হওয়ার পর, ঐ বস্তুটা আলোর সবগুলো রঙ শোষন করে নেয়, কেবল একটি রঙ ছাড়া; আর ঐ রঙটিই বস্তুটির উপর ফুটে থাকে, এবং বস্তুটির গায়ে আমরা ঐ রঙটিই দেখি। যেমন গাছের পাতা, সূর্যের আলোর সবগুলো রঙই শোষণ করে নেয়, শুধু সবুজ রঙটি ছাড়া। তাই সবুজ রঙটি গাছের পাতার উপর ফুটে থাকে এবং আমরা গাছের পাতার রঙ যথারীতি সবুজ দেখি। এইভাবে কোন বস্তু যদি আলোর কোন রঙই শোষণ না করে তবে সেই বস্তুর রঙ আমরা সাদা দেখি। আলোর সাতটি রঙ মিলালে তা সাদা হয়। আবার এমন বস্তু আছে, যা আলোর সবগুলো রঙই শোষণ করে নেয়; তখন ঐ বস্তুটির রঙ আমরা কালো দেখি। তাই কালো কোন রঙ নয়, বরং রঙের শূণ্যতা।’ এখন আমি জানি যে ঐ আর্টিকেলের কথাগুলো কাটায় কাটায় সঠিক নয়। তবে নয়-দশ বছরের একটা শিশুকে বোঝানোর জন্য, ঐভাবে ছাড়া আর কোন পথও নাই। প্রবন্ধটির লেখকের নাম আমার এখন আর মনে নাই, তবে তিনি শিশুদের উপযোগী একটা লেখাই লিখেছিলেন, ও রঙ ও আলোর সম্পর্ক সম্বন্ধে প্রাথমিক ধারণা ঠিকই মাথায় গেঁথে দিতে পেরেছিলেন। লেখক-কে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

এবার আমি আলো ও রঙের মধ্যেকার সম্পর্ক সম্বন্ধে আসল কথা বলছি। আলোর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘই হলো রঙ। আবার একই রঙও নানা রকমের হতে পারে কারণ তরঙ্গদৈর্ঘ্য কেবল একটি নয় একটা রেঞ্জের মধ্যে থাকে। আরেকটু খুলে বলি। একটু আগে বুঝিয়েছি যে, আলো একপ্রকারের তরঙ্গ। তরঙ্গ হলে তার তরঙ্গদৈর্ঘ্যও থাকবে। আছেও তাই, তবে আলোর  তরঙ্গদৈর্ঘ্য একটি নয়। নানা রকমের  তরঙ্গদৈর্ঘ্য-এর আলো রয়েছে। কিছু তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো আছে যা দেখাই যায় না, মানে মানুষের চোখ তাদেরকে দেখতে পায় না। আমাদের জন্য ওরা ইনভিজিবল লাইট। উদাহরণস্বরুপ বলতে পারি যে, মাইক্রোওয়েভ ওভেনে খাবার গরম করে যেই আলো, তা অদৃশ্য; অথবা মোবাইলে টেলিফোনে সিগনাল আদান-প্রদান করা হয় যে আলোর দ্বারা তারাও অদৃশ্য; যে আলো ব্যবহার করে হাসপাতালে এক্স-রে করা হয় তারাও অদৃশ্য। দৃশ্যমান আলোর বর্ণালীটি খুব কম। ঐ যে বৃষ্টি শেষে যে রংধনুটি আকাশের শ্রীবৃদ্ধি ঘটায়, ঐ সাতটি আলো-ই দৃশ্যমান। তাদের মধ্যে যে আলোটির তরঙ্গদৈর্ঘ্য সব চাইতে কম তা হলো বেগুনী, আর যে আলোটির তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচাইতে বেশি তা হলো লাল। মাঝামাঝিটি সবুজ। তাহলে রঙ কি? ৩৮০ থেকে ৪৩৫ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোটি মানুষের চোখে প্রবেশ করলে মস্তিষ্কে যে অনুভূতির জন্ম হয় তার নাম বেগুণী রঙ। আবার ৬২৫ থেকে ৭৪০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোটি মানুষের চোখে প্রবেশ করলে মস্তিষ্কে যে অনুভূতির জন্ম হয় তার নাম লাল রঙ। মানে কি দাঁড়ালো? তরঙ্গদৈর্ঘ্যে সৃষ্ট অনুভূতিই রঙ। আমরা বায়ো-রোবট! এবার আরেকটু ইন্টারেস্টিং তথ্য দেই। লালের মধ্যেও প্রকারভেদ রয়েছে। ঐ যে বললাম লাল রঙ কেবল একটি মাত্র তরঙ্গদৈর্ঘ্য নয়, সেখানে রেঞ্জ রয়েছে – ৬২৫ থেকে ৭৪০ ন্যানোমিটার। অর্থাৎ  ৬২৫ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্য চোখে প্রবেশ করলে যে ধরনের লাল দেখা যাবে,  ৭৪০ ন্যানোমিটারের তরঙ্গদৈর্ঘ্য চোখে প্রবেশ করলে ভিন্ন ধরনের লাল দেখা যাবে। কি বুঝলাম?

‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হয়ে উঠলো সবুজ,

চুনী উঠলো রাঙা হয়ে।’

(চলবে)

———————————————

রচনাতারিখ: ২৩শে অক্টোবর, ২০২০ সাল

সময়: রাত ০৩টা ১৯ মিনিট