Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৫

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৫

———————————————– রমিত আজাদ

হ্যাঁ, যা বলছিলাম। ব্ল্যাক হোল-এর ভিতরে কি আছে ও কি ঘটছে, কোন পর্যবেক্ষক তা দেখতে পাবে না। প্রকৃতি সতর্কভাবে এমনই এক আইন বানিয়েছে যে, পর্যবেক্ষকের কাছ থেকে তা লুকিয়ে রাখা হয়।

এবার প্রশ্ন হলো, পর্যবেক্ষক কেন তা দেখতে পাবে না? এটা ব্যাখ্যা করার আগে কয়েকটি জিনিস ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন, এর মধ্যে একটা হলো দেখা বিষয়টি কি? অনেককাল আগে মনে করা হতো যে, মানুষের চোখ থেকে কিছু একটা নির্গত হয়ে কোন বডি-কে আলোকিত করলে তখন তাকে দেখা যায়। কিন্তু আল হাইয়াম ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, মানুষের চোখ থেকে কোন রশ্মি নির্গত হয় না, বরং  অন্য কোন উৎস থেকে নির্গত আলোকই কোন বডিকে আলোকিত করে, আর সেই আলো বডিতে প্রতিফলিত হয়ে মানুষের চোখে প্রবেশ করলেই মানব মস্তিষ্কে দর্শনের অনুভূতি জন্মায়।

তার মানে দেখা কর্মটির সাথে আলোর সম্পর্ক গভীর। আলো আছে তাই দেখি, আলো না থাকলে দেখা যাচ্ছে না। আবার কোন একটা বডি আছে, কিন্তু সেখান থেকে আলো এখনও আমাদের চোখে এসে পৌছায় নাই, তাহলেও আমরা তাকে দেখতে পাবো না। আর এই বিষয়ে একটা প্যারাডক্স আছে, যার নাম ‘অলবার্স প্যারাডক্স’। আমার মাস্টার্স-এর থিসিস ছিলো ‘কসমোলজি’-র উপরে। সেখানে যে কয়েকটি বিষয় নিয়ে আমি গবেষণা করেছিলাম তার মধ্যে একটি হলো, এই  ‘অলবার্স প্যারাডক্স’। এর আরেক নাম হলো “dark night sky paradox”। প্যারাডক্সের বাংলা হলো কূটাভাস – মানে, যা হবে না বলে মনে হয়, তাই বাস্তবে ঘটছে। প্যারাডক্স-টি কি রকম তা আমি সংক্ষেপে বোঝানোর চেষ্টা করছি। দার্শনিক এরিস্টটল বলেছিলেন যে, এই মহাবিশ্ব অনাদি, মানে এর কোন শুরু নেই, ও শেষও নেই। আমাদের মহাবিশ্বটি অনন্তকাল ধরেই ছিলো। এবার ভাবুন তো,  অনন্তকাল ধরে আছে, এই বিশালাকৃতির মহাবিশ্ব। কেবল আমাদের গ্যালাক্সিতেই রয়েছে দশ হাজার কোটি তারকা। আবার পুরো মহাবিশ্বে রয়েছে দুই শত বিলিয়ন গ্যালাক্সি! এবার ভাবুন যে, পুরো মহাবিশ্বে তারকার পপুলেশন কত? আচ্ছা মহাবিশ্ব যদি অনাদিকাল থেকে বিরাজ করতো, তাহলে এই বিলিয়ন বিলিয়ন তারকাদের উৎসারিত সব আলো কি এতদিনে আমাদের পৃথিবীতে এসে পৌছাতো না? আর তাই যদি হতো, তাহলে রাতের আকাশ কি আর রাতের আকাশ থাকতো? দিনের বেলায় সূর্য নামক একটি মাত্র তারকার আলোতেই কত উজ্জ্বল চারিপাশ! আর রাতের পুরো আকাশটাই যদি তারায় তারায় ভরে যেত, আর তাদের সন্মিলিত আলোকের পরিমানটা কেমন হতো? আজ আমরা রাতের যে কালো আকাশটা দেখছি, ওটা না হয়ে হতো ঘনসন্নিবিষ্ট তারকারাজীর অত্যুজ্জ্বল এক আকাশ। কিন্তু যত্য হলো এই যে, রাতের আকাশ কালো, আর এর একমাত্র ব্যাখ্যা হলো যে, মহাবিশ্ব অনাদি নয়। যা ইমাম গাজ্জ্বালী উনার ‘তাহফুত আল ফালসিফা’ গ্রন্থে সুস্পষ্টভাবেই লিখেছেন যে মহাবিশ্ব অনাদি নয়, এর যেমন একটা শুরু আছে, তেমনি একটা শেষও আছে।

এই আলোচনা থেকে আরেকটি বিষয় উত্থাপন করতে চাই। তা হলো কোন উৎস থেকে আমাদের চোখ পর্যন্ত আলো পৌছানোর জন্য আলোর গতিবেগের বিষয়টিও বিবেচনার মধ্যে নিতে হবে। ধরুন যে, কোন উৎস থেকে আলো উৎসারিত হচ্ছে কিন্তু সেটা আমাদের চোখ পর্যন্ত পৌছাতে পারছে না, এটা হতে পারে এভাবে যে, উৎসটা এতই দূরে যে সেখান থেকে আলো এখনো আমাদের চোখে এসে পৌছায় নাই। মনে রাখতে হবে যে এককালে অনেক দার্শনিকই মনে করতেন যে আলোকের বেগ অসীম। তাই যদি হতো তাহলে যে কোন উৎস থেকেই মুহূর্তের মধ্যেই আলো আমাদের চোখে এসে পৌছাত, এবং সাথে সাথে তা আমরা দেখতে পেতাম। এতে কিন্তু মানবজগতে একটা বিশাল বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতো। কিন্তু আল হাইয়াম বলেছিলেন যে, আলোকের গতিবেগ যদিও অতি উচ্চ তারপরেও সসীম। তিনি আরো বলেছিলেন যে আলোর সঞ্চালিত হতে সময়-এর প্রয়োজন হয়। এছাড়া এগারো শতকে পলিম্যাথ আল-বিরুণী ও আলোকের গতিকে সসীম বলেছিলেন। তিনি এও বলেছিলেন যে, শব্দের গতিবেগ-এর চাইতে আলোকের গতিবেগ কয়েকগুণ বেশি। প্রসঙ্গত বলছি যে, খুব ছোটবেলায় আমি একবার নদীর ধারে গিয়েছিলাম, সেখানে খুব সম্ভবত কোন এক ধোপা কাপড় ধৌত করছিলো। সে কোন একটি তক্তার উপর কাপড়টি জোরে জোরে মারছিলো। আমি দূর থেকে লক্ষ্য করলাম যে, তক্তার উপর কাপড়ের বাড়ি পড়ার বেশ পরে আমি শব্দটি শুনতে পাচ্ছি! অথচ আমার মন বলছে যে, বাড়ি পড়ার দৃশ্য দেখা ও শব্দ শোনা দুটো-ই একইসাথে হওয়ার কথা। আমার তখন নিজের উপর নিজেরই সন্দেহ হচ্ছিলো! আমার সমস্যা কি কানে, নাকি চোখে? আমি ভেবেছিলাম যে, আমার চোখ ঠিক থাকলে, কান ঠিক নাই; আর কান ঠিক থাকলে, চোখ ঠিক নাই। যাহোক, কয়েক বৎসর পরে আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, আমার চোখ ও কান দুটাই ঠিক আছে। আমি যা পর্যবেক্ষণ করেছি তাও ঠিক আছে। ঘটনাটা শুধু আলোর বেগ আর শব্দের বেগের তফাৎের কারণেই ঘটছে।

যাহোক, আলোর বেগের বৈশিস্ট্য বিষয়টি মুসলিম বিজ্ঞানীরা  অনেক আগেই সমাধান করলেও, সেই জ্ঞান হয়তো ইউরোপ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছায় নাই। তাই বিষয়টি নিয়ে কয়েক শতাব্দী পরে ইউরোপে আবারও বিতর্কের সুত্রপাত হয়। গ্যালিলিও এবং কেপলার ভেবেছিলেন যে, আলোকের বেগ অসীম; কিন্তু পরবর্তিকালে ১৬৭৬ সালে বিজ্ঞানী রোমার আলোকের বেগের সসীমতা প্রমাণ ও নির্ণয় করেছিলেন। 

আলোকের বেগ সসীম বলেই এই মহাবিশ্বে এমন অনেক উৎস আছে যার দূরত্ব মাত্রাতিরিক্ত বেশী হওয়ার কারণে ও সময়ের  অপর্যাপ্ততার কারণে সেইসব উৎস থেকে আলো এখনো আমাদের চোখে এসে পৌছায় নাই।  আবার হতে পারে যে উৎসটি আমাদের থেকে (অথবা আমরা উৎসটি থেকে) ক্রমশঃই এমনভাবে দূরে সরে যাচ্ছে যে আলো আর আমাদের চোখ পর্যন্ত পৌছাতে পারছে না। এইখানেই চলে আসে আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব।  অতিরিক্ত গতির কারণে যেমন হয় টাইম ডাইলেশন বা সময় প্রসারণ, তেমনি হয় লেংথ কনট্রাকশন বা দূরত্ব সংকোচন। আর হ্যাঁ, মাত্রাতিরিক্ত মহাকর্ষ বল আলো-কে টেনেও ধরে রাখতে পারে, এবং সময়কেও প্রসারিত করে দিতে পারে;  উভয় ক্ষেত্রেই আমরা ঐ দিগন্তরেখার ওপাশে কি হচ্ছে বা কি আছে তা দেখতে পারবো না!

আলোর ডুয়ালিটি

আল হাইয়াম ও নিউটনের মতে আলো হলো এক ধরনের কণিকা। কণিকা হিসাবে তা যদি কামানের গোলা বা মোটর দানার মত হয়, তাহলে মহাকর্ষ দ্বারা তার তো প্রভাবিত হওয়ারই কথা। কিন্তু কই, সূর্য বা নক্ষত্ররা তো আলোকে ধরে রাখতে পারে না! পৃথিবীর দিকে আসার সময় আলো তো আর সব বডির মত ত্বরান্বিত হয় না! পৃথিবী বলি আর নক্ষত্রই বলি কোন কিছুই আলোর গতিবেগকে প্রভাবিত করতে পারে না। তাই আলোর কণিকা ধর্ম নিয়ে সন্দেহ শুরু হলো।

এদিকে ইবনে সাহিল থেকে শুরু করে হুইগেন পর্যন্ত বেশ কিছু বিজ্ঞানী আলোর তরঙ্গ ধর্মকে বেশ ভালোভাবেই প্রমাণ করতে পেরেছিলেন। তাই একসময় আলোকে শুধুই তরঙ্গ (ভরহীন) বলে ধরে নেয়া হলো। ছাইচাপা পড়ে গেলো আলোর কণিকাতত্ত্ব।

এদিকে আইনস্টাইন-এর জীবদ্দশায় ঘটলো একটা ঘটনা। দেখা গেলো যে কোন মেটাল-এর উপর আলো পড়লে সেখানে চল-বিদ্যুৎের (current) জন্ম হয়। এর আগে আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনের দুইটা পথ জানতাম কেমিকেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চুম্বক ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন। এবার আরো একটি প্রাকটিকাল মেথড অবজার্ভড হলো। কিন্তু এর ব্যাখ্যাটা কি হবে? তাহলে আগে বুঝতে হবে যে, বিদ্যুৎ কি? এক কথায় বিদ্যুৎ হলো ‘ইলেকট্রনের প্রবাহ’। আগেই বলেছি, ইলেকট্রনের কিন্তু ভর আছে, মানে তার বডি আছে। বডি যদি থাকে তাহলে তাকে ধাক্কা না দিলে তো, সে চলতে শুরু করবে না! তাহলে কি আলো কোন না কোনভাবে মেটালে অবস্থিত ইলেকট্রনগুলোকে ধাক্কা দিচ্ছে? আর ধাক্কাই যদি দিয়ে থাকে তাহলে আলোরও বডি আছে, আলো একপ্রকার ‘কণিকা’। ওরকমই হওয়ার কথা লজিক তো তাই বলে।

এদিকে পরীক্ষার দ্বারাই প্রমাণ হয়ে গিয়েছে যে, আলো একপ্রকার তরঙ্গ। এখন তাকে আবার ‘কণিকা’ বলি কি করে? মনে পড়লো আল হাইয়ামের কথা। পরবর্তিকালে স্যার আইজাক নিউটন-ও আলোকের কণিকাতত্ত্বেই বিশ্বাস করতেন। এতকাল পরে আবার সেই কণিকাতত্ত্বের কথা ওঠা মানে, ছাই থেকে ফিনিক্স জেগে ওঠার মত। যাহোক চোখের সামনে ঘটে যাওয়া প্রতিভাসটির একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার খুবই প্রয়োজন হয়ে পড়েছিলো। প্রতিভাবান বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন (অথবা উনার স্ত্রী মিলেভা) সেই ব্যাখ্যা সফলভাবে দিতে পেরেছিলেন।

এবার হয়ে গেলো দ্বৈততা। যেমন থিওরেটিকালি, তেমনি প্রাকটিকালি বৈজ্ঞানিকভাবেই প্রমাণিত হলো যে আলো এক ধরণের ‘তরঙ্গ’; আবার সেই থিওরেটিকালি, ও প্রাকটিকালি বৈজ্ঞানিকভাবেই প্রমাণিত হলো যে আলো এক ধরণের ‘কণিকা’। কি বুঝলাম? দ্বৈততা? জ্বী, এটা দ্বৈততাই। একে বলা হয় আলোকের তরঙ্গ-কণিকা দ্বৈততা।

খটকা কিন্তু দূর হলো না। বিজ্ঞান নামক শাস্ত্রটির জন্ম হওয়ার পর মানবজাতি ধরেই নিয়েছিলো যে এমন একটা সাবজেক্টের জন্ম হয়েছে যে, সেখানে দর্শনের মতন কোন দ্বৈততা নেই। কিন্তু ‘ আলোকের তরঙ্গ-কণিকা দ্বৈততা’ আবার সেই ঘূর্ণাবর্তে নিয়ে যাচ্ছে!

চলবে)

—————————————————————-

রচনাতারিখ: ২৩শে অক্টোবর, ২০২০ সাল

সময়: রাত ১২টা ৪০মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৪

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৪

——————————————– রমিত আজাদ

‘ব্ল্যাক হোল’ সম্পর্কে প্রথম পড়েছিলাম স্কুল জীবনে ‘রহস্য পত্রিকা’-য়। তার কয়েকটি লাইন এখনও মনে আছে – ‘মনে করুন, এমন একটা অবজেক্ট যা প্রচন্ড রাক্ষুসে, চারপাশে যা আছে সব গিলে খাচ্ছে, কোন কিছুই তার পাশে থাকতে পারছে না। কোন কিছু তার কাছাকাছি আসলেই তা ঐ রাক্ষসের পেটে চলে যাচ্ছে। এমন এক ধরনের অবজেক্ট আছে এই মহাবিশ্বে, নাম তার ব্ল্যাক হোল।’ ভীষণ রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম ঐ লেখা পড়ে। আবার ভয় ভয় করছিলো, যদি এমন কিছু আমাদের পৃথিবীর কাছে চলে আসে তাহলে তো আমাদেরকে সহ পুরো পৃথিবীটাই সে গিলে খেয়ে ফেলবে! এর কিছুকাল পরে ‘ব্ল্যাক হোল’ সম্পর্কে পড়েছিলাম শক্তিমান লেখক হুমায়ুন আহমেদ-এর লেখা একটা সায়েন্স ফিকশনে – একদল বিজ্ঞানী রকেটে চেপে যাচ্ছেন মহাকাশের কোন এক গন্তব্যে, অজানা সেই পথে হঠাৎ করে তারা পাল্লায় পড়লেন প্রবল মহাকর্ষ শক্তিসম্পন্ন একটি ‘ব্ল্যাক হোল’-এর। রকেটের নিজস্ব গতি হারিয়ে, যতই তারা ঐ ‘ব্ল্যাক হোল’-এর টানে তার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন তত বেশি মৃত্যুভয় তাদেরকে ঘিরে ধরছিলো।’

একবাটি তুলা হাতে নিন। তেমন কোন ভর কি অনুভব করবেন? না। এবার এক বাটি পানি নিন, নিঃসন্দেহে ভর হবে আগের চাইতে বেশী। তারপর একবাটি পারদ নিন, হলপ করে বলতে পারি যে, এবার ভর অনুভুত হবে আগের চাইতে অনেক অনেক বেশি। একই আয়তনে ভিন্ন ভিন্ন ভর অনুভুত হওয়ার কারণ কি? কারণটা হলো পদার্থের ঘনত্ব। একইভাবে অল্প আয়তনে সংকুচিত হয়ে জমাট বেধে থাকা একটা ‘ব্ল্যাক হোল’-এর ভর হবে বিপূল!

ভর কি?

ঠিক কিভাবে উত্তরটা দেব জানি না।

ক্লাস সেভেনে পড়েছিলাম যে, যার ভর আছে সে ‘পদার্থ’ (substance)। আবার ক্লাস নাইনে পড়লাম, কোন বডির মধ্যে মোট পদার্থের পরিমান-কে ‘ভর'(mass) বলে। সেইদিনই খটকা লেগেছিলো। ‘ভর’ থাকলে ‘পদার্থ’, আর পদার্থের পরিমানই ‘ভর’। এটা কি ফাইজলামি? নাকি কনফিউশন? নাকি কনট্রাডিকশন? নাকি তারা নিজেরাই জানে না? যাহোক, ক্লাস নাইনেই আরো শিখেছিলাম, ‘বল’ (force) হলো কোন পদার্থের ভর ও ত্বরণের গুণফল। এই তিনটি ভৌত রাশির মধ্যে, ত্বরণটাই কেবল আমার বোধগম্য হলো; কারণ ওটা চোখে দেখা যায় ও মাপা যায়। কিন্তু ভর-এর সংজ্ঞা আমার কাছে ক্লিয়ার ছিলো না, বা কনফিউজিং ছিলো। তাহলে একইভাবে ‘বল’-ও তো কনফিউজিং! বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে ‘ভর’-এর নতুন একটা সংজ্ঞা পেলাম – ‘ভর’ হলো ‘জড়তা’-র পরিমাপ। ‘জড়তা’ হলো স্থির বডির স্থির থাকার ও গতিশীল বডি-র গতিশীল থাকার প্রবণতা। স্থির বডি-র স্থির থাকার প্রবণতা তো চারপাশে সারাক্ষণই দেখতে পাচ্ছি। আর গতিশীল বডি-র গতিশীল থাকার প্রবণতা টের পাওয়া যায়, কোন একটি চলন্ত গাড়ীতে হঠাৎ ব্রেক কষলে। ব্রেক কষা হয়ে গেলো, তবে গাড়ী কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে থামছে না! সে আরো কিছুদূর এগিয়ে যাবেই যাবে। ঢাকার বিজ্ঞান যাদুঘরে একবার ডেমোনস্ট্রেটর আমাকে দেখিয়েছিলেন যে, ঐ রাস্তার ফ্রিকশন না থাকলে ঐ গাড়িটি কখনো-ই থামবে না। এভাবে একটি রকেটকে মহাকাশে পাঠিয়ে দিলে সেও আর থামবে না, অনন্ত পথে চলতেই থাকবে (যদিনা কারো দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হয়)। যাহোক, যা বলছিলাম, ‘ভর’ হলো ‘জড়তা’-র পরিমাপ; মানে কি এই কথার? মানে হলো কোন একটা বডি আমার সামনে রাখলাম তারপর তার উপর ‘ক’ পরিমাণ বল প্রয়োগ করলাম, বডি-টি ত্বরান্বিত হয়ে কিছুদূর গেল। এবার আরেকটি বডি নিলাম, এবং আগের মতই  ‘ক’ পরিমাণ বল প্রয়োগ করলাম; এবার বডিটি ত্বরান্বিত হয়ে  আগের চাইতে কম দূরত্ব  অতিক্রম করলো। তার মানে হলো যে, দ্বিতীয় বডিটির ‘জড়তা’ বেশি। তার মানে দ্বিতীয় বডিটির ‘ভর’ও বেশি। তাহলে এখন দাড়ালো যে, ‘ভর’-কে বল ও ত্বরণ দ্বারা বুঝতে হচ্ছে। সব কেমন তালগোল পাকানো! আরো বুঝলাম যে বডি সাইজে বড় হলেই যে তার ভর বেশি হবে তা নয়। ছোটবেলার একটা ঘটনা মনে পড়ে, ঈদের দিনে বন্ধুরা মিলে কোথাও বেড়াতে গিয়েছি। দেখলাম যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে একজন মানুষের ভর মাপছে। কৌতুহল বশতঃ আমরা একে একে দাঁড়ালাম ঐ কাটাওয়ালা ক্ষুদে যন্ত্রের উপর। সবশেষে দাঁড়ালো আমাদের মধ্যে সাইজে যে তুলনামূলক ছোট, কিন্তু ওর ক্ষেত্রেই যন্ত্রের কাটা ঘুরলো সবচাইতে বেশি। মাপওয়ালা অবাক হয়ে বললো, “দেখতে ছোট হলেও ওর ভরই তো সবচাইতে বেশি!” এই পরীক্ষণেরই বা মানে কি?

এইখানে আসে ঘনত্বের বিষয়টি। আয়তন বড় ছোট ব্যাপার না! ভিতরে মাল-মশল্লা কি আছে সেটার উপরেই ভর নির্ভর করে। মাল-মশল্লা বেশী থাকলে ভর বেশি, আর মাল-মশল্লা কম থাকলে ভর কম। এবার প্রশ্ন হলো, কোন একটি পদার্থের (সোনা, রুপা, তামা, কার্বন যাইহোক না কেন) ভিতরের মাল-মশল্লা কি?

হ্যাঁ, এই প্রশ্নের উত্তরই তো খুঁজে ফিরছেন দার্শনিক আর বিজ্ঞানীরা এতকাল যাবৎ। যখন বিজ্ঞান ছিলো না, তখন দর্শন ছিলো। আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে বৌদ্ধ দার্শনিক ঋষি ‘কণাদ’ বলেছিলেন যে কোন কিছুকে ভাঙতে ভাঙতে এমন এক অবস্থায় উপনিত হতে হবে যখন তাকে আর ভাঙা যাবে না, আর এটাই হলো এই মহাবিশ্বের ক্ষুদ্রতম গঠন একক। তিনি তার নাম দিলেন ‘অণু’।  তার দুইশত বছর পরে গ্রীক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস একই কথার প্রতিধ্বনী করলেন। ডেমোক্রিটাস তার নাম দিলেন ‘এ্যাটম (অতম)’, মানে যাকে আর ভাঙা যায় না।

ক্ষ্যাপা যেভাবে পরশ-পাথর খুঁজে বেড়ায়, ঠিক সেইভাবেই হন্যে হয়ে  ‘অণু’ বা ‘অতম’ খুঁজে বেড়ালো মানবজাতি কয়েক হাজার বছর যাবৎ। অবশেষে জন ডাল্টন ১৮০৩ সালে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আবিষ্কার করলেন সেই এ্যাটম। অবশেষে হাফ ছেড়ে বাঁচলেন বিজ্ঞানীকূল – মঞ্জিল মিল গায়া। কণাদ ও ডেমোক্রিটাসের প্রিডিকটেড সেই ক্ষুদ্রতম গঠ একক পাওয়া গিয়েছে। এখানে থেমে গেলেই বেশ হতো হয়তো। কিন্তু ঐ যে, ‘মানুষের জানার পরিধি যত বিস্তৃত হয়,  অজানার পরিসীমাও তত প্রসারিত হয়।’ ডাল্টন-এর এ্যাটম পেয়ে মানুষ ভুলেই গিয়েছিলো এরিস্টটলের উল্টা দর্শন-টি – ‘কোন কিছুকে ভাঙতে শুরু করলে, তা কোন ‘অতম’-তে গিয়ে থামবে না। এই ভাঙার কোন শেষ নেই।’ যাহোক, রোখ চেপেছিলো বিজ্ঞানী রাদারফোর্ডের মাথায়, তিনি একটি পরীক্ষণের মাধ্যেমে টের পেলেন যে, ডাল্টনের এ্যাটম নিরেট বা অবিভাজ্য নয়! বরং তার মধ্যেও কিছু রয়েছে। আর তারা তিন রকমের। এখন অবশ্য আমরা জানি যে ঐ তিনরকমের কিছু হলো তিনটি মৌলিক কণিকা ‘ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন’। তিনটিরই পৃথক পৃথক ভর রয়েছে, তবে কম আর বেশি। এবং সোনা, রুপা, তামা, কার্বন, ইত্যাদি মৌলিক পদার্থের মধ্যে ‘ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন’ সমুহের সংখ্যার তারতম্য রয়েছে। একটা কার্বনের এ্যাটমের চাইতে, একটা সোনার এ্যাটম অনেক বেশি ভারী। কারণ একটা সোনার এ্যাটমে ‘ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন’-এর সংখ্যা কার্বনের এ্যাটমের চাইতে বেশি। তার মানে আপাতত দাঁড়ালো যে, যেই পদার্থের মধ্যে ‘ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন’ সমুহের সংখ্যা বেশি, সেই পদার্থ তত বেশি ভারী।

আরো রয়েছে মহাকর্ষ ভর (gravitational mass)। স্যার আইজাক নিউটনের সেই বিখ্যাত গ্রাভিটিশনাল থিওরী প্রকাশিত হওয়ার পরে জানা গেল মহাকর্ষ ক্ষেত্রের কথা। তখনই বোঝা গেলো যে কোন বডির মহাকর্ষ ক্ষেত্রের আকর্ষণ ক্ষমতা কম, আবার কোন বডির  মহাকর্ষ ক্ষেত্রের আকর্ষণ ক্ষমতা বেশি। তার মানে কি? তার মানে হলো, যেই বডির আকর্ষণ ক্ষমতা বেশি তার ভর বেশি আর  যেই বডির আকর্ষণ ক্ষমতা কম, তার ভরও কম। গাণিতিকভাবে কেপলার মেথড ব্যবহার করে এই ‘ভর’ নির্ণয় করা যায়।

এছাড়াও রয়েছে ‘আপেক্ষিক ভর. মানে গতির উপর নির্ভর করে কোন বডির ভর কম বা বেশি মনে হতে পারে! তবে এই নিয়ে অন্য কোন লেখায় আলোচনা করা যাবে।

কৃষ্ণবিবর কি গতিশীল না স্থির?

এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে বলি গতিশীল যে কোন বডিই কোন না কোন ধরনের তরঙ্গ উৎসার করে। তা সে বিদ্যুৎ-চুম্বক তরঙ্গ হোক, বা মহাকর্ষীয় তরঙ্গ হোক। তাহলে গতিশীল একটা কৃষ্ণবিবর তরঙ্গ উৎসার করবেই। তবে সেখান থেকে বিদ্যুৎ-চুম্বক তরঙ্গ সম্ভাবনা কম। ঐ যে আগেই বলেছি যে, কৃষ্ণবিবর আলোকে খেয়ে ফেলে। তাহলে অদৃশ্য ঐ কৃষ্ণবিবরের অস্তিত্ব কি কোনভাবেই টের পাবো না? না, তা হবে না। অস্তিত্ব রয়েছে এমন কোন কিছুর অস্তিত্ব টের পাওয়া যাবে না, তা বোধহয় এই জগতে হবার নয়। সব কিছুরই কোন না কোন ইফেক্ট থাকবেই। কৃষ্ণবিবর মহাকর্ষীয় তরঙ্গ উৎসার করবেই।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ:

এক একটি কৃষ্ণবিবর এতটাই ম্যাসিভ যে তা গতিশীল অবস্থায় ভালো পরিমানেই মহাকর্ষ তরঙ্গ উৎসার করে। কিছুকাল আগে এরকম একজোড়া ঘূর্ণায়মান কৃষ্ণবিবর থেকে উৎসারিত মহাকর্ষ তরঙ্গ ডিটেক্ট করা সম্ভব হয়েছে। যে বিজ্ঞানীরা তা সনাক্ত করেছিলেন তারা নোবেল পুরষ্কারও পেয়েছিলেন।

মহাকর্ষীয় তরঙ্গ এবং এর প্রকৃতি ও উৎসার সম্পর্কে মোটামুটি বিস্তারিতভাবে আমি লিখেছিলাম ২০১৭ সালে লিখিত একটি প্রবন্ধে, যার নাম ছিলো ‘এবারের নোবেল পুরষ্কার (পদার্থবিজ্ঞান ২০১৭)’।

তরঙ্গ কি?

শান্ত একটা পুকুরে ঢিল ছুঁড়লে পানিতে যে ওঠানামা দেখা যায়, সেটা তরঙ্গ। নদীর পানিতে যে আন্দোলন দেখা যায়, সেটা তরঙ্গ। সমুদ্রের তরঙ্গের কথা আর নাই বা বললাম। অত বড় তরঙ্গ বোধহয় ক্ষীণদৃষ্টিসম্পন্ন লোকেও দেখবে। আবার দেখা যায় না এমন তরঙ্গও রয়েছে, যেমন বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় তরঙ্গ, মহাকর্ষ তরঙ্গ, ইত্যাদি।

তরঙ্গ আসলে ‘ক্যারিয়ার অব এনার্জি’ তাই কোন উৎস যদি তরঙ্গ উৎপাদন করে বা নিঃসরণ করে তাহলে সেই উৎস কিছু পরিমানে শক্তি হারায়।, তা সেই তরঙ্গ বিদ্যুৎ-চুম্বক তরঙ্গ-ই হোক আর মহাকর্ষ তরঙ্গই হোক। যেমন আমাদের পৃথিবী ঘূর্ণনকালে মহাকর্ষ তরঙ্গ উৎসার করে। এইভাবে শক্তি ক্ষয় করতে করতে সে একসময় সূর্যের উপর পতিত হবে। তবে তা হতে বহু  বহুকাল সময় লাগবে। পৃথিবী ঘূর্ণনকালে যে পরিমাণ শক্তি হারায় তা খুবই কম, জাস্ট একটা ইলেকট্রিক হিটার জ্বালাতে যে পরিমাণ শক্তি প্রয়োজন।

‘ইন্টারএ্যাকশন’

পদার্থবিজ্ঞানী হিসাবে ‘ইন্টারএ্যাকশন’ টার্মটির সাথে আমার বারবার সাক্ষাৎ হয়। তবে এই ‘ইন্টারএ্যাকশন’ বিষয়টার সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিলো খুব ছোটবেলায়। আমাদের এলাকায় কেউ একজন দুটি চুম্বক নিয়ে এসেছিলো খেলার উঠানে। তার হাতে ধরা চুম্বক দুইটির মধ্যে দেখলাম এক আজব খেলা, তারা দূর থেকে কখনো পরস্পরকে ঝপ করে আকর্ষণ করছে, আবার কখনো একে অপরকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। আবার একটা সুতায় বাধা সুঁই কে চুম্বকের কাছাকাছি ধরলে সে থাকে শূণ্যে ঝুলিয়ে রাখছে। বাংলা চলচ্চিত্রের খ্যাতিমান অভিনেতা জনাব গোলাম মোস্তফার একমাত্র ছেলে সুমিত মোস্তফার একটা খেলনা সেট ছিলো। সেখানে ছিলো দুইটা পুতুল। একটা ছেলে পুতুল, আরেকটা মেয়ে পুতুল। ছেলে পুতুলটা দাঁড়িয়ে ছিলো একর্ডিয়ান গলায়, আর মেয়ে পুতুলটা দাঁড়িয়ে ছিলো ব্যালে নাচের ভঙ্গিতে। সুমিত আমাকে একদিন দেখালো যে, পুতুল দুটাকে ফ্লোরের উপরে একটু দূরত্বে রেখে ছেলে পুতুলটাকে হাত দিয়ে সামনের দিকে নিলে, মেয়ে পুতুলটা ঘুরে ঘুরে নাচতে থাকে। ঐ খেলা ঐদিন আমার কাছে অদ্ভুত লেগেছিলো। বুঝেছিলাম যে পুতুল দুইটার ভিতরে চুম্বক রয়েছে, যা দূর থেকেই একে অপরকে প্রভাবিত করতে পারে। বুঝলাম এমন কিছু প্রতিভাস আছে যা কোন বডি কন্টাক্ট ছাড়াই দূর থেকে একে অপরকে প্রভাবিত করতে পারে। তা সে আকর্ষণই হোক আর বিকর্ষণই হোক।  

ইন্টারেস্টিং হলো, যে ইন্টারএ্যাকশনটি-কে প্রতিদিনই বারংবার দেখছি, মানে পৃথিবীপৃষ্ঠে কোন কিছুকে বারবার টেনে আনা সেই মহাকর্ষ বিষয়ে কখনো-ই কোন বিস্ময়বোধ জাগেনি! ওটাকে ইন্টারএ্যাকশন বলেও মালুম হয় নাই, যতদিন না নবম শ্রেণীর ছাত্র হিসাবে গ্রাভিটেশন চাপ্টারটি পড়া শুরু করলাম। আসলে জন্ম থেকেই আশেপাশে যা দেখে আসছি, তাকে অতি স্বাভাবিক ও মামুলি মনে হয় বলে তার ব্যাপারে কোন বিস্ময় জাগে না। অথচ তার মধ্যেও কত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও বিস্ময় রয়ে গেছে!

কণিকা কি?

গৌতম বুদ্ধ অতি ক্ষুদ্রের হিসাবের গণিত জানতেন। কণিকা সম্পর্কে তিনি কিছু বলেছিলেন কিনা তা আমার জানা নাই। তবে বৌদ্ধ দার্শনিক কণাদ-ই যে প্রথম  ‘অণু’ নামক গঠন কণিকার ধারণা দিয়েছিলেন সেটা সুস্পষ্ট। সেটা ছিলো আজ থেকে ২৬০০ বছর আগের কথা। আরো অনেককাল পরে বৌদ্ধ ঋষি দিগনাগ ও ধর্মকীর্তি কণিকা সম্পর্কে বলেছিলেন। এমনকি এও বলেছিলেন যে শূণ্যস্থানে শূণ্যতা থেকেই সহসা কণিকার জন্ম ও মৃত্যু হতে পারে। (অবশ্য আধুনিক বিজ্ঞানও এখন এই কথাই বলে)। আলো যে এক ধরনের কণিকার স্রোত এই কথা বিজ্ঞানী আল হাইয়াম স্পষ্ট করেই বলেছিলেন। উনার লিখিত কালজয়ী গ্রন্থ ‘কিতাব আল মানাজির’-এ আলো সম্পর্কে বিস্তারিত গবেষণা আছে, যা উনাকে আধুনিক আলোকবিজ্ঞানের জনক হিসাবে পরিচিত করেছে।

তবে এই যুগে বৈজ্ঞানিকভাবে এ্যাটম বা পরমাণু প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন জন ডাল্টন (১৮০৮ সালে)। পরমাণু-কে প্রথমে নিরেট ভাবা হলেও বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড পরীক্ষার মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, তা নিরেট নয়, বরং ওখানে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন বডির অস্তিত্ব রয়েছে (১৯১৩ সালে)। এরপর জানা গিয়েছিলো যে, তার মধ্যে তিনটি মৌলিক কণিকা রয়েছে যাদের নাম, ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন। তবে মজার ব্যাপার হলো এই যে, ইলেকট্রন আবিষ্কৃত হয়েছিলো পরমাণুর অভ্যন্তরস্থ মৌলিক কণিকা আবিষ্কার হওয়ার আগেই (1897 সালে)।

ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন সকলেরই নিজ নিজ ভর ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

ঘটনা কিন্তু এখানেই শেষ না। পরবর্তিতে আরো জানা গেলো যে নিউট্রন-কে ভাঙলে পাওয়া যায় ইলেকট্রন ও প্রোটন। তার মানে নিউট্রন হলো ইলেকট্রন ও প্রোটন মিশ্রিত এক কণিকা। আবার প্রোটনকে ভাঙতে গিয়ে পাওয়া গেলো আরো বহু রকমের কণিকা। সাক্ষাৎ মিললো বিস্ময়কর এক জগতের সাথে যার নাম ‘কণিকা জগত’।

ব্ল্যাক হোল-এর মধ্যে কি ধরনের পদার্থ রয়েছে?

হু হু, দারুণ প্রশ্ন! একটি তারকার সব হাইড্রোজেন ফুয়েল শেষ হয়ে গিয়ে তা হয়ে যাবে ‘শ্বেত বামন’। তারপর বৈশিস্টের উপর নির্ভর করে, তা পরিনত হতে পারে নিউট্রন স্টারে। কেন? কারণ মহাকর্ষের প্রবল আকর্ষণে হিলিয়ামের ভিতরকার সব ইলেকট্রনগুলো প্রোটনগুলোর মধ্যে ঢুকে পুরো মৃত তারকাটা পরিণত হবে নিউট্রনের খনিতে। তাই তার নাম ‘নিউট্রন স্টার’। এরপর কি? মহাকর্ষ বল যদি আরো প্রবল হয়, তখন তা আরো চুপসে যাবে! চুপসাতে চুপসাতে তা পরিণত হবে কৃষ্ণবিবরে। এবং তার ভর মাত্রাতিরিক্ত! কি আছে ঐ কৃষ্ণবিবরে? তা জানতে হলে সেই পদার্থ বা বস্তু তো দেখতে হবে। কিন্তু প্রকৃতির কি এক খেয়াল! তা যাতে আমরা দেখতে না পারি সেই ব্যবস্থা করা আছে। ওখান থেকে তো আর কোন আলো আমাদের চোখে আসে না! তাই দেখা সম্ভবও না। আবার তা এমন একটা হরাইজোনের ওপাশে আছে যা আপেক্ষিক টাইম কনসেপ্টে দেখাও সম্ভব না!

(চলবে)

—————————————————————-

রচনাতারিখ: ২২শে অক্টোবর, ২০২০ সাল

সময়: রাত ০৯টা ১০ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

মণির রূপে সেই তটিনী

মণির রূপে সেই তটিনী
———————————- রমিত আজাদ

বইছে সুখে স্রোতস্বিনী, তারই ধারে বসলো মণি;
লজ্জ্বা পেলো কেমন জানি! মণির রূপে সেই তটিনী।
শরৎ শোভাও হারলো আজি, মণির অলোক ছুঁয়ে,
ফুলের মাঝে ফুলের শোভা, আকাশ দেখে নুয়ে।

শরৎ রাণী রঙ ছিটালো, সাগর পারের বনে;
কোন রঙে আজ রঙিন হলো, মণির মনে মনে?
সিন্ধু পারের বন্ধু হৃদয়, আকুল হলো প্রেমে,
মন ভরিয়ে মণির সুধা, দেখছে থেমে থেমে।

জলের বুকে হয়তো মণি লিখছে মনের কথা,
সেই কথা কি কাব্য হবে, ঢেউ জাগানো ব্যথা?
লেখার আগেই ঢেউ মুছে দেয়, জলের লেখা রয়না!
কবি তবু পড়তে পারে, জল যেন তার আয়না!

সাত সাগর আর তেরো নদীর ঐ পারে আজ মণি,
এই পারে তার আঁকছে ছবি, চিত্রকর এক ঋণী।
উদাসিনীর ব্যাকুল আঁখি হাজার যোজন দূরে,

যেই দেশে আজ গাইছে মাঝি ভাটিয়ালি সুরে।

রচনাতারিখ: ২১শে অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ০১টা ১০ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

তাকে শাড়ী পড়ে আসতে বলেছিলাম

তাকে শাড়ী পড়ে আসতে বলেছিলাম
————————— রমিত আজাদ

বোশেখ মেলায় আসবে যদি, এসো তবে পড়ে শাড়ি,
শাড়ীর শোভায় দেখবো তোমায়, দীপ্ত শশির পূর্ণ নারী।
ভীনদেশী আর ভিন্ন পোষাক, আর কতদিন পড়বে?
শাড়ির বাহার না দেখিলে মন কি আমার ভরবে?

আকুলতার অনুরোধের কথা তুমি রেখেছিলে,
বিকিকিনির বোশেখ মেলায় শাড়ি পড়েই এসেছিলে।
নওজোয়ানীর রূপের সে ঢল ভাসিয়েছিলো সারা বেলায়!
কিন্তু মোদের হয়নি দেখা এবারের এই বোশেখ মেলায়।

মেলার আগে সকাল বেলায় টেলিফোনে বলেছিলে,
“আসছি আমি সবুর করো।” অপেক্ষাতেই রেখেছিলে।
অপেক্ষা নয় প্রতীক্ষাতে ছিলাম আমি অধীর মনে,
এই সুযোগে দেখবো তোমায় জরীন শাড়ি পড়নে।

বাঙালী এই প্রাচীন পোষাক আমার অতি দুর্বলতা,
শাড়ির ছোঁয়ায় নারী যে পায়, আকাঙ্খিত সে পূর্ণতা!
তোমায় আমি সে পূর্ণতায় মেলার ঢলে দেখতে চে’লাম,
কিন্তু হায়রে কেমন কপাল, পরিতুষ্টি কোথায় পেলাম?

অপেক্ষাতে থাকা আমি, একটি কলও পাইনি ফোনে!
দিন ফুরিয়ে সন্ধ্যা এলো, নামলো আঁধার আমার মনে।
নও বছরের আমোদ-প্রমোদ, বাজনা-গীতি থামলো পুরে,
কুহেল সাঁঝের বিষাদ সম রইলে তুমি দূরে দূরে।

ইলেকট্রনিক মোবাইল ফোনে তার পরদিন হলো কথা,
অবশেষে বলেছিলে গতকালের ক্লেশের ব্যাথা।
“মেলায় কি কাল এসেছিলে?”
“আমার আশায় বসে ছিলে?”
“তা নইলে বলছি কেন?”
“ইচ্ছে করে হয়নি জেনো!”
“শাড়ি পড়েই এসেছিলে?”
“শাড়ির মায়ায় ভেসেছিলে?”
“না ভাসলে বলবো কেন?”
“হ্যাঁ, শাড়িতেই ছিলাম জেনো।”
“আমায় কেন কল দিলে না?”
“তুমি কেন খোঁজ নিলে না?”
“চষেছিলাম সারা মেলা, তোমার দেখা পেলাম না তো!”
“মা যে আমার সাথে ছিলো, বাধা ছিলাম আমিওতো।”
“ও, তাহলে এই ঝামেলা, যেই কারণে হয়নি দেখা!”
“কাছে এসেও হয়নি দেখা, কেমনে বোঝাই মনের ব্যাথা?”

আসবে আবার বোশেখ মেলা একটি বছর সূর্য ঘুরে,
সে বোশেখ কি মোদের হবে? নাকি সেদিন থাকবো দূরে?
কেই বা জানে, কেমন হবে সেই বোশেখের নতুন বেলা!

হয়তো তুমি জায়া হবে, নতুন ঘরে পাতবে মেলা!

রচনাতারিখ: ১৬ই অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ০৩টা ১৩ মিনিট

She in Saree
—————– Ramit Azad

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৩

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ৩
———————————————— রমিত আজাদ

“The most incomprehensible thing about the universe is that it is comprehensible” – এই বিশ্বজগতের সবচাইতে অব্যাখ্যায়িত বিষয়টি হলো যে, জগতটাকে ব্যাখ্যা করা যায়। ১৯৩৬ সালে বিশ্বখ্যাত ফিজিসিস্ট আলবার্ট আইনস্টাইন এই মহান ও গুরুত্বপূর্ণ বাণীটি বলেছিলেন। এই বাণীটি শোনার পর থেকে সকলেই গভীর ভাবনায় পড়ে গিয়েছিলো; সত্যিই তো, উল্টাটাও তো হতে পারতো, জগত-সংসারের কোন কিছুই ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না, সবকিছু হচ্ছে র‍্যান্ডম, আজ এটা হয় তো কাল ওটা, আবার কিছুকাল পরে সব ওলোট-পালোট হয়ে যায়। কিন্তু এমন তো ঘটে না! সূর্য
যথানিয়ম মেনে বরাবর পূবেই ওঠে ও পশ্চিমেই অস্ত যায়। ষোল কলা পূর্ণ করেই শশধর তার পূর্ণিমা ও অমাবশ্যা দেখায়। সাগরের জোয়ার-ভাটায় ব্যাতিক্রম হয়না বিন্দুমাত্রও। বিদ্যুৎ মেনে চলে ওহম’স ল, মহাকর্ষ মেনে চলে নিউটন’স ল। তারা এইসব আইন মেনে চলছে ওহম বা নিউটন কর্তৃক আবিষ্কৃত হওয়ার কোটি কোটি বছর আগে থেকেই। সাহিত্যিক রবি ঠাকুর উনার শেষ বয়সের লেখা ‘শেষের কবিতা’-য় লিখেছিলেন, “দেবতাদের হাতে সময় অসীম; তাই ঠিক সময়টিতে সূর্য ওঠে, ঠিক সময়ে অস্ত যায়।” বিষয়টা কি তাই? গীত এর মাধ্যমে অঞ্জলী দেয়া ‘গীতাঞ্জলী’ খ্যাত রবি ঠাকুরের বহুদেবদেবী কনসেপ্টে তো উল্টাটাই হওয়ার কথা! প্যাগান মিথোলজিকাল কনসেপ্টে বিশ্বজগতে আইনের কোন বালাই নেই দেবতাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাতেই সব হয়। তাদের দেবদেবীদের রোষ ও অন্ত:কলহের বলি হয় মানবসন্তানেরা, তাদের র‍্যান্ডম স্বেচ্ছাচারিতায় ওলটপালট হয় বিশ্বজগত! আর ঐসব মিথোলজিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিজ্ঞান চোখে আঙুল দিয়ে দেখালো যে, পুরো মহাবিশ্বই এক ঝাঁক আইনের অধীন। প্রকৃতির আইনগুলো আবার পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত হয়ে এমনই একইসূত্রে গাঁথা যে তারা কেবলই একজনার পরিকল্পনা না হয়ে পারে না!

পাঠকদিগের মধ্যে যারা বিজ্ঞানের ছাত্র নন, তাদের বলবো যে আপনারা শুনলে অবাক হবেন যে অতিক্ষুদ্র যে এ্যাটম, তার ভিতরকার আইনগুলি যদি অমন না হয়ে অন্যরকম হতো তাহলে এই বিশ্বজগতে কোন প্রাণই থাকতো না, এমনকি বিশ্বজগতটাই টিকে থাকতে পারতো না! কোন এক মহাজ্ঞানীর বিস্ময়কর বুদ্ধিমত্তায় সবকিছু ডিজাইনড! কোন এক নিপূণ শিল্পীর তুলিতে জগতের সব সৌন্দর্য আঁকা!

গত পর্বে বিজ্ঞান বিষয়ক কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলাম; এবং নক্ষত্রের ভবিষ্য নিয়ে কিছু কথা বলেছিলাম। এ পর্বে তা কন্টিনিউ করবো। আপাতত আলোচনা করতে চাই মহাকাশের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক নক্ষত্রগুলোকে নিয়ে। জানিনা, আপনারা আমার কথা বিশ্বাস করবেন কিনা, কিতাবে পড়ার আগেই আমি রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে কালপুরুষ ও ক্যাসিওপিয়াকে পর্যবেক্ষণ করেছিলাম। আরও পর্যবেক্ষণ করেছিলাম দূরবর্তি নক্ষত্রের ঝাঁক, পরে জেনেছি যে ওগুলো ভিন্ন গ্যালাক্সি। আমার ধারণা আমার মতন এমন অনেকেই আছেন। এর মানে আমি এই বলতে চাই যে, নক্ষত্র নিয়ে আগ্রহ নেই এমন মানুষ মেলা ভার। মুরতাবা ভাইয়ের কাছ থেকে যেদিন জেনেছিলাম যে সূর্য মূলতঃ একটা হাইড্রোজেন বোমা, সেদিন বিস্মিত হওয়ার পাশাপাশি ভীত ও রাগান্বিতও হয়েছিলাম। আমেরিকা, রাশিয়া হাইড্রোজেন বোমা বানিয়েছে। তার মানে হলো বিজ্ঞানীদের মেধায় এই পৃথিবীতেই ছোটখাট সূর্য নির্মিত হয়েছে। রাশিয়ান সাখারোভ ও মার্কিন টেলরের মতন বিজ্ঞানীদের মেধার প্রশংসা না করে পারা যায় না। আবার ভয় ও রাগের বিষয় হলো এই যে, বৃহৎ শক্তিগুলো ব্যাপকবিধ্বংসী মারণাস্ত্র নিয়ে যেইভাবে ইতরামি-ফাতরামি করছে, তাতে কোন্‌দিন যে কি অঘটন ঘটে যায়, তার আর কোন অজুহাত থাকবে না। যাহোক, নক্ষত্রের আলোচনায় আসি। রাতের মহাকাশে তাকালে দেখা যায় শুধু কালো আর কালো। তার মাঝে জ্বোনাকী পোকার মত মিটমিট করা কিছু আলোর বিন্দু, ওগুলোর বেশীরভাগই নক্ষত্র। এক একটা নক্ষত্র বিশাল বড় বড়। তাহলে মহাকাশটা কত বড়? তারপরে প্রশ্ন জাগে যে, এত বিশাল ও শূণ্যস্থানে নক্ষত্রগুলোর জন্ম হয় কি করে? শূণ্যতা থেকে কি কিছু আসতে পারে? প্রাচীন গ্রীক দর্শনে বলা হয়েছে, Ex Nihilo Nihil Fit – মানে শূণ্যতা থেকে কোন কিছুই আসতে পারে না। দর্শনটি বাইবেলেও সংক্রমিত হয়েছে। অন্যদিকে ‘পবিত্র কোরআন’-এ লিখিত আছে যে, মহান সৃষ্টিকর্তা শূণ্যতা থেকেই আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। যেহেতু মহাবিশ্বের জন্মের আগের অবস্থা আমাদের জানা নেই। তাই মহাবিশ্বের জন্মের পরের অবস্থাটি নিয়ে কাজ বা স্টাডি করা ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় নেই। অতঃপর মহাবিশ্ব স্টাডি করে আপাতত পাওয়া যায় যে, মহাবিশ্বের ভিতরে বস্তু (পদার্থ, শক্তি, কণিকা, ক্ষেত্র, ইত্যাদি) রয়েছে। আরো রয়েছে গতি। এই বস্তু আর গতির টানাপোড়নেই নানান অবজেক্টের সৃষ্টি। ভরের নিত্যতার যে আইন-টি আধুনিক স্কুল-কলেজগুলোতে পড়ানো হয় তার আদিরূপটির আবিষ্কারক ছিলেন একাদশ শতকের মুসলিম বিজ্ঞানী আল-বিরুণী। বল ও ত্বরণের মধ্যকার সম্পর্কটিও উনারই আবিষ্কার। পাঠকরা বিষয় তিনটি মনে রাখবেন, আমার পরবর্তি আলোচনায় এই তিনটি বিষয়ই আসবে।

শুরু করি মহাকাশের শূণ্যতা নিয়ে। গ্রীক ‘কসমস’-এর বাংলা অনুবাদ একসময় পড়েছিলাম ‘মহাশূণ্য’, আমার মতে অনুবাদটি মিসলিডিং। কারণ মহাকাশ নিরেট শূণ্যতা নয়। সেখানে অনেক কিছুই আছে। তাদের মধ্যে একটি হলো হাইড্রোজেন এ্যাটম। খুবই অল্প ঘনত্বের হাইড্রোজেন এ্যাটম মহাকাশে ঘুরে বা ভেসে বেড়ায়। প্রসঙ্গত বলছি যে, বালক ‘ক’-কে নিয়ে গিয়েছিলাম গ্রামে। গ্রীস্মের দাবদাহে রোদ-তাপ থেকে বাঁচতে একটা বাঁশঝাড়ের ছায়ায় বসলাম। সেখানে একটু পরপর ঝিরঝির বাতাস বইছিলো। বালক ‘ক’ আমাকে প্রশ্ন করে বসলো, “বাতাস আসে কোথা থেকে?” ওর প্রশ্ন শুনে আমার মনে পড়লো বহুকাল আগে এমনই প্রশ্ন আমরা করেছিলাম, আমাদের স্কুল-কলেজের শ্রদ্ধেয় উপাধ্যক্ষ মাসুদ হাসান স্যারকে। ভূগোলের জ্ঞানী শিক্ষক মাসুদ হাসান স্যার পুরো বিষয়টা আমাদেরকে খুব সুন্দর করে ব্যাখ্যা করেছিলেন। সমতা থাকলে কোন প্রবাহ হয় না। প্রবাহের পিছনে আছে অসমতা। মন্ডলে বায়ু তো আছেই, কিন্তু তার ঘনত্ব কোথাও বেশী কোথাও কম। কোন এলাকায় বায়ু উত্তপ্ত হয়ে গেলে, তার ঘনত্ব যায় কমে; তখন বেশী ঘনত্ব এলাকা থেকে বায়ুরা কম ঘনত্ব এলাকার দিকে ধাবিত হয়। সংক্ষেপে বললে এটাই ‘বায়ু প্রবাহ’। এখন আসুন মেঘ সংক্রান্ত আলোচনায়, আকাশের দিকে যদি তাকাই, কত চমৎকার সাদা সাদা মেঘ আকাশে ভেসে বেড়ায়; ওরা উড়তে উড়তে একসময় কালো হয়ে ওঠে; আর তার কিছুক্ষণ পর নামে ঘোর দেয়া। মেঘেরা সাদা, কারণ সেখানে জলীয় বাষ্পের ঘনত্ব কম, আর জমাট বাধতে বাধতে তা একসময় কালো ও ঘন হয়ে ওঠে। নক্ষত্রের জন্ম বিষয়টাও ঐ রকমই। মহাকাশে ভেসে বেড়ানো হাইড্রোজেন এ্যাটমগুলো উড়তে উড়তে একসময় কোন এক জায়গায় মেঘের মতই জমাট বাধতে শুরু করে। একবার কিছু সংখ্যক এ্যাটম জমাট বাধলেই হলো, ওগুলোর টানে আরও হাইড্রোজেন এ্যাটম ঐদিকে ধাবিত হয়। বাড়তে থাকে এ্যাটমের ঝাঁক, সেইসাথে ক্রমাগত বাড়তে থাকে তাদের সমষ্টিগত মহাকর্ষ বল। মহাকর্ষ বল এমনিতে দুর্বল হলেও, সমষ্টিগতভাবে সেটা সবলই হয়ে ওঠে। তাছাড়া মহাকর্ষ বলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তার কেবল আকর্ষণ বলই রয়েছে, চুম্বক বা বিদ্যুতের মত তার কোন বিকর্ষণ বল নাই। তাই বিশাল আকৃতিতে পুঞ্জিভূত হাইড্রোজেন এ্যাটমগুলো সমষ্টিগত মহাকর্ষ বলের প্রভাবে নিজেদের মধ্যেই ছুটোছুটি করতে থাকে। আর এই ছুটাছুটি শুধুই টেনিস বলের কলিশনের মত ধাক্কাধাক্কি পর্যায়ে থাকে না, বরং প্রবল সংঘর্ষে দুই পরমাণু হাইড্রোজেন একীভূত হয়ে একটি হিলিয়াম পরমাণুতে পরিণত হয়। যা মূলত: একটি তাপ-উৎপন্নকারী রাসায়নিক বিক্রিয়া। পুঞ্জিভূত হাইড্রোজেন এ্যাটমগুলো রাসায়নিক বিক্রিয়া করে রুপান্তরিত হচ্ছে হিলিয়ামে, সেখান থেকে উৎসারিত হচ্ছে বিপুল পরিমানে তাপ ও আলো। ব্যাস শুরু হয়ে গেল একটি নক্ষত্রের জীবন। কোটি কোটি অথবা শত শত আলোকবর্ষ দূর থেকে আমরা তা পর্যবেক্ষণ করি, চোখ নামক একজোড়া অদ্ভুত প্রাকৃতিক ক্যামেরা দিয়ে।

এবার পাঠকদের মনে নিশ্চয়ই প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছে যে, নক্ষত্র থেকে উৎসারিত তাপ কি? নক্ষত্র থেকে উৎসারিত আলো কি? নক্ষত্র থেকে আর কি কি উৎসারিত হয়? কেন নক্ষত্রের প্রবল মহাকর্ষ ক্ষেত্র ওদের ধরে রাখতে পারে না?

(চলবে)

রচনাতারিখ: ১৪ই অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ০৮টা ৫০ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ২

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ২
————————————————– রমিত আজাদ

‘কসমস’ শব্দটির অর্থ সুন্দর। সম্ভবত রাতের আকাশের সৌন্দর্য্যে বিমোহিত হয়ে মানুষ তার নাম দিয়েছে ‘কসমস’। শীতের দেশগুলিতে তারকাশোভিত সৌন্দর্য্যমন্ডিত রাতের আকাশ দেখা যায় কম। বছরের সামান্য কয়েকটি মাস তা দৃশ্যমান। বাকি সময় আকাশ থাকে ঘন কালো মেঘে ঢাকা। অপরদিকে আমাদের মত দেশগুলিতে বারোমাসই সেই সৌন্দর্যের ডালি আমরা উপভোগ করতে পারি। তাই হয়তোবা প্রাচ্যে এ্যাস্ট্রোনমি নিয়ে কাজ হয়েছে অনেক বেশী। আর্যভট্ট থেকে শুরু করে ওমার খৈয়াম পর্যন্ত বিজ্ঞানী অথবা দার্শনিকেরা এ্যাস্ট্রোনমি নিয়ে কাজ না করে পারেননি।

দিনের প্রচন্ড আলোতে মহাকাশে নীল রঙ ছাড়া আর তেমন কিছুই দেখা যায় না। কিন্তু রাতের আকাশে কত কিছুই যে হাতছানি দেয়! কি আছে ঐ মহাকাশে। এই নিয়ে গবেষণা করতে করতে মানবজাতি সন্ধান পেলেন নানা ধরনের অবজেক্টের যাদের নাম উল্কা, ধুমকেতু, গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র, ইত্যাদি। যাদের সাধারণ নাম জ্যোতিষ্ক। জ্যোতিষ্ক মানে যে জ্যোতি দেয় বা আলো দেয়। তাই বলে তাদের সকলেই কি আলো দেয়? ভালো করে খোঁজখবর নিয়ে বোঝা গেল যে, না, মহাকাশে আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী চাঁদের যেমন নিজস্ব কোন আলো নেই (চাঁদের নিজস্ব আলো থাকলে আর অমাবশ্যার রাতে ভুতের ভয় থাকতো না!) তেমনি অনেক অবজেক্টই মহাকাশে রয়েছে যাদের নিজস্ব কোন আলো নেই, তারা অন্যের আলোয় আলোকিত হয়। তার মধ্যে রয়েছে ধুমকেতু, গ্রহ, উপগ্রহ, গ্রহানু, ইত্যাদি। তারপরে স্বভাবতঃই আরো প্রশ্ন জাগে যে এমন কিছু অবজেক্ট কি থাকতে পারে, যারা আলো দেয় না, আবার অন্যের আলোকেও আলোকিত হয় না, যারা রঙে কালো তাই রাতের কালো আকাশে তারা ক্যামোফ্লেজড হয়ে যায় এবং মানবের নয়নে ধরা আর দেয় না?

এবার খেয়াল করুন এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় হয়ে আসছে আলো (সেইসাথে আমাদের চোখও অবশ্যই)। কোন উৎস থেকে আলো এসে আমাদের চোখে পড়লেই কেবল আমরা তাকে দেখতে পাবো তা নইলে নয়। তা সে জ্বলজ্যান্ত একটা শরীর নিয়ে আমাদের নয়ন সমুখে যতই বিদ্যমান থাকুক না কেন।

আলোচনার এই পর্যায়ে একটু থেমে, গত পর্বের শেষ প্রশ্নটিতে ফিরে যাই। একটি তারকা তাপ বা শক্তি বিকিরণ করে করে হাইড্রোজেন নামক ফুয়েলটি শেষ হওয়ার পর তার অবস্থাটা ঠিক কি হবে? সকল তারকাই কি আমাদের প্রিয় ও অতি আপন তারকা সূর্যটির মত শ্বেত বামনে রুপান্তরিত হবে? হ্যাঁ, এমন প্রশ্নই করেছিলেন বিজ্ঞানী জন মিচেল (John Michell)। তিনি তার লেখা একটি চিঠিতে ১৭৮৩ সালে তিনি রয়েল সোসাইটির সদস্য এবং বিজ্ঞানী হেনরি ক্যাভেন্ডিসকে (Henry Cavendish) এই জাতীয় কিছু লিখেছিলেন। বিপুল পরিমাণ ভর বিশিষ্ট কোন অবজেক্ট, যার মহাকর্ষ বল এতই প্রবল যে আলোকেও টেনে ধরে রাখে, সেই বিপুল মহাকর্ষের প্রভাবে আলোক তরঙ্গ পর্যন্ত পালাতে পারে না, তাকে তো আর মানব নয়নে দেখা যাবে না! আর ঐ পর্যায়ে একটা অবজেক্ট পরিনত হবে কি করে? ১৭৯৬ সালে ফরাসী গণিতবিদ পিয়েরে সিমন ল্যাপলেস একই মতবাদ প্রদান করেন তার Exposition du système du Monde বইয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় সংস্করণে। কিন্তু পরবর্তী সংস্করণগুলোতে এ সম্পর্কিত ধারণা তিনি আর রাখেন নি। কেন রাখেননি সেটা পরে আলোচনা করবো।

মার্কসিজমের অনুসারী হাবিব ভাই-এর হাতে আমার দর্শনের হাতেখড়ি। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র। যদিও সক্রেটিস-প্লেটো-এরিস্টটল সম্পর্কে আমাদেরকে স্কুল জীবনেই জ্ঞান দিয়েছিলেন শ্রদ্ধেয় দেলোয়ার হোসেন স্যার। তবে দর্শন বা ফিলোসফি শব্দটি স্যার আলাদাভাবে উল্লেখ করেননি। তিনি নিজে ছিলেন রাষ্ট্রবিদ্যা-র গ্রাজুয়েট, তাই রাষ্ট্রবিদ্যার পার্ট হিসাবেই তিনি আমাদেরকে সক্রেটিস-প্লেটো-এরিস্টটল পড়িয়েছিলেন। আর হাবিব ভাই আমাকে ‘ফিলোসফি’ শব্দটি পৃথকভাবে উল্লেখ করে ঐ সাবজেক্ট-এর গুরুত্ব বুঝিয়েছিলেন। উনার সাথে আলোচনার সূত্র ধরেই আমি নিজ উদ্যোগে দর্শন পড়তে শুরু করি। যা পরবর্তি বৎসরেই আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এ্যাকাডেমিকালি কাজে লেগেছিলো (যেহেতু, সেকেন্ড ইয়ারে ফিলোসফি সাবজেক্ট-টি আমাদের বাধ্যতামূলক ছিলো), আর পুরো জীবনেই দর্শন কাজে লাগছে নানা বিষয় উপলদ্ধি করতে। এখন আমি জানি যে, যেকোন বিষয় বোঝা বা পড়া শুরুই করতে হয় ‘দর্শন’ দিয়ে।

‘ডুয়ালিটি ইন ন্যাচার’ সম্পর্কেও হাবিব ভাই-ই আমাকে প্রথম বলেছিলেন। তারপর সেকেন্ড ইয়ারে আলোকের কণা-তরঙ্গ ডুয়ালিটি পড়তে গিয়ে বিষয়টা ভালোই উপলদ্ধি করেছিলাম। হাবিব ভাইকে একদিন আমি কথায় কথায় বলেছিলাম যে, “ভালো যে আমরা সূর্য থেকে অনেক দূরে আছি। সেই কারণে অতি তাপে পুড়ে মরছি না, আবার সূর্যের যে প্রবল আকর্ষণ বল সেটাও আমাদের টেনে তার ভিতরে নিয়ে যেতে পারছে না।” হাবিব ভাই হেসে বলেছিলেন, ” ঐ শক্তিশালী সূর্যেরও লিমিটেশন আছে।” আমি বলেছিলাম, “কি লিমিটেশন আছে? তার মহাকর্ষ বল তো প্রবল।” হাবিব ভাই বলেছিলেন, “ভালো করে খেয়াল করে দেখেন, সূর্য কিন্তু সবকিছুকেই টেনে ধরে রাখতে পারে না।”
আমি: যেমন?
হাবিব ভাই: যেমন আলো। আলোকে সূর্য টেনে ধরে রাখতে তো পারেই না, বরং আলোই নিজগুনে সূর্য থেকে বাইরে বেরিয়ে বহু দূরে চলে আসে।

উনার ঐ অকাট্য যুক্তির সেদিন আর কোন জবাব দিতে পারি নাই। কারণ বিষয়টা আমাকেও ভাবিয়েছিলো। তাই তো, মহাশক্তিমান সূর্যও তাহলে অতটা শক্তিমান নয়? আকর্ষণ-এর পাশাপাশি সেখানে বিকর্ষণও রয়েছে! এরপর মনে আরো প্রশ্ন জেগেছিলো, “আলো আসলে কি?” যদিও স্কুলজীবনে পড়েছিলাম যে, আলো ‘ফোটন’ নামক এক ধরণের কণিকা। আবার অমিতাভ বিশ্বাস স্যার বলেছিলেন যে, আলোক কণিকার কোন ভর নাই। বিষয়টা আমাকে নাড়া দিয়েছিলো, কণিকাই যদি হবে তাহলে ভর থাকবে না কেন? কণিকা বলতে তখন আমি মোটরদানা জাতীয় কিছু বুঝতাম।

আবার একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীতেই তো পড়েছিলাম যে আলোর তরঙ্গ ধর্ম রয়েছে। আলোর প্রতিফলন, প্রতিসরন ইত্যাদি আছে। সেই নিয়ে কত রকম অংকও তো কষলাম! আলো একটি ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ সেটাও পড়েছিলাম, অবশ্য ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ যে কি সেটা তখন বুঝিনাই বা জানতে পারিনাই। তবে বাঙালী বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু অদৃশ্য তরঙ্গকে বিনা তারে প্রেরণ করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন সেটাও পড়েছিলাম, কিন্তু তখনও বুঝি নাই যে ঐ অদৃশ্য তরঙ্গটি আসলে কি ছিলো? কেনই বা সে অদৃশ্য? রেডিও স্টেশন থেকে কি পাঠানো হয়, যা আমাদের ঘরের রেডিওকে বাজায়? টেলিভিশন স্টেশন থেকে কি পাঠানো হয়, যা আমাদের ঘরের টিভি সেটে ছবি তৈরী করে? ঢাকার রামপুরা টেলিভিশন ভবনে গেলে আমার কাছে চটকদার স্টুডিওর চাইতে বেশী আকর্ষণীয় মনে হতো তার সুউচ্চ টাওয়ারটি। ওর নীচে দাঁড়িয়ে আমি বহুবার তার উপরে তাকিয়ে বোঝার বা দেখার চেষ্টা করেছি, ঐ টাওয়ার থেকে কি বের হয়?

হাবিব ভাইয়ের সাথে আলোচনা থেকে বুঝলাম যে মহাকর্ষ বল আলোকে প্রভাবিত করতে পারে না। তা নইলে সূর্যের মত অত ম্যাসিভ একটা বডি আলোকে টেনে রাখতে পারে না কেন? আবার আলো কণিকা না তরঙ্গ, তরঙ্গ না কণিকা এই খটকাও দূর হলো না।

আরেকটি বিষয় আমাকে স্কুল জীবনে বলেছিলেন আমাদের চৌকষ শিক্ষক শ্রদ্ধেয় বদরুদ্দোজা স্যার (রসায়নের শিক্ষক) – কোন মেটালের উপর আলো পড়লে তাতে ইলেকট্রিসিটি উৎপন্ন হয়। জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ – ‘সোলার ক্যালকুলেটর’। সেই আশির দশকে সোলার এনার্জীর এর চাইতে বেশী কোন ব্যবহার আর ছিলো না। ঐ বিষয়টাও আমাকে ভাবিয়েছিলো, আলো কি করে ইলেকট্রিসিটি হয়ে গেলো? আলো আর বিদ্যুতের মধ্যে তাহলে কি কোন সম্পর্ক রয়েছে? বদরুদ্দোজা স্যারই আমাকে বুঝিয়েছিলেন যে, ‘ইলেকট্রিসিটি ইজ দা ফ্লো অব ইলেকট্রন’। আরো তালগোল পাকিয়েছিলো আমার মাথায়! ইলেকট্রন এক ধরনের কণিকা, মেটালে আলো পড়লে ইলেকট্রনরা চলতে শুরু করে কেন?

যাদুবিদ্যার প্রতি আমার খুব ঝোঁক ছিলো। আমার চাচাতো ভাই অণুর কল্যানে জুয়েল আইচ বা পিসি সরকারের প্রায় সবগুলি যাদুই শিখে নিয়েছিলাম বারো-তের বছরের মাথায়ই। আর ঐ শিখতে গিয়ে বুঝেছিলাম যে, যাদু আর কিছুই নয়, জাস্ট ইউজ অব সায়েন্স ফর এ্যামিউজমেন্ট। মানে হলো, যারা সায়েন্স বোঝে না, সায়েন্স জানা তুমি তাদেরকে ঐ দিয়ে ধোঁকা দাও। তখন থেকেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাতে শুরু করেছিলো যে, ‘জগতে কোন কিছুই অব্যখ্যায়িত নয়।’

উপরের বিষয়গুলো নিয়ে পরে কথা হবে। আপাতত যে বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে চাই তা হলো নক্ষত্রের ভাগ্য। ক্রমাগত তাপ বিকিরণ করে নিঃশেষ হওয়া একটা নক্ষত্রের ভাগ্যে শেষমেশ কি লেখা আছে? কিছুক্ষণ আগে চট করে ‘ভর’ কথাটি উল্লেখ করে ফেলেছি। রাইট, নক্ষত্রের ভর এখানে একটা বড় ভূমিকা রাখে। মহাকাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কোটি কোটি নক্ষত্র ভর ও আয়তনের দিক থেকে নানান রকম। আমাদের সূর্য একটি মাঝারি সাইজের তারকা। সূর্যের ভরের তারকাগুলো প্রাথমিকভাবে শ্বেত বামনেই পরিণত হবে। সূর্যের চাইতে দেড় দুইগুন বেশী ভরের তারকাগুলো পরিণত হবে ‘নিউট্রন স্টারে। কি এই ‘নিউট্রন তারকা’ তা পরে আলোচনা করবো। আর আরও বেশী ভরের তারকাগুলো পরিণত হয় এক মহাশক্তিশালী মহাকর্ষ বলের আধারে, এখানে মহাকর্ষ বল এতটাই শক্তিশালী যে তা সবকিছুকেই টেনে ধরে, এমনকি আলোকেও। সেখান থেকে কোন আলো বাইরে বেরুতে পারে না, আবার বাইরের কোন উৎস থেকে সেখানে আলো পড়লে সেই আলোও এমনভাবে শোষিত হয় যে, আর তা প্রতিফলিত হয় না। সেই যে রূপকথায় পড়া কোন এক অজানা জগত বা গহ্বরের মত যেখানে একবার গেলে আর কেউ ফিরে আসে না! যে অবজেক্ট থেকে আলো বের হবে না তার রঙ কি দেখবো? তার কোন রঙই দেখা যাবে না। তাই সে কালো। আর সে কারণেই অমন অবজেক্টকে বলা হয় ‘কৃষ্ণবিবর’।

ভর দুপুরে প্রসস্ত জায়গায় দূর থেকে কোন একটা বাড়ীর খোলা জানালার দিকে তাকালে মনে হবে যেন রুমটির ভিতরে ঘোর অন্ধকার। এবার ভাবুন তো রুমটার ভিতরে যিনি আছেন তিনিও কি কামড়ার ভিতরে সব অন্ধকার দেখছেন? মোটেও নয় কিন্তু; বরং উল্টা তিনি কামরার ভিতরটা ভীষণ আলোকজ্জ্বল দেখতে পাচ্ছেন। এবার তো প্রশ্ন জাগবে, তাহলে ‘ব্লাক হোল’-এর ভিতরটা কি আসলেই ব্লাক?

(চলবে)

রচনাতারিখ: ১৪ই অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ০১টা ২৮ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১

কৃষ্ণবিবর ও ২০২০ সালের নোবেল পুরষ্কার – পর্ব ১
——————————————- রমিত আজাদ

কসমোলজি বা সৃষ্টিতত্ত্ব আমার ছেলেবেলায় এমনকি যৌবনেও বাংলাদেশে খুব একটা পপুলার ছিলো না। আসলে সেই সময়ে বাংলাদেশে বিজ্ঞান বিষয়ে গ্রাজুয়েশন করেছেন এমন মুরুব্বী যেমন ছিলেন হাতেগোনা কয়েকজন, তেমনি স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান নিয়ে লেখাপড়া করছে এমন ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাও ছিলো কম। আমি ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্স অধ্যায়নকালীন সময়ে প্রথম ‘কসমোলজি’-র নাম শুনি। যদিও স্কুলে থাকতেই আমি আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতত্ত্বের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম উনার জীবনী পাঠের বদৌলতে। এছাড়া আমাদের স্কুল-কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক অমিতাভ বিশ্বাস স্যার আমাদেরকে নবম শ্রেণীর ক্লাসরুমেই আপেক্ষিকতত্ত্বের প্রাথমিক পাঠ দিয়েছিলেন। ভালোভাবে বিষয়টা না বুঝলেও এইটুকু অন্ততপক্ষে বুঝেছিলাম যে গতি মাত্রেই আপেক্ষিক। আর পরবর্তি জীবনে জেনেছিলাম যে স্থান () বলি আর সময় () বলি উভয়েই গতির উপরই নির্ভরশীল। তাহলে স্থান এবং সময়-ও আপেক্ষিক হবে এটাই যৌক্তিক। স্কুল-কলেজ জীবনে আমরা একটা ইসলাম ধর্মীয় অনুষ্ঠান নিয়মিত পালন করতাম, সেটি হলো পবিত্র লাইলাতুল মিরাজ। যেখানে সুস্পষ্টভাবেই স্থানের ভিতর দিয়ে অত্যাধিক দ্রুতগতিতে ভ্রমণ ও সময়ের আপেক্ষিকতা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। শ্রদ্ধেয় অমিতাভ বিশ্বাস স্যার ধর্মবিশ্বাসে অমুসলিম হলেও ছাত্রদের কর্তৃক শব-ই-মিরাজ-এর অনুষ্ঠানে পঠিত ‘সময়ের আপেক্ষিকতা’ বিষয়ক প্রবন্ধটি লিখতে সাহায্য করতেন। একবার আমি ল্যাব ক্লাসে অমিতাভ স্যারকে ধরে বসলাম, “স্যার আপেক্ষিকতা আমাকে বোঝাতেই হব.” স্যার আমাকে বিশেষ স্নেহ করতেন, তাই কোন আপত্তি জানালেন না। যদিও জানতেন আমি অত কঠিন তত্ত্বকথা ঐ বয়সে বুঝবো না। তারপরেও সংক্ষেপে আমাকে বিষয়টা বোঝালেন। এক পর্যায়ে তিনি বললেন যে, “আলোকের বেগ ধ্রুব, তার কোন পরিবর্তন হয় না।” এবার আমি ধরে বসলাম, “না স্যার, পাটিগণিতে আমরা যাদবের অংক সমাধান করেছি। সারারাত মাথা ধরিয়ে অবশেষে বুঝেছি যে দুইটা ট্রেন মুখোমুখি হলে, তাদের আপেক্ষিক বেগ বাড়ে বা যোগ হয়; আর দুইটা ট্রেন পাশাপাশি চললে তাদের আপেক্ষিক বেগ কমে মানে বিয়োগ হয়।” এরপর আমি রহস্যময় হাসি হেসে বলেছিলাম, “স্যার ট্রেনে চেপে কলেজ থেকে যখন বাড়ীতে যাই তখন এটা এক্সপেরিয়েন্সডও করেছি। মুখোমুখী চলমান দুটি ট্রেন সাঁইসাঁই করে চলে যায়, ওপাশের ট্রেনের কারো চেহারাটাও দেখা যায় না। আর পাশাপাশি চলমান দুটি ট্রেনের যাত্রিরা নিজেদের মধ্যে কথাও বলতে পারে। তাহলে স্যার খুব দ্রুত গতিতে আমাদের দিকে আসা কোন একটা বাহনের উপরে যদি একটা মোমবাতি জ্বালানো থাকে তার থেকে আসা আলোর বেগ কি স্থির অবস্থার চাইতে বেশী হবে না?” এবার স্যারও রহস্য করে হেসে বলেছিলেন, “না, হবে না।” আমি স্যারের দিকে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। স্যার আমার মনের কথা বুঝতে পেরে শান্তভাবে বললেন, “ট্রেনের উদাহরণ-টা নিয়ে ভাবছো তো? তা সব অবজেক্টের ক্ষেত্রেই গতিবেগের ঐ যোজন-বিয়োজন সূত্রটা খাটবে, কিন্তু একমাত্র ব্যাতিক্রম হলো ঐ আলো। আলোর ক্ষেত্রে ঐ সূত্র অচল!” আমিও নাছোড়বান্দা, বললাম, “স্যার, কিছু একটা তো হবে? গতির প্রভাব একেবারে এ্যাফেক্টলেস হয় কি করে?” স্যার এবার বললেন, “হুম এ্যাফেক্টলেস হয় না, আলোর বেগ না বাড়লেও, আলোর ইনটেনসিটি বেড়ে যায়।” সেদিনের আলোচনাটা খুবই ফ্রুটফুল ছিলো। অনেককিছুর সাথে প্রথমবারের মত জেনেছিলাম যে জগতবিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার আইজাক নিউটনের ফিজিক্সের আইন গুলো সবক্ষেত্রে কাজ করে না।

সূর্য নিয়ে আলোচনা করছিলাম আমার মেধাবী ও পড়ুয়া রুমমেট আসিফের সাথে।
আমি: আচ্ছা সূর্যটা আলো ছড়াতে ছড়াতে একদিন কি প্রদীপের মত নিভে যাবে?
আসিফ: তাই তো বইয়ে পড়েছি। নিভে গিয়ে এক সময়ে সূর্যটা ‘হোয়াইট ডোয়ার্ফ’ হয়ে যাবে।
আমি: মানে কি?
আসিফ: সূর্যটা আর আলো বিকিরণ করবে না। কিন্তু ও থাকবে। তখন তার যা অবস্থা হবে তার নাম ‘হোয়াইট ডোয়ার্ফ’ ।
‘হোয়াইট ডোয়ার্ফ’ বা ‘শ্বেত বামন’ নামটা ঐদিন প্রথম জেনেছিলাম।

হিরোশিমা ও নাগসাকি-র ট্রাজেডির কথা জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই জেনে এসেছি। একটা ছোট্ট বোমা কেমন বিপূল শক্তি ছড়িয়ে গোটা একটা শহরকে ধ্বংস করে দিলো, তা শুধু বিস্ময়করই না, রূপকথাকেও হার মানায়! কি ছিলো ঐ বোমার মধ্যে? কেমন করে এমন হলো তাই ভাবতাম।
আশির দশকে শব-ই-বরাতের রাত্রীতে ছোট ছোট বোমা ফাটায়নি, মুরুব্বীদের উত্যক্ত করেনি এমন বালক বোধহয় ঢাকা শহরে পাওয়া যাবে না। এই করে কিযে মজা পেতাম সেই বয়সে! ঢাকা শহরের রাস্তার মোড়ে মোড়ে অলিতে গলিতে বিক্রি হতো পাঁচ পয়শা, দশ পয়শা দামের ঐসব আতশ-বাজি। ডিনামাইটের আকৃতির বোমাটার মূল্য ছিলো চার আনা। মাঝে ঐসব বোমা কিনে না ফাটিয়ে খুলে খুলে দেখতাম, ওর ভিতরে আছেটা কি? কেন ও ফেটে এত আওয়াজ করে? আগুন জ্বলে ওঠে কেন? এরপর ভাবতাম, তাহলে অত ক্ষুদ্র একটা এ্যাটম বোমা এত বড় ধ্বংসযজ্ঞ করলো কি করে?

রসায়ন ক্লাসে শ্রদ্ধেয় কানন কুমার পুরোকায়স্থ স্যার শেখালেন, এ্যাটম বোমার সূত্র। কিভাবে ফিশন বা বিভাজন হয়ে এ্যাটমের নিউক্লিয়াস ভেঙে বিপুল শক্তি বেরিয়ে যায়। এদিকে ততদিনে বিশ্বব্যাপি হৈচৈ শুরু হয়েছে মার্কিন রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রিগানের ব্যাপকবিধ্বংসী মারণাস্ত্র ‘নিউট্রন বোমা’ নিয়ে। শুনলাম তার আগে আমেরিকা ও রাশিয়া দুই দেশই তৈরী করেছে ‘হাইড্রোজেন বোমা’। আর ‘হাইড্রোজেন বোমা’ নাকি হিরোসিমা-নাগাসাকি ধ্বংসকারী এ্যাটম বোমার চাইতেও শক্তিশালী! কানন কুমার স্যারকে ধরে বসলাম, “হাইড্রোজেন বোমার বিক্রিয়া সূত্র শেখান স্যার।” স্যার শেখালেন যে, দুইটি হাইড্রোজেন এ্যাটম মিলিত হয়ে একটি হিলিয়াম এ্যাটম তৈরী হয়, আর তাতে বিপুল শক্তি লিবারেটেড হয়। দুইটি হাইড্রোজেন এ্যাটম মিলিত হয়ে একটি হিলিয়াম এ্যাটম তৈরী হওয়ার অতি সহজ গণিতটা বুঝলাম। কিন্তু তাতে বিপুল শক্তি লিবারেটেড হওয়ার কারণটা বুঝলাম না। ফিশনে শক্তি বের হওয়ার বিষয়টা জলবত তরলং মনে হয়েছিলো, কারণ আতশ-বাজি ফুটিয়ে নিজেই তো দেখেছি যে ভাঙলে বা ফাটলে আওয়াজ হয়, আগুন হয়, তাপ হয়। কিন্তু দুইটি অবজেক্ট যুক্ত হলে তাপ বা শক্তি উৎপাদিত হবে কেন তা আর বুঝলাম না।

আমার এক ব্যাচ সিনিয়র মুরতবা ভাই ছিলেন যেমন মেধাবী তেমনি দিল দরিয়া মানুষ । বিনা পয়সায় আমাকে পড়াতেন। একদিন তিনি কথায় কথায় আমাকে বললেন, “হাইড্রোজেন বোম সম্পর্কে জানো?” আমি বললাম, “বিক্রিয়াটা জানি, কানন স্যার বুঝিয়েছেন।” মুরতাবা ভাই হেসে বললেন, “আর মাথার উপর সূর্যটা দেখোনা?” আমি বললাম, “দেখি তো!” তিনি বললেন, “ঐ সূর্যটা হলো একটা হাইড্রোজেন বোমা।”
আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম! বললাম, “কি বলেন ভাই? ঐটা একটা হাইড্রোজেন বোমা?” মুরতাবা ভাই বললেন, “জ্বি, দুইটি হাইড্রোজেন এ্যাটম মিলিত হয়ে একটি হিলিয়াম এ্যাটম তৈরী হয় ওখানে। অবিরাম চলছে ঐ প্রোসেস।” আমি বললাম, “এভাবে চলতে থাকলে একদিন সূর্যের সব হাইড্রোজেন শেষ হয়ে হিলিয়াম হয়ে যাবে না?”
মুরতাবা ভাই: তা তো হবেই।
আমি: তারপর সূর্যটা নিভে যাবে? আর আলো দেবে না?
মুরতাবা ভাই: নাহ। আর আলো দেবে কি করে? ফুয়েল তো শেষ!

এবার আমি বুঝলাম, সূর্যটা কেন একদিন নিভে গিয়ে ‘হোয়াইট ডোয়ার্ফ’ হবে। ভাবলাম আকাশে তো লক্ষ তারার মেলা, তারাও সকলে কি একদিন নিভে গিয়ে ‘হোয়াইট ডোয়ার্ফ’ হবে?

(চলবে)

রচনাতারিখ: ১২ই অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ১০টা ৩৯ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

অতীত – লুইস গ্লুক (১৯৪৩)

অতীত
লুইস গ্লুক (১৯৪৩)

আকাশে ছোট্ট আলো ফুটে উঠেছে,
হঠাৎ দুটি সূক্ষ্ম সূঁচ
পাইন শাখার মধ্যে,

তারা প্রসারিত উজ্জ্বল পটভূমিতে
আর তার উপরে
সুউচ্চ, পেলব অম্বর।

বাতাসের সুরভী নাও। এটাই সাদা পাইনের সৌরভ,
এ সুবাস সবচেয়ে তীব্র যখন বাতাস তাদের গা ছুঁয়ে প্রবাহিত হয়।
এবং সৃষ্ট শব্দটি কোন চলচ্চিত্রে শোনানো
বাতাসের নিনাদের মতই অদ্ভুত।

ছায়ারা ইতস্তত চলমান।
রজ্জুরা নির্মান করছে শব্দ।
আপনি যে শব্দটা শুনছেন
তা হবে নাইটিঙ্গেল আর কর্ডাটার শব্দ।
অথবা পুরুষ পাখির প্রণয়প্রার্থী কোন এক স্ত্রী বিহঙ্গের মিনতি!

রজ্জুরা স্থানান্তরিত হয়।
বাতাসে দোল খায় যে ঝুলনশয্যা
তাকে আঁটো করে বাঁধা হয়েছে
দুটি পাইন বৃক্ষের মধ্যে।

বাতাসের সুরভী নাও। এটাই সাদা পাইনের সৌরভ।

আপনি যা শুনছেন তা আমার মায়ের কন্ঠ,
অথবা এটি সেই শব্দ
যা কেবল গাছগুলিই তৈরী করতে পারে।
যখন বাতাস তাদের গা ছুঁয়ে প্রবাহিত হয়।

কারণ, কি শব্দই বা তারা সৃষ্টি করবে
যা কোন কিছুর মধ্য দিয়েই প্রবাহিত হচ্ছে না?

(অনুবাদ – রমিত আজাদ)
তারিখ: ১১ই অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ০৮টা ১৪ মিনিট

(২০২০ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী হয়েছেন মার্কিন কবি লুইস গ্লুক ।
আমি উনার লেখা একটা কবিড়া অনুবাদের সামান্য চেষ্টা করলাম। ভুল হলে মাফ করবেন।)

The Past
Louise Glück – 1943-

Small light in the sky appearing
suddenly between
two pine boughs, their fine needles

now etched onto the radiant surface
and above this
high, feathery heaven—

Smell the air. That is the smell of the white pine,
most intense when the wind blows through it
and the sound it makes equally strange,
like the sound of the wind in a movie—

Shadows moving. The ropes
making the sound they make. What you hear now
will be the sound of the nightingale, Chordata,
the male bird courting the female—

The ropes shift. The hammock
sways in the wind, tied
firmly between two pine trees.

Smell the air. That is the smell of the white pine.

It is my mother’s voice you hear
or is it only the sound the trees make
when the air passes through them

because what sound would it make,
passing through nothing?

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

নিথর কৃষ্ণ বিবরে আমরা

নিথর কৃষ্ণ বিবরে আমরা
——————————–রমিত আজাদ

গ্রহ এক তার আপন তারাকে ঘিরে
অবিরাম ঘুরে চলে অন্তহীন শূন্যতায়?
অনুসূর অপসূরে ফিরে ফিরে দেখে
কেমন তারার জ্বালা!
তারার উমানে নিজেও জ্বলে যে গ্রহ।
জ্বলে জ্বলে তারা জ্বালায় সে গ্রহ,
আলো আর জ্বালা এক সুতে গাঁথা!
নিযুত আলোকবর্ষ দূরে থেকে ভাবে বিজ্ঞান
এ তো শুধু ফোটনের উৎসার!

উল্কারা ছোটাছুটি করে আঁকিবুকি আঁকে
জাগতিক মহাস্থানে।
আকাশের ছায়াপথে নীলাভ জোনাকীর দ্বীপ
গেঁথে চলে আলোকের মালা।

মহাকাশের ক্ষত কতটুকু কে রেখেছে খোঁজ তার?
আঁধারের ক্ষত দেখা যায় না।
শুধু তার মর্মদাহ অদৃশ্য তরঙ্গ হয়ে ছোটে,
তারপর একদিন ধরা পড়ে কোন এক টেলিস্কোপে।

মহাজাগতিক অখন্ড নীরবতা যখন জাগে দুজনার চারপাশে,
তখন আর হিসেব থাকে না সূর্য আর চন্দ্রের ঘুর্ণাবর্তের,
মনে হয় যেন সূর্য, চাঁদ আর মহাকালকে
অকরুণ গিলে খাওয়া

অকরুণ গিলে খাওয়া রাক্ষুসে
এক নিথর কৃষ্ণ বিবরে আমরা দুজন!

রচনাতারিখ: ০৭ই অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: সন্ধ্যা ০৭টা ২৭ মিনিট

We are in a Tranquil Black Hole
————————- Ramit Azad

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

কৃষ্ণবিবরি শতরঞ্চ

কৃষ্ণবিবরি শতরঞ্চ
—————————- রমিত আজাদ

ছলনার চৌষট্টি চতুষ্কে গুটি ছোটে নিরন্তর
কখনো আড়াআড়ি, কখনো সোজাসুজি,
প্রয়োজনে আড়াই চাল লম্ফ হয়!
মুখোমুখী দাঁড়িয়ে যায় অশ্বারোহী।
কে কাকে ঠেলে দেবে অপার প্রান্তরে?

সাদার বিপরীতে কালো,
কালোর বিপরিতে সাদা।
সাদা-কালো বর্গেরা আছে পাশাপাশি।
যেমন বিবশি রাত্রির গা চিরে
ছুটে চলে উজ্জ্বল আলোক রশ্মি।

তবে যদি একবার সে দীপ্তি পতিত হয় গুরুভার কৃষ্ণবিবরে,
আলোকের আর ফেরা হবে না কোনকালেও।
এমনকি কালেরাও দিকভ্রান্ত হয় অলুক্ষণে কৃষ্ণ গহ্বরে!

তাহাদের শতরঞ্চ খেলায়,
আমাদের কেউ কেউ দাবার গুটি হয়ে ছোটে
ছলনার চৌষট্টি চতুষ্কে।
আমাদের কেউ কেউ নীরব পুতুল হয়ে থাকে
ছলনার চৌষট্টি চতুষ্কে।

শিশিরে ঘুমের আবেশ ভাসেনা আর,
অশরীরীরা বিষাক্ত নিশ্বাসে বাতাস করেছে ভারী।
তন্দ্রাতুর নৈশ প্রহরীরা অশরীরীদের দেখা পায়না,
কেবলই জোনাকীর নাচ দেখে গাঢ় নিদ্রার ঘোরে।
খট্টাসের ডাক শুনে চমকে ওঠে মাসুম শিশু।
সাইরেন কোন বাঁশরীর সুর নয় উদাসী রাখালের,
কেবল নিষ্প্রদীপ আঁধারের ভয়ার্ত বার্তা!
হয়তো পূর্বাভাস কোন এক আসন্ন দুর্যোগের।

এভাবে উল্কার প্রজ্বলনে প্রার্থনা করে,
অজস্র তারকারূপী বিগতের আত্মারা।
শৃঙ্খলিত অরন্যতটে ছায়াচ্ছন্ন নিস্তদ্ধতায়
তাহাদের চক্রবৎ আবর্তনে আবিষ্কৃত হয়
অতিগুরুভার নীরন্ধ্র বস্তুসত্তা,

গ্যালাক্সির কেন্দ্রিভূত কৃষ্ণ গহ্বরে!

রচনাতারিখ: ৭ই অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ০১টা ০৪ মিনিট

The Black Hole Chess
———————- Ramit Azad

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

Malarae oru vaarthai pesu (ফুল একটা কথা বলো)

তামিল এই গানটি আমার ভালো লেগেছে।
তবে তার অর্থ উদ্ধার করতে অনেক সাধনা করতে হয়েছে।
যতটুকু পারলাম অনুবাদ করলাম।

পুরুষ কন্ঠে:

ফুল একটা কথা বলো,
এই সুন্দর হাওয়া-র জন্য।
ফুল একটা কথা বলো,
এই সুন্দর হাওয়া-র জন্য।

হাওয়া এসে যখন কর্ণে দংশন করে
তখন আর কিসের নীরবতা?
বায়ু ঝাপটা এসে যদি চুমু খায়
তাতেই তো শেষ হবে নীরবতা।

ভীরুতাই তোমার পরিচ্ছদ,
লাজই তোমার ভূষণ,
নীরবতাই তোমার বেষ্টনী।

নারী কন্ঠ:
যখন দুই জোড়া নয়ন মুখোমুখী হয়,
তখন কি আর মুখের ভাষার কোন প্রয়োজন থাকে?
বাসনা তো লোচনেই ছন্দিত হয়!
প্রিয় প্রিয় প্রিয়

কাউকে বলোনা কিন্তু।

রমিত আজাদ
০৫ই অক্টোবর, ২০২০ সাল
রাত ০১টা ৫৫ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব – ২৭)

নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব – ২৭)
————————————- রমিত আজাদ

স্ট্রিপটিজ নামক নাচটি এখন বেশ জনপ্রিয় হয়েছে মস্কোর নাইটক্লাব ও ডিসকোগুলোতে। কম্যুনিস্ট আমলে ঐ সুযোগ ছিলো না। তবে, একেবারেই যে ছিলো না, তা নয়। বলা যায় বৈধভাবে ছিলো না। অবৈধভাবে লুকিয়ে-চুরিয়ে সব আয়োজনই ছিলো!

স্ট্রিপটিজ বা কাপড় খোলা হচ্ছে মানুষের মধ্যে যৌন-উত্তেজনা জাগানোর জন্য এক প্রকারের আয়োজন যেটাতে একজন সুন্দরী নারী বা একজন সুদর্শন পুরুষ নাচতে নাচতে একে একে তার সব কাপড় খুলে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে যায়। স্ট্রিপটিজের মূল উদ্দেশ্য মানুষের শরীর দেখিয়ে অন্য মানুষকে যৌন-উত্তেজনা দেওয়া, যৌনমিলন করতে দেওয়া নয়। এরূপ কর্মে নিয়োজিত নারী বা পুরুষকে স্ট্রিপার ড্যান্সার বলা হয়। এই ধরনের অনুষ্ঠান বা আয়োজন সাধারণত কোনো বিলাস-বহুল হোটেলে বা স্ট্রিপক্লাবে হয়।

কবে কোথায় এই নাচ প্রথম শুরু হয়েছিলো, এটা সুস্পষ্ট নয়। তবে বেবিলনীয় থেকে শুরু করে রোমান পর্যন্ত সব সভ্যতায়ই যে এই আয়োজন ছিলো তা সুবিদিত। ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো গ্রীক গণতন্ত্রের জনক ও আইনপ্রণেতা সোলন সেই আড়াই হাজার বছর আগে কয়েক শ্রেণীর গণিকা তৈরী করেছিলেন, যাদের মধ্যে পুরুষের মনোরঞ্জনকারী নারী স্ট্রিপার ড্যান্সার-ও ছিলো। পুরুষদের উপস্থিতিতে সিডাক্টিভ নৃত্যানুষ্ঠানে স্ট্রিপ নেচে রূপসী নারীরা মঞ্চ মাতাতো।

কম্যুনিস্ট রেজিম উঠে যাওয়ার পর বড় বেশী লাগামহীন হয়ে গিয়েছে রুশ সমাজ! এটা অনেকটা খাঁচায় বন্দী কাউকে হঠাৎ ছেড়ে দিলে যেমন বেপরোয়া হয়ে ওঠে তেমনটা। এই কয়েকবছর আগেই যেই দেশে নাইটক্লাব-স্ট্রিপক্লাব বলে তেমন কিছু ভাবাই যেত না, সেখানে এখন নগরীর অলিতে-গলিতে ব্যাঙের ছাতার মতন গজিয়ে উঠেছে স্ট্রিপক্লাব, ক্যাসিনো ইত্যাদি। সেই সাথে বেড়েছে সংশ্লিষ্ট অপরাধ।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছিই এরকম দুএকটা স্ট্রিপক্লাব ছিলো। তা ছাত্ররা মাঝেমধ্যে সেখানে যেত। তবে বেশীরভাগ সময়ই ধনীরাই কেবল যেত, যেহেতু পয়সা-কড়ির একটা ব্যাপার আছে!

একবার বাংলাদেশ থেকে মাঝবয়সী একজন ব্যবসায়ী এলেন মস্কোতে। ব্যবসার কাজে ছয়-সাতদিন ছিলেন। তিনি হঠাৎ আমাকে বললেন, “ভাই আপনাদের মস্কোতে স্ট্রিপটিজ শো কোথায় হয়?” আমি উনার দিকে শীতল চোখে তাকালাম। তিনি একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, “বুঝলেন না, এই দেশে কাজেই এসেছি, তবে ফাকে একটু বিনোদনও তো দরকার। এই দেশে আসলাম আর এই দেশী দুই-একটা নগ্নিকাকে না দেখলে কি চলে? আমি অবশ্য যে দেশে যাই, সেই দেশেই স্ট্রিপ বারে ঢুকি।” বুঝলাম, বাংলাদেশীরা দেশের রক্ষণশীল বদ্ধ সমাজে যা যা করতে পারেনা, বিদেশের মাটিতে গিয়ে তাই করতে হন্যে হয়ে ওঠে!

আমার এক প্রবাসী বন্ধু একবার বলেছিলো যে ঢাকাতে সে একটা অত্যাধুনিক ক্যাফে খুলতে চায়। খাবার-দাবার ও অন্যান্য সেবা হবে একেবারে পাশ্চাত্য মানের। তারপর হাসতে হাসতে বলেছিলো, “সেখানে নৈশ অনুষ্ঠানে স্ট্রিপটিজ-এর আয়োজন থাকলে কেমন হয়?”
আমিও কৌতুক করে বলেছিলাম, “হুম, শাড়ী স্ট্রিপিং হলে আরো জমজমাট হবে! চিরকাল তো সবাই পাশ্চাত্য পোষাকের স্ট্রিপিং দেখে অভ্যস্ত!” এবার বন্ধু সব কয়টা দাঁত বের করে হেসে বলেছিলো, “দ্যা আইডিয়া ইজ ব্র্যান্ড-নিউ এ্যান্ড গ্রেইট!”

স্ট্রিপবার একে তো ব্যায়বহুল, তার উপর পরিবেশও ভিন্ন, তাই ছাত্রছাত্রীদের সেখানে খুব একটা যাওয়া হয় না। তবে ছাত্রছাত্রীদের বিনোদনের জন্য রয়েছে ভিন্ন ব্যবস্থা, যার নাম ডিসকোটেকা। সেখানকার মূল আকর্ষণ হলো ‘নাচ’। যারা ওখানে যায় তারা সকলেই নাচে। নানান ধরনের মিউজিকের তালে তালে নাচ। দ্রুত লয়ের নাচগুলোতে সবাই ইন্ডিভুজুয়ালী যে যার মত নাচে। আর ধীর লয়ের নাচগুলোতে নাচ হয় জোড়ায় জোড়ায়। মেয়েরা অপেক্ষা করে, আর ছেলেরা যে কোন মেয়েকে হাত বাড়িয়ে আমন্ত্রণ জানায়, সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে মেয়েটি তাঁর কাধ ও কোমর জড়িয়ে গায়ে গা ঘেষে খুব কাছাকাছি হয়ে ঘুরে ঘুরে ধীর লয়ে নাচে। কেউ কেউ ওখানে যায়ই জোড়া বেধে, মানে বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড একসাথে। তারা আর অন্যদের দিকে তেমন তাকায় না। ধীর লয়ের মিউজিক শুরু হলেই পরস্পরের বাহুলগ্ন হয়ে, এমনকি আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়েই নাচে।

এই ডিসকো নিয়ে আমার দুটি ইন্টারেস্টিং অভিজ্ঞতা রয়েছে। একটা প্রীতিকর, আরেকটা হাস্যকর। একেবারে ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র আমি, কোন এক ডিনারের অনুষ্ঠানের মধ্যে নাচের আয়োজন হয়েছে। তা সেখানে উপস্থিত ছিলো খুবই অল্প বয়স্কা (ষোল কি সতেরো বছর বয়স হবে মেয়েটির) এক রূপসী রুশ তরুণী। একেবারে সদ্য প্রস্ফুটিত গোলাপ! তা ধীর লয়ের গান শুরু হলেই ছেলেরা ছুটছিলো ওকে আমন্ত্রণ জানাতে। কিন্তু কি এক অজ্ঞাত কারণে মেয়েটা কারো আমন্ত্রণই গ্রহণ করছিলো না। যদিও এরকম হয় কম, এখানে সাধারণত সব মেয়েই নাচের আমন্ত্রণে সাড়া দেয়, এটাই কালচার। যাহোক, আমি হঠাৎ ভাবলাম, যাই না মেয়েটার কাছে, অন্যেরা ব্যর্থ হলেও আমি দেখি সফল হই কিনা। দেখি না কতটা সুদর্শন বা এ্যাট্রাকটিভ আমি? সেদিন কালো রঙের একটা স্যুট পড়েছিলাম আমি। অনুষ্ঠানে আসার আগে আয়নার দিকে তাকিয়ে আমার মনে হয়েছিলো, আজ আমাকে দেখতে ভালোই লাগছে! তা একটা ধীর লয়ী গান শুরু হতেই আমি তরুণীটির দিকে এগিয়ে গেলাম, কয়েক সেকেন্ড আগেই ও দুজনকে প্রত্যাখ্যান করেছে। আমি গিয়ে ওর দিকে হাত বাড়ালাম। ও আমার দিকে তাকিয়ে সংকোচে চোখ নামিয়ে ফেললো। তারপর আবার চোখ তুলে তাকালো, আমি ওর মন জয় করা যায় এমন একটি নির্মল হাসি হাসলাম ওর দিকে তাকিয়ে। সেই হাসির মধ্যে কি লেখা সে পড়েছিলো তা আমি জানিনা; তবে এবার মেয়েটিও হাত বাড়িয়ে দিলো আমার দিকে। ওর নরম পেলব হাত ধরে আমি ওকে ডান্স ফ্লোরের দিকে নিয়ে গেলাম। তারপর একটা গানের টাইমলেংথ কত সময় হবে আমি জানি না, হয়তো পাঁচ মিনিট হবে। কিন্তু আমার মনে হয়েছিলো জয় করা কোন এক স্বর্গের অপ্সরার সাথে আমি দীর্ঘ সময় নৃত্যছন্দে দোলায়িত!

আর হাস্যকর অভিজ্ঞতাটি সংক্ষিপ্ত। কোন এক নাচের ফ্লোরে আমি, তাকিয়ে আছি এক রূপসীর দিকে ভাবছি ওকে আমন্ত্রণ জানাবো কোন গানে কখন। ফট করে ইয়া মোটা এক বয়স্কা নারী এসে আমার হাতে একরকম জোর করেই টেনে নিয়ে নাচতে শুরু করলো। আমি ভদ্রতার খাতিরে নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার সাথে নাচতে বাধ্য হয়েছিলাম। অবশ্য পরে ঐ রূপসীরা সাথে নেচে ঐ ক্ষতিটা পুষিয়ে নিয়েছিলাম।

এই ডিসকো নিয়ে আমার একবার কথা হয়েছিলো পানামার তেরসি-র সাথে। তেরসি আনিতার বান্ধবী।
তেরসি: আমি কাল সন্ধ্যায় ডিসকোতে যাবো, তুমি যাবে?
আমি: নাহ।
তেরসি: না, কেন?
আমি: ভাল্লাগে না।
তেরসি: ভালো না লাগার কি আছে? তুমি কি ইয়াং ছেলে নও?
আমি: আনিতা নাই।
তেরসি: আনিতা না থাকলে যাওয়া নিষেধ?
আমি: না, এমন কোন আইন নাই। তবে আমার মন ভালো নেই।
তেরসি: আমার সাথে চলো, মন ভালো হয়ে যাবে।
আমি: ওখানে গেলে তোমার মন কি খুব ভালো হয়ে যায়?
তেরসি: আমি তো রেগুলার ডিসকোতে যাই। ওখানে ছেলেদের সাথে স্পর্শানুভূতি উপভোগ করি।
আমি: মানে?
তেরসি: আরে এরকম তো অনেকেই করে। তুমি আকাশ থেকে পড়লে মনে হয়।
আমি: কি বিষয়?
তেরসি: নাচের ফাকে ছেলেরা আমার ভারী নিতম্ব, উত্তুঙ্গ স্তন ইত্যাদি স্পর্শ করে। আমি আবার ওদের উদ্ধত পুরুষাঙ্গ স্পর্শ করি।
আমি: তাই?
তেরসি: এটা জাস্ট একটা ফান বা এ্যামিউজমেন্ট। অত সিরিয়াস কিছু না।
আমি: তোমার একজন বয়ফ্রেন্ড আছে না?
তেরসি: আছে। কিন্তু ও আমাকে ডিসকোতে যেতে এ্যালাউ করেছে।
আমি: কেন?
তেরসি: ও বয়সে আমার চাইতে অনেক বড়। প্রায় দশ বছরের বড়। ও হয়তো বুঝতে পেরেছে যে আমার এই বয়সে আমার একটু আনন্দ করার প্রয়োজন আছে। অথবা এমনও হতে পারে যে, ও বিষয়টাকে পাত্তাই দেয় না।
আমি: কেন পাত্তা দেয় না? বয়ফ্রেন্ড হিসাবে ওর তো আপত্তি করারই কথা!
তেরসি: তার মানে দুইটা হতে পারে। ও হয়তো বেশ বুঝদার, অথবা ও আমাকে আদৌ ভালোবাসে না।
আমি: ঐ সময়ে কেউ কি তোমাকে প্রস্তাব দেয়?
তেরসি: তা তো দেয়ই। তবে আমি প্রস্তাবে কান দেই না।
আমি: কেন?
তেরসি: আবারো বলছি এটা জাস্ট একটা ফান। আমি নাচের সময় যা করি ঐটুকুই। এর বেশি আমি আগাতে চাই না। আর তাছাড়া সবার সাথে তো আর এরকম করি না।
আমি: কার সাথে করো।
তেরসি: যদি ওদের মধ্যে কোন একটা ছেলেকে পছন্দ হয় তখন। তাছাড়া……
আমি: তাছাড়া কি?
তেরসি: ঐ নাচ আর ছোঁয়াছুয়ি পর্যন্তই; এর বেশি কিছু না। ঐ ছেলের সাথে আমার ঐদিনই প্রথম দেখা, আর ঐদিনই শেষ দেখা।

আমি এই নিয়ে তেরসির সাথে আর কথা বাড়ালাম না। একেক জনের সাইকোলজি এক একরকম। ঐ যে আমার দাদীমা বলতেন, ‘পাগোলের সুখ মনে, আর আর্জিনার সুখ বেতের বনে!’

ক্রেস্তের আড্ডা:

এজাজ: আজ ভাই মেজাজটাই গরম হয়ে গেলো।
আমি: কেন?
এজাজ: এক শালায় ফোন করছে কানাডা থেকে।
আমি: কেন টাকা চায়?
এজাজ: আরে ধুর টাকা! টাকা চাওয়া তো ভালো। শালায় চায় বৌ।
আমি: বুঝলাম না!
এজাজ: শোনেন তাইলে। শালায় কানাডায় থাকে আজ বহু বছর। ওখানেই তার সংসার, বৌ ছেলেমেয়ে। সবসময় বাংলাদেশকে ঠেস দিয়ে কথা বলে। কথায় কথায় বাংলাদেশীদের অমানুষ বলতো। এখন নিজের ছেলের বিয়ের বয়স হইছে, তো বিয়ের জন্য একটা বাংলাদেশী কনে খুঁজতেছে।
আমি: সারা জীবন বাংলাদেশ আর বাংলাদেশীরা খারাপ! আর বিয়ের সময় ভিন্ন কথা?
এজাজ: আমি বললাম, বাংলাদেশীরা তো খারাপ। তা আপনি ছেলের বিয়ের জন্য বাংলাদেশী মেয়ে খুজেন কেন? একটা কানাডিয়ান মেয়ের সাথে বিয়া দিলেই তো পারেন, ওরা তো মহা ভালো!
আমি: তা মশাই কি বলেন?
এজাজ: সরাসরি অস্বীকার করলো। বলে, “না, আমি আবার কবে বাংলাদেশীদের খারাপ বললাম? বাংলাদেশী মেয়েরা তো খুব লক্ষী!”
আমি: আজব তো!
এজাজ: আমি বললাম। তা মেয়ের বিয়ে কোন দেশী ছেলের সাথে দিবেন? তো সেই লোক বলে, “অবশ্যই বাংলাদেশী ছেলের সাথে বিয়ে দেব। বাংলাদেশী ছেলেরা তো খুব সুবোধ হয়। শ্বশুড়-শাশুড়ীকে সম্মান করে। এরকম কি আর বিদেশী ছেলের কাছ থেকে পাবো?”
নাসিম ভাই: এই হলো হিপোক্রেসী! সারা জীবন বাংলাদেশ খারাপ, বাংলাদেশীরা খারাপ, বাঙালী কালচার যাচ্ছেতাই; আর মোক্ষম সময়ে বাংলাদেশীদেরকেই চাই! আমিতো অনেককেই জানি কানাডা-আমেরিকায় সেটল করে বিয়ে করার সময় যায় বাংলাদেশে ।
টিটো: তার আবার আরেক জ্বালা আছে।
এজাজ: কি জ্বালা?
টিটো: অনেক বাঙালী মেয়ের বিয়া হইয়া আমেরিকা যাওয়ার পর পাখনা গজায়। এরপর একদিন দেখা যায় পাখী উড়াল দিছে! তারপর ঐ ব্যাটার বৌ তো যায়ই, সাথে অর্ধেক সম্পত্তিও যায়।
নাসির ভাই: আরো অনেক রকম কারণই আছে ভাই। আমি একটা ঘটনা বলি।
টিটো: বলেন।
নাসির ভাই: আমরা যখন প্রিপারেটরি কোর্সের ছাত্র ছিলাম তখনকার কথা। তা আমাদের সাথে পড়তো একটা ইন্ডিয়ান মেয়ে। বোম্বের মেয়ে, কিন্তু বাঙালী। মেয়েটি এখন আর সেই সময়কার বন্ধুবান্ধব সহপাঠী কারো সাথেই যোগাযোগ করে না।
আমি: কারণ কি?
নাসির ভাই: সেটাই তো বলছি। কারণ হলো, প্রিপারেটরি কোর্সে থাকতে ওর ফ্রেন্ডশীপ হয় আরেক ইন্ডিয়ান সিনিয়রের সাথে। তা মেয়েটা একবার তার প্রেমিকের দ্বারা গর্ভবতী হয়ে পড়েছিলো, তারপর বাধ্য হয়েছিলো গর্ভপাত করতে। তাই পরবর্তি জীবনে মেয়েটি ঐ ফ্রেন্ড সার্কেলের কারো সাথে আর যোগাযোগ রাখেনাই।
আমি: এরকম হওয়ারই কথা। আচ্ছা, যদি কখনো ওর সাথে দেখা হয়, তোমরা ওকে বিষয়টি মনে করিয়ে দিও না, মনে রেখো ওটা ছিলো কাঁচা বয়সের একটা ভুল মাত্র! এই দেশে যাকে বলে ‘যৌবনের ভুল’।
নাসির ভাই: এইসব ভেবেই বোধহয় বাংলাদেশী ইমিগ্রান্টরা বিয়ের সময় বাংলাদেশী ছেলে বা মেয়ে খোঁজে।
টিটো” ইন্ডিয়ার ব্যাপার আলাদা ভাই। বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালী’-তে পড়েছিলাম ব্রাহ্মণ কুলিনদের বহুবিবাহের কথা। কেউ কেউ নাকি শতাধিক বিবাহও করতো!
আমি: শরৎচন্দ্রের কিছু উপন্যাসেও এই কুলিনদের বহুবিবাহের কথা উল্লেখিত হয়েছে।
টিটো: তাহলে মুসলমানদের চার বিয়ে নিয়ে ওদের গা-জ্বালা করে কেন?
আমি: এটা তো ঐ গা-জ্বালাই। আর অজ্ঞতা থেকেও অনেক কিছু হয়। অনেকেই কুলিনদের এই গন্ডায় গন্ডায় বিয়ের রীতির কথা আদৌ জানে না।
নাসির ভাই: এদিকে খ্রীষ্টধর্মে তো বহুবিবাহ নিষিদ্ধ।
আমি: না। বাইবেলে এমন সুস্পষ্ট কিছু লেখা নাই। এমনকি ওল্ড-টেস্টামেন্টে উল্লেখ্য চল্লিশজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তির একইসাথে একাধিক স্ত্রী থাকার কথাই লেখা আছে।
টিটো: তাহলে? এরা একটার বেশী বিয়ে করতে পারে না কেন?
আমি: ওটা চার্চের অনুশাসনে হয়েছে। কোন এক সময়ে চার্চ আদেশ দিয়ে বহুবিবাহ বন্ধ করেছিলো, যতদূর জানি। আর রাশিয়ায় একটা মজার ঘটন আছে এই নিয়ে।
নাসিম ভাই: কি ঘটনা?
আমি: রসায়ন-এর পর্যায় সারণী-টা তো সবাই-ই পড়েছেন। সেটার জনক তো রুশ বিজ্ঞানী ‘দিমিত্রি মেন্ডেলিভ’। তা একবার প্রকাশিত হয়ে গেলো যে মেন্ডেলিভ-এর বৌ দুইজন। তা রাশান অর্থোডক্স চার্চের দৃষ্টিকোন থেকে এটা অপরাধ। বিচার গেলো রাশিয়ার দন্ডমুন্ডের কর্তা জার-এর কাছে। সব শুনে জার বললেন, “মেন্ডেলিভের দুই বৌ থাকতে পারে, কিন্তু আমাদেরতো মাত্র একটাই মেন্ডেলিভ রয়েছে!”
সবাই হেসে উঠলো!
এজাজ: ইনারা বিয়া নাইলে একটা করে, কিন্তু ফ্যাক্ট হইলো, সারা ইউরোপ-আমেরিকায় ঘরে বৌ থাকে একটা, আর বাইরে গার্লফ্রেন্ড থাকে দশটা।
সবাই হো হো করে হাসতে লাগলো!
আমি: রিসেন্টলি রাশিয়ার বিরোধী দলীয় নেতা ভ্লাদিমির ঝিরিনোভ্‌স্কি তো এই ব্যাপারে ডায়রেক্ট-ই বলে বসলেন!
নাসিম ভাই: কি বললো?
আমি: ঝিরিনোভ্‌স্কি বললেন, “দেখেন ভাই রাশিয়াতে বহুবিবাহটা কম্যুনিস্ট-রা নিষিদ্ধ করেছে, কিন্তু ফল কি? আজকে একজন রুশ পুরুষের ঘরে বৌ থাকে একটা, আর বাইরে গার্লফ্রেন্ড থাকে তিনটা। তাদের একজন আবার সিঙ্গল মাদার, আরেকজন গণিকা। সেইদিক থেকে মুসলাম-রা তো ভালো-ই, অনেস্টলি তিন-চারটা পরিবার রাখে।”
সবাই আরেক দফা কোরাসে হাসলো।

আমি: কি ভাই সজল, তুমি তো অনেকদিন পরে আসলা। তা এত চুপচাপ কেন?
সজল: না, চুপচাপ না। আপনাদের আলোচনা শুনতেছি। আমার আবার ঐদিন হইছে একটা ঘটনা।
নাসিম ভাই: কি ঘটনা আবার? বলো শুনি।
সজল: ভাইজান কাছের স্ট্রিপক্লাবে গেছিলাম একবার। বুঝেনই তো ভাই, আমি ছাত্র মানুষ টাকা-পয়সা কিছু নাই। অনেক কষ্টে কিছু টাকা যোগাড় কইরা টিকিট কাইটা ভিতরে ঢুকলাম। চোখ জুড়াইয়া নাচ দেখতাছি হঠাৎ খেয়াল করলাম, টিকিটের টাকাই সব না। রূপসী ডান্সার নাচতে নাচতে বিভিন্ন জনের কাছে যাইতাছে আর টাকা চাইতাছে। ডায়রেক্ট মুখে বইলা চায় না, তবে কোমর দুলাইয়া ভাব-ভঙ্গিতে চায়। তা লোকে দিতাছেও। আমি মনে মনে বলি, আমার কাছে আইসো না সুন্দরী, আমার পাকেট ফাঁকা। তা যেইখানে বাঘের ভয়, সেইখানেই সন্ধ্যা হয়। আমার চেহারা তার কি দেইখা পছন্দ হইলো, বুঝলাম না। ফট কইরা আমার সামনে আইসা নাচ শুরু করছে। এখন আমি করি কি? তারে টাকা কেমনে দেই? তো পকেট থেইকা দশ টাকার একটা নোট বাইর কইরা ভাজটাজ কইরা, মানে ঐটা যে মাত্র দশ টাকার নোট তা জানি বোঝা না যায়, ঐভাবে ভাজ কইরা সুন্দরীর ব্রা-র ফিতার নীচে গুইজা দিলাম। সে খুশী হইয়া নাচতে নাচতে চইলা গেল!

আমরা সবাই মিটিমিটি হাসতে লাগলাম।

টিটো: (সাদা তুষারে ঢাকা বাইরের চত্বরের দিকে তাকিয়ে) নিউ ইয়ার তো ঘনাইয়া আসলো, কি প্লান করলেন? সেলিব্রেট করবেন কিভাবে?
নাসিম ভাই: চলো সবাই মিলে গতবারের মতন রেড স্কয়ারে যাই। ওখানে মজা-টজা করে ডর্মে এসে খানা-পিনা করলাম।
আমি: হ্যাঁ, এটাই ভালো প্রস্তাব। চলেন তাই করি সবাই।
এজাজ: তাইলে চান্দা কালেক্ট করা শুরু করি?
নাসির ভাই: দাবাই (চলেন), শুরু করেন; এই নেন আমি দিলাম এক হাজার রুবল।

হুররা, সকলে একসাথে হাততালি দিলো।

(চলবে)

রচনাতারিখ: ৪ঠা অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: ভোর ৪টা ০১ মিনিট

The Lonely Carnation

——————————— Ramit Azad

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব -২৬)

নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব -২৬)
————————————- রমিত আজাদ

আনিতা নাই, তাই ঘরেও কেউ নাই। এখন ঘরের চাইতে বাইরেই বেশি সময় কাটাই।
ডর্মিটরির সামনেই ছিলো একটি আফগান কাফে। ওদের ওখানে প্রথমবার গিয়েছিলাম একটা অনুষ্ঠানের জন্য খাবার বুকিং দিতে। মস্কোতে আমি কোন অনুষ্ঠান আয়োজনের সুযোগ পেলেই সটান যোগাযোগ করতাম কোন এক বাংলাদেশী রেস্টুরেন্টের সাথে। আমার দর্শন ছিলো আমাদের টাকাটা বাংলাদেশীরাই পাক। তা একবার এক বাংলাদেশী রেস্টুরেন্টে গেলে এমন একটা বিল হাঁকলো যে আমার তো একেবারেই আক্কেল গুরুম। অথচ এই তারাই আগের প্রোগ্রামে সহনীয় বিলেই খাবার সাপ্লাই দিয়েছিলো! বুঝলাম চোখ বড় হয়ে গিয়েছে, নয়তো সুযোগ নিতে চাইছে, ভাবছে হয়তো আমার যাওয়ার আর জায়গা নাই; বাঙালী খাবার কিনতে আর কোথায়ই বা যাবো; তাই ইচ্ছামত দাম হেঁকে বসেছে। আমিও কম বাঘা তেতুল নই; আমি জানি আফগানীদের রন্ধন আমাদের মতনই, বরং আরেকটু টেস্টিই বলা যায়। তাই যোগাযোগ করলাম এই আফগান কাফেটির সাথে। ওরা আমাকে মুখরোচক পরোটা থেকে শুরু করে কাবাব পর্যন্ত খুব মজাদার মজাদার আইটেম খুব সস্তায়ই দিলো। পরে অনুষ্ঠানে ঐ আফগান খাবার খেয়ে বাঙালীরা ধন্য ধন্য করেছিলো! সেই থেকে ওদের সাথে আমার একটা ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

আজ গেলাম সেই আফগান কাফেটিতে। ভিতরে ঢুকে দেখলাম, সেখানে চলছে অর্ধ-উলঙ্গ নাচ। দুটি অতীব রূপসী রাশান তরুণী মধ্যপ্রাচ্যের বেলী ডান্স-এর পোষাক পড়ে নাচছে। সহস্র এক আরব্য রজনীর বইয়ে উন্নত বক্ষ, সরু কটি ও ভারী নিতম্বের অর্ধনগ্নিকাদের হাতে আঁকা যে ছবিগুলি দেখেছিলাম, মনে হলো তাদেরই দুজন বোধহয় আজ মূর্ত হয়ে আবির্ভূত হয়েছে, আর এই ক্যাফের অতিথিদের মনোরঞ্জন করছে। আনার-কলি গাত্রবর্ণ মেয়ে দুটির একজন ছিলো ব্রুনেট মানে কৃষ্ণকেশী আর অপরজন ছিলো ব্লন্ড মানে স্বর্ণকেশী। অনেকেই তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্পর্শ করছিলো, তবে তাতে তাদের মধ্যে কোন ভাবান্তর ছিলো না, বরঞ্চ মুখের হাসিটি ধ্রুবক হয়ে আছে।

আমাকে দেখে, ক্যাফের ম্যানেজার শমশের এগিয়ে এলেন।

শমশের: আস সালামু আলাইকুম।
আমি: ওয়া আলাইকুম সালাম।
শমশের: কেমন আছেন। বসেন।
আমি: আছি ভালো-ই। শোকরান।
শমশের: নাচ দেখুন, ভালো লাগবে।
আমি: হুম। নাচের আয়োজন করেছেন দেখছি। এরকম কি মাঝে মাঝে করেন, নাকি রুটিন আছে?
শমশের: নাহ্‌, কোন রুটিন নাই। তাহলে ঝামেলা হবে। হঠাৎ করেই আয়োজন করি।
আমি: আগে থেকে কোন বিজ্ঞাপন দেন?
শমশের: আরে না না। তাহলে দেখা যাবে যে কাফেতে উটকো লোকজন এসে উপস্থিত। এখন রাশিয়ার আইন-শৃঙ্খলা পদ্ধতির যা অবস্থা, ঝামেলা বেধে যেতে পারে।
আমি: তাহলে লোকে জানবে কি করে?
শমশের: এই যে, এইভাবে জানাই। (উনার হাত দেখালেন)
উনার হাতে কিছু হাতেলেখা লিফলেট দেখলাম। হরফগুলো দেখে, ফারসী ভাষায় লেখা মনে হলো।
শমশের: চলেন আমার রুমে বসে চা খাই।
আমি: চলেন।

ম্যানেজারের রুমটিতে আলো কম। চারটি দেয়ালেই নগ্নিকাদের ছবি টানানো। এখানে সম্ভবত কাফের মালিক তার একান্ত আপন লোকজনদের সাথে সুরা পান করে থাকেন। তাদের সাথে সাকী-রা থাকে কিনা জানিনা, তবে দেয়ালে কিছু সাকীর ছবি টানানো আছে। আমার বহুকাল আগে ঢাকায় দেখা, পানশালা শ্যালের কথা মনে পড়লো। এখন যেখানে পান্থপথ আগে সেখানে একটি চওড়া খাল ছিলো। সেই খালের পাড়েই ছিলো সেই পানশালা। সেখানেও ভিতরে ছিলো হালকা আলো, আর দেয়ালে দেয়ালে নগ্ন তরুণীদের ছবি। ওমার খৈয়ামের রুবাই মনে পড়লো,

‘আমার আজের রাতের খোরাক তোর টুকটুক শিরীন ঠোঁট
গজল শোনাও, শিরাজি দাও, তন্বী সাকি জেগে ওঠ!
লাজ-রাঙা তোর গালের মত দে গোলাপি-রং শরাব,
মনে ব্যথার বিনুনি মোর খোঁপায় যেমন তোর চুনোট।’

আমরা দুজন ম্যানেজারের রুমে বসে চা খেতে খেতে, নাচিয়ে তরুণী দু’টি ম্যানেজারের রুমে প্রবেশ করলো। বুঝলাম এখন বিরতী শুরু হয়েছে। তারা দুজন আমাদের ডিস্টার্ব না করে রুমের অপর প্রান্তে চলে গেলো। পোষাক ঠিক করতে করতে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলো তারা। আমি দূর থেকে কিনলী অবজার্ভ করছিলাম ওদেরকে। নাচের সময় ওদের মুখে যেমন ঝলমলে হাসি দেখেছিলাম, এখন আর তেমন কিছুই নাই। বরং ওদের মুখ যথেষ্ট গোমড়া মনে হলো।

বুঝলাম এই হলো মনোরঞ্জন ও মনোরঞ্জকদের অবস্থা! পেশাগত কারণে কত অভিনয়ই না তাদের করতে হয়। আমরা পর্দার সামনে যা দেখি, আর পর্দার অন্তরালে যা দেখি, এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য বিশাল!
খৈয়ামের আরেকটি রুবাই মনে পড়লো,

‘সুরা দ্রবীভূত চুনি, সোরাহি সে খনি তার,
এই পিয়ালা কায়া যেন, প্রাণ তার এই দ্রাক্ষাসার।
বেলোয়ারির এই পিয়ালা-ভরা তরল হাসির রক্তিমা,
কিংবা ওরা ব্যথায়-ক্ষত হিয়ার যেন রক্তাধার।’


ক্রেস্তের আড্ডা:

আজ আমাদের আড্ডায় আছেন রুপালী আপা। তিনি আমাদের চাইতে বয়সে অনেক বড়। অনেক বছর আগেই পড়ালেখা শেষ করেছেন, তবে দেশে আর ফেরেননি, মস্কোতেই রয়ে গিয়েছেন। অবশ্য তার কারণ আছে, রুপালী আপাটা বিয়ে করেছেন একজন রাশিয়ান-কে। আমাদের আড্ডার মাঝে রুপালী আপার জামাই এসে উপস্থিত। উনাকে দেখে আমরা সমস্বরে চিৎকার করে উঠলাম, “আরে দুলাভাই, ও দুলাভাই।” তিনি আবার খুব রসিক মানুষ! ‘দুলাভাই’ শব্দটার সাথে আজ বহু বছর যাবৎ পরিচিত তিনি। একগাল হেসে আমাদের সাথে বসলেন। বসেই বললেন,

দুলাভাই: আজ কিন্তু ভাই আমিই তোমাদের কফি খাওয়াবো।
টিটো: আরে আপনি হলেন আমাদের দুলাভাই, আপনি শালাশালীদের কফি খাওয়াবেন এতো আমাদের সৌভাগ্য!
রুপালী আপা রিনরিন করে হেসে উঠলেন। রুপালী আপা একদিন আমাদেরকে একান্তে বলেছিলেন যে, কিভাবে উনাদের পরিচয় হয়েছিলো, কিভাবে একদিন একগাদা ফুল নিয়ে এসে উনাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন উনার রুশ বন্ধু।

এজাজ: ভাই আপনারা শুধু শুধু আমাদের দোষ দেন। গতবার গিয়েছিলাম দেশে। তা বন্ধুবান্ধবীদের কাছ থেকে যা শুনলাম, তাতে তো মনে হলো আজকাল দেশের পোলামাইয়ারাও কম যায় না, পুরা ইউরোপীয়ান লাইফই লীড করে!
রুপালী আপা: (মিটিমিটি হেসে বললেন) যা করে করুক। তাতে তোমার অসুবিধা কি?
এজাজ: আমার কোন অসুবিধা নাই। সুবিধা-অসুবিধা ওদের ব্যাপার। আমি বলতে চাই যে, দেশেও দিন পাল্টাইছে।
আমি: রশিদ ভাই আপনি তো ডাক্তার মানুষ। আপনি কি বলেন? “একটা মেয়েকে কত বছর বয়স থেকে কনজুগাল লাইফে থাকতে হয়? এবং একটা ছেলেকে কত বছর বয়স থেকে কনজুগাল লাইফে থাকতে হয়?”
ডাক্তার রশিদ ভাই: ডাক্তারী শাস্ত্রমতে, মেয়েকে সতেরো বছর বয়স থেকে কনজুগাল লাইফে থাকতে হয়। এবং ছেলেকে থাকতে হয় উনিশ বছর বয়স থেকে।
আমি: এবার আপনিই ভেবে দেখেন, এই আধুনিক যুগে কত বছর বয়সে বিয়ে-শাদী দেয়া হয়? পঁচিশ-তিরিশ বছরের আগে কি আদৌ বিয়ে হয়? একদিকে বিয়েশাদী কিছু নাই। আরেকদিকে এতগুলা তরুণ-তরুণী একসাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে বা কলেজে পড়ছে। শরীরের ন্যাচারাল চাহিদাটাকে কতক্ষণ দমন করে রাখা যায়?
ডাক্তার রশিদ ভাই: জ্বী, কঠিন অবশ্যই। শারীরিক চাহিদা যেমন আছে, মানসিক চাহিদাও তো রয়েছে!
আমি: তাহলে আধুনিক ছেলেমেয়েরা এক্সট্রামেরিটাল বা প্রিম্যারিটাল রিলেশনে যাবে না কেন? লীভ-টুগেদার করবে না কেন?
ডাক্তার রশিদ ভাই: ভাববার মত বিষয়ই বটে!
নাসিম ভাই: আপনাদের একটা ঘটনা বলি। এই মস্কো কম্যুনিটির মধ্যেই। ছেলেটা এখানে পড়ালেখা করেছে। তা বোঝেনই তো, এখানে সে রূপসীদের সাথে এদিক-সেদিক ঠিকই করেছে। কিন্তু তার শেষটা ছিলো ভিন্নরকম।
টিটো: কি রকম?
নাসিম ভাই: ছেলেটার দেশে একজন প্রেমিকা ছিলো। মেয়েটাকে সে ভালোই বাসতো। তা পড়ালেখা শেষ করে সে গেলো বাংলাদেশে, তারপর সেই মেয়েকে দিলো সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব।
এজাজ: ইন্টারেস্টিং! তারপর কি হলো?
নাসিম ভাই: মেয়েটাও ছেলেটাকে ভালোবাসতো। সে সাথে সাথেই মেনে নিলো। তারপর গার্জিয়ানরা আর আপত্তি করতে পারলো না। ওদের বিয়ে হয়ে গেলো।
আমি: ওরা কি এখন বাংলাদেশে থাকে?
নাসিম ভাই: আরে নাহ। তাহলে তো আর এই ঘটনা এক্সসেপশনাল হতো না। ওরা এখন মস্কোতেই থাকে। ছেলেটা এখানে চাকুরী করে, কিছুদিন আগে তার বাংলাদেশী বৌকে মস্কোতে নিয়ে এসেছে।
টিটো: কে সেই ভাগ্যবান? নাম বলা যাবে?
নাসিম ভাই: নারে ভাই, নাম বলবো না।
আমি: কেন? নাম বললে চাকরী থাকবে না?
সবাই হো হো করে হেসে দিলো।

নাসির ভাই: কদিন পরেই নিউ ইয়ার। এদিকে শীত তো জমকালো হয়ে নেমে গেল!
টিটো: শীতকালে শীত তো নামবেই!
আমি: (মুচকি হেসে) শীত নামা মানেই কিন্তু দুটা অসুবিধা!
টিটো: কি অসুবিধা?
আমি: এক. নিউ ইয়ারের পরপরই সেমিস্টার পরীক্ষা হবে।
টিটো: আহহারে! একেবারে কষ্টের কথা মনে করাইয়া দিলেন। একমাস আর কোন আড্ডা-ফাড্ডা চলবে না। শুধু পড়া আর পড়া!
এজাজ: আর দ্বিতীয় অসুবিধাটা কি?
আমি: (আবারো মুচকি হেসে) সেটা হলো, তোমরা আগামী ছয়মাস রূপসীদেরকে আর মিনিস্কার্ট বা ঐ জাতীয় পোষাকে বাইরে দেখতে পাবা না!
টিটো: হা হা হা। এক্কেবারে মনের কথা কইছেন!
রুপালী আপা: তোমরা যে শয়তান! তোমাদের অনেকেই সামারে নদীতীরে যাও বিকিনি পড়া মেয়েগুলাকে দেখতে।
টিটো: এইটা কি বলেন আপা? আমরা তো ওখানে যাই সাঁতার কাটতে। এখন ওরা যদি ঐখানে ঐ বেশে আসে, তাহলে কি দোষটা আমাদের?

সবাই আরেক দফা হাসলাম।

————————————————————-

রাতে ডর্মিটরিতে ফেরার আগে ইন্টারনেট কাফেতে ঢুকলাম ই-মেইল চেক করতে। আনিতার কোন ই-মেইল নেই। তাই ওর মেইল চেক করার বিষয়টা নেই। আর আমার আগ্রহও নাই। আমি মোনালিসার ই-মেইল চেক করতে চাই। ওকে আগের মেইলে লিখেছিলাম, ও নিউ ইয়ার সেলিব্রেশন কিভাবে কোথায় করবে ইত্যাদি।
ইমেইলে মোনালিসার উত্তর পেলাম।
“আমি ইংল্যান্ডে একেবারেই নতুন। আমার এখনো একটা কম্পিউটারও নেই। অন্যের কম্পিউটারে বসে তোমার কাছে ই-মেইল পাঠাই । বুঝতেই পারো! গোছাতে তো একটু সময় লাগবে। নিউ-ইয়ার সেলিব্রেশন কি করবো-টরবো এখনো কিছু বুঝতে পারছি না। কিস ইউ এ্যান্ড হাগ ইউ।” – মোনালিসা


বাইরে এখন জাঁকালো শীত পড়েছে। নিউ-ইয়ার আসার আগে আগে মস্কোতে একটা দারুণ শীত পড়ে। কথিত আছে যে, নিউ-ইয়ারের রাতে যদি ভীষণ শীত পড়ে তো নতুন বছরটা খুবই শুভ হবে। মনে হচ্ছে তারই তোরজোড় চলছে। আমি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাগিচার পথ ধরে আমার হোস্টেলের দিকে হাটছিলাম। রাত এখন নয়টার কাছাকাছি। তারপরেও পথে লোক চলাচল কমে আসছে।

আমি রুমের দরজা খুলে ভিতরে ঢোকার সাথে সাথেই আমার পকেটে রাখা মোবাইল-টা বেজে উঠলো। লম্বা রিং হয়েছে, তার মানে বিদেশ থেকে কল এসেছে। মোনালিসাই কি ফোন করলো? নাকি আনিতা ইন্ডিয়া থেকে কল করেছে? তাকিয়ে দেখলাম কল এসেছে বাংলাদেশ থেকে। সুইচ অন করে ফোন কানে ধরতেই আমার মায়ের কন্ঠস্বর শুনলাম। উনার কন্ঠস্বর শুনে মনটা আনন্দে ভরে উঠলো! প্রথমে তিনি আমার খোঁজখবর নিলেন, কেমন আছি, পড়ালেখা কেমন চলছে, ইত্যাদি। তারপর হঠাৎ করেই তিনি প্রশ্ন করে বসলেন, “আচ্ছা, তুই কি বিয়েটিয়ে কিছু করেছিস নাকি?”
আমার বুকটা ধড়াক করে উঠলো! উনি হঠাৎ এই প্রশ্ন করলেন কেন? কেউ কি উনাকে কিছু বলেছে?
আমি: বিয়ে? নাতো! কেন?
আম্মা: এম্নিই জিজ্ঞাসা করলাম।
আমার মোনালিসার প্রস্তাবটার কথা মনে পড়লো। মোনালিসাকে মা ভালো করেই চেনেন। এই বিয়েতে উনার আপত্তি করার কিছুই থাকবে না। তাই ভাবলাম উনাকে একটু হিন্টস দেই।
আমি: না। আমি এখনো কোন বিয়ে করিনি। তবে!
আম্মা: তবে কি?
আমি: বিয়ের ব্যাপারে একটা কিছু বলার আছে।
আম্মা: কি বলার আছে?

আমি: আমি পরে আপনাকে জানাবো।

(চলবে)

রচনাতারিখ: ০৩রা অক্টোবর, ২০২০ সাল
সময়: রাত ০৩টা ০১ মিনিট

The Lonely Carnation – 25
—————————- Ramit Azad

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব -২৫)

নিঃসঙ্গ কার্নেশন (পর্ব -২৫)

————————————- রমিত আজাদ

আনিতাকে এয়ারপোর্টে সি-অফ করে এসেছিলাম অত্যন্ত শীতল অনুভূতিতে। বিশাল বড় শেরমিতোভা এয়ারপোর্টের কাস্টমস চেকিং পার হয়ে আমার দিকে একনজর তাকিয়ে, হতাশা, কষ্ট, নিরাশা ও গোপন দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আনিতা যখন ধীরে ধীরে ইমিগ্রেশন বুথের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো; আমার মধ্যে তখন কোনই তোলপাড় হয়নি। বুকের ভিতর যদি কোন সরোবর থাকে সেখানে কোন ঢেউ ওঠা তো দূরের কথা, সামান্য ফ্লাকচুয়েশনও হয়নি। যার সাথে এতগুলো বছরের দৈহিক অন্তরঙ্গতা, তার বিদায়ে এতটা নির্লিপ্ত থাকাটা থিওরেটিকালি অস্বাভাবিক। তবে পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র হিসাবে আমি জানি, জীবনে থিওরীই সব নয়। পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাস বলে, বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীদের দেয়া থিওরীও ফেইল করেছে। নিউটনের মত মহাজ্ঞানীর প্রদত্ত থিওরীও ল্যাবরেটরি এক্সপেরিমেন্টে গিয়ে ধাক্কা খেয়েছিলো, যা ‘আলট্রাভায়োলেট ক্যাটাসট্রোফ’ নামে বহুল পরিচিত।! দার্শনিক এরিস্টটল বলেছিলেন যে, ‘বিশুদ্ধ চিন্তা থেকে থিওরী তৈরী করা যায়’। আর মুসলিম বিজ্ঞানী আল হাইয়াম বলেছিলেন যে, থিওরী ইজ নট অল, যতক্ষণ না তা পরীক্ষার দ্বারা ইমপিরিকালি প্রমাণিত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ঐ থিওরী স্বীকৃত নয়। হ্যাঁ, প্রাকটিকালটাই চরম সত্য। আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোই এ্যাবসোলুট ট্রুথ। জীবন যদি এমন কোন নতুন ঘটনার সম্মুখীন হয়, যা প্রচলিত থিওরীর সাথে কনফ্লিকটিং; তাহলে বিজ্ঞানের দায়িত্ব হলো ঐ প্রতিভাস ব্যাখ্যার নিমিত্তে নতুন থিওরী নির্মান করা। প্রয়োজনে এই পর্যায়ে বিজ্ঞানের নতুন শাখারও জন্ম হতে পারে। এছাড়াও প্রকৃতি জগতে রয়েছে ‘কূটাভাস’ – মানে হলো আমাদের সাধারণ ধারণায় যা ঘটবে না বলে মনে হয়, বাস্তবে সেটাই ঘটে; বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘প্যারাডক্স’! আনিতার বিদায়ে আমার হৃদয়বৃত্তিক অনুভূতিতে যেটা ঘটেছিলো সেটা নিঃসন্দেহে ‘প্যারাডক্স’!

দুদিন পরে আমার খুব খারাপ লেগেছিলো! আনিতার কথা বারবারই মনে পড়ছিলো। ঘুমানোর ঠিক আগে আগে আনিতার জন্য আমার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেলো। আমার ভীষণ কান্না পেলো। বিছানায় শুয়ে শুয়ে মনে হচ্ছিলো, ‘আমি এত একা কেন?’ এটা কি নৈশক্রীড়ায় কোন শয্যাসঙ্গী নাই বলে এমনটা ঘটছিলো? না, খুব সম্ভবত না। কোনরূপ দুঃখবিলাসও নয়, একেবারে ন্যাচারালিই বুকের গভীর থেকে দুঃখটা উথলে উঠেছিলো! আমার এই আনএক্সপেকটেড অনুভূতিটা দেখে নিজের কাছে নিজেই বিস্মিত হয়েছিলাম!

নিজের বিবাহ নিয়ে আপাতত কিছু ভাবিনা। এই জীবনে কোনদিন বিয়ে করবো না বলেই ঠিক করেছি। একটা প্রশ্ন বা বিষয় আমার মনে শুধুই ঘুরপাক খায়।

যাকে ভালোবাসিনা, তাকে নিয়ে কি ঘর করা যায়? কথা হতে পারে যে, এমন তো লক্ষ লক্ষ ঘর রয়েছে, যেখানে নর-নারী পরস্পরকে ভালো না বেসেই পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। তারা তো ঠিকই ঘর করছে। আপত্তি জানাবো না যে, এমন হচ্ছে না। হতে পারে যে আমাদের পিতামাতারাই সেই ভালোবাসাহীন পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তদুপরী তারা ঘর, সংসার, সন্তান লালন-পালন সবই করেছিলেন। তার পরেও প্রশ্ন থেকে যায়, তারা হয়তো সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্ববোধ থেকেই এইসব করেছিলেন। কিন্তু তাদের মধ্যে হৃদয়ের বন্ধন কতটুকু ছিলো। হৃদয়ের মধ্যে এক নারীকে ধরে রেখে, আরেক নারীর সাথে রাতের পর রাত কাটিয়ে দেয়া যায়; অথবা হৃদয়ের মধ্যে এক পুরুষকে ধরে রেখে, আরেক পুরুষের সাথে দিনের পর দিন কাটিয়ে দেয়া যায়। তারপরেও মন অস্থির করা কোন এক দুর্বল মুহূর্তে ঐ হৃদয়ের মানুষটার জন্য মন কি উন্মনা হয়ে ওঠেনা? সুদীর্ঘ বৈবাহিক জীবনের অভ্যস্ততার পরেও স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঐ একটা দেয়াল বারংবার বাধা সৃষ্টি করে না?

——————————————————-

ক্রেস্তের আড্ডা:

আনিতা দেশে চলে যাওয়ার পর আমার ঘরের প্রতি টান কমে গেছে। তাই ইদানিং একটু বেশী সময়ই ক্যাফেতে বসে থাকি।

ক্রেস্তের কাঁচের প্রদর্শ গবাক্ষ দিয়ে দেখলাম, দূরের মাঠে ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশের প্রিপারেটরি কোর্সের ছাত্রছাত্রীরা টেনিস বল দিয়ে সাতচারা খেলছে। ঐ দেখে আমি খুব কৌতুক অনুভব করলাম। আমি নিজেও প্রিপারেটরি কোর্সে ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীরা মিলে সাতচারা খেলেছিলাম। হা হা হা, পাত্রপাত্রী বদলায়; কিন্তু কাহিনী বদলায় না।

আতিক তার রুশ বান্ধবীকে সাথে নিয়ে ক্যাফেতে ঢুকলো। ইউলিয়া নামের এই মেয়েটি বেশ ফ্রাংক। আমাদের সাথে বসে খোলামেলা আলোচনাই করে। কোন বাঙালী মেয়ের উপস্থিতিতে যে আলোচনা করতে সংকোচ হয়, ওর সামনে সেই আলোচনা অকপটেই করা যায়।

প্রসঙ্গ উঠলো বিল ক্লিন্টনকে নিয়ে। সবাই হাসাহাসি শুরু করলো। এদিকে আয়ুব খান আর জ্যাকুলিন কেনেডিকে নিয়ে এটাওটা কথা প্রচলিত আছে। তবে জ্যাকুলিন যে একা পাকিস্তানে এসেছিলেন, এবং দীর্ঘদেহী সুদর্শন পাঠান আয়ুব তাকে নিয়ে খোলা জীপে চড়ে শহরময় ঘুরে বেড়িয়েছিলেন এটা সর্বজনবিদিত। একজন বললো, আমাদের এরশাদ কাকুও তো কম যেতেন না। তা এইসব লোকদের মেয়েবাজ জেনেও কেন কিছু নারী তাদের সাথে সম্পর্কে লিপ্ত হয়? উত্তরে ইউলিয়া বলেছিলো, “তোমরা পুরুষ মানুষদের অনেকেই জানো না, “বাবনিকি পাখনিয়াৎ সেক্সোম!” (কথাটার মোদ্দা অর্থ হলো, মেয়েবাজ পুরুষদের শরীর থেকে যৌনতার গন্ধ ভেসে আসে, আর যৌনতাপ্রিয় মেয়েরা ঐ গন্ধে ব্যকুল হয়ে ওঠে!)

আতিক: লক্ষ্য করেছেন যে, ঐখানে বাংলাদেশী আর ইন্ডিয়ান ছেলেমেয়ারা মিলে সাতচারা খেলছে?

আমি: হুম, আমি আগেই দেখেছি।

আতিক: ইন্ডিয়ানরাও সাতচারা খেলে?

আমি: হুম খেলে। আমি নিজেই প্রিপারেটরি কোর্সে থাকতে ওদের সাথে মিলে সাতচারা খেলেছি। খেলাটা দুই দেশেই প্রচলিত আছে।

আতিক: ওদের সাথে আমাদের অনেক মিলই আছে। তবে একটা বড় অমিল আছে।

আমি: কি সেই অমিলটা?

আতিক: ভারতীয়রা আমাদের চাইতে বেশী দেশপ্রেমিক।

আমি: (আমি মৃদু ক্ষিপ্ত হয়ে বললাম) বাংলাদেশীদের অনেকেই ভারতীয়দের আমাদের চেয়ে বেশী দেশপ্রেমিক মনে করে।, “এটা একটা অত্যন্ত অবমাননাকর কথা, যা উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাতাসে ভাসিয়ে দেয়া আছে। আমাদের মনোবল ভেঙ্গে দেয়ার জন্য এটা করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আমরাই বেশী দেশপ্রেমিক। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য বাংলাদেশের মানুষ তথা বাঙালীরা যতটা ত্যাগ স্বীকার করেছে, পৃথিবীর ইতিহাসেই তা বিরল!”

আতিক: জ্বী?

আমি: তোমাকে তাহলে সীপাহী বিপ্লবের কথা বলি। বাঙালী সৈনিকদের সৃষ্ট সীপাহী বিপ্লবের দাবানল দিল্লী পর্যন্ত পৌঁছালো। নির্যাতিত সৈনিকদের বিদ্রোহ ততদিনে স্বাধীনতাযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। তখনো জীবিত ছিলেন দিল্লীর মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর। উনার শিশুকালেই উপমহাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলোতে ডানা মেলেছিলো দখলদার দস্যু ইংরেজ শকুন। উনার একজীবনেই তিনি ঐ শকুনদের অশুভ বিস্তৃতি দেখেছিলেন। সাহিত্যের বিশেষ অনুরাগী ও কবি বৃদ্ধ সম্রাটকেই এই স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতা হিসাবে মেনে নিয়েছিলো মুক্তিকামী জনতা। উনার নেতৃত্বে ভারতীয় জনগনের স্বাধীনতার পুনরুদ্ধারের চেষ্টা সফলতার মুখ দেখতে সফল হতে হতে ব্যার্থ হয়। সে এক করুণ ইতিহাস, তবে তার পিছনের কারণ ছিলো কিছু ভারতীয় ব্রহ্মণ্যবাদীদের বেঈমানি। মোহন লাল গোবিন্দ দাস, আগারজানদের বিশ্বাস ঘাতকতা; ভারতীয় ব্রাহ্মণ রাজন্যবর্গের অসহযোগীতা সর্ব ভারতীয় স্বাধীনতার প্রচেষ্টাকে সফল হতে দেয়নি। মুক্তিকামী দেশপ্রেমিক বাহাদুর শাহ জাফর নিজের অনেক কিছু বিক্রি করে বিপ্লবী সৈনিকদের ৬ মাসের অগ্রিম বেতন দিলেন। যখন আর পেরে উঠলেন না, তখন

মুক্তিসংগ্রামের অধিনায়ক মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ ভিক্ষুকের মত ধনী ব্যবসাদার রামজীমলকে বললেন “আমি আপনার কাছে অর্থ ঋণ হিসাবে চাচ্ছি, কর হিসাবে নয়”। কিন্তু রামজীমল ঋণ দিতেও অস্বীকার করল। অথচ আগ্রার ধনী- ঠিকাদার জ্যোতিপ্রসাদ ইংরেজদের ত্রিশ হাজার টাকা যুদ্ধকালীন তহবিলে সাহায্য করে। এ দিকে হঠাৎ বাজার থেকে রসদ ও বারুদ উধাও হয়ে গেল, যামিনী দাসের মত অর্থলোভীরা গড়ে তুলল আটার মজুদ। বারুদ লুকিয়ে সংকট সৃষ্টি করল দেবীলাল। ঐ বারুদ দিয়ে সে ইংরেজদের সহযোগিতা করল ফলে যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তন হয়ে গেল। দিল্লী দখলের পর ইংরেজরা নগরীর প্রতিটি রাজপথে রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছিলো; দোষী-নির্দোষ কাউকেই তারা ছেড়ে কথা বলেনি, দিল্লীর পথেঘাটে আনাচে-কানাচে যাকেই পেয়েছে বিনা বাক্য ব্যায়েই তাকে হত্যা করেছে।

টিটো: আপনি এইসব তথ্য কোথায় পেলেন?

আমি: সূত্র: ভারতবর্ষের ইতিহাস-কোকা আন্তোনভা। তিনি রুশ ইতিহাসবিদ। বইটা মস্কো থেকেই প্রকাশিত হয়েছে। বইটার বাংলা অনুবাদও রয়েছে। অনুবাদক: মঙ্গলাচরণ চট্রোপাধ্যায়

নাসিম ভাই: রিয়েলী স্যাড। এতটাই নিষ্ঠুর ছিলো এই ইংরেজরা!

আমি:  এডওয়ার্ড সাইদ-এর সেই বিখ্যাত উক্তিটি মনে পড়ে, ‘পাশ্চাত্য কেবলই মানুষ মানুষ করে, আর বাস্তবে পৃথিবীর এখানে-সেখানে, অলিতে-গলিতে আনাচে-কানাচে যেখানেই মানুষ পায় প্রথম সুযোগেই তাকে হত্যা করে।’

নাসিম ভাই: রুশরা তো সব সাবজেক্টেই পন্ডিত। ইতিহাসও ভালোই লেখে। তাছাড়া, ভারতবর্ষের ইতিহাসের উপর রুশদের লেখা ইতিহাস বই-ই অধিক গ্রহনযোগ্য। কারণ ইংরেজরা তো তাদের স্বার্থে আমাদের বিরুদ্ধে হাবিজাবিই লিখবে!

আমি: শুধু তাই না। তারা কিছু দেশীয় অনুগতদের দ্বারাও ফরমাশি ইতিহাস লিখিয়েছিলো, আর পুরো দুশো বছর ঐসব আবর্জনা আমাদের গিলিয়েছিলো। যার অনেক কিছু এখনো প্রচলিত আছে।

টিটো: রুশীরা সাহিত্যেও তো দুর্দান্ত!

আমি: হ্যাঁ। প্রাক সোভিয়েত রুশ লেখকদের লেখা তুলনাহীন, তারা সবাই-ই রোমান্টিকতা নিয়ে লিখেছিলেন। ফরাসী, ইংরেজ ও মার্কিনী সাহিত্যিকরাও শক্তিশালী রোমান্টিক সাহিত্য রচনা করেছেন।

নাসির ভাই: সোভিয়েত আমলের সাহিত্য কেমন ছিলো?

আমি: অন্যান্য দেশের তুলনায় ভালো। সাহিত্যে অনেকগুলো নোবেল পুরষ্কারও সোভিয়েত রুশীদের আছে। তবে তারপরেও, সোভিয়েত আমলের সাহিত্য তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিলো।

টিটো: কেন দুর্বল ছিলো?

আমি: এটা সম্ভবত বাক-স্বাধীনতাহীনতার কারণে হয়েছিলো। বাক-স্বাধীনতার অভাব থাকলে খোলামেলা আর কিছু লেখা যায় না। প্রকৃত সত্য তুলে ধরা যায় না। আর একপেশে লেখা খোঁড়া তো হবেই।

এজাজ: সাহিত্যে যৌনতা কি ভেজাল না প্রয়োজনীয় উপাদান?

আমি: হা হা হা। এই নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই। আমি কৈশোরের শেষ দিকে সাহিত্যের যৌনতাগুলো মজা পাওয়ার বা সুরসুরি পাওয়ার জন্যই পড়তাম। তখনই লুকিয়ে লুকিয়ে পড়েছিলাম ………..।

এজাজ: কি ‘মাসুদ রানা?’

আমি: দুরো ব্যাটা! ‘মাসুদ রানা’ তো নস্যি! আমি পড়েছিলাম নাবোকভের ‘লোলিতা’, আরও পড়েছিলাম হেনরি মিলারের ‘কর্কট ক্রান্তি’, ইত্যাদি।

নাসির ভাই: পড়ে কি বুঝলেন?

আমি: আরে ঐ বয়সে বোঝাবুঝির কিছু ছিলো না। বললাম, জাস্ট মজা পাওয়ার জন্য পড়তাম। তবে ইউরোপে এসে এখন তো চোখের সামনেই ‘লোলিতা’ বা ”কর্কট ক্রান্তি’-র কাহিনী দেখছি। আসলে ঐ লেখকরা খুব সাহসী ছিলেন। তারা অকপটে তাদের সমাজের লুক্কায়িত সত্যগুলোকে তুলে ধরেছিলেন।

নাসিম ভাই: হুম ভুল কিছু বলেন নাই।

আমি: তারপর আমার বয়স আঠারো প্লাস হওয়ার পর, আমার বড়বোনই আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন ইয়া মোটা বিশাল বড় এক বই, ওজন কয়েক কেজি হবে। নাম তার ‘সহস্র এক আরব্য রজনীর গল্প’। বইটার পাতায় পাতায় গল্পের পাশাপাশি ছিলো যৌন-উত্তেজক সব হাতে আঁকা ছবি। ছবিগুলো সাদাকালো ও রঙিন দুই ফর্মেই ছিলো। আর গল্পগুলি সবই তো ছিলো যৌনতায় ভরপুর।

টিটো: তাহলে এই দাঁড়ালো যে, সেই অতীতকাল থেকেই সাহিত্যে যৌনতা রয়েছে অন্যতম উপাদান হিসাবে?

আমি: সেরকমই তো মনে হয়। পরবর্তিকালীন লেখকরাও যৌনতাকে বাদ দিয়ে কিছু লেখেননি। যেমন, কয়েকদিন আগে একজন মুরুব্বী বললেন যে তিনি একটা বই অনুবাদ করতে গিয়ে ধাক্কা খেয়েছেন। সেটা হলো জোনাথন সুইফট-এর উপন্যাস। উপন্যাসে কিছু কিছু বর্ণনা একেবারেই পর্ণোগ্রাফি!

আমরা আলাপ করতে করতে ক্যাফেতে ঢুকলেন হিমেল ভাই। হাতে একটা বাংলা জার্নাল, বাংলাদেশী কোন সিনে পত্রিকা হবে হয়তো। এসে সটান আমার পাশের চেয়ারটায় বসে পড়লেন। ফট করে হাতের পত্রিকাটা খুলে বললেন,

হিমেল ভাই: দেখোতো ছবিতে কি সুন্দর সুন্দর বাংলাদেশী মেয়ে। স্তন, নিতম্ব, ফিগার, সবই কত সুন্দর!

আমি: (কৌতুক করে বললাম) ভালো-ই তো দেখেন বসে বসে পত্রিকার পাতায় বাঙালী মেয়েদের সৌন্দর্য!

হিমেল ভাই: হ্যাঁ সৌন্দর্য! ঐ পত্রিকার পাতায়ই! এদিকে বিয়ে করতে গেলে আর কোন সুন্দর মেয়ে পাওয়া যায় না!

সবাই শব্দ করে হেসে উঠলো!

টিটো: দেশে গিয়া ট্রাই দিছিলেন নাকি?

হিমেল ভাই: শুনো মিঞারা। তোমাদের একটা কথা কই। তোমরাও লক্ষ্য করছো জিনিসটা। এই যে মস্কো বা বিদেশে থাকা বাঙালী ছেলেগুলা, একশোটা বিদেশী মেয়ের সাথে শুইয়াও তৃপ্তি পায় না, যতক্ষণ না একটা বাঙালী মেয়ের সাথে শুইছে!

উনার কথাটা শুনে কেউ কোন কথা না বলে মিটিমিটি হাসতে লাগলো। কারণ সবাই-ই জানে হিমেল ভাই কথা বলছেন একশো পার্সেন্ট খাঁটি।

এটা একটা আশ্চর্য সাইকোলজিও বটে! একটা বাঙালী ছেলে ইউরোপের ওপেননেস-এর সুযোগ নিয়ে অনেক বিদেশীনীর সাথেই দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করে, অথচ কোন বাঙালী মেয়ের সাথে ওটা না হলে সে অতৃপ্তই থেকে যায়। কোন বাঙালী মেয়ের সাথে ঐ সম্পর্কটা কেমন হবে এটা জানা-বোঝার জন্য তার মন থাকে ব্যাকুল!

একটু পরে রিংকু ভাই আসলেন। তিনি মূল লেখাপড়া করেছেন দেশের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে। শোনা যায় সেখানে তিনি বামপন্থী রাজনীতি-ফাজনীতিও নাকি করেছেন। অন্ততপক্ষে তিনি সেরকমই প্রচার করেন। মস্কোতে এসেছেন কেবল পিএইচডি করতে। উনাদের মত লোকদের নিয়ে একটা কমোন প্রবলেম হলো, উনারা একেতো লেখাপড়ায় দুর্বল থাকেন, তার উপর রুশ ভাষায় একেবারেই কাঁচা থাকেন।  রাশিয়া দেশটাকেও তারা জানতে পারেন কম। তাই পড়ালেখা করতে গিয়ে বারবার হোচট খান। উনাদের সুপারভাইজার দয়াশীল না হলে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই তাদেরকে ডিগ্রীবিহীন খালি হাতেই দেশে ফিরতে হয়।

রিংকু ভাই: এই বিল্ডিংয়েই ক্লাস ছিলো। ফিলোসফির ক্লাস হলো। ভাষাগত কারণে কিছুই বুঝলাম না; বুঝলাম শুধু দুইটা ওয়ার্ড প্লেটো আর এরিস্টটল। (তারপর হতাশার সাথে বললেন) উপরওয়ালা জানেন, আমার পিএইচডি করা আদৌ হবে কিনা!

আমি: (কৌতুক করে বললাম) আরে আপনি হলেন বামপন্থী রাজনীতিবিদ। এই দেশ তো আপনাদের জন্যই।

রিংকুভাই: আরে রাখেন ভাই বামপন্থী রাজনীতি। ঐসব কবে তলাইয়া গেছে। এখন এই দেশেও আর কম্যুনিজম নাই, আর বাংলাদেশের বামপন্থী-রাও ধান্দাবাজ হইয়া গেছে। আমি যে স্কলারশীপটা পাইছি এইটাই আমার রাজনীতির একমাত্র প্রাপ্তি।

আমি: মানে কি?

রিংকু ভাই: আরে এতগুলা বছর যে এদের দালালী করলাম, তার একটা পুরষ্কার হিসাবে রুশীরা আমাকে এই স্কলারশীপটা দিয়েছে আরকি!

একটা দারুন ফিগারের এশিয়ান-রুশ তরুণী বেশ হট ড্রেসে আমাদের পাশ দিয়ে হেটে গেলো।  অনেকেই আড়চোখে ঐ দিকে তাকালো। এটা একটা নর্মাল ম্যাসকুলিন রিএ্যাকশন। আর হটড্রেসে যেরকম টাইট মিনি-স্কার্ট তারা পড়ে, যে চলার পথে তাদের নিতম্বের দিকে না তাকিয়ে পারা যায় না।

আমি: টিটো, আড়চোখে কি দেখলেন?

টিটো: (লজ্জ্বা পেয়ে) না মানে, ঐ আর কি! বড় ভাই, কবি হতে গেলে, একটু আড় চোখে তাকানো লাগে।

আমি: টিটো কি ইদানিং কবিতা লিখতে শুরু করেছেন নাকি?

টিটো: না। এখনো শুরু করিনি। তবে প্লান আছে। তাই প্রথম ধাপ হিসাবে আড় চোখে তাকানো শুরু করেছি।

আমরা আলাপ করতে কারতে এক আফ্রিকান এসে আমাদের সাথে বসলো। আমি প্রশ্ন করলাম, “তোমার নাম কি ভাই?” উত্তরে সে আমাকে বললো, “কালু।” আমি একটা থতমত খেলাম! মস্কোতে আমরা বাংলাদেশীরা আফ্রিকানদেরকে ‘কালু’ ফান নেইমে ডাকি। এখন ব্যাটা বলছে যে, ওর নামই ‘কালু’! আমি নিশ্চিত হওয়ার জন্য দ্বিতীয় দফা প্রশ্ন করলাম, “ভাই তোমার পুরো নাম কি?” সে উত্তর দিলো, “এজি কালু ইমো।” এবার নিশ্চিত হলাম ওর নাম আসলেই ‘কালু’। ক্যাফেতে বসা বাকী বাংলাদেশীরা মিটিমিটি হাসতে লাগলো।

————————————————–

ইন্টারনেটে ঢুকলাম, ই-মেইল চেক করার জন্য। এই ই-মেইলের কল্যাণে এখন স্কুল জীবনের বন্ধু-বান্ধবের সাথে রেগুলার যোগাযোগ হচ্ছে। ঐ যে গান আছে,

‘হায় মাঝে হলো ছাড়াছাড়ি,

গেলেম কে কোথায়!

আবার দেখা যদি হলো সখা,

প্রাণের মাঝে আয়!’

সত্যিই ই-মেইলের কল্যাণে আবার তাদেরকে প্রাণের মাঝে নিয়ে আসতে পারছি। বন্ধুবান্ধবরা যেহেতু আমার বয়সীই তাই বেশীরভাগই অবিবাহিত (দুইএকজন আর্মীর বন্ধুবান্ধব ব্যাতীত), তাই ই-মেইলে নারীপ্রসঙ্গ ও আদিরসাত্মক গল্পগুজবও হয়।

একজন বন্ধু লিখেছেন যে, ‘তোমাদের কারো যদি চাইনিজ মেয়ে পছন্দ হয় তো ঢাকাতে আমার অফিসেই চারজন চিংকি আছে।’ সাথে সাথে অনেকেই উৎসাহিত হয়ে লিখেছে যে, তারা আগামীকালই ঐ অফিস ভিজিট করতে যাবে।

যাহোক, আমি খুঁজলাম মোনালিসা কোন ই-মেইল পাঠিয়েছে কিনা। হ্যাঁ, পাঠিয়েছে।

তবে তেমন কিছু সেখানে নেই। ওর ইংল্যান্ডে গোছানো শুরু করছে, এই জাতীয় মামুলি ইনফর্মেশন। তবে ই-মেইলের শেষে লেখা ছিলো, ‘কিস ইউ, এ্যান্ড হাগ ইউ’।

ফ্যাকাল্টিতে লেনার সাথে দেখা হলো।

কফি খেতে খেতে ওর সাথে গণিতের দুই-একটা টপিক নিয়ে আলোচনা করছিলাম। ওর গাণিতজ্ঞান খুব ভালো। অবশ্য এমনটিই হওয়ার কথা। গণিতজ্ঞান না থাকলে তো আর ফিজিক্সে পিএইচডি করার চান্স পেতো না। এদিকে আনিতা সায়েন্সের স্পেশালিস্ট হলেও ওর গণিতজ্ঞান কম। আমার কাছে মনে হয় যে, যে মেয়ের গণিতজ্ঞান ও সাহিত্যজ্ঞান নাই, এমন মেয়েকে বিয়ে করা উচিৎ না।

আমার এই কথাটা বোধহয় খুব চাঁচাছোলা হয়ে গেলো। আমি মনে করি গণিত যেহেতু লজিক শেখায়, তাই যার গণিতজ্ঞান আছে সে লজিকালি চিন্তাভাবনা করতে পারে। আর যার সেই জ্ঞান নাই তার চিন্তাভাবনা লজিকাল হয় না। এটা একটা সমস্যাই বটে। ঐ যে কে যেন বলেছিলো, ‘মেয়েরা লজিক বোঝে না, তাই তারা ডিবেট করতে পারে না। শেষ পর্যন্ত তারা কেঁদে জিততে চায়।’

কফি খাওয়া শেষ করে বললাম,

আমি: লেনা, তুমি এখন কি করবে?

লেনা: বাসায় চলে যাবো।

আমি: আমিও ডরমিটরিতে যাবো। চলো তাহলে একসাথে নীচে নামি।

লেনা: চলো।

এখানকার বিল্ডিংগুলোতে সেন্ট্রাল হিটিং সিস্টেম থাকে, তাই বিল্ডিং-এর ভিতরে বসে বাইরের তাপমাত্রা তেমন বোঝা যায় না। বিল্ডিং থেকে বের হওয়ার পর অনুভব করলাম, বাইরে তাপমাত্রা কম। লেনা বললো, “ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে”।

লেনা হাটু পর্যন্ত স্কার্টের নিচে লেগিস পড়া ছিলো। আমি বললাম, “তোমার তো লেগিস পড়া আছো তাহলে তো আর ঠান্ডা লাগার কথা না। ওয়ার্ম নিশ্চয়ই?”

লেনা: কিসের উষ্ণতা। লেগিস একটা স্ট্রেচি পোষাক, পড়ার পর আরো প্রসারিত হয়, তারপর ওর মধ্যে দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢোকে। আমার পায়ে এখন ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে।

আমি এই ব্যাপারে আর কোন কথা না বাড়িয়ে চুপ করে রইলাম। ওর মিনিস্কার্টের নীচে লেগিস কিভাবে পড়া, পড়ার পর তা প্রসারিত হয়ে কি রুপ ধারণ করে, কেনই বা ঠান্ডা বাতাস তার মধ্যে দিয়ে ঢুকে, এই নিয়ে আলাপ করাটা বোধহয় শালীন হবে না।

আমি: তুমি নিউ ইয়ার কোথায় করবে?

লেনা: কেন?

আমি: আমার সাথে নিউ ইয়ার করতে পারো। (এবার প্রস্তাবটা কনফিডেন্টলি দিলাম। কারণ এখন আনিতা আর মস্কোতে নাই)

মনে হলো লেনা কিছুটা বিরক্ত হলো। আমি এই প্রথম ওকে বিরক্ত হতে দেখলাম।

লেনা: (বেশ বিরক্তির সাথে) আমি অলরেডী, বন্ধুদের কথা দিয়ে ফেলেছি। ওদের সাথেই নিউ ইয়ার পালন করবো।

ওর কথার মধ্যে একটা ঠেস ছিলো। যার মানে হলো। ‘আগেতো তোমাকে কতবার ইনডায়েরক্টলি বোঝানোর চেষ্টা করেছি যে, তোমার সাথে আমি নিউ ইয়ার পালন করতে চাই; তা তখন তো এড়িয়ে গেলে; আর এখন দ্বারপ্রান্তে এসে প্রস্তাব দিচ্ছো! এদিকে আমার তো বন্ধুদেরকে কথা দেয়া হয়ে গিয়েছে।

—————————————————————————————–

(চলবে)

রচনাতারিখ: ২রা  অক্টোবর, ২০২০ সাল

সময়: রাত ১২টা ৫২ মিনিট

Categories
অনলাইন প্রকাশনা

নিখাদ কৈশোরি প্রেম

নিখাদ কৈশোরি প্রেম
—————————- রমিত আজাদ

শ্রেষ্ঠতর ঔষধি
পাওয়া যাবে হয়তো
কৈশোরের ঔষধালয়ে,
যখন প্রেম ছিলো নিখাদ।

যখন
হিসেববিহীন এক আত্মিক সম্পর্কে
বাধা পড়া দুটি মন,
উড়ে যেতে চাইতো মেঘেদের দেশে।

বাতাসে ভেসে যাওয়া দুটি প্রজাপতি
শুধুই ফুলে ফুলে খুঁজে নিতো সুখ,
বসন্তের বিশুদ্ধ উত্তাপে।

আজও বাতাসে নাসিকা ডোবালে
পাওয়া যায় সেই নির্মল প্রেমের সুবাস।

———— রমিত আজাদ
২৯সে সেপ্টেম্বর, ২০২০ সাল
সময়: সকাল ১০টা ১৮ মিনিট
(ফেইসবুকে প্রথম প্রকাশিত)