Categories
অনলাইন প্রকাশনা কবিতা বিনোদন ভালবাসা/প্রণয়লীলা সৃজনশীল প্রকাশনা

আমি একবার দুঃখ ভুলে বসন্তের ফুল পেতে চাই

আমি একবার দুঃখ ভুলে বসন্তের ফুল পেতে চাই
——————- ডঃ রমিত আজাদ

কাল ছিল শীতের শেষ রাত,
আলোহারা রজনীর নিঝুম নিস্তদ্ধতা,
আজ বসন্তের প্রথম দিন,
ফুলের সৌরভের মাতামাতি, কোকিলের গান।
সৌভাগ্যক্রমে এটিই তোমার জন্মদিন।

কেমন আছ তুমি?
খুব জানতে ইচ্ছা করে আমার।
তুমি কি সুখে আছ?
নাকি আমার মতোই কষ্টে কাটে দিন?
নিঃসঙ্গতায় ভোগো?
না, বোধহয়, তোমার তো স্বামী রয়েছে।
অবশ্য আমারও রয়েছে স্ত্রী,
তারপরেও কিন্তু আমি নিঃসঙ্গতায় ভুগী,
কি অদ্ভুত তাইনা?
সঙ্গ আছে তবু নিঃসঙ্গ
আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, তুমিও কি
সঙ্গ থেকেও নিঃসঙ্গ?

আমার অংশিদার যেদিন আমাকে ঠকিয়ে ব্যবসা নিয়ে গেল,
অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম,
আমার বাবার উপহার একমাত্র জমিটি যেদিন দখল করে নিল,
অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম,
টাকার জন্য যেদিন আপন ভাই দুর্ব্যবহার করলো,
অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম,
কিন্তু তোমাকে যেদিন হারালাম,
সেদিনের মত কষ্ট আর কোনদিনও পাইনি,
ঐসব টাকা-পয়সা, জমি-জমার দুঃখ কবেই ভুলে গিয়েছি।
কিন্ত তোমার সাথে বিচ্ছেদের কষ্ট,
এখনও ক্ষত হয়ে জ্বলছে,
ভালোবাসা যে এত দুঃখ, কষ্ট, জ্বালা আর যন্ত্রণা
দিতে পারে তা কে জানত!

তোমাকে ভালোবেসে,
পৃথিবীর সব কিছুই আমার কাছে
মেঘের মত রঙিন মনে হতো।
মনে হতো পৃথিবীতে কষ্ট বলে কিছু নেই,
সিদ্ধার্থ মিছেই বলেছেন, ‘জগৎ দুঃখময়!’
জগৎ সুন্দর, সুন্দর, অদ্ভুত সুন্দর,
আমার পাশের রমণীটির মতই সুন্দর!
আর এখন, আমার চারপাশে শুধুই যন্ত্রণা,
সিদ্ধার্থ যথার্থই বলেছেন, ‘জীবন মানেই দুঃখ!’

গতরাত ছিল শীতের শেষ রাত,
আমার অতৃপ্ত মনের প্রতীক,
আজ বসন্তের প্রথম দিন,
হাজার হাজার ফুলে ফুটে আছে তোমার ভালোবাসা ।
তোমার মধুর জন্মদিনে,
আমি একবার দুঃখ ভুলে বসন্তের ফুল পেতে চাই।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা কবিতা বিনোদন ভালবাসা/প্রণয়লীলা সৃজনশীল প্রকাশনা

একরাশ ভালোবাসার কবিতা

অনিয়মের ভালো লাগা
ডঃ রমিত আজাদ

তোমাকে আমার ভালো লেগেছে,
কিন্তু কি করে বলি বলতো?
আর তুমিই বা কিভাবে নেবে?
আমার কি আর সে বয়স এখন আছে?
যৌবন পেরিয়ে চলে এসেছি অনেকটা দূর,
আর তোমার তো মাত্র শুরু,
তদুপরি আমার পাশে রয়েছে ভিন্ন এক রমণী।

যদি আমি সাহস করে বলেই ফেলি,
যদি তুমি ফুঁসে ওঠো,
যদি এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে শহরময়,
আমি কি ধিক্কৃত হব না?
তোমাকে কেমন করে বোঝাই,
আমার বুক জুড়ে চলছে,
উত্তপ্ত আগ্নেয় লাভার তীব্র তোলপাড়।

তোমার ঘুরে দাঁড়ানোর ছন্দময় স্নিগ্ধতা,
আমার অতৃপ্ত আত্মার মরুময়তা,
বিন্দু বিন্দু করে জমা হওয়া নিস্পেষণ ,
আমার আবেগের আল্পনায় স্নিগ্ধ অনুরণন,
তোমার মমতা খেলে আমার কবিতা হয়ে,
এই গুমোট নগরীর জমাট আঁধার কেটে দিয়ে,

ঐ যে শুনেছিলাম ভালোবাসার কোন বয়স নেই,
তখন বুঝিনি, আর এখন বুঝতে পারছি বেশ,
আমার না বলা কথা ভবঘুরের মত ঘোরে,
নীরব বিবেকের অলিগলিতে,
নিয়ম মেনে চলাই যেখানে রীতি,
সেখানে অনিয়ম চলেনা,
আমি তো নিতে পারব না, জন্ম নতুন এক।
তাই আর হয়না বলা,
কেবল স্বগতোক্তির মত নিজের কথা নিজেকেই বলি,
সেকথা তোমাকে বলা হবে না হয়ত কোনদিনও,
কিণ্তু তোমাকে আমার সত্যিই ভালো লেগেছে।

আজ তাকে শাড়ীতে দেখেছি
—————————ডঃ রমিত আজাদ

মেয়েটিকে প্রায়ই দেখি,
অসম্ভব সুন্দর, নিস্পাপ একটি মুখ,
বৃষ্টির পরে সবুজ সতেজ ঘাস যেমন,
কখনো তুলনা করি বন ছেয়ে যাওয়া পিংক কাসিয়ার সাথে,
ঐ সৌন্দর্য থেকে চোখ সরানো যায়না।
তার অনুপস্থিতি আমার মাঝে শূণ্যতার সৃষ্টি করে।
আবার কখনো কখনো তাকে দেখি,
অনেক মানুষের ভীড়ে হঠাৎ হঠাৎ দেখা দেয়,
অনেকটা দক্ষিণা হাওয়ার দিনে,
গাছের পাতা আর সুর্যের আলোর লুকোচুরির মত
আর আমার চোখ ফিরে ফিরে আসে নতুন মুগ্ধতা নিয়ে।

ব্যাতিক্রম কেবল তার পোশাক,
আধুনিক যুগে সব মেয়ে আর অস্টপ্রহর বাঙালী পোশাক পড়েনা,
সালোয়ার-কামিসের পাশাপাশি
প্যান্ট-শার্ট, স্কার্ট-টপস চলছে বেশ,
একসময় এগুলো ছিল নিতান্তই অপ্রচলিত,
ইন্টারনেট আর আকাশ সংস্কৃতির যুগে,
এখন এটাই হয়ত রীতি।

বাঙালী নারীর আজন্ম লালিত পরিচ্ছদ
শাড়ীটা এখন একেবারেই আনুষ্ঠানিক হয়ে গিয়েছে,
খুব ইচ্ছে হতো চপলমতি ইনোসেন্ট ঐ মেয়েটিকে
একবার শুধু শাড়ীতে দেখতে।

অবশেষে দেখলাম,
অপ্রত্যাশিত একটি জায়গায়, হঠাৎ করেই সে,
ফিরোজা রঙের চমৎকার কারুকাজ করা শাড়ী পড়া,
আমি থমকে গেলাম,
অপ্সরী দেখিনি সত্যি,
কিন্তু ঠিক ঐ মুহুর্তে মনে হলো,
সেই তো অপ্সরী ।

চপলমতি হেটে গেল বাতাসে ঢেউ তুলে,
যেন পাহাড়ী ঝর্নার গায়ে ঝরে ঝরে পরছে সোনালী ফুল,
তখনো নামেনি সন্ধ্যা এই ব্যাস্ত নগরীতে,
বসন্ত এলো এলো বলে ঐ আকাশটাও পুরোপুরি নীল।
শাড়ী? হ্যাঁ শাড়ীই তাকে এতটা সুন্দর করেছে,
শাড়ীই তাকে দিয়েছে রমণীর রূপ,
আচ্ছা এই সুন্দর বসনটি কি চিরস্থায়ী হতে পারেনা?
চিরস্থায়ী সৌন্দর্য হয়ে তুলুক ঢেউ দক্ষিণা হাওয়ায়,
নন্দনের প্রসুন হয়ে বসন্ত বাগানে ফুটুক কামিনী,
তোমাকে আমি বারবার শাড়ীতে দেখতে চাই রমণী।

নীল সিকোরী

মূল: মারিনা রাতনের
ভাবানুবাদ: ড: রমিত আজাদ

স্মৃতির রং – নীল সিকোরী,
অপার্থিব নিসর্গের সৌন্দর্যে প্রস্ফুটিত।
ত্সিকোরীর নীল রঙে ভরা স্মৃতিবিধুর দিনগুলোতে,
প্রিয়তম আমার, তুমি কি অস্টপ্রহর কেবল আমাকেই ভাবছ?

আর ফুলগুলো পরম আকুলতায়
অনুরাগ ভরা উদ্ভাসিত হৃদয়ে
জড়িয়ে ধরেছে পেটিওলিট বিথীর
প্রলোভিত ভাগ্যের কান্ড।

এখনো উঠেনি চাঁদ নীলান্ত আকাশে,
স্বচ্ছ প্রস্ফুটিত প্রভাতের উষ্ণতা কেবল ছুঁয়েছে
সিভেরস্কি দোন্ত্স হ্রদের গভীর নির্বাক জল।

এই অধর ছুঁয়েছে স্মৃতির নীল রং,
বেদনার রং গায়ে মেখে নিয়ে বলি,
উল্লসিত নীল ত্সিকোরী ফুটে ‘যদি’,
বিস্ময়বিহ্বল আলো ‘আসবে কি’?

(নীল ত্সিকোরী – গ্রীস্মের উজ্জ্বল দিনগুলোতে ইউক্রেনের প্রকৃতিতে ফুটে থাকা অদ্ভুত সুন্দর ফুল।)

আমি একবার দুঃখ ভুলে বসন্তের ফুল পেতে চাই
——————- ডঃ রমিত আজাদ

কাল ছিল শীতের শেষ রাত,
আলোহারা রজনীর নিঝুম নিস্তদ্ধতা,
আজ বসন্তের প্রথম দিন,
ফুলের সৌরভের মাতামাতি, কোকিলের গান।
সৌভাগ্যক্রমে এটিই তোমার জন্মদিন।

কেমন আছ তুমি?
খুব জানতে ইচ্ছা করে আমার।
তুমি কি সুখে আছ?
নাকি আমার মতোই কষ্টে কাটে দিন?
নিঃসঙ্গতায় ভোগো?
না, বোধহয়, তোমার তো স্বামী রয়েছে।
অবশ্য আমারও রয়েছে স্ত্রী,
তারপরেও কিন্তু আমি নিঃসঙ্গতায় ভুগী,
কি অদ্ভুত তাইনা?
সঙ্গ আছে তবু নিঃসঙ্গ
আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, তুমিও কি
সঙ্গ থেকেও নিঃসঙ্গ?

আমার অংশিদার যেদিন আমাকে ঠকিয়ে ব্যবসা নিয়ে গেল,
অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম,
আমার বাবার উপহার একমাত্র জমিটি যেদিন দখল করে নিল,
অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম,
টাকার জন্য যেদিন আপন ভাই দুর্ব্যবহার করলো,
অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম,
কিন্তু তোমাকে যেদিন হারালাম,
সেদিনের মত কষ্ট আর কোনদিনও পাইনি,
ঐসব টাকা-পয়সা, জমি-জমার দুঃখ কবেই ভুলে গিয়েছি।
কিন্ত তোমার সাথে বিচ্ছেদের কষ্ট,
এখনও ক্ষত হয়ে জ্বলছে,
ভালোবাসা যে এত দুঃখ, কষ্ট, জ্বালা আর যন্ত্রণা
দিতে পারে তা কে জানত!

তোমাকে ভালোবেসে,
পৃথিবীর সব কিছুই আমার কাছে
মেঘের মত রঙিন মনে হতো।
মনে হতো পৃথিবীতে কষ্ট বলে কিছু নেই,
সিদ্ধার্থ মিছেই বলেছেন, ‘জগৎ দুঃখময়!’
জগৎ সুন্দর, সুন্দর, অদ্ভুত সুন্দর,
আমার পাশের রমণীটির মতই সুন্দর!
আর এখন, আমার চারপাশে শুধুই যন্ত্রণা,
সিদ্ধার্থ যথার্থই বলেছেন, ‘জীবন মানেই দুঃখ!’

গতরাত ছিল শীতের শেষ রাত,
আমার অতৃপ্ত মনের প্রতীক,
আজ বসন্তের প্রথম দিন,
হাজার হাজার ফুলে ফুটে আছে তোমার ভালোবাসা ।
তোমার মধুর জন্মদিনে,
আমি একবার দুঃখ ভুলে বসন্তের ফুল পেতে চাই।


তোমার কথা প্রায়ই মনে পড়ে, তুমি কেমন আছো?

———————————— ডঃ রমিত আজাদ

আমার মন যে কতটা খারাপ তুমি বুঝবে না,
রৌদ্র কেড়ে নেয়া কালো মেঘের থমথমে নীরবতা দেখেছ?
অথবা তুহীন শীতে জমে বরফ হয়ে যাওয়া কোন নদী?
তোমার ঐ পেলব হাতটি দাও,
স্পর্শ করতো আমার হৃদয়,
টের পাও কিছু?
তবে আমার বুকের ক্ষত গলে হৃদয়ের ভিতরে ঢুকে যাও,
এবার কি দেখতে পাও,
সব বেদনা জমাট বেধে কেমন পাথর হয়ে আছে?

আচমকা এলে, আচমকা গেলে,
এ যেন সুরের বীণা বেজেই থেমে গেল,
এ কেমন প্রেম বলতো?
তার চাইতে না এলেই পারতে।

এটি একটি অপূর্ণ কবিতা, একটি অসম্পূর্ণ গান।
না কিছুই নয়, স্রেফ তোমার জন্য
নির্মল সাদা কাগজে কলমের ধাতব নিবের নিষ্ঠুর আঁচড়

অনেকটা দেরী করেই পরিচয় হয়েছিলো আমাদের,
হয়তো তোমার জন্ম হয়েছে অনেক পরে,
অথবা আমি পৃথিবীতে এসেছি অনেক আগে,
এমনটা না হয়ে যদি সব কিছু সময়মতো হতো,
তবে কি ভিন্ন জীবন হতো আমাদের?

বাতাসে দোল খাওয়া মাধবীলতা,
কার্নিশ ছেয়ে হেসে ওঠা বাগানবিলাস,
বাগান ভরা সুহাসিনী ডালিয়া ফুলের উজ্জ্বল বর্ণচ্ছটা,
সারাটা বিকেল জুড়ে তোমার প্রতিক্ষা,
তোমার কি মনে পড়ে?

আমার কিন্তু বেশ মনে পড়ে,
তোমার চুলে রৌদ্রের খেলা,
তোমার ওড়নার ঝালর, তোমার শাড়ীর আঁচল
তোমার কপোলের লাল আভা
তোমার ভীরু চোখে উপচে পড়া হাসি,
জাপানী কিমানোর মত পরিপাটি তুমি,
অনেক কৌতুহলী চোখ এড়িয়ে,
অথবা সবগুলো চোখের সামনেই,
আমাদের নিষিদ্ধ অভিসার,
অস্হির এই পৃথিবীতে একমুঠো সুখ।

তুমি কি জানো, আমি এখনো তোমাকে খুঁজি?
ঢাকার পথে পথে খুঁজি,
ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে খুঁজি,
মোবাইলের স্ক্রীনে খুঁজি,
ফেইসবুকের পাতায় পাতায় খুঁজি,
কেন?
দু’টি প্রশ্ন করব,
তোমার কথা প্রায়ই মনে পড়ে,
তুমি কেমন আছো?
আমার কথা ভেবে,
তোমার মনও কি উন্মনা হয়না?

সেই থেকে আমি আর কবিতা পড়িনা
—————————— ডঃ রমিত আজাদ

সেই থেকে আমি আর কবিতা পড়িনা,
কেবলই শুনি গান,
সুরের মূর্ছনার আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হই,
যেমনটি হয় কোঁচবিদ্ধ ছটফটে মাছ ।

হৃদয়টাকে টেনে ছিঁড়ে বুকের মাঝখানে একটা গহবর তৈরী করেছ,
তাই আমি আজ একেবারেই হৃদয়হীন,
সুদুর সাইবেরিয়ার হীমশীতলে নির্বাসিত।
কালাপানির আন্দামান হলে ভালো হত,
অন্ততপক্ষে মহাসাগরের গর্জন শুনতে পেতাম।

একদিন তুমি তো আমারই ছিলে,
তোমার সুমিষ্ট নারীকন্ঠের ডাক,
এই কানে ঢেলেছে সুধা মৃন্ময়ী বসন্ত হয়ে,
স্বপ্নে তো নয়, বাস্তবেই তোমাকে চুমু খেয়েছি সহস্রবার,
একেবারে বুকে জড়িয়ে, নিস্পেষিত করেছি,
অজস্র আকুলতা নিয়ে।
আবেগঘন মুহুর্তগুলোতে ঘনঘন দীর্ঘশ্বাসের সাথে
ছিল ফিসফাস কথপোকথন,
এই আঙুলের সব উষ্ণতা দিয়ে তোমাকে ছুঁয়েছি।
হ্যাঁ, নিশ্চিত তোমাকে ছুঁয়েছি বাধাহীন, বারংবার,
দেখিয়েছি তোমাকে, আমি কতটুকু উত্তাল হতে পারি,
মনে হয়েছে যেন আমিই তোমার স্বামী।

সদ্য পঠিত কবিতা রেখে, ছুঁয়েছি তোমার অধর,
তোমার দেহবল্লরীকে মনে হয়েছে খরস্রোতা নদী যেন
তোমার সজল আঁখী,
তোমার পেলব ঠোট,
তোমার গোপন তিল
একসময় এই সবকিছুর অধিকার শুধুই আমার ছিল।

আমার আকাশ বিদ্ধ করেছে ডাকিনীর তীর,
পূর্ণিমার চাঁদ গিয়েছে নিভে ,
নিঃশব্দে নেমেছে ঘোর অমাবশ্যা ,
আজ তোমার গায়ে পরপুরুষের ঘ্রান
পেচিয়ে আছে সম্মোহিত সাপ হয়ে।
ক্লান্তিকর খেলা শেষে,
আমার হতাশা আর নিরুত্তাপ তুমি ।

আমি ডানা ঝাপটানো একটি নিঃসঙ্গ বিহঙ্গ যেন,
টর্নেডো ভেঙেছে কপাট,
ভূমিকম্প গুড়িয়ে ঘর,
সুনামীর তীব্র স্রোতে উঠেছে ভয়াল ঝড়।
মনের গভীরে চোখের জল ঝড়ে ঝড়ে হয়ে গেল যেই নদী,
ধীরে ধীরে বাড়ছে সে নদীর জল, এই প্লাবন এলো বলে,
আমাকে কি ধুর্ত প্রেমিক বলবে?
কিংবা প্রতারক যুবক?

কোন মায়াবী খাঁচায় তো তোমাকে পুরে রাখিনি,
তুমি মুক্ত বিহঙ্গ, উড়ে যাও যেখানে চাও।
আমি বড়জোড় লিখতে পারি একঝাক চিঠি।
প্রেমের অনন্তলোক ছুঁয়ে,
আমার চিঠিগুলো কাগজের পতঙ্গ হয়ে,
একের পর এক ঢুকে পড়বে তোমার জানালা গলে
দুর্নিবার পূর্ণিমার আকাশ ছেঁয়ে দেবে তমশায়,
নিশি জাগা তুমি আর তোমার স্বামী
নিশ্চিত বঞ্চিত হবে জোছনার মাধুরী থেকে।

আমার আকাশেও এখন আর চাঁদ ওঠেনা,
তবু সিদ্ধার্থের মত গৃহত্যাগী হতে চাই,
পাশে শুয়ে থাকা বধু আর শিশু ইচ্ছেটাকে অবদমিত করে

এই ভয়ার্ত আঁধারে কার কাছে যাব আমি, তোমাকে ছাড়া?
সেই তুমিই রয়েছ ফিরে, হয়েছ বৈরী,
অসহায় আমি আজ আকাশের মত একলা।
আমাদের বিচ্ছেদে অনেক কেঁদেছি আমি,
তুমিতো দেখনি সে কান্না!
আমি একাই সে অশ্রুবারির দর্শক।
তোমার কাছে ফিরে যাবার আর কোন পথ নেই তো খোলা।

এখন হাতড়ে বেড়াই,
কেবলই স্মৃতি, কেবলই স্মৃতি, কেবলই স্মৃতি,
বারবার মনে পড়ে একটি মায়াবী মেয়ের মুখ!

নারী ও সমুদ্র
——– ডঃ রমিত আজাদ

চুলগুলি অযত্ন বিন্যস্ত,
এলোমেলো উড়ছে মোলায়েম কেশগুচ্ছ ,
উচ্ছাসী সাগরের হাওয়ায়
সমুদ্রের ছায়া পড়ে তার চোখে,
সমুদ্রের ঐ আশ্চর্য্য নীলের মত
তার চোখও ঠিকরে দিচ্ছে তীব্র রঙের ছটা।

খুব দূরে দূরে একেবারে দিগন্ত ঘেসে
সাগরের ঢেউ ছুঁয়ে ছুঁয়ে, এক টুকরো মেঘে
ক্ষণে ক্ষণে জাগে বিদ্যুতের চমকানি,
আর আমি থেমে থেমে দেখি তার রূপ-ঝলকানি

মনে হয় সে এত কাছে, যেন
তার হৃদস্পন্দন শুনতে পাই।
কেমন উদগত আবেগে,
তার লাবণ্য, দীপ্তি সৌরভে
সুগন্ধী নিশ্বাসের মদিরায়,
মনে জেগে ওঠে নেশা।
এইতো প্রথম এমন করে নারী ও সমুদ্র দেখা ।

কোন কালে কোন কবি যেন
তুলনা করেছিলেন নারী ও ফুলের,
আরো হয়েছে তুলনা নারী ও নদীর।
আর এই ক্ষণে বলে ওঠে আমার উন্মত্ত মন-রুদ্র
উদ্বেলিত নারীর একমাত্র তুলনা ঐ উচ্ছসিত সমুদ্র।

তুমি কি চোখের ভাষা পড়তে পার?
– ডঃ রমিত আজাদ

তুমি একদিন জানতে চেয়েছিলে,
আমি তোমাকে কতটুকু ভালোবাসি।
প্রিয়তমা আমার,
সমুদ্রের গভীরতা, সেও তো মেপে ফেলা যায়।
ভালোবাসার গভীরতা আমি কোন ফিতায় মাপব?
বুঝিয়ে বলতে বল?
আমাদের জানা কোন ভাষায় বলতে গেলেও
তা কেমন যেন দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে।
আমি বরং শ্বাশত ভাষাতেই বলি।
কোন সে ভাষা?
শব্দের পিঠে শব্দ জুড়ে দিয়ে নয়,
ধ্বনির পর ধ্বনি উচ্চারিত করে নয়,
চোখে চোখ রেখে নির্বাক সে ভাষা।
কোমল প্রাণ আমার,
তুমি কি চোখের ভাষা পড়তে পার?
তোমার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে,
আমার চোখ ভেদ করে হৃদয় ছুঁয়ে দেখ,
মহাসাগরের সুনীল স্বচ্ছ জলের মতই
আমার ভালোবাসা সত্য।
মহাকাশের ঝকঝকে তারাগুলোর মতই
আমার ভালোবাসা পবিত্র।

(বিদেশী কবিতার ছায়া অবলম্বনে রচিত)

বিচিত্র মন

হৃদয়ের রজনীগন্ধা তুমি, তুমি নীল অপরাজিতা
বলেছিলে হেসে, “আমায় নিয়ে লেখনা একটি কবিতা”।
আমি কবি নই তবু, লিখব আজ কিছু পংক্তিমালা,
বাতায়ন খুলে সাজিয়ে দেব হাজার তারার মেলা।
শব্দের ঝড় উঠবে ফুঁসে নন্দিত কোন অরণ্যে,
কবিতার তার তুলবে সুর, তোমাকে স্পন্দিত করার জন্যে।

যদিও প্রথম প্রেম নয়,
তবুও শীতের কুয়াশায়,
তোমার শ্যামল ছবি রহস্যময়,
আমার বুকে তুলেছিল ক্ষুদ্ধ আলোড়ন,
সাগরের গর্জনের মত অশান্ত, উদ্দাম।

তোমার মনের কথা আমার দুহাত ছুঁয়ে যাওয়া,
কি জানতে চাও বল? কেন আমি এতই বেপরোয়া?
অমিত তৃষ্ণা আমার, তাই আমি হয়েছি অবাধ,
নিষেধের বেড়াজাল ভেঙ্গে, নিয়েছি প্রেমের সাধ।
দুরন্ত স্রোতের মত, দিগন্ত রেখার টানে,
ছুটে গিয়েছি নিঃসীম শূণ্যের পানে।

সুহাসীনি শীতের ডালিয়া অথবা সুর্যমূখী, বৈকালের টলটলে জল সেচে,
তোমার হৃদয়ের সকল উষ্ণতা আমাকে দিয়েছ তুমি অতি নিঃসংকোচে।
ময়ুরাক্ষী নদীটির কলহাস্য যেন গানের আসরে তুলেছে বীণার ঝংকার,
মানস সরোবরে সদ্য প্রস্ফুটিত নীলপদ্ম সেজে হয়েছে অলিক উপহার।

যদি জানতে চাও, এই কাহিনীর ইতি ডাকবে কবে ?
আমি বলব, শেষ নেই, এ গল্প অবিরাম চলেই যাবে।
সেই জমি, কাজ, রাজনীতি আর মেয়ে মানুষের গল্পের মত,
জাহাজের ডেকে, রেলের বগিতে, বাসের সিটে, মানুষের মুখে যত,
কাহিনী বদলায় না, গল্প বদলায় না, বদলায় শুধু পাত্র,
তুমি আমি তো মহাকালের স্রোতে দুটি ক্ষুদ্র বিন্দু মাত্র।

কি উদ্দেশ্য? দোহাই তোমার, এমন প্রশ্ন করনা।
উদ্দেশ্যহীনভাবে কি ভালোবাসা যায়না?
জানি তুমি আমার অন্তরঙ্গতায়,
আবেগঘন স্পর্শকাতরতায়,
বিন্দুমাত্রও কুন্ঠিত নও,
বরং তুমি বারংবার কেবল স্পন্দিতই হও।

তবুও অতটা অশান্ত হবনা,
দূরেই থাকি, অত কাছে যাবনা,
ভয় হয়, আমার উত্তপ্ত স্পর্শে ,
যদি তুমি ছাই হও শেষে।

তুমি আমায় ভালোবেসেছিলে
– ড: রমিত আজাদ

তুমি আমায় ভালোবেসেছিলে,
আমি তোমায় ভালোবাসিনি।
তুমিও জানতে তা,
তবু তুমি এসেছিলে,
পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে উদ্ভাসিত হৃদয়ে।

তোমার ভাষাহীন নির্বাক চোখ,
তমসায় ছেয়েছিল।
তোমার অভিমানি মন,
এ মনে পায়নি ঠাঁই।
পরাজিত প্রেম আকুল হয়ে ছুটেছে নিরুদ্দেশ,
বেদনার রং গায়ে মেখে নিয়ে বলেছিলে,
“আপনি মিথ্যে করে হলেও বলুন, ভালোবাসি”।
আমি মিথ্যে করে হলেও বলেছিলাম, “ভালোবাসি”।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গবেষণামূলক প্রকাশনা জীবনী ও স্মৃতিকথা শিল্প ও ফটোগ্রাফি সৃজনশীল প্রকাশনা

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন

জয়নুল আবেদিনের যেমন ছিলেন একজন শিল্পী তেমনি ছিলেন এদেশের আধুনিক শিল্পকলা আন্দোলনের পথিকৃৎ। তাঁর মানবিক গুণাবলির জন্যেও তিনি বিখ্যাত ছিলেন। প্রচণ্ড শক্তিশালী এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল এক শিল্পী জয়নুল আবেদিন। শিল্পকলাকে কখনই তিনি সাধারণ জীবনের বাইরের কোন বিষয় বলে গণ্য করেননি। “শিল্পের জন্য শিল্প” এমন আদর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না জয়নুল আবেদিন। আবার প্রপাগন্ডা আর্টেও তিনি বিশ্বাস করতেন না। শিল্প জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, এটাই ছিল তাঁর দর্শন। তাঁর কাছে শিল্প হচ্ছে জীবনেরই এক প্রকাশ আর এর উদ্দেশ্য হলো মানব সমাজকে সমৃদ্ধ ও সুন্দর করে তোলা। সমাজে সুন্দরের প্রতিষ্ঠার আগেই অবশ্য সেখান থেকে সব ধরনের কদর্যতা অপসারণ আবশ্যক। এসব কদর্যতার মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও দৃশ্যমান অসমতা। জয়নুল তাঁর চার দশকের সুদীর্ঘ শৈল্পিক জীবনে একাগ্রভাবে শুধু সেই সামগ্রিক ও সমন্বিত পরিবেশটিরই প্রতিষ্ঠায় নিবিষ্ট ছিলেন যার মাধ্যমে সম্ভব হয় অথপূর্ণ নন্দনচর্চার অব্যাহত প্রয়াস। তাঁর শিল্প সব সময়েই সাধারণ মানুষের কথা বলেছে। তিনি নিজেও উঠে এসেছেন তাদের মধ্য থেকেই। তাদের জীবন, তাদের অন্তহীন সংগ্রাম, তাদের আশা ও আকাঙ্ক্ষা সব কিছুই তিনি অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে তাঁর কাজের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। গ্রামীণ দরিদ্র খেটে খাওয়া মানুষ ও বাংলার নিসর্গ ছিল তাঁর অতি প্রিয় বিষয়।

জন্ম ও বংশ পরিচয়

জয়নুল আবেদিন ১৯১৪ সনের ২৯শে ডিসেম্বর বর্তমান বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। (সরকারি নথিপত্রে তাঁর জন্ম তারিখ অবশ্য ১৮ই নভেম্বর, ১৯১৪)। বাবার নাম তমিজউদ্দিন আহমেদ এবং মা জয়নাবুন্নেছা। বাবা ছিলেন পুলিশের সহকারী সাব-ইন্সপেক্টর। তিনি ছিলেন পিতামাতার দ্বিতীয় সন্তান এবং জ্যেষ্ঠ পুত্র।

 

শিক্ষা জীবন ও শৈশব

ময়মনসিংহে তাঁর জীবনের শুরুতেই তিনি শৈল্পিক প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে বহু দূরের সেই শহর কলকাতায় গিয়ে শিল্পকলা শেখার দীর্ঘ এবং কঠিন ছাত্রজীবন শুরু না করা পযর্ন্ত স্বস্তি পাচ্ছিলেন না জয়নুল আবেদিন। ১৯৩০ সালে বাড়ি থেকে পালিয়ে বন্ধুদের সাথে কলকাতা গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস দেখতে যান। ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৮ সন পযর্ন্ত তিনি কলাকাতার সরকারি আর্ট স্কুলের ছাত্র ছিলেন। ১৯৩৩ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগেই স্কুলের সাধারণ পড়ালেখার পাট চুকিয়ে কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস-এ ভর্তি হন। ১৯৩৮ সালে কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টসের ড্রইং এ্যান্ড পেইন্টিং ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

ব্রহ্মপুত্র নদের প্লাবন অববাহিকার অত্যন্ত শান্ত সুনিবিড় ও রোমান্টিক পরিবেশে তিনি বেড়ে উঠেছেন। তাঁর শৈশব এবং তারুণ্যের প্রধানতম অর্জন ছিল বলতে গেলে এই প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের অভিজ্ঞতা। তাঁর শৈল্পিক মানসিকতা নির্মাণে প্রকৃতির প্রভাব ছিল অসামান্য ও সুদূরপ্রসারী। তিনি বলতে ভালোবাসতেন, “নদীই আমার শ্রেষ্ঠতম শিক্ষক”।

শৈশবে তাঁর ওপর প্রকৃতির প্রভাব এবং কলকাতায় আর্ট স্কুলে ইউরোপীয় একাডেমিক বাস্তববাদী ধারার শিল্পাঙ্কন পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ তরুণ জয়নুল আবেদিনকে গ্রামীণ নিসর্গশিল্পী হিসেবে গড়ে তোলে। একাডেমিক ধারার সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও তিনি বিহারের সাঁওতাল পরগনা ও ময়মনসিংহের নিসর্গ দৃশ্যের ওপর বেশ কিছু স্মরণীয় স্কেচ এবং জলরং চিত্র এঁকেছেন।

 

কর্মজীবন

১৯৩৮ সালে শেষ বর্ষের ছাত্র থাকাকালীন সময়েই কলকাতার গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টসের শিক্ষক হিসেবে নিযুক্তি পান। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর তৎকালীন পাকিস্তানের প্রদেশ পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকার আরমানিটোলায় অবস্থিত নর্মাল স্কুলে আর্ট শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং শ্বশুরালয় ১২ নম্বর আবদুল হাদী লেনে বসবাস করতে থাকেন।

১৯৪৮ সালে ঢাকাতে প্রদেশের প্রথম আর্ট স্কুল, গভর্নমেন্ট ইন্সটিটিউট অব আর্টস প্রতিষ্ঠার যাবতীয় পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন। এতে তাঁর কয়েকজন শিল্পী সহযোগীও উদ্যোগী ভূমিকা রাখেন। জয়নুল আবেদিন ইন্সটিটিউটের প্রথম ‘প্রিন্সিপাল ডেজিগনেট’ হন এবং পাকিস্তানের রাজধানী করাচীতে কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য ও প্রকাশনা বিভাগের মুখ্য নকশাবিদ হিসেবে যোগদানের জন্যে ৩রা আগস্ট, ১৯৪৮, করাচীর পথে ঢাকা ত্যাগ করেন। করাচী থাকাকালীন সময়ের উল্লেখযোগ্য কাজ, “কায়েদে আজমের মাজারের পথে।”

শিল্পী হিসেবে তাঁর খ্যাতি, অসাধারণ সাংগঠনিক মেধা, তৎকালীন শিল্পী সহকর্মী ও বন্ধুদের সহযোগিতা এবং কতিপয় বাঙালী সরকারী কর্মকর্তার সাহায্য ইত্যাদি সব কিছু মিলিয়েই সম্ভব হয়েছিল ১৯৪৮ সনে দেশের প্রথম আর্ট স্কুলের প্রতিষ্ঠা।তখন এর নাম ছিল ‘গভর্মেন্ট ইনস্টিটিউট অফ আর্ট’ পুরাতন ঢাকার জনসন রোডে অবস্থিত ন্যাশনাল মেডিকেল স্কুল ভবনে দুটো কক্ষে গভর্নমেন্ট ইন্সটিটিউট অব আর্টস-এর ক্লাস শুরু হয় নভেম্বর মাসে। শিল্পী আনোয়ারুল হক অস্থায়ী প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৯ সালে ২৮শে ফেব্রুয়ারি তারিখে জয়নুল করাচী থেকে ঢাকায় ফেরেন এবং ১লা মার্চ ইন্সটিটিউটের প্রথম স্থায়ী প্রিন্সিপাল হিসেবে কার্যভার গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমীর সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯৭৪ সন পর্যন্ত এই পদে বহাল থাকেন। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর অন্যতম উপদেষ্টা মনোনীত হন। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়াস্থ ‘কংগ্রেস ফর ওয়ার্ল্ড ইউনিটি’র সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় অধ্যাপক নিযুক্ত হন এবং আমৃত্যু এই পদে অধিষ্ঠিত থাকেন।

 

পারিবারিক জীবন

১৯৪৬ সালে জয়নুল আবেদিন ঢাকা নিবাসী তৈয়ব উদ্দিন আহমদের কন্যা জাহানারা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। জয়নুল আবেদিন তিন পুত্রের জনক। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র সাইফুল আবেদিন (টুটুল) স্থপতি। বর্তমানে তিনি আমেরিকা প্রবাসী। দ্বিতীয় পুত্র খায়রুল আবেদিন (টুকুন), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোল বিষয়ে এম.এ এবং কনিষ্ঠ পুত্র মঈনুল আবেদিন (মিতু) প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পানি-সম্পদ প্রকৌশল বিদ্যায় স্নাতক।

 

১৯৪৩-এর বাংলার দুর্ভিক্ষ ও জয়নুল আবেদিন

images cover13

তিনি ১৯৩৮ সনে নিখিল ভারত চিত্র প্রদর্শনীতে গভর্নরের স্বর্ণপদক লাভ করেন। এ পুরস্কার ছিল ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদ নিয়ে আঁকা তাঁর একগুচ্ছ জলরং ছবির জন্যে। এরপর আরো কিছুকাল পর্যন্ত জয়নুল আবেদিন প্রাকৃতিক পরিবেশেরই এক রোমান্টিক রূপকার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি তখন ছিলেন এক অরাজনৈতিক ব্যক্তি, একজন বিশ্বস্ত নিসর্গশিল্পী। কিন্তু ১৯৪৩-এর বাংলার দুর্ভিক্ষ জয়নুল আবেদিনকে একেবারে বদলে দেয়। গ্রাম-বাংলার রোমান্টিক নিসর্গশিল্পীকে রূপান্তরিত করে ফেলে এক দুর্দান্ত বিদ্রোহী ব্যক্তিত্বে। অতঃপর সারাটি জীবনই বিক্ষুব্ধ থেকে গেছেন তিনি।

দুর্ভিক্ষ শুরু হওয়ার পরপরই জয়নুল তাঁদের ময়মনসিংহের বাড়িতে ফিরে যান। সেখানেও দুর্ভিক্ষের যে মর্মান্তিক দৃশ্যাবলি দেখতে পান তাতে তিনি ভীষণভাবে ব্যথিত হন এবং আবার কলকাতায় ফিরে আসেন। কিন্তু দুর্ভিক্ষপীড়িত দুস্থ মানবতা যেন সে যাত্রায় তাঁর সঙ্গী হয়ে আসে। তেতাল্লিশের কলকাতা মহানগরে ঘটেছে মানবতার চরম অবমাননা। ডাস্টবিনের উচ্ছিষ্ট থেকে খাদ্যান্বেষণে তীব্র প্রতিযোগিতা চলেছে মানুষ আর কুকুরের মধ্যে। ঊনত্রিশ বছর বয়স্ক জয়নুল এ রকম অমানবিক দৃশ্যে প্রচণ্ডভাবে মর্মাহত হন, আতঙ্কে শিউরে ওঠেন, আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কিন্তু সে আবেগ তিনি কাজে লাগান সেসব দৃশ্যাবলির শিল্পরূপ দিতে। অন্যভাবে বলা যায় সেই আবেগই তাঁকে তাড়িত করে, বাধ্য করে অমানবিক পরিস্থিতির এক মানবিক নির্মাণে। তিনি রাতদিন শুধু কলকাতার দুর্ভিক্ষের সেসব নারকীয় দৃশ্যাবলির স্কেচ করতে থাকেন।

জয়নুল তখন আর্ট স্কুলের একজন শিক্ষক, তাঁর আয় সামান্য। দুর্ভিক্ষের বাজারে উন্নতমানের শিল্পসামগ্রী তখন যেমন ছিল দুর্লভ তেমনি দুর্মূল্য। সে কারণে তিনি বেছে নেন শুধু কালো কালি আর তুলি। শুকনো তুলিতে কালো চীনা কালির টানে স্কেচ করতে থাকেন অতি সাধারণ সস্তা কাগজের ওপর। ব্যবহার করেছেন কার্টিজ পেপার। এসব কাগজ ছিল ঈষৎ পীত বর্ণের। এমনকি তিনি প্যাকেজিং কাগজও ব্যবহার করেছেন। সাধারণ স্বল্পমূল্যের এসব অঙ্কন সামগ্রী ব্যবহার করে তিনি যে শিল্প সৃষ্টি করলেন তাই পরিণত হলো অমূল্য সম্পদে। এমন এক অসাধারণ শক্তিশালী অঙ্কন শৈলীর মাধ্যমে তিনি দুর্ভিক্ষের করুণ বাস্তব দৃশ্যাবলি চিত্রায়িত করলেন, যার কোন পূর্ব দৃষ্টান্ত উপমহাদেশের চিত্রঐতিহ্যে ছিল না। জয়নুলের দুর্ভিক্ষের স্কেচগুলো দেখার পর “ভারতের নাইটিঙ্গেল” শ্রীমতি সরোজিনি নাইডু মন্তব্য করেছিলেন, “সব চাইতে মর্মস্পর্শী ও আবেগময় বর্ণনার চাইতেও তাঁর এসব ছবির আবেদন অধিকতর”। সমসাময়িক এক শ্রদ্ধাভাজন শিল্পসমালোচক ছিলেন ও.সি. গাঙ্গুলী। ১৯৪৪ সনে তিনি জয়নুলের দুর্ভিক্ষের ড্রইং সম্পর্কে লিখেছেন, “তাঁর এসব নির্মম তুলির টানের দুঃসাহসিকতার মধ্যে একাধারে ছিল স্বতঃস্ফূর্ততা ও সততা এবং তার সাথে আবার যুক্ত হয়েছিল আপোসহীন বাস্তবতা, যা কিনা বাংলার আধুনিক শিল্পীদের কাজে একেবারেই বিরল এক বৈশিষ্ট্য। তাঁর এই অসাধারণ কাজের মাধ্যমে তিনি আধুনিক চিত্রকালার এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করলেন। জয়নুলের ড্রইংগুলো ১৯৪৩-এর বাংলার ইতিহাসের ক্ষেত্রে এক অমূল্য বিশ্বস্ত দলিল হয়ে থাকলো। মানব জীবনের শোচনীয় পরিণতির মধ্যেও সৌন্দর্যের পূজারী হিসেবে এই শিল্পী বাংলার বিদ্যমান সস্তা ভাবপ্রবণ নিম্ন পর্যায়ের চিত্রধারাকে উন্নীত করলেন এক সম্মানজনক স্তরে”। জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষের স্কেচগুলো শুধুমাত্র সমাজ বাস্তবতার স্মারক হিসেবেই নয়; বরং যুগপৎভাবে এগুলোর শৈল্পিক উৎকর্ষতার জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ। ও.সি. গাঙ্গুলির বস্তনিষ্ঠ মূল্যায়নের সাথে আমরা আরো যোগ করতে পারি ১৯৫২ সনে প্রদত্ত প্রখ্যাত বৃটিশ শিল্পসমালোচক স্যার এরিখ নিউটনের মন্তব্য, “এগুলো অত্যন্ত চমৎকার ড্রইং, এগুলোর মধ্যে সেই অসম্ভব ব্যাপরটিই ঘটেছে, এক অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের”।

Shilparcho_Joynul_Abedin_bathingRebelCowAbedin

তাঁর দুর্ভিক্ষের চিত্রমালার মাধ্যমেই জয়নুল আবেদিন চিহ্নিত হলেন বাংলার শিল্পকলার প্রথম সমাজ বাস্তবতার শিল্পী হিসেবে। এটা অবশ্যই এক আশ্চর্য ঘটনা যে জয়নুলের আরেক সমকালীন মুসলমান, কাজী নজরুল ইসলামও মাত্র দু’দশক আগে ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন শোষিত নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠ হিসেবে তাঁর বিখ্যাত “বিদ্রোহী” কবিতার মাধ্যমে। নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী ছিলেন, রাজনৈতিক চেতনায় এবং তাঁর কাব্যে। তিনি বৃটিশ রাজের বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠ উচ্চকিত করেছেন আবার অন্যদিকে তৎকালীন কবিতায় প্রভাবশালী রাবীন্দ্রিক বলয় ভেঙেছেন। জয়নুল আবেদিনও তাঁর সমসাময়িক প্রতিপত্তিশালী ভারতীয় নব্য ধ্রুপদী ধারার চিত্র ধারার বাইরে অবস্থান করতে প্রয়াসী হয়েছিলেন। এই ধারাটির প্রবর্তন করেছিলেন আবার ঠাকুর পরিবারের আরেক ব্যক্তিত্ব, রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অবনীন্দ্রনাথের অত্যন্ত শীতল ও রীতিবদ্ধ নব্য ধ্রুপদী ধারা কিংবা “বেঙ্গল স্কুলের” চিত্রধারার চাইতে পাশ্চাত্যের বাস্তবতাভিত্তিক চিত্রধারাই প্রথম থেকে জয়নুল আবেদিনের অধিকতর পছন্দ ছিল। এরই ফলশ্রুতিতে দুর্ভিক্ষ নিয়ে চিত্রমালার শক্তিশালী বাস্তববাদী-প্রতীকী স্কেচগুলো বেরিয়ে এসেছে বলে মনে হয়।

বিদ্রোহী কবির মতোই জয়নুল আবেদিনও মানবতাবাদ ও সমাজতন্ত্রের পক্ষে ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ নিয়ে সে বছরই কলকাতায় যে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল তাতে জয়নুল তাঁর দুর্ভিক্ষ নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। কম্যুনিস্ট পার্টির মুখপত্র The People’s War পত্রিকায় ১৯৪৫ সনের ২১শে জানুয়ারি সংখ্যায় জয়নুলের ওপর একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। এতে জয়নুলকে “এক তরুণ বাঙালি মুসলমান” হিসেবে পরিচয় করানো হয়। সাথে ছিল তাঁর একটি ফটোগ্রাফ এবং দুর্ভিক্ষ চিত্রমালার তিনটি ছবির প্রতিলিপি। কাগজটি তাঁর সম্বন্ধে লিখেছিল, “বাঙলার ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পীসংঘের একজন সদস্য জয়নুল। এই সংঘটি সমগ্র বাংলার সকল শিল্পী ও লেখকের এ রকম একটি প্রতিষ্ঠান যার প্রধান কর্তব্যই ছিল সমস্যাতাড়িত জনগণকে সাহায্য করা। আর এতে কোন সন্দেহ নেই যে, সে সকল সময়েই এঁদেরই একজন অগ্রণী সদস্য থাকবে।” জয়নুল সম্পর্কে পত্রিকাটির মূল্যায়ন বস্তুতই অত্যন্ত সঠিক ছিল একথা পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়েছে।

 

শিল্প আন্দোলনের কর্ণধার

১৯৪৭ সনে উপমহাদেশে দুটো স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হলো, তারপর জয়নুল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র পাকিস্তানের অন্যতম প্রদেশ পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকায় চলে আসেন। তিনি কলকাতা আর্ট স্কুলে তাঁর চাকরিটি ছেড়ে ঢাকায় এসে নর্মাল স্কুলের অঙ্কন শিক্ষকের কাজ পান। কিন্তু তখন থেকেই তিনি এদেশে শিল্প আন্দোলন শুরুর গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেন। তখনকার সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবায় তাঁর এই উদ্যোগটি ছিল রীতিমতো বিপ্লবাত্মক ঘটনা। তাঁর শিল্পী হিসেবে খ্যাতি, অসাধারণ সাংগঠনিক মেধা, তৎকালীন শিল্পী সহকর্মী ও বন্ধুদের সহযোগিতা এবং কতিপয় বাঙালি সরকারি কর্মকর্তার সাহায্য ইত্যাদি সব কিছু মিলিয়েই সম্ভব হয়েছিল ১৯৪৮ সনে এদেশের প্রথম আর্ট স্কুলের প্রতিষ্ঠা। তখন এর নাম ছিল “গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস”। এই ইনস্টিটিউটকে গড়ে তোলার গুরুদায়িত্ব তিনি গ্রহণ করেন এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষরূপে। মাত্র দু’কামরার সেই ইনস্টিটিউটটিকে ১৯৫৬ সনের মধ্যেই তিনি এক অতি চমৎকার আধুনিক প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করেন। পরবর্তীকালে এটি পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় এবং স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। (আরো পরে মহাবিদ্যালয়টি সরকারি নিয়ন্ত্রণ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হস্তান্তরিত হয় এবং এর বর্তমান পরিচয় চারুকলা ইনস্টিটিউট নামে)। কলেজ ক্যাম্পাসের নকশা নির্মাণে জয়নুল আবেদিন বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ স্থপতি মাজহারুল ইসলামকেই দায়িত্ব দিয়েছিলেন। চারুকলা কলেজ/ইনস্টিটিউটের ক্যাম্পাসের যে নান্দনিকতা তা এদেশের ক্যাম্পাস স্থাপত্যের এক মানদণ্ড হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে।

ইতিমধ্যে ১৯৫১-৫২তে জয়নুল আবেদিন সরকারি বৃত্তি নিয়ে এক বছরের জন্যে ইংল্যান্ডে যান। সেখানে অবস্থানকালে তিনি বিভিন্ন চারুকলা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন। তিনি তাঁর নিজের শিল্পকর্মের প্রদর্শনীও করেন। তাঁর কাজ ইংল্যান্ডের বিদগ্ধজনের অকুণ্ঠ প্রশংসা অর্জন করে। তাঁর এই ইংল্যান্ড ভ্রমণটি শুধুমাত্র যে তাঁকে পাশ্চাত্য জগতে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল তাই নয়, এতে করে তাঁর দৃষ্টি আরো প্রসারিত হয় এবং সম্ভবত এর মাধ্যমেই বাংলাদেশের চারুকলা চর্চা শুরু থেকেই এক প্রাণবন্ত আধুনিকতার চরিত্র গ্রহণ করতে পেরেছিল। আবেদিনের এই ইউরোপ ভ্রমণ তাঁকে বাংলার সমৃদ্ধ লোকশিল্পের মর্যাদা ও গুরুত্ব সম্পর্কেও বিশেষভাবে সচেতন করে তোলে। জয়নুল তাঁর ছাত্রাবস্থায় ও তারুণ্যে যদিও অবনীন্দ্রনাথের নব্য-ধ্রুপদী ধারা কিংবা যামিনী রায়ের বাংলার লোক-ঐতিহ্যসমৃদ্ধ শিল্পশৈলীর প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন না, তবে ‘৫২তে বিলেত থেকে ফিরে এসে তিনি এদেশের স্থানীয় শিল্প-ঐতিহ্যের সাথে পাশ্চাত্যের আধুনিক শিল্প-আন্দোলন ও কৌশলাদির সমন্বয় সাধনে ব্রতী হন। ইতিমধ্যে তিনি নানান অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। তৎকালীন বিদ্যমান রাজনৈতিক আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি থেকেই তিনি বাঙালি সংস্কৃতির ওপর বৈরী পশ্চিম পাকিস্তানি আধিপত্যবাদী মনোভাব সম্পর্কে সচেতন হন। তিনি তখন থেকেই চিত্রকলায় এক ধরনের আধুনিক বাঙালিত্ব ফুটিয়ে তোলার পক্ষে সুস্পষ্ট ও জোরালো মত ব্যক্ত করতে থাকেন। তাঁর এই মানসিকতা তাঁর নিজের কাজের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়েছে। ১৯৫১ সনে এবং এর অব্যবহিত পরে আঁকা তাঁর ছবিতে একটি অসাধারণ আঙ্গিকের পরিচয় পাওয়া যায়। এই আঙ্গিকের প্রাথমিক পর্যায়ে দেখা যায়, জয়নুল গ্রাম বাংলার অতি সাধারণ প্রাত্যহিক অথচ অত্যন্ত প্রতীকী গুরুত্বসম্পন্ন দৃশ্যাবলি এঁকেছেন। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ চিত্রমালার সেই তুলির বলিষ্ঠতা ও সাবলীলতা আবার প্রাণ পেয়েছে এ সময়ের কাজে। অধিকাংশ কাজ জলরং বা গোয়াশে করা। ব্যবহৃত জলরংঙের বৈশিষ্ট্য হালকা এবং অনুজ্জ্বল, তুলির টান এবং কম্পোজিশন বা স্পেস ব্যবহার অত্যন্ত প্রাচ্যধর্মী। অন্যদিকে বিষয় উপস্থাপনা ও ড্রইং পাশ্চাত্য-বাস্তবধর্মী। এভাবে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের এক অপরূপ সমন্বয় ঘটেছে তাঁর শিল্পকর্মে। তাঁর “ঝড়” শীর্ষক ছবিটি এক অসাধারণ কাজ। এতে বাংলাদেশের কালবৈশাখীর আকস্মিকতা ও উদ্দামতা ধরা পড়েছে অতি চমৎকারভাবে। বিন্যাসের সংক্ষিপ্ততায় ছবিটি আকর্ষণীয়। একইভাবে আরেকটি সুন্দর জলরং ছবি “মই দেয়া”। তবে এই সিরিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্ভবত মাঝারি সাইজের একটি জলরং, যার শিরোনাম “বিদ্রোহী”। পরবর্তী সময়ে এটি একটি প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে। একটি অবাধ্য গাভী ষাড়ের মতো প্রচণ্ড শক্তিতে তার বাঁধন ছিঁড়ে ছুটে যাচ্ছে। তুলির টানের শক্তি ও সাবলীলতা অসাধারণ। ক্ষিপ্রতার সাথে আঁকা হলেও ছবিতে বিভিন্ন অংশের সূক্ষ উপস্থাপনায় চরম মুন্সিয়ানা ধরা পড়ে। পাকানো দড়ি কিংবা গরুটির পায়ের খুর, এসবের ডিটেলস লক্ষণীয়। এই আঙ্গিকে তিনি ছবি এঁকেছনে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে। সুগঠিত সুন্দর সাঁওতাল নরনারীকে বিষয় করে চিত্তাকর্ষক ছবিও এঁকেছেন।

এর পরপরই ‘৫২-৫৩তে জয়নুল গড়ে তোলেন এক চমৎকার নতুন ঢং, যাকে “আধুনিক বাঙালি ঢং” বলা চলে। এই ঢঙের কাজের সাথে যামিনী রায়ের ছবির ঢঙের সামঞ্জস্য দেখা যায়। জয়নুলের এই ঢঙের কাজে বাংলার লোক-শিল্পের নানা মটিফ এবং রং বিন্যাসের প্রভাবও লক্ষণীয়। তাঁর এ সময়ের কাজগুলোকে রোমান্টিক মেজাজের বলে চিহ্নিত করা যায়। বছর কয়েক আগে জয়নুল বিয়ে করেছেন, তাঁর সন্তানদের জন্ম হয়েছে এরই মাঝে। তাঁর ঢঙের ছবি সবই অবয়বভিত্তিক, তবে তাঁর এই ঢঙের ছবি সবই অবয়বভিত্তিক, তবে তাঁর নিজস্ব নতুন আঙ্গিকেই উপস্থাপিত। আধাবিমূর্ত, জ্যামিতিক ফর্মে নির্মিত হয়েছে মানব-মানবীর শরীর। অনেক ক্ষেত্রে প্রথাগত পারসপেকটিভের শর্ত মানা হয়নি। জলরং, গোয়াশ এবং তেলরং, নানা মাধ্যমে আঁকা ছবির এক সাধারণ বৈশিষ্ট্য উজ্জ্বল প্রাথমিক রঙের ব্যবহার। ছবিগুলো আকারে আয়তনে ছোট বা মাঝারি। অধিকাংশ ছবি মহিলাদের জীবনযাপন নিয়ে, এসব ছবিতে পল্লী-রমণীগণ নদীর ঘাটে যাচ্ছে জল আনতে বা স্নান করতে। অনাবিল প্রশান্তিতে প্রসাধানে নিযুক্ত, একক, যুগল কিংবা ত্রয়ী মহিলার চিত্র। মা ও শিশুও রয়েছে। গ্রামীণ কর্মী পুরুষের জীবনও ধরা পড়েছে এই সময়কার কাজে। একটি গোটা সিরিজ গড়ে উঠেছে এসব ছবি নিয়ে। এগুলোর মধ্যে কিছু স্মরণীয় কাজ হলো ‘নৌকোর গুণটানা’, ‘পল্লী-রমণী’, ‘আয়না নিয়ে বধূ’, ‘একাকী বনে’, ‘পাইন্যার মা’, ‘মা ও শিশু’, ‘তিন পল্লী রমণী’, ‘মুখ চতুষ্টয়’ ইত্যাদি।

জয়নুলের এই ‘আধুনিক বাঙালি’ রীতির কাজগুলো দেখে একজন বৃটিশ শিল্পসমালোচক, রিচার্ড উইলসন, ১৯৫৫ সনে লিখেছেন, “এক হিসেবে বলতে হয় তাঁর এসব কাজ পাক-ভারতীয় চিত্রকলার আধুনিক যুগে উত্তরণের সূচনা করেছে। ভারত ও পাকিস্তানের তিনিই প্রথম শিল্পী যিনি অত্যন্ত সফলতার সাথে বিমূর্ত চিত্রকালার টেকনিক ও স্থানীয় ঐতিহ্যের সমন্বয় ঘটাতে পেরেছেন, অনুকরণের ওপর মোটেও গুরুত্ব দেননি।”

 

সংগ্রামী জয়নুল

জয়নুল আবেদিন অবশ্য তাঁর এই শিল্প আঙ্গিকটি খুব বেশি দিন ধরে রাখেননি। পঞ্চাশ দশকের শেষ ভাগেই তিনি বরং ফিরে যান তাঁর প্রথম পযার্য়ের বাস্তবধর্মী আঙ্গিকে যার বৈশিষ্ট্য ছিল গতিময় ও শক্তিশালী রেখা। মাঝে মধ্যে তিনি বিমূর্ত প্রকাশবাদী আঙ্গিকে কিছু ছবি এঁকেছেন তবে তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য ছিল বাংলার খেটে খাওয়া কর্মীমানুষের জীবন সংগ্রামের ছবি আঁকাতেই। ১৯৫৯ সনে আঁকা “সংগ্রাম” শিরোনামে তাঁর বিশাল তেলরঙের একটি কাজ এই ধারারই প্রতীক। এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে গরুর গাড়ির এক চালককে প্রাণপণ শক্তিতে কাদার মধ্যে আটকে পড়া তার গাড়িটিকে ঠেলে তুলতে। চালকের এই সংগ্রাম, এক নিঃসঙ্গ একক মানুষের সংগ্রাম। এ যেনো সিসিফাসের সংগ্রাম। এ সংগ্রামের কোন শেষ নেই।

১৯৬৯ সনের গণ-আন্দোলন তৎকালীন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। স্বৈরশাসনের শুরু ১৯৫৮ সনের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে। বাংলাদেশে (অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে) বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির দাবিই ছিল গণ-আন্দোলনের মূল কথা। তখন এদেশের চিত্রশিল্পীরাও জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ হন এবং ১৯৭০ সনের ফেব্রুয়ারি মাসে আর্ট কলেজে “নবান্ন” শীর্ষক এক বিশাল প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। আপাদমস্তক এক বাঙালি জাতীয়তাবাদী, জয়নুল, বাংলার মানুষের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। শহীদ মিনারের সামনে প্রদর্শনের জন্যে তিনি ব্যানার এঁকেছেন, ২১শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিনগুলোর জন্যে প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছেন, লিখেছেনও এগুলোতে, আর মিছিলেও তিনি অংশ নিয়েছেন। এমনকি তিনি জননেতা মাওলানা ভাসানীর সাথে ১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারি মাসে ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত বিশাল জনসভায় ভাষণও দিয়েছেন। এভাবে দেখা যায় জয়নুল ছিলেন তাঁর সমকালীন মেক্সিকোর শিল্পী ডেভিড সিকিওরসের ভাষার সেই “বিপ্লবী সমাজবাদী শিল্পী”। উল্লেখ্য, সিকিওরসের সাথে জয়নুলের দেখা হয়েছিল সিকিওরসের দেশ মেক্সিকোতে। জয়নুল ১৯৫৬-৫৭ সালে বিশ্ব ভ্রমণের এক পর্যায়ে মেক্সিকো বেড়াতে গিয়ে সিকিওরসের সাথে দেখা করেন।

১৯৬৮ সনের ‘নবান্ন’ প্রদর্শনীতে এরই জন্যে বিশেষভাবে আঁকা ৬৫ ফুট দীর্ঘ একটি স্ক্রল চিত্র নিয়ে নেতৃত্ব দেন জয়নুল আবেদিন। স্ক্রলের কাগজের প্রস্থ ছিল ৪ফুট। কালো চীনা কালি, জলরং আর মোম ব্যবহার করেছেন স্ক্রলটি আঁকতে। এই চিত্রমালায় তিনি তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস। “সোনার বাংলা”-র সুখ ও শান্তির দিনের চিত্র দিয়ে শুরু, তারপর ঔপনিবেশিক শাসনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত বাংলার ক্রম-নিঃস্বতার পরিণতি, চরম দারিদ্র্যাবস্থা, দুর্ভিক্ষ এবং অবধারিতভাবে দুঃখী দরিদ্র মানুষের গ্রামত্যাগী হয়ে শহরমুখী যাত্রা। এ এক মহা আলেখ্য।

স্পর্শকাতর দৃশ্যাবলি, হৃদয় স্পর্শী উপস্থাপনা, অত্যন্ত সহজ সরল আঙ্গিক ও ঢং অথচ অসাধারণ তার আবেদন। হাজার হাজার মানুষ ‘নবান্ন’ প্রদর্শনীতে এসে এই ছবি দেখেছে। পরে তাঁর শান্তিনগরের বাড়িতে গিয়েও অনেকে দেখেছে। তাঁর বাড়ি ছিল যেনো এক খোলামেলা জাদুঘর। সবার ছিল অবারিত প্রবেশাধিকার। তিনি দর্শকদের উৎসাহ দিতেন ‘নবান্ন’ দীর্ঘচিত্রের এক প্রান্তে তাঁদের নিজের নাম সই করতে। অসংখ্য দর্শক তাদের নামের স্বাক্ষর রেখেছে ছবিটিতে। এভাবে তিনি মানুষকে তাঁর শিল্পকলার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। এদের মধ্যে যেমন ছিলেন দেশ ও বিদেশের নামিদামি মানুষ, তেমনি ছিল বাংলার সাধারণ মানুষ।

জয়নুল আবেদিন ছিলেন মুক্তিকামী মানুষ। স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্যে যাঁরা সংগ্রাম করেন তাঁদের সবার সাথেই একাত্মতা জানাতে উৎসাহী ছিলেন তিনি। ১৯৭০ সনে যখন তাঁর বয়স প্রায় ৫৬, তিনি আরব লীগের আমন্ত্রণে ছুটে যান মধ্যপ্রাচ্যের সমর ক্ষেত্রে। আল-ফাতাহ গেরিলাদের সাথে চলে যান যুদ্ধফ্রন্টে। সেখানে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি আঁকেন, তাঁর সেসব ছবির প্রদর্শনী হয় একাধিক আরব দেশে। মুক্তিযোদ্ধারা তাতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।

প্যালেস্টাইন থেকে দেশে ফিরতে না ফিরতে জয়নুলের নিজের দেশেই এক প্রলয়ঙ্করী ঝড় আঘাত হানে দেশের উপকূলীয় এলাকায়। তিন লক্ষাধিক মানুষ এই ঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ হারায়। প্রচণ্ড মানসিক ধাক্কা খান জয়নুল আবেদিন। কিন্তু বসে না থেকে একটি রিলিফ টিমের সাথে ছুটে যান দুর্যোগাক্রান্ত এলাকায়। দুঃখী জনগণের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। পরে তিনি সেখানকার মর্মস্পর্শী দৃশ্যাবলির কিছু কিছু তুলে ধরেন তাঁর তুলিতে, কালিতে। ‘নবান্ন’ আঙ্গিকেই আকেঁন আবার একটি দীর্ঘচিত্র বা স্ক্রল। ‘মনপুরা ৭০’ শীর্ষক এই স্ক্রলটি ছিল ৩০ ফুট দীর্ঘ। কালো কালি এবং মোম সহযোগে আঁকা হয়েছে স্ক্রলের ছবি। এতে দেখানো হয়েছে স্তূপীকৃত লাশের দৃশ্য। এ ছবির সামনে দাঁড়িয়ে জয়নুল দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে বলতেন “আমরা শুধু মৃত্যুতেই একতাবদ্ধ হই” । তবে স্ক্রলটির একেবারে শেষ প্রান্তে শিল্পী স্থাপন করেন এক বলিষ্ঠ পুরুষকে। এখনো জীবিত এবং মাথা নিচু করে বসে আছে ধ্বংসস্তূপ থেকে বাঙালির সম্ভাব্য পুনরুত্থানের প্রতীক হিসেবে।

সত্তরের ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত সেরে উঠতে না উঠতেই শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। নিজ দেশে বন্দি জীবন কাটাতে বাধ্য হলেন জয়নুল। পালিয়ে পালিয়ে বেড়ালেন কিন্তু সবর্ক্ষণই তাঁর দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা আঁকড়ে ধরে রাখলেন।

মুক্তিযুদ্ধ জয়নুলের মনে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিজয় অর্জনের পর পরই তিনি পুর্ণোদ্যমে লেগে যান শিল্পচর্চা সংগঠনের কাজে। এবারে লোকশিল্প তাঁর কাছে প্রাধান্য পেতে থাকে। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার জয়নুল আবেদিনকে দায়িত্ব দেন বাংলাদেশের সংবিধানটির অঙ্গ সজ্জার জন্যে। তিনি প্রবল উৎসাহের সাথে কাজটি সমাধা করেন। তাঁকে সাহায্য সহযোগিতা করেন আরো কয়েকজন শিল্পী। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক সংকট তাঁকে অত্যন্ত ব্যথিত করে। তাঁর কর্মচাঞ্চল্যে কিছুটা ভাটা পড়তে থাকে। তাঁর মন খারাপ হতে থাকে। সুপুরুষ স্বাস্থ্যবান দীর্ঘদেহী জয়নুলের স্বাস্থ্য দ্রুত ভেঙে পড়তে থাকে। তিনি যেন বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর সময় দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। তিনি ছুটলেন তাঁর আজীবন লালিত স্বপ্ন “লোকশিল্প জাদুঘর” প্রতিষ্ঠার কাজে। তাঁর ইচ্ছে ছিল এই জাদুঘরে সংরক্ষিত হবে দেশের মূল্যবান লোকশিল্প, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এখান থেকেই নতুন প্রেরণা পাবে। জয়নুল তাঁর নিজের শিল্পকর্ম সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের জন্যেও একটি চিত্রশালা প্রতিষ্ঠার কথা ভেবেছেন। এসব কাজের মন্যে সরকার সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেছিলেন। প্রয়োজনীয় কিছু অর্থ মঞ্জুরিও দিয়েছিলেন। কঠোর পরিশ্রম করে এ দুটো প্রতিষ্ঠানেরই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার শুরুটা তিনি তাঁর মৃত্যুর আগেই দেখে যেতে পেরেছেন।

দীর্ঘ ছ’মাস ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সরকার দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পীর চিকিৎসার জন্যে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন। কিন্তু মাত্র ৬২ বছর বয়সেই তাঁর জীবনাবসান হলো। অবশ্য জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তিনি আঁকার কাজ অব্যাহত রাখেন। ১৯৭৬ সনের ২৮শে মে তারিখে তাঁর মৃত্যুর মাত্র ক’দিন আগে হাসপাতালে শুয়ে তিনি তাঁর নিজস্ব ঢঙে শেষ ছবিটি আঁকেন, দুটো মুখ, বলিষ্ঠ মোটা রেখায়, কালো কালি আর মোম ব্যবহার করে।

Abedin1971painting200px-The_struggle

সোনারগাঁও-এ লোকশিল্প জাদুঘর প্রতিষ্ঠা

জয়নুল আবেদিনের ঐকান্তিক প্রচেস্টায় নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে লোকশিল্প জাদুঘর স্থাপিত হয়। এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও গুরুত্ব রয়েছে। ঢাকা থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত সোনারগাঁও একসময়ে বাংলার অন্যতম রাজধানী শহর ছিল। মোঘল আমলে এই অঞ্চল প্রসিদ্ধ ছিল মসলিম কাপড় তৈরির কেন্দ্র হিসেবে। এখনো এ অঞ্চলে সুন্দর সুন্দর হাতের কাজ হয়, তাঁতের কাপড় তৈরি হয়।

 

নিজস্ব সংগ্রহশালা

জয়নুল আবেদিনের জন্ম সাধারণ পরিবারে। তিনি জীবনযাপনও করেছেন সাধারণ বাঙালির মতোই। সরল কিন্তু আত্মবিশ্বাসী জয়নুল সমাজের শক্তিধর ব্যক্তিত্ব এবং দরিদ্র চাষী সবার সাথেই অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দে মেলামেশা করতে পারতেন। তারাও যেনো তাঁকে আপন মানুষ মনে করতেন। তিনি ছিলেন এক অসাধারণ মজলিশি মানুষ, অক্লান্ত আড্ডা দিতে পারতেন। তাঁর কথা বলার ভঙ্গিটি ছিল একেবারেই নিজস্ব ও অননুকরণীয়। ময়মনসিংহের আঞ্চলিকতার টান ছিল ভাষায়। তিনি ছিলেন যেমন আমুদে, তেমনি রসিক। তিনি ভালোবাসতেন শিশুদের, ভালোবাসতেন ভালো খাবার, বিশেষ করে গ্রামবাংলার খাবার। তিনি ছিলেন চা প্রেমিক এবং ধূমপানে আসক্ত। নিরবচ্ছিন্নভাবে সিগারেট খেতেন। এই অভ্যাসই হয়তো শেষে তাঁর কাল হয়েছিল। তিনি প্রকৃতির সবকিছুই ভালোবাসতেন, শুধু কাক পছন্দ করতেন না। অথচ কাকের ছবিই বার বার তাঁর হাতের তুলির পরশে কী জীবন্ত রূপ পেয়েছে। তাঁর কাছে কাক ছিল “সুযোগ সন্ধানী চালাকদের প্রতীক।”

জয়নুল তাঁর নিজের ছবির গ্যালারির স্থান নির্বাচন করেন ময়মনসিংহে তাঁর অতি প্রিয় ব্রহ্মপুত্র নদের তীরের একটি পুরাতন ভবনে। এটাই তাঁর জন্যে স্বাভাবিক ছিল। ময়মনসিংহ তাঁর নিজের জেলা।১৯৭৫ সালে ময়মনসিংহে জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালাটি প্রতিষ্ঠা করেন। এখানকার নৈসর্গিক পরিবেশই গড়ে তুলেছিল তাঁর শিল্প মানস, এখানকার জেলা বোর্ডই কলকাতায় তাঁর শিল্পকলা শিক্ষাকালের প্রথম পর্যায়ের অতি জরুরি বৃত্তিটি দিয়ে তাঁকে উৎসাহিত করেছিল। তাঁর মা নিজের গলার হার বিক্রি করে সেই দূরের অচেনা শহর কলকাতায় ছেলেকে আর্ট স্কুলে পড়তে যেতে সাহায্য করেছেন। তাঁর বাবা ছিলেন ময়মনসিংহে কর্মরত ছোট দারোগা। অনেক কষ্টে তিনি ছেলের জন্যে মাসে মাত্র দশটি টাকা পাঠাতে পারতেন। সেই তিরিশের দশকেও এটা খুব সামান্য পরিমাণ টাকাই ছিল। তখন ময়মনসিংহ জেলা বোর্ড আর্থিক সাহায্য না করলে প্রায় অসম্ভব হতো জয়নুলের শিল্প-শিক্ষা গ্রহণ। কলেজের অধ্যক্ষ মুকুল দে-র জোর সুপারিশে কাজ হয়েছিল। জেলা বোর্ড জয়নুলকে মাসিক পনেরো টাকা করে বৃত্তি অনুমোদন করেছিল। এতে করে আর্ট স্কুলের জীবনটা তাঁর কিছুটা হলেও দুশ্চিন্তামুক্ত হয়েছিল।

জয়নুল আবেদিন তাঁর এসব ঋণের কথা ভোলেননি কখনও। সুযোগ পেলেই ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করেছেন। তিনি যখন তৃতীয় বর্ষের ছাত্র তখন থেকেই জয়নুল পত্র-পত্রিকার অঙ্গসজ্জা করে যে সামান্য আয় করতেন তা দিয়েই তাঁর পিতার অস্বচ্ছল পরিবারে আর্থিক অবদান রেখেছেন। তাঁর মাকে দিয়েছেন শুধু ভালোবাসা। তাঁর জন্মস্থান ময়মনসিংহকে উপহার দিয়েছেন একটি আর্ট গ্যালারি আর বাংলাদেশের জনগণকে দিয়েছেন তাঁর সারা জীবনের শিল্পকর্মের বৃহৎ সম্ভার। এসবের মধ্যে মহামূল্যবান দুর্ভিক্ষ চিত্রমালার অধিকাংশ স্কেচও রয়েছে। তাঁর এই শিল্পসম্ভার বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের জয়নুল গ্যালারিতে সংরক্ষিত।

 

পুরস্কার ও সম্মাননা

১৯৫১ সালে পাকিস্তান সরকারের বৃত্তি নিয়ে ইংল্যান্ড, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণ করেন। লন্ডনের স্লেড স্কুল অব আর্টস-এ কাজ করেন এবং তখন রয়েল ইন্ডিয়া, পাকিস্তান এ্যান্ড সিলোন সোসাইটির উদ্যোগে তাঁর পেইন্টিং এবং ড্রইং-এর এক প্রদর্শনী হয় (৩-৮ ডিসেম্বর, ১৯৫১)। লন্ডনের বার্কলী গ্যালারিতে পেইন্টিং এবং ড্রইং-এর প্রদর্শনী (১৪-২৬) জানুয়ারি, ১৯৫২)। এই প্রদর্শনীর আয়োজক ছিলেন লন্ডনস্থ পাকিস্তান হাইকমিশনার। এরিখ নিউটন প্রমুখের প্রশংসা। বেলজিয়াম, প্যারিস, আঙ্কারা ও ইস্তাম্বুলে ভ্রাম্যমাণ প্রদর্শনী। ইউনেস্কো আয়োজিত ও ভেনিসে আর্ট কনফারেন্সে যোগদান করেন। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তানের লাহোর শহরের আলহামরায় (১৪-২১ সেপ্টেম্বর) প্রদর্শনী, আয়োজক ছিল লাহোরের মেয়ো স্কুল অব আর্ট এবং পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিল।

১৯৫৫ সালে পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিলে আয়োজিত করাচীতে তাঁর চিত্রকলার প্রদর্শনী। জাপানের টোকিও শহরে দামারু গ্যালারিতে সপ্তাহব্যাপী প্রদর্শনী (অক্টোবর)। আয়োজক জাপানিজ ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন এবং মাইনিচি পাবলিকেশন্স। ১৯৫৬ সালে রকফেলার ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে বর্ষব্যাপী বিশ্ব ভ্রমণে যান এবং জাপান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং ইউরোপ ভ্রমণ করেন। ১৯৫৭ সালের ৮-২৯ এপ্রিল ওয়াশিংটন ডিসি’র স্মিথরোনিয়ান ইন্সটিটিউশনে তাঁর ৫২টি চিত্রকর্মের প্রদর্শনী করেন। ১৯৫৯ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট কর্তৃক সৃজনশীল কাজের জন্যে দেশের সর্বোচ্চ পদক “প্রাইড অব পারফরমেন্স” লাভ করেন। পাকিস্তান সরকার কর্তৃক “হিলাল-ই-ইমতিয়াজ” শীর্ষক বেসামরিক উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯৬১ সালে সোভিয়েত সরকার কর্তৃক আমন্ত্রিত সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমণ করেন এবং সেখানে তাঁকে স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। ১৯৬৫ সালে পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি চারুকলা বিভাগ খোলার জন্যে সে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আমন্ত্রিত হয়ে সেখানে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে সাতমাস কাটান এবং বিভাগটি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৬ সালে ইরানের তেহরানে আরসিডি দেশসমূহের (পাকিস্তান, ইরান ও তুরস্ক) দ্বিবার্ষিক চিত্র প্রদর্শনীতে বিচারকর্মগুলীর সদস্য হিসেবে কাজ করেন।

১৯৭০ সালে আরব লীগের আমন্ত্রণে মধ্যপ্রাচ্য সফরে যান এবং ফাত্তাহ গেরিলা মুক্তি যোদ্ধাদের সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে যান। মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহিত করার জন্যে গেরিলা যোদ্ধাদের ওপর আঁকা তাঁর ছবির প্রদর্শনী করেন বিভিন্ন আরব শহরে। ১৯৭১ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে জননেতা মাওলানা ভাসানী আয়োজিত ময়মনসিংহের এক জনসভায় জয়নুল ভাষণ দেন। জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সংগঠিত বাঙালিদের অসহযোগ আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণার প্রতীক হিসেবে “হিলাল-ই-ইমতিয়াজ” উপাধি বর্জন করেন।

১৯৭৩ সালে ভারতে বাংলাদেশের চিত্রকলার প্রদর্শনী উপলক্ষে শিল্পীদলের নেতৃত্ব দান করেন। ১৯৭৪ সালে ভারত সরকারের রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে ভারত পরিভ্রমণ করেন। এবছরই তিনি ভারতের দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সম্মানজনক ডি লিট ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে সে দেশ ভ্রমণ করেন। বাংলাদেশে চারুকলার উন্নয়নে জয়নুল আবেদিন তাঁর অবদানের যথার্থ স্বীকৃতি পেয়েছেন “শিল্পাচার্য” সম্বোধনে। এ শিরোপা তাঁকে উপহার দিয়েছে তাঁরই দেশের গুণমুগ্ধ ও কৃতজ্ঞ জনগণ।

আজীবন জয়নুল আবেদিন ছিলেন জনগণের শিল্পী এবং জনগণেরেই মানুষ। আবার তাঁকেই দেশ-বিদেশের রাষ্ট্রনায়ক এবং পণ্ডিতগণ অতি উঁচু দৃষ্টিতে দেখতেন। তাঁর অসাধারণ শিল্প-প্রতিভা এবং তাঁর মহৎ মানবিক গুণাবলির জন্যে তিনি বহু পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন, সরকার এবং জনগণের কাছ থেকে পেয়েছেন সম্মান। রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে তিনি অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন।

তথ্য ও ছবি সূত্র – আর্ট অব বাংলাদেশ সিরিজ; জয়নুল আবেদিন, প্রকাশ-১৯৯৭-জুন। লেখক-নজরুল ইসলাম। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা ইতিহাস জীবনী ও স্মৃতিকথা শিক্ষা এবং ভাষা

ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার। বর্তমানে যেটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরী বিভাগ সেটিই বিশ্ববিদ্যালয় শুরুর দিকে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল গ্রন্থাগার হিসেবে। সেই গ্রন্থাগারে একজন বইপাগল, শান্ত, সৌম্য, শুভ্র-শ্মশ্রুমণ্ডিত ব্যক্তি মোটা ফ্রেমের চশমা পরে ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো ডুবে আছেন মোটা মোটা বইয়ের গুরুগম্ভীর লেখার জ্ঞান সমুদ্রে। দুপুর গড়িয়ে পড়ন্ত বিকেলে পশ্চিমের রক্তিম সূর্য যখন তার লাল আভা মিলিয়ে দিয়েছে নীলিমায়, তখনও তিনি পড়েই চলেছেন। আর ততক্ষণে গ্রন্থাগারের দারোয়ান তালা লাগিয়ে চলে গেছে।

ঢাকার চকবাজারের লাগোয়া বেগমবাজার। বেগমবাজারের দক্ষিণ উপপ্রান্তে জনাকীর্ণ পথের কোণাকুণি জায়গাটায় একখানি দ্বিতল পাকাবাড়ি, নাম ‘পেয়ারা ভবন’। বাড়িটির মাঝখান দিয়ে একটা সরু করিডর। করিডর দিয়ে সামনের দিকে এগুলে সিঁড়ি বেয়ে সোজা দোতালায় ওঠা যায়। নিচ তলায় একটি পড়ার ঘর এবং লাইব্রেরী। সেখানে বিভিন্ন ভাষার হরেক রকমের অসংখ্য বই। বাংলা, ইংরেজী, জার্মান, ফরাসী, ল্যাটিন, হিব্র, আরবী, ফার্সী, উর্দূ, হিন্দী, আসামীয়, উড়িয়া, মারাঠি, তামিল, গুজরাটি, সিংহলীসহ দেশী-বিদেশী নানা ভাষার লক্ষ লক্ষ শব্দ বন্দী হয়ে আছে সেই বইগুলিতে। আর বইগুলি থরে থরে সাজানো আছে আলমারীতে ও শেলফে এবং প্রত্যেকটি বই আচার্যের বহু বিনিদ্র রজনীর পড়াশুনার সাক্ষর বহন করছে। যিনি হামেশা বলতেন ‘দেখো, ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার না হলে কেউ লেখক হতে পারে না। হতে পারে না গবেষক ও পণ্ডিত। লেখক ও সাহিত্যিক হওয়ার পূর্বশর্ত হলো মূল্যবান গ্রন্থের সংগ্রহশালা।’

এতক্ষণ যাঁর কথা বলছি তিনি এশিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষাতত্ত্ববিদ, জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি ছিলেন একাধারে ভাষাবিদ, গবেষক, লোকবিজ্ঞানী, অনুবাদক, পাঠসমালোচক, সৃষ্টিধর্মী সাহিত্যিক, কবি, ভাষাসৈনিক এবং একজন খাঁটি বাঙালি মুসলিম ও দেশপ্রেমিক। জ্ঞানপ্রদীপ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন বাংলা ভাষার গবেষণায় অদ্বিতীয়। তিনি ছিলেন একটি কাল, একটি শতাব্দী, একটি জাতি, একটি সংস্কৃতি; অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক, ধর্মবেত্তা ও সূফীসাধক।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৮৮৫ সালের ১০ জুলাই শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার পেয়ারা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন । তিনি ছিলেন বাবা-মার পঞ্চম সন্তান। তাঁর বাবা মফিজ উদ্দিন আহমদ ছিলেন ইংরেজ আমলে সরকারি জরিপ বিভাগের একজন কর্মকর্তা। শহীদুল্লাহ মাতা হরুন্নেছা খাতুনের শিক্ষার প্রতি ছিল প্রচণ্ড আগ্রহ। তিনি বাড়িতে তাঁর পরিবার ও পেয়ারা গ্রামের অন্যান্য মহিলাদের শিক্ষা দিতেন। প্রথম দিকে মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নাম রাখা হয় মুহম্মদ ইব্রাহীম। কিন্তু পরবর্তীকালে পিতার পছন্দে আকিকা করে তাঁর নাম পুনরায় রাখা হয় মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। পরিবারে তিন বোন ও চার ভাইয়ের মধ্যে শহীদুল্লাহ ছোটবেলায় ছিলেন দারুণ আমুদে ও আত্মভোলা। বাড়ীর সবাই আদর করে তাঁকে ডাকত ‘সদানন্দ’ বলে। গ্রামের পাঠশালায় পণ্ডিত মশাইরা তাঁকে ডাকতেন ‘সিরাজ দৌল্লাহ’ নামে। কিন্তু তিনি নিজের নাম রেখেছিলেন ‘জ্ঞানানন্দ সংগ্রামী’।

ছোটবেলায় ঘরোয়া পরিবেশে শহীদুল্লাহ উর্দু, ফার্সী ও আরবি শেখেন এবং গ্রামের পাঠশালায় সংস্কৃত পড়েন। পাঠশালার পড়া শেষ করে ভর্তি হন হাওড়া জেলা স্কুলে। স্কুলের ছাত্র থাকতেই বই পড়ার এবং নানা বিষয়ে জানার প্রতি ছিল তাঁর দারুণ নেশা। হাওড়া স্কুলের স্বনামখ্যাত ভাষাবিদ আচার্য হরিনাথ দের সংস্পর্শে এসে শহীদুল্লাহ ভাষা শেখার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। স্কুলজীবন থেকেই তিনি আরবী-ফার্সী-উর্দুর পাশাপাশি হিন্দি ও উড়িয়া ভাষা পড়তে শিখেছিলেন। ১৯০৪ সালে হাওড়া জেলা স্কুল থেকে তিনি কৃতিত্ত্বের সাথে সংস্কৃতসহ প্রবেশিকা পাশ করেন। এরপর কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে থেকে ১৯০৬ সালে এফ.এ পাশ করেন। অসুস্থতার কারণে অধ্যয়নে সাময়িক বিরতির পর তিনি কলকাতা সিটি কলেজ থেকে সংস্কৃতে অনার্সসহ বিএ পাস করেন ১৯১০ সালে। বাঙালি মুসলমান ছেলেদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম অনার্স নিয়ে পাস করেন।

সংস্কৃতিতে অনার্স পাস করার পর সংস্কৃত নিয়ে উচ্চতর পড়াশুনা করতে চাইলে তৎকালীন হিন্দু পণ্ডিতগণ তাঁকে পড়াতে অস্বীকার করেন। ফলে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯১২ সালে এ বিভাগের প্রথম ছাত্র হিসেবে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এর দু বছর পর ১৯১৪ সালে তিনি আইনশাস্ত্রে বিএল ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯২৬ সালে তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য ইউরোপ গমন করেন। বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শণ চর্যাপদাবলি বিষয়ে গবেষণা করে ১৯২৮ সালে তিনি প্যারিসের সোরবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। এ বছরই ধ্বনিতত্ত্বে মৌলিক গবেষণার জন্যে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপ্লোমা লাভ করেন।

আঠারো শতকের মুসলিম সমাজ, পারিবারিক ঐতিহ্য ও পৈত্রিক পেশা থেকে বেরিয়ে ব্যতিক্রমী মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভাষা ও জ্ঞানচর্চায় ব্রতী হন। ভাষাবিজ্ঞানের প্রায় সকল ক্ষেত্রেই তিনি সচ্ছন্দে বিচরণ করেছেন, আয়ত্ত করেছিলেন বাইশটি ভাষা। তিনি বাংলা, উর্দু, ইংরেজী, হিন্দী, সংস্কৃত, পালি, আসাম, উড়িয়া, আরবী, ফার্সী, হিব্র, আবেস্তান, ল্যাটিন,তিব্বর্তী, জার্মান, ফরাসী, প্রাচীন সিংহলী, পশতু, মুন্ডা, সিন্ধী, মারহাটী, মৈথালী ইত্যাদি ভাষা জানলেও ভাষার ব্যাপারে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে তিনি সানন্দে বলতেন, আমি বাংলা ভাষাই জানি।

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯১৪ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে সিতাকুন্ডু উচ্চ বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি কিছুদিন ওকালতি প্র্যাকটিস করেন। তিনি বশিরহাট মিউনিসিপ্যালিটির ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর দিনেশ চন্দ্র সেনের অধীনে শরৎচন্দ্র লাহিরী রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করেন। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে সে বছরের ২ জুন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগে প্রভাষক পদে স্থায়ী চাকুরিতে যোগদান করেন। একইসঙ্গে নিখরচে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষক নিযুক্ত হন। ১৯২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত মুসলিম সাহিত্য-সমাজের সভাপতি নিযুক্ত হন। পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে ১৯২৮ সালে দেশে ফিরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগে প্রভাষকের এবং সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষকের পূর্বপদে যোগদান করেন। ১৯৩৪ সালে তিনি রীডার পদে পদোন্নতি লাভ করেন। একই বছর তিনি সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ এবং পরে ১৯৩৭ সালে স্বতন্ত্র বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। ১৯৪৪ সালের ৩০ জুন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে রীডার ও অধ্যক্ষ হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। অবসর গ্রহণের পর তিনি বগুড়া আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং একইসাথে উক্ত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও ছয় বছর কলা অনুষদের ডীন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা বিভাগে বাংলা সাহিত্য ও বাংলা ভাষা গড়ে তোলার জন্য মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে আমন্ত্রণ জানানো হলে তিনি সেখানে যোগদান করেন। ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন শেষে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে (ফরাসি ভাষার) খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের অস্থায়ী প্রাধ্যক্ষের এবং ফজলুল হক হলের প্রাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর ইমেরিটাস নিযুক্ত হন। অধ্যাপনার বাইরে তিনি করাচির উর্দু উন্নয়ন সংস্থার উর্দু অভিধান প্রকল্প, ঢাকায় বাংলা একাডেমীর ‘পূর্ব পাকিস্তান ভাষার আদর্শ অভিধান প্রকল্প’ এবং ইসলামি বিশ্বকোষ প্রকল্পে সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিশনের সদস্য, ইসলামিক একাডেমীর কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য, বাংলা একাডেমীর বাংলা পঞ্জিকার তারিখ বিন্যাস কমিটির সভাপতি, আদমজি সাহিত্য পুরস্কার ও দাউদ সাহিত্য পুরস্কার কমিটির স্থায়ী চেয়ারম্যান ছিলেন। এছাড়া তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সম্পাদক ছিলেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সভা ও সম্মলনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। মাদ্রাজে Seminar on Traditional Culture in South-East Asia -তে তিনি UNESCO -র প্রতিনিধিত্ব করেন এবং এর চেয়ারম্যান মনোনীত হন।

১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ উর্দূকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশ করেন। এর প্রতিবাদে প্রথম লেখনী ধারণ করে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধে বলেন, ‘পাকিস্তান ডোমিনিয়নের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসীদের মাতৃভাষা বিভিন্ন, যেমন পশতু, বেলুচি, পাঞ্জাবী, সিন্ধী এবং বাংলা; কিন্তু উর্দূ পাকিস্তানের কোন অঞ্চলেই মাতৃভাষা রূপে চালু নয়। … যদি বিদেশী ভাষা বলিয়া ইংরেজী ভাষা পরিত্যক্ত হয়,তবে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ না করার পক্ষে কোন যুক্তি নাই। যদি বাংলা ভাষার অতিরিক্ত কোন দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা গ্রহণ করিতে হয়, তবে উর্দূ ভাষার দাবী বিবেচনা করা কর্তব্য। … বাংলাদেশের কোর্ট ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দূ বা হিন্দী ভাষা গ্রহণ করা হইলে, ইহা রাজনৈতিক পরাধীনতারই নামান্তর হইবে। ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ পাকিস্তানের প্রদেশসমূহের বিদ্যালয়ে শিক্ষার বাহনরূপে প্রাদেশিক ভাষার পরিবর্তে উর্দূ ভাষার স্বপক্ষে যে অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন আমি একজন শিক্ষাবিদরূপে উহার তীব্র প্রতিবাদ জানাইতেছি।’

এই প্রতিবাদ অচিরেই ছড়িয়ে পড়ে শুরু করেছিল রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের। শহীদুল্লাহ রয়ে গেলেন বিতর্কের কেন্দ্রে। ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতির অভিভাষণে তিনি বলেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশী সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোন আদর্শের কথা নয়; এটি একটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙ্গালীত্বের এমন ছাপ রেখে দিয়েছেন যে মালল-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি দাড়িতে ঢাকবার কোন জো-টি নেই।’ ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা দিবসে বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের ছাত্রদের আহ্বানে তিনি হাসিমুখে এগিয়ে এসে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারী ছাত্রজনতার মাঝে সশরীরে উপস্থিত থেকে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করেছেন তিনি; এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে পুলিশী হামলায় টিয়ার গ্যাসে নিগৃহীত হয়েছেন।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জীবন-দর্শনের ভিত্তি ছিল ইসলামী বিশ্বাস। তিনি যেমন পারিবারিকভাবে ইসলামিক পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠেছেন, ঠিক তেমনি তাঁর সাংসারিক জীবন এবং কর্মক্ষেত্রের সর্বত্র ইসলামের প্রতিফলন ঘটেছিল। তিনি কখনো ধর্মীয় রাজনীতি, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা এবং ধর্মের অপব্যবহারকে প্রশ্রয় দেননি। স্বধর্মে নিষ্ঠাবান থেকে তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রচেষ্টা করে গেছেন আজীবন। ১৯৫০ সালে ঢাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে তা প্রতিরোধ করার আহ্বান জানিয়ে সুধীজনেরা যে বিবৃতি দিয়েছিলেন তার খসড়া ছিল তাঁরই রচনা। বছরের শেষ দিকে ‘আঞ্জুমান-ই-ইশা আৎ-ই-ইসলাম’ নামে ইসলাম প্রচার সমিতি গঠন করেন তিনি।

বাঙালি মুসলমান সমাজে নারীর ধর্মসম্মত অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি অত্যন্ত উদযোগী ছিলেন। তাঁর মতে, পর্দা দুরকম এক রকম হলো- ইসলামিক পর্দা, সেটি হচ্ছে মুখ হাত-পা ছাড়া সর্বাঙ্গ ঢেকে রাখা, আর এক রকম হলো- অনৈসলামিক পর্দা, সেটি মেয়েদের চার দেয়ালের মধ্যে চিরজীবনের জন্যে কয়েদ করে রাখে। ইসলামি পর্দায় বাইরের খোলা হাওয়ায় বেরুনো কিংবা অন্যের সঙ্গে দরকারি কথাবার্তা বলা মানা নয়; তবে অনৈসলামী পর্দায় এসব হবার জো নেই। সবার প্রাণপণ চেষ্টা করতে হবে এই অনৈসলামীক পর্দা সরিয়ে দিতে। তা না হলে সবার নারীহত্যার মতো মহাপাপ হবে। নারী যে মসজিদে যেতে পারে, পুরুষের ইমামতিতে নামাজ আদায় করতে পারে এবং শুধু প্রাচীন আরবে নয়, মুসলিম আমলের বাংলাদেশেও যে এ প্রথা প্রচলিত ছিল-তিনি তার প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন এবং ঢাকায় মেয়েদের জামাতে তিনিই প্রথম ইমামতি করেছিলেন।

তাঁর দীর্ঘ জীবনে তৎকালীন পরিবর্তনশীল সামাজিক রুচির যে ধারা চলছিল তার সাথে তিনি সহ-অবস্থান নীতি গ্রহণ করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষক থাকাকালীন তিনি ছাত্রদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন। আবার Traditional culture of east Pakistan গ্রন্থে তিনি Folk Dance, Folk Music I Folk Arts সম্পের্ক প্রবন্ধ লিখেছেন; শুধু তাই নয়, একটি প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, “Educated and talented dancers of our country can draw profitable on this indeginous dances and add new colour and life to the art of dancing.”

স্বদেশী আন্দোলনের সময় চারদিকে যখন বিদেশী পণ্য বর্জনের ডাক শুরু হয়ে গেছে। ঠিক তখন থেকেই তিনি সাহেবী প্যান্ট-কোর্ট ছেড়ে দিয়ে খদ্দর কাপড়ের আচকান, পায়জামা ও পাঞ্জাবী পরিধান শুরু করে দিলেন। তিনি মনে করতেন, দেশী জিনিষ ব্যবহার করলে দেশে পয়সাটা থাকে আর বিদেশী জিনিস ব্যবহারে দেশের পয়সাটা বিদেশে চলে যাবে।

জ্ঞানতাপস এই শিক্ষাবিদ নিজে যেমন আজীবন জ্ঞান সাধনা করেছেন, তেমনি শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষার প্রচার ও প্রসারে নিজকে আত্মনিয়োগ করেছেন। আমাদের দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার একজন কঠোর সমালোচক ছিলেন তিনি। তৎকালীন সরকারের অনুমোদিত নিউস্কীম মাদ্রাসা, ওল্ডস্কীম মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষা এই তিন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর মতে, এই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষাক্ষেত্রে কেবল গণ্ডগোলই সৃষ্টি করেছে এবং মুসলমান সমাজে অনৈক্য এনেছে। এই শিক্ষাব্যবস্থায় মুষ্টিমেয় মানুষের অধিকার তিনি কখনো মেনে নিতে পারেননি। তাই শিক্ষার কথা যখনই বলেছেন তখনই তিনি সার্বজনীন শিক্ষার অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা ঘোষণা করেছেন। দেশের প্রতিটি নাগরিকের ষোলো বৎসর বয়স পর্যন্ত অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার প্রবর্তন করা সরকারের আশু কর্তব্য বলে তিনি বিবেচনা করতেন। মাদ্রাসা শিক্ষার বর্তমান প্রণালীকে তিনি সময় ও শক্তির অপচয় বলে মনে করতেন। শিক্ষাক্ষেত্রে যে একটিমাত্র ব্যবস্থার পরিকল্পনা তাঁর ছিল, সেখানে ধর্মশিক্ষার একটা বিশিষ্ট স্থান ছিল।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর একটি নিজস্ব আসন আছে। এই দুই ক্ষেত্রেই তিনি কিছু মৌলিক ধারণার পরিচয় দিয়েছেন। ১৯২০ সাল থেকে নানা প্রবন্ধ লিখে তিনি নিজের যে বক্তব্য তুলে ধরতে থাকেন তার চূড়ান্ত ও ধারাবহিক রূপ দেখা যায় তাঁর ‘বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত’ (১৯৫৬) গ্রন্থে।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এক স্বতন্ত্র ধর্মী গবেষক ছিলেন। তাঁর গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল জটিল দিকের গ্রন্থিমোচন এবং নবতর ব্যাখ্যা। বাংলা লোকসাহিত্যের প্রতিও তিনি বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। গবেষণাগ্রন্থের পাশাপাশি তিনি সাহিত্য এবং শিশু সাহিত্যের অনেক মৌলিক গ্রন্থও রচনা করেন। তিনি বেশ কয়েকটি গ্রন্থ অনুবাদ ও সম্পাদনা করেন। বাংলার গঠন অনুসারে তিনিই প্রথম ১৯৪৩ সালে বাংলা ব্যাকরণ রচনায় হাত দেন । তাঁর অবিস্মরণীর কৃতিত্ত্ব হলো বাংলা একাডেমী থেকে দু খণ্ডে প্রকাশিত ‘বাংলা ভাষার আঞ্চলিক অভিধান’ সম্পাদনা। তিনিই প্রথম ১৯৪০ সালে ভারতের মুসলিম শিক্ষা কংগ্রেসে পূর্ব বাংলায় ভাষা চর্চা উন্নয়ন ও গবেষণার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রস্তাব করেন। ১৯৪৮ সালে ঢাকার কার্জন হলে অনুষ্ঠিত পূর্ববঙ্গ সম্মেলনে তিনি সেই প্রতিষ্ঠানের নাম ‘বাংলা একাডেমী’ রাখার প্রস্তাব করেন।

ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর বহু মননশীল ও জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ নানা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা তিনি সম্পদনা করেছেন। তিনি আল এসলাম পাত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক (১৯২৫) ও বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক (১৯২৮-২১) হিসেবে যোগ্যতার প্রমাণ দেন। তাঁরই সম্পদনা ও প্রকাশনায় মুসলিম বাংলার প্রথম শিশু পত্রিকা আঙ্গুর (১৯২০) আত্মপ্রকাশ করে। এছাড়াও তিনি ইংরেজী মাসিক পত্রিকা দি পীস (১৯২৩), বাংলা মাসিক সাহিত্য পত্রিকা বঙ্গভূমি (১৯৩৭) এবং পাক্ষিক তকবীর (১৯৪৭) সম্পাদনা করেন। ১৯২২ সাল থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলা ও ইংরেজী ভাষায় প্রকাশিত পাক্ষিক ও মাসিক জার্নাল সম্পাদনা করেন।

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর স্ত্রীর নাম মরগুবা খাতুন। তিনি সাত পুত্র ও দুই কন্যার জনক। মাহযূযা খাতুন, আবুল ফযল মুহম্মদ সফীয়্যুল্লাহ, মাসব্দরা খাতুন, আবুল কালাম মোস্তফা ওলিয়্যুল্লাহ, আবুল করম মাহমুদ যকীয়্যুল্লাহ, আবুল জামার মহামেদ তকীয়্যুল্লাহ, আবুল বয়ান মুজতাবা নকীয়্যুল্লাহ, আবুল ফসল মুতাওয়াক্কিল ববীয়্যুল্লাহ, আবুল খায়ের মুর্তজা বশীরুল্লাহ।

তিনি ছিলেন আজীবন ছাত্র এবং আজীবন শিক্ষক। সারাটি জীবন শুধু জ্ঞানের পিছু ছুটেছেন এবং জ্ঞান বিলিয়ে দিয়েছেন সবার মাঝে। অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁ ও আবুল কাশেম সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে তিনি মিরপুরে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলা কলেজ। মানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণেই শিক্ষক তিনি; একই কারণে দেশপ্রেমিক এবং মনেপ্রাণে বাঙালী।

জীবনভর ভাষা ও সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ এই জ্ঞানতাপস পাকিস্তান সরকার কর্তৃক ‘প্রাইড অফ পারফরম্যান’ এবং ১৯৬৭ সালে ফরাসী সরকার তাঁকে ‘নাইট অফ দি অর্ডারস অফ আর্ট লেটার্স’ পদকে ভূষিত করেন। ১৯৭০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী সরকার তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করেন।

আজীবন উদ্যমী এই মানুষটি সর্বদা ছিলেন কর্মচঞ্চল। ১৯৬৭ সালে ২৭ ডিসেম্বর প্রথম সেরিব্রাল থ্রম্বোসিসে আক্রান্ত হন এই জ্ঞানানন্দ প্রবাদপুরুষ। জীবন সায়াহ্নে যখন হাসপাতালের বিছানায়, তখন ডান হাতের লেখার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। খুব দুঃখিত হয়ে বললেন, ‘ভাল হয়ে নিই, আমার বাম হাতে লেখার অভ্যাস করবো।’ ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই সুদীর্ঘ কর্মজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে তাঁর। ঐতিহাসিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল সংলগ্ন মূসা খাঁন মসজিদের পশ্চিম পাশে র্তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।

সংক্ষিপ্ত জীবনীঃ

নাম: মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

পিতা: মফিজ উদ্দিন আহমদ

মাতা: হুরুন্নেছা খাতুন

স্ত্রী: মরগুবা খাতুন

সন্তান-সন্ততি: সাত পুত্র ও দুই কন্যার জনক। শিক্ষা: ১৯০৪ সালে হাওড়া জেলা স্কুল থেকে তিনি কৃতিত্ত্বের সাথে সংস্কৃতসহ প্রবেশিকা পরীক্ষা পাশ করেন। এরপর ১৯০৬ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে থেকে এফ.এ পাশ করেন। তিনি কলকাতা সিটি কলেজ থেকে সংস্কৃতে অনার্সসহ বিএ পাস করেন ১৯১০ সালে। এরপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালেয় তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯১২ সালে এ বিভাগের প্রথম ছাত্র হিসেবে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। এর দু বছর পর ১৯১৪ সালে তিনি আইনশাস্ত্রে বিএল ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯২৬ সালে তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য ইউরোপ গমন করেন। বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শণ চর্যাপদাবলি বিষয়ে গবেষণা করে ১৯২৮ সালে তিনি প্যারিসের সোরবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।

পত্রিকা ও সম্পাদনা: ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর বহু মননশীল ও জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ নানা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে এবং এ সংক্রান্ত বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা তিনি সম্পদনা করেন। তিনি আল এসলাম পাত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক (১৯২৫)ও বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক (১৯২৮-২১)হিসেবে যোগ্যতার প্রমাণ দেন। তাঁরই সম্পদনা ও প্রকাশনায় মুসলিম বাংলার প্রথম শিশু পত্রিকা আঙ্গুর (১৯২০)আত্মপ্রকাশ করে। এছাড়াও তিনি ইংরেজী মাসিক পত্রিকা দি পীস (১৯২৩),বাংলা মাসিক সাহিত্য পত্রিকা বঙ্গভূমি (১৯৩৭)এবং পাক্ষিক তকবীর (১৯৪৭)সম্পাদনা করেন। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি বাংলা ও ইংরেজী ভাষায় প্রকাশিত পাক্ষিক ও মাসিক জার্নাল সম্পাদনা করেন।

তাঁর প্রকাশনা গুলি হলো:

গবেষণাগ্রন্থ: সিদ্ধা কানুপার গীত ও দোহা (১৯২৬), বাংলা সাহিত্যের কথা (১ম খণ্ড ১৯৫৩, ২য় খণ্ড ১৯৬৫), বৌদ্ধ মর্মবাদীর গান (১৯৬০) ।

ভাষাতত্ত্ব: ভাষা ও সাহিত্য (১৯৩১), বাংলা ব্যাকরণ (১৩৬৫ বঙ্গাব্দ), বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত (১৯৬৫) । প্রবন্ধ-পুস্তক: ইকবাল (১৯৪৫), আমাদের সমস্যা (১৯৪৯), বাংলা আদব কি তারিখ (১৯৫৭), Essay on Islam (1945), Traditional culture in East Pakistan (মুহম্মদ আবদুল হাই-এর সঙ্গে তাঁর যুগ্ম-সম্পাদনায় রচিত; ১৯৬১) ।

গল্পগ্রন্থ: রকমারী (১৯৩১) ।

শিশুতোষ গ্রন্থ: শেষ নবীর সন্ধানে, ছোটদের রাসূলুল−াহ (১৯৬২), সেকেলের রূপকথা (১৯৬৫) ।

অনুবাদ গ্রন্থ: দাওয়ানে হাফিজ (১৯৩৮), অমিয়শতক (১৯৪০),রুবাইয়াত-ই-ওমর খয়্যাম (১৯৪২),শিকওয়াহ ও জাওয়াব-ই-শিকওয়াহ (১৯৪২),বিদ্যাপতিশতক (১৯৪৫), মহানবী (১৯৪৬), বাই অতনা মা (১৯৪৮), কুরআন প্রসঙ্গ (১৯৬২),মহররম শরীফ (১৯৬২),অমর কাব্য (১৯৬৩), ইসলাম প্রসঙ্গ (১৯৬৩), Hundred Sayings of the Holly Prophet (1945), Buddist Mystic Songs (1960)।

সংকলন: পদ্মাবতী (১৯৫০), প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে শেষ নবী (১৯৫২), গল্প সংকলন (১৯৫৩), তাঁর গবেষণামূলক গ্রন্থ ও প্রবন্ধের সংখ্যা প্রায় ৪০টি। এছাড়া তিনি ৪১টি পাঠ্যবই লিখেছেন, ২০টি বই সম্পাদনা করেছেন। বাংলা সাহিত্যের উপর তাঁর লিখিত প্রবন্ধের সংখ্যা ৬০টিরও বেশি। ভাষাতত্ত্বের উপর রয়েছে তার ৩৭টি রচনা। অন্যান্য বিষয়ে বাংলা ইংরেজী মিলিয়ে সংখ্যা দাঁড়ায় ২৮০টি। এ ছাড়া তিনি তিনটি ছোটগল্প এবং ২৯টি কবিতা ও লিখেছেন।

সম্মাননা: জীবনভর ভাষা ও সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ এই জ্ঞানতাপস পাকিস্তান সরকার কর্তৃক ‘প্রাইড অফ পারফরম্যান’। ১৯৬৭ সালে ফরাসী সরকার তাঁকে ‘নাইট অফ দি অর্ডারস অফ আর্ট লেটার্স’ পদকে ভূষিত করেন।১৯৭০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী সরকার তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করেন। এছাড়া তিনি আদমজী ও দাউদ সাহিত্য পুরস্কার কমিটির স্থায়ী সভাপতিরূপে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন।

কর্মজীবন: মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কর্মজীবন বহুধা বিভাজিত। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে সে বছরের ২ জুন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগে প্রভাষক পদে স্থায়ী চাকুরিতে যোগদান করেন। একইসঙ্গে নিখরচে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষক বা হাউজ টিউটর নিযুক্ত হন। ১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং বিভাগীয় প্রধান ও কলা অনুষদের ডীন হিসেবে ছয় বছর দায়িত্ব পালন করেন।

১৯২৩ সালের গ্রীষ্মকালে ‘মালাকান’ রাজপুতদের মধ্যে ইসলাম প্রচারের জন্য রাজপুতনা গমন করেন। বছরের শেষ দিকে ‘আঞ্জুমান-ই-ইশা আৎ-ই-ইসলাম’ নামে ইসলাম প্রচার সমিতি গঠন করেন। ১৯২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত মুসলিম সাহিত্য-সমাজের সভাপতি নিযুক্ত হন। ১৯২৬ সনের সেপ্টেম্বরে তিনি ইউরোপে উচ্চ শিক্ষার জন্য গমন করেন। দু বছর অধ্যয়নের পর উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে ১৯২৮ সনে ঢাকায় ফিরে এসে তিনি বাংলা ও সংস্কৃতের প্রভাষকের পূর্ব পদে যোগদান করেন এবং সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষকের দায়িত্ব পুনর্বার গ্রহণ করেন। ১৯৩২ সালে তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের অস্থায়ী প্রাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩৪ সালে তিনি রীডার পদে পদোন্নতি লাভ করেন এবং সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত থাকেন। ১৯৩৭ সালে সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগ স্বতন্ত্র দুই বিভাগে পরিণত হয়। মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। ১৯৪০ সালে তিনি ফজলুল হক হলের প্রাধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। ১৯৪৪ সালের ৩০ জুন শহীদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ থেকে রীডার ও অধ্যক্ষ হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে (ফরাসি ভাষার)খণ্ডকালীন অধ্যাপক (১৯৫৩-৫৫) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপরে তিনি খণ্ডকালীন হিসেবে ১৯৪৮ সালে ও ১৯৫৫ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। ১৯৫৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হলে ১৯৫৫ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা বিভাগ চালু হয়। এখানে বাংলা সাহিত্য ও বাংলা ভাষা গড়ে তোলার জন্য মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং এ বছরই তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন।কিছুদিন পরেই তিনি কলা বিভাগের ডীন হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন শেষে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি বগুড়া আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রফেসর ইমেরিটাস নিযুক্ত হন। অধ্যাপনার বাইরে তিনি করাচির উর্দু উন্নয়ন সংস্থার উর্দু অভিধান প্রকল্প (১৯৫৯-৬০), ঢাকায় বাংলা একাডেমীর ‘পূর্ব পাকিস্তান ভাষার আদর্শ অভিধান প্রকল্প’ (১৯৬০) এবং ইসলামি বিশ্বকোষ প্রকল্প-এ (১৯৬১-৬৪) সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিশনের সদস্য (১৯৬৩-৬৪), ইসলামিক একাডেমীর কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য (১৯৬৩-৬৪), বাংলা একাডেমীর বাংলা পঞ্জিকার তারিখ বিন্যাস কমিটির সভাপতি, আদমজি সাহিত্য পুরস্কার ও দাউদ সাহিত্য পুরস্কার কমিটির স্থায়ী চেয়ারম্যান ছিলেন। এছাড়াও তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সম্পাদক (১৯১১) ছিলেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সভা ও সম্মলনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সেগুলির মধ্যে উলে−খযোগ্য দ্বিতীয় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলন (১৯১৭), ঢাকায় মুসালিম সাহিত্য সমাজ সম্মেলন (১৯২৬), কলকাতায় নিখিল বঙ্গ মুসলিম যুবক সম্মেলন (১৯২৮), হায়াদ্রাবাদে নিখিল ভারত প্রাচ্যবিদ্যা সম্মেলন (ভাষাতত্ত্ব শাখা,১৯৪১) এবং পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলন (১৯৪৮)। মাদ্রাজে Seminar on Traditional Culture in South-East Asia-তে তিনি UNESCO-র প্রতিনিধিত্ব করেন এবং এর চেয়ারম্যান মনোনীত হন।

তথ্যসূত্র:

১. সংসদ বাঙালা চরিতাবিধান; সাহিত্য সংসদ;

২. আচার্য সুনীত কুমার চট্টোপাধ্যায়; বাংলা সাহিত্যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ.বাংলাপিডিয়া, এশিয়াটিক সোসাইটি;

৩.চরিতাবিধান, বাংলা একাডেমি;

৪. ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও আমি; মাহযূযা হক, ২০০০ প্রকাশিত।

গবেষক:হোসাইন মোঃ আল-জুনায়েদ

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প বিনোদন ভালবাসা/প্রণয়লীলা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হিন্দুধর্মীয়

হৈমন্তী

—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কন্যার বাপ সবুর করিতে পারিতেন, কিন্তু বরের বাপ সবুর করিতে চাহিলেন না। তিনি দেখিলেন , মেয়েটির বিবাহের বয়স পার হইয়া গেছে , কিন্তু আর কিছুদিন গেলে সেটাকে ভদ্র বা অভদ্র কোনো রকমে চাপা দিবার সময়টাও পার হইয়া যাইবে । মেয়ের বয়স অবৈধ রকমে বাড়িয়া গেছে বটে , কিন্তু পণের টাকার আপেক্ষিক গুরুত্ব এখনো তাহার চেয়ে কিঞ্চিৎ উপরে আছে , সেইজন্যই তাড়া।

আমি ছিলাম বর, সুতরাং বিবাহসম্বন্ধে আমার মত যাচাই করা অনাবশ্যক ছিল। আমার কাজ আমি করিয়াছি , এফ.এ. পাস করিয়া বৃত্তি পাইয়াছি। তাই প্রজাপতির দুই পক্ষ , কন্যাপক্ষ ও বরপক্ষ, ঘন ঘন বিচলিত হইয়া উঠিল।

আমাদের দেশে যে মানুষ একবার বিবাহ করিয়াছে বিবাহ সম্বন্ধে তাহার মনে আর কোনো উদ্‌বেগ থাকে না। নরমাংসের স্বাদ পাইলে মানুষের সম্বন্ধে বাঘের যে দশা হয়, স্ত্রীর সম্বন্ধে তাহার ভাবটা সেইরূপ হইয়া উঠে । অবস্থা যেমনি ও বয়স যতই হউক, স্ত্রীর অভাব ঘটিবামাত্র তাহা পূরণ করিয়া লইতে তাহার কোনো দ্বিধা থাকে না। যত দ্বিধা ও দুশ্চিন্তা সে দেখি আমাদের নবীন ছাত্রদের । বিবাহের পৌনঃপুনিক প্রস্তাবে তাহাদের পিতৃপক্ষের পাকা চুল কলপের আশীর্বাদে পুনঃপুনঃ কাঁচা হইয়া উঠে , আর প্রথম ঘটকালির আঁচেই ইহাদের কাঁচা চুল ভাবনায় একরাত্রে পাকিবার উপক্রম হয়।

সত্য বলিতেছি , আমার মনে এমন বিষম উদ্‌বেগ জন্মে নাই । বরঞ্চ বিবাহের কথায় আমার মনের মধ্যে যেন দক্ষিনে হাওয়া দিতে লাগিল। কৌতূহলী কল্পনার কিশলয়গুলির মধ্যে একটা যেন কানাকানি পড়িয়া গেল । যাহাকে বার্কের ফ্রেঞ্চ্ রেভোল্যুশনের নোট পাঁচ-সাত খাতা মুখস্থ করিতে হইবে , তাহার পক্ষে এ ভাবটা দোষের । আমার এ লেখা যদি টেক‌্স‌্ট‌্‌‌বুক্‌‌-কমিটির অনুমোদিত হইবার কোনো আশঙ্কা থাকিত তবে সাবধান হইতাম।

কিন্তু , এ কী করিতেছি । এ কি একটি গল্প যে উপন্যাস লিখিতে বসিলাম । এমন সুরে আমার লেখা শুরু হইবে এ আমি কি জানিতাম। মনে ছিল , কয় বৎসরের বেদনার যে মেঘ কালো হইয়া জমিয়া উঠিয়াছে , তাহাকে বৈশাখসন্ধ্যার ঝোড়ো বৃষ্টির মতো প্রবল বর্ষণে নিঃশেষ করিয়া দিব । কিন্তু , না পারিলাম বাংলায় শিশুপাঠ্য বই লিখিতে , কারণ, সংস্কৃত মুগ্ধবোধ ব্যাকরণ আমার পড়া নাই; আর, না পারিলাম কাব্য রচনা করিতে , কারণ মাতৃভাষা আমার জীবনের মধ্যে এমন পুষ্পিত হইয়া উঠে নাই যাহাতে নিজের অন্তরকে বাহিরে টানিয়া আনিতে পারি । সেইজন্যেই দেখিতেছি , আমার ভিতরকার শ্মশানচারী সন্ন্যাসীটা অট্টহাস্যে আপনাকে আপনি পরিহাস করিতে বসিয়াছে। না করিয়া করিবে কী। তাহার যে অশ্রু শুকাইয়া গেছে। জ্যৈষ্ঠের খররৌদ্রই তো জ্যৈষ্ঠের অশ্রুশূন্য রোদন।

আমার সঙ্গে যাহার বিবাহ হইয়াছিল তাহার সত্য নামটা দিব না। কারণ , পৃথিবীর ইতিহাসে তাহার নামটি লইয়া প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে বিবাদের কোনো আশঙ্কা নাই। যে তাম্রশাসনে তাহার নাম খোদাই করা আছে সেটা আমার হৃদয়পট । কোনোকালে সে পট এবং সে নাম বিলুপ্ত হইবে , এমন কথা আমি মনে করিতে পারি না । কিন্তু , যে অমৃতলোকে তাহা অক্ষয় হইয়া রহিল সেখানে ঐতিহাসিকের আনাগোনা নাই।

আমার এ লেখায় তাহার যেমন হউক একটা নাম চাই। আচ্ছা , তাহার নাম দিলাম শিশির। কেননা, শিশিরে কান্নাহাসি একেবারে এক হইয়া আছে , আর শিশিরে ভোরবেলাটুকুর কথা সকালবেলায় আসিয়া ফুরাইয়া যায়।

শিশির আমার চেয়ে কেবল দুই বছরের ছোটো ছিল । অথচ , আমার পিতা যে গৌরীদানের পক্ষপাতী ছিলেন না তাহা নহে। তাঁহার পিতা ছিলেন উগ্রভাবে সমাজবিদ্রোহী, দেশের প্রচলিত ধর্মকর্ম কিছুতে তাঁহার আস্থা ছিল না; তিনি কষিয়া ইংরাজি পড়িয়াছিলেন। আমার পিতা উগ্রভাবে সমাজের অনুগামী ; মানিতে তাঁহার বাধে এমন জিনিস আমাদের সমাজে , সদরে বা অন্দরে , দেউড়ি বা খিড়কির পথে খুঁজিয়া পাওয়া দায়, কারণ, ইনিও কষিয়া ইংরাজি পড়িয়াছিলেন। পিতামহ এবং পিতা উভয়েরই মতামত বিদ্রোহের দুই বিভিন্ন মূর্তি। কোনোটাই সরল স্বাভাবিক নহে। তবুও বড়ো বয়সের মেয়ের সঙ্গে বাবা যে আমার বিবাহ দিলেন তাহার কারণ, মেয়ের বয়স বড়ো বলিয়াই পণের অঙ্কটাও বড়ো। শিশির আমার শ্বশুরের একমাত্র মেয়ে। বাবার বিশ্বাস ছিল , কন্যার পিতার সমস্ত টাকা ভাবী জামাতার ভবিষ্যতের গর্ভ পূরণ করিয়া তুলিতেছে।

আমার শ্বশুরের বিশেষ কোনো-একটা মতের বালাই ছিল না। তিনি পশ্চিমের এক পাহাড়ের কোনো রাজার অধীনে বড়ো কাজ করিতেন। শিশির যখন কোলে তখন তাহার মার মৃত্যু হয়। মেয়ে বৎসর-অন্তে এক-এক বছর করিয়া বড়ো হইতেছে , তাহা আমার শ্বশুরের চোখেই পড়ে নাই। সেখানে তাঁহার সমাজের লোক এমন কেহই ছিল না যে তাঁহাকে চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিবে।

শিশিরের বয়স যথাসময়ে ষোলো হইল; কিন্তু সেটা স্বভাবের ষোলো, সমাজের ষোলো নহে। কেহ তাহাকে আপন বয়সের জন্য সতর্ক হইতে পরামর্শ দেয় নাই, সেও আপন বয়সটার দিকে ফিরিয়াও তাকাইত না।

কলেজে তৃতীয় বৎসরে পা দিয়াছি, আমার বয়স উনিশ, এমন সময় আমার বিবাহ হইল। বয়সটা সমাজের মতে বা সমাজসংস্কারকের মতে উপযুক্ত কি না তাহা লইয়া তাহারা দুই পক্ষ লড়াই করিয়া রক্তারক্তি করিয়া মরুক, কিন্তু আমি বলিতেছি, সে বয়সটা পরীক্ষা পাস করিবার পক্ষে যত ভালো হউক বিবাহের সম্বন্ধ আসিবার পক্ষে কিছুমাত্র কম ভালো নয়।

বিবাহের অরুণোদয় হইল একখানি ফোটোগ্রাফের আভাসে। পড়া মুখস্থ করিতেছিলাম। একজন ঠাট্টার সম্পর্কের আত্মীয়া আমার টেবিলের উপরে শিশিরের ছবিখানি রাখিয়া বলিলেন, “এইবার সত্যিকার পড়া পড়ো — একেবারে ঘাড়মোড় ভাঙিয়া।”

কোনো একজন আনাড়ি কারিগরের তোলা ছবি। মা ছিল না, সুতরাং কেহ তাহার চুল টানিয়া বাঁধিয়া, খোঁপায় জরি জড়াইয়া, সাহা বা মল্লিক কোম্পানির জবড়জঙ জ্যাকেট পরাইয়া, বরপক্ষের চোখ ভুলাইবার জন্য জালিয়াতির চেষ্টা করে নাই। ভারি একখানি সাদাসিধা মুখ, সাদাসিধা দুটি চোখ, এবং সাদাসিধা একটি শাড়ি । কিন্তু , সমস্তটি লইয়া কী যে মহিমা সে আমি বলিতে পারি না। যেমন-তেমন একখানি চৌকিতে বসিয়া, পিছনে একখানা ডোরা-দাগ-কাটা শতরঞ্চ ঝোলানো, পাশে একটা টিপাইয়ের উপরে ফুলদানিতে ফুলের তোড়া। আর, গালিচার উপরে শাড়ির বাঁকা পাড়টির নীচে দুখানি খালি পা।

পটের ছবিটির উপর আমার মনের সোনার কাঠি লাগিতেই সে আমার জীবনের মধ্যে জাগিয়া উঠিল। সেই কালো দুটি চোখ আমার সমস্ত ভাবনার মাঝখানে কেমন করিয়া চাহিয়া রহিল। আর , সেই বাঁকা পাড়ের নীচেকার দুখানি খালি পা আমার হৃদয়কে আপন পদ্মাসন করিয়া লইল।

পঞ্জিকার পাতা উল্ টাইতে থাকিল; দুটা-তিনটা বিবাহের লগ্ন পিছাইয়া যায়, শ্বশুরের ছুটি আর মেলে না। ও দিকে সামনে একটা অকাল চার-পাঁচটা মাস জুড়িয়া আমার আইবড় বয়সের সীমানাটাকে উনিশ বছর হইতে অনর্থক বিশ বছরের দিকে ঠেলিয়া দিবার চক্রান্ত করিতেছে। শ্বশুরের এবং তাঁহার মনিবের উপর রাগ হইতে লাগিল।

যা হউক, অকালের ঠিক পূর্বলগ্নটাতে আসিয়া বিবাহের দিন ঠেকিল। সেদিনকার সানাইয়ের প্রত্যেক তানটি যে আমার মনে পড়িতেছে। সেদিনকার প্রত্যেক মুহূর্তটি আমি আমার সমস্ত চৈতন্য দিয়া স্পর্শ করিয়াছি। আমার সেই উনিশ বছরের বয়সটি আমার জীবনে অক্ষয় হইয়া থাক্‌।

বিবাহসভায় চারি দিকে হট্টগোল ; তাহারই মাঝখানে কন্যার কোমল হাতখানি আমার হাতের উপর পড়িল। এমন আশ্চর্য আর কী আছে। আমার মন বারবার করিয়া বলিতে লাগিল, ‘ আমি পাইলাম , আমি ইহাকে পাইলাম। ‘

কাহাকে পাইলাম। এ যে দুর্লভ, এ যে মানবী, ইহার রহস্যের কি অন্ত আছে।

আমার শ্বশুরের নাম গৌরীশংকর। যে হিমালয়ে বাস করিতেন সেই হিমালয়ের তিনি যেন মিতা। তাঁহার গাম্ভীর্যের শিখরদেশে একটি স্থির হাস্য শুভ্র হইয়াছিল। আর, তাঁহার হৃদয়ের ভিতরটিতে স্নেহের যে-একটি প্রস্রবণ ছিল তাহার সন্ধান যাহারা জানিত তাহারা তাঁহাকে ছাড়িতে চাহিত না।

কর্মক্ষেত্রে ফিরিবার পূর্বে আমার শ্বশুর আমাকে ডাকিয়া বলিলেন, “ বাবা , আমার মেয়েটিকে আমি সতেরো বছর ধরিয়া জানি , আর তোমাকে এই ক ‘ টি দিন মাত্র জানিলাম , তবু তোমার হাতেই ও রহিল । যে ধন দিলাম, তাহার মূল্য যেন বুঝিতে পার , ইহার বেশি আশীর্বাদ আর নাই। ”

তাঁহার বেহাই বেহান সকলেই তাঁহাকে বার বার করিয়া আশ্বাস দিয়া বলিলেন, “ বেহাই , মনে কোনো চিন্তা রাখিয়ো না। তোমার মেয়েটি যেমন বাপকে ছাড়িয়া আসিয়াছে এখানে তেমনি বাপ মা উভয়কেই পাইল। ”

তাহার পরে শ্বশুরমশায় মেয়ের কাছে বিদায় লইবার বেলা হাসিলেন; বলিলেন , “ বুড়ি, চলিলাম। তোর একখানি মাত্র এই বাপ , আজ হইতে ইহার যদি কিছু খোওয়া যায় বা চুরি যায় বা নষ্ট হয় আমি তাহার জন্য দায়ী নই। ”

মেয়ে বলিল, “ তাই বৈকি । কোথাও একটু যদি লোকসান হয় তোমাকে তার ক্ষতিপূরণ করিতে হইবে। ”

অবশেষে নিত্য তাঁহার যে-সব বিষয়ে বিভ্রাট ঘটে বাপকে সে সম্বন্ধে সে বার বার সতর্ক করিয়া দিল। আহারসম্বন্ধে আমার শ্বশুরের যথেষ্ট সংযম ছিল না, গুটিকয়েক অপথ্য ছিল , তাহার প্রতি তাঁহার বিশেষ আসক্তি — বাপকে সেই-সমস্ত প্রলোভন হইতে যথাসম্ভব ঠেকাইয়া রাখা মেয়ের এক কাজ ছিল। তাই আজ সে বাপের হাত ধরিয়া উদ্‌বেগের সহিত বলিল, “ বাবা , তুমি আমার কথা রেখো — রাখবে ?”

বাবা হাসিয়া কহিলেন, “ মানুষ পণ করে পণ ভাঙিয়া ফেলিয়া হাঁফ ছাড়িবার জন্য, অতএব কথা না-দেওয়াই সব চেয়ে নিরাপদ। ”

তাহার পরে বাপ চলিয়া আসিলে ঘরে কপাট পড়িল। তাহার পরে কী হইল কেহ জানে না।

বাপ ও মেয়ের অশ্রুহীন বিদায়ব্যাপার পাশের ঘর হইতে কৌতূহলী অন্তঃপুরিকার দল দেখিল ও শুনিল । অবাক কাণ্ড! খোট্টার দেশে থাকিয়া খোট্টা হইয়া গেছে! মায়ামমতা একেবারে নাই!

আমার শ্বশুরের বন্ধু বনমালীবাবুই আবাদের বিবাহের ঘটকালি করিয়াছিলেন । তিনি আমাদের পরিবারেরও পরিচিত । তিনি আমার শ্বশুরকে বলিয়াছিলেন , “ সংসারে তোমার তো ঐ একটি মেয়ে । এখন ইহাদেরই পাশে বাড়ি লইয়া এইখানেই জীবনটা কাটাও।”

তিনি বলিলেন, “ যাহা দিলাম তাহা উজাড় করিয়াই দিলাম । এখন ফিরিয়া তাকাইতে গেলে দুঃখ পাইতে হইবে । অধিকার ছাড়িয়া দিয়া অধিকার রাখিতে যাইবার মতো এমন বিড়ম্বনা আর নাই।”

সব-শেষে আমাকে নিভৃতে লইয়া গিয়া অপরাধীর মতো সসংকোচে বলিলেন, “ আমার মেয়েটির বই পড়িবার শখ , এবং লোকজনকে খাওয়াইতে ও বড়ো ভালোবাসে । এজন্য বেহাইকে বিরক্ত করিতে ইচ্ছা করি না । আমি মাঝে মাঝে তোমাকে টাকা পাঠাইব । তোমার বাবা জানিতে পারিলে কি রাগ করিবেন।”

প্রশ্ন শুনিয়া কিছু আশ্চর্য হইলাম । সংসারে কোনো-একটা দিক হইতে অর্থসমাগম হইলে বাবা রাগ করিবেন , তাঁহার মেজাজ এত খারাপ তো দেখি নাই।

যেন ঘুষ দিতেছেন, এমনিভাবে আমার হাতে একখানা একশো টাকার নোট গুঁজিয়া দিয়াই আমার শ্বশুর দ্রুত প্রস্থান করিলেন; আমার প্রণাম লইবার জন্য সবুর করিলেন না। পিছন হইতে দেখিতে পাইলাম , এইবার পকেট হইতে রুমাল বাহির হইল ।

আমি স্তব্ধ হইয়া বসিয়া ভাবিতে লাগিলাম । মনে বুঝিলাম , ইহারা অন্য জাতের মানুষ।

বন্ধুদের অনেককেই তো বিবাহ করিতে দেখিলাম । মন্ত্র পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্ত্রীটিকে একেবারে এক গ্রাসে গলাধঃকরণ করা হয় । পাকযন্ত্রে পৌঁছিয়া কিছুক্ষণ বাদে এই পদার্থটির নানা গুণাগুণ প্রকাশ হইতে পারে এবং ক্ষণে ক্ষণে আভ্যন্তরিক উদ্‌বেগ উপস্থিত হইয়াও থাকে , কিন্তু রাস্তাটুকুতে কোথাও কিছুমাত্র বাধে না । আমি কিন্তু বিবাহসভাতেই বুঝিয়াছিলাম , দানের মন্ত্রে স্ত্রীকে যেটুকু পাওয়া যায় তাহাতে সংসার চলে , কিন্তু পনেরো-আনা বাকি থাকিয়া যায় । আমার সন্দেহ হয় , অধিকাংশ লোকে স্ত্রীকে বিবাহমাত্র করে , পায় না, এবং জানেও না যে পায় নাই ; তাহাদের স্ত্রীর কাছেও আমৃত্যুকাল এ খবর ধরা পড়ে না । কিন্তু , সে যে আমার সাধনার ধন ছিল ; সে আমার সম্পত্তি নয় , সে আমার সম্পদ ।

শিশির — না , এ নামটা আর ব্যবহার করা চলিল না । একে তো এটা তাহার নাম নয় , তাহাতে এটা তাহার পরিচয়ও নহে । সে সূর্যের মতো ধ্রুব ; সে ক্ষণজীবিনী উষার বিদায়ের অশ্রুবিন্দুটি নয় । কী হইবে গোপনে রাখিয়া। তাহার আসল নাম হৈমন্তী।

দেখিলাম , এই সতেরো বছরের মেয়েটির উপরে যৌবনের সমস্ত আলো আসিয়া পড়িয়াছে , কিন্তু এখনো কৈশোরের কোল হইতে সে জাগিয়া উঠে নাই । ঠিক যেন শৈলচূড়ার বরফের উপর সকালের আলো ঠিকরিয়া পড়িয়াছে , কিন্তু বরফ এখনো গলিল না । আমি জানি , কী অকলঙ্ক শুভ্র সে , কী নিবিড় পবিত্র ।

আমার মনে একটা ভাবনা ছিল যে , লেখাপড়া-জানা বড়ো মেয়ে , কী জানি কেমন করিয়া তাহার মন পাইতে হইবে । কিন্তু, অতি অল্পদিনেই দেখিলাম , মনের রাস্তার সঙ্গে বইয়ের দোকানের রাস্তার কোনো জায়গায় কোনো কাটাকাটি নাই । কবে যে তাহার সাদা মনটির উপরে একটু রঙ ধরিল , চোখে একটু ঘোর লাগিল, কবে যে তাহার সমস্ত শরীর মন যেন উৎসুক হইয়া উঠিল, তাহা ঠিক করিয়া বলিতে পারিব না।

এ তো গেল এক দিকের কথা । আবার অন্য দিকও আছে , সেটা বিস্তারিত বলিবার সময় আসিয়াছে ।

রাজসংসারে আমার শ্বশুরের চাকরি । ব্যাঙ্কে যে তাঁহার কত টাকা জমিল সে সম্বন্ধে জনশ্রুতি নানাপ্রকার অঙ্কপাত করিয়াছে , কিন্তু কোনো অঙ্কটাই লাখের নীচে নামে নাই । ইহার ফল হইয়াছিল এই যে , তাহার পিতার দর যেমন-যেমন বাড়িল হৈমর আদরও তেমনি বাড়িতে থাকিল । আমাদের ঘরের কাজকর্ম রীতিপদ্ধতি শিখিয়া লইবার জন্য সে ব্যগ্র , কিন্তু মা তাহাকে অত্যন্ত স্নেহে কিছুতেই হাত দিতে দিলেন না । এমন-কি , হৈমর সঙ্গে পাহাড় হইতে যে দাসী আসিয়াছিল যদিও তাহাকে নিজেদের ঘরে ঢুকিতে দিতেন না তবু তাহার জাত সম্বন্ধে প্রশ্নমাত্র করিলেন না , পাছে বিশ্রী একটা উত্তর শুনিতে হয় ।

এমনিভাবেই দিন চলিয়া যাইতে পরিত , কিন্তু হঠাৎ একদিন বাবার মুখ ঘোর অন্ধকার দেখা গেল । ব্যাপারখানা এই — আমার বিবাহে আমার শ্বশুর পনেরো হাজার টাকা নগদ এবং পাঁচ হাজার টাকার গহনা দিয়াছিলেন । বাবা তাঁহার এক দালাল বন্ধুর কাছে খবর পাইয়াছেন , ইহার মধ্যে পনেরো হাজার টাকাই ধার করিয়া সংগ্রহ করিতে হইয়াছে, তাহার সুদও নিতান্ত সামান্য নহে । লাখ টাকার গুজব তো একেবারেই ফাঁকি ।

যদিও আমার শ্বশুরের সম্পত্তির পরিমাণ সম্বন্ধে আমার বাবার সঙ্গে তাঁহার কোনোদিন কোনো আলোচনাই হয় নাই , তবু বাবা জানি না, কোন্‌ যুক্তিতে ঠিক করিলেন , তাঁহার বেহাই তাঁহাকে ইচ্ছাপূর্বক প্রবঞ্চনা করিয়াছেন।

তার পরে , বাবার একটা ধারণা ছিল , আমার শ্বশুর রাজার প্রধান মন্ত্রী-গোছের একটা-কিছু । খবর লইয়া জানিলেন , তিনি সেখানকার শিক্ষাবিভাগের অধ্যক্ষ। বাবা বলিলেন , অর্থাৎ ইস্কুলের হেড্ মাস্টার — সংসারে ভদ্র পদ যতগুলো আছে তাহার মধ্যে সব চেয়ে ওঁচা। বাবার বড়ো আশা ছিল , শ্বশুর আজ বাদে কাল যখন কাজে অবসর লইবেন তখন আমিই রাজমন্ত্রী হইব।

এমন সময়ে রাস-উপলক্ষে দেশের কুটুম্বরা আমাদের কলিকাতার বাড়িতে আসিয়া জমা হইলেন। কন্যাকে দেখিয়া তাঁহাদের মধ্যে একটা কানাকানি পড়িয়া গেল । কানাকানি ক্রমে অস্ফুট হইতে স্ফুট হইয়া উঠিল। দূর সম্পর্কের কোনো-এক দিদিমা বলিয়া উঠিলেন, “পোড়া কপাল আমার! নাতবউ যে বয়সে আমাকেও হার মানাইল। ”

আর-এক দিদিমাশ্রেণীয়া বলিলেন, “ আমাদেরই যদি হার না মানাইবে তবে অপু বাহির হইতে বউ আনিতে যাইবে কেন। ”

আমার মা খুব জোরের সঙ্গে বলিয়া উঠিলেন, “ ওমা , সে কি কথা । বউমার বয়স সবে এগারো বৈ তো নয় , এই আসছে ফাল্গুনে বারোয় পা দিবে । খোট্টার দেশে ডালরুটি খাইয়া মানুষ, তাই অমন বাড়ন্ত হইয়া উঠিয়াছে। ”

দিদিমারা বলিলেন, “ বাছা , এখনো চোখে এত কম তো দেখি না। কন্যাপক্ষ নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে বয়স ভাঁড়াইয়াছে।”

মা বলিলেন, “ আমরা যে কুষ্ঠি দেখিলাম। ”

কথাটা সত্য। কিন্তু কোষ্ঠীতেই প্রমাণ আছে , মেয়ের বয়স সতেরো।

প্রবীণারা বলিলেন , “ কুষ্ঠিতে কি আর ফাঁকি চলে না। ”

এই লইয়া ঘোর তর্ক , এমন-কি বিবাদ হইয়া গেল।

এমন সময়ে সেখানে হৈম আসিয়া উপস্থিত । কোনো-এক দিদিমা জিজ্ঞাসা করিলেন , “ নাতবউ , তোমার বয়স কত বলো তো। ”

মা তাহাকে চোখ টিপিয়া ইশারা করিলেন । হৈম তাহার অর্থ বুঝিল না ; বলিল , “ সতেরো। ”

মা ব্যস্ত হইয়া বলিয়া উঠিলেন, “ তুমি জান না। ”

হৈম কহিল , “ আমি জানি , আমার বয়স সতেরো। ”

দিদিমারা পরস্পর গা-টেপাটেপি করিলেন।

বধূর নির্বুদ্ধিতায় রাগিয়া উঠিয়া মা বলিলেন, “ তুমি তো সব জান! তোমার বাবা যে বলিলেন , তোমার বয়স এগারো । ”

হৈম চমকিয়া কহিল, “ বাবা বলিয়াছেন ? কখনো না। ”

মা কহিলেন , “ অবাক করিল । বেহাই আমার সামনে নিজের মুখে বলিলেন , আর মেয়ে বলে ‘ কখনো না ‘ ! ” এই বলিয়া আর-একবার চোখ টিপিলেন।

এবার হৈম ইশারার মানে বুঝিল; স্বর আরো দৃঢ় করিয়া বলিল, “ বাবা এমন কথা কখনোই বলিতে পারেন না। ”

মা গলা চড়াইয়া বলিলেন, “ তুই আমাকে মিথ্যাবাদী বলিতে চাস? ”

হৈম বলিল, “ আমার বাবা তো কখনোই মিথ্যা বলেন না। ”

ইহার পরে মা যতই গালি দিতে লাগিলেন কথাটার কালি ততই গড়াইয়া ছড়াইয়া চারি দিকে লেপিয়া গেল।

মা রাগ করিয়া বাবার কাছে তাঁহার বধূর মূঢ়তা এবং ততোধিক একগুঁয়েমির কথা বলিয়া দিলেন। বাবা হৈমকে ডাকিয়া বলিলেন, “ আইবড় মেয়ের মেয়ের বয়স সতেরো, এটা কি খুব একটা গৌরবের কথা, তাই ঢাক পিটিয়া বেড়াইতে হইবে? আমাদের এখানে এ-সব চলিবে না, বলিয়া রাখিতেছি। ”

হায় রে, তাঁহার বউমার প্রতি বাবার সেই মধুমাখা পঞ্চম স্বর আজ একেবারে এমন বাজখাঁই খাদে নাবিল কেমন করিয়া।

হৈম ব্যথিত হইয়া প্রশ্ন করিল, “ কেহ যদি বয়স জিজ্ঞাসা করে কী বলিব। ”

বাবা বলিলেন, “ মিথ্যা বলিবার দরকার নাই , তুমি বলিয়ো, ‘ আমি জানি না; আমার শাশুড়ি জানেন ‘ । ”

কেমন করিয়া মিথ্যা বলিতে না হয় সেই উপদেশ শুনিয়া হৈম এমন ভাবে চুপ করিয়া রহিল যে বাবা বুঝিলেন, তাঁহার সদুপদেশটা একেবারে বাজে খরচ হইল।

হৈমর দুর্গতিতে দুঃখ করিব কী, তাহার কাছে আমার মাথা হেঁট হইয়া গেল। সেদিন দেখিলাম, শরৎপ্রভাতের আকাশের মতো তাহার চোখের সেই সরল উদার দৃষ্টি একটা কী সংশয়ে ম্লান হইয়া গেছে । ভীত হরিণীর মতো সে আমার মুখের দিকে চাহিল। ভাবিল, ‘ আমি ইহাদিগকে চিনি না। ‘

সেদিন একখানা শৌখিন-বাঁধাই-করা ইংরাজি কবিতার বই তাহার জন্য কিনিয়া আনিয়াছিলাম। বইখানি সে হাতে করিয়া লইল এবং আস্তে আস্তে কোলের উপর রাখিয়া দিল, একবার খুলিয়া দেখিল না।

আমি তাহার হাতখানি তুলিয়া ধরিয়া বলিলাম, “ হৈম , আমার উপর রাগ করিয়ো না। আমি তোমার সত্যে কখনো আঘাত করিব না। আমি যে তোমার সত্যের বাঁধনে বাঁধা। ”

হৈম কিছু না বলিয়া একটুখানি হাসিল। সে হাসি বিধাতা যাহাকে দিয়াছেন তাহার কোনো কথা বলিবার দরকার নাই।

পিতার আর্থিক উন্নতির পর হইতে দেবতার অনুগ্রহকে স্থায়ী করিবার জন্য নূতন উৎসাহে আমাদের বাড়িতে পূজার্চনা চলিতেছে। এ-পর্যন্ত সে-সমস্ত ক্রিয়াকর্মে বাড়ির বধূকে ডাক পড়ে নাই। নূতন বধূর প্রতি একদিন পূজা সাজাইবার আদেশ হইল ; সে বলিল, “ মা , বলিয়া দাও কী করিতে হইবে। ”

ইহাতে কাহারো মাথায় আকাশ ভাঙিয়া পড়িবার কথা নয়, কারণ সকলেরই জানা ছিল মাতৃহীন প্রবাসে কন্যা মানুষ । কিন্তু, কেবলমাত্র হৈমকে লজ্জিত করাই এই আদেশের হেতু। সকলেই গালে হাত দিয়া বলিল , “ ওমা , এ কী কাণ্ড। এ কোন্‌ নাস্তিকের ঘরের মেয়ে । এবার এ সংসার হইতে লক্ষ্মী ছাড়িল, আর দেরি নাই। ”

এই উপলক্ষে হৈমর বাপের উদ্দেশে যাহা-না-বলিবার তাহা বলা হইল। যখন হইতে কটু কথার হাওয়া দিয়াছে হৈম একেবারে চুপ করিয়া সমস্ত সহ্য করিয়াছে। এক দিনের জন্য কাহারো সামনে সে চোখের জলও ফেলে নাই। আজ তাহার বড়ো বড়ো দুই চোখ ভাসাইয়া দিয়া জল পড়িতে লাগিল। সে উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, “ আপনারা জানেন- সে দেশে আমার বাবাকে সকলে ঋষি বলে ? ”

ঋষি বলে! ভরি একটা হাসি পড়িয়া গেল। ইহার পরে তাহার পিতার উল্লেখ করিতে হইলে প্রায়ই বলা হইত তোমার ঋষিবাবা! এই মেয়েটির সকলের চেয়ে দরদের জায়গাটি যে কোথায় তাহা আমাদের সংসার বুঝিয়া লইয়াছিল।

বস্তুত , আমার শ্বশুর ব্রাক্ষ্মও নন, খৃস্টানও নন , হয়তো বা নাস্তিকও না হইবেন। দেবার্চনার কথা কোনোদিন তিনি চিন্তাও করেন নাই। মেয়েকে তিনি অনেক পড়াইয়াছেন-শুনাইয়াছেন , কিন্তু কোনোদিনের জন্য দেবতা সম্বন্ধে তিনি তাহাকে কোনো উপদেশ দেন নাই । বনমালীবাবু এ লইয়া তাঁহাকে একবার প্রশ্ন করিয়াছিলেন। তিনি বলিয়াছিলেন, “ আমি যাহা বুঝি না তাহা শিখাইতে গেলে কেবল কপটতা শেখানো হইবে। ”

অন্তঃপুরে হৈমর একটি প্রকৃত ভক্ত ছিল, সে আমার ছোটো বোন নারানী। বউদিদিকে ভালোবাসে বলিয়া তাহাকে অনেক গঞ্জনা সহিতে হইয়াছিল। সংসারযাত্রায় হৈমর সমস্ত অপমানের পালা আমি তাহার কাছেই শুনিতে পাইতাম। এক দিনের জন্যও আমি হৈমর কাছে শুনি নাই। এ-সব কথা সংকোচে সে মুখে আনিতে পারিত না। সে সংকোচ নিজের জন্য নহে।

হৈম তাহার বাপের কাছ হইতে যত চিঠি পাইত সমস্ত আমাকে পড়িতে দিত। চিঠিগুলি ছোটো কিন্তু রসে ভরা। সেও বাপকে যত চিঠি লিখিত সমস্ত আমাকে দেখাইত। বাপের সঙ্গে তাহার সম্বন্ধটি আমার সঙ্গে ভাগ করিয়া না লইলে তাহার দাম্পত্য যে পূর্ণ হইতে পারিত না। তাহার চিঠিতে শ্বশুরবাড়ি সম্বন্ধে কোনো নালিশের ইশারাটুকুও ছিল না। থাকিলে বিপদ ঘটিতে পারিত। নারানীর কাছে শুনিয়াছি , শ্বশুরবাড়ির কথা কী লেখে জানিবার জন্য মাঝে মাঝে তাহার চিঠি খোলা হইত।

চিঠির মধ্যে অপরাধের কোনো প্রমাণ না পাইয়া উপরওয়ালাদের মন যে শান্ত হইয়াছিল তাহা নহে। বোধ করি তাহাতে তাঁহারা আশাভঙ্গের দুঃখই পাইয়াছিলেন । বিষম বিরক্ত হইয়া তাঁহারা বলিতে লাগিলেন, “ এত ঘন ঘন চিঠিই বা কিসের জন্য। বাপই যেন সব , আমরা কি কেহ নই। ” এই লইয়া অনেক অপ্রিয় কথা চলিতে লাগিল। আমি ক্ষুব্ধ হইয়া হৈমকে বলিলাম , “ তোমার বাবার চিঠি আর-কাহাকেও না দিয়া আমাকেই দিয়ো। কলেজে যাইবার সময় আমি পোস্ট করিয়া দিব। ”

হৈম বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “ কেন ? ”

আমি লজ্জায় তাহার উত্তর দিলাম না।

বাড়িতে এখন সকলে বলিতে আরম্ভ করিল, “ এইবার অপুর মাথা খাওয়া হইল। বি.এ. ডিগ্রি শিকায় তোলা রহিল। ছেলেরই বা দোষ কী। ”

সে তো বটেই । দোষ সমস্তই হৈমর। তাহার দোষ যে তাহার বয়স সতেরো ; তাহার দোষ যে আমি তাহাকে ভালোবাসি ; তাহার দোষ যে বিধাতার এই বিধি , তাই আমার হৃদয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সমস্ত আকাশ আজ বাঁশি বাজাইতেছে।

বি.এ.ডিগ্রি অকাতরচিত্তে আমি চুলায় দিতে পারিতাম কিন্তু হৈমর কল্যাণে পণ করিলাম, পাস করিবই এবং ভালো করিয়াই পাস করিব। এ পণ রক্ষা করা আমার সে অবস্থায় যে সম্ভবপর বোধ হইয়াছিল তাহার দুইটি কারণ ছিল — এক তো হৈমর ভালোবাসার মধ্যে এমন একটি আকাশের বিস্তার ছিল যে , সংকীর্ণ আসক্তির মধ্যে সে মনকে জড়াইয়া রাখিত না, সেই ভালোবাসার চারি দিকে ভারি একটি স্বাস্থ্যকর হাওয়া বহিত। দ্বিতীয় , পরীক্ষার জন্য যে বইগুলি পড়ার প্রয়োজন তাহা হৈমর সঙ্গে একত্রে মিলিয়া পড়া অসম্ভব ছিল না।

পরীক্ষা পাসের উদ্‌যোগে কোমর বাঁধিয়া লাগিলাম। একদিন রবিবার মধ্যাহ্নে বাহিরের ঘরে বসিয়া মার্টিনোর চরিত্রতত্ত্ব বইখানার বিশেষ বিশেষ লাইনের মধ্যপথগুলা ফাড়িয়া ফেলিয়া নীল পেন্সিলের লাঙল চালাইতেছিলাম, এমন সময় বাহিরের দিকে হঠাৎ আমার চোখ পড়িল।

আমার ঘরের সমুখে আঙিনার উত্তর দিকে অন্তঃপুরে উঠিবার একটা সিঁড়ি। তাহারই গায়ে গায়ে মাঝে মাঝে গরাদে-দেওয়া এক-একটা জানলা। দেখি, তাহারই একটি জানলায় হৈম চুপ করিয়া বসিয়া পশ্চিমের দিকে চাহিয়া। সে দিকে মল্লিকদের বাগানে কাঞ্চনগাছ গোলাপি ফুলে আচ্ছন্ন।

আমার বুকে ধক্‌ করিয়া একটা ধাক্কা দিল; মনের মধ্যে একটা অনবধানতার আবরণ ছিঁড়িয়া পড়িয়া গেল। এই নিঃশব্দ গভীর বেদনার রূপটি আমি এতদিন এমন স্পষ্ট করিয়া দেখি নাই।

কিছু না , আমি কেবল তাহার বসিবার ভঙ্গিটুকু দেখিতে পাইতেছিলাম। কোলের উপরে একটি হাতের উপর আর-একটি হাত স্থির পড়িয়া আছে , মাথাটি দেয়ালের উপরে হেলানো , খোলা চুল বাম কাঁধের উপর দিয়া বুকের উপর ঝুলিয়া পড়িয়াছে । আমার বুকের ভিতরটা হুহু করিয়া উঠিল।

আমার নিজের জীবনটা এমনি কানায় কানায় ভরিয়াছে যে , আমি কোথাও কোনো শূন্যতা লক্ষ করিতে পারি নাই। আজ হঠাৎ আমার অত্যন্ত নিকটে অতি বৃহৎ একটা নৈরাশ্যের গহ্বর দেখিতে পাইলাম। কেমন করিয়া কী দিয়া আমি তাহা পূরণ করিব।

আমাকে তো কিছুই ছাড়িতে হয় নাই। না আত্মীয়, না অভ্যাস, না কিছু। হৈম যে সমস্ত ফেলিয়া আমার কাছে আসিয়াছে। সেটা কতখানি তাহা আমি ভালো করিয়া ভাবি নাই। আমাদের সংসারে অপমানের কণ্টকশয়নে সে বসিয়া; সে শয়ন আমিও তাহার সঙ্গে ভাগ করিয়া লইয়াছি। সেই দুঃখে হৈমর সঙ্গে আমার যোগ ছিল, তাহাতে আমাদিগকে পৃথক করে নাই। কিন্তু , এই গিরিনন্দিনী সতেরো-বৎসর-কাল অন্তরে বাহিরে কত বড়ো একটা মুক্তির মধ্যে মানুষ হইয়াছে। কী নির্মল সত্যে এবং উদার আলোকে তাহার প্রকৃতি এমন ঋজু শুভ্র ও সবল হইয়া উঠিয়াছে। তাহা হইতে হৈম যে কিরূপ নিরতিশয় ও নিষ্ঠুররূপে বিচ্ছিন্ন হইয়াছে এতদিন তাহা আমি সম্পূর্ণ অনুভব করিতে পারি নাই , কেননা সেখানে তাহার সঙ্গে আমার সমান আসন ছিল না।

হৈম যে অন্তরে অন্তরে মুহূর্তে মুহূর্তে মরিতেছিল। তাহাকে আমি সব দিতে পারি কিন্তু মুক্তি দিতে পারি না — তাহা আমার নিজের মধ্যে কোথায়? সেইজন্যই কলিকাতার গলিতে ঐ গরাদের ফাঁক দিয়া নির্বাক্‌ আকাশের সঙ্গে তাহার নির্বাক্‌ মনের কথা হয়; এবং এক-একদিন রাত্রে হঠাৎ জাগিয়া উঠিয়া দেখি সে বিছানায় নাই, হাতের উপর মাথা রাখিয়া আকাশ-ভরা তারার দিকে মুখ তুলিয়া ছাতে শুইয়া আছে।

মার্টিনো পড়িয়া রহিল। ভাবিতে লাগিলাম, কী করি। শিশুকাল হইতে বাবার কাছে আমার সংকোচের অন্ত ছিল না— কখনো মুখোমুখি তাঁহার কাছে দরবার করিবার সাহস বা অভ্যাস আমার ছিল না। সেদিন থাকিতে পারিলাম না। লজ্জার মাথা খাইয়া তাঁহাকে বলিয়া বসিলাম, “ বউয়ের শরীর ভালো নয় , তাহাকে একবার বাপের কাছে পাঠাইলে হয়।”

বাবা তো একেবারে হতবুদ্ধি। মনে লেশমাত্র সন্দেহ রহিল না যে, হৈমই এরূপ অভূতপূর্ব স্পর্ধায় আমাকে প্রবর্তিত করিয়াছে। তখনই তিনি উঠিয়া অন্তঃপুরে গিয়া হৈমকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “ বলি বউমা , তোমার অসুখটা কিসের। ”

হৈম বলিল, “ অসুখ তো নাই। ”

বাবা ভাবিলেন, এ উত্তরটা তেজ দেখাইবার জন্য।

কিন্তু , হৈমর শরীরও যে দিনে দিনে শুকাইয়া যাইতেছিল তাহা আমরা প্রতিদিনের অভ্যাসবশতই বুঝি নাই। একদিন বনমালীবাবু তাহাকে দেখিয়া চমকিয়া উঠিলেন, “ অ্যাঁ , এ কী। হৈমী , এ কেমন চেহারা তোর! অসুখ করে নাই তো ?”

হৈম কহিল, “ না। ”

এই ঘটনার দিন-দশেক পরেই , বলা নাই , কহা নাই , হঠাৎ আমার শ্বশুর আসিয়া উপস্থিত। হৈমর শরীরের কথাটা নিশ্চয় বনমালীবাবু তাঁহাকে লিখিয়াছিলেন।

বিবাহের পর বাপের কাছে বিদায় লইবার সময় মেয়ে আপনার অশ্রু চাপিয়া নিয়াছিল। এবার মিলনের দিন বাপ যেমনি তাহার চিবুক ধরিয়া মুখটি তুলিয়া ধরিলেন অমনি হৈমর চোখের জল আর মানা মানিল না। বাপ একটি কথা বলিতে পারিলেন না; জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করিলেন না ‘ কেমন আছিস ‘। আমার শ্বশুর তাঁহার মেয়ের মুখে এমন-একটা কিছু দেখিয়াছিলেন যাহাতে তাঁহার বুক ফাটিয়া গেল।

হৈম বাবার হাত ধরিয়া তাঁহাকে শোবার ঘরে লইয়া গেল । অনেক কথা যে জিজ্ঞাসা করিবার আছে । তাহার বাবারও যে শরীর ভালো দেখাইতেছে না।

বাবা জিজ্ঞাসা করিলেন , “ বুড়ি , আমার সঙ্গে যাবি ? ”

হৈম কাঙালের মতো বলিয়া উঠিল , “ যাব। ”

বাপ বলিলেন , “ আচ্ছা , সব ঠিক করিতেছি। ”

শ্বশুর যদি অত্যন্ত উদ্‌বিগ্ন হইয়া না থাকিতেন তাহা হইলে এ বাড়িতে ঢুকিয়াই বুঝিতে পারিতেন, এখানে তাঁহার আর সেদিন নাই। হঠাৎ তাঁহার আবির্ভাবকে উপদ্রব মনে করিয়া বাবা তো ভালো করিয়া কথাই কহিলেন না। আমার শ্বশুরের মনে ছিল তাঁহার বেহাই একদা তাঁহাকে বার বার করিয়া আশ্বাস দিয়াছিলেন যে, যখন তাঁহার খুশি মেয়েকে তিনি বাড়ি লইয়া যাইতে পারিবেন। এ সত্যের অন্যথা হইতে পারে সে কথা তিনি মনেও আনিতে পারেন নাই।

বাবা তামাক টানিতে টানিতে বলিলেন, “ বেহাই , আমি তো কিছু বলিতে পারি না, একবার তা হলে বাড়ির মধ্যে — ”

বাড়ির-মধ্যের উপর বরাত দেওয়ার অর্থ কী আমার জানা ছিল। বুঝিলাম, কিছু হইবে না। কিছু হইলও না।

বউমার শরীর ভালো নাই! এত বড়ো অন্যায় অপবাদ!

শ্বশুরমশায় স্বয়ং একজন ভালো ডাক্তার আনিয়া পরীক্ষা করাইলেন। ডাক্তার বলিলেন, “ বায়ু-পরিবর্তন আবশ্যক, নহিলে হঠাৎ একটা শক্ত ব্যামো হইতে পারে। ”

বাবা হাসিয়া কহিলেন, “ হঠাৎ একটা শক্ত ব্যামো তো সকলেরই হইতে পারে। এটা কি আবার একটা কথা। ”

আমার শ্বশুর কহিলেন, “ জানেন তো , উনি একজন প্রসিদ্ধ ডাক্তার, উহার কথাটা কি —”

বাবা কহিলেন, “ অমন ঢের ডাক্তার দেখিয়াছি। দক্ষিণার জোরে সকল পণ্ডিতেরই কাছে সব বিধান মেলে এবং সকল ডাক্তারেরই কাছে সব রোগের সার্টিফিকেট পাওয়া যায়! ”

এই কথাটা শুনিয়া আমার শ্বশুর একেবারে স্তব্ধ হইয়া গেলেন। হৈম বুঝিল তাহার বাবার প্রস্তাব অপমানের সহিত অগ্রাহ্য হইয়াছে। তাহার মন একেবারে কাঠ হইয়া গেল।

আমি আর সহিতে পরিলাম না। বাবার কাছে গিয়া বলিলাম, “ হৈমকে আমি লইয়া যাইব। ”

বাবা গর্জিয়া উঠিলেন, “ বটে রে — ” ইত্যাদি ইত্যাদি।

বন্ধুরা কেহ কেহ আমাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছেন, যাহা বলিলাম তাহা করিলাম না কেন। স্ত্রীকে লইয়া জোর করিয়া বাহির হইয়া গেলেই তো হইত। গেলাম না কেন? কেন! যদি লোকধর্মের কাছে সত্যধর্মকে না ঠেলিব যদি ঘরের কাছে ঘরের মানুষকে বলি দিতে না পারিব, তবে আমার রক্তের মধ্যে বহুযুগের যে শিক্ষা তাহা কী করিতে আছে। জান তোমরা? যেদিন অযোধ্যার লোকেরা সীতাকে বিসর্জন দিবার দাবি করিয়াছিল তাহার মধ্যে আমিও যে ছিলাম। আর সেই বিসর্জনের গৌরবের কথা যুগে যুগে যাহারা গান করিয়া আসিয়াছে আমিও যে তাহাদের মধ্যে একজন। আর , আমিই তো সেদিন লোকরঞ্জনের জন্য স্ত্রীপরিত্যাগের গুণবর্ণনা করিয়া মাসিকপত্রে প্রবন্ধ লিখিয়াছি। বুকের রক্ত দিয়া আমাকে যে একদিন দ্বিতীয় সীতাবিসর্জনের কাহিনী লিখিতে হইবে , সে কথা কে জানিত।

পিতায় কন্যায় আর-একবার বিদায়ের ক্ষণ উপস্থিত হইল। এইবারেও দুইজনেরই মুখে হাসি। কন্যা হাসিতে হাসিতেই ভর্ৎসনা করিয়া বলিল, “ বাবা, আর যদি কখনো তুমি আমাকে দেখিবার জন্য এমন ছুটাছুটি করিয়া এ বাড়িতে আস তবে আমি ঘরে কপাট দিব। ”

বাপ হাসিতে হাসিতেই বলিলেন, “ ফের যদি আসি তবে সিঁধকাটি সঙ্গে করিয়াই আসিব। ”

ইহার পরে হৈমর মুখে তাহার চিরদিনের সেই স্নিগ্ধ হাসিটুকু আর একদিনের জন্যও দেখি নাই।

তাহারও পরে কী হইল সে কথা আর বলিতে পারিব না।

শুনিতেছি, মা পাত্রী সন্ধান করিতেছেন । হয়তো একদিন মার অনুরোধ অগ্রাহ্য করিতে পারিব না , ইহাও সম্ভব হইতে পারে। কারণ — থাক্‌, আর কাজ কী!

Categories
অনলাইন প্রকাশনা ইতিহাস গবেষণামূলক প্রকাশনা বিজ্ঞান

পৃথিবীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস – ১

পৃথিবীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস – ১
—————— ডঃ রমিত আজাদ

ভূমিকাংশ
লক্ষ লক্ষ বৎসর আগে মানুষ এই পৃথিবীতে এসেছে এবং আদিম মানুষ সম্ভবত পশু-পাখীর মতই প্রকৃতির দেয়া খাদ্য ও আশ্রয় অবলম্বন করে যাযাবরের জীবন যাপন করে বহুকাল ধরে জীবন সংগ্রাম করেছে। তারপর একসময় সে আগুনের ব্যবহার শিখে সৃষ্টিশীল হয়েছে, কৃষি আবিস্কার করে স্থায়ী বাসভুমি গড়ে তুলেছে। কালের স্রোতে উন্নততর জীবন ধারনের ঊপায়ই কেবল আবিষ্কার করে নাই, পাশাপাশি তার বুদ্ধি শ্রম ও বিবেক খাটিয়ে চারপাশের জগৎটিকে জানতে ও বুঝতে চেষ্টা করেছে। তার নিজের প্রয়োজনে অনেক কিছুকে বদলে দেবারও চেষ্টা করেছে। এই বিশাল বিশ্বব্রহ্মান্ডের অতি ক্ষুদ্র একটি গ্রহ পৃথিবীর পরে ঠিক কবে কোন ক্ষণে কিভাবে মানুষের আগমণ ঘটেছিল তা এখনো চুলচেরাভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি সত্য কিন্তু সে চেষ্টায় ভাটাও পরেনি কখনো। অতীতে মানুষ কেমন ছিল, তাদের জীবন কেমন কাটত, বর্তমানে প্রাপ্ত নানাবিধ তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে তার যুক্তিপূর্ণ অনুসন্ধানই ইতিহাস।

ইতিহাসের নানা দিক আছে – ভৌগলিক ইতিহাস, জীব-বৈচিত্রের ইতিহাস, নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস, রাজনৈতিক ইতিহাস, দর্শনের ইতিহাস, ধর্মীয় ইতিহাস, সাহিত্যের ইতিহাস, সামাজিক ইতিহাস, বিজ্ঞানের ইতিহাস অর্থনৈতিক ইতিহাস, আবার পৃথিবী জুড়ে নানাবিধ সামাজিক পরিবর্তনের পিছনে রয়েছে নানাবিধ দর্শনের প্রভাবের ইতিহাস, ইত্যাদি। এরা সকলে ইতিহাসের এক একটি অংশ হলেও সামগ্রিকভাবেও পৃথিবীর ইতিহাসকে দেখা প্রয়োজন। এই সিরিজে এই সব কিছুকে সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করব। পাঠকদের গঠনমূলক সমালোচনা আশা করছি।

শুরু করছি প্রাগৈতিহাসিক যুগ দিয়েঃ

প্রাগৈতিহাসিক যুগ
বিশ্বের ইতিহাস মুলতঃ হোমো স্যাপিয়েন্সের অতীত অভিজ্ঞতার স্মৃতি। ইতিহাস লিখতে গেলে লিখতে-পড়তে জানতে হবে। তাই লিখিত ইতিহাস সংরক্ষিত হয়েছে মানুষ লিখতে শেখার পর থেকে। কিন্তু তার আগেও তো মানবজাতি এই পৃথিবীতে বিচরণ করেছে কয়েক লক্ষ বছর, সেই সময়ের অভিজ্ঞতা জানব কেমন করে? এই যুগটিকে বলা হয় প্রাগৈতিহাসিক অর্থাৎ ইতিহাসেরও আগের যুগ। নিঃসন্দেহে এই যুগের কোন লিখিত রেকর্ড নেই। সেই সময়ের প্রাপ্ত বিভিন্ন পেন্টিং, অঙ্কন, ভাস্কর্য, এবং অন্যান্য হস্তনির্মিত নিদর্শন পাঠ করে অনেক তথ্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। বিংশ শতাব্দি থেকে প্রাগৈতিহাসিক যুগের গবেষণা অপরিহার্য বিবেচনা করা হয়েছে, কেননা একদিকে তা যেমন সেই সময়ের আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে জানার জন্য অত্যাবশ্যকীয় অন্যদিকে তা না করলে সাব সাহারান আফ্রিকা, পূর্ব এবং কলম্বিয়ান আমেরিকার মত গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতাগুলোও বাদ পরে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। কোন এক কালে পশ্চিমা ঐতিহাসিকরা কেবলমাত্র পশ্চিমী বিশ্বের উপরই মনোযোগ নিবদ্ধ করেছিলেন এবং যা কিছু শুরু করতেন শুরু করতেন প্রাচীন গ্রীস থেকে। কিন্তু সময়ের বিচারে গ্রীক সভ্যতা সিন্ধু ও ব্যাবিলনীয় সভ্যতা থেকে অনেক নবীন। এমনকি অস্ট্রেলিয়ান অ্যাবোরিজিনরা এবং নিউজিল্যান্ডের মাওরিরা তাদের ইতিহাস মৌখিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করে রেখেছিলো ইউরোপীয়দের সাথে তাদের যোগাযোগ হওয়ার অনেক আগে থেকেই।

বৃটিশ ইতিহাসবিদ E. H. Carr বলেছেন, ‘প্রাগৈতিহাসিক এবং ঐতিহাসিক এর মধ্যে প্রভেদ রেখা আমরা অতিক্রম করেছি যখন মানুষ শুধুমাত্র বর্তমানে বাস করা বন্ধ করেছে, এবং সচেতনভাবে তাদের অতীত এবং তাদের ভবিষ্যতের উভয়েই আগ্রহী হয়ে উঠেছে। ইতিহাস আরম্ভ হয় ঐতিহ্যের হস্তান্তরের মধ্যে দিয়ে; আর ঐতিহ্য মানে অতীত অভ্যাস ও অনুশীলনগুলোকে পরিবহণ করে ভবিষ্যতের মধ্যে ঠেলে দেয়া। অতীতের রেকর্ড ভবিষ্যত প্রজন্মের সুবিধার জন্যই সংরক্ষণ করে রাখা প্রয়োজন।’

(চলবে)

Categories
অনলাইন প্রকাশনা ইতিহাস শিশু

শিশুদের জিয়া

শিশুদের জিয়া
————– ডঃ রমিত আজাদ

দিনটি ছিল মহান একুশে ফেব্রুয়ারী। শহীদ মিনারের ঠিক উল্টা দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা বাগানে, একটি আড়াই বছরের শিশুকে মালি বা পিওন ধমকা ধমকি করছে, ফুল ধরেছে বলে। বাবা-মা মালিকে বোঝাতে পারছে না। তারপর আমি এগিয়ে গেলাম, “কি হয়েছে, আপনি বাচ্চাটাকে ধমকাচ্ছেন কেন?” বলল, “বাচ্চাটা ফুল ছিড়ছে তাই”। আমি বললাম, “ফুল তো ছিড়ে নাই, ধরেছে মাত্র”। ছোট শিশুটির বাবা বলল, “ওর তো মাত্র আড়াই বছর বয়স, একটু ফুল ধরে দেখতে চেয়েছে”। সেই মালি/পিওন বলল, “না, এখানে ফুলে হাত দেয়া নিষেধ, ফুল থাকবে সবাই দেখবে”। আমি বললাম, “ছোট বাচ্চা, এগুলো তো আর বুড়োদের জন্য না। বাচ্চারা দেখবে, হাসবে, খেলবে। ওদের জন্যই তো সবকিছু। পিওনটা গজগজ করতে করতে চলে গেল। এই হলো আমাদের দেশের সামগ্রিক অবস্থা, শিশুদের প্রতি আবেগ, নজর, ভালোবাসার অনেক অভাব।

কিন্তু এই আমাদের দেশেই এমন একজন রাষ্ট্রপতি ছিলেন, যিনি বুঝতে পেরেছিলেন, শিশুদের ভালো না বসলে দেশ বা জাতিকে ভালোবাসা হয়না। যেকোন জাতি গঠনের শুরু করতে হবে শিশুদেরকে দিয়ে। তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতি হলেন জিয়াউর রহমান। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, জাতির ভবিষ্যৎ হলো শিশুরা। যে কোন জাতি গঠন শিশুদেরকে দিয়েই শুরু করতে হবে। সেই উদ্দেশ্যেই তিনি বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেন।
১। শিশুদের সাংস্কৃতিক ও নানা জাতীয় মেধা চর্চার জন্য শিশু এ্যকাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন,
২। দেশের প্রতিটি বৃহত্তর জেলায় এ্যকাডেমির শাখা স্থাপন করেন,
৩। শিশুদের সাংস্কৃতিক প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে নতুন কুঁড়ি নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন, যা বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচার হতো। পরবর্তিকালে অনেক সুখ্যাত শিল্পি ঐ নতুন কুঁড়িরই প্রডাক্ট,
৪। সারাদেশে মেধাবী শিশু ছাত্রদের অনুপ্রেরণা দেয়ার লক্ষ্যে তাদের জন্য একটি সম্মেলনের আয়োজন করেন এবং সশরীরে সেখানে উপস্থিত হয়ে তাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করেন। সেই সম্মেলনে অংশগ্রহনকারী মেধাবী শিশুদের জন্য দিনটি ছিল স্মরণীয়,
৫। মেধাবী শিশুদের (ধনী হোক দরিদ্র হোক) লালণের নিমিত্তে নির্মিত সামরিক মেরিট স্কুল ক্যাডেট কলেজের সংখ্যা চারটি থেকে আটটিতে উন্নিত করেন,
৬। সুস্থ অর্থবহ ও উন্নত চলচিত্রের নির্মানের লক্ষ্যে তিনি রাষ্ট্রীয় অনুদানের ব্যবস্থা করেন। এই সময়ে বেশ কিছু ভালো ভালো শিশু চলচিত্র নির্মিত হয়, যেমন- ছুটির ঘন্টা, ডুমুরের ফুল, ডানপিটে ছেলেটি, অশিক্ষিত, এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী, ইত্যাদি,
সেই সময় বিটিভিতেও খুব সুন্দর সুন্দর শিশুতোষ অনুষ্ঠান হতো। এরমধ্যে একটি ধারাবাহিক নাটক ছিল, ‘রোজ রোজ’।
৭। জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালকে বাংলাদেশ শিশু বর্ষ ঘোষণা করেন। পুরো বছর জুড়ে সারাদেশে নানা রকম কর্মকান্ড হয়।
৮। শিশু পার্ক – সেনাবাহিনীর চাকুরী জীবনে তিনি জার্মানীতে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। সেই সময় তিনি নিশ্চয়ই সেখানকার অত্যাধুনিক শিশু পার্কগুলো দেখেছিলেন। তাছাড়া রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়েও তিনি একাধিক দেশ সফর করেছিলেন এবং সেসব দেশের শিশুপ্রেম ভালোভাবে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি তাই ঢাকাতে একটি অত্যাধুনিক শিশু পার্ক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিলেন। যেই চাওয়া সেই কাজ, খুব দ্রুতই কাজ শেষ করে ১৯৭৯ সালে উদ্ধোধন করলেন ‘ঢাকা শিশু পার্ক’। হুমড়ি খেয়ে পড়ল শুধু শিশুরা নয় পুরো ঢাকা শহর। শিশু, কিশোর, যুবা এমনকি প্রৌঢ়-বৃদ্ধরাও বাদ যায়নি। আমাদের কল্পনাতেই ছিলনা এমন কিছু একেবারে বাস্তব রূপে ধরা দিল। এই পার্ক দেখে প্রতিটি শিশুরই মনে হয়েছিল, এ যেন এক রূপকথার জগৎ।
এই পার্ক নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনাও আছে।
এক পাগলাটে যুবক, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী একটি আভ্যন্তরীণ বিমান হাইজ্যাক করে খেলনা পিস্তল দিয়ে। তারপর পাইলটকে বাধ্য করে বিমানটি কলকাতায় নিয়ে যেতে। কি আর করা? পাইলট তো আর বুঝতে পারেনি যে, সেটা খেলনা পিস্তল। যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে ছিনতাইকারীর কথাই শোনে। ছিনতাইকারীর কাছে তার দাবী শুনতে চাইলে সে বলে, “ঢাকার শিশু পার্কটি চরম বিলাসিতা, বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে এমন পার্কের প্রয়োজন নেই। আমি পার্কটি বন্ধ করার দাবী জানাচ্ছি”। এত সুন্দর একটা পার্ক, যা দেখে শিশুরা আনন্দে ভাসছে সেটা সে বন্ধ করার দাবী জানালো! এই একটা সমস্যা। আমরা কোন ভালো কিছুকে খুব সহজে গ্রহন করতে পারিনা।
৯। শিশুদের অধ্যায়নের সুবিধার্থে শাহবাগের পাবলিক লাইব্রেরীর পাশেই তিনি একটি শিশু গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন।

জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় এলেন তখন আমি পাঁচ পেরিয়ে ছয় বছরে পা রেখেছি। পত্রিকায় উনার বড় মাপের একটা ছবি দেখলাম, এটা মনে আছে। তার কিছুকাল পরে শুনলাম, তিনি ঢাকার মগবাজার, মধুবাগে আসবেন। ব্যাস প্রবল উৎসাহ পড়ে গেল। নির্দিষ্ট দিনে পথের পাশে দাঁড়িয়ে গেলাম। কিছু সময় অপেক্ষা করার পর দেখলাম, খোলা জীপে সামরিক পোষাকে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি, ধীরে ধীরে আমাকে অতিক্রম গেল জিপটি । এই প্রথম চোখের সামনে দেখলাম, সুদর্শন, সুপুরুষ, জনপ্রিয় এই রাষ্ট্রপতিকে। সেই ভালোলাগার অনুভূতি আমি কোনদিন ভুলব না। সম্ভবতঃ আরো একবছর পর তিনি আরেকবার এলেন
ঢাকার মগবাজার, মধুবাগে। আমি তখন মগবাজার টি এন্ড টি স্কুলের ছাত্র। স্কুলটির অবস্থা শোচনীয় ছিল। হেডমাস্টার দেখলেন এই তো সুযোগ, তিনি এক ফন্দি আটলেন। রাষ্ট্রপতি যাওয়ার পথে স্কুলের ছাত্র শিক্ষক মিলে তাঁর পথ আটকাবে যাতে কিছু অনুদান পাওয়া যায়। করলেনও তাই। রাষ্ট্রপতির গাড়ি বহরের সামনে ছিল মটর সাইকেল আরোহী গার্ডরা। তারা মৃদু হেসে থেমে গেলেন। একটু পর একটা জীপ এসে থামলো। তার পিছনে বাকী গাড়ীগুলোও থামলো। এর মধ্যে একটি ছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গাড়ী। এসময় জিয়াউর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন যে, শিশুদের অনেকেই উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছে উনার সাথে হ্যান্ডশেক করার জন্য। তিনি তার ডান হাতটি জানালার বাইরে বের করে দিলেন। বেশ কয়েকজন ছুটে গেল উনার সাথে হাত মিলানোর জন্য। আমিও ছুটে গিয়ে উনার সাথে হাত মিলিয়েছিলাম। সেই অনুভূতি আমি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মনে রাখবো।

খোলা জীপ থেকে একজন সুঠামদেহী সেনা কর্মকর্তা নেমে এসে কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন, “এভাবে রাষ্ট্রপতির গতি রোধ করা যায়না, আপনারা সরে দাঁড়ান”। পায়ে পায়ে সরে গেল সবাই। কিন্তু জিয়াউর রহমান ঘটনাটি মনে রেখেছিলেন, এবং পরে তিনি আমদের স্কুলের জন্য অনুদান পাঠিয়েছিলেন।

তৃতীয়বার উনাকে দেখেছিলাম, বাংলাদেশ শিশু বর্ষ ১৯৭৯ সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে, ঢাকা স্টেডিয়ামে। অনুষ্ঠানটি বর্নাঢ্য হয়েছিল, এবং স্বয়ং রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি তাকে আরো প্রানবন্ত করেছিল।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শিশুপ্রেমের আরেকটি ঘটনা আমি শুনেছিলাম আরেকজনার কাছ থেকে। তিনি বর্তমানে একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য্য। সে সময় জিয়াউর রহমান রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না। ছিলেন সেনা উপ-প্রধান ও বাংলাদেশ ক্যাডেট কলেজ সমূহের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে কি একটা মনমালিন্য হলো সিনিয়র জুনিয়রদের মধ্যে। মোটামুটি সিরিয়াস পর্যায়েই দাঁড়ালো। প্রিন্সিপাল বললেন আগামীকাল এর বিহিত করবেন। সবাই বুঝতে পারছিল, সিভিয়ার এ্যকশন নেবেন প্রিন্সিপাল, দু’য়েকজনকে কলেজ থেকে উইথড্রও করতে পারেন। প্রমাদ গুনছিল অনেকেই।

পরদিন সকালে হাউজের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল ক্যাডেটরা, এরকম সময় তারা বিস্মিত হয়ে দেখলো, ‘চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, সারা বাংলাদেশের উপ-সেনাপ্রধান ও ক্যাডেট কলেজ সমূহের দন্ডমুন্ডের কর্তা জিয়াউর রহমান। সংবাদ পেয়ে তিনি নিজেই চলে এসেছেন। তিনি কিছুক্ষণ প্রিন্সিপালের সাথে কথা বললেন, তারপর জুনির ক্লাসের (ক্লাস এইট অথবা নাইন) এই গোলযোগের রিং লিডারদের ডেকে সামনে দাঁড় করালেন। উনার হাতে ছিল একটা কেইন, আপন পিতার মত শাসনের সুরে তাদের তিরষ্কার করলেন এবং তাদের প্রত্যেকের পিঠে মৃদু চালালেন তার কেইন। আর সিনিয়রদেরও বাদ দিলেন না। তাদের আলাদা করে ডেকে নিয়ে গেলেন প্রিন্সিপালের রূমে, এবং সেখানে তাদেরকেও তিরষ্কার ও সাবধান করে দিলেন।

নিজের সন্তানদেরও কোন প্রশ্রয় দেননি তিনি। পত্রিকায় পড়েছিলাম, একবার তারেক রহমান বায়না ধরেছিল, বাবার সাথে বিদেশ সফরে যাবে। পিতা জিয়া সরাসরি নিষেধ করে দিয়েছিলেন। এরকম নিয়ম নেই, সুতরাং এটা কখনোই সম্ভব নয়। তারেক তখন বলল যে, নেপালের রাজা যখন বাংলাদেশ সফরে এলেন, তখন তাঁর সাথে তো তার ছেলে ছিল। ভীষণ রাগান্বিত হয়ে জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, “তোমরা কোন রাজা-বাদশার ছেলে নও”।

‘এমন একটি পৃথিবী কল্পনা করুন যেখানে কোন শিশু নেই, সেই পৃথিবীতে কি অফিস-আদালত কাজ করবে? ট্রেন চলবে? বিমান উড়বে? পেটের দায়ে সবই হবে হয়তো। কিন্তু এই সব কিছুর কোন অর্থ থাকবে না। কারণ আমরা যা কিছু করি, সবই ভবিষ্যতের জন্য করি, আর ভবিষ্যত মানেই শিশুরা।’

আমি শিশু হিসাবে তাঁকে যেমন দেখেছি। তাতে মনে হয়েছে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, উপরের কথাগুলোর মর্মার্থ বুঝতে পেরেছিলেন। আর তাই শিশুদের জন্য তিনি যতদূর সম্ভব অবদান রাখার চেস্টা করেছেন।

শিশু জিয়ার নাম ছিল কমল। আজ সেই কমলের জন্মদিন। আসুন আমরা সবাই মিলে তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

যেদিন তুমি এসেছিলে ভবে
কেঁদেছিলে তুমি আর হেসেছিল সবে
এমন জীবন ভবে করিবে গঠন
মরনে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন ।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গবেষণামূলক প্রকাশনা প্রকৌশল ও বিজ্ঞান বিজ্ঞান

The uncertainty Principle

The uncertainty Principle

–Dr. Ramit Azad
Atomic phenomenon ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যখন আমরা Classical Mechanics ও Electrodynamics ব্যবহার করি তা আমাদের এমন তাত্ত্বিক ফলাফল দেয় যা পরীক্ষালদ্ধ ফলাফলের সাথে বিরোধিতা করে। ফলে তত্ত্ব ও বাস্তবের মধ্যে পরস্পর বিরোধিতার সৃস্টি হয়। এই বিরোধিতা স্পষ্ট দেখা যায় যখন atom-এর model এ (যেখানে নিউক্লিয়াসের চতুর্দিকে electron-সমূহ classical orbit-এ ঘূর্ণায়মান) electrodynamics ব্যবহার করি। electromagnetic-এর আইন অনুযায়ী যে কোন ত্বরান্বিত charge অবিরাম electromagnetic wave emit করবে। এই জাতীয় emission যদি হতো তাহলে electron তার সমস্ত শক্তি হারিয়ে অনিবার্যভাবে nucleus-এর উপর পতিত হতো। এভাবে Classical Mechanics অনুযায়ী atom হতো unstable যা বাস্তবের সাথে কোন ক্রমেই মেলে না ।

তত্ত্ব ও পরীক্ষণের মধ্যে সৃষ্ট এই উল্লেখযোগ্য contradiction-টি এই নির্দেশ করে যে atomic phenomena-এ প্রয়োগযোগ্য একটি নতুন তত্ত্বের প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। Atomic phenomena হলো সেই phenomenon-সমূহ যা সংঘটিত হয় অতি ক্ষুদ্রকণিকাসমূহের মধ্যে । অতি ক্ষুদ্রকণিকাসমূহের তত্ত্বে থাকতে হবে physical concept- এর মৌলিক সংস্কার।

এই মৌলিক সংস্কারের investigation-এর সূচনা বিন্দু হিসাবে electron diffraction কে বিবেচনা করা সুবিধাজনক। এটি একটি পরীক্ষার দ্বারা পর্যবেক্ষণকৃত phenomenon । (যদিও electron diffraction আবিস্কৃত হয়েছে Quantum Mechanics-এর উদ্ভাবনার পরে তবে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় না গিয়ে, আমাদের আলোচনায় বিষয়টি বিবেচনার উদ্দেশ্য তত্ত্ব ও পরীক্ষার দ্বারা পর্যবেক্ষিত-এর মধ্যে স্পষ্ট সম্পর্ক প্রদর্শণ করা। এটা দেখা গিয়েছে একটি homogeneous electron beam যদি crystal-এর মধ্যে দিয়ে pass করে, তাহলে emergent beam প্রদর্শন করে এমন একটি pattern যেখানে alternate maxima ও minima intensity আছে যা কিনা সম্প–র্র্ণভাবে electromagnetic wave-এর diffraction pattern-এর অনুরূপ। এভাবে কিছু নির্দিষ্ট condition-এ material particle সমূহের আচরণ এমন feature দেখায় যা wave process-এ বিদ্যমান।
Electron diffraction phenomena চলতি classical idea-কে কতটুকু contradict করে, একটি কাল্পনিক পরীক্ষার সাহায্যে তা দেখানো যেতে পারে। ইলেকট্রনের জন্য ভেদনযোগ্য নয় এমন একটি পর্দা কল্পনা করি। পর্দাটিতে দুইটি slit কাটি। এবার মনে করি নীচের slit-টি ঢাকা, উপরের slit-টি দিয়ে electron diffraction হয়ে পিছনের পর্দায় একটি intensity distribution pattern দেখা যাবে। আবার, উপরের slit-টি ঢেকে নীচের slit-টির মধ্যে দিয়ে diffraction করি। এবারেও পিছনের পর্দায় একটি pattern দেখা যাবে। এবার দু’টি slit-ই খুলে দেই। classical idea অনুযায়ী আমরা এমন আশা করতে পারি যে এবারের প্রাপ্ত pattern-টি হবে, পূর্ববর্তী দু’টি pattern-এর superposition: প্রতিটি electron তার চলার পথে একটি slit-এর মধ্যে দিয়ে pass করে এবং অন্য slit- টির মধ্যে দিয়ে pass কারী electron-টিকে প্রভাবিত করে না। কিন্তু বাস্তবে electron diffraction-এর phenomenon আমাদের এই দেখায় যে interference জনিত যে diffraction pattern-টি আমরা পাই তা কোনক্রমেই প্রতিটি slit-এর মধ্যে দিয়ে পৃথক পৃথক ভাবে প্রাপ্ত diffraction pattern-এর superposition না। এটা স্পষ্ট যে প্রাপ্ত ফলাফল আমাদের এই বোঝায় যে electron একটি নির্দিস্ট পথে ভ্রমণ করে এমন ধারণা সঠিক নয়। এইভাবে যে Mechanics atomnic phenomenon-গুলো নিয়ে কাজ করে (Quantum Mechanics অথবা wave Mechanics) তা এমন ভাবনা (idea)র উপর ভিত্তি করে হবে যা Classical mechanics-এর ধারণা থেকে মৌলিক ভাবেই ভিন্ন। Quantum Mechanics-এ path of particle-এর কোন ধারণাই (concept) নাই। এটাই uncertainty principle-এর ধারণাই (concept) গঠন করে। এই uncertainty principle হলো Quantum Mechanics-এর একটি মৌলিক নীতি যা আবিষ্কার করেছেন Warren Heisenberg, ১৯২৭ সালে।

এইভাবে Quantum Mechanics, Classical Mechanics-এর সাধারণ ভাবণাগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে, এভাবে uncertainty principle-কে বলা যায় negative in content. অবশ্যই এই principle-টি particle-সমূহের একটি নতুন Mechanics তৈরীর জন্য যথেষ্ট না । অবশ্যই এই জাতীয় তত্ত্ব কোন ধনাত্মক দৃঢ় উক্তির উপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত, যা নিয়ে আমরা নীচে আলোচনা করব।

যাহোক, এই জাতীয় দৃঢ় উক্তি (assertion)-গুলোর সূত্রায়নের জন্য আমরা প্রথমে স্থির করব Quatum Mechanics-কে confront করে সই জাতীয় সমস্যাগুলোর statement । এটা করতে গিয়ে আমরা প্রথমে Quatum Mechanics ও Classical Mechanics-এর মধ্যেকার interrelation-এর special nature-গুলোকে পরীক্ষা করব। একটি অধিকতর সাধারণ তত্ত্ব যৌক্তিক ভাবে formulate করা যায়। একটি অল্পতর সাধারণ তত্ত্ব যা তৈরী করে একটি limiting case, কোন কিছ–র ঊপর নির্ভর করেনা ।এইভাবে fundamental principle-গুলোর উপর ভিত্তি করে Relativistic Mechanics গঠন করা যায়, এরজন্য Classical (Newtonian)
Mechanics-এর reference-এর কোন প্রয়োজন পড়ে না কিন্ত Quatum Mechanics-এর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন, Classical Mechanics-কে ব্যবহার না করে Quantum Mechanics-এর basic concept তৈরী করা অসম্ভব। Electron- এর কোন নির্দিষ্ট path নাই বাস্তবতাটি এই বলে যে তার কোন dynamical characteristics -ও নাই । এভাবে এটা স্পষ্ট যে quantum object দ্বারা সৃষ্ট কোন একটি system-এর জন্য logically independent mechanics তৈরী করা সম্ভব না।

একটি electron-এর motion-এর quantum description এমন physical object-এর উপস্থিতি দাবী করে যা যথেষ্ট পরিমাণে Classical Mechanics মেনে চলে। যদি electron এই রকম কোন classical object-এর সাথে interact করে, তাহলে ঐ classical object-টি altered হয়। এই পরিবর্তনের nature এবং magnitude নির্ভরশীল হবে electron-টির state-এর উপর এবং এইভাবে তাকে quantitatively characterize করা যাবে।

এই সম্পর্কে classical object-টিকে বলা হয় apparatus, এবং electron-এর সাথে তার interaction-কে বলা হচ্ছে measurement। তবে একথাও জোর দিয়ে বলা প্রয়োজন যে আলোচনার এই পর্যায়ে আমরা এই বিষয়টি আলোচনার অন্তর্ভূক্ত করছি না যে আমাদের measurement process-এ physicist observer অংশগ্রহণ করছে।

Quantum Mechanics-এ আমরা measurement বলতে এই বুঝি যে classical ও quantum object-এর মধ্যে interaction-এর যে কোন process, যা observer-এর উপরে নির্ভরশীল নয়। Quantum Mechanics-এ concept of measurement-এর গুরুত্বের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ (elucidate) করেছিলেন Niels Bohr.

Apparatus বলতে আমরাএমন physical object-কে বোঝাব যা classical mechanics অনুযায়ী যথেষ্ট accuracy দ্বারা ঠিক করা হয়। যেমন একটি body যার অনেক ভর আছে। আবার, এটা মনে করাও ঠিক হবেনা যে apparatus-টিকে macroscopic-ই হতে হবে। এই পরিস্থিতিতে কোন একটি apparatus-এর কোন অংশ microscopic-ও হতে পারে। যেহেতু with sufficient accuracy-র ধারণাটি actual proposed problem-টির উপর নির্ভরশীল এইভাবে wilson chamber-এ কোন electro-এর motion-কে observe করা হয়। Electron-টি যে cloudy track-টি রেখে যায় তার দ্বারা এবং তার পুরুত্ব খুব বড় এবং atomic dimension-এর সাথে তুলনীয়; যখন path-টি এত low accuracy দ্বারা নির্ণিত, তখন electron-টি সম্পূর্ণরূপে classical object

এইভাবে physical theory সমূহের মধ্যে Quantum mechanics একটি unusual স্থান দখল করে Quantum mechanics limiting case হিসাবে classical mechanics-কে ধারণ করে আবার একই সাথে তার নিজের formulation-এর জন্যই তার এই limiting case-টির প্রয়োজন।

এখন আমরা Quantum Mechanics-এর কিছু সমস্যা (অংক) formulate করতে পারি। একটি typical সমস্যা হলো কোন একটি previous measurement-এর জ্ঞাত ফলাফল থেকে subsequent measurement-কে predict করা উপরন্ত পরবর্তিতে আমরা দেখব যে, Classical Mechanics-এর তুলনায় Quantum Mechanics, restrict the range of value যা কিনা বিভিন্ন physical quantuty ধারণ করতে পারে (যেমন energy): অর্থাত্ সেই মানগুলো যা কোন পরিমাপের ফলাফল হিসাবে পাওয়া যাবে। Quantum Mechanics-এর metrhod সমূহ এই সকল admissible ( অনুজ্ঞেয় ) value নির্ণয় করতে সাহায্য করে।

Quantum Mechanics-এ Measuring process-টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা সবসময়ই electron-টিকে affect করে এবং নীতিগতভাবেই এই effect টাকে ছোট করা অসম্ভব। Measurement যত বেশী exact হবে effect তত strong হবে এবং কেবলমাত্র খুবই low accuracy measurement-এ effect on measurement ছোট হবে। Measurement-এর ধর্ম যুক্তিসংগতভাবে এই fact-এর সাথে সম্পর্কিত যে electron-এর dynamical characteristic কেবলমাত্র measurement-এর ফলাফল হিসাবেই appear করে। এটা পরিস্কার যে, যদি object-এর উপর Measuring process-এর effect যদি arbitrarily ছোট করা যায়, এটা এই অর্থ বহন করবে যে পরিমিত রাশির একটি নিজস্ব মান আছে যা এর measurement-এর উপর নির্ভর করে না।

ভিন্ন ধরণের measurement-এর মধ্যে, electron-এর coordinate-এর measurement-টি fundamental ভূমিকা পালন করে। Quantum Mechanics-এর applicability-র limit-এর মধ্যে electron-এর coordinate-এর measurement যে কোন desired accuracy দ্বারা সম্পন্ন করা যাবে।

মনে করি, একটি নির্দিষ্ট time interval ∆t-তে, একটি electron-এর coordinate-এর কিছু successive measurement করলাম। ফলাফলসমূহ একটি smooth curve-এর উপর থাকবে না। বরং, যত accurately measure করা হবে প্রাপ্ত ফলাফলগুলোর variable হবে তত বেশী discontinuous ও disorderly, যেহেতু electron-এর কোন path নাই। একটা smooth path পাওয়া যেতে পারে যদি electron-এর coordinate low degree of accuracy-তে মাপা হয়। যেমন Wilson chamber-এর vapour droplet-এর condensation থেকে যে পরিমাপ করা হয়

আবার যদি accuracy of measurement অপরিবর্তনীয় রেখে interval ∆t-কে যদি diminish করা হয় তাহলে adjacent measurement, coordinate-এর মান দেয়। however, series of successive measurement সমূহের ফলাফলগুলো একটি region -এ বর্ণিত হবে পুরোপুরি irregular manner-এ তারা কোন smooth curve-এর উপর থাকবে না। যখন ∆t tends to zero তখন ফলাফল কোন ক্রমেই একটি সরলরেখার উপর থাকে না।

এই পরিস্থিতি এই দেখায় যে Quatum Mechanics-এ Classical Mechanics-এর sense-এ velocity of particle-এর কোন concept নাই। অর্থ্যাৎ limit যেখানে coordinate-এর difference দু’টি instant-এ ∆t interval দ্বারা ভাগ করলে, তা (সেই limit) tends যেহেতু ∆t tends to zero যাহোক পরবর্তিতে আমরা দেখাব যে Quantum Mechanics-এ কোন একটি given instant-এ একটি particle-এর velocity-কে কোনরূপেই যৌক্তিক সংজ্ঞায়ন করা সম্ভব না। কিন্ত যেখানে Classical Mechanics-এ একটি particle-এর একই সাথে velocity ও coordinate নির্ণয় করা যায় সেখানে Quantum Mechanics-এ situation সম্পূর্ণ ভিন্ন। যদি কোন পরিমাপের ফলাফল হিসাবে electron-এর নির্দিষ্ট একটি coordinate পাওয়া যায়, তাহলে তার নির্দিষ্ট কোন velocity পাওয়াই যাবে না । উল্টোভাবে, electron-এর নির্দিষ্ট velocity পাওয়া গেলে নির্দিষ্ট coordinate পাওয়া যাবে না। coordinate ও velocity-র যুগপৎ অস্তিত্ত্ব এই বোঝাবে যে particle-টির একটি নির্দিষ্ট path আছে। এভাবে Quantum Mechanics-এ coordinate এবং velocity এমন দু’টা quantuty যা একই সাথে নির্ণয় করা সম্ভব না। এখান থেকে এই বোঝা যায় যে আমরা এমন quantitative realation-কে derive করব যা নির্ণয় করে possibility of an exact measurement of the coordinate and velocity at the same instant. Classical Mechanics-এ কোন physical system-এর state-এর বর্ণনা নির্ভর করে একই ক্ষণে তার coordinate ও velocity- র উপর।

References:
1. Quantum Mechanics, Landau L. & Evgeni Lifshits
2. Physics for All, Landau L., Kitaigorodski, Perelman

Categories
অনলাইন প্রকাশনা আত্ম উন্নয়ন সৃজনশীল প্রকাশনা

চেতনার সংকট

চেতনার সংকট
——-ডঃ রমিত আজাদ

আধুনিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বেশি দিনের নয়। ইতিপূর্বে ছিল ‘রাজ্য’। রাজ্যের প্রতিষ্ঠা জনসমর্থনে হতো না। রাজ্যের প্রধান বাহুবলে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে সিংহাসনে আরোহন করতেন। রাজ্যে জনগণনের ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন মূল্য ছিল না। রাজার ইচ্ছাই ছিল আইন। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে তিনি সভাসদদের পরামর্শ নিতেন। সেখানে জনগণের কোন অংশগ্রহণ থাকতো না। ঐতিহ্যগত কারণে জনতা রাজা ও সিংহাসনকে সম্মান করত।

এক সময় এই মূল্যবোধের পরিবর্তন ঘটল। জনগণ বুঝতে শুরু করলো তাদেরই অর্থপুষ্ট প্রতিষ্ঠানে তাদের অধিকার নেই। এই অসন্তোষ যতই বাড়তে থাকে, সিংহাসনের প্রতি সম্মান ততই কমতে থাকে। মানব সভ্যতার বিকাশে এই রকম একটি পর্যায়ে, নির্যাতিত ও নিগৃহিত প্রজাদের মধ্যে দানা বেঁধে ওঠা অপরিসীম গণ অসন্তোষ থেকে সৃষ্ট বিপ্লবের মাধ্যমে পতন হয়েছিল প্রবল প্রতাপশালী রোম সাম্রাজ্যের।

এই পতনের পেছনে কাজ করেছিল একটি চেতনা। যীশু খ্রীষ্টের প্রচারিত খ্রীষ্ট ধর্মীয় ‘চেতনা’। হ্যাঁ চেতনাই মানুষকে পশুকূল থেকে পৃথক করে। চেতনা জীবনকে অর্থবহ করে। বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগায়। মানব সভ্যতার বিকাশের এক একটি যুগের সূচনায় কাজ করেছিল এক একটি চেতনা।

খ্রীষ্ট ধর্মীয় চেতনা এক সময় ইউরোপবাসীকে রোমক নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করেছিল। আবার এই চেতনাকে পূঁজি করেই কিছুকাল পরে একদল মানুষ সৃষ্টি করল নির্যাতনের নতুন অধ্যায়। চার্চ হয়ে উঠল প্রধান সামন্ত। ধর্মীয় অনুশাসন মানুষকে বেঁধে ফেলল আষ্টেপৃষ্ঠে। এ পর্যায়ে প্রয়োজন হল নতুন চেতনার।

এই নতুন চেতনাটির ভিত রচিত হয়েছিল ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যকার শতর্বষব্যপি যুদ্ধে (১৩৩৭-১৪৫৩)। এর দার্শনিক রূপ দিয়েছিলেন নিকোলো দি ভের্নাদো মেকিয়েভেলি (১৪৬৯-১৫২৭)। চার্চের অনুশাসন মুক্ত হয়ে জনতা কেন্দ্রিক সেক্যুলার রাষ্ট্র গঠনের দর্শন প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। পরবর্তীতে বডেন (১৫৩০-১৫৯৬) ‘সার্বভৌমত্বে’র ধারণা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি আরো বলেন, ‘রাষ্ট্র হলো জনতার ক্ষমতা’। এই দর্শনগুলোই এক সময় ‘জাতীয়তাবাদী চেতনা’র উন্মেষ ঘটায় যার প্রবল বিকাশ ঘটে ফরাসী বিপ্লবের (১৭৮৯) মধ্য দিয়ে। তখন থেকেই প্রতিষ্ঠা হতে শুরু করে জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ আধুনিক রাষ্ট্রসমূহ।

জাতীয়তাবাদ সংক্রান্ত আলোচনার গভীরে যাওয়ার আগে জাতির সংজ্ঞাটি দেয়া প্রয়োজন। এই সংজ্ঞা দিতে গিয়ে অনেক সমাজ বিজ্ঞানী থমকে দাঁড়িয়েছেন। কার্ল মার্কস সম্ভবত কোন সংজ্ঞাই দেননি। যা হোক, তার পরেও মোটামুটিভবে গৃহিত একটি সংজ্ঞা আছে। তা হলো, ‘যে বৃহৎ জনগোষ্ঠী একটি নির্দিষ্ট ভাষায় কথা বলে, যাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য আছে, যারা একটি নির্দিষ্ট ভূÑখন্ডের অধিবাসী এবং যাদের মধ্যে আবেগগত ঐক্য রয়েছে, সেই বৃহৎ জনগোষ্ঠী একটি জাতি।’

জাতি ও জাতিসত্তা বিষয়ক পার্থক্যমূলক আলোচনায় না গিয়ে উপরের সংজ্ঞাটিকে যথাযথ ধরে আমি পরবর্তী আলোচনায় প্রবেশ করছি।

‘জাতীয়তাবাদ’ জাতি ভিত্তিক একটি চেতনা। আদিম সমাজের গোত্র চেতনার নতুন রূপ। আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যুগের ঊষালগ্নে সামন্ততান্ত্রিক খন্ড-বিখন্ডতা থেকে উঠে এসে অখন্ড রাষ্ট্র গঠনে এবং চার্চের অনুশাসন মুক্ত সেক্যুলার রাষ্ট্র গঠনে, সর্বপোরি সিংহাসনের প্রভাব খর্ব করে জনতাকেন্দ্রিক পার্লামেন্ট ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে এই চেতনা বিশেষ ভুমিকা রাখে।

পরবর্তীতে এই চেতনাই উগ্র রূপ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়। এই উগ্রতার নাম হয় ‘শোভিনিজম।’ শোভিনিজমের উপর ভিত্তি করে ইউরোপের কয়েকটি রাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী উপনিবেশ গড়ে তোলা শুরু করে। এমন একটি পর্যায়ে বাংলা ইংরেজদের উপনিবেশে পরিণত হয়। উল্লেখ্য যে, এ সময় বাংলায় কোন জাতীয়তাবাদী চেতনা ছিল না। তাই ইংরেজদের দূরভিসন্ধি বোঝা সবার পক্ষে সম্ভব হয়নি। যদিও বিচক্ষণ নবাব আলীবর্দী খান পৌত্র নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে ইংরেজদের মতি-গতি সম্পর্কে সাবধান করে দিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু মসনদ দখলের লড়াইয়ে অন্ধ হয়ে নবাবের বেশীর ভাগ সদস্যই পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজের পক্ষ নিয়েছিল। জাতীয়তাবাদী চেতনা থাকলে সেদিন এই ভুল নাও হতে পারত।

পলাশীর পাপ মোচনের উদ্দেশ্যে মীরজাফর একবার এবং মীর কাসিম একবার ইংরেজের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ইংরেজ তখন এমনভাবে জাল বিস্তার করেছে, যে তা আর কাটা সম্ভব হয়নি। এই পর্যায়ে বাংলার বুদ্ধিজীবীরা বুঝতে শুরু করেন জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রতিষ্ঠা করে গণজাগরণ সৃষ্টি না করে উপনিবেশিকতা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। এভাবেই নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে স্বাধীনতার প্রতীক করে সৃষ্টি করা হয় বাংলার প্রথম জাতীয়তাবাদী চেতনা। এই চেতনার মূল মন্ত্র ছিল ‘ইংরেজ, তুমি বাংলা ছাড়’।

ধীরে ধীরে ভারতের অন্যান্য জাতিগুলোও এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ইংরেজ হটাও আন্দোলনে নামে। কিন্তু চতুর ইংরেজও কম যায় না। কখনও অস্ত্রের জোরে, কখনও সমান্তরাল চেতনার সৃষ্টি করে বিভেদ সৃষ্টি করে তারা আন্দোলনকে ভোঁতা করতে থাকে। ভারতবাসীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির মূল অস্ত্র হিসাবে তারা ব্যবহার করে ‘ধর্মীয় সা¤প্রদায়িক চেতনা।’

ভারত ছাড় আন্দোলনের চরম পর্যায়ে গঠিত হয় রাজনৈতিক দল ‘কংগ্রেস’। রোম সাম্রাজ্যের একটি সভার নাম ছিল কংগ্রেস। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছিল ভারতের স্বাধীনতাকামীদের সৃষ্ট এই দল। আসলে কংগ্রেস ছিল ইংরেজদেরই সমর্থনপুষ্ট একটি দল। এর প্রতিষ্ঠার পেছনে হাত ছিল লর্ড ডাফরিনের। পরবর্তীকালে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আগত এম. করমচাঁদ গান্ধির নেতৃত্বে দলীয় রাজনীতি নতুন স্রোত পায়। তদুপরি কংগ্রেস তার বিশেষ উদ্দেশ্য অর্থাৎ উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের স্বার্থ রক্ষার ব্রত থেকে বিচ্যুত হয়নি। কংগ্রেসের নেতৃত্বে ভারত ¯¦াধীন হলে তা উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের শাসনাধীণ হয়ে যেতে পারে এবং তফসীলি স¤প্রদায় ও মুসলমানরা ইংরেজ আমলের মতই নির্যাতিত থেকে যাবে। দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মুসলমান এলিট স¤প্রদায় এই কূটকৌশল টের পেয়ে নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে গঠন করেন ‘মুসলীম লীগ’। মুসলীম লীগ ছিল কংগ্রেসের কাউন্টার। ঢাকার শাহবাগে নবাব সলিমুল্লাহর এক ভবনে এই লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুর পর, শেরে বাংলা মুসলীম লীগের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে এই দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। উল্লেখ্য, মুসলীম লীগের প্রতিষ্ঠার সাথে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কোন সম্পর্ক ছিল না। মুসলীম লীগে জিন্নাহর প্রবেশ অনেক পরে।

কংগ্রেস ও মুসলীম লীগের নেতৃত্বে ভারতবর্ষে দু’টি ভিন্ন চেতনার বিকাশ হতে থাকে। বাংলায় তখন দুইটি স¤প্রদায়ের বসবাস। একটির সংখ্যাধিক্য পশ্চিমে ও অপরটি পূর্বে। তাঁদের ভাষা এক কিন্তু ধর্ম ভিন্ন। তাই সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যগত পার্থক্যও আছে। এই পার্থক্যই চেতনাগত পার্থক্য এনে দেয়। ভৌগলিক ভাগাভাগির প্রশ্নও তুলে ধরে। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনাকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন বাঙালীর রাজনীতির কথা বলেছিলেন কিন্তু তাকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন নি। কারণ যুগটি ছিল ধর্মীয় চেতনার যুগ। পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে ভাষাগত মিল ছিল কিন্তু চেতনাগত পার্থক্য ছিল। প্রবন্ধের শূরুতেই বলেছিলাম জাতি গঠনে আবেগগত ঐক্যের কথা। পূর্ব ও পশ্চিম বঙ্গের মধ্যে ছিল আবেগগত অনৈক্য। তাই অখন্ড জাতি হিসাবে তাদের আত্মপ্রকাশ করা সম্ভব ছিল না।

ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের পর ভৌগলিক ভাগাভাগি নিশ্চিত হয়ে পড়ে। পূর্ব বাংলায় শক্তিশালী রূপ ধারণ করে একটি চেতনা— ইসলাম ধর্ম। সেই সময়ের রাজনীতির সব উজ্জ্বল তারকা শেরে বাংলা ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, খাজা নাজিমুদ্দিন, ছাত্রনেতা বঙ্গবন্ধ– শেখ মুজিবুর রহমান সবাই ছিলেন এই চেতনায় উদ্বূদ্ধ। তাঁরা যেখানেই গিয়েছিলেন তাঁদের পেছনে জনতার ঢল নেমেছে। হিন্দু জমিদারদের অত্যাচারে ক্লান্ত, নিঃশেষিত বাঙালী মুসলমানরা ইংরেজ মুক্ত, হিন্দু জমিদারদের শাসনমুক্ত একটি নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল।

অবশেষে ধর্মীয় চেতনার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয় দু’টি পৃথক রাষ্ট্র, ভারত ও পাকিস্তান। ৮৭২ টি ভাষাভাষি সম্পন্ন বহুজাতিক রাষ্ট্র ভারতে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী কোন চেতনা থাকার কথা নয়, ধর্মীয় চেতনাই তাদের মধ্যে আবেগগত ঐক্যের সৃষ্টি করেছে। অনুরুপভাবে বহুজাতিক রাষ্ট্র পাকিস্তানেও ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনার অবকাশ ছিল না। সেখানেও ইসলাম ধর্মই ছিল ঐ রাষ্ট্রের চেতনা। তদানিন্তন রাষ্ট্রপ্রধানরা বক্তৃতা-বিবৃতিতে হামেশাই বলতেন যে, পাকিস্তান একটি চেতনাভিত্তিক রাষ্ট্র।

১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলার ইতিহাসে একটি গুরত্বপূর্ণ অধ্যায়- একটি নতুন চেতনার জয়, একদল জালিমের উৎখাত। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই দেখা গেল সংগ্রামের অবসান হয়নি। একদল জালিমকে রিপ্লেস করেছে আরেক দল জালিম। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় বাংলার মানুষের ভূমিকা ছিল মুখ্য, মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ঢাকায়, লাহোর প্রস্তাব শেরে বাংলার উপরন্তু পাকিস্তানের পক্ষে অত ভোট ব্রিটিশ ভারতের অন্য কোন প্রদেশে পড়েনি। অথচ কেন্দ্রীয় রাজধানী ঢাকায় হয়নি, কেন্দ্রীয় ক্ষমতা থেকে বাঙ্গালীদের দূরে সরিয়ে রাখা হয়। বাংলা ভাষার অবমাননা মূলক জিন্নাহর ঘোষণায়, ১৯৪৭ এর চেতনার পরাজয় ঘটল। সারা পূর্ব বাংলায় প্রতিবাদের ঝড় উঠল, বোঝা গেল ৪৭এর চেতনা নিয়ে বেশী দূর আগানো যাবে না। প্রয়োজন দেখা গেল নতুন চেতনার। উল্লেখ্য যে ভারতে হিন্দীকে রাষ্ট্রভাষা করা জনিত গান্ধীর ঘোষণায় পশ্চিম বঙ্গে কোন প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়নি।

’৪৭-এর চেতনা অকেজো হয়ে পড়ে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনে। যে রাজনৈতিক তারকারা ’৪৭-এ পাকিস্তান গঠন করেছিলেন তারা সবাই-ই (খাজা নাজিমুদ্দিন বাদে) প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভাষা আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। ২১ শে ফেব্র“য়ারী পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব বাংলার স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দেয় (প্রথমে মানসিক, পরে ভৌগলিক)। ২১ হয়ে উঠে আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। ইতিহাসের সমষ্টি ঐতিহ্য কিন্তু ইতিহাসের সবটাই ঐতিহ্য নয়। ইতিহাসের ঐ অংশই ঐতিহ্য হয়ে যায় যা অন্তর্গত হয়ে পড়ে চেতনার, দৃষ্টিভঙ্গির ও আচার আচরণের যা সতত প্রবাহমান। হ্যাঁ, ঐ চেতনার কারণে ২১ ঐতিহ্য হয়ে যায়। একুশ জন্ম দেয় নতুন চেতনার। চেতনাটি হলো ‘আমরা বাংলায় কথা বলি’।

এই চেতনাভিত্তিক পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন একসময় রুপ নেয় মহান মুক্তিযুদ্ধে। পরিশেষে প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ব বাংলার বাঙালীদের নিজস্ব রাষ্ট্র- ‘বাংলাদেশ’। আমাদের ইতিহাসে আরও একটি গুরত্বপূর্ণ সন- ‘১৯৭১। একাত্তুরে ’৪৭ এর চেতনার পুরোপুরি মৃত্যু ঘটে কিন্তু একুশের চেতনা আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। একাত্তুরে আমরা শুরু করি নতুন যাত্রা। এই যাত্রার তো একটি চেতনা থাকবে। কি সেই চেতনা?

বাংলাদেশ নতুন রাষ্ট্র। নতুন রাষ্ট্রের থাকবে নতুন চেতনা। নতুন চেতনা নিয়ে হয়েছে সংকট- চেতনার সংকট। চেতনার প্রশ্নে দেশের দু’টি প্রধান দল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছে, আওয়ামী লীগ এই চেতনাকে বলেছে ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’, বি,এন,পি বলেছে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে চেতনা ছিল, ’৪৭-এ চেতনা ছিল, ’৫২-তে চেতনা ছিল অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে রয়েছে চেতনার সংকট। এটা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। নতুন একটি চেতনার জন্ম পুরাতন একটি চেতনার মৃত্যু ঘটায়। কিন্তু একটি চেতনার মৃত্যু হলো, অথচ নতুন কোন চেতনার জন্ম হলো না, এতে চেতনাহীন এই সময়টিতে জাতি সম্মুখীন হয় চরম সংকটের। যতক্ষণ পর্যন্ত না বিশ্ববিক্ষণজনিত এই সমস্যাটির সমাধান না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত অন্য কোন জাতীয় সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

‘বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ’-এর প্রসঙ্গে আসা যাক। এই জাতীয়তাবাদ বলতে বুঝি, বাংলা ভাষাভাষীদের সংস্কৃত ও ঐতিহ্য ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। প্রথমতঃ বাংলা ভাষীরা শুধু বাংলাদেশেই নয়, পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতের আরো কয়েকটি প্রদেশে বসবাস করে। তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু। এক সময় তারা ধর্মীয় চেতনার প্রশ্নে সোহরাওয়ার্দীর প্রস্তাবিত ‘অখন্ড স্বাধীন বাংলা’ প্রতিষ্ঠা হতে দেয়নি। দ্বিতীয়তঃ তাদের সাথে আমাদের যেমন ধর্মে তেমনি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যগত পার্থক্য আছে। আমাদের হৃদয়ে আছে একুশ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। একুশ ও মুক্তিযুদ্ধের অস্তিত্ব বাংলাদেশের বাইরের কোন বাঙ্গালীর মধ্যে নেই।

ভারতের বাঙ্গালীরা ভাষা আন্দোলন করেনি। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে যে ভাষা ভিত্তিক রাষ্ট্র বাংলাদেশের বাঙ্গালীরা সৃষ্টি করেছে তার সাথে বাংলাদেশের বাইরের বাঙ্গালীরা একাত্মতা ঘোষণা করেনি। তাদের আর আমাদের চেতনা এক হতে পারে না।

মুসলিম লীগের নামের সাথে ‘আওয়ামী’ শব্দটা জুড়ে দিয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করেছিলেন সোহরাওয়ার্দী যার অর্থ জনতার মুসলিম লীগ, বাঙ্গালীর মুসলিম লীগ নয়। পরবর্তীতে ‘মুসলিম’ কথাটি বাদ দিয়ে শুধুই ‘আওয়ামী লীগ’ করা হয়। এই পরিবর্তন যথাযথ। ব্রিটিশ শাসন আমলের মত বিশেষত্ব প্রদর্শন করার উদেশ্যে ‘মুসলিম’ কথাটির ব্যবহার করার আর প্রয়োজন ছিল না। কারণ পাকিস্তানে মুসলমানরাই ছিল সংখ্যা গরিষ্ঠ। কিন্তু নতুন নাম করণেও বাঙ্গালী কথাটি আসেনি, ‘আওয়ামী লীগ’ অর্থ ‘জনতার দল’ । স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল, বাংলাদেশের (পূর্ব বাংলার), অখন্ড বাংলার নয় ।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চেতনার প্রয়োজন অপরির্হায। এই চেতনার দু’টি প্রধান উপাদান- এক. সংখ্যা গরিষ্ঠের ধর্ম- ইসলাম; দুই. সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা-বাংলা। এছাড়া রয়েছে জাতীয় আবেগ সঞ্চারকারী উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট- দুই শতক দীর্ঘ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন এবং একাত্তরের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম।

অনেক বামপন্থী দল আত্মিক চাহিদা উপেক্ষা করে ভূ-গোলের উপর বেশী জোর দিয়ে ফেলেন। বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে অনেক দূরে। ইসলাম ধর্মের উৎপত্তি যেহেতু মধ্য প্রাচ্যে তাই বাংলাদেশে তা অকেজো এমন কথা তারা প্রচার করেন। কিন্তু তারা ভুলে যান নীতি বা আদর্শ ভূ-গোলের বাধা মানে না। বাংলাদেশের খুব কাছাকাছি উদ্ভূত বৌদ্ধ দর্শন গৃহীত হয়েছে সুদূর জাপানেও, আর জার্মানীতে সৃষ্ট কম্যুনিজমকে বাংলাদেশের বামপন্থীরা আঁকড়ে ধরেছেন। তাই অতিমুসলমান হতে গিয়ে অবাঙ্গালী হয়ে যাওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি অতি বাঙ্গালী হতে গিয়ে অমুসলমান হয়ে যাওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। বঙ্গবন্ধু– শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর ১০ই জানুয়ারী ১৯৭২-এর ভাষণে বলেছিলেন, “.. ..আমি বাঙ্গালী, আমি মুসলমান, . . . .” তিনি দু’টো বিষয়ের উপরই সমান গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

প্রসঙ্গত অনেকে উল্লেখ করে থাকে পার্বত্য চট্টগ্রাম সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর কথা। তাদের চেতনা কি হবে? তাদের ভাষা বাংলা নয়, ধর্মও ইসলাম নয়। কিন্তু কয়েক শতক যাবৎ পূর্ব বাংলার অধিবাসী। এ দীর্ঘ সময়ে তাদের ও আমাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে অভিন্নতা এসেছে। তারাও আমাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন করেছে, একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছে। এই আবেগের উপর ভিত্তি করে কি একটি ঐক্য প্রতিষ্ঠা হতে পারে না?

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রায় চার দশক পার হয়ে গেছে। কিন্তু এই সময়ে আমরা খুব বেশী দূর এগুতে পারিনি। তুলনামূলক বিচারে পিছিয়েই পড়েছি। ধীরে ধীরে আমদের অতিক্রম করে গিয়েছে থাইল্যান্ড, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, আর মধ্য প্রাচ্যের কথা বাদই দিলাম। এর মূল কারণ- চেতনার সংকট। চেতনার প্রশ্নে আমরা দ্বিধা বিভক্ত হয়ে আছি। এই দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারলেই দেশ গতিশীলতা পাবে।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা জীবনী ও স্মৃতিকথা

আমার ক্যাডেট কলেজ

আমার ক্যাডেট কলেজ
ডঃ রমিত আজাদ (৭ম ব্যাচ)

আমার বয়স যখন পাঁচ বছর হলো, সকলে ঠিক করলেন আমাকে স্কুলে দিতে হবে। আমরা তখন থাকতাম ঢাকার মগবাজারে মধুবাগে। কাছাকাছি স্কুল ছিল। মগবাজার টি এন্ড টি স্কুল। বড় বোন রীনা আপার হাত ধরে একদিন ঐ স্কুলে গেলাম। তখনকার ভর্তি পদ্ধতি আজকের মত এত জটিল ছিল না। স্কুলের একজন শিক্ষককে আমার বড় বোন বললেন “স্যার আমার ছোট ভাই, ওকে ভর্তি করতে চাই। ও সবকিছু খুব সুন্দর করে পড়তে পারে”। স্যার তার হাতের বইটি খুলে আমাকে বললেন, “পড়”। আমি খুব দ্রুত পড়লাম, “বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র…………….”। স্যার চমৎকৃত হয়ে বললেন, “বেশ বেশ আর পড়তে হবে না”। চল তোমাকে ভর্তি করিয়ে দেই। সব ফর্মালিটিস শেষ হওয়ার পর আমার আপা বললেন “তুমি ভর্তি হয়ে গিয়েছ, কাল থেকে এই স্কুলে পড়বে”। স্কুলের দিকে তাকিয়ে আমার মন খারাপ হয়ে গেল। আমি বললাম, “বেড়ার স্কুল!”। আপারও বোধ হয় মন খারাপ হয়ে গেল, বললেন, “এখন তুমি ছোট তো, যখন বড় হবে, তখন অনেক বড় স্কুলে পড়বে”। মনে আকাঙ্খা রয়ে গেল, অনেক বড় স্কুলে পড়ার। এরপর যখন তৃতীয় বা চর্তুথ শ্রেণীর ছাত্র, একদিন আমার মাতৃতুল্য ফুপু আমাকে বললেন, “রমিত, পত্রিকায় তোমার নাম উঠেছে দেখবে এসো”। আমি অবাক হয়ে গেলাম, পত্রিকায় আমার নাম। এরপর তিনি খবরের কাগজ খুলে একটি বিজ্ঞপ্তি দেখালেন, ক্যাডেট কলেজে ভর্তির বিজ্ঞপ্তি। আমি প্রশ্ন করলাম, “কোথায় আমার নাম?” ফুপু হেসে বললেন, তোমার নাম না, এটা ক্যাডেট কলেজের ভর্তির বিজ্ঞপ্তি। খুব ভালো স্কুল। তোমাকে এখানে ভর্তি হতে হবে”। সেই প্রথম জানতে পারলাম, ক্যাডেট কলেজের নাম । এদিকে আমার এক ফুপাতো বোনের ছেলে, ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হয়েছে। তার বাবা মা খুব খুশি। একদিন তাকে দেখতে গেলাম। তিনি আমাকে তার ইউনিফর্ম দেখালেন। আমার মনকে আলোকিত করল ঐ ঝকঝকে ইউনিফর্ম । এবার ক্যাডেট কলেজে ভর্তির বাসনা আরো তীব্র হলো। ১৯৮১ সালে আমার বড় দুই বোনের মধ্যে যিনি দ্বিতীয় (রিতা আপা), তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন আমাকে ক্যাডেট কলেজে ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করতে হবে। নিয়ে গেলেন একটি কোচিং সেন্টারে। আমার সৌভাগ্য, সেই কোচিং সেন্টারে পড়েছিলাম যার পরিচালক ও শিক্ষক ছিলেন আশরাফুল হক স্যার। তিনি বর্তমানে হলি চাইল্ড স্কুলের অধ্যক্ষ ও প্রতিষ্টাতা। খুব মনযোগ দিয়ে স্যার পড়িয়েছিলেন। উনার প্রশিক্ষন পেয়ে আমরা অনেকেই ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হতে পেরেছিলাম। আমার আজও মনে আছে যেদিন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সংবাদ পেয়েছিলাম সেদিন কি খুশীই না হয়েছিলাম। আমার গৃহশিক্ষক স্বপন ভাই আমাকে খুব যত্ন করে পড়িয়েছিলেন । উনাকে সালাম করে খুশীর সংবাদটা দিলাম। উনি হেসে বললেন, “তুমি যে এ্যালাউ হবে তা আমি জানতাম”।

আশরাফুল হক স্যার বললেন “রিটেন পরীক্ষায় এ্যালাউ হয়ে উচ্ছসিত হওয়ার কিছু নাই। ১৫০ জন এ্যালাউ হয়েছে কিন্ত মৌখিক পরীক্ষার পর রাখা হবে মাত্র ৫০ জন। সুতরাং তোমাদের আরো অনেক পড়তে হবে।

স্যারের প্রশিক্ষন নিয়ে কাটলো বাকী দিনগুলো। অবশেষে এলো মৌখিক পরীক্ষার দিন। পরীক্ষা হলো ঢাকার টিচার্স ট্রেনিং কলেজে। সারাদিন অপেক্ষা করার পর বিকালের দিকে আমাদের কলেজের স্বপন ভাই (যিনি এখনো কর্মরত) ডেকে নিলেন ভিতরে। রুমে ঢুকে দেখলাম, চেয়ার আলো করে বসে আছেন কলেজের অধ্যক্ষ শ্রদ্ধেয় বাকিয়াতুল্লাহ স্যার। তার পাশে বসে আছেন উপাধ্যক্ষ আল-আমিন স্যার। অনেক প্রশ্ন করলেন, অনেক কিছু জানতে চাইলেন, কিন্তু একটুও ঘাবড়ালাম না। অবাক হয়ে শুধু ভাবছিলাম, এত চমৎকার শিক্ষক হয়! একই মন্তব্য করেছিল আমাদের ব্যাচের কালাম সারোয়ার, “দু’জনই এত ভালো!” ভাইভায় নানা প্রশ্ন করলেন। মোটামুটি সবকিছুরই ভালো উত্তর দিলাম। এরপর অনেকদিন অপেক্ষা করলাম। তারপর আবারো চিঠি পেলাম। চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সংবাদ। এত খুশি আর জীবনে কোনদিন হইনি। চিঠিতে লেখা ছিল ৬ই জুন জয়িেনং ডেট এরপর কেবল অপেক্ষা, কবে ৬ ই জুন আসবে। যথারীতি ৫ই জুন এলো। ঢাকা থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। আমার জীবনের অনেক আনন্দের দিন। বেশ কয়েকটি আনন্দ একদিনে, জীবনে প্রথম ট্রেনে চড়ার আনন্দ, স্কুলের বই-পত্রে, গল্পে সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য, চা-বাগান, হজরত শাহ্জালাল (র) এর মাজার ইত্যাদির গল্প অনেক পড়েছি সেই সিলেট দেখার আনন্দ, সর্বপোরী ক্যাডেট কলেজে ভর্তির আনন্দ। ৬ই জুন সিলেট পৌঁছে রেল ষ্টেশনেই দু’একজন ব্যাচ মেটের সাথে দেখা হলো, যারা আমার সাথেই ভাইভা পরীক্ষা দিয়েছিল। বিকালের দিকে একটি জীপে চড়ে কলেজের দিকে রওয়ানা হলাম। সিলেট শহর ছাড়িয়ে বাইরে নামতেই অপরূপ প্রাকৃতিক শোভা। মালিনীছড়া আর লাক্কাতুরা চা বাগানের অপূর্ব দৃশ্যে মন জুড়িয়ে গেল। সেই দৃশ্য শেষ হতে হতেই ঝকঝক করে উঠল সিলেট ক্যাডেট কলেজে-এর ক্যাম্পাস।

এয়ারপোর্ট রোড বরাবর কলেজের দেয়াল ঘেঁষে চলে একেবারে শেষ মাথায় থাকা প্রধান ফটক দিকে চট করে জীপ ঢুকে গেল কলেজ ক্যাম্পাসের ভিতর। কিছুদুর যেতেই খাঁকি পোষাকের উপর লাল শ্যাষ পরা দু’জন ক্যাডেট লাঠি উচিয়ে থামতে নির্দেশ দিল জীপটেিক। দেখে খুব ভালো লাগলো, মনে মনে বললাম, বাহ্! বেশ স্মার্ট তো!’ জীপ থেকে নামিয়ে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো তৎকালীন কলেজ প্রিফেক্ট মহিউদ্দিন ভাই এর কাছে। খুঁজে দেখলেন আমি শাহ্জালাল হাউজের। এলেন হাউজ লিডার ওয়ালীউলল্লাহ ভাই। তালিকা খুঁজে বললেন, “মশিউর তোমার রুমমেট। এগিয়ে এলেন আমার এক ব্যাচ সিনিয়র মশিউর ভাই। আমার সাথের কালো ট্রাংকটির একদিকে তিনি ধরে আমাকে বললেন, “তুমি অন্যদিকে ধর”। দু’জনে ট্রাংকের দু’দিকে ধরে এগিয়ে চললাম শাহ্জালাল হাউজের ৩৪ নং রুমের দিকে। ট্রাংকের একদিকে পুরাতন ক্যাডেট অন্যদিকে নতুন ক্যাডেট। মুগ্ধ হলাম এই রীতি দেখে। ট্রাংকের বন্ধনের মধ্যে দিয়ে হৃদয়ের যে বন্ধন তৈরী হলো তা চিরস্থায়ী হয়ে গেল। কিছুক্ষনের মধ্যে আমার অপর দু’জন রুমমেট আসিফ ও মঈনুলকে পেয়ে গেলাম। কিছুক্ষন পর পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক শ্রদ্ধেয় দেলোয়ার হোসেন স্যার এলেন। প্রাণবন্ত আলোচনা জমালেন আমাদের তিনজনার অভিভাবকদের সাথে। ৬ ই জুন ক্যাডেট কলেজে প্রথম দিন, প্রীতিকর অভজ্ঞিতার মধ্যে দিয়ে যাত্রা শুরু হলো আমার ক্যাডেট জীবনের।

ছয় ছয়টি বছারের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা একটি ছোট প্রবন্ধে সীমাবদ্ধ করা যায় না। সিলেট ক্যাডেট কলজে প্রানের কলেজ, কলেজের প্রতিটি গাছ, প্রতিটি ইট, হয়তো প্রতিটি ঘাঁসের সাথেও আছে আমাদরে হৃদয়ের সম্পর্ক। সেই হৃদয়ের কিছু কথা আজ বলব। কলেজের কথা বলতে গেলে প্রথমে আসে আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের কথা। আমরা প্রথম অধ্যক্ষ হিসাবে যাকে পেয়েছি সেই বাকিয়াতুল্লাহ্ স্যারের কথা। স্যারের শান্ত-সৌম্য অবয়বে ছিল আভিজাত্যের ছাপ। প্রথম দিন পারেডে এসে আমাকে বললেন, “এত স্বাস্থ্য খারাপ কনে? থাক স্বাস্থ্য ভালো হয়ে যাবে। এখানে তো তোমাদের বাবা-মা-রা নেই, এখানে আমরাই বাবা-মা।” আমাদেরকে এভাবেই স্যার আপন করে নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ক্যাডেট কলেজ সমূহের প্রথম সিভিলিয়ান প্রিন্সিপাল। সেরা শিক্ষক হিসাবে এ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন, ফৌজদার ক্যাডেট কলেজে কর্মরত অবস্থায়। তারপর তদানিন্তন সরকার তাকে ইংল্যান্ডে পাঠিয়েছিল প্রশিক্ষন নিয়ে আসতে। যথাযথই প্রশিক্ষন নিয়েছিলেন। তার হাতে গড়ে উঠেছে এদেশের অনেক বড় বড় মানুষ। আমি মস্কোতে এক বাংলাদেশীর সাথে পরিচিত হয়েছিলাম। বৃটিশ এক সুখ্যাত কোম্পানীর মস্কো শাখার কর্নধার। কথায় কথায় জানলাম তিনি ফৌজদারহাটের থার্ড ব্যাচের এক্স-ক্যাডেট। বাকিয়াতুল্লাহ্ স্যারের ভূয়সী প্রশংসা করলেন তিনি। সেই বাকিয়াতল্লাহ্ স্যার আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। পরম করুনাময় তাকে জান্নাতবাসী করুন।

ক্যাডেট কলেজে ভর্তির আগে ঢাকায় একটি সাধারণ স্কুলে পড়তাম আমি। মুখস্থ বিদ্যা ছাড়া আর কিছুই সেখানে শেখানো হতো না। আমাদের সমাজবিদ্যার শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন স্যার এসে প্রথম দিনই বললেন, “তোমরা তো সবাই ভালো ছাত্র। আর্টস নিয়ে তো কেউই পড়বে না জানি। কিন্তু মানুষ হিসবে বিজ্ঞানের পাশাপাশি আর্টসেরও অনেক কিছু জানা থাকা প্রয়োজন। তাই এই বোর্ডের বইটা থাক। আমি তোমাদের এই বইয়ের বাইরে অনেক কিছু পড়াব, যা তোমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন”। তিনি শুরু করলেন সক্রেটিস থেকে। তারপর প্লেটো, এ্যারিষ্টটল, মেকিয়েভেলি হয়ে বিশ্ববিক্ষনের অনেক শাখা পেরিয়ে শেষ করলেন বাংলাদেশ ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত । তিনি আমাদের প্রথম আলো দেখালেন দর্শনের, আলো দেখালেন সমাজবিদ্যার, প্রবল আগ্রহ জাগিয়ে তুললেন রাজনীতি বিষয়ে।

মনে পড়ে মরহুম মাজহারুল হক স্যারের কথা। সুদর্শন মাজহার স্যার বরাবরই ছিলেন পরিপাটি, সৌন্দর্য্যপ্রীয়। আমাদের মধ্যেও এই সৌন্দর্য্য সচেতনতা তিনি তৈরী করে দিয়েছিলেন। হাউজ মাষ্টার হিসাবে সুরমা হাউজকে করেছিলেন নানা ভাবে শোভিত। ইতিহাস পড়াতেন। সাধারণ স্কুলে পড়াকালীন ইতিহাসে কোন আনন্দ পেতাম না। মনে হতো দিনক্ষণ মুখস্থ করার একটা কাঠখোট্টা সারজেক্ট্। মাজহার শুরু করলেন সিন্ধু সভ্যতা থেকে। স্যারের কাছ থেকে জানলাম আলেকজান্ডারের কাহিনী। জানলাম ১৮৫৭ সালে যা ঘটেছিল তাকে ইংরেজরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে সিপাহী বিপ্লব নাম দিয়েছিল, আসলে সেটা ছিল আমাদের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ। জেনেছি গৌতম বুদ্ধের কথা, মহাবীরের কথা। আরো কত কি! মাজহার স্যারই শেখালেন, ইতিহাস কত তাৎপর্যপূর্ণ!

বাংলার শিক্ষক রকিবুল হাসান স্যার। কোমলে কঠোরে মিশ্রিত। যেমনি ভালোবাসতেন, তেমনি শাসনে রাখতেন। পড়ালেখার পাশাপাশি জীবনে প্রয়োজন হবে এমন অনেক কিছুই শেখাতেন বন্ধুর মতো। ক্লাসে সুবোধ বালকটির মত বসে থাকলে স্যার ভৎর্সনা করতেন। বলতেন, শিশু কিশোররা হবে চঞ্চল উচ্ছল। হৈ চৈ আর দুরন্তপনাকে তিনি উৎসাহই দিতেন। আমার এখানো মনে আছে আমাদের ব্যাচের পাস-আউটের সকল অনুষ্ঠানের আয়োজন স্যারই করেছিলেন। আমাদের কোন আবদারই ফিরিয়ে দেননি।

বক্তৃতা, নাটক, আবৃত্তি ইত্যাদি নানা সাংস্কৃতিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেয়েছিলাম শফিকুল আজম স্যার এবং সাইফুল ইসলাম স্যারের কাছে। একবার মনে আছে আন্ত:ভবন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার সময় শাহ্জালাল হাউজের প্রতিযোগিদের একটার পর একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাচ্ছিল। গায়ক ঠান্ডা লাগিয়ে গলা ভেঙে ফেলেছে। তবলা বাদক হসপিটালাইজড। শেষ দু:সংবাদ এলো, অভিনেতাদের একজন হাত ভেঙেছে। আমরা সবাই হায় হায়! হাউজ এবার ডুবল! শফিকুল আজম স্যার ঠান্ডা মাথায় সব ট্যাকল করলেন। নতুন গান সিলেক্ট করলেন, নতুন অভিনেতা নিলেন, আমাকে আনাড়ি হাতে দিলেন তবলা বাজাতে। অনুষ্ঠানের ফলাফল ঘোষিত হলো, শাহজালাল হাউজ প্রথম হয়েছে। আনন্দের আতিশয্যে স্যারকে কাঁধে তুলে নিয়েছিলাম।

ইংরেজীর শিক্ষক শফিকুল ইসলাম স্যার নিজেই এক্স ক্যাডেট। তার উপর একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। চমৎকার পড়াতেন। ইংরেজীর ভয় কেটে গেল স্যারের ক্লাশ পেয়ে। অংকের ভয় বোধ হয় সবার মধ্যেই থাকে , কুদ্দুস স্যার এলেন রাজশাহী থেকে। এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিলেন সেই ভয়। কনফিডেন্স, ব্যাক্তি জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই কনফিডেন্স আমাদের মনে এনে দিয়েছিলেন নজরুল ইসলাম স্যার। তখন তীতুমীর হাউজ সব কিছুতে তৃতীয় স্থান পেত। তারা নিজেরাও ধরে নিয়েছিল যে, ঐ অবস্থান থেকে তাদের উঠে আসা সম্ভব নয়। রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ থেকে এসে তীতুমীর হাউজের হাউজ মাষ্টার হিসাবে দায়িত্ব নিলেন নজরুল ইসলাম স্যার । যাদুকরের মতো হাউজকে টেনে তুললেন। এরপর আমরা বুঝে গিয়েছিলাম নজরুল ইসলাম স্যার যতদিন আছেন ততদিন তীতুমীর হাউজ শক্ত ভীতের উপর দাঁড়িয়ে থাকবে।

হাসান স্যার ছিলেন ভূগোলের শিক্ষক। ম্যাপ আঁকতে ভয় পেতাম সবাই। সেই ম্যাপ আঁকা শিখিয়েই ছাড়লেন। শাহজালাল হাউজের হাউজ মাষ্টারের দায়িত্ব পালন করেছেন। সৎ নিষ্ঠাবান একজন মানুষ। নিজের সন্তানের মত স্নেহ করতেন আমাদের। স্যার যেমন ছিলেন মেজাজী তেমনি আবার হাস্য রসিকতায় মন ভরিয়ে দিতেন। একবার ক্রস-কান্ট্রি প্রতিযোগিতার আগে বললাম, “স্যার ছোট ছোট ক্যাডেটদের দৌড়াতে কষ্ট হয়”। স্যার উত্তরে বললেন, “ছোট পোলাপানে দৌড়াইবে বান্দরের মত”।

পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসাবে যোগ দিলেন অমিতাভ বিশ্বাস স্যার। সিলেট ক্যাডেট কলেজই স্যারের প্রথম ক্যাডেট কলেজ। কলেজে এসেই স্যার সকলকে আপন করে নিলেন। স্যারের ধ্যান-জ্ঞান সবই হয়ে গেল ক্যাডেটরা। ক্লাশে তিনি ডুবে যেতেন শিক্ষকতায়। জটিল সব বিষয়, সূত্র, নীতি, আইন জলবৎ তরলং করে দিতেন। তখনই বুঝতে পেরেছিলাম স্যারের প্রভাব মুক্ত হতে পারব না। হলোও তাই, কেবল আমাদের ক্লাশ থেকেই পাঁচ-পাঁচজন পরবর্তিতে পদার্থবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা নিলাম। এদের মধ্যে তিনজন আমি, তানভীর ও সাজ্জাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক। ইউরোপে লেখাপড়া করেছি, পি.এইচ.ডি. ডিগ্রী নিয়েছি। আমার লেখা তিনটি বই ইউরোপ থেকে প্রকাশিত। এর সবকিছুর পিছনে স্যারেরই অবদান।

টেকনিকাল ড্রইং-য়ের শিক্ষক ছিলেন বজলুর রহমান স্যার। আমরা যখন ক্লাশ নাইনে, স্যার তখন জয়েন করলেন। কলেজে সাবজেক্টটি মাত্র চালু করা হয়েছে। আমরা দ্বিধা দ্বন্দের মধ্যে ছিলাম। সাবজেক্টটি নেব কি নেব না ৷ নজরুল ইসলাম স্যার এলেন। সায়েন্সের ষ্টুডেন্টদের জীবনে এই সাবজেক্টের গুরুত্ব সম্পর্ক ছোটখাট বক্তৃতা দিলেন। এর পর পেলাম বজলুর রহমান স্যারের ক্লাশ। অত্যন্ত শান্ত ও নম্র মানুষ। অসীম ধৈর্য্য নিয়ে আমাদের সবকিছু বুঝাতেন। অল্প দিনের মধ্যেই স্যার এবং সাবজেক্ট উভয়ই আমাদের কাছে প্রীয় হয়ে গেল। এই সাবজেক্টে যা কিছু শিখেছি তা সবই আমার সারা জীবন কাজে লেগেছে, এখনো লাগছে।

ভাইস প্রিন্সিপাল হয়ে এলেন মাসুদ হাসান স্যার। তার আগের বছর এস.এস.সি পরীক্ষার ফল ভাল হয় নি। মাসুদ হাসান স্যার এসে যাদু করলেন। পরের বছর চমৎকার ফলাফল। তার পরের বছর তাক লাগিয়ে দিলেন, বোর্ডে সবচাইতে ভাল ফলাফল সিলেট ক্যাডেট কলেজের। ফলাফল যখন স্যারের হাতে এলো, স্যার টেবিল চাপড়ে বলছিলেন, “আমি ফৌজদারহাটকে হারিয়েছি”।

জসিবুর রহমান স্যার ছিলেন প্রাণীবিজ্ঞানের শিক্ষক। কথায় কথায় বলতেন “আমি তোমাদের বড় বড় ডাক্তার বানাতে চাই”। হয়ে ছিলও তাই স্যারের কল্যাণেই অনেকেই বড় ডাক্তার হলো। শাকিল ভাই এবং আমাদের ব্যাচের ডাঃ হাবিব এদরে মধ্যে উল্লখেযোগ্য। স্যার ছিলেন আমাদের ফর্ম মাষ্টার। আমাদের নিয়ে এক্সর্কাসনে যেতেন। পরিচিত করে দিতেন নানা রকম উদ্ভিদ ও প্রাণীদের সাথে। অবাক হয়ে শুনতাম স্যারের কথা। সেই স্যারের ছেলে এখন আমারই ছাত্র। উপরওয়ালার কি খেয়াল। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম র্পযন্ত জ্ঞান সঞ্চালিত করে দিচ্ছেন।

লেখক রফিক কায়সারের নাম শুনেছি অনেক। তিনি যখন আমাদের শিক্ষক হয়ে এলেন, আমাদের আনন্দ আর ধরে না। সাহিত্যের কত গভির বিষয় যে উনার কাছ থেকে শিখেছিলাম। মাঝে মাঝে পত্র পত্রিকায় স্যারের নাম দেখে খুব গর্ব হতো, যে উনার ছাত্র আমরা।

আবদুর রব স্যার ছিলেন ইসলামিয়াতের শিক্ষক। ধর্মীয় শিক্ষায় তিনি আমাদের শিক্ষিত করেছিলেন। আমাদের চেতনায় গেঁথে দিয়েছিলেন ইসলামের শিক্ষাকে। কলেজের এ্যাডজুটেন্ট ছিলেন খন্দকার ওবায়দুল আনোয়ার স্যার। এডুকেশন কোরের অফিসার ছিলেন। তাই হয়তো একটু নমনীয় ছিলেন। উনার গানের গলা চমৎকার আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম, সামরিক অফিসারের কন্ঠে গান। ক্যাডেটদের খুব ভালবাসতেন, বিদায়ের দিন ডাইনিং হলের সামনে দাঁড়িয়ে আন অফিসিয়াল একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। দেশপ্রেম কি, কোন পথ ধরে বাংলাদেশকে এগোতে হবে, কি হবে আমাদের দায়িত্ব , খুব সুন্দরভাবে আমাদের বুঝেিয় বলেছিলেন। তখনই বুঝতে পারলাম যে, ক্যাডেট কলেজের সাথে স্যারের গভির সম্পর্ক হবে। হয়েছিলও তাই, স্যার পরে সি.সি. আর এর প্রিন্সিপাল হয়েছিলনে। তারও পরে এ.এ.জি হয়ে ক্যাডেট কলেজগুলো খুব ভাল ভাবে পরিচালনা করেছিলেন । সেই স্যারের সাথে দেখা গত বৎসর । প্রায় বিশ বৎসর পর। আমি সানগ্লাস পরা অবস্থায় ছিলাম। স্যারকে সালাম করে বললাম, “স্যার চিনতে পেরেছেন?” স্যার আমাকে অবাক করে বললেন, তুমি রমতি আজাদ । ছয় বৎসরে দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে অনেক শিক্ষকদের সহচর্যে এসেছি ৷পিছনে ফিরে তাকালে মনে পরে, এক একটি উজ্জল নাম, আবদুল বারী স্যার, জায়েদুল আলম স্যার, মেজর আমীন স্যার, আলতাফুর রহমান স্যার, রয়িাজউদ্দনি প্রামানকি স্যার, কলেজের প্রথম শিক্ষয়ত্রী মুনিরা পারভীন, ওয়াহিদুর রহমান স্যার, চৌধুরী আনিসুর রহমান স্যার, বেলাল হোসেন স্যার, কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম স্যার, উপাধ্যক্ষ আবুল আশরাফ নূর । আমাদের সকলের জীবনে গভীর ছাপ রয়েছে প্রতিটি শিক্ষকের। তাঁরাই গড়ে তুলেছেন আমাদের জীবন। তাঁদের কল্যানে আমরা আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত।

আমাদের দেশের যে সামান্য কয়েটি জায়গায় মেধার মূল্যায়ন হয়, এর মধ্যে একটি হলো ক্যাডেট কলেজ । যে শিশুরা মেধা যাচাইয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, এখানে তাদের খতেে দয়ো হয়, কাপড় পরতে দেয়া হয়, সু-চিকিৎসা দেয়া হয়, পড়া লেখাতো শেখানো হয়ই, তার পাশপাশি আরো অনেক প্রশিক্ষনই এখানে দেয় হয়। অথচ তথাকথিত বুদ্ধিজীবিদের অনেকেই ক্যাডেট কলেজের বিরোধী। ক্যাডেট কলেজ বন্ধ করে দিলেই তারা খুশি হবে।

আমাকে একবার এক কম্যূনিষ্ট বলেছিল, যে ক্যাডেট কলেজ বন্ধ করে দেওয়াটাই উচিৎ, কেননা এখানে বিশেষ একটি শ্রেণী খুব ভাল আছে। আমি প্রশ্ন করেছিলাম, “বিশেষ একটি শ্রেণী মানে কি? ” “কম্যুনিজদের দৃষ্টিকোন থেকে শ্রেণী দু’টো, শ্রমিক শ্রেণী ও মালিক শ্রেণী, ক্যাডেট কলেজে এ জাতীয় কোন শ্রেণী ভেদ নেই। ক্যাডেট কলেজের দরজা সকলের জন্যই উম্মুক্ত। ”

ক্যাডেট কলেজ একটি মেরিট স্কুল । দেশের সেরা ছাত্রদের বাছাই করে, যথাযথ প্রশিক্ষন দিয়ে পটেনশিয়াল বিশেষজ্ঞ তৈরি করা হয় । এতে দেশের সামরিক ও বেসামরিক দুটি ক্ষেত্রই লাভবান হয় । অথচ এই ক্যাডেট কলেজের বিরোধীতা করছে একদল তথাকথিত বুদ্ধিজীবি । অবশ্য আমি ভিন্নমতের মানুষও দেখেছি ৷

বিদেশে অধ্যায়নরত সময়ে এক বাংলাদেশীর সাথে পরিচয় হয়েছিল, কট্টর কম্যূনিষ্ট, ক্যাডেট কলেজের ঘোর বিরোধী । ক্যাডেট কলেজ সর্ম্পকে তার ধারনা ছিল এটি একটি র্বুজোয়া প্রতিষ্ঠান ৷ আমার সাথে কিছুদিন চলাফেরার পর দেখলাম, হি ইজ ইমপ্রেস্ড। একদিন আমাকে প্রশ্ন করলেন, ক্যাডেট কলেজে ভর্তির নিয়ম কি ? আমি জানতে চাইলাম, “কেন?” বললেন, “ দেশে ভাতিজা-ভাতিঝি আছে ওদেরকে র্ভতি করাতে চাই ” । আর একদিন প্রশ্ন করলেন, “বাংলাদেশে ক্যাডেট কলেজ কয়টি ?” বললাম, “দশটি ” । উনি বললেন, “এর সংখ্যা বাড়ানো যায়না? ” আমি বললাম, “ক্যাডেট কলেজ ব্যায়বহুল প্রতিষ্ঠান, “ক্যাডেট কলেজ চালাতে যা খরচ হয় এই টাকা দিয়ে ছোটখাটো নদীর উপরে সেতু তৈরী করা যায় ” । তিনি বললেন, “সেতুর দরকার নাই, নৌকা চলবে , তাও ক্যাডেট কলেজের সংখ্যা বাড়ুক ” ।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গবেষণামূলক প্রকাশনা প্রকৌশল ও বিজ্ঞান বিজ্ঞান

Use of Mathematics in Business in the ancient and mediaeval Bangladesh

Use of Mathematics in Business in the ancient and mediaeval Bangladesh

Dr. Ramit Azad

Excavations at Mainamoti, Mohasthangar, Paharpur, Naogaon and other sites of Bengal civilization have uncovered evidence of the use of practical mathematics in Bangladesh. The people of Bangladesh of that period manufactured bricks whose dimensions were in a correct proportion. In these constructions they used regular geometrical shapes included hexahedra, cones, cylinders, etc. thereby demonstrating knowledge of basic geometry. The “Somapuri Vihara” at Paharpur site is said to have been the biggest Buddhist monastery in south of the Himalayas. The site consists of a large quadrangle of some 170 monastic cells set in a high wall/earthwork and looking inward to a 3 level Stupa now largely ruined but originally containing, presumably, Buddha statues in shrines set deep into each face of the structure. There are also various other structures within the quadrangle. A visit is likely to consist of a walk around the outer wall and then round each of the 3 levels of the stupa whilst taking in some of the other structures. Around the Stupa itself we can see examples of the terracotta “tiles” which decorated the walls of each level. These types of decorations are also found at “Salban Vihara” at Mainamoti.
From ancient to medieval period important contributions to mathematics were made by Bangladeshi mathematicians. Unfortunately original works of many of our mathematicians are lost. It is because of the almost 200 years’ repression of the British rule. However history keeps some of the names immortal. One of them is Sridhara
Sridhara is now believed to have lived in Bangladesh in the ninth and tenth centuries. However, there has been much dispute over his date and in different works the dates of the life of Sridhara have been placed from the seventh century to the eleventh century. The best present estimate is that he wrote around 900 AD, a date which is deduced from seeing which other pieces of mathematics he was familiar with and also seeing which later mathematicians were familiar with his work.
Sridhara is known as the author of two mathematical treatises, namely the Trisatika (sometimes called the Patiganitasara ) and the Patiganita. However at least three other works have been attributed to him, namely the Bijaganita, Navasati, and Brhatpati. Information about these books was given the works of Bhaskara II (writing around 1150), Makkibhatta (writing in 1377), and Raghavabhatta (writing in 1493). We give details below of Sridhara’s rule for solving quadratic equations as given by Bhaskara II.
There is another mathematical treatise Ganitapancavimsi which some historians believe was written by Sridhara. Hayashi in, however, argues that Sridhara is unlikely to have been the author of this work in its present form.
The Patiganita is written in verse form. The book begins by giving tables of monetary and metrological units. Following this algorithms are given for carrying out the elementary arithmetical operations, squaring, cubing, and square and cube root extraction, carried out with natural numbers. Through the whole book Sridhara gives methods to solve problems in terse rules in verse form which was the typical style of Indian sub-continental texts at this time. All the algorithms to carry out arithmetical operations are presented in this way and no proofs are given. Indeed there is no suggestion that Sridhara realised that proofs are in any way necessary. Often after stating a rule Sridhara gives one or more numerical examples, but he does not give solutions to these example nor does he even give answers in this work. In his book Pati Ganita Shridhara gave a good rule for finding the volume of a sphere. He dealt with various operations like elementary operations, extracting square and cube roots, fractions, eight rules given for operations involving zero, methods of summation of different arithmetic and geometric series.

After giving the rules for computing with natural numbers, Sridhara gives rules for operating with rational fractions. He gives a wide variety of applications including problems involving ratios, barter, simple interest, mixtures, purchase and sale, rates of travel, wages, and filling of cisterns. Some of the examples are decidedly non-trivial and one has to consider this as a really advanced work. Other topics covered by the author include the rule for calculating the number of combinations of n things taken m at a time. There are sections of the book devoted to arithmetic and geometric progressions, including progressions with a fractional numbers of terms, and formulae for the sum of certain finite series are given.
The book ends by giving rules, some of which are only approximate, for the areas of a some plane polygons. In fact the text breaks off at this point but it certainly was not the end of the book which is missing in the only copy of the work which has survived. We do know something of the missing part, however, for the Patiganitasara is a summary of the Patiganita including the missing portion.
In Shukla examines Sridhara’s method for finding rational solutions of Nx2 ± 1 = y2, 1 – Nx2 = y2, Nx2 ± C = y2, and C – Nx2 = y2 which Sridhara gives in the Patiganita. Shukla states that the rules given there are different from those given by other Hindu mathematicians.
Sridhara wrote on practical applications on algebra.
Babylonian mathematicians, as early as 2000 BC could solve a pair of simultaneous equations of the form
x + y = p, xy = q
Which are equivalent to the equation
X2 + q = px
Sridhara was one of the first mathematicians to give a rule to solve a quadratic equation. Unfortunately, as we indicated above, the original is lost and we have to rely on a quotation of Sridhara’s rule from Bhaskara II:-
Multiply both sides of the equation by a known quantity equal to four times the coefficient of the square of the unknown; add to both sides a known quantity equal to the square of the coefficient of the unknown; then take the square root.
To see what this means take
ax2 + bx = c.
Multiply both sides by 4a to get
4a2x2 + 4abx = 4ac
then add b2 to both sides to get
4a2x2 + 4abx + b2= 4ac + b2
and, taking the square root
2ax + b = √(4ac + b2).
There is no suggestion that Sridhara took two values when he took the square root.
Usually it is told that there is no original work on mathematics in Indian sub-continent in the 2nd millennium. But basically in that period the development of mathematics in this region occurred to some other directions namely computational mathematics and mathematical logic. Some Bengali mathematicians worked on mathematical logic.
Bengali mathematician Raghunatha Siromoni (1477-1547) was a philosopher and logician He was born at Navadvipa in present day Nadia district of West Bengal. He was the grandson of Śulapāṇi (c. 14th century CE), a noted writer on Smṛti from his mother’s side. He brought the new school of Nyaya, Navya Nyāya, representing the final development of Indian formal logic, to its zenith of analytic power.
Raghunatha’s analysis of relations revealed the true nature of number, inseparable from the abstraction of natural phenomena, and his studies of metaphysics dealt with the negation or nonexistence of a complex reality. His most famous work in logic was the Tattvacintāmaṇidīdhiti, a commentary on the Tattvacintāmaṇi of Gangeśa Upādhyāya, founder of the Navya Nyāya school.

Mathuranath Tarkavagish (c 1550) scholar of navya nyaya (new logic), was born at Navadwip, son of Sriram Tarkalankar, also a famous logician. Mathuranath studied logic under Rambhadra Sarvabhauma. Jagadish Tarkalankar, a renowned logician of the time, was his classmate and Harihar Tarkalankar, another renowned logician, was his pupil.
Mathuranath’s commentaries on new logic expanded the study of logic in Bengal. By virtue of his extraordinary wisdom and writing skill he won a distinguished place in learned society. Mathuri, his commentary on Chintamani, was very famous and regarded as an essential text for the study of logic. It is held in high esteem all over India. He also wrote commentaries and explanatory notes on a number of books by Raghunath Shiromoni, Udayan and Bardhamanopadhyay, among them Anumanadidhitimathuri, Gunadidhitimathuri, Dravyakiranavalitika, Dravyaprakashatika, and Gunaprakashavivrti. One of his original books was named Siddhantarahasya.
Jagadish Tarkalankar Nyaya philosopher and Sanskrit scholar from Navadwip in the 16th century. Jagadish Tarkalankar’s ancestors were originally from Sylhet, Bangladesh. His father, Jadavchandra Vidyavagish, was a nyaya scholar at Navadwip and his great-grandfather, Sanatan Mishra, was the father-in-law of Sri Chaitanya. Jagadish was taught nyaya scriptures at Bhavananda’s chatuspathi (religious school), where he became well-versed in nyaya philosophy and was awarded the title of ‘Tarklankar’.
Jagadish Tarkalankar was a college teacher. Mayukh, Jagadish’s annotation of Raghunath Shiromani’s Tattvachintamanididhiti is a four volume discourse: Pratyaksamayukh, Anumanmayukh, Upamanmukh and Shabdamayukh. He also wrote Anumandidhititika, Pratyaksadidhititika and Lilavatididhititika, annotations on Shiromani’s didhiti.
Jagadish’s Shabdashaktiprakashika was once taught as a textbook at all chatuspathi in Bengal. Two of his other books are Tarkamrta and Nyayadarshan. He was awarded the title of ‘Jagadguru’ for his scholarship.

Few words on business and mathematics:
Though the mathematization of economics began in earnest in the 19th century. Most of the economic analysis of the time was what would later be called classical economics. Subjects were discussed and dispensed with through algebraic means, but calculus was not used. One of the earliest use of mathematics was in trading.
Algebra is widely used in business. Since Sridhara was the first mathematician who made practical application of algebra, so it can be guessed that the use of algebra in business started then.
Muslin was bought by the pharaohs of Egypt. Weaving muslin cloth needed a good knowledge of measurement, where use of mathematics is vital.
First century B.C. to first century A.D. Kushan and Gupta era the trade became more developed. Use of currency spread over. The money-goods-money relation became a practice. The use of mathematics became important in this case.
The merchant fleet floated in the Bay of Bengal. They had their business in Sindh, Koromandal and Bengal. Trade items were silk, precious stones, spices, metal goods, clothes etc. The Bengalese had their sea trade with Ceylon, Malabar, Koromandal, Pegu, etc. during Mughal period. On the land way they had the business from Persia to Volga river. During the reign of Emperor Akbar there was a professional group called kusid who used to give money on interest. Mathematics played a role in calculation of this type of business. The Emperor Akbar also introduced ‘common system of measurement’ and ‘currency unit’.

Conclusion
So we see that the use of mathematics in business and trade was wide in ancient and medieval Bengal. The Bengali mathematicians made enormous contribution in world mathematics as well.

References

1. D Pingree, Biography in Dictionary of Scientific Biography (New York 1970-1990).
Books:
2. G G Joseph, The crest of the peacock (London, 1991).
Articles:
3. K Shankar Shukla, The Patiganita of Sridharacarya (Lucknow, 1959).
4. B Datta, On the relation of Mahavira to Sridhara, Isis 17 (1932), 25-33.
5. Ganitanand, On the date of Sridhara, Ganita Bharati 9 (1-4) (1987), 54-56.
6. T Hayashi, Sridhara’s authorship of the mathematical treatise Ganitapancavimsi, Historia Sci. (2) 4 (3) (1995), 233-250.
7. K Shankar Shukla, On Sridhara’s rational solution of Nx^2+1=y^2, Ganita 1 (1950), 1-12.
8. A I Volodarskii, Mathematical treatise Patiganita by Sridhara (Russian), in 1966 Phys. Math. Sci. in the East (Russian) ‘Nauka’ (Moscow, 1966), 141-159
9. A I Volodarskii, Notes on the treatise Patiganita by Sridhara (Russian), in 1966 Phys. Math. Sci. in the East (Russian) ‘Nauka’ (Moscow, 1966), 182-246.
10. A I Volodarskii, Outlines of the history of medieval Indian Mathematics (Russian), ‘Nauka’ (Moscow, 2009).
11. Bongard Levin, Antonova, Kotovski, History of India, Progress Publisher, Moscow,1982

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প জীবনী ও স্মৃতিকথা ভালবাসা/প্রণয়লীলা

রেইনা ১, ২ ও ৩ :একটি প্রেমের গল্প

রেইনা ১, ২ ও ৩ :একটি প্রেমের গল্প

———–ডঃ রমিত আজাদ

রেইনা ১

কবরস্থানের খুব কাছেই হোষ্টেলটি। এই বিষয়টি আমার ভালো লাগেনি। জর্জিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দয্য অপূর্ব। এর রাজধানী ‘তিবিলিসি’। মানুষের হাতে গড়া নিখুঁত পুরাতন ও আধনিক দালান-কোঠা, রাস্তা-ঘাট আর বিধাতার হাতে গড়া মনোরম নৈসর্গিক সৌন্দর্য্য এই দু’য়ের সমন্বয়ে শহরটি হয়ে উঠেছে অপরূপ। বিদেশে উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নে আসা। তারই একটি রিপাবলিক জর্জিয়া পার্বত্য অঞ্চল, ঠিক …। মস্কো থেকে চার রাত্রি, তিন দিনের ট্রেন ভ্রমন শেষে তিবিলিসি শহরে পৌঁছানোর পর, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস যখন আমাদের রেলওয়ে ষ্টেশন থেকে শহরের সড়ক বেয়ে নিয়ে যাচ্ছিল শহরের এক প্রান্তে থাকা বাগেবী ষ্টুডেন্টস্ টাউনের দিকে, বাসের জানালা দিয়ে দু’পাশের শহরের দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। উঁচু নিচু পাহাড়ী পথ বেয়ে বাস যখন পৌঁছাল শহরের এক প্রান্তে। হঠাৎ করেই শুরু হলো কবরস্থান। খুব পরিচ্ছন্ন, টিপ-টপ, সাজানো-গোছানো হলেও কবরস্থান কবরস্থানই। কবরস্থান শব্দটির সাথে নিস্তদ্ধতার গভীর সম্পর্ক। যেখানে জীবন নাই, তাই কোন গতিও নাই। গতিহীনতা আর শব্দহীনতার নিস্তদ্ধতা। কবরস্থান শেষ হতে না হতেই ফুটে উঠল ’বাগেবী ষ্টুডেন্ডস্ টাউন। এদেশে গাড়ী চলে রাস্তার ডান দিক দিয়ে। ডানে মোড় নিয়ে বাসটি ঢুকে গেল ষ্টুডেন্টস্ টাউনে। রাস্তার ডানে ষ্টুডেন্টস্ টাউন বামে পাহাড়ী বন। সত্যিই চমৎকার। কিন্তু কবরস্থানের খুব কাছে বলে মনটা খারাপ হয়ে গেল। যদিও জীবন আর মৃত্যূ খুব কাছাকাছি, তারপরেও যতক্ষন জীবিত আছি মৃত্যুকে স্বাগত জানাতে ইচ্ছা হয় না। ষ্টুডেন্টস্ টাউনটা শহরের বাইরে বলে, ট্রান্সপোর্টের সামান্য সমস্যা হয়। সিটি সার্ভিসের বাসগুলো প্রায় সবই শহরের শেষে এসে যায়, অর্থাৎ কবরস্থানটাই তাদের সীমানা। কেবল একটি নান্বারের বাস এবং একটি নাম্বারের মাইক্রোবাস ষ্টুডেন্টস্ টাউন পর্যন্ত যায়। শহর থেকে ফেরার পথে কখনো এই দু’টা ট্রান্সপোর্ট না পাওয়া গেলে, যে কোন বাস বা ট্রলিবাসে চড়ে শহরের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত আসা যায়। এরপর বাকী পথটুকু পাহাড়ের মধ্যে উপভোগ করতে করতে হেঁটে হেঁটেই চলে আসা যায়। কিন্তু আজ একটু সমস্যা হয়ে গেলে। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। ট্রলিবাস থেকে নেমে বুঝতে পারলাম আমি একাই এই বাস ষ্টপেজে নেমেছি। আশে-পাশেও কাউকে দেখতে পেলাম না। এদেশে এম্নিতেই মানুষ কম, এই মুহুর্তে আমার মনে হলো, এদেশে বোধ হয় কোন মানুষই নেই। এখান থেকে হেটে আমাকে হোষ্টেলে যেতে হবে। ঠিক করবস্থানের পাশ দিয়ে। ভাবতেই গাটা ছমছম করে উঠল। ভুত আমি কখনো দেখিনি, তারপরেও ভুতের ভয় মনে ঠিকই আছে। কোন লেখক যেন বলেছিলেন যে, ভূতকে অ¯বীকার করা যায় কিন্তু ভুতের ভয়টাকে অ¯বীকার করা যায় না। মোক্ষম বলেছেন, উনিও বোধ হয় আমার মত ভুতের ভয় পেতেন। আমি এখন ভাবছি, আমাকে এখন হোষ্টেলে ফিরতে হবে। বাস ষ্টপেজে তো আর রাত কাটানো যাবে না। হোষ্টেলে বন্ধু-বান্ধবেরা হয়তো এতখনে দুশ্চিন্তা করছে। সবচাইতে বেশী অস্থির হয়ে উঠছে রেইনা, আমার বিদেশিনী বান্ধবী। কি আর করা, বাস ষ্টপেজ ছেড়ে হোষ্টেলের দিকে হাট্তে শুরু করলাম। দু’তিন মিনিট পরেই হাতের ডানে কবরস্থান শুরু হলো। গা ছমছম করছে বা পাশে ঘন পাহাড়ী বন আর ডানপাশে কবরস্থান তার মধ্যে দিয়ে হেটে চলছি আমি একা। মনে মনে দোয়া-দরূদ পড়ছি আর চোখ-কান খোলা রেখে চলছি। চোখ-কান বন্ধ থাকলেই বোধ হয় ভালো হতো। কিন্তু তাতো আর হবার না। কানতো প্রকৃতিগত ভাবেই খোলা থাকে আর চোখ বন্ধ রাখলে চলা যাবে না। মিনিট পাঁচেক চলার পর যা দেখলাম তাতে গায়ের রক্ত হীম হয়ে গেল। একটি কবরের কাছে কালো একটি ছায়া মুর্তি নড়ে উঠল। থমকে গেলাম। কি করব বুছে উঠতে পারছি না। এখনই কি মুর্ছা যাব ? হঠাৎ করে ছায়া-মুর্তিটি স্পষ্ট রুশ ভাষায় বলে উঠল, “হে যুবা তোর কাছে সিগারেট হইবে ?” মনে প্রাণ ফিরে পেলাম। কবর থেকে উঠে আসা অশরীরি কিছু নয়। একেবারে রক্ত-মাংসের মানুষ। সন্ধ্যায় নির্জন কবরস্থানে ও করছে টা কি ? টলতে টলতে ও আমার দিকে এগিয়ে এলো, কথা বলার সময় শুনেছি ওর কন্ঠস্বরও জড়ানো ছিল। মাতাল! এবার বুঝলাম, মদ খেয়ে চুড় হয়ে কবরস্থানে বসে আছে। দিন-রাতের জ্ঞানও বোধ হয় এই মুহূতে নেই। তাকে আমার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে এবার অন্য ভয় ধরে বসল। ব্যাটা না আবার আমার উপর চড়াও হয়। মদ খেলে তো আর কান্ডজ্ঞান থাকে না। মাতাল অবস্থায় ভাই ভাইকে, স্বামী-স্ত্রীকে হত্যা করেছে এমন তো হর হামেশাই শোনা যায়। ইসলাম ধর্মে মদ্যপান শুধু শুধু হারাম করা হয় নি। আমার কাছাকাছি এসে আরেকবার জড়ানো কন্ঠে জিজ্ঞেস করল “তোর কাছে সিগারেট হইবে?” আমি উত্তর দিলাম, “না আমি সিগারেট খাই না”। ওহ, তুইতো বিদেশী দেখিতেছি, সিগারেট খাস না কেন? যোগী সাধক নাকি! ” যা ভেবেছিলাম তাই, ওর কন্ঠস্বর এগ্রেসিভ, যে কোন মূহুর্তে মারমূখী হয়ে উঠতে পারে। রুশ বা জর্জিয়ানরা দীর্ঘকায়, আমার তিনগুন তো হবেই। এর সাথে হাতাহাতি শুরু হলে রক্ষা নাই । কোন কিছু ঘটার আগেই ঝেড়ে দৌড় দিলাম। পিছন থেকে ও ডাকছে, কি কি যেন বলছে কিন্তু টলায়মান পা নিয়ে আমার পিছনে পিছনে আসতে পারলো না। কিছু দূর এসে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। এবার আমার কাছে ¯পষ্ট হলো ম্ত না, জীবিত মানুষই ভয়ংকর। হোষ্টেলে ফিরে দেখলাম সবাই মোটামুটি চিন্তিত। রেইনা উৎকন্ঠিত হয়ে আমার রুমে এসে বসেছিল। আমার রুমমেট সাইফুল আর বিদ্যুৎ তাকে অভয় দিচ্ছিল। আমাকে দেখে ওর মুখে হাসির ঝিলিক খেলে গেল। ‘তুমি ফিরিয়াছ।’
ঃ হ্যাঁ
ঃ কোন সমস্যা হয় নাই তো ?
ঃ উঁ, কিছুটা। না, তেমন কিছুনা । তোমাকে পরে বলব।

রেইনা দক্ষিণ আমেরিকার মেয়ে। দেশের নাম বলিভিয়া। ছোট-খাট গড়নের, কিন্তু অদ্ভূত সুন্দরী। গায়ের রঙ ইউরোপীয়ানদের মত সাদা নয় আবার আমাদের মত শ্যামবর্ণও নয় এই দু’য়ের মাঝামাঝি। দীঘল চুলের রঙ কালো। আমার আগে ধারণা ছিল বিদেশী মেয়েরা লম¦া চুল রাখেনা, বিদেশে এসে ধারণা পাল্টেছে। অনেক মেয়েরই বেশ লম্বা চুল আছে। রেইনা এমন একজন। চোখ দু’টো বেশ বড় বড়। ও আমাকে বলেছে বাড়ীতে ওর ভাই-বোনরা ওকে বলত গরুর চোখী। আমি হেসে বলেছি, তাই নাকি এরকম কথা তো আমাদের দেশেও প্রচলিত আছে। আমি জানিনা ওর রূপের প্রশংসা আমি খুব বাড়িয়ে বলছি কি না। তবে ও যে মন কেড়ে নেয়ার মত সুন্দরী এই বিষয়ে সবাই আমার সাথে একমত হয়েছে। তবে ওর রূপ যে আমাকে আকৃষ্ট করেছে ব্যাপারটা সেরকম নয়। ওর মনই আমার মন কেড়েছে। দেশে থাকতে একটা গান শুনতাম ‘এ মন শুধু মন ছুঁয়েছে’। রেইনার সাথে পরিচিত হওয়ার পর গানটির মর্ম বুঝতে পেরেছি।

বিদেশীনিদের মন যে এত সুন্দর হয় তা আগে ধারনা করতে পারিনি। দেশে থাকতে মনে হতো আবেগ, অনুভুতি, ভালোবাসা এগুলো কেবল বাঙালীদেরই আছে, বড়জোর ভারতীয় বা পাকিস্তানীদের । আমার সে ভুল ভেঙেছে। মানবীয় আবেগ অনুভুতি কোন ভৌগলিক সীমারেখায় সীমাবদ্ধ নয়। ওকে প্রথম দেখেছিলাম মস্কোর একটি রেলওয়ে ষ্টেশনে। সারা পুথিবীর ছেলে-মেয়েরা সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়তে আসে। প্রথম ল্যান্ড করে মস্কোতে । দু’একদিন মস্কোতে থাকতে হয়। তারপর মস্কো থেকে তাদের ছড়িয়ে দেয়া হয়। সারা সোভিয়েত জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন শহরে। মস্কো বিশাল নগরী এখানে ৮/১০ টি রেলষ্টেশন আছে। এই ষ্টেশন গুলো থেকে ট্রেনে চেপে বিদেশী ছাত্র-ছাত্রীরা চলে যায় তাদের গন্তব্যে। মস্কোতে যখন দ্বিতীয় দিন কাটাচ্ছি, দু’জন রুশ মেয়ে এসে আমাকে জানালো, “আজ রাতের ট্রেনে তোমাকে তিবিলিসি যেতে হবে।” দেশে থাকতে শুনেছিলাম যে, রুশরা ইংরেজী জানেনা, আমার ধারনাা ভুল ছিল, এই দু’টি মেয়ে চমৎকার ইংরেজী বলে। সন্ধ্যা আটটার দিকে একটি বাস এসে হোটেল থেকে আমাকে তুলে নিল। আমার সাথে আরো কয়েকজন বাংলাদেশী ছিল। দু’জন ছাত্রী আর চারজন ছাত্র। সুমন নামে আরেকজন সিনিয়র ছাত্র আমাদের সাহায্য করার জন্য আমাদের সাথে বাসে চড়ে ষ্টেশনে এসে ট্রেনে তুলে দিতে এসেছিলেন। আমাদের এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে রেখে তিনি খোঁজ-খবর করে এলেন, আমাদের ট্রেন কখন কোন প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়বে। এ সময় আমার চোখে পড়ল কিছুদূরে বাঙালী মেয়েদের মতই দেখতে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে এক ভদ্রলোক দাঁড়ানো। ওই মেয়েটিরই দেশী হবে হয়তো। এমসয় সুমন ভাই এগিয়ে গিয়ে তাঁর সাথে কথা বললেন। ফিরে এসে বললেন ঐ মেয়েটি তোমদের সাথেই তিবিলিসি যাবে, ওর সাথে ওর দেশী আর কেউ নেই। তোমরা ওকে দেখে রেখ। আমি বললাম, “আর ঐ ভদ্রলোক ?” সুমন ভাই বললেন উনি ওদের এ্যাম্বেসীর, ওকে ষ্টেশনে পৌঁছে দিতে এসেছেন। ষ্টেশনটি বিশাল আকৃতির এবং বেশ ঝকঝকে । আমরা ঘুরে ফিরে দেখছিলাম আর মুগ্ধ হচ্ছিলাম। এরমধ্যেই বারবার আমার চোখ যাচ্ছিল ঐ মেয়েটির দিকে। কেন এমন হচ্ছিল বুঝতে পারছিলাম না। ও কি এমনি রূপসী, যার থেকে চোখ ফেরানো যায় না । মনে তো হয় না। তারপরেও কেন এমন হচ্ছে ? একটা গানের কলি মনে পড়ল ‘হঠাৎ দেখে চমকে. নির্বাক হয়ে গেছি থমকে, মনে হলো তুমি যেন অনেক দিনের চেনা।’ এই পৃথিবীতে কত মেয়েই তো আছে, তারপরেও একটি মেয়েকে দেখামাত্রই অনেক দিনের চেনা মনে হবে কেন ? আধুনিক চিকিৎসা শা¯ত্র বলে এই দু’জনের হরমোন লেভেলে কিছু একটা কোইনসাইড করে, ফলে এরকম হয়। হবে হয়তোবা। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হয়তো এমনই । আবার না হলেই বা কি? সবকিছুর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকতেই হবে এমন তো কোন কথা নেই।

রাত দশটার দিকে ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে সুমন ভাই খুঁজে-খাজে আমাদের সঠিক ট্রেনে, সঠিক ট্রেনটিতে তুলে দিয়েছিলেন। রুশদের অনেকেই চমৎকার ইংরেজী বলে, কিন্তু বেশীরভাগই ইংরেজী বলতে পারেনা। প্রথমে অবাক হয়েছিলাম, প্রাক্তন বৃটিশ শাসিত দেশে থেকে ধারনা হয়েছে। শিক্ষিত মানুষ মাত্রেই ইংরেজী জানবে। ভালো ইংরেজী জানা তো শিক্ষারই একটি ইন্ডিকেটর । বিদেশে এসে এই ভুল ভেঙেছে। উন্নত সবগুলো দেশেই তাদের মাতৃভাষায়ই শিক্ষা প্রদান করা হয়। এর পাশাপাশি তারা অন্যান্য বিদেশী ভাষাও শিখে থাকে। রাশিয়ার স্কুলগুলোতে বিদেশী ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামুলক, তবে অপশোন থাকে। ইংরেজী, জার্মান, ফ্রেঞ্চ ও ষ্প্যানিশ এইগুলোর যে কোন একটি বেছে নিতে হয়। ফলে কেউ জানে ইংরেজী, কেউ জার্মান, কেউ ফ্রেঞ্চ বা ষ্প্যানিশ জানে। আমরা যেহেতু তখনো রুশ ভাষা জানতাম না, তাই সুমন ভাই আমাদের সাথে থেকে সবরকম সাহায্য করে একবারে ট্রেনে তুলে দিলেন। উনি পুরো কাজটি করেছিলেন একেবারে নিঃস্বার্থে। এই দূরদেশে একদল বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রীর যেন কোন কষ্ট না হয় সেই উদ্দেশ্যে তিনি তা করেছিলেন । আমি ট্রেনে উঠে উনাকে অনেক ধন্যবাদ জানিয়েছলাম। এই দূরদেশে এমন একজন হৃদয়বান বাংলাদেশীকে দেখে মন ভরে গিয়েছিল। কম্পার্টমেন্টে উঠে দেখলাম চারটি টিকিট একটি বার্থের, বাকী চারটি টিকিট, চারটি ভিন্ন ভিন্ন বার্থের। এভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে ভেবে মন খারাপ হয়ে গেল। আমাদের সাথের মেয়ে তিনজনার জন্য দায়িত্ববোধ জেগে উঠল। বললাম, “ওরা তিনজন এক বার্থে থাকুক।” আর সালমান নামে আমাদের মধ্যে একজন ছিল, মাত্র দু’দিন হলো বিদেশে এসেছি এর মধ্যেই ও হোম সিকনেস ফীল করে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে গিয়েছিল, সালমানকে ওদের সাথে দিলাম। সাইফুল খুব লম্বা-চওড়া, প্রায় রুশদের মতই, পাহাড়াদার হিসাবে ওকে পাশের বার্থেই দিলাম। আমি আর বিদ্যুৎ একটু দূরের বার্থ দু’টিকে স্থান নিলাম। ট্রেন ঘন্টাখানেক চলার পর মন খারাপ হয়ে গেল। আমার বার্থে যারা ছিলেন তারা ভালোই ছিলেন। তারপরেও আস্তে আস্তে এসে সালমানদের বার্থে এসে ঢুকলাম ভেবেছিলাম কিছুক্ষণ গল্প-গুজব করে, আবার নিজের বার্থে এসে ঘুমাবো। আমি ওদের বার্থে ঢুকে দেখি সাইফুল আর বিদ্যুৎ আগে থেকেই ওখানে বসে আছে। সবার মনেই এক্ অবস্থা। মনে হচ্ছিল এই ট্রেনটা জুড়ে সব্ইা আমাদের পর, সবাই ভিন জগতের মানুষ। কেবল আমরা সাত জনই একে অপরের আপন। হঠাৎ করে রেইনার দিকে নজর পড়ল। আরে আমরা তো তাও ছয়জন একই দেশের, ও তো একেবারেই একা। ওর কথা ভেবে মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল। তবে ওর মুখভাব দেখে মনে হচ্ছিল না যে ওর মন ততটা খারাপ। বুঝলাম বেশ শক্ত মেয়ে, ওর সাথে কথা বলতে চাইলাম। কথা বলতে গিয়ে কথা আটকে গেল। কোন ভাষায় কথা বলব ওর সাথে ? এদের ভাষা কি ? ও কি ইংরেজী বুঝবে ? আমি তো এর বাইরে কোন বিদেশী ভাষা জানিনা। কাছে এগুতে গিয়েও এগুতে পারব না। ভাষার ব্যবধান খুব বড় ব্যবধান, আমাদের মধ্যে সেই ব্যবধান আছে। নানা জাতির ভাষা বৈচিত্র্য সম্পর্কে বাইবেলে একটি কাহিনী বর্ণিত আছে ঃ এক সময় মানব জাতির একটিই ভাষা ছিল। তারা একবার ঠিক করল, একটি উচু টাওয়ার তৈরী করে ইশ্বরের কাছে পৌছে যাবে। যখন তারা টাওয়ারটি তৈরী করে কাজ কিছুদূর এগিয়ে নিয়ে গেলে, ইশ্বর তখন টাওয়ারটি ভেঙে দিলেন আর মানবজাতিকে নানা ভাষা তথা নানা জাতিতে বিভক্ত করে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিলেন, যাতে তারা খুব সহজে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে। কাহিনীটির ঐতিহাসিক সত্যতা যাচাই করার ক্ষমতা আমার নেই, তবে ভাষাগত পার্থক্য যে জাতিতে জাতিতে বিশাল ব্যবধান সৃষ্টি করেছে, তা ঐ মুহুর্তে তো বটেই, পরবর্তী জীবনেও বেশ বুঝতে পেরেছিলাম।

রেইনার চোখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে একটা কবিতা লিখে ফেললাম

সুদূর নক্ষত্রলোক থেকে
শত বছরের নিস্তদ্ধতা এসে বলে গেল,
ধ্বনিরা জাগ্রত হও,
কোলাহলময় উৎসবের রাতে
প্রেয়সীর চোখে জমে থাকা জলে
জ্যোৎস্নার আলো জ্বলে উঠে বলে
প্রেমিক তুমি স্থবিরতা ভেঙে, চঞ্চল হয়ে ওঠো।

রেইনা হঠাৎ করে বলে উঠল, “ওয়ান্ট টু সে সামথিং ?” এবার আমি চমকে উঠলাম, বললাম, “ ডু ইউ স্পীক ইংশিল ?”, ও বলল “ইয়েস, এ লিট্ল বিট”। জানলাম, ওদের ভাষা ষ্প্যানিশ। ও ভাঙা ভাঙা ইংলিশ ও ভাঙা ভাঙা রুশ বলতে পারে। ভাঙা ভাঙা রুশ আমিও বলতে পারতাম। রাশিয়ায় আসব জেনে, রাশান কালচারাল সেন্টার থেকে ছোটখাট একটা কোর্স করে কিছু কিছু শব্দ, কিছু বাক্য শিখে নিয়েছিলাম। সেই ভাঙা রুশ আর কাজ চালানোর মত ইংরেজী এই দিয়ে ওর সাথে কথোপকথন চালাচ্ছিলাম। এ এক অদ্ভূত খেলায় আমরা মেতে উঠলাম। হৃদয়ের টানে ভাষার ব্যবধান মুছে ফেলতে চাচ্ছিলাম। মস্কো থেকে তিবিলিসি দীর্ঘ রেলপথ। আগে বই-পত্রে পড়েছি পৃথিবীর দীর্ঘমত রেলপথ রাশিয়ার ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলওয়ে। আমরা যে লাইনের উপর দিয়ে যাচ্ছিলাম এটা ‘ ট্রান্স ককেশিয়ান রেলওয়ে ’। চার রাত তিন দিন এ’্ রেলপথে ছিলাম। আমার জীবনে এটাই ছিল দীর্ঘতম ট্রেন ভ্রমণ। ট্রেনের দু’পাশের দৃশ্য ছিল চমৎকার। আমাকে সাইফুল বলেছিল যে, সে শুনেছে ট্রেন কৃষ্ণ সাগরের পাশ দিয়ে যাবে। এটা শুনে আমার উৎসাহ ভীষণ বেড়ে গেল। এই কৃষ্ণ সাগরের বর্ণনা ভূগোলে পড়েছি, পড়েছি বিভিন্ন গল্প-সাহিত্যে, এখন চোখের সামনেই দেখতে পাব !

মস্কো থেকে তিবিলিসি পর্য›ত দীর্ঘ রেলপথে সময় কাটছিল রেইনার সাথে কথা বলে । জানলাম দেশে ওদের বাবা-মা ও ছয় ভাই-বোন নিয়ে বড় পরিবার। ওর বাবা-মা সন্তানদের পড়ালেখার বিষয়ে ভীষণ উৎসাহী। ওর বড় ভাইও রাশিয়াতে পড়ালেখা করেছেন। ওর বাবা পেশায় ইঞ্জিনিয়ার । পরবর্তিতে রেইনার কাছ থেকে জেনেছিলাম, যে ওর বাবার আরেকটি পরিচয় হলো, তিনি ওদের দেশের একজন কম্যুনিষ্ট নেতা। তিনিও বছর দুই রাশিয়াতে কাটিয়েছিলেন। কম্যূনিষ্ট আদর্শে এত বেশী উজ্জীবিত ছিলেন যে, ছেলে-মেয়েদের রাশিয়ায় পড়তে পাঠিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, তাদেরকেও কম্যূনিষ্ট আদর্শে গড়ে তোলা। আমার ঐ বয়সে রাজনৈতিক নীতি-আদর্শ, দর্শন আমি ভালো বুঝতাম না। যা বুঝতাম তা যৎসামান্য। তারপরেও মনে করতাম অনেক জানি, অনেক বুঝি। এটা বোধ হয় বয়সের দোষ। আরেকটি বিষয় আমার মনে বদ্ধমূল হয়েছিল, সেটি হলো ‘জাতীয়তাবাদ’ । এই জাতীয়তাবাদী চিন্তা-ভাবনার দ্বারা আমি এত বেশী প্রভাবিত ছিলাম যে তা অনেক সময় ফ্যাসিবাদের পর্যায়ে চলে যেত । বইয়ে পড়েছিলাম যে, এডলফ হিটলার মনে করতেন, ‘রাষ্ট্রের জন্য মানুষ, মানুষের জন্য রাষ্ট্র নয়’। আমার কাছে মনে হয়েছিল, হিটলার ঠিকই বলেছেন। যে দেশটায় আমার জন্ম , যে দেশটার আলো-বাতাসে আমি বড় হয়েছি, সেই দেশের জন্য কাজ করার চাইতে বড় কর্তব্য আর কি হয়ে পারে ? সে দেশের জন্য যদি জীবন দিতে পারি, এর চাইতে বড় সম্মান আর কিসে হতে পারে ? পরবর্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দর্শনের ক্লাসগুলোতে আমার চিন্তা-ভাবনার ক্রটি বুঝতে পেরেছিলাম।

রাতে সমস্যায় পড়লাম। আমরা সাতজন এক বার্থে। বার্থে সীট আছে চারটি। আমরা ঘুমাবো কি করে ? আমাদের মধ্যে সাইফুল ছিল সবচাইতে বেশী লম্বা-চওড়া। লম্বায় প্রায় ছ’ফুট। সুঠাম দেহের বাংলাদেশীরা সাধারণত মাস্তান স্বভাবের হয়, কিন্তু সাইফুল মোটেও সেরকম নয়, অত্যন্ত নম্র-ভদ্র। দু’তিন দিনের পরিচয়েই ওকে ভালো লেগে গেল। ও বলল, “ আমার সীট তো পাশেই বার্থেই, আমি ওখানেই ঘুমাই ”। ওকে, একটা সমাধান পাওয়া গেল। বাকী ছ’জনের এ্যারেঞ্জমেন্ট কিভাবে করা যায় ? বিদ্যুৎ বলল, “ অত কিছু বুঝি না, আমার ঘুম পাইছে, আমি সালমানের পাশে ঘুমাই ”। এই বলে বার্থের উপরের সীটে সালমানের পাশে গুয়ে পড়ল। বাংলাদেশী মেয়ে দু’জন লিজা আর আফসানা ঠিক করল ওরা দু’জন এক সীটে ঘুমাবে। বাকী রইলাম আমি আর রেইনা। আমরা দু’জন কে কোথায় ঘুমাবো? তাকিয়ে দেখলাম লিজা আর আফসানা মুখ টিপে হাসছে। আমিই সমস্যার সমাধান করে দিলাম। সীটটাা যেহেতু রেইনার, অতএব ও ঐ সীটেই ঘুমাবে, আর আমি ওর পায়ের কাছে বসে থাকব। আফসানা বলল, “কতগুলো রাত পায়ের কাছে বসে কাটাবে ?” সবাই কোরাসে হেসে উঠল। বেশ লজ্জা লেগে গেল। রেইনা কিছু বুঝতে না পেরে আমার দিকে তাকালো। আমি চুপ করে রইলাম।

বসে বসে ঘুমিয়ে, প্রথম রাতটা পার করলাম। রাতে মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে যাচ্ছিল। বার্থের মধ্যে সবাই বেশ নির্বিঘেœ ঘুমাচ্ছিল। রেইনার দিকে তাকিয়ে দেখলাম ঘুমন্ত একটি লিস্পাপ মুখশ্রী। যতবার ওর দিকে তাকাছিলাম ততবারই মন তোলপাড় হয়ে যাচ্ছিল। অনেকের মনে হতে পারে রাতের আলো-আধারীতে একটি রূপসী মেয়ের পাশে বসে আমার মধ্যে কামণা জাগ্রত হতে পারে। কিন্তু এমন কোন অনুভুতিই আমার হয়নি। বিন্দুমাত্রও না । আমার হৃদয়টাকে যদি ফুলের সাথে তুলনা করি, তবে যা হচ্ছিল তাকে বলা যায়, ফুলের পাঁপড়িতে আন্দোলন।

সকালে উঠে সবাই ক্ষুধার্ত । একটি গ্রামের ষ্টেশনে ট্রেনটি থামলে আমরা দুধ, রুটি আর কিছু ফলমূল কিনলাম। লিজা আর আফসানাকে দেখেছি সব সময়ই ছেলেদের উপর ডিপেনডেন্ট। কিছু লাগলে বলছে, এটা করে দাওনা, ওটা করে দাওনা। কিছু কিনতে চাইলে বলছে, এটা কিনে দাওনা, ওটা কিনে দাওনা। রেইনাকে দেখালাম সেরকম নয়। ওর কাজ ও নিজেই করে নিচ্ছে। কিছু কিনতে চাইলে ফেরিওয়ালা ডেকে নিজেই দরদাম করে কিনে নিচ্ছে। বুঝলাম এই মেয়ে স্বাবলম্বী, নিজের ভার নিজেই নিতে পারে। পরে বুঝতে পেরছিলাম সাউথ এ্যামেরিকান বা ইউরোপীয়ান মেয়েরা এরকমই হয়। ব্রেকফাষ্টে ফলমূল যা খাচ্ছিলাম তার প্রায় সবই অপরিচিত, ব্ল্যাক বেরী, পিচ, রাস্প বেরী, চেরী, ইত্যাদি। এতকাল কেবল এদের নাম শুনেছি, এই প্রথম স্বাদ গ্রহণ করলাম। খেতে খেতে খাবার প্রসঙ্গে আলাপ হলো। জানতে পারলাম ওদের দেশে আম, কলা, পেঁপে, জাম্বুরা, কমলা ইত্যাদি আছে। ওদের প্রধান খাদ্য ভুট্টা আর আলু। ওর কাছ থেকেই প্রথম জানলাম আলুর জন্মভুমি বলিভিয়া এবং পেরু। ভুট্টাও ওখানেই প্রথম আবাদ হয়। মরিচের জন্ম ভুমিও ঐ দুটি দেশ। পরবর্তিতে জানতে পেরেছিলাম নানা ধরনের ফল-মূল, শাক-সবজী, শস্য আমেরিকা মহাদেশ থেকে ইউরোপ-এশিয়ায় এসেছিল। চকলেটের জন্মস্থানও বলিভিয়া, ইনকারা প্রথম এই মিষ্টান্নটি তৈরী করে। ইন্কা, হ্যা ইন্কাদের সম্পর্কে বইয়ে পড়েছি। দক্ষিণ আমেরিকার সবচাইতে উন্নত জাতি ছিল ওরা। ষ্প্যানিশরা আমেরিকায় প্রবেশের পর ইনকাদের সভ্যতা দেখে বি¯ি¥ত হয়েছিল। ইন্কাদের কেবল একটি জিনিসেরই অভাব ছিল, সেটি হলো আগ্নেয়াস্ত্র। এই আগ্নেয়াস্ত্রের অভাবেই তারা আগ্রাসী ষ্প্যানিশদের কাছ পরাজিত হয়েছিল। বেচারা ইন্কাদের কি দোষ দেব ? আগ্নেয়াস্ত্র থাকা সত্ত্বেত্ত তো আমরা ইংরেজদের কাছে পরাজিত হয়েছিলাম। আমাদের সভ্যতা তো ইংরেজদের চাইতে বহুগুন উন্নত ছিল। এ কারনেই আমাদের নেতা সোহরাওয়ার্দী বলেছিলেন, “ এ কথা সত্য যে ইংরেজদের পাশবিক শক্তির কাছে আমরা হার মানতে বাধ্য হয়েছি কিন্তু সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যাগত গুনাগুন বিচার করলে আমরা কোন অংশেই তাদের চাইতে কম নই। ” তৃতীয় দিন সকালে লিজা হৈ চৈ করে সবাইকে ডাকতে লাগলো , ও বার্থের বাইরে করিডোরে জানালার পাশে দাড়িয়েছিল। সবাই ছুটে গেলাম। অদ্ভুদ সুন্দর দৃশ্য। ব্ল্যাক সী (কৃষ্ণ সাগর) ! খুব ধীর গতিতে ট্রেন যাচ্ছে সাগরের তীর ঘেসে, আর আমরা জানালা দিয়ে দেখ্ছি দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশির অপূর্ব সৌন্দর্য্য। ব্ল্যাক সী আসলেই ব্ল্যাক। ট্রেনের জানালা দিয়ে পানির রঙ কালো মনে হচ্ছিল। পানির উপরে হালকা কূয়াশা ছিল। যে বিষয়টি আমাদের একটু লজ্জায় ফেলে দিয়েছিল তা হলো সাগর তীরে সবাই বিকিনি পরিহিত। আমরা বাংলাদেশী ছেলে-মেয়েরা সব একসাথে দাড়িয়ে ছিলাম, এরকম দৃশ্য দেখে তো অভ্যস্ত নই। আফসানা বলেই বসল, “ লজ্জার দৃশ্য ”।

দ্বীতিয় রাতে বসে বসে ঘুমাতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। মাঝরাতের দিকে একবার ঘুম ভেঙে গেলে, রেইনা উঠে বসল। আমাকে প্রশ্ন করল, “ বসে বসে ঘুমাতে তোমার কষ্ট হচ্ছে ?” আমি চুপ করে রইলাম। হ্যা না কোন কিছু বলাই ঠিক হবে না ভেবে। রেইনা বলল, “ তুমি আমার পাশে শুতে পারো ”। আমি চমকে উঠলাম। বলে কি ও ! এই ভরা বার্থে এতগুলো তরুন-তরুনীর মধ্যে আমরা দু’জন যদি পাশা-পাশি শুই, পরিস্থিতি কেমন হবে! “ তবে এক শর্তে ,” রেইনা বলল।
ঃ কি শর্ত ?
ঃ আমার যেখানে পা, তোমাকে সেখানে মাথা দিতে হবে, আর তোমার পা থাকবে আমার মাথার কাছে।
মনে মনে ভাবলাম বেশ ভালো বুদ্ধি বার করেছে তো। আমার কষ্টটা কমানো হলো, আবার আমাদের মধ্যে ব্যবধানও রইল। এভাবেই আমরা বাকী রাতগুলো কাটিয়ে ছিলাম। চতুর্থ দিনে আমরা জর্জিয়ার কাজধানী তিবিলিসি এসে পৌছালাম। আমাদের মালপত্র সবকিছু নিয়ে আমরা এক ঝাঁক পাখীর মত কল-কাকলী করতে করতে ট্রেন থেকে নেমে এলাম। হঠাৎ করে, অত্যন্ত সুদর্শন ও প্রীতিকর একজন ব্যক্তি এসে স্পষ্ট ইংরেজীতে প্রশ্ন করলেন “ আর ইউ ফ্রম বাংলাদেশ ?”
ঃ ইয়েস ।
ঃ আই এ্যাম সাশা, দ্যা ডেপুটি ডীন অব ইয়ার ফ্যাকাল্টি।
ভদ্রলোককে প্রথম দর্শনেই সবার ভালো লেগেছিল। একটি মাইক্রোবাসে করে তিনি আমাদের নিয়ে গিয়েছিলেন বাগেবী ষ্টুডেন্টস্ টাউনে। এখানেই আছে তিবিলিসি ষ্টেট ইউনিভার্সিটির রাশান ল্যাংগুয়েজ কোর্সের ফ্যাকালটি।

আমরা খুব ক্লান্ত ছিলাম। আমাদের খুব প্রয়োজন ছিল লম্বা একটি ঘুমের। তারপরেও ’সাশা‘ আমাদের নিয়ে গেলেন ফ্যাকালটির অফিস রুমে। রেজিষ্ট্রেশনের প্রয়োজনে। আমাদের সাথে তিনি চোস্ত ইংরেজীতে কথা বলাইলেন। হঠাৎ করে উনার চোখ গেল রেইনার দিকে।
ঃ ইউ আর নট ফ্রম বাংলাদেশ, আই গেজ।
ঃ নো ! বলিভিয়া।
ঃ ও !
এরপর সাশা চট করে ষ্প্যানিশ বলতে শুরু করলেন। রেইনার সাথে কথাপোকথন ষ্প্যানিশ ভাষায়ই চালালেন। আমরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছিলাম। লোকটা ষ্প্যানিশও জানে। পরবর্তিতে জেনেছিলাম, তিনি সবগুলো ইউরোপীয়ান ভাষাইই জানেন।

কিছুক্ষনের মধ্যে রুম বন্টন হয়ে গেল। নাতাশা নামের অদ্ভুদ সুন্দরী এক ম্যাডাম আমাদের হোষ্টেলে নিয়ে গিয়ে রুম দেখিয়ে দিলেন। ম্যাডামকে দেখলাম ইংরেজী ও ষ্প্যানিশ দুটোতেই খুব পারদর্শী। আমরা বাংলাদেশীরা রুম পেলাম দোতালায়। রেইনা পেল তিনতলায়, পরে বুঝতে পেরেছিলাম, বাংলাদেশী ও ভারতীয় ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য নির্ধানিত ছিল দোতলা, আর দক্ষিণ আমেরিকানদের জন্য তিন তলা। দীর্ঘ ক্লান্তিকর ট্রেন জার্নির পর, হোষ্টেল এসে হাপ ছেড়ে বাঁচলাম সত্যি, কিন্তু ঐ চারদিনের মধুময়তা কিছুতেই কাটছিল না। মনে বারবার উকি দিচ্ছিল সেই বার্থ, সেই ভোর, সেই ভাঙা-ভাঙা ইংরেজী আর রুশে আলাপন।

পরদিন সন্ধ্যাবেলা বসেছিলাম হোষ্টেল সামনের বেলকুনিতে। এই বেলকুনিটির একটি বিশেষত্ব ছিল। বাগেবী যেহেতু শহরের একপাশে, এখান থেকে দূরে পাহাড়ের ঢালে বিশাল শহরের একাংশ দেখা যায়। সন্ধ্যা বেলায় বিশাল বিশাল দালানগুলোর জানালায় যখন আলো জ্বলে উঠে তখন মনে হয় যেন পাহাড়ের ঢালে হাজার হাজার প্রদীপ জ্বলছে। আর এই দৃশ্য থেকে চোখ ফেরানো যায় না। আমার মত আরো অনেকেই ব্যালকুনিতে বসে ঐ দৃশ্য উপভোগ করছিল। এত সৌন্দর্য্য সত্ত্বেও আমার মন বারবার ছুটে যাচ্ছিল রেইনার কাছে হঠাৎ পাশ থেকে লিজা বলে উঠল “এতই যখন মন খারাপ তখন তিনতলা থেকে ঘুরে এলেই পারো।” ও যদিও আমার মনের কথা ধরতে পেরেছিল। তারপরেও বিরক্তি লাগলো মনে হলো এ আমার একান্ত বিষয়ে হস্তক্ষেপে করা । এ সময় তিনতলার ব্যালকুনিতে হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। চেনা হাসির শব্দ হৃদয় উদে¦ল করে গেল। একবার পত্রিকায় পড়েছিলাম, ‘মেয়েটিকে দেখলে যদি বুকে ধুকধুকানি হয়, বুঝবেন মেয়েটিকে আপনি ভালোবাসেন, আমার বুকে সেই ধুুুকধুকানি শুনতে úেলাম । তাহলে কি আমি ওকে ভালোবাসি ?

সম্মোহিতের মতো সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠে গেলাম। রেইনা ওর বান্ধবীদের নিয়ে গল্প করছিল। আমাকে দেখে কয়েক সেকেন্ড নিস্তদ্ধ হয়ে গেল। আমার বুকে তখন প্রশান্ত মহাসাগরের আলোড়ন। সামনে জ্বলা হাজারো প্রদীপের আলোর পটভুমিতে দাড়ানো রূপসী রেইনাকে মনে হচ্ছিল রোমঞ্চিত হৃদয়ের পসারিনী। আমাকে দেখে ওর বান্ধবীরা চলে গেল। বিদেশীদের ভদ্রতাবোধ এদিক থেকে অনেক বেশী। বুঝতে পেরেছিল, এই দু’জনকে নিভৃতে থাকতে দেয়া প্রয়োজন। এরপর আমরা দু’জন হাত ধরাধরি করে ঐ আলো-আধারী বেলকুনীতে বসে, হাজার প্রদীপ জ্বলা দূরের তিবিলিসি শহরের সৌন্দর্য্য উপভোগ করেছি। কথায় কথায়, রোমাঞ্চ আবেগে কখন যে মাঝরাত পার হয়ে গিয়েছে টেরই পাইনি।

এর পর থেকে আমাদের ঘনিষ্টতা বাড়তেই থাকে। আমরা দু’জন দুই বিষয়ে উপর পড়ালেখা করতে এসেছিলাম। আমি ইঞ্জিনিয়ারিং আর ও বায়োকেমিষ্ট্রি। তাই ফ্যাকাল্টিতে আমাদের গ্র“প ছিল ভিন্ন ভিন্ন। এখানে আট-নয় জন নিয়ে একটা গ্র“প হয়। এক গ্র“পের একজন টিচার থাকেন। আমার টিচার ছিলেন মায়া তুখারিলি। তুখোর শিক্ষিকা হিসাবে তার নামডাক ছিল। সকাল নয়টা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত আমাদের ক্লাস ছিল। মাঝে মাঝে ব্রেক হতো, ব্রেক টাইমে রেইনা আমার কাছে আসতো, আমরা এক সাথে কফি খেতে যেতাম। একদিন ম্যাডাম মায়া আমাকে বললেন, “বিদেশীনি বান্ধবী তোমার।” আমি লাজুক হাসলাম। মায়া ম্যাডাম বললেন “ক্লাসের আলাপ-আলোচনায় যা বুঝতি পারি, তোমার মধ্যে জাতীয়তাবাদী ফিলিং খুব বেশী। তাছাড়া তুমি তোমার সংস্কৃতির প্রতি অতিমাত্রায় আসক্ত। আমি বললাম “জ¦ী আপনার মূল্যায়ন সঠিক। তিনি বললেন, “সেই তোমারই বিদেশীনি বান্ধবী, এটা কন্ট্রডিকশন নয় কি ?” আমি কি উত্তর দেব বুঝতে পারছিলাম না। আসলে আমার মনেও প্রশ্নটি বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল। ম্যাডামই প্রশ্নটির উত্তর দিয়ে দিলেন, “হৃদয়ের উচ্ছাস কোন বাধাই মানে না ”।

আমার সাথে মেলামেশা করতে করতে আমাদের সাথের অন্যান্য বাংলাদেশীদের সাথেও ওর সখ্যতা গড়ে উঠল। ও আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও যোগ দিত। রমজানের সময় একবার ইফতার পার্টির আয়োজন করলাম। ওকে বললাম, মাথায় কাপড় দিয়ে আসতে হবে কিন্তু। ও প্রথমে বলল, “উহু ! পারব না।” ইফতারের সময় দেখলাম ঠিকই মাথায় স্কার্ফ বেধে এসেছে। সাউথ আমেরকিানরা ইউরোপীয়ানদের মতই পোশাক-আশাক পড়ে। প্যান্ট-শাট, স্কার্ট-টপস ইত্যাদি। ওদের স্থানীয় কিছু পোশাক-আশাক আছে, তবে সেগুলো ওরা পড়ে বিশেষ উৎসবের দিনগুলোতে। প্যান্ট-শার্ট আর মাথায় স্কার্ফ পরিহিত রেইনাকে চমৎকার লাগছিল। আমি ওকে প্রশ্ন করলাম, “তোমার কি স্কার্ফ মাথায় অ¯¡স্তি লাগছে ?” ও বলল, “মোটেও না, আমরা তো এই পোশাকেই চার্চে যাই।” এরপর ও আমাকে আস্তে আস্তে বলল, “তোমাদের মেয়েরা যে শাড়ী পড়ে, ঐ পোশাকটি কিন্তু চমৎকার ! আমার খুব ইচ্ছা হয় শাড়ী পড়তে।”

ইতিমধ্যে মাস ছয়েক পেরিয়ে গেছে। রুশ ভাষা অনেকখানি রপ্ত করে এনেছি। এখন আমাদের কমন ল্যাংগুয়েজ রুশ। খুব ঠেকে গেলে ইংরেজী বলতাম। ও বলত, “ইংরেজী বলিতেছ আমিতো উহাও খুব ভালো পারিনা ।” আমি বলতাম, “তাও যা বল যথেষ্ট ভালো। আমাদের বাংলাদেশীদের অনেকে কিন্তু তোমার চাইতে অনেক খারাপ ইংরেজী বলে”। রেইনা হাসল, কিছু বলল না। বিদেশীরা ভদ্র হয়, সহজে মানুষের মনে কষ্ট দিতে চায়না। আমরা বাংলাদেশীরা মনে করি যে, আমরা খুব ভালো ইংরেজী জানি। বিষয়টি মোটেও সে রকম না, মোটামুটি ভালো ইংরেজী বলতে পারে এমন লোক হাতে গোনা। বাংলাদেশের স্কুল-কলেজ গুলোত উচু মানের ইংরেজী তো দূরের কথা, স্পোকেন ইংলিশ শেখানোর মতও ভালো শিক্ষক নেই। সেরকম কোন রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপও নেই। ছাত্রদের দোষ দেয়া যাবে না, তাদের যা শেখানো হয়, তারা তাই শেখে। রাশিয়াতে একটা কথা প্রচলিত আছে, খারাপ ছাত্র হয় না, খারাপ শিক্ষক হয়। ষ্প্যনিশ ও ইংরেজী ভাষা কাছাকাছি। আসলে ®প্যনিসের রুট হলো ল্যাটিন ভাষা, আবার ইংরেজীর রুট জার্মান ভাষা হলেও সেখানে পঞ্চাশ পারসেন্ট ল্যাটিন শব্দ আছে। তাই ইংরেজী রেইনা দ্রুত ধরতে পারত। সমস্যা হতো কেবল ইংরেজী বানান নিয়ে। ষ্প্যানিশ ভাষায় যেমন উচ্চারণ, লেখ্য রূপটাও ঠিক তেমনি। রুশ ভাষাতেও তাই। কিন্তু ইংরেজীতে বলি এক, আর লিখি আরেক। বাংলা ভাষায়ও ঐ একই জাতীয় বানান সমস্যা। ছেলে-বেলায় তো ভীষন সমস্যা হতো। চেষ্টা করতাম লজিকাল চিন্তা করতে, কিন্তু বাংলা বানানে কোন লজিক নেই। তিনটি শ এর উচ্চারণ একই রকম, ‘শ’ এর মত, অথচ লেখা হয় নানা ভাবে। দন্ত ‘স’ এর উচ্চারন ল্যাটিন ‘ঝ’ এর মত হওয়া ঊচিৎ, অথচ তার উচ্চারণ কখনো ‘ঝ’ কখন ‘শ’। আমাকে একবার একজন বললেন, যে ‘স’ এর উচ্চারন সবসময়ই ‘শ’ এর মত হওয়া উচিৎ, আমরা ‘সালাম’ (ঝধষধস) বলি, এটা ভুল, বলা উচিৎ ‘শালাম’। আমি বললাম, ’আপনার সাথে একমত হতে পারছি না। মানুষের নাম সালাহউদ্দিন (ঝধষধযঁফফরহ) হবে, না শালাউদ্দিন হবে ? একথা শুনে উনি চুপ করে গেলেন।

ল্যাংগুয়েজ কোর্সের ছয়মাস পেরিয়ে গেল। প্রথম সেমিষ্টার শেষ হলো। আমার ও রেইনার দু’জনের ফলাফলই চমৎকার হয়েছিল। এদেশের গ্রেডিং সিষ্টেমে তিনটি গ্রেড আছে ‘সেটিসফেকটরি’, ‘গুড’ , ‘এক্সিলেন্ট’ । আমরা দু’জনেই এক্সিলেন্ট গ্রেড পেয়েছিলাম। বাংলাদেশে পারসেন্ট পদ্ধতিতে পড়ালেখা করে অভ্যস্ত ছিলাম। তাই প্রথম প্রথম গ্রেডিং সিষ্টেম মেনে নিতে পারতাম না। পরে বুঝতে পেরেছিলাম সিষ্টেমটি কত চমৎকার । যাহোক আমাদের ভালো ফলাফল দেখে, বন্ধু-বান্ধব ধরল পার্টি দিতে হবে। ঠিক আছে, এক সন্ধ্যায় একটি বড় কেক আর কিছু স্ন্যাকসের আয়োজন করলাম। সবাই জড়ো হলো। এবার কেক কাটার পালা। কেক কে কাটবে ? আমি বললাম, রেইনা কাটুক, নারীর অগ্রাধিকার। রেইনা আমাকে বলল, “তুমিই কাটো না।” এবার সবাই মিটিমিটি হেসে বলল, দু’জন একসাথে কাটো। শেষ পর্যন্ত তাই হলো লাজুক হেসে একটি ছুরিতে দু’জনে হাত রেখে একসাথে কেক কাটলাম খুব হৈ চৈ আর আনন্দ হয়েছিল ঐ সন্ধ্যায়।

রাতের দিকে হোষ্টেলের সামনের ব্যালকুনিতে রেইনাকে দেখলাম খুব মনমরা হয়ে বসে আছে। আমি তখনও বেশ উৎফুল্ল। ওকে বললাম। কি ব্যাপার হঠাৎ এত বিমর্ষ কেন? ও খুব ভার গলায় বলল, “তুমি কি বুঝতে পারছ পরিস্থিতি কত জটিল হয়ে গিয়েছে ?”
ঃ কি রকম ?
ঃ আমাদের ল্যাংগুয়েজ কোর্স শেষ হতে আর মাত্র এক সেমিষ্টার বাকী।
ঃ তা তো জানিই।
ঃ তুমি বুঝতে পারছ না।
ঃ কি ?
ঃ আর এক সেমিষ্টার পর আমরা দু’জন দু’জায়গায় চলে যাব।
বিদ্যুৎ খেলে গেল আমার শরীর দিয়ে। সত্যিই তো ! এতদিন তো একথা ভাবিনি। এটা তো ল্যাংগুয়েজ কোর্স। এখানকার নিয়ম অনুযায়ী, ল্যাংগুয়েজ কোর্সের পর যার যার সাবজেক্ট অনুযায়ী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে দেয়া হয়। আমাদের দু’জনের ক্ষেত্রেও তাই ঘটবে যেহেতু আমাদের দু’জনের সাবজেক্ট ভিন্ন ভিন্ন, তাই আমাদের দু’জনকে দুই বিশ্

ramit_1345341295_1-Naino_Mein_Badra_Chhaye_-_Mera_Saaya__720p_HD_Song__-_YouTube.mp4.part_snapshot_01.03__2012.08.16_11.47.32_

রেইনা (২)

ইংরেজীতে একটি শব্দ আছে ‘কোইনসিডেন্স’- এর বাংলা অনুবাদ ’ কাকতালীয়’। অর্থাৎ কাক এসে তাল গাছের উপর বসল, আর সাথে সাথে একটি তাল পরে গেল। এর মানে কি এই যে কাক এসে গাছের উপর বসল বলেই তালটা পরে গেল? নাকি তালটা পরবে জেনেই কাকটা এসে বসেছিল? আসলে দুটোর কোনটাই না। কাক কাকের মত এসে বসেছে, তাল তালের মত পরেছে। তবে ঘটনা দু’টো বিচ্ছিন্ন ভাবে ঘটেছে একই সাথে। এ জন্যই এই ভাবে ঘটে যাওয়া দু’টো সমকালীন ঘটনাকে বলা হয় কাকতালীয়।
থিওরী অফ প্রোবাবিলিটির অংক পড়াতে গেলে তাসের কিছু অংক চলে আসে। ক্লাসরূমে ছাত্র যেমন থাকে ছাত্রীরাও থাকে। ছাত্ররা ৫২টি তাসের সাথে পরিচিত। ছাত্রীরা নয়। তাই ছাত্রীদের তাসগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হয়। আমি বললাম, “আপনারা ছাত্রীরা তো তাস খেলতে পারেননা, তাই তাসের সাথে পরিচিতও নয়, আমি আপনাদের তাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি”।” হঠাৎ একজন ছাত্রী বলে উঠল,”আমি তাস খেলতে পারি”।” সাথে সাথে আরো কয়েকজন ছাত্রী তার সাথে সুর মেলালো। আমি অবাক হলাম। যুগ তাহলে পাল্টেছে। এখন অনেক বাঙ্গালী মেয়েও তাস খেলতে পারে।
আমার বহু বছর আগের এশটি মুখচ্ছবি মনে পড়ল, ‘রেইনা’’। হ্যাঁ রেইনাও তাস খেলতে পারতো।

আজ থেকে একুশ বছর আগে যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের জর্জিয়ায় ল্যাংগুয়েজ কোর্সের ছাত্র ছিলাম, তখন দক্ষিণ আমেরিকার মেয়ে রেইনা ছিল আমার বান্ধবী। দারুন সুন্দরী আর অসম্ভব বুদ্ধিমতি এই মেয়েটি তাস খেলতে পারতো তুখোর। ল্যাংগুয়েজ কোর্সের প্রথম সেমিস্টার পরীক্ষা শেষে বিশ দিনের মত ছুটি ছিল। ক্লাস যেহেতু নেই তাই কাজের কাজ কিছুই নেই। দিনের বেলায় শহরের পার্কগুলোতে ঘুরতাম। শহরে পার্ক অনেকগুলো। প্রতিটি পার্কই অপূর্ব। শহরটাতে অপরূপ পার্কগুলো সেই সৌন্দর্য্যকে বাড়িয়ে তুলেছে বহুগুনে। এমনিতেই সোভিয়েতদের রুচিবোধ প্রশংসনী। তাছাড়া স্থাপত্যশিল্পে একটা গুরুত্বপূর্ন বিষয় হলো ‘রাশান কনস্ট্রাকটিভিজম’ ১৯১৩ সালের দিক থেকে এর শুরু। রুশরা প্রতিটি ভবন নির্মাণ করতে শুরু করে এমন এক অদ্ভুদ স্থাপত্য শৈলীতে যে এক একটা ভবন দেখতে হয় এক একটি ভাস্কর্য্যের মত। দিনের বেলায় আমাদের নগরীর এসব সৌন্দর্য্য দেখেই কাটতো। আর রাতে কোন কাজই থাকত না। কোন কোন রুমে চলত জমিয়ে আড্ডা আর কোন কোন রূমে চলত তাসের আসর। রেইনা তাস বেশ ভালো খেরত। তবে আমাদের মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় স্পেকট্রাম খেলাটি ও জানত না। খুব সম্ভবত: ওদের দেশে খেলাটির প্রচলন নেই। আমি ওকে শিখিয়ে দিলাম। দু’ একদিনের মধ্যেই দেখলাম ওর কোন জুড়ি নেই। আসরে বসলে একের পর এক গেম ওই জিতে যাচ্ছে। অনেকে বলত, “তোমর বান্ধবীকে জুয়াড় আসরে বসালে, ও সবাইকে ফতুর করে ছাড়বে”।” “না ভাই জুয়াখেলার মধ্যে নেই আনন্দের জন্য খেলি”, আমি বলতাম। আর রেইনা বলত’ জীবনটিই একটা জুয়া খেলা, ভাগ্য আর বুদ্ধির সমন্বয় সাধনের অবিরাম ক্রিড়া”।

সেমিস্টার ব্রেকের ছুটি শেষ হয় এমন সময়ে ভাবলাম বড় একটা আনন্দানুষ্ঠান করা দরকার। কি করা যায়? কি করা যায়? ঠিক করলাম পিকনিক করব। সিনিয়রদের কানে কথাটা যেতে তারা হা হা করে হাসলেন বললেন, বাংলাদেশে পিকনিক হয় শীতকালে। আর এদেশে হয় গ্রীষ্মকালে। তাওতো ভালো জার্জিয়া, তুহীন শীত নয়। মস্কোতে গিয়ে দেখ মাইনাস দশ / পনের টেমপ্যারেচার। কিন্তু কে শোনে কার কথা। আর আমরা সবাই ১৮/১৯ বছরের টগবগে তরুন-তরুনী ঐ বয়সের উদ্দামতায় কোন বাঁধাই বাঁধা থাকে না। যেমন ভেবেছি তেমনই করব। পিকনিক করব। ঘটা করে মিটিং করলাম। বাজেট ঠিক করলাম। দশ রুবল করে চাঁদা ঠিক করা হলো। এবার প্রশ্ন উঠল, শুধু কি আমরাই যাব? গেস্ট নেয়া যাবে না? একজন বলল ইন্ডিয়ান বাঙালী মেয়ে শর্মিলাকে নেয়া উচিত, ওতো আমাদেরই একজন। আবার দু’ একজন বলল হোক বাঙালী, ইন্ডিয়ান তো। কিছুক্ষণ বাক-বিতন্ডার পর ঠিক হলো ওকে নেয়া হবে। এরপর বান্ধবী প্রসঙ্গ। সবাই আমার দিকে তাকালো। লিজা বলল, ”বান্ধবী এ্যালাউ করা উচিত”। অনেকেই হেসে উঠল। এরপর ঠিক করা হলো কেউ যদি বান্ধবী নিতে চায়, নেয়া যাবে। আর অনেকে ঠাট্টা করে বলল, “আর তোমরা বাঙালী মেয়েরা যদি বন্ধু নিতে চাও নিতে পারবে”।” বেশ কয়েকদিন যাবৎ পিকনিকের যোগাড়-যন্ত্র হলো। টাকা-পয়সা সংগ্রহ করা, প্লান-প্রোগ্রাম করা। কাকে কি দায়িত্ব দেয়া হবে ঠিক করা হলো। আমার আর রেইনার দায়িত্ব পড়ল টাকা-পয়সা সংগ্রহ ও বাজেট নিয়ন্ত্রন। নাসিমকে দেয়া হলো বাজারের দায়িত্ব। পিকনিকের আগের দিন ওর হাতে একশত রুবল দিয়ে বাজারে পাঠালাম। ওর সাথে আরো তিনজন গেল। শক্ড হলাম ও ফিরে আসার পর। সন্ধ্যার দিকে ওরা ফিরে এলো। চেহারা দেখে মনে হলো বিধ্বস্ত অবস্থা। প্রশ্ন করলাম, “কি হয়েছে?”নাসিম উত্তর দিল, “বাজেট ফেল করেছে।” “সেকি বাজেট ফেল করবে কেন?” এদেশে সবই তো চুলচেড়া হিসেব করা। প্রতিটি জিনিসের দামই তো আজ বহু বছর ধরে ফিক্সড । নাসিম বলল, ” মুরগীর মাংস ও দামী অনেক খাবারের আইটেমই দোকানে পাওয়া যায়নি। আমরা নিরূপায় হয়ে বাজারে যাই। আর সেখানে সব কিছুর দাম দুই থেকে তিনগুন। ” আমরা স্তব্ধ হয়ে গেলাম। এরকম একটা ঘটনা সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নে ঘটতে পারে আমরা কখনো ভাবতেই পারিনি। আসলে ঐ ছিল সোভিয়েত অর্থনৈতিক সংকটের শুরু।

নির্দিষ্ট দিনে গেলাম পিকনিকে। দিনটি ছিল রবিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষমতাসীন কমুনিষ্ট পার্টি যদিও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়েছে ধর্মহীনতার বিষবাস্প, কিন্তু ঐ সমাজতন্ত্রের আলখেল্লায় খ্রীষ্ট ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা কিছুটা হলেও ছিল। তাই খ্রীষ্টানদের পবিত্র দিন রবিবারই ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন। মুসলিম প্রধান রিপাবলিকগুলোকেও ঐ নিয়ম মেনে চলতে হতো।

পিকনিক স্পট আগে থেকে সিলেক্ট করা ছিল। শহরের বাইরে পাহাড়ে ঘেরা একটি ঝকঝকে পাহাড়ী হ্রদ।ক্ষেত্রফলে বিশাল বলে ওরা তার নাম দিয়েছে ”তিবিলিস্কোয়ে মোরে” অর্থাৎ তিবিলিসির সাগর। তিনটি ট্যাক্সি ভাড়া করে রওয়ানা দিলাম হ্রদের উদ্দেশ্যে। আমাদের ট্যাক্সি ড্রাইভার ছিলেন বৃদ্ধ এক ভদ্রলোক। তিনি প্রশ্ন করলেন, ” তিবিলিসি সাগর কেন? বেড়াতে যাবে?” উত্তর দিলাম , ”জ্বী”
“এটা কি ওখানে বেড়াতে যাওয়ার সিজন? ওখানে যেতে হয় গ্রীষ্মকালে।”
“আমরা তো আগে কখনো যাইনি। অনেক শুনেছি ঐ হ্রদের সৌন্দর্যের কথা। ছুটি পেলাম যাই ঘুরে আসি।”
আনন্দ করতে পারবে বলে মনে হয় না। বৃদ্ধের মুখভঙ্গি দেখে মনে হলো।
খুব মন খারাপ করছে। হয়তো ভাবছে আহা বেচারারা একটা আনন্দের জায়গায় যাচ্ছে, নিরানন্দ সময়ে।

আমাদের তখন কাঁচা বয়স। অত কিছু কি আর ভাবি। গাড়ী শহর ছাড়িয়ে বাইরে আসতেই অপরূপ প্রকৃতির শোভায় মন ভরে গেল। উচুঁ উচুঁ পর্বত আর তার গায়ে থরে থরে গাছ। রেইনাকে প্রশ্ন করলাম, কেমন দেখছ? ও মৃদু হেসে বলল,
ঃ তোমরা সমতল ভূমির মানুষ তাই তোমাদের জন্য এই দৃশ্য দুর্লভ। আমার কাছে কিন্তু নতুন কিছুই না। আমার বাড়ী আন্ডিজ পর্বতমালার উপর। ককেশাস পবর্তমালার চাইতেও অনেক উচুঁতে। তবে পার্থক্য এই যে, এখানেকার পাহাড়গুলো বন-বনানিতে ছেয়ে সবুজ। আর আমাদের পর্বতগুলো বৃক্ষহীন, কঠিন পাথরের শক্ত ভিতে একেবারেই রুক্ষ।

বৃদ্ধ ট্যাক্সি ড্রাইভার লক্ষ্য করল আমরা রুশ ও ইংরেজী মেশানো ভাষায় লক্ষ্য করছি। প্রশ্ন করল
ঃ তোমার বান্ধবী কি, তোমার দেশী নয়।
ঃ না।
ঃ তুমি কোন দেশের।
ঃ বাংলাদেশ।
ঃ তোমার বান্ধবী?
ঃ বলিভিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা।
ঃ ও আচ্ছা, ’ ইন্ডিয়াংকা।
রশীরা ’ ইন্ডিয়াংকা বলতে নেটিভ অ্যামেরিকানদের বোঝে। আর ভারতীয়দের বলে ‘ইন্দুস’’।
কিছুক্ষণ পর ‘তিবিলিস্কোয়ে মোরে’ এসে পৌঁছালাম। আমরা গভীর আগ্রহ নিয়ে নয়ানাভীরাম হ্রদটির দিকে তাকিয়ে আছি, আর এদিকে বৃদ্ধ ট্যাক্সি ড্রাইভার আক্ষেপ করে বলছে, “দেখতো কান্ড, সবকিছু বন্ধ, একটি জনমানবও নেই। শীতকালে কেউ এখানে আসে?”

আমাদের অন্যান্য বন্ধুরা আগেই পৌঁছে গিয়েছিল। আমাদের দেখে হৈ চৈ করে ছুটে এলো। বৃদ্ধ ট্যাক্সি ড্রাইভার অবাক বিস্ময়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো ভাবছে, কি অদ্ভুত এই তারুণ্য। শীত হোক শৈত্য হোক তারুণ্যের উম্মত্ততার কাছে কোন বাধাঁই বাঁধা নয়।

যদিও ঠান্ডায় কিছুটা কষ্ট হচ্ছিল। তারপরেও হৈ হুল্লোড়, হাসি- আনন্দের মধ্যে দিয়ে চমৎকার কেটেছিল দিনটি।শুধুই কি চমৎকার? বিশেষণ বোধ হয় কম ব্যবহার করলাম। তারুণ্যের উচ্ছাস, প্রকৃতির স্নিগ্ধতা, রেইনার মিষ্টি চোখের তীব্র আর্কষণ সবকিছুর সমন্বিত রূপই তো সৃষ্টি করেছিল মনে রাখার মত দিনগুলি।

চেংগিস খান আর তৈমূর লং এর রাজ্য জয়ের নামে রক্তের হোলি খেলা, পিউরিটানিষ্ট প্রোটেষ্টান্টদের সাম্রাজ্যবাদের করাল গ্রাস, পলাশীর ট্রাজেডির পরপরই ভয়াবহ দূর্ভিক্ষে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বাংলার এক তৃতীয়াংশ মানুষ আফ্রিকার মুক্ত বণভূমি থেকে ধরে নিয়ে এসে আমেরিকার খাচা বন্দি করা শত শত কালো মানুষদের হাহাকার। পৃথিবীর উপর দিয়ে দুঃস্বপ্নের মত বয়ে যাওয়া দু’দুটো বিশ্বযুদ্ধের তান্ডব, এই সবই ভালোবাসাহীনতার কাহিনী। কিন্তু, তার পরেও পৃথিবীতে ভালোবাসা আছে। গ্রীস ও ট্রয়ের নিষ্ঠুর যুদ্ধে মধ্যেও একিলিস ও ব্রিসেইস এর মধ্যে প্রেম হয়েছিল।

আমার ও রেইনার দু’জনেরই তখন কাঁচা বয়স। ম্যাচুরিটি বলতে যা বোঝায় সেটা তখনও আসেনি। পরবর্তি জীবনে বুঝতে পেরেছিলাম, ম্যাচিউরড্ মানব-মানবীর সম্পর্কের মধ্যে ডোমিনেটিং হয় দেহের তাপ। আর ঐ বয়সে আমাদের দু’জনার সম্পর্কের মধ্যে ছিল হৃদয়ের উত্তাপ।
কিছুদিন পরের কথা। আফসানার জন্মদিন। আমরা আগে থেকেই জানতাম। বিদেশ – বিভূঁয়ে, এই প্রথম ও পিতা-মাতা, আত্মীয়-পরিজনহীন জন্মদিন পালন করবে। ওর মনে যেন কোন কষ্ট না হয আমরা সেই চেষ্টাই করব।

আপনজনদের অভাব যেন ও বুঝতে না পারে সেই প্রচেষ্টাই থাকবে আমাদের। শীত গড়িয়ে তখন বসন্ত আসবে আসবে করছে। শীত আর বসন্তের পার্থক্য কতটুকু বাংলাদেশে এটা বোঝা যায় না। ইউরোপে এই ব্যবধান তীব্র। শীতে যেখানে পুরো দেশট বরফে ঢেকে যায়, পাহাড়-নদী, গাছপালা এমনকি মানবকুলও তুহীন শীতে জমাট বেধে যায়। বসন্তে সেখানে বাতাসের উষ্ণতা, কোকিলের কন্ঠের মতই সুমধুর হয়ে ওঠে। পত্র-পল্লবহীন গাছগুলোর নেড়া ডালপালা থেকে একটু একটু করে কিষলয় উঁকি দিতে থাকে। সেই সবুজের মমতার ছোঁয়া মানুষের মনকে যে কতটুকু উৎফুল্ল করে তুলতে পারে, ইউরোপে বসন্ত না কাটালে তা কখনোই হৃদয়ঙ্গম করা যাবে না। আমরা বাংলাদেশীরা ভাগ্যবান চির সবুজ দেশে আমাদের জন্ম। যারা কোনদিনই শৈত্যপ্রবাহের ইউরোপ অথবা রুক্ষ মরুভূমির মধ্রপ্রাচ্য দেখেনি, সবুজের রিক্ততার বেদনা তারা কোনদিনই বুঝতে পারবে না। তাই আমরা গাছের মর্যাদা বুঝিনা। বিনা কষ্টে, বিনা খরচে পাওয়া বৃক্ষরাজির ধ্বংষযজ্ঞে আমাদের উৎসাহের ভাটা পরে না। যাহোক, বসন্তের উৎফুল্লতায় আমরা মহা আনন্দে আফসানার জন্মদিনের উৎসবের যোগার-যন্ত্র শুরু করলাম সকাল থেকেই। কেউ বাজার করল, কেউ রান্না করল, কেউ ঘর সাজালো। সবার এত মমতা দেখে, অভিমানী আফসানাও আনন্দে কেঁদে ফেলল, “তোমরা আমাকে এত ভালোবাসো!” আসলে বিদেশের মাটিতে আসলে সবাই সবার খুব আপন হয়ে যায়। আমি আফসানাকে বললাম, “কেক কাটার অনুষ্ঠানে রাজকূমারীর মত সেজে হাজির হয়ো”। আফসানা কপট হেসে বলল,
ঃ তোমার বান্ধবী রেইনার মতো সুন্দরীতো আর আমি নই। রাজকূমারী সাজব কি করে?
ঃ আফসানা, যার হৃদয়ে তুমি আছো, তার কাছে তুমি কেবল রাজকূমারীই নও একেবারে মনের রাণী।
ঃ উপহাস করোনা তো। আমি এখনও কারো মনের রাণী নই।
ঃ তুমি তো জান এদেশে বাংলাদেশী ছাত্রী কম। তাই ছাত্রদের সব সময়ই নজর থাকে জুনিয়র ছাত্রীদের দিকে।
ঃ না, থাকে না। তোমরা বাংলাদেশী ছাত্ররা বড় ত্যাঁদোর, তাকাও কেবল বিদেশীনিদের দিকে।

আমি একটু দমে গেলাম। আমি জানি, শুধু বাংলাদেশী না, অন্যান্য দেশের ছাত্রদের মধ্যেও এই দৃষ্টিভঙ্গি দেখেছি, দেশী মেয়ে তো দেশেই কত আছে। বিদেশে যতদিন আছি, ততোদিন বিদেশীনিদের সান্নিধ্যই উপভোগ করি। তবে আমি তো সেই দৃষ্টি দিয়ে রেইনার দিকে তাকাইনি। আফসানা কি তা বোঝে না? আফসানা বোধ হয় আমার মনের কথা বুঝতে পারলো।
ঃ থাক থাক মন খারাপ করোনা। আমি তোমাকে মিন্ করছি না। এবার বলতো কি পড়লে আমাকে ভালো লাগবে?
ঃ শাড়ী। বাঙালী মেয়েদের শাড়ীতেই সব চাইতে সুন্দর মানায়।
সন্ধ্যার দিকে বেশ আয়োজন হলে।

হোষ্টেলে ’ ইন্টারক্লুব’ নামে একটা জায়গা আছে এর অর্থ ক্লাব বলা যায়। আমরা বাংলাদেশী বাঙালীরা তো ছিলামই, তাছাড়া কিছু ইন্ডিয়ান এবং আফসানার গ্রুপমেইট অন্যান্য বিদেশীরাও ছিল। ইন্টারক্লুবে কিছু জর্জিয়ান ও রুশ মেয়ে ছিল, তাঁরা ইউনিভার্সিটির সিনিয়র ছাত্রী। আমাদের ভাষা শিক্ষায় সাহায্য করতেন তাঁরা। তাঁরাও এসেছিলেন আফসানার জন্মদিনে। অনুষ্ঠানটি শুরু হয়েছিল এইভাবে। সন্ধ্যার দিকে সবাই উপস্থিত হলাম ইন্টারক্লুবে। একটু পরে যার জন্য এই সব আয়োজন সেই আফসানা প্রবেশ করল ক্লাবের দরজা দিয়ে। ওর সাজ-পোষাক হঠাৎ করেই যেন সবার চোখ ধাঁধিয়ে দিল। নীল রঙের উপর নানান কারুকাজ খচিত চমৎকার একটি শাড়ী পড়েছে আফসানা। আফসানাকে আগে আমরা নানা পোষাকে দেখেছি। ইউরোপীয় সমাজের প্রভাব ও আবহাওয়ার কারণে আধুনিক পোষাকেই ওকে দেখেছি বেশী। মাঝে মাঝে সালোয়ার-কামিসেও দেখেছি। কিন্তু শাড়ীতে দেখলাম এই প্রথম। আমার কথাই ঠিক মনে হলো। বাঙালী মেয়েদের শাড়ীতেই সব চাইতে বেশী মানায়।

ঃ চমৎকার তোমাদের এই পোষাকটি!
আমার পাশ থেকে বলে উঠল রেইনা।
ঃ তাই?
ঃ হ্যাঁ। এই পোষাকে একজন নারীকে, নারী বলেই মনে হয়।
ওর দিকে তাকালাম আমি, চমৎকার বলেছো তো। এরকম ভাবে তো কখনো ভাবিনি। তাইতো নারী নারীর মত হবে, পুরুষ পুরুষের মত হবে। নারী পরবে নারীর পোষাক। পুরুষ পরবে পুরুষের পোষাক। নারী যদি পুরুষের পোষাকই ব্যবহার করতে শুরু করে আর পুরুষের মত খাটো করে চুল ছাটে, তবে কি নারীর কমনীয়তা তার মধ্যে থেকে হারিয়ে যাবে না? নারী পুরুষে পার্থক্যই যদি না থাকে তবে নারী পুরুষের আকর্ষনই বা থাকবে কি করে।

রেইনার শিরায় কয়েক হাজার বছরের পুরাতন সভ্যতার স্রষ্টা ইনকাদের রক্ত আর মুখে স্প্যানিশ ভাষা। বৃটিশ শাসনের ইতিহাস পড়ে সাম্রাজ্যবাদীদের প্রতি চাপা ক্রোধ আমার মনে সবসময়ই জ্বলত। রেইনাকে বলতাম, ” সাম্রাজ্যবাদীদের ভাষা তোমাদের মুখে কেন? ওটাকে ছুঁড়ে ফেলতে পারো না?” রেইনা হেসে বলত, ”মানুষ অপরাধ করে, ভাষা অপরাধ করে না। ভাষার উপর রাগ রাখতে নেই। সব ভাষাতেই রচিত হয়েছে শ্বাশত অনুভূতির কাব্য। ফর ইওর বেটার ইনফরমেশন, আমি কেচুয়া ভাষাও পারি”। কেচুয়া বলিভিয়ার প্রাচীন ভাষা।
আমাদের মধ্যে কথপোকথন হতো বিদেশী ভাষায় কিন্তু আমরা এত বেশী ঘনিষ্ট হয়ে গিয়েছিলাম আর আমাদের আলোচনার গভীরতা এত বেশী হয়ে গিয়েছিল যে মাঝে মাঝে মনে হতো ওর মুখে যেন বাংলা কথাই শুনছি। আফসানার অভিযোগ কতটুকু সত্যি, আমরা দেশিনীদের নিয়ে উচ্ছাস করি না, আর বিদেশিনীদের নিয়ে উন্মত্ত হয়ে যাই। দেশের বাইরে এসে, অর্ধেক পৃথিবীর মানুষের সান্নিধ্যে এসে একটি সত্য আমি উপলদ্ধি করতে পেরেছি – দেশ-বিদেশ আমাদের সঙ্কীর্ণ দৃষ্টি ও ক্ষমতা লিপ্সার অস্বস্তিকর সৃষ্টি মাত্র। পৃথিবী নামক এই গ্রহটির সমগ্রটাই আমাদের দেশ। মানব-মানবীর বিশুদ্ধ অনুভূতিগুলো ও হৃদয়- বোধে জাতি-ধর্ম-বর্ণের বাধা পেরিয়ে অভিন্ন ও এক সত্তায় লীন।

বাগেবী স্টুডেন্টস টাউনের ডরমিটরির তিনতলায় ব্যালকনি থেকে ককেশাসের ঢালে ঢালে গড়ে ওঠা তিবিলিসি শহরের অসংখ্য বাতির তীব্র আলোর ঝলমলানি স্বপ্নপূরী রচনা করে। সেই স্বপ্নপূরীর সামনে আমরা একে অপরের হাত ধরে বসে থাকি। রেইনা কবিতা ভালোবাসে, মাঝে মাঝে স্প্যানিশ ভাষায় কিছু কবিতা আমাকে শোনায়। আমি বেশী ভালোবাসি গান, তই আমার গানের কলি মনে পড়ে, কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে, রাতের নির্জনে .. .. .। নারীদেহের রূপ লাবণ্য যদি নিখুঁত ও পরিমিত হয়। যে কোন পুরুষই তখন সেই সৌন্দর্য্যরে তপ্ত মাধুর্য অনুভব করতে চায়। মেয়েরা তাদের সহজাত দৃষ্টি – বুদ্ধি দিয়ে সেদিক থেকে সাবধানী থাকে। তবে এ সবই পরিণত বয়সের দাবী। আমাদের দু’জনের কেউই তখনো পরিণত নই। রুশরা প্ল্যাসিড, বড় শান্ত। কিন্তু সাউথ আমেরিকানরা উচ্ছল।

রাত তখন গভীর। ডরমিটরির করিডোরে লাইট্স আউট হয়ে গেছে অনেক আগেই। বেশীরভাগ ছাত্র-ছাত্রীই ঘুমিয়ে পড়েছে। রাতের আকাশের তারাগুলো সরে সরে নতুন দৃশ্যপট রচনা করছে। ডরমিটরির ব্যালকনির সেই স্বপ্নপূরীর আলো-আঁধারীর রহস্যময়তার মধ্যে মুখোমুখী বসে আছি আমরা দু’জন। রেইনা পূর্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাঁকিয়ে। সেই দৃষ্টির গভীরে দেখলাম; এতদিনকার বয়ে যাওয়া ঝড় যেন থেমে যাওয়ার আশংকায় আছে। সেই আশংকা তখনো আমাকে ছোঁয়নি। আমি ভাবছি আমার সামনে একটি পূর্ণ প্রস্ফুটিত ম্যাগনোলিয়া অথবা তিবিলিসির পার্ক-পাবেদী (ভিক্টরি পার্ক) তে দেখা নাম না জানা ম্যাজেন্টা রঙের পুস্প।
ঃ তুমি কি উদ্বিগ্ন নও?
রেইনা প্রশ্ন করল।
ঃ কিসের উদ্বেগ?
ঃ বসন্ত গড়িয়ে এখন গ্রীস্মকাল চলে এসেছে।
ঃ ভালো কথা বসন্তের পরে, গ্রীস্ম তো আসবেই।
ঃ তুমি বুঝতে পারছ না। আমাদের ল্যাংগুয়েজ কোর্স শেষ হওয়ার পথে।
আচমকা বজ্রপাত হলো আমার বুকে।

জুন মাসে দ্বিতীয় সেমিস্টারের শেষ।
কোর্স ফাইনাল পরীক্ষা হয় এই মাসে। পরীক্ষার প্রস্তুতি নিলাম মনযোগ দিয়ে। রেইনাও খুব খাটাখাটনি করল। পরীক্ষার ফলাফল দু’জনেরই শুভ হলো। দু’জনই এক্সিলেন্ট গ্রেড পেলাম। পরীক্ষার ফলাফল সেলিব্রেট করার জন্য বেশ একটা হৈ চৈ। যাদের ফল ভালো হয়েছে তারা তো অবশ্যই খুশী। যাদের ফল মোটামুটি তারাও দুঃখিত নয়। ল্যাংগুয়েজ কোর্সে পাশ করাটাই বড় কথা। পাশ করতে পারলেই, তুমি সুযোগ পাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কোর্সে পড়ার। যা আমাদের দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন। ছোট বেলায়, বড় বোনের হাত ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতাম। তিনি তখন সেখানকার ছাত্রী ছিলেন। অপরাজেয় বাংলার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হত, বিশ্ববিদ্যালয়ের মানে মাথা নত না করা। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে হাটতাম আর ভাবতাম, কবে ছাত্র হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে হাটতে পারব?

 

রেইনা (৩)

জুন মাসে তিবিলিসিতে পূর্ণ গ্রীস্মকাল। একেবারেই গরম, অনেকটা বাংলাদেশের মতই গরম। আবার দিনের দৈর্ঘ্যও বিশাল। সন্ধ্যা হয় রাত দশটা/সাড়ে দশটায়। রাত বলে ভুল হচ্ছে, বিকাল দশটা বলতে হবে। ‘ইভিনিং’ শব্দটির অর্থ এখন বুঝতে পারছি। দুপুর দুটা-তিনটা থেকে সূর্য ডোবার আগ পর্যন্ত ইভিনিং। বাংলার মত ‘বিকাল’ ও ‘সন্ধ্যা’ আলাদা আলাদা শব্দ নেই। আর সূর্য ডুবে গেলেই শুরু হয় রাত। সামারে ঘোরাঘুরি করার জন্য ইভিনিংটা চমৎকার। চারটা থেকে দশটা অবধি ছয় ছয়টি ঘন্টা, বেশ দীর্ঘ সময় ঘোরাঘুরি করা যায়।

এই সময় আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করলাম। আকাশে সাদা সাদা কি যেন উড়ছে। কিছু গায়ে এসে পড়লে দেখলাম, তুলার মত লাগে। ঢাকাতে কোন এক কালে এই রকম কিছু দেখতাম, কোথা থেকে যেন তুলার মত কিছু উড়ে উড়ে আসত। কোন গাছ-টাছ থেকে হবে হয়তো। এখানে ঐ জিনিস উড়ছে ব্যাপক ভাবে। পানামার খোরকে এসে ইন্টারক্লুবের নাতাশাকে জিজ্ঞেস করে, “এগুলো কি? স্নো?”।
নাতাশা উত্তর দিল
ঃ স্নোর মতই লাগে।
ঃ গ্রীস্মকালীন স্নো!
খোরকে রসিকতা করে বলল।
আসলে এগুলো টোপল নামে এক ধরনের গাছের ফুল থেকে বের হয়। সারা শহর জুড়ে এই গাছগুলি সারি করে লাগানো আছে। এই নিয়ে একটি মিথ প্রচলিত আছে। রাশিয়ার কোন এক রাণী স্নো ফল দেখতে খুব পছন্দ করত, তাই জারকে বলেছিল, “আমি গ্রীস্মকালেও স্নো দেখতে চাই। তুমি তো রাজা, পারবে আমার জন্য গ্রীস্মকালেও স্নো ফলের ব্যবস্থা করতে?” প্রিয়তমার আবদার রাখতে পুরুষ কি না পারে? জারের মন হয়তো তখন বলছিল, “তোমার জন্য বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে আনতে পারি, একশ আটটি নীল পদ্ম।” যাহোক রাজা নানা চিন্তা করে এই বুদ্ধি বের করলেন। হুকুম দিয়ে দিলেন, ‘সারা দেশ জুড়ে টোপল গাছ লাগিয়ে দাও’। গ্রীস্মকালেও রাণী দেখলেন স্নো ফল। প্রসন্ন হলো রাজার হৃদয়।

এই স্নো ফলের কথা বলতে গিয়ে আমার আরেকটি কথা মনে পড়ল। তখন জানুয়ারী মাস। অবিরাম তুষারপাতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাগেবী ক্যাম্পাস ও আশেপাশের উঁচুনীচু পাহাড়ী পথ যোজনব্যাপী শুভ্রতায় আচ্ছন্ন হয়েছে। তুষারপাতের প্রথম দিকে পেঁজা তুলার মত ঝরঝরে স্নো বলে পথ ভালোই থাকে। তুষার মারিয়ে যাচ্ছি এই ভেবে হাটতেও ভালো লাগে। কিন্তু ধীরে ধীরে তা শক্ত বরফে পরিণত হয়। পথ হয়ে যায় পিচ্ছিল আর চলাও হয়ে ওঠে বিপজ্জনক। এদেশীয়রা জন্ম থেকেই এই পথে হেটে অভ্যস্ত, তাই তাদের অসুবিধা অত একটা হয়না। তারপরেও দুয়েক সময় দেখি ওদেরকে পিছলে পড়ে যেতে। একবার একজনকে দেখলাম বেশ কোট টাই, ওভারকোট হ্যাট ভারিক্কী বেশভূষা নিয়েছে, তার হাতে আবার ধরানো ছিল, একটা জ্বলন্ত তামাকের পাইপ, যা তার ভার আরো বাড়িয়েছে। হাটছিলও নবাবী চালে, হাটতে হাটতে চোখের পলকে হঠাৎই উল্টে পড়ে একেবারে রাস্তায় শুয়ে পড়ল। ঘটনাটি দুঃখজনক নি:সন্দেহে কিন্তু ঠিক ঐ মুহুর্তে তার নাকানি-চুবানি অবস্থা দেখে আমি হাসি আটকাতে পারলাম না। যেখানে ওদেরই এই অবস্থা সেখানে আমাদের অবস্থা তো আরো করুণ। রেইনা বলিভিয়ার যে এলাকায় থাকে (আন্ডিজ পর্বতমালার উপরে), সেখানে কিছুটা বরফ পড়ে। তাই ওর অভ্যাস আছে। আমি জর্জিয়ায় এসেই প্রথম বরফ দেখলাম। একদিন ও আর আমি হেটে এ্যাকাডেমিক বিল্ডিং থেকে হোস্টেলের দিকে যাচ্ছি, ঐ পিচ্ছিল পথে অনেক সাবধানে হাটছিলাম, সামনে একটা ঢালু যায়গায় এসে তাল সামলাতে না পেরে পা হঠাৎ পিছলে গেল। শুনেছিলাম এরকম আকস্মিক পরিস্থিতিতে মস্তিস্ক কাজ করেনা, স্পাইনাল কর্ড ডিসিশন নেয়। আমার স্পাইনাল কর্ড ডিসিশন নিল রেইনাকে আঁকড়ে ধরার। বেচারী আর সোজা দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। আমার সাথে সাথে হুরমুড় করে পড়ে গেল মেয়েলী মিষ্টি সুগন্ধের রোমাঞ্চকের অনুভবে বুঝতে পারলাম, রেইনা একেবার আমার গায়ের উপরেই। সেই মুহুর্তে আমি কি সব চাইতে বেশী অনুভব করেছিলাম, দেহমনের তাপ? না মোটেও না যেটা অনুভব করেছিলাম সেটা হৃদয়ের উত্তাপ।

এখানে শীতকালটা প্রচন্ড ঠান্ডা। বাংলাদেশের শীতের সাথে কোনক্রমেই তুলনা হয়না। প্রিয় গায়ক ভূপেন হাজারিকার একটি গানে শুনেছিলাম, ‘মাঘের শীতে বাঘে পালায়…..।’ হা হা হা, ভুপেন সোভিয়েত ইউনিয়নে আসলে বুঝতেন শীত কাকে বলে, বাঘ শুধু না বাঘের দাদা পরদাদাও পালিয়ে যাবে। মোটামুটিভাবে নভেম্বরের মাঝের দিকে শীত শুরু হলো, এরপর থেকে শীতের তীব্রতা শুধু বেড়েছেই, ডিসেম্বর, জানুয়ারী, ফেব্রুয়ারী, মার্চের শেষ দিক পর্যন্তও ঠান্ডা ছিল। এপ্রিলে উষ্ণতা আসতে শুরু করল। পৃথিবীর এ অংশটা এরকমই। শীত সহজে বিদায় নিতে চায়না। রাশিয়া, ইউক্রেণে আরো খারাপ অবস্থা, মধ্য এপ্রিলে অথবা মে মাসের শেষেও এখানে তুষারপাত হয়। শীতকালের আরেকটি সমস্যা হলো দিনের দৈর্ঘ্য খুব কম। চারটা-পাচটার দিকেই সন্ধ্যা হয়ে যায়।

যাহোক সেই অসহনীয় শীত কেটে যখন গ্রীস্মকাল এলো আমরা গরমের দেশের মানুষেরা হাপ ছেড়ে বাচলাম।এই সামারে তিবিলিসি স্টেট ইউনিভার্সিটিতে একটা ট্রেডিশন আছে। বিভিন্ন দেশের ছেলেমেয়েরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে। ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোর ছেলেমেয়েরা আলাদা আলাদা অনুষ্ঠান না করে সবাই মিলে একটা অনুষ্ঠান করে। এর কারণ কয়েকটি, প্রথমতঃ আলাদা আলাদা করে প্রতিটি দেশের ছেলেমেয়ের সংখ্যা কম, দ্বিতীয়তঃ ওদের সবার ভাষা এক – স্প্যানিশ। আবার তাদের ধর্মও এক। এই ধর্মের উপর ভিত্তি করেই তো সংস্কৃতির একটা মেজর অংশ গড়ে ওঠে। ওদের কালচারে পার্থক্য যে লেই তা নয়, তবে অমিলের চাইতে মিলটাই বেশী। আরবরাও সব দেশ মিলে একটা অনুষ্ঠান করে, ল্যটিনদের মত ঐ একই কারণে।

ইন্ডিয়ান আর আমরা বাংলাদেশীরা একসাথে অনুষ্ঠান কখনো করতে পারিনি। করতে চাইওনি। এটা সম্ভবও না। আমাদের সংস্কৃতিতে মিলের চাইতে অমিলটাই বেশী। আমাদের ভাষা এক নয়, ধর্মও এক নয়। এবার আমাদের তোড়জোড় খুব বেশী ছিল, উঠেপড়ে লেগেছিলাম, একটা ভালো অনুষ্ঠান উপহার দিতেই হবে। আমাদের তোরজোড়টা ইন্ডিয়ানরা টের পেয়ে যায়। ওদের পক্ষ থেকে একবার অফার দিল একসাথে অনুষঠান করার। আমরা স্ট্রেইটওয়ে নিষেধ করে দিলাম। মাথা খারাপ, ওদের সাথে অনুষ্ঠান করতে যাব কোন দুঃখে। আগেই বলেছি, ওদের আর আমাদের ভাষা ভিন্ন, একসাথে অনুষ্ঠেন করলে হিন্দির প্রভাব বেশী থাকবে। বাংলা গান-টান হয়তো একটা দুটা হবে। ফলে হিন্দির মাঝে বাংলা হারিয়েই যাবে। তাছাড়া ওদের নাচ-গানে হিন্দু ফিলোসোফির প্রভাব থাকে, আমাদের সংস্কৃতিতে তা নেই। সুতরাং ওদের সাথে অনুষ্ঠান করলে আমাদের আর নিজস্ব সংস্কৃতি উপস্থাপন করা হবে না।

তার কিছুদিন আগে ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টস কম্যুনিটির নতুন সভাপতি নির্বাচিত হয়। যে সভাপতি হয় তার নাম কেকে। রুবেল এসে আমাকে বলল, “ঐ যে মোচওয়ালা সিনিয়র ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টটা আছে না, ও আজ গিয়েছিল আমার ম্যডামকে অনুষ্ঠানের দাওয়াত দিতে। আমি শুনে বললাম,
: ও আচ্ছা, কেকে গিয়েছিল।
: ও একাই গিয়েছিল।
রুবেলের উত্তর।
: হু কেকে।
: ও একাই।
: ঐ তো, বুঝলাম কেকে গিয়েছিল।
আমি আবার জোর দিয়ে বললাম। আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রুবেল বলল।
: ও একাই তো গিয়েছিল।
: আরে দূর। আমি কোন প্রশ্ন করছি না। ওর নামই কেকে।
: ও তাই বলো,
হাসিতে ফেটে পড়ল রুবেল।

ভারতের অনুষ্ঠান হয়ে গেল, খুব সুন্দর হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে এদেশের মানুষ এম্নিতেই ভারত বলতে অজ্ঞান (আমার এক বন্ধু একবার বলেছিল, ভারত এমন একটা দেশ যে, রাশিয়া ছাড়া আর কোন দেশের সাথেই তার সুসম্পর্ক নেই, আবার রাশিয়া এমন একটা দেশ যে ভারত ছাড়া আর কোন দেশের সাথেই তার সুসম্পর্ক নেই)। হিন্দি সিনেমা তখন সোভিয়েতে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। আসলে অন্যান্য দেশের ছবি, এখানে দেখানো হতো কম। আর হিন্দি ছবি ও তার অভিনেতা অভিনেত্রিদের হাইলাইট করা হতো বেশী। বয়স্কদের দেখেছি এখনো রাজকাপুর রাজকাপুর করে। লোক ঝুঁকে পড়েছিল ওদের অনুষ্ঠানে। তার এক সপ্তাহ পর বাংলাদেশের অনুষ্ঠান, আমরা শপথ করলাম যে করেই হোক ওদের চাইতে ভালো করতে হবে। ভারতের সাথে আমাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতা।

ভারতের অনুষ্ঠান ভালো হয়েছে আমাদের আরো ভালো করতে হবে, দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে হবে, এই মটো নিয়ে প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। প্রস্তুতি অবশ্য আগে থেকেই নিচ্ছিলাম, এবার গতি ও উদ্যম বাড়ি্যে দিলাম। একসময় সমুদ্র পাড়ি দেয়া ভারতীয়দের (অথবা হিন্দুদের) জন্য পাপ ছিল, এখন সমুদ্র পাড়ি দেয়ায় আমাদের চাইতে তাদের উৎসাহই বেশী। ভারতের ছাত্র-ছাত্রী অনেক। একটা অনুষ্ঠানের জন্য নাচ-গান-বাজনা ইত্যাদি সবকিছুর পারফর্মারই তারা পেয়ে যায়। আবার ভারতীয়দের মধ্যে ছাত্রীদের সংখ্যা অনেক। আমাদের ছাত্রী প্রায় নেইই। ল্যাংগুয়েজ কোর্সে চারজন ছাত্রী এবং সিনিয়রদের মধ্যে একজন, এই পাঁচজনই সম্বল।

একটা কালচারাল ফাংশনে ছাত্রীরা সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করে। ইন্ডিয়ানরা করেছিলোও তাই। অনেক ছাত্রী নাচের পারফর্মার ছিল। একটা ফ্যাশন শোও তারা করেছে। আবার রিসিপশনে তারা অতিথিদের ঢোকার পথে দুদিকে পাঁচজন পাঁচজন দশজন ছাত্রীকে বিভিন্ন রাজ্যের জাতীয় পোশাকে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল। শুনিতা নামে গুজরাটি একটা মেয়ে, গুজরাটি ঢংয়ে (আমাদের মত করে শাড়ি তারা পরেনা, ঢংটা ভিন্ন) শাড়ী পড়ে দাঁড়িয়ে ছিল। খুব সুন্দর লাগছিল।

আমাকে রেইনা বলল
ঃ ওদের ফ্যাশন শো তোমার কেমন লাগছিল?
ঃ ভালোইতো।
ঃ আমার ভালো লাগেনি
ঃ কেন?
ঃ তোমার কি মনে হয়নি, এখানে নারীদের অসম্মান করা হয়েছে?
ঃ কেন এমন মনে করছ?
ঃ আমি দেশে থাকতে ইন্ডিয়ান সিনেমা দেখতাম।ওদের কিছু কিছু কাহিনী হৃদয়স্পর্শী সত্যি, কিন্তু তারপরেও সিনেমাগুলোর মধ্যে এমন কিছু উপাদান থাকে যা একেবারেই নোংরা।
ঃ যেমন?
ঃ ওদের নাচগুলো একেবারেই অশ্লীল। ওরা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এটা করে।
ঃ বিষয়টা নিয়ে আমি আসলে আগে কখনো গভীরভাবে ভাবিনি, আমাকে একটু বুঝিয়ে বল।
ঃ নারীদেহের উপস্থাপনাটা এমন যৌন আবেদনময়ী কেন হবে বলতো? এসব দেখে শুনে মনে হতে পারে, নারী মানেই নির্লজ্জ্ব ও রতিসর্বস্ব। কেন কোন সংযত ও মিতশ্রী রমনীর কথা তোমরা ভাবতে পারনা? নারী নিজেকে কখন বেশী সন্মানিত বোধ করে? সৌন্দর্যের নামে যখন নারীদেহকে পণ্য হিসাবে উপস্থাপন করা হয়, তখন কি নারী নিজেকে সন্মানিত বোধ করে? কেউ যখন মন প্রাণ সঁপে দিয়ে নারীকে একটি ফুল উপহার দেয়, তখন কি নারী নিজেকে সন্মানিত বোধ করে, না কি যখন তাকে কেউ প্রেমহীন সেক্স প্রস্তাব দেয় তখন। কখন নারীর দেহমন পুলকিত হয়, যখন মুগ্ধ নয়নে তার দিকে চেয়ে বলে, “তুমি অপূর্ব! নাকি, যখন লোলুপ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলে, “ইউ আর সো সেক্সি!”

আমাদের অনুষ্ঠানের জন্য ঠিক করা হলো দুয়েক জনকে মস্কো থেকে আনা হবে। উনারা তিবিলিসিরই, ল্যাংগুয়েজ কোর্সটা তিবিলিসিতে পরে মস্কো চলে গি্যেছেন। তাদের সাথে যোগাযোগ করলে তারা সানন্দে মস্কো চলে আসেন। তাদের আনন্দ ছিল অনেকটা নেটিভ শহরে ফেরার আনন্দের মতো। সাথে করে নিয়ে এলেন ওলগা কিরিলোভনা নামে একজন রুশ ম্যডামকে। গান-বাজনায় অদ্ভুত পারদর্শী তিনি। বিশেষ করে আমাদের উপমহাদেশীয় সঙ্গিতগুলো তিনি সহজেই তুলতে পারেন যে কোন বাদ্যযন্ত্রে। উনার বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে গিয়েছে, এখনো অবিবাহিতা। অবিবাহিতা নারী রুশদের মধ্যে কম দেখা যায়, প্রায় না থাকার মতই। তাহলে তিনি অবিবাহিতা রইলেন কেন? উনার সম্পর্কে গুজব আছে, ছাত্রীজীবনে উনার একজন ইন্ডিয়ান অথবা বাংলাদেশী ছাত্রের সাথে প্রেম ছিল। ছেলেটি পাশ করার পর দেশে ফিরে যায়। উনাদের আর বিয়ে হয়নি। সেই থেকে একাই আছেন ওলগা কিরিলোভনা। প্রেমের জন্য এত ত্যাগ এই যুগে কমই দেখা যায়।

মূল ঘটনা সম্ভবত: অন্য জায়গায় ছিল। সে সময় সোভিয়েতদের ভিন জাতি বিবাহে প্রচন্ড জটিলতা ছিল। আইনি জটিলতা এর মধ্যে একটি। বিবাহের পর দম্পতি কোথায় থাকবে, এটা একটা ভাইটাল কোশ্চেন ছিল। অনেক পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন হেলসিংকির কনভেনশন মেনে নেয়। সেই কনভেনশন অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন রাস্ট্রের নাগরীকদের মধ্যে বিবাহ হলে, দম্পতি তাদের পছন্দ অনুযায়ী দুই দেশের যে কোন একটি দেশেই থাকার আইনগত অধিকার রাখে। এত গেল আইনের কথা। সমাজ কি দৃষ্টিতে দেখছে? সোভিয়েত সমাজে ভীন দেশী বিবাহকে খুবই নেতিবাচকভাবে দেখা হত। এছাড়া তথাকথিত কম্যুনিষ্ট আদর্শ অনুযায়ী, এটাকে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হুসাবে নেয়া হত। অনেক সময় সেই নারী অথবা পুরুষকে রাষ্ট্রের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার দায়েও অভিযুক্ত করা হতো। এই সম্পর্কিত অনেক করুণ কাহিনীও শোনা যায়। আবার সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, সোভিয়েত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ও পরবর্তিতে রাষ্ট্রনায়ক, জোসেফ স্তালিন-এরই মেয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল এক ভারতীয়র সাথে।

আমরা প্রানান্ত চেষ্টা করতে লাগলাম অনুষ্ঠান সফল করার জন্য। অনেকেই ভয় পাচ্ছিল দর্শক হবে না। ইন্ডিয়া নাম শুনতেই তো পাগল, সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ে, বাংলাদেশের নাম শুনে অমন হুমড়ি খাওয়ার কিছু নাই। সবাই নানা প্ল্যান প্রোগ্রাম করছে , কি করে লোক বাড়ানো যায়। আমি বললাম, “ঘাবড়াবেন না, ডিসেম্বরে ল্যাংগুয়েজ কোর্সের প্রোগ্রামে আমরা যত ভালো পারফর্ম করেছি, তাতা আমাদের অনেক শুনাম হয়েছে। ল্যাংগুয়েজ কোর্সের সব বিদেশীদের নিয়ে আসতে পারব।” একজন সিনিয়র আমাকে বললেন, “তোমার উপর আমাদের অনেক আশা, ভালো করে যাদু দেখাবে, তাক লাগিয়ে দেবে, সবাইকে।” সবাই আমার দিকে আশার দৃষ্টিতে তাকালো। আমি যাদু দেখানোর আশ্বাস দি্যেছি। আমার সাথে থাকবে রুবেল আর দোলন।

আরেকজন বলল, “আমাদের গানও সুন্দর হবে, লোক শুনে তারিফ করবে দেখবেন।” সেলিম ভাই বললেন, “আরে ধুর! আমাদের ভাষা স্প্যানিশের মত মিষ্টি মধুর নয়। তাই গান সিলেক্ট করার ব্যাপারে আমাদের সচেতন থাকতে হবে।” আমার তখন মনে পড়ল হিণ্দুস্থানী রমেশের কথা, “বেঙ্গলী ল্যাংগুয়েজ ইজ ভেরী সুইট! আমাদের ভারতের জাতীয় সঙ্গিতটাতো বাংলাতেই।”

আমার দিকে একজন তাকিয়ে বলল, “ল্যাটিনদের লাম্বাদা, নাচটাওতো দেয়া যায়, ভীষণ দর্শক মাতাবে।” সে সময় লাম্বাদা নামে একটি গান পুরো ইউরোপে প্রচন্ড জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। জর্জিয়াতেও তার ঢেউ এসে লেগেছিল। আমার মনে আছে বাংলাদেশের ঘরে-বাইরে, চায়ের দোকানে, এখানে-সেখানে তখন একটা গান বাজত – ‘চিরদিনই তুমি যে আমার, যুগে যুগে আমি তোমারই।’ এমন অবস্থা হয়েছিল যে আমরা ঠাট্টা করে একে জাতীয় সঙ্গীত বলতে শুরু করছিলাম। সেরকম লাম্বাদাও জর্জিয়ায় আনাচে-কানাচে একবারে জাতীয় সঙ্গীতের মত বাজতে শুরু করছিল। এর মূল কারণ ছিল দুটি, প্রথমত গানটির সুর ও তাল খুব মন কাড়া ছিল, দ্বিতীয়তঃ এর সাথে নাচটি ছিল প্রচন্ড যৌন আবেদনময়ী। একটি যুগল নাচটি নাচত, সেখানে মেয়েটির পোষাক ছিল একেবারেই সংক্ষিপ্ত। একপাশ থেকে আরেকপাশ পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে মেয়েটি নাচত বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে আবেদনের ঝড় তুলে। লাম্বাদা বলতে সেই সময়ে যদিও আমরা ঐ গানটিকে বুঝতাম আসলে লাম্বাদা একটি পুরাতন নাচের স্টাইল। “Chorando se foi” (which means: the one who left crying) গানটির সাথে সেই পুরাতন নাচের স্টাইলটিই ব্যবহার করা হয়। আমি রেইনাকে একবার বলেছিলাম
ঃ ব্রাজিলিয়ান এই গানটি কিন্তু চমৎকার!
ঃ ব্রাজিলিয়ান?
ঃ কেন, আমি কি ভুল জানি?
ঃ শুধু তুমি না, সারা পৃথিবীই ভুল জানে।
ঃ তাহলে?
ঃ গানটি বলিভিয়ান।
ঃ বলিভিয়ান?
ঃ হ্যাঁ, বলিভিয়ার একটি গানের গ্রুপ গানটি প্রথম গেয়েছিল। পরে ব্রাজিলিয়ানরা এটা অনুকরণ করে আর তাল একটু দ্রুত করে দেয়। তারপর থেকে পুরো পৃথিবীই মনে করছে এটা ব্রাজিলিয়ান গান।

সবাই মিলে ঠিক করল এই নাচটি অনুষ্ঠানে ইনক্লুড করা হবে। ধীরে ধীরে অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ চলে এলো। আমরা ভাড়া করেছিলাম নগরীর নামজাদা একটি অডিটোরিয়াম। আমাদের সাথে বাজনায় সহযোগিতা করার জন্য জর্জিয়ার একটি গানের গ্রুপকে ভাড়া করা হয়েছিল। সকাল থেকেই আমরা অডিটোরিয়ামে রিহার্সাল, হল গুছানো ইত্যাদি নানা কাজে লেগে গেলাম। এত কিছুর পরও আমাদের একটু ভয় ভয় হচ্ছিল, দর্শক হবে তো? সেলিম ভাই হঠাৎ এসে উপস্থিত হয়ে বললেন দর্শকের অভাব হবেনা। পুরো বার এসে উপস্থিত হবে।
আমি কানে কানে এক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম, “বার মানে, সেলিম ভাই কি বলতে চাচ্ছেন?”
ঃ আরে জানোই তো, সেলিম ভাই শুরায় আসক্ত।
ঃ সে তো জানিই। সাকীতেও অরুচী নেই।
ঃ সিটি সেন্টারের একটি বারে, নিয়মিত পান করেন। সেখানকার সবাই উনার বন্ধু।

“বুঝলে, আমি ওদেরকে বলে এসেছি তুমি মানুষ শূণ্যে তোলার যাদু দেখাবে। শুনে তো ওদের তাক লেগে গি্যেছে। আবার লাম্বাদা নাচ হবে। এই সব শুনে বারশুদ্ধ সব, দল বেধে রেডী হচ্ছে আসার জন্য। আমাদের আশা ভাঙবে না কিন্তু সন্মান রাখতেই হবে।” বললেন সেলিম ভাই।

বিকালের দিকে অনুষ্ঠান শুরু হওয়ায়র ঘন্টাখানেক আগেও লোকজন খুব কম দেখলাম। আমার দু’একজন ঘনিষ্ট আরব, ল্যাটিন বন্ধু-বান্ধব ছিল, তারা এসে উপস্থিত। জিজ্ঞাসা করলাম, “বাকীরা, বাকীরা কি আসবে না?”
ঃ আরে আসবে আসবে সবাই আসবে। এখনওতো এক ঘন্টা বাকী।
রেইনা এসে উপস্থিত হলো, পয়তাল্লিস মিনিট আগে। অপূর্ব সাজে সেজেছে, একেবারে সাক্ষাৎ পরী। আমার বান্ধবী বলে বলছি না। সাজগোজের অদ্ভুত কৌশল জানে ও। যেকোন পোষাকের সাথেই মানানসই সব গয়নাগাটি মেক আপ, ইত্যাদি। সাথে নিয়ে এসেছে একগাদা ফুল।
ঃ ফুল? ফুল কেন?
ঃ বারে, তোমাকে দিতে হবেনা?
ঃ আমাকে হঠাৎ ফুল?
ঃ ওমা তুমি যাদু দেখাবে না!
ঃ ও, আচ্ছা।
বুঝলাম পারফর্মেন্সের পর স্টেজে উঠেই ফুল দেয়ার একটা রীতি আছে। আমাদের দেশে এই রীতি তখনও দেখিনি।
ঃ তোমাকে চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন? পারফর্মেন্সের ভয়ে?
ঃ না না, আমার পারফর্মেন্সের ব্যাপারে আমি সব সময়ই কনফিডেন্ট।
ঃ তাহলে?
ঃ বাংলাদেশের কোন নাম ডাক নেই, দর্শক হবে কিনা তাই ভাবছি।
ঃ উহু, নিজের দেশকে এতো ছোট ভেবোনা। আমি ইতিহাস পড়ে দেখেছি, তোমাদের কালচারাল হেরিটেজ খুব স্ট্রং। শুধু ইংরেজ শাসনামলের কারণে, তোমাদের একটা বড় ইন্টারাপশন হয়েছে। এখন তো তোমাদের দেশ স্বাধীন। সেটা রিকভার করার চেষ্টা কর।
আমি মনে মনে ভাবছি, বুকের রক্ত ঢেলে দেশ আমরা স্বাধীন করেছি সত্য, কিন্তু দেশ গঠনে কতটুকু এগুতে পেরেছি সেটা একটা বড় প্রশ্ন।
ঃ চিন্তা করোনা। আমি দেখে এসেছি ল্যাংগুয়েজ কোর্সের সবাই রেডী হচ্ছে, সবাই আসবে।
কিছুক্ষণ পর দেখলাম সত্যিই বানের পানির মত মানুষ আসতে শুরু করল। একটা সময় আর জায়গা হচ্ছিল না, অনেকেই অডিটোরিয়ামের মাঝখানের সিঁড়ীতে বসে গেল।

অনুষ্ঠান অদ্ভুত সুন্দর হয়েছিল সেদিন। চারিদিকে প্রশংসার ঢেউ উঠেছিল। আমার যাদুও ব্যাপক প্রশংসা পেল। গুজরাটি মেয়ে আলিশা বলেছিল, “ইস ফাংশন মে সবসে আচ্ছা থা তেরা যাদুকা খেল।” এই ধীর শান্ত ভারতীয় রূপসীর আমার প্রতি দুর্বলতা ছিল, আমি জানতাম। আর রেইনা একগাদা ফুল নিয়ে মঞ্চে উঠে এসে সবার সামনেই আমার গালে চুমু খেয়ে সবাইকে অবাক করে দি্যেছিল।

আরেকটি কথা বারবার বলছিল (সেটা সে আগেও বলেছে) শাড়ী পড়ে তোমাদের মেয়েরা যখন হাটছিল পরীর মত লাগছিল। অদ্ভুত সুন্দর তোমাদের এই পোষাকটি।
ঃ তুমি শাড়ী পড়বে?
ঃ হু, কিন্ত পাবো কোথায়?
ঃ ঠিক আছে আমি দেশে গেলে এনে দেব।

তার এক সপ্তাহ পরে হলো ল্যাটিন আমেরিকানদের অনুষ্ঠান। সালসা, মিরেঙ্গে, বাচাটা, ট্যাঙ্গো, রুম্বা, সাম্বা, মুরালিজম আর কার্নিভালের মহাদেশ ল্যাটিন আমেরিকা। ওরাও খুব সুন্দর করেছিল। রেইনা গিটার বাজিয়েছিল। খুব সুন্দর গিটার বাজায় ও। ওর গিটারের সুরের মূর্ছনায় আমার কাছে মনে হয়েছিল যেন পাহাড়ী ঝর্নার গায়ে ঝরে ঝরে পড়ছে সোনালী ফুল। মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনেছিল পুরো হল। আলিশা বলেছিল তোমরা দুজন তো শহর মাতিয়ে দিলে দেখছি।

ল্যাটিন আমেরিকানরা নাচতে গাইতে খুব পছন্দ করে। ডিসকোতে আমি নাচতাম না, সংকোচ হতো। রেইনা চমৎকার নাচে। নাচের আসরে মাঝে মাঝে স্লো মিউজিক হয়। ছেলে-মেয়েরা তখন যুগলবন্দি হয়ে স্লো ডান্স করে। সব সাউথ আমেরিকান ছেলে-মেয়েরাই স্লো ডান্স করে, এর সাথে অশ্লীলতার কোন সম্পর্ক নেই । এটা ওদের কালচারেররই একটা পার্ট। ভব্যতা রেখেই ওরা এটা করত। আমি লক্ষ্য করলাম , রেইনা যখন ডিসকোতে যায় তখন ও ইন্ডিভিজুয়ালি নাচে, স্লো ডান্স করে না। একদিন প্রশ্ন করলাম
ঃ তুমি স্লো ডান্স কর না কেন?
ঃ উহু করব না। নিজের বন্ধুর সামনে অন্যের বাহুপাশে কোনদিন আবদ্ধ হব না।

ভিনদেশে এসে আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে নানা দেশের নানা বর্ণের মানুষদের কাছ থেকে দেখে আমার গভীর বোধ জন্মেছে – দেশ-বিদেশ আমাদের খন্ড দৃষ্টি ও বাস্তব বোধের অস্বস্তিকর সৃষ্টি মাত্র। এই মাটির পৃথিবীর পুরোটাই আমার দেশ। রঙে, রূপে, রম্যতায় নানা ভিন্নতা সত্ত্বেও হৃদয়বোধে ও মানবিক অনুভবে সকল মানব-মানবীই অভিন্ন।

এদিকে শুরু হয়েছিল বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা। বলিভিয়া এই টুনার্মেন্টে অংশগ্রহনকারী দেশ ছিল। বাংলাদেশ তখন ফুটবল তো দূরের কথা কোন খেলাতেই বিশ্বকাপ খেলেনা। রেইনা অবশ্যই বলিভিয়ার সমর্থক। বাঙলাদেশ যেহেতু খেলেনা তাই আমরা যেই দেশটিতে আছি অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থক হলাম।

পরিক্ষার রেজাল্টের পর কে কোন শহর পাবে এটা নিয়ে নানা হৈ চৈ হচ্ছিল। সাধারনতঃ এটা রেজাল্টের উপর নির্ভর করে। যাদের রেজাল্ট ভালো তাদের ভালো শহরগুলোতে দেয়া হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন কলেবরে একটি মহাদেশের মতই বিশাল। তার শহরের সংখ্যার কোন ইয়ত্তা নেই। রিপাবলিকই তো পনেরটা। সেই পনেরটি রিপাবলিকের আবার পনেরটি রাজধানী। গতানুগতিকভাবেই সবাইই মস্কো যেতে চায়, রাজধানী, দেশের কেন্দ্র সবরকম সুযোগ সুবিধাই অনেক বেশী। এশিয়ান সিটি যেমন তাসখন্দ, বাকু, আশগাবাদ ইত্যাদিতে কেউ যেতে চায়না। বলে ওখানে কিছু নেই। এই কিছু নেই বলতে একেবারে কিছি নেই তা নয়। এর যেকোনটিই আমাদের ঢাকার চাইতে বহু গুনে উন্নত। আসলে সবার লক্ষ্য ইউরোপ। অগ্রসর সংস্কৃতি। অপেক্ষাকৃত কম উন্নত, কনজারভেটিভ এশিয়া কেউ চুজ করতে চায়না। জনপ্রিয়তার দিক থেকে মস্কোর পর আসে লেনিনগ্রাদ (বর্তমান নাম সাংক্ত পিতেরবুর্গ বা ইংরেজী উচ্চারণে সেন্ট পিটার্সবার্গ), ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ, ইউক্রেনের পুরাতন রাজধানী খারকভ, বিলোরাশিয়ার রাজধানী মিনস্ক, ইত্যাদি। অনেকে একটু এগিয়ে গিয়ে মস্কোর চাইতেও বেশী প্রেফারেন্স দেয় তিনটি বাল্টিক প্রজাতন্ত্র লাটভিয়া, লিথুনিয়া এবং এস্থোনিয়ার রাজধানী যাথাক্রমে রিগা, ভিলনুস ও তাল্লিন। কারণ অনেকে মনে করেন সংস্কৃতিগত দিক থেকে তারা রুশদের চাইতে উন্নত। আবার ছেলেরা মুচকি হেসে আকর্ষণের কারণ হিসাবে বলে, ওখানকার মেয়েরা অনেক বেশী সুন্দরী আর অনেক বেশী খোলামেলা।

আমি শহর নিয়ে অতো মাথা ঘামাইনি। ভাবলাম কি হবে মস্কো গিয়ে? প্রচন্ড ঠান্ডা, অত ঠান্ডা আমি সইতে পারব না। আর রাজনীতির হাওয়া বদলের ক্রাইসিসের ছোঁয়ায় জিনিস-পত্রের দামও আকাশ ছোঁয়া। আমাকে ডেপুটি ডীন ডেকে বললেন, “তুমি ভালো ছাত্র ছিলে, তাই তোমাকে চয়েস দিচ্ছি, তোমার সাবজেক্টওয়ালাদের জন্য দুটো শহর আমার হাতে আছে, তিবিলিসি ও খারকভ। তুমি কোনটা বেছে নেবে?” তিবিলিসি শহরে একটা বছর কেটে গেছে। শহরটা আমার দেখা তাই তার প্রতি আমার আর কোন ফ্যসিনেশন ছিল না। ভাবলাম এই দেশের আরেকটা শহর দেখি।
রেইনা ভালো ছাত্রী হওয়ার পরও, মস্কোতে সীট না থাকার না কারণে ওর মস্কোর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া হলোনা। ওকে কিয়েভে সীট দেয়া হলো।
ঃ এখন কি করবে? কিয়েভে যাবে? তুমি তো মস্কো যেতে চাইছিলে।
ঃ আমি অত সহজে হার মানার মানুষ না। ব্যবস্থা একটা করবই।
বলল রেইনা।

জুনের শেষে অনেকেই হোস্টেল ছাড়তে শুরু করল। এটা ঠিক একেবারে চলে যাওয়া না। সামার ভ্যাকেশন কাটাতে বাইরে যাওয়া। বেশীরভাগই যাচ্ছে নিজ নিজ দেশে। মাত্র এক বছর আগে দেশ থেকে এসেছে, তাই দেশের প্রতি টান সবারই বেশী। অন্যদিকে, সিনিয়রদের দেখতাম ভ্যাকেশনগুলো কাটাতো ওয়েস্ট ইউরোপের কোন দেশে, মাঝে মধ্যে সিঙ্গাপুরে। আমাদের ল্যংগুয়েজ কোর্সওয়ালাদের মধ্যে থেকেও কয়েকজন ইউরোপের কোথাও গেল। জুলাই-আগস্ট এই দুমাসের জন্য বাইরে যাওয়া তারপর আবার সবাই ফিরে আসব এই হোস্টেলে। সাত-আট দিনের জন্য। এরপর একবারে চলে যাব, যে যার নির্ধারিত বিশ্ববিদ্যালয় ও শহরে। আমি সামার ভ্যাকেশন কাটাতে দেশে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম আর রেইনা ঠিক করল স্পেনে যাবে।ওদের কাছে স্পেনটা অনেকটা আমাদের কাছে ইংল্যান্ডের মত।ছুটিতে দেশে যাওয়ার আনন্দে অনেক উৎফুল্ল ছিলাম। রেইনা সামারে ওর দেশে যাবেনা। ঠিক করেছে স্পেন যাবে। সামার টাইমটাতে রাশ খুব বেশী থাকায়, প্লেনের টিকিট পাওয়া খুব ঝামেলার ব্যাপার। তাছাড়া ওখান থেকে একটা এয়ারলাইন্সই তখন মস্কো থেকে ঢাকা আসত – বিশ্বের বৃহত্তম এয়ারলাইন্স ‘এরোফ্লট’। দেশে থাকতে এই এয়ারলাইন্সটির অনেক বদনাম শুনলেও আমি নিজের অভিজ্ঞতায় সেরকম কিছু দেখিনি, বরং তার ফ্লাইং ল্যান্ডিং খুবই স্মুথ। তাছাড়া তখন পর্যন্ত ইন্টারন্যাশনাল রূটে এরোফ্লটের একটিও দুর্ঘটনা ছিল না। তিবিলিসি থেকে প্লেনে চড়ে মস্কো এলাম। মাত্র দুঘন্টার পথ। মাত্র বলছি, আসলে দূরত্ব তো অনেক। ট্রেনে যেখানে লেগেছিল তিনদিন চার রাত্রি, বিজ্ঞানের অপর উপহার প্লেনের কল্যাণে, সেই দুরত্ব কমে এসে হলো দুই ঘন্টা। বাংলা সাহিত্যের অনন্য সাধারণ কর্ম যাযাবরের দৃষ্টিপাতে পড়েছিলাম, ‘বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ’। আমি এই উক্তির সাথে একমত হতে পারিনা। ট্রেন ও প্লেন দুটোই বিজ্ঞানের অবদান। আর বিজ্ঞানের কল্যাণেই আবেগ প্রকাশ করার সুযোগ অনেক বেড়ে গিয়েছে। যাহোক মস্কো এসে মাত্র একদিন ছিলাম, কোথাও আর বের হয়নি। বিশাল মস্কো শহরে অনেকগুলো এয়ারপোর্ট, যতদূর জানি ছয়টি। তিবিলিসি থেকে এসে নামলাম ভ্নুকোভা এয়ারপোর্টে। তবে এই এয়ারপোর্ট থেকে প্লেন ঢাকা যাবেনা। তাই সেখান থেকে ট্যাক্সি নিয়ে চলে এলাম, শেরমিতোভা এয়ারপোর্টে। ঢাকা থেকে এসে এই এয়ারপোর্টেই প্রথম ল্যান্ড করেছিলাম। ভ্নুকোভা থেকে শেরমিতোভা আসার পথে নতুন অগ্রহ নিয়ে মস্কো দেখছিলাম। গ্র্যান্ড সিটি। তার বিশালত্ব অল্পতে বর্নণা করা যাবেনা। ঢাকার মানিক মিয়া এ্যভেনিউকে এক সময় খুব চওড়া মনে হতো আমার কাছে। মস্কোর সব রাস্তাই সেরকম এবং অনেক রাস্তা আবার তার দ্বিগুনেরও বেশী চওড়া। দুপাশের দালান কোঠাও অপূর্ব স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন। যেতে যেতে এক যায়গায় দেখলাম সুউচ্চ ধাতব স্তম্ভের উপর, বিশাল এক ধাতব মুর্তি। পুরো ভাস্কর্যটা দেখে মনে উর্ধবগামী কোন অতিমানব। আমি ট্যাক্সি ড্রাইভারকে প্রশ্ন করলাম, “এটা কার মুর্তি?” ট্যাক্সি ড্রাইভার উত্তর দিল, “ইউরি গ্যাগারিন”। ওহ! এইতো সেই গ্যাগারিন, পৃথিবীর প্রথম নভোচারী।

মস্কো থেকে প্লেনে চড়ে রওয়ানা দিলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। বারো ঘন্টা জার্নির পর (মাঝখানে দুবাইয়ে কিছু সময়ের জন্য হল্ট করেছিলাম), যখন ঢাকা এসে পৌছেছিলাম মনে হচ্ছিল আমি আমার আপন ডেরায়, নিজের ঘরে ফিরে এসেছি। স্পষ্ট মনে আছে, প্লেন থেকে নেমেই মাটি ছুঁয়ে চুমু খেয়েছিলাম।

দেশে এসে ডায়েরিতে লিখেছিলাম, ‘এখানে আসার পর আবার নিজেকে ফিরে পেয়েছি। ওখানে যাওয়ার পর পরিবেশ-পরিস্থিতির চাপে বা প্রভাবে নিজের অনেক বিশ্বাস এবং নীতির প্েতি নিজেরই অনেক সন্দেহ জেগেছিল। কিন্তু দেশের শান্তিময় পরিবেশ আমার সন্দেহগুলোকে ধুয়ে মুছে ফেলেছে। আপাতঃ ঝলমলে প্রতিচ্যের প্রতি সবার একটা দুর্নিবার আকর্ষণ আছে। প্রতিচ্যের কাছে তার এই ঝলমলানির কতটুকু মূল্য আছে জানিনা, কিন্তু আমাদের কাছে তা অর্থহীন। আসলে প্রাচ্যের হয়ে প্রতিচ্যের অনুসরণ করতে যাওয়াটা নিছক বোকামী, এতে নিজেকেই জলান্জলী দেয়া হয়।’
অনেক পরে আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমি সেদিন ঠিক লিখিনি। এক বৎসের বসবাস একটি দেশকে জানার জন্য যথেষ্ট নয়।

দেশ থেকে ফিরে এলাম তিবিলিসিতে। রেইনা তখনও স্পেন থেকে ফেরেনি। আমি ওর জন্য কিছু উপ হার দেশ থেকে নিয়ে এসেছিলাম, অপেক্ষায় ছিলাম ও আসলেই দেব। হঠাৎ আমার মনে হলো, ‘রেইনার জন্য একটা শাড়ীতো আনলাম না। এত কিছু আনলাম, আর শাড়ী আনার কথা বেমালুম ভুলে গেলাম!

ও স্পেন থেকে যেদিন ফিরে এলো। অনেকদিন পর ওকে দেখে আমার মন ভরে উঠল। চেয়ে চেয়ে এত দেখেও যেন সাধ মেটে না শুধু দেখতেই ইচ্ছা করে। মুক্তার মত দাতগুলি ঝিলিক দি্যে ওঠে।
বার্চ পাতার মর্মর ধ্বনির মতই মিষ্টি ও মুখর। তার লাবণ্য ও দিপ্তি-সৌরভে মন নেষায় নিমেষে রঙিন হয়ে ওঠে।
ঃ রেইনা, তুমি কয়েকদিন দেরী করে এলে মনে হয়?
ঃ হ্যাঁ তাই।
ঃ মস্কোতে হল্ট করেছিলে?
ঃ ঠিক ধরেছ।
ঃ কেন?
ঃ সারপ্রাইজ।
ঃ কি সারপ্রাইজ?
ঃ আমি মস্কো ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির অনুমতি পেয়েছি।
ঃ বাহ্, বেশতো! কি করে পেলে?
ঃ বললাম না আমি হার মানব না। আমি ওখানে ডীনের সাথে দেখা করি। আমার আগ্রহ দেখে তিনি, ভর্তি পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। ব্যাস, টিকে গেলাম।
সাবাস, মেয়ে সাবাস। পরাজিত হবার জন্য মানুষ হয়ে জন্ম হয়নি।

পর মুহূর্তে আমার মনে হলো। এরপর কি? আমাদের মধ্যে অনেক বাধা। ধর্ম বাধা, সংস্কৃতি বাধা, এমনকি আমরা নিজেরাই বাধা। আমাদের প্রেমের জন্ম হয়েছিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে। কিন্তু স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা তো মোছার নয়। আমরা কোন চূড়ান্ত পরিণতি চাইনি। নারী-পুরুষের সম্পর্কের চূড়ান্ত পরিণতি কি? বিবাহ? এই চূড়ান্ত পরিণতির ব্যপারে আমরা কেউই সচেতন ছিলাম না। আমি কি ভাবব? এই অল্প কয়েকদিনের পাওয়াতেও স্বস্তি সার্থকতা আছে। চির ও চিরন্তন করে মানুষ মানুষকে পেতে পারেনা। এই অল্পকালকেই সেই চিরকাল ভাবব।টেপ রেকর্ডারে তখন বীর মুক্তিযোদ্ধা আজম খানের রোমান্টিক অথচ বিরহের গান বাজছে, ‘প্রেম চিরদিন দূরে দূরে এক হয়ে থাকনা, মিললেই তো ফুরিয়ে যাবে।’

আজ বিদায়ের আগের রাত। রেইনা আমার রূমে এসেছে। সেই রাতে হঠাৎ করেই ঝড় হলো। ঝরের রাত্রি। বাইরে বাতাসের প্রচন্ড দাপাদাপি। আকাশে মেঘ তেমন ছিল না, কেবল বাতাসটাই বেশী। প্রসস্ত কাঁচের জানালা দিয়ে দেখছি গাছের মাথাগুলো বাতাসের ঝাপটায় কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। এই তো অভিসারের রাত্রি। এই রাত্রটিতে কি আমরা একবার আমাদের দেহ-মনের উত্তাপ গ্রহন করতে পারিনা? সুন্দর প্রসন্ন মূর্তি – বয়স কম বলে উম্যানস ক্লাসিকাল বিউটি এখনো আসেনি, অর্থাৎ সেটাকে বর্ষার ভরা নদী বলা চলবে না। কিন্তু কিছুটা চাঞ্চল্য কিছুটা সৌম্য, সে এক ভিন্ন সৌন্দর্য্য। নারীর সৌন্দর্য্যের বয়স ভেদে তারতম্য তো হবেই।
প্রসস্ত জানালা দিয়ে বাইরের ঝড়ের তান্ডবে ছেয়ে যাওয়া অন্ধকারাচ্ছন্ন পাহাড়টিকে খুব রহস্যময় মনে হচ্ছিল। আমার রূমে বাজছে রেইনার প্রিয় মোসার্টের মিউজিক, গভীর আবেগ আর দরদ ভরা সে সঙ্গীত। মোসার্ট চরম দুঃখ আর হতাশার মুহূর্তে অনন্য সুর বন্দনার রূপ দি্যেছিলেন। সেই ক্ষণ যেন আমার সামনেও উপস্থিত হয়েছে। এই মিউজিকের মোলায়েম ছন্দের সাথে তাল মিলিয়ে আমার খুব স্লো ডান্স করতে ইচ্ছে হলো। আমি রেইনার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম। ও আবেশে আমার বাহুপাশে চলে এলো। পরস্পর পরস্পরের নিবীড় বাহুবন্ধনে আমরা অনেকক্ষণ নেচেছিলাম।

কি আশ্চর্য্য অতল রেইনার কালো জোড়া চোখের দৃষ্টি। সেই দৃষ্টির গহীন অরণ্যে ঝড় চলছে, নারী-পুরুষ সান্নিধ্যের সেই চীরকালীন ঝড়। গভীর দৃষ্টি নিয়ে ওর দিকে তাকালাম। কারো মুখেই কোন কথা নেই। কথার শেষ আছে কিন্তু অনুভূতি অতলস্পর্শী, সুদুর প্রসারী। তাই মুখের ভাষায় কথা না বলে, বললাম চোখের ভাষায়। রেইনা মনের ভাষা দি্যে সেটা পড়তে পারল। ওর ললাটে গালে আমি চুমু খেয়েছি অনেকবার। ওর ওষ্ঠ স্পর্শ এখনো পাইনি, চাইওনি। আজ মন আবেগ-দীপ্তি দিয়ে তাই চাইল। আমি আমার মুখটা ওর মুখের কাছাকাছি আনতেই, ও আগের মত ওর গাল অথবা ললাট নয় ঠোটটিই বাড়িয়ে দিল।আমার কম্পিত ঠোট দুটি রাখলাম ঐ সূর্য-পক্ক ঠোটে. নারীর ঠোটে এই প্রথম ঠোট রাখা। কেমন মৃদু কোমল সে স্পর্শ। ‘অধরের কানে যেন অধরের ভাষা’. জর্জিয়ার পাহাড়ে দেখা দুস্প্রাপ্য একটি নীলচে বেগুনী বুনো ফুলের পাঁপড়ি স্পর্শ সুখের অপেক্ষায় । আমি সমস্ত মন উজাড় করে গভীর আবেগে ওকে আলিঙ্গন করলাম।

বিদায়ের শেষ মুহূর্তে হয়তো কান্নায় ভেঙে পড়ব, সেই ভয়ে কেই কারো মুখের দিকে তাকাতে সাহস পাচ্ছিলাম না। রেইনা সাহসী শক্ত মেয়ে, ওর বুকের ভিতর অশ্রুর নদী বয়ে গেলেও বাইরের চোখে বারি ঝরবে না, এমনটিই ধরে নিয়েছিলাম। হঠাৎ করেই যেন বাধ ভেঙে গেল। রেইনা অঝোর ধারায় কাঁদছে। মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেললাম, “কেদোনা রেইনা”। আমি বললাম। পিছন থেকে গুজরাটি মেয়ে আলিশা বলল, “ওকে ধর”। দুহাত দিয়ে মুখখানি তুলে শিশির-ভেজা কামিনী ফুলের দিকে অপলক চেয়ে রইলাম। সমস্ত আবেগ-আনন্দ, বেদনা-দুঃখ দিয়ে বহু জোড়া কৌতুহলী দৃষ্টির সামনে ওর মুখের দিকে সকাতর চেয়ে রইলাম। রেইনার মুখটি বেলা শেষের আকাশের মত ম্লান ও রক্তিম হয়ে উঠল।

এয়ারপোর্ট পর্যন্ত আমি আর গেলাম না, আবেগ ধরে রাখতে পারব না ভেবে। আমার কাশ্মিরী বন্ধু এজাজ একটি ট্যাক্সি ডেকে নিয়ে এলো। আমাকে বলল, “তুমি থাক, আমি ওকে এয়ারপোর্ট পৌঁছে দিয়ে আসি।” রেইনা, এজাজ আর পেরুর কার্লা গাড়ীতে উঠল। বুড়ো জর্জিয়ান ট্যাক্সি ড্রাইভার একবার আমার দিকে, একবার রেইনার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু আঁচ করতে পারল। আমাকে বলল, “চিন্তা করনা, আমি ঠিকমতো পৌছে দেব।” মৃদু একটা শব্দ করে স্টার্ট নিল রাশান ভলগা। স্থীর গাড়ী গতিশীল হয়ে উঠল, তারপর ককেশাস পাহাড় আর সবুজ বনের পটভূমিতে ধীরে ধীরে দূরে মিলিয়ে গেল। আমি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। এটাই বোধহয় আমাদের শেষ দেখা। “মন খারাপ করোনা এটাই জীবন।” কোন ফাকে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে আফসানা, খেয়ালই করিনি। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম আফসানার পরনে আজও চমৎকার নীল শাড়ী। আগের মতই সুন্দর লাগছিল ওকে শাড়ীতে। আর রেইনা? রেইনা চলে গেছে। শাড়ী পরা এ জীবনে তো তার আর হলোনা!

Categories
অনলাইন প্রকাশনা ইতিহাস

ভয়ঙ্কর এক সংখ্যার জন্ম, নিষ্ঠুর এক খুনের গল্প


৫ম খ্রিস্টপূর্বাব্দের শেষভাগ

“আচ্ছা, সবাই বলে ভ্রাতৃগোষ্ঠির সদস্যরাই তাকে মেরে আইওনিয়ান সাগরে তার লাশ ফেলে দিয়েছিল! গুরু নিজেই নাকি নির্দেশ দিয়েছিলেন এ কাজে?” উদ্বিগ্নতা আর তীব্র কৌতূহলে মেয়েটি জানতে চায় যুবকের কাছে।
“হশ্‌শ্‌…”মুখে তর্জনী রেখে দ্রুত চারদিকে তাকায় যুবক।

অস্তগামী সূর্যের ম্লান আলোয় ভরে গেছে গাঢ় সবুজ জলপাই অরণ্য, খেলা করছে বৃক্ষশাখা আর পত্রপল্লবের ছায়া। মাঝেমাঝে আইওনিয়ান সাগরের বুক থেকে ভেসে আসছে দমকা হাওয়া, তার তোড়ে জায়গা বদল করে আলো-ছায়া। না, কোথাও কাউকে দেখা যাচ্ছে না।

তবু অ্যাডোনিয়াকে সাবধান করে ফিলোক্রেটস, “আস্তে কথা বলো, কে কী শুনে ফেলে, বিপদে পড়ব আমরা।”
গলার স্বর নামিয়ে ফিসফিসিয়ে প্রশ্ন করে অ্যাডোনিয়া, “কিন্তু এ কি সত্যি?”
“আরে না, তা হবে কেন?” তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে ফিলোক্রেটস। “সাগরে ঝড় উঠেছিল সেদিন, আর সে দাঁড়িয়ে ছিল জাহাজের খোলা জায়গায়। প্রচণ্ড এক ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে যায় তাকে।”
“সে একাই কেন দাঁড়াতে গেলো খোলা জায়গায়?” প্রশ্ন করে অ্যাডোনিয়া, সন্দেহ দূর হয় না তার। “আর, বছরের এ সময় ঝড়ের কথা তো কখনো শোনে না কেউ, মাছরাঙা দিন [halcyon days] চলছিল তখন!”

“অ্যাডো, গুরু কেন এ কাজের নির্দেশ দিতে যাবেন? সত্যানুসন্ধানী মানুষ তিনি, কেবল সত্যেরই লেনদেন করেন। একটি সংখ্যা আবিষ্কারের জন্য কেন মানুষ খুন করাবেন তিনি?” ফিলোক্রেটসের গলার স্বর দৃঢ় হয়ে উঠে।
“কারণ গুরুর সারা জীবনের দর্শন আর শিক্ষার ভীত দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছিল সংখ্যটি। তিনি কঠোরভাবে চেয়েছিলেন তা গুপ্ত থাকুক, কিন্তু সে প্রকাশ করে দিয়েছে।”

“আমি তা বিশ্বাস করি না, অ্যডো। তুমি জানো, তাঁর কাছে বিদ্যাশিক্ষার বিনিময়ে আমাকে প্রতিদিন তিন অবোলি [oboli] করে দিতেন! এরকম অদ্ভুত শিক্ষক, যিনি পড়ানোর বিনিময়ে ছাত্রকেই পারিশ্রমিক দেন, আর একজন খুঁজে পাবে না তুমি। এ ধরণের মানুষ কখনো কাউকে হত্যা করতে পারেন না। আমি তাকে চিনি বলেই, জন্মভূমি সামোস ছেড়ে কেবল তাঁর দর্শন শেখার জন্য ক্রোটন এসেছি।” এক টানে বলতে থাকে ফিলোক্রেটস, একটু উষ্ণ তার গলা।
খানিক পর আর্দ্র হয় যুবকের কণ্ঠ। “অবশ্য তা না হলে তোমাকেও পাওয়া হতো না,” অ্যাডোনিয়ার কাঁধে দু’হাত রেখে আলতো করে তার কপোল ঘষে দেয় ফিলোক্রেটস। সোনালি অলকগুচ্ছ নড়ে উঠে মেয়েটির, ভূমধ্যসাগরের গাঢ় নীল জলরাশির মতো চোখ মেলে গভীর ভালোবাসা আর মায়ায় গণিতপাগল স্বামীর দিকে চেয়ে থাকে সে।
এর এক বছর আগের কথা।

চমৎকার করে কেটে, মসৃণভাবে লেপে দেয়া অর্ধবৃত্তাকার মাটির ঢিবি— সেমিসার্কেল (semicircle)। ব্যাস লাইন বরাবর ঝুলছে ভারী পর্দা। অর্ধবৃত্তের ধার ঘেঁষে ইতোমধ্যেই সমবেত হয়েছে অনেক তরুণ-তরুণী, ভ্রাতৃগোষ্ঠির সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ শাখা ম্যাথমেটিকোই (Mathematici)’র অন্তর্ভুক্ত তারা, অর্জন করেছে স্বচক্ষে গুরুকে দেখা ও তাঁর ভাষণ শোনার বিরল কৃতিত্ব। এর আগে তারা ছিল ভ্রাতৃগোষ্ঠির আরেকটি শাখা অ্যাকৌজমেটিকোই (Acusmatici)’র সদস্য, তিন বছর তীব্র কৌতূহলে শুধু গুরুর ভাষণই শুনে গিয়েছিল, পর্দার আড়ালের মানুষটি দেখতে পায়নি কখনো, কারণ তার জন্য আগে যোগ্যতা অর্জন করতে হয়।

গভীর উদ্দীপনায় অপেক্ষা করছে ম্যাথমেটিকোইয়ের সদস্যগণ, দিনের পর দিন তারা এভাবেই অপেক্ষা করে আসছে গুরুর আগমনক্ষণটিতে। আজকে কী নিয়ে কথা বলবেন গুরু ভাবতে থাকে তারা, আর পরিকল্পনা করে আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে কীভাবে নিজেদের যোগ্যতা মেলে ধরবে।

বাজনা বেজে উঠে অর্ধবৃত্তের অভ্যন্তরে, শোনা যায় জনপ্রিয় গ্রিসীয় সঙ্গীত, পর্দা সরে যায় দু’পাশে। সাদা আলখেল্লা পরিহিত, পায়ে সোনালি পাদুকা, আর মাথায় গ্রিসীয় ফুলের মুকুট, জলপাইয়ের পাতা গোঁজা তাতে, রাজকীয় মহিমায় প্রবেশ করেন সৌম্য চেহারা মানুষটি—পীথাগোরাস, সেমিসার্কেলের শিক্ষক, ভ্রাতৃগোষ্ঠির প্রতিষ্ঠাতা, তাঁর সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় দর্শনের প্রচারক।

 

“কেমন আছ তোমরা, হে অভিমন্ত্রিত [initiated] সত্যব্রতগণ?” দু’হাত প্রসারিত করে হাস্যপ্রোজ্জ্বল মুখে জানতে চান পীথাগোরাস।
“চমৎকার, হে মহান গুরুদেব!” সমস্বরে বলে উঠে সবাই।
“তোমরা হচ্ছ নির্বাচিতগণ,” শান্তস্বরে বলেন পীথাগোরাস,”তোমরা পরিহার করবে সব ধরণের উগ্রবাদিতা। সর্বোতপ্রচেষ্টায় তোমাদেরকে অপসারণ করতে হবে, এবং ছিন্ন করতে হবে অগ্নি ও তরবারির মাধ্যমে, এবং আরো নানাবিধ উপায়ে, দেহ থেকে অসুস্থতা, আত্মা থেকে অজ্ঞানতা, উদর থেকে ভোগবিলাস, নগরী থেকে অরাজকতা, পরিবার থেকে বিভেদ, এবং সকল ক্ষেত্রে বাহুল্য।”
“জী, গুরুদেব।” সবার হৃদয়ে গেঁথে থাকে বাণীটি।

পীথাগোরাসের নেতৃত্বে ভ্রাতৃগোষ্ঠির সদস্যগণ অতঃপর মেতে উঠে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোচনায়, নিয়ন্ত্রিত বিতর্কে, প্রশ্নোত্তরে। কেটে যায় বেশ কয়েক ঘন্টা, শেষ হয় প্রথম পর্বের আলোচনা।

অপরাহ্নে, অড্রিয়াটিক সাগর থেকে উঠে আসা বর্ষবায়ু (etesian wind) যখন বয়ে যাচ্ছিল আয়োনিয়ার উপর, দলটি আবার সমবেত হয়, এবার আলোচনার বিষয়বস্তু অতিন্দ্রীয় শাস্ত্র (esoterica)।
“আপনার জীবনের কথা বলে আমাদের সম্মানিত করুন, হে গুরুদেব।” লুকানিয়া থেকে আগত কমনীয় চেহারার মেয়েটি, ঈসারা (Aesara) তার নাম, উঠে দাঁড়িয়ে অনুরোধ করে; তীব্র কৌতূহলে নড়েচড়ে বসে সবাই।

স্মিতহাস্যে আলখেল্লাটি ঠিক করে নেন পীথাগোরাস। মনে তাঁর ভীড় করে কত না স্মৃতি—নদী, দরিয়া আর পথের অন্তহীন বয়ে চলা, নগর ও বন্দরসমূহের শান-শওকত, উত্থান-পতন, নানা জাতির মানুষ, দেহ ও মনে তাদের হরেক রঙের খেলা; সম্মোহিত হয়ে যান দার্শনিক কয়েক মুহূর্তের জন্য।

“সাতচল্লিশতম অলিম্পিয়াডের প্রাক্কালে জন্ম আমার। আমার বাবা নেসারকাস (Mnesarchus) ছিলেন ফিনিশিয়ার [Lebanon] বন্দরনগরী টায়ারের (Tyre) মুক্তা ব্যবসায়ী, মা ঈজিয়ানতীরে সামোস নগরীর (Samos) মেয়ে পার্থেনাস। সামোসের ভয়ানক দুর্ভিক্ষে বাবা একদা প্রচুর খাদ্শস্য দিয়ে সাহায্য করেছিলেন, ফলে নগরীর অধিকর্তাগণ কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তাঁকে সামোসের নাগরিকত্ব দান করেন।

আমি যখন মাতৃগর্ভে, মা’কে নিয়ে বাবা পার্নেসাস পর্বতের পাদদেশে ডেলফাই’র(Delphi) দৈববাণীর মন্দিরে গমন করেন, এপোলোর সন্ন্যাসিনী পীথিয়ার (Pythia, Pythoness) ওরাকল শুনতে। পীথিয়া আমার পিতাকে তাঁর জাহাজের জন্য অনুকূল বাণিজ্যবায়ুর ভবিষ্যতবাণী ব্যক্ত করে, এবং সুসংবাদ প্রদান করে আমার আগমনের, যা বাবা তখনও জানতেন না। ডেলফাই থেকে টায়ারে ফেরার পথে সিডন (Sidon) বন্দরে আমার জন্ম হয়। বাবা-মা খুশিতে সন্ন্যাসিনীর নামানুসারে আমার নাম রাখেন পীথাগোরাস—পীথিয়া’র মতো কথা বলে যে।

জগতকে জানার অদম্য স্পৃহা আমার উপর ভর করে সেই শৈশবেই, বাবার বাণিজ্য অভিযাত্রায় প্রায়ই তাঁর সহযাত্রী হতাম আমি। এভাবে ঈজিয়ান, এশিয়া মাইনর এবং ফিনিশিয়ার তীরে হাঁটতে হাঁটতে বড় হতে থাকি আমি।

maveric11

আমার বিদ্যাশিক্ষার জন্য শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নিয়োগ করেন বাবা। ছেলেবেলায়ই শামদেশের (Syria) বিদ্বজ্জনদের কাছে দীক্ষা লাভ করি আমি, সংস্পর্শে আসি আমার প্রিয় শিক্ষক ফেরেকাইদেসের (Pherekydes)।

অষ্টদশ বর্ষ বয়স পূর্ণ হলে আমি গমন করি মাইলিটাস নগরে, গ্রিক জ্ঞানের পুরোধা বৃদ্ধ থেলিজ (Thales) ও তাঁর ছাত্র অ্যানাক্সিম্যান্ডরের (Anaximander) সাহচর্য লাভ করি। পরিপূর্ণ জ্ঞান লাভের জন্য থেলিজ আমাকে কৃষ্ণ ও লোহিত মৃত্তিকার দেশে (Khemet-Deshret) গমন করতে উদ্বুদ্ধ করেন।

দূরদেশ গমনের প্রস্তুতি নেয়ার জন্য সিডন বন্দরে ফিরে আসি আমি, এখানে আরো কিছুকাল বিবলস ও টায়ারের যাবতীয় অতিন্দ্রীয় শাস্ত্রে অভিমন্ত্রিত হই। তারপর শুভ এক দিনে কারমেলাস পর্বতের পাদদেশে কৃষ্ণ ও লোহিত মৃত্তিকার দেশ মিশরগামী এক জাহাজে আরোহণ করি আমি।

মিশরের ফারাও আমাসিস (Ahmose II) এবং তাঁর গ্রিক স্ত্রী রদোপেস [Rodhopes, ইনি প্রাচীনতম সিন্ডারেলা, যার উপর ভিত্তি করেই পৃথিবীর নানা দেশে সিন্ডারেলা কাহিনী ছড়িয়েছে এবং ঈশপ যাকে রূপকথা শোনাতেন] আমাকে সাদরে গ্রহণ করেন। ফারাওয়ের প্রাসাদে কিছুদিন কাটানোর পর তাঁর রাজ্যের উচ্চ পুরোহিতদের কাছে দীক্ষা নেবার অভিপ্রায় ব্যক্ত করি আমি, রাজা তখন আমাকে একটি সুপারিশনামা লিখে পাঠিয়ে দেন মেমফিসের মন্দিরে ও পিরামিডে।

কিন্তু জ্ঞান-বিজ্ঞানে উৎকর্ষ মিশরীয়রা চূড়ান্ত রকমের গোপনীয়তা অবলম্বন করত তাদের জ্ঞান-সাধনায়, যেরকম করে গিয়েছিল ত্রিভূবনের জ্ঞানী থোথ-হার্মিস-ট্রাইম্যাজিস্টাস। তিন দিবস তিন রজনী আমি অতিবাহিত করি পাথরের শবাধারে (sarcophagus), মিশমিশে অন্ধকার এক গুপ্ত প্রকোষ্ঠে, আলোর প্রতীক্ষায়। আস্তে আস্তে আলোড়িত হতে থাকে শরীর আমার, বাড়তে থাকে হৃদস্পন্দন, ধীরে ধীরে চেতনা হারাই আমি। আমি অনুভব করি আলো, ভাসতে থাকে সত্তা আমার, অনন্তকালের গর্ভে, ফিনিক্স পাখির মতো উড়তে থাকে আমার আত্মা। চারপাশে প্রাণের স্পন্দন অনুভব করি আমি, অবলোকন করি আকার ও সংখ্যা।

“তুমি এখানে, পুনরুজ্জীবিত, অনুভব করেছ মহান রহস্য। মৃত্যুকে পরাভূত করেছ তুমি, অর্জন করেছ মৃত্যুঞ্জয়তা।” তিন দিন পরে উচ্চ পুরোহিত সঞ্চিসের গলার স্বরে জাগরণ আসে আমার। “এসো, অভিমন্ত্রিতদের গৌরব উদযাপন কর। তুমি হয়েছ আমাদেরই একজন, লাভ করেছ নবজন্ম।”

২২ বছর মিশরে কাটাই আমি, আয়ত্ত করি তাদের জ্যামিতিক জ্ঞান, সান্নিধ্যে আসি দড়ি-প্রসারণকারীদের (rope stretcher)। প্রতিবছর নীল নদের বন্যায় ভেসে যেত জমির খাড়া আল, ফারাও তখন নীলের অববাহিকায় পাঠাতেন দড়ি-প্রসারণকারীদের, কতটুকু জমি কমে গেল তা পরিমাপ করতে। পরিমাপের কাজে সূক্ষ্মভাবে সমকোণ বানানোর প্রয়োজন হতো তাদের, এর জন্য সমান দূরত্বে তৈরি করা ১২টি গিঁটের দড়ি নিত তারা। তারপর মাঝ থেকে এমনভাবে ৩ গিঁট নিত, যাতে একপাশে ৪গিঁট ও অন্যপাশে ৫ গিঁট থাকে এবং তাদের প্রান্ত জোড়া দিয়ে একটি ত্রিভুজ সৃষ্টি করা যায়, যা সবসময় সমকোণ সৃষ্টি করে। অন্য কোনো ভাবে গিঁট নিলে কখনো সমকোণ হতো না।

maveric21

ফারাও আমাসিস। আহ্‌, কী দূরদর্শী প্রতাপান্বিত সম্রাটই না ছিলেন তিনি! বয়স হয়েছিল বেশ, অন্তিম শয়ানে তখন, তারপরও রণকৌশল সাজিয়ে গেছেন তিনি, রাজধানী মেমফিসের চারপাশে গড়ে তুলেছেন কঠিন প্রতিরক্ষাবেষ্টনী। দক্ষিণ-পশ্চিম আনাতোলিয়া’র (Turkey) কারিয়া এবং গ্রিস থেকে ভাড়াটে সৈন্য এনে শক্তিশালী করে তুলেছিলেন সেনাদল, মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন সামোসের পলিক্রেটিজকে, যাতে পলিক্রেটিজের বিশাল নৌবহর গাজা থেকে পেলুসিয়াম (Pelusium) পর্যন্ত সঙ্কীর্ণ মরুপথটিতে অরক্ষিত পার্সি বাহিনীর উপর শাম সাগর (Syrian Sea) থেকে ভয়ঙ্কর আক্রমণ চালায়।

যুদ্ধ শুরু হবার কিছু দিন পূর্বে বিশ্বাঘাতকতা করে পলিক্রেটিজ। ক্যাম্বাইসিজের পক্ষে যোগ দেয় তার নৌবহর, বিনা বাধায় পার্সি সৈন্যদল পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে পৌঁছে যায় পেলুসিয়াম উপসাগরের তীরে। আর এ সময় মারা যান বৃদ্ধ আমাসিস, সিংহাসনে আরোহণ করেন সামতিক—সে কেবল কয়েক মাসের জন্য। পেলুসিয়ামে পরাজিত হয় মিশরবাহিনী, ক্যাম্বাইসিজ অগ্রসর হতে থাকেন আরো পশ্চিমে, হেলিওপলিসের পতন ঘটিয়ে পৌঁছে যান রাজধানী মেমফিসের সদর দরজায়। কয়েক মাস অবরোধের পর ভেঙে পড়ে মেমফিস।

পারস্যরাজ আমাকে বন্দি করে ব্যাবিলনে (Babylon) নিয়ে আসেন, কিন্তু রহস্যময়ভাবে মুক্তভাবে সেখানে চলাচল করতে দেন। অপ্রত্যাশিত সুযোগটি আমি কাজেই লাগাই জ্ঞান সাধনায়—প্রাচ্যদেশীয় জ্ঞানীদের (magi) কাছে দীক্ষালাভ করি অতিন্দ্রীয় শাস্ত্রে, আয়ত্ত করি ক্যালডীয় (Caldean) পুরোহিতদের ধর্মাচার, অর্জন করি নক্ষত্র-অবলোকনকারীদের (star-gazer) গণিত ও জ্যোতির্জ্ঞান। সমকোণী ত্রিভুজ নিয়ে এদেরও ছিল সুতীব্র আকর্ষণ যা আমাকেও তীব্র আলোড়িত করে।

maveric31

আনুমানিক ১৮০০-১৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের একটি ব্যাবিলনীয় শিলাখণ্ড যেখানে কীলক-লিখনের (cuneiform) সাহায্যে ২-এর বর্গমূলের মান ৬০-ভিত্তিক (sexagesimal) পদ্ধতিতে নির্ণয় করা হয়েছে; দশমিক পদ্ধতিতে রূপান্তর করলে বর্গমূলটির মান দশমিকের পর ৫-ঘর পর্যন্ত সঠিক হয়। সৌজন্যে, উইকিপিডয়া

 

এক যুগ কাটাই আমি ব্যাবিলনে। পারস্যরাজ ক্যাম্বাইসিজ ও গ্রিক স্বৈরাচারী (tyrant) পলিক্রেটিজের মৃত্যু হয় ইত্যবসরে, ফলে সামোস ফিরে আসি আমি। তারপর ক্রিট দ্বীপে কিছু দিন আইনশাস্ত্র অধ্যয়ন করে আবার সামোসে ফিরে একটি বিদ্যালয় চালু করার মনঃস্থির করি।

আহ্‌, সামিয়ানবাসীরা ছিল খুব ব্যস্ত, বিদ্যাশিক্ষার মতো অগুরুত্বপূর্ণ কাজে তাদের সময় ছিল অপ্রতুল। সামগ্রিক বিবেচনা করে চলে আসি ক্রোটন, এখানেই আদিষ্ট আমি, আর সব দার্শনিকের মতো, যারা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন দূরদেশে। তবে সামোসে পেয়েছি আমি নক্ষত্র এক, তোমাদেরই একজন সে, তোমাদের মতোই আলোকিত, প্রিয় ফিলোক্রেটজ।

“এ-ই হচ্ছে আমার গল্প, হে স্বর্গীয় আলোর দিশারীগণ, হে নির্বাচিত অভিমন্ত্রিতগণ।” পীথাগোরাস শেষ করেন তাঁর কাহিনী, সসম্ভ্রমে সবাই তাকায় ফিলোক্রেটজের দিকে।

সূর্য ডুবে গেছে পশ্চিমাকাশে, ধীরে ধীরে শীতল হয়ে উঠে ভূমধ্যসাগরীয় রাত। “জগতের সবই সংখ্যা, পূর্ণসংখ্যা, যাদের রয়েছে বাস্তব, স্বকীয় অস্তিত্ব।” রহস্যময়ভাবে বলে উঠেন পীথাগোরাস। “সংখ্যা-ই জীবন, সংখ্যা-ই মরণ, সংখ্যা গড়েছে জগত-সংসার। মহাবিশ্বের সবকিছুই পূর্ণসংখ্যায় পরিমাপযোগ্য (commensurable), এমনকি শরীর বলো, আত্মা বলো, ন্যায়বিচার বলো, সবই সংখ্যা।

যেকোনো দুটি সংখ্যাকে তোমরা সর্বদা সুবিধামতো তৃতীয় একটি ক্ষুদ্রতর সংখ্যার পূর্ণ গুণিতক আকারে প্রকাশ করতে পার। যেমন ধরো, ক্রোটনের বাজার থেকে ৫ ড্রাকমা ২ অবোলি দিয়ে কিছু জলপাই কিনলে তুমি, সম পরিমাণ জলপাই কিনলে সামোস থেকে ৪ ড্রাকমা ৪ অবোলি দিয়ে। তাহলে অবোলি হিসেবে তুমি পেলে দুটি সংখ্যা:
৩২ [অবোলি] ও ২৮ [অবোলি], যেহেতু ১ ড্রাকমা=৬ অবোলি।

এখন তুমি যদি একটি ক্ষুদ্রতর সংখ্যা, ১৬ [অবোলি] নাও, তাহলে মূল সংখ্যা দু’টি কিন্তু পরিপূর্ণ বিভাজ্য তথা পূর্ণ গুণিতক হচ্ছে না, কারণ ৩২÷১৬=পূর্ণ সংখ্যা, কিন্তু ২৮÷১৬=পূর্ণ সংখ্যা নয়।

এবার তুমি আরেকটু ক্ষুদ্রতর সংখ্যা নিয়ে চেষ্টা কর: ধরো, ১৪। না, এবারও দুটি পূর্ণ গুণিতক হচ্ছে না। কিন্তু এভাবে ক্ষুদ্রতর সংখ্যাটি কমিয়ে যেতে থাক, এক সময় দেখবে সেটি ৪ ধরলে দুটি সংখ্যাই পূর্ণ বিভাজ্য হচ্ছে: ৩২÷৪=৮, ২৮÷৪=৭। ৪ হচ্ছে ৩২ ও ২৮-এর সাধারণ পরিমাপক (common measure)।

আবার তুমি যদি ড্রাকমা হিসেব করো, তাহলে সংখ্যা দুটি:
৫ ও ১/৩ [ড্রাকমা] এবং ৪ ও ২/৩ [ড্রাকমা]।

এখন তুমি যদি ক্ষুদ্রতর সংখ্যাটি নাও ১/৩, তাহলে আগের মতো ভাগফল হিসেবে পাচ্ছ দুটি পূর্ণ সংখ্যা:
(৫ ও ১/৩)÷১/৩=১৫ ও ১=১৬
(৪ ও ২/৩)÷১/৩=১২ ও ২=১৪

জ্যামিতিকভাবে বললে, ৩২ ও ২৮ যদি দুটি রেখাংশ হয়, তাহলে ৪ মাপের রেখাংশটি তাদের সাধারণ পরিমাপক। এভাবে ২, ১, ১/২, ১/৪… প্রভৃতিও তাদের সাধারণ পরিমাপক হবে।

আবার ৫ ও ১/৩ এবং ৪ ও ২/৩ দুটি রেখাংশ হলে, তাদের সাধারণ পরিমাপক হবে ১/৩, ১/৬, ১/৯…এসব মানের রেখাংশ।

maveric41

এভাবে ক্ষুদ্রতর সংখ্যাটি যত ক্ষুদ্র নেবে, এক সময় না এক সময় সেটি দিয়ে মূল সংখ্যাদ্বয়কে ভাগকরলে ভাগফল হিসেবে পূর্ণ সংখ্য পাবেই— মহাবিশ্বের সবকিছুই পূর্ণ সংখ্যায় পরিমাপযোগ্য।

“না, এ সত্য নয়, জগতের সবকিছুই এভাবে পূর্ণ সংখ্যায় প্রকাশযোগ্য নয়। অনেক সংখ্যাযুগল আছে দুনিয়ায় যাদের এরূপ তৃতীয় কোনো সাধারণ পরিমাপক পাওয়া যাবে না, তা যত চেষ্টাই করাই হোক, আর পরিমাপকটি যত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রই নেয়া হোক না কেন।

আতঙ্কে শিউরে উঠল ভ্রাতৃগোষ্ঠির সদস্যগণ। প্রখর রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে ভয়ানক বজ্রপাতেও এতটা চমকে উঠত না তারা। গুরুর সামনে উচ্চকণ্ঠ হয় না তারা, তাঁর শিক্ষাকে অস্বীকার করা তাদের ভয়ানক দুঃস্বপ্নেরও অতীত; আর এ তো স্পষ্ট বিদ্রোহ, ভ্রাতৃগোষ্ঠির বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত, তাদের সামগ্রিক জীবনাচারণকে অস্বীকার। কে সে দুরাত্মা, পাপিষ্ঠ! আক্রোশে ফেটে পড়তে উন্মুখ ভ্রাতৃগোষ্ঠির সদস্যগণ।

“কে, কে বলেছে এ কথা?” কঠোর থমথমে মুখে প্রশ্ন করেন পীথাগোরাস।
“আমি, হিপ্যাসাস।” মেটাপানটামের (Metapontum) যুবকটি বলে। গত কয়েক দিন অস্থির সময় কেটেছে। আবিষ্কারটির ভয়ঙ্করতায় প্রথমে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল সে, কেঁপে উঠেছিল তার অন্তরাত্মা। তারপরও নানা ভাবে পরীক্ষা করে দেখেছে সে—না, সে-ই ঠিক, পীথাগোরাসের সংখ্যাই জগতের সব সংখ্যা নয়। শেষ পর্যন্ত সহ্য করতে না পেরে উচ্চারণ করেই ফেলেছে সত্যটির কথা।
“তুমি জান কী উচ্চারণ করেছে তুমি? এর কী প্রমাণ আছে তোমার কাছে? প্রমাণ করতে না পারলে তার পরিণতি সম্পর্কে ধারণা আছে?” পীথাগোরাস দৃঢ়কণ্ঠে বলেন।
“হ্যাঁ, প্রমাণ আমি করতে পারব। আপনার সমকোণী ত্রিভুজেই লুকিয়ে আছে তা।” ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে হিপ্যাসাসের।
“উঠে এসো এখানে, প্রমাণ কর।”

ভীড় সরিয়ে সেমিসার্কেলে উঠে হিপ্যাসাস। নানা রঙের বালি ও নূড়িপাথর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একজন সহকারী। মাটিতে একটি বর্গক্ষেত্র আঁকে হিপ্যাসাস, তারপর নীল বালি ছিটিয়ে রঙিন করে তার বাহুগুলো, আর একটি সবুজ কর্ণ তৈরি করে।
“আপনার কথামতো বাহু-রেখাংশ AB এবং কর্ণ-রেখাংশ AC পরস্পর পরিমাপযোগ্য (commensurable), অর্থাৎ তৃতীয় আরেকটি ক্ষুদ্রতর রেখাংশ তাদের উভয়কে পূর্ণ সংখ্যায় ভাগ করতে পারবে, তাই না?” প্রশ্ন করে হিপ্যাসাস।

maveric51

“হ্যাঁ, তাই।” ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করে বলেন পীথাগোরাস, স্পষ্টতই এ ধরণের আচরণ, বিশেষ করে শিষ্যদের কাছ থেকে, একেবারে অকল্পনীয়।
“ধরে নেই, তৃতীয় সেই ক্ষুদ্রতর রেখাংশটির মান m। অতএব, AB ও AC উভয়ে m-এর সাপেক্ষে পরিমেয়, যেখানে m হতে পারে অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি সংখ্যা। বোঝার সুবিধার্থে ধরে নেই, AC=1000m, AB=707m, যদিও পরে আমরা দেখব আমার পদ্ধতিতে 1000 বা 707-এর কোনো ভূমিকা নেই।”
বর্গের কর্ণ যদি ১০ হস্ত হয়, বাহু তার মোটামুটি ৭ হস্ত; ১০০০ হলে মোটামুটি ৭০০, মনে মনে হিসেব করেন পীথাগোরাস। “ঠিক আছে।” বলেন তিনি।

“এবার কর্ণ AC থেকে AB-এর সমান করে AB1 অংশ কেটে নেই। CB1 কে বাহু ধরে আরেকটি বর্গ আঁকি।” বর্গক্ষেত্রটিকে হিপ্যাসাস এবার লালচে বালি দিয়ে স্পষ্ট করেন। পিনপতন নীরবতা সেমিসার্কেলে, কী একটা আঁচ করার চেষ্টা করছেন পীথাগোরাস, কপালে বয়সরেখাগুলোতে ভাঁজ পড়তে শুরু করছে।

maveric61

“এখন ছোট বর্গের বাহু, CB1=1000m-707m=293m (=EB1)।
ত্রিভুজ ABE এবং ত্রিভুজ AB1E সর্বসম, কারণ এরা সমকোণী ত্রিভুজ যেখানে দুটি করে বাহু সমান: AB=AB1, AE সাধারণ বাহু।
ফলে EB1=EB=293m, এবং
ছোট বর্গের কর্ণ, CE=707m-293m=414m।
অতএব আমরা পাচ্ছি, ছোট বর্গের বাহু ও তার কর্ণ পরস্পর m-এর সাপেক্ষে পরিমাপযোগ্য।” হিপ্যাসাস একটি বিরতি নেন।

মৃদু গুঞ্জন উঠে সেমিসার্কেলের চারপাশে, এ-তো ঠিকই আছে, সমস্যা কোথায়! হিপ্যাসাস আবার তার চিত্রে মনোযোগ দেয়, CE রেখাংশ থেকে CB1 এর সমান করে CB2 অংশ কেটে নিয়ে আগের মতো ক্ষুদ্রতর একটি বর্গক্ষেত্র অঙ্কন করে, এবারেরটি বেগুনি বর্ণের।

maveric71

“আগের মতোই আমরা বলতে পারি, বেগুনি বর্গের বাহু এবং তার কর্ণও m-এর সাপেক্ষে পরিমাপযোগ্য, তা m-এর যত গুণিতকই হোক না কেন? তবে আগের বর্গদুটোর চেয়ে এখানে গুণিতকের মান কম হবে, তাই না?” হিপ্যাসাস প্রশ্ন করে।
“হ্যাঁ।” পীথাগোরাস সায় দেন, স্বর তার ক্ষীণ, যুক্তিশাস্ত্রের কোন শাখা দিয়ে হিপ্যাসাস অগ্রসর হচ্ছে, তা ধরতে পেরেছেন তিনি।
“এভাবে m-এর সাপেক্ষে কর্ণ ও বাহুতে গুণিতকের মান কমতে থাকবে। আমি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর বর্গ এঁকে যেতে থাকব, এক সময় এমন এক বর্গ পাব যার বাহু ও কর্ণ m-রেখাংশটির চেয়েও ছোট হয়ে যাবে, ফলে বাহু ও কর্ণ m-এর সাপেক্ষে আর পরিমাপযোগ্য হবে না।”

খানিক থেমে আবার বলে হিপ্যাসাস, “এখন কথা হলো m কত ছোট হতে পারে। আমি সুবিধার জন্য m-কে এমন ধরেছি যে প্রথম বর্গের কর্ণ 1000m ও বাহু 707m হয়। কিন্তু m যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন, তা নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের হবে, কিন্তু আমি এভাবে অসীম সংখ্যক ক্ষুদ্রতর বর্গ আঁকতে পারব, যখন বর্গের বাহু নির্দিষ্ট mটি থেকে এক সময় ছোট হবে।”

“অতএব, যুক্তিশাস্ত্রের রিডাকশিও এড অ্যাবসার্ডাম (reductio ad absurdum) এর ব্যাতিরেকী প্রমাণের (proof by contradiction) মাধ্যমে আমি প্রমাণ করলাম, এক সময় এমন বর্গ আঁকাও সম্ভব যার বাহু ও কর্ণ কোনোভাবেই সাধারণ কোনো পরিমাপকের সাপেক্ষে পরিমেয় নয়! কিন্তু এ তো স্ববিরোধী কথা, কারণ সকল বর্গেরই কর্ণ ও বাহু একই আনুপাতিক সম্পর্কে থাকার কথা।
তার মানে বর্গের বাহু ও কর্ণ আসলেই কখনো পরস্পর পরিমেয় নয়—বাহু পূর্ণ সংখ্যায় পরিমেয় হলে কর্ণ পরিমেয় হবে না, আবার কর্ণ পরিমেয় হলে বাহু হবে না। বর্গের বাহু যদি ১ হয়, তার কর্ণ হয় ২-এর বর্গমূল, এবং ১ যেহেতু পরিমেয়, ২-এর বর্গমূল কখনো চূড়ান্ত পরিমেয় নয়। একে দুটি পূর্ণ সংখ্যার কোনো অনুপাতে প্রকাশ করা যায় না। এটি একেবারেই নতুন ধরণের সংখ্যা, মহান পীথাগোরাস! ”

গভীর নিঃস্তব্ধতা নেমে আসে সেমিসার্কেলে। আইওনিয়ান সাগর থেকে পাক খেতে খেতে সাদা কুয়াশা ছড়িয়ে পরে ভুখণ্ডে, শীতলতর হয় ভূমধ্যসাগরীয় রাত। হিপ্যাসাসের যুক্তি বুঝতে পেরেছেন তিনি, কিন্তু এখনই সামলে নেয়া প্রয়োজন ব্যাপারটি, নয়তো ভ্রাতৃগোষ্ঠির ভাঙন ঠেকাতে পারবে না কেউ!
“তুমি অশুভ অযৌক্তিক (irrational) এক সংখ্যার কথা বললে, হিপ্যাসাস। আমি আরো পরীক্ষা করে দেখব তোমার প্রমাণ, তবে উদ্ধত, অমার্জিত আচরণের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে তোমাকে। আগামীকাল প্রত্যূষেই জাহাজে করে ক্রোটন ত্যাগ করবে তুমি, আমার নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত মেটাপানটাম আসার চেষ্টা করবে না এবং কোথাও প্রকাশও করবে না অশুভ সংখ্যাটির কথা।” সভা ত্যাগ করেন পীথাগোরাস।

“এ-ই হচ্ছে হিপ্যাসাসের গল্প, ভয়ঙ্কর অমূলদ সংখ্যার জন্মের গল্প।” বিবর্ণ পোশাক পরিহিত মানুষটি, চোখে তার অপার্থিব আনন্দ-আভা, চারপাশে মানুষের ভীড়, বলতে লাগল। দীনহীন এক চারণকবি সে—পথে-প্রান্তরে বর্ণনা করে গণিতের উপাখ্যান, গণিতই মহান গীতিকবিতা তার কাছে, আনন্দ-বেদনা হাসি-কান্নার গৌরবগাঁথা।
“সহজ-সরল ভাষায় নিজের মতো করে এ উপাখ্যান বর্ণনা করার চেষ্টা করেছি; এতে আছে ইতিহাস, আছে কিংবদন্তি, পুরাকালের পরম কথা, যার সত্য-মিথ্যা আজ হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। মানুষ হিসেবে আমারও রয়েছে সীমাবদ্ধতা, ভুল-ত্রুটি নিজ গুণে মার্জনা করবেন।” দু’হাত জোড় করে বুকের কাছে রাখে সে।
“হিপ্যাসাসের শেষ পর্যন্ত কী হলো!” উৎসুক জনতা জানতে চায়।
“গুরুর আদেশে পরদিনই সমুদ্রযাত্রা করে সে। তারপর হঠাৎই হারিয়ে যায় ভূমধ্যসাগরের বুকে, কেউ তাকে আর দেখেনি কোনো দিন! শান্ত মাছরাঙা দিন [halcyon days] ছিল সেদিন, কিন্তু কেউ বলে ঝড়ে ভেসে গেছে সে, কেউ বলে ভ্রাতৃগোষ্ঠির সদস্যরা খুন করে লাশ তার ফেলে দিয়েছে সাগরে।”

“শান্তি পাক হিপ্যাসাসের আত্মা, সুখে থাকুক জগতের সব মানুষ।” মাটি থেকে কাপড়ের ঝোলাটি তুলে নেয় চারণকবি, জনপদটি পেছনে ফেলে দিগন্তজোড়া সবুজ মাঠে নেমে পড়ে সে, এগিয়ে যেতে থাকে নতুন আরেক জনপথের সন্ধানে, যারা গণিতের প্রতি ভালোবাসা মমতায় তাকে থামিয়ে দেবে চলার পথে, গভীর আগ্রহে শুনতে চাইবে প্রাচীন মানুষদের কথা— জ্ঞানের মধ্যেই যারা খুঁজে পেয়েছেন জীবনের মহত্তম অর্থ, পরিশুদ্ধতম আনন্দ।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা সৃজনশীল প্রকাশনা

শুভ উদ্ধোধন হল ইজি পাবলিকেশনস এর যাত্রা

শুভ উদ্ধোধন হল ইজি পাবলিকেশনস এর যাত্রা । সঙ্গে থাকার জন্য সকলকে ধন্যবাদ ।

প্রতিবছর ১০০ শ্রেষ্ঠ গল্প ও ১০০ শ্রেষ্ঠ কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হবে আমাদের বই, “১০০ শ্রেষ্ঠ গল্প” ও “১০০ শ্রেষ্ঠ কবিতা” ।যা পাওয়া যাবে আমাজন.কম সহ আরো অনেক বুক স্টোরে ।

তাই দেরী না করে প্রকাশ করুন আপনার যেকোন ধরনের সৃজনশীল লেখা ।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা কল্পবিজ্ঞান

আবিষ্কার

০১

ইজি চেয়ারে দোল খাচ্ছেন বিশিষ্ট সমাজসেবী, কেমিস্ট ও বিশিষ্ট নিউরোলজিস্ট, ডঃ এ, এফ, আর, জিলান। সংক্ষেপে ডঃ জিলান। নিউরনের উপর ডক্টরেট করেছেন । যে ঘরটাতে তিনি বসেছেন তা তার গবেষণা কক্ষ, গবেষণা কক্ষটি ২য় তলার সিঁড়ির ডান পাশে। সম্পূর্ণ বাড়িটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত । বাড়ির চার ধারে বিশেষ উপায়ে শোভাবর্ধক গাছ লাগানো হয়েছে। বাড়িতে তিনি একা নন; তার স্ত্রী মারিয়াও থাকেন। কাজের লোক কেউ নেই । দ্বাবিংশ শতাব্দীর শুরুর কথা, এখন ২১০৭ সাল চলছে । বিজ্ঞানের উন্নতি হয়েছে অনেক । ঘরের কাজ তেমন থাকে না বললেই চলে। তবে বিজ্ঞান এখনও সবার কাছে সমান ভাবে পৌঁছায়নি । ডঃ জিলান যে বিজ্ঞান ব্যবহার করছেন তার সামান্যতম হয়ত পেয়েছে অনুন্নত এলাকার মানুষ । তবুও বিজ্ঞান এখন অনেক দুর এগিয়েছে। ৩য় সৌরজগত আবিষ্কার করে সেখানে মানুষ পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। চাঁদে মানুষ বসবাস করছে, সমুদ্রের নীচে গড়ে তুলেছে নতুন বিশ্ব; তাওতো কম নয় । এত কিছুর পরও ডঃ জিলানের মন শান্ত নয়। নতুন একটা ব্যাপার নিয়ে ভাবছেন, না ঠিক নতুন নয় প্রায় বাইশ বছর ধরে তিনি এটা নিয়ে গবেষণা করছেন, যা সবার কাছে নতুন । গবেষণা কক্ষে বসে একের পর এক সিগারেট পান করছেন। প্যাবিউলাম (pabulum) সিগারেট, অত্যন্ত দামী এবং স্বাস্থ্যের কোন ক্ষতি করে না। এ ধরনের সিগারেট বের হয়েছে ৩০ বছর চলছে। সমুদ্রের প্যাবিলাস শৈবালের পাতা থেকে এটি তৈরি করা হয়। প্রশান্ত মহাসাগরে এটি পাওয়া যায়। ডঃ জিলানের কাছে অত্যন্ত প্রিয় আর তাই প্রতিদিন সকালে হোটেল বয় এক প্যাকেট করে দিয়ে যায়।

এ পর্যন্ত তিনি বারটি সিগারেট খেয়ে ফেলেছেন কিন্তু চিন্তামুক্ত হতে পারছেন না। কিছুতেই তার হিসাব মিলছে না। ইজি চেয়ার ছেড়ে তিনি ডেস্কটপ কম্পিউটারটির সামনে ঝুঁকে বসলেন। অত্যাধুনিক কম্পিউটার এটি। কোনো কিবোর্ড কিংবা মাউস লাগেনা এটাতে। দুটি সেন্সর মাথার দুপাশে তারের মাধ্যমে লাগিয়ে দিলেই হল, যেকোনো কাজ যা কিবোর্ড মাউস করতো তা করে দিচ্ছে; শুধু মনে মনে বা মুখে বললেই হয়। এছাড়া কম্পিউটারটিতে বিশেষ প্রোগ্রামিং করা আছে যাতে এটি প্রয়োজনে কথাও বলতে পারে, এজন্য এর পেছনে আছে দুটি থ্রি-ডি স্পীকার । জিলান কম্পিউটারটি অন করতেই ত্রিমাত্রিক স্ক্রিনে ছবি ফুটে উঠে, তার এবং তার স্ত্রীর। তাদের বিয়ে হয়েছে প্রায় চল্লিশ বছর চলছে। কিন্তু একদিনের জন্যেও তারা আনন্দ অবসর কাটাতে পারেননি। তাদের কোনও সন্তান নেই। ডঃ জিলান আবিষ্কারের নেশায় তার স্ত্রীর প্রতি অনেক অবিচার করেছেন। তবে তার স্ত্রী মারিয়া কখনও প্রতিবাদ করেনি। স্বামীর প্রতি তার বিশেষ ধরনের মমতা রয়েছে যা দ্বাবিংশ শতাব্দীতে নেই।

ডঃ জিলান ত্রিমাত্রিক ছবির দিকে তাকিয়ে আছেন, এ ছবিটি তিনি এর আগেও অনেকবার পর্যবেক্ষণ করেছেন। এটি একটি নিউরনের(মানুষের মস্তিষ্কের কোষ) জটিল বিন্যাস এর ছবি।দুদিন যাবত তিনি গবেষণা কক্ষে বসে আছেন, ঘুমাননি; বিশেষ ভিটামিন ও উত্তেজক ট্যাবলেট খেয়েছেন বলে কোন ক্লান্তি বোধ করছেন না। হঠাৎ তিনি প্রায় লাফিয়ে উঠলেন এবং চিৎকার করে বললেন, পেয়েছি, পেয়েছি, আমার স্বপ্ন অবশ্যই সফল হবে, অবশ্যই সফল হবে। তৎক্ষণাৎ তিনি গবেষণা কক্ষ থেকে বের হয়ে নিচে গেলন, রাত ২টা বাজে। ড্রয়িং রুমের কোনায় ঘুমিয়ে থাকা বেড়ালের গায়ে কিছুক্ষণ হাত বুলিয়ে দিলেন, এটি তার এক ভক্ত তাকে জন্মদিনে উপহার দিয়েছে। বেড়ালের সাথে জিলানের বেশ ভাব হয়ে গেছে। বেড়াল জেগে উঠল এবং দুইবার মিউ মিউ সুরে ডেকে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। জিলান সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল এবং তার বেড রুমে প্রবেশ করল। তার স্ত্রী মারিয়া ঘুমে অচেতন হয়ে আছে। জিলান তার এক পাশে ঘুমানোর জন্য জায়গা করে নিলো।

০২

ডঃ জিলান ঘুম থেকে উঠলেন সারে দশটায় । তার স্ত্রী তাকে নাস্তার টেবিলে ডাকছে । মুখ ধুয়ে জিলান নাস্তার টেবিলে গেল এবং টিভি টেন, অন করল । এটি বিশেষ ধরনের টেলিভিশণ । ত্রিমাত্রিক ছবি ছাড়াও এর প্রধান বিশেষত্ব হচ্ছে এটি দেখতে খুবই ছোট, তবে স্ক্রিন বা পর্দা ছোট/বড় করা যায় । এর পর্দাটি তৈরি হয় বাতাসের বিভিন্ন গ্যাসীয় অনুর মধ্যে । টিভি টেন এর আলোর উৎস বাতাসের ক্ষুদ্র অনু এর উপর পড়লে তা ত্রিমাত্রিক একটি হলোগ্রাফিক বিম্ব তৈরি করে যা বাস্তব চিত্রের মত দেখতে ।

টেলিভিশনে খবর প্রচারিত হচ্ছে ,“আজকের প্রধান প্রধান সংবাদের মধ্যে, পাউডার ওয়াটার, আবিষ্কার অন্যতম, এটি পাউডার আকারে আগামী এক মাসের মধ্যে বাজারে পাওয়া যাবে । নির্দিস্ট পরিমান পাউডার ওয়াটার একটি গ্লাসে নিলে তা বাতাসের জলীয় বাষ্পকে শীতল করে গ্লাস ভর্তি তরল বিশুদ্ধ পানিতে পরিণত হবে মাত্র পাচঁ মিনিটে, তবে–”। এ পর্যন্ত দেখার পর জিলান টিভি টেন টি বন্ধ করে দিল ।

দেখলে বিজ্ঞান কত দ্রুত এগুচ্ছে, আমার আবিষ্কারও প্রায় শেষের দিকে, দেখবে এ আবিষ্কার আমাদের দুজনকে বদলে দেবে । জিলানের কথায় তার স্ত্রী কিছুটা আগ্রহের সাথে বলল, কি আবিষ্কার?

:কেন তোমাকে বলিনি, নতুন জীবন সর্ম্পকে আমি গবেষণা করছি, তাওতো প্রায় ২২ বছর চলছে ।

:এতো অনেক দিন ধরেই বলছো, কিন্তু..

:কিন্তু কি? তুমি শুনলে অবাক হবে কিনা জানি না, এ আবিষ্কারটি করা হলে আমরা পাবো নতুন জীবন । কাজ প্রায় শেষের দিকে ।

:নতুন জীবন পাওয়া কি সম্ভব ? আমাদের বয়স তো কম হলো না, প্রায় আশিঁ ছুঁই ছুঁই করছে ।

: হ্যাঁ সম্ভব, তবে সম্পূর্ণ কাজটা গোপনে করতে হবে ।

: কতদিন লাগবে আনুমানিক ?

: তা প্রায় আঠারো মাস, আর এরই মধ্যে আমাদের দুজন মানুষ লাগবে, একজন তরুন অন্যজন তরুনী ।

: তরুন, তরুনী দিয়ে কি করবে?

:কেন আবার, নতুন জীবন পেতে হবে না । ব্যাপারটা একটু জটিল; প্রথমে নিউরোসিস্ট যন্ত্রটি আবিষ্কার করতে হয়েছে আমাকে অনেক কষ্টে । কিন্তু কিভাবে ব্যবহার করবো তা বুঝে উঠতে পারিনি । কিন্তু এখন পারছি । ট্রান্সফার সিস্টেম অব নিউরন যন্ত্রটির আবিষ্কারও প্রায় শেষের পথে । এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা ।

জিলানের চোখে এক ধরনের লোভ লালসার আগুন জ্বলে উঠে । আপন মনে বিড় বিড় করতে থাকে, নতুন জীবন, new life.

জিলান সারাজীবনে কোটি কোটি টাকা, বাড়ি গাড়ি, ব্যবসা গড়ে তুলেছে, যার কোন উত্তরাধিকার নেই । আবিষ্কারের নেশা তাকে এতটাই ঝেঁকে ধরেছিল যে সংসারের প্রতি তার কোনো মনোযোগই ছিল না । তার দৃঢ় সংকল্প সে নতুন জীবন আবিষ্কার করবেই এবং ক্রমশ তার সে স্বপ্ন সফল হতে চলেছে ।

 

০৩

আজ সকালে জিলানকে একটু আগে আগে বের হতে হবে । প্রথমে পত্রিকাতে একটা বিজ্ঞাপণ দিতে হবে, তারপর কিছু কেনা কাটা করতে হবে ।  বিজ্ঞাপণটা এরকম হবে: ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সী দুজন তরুন তরুনী চাই; বৃদ্ধ বিজ্ঞানী, নিউরোলজিস্ট ডঃ জিলান ও তার স্ত্রী মারিয়াকে দেখা শোনার জন্য । উপযুক্ত পারিশ্রমিক ও থাকা খাওয়ার সু ব্যবস্থা করা হবে ।

যোগাযোগ: ডঃ জিলান, অতশী কটেক্স, 52E78B.

অপর কাজটি হল কিছু কেনা কাটা, বিশেষত ইলেকট্রনিক্স জাতীয় ।

বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হবার পরদিন থেকেই তরুন তরুনী আসা শুরু করেছে । ডঃ জিলান ও তার স্ত্রী মারিয়া দেখে শুনে এমন দুজন তরুন তরুনীকে বাছাই করলেন যারা সুদর্শণ, ২০/২২ বছর বয়স এবং আত্মীয় স্বজন নেই বললেই চলে । তাদের একজনের নাম জয়নাল এবং অন্যজনের নাম আখিঁ । কাজ কর্ম সব কিছু বুঝিয়ে দিয়ে মারিয়া তাদের শোবার ঘর দুটিও দেখিয়ে দিল । ডঃ জিলান গবেষণা কক্ষে প্রবেশ করেছেন প্রায় চার ঘন্টা চলছে । নতুন “ট্রান্সফার সিস্টেম অব নিউরন” যন্ত্রটির কাজও প্রায় শেষের পথে । এখন তাকে জীবনশক্তি শরবত তৈরি করতে হবে । ফর্মূলা সব আগেই তৈরি করা আছে । কিছু ভেষজ ও খনিজ উপাদানের সংমিশ্রণে তৈরি করা হল এ শরবত । ডঃ জিলান তা গবেষণা কক্ষের হিমাগারে রেখে দিলেন যত্ন করে । কাজ ভালই এগুচ্ছে, তবে কোন সমস্যায় যাতে পড়তে না হয় সেদিকে বিশেষ খেয়ালও রাখতে হচ্ছে তাকে ।

গবেষণা কক্ষ থেকে বের হয়ে তিনি তার স্ত্রী কে জানালেন আগামী সোমবার আমাদের জীবনের শেষ পরীক্ষা শুরু হবে । মিসেস জিলানকে সব কিছু সম্পর্কে অবগত করে এবং তাকে সবকিছু বুঝিয়ে দিলেন ডঃ জিলান । কিভাবে বি করতে হবে; তবুও তার স্ত্রীর চোখে বিশ্ময়, শেষ পর্যন্ত কাজটা সমাধা হলেই হল । নয়তো জীবনের কাছে হার মানতে হবে তাদের । এক পর্যায়ে মারিয়া, জিলানকে প্রশ্ন করে বসে কাজটা কি সম্ভব হবে?

জিলান উত্তর দেয়, অবশ্যই সম্ভব ।

: যদি কোন সমস্যা দেখা দেয় ।

: কোন সমস্যা নেই । সম্পূর্ণ কাজটা হবে নিউরন এর স্মৃতি ট্রান্সফার এর মাধ্যমে । আমার সকল স্মৃতি ট্রান্সফার করে জয়নালের মস্তিষ্কে আর জয়নালের টা আমার মস্তিষ্কে, ব্যস ! একই ভাবে তোমার ও আখিঁর স্মৃতি পাল্টানো হবে ।

: অবিশ্বাস্য কথা ।(জিলানের স্ত্রী কিছুটা অবিশ্বাস্য দৃস্টিতে তাকিয়ে থাকে)

: হ্যাঁ অবিশ্বাস্য কথা, তবে খুব সাবধানে করতে হবে ।

 

আখিঁ ও জয়নাল বাগানে কাজ করছে । নিষ্পাপ দুটি জীবন । তাদের নিয়ে যে কি ষড়যন্ত্র চলছে তা তারা জানে না ।

 

 

০৪

আজ সোমবার । রাতটা অত্যন্ত অন্ধকার । অমাবস্যার রাত । রাতের খাবার দেয়া হয়েছে টেবিলে । জয়নাল ও আখিঁ খুব সুন্দর পরিপাটি করে সাজিয়ে রেখেছে বিভিন্ন ধরনের খাবার।

জয়নাল উপরে উঠে গিয়ে জিলান ও মারিয়া কে ডেকে আনল রাতের খাবার খাওয়ার জন্য । জিলানের হাতে জীবনশক্তি শরবতের মগ । চেয়ারে বসে জিলান ও মারিয়া আখিঁ ও জয়নালকেও তাদের সাথে খেতে বসতে বলল । আখিঁ ও জয়নাল প্রথমে সংকোচ করছিল, পরে তারাও খেতে বসল এক সাথে । খাবার এর শেষে সবাইকে জীবনশক্তি শরবত পান করতে দিলেন জিলান । জিলান খাওয়া দাওয়া সেরে গবেষণা কক্ষে চলে গেল । সব কিছু ঠিকঠাক করে আবার ফিরে এলেন তিনি প্রায় দুঘন্টা পরে । রাত তখন বারটা বাজতে দশ মিনিট বাকি । আখিঁ ও জয়নাল ঘুমিয়ে প্রায় অচেতন । তাদের জীবনশক্তি শরবতের সাথে উচ্চ শক্তিসম্পন্ন ঘুমের ঔষধ দিয়েছিলেন জিলান । ঘুমে এখন অচেতন তারা দুজনেই । স্ত্রী মারিয়াকে সাথে নিয়ে জয়নাল ও আখিঁকে গবেষণা কক্ষে নিয়ে গেল ডঃ জিলান । মারিয়ার হাত কিছুটা কাঁপছে । সে এক ধরনের ভয় অনুভব করছে । তার শরীর শিহিরত হচ্ছে বার বার ।

 

ডঃ জিলান জয়নাল ও আখিঁকে দুটি আলাদা বেডে শুইয়ে দিল । লোভাতুর দৃস্টিতে তাকিয়ে জিলান মনে মনে ভাবছে আর কিছুক্ষণ পর এই দেহটা হবে তার । তার নতুন জীবন লাভ হবে । ডঃ জিলান প্রথমে তার স্ত্রীকে সব কিছু বুঝিয়ে দিলেন কিভাবে এ যন্ত্রটি ব্যবহার করে মস্তিষ্কের স্মৃতি পরিবর্তন করা যায় । তারপর তিনি তার স্ত্রীকে শুইয়ে দিলেন আখিঁর বেডে । আখিঁর মাথায় একটি ইলেকট্রনিক্স সেন্সর কপোট্রনিক হেলমেট ও মারিয়ার মাথায় আরেকটি পরানো হল । মারিয়ার গায়ের চামড়া কুচঁকে গেছে শরীর অসাড় হয়ে পড়েছে বয়সের ভাড়ে । কিন্তু সে ভাবতেও পারছেনা আর কিছুকক্ষণ পর সে নতুন একটি সতেজ দেহ ফিরে পাবে ।

 

০৫

সম্পূর্ণ ঘটনাটি ঘটতে দুদিন সময় লাগল । মস্তিষ্কের সকল স্মৃতি পাল্টানো সম্ভব হল । জিলান ও মারিয়া অবাক দৃস্টিতে নিজেদের আয়নাতে দেখছে । জয়নাল ও আখিঁর শরীর এখন থেকে তাদের আর জয়নাল ও আখিঁ পেয়েছে তাদের জীর্ন শীর্ন দুর্বল শরীর । জিলান এক মূহুর্ত দেরী না করে জয়নাল ও আখিঁ যারা তাদের শীর্নকায় শরীর এ অবস্থান করছে তাদের টেট্রাকোমিন-১০ ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলল । কিন্তু সবাই জানবে ডঃ জিলান ও মারিয়া আত্মহত্যা করেছেন এবং বাস্তবে হলোও তাই; পুলিশ এসে তদন্ত করল এবং সংবাদে প্রকাশ হল ডঃ জিলান ও মারিয়া বয়সের ভারে আত্মহত্যা করেছেন ।

 

জয়নাল ও আখিঁর দেহতে বসবাসকারী জিলান ও মারিয়া কি করবে বুঝতে পারছে না । সম্ভবত যন্ত্রটিতে কোন একটা সমস্যা ছিল । জিলান ও মারিয়া আস্তে আস্তে নিজেদের জয়নাল ও আখিঁ মনে করতে শুরু করছে । তবে কি তাদের স্বপ্ন সফল হয়নি । জয়নাল ও আখিঁর মাথায় কি তাদের স্মৃতি ট্রান্সফার হয়নি, নাকি সাময়িক ভাবে হয়েছে? । আসলেই তাই, সারা জীবনের জন্য নয় সাময়িকভাবে স্মৃতি ট্রান্সফার হয়েছে । জিলান ও মারিয়া নিজেদেরকে টেট্রাকোমিন-১০ ইনজেকশন  দিয়ে মেরেছে অন্য জনের মস্তিষ্কে অবস্থান করে । সে মস্তিষ্কে তারা বেশিক্ষণ থাকতে পারবে বলে মনে হয় না ।

 

সকাল বেলাতে ঘুম ভাঙল আখিঁ ও জয়নালের রাতের বেলা তারা অদ্ভুদ সব স্বপ্ন দেখেছে । অথচ দুজনের স্বপ্ন একই ধরনের । আখিঁ ও জয়নাল কিছুক্ষণ পর জানতে পারল তাদের মনিব ডঃ জিলান ও মারিয়া আর ইহ জগতে নেই তবে মৃত্যুর পূর্বে সকল সম্পদ তাদের নামে দিয়ে গেছে । ঘরের কোনে বসে থাকা বেড়ালটি দৌড়ে এসে জয়নাল ও আখিঁর পায়ের কাছে ঘুরাঘুরি করতে লাগল এবং মিউ মিউ সুরে ডাকতে লাগল । জয়নাল ও আখিঁ তার অর্থ কিছুই বুঝতে পারল না , একজন অন্যজনের দিকে তাকিয়ে থাকে; তাদের চোখে মুখে এক ধরনের বিস্বয় এর ছাপ ।