Some Stories Cannot be Written – 1 (Ramit Azad)

কিছু গল্প লেখা যায় না – ১
——————————– রমিত আজাদ

ইউক্রেণের ইন্না (পর্ব – ম) (শেষ পর্ব)

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

মিষ্টি মিষ্টি হেসে ভিতালিকের হাত ধরে নাচঘরে প্রবেশ করেছিলো ইন্না। তাই দেখে রাগে অথবা ঈর্ষায় আমার গা কাঁপছিলো! আবার আমার মনে হলো, আমার কি? কোন ঘোড়ার ডিম? আমার সাথে কি ইন্নার কোন প্রেম হয়েছে? আমি কি ওর কোন অনুভূতিতে আদৌ সাড়া বা সম্মতি দিয়েছি? তাহলে, ইন্না কার হাত ধরে নাচঘরে ঢুকলো, কার সাথে কি করলো, এই নিয়ে আমার মাথাব্যাথার তো কিছু নাই!

এরপর আমার মনে প্রশ্ন জাগলো, আচ্ছা আমি যে এখানে দাঁড়িয়ে আছি, ইন্না কি তা লক্ষ্য করেছে? আমার খুব কাছ দিয়েই তো গেলো! আবার মনে হলো যে, নাও দেখতে পারে। সব সময় কি আর সবকিছু খেয়াল করা যায়? তাও আবার এই গিজগিজ করা ভীড়ের মধ্যে। একটু পরে মাইকে ঘোষণা করা হলো, “কিছুক্ষণের মধ্যেই নিউ ইয়ার শুরু হবে, আপনারা তৈরী হন।” পিন পতন নীরবতা নেমে এলো নাচঘরে। তারপর ঘড়ির সেকেন্ডের কা টার সাথে সাথে সবাই গুনতে শুরু করলো, দশ, নয়, আট, সাত, ছয়, পাঁচ, চার, তিন, দুই, এক, শূন্য ও ও ও ও!!!!!!!!!!! হুররে নিউ ইয়ার!!!!!!!!!!!!!!! জোড়ে গান বেজে উঠলো, ‘হ্যাপী নিউ ইয়ার! হ্যাপী নিউ ইয়ার!! হ্যাপী নিউ ইয়ার!!!’ বাইরে শহরের এখানে সেখানে পটকা ও আতশ-বাজী ফুটতে থাকলো বিকট আওয়াজ করে করে!!! আধো অন্ধকার নাচঘরে উপস্থিত সবাই আনন্দে উত্তাল হয়ে দ্রুত তালে নাচতে থাকলো। কেবল আমিই বোধহয় চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম! নাচতে নাচতে কিছুক্ষণ পর সবাই যখন ক্লান্ত হয়ে পড়লো তখন হঠাৎ নাচঘরে উজ্জ্বল বাতি জ্বলে উঠলো। মাইকে ঘোষণা দেয়া হলো, “এখন নতুন বছরকে বরণকারী একটা যুগল নাচের প্রতিযোগিতা হবে। সবার অংশ নেয়ার দরকার নাই, কয়েকটি বাছাই করা যুগল হলেই হবে। হলের মাঝখানে একটা জায়গা ফাঁকা করা হয়েছে।” একে অপরের দিকে তাকিয়ে কয়েকটি যুগল এগিয়ে গেল সেই ফাঁকা জায়গায়। ঐ যুগলগুলোকে আমরা চিনি, তাদের কয়েক জোড়া স্বামী-স্ত্রী, কয়েক জোড়া পুরাতন প্রেমিক-প্রেমিকা। সহসাই ইন্নার হাত ধরে টানতে টানতে ভিতালিক তাকে নিয়ে গেলো ওখানে! আমি সহ কয়েকজন অবাক হলো! আরে ওরা তো পরিচিত কোন যুগল না! তাছাড়া কোনদিন তো তাদেরকে একসাথে দেখাও যায় নি! তাহলে কি আজই ওদের মধ্যে কোন আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছে?

কিন্তু আমার কেন যেন ইন্নার ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন-টা ভালো লাগলো না। একবার ওর মুখে কৃত্রিম মৃদু হাসি দেখি, তো আরেকবার গম্ভীর! ডাল মে কি কুছ কালা হ্যায়?! যাহোক, নাচ শুরু হলে সবকটা যুগল নাচতে শুরু করলো, আমরা দেখলাম। আমি শুধু মেজাজ গরম করে তাকিয়ে তাকিয়ে ইন্না আর ভিতালিকের যুগল নাচ দেখছিলাম! নাচ শেষ হওয়ার পর সবাই জোরসে তালি দিলো! ইন্না হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে রইলো ভিতালিকের পাশে। মাইকে আবার ঘোষণা হলো, “বরণ করা হয়ে গেলো নিউ ইয়ারকে! চলুন আনন্দ চালিয়ে যাই।” নাচঘরের উজ্জ্বল আলোগুলো আবারও নিবে গিয়ে ধুম-ধারাক্কা মিউজিক বেজে উঠলো। সবাই আবারো উত্তাল নাচ শুরু করলো। আমি আর ওখানে থাকার কোন প্রয়োজন মনে করলাম না। ভাবলাম, যাই, আমি আমার রুমে চলে যাই।

ওখান থেকে বেরিয়ে সোজা আমার রুমের দিকে হাটা দিলাম। সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে হনহন করে হেটে চললাম, আমার রুমের দিকে। করিডোরে তখন কেউই ছিলো না। সবাই বোধহয় ছিলো ঐ নাচঘরে, নয়তো নিজ রুমে। অনেকে নিজের রুমে বসেই একান্ত পরিবেশে নিউ ইয়ার পালন করছিলো! তা সেই রাতে ডরমিটরির করিডোরেও আলো ছিলো কম। আমি আধো অন্ধকারে আমার রুমের তালা খুলে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতে যাবো, হঠাৎ পিছন থেকে একটি নরম হাত আমার বাঁ হাতটি টেনে ধরলো! আমি তো হতবাক! এই অসময়ে, এই মাঝরাতে, এই আধো আঁধারিতে কে আমার হাত চেপে ধরলো? আমার শরীর তখন অর্ধেক আমার রুমের ভিতরে, আর অর্ধেক রুমের বাইরে। “না, তুমি চলে এলে কেন? আমার উপর রাগ করেছ? প্লিজ রাগ করোনা!” এই কয়েকটি আকুতিপূর্ণ কথা শুনে আমি হতবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি, এ যে ইন্না!

আমি অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকালাম। ইন্না আমাকে ঠেলে রুমের ভিতরে নিয়ে এলো। আবারো বললো, “বিশ্বাস করো আমার কোন দোষ নাই। ভিতালিক অনেকটা জোর করেই আমাকে ওখানে নিয়ে গিয়েছিলো। জোর করেই আমার হাত ধরে রেখেছিলো। নাচ, সেটাও আমি ওর সাথে নেচেছি ভদ্রতার খাতিরে। আমার ওর সাথে কিচ্ছু নাই! অন্ততপক্ষে আমার দিক থেকে নাই! তুমি বিশ্বাস করো!”

এই পুরো দৃশ্যপট-টা আমার জন্যও ছিলো কোয়াইট আনএক্সপেকটেড! আমার মন ভাবছিলো, কি হচ্ছে এসব? আমি তো ইন্নাকে কখনোই কিছু বলি নাই। কোন আবেগ-অনুভূতিও প্রকাশ করি নাই। তাহলে আজ ইন্নাকে ভিতালিকের সাথে দেখে আমার এত মেজাজ খারাপ হচ্ছিলো কেন? আমি নাচঘর থেকে চলে এলাম, কারণ আমার আর ওখানে থাকতে ইচ্ছা হচ্ছিলো না। কিন্তু ইন্না কি করে খেয়াল করলো যে, আমি ঐ ঘরে আছি? তাহলে কি ও শুরু থেকেই আমাকে দেখেছিলো, এবং আমার দিকে নজর রাখছিলো? আমাকে ওখান থেকে চলে আসতে দেখে ও ভাবলো যে, আমি ওর প্রতি ক্ষুন্ন হয়েছি? তাই আমার ভুল ভাঙানোর জন্য পিছনে পিছনে ছুটে এসেছে?

আমরা রুমে ঢোকার পর, ইন্না নিজেই দরজাটা লক করে দিলো। আমরা দু’জনা সোফায় গিয়ে পাশাপাশি বসলাম। কিছু সময় নীরবে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। বিশাল কাচের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে একদিকে যেমন দেখা যায় তারাহীন নিকষ কালো আকাশ, আরেক দিকে থেকে থেকে জ্বলে উঠছিলো নতুন বছরের রাত্রী-প্রদীপ ফায়ার-ওয়ার্কের জ্বলন্ত-বিস্ফোরিত আতশ-বাজী! ওরাই এই রাতের উৎসব মুখর তারকারাজি!

আমার রুমেও ঐ রাতে একটি তারা এলো! এ’ কদিন যাবৎ এই তারাটি আমার ভিতর কিছু অন্বেষণ করছিলো। হয়তো অন্বেষণ করতে করতে আমার হৃদয়ে ব্লাকহোল ছাড়া আর কিছুই পায়নি। তারপরেও সে হাল ছাড়েনি। এমন একটা উৎসব মুখর রাতে, তার উপস্থিতির আড়ালে হয়তো নীরব ভাষার প্রশ্ন, “এমন রাতেও কি আমাকে ফিরিয়ে দেবে?” আমার তখন মনে পড়লো, কালচারাল হিরো কাজী নজরুল ইসলামের সেই কালজয়ী গানটি,

‘প্রিয় ​​​​ এমন রাত যেন যায় না বৃথাই॥
​​পরি ​​​​ চাঁপা রঙের শাড়ি,​​ খয়েরি টিপ,
জাগি ​​​​ বাতায়নে,​​ জ্বালি আঁখি-প্রদীপ
মালা ​​​​ চন্দন দিয়ে মোর থালা সাজাই॥
​​তুমি ​​​​ আসিবে বলে সুদূর অতিথি
জাগি ​​​​ চাঁদের তৃষ্ণা লয়ে কৃষ্ণা-তিথি
​​কভু ​​​​ ঘরে আসি কভু বাহিরে চাই॥​​
আজি ​​ আকাশে বাতাসে কানাকানি,
জাগে ​​ বনে বনে নব ফুলের বাণী,
আজি ​​ আমার কথা যেন বলিতে পাই॥’

সেদিন সুন্দর যে পোশাকটি পড়ে ইন্না এসেছিলো, তার রঙ ছিলো অনেকটা জারুল ফুলের রঙের মতন, হালকা বেগুনী রঙ। ঐ পোশাকে ইন্নাকে একটা সদ্য ফোটা জারুল ফুলের মতন লাগছিলো!

পাঠকগণ হয়তো জানতে চাইছেন যে, ইন্না আর নয়নের মধ্যে শেষ পর্যন্ত কি হয়েছিলো? তাদের সম্পর্ক কি কোনরূপ পরিণতি পেয়েছিলো? আর তা না হলে সম্পর্ক কতদূর গড়িয়েছিলো?

এসব প্রশ্নের উত্তরে বলতে হবে যে, না, ইন্না আর নয়নের মধ্যে সম্পর্ক কোনরূপ পরিণতি পায়নি। ঐ ঘটনার অল্প কিছুদিন পরেই তাদের মধ্যে স্থায়ী বিচ্ছেদ হয়। তারপর তাদের আর একবার মাত্র দেখা হয়েছিলো, আর সেটাও ছিলো খুবই ফর্মাল, হাই-হ্যালো টাইপ। কেন তাদের মধ্যে সম্পর্কে গভীরতা আসেনি, কেন তাদের সম্পর্ক কোনরূপ পরিণতি পায়নি, তার কারণ অবশ্যই আছে। তবে সেটা প্রকাশ্যে লেখা বা উল্লেখ করার মতন নয়। ঐ যে শুরুতেই বলা হয়েছিলো যে, ‘কিছু গল্প লেখা যায় না’।

জারুল ঝরানো রাত
————————– রমিত আজাদ

আমি কি তোমার নগ্ন কায়ায় বুলিয়েছি কভু হাত?
স্বপ্নসুধায় মধুমাস তিথি, জারুল ঝরানো রাত!
বেগুনী শোভায় কর পরশে শিহরীত তমা নিশি,
উঠিয়াছে ঝড়, কেঁপে থরথর, উতলা নিঝুম শশী।

অপ্সরা তার নিঃশ্বাস রাখি ছেয়ে ছিলো ছায়াপথ,
স্বপ্নবিলাসী খোলসে ঢাকিয়া উড়িছে আলোর রথ।
জারুল ফুলের গন্ধসুবাসী রূপসীর দু’টি বৃন্ত,
কোমলতা ছুঁয়ে মায়াবী চূড়ার, অমানিশা অবিশ্রান্ত।

কুমারী জারুল চিত্রিত পটে বিস্মৃত নদীতট,
নিপতিত ফুল, বেগুনী জারুল, সাজিয়েছে মেঠোপথ।
দুঃখবিলাসী স্মৃতির আখরে, অবিনাশী মধুমাস,

তরু উদ্যানে, পুষ্পের সারি, নারীর ইশারা বাস।

(Jarul Dripping Night – Ramit Azad)

(সমাপ্ত)


গল্পের রচনাতারিখ: ০১লা অক্টোবর, (শনিবার), ২০২২ সাল
রচনাসময়: রাত ০২টা ৫০মিনিট

Some Stories Cannot be Written – 1
————————————– Ramit Azad

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.