Categories
অনলাইন প্রকাশনা ইতিহাস গবেষণামূলক প্রকাশনা বিজ্ঞান

পৃথিবীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস – ১

পৃথিবীর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস – ১
—————— ডঃ রমিত আজাদ

ভূমিকাংশ
লক্ষ লক্ষ বৎসর আগে মানুষ এই পৃথিবীতে এসেছে এবং আদিম মানুষ সম্ভবত পশু-পাখীর মতই প্রকৃতির দেয়া খাদ্য ও আশ্রয় অবলম্বন করে যাযাবরের জীবন যাপন করে বহুকাল ধরে জীবন সংগ্রাম করেছে। তারপর একসময় সে আগুনের ব্যবহার শিখে সৃষ্টিশীল হয়েছে, কৃষি আবিস্কার করে স্থায়ী বাসভুমি গড়ে তুলেছে। কালের স্রোতে উন্নততর জীবন ধারনের ঊপায়ই কেবল আবিষ্কার করে নাই, পাশাপাশি তার বুদ্ধি শ্রম ও বিবেক খাটিয়ে চারপাশের জগৎটিকে জানতে ও বুঝতে চেষ্টা করেছে। তার নিজের প্রয়োজনে অনেক কিছুকে বদলে দেবারও চেষ্টা করেছে। এই বিশাল বিশ্বব্রহ্মান্ডের অতি ক্ষুদ্র একটি গ্রহ পৃথিবীর পরে ঠিক কবে কোন ক্ষণে কিভাবে মানুষের আগমণ ঘটেছিল তা এখনো চুলচেরাভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি সত্য কিন্তু সে চেষ্টায় ভাটাও পরেনি কখনো। অতীতে মানুষ কেমন ছিল, তাদের জীবন কেমন কাটত, বর্তমানে প্রাপ্ত নানাবিধ তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে তার যুক্তিপূর্ণ অনুসন্ধানই ইতিহাস।

ইতিহাসের নানা দিক আছে – ভৌগলিক ইতিহাস, জীব-বৈচিত্রের ইতিহাস, নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস, রাজনৈতিক ইতিহাস, দর্শনের ইতিহাস, ধর্মীয় ইতিহাস, সাহিত্যের ইতিহাস, সামাজিক ইতিহাস, বিজ্ঞানের ইতিহাস অর্থনৈতিক ইতিহাস, আবার পৃথিবী জুড়ে নানাবিধ সামাজিক পরিবর্তনের পিছনে রয়েছে নানাবিধ দর্শনের প্রভাবের ইতিহাস, ইত্যাদি। এরা সকলে ইতিহাসের এক একটি অংশ হলেও সামগ্রিকভাবেও পৃথিবীর ইতিহাসকে দেখা প্রয়োজন। এই সিরিজে এই সব কিছুকে সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করব। পাঠকদের গঠনমূলক সমালোচনা আশা করছি।

শুরু করছি প্রাগৈতিহাসিক যুগ দিয়েঃ

প্রাগৈতিহাসিক যুগ
বিশ্বের ইতিহাস মুলতঃ হোমো স্যাপিয়েন্সের অতীত অভিজ্ঞতার স্মৃতি। ইতিহাস লিখতে গেলে লিখতে-পড়তে জানতে হবে। তাই লিখিত ইতিহাস সংরক্ষিত হয়েছে মানুষ লিখতে শেখার পর থেকে। কিন্তু তার আগেও তো মানবজাতি এই পৃথিবীতে বিচরণ করেছে কয়েক লক্ষ বছর, সেই সময়ের অভিজ্ঞতা জানব কেমন করে? এই যুগটিকে বলা হয় প্রাগৈতিহাসিক অর্থাৎ ইতিহাসেরও আগের যুগ। নিঃসন্দেহে এই যুগের কোন লিখিত রেকর্ড নেই। সেই সময়ের প্রাপ্ত বিভিন্ন পেন্টিং, অঙ্কন, ভাস্কর্য, এবং অন্যান্য হস্তনির্মিত নিদর্শন পাঠ করে অনেক তথ্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। বিংশ শতাব্দি থেকে প্রাগৈতিহাসিক যুগের গবেষণা অপরিহার্য বিবেচনা করা হয়েছে, কেননা একদিকে তা যেমন সেই সময়ের আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে জানার জন্য অত্যাবশ্যকীয় অন্যদিকে তা না করলে সাব সাহারান আফ্রিকা, পূর্ব এবং কলম্বিয়ান আমেরিকার মত গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতাগুলোও বাদ পরে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। কোন এক কালে পশ্চিমা ঐতিহাসিকরা কেবলমাত্র পশ্চিমী বিশ্বের উপরই মনোযোগ নিবদ্ধ করেছিলেন এবং যা কিছু শুরু করতেন শুরু করতেন প্রাচীন গ্রীস থেকে। কিন্তু সময়ের বিচারে গ্রীক সভ্যতা সিন্ধু ও ব্যাবিলনীয় সভ্যতা থেকে অনেক নবীন। এমনকি অস্ট্রেলিয়ান অ্যাবোরিজিনরা এবং নিউজিল্যান্ডের মাওরিরা তাদের ইতিহাস মৌখিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করে রেখেছিলো ইউরোপীয়দের সাথে তাদের যোগাযোগ হওয়ার অনেক আগে থেকেই।

বৃটিশ ইতিহাসবিদ E. H. Carr বলেছেন, ‘প্রাগৈতিহাসিক এবং ঐতিহাসিক এর মধ্যে প্রভেদ রেখা আমরা অতিক্রম করেছি যখন মানুষ শুধুমাত্র বর্তমানে বাস করা বন্ধ করেছে, এবং সচেতনভাবে তাদের অতীত এবং তাদের ভবিষ্যতের উভয়েই আগ্রহী হয়ে উঠেছে। ইতিহাস আরম্ভ হয় ঐতিহ্যের হস্তান্তরের মধ্যে দিয়ে; আর ঐতিহ্য মানে অতীত অভ্যাস ও অনুশীলনগুলোকে পরিবহণ করে ভবিষ্যতের মধ্যে ঠেলে দেয়া। অতীতের রেকর্ড ভবিষ্যত প্রজন্মের সুবিধার জন্যই সংরক্ষণ করে রাখা প্রয়োজন।’

(চলবে)

Categories
অনলাইন প্রকাশনা ইতিহাস শিশু

শিশুদের জিয়া

শিশুদের জিয়া
————– ডঃ রমিত আজাদ

দিনটি ছিল মহান একুশে ফেব্রুয়ারী। শহীদ মিনারের ঠিক উল্টা দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা বাগানে, একটি আড়াই বছরের শিশুকে মালি বা পিওন ধমকা ধমকি করছে, ফুল ধরেছে বলে। বাবা-মা মালিকে বোঝাতে পারছে না। তারপর আমি এগিয়ে গেলাম, “কি হয়েছে, আপনি বাচ্চাটাকে ধমকাচ্ছেন কেন?” বলল, “বাচ্চাটা ফুল ছিড়ছে তাই”। আমি বললাম, “ফুল তো ছিড়ে নাই, ধরেছে মাত্র”। ছোট শিশুটির বাবা বলল, “ওর তো মাত্র আড়াই বছর বয়স, একটু ফুল ধরে দেখতে চেয়েছে”। সেই মালি/পিওন বলল, “না, এখানে ফুলে হাত দেয়া নিষেধ, ফুল থাকবে সবাই দেখবে”। আমি বললাম, “ছোট বাচ্চা, এগুলো তো আর বুড়োদের জন্য না। বাচ্চারা দেখবে, হাসবে, খেলবে। ওদের জন্যই তো সবকিছু। পিওনটা গজগজ করতে করতে চলে গেল। এই হলো আমাদের দেশের সামগ্রিক অবস্থা, শিশুদের প্রতি আবেগ, নজর, ভালোবাসার অনেক অভাব।

কিন্তু এই আমাদের দেশেই এমন একজন রাষ্ট্রপতি ছিলেন, যিনি বুঝতে পেরেছিলেন, শিশুদের ভালো না বসলে দেশ বা জাতিকে ভালোবাসা হয়না। যেকোন জাতি গঠনের শুরু করতে হবে শিশুদেরকে দিয়ে। তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতি হলেন জিয়াউর রহমান। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, জাতির ভবিষ্যৎ হলো শিশুরা। যে কোন জাতি গঠন শিশুদেরকে দিয়েই শুরু করতে হবে। সেই উদ্দেশ্যেই তিনি বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেন।
১। শিশুদের সাংস্কৃতিক ও নানা জাতীয় মেধা চর্চার জন্য শিশু এ্যকাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন,
২। দেশের প্রতিটি বৃহত্তর জেলায় এ্যকাডেমির শাখা স্থাপন করেন,
৩। শিশুদের সাংস্কৃতিক প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে নতুন কুঁড়ি নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন, যা বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচার হতো। পরবর্তিকালে অনেক সুখ্যাত শিল্পি ঐ নতুন কুঁড়িরই প্রডাক্ট,
৪। সারাদেশে মেধাবী শিশু ছাত্রদের অনুপ্রেরণা দেয়ার লক্ষ্যে তাদের জন্য একটি সম্মেলনের আয়োজন করেন এবং সশরীরে সেখানে উপস্থিত হয়ে তাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করেন। সেই সম্মেলনে অংশগ্রহনকারী মেধাবী শিশুদের জন্য দিনটি ছিল স্মরণীয়,
৫। মেধাবী শিশুদের (ধনী হোক দরিদ্র হোক) লালণের নিমিত্তে নির্মিত সামরিক মেরিট স্কুল ক্যাডেট কলেজের সংখ্যা চারটি থেকে আটটিতে উন্নিত করেন,
৬। সুস্থ অর্থবহ ও উন্নত চলচিত্রের নির্মানের লক্ষ্যে তিনি রাষ্ট্রীয় অনুদানের ব্যবস্থা করেন। এই সময়ে বেশ কিছু ভালো ভালো শিশু চলচিত্র নির্মিত হয়, যেমন- ছুটির ঘন্টা, ডুমুরের ফুল, ডানপিটে ছেলেটি, অশিক্ষিত, এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী, ইত্যাদি,
সেই সময় বিটিভিতেও খুব সুন্দর সুন্দর শিশুতোষ অনুষ্ঠান হতো। এরমধ্যে একটি ধারাবাহিক নাটক ছিল, ‘রোজ রোজ’।
৭। জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালকে বাংলাদেশ শিশু বর্ষ ঘোষণা করেন। পুরো বছর জুড়ে সারাদেশে নানা রকম কর্মকান্ড হয়।
৮। শিশু পার্ক – সেনাবাহিনীর চাকুরী জীবনে তিনি জার্মানীতে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। সেই সময় তিনি নিশ্চয়ই সেখানকার অত্যাধুনিক শিশু পার্কগুলো দেখেছিলেন। তাছাড়া রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়েও তিনি একাধিক দেশ সফর করেছিলেন এবং সেসব দেশের শিশুপ্রেম ভালোভাবে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি তাই ঢাকাতে একটি অত্যাধুনিক শিশু পার্ক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিলেন। যেই চাওয়া সেই কাজ, খুব দ্রুতই কাজ শেষ করে ১৯৭৯ সালে উদ্ধোধন করলেন ‘ঢাকা শিশু পার্ক’। হুমড়ি খেয়ে পড়ল শুধু শিশুরা নয় পুরো ঢাকা শহর। শিশু, কিশোর, যুবা এমনকি প্রৌঢ়-বৃদ্ধরাও বাদ যায়নি। আমাদের কল্পনাতেই ছিলনা এমন কিছু একেবারে বাস্তব রূপে ধরা দিল। এই পার্ক দেখে প্রতিটি শিশুরই মনে হয়েছিল, এ যেন এক রূপকথার জগৎ।
এই পার্ক নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনাও আছে।
এক পাগলাটে যুবক, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী একটি আভ্যন্তরীণ বিমান হাইজ্যাক করে খেলনা পিস্তল দিয়ে। তারপর পাইলটকে বাধ্য করে বিমানটি কলকাতায় নিয়ে যেতে। কি আর করা? পাইলট তো আর বুঝতে পারেনি যে, সেটা খেলনা পিস্তল। যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে ছিনতাইকারীর কথাই শোনে। ছিনতাইকারীর কাছে তার দাবী শুনতে চাইলে সে বলে, “ঢাকার শিশু পার্কটি চরম বিলাসিতা, বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে এমন পার্কের প্রয়োজন নেই। আমি পার্কটি বন্ধ করার দাবী জানাচ্ছি”। এত সুন্দর একটা পার্ক, যা দেখে শিশুরা আনন্দে ভাসছে সেটা সে বন্ধ করার দাবী জানালো! এই একটা সমস্যা। আমরা কোন ভালো কিছুকে খুব সহজে গ্রহন করতে পারিনা।
৯। শিশুদের অধ্যায়নের সুবিধার্থে শাহবাগের পাবলিক লাইব্রেরীর পাশেই তিনি একটি শিশু গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন।

জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় এলেন তখন আমি পাঁচ পেরিয়ে ছয় বছরে পা রেখেছি। পত্রিকায় উনার বড় মাপের একটা ছবি দেখলাম, এটা মনে আছে। তার কিছুকাল পরে শুনলাম, তিনি ঢাকার মগবাজার, মধুবাগে আসবেন। ব্যাস প্রবল উৎসাহ পড়ে গেল। নির্দিষ্ট দিনে পথের পাশে দাঁড়িয়ে গেলাম। কিছু সময় অপেক্ষা করার পর দেখলাম, খোলা জীপে সামরিক পোষাকে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি, ধীরে ধীরে আমাকে অতিক্রম গেল জিপটি । এই প্রথম চোখের সামনে দেখলাম, সুদর্শন, সুপুরুষ, জনপ্রিয় এই রাষ্ট্রপতিকে। সেই ভালোলাগার অনুভূতি আমি কোনদিন ভুলব না। সম্ভবতঃ আরো একবছর পর তিনি আরেকবার এলেন
ঢাকার মগবাজার, মধুবাগে। আমি তখন মগবাজার টি এন্ড টি স্কুলের ছাত্র। স্কুলটির অবস্থা শোচনীয় ছিল। হেডমাস্টার দেখলেন এই তো সুযোগ, তিনি এক ফন্দি আটলেন। রাষ্ট্রপতি যাওয়ার পথে স্কুলের ছাত্র শিক্ষক মিলে তাঁর পথ আটকাবে যাতে কিছু অনুদান পাওয়া যায়। করলেনও তাই। রাষ্ট্রপতির গাড়ি বহরের সামনে ছিল মটর সাইকেল আরোহী গার্ডরা। তারা মৃদু হেসে থেমে গেলেন। একটু পর একটা জীপ এসে থামলো। তার পিছনে বাকী গাড়ীগুলোও থামলো। এর মধ্যে একটি ছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গাড়ী। এসময় জিয়াউর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন যে, শিশুদের অনেকেই উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছে উনার সাথে হ্যান্ডশেক করার জন্য। তিনি তার ডান হাতটি জানালার বাইরে বের করে দিলেন। বেশ কয়েকজন ছুটে গেল উনার সাথে হাত মিলানোর জন্য। আমিও ছুটে গিয়ে উনার সাথে হাত মিলিয়েছিলাম। সেই অনুভূতি আমি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মনে রাখবো।

খোলা জীপ থেকে একজন সুঠামদেহী সেনা কর্মকর্তা নেমে এসে কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললেন, “এভাবে রাষ্ট্রপতির গতি রোধ করা যায়না, আপনারা সরে দাঁড়ান”। পায়ে পায়ে সরে গেল সবাই। কিন্তু জিয়াউর রহমান ঘটনাটি মনে রেখেছিলেন, এবং পরে তিনি আমদের স্কুলের জন্য অনুদান পাঠিয়েছিলেন।

তৃতীয়বার উনাকে দেখেছিলাম, বাংলাদেশ শিশু বর্ষ ১৯৭৯ সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে, ঢাকা স্টেডিয়ামে। অনুষ্ঠানটি বর্নাঢ্য হয়েছিল, এবং স্বয়ং রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি তাকে আরো প্রানবন্ত করেছিল।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শিশুপ্রেমের আরেকটি ঘটনা আমি শুনেছিলাম আরেকজনার কাছ থেকে। তিনি বর্তমানে একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য্য। সে সময় জিয়াউর রহমান রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না। ছিলেন সেনা উপ-প্রধান ও বাংলাদেশ ক্যাডেট কলেজ সমূহের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান। ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে কি একটা মনমালিন্য হলো সিনিয়র জুনিয়রদের মধ্যে। মোটামুটি সিরিয়াস পর্যায়েই দাঁড়ালো। প্রিন্সিপাল বললেন আগামীকাল এর বিহিত করবেন। সবাই বুঝতে পারছিল, সিভিয়ার এ্যকশন নেবেন প্রিন্সিপাল, দু’য়েকজনকে কলেজ থেকে উইথড্রও করতে পারেন। প্রমাদ গুনছিল অনেকেই।

পরদিন সকালে হাউজের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল ক্যাডেটরা, এরকম সময় তারা বিস্মিত হয়ে দেখলো, ‘চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, সারা বাংলাদেশের উপ-সেনাপ্রধান ও ক্যাডেট কলেজ সমূহের দন্ডমুন্ডের কর্তা জিয়াউর রহমান। সংবাদ পেয়ে তিনি নিজেই চলে এসেছেন। তিনি কিছুক্ষণ প্রিন্সিপালের সাথে কথা বললেন, তারপর জুনির ক্লাসের (ক্লাস এইট অথবা নাইন) এই গোলযোগের রিং লিডারদের ডেকে সামনে দাঁড় করালেন। উনার হাতে ছিল একটা কেইন, আপন পিতার মত শাসনের সুরে তাদের তিরষ্কার করলেন এবং তাদের প্রত্যেকের পিঠে মৃদু চালালেন তার কেইন। আর সিনিয়রদেরও বাদ দিলেন না। তাদের আলাদা করে ডেকে নিয়ে গেলেন প্রিন্সিপালের রূমে, এবং সেখানে তাদেরকেও তিরষ্কার ও সাবধান করে দিলেন।

নিজের সন্তানদেরও কোন প্রশ্রয় দেননি তিনি। পত্রিকায় পড়েছিলাম, একবার তারেক রহমান বায়না ধরেছিল, বাবার সাথে বিদেশ সফরে যাবে। পিতা জিয়া সরাসরি নিষেধ করে দিয়েছিলেন। এরকম নিয়ম নেই, সুতরাং এটা কখনোই সম্ভব নয়। তারেক তখন বলল যে, নেপালের রাজা যখন বাংলাদেশ সফরে এলেন, তখন তাঁর সাথে তো তার ছেলে ছিল। ভীষণ রাগান্বিত হয়ে জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, “তোমরা কোন রাজা-বাদশার ছেলে নও”।

‘এমন একটি পৃথিবী কল্পনা করুন যেখানে কোন শিশু নেই, সেই পৃথিবীতে কি অফিস-আদালত কাজ করবে? ট্রেন চলবে? বিমান উড়বে? পেটের দায়ে সবই হবে হয়তো। কিন্তু এই সব কিছুর কোন অর্থ থাকবে না। কারণ আমরা যা কিছু করি, সবই ভবিষ্যতের জন্য করি, আর ভবিষ্যত মানেই শিশুরা।’

আমি শিশু হিসাবে তাঁকে যেমন দেখেছি। তাতে মনে হয়েছে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, উপরের কথাগুলোর মর্মার্থ বুঝতে পেরেছিলেন। আর তাই শিশুদের জন্য তিনি যতদূর সম্ভব অবদান রাখার চেস্টা করেছেন।

শিশু জিয়ার নাম ছিল কমল। আজ সেই কমলের জন্মদিন। আসুন আমরা সবাই মিলে তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।

যেদিন তুমি এসেছিলে ভবে
কেঁদেছিলে তুমি আর হেসেছিল সবে
এমন জীবন ভবে করিবে গঠন
মরনে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন ।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গবেষণামূলক প্রকাশনা প্রকৌশল ও বিজ্ঞান বিজ্ঞান

The uncertainty Principle

The uncertainty Principle

–Dr. Ramit Azad
Atomic phenomenon ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যখন আমরা Classical Mechanics ও Electrodynamics ব্যবহার করি তা আমাদের এমন তাত্ত্বিক ফলাফল দেয় যা পরীক্ষালদ্ধ ফলাফলের সাথে বিরোধিতা করে। ফলে তত্ত্ব ও বাস্তবের মধ্যে পরস্পর বিরোধিতার সৃস্টি হয়। এই বিরোধিতা স্পষ্ট দেখা যায় যখন atom-এর model এ (যেখানে নিউক্লিয়াসের চতুর্দিকে electron-সমূহ classical orbit-এ ঘূর্ণায়মান) electrodynamics ব্যবহার করি। electromagnetic-এর আইন অনুযায়ী যে কোন ত্বরান্বিত charge অবিরাম electromagnetic wave emit করবে। এই জাতীয় emission যদি হতো তাহলে electron তার সমস্ত শক্তি হারিয়ে অনিবার্যভাবে nucleus-এর উপর পতিত হতো। এভাবে Classical Mechanics অনুযায়ী atom হতো unstable যা বাস্তবের সাথে কোন ক্রমেই মেলে না ।

তত্ত্ব ও পরীক্ষণের মধ্যে সৃষ্ট এই উল্লেখযোগ্য contradiction-টি এই নির্দেশ করে যে atomic phenomena-এ প্রয়োগযোগ্য একটি নতুন তত্ত্বের প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। Atomic phenomena হলো সেই phenomenon-সমূহ যা সংঘটিত হয় অতি ক্ষুদ্রকণিকাসমূহের মধ্যে । অতি ক্ষুদ্রকণিকাসমূহের তত্ত্বে থাকতে হবে physical concept- এর মৌলিক সংস্কার।

এই মৌলিক সংস্কারের investigation-এর সূচনা বিন্দু হিসাবে electron diffraction কে বিবেচনা করা সুবিধাজনক। এটি একটি পরীক্ষার দ্বারা পর্যবেক্ষণকৃত phenomenon । (যদিও electron diffraction আবিস্কৃত হয়েছে Quantum Mechanics-এর উদ্ভাবনার পরে তবে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় না গিয়ে, আমাদের আলোচনায় বিষয়টি বিবেচনার উদ্দেশ্য তত্ত্ব ও পরীক্ষার দ্বারা পর্যবেক্ষিত-এর মধ্যে স্পষ্ট সম্পর্ক প্রদর্শণ করা। এটা দেখা গিয়েছে একটি homogeneous electron beam যদি crystal-এর মধ্যে দিয়ে pass করে, তাহলে emergent beam প্রদর্শন করে এমন একটি pattern যেখানে alternate maxima ও minima intensity আছে যা কিনা সম্প–র্র্ণভাবে electromagnetic wave-এর diffraction pattern-এর অনুরূপ। এভাবে কিছু নির্দিষ্ট condition-এ material particle সমূহের আচরণ এমন feature দেখায় যা wave process-এ বিদ্যমান।
Electron diffraction phenomena চলতি classical idea-কে কতটুকু contradict করে, একটি কাল্পনিক পরীক্ষার সাহায্যে তা দেখানো যেতে পারে। ইলেকট্রনের জন্য ভেদনযোগ্য নয় এমন একটি পর্দা কল্পনা করি। পর্দাটিতে দুইটি slit কাটি। এবার মনে করি নীচের slit-টি ঢাকা, উপরের slit-টি দিয়ে electron diffraction হয়ে পিছনের পর্দায় একটি intensity distribution pattern দেখা যাবে। আবার, উপরের slit-টি ঢেকে নীচের slit-টির মধ্যে দিয়ে diffraction করি। এবারেও পিছনের পর্দায় একটি pattern দেখা যাবে। এবার দু’টি slit-ই খুলে দেই। classical idea অনুযায়ী আমরা এমন আশা করতে পারি যে এবারের প্রাপ্ত pattern-টি হবে, পূর্ববর্তী দু’টি pattern-এর superposition: প্রতিটি electron তার চলার পথে একটি slit-এর মধ্যে দিয়ে pass করে এবং অন্য slit- টির মধ্যে দিয়ে pass কারী electron-টিকে প্রভাবিত করে না। কিন্তু বাস্তবে electron diffraction-এর phenomenon আমাদের এই দেখায় যে interference জনিত যে diffraction pattern-টি আমরা পাই তা কোনক্রমেই প্রতিটি slit-এর মধ্যে দিয়ে পৃথক পৃথক ভাবে প্রাপ্ত diffraction pattern-এর superposition না। এটা স্পষ্ট যে প্রাপ্ত ফলাফল আমাদের এই বোঝায় যে electron একটি নির্দিস্ট পথে ভ্রমণ করে এমন ধারণা সঠিক নয়। এইভাবে যে Mechanics atomnic phenomenon-গুলো নিয়ে কাজ করে (Quantum Mechanics অথবা wave Mechanics) তা এমন ভাবনা (idea)র উপর ভিত্তি করে হবে যা Classical mechanics-এর ধারণা থেকে মৌলিক ভাবেই ভিন্ন। Quantum Mechanics-এ path of particle-এর কোন ধারণাই (concept) নাই। এটাই uncertainty principle-এর ধারণাই (concept) গঠন করে। এই uncertainty principle হলো Quantum Mechanics-এর একটি মৌলিক নীতি যা আবিষ্কার করেছেন Warren Heisenberg, ১৯২৭ সালে।

এইভাবে Quantum Mechanics, Classical Mechanics-এর সাধারণ ভাবণাগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে, এভাবে uncertainty principle-কে বলা যায় negative in content. অবশ্যই এই principle-টি particle-সমূহের একটি নতুন Mechanics তৈরীর জন্য যথেষ্ট না । অবশ্যই এই জাতীয় তত্ত্ব কোন ধনাত্মক দৃঢ় উক্তির উপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত, যা নিয়ে আমরা নীচে আলোচনা করব।

যাহোক, এই জাতীয় দৃঢ় উক্তি (assertion)-গুলোর সূত্রায়নের জন্য আমরা প্রথমে স্থির করব Quatum Mechanics-কে confront করে সই জাতীয় সমস্যাগুলোর statement । এটা করতে গিয়ে আমরা প্রথমে Quatum Mechanics ও Classical Mechanics-এর মধ্যেকার interrelation-এর special nature-গুলোকে পরীক্ষা করব। একটি অধিকতর সাধারণ তত্ত্ব যৌক্তিক ভাবে formulate করা যায়। একটি অল্পতর সাধারণ তত্ত্ব যা তৈরী করে একটি limiting case, কোন কিছ–র ঊপর নির্ভর করেনা ।এইভাবে fundamental principle-গুলোর উপর ভিত্তি করে Relativistic Mechanics গঠন করা যায়, এরজন্য Classical (Newtonian)
Mechanics-এর reference-এর কোন প্রয়োজন পড়ে না কিন্ত Quatum Mechanics-এর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন, Classical Mechanics-কে ব্যবহার না করে Quantum Mechanics-এর basic concept তৈরী করা অসম্ভব। Electron- এর কোন নির্দিষ্ট path নাই বাস্তবতাটি এই বলে যে তার কোন dynamical characteristics -ও নাই । এভাবে এটা স্পষ্ট যে quantum object দ্বারা সৃষ্ট কোন একটি system-এর জন্য logically independent mechanics তৈরী করা সম্ভব না।

একটি electron-এর motion-এর quantum description এমন physical object-এর উপস্থিতি দাবী করে যা যথেষ্ট পরিমাণে Classical Mechanics মেনে চলে। যদি electron এই রকম কোন classical object-এর সাথে interact করে, তাহলে ঐ classical object-টি altered হয়। এই পরিবর্তনের nature এবং magnitude নির্ভরশীল হবে electron-টির state-এর উপর এবং এইভাবে তাকে quantitatively characterize করা যাবে।

এই সম্পর্কে classical object-টিকে বলা হয় apparatus, এবং electron-এর সাথে তার interaction-কে বলা হচ্ছে measurement। তবে একথাও জোর দিয়ে বলা প্রয়োজন যে আলোচনার এই পর্যায়ে আমরা এই বিষয়টি আলোচনার অন্তর্ভূক্ত করছি না যে আমাদের measurement process-এ physicist observer অংশগ্রহণ করছে।

Quantum Mechanics-এ আমরা measurement বলতে এই বুঝি যে classical ও quantum object-এর মধ্যে interaction-এর যে কোন process, যা observer-এর উপরে নির্ভরশীল নয়। Quantum Mechanics-এ concept of measurement-এর গুরুত্বের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ (elucidate) করেছিলেন Niels Bohr.

Apparatus বলতে আমরাএমন physical object-কে বোঝাব যা classical mechanics অনুযায়ী যথেষ্ট accuracy দ্বারা ঠিক করা হয়। যেমন একটি body যার অনেক ভর আছে। আবার, এটা মনে করাও ঠিক হবেনা যে apparatus-টিকে macroscopic-ই হতে হবে। এই পরিস্থিতিতে কোন একটি apparatus-এর কোন অংশ microscopic-ও হতে পারে। যেহেতু with sufficient accuracy-র ধারণাটি actual proposed problem-টির উপর নির্ভরশীল এইভাবে wilson chamber-এ কোন electro-এর motion-কে observe করা হয়। Electron-টি যে cloudy track-টি রেখে যায় তার দ্বারা এবং তার পুরুত্ব খুব বড় এবং atomic dimension-এর সাথে তুলনীয়; যখন path-টি এত low accuracy দ্বারা নির্ণিত, তখন electron-টি সম্পূর্ণরূপে classical object

এইভাবে physical theory সমূহের মধ্যে Quantum mechanics একটি unusual স্থান দখল করে Quantum mechanics limiting case হিসাবে classical mechanics-কে ধারণ করে আবার একই সাথে তার নিজের formulation-এর জন্যই তার এই limiting case-টির প্রয়োজন।

এখন আমরা Quantum Mechanics-এর কিছু সমস্যা (অংক) formulate করতে পারি। একটি typical সমস্যা হলো কোন একটি previous measurement-এর জ্ঞাত ফলাফল থেকে subsequent measurement-কে predict করা উপরন্ত পরবর্তিতে আমরা দেখব যে, Classical Mechanics-এর তুলনায় Quantum Mechanics, restrict the range of value যা কিনা বিভিন্ন physical quantuty ধারণ করতে পারে (যেমন energy): অর্থাত্ সেই মানগুলো যা কোন পরিমাপের ফলাফল হিসাবে পাওয়া যাবে। Quantum Mechanics-এর metrhod সমূহ এই সকল admissible ( অনুজ্ঞেয় ) value নির্ণয় করতে সাহায্য করে।

Quantum Mechanics-এ Measuring process-টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা সবসময়ই electron-টিকে affect করে এবং নীতিগতভাবেই এই effect টাকে ছোট করা অসম্ভব। Measurement যত বেশী exact হবে effect তত strong হবে এবং কেবলমাত্র খুবই low accuracy measurement-এ effect on measurement ছোট হবে। Measurement-এর ধর্ম যুক্তিসংগতভাবে এই fact-এর সাথে সম্পর্কিত যে electron-এর dynamical characteristic কেবলমাত্র measurement-এর ফলাফল হিসাবেই appear করে। এটা পরিস্কার যে, যদি object-এর উপর Measuring process-এর effect যদি arbitrarily ছোট করা যায়, এটা এই অর্থ বহন করবে যে পরিমিত রাশির একটি নিজস্ব মান আছে যা এর measurement-এর উপর নির্ভর করে না।

ভিন্ন ধরণের measurement-এর মধ্যে, electron-এর coordinate-এর measurement-টি fundamental ভূমিকা পালন করে। Quantum Mechanics-এর applicability-র limit-এর মধ্যে electron-এর coordinate-এর measurement যে কোন desired accuracy দ্বারা সম্পন্ন করা যাবে।

মনে করি, একটি নির্দিষ্ট time interval ∆t-তে, একটি electron-এর coordinate-এর কিছু successive measurement করলাম। ফলাফলসমূহ একটি smooth curve-এর উপর থাকবে না। বরং, যত accurately measure করা হবে প্রাপ্ত ফলাফলগুলোর variable হবে তত বেশী discontinuous ও disorderly, যেহেতু electron-এর কোন path নাই। একটা smooth path পাওয়া যেতে পারে যদি electron-এর coordinate low degree of accuracy-তে মাপা হয়। যেমন Wilson chamber-এর vapour droplet-এর condensation থেকে যে পরিমাপ করা হয়

আবার যদি accuracy of measurement অপরিবর্তনীয় রেখে interval ∆t-কে যদি diminish করা হয় তাহলে adjacent measurement, coordinate-এর মান দেয়। however, series of successive measurement সমূহের ফলাফলগুলো একটি region -এ বর্ণিত হবে পুরোপুরি irregular manner-এ তারা কোন smooth curve-এর উপর থাকবে না। যখন ∆t tends to zero তখন ফলাফল কোন ক্রমেই একটি সরলরেখার উপর থাকে না।

এই পরিস্থিতি এই দেখায় যে Quatum Mechanics-এ Classical Mechanics-এর sense-এ velocity of particle-এর কোন concept নাই। অর্থ্যাৎ limit যেখানে coordinate-এর difference দু’টি instant-এ ∆t interval দ্বারা ভাগ করলে, তা (সেই limit) tends যেহেতু ∆t tends to zero যাহোক পরবর্তিতে আমরা দেখাব যে Quantum Mechanics-এ কোন একটি given instant-এ একটি particle-এর velocity-কে কোনরূপেই যৌক্তিক সংজ্ঞায়ন করা সম্ভব না। কিন্ত যেখানে Classical Mechanics-এ একটি particle-এর একই সাথে velocity ও coordinate নির্ণয় করা যায় সেখানে Quantum Mechanics-এ situation সম্পূর্ণ ভিন্ন। যদি কোন পরিমাপের ফলাফল হিসাবে electron-এর নির্দিষ্ট একটি coordinate পাওয়া যায়, তাহলে তার নির্দিষ্ট কোন velocity পাওয়াই যাবে না । উল্টোভাবে, electron-এর নির্দিষ্ট velocity পাওয়া গেলে নির্দিষ্ট coordinate পাওয়া যাবে না। coordinate ও velocity-র যুগপৎ অস্তিত্ত্ব এই বোঝাবে যে particle-টির একটি নির্দিষ্ট path আছে। এভাবে Quantum Mechanics-এ coordinate এবং velocity এমন দু’টা quantuty যা একই সাথে নির্ণয় করা সম্ভব না। এখান থেকে এই বোঝা যায় যে আমরা এমন quantitative realation-কে derive করব যা নির্ণয় করে possibility of an exact measurement of the coordinate and velocity at the same instant. Classical Mechanics-এ কোন physical system-এর state-এর বর্ণনা নির্ভর করে একই ক্ষণে তার coordinate ও velocity- র উপর।

References:
1. Quantum Mechanics, Landau L. & Evgeni Lifshits
2. Physics for All, Landau L., Kitaigorodski, Perelman

Categories
অনলাইন প্রকাশনা আত্ম উন্নয়ন সৃজনশীল প্রকাশনা

চেতনার সংকট

চেতনার সংকট
——-ডঃ রমিত আজাদ

আধুনিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বেশি দিনের নয়। ইতিপূর্বে ছিল ‘রাজ্য’। রাজ্যের প্রতিষ্ঠা জনসমর্থনে হতো না। রাজ্যের প্রধান বাহুবলে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে সিংহাসনে আরোহন করতেন। রাজ্যে জনগণনের ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন মূল্য ছিল না। রাজার ইচ্ছাই ছিল আইন। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষেত্রে তিনি সভাসদদের পরামর্শ নিতেন। সেখানে জনগণের কোন অংশগ্রহণ থাকতো না। ঐতিহ্যগত কারণে জনতা রাজা ও সিংহাসনকে সম্মান করত।

এক সময় এই মূল্যবোধের পরিবর্তন ঘটল। জনগণ বুঝতে শুরু করলো তাদেরই অর্থপুষ্ট প্রতিষ্ঠানে তাদের অধিকার নেই। এই অসন্তোষ যতই বাড়তে থাকে, সিংহাসনের প্রতি সম্মান ততই কমতে থাকে। মানব সভ্যতার বিকাশে এই রকম একটি পর্যায়ে, নির্যাতিত ও নিগৃহিত প্রজাদের মধ্যে দানা বেঁধে ওঠা অপরিসীম গণ অসন্তোষ থেকে সৃষ্ট বিপ্লবের মাধ্যমে পতন হয়েছিল প্রবল প্রতাপশালী রোম সাম্রাজ্যের।

এই পতনের পেছনে কাজ করেছিল একটি চেতনা। যীশু খ্রীষ্টের প্রচারিত খ্রীষ্ট ধর্মীয় ‘চেতনা’। হ্যাঁ চেতনাই মানুষকে পশুকূল থেকে পৃথক করে। চেতনা জীবনকে অর্থবহ করে। বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগায়। মানব সভ্যতার বিকাশের এক একটি যুগের সূচনায় কাজ করেছিল এক একটি চেতনা।

খ্রীষ্ট ধর্মীয় চেতনা এক সময় ইউরোপবাসীকে রোমক নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করেছিল। আবার এই চেতনাকে পূঁজি করেই কিছুকাল পরে একদল মানুষ সৃষ্টি করল নির্যাতনের নতুন অধ্যায়। চার্চ হয়ে উঠল প্রধান সামন্ত। ধর্মীয় অনুশাসন মানুষকে বেঁধে ফেলল আষ্টেপৃষ্ঠে। এ পর্যায়ে প্রয়োজন হল নতুন চেতনার।

এই নতুন চেতনাটির ভিত রচিত হয়েছিল ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যকার শতর্বষব্যপি যুদ্ধে (১৩৩৭-১৪৫৩)। এর দার্শনিক রূপ দিয়েছিলেন নিকোলো দি ভের্নাদো মেকিয়েভেলি (১৪৬৯-১৫২৭)। চার্চের অনুশাসন মুক্ত হয়ে জনতা কেন্দ্রিক সেক্যুলার রাষ্ট্র গঠনের দর্শন প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। পরবর্তীতে বডেন (১৫৩০-১৫৯৬) ‘সার্বভৌমত্বে’র ধারণা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি আরো বলেন, ‘রাষ্ট্র হলো জনতার ক্ষমতা’। এই দর্শনগুলোই এক সময় ‘জাতীয়তাবাদী চেতনা’র উন্মেষ ঘটায় যার প্রবল বিকাশ ঘটে ফরাসী বিপ্লবের (১৭৮৯) মধ্য দিয়ে। তখন থেকেই প্রতিষ্ঠা হতে শুরু করে জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ আধুনিক রাষ্ট্রসমূহ।

জাতীয়তাবাদ সংক্রান্ত আলোচনার গভীরে যাওয়ার আগে জাতির সংজ্ঞাটি দেয়া প্রয়োজন। এই সংজ্ঞা দিতে গিয়ে অনেক সমাজ বিজ্ঞানী থমকে দাঁড়িয়েছেন। কার্ল মার্কস সম্ভবত কোন সংজ্ঞাই দেননি। যা হোক, তার পরেও মোটামুটিভবে গৃহিত একটি সংজ্ঞা আছে। তা হলো, ‘যে বৃহৎ জনগোষ্ঠী একটি নির্দিষ্ট ভাষায় কথা বলে, যাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য আছে, যারা একটি নির্দিষ্ট ভূÑখন্ডের অধিবাসী এবং যাদের মধ্যে আবেগগত ঐক্য রয়েছে, সেই বৃহৎ জনগোষ্ঠী একটি জাতি।’

জাতি ও জাতিসত্তা বিষয়ক পার্থক্যমূলক আলোচনায় না গিয়ে উপরের সংজ্ঞাটিকে যথাযথ ধরে আমি পরবর্তী আলোচনায় প্রবেশ করছি।

‘জাতীয়তাবাদ’ জাতি ভিত্তিক একটি চেতনা। আদিম সমাজের গোত্র চেতনার নতুন রূপ। আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যুগের ঊষালগ্নে সামন্ততান্ত্রিক খন্ড-বিখন্ডতা থেকে উঠে এসে অখন্ড রাষ্ট্র গঠনে এবং চার্চের অনুশাসন মুক্ত সেক্যুলার রাষ্ট্র গঠনে, সর্বপোরি সিংহাসনের প্রভাব খর্ব করে জনতাকেন্দ্রিক পার্লামেন্ট ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে এই চেতনা বিশেষ ভুমিকা রাখে।

পরবর্তীতে এই চেতনাই উগ্র রূপ নিয়ে সাম্রাজ্যবাদে পরিণত হয়। এই উগ্রতার নাম হয় ‘শোভিনিজম।’ শোভিনিজমের উপর ভিত্তি করে ইউরোপের কয়েকটি রাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী উপনিবেশ গড়ে তোলা শুরু করে। এমন একটি পর্যায়ে বাংলা ইংরেজদের উপনিবেশে পরিণত হয়। উল্লেখ্য যে, এ সময় বাংলায় কোন জাতীয়তাবাদী চেতনা ছিল না। তাই ইংরেজদের দূরভিসন্ধি বোঝা সবার পক্ষে সম্ভব হয়নি। যদিও বিচক্ষণ নবাব আলীবর্দী খান পৌত্র নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে ইংরেজদের মতি-গতি সম্পর্কে সাবধান করে দিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু মসনদ দখলের লড়াইয়ে অন্ধ হয়ে নবাবের বেশীর ভাগ সদস্যই পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজের পক্ষ নিয়েছিল। জাতীয়তাবাদী চেতনা থাকলে সেদিন এই ভুল নাও হতে পারত।

পলাশীর পাপ মোচনের উদ্দেশ্যে মীরজাফর একবার এবং মীর কাসিম একবার ইংরেজের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ইংরেজ তখন এমনভাবে জাল বিস্তার করেছে, যে তা আর কাটা সম্ভব হয়নি। এই পর্যায়ে বাংলার বুদ্ধিজীবীরা বুঝতে শুরু করেন জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রতিষ্ঠা করে গণজাগরণ সৃষ্টি না করে উপনিবেশিকতা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। এভাবেই নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে স্বাধীনতার প্রতীক করে সৃষ্টি করা হয় বাংলার প্রথম জাতীয়তাবাদী চেতনা। এই চেতনার মূল মন্ত্র ছিল ‘ইংরেজ, তুমি বাংলা ছাড়’।

ধীরে ধীরে ভারতের অন্যান্য জাতিগুলোও এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ইংরেজ হটাও আন্দোলনে নামে। কিন্তু চতুর ইংরেজও কম যায় না। কখনও অস্ত্রের জোরে, কখনও সমান্তরাল চেতনার সৃষ্টি করে বিভেদ সৃষ্টি করে তারা আন্দোলনকে ভোঁতা করতে থাকে। ভারতবাসীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির মূল অস্ত্র হিসাবে তারা ব্যবহার করে ‘ধর্মীয় সা¤প্রদায়িক চেতনা।’

ভারত ছাড় আন্দোলনের চরম পর্যায়ে গঠিত হয় রাজনৈতিক দল ‘কংগ্রেস’। রোম সাম্রাজ্যের একটি সভার নাম ছিল কংগ্রেস। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছিল ভারতের স্বাধীনতাকামীদের সৃষ্ট এই দল। আসলে কংগ্রেস ছিল ইংরেজদেরই সমর্থনপুষ্ট একটি দল। এর প্রতিষ্ঠার পেছনে হাত ছিল লর্ড ডাফরিনের। পরবর্তীকালে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আগত এম. করমচাঁদ গান্ধির নেতৃত্বে দলীয় রাজনীতি নতুন স্রোত পায়। তদুপরি কংগ্রেস তার বিশেষ উদ্দেশ্য অর্থাৎ উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের স্বার্থ রক্ষার ব্রত থেকে বিচ্যুত হয়নি। কংগ্রেসের নেতৃত্বে ভারত ¯¦াধীন হলে তা উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের শাসনাধীণ হয়ে যেতে পারে এবং তফসীলি স¤প্রদায় ও মুসলমানরা ইংরেজ আমলের মতই নির্যাতিত থেকে যাবে। দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মুসলমান এলিট স¤প্রদায় এই কূটকৌশল টের পেয়ে নবাব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে গঠন করেন ‘মুসলীম লীগ’। মুসলীম লীগ ছিল কংগ্রেসের কাউন্টার। ঢাকার শাহবাগে নবাব সলিমুল্লাহর এক ভবনে এই লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুর পর, শেরে বাংলা মুসলীম লীগের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে এই দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। উল্লেখ্য, মুসলীম লীগের প্রতিষ্ঠার সাথে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কোন সম্পর্ক ছিল না। মুসলীম লীগে জিন্নাহর প্রবেশ অনেক পরে।

কংগ্রেস ও মুসলীম লীগের নেতৃত্বে ভারতবর্ষে দু’টি ভিন্ন চেতনার বিকাশ হতে থাকে। বাংলায় তখন দুইটি স¤প্রদায়ের বসবাস। একটির সংখ্যাধিক্য পশ্চিমে ও অপরটি পূর্বে। তাঁদের ভাষা এক কিন্তু ধর্ম ভিন্ন। তাই সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যগত পার্থক্যও আছে। এই পার্থক্যই চেতনাগত পার্থক্য এনে দেয়। ভৌগলিক ভাগাভাগির প্রশ্নও তুলে ধরে। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনাকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন বাঙালীর রাজনীতির কথা বলেছিলেন কিন্তু তাকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন নি। কারণ যুগটি ছিল ধর্মীয় চেতনার যুগ। পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে ভাষাগত মিল ছিল কিন্তু চেতনাগত পার্থক্য ছিল। প্রবন্ধের শূরুতেই বলেছিলাম জাতি গঠনে আবেগগত ঐক্যের কথা। পূর্ব ও পশ্চিম বঙ্গের মধ্যে ছিল আবেগগত অনৈক্য। তাই অখন্ড জাতি হিসাবে তাদের আত্মপ্রকাশ করা সম্ভব ছিল না।

ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের পর ভৌগলিক ভাগাভাগি নিশ্চিত হয়ে পড়ে। পূর্ব বাংলায় শক্তিশালী রূপ ধারণ করে একটি চেতনা— ইসলাম ধর্ম। সেই সময়ের রাজনীতির সব উজ্জ্বল তারকা শেরে বাংলা ফজলুল হক, মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, খাজা নাজিমুদ্দিন, ছাত্রনেতা বঙ্গবন্ধ– শেখ মুজিবুর রহমান সবাই ছিলেন এই চেতনায় উদ্বূদ্ধ। তাঁরা যেখানেই গিয়েছিলেন তাঁদের পেছনে জনতার ঢল নেমেছে। হিন্দু জমিদারদের অত্যাচারে ক্লান্ত, নিঃশেষিত বাঙালী মুসলমানরা ইংরেজ মুক্ত, হিন্দু জমিদারদের শাসনমুক্ত একটি নতুন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল।

অবশেষে ধর্মীয় চেতনার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয় দু’টি পৃথক রাষ্ট্র, ভারত ও পাকিস্তান। ৮৭২ টি ভাষাভাষি সম্পন্ন বহুজাতিক রাষ্ট্র ভারতে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী কোন চেতনা থাকার কথা নয়, ধর্মীয় চেতনাই তাদের মধ্যে আবেগগত ঐক্যের সৃষ্টি করেছে। অনুরুপভাবে বহুজাতিক রাষ্ট্র পাকিস্তানেও ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী চেতনার অবকাশ ছিল না। সেখানেও ইসলাম ধর্মই ছিল ঐ রাষ্ট্রের চেতনা। তদানিন্তন রাষ্ট্রপ্রধানরা বক্তৃতা-বিবৃতিতে হামেশাই বলতেন যে, পাকিস্তান একটি চেতনাভিত্তিক রাষ্ট্র।

১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলার ইতিহাসে একটি গুরত্বপূর্ণ অধ্যায়- একটি নতুন চেতনার জয়, একদল জালিমের উৎখাত। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই দেখা গেল সংগ্রামের অবসান হয়নি। একদল জালিমকে রিপ্লেস করেছে আরেক দল জালিম। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় বাংলার মানুষের ভূমিকা ছিল মুখ্য, মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ঢাকায়, লাহোর প্রস্তাব শেরে বাংলার উপরন্তু পাকিস্তানের পক্ষে অত ভোট ব্রিটিশ ভারতের অন্য কোন প্রদেশে পড়েনি। অথচ কেন্দ্রীয় রাজধানী ঢাকায় হয়নি, কেন্দ্রীয় ক্ষমতা থেকে বাঙ্গালীদের দূরে সরিয়ে রাখা হয়। বাংলা ভাষার অবমাননা মূলক জিন্নাহর ঘোষণায়, ১৯৪৭ এর চেতনার পরাজয় ঘটল। সারা পূর্ব বাংলায় প্রতিবাদের ঝড় উঠল, বোঝা গেল ৪৭এর চেতনা নিয়ে বেশী দূর আগানো যাবে না। প্রয়োজন দেখা গেল নতুন চেতনার। উল্লেখ্য যে ভারতে হিন্দীকে রাষ্ট্রভাষা করা জনিত গান্ধীর ঘোষণায় পশ্চিম বঙ্গে কোন প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়নি।

’৪৭-এর চেতনা অকেজো হয়ে পড়ে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনে। যে রাজনৈতিক তারকারা ’৪৭-এ পাকিস্তান গঠন করেছিলেন তারা সবাই-ই (খাজা নাজিমুদ্দিন বাদে) প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভাষা আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। ২১ শে ফেব্র“য়ারী পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব বাংলার স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দেয় (প্রথমে মানসিক, পরে ভৌগলিক)। ২১ হয়ে উঠে আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। ইতিহাসের সমষ্টি ঐতিহ্য কিন্তু ইতিহাসের সবটাই ঐতিহ্য নয়। ইতিহাসের ঐ অংশই ঐতিহ্য হয়ে যায় যা অন্তর্গত হয়ে পড়ে চেতনার, দৃষ্টিভঙ্গির ও আচার আচরণের যা সতত প্রবাহমান। হ্যাঁ, ঐ চেতনার কারণে ২১ ঐতিহ্য হয়ে যায়। একুশ জন্ম দেয় নতুন চেতনার। চেতনাটি হলো ‘আমরা বাংলায় কথা বলি’।

এই চেতনাভিত্তিক পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন একসময় রুপ নেয় মহান মুক্তিযুদ্ধে। পরিশেষে প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ব বাংলার বাঙালীদের নিজস্ব রাষ্ট্র- ‘বাংলাদেশ’। আমাদের ইতিহাসে আরও একটি গুরত্বপূর্ণ সন- ‘১৯৭১। একাত্তুরে ’৪৭ এর চেতনার পুরোপুরি মৃত্যু ঘটে কিন্তু একুশের চেতনা আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। একাত্তুরে আমরা শুরু করি নতুন যাত্রা। এই যাত্রার তো একটি চেতনা থাকবে। কি সেই চেতনা?

বাংলাদেশ নতুন রাষ্ট্র। নতুন রাষ্ট্রের থাকবে নতুন চেতনা। নতুন চেতনা নিয়ে হয়েছে সংকট- চেতনার সংকট। চেতনার প্রশ্নে দেশের দু’টি প্রধান দল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছে, আওয়ামী লীগ এই চেতনাকে বলেছে ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’, বি,এন,পি বলেছে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে চেতনা ছিল, ’৪৭-এ চেতনা ছিল, ’৫২-তে চেতনা ছিল অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে রয়েছে চেতনার সংকট। এটা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। নতুন একটি চেতনার জন্ম পুরাতন একটি চেতনার মৃত্যু ঘটায়। কিন্তু একটি চেতনার মৃত্যু হলো, অথচ নতুন কোন চেতনার জন্ম হলো না, এতে চেতনাহীন এই সময়টিতে জাতি সম্মুখীন হয় চরম সংকটের। যতক্ষণ পর্যন্ত না বিশ্ববিক্ষণজনিত এই সমস্যাটির সমাধান না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত অন্য কোন জাতীয় সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

‘বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ’-এর প্রসঙ্গে আসা যাক। এই জাতীয়তাবাদ বলতে বুঝি, বাংলা ভাষাভাষীদের সংস্কৃত ও ঐতিহ্য ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। প্রথমতঃ বাংলা ভাষীরা শুধু বাংলাদেশেই নয়, পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতের আরো কয়েকটি প্রদেশে বসবাস করে। তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু। এক সময় তারা ধর্মীয় চেতনার প্রশ্নে সোহরাওয়ার্দীর প্রস্তাবিত ‘অখন্ড স্বাধীন বাংলা’ প্রতিষ্ঠা হতে দেয়নি। দ্বিতীয়তঃ তাদের সাথে আমাদের যেমন ধর্মে তেমনি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যগত পার্থক্য আছে। আমাদের হৃদয়ে আছে একুশ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। একুশ ও মুক্তিযুদ্ধের অস্তিত্ব বাংলাদেশের বাইরের কোন বাঙ্গালীর মধ্যে নেই।

ভারতের বাঙ্গালীরা ভাষা আন্দোলন করেনি। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে যে ভাষা ভিত্তিক রাষ্ট্র বাংলাদেশের বাঙ্গালীরা সৃষ্টি করেছে তার সাথে বাংলাদেশের বাইরের বাঙ্গালীরা একাত্মতা ঘোষণা করেনি। তাদের আর আমাদের চেতনা এক হতে পারে না।

মুসলিম লীগের নামের সাথে ‘আওয়ামী’ শব্দটা জুড়ে দিয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করেছিলেন সোহরাওয়ার্দী যার অর্থ জনতার মুসলিম লীগ, বাঙ্গালীর মুসলিম লীগ নয়। পরবর্তীতে ‘মুসলিম’ কথাটি বাদ দিয়ে শুধুই ‘আওয়ামী লীগ’ করা হয়। এই পরিবর্তন যথাযথ। ব্রিটিশ শাসন আমলের মত বিশেষত্ব প্রদর্শন করার উদেশ্যে ‘মুসলিম’ কথাটির ব্যবহার করার আর প্রয়োজন ছিল না। কারণ পাকিস্তানে মুসলমানরাই ছিল সংখ্যা গরিষ্ঠ। কিন্তু নতুন নাম করণেও বাঙ্গালী কথাটি আসেনি, ‘আওয়ামী লীগ’ অর্থ ‘জনতার দল’ । স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল, বাংলাদেশের (পূর্ব বাংলার), অখন্ড বাংলার নয় ।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চেতনার প্রয়োজন অপরির্হায। এই চেতনার দু’টি প্রধান উপাদান- এক. সংখ্যা গরিষ্ঠের ধর্ম- ইসলাম; দুই. সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা-বাংলা। এছাড়া রয়েছে জাতীয় আবেগ সঞ্চারকারী উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট- দুই শতক দীর্ঘ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন এবং একাত্তরের মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম।

অনেক বামপন্থী দল আত্মিক চাহিদা উপেক্ষা করে ভূ-গোলের উপর বেশী জোর দিয়ে ফেলেন। বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে অনেক দূরে। ইসলাম ধর্মের উৎপত্তি যেহেতু মধ্য প্রাচ্যে তাই বাংলাদেশে তা অকেজো এমন কথা তারা প্রচার করেন। কিন্তু তারা ভুলে যান নীতি বা আদর্শ ভূ-গোলের বাধা মানে না। বাংলাদেশের খুব কাছাকাছি উদ্ভূত বৌদ্ধ দর্শন গৃহীত হয়েছে সুদূর জাপানেও, আর জার্মানীতে সৃষ্ট কম্যুনিজমকে বাংলাদেশের বামপন্থীরা আঁকড়ে ধরেছেন। তাই অতিমুসলমান হতে গিয়ে অবাঙ্গালী হয়ে যাওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি অতি বাঙ্গালী হতে গিয়ে অমুসলমান হয়ে যাওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। বঙ্গবন্ধু– শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর ১০ই জানুয়ারী ১৯৭২-এর ভাষণে বলেছিলেন, “.. ..আমি বাঙ্গালী, আমি মুসলমান, . . . .” তিনি দু’টো বিষয়ের উপরই সমান গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

প্রসঙ্গত অনেকে উল্লেখ করে থাকে পার্বত্য চট্টগ্রাম সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর কথা। তাদের চেতনা কি হবে? তাদের ভাষা বাংলা নয়, ধর্মও ইসলাম নয়। কিন্তু কয়েক শতক যাবৎ পূর্ব বাংলার অধিবাসী। এ দীর্ঘ সময়ে তাদের ও আমাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে অভিন্নতা এসেছে। তারাও আমাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন করেছে, একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছে। এই আবেগের উপর ভিত্তি করে কি একটি ঐক্য প্রতিষ্ঠা হতে পারে না?

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রায় চার দশক পার হয়ে গেছে। কিন্তু এই সময়ে আমরা খুব বেশী দূর এগুতে পারিনি। তুলনামূলক বিচারে পিছিয়েই পড়েছি। ধীরে ধীরে আমদের অতিক্রম করে গিয়েছে থাইল্যান্ড, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, আর মধ্য প্রাচ্যের কথা বাদই দিলাম। এর মূল কারণ- চেতনার সংকট। চেতনার প্রশ্নে আমরা দ্বিধা বিভক্ত হয়ে আছি। এই দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারলেই দেশ গতিশীলতা পাবে।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা জীবনী ও স্মৃতিকথা

আমার ক্যাডেট কলেজ

আমার ক্যাডেট কলেজ
ডঃ রমিত আজাদ (৭ম ব্যাচ)

আমার বয়স যখন পাঁচ বছর হলো, সকলে ঠিক করলেন আমাকে স্কুলে দিতে হবে। আমরা তখন থাকতাম ঢাকার মগবাজারে মধুবাগে। কাছাকাছি স্কুল ছিল। মগবাজার টি এন্ড টি স্কুল। বড় বোন রীনা আপার হাত ধরে একদিন ঐ স্কুলে গেলাম। তখনকার ভর্তি পদ্ধতি আজকের মত এত জটিল ছিল না। স্কুলের একজন শিক্ষককে আমার বড় বোন বললেন “স্যার আমার ছোট ভাই, ওকে ভর্তি করতে চাই। ও সবকিছু খুব সুন্দর করে পড়তে পারে”। স্যার তার হাতের বইটি খুলে আমাকে বললেন, “পড়”। আমি খুব দ্রুত পড়লাম, “বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র…………….”। স্যার চমৎকৃত হয়ে বললেন, “বেশ বেশ আর পড়তে হবে না”। চল তোমাকে ভর্তি করিয়ে দেই। সব ফর্মালিটিস শেষ হওয়ার পর আমার আপা বললেন “তুমি ভর্তি হয়ে গিয়েছ, কাল থেকে এই স্কুলে পড়বে”। স্কুলের দিকে তাকিয়ে আমার মন খারাপ হয়ে গেল। আমি বললাম, “বেড়ার স্কুল!”। আপারও বোধ হয় মন খারাপ হয়ে গেল, বললেন, “এখন তুমি ছোট তো, যখন বড় হবে, তখন অনেক বড় স্কুলে পড়বে”। মনে আকাঙ্খা রয়ে গেল, অনেক বড় স্কুলে পড়ার। এরপর যখন তৃতীয় বা চর্তুথ শ্রেণীর ছাত্র, একদিন আমার মাতৃতুল্য ফুপু আমাকে বললেন, “রমিত, পত্রিকায় তোমার নাম উঠেছে দেখবে এসো”। আমি অবাক হয়ে গেলাম, পত্রিকায় আমার নাম। এরপর তিনি খবরের কাগজ খুলে একটি বিজ্ঞপ্তি দেখালেন, ক্যাডেট কলেজে ভর্তির বিজ্ঞপ্তি। আমি প্রশ্ন করলাম, “কোথায় আমার নাম?” ফুপু হেসে বললেন, তোমার নাম না, এটা ক্যাডেট কলেজের ভর্তির বিজ্ঞপ্তি। খুব ভালো স্কুল। তোমাকে এখানে ভর্তি হতে হবে”। সেই প্রথম জানতে পারলাম, ক্যাডেট কলেজের নাম । এদিকে আমার এক ফুপাতো বোনের ছেলে, ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হয়েছে। তার বাবা মা খুব খুশি। একদিন তাকে দেখতে গেলাম। তিনি আমাকে তার ইউনিফর্ম দেখালেন। আমার মনকে আলোকিত করল ঐ ঝকঝকে ইউনিফর্ম । এবার ক্যাডেট কলেজে ভর্তির বাসনা আরো তীব্র হলো। ১৯৮১ সালে আমার বড় দুই বোনের মধ্যে যিনি দ্বিতীয় (রিতা আপা), তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন আমাকে ক্যাডেট কলেজে ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করতে হবে। নিয়ে গেলেন একটি কোচিং সেন্টারে। আমার সৌভাগ্য, সেই কোচিং সেন্টারে পড়েছিলাম যার পরিচালক ও শিক্ষক ছিলেন আশরাফুল হক স্যার। তিনি বর্তমানে হলি চাইল্ড স্কুলের অধ্যক্ষ ও প্রতিষ্টাতা। খুব মনযোগ দিয়ে স্যার পড়িয়েছিলেন। উনার প্রশিক্ষন পেয়ে আমরা অনেকেই ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হতে পেরেছিলাম। আমার আজও মনে আছে যেদিন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সংবাদ পেয়েছিলাম সেদিন কি খুশীই না হয়েছিলাম। আমার গৃহশিক্ষক স্বপন ভাই আমাকে খুব যত্ন করে পড়িয়েছিলেন । উনাকে সালাম করে খুশীর সংবাদটা দিলাম। উনি হেসে বললেন, “তুমি যে এ্যালাউ হবে তা আমি জানতাম”।

আশরাফুল হক স্যার বললেন “রিটেন পরীক্ষায় এ্যালাউ হয়ে উচ্ছসিত হওয়ার কিছু নাই। ১৫০ জন এ্যালাউ হয়েছে কিন্ত মৌখিক পরীক্ষার পর রাখা হবে মাত্র ৫০ জন। সুতরাং তোমাদের আরো অনেক পড়তে হবে।

স্যারের প্রশিক্ষন নিয়ে কাটলো বাকী দিনগুলো। অবশেষে এলো মৌখিক পরীক্ষার দিন। পরীক্ষা হলো ঢাকার টিচার্স ট্রেনিং কলেজে। সারাদিন অপেক্ষা করার পর বিকালের দিকে আমাদের কলেজের স্বপন ভাই (যিনি এখনো কর্মরত) ডেকে নিলেন ভিতরে। রুমে ঢুকে দেখলাম, চেয়ার আলো করে বসে আছেন কলেজের অধ্যক্ষ শ্রদ্ধেয় বাকিয়াতুল্লাহ স্যার। তার পাশে বসে আছেন উপাধ্যক্ষ আল-আমিন স্যার। অনেক প্রশ্ন করলেন, অনেক কিছু জানতে চাইলেন, কিন্তু একটুও ঘাবড়ালাম না। অবাক হয়ে শুধু ভাবছিলাম, এত চমৎকার শিক্ষক হয়! একই মন্তব্য করেছিল আমাদের ব্যাচের কালাম সারোয়ার, “দু’জনই এত ভালো!” ভাইভায় নানা প্রশ্ন করলেন। মোটামুটি সবকিছুরই ভালো উত্তর দিলাম। এরপর অনেকদিন অপেক্ষা করলাম। তারপর আবারো চিঠি পেলাম। চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সংবাদ। এত খুশি আর জীবনে কোনদিন হইনি। চিঠিতে লেখা ছিল ৬ই জুন জয়িেনং ডেট এরপর কেবল অপেক্ষা, কবে ৬ ই জুন আসবে। যথারীতি ৫ই জুন এলো। ঢাকা থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। আমার জীবনের অনেক আনন্দের দিন। বেশ কয়েকটি আনন্দ একদিনে, জীবনে প্রথম ট্রেনে চড়ার আনন্দ, স্কুলের বই-পত্রে, গল্পে সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য, চা-বাগান, হজরত শাহ্জালাল (র) এর মাজার ইত্যাদির গল্প অনেক পড়েছি সেই সিলেট দেখার আনন্দ, সর্বপোরী ক্যাডেট কলেজে ভর্তির আনন্দ। ৬ই জুন সিলেট পৌঁছে রেল ষ্টেশনেই দু’একজন ব্যাচ মেটের সাথে দেখা হলো, যারা আমার সাথেই ভাইভা পরীক্ষা দিয়েছিল। বিকালের দিকে একটি জীপে চড়ে কলেজের দিকে রওয়ানা হলাম। সিলেট শহর ছাড়িয়ে বাইরে নামতেই অপরূপ প্রাকৃতিক শোভা। মালিনীছড়া আর লাক্কাতুরা চা বাগানের অপূর্ব দৃশ্যে মন জুড়িয়ে গেল। সেই দৃশ্য শেষ হতে হতেই ঝকঝক করে উঠল সিলেট ক্যাডেট কলেজে-এর ক্যাম্পাস।

এয়ারপোর্ট রোড বরাবর কলেজের দেয়াল ঘেঁষে চলে একেবারে শেষ মাথায় থাকা প্রধান ফটক দিকে চট করে জীপ ঢুকে গেল কলেজ ক্যাম্পাসের ভিতর। কিছুদুর যেতেই খাঁকি পোষাকের উপর লাল শ্যাষ পরা দু’জন ক্যাডেট লাঠি উচিয়ে থামতে নির্দেশ দিল জীপটেিক। দেখে খুব ভালো লাগলো, মনে মনে বললাম, বাহ্! বেশ স্মার্ট তো!’ জীপ থেকে নামিয়ে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো তৎকালীন কলেজ প্রিফেক্ট মহিউদ্দিন ভাই এর কাছে। খুঁজে দেখলেন আমি শাহ্জালাল হাউজের। এলেন হাউজ লিডার ওয়ালীউলল্লাহ ভাই। তালিকা খুঁজে বললেন, “মশিউর তোমার রুমমেট। এগিয়ে এলেন আমার এক ব্যাচ সিনিয়র মশিউর ভাই। আমার সাথের কালো ট্রাংকটির একদিকে তিনি ধরে আমাকে বললেন, “তুমি অন্যদিকে ধর”। দু’জনে ট্রাংকের দু’দিকে ধরে এগিয়ে চললাম শাহ্জালাল হাউজের ৩৪ নং রুমের দিকে। ট্রাংকের একদিকে পুরাতন ক্যাডেট অন্যদিকে নতুন ক্যাডেট। মুগ্ধ হলাম এই রীতি দেখে। ট্রাংকের বন্ধনের মধ্যে দিয়ে হৃদয়ের যে বন্ধন তৈরী হলো তা চিরস্থায়ী হয়ে গেল। কিছুক্ষনের মধ্যে আমার অপর দু’জন রুমমেট আসিফ ও মঈনুলকে পেয়ে গেলাম। কিছুক্ষন পর পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক শ্রদ্ধেয় দেলোয়ার হোসেন স্যার এলেন। প্রাণবন্ত আলোচনা জমালেন আমাদের তিনজনার অভিভাবকদের সাথে। ৬ ই জুন ক্যাডেট কলেজে প্রথম দিন, প্রীতিকর অভজ্ঞিতার মধ্যে দিয়ে যাত্রা শুরু হলো আমার ক্যাডেট জীবনের।

ছয় ছয়টি বছারের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা একটি ছোট প্রবন্ধে সীমাবদ্ধ করা যায় না। সিলেট ক্যাডেট কলজে প্রানের কলেজ, কলেজের প্রতিটি গাছ, প্রতিটি ইট, হয়তো প্রতিটি ঘাঁসের সাথেও আছে আমাদরে হৃদয়ের সম্পর্ক। সেই হৃদয়ের কিছু কথা আজ বলব। কলেজের কথা বলতে গেলে প্রথমে আসে আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের কথা। আমরা প্রথম অধ্যক্ষ হিসাবে যাকে পেয়েছি সেই বাকিয়াতুল্লাহ্ স্যারের কথা। স্যারের শান্ত-সৌম্য অবয়বে ছিল আভিজাত্যের ছাপ। প্রথম দিন পারেডে এসে আমাকে বললেন, “এত স্বাস্থ্য খারাপ কনে? থাক স্বাস্থ্য ভালো হয়ে যাবে। এখানে তো তোমাদের বাবা-মা-রা নেই, এখানে আমরাই বাবা-মা।” আমাদেরকে এভাবেই স্যার আপন করে নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ক্যাডেট কলেজ সমূহের প্রথম সিভিলিয়ান প্রিন্সিপাল। সেরা শিক্ষক হিসাবে এ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন, ফৌজদার ক্যাডেট কলেজে কর্মরত অবস্থায়। তারপর তদানিন্তন সরকার তাকে ইংল্যান্ডে পাঠিয়েছিল প্রশিক্ষন নিয়ে আসতে। যথাযথই প্রশিক্ষন নিয়েছিলেন। তার হাতে গড়ে উঠেছে এদেশের অনেক বড় বড় মানুষ। আমি মস্কোতে এক বাংলাদেশীর সাথে পরিচিত হয়েছিলাম। বৃটিশ এক সুখ্যাত কোম্পানীর মস্কো শাখার কর্নধার। কথায় কথায় জানলাম তিনি ফৌজদারহাটের থার্ড ব্যাচের এক্স-ক্যাডেট। বাকিয়াতুল্লাহ্ স্যারের ভূয়সী প্রশংসা করলেন তিনি। সেই বাকিয়াতল্লাহ্ স্যার আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। পরম করুনাময় তাকে জান্নাতবাসী করুন।

ক্যাডেট কলেজে ভর্তির আগে ঢাকায় একটি সাধারণ স্কুলে পড়তাম আমি। মুখস্থ বিদ্যা ছাড়া আর কিছুই সেখানে শেখানো হতো না। আমাদের সমাজবিদ্যার শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন স্যার এসে প্রথম দিনই বললেন, “তোমরা তো সবাই ভালো ছাত্র। আর্টস নিয়ে তো কেউই পড়বে না জানি। কিন্তু মানুষ হিসবে বিজ্ঞানের পাশাপাশি আর্টসেরও অনেক কিছু জানা থাকা প্রয়োজন। তাই এই বোর্ডের বইটা থাক। আমি তোমাদের এই বইয়ের বাইরে অনেক কিছু পড়াব, যা তোমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন”। তিনি শুরু করলেন সক্রেটিস থেকে। তারপর প্লেটো, এ্যারিষ্টটল, মেকিয়েভেলি হয়ে বিশ্ববিক্ষনের অনেক শাখা পেরিয়ে শেষ করলেন বাংলাদেশ ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত । তিনি আমাদের প্রথম আলো দেখালেন দর্শনের, আলো দেখালেন সমাজবিদ্যার, প্রবল আগ্রহ জাগিয়ে তুললেন রাজনীতি বিষয়ে।

মনে পড়ে মরহুম মাজহারুল হক স্যারের কথা। সুদর্শন মাজহার স্যার বরাবরই ছিলেন পরিপাটি, সৌন্দর্য্যপ্রীয়। আমাদের মধ্যেও এই সৌন্দর্য্য সচেতনতা তিনি তৈরী করে দিয়েছিলেন। হাউজ মাষ্টার হিসাবে সুরমা হাউজকে করেছিলেন নানা ভাবে শোভিত। ইতিহাস পড়াতেন। সাধারণ স্কুলে পড়াকালীন ইতিহাসে কোন আনন্দ পেতাম না। মনে হতো দিনক্ষণ মুখস্থ করার একটা কাঠখোট্টা সারজেক্ট্। মাজহার শুরু করলেন সিন্ধু সভ্যতা থেকে। স্যারের কাছ থেকে জানলাম আলেকজান্ডারের কাহিনী। জানলাম ১৮৫৭ সালে যা ঘটেছিল তাকে ইংরেজরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে সিপাহী বিপ্লব নাম দিয়েছিল, আসলে সেটা ছিল আমাদের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ। জেনেছি গৌতম বুদ্ধের কথা, মহাবীরের কথা। আরো কত কি! মাজহার স্যারই শেখালেন, ইতিহাস কত তাৎপর্যপূর্ণ!

বাংলার শিক্ষক রকিবুল হাসান স্যার। কোমলে কঠোরে মিশ্রিত। যেমনি ভালোবাসতেন, তেমনি শাসনে রাখতেন। পড়ালেখার পাশাপাশি জীবনে প্রয়োজন হবে এমন অনেক কিছুই শেখাতেন বন্ধুর মতো। ক্লাসে সুবোধ বালকটির মত বসে থাকলে স্যার ভৎর্সনা করতেন। বলতেন, শিশু কিশোররা হবে চঞ্চল উচ্ছল। হৈ চৈ আর দুরন্তপনাকে তিনি উৎসাহই দিতেন। আমার এখানো মনে আছে আমাদের ব্যাচের পাস-আউটের সকল অনুষ্ঠানের আয়োজন স্যারই করেছিলেন। আমাদের কোন আবদারই ফিরিয়ে দেননি।

বক্তৃতা, নাটক, আবৃত্তি ইত্যাদি নানা সাংস্কৃতিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেয়েছিলাম শফিকুল আজম স্যার এবং সাইফুল ইসলাম স্যারের কাছে। একবার মনে আছে আন্ত:ভবন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার সময় শাহ্জালাল হাউজের প্রতিযোগিদের একটার পর একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাচ্ছিল। গায়ক ঠান্ডা লাগিয়ে গলা ভেঙে ফেলেছে। তবলা বাদক হসপিটালাইজড। শেষ দু:সংবাদ এলো, অভিনেতাদের একজন হাত ভেঙেছে। আমরা সবাই হায় হায়! হাউজ এবার ডুবল! শফিকুল আজম স্যার ঠান্ডা মাথায় সব ট্যাকল করলেন। নতুন গান সিলেক্ট করলেন, নতুন অভিনেতা নিলেন, আমাকে আনাড়ি হাতে দিলেন তবলা বাজাতে। অনুষ্ঠানের ফলাফল ঘোষিত হলো, শাহজালাল হাউজ প্রথম হয়েছে। আনন্দের আতিশয্যে স্যারকে কাঁধে তুলে নিয়েছিলাম।

ইংরেজীর শিক্ষক শফিকুল ইসলাম স্যার নিজেই এক্স ক্যাডেট। তার উপর একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। চমৎকার পড়াতেন। ইংরেজীর ভয় কেটে গেল স্যারের ক্লাশ পেয়ে। অংকের ভয় বোধ হয় সবার মধ্যেই থাকে , কুদ্দুস স্যার এলেন রাজশাহী থেকে। এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিলেন সেই ভয়। কনফিডেন্স, ব্যাক্তি জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই কনফিডেন্স আমাদের মনে এনে দিয়েছিলেন নজরুল ইসলাম স্যার। তখন তীতুমীর হাউজ সব কিছুতে তৃতীয় স্থান পেত। তারা নিজেরাও ধরে নিয়েছিল যে, ঐ অবস্থান থেকে তাদের উঠে আসা সম্ভব নয়। রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ থেকে এসে তীতুমীর হাউজের হাউজ মাষ্টার হিসাবে দায়িত্ব নিলেন নজরুল ইসলাম স্যার । যাদুকরের মতো হাউজকে টেনে তুললেন। এরপর আমরা বুঝে গিয়েছিলাম নজরুল ইসলাম স্যার যতদিন আছেন ততদিন তীতুমীর হাউজ শক্ত ভীতের উপর দাঁড়িয়ে থাকবে।

হাসান স্যার ছিলেন ভূগোলের শিক্ষক। ম্যাপ আঁকতে ভয় পেতাম সবাই। সেই ম্যাপ আঁকা শিখিয়েই ছাড়লেন। শাহজালাল হাউজের হাউজ মাষ্টারের দায়িত্ব পালন করেছেন। সৎ নিষ্ঠাবান একজন মানুষ। নিজের সন্তানের মত স্নেহ করতেন আমাদের। স্যার যেমন ছিলেন মেজাজী তেমনি আবার হাস্য রসিকতায় মন ভরিয়ে দিতেন। একবার ক্রস-কান্ট্রি প্রতিযোগিতার আগে বললাম, “স্যার ছোট ছোট ক্যাডেটদের দৌড়াতে কষ্ট হয়”। স্যার উত্তরে বললেন, “ছোট পোলাপানে দৌড়াইবে বান্দরের মত”।

পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক হিসাবে যোগ দিলেন অমিতাভ বিশ্বাস স্যার। সিলেট ক্যাডেট কলেজই স্যারের প্রথম ক্যাডেট কলেজ। কলেজে এসেই স্যার সকলকে আপন করে নিলেন। স্যারের ধ্যান-জ্ঞান সবই হয়ে গেল ক্যাডেটরা। ক্লাশে তিনি ডুবে যেতেন শিক্ষকতায়। জটিল সব বিষয়, সূত্র, নীতি, আইন জলবৎ তরলং করে দিতেন। তখনই বুঝতে পেরেছিলাম স্যারের প্রভাব মুক্ত হতে পারব না। হলোও তাই, কেবল আমাদের ক্লাশ থেকেই পাঁচ-পাঁচজন পরবর্তিতে পদার্থবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা নিলাম। এদের মধ্যে তিনজন আমি, তানভীর ও সাজ্জাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক। ইউরোপে লেখাপড়া করেছি, পি.এইচ.ডি. ডিগ্রী নিয়েছি। আমার লেখা তিনটি বই ইউরোপ থেকে প্রকাশিত। এর সবকিছুর পিছনে স্যারেরই অবদান।

টেকনিকাল ড্রইং-য়ের শিক্ষক ছিলেন বজলুর রহমান স্যার। আমরা যখন ক্লাশ নাইনে, স্যার তখন জয়েন করলেন। কলেজে সাবজেক্টটি মাত্র চালু করা হয়েছে। আমরা দ্বিধা দ্বন্দের মধ্যে ছিলাম। সাবজেক্টটি নেব কি নেব না ৷ নজরুল ইসলাম স্যার এলেন। সায়েন্সের ষ্টুডেন্টদের জীবনে এই সাবজেক্টের গুরুত্ব সম্পর্ক ছোটখাট বক্তৃতা দিলেন। এর পর পেলাম বজলুর রহমান স্যারের ক্লাশ। অত্যন্ত শান্ত ও নম্র মানুষ। অসীম ধৈর্য্য নিয়ে আমাদের সবকিছু বুঝাতেন। অল্প দিনের মধ্যেই স্যার এবং সাবজেক্ট উভয়ই আমাদের কাছে প্রীয় হয়ে গেল। এই সাবজেক্টে যা কিছু শিখেছি তা সবই আমার সারা জীবন কাজে লেগেছে, এখনো লাগছে।

ভাইস প্রিন্সিপাল হয়ে এলেন মাসুদ হাসান স্যার। তার আগের বছর এস.এস.সি পরীক্ষার ফল ভাল হয় নি। মাসুদ হাসান স্যার এসে যাদু করলেন। পরের বছর চমৎকার ফলাফল। তার পরের বছর তাক লাগিয়ে দিলেন, বোর্ডে সবচাইতে ভাল ফলাফল সিলেট ক্যাডেট কলেজের। ফলাফল যখন স্যারের হাতে এলো, স্যার টেবিল চাপড়ে বলছিলেন, “আমি ফৌজদারহাটকে হারিয়েছি”।

জসিবুর রহমান স্যার ছিলেন প্রাণীবিজ্ঞানের শিক্ষক। কথায় কথায় বলতেন “আমি তোমাদের বড় বড় ডাক্তার বানাতে চাই”। হয়ে ছিলও তাই স্যারের কল্যাণেই অনেকেই বড় ডাক্তার হলো। শাকিল ভাই এবং আমাদের ব্যাচের ডাঃ হাবিব এদরে মধ্যে উল্লখেযোগ্য। স্যার ছিলেন আমাদের ফর্ম মাষ্টার। আমাদের নিয়ে এক্সর্কাসনে যেতেন। পরিচিত করে দিতেন নানা রকম উদ্ভিদ ও প্রাণীদের সাথে। অবাক হয়ে শুনতাম স্যারের কথা। সেই স্যারের ছেলে এখন আমারই ছাত্র। উপরওয়ালার কি খেয়াল। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম র্পযন্ত জ্ঞান সঞ্চালিত করে দিচ্ছেন।

লেখক রফিক কায়সারের নাম শুনেছি অনেক। তিনি যখন আমাদের শিক্ষক হয়ে এলেন, আমাদের আনন্দ আর ধরে না। সাহিত্যের কত গভির বিষয় যে উনার কাছ থেকে শিখেছিলাম। মাঝে মাঝে পত্র পত্রিকায় স্যারের নাম দেখে খুব গর্ব হতো, যে উনার ছাত্র আমরা।

আবদুর রব স্যার ছিলেন ইসলামিয়াতের শিক্ষক। ধর্মীয় শিক্ষায় তিনি আমাদের শিক্ষিত করেছিলেন। আমাদের চেতনায় গেঁথে দিয়েছিলেন ইসলামের শিক্ষাকে। কলেজের এ্যাডজুটেন্ট ছিলেন খন্দকার ওবায়দুল আনোয়ার স্যার। এডুকেশন কোরের অফিসার ছিলেন। তাই হয়তো একটু নমনীয় ছিলেন। উনার গানের গলা চমৎকার আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম, সামরিক অফিসারের কন্ঠে গান। ক্যাডেটদের খুব ভালবাসতেন, বিদায়ের দিন ডাইনিং হলের সামনে দাঁড়িয়ে আন অফিসিয়াল একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। দেশপ্রেম কি, কোন পথ ধরে বাংলাদেশকে এগোতে হবে, কি হবে আমাদের দায়িত্ব , খুব সুন্দরভাবে আমাদের বুঝেিয় বলেছিলেন। তখনই বুঝতে পারলাম যে, ক্যাডেট কলেজের সাথে স্যারের গভির সম্পর্ক হবে। হয়েছিলও তাই, স্যার পরে সি.সি. আর এর প্রিন্সিপাল হয়েছিলনে। তারও পরে এ.এ.জি হয়ে ক্যাডেট কলেজগুলো খুব ভাল ভাবে পরিচালনা করেছিলেন । সেই স্যারের সাথে দেখা গত বৎসর । প্রায় বিশ বৎসর পর। আমি সানগ্লাস পরা অবস্থায় ছিলাম। স্যারকে সালাম করে বললাম, “স্যার চিনতে পেরেছেন?” স্যার আমাকে অবাক করে বললেন, তুমি রমতি আজাদ । ছয় বৎসরে দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে অনেক শিক্ষকদের সহচর্যে এসেছি ৷পিছনে ফিরে তাকালে মনে পরে, এক একটি উজ্জল নাম, আবদুল বারী স্যার, জায়েদুল আলম স্যার, মেজর আমীন স্যার, আলতাফুর রহমান স্যার, রয়িাজউদ্দনি প্রামানকি স্যার, কলেজের প্রথম শিক্ষয়ত্রী মুনিরা পারভীন, ওয়াহিদুর রহমান স্যার, চৌধুরী আনিসুর রহমান স্যার, বেলাল হোসেন স্যার, কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম স্যার, উপাধ্যক্ষ আবুল আশরাফ নূর । আমাদের সকলের জীবনে গভীর ছাপ রয়েছে প্রতিটি শিক্ষকের। তাঁরাই গড়ে তুলেছেন আমাদের জীবন। তাঁদের কল্যানে আমরা আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত।

আমাদের দেশের যে সামান্য কয়েটি জায়গায় মেধার মূল্যায়ন হয়, এর মধ্যে একটি হলো ক্যাডেট কলেজ । যে শিশুরা মেধা যাচাইয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, এখানে তাদের খতেে দয়ো হয়, কাপড় পরতে দেয়া হয়, সু-চিকিৎসা দেয়া হয়, পড়া লেখাতো শেখানো হয়ই, তার পাশপাশি আরো অনেক প্রশিক্ষনই এখানে দেয় হয়। অথচ তথাকথিত বুদ্ধিজীবিদের অনেকেই ক্যাডেট কলেজের বিরোধী। ক্যাডেট কলেজ বন্ধ করে দিলেই তারা খুশি হবে।

আমাকে একবার এক কম্যূনিষ্ট বলেছিল, যে ক্যাডেট কলেজ বন্ধ করে দেওয়াটাই উচিৎ, কেননা এখানে বিশেষ একটি শ্রেণী খুব ভাল আছে। আমি প্রশ্ন করেছিলাম, “বিশেষ একটি শ্রেণী মানে কি? ” “কম্যুনিজদের দৃষ্টিকোন থেকে শ্রেণী দু’টো, শ্রমিক শ্রেণী ও মালিক শ্রেণী, ক্যাডেট কলেজে এ জাতীয় কোন শ্রেণী ভেদ নেই। ক্যাডেট কলেজের দরজা সকলের জন্যই উম্মুক্ত। ”

ক্যাডেট কলেজ একটি মেরিট স্কুল । দেশের সেরা ছাত্রদের বাছাই করে, যথাযথ প্রশিক্ষন দিয়ে পটেনশিয়াল বিশেষজ্ঞ তৈরি করা হয় । এতে দেশের সামরিক ও বেসামরিক দুটি ক্ষেত্রই লাভবান হয় । অথচ এই ক্যাডেট কলেজের বিরোধীতা করছে একদল তথাকথিত বুদ্ধিজীবি । অবশ্য আমি ভিন্নমতের মানুষও দেখেছি ৷

বিদেশে অধ্যায়নরত সময়ে এক বাংলাদেশীর সাথে পরিচয় হয়েছিল, কট্টর কম্যূনিষ্ট, ক্যাডেট কলেজের ঘোর বিরোধী । ক্যাডেট কলেজ সর্ম্পকে তার ধারনা ছিল এটি একটি র্বুজোয়া প্রতিষ্ঠান ৷ আমার সাথে কিছুদিন চলাফেরার পর দেখলাম, হি ইজ ইমপ্রেস্ড। একদিন আমাকে প্রশ্ন করলেন, ক্যাডেট কলেজে ভর্তির নিয়ম কি ? আমি জানতে চাইলাম, “কেন?” বললেন, “ দেশে ভাতিজা-ভাতিঝি আছে ওদেরকে র্ভতি করাতে চাই ” । আর একদিন প্রশ্ন করলেন, “বাংলাদেশে ক্যাডেট কলেজ কয়টি ?” বললাম, “দশটি ” । উনি বললেন, “এর সংখ্যা বাড়ানো যায়না? ” আমি বললাম, “ক্যাডেট কলেজ ব্যায়বহুল প্রতিষ্ঠান, “ক্যাডেট কলেজ চালাতে যা খরচ হয় এই টাকা দিয়ে ছোটখাটো নদীর উপরে সেতু তৈরী করা যায় ” । তিনি বললেন, “সেতুর দরকার নাই, নৌকা চলবে , তাও ক্যাডেট কলেজের সংখ্যা বাড়ুক ” ।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গবেষণামূলক প্রকাশনা প্রকৌশল ও বিজ্ঞান বিজ্ঞান

Use of Mathematics in Business in the ancient and mediaeval Bangladesh

Use of Mathematics in Business in the ancient and mediaeval Bangladesh

Dr. Ramit Azad

Excavations at Mainamoti, Mohasthangar, Paharpur, Naogaon and other sites of Bengal civilization have uncovered evidence of the use of practical mathematics in Bangladesh. The people of Bangladesh of that period manufactured bricks whose dimensions were in a correct proportion. In these constructions they used regular geometrical shapes included hexahedra, cones, cylinders, etc. thereby demonstrating knowledge of basic geometry. The “Somapuri Vihara” at Paharpur site is said to have been the biggest Buddhist monastery in south of the Himalayas. The site consists of a large quadrangle of some 170 monastic cells set in a high wall/earthwork and looking inward to a 3 level Stupa now largely ruined but originally containing, presumably, Buddha statues in shrines set deep into each face of the structure. There are also various other structures within the quadrangle. A visit is likely to consist of a walk around the outer wall and then round each of the 3 levels of the stupa whilst taking in some of the other structures. Around the Stupa itself we can see examples of the terracotta “tiles” which decorated the walls of each level. These types of decorations are also found at “Salban Vihara” at Mainamoti.
From ancient to medieval period important contributions to mathematics were made by Bangladeshi mathematicians. Unfortunately original works of many of our mathematicians are lost. It is because of the almost 200 years’ repression of the British rule. However history keeps some of the names immortal. One of them is Sridhara
Sridhara is now believed to have lived in Bangladesh in the ninth and tenth centuries. However, there has been much dispute over his date and in different works the dates of the life of Sridhara have been placed from the seventh century to the eleventh century. The best present estimate is that he wrote around 900 AD, a date which is deduced from seeing which other pieces of mathematics he was familiar with and also seeing which later mathematicians were familiar with his work.
Sridhara is known as the author of two mathematical treatises, namely the Trisatika (sometimes called the Patiganitasara ) and the Patiganita. However at least three other works have been attributed to him, namely the Bijaganita, Navasati, and Brhatpati. Information about these books was given the works of Bhaskara II (writing around 1150), Makkibhatta (writing in 1377), and Raghavabhatta (writing in 1493). We give details below of Sridhara’s rule for solving quadratic equations as given by Bhaskara II.
There is another mathematical treatise Ganitapancavimsi which some historians believe was written by Sridhara. Hayashi in, however, argues that Sridhara is unlikely to have been the author of this work in its present form.
The Patiganita is written in verse form. The book begins by giving tables of monetary and metrological units. Following this algorithms are given for carrying out the elementary arithmetical operations, squaring, cubing, and square and cube root extraction, carried out with natural numbers. Through the whole book Sridhara gives methods to solve problems in terse rules in verse form which was the typical style of Indian sub-continental texts at this time. All the algorithms to carry out arithmetical operations are presented in this way and no proofs are given. Indeed there is no suggestion that Sridhara realised that proofs are in any way necessary. Often after stating a rule Sridhara gives one or more numerical examples, but he does not give solutions to these example nor does he even give answers in this work. In his book Pati Ganita Shridhara gave a good rule for finding the volume of a sphere. He dealt with various operations like elementary operations, extracting square and cube roots, fractions, eight rules given for operations involving zero, methods of summation of different arithmetic and geometric series.

After giving the rules for computing with natural numbers, Sridhara gives rules for operating with rational fractions. He gives a wide variety of applications including problems involving ratios, barter, simple interest, mixtures, purchase and sale, rates of travel, wages, and filling of cisterns. Some of the examples are decidedly non-trivial and one has to consider this as a really advanced work. Other topics covered by the author include the rule for calculating the number of combinations of n things taken m at a time. There are sections of the book devoted to arithmetic and geometric progressions, including progressions with a fractional numbers of terms, and formulae for the sum of certain finite series are given.
The book ends by giving rules, some of which are only approximate, for the areas of a some plane polygons. In fact the text breaks off at this point but it certainly was not the end of the book which is missing in the only copy of the work which has survived. We do know something of the missing part, however, for the Patiganitasara is a summary of the Patiganita including the missing portion.
In Shukla examines Sridhara’s method for finding rational solutions of Nx2 ± 1 = y2, 1 – Nx2 = y2, Nx2 ± C = y2, and C – Nx2 = y2 which Sridhara gives in the Patiganita. Shukla states that the rules given there are different from those given by other Hindu mathematicians.
Sridhara wrote on practical applications on algebra.
Babylonian mathematicians, as early as 2000 BC could solve a pair of simultaneous equations of the form
x + y = p, xy = q
Which are equivalent to the equation
X2 + q = px
Sridhara was one of the first mathematicians to give a rule to solve a quadratic equation. Unfortunately, as we indicated above, the original is lost and we have to rely on a quotation of Sridhara’s rule from Bhaskara II:-
Multiply both sides of the equation by a known quantity equal to four times the coefficient of the square of the unknown; add to both sides a known quantity equal to the square of the coefficient of the unknown; then take the square root.
To see what this means take
ax2 + bx = c.
Multiply both sides by 4a to get
4a2x2 + 4abx = 4ac
then add b2 to both sides to get
4a2x2 + 4abx + b2= 4ac + b2
and, taking the square root
2ax + b = √(4ac + b2).
There is no suggestion that Sridhara took two values when he took the square root.
Usually it is told that there is no original work on mathematics in Indian sub-continent in the 2nd millennium. But basically in that period the development of mathematics in this region occurred to some other directions namely computational mathematics and mathematical logic. Some Bengali mathematicians worked on mathematical logic.
Bengali mathematician Raghunatha Siromoni (1477-1547) was a philosopher and logician He was born at Navadvipa in present day Nadia district of West Bengal. He was the grandson of Śulapāṇi (c. 14th century CE), a noted writer on Smṛti from his mother’s side. He brought the new school of Nyaya, Navya Nyāya, representing the final development of Indian formal logic, to its zenith of analytic power.
Raghunatha’s analysis of relations revealed the true nature of number, inseparable from the abstraction of natural phenomena, and his studies of metaphysics dealt with the negation or nonexistence of a complex reality. His most famous work in logic was the Tattvacintāmaṇidīdhiti, a commentary on the Tattvacintāmaṇi of Gangeśa Upādhyāya, founder of the Navya Nyāya school.

Mathuranath Tarkavagish (c 1550) scholar of navya nyaya (new logic), was born at Navadwip, son of Sriram Tarkalankar, also a famous logician. Mathuranath studied logic under Rambhadra Sarvabhauma. Jagadish Tarkalankar, a renowned logician of the time, was his classmate and Harihar Tarkalankar, another renowned logician, was his pupil.
Mathuranath’s commentaries on new logic expanded the study of logic in Bengal. By virtue of his extraordinary wisdom and writing skill he won a distinguished place in learned society. Mathuri, his commentary on Chintamani, was very famous and regarded as an essential text for the study of logic. It is held in high esteem all over India. He also wrote commentaries and explanatory notes on a number of books by Raghunath Shiromoni, Udayan and Bardhamanopadhyay, among them Anumanadidhitimathuri, Gunadidhitimathuri, Dravyakiranavalitika, Dravyaprakashatika, and Gunaprakashavivrti. One of his original books was named Siddhantarahasya.
Jagadish Tarkalankar Nyaya philosopher and Sanskrit scholar from Navadwip in the 16th century. Jagadish Tarkalankar’s ancestors were originally from Sylhet, Bangladesh. His father, Jadavchandra Vidyavagish, was a nyaya scholar at Navadwip and his great-grandfather, Sanatan Mishra, was the father-in-law of Sri Chaitanya. Jagadish was taught nyaya scriptures at Bhavananda’s chatuspathi (religious school), where he became well-versed in nyaya philosophy and was awarded the title of ‘Tarklankar’.
Jagadish Tarkalankar was a college teacher. Mayukh, Jagadish’s annotation of Raghunath Shiromani’s Tattvachintamanididhiti is a four volume discourse: Pratyaksamayukh, Anumanmayukh, Upamanmukh and Shabdamayukh. He also wrote Anumandidhititika, Pratyaksadidhititika and Lilavatididhititika, annotations on Shiromani’s didhiti.
Jagadish’s Shabdashaktiprakashika was once taught as a textbook at all chatuspathi in Bengal. Two of his other books are Tarkamrta and Nyayadarshan. He was awarded the title of ‘Jagadguru’ for his scholarship.

Few words on business and mathematics:
Though the mathematization of economics began in earnest in the 19th century. Most of the economic analysis of the time was what would later be called classical economics. Subjects were discussed and dispensed with through algebraic means, but calculus was not used. One of the earliest use of mathematics was in trading.
Algebra is widely used in business. Since Sridhara was the first mathematician who made practical application of algebra, so it can be guessed that the use of algebra in business started then.
Muslin was bought by the pharaohs of Egypt. Weaving muslin cloth needed a good knowledge of measurement, where use of mathematics is vital.
First century B.C. to first century A.D. Kushan and Gupta era the trade became more developed. Use of currency spread over. The money-goods-money relation became a practice. The use of mathematics became important in this case.
The merchant fleet floated in the Bay of Bengal. They had their business in Sindh, Koromandal and Bengal. Trade items were silk, precious stones, spices, metal goods, clothes etc. The Bengalese had their sea trade with Ceylon, Malabar, Koromandal, Pegu, etc. during Mughal period. On the land way they had the business from Persia to Volga river. During the reign of Emperor Akbar there was a professional group called kusid who used to give money on interest. Mathematics played a role in calculation of this type of business. The Emperor Akbar also introduced ‘common system of measurement’ and ‘currency unit’.

Conclusion
So we see that the use of mathematics in business and trade was wide in ancient and medieval Bengal. The Bengali mathematicians made enormous contribution in world mathematics as well.

References

1. D Pingree, Biography in Dictionary of Scientific Biography (New York 1970-1990).
Books:
2. G G Joseph, The crest of the peacock (London, 1991).
Articles:
3. K Shankar Shukla, The Patiganita of Sridharacarya (Lucknow, 1959).
4. B Datta, On the relation of Mahavira to Sridhara, Isis 17 (1932), 25-33.
5. Ganitanand, On the date of Sridhara, Ganita Bharati 9 (1-4) (1987), 54-56.
6. T Hayashi, Sridhara’s authorship of the mathematical treatise Ganitapancavimsi, Historia Sci. (2) 4 (3) (1995), 233-250.
7. K Shankar Shukla, On Sridhara’s rational solution of Nx^2+1=y^2, Ganita 1 (1950), 1-12.
8. A I Volodarskii, Mathematical treatise Patiganita by Sridhara (Russian), in 1966 Phys. Math. Sci. in the East (Russian) ‘Nauka’ (Moscow, 1966), 141-159
9. A I Volodarskii, Notes on the treatise Patiganita by Sridhara (Russian), in 1966 Phys. Math. Sci. in the East (Russian) ‘Nauka’ (Moscow, 1966), 182-246.
10. A I Volodarskii, Outlines of the history of medieval Indian Mathematics (Russian), ‘Nauka’ (Moscow, 2009).
11. Bongard Levin, Antonova, Kotovski, History of India, Progress Publisher, Moscow,1982