Categories
কবিতা

কবিতা::::::: নীলাচল

অনেক উপরে আমি, বান্দরবনের
সুউচ্চ নীলাচল টিলায়
নিচে বহমান নদীর মতো
আকাঁবাকা হয়ে নেমে গেছে
সরু র্কাপেটের উচু-নিচু রাস্তা।

শহরের বুকে বড় বড় ইমারত
কিংবা খুঁড়ে ঘরগুলোকে মনে হচ্ছে
তরে তরে সাজানো ঠিক বাচ্চাদের খেলাঘর
সৃষ্টি সেরা মানুষগুলোকে উপর থেকে
দেখায় তখন পিঁপড়ার মতো।

যতদুর চোখ যায়, বিস্থীর্ণ প্রান্তর
জুড়ে সবুজের মিলন মেলা
বাতাশের শীতল ঝাপটা আর মেঘের
আলো-ছায়ার মুগ্ধতায় হৃদয়ের
বদ্ধ বাতায়ন খোলে যায়।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা আত্ম উন্নয়ন ইসলামধর্মীয় খ্রীষ্টধর্মীয় গবেষণামূলক প্রকাশনা ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা বৌদ্ধধর্মীয় হিন্দুধর্মীয়

আমাদের ধর্ম ও সৌহার্দতা

— সাকি বিল্লাহ্

 

ইদানিং কালে একটা ব্যাপার লক্ষ্যনীয়, কিছু অতি উচ্চমর্গীয় বা উচ্চবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ বলছে, জীব হত্যা বা ভক্ষণ করা যাবে না, গো হত্যা বন্ধ করতে হবে ইত্যাদি । যারা বলেন তারা জীব হত্যার বিপক্ষে অথবা নিরামিষভোজী বলা যেতে পারে ।

ভাল কথা ।

তবে বিষয়টা নিয়ে বাংলাদেশী বিজ্ঞানী (আমাদের গৌরব) জগদীশ চন্দ্র বসু স্যারের কথা মনে পড়ে গেল । গাছের প্রাণ আছে এবং তারাও মানুষ বা অন্যান্য প্রাণীর মত সকল জৈবিক কাজ করতে পারে এটা তিনি-ই প্রথম প্রমাণ করেছেন । বলা বাহুল্য তিনি একজন হিন্দু (বেদান্ত) ছিলেন ।

 

ডা. জাকির নায়েকের মত তাহলে বলতে হয় গাছের তো প্রাণ আছে তাহলে তাদেরও তো খাওয়া যাবে না । মনুষ্য জাতি তাহলে কি খাবে? বরং জীব হত্যার চাইতে গাছ হত্যা আরো বেশি শাস্তিযোগ্য অপরাধ । জীবের চাইতে গাছ বেশি কস্ট সহ্য করে যেমন, সে কথা বা শব্দ অথবা নড়াচড়া করতে পারে না, ধরুন আপনার দুইজন ভাই আছে, একজনের শারীরিক কোন সমস্যা নাই আর অন্য জনের শরীর পক্ষাঘাতগ্রস্ত বা বিকলাঙ্গ, কথা বলতে পারে না, চলতে পারে না, খাবার দিতে হয় সেলাইনের মাধ্যমে, কানে শোনে না; এই দুই ভাই এর ভিতর যদি সুস্থ ভাইকে কোন খুনী হত্যা করে তাহলে আপনি যতটুকু কষ্ট পাবেন তার চাইতে অসুস্থ বোবা ভাইকে হত্যা করলে অনেক বেশি কষ্ট পাবেন এটাই স্বাভাবিক বরং আদালতে গিয়ে আপনি বিচারকের কাছে বলবেন, আমার অসহায় প্রতিবন্ধী ভাইকে বিনা কারনে হত্যা করা হয়েছে তাই এর দৃস্টান্ত মূলক শাস্তি চাই ।

 

গাছের বেলায়ও তাই, পশু হত্যার চাইতে গাছ হত্যা করা আরো বড় অপরাধ(নিরামিষভোজীদের মতে যেহেতু জীব হত্যা পাপ) । তাহলে জীবন রক্ষার জন্য আমরা জীব হত্যা করবো নাকি গাছ হত্যা করবো সেটা একটা বিবেচ্য বিষয় ।

 

জ্ঞানীরা চুপ থাকে আর মূর্খরা তর্ক করে ।

বাঘ কখনও ঘাস বা লতাপাতা খেয়ে জীবন ধারণ করতে পারবে না, অন্যদিকে হরিণ তৃনভোজী প্রাণী । বাঘকে বেঁচে থাকতে হলে মাংস খেতে হবে আর হরিণ খাবে তৃণজাতীয় উদ্ভিদ এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম । তেলাপোকা সর্বভূক প্রাণী মানে সে সব কিছু খেতে পারে অনেকটা মানুষের মত । যেসকল প্রাণী সব কিছু খেতে পারে তাদের পৃথিবীতে টিকে থাকার সম্ভাবনা বেশি থাকে ।

ছোটবেলায় বই পুস্তকে সবাই পড়েছেন খাদ্য শৃঙ্খল বা খাদ্য চক্র । কে কাকে খাবে সেটা প্রাকৃতিক ভাবে নিয়ন্ত্রিত আরো স্পষ্টভাবে বলতে গেলে স্রস্টার দ্বারা নির্ধারিত ।

 

স্রস্টা যদি বাঘের উপর সুবিচার করে তাহলে হরিণকে জীবন দিয়ে বাঘের ক্ষুধা তথা জীবন বাঁচাতে হবে আর যদি হরিণের উপর দয়া করে তাহলে হরিণের জীবন বাঁচে কিন্তু বাঘের জীবন বিপন্ন হবে । তাই স্রস্টা একটি খাদ্যচক্র তৈরী করে দিয়েছেন আর সে চক্রে মানুষও একটি জীব । সে মাংশ খাবে অথবা গাছ খাবে এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার বা ধর্মীয় ব্যাপার । তবে বিজ্ঞানীদের মতে মানুষের বুদ্ধির বিকাশ হয় আগুনে ঝলসে যাওয়া মাংস খাওয়ার পর থেকে । মাংসে বেশ কিছু ভিটামিন ও অন্যান্য উপকারী উপদান আছে যেগুলো উদ্ভিদ থেকে পাওয়া যায় না, যেমন ভিটামিন বি-১২, ক্রিয়েটিন, কারনোসাইন, ওমেগা-৩( DHA & EPA), বিশেষ কিছু এমাইনো এসিড(প্রোটিন) ইত্যাদি ।

অনেক সময় নিরামিষভোজীদের শরীরে উপরোক্ত খাদ্য উপাদানগুলোর অভাব দেখা দেয় আর তখন তারা স্বরনাপন্ন হয় ডাক্তারের কাছে, ডাক্তার তাদের কৃত্তিম যে ভিটামিন বা খনিজ উপাদানের বড়ি বা ট্যাবলেট দিয়ে থাকে তা আসলে তৈরী হয় এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার গাঁজন প্রক্রিয়ায় আর কিছু আসে মাছ ও পশু থেকে । আর এই ভিটামিন বড়ি গুলো তৈরী করা হয় বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান দ্বারা; যেহেতু আপনার মস্তিষ্ক ও শরীর ঠিক রাখতে হলে এই ভিটামিন গুলো প্রয়োজন, তাই হয় সরাসরি প্রাণীর মাংস খেয়ে বা কৃত্তিম ভিটামিন খেয়ে (যা ব্যাকটেরিয়া ও প্রাণী হতে আসে) আপনাকে সুস্থ থাকতে হবে । যদি কৃত্তিম ভিটামিন বড়ি খান তাহলে ক্যানসার, কিডনির সমস্যা, স্নায়ুবিক দুর্বলতাসহ নানা ধরনের প্রদাহ দেখা দিতে বাধ্য । আবার উভয় ক্ষেত্রেই কিন্তু পশু হত্যা হচ্ছে ।

 

মূল প্রসঙ্গে ফেরা যাক, কে কি খাবে না খাবে এটা যার যার ব্যাক্তিগত বিষয় তবে অন্যেরা কি খাবে না খাবে তা নিয়েও হাস্যকর কাজ বা মন্তব্য করা উচিত নয় ।

 

হাজার বছর ধরে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানদের নিয়ে একসাথে বসবাস করা আমাদের এই বাংলাদেশ আর বাঙ্গালী সংস্কৃতি ।

এখানে কিছু কুচক্রী ধর্মীয় সৌহার্দ নস্ট করার অপচেস্টা করছে, আমাদের উচিত ঐসকল মানুষদের এড়িয়ে চলা । ১৯৪৭ সনে যখন দেশ ভাগ হয় তখন, পাকিস্তানী ও ভারতীয় কিছু স্বার্থাণ্বেষী রাজনীতিবিদ আমাদের দেশটাকে চিরে টুকরো টুকরো করে দিয়েছিল ধর্মীয় দাঙ্গা লাগিয়ে । হাজার হাজার বছরের বাংলাদেশকে, ছিন্নভিন্ন করে দেয়া হল । সেভেন সিস্টার নামে যে অংশগুলো বাংলার সাথে ছিল সেগুলো সমেত যদি দেশ হয় তাহলে তা পাকিস্তান কিংবা ভারতের চাইতে আকারে অনেক বড় হয়ে যায় তাই ব্যাপারটা গান্ধী কিংবা জিন্নাহ কেউই মেনে নিতে পারেনি । শেরে বাংলা অবিভক্ত বাংলাদেশ এর কথা উপস্থাপন করলেও তা ধোপে টেকেনি ।

 

ভারতে কিছুদিন পর পরই হিন্দু মুসলিম দাঙ্গায় নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায় । দুস্ট রাজনীতিবিদদের হিংসাকে চরিতার্থ করতে ধর্মযুদ্ধ একটি হাতিয়ার মাত্র ।

বাংলাদেশে সকল ধর্মের মানুষ একসাথে কোন ধরনের সমস্যা ছাড়াই ভালভাবে থাকছে, চাকুরী করছে, ব্যাবসা করছে এটা কিছু হিংসুকের বিশেষত প্রতিবেশী দেশগুলোর সহ্য হচ্ছে না । আমাদের কিছু দালালদের মাথা কিনে তাদের দিয়ে দেশের মানুষের ভাই ভাই সম্পর্ক নস্ট করার অপচেস্টা চালানো হচ্ছে । সে অপচেস্টাকে কিছুতেই সমর্থন করা যায় না ।

বাংলাদেশের মানুষ শান্তি প্রিয় এবং সকল ধর্মের মানুষ আমরা সবাই বাংলাদেশী এটাই হোক আমাদের প্রথম পরিচয় । আর সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, যার যার ধর্ম তার তার কাছে । নিজের ধর্মকে সবাই বড় মনে করে তাতে দোষের কিছু না কিন্তু অন্যের ধর্মকে ছোট করা ক্ষমাহীন অপরাধ ।

যে অন্যের ধর্মকে শ্রদ্ধা করতে জানে না সে নিজের ধর্মকেও শ্রদ্ধা করতে শেখেনি ।

 

তাই সকল ধর্মের বাঙ্গালীদের বলছি, অন্যের ধর্মকে শ্রদ্ধা করুন তাহলে সে বা তারাও আপনার ধর্মকে শ্রদ্ধা করতে শিখবে আর মনুষ্যরূপী শয়তান হতে সাবধান থাকবেন যারা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে কারণ ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করা হয়েছে প্রায় সকল ধর্মেই । ইসলাম ধর্মেও আছে তোমরা কখনও ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না বা অবিশ্বাসীদের সাথে কুতর্কে লিপ্ত হইও না ।

 

পরিশেষে কোরআ’নের আলোকে ধর্ম ও আমাদের সৌহার্দতা নিয়ে কিছু আয়াত উপস্থাপন করছি যাতে বিষয়টা আরো সুস্পস্ট হয়ঃ

সূরা আল বাক্বারাহ এর ২৫৬ নাম্বার আয়াতে উল্লেখ আছে,

“দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি বা বাধ্য-বাধকতা নেই। নিঃসন্দেহে হেদায়াত গোমরাহী থেকে পৃথক হয়ে গেছে। এখন যারা গোমরাহকারী ‘তাগুত’দেরকে মানবে না এবং আল্লাহ‘তে বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে ধারণ করে নিয়েছে সুদৃঢ় হাতল যা ভাংবার নয় । আর আল্লাহ সবই শুনেন এবং জানেন।” ।

এ ছাড়াও কোরআ’নের বিভিন্ন আয়াতে উল্লেখ আছে,

“আহবান করো সকলকে তোমার বিধাতা প্রতিপালকের পথে- পান্ডিত্যপূর্ণ সুন্দরতম বাগ্মীতার সাথে। আর যুক্তি প্রমাণ দিয়ে আলোচনা করো তাদের সাথে এমনভাবে, যা সর্বোত্তম (এবং সে আহবান হতে হবে এমন হৃদ্যতাপূর্ণ যেন কোন পাষাণ হৃদয়ের কাছেও তা গ্রহণযোগ্য হয়)।” আল কুর’আন (১৬:১২৫)

“…যারা ধর্ম সম্পর্কে নানা মতের সৃষ্টি করেছে ও বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে তাদের কোন কাজের দায়িত্ব তোমার নেই, তাদের বিষয় আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত।…” –আল কোরআন (সুরা আনআমঃ১৫৯)

“…হে কিতাবিগণ! তোমরা তোমাদের ধর্ম নিয়ে অন্যায় ভাবে বাড়াবাড়ি করোনা…” –আল কোরআন (সুরা মায়িদাঃ৭৭)

“…(ধর্ম সম্পর্কে) বিদ্রূপকারীদের বিরুদ্ধে আমিই (আল্লাহ) আপনার জন্য
যথেষ্ট…” –আল কোরআন (সুরা হিজরঃ৯৫)

“…যদি তারা আত্মসমর্পণ (আল্লাহর কাছে) করে তবে নিশ্চয়ই তারা পথ পাবে। আর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তোমার কাজ তো কেবল প্রচার করা। আল্লাহর দৃষ্টিতে রয়েছে সকল বান্দা।”–আল কোরআন
(সুরা আল ইমরানঃ২০)

“…তারপর ওরা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে তোমার কর্তব্য তো শুধুমাত্র স্পষ্ট বাণী পৌঁছে দেয়া…”–আল কোরআন (সুরা নাহলঃ৮২)

“…তুমি মানুষকে হিকমত ও সৎ উপদেশ দিয়ে তোমার প্রতিপালকের (আল্লাহর)পথে ডাক এবং তাদের সাথে ভালভাবে আলোচনা কর। তাঁর (আল্লাহর) পথ ছেড়ে যে বিপথে যায় তার সম্পর্কে আল্লাহ্ই ভাল জানেন, আর যে সৎ পথে আছে তা-ও তিনিই ভাল করে জানেন”
– আল কোরআন (সুরা নাহলঃ১২৫)

“…তোমাদের কাজ তো কেবল প্রচার করা, আর হিসাব-নিকাশ তো আমার কাজ…” –আল কোরআন (সুরা রাদঃ৪০)

“…আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য এবাদতের নিয়ম কানুন নির্ধারিত করে দিয়েছি যা ওরা পালন করে… তুমি ওদেরকে তোমার প্রতিপালকের দিকে ডাক… ওরা যদি তোমার সাথে তর্ক করে তবে বল, ‘তোমরা যা কর সে সম্পর্কে আল্লাহ্ ভাল করেই জানেন। তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করছ আল্লাহ্ কিয়ামতের দিন সে বিষয়ে তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেবেন…” –আল কোরআন (সুরা হজঃ৬৭-৬৯)

 

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, কোরআ’নে কঠোরভাবে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং কাউকে ইসলাম সম্পর্কে বোঝাতে হলে বিনয়ী হতে বলা হয়েছে । যদি কেউ ইসলামকে বিদ্রুপ করে, বিমুখ হয় বা কেউ নাস্তিকতা প্রদর্শন করে তাহলে তার ব্যাপারে আল্লাহ নিজে ব্যাবস্থা নিবেন বলে হুঁশিয়ারী করে দিয়েছেন তথাপি আমাদের ভিতর কিছু অতি উৎসাহী কট্টর পন্থী আছে যারা কোরআ’ন তথা আল্লাহর বানীকে মানতে নারাজ । যদিও আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন অন্য ধর্মের মানুষদের সাথে বিনয়ী হতে তবুও তারা তাদের প্রতি কঠোর ।

পাঠকগণ নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিবেন কোনটা ভাল আর কোনটা খারাপ আমি শুধু সবাইকে স্বরণ করিয়ে দিলাম যে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি কোন সুফল বয়ে আনতে পারে না ।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা কবিতা দুঃসাহসিক সৃজনশীল প্রকাশনা

ফাঁসি

——-সাকি বিল্লাহ্

কি কারন কি জানি কি হল
মনের গহীনে অভিশম্পাত ঝরিল
দূর মেঘের গর্জনে
আত্মাহুতি দিল হৃদয় বিসর্জনে
কেন এ ভোগান্তি কেন বিরহ
বুকের আগুন মিটাল তাই আত্মাহুতি সহ
রাতের বেলায়, নিঝুম রাতের বেলায় তাই
কমলা করে তার জীবন উৎসর্গ কেন ?
কেহ জানে নাই ।

কি কারন কেন ফাঁসিরে আসন দিলো
কেহ জানে না তবে অভাগীর বিবেক মানিল
ফাঁসি হয়ে ঝুলে ছিলে কমলা
সহজ সরলা গ্রাম্য মেয়ে এক চঞ্চলা
রাতের নিভূতে যখন সব ঘুমে
জেগেছিলে বিদায় দিতে এই ধরনী সমে
হাতে নিয়েছিলে লম্বা দড়ি
গলে পড়বে বলে
মৃত্যুর দুয়ারে দাড়ায়ে মন কি
কাঁপিল দুর্বলে?

গলায় পড়বে বলে জানি কত অপেক্ষা
কেন এই অভিমান আসলে কিসের অভীক্ষা
ফাঁসির সিংহাসনে তাই কমলা
কমলা গ্রামের মেয়ে সহজ সরলা
ফাঁসি,ফাঁসি, চোখে তার ঘৃনার হাসি
কিসের সে ব্যথা, আর অপমানের রাশি
কিসের সে ক্ষোভ ? না জানি
কেন এ ফাঁসি ?
না মানি ।

হাতের দড়ি সাথে লয়ে তাই
হাটিছে কমলা নীরব রাতে সেই
স্কুলের পাশে বিশাল বটবৃক্ষের কাছে
কমলা হাতে দড়ি, থামিল নীচে
কাঁদিল কমলা, কাঁদিল ভুবন আর
কাঁদিল ঝিঁঝিঁ পোকারা
চোখের পানি শুন্য করে কাঁদিল সব মেঘেরা
হেরিল বাতাস বৃটবৃক্ষের পাতায় মৃত্যুর সমন
শুনশান নীরবতায় হল ছন্দপতন

লক্ষ্মী পেঁচা হুতোম বারণ করেছিল বুঝি
বাদুড়েরা ছিল কাল স্বাক্ষী কমলার ফাঁসি
ঝটপট গাছে উঠি পড়ি
শক্ত করে বেধেঁছে দড়ি
কমলা বুঝি বিদায় নিতে রাজি
কেন এই ফাঁসি, কেন জীবন বাজি
পাতার শব্দে যোগ হল নতুন শব্দ
ধস্তাধস্তি আর নিশ্বাসের শত অব্দ
কতকাল এভাবে কমলা জানে না
ঝুলে ছিল বটডালে
বিদায় নিল কমলা সেই রাতে
যেতে হবে না আর স্কুলে

মা ডাকিছে, বাবা ডাকিছে, চোখ নাহি মেলে
কমলা সবেরে অন্ধ করে দূরে গেল সরে চলে
কি জানি কেন ফাঁসি দিল সে জানতে
পারলাম পরে
রাস্তার ধারে বখাটেদের অতীব অত্যাচারে ।

স্কুলে যেতে হতো তাকে উপদ্রব শুনে শুনে
রাস্তার ধারে মানুষ গুলো মজা দেখে সর্বক্ষণে
বখাটেরা তাই সাহস যোগাল দিনে দিনে
কমলা কে করিল বধ্ আদিমতা বিধানে
কেহ না জানিল কি করিল ক্ষতি সাধন
কমলা সহজ সরলা দান করিল নিজ জীবন
কি কারন ফাঁসি, সবে জানিল ক্ষণে
বখাটেরা কি পাবে শাস্তি সমনে
ধূর্ত সমাজ ধ্বংস করে সব সাদামন
শাসকের আসনে বসায়ে তোরে করেছি জাতিরে অপমান

কমলার ঋণ শোধরানো গেছে
বখাটেদের শাস্তি হয়েছে
কিন্তু হাজার কমলা যারা এই সমাজে আছে
তাদের সবার ঋণ কি শুধরানো গেছে
যদি তা না হয়
তবে কিসের এত ভয়
হাতটি তোমার কলমের জোড়
তুলে নাও তোল সমুদ্রসম ঝড় ।।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা আত্ম উন্নয়ন কবিতা পরিবেশ ও বন সৃজনশীল প্রকাশনা

একজন এক’শ বছরের বুড়ো

–সাকি বিল্লাহ্

আমি একজন এক’শ বছরের বুড়ো
বুড়ো থুড় থুড়ো,
হাতের কুঁচকানো শুকনো চামড়,
ঝুলে আছে থুতনির ভাজে পড়া অসাড় ।
মস্তকের গুটি কয়েক চুলের উঁকি দেয়া,
প্রান্তিক ভাগে আছে শেওলা ধরা ছাঁয়া ।

আমি দেখেছি শত পাখির উড়ে যাওয়া,
দেখেছি শত বুনো হাঁসের জলকেলি খেওয়া;
আমি বুড়ো এক’শ বছরের বুড়ো,
চামড়া কুঁচকানো বুড়ো থুড়থুড়ো ।

রাতের অভিসারে গাছের সাথে মাখামাখি,
বাতাসের ভেলা যেন মুঁদেছে দুটি আঁখি;
ঘন বনে দেখেছি কত জোনাকির খেলা,
সারারাত গান গেয়ে ক্লান্ত ভোর বেলা;
বাঁশ ঝাড়ের পেঁচাটা কেঁদেছে ঘনঘন,
সাক্ষী শুধু এই বুড়ো, পেঁচার প্রিয়জন ।

শত বছরে আমি দেখেছি শত মানুষ,
দেখেছি তাদের ধ্বংস লীলা আর ফানুস;
মানুষ নামের ধারক হয়ে বধেছি কত প্রাণ,
ধ্বংস করেছি মনুষত্ব আর আত্মসম্মান;
প্রকৃতি গ্রাসী নরমাংসী এই মানুষী,
শত বছরে বদলায়নি একটুখানি অমানুষী;
আমি তাই একজন অতীকায় বুড়ো,
মানুষ না পরিচয়ে বলি বুড়ো থুড়থুড়ো ।

আমি দেখেছি স্বদেশী, দেখেছি একাত্তর,
দেখেছি মায়ের রক্ত ত্রিবেদী ১৯৫২’র;
অগ্নি ঝরা দুপুরে কিংবা রাতের নিঃশব্দে,
দেখেছি দামাল মুক্তি সেনাদের যুদ্ধশত অব্দে;
অরুন তরুণ দামাল ছেলে দেখেছি তাদের যুদ্ধ,
মায়ের মান রাখতে যারা বরণ করেছে মৃত্যু ।

শত বছরের বয়সের ভারে হয়েছে দেহ অসাড়,
জ্ঞান আর ইতিহাসে হয়েছে নত শির আমার;
জ্ঞানের ডালে বসে সে ইতিহাসের পাখি,
কথা বলে আজও মুক্ত পাতার আঁখি ।

হাজার দিনে উঠেছি সকালে মোরগের ডাক শুনে,
ঘরে ফিরেছি সান্ধ্য আযানের আহবানে;
হাজার ক্রোশ হেঁটেছি আমি যেতে বহুদূরে,
দুপাশে ছিল মুক্ত বনের গাছের সারি জুড়ে;
এখন মানুষ জ্ঞান আহড়নে পুজিছে কলকব্জা,
পুজিবে গাছেরে সময় কোথায় নীতিহীন এই রাজা ।

বিংশ অব্দে জ্ঞান সমুদ্রে ভেসে ভেসে,
শত বছরের বুড়োর ঝাপসা চোখের দৃশ্যে,
দেখছি আমি ধুলো মাখা প্রিয় ধরণীকে,
সবুজ হারিয়ে নরক ধুসর রং-এ তোমাকে;
দেখছি আর ভাবছি তোমার ধৈর্যশৈলী মনটি,
গো গ্রাসে কেন গিলছো না সবের নরমুন্ডি ।

আজ এত বছর পর যখন পথে পথে ঘুরি,
দেখি না বনের সবুজ আর গাছ গাছারি,
ঝোপের আড়ালে বসে থাকা কাকাতুয়া,
হারিয়ে গেছে বনের সাথে গোধূলির সাজ নিয়া ।

এখন শুধু বসতির বন চারিদিকে,
সবুজ মিশিয়া ইটের দালান সবদিকে;
ঝাপসা চোখের ঝাপসা চাহনিতে,
দেখছি আমি ধ্বংস হচ্ছে মানুষ অহমিতে;
মোরগের ডাক শুনিনা এখন গাড়ির হর্ণ বাজে,
তোমাদের কাছে সুমধুর লাগে, আমার লাগে বাজে;
তাই আমি ভুলতে চাই তোমাদের মায়া,
ভগ্ন শরীরে অপেক্ষায় আছে আমার কায়া;
শূন্য দাঁতের হাসি দিতে করি না কার্পণ্য,
আমি বুড়ো থুড়থুড়ো, নতুনের কাছে নগণ্য ।

এখনও সময় আছে, এখনও আছে উপায়,
পোঁড়ামাটি ছেড়ে ভুলো সজীব মাটির মায়ায়;
আমি একজন এক’শ বছরের বুড়ো, অতীব বুড়ো,
বুড়ো থুড় থুড়ো ।।

folk singer of bangladesh by Syeda Oishee

Categories
গবেষণামূলক প্রকাশনা প্রকৌশল ও বিজ্ঞান বিনোদন

বেনারসি শাড়ি ও জন্মনিরোধক বেলুন পর্ব ১

জন্ম নিরোধক বেলুন ‘ডিলাক্স নিরোধ’-এর বিজ্ঞাপন ভারতের শহরে ও গ্রামে- পেয়ার হুয়া, একরারহুয়া, পেয়ার সে ফের কোই ডরতা হ্যায় দিল (প্রেম হয়েছে, সম্মতিও দিয়েছে, তাহলে অন্তরে আর ভয় কিসের?)। সুতরাং পঞ্চাশ পয়সায় তিনটি কিনে এখনই মাঠে নেমে পড়ুন।

মূল্য যত কম, অভাব তত বেশি- অর্থনীতির মূল সূত্রে আঘাত করছে অতি সস্তা জন্মনিরোধক কনডম। এই লক্ষণ কেবল ভারতে নয়, অন্যান্য দেশেও, বাংলাদেশেও।

 

কনডমের বিচিত্র চাহিদা। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ও শিল্পের চাকা ঘোরাতে। জন্মনিরোধক কনডম প্রচলনের প্রথম পর্যায়ে এর অন্যতম ব্যবহার দেখা যেত বেলুন হয়ে আকাশে ওড়ার মধ্য দিয়ে।

পশ্চিম থেকে অনুদান হিসাবে আসা কনডমকেও এক সময় সন্দেহের চোখে দেখা হত- আমাদের জনবল কমিয়ে দেওয়ার পশ্চিমা ষড়যন্ত্র হিসাবে। নিরোধকবিরোধী ধর্মীয় অনুশাসনও ছিল- ক্যাথলিক ‘আপত্তি’ এখনও রয়েই গেছে। সুতরাং মূল কাজকে পাশ কাটিয়ে অন্য কাজে লাগাতে সমস্যা কী? ভর্তুকি দিয়ে সরবরাহ করা এই বেলুনের ‘বেলুন হিসাবে’ ব্যবহার রোধ করা খুব একটা সহজ কাজ ছিল না। ছেলেমেয়ে ঘিয়ে রঙের বেলুন ফুলিয়ে সুতোয় বেঁধে আকাশে ওড়াচ্ছে, আর বাবা-মা ও বিবাহযোগ্য ভাইবোন বিব্রত হচ্ছে- এটা ছিল গত শতকের ষাট ও সত্তর দশকের একটি সাধারণ চিত্র। ভর্তুকির বেলুন কিংবা বিনামূল্যে পাওয়া বেলুন দু-চার পয়সায় বিক্রি করতে পারলেও মন্দ কী- সুতরাং মুদি দোকানদারও একটি বাড়তি বাজার পেয়ে যায়। বেলুনটা টেকসই, দামটা কম এবং দোকানদারও বেচতে রাজি- সুতরাং শখ করে প্রাইমারি স্কুলের ছাত্রও দু-একটা কিনে নিয়েছে।

 

একবার ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কের কাছে ভাওয়াল বনাঞ্চলে আবিষ্কৃত হয় বিপুল পরিমাণ কনডম। বিতরণের ঝামেলা এড়াতেই পরিবার পরিকল্পনা কর্মী জঙ্গলে ফেলে এসেছে। আর নিশ্চয় পূর্ণ বিতরণ ও ব্যবহারের প্রতিবেদন সরকারের কাছে দাখিল করা হয়েছে। পুরুষ প্রাণী এসবের সঠিক ব্যবহার জানলে অরণ্যে অনেক আগেই প্রাণীর জন্য হাহাকার পড়ে যেত।

এই নিবন্ধটি জন্ম-শাসন কিংবা ঘাতক ব্যাধি এইডস প্রতিরোধে কনডমের ভূমিকা নিয়ে নয়- কনডমের অপব্যবহার ও বিচিত্র ব্যবহার নিয়ে।

বেনারসি উপাখ্যান

ভারতের সিল্ক রাজধানী বারানসি শহরে কনডমের চাহিদা সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। চাহিদা বিবাহিত সক্ষম দম্পতি এবং অবিবাহিত জোড়ের মোট চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি। কেবল বেনারসি শাড়ির পেছনে প্রতিদিন ব্যবহার করা হচ্ছে ৬ লাখ কনডম। তাঁতে মাকুর চলাচল অবাধ করতে গিয়ে তাঁতিরা ব্যবহার করছে কনডমের পিচ্ছিল লুব্রিক্যান্ট। প্রতিটি তাঁতের প্রতিদিনের চাহিদা চার থেকে পাঁচটি কনডম। পিচ্ছিলকারক এই তরলের একটি বিশেষ গুণ হচ্ছে দামি শাড়িতে এটা কোনও ধরনের দাগ রেখে যায় না।

 

প্রথম দিকে কনডমের ব্যবহার চুপিসারে হলেও এখন তা প্রকাশ্য চর্চা হিসাবে স্বীকৃত হয়েছে। একটি শাড়িতে, একজন দক্ষ তাঁতি মনে করেন, চৌদ্দটির বেশি কনডম লাগা উচিত নয়।

 

ভারতীয় বেনারসি শাড়িতে শরীর পেঁচানো একজন বাংলাদেশি সুন্দরী রমণী একবার কি ভেবে দেখবেন তার শাড়িতে রয়েছে চৌদ্দটি কনডমের স্পর্শ।

 

বেনারসির চাহিদা কমার কোনও লক্ষণ নেই। তাঁতের সংখ্যাও বাড়ছে। কেবল ভারানাস শহরে তাঁতের সংখ্যা দুই লক্ষ। তাঁতিদের মতে এমন সসত্মা ও নিদাগ লুব্রিক্যান্ট আর নেই। বিবিসি কনডম ও বেনারসি শাড়ি নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রামাণ্য চিত্রও প্রদর্শন করেছে। চিত্রটির নাম কনডম ঘোরায় শিল্পের চাকা। এক সময় বাংলাদেশ থেকেও ভারতে কনডম চোরাচালান হয়েছে। তাঁতিরা বরাবরই আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসাবে বড় ধরনের মজুদ নিশ্চিত করে। সরকার আইনি হস্তক্ষেপও তেমন কাজে আসছে না।

 

বারানসির তাঁতি বাঁচাও আন্দোলনের একজন অন্যতম আহ্বায়ক মাহফুজ আলম বলেছেন- সরকারের অফিসাররা সতর্ক হলে শাড়িতে কনডমের ব্যবহার কমবে। তারাই পরিবার পরিকল্পনা কর্মীদের বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে সরাবরাহ করে থাকে কিন’ মনিটর করে না।

 

কর্মীরা এনে দোকানে বিক্রি করে দেয় আর তাঁতিরা দশ টাকায় এক ডজন রেটে দোকান থেকে কিনে নেয়। কাজেই পুলিশ দিয়ে তাঁতিদের হয়রানি করার কোনও মানে নেই।

 

পুরনো প্রজন্মের তাঁতিরা অবশ্য কনডম হাতে নিতে চায় না। কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে এ নিয়ে কোনও সংস্কার নেই। লাভ হলেই হলো। তাঁতিদের কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন রমণীরা কনডমের ব্যবহারটা জেনে গেলে হয়তো শাড়ির বাজার ধসে যেতে পারে। বাস্তবতা হচ্ছে ভারতের শিক্ষিত মহিলারা ব্যাপারটা জেনে গেছে। কিন্তু বাজার সঙ্কুচিত হয়নি।

 

বাহারি ব্যবহার

কনডম গবেষকদের ধারণা হাজার বছর আগেই কনডম ব্যবহার হয়েছে কিন্তু ভিন্ন উদ্দেশ্যে। অরণ্যচারী মানুষ বনে-বাদাড়ে ঘুমিয়ে পড়লে বিষাক্ত কীট-পতঙ্গ যাতে এই নাজুক অঙ্গটির ক্ষতি সাধন না করতে পারে সে জন্য শিশ্ন-পেঁচানো ছাল-বাকল ব্যবহার করত। নদী পারাপারের প্রয়োজনে কিংবা মাছ ধরার সময় জোঁকের হাত থেকে এই অঙ্গটি রক্ষার প্রয়োজনে এ ধরনের পোশাকের ব্যবহার হতো।

 

চারশ বছর আগেও ছাগলের অন্ত্র থেকে তৈরি কনডম যৌন প্রয়োজনেই ব্যবহার করা হতো বলে মনে করা হয়। গ্যাব্রিয়েল ফ্যালোপ্পিওর লেখা সিফিলিস বিষয়ক একটি অভিসন্দর্ভে উল্লেখ করা হয়েছে লিলেনের খাপ একটি বিশেষ রাসায়নিক দ্রবণে চুবিয়ে যৌনকর্মের সময় তা ব্যবহার করলে সিফিলিসের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। এই খাপটি ওপরে একটি রিবন দিয়ে বাঁধা হতো। চীনে তৈলাক্ত সিল্ক পেপারে কনডম তৈরি হতো।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা কবিতা ভালবাসা/প্রণয়লীলা সৃজনশীল প্রকাশনা

অসম্পূর্ন ভালবাসা

image

তুমিতো আমায় কোন দিন ভালইবাসনি ……
করেছ শুধু ই ছলনা ।।।।।।
আমি তোমায় ভালবেসে দিয়েছিলাম পাঁচটি লাল গোলাপ ..
সেগুলো শুধু গোলাপ ছিলনা ,,, গোলাপের প্রতিটি পাপডি্তে আমার ভালবাসার স্পর্শ জডি্য়ে ছিল ।।।।।

গুনিজনরা বলে কাওকে ভালবাসা শেখাতে যেওনা তাহলে কস্ট পাবে ।। সে তোমার কাছ থেকে শিখে অন্যকে সেই ভালবাসা দিবে ।। তোমার পাওনা তুমি কখনোই পাবা না ।। আমি বুঝিনি এ ভুল আমিও করেছি ।। ন্বীশ্বার্থ ভাবে ভালবেসেছিলাম আমি তোমায় ।। তুমি আমায় ছলনা ছারা আর কিছুই দাও নি ।।।

আজও আমি তোমার অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকি ।।।।।।।
হয়ত আসবেনা কোন দিন ।।।।।।
তবুও থাকি ।।।।।।।
থাকতে ভাল লাগে ।।।।।
জানি তুমি খুব ভাল আছ আমাকে ছাড্া ।।।।।।
কামনা করি আরো ভাল থাক ।।।।।।।
তাই বলে ভেবনা আমি ভাল নেই ।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।।
আমিও খুব ভাল আছি ।।।।।।।।।।।।
আমি জানি আমি তোমার চেয়ে বেশি ভাল আছি ,, কারন আমি ছলনা করিনি ,,, আমি সত্যিকারের ভালবাসা দিতে জানি ,,,, আমি ভালবাসতে জানি ।।।।।

আমার দেওয়া স্মৃতি গুলো যদি তুমি ভুলে যেতে পার তাহলে তুমি মানুষ না ফেরেস্তা ।। কারন আমি তোমায় ছোট করতে পারব না তাই ফেরেস্তা বললাম ।।।।।।….

তোমার দেওয়া পাঁচটি পদ্ম ফুল আমি রেখে দিয়েছি স্ব-যতনে ।।।।।।। কাওকে ছুঁতে পর্যন্ত দেই না ।।।।।।।
কারন তুমি আমার অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ আর সেখানে প্রবেশ করার অধীকার কারোর নেই ।।।।।।।।

জানি তুমি ফিরে আসবে কোন এক দিন ।।। আমি শুধু সেই অপেক্ষায় আছি ।।। তোমাকে ফিরে আসতেই হবে ।।।।।
কিন্তু ………..,,,,,,…….,,,,,,,,
সেদিন ?????????????
সেদিন তোমায় গ্রহন করার মত কোন পথ খোলা থাকবে না ।।। আর যদিওবা থাকল তবুও আমি তোমায় গ্রহন করব না ।।।। কারন যে ভালবাসার সন্মান দিতে জানেনা তার ভালবাসা পাবার কোন অধিকার নেই ।।।।।।।।।।।
তার প্রাপ্য শুধু করুনা ।।।।।।।
আর।।।।।…..
সেটুকুও আমি তোমায় দিব না ।।।।।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা বিনোদন সঙ্গীত সৃজনশীল প্রকাশনা

দমা দম মাস্ত কালান্দার

 

দমা দম মাস্ত কালান্দার

————- ড. রমিত আজাদ

 

‘দমা দম মাস্ত কালান্দার’ গানটি শুনছি খুব ছোটবেলা থেকেই, সেটা সত্তরের দশক। তখনকার অনেক তরুণের মুখে মুখে ফিরতো এই ছন্দোময় গানটি। সেই এ্যানালগ যুগে অনুষ্ঠানে-উৎসবে মাইকেও বাজতো এই গীত। তারপর গানটি শুনলাম খ্যাতিমান কন্ঠশিল্পী রুণা লায়লা-র কন্ঠে। বাংলাদেশের গর্ব এই সুবিদিত গায়িকা নানা ভাষায় অদ্ভুত সুন্দর গাইতে পারেন। একবার আমাদের কলেজের এক অনুষ্ঠানে এক কিশোরী ‘দমা দম মাস্ত কালান্দার’ গানের সুরে ও তালে খুব সুন্দর নাচলো। কিশোরীর নৃত্য সুন্দর হয়েছিলো সত্য, তবে দর্শকরা গানটির যাদুময় সুর ও ছন্দে মোহাবিষ্ট হয়েছিলো বেশী। এরপর আমাদের বন্ধু-বান্ধবের সবার মনে একটা প্রশ্ন ভীর করেছিলো – ‘গানটির অর্থ কি?’ এছাড়া গানটির রচয়িতা কে? গানটির মূল গায়ক (বা গায়িকা) কে? এই প্রশ্নও মনে ছিলো। তবে এইগুলোর কোন উত্তর পাইনি। শুধু জানতাম যে গানটি ঊর্দু ভাষায়।

 

কয়েকদিন আগে গানটি শোনার জন্য ইউটিউব ডাউনলোড করলাম। গানটি শুনতে শুনতে নীচের একটি কমেন্টে চোখ আটকে গেলো

 

https://www.youtube.com/watch?v=IXw68K_kdr4

+50 years are gone, Sewhan was a village of ~5000 people, there was a shrine of Osman Marindi, nothing big deal. There are hundreds of them in the subcontinent. It was a popular place for religious ones, but it also attracted prostitutes, druggies & what not. Once a gypsy girl from the desert came & sung this song, it happened to be a recorder of the Radio Pakistan captured this. That girl disappeared as she came, but the song became a hit. As the time went by, almost every singer from Pakistan tried it. This one catapulted Sewhan & the shrine to the top. All of sudden the other saints were eclipsed. I visited this shrine many times. My attitude is rebellious, I saw nothing ordinary, perhaps my eyes are opaque. It does not matter. You can enjoy it.

 

আজ থেকে পঞ্চাশ বছরেরও আগে, সেহওয়ান নামক ৫০০০ অধিবাসীর একটি গ্রামে ওসমান মারিন্দি-র মাজার (আশ্রম) ছিলো। তেমন কোন উল্লেখযোগ্য ঘটনা নয়, এই উপমাহাদেশের আনাচে-কানাচে এমন কত শতই তো আছে। এটা ধর্মীয় স্থান হিসাবে জনপ্রিয় থাকলেও, কসবী নেশাখোর ও আরো অনেক জাতীয় লোকদের কাছে আকর্ষণীয় স্থান ছিলো এইটি। একদা সেই স্থানে মরুভূমীর মধ্য থেকে উঠে এসে একটি জিপসি বালিকা এই গানটি গাইলো, আর রেডিও পাকিস্তানের একটি রেকর্ডার গানটি ধারণ করে রাখলো। বালিকাটি যেভাবে সহসা এলো তেমনি সহসাই নিলীন হলো। কিন্তু গানটি হিট হয়ে গেলো। এরপর বহু বছর পার হয়ে গিয়েছে, পাকিস্তানের প্রায় সব গায়ক-গায়িকাই গানটি গেয়েছে। আর গানটি  সেহওয়ান ও আশ্রমটিকে পরিচিত করে তুলেছে। ………

 

কমেন্ট-টির উত্তরে একজন লিখেছেন,

Gypsy? Do you mean banjaras? Wow that’s amazing banjaras have also contributed much to rajasthani and Gujarati folk songs, I never knew Duma dum was originally banjara song!

 

“জিপসি? মানে বানজারান? এটা চমকপ্রদ যে এই বানজারান-রা রাজস্থান ও গুজরাট এর ফোক গানে অনেক অবদান রেখেছে। ……

 

এরপর গানটি সম্পর্কে আরো জানার ইচ্ছা জাগলো। ডিজিটাল যুগের কল্যাণে সবকিছু এখন ফিঙ্গার এন্ডে। ক্লিক করলেই অনেক তথ্য পাওয়া যায়। অতঃপর আমি ক্লিক করে যা যা পেলাম।

 

গানটি একটি আধ্যাত্মিক গান। এটা পাঞ্জাবী ভাষায় একটি বুনিয়াদি গান। এর রচয়িতার নাম জানা নাই। কয়েক শতাব্দি আগে রচিত হয়েছে অতীব সম্মানিত সিন্ধ-এর সূফী ‘শাহবাজ কালান্দার’-এর সম্মানে। তিনি পাকিস্তানের জামশোরো জেলার সেহওয়ান শরীফে ছিলেন। এই মহানুভব সূফী হিন্দুইজম ও ইসলাম এর ঐক্য সাধনের জন্য কাজ করেছিলেন। উপমহাদেশের অনেক খ্যাতিমান গায়ক-গায়িকাই গানটি গেয়েছেন। বলা হয়ে থাকে যে এই কাওয়ালীটি কবি আমীর খসরুর মূল প্রার্থনা থেকে নেয়া হয়েছিলো, এবং পরবর্তিতে তা অভিশ্রুত করেন বুলেহ শাহ। বুলেহ শাহ কাওয়ালীটিতে একেবারে ভিন্ন রঙ দেন ও সেখানে হযরত লাল শাহবাজ কালান্দার-এর স্তুতি যোগ করেন।

 

https://en.wikipedia.org/wiki/Dama_Dam_Mast_Qalandar

 

Dama Dam Mast Qalandar” (Urdu and Punjabi: دَما دَم مَست قَلَندَر), GurmukhiPunjabi: ਦਮਾ ਦਮ ਮਸਤ ਕਲੰਦਰ is a spiritual song.[1] It is a traditional song in Punjabi, author unknown, written a few centuries ago in honour of the most revered Sufi Saint of SindhShahbaz Qalandar of Sehwan Sharif, District Jamshoro , Pakistan, who worked for the unity of Hinduism and Islam in what is now Sindh Province in Pakistan. The melody was composed by Master Ashiq Hussain of Pakistan [2] and was made widely popular by many Pakistani and Indian singers like Noor JahanUstad Nusrat Fateh Ali KhanAbida ParveenSabri BrothersJunoon (band)Wadali brothersMika SinghReshma and Runa Laila a singer of Bangladesh. It is said that the kalaam/qawwali was adapted from the original prayer by Amir Khusrow and was then modified completely by Bulleh Shah. Apparently, Bulleh Shah gave an entirely different colour to the qawwali and added verses in praise of Hazrat Lal Shahbaz Qalandar. Bulleh Shah’s version of the qawwali gives it a large tint of Sindhi culture.

 

গানটির অর্থ:

আগেই বলেছি যে, গানটি সূফী ‘শাহবাজ কালান্দার’-এর সম্মানে রচিত। তিনি হিন্দু-মুসলিম সহনশীলতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে অনেক কাজ করেছিলেন। উনার অতীন্দ্রি়বাদ সর্বধর্মের মানুষকেই আকৃষ্ট করেছে। উনাকে ‘লাল’ নামে ডাকা হতো, কারণ তিনি লাল রঙের পোষাক পরতেন। ‘শাহবাজ’ বলা হতো কারণ তিনি মহৎ ছিলেন ও ‘কালান্দার’ বলা হতো কারণ তিনি সূফী সাধক ছিলেন। এছাড়া চিরকুমার সাধু যারা উচ্চ আধ্যাত্মিক স্তরে পৌঁছেছেন তাঁদেরও কালান্দার বলা হয়। ‘শাহবাজ কালান্দার’-কে তার ভক্তরা ঝুলেলাল-ও বলতো। সেহওয়ান শরীফে উনার মাজার আছে। এছাড়া এই গানে হযরত হযরত আলী (রাঃ)-এর নামও আছে।

 

Ho… Laal Meri Pat Rakhiyo Bhala Jhoole Laalan

ও লাল পোষাকী! আমাকে চিরকাল রক্ষা কর, ও ঝুলেলাল

Laal Meri Pat Rakhiyo Bhala Jhoole Laalan

ও লাল পোষাকী! আমাকে চিরকাল ভালো রেখো, ও ঝুলেলাল

Sindhri Da Sehwan Da Sakhi Shahbaz Kalandar

সিন্ধ ও সেহওয়ানের হযরত, শাহবাজ কালান্দার

Duma Dum Mast Kalandar, Ali Da Pehla Number

ও লাল পোষাকী! বুক ফাটা কালান্দার, আলীই চিরকাল ছিলেন পহেলা নাম্বার

Duma Dum Mast Kalandar, Sakhi Shahbaz Kalandar

ও লাল পোষাকী! বুক ফাটা কালান্দার, ও মহৎ শাহবাজ কালান্দার

Ho… Laal Meri Pat Rakhiyo Bhala Jhoole Laalan

ও লাল পোষাকী! আমাকে চিরকাল রক্ষা কর, ও ঝুলেলাল

 

Laal Meri Pat Rakhiyo Bhala Jhoole Laalan

ও লাল পোষাকী! আমাকে চিরকাল ভালো রেখো, ও ঝুলেলাল

Sindhri Da Sehwan Da Sakhi Shahbaz Kalandar

সিন্ধ ও সেহওয়ানের হযরত, শাহবাজ কালান্দার

Ho Laal Meri, Haaye Laal Meri…

ও লাল পোষাকী! হায় লাল পোষাকী!

 

Ho… Chaar Chiraag Tere Baran Hamesha (x2)

তোমার মাজার চিরকাল চার চেরাগ দ্বারা আলোকিত ছিলো

Char Chiraag Tere Baran Hamesha

তোমার মাজার চিরকাল চার চেরাগ দ্বারা আলোকিত ছিলো

Paanjwaan Ve Palan Aaiyaan Bala Jhoole Laalan

আমি এসেছি তোমার সম্মানে পঞ্চম চেরাগটি জ্বালাতে, ও ঝুলেলাল

Ho… Paanjwaan Ve Palan

পঞ্চম চেরাগটি জ্বালাতে

Ho… Paanjwaan Ve Palan Aaiyaan Bala Jhoole Laalan

আমি এসেছি তোমার সম্মানে পঞ্চম চেরাগটি জ্বালাতে, ও ঝুলেলাল

Sindhri Da Sehwan Da Sakhi Shahbaz Kalandar

সিন্ধ ও সেহওয়ানের হযরত, শাহবাজ কালান্দার

 

Ho… Jhanan Jhanan Teri Naubat Baaje (x2)

তোমার ঢোল বাজে (তোমার বীরোচিত নামে)

Jhanan Jhanan Teri Naubat Baaje

ঝানান ঝানান তোমার নহবৎ বাজে

Laal Baje Ghadiyal Bala Jhoole Lalan

ঢোল জোরে জোরে বাজতে থাকুক তোমার গৌরবে, দিন রাত বাজুক, ও ঝুলেলাল

Ho… Laal Baje

ঢোল বাজতে থাকুক

Laal Baje Ghadiyal Bala Jhoole Lalan

ঢোল জোরে জোরে বাজতে থাকুক তোমার গৌরবে, দিন রাত বাজুক, ও ঝুলেলাল

Sindhri Da Sehwan Da Sakhi Shahbaz Kalandar

সিন্ধ ও সেহওয়ানের হযরত, শাহবাজ কালান্দার

 

Arre Dum Dum Dum Dum Dum Dum Ali Ali (x3)

আমার প্রতিটি নিশ্বাসে আছে আলী

 

Meaning of the song:

http://www.bollynook.com/en/lyrics/11702/duma-dum-mast-dama-dam-mast/

Note: This song is sung in the praise of a one of the most famous and renowned Sufi Saint of the
Chisti Order, ‘Hazrat Lal Shahbaz Qalandar’. He preached religious tolerance among Muslims and
Hindus. His mysticism attracted people from all religions. He was called Laal (red) after his usual red
attire, Shahbaz due to his noble and divine spirit, and Qalandar for his Sufi affiliation.
Qalandars/Kalandar are wandering ascetic Sufi saints. Qalandar is also a title given to a unmarried
saint who is at a very high level of spirituality. Qalandars are considered chosen saints of God Almighty.
They are different from other saints and they have very strong feelings of love in them. Qalandars,
amongst the saints, are those persons who enjoy freedom from the ties and bounds of time and space.
Hazrat Lal Shahbaz Qalandar is sometimes fondly referred to by his lovers as Jhoolelaal. His shrine
(resting place) known as Sehwan Sharif is in Sehwan, a city located in Jamshoro District in the Sindh
province of Pakistan. There is also mention of Ali in this song. Ali was the cousin and son-in-law of
Prophet Mohammed. He is believed to be the first male to convert to Islam and is the first Imaam or the
spiritual leader of Islam.

Ho… Laal Meri Pat Rakhiyo Bhala Jhoole Laalan
O red robed one! May I always be protected by You, O Jhoolelaal
Laal Meri Pat Rakhiyo Bhala Jhoole Laalan
O red robed one! May I always be protected by You, O Jhoolelaal
Sindhri Da Sehwan Da Sakhi Shahbaz Kalandar
O Lord of Sindh and Sehwan, O noble Kalandar

Duma Dum Mast Kalandar, Ali Da Pehla Number
O red-robed euphoric Kalandar, Ali is always the first
Duma Dum Mast Kalandar, Sakhi Shahbaz Kalandar
O red-robed euphoric Kalandar, O noble Kalandar

Ho… Laal Meri Pat Rakhiyo Bhala Jhoole Laalan
O red robed one! May I always be protected by You, O Jhoolelaal
Laal Meri Pat Rakhiyo Bhala Jhoole Laalan
O red robed one! May I always be protected by You, O Jhoolelaal
Sindhri Da Sehwan Da Sakhi Shahbaz Kalandar
O Lord of Sindh and Sehwan, O noble Kalandar
Ho Laal Meri, Haaye Laal Meri…
O red robed one!

Ho… Chaar Chiraag Tere Baran Hamesha (x2)
Your shrine is always lighted with four lamps
Char Chiraag Tere Baran Hamesha
Your shrine is always lighted with four lamps
Paanjwaan Ve Palan Aaiyaan Bala Jhoole Laalan
I’ve come here to light the fifth lamp in Your honour, O Jhoolelaal
Ho… Paanjwaan Ve Palan
To light the fifth lamp
Ho… Paanjwaan Ve Palan Aaiyaan Bala Jhoole Laalan
I’ve come here to light the fifth lamp in Your honour, O Jhoolelaal
Sindhri Da Sehwan Da Sakhi Shahbaz Kalandar
O Lord of Sindh and Sehwan, O noble Kalandar

Duma Dum Mast Kalandar, Ali Da Pehla Number
O red-robed euphoric Kalandar, Ali is always the first
Duma Dum Mast Kalandar, Sakhi Shahbaz Kalandar
O red-robed euphoric Kalandar, O noble Kalandar
Ho Laal Meri, Haaye Laal Meri…
O red robed one!

Ho… Jhanan Jhanan Teri Naubat Baaje (x2)
Your drums are ringing (beating with Your heroic name)
Jhanan Jhanan Teri Naubat Baaje
Your drums are ringing
Laal Baje Ghadiyal Bala Jhoole Lalan
Let the gong ring loudly for your glory, day and night, O Jhoolelaal
Ho… Laal Baje
Let the gong ring
Laal Baje Ghadiyal Bala Jhoole Lalan
Let the gong ring loudly for your glory, day and night, O Jhoolelaal
Sindhri Da Sehwan Da Sakhi Shahbaz Kalandar
O Lord of Sindh and Sehwan, O noble Kalandar

Duma Dum Mast Kalandar, Ali Da Pehla Number
O red-robed euphoric Kalandar, Ali is always the first
Duma Dum Mast Kalandar, Sakhi Shahbaz Kalandar
O red-robed euphoric Kalandar, O noble Kalandar
Ho Laal Meri, Haaye Laal Meri…
O red robed one!

Arre Dum Dum Dum Dum Dum Dum Ali Ali (x3)
There’s Ali in every breath I take

Duma Dum Mast Kalandar, Ali Da Pehla Number
O red-robed euphoric Kalandar, Ali is always the first
Duma Dum Mast Kalandar, Sakhi Shahbaz Kalandar
O red-robed euphoric Kalandar, O noble Kalandar
Duma Dum Mast Kalandar, Ali Da Pehla Number
O red-robed euphoric Kalandar, Ali is always the first
Duma Dum Mast Kalandar, Sakhi Shahbaz Kalandar
O red-robed euphoric Kalandar, O noble Kalandar
Duma Dum Mast Kalandar, Ali Da Pehla Number
O red-robed euphoric Kalandar, Ali is always the first
Duma Dum Mast Kalandar, Sakhi Shahbaz Kalandar
O red-robed euphoric Kalandar, O noble Kalandar
Duma Dum Mast Kalandar, Ali Da Pehla Number
O red-robed euphoric Kalandar, Ali is always the first
Duma Dum Mast Kalandar, Sakhi Shahbaz Kalandar
O red-robed euphoric Kalandar, O noble Kalandar

 

http://www.techofheart.co/2008/08/dama-dam-mast-qalandar-translation-of.html

 

O laal meri pat rakhio bala jhoole laalan, Sindri da Sehvan da, sakhi Shabaaz kalandar, Dama dam mast Qalandar, Ali dam dam de andar.

O the red robed, may I always have your benign protection, Jhulelal (as he was affectionately called). O master, friend and Sire of Sindh and Sehwan (or Serwan), The red robed God-intoxicated Qalandar, The Lord in every breath of mine, glory be to you.

Chaar charaag tere baran hamesha, Panjwa mein baaran aayi bala jhoole laalan O panjwa mein baaran, O panjwa mein baaran aayi bala jhoole laalan, Sindri da Sehvan da, sakhi Shabaaz Qalandar, Dama dam mast Qalandar, Ali dam dam de andar.

Your shrine is always lighted with four lamps, And here I come to light a fifth lamp in your honor. Here I come with fifth O master, friend and Sire of Sindh and Sehwan (or Serwan), The red robed God-intoxicated Qalandar, The Lord in every breath of mine, glory be to you.

Hind Sind (some also sing Ghanan ghanan) peera teri naubat vaaje, Naal vaje ghadiyaal bala jhoole laalan, O naal vaje, O naal vaje ghadiyaal bala jhoole laalan.

Let your heroic name ring out in Hind & Sindh (or lets the gongs bell loud), Let the gong ring loud for your glory day and night by the people (ghadiyaal – watchman, symbolism of night).

Har dam peera teri khair hove, Naam-e-ali beda paar laga jhoole laalan, O naam-e-ali, O naam-e-ali beda paar laga jhoole laalan, Sindri da sehvan da sakhi Shabaaz Qalandar, Dama dam mast Qalandar, Ali dam dam de andar.

O Lord, may you prevail everytime, everywhere, I pray of your well being, In the name of Ali, I pray to you to help my boat cross in safety (in the river of life).

 

his song, one of the most famous qawwali, is written and sung in the honor of Sufi mystic saint ‘Hazrat Lal Shahbaz Qalandar‘ (Usman Marvandhi) – may God sanctify his station. Every word of his name used in the qawwali has a meaning – he was known as Hazrat (holiness), Lal (he wore red robes, also mothers fondly call their kids as Lal in Punjab and nearby region), Shahbaz (Shah – King and Baz – Falcon, king of falcons and in Iranian mythology represent godly figure who led them to victory, divine spirit), and finally Qalandar (a qalandari – a sufi saint, poet, mystic, noble man). He settled in Serwan (Sindh, now in Pakistan) and tried bringing peace between Hindus and Muslims. Hindus regard him as divine reincarnate, avatar as well. Still today many Punjabi singers, singing in his praise. He is also fondly called as Jhulelal.

 

Dama Dam Mast Qalandar

 

তথ্যসূত্র:

  1. https://www.youtube.com/watch?v=IXw68K_kdr4
  2. https://en.wikipedia.org/wiki/Dama_Dam_Mast_Qalandar
  3. http://www.bollynook.com/en/lyrics/11702/duma-dum-mast-dama-dam-mast/
  4. http://www.techofheart.co/2008/08/dama-dam-mast-qalandar-translation-of.html

 

(ইতঃপূর্বে প্রকাশিত)

 

Categories
অনলাইন প্রকাশনা কবিতা বিনোদন

কেন আমি ওকে ভুলে যাবো?

Why Should I Forget Her?
———————– Dr. Ramit Azad

 

Many people ask me, “Why can’t you forget her yet?”

I ask the counter, “Why should I forget her at all?”

I did not play-acting, I did not cheat,

I did not lie, did not deceive,

This nerve is not just nerve; it is not only bio-chemistry,

The body is not only the body, there is also heart.

I told you from that heart, “love you”,

I played flutes causing storm over the peacock forest,

Waves come waves go, but there is no erosion of shore,

Days come, days go, and love does not weaken but strengthens.

 

Do the wounds of the heart increases? Let it increase.

Let tatter the heart, like bullets do with a body,

 

Break my body into pieces,

Breaking it down into atoms,

The smallest building block

As ancient wise Kanada described,

But the soul? Can it be broken?

 

Of course not,

“The soul (aatman) cannot be cut, burnt,

suffer any decay or be dried out.”

She is the part of my soul,

Why should I forget her?

 

12th August, 2015

 

কেনআমিওকেভুলেযাবো?
———— ড. রমিত আজাদ

আমাকেঅনেকেইপ্রশ্নকরে, “এখনোওকেভুলতেপারলেনা?”
আমিপাল্টাপ্রশ্নকরি, “কেনআমিওকেভুলেযাবো?”
আমিতোঅভিনয়করিনি, নাকরেছিপ্রতারণা,
আমিতোমিথ্যেবলিনি, নাকরেছিছলনা,
এইস্নায়ুশুধুতোস্নায়ুনয়, নয়শুধুপ্রাণ-রসায়ন,
এইদেহশুধুতোদেহনয়, এখানেআরোআছেমন।
সেইমনথেকেইতোবলেছিলাম, “ভালোবাসি”,
কৃষ্ণচূড়ারবনেঝড়তুলে, বাজিয়েছিলামবাঁশী।
ঢেউআসেঢেউযায়, বেলাভূমীসরেনাবরংগড়ে,
দিনআসেদিনযায়, ভালোবাসেকমেনাবরংবাড়ে।

হৃদয়েরক্ষত, সেওকিবাড়ে? বাড়লেবাড়ুক!
সমস্তহৃদপিন্ডটাকেক্ষতবিক্ষতঝাঁঝরাকরুক!
আমারদেহটাকেওদুমরে-মুচড়েভেঙেফেলো,
ভাঙতেভাঙতেঋষীকণাদেরবর্ণিত
অণু-পরামাণুতেনিয়েযাও।
কিন্তুআত্মা? তাকেকিভাঙাযায়?

না।
এইআত্মাসেইআত্মা, যাকেকাটাযায়না, ছেঁড়াযায়না,
আগুনেদহনকরাযায়না, বায়ুদ্বারাআর্দ্রকরাযায়না।
সেইআত্মায়সত্তাহয়েমিশেআছেও,
কেনআমিওকেভুলেযাবো?

 

১২ইআগস্ট, ২০১৫রাত৩:১২

Categories
অনলাইন প্রকাশনা কবিতা

এই মাঝরাতে

এই মাঝরাতে
——– রমিত আজাদ

এই মাঝরাতে,
মাঝে মাঝে জেগে উঠি আমি,
আরো জেগে ওঠে লুব্ধক
বাকহীন দেহভৃৎ বাগ্বিধি
থেমে থেমে অস্বস্তি গোঙানী
যামিনীর গা বেয়ে নেমে আসা
অসংখ্য অতৃপ্ত প্রেত,
আসন্ন দুঃসময়ের অশনী সংকেত।

এই মাঝরাতে,
নিরাশ্বাস সোম জাগে রোষে
সহস্র বছরের দহন-স্মৃতি পুষে নিয়ে বুকে,
জ্বলন্ত রোমের প্রাসাদের ছাদে বংশীর ধ্বনি
সেতো নিরোর সুর নয়, ক্রন্দন নিরুদ্ধের,
উন্মাদ কালিগুলা, আর উদ্ধত নমরুদ।

এই মাঝরাতে,
কেউ কেউ উল্লাস করে সুখে,
আর নাগ হয় নদী, প্যাচানো সরিসৃপ।
এক পায়ে উদ্ভিদ, অবিচল
মুখ বুজে সয়ে যায় সব,
অসহায় প্রজাপুঁজ সম।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা কবিতা বিনোদন ভালবাসা/প্রণয়লীলা

অবশেষে ফিরে এলাম

— সাকি বিল্লাহ্

 

অবশেষে ফিরে এলাম

সাত সমুদ্র আর তের নদী

আর এক বির্স্তীন মরুভূমি পার হয়ে_

কোথাও যেন কেউ নেই

অবশেষে ফিরে এলাম মনের গভীর থেকে

অদ্ভুদ এক চোখের ইশাঁরায়

হাতে একগুচ্ছ রজণীগন্ধা আর-

অবশেষে ফিরে এলাম।

 

তাকিয়ে থেকে থেকে চোখ পাথর হয়েছে আমার,

তোমারই হরিণী চোখের পানে ।

যখন হাতে নিয়ে ছিলাম

এক মুঠো মরুদ্দুর আর তখনই তুমি এলে,

যখন হাতে ছিল একরাশ ক্যামেলিয়া

তখন তুমি এলে

আর আমি _

অবশেষে ফিরে এলাম ক্লান্ত কোনো বিকেলে

হাজারো স্বপ্ন নিয়ে, পাথর চোখে,

নীল বারি স্পর্শ করে করে

আর হাতের কাঁকন রিনঝিন রিনঝিন

আওয়াজে তুমি এলে

তাই আমিও ফিরে এলাম

চৈত্রের দুপুরে কোকিলের কুহু গানে

 

অবশেষে ফিরে এলাম

শান্ত কোনো নদের পাশে

কাকতাড়ুয়ার মত দাড়িয়ে থেকে,

যখন তুমি বললে,

তখনই ফিরে এলাম

পাখি আর গানে, কবিতার তানে

তোমার কোমলতার কারনে

অবশেষে ফিরে এলাম

তোমারই কারনে।

 

আধ রাতে যখন চাঁদ ঝরে পড়ে

অথবা হাসনা হেনার সুবাস বয়

তখন তুমি নিঃস্ব হয়ে বসে

আর আমি ফিরে আসি অবশেষে।

হাতুরির শব্দে, হাপরের নিশ্বাঁসে

যখন বৈশাখের দুপুর হল

তখন অগ্নি স্ফুলিঙ্গে

আমি ফিরে এলাম।

 

তোমার অপেক্ষায় থেকে থেকে,

যখন অরণ্য সব মরুভুমি হল

পোকা মাকড়ে ভরে গেল ঘর

তখন তুমি এলে,

হাতে একটি সবুজ গোলাপ নিয়ে

কিণ্তু আমি আর ফিরে এলাম

নিস্প্রাণ সজীবতার উৎস হয়ে

ঝিরি ঝিরি বাতাসের ভেলায়

বর্ষার প্রথম দিকে, মেঘান্ন বিকেলে

অবশেষে ফিরে এলাম ।

 

ধুমকেতু হয়ে চলে ছিলাম যখন

ধোয়ার কুন্ডুলী পাকিয়ে

তখন বলেছিলাম তোমায় সাথী হতে আর তুমি_

তাই অবশেষে ফিরে এলাম

নিদারুণ এক কষ্ট আর

যন্ত্রণার ভিতর দিয়ে

অদৃশ্য কোনো অবস্থান নিয়ে

দৃশ্যপটে আঁকা তোমার সে ছবি

মিছি মিছি আমি ভাবছিলাম(হা..হা..)

 

তাই তোমার অপেক্ষায়

থেকে থেকে যখন ফিরে এলাম

তখন আমার আর কিছুই থাকল না

চোখের ভিতরে শুধু দুঃস্বপ্ন

মনের ভিতরে বাসা বেধেঁছে কেউ

চোখ নেই, দেখছি না কিছুই,

কঙ্কালসার এই দেহটাকে

নিয়ে ফিরে এলাম

অবিশ্বাস্য সব বিশ্বাস নিয়ে

ফিরে এসে তোমার হাতে

হাত রাখলাম,

তুমি ভাবলে জ্যোছনা

অথবা ভাবলে একপসলা বৃস্টি,

র্স্পশ করলে আমায় এক মুঠো রুদ্দুরে

কোকিলের কুহু গানে অথবা

ভাদ্রের ঝিরি বাতাসকে

র্স্পশ করে তুমি ভাবলে

আমি ফিরে এলাম ।

 

দিনের শুরুতে আর শেষে

সূর্যের উড়াউড়িতে

কার্তিকের ধান গুনে গুনে

বেদনার বিষাদময় পদচারনায়

তুমি ভাবলে, আমি এলাম

পৌঁষের রাতে, অথবা ছায়াবীথির তলে

জড়িয়ে ধরে আমার কঙ্কালটা

তুমি ভাবলে, আমি এলাম

ভাবলে, বিষন্ন চোখে তোমাকে দেখছি,

আর আমি-

অপলক চাহনির ফাঁকে ফাঁকে

তোমারই কারনে ভিজিয়েছি দুচোখ

তুমি জানলেও না

ঐ অজানার কারনে আজ আমি নিঃস্ব হলাম

বেদনার বিষাবনীল দেহ নিয়ে

তোমারই ফিরে আসার অপেক্ষাতে

কিণ্তু যখন তুমি এলে

দেখে গেলে আমায়

কোনো এক কবরে

দুর্বা ঘাসের নাচনীতে আর

শিশিরের ঝলমলতায়

হাতে নিয়ে কবিতার বই,

কিণ্তু আমি ফিরে এলাম রিক্ত হয়ে

কিছুই নেই আমার যেন

শুধু অস্পষ্ঠ চোখের চাহনি,

তোমায় দেখছিলাম

তুমি ভাবলে ধরবে আমায়

আমি হাত বাড়ালাম

আর তুমি?

 

তাই অবশেষে ফিরে এলাম

বিষাদময় কোনো বরবরতায়

হঠাৎ দেখি তোমায়

হাতে একটি লাল অথবা সাদা গোলাপ,

সুমিস্ট বাতাসে ভরে গেল দেহ

তবুও তুমি এলে যখন

ভাবলাম অবশেষে

ফিরে যাই, তোমায় বলি

তুমি কি আমার, হে প্রিয় ?

সাঁজ বেলায় যখন নিঁশুথিরা জাগে

তোমারই পাশে জেগে ছিলাম

তুমি  দেখনি,

তোমারই জন্য ভেবেছিলাম

তুমি ভাবনি,

তোমারই জন্য চেয়েছিলাম

তুমি চাওনি,

আর এখন_

তুমি অবশেষে এলে

ভাবলাম এবার তোমায় বলব

তুমি ভাবলে, আর আমি নেই,

শূন্যের বিশালতার গহীনে ,

তাই তোমার জন্য এ কবিতা

তোমার জন্য এ বিরহ

নাইবা র্স্পশতার মায়ায়

পেলে তুমি আমায়,

ক্ষনে ক্ষনে পেলে যখন সকল উণ্মাদনায়

তখন আমি বলব

অবশেষে ফিরে এলাম ।।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প বঙ্গিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বিনোদন ব্যঙ্গকৌতুক

কমলাকান্তের জবানবন্দী (জোবানবন্দী)

–বঙ্গিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

–প্রথম প্রকাশ- বঙ্গদর্শন, ফাল্গুন সংখ্যা, ১২৮৮ বঙ্গাব্দ

বঙ্কিমের বিখ্যাত রম্যব্যঙ্গ সংকলন ‘কমলাকান্তের দপ্তর’-এর সর্বশেষ রচনার নির্বাচিত অংশ।

মূলপাঠে (বঙ্কিমের দেয়া নাম) রচনাটির নাম ছিলো ‘কমলাকান্তের জোবানবন্দী’। সংকলিত অংশের নামের বানানে একটু পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘কমলাকান্তের জবানবন্দী’।

এটি একটি নকশা জাতীয় রচনা।

চরিত্র

কমলাকান্ত- প্রধান চরিত্র। আফিংখোর। ব্রাহ্মণ। পুরো নাম- শ্রীকমলাকান্ত চক্রবর্তী। বয়স-৫১ বছর ২ মাস ১৩ দিন। বাসা নেই, কোন পেশাও নেই।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও উদ্ধৃতি

এজলাসে, প্রথামত মাচানের উপর হাকিম বিরাজ করিতেছেন। হাকিমটি একজন দেশী ধর্মাবতার- পদে গৌরবে ডেপুটি।

কমলাকান্ত আসামী নহে- সাক্ষী।

মোকদ্দমা গরুচুরি।

ফরিয়াদী প্রসন্ন গোয়ালিনী।

————–

সেই আফিঙ্গখোর কমলাকান্তের অনেক দিন কোন সম্বাদ পাই নাই। অনেক সন্ধান করিয়াছিলাম, অকস্মাৎ সম্প্রতি একদিন তাহাকে ফৌজদারী আদালতে দেখিলাম। দেখি যে, ব্রাহ্মণ এক গাছতলায় বসিয়া, গাছের গুঁড়ি ঠেসান দিয়া, চক্ষু বুজিয়া ডাবায় তামাকু টানিতেছে। মনে করিলাম, আর কিছু না, ব্রাহ্মণ লোভে পড়িয়া কাহার ডিবিয়া হইতে আফিঙ্গ চুরি করিয়াছে-অন্য সামগ্রী কমলাকান্ত চুরি করিবেনা-ইহা নিশ্চিত জানি। নিকটে একজন কালোকোর্ত্তা কনষ্টেবলও দেখিলাম। আমি বড় দাঁড়াইলাম না-কি জানি যদি কমলাকান্ত জামিন হইতে বলে। তফাতে থাকিয়া দেখিতে লাগিলাম যে, কাণ্ডটা কি হয়।

কিছুকাল পরে কমলাকান্তের ডাক হইল। তখন একজন কনষ্টেবল রুল ঘুরাইয়া তাহাকে সঙ্গে করিয়া এজ্লাসে লইয়া গেল। আমি পিছু পিছু গেলাম। দাঁড়াইয়া, দুই একটি কথা শুনিয়া ব্যাপারখানা বুঝিতে পারিলাম।

এজ্লাসে, প্রথমত মাচানের উপর হাকিম বিরাজ করিতেছেন। হাকিমটি একজন দেশী ধর্ম্মাবতার-পদে ও গৌরবে ডিপুটি। কমলাকান্ত আসামী নহে-সাক্ষী। মোকদ্দমা গরুচুরি। ফরিয়াদি সেই প্রসন্ন গোয়ালিনী।

কমলাকান্তকে সাক্ষীর কাটরায় পূরিয়া দিল। তখন কমলাকান্ত মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিল। চাপরাশী ধমকাইল- “হাস কেন?”

কমলাকান্ত যোড়হাত করিয়া বলিল. “বাবা, কার ক্ষেতে ধান খেয়েছি যে, আমাকে এর ভিতর পূরিলে?”

চাপরাশী মহাশয় কথাটা বুঝিলেন না। দাড়ি ঘুরাইয়া বলিলেন, “তামাসার জায়গা এ নয় –হলফ পড়।”

কমলাকান্ত বলিল, “পড়াও না বাপু।”

একজন মুহুরি তখন হলফ পড়াইতে আরম্ভ করিল। বলিল, “বল আমি পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষ জানিয়া…”

কমলাকান্ত। (সবিস্ময়ে) কি বলিব?

মুহুরি। শুন্‌তে পাও না-“পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষ জেনে__”

কমলা। পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষ জেনে! কি সর্বনাশ!

হাকিম দেখিলেন, সাক্ষীটা কি একটা গণ্ডগোল বাধাইতেছে। জিজ্ঞাসা করিলেন, “সর্বনাশ কি?”

কমলা। পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষ জেনেছি-এ কথাটা বল্‌তে হবে?

হাকিম। ক্ষতি কি? হলফের ফারমই এই।

কমলা। হুজুর সুবিচারক বটে। কিন্তু একটা কথা বলি কি, সাক্ষ্য দিতে দিতে দুই একটা ছোট রকম মিথ্যা বলি, না হয় বলিলাম-কিন্তু গোড়াতেই একটা বড় মিথ্যা বলিয়া আরম্ভ করিব, সেটা কি ভাল?

হাকিম। এর আর মিথ্যা কথা কি?

কমলাকান্ত মনে মনে বলিল, “তত বুদ্ধি থাকিলে তোমার কি এ পদবৃদ্ধি হইত?” প্রকাশ্যে বলিল, “ধর্ম্মাবতার, আমার একটু একটু বোধ হইতেছে কি যে, পরমেশ্বর ঠিক প্রত্যক্ষের বিষয় নয়। আমার চোখের দোষই হউক, আর যাই হউক; কখনও ত এ পর্য্যন্ত পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষ দেখিতে পাইলাম না। আপনারা বোধ হয় আইনের চসমা নাকে দিয়া তাঁহাকে প্রত্যক্ষ দেখিতে পারেন-কিন্তু আমি যখন তাঁহাকে এ ঘরের ভিতর প্রত্যক্ষ পাইতেছি না-তখন কেমন করিয়া বলি-আমি পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষ জেনে__”

ফরিয়াদীর উকিল চটিলেন-তাঁহার মূল্যবান সময়, যাহা মিনিটে মিনিটে টাকা প্রসব করে, তাহা এই দরিদ্র সাক্ষী নষ্ট করিতেছে। উকীল তখন গরম হইয়া বলিলেন, “সাক্ষী মহাশয়!” Theological Lecture টা ব্রাহ্মসমাজের জন্য রাখিলে ভাল হয় না? এখানে আইনের মতে চলিতে মন স্থির করুন।”

কমলাকান্ত তাঁহার দিকে ফিরিল। মৃদু হাসিয়া বলিল, “আপনি বোধ হইতেছে উকীল।”

উকীল । (হাসিয়া) কিসে চিনিলে?

কমলা। বড় সহজে। মোটা চেন আর ময়লা শামলা দেখিয়া। তা মহাশয়! আপনাদের জন্য এ Theological Lecture নয়। আপনারা পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষ দেখেন স্বীকার করি-যখন মোয়াক্কেল আসে।

উকীল সরোষে উঠিয়া হাকিমকে বলিলেন, “I ask the protection of the Court against the insults of this witness.”

কোর্ট বলিলেন, “O Baboo! the witness is your own witness, and you are at liberty to send him away if you like.”

এখন কমলাকান্তকে বিদায় দিলে উকীল বাবুর মোকদ্দমা প্রমাণ হয় না-সুতরাং উকীল বাবু চুপ করিয়া বসিয়া পড়িলেন। কমলাকান্ত ভাবিলেন, এ হাকিমটা জাতিভ্রষ্ট-পালের মত নয়।

হাকিম গতিক দেখিয়া, মুহুরিকে আদেশ করিলেন যে, “ওথের প্রতি সাক্ষীর objection আছে-উহাকে simple affirmation দাও।” তখন মুহুরি কমলাকান্তকে বলিল, “আচ্ছা, ও ছেড়ে দাও-বল, আমি প্রতিজ্ঞা করিতেছি-বল |”

কমলা। কি প্রতিজ্ঞা করিতেছি, সেটা জানিয়া প্রতিজ্ঞাটা করিলে ভাল হয় না?

মুহুরি হাকিমের দিকে চাহিয়া বলিল, “ধর্ম্মাবতার! সাক্ষী বড় সেরকশ্ |”

উকীল বাবু হাঁকিলেন, “Very obstructive.”

কমলা। (উকীলের প্রতি) শাদা কাগজে দস্তখত করিয়া লওয়ার প্রথাটা আদালতের বাহিরে চলে জানি-ভিতরেও চলিবে কি?

উকীল । শাদা কাগজে কে তোমার দস্তখত লইতেছে?

কমলা। কি প্রতিজ্ঞা করিতে হইবে, তাহা না জানিয়া, প্রতিজ্ঞা করা, আর কাগজে কি লেখা হয় তাহা না দেখিয়া, দস্তখত করা, একই কথা।

হাকিম তখন মুহুরিকে আদেশ করিলেন যে, “প্রতিজ্ঞা আগে ইহাকে শুনাইয়া দাও-গোলমালে কাজ নাই |” মুহুরি তখন বলিল, “শোন, তোমাকে বলিতে হইবে যে, আমি প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে, আমি যে সাক্ষ্য দিব, তাহা সত্য হইবে, আমি কোন কথা গোপন করিব না-সত্য ভিন্ন আর কিছু হইবে না |”

কমলা। ওঁ মধু মধু মধু।

মুহুরি। সে আবার কি?

কমলা। পড়ান, আমি পড়িতেছি।

কমলাকান্ত তখন আর গোলযোগ না করিয়া প্রতিজ্ঞা পাঠ করিল। তখন তাঁহাকে জিজ্ঞাসাবাদ করিবার জন্য উকীল বাবু গাত্রোত্থান করিলেন, কমলাকান্তকে চোখ রাঙ্গাইয়া বলিলেন, “এখন আর বদ্‌মায়েশি করিও না-আমি যা জিজ্ঞাসা করি, তার যথার্থ উত্তর দাও। বাজে কথা ছাড়িয়া দাও |”

কমলা। আপনি যা জিজ্ঞাসা করিবেন, তাই আমাকে বলিতে হইবে? আর কিছু বলিতে পাইব না?

উকীল । না।

কমলাকান্ত তখন হাকিমের দিকে ফিরিয়া বলিলেন, “অথচ আমাকে প্রতিজ্ঞা করাইলেন যে, ‘কোন কথা গোপন করিব না |’ ধর্ম্মাবতার, বে-আদবি মাফ হয়! পাড়ায় আজ একটা যাত্রা হইবে, শুনিতে যাইব ইচ্ছা ছিল; সে সাধ এইখানেই মিটিল। উকীল বাবু অধিকারী-আমি যাত্রার ছেলে, যা বলাইবেন, কেবল তাই বলিব; যা না বলাইবেন, তা বলিব না। যা না বলাইবেন, তা কাজেই গোপন থাকিবে। প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের অপরাধ লইবেন না |”

হাকিম। যাহা আবশ্যক বিবেচনা করিবে, তাহা না জিজ্ঞাসা হইলেও বলিতে পার।

কমলাকান্ত তখন সেলাম করিয়া বলিল, “বহুৎ খুব |” উকীল তখন জিজ্ঞাসাবাদ আরম্ভ করিলেন, “তোমার নাম কি?”

কমলা। শ্রী কমলাকান্ত চক্রবর্ত্তী।

উকীল । তোমার বাপের নাম কি?

কমলা। জোবানবন্দীর আভ্যুদয়িক আছে না কি?

উকীল গরম হইলেন, বলিলেন, “হুজুর! এ সব Contempt of Court.” হুজুর, উকীলের দুর্দ্দশা দেখিয়া নিতান্ত অসন্তুষ্ট নন-বলিলেন, “আপনারই সাক্ষী |” সুতরাং উকীল আবার কমলাকান্তের দিকে ফিরিলেন, বলিলেন, “বল। বলিতে হইবে |”

কমলাকান্ত পিতার নাম বলিল। উকীল তখন জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কি জাতি?”

কমলা। আমি কি একটা জাতি?

উকীল । তুমি কোন্ জাতীয়।

কমলা। হিন্দু জাতীয়।

উকীল । আঃ! কোন্ বর্ণ?

কমলা। ঘোরতর কৃষ্ণবর্ণ।

উকীল । দূর হোক ছাই! এমন সাক্ষীও আনে! বলি তোমার জাত আছে?

কমলা। মারে কে?

হাকিম দেখিলেন, উকীলের কথায় হইবে না। বলিলেন, “ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, কৈয়বর্ত্ত, হিন্দুর নানা প্রকার জাতি আছে জান ত-তুমি তার কোন জাতির ভিতর?”

কমলা। ধর্ম্মাবতার! এ উকীলের ধৃষ্টতা! দেখিতেছেন আমার গলায় যজ্ঞোপবীত, নাম বলিয়াছি চক্রবর্ত্তী-ইহাতেও যে উকীল বুঝেন নাই যে, আমি ব্রাহ্মণ, ইহা আমি কি প্রকারে জানিব?

হাকিম লিখিলেন, “জাতি ব্রাহ্মণ |” তখন উকীল জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোমার বয়স কত?”

এজ্লাসে একটা ক্লক ছিল-তাহার পানে চাহিয়া হিসাব করিয়া কমলাকান্ত বলিল, “আমার বয়স একান্ন বৎসর, দুই মাস, তের দিন, চারি ঘণ্টা, পাঁচ মিনিট ___”

উকীল । কি জ্বালা! তোমার ঘণ্টা মিনিট কে চায়?

কমলা। কেন, এইমাত্র প্রতিজ্ঞা করাইয়াছেন যে, কোন কথা গোপন করিব না।

উকীল । তোমার যা ইচ্ছা কর! আমি তোমায় পারি না। তোমার নিবাস কোথা?

কমলা। আমার নিবাস নাই।

উকীল । বলি, বাড়ী কোথা?

কমলা। বাড়ী দূরে থাক, আমার একটা কুঠারীও নাই।

উকীল । তবে থাক কোথা?

কমলা। যেখানে সেখানে।

উকীল । একটা আড্ডা ত আছে?

কমলা। ছিল, যখন নসী বাবু ছিলেন। এখন আর নাই।

উকীল । এখন আছ কোথা?

কমলা। কেন, এই আদালতে।

উকীল । কাল ছিলে কোথা?

কমলা। একখানা দোকানে।

হাকিম বলিলেন, “আর বকাবকিতে কাজ নাই-আমি লিখিয়া লইতেছি, নিবাস নাই। তারপর?

উকীল । তোমার পেশা কি?

কমলা। আমার আবার পেশা কি? আমি কি উকীল না বেশ্যা যে, আমার পেশা আছে?

উকীল । বলি, খাও কি করিয়া?

কমলা। ভাতের সঙ্গে ডাল মাখিয়া, দক্ষিণ হস্তে গ্রাস তুলিয়া, মুখে পুরিয়া গলাধঃকরণ করি।

উকীল । সে ডাল ভাত জোটে কোথা থেকে?

কমলা। ভগবান্ জোটালেই জোটে, নইলে জোটে না।

উকীল । কিছু উপার্জ্জন কর?

কমলা। এক পয়সাও না।

উকীল । তবে কি চুরি কর?

কমলা। তাহা হইলে ইতিপূর্ব্বেই আপনার শরণাগত হইতে হইত। আপনি কিছু ভাগও পাইতেন।

উকীল তখন হাল ছাড়িয়া দিয়া, আদালতকে বলিলেন, “আমি এ সাক্ষী চাহি না। আমি ইহার জোবানবন্দী করাইতে পারিব না |”

প্রসন্ন বাদিনী, উকীলের কোমর ধরিল; বলিল, “এ সাক্ষী ছাড়া হইবে না। এ বামন সত্য কথা বলিবে, তাহা আমি জানি-কখনও মিছা বলে না। উহাকে তোমরা জিজ্ঞাসা করিতে জান না-তাই ও অমন করিতেছে। ও বামনের আবার পেশা কি? ও এর বাড়ী ওর বাড়ী খেয়ে বেড়ায়, ওকে জিজ্ঞাসা করিতেছ, উপার্জ্জন কর! ও কি বলবে?”

উকীল তখন হাকিমকে বলিল, “লিখুন, পেশা ভিক্ষা |”

এবার কমলাকান্ত রাগিল, “কি? কমলাকান্ত চক্রবর্ত্তী ভিক্ষোপজীবী? আমি মুক্তকণ্ঠে হলফের উপর বলিতেছি, আমি কখনও কাহারও কাছে এক পয়সা ভিক্ষা চাই না |”

প্রসন্ন আর থাকিতে পারিল না-সে বলিল, “সে কি ঠাকুর! কখন আফিঙ্গ চেয়ে খাও নাই?”

কমল। দূর মাগি ধেমো গোয়ালার মেয়ে! আফিঙ্গ কি পয়সা! আমি কখন একটি পয়সাও কাহারও কাছে ভিক্ষা লই নাই।

হাকিম হাসিয়া বলিলেন, “কি লিখিব কমলাকান্ত?”

কমলাকান্ত নরম হইয়া বলিল, “লিখুন, পেশা ব্রাহ্মণভোজনের নিমন্ত্রণ-গ্রহণ” সকলে হাসিল-হাকিম তাই লিখিয়া লইলেন।

তখন উকীল মহাশয় মোকদ্দমায় প্রবৃত্ত হইলেন। জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কি ফরিয়াদীকে চেন?”

কমল। না।

প্রসন্ন হাঁকিল, “সে কি ঠাকুর! চিরটা কাল আমার দুধ দই খেলে, আজ বল চিনি না?”

কমলাকান্ত বলিল, “তোমার দুধ দই চিনি না, এমন কথা ত বল্‌তেছি না-তোমার দুধ দই বিলক্ষণ চিনি। যখনই দেখি এক পোয়া দুধে তিন পোয়া জল, তখনই চিনিতে পারি যে, এ প্রসন্ন গোয়ালিনীর দুধ; যখনই দেখ্‌তে পাই যে, ঘোলের চেয়ে দই ফিকে, তখনই চিনতে পারি যে, এ প্রসন্নময়ীর দুধ। দুধ দই চিনি নে?”

প্রসন্ন নথ ঘুরাইয়া বলিল, “আমার দুধ দই চেন, আর আমায় চিনিতে পার না?”

কমলাকান্ত বলিল, “মেয়েমানুষকে কে কবে চিনিতে পেরেছে, দিদি? বিশেষ, গোয়ালার মেয়ের কাঁকালে যদি দুধের কেঁড়ে থাকিল, তবে কার বাপের সাধ্য তাকে চিনে উঠে?”

উকীল তখন আবার সওয়াল করিতে লাগিলেন, “বুঝা গেল; তুমি বাদিনীকে চেন-উহার সঙ্গে তোমার কোন সম্বন্ধ আছে?”

কমল। মন্দ নয়-এত গুণ না থাকিলে কি উকীল হয়!

উকীল । তুমি আমার কি গুণ দেখিলে?

কমল। বামনের ছেলে গোয়ালার মেয়েতেও আপনি একটা সম্বন্ধ খুঁজিয়া বেড়াইতেছেন।

উকীল । এমন সম্বন্ধ কি হয় না? কে জানে তুমি ওর পোষ্যপুত্র কি না?

কমল। ওর নয়, কিন্তু ওর গাইয়ের বটে।

উকীল । বুঝা গেল, তোমার সঙ্গে বাদিনীর একটা সম্বন্ধ আছে, একেবারে সাফ বলিলেই হইত-এত দুঃখ দাও কেন? এখন জিজ্ঞাসা করি, তুমি এ মোকদ্দমার কি জান?

কমল। জানি যে, এ মোকদ্দমায় আপনি উকীল, প্রসন্ন ফরিয়াদী, আমি সাক্ষী আর এই নেড়ে আসামী।

উকীল । তা নয়, গোরুচুরির কি জান?

কমল। গোরুচুরির আমার বাপ-দাদাও জানে না। বিদ্যাটা আমায় শিখাইবেন?-আমার দুধ দধির বড় দরকার।

উকীল । আঃ-বলি গোরুচুরি দেখিয়াছ?

কমল। একদিন দেখিয়াছিলাম। নসী বাবুর একটা বক্‌না-এক বেটা মুচি-

উকীল । কি যন্ত্রণা! বলি, প্রসন্ন গোয়ালিনীর গোরু যখন চুরি যায়, তখন তুমি দেখিয়াছ?

কমল। না-চোর বেটার এত বুদ্ধি হয় নাই যে, আমাকে ডাকিয়া সাক্ষী রাখিয়া গোরুটা চুরি করে। তাহা হইলে আপনারও কাজে সুবিধা হইত, আমারও কাজের সুবিধা হইত।

প্রসন্ন দেখিল, উকীলকে টাকা দেওয়া সার্থক হয় নাই –তখন আপনার হাতে হাল লইবার ইচ্ছায়, উকীলের কাণে কাণে বলিয়া দিল, “ও বামুন সে সব কিছুর সাক্ষী নয়-ও কেবল গোরু চেনে |”

উকীল মহাশয় তখন কূল পাইলেন। গর্জ্জিয়া উঠিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি গোরু চেন?”

কমলাকান্ত মধুর হাসিয়া বলিল, “আহা চিনি বই কি-নহিলে কি আপনার সঙ্গে এত মিষ্টালাপ করি?”

হাকিম দেখিলেন, সাক্ষী বড় বাড়াবাড়ি করিতেছে-বলিলেন, “ও সব রাখ |” প্রসন্ন গোয়ালীর শামলা গাই আদালতের সম্মুখে মাঠে বাঁধা ছিল-দেখা যাইতেছিল। ডিপুটি বাবু সেই দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি এই গোরুটিকে চেন?”

কমলাকান্ত যোড়হাত করিয়া বলিল, “কোন্ গোরুটি, ধর্ম্মাবতার?”

হাকিম বলিলেন, “কোন্ গোরুটি কি? একটি বই ত সাম্‌নে নাই?”

কমল। আপনি দেখিতেছেন, একটি-আমি দেখিতেছি অনেকগুলি।

হাকিম বিরক্ত হইয়া বলিলেন, “দেখিতে পাইতেছ না-ঐ শামলা?”

কমলাকান্ত শামলা গাইয়ের দিকে না চাহিয়া উকীলের শামলার প্রতি চাহিল। বলিল, “এ শামলাও চুরির না কি?”

কমলাকান্তের নষ্টামি হাকিম আর সহ্য করিতে পারিলেন না-বলিলেন, “তুমি আদালতের কাজের বড় বিঘ্ন করিতেছ-Contempt of Court জন্য তোমার পাঁচ টাকা জরিমানা |”

কমলাকান্ত আভূমিপ্রণত সেলাম করিয়া যোড়হাত করিয়া বলিল, “বহুৎ খুব হুজুর! জরিমানা আদায়ের ভার কার প্রতি?”

হাকিম। কেন?

কমল। কিরূপে আদায় করিবেন, সে বিষয়ে তাঁহাকে কিছু উপদেশ দিব।

হাকিম। উপদেশের প্রয়োজন কি?

কমল। ইহলোকে ত আমার নিকট জরিমানা আদায়ের কোন সম্ভাবনা নাই- তিনি পরলোকে যাইতে প্রস্তুত কি না জিজ্ঞাসা করিব।

হাকিম। জরিমানা না দিতে পার, কয়েদ যাইবে।

ক। কত দিনের জন্য, ধর্ম্মাবতার?

হাকিম। জরিমানা অনাদায়ে এক মাস কয়েদ।

কমল। দুই মাস হয় না?

হাকিম। বেশী মিয়াদের ইচ্ছা কর কেন?

কমল। সময়টা কিছু মন্দ পড়িয়াছে-ব্রাহ্মণভোজনের নিমন্ত্রণ আর তেমন সুলভ নয়-জেলখানায় যাহাতে মাস দুই ব্রাহ্মণভোজনের নিমন্ত্রণ হয়, সে ব্যবস্থা যদি আপনি করেন, তবে গরীব ব্রাহ্মণ উদ্ধার পায়।

এরূপ লোককে জরিমানা বা কয়েদ করিয়া কি হইবে? হাকিম হাসিয়া বলিলেন, “আচ্ছা, তুমি যদি গোল না করিয়া সোজা জোবানবন্দী দাও, তবে তোমার জরিমানা মাপ করা যাইতে পারে। বল-ঐ গোরু তুমি চেন কি না?”

হাকিম তখন একজন কনষ্টেবলকে আদেশ করিলেন যে গোরুর নিকট গিয়া প্রসন্নের গাই দেখাইয়া দেয়। কনষ্টেবল তাহাই করিল। বিষণ্ণ উকীল বাবু তখন জিজ্ঞাসা করিলেন, “ঐ গোরু তুমি চেন?”

কমল। সিংওয়ালা গোরু-তাই বলুন।

উকীল । তুমি বল কি?

কমল। আমি বলি শামলাওয়ালা-তা যাক্-আমি ও সিংওয়ালা গোরুটা চিনি। বিলক্ষণ আলাপ আছে।

উকীল । ও কার গোরু?

কমল। আমার।

উকীল । তোমার!

কমল। আমারই।

হরি হরি! প্রসন্নের মুখ শুকাইল! উকীল দেখিল, মোকদ্দমা ফাঁসিয়া যায়। প্রসন্ন তখন তর্জ্জন গর্জ্জন করিয়া বলিল, “তবে রে বিটলে! গোরু তোমার!”

কমলাকান্ত বলিল, “আমার না ত কার! আমি ওর দুধ খেয়েছি, ওর দই খেয়েছি-ওর ঘোল খেয়েছি, ওর ছানা খেয়েছি-ওর মাখন খেয়েছি, ওর ননী খেয়েছি-ও গোরু আমার হলো না, তুই বেটী পালিস্ ব’লে কি তোর বাবার গোরু হলো!”

উকীল অতটা বুঝিলেন না। বলিলেন, “ধর্ম্মাবতার, witness hostile! permission দিন আমি ওকে cross করি |”

কমল। কি? আমায় cross করিবে?

উকিল। হাঁ করিব।

কমল। নৌকায়, না সাঁকো বেঁধে?

উকিল। সে আবার কি?

কমল। বাবা! কমলাকান্ত-সাগর পার হও, এত বড় হনূমান্ তুমি আজও হও নাই।

এই বলিয়া কমলাকান্ত চক্রবর্ত্তী রাগে গর্ গর্ করিয়া কাটরা হইতে নামিয়া যায়-চাপরাশী ধরিয়া আবার কাটরায় পূরিল। তখন কমলাকান্ত আলু থালু হইয়া নিশ্চেষ্ট হইল-বলিল, “কর বাবা ক্রস্ কর!-আমি অগাধ সমুদ্রে পড়িয়া আছি-যে ইচ্ছা লম্ফ দাও-‘অপামিবাধারমনুত্তরঙ্গং!-উকিল মহাশয়! এ প্রশান্ত মহাসমুদ্র তরঙ্গ বিক্ষেপ করে না আপনি স্বচ্ছন্দে উল্লম্ফন করুন |”

উকীল তখন কোর্টকে বলিলেন, “ধর্ম্মাবতার, দেখা যাইতেছে যে, এ ব্যক্তি বাতুল; ইহাকে আর ক্রস্ করিবার প্রয়োজন নাই। বাতুল বলিয়া ইহার জবানবন্দী পরিত্যক্ত হইবে। ইহাকে বিদায় দেওয়া হউক |”

হাকিম কমলাকান্তের হাত হইতে নিষ্কৃতি পাইলে বাঁচেন, বিদায় দিতে প্রস্তুত, এমত সময়ে প্রসন্ন হাত যোড় করিয়া আদালতে নিবেদন করিল, “যদি হুকুম হয়, তবে আমি স্বয়ং উহাকে গোটা কত কথা জিজ্ঞাসা করি, তার পর বিদায় দিতে হয়, দিবেন |”

হাকিম কৌতূহলী হইয়া অনুমতি দিলেন। প্রসন্ন তখন কমলাকান্তের প্রতি চাহিয়া বলিল, “ঠাকুর! মৌতাতের সময় হয়েছে না?”

কমল। মৌতাতের আবার সময় কি রে বেটী –“অজরামরবৎ প্রাজ্ঞঃ বিদ্যাং নেশ্চাঞ্চ চিন্তয়েৎ |”

প্রসন্ন । অং বং এখন রাখ –এখন মৌতাত করিবে?

কমল। দে!

প্রসন্ন । আচ্ছা, আগে আমার কথার উত্তর দাও –তার পর সে হবে।

কমল। তবে জল্‌দি জল্‌দি বল – জল্‌দি জল্‌দি জবাব দিই।

প্রসন্ন । বলি, গোরু কার?

কমল। গোরু তিন জনের; গোরু প্রথমে বয়সে গুরুমহাশয়ের; মধ্যবয়সের স্ত্রীজাতির; শেষ বয়সে উত্তরাধিকারীর; দড়ি ছিঁড়িবার সময়ে কারও নয়।

প্রসন্ন । বলি, ঐ শামলা গাই কার?

কমল। যে ওর দুধ খায় তার।

প্রসন্ন । ও গোরু আমার কি না?

কমল। তুই বেটী কখন ওর এক বিন্দু দুধ খেলি নে, কেবল বেচে মর্‌লি, গোরু তোর হলো? ও গোরু যদি তোর হয়, তবে বাঙ্গাল বেঙ্কের টাকাও আমার। দে বেটী, গোরুচোরকে ছেড়ে দে-গরীবের ছেলে দুধ খেয়ে বাঁচুক।

হাকিম দেখিলেন, দুই জনে বড় বাড়াবাড়ি করিতেছে-আদালত মেছো-হাটা হইয়া উঠিল। তখন উভয়কে ধমক দিয়া জিজ্ঞাসাবাদ নিজহস্তে লইলেন। জিজ্ঞাসা করিলেন, “প্রসন্ন এই গোরুর দুধ বেচে?”

কমল। আজ্ঞে, হাঁ।

“উহার গোহালে এই গোরু থাকে?”

কমল। ও গোরুও থাকে, আমিও কখন কখন থাকি।

“ওই খাওয়ায়?”

কমল। উভয়কে।

বাদিনীর উকীল তখন বলিলেন, “আমার কার্য্য সিদ্ধ হইয়াছে-আমি উহাকে জিজ্ঞাসা করিতে চাই না”। এই বলিয়া তিনি উপবেশন করিলেন। তখন আসামীর উকীল গাত্রোত্থান করিলেন। দেখিয়া কমলাকান্ত জিজ্ঞাসা করিলেন, “আবার তুমি কে?”

আসামীর উকীল বলিলেন, “আমি আসামীর পক্ষে তোমাকে ক্রস্ করিব”।

কমল। একজন ত ক্রস্ করিয়া গেল, আবার তুমি কুমার বাহাদুর এলে না কি?

উকীল । কুমার বাহাদুর কে?

কমল। রাজপুত্রকে চেন না? ত্রেতা যুগে আগে ক্রস্ করিলেন, পবনাঙ্গজ মহাশয়। তার পর ক্রস্ করিলেন, কুমার বাহাদুর।20

উকীল । ও সব রাখ-তুমি গোরু চেন বলেছ-কিসে চেন?

কমল। কখন শিঙ্গে-কখন শামলায়!

উকীল রাগিয়া উঠিয়া, গর্জ্জন করিয়া টেবিল চাপড়াইয়া বলিলেন, “তোমার পাগলামি রাখ-তুমি এই গোরু চিনিতে পারিতেছ কিসে?”

কমল। ঐ হাম্বা-রবে।

উকীল হতাশ হইয়া বলেন, “Hopeless” উকীল মহাশয় বসিয়া পড়িলেন-আর জেরা করিবেন না। কমলাকান্ত বিনীতভাবে বলিল, “দড়ি ছেঁড় কেন বাবা?”

উকীল আর জেরা করিবেন না দেখিয়া হাকিম কমলাকান্তকে বিদায় দিলেন। কমলাকান্ত উর্দ্ধ্বশ্বাসে পলাইল। আমি কিছু কাজ সারিয়া বাহিরে আসিয়া দেখিলাম যে, কমলাকান্ত থেলো হুঁকা হাতে করিয়া বসিয়া আছে-চারি দিকে লোক জমিয়াছে-প্রসন্নও সেখানে আসিয়াছে। কমলাকান্ত তাহাকে তিরস্কার করিতেছে আর বলিতেছে, “তোর মঙ্গলার বাঁটের দিব্য, তোর দুধের কেঁড়ের দিব্য, তোর ঘোলমউনির দিব্য, তোর ফাঁদি-নথের দিব্য, তুই যদি চোরকে গোরু ছেড়ে না দিস্!”

আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “চক্রবর্ত্তী মহাশয়! চোরকে গোরু ছাড়িয়া দিবে কেন?”

কমলাকান্ত বলিল, “পূর্ব্বকালে মহারাজ শ্যেনজিৎকে এক ব্রাহ্মণ বলিয়াছিল যে, ‘বৎস, গোপস্বামী ও তস্কর, ইহাদের মধ্যে যে ধেনুর দুগ্ধ পান করে, সেই তাহার যথার্থ অধিকারী। অন্যের তাহার উপর মমতা প্রকাশ করা বিড়ম্বনা মাত্র।21 এই হলো ভীষ্মদেব ঠাকুরের Hindu Law, আর ইহাই ইউরোপের International Law। যদি সভ্য এবং উন্নত হইতে চাও, তবে কাড়িয়া খাইবে। গো শব্দে ধেনুই বুঝ, আর পৃথিবীই বুঝ, ইনি তস্করভোগ্যা। সেকন্দর হইতে রণজিৎ সিংহ পর্য্যন্ত সকল তস্করই ইহার প্রমাণ। Right of Conquest যদি একটা right হয়, তবে Right of theft, কি একটা right নয়? অতএব, হে প্রসন্ন নামে গোপকন্যে! তুমি আইনমতে কার্য্য কর। ঐতিহাসিক রাজনীতির অনুবর্ত্তী হও। চোরকে গোরু ছাড়িয়া দাও |”

এই বলিয়া কমলাকান্ত সেখান হইতে চলিয়া গেল। দেখিলাম, মানুষটা নিতান্ত ক্ষেপিয়া গিয়াছে।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প সুকুমার রায়

হারকিউলিস

-সুকুমার রায়

মহাভারতে যেমন ভীম, গ্রীস দেশের পুরাণে তেমনই হারকিউলিস। হারকিউলিস দেবরাজ জুপিটারের পুত্র কিন্তু তার মা এই পৃথিবীরই এক রাজকন্যা, সুতরাং তিনিও ভীমের মত এই পৃথিবীরই মানুষ, গদাযুদ্ধে আর মল্লযুদ্ধে তাঁর সমান কেহ নাই। মেজাজটি তাঁর ভীমের চাইতেও অনেকটা নরম, কিন্তু তাঁর এক একটি কীর্তি এমনি অদ্ভুত যে, পড়িতে পড়িতে ভীম, অর্জুন, কৃষ্ণ আর হনুমান এই চার মহাবীরের কথা মনে পড়ে।

হারকিউলিসের জন্মের সংবাদ যখন স্বর্গে পৌঁছিল, তখন তাঁর বিমাতা জুনো দেবী হিংসায় জ্বলিয়া বলিলেন, “আমি এই ছেলের সর্বনাশ করিয়া ছাড়িব।” জুনোর কথামত দুই প্রকান্ড বিষধর সাপ হারকিউলিসকে ধ্বংস করিতে চলিল। সাপ যখন শিশু হারকিউলিসের ঘরে ঢুকিল, তখন তাহার ভয়ঙ্কর মূর্তি দেখিয়া ঘরসুদ্ধ লোকে ভয়ে আড়ষ্ট হইয়া গেল, কেহ শিশুটিকে বাঁচাইবার জন্য চেষ্টা করিতে পারিল না। কিন্তু হারকিউলিস নিজেই তাঁর দুইখানি কচি হাত বাড়াইয়া সাপ দুটার গলায় এমন চাপিয়া ধরিলেন যে, তাহাতেই তাদের প্রাণ বাহির হইয়া গেল। জুনো বুঝিলেন, এ বড় সহজ শিশু নয়! বড় হইয়া হারকিউলিস সকল বীরের গুরু বৃদ্ধ চীরনের কাছে অস্ত্রবিদ্যা শিখিতে গেলেন। চীরন জাতিতে সেন্টর—তিনি মানুষ নন। সেন্টরদের কোমর পর্যন্ত মানুষের মত, তার নীচে একটা মাথাকাটা ঘোড়ার শরীর বসান। চীরনের কাছে অস্ত্রবিদ্যা শিখিয়া হারকিউলিস অসাধারণ যোদ্ধা হইয়া উঠিলেন। তখন তিনি ভাবিলেন, ‘এইবার পৃথিবীটাকে দেখিয়া লইব।’

হারকিউলিস পৃথিবীতে বীরের উপযুক্ত কাজ খুঁজিতে বাহির হইয়াছেন, এমন সময় দুটি আশ্চর্য সুন্দর মূর্তি তাঁর সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। হারকিউলিস দেখিলেন দুটি মেয়ে—তাদের একজন খুব চঞ্চল, সে নাকে-চোখে কথা কয়, তার দেমাকের ছটায় আর অলঙ্কারের বাহারে যেন চোখ ঝলসাইয়া দেয়। সে বলিল, “হারকিউলিস, আমাকে তুমি সহায় কর, আমি তোমায় ধন দিব, মান দিব, সুখে স্বচ্ছন্দে আমোদের আহ্লাদে দিন কাটাইবার উপায় করিয়া দিব।” আর একটি মেয়ে শান্তশিষ্ট, সে বলিল, “আমি তোমাকে বড় বড় কাজ করিবার সুযোগ দিব, শক্তি দিব, সাহস দিব। যেমন বীর তুমি তার উপযুক্ত জীবন তোমায় দিব।” হারকিউলিস খানিক চিন্তা করিয়া বলিলেন, “আমি ধন মান সুখ চাই না—আমি তোমার সঙ্গেই চলিব। কিন্তু তোমার পরিচয় জানিতে চাই।” তখন দ্বিতীয় সুন্দরী বলিল, “আমার নাম পুন্য। আজ হইতে আমি তোমার সহায় থাকিলাম।”

তারপর কত বৎসর হারকিউলিস দেশে দেশে কত পুন্য কাজ করিয়া ফিরিলেন—তাঁর গুণের কথা আর বীরত্বের কথা চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল। থেবিসের রাজা ক্রয়ন্‌ তাঁর সঙ্গে তাঁর কন্যা মেগারার বিবাহ দিলেন। হারকিউলিস নিজের পুন্য ফলে কয়েক বৎসর সুখে কাটাইলেন।

কিন্তু বিমাতা জুনোর মনে হারকিউলিসের এই সুখ কাঁটার মত বিঁধিল। তিনি কী চক্রান্ত করিলেন, তাহার ফলে একদিন হারকিউলিস হঠাৎ পাগল হইয়া তাঁর স্ত্রী পুত্র সকলকে মারিয়া ফেলিলেন। তারপর যখন তাঁর মন সুস্থ হইল, যখন তিনি বুঝিতে পারিলেন যে পাগল অবস্থায় কি সর্বনাশ করিয়াছেন, তখন শোকে অস্থির হইয়া এক পাহাড়ের উপরে নির্জন বনে গিয়া তিনি ভাবিতে লাগিলেন, ‘আর বাঁচিয়া লাভ কি?’

হারকিউলিস দুঃখে বনবাসী হইয়াছেন, এদিকে জুনো ভাবিতেছেন, ‘একনও যথেষ্ট হয় নাই।’ তিনি দেবতাদের কুমন্ত্রণা দিয়া এই ব্যবস্থা করাইলেন যে, এক বৎসর সে আর্গসের দুর্দান্ত রাজা ইউরিসথিউসের দাসত্ব করিবে।

হারকিউলিস প্রথমে এই অন্যায় আদেশ পালন করিতে রাজী হন নাই—কিন্তু দেবতার হুকুম লঙ্ঘন করিবার উপায় নাই দেখিয়া, শেষে তাহাতেই সম্মত হইলেন। রাজা ইউরিসথিউস্‌ ভাবিলেন, এইবার হারকিউলিসকে হাতে পাওয়া গিয়াছে। ইহাকে দিয়া এমন সব অদ্ভুত কাজ করাইয়া লইব, যাহাতে আমার নাম পৃথিবীতে অমর হইয়া থাকিবে।

নেমিয়ার জঙ্গলে এক দুর্দান্ত সিংহ ছিল, তার দৌরাত্মে দেশের লোক অস্থির হইয়া পড়িয়াছিল। রাজা ইউরিসথিউস্‌ বলিলেন, ‘যাও হারকিউলিস! সিংহটাকে মারিয়া আইস।” হারকিউলিস সিংহ মারিতে চলিলেন। “কোথায় সেই সিংহ?” পথে যাকে জিজ্ঞাসা করেন সেই বলে, “কেন বাপু সিংহের হাতে প্রাণ দিবে? সে সিংহকে কি মানুষে মারিতে পারে? আজ পর্যন্ত যে-কেহ সিংহ মারিতে গিয়াছে সে আর ফিরে নাই।” কিন্তু হারকিউলিস ভয় পাইলেন না। তিনি একাকী গভীর বনে সিংহের গহ্বরে ঢুকিয়া, সিংহের টুঁটি চাপিয়া তাহার প্রাণ বাহির করিয়া দিলেন। তারপর সেই সিংহের চামড়া পরিয়া তিনি রাজার কাছে সংবাদ দিতে ফিরিলেন।

রাজা বলিলেন, “এবার যাও লের্নার জলাভুমিতে। সেখানে হাইড্রা নামে সাতমুণ্ড সাপ আছে, তাহার ভয়ে লোকজন দেশ ছাড়িয়া পলাইতেছে। জন্তুটাকে না মারিলে ত আর চলে না।” হারকিউলিস তৎক্ষণাৎ সাতমুণ্ড জানোয়ারের সন্ধানে বাহির হইলেন।

লের্নার জলাভুমিতে গিয়া আর সন্ধান করিতে হইল না, কারণ, হাইড্রা নিজেই ফোঁস ফোঁস শব্দে আকাশ কাঁপাইয়া তাঁকে আক্রমণ করিতে আসিল। হারকিউলিস এক ঘায়ে তার একটা মাথা উড়াইয়া দিলেন—কিন্তু, সে কি সর্বনেশে জানোয়ার—সে একটা কাটা মাথার জায়গায় দেখিতে দেখিতে সাতটা নূতন মাথা গজাইয়া উঠিল। হারকিউলিস দেখিলেন, এ জন্তু সহজে মরিবা নয়। তিনি তাঁহার সঙ্গী ইয়োলাসকে বলিলেন, “একটা লোহা আগুনে রাঙাইয়া আন ত।” তখন জ্বলন্ত গরম লোহা আনাইয়া তারপর হাইড্রার এক একটা মাথা উড়াইয়া কাটা জায়গায় লোহার ছ্যাঁকা দিয়া পোড়াইয়া দেওয়া হইল। কিন্তু এত করিয়াও নিস্তার নাই, শেষ একটা মাথা আর কিছুতেই মরিতে চায় না—সাপের শরীর হইতে একেবারে আলগা হইয়াও সে সাংঘাতিক হাঁ করিয়া কামড়াইতে আসে। হারকিউলিস তাহাকে পিটিয়া মাটিতে পুঁতিয়া, তাহার উপর প্রকাণ্ড পাথর চাপা দিয়া তবে নিশ্চিন্ত হইতে পারিলেন। ফিরিবার আগে হারকিউলিস সে সাপের রক্তে কতগুলা তীরের মুখ ডুবাইয়া লইলেন, কারণ, তাঁহার গুরু চীরণ বলিয়াছেন—হাইড্রার রক্তমাখা তীর একেবারে অব্যর্থ মৃত্যুবাণ।

হারকিউলিস ইউরিসথিউসের দেশে ফিরিয়া গেলে পর, কিছুদিন বাদেই আবার তাঁর ডাক পড়িল। এবারে রাজা বলিলেন, “সেরিনিয়ার হরিণের কথা শুনিয়াছি, তার সোনার শিং, লোহার পা, সে বাতাসের আগে ছুটিয়া চলে। সে হরিণ আমার চাই—তুমি তাহাকে জীবন্ত ধরিয়া আন।” হারকিউলিস আবার চলিলেন। কত দেশ দেশান্তর, কত নদী সমুদ্র পার হইয়া, দিনের পর দিন সেই হরিণের পিছন ঘুরিয়া ঘুরিয়া, শেষে উত্তরের ঠান্ডা দেশে বরফের মধ্যে হরিণ যখন শীতে অবশ হইয়া পড়িল, তখন হারকিউলিস সেখান হইতে তাকে উদ্ধার করিয়া রাজার কাছে হাজির করিলেন।

ইহার পর রাজা হুকুম দিলেন, এরিম্যান্থাসের রাক্ষসবরাহকে মারিতে হইবে। সে বরাহ খুবই ভীষ্ণ বটে, কিন্তু তাকে মারিতে হারকিউলিসের বিশেষ কোন ক্লেশ হইবার কথা নয়। তা ছাড়া, বরাহ পলাইবার পাত্র নয়, সুতরাং তার জন্য দেশ বিদেশ ছুটিবারও দরকার হয় না। হারকিউলিস সহজেই কার্যোদ্ধার করিতে পারিতেন, কিন্তু মাঝ হইতে একদল হতভাগা সেন্টর আসিয়া তাঁর সহিত তুমুল ঝগড়া বাধাইয়া বসিল। হারকিউলিস তখন সেই হাইড্রার রক্ত-মাখান বিষবাণ ছুঁড়িয়া তাদের মারিতে লাগিলেন। এদিকে বৃদ্ধ চীরণের কাছে খবর গিয়াছে যে, হারকিউলিস নামে কে একটা মানুষ আসিয়া সেন্টরদের মারিয়া শেষ করিল। চীরণ তখনই ঝগড়া থামাইবার জন্য ব্যস্ত হইয়া দৌড়িয়া আসিতেছেন, এমন সময়, হঠাৎ করিয়া হারকিউলিসের একটা তীর ছুটিয়া তাঁর গায়ে বিঁধিয়া গেল। সকলে হায় হায় করিয়া উঠিল, হারকিউলিসও অস্ত্র ফেলিয়া ছুটিয়া আসিলেন। সেন্টরেরা অনেকরকম ঔষধ জানে, হারকিউলিসও তাঁর গুরুর কাছে অস্ত্রাঘাতের নানারকম চিকিৎসা শিখিয়াছেন—কিন্তু সে বিষবাণ এমন সাংঘাতিক, তার কাছে কোন চিকিৎসাই খাটিল না। চীরণ আর বাঁচিলেন না। এবার হারকিউলিস তাঁর কাজ সারিয়া, নিতান্ত বিষন্ন মনে গুরুর কথা ভাবিতে ভাবিতে দেশে ফিরিলেন।

হারকিউলিস একা সেন্টরদের যুদ্ধে হারাইয়াছেন, এই সংবাদ চারিদিকে রাষ্ট্র হইয়া পড়িল। সকলে বলিল, “হারকিউলিস না জানি কর বড় বীর! এমন আশ্চর্য কীর্তির কথা আমরা আর শুনি নাই।” আসলে কিন্তু হারকিউলিসের বড় বড় কাজ এখনও কিছুই করা হয় নাই—তাঁর কীর্তির পরিচয় সবেমাত্র আরম্ভ হইয়াছে।

বরাহ মারিয়া হারকিউলিস অল্পই বিশ্রাম করিবার সুযোগ পাইলেন—কারণ তারপরেই এলিস নগরের রাজা আগিয়াসের গোয়ালঘর সাফ করিবার জন্য তাঁহার ডাক পড়িল। আগিয়াসের প্রকান্ড গোয়ালঘরে অসংখ্য গরু, কিন্তু বহু বৎসর ধরিয়া সে ঘর কেহ ঝাঁট দেয় না, ধোয় না—সুতরাং তাহার চেহারাটি তখন কেমন হইয়াছিল, তাহা কল্পনা করিয়া দেখ। গোয়ালঘরের অবস্থা দেখিয়া হারকিউলিস ভাবনায় পড়িলেন। প্রকান্ড ঘর, তাহার ভিতর হাঁটিয়া দেখিতে গেলেই ঘণ্টাখানেক সময় যায়। সেই ঘরের ভিতর হয়ত বিশ বৎসরের আবর্জনা জমিয়াছে—অথচ একজন মাত্র লোকে তাকে সাফ করিবে। ঘরের কাছ দিয়া আলফিউস নদী স্রোতের জোরে প্রবল বেগে বহিয়া চলিয়াছে—হারকিউলিস ভাবিলেন—’এই ত চমৎকার উপায় হাতের কাছেই রহিয়াছে!’ তিনি তখন একাই গাছ পাথরের বাঁধ বাঁধিয়া স্রোতের মুখ ফিরাইয়া, নদীটাকে সেই গোয়ালঘরের উপর দিয়া চালাইয়া দিলেন। নদী হু হু শব্দে নূতন পথে বহিয়া চলিল, বিশ বৎসরের জঞ্জাল মুহূর্তের মধ্যে ধুইয়া সাফ হইয়া গেল। তারপর দেখানকার নদী সেখানে রাখিয়া তিনি দেশে ফিরিলেন।

এদিকে ক্রীটদ্বীপে আর এক বিপদ দেখা দিয়াছে। জলের দেবতা নেপচুন সে দেশের রাজাকে এক প্রকান্ড ষাঁড় উপহার দিয়া বলিয়াছেন, “এই জন্তুটিকে তুমি দেবতার নামে উৎসর্গ করিয়া বলি দাও।” কিন্তু ষাঁড়টি এমন সুন্দর যে, তাকে বলি দিতে রাজার মন সরিল না—তিনি তার বদলে আর একটি ষাঁড় আনিয়া বলির কাজ সারিলেন। নেপচুন সমুদ্রের নীচে থাকিয়াও এ সমস্তই জানিতে পারিলেন। তিনি তাঁর ষাঁড়কে আদেশ দিলেন, “যাও! এই দুষ্ট রাজার রাজ্য ধ্বংস কারিয়া ইহার অবাধ্যতার সাজা দাও।” নেপচুনের আদেশ সেই সর্বনেশে ষাঁড় পাগলের মত চারিদিকে ছুটিয়া সারাটি রাজ্য উজাড় করিয়া ফিরিতেছে। একে দেবতার ষাঁড়, তার উপর যেমন পাহাড়ের মত দেহখানি, তেমনই আশ্চর্য তার শরীরের তেজ—কাজেই রাজ্যের লোক প্রাণভয়ে দেশ ছাড়িয়া পলাইবার জন্য ব্যস্ত। এমন জন্তুকে বাগাইবার জন্য ত হারকিউলিসের ডাক পড়িবেই। হারকিউলিসও অতি সহজেই তাকে শিং ধরিয়া মাটিতে আছড়াইয়া একেবারে পোঁটলা বাঁধিয়া রাজসভায় নিয়া হাজির করিলেন। রাজা ইউরিসথিউসের মেয়ে বাপের বড় আদুরে। সে একদিন আবদার ধরিল তাকে হিপোলাইটের চন্দ্রহার আনিয়া দিতে হইবে। হিপোলাইট এসেজন্‌দের রানী। এসেজন্‌দের দেশে কেবল মেয়েদেরই রাজত্ব। বড় সর্বনেশে মেয়ে তারা— সর্বদাই লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত, পৃথিবীর কোন মানুষকে তারা ডরায় না। কিন্তু হারকিউলিসকে তারা খুব খাতির সম্মান করিয়া তাদের রানীর কাছে লইয়া গেল। হারকিউলিস তখন রানীর কাছে তার প্রার্থনা জানাইলেন। রানী বলিলেন, “আজ তুমি খাও-দাও, বিশ্রাম কর, কাল অলঙ্কার লইতে আসিও।” হারকিউলিসের সৎমা জুনো দেবী দেখিলেন, নেহাৎ সহজেই বুঝি এবারের কাজটা উদ্ধার হইয়া যায়। তিনি নিজে এসেজন্‌ সাজিয়া এসেজন্‌ দলে ঢুকিয়া, সকলকে কুমন্ত্রণা দিতে লাগিলেন। তিনি বলিলেন, “এই যে লোকটি রানীর কাছে অলঙ্কার ভিক্ষা করিতে আসিয়াছে ইহাকে তোমরা বড় সহজ পাত্র মনে করিও না। আসলে কিন্তু এ লোকটা আমাদের রানীকে বন্দী করিয়া লইয়া যাইতে চায়। অলঙ্কার-টলঙ্কার ওসকল মিথ্যা কথা—কেবল তোমাদের ভুলাইবার জন্য।” তখন সকলে রুখিয়া একেবারে মার মার শব্দে হারকিউলিসকে আক্রমণ করিল। হারকিউলিস একাকী গদা হাতে আত্মরক্ষা করিতে লাগিলেন। অনেকক্ষণ যুদ্ধের পর এসেজন্‌রা বুঝিল, হারকিউলিসের সঙ্গে পারিয়া উঠা তাহাদের সাধ্য নয়। তখন তাহারা রানীর চন্দ্রহার হারকিউলিসকে দিয়া বলিল, “যে অলঙ্কার তুমি চাহিয়াছিলে, এই লও। কিন্তু তুমি এদেশে আর থাকিতে পাইবে না।” হারকিউলিসের কাজ উদ্ধার হইয়াছে, তাঁর আর থাকিবার দরকার কি? তিনি তখনই তাদের নমস্কার করিয়া ফিরিয়া আসিলেন।

ইউরিসথিউস্‌ মহা সন্তুষ্ট হইয়া বলিলেন, “হারকিউলিস! আমি তোমার উপর বড় সন্তুষ্ট হইলাম। তুমি আমার জন্য আটটি বড় কাজ করিলে, এখন আর চারিটি কাজ করিলে তোমার ছুটি। প্রথম কাজ এই যে, স্টাইমফেলাসের সমুদ্রতীরে যে বড় বড় লৌহমুখ পাখি আছে, সেগুলোকে মারিতে হইবে।” হারকিউলিস হাইড্রার রক্তমাখা বিষাক্ত তীর ছুঁড়িয়া সহজেই পাখিগুলাকে মারিয়া শেষ করিলেন। ইহার পর তিনি রাজার হুকুমে গেরিয়ানিস নামে এক দৈত্যের গোয়াল হইতে তার গরুর দল কাড়িয়া আনিলেন। পথে ক্যাকাস্‌ নামে এক কদাকার দৈত্য কয়েকটা গরু চুরি করিবার চেষ্টা করিয়াছিল। হারকিউলিস তাকে তার বাসা পর্যন্ত তাড়া করিয়া, শেষে গদার বাড়িতে তাহার মাথা গুঁড়াইয়া দেন।

পশ্চিমের দেবতা সন্ধ্যাতারার মেয়েদের নামে হেস্‌পেরাইদিস্‌। লোকে বলিত, তাদের বাগানে আপেল গাছে সোনার ফল ফলে। একদিন রাজা সেই ফল হারকিউলিসের কাছে চাহিয়া বসিলেন। এমন কঠিন কাজ হারলিউলিস আর করেন নাই। ফলের কথা সকলেই জানে, কিন্তু কোথায় যে সে ফল, আর কোথায় যে সে আশ্চর্য বাগান, কেউ তাহা বলিতে পারে না। হারকিউলিস দেশ-বিদেশ ঘুরিয়া কেবলই জিজ্ঞাসা করিয়া ফিরিতে লাগিলেন, কিন্ত কেউ তার জবাব দিতে পারে না। কত দেশের কত রকম লোকের সঙ্গে তাঁর দেখা হইল, সকলেই বলে, “হাঁ, সেই ফলের কথা আমরাও শুনিয়াছি, কিন্তু কোথায় সে বাগান তাহা জানি না।” এই রূপে ঘুরিতে ঘুরিতে একদিন হারকিউলিস এক নদীর ধারে আসিয়া দেখিলেন, কয়েকটি মেয়ে বসিয়া ফুলের মালা গাঁথিতেছে। হারকিউলিস বলিলেন, “ওগো, তোমরা হেস্‌পেরাইডিসের বাগানের কথা জান? সেই যেখানে আপেল গাছে সোনার ফল ফলে?” মেয়েরা বলিল, “আমরা নদীর মেয়ে, নদীর জলে থাকি—আমরা কি দুনিয়ার খবর রাখি? আসল খবর যদি চাও তবে বুড়ার কাছে যাও।” হারকিউলিস বলিলেন, “কে বুড়া? সে কোথায় থাকে?” মেয়েরা বলিল, “সমুদ্রের থুড়্‌থুড়ে বুড়া, যার সবুজ রঙের জটা, যার গায়ে মাছের মত আঁশ, যার হাত-পাগুলো হাঁসের মত চ্যাটাল— সে বুড়া যখন তীরে ওঠে তখন যদি তাকে ধরতে পার, তবে সে তোমায় বলিতে পারিবে পৃথিবীর কোথায় কি আছে। কিন্তু খবরদার! বুড়া বড় সেয়ানা, তাকে ধরিতে পারিলে খবরটা আদায় না করিয়া ছেড়ো না।” হারকিউলিস তাদের অনেক ধন্যবার দিয়া বুড়ার খবর লইতে চলিলেন। সমুদ্রের তীরে তীরে খুঁজিতে খুঁজিতে একদিন হারকিউলিস দেখিলেন, শ্যাওলার মত পোশাক পরা কে একজন সমুদ্রের ধারে ঘুমাইয়া রহিয়াছে। তাহার সবুজ চুল আর গায়ের আঁশেই তার পরিচয় পাইয়া হারকিউলিস এক লাফে তাহার হাত ধরিয়া বলিলেন, “বুড়া! হেস্‌পেরাইডিসের বাগানের সন্ধান বল, নহিলে তোমায় ছাড়িব না।” এই বলিতে না বলিতেই বুড়া তাঁর সামনেই কোথায় মিলাইয়া গেল, তার জায়গায় একটা হরিণ কোথা হইতে আসিয়া দেখা দিল। হারকিউলিস বুঝিলেন এসব বুড়ার শয়তানী, তাই তিনি খুব মজবুত করিয়া হরিণের ঠ্যাং ধরিয়া থাকিলেন। হরিণটা তখন একটা পাখি হইয়া করুণ স্বরে আর্তনাদ আর ছট্‌-ফট্‌ করিতে লাগিল। হারকিউলিস তবু ছাড়িলেন না। তখন পাখিটা একটা তিন-মাথাওয়ালা কুকুরের রূপ ধরিয়া তাঁকে কামড়াইতে আসিল। হারকিউলিস তখন থার ঠাংটা আরও শক্ত করিইয়া চাপিয়া ধরিলেন। তাতে কুকুরটা চিৎকার করিয়া গেরিয়ানের মূর্তিতে দেখা দিল। গেরিয়ান শরীরটা মানুষের মত, কিন্তু তার ছয়টি পা। এক পা হারকিউলিসের মুঠোর মধ্যে, সেইটা ছাড়াইবার জন্য সে পাঁচ পায়ে লাথি ছুঁড়িতে লাগিল।

তাহাতেও ছাড়াইতে না পারিয়া সে প্রকান্ড অজগর সাজিয়া হারকিউলিসকে গিলিতে আসিল। হারকিউলিস ততক্ষণে ভয়ানক চটিয়া গিয়াছেন, তিনি সাপটাকে এমন টুটি চাপিয়া ধরিলেন যে, প্রাণের ভয়ে বুড়া তাহার নিজের মূর্তি ধরিয়া বাহির হইল। বুড়া হাঁপাইতে হাঁপাইতে বলিল, “তুমি কোথাকার অভদ্র হে! বুড়া মানুষের সঙ্গে এরকম বেয়াদবি কর।” হারকিউলিস বলিলেন, “সে কথা পরে হইবে, আগে আমার প্রশ্নের জবাব দাও।” বুড়া তখন বেগতিক দেখিয়া বলিল, “যার কাছে গেলে তোমার কাজটি উদ্ধার হইবে, আমি তার সন্ধান বলিতে পারি। এইদিকে আফ্রিকার সমুদ্রতীর ধরিয়া বরাবর চলিয়া যাও, তাহা হইলে তুমি এটলাস দৈত্যের দেখা পাইবে। এমন দৈত্য আর দ্বিতীয় না। দিনের পর দিন বৎসরের পর বৎসর সমস্ত আকাশটিকে ঘাড়ে করিয়া সে ঠায় দাঁড়াইয়া আছে। এক মুহূর্ত তাহার কোথাও যাইবার যো নাই, তাহা হইলে আকাশ ভাঙ্গিয়া পৃথিবীর উপর পাড়িবে। মেঘের উপরে কোথায় আকাশ পর্যন্ত তাহার মাথা উঠিয়া গিয়াছে, সেখান হইতে দুনিয়ার সবই সে দেখিতে পায়। সে যদি খুশী মেজাজে থাকে, তবে হয়ত তোমার সোনার ফলের কথা বলিতে পারে।” হারকিউলিস তাঁর গদা ঘুরাইয়া বলিলেন, “যদি খুশী মেজাজে না থাকে, তবুও সোনার ফলের কথা তাকে বলাইয়া ছাড়িব। সমুদ্রের বুড়ার কাছে এটলাসের খবর আদায় করিয়া হারকিউলিস তাহার কথা মত আফ্রিকার উপকূল ধরিয়া পশ্চিম মুখে চলিতে লাগিলেন। চলিতে চলিতে কত পাহাড় নদী, কত সহর গ্রাম পার হইয়া, তিনি এক অদ্ভুত দেশে আসিলেন। সেখানে মানুষগুলো অসম্ভবরকম বেঁটে। শত্রুর ভয় তাদের এতই বেশী যে, তাহাদের দেশ রক্ষার জন্য তারা এক দৈত্যের সঙ্গে বন্ধুতা করিয়া, তারই উপর পাহারা দিবার ভার রাখিয়াছে। এই দৈত্যের নাম এন্টিয়াস—পৃথিবী তার মা।

দূর হইতে হারলিউলিসকে গদা ঘুরাইয়া আসিতে দেখিয়া, বামনদের মধ্যে মহা হৈ-চৈ বাধিয়া গেল। তারা চিৎকার করিয়া এন্টিয়াসকে সাবধান করিয়া দিল। এন্টিয়াসও তাহাই চায়। তার ভয়ে বহুদিন পর্যন্ত লোকজন কেউ সে দিকে ঘেঁষে না, তাই হারকিউলিসকে দেখিয়াই সে একেবারে গদা উঠাইয়া “মার্‌ মার্‌” করিয়া তাঁহাকে আক্রমণ করিল। হারকিউলিসও তৎক্ষণাৎ তার গদা এড়াইয়া, এক বাড়িতে তাকে মাটিতে আছড়াইয়া ফেলিলেন। কিন্তু কি আশ্চর্য! মাটিতে পড়িবামাত্র তার তেজ যেন দ্বিগুণ বাড়িয়া গেল। সে আবার উঠিয়া ভীষণ তেজে হারকিউলিসকে মারিতে উঠিল। হারকিউলিস আবার তাকে ঘাড়ে ধরিয়া মাটিতে পাড়িয়া ফেলিলেন, কিন্তু মাটি ছোঁয়ামাত্র আবার তার অসম্ভব তেজ বাড়িয়া গেল, সে আবার হুঙ্কার দিয়া লাফাইয়া উঠিল। হারকিউলিস ত জানে না যে পৃথিবীর বরে মাটি ছুঁইলেই তাহার তেজ বাড়ে। তিনি বার বার তাকে নানারকম মারপ্যাঁচ দিয়া মাটিতে ফেলেন, বার বারই কোথা হইতে তার নূতন তেজ দেখা দেয়। তখন তিনি দৈত্যটাকে ঘাড়ে ধরিয়া শূন্যে তুলিয়া দুই হাতে তাকে এমন চাপিয়া ধরিলেন যে, সেই চাপের চোটে তার দম বাহির হইয়া প্রাণসুদ্ধ উড়িয়া গেল। তখন তার দেহটাকে তিনি পাহাড় পর্বত ডিঙ্গাইয়া কোথায় ছুঁড়িয়া ফেলিলেন, তাহার আর কোন খোঁজই পাওয়া গেল না।

তখন বামনেরা সবাই মিলিয়া ভয়ানক কোলাহল আর কান্নাকাটি জুড়িয়া দিল। কেহ, “হায় হায়” করিয়া চুল ছিঁড়িতে লাগিল, কেহ প্রাণভয়ে ছুটাছুটি করিতে লাগিল, কেহ আস্ফালন করিয়া বলিল, “এস, আমরা সকলে ইহার প্রতিশোধ লই।” হারকিউলিস তাদের বলিলেন, “ভাইসকল, তোমাদের সঙ্গে আমার কোন ঝগড়া নাই। ওই হতভাগা খামখা আমাকে মারিতে আসিয়াছিল, তাই উহাকে যৎকিঞ্চিৎ সাজা দিয়াছি। তোমাদের আমি কোন অনিষ্ট করিতে চাই না।” এই বলিয়া তিনি লম্বা লম্বা পা ফেলিয়া, সেখান হইতে সেই সোনার আপেলের সন্ধানে এটলাস দৈত্যের খবর লাইতে চলিলেন।

এই ভাবে পথ চলিতে চলিতে শেষে হারকিউলিস সত্য সত্যই এটলাসের দেখা পাইলেন। সেই সমুদ্রের বুড়া যেমন বর্ণনা করিয়াছিল, ঠিক সেইরকমভাবে সেই বিরাট দৈত্য আকাশটাকে মাথায় লইয়া দাঁড়াইয়া আছে। হারকিউলিসকে দেখিয়া সে মেঘের ডাকের মত গম্ভীর গলায় বলিল, “আমি এটলাস—আমি আকাশকে মাথা ধরিয়া রাখি—আমার মত আর কেউ নাই।” হারকিউলিস তাকে নমস্কার করিয়া বলিলেন, “আপনার সন্ধানে আমি দেশ-বিদেশ ঘুরিয়াছি—এখন আমার একটি প্রশ্ন আছে, সেইটি জিজ্ঞাসা করিতে চাই।” দৈত্য বলিল, “এই আকাশের নীচে মেঘের উপরে থাকিয়া আমার চোখ সব দেখে, সব জানে—যাহা জানিতে চাও আমাকে জিজ্ঞাসা কর।” হারকিউলিস বলিলেন, “তবে বলিয়া দিন, হেস্‌পেরাইডিসের বাগানে যে সোনার ফল ফলে, সেই ফল আমি কেমন করিয়া পাইতে পারি।” দৈত্য হইলেও এটলাসের মেজাজটি বড় ভাল। সে বলিল, “তাহাতে আর মুশকিল কি? এই আকাশটাকে তুমি একটুক্ষণ ধরিয়া রাখ, আমি এখনই তোমায় সেই ফল আনিয়া দিতেছি।” হারকিউলিস ভাবিলেন, “এ বড় চমৎকার কথা। কত কীর্তি সঞ্চয় করিয়াছি, কিন্তু আকাশটাকে ঠেকাইয়া অক্ষয় কীর্তি রাখিবার এমন সুযোগ আর কোনদিন পাইব না।” তাই তিনি দৈত্যের কথায় তৎক্ষণাৎ রাজী হইলেন।

কত হাজার হাজার বছর এটলাসের ঘাড়ে আকাশের ভার চাপান রহিয়াছে, শীত গ্রীষ্ম, রোদ বৃষ্টি সব সহিয়া বেচারা সেই বোঝা মাথায় রাখিয়া আসিতেছে। এতদিন পরে হারকিউলিসের কৃপায় সে একটু জিরাইয়া লইবার সুযোগ পাইল। মনের আনন্দে সে খু খানিকটা লাফাইয়া, মাটিতে গড়াগড়ি দিয়া, তারপর লম্বা পা ফেলিয়া চক্ষের নিমেষে হেস্‌পেরাইডিসের বাগানে গিয়া হাজির। সেখানে ‘ড্রেগন’ মারিয়া বাগান খুঁজিয়া সোনার আপেল তুলিয়া আনিতে তার একটুও বিলম্ব হইল না। তখন তাহার মনে হঠাৎ এক কুবুদ্ধি জাগিল। সে ভাবিল, কেন আর মিছামিছি আকাশের বোঝা লইয়া থাকি। এই মানুষটার উপরেই এখন আকাশের ভার দিলেই হয়। এই ভাবিয়া সে হারকিউলিসকে বলিল, “ওহে পৃথিবীর মানুষ, তোমার গায়ে ত বেশ শক্তি দেখিতেছি। এখন হইতে তুমিই আকাশটাকে ঠেকাইবার ভার লও না কেন? আমি বরং তোমার রাজার কাছে আপেলগুলা দিয়া আসি!”

হারকিউলিস দেখিলেন, বেগতিক! এ হতভাগা একটুক্ষণ ছুটি পাইয়া আর কাজে ফিরিতে চায় না। তিনি একটু চালাকি করিয়া বলিলেন, “তবে ভাই একটু আকাশটাকে ধর ত, আমার এই সিংহচর্মটিকে কাঁধের উপর ভাল করিয়া পাতিয়া লই।” বোকা দৈত্য তাড়াতাড়ি ফলগুলা রাখিয়া, আবার নিজের কাঁধ দিয়া আকাশটাকে আগলইয়া ধরিল। হারকিউলিসও তৎক্ষণাৎ ফলগুলা উঠাইয়া লইয়া, দৈত্যকে এক লম্বা নমস্কার দিয়া সেখান হইতে সরিয়া পড়িলেন। দৈত্য বেচারা ব্যাপারটা কিছুই বুঝিতে না পারিয়া, ফ্যাল্‌ফ্যাল্‌ করিয়া তাকাইয়া রহিল।

এত পরিশ্রম করিয়া সোনার ফল আনিয়াও হারকিউলিসের দাসত্ব ঘুচিল না। রাজা ইউরিসথিউস্‌ বলিলেন, “আর একটি কাজ তোমায় করিতে হইবে—তুমি পাতালে গিয়া যমের কুকুর সারবেরাস্‌কে বাঁধিয়া আন।” হারকিউলিস পাতালে গিয়া, সেই ভীষণমূর্তি কুকুরকে ধরিয়া রাজার সম্মুখে হাজির করিলেন। তার তিন মাথায় তিনটি মুখ, সেই মুখ দিয়া বিষ ঝরিয়া পড়িতেছে, নাকে চোখে আগুনের মত ধোঁয়া— তার মূর্তি দেখিয়া ভয়ে রাজার প্রাণ উড়িবার উপক্রম হইল—তিনি একটা জালার মধ্যে ঢুকিয়া চীৎকার করিতে লাগিলেন—”ওটাকে শীঘ্র সরাইয়া লও।” হারকিউলিস তখন আবার যেখানকার কুকুর সেইখানে রাখিয়া আসিলেন।

এতদিনে হারকিউলিস তাঁর স্বাধীনতা ফিরিয়া পাইলেন। তখন তিনি নিজের ইচ্ছামত ত্রিভুবন ঘুরিয়া আরও অদ্ভুত কাজ করিয়া ফিরিতে লাগিলেন। কত বড় বড় যুদ্ধে সাহায্য করিয়া, কত বীরত্বের কীর্তিতে যোগ দিয়া তিনি আপনার আশ্চর্য শক্তির পরিচয় দিতে লাগিলেন। পাহাড় উপড়াইয়া জিব্রাল্টার প্রণালীর পথ খুলিয়া তিনি সমুদ্রের সঙ্গে সমুদ্র জুড়িয়া দিলেন। সুন্দরী আলসেবিটস নিজের প্রাণ দিয়া স্বামীকে অমর করিতে চাহিয়াছিলেন, হারকিউলিস যমের সহিত যুদ্ধ করিয়া সেই আলসেবিটসকে মৃত্যুর গ্রাস হইতে কাড়িয়া আনিলেন।

এইরূপ ঘুরিতে ঘুরিতে একদিন ঈনিয়ুসের সুন্দরী কন্যা ডেয়ানীরাকে দেখিয়া হারকিউলিস তাকে বিবাহ করিতে চাহিলেন। কিন্তু, কোথা হইতে এক জলদেবতা আসিয়া তাহাতে গোল বাধাইয়া দিল। সে বলিল, “ঈনিয়ুস আমাকে কন্যা দান করিবেন বলিয়াছেন, তুমি কোথাকার কে যে মাঝ হইতে দাবী বসাইতে আসিয়াছ?” তখন ডেয়ানীরার অনুমতি লইয়া হারকিউলিস জলদেবতার সহির দ্বন্দযুদ্ধ বাধাইয়া দিলেন। সে এই অদ্ভুত দেবতা, আপন ইচ্ছামত চেহারা বদলায়। প্রথমেই হারকিউলিসের কাছে খুব খানিক চড়চাপড় খাইয়া, সে ষাঁড়ের মূর্তি ধরিয়া তাঁকে গুঁতাইতে আসিল। হারকিউলিস তখন তার শিং ভাঙ্গিয়া দিলেন; সে পলাইয়া আবার আর এক মূর্তিতে ফিরিয়া আসিল। এইরূপ বহুক্ষণ যুদ্ধের পর হারকিউলিস তাকে এমন কাবু করিয়া ফেলিলেন যে, প্রাণের দায়ে সে দেশ ছাড়িয়া চম্পট দিল।

তারপর হারকিউলিস ডেয়ানীরাকে বিবাহ করিয়া তাঁহার সঙ্গে দেশ ভ্রমণে বাহির হইলেন। কত রাজ্য কত দেশ ঘুরিয়া, একদিন তাঁরা এক প্রকাণ্ড নদীর ধারে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। নদীতে ভয়ানক স্রোত দেখিয়া হারকিউলিস ডেয়ানীরাকে পার করিবার উপায় ভাবিতেছেন; এমন সময়ে নেসাস নামে এক বুড়া সেন্টর (মানুষ-ঘোড়া) আসিয়া বলিল, “আমি এই মেয়েটিকে পিঠে করিয়া পার করিয়া দিব।” ডেয়ানীরা সেন্টরের পিঠে চড়িয়া নদী পার হইলেন, হারকিউলিসও একহাতে তাঁহার তীর ধনুক জল হইতে উঠাইয়া, আর একহাতে ঢেউ ঠেলিয়া পার হইতে লাগিলেন। নদীর ওপারে গিয়া হতভাগা নেসাস ভাবিল, “আহা! এমন সুন্দরী মেয়ে কেন এই মানুষটার সঙ্গে ঘুরিয়া বেড়ায়? তাহার চাইতে ইহাকে লইয়া আমাদের দেশে পলাইয়া যাই না?” এই ভাবিয়া সে ডেয়ানীরাকে লইয়া এক ছুট্‌ দিল। ডেয়ানীরার চিৎকারে হারকিউলিস মাথা তুলিয়া চাহিলেন, এবং তৎক্ষণাৎ জলের ভিতর হইতে তীর ছুঁড়িয়া নেসাসের মর্মভেদ করিয়া ফেলিলেন। মরিবার সময় দুষ্ট সেন্টর অত্যন্ত ভাল মানুষের মত অনেক আনুতাপ করিয়া ডেয়ানীরাকে বলিয়া গেল, “আমার ঘাড়ের উপর হইতে এই জামাটি খুলিয়া তুমি রাখিয়া দাও। যদি তোমার স্বামীর ভালবাসা কোনদিন কমিতে দেখ, তবে এই জামা তাহাকে পরাইলেই তার সমস্ত ভালবাসা আবার ফিরিয়া আসিবে।” ডেয়ানীরা তাকে অনেক ধন্যবাদ দিয়া জামাটি পরম যত্নে লুকাইয়া রাখিলেন। ততক্ষণে হারকিউলিসও নদী পার হইয়া আসিয়াছেন, দুইজনে আবার চলিতে লাগিলেন।

তারপর কত বৎসর কাটিয়া গেল। একদিন কি একটা কাজের জন্য দূর দেশের এক রাজসভায় হারকিউলিসের যাওয়া দরকার হইল। তিনি ডেয়ানীরাকে রাখিয়া সেই যে বাহির হইলেন, তারপর কত দিন গেল, কত মাস গেল, হারকিউলিস আর ফিরিলেন না। ডেয়ানীরা ব্যস্ত হইয়া উঠিলেন, ভাবিতে লাগিলেন, “তবে কি হারকিউলিস আমায় ভুলিয়া গেলেন? আর কি তিনি আমায় ভালবাসেন না?” তিনি দূত পাঠাইলেন, তারা আসিয়া বলিল, “হারকিউলিস বেশ ভালই আছেন—রাজসভায় নানা আমোদ-প্রমোদে তাঁর দিন কাটিতেছে।” শুনিয়া ডেয়ানীরা সেই সেন্টরের দেওয়া জামাটি বাহির করিলেন। সোনার মত ঝক্‌ঝকে জামা, সেন্টরের মৃত্যু সময়ে রক্তে ভিজিয়া গিয়াছিল—কিন্তু এখন তাহাতে রক্তের চিহ্নমাত্র নাই। সেই জামা তিনি লাইকাস নামে এক দূতকে দিয়া হারকিউলিসের কাছে পাঠাইয়া দিলেন— ভাবিলেন তাহা হইলে হারকিউলিসকে শীঘ্র ফিরিয়া পাইবেন। জামার কাহিনী ত হারকিউলিস জানেন না, সেন্টরের রক্তে যে তাহা বিষাক্ত হইয়া আছে, এরূপ সন্দেহই তাঁর মনে জাগিল না, তিনি নিশ্চিন্ত মনে সেই জামা পরিলেন। জামা পরিবামাত্র তাঁর সর্বাঙ্গ জ্বলিতে লাগিল, তাঁর শিরায় শিরায় যেন আগুনের প্রবাহ ছুটিতে লাগিল। তিনি তাড়াতাড়ি জামা ছাড়াইতে গিয়া দেখেন যে সর্বনাশ, জামা তাঁহার শরীরের মধ্যে বসিয়া গিয়াছে; গায়ের চামড়া উঠিয়া আসে, তবু জামা ছাড়িতে চায় না। রাগে ও যন্ত্রণায় পাগল হইয়া তিনি দূতকে ধরিয়া সমুদ্রে ছুঁড়িয়া ফেলিলেন। তারপর সেন্টরের বিষ এড়াইবার উপায় নাই দেখিয়া তিনি তার অনুচরদের ডাকিয়া বলিলেন, “তোমরা শীঘ্র কাঠ আন, আগুন জ্বাল, আমি এখন মরিতে ইচ্ছা করি।” শুনিয়া সকলে কাঁদিতে লাগিল, কেহ চিতা জ্বালাইতে প্রস্তুত হইল না। তখন তিনি আপন হাতে গাছ উপ্‌ড়াইয়া প্রকাণ্ড চিতা জ্বালাইয়া তাহাতে শুইলেন এবং তাঁর এক বন্ধুকে বলিলেন, “তুমি যদি আমার বন্ধু হও, তবে আমার কথা শুনিয়া এই চিতায় আগুন দাও। বন্ধুতার পুরস্কারস্বরূপ আমার বিষমাখান অব্যর্থ তীরগুলি তোমায় দিলাম।”

তারপর চিতায় আগুন দেওয়া হইল, দেবতারা জয়গান করিয়া তাঁহাকে স্বর্গের দেবতাদের মধ্যে ডাকিয়া লইলেন, এবং তাঁহাকে অমর করিয়া আকাশের নক্ষত্রদের মধ্যে রাখিয়া দিলেন।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প সুকুমার রায়

বুদ্ধিমান শিষ্য

–সুকুমার রায়

এক মুনি, তাঁর অনেক শিষ্য। মুনিঠাকুর তাঁর পিতৃশ্রাদ্ধে এক মস্ত যজ্ঞের আয়োজন করলেন। সে যজ্ঞ এর আগে মুনির আশ্রমে আর হয়নি। তাই তিনি শিষ্যদের ডেকে বললেন, “আমি এক যজ্ঞের আয়োজন করেছি, সে যজ্ঞ তোমরা হয়তো আর কোথাও দেখবার সুযোগ পাবে না, কাজেই যজ্ঞের সব কাজ কর্ম বিধি ব্যবস্থা বেশ মন দিয়ে দেখো। নিজের চোখে সব ভালো ক’রে না দেখলে শুধু পুঁথি পড়ে এ যজ্ঞ করা সম্ভব হবে না।”

মুনিঠাকুরের আশ্রমে বেড়ালের ভারি উৎপাত; যজ্ঞের আয়োজন সব ঠিক হচ্ছে, এর মধ্যে বেড়ালগুলো এসে জ্বালাতন আরম্ভ করেছে- এটাতে মুখ দেয়, ওটা উল্‌টে ফেলে, কিছুতেই তাদের সামলানো যায় না। তখন মুনিঠকুর রেগে বললেন, “বেড়ালগুলোকে ধরে ঐ কোণায় বেঁধে রেখে দাও তো।” অমনি নয়টা বেড়ালকে ধরে সভার এক পাশে খোঁটায় বেঁধে রাখা হল। তারপর ঠিক সময় বুঝে যজ্ঞ আরম্ভ হল। শিষ্যেরা সব সভার সাজসজ্জা, আয়োজন, যজ্ঞের সব ক্রিয়া-কাণ্ড, মন্ত্রোচ্চারণের নিয়ম ইত্যাদি মন দিয়ে দেখতে আর শুনতে লাগল। নির্বিঘ্নে অতি সুন্দররূপে মুনিঠাকুরের যজ্ঞ সম্পন্ন হল।

কিছুকাল পরে শিষ্যদের একজনের বাবা মারা গেলেন। শিষ্যের ভারি ইচ্ছা তার পিতৃশ্রাদ্ধে সেও ঐ রকম সুন্দর যজ্ঞের আয়োজন করে। সে গিয়ে তার গুরুকে ধরল। তিনি বললেন, “আচ্ছা, সব আয়োজন করতে থাক, আমি এসে যজ্ঞের পুরোহিত হব।” শিষ্য মহা সন্তুষ্ট হয়ে যজ্ঞের সব ঠিকঠাক করতে লাগল।

ক্রমে যজ্ঞের দিন উপস্থিত। মুনিঠাকুর সশিষ্য শ্রাদ্ধের সভায় উপস্থিত; ঠিক নিয়ম মতো যজ্ঞের সমস্ত ব্যবস্থা প্রস্তুত হয়েছে কিন্তু শিষ্যটি তখনও সভাস্থলে এসে বসছে না, কেবল ব্যস্তভাবে ঘোরাঘুরি করছে। এদিকে যজ্ঞের সময় প্রায় উপস্থিত দেখে মুনিঠাকুরও ক্রমে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। তিনি শিষ্যকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আর বিলম্ব কেন? সবই তো প্রস্তুত, যজ্ঞের সময়ও উপস্থিত, এই বেলা সভায় এস।” শিষ্য বলল, “আজ্ঞে একটা আয়োজন বাকি রয়ে গেছে, সেইটা নিয়ে ভারি মুশকিলে পড়েছি।” মুনি বললেন, “কই, কিছুরই তো অভাব দেখছি না।” শিষ্য বলল, “আজ্ঞে চারটে বেড়াল কম পড়েছে।” মুনি বললেন, “সে কি রকম?” শিষ্য মুখ কাঁচুমাচু ক’রে বলল, “ঐ যে আপনার যজ্ঞে দেখলাম ঈশান কোণে নয়টা বেড়াল বাঁধা রয়েছে। আমাদের এ গ্রামে অনেক খুঁজে পাঁচটার বেশি পাওয়াই গেল না, কাজেই আর বাকি চারটার জন্য পাশের গ্রামে লোক গিয়েছে; তারা এই এসে পড়ল ব’লে।” শুনে গুরুর তো চক্ষুস্থির! তিনি বললেন, “আরে বুদ্ধিমান! কোনটা যজ্ঞের অঙ্গ আর কোনটা নয় তাও বিচার করতে শেখনি? আশ্রমের বেড়ালগুলি উৎপাত করছিল তাই বেঁধে রেখেছিলাম, তোমার এখানে কোনো উৎপাত ছিল না, তুমি আবার গায়ে পড়ে উৎপাত সংগ্রহ করতে গিয়েছ? বসে পড়, বসে পড়, আর বেড়াল ধরে কাজ নেই। এখন যজ্ঞটা নির্বিঘ্নে শেষ হয়ে যাক্‌।”

শিষ্য নিজের আহাম্মকিতে লজ্জিত হয়ে অপ্রস্তুত ভাবে সভার মধ্যে বসে পড়ল।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প সুকুমার রায়

ব্যাঙের সমুদ্র দেখা

–সুকুমার রায়

(জাপানী গল্প)

গ্রামের ধারে কবেকার পুরান এক পাতকুয়োর ফাটলের মধ্যে কোলাব্যাং তার পরিবার নিয়ে থাকত। গ্রামের মেয়েরা সেখানে জল তুলতে এসে যেসব কথাবার্তা বলত কোলাব্যাং তার ছেলেদের সেইসব কথা বুঝিয়ে দিত—আর ছেলেরা ভাবত ‘ইস্‌! বাবা কত জানে!’

একদিন সেই মেয়েরা সমুদ্রের কথা বলতে লাগল। ব্যাঙের ছানারা জিজ্ঞাসা করল—”হ্যাঁ বাবা! সমুদ্র কাকে বলে?” ব্যাং খানিক ভেবে বলল, “সমুদ্র? সে একরকম জন্তুর নাম।” তখন একটা ছানা বলল—”ওরা যে বলছিল সমুদ্র খুব ভয়ানক বড় হয়, আর তার মধ্যে অনেক জল থাকে—আর লোকেরা সাঁতার কেটে তা পার হতে পারে না।” তখন কোলাব্যাং মুশকিলে পড়ল। সে গাছপালা দেখেছে, বাড়িঘর দেখেছে—মানুষ কুকুর ঘটি বাটি নানারকম জিনিসপত্র দেখেছে, আর ছেলেবেলায় অনেকরকম জিনিসের গল্প শুনেছে। কিন্তু সমুদ্রের কথা ত কখন শোনেনি! তখন সে ভাবল সমুদ্রের কথা একটু খোঁজ করে দেখতে হবে।

পরদিন সকালে উঠেই কোলাব্যাং তার ছাতা পোঁটলা নিয়ে বলল, “আমি সমুদ্রের সন্ধান করতে যাচ্ছি।” তার গিন্নী কত কাঁদল, ছেলেরা নানারকম সুর করে তাকে বারণ করল কিন্তু কোলাব্যাং বলল, “না, এতে আমার জ্ঞানলাভ হবে—তোমরা বাধা দিও না।” এই বলে সে পাতকুয়ো থেকে উঠে একটা মাঠের দিকে চলল। ব্যাং বাইরে এসেই দেখে মানুষ কুকুর গরু তারা কেউ তার মতো লাফিয়ে লাফিয়ে চলে না—তাই দেখে সে ভাবল ‘লাফিয়ে চললে সবাই আমায় বেকুব ভাববে।’ এই ভেবে সে হেঁটে হেঁটে চলতে লাগল। কিন্তু অমন করে চলে ত তার অভ্যাস নেই—খানিক গিয়েই তার ভারই পরিশ্রম বোধ হল।

মাঠের ওপারে আর এক গ্রামের কাছে এক গর্তের মধ্যে মেতে ব্যংদের বাসা ছিল। মেটে ব্যাঙেরাও সমুদ্রের কথা শুনেছে, তাই তাদের মধ্যে একজন বেরিয়েছে সমুদ্রটা দেখতে। মাঝখানে দুই ব্যাঙের দেখা হল। কোলাব্যাং বলল, “আমি ফাটল-কুয়োর কোলাব্যাং, যাচ্ছি সমুদ্রে।” মেটে ব্যাং বলল, “আমি মেঠো-ব্যাং, আমিও যাচ্ছি সমুদ্রে।” তখন তাদের ভারি ফূর্তি হল।

কিন্তু সমুদ্রে যাবার পথ ত তারা জানে না। মাঠের মধ্যে একটা মস্ত ঢিপি ছিল; মেটে ব্যাং বলল, “ওর উপরে উঠে দেখি ত কিছু দেখা যায় কিনা।”

এই বলে তারা অনেক কষ্টে সেই ঢিপির উপর চড়ে সেখান থেকে একটা গ্রাম দেখতে পেল। মেটে ব্যাং বলল, “আরে দুর ছাই! এরকম ত ঢের দেখেছি! আমার বাড়ির কাছেই ত অমন আছে।” কোলাব্যাং বলল, “তাই ত! আমিও ছেলেবেলা থেকে ওরকম কত দেখেছি। সব জায়গাই দেখছি একরকম। মিছামিছি আমরা হেঁটে মরলাম।”

তখন তারা ভারই বিরক্ত হয়ে বাড়ি ফিরে গেল। কোলাব্যাং তার ছানাদের বলল, “সমুদ্র টমুদ্র কিছু নেই—ওসব মিছে কথা!”

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প সুকুমার রায়

পাগলা দাশু

— সুকুমার রায়

আমাদের স্কুলের যত ছাত্র তাহাদের মধ্যে এমন কেহই ছিল না, যে পাগলা দাশুকে না চিনে। যে লোক আর কাহাকেও জানে না, সেও সকলের আগে দাশুকে চিনিয়া ফেলে। সেবার এক নতুন দারোয়ান আসিল, একেবারে আন্‌‌কোরা পাড়াগেঁয়ে লোক, কিন্তু প্রথম যখন সে পাগলা দাশুর নাম শুনিল, তখনই আন্দাজে ঠিক করিয়া লইল যে, এই ব্যক্তিই পাগলা দাশু। কারণ মুখের চেহারায়, কথাবার্তায়, চাল-চলনে বোঝা যাইত যে তাহার মাথায় একটু ‘ছিট’ আছে। তাহার চোখ দুটি গোল গোল, কান দুটি অনাবশ্যক রকমের বড়, মাথায় একবস্তা ঝাঁকড়া চুল। চেহারাটা দেখিলেই মনে হয়—

ক্ষীণদেহ খর্বকায় মুণ্ডু তাহে ভারি
যশোরের কই যেন নরমূর্তিধারি।

সে যখন তাড়াতাড়ি চলে অথবা ব্যস্ত হইয়া কথা বলে, তখন তাহার হাত পা ছোঁড়ার ভঙ্গী দেখিয়া হঠাৎ কেন জানি চিংড়িমাছের কথা মনে পড়ে।

সে যে বোকা ছিল তাহা নয়। অঙ্ক কষিবার সময়, বিশেষত লম্বা লম্বা গুণ-ভাগের বেলায় তাহার আশ্চর্য মাথা খুলিত। আবার এক এক সময় সে আমাদের বোকা বানাইয়া তামাশা দেখিবার জন্য এমন সকল ফন্দি বাহির করিত যে, আমরা তাহার বুদ্ধি দেখিয়া অবাক হইয়া থাকিতাম।

‘দাশু’ অর্থাৎ দাশরথি, যখন প্রথম আমাদের ইস্কুলে ভরতি হয়, তখন জগবন্ধুকে আমাদের ‘ক্লাশের ভালো ছেলে’ বলিয়া সকলে জানিত। সে পড়াশোনায় ভালো হইলেও, তাহার মতো অমন একটি হিংসুটে ভিজেবেড়াল আমরা আর দেখি নাই। দাশু একদিন জগবন্ধুর কাছে কি একটা ইংরাজি কথার মানে জিজ্ঞাসা করিতে গিয়াছিল। জগবন্ধু তাহাকে খামখা দুকথা শুনাইয়া বলিল, “আমার বুঝি আর খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই ? আজ একে ইংরাজি বোঝাব, কাল ওর অঙ্ক কষে দেব, পরশু আর একজন আসবেন আর এক ফরমাইস নিয়ে— ঐ করি আর কি !” দাশু সাংঘাতিক চটিয়া বলিল, “তুমি তো ভারি ছ্যাঁচড়া ছোটলোক !” জগবন্ধু পণ্ডিত মশায়ের কাছে নালিশ করিল, “ঐ নতুন ছেলেটা আমায় গালাগালি দিচ্ছে।” পণ্ডিত মহাশয় দাশুকে এমনি ধমক দিয়া দিলেন যে বেচারা একেবারে দমিয়া গেল।

আমাদের ইংরাজি পড়াইতেন বিষ্টুবাবু। জগবন্ধু তাঁহার প্রিয় ছাত্র। পড়াইতে পড়াইতে যখনই তাঁহার বই দরকার হয়, তিনি জগবন্ধুর কাছে বই চাহিয়া লন। একদিন তিনি পড়াইবার সময় ‘গ্রামার’ চাহিলেন, জগবন্ধু তাড়াতাড়ি তাহার সবুজ কাপড়ের মলাট দেওয়া ‘গ্রামার’ খানা বাহির করিয়া দিল। মাস্টার মহাশয় বইখানি খুলিয়াই হঠাৎ গম্ভীর হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “বইখানা কার ?” জগবন্ধু বুক ফুলাইয়া বলিল, “আমার”। মাস্টার মহাশয় বলিলেন, “হুঁ— নতুন সংস্করণ বুঝি ? বইকে-বই একেবারে বদলে গেছে।” এই বলিয়া তিনি পড়িতে লাগিলেন— ‘যশোবন্ত দারোগা— লোমহর্ষক ডিটেকটিভ নাটক।’ জগবন্ধু ব্যাপারখানা বুঝিতে না পারিয়া বোকার মতো তাকাইয়া রহিল। মাস্টার মহাশয় বিকট রকম চোখ পাকাইয়া বলিলেন, “এই সব জ্যাঠামি বিদ্যে শিখছ বুঝি ?” জগবন্ধু আম্‌তা আম্‌তা করিয়া কি যেন বলিতে যাইতেছিল, কিন্তু মাস্টার মহাশয় এক ধমক দিয়া বলিলেন, “থাক্‌ থাক্‌, আর ভালমানুষি দেখিয়ে কাজ নেই— ঢের হয়েছে।” লজ্জায় অপমানে জগবান্ধুর দুই কান লাল হইয়া উঠিল— আমরা সকলেই তাহাতে বেশ খুশি হইলাম। পরে জানা গেল যে, এটিও দাশু ভায়ার কীর্তি, সে মজা দেখিবার জন্য উপক্রমণিকার জায়গায় ঠিক ঐরূপ মলাট দেওয়া একখানা বই রাখিয়া দিয়াছিল।

দাশুকে লইয়া আমরা সর্বদাই ঠাট্টাতামাশা করিতাম এবং তাহার সামনেই তাহার বুদ্ধি ও চেহারা সম্বন্ধে অপ্রীতিকর সমালোচনা করিতাম। তাহাতে একদিনও তাহাকে বিরক্ত হইতে দেখি নাই। এক এক সময়ে সে নিজেই আমাদের মন্তব্যের উপর রঙ চড়াইয়া নিজের সম্বন্ধে নানারকম অদ্ভুত গল্প বলিত। একদিন সে বলিল, “ভাই, আমাদের পাড়ায় যখন কেউ আমসত্ত্ব বানায় তখনই আমার ডাক পড়ে। কেন জানিস ?” আমরা বলিলাম, “খুব আমসত্ত্ব খাস বুঝি ?” সে বলিল, “তা নয়। যখন আমতত্ত্ব শুকোতে দেয়, আমি সেইখানে ছাদের উপর বার দুয়েক চেহারাখানা দেখিয়ে আসি। তাতেই, ত্রিসীমানার যত কাক সব ত্রাহি ত্রাহি করে ছুটে পালায় কাজেই আর আমসত্ত্ব পাহারা দিতে হয় না।”

একবার সে হঠাৎ পেন্টেলুন পরিয়া স্কুলে হাজির হইল। ঢল্‌ঢলে পায়জামার মতো পেন্টেলুন আর তাকিয়ার খোলের মতো কোট পরিয়া তাহাকে যে কিরূপ অদ্ভুত দেখাইতেছিল, তাহা সে নিজেই বুঝিতেছিল এবং তাহার কাছে ভারি একটা ব্যাপার বলিয়া বোধ হইতেছিল। আমরা জিজ্ঞাসা করিলাম, “পেন্টেলুন পরেছিস্‌ কেন ?” দাশু এক গাল হাসিয়া বলিল, “ভালো ইংরাজি শিখব ব’লে।” আর একবার সে খামখা নেড়া মাথায় এক পট্টি বাঁধিয়া ক্লাশে আরম্ভ করিল এবং আমরা সকলে তাহা লইয়া ঠাট্টা তামাশা করায় যারপরনাই খুশি হইয়া উঠিল। দাশু আদপেই গান গাহিতে পারে না, তাহার যে তালজ্ঞান বা সুরজ্ঞান একেবারে নাই, একথা সে বেশ জানে। তবু সেবার ইনস্পেক্টার সাহেব যখন ইস্কুল দেখিতে আসেন, তখন আমাদের খুশি করিবার জন্য চিৎকার করিয়া গান শুনাইয়াছিল। আমরা কেহ ওরূপ করিলে সেদিন রীতিমত শাস্তি পাইতাম, কিন্তু দাশু ‘পাগলা’ বলিয়া তাহার কোনো শাস্তি হইল না।

একবার ছুটির পরে দাশু অদ্ভুত এক বাক্স লইয়া ক্লাসে হাজির হইল। মাস্টার মহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি দাশু, ও বাক্সের মধ্যে কি আছে ?” দাশু বলিল, “আজ্ঞে, আমার জিনিসপত্র।” জিনিসপত্রটা কিরূপ হইতে পারে, এই লইয়া আমাদের মধ্যে বেশ একটা তর্ক হইয়া গেল। দাশুর সঙ্গে বই, খাতা, পেনসিল, ছুরি সবই তো আছে, তবে আবার জিনিসপত্র কি বাপু? দাশুকে জিজ্ঞাসা করিলাম, সে সোজাসুজি কোনো উত্তর না দিয়া বাক্সটিকে আঁকড়াইয়া ধরিল এবং বলিল, “খবরদার, আমার বাক্স তোমরা কেউ ঘেঁটো না।” তাহার পর চাবি দিয়া বাক্সটাকে একটুখানি ফাঁক করিয়া, সে তাহার ভিতর দিয়া কি যেন দেখিল, এবং ‘ঠিক আছে’ বলিয়া গম্ভীরভাবে মাথা নাড়িয়া বিড় বিড় করিয়া হিসাব করিতে লাগিল। আমি একটুখানি দেখিবার জন্য উঁকি মারিতে গিয়াছিলাম— অমনি পাগলা মহা ব্যস্ত হইয়া তাড়াতাড়ি চাবি ঘুরাইয়া বাক্স বন্ধ করিয়া ফেলিল।

ক্রমে আমাদের মধ্যে তুমুল আলোচনা আরম্ভ হইল। কেহ বলিল, “ওটা ওর টিফিনের বাক্স— ওর মধ্যে খাবার আছে।” কিন্তু একদিনও টিফিনের সময় তাহাকে বাক্স খুলিয়া কিছু খাইতে দেখিলাম না। কেহ বলিল, “ওটা বোধ হয় ওর মানি-ব্যাগ— ওর মধ্যে টাকা পয়সা আছে, তাই ও সর্বদা কাছে কাছে রাখতে চায়। আর একজন বলিল, “টাকা পয়সার জন্য অত বড় বাক্স কেন ? ও কি ইস্কুলে মহাজনী কারবার খুলবে নাকি ?”

একদিন টিফিনের সময় দাশু হঠাৎ ব্যস্ত হইয়া, বাক্সের চাবিটা আমার কাছে রাখিয়া গেল আর বলিল, “ওটা এখন তোমার কাছে রাখো, দেখো হারায় না যেন। আর আমার আসতে যদি একটু দেরি হয়, তবে তোমরা ক্লাশে যাবার আগে ওটা দারোয়ানের কাছে দিও।” এই বলিয়া বাক্সটি দারোয়ানের জিম্মায় রাখিয়া বাহির হইয়া গেল। তখন আমাদের উৎসাহ দেখে কে! এতদিনে সুবিধা পাওয়া গিয়াছে, এখন দারোয়ানটা একটু তফাৎ গেলেই হয়। খানিক বাদে দারোয়ান তাহার রুটি পাকাইবার লোহার উনানটি ধরাইয়া, কতকগুলি বাসনপত্র লইয়া কলতলার দিকে গেল। আমরা এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম, দারোয়ান আড়াল হওয়া মাত্র, আমরা পাঁচ-সাতজনে তাহার ঘরের কাছে সেই বাক্সের উপর ঝুঁকিয়া পড়িলাম। তাহার পর আমি চাবি দিয়া বাক্স খুলিয়া দেখি বাক্সের মধ্যে বেশ ভারি একটা কাগজের পোঁটলা ন্যাকড়ার ফালি দিয়া খুব করিয়া জড়ানো। তাড়াতাড়ি পোঁটলার প্যাঁচ খুলিয়া দেখা গেল, তাহার মধ্যে একখানা কাগজের বাক্স— তাহার ভিতর আর একটা ছোট পোঁটলা। সেটি খুলিয়া একখানা কার্ড বাহির হইল, তাহার এক পিঠে লেখা, ‘কাঁচকলা খাও’ আর একটি পিঠে লেখা ‘অতিরিক্ত কৌতুহল ভালো নয়।’ দেখিয়া আমরা এ-উহার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিতে লাগিলাম। সকলের শেষে একজন বলিয়া উঠিল, “ছোকরা আচ্ছা যা হোক, আমাদের বেজায় ঠকিয়েছে।” আর একজন বলিল, “যেমন ভাবে বাঁধা ছিল তেমনি করে রেখে দাও, সে যেন টেরও না পায় যে আমরা খুলেছিলাম। তাহলে সে নিজেই জব্দ হবে।” আমি বলিলাম, “বেশ কথা। ও আস্‌‌লে পরে তোমরা খুব ভালোমানুষের মতো বাক্সটা দেখাতে বলো আর ওর মধ্যে কি আছে, সেটা বার বার করে জানতে চেয়ো।” তখন আমরা তাড়াতাড়ি কগজপত্রগুলি বাঁধিয়া, আগেকার মতো পোঁটলা পাকাইয়া বাক্সে ভরিয়া ফেলিলাম।

বাক্সে চাবি দিতে যাইতেছি, এমন সময় হো হো করিয়া একটা হাসির শব্দ শোনা গেল— চাহিয়া দেখি পাঁচিলের উপরে বসিয়া পাগলা দাশু হাসিয়া কুটিকুটি। হতভাগা এতক্ষণ চুপি চুপি তামাশা দেখিতেছিল। তাখন বুঝিলাম আমার কাছে চাবি দেওয়া, দারোয়ানের কাছে বাক্স রাখা, টিফিনের সময় বাহিরে যাওয়ার ভান করা এ সমস্ত তাহার শয়তানি। খামখা আমাদের আহাম্মক বানাইবার জন্যই সে মিছিমিছি এ কয়দিন ক্রমাগত একটা বাক্স বহিয়া বেড়াইতেছে।

সাধে কি বলি ‘পাগলা দাশু ?’