Categories
অনলাইন প্রকাশনা আইন কানুন আত্ম উন্নয়ন গল্প জীবনী ও স্মৃতিকথা সাকি বিল্লাহ্ সৃজনশীল প্রকাশনা

তিতা কথাঃ পর্ব-১০ অভাবে চোর আর স্বভাবে চোর !!!

— সাকি বিল্লাহ্
 
সকালে সংবাদপত্রটা হাতে নিলাম, না আমাদের দেশের না । জার্মানীর একটা পত্রিকা । শিরোনাম হচ্ছে “রাস্তায় গাড়ী দুর্ঘটনায় কুকুর নিহত”
এবার আসি আমাদের দেশের পত্রিকাগুলোর শিরোনামে,
“১১ ঘন্টায় রাজধানীতে দুই জোড়া খুন”
“বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও মাদকের ছোবল”
“অপারেশন হিট ব্যাকঃ বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন সাত লাশের চারটিই শিশুর”
“পুরনো রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের অনাগ্রহ”
“খাদ্যদ্রব্যের লাগাম ছাড়া দামে জনজীবন বিপর্যয়ের মুখে”
“শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ, পানি দূষণ, যানজট, লোডশেডিং সমস্যায় শহরজীবন দুর্বিষহ”
 
এ রকম ভয়ঙ্কর পরিস্থিতে বাংলাদেশ আগে কখনও পড়েছে বলে আমার মনে পড়ে না । তারপরও অনেক অন্ধ সরকার পন্থীরা বলে বেড়াচ্ছে দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে আছে(!) । একটা দেশ কতটা ভাল অবস্থায় আছে তা তার সংবাদ শিরোনামগুলো দেখলেই আসলে বোঝা যায় ।
যে দেশের মানুষদের নিয়ে আমরা স্বপ্ন দেখি তার একটা বড় অংশ অত্যন্ত নির্দয় এবং সুযোগ পেলে তাদের ভয়ঙ্কর রুপটা দেখিয়ে দেয় ।
দুমাস আগে একজন খুব কাছের মানুষের হঠাৎ পরিবর্তন দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম । ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার উপর বা দুদিন আগে খালেদা জিয়ার উপর আক্রমন দেখে সত্যিই অবাক হই মানুষরুপী জানোয়ারদের জন্য; আমরা আসলে সভ্য কবে হব ।
 
এ ধরনের মানুষের নির্মমতা দেখে কিছুটা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম কিছুদিন আগে । ছোটবেলার একটা ঘটনা মনে পড়ল,
তখন যতদূর মনে পড়ে সবেমাত্র ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে ভর্তি হয়েছি । একদিন সকাল ৫টার দিকে একজন চোর ধরা পড়ল । তিন রাস্তার মাথায় বিদ্যুতের খুটিঁর সাথে তাকে অত্যন্ত নির্মমভাবে শক্ত করে বাঁধা হল । এর মধ্যে যে যেভাবে পেরেছে তাকে বেধরক মারধর, লাথি, কিল, ঘুসি দিয়ে আধ মরা করে ফেলেছে । মানুষের শোরগোল শুনে বাসা থেকে বের হতে গেলাম, মা বললেন, “বাবা, ছেলেটাকে মারধর করিস না”, আমি বললাম, কোন ছেলেটা? মা বললেন, মানে চোর ছেলেটা, সেও তো কোন মায়ের সন্তান, হয়ত অভাবের তাড়নায় চুরি করেছে”
-কি বলব, বুঝতে পারলাম না
 
ইতোমধ্যে শুনতে পেলাম, চোরটা এক গ্লাস পানি পান করতে চাইলো । কেউ একজন বলল, ওকে পানি দেয়া যাবে না, কেউ বলল, ওর চোখ উপরে ফেলতে হবে, কেউ বলল, হাত পা ভেঙ্গে দিলে আর চুরি করতে পারবে না । আমার একমাত্র খালার বাড়ী আর আমাদের বাড়ী পাশাপাশি । খালা আর মা দুজনেরই অসহায় মানুষদের প্রতি মমত্ববোধটা অনেক বেশি । খালা আর মা দুজনেই বললেন চোরটাকে ছেড়ে দিতে । এরই মধ্যে আমার মা দেখি এক গ্লাস পানি হাতে আমাকে বললেন চোরটাকে দিয়ে আসতে, অবাক না হয়ে পারলাম না; একই রক্তে মাংসের মানুষ আমরা অথচ কেউ বলছে চোর টাকে পানি না দিয়ে, বরং চোখ উপরে ফেলতে আর কেউ পানি হাতে বলছে চোরটাকে পুলিশে দিতে বা ছেড়ে দিতে ।
পানির গ্লাস হাতে সামনে গেলাম, আমাকে পানির গ্লাস হাতে দেখে আমাদের বাড়ীর এক ভাড়াটিয়া খুবই বিরক্ত হলেন, উনার হাতে ছোটখাট একটা বাঁশের টুকরো, মারমুখী পৈশাচিক একটা ভয়ঙ্কর চেহারা নিয়ে উনি দাড়িয়ে আছেন । অন্যরা তেমন কিছু বলল না, শুধু উনি বললেন, আরে চোরকে এত সমাদর করার দরকার কি, শালায় গত মাসে আমার মোবাইল চুরি করছে আজকে আরেকজনেরটা চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ছে, ওর জান শেষ করে ফেলতে হবে মারতে মারতে” ।
 
অবাক হয়ে সেই লোকটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, সমাজে কত বড় বড় চোর প্রতিনিয়ত চুরি করে যাচ্ছে, হলমার্কস, ডেসটিনি, শেয়ার বাজার, ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ, ঘুষ, কালোবাজারি, ভোট চুরি, গম চুরি, গরীবদের ত্রান চুরি, আরো কত ধরনের চুরি ।
ক্ষুধার তাড়নায় যারা চুরি করে তারা তো অভাবে পড়ে করে, আর যাদের টাকা পয়সা বা খাবার দাবারের অভাব নেই তারা করে আসলে নিকৃস্ট স্বভাবের কারনে । অভাবে চুরি করা মানুষগুলোকে আমরা সুযোগ পেলে মেরে আধমরা করে ফেলি বা চোখ উপরে ফেলি কিন্তু যারা স্বভাবে চোর তাদের বেলায় সবাই নির্জীব ।
 
পানি পান করার পর চুরির অপবাদে দুস্ট ছেলেটা কিছুটা প্রাণ ফিরে পেল । সবাইকে উদ্দেশ করে বলল, ভাই, আমাকে পুলিশে দেন । জনসমাবেশের একজন বলল, তার আগে তোকে মেরে হাত পা ভেঙ্গে ফেলতে হবে । বাকী সবাই বলল, হ্যাঁ একদম ঠিক । আবারও একজন বলে উঠল, এর চাইতে ভাল হবে চোখ তুলে ফেললে তাহলে আর চুরি করতে পারবে না ” । ভয়ঙ্কর নির্মম কথায় হতবাক না হয়ে পারা যায় না ।
ফাঁসির আসামী যখন বুঝতে পারে, তার ফাঁসি নিশ্চিত তখন সে কিছুক্ষণের জন্য নির্বাক হয়ে যায়, আর একটা সময় সে আর কোন উপায় নেই ভেবে মৃত্যুর জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নিতে থাকে । এক সময় সে এ বিষয়টা মেনে নেয় । ফাঁসির মঞ্চে অত্যন্ত শান্তভাবেই সে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় । তার হাত বাঁধতে গিয়েও কোন সমস্যা হয় না কিন্তু যখন তার মুখে কালো কাপড়ে দিয়ে ঢেকে দেয়া হয় তখন সে শেষ বারের মত বাঁচার আদিম প্রবৃত্তিতে শেষ চেস্টা করতে থাকে ।
মানুষের আচড়ন আসলে সত্যিই ব্যতিক্রম ।
 
চোর যখন বুঝতে পারল তার মার খাওয়া নিশ্চিত বা চোখ উপরে ফেলা নিশ্চিত তখন এক পর্যায়ে সে সবাইকে অনুরোধ করলে, ভাই, আস্তে মাইরেন । ”
তবে এই নির্মমতা আমার অভিজ্ঞতায় তৃতীয় বিশ্বের মানুষদের ভিতর সবচাইতে বেশি । বাঙ্গালী জাতি হিসেবে আমরা আসলে এতটা নির্মম ছিলাম না । ব্রিটিশদের দুশ বছরের নির্মম অত্যাচারে, ইংরেজদের কৃত্তিম দুর্ভিক্ষের পর বিরাট ধনী জাতি থেকে যখন রাতারাতি গরীব হয়ে গেলাম আমরা তখন থেকেই আসলে আমাদের স্বভাব আর চরিত্র খারাপ হতে থাকে । কথায় আছে অভাবে স্বভাব নস্ট । আর যাদের স্বভাব একবার নস্ট হয় তখন অবস্থা ভাল হলেও স্বভাবটা থেকে যায় ।
 
ইতোমধ্যে আমার খালা ও মা সবাইকে বললেন কোন ধরনের মারধর না করতে, আর পুলিশকে ফোন করা হয়েছে । পুলিশ এসে চোরকে থানায় নিয়ে গেল । পুলিশের চোর নিধনে বর্থ্যতায় কেউ কেউ বললেন, আপনারা থাকতেও চুরি হয়, শান্তিতে কেউ ঘুমাতে পারে না । একজন পুলিশ অফিসার স্বগৌরবে বলে উঠলেন, দু একটারে চোখ উপরে দিয়ে পরে আমাদের ডাকবেন; দেখবেন চুরি বন্ধ হয়ে গেছে ।” আইন রক্ষাকারী একজন মানুষ যদি এ ধরনের উস্কানীমূলক কথা বলে তাহলে সে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সহজেই অনুমেয় ।
 
কিন্তু যারা দিব্যি কোটি টাকা চুরি করে যাচ্ছে তাদের তো কেউ কিছু করতে পারছে না বা করছেও না । ভয়ঙ্কর মানসিকতার এইসকল মানুষ গুলো আসলে দেখতে মানুষ হলেও এরা পশুর চাইতে অধম ।
এরা সুযোগ পেলে নির্মম হয়ে যায় আর অভাব না থাকলেও স্বভাবের কারণে সারাজীবন চুরি করতেই থাকে, তাই “কেউ অভাবে চোর আর কেউ স্বভাবে চোর” !
Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প বঙ্গিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বিনোদন ব্যঙ্গকৌতুক

কমলাকান্তের জবানবন্দী (জোবানবন্দী)

–বঙ্গিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

–প্রথম প্রকাশ- বঙ্গদর্শন, ফাল্গুন সংখ্যা, ১২৮৮ বঙ্গাব্দ

বঙ্কিমের বিখ্যাত রম্যব্যঙ্গ সংকলন ‘কমলাকান্তের দপ্তর’-এর সর্বশেষ রচনার নির্বাচিত অংশ।

মূলপাঠে (বঙ্কিমের দেয়া নাম) রচনাটির নাম ছিলো ‘কমলাকান্তের জোবানবন্দী’। সংকলিত অংশের নামের বানানে একটু পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘কমলাকান্তের জবানবন্দী’।

এটি একটি নকশা জাতীয় রচনা।

চরিত্র

কমলাকান্ত- প্রধান চরিত্র। আফিংখোর। ব্রাহ্মণ। পুরো নাম- শ্রীকমলাকান্ত চক্রবর্তী। বয়স-৫১ বছর ২ মাস ১৩ দিন। বাসা নেই, কোন পেশাও নেই।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও উদ্ধৃতি

এজলাসে, প্রথামত মাচানের উপর হাকিম বিরাজ করিতেছেন। হাকিমটি একজন দেশী ধর্মাবতার- পদে গৌরবে ডেপুটি।

কমলাকান্ত আসামী নহে- সাক্ষী।

মোকদ্দমা গরুচুরি।

ফরিয়াদী প্রসন্ন গোয়ালিনী।

————–

সেই আফিঙ্গখোর কমলাকান্তের অনেক দিন কোন সম্বাদ পাই নাই। অনেক সন্ধান করিয়াছিলাম, অকস্মাৎ সম্প্রতি একদিন তাহাকে ফৌজদারী আদালতে দেখিলাম। দেখি যে, ব্রাহ্মণ এক গাছতলায় বসিয়া, গাছের গুঁড়ি ঠেসান দিয়া, চক্ষু বুজিয়া ডাবায় তামাকু টানিতেছে। মনে করিলাম, আর কিছু না, ব্রাহ্মণ লোভে পড়িয়া কাহার ডিবিয়া হইতে আফিঙ্গ চুরি করিয়াছে-অন্য সামগ্রী কমলাকান্ত চুরি করিবেনা-ইহা নিশ্চিত জানি। নিকটে একজন কালোকোর্ত্তা কনষ্টেবলও দেখিলাম। আমি বড় দাঁড়াইলাম না-কি জানি যদি কমলাকান্ত জামিন হইতে বলে। তফাতে থাকিয়া দেখিতে লাগিলাম যে, কাণ্ডটা কি হয়।

কিছুকাল পরে কমলাকান্তের ডাক হইল। তখন একজন কনষ্টেবল রুল ঘুরাইয়া তাহাকে সঙ্গে করিয়া এজ্লাসে লইয়া গেল। আমি পিছু পিছু গেলাম। দাঁড়াইয়া, দুই একটি কথা শুনিয়া ব্যাপারখানা বুঝিতে পারিলাম।

এজ্লাসে, প্রথমত মাচানের উপর হাকিম বিরাজ করিতেছেন। হাকিমটি একজন দেশী ধর্ম্মাবতার-পদে ও গৌরবে ডিপুটি। কমলাকান্ত আসামী নহে-সাক্ষী। মোকদ্দমা গরুচুরি। ফরিয়াদি সেই প্রসন্ন গোয়ালিনী।

কমলাকান্তকে সাক্ষীর কাটরায় পূরিয়া দিল। তখন কমলাকান্ত মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিল। চাপরাশী ধমকাইল- “হাস কেন?”

কমলাকান্ত যোড়হাত করিয়া বলিল. “বাবা, কার ক্ষেতে ধান খেয়েছি যে, আমাকে এর ভিতর পূরিলে?”

চাপরাশী মহাশয় কথাটা বুঝিলেন না। দাড়ি ঘুরাইয়া বলিলেন, “তামাসার জায়গা এ নয় –হলফ পড়।”

কমলাকান্ত বলিল, “পড়াও না বাপু।”

একজন মুহুরি তখন হলফ পড়াইতে আরম্ভ করিল। বলিল, “বল আমি পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষ জানিয়া…”

কমলাকান্ত। (সবিস্ময়ে) কি বলিব?

মুহুরি। শুন্‌তে পাও না-“পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষ জেনে__”

কমলা। পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষ জেনে! কি সর্বনাশ!

হাকিম দেখিলেন, সাক্ষীটা কি একটা গণ্ডগোল বাধাইতেছে। জিজ্ঞাসা করিলেন, “সর্বনাশ কি?”

কমলা। পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষ জেনেছি-এ কথাটা বল্‌তে হবে?

হাকিম। ক্ষতি কি? হলফের ফারমই এই।

কমলা। হুজুর সুবিচারক বটে। কিন্তু একটা কথা বলি কি, সাক্ষ্য দিতে দিতে দুই একটা ছোট রকম মিথ্যা বলি, না হয় বলিলাম-কিন্তু গোড়াতেই একটা বড় মিথ্যা বলিয়া আরম্ভ করিব, সেটা কি ভাল?

হাকিম। এর আর মিথ্যা কথা কি?

কমলাকান্ত মনে মনে বলিল, “তত বুদ্ধি থাকিলে তোমার কি এ পদবৃদ্ধি হইত?” প্রকাশ্যে বলিল, “ধর্ম্মাবতার, আমার একটু একটু বোধ হইতেছে কি যে, পরমেশ্বর ঠিক প্রত্যক্ষের বিষয় নয়। আমার চোখের দোষই হউক, আর যাই হউক; কখনও ত এ পর্য্যন্ত পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষ দেখিতে পাইলাম না। আপনারা বোধ হয় আইনের চসমা নাকে দিয়া তাঁহাকে প্রত্যক্ষ দেখিতে পারেন-কিন্তু আমি যখন তাঁহাকে এ ঘরের ভিতর প্রত্যক্ষ পাইতেছি না-তখন কেমন করিয়া বলি-আমি পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষ জেনে__”

ফরিয়াদীর উকিল চটিলেন-তাঁহার মূল্যবান সময়, যাহা মিনিটে মিনিটে টাকা প্রসব করে, তাহা এই দরিদ্র সাক্ষী নষ্ট করিতেছে। উকীল তখন গরম হইয়া বলিলেন, “সাক্ষী মহাশয়!” Theological Lecture টা ব্রাহ্মসমাজের জন্য রাখিলে ভাল হয় না? এখানে আইনের মতে চলিতে মন স্থির করুন।”

কমলাকান্ত তাঁহার দিকে ফিরিল। মৃদু হাসিয়া বলিল, “আপনি বোধ হইতেছে উকীল।”

উকীল । (হাসিয়া) কিসে চিনিলে?

কমলা। বড় সহজে। মোটা চেন আর ময়লা শামলা দেখিয়া। তা মহাশয়! আপনাদের জন্য এ Theological Lecture নয়। আপনারা পরমেশ্বরকে প্রত্যক্ষ দেখেন স্বীকার করি-যখন মোয়াক্কেল আসে।

উকীল সরোষে উঠিয়া হাকিমকে বলিলেন, “I ask the protection of the Court against the insults of this witness.”

কোর্ট বলিলেন, “O Baboo! the witness is your own witness, and you are at liberty to send him away if you like.”

এখন কমলাকান্তকে বিদায় দিলে উকীল বাবুর মোকদ্দমা প্রমাণ হয় না-সুতরাং উকীল বাবু চুপ করিয়া বসিয়া পড়িলেন। কমলাকান্ত ভাবিলেন, এ হাকিমটা জাতিভ্রষ্ট-পালের মত নয়।

হাকিম গতিক দেখিয়া, মুহুরিকে আদেশ করিলেন যে, “ওথের প্রতি সাক্ষীর objection আছে-উহাকে simple affirmation দাও।” তখন মুহুরি কমলাকান্তকে বলিল, “আচ্ছা, ও ছেড়ে দাও-বল, আমি প্রতিজ্ঞা করিতেছি-বল |”

কমলা। কি প্রতিজ্ঞা করিতেছি, সেটা জানিয়া প্রতিজ্ঞাটা করিলে ভাল হয় না?

মুহুরি হাকিমের দিকে চাহিয়া বলিল, “ধর্ম্মাবতার! সাক্ষী বড় সেরকশ্ |”

উকীল বাবু হাঁকিলেন, “Very obstructive.”

কমলা। (উকীলের প্রতি) শাদা কাগজে দস্তখত করিয়া লওয়ার প্রথাটা আদালতের বাহিরে চলে জানি-ভিতরেও চলিবে কি?

উকীল । শাদা কাগজে কে তোমার দস্তখত লইতেছে?

কমলা। কি প্রতিজ্ঞা করিতে হইবে, তাহা না জানিয়া, প্রতিজ্ঞা করা, আর কাগজে কি লেখা হয় তাহা না দেখিয়া, দস্তখত করা, একই কথা।

হাকিম তখন মুহুরিকে আদেশ করিলেন যে, “প্রতিজ্ঞা আগে ইহাকে শুনাইয়া দাও-গোলমালে কাজ নাই |” মুহুরি তখন বলিল, “শোন, তোমাকে বলিতে হইবে যে, আমি প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে, আমি যে সাক্ষ্য দিব, তাহা সত্য হইবে, আমি কোন কথা গোপন করিব না-সত্য ভিন্ন আর কিছু হইবে না |”

কমলা। ওঁ মধু মধু মধু।

মুহুরি। সে আবার কি?

কমলা। পড়ান, আমি পড়িতেছি।

কমলাকান্ত তখন আর গোলযোগ না করিয়া প্রতিজ্ঞা পাঠ করিল। তখন তাঁহাকে জিজ্ঞাসাবাদ করিবার জন্য উকীল বাবু গাত্রোত্থান করিলেন, কমলাকান্তকে চোখ রাঙ্গাইয়া বলিলেন, “এখন আর বদ্‌মায়েশি করিও না-আমি যা জিজ্ঞাসা করি, তার যথার্থ উত্তর দাও। বাজে কথা ছাড়িয়া দাও |”

কমলা। আপনি যা জিজ্ঞাসা করিবেন, তাই আমাকে বলিতে হইবে? আর কিছু বলিতে পাইব না?

উকীল । না।

কমলাকান্ত তখন হাকিমের দিকে ফিরিয়া বলিলেন, “অথচ আমাকে প্রতিজ্ঞা করাইলেন যে, ‘কোন কথা গোপন করিব না |’ ধর্ম্মাবতার, বে-আদবি মাফ হয়! পাড়ায় আজ একটা যাত্রা হইবে, শুনিতে যাইব ইচ্ছা ছিল; সে সাধ এইখানেই মিটিল। উকীল বাবু অধিকারী-আমি যাত্রার ছেলে, যা বলাইবেন, কেবল তাই বলিব; যা না বলাইবেন, তা বলিব না। যা না বলাইবেন, তা কাজেই গোপন থাকিবে। প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের অপরাধ লইবেন না |”

হাকিম। যাহা আবশ্যক বিবেচনা করিবে, তাহা না জিজ্ঞাসা হইলেও বলিতে পার।

কমলাকান্ত তখন সেলাম করিয়া বলিল, “বহুৎ খুব |” উকীল তখন জিজ্ঞাসাবাদ আরম্ভ করিলেন, “তোমার নাম কি?”

কমলা। শ্রী কমলাকান্ত চক্রবর্ত্তী।

উকীল । তোমার বাপের নাম কি?

কমলা। জোবানবন্দীর আভ্যুদয়িক আছে না কি?

উকীল গরম হইলেন, বলিলেন, “হুজুর! এ সব Contempt of Court.” হুজুর, উকীলের দুর্দ্দশা দেখিয়া নিতান্ত অসন্তুষ্ট নন-বলিলেন, “আপনারই সাক্ষী |” সুতরাং উকীল আবার কমলাকান্তের দিকে ফিরিলেন, বলিলেন, “বল। বলিতে হইবে |”

কমলাকান্ত পিতার নাম বলিল। উকীল তখন জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কি জাতি?”

কমলা। আমি কি একটা জাতি?

উকীল । তুমি কোন্ জাতীয়।

কমলা। হিন্দু জাতীয়।

উকীল । আঃ! কোন্ বর্ণ?

কমলা। ঘোরতর কৃষ্ণবর্ণ।

উকীল । দূর হোক ছাই! এমন সাক্ষীও আনে! বলি তোমার জাত আছে?

কমলা। মারে কে?

হাকিম দেখিলেন, উকীলের কথায় হইবে না। বলিলেন, “ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, কৈয়বর্ত্ত, হিন্দুর নানা প্রকার জাতি আছে জান ত-তুমি তার কোন জাতির ভিতর?”

কমলা। ধর্ম্মাবতার! এ উকীলের ধৃষ্টতা! দেখিতেছেন আমার গলায় যজ্ঞোপবীত, নাম বলিয়াছি চক্রবর্ত্তী-ইহাতেও যে উকীল বুঝেন নাই যে, আমি ব্রাহ্মণ, ইহা আমি কি প্রকারে জানিব?

হাকিম লিখিলেন, “জাতি ব্রাহ্মণ |” তখন উকীল জিজ্ঞাসা করিলেন, “তোমার বয়স কত?”

এজ্লাসে একটা ক্লক ছিল-তাহার পানে চাহিয়া হিসাব করিয়া কমলাকান্ত বলিল, “আমার বয়স একান্ন বৎসর, দুই মাস, তের দিন, চারি ঘণ্টা, পাঁচ মিনিট ___”

উকীল । কি জ্বালা! তোমার ঘণ্টা মিনিট কে চায়?

কমলা। কেন, এইমাত্র প্রতিজ্ঞা করাইয়াছেন যে, কোন কথা গোপন করিব না।

উকীল । তোমার যা ইচ্ছা কর! আমি তোমায় পারি না। তোমার নিবাস কোথা?

কমলা। আমার নিবাস নাই।

উকীল । বলি, বাড়ী কোথা?

কমলা। বাড়ী দূরে থাক, আমার একটা কুঠারীও নাই।

উকীল । তবে থাক কোথা?

কমলা। যেখানে সেখানে।

উকীল । একটা আড্ডা ত আছে?

কমলা। ছিল, যখন নসী বাবু ছিলেন। এখন আর নাই।

উকীল । এখন আছ কোথা?

কমলা। কেন, এই আদালতে।

উকীল । কাল ছিলে কোথা?

কমলা। একখানা দোকানে।

হাকিম বলিলেন, “আর বকাবকিতে কাজ নাই-আমি লিখিয়া লইতেছি, নিবাস নাই। তারপর?

উকীল । তোমার পেশা কি?

কমলা। আমার আবার পেশা কি? আমি কি উকীল না বেশ্যা যে, আমার পেশা আছে?

উকীল । বলি, খাও কি করিয়া?

কমলা। ভাতের সঙ্গে ডাল মাখিয়া, দক্ষিণ হস্তে গ্রাস তুলিয়া, মুখে পুরিয়া গলাধঃকরণ করি।

উকীল । সে ডাল ভাত জোটে কোথা থেকে?

কমলা। ভগবান্ জোটালেই জোটে, নইলে জোটে না।

উকীল । কিছু উপার্জ্জন কর?

কমলা। এক পয়সাও না।

উকীল । তবে কি চুরি কর?

কমলা। তাহা হইলে ইতিপূর্ব্বেই আপনার শরণাগত হইতে হইত। আপনি কিছু ভাগও পাইতেন।

উকীল তখন হাল ছাড়িয়া দিয়া, আদালতকে বলিলেন, “আমি এ সাক্ষী চাহি না। আমি ইহার জোবানবন্দী করাইতে পারিব না |”

প্রসন্ন বাদিনী, উকীলের কোমর ধরিল; বলিল, “এ সাক্ষী ছাড়া হইবে না। এ বামন সত্য কথা বলিবে, তাহা আমি জানি-কখনও মিছা বলে না। উহাকে তোমরা জিজ্ঞাসা করিতে জান না-তাই ও অমন করিতেছে। ও বামনের আবার পেশা কি? ও এর বাড়ী ওর বাড়ী খেয়ে বেড়ায়, ওকে জিজ্ঞাসা করিতেছ, উপার্জ্জন কর! ও কি বলবে?”

উকীল তখন হাকিমকে বলিল, “লিখুন, পেশা ভিক্ষা |”

এবার কমলাকান্ত রাগিল, “কি? কমলাকান্ত চক্রবর্ত্তী ভিক্ষোপজীবী? আমি মুক্তকণ্ঠে হলফের উপর বলিতেছি, আমি কখনও কাহারও কাছে এক পয়সা ভিক্ষা চাই না |”

প্রসন্ন আর থাকিতে পারিল না-সে বলিল, “সে কি ঠাকুর! কখন আফিঙ্গ চেয়ে খাও নাই?”

কমল। দূর মাগি ধেমো গোয়ালার মেয়ে! আফিঙ্গ কি পয়সা! আমি কখন একটি পয়সাও কাহারও কাছে ভিক্ষা লই নাই।

হাকিম হাসিয়া বলিলেন, “কি লিখিব কমলাকান্ত?”

কমলাকান্ত নরম হইয়া বলিল, “লিখুন, পেশা ব্রাহ্মণভোজনের নিমন্ত্রণ-গ্রহণ” সকলে হাসিল-হাকিম তাই লিখিয়া লইলেন।

তখন উকীল মহাশয় মোকদ্দমায় প্রবৃত্ত হইলেন। জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কি ফরিয়াদীকে চেন?”

কমল। না।

প্রসন্ন হাঁকিল, “সে কি ঠাকুর! চিরটা কাল আমার দুধ দই খেলে, আজ বল চিনি না?”

কমলাকান্ত বলিল, “তোমার দুধ দই চিনি না, এমন কথা ত বল্‌তেছি না-তোমার দুধ দই বিলক্ষণ চিনি। যখনই দেখি এক পোয়া দুধে তিন পোয়া জল, তখনই চিনিতে পারি যে, এ প্রসন্ন গোয়ালিনীর দুধ; যখনই দেখ্‌তে পাই যে, ঘোলের চেয়ে দই ফিকে, তখনই চিনতে পারি যে, এ প্রসন্নময়ীর দুধ। দুধ দই চিনি নে?”

প্রসন্ন নথ ঘুরাইয়া বলিল, “আমার দুধ দই চেন, আর আমায় চিনিতে পার না?”

কমলাকান্ত বলিল, “মেয়েমানুষকে কে কবে চিনিতে পেরেছে, দিদি? বিশেষ, গোয়ালার মেয়ের কাঁকালে যদি দুধের কেঁড়ে থাকিল, তবে কার বাপের সাধ্য তাকে চিনে উঠে?”

উকীল তখন আবার সওয়াল করিতে লাগিলেন, “বুঝা গেল; তুমি বাদিনীকে চেন-উহার সঙ্গে তোমার কোন সম্বন্ধ আছে?”

কমল। মন্দ নয়-এত গুণ না থাকিলে কি উকীল হয়!

উকীল । তুমি আমার কি গুণ দেখিলে?

কমল। বামনের ছেলে গোয়ালার মেয়েতেও আপনি একটা সম্বন্ধ খুঁজিয়া বেড়াইতেছেন।

উকীল । এমন সম্বন্ধ কি হয় না? কে জানে তুমি ওর পোষ্যপুত্র কি না?

কমল। ওর নয়, কিন্তু ওর গাইয়ের বটে।

উকীল । বুঝা গেল, তোমার সঙ্গে বাদিনীর একটা সম্বন্ধ আছে, একেবারে সাফ বলিলেই হইত-এত দুঃখ দাও কেন? এখন জিজ্ঞাসা করি, তুমি এ মোকদ্দমার কি জান?

কমল। জানি যে, এ মোকদ্দমায় আপনি উকীল, প্রসন্ন ফরিয়াদী, আমি সাক্ষী আর এই নেড়ে আসামী।

উকীল । তা নয়, গোরুচুরির কি জান?

কমল। গোরুচুরির আমার বাপ-দাদাও জানে না। বিদ্যাটা আমায় শিখাইবেন?-আমার দুধ দধির বড় দরকার।

উকীল । আঃ-বলি গোরুচুরি দেখিয়াছ?

কমল। একদিন দেখিয়াছিলাম। নসী বাবুর একটা বক্‌না-এক বেটা মুচি-

উকীল । কি যন্ত্রণা! বলি, প্রসন্ন গোয়ালিনীর গোরু যখন চুরি যায়, তখন তুমি দেখিয়াছ?

কমল। না-চোর বেটার এত বুদ্ধি হয় নাই যে, আমাকে ডাকিয়া সাক্ষী রাখিয়া গোরুটা চুরি করে। তাহা হইলে আপনারও কাজে সুবিধা হইত, আমারও কাজের সুবিধা হইত।

প্রসন্ন দেখিল, উকীলকে টাকা দেওয়া সার্থক হয় নাই –তখন আপনার হাতে হাল লইবার ইচ্ছায়, উকীলের কাণে কাণে বলিয়া দিল, “ও বামুন সে সব কিছুর সাক্ষী নয়-ও কেবল গোরু চেনে |”

উকীল মহাশয় তখন কূল পাইলেন। গর্জ্জিয়া উঠিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি গোরু চেন?”

কমলাকান্ত মধুর হাসিয়া বলিল, “আহা চিনি বই কি-নহিলে কি আপনার সঙ্গে এত মিষ্টালাপ করি?”

হাকিম দেখিলেন, সাক্ষী বড় বাড়াবাড়ি করিতেছে-বলিলেন, “ও সব রাখ |” প্রসন্ন গোয়ালীর শামলা গাই আদালতের সম্মুখে মাঠে বাঁধা ছিল-দেখা যাইতেছিল। ডিপুটি বাবু সেই দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি এই গোরুটিকে চেন?”

কমলাকান্ত যোড়হাত করিয়া বলিল, “কোন্ গোরুটি, ধর্ম্মাবতার?”

হাকিম বলিলেন, “কোন্ গোরুটি কি? একটি বই ত সাম্‌নে নাই?”

কমল। আপনি দেখিতেছেন, একটি-আমি দেখিতেছি অনেকগুলি।

হাকিম বিরক্ত হইয়া বলিলেন, “দেখিতে পাইতেছ না-ঐ শামলা?”

কমলাকান্ত শামলা গাইয়ের দিকে না চাহিয়া উকীলের শামলার প্রতি চাহিল। বলিল, “এ শামলাও চুরির না কি?”

কমলাকান্তের নষ্টামি হাকিম আর সহ্য করিতে পারিলেন না-বলিলেন, “তুমি আদালতের কাজের বড় বিঘ্ন করিতেছ-Contempt of Court জন্য তোমার পাঁচ টাকা জরিমানা |”

কমলাকান্ত আভূমিপ্রণত সেলাম করিয়া যোড়হাত করিয়া বলিল, “বহুৎ খুব হুজুর! জরিমানা আদায়ের ভার কার প্রতি?”

হাকিম। কেন?

কমল। কিরূপে আদায় করিবেন, সে বিষয়ে তাঁহাকে কিছু উপদেশ দিব।

হাকিম। উপদেশের প্রয়োজন কি?

কমল। ইহলোকে ত আমার নিকট জরিমানা আদায়ের কোন সম্ভাবনা নাই- তিনি পরলোকে যাইতে প্রস্তুত কি না জিজ্ঞাসা করিব।

হাকিম। জরিমানা না দিতে পার, কয়েদ যাইবে।

ক। কত দিনের জন্য, ধর্ম্মাবতার?

হাকিম। জরিমানা অনাদায়ে এক মাস কয়েদ।

কমল। দুই মাস হয় না?

হাকিম। বেশী মিয়াদের ইচ্ছা কর কেন?

কমল। সময়টা কিছু মন্দ পড়িয়াছে-ব্রাহ্মণভোজনের নিমন্ত্রণ আর তেমন সুলভ নয়-জেলখানায় যাহাতে মাস দুই ব্রাহ্মণভোজনের নিমন্ত্রণ হয়, সে ব্যবস্থা যদি আপনি করেন, তবে গরীব ব্রাহ্মণ উদ্ধার পায়।

এরূপ লোককে জরিমানা বা কয়েদ করিয়া কি হইবে? হাকিম হাসিয়া বলিলেন, “আচ্ছা, তুমি যদি গোল না করিয়া সোজা জোবানবন্দী দাও, তবে তোমার জরিমানা মাপ করা যাইতে পারে। বল-ঐ গোরু তুমি চেন কি না?”

হাকিম তখন একজন কনষ্টেবলকে আদেশ করিলেন যে গোরুর নিকট গিয়া প্রসন্নের গাই দেখাইয়া দেয়। কনষ্টেবল তাহাই করিল। বিষণ্ণ উকীল বাবু তখন জিজ্ঞাসা করিলেন, “ঐ গোরু তুমি চেন?”

কমল। সিংওয়ালা গোরু-তাই বলুন।

উকীল । তুমি বল কি?

কমল। আমি বলি শামলাওয়ালা-তা যাক্-আমি ও সিংওয়ালা গোরুটা চিনি। বিলক্ষণ আলাপ আছে।

উকীল । ও কার গোরু?

কমল। আমার।

উকীল । তোমার!

কমল। আমারই।

হরি হরি! প্রসন্নের মুখ শুকাইল! উকীল দেখিল, মোকদ্দমা ফাঁসিয়া যায়। প্রসন্ন তখন তর্জ্জন গর্জ্জন করিয়া বলিল, “তবে রে বিটলে! গোরু তোমার!”

কমলাকান্ত বলিল, “আমার না ত কার! আমি ওর দুধ খেয়েছি, ওর দই খেয়েছি-ওর ঘোল খেয়েছি, ওর ছানা খেয়েছি-ওর মাখন খেয়েছি, ওর ননী খেয়েছি-ও গোরু আমার হলো না, তুই বেটী পালিস্ ব’লে কি তোর বাবার গোরু হলো!”

উকীল অতটা বুঝিলেন না। বলিলেন, “ধর্ম্মাবতার, witness hostile! permission দিন আমি ওকে cross করি |”

কমল। কি? আমায় cross করিবে?

উকিল। হাঁ করিব।

কমল। নৌকায়, না সাঁকো বেঁধে?

উকিল। সে আবার কি?

কমল। বাবা! কমলাকান্ত-সাগর পার হও, এত বড় হনূমান্ তুমি আজও হও নাই।

এই বলিয়া কমলাকান্ত চক্রবর্ত্তী রাগে গর্ গর্ করিয়া কাটরা হইতে নামিয়া যায়-চাপরাশী ধরিয়া আবার কাটরায় পূরিল। তখন কমলাকান্ত আলু থালু হইয়া নিশ্চেষ্ট হইল-বলিল, “কর বাবা ক্রস্ কর!-আমি অগাধ সমুদ্রে পড়িয়া আছি-যে ইচ্ছা লম্ফ দাও-‘অপামিবাধারমনুত্তরঙ্গং!-উকিল মহাশয়! এ প্রশান্ত মহাসমুদ্র তরঙ্গ বিক্ষেপ করে না আপনি স্বচ্ছন্দে উল্লম্ফন করুন |”

উকীল তখন কোর্টকে বলিলেন, “ধর্ম্মাবতার, দেখা যাইতেছে যে, এ ব্যক্তি বাতুল; ইহাকে আর ক্রস্ করিবার প্রয়োজন নাই। বাতুল বলিয়া ইহার জবানবন্দী পরিত্যক্ত হইবে। ইহাকে বিদায় দেওয়া হউক |”

হাকিম কমলাকান্তের হাত হইতে নিষ্কৃতি পাইলে বাঁচেন, বিদায় দিতে প্রস্তুত, এমত সময়ে প্রসন্ন হাত যোড় করিয়া আদালতে নিবেদন করিল, “যদি হুকুম হয়, তবে আমি স্বয়ং উহাকে গোটা কত কথা জিজ্ঞাসা করি, তার পর বিদায় দিতে হয়, দিবেন |”

হাকিম কৌতূহলী হইয়া অনুমতি দিলেন। প্রসন্ন তখন কমলাকান্তের প্রতি চাহিয়া বলিল, “ঠাকুর! মৌতাতের সময় হয়েছে না?”

কমল। মৌতাতের আবার সময় কি রে বেটী –“অজরামরবৎ প্রাজ্ঞঃ বিদ্যাং নেশ্চাঞ্চ চিন্তয়েৎ |”

প্রসন্ন । অং বং এখন রাখ –এখন মৌতাত করিবে?

কমল। দে!

প্রসন্ন । আচ্ছা, আগে আমার কথার উত্তর দাও –তার পর সে হবে।

কমল। তবে জল্‌দি জল্‌দি বল – জল্‌দি জল্‌দি জবাব দিই।

প্রসন্ন । বলি, গোরু কার?

কমল। গোরু তিন জনের; গোরু প্রথমে বয়সে গুরুমহাশয়ের; মধ্যবয়সের স্ত্রীজাতির; শেষ বয়সে উত্তরাধিকারীর; দড়ি ছিঁড়িবার সময়ে কারও নয়।

প্রসন্ন । বলি, ঐ শামলা গাই কার?

কমল। যে ওর দুধ খায় তার।

প্রসন্ন । ও গোরু আমার কি না?

কমল। তুই বেটী কখন ওর এক বিন্দু দুধ খেলি নে, কেবল বেচে মর্‌লি, গোরু তোর হলো? ও গোরু যদি তোর হয়, তবে বাঙ্গাল বেঙ্কের টাকাও আমার। দে বেটী, গোরুচোরকে ছেড়ে দে-গরীবের ছেলে দুধ খেয়ে বাঁচুক।

হাকিম দেখিলেন, দুই জনে বড় বাড়াবাড়ি করিতেছে-আদালত মেছো-হাটা হইয়া উঠিল। তখন উভয়কে ধমক দিয়া জিজ্ঞাসাবাদ নিজহস্তে লইলেন। জিজ্ঞাসা করিলেন, “প্রসন্ন এই গোরুর দুধ বেচে?”

কমল। আজ্ঞে, হাঁ।

“উহার গোহালে এই গোরু থাকে?”

কমল। ও গোরুও থাকে, আমিও কখন কখন থাকি।

“ওই খাওয়ায়?”

কমল। উভয়কে।

বাদিনীর উকীল তখন বলিলেন, “আমার কার্য্য সিদ্ধ হইয়াছে-আমি উহাকে জিজ্ঞাসা করিতে চাই না”। এই বলিয়া তিনি উপবেশন করিলেন। তখন আসামীর উকীল গাত্রোত্থান করিলেন। দেখিয়া কমলাকান্ত জিজ্ঞাসা করিলেন, “আবার তুমি কে?”

আসামীর উকীল বলিলেন, “আমি আসামীর পক্ষে তোমাকে ক্রস্ করিব”।

কমল। একজন ত ক্রস্ করিয়া গেল, আবার তুমি কুমার বাহাদুর এলে না কি?

উকীল । কুমার বাহাদুর কে?

কমল। রাজপুত্রকে চেন না? ত্রেতা যুগে আগে ক্রস্ করিলেন, পবনাঙ্গজ মহাশয়। তার পর ক্রস্ করিলেন, কুমার বাহাদুর।20

উকীল । ও সব রাখ-তুমি গোরু চেন বলেছ-কিসে চেন?

কমল। কখন শিঙ্গে-কখন শামলায়!

উকীল রাগিয়া উঠিয়া, গর্জ্জন করিয়া টেবিল চাপড়াইয়া বলিলেন, “তোমার পাগলামি রাখ-তুমি এই গোরু চিনিতে পারিতেছ কিসে?”

কমল। ঐ হাম্বা-রবে।

উকীল হতাশ হইয়া বলেন, “Hopeless” উকীল মহাশয় বসিয়া পড়িলেন-আর জেরা করিবেন না। কমলাকান্ত বিনীতভাবে বলিল, “দড়ি ছেঁড় কেন বাবা?”

উকীল আর জেরা করিবেন না দেখিয়া হাকিম কমলাকান্তকে বিদায় দিলেন। কমলাকান্ত উর্দ্ধ্বশ্বাসে পলাইল। আমি কিছু কাজ সারিয়া বাহিরে আসিয়া দেখিলাম যে, কমলাকান্ত থেলো হুঁকা হাতে করিয়া বসিয়া আছে-চারি দিকে লোক জমিয়াছে-প্রসন্নও সেখানে আসিয়াছে। কমলাকান্ত তাহাকে তিরস্কার করিতেছে আর বলিতেছে, “তোর মঙ্গলার বাঁটের দিব্য, তোর দুধের কেঁড়ের দিব্য, তোর ঘোলমউনির দিব্য, তোর ফাঁদি-নথের দিব্য, তুই যদি চোরকে গোরু ছেড়ে না দিস্!”

আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “চক্রবর্ত্তী মহাশয়! চোরকে গোরু ছাড়িয়া দিবে কেন?”

কমলাকান্ত বলিল, “পূর্ব্বকালে মহারাজ শ্যেনজিৎকে এক ব্রাহ্মণ বলিয়াছিল যে, ‘বৎস, গোপস্বামী ও তস্কর, ইহাদের মধ্যে যে ধেনুর দুগ্ধ পান করে, সেই তাহার যথার্থ অধিকারী। অন্যের তাহার উপর মমতা প্রকাশ করা বিড়ম্বনা মাত্র।21 এই হলো ভীষ্মদেব ঠাকুরের Hindu Law, আর ইহাই ইউরোপের International Law। যদি সভ্য এবং উন্নত হইতে চাও, তবে কাড়িয়া খাইবে। গো শব্দে ধেনুই বুঝ, আর পৃথিবীই বুঝ, ইনি তস্করভোগ্যা। সেকন্দর হইতে রণজিৎ সিংহ পর্য্যন্ত সকল তস্করই ইহার প্রমাণ। Right of Conquest যদি একটা right হয়, তবে Right of theft, কি একটা right নয়? অতএব, হে প্রসন্ন নামে গোপকন্যে! তুমি আইনমতে কার্য্য কর। ঐতিহাসিক রাজনীতির অনুবর্ত্তী হও। চোরকে গোরু ছাড়িয়া দাও |”

এই বলিয়া কমলাকান্ত সেখান হইতে চলিয়া গেল। দেখিলাম, মানুষটা নিতান্ত ক্ষেপিয়া গিয়াছে।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প সুকুমার রায়

হারকিউলিস

-সুকুমার রায়

মহাভারতে যেমন ভীম, গ্রীস দেশের পুরাণে তেমনই হারকিউলিস। হারকিউলিস দেবরাজ জুপিটারের পুত্র কিন্তু তার মা এই পৃথিবীরই এক রাজকন্যা, সুতরাং তিনিও ভীমের মত এই পৃথিবীরই মানুষ, গদাযুদ্ধে আর মল্লযুদ্ধে তাঁর সমান কেহ নাই। মেজাজটি তাঁর ভীমের চাইতেও অনেকটা নরম, কিন্তু তাঁর এক একটি কীর্তি এমনি অদ্ভুত যে, পড়িতে পড়িতে ভীম, অর্জুন, কৃষ্ণ আর হনুমান এই চার মহাবীরের কথা মনে পড়ে।

হারকিউলিসের জন্মের সংবাদ যখন স্বর্গে পৌঁছিল, তখন তাঁর বিমাতা জুনো দেবী হিংসায় জ্বলিয়া বলিলেন, “আমি এই ছেলের সর্বনাশ করিয়া ছাড়িব।” জুনোর কথামত দুই প্রকান্ড বিষধর সাপ হারকিউলিসকে ধ্বংস করিতে চলিল। সাপ যখন শিশু হারকিউলিসের ঘরে ঢুকিল, তখন তাহার ভয়ঙ্কর মূর্তি দেখিয়া ঘরসুদ্ধ লোকে ভয়ে আড়ষ্ট হইয়া গেল, কেহ শিশুটিকে বাঁচাইবার জন্য চেষ্টা করিতে পারিল না। কিন্তু হারকিউলিস নিজেই তাঁর দুইখানি কচি হাত বাড়াইয়া সাপ দুটার গলায় এমন চাপিয়া ধরিলেন যে, তাহাতেই তাদের প্রাণ বাহির হইয়া গেল। জুনো বুঝিলেন, এ বড় সহজ শিশু নয়! বড় হইয়া হারকিউলিস সকল বীরের গুরু বৃদ্ধ চীরনের কাছে অস্ত্রবিদ্যা শিখিতে গেলেন। চীরন জাতিতে সেন্টর—তিনি মানুষ নন। সেন্টরদের কোমর পর্যন্ত মানুষের মত, তার নীচে একটা মাথাকাটা ঘোড়ার শরীর বসান। চীরনের কাছে অস্ত্রবিদ্যা শিখিয়া হারকিউলিস অসাধারণ যোদ্ধা হইয়া উঠিলেন। তখন তিনি ভাবিলেন, ‘এইবার পৃথিবীটাকে দেখিয়া লইব।’

হারকিউলিস পৃথিবীতে বীরের উপযুক্ত কাজ খুঁজিতে বাহির হইয়াছেন, এমন সময় দুটি আশ্চর্য সুন্দর মূর্তি তাঁর সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। হারকিউলিস দেখিলেন দুটি মেয়ে—তাদের একজন খুব চঞ্চল, সে নাকে-চোখে কথা কয়, তার দেমাকের ছটায় আর অলঙ্কারের বাহারে যেন চোখ ঝলসাইয়া দেয়। সে বলিল, “হারকিউলিস, আমাকে তুমি সহায় কর, আমি তোমায় ধন দিব, মান দিব, সুখে স্বচ্ছন্দে আমোদের আহ্লাদে দিন কাটাইবার উপায় করিয়া দিব।” আর একটি মেয়ে শান্তশিষ্ট, সে বলিল, “আমি তোমাকে বড় বড় কাজ করিবার সুযোগ দিব, শক্তি দিব, সাহস দিব। যেমন বীর তুমি তার উপযুক্ত জীবন তোমায় দিব।” হারকিউলিস খানিক চিন্তা করিয়া বলিলেন, “আমি ধন মান সুখ চাই না—আমি তোমার সঙ্গেই চলিব। কিন্তু তোমার পরিচয় জানিতে চাই।” তখন দ্বিতীয় সুন্দরী বলিল, “আমার নাম পুন্য। আজ হইতে আমি তোমার সহায় থাকিলাম।”

তারপর কত বৎসর হারকিউলিস দেশে দেশে কত পুন্য কাজ করিয়া ফিরিলেন—তাঁর গুণের কথা আর বীরত্বের কথা চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল। থেবিসের রাজা ক্রয়ন্‌ তাঁর সঙ্গে তাঁর কন্যা মেগারার বিবাহ দিলেন। হারকিউলিস নিজের পুন্য ফলে কয়েক বৎসর সুখে কাটাইলেন।

কিন্তু বিমাতা জুনোর মনে হারকিউলিসের এই সুখ কাঁটার মত বিঁধিল। তিনি কী চক্রান্ত করিলেন, তাহার ফলে একদিন হারকিউলিস হঠাৎ পাগল হইয়া তাঁর স্ত্রী পুত্র সকলকে মারিয়া ফেলিলেন। তারপর যখন তাঁর মন সুস্থ হইল, যখন তিনি বুঝিতে পারিলেন যে পাগল অবস্থায় কি সর্বনাশ করিয়াছেন, তখন শোকে অস্থির হইয়া এক পাহাড়ের উপরে নির্জন বনে গিয়া তিনি ভাবিতে লাগিলেন, ‘আর বাঁচিয়া লাভ কি?’

হারকিউলিস দুঃখে বনবাসী হইয়াছেন, এদিকে জুনো ভাবিতেছেন, ‘একনও যথেষ্ট হয় নাই।’ তিনি দেবতাদের কুমন্ত্রণা দিয়া এই ব্যবস্থা করাইলেন যে, এক বৎসর সে আর্গসের দুর্দান্ত রাজা ইউরিসথিউসের দাসত্ব করিবে।

হারকিউলিস প্রথমে এই অন্যায় আদেশ পালন করিতে রাজী হন নাই—কিন্তু দেবতার হুকুম লঙ্ঘন করিবার উপায় নাই দেখিয়া, শেষে তাহাতেই সম্মত হইলেন। রাজা ইউরিসথিউস্‌ ভাবিলেন, এইবার হারকিউলিসকে হাতে পাওয়া গিয়াছে। ইহাকে দিয়া এমন সব অদ্ভুত কাজ করাইয়া লইব, যাহাতে আমার নাম পৃথিবীতে অমর হইয়া থাকিবে।

নেমিয়ার জঙ্গলে এক দুর্দান্ত সিংহ ছিল, তার দৌরাত্মে দেশের লোক অস্থির হইয়া পড়িয়াছিল। রাজা ইউরিসথিউস্‌ বলিলেন, ‘যাও হারকিউলিস! সিংহটাকে মারিয়া আইস।” হারকিউলিস সিংহ মারিতে চলিলেন। “কোথায় সেই সিংহ?” পথে যাকে জিজ্ঞাসা করেন সেই বলে, “কেন বাপু সিংহের হাতে প্রাণ দিবে? সে সিংহকে কি মানুষে মারিতে পারে? আজ পর্যন্ত যে-কেহ সিংহ মারিতে গিয়াছে সে আর ফিরে নাই।” কিন্তু হারকিউলিস ভয় পাইলেন না। তিনি একাকী গভীর বনে সিংহের গহ্বরে ঢুকিয়া, সিংহের টুঁটি চাপিয়া তাহার প্রাণ বাহির করিয়া দিলেন। তারপর সেই সিংহের চামড়া পরিয়া তিনি রাজার কাছে সংবাদ দিতে ফিরিলেন।

রাজা বলিলেন, “এবার যাও লের্নার জলাভুমিতে। সেখানে হাইড্রা নামে সাতমুণ্ড সাপ আছে, তাহার ভয়ে লোকজন দেশ ছাড়িয়া পলাইতেছে। জন্তুটাকে না মারিলে ত আর চলে না।” হারকিউলিস তৎক্ষণাৎ সাতমুণ্ড জানোয়ারের সন্ধানে বাহির হইলেন।

লের্নার জলাভুমিতে গিয়া আর সন্ধান করিতে হইল না, কারণ, হাইড্রা নিজেই ফোঁস ফোঁস শব্দে আকাশ কাঁপাইয়া তাঁকে আক্রমণ করিতে আসিল। হারকিউলিস এক ঘায়ে তার একটা মাথা উড়াইয়া দিলেন—কিন্তু, সে কি সর্বনেশে জানোয়ার—সে একটা কাটা মাথার জায়গায় দেখিতে দেখিতে সাতটা নূতন মাথা গজাইয়া উঠিল। হারকিউলিস দেখিলেন, এ জন্তু সহজে মরিবা নয়। তিনি তাঁহার সঙ্গী ইয়োলাসকে বলিলেন, “একটা লোহা আগুনে রাঙাইয়া আন ত।” তখন জ্বলন্ত গরম লোহা আনাইয়া তারপর হাইড্রার এক একটা মাথা উড়াইয়া কাটা জায়গায় লোহার ছ্যাঁকা দিয়া পোড়াইয়া দেওয়া হইল। কিন্তু এত করিয়াও নিস্তার নাই, শেষ একটা মাথা আর কিছুতেই মরিতে চায় না—সাপের শরীর হইতে একেবারে আলগা হইয়াও সে সাংঘাতিক হাঁ করিয়া কামড়াইতে আসে। হারকিউলিস তাহাকে পিটিয়া মাটিতে পুঁতিয়া, তাহার উপর প্রকাণ্ড পাথর চাপা দিয়া তবে নিশ্চিন্ত হইতে পারিলেন। ফিরিবার আগে হারকিউলিস সে সাপের রক্তে কতগুলা তীরের মুখ ডুবাইয়া লইলেন, কারণ, তাঁহার গুরু চীরণ বলিয়াছেন—হাইড্রার রক্তমাখা তীর একেবারে অব্যর্থ মৃত্যুবাণ।

হারকিউলিস ইউরিসথিউসের দেশে ফিরিয়া গেলে পর, কিছুদিন বাদেই আবার তাঁর ডাক পড়িল। এবারে রাজা বলিলেন, “সেরিনিয়ার হরিণের কথা শুনিয়াছি, তার সোনার শিং, লোহার পা, সে বাতাসের আগে ছুটিয়া চলে। সে হরিণ আমার চাই—তুমি তাহাকে জীবন্ত ধরিয়া আন।” হারকিউলিস আবার চলিলেন। কত দেশ দেশান্তর, কত নদী সমুদ্র পার হইয়া, দিনের পর দিন সেই হরিণের পিছন ঘুরিয়া ঘুরিয়া, শেষে উত্তরের ঠান্ডা দেশে বরফের মধ্যে হরিণ যখন শীতে অবশ হইয়া পড়িল, তখন হারকিউলিস সেখান হইতে তাকে উদ্ধার করিয়া রাজার কাছে হাজির করিলেন।

ইহার পর রাজা হুকুম দিলেন, এরিম্যান্থাসের রাক্ষসবরাহকে মারিতে হইবে। সে বরাহ খুবই ভীষ্ণ বটে, কিন্তু তাকে মারিতে হারকিউলিসের বিশেষ কোন ক্লেশ হইবার কথা নয়। তা ছাড়া, বরাহ পলাইবার পাত্র নয়, সুতরাং তার জন্য দেশ বিদেশ ছুটিবারও দরকার হয় না। হারকিউলিস সহজেই কার্যোদ্ধার করিতে পারিতেন, কিন্তু মাঝ হইতে একদল হতভাগা সেন্টর আসিয়া তাঁর সহিত তুমুল ঝগড়া বাধাইয়া বসিল। হারকিউলিস তখন সেই হাইড্রার রক্ত-মাখান বিষবাণ ছুঁড়িয়া তাদের মারিতে লাগিলেন। এদিকে বৃদ্ধ চীরণের কাছে খবর গিয়াছে যে, হারকিউলিস নামে কে একটা মানুষ আসিয়া সেন্টরদের মারিয়া শেষ করিল। চীরণ তখনই ঝগড়া থামাইবার জন্য ব্যস্ত হইয়া দৌড়িয়া আসিতেছেন, এমন সময়, হঠাৎ করিয়া হারকিউলিসের একটা তীর ছুটিয়া তাঁর গায়ে বিঁধিয়া গেল। সকলে হায় হায় করিয়া উঠিল, হারকিউলিসও অস্ত্র ফেলিয়া ছুটিয়া আসিলেন। সেন্টরেরা অনেকরকম ঔষধ জানে, হারকিউলিসও তাঁর গুরুর কাছে অস্ত্রাঘাতের নানারকম চিকিৎসা শিখিয়াছেন—কিন্তু সে বিষবাণ এমন সাংঘাতিক, তার কাছে কোন চিকিৎসাই খাটিল না। চীরণ আর বাঁচিলেন না। এবার হারকিউলিস তাঁর কাজ সারিয়া, নিতান্ত বিষন্ন মনে গুরুর কথা ভাবিতে ভাবিতে দেশে ফিরিলেন।

হারকিউলিস একা সেন্টরদের যুদ্ধে হারাইয়াছেন, এই সংবাদ চারিদিকে রাষ্ট্র হইয়া পড়িল। সকলে বলিল, “হারকিউলিস না জানি কর বড় বীর! এমন আশ্চর্য কীর্তির কথা আমরা আর শুনি নাই।” আসলে কিন্তু হারকিউলিসের বড় বড় কাজ এখনও কিছুই করা হয় নাই—তাঁর কীর্তির পরিচয় সবেমাত্র আরম্ভ হইয়াছে।

বরাহ মারিয়া হারকিউলিস অল্পই বিশ্রাম করিবার সুযোগ পাইলেন—কারণ তারপরেই এলিস নগরের রাজা আগিয়াসের গোয়ালঘর সাফ করিবার জন্য তাঁহার ডাক পড়িল। আগিয়াসের প্রকান্ড গোয়ালঘরে অসংখ্য গরু, কিন্তু বহু বৎসর ধরিয়া সে ঘর কেহ ঝাঁট দেয় না, ধোয় না—সুতরাং তাহার চেহারাটি তখন কেমন হইয়াছিল, তাহা কল্পনা করিয়া দেখ। গোয়ালঘরের অবস্থা দেখিয়া হারকিউলিস ভাবনায় পড়িলেন। প্রকান্ড ঘর, তাহার ভিতর হাঁটিয়া দেখিতে গেলেই ঘণ্টাখানেক সময় যায়। সেই ঘরের ভিতর হয়ত বিশ বৎসরের আবর্জনা জমিয়াছে—অথচ একজন মাত্র লোকে তাকে সাফ করিবে। ঘরের কাছ দিয়া আলফিউস নদী স্রোতের জোরে প্রবল বেগে বহিয়া চলিয়াছে—হারকিউলিস ভাবিলেন—’এই ত চমৎকার উপায় হাতের কাছেই রহিয়াছে!’ তিনি তখন একাই গাছ পাথরের বাঁধ বাঁধিয়া স্রোতের মুখ ফিরাইয়া, নদীটাকে সেই গোয়ালঘরের উপর দিয়া চালাইয়া দিলেন। নদী হু হু শব্দে নূতন পথে বহিয়া চলিল, বিশ বৎসরের জঞ্জাল মুহূর্তের মধ্যে ধুইয়া সাফ হইয়া গেল। তারপর দেখানকার নদী সেখানে রাখিয়া তিনি দেশে ফিরিলেন।

এদিকে ক্রীটদ্বীপে আর এক বিপদ দেখা দিয়াছে। জলের দেবতা নেপচুন সে দেশের রাজাকে এক প্রকান্ড ষাঁড় উপহার দিয়া বলিয়াছেন, “এই জন্তুটিকে তুমি দেবতার নামে উৎসর্গ করিয়া বলি দাও।” কিন্তু ষাঁড়টি এমন সুন্দর যে, তাকে বলি দিতে রাজার মন সরিল না—তিনি তার বদলে আর একটি ষাঁড় আনিয়া বলির কাজ সারিলেন। নেপচুন সমুদ্রের নীচে থাকিয়াও এ সমস্তই জানিতে পারিলেন। তিনি তাঁর ষাঁড়কে আদেশ দিলেন, “যাও! এই দুষ্ট রাজার রাজ্য ধ্বংস কারিয়া ইহার অবাধ্যতার সাজা দাও।” নেপচুনের আদেশ সেই সর্বনেশে ষাঁড় পাগলের মত চারিদিকে ছুটিয়া সারাটি রাজ্য উজাড় করিয়া ফিরিতেছে। একে দেবতার ষাঁড়, তার উপর যেমন পাহাড়ের মত দেহখানি, তেমনই আশ্চর্য তার শরীরের তেজ—কাজেই রাজ্যের লোক প্রাণভয়ে দেশ ছাড়িয়া পলাইবার জন্য ব্যস্ত। এমন জন্তুকে বাগাইবার জন্য ত হারকিউলিসের ডাক পড়িবেই। হারকিউলিসও অতি সহজেই তাকে শিং ধরিয়া মাটিতে আছড়াইয়া একেবারে পোঁটলা বাঁধিয়া রাজসভায় নিয়া হাজির করিলেন। রাজা ইউরিসথিউসের মেয়ে বাপের বড় আদুরে। সে একদিন আবদার ধরিল তাকে হিপোলাইটের চন্দ্রহার আনিয়া দিতে হইবে। হিপোলাইট এসেজন্‌দের রানী। এসেজন্‌দের দেশে কেবল মেয়েদেরই রাজত্ব। বড় সর্বনেশে মেয়ে তারা— সর্বদাই লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত, পৃথিবীর কোন মানুষকে তারা ডরায় না। কিন্তু হারকিউলিসকে তারা খুব খাতির সম্মান করিয়া তাদের রানীর কাছে লইয়া গেল। হারকিউলিস তখন রানীর কাছে তার প্রার্থনা জানাইলেন। রানী বলিলেন, “আজ তুমি খাও-দাও, বিশ্রাম কর, কাল অলঙ্কার লইতে আসিও।” হারকিউলিসের সৎমা জুনো দেবী দেখিলেন, নেহাৎ সহজেই বুঝি এবারের কাজটা উদ্ধার হইয়া যায়। তিনি নিজে এসেজন্‌ সাজিয়া এসেজন্‌ দলে ঢুকিয়া, সকলকে কুমন্ত্রণা দিতে লাগিলেন। তিনি বলিলেন, “এই যে লোকটি রানীর কাছে অলঙ্কার ভিক্ষা করিতে আসিয়াছে ইহাকে তোমরা বড় সহজ পাত্র মনে করিও না। আসলে কিন্তু এ লোকটা আমাদের রানীকে বন্দী করিয়া লইয়া যাইতে চায়। অলঙ্কার-টলঙ্কার ওসকল মিথ্যা কথা—কেবল তোমাদের ভুলাইবার জন্য।” তখন সকলে রুখিয়া একেবারে মার মার শব্দে হারকিউলিসকে আক্রমণ করিল। হারকিউলিস একাকী গদা হাতে আত্মরক্ষা করিতে লাগিলেন। অনেকক্ষণ যুদ্ধের পর এসেজন্‌রা বুঝিল, হারকিউলিসের সঙ্গে পারিয়া উঠা তাহাদের সাধ্য নয়। তখন তাহারা রানীর চন্দ্রহার হারকিউলিসকে দিয়া বলিল, “যে অলঙ্কার তুমি চাহিয়াছিলে, এই লও। কিন্তু তুমি এদেশে আর থাকিতে পাইবে না।” হারকিউলিসের কাজ উদ্ধার হইয়াছে, তাঁর আর থাকিবার দরকার কি? তিনি তখনই তাদের নমস্কার করিয়া ফিরিয়া আসিলেন।

ইউরিসথিউস্‌ মহা সন্তুষ্ট হইয়া বলিলেন, “হারকিউলিস! আমি তোমার উপর বড় সন্তুষ্ট হইলাম। তুমি আমার জন্য আটটি বড় কাজ করিলে, এখন আর চারিটি কাজ করিলে তোমার ছুটি। প্রথম কাজ এই যে, স্টাইমফেলাসের সমুদ্রতীরে যে বড় বড় লৌহমুখ পাখি আছে, সেগুলোকে মারিতে হইবে।” হারকিউলিস হাইড্রার রক্তমাখা বিষাক্ত তীর ছুঁড়িয়া সহজেই পাখিগুলাকে মারিয়া শেষ করিলেন। ইহার পর তিনি রাজার হুকুমে গেরিয়ানিস নামে এক দৈত্যের গোয়াল হইতে তার গরুর দল কাড়িয়া আনিলেন। পথে ক্যাকাস্‌ নামে এক কদাকার দৈত্য কয়েকটা গরু চুরি করিবার চেষ্টা করিয়াছিল। হারকিউলিস তাকে তার বাসা পর্যন্ত তাড়া করিয়া, শেষে গদার বাড়িতে তাহার মাথা গুঁড়াইয়া দেন।

পশ্চিমের দেবতা সন্ধ্যাতারার মেয়েদের নামে হেস্‌পেরাইদিস্‌। লোকে বলিত, তাদের বাগানে আপেল গাছে সোনার ফল ফলে। একদিন রাজা সেই ফল হারকিউলিসের কাছে চাহিয়া বসিলেন। এমন কঠিন কাজ হারলিউলিস আর করেন নাই। ফলের কথা সকলেই জানে, কিন্তু কোথায় যে সে ফল, আর কোথায় যে সে আশ্চর্য বাগান, কেউ তাহা বলিতে পারে না। হারকিউলিস দেশ-বিদেশ ঘুরিয়া কেবলই জিজ্ঞাসা করিয়া ফিরিতে লাগিলেন, কিন্ত কেউ তার জবাব দিতে পারে না। কত দেশের কত রকম লোকের সঙ্গে তাঁর দেখা হইল, সকলেই বলে, “হাঁ, সেই ফলের কথা আমরাও শুনিয়াছি, কিন্তু কোথায় সে বাগান তাহা জানি না।” এই রূপে ঘুরিতে ঘুরিতে একদিন হারকিউলিস এক নদীর ধারে আসিয়া দেখিলেন, কয়েকটি মেয়ে বসিয়া ফুলের মালা গাঁথিতেছে। হারকিউলিস বলিলেন, “ওগো, তোমরা হেস্‌পেরাইডিসের বাগানের কথা জান? সেই যেখানে আপেল গাছে সোনার ফল ফলে?” মেয়েরা বলিল, “আমরা নদীর মেয়ে, নদীর জলে থাকি—আমরা কি দুনিয়ার খবর রাখি? আসল খবর যদি চাও তবে বুড়ার কাছে যাও।” হারকিউলিস বলিলেন, “কে বুড়া? সে কোথায় থাকে?” মেয়েরা বলিল, “সমুদ্রের থুড়্‌থুড়ে বুড়া, যার সবুজ রঙের জটা, যার গায়ে মাছের মত আঁশ, যার হাত-পাগুলো হাঁসের মত চ্যাটাল— সে বুড়া যখন তীরে ওঠে তখন যদি তাকে ধরতে পার, তবে সে তোমায় বলিতে পারিবে পৃথিবীর কোথায় কি আছে। কিন্তু খবরদার! বুড়া বড় সেয়ানা, তাকে ধরিতে পারিলে খবরটা আদায় না করিয়া ছেড়ো না।” হারকিউলিস তাদের অনেক ধন্যবার দিয়া বুড়ার খবর লইতে চলিলেন। সমুদ্রের তীরে তীরে খুঁজিতে খুঁজিতে একদিন হারকিউলিস দেখিলেন, শ্যাওলার মত পোশাক পরা কে একজন সমুদ্রের ধারে ঘুমাইয়া রহিয়াছে। তাহার সবুজ চুল আর গায়ের আঁশেই তার পরিচয় পাইয়া হারকিউলিস এক লাফে তাহার হাত ধরিয়া বলিলেন, “বুড়া! হেস্‌পেরাইডিসের বাগানের সন্ধান বল, নহিলে তোমায় ছাড়িব না।” এই বলিতে না বলিতেই বুড়া তাঁর সামনেই কোথায় মিলাইয়া গেল, তার জায়গায় একটা হরিণ কোথা হইতে আসিয়া দেখা দিল। হারকিউলিস বুঝিলেন এসব বুড়ার শয়তানী, তাই তিনি খুব মজবুত করিয়া হরিণের ঠ্যাং ধরিয়া থাকিলেন। হরিণটা তখন একটা পাখি হইয়া করুণ স্বরে আর্তনাদ আর ছট্‌-ফট্‌ করিতে লাগিল। হারকিউলিস তবু ছাড়িলেন না। তখন পাখিটা একটা তিন-মাথাওয়ালা কুকুরের রূপ ধরিয়া তাঁকে কামড়াইতে আসিল। হারকিউলিস তখন থার ঠাংটা আরও শক্ত করিইয়া চাপিয়া ধরিলেন। তাতে কুকুরটা চিৎকার করিয়া গেরিয়ানের মূর্তিতে দেখা দিল। গেরিয়ান শরীরটা মানুষের মত, কিন্তু তার ছয়টি পা। এক পা হারকিউলিসের মুঠোর মধ্যে, সেইটা ছাড়াইবার জন্য সে পাঁচ পায়ে লাথি ছুঁড়িতে লাগিল।

তাহাতেও ছাড়াইতে না পারিয়া সে প্রকান্ড অজগর সাজিয়া হারকিউলিসকে গিলিতে আসিল। হারকিউলিস ততক্ষণে ভয়ানক চটিয়া গিয়াছেন, তিনি সাপটাকে এমন টুটি চাপিয়া ধরিলেন যে, প্রাণের ভয়ে বুড়া তাহার নিজের মূর্তি ধরিয়া বাহির হইল। বুড়া হাঁপাইতে হাঁপাইতে বলিল, “তুমি কোথাকার অভদ্র হে! বুড়া মানুষের সঙ্গে এরকম বেয়াদবি কর।” হারকিউলিস বলিলেন, “সে কথা পরে হইবে, আগে আমার প্রশ্নের জবাব দাও।” বুড়া তখন বেগতিক দেখিয়া বলিল, “যার কাছে গেলে তোমার কাজটি উদ্ধার হইবে, আমি তার সন্ধান বলিতে পারি। এইদিকে আফ্রিকার সমুদ্রতীর ধরিয়া বরাবর চলিয়া যাও, তাহা হইলে তুমি এটলাস দৈত্যের দেখা পাইবে। এমন দৈত্য আর দ্বিতীয় না। দিনের পর দিন বৎসরের পর বৎসর সমস্ত আকাশটিকে ঘাড়ে করিয়া সে ঠায় দাঁড়াইয়া আছে। এক মুহূর্ত তাহার কোথাও যাইবার যো নাই, তাহা হইলে আকাশ ভাঙ্গিয়া পৃথিবীর উপর পাড়িবে। মেঘের উপরে কোথায় আকাশ পর্যন্ত তাহার মাথা উঠিয়া গিয়াছে, সেখান হইতে দুনিয়ার সবই সে দেখিতে পায়। সে যদি খুশী মেজাজে থাকে, তবে হয়ত তোমার সোনার ফলের কথা বলিতে পারে।” হারকিউলিস তাঁর গদা ঘুরাইয়া বলিলেন, “যদি খুশী মেজাজে না থাকে, তবুও সোনার ফলের কথা তাকে বলাইয়া ছাড়িব। সমুদ্রের বুড়ার কাছে এটলাসের খবর আদায় করিয়া হারকিউলিস তাহার কথা মত আফ্রিকার উপকূল ধরিয়া পশ্চিম মুখে চলিতে লাগিলেন। চলিতে চলিতে কত পাহাড় নদী, কত সহর গ্রাম পার হইয়া, তিনি এক অদ্ভুত দেশে আসিলেন। সেখানে মানুষগুলো অসম্ভবরকম বেঁটে। শত্রুর ভয় তাদের এতই বেশী যে, তাহাদের দেশ রক্ষার জন্য তারা এক দৈত্যের সঙ্গে বন্ধুতা করিয়া, তারই উপর পাহারা দিবার ভার রাখিয়াছে। এই দৈত্যের নাম এন্টিয়াস—পৃথিবী তার মা।

দূর হইতে হারলিউলিসকে গদা ঘুরাইয়া আসিতে দেখিয়া, বামনদের মধ্যে মহা হৈ-চৈ বাধিয়া গেল। তারা চিৎকার করিয়া এন্টিয়াসকে সাবধান করিয়া দিল। এন্টিয়াসও তাহাই চায়। তার ভয়ে বহুদিন পর্যন্ত লোকজন কেউ সে দিকে ঘেঁষে না, তাই হারকিউলিসকে দেখিয়াই সে একেবারে গদা উঠাইয়া “মার্‌ মার্‌” করিয়া তাঁহাকে আক্রমণ করিল। হারকিউলিসও তৎক্ষণাৎ তার গদা এড়াইয়া, এক বাড়িতে তাকে মাটিতে আছড়াইয়া ফেলিলেন। কিন্তু কি আশ্চর্য! মাটিতে পড়িবামাত্র তার তেজ যেন দ্বিগুণ বাড়িয়া গেল। সে আবার উঠিয়া ভীষণ তেজে হারকিউলিসকে মারিতে উঠিল। হারকিউলিস আবার তাকে ঘাড়ে ধরিয়া মাটিতে পাড়িয়া ফেলিলেন, কিন্তু মাটি ছোঁয়ামাত্র আবার তার অসম্ভব তেজ বাড়িয়া গেল, সে আবার হুঙ্কার দিয়া লাফাইয়া উঠিল। হারকিউলিস ত জানে না যে পৃথিবীর বরে মাটি ছুঁইলেই তাহার তেজ বাড়ে। তিনি বার বার তাকে নানারকম মারপ্যাঁচ দিয়া মাটিতে ফেলেন, বার বারই কোথা হইতে তার নূতন তেজ দেখা দেয়। তখন তিনি দৈত্যটাকে ঘাড়ে ধরিয়া শূন্যে তুলিয়া দুই হাতে তাকে এমন চাপিয়া ধরিলেন যে, সেই চাপের চোটে তার দম বাহির হইয়া প্রাণসুদ্ধ উড়িয়া গেল। তখন তার দেহটাকে তিনি পাহাড় পর্বত ডিঙ্গাইয়া কোথায় ছুঁড়িয়া ফেলিলেন, তাহার আর কোন খোঁজই পাওয়া গেল না।

তখন বামনেরা সবাই মিলিয়া ভয়ানক কোলাহল আর কান্নাকাটি জুড়িয়া দিল। কেহ, “হায় হায়” করিয়া চুল ছিঁড়িতে লাগিল, কেহ প্রাণভয়ে ছুটাছুটি করিতে লাগিল, কেহ আস্ফালন করিয়া বলিল, “এস, আমরা সকলে ইহার প্রতিশোধ লই।” হারকিউলিস তাদের বলিলেন, “ভাইসকল, তোমাদের সঙ্গে আমার কোন ঝগড়া নাই। ওই হতভাগা খামখা আমাকে মারিতে আসিয়াছিল, তাই উহাকে যৎকিঞ্চিৎ সাজা দিয়াছি। তোমাদের আমি কোন অনিষ্ট করিতে চাই না।” এই বলিয়া তিনি লম্বা লম্বা পা ফেলিয়া, সেখান হইতে সেই সোনার আপেলের সন্ধানে এটলাস দৈত্যের খবর লাইতে চলিলেন।

এই ভাবে পথ চলিতে চলিতে শেষে হারকিউলিস সত্য সত্যই এটলাসের দেখা পাইলেন। সেই সমুদ্রের বুড়া যেমন বর্ণনা করিয়াছিল, ঠিক সেইরকমভাবে সেই বিরাট দৈত্য আকাশটাকে মাথায় লইয়া দাঁড়াইয়া আছে। হারকিউলিসকে দেখিয়া সে মেঘের ডাকের মত গম্ভীর গলায় বলিল, “আমি এটলাস—আমি আকাশকে মাথা ধরিয়া রাখি—আমার মত আর কেউ নাই।” হারকিউলিস তাকে নমস্কার করিয়া বলিলেন, “আপনার সন্ধানে আমি দেশ-বিদেশ ঘুরিয়াছি—এখন আমার একটি প্রশ্ন আছে, সেইটি জিজ্ঞাসা করিতে চাই।” দৈত্য বলিল, “এই আকাশের নীচে মেঘের উপরে থাকিয়া আমার চোখ সব দেখে, সব জানে—যাহা জানিতে চাও আমাকে জিজ্ঞাসা কর।” হারকিউলিস বলিলেন, “তবে বলিয়া দিন, হেস্‌পেরাইডিসের বাগানে যে সোনার ফল ফলে, সেই ফল আমি কেমন করিয়া পাইতে পারি।” দৈত্য হইলেও এটলাসের মেজাজটি বড় ভাল। সে বলিল, “তাহাতে আর মুশকিল কি? এই আকাশটাকে তুমি একটুক্ষণ ধরিয়া রাখ, আমি এখনই তোমায় সেই ফল আনিয়া দিতেছি।” হারকিউলিস ভাবিলেন, “এ বড় চমৎকার কথা। কত কীর্তি সঞ্চয় করিয়াছি, কিন্তু আকাশটাকে ঠেকাইয়া অক্ষয় কীর্তি রাখিবার এমন সুযোগ আর কোনদিন পাইব না।” তাই তিনি দৈত্যের কথায় তৎক্ষণাৎ রাজী হইলেন।

কত হাজার হাজার বছর এটলাসের ঘাড়ে আকাশের ভার চাপান রহিয়াছে, শীত গ্রীষ্ম, রোদ বৃষ্টি সব সহিয়া বেচারা সেই বোঝা মাথায় রাখিয়া আসিতেছে। এতদিন পরে হারকিউলিসের কৃপায় সে একটু জিরাইয়া লইবার সুযোগ পাইল। মনের আনন্দে সে খু খানিকটা লাফাইয়া, মাটিতে গড়াগড়ি দিয়া, তারপর লম্বা পা ফেলিয়া চক্ষের নিমেষে হেস্‌পেরাইডিসের বাগানে গিয়া হাজির। সেখানে ‘ড্রেগন’ মারিয়া বাগান খুঁজিয়া সোনার আপেল তুলিয়া আনিতে তার একটুও বিলম্ব হইল না। তখন তাহার মনে হঠাৎ এক কুবুদ্ধি জাগিল। সে ভাবিল, কেন আর মিছামিছি আকাশের বোঝা লইয়া থাকি। এই মানুষটার উপরেই এখন আকাশের ভার দিলেই হয়। এই ভাবিয়া সে হারকিউলিসকে বলিল, “ওহে পৃথিবীর মানুষ, তোমার গায়ে ত বেশ শক্তি দেখিতেছি। এখন হইতে তুমিই আকাশটাকে ঠেকাইবার ভার লও না কেন? আমি বরং তোমার রাজার কাছে আপেলগুলা দিয়া আসি!”

হারকিউলিস দেখিলেন, বেগতিক! এ হতভাগা একটুক্ষণ ছুটি পাইয়া আর কাজে ফিরিতে চায় না। তিনি একটু চালাকি করিয়া বলিলেন, “তবে ভাই একটু আকাশটাকে ধর ত, আমার এই সিংহচর্মটিকে কাঁধের উপর ভাল করিয়া পাতিয়া লই।” বোকা দৈত্য তাড়াতাড়ি ফলগুলা রাখিয়া, আবার নিজের কাঁধ দিয়া আকাশটাকে আগলইয়া ধরিল। হারকিউলিসও তৎক্ষণাৎ ফলগুলা উঠাইয়া লইয়া, দৈত্যকে এক লম্বা নমস্কার দিয়া সেখান হইতে সরিয়া পড়িলেন। দৈত্য বেচারা ব্যাপারটা কিছুই বুঝিতে না পারিয়া, ফ্যাল্‌ফ্যাল্‌ করিয়া তাকাইয়া রহিল।

এত পরিশ্রম করিয়া সোনার ফল আনিয়াও হারকিউলিসের দাসত্ব ঘুচিল না। রাজা ইউরিসথিউস্‌ বলিলেন, “আর একটি কাজ তোমায় করিতে হইবে—তুমি পাতালে গিয়া যমের কুকুর সারবেরাস্‌কে বাঁধিয়া আন।” হারকিউলিস পাতালে গিয়া, সেই ভীষণমূর্তি কুকুরকে ধরিয়া রাজার সম্মুখে হাজির করিলেন। তার তিন মাথায় তিনটি মুখ, সেই মুখ দিয়া বিষ ঝরিয়া পড়িতেছে, নাকে চোখে আগুনের মত ধোঁয়া— তার মূর্তি দেখিয়া ভয়ে রাজার প্রাণ উড়িবার উপক্রম হইল—তিনি একটা জালার মধ্যে ঢুকিয়া চীৎকার করিতে লাগিলেন—”ওটাকে শীঘ্র সরাইয়া লও।” হারকিউলিস তখন আবার যেখানকার কুকুর সেইখানে রাখিয়া আসিলেন।

এতদিনে হারকিউলিস তাঁর স্বাধীনতা ফিরিয়া পাইলেন। তখন তিনি নিজের ইচ্ছামত ত্রিভুবন ঘুরিয়া আরও অদ্ভুত কাজ করিয়া ফিরিতে লাগিলেন। কত বড় বড় যুদ্ধে সাহায্য করিয়া, কত বীরত্বের কীর্তিতে যোগ দিয়া তিনি আপনার আশ্চর্য শক্তির পরিচয় দিতে লাগিলেন। পাহাড় উপড়াইয়া জিব্রাল্টার প্রণালীর পথ খুলিয়া তিনি সমুদ্রের সঙ্গে সমুদ্র জুড়িয়া দিলেন। সুন্দরী আলসেবিটস নিজের প্রাণ দিয়া স্বামীকে অমর করিতে চাহিয়াছিলেন, হারকিউলিস যমের সহিত যুদ্ধ করিয়া সেই আলসেবিটসকে মৃত্যুর গ্রাস হইতে কাড়িয়া আনিলেন।

এইরূপ ঘুরিতে ঘুরিতে একদিন ঈনিয়ুসের সুন্দরী কন্যা ডেয়ানীরাকে দেখিয়া হারকিউলিস তাকে বিবাহ করিতে চাহিলেন। কিন্তু, কোথা হইতে এক জলদেবতা আসিয়া তাহাতে গোল বাধাইয়া দিল। সে বলিল, “ঈনিয়ুস আমাকে কন্যা দান করিবেন বলিয়াছেন, তুমি কোথাকার কে যে মাঝ হইতে দাবী বসাইতে আসিয়াছ?” তখন ডেয়ানীরার অনুমতি লইয়া হারকিউলিস জলদেবতার সহির দ্বন্দযুদ্ধ বাধাইয়া দিলেন। সে এই অদ্ভুত দেবতা, আপন ইচ্ছামত চেহারা বদলায়। প্রথমেই হারকিউলিসের কাছে খুব খানিক চড়চাপড় খাইয়া, সে ষাঁড়ের মূর্তি ধরিয়া তাঁকে গুঁতাইতে আসিল। হারকিউলিস তখন তার শিং ভাঙ্গিয়া দিলেন; সে পলাইয়া আবার আর এক মূর্তিতে ফিরিয়া আসিল। এইরূপ বহুক্ষণ যুদ্ধের পর হারকিউলিস তাকে এমন কাবু করিয়া ফেলিলেন যে, প্রাণের দায়ে সে দেশ ছাড়িয়া চম্পট দিল।

তারপর হারকিউলিস ডেয়ানীরাকে বিবাহ করিয়া তাঁহার সঙ্গে দেশ ভ্রমণে বাহির হইলেন। কত রাজ্য কত দেশ ঘুরিয়া, একদিন তাঁরা এক প্রকাণ্ড নদীর ধারে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। নদীতে ভয়ানক স্রোত দেখিয়া হারকিউলিস ডেয়ানীরাকে পার করিবার উপায় ভাবিতেছেন; এমন সময়ে নেসাস নামে এক বুড়া সেন্টর (মানুষ-ঘোড়া) আসিয়া বলিল, “আমি এই মেয়েটিকে পিঠে করিয়া পার করিয়া দিব।” ডেয়ানীরা সেন্টরের পিঠে চড়িয়া নদী পার হইলেন, হারকিউলিসও একহাতে তাঁহার তীর ধনুক জল হইতে উঠাইয়া, আর একহাতে ঢেউ ঠেলিয়া পার হইতে লাগিলেন। নদীর ওপারে গিয়া হতভাগা নেসাস ভাবিল, “আহা! এমন সুন্দরী মেয়ে কেন এই মানুষটার সঙ্গে ঘুরিয়া বেড়ায়? তাহার চাইতে ইহাকে লইয়া আমাদের দেশে পলাইয়া যাই না?” এই ভাবিয়া সে ডেয়ানীরাকে লইয়া এক ছুট্‌ দিল। ডেয়ানীরার চিৎকারে হারকিউলিস মাথা তুলিয়া চাহিলেন, এবং তৎক্ষণাৎ জলের ভিতর হইতে তীর ছুঁড়িয়া নেসাসের মর্মভেদ করিয়া ফেলিলেন। মরিবার সময় দুষ্ট সেন্টর অত্যন্ত ভাল মানুষের মত অনেক আনুতাপ করিয়া ডেয়ানীরাকে বলিয়া গেল, “আমার ঘাড়ের উপর হইতে এই জামাটি খুলিয়া তুমি রাখিয়া দাও। যদি তোমার স্বামীর ভালবাসা কোনদিন কমিতে দেখ, তবে এই জামা তাহাকে পরাইলেই তার সমস্ত ভালবাসা আবার ফিরিয়া আসিবে।” ডেয়ানীরা তাকে অনেক ধন্যবাদ দিয়া জামাটি পরম যত্নে লুকাইয়া রাখিলেন। ততক্ষণে হারকিউলিসও নদী পার হইয়া আসিয়াছেন, দুইজনে আবার চলিতে লাগিলেন।

তারপর কত বৎসর কাটিয়া গেল। একদিন কি একটা কাজের জন্য দূর দেশের এক রাজসভায় হারকিউলিসের যাওয়া দরকার হইল। তিনি ডেয়ানীরাকে রাখিয়া সেই যে বাহির হইলেন, তারপর কত দিন গেল, কত মাস গেল, হারকিউলিস আর ফিরিলেন না। ডেয়ানীরা ব্যস্ত হইয়া উঠিলেন, ভাবিতে লাগিলেন, “তবে কি হারকিউলিস আমায় ভুলিয়া গেলেন? আর কি তিনি আমায় ভালবাসেন না?” তিনি দূত পাঠাইলেন, তারা আসিয়া বলিল, “হারকিউলিস বেশ ভালই আছেন—রাজসভায় নানা আমোদ-প্রমোদে তাঁর দিন কাটিতেছে।” শুনিয়া ডেয়ানীরা সেই সেন্টরের দেওয়া জামাটি বাহির করিলেন। সোনার মত ঝক্‌ঝকে জামা, সেন্টরের মৃত্যু সময়ে রক্তে ভিজিয়া গিয়াছিল—কিন্তু এখন তাহাতে রক্তের চিহ্নমাত্র নাই। সেই জামা তিনি লাইকাস নামে এক দূতকে দিয়া হারকিউলিসের কাছে পাঠাইয়া দিলেন— ভাবিলেন তাহা হইলে হারকিউলিসকে শীঘ্র ফিরিয়া পাইবেন। জামার কাহিনী ত হারকিউলিস জানেন না, সেন্টরের রক্তে যে তাহা বিষাক্ত হইয়া আছে, এরূপ সন্দেহই তাঁর মনে জাগিল না, তিনি নিশ্চিন্ত মনে সেই জামা পরিলেন। জামা পরিবামাত্র তাঁর সর্বাঙ্গ জ্বলিতে লাগিল, তাঁর শিরায় শিরায় যেন আগুনের প্রবাহ ছুটিতে লাগিল। তিনি তাড়াতাড়ি জামা ছাড়াইতে গিয়া দেখেন যে সর্বনাশ, জামা তাঁহার শরীরের মধ্যে বসিয়া গিয়াছে; গায়ের চামড়া উঠিয়া আসে, তবু জামা ছাড়িতে চায় না। রাগে ও যন্ত্রণায় পাগল হইয়া তিনি দূতকে ধরিয়া সমুদ্রে ছুঁড়িয়া ফেলিলেন। তারপর সেন্টরের বিষ এড়াইবার উপায় নাই দেখিয়া তিনি তার অনুচরদের ডাকিয়া বলিলেন, “তোমরা শীঘ্র কাঠ আন, আগুন জ্বাল, আমি এখন মরিতে ইচ্ছা করি।” শুনিয়া সকলে কাঁদিতে লাগিল, কেহ চিতা জ্বালাইতে প্রস্তুত হইল না। তখন তিনি আপন হাতে গাছ উপ্‌ড়াইয়া প্রকাণ্ড চিতা জ্বালাইয়া তাহাতে শুইলেন এবং তাঁর এক বন্ধুকে বলিলেন, “তুমি যদি আমার বন্ধু হও, তবে আমার কথা শুনিয়া এই চিতায় আগুন দাও। বন্ধুতার পুরস্কারস্বরূপ আমার বিষমাখান অব্যর্থ তীরগুলি তোমায় দিলাম।”

তারপর চিতায় আগুন দেওয়া হইল, দেবতারা জয়গান করিয়া তাঁহাকে স্বর্গের দেবতাদের মধ্যে ডাকিয়া লইলেন, এবং তাঁহাকে অমর করিয়া আকাশের নক্ষত্রদের মধ্যে রাখিয়া দিলেন।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প সুকুমার রায়

বুদ্ধিমান শিষ্য

–সুকুমার রায়

এক মুনি, তাঁর অনেক শিষ্য। মুনিঠাকুর তাঁর পিতৃশ্রাদ্ধে এক মস্ত যজ্ঞের আয়োজন করলেন। সে যজ্ঞ এর আগে মুনির আশ্রমে আর হয়নি। তাই তিনি শিষ্যদের ডেকে বললেন, “আমি এক যজ্ঞের আয়োজন করেছি, সে যজ্ঞ তোমরা হয়তো আর কোথাও দেখবার সুযোগ পাবে না, কাজেই যজ্ঞের সব কাজ কর্ম বিধি ব্যবস্থা বেশ মন দিয়ে দেখো। নিজের চোখে সব ভালো ক’রে না দেখলে শুধু পুঁথি পড়ে এ যজ্ঞ করা সম্ভব হবে না।”

মুনিঠাকুরের আশ্রমে বেড়ালের ভারি উৎপাত; যজ্ঞের আয়োজন সব ঠিক হচ্ছে, এর মধ্যে বেড়ালগুলো এসে জ্বালাতন আরম্ভ করেছে- এটাতে মুখ দেয়, ওটা উল্‌টে ফেলে, কিছুতেই তাদের সামলানো যায় না। তখন মুনিঠকুর রেগে বললেন, “বেড়ালগুলোকে ধরে ঐ কোণায় বেঁধে রেখে দাও তো।” অমনি নয়টা বেড়ালকে ধরে সভার এক পাশে খোঁটায় বেঁধে রাখা হল। তারপর ঠিক সময় বুঝে যজ্ঞ আরম্ভ হল। শিষ্যেরা সব সভার সাজসজ্জা, আয়োজন, যজ্ঞের সব ক্রিয়া-কাণ্ড, মন্ত্রোচ্চারণের নিয়ম ইত্যাদি মন দিয়ে দেখতে আর শুনতে লাগল। নির্বিঘ্নে অতি সুন্দররূপে মুনিঠাকুরের যজ্ঞ সম্পন্ন হল।

কিছুকাল পরে শিষ্যদের একজনের বাবা মারা গেলেন। শিষ্যের ভারি ইচ্ছা তার পিতৃশ্রাদ্ধে সেও ঐ রকম সুন্দর যজ্ঞের আয়োজন করে। সে গিয়ে তার গুরুকে ধরল। তিনি বললেন, “আচ্ছা, সব আয়োজন করতে থাক, আমি এসে যজ্ঞের পুরোহিত হব।” শিষ্য মহা সন্তুষ্ট হয়ে যজ্ঞের সব ঠিকঠাক করতে লাগল।

ক্রমে যজ্ঞের দিন উপস্থিত। মুনিঠাকুর সশিষ্য শ্রাদ্ধের সভায় উপস্থিত; ঠিক নিয়ম মতো যজ্ঞের সমস্ত ব্যবস্থা প্রস্তুত হয়েছে কিন্তু শিষ্যটি তখনও সভাস্থলে এসে বসছে না, কেবল ব্যস্তভাবে ঘোরাঘুরি করছে। এদিকে যজ্ঞের সময় প্রায় উপস্থিত দেখে মুনিঠাকুরও ক্রমে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। তিনি শিষ্যকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আর বিলম্ব কেন? সবই তো প্রস্তুত, যজ্ঞের সময়ও উপস্থিত, এই বেলা সভায় এস।” শিষ্য বলল, “আজ্ঞে একটা আয়োজন বাকি রয়ে গেছে, সেইটা নিয়ে ভারি মুশকিলে পড়েছি।” মুনি বললেন, “কই, কিছুরই তো অভাব দেখছি না।” শিষ্য বলল, “আজ্ঞে চারটে বেড়াল কম পড়েছে।” মুনি বললেন, “সে কি রকম?” শিষ্য মুখ কাঁচুমাচু ক’রে বলল, “ঐ যে আপনার যজ্ঞে দেখলাম ঈশান কোণে নয়টা বেড়াল বাঁধা রয়েছে। আমাদের এ গ্রামে অনেক খুঁজে পাঁচটার বেশি পাওয়াই গেল না, কাজেই আর বাকি চারটার জন্য পাশের গ্রামে লোক গিয়েছে; তারা এই এসে পড়ল ব’লে।” শুনে গুরুর তো চক্ষুস্থির! তিনি বললেন, “আরে বুদ্ধিমান! কোনটা যজ্ঞের অঙ্গ আর কোনটা নয় তাও বিচার করতে শেখনি? আশ্রমের বেড়ালগুলি উৎপাত করছিল তাই বেঁধে রেখেছিলাম, তোমার এখানে কোনো উৎপাত ছিল না, তুমি আবার গায়ে পড়ে উৎপাত সংগ্রহ করতে গিয়েছ? বসে পড়, বসে পড়, আর বেড়াল ধরে কাজ নেই। এখন যজ্ঞটা নির্বিঘ্নে শেষ হয়ে যাক্‌।”

শিষ্য নিজের আহাম্মকিতে লজ্জিত হয়ে অপ্রস্তুত ভাবে সভার মধ্যে বসে পড়ল।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প সুকুমার রায়

ব্যাঙের সমুদ্র দেখা

–সুকুমার রায়

(জাপানী গল্প)

গ্রামের ধারে কবেকার পুরান এক পাতকুয়োর ফাটলের মধ্যে কোলাব্যাং তার পরিবার নিয়ে থাকত। গ্রামের মেয়েরা সেখানে জল তুলতে এসে যেসব কথাবার্তা বলত কোলাব্যাং তার ছেলেদের সেইসব কথা বুঝিয়ে দিত—আর ছেলেরা ভাবত ‘ইস্‌! বাবা কত জানে!’

একদিন সেই মেয়েরা সমুদ্রের কথা বলতে লাগল। ব্যাঙের ছানারা জিজ্ঞাসা করল—”হ্যাঁ বাবা! সমুদ্র কাকে বলে?” ব্যাং খানিক ভেবে বলল, “সমুদ্র? সে একরকম জন্তুর নাম।” তখন একটা ছানা বলল—”ওরা যে বলছিল সমুদ্র খুব ভয়ানক বড় হয়, আর তার মধ্যে অনেক জল থাকে—আর লোকেরা সাঁতার কেটে তা পার হতে পারে না।” তখন কোলাব্যাং মুশকিলে পড়ল। সে গাছপালা দেখেছে, বাড়িঘর দেখেছে—মানুষ কুকুর ঘটি বাটি নানারকম জিনিসপত্র দেখেছে, আর ছেলেবেলায় অনেকরকম জিনিসের গল্প শুনেছে। কিন্তু সমুদ্রের কথা ত কখন শোনেনি! তখন সে ভাবল সমুদ্রের কথা একটু খোঁজ করে দেখতে হবে।

পরদিন সকালে উঠেই কোলাব্যাং তার ছাতা পোঁটলা নিয়ে বলল, “আমি সমুদ্রের সন্ধান করতে যাচ্ছি।” তার গিন্নী কত কাঁদল, ছেলেরা নানারকম সুর করে তাকে বারণ করল কিন্তু কোলাব্যাং বলল, “না, এতে আমার জ্ঞানলাভ হবে—তোমরা বাধা দিও না।” এই বলে সে পাতকুয়ো থেকে উঠে একটা মাঠের দিকে চলল। ব্যাং বাইরে এসেই দেখে মানুষ কুকুর গরু তারা কেউ তার মতো লাফিয়ে লাফিয়ে চলে না—তাই দেখে সে ভাবল ‘লাফিয়ে চললে সবাই আমায় বেকুব ভাববে।’ এই ভেবে সে হেঁটে হেঁটে চলতে লাগল। কিন্তু অমন করে চলে ত তার অভ্যাস নেই—খানিক গিয়েই তার ভারই পরিশ্রম বোধ হল।

মাঠের ওপারে আর এক গ্রামের কাছে এক গর্তের মধ্যে মেতে ব্যংদের বাসা ছিল। মেটে ব্যাঙেরাও সমুদ্রের কথা শুনেছে, তাই তাদের মধ্যে একজন বেরিয়েছে সমুদ্রটা দেখতে। মাঝখানে দুই ব্যাঙের দেখা হল। কোলাব্যাং বলল, “আমি ফাটল-কুয়োর কোলাব্যাং, যাচ্ছি সমুদ্রে।” মেটে ব্যাং বলল, “আমি মেঠো-ব্যাং, আমিও যাচ্ছি সমুদ্রে।” তখন তাদের ভারি ফূর্তি হল।

কিন্তু সমুদ্রে যাবার পথ ত তারা জানে না। মাঠের মধ্যে একটা মস্ত ঢিপি ছিল; মেটে ব্যাং বলল, “ওর উপরে উঠে দেখি ত কিছু দেখা যায় কিনা।”

এই বলে তারা অনেক কষ্টে সেই ঢিপির উপর চড়ে সেখান থেকে একটা গ্রাম দেখতে পেল। মেটে ব্যাং বলল, “আরে দুর ছাই! এরকম ত ঢের দেখেছি! আমার বাড়ির কাছেই ত অমন আছে।” কোলাব্যাং বলল, “তাই ত! আমিও ছেলেবেলা থেকে ওরকম কত দেখেছি। সব জায়গাই দেখছি একরকম। মিছামিছি আমরা হেঁটে মরলাম।”

তখন তারা ভারই বিরক্ত হয়ে বাড়ি ফিরে গেল। কোলাব্যাং তার ছানাদের বলল, “সমুদ্র টমুদ্র কিছু নেই—ওসব মিছে কথা!”

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প সুকুমার রায়

পাগলা দাশু

— সুকুমার রায়

আমাদের স্কুলের যত ছাত্র তাহাদের মধ্যে এমন কেহই ছিল না, যে পাগলা দাশুকে না চিনে। যে লোক আর কাহাকেও জানে না, সেও সকলের আগে দাশুকে চিনিয়া ফেলে। সেবার এক নতুন দারোয়ান আসিল, একেবারে আন্‌‌কোরা পাড়াগেঁয়ে লোক, কিন্তু প্রথম যখন সে পাগলা দাশুর নাম শুনিল, তখনই আন্দাজে ঠিক করিয়া লইল যে, এই ব্যক্তিই পাগলা দাশু। কারণ মুখের চেহারায়, কথাবার্তায়, চাল-চলনে বোঝা যাইত যে তাহার মাথায় একটু ‘ছিট’ আছে। তাহার চোখ দুটি গোল গোল, কান দুটি অনাবশ্যক রকমের বড়, মাথায় একবস্তা ঝাঁকড়া চুল। চেহারাটা দেখিলেই মনে হয়—

ক্ষীণদেহ খর্বকায় মুণ্ডু তাহে ভারি
যশোরের কই যেন নরমূর্তিধারি।

সে যখন তাড়াতাড়ি চলে অথবা ব্যস্ত হইয়া কথা বলে, তখন তাহার হাত পা ছোঁড়ার ভঙ্গী দেখিয়া হঠাৎ কেন জানি চিংড়িমাছের কথা মনে পড়ে।

সে যে বোকা ছিল তাহা নয়। অঙ্ক কষিবার সময়, বিশেষত লম্বা লম্বা গুণ-ভাগের বেলায় তাহার আশ্চর্য মাথা খুলিত। আবার এক এক সময় সে আমাদের বোকা বানাইয়া তামাশা দেখিবার জন্য এমন সকল ফন্দি বাহির করিত যে, আমরা তাহার বুদ্ধি দেখিয়া অবাক হইয়া থাকিতাম।

‘দাশু’ অর্থাৎ দাশরথি, যখন প্রথম আমাদের ইস্কুলে ভরতি হয়, তখন জগবন্ধুকে আমাদের ‘ক্লাশের ভালো ছেলে’ বলিয়া সকলে জানিত। সে পড়াশোনায় ভালো হইলেও, তাহার মতো অমন একটি হিংসুটে ভিজেবেড়াল আমরা আর দেখি নাই। দাশু একদিন জগবন্ধুর কাছে কি একটা ইংরাজি কথার মানে জিজ্ঞাসা করিতে গিয়াছিল। জগবন্ধু তাহাকে খামখা দুকথা শুনাইয়া বলিল, “আমার বুঝি আর খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই ? আজ একে ইংরাজি বোঝাব, কাল ওর অঙ্ক কষে দেব, পরশু আর একজন আসবেন আর এক ফরমাইস নিয়ে— ঐ করি আর কি !” দাশু সাংঘাতিক চটিয়া বলিল, “তুমি তো ভারি ছ্যাঁচড়া ছোটলোক !” জগবন্ধু পণ্ডিত মশায়ের কাছে নালিশ করিল, “ঐ নতুন ছেলেটা আমায় গালাগালি দিচ্ছে।” পণ্ডিত মহাশয় দাশুকে এমনি ধমক দিয়া দিলেন যে বেচারা একেবারে দমিয়া গেল।

আমাদের ইংরাজি পড়াইতেন বিষ্টুবাবু। জগবন্ধু তাঁহার প্রিয় ছাত্র। পড়াইতে পড়াইতে যখনই তাঁহার বই দরকার হয়, তিনি জগবন্ধুর কাছে বই চাহিয়া লন। একদিন তিনি পড়াইবার সময় ‘গ্রামার’ চাহিলেন, জগবন্ধু তাড়াতাড়ি তাহার সবুজ কাপড়ের মলাট দেওয়া ‘গ্রামার’ খানা বাহির করিয়া দিল। মাস্টার মহাশয় বইখানি খুলিয়াই হঠাৎ গম্ভীর হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “বইখানা কার ?” জগবন্ধু বুক ফুলাইয়া বলিল, “আমার”। মাস্টার মহাশয় বলিলেন, “হুঁ— নতুন সংস্করণ বুঝি ? বইকে-বই একেবারে বদলে গেছে।” এই বলিয়া তিনি পড়িতে লাগিলেন— ‘যশোবন্ত দারোগা— লোমহর্ষক ডিটেকটিভ নাটক।’ জগবন্ধু ব্যাপারখানা বুঝিতে না পারিয়া বোকার মতো তাকাইয়া রহিল। মাস্টার মহাশয় বিকট রকম চোখ পাকাইয়া বলিলেন, “এই সব জ্যাঠামি বিদ্যে শিখছ বুঝি ?” জগবন্ধু আম্‌তা আম্‌তা করিয়া কি যেন বলিতে যাইতেছিল, কিন্তু মাস্টার মহাশয় এক ধমক দিয়া বলিলেন, “থাক্‌ থাক্‌, আর ভালমানুষি দেখিয়ে কাজ নেই— ঢের হয়েছে।” লজ্জায় অপমানে জগবান্ধুর দুই কান লাল হইয়া উঠিল— আমরা সকলেই তাহাতে বেশ খুশি হইলাম। পরে জানা গেল যে, এটিও দাশু ভায়ার কীর্তি, সে মজা দেখিবার জন্য উপক্রমণিকার জায়গায় ঠিক ঐরূপ মলাট দেওয়া একখানা বই রাখিয়া দিয়াছিল।

দাশুকে লইয়া আমরা সর্বদাই ঠাট্টাতামাশা করিতাম এবং তাহার সামনেই তাহার বুদ্ধি ও চেহারা সম্বন্ধে অপ্রীতিকর সমালোচনা করিতাম। তাহাতে একদিনও তাহাকে বিরক্ত হইতে দেখি নাই। এক এক সময়ে সে নিজেই আমাদের মন্তব্যের উপর রঙ চড়াইয়া নিজের সম্বন্ধে নানারকম অদ্ভুত গল্প বলিত। একদিন সে বলিল, “ভাই, আমাদের পাড়ায় যখন কেউ আমসত্ত্ব বানায় তখনই আমার ডাক পড়ে। কেন জানিস ?” আমরা বলিলাম, “খুব আমসত্ত্ব খাস বুঝি ?” সে বলিল, “তা নয়। যখন আমতত্ত্ব শুকোতে দেয়, আমি সেইখানে ছাদের উপর বার দুয়েক চেহারাখানা দেখিয়ে আসি। তাতেই, ত্রিসীমানার যত কাক সব ত্রাহি ত্রাহি করে ছুটে পালায় কাজেই আর আমসত্ত্ব পাহারা দিতে হয় না।”

একবার সে হঠাৎ পেন্টেলুন পরিয়া স্কুলে হাজির হইল। ঢল্‌ঢলে পায়জামার মতো পেন্টেলুন আর তাকিয়ার খোলের মতো কোট পরিয়া তাহাকে যে কিরূপ অদ্ভুত দেখাইতেছিল, তাহা সে নিজেই বুঝিতেছিল এবং তাহার কাছে ভারি একটা ব্যাপার বলিয়া বোধ হইতেছিল। আমরা জিজ্ঞাসা করিলাম, “পেন্টেলুন পরেছিস্‌ কেন ?” দাশু এক গাল হাসিয়া বলিল, “ভালো ইংরাজি শিখব ব’লে।” আর একবার সে খামখা নেড়া মাথায় এক পট্টি বাঁধিয়া ক্লাশে আরম্ভ করিল এবং আমরা সকলে তাহা লইয়া ঠাট্টা তামাশা করায় যারপরনাই খুশি হইয়া উঠিল। দাশু আদপেই গান গাহিতে পারে না, তাহার যে তালজ্ঞান বা সুরজ্ঞান একেবারে নাই, একথা সে বেশ জানে। তবু সেবার ইনস্পেক্টার সাহেব যখন ইস্কুল দেখিতে আসেন, তখন আমাদের খুশি করিবার জন্য চিৎকার করিয়া গান শুনাইয়াছিল। আমরা কেহ ওরূপ করিলে সেদিন রীতিমত শাস্তি পাইতাম, কিন্তু দাশু ‘পাগলা’ বলিয়া তাহার কোনো শাস্তি হইল না।

একবার ছুটির পরে দাশু অদ্ভুত এক বাক্স লইয়া ক্লাসে হাজির হইল। মাস্টার মহাশয় জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি দাশু, ও বাক্সের মধ্যে কি আছে ?” দাশু বলিল, “আজ্ঞে, আমার জিনিসপত্র।” জিনিসপত্রটা কিরূপ হইতে পারে, এই লইয়া আমাদের মধ্যে বেশ একটা তর্ক হইয়া গেল। দাশুর সঙ্গে বই, খাতা, পেনসিল, ছুরি সবই তো আছে, তবে আবার জিনিসপত্র কি বাপু? দাশুকে জিজ্ঞাসা করিলাম, সে সোজাসুজি কোনো উত্তর না দিয়া বাক্সটিকে আঁকড়াইয়া ধরিল এবং বলিল, “খবরদার, আমার বাক্স তোমরা কেউ ঘেঁটো না।” তাহার পর চাবি দিয়া বাক্সটাকে একটুখানি ফাঁক করিয়া, সে তাহার ভিতর দিয়া কি যেন দেখিল, এবং ‘ঠিক আছে’ বলিয়া গম্ভীরভাবে মাথা নাড়িয়া বিড় বিড় করিয়া হিসাব করিতে লাগিল। আমি একটুখানি দেখিবার জন্য উঁকি মারিতে গিয়াছিলাম— অমনি পাগলা মহা ব্যস্ত হইয়া তাড়াতাড়ি চাবি ঘুরাইয়া বাক্স বন্ধ করিয়া ফেলিল।

ক্রমে আমাদের মধ্যে তুমুল আলোচনা আরম্ভ হইল। কেহ বলিল, “ওটা ওর টিফিনের বাক্স— ওর মধ্যে খাবার আছে।” কিন্তু একদিনও টিফিনের সময় তাহাকে বাক্স খুলিয়া কিছু খাইতে দেখিলাম না। কেহ বলিল, “ওটা বোধ হয় ওর মানি-ব্যাগ— ওর মধ্যে টাকা পয়সা আছে, তাই ও সর্বদা কাছে কাছে রাখতে চায়। আর একজন বলিল, “টাকা পয়সার জন্য অত বড় বাক্স কেন ? ও কি ইস্কুলে মহাজনী কারবার খুলবে নাকি ?”

একদিন টিফিনের সময় দাশু হঠাৎ ব্যস্ত হইয়া, বাক্সের চাবিটা আমার কাছে রাখিয়া গেল আর বলিল, “ওটা এখন তোমার কাছে রাখো, দেখো হারায় না যেন। আর আমার আসতে যদি একটু দেরি হয়, তবে তোমরা ক্লাশে যাবার আগে ওটা দারোয়ানের কাছে দিও।” এই বলিয়া বাক্সটি দারোয়ানের জিম্মায় রাখিয়া বাহির হইয়া গেল। তখন আমাদের উৎসাহ দেখে কে! এতদিনে সুবিধা পাওয়া গিয়াছে, এখন দারোয়ানটা একটু তফাৎ গেলেই হয়। খানিক বাদে দারোয়ান তাহার রুটি পাকাইবার লোহার উনানটি ধরাইয়া, কতকগুলি বাসনপত্র লইয়া কলতলার দিকে গেল। আমরা এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম, দারোয়ান আড়াল হওয়া মাত্র, আমরা পাঁচ-সাতজনে তাহার ঘরের কাছে সেই বাক্সের উপর ঝুঁকিয়া পড়িলাম। তাহার পর আমি চাবি দিয়া বাক্স খুলিয়া দেখি বাক্সের মধ্যে বেশ ভারি একটা কাগজের পোঁটলা ন্যাকড়ার ফালি দিয়া খুব করিয়া জড়ানো। তাড়াতাড়ি পোঁটলার প্যাঁচ খুলিয়া দেখা গেল, তাহার মধ্যে একখানা কাগজের বাক্স— তাহার ভিতর আর একটা ছোট পোঁটলা। সেটি খুলিয়া একখানা কার্ড বাহির হইল, তাহার এক পিঠে লেখা, ‘কাঁচকলা খাও’ আর একটি পিঠে লেখা ‘অতিরিক্ত কৌতুহল ভালো নয়।’ দেখিয়া আমরা এ-উহার মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিতে লাগিলাম। সকলের শেষে একজন বলিয়া উঠিল, “ছোকরা আচ্ছা যা হোক, আমাদের বেজায় ঠকিয়েছে।” আর একজন বলিল, “যেমন ভাবে বাঁধা ছিল তেমনি করে রেখে দাও, সে যেন টেরও না পায় যে আমরা খুলেছিলাম। তাহলে সে নিজেই জব্দ হবে।” আমি বলিলাম, “বেশ কথা। ও আস্‌‌লে পরে তোমরা খুব ভালোমানুষের মতো বাক্সটা দেখাতে বলো আর ওর মধ্যে কি আছে, সেটা বার বার করে জানতে চেয়ো।” তখন আমরা তাড়াতাড়ি কগজপত্রগুলি বাঁধিয়া, আগেকার মতো পোঁটলা পাকাইয়া বাক্সে ভরিয়া ফেলিলাম।

বাক্সে চাবি দিতে যাইতেছি, এমন সময় হো হো করিয়া একটা হাসির শব্দ শোনা গেল— চাহিয়া দেখি পাঁচিলের উপরে বসিয়া পাগলা দাশু হাসিয়া কুটিকুটি। হতভাগা এতক্ষণ চুপি চুপি তামাশা দেখিতেছিল। তাখন বুঝিলাম আমার কাছে চাবি দেওয়া, দারোয়ানের কাছে বাক্স রাখা, টিফিনের সময় বাহিরে যাওয়ার ভান করা এ সমস্ত তাহার শয়তানি। খামখা আমাদের আহাম্মক বানাইবার জন্যই সে মিছিমিছি এ কয়দিন ক্রমাগত একটা বাক্স বহিয়া বেড়াইতেছে।

সাধে কি বলি ‘পাগলা দাশু ?’

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প সুকুমার রায়

নন্দলালের মন্দ কপাল

— সুকুমার রায়

 

নন্দলালের ভারি রাগ, অঙ্কের পরীক্ষায় মাস্টার তাহাকে গোল্লা দিয়াছেন। সে যে খুব ভালো লিখিয়াছিল তাহা নয়, কিন্তু তা বলিয়া একেবারে গোল্লা দেওয়া কি উচিত ছিল? হাজার হোক সে একখানা পুরা খাতা লিখিয়াছিল তো ! তার পরিশ্রমের কি কোনো মূল্য নাই? ঐ যে ত্রৈরাশিকের অঙ্কটা, সেটা তো তার প্রায় ঠিক‌‌ই হ‌‌ইয়াছিল, কেবল একটুখানি হিসেবের ভুল হওয়াতে উত্তরটা ঠিক মেলে নাই। আর ঐ যে একটা ডেসিমাল অঙ্ক ছিল, সেটাতে গুণ করিতে গিয়া সে ভাগ করিয়া বসিয়াছিল, তাই বলিয়া কি একটা নম্বরও দিতে নাই? আরও অন্যায় এই যে, এই কথাটা মাস্টার মহাশয় ক্লাশের ছেলেদের কাছে ফাঁস করিয়া ফেলিয়াছেন। কেন? আর একবার হরিদাস যখন গোল্লা পা‌‌ইয়াছিল, তখন তো সে কথাটা রাষ্ট্র হয় নাই !

সে যে ইতিহাসের একশোর মধ্যে পঁচিশ পা‌‌ইয়াছে, সেটা বুঝি কিছু নয়? খালি অঙ্ক ভালো পারে নাই বলিয়াই তাহাকে লজ্জিত হ‌‌ইতে হ‌‌ইবে? সব বিষয়ে যে সকলকে ভালো পারিতে হ‌‌ইবে তাহারি বা অর্থ কি? স্বয়ং নেপোলিয়ান যে ছেলেবেলায় ব্যাকরণে একেবারে আনাড়ী ছিলেন, সে বেলা কি? তাহার এই যুক্তিতে ছেলেরা দমিল না, এবং মাস্টারের কাছে এই তর্কটা তোলাতে তাঁহারাও যে যুক্তিটাকে খুব চমৎ‌কার ভাবিলেন, এমন বোধ হ‌‌ইল না। তখন নন্দলাল বলিল, তাহার কপাল‌‌ই মন্দ— সে নাকি বরাবর তাহা দেখিয়া আসিয়াছে।

সেই তো যেবার ছুটির আগে তাহাদের পাড়ায় হাম দেখা দিয়াছিল, তখন বাড়িসুদ্ধো সকলেই হামে ভুগিয়া দিব্যি মজা করিয়া স্কুল কামাই করিল, কেবল বেচারা নন্দলালকেই নিয়মমতো প্রতিদিন স্কুলে হাজিরা দিতে হ‌‌ইয়াছিল। তারপর যেমন ছুটি আরম্ভ হ‌‌ইল, অমনি তাহাকে জ্বরে আর হামে ধরিল— ছুটির অর্ধেকটাই মাটি ! সেই যেবার সে মামার বাড়ি গিয়াছিল, সেবার তাহার মামাতো ভাই‌‌য়েরা কেহ ছিল না- ছিলেন কোথাকার এক বদমেজাজি মেশো, তিনি উঠিতে বসিতে কেবল ধমক আর শাসন ছাড়া আর কিছুই জানিতেন না। তাহার উপর সেবার এমন বৃষ্টি হ‌‌ইয়াছিল, একদিনও ভালো করিয়া খেলা জমিল না, কোথাও বেড়ানো গেল না। এই জন্য পরের বছর যখন আর সকলে মামার বাড়ি গেল তখন সে কিছুতেই যা‌‌ইতে চাহিল না। পরে শুনিল সেবার নাকি সেখানে চমৎ‌কার মেলা বসিয়াছিল, কোন রাজার দলের সঙ্গে পঁচিশটি হাতি আসিয়াছিল, আর বাজি যা পোড়ানো হ‌‌ইয়াছিল সে একেবারে আশ্চর্যরকম ! নন্দলালের ছোট ভাই যখন বার বার উৎ‌সাহ করিয়া তাহার কাছে এই সকলের বর্ণনা করিতে লাগিল, তখন নন্দ তাহাকে এক চড় মাড়িয়া বলিল, “যা যা ! মেলা বক্‌‌বক্‌‌ করিসনে !” তাহার কেবল মনে হ‌‌ইতে লাগিল সেবার সে মামার বাড়ি গিয়াও ঠকিল, এবার না গিয়াও ঠকিল ! তাহার মতো কপাল-মন্দ আর কেহ‌‌ নাই।

স্কুলেও ঠিক তাই। সে অঙ্ক পারে না- অথচ অঙ্কের জন্য দুই-একটা প্রা‌‌ইজ আছে- এদিকে ভুগোল ইতিহাস তাহার কণ্ঠস্থ কিন্তু ঐ দুইটার একটাতেও প্রাইজ নাই। অবশ্য সংস্কৃতেও সে নেহাত কাঁচা নয়, ধাতু প্রত্যয় বিভক্তি সব চট্‌‌পট্‌‌ মুখস্থ করিয়া ফেলে- চেষ্টা করিলে কি পড়ার ব‌‌ই আর অর্থ-পুস্তকটাকেও সড়গড় করিতে পারে না? ক্লাশের মধ্যে ক্ষুদিরাম একটু আধটু সংস্কৃত জানে- কিন্তু তাহা তো বেশি নয়। নন্দলাল ইচ্ছা করিলে কি তাহাকে হারা‌‌ইতে পারে না? নন্দ জেদ করিয়া স্থির করিল, ‘একবার ক্ষুদিরামকে দেখে নেব। ছোকরা এ বছর সংস্কৃতের প্রাইজ পেয়ে ভারি দেমাক করছে— আবার অঙ্কের গোল্লার জন্য আমাকে খোঁটা দিতে এসেছিল। আচ্ছা, এবার দেখা যাবে।’

নন্দলাল কাহাকেও কিছু না জানাইয়া সেইদিন হ‌‌ইতেই বাড়িতে ভয়ানক ভাবে পড়িতে শুরু করিল। ভোরে উঠিয়াই সে ‘হসতি হসত হসন্তি’ শুরু করে, রাত্রেও ‘অস্তি গোদাবরী তীরে বিশাল শল্মলীতরু’ বলিয়া ঢুলিতে থাকে। কিন্তু ক্লাশের ছেলেরা এ কথার বিন্দুবিসর্গও জানে না। পণ্ডিত মহাশয় যখন ক্লাশে প্রশ্ন করেন, তখন মাঝে মাঝে উত্তর জানিয়াও সে চুপ করিয়া মাথা চুলকা‌‌ইতে থাকে, এমন কি কখনো ইচ্ছা করিয়া দুই-একটা ভুল বলে, পাছে ক্ষুদিরাম তাহার পড়ার খবর টের পাইয়া আরও বেশি করিয়া পড়ায় মন দিতে থাকে। তাহার ভুল উত্তর শুনিয়া ক্ষুদিরাম মাঝে মাঝে ঠাট্টা করে, নন্দলাল তাহার কোনো জবাব দেয় না; কেবল ক্ষুদিরাম যখন নিজে যখন এক-একটা ভুল করে, তখন সে মুচকি মুচকি হাসে, আর ভাবে, ‘পরীক্ষার সময় অম্নি ভুল করলেই এবার ওঁকে সংস্কৃতের প্রাইজ আর পেতে হবে না।’

ওদিকে ইতিহাসের ক্লাশে নন্দলালের প্রতিপত্তি কমিতে লাগিল। কারণ, ইতিহাস আর ভুগোল নাকি এক রকম শিখিলেই পাশ করা যায়— তাহার জন্য নন্দর কোনো ভবনা নাই। তাহার সমস্ত মনটা রহিয়াছে ঐ সংস্কৃত পড়ার উপরে— অর্থাৎ‌ সংস্কৃত প্রাইজটার উপরে ! একদিন মাস্টার মহাশয় বলিলেন, “কি হে নন্দলাল, আজকাল বুঝি বাড়িতে কিছু পড়াশুনা কর না? সব বিষয়েই সে তোমার এমন দুর্দশা হচ্ছে তার অর্থ কি?” নন্দ আর একটু হ‌‌ইলেই বলিয়া ফেলিত, “আজ্ঞে সংস্কৃত পড়ি” কিন্তু কথাটাকে হঠাৎ‌ সামলা‌‌ইয়া “আজ্ঞে সংস্কৃত— না সংস্কৃত নয়” বলিয়াই সে থতমত খাইয়া গেল। ক্ষুদিরাম তাড়াতাড়ি বলিয়া উঠিল, “ক‌‌ই সংস্কৃতও তো কিছু পারে না।” শুনিয়া ক্লাশসুদ্ধ ছেলে হাসিতে লাগিল। নন্দ একটু অপ্রস্তুত হ‌‌ইল বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিল— ভাগ্যিস্‌‌ তাহার সংস্কৃত পড়ার কথাটা ফাঁস হ‌‌ইয়া যায় নাই।

দেখিতে দেখিতে বছর কাটিয়া আসিলে, পরীক্ষার সময় প্রায় উপস্থিত। সকলে পড়ার কথা, পরীক্ষার কথা আর প্রাইজের কথা বলাবলি করিতেছে, এমন সময় একজন জিজ্ঞাসা করিল, “কি হে! নন্দ এবার কোন প্রাইজটা নিচ্ছ?” ক্ষুদিরাম নন্দর মতো গলা করিয়া ঘাড় নাড়িয়া বলিল, “আজ্ঞে সংস্কৃত— না সংস্কৃত নয়।” সকলে হাসিল, নন্দও খুব উৎ‌সাহ করিয়া সেই হাসিতে যোগ দিল। মনে ভাবিল, ‘বাছাধন, এ হাসি আর তোমার মুখে বেশিদিন থকছে না।’

যথাসময়ে পরীক্ষা আরম্ভ হ‌‌ইল এবং যথাসময়ে শেষ হ‌‌ইল। পরীক্ষার ফল জানিবার জন্য সকলে আগ্রহ করিয়া আছে, নন্দও রোজ নোটিশবোর্ডে গিয়া দেখে, তাহার নামে সংস্কৃত প্রাইজ পাওয়ার কোনো বিজ্ঞাপন আছে কিনা। তারপর একদিন হেডমাস্টার মহাশয় এক তাড়া কাগজ ল‌‌ইয়া ক্লাশে আসিলেন, আসিয়াই গম্ভীর ভাবে বলিলেন, এবার দুই-একটা নতুন প্রাইজ হয়েছে আর অন্য বিষয়েও কোনো কোনো পরিবর্তন হয়েছে।” এই বলিয়া তিনি পরীক্ষার ফলাফল পড়িতে লাগিলেন। তাহাতে দেখা গেল, ইতিহাসের জন্য কে যেন একটা রূপার মেডেল দিয়াছেন। ক্ষুদিরাম ইতিহাসে প্রথম হ‌‌ইয়াছে, সে-ই ঐ মেডেলটা ল‌‌ইবে। সংস্কৃতে নন্দ প্রথম, ক্ষুদিরাম দ্বিতীয়— কিন্তু এবার সংস্কৃতে কোনো প্রাইজ নাই।

হায় হায় ! নন্দর অবস্থা তখন শোচনীয় ! তাহার ইচ্ছা হ‌‌ইতেছিল সে ছুটিয়া গিয়া ক্ষুদিরামকে কয়েকটা ঘুঁষি লাগাইয়া দেয়। কে জানিত এবার ইতিহাসের জন্য প্রাইজ থাকিবে, আর সংস্কৃতের জন্য থাকিবে না। ইতিহাসের মেডেলটা তো সে অনায়াসেই পাইতে পারিত। কিন্তু তাহার মনের কষ্ট কেহ বুঝিল না— সবাই বলিল, “বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েছে— কেমন করে ফাঁকি দিয়ে নম্বর পেয়েছে।” দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া নন্দ বলিল, “কপাল মন্দ!”

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প সুকুমার রায়

আজব সাজা

— সুকুমার রায়

 

“পণ্ডিতমশাই, ভোলা আমায় ভ্যাংচাচ্ছে।” “না পণ্ডিতমশাই, আমি কান চুলকাচ্ছিলাম, তাই মুখ বাঁকা দেখাচ্ছিল !” পণ্ডিতমশাই চোখ না খুলিয়াই অত্যন্ত নিশ্চিন্ত ভাবে বলিলেন, “আঃ ! কেবল বাঁদরামি ! দাঁড়িয়ে থাক।” আধমিনিট পর্যন্ত সব চুপচাপ। তারপর আবার শোনা গেল, “দাঁড়াচ্ছিস না যে ?” “আমি দাঁড়াব কেন ?” “তোকেই তো দাঁড়াতে হবে।” “যাঃ আমায় বলেছে না আর কিছু ! গণশাকে জিগ্‌‌গেস কর ? কিরে গণশা, ওকে দাঁড়াতে বলেছে না ?” গণেশের বুদ্ধি কিছুটা মোটা, সে আস্তে আস্তে উঠিয়া গিয়া পণ্ডিতমশাইকে ডাকিতে লাগিল, “পণ্ডিতমশাই ! ও পণ্ডিতমশাই !”

পণ্ডিতমশাই বিরক্ত হ‌‌ইয়া বলিলেন, “কি বলছিস বল্‌‌ না।” গণেশচন্দ্র অত্যন্ত ব্যাকুলভাবে জিজ্ঞাসা করিল, “কাকে দাঁড়াতে বলেছেন, পণ্ডিতমশাই ?” পণ্ডিতমশাই কট্‌‌মটে চোখ মেলিয়াই সাংঘাতিক ধমক দিয়া বলিলেন, “তোকে বলেছি, দাঁড়া।” বলিয়াই আবার চোখ বুজিলেন।

গণেশচন্দ্র দাঁড়াইয়া রহিল। আবার মিনিটখানেক সব চুপচাপ। হঠাৎ‌ ভোলা বলিল, “ওকে এক পায়ে দাঁড়াতে বলেছিল না ভাই ?” গণেশ বলিল, “কক্ষনো না, খালি দাঁড়াতে বলেছে।” বিশু বলিল, “এক আঙুল তুলে দেখিয়েছিল, তার মানেই এক পায়ে দাঁড়া।” পণ্ডিতমশাই যে ধমক দিবার সময় তর্জনী তুলিয়াছিলেন, এ কথা গণেশ অস্বীকার করিতে পারিল না। বিশু আর ভোলা জেদ করিতে লাগিল, “শিগগির এক পায়ে দাঁড়া বলছি, তা না হলে এক্ষুণি বলে দিচ্ছি।”

গণেশ বেচারা ভয়ে ভয়ে তাড়াতাড়ি এক পা তুলিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। অমনি ভোলা আর বিশুর মধ্যে তুমুল তর্ক বাঁধিয়া গেল। এ বলে ডান পায়ে দাঁড়ানো উচিত, ও বলে, না, আগে বাঁ পা। গণেশ বেচারার মহা মুশকিল ! সে আবার পণ্ডিতমশাইকে জিজ্ঞাসা করিতে গেল, “পণ্ডিতমশাই, কোন্‌‌ পা ?”

পণ্ডিতমশাই তখন কি যেন একটা স্বপ্ন দেখিয়া অবাক হ‌‌ইয়া নাক ডাকাইতেছিলেন। গণেশের ডাকে হঠাৎ‌ তন্দ্রা ছুটিয়া যাওয়ায় তিনি সাংঘাতিক রকম বিষম খাইয়া ফেলিলেন। গণেশ বেচারা তার প্রশ্নের এ রকম জবাব একেবারেই কল্পনা করে নাই, সে ভয় পাইয়া বলিল, “ঐ যা কি হবে ?” ভোলা বলিল, “দৌড়ে জল নিয়ে আয়।” বিশু বলিল, “শিগ্‌‌গির মাথায় জল দে।” গণেশ এক দৌড়ে কোথা হ‌‌ইতে একটা কুঁজা আনিয়া ঢক্‌‌ঢক্‌‌ করিয়া পণ্ডিতমশায়ের টাকের উপর জল ঢালিতে লাগিল। পণ্ডিতমশায়ের বিষম খাওয়া খুব চট্‌‌পট্‌‌ থামিয়া গেল, কিন্তু তাঁহার মুখ দেখিয়া গণেশের হাতে জলের কুঁজা ঠক্‌‌ঠক্‌‌ করিয়া কাঁপিতে লাগিল।

ভয়ে সকলেই খুব গম্ভীর হ‌‌ইয়া রহিল, খালি শ্যামলাল বেচারার মুখটাই কেমন যেন আহ্লাদি গোছের হাসি হাসি মতো, সে কিছুতেই গম্ভীর হ‌‌ইতে পারিল না। পণ্ডিতমশায়ের রাগ হঠাৎ‌ তার উপরেই ঠিক্‌‌রাইয়া পড়িল। তিনি বাঘের মতো গুম্‌‌গুমে গলায় বলিলেন, “উঠে আয় !” শ্যামলাল ভয়ে কাঁদ কাঁদ হ‌‌ইয়া বলিল, “আমি কি করলাম? গণশা জল ঢাল্‌‌ল, তা আমার দোষ কি?” পণ্ডিতমশাই মানুষ ভালো, তিনি শ্যামলালকে ছাড়িয়া গণ্‌‌শার দিকে তাকাইয়া দেখেন তাহার হাতে তখনও জলের কুঁজা। গণেশ কোনো প্রশ্নের অপেক্ষা না করিয়াই বলিয়া ফেলিল, “ভোলা আমাকে বলেছিল।” ভোলা বলিল, “আমি তো খালি জল আনতে বলেছিলম। বিশু বলেছিল, মাথায় ঢেলে দে।” বিশু বলিল, “আমি কি পণ্ডিতমশায়ের মাথায় দিতে বলেছি? ওর নিজের মাথায় দেওয়া উচিত ছিল, তাহলে বুদ্ধিটা ঠাণ্ডা হত।”

পণ্ডিতমশাই খানিকক্ষণ কটমট করিয়া সকলের দিকে তাকাইয়া তারপর বলিলেন, “যা ! তোরা ছেলেমানুষ তাই কিছু বললাম না। খবরদার আর অমন করিসনে।” সকলে হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল, কিন্তু পণ্ডিতমশাই কেন যে হঠাৎ‌ নরম হ‌‌ইয়া গেলেন কেহ তাহা বুঝিল না। পণ্ডিতমশায়ের মনে হঠাৎ‌ যে তাঁর নিজের ছেলেবেলার কোন দুষ্টুমির কথা মনে পড়িয়া গেল, তাহা কেবল তিনি‌‌ই জানেন।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প সুকুমার রায়

এক বছরের রাজা

–সুকুমার রায়

এক ছিলেন সওদাগর— তাঁর একটি সামান্য ক্রীতদাস তাঁর একমাত্র ছেলেকে জল থেকে বাঁচায়। সওদাগর খুশি হয়ে তাকে মুক্তি তো দিলেনই, তা ছাড়া জাহাজ বোঝাই ক’রে নানা রকম বাণিজ্যের জিনিস তাকে বকশিশ দিয়ে বললেন, “সমুদ্র পার হয়ে বিদেশে যাও— এই সব জিনিস বেচে যা টাকা পাবে, সবই তোমার।” ক্রীতদাস মনিবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে জাহাজে চড়ে রওনা হল বাণিজ্য করতে।

কিন্তু বাণিজ্য করা আর হল না। সমুদ্রের মাঝখানে তুফান উঠে জাহাজটিকে ভেঙ্গে-চুরে জিনিসপত্র লোকজন কোথায় যে ভাসিয়ে নিল, তার আর খোঁজ পাওয়া গেল না।

ক্রীতদাসটি অনেক কষ্টে হাবুডুবু খেয়ে, একটা দ্বীপের চড়ায় এসে ঠেকল। সেখানে ডাঙ্গায় উঠে সে চারিদিকে চেয়ে দেখল, তার জাহাজের চিহ্নমাত্র নাই, তার সঙ্গের লোকজন কেউ নাই। তখন সে হতাশ হয়ে সমুদ্রের ধারে বালির উপর বসে পড়ল। তারপর যখন সন্ধ্যা হয়ে এল, তখন সে উঠে দ্বীপের ভিতর দিকে যেতে লাগল। সেখানে বড় বড় গাছের বন— তারপর প্রকাণ্ড মাঠ, আর তারই ঠিক মাঝখানে চমৎকার শহর। শহরের ফটক দিয়ে মশাল হাতে মেলাই লোক বার হচ্ছে। তাকে দেখতে পেয়েই সেই লোকেরা চীৎকার ক’রে বলল, “মহারাজের শুভাগমন হোক। মহারাজ দীর্ঘজীবী হউন।” তারপর সবাই তাকে খাতির ক’রে জমকালো গাড়িতে চড়িয়ে প্রকাণ্ড এক প্রাসাদে নিয়ে গেল। সেখানের চাকরগুলো তাড়াতাড়ি রাজপোশাক এনে তাকে সাজিয়ে দিল।

সবাই বলছে, ‘মহারাজ’,’মহারাজ’, হুকুম মাত্র সবাই চট্‌পট্‌ কাজ করছে, এসব দেখেশুনে সে বেচারা একেবারে অবাক। সে ভাবল সবই বুঝি স্বপ্ন— বুঝি তার নিজেরই মাথা খারাপ হয়েছে তাই এরকম মনে হচ্ছে। কিন্তু ক্রমে সে বুঝতে পারল সে জেগেই আছে আর দিব্যি জ্ঞানও রয়েছে, আর যা যা ঘটছে সব সত্যিই। তখন সে লোকদের বলল, “এ কি রকম হচ্ছে বল তো? আমি তো এর কিছুই বুঝছি না। তোমরা কেনই বা আমায় ‘মহারাজ’ বলছ আর কেনই বা এমন সম্মান দেখাচ্ছ?”

তখন তাদের মধ্যে থেকে এক বুড়ো উঠে বলল, “মহারাজ, আমরা কেউ মানুষ নই— আমরা সকলেই প্রেতগন্ধর্ব— যদিও আমাদের চেহারা ঠিক মানুষের মতো। অনেক দিন আগে আমরা, ‘মানুষ রাজা’ পাবার জন্য সবাই মিলে প্রার্থনা করেছিলাম; কারণ মানুষের মতো বুদ্ধিমান আর কে আছে? সেই থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের মানুষ রাজার অভাব হয়নি। প্রতি বৎসরে একটি ক’রে মানুষ এইখানে আসে আর আমরা তাকে এক বৎসরের জন্য রাজা করি। তার রাজত্ব শুধু ঐ এক বৎসরের জন্যই। বৎসর শেষ হলেই তাকে সব ছাড়তে হয়। তাকে জাহাজে ক’রে সেই মরুভূমির দেশে রেখে আসা হয়, সেখানে সামান্য ফল ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় না— আর সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে বালি না খুঁড়লে এক ঘটি জলও মেলে না। তারপর আবার নূতন রাজা আসে— এই রকমে বৎসরের পর বৎসর আমাদের চলে আসছে।”

তখন দাসরাজা বললেন, “আচ্ছা বল তো— এর আগে তোমাদের রাজারা কি রকম স্বভাবের লোক ছিলেন?” বুড়ো বলল, “তাঁরা সবাই ছিলেন অসাবধান আর খামখেয়ালি। সারাটি বছর সবাই শুধু জাঁকজমক আমোদে আহ্লাদে দিন কাটাতেন— বছর শেষে কি হবে সে কথা ভাবতেন না।”

নতুন রাজা মন দিয়ে সব শুনলেন, বছরের শেষে তাঁর কি হবে এই কথা ভেবে ক’দিন তাঁর ঘুম হল না।

তারপর সে দেশের সকলের চেয়ে জ্ঞানী আর পণ্ডিত যারা, তাদের ডেকে আনা হল, আর রাজা তাদের কাছে মিনতি ক’রে বললেন, “আপনারা আমাকে উপদেশ দিন— যাতে বছর শেষে এই সর্বনেশে দিনের জন্য প্রস্তুত হতে পারি।”

তখন সবচেয়ে প্রবীণ বৃদ্ধ যে, সে বলল, “মহারাজ, শূন্য হাতে আপনি এসেছিলেন, শূন্য হাতেই আবার সে দেশে যেতে হবে— কিন্তু এই এক বছর আপনি আমাদের যা ইচ্ছা তাই করাতে পারেন। আমি বলি— এই বেলা রাজ্যের ওস্তাদ লোকদের সে দেশে পাঠিয়ে, সেখানে বাড়ি ক’রে, বাগান ক’রে, চাষবাসের ব্যবস্থা ক’রে চারিদিক সুন্দর করে রাখুন। ততদিনে ফলে ফুলে দেশ ভরে উঠবে, সেখানে লোকের যাতায়াত হবে। আপনার এখানকার রাজত্ব শেষ হতেই সেখানে আপনি সুখে রাজত্ব করবেন। বৎসর তো দেখতে দেখতে চলে যাবে, অথচ কাজ আপনার ঢের; কাজেই বলি, এই বেলা খেটে-খুটে সব ঠিক ক’রে নিন।” রাজা তখনই হুকুম দিয়ে লোকলস্কর, জিনিসপত্র, গাছে চারা, ফলের বীজ, আর বড় বড় কলকব্জা পাঠিয়ে, আগে থেকে সেই মরুভূমিকে সুন্দর ক’রে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখলেন।

তারপর বছর যখন ফুরিয়ে এল, তখন প্রজারা তাঁর ছত্র মুকুট রাজদণ্ড সব ফিরিয়ে নিল, তাঁর রাজার পোশাক ছাড়িয়ে এক বছর আগেকার সেই সামান্য কাপড় পরিয়ে, তাঁকে জাহাজে তুলে সেই মরুভূমির দেশে রেখে এল। কিন্তু সে দেশ আর এখন মরুভূমি নেই— চারিদিকে ঘর বাড়ি, পথ ঘাট, পুকুর বাগান। সে দেশ এখন লোকে লোকারণ্য। তারা সবাই এসে ফুর্তি ক’রে শঙ্খ ঘণ্টা বাজিয়ে তাঁকে নিয়ে সিংহাসনে বসিয়ে দিল। এক বছরের রাজা সেখানে জন্ম ভরে রাজত্ব করতে লাগলেন।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা উপন্যাস গল্প জীবনী ও স্মৃতিকথা বিনোদন ভয়ংকর(হরর) ভালবাসা/প্রণয়লীলা ভুতুরে গল্প সৃজনশীল প্রকাশনা

বিষন্ন বিরিওজা-৫,৬,৭,৮ ও ৯

—ডঃ রমিত আজাদ

বিষন্ন বিরিওজা – ৫

 

(পূর্ব প্রকাশিতের পর থেকে) :::::::: অন্যান্য (বিষন্ন বিরিওজা’র ১,২,৩ ও ৪ )পর্বগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন

বিকেল বেলাটায় আমার মনটা খুব বিষন্ন হয়ে ওঠে। আমি জানিনা কেন। সত্যিই জানিনা। ছেলেবেলার কোন ঘটনা কি এর সাথে জড়িত? আমি অনেক মনে করার চেষ্টা করেছি। কিছুতেই মনে করতে পারিনি। অবচেতন মনে কি কিছু রয়ে গেছে? কে জানে!

আগেই বলেছি যে আমার রূমটা ছিল অনেকটা ক্লাবের মত। দেশী-বিদেশী বহু বন্ধুরা আমার রূমে আসতো। ডরমিটরির বাইরে থেকেও আসতো। অথচ ঠিক বিকালটায় কেউই আসতো না। কেন? কে জানে! এটাও একটা আশ্চর্য্য ব্যাপার। সামারের দিনগুলোতে বাইরে কোথাও না বেরোলে আমি একাই থাকতাম। বই পড়তাম অথবা টিভি দেখতাম। কখনো কখনো
জানালায় দাঁড়িয়ে শিশুর মত ঘন নীল আকাশে মেঘের বর্ণচ্ছটা দেখতাম।

কোন কোন দিন খুব বেশী মন খারাপ হলে হুমায়ুন আহমেদের ‘ইরিনা’ পড়তাম। চমৎকার একটা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লিখেছেন উনি। উনার বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী সমগ্র – ১, আমি দেশ থেকে নিয়ে এসেছিলাম। বইটার ভূমিকায় উনি লিখেছিলেন, রাশিয়ান বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী পড়ে তিনি ভীষণ প্রভাবিত হয়ে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লেখার সিদ্ধান্ত নেন। রাশিয়ান বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী যে দুর্দান্ত সেটা আমি আগেও জানতাম। হুমায়ুন আহমেদের লেখা পড়ার আগেই আমি পড়েছিলাম ‘রুশ বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী’ নামে একটি বই। বেশ কয়েকটি গল্প ছিল সেখানে। বইয়ের প্রতিটি গল্পই অসাধারণ। আমি অভিভুত হয়ে গিয়েছিলাম। যাহোক সেগুলোর অনুকরণে লেখা হুমায়ুন আহমেদের লেখাগুলো, যেমন – ইরিনা, তোমাদের জন্য ভালোবাসা, তারা তিনজন, ইত্যাদি ভালোই হয়েছে। অনেকে উনার লেখার গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আমি সাধারণ পাঠক অত তত্বকথা বুঝিনা। হুমায়ুন আহমেদের লেখাগুলো পড়তে ভালো লাগে তাই পড়ি। উনার ‘সবাই গেছে বনে’ তো ভীষণ টাচি। বিদেশে আসার পর মনে হলো আমি ঐ গল্পের মধ্যেই প্রবেশ করেছি। মনে হয় আমেরিকার ফার্গোর মত ইউক্রেনের খারকভও বরফে আকন্ঠ ডুবে আছে। গল্পের নায়িকা চঞ্চল মালিশার মতো প্রজাপতির পাখায় উড়ে সব মেয়েরা আমার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

টুক টুক টুক। দরজায় নক করার শব্দ শুনতে পেলাম। এই পড়ন্ত বিকালে আমার রুমে কখনোই কেউ আসেনা। ভুল শুনছি নাতো? কান খাড়া করলাম। আবারো শুনলাম, টুক টুক টুক। নাহ্‌ ঠিকই আছে, শব্দটা আমার দরজায়ই। কেউ এসেছে। কে? সাশা? খালেদ? বাঙালীদের কেউ? যেই আসুক, ভালোই। গল্প করা যাবে। গল্প করে আমার বিষন্ন মনটা কিছুটা হলেও হালকা হবে।

দরজা খুলে সামনে যাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম, তাতে রীতিমতো অবাকই হলাম। যিনি ইতিপূর্বে আমার রূমে কখনোই আসেননি। এবং এর আগে তার সাথে আমার কুশল বিনিময় ছাড়া আর কোন আলাপই হয়নি। তার উপর তিনি পুরুষ নন, বরং একজন লাজুকলতা রমনী। রমনী বলা কি ঠিক হচ্ছে? সে তো নিতান্তই বালিকা, সদ্য যৌবনপ্রাপ্তা। মনে মনে আমি যার নাম দিয়েছিলাম, ‘বার্চ বনের প্রণরেনী’।

তাতিয়ানাঃ আমি কি ভিতরে আসতে পারি?
রিনরিনে মিস্টি কন্ঠ তাতিয়ানার। অনেকটাই বিস্মিত স্বরে বললাম

আমিঃ অবশ্যই, অবশ্যই।
তাতিয়ানাঃ অবশ্যই, অবশ্যই বলছো কিন্তু পথ তো ছেড়ে দিচ্ছ না।
আমিঃ ওহ্‌, সরি।
আমি দরজা থেকে সরে দাঁড়ালাম। লাস্যময়ী ভঙ্গিতে হেটে গিয়ে, লাবণ্য-লালিত মরালিনির ভঙ্গিতে ডিভানে গিয়ে বসলো তাতিয়ানা। আমি ডিভানে ওর পাশে না বসে, ওর থেকে সামান্য দূরত্বে একটা চেয়ারে বসলাম।

আমিঃ তোমার কি সাহায্যে আসতে পারি বলো?
তাতিয়ানাঃ তেমন কিছু না তোমার রূমে ‘প্রোস্তা মারিয়া’ দেখতে এসেছি। চোখে কৌতুক নাচিয়ে বললো তাতিয়ানা।

আমিঃ ও আচ্ছা। ঠিক আছে চ্যানেল চেইন্জ করে দিচ্ছি। দশ মিনিট পরে শুরু হবে বোধহয়।
তাতিয়ানাঃ দা, ইয়েসলি মোঝনা (ইয়েস প্লিজ)। (বলে ও মিস্টি করে হাসলো)।
‘প্রোস্তা মারিয়া’ একটি ল্যাটিন আমেরিকান টেলি সিরিয়াল। এখন বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেনে। এই সময়টাতে চারিদিকে খুব শুনসান থাকে, কারণ সবাই টিভি সেটের সামনে। বিশেষতঃ মেয়েরা।

‘প্রোস্তা মারিয়া’ একটি ভালোবাসার গল্প। মেক্সিকোর কাহিনী। সদ্য যৌবনপ্রাপ্তা তরুণী গ্রাম থেকে শহরে এসেছে ভাগ্যান্বেষণে। একটি বাড়িতে অনেকটাই পরিচারিকার কাজ নেয়, মারিয়া নামের মেয়েটি। তাঁর রূপ-সৌন্দর্য্য সরলতা এই সব কিছুতে মুগ্ধ হয়ে গৃহকর্তার তরুণ ছেলেটি মারিয়ার প্রেমে পড়ে যায়। ধীরে ধীরে তা গভীর সম্পর্কে রূপ নেয়। কিন্তু তাদের মধ্যে ছিল সামাজিক শ্রেণী বৈষম্যের ব্যারিয়ার। তাই তাদের সম্পর্ক কোন স্থায়ী পরিণতি বা হ্যাপী এন্ডের দিকে যেতে পারেনা। বরং এই সম্পর্কের কথা জানাজানি হয়ে গেলে মারিয়াকে সেই বাড়ি ছাড়তে হয়। কিন্তু ইতিমধ্যে তার গর্ভে এসেছে গৃহকর্তার তরুণ ছেলের সন্তান। বাইরে এসে মারিয়ার শুরু হলো কঠিন জীবন সংগ্রাম। ভালোবাসার কাছে পরাজিত কিন্তু প্রবল মনোবল সম্পন্ন সিঙ্গল মাদার মারিয়া এই সংগ্রামে বিজয়ী হয়। ‘প্রোস্তা মারিয়া (সাধারণ মারিয়া) থেকে সে হয়ে ওঠে অসাধারণ মারিয়া। এই নিয়েই মূলতঃ টেলি-সিরিয়ালটির কাহিনী। রাশিয়ানরা ফিল্ম জগতে বস্‌ হলেও, এই জাতীয় টেলি-সিরিয়াল তাদের দেশে প্রচলিত ছিলনা। তাছাড়া তাদের দেশের সমাজ জীবনের সাথে ল্যাটিন আমেরিকার সমাজ জীবন খাপ খায়না। কিন্তু তার পরেও এই আনইউজুয়াল সিরিয়ালটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এখানে। সবাই বেশ গোগ্রাসে গিলছে।

আমিঃ তোমার ‘প্রোস্তা মারিয়া’ ভালো লাগে?
তাতিয়ানাঃ হু, খুব ভালো লাগে। বাড়ীতে থাকতে একটা এপিসোডও মিস করি নাই। ডরমিটরিতে আসার পর দুয়েকটা মিস হয়ে গিয়েছে। আজ ভাবলাম তোমার কাছে যাই।

আমিঃ তোমার বাড়ি কোথায়?
তাতিয়ানাঃ গ্রামে, এখান থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে হবে।
আমিঃ তুমি গ্রামে থাকো?
তাতিয়ানাঃ হু, একদম গ্রামের মেয়ে। জানো গ্রামের মেয়েরা …………..।
কথা শেষ হওয়ার আগেই সিরিয়াল শুরু হয়ে গেল। আর তাতিয়ানার মনযোগ ঐদিকে চলে গেলো। আমি কফি বানাতে শুরু করলাম। দুকাপ কফি বানিয়ে ফোল্ডিং টেবিল খুলে, একটি কাপ ওর সামনে রাখলাম। ও আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে ধন্যবাদ জানালো। আমি কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে চুপচাপ ওকে দেখতে লাগলাম।

রাশিয়া-ইউক্রেনের মেয়েরা প্রায় সবাইই চোখ ধাঁধানো সুন্দরী হয়। তাতিয়ানা মেয়েটি সেই তুলনায় দেখতে তেমন সুন্দরী নয়।
অল্পবয়সী বলে একটা লাবণ্য আছে মাত্র। কাঁচা বয়সে নারী দেহের বাঁকগুলোর দিকে নজর যেতনা আমার, এখন যায়। তাতিয়ানা একমনে সিরিয়াল দেখছিলো। এই সুযোগে আমি ভালো করে ওকে দেখলাম। কাজটা কি এথিকাল? মনে হয় না। কিন্তু তারপরেও এটা ঘটে। পুরুষের চোখ নারীর দেহের বাঁকগুলোর দিকে বার বার চলে যায়। ওর পরনে ছিলো একটি লং স্কার্ট, আর টপস্‌। টাইট ফিট না, আবার ঢিলে-ঢালাও নয়। তাতিয়ানার শরীর পুরুষ্টু নয়, একে ভাদ্রের ভরা নদী বলা যাবেনা। হালকা গড়ন। তার দেহের বাঁকগুলো তেমন আকর্ষনীয় নয়। অল্প বয়সের কারণে স্বাভাবিক লাবণ্য থাকলেও ওর দেহের দীপ্তি সৌরভে মনে নেশা ধরানোর কিছু নেই।

হঠাৎ লুবনার কথা মনে হলো। লুবনার দেহের বাঁকগুলো কেমন? মনে করার চেষ্টা করলাম। না কিছুতেই মনে পড়ছে না। বুঝলাম মনে পড়ার কথাও না। লুবনাকে যখন দেশে রেখে এসেছি, তখন আমার কাঁচা বয়স ছিলো। ঐ বয়সে নারী দেহের বাঁকগুলোর দিকে নজর যেত না। বরং সবসময়ই মনে হয়েছে পূর্ণ রূপলালিত্যে ও যেন একটি প্রস্ফুটিত গোলাপ, একরাশ রজনীগন্ধার প্রশান্তি। আর লুবনাকে আমি ভালোবাসি। যাকে ভালোবাসি তাকে নিয়ে ওসব কথা ভাবা যায়না বোধহয়। অন্ততপক্ষে আমি কখনো ভাবিনি। ওকে আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখি। ও লুবনা, আমার লুবনা এটাই আমার কাছে সব। আর কোন কিছুই আমার কাছে কোন গুরুত্ব বহন করেনা।

ঐদিন টেলিসিরিয়াল দেখে ও চলে যায়। আর কোন কথা হয়নি। পরদিন বিকেলে আবারো যথারীতি আমার মন খুব খারাপ। বিশাল কাঁচের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আকাশে মেঘের খেলা দেখছিলাম। জানালার ডানপাশের বিরিওজা গাছটির পাতাগুলো গ্রীস্মের মাতাল বাতাসে তির তির করে কাঁপছিলো। কিছুটা দূরে ডরমিটরির একদল ছেলে মেয়ে ভলিবল খেলছিলো। সামারে এই একটা মজা, আউটডোর গেমস বেশ ভালো জমে। লেনা নামের একটি স্বাস্থ্যবতী সুন্দরী মেয়ে খুব ভালো খেলছিলো। ছেলেরাও পেরে উঠছিলো না। এই মেয়েটি সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে গত বছর যখন ও প্রথম ডরমিটরিতে আসে, ওর রূপের ঝলকানী দেখে অনেক পুরুষই নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। আমরা দর্শকরা আগ্রহ নিয়ে দেখছিলাম, শেষ পর্যন্ত মেয়েটিকে কে পায়। শেষমেশ যা হলো তাতে আমি হতাশই হয়েছিলাম। মেয়েটি অবশেষে ধরা দিয়েছিলো বিবাহিত একজন পুরুষের কাছে। তার সাথেই এখনো আছে। বিবাহিত পুরুষ আলেগ স্ত্রী নিয়ে আমাদের ডরমিটরিতেই থাকতো। প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর আলেগের স্ত্রী বাবার বাড়ী চলে গিয়েছিলো। আলেগ একা ডরমিটরিতে, সেই সময়েই লেনার সাথে আলেগের সম্পর্ক হয়। এরপর আর আলেগের স্ত্রীকে ডরমিটরিতে দেখিনি। লোকমুখে শুনছি তাদের মধ্যে ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে। আলেগ এখন লেনার সাথে লিভ টুগেদার করছে। সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে কি কি সব ঘটে! এসব দেখলে মন খারাপ হয়ে যায়।

টুক টুক টুক দরজায় নক করার শব্দ পেলাম। কে এলো এই ভর বিকেলে? দরজা খুলে দেখলাম গতকালকের তাতিয়ানা মুখে হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

তাতিয়ানাঃ কি হলো? আজও পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছো! ঢুকতে দেবেনা?
আমিঃ ও, হ্যাঁ, এসো এসো ভিতরে এসো। (অপ্রস্তুত হয়ে বললাম )।
গতকালের চাইতে কম জড়তা নিয়ে ও গিয়ে বসলো ডিভানে।
তাতিয়ানাঃ টিভি সেট অফ যে?
আমিঃ ও, না, মানে কিছু দেখছি না তো।
তাতিয়ানাঃ কি করো রূমে বসে বসে? বোর ফীল করোনা।
আমিঃ উঁ কিছুটা। মানে এখন কিছু করার নাই তো।
তাতিয়ানাঃ প্রোস্তা মারিয়া শুরু হতে আর পনের মিনিট বাকী। টিভি সেটটা অন করো।
আমিঃ ও হ্যাঁ, অন করছি। (আমি টিভি অন করলাম)
তাতিয়ানাঃ তোমার মন খারাপ মনে হচ্ছে?

আমি কৌতুক করার জন্য বললাম

আমিঃ মন খারাপ ছিলো তবে তোমাকে দেখে মন ভালো হয়ে গিয়েছে।
তাতিয়ানাঃ উঃ ফাজলামো না?
আমিঃ না, ফাজলামো হবে কেন? এমন সুন্দরী এক তরুনীকে দেখলে কোন ছেলের মন ভালো হয়না বলো?
মুহুর্তের মধ্যে ওর মুখে খুশীর ঝলক ছড়িয়ে পড়লো। কপট রাগ দেখিয়ে বললো
তাতিয়ানাঃ তুমি জোক করছো!
আমি ভাবলাম, এই মিথ্যে কথাটা বলা ঠিক হয়নি। ও সিরিয়াসলি নিলে তো কাজটা ভালো হবে না। পরমুহুর্তেই ভাবলাম। নাহ্ সিরিয়াসলি নেবেই বা কেন? দুদিনের মাত্র পরিচয়। তাছাড়া এদেশের মেয়েরা অত আবেগ প্রবন বলে মনে হয়না।

আমিঃ ইউনিভার্সিটিতে কেমন লাগছে?
তাতিয়ানাঃ ভালো।
আমিঃ কি ভালো?
তাতিয়ানাঃ সব ভালো।
আমিঃ তোমার বাড়ীর চাইতেও ভালো?
তাতিয়ানাঃ বাড়ী, না। মানে বাড়ী আর ডর্ম দুটা দুরকম। আমি আাসলে এর আগে ‘টেখ্‌নিকুমে’ পড়তাম। (টেখ্‌নিকুম হলো টেকনিকাল স্কুল যেখানে ক্লাস এইট শেষ করার পর ভর্তি হয় এবং তিন বছরের জন্য ভোকেশনাল ট্রেনিং ও পড়ালেখা করে। এটা শেষ করার পর একজন টেকনিশিয়ানের পেশায় যোগ দিতে পারে, আবার কেউ চাইলে ইউনিভার্সিটিতেও ভর্তি হতে পারে)

আমিঃ ও, কোথায় পড়তে।
তাতিয়ানাঃ এই খারকভেই। সালতাভকা এলাকায় আমার হোস্টেল ছিলো।
আমিঃ তাহলে তো তুমি খারকভে নতুন না।
তাতিয়ানাঃ না, নতুন না। কিন্তু ওখানকার হোস্টেলের পরিবেশ ভালো ছিল না। সেই হিসাবে এই ডরমিটরি অনেক সুন্দর।
আমিঃ কি খারাপ ছিলো ওখানে?
তাতিয়ানাঃ ওখানকার হোস্টেলে ম্যানেজমেন্ট খারাপ ছিল। কোন সিকিউরিটি ছিলো না। মাঝে মাঝে স্থানীয় লোকজন হোস্টেলে ঢুকে মেয়েদের ডিস্টার্বও করতো।
আমিঃ কি বলো? (আস্চর্য্য হয়ে বললাম আমি। অবশ্য এই জাতীয় কথাবার্তা আমি আগেও শুনেছি)।
তাতিয়ানাঃ হ্যাঁ, এরকমই। আমাদের দেশে তো মেয়েদের সম্মান বলে কিছু নেই!

আমি মনে মনে একটা দীর্গশ্বাস ফেললাম। দেশে থাকতে তথাকথিত প্রগতিশীলদের বক্তব্য শুনতাম। বাংলাদেশে মেয়েদের সম্মান বলে কিছু নাই। বাংলাদেশ তথা মুসলিম সমাজে নারীরা বন্দি। আর পাশ্চাত্যে নারীরা মুক্ত স্বাধীন। এখানে এসে চোখের সামনে যা দেখেছি ও দেখছি তার সাথে ঐ ধারণার কোন মিলই খুঁজে পাইনি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পট পরিবর্তনের পর পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। ইদানিং নারী একেবারেই এনজয়মেন্টের ইনস্ট্রুমন্ট হয়ে গিয়েছে। জায়গায় জায়গায় নাইট ক্লাব জেন্টেলম্যান্‌স ক্লাব খোলা হয়েছে। বৈধ-অবৈধ ব্রথেল খোলা হয়েছে। পর্নো পত্রিকায় দেশ ছেয়ে গেছে। এসব জায়গায় স্ট্রীপ শো থেকে শুরু করে নানা কর্মে মেয়েদের ব্যবহার করা হচ্ছে। পত্র-পত্রিকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ওপেনলি এইসব কাজে মেয়ে যোগারের বিজ্ঞাপন দেয়া হচ্ছে, ‘উচ্চ আয়ের সুযোগ আছে, কমপ্লেক্সহীন মেয়ে চাই’। এই কমপ্লেক্সহীন বলতে তারা কি বোঝাতে চাইছে? লজ্জাহীন, জড়তাহীন, নির্লজ্জ? তারা কি এই বোঝাতে চাইছে যে, লজ্জা-হায়া থাকা খারাপ, আনস্মার্টনেস? হায়রে!

আশ্চর্য দর্শন এই যে, মহিলা যখন
বিমানে বিমানবালা হয়ে মানুষের সেবা করে, তাদের সামনে ট্রে সাজিয়ে পরিবেশন করে এবং তাদের কামাসক্ত দৃষ্টিতে বিদ্ধ হয় তখন তা হয় ‘স্বাধীনতা’। পক্ষান্তরে সে যদি নিজের ঘরে নিজের জন্য, স্বামী ও সন্তানের জন্য, পিতামাতার জন্য খাবার রান্না করে তাহলে তা পরাধীনতা। এই আশ্চর্য দর্শনে নারীকে ভুলিয়ে বণিক সম্প্রদায় তাকে ব্যবহার করেছে বাণিজ্যিক স্বার্থে। তাকে বানানো হয়েছে প্রদর্শনীর বস্তু। সেলসগার্ল দরকার তো মহিলা হতে হবে, পণ্য বিক্রির প্রয়োজন তো মহিলারই বিক্রি করতে হবে। যেন তার রূপ- সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মানুষ পণ্য ক্রয় করে। তার প্রতিটি অঙ্গ খোলা বাজারের পণ্যে পরিণত হয়েছে। যে কোন মেলায় মেয়েদের ডেকোরেশন পিস হিসাবে দাঁড় করিয়ে রাখা হয় স্টলে। ইউরোপের কিছু কিছু এক্সিবিশনে তো একেবারে টু পিস পরিয়েও দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। ধনী বসের সেক্রেটারি হতে হবে সুন্দরী তরুনী, এমন কোনো বিজ্ঞাপন পাওয়া যাবে না, যাতে নারীর ছবি নেই। সেই সব ছবিতে নারীর পোষাক দিন দিনই সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছে। নারীকে পণ্য বানিয়ে নিজেরা অর্থ উপার্জন করছে। এর নাম দিয়েছে নারী স্বাধীনতা।

টেলিসিরিয়ালটি শেষ হওয়ার পর, গতকালের মত তাতিয়ানা সাথেসাথে উঠে গেল না। বুঝলাম ও আরো কিছু সময় বসতে চাইছে। বললাম

আমিঃ আর এক কাপ কফি খাই আমরা?
তাতিয়ানাঃ উ, না কফি না। কফি খেলাম তো। চা দিতে পারবে?
এমনভাবে বললো যেন আমরা অনেক দিনের বন্ধু। চা খেতে খেতে ও বললো

তাতিয়ানাঃ বাহ্‌, বেশ টেস্টি চা তো!
আমিঃ হ্যাঁ, আমাদের দেশের চা। আমি দেশ থেকে আনিয়েছি।
তাতিয়ানাঃ ও তাই। তোমাদের দেশে টেস্টি চা হয় আমি জানি।
আমিঃ কোথা থেকে জানলে?
তাতিয়ানাঃ জানি তো। ইন্ডিয়া, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা এসমস্ত দেশের চা খুব ভালো। আমাদের ক্রাসনাদার চা কোনরকম। আমার কাছে একেবারে পানসে লাগে। ইন্ডিয়ান চা আগে অনেক খেয়েছি। বাংলাদেশের চা এই প্রথম খেলাম।
ইত্যাদি আরো কিছু হালকা আলাপ-আলোচনার পর ও বিদায় নিলো।

পরদিন ক্লাস শেষে। ভাবলাম ডরমিটরিতে না গিয়ে একটু কোথাও ঘুরতে যাই। সামার ভ্যাকেশন তো কয়েকদিন আগে শেষ হয়ে গিয়ে এখন পুরো দমে ক্লাস শুরু হয়ে গিয়েছে। ভ্যাকেশন টাইমে যখন-তখন যেখানে-সেখানে বেড়ানো যেত। এখন তো নিজের ক্লাস রয়েছে, কারো রূমে যদি বেড়াতে যেতে চাই তারও ক্লাস আছে। তাই বিকেলটাই, বেড়ানোর জন্য ব্যবহার করতে হয়। যতদিন সামারের উষ্ণতা আছে, তারপর তো আবার ঠান্ডা শুরু যাবে তখন আর এত আরামে ঘোরাঘুরি করা যায়না। কোথায় যাব? কবীর ভাইদের ওখানে যাই। শহরের ঐ দিকটা আমার ভালো লাগে। তারপর হঠাৎ তাতিয়ানার কথা মনে হলো। মেয়েটা যদি, আমার রূমে এসে ফিরে যায়! বেচারী টেলিসিরিয়ালটা খুব পছন্দ করে। তারপর আবার ভাবলাম। ওর কথা ভেবে কি হবে? আমি আমার কথা ভাবি। ওর টিভি দেখা নিয়ে আমার চিন্তা কি, ও তো আর আমার বান্ধবী না। তারপর আবার মন খারাপ হলো, বান্ধবী-অবান্ধবীর ব্যপার না। জাস্ট মানুষ হিসাবে, মেয়েটা আশা নিয়ে টিভি দেখতে এলো, আর আমি রূমে নেই, ওর মন খারাপ হতে পারে। একটু দ্বিধা-দন্দ্বের মধ্যে পড়ে গেলাম। শেষ পর্যন্ত রূমে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

বাসস্ট্যান্ড থেকে নেমে আধা কিলোমিটারের মতো হেটে ডরমিটরিতে আসতে হয়। এই রাস্তাটা বেশ সুন্দর। আরো সামারে ঝাকড়া পাতায় ভরা গাছ-গাছালী। তার মধ্যে চোখ ধাঁধানো সব সুন্দরীরা নানা রকম বাহারী পোষাকে সজ্জ্বিত। কেউ মিনি স্কার্ট পড়া, কেউ টাইট প্যান্ট আর হাতা কাটা গেন্জী পড়া, কেউ কেউ হাফপ্যান্ট পড়াও আছে। একটি মেয়েকে দেখলাম লং স্কার্ট পড়া। মিশরের আহমেদের কথা মনে পড়লো। আমার সিনিয়র ফ্রেন্ড। উনি এখানে আন্ডারগ্রেড করেননি। দেশ থেকে পাশ করে, এখানে পি, এইচ, ডি, করতে এসেছেন। বেশ পরহেজগার। একদিন বললেন, ” আজ একটা মেয়েকে দেখলাম, উপরে গা ঢাকা সুন্দর টপস, নীচে লং স্কার্ট পড়া, আমি ভাবলাম বাহ্‌ বেশ তো মেয়েটি। কি সুন্দর পুরো গা ঢাকা কাপড় পড়েছে! তারপর মেয়েটি পিছন ফিরলে দেখলাম, স্কার্টটির পিছন দিকে প্রায় পুরোটাই কাটা। পায়ের প্রায় ৮০ পার্সেন্টই দেখা যাচ্ছে।” বেশ হাসি লেগেছিলো আহমেদের কথা শুনে।

রূমে এসে ভাতটাত খেয়ে একটা গল্পের বই নিয়ে শুয়ে শুয়ে পড়তে বসলাম। কিছুক্ষণ পড়ার পর। বাইরে হালকা আওয়াজ শুনতে পেলাম। ওরা ভলিবল খেলতে শুরু করেছে। যাক আমি বইটার মধ্যা ডুবে গেলাম। বইটা কিছুদিন আগে যোগার করেছি। কিছু ছোটগল্পের সমাহার। রবীন্দ্রনাথের লেখা কয়েকটি ছোটগল্প আছে। এরমধ্যে একটা ছিলো প্রেমের গল্প, একটি মেয়ের প্রতি একটি ছেলের আকুলি-বিকুলি মনের ভাবকে এত চমৎকার ভাষা মাধুর্য্য দিয়ে তিনি লিখেছেন। যা পড়ে মুগ্ধ হওয়া তো স্বাভাবিকই, উপরন্তু এই গল্প পড়ে যে কারোরই প্রেম করতে ইচ্ছে হবে। গল্পটা পড়ে মনে আবেশ ছড়িয়ে গেল। এরপর ঘড়ির দিকে তাকালাম। বিকাল ছয়টা। ওহ্‌ এসময় তো তাতিয়ানার আসার কথা। না ঠিক কথা বলে কিছু নেই। গত দুদিন এসেছিলো। তাই ভাবছিলাম আজও টিভি দেখতে আসবে হয়তো। আরো আধ ঘন্টা অপেক্ষা করলাম। না ও আসছে না। কি হলো? প্রোস্তা মারিয়া দেখবে না? একবার ভাবলাম, আমি টিভি সেটটা অন করি। একা একাই দেখি। তার পরমুহুর্তে আর ইচ্ছে হলোনা। টিভি আর অন করলাম না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওদের ভলিবল খেলা দেখলাম। ভরাট শরীর নিয়ে লেনা দৌড়াদৌড়ি করছে। ওর প্রেমিক বা হাফ-জামাইও খেলছে। কে জানে, জানালায় দাঁড়িয়ে অনেকেই হয়তো লেনাকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। যাক আমার অতশত চিন্তা করার দরকার নাই। ডিভানে বসে বসে আরো কয়েকটি ছোটগল্প পড়লাম। ইতিমধ্যে, উত্তর গোলার্ধের দীর্ঘ বিকেল গড়িয়ে অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। আমি জানালায় দাঁড়িয়ে সাঁঝের রঙের রঙিন আকাশ দেখতে লাগলাম। এখানে সামারে সাঁঝের আকাশে বাংলাদেশের আকাশের মতই নানা রঙের বর্ণচ্ছটা থাকে। এই সুন্দর দৃশ্যপট আমার দারুন লাগে। গানটা শোনার জন্য ক্যাসেট প্লেয়ারটা চালু করলাম। শুরু হলো, ‘সাঁঝের রঙের রঙিন আকাশ, সূর্যটা চায় যে বিদায়…।” কয়েকটা গানের পর শুরু হলো,

‘কি যেন শব্দ হতে ফিরে তাকালাম,
দেখি ঝড়ের বাতাস,
অকাল বাদলের একটু আভাস,
আমি পথ হারালাম একা ঘুরে ঘুরে,
তুমি তখন অনেক দূরে।
প্রতীক্ষা ছিলো সারা বিকেল জুড়ে,”

হঠাৎ মেজাজটা তিরিক্ষি হয়ে গেল। সে কি তাতিয়ানা আসে নাই বলে। আমি কি ওর জন্য প্রতীক্ষা করেছি? দুরো ওর জন্য প্রতীক্ষা করতে যাবো কোন দুঃখে, ও আমার বান্ধবী না, কিছু না, দেখতেও আকর্ষণিয় না। ওর কি প্রতিক্ষা করবো!

টুক টুক টুক। এই রাত নয়টার সময় আবার কে এলো? দরজা খুলে দেখি, তাতিয়ানা দাঁড়িয়ে আছে।

ভালোবাসা কাকে বলে?
আমার না যদি থাকে সুর, তোমার আছে তুমি তা দেবে,
তোমার গন্ধ হারা ফুল আমার কাছে সুরভী নেবে,
এরই নাম প্রেম, এরই নাম প্রেম,
জীবনে যা গৌরবও হয় মরণেও নেই পরাজয়,
চোখের স্মৃতির মণিদ্বীপ মনের আলোয় কভু কি নেভে?
এরই নাম প্রেম, এরই নাম প্রেম,
দুজনেই দুজনাতে মুগ্ধ, দুজনার রূপে কত সুন্দর,
দুজনার গীতালীর ছন্দে, তন্ময় দুজনার অন্তর,
এর কাছে স্বর্গ সুধার বেশী আছে মূল্য কি আর,
আমার দেবতা সেও তাই, প্রেমের কাঙাল পেয়েছি ভেবে,
এরই নাম প্রেম, এরই নাম প্রেম।

 

 

বিষণ্ন বিরিওজা – ৬

তাতিয়ানাঃ কই? আজও পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছো? ভিতরে ঢুকতে দাও।
আমিঃ ও হ্যাঁ হ্যাঁ, আসো ভিতরে আসো। (বিব্রত হয়ে বললাম আমি)
বিন্দুমাত্র জড়তাহীন, সাবলীল ভঙ্গিতে ডিভানে গিয়ে বসলো ও।

তাতিয়ানাঃ কি করো?
আমিঃ কিছুনা।
তাতিয়ানাঃ টিভি দেখছো? সেট তো অন করা আছে?
আমিঃ আঁ, হ্যাঁ, সেট অন করা আছে। জাস্ট অন আর কি। আমি মনোযোগ দিয়ে কিছু দেখছিলাম না।
তাতিয়ানাঃ একা একা খারাপ লাগেনা?
আমিঃ একা মানে, না। রূমে একা থাকতেই ভালো লাগে। রূমমেট না থাকাই ভালো। গত কয়েক বছর ধরে আমি একাই আছি। শুধু প্রথম বছর রূমমেট ছিল। নানা ঝামেলা হয়।
তাতিয়ানাঃ কি ঝামেলা হয়?
আমিঃ এই তো। একসাথে থাকার অনেক ঝামেলা। রান্নাবান্না, বাজারঘাট, মেস বিল, গেস্ট, বন্ধুবান্ধব, ঘুমের টাইম সবকিছু নিয়েই মিসম্যাচিং। সেই থেকে মনমালিন্য, ইত্যাদি। তার চাইতে একাই ভালো।
তাতিয়ানাঃ তোমার রূমমেইট কি রাতে মেয়ে নিয়ে আসতো? তারপর বলতো, “আজ রাতটা তুমি অন্য কোথাও কাটাও, আমি ওকে নিয়ে এখানে থাকবো”, এরকম?
তাতিয়ানার চোখে দুষ্টু হাসি চিকচিক করছে। আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। ভাবলাম ও হঠাৎ এরকম কথা বলছে কেন? কথা ঘোরানোর জন্য বললাম

আমিঃ আজ প্রোস্তা মারিয়া দেখতে এলেনা যে?
তাতিয়ানাঃ তুমি আমার জন্যে অপেক্ষা করেছিলে?
কি উত্তর দেব ঠিক বুঝতে পারছিলাম না।
আমিঃ না, মানে প্রতিদিনই তো আসো। তাছাড়া তুমি বলেছিলে, সিরিজটা তুমি পছন্দ করো, কোনো এপিসোড মিস করতে চাওনা।
তাতিয়ানাঃ মিস করিনি তো।
আমিঃ মানে?
রিনরিনে শব্দ করে মিষ্টি হেসে বললো
তাতিয়ানাঃ তুমি বোধহয় প্রোস্তা মারিয়া রেগুলার দেখোনা।
আমিঃ না সেরকম উৎসাহ নিয়ে তো কখনোই দেখিনি। তোমার সাথেই যা দেখা।
তাতিয়ানাঃ আমার সাথে তো মাত্র তিনদিন দেখলে। যাহোক, আজ মারিয়া দেখায় না।
আমিঃ মানে?
তাতিয়ানাঃ সপ্তাহে দুইদিন মারিয়া বন্ধ।
আমিঃ ও তাই? কি কি বারে বন্ধ?
তাতিয়ানাঃ আজ সোমবার, আর কাল মঙ্গলবার। বাকী পাঁচদিন চলে।
আমিঃ ও। তাহলে তো তুমি আমার এখানে দুইদিন আসবে না।
তাতিয়ানা আবারো চোখে কৌতুক নাচিয়ে বললো।
আমিঃ এই কনক্লুশন ড্র করছো কেন? আজতো মারিয়া দেখায়নি, কিন্তু আমি তো এসেছি।
আমিঃ ও, হ্যাঁ।
তাতিয়ানাঃ কি হ্যাঁ?
আমিঃ কিছুনা।
তাতিয়ানাঃ কিছুনা কি? কিছু কি বলতে চাইছিলে?
আমি ঠিক ধরতে পারছিলাম না, কথা কোনদিক থেকে কোনদিক চলে যায়। নাহ্, চিন্তাভাবনা না করে কথা বলা যাবেনা। প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য আমি বললাম
আমিঃ এসো কফি খাই।
তাতিয়ানাঃ তুমি ডিনার করেছো?
আমিঃ না।
তাতিয়ানাঃ তাহলে কফি কি খাবে? আগে ডিনার করো। রাত সাড়ে নয়টার মতো বাজে।
আমিঃ উঁ, ডিনার আমি একটু লেটেই করি, তুমি খাবে আমার সাথে?
তাতিয়ানাঃ এত রাতে কি খাবো? আমরা রাশানরা রাত আটটার মধ্যেই ডিনার সেরে ফেলি জানোনা?
আমিঃ তা জানি। কিন্তু তোমার সামনে একা একা খাই কি করে?
তাতিয়ানাঃ তাহলে আমি চলে যাই।
আমি একটা সংকটে পড়লাম। ওকে চলে যেতে বলি কি করে? এটা অভদ্রতা হবে, তাছাড়া কেন যেন ওর সাথে কথা বলতে ভালোও লাগছিলো। আবার ওর সামনে খাওয়াটাও তো ঠিক হবে না।
আমিঃ না থাক, আমি পরেই ডিনার করবো। এখন বরং কফি খাই।
তাতিয়ানাঃ তার চেয়ে তুমি বরং ডিনার করো। আমি যাই। তবে মন খারাপ করোনা। একেবারে যাচ্ছি না। ঠিক আধাঘন্টা পরে ফিরে আসছি। আশা করি ততোক্ষণে তোমার ডিনার করা হয়ে যাবে।
আমিঃ কষ্ট করে আসলে, আবার যাবে, আবার আসবে!
তাতিয়ানাঃ ভারি আশ্চর্য্য কথা! আমি কি শত কিলোমিটার দূর থেকে আসা যাওয়া করি নাকি? আমি তো এই ফ্লোরে তোমার পাশের রূমেই থাকি।
আমিঃ ও হ্যাঁ, তাইতো।
তাতিয়ানাঃ তাইইতো। থাকো, ডিনার করে আমি ফিরে আসলে পরে একসাথে কফি খাবো।
একটি লাস্যময় ভঙ্গিতে ডিভান থেকে উঠে, দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল তাতিয়ানা। আমি চোরা চোখে দেখলাম। মেয়েটি আর দশটা রাশান মেয়ের মত চোখ ধাঁধানো সুন্দরী নয় সত্য, কিন্তু মেয়ে তো। তাই মেয়েলী ভঙ্গিমা, দৃষ্টি, চলন, কথা বলার ধরন, ইত্যাদি আর দশটা মেয়ের মতই নজর কাড়া। অন্ততপক্ষে আমার কাছে তো তাই মনে হয়।
আমি গতকাল রান্না করে রাখা খাবার ফ্রীজ থেকে বের করে নিয়ে, গরম করার জন্য কিচেনের দিকে গেলাম। পিক আওয়ারে আট টা চুলাই বিজি হয়ে যায়, তবে এখন হবে না। তারপরেও একটা চুলা বিজি পেলাম। আমারই মতো কেউ হয়তো। একটা মাইক্রোওয়েভ ওভেন থাকলে ভালো হতো। দ্রুত গরম করা যেত। কিনে নেব নাকি একটা? পরক্ষণেই ভাবলাম, না দরকার নাই। মাইক্রোওয়েভ ওভেন ভালো জিনিস না। মাইক্রোওয়েভ ওভেনে গরম করা খাবার ক্ষতিকর হয়। ইলেকট্রোম্যগনেটিক ওয়েভ যে কি ক্ষতি করতে পারে নিজে ফিজিসিস্ট হয়ে আমি তা জানি। যে কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নে একসময় তা মার্কেট থেকে তুলে নেয়া হয়েছিলো।
ডিনার খেতে খেতে ভাবছি। আধঘন্টা পর আসবে বললো। আসতেই পারে। সত্যিই তো, শত মাইল দূর থেকে তো আর আসে না। দুটা রূম পরেই থাকে। ছেলেমেয়ে এক হোস্টেলে থাকার এই ইউরোপীয় সিস্টেমটায় আমি প্রথমে একটু ধাক্কা খেয়েছিলাম সত্য, কিন্তু সেই আমিই মাসখানেক পরে উপলদ্ধি করেছিলাম যে এটা ভালো। প্রথম যখন এই দেশে আসি, ল্যাংগুয়েজ কোর্সে আমরা বিশজন বাঙালী ছিলাম। আমাদের কিছু বাঙালী বন্ধু বলেছিলো, ” আরে সালা, হেভি সিস্টেম তো, ইউরোপে আইছি তো যত বেশী ফুর্তি করন যায়। পোলা-মাইয়া এক হোস্টেলে দিয়া তো দশ ডিগ্রী বেশী সুবিধা দিয়া দিল।” আমি অবশ্য সেই মতে বলছি না। বিষয়টার পজেটিভ দিক রয়েছে। আমাদের ব্যাচে নুরুন্নবী বলে একজন ছিল। নোয়াখালী বাড়ী। সেই কারণেই হয়তো একটু ধর্মভীরু। আমাদের মধ্যে ও সবচাইতে বেশী চঞ্চল ছিলো যদিও কিন্তু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে কোন গাফিলতি করতো না। ও একদিন বললো, “এই যে এখানে ছেলেমেয়ে এক হোস্টেলে থাকে এটা ভালো রে। নারী-পুরুষের মধ্যে যত বেশী দূরত্ব সৃস্টি করা হয়, পরস্পরকে বুঝতেও তত বেশী সমস্যা হয়। এই দূরত্ব কমিয়ে আনলেই বরং নারী-পুরুষ সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।” আমি বলেছিলাম, “এতে বেলেল্লাপনার সম্ভাবনা বেড়ে যায়না কি?” নুরুন্নবী বলেছিলো, “এখানে তো সবাই ম্যাচিউরড্, ভালো-মন্দের ফারাক তো সবাইই বোঝ. কিছু করলে নিজ দায়িত্বেই করবে”।

আমি ডিনার শেষ করে কফি তৈরীর জন্য ইলেকট্রিক কেট্লটা বসালাম। চিনি ও গুড়া কফির পটটা টেবিলের উপর রাখলাম। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালাম, দশটা পনের মিনিট বাজে। টুক, টুক, টুক, দরজায় নকের আওয়াজ। নিশ্চিত ছিলাম, এটা তাতিয়ানা। তাই নিজে দরজা না খুলে, একটু উচ্চস্বরে বললাম,
আমিঃ ইয়েস, কামইন।
কফির কাপ সাজানো নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম তাই দরজার দিকে তাকাইনি।
“রিমন”।
মেয়েলী কন্ঠের ডাক, তবে তাতিয়ানার কন্ঠস্বর নয়। আরে ঝামেলা! এত রাতে আবার কোন মেয়ে এলো! তাকিয়ে দেখি দাঁড়িয়ে আছে আমার ক্লাসমেট অপরূপ সুন্দরী ইরিনা।
আমি ওর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম।
ইরিনা, আমার আর কফি টেবিলের দিকে তাকিয়ে বললো,
ইরিনাঃ কেউ আসবে?
আমি কি উত্তর দেব বুঝতে পারছিলাম না।
আমিঃ বস ইরিনা।
ইরিনাঃ কফি খাওয়াবে।
আমি অনেকটাই অপ্রস্তুত। বুঝতে পারছি না কি বলবো। ইরিনা আয়েশী ভঙ্গিতে ডিভানে বসে গেল।
ইরিনাঃ খাওয়াও তাহলে কফি।
আমিঃ উঁ, হ্যা, ওয়েট, বানাচ্ছি।
এসময় খোলা দরজা দিয়ে গটগট করে ঢুকে গেল তাতিয়ানা। ওর হাতে কাগজের ছোট্ট একটা প্যাকেট। ভিতরে ঢুকে ডিভানে ইরিনাকে দেখে আর আমার হাতে কফির কাপ দেখে, বেশ অপ্রতিভ হয়ে গেল তাতিয়ানা, মনে হলো যেন একটা ধাক্কা খেয়েছে। তাতিয়ানা অনেকটা আহত ভঙ্গিতে বললো
তাতিয়ানাঃ আমি তাহলে যাই ।
আমি আরও সংকটাপন্ন হয়ে বললাম
আমিঃ না, না যাবে কেন? বসো।
তাতিয়ানাঃ না, মানে তোমরা কফি খাও তাহলে। আমি যাই।
ইরিনাকে দেখলাম বেশ কৌতুহলী হয়ে ওকে অবসার্ভ করছে।
আমিঃ না, তুমি বসো। আমরা তিনজনে মিলেই কফি খাবো।
তাতিয়ানা আমার দিকে কাগজের প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিলো।
আমিঃ কি এটা?
তাতিয়ানাঃ ফ্রেশ বিনের কফির গুড়া। এই মাত্র গুড়ো করে এনেছি।
আমিঃ ওহ্, দারুন তো! আই লাইক ইট।
তাতিয়ানাঃ লাইক ইট তো বলছো, কিন্তু খাও তো, সাধারণ কফি।
আমিঃ আরে এটাও তো বিন থেকে করা।
তাতিয়ানাঃ কি করে জানলে? গুড়া করার সময় তুমি ছিলে?
ইরিনাঃ এই কৌটার গুলোয় ভেজাল থাকে বলে অনেকে মনে করে, তাই অনেকে কফি বিন কিনে নিজের হাতে গুড়া করে খায়।
তাতিয়ানাঃ আর এটার টেস্টও বেশী।
আমিঃ ও। তাহলে আমি বানাই।
কফি বানানো হলে কফির খুব সুন্দর মিষ্টি গন্ধে ঘর ভরে গেল। আরও একটা মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছিলাম। কেউ একজন কড়া পারফিউম ব্যবহার করেছে হয় তাতিয়ানা নয়তো ইরিনা।
আমি লক্ষ্য করলাম ওরা দুজন নিজেদের মধ্যে কোন কথা বলছিলো না। টুকটাক দুএকটা কথা আমি বলছিলাম। আর তার ফাঁকে ফাঁকে ওরা দুজন দুজনকে দেখছিলো। কফি খাওয়া শেষ হলে। তাতিয়ানা বললো
তাতিয়ানাঃ আমি তাহলে যাই।
আমি কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। আবার ইরিনা তখনো বসে আছে। যাওয়ার কথা মুখেই আনছে না। অবশেষে বললাম।
আমিঃ আচ্ছা যাও, ভালো থেক।
তাতিয়ানাঃ গুড নাইড।
সেকি হতাশ হয়ে বললাম জানিনা। তাতিয়ানা চলে যাওয়ার পর। চোখে কৌতুক নাচিয়ে ইরিনা বললো।

ইরিনাঃ মেয়েটি কে?
আমি শীতল কন্ঠস্বরে বললাম।
আমিঃ এই তো। এই ফ্লোরেই থাকে।
ইরিনাঃ কই আগে তো কখনো দেখি নাই।
আমিঃ ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী, মাত্র এসেছে।
ইরিনাঃ ও তাই বলো। (মুখে আরো কৌতুক এনে বললো) তোমাদের মধ্যে কি কিছু চলছে?
আমিঃ (বিরক্ত হয়ে বললাম) কি চলবে? মেয়েটা তো এই সেদিন এলো।
রিনরনে হেসে ইরিনা বললো।
ইরিনাঃ তুমি চিরকালের বোকাই রয়ে গেলে রিমন।

আমিঃ কেন?
ইরিনাঃ তোমাকে সেই ফার্স্ট ইয়ার থেকে দেখে আসছি। মেয়েদের মনের কথা বুঝতে পারো না।
আমিঃ এমন কথা বলছো কেন?
ইরিনাঃ তোমার রেগিনার কথা মনে আছে?
আমিঃ আছে। রেগিনা আবার কি হলো?
ইরিনাঃ রেগিনা কিন্তু তোমাকে ভীষণ পছন্দ করতো। অথচ তুমি সেটা ধরতেও পারোনি।

আমিঃ জানিনা।
ইরিনাঃ আকসানা তো তোমার পিছনে ঘুরে ঘুরে হয়রান হয়ে, অবশেষে রোমানকে বিয়ে করলো। আহা বেচারী! রিমনকে না পেয়ে রোমানকে পেল।
আকসানার কথা শুনে আমি একটু শক্ত হয়ে গেলাম। আকসানা এই হোস্টেলেই থাকতো। মাঝে মধ্যে আমার রুমে আসতো, চা খেয়েছি গল্প-গুজব হয়েছে। এর বেশী তো কিছু ছিলনা! দুবছর আগে ওর বিয়ে হয়ে শ্বশুড় বাড়ীর এ্যাপার্টমেন্টে উঠে গিয়েছে। আকসানা বাইরের শহরের, ছেলেটা খারকভেরই।

আমিঃ আকসানা তো কখনো কিছু বলেনি।
ইরিনাঃ সমস্যাটা তো ওখানেই। তোমার মতো ছেলে মেয়েদের মনের কথা বুঝতে পারেনা, তোমাকে বলতে হয়। মেয়েরা কি সব কিছু মুখ ফুটে বলতে পারে?
আমিঃ অনেকেই তো বলে।
ইরিনাঃ না অনেকেই না, কেউ কেউ বলে। সেই কেউ কেউ-এর দলে আকসানা ছিল না। তোমাদের দেশের মেয়েদের চাইতে আমাদের জড়তা হয়তো কম, তারপরেও আমরা মেয়ে কিন্তু।
আমিঃ আকসানা বললেই পারতো।
ইরিনাঃ তা হয়তো পারতো। কিন্তু তোমার দৃষ্টিতে শীতলতা দেখে আর কিছু বলতে চায়নি।
আমি বেশ বিব্রত হলাম। কথাবার্তা কেমন যেন হচ্ছে। হৃদয় ঘটিত বিষয় নিয়ে এমন আক্রমণাত্মক কথা আমাকে ইতিপূর্বে আর কেউ বলেনি। আকসানার বিষয়টা কখনো ঘুণা্ক্ষরেও টের পাইনি। তাছাড়া টের পেলেও যে কিছু হতো তাও তো না।

উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ইরিনা বললো।
ইরিনাঃ দেখো, এই মেয়েটিকে আবার নিরাশ করোনা যেন।
আমি কোন কিছু বলার কোন ভাষাই খুঁজে পেলাম না।

ইরিনাঃ আমি আসলে কফি খেতে আসিনি, তোমার কাছে এসেছিলাম ল্যাবের খাতাটা নিতে। গত ল্যাব ক্লাসে আমি এ্যাটেন্ড করতে পারিনি।

আমি তাড়াতাড়ি ওকে খাতাটা বের করে দিলাম। আপদ বিদায় হলে বাঁচি।
ইরিনা চলে যাবার পর, কিছু সময় বসে রইলাম। মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে ছিলো। ইরিনা যেসব কথা বললো, তাতে মেজাজ ঠিক থাকার কথা না। রেগিনা আমাদের দুবছরের সিনিয়র ছিলো। পাশ করে ওর সিটিতে চলে গেছে। এই ডরমিটরিতেই থাকতো। আমাকে তার ভালো লাগতো তাতো আমি জানতাম না। আকসানার বিষয়টাও জানতাম না। আসলে ওদের ব্যাপারে আমার আগ্রহ কিছু ছিল না। কিন্তু অন্যেরা কি জানতো? না জানলে ইরিনা এতো কথা বললো কি করে? সর্বনাশ!
যাকগে যা হয়েছে হয়েছে। আমি তো আর কিছু করি নাই। অনেক রাত হয়েছে ঘুমানোর প্রস্তুতি নেয়া দরকার। ডিভানটা খুলে বিছানাটা গুছালাম। শুতে যাব এমন সময় আবারো। টুক, টুক, টুক, দরজায় নক হলো। আবার কে এলো এত রাতে? এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেখলাম। খুব সুন্দর সেজেগুজে তাতিয়ানা দাঁড়িয়ে আছে।

তুমি না হয় রহিতে কাছে
কিছুক্ষণ আরো নাহয় রহিতে কাছে
আরো কিছু কথা নাহয় বলিতে মোরে
এই মধুক্ষণ মধুময় হয়ে নাহয় উঠিত ভরে।।
সুরে সুরভীতে নাহয় ভরিত বেলা
মোর এলো চুল লয়ে বাতাস করিত খেলা।
ব্যাকুল কত না বকুলের কুড়ি
রয়ে রয়ে যেত ঝরে
ওগো নাহয় রহিতে কাছে।।
কিছু দিয়ে নিয়ে ওগো মোর মনময়
সুন্দরতর হতো নাকি বলো
একটু ছোঁয়ার পরিচয়।
ভাবের লীলায় নাহয় ভরিত আঁখি
আমারে নাহয় আরো কাছে নিতে ডাকি।
নাহয় শোনাতে মরমের কথা
মোর দুটি হাত ধরে
ওগো নাহয় রহিতে কাছে।।

বিষণ্ন বিরিওজা – ৭

রাত এখন দশটার উপরে। আমি ঘুমানোর প্রস্ততি নিয়ে শুয়েই পরেছিলাম প্রায়। এসময় আমার দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে অপরূপ সাজগোজ করে আসা চপলমতি একটি তন্বী শ্বেতাঙ্গিনী তরুণী। আগে অনেকবারই ভেবেছি, মেয়েটি সুন্দরী নয়, কিন্তু এই মুহুর্তে প্রসাধনের গুন তাকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। চোখ ফেরানো গেলেও কয়েক মুহুর্তের জন্য চোখ আটকে যাবে নিঃসন্দেহে। মেয়েটিকে এত রাতে এই সাজে রূমে ঢুকতে দেয়া ঠিক হবে কি? আমার স্থবিরতা দেখে ও তার স্বভাবসুলভ মিষ্টি হসে বললো,

তাতিয়ানাঃ আবারো পথ আটকে আছো! ঢুকতে দেবেনা?
আমি আরেকবার ভাবলাম এত রাতে এই সাজে মেয়েটাকে ঢুকতে দিলে লোকে কি বলবে? পরক্ষণেই আবার নিজের চিন্তায় নিজেরই হাসি পেলো, আমি কি বাংলাদেশে বসে আছি? এই ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে নারী-পুরুষ অবাধ সম্পর্কের দেশে বসে আমি এই কথা ভাবছি। এখানে তো এটা চা-বিস্কুট খাওয়ার মতই একটা সাধারণ ঘটনা। এই মুহুর্তেই দেখা যাবে এই ডরমিটরিতে অনেকেই বান্ধবীকে নিয়ে শুয়ে পরেছে। বান্ধবীতো ভালো অনেক সময় দেখা যায় আজই পরিচয় হলো এমন কারো সাথেই অবলীলায় রাত কাটিয়ে দিচ্ছে। আমার তাহলে ওকে ঢুকতে দিতে সমস্যা কি? ভিতর থেকেও কোন একটি চালিকা শক্তি আমাকে বলছিলো, “আসুক না মেয়েটা”। মৃদু স্বরে, “এসো” বলে দরজা ছেড়ে দাড়ালাম।

নিভৃত রাতে আমার ঘরে উপস্থিত হয়েছে সেই মেয়েটি, মনে মনে যার নাম আমি দিয়েছিলাম বার্চ বনের প্রণরেনী।আমি আরেকটু ভালো করে তাতিয়ানার দিকে তাকালাম। ও পোষাক পাল্টে এসেছে। কিছুক্ষণ আগে ওর পরনে ছিল ট্রাউজার আর শার্ট। আর এখন ওর পরনে হাটুর উপরে তোলা স্কার্ট, তবে মিনি স্কার্ট নয়। আর টাইট টপস। এই পোষাক অনেকটাই আবেদন ফুটিয়ে তোলে। অবশ্য এখানে এটা স্বাভাবিক পোষাকই। শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম বলে ডিভানটা আমি ইতিমধ্যেই টেনে বেড বানিয়ে ফেলেছি। তার উপর বেডশীট ও ব্লাংকেটও ছড়ানো ছিলো। তাতিয়ানা প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলো, কোথায় বসবে। তারপর ডিভানেই বসে গেল। তবে পিঠ হেলান দেয়া যাবেনা বলে ও পায়ের উপর পা তুলে বসলো। স্কার্টের সাইজের কারণে এম্নিতেই হাটুর নীচের অংশ খোলা ছিলো, পা তুলে বসাতে আরো কিছুটা অনাবৃত হলো। ওর নীল চোখে ঘন কালো কাজল দিয়েছে। চোখের পাতার উপরে নীল ব্লাশন। কালোও নয় আবার সোনালীও নয় মাঝামাঝি একটা রঙের দীর্ঘ চুলগুলো পরিপাটি করে সাজানো। মুখে হালকা মেকআপের ছাপ। ঠোটে গোলাপী রঙের লিপস্টিক। সব কিছুই মানিয়েছে বেশ। মনে হচ্ছে প্রগলভা এই মেয়েটির ঠোট ভরা মধু, গাল ভরা লালিত্য। পুরুষ মনকে প্রলুদ্ধ করার জন্য যথেস্ট। হয়তো অনেককেই প্রলুদ্ধ করেছে। কে জানে কার কাছে ও ধরা দিয়েছে। নাকি কারো কাছেই ধরা দেয়নি?
তাতিয়ানাঃ কি দেখ?
আমি যদিও ওকেই দেখছিলাম। কিন্তু সেটা বলতে না চেয়ে বললাম,
আমিঃ দেখছি চাঁদটিকে।
তাতিয়ানা পাশ ফিরে তাকালো। সত্যিই জানালার বাইরে রাতের আকাশে এক ফালি চাঁদ দেখা যাচ্ছে। তার নীচে শহরের একাংশ। অসংখ্য বাতির তীব্র বিদ্যুৎ আলো জ্বলজ্বল করছে। সারি করে লাগানো গাছগুলি দাঁড়িয়ে আছে কালো মুর্তির মতো। আর তার সামনে বার্চ বনের প্রণরেনী। একে কি স্বপ্নপূরী আর তার রাজকন্যার সাথে তুলনা করবো?

তাতিয়ানাঃ (কপট অভিমান করে) চাঁদের মধ্যে দেখার কি আছে?
আমিঃ তোমাদের এই শীতপ্রধান দেশে তো সারা বছর চাঁদ দেখা যায়না। বছরের যে কয়মাস চাঁদ দেখা যায় সেই কয়মাস চাঁদটাকে খুব সুন্দর মনে হয়। দুর্লভের প্রতি বাড়তি আকর্ষণ আরকি।
তাতিয়ানাঃ উঁ, তুমি আছো চাঁদের সৌন্দর্য্য নিয়ে!
আমিঃ চাঁদকে ইর্ষা করোনা, ও অবুঝ।
তাতিয়ানাঃ কাব্য করছ? তুমি কি কবিতা লেখো?
আমিঃ লিখতাম একসময়।
তাতিয়ানাঃ (উৎফুল্ল হয়ে বললো)কবিতা লিখতে, বেশ তো! ছেড়ে দিলে কেন?
আমিঃ মনে হলো কিছু হচ্ছে না, নিম্নমান।
তাতিয়ানাঃ তাও লেখা উচিৎ ছিলো। ধীরে ধীরে মান বাড়তো। আচ্ছা আমাকে দেখাবে তোমার কবিতা।
আমিঃ তুমি কিছু বুঝবে নাতো। ওগুলোতো বাংলায় লেখা।

এরপর আমার দিকে হালকা কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,
তাতিয়ানাঃ ঐ মেয়েটি কি তোমার বান্ধবী?
আমিঃ কে?
তাতিয়ানাঃ যে মেয়েটি এসেছিলো।
আমিঃ বান্ধবী হলে তো রাতে থেকে যেত, চলে যেত না।
তাতিয়ানাঃ যাহ্, কি যে বলো!
আমিঃ না, জোক করলাম। ও আমার বান্ধবী নয় ক্লাসমেট

তাতিয়ানাঃ তোমার বান্ধবী আছে?
আমিঃ না।
তাতিয়ানাঃ ফাইনাল ইয়ারে পড়ো, এখনো না!
আমিঃ সেরকমই।
তাতিয়ানাঃ নাকি ছিলো, কাট-আপ হয়ে গিয়েছে?
আমিঃ না থাকলে কাট-আপ হবে কোত্থেকে?
তাতিয়ানা আমার চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকালো, তারপর চোখ নামিয়ে নিলো, তারপর আবার তাকিয়ে লাজুক কন্ঠে বললো,
তাতিয়ানাঃ বান্ধবী করতে ইচ্ছে হয়না?
আমি ঠিক কি উত্তর দেব বুঝতে না পেরে চুপ করে রইলাম।
তাতিয়ানা আবার বললো,

তাতিয়ানাঃ ইয়াং ছেলে বান্ধবী না থাকাটাই তো অস্বাভাবিক। (তারপর মুখ ফসকে বলে ফেলা কথাটায় বিব্রত হয়ে আবার বললো) না মানে এটা অবশ্য তোমার ব্যাপার।
আমি ওর সাথে কৌতুক করার জন্য বললাম।

আমিঃ কেউ তো তাকালো না আমার দিকে। তাই বেচারা এত নিঃসঙ্গ।
তাতিয়ানাঃ মনে তো হয়না, কেউ তাকায়নি। খুব সম্ভবতঃ তোমার দেখার চোখ নেই।
আমিঃ হ্যা, চোখে কিছুটা সমস্যা আছে বোধহয়।
তাতিয়ানাঃ ডরমিটরিতে তোমার রেপুটেশন আছে।
আমিঃ (অবাক হয়ে বললাম) কিসের রেপুটেশন?
তাতিয়ানাঃ সবাই বলে, তুমি খুব ভালো ।
আমিঃ ও বাবা এর মধ্যে সবার সাথে কথা বলে ফেলেছ!
তাতিয়ানাঃ (হেসে ফেললো তাতিয়ানা) সবাই না হলেও যে কয়জনার সাথে কথা হয়েছে, তারা তো তোমাকে ভালো বলেছে।
আমিঃ ওদের সাথে আবার আমার সম্পর্কে জানতে চাইলে কেন?
তাতিয়ানা হঠাৎ মাথা নীচু করে ফেললো। মনে হচ্ছিলো ও ঠিক কি উত্তর দেবে বুঝতে পারছিলো না। আমি প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য বললাম

আমিঃ তোমার বয়ফ্রেন্ড আছে তাতিয়ানা?
তাতিয়ানাঃ (অনেকটা আক্ষেপের স্বরে বললো) না।
আমিঃ ছিলো বোধহয়, তাই না?
তাতিয়ানাঃ (তাতিয়ানা আরেকটু খেদ টেনে বললো) ছিলো, সে ছিলো। এখন কেউ নেই।

এই মুহুর্তে ওকে আমার দুঃখী মনে হলো। বুঝলাম, তাতিয়ানার মন চিরকালের একজনকে খুঁজে ফিরছে। সেই সন্ধানী মনের তন্বি দেহটিকে কি নিরালায় ছুঁয়ে দেখবো? তাতিয়ানার বয়সটা এত কম, যেন সদ্য ফোটা একটি প্রস্ফুটিত ম্যাগনোলিয়া। হাতদুটো অধীর হয়ে উঠছে। ভাবলাম ওর সর্বাঙ্গে স্পর্শ বুলিয়ে তার তপ্ত মাধুর্য্য সমস্ত দেহমন দিয়ে অনুভব করি।
জানিনা আমার মনের কথা বুঝতে পারলো কিনা তাতিয়ানা।

তাতিয়ানাঃ কিছু বলবে?
আমিঃ তোমার ঘুম পাচ্ছেনা তাতিয়ানা?
তাতিয়ানাঃ তুমি ঘুমাবে?
আমিঃ হু, তুমি চলে গেলেই ঘুমাবো।
তাতিয়ানা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো, মুখের ভাব বলছে, “আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছ!”
অনেকটা আহত ব্যাথিত হয়ে তাতিয়ানা উঠে দাঁড়ালো।
তাতিয়ানাঃ আমি আজ যাই তাহলে?
আমিঃ আচ্ছা, কাল দেখা হবে।
যে ভঙ্গিতে ও দরজার দিকে হেটে গেল, তা বলছে, ‘আমার সাজ, পোষাক, প্রসাধন সবই বৃথা গেল।

তাতিয়ানা চলে যাবার পর আমিও কিছু সময় স্থবির বসে রইলাম। আমার জানালা গলে চাঁদের আলোর সাথে সাথে ডরমিটরির কোন রূম থেকে চাইকোভ্স্কীর সুর ভেসে এলো। বিমুর্ত এই সুর আনন্দ, বেদনা, হতাশা যে কোন মুহুর্তকেই অপরূপ করে তোলে। নারী-পুরুষের অন্তরঙ্গতায় এই সুর যেন এক অদ্ভুত আবেশ সৃষ্টি করে।

নয়ন ভরা জল গো তোমার, আচল ভরা ফুল,
ফুল নেব না অশ্রু নেব ভেবে হই আকুল।
মালা যখন গেঁথে ছিলে পাওয়ার সাধ যে জাগে,
মোর বিরহে কাঁদো যখন, আরো ভালো লাগে।

বিষণ্ন বিরিওজা – ৮

একটি পুরনো দিনের টুডোর ফোকস্ ভাগেন গাড়ীতে চড়ে যাচ্ছি আমি। যে রাস্তায় চল্‌ছি সেটা পাহাড়ি হতে পারে, বন্ধুর পথে প্রচন্ড ঝাঁকুনি খেতে খেতে যাচ্ছে গাড়িটি। কিছুদূর এগিয়ে যাবার পর ছোটখাট একটি টিলার পাশে এসে মোড় ঘোরালো ড্রাইভার। তার পরপরই রাস্তাটা নাক বরাবর, সোঁজা তীব্র গতিতে ছুটে চললো গাড়ী। হঠাৎ একটা অদ্ভুত সন্দেহ জাগলো আমার মনে। বাঁকের পর বাঁক ঘুরে মনে হলো একই পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে গাড়িটা। কেন? ভাবলাম ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করি। পরক্ষণেই মন থেকে বাতিল করে দিলাম চিন্তাটা। সহসা একটি বাঁকের কাছে এসে প্রচন্ড ঝাঁকুনি খেয়ে থেমে গেল গাড়িটা। ও ও ও ও ও……… পিলে কাঁপানো শব্দ করে পাহাড়, বন, নদী, সব দিক থেকে ধেয়ে এলো খাঁকি পোষাক পড়া একদল সসস্ত্র সৈন্য। ধক করে উঠল হৃৎপিন্ডটা। ড্রাইভারকে ডাকতে গিয়ে দেখলাম সিটে কেউ নেই, যেন ভোজবাজির মতো উধাও হয়ে গিয়েছে। এদিকে ক্রমশই এগিয়ে আসছে সৈন্যরা। বিপন্ন আমাকে ঐ মুহূর্তে একরাশ এলোমেলো দুশ্চিন্তা ঘিরে ধরলো, কারা ওরা? সৈন্য? কোন দেশের সৈন্য? আমার দিকে তেড়ে আসছে কেন? আমাকে মারতে চায়? আমাকে মেরে ওদের কি লাভ? ভাবতে ভাবতে ওরা আমার খুব কাছে চলে এলো, এত কাছে তারপরেও ওদের কারো মুখ দেখতে পাচ্ছিনা, মনে হচ্ছে ওদের মুখের জায়গাটা অদৃশ্য। কেন? কিন্তু এ মুহূর্তে চিন্তা করারও সময় নেই। আমাকে বাঁচতে হবে। দ্রুত গাড়ির দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে পড়লাম, দিকবিদিক জ্ঞানশূণ্য হয়ে ছুটতে লাগলাম। এতগুলো সৈন্যের সাথে আমি দৌড়ে পারব? তারপরেও ছুটছি, আমার পিছন পিছন ওরাও ছুটছে। ওদের থেকে অনেকটা দূরে চলে এসেছি, নিজেকে সামান্য নিরাপদ মনে হলো। হঠাৎ আমার সামনের মাঠ ফুরে বেরিয়ে এলো আরো কিছু সৈন্য । আমি সর্বশক্তি নিয়োগ করে ডান দিকে ছুটলাম । মনে হচ্ছে আমার চতুর্দিকেই বিপদ, কোথায় ছুটছি, কি করছি, কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। হঠাৎ বড় একটি গাছের সাথে ধাক্কা খেলাম। তারপর সব ফাঁকা। কেউ নেই। আমি মিটমিট করে চোখ খুললাম। জানালা গলে সোনালী রোদ আমার চোখে এসে পড়ছে। ভোর হয়ে গেছে। এতক্ষণ যা দেখছিলাম সব দুস্বপ্ন। আমার গায়ের স্লিপিং স্যুট ঘামে ভিজে চপচপ করছে। হৃৎপিন্ডের ধুকধুকানী এখনো আছে। আশ্চর্য্য! এই স্বপ্নটি আমিআগেও অনেকবার দেখেছি। একই স্বপ্ন বারবার দেখি কেন?

বিছানা ছেড়ে তখনো উঠতে পারিনি, আমার চোখের ঘুম ভেঙেছে কিন্তু শরীর তখনো ঘুমাচ্ছে। আরো কিছুক্ষণ শুয়ে রইলাম। গতরাতের কথা মনে পড়লো। তাতিয়ানার চলে যাওয়ার দৃশ্যটা মনে করে একটু ব্যাথিত হলাম। মেয়েটা কি মনে খুব দুঃখ পেয়েছে? কি জানি? কিন্তু আমি ঐ মুহূর্তে ওকে গ্রহণ করতে পারছিলাম না। অনেকগুলো আবেগ আমাকে ঘিরে ধরেছিলো। যদিও আমি অনেক দিন যাবৎ এদেশে আছি, কিন্তু এখনো আমি ওদের সাথে একাত্ম হতে পারিনি। আমি মদ খাইনা, তাই মদের আসরে আমার বসা হয়না। আর আমি ঐ আসরে বসে যদি না খাই, তাহলে ওরাও অস্বস্তি বোধ করে, তার থেকে না বসাই ভালো। যখন-তখন যেকোন মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করিনা। নারী-পুরুষ সম্পর্কটাকে আমার কাছে অত্যন্ত সিরিয়াস বলে মনে হয় এখানে নিছক ফানের কিছু নেই। নারী-পুরুষ সম্পর্কটা হওয়া উচিৎ পবিত্র, যাকে ভালোবাসোনা তাকে শয্যাসঙ্গিনীও করা যায়না। বাংলাদেশী ও মুসলিম টাবুও বোধহয় আমার মধ্যে কাজ করছিলো কাল রাতে। এদেশে আসার পর অবাধ মেলামেশা করছে সব দেশের ছেলেমেয়েরাই। সেই তালিকায় বাংলাদেশীরাও পিছিয়ে নেই। কিন্তু আমি এখন পর্যন্ত কোন মেয়ের সাথেই সম্পর্কে যাইনি। ঐ বোধগুলো কাজ করে বলেই বোধহয়। আবারো লুবনার কথা মনে হলো। অনেকগুলো বছর ওকে দেখিনা!

ইউনিভার্সিটিতে আজকে চারটি ক্লাস আছে। সবগুলো ক্লাসই ইমপর্ট্যান্ট, কোনটাই মিস দেয়া যাবেনা। ব্রেকফাস্ট করতে বসলাম। চা, ডিম পোচ, বাটার মাখানো ব্রেড টোস্ট আর কিছু পিচ ফল, এই ছিলো খাদ্য তালিকা। খুব মামুলি! যাক, স্টুডেন্টের ব্রেকফাস্ট কি আর রাজকীয় হবে? হঠাৎ অনেক বছর আগে পত্রিকায় পড়া একটা ঘটনা মনে পড়ল, “একদিন শুক্রবার ভোরে প্রেসিডেন্ট জিয়া নাশতা খাচ্ছিলেন ।
আয়োজন সামান্য-
চারটা লাল আটার রুটি, দুই পিস বেগুন ভাজি, একটা সিদ্ধ ডিম !

জিয়ার সঙ্গে নাশতার টেবিলে বসেছেন তাঁর বন্ধু এবং সহযোদ্ধো জেনারেল মঞ্জুর ।
জেনারেল মঞ্জুর বিস্মিত হয়ে বললেন, এই আপনার নাশতা ?
প্রেসিডেন্ট জিয়া বললেন, হতদরিদ্র একটি দেশের প্রেক্ষিতে এই নাশতা কি যথেষ্ট না? ”

ব্রেকফাস্ট সারার পর ধীরে ধীরে হেটে হেটে বাসস্ট্যান্ডের দিকে গেলাম। মিনিট পাঁচেক বাসের জন্য দাঁড়িয়ে মনে হলো, নাহ্‌, হেটে হেটেই ইউনিভার্সিটিতে চলে যাই। আমাদের আশি বছরের বৃদ্ধ অংকের টিচার আগ্রানোভিচ যদি হেটে হেটে এখান থেকে ইউনিভার্সিটিতে যেতে পারেন টগবগে তরুণ হয়ে আমি পারব না? আতাকারা ইয়ারোশা থেকে জিরজিন্‌স্কি স্কোয়ার পর্যন্ত দুইকিলোমিটারের মত পথটা খুব মনোরম। বিশেষত সামারে। চার লেনের চওড়া পিচ ঢালা সড়কের দুপাশে ঢালাই করা চওড়া ফুটপাত। পথের দুপাশে চার সারিতে সুন্দর করে লাগানো বার্চের সারি। শীতকালে এই গাছগুলোতে কোন পাতা থাকেনা একেবারেই ন্যাড়া। আর গ্রীস্ম আসার সাথে সাথে দু’একদিনের মধ্যেই কার্টুন ছবির মত দ্রুত পাতা গজিয়ে বড় হয়ে পাতায় পাতায় ভরে ঝাঁকড়া হয়ে ওঠে, তখন আর বিশ্বাসই করতে ইচ্ছে হয়না যে, এই দুদিন আগেও তারা একদম ন্যাড়া ছিলো। এখন সেপ্টেম্বর মাস। ক্যালেন্ডারের হিসাবে ফল সিজন। গাছের পাতায় পাতায় হলুদ ছোপ সেই সিজনের আগমনী ধ্বনী জানাচ্ছে। আর কিছুদিন পর পাতাগুলো পুরোপুরি হলুদ হয়ে ঝরতে শুরু করবে। এজন্য ইউক্রেণীয় ভাষায় এই ঋতুর নাম ‘লিস্তাপাদ’, মানে ‘পাতাঝরা’। এদেশে জনসংখ্যা কম তাই রাস্তাঘাটে অসহনীয় ভীড় থাকেনা। মনোরম ফুটপাত দিয়ে আমি এবং আমার মত দুএকজন হেটে হেটে যাচ্ছিলো। বার্চের পাতায় একটানা ঝিরঝির শব্দ তুলে চলছে দক্ষিণা হাওয়া। তার মাঝে মাঝে কিছু কিছু টোপল গাছ। এই গাছগুলোতে গ্রীস্মকালে এক ধরনের তুলা হয় আর বাতাসে খসে সারা শহরময় উড়তে থাকে মনে হয় যেন গ্রীস্মের ভর দুপুরে তুষারপাত হচ্ছে। এই নিয়ে একটা গল্প প্রচলিত আছে, কোন এক জারের রাণী জারকে বললো, “আমি তুষারপাত খুব পছন্দ করি কিন্তু গ্রীস্ম ঋতুতে তুষারপাত হয়না, তুমি জার, আমার জন্যে গ্রীস্মে তুষারপাতের ব্যবস্থা করতে পারোনা?” রাণীর ভালোবাসায় সিক্ত রাজা ভেবে ভেবে তখন এই বুদ্ধি করলেন, দেশব্যাপি টপোল গাছ লাগিয়ে দিলেন, আর প্রখর রৌদ্রের গ্রীস্মেও তখন উড়ন্ত টুকরো টুকরো তুলাগুলো তুষারপাতের দৃশ্যের অবতারনা করলো। আহা ভালোবাসা! নারীর আবদার পুরুষকে কত কিছুই না করিয়ে ছাড়ে!

দিনের বেলাটা ইউনিভার্সিটির ক্লাসরূমেই কাটলো। আমাদের ক্লাসে আবার একটা ইন্টারেস্টিং ঘটনা চলছে। সের্গেই আর লেনার মধ্যে চলছে প্রেম। এদিকে আমাদেরই ক্লাসমেট ইয়াকোভ লেনার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। সের্গেই আর লেনা ক্লাসরূমে বসে পাশাপাশি, আর তার ঠিক পিছনেই বসে ইয়াকোভ। ভার্সিটির করিডোরে সের্গেই আর লেনা পাশাপাশি হেটে যায়, আর তাদের পিছনে পিছনে হাটে ইয়াকোভ। সাশা ঠাট্টা করে বলছিলো, “ভেরি ইন্টারেস্টিং, শুধু এই দৃশ্য দেখার জন্যই আমার ইউনিভার্সটিতে আসতে মজা লাগে।” বিকালে ক্লাস শেষ হলো। রূমে ফিরতে ইচ্ছা করছিলো না। তাতিয়ানার কথা মনে হলো। ও যদি আসে? না, আজ প্রোস্তা মারিয়া হবেনা। সুতরাং এই কারণে ও আাসবে না। আমি আর রুমে ফিরলাম না। আলেক্সিয়েভ্‌কা স্টুডেন্টস টাউনের ট্রলিবাসে চড়ে বসলাম। উদ্দেশ্য, কবীর ভাইয়ের রূমে যাব।

কবীর ভাইদের ডরমিটরির গেটেই দেখা হলো আশরাফ ভাইয়ের সাথে। সাথে একটি মেয়ে। মেয়ে বলা বোধহয় ঠিক হলো না, কারণ সে কিছুটা বয়স্ক। এ্যারাউন্ড থার্টি হবে। অবশ্য আশরাফ ভাইও ঐ বয়সীই। আমাকে দেখে আশরাফ ভাই একটু লাজুক হাসলেন।
আশরাফ ভাইঃ আমাদের ডরমিটরিতে বেড়াতে এসেছেন? ওয়েল কাম, ওয়েল কাম। কবীর উপরে আছে, চলে যান। আমি এই আসছি।
বুঝলাম মহিলাটিকে এগিয়ে দিতে যাচ্ছে।

কবীর ভাই আমাকে পেয়ে ভীষণ খুশী। কফি চড়িয়ে দিলেন। প্যাকেট খুলে তস্তরীতে বিস্কিট ছড়িয়ে দিলেন। দুটি আপেল স্লাইস করে কাটলেন। ঐ খেতে খেতে গল্প শুরু করলাম। এর মধ্যে উপর তলা থেকে শিশির ভাই এসে উপস্থিত হলেন। কিছুক্ষণ পর বিরাট বড় একটা তরমুজ নিয়ে আশরাফ ভাই ঢুকলেন।
আশরাফ ভাইঃ বাসস্ট্যান্ডে দেখলাম, বিক্রি হচ্ছে, নিয়ে এলাম। এখানকার তরমুজ তো খুব মিষ্টি হয়, আসুন সবাই মিলে মজা করে খাই।
কবীর ভাইঃ ক্লাস তো শুরু হয়ে গেল। কেমন চলছে দিনকাল?
আমিঃ হ্যাঁ, এতোদিন ভ্যাকেশন ছিলো, মজায় ছিলাম। এখন তো আবার ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল।
আশরাফ ভাইঃ নতুন ইয়ার শুরু, ডরমিটরিতে নতুনা মেয়েরা এসেছা না?
আমিঃ (মুচকি হেসে) তাতো এসেছেই। আপনার কি খবর?
আশরাফ ভাইয়ের আমাকে এড়ানোর কিছু নাই, কারণ একটু আগেই আমি তাকে একজনার সাথে দেখেছি। তিনি তাই খোলাখুলি বললেন,
আশরাফ ভাইঃ ঐ যে মহিলা একজনকে দেখলেন রঙ্গ-রস করতে এসেছিলো।
আমিঃ তা রঙ্গ-রস হলো?
কবীর ভাইঃ (টিপ্পনী কেটে) রঙ্গ হয়েছে রস হয়নি।
হাঃ হাঃ হাঃ করে সবাই কোরাসে হাসলাম। আশরাফ ভাই লজ্জা পেয়ে গেলেন।
আশরাফ ভাইঃ ও তো বয়স্ক। ডিভোর্সড লেডি, ছোট একটা মেয়ে আছে। আপনার ওখানে তো ফার্স্ট ইয়ারের ফ্রেস মেয়ে আসার কথা।
আমিঃ তা তো এসেছেই।
শিশির ভাইঃ ছেলেপেলেরা তো তাহলে বেশ রঙ্গ-রস করছে।
আশরাফ ভাইঃ ছেলেপেলেদের কথা বাদ দেন। রিমন ভাই কি রঙ্গ-রস করছেন তাই বলেন।
আমিঃ (আমি হতাশ সুরের ভান করে বললাম) আমি কিছুই করছি না।
শিশির ভাইঃ কি বলেন সুযোগ পেয়েও করছেন না?
আশরাফ ভাইঃ সুযোগ এসেছে?
আমিঃ (রহস্য করে বললাম) হু, একটা মেয়ে আছে।
আশরাফ ভাইঃ বলেন কি? ফার্স্ট ইয়ার?
আমিঃ ইয়েস।
আশরাফ ভাইঃ খুব সুন্দরী?
আমি (হতাশার ভঙ্গি করে) নাহ্‌! নিতান্তই অসুন্দরী।
কবীর ভাইঃ তা কি করে হয়? এদেশের সব মেয়েই তো সুন্দরী।
আমিঃ মাই ব্যাড লাক। যে দু’একটা অসুন্দরী আছে, মেয়েটি তার তালিকায়।
আশরাফ ভাইঃ রিমন ভাই কি মেয়েটিকে বাতিলের খাতায় লিখে রেখেছেন?
আমিঃ মেয়েটির জন্য কি আপনার মনে দরদ জাগছে?
আশরাফ ভাইঃ ওকে দেখিনিতো।
আমিঃ আসেন একদিন দেখে যান। পছন্দ হলে প্রোপোজ করবেন।
লাজুক হাসলেন আশরাফ ভাই।
আশরাফ ভাইঃ ঠিক আছে আসবো একদিন, দেখে যাবো। তারমধ্যে আপনি একটু দেখেশুনে রাখুন। দেখবেন অন্য কেউ যাতে আবার ট্রাম্প করে না ফেলে।
আমিঃ আরে আশরাফ ভাই ট্রাম্প করলেই বা অসুবিধা কি? ট্রাম্পের উপর দিয়ে আবার ওভার ট্রাম্প করা যায়।
হাঃ হাঃ হাঃ । সবাই আরেক দফা কোরাসে হাসলো।
গল্পে গল্পে কখন যে বেলা শেষ হয়ে গেছে টের পাইনি। হঠাৎ কবীর ভাইয়ের রূম থেকে দেখলাম দূরে টিলা আর বনের উপর অস্ত যাচ্ছে লাল সূর্যটা। ধীরে ধীরে খারকভ শহরের উপর নেমে আসছে ঘন অন্ধকার। দ্রুত উঠে পড়লাম।

ট্রলিবাসটি ছুটে চলছে আতাকারা ইয়ারোশার স্টুডেন্টস টাউনের দিকে মাঝখানে ছয়টি স্টপেজ। স্টপেজগুলেতে বাস থামলে যাত্রীরা ওঠানামা করছে। অন্ধকারে আর বাসের বিশাল কাঁচের জানালা গলে প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগ নাই। যা উপভোগ করা যায় তা হলো, রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া আর স্ট্রীট ল্যাম্পগুলোর তীব্র আলোর ঝলকানি। এদেশেই প্রথম নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট স্থাপিত হয়। অতি ক্ষুদ্র পরমাণুর ভিতরে নিহিত রয়েছে অপরিসীম শক্তি। মানুষ রপ্ত করেছে সেই শক্তি বের করে আনার কায়দা। কি করবে সেই শক্তি দিয়ে সেটা শাসকের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে। এই পৃথিবীতে পারমানবিক শক্তি ব্যবহারের প্রথম সিদ্ধান্তটি ছিল মানুষের বিরুদ্ধে। পরমানু থেকে প্রবল শক্তি বাইরে বের করে আনা সম্ভব এটা তখন অনেকেরই জানা হয়ে গেছে। সেই সময় পৃথিবী জুড়ে চলছিলো ভয়াবহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল। চলছে শক্তির লড়াই, কে করবে পৃথিবী শাসন? কে হবে বিশ্বের দন্ডমুন্ডের কর্তা? তাই জার্মানী, জাপান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইত্যাদি বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে চলছে প্রতিযোগিতা কে প্রথম অর্জন করতে পারবে পরমানু থেকে শক্তি বাইরে বের করে আনার প্রযুক্তি। সর্বপ্রথম এই প্রযুক্তি অর্জন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ব্যাস ব্রহ্মাস্র চলে এলো হাতে। আর যায় কোথায়। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো মার্কিন সরকার,জাপানী জনগণের বিরূদ্ধে ব্যবহার করা হবে এই ব্রহ্মাস্র। পরমাণুর প্রবল শক্তিতে ছাড়খার হয়ে যাবে জাপানী জনগণ। হাহাকার করে উঠলো বিজ্ঞানীদের অন্তরাত্মা। এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে তারা এই প্রযুক্তি অর্জনে দিবারাত্রি পরিশ্রম করেননি। বারংবার তারা আর্জি করেন, সরকার যেন কিছুতেই তা ধ্বংসাত্মক কাজে ব্যবহার না করে। তাদের শত অনুনয় সত্বেও, মানবজাতির এত বড় একটি অর্জন প্রথম ব্যবহার করা হলো মানবজাতির বিরুদ্ধেই। বিশ্ববাসী হতবাক হয়ে দেখলো হিরোসিমা আর নাগাসাকির তান্ডবলীলা। মুহুর্তেই ঝরে গিয়েছিলো এক লক্ষ চল্লিশ হাজার নিরিহ নিরাপরাধ প্রাণ। এই প্রযুক্তি অর্জনকারী দ্বিতীয় রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম সফল প্রয়োগ ছিলো শান্তিপূর্ণ কাজে। তারা প্রতিষ্ঠা করেছিলো পৃথিবীর প্রথম নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট। অল্পতেই পাওয়া যাচ্ছে অফুরন্ত বিদ্যুৎ শক্তি। তাই এনার্জি ক্রাইসিসের কোন ধারণাই এদেশে নাই। বরং নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে তারা পশ্চিম ইউরোপে বিদ্যুৎ রপ্তানীও করে থাকে।

ডরমিটরিতে ঢোকার পথে সাশার সাথে দেখা হলো।
সাশাঃ আরে রিমন, তুমি বাইরে ছিলে?
আমিঃ হ্যাঁ, আমাকে খুঁজছিলে?
সাশাঃ একবার গিয়েছিলাম তোমার রুমে। জাস্ট ঢুঁ মারা আরকি। কেমন আছো জানতে।
আমিঃ চল, রূমে যাই।
সাশাঃ না থাক। দেখা তো হলোই। এখন রাত হয়ে গিয়েছে।
সেই রাতে আমার রূমে আর কেউ আসলো না।

পরদিন ক্লাশ শেষ করে কোথাও না গিয়ে সরাসরি রূমে চলে এলাম। কেন? সে কি তাতিয়ানা যাতে আমার রূমে ‘প্রোস্তা মারিয়া’ দেখতে পারে সেজন্যই? কি জানি? যাহোক তাড়াতাড়ি লাঞ্চ শেষ করে, রূমটা একটু গোছগাছ করে নিলাম। টিভি সেটটা অন করে রাখলাম। সেখানে রাশিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর একটা ডকুমেন্টারী ফিল্ম চলছে। রাজনীতিতে আমার আগ্রহ প্রচন্ড। মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলাম। প্রি ও পোস্ট সোভিয়েত রাজনীতির উপর ডকুমেন্টারিটি। বেশ ইন্টারেস্টিং। এক পর্যায়ে জর্জিয়া প্রজাতন্ত্রের রাজধানী তিবিলিসির ১৯৮৯ সালের নয়ই এপ্রিল ট্রাজেডি দেখালো। সেখানে এন্টি-সোভিয়েত মুভমেন্টে সমাবেশ ও অনশনরত মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো কম্যুনিস্ট পার্টির তল্পিবাহক সোভিয়েত আর্মি। এই অনশনের ফুটেজ দেখে আমার আরেকটি ঘটনা মনে পড়লো। ১৯৮১ সালের গোঁড়ার দিককার কথা। আমি তখন নিতান্তই বালক। হঠাৎ পত্র-পত্রিকায় দেখলাম এক কিশোরকে নিয়ে ভীষণ হৈচৈ। লন্ডনের জেলে কয়েকজন আইরিশ কয়েদি আমরণ অনশন করছে। পত্র-পত্রিকায় খবর এটুকুই। আর একটু বিস্তারিত জানা গেল আরও দুদিন পর। আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির (আইআরএ) গ্রেপ্তারকৃত যে যোদ্ধারা অনশন করছিল তাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছেলেটির নাম ববি স্যান্ডস। বয়স মাত্র সতের! সেই সতের বছরের কিশোর অনশণ করছিল রাজবন্দী ঘোষণার দাবীতে! থ্যাচার সরকার তাদের গ্রেপ্তার করেছিল ‘সন্ত্রাসী’ বলে। তারা সেটি মানতে নারাজ। তাদের দাবী তারা আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির সদস্য, এবং ব্রিটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতার দাবীতে। সুতরাং তারা রাজবন্দী কেন নয়? কিন্তু মার্গারেট থ্যাচার সরকার কিছুতেই ওই আইআরএ যোদ্ধাদের রাজবন্দীর মর্যাদা দেবেনা। টানা অনশন করতে করতে একসময় মৃত্যুবরণ করলেন ববি স্যান্ডস। ওই কিশোরের মৃত্যুর পর পরই সারা বিশ্বে এ নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। একের এর পর এক আরও কয়েকজন বন্দীর মৃত্যু হয়েছিল। ঐ রকম এক সুদর্শন কিশোরের সাদাকালো ছবি খবরের কাগজে দেখে আমি অনেকক্ষণ চোখ ফেরাতে পারিনি। একইসাথে ব্যাথিত ও অভিভুত হয়েছিলাম। ও তারুণ্য কি তোমার দুর্বার শক্তি কেমন অনায়াসেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলে! কিন্তু লৌহমানবী খ্যাত থ্যাচারের লৌহহৃদয় তাতে এতটুকুও গলেনি। শেষ পর্যন্ত তাদের রাজবন্দীর ‘মর্যাদা’ দেয়া হয়নি।

ডকুমেন্টারী ফিল্মটা শেষ হওয়ার পর কিছু বিজ্ঞাপন হলো। এক সময় সোভিয়েত টিভিতে কোন বিজ্ঞাপন ছিল না। এখন বেশ চটকদার চটকদার রকমারী বিজ্ঞাপন হয়। বিজ্ঞাপন শেষে প্রোস্তা মারিয়া শুরু হলো। মারিয়া দেখায় আমার তেমন কোন আগ্রহ নেই তারপরেও আজ কেন জানিনা দেখতে শুরু করলাম। দশ মিনিট পার হয়ে গেল, ভাবলাম একটু চা খাওয়া যাক। ইলেকট্রিক কেট্লটা হাতে নিয়ে দেখলাম, খালি। পানি আনতে পাশের বাথরূমে যাওয়া প্রয়োজন। সেই উদ্দেশ্যে দরজা খুলতেই দেখলাম তাতিয়ানা দঁড়িয়ে আছে। নক করতে উদ্যত হচ্ছিলো। কেন জানিনা আমার মনটা খুশিতে ভরে উঠলো। আমি কি ওর জন্য অপেক্ষা করছিলাম? না, কখনোই না, আমার মন বলছে, না। তাহলে ওকে দেখে আমি খুশী হলাম কেন? আবার মন তীব্র প্রতিবাদ করে উঠলো। কিছুতেই আমি ওকে দেখে খুশী হইনি। ওকে দেখে খুশী হবো কেন? ও আমার কে?

আজ সাদাসিদা পোষাকে আছে ও। প্রসাধনও নেই কোন। ডিভানে বসে একমনে ‘প্রোস্তা মারিয়া’ দেখছে। ফিল্মের এক জায়গায় বিয়ের প্রসঙ্গ এসেছিলো। ছেলে নিজে মেয়ে পছন্দ করেছে, কিন্তু বাবা মা রাজী হচ্ছে না। কারণ মেয়ের পরিবারের অর্থনৈতিক স্ট্যাটাস ছেলের পরিবারের চাইতে অনেক নীচে। আমি এক সময় ভাবতাম এই কালচারটা কেবল ভারত উপমহাদেশের সমাজেই রয়েছে। পরে আমার আরব বন্ধুদের সাথে আলোচনা করে জেনেছিলাম, ওদের দেশেও একই ব্যাপার। একবার আমার এক সিরিয়ান বন্ধু, বললো, এবারের ছুটিতে ও দেশে গিয়ে এনগেজমেন্ট করে এসেছে। আমি ওকে অভিনন্দন জানিয়ে জানতে চাইলাম, “মেয়ে কেমন?” ও উত্তর দিলো, “আমাদের দেশে মেয়েকে যত না দেখা হয়, তার চাইতে বেশি দেখা হয় মেয়ের পরিবারকে”। ল্যাটিন আমেরিকান টেলে-সিরিয়ালগুলোর কল্যাণে জানলাম, ওখানেও একই অবস্থা। একবার মার্কিনী এক ফিল্মেও এই বিষয়টি দেখে বেশ অবাক হয়েছিলাম। রাশিয়াতে এই সমস্যাটি এখনো নেই। সমাজতন্ত্রের কল্যাণে, অর্থনৈতিকভাবে সবাই সমান হওয়াতে, এই সামাজিক স্তরজনিত সমস্যা কম ছিলো। তবে সুশিক্ষিত ভদ্র পরিবার ও নিম্নমানের পরিবার এই বিষয়টি আছে।

সিরিয়াল শেষ হলে তাতিয়ানা আমাকে প্রশ্ন করলো
তাতিয়ানাঃ তোমাদের দেশে বিয়ের পদ্ধতি কি? এ্যারেন্জড ম্যরেজ না লাভ ম্যারেজ?
আমিঃ দুটোই আছে। তোমাদের দেশে বিয়ের একটাই পদ্ধতি – নিজের পছন্দ বা ভালোবাসার বিয়ে।
তাতিয়ানাঃ হু। তবে আজকাল প্রচুর হিসেবের বিয়ে হচ্ছে।
আমিঃ হিসেবের বিয়ে মানে?
তাতিয়ানাঃ মানে ছেলে মেয়েরা হিসেব করে, এই বিয়েটা করে কতটুকু লাভ হবে।
আমিঃ তাই?
তাতিয়ানাঃ হ্যাঁ। এখন দেশের সমাজ কাঠামোর পরিবর্তন হয়েছে। ধনী-গরীব বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। তাই বিয়ের মধ্যেও টাকা-পয়সা ব্যাপারটা চলে এসেছে।
আমিঃ ও, জানতাম না।
তাতিয়ানাঃ মেয়েরা বিশেষতঃ টাকাওয়ালা ছেলে খোঁজে। তারপর সেরকম পেলে তাকে নানাভাবে জালে আটকানোর চেষ্টা করে।
আমিঃ তোমার কি মনে হয়? কোনটা ভালো, এ্যারেন্জড ম্যরেজ না লাভ ম্যারেজ?
তাতিয়ানাঃ নিজের পছন্দের বিয়ে হলেই ভালো কারণ সেটা ভালোবাসার বিয়ে, মনের মানুষটাকে নিয়েই তো ঘর বাঁধতে ইচ্ছা হয়।
আমিঃ তোমাদের দেশের অনেকেই একাধিক সম্পর্কের পর বিয়ে করে, সেই বিয়েটা কি আদৌ ভালোবাসার?
তাতিয়ানাঃ লুবোভ প্রিখোদিত ই উখোদিত।
আমিঃ মানে কি?
তাতিয়ানাঃ ভালোবাসা আসে আর যায়।
আমিঃ এটা কেমন কথা? ভালোবাসা কি এতোই ঠুনকো?
তাতিয়ানা হেসে ফেললো। গত পরশু রাতের ঘটনার পর থেকে এই পর্যন্ত ওকে খুব গম্ভীর দেখছিলাম। মুক্তোর মতো দাত বের করে এই হঠাৎ হাসির ঝলক খুব ভালো লাগলো। যেন অনেকক্ষণের গুমোট বাতাস উড়িয়ে নিয়ে গেল।
তাতিয়ানাঃ না। কথাটা আমাদের দেশে প্রচলিত আছে। অনেকে বলে আমি বিশ্বাস করিনা। ভালোবাসা ভালোবাসাই তা ঠুনকো হবে কেন?
আমিঃ তবে একটি বিষয় কি জানো? ভালোবাসলেই ঘর বাধা যায়না।
তাতিয়ানাঃ কেন?
আমিঃ অনেক সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, আইনগত জটিলতা থাকে।
তাতিয়ানাঃ ও। পৃথিবীতে কেন এতো জটিলতা বলতো? (ওর হতাশ কন্ঠ প্রকাশ পেল)
আমিঃ এ্যারেন্জড ম্যরেজের সুবিধা হলো, বিবাহোত্তর জীবনে টাকা একটা বড় ফ্যক্টর হয়ে দেখা দেয়, তাই সেটা নিশ্চিত করা জরুরী, বিয়ের আগে বিশাল আবেগ থাকে, কিন্তু বৈবাহিক জীবনের একটা পর্যায়ের পরে সেটা তিরোহিত হয়।
তাতিয়ানাঃ তুমি তাই মনে করো?
আমিঃ ঠিক বলতে পারবো না। আমার বাস্তব কোন অভিজ্ঞতা নেই তো। বই-পত্র, নাটক-নভেলে যা দেখি।
তাতিয়ানাঃ ভালোবাসা দিয়ে কি দুজন-দুজনের অভাবগুলোকে পুরণ করা যায়না?
আমিঃ জানিনা। যায় হয়তো। এই নিয়ে একটা গান আছে আমাদের ভাষায়।
তাতিয়ানাঃ কি গান? (ভীষণ উৎসাহিত হয়ে উঠে বললো তাতিয়ানা)
আমিঃ আমার না যদি থাকে সুর, তোমার আছে তুমি তা দেবে,
তোমার গন্ধ হারা ফুল আমার কাছে সুরভী নেবে,
এরই নাম প্রেম, এরই নাম প্রেম, ………………..।
তাতিয়ানাঃ (দ্বিগুন উৎসাহ নিয়ে) তোমার কাছে আছে গানটি? শোনাবে আমাকে। অনুবাদও করে দিও প্লিজ
আমি কিংবদন্তির বাঙালী গায়ক মান্না দে’-র গাওয়া গানটি চালিয়ে দিলাম।
” কি অদ্ভুত সুন্দর সুর” উচ্ছাস প্রকাশ করে। গভীর আবেগে তা শুনতে লাগলো বাংলাদেশ থেকে হাজার যোজন মাইল দূরে বসে থাকা এক ইউক্রেণীয় তরুণী।

আমার না যদি থাকে সুর, তোমার আছে তুমি তা দেবে,
তোমার গন্ধ হারা ফুল আমার কাছে সুরভী নেবে,
এরই নাম প্রেম, এরই নাম প্রেম,
জীবনে যা গৌরবও হয় মরণেও নেই পরাজয়,
চোখের স্মৃতির মণিদ্বীপ মনের আলোয় কভু কি নেভে?
এরই নাম প্রেম, এরই নাম প্রেম,
দুজনেই দুজনাতে মুগ্ধ, দুজনার রূপে কত সুন্দর,
দুজনার গীতালীর ছন্দে, তন্ময় দুজনার অন্তর,
এর কাছে স্বর্গ সুধার বেশী আছে মূল্য কি আর,
আমার দেবতা সেও তাই, প্রেমের কাঙাল পেয়েছি ভেবে,
এরই নাম প্রেম, এরই নাম প্রেম।

বিষণ্ন বিরিওজা – ৯

বাহ্ মেয়েটিতো সুন্দর!” বেশ উচ্ছসিত হয়ে বললেন আশরাফ ভাই। পাশে বসে মুচকি হাসলেন শিশির ভাই।
ডিভানের এক পাশে চুপচাপ বসে ছিলো তাতিয়ানা। ও বাংলা বোঝেনা তাই আমাদের সুবিধা হচ্ছিলো। এদেশে এটাকে অভদ্রতা মনে করা হয়, যখন ভিনদেশী একজন বা কয়েকজনার উপস্থিতিতে কেউ কেউ তার মাতৃভাষা বা এমন কোন ভাষায় কথা বলে যা সবাই বুঝতে পারেনা। কিন্তু আমরা বাঙালীরা অত ভদ্রতা বুঝিনা। সমানে অন্যদের সামনে বাংলায় কথা বলে যাচ্ছি। অন্যে যে আমার কথাটা বুঝতে পারছে না,সে বিব্রত বোধ করতে পারে, এটা চিন্তা না করে বরং এটার সুযোগই নেই বেশীর ভাগ সময়ে।

আশরাফ ভাই আর শিশির ভাই, আমার রুমে এসেছিলেন বেড়াতে। আধ ঘন্টা তক গল্প-গুজব করার পর এক পর্যায়ে তাতিয়ানা এসে ঢুকলো আমার রূমে। সাদা টপস আর কালো স্কার্ট পরিহিতা তাতিয়ানাকে আমার খুব সাদাসিদে মনে হচ্ছিলো। যার সম্বন্ধে আমি ইতিমধ্যেই উনাদেরকে বলেছি, ‘অসুন্দর’। সেই মেয়েটিকেই আশরাফ ভাই সুন্দরী আখ্যা দিলেন! আসলে পছন্দের রকমফের হয়।একবার রাশিয়ার ভ্লাদিমির শহরে বেড়াতে গিয়েছিলাম। একটি উঁচু টিলায় বসে শহরের বুক চিরে চলে যাওয়া ছোট একটি নদীর সৌন্দর্য্য উপভোগ করছিলাম। এসময় দুটি রুশ মেয়ে এগিয়ে এসে আমার পাশে বসা ভ্লাদিমিরে অধ্যয়নরত আমার বন্ধুটির সাথে কুশল বিনিময় করলো। দুজনাই ইউনিভার্সিটিতে সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী। এদের মধ্যে একজন ছিলো দীর্ঘাঙ্গী, প্যান্ট শার্ট পরা, অপরজন ছিলো মাঝারী গরনের, পরনে স্কার্ট। ওরা চলে যাওয়ার পর আমার বন্ধুটি বললো, “কেমন দেখলি ঐ মেয়েটিকে?”
আমিঃ কোন মেয়েটি?
বন্ধুঃ স্কার্ট পড়া মেয়েটি।
আমিঃ হাসিখুশী।
বন্ধুঃতা ঠিক আছে। কিন্তু দেখতে কেমন?
আমিঃ হু, মোটামুটি। (দায়সারা গোছের উত্তর দিলাম)
বন্ধুঃ সুন্দর না, তাইনা?
আমিঃ হ্যাঁ, তাই। এবার সত্যি কথাটা বললাম।
বন্ধুঃ অথচ, এক ইন্ডিয়ান ছেলে ওর জন্য পাগল। ছেলেটি খুব ভদ্র। মেয়েটিকে ভীষণ ভালোবাসে। মেয়েটির জন্য ও কেঁদেছে পর্যন্ত। ওর বক্তব্য, “এতো সুন্দর মেয়ে আমি জীবনে কখনো দেখিনি”।
আমি ভাবলাম, এজন্যই বোধহয় গান রচিত হয়েছে, ‘যার নয়নে যারে লাগে ভালো!’

আশরাফ ভাইরা চলে যাওয়ার পর আমি কিছুক্ষণ টিভি দেখলাম। কালকে একটা ক্লাস টেস্ট হবে, পড়তে ইচ্ছা করছিলো না। ফাইনাল ইয়ারে এসে আর ক্লাস টেস্টে কোন টেস্ট পাইনা। টিভিতে চলা এ্যমেরিকান ফিল্মটি বোগাস মনে হলো। সব এক ধাঁচের। ক্রাইম, খুন, গাড়ী ভাঙা, টাকা আর সেক্স। এই হলো এ্যামেরিকান ফিল্মের মাল-মশল্লা! কফি তেস্টা পেলো। ইলেকট্রিক কেটলটা অন করলাম।

টুক টুক টুক, তাতিয়ানা হতে পারে। আজকাল দিনে দুবারও আসে। যা ভেবেছিলাম তাই। তাতিয়ানাই। পোষাক পাল্টে এসেছে। পরনে হালকা খাটো সাদা শার্ট আর কালো রঙের মিনি স্কার্ট। যথারিতি সিডাকটিভ পোষাক। ও কি আমাকে সিডিউস করার জন্য এই পোষাক পড়েছে? বুঝিনা। হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। এখানে তো ঐ পোষাক স্বাভাবিক। এই মুহুর্তে করিডোরে অনেক মেয়েকেই ঐ পোষাকে দেখা যাবে।

আমিঃ বসো।
তাতিয়ানাঃ কি করছো?
আমিঃ কিছুনা। টিভি দেখার চেষ্টা করছিলাম। বোগাস এ্যামেরিকান ফিল্ম।
তাতিয়ানাঃ অন্য চ্যনেলে দেখো কি আছে।
আমিঃ মুড নাই।
তাতিয়ানাঃ তাহলে গান শোন।
আমিঃ গান? হ্যাঁ, গান শোনা যায়।
তাতিয়ানাঃ তাহলে চালাও।
আমিঃ ওকে
এই বলে আমি ক্যাসেট প্লেয়ারের সুইচ অন করতে গিয়ে থেমে গেলাম।
তাতিয়ানাঃ কি ব্যাপার?
আমিঃ না থাক।
তাতিয়ানাঃ কেন?
আমিঃ এখানে তুমি আছো।
তাতিয়ানাঃ আমি থাকাতে গান শুনতে অসুবিধা কি?
আমিঃ আমি তো বাংলা গান শুনি। তুমি তো বুঝবে না। শুধু শুধু বোর ফীল করবে।
তাতিয়ানাঃ ওহো, এই ব্যাপার! না তোমাদের গানের অর্থ আমি বুঝিনা সত্য, কিন্তু সুর খুব ভালো লাগে।
আমিঃ একটা গান শুনেই সুর ভালো লেগে গেল?
তাতিয়ানাঃ একটা গান? না একটা গান না। আমি আগেও তোমাদের দেশের গান অনেক শুনেছি।
আমি সরু চোখে ওর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম
আমিঃ আমার আগেও আরো কারো কাছে আমাদের গান শুনেছ নাকি?
তাতিয়ানাঃ (হেসে ফেললো) না, কারো কাছে নয়। আমি ইন্ডিয়ান ফিল্ম দেখি মাঝে মাঝে। সেখানে তো অনেক গান থাকে। গান ছাড়া তো কোন ফিল্ম করতে পারোনা তোমরা।
আমিঃ কোথায় দেখো ইন্ডিয়ান ফিল্ম?
তাতিয়ানাঃ টিভিতে তো দেখায়। তাছাড়া আাদের গ্রামের সিনেমা হলেও আসে মাঝে মাঝে।
আমিঃ ও।
তাতিয়ানাঃ আচ্ছা তোমাদের ফিল্মগুলো গান ছাড়া হয়না, না?
আমিঃ তুমি তো ইন্ডিয়ান ফিল্মের কথা বললে। আমি তো ইন্ডিয়ান না, বাংলাদেশী।
তাতিয়ানাঃ জানি তোমাদের ভিন্ন ভিন্ন দেশ, কিন্তু আমার কাছে তোমাদের একই রকম মনে হয়। ইন্ডিয়ান বাংলাদেশীতে পার্থক্য কি খুব বেশী?
আমিঃ কিছু পার্থক্য তো আছেই। তা নইলে আলাদা আলাদা দেশ হবে কেন?
তাতিয়ানাঃ সে বোধহয় আমাদের ইউক্রেন আর রাশিয়ার মতো।
আমিঃ হতে পারে। ফিল্মে গানের কথা যেটা বলছো, ওটা কিন্তু হিন্দি ছবির আগে বাংলা ফিল্মেই প্রথম এসেছে।
তাতিয়ানাঃ তাই?
আমিঃ যতদূর জানি, প্লে-ব্যাক বিষয়টি, মানে নেপথ্যে গায়ক-গায়িকা গান গাইবে, আর পর্দায় নায়ক-নায়িকা লীপ মিলাবে এই বিষয়টি পৃথিবীতেই প্রথম চালু করা হয় বাংলা সিনেমায়।
তাতিয়ানাঃ তাই? তোমাদের সিনেমায়?
আমিঃ হ্যাঁ, তবে তখন ফিল্ম ঢাকায় চিত্রায়িত হতোনা, হতো কোলকাতায়।
তাতিয়ানাঃ ইন্টারেস্টিং। আমাদের রুশ কিছু ছবিতেও তো প্লে-ব্যাক রয়েছে।
আমিঃ আমি দেখেছি। বিখ্যাত ছবি ‘কাভখাজকাইয়া প্লেননিত্সা’, ‘ইরোনিয়া সুদবি ইলি এস লিওগকিম পারোম’, ইত্যাদি ছবিগুলেতে প্লে-ব্যাক আছে।
তাতিয়ানাঃ তাইতো। তার মানে এটা আমরা তোমাদের কাছ থেকে শিখেছি?
আমিঃ তাইতো মনে হয়। বাই দ্য বাই। আমি কিন্তু তোমাদের টিভিতে একটা প্রোগ্রাম দেখেছিলাম, ‘সিনেমার গান’ নামে।
তাতিয়ানাঃ হ্যাঁ, এক সময় খুব জনপ্রিয় ছিলো ঐ প্রোগ্রাম।
আমিঃ আমাদের দেশেও ‘ছায়াছন্দ’ নামে ঐরকম একটি প্রোগ্রাম খুবই জনপ্রিয় ছিলো।
তাতিয়ানাঃ ইন্টারেস্টিং, দেখতে পারলে ভালো লাগতো।
আমিঃ দেখবে?
তাতিয়ানাঃ কিভাবে?
আমিঃ ভিডিও চালিয়ে দেই।
তাতিয়ানাঃ ক্যাসেট আছে?
আমিঃ আছে।
তাতিয়ানাঃ চালাও তাহলে।
আমি গীতমালার একটি ক্যাসেট হাতে নিলাম, এখানে কিছু বাংলা ও হিন্দি গান রয়েছে। ভিডিওটার কাছে গিয়ে বললাম

আমিঃ না আজ থাক
তাতিয়ানাঃ (অনেকটাই ক্ষিপ্ত হয়ে) আজ থাকবে কেন? আশা দিয়ে এভাবে নিরাশ করো! দিস ইজ ভেরি ব্যাড।
আমিঃ না, নিরাশ করতে চাচ্ছিনা। মানে আজ অনেক রাত হয়ে গেছে।
তাতিয়ানাঃ কি হয়েছে তাতে? আমি কি হাজার মাইল দূরে থাকি নাকি?
আমিঃ কাছেই থাকো (একটু দমে গিয়ে বললাম)
তাতিয়ানাঃ তোমার ফ্লোরেই তো থাকি। আর দুটো রূম পরে। গভীর রাত হলেই বা সমস্যা কি?
আমিঃ না, তার পরেও।
তাতিয়ানাঃ তার আবার পর কি? এখানে কি আমার বাবা-মা আছে যে, আমার ফিরতে দেরী হলে তাদের রাতে ঘুম হবে না? ডরমিটরিতে তো আমরাই রাজা।
ওর এতো মারমুখো কথায় আমি আর, বাধা দিতে পারলাম না। ভিডিওটা অন করে দিলাম। গীতমালা বা ছায়াছন্দ চলতে শুরু করলো। তাতিয়ানাকে দেখলাম বেশ মুগ্ধ হয়ে দেখছে।
তাতিয়ানাঃ আচ্ছা এখানে যেমন দেখায়, তোমাদের দেশে প্রেমিক-প্রেমিকা কি সত্যিই এমন নাচ-গান করে?
আমিঃ সব্বোনাশ! রাস্তা-ঘাটে এরকম নাচ গান করলে রক্ষে আছে?
তাতিয়ানাঃ কেন কেন, কি অসুবিধা?
আমিঃ পাবলিক ধাওয়া দেবে।
তাতিয়ানাঃ বুঝলাম না!
আমিঃ মানে এরকম হয়না। আমাদের কালচারে নেই। এটা কেবলই সিনেমা।
তাতিয়ানাঃ ও, স্বপ্নের জগৎ!
আমিঃ তবে তোমরা এদিক থেকে এগিয়ে আছো।
তাতিয়ানাঃ কি রকম?
আমিঃ তোমাদের এখানে ডিসকো-টেকা হয়। সেখানে নাচ-গান করো। প্রেমিক-প্রেমিকা একে অপরের সান্যিধ্যে এসে ক্লোজ ড্যান্স করতে পারো।
তাতিয়ানা মৃদু হেসে বললো
তাতিয়ানাঃ তুমি ডিসকোতে যাওনা?
আমিঃ খুব কম।
তাতিয়ানাঃ তোমাকে দেখিনি কখনো।
আমিঃ কম যাই, তাই দেখোনি।
তাতিয়ানা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে, একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বললো
তাতিয়ানাঃ চলোনা নেক্সট স্যটারডেতে যাই।
আমিও একটু চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লাম। কি উত্তর দেব। এই মেয়েটির সাথে আমি নিজেকে জড়াতে চাইনা। একটু থেমে ক্ষীণ স্বরে উত্তর দিলাম
আমিঃ দেখি।

ঐরাতে তাতিয়ানা আরো একঘন্টা আমার রূমে বসে সিনেমার গান শুনেছিলো। তারপর চলে যাওয়ার জন্য নড়েচড়ে বসে বললো
তাতিয়ানাঃ খুব রোমান্টিক, তোমাদের এই গানগুলো!
ও উঠে দাঁড়াতেই বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো।
তাতিয়ানাঃ বাহ্ বৃষ্টি! তোমাদের দেশে তো অনেক বৃষ্টি হয়, তাই না?
আমিঃ হ্যাঁ আমাদের দেশে ঝম-ঝম বর্ষা নামে। ঝিলের বুকে শাপলা ফোটে। উথাল-পাতাল জোছনায় ভরে যায় চারিদিক। হালের দুপাশে দিগন্তজোড়া ধান ক্ষেত, তার উপর দিয়ে হু হু করে বয়ে যায় দুরন্ত হাওয়া!

তাতিয়ানা গভীর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো, জানিনা ও কি ভাবছে।

তাতিয়ানা উঠে দাঁড়ালো। আমি ভাবলাম চলে যাবে তাই উঠে দাঁড়িয়েছে। আমিও উঠে দাঁড়াতে যাব, এসময় ও আবার বসে পড়লো।
তাতিয়ানাঃ কি ধরনের ফিল্ম পছন্দ কর তুমি?
আমিঃ সব রকমই।
তাতিয়ানাঃ তাই হয় নাকি?
আমিঃ কেন হবে না?
তাতিয়ানাঃ সবার কি সব পছন্দ হয়? এই ধর রঙ , তোমার কি সব রঙই পছন্দ?
আমিঃ না।
তাতিয়ানাঃ এই দেখো, কোন একটি বিশেষ রংয়ের প্রতিই তোমার দুর্বলতা রয়েছে।
আমিঃ না ঠিক তাও নয়। কোন একটি বিশেষ রংয়ের প্রতি নয়, কিছু কিছু রং ভালো লাগে। যেমন আকাশী, ম্যাজেন্টা, বেগুনী।
তাতিয়ানাঃ তাইতো বলছি, সব ভালো লাগতে পারেনা। ভালো হলেও না। আবার ধরো ফুল, ফুল সবই তো সুন্দর, তারপরেও নিশ্চয়ই কোন একটি ফুল তোমার বেশি ভালো লাগে?
আমিঃ হ্যাঁ, তবে আবারও সেই, একটি নয় কয়েকটি ফুল আমার ভালো লাগে।
তাতিয়ানাঃ কোন কোন ফুল ভালো লাগে তোমার?
আমিঃ আমার ভালো লাগার ফুলগুলো দিয়ে তোমার বাগান ভরিয়ে দিতে চাও নাকি?
তাতিয়ানাঃ যাহ্ (লজ্জ্বা পেয়ে গেল তাতিয়ানা)। এম্নিই জানতে চাইছি।
আমিঃ আমার যে ফুলগুলো ভালো লাগে, তার কিছু তোমাদের দেশে আছে, আর কিছু কেবল আমাদের দেশেই আছে।
তাতিয়ানাঃ তোমাদের দেশে বুঝি অনেক ফুল ফোটে?
আমিঃ হ্যাঁ, তাতো ফোটেই। ট্রপিকাল কান্ট্রি। আবহাওয়া ভালো।
তাতিয়ানাঃ তাহলে নিশ্চয়ই তোমাদের দেশ পুরোটাই ফুল দিয়ে সাজানো অদ্ভুত সুন্দর একটা দেশ।
এবার আমার দীর্ঘনিশ্বাস ফেলার পালা। আমার দেশ সাজালে-গোছালে অবশ্যই অদ্ভুত সুন্দর একটা দেশ হওয়ার কথা। কিন্ত বিধাতা আমাদের যা দিয়েছেন, তার কিছুই আমরা কাজে লাগাতে পারিনি! রুচিবোধ বলে তো কিছুই আমাদের নেই। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রতিটি শহর একেবারে ডাস্টবিন বানিয়ে রেখেছি। আর এদের সামান্য যা আছে, তাই দিয়েই এরা স্বর্গ রচনা করেছে।

তাতিয়ানাঃ কই বললে না তো তোমার কোন কোন ফুল ভালো লাগে?
আমিঃ আমার দেশের ফুলের মধ্যে, রজনীগন্ধা, কৃষ্ণচূড়া, বাগানবিলাস, কামিনী, কাঠ গোলাপ, অলকানন্দা, মাধবীলতা, ডালিয়া। তোমার দেশের মধ্যে যেগুলো আমার দেশেও পাওয়া যায়, লিলি, জেসমিন, গ্লাডিওলাস, ক্রিসেনথিমাম। যা তোমার দেশে পাওয়া যায় কিন্তু আমার দেশে নেই, যেমন কারনেশন, টিউলিপ।
তাতিয়ানাঃ ওরে বাব্বা! কোন ফুলই তো বাদ রাখলে না।
আমিঃ অনেকটা সেরকমই হয়ে গেল।
তাতিয়ানাঃ আসলে কি জানো?
আমিঃ কি?
তাতিয়ানাঃ তোমার মনটা খুব সুন্দর! সুন্দর মনের মানুষরা ফুল প্রিয় হয়।
আমিঃ তাই? (একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললাম আমি)
তাতিয়ানাঃ আমি প্রথম দিন যেদিন তোমার রূমে ঢুকেছি সেদিনই লক্ষ্য করেছি, তোমার ঘর ভরা ফুল। এখানে সেখানে ফুলদানী আর তাতে নানা রংয়ের ফুল। তোমার পর্দার প্রিন্টেও খুব সুন্দর ফুলের ছবি তোলা। ডিভানের কাভারটাও ছোট ছোট চমৎকার ফুলের প্রিন্ট।
আমিঃ থাক থাক আর বলতে হবেনা। প্রশংসা বেশি হয়ে যাচ্ছে।
তাতিয়ানা: তোমাদের দেশে গোলাপ নেই গোলাপের কথা বললে না যে?
আমিঃ ও, গোলাপ! আসলে গোলাপ খুব কমোন একটা ফুল। আমি একে অসুন্দর বলবো না। গোলাপ তো সুন্দরই। তবে খুব কমোন হওয়ায় বোধহয় এর প্রতি আসক্তি কমে গিয়েছে।
তাতিয়ানাঃ গোলাপের প্রতি আসক্তি কমিও না।
আমিঃ কেন?
তাতিয়ানাঃ প্রিয়জনকে গোলাপই উপহার দিতে হয়।
আমি হেসে ফেললাম।
আমিঃ আচ্ছা ঠিকআছে, কোনদিন প্রিয়জন হলে আমি গোলাপই উপহার দেব।
হঠাৎ খুব করুণ চোখে আমার দিকে তাকালো তাতিয়ানা। আমি একটি বিব্রত হয়ে গেলাম। ওর দৃষ্টি হঠাৎ বদলে গেলো কেন?
তাতিয়ানাঃ তারপর ফিল্ম? ফিল্ম সম্পর্কে তো কিছু বললে না?
আমিঃ তুমি বলো। তোমার কি ধরনের ফিল্ম ভালো লাগে?
তাতিয়ানাঃ উঁ, হরর মুভি ভালো লাগে। তবে সবচাইতে বেশি ভালো লাগে রোমান্টিক মুভি।
আমিঃ আমি সব মুভিই দেখি, তবে ক্লাসিকাল মুভিগুলো বেশী ভালো লাগে।
তাতিয়ানাঃ তোমার দেশে টিভিতে এ্যরোটিকা দেখায়?
আমিঃ না।
তাতিয়ানাঃ কেন?
আমিঃ মুসলমানদের দেশ। টিভিতে এ্যরোটিকা দেখানো আন এথিকাল মনে করা হয়।
তাতিয়ানাঃ আমাদের দেশেও এগুলো একসময় আন-এথিকাল মনে করা হতো। এখন আর কোন বাছ-বিচার নাই। সবই দেখায়।
আমিঃ হ্যাঁ ইদানিং সবকিছুই লাগামহীন হয়ে গেছে।
তাতিয়ানাঃ তোমার দেশে টিভিতে পর্নোগ্রাফি দেখায়?
আমিঃ এ্যরোটিকাই দেখায় না, পর্নো তো অনেক দূরের কথা।
তাতিয়ানাঃ ও তাইতো, এ্যরোটিকা না দেখালে পর্নোতো অনেক দূরের কথা। ভিডিওতে পর্নো দেখা আইনসিদ্ধ?
আমিঃ আইনসিদ্ধ না। তবে চলছে। এই বিষয়ে কোন কড়াকড়ি নেই।
তাতিয়ানাঃ তুমি দেশে থাকতে পর্নোগ্রাফি দেখেছ?
একটু ফাঁপড়ে পড়ে গেলাম, কি উত্তর দেব! মেয়েটা এমন প্রশ্ন করছে কেন?
তাতিয়ানাঃ উত্তর না দিতে চাইলে থাক।
দেখলাম ওর চোখে কৌতুক চিকচিক করছে।
——————– *** ———————————–

টুক টুক টুক দরজায় নক করার শব্দ। তাতিয়ানাই হবে। এখন ও ‘প্রোস্তা মারিয়া’ দেখা ছাড়াও দিনে কয়েকবার আসে। গল্পগুজব করে। আমিও এতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। ‘প্রোস্তা মারিয়া’ ছাড়া বাকী সময়টুকুতে ওর জন্য আর বিশেষভাবে অপেক্ষা করি না। বাইরে নিজের কোন কাজ থাকলে বের হয়ে যাই। এই সময় তাতিয়ানা আসলেও আমাকে না পেলে ফিরে যায়, আবার আসে।

আমি “কাম ইন বলে দরজার দিকে চোখ রাখলাম।” দরজা ঠেলে যে ভিতরে ঢুকলো সে তাতিয়ানা তো নয়ই, এমনকি আমার বন্ধু-বান্ধবদেরও কেউ নয়। দীর্ঘকায় একজন সুপুরুষ ঢুকলেন তাও ইউনিফর্ম পড়া। ইউনিফর্মটির দিকে লক্ষ্য করলাম। পুলিশের ইউনিফর্মও নয়, মিলিটারির ইউনিফর্মও নয়। তাহলে কার ইউনিফর্ম?

ইউনিফর্মধারীঃ স্দ্রাভস্তভুইচে (সুস্থ থাকুন)!
আমিঃ স্দ্রাভস্তভুইচে!
উনার পিছনে পিছনে ডরমিটরির কমান্ড্যন্ট ঢুকলো। এবার আমার মেজাজ একটু তিরিক্ষি হলো। কোন ঝামেলা পাকাতে এসেছে নাকি?
আমিঃ আপনি?
ইউনিফর্মধারীঃ (সরল হাসি হেসে বললেন) না, কিছুনা। জাস্ট দেখতে এসেছি।
আমিঃ কি দেখতে এসেছেন?
ইউনিফর্মধারীঃ সব ঠিক আছে কিনা।
আমি (আরও অবাক হয়ে) কি ঠিক আছে?
ইউনিফর্মধারীঃ আমি ফায়ার ব্রিগেডের লোক। এটা আমাদের দায়িত্ব।
এবার বুঝতে পারলাম। ফায়ার ব্রিগেডের ইন্সপেকটর। রুটিন চেক আপ-এ এসেছে। এখানে অনেক ভালো কিছু আছে। প্রতিটি বাড়ী নির্মিত হয় যথাযথ বিল্ডিং কোড মেনে। তাই এখানকার কন্সট্রাকশন বেশ নিরাপদ।
একটি বাড়ী নির্মানের সময় ফায়ার ব্রিগেডের অনুমোদনেরও প্রয়োজন পড়ে। তারপর ফায়ার ব্রিগেডের ইন্সপেক্টররা নিয়মিত পরিদর্শন করেন সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা? আগুন লেগে যাওয়ার মত ঝুঁকিপূর্ণ এমন কিছু থাকলে তা সাথে সাথে সরিয়ে ফেলেন বা সমাধানের ব্যবস্থা করেন। কেউ অগ্নি সংক্রান্ত আইন অমান্য করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়। তবে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই জনগন নিজেদের প্রয়োজনেই সচেতনভাবে এইসব আইন মেনে চলে। আমি মনে মনে ভাবলাম। দেশে থাকতে বিল্ডিং কন্সট্রাকশনে ও ইন্সপেকশনে যে ফায়ার ব্রিগেডেরও যে ভূমিকা থাকে এটা জানতামই না। আর কখনো কোন ফায়ার ব্রিগেডের ইন্সপেকটরকে দেখি নাই বাসা বাড়ী ইন্সপেকশন করতে।
ইউনিফর্মধারীঃ না ঠিকই আছে। (বলে আর একবার সরল হাসি হাসলেন)
আমিঃ আপনাকে ধন্যবাদ।
ইউনিফর্মধারীঃ আপনার ফার্নিচারগুলো ঠিকঠাক মতো রাখা আছে। অতিরিক্ত দাহ্য কোন পদার্থও দেখছি না।
আমিঃ ও, ধন্যবাদ।
ইউনিফর্মধারীঃ ভালো কথা। আপনার রুমে কি রান্নার হিটার আছে?
আমিঃ না। রান্নার হিটার লাগবে কেন? ফ্লোরে তো দুইটা কিচেন আছে।
ইউনিফর্মধারীঃ ঠিক। কেউ যাতে রূমে রান্না না করে এইজন্যই এই ব্যবস্থা।
আমিঃ আর কিছু?
ইউনিফর্মধারীঃ না। ও আচ্ছা। আপনার রূমের ফায়ার এলার্মটা একটু চেক করি।
এখানে প্রত্যেকটা রূমেই ফায়ার এলার্ম থাকে। দুর্ঘটনা বশতঃ আগুন লেগে গেলে বা লাগার সম্ভাবনা দেখা গেলে সাথে সাথে এলার্ম বেজে ওঠে।

ইউনিফর্মধারীঃ না। সবই ঠিক আছে। ইউ আর এ গুড বয়।
আমি হাসলাম ।
বিল্ডিং কোড কথাটি দেশে থাকতে শুনেছি বলে মনে পড়েনা। আইনে আছে নিশ্চয়ই। তবে ব্যাপক জনগনের মধ্যে প্রচলিত নেই। গায়ে গা লাগানো ঘিন্জি দালান-কোঠা তো খুবই বিপজ্জনক। কিন্তু এই বিষয়ে সরকারি কোন পদক্ষেপের কথা কখনো শুনিনি। পুরোনো ঢাকার পর নতুন ঢাকাতেও একের পর এক ঘিন্জি এলাকা গড়ে উঠতে শুরু করেছে। অথচ কারো কোন ভ্রুক্ষেপই নেই। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় একবার ঢাকার রামপুরা, মগবাজার, মালিবাগ সহ বেশ কিছু এলাকায় বড় বড় চওড়া লিংক রোড ও অন্যান্য রাস্তা তৈরী করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছিলো। কিন্তু উনি শহীদ হওয়ার পর এই সব পরিকল্পনাও শহীদ হয়ে যায়। তখন কাজটা করা অনেক সহজ হতো, কারণ উঁচুতলা কোন ভবন তখন ঐ সব এলাকায় ছিলনা শতকরা নব্বই ভাগই ছিলো একতলা বা টিনের ঘর। এরপর এরশাদের শাসনামলে শহরের পরিবেশ, যোগাযোগ কোনকিছুর কোন সুদুরপ্রসারী চিন্তাভাবনা না করেই সরু রাস্তা, আঁকা-বাঁকা অলি-গলির পাশে ব্যঙের ছাতার মত গড়ে উঠতে থাকে বহুতল ভবন। পুকুর ভরাট করে কখনো অনুমতিহীন আর কখনো ঘুষ দিয়ে অনুমতি নিয়ে তৈরী করা হয় অট্টালিকা। এরকম বেশ কিছু দালান ধ্বসে পড়ারও সংবাদ পাওয়া যায়। এসবের দায়ভাগ কেউ নিয়েছে বলে শুনিনি। উদ্ধার তৎপরতায়ও সরকারের উৎসাহ ছিলোনা কোন। হায়রে আমার দেশ! মানুষের জীবনের কি কোন মূল্য নেই? নাকি ইকোনোমিক্সের ডিমান্ড-সাপ্লাই থিওরী কাজ করছে। মানুষের সাপ্লাই এত বেশী হয়ে গিয়েছে যে, মূল্য কমে গিয়েছে অনেক। রেসিডেন্সিয়াল এরিয়ায় একের পর এক গড়ে উঠেছে গার্মেন্টস থেকে শুরু করে নানা ধরনের মিল-কারখানা। উন্নত দেশগুলোতে যেখানে রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া, কমার্শিয়াল এরিয়া, ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়া ভিন্ন ভিন্ন, এবং অগ্র পশ্চাৎ অনেক চিন্তা ভাবনা করে এগুলো তৈরী করা হয়, সেখানে আমাদের দেশে হলো ডালে-চালে খিচুড়ী।

কোন একটি দুর্ঘটনায় উদ্ধার তৎপরতাও আশাব্যন্জক নয়। হঠাৎ আমার ফিলিপাইনের একটি মর্মান্তিক ঘটনার কথা মনে পড়লো। ১৯৮১ সালের ১৭ নভেম্বরের কথা। ফিলিপাইনের রাষ্ট্রক্ষমতায় তখন ছিলো জান্তা ফার্দিনান্দ মার্কোস। দেশের জনগণের কাছে যার কোন জনপ্রিয়তাই ছিলনা। তারপরেও বহাল তবিয়তে সিংহাসনে বসে ছিলো খুটির জোড়ে। একবার তার খ্যাতির লক্ষ্যে ভাবলেন, তাক লাগানো একটি ফিল্ম সেন্টার তৈরী করবেন তিনি। যথারীতি শুরু করলেন ব্যয়বহুল ‘ম্যানিলা চলচ্চিত্র কেন্দ্র’-এর নির্মাণ। নির্মাণ চলাকালীন সময়ে তিনি এবং তার রূপসী স্ত্রী ইমেল্দা মার্কোস কয়েকদফা নির্মাণ পরিকল্পনা পরিবর্তন করেন। এর ফলে একদিকে যেমন কাজে বারবার বাধা আসছিলো আবার সেই বাধা মেক-আপ করার জন্য আসন্ন ফিল্ম ফেস্টিভালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে লক্ষ্য করে বেধে দেয়া সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার জন্য তাড়াহুড়োও করা হচ্ছিলো প্রচুর। এসময় দুর্ভাগ্যবশত একটি scaffold ধ্বসে পড়ে, আর শ্রমিকরা পতিত হয় ভেজা সিমেন্টের মধ্যে যার উপরে ধ্বসে পড়েছিলো ভারী ভারী ইস্পাতের বার। অনেকেরই জীবন্ত কবর হয় ওখানে। বেঁচে থাকা অনেকেই ট্র্যাপ্টড হয়ে যায় । যেহেতু মৃতদেহ ও জীবিতদের উদ্ধার করতে যথেস্ট সময়ের প্রয়োজন ছিলো, তাই ইমেল্দা মার্কোস নির্দেশ দিলো, “উদ্ধার করার প্রয়োজন নেই, দেহগুলোকে সিমেন্ট দিয়ে ঢেকে দাও। কন্সট্রাকশন ওয়ার্ক চলুক।” এই দুর্ঘটনায় ১৬৯ জন মারা যায়। এবং তাদের দেহাবশেষ ঐ ইমারতেই রয়ে যায়। এই ভয়াবহতা ও নির্মমতার সংবাদ সকল ম্যানিলাবাসীই জানতো। কিন্তু প্রেসিডেন্ট মার্কোসের নির্দেশে ফিলিপিনি কোন সংবাদ মাধ্যেমেই তা প্রচারিত হয়নি। হায়রে নিস্ঠুরতা! স্বৈরাচার থাকলে যা হয় আরকি!!

ঐ অভিশপ্ত ভবনটির চারপাশ দিয়ে ভয়ে কেউ হাটতে চাইতো না। লোকে বলতো, নিহত হতভাগ্য শ্রমিকদের আত্মার দীর্ঘশ্বাস শোনা যায় ওখানে। পুরো ভবনের বাতাস ভারী হয়ে থাকে অকালে ঝরে পড়া অতৃপ্ত আত্মাদের চাপা কান্নার শব্দে। এর ফল অবশ্য ক্ষমতার দাপটে অন্ধ মার্কোস পরিবার পেয়েছিলো। কয়েক বৎসর পরে এই সাধারণ মানুষগুলোই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ক্ষমতা থেকে ফেলে দিয়েছিলো ফার্দিনান্দ মার্কোস ও ইমেল্দা মার্কোসকে। ক্ষমতার জোরে অনেকেই অনেক কিছু করে আর বেমালুম ভুলে যায় ইতিহাসের শিক্ষা যে, ‘ক্ষমতা চিরকাল থাকেনা’।

—————————————————– ***———————————————

টুক টুক টুক দরজায় নক করার শব্দ। তাতিয়ানাই হবে। এখন রাত নয়টা বাজে। এসময় আজকাল তাতিয়ানাই বেশী আসে। দরজা ঠেলে তাতিয়ানা ঢুকলো।

আমিঃ কেমন আছো?
তাতিয়ানাঃ (বিষন্ন কন্ঠে) বোরিং।
আমিঃ কেন বোরিং কেন?
তাতিয়ানাঃ (আবারও মন খারাপ করা গলায়) জীবনটাই বোধহয় বোরিং।
আসলে ও ভুল কিছু বলছে না। মাঝে মাঝে আমারও খুব বোরিং লাগে। কিন্তু ঐ কথা না বলে ওকে শান্তনাই দেয়া উচিৎ।
আমিঃ ডরমিটরিতে বোধহয় তোমার ভালো লাগছে না। কয়েকদিনের জন্য বাড়ীতে চলে যাও। গ্রামের শান্ত নির্জন পরিবেশে ভালো লাগবে।
তাতিয়ানাঃ বাড়ীতেও বোরিং!
আমিঃ বাড়ীতেও বোরিং?
তাতিয়ানাঃ তার উপরে অনেক কাজ।
আমিঃ কি কাজ?
তাতিয়ানাঃ (একটু ক্ষুদ্ধ হয়ে), অনেক।
আমিঃ যেমন।
তাতিয়ানাঃ যেমন, ঘরে দুইটা গরু আছে। দিনে দুইবার করে ওদের দুধ দোয়াতে হয়।
আমিঃ হাঃ, হাঃ, হাঃ, (আমি হেসে ফেললাম)। তাহলে তো অনেক কাজই বলতে হবে।
আমার সাথে সাথে তাতিয়ানাও লাজুক হাসলো।

তারপর ভাবলাম। মেয়েটির বোরিং লাগে কেন? লাগতেই পারে। আমারও তো মাঝে মাঝে ভীষণ বোরিং লাগে। মাঝে মাঝে এই জীবন তো অর্থহীনই মনে হয়। গতকাল রাতেও তো এমন হয়েছিলো। রাত বারোটার পর চুপচাপ ডরমিটরির বাইরে বেরিয়ে এসেছিলাম। ঠিক মাথার উপরে চাঁদ হাসছিলো। চাঁদটাকে খুব বিমর্ষ মনে হচ্ছিলো। আসলে চাঁদ নয় আমিই বিমর্ষ ছিলাম। বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক সাইফুল ইসলাম স্যারের কথা মনে পড়লো। উনি বলেছিলেন, “তোমার মনের অবস্থার মতই মনে হয় চারপাশের প্রকৃতিটাকে। যদি তুমি উৎফুল্ল থাকো, দিঘীর ঢেউয়ে চাঁদের খন্ড-বিখন্ড প্রতিফলন দেখে মনে হবে, ‘বাহ্! চাঁদটা কেমন হেসে কুটি কুটি যাচ্ছে’। আর তুমি যদি দুঃখ ভাড়াক্রান্ত থাকো, তোমার মনে হবে, ‘আমার দুঃখে চাঁদটা ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে’। গতরাতে আমিও এমনি বিষণ্ন হয়ে পড়েছিলাম। এ বিষাদ বোধহয় মানুষের চিরকালের চিরন্তন চিত্তবৃত্তি। যেমন উইলিয়াম শেক্সপীয়র প্রশ্ন করেছিলেন, “হোয়াই আই এ্যাম সো স্যাড?” মানুষের অক্ষমতা আর অপূর্ণতার বেদনাই কি এই বিষাদের কারণ?

ওহ্! এইতো উত্তর পেয়েছি। তাতিয়ানার কোন অপূর্ণতা রয়েছে। কি সেই অপূর্ণতা?

আমিঃ তাতিয়ানা, তোমার কি কোন অপূর্ণতা রয়েছে?
দপ করে জ্বলে উঠলো তাতিয়ানার দৃষ্টি।
তাতিয়ানাঃ কি অর্থে?
আমিঃ না, মানে তোমাকে মাঝে মাঝে খুব বিমর্ষ লাগে তাই।

দৃষ্টি নামিয়ে নিলো তাতিয়ানা। কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারলো না। একি সেই চিরন্তন নারী? ধ্যানস্তদ্ধ গভীর অরণ্যে, কম্পিত তারার তিমিরে আদিকাল থেকে কাকে যেন খুঁজে ফিরছে। সেই আকাঙ্খার নিবৃত্তি হবে কি কোন কালে? নাকি ঐ চাঁদের মতই বড় একাকী ও নিঃসঙ্গ রয়ে যাবে চিরকাল?


(চলবে)


বঁধু, মিটিলনা সাধ

বঁধু, মিটিলনা সাধ ভালোবাসিয়া তোমায়
তাই আবার বাসিতে ভালো আসিব ধরায়।
আবার বিরহে তব কাঁদিব
আবার প্রণয় ডোরে বাঁধিব
শুধু নিমেষেরি তরে আঁখি দুটি ভ’রে
তোমারে হেরিয়া ঝ’রে যাব অবেলায়।
যে গোধূলি-লগ্নে নববধূ হয় নারী
সেই গোধূলি-লগ্নে বঁধু দিল আমারে গেরুয়া শাড়ি
বঁধু আমার বিরহ তব গানে
সুর হয়ে কাঁদে প্রাণে প্রাণে
আমি নিজে নাহি ধরা দিয়ে
সকলের প্রেম নিয়ে দিনু তব পায়।।

 

 

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প জীবনী ও স্মৃতিকথা বিনোদন ভালবাসা/প্রণয়লীলা সৃজনশীল প্রকাশনা

স্বপ্নময়ী শীত

— এম,এইচ, জনি

 

শীত মানেই বাঙ্গালী সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তন, শীতকালে বাংলার গ্রামে শুরু হয় নানান স্বাদের পিঠা তৈরীর তুমুল প্রতিযোগিতা। নতুন নতুন শাক-সবজিতে ভরে উঠে আমাদের ফসলের মাঠ। গাছের ডালে ডালে আমাদের দেশিও পাখি ও অতিথি পাখির কলরবে, মুখরিত হয় আমাদের গ্রামীন জনপথ। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ ও ঝাকে ঝাকে উন্মুক্ত পাখিদের আকাশের উড়ার দৃশ্য দেখে, তরুন তরুনীর মনেও লাগে রোমাঞ্চের ঢেউ। স্বপ্নময়ী বাসরের দৃশ্য ভেসে উঠে, বাঙ্গালী তরুন তরুনীর আবেগ ভরা হৃদয়ে। তেমনি শীতের এক বিকেলে প্রেমের একটি বিয়েতে যোগ দিলাম আমি। আমি ছিলাম মেয়ে পক্ষের, তাই আমার দায়িত্ব ও কাজ ছিল বেশি। সব কাজ মোটামুটি গুছিয়ে বর যাত্রী আসার অপেক্ষায় ছিলাম। কিছুক্ষন পরেই বর-যাত্রীর গাড়ী এসে উপস্থিত গেটের সামনে। শুরু হলো আমাদের বাধ ভাঙ্গা আনন্দ, বর-যাত্রীদরে বরন করতে গেটের মূল দায়িত্ব দেয়া হলো আমাকে। সাথে কিছু ছেলে মেয়ে নিয়ে বরযাত্রীদরে বরন করতে গেলাম। বর পক্ষের অনেকগুলো তরুন তরুনী আমাদের সাথে কথা কাটাকাটি শুরু করল, সাধারণত বিয়েতে যা হয়। এক পর্যায়ে তুমুল ঝগড়া ও কথা কাটাকাটি শুরু হয়ে গেল। কেউ কারো কথা বুঝতে পারছিলাম না, তাই বর যাত্রীদরে বললাম তাদের পক্ষ থেকে একজন দলনেতা নির্বাচন করার জন্য। তাই তাদের পক্ষথেকে এক ললনাকে নির্বাচন করা হলো, আর কনে পক্ষ থেকে আমি। শুরু হলো দুজনার মধ্যে মধুর যুক্তি-তর্ক। বিষয় ভিত্তিক তর্ক ছেড়ে আমরা চলে গেলাম গল্প কবিতা ও উপন্যাসের দিকে। তর্ক করতে করতে রেগে গিয়ে আমাকে বলল, জানেন আপনি কার সাথে কথা বলছেন। আমি তাকে রাগানোর জন্য বললাম, আপনি রবিন্দ্রনাথের লাবণ্য-ও না, জীবনানন্দের বনলতা সনে-ও না, লিওনার্দো দ্যা ভঞ্চিরি আঁকা ভূবন ভূলানো হাঁসিমাখা মোনালসিা-ও না। এগুলো বলার পর সে কি উত্তর দিবে, কোন ভাষা খুঁজে পাচ্ছিল না। তাই পরিবেশটা স্বাভাবিক করার জন্য, সে আমার জীবন বৃত্তান্ত জানতে চাইল এবং প্রথমেই আমার নাম জিজ্ঞাসা করল। আমি মজা করে বললাম আমার নাম রোমাঞ্চ, তারপর জানতে চাইল আমি কি করি বললাম পড়াশোনা, জিজ্ঞাসা করল কোন ইউনিভার্সিটি, বললাম প্রেম নগর ইউনিভার্সিটি। জানতে চাইল কোন সাবজেক্ট উত্তর দিলাম ভালোবাসা। এগুলো শুনে আমার প্রতি ভীষন ক্ষঁেপে গেল সে। যা-ই হোক অনেক যুক্তিতর্কের পর আমরা স্বাদরে বরন করে নিলাম বরযাত্রীদরে। বিশেষ করে ঐ ললনাকে, কেননা তর্কে হেরে গিয়ে আমার প্রতি তার রাগটা একটু বেশিই মনে হলো। শত হলেও-তো তিনি সম্মানী ব্যক্তি, কারণ তিনি যে বরযাত্রী। তাই তাকে একটু বেশি করে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে বরণ করলাম। তারপর তাদেরকে প্যান্ডেলে বসানো হলো খাবার দেয়ার জন্য। মেয়েটি বসেছিল বরের সঙ্গে, আমারও দায়িত্ব পড়ল বরের ষ্টেজে খাবার পরিবেশনের। খাবারের একপর্যায়ে মেয়েটি আমাকে, এক টুকরো মাংস দিলো খাওয়ার জন্য। আমি মজা করে তাকে আরো রাগানোর জন্য বললাম, আমার নিকট-আতœীয় ছাড়া অন্য কোন মেয়ের হাতে কিছুই খাই না। আবারো সে আমার প্রতি ভীষন রেগে গেল। যাইহোক সব আনুষ্ঠানিকতা সেরে বর যাত্রীদরে বিদায়ের পালা। আমি তার মনটা ভালো করার জন্য বললাম, ম্যাডাম ভালো থাকবেন, আপনার সাথে একটু মজা করলাম। আর বিয়ের অনুষ্ঠানে এ রকম কিছু না হলে বিয়েটা আনন্দের হয় না । উত্তরে সে বলল আপনি স্বাভাবিক মানব নন। আমি বললাম আপনার কথাই ঠিক, কারণ আমি স্বাভাবিক মানব নই, আমি হলাম মহা মানব। আবারো সে রেগে বলল আমি আপনাকে দেখে নেব, এ বলেই চলে গেল বরপক্ষ। আমরাও সব কাজ শেষ করে। সারা দিনের ক্লান্তি নিয়ে ঘুমাতে গেলাম, মুহুর্তেই হারিয়ে গেলাম ঘুমের রাজ্যে। অবিশ্বাস্য! আমার ঘুমের মাঝে স্বপ্নে দেখতে পেলাম সেই মেয়েটিকে। যার সাথে অনেক রোমান্টিক ঝগড়া হয়েছিল। স্বপ্নের এক পর্যায়ে সে আমাকে অনুষ্ঠানের তর্ক-বিতর্কের জন্য সরি বলতে অনুরোধ করল। আমিও তার মন ভালো করার জন্য স্বপ্নের মাঝে সরি বললাম। মূহুতেই সে রাজ্যের সকল সৌর্ন্দয নিয়ে, একটি ভূবন ভুলানো হাঁসি দিল এবং আমার কাছে সে জানতে চাইল এই মূহুর্তে তার কাছে আমি কি চাই। আমি বললাম একটি গান শুনতে চাই। যে কথা সেই কাজ, তার সুরেলা কন্ঠে সে গাইতে লাগলো, “আমি খোলা জানালা, তুমি ঐ দখিনা বাতাস, আমি নিঝুম রাত, তুমিত জাগরি আকাশ…।”  কিন্তু দূভাগ্য গানটি শেষ হতে না হতেই, আমার সেল ফোনটি বেজে উঠলো, আর ভেঙ্গেগেল আমার রোমান্টিক স্বপ্নটি। তাই এখন শীত এলেই মনে পড়ে সেই দিনের বিয়ে ও রোমাঞ্চকর স্বপ্নের কথা।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প বিনোদন ভালবাসা/প্রণয়লীলা সৃজনশীল প্রকাশনা

নারীর আট কলা হেকমত

নারীর আট কলা হেকমত

—pantha_nazrul

কয়েকদিন পূর্বে এক সন্ধ্যায় জরুরী কথা আছে বলে আমার আবাল্য বন্ধু রনি আমাকে ডেকে নিয়ে যায় মতিঝিলের একটি রেস্তোরায়। রনির চোখে-মুখে চিন্তার রেখা। মলিন চেহারা। মুখোমুখি বসে জানতে চাইলাম ‘‘কি হয়েছে তোর?’’

কষ্টের দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে সে বললো, ‘‘দোস্ত হেরে গেছি! সেই মেয়েটির কাছে হেরে গেছি!’’ মৃদু হেসে বললাম, ‘‘এতে লজ্জার কিছু নেই। নারীর কাছে হারাতেই গৌরব!’’ সে রেগে বললো, ‘‘মারুফ শয়তানি করবি না। তুই সবকিছুতেই শয়তানি করিস।’’

এদিক সেদিক পর্যবেক্ষণ করে রনি বললো, ‘‘মারুফ এখানে মাঝখানটায় না বসে চল আমরা ঐ ‘এসি রুমটায় গিয়ে বসি।’’ মারুফ বললো, ‘‘না, যারা লেডিস নিয়ে আসে তারা সাধারণত ঐখানে বসে। ঐটার ভিতরে আবার ছোট ছোট কেবিন আছে।’’ ‘‘তাইলে চল ঐ কর্নারে গিয়ে বসি’’ বললো রনি।

বাচ্চা বয়সের এক ওয়েটার মারুফের মুখের দিকে চেয়ে বলে, ‘‘মামা কী খাবেন।’’ রনি বলে, ‘‘এই বেটা, ‘নান’ নিয়ে আয়, যা।’’ এবার রনির মুখে দিকে চেয়ে ওয়েটার বলে, ‘‘মামা সাথে কি গ্রীল দিবো না শিক?’’ হালকা রেগে রনি বলে, ‘‘এই বেটা ‘বস’ দিছে বাঁশ আর তুই দিবি শিক?’’ রনির কথা শুনে বেচারা ওয়েটার ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। মারুফ হাসতে হাসতে বলে, ‘‘মামা হাফ গ্রীল নিয়ে এসো।’’

‘নান’ খেতে খেতে রনি বললো, ‘‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি ব্যাংক শিফ্ট করবো। কাজের প্রতি আমার ডিভোশন, ডেডিকেশন, সিন্সিয়ারিটি সবই গেল বৃথা। মেয়েটি সারাদিন থাকে ইজি মুডে তারপরও সে-ই পেল কনফার্মেশন লেটার!

তাছাড়া সে তো আমার পরে জয়েন করেছে। যেখানে বস প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিল আমার পারফর্মেন্সে তিনি ওভার সেটিসফাইড সেখানে তিনি চূড়ান্ত কাজটি করলেন মেয়েটির ফেভারে। আমার মন খারাপ দেখে বস ডেকে নিয়ে বললেন, মেয়েটি একজন ডাইরেক্টরের আত্মীয় তাই আমার কিছুই করার ছিল না।’’

মারুফ ঝলসানো মাংশখন্ড মুখের কাছে নিয়েও মুখে না দিয়ে হাত নীচে নামিয়ে ইষত রেগে তীক্ষ কণ্ঠে বলে, ‘‘শালা তুই আসলেই একটা গাধা। মেয়েটি কারোরই আত্মীয় নয়। নিশ্চয় সে আট কলার যে কোন এক কলা দিয়ে কাজ বাগিয়েছে!’’

মারুফের কথা শুনে রনি যেন আকাশ থেকে পড়ে! বিস্ফারিত নয়নে প্রশ্ন ছুড়ে দিলো, ‘‘আট কলা মানে?’’ বড়ো বড়ো চোখে রনির মুখের দিকে চেয়ে মারুফ বললো, ‘‘বেটা বলদ ইউনিভার্সিটি লাইফে তো শুধু সবরি কলা খেয়েছিস আর হলে বসে বসে অঙ্ক কষেছিস কোন দিন কি সন্ধ্যার পর টিএসসিতে গিয়েছিস? তুই নারীর আট কলা বুঝবি কিভাবে?’’

ভেংচি কেটে রনি বললো, ‘‘তুই মনে হয় খুব জ্ঞানী হয়ে গেছিস?’’ ‘‘না তা নয় তবে আমি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে-ফিরে নারীর আট কলা হেকমতের তাণ্ডব দেখে পাকা হয়ে গেছি!’’ বললো মারুফ।

ওয়েটারকে ডেকে চা’র অর্ডার দিয়ে, মরুফ বললো, ‘‘দোস্ত, কয়েকটি ফার্মে কাজ করার সুবাদে লক্ষ্য করেছি, ছেলেরা প্রচুর পরিশ্রম করে, খাটুনি করে, দৌড়া-দৌড়ি করে কাজ করে। যখন-তখন অর্থাত ঝড়-বৃষ্টি, রোদ-খরা, শীত-গরম যাই থাকুক না কেন অফিসের কাজে বাইরে ছুটাছুটি করে। তারপরও দেখতাম ছেলেরা বসের মন পেতো না। ছেলেদের প্রতি বসের চোখ সবসময় রাঙ্গানোই থাকতো! অপর দিকে নারী সহকর্মীরা সৌন্দর্য চর্চা আর পর চর্চায় ব্যস্ত থেকেও বসের সদয় কৃপায় থাকতো দুধে-ভাতে। ওদের প্রতি বসের ভাবখানা এমন যে, ‘তোর বদনখানি মলিন হলে . . . . আমি নয়ন জলে ভাসি’!’’

রনি নড়েচড়ে বসে খুশীভাব নিয়ে বললো, ‘‘তুই একেবারে সত্যি কথা বলেছিস।’’ চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে মারুফ বললো, ‘‘দেখ দোস্ত. মাজার ব্যাপার হলো, কিছুদিন হলো একটি কর্পোরেট অফিসে জয়েন করেছি। কাজের চাপ প্রচুর। দম বন্ধ হয়ে আসে। ছেলেরা রীতিমত গলদঘর্ম। এ অবস্থায়ও মেয়েরা গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়!

দ্বিতীয় স্তরের কয়েকজন বস সুযোগ পেলেই বলাবলি করে, ‘কেন যে কর্তৃপক্ষ মেয়েদেরকে নিয়োগ দেয়! আসে সবার পরে আবার যায় সবার আগে। কাজের লোড নিতে চায় না।’ মনে মনে ভাবি যাক্ বাবা তাহলে এখানকার বসেরা বিষয়টি বুঝতে পেরেছে। হায় খোদা! এন্ড অব ইয়ারে যখন এই বসেরা এসিআর দিলো তখন দেখা গেলো বেশ কয়েকজন ছেলে ফেল! আর মেয়েরা সর্বোচ্চ নাম্বার নিয়ে ফার্স্ট পজিশনে থেকে পূর্ণিমার চাঁদের মতো হাসছে! রবিন্দ্রনাথের ‘আমি কী দেখেছি মধুর হাসি’র মতই প্রাণ জুড়ানো হাসি! এই হাসিও কি নারীর আট কলার এক কলা যা দেখে পুরুষদের প্রাণ জুড়িয়ে যায়?

প্রথম স্তরের একজন বস যাকে সিংহের সাথে তুলনা করা যায়। তাঁর শাসন গাদ্দাফির মতই লৌহ-কঠিন। বিন্দু পরিমাণ দয়া মায়া নেই। ছেলেদের কোন কাজে য্তকিঞ্চিত ত্রুটি কিংবা কোন একটি অফিস নোটে সামান্য ভুল পেলেই ডেকে নিয়ে কর্কশ ভাষায় চেচামেচি করেন এবং বলদ, গাধা, অকর্মা ইত্যকার কান গরম করা শব্দে বকা-ঝকা করেন।

কিন্ত সেই বসের সামনে যখন সম অপরাধে কোন নারী অফিসারকে হাজিরা দিতে হয় তখন তিনি মুনালিসার সেই বিখ্যাত হাসি দিয়ে, মোমের মতো গলে, মোলায়েম কন্ঠে বলেন, ‘এই ভুলগুলো কারেকশান করে ফাইনাল প্রিন্ট নিয়ে আসুন।’

এদিকে সামান্য ভুলের জন্য বসের ধমক আর বকা-ঝকা খেয়ে গোমড়া মুখে বসে থাকা ছেলেরা অসহায়ের মতো চেয়ে চেয়ে দেখে, নারীর প্রতি বসের ‘কী স্নেহ, কী মায়া গো – !’ কেউ কেউ মনে মনে নিজের উপর রাগ করে বলে, ‘শালা কেন যে নারী হয়ে জন্ম নেই নি’!

জোসের সাথে রনি বলে উঠে, ‘‘আরে দোস্ত আমিই তো মনে মনে নারী না হওয়ার জন্য নিজের উপর রাগ করতে ছিলাম! তবে সত্য বলতে কি আমার বস আবার একটু অন্যরকম মানুষ। খুব কঠিন প্রকৃতির লোক। তার মাঝে রসবোধ বলতে কিছু নেই। কাজ ছাড়া কিচ্ছু বুঝেন না। মেয়েদের প্রতি তার দূর্বলতা আছে এমন কথা কেউ বলতে পারবে না।’’

মারুফ বলে, ‘‘আমার লৌহ কঠিন বস, যার দাপটে ছেলেরা বিড়ালের মতো ঘাড় নুয়ে মাটির সাথে মিশে চলে অথচ সেই বসই কিনা একজন নারী কর্মী সামনে গেলে বরফের মতো গলে যায়! বিশাল সরোবরের নীল শান্ত পানির মতো ঠান্ডা হয়ে যায়!

পল্লী কবির গল্পের বই ‘বাঙ্গালীর হাসির গল্পে’ পড়ে ছিলাম, নারীর নাকি আট কলা হেকমত আছে। সাপুড়েরা মন্ত্রবলে যেভাবে বিষধর সাপকে পোষ মানিয়ে রাখে তেমনি নারীরা এই আট কলা হেকমত দিয়ে পুরুষকে কাবু করে রাখে! সিংহপুরুষ তুল্য বস কি তাহলে নারীর আট কলা হেকমতের প্রভাবে এমনভাবে বিগলিত হয়ে পড়েন?’’

রনির চোখের দিকে চেয়ে মারুফ বলে, ‘‘নাকি ময়মনসিংহের বাউল কবি জালালের নিম্নোক্ত গানের ‘চুলা’র তাপে বিগলিত হয়ে পড়েন? ‘’চুলা বানাইলে কি কৌশলে/কলের চুলায় জল দিয়ে আগুণ জ্বলে/যেখানে ঐ কলের চুলা, দুনিয়ার সব ওলামেলা/ধনী-মানীর পান্থশালা, আসে যায় দলে দলে/ . . . . . সেই চুলাতে সবই রান্ধা, এই দুনিয়ার যত বান্দা!’’

গানটা বলার সাথে সাথে তারা দু’জনে একসাথে হেসে উঠে। রনি বলে, ‘‘দোস্ত তুই তো দেখি পুরোদস্তর নারী বিদ্বেষী!’’ ‘‘আরে না, পাবনা কলোনীর রিদওয়ানাকে পাবার আশায় ক্যারিয়ার গঠনের পিছনে ছুটতে ছুটতে জীবনটার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছি! আর তুই আমাকে বলিস নারী বিদ্বেষী!’’ বললো মারুফ। রনি বললো, ‘‘দোস্ত আমারও তো একই অবস্থা, চাকুরীটা পাকাপোক্ত না হলে তানিয়াকে তো ওর ‘কর্তৃপক্ষ’ বিয়েই দিবে না। কতো সিরিয়াস হয়ে যে, অফিসে কাজ করি, তারপরও বসের মন পেলাম না।’’

মারুফ মুচকি হেসে বলে, ‘‘এক কাজ কর ঐ মেয়েটাকে বিয়ে করে ফেল। তাহলে তোর ভাগ্যও ফিরে যাবে।’’ রনি বলে, ‘‘শালা, তানিয়া জানতে পারলে, এ পরামর্শের জন্য তোর আক্কেল দাঁত তুলে ফেলবে!’’

হঠাত রনির মুখ ফ্যাকাসে হয়ে উঠে। হোটেলের প্রবেশ পথের দিকে নির্বাক চেয়ে আছে সে। রনির চোখের সামনে হাত নেড়ে মারুফ বলে, ‘‘কীরে কী হয়েছে?’’ কিছুটা তুতলিয়ে তুতলিয়ে রনি বলে, ‘‘দোস্ত পিছনে চেয়ে দেখ আমার বস, সাথে ঐ মেয়েটা!’’

রনির বস মেয়েটার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাসতে হাসতে হোটেলে প্রবেশ করে সোজা ‘এসি রুম লেখা’ দরজা দিয়ে ভিতের চলে যায়। মারুফ রনির দিকে কঠিন চোখে চেয়ে বলে, ‘‘কীরে তুই না বললে, তোর বসের রসবোধ বলতে কিছু নেই। এখন তো দেখি, রস উপচে পড়ছে!’’

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গল্প বিনোদন ভালবাসা/প্রণয়লীলা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সৃজনশীল প্রকাশনা

সমাপ্তি

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

প্রথম পরিচ্ছেদ

অপূর্বকৃষ্ণ বি. এ. পাস করিয়া কলিকাতা হইতে দেশে ফিরিয়া আসিতেছেন। নদীটি ক্ষুদ্র। বর্ষা-অন্তে প্রায় শুকাইয়া যায়। এখন শ্রাবণের শেষে জলে ভরিয়া উঠিয়া একেবারে গ্রামের বেড়া ও বাঁশঝাড়ের তলদেশ চুম্বন করিয়া চলিয়াছে। বহুদিন ঘন বর্ষার পরে আজ মেঘমুক্ত আকাশে রৌদ্র দেখা দিয়াছে। নৌকায় আসীন অপূর্বকৃষ্ণের মনের ভিতরকার একখানি ছবি যদি দেখিতে পাইতাম তবে দেখিতাম, সেখানেও এই যুবকের মানসনদী নববর্ষায় কূলে কূলে ভরিয়া আলোকে জ্বলজ্বল এবং বাতাসে ছল্‌ছল্ করিয়া উঠিতেছে। নৌকা যথাস্থানে ঘাটে আসিয়া লাগিল। নদীতীর হইতে অপূর্বদের বাড়ির পাকা ছাদ গাছের অন্তরাল দিয়া দেখা যাইতেছে। অপূর্বর আগমনসংবাদ বাড়ির কেহ জানিত না, সেইজন্য ঘাটে লোক আসে নাই। মাঝি ব্যাগ লইতে উদ্যত হইলে অপূর্ব তাহাকে নিবারণ করিয়া নিজেই ব্যাগ হাতে লইয়া আনন্দভরে তাড়াতাড়ি নামিয়া পড়িল।

নামিবামাত্র, তীর ছিল পিছল, ব্যাগ-সমেত অপূর্ব কাদায় পড়িয়া গেল। যেমন পড়া অমনি কোথা হইতে এক সুমিষ্ট উচ্চ কণ্ঠে তরল হাস্যলহরী উচ্ছ্বসিত হইয়া নিকটবর্তী অশথ গাছের পাখিগুলিকে সচকিত করিয়া দিল।

অপূর্ব অত্যন্ত লজ্জিত হইয়া তাড়াতাড়ি আত্মসংবরণ করিয়া চাহিয়া দেখিল। দেখিল, তীরে মহাজনের নৌকা হইতে নূতন ইঁট রাশীকৃত করিয়া নামাইয়া রাখা হইয়াছে, তাহারই উপরে বসিয়া একটি মেয়ে হাস্যাবেগে এখনি শতধা হইয়া যাইবে এমনি মনে হইতেছে।

অপূর্ব চিনিতে পারিল, তাহাদেরই নূতন প্রতিবেশিনীর মেয়ে মৃন্ময়ী। দূরে বড়ো নদীর ধারে ইহাদের বাড়ি ছিল, সেখানে নদীর ভাঙনে দেশত্যাগ করিয়া বছর দুই-তিন হইল এই গ্রামে আসিয়া বাস করিতেছে।

এই মেয়েটির অখ্যাতির কথা অনেক শুনিতে পাওয়া যায়। পুরুষ গ্রামবাসীরা স্নেহভরে ইহাকে পাগলী বলে, কিন্তু গ্রামের গৃহিণীরা ইহার উচ্ছৃঙ্খল স্বভাবে সর্বদা ভীত চিন্তিত শঙ্কান্বিত। গ্রামের যত ছেলেদের সহিতই ইহার খেলা; সমবয়সী মেয়েদের প্রতি অবজ্ঞার সীমা নাই। শিশুরাজ্যে এই মেয়েটি একটি ছোটোখাটো বর্গির উপদ্রব বলিলেই হয়। বাপের আদরের মেয়ে কিনা, সেইজন্য ইহার এতটা দুর্দান্ত প্রতাপ। এই সম্বন্ধে বন্ধুদের নিকট মৃন্ময়ীর মা স্বামীর বিরুদ্ধে সর্বদা অভিযোগ করিতে ছাড়িত না; অথচ বাপ ইহাকে ভালোবাসে, বাপ কাছে থাকিলে মৃন্ময়ীর চোখে অশ্রুবিন্দু তাহার অন্তরে বড়োই বাজিত, ইহাই মনে করিয়া প্রবাসী স্বামীকে স্মরণ-পূর্বক মৃন্ময়ীর মা মেয়েকে কিছুতেই কাঁদাইতে পারিত না।

মৃন্ময়ী দেখিতে শ্যামবর্ণ; ছোটো কোঁকড়া চুল পিঠ পর্যন্ত পড়িয়াছে। ঠিক যেন বালকের মতো মুখের ভাব। মস্ত মস্ত দুটি কালো চক্ষুতে না আছে লজ্জা, না আছে ভয়, না আছে হাবভাবলীলার লেশমাত্র। শরীর দীর্ঘ, পরিপুষ্ট, সুস্থ, সবল, কিন্তু তাহার বয়স অধিক কি অল্প সে প্রশ্ন কাহারও মনে উদয় হয় না; যদি হইত, তবে এখনো অবিবাহিত আছে বলিয়া লোকে তাহার পিতামাতাকে নিন্দা করিত।

গ্রামে বিদেশী জমিদারের নৌকা কালক্রমে যেদিন ঘাটে আসিয়া লাগে সেদিন গ্রামের লোকেরা সম্ভ্রমে শশব্যস্ত হইয়া উঠে, ঘাটের মেয়েদের মুখরঙ্গভূমিতে অকস্মাৎ নাসাগ্রভাগ পর্যন্ত যবনিকাপতন হয়, কিন্তু মৃন্ময়ী কোথা হইতে একটা উলঙ্গ শিশুকে কোলে লইয়া কোঁকড়া চুলগুলি পিঠে দোলাইয়া ছুটিয়া ঘাটে আসিয়া উপস্থিত। যে দেশে ব্যাধ নাই, বিপদ নাই, সেই দেশের হরিণশিশুর মতো নির্ভীক কৌতূহলে দাঁড়াইয়া চাহিয়া চাহিয়া দেখিতে থাকে, অবশেষে আপন দলের বালক সঙ্গীদের নিকট ফিরিয়া গিয়া এই নবাগত প্রাণীর আচারব্যবহার সম্বন্ধে বিস্তর বাহুল্য বর্ণনা করে।

আমাদের অপূর্ব ইতিপূর্বে ছুটি উপলক্ষে বাড়ি আসিয়া এই বন্ধনহীন বালিকাটিকে দুই চারিবার দেখিয়াছে এবং অবকাশের সময়, এমন-কি, অনবকাশের সময়ও ইহার সম্বন্ধে চিন্তা করিয়াছে। পৃথিবীতে অনেক মুখ চোখে পড়ে, কিন্তু এক-একটি মুখ বলা কহা নাই একেবারে মনের মধ্যে গিয়া উত্তীর্ণ হয়। সে কেবল সৌন্দর্যের জন্য নহে, আর-একটা কী গুণ আছে। সে গুণটি বোধ করি স্বচ্ছতা। অধিকাংশ মুখের মধ্যেই মনুষ্যপ্রকৃতিটি আপনাকে পরিস্ফুটরূপে প্রকাশ করিতে পারে না; যে মুখে সেই অন্তরগুহাবাসী রহস্যময় লোকটি অবাধে বাহির হইয়া দেখা দেয় সে মুখ সহস্রের মধ্যে চোখে পড়ে এবং এক পলকে মনে মুদ্রিত হইয়া যায়। এই বালিকার মুখে চোখে একটি দুরন্ত অবাধ্য নারীপ্রকৃতি উন্মুক্ত বেগবান অরণ্যমৃগের মতো সর্বদা দেখা দেয়, খেলা করে ; সেইজন্য এই জীবনচঞ্চল মুখখানি একবার দেখিলে আর সহজে ভোলা যায় না।

পাঠকদিগকে বলা বাহুল্য, মৃন্ময়ীর কৌতুকহাস্যধ্বনি যতই সুমিষ্ট হউক, দুর্ভাগা অপূর্বর পক্ষে কিঞ্চিৎ কে­শদায়ক হইয়াছিল। সে তাড়াতাড়ি মাঝির হাতে ব্যাগ সমর্পণ করিয়া রক্তিমমুখে দ্রুতবেগে গৃহ-অভিমুখে চলিতে লাগিল।

আয়োজনটি অতি সুন্দর হইয়াছিল। নদীর তীর, গাছের ছায়া, পাখির গান, প্রভাতের রৌদ্র, কুড়ি বৎসর বয়স ; অবশ্য ইঁটের স্তূপটা তেমন উল্লেখযোগ্য নহে, কিন্তু যে ব্যক্তি তাহার উপর বসিয়া ছিল সে এই শুষ্ক কঠিন আসনের প্রতিও একটি মনোরম শ্রী বিস্তার করিয়াছিল। হায়, এমন দৃশ্যের মধ্যে প্রথম পদক্ষেপমাত্রেই যে সমস্ত কবিত্ব প্রহসনে পরিণত হয় ইহা অপেক্ষা অদৃষ্টের নিষ্ঠুরতা আর কী হইতে পারে।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

সেই ইষ্টকশিখর হইতে প্রবহমান হাস্যধ্বনি শুনিতে শুনিতে চাদরে ও ব্যাগে কাদা মাখিয়া গাছের ছায়া দিয়া অপূর্ব বাড়িতে গিয়া উপস্থিত হইল।

অকস্মাৎ পুত্রের আগমনে তাহার বিধবা মাতা পুলকিত হইয়া উঠিলেন। তৎক্ষণাৎ ক্ষীর দধি রুইমাছের সন্ধানে দূরে নিকটে লোক দৌড়িল এবং পাড়া-প্রতিবেশীর মধ্যেও একটা আন্দোলন উপস্থিত হইল।

আহারান্তে মা অপূর্বর বিবাহের প্রস্তাব উত্থাপন করিলেন। অপূর্ব সেজন্য প্রস্তুত হইয়াছিল। কারণ, প্রস্তাব অনেক পূর্বেই ছিল, কিন্তু পুত্র নব্যতন্ত্রের নূতন ধুয়া ধরিয়া জেদ করিয়া বসিয়াছিল যে, ‘বি. এ. পাস না করিয়া বিবাহ করিব না।’ এতকাল জননী সেইজন্য অপেক্ষা করিয়াছিলেন, অতএব এখন আর-কোনো ওজর করা মিথ্যা। অপূর্ব কহিল, “আগে পাত্রী দেখা হউক, তাহার পর স্থির হইবে।” মা কহিলেন, “পাত্রী দেখা হইয়াছে, সেজন্য তোকে ভাবিতে হইবে না।” অপূর্ব ঐ ভাবনাটা নিজে ভাবিতে প্রস্তুত হইল এবং কহিল, “মেয়ে না দেখিয়া বিবাহ করিতে পারিব না।” মা ভাবিলেন, এমন সৃষ্টিছাড়া কথাও কখনো শোনা যায় নাই ; কিন্তু সম্মত হইলেন।

সে রাত্রে অপূর্ব প্রদীপ নিবাইয়া বিছানায় শয়ন করিলে পর বর্ষানিশীথের সমস্ত শব্দ এবং সমস্ত নিস্তব্ধতার পরপ্রান্ত হইতে বিজন বিনিদ্র শয্যায় একটি উচ্ছ্বসিত উচ্চ মধুর কণ্ঠের হাস্যধ্বনি তাহার কানে আসিয়া ক্রমাগত বাজিতে লাগিল। মন নিজেকে কেবলই এই বলিয়া পীড়া দিতে লাগিল যে, সকালবেলাকার সেই পদস্খলনটা যেন কোনো একটা উপায়ে সংশোধন করিয়া লওয়া উচিত। বালিকা জানিল না যে, ‘আমি অপূর্বকৃষ্ণ অনেক বিদ্যা উপার্জন করিয়াছি, কলিকাতায় বহুকাল যাপন করিয়া আসিয়াছি, দৈবাৎ পিছলে পা দিয়া কাদায় পড়িয়া গেলেও আমি উপহাস্য উপেক্ষণীয় একজন যে-সে গ্রাম্য যুবক নহি।’

পরদিন অপূর্ব কনে দেখিতে যাইবে। অধিক দূরে নহে, পাড়াতেই তাহাদের বাড়ি। একটু বিশেষ যত্ন পূর্বক সাজ করিল। ধুতি ও চাদর ছাড়িয়া সিল্কের চাপকান জোব্বা, মাথায় একটা গোলাকার পাগড়ি, এবং বার্নিশকরা একজোড়া জুতা পায়ে দিয়া, সিল্কের ছাতা হস্তে প্রাতঃকালে বাহির হইল।

সম্ভাবিত শ্বশুরবাড়িতে পদার্পণ করিবামাত্র মহা সমারোহ-সমাদরের ঘটা পড়িয়া গেল। অবশেষে যথাকালে কম্পিতহৃদয়ে মেয়েটিকে ঝাড়িয়া মুছিয়া, রঙ করিয়া, খোঁপায় রাংতা জড়াইয়া, একখানি পাতলা রঙিন কাপড়ে মুড়িয়া বরের সম্মুখে আনিয়া উপস্থিত করা হইল। সে এক কোণে নীরবে মাথা প্রায় হাঁটুর কাছে ঠেকাইয়া বসিয়া রহিল এবং এক প্রৌঢ়া দাসী তাহাকে সাহস দিবার জন্য পশ্চাতে উপস্থিত রহিল। কনের এক বালক ভাই, তাহাদের পরিবারের মধ্যে এই এক নূতন অনধিকার-প্রবেশোদ্যত লোকটির পাগড়ি, ঘড়ির চেন এবং নবোদগত শ্মশ্রু একমনে নিরীক্ষণ করিতে লাগিল।

অপূর্ব কিয়ৎকাল গোঁফে তা দিয়া অবশেষে গম্ভীরভাবে জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কী পড়।” বসনভূষণাচ্ছন্ন লজ্জাস্তূপের নিকট হইতে তাহার কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। দুই-তিনবার প্রশ্ন এবং প্রৌঢ়া দাসীর নিকট হইতে পৃষ্ঠদেশে বিস্তর উৎসাহজনক করতাড়নের পর বালিকা মৃদুস্বরে এক নিশ্বাসে অত্যন্ত দ্রুত বলিয়া গেল, চারুপাঠ দ্বিতীয় ভাগ, ব্যাকরণসার প্রথম ভাগ, ভূগোলবিবরণ, পাটিগণিত, ভারতবর্ষের ইতিহাস। এমন সময় বহির্দেশে একটা অশান্ত গতির ধুপ্‌ধাপ্ শব্দ শোনা গেল এবং মুহূর্তের মধ্যে দৌড়িয়া হাঁপাইয়া পিঠের চুল দোলাইয়া মৃন্ময়ী ঘরে আসিয়া প্রবেশ করিল। অপূর্বকৃষ্ণের প্রতি দৃক্পাত না করিয়া একেবারে কনের ভাই রাখালের হাত ধরিয়া টানাটানি আরম্ভ করিয়া দিল। রাখাল তখন আপন পর্যবেক্ষণশক্তির চর্চায় একান্তমনে নিযুক্ত ছিল, সে কিছুতেই উঠিতে চাহিল না। দাসীটি তাহার সংযত কণ্ঠস্বরের মৃদুতা রক্ষার প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া যথাসাধ্য তীব্রভাবে মৃন্ময়ীকে ভর্ৎসনা করিতে লাগিল।

অপূর্বকৃষ্ণ আপনার সমস্ত গাম্ভীর্য এবং গৌরব একত্র করিয়া পাগড়িপরা মস্তকে অভ্রভেদী হইয়া বসিয়া রহিল এবং পেটের কাছে ঘড়ির চেন নাড়িতে লাগিল। অবশেষে সঙ্গীটিকে কিছুতেই বিচলিত করিতে না পারিয়া, তাহার পিঠে একটা সশব্দ চপেটাঘাত করিয়া চট করিয়া কনের মাথার ঘোমটা টানিয়া খুলিয়া দিয়া ঝড়ের মতো মৃন্ময়ী ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল। দাসীটি গুমরিয়া গর্জন করিতে লাগিল এবং ভগ্নীর অকস্মাৎ অবগুণ্ঠনমোচনে রাখাল খিল্‌খিল্ শব্দে হাসিতে আরম্ভ করিল। নিজের পৃষ্ঠের প্রবল চপেটাঘাতটি সে অন্যায় প্রাপ্য মনে করিল না, কারণ, এরূপ দেনা-পাওনা তাহাদের মধ্যে সর্বদাই চলিতেছে। এমন-কি, পূর্বে মৃন্ময়ীর চুল কাঁধ ছাড়াইয়া পিঠের মাঝামাঝি আসিয়া পড়িত; রাখালই একদিন হঠাৎ পশ্চাৎ হইতে আসিয়া তাহার ঝুঁটির মধ্যে কাঁচি চালাইয়া দেয়। মৃন্ময়ী তখন অত্যন্ত রাগ করিয়া তাহার হাত হইতে কাঁচিটি কাড়িয়া লইয়া নিজের অবশিষ্ট পশ্চাতের চুল ক্যাঁচ্ ক্যাঁচ্ শব্দে নির্দয়ভাবে কাটিয়া ফেলিল, তাহার কোঁকড়া চুলের স্তবকগুলি শাখাচ্যুত কালো আঙুরের স্তূপের মতো গুচ্ছ গুচ্ছ মাটিতে পড়িয়া গেল। উভয়ের মধ্যে এরূপ শাসনপ্রণালী প্রচলিত ছিল।

অতঃপর এই নীরব পরীক্ষাসভা আর অধিকক্ষণ স্থায়ী হইল না। পিণ্ডাকার কন্যাটি কোনোমতে পুনশ্চ দীর্ঘাকার হইয়া দাসী-সহকারে অন্তঃপুরে চলিয়া গেল। অপূর্ব পরম গম্ভীরভাবে বিরল গুম্ফরেখায় তা দিতে দিতে উঠিয়া ঘরের বাহিরে যাইতে উদ্যত হইল। দ্বারের নিকটে গিয়া দেখে বার্নিশকরা নূতন জুতাজোড়াটি যেখানে ছিল সেখানে নাই, এবং কোথায় আছে তাহাও বহু চেষ্টায় অবধারণ করা গেল না। বাড়ির লোক সকলেই বিষম বিব্রত হইয়া উঠিল। এবং অপরাধীর উদ্দেশে গালি ও ভর্ৎসনা অজস্র বর্ষিত হইতে লাগিল। অনেক খোঁজ করিয়া অবশেষে অনন্যোপায় হইয়া বাড়ির কর্তার পুরাতন ছিন্ন ঢিলা চটিজোড়াটা পরিয়া, প্যান্টলুন চাপকান পাগড়ি-সমেত সুসজ্জিত অপূর্ব কর্দমাক্ত গ্রামপথে অত্যন্ত সাবধানে চলিতে লাগিল।

পুষ্করিণীর ধারে নির্জন পথপ্রান্তে আবার হঠাৎ সেই উচ্চকণ্ঠের অজস্র হাস্যকলোচ্ছ্বাস। যেন তরুপল্লবের মধ্য হইতে কৌতুকপ্রিয়া বনদেবী অপূর্বর ঐ অসংগত চটিজুতাজোড়ার দিকে চাহিয়া হঠাৎ আর হাসি ধারণ করিয়া রাখিতে পারিল না।

অপূর্ব অপ্রতিভভাবে থমকিয়া দাঁড়াইয়া ইতস্তত নিরীক্ষণ করিতেছে, এমন সময় ঘন বন হইতে বাহির হইয়া একটি নির্লজ্জ অপরাধিনী তাহার সম্মুখে নূতন জুতাজোড়াটি রাখিয়াই পলায়নোদ্যত হইল। অপূর্ব দ্রুতবেগে দুই হাত ধরিয়া তাহাকে বন্দী করিয়া ফেলিল।

মৃন্ময়ী আঁকিয়া-বাঁকিয়া হাত ছাড়াইয়া পলাইবার চেষ্টা করিল, কিন্তু পারিল না। কোঁকড়া চুলে বেষ্টিত তাহার পরিপুষ্ট সহাস্য দুষ্ট মুখখানির উপরে শাখান্তরালচ্যুত সূর্যকিরণ আসিয়া পড়িল। রৌদ্রোজ্জ্বল নির্মল চঞ্চল নির্ঝরিণীর দিকে অবনত হইয়া কৌতূহলী পথিক যেমন নিবিষ্ট দৃষ্টিতে তাহার তলদেশ দেখিতে থাকে, অপূর্ব তেমনি করিয়া গভীর গম্ভীর নেত্রে মৃন্ময়ীর ঊর্ধ্বোৎপ্তি মুখের উপর, তড়িত্তরল দুটি চক্ষুর মধ্যে চাহিয়া দেখিল এবং অত্যন্ত ধীরে ধীরে মুষ্টি শিথিল করিয়া যেন যথাকর্তব্য অসম্পন্ন রাখিয়া বন্দিনীকে ছাড়িয়া দিল। অপূর্ব যদি রাগ করিয়া মৃন্ময়ীকে ধরিয়া মারিত তাহা হইলে সে কিছুই আশ্চর্য হইত না, কিন্তু নির্জন পথের মধ্যে এই অপরূপ নীরব শাস্তির সে কোনো অর্থ বুঝিতে পারিল না।

নৃত্যময়ী প্রকৃতির নূপুরনিক্বণের ন্যায় চঞ্চল হাস্যধ্বনিটি সমস্ত আকাশ ব্যাপিয়া বাজিতে লাগিল এবং চিন্তানিমগ্ন অপূর্বকৃষ্ণ অত্যন্ত ধীরপদেক্ষেপ বাড়িতে আসিয়া উপস্থিত হইল।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

অপূর্ব সমস্ত দিন নানা ছুতা করিয়া অন্তঃপুরে মার সহিত সাক্ষাৎ করিতে গেল না। বাহিরে নিমন্ত্রণ ছিল, খাইয়া আসিল। অপূর্বর মতো, এমন একজন কৃতবিদ্য গম্ভীর ভাবুক লোক একটি সামান্য অশিক্ষিতা বালিকার কাছে আপনার লুপ্ত গৌরব উদ্ধার করিবার, আপনার আন্তরিক মাহাত্ম্যের পরিপূর্ণ পরিচয় দিবার জন্য কেন যে এতটা বেশি উৎকণ্ঠিত হইয়া উঠিবে তাহা বুঝা কঠিন। একটি পাড়াগাঁয়ের চঞ্চল মেয়ে তাঁহাকে সামান্য লোক মনে করিলই বা। সে যদি মুহূর্তকালের জন্য তাঁহাকে হাস্যাস্পদ করিয়া তার পর তাঁহার অস্তিত্ব বিস্মৃত হইয়া রাখাল-নামক একটি নির্বোধ নিরর বালকের সহিত খেলা করিবার জন্য ব্যগ্রতা প্রকাশ করে, তাহাতেই বা তাঁহার ক্ষতি কী। তাহার কাছে প্রমাণ করিবার আবশ্যক কী যে, তিনি বিশ্বদীপ-নামক মাসিক পত্রে গ্রন্থসমালোচনা করিয়া থাকেন, এবং তাঁহার তোরঙ্গের মধ্যে এসেন্স, জুতা, রুবিনির ক্যাম্ফর, রঙিন চিঠির কাগজ এবং ‘হারমোনিয়ম-শিক্ষা’ বহির সঙ্গে একখানি পরিপূর্ণ খাতা নিশীথের গর্ভে ভাবী উষার ন্যায় প্রকাশের প্রতীক্ষায় রহিয়াছে। কিন্তু মনকে বুঝানো কঠিন এবং এই পল্লিবাসিনী চঞ্চলা মেয়েটির কাছে শ্রীযুক্ত অপূর্বকৃষ্ণ রায়, বি এ. কিছুতেই পরাভব স্বীকার করিতে প্রস্তুত নহে।

সন্ধ্যার সময়ে অন্তঃপুরে প্রবেশ করিলে মা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কেমন রে অপু, মেয়ে কেমন দেখলি। পছন্দ হয় তো ?” অপূর্ব কিঞ্চিৎ অপ্রতিভভাবে কহিল, “মেয়ে দেখেছি মা, ওর মধ্যে একটিকে আমার পছন্দ হয়েছে।”

মা আশ্চর্য হইয়া কহিলেন, “তুই আবার কটি মেয়ে দেখলি !”

অবশেষে অনেক ইতস্ততর পর প্রকাশ পাইল, প্রতিবেশিনী শরতের মেয়ে মৃন্ময়ীকে তাঁহার ছেলে পছন্দ করিয়াছে। এত লেখাপড়া শিখিয়া এমনি ছেলের পছন্দ! প্রথমে অপূর্বর পক্ষে অনেকটা পরিমাণ লজ্জা ছিল, অবশেষে মা যখন প্রবল আপত্তি করিতে লাগিলেন তখন তাহার লজ্জা ভাঙিয়া গেল। সে রোখের মাথায় বলিয়া বসিল, ‘মৃন্ময়ীকে ছাড়া আর-কাহাকেও বিবাহ করিব না।’ অন্য জড়পুত্তলি মেয়েটিকে সে যতই কল্পনা করিতে লাগিল ততই বিবাহ-সম্বন্ধে তাহার বিষম বিতৃষ্ণার উদ্রেক হইল।

দুই-তিন দিন উভয়পক্ষে মান-অভিমান, অনাহার-অনিদ্রার পর অপূর্বই জয়ী হইল। মা মনকে বোঝাইলেন যে, মৃন্ময়ী ছেলেমানুষ এবং মৃন্ময়ীর মা উপযুক্ত শিক্ষাদানে অসমর্থ, বিবাহের পর তাঁহার হাতে পড়িলেই তাহার স্বভাবের পরিবর্তন হইবে। এবং ক্রমশ ইহাও বিশ্বাস করিলেন যে, মৃন্ময়ীর মুখখানি সুন্দর। কিন্তু, তখনই আবার তাহার খর্ব কেশরাশি তাঁহার কল্পনাপথে উদিত হইয়া হৃদয় নৈরাশ্যে পূর্ণ করিতে লাগিল, তথাপি আশা করিলেন দৃঢ় করিয়া চুল বাঁধিয়া এবং জব্‌জবে করিয়া তেল লেপিয়া, কালে এ ত্রুটিও সংশোধন হইতে পারিবে। পাড়ার লোক সকলেই অপূর্বর এই পছন্দটিকে অপূর্ব-পছন্দ বলিয়া নামকরণ করিল। পাগলী মৃন্ময়ীকে অনেকেই ভালোবাসিত, কিন্তু তাই বলিয়া নিজের পুত্রের বিবাহযোগ্য বলিয়া কেহ মনে করিত না।

মৃন্ময়ীর বাপ ঈশান মজুমদারকে যথাকালে সংবাদ দেওয়া হইল। সে কোনো একটি স্টীমার কোম্পানির কেরানি-রূপে দূরে নদীতীরবর্তী একটি ক্ষুদ্র স্টেশনে একটি ছোটো টিনের ছাদ-বিশিষ্ট কুটিরে মাল ওঠানো-নাবানো এবং টিকিট বিক্রয়-কার্যে নিযুক্ত ছিল।

তাহার মৃন্ময়ীর বিবাহপ্রস্তাবে দুই চক্ষু বহিয়া জল পড়িতে লাগিল। তাহার মধ্যে কতখানি দুঃখ এবং কতখানি আনন্দ ছিল পরিমাণ করিয়া বলিবার কোনো উপায় নাই।

কন্যার বিবাহ-উপলক্ষে ঈশান হেড-আপিসের সাহেবের নিকট ছুটি প্রার্থনা করিয়া দরখাস্ত দিল। সাহেব উপলক্ষটা নিতান্তই তুচ্ছ জ্ঞান করিয়া ছুটি নামঞ্জুর করিয়া দিলেন। তখন, পূজার সময় এক সপ্তাহ ছুটি পাইবার সম্ভাবনা জানাইয়া, সে-পর্যন্ত বিবাহ স্থগিত রাখিবার জন্য দেশে চিঠি লিখিয়া দিল। কিন্তু অপূর্বর মা কহিল, “এই মাসে দিন ভালো আছে, আর বিলম্ব করিতে পারিব না।”

উভয়তই প্রার্থনা অগ্রাহ্য হইলে পর ব্যথিতহৃদয়ে ঈশান আর-কোনো আপত্তি না করিয়া পূর্বমত মাল ওজন এবং টিকিট বিক্রয় করিতে লাগিল।

অতঃপর মৃন্ময়ীর মা এবং পল্লীর যত বর্ষীয়সীগণ সকলে মিলিয়া ভাবী কর্তব্য সম্বন্ধে মৃন্ময়ীকে অহর্নিশি উপদেশ দিতে লাগিল। ক্রীড়াসক্তি, দ্রুত গমন, উচ্চহাস্য, বালকদিগের সহিত আলাপ এবং ক্ষুধা-অনুসারে ভোজন সম্বন্ধে সকলেই নিষেধ পরামর্শ দিয়া বিবাহটাকে বিভীষিকারূপে প্রতিপন্ন করিতে সম্পূর্ণ কৃতকার্য হইল। উৎকণ্ঠিত শঙ্কিত হৃদয়ে মৃন্ময়ী মনে করিল, তাহার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং তদবসানে ফাঁসির হুকুম হইয়াছে।

সে দুষ্ট পোনি ঘোড়ার মতো ঘাড় বাঁকাইয়া পিছু হটিয়া বলিয়া বসিল, “আমি বিবাহ করিব না।”

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

কিন্তু, তথাপি বিবাহ করিতে হইল।

তার পরে শিক্ষা আরম্ভ হইল। এক রাত্রির মধ্যে মৃন্ময়ীর সমস্ত পৃথিবী অপূর্বর মার অন্তঃপুরে আসিয়া আবদ্ধ হইয়া গেল। শাশুড়ি সংশোধনকার্যে প্রবৃত্ত হইলেন। অত্যন্ত কঠিন মুখ করিয়া কহিলেন, “দেখো বাছা, তুমি কিছু আর কচি খুকি নও, আমাদের ঘরে অমন বেহায়াপনা করিলে চলিবে না।”

শাশুড়ি যে ভাবে বলিলেন মৃন্ময়ী সে ভাবে কথাটা গ্রহণ করিল না। সে ভাবিল, এ ঘরে যদি না চলে তবে বুঝি অন্যত্র যাইতে হইবে। অপরাহ্নে তাহাকে আর দেখা গেল না। কোথায় গেল, কোথায় গেল, খোঁজ পড়িল। অবশেষে বিশ্বাসঘাতক রাখাল তাহাকে তাহার গোপন স্থান হইতে ধরাইয়া দিল। সে বটতলায় রাধাকান্ত ঠাকুরের পরিত্যক্ত ভাঙা রথের মধ্যে গিয়ে বসিয়া ছিল।

শাশুড়ি মা এবং পাড়ার সমস্ত হিতৈষিণীগণ মৃন্ময়ীকে যেরূপ লাঞ্ছনা করিল তাহা পাঠকগণ এবং পাঠিকাগণ সহজেই কল্পনা করিতে পারিবেন।

রাত্রে ঘন মেঘ করিয়া ঝুপ্‌ঝুপ্ শব্দে বৃষ্টি হইতে আরম্ভ হইল। অপূর্বকৃষ্ণ বিছানার মধ্যে অতি ধীরে ধীরে মৃন্ময়ীর কাছে ঈষৎ অগ্রসর হইয়া তাহার কানে কানে মৃদুস্বরে কহিল, “মৃন্ময়ী, তুমি আমাকে ভালোবাস না ?”

মৃন্ময়ী সতেজে বলিয়া উঠিল, “না। আমি তোমাকে কক্খনোই ভালোবাসব না।” তাহার যত রাগ এবং যত শাস্তিবিধান সমস্তই পুঞ্জীভূত বজ্রের ন্যায় অপূর্বর মাথার উপর নিক্ষেপ করিল।

অপূর্ব ক্ষুন্ন হইয়া কহিল, “কেন, আমি তোমার কাছে কী দোষ করেছি।” মৃন্ময়ী কহিল, “তুমি আমাকে বিয়ে করলে কেন।”

এ অপরাধের সন্তোষজনক কৈফিয়ত দেওয়া কঠিন। কিন্তু, অপূর্ব মনে মনে কহিল, যেমন করিয়া হউক এই দুর্বাধ্য মনটিকে বশ করিতে হইবে।

পরদিন শাশুড়ি মৃন্ময়ীর বিদ্রোহী ভাবের সমস্ত লণ দেখিয়া তাহাকে ঘরে দরজা বন্ধ করিয়া রাখিয়া দিল। সে নূতন পিঞ্জরাবদ্ধ পাখির মতো প্রথম অনেকক্ষণ ঘরের মধ্যে ধড়ফড় করিয়া বেড়াইতে লাগিল। অবশেষে কোথাও পালাইবার কোনো পথ না দেখিয়া নিষ্ফল ক্রোধে বিছানার চাদরখানা দাঁত দিয়া ছিঁড়িয়া কুটিকুটি করিয়া ফেলিল, এবং মাটির উপর উপুড় হইয়া মনে মনে বাবাকে ডাকিতে ডাকিতে কাঁদিতে লাগিল।

এমন সময় ধীরে ধীরে কে তাহার পাশে আসিয়া বসিল। সস্নেহে তাহার ধূলিলুণ্ঠিত চুলগুলি কপোলের উপর হইতে তুলিয়া দিবার চেষ্টা করিল। মৃন্ময়ী সবলে মাথা নাড়িয়া তাহার হাত সরাইয়া দিল। অপূর্ব কানের কাছে মুখ নত করিয়া মৃদুস্বরে কহিল, “আমি লুকিয়ে দরজা খুলে দিয়েছি। এসো আমরা খিড়কির বাগানে পালিয়ে যাই।” মৃন্ময়ী প্রবলবেগে মাথা নাড়িয়া সতেজে সরোদনে কহিল, “না।” অপূর্ব তাহার চিবুক ধরিয়া মুখ তুলিয়া দিবার চেষ্টা করিয়া কহিল, “একবার দেখো কে এসেছে।”

রাখাল ভূপতিত মৃন্ময়ীর দিকে চাহিয়া হতবুদ্ধির ন্যায় দ্বারের কাছে দাঁড়াইয়া ছিল। মৃন্ময়ী মুখ না তুলিয়া অপূর্বর হাত ঠেলিয়া দিল। অপূর্ব কহিল, “রাখাল তোমার সঙ্গে খেলা করতে এসেছে, খেলতে যাবে ?” সে বিরক্তি-উচ্ছ্বসিত স্বরে কহিল, “না।” রাখালও সুবিধা নয় বুঝিয়া কোনোমতে ঘর হইতে পালাইয়া হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল। অপূর্ব চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। মৃন্ময়ী কাঁদিতে কাঁদিতে শ্রান্ত হইয়া ঘুমাইয়া পড়িল, তখন অপূর্ব পা টিপিয়া বাহির হইয়া দ্বারে শিকল দিয়া চলিয়া গেল।

তাহার পরদিন মৃন্ময়ী বাপের কাছ হইতে এক পত্র পাইল। তিনি তাঁহার প্রাণপ্রতিমা মৃন্ময়ীর বিবাহের সময় উপস্থিত থাকিতে পারেন নাই বলিয়া বিলাপ করিয়া নবদম্পতিকে অন্তরের আশীর্বাদ পাঠাইয়াছেন।

মৃন্ময়ী শাশুড়িকে গিয়া কহিল, “আমি বাবার কাছে যাব।” শাশুড়ি অকস্মাৎ এই অসম্ভব প্রার্থনায় তাহাকে ভর্ৎসনা করিয়া উঠিলেন, “কোথায় ওর বাপ থাকে তার ঠিকানা নেই ; বলে ‘বাবার কাছে যাব’। অনাসৃষ্টি আবদার।” সে উত্তর না করিয়া চলিয়া গেল। আপনার ঘরে গিয়া দ্বার রুদ্ধ করিয়া নিতান্ত হতাশ্বাস ব্যক্তি যেমন করিয়া দেবতার কাছে প্রার্থনা করে তেমনি করিয়া বলিতে লাগিল, “বাবা, আমাকে তুমি নিয়ে যাও। এখানে আমার কেউ নেই। এখানে থাকলে আমি বাঁচব না।” গভীর রাত্রে তাহার স্বামী নিদ্রিত হইলে ধীরে ধীরে দ্বার খুলিয়া মৃন্ময়ী গৃহের বাহির হইল। যদিও এক-একবার মেঘ করিয়া আসিতেছিল তথাপি জ্যোৎস্নারাত্রে পথ দেখিবার মতো আলোক যথেষ্ট ছিল। বাপের কাছে যাইতে হইলে কোন্ পথ অবলম্বন করিতে হইবে মৃন্ময়ী তাহার কিছুই জানিত না। কেবল তাহার মনের বিশ্বাস ছিল, যে পথ দিয়া ডাকের পত্রবাহক ‘রানার’গণ চলে সেই পথ দিয়া পৃথিবীর সমস্ত ঠিকানায় যাওয়া যায়। মৃন্ময়ী সেই ডাকের পথ ধরিয়া চলিতে লাগিল। চলিতে চলিতে শরীর শ্রান্ত হইয়া আসিল, রাত্রিও প্রায় শেষ হইল। বনের মধ্যে যখন উসখুস করিয়া অনিশ্চিত সুরে দুটো-একটা পাখি ডাকিবার উপক্রম করিতেছে অথচ নিঃসংশয়ে সময় নির্ণয় করিতে না পারিয়া ইতস্তত করিতেছে তখন মৃন্ময়ী পথের শেষে নদীর ধারে একটা বৃহৎ বাজারের মতো স্থানে আসিয়া উপস্থিত হইল। অতঃপর কোন্ দিকে যাইতে হইবে ভাবিতেছে এমন সময় পরিচিত ঝম্‌ঝম্ শব্দ শুনিতে পাইল। চিঠির থলে কাঁধে করিয়া ঊর্ধ্বশ্বাসে ডাকের রানার আসিয়া উপস্থিত হইল। মৃন্ময়ী তাড়াতাড়ি তাহার কাছে গিয়া কাতর শ্রান্তস্বরে কহিল, “কুশীগে আমি বাবার কাছে যাব, আমাকে তুমি সঙ্গে নিয়ে চলো-না।” সে কহিল, “কুশীগ কোথায় আমি জানি নে।” এই বলিয়া ঘাটে-বাঁধা ডাকনৌকার মাঝিকে জাগাইয়া দিয়া নৌকা ছাড়িয়া দিল। তাহার দয়া করিবার বা প্রশ্ন করিবার সময় নাই।

দেখিতে দেখিতে হাট এবং বাজার সজাগ হইয়া উঠিল। মৃন্ময়ী ঘাটে নামিয়া একজন মাঝিকে ডাকিয়া কহিল, “মাঝি, আমাকে কুশীগে নিয়ে যাবে ?” মাঝি তাহার উত্তর দিবার পূর্বেই পাশের নৌকা হইতে একজন বলিয়া উঠিল, “আরে কে ও ! মিনু মা, তুমি এখানে কোথা থেকে।” মৃন্ময়ী উচ্ছ্বসিত ব্যগ্রতার সহিত বলিয়া উঠিল, “বনমালী, আমি কুশীগে বাবার কাছে যাব, আমাকে তোর নৌকায় নিয়ে চল্।” বনমালী, তাহাদের গ্রামের মাঝি ; সে এই উচ্ছৃঙ্খলপ্রকৃতি বালিকাটিকে বিলক্ষণ চিনিত ; সে কহিল, “বাবার কাছে যাবে ? সে তো বেশ কথা। চলো, আমি তোমাকে নিয়ে যাচ্ছি।” মৃন্ময়ী নৌকায় উঠিল।

মাঝি নৌকা ছাড়িয়া দিল। মেঘ করিয়া মুষলধারে বৃষ্টি আরম্ভ হইল। ভাদ্রমাসের পূর্ণ নদী ফুলিয়া ফুলিয়া নৌকা দোলাইতে লাগিল, মৃন্ময়ীর সমস্ত শরীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হইয়া আসিল; অঞ্চল পাতিয়া সে নৌকার মধ্যে শয়ন করিল এবং এই দুরন্ত বালিকা নদী-দোলায় প্রকৃতির স্নেহপালিত শান্ত শিশুটির মতো অকাতরে ঘুমাইতে লাগিল।

জাগিয়া উঠিয়া দেখিল, সে তাহার শ্বশুরবাড়িতে খাটে শুইয়া আছে। তাহাকে জাগ্রত দেখিয়া ঝি বকিতে আরম্ভ করিল। ঝির কণ্ঠস্বরে শাশুড়ি আসিয়া অত্যন্ত কঠিন কঠিন করিয়া বলিতে লাগিলেন। মৃন্ময়ী বিস্ফারিতনেত্রে নীরবে তাঁহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। অবশেষে তিনি যখন তাহার বাপের শিক্ষাদোষের উপর কটা করিয়া বলিলেন, তখন মৃন্ময়ী দ্রুতপদে পাশের ঘরে প্রবেশ করিয়া ভিতর হইতে শিকল বন্ধ করিয়া দিল।

অপূর্ব লজ্জার মাথা খাইয়া মাকে আসিয়া বলিল, “মা, বউকে দুই-এক দিনের জন্যে একবার বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিতে দোষ কী।”

মা অপূর্বকে ‘ন ভূতো ন ভবিষ্যতি’ ভর্ৎসনা করিতে লাগিলেন, এবং দেশে এত মেয়ে থাকিতে বাছিয়া বাছিয়া এই অস্থিদাহকারী দস্যু-মেয়েকে ঘরে আনার জন্য তাহাকে যথেষ্ট গঞ্জনা করিলেন।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

সেদিন সমস্ত দিন বাহিরে ঝড়বৃষ্টি এবং ঘরের মধ্যেও অনুরূপ দুর্যোগ চলিতে লাগিল।

তাহার পরদিন গভীর রাত্রে অপূর্ব মৃন্ময়ীকে ধীরে ধীরে জাগ্রত করিয়া কহিল, “মৃন্ময়ী, তোমার বাবার কাছে যাবে?”

মৃন্ময়ী সবেগে অপূর্বর হাত চাপিয়া ধরিয়া সচকিত হইয়া বলিল, “যাব।”

অপূর্ব চুপিচুপি কহিল, “তবে এসো, আমরা দুজনে আস্তে আস্তে পালিয়ে যাই। আমি ঘাটে নৌকা ঠিক করে রেখেছি।”

মৃন্ময়ী অত্যন্ত সকৃতজ্ঞ হৃদয়ে একবার স্বামীর মুখের দিকে চাহিল। তাহার পর তাড়াতাড়ি উঠিয়া কাপড় ছাড়িয়া বাহির হইবার জন্য প্রস্তুত হইল। অপূর্ব তাহার মাতার চিন্তা দূর করিবার জন্য একখানি পত্র রাখিয়া দুইজনে বাহির হইল।

মৃন্ময়ী সেই অন্ধকার রাত্রে জনশূন্য নিস্তব্ধ নির্জন গ্রামপথে এই প্রথম স্বেচ্ছায় আন্তরিক নির্ভরের সহিত স্বামীর হাত ধরিল; তাহার হৃদয়ের আনন্দ-উদ্বেগ সেই সুকোমল স্পর্শ-যোগে তাহার স্বামীর শিরার মধ্যে সঞ্চারিত হইতে লাগিল। নৌকা সেই রাত্রেই ছাড়িয়া দিল। অশান্ত হর্ষোচ্ছ্বাস সত্ত্বেও অনতিবিলম্বেই মৃন্ময়ী ঘুমাইয়া পড়িল। পরদিন কী মুক্তি, কী আনন্দ। দুই ধারে কত গ্রাম বাজার শস্যক্ষেত্র বন, দুই ধারে কত নৌকা যাতায়াত করিতেছে। মৃন্ময়ী প্রত্যেক তুচ্ছ বিষয়ে স্বামীকে সহস্রবার করিয়া প্রশ্ন করিতে লাগিল। ঐ নৌকায় কী আছে, উহারা কোথা হইতে আসিয়াছে, এই জায়গার নাম কী, এমন সকল প্রশ্ন যাহার উত্তর অপূর্ব কোনো কলেজের বহিতে পায় নাই এবং যাহা তাহার কলিকাতার অভিজ্ঞতায় কুলাইয়া উঠে না। বন্ধুগণ শুনিয়া লজ্জিত হইবেন, অপূর্ব এই-সকল প্রশ্নের প্রত্যেকটারই উত্তর করিয়াছিল এবং অধিকাংশ উত্তরের সহিত সত্যের ঐক্য হয় নাই। যথা, সে তিলের নৌকাকে তিসির নৌকা, পাঁচবেড়েকে রায়নগর এবং মুন্সেফের আদালতকে জমিদারি কাছারি বলিতে কিছুমাত্র কুণ্ঠিত বোধ করে নাই। এবং এই-সমস্ত ভ্রান্ত উত্তরে বিশ্বস্তহৃদয় প্রশ্নকারিণীর সন্তোষের তিলমাত্র ব্যাঘাত জন্মায় নাই।

পরদিন সন্ধ্যাবেলায় নৌকা কুশীগে গিয়া পৌঁছিল। টিনের ঘরে একখানি ময়লা চৌকা-কাঁচের লণ্ঠনে তেলের বাতি জ্বালাইয়া ছোটো ডেস্কের উপর একখানি চামড়ায়-বাঁধা মস্ত খাতা রাখিয়া গা-খোলা ঈশানচন্দ্র টুলের উপর বসিয়া হিসাব লিখিতেছিলেন। এমন সময় নবদম্পতি ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল। মৃন্ময়ী ডাকিল, “বাবা।” সে ঘরে এমন কণ্ঠধ্বনি এমন করিয়া কখনো ধ্বনিত হয় নাই। ঈশানের চোখ দিয়া দর্‌দর্ করিয়া অশ্রু পড়িতে লাগিল। সে কী বলিবে, কী করিবে কিছুই ভাবিয়া পাইল না। তাহার মেয়ে এবং জামাই যেন সাম্রাজ্যের যুবরাজ এবং যুবরাজমহিষী; এই সমস্ত পাটের বস্তার মধ্যে তাহাদের উপযুক্ত সিংহাসন কেমন করিয়া নির্মিত হইতে পারে ইহাই যেন তাহার দিশাহারা বুদ্ধি ঠিক করিয়া উঠিতে পারিল না।

তাহার পর আহারের ব্যাপার – সেও এক চিন্তা। দরিদ্র কেরানি নিজ হস্তে ডাল ভাতে-ভাত পাক করিয়া খায় – আজ এই এমন আনন্দের দিনে সে কী করিবে, কী খাওয়াইবে। মৃন্ময়ী কহিল, “বাবা, আজ আমরা সকলে মিলিয়া রাঁধিব।” অপূর্ব এই প্রস্তাবে সাতিশয় উৎসাহ প্রকাশ করিল।

ঘরের মধ্যে স্থানাভাব লোকাভাব অন্নাভাব, কিন্তু ক্ষুদ্র ছিদ্র হইতে ফোয়ারা যেমন চতুর্গুণ বেগে উত্থিত হয় তেমনি দারিদ্র্যের সংকীর্ণ মুখ হইতে আনন্দ পরিপূর্ণ ধারায় উচ্ছ্বসিত হইতে লাগিল।

এমনি করিয়া তিন দিন কাটিল। দুই বেলা নিয়মিত স্টীমার আসিয়া লাগে, কত লোক, কত কোলাহল; সন্ধ্যাবেলায় নদীতীর একেবারে নির্জন হইয়া যায়, তখন কী অবাধ স্বাধীনতা ; এবং তিন জনে মিলিয়া নানাপ্রকারে জোগাড় করিয়া, ভুল করিয়া, এক করিতে আর-এক করিয়া তুলিয়া রাঁধাবাড়া। তাহার পরে মৃন্ময়ীর বলয়ঝংকৃত স্নেহহস্তের পরিবেশনে শ্বশুর-জামাতার একত্রে আহার এবং গৃহিণীপনার সহস্র ত্রুটি প্রদর্শন-পূর্বক মৃন্ময়ীকে পরিহাস ও তাহা লইয়া বালিকার আনন্দকলহ এবং মৌখিক অভিমান। অবশেষে অপূর্ব জানাইল, আর অধিক দিন থাকা উচিত হয় না। মৃন্ময়ী করুণস্বরে আরো কিছু দিন সময় প্রার্থনা করিল। ঈশান কহিল, “কাজ নাই।”

বিদায়ের দিন কন্যাকে বুকের কাছে টানিয়া তাহার মাথায় হাত রাখিয়া অশ্রুগদ্গদকণ্ঠে ঈশান কহিল, “মা, তুমি শ্বশুরঘর উজ্জ্বল করিয়া লক্ষ্মী হইয়া থাকিয়ো। কেহ যেন আমার মিনুর কোনো দোষ না ধরিতে পারে।”

মৃন্ময়ী কাঁদিতে কাঁদিতে স্বামীর সহিত বিদায় হইল। এবং ঈশান সেই দ্বিগুণ নিরানন্দ সংকীর্ণ ঘরের মধ্যে ফিরিয়া গিয়া দিনের পর দিন, মাসের পর মাস নিয়মিত মাল ওজন করিতে লাগিল।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

এই অপরাধীযুগল গৃহে ফিরিয়া আসিলে মা অত্যন্ত গম্ভীরভাবে রহিলেন, কোনো কথাই কহিলেন না। কাহারও ব্যবহারের প্রতি এমন কোনো দোষারোপ করিলেন না যাহা সে ক্ষালন করিতে চেষ্টা করিতে পারে। এই নীরব অভিযোগ, নিস্তব্ধ অভিমান, লৌহভারের মতো সমস্ত ঘরকন্নার উপর অটলভাবে চাপিয়া রহিল। অবশেষে অসহ্য হইয়া উঠিলে অপূর্ব আসিয়া কহিল, “মা, কলেজ খুলেছে, এখন আমাকে আইন পড়তে যেতে হবে।”

মা উদাসীনভাবে কহিলেন, “বউয়ের কী করবে।”

অপূর্ব কহিল, “বউ এখানেই থাক্।”

মা কহিলেন, “না বাপু, কাজ নাই; তুমি তাকে তোমার সঙ্গে নিয়ে যাও।” সচরাচর মা অপূর্বকে ‘তুই’ সম্ভাষণ করিয়া থাকেন।

অপূর্ব অভিমানক্ষুন্নস্বরে কহিল, “আচ্ছা।”

কলিকাতা যাইবার আয়োজন পড়িয়া গেল। যাইবার আগের রাত্রে অপূর্ব বিছানায় আসিয়া দেখিল, মৃন্ময়ী কাঁদিতেছে।

হঠাৎ তাহার মনে আঘাত লাগিল। বিষণ্নকণ্ঠে কহিল, “মৃন্ময়ী, আমার সঙ্গে কলকাতায় যেতে তোমার ইচ্ছে করছে না ?”

মৃন্ময়ী কহিল, “না।”

অপূর্ব জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি আমাকে ভালোবাস না ?” এ প্রশ্নের কোনো উত্তর পাইল না। অনেক সময় এই প্রশ্নটির উত্তর অতিশয় সহজ কিন্তু আবার এক-এক সময় ইহার মধ্যে মনস্তত্ত্বঘটিত এত জটিলতার সংস্রব থাকে যে, বালিকার নিকট হইতে তাহার উত্তর প্রত্যাশা করা যায় না।

অপূর্ব প্রশ্ন করিল, “রাখালকে ছেড়ে যেতে তোমার মন কেমন করছে ?”

মৃন্ময়ী অনায়াসে উত্তর করিল, “হাঁ।”

বালক রাখালের প্রতি এই বি.এ. পরীক্ষোত্তীর্ণ কৃতবিদ্য যুবকের সূচির মতো অতি সূক্ষ্ম অথচ অতি সুতীক্ষ্ণ ঈর্ষার উদয় হইল। কহিল, “আমি অনেককাল আর বাড়ি আসতে পাব না।” এই সংবাদ সম্বন্ধে মৃন্ময়ীর কোনো বক্তব্য ছিল না। “বোধ হয় দু-বৎসর কিংবা তারও বেশি হতে পারে।”

মৃন্ময়ী আদেশ করিল, “তুমি ফিরে আসবার সময় রাখালের জন্যে একটা তিনমুখো রজাসের ছুরি কিনে নিয়ে এসো।”

অপূর্ব শয়ান অবস্থা হইতে ঈষৎ উত্থিত হইয়া কহিল, “তুমি তা হলে এইখানেই থাকবে ?”

মৃন্ময়ী কহিল, “হাঁ, আমি মায়ের কাছে গিয়ে থাকব।”

অপূর্ব নিশ্বাস ফেলিয়া কহিল, “আচ্ছা, তাই থেকো। যতদিন না তুমি আমাকে আসবার জন্যে চিঠি লিখবে, আমি আসব না। খুব খুশি হলে ?”

মৃন্ময়ী এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বাহুল্য বোধ করিয়া ঘুমাইতে লাগিল। কিন্তু, অপূর্বর ঘুম হইল না, বালিশ উঁচু করিয়া ঠেসান দিয়া বসিয়া রহিল।

অনেক রাত্রে হঠাৎ চাঁদ উঠিয়া চাঁদের আলো বিছানার উপর আসিয়া পড়িল। অপূর্ব সেই আলোকে মৃন্ময়ীর দিকে চাহিয়া দেখিল। চাহিয়া চাহিয়া মনে হইল, যেন রাজকন্যাকে কে রুপার কাঠি ছোঁয়াইয়া অচেতন করিয়া রাখিয়া গিয়াছে। একবার কেবল সোনার কাঠি পাইলেই এই নিদ্রিত আত্মাটিকে জাগাইয়া তুলিয়া মালাবদল করিয়া লওয়া যায়। রুপার কাঠি হাস্য, আর সোনার কাঠি অশ্রুজল।

ভোরের বেলায় অপূর্ব মৃন্ময়ীকে জাগাইয়া দিল; কহিল, “মৃন্ময়ী, আমার যাইবার সময় হইয়াছে। চলো তোমাকে তোমার মার বাড়ি রাখিয়া আসি।”

মৃন্ময়ী শয্যাত্যাগ করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইলে অপূর্ব তাহার দুই হাত ধরিয়া কহিল, “এখন আমার একটি প্রার্থনা আছে। আমি অনেক সময় তোমার অনেক সাহায্য করিয়াছি, আজ যাইবার সময় তাহার একটি পুরস্কার দিবে ?”

মৃন্ময়ী বিস্মিত হইয়া কহিল, “কী।”

অপূর্ব কহিল, “তুমি ইচ্ছা করিয়া, ভালোবাসিয়া আমাকে একটি চুম্বন দাও।”

অপূর্বর এই অদ্ভুত প্রার্থনা এবং গম্ভীর মুখভাব দেখিয়া মৃন্ময়ী হাসিয়া উঠিল। হাস্য সংবরণ করিয়া মুখ বাড়াইয়া চুম্বন করিতে উদ্যত হইল কাছাকাছি গিয়া আর পারিল না। খিল্‌খিল্ করিয়া হাসিয়া উঠিল। এমন দুইবার চেষ্টা করিয়া অবশেষে নিরস্ত হইয়া মুখে কাপড় দিয়া হাসিতে লাগিল। শাসনচ্ছলে অপূর্ব তাহার কর্ণমূল ধরিয়া নাড়িয়া দিল।

অপূর্বর বড়ো কঠিন পণ। দস্যুবৃত্তি করিয়া কাড়িয়া লুটিয়া লওয়া সে আত্মাবমাননা মনে করে। সে দেবতার ন্যায় সগৌরবে থাকিয়া স্বেচ্ছানীত উপহার চায়, নিজের হাতে কিছুই তুলিয়া লইবে না।

মৃন্ময়ী আর হাসিল না। তাহাকে প্রত্যুষের আলোকে নির্জন পথ দিয়া তাহার মার বাড়ি রাখিয়া অপূর্ব গৃহে আসিয়া মাতাকে কহিল, “ভাবিয়া দেখিলাম, বউকে আমার সঙ্গে কলিকাতায় লইয়া গেলে আমার পড়াশুনার ব্যাঘাত হইবে, সেখানে উহারও কেহ সঙ্গিনী নাই। তুমি তো তাহাকে এ বাড়িতে রাখিতে চাও না, আমি তাই তাহার মার বাড়িতেই রাখিয়া আসিলাম।”

সুগভীর অভিমানের মধ্যে মাতাপুত্রের বিচ্ছেদ হইল।

সপ্তম পরিচ্ছেদ

মার বাড়িতে আসিয়া মৃন্ময়ী দেখিল, কিছুতেই আর মন লাগিতেছে না। সে বাড়ির আগাগোড়া যেন বদল হইয়া গেছে। সময় আর কাটে না। কী করিবে, কোথায় যাইবে, কাহার সহিত দেখা করিবে, ভাবিয়া পাইল না।

মৃন্ময়ীর হঠাৎ মনে হইল, যেন সমস্ত গৃহে এবং সমস্ত গ্রামে কেহ লোক নাই। যেন মধ্যাহ্নে সূর্যগ্রহণ হইল। কিছুতেই বুঝিতে পারিল না, আজ কলিকাতায় চলিয়া যাইবার জন্য এত প্রাণপণ ইচ্ছা করিতেছে, কাল রাত্রে এই ইচ্ছা কোথায় ছিল; কাল সে জানিত না যে, জীবনের যে অংশ পরিহার করিয়া যাইবার জন্য এত মন-কেমন করিতেছিল তৎপূর্বেই তাহার সম্পূর্ণ স্বাদ পরিবর্তন হইয়া গিয়াছে। গাছের পক্ব-পত্রের ন্যায় আজ সেই বৃন্তচ্যুত অতীত জীবনটাকে ইচ্ছাপূর্বক অনায়াসে দূরে ছুঁড়িয়া ফেলিল।

গল্পে শুনা যায়, নিপুণ অস্ত্রকার এমন সূক্ষ্ম তরবারি নির্মাণ করিতে পারে যে, তদ্বারা মানুষকে দ্বিখণ্ড করিলেও সে জানিতে পারে না, অবশেষে নাড়া দিলে দুই অর্ধখণ্ড ভিন্ন হইয়া যায়। বিধাতার তরবারি সেইরূপ সূক্ষ্ম, কখন তিনি মৃন্ময়ীর বাল্য ও যৌবনের মাঝখানে আঘাত করিয়াছিলেন সে জানিতে পারে নাই ; আজ কেমন করিয়া নাড়া পাইয়া বাল্য-অংশ যৌবন হইতে বিচ্যুত হইয়া পড়িল এবং মৃন্ময়ী বিস্মিত হইয়া ব্যথিত হইয়া চাহিয়া রহিল।

মাতৃগৃহে তাহার সেই পুরাতন শয়নগৃহকে আর আপনার বলিয়া মনে হইল না, সেখানে যে থাকিত সে হঠাৎ আর নাই। এখন হৃদয়ের সমস্ত স্মৃতি সেই আর-একটা বাড়ি, আর-একটা ঘর, আর-একটা শয্যার কাছে গুন্‌গুন্ করিয়া বেড়াইতে লাগিল।

মৃন্ময়ীকে আর কেহ বাহিরে দেখিতে পাইল না। তাহার হাস্যধ্বনি আর শুনা যায় না। রাখাল তাহাকে দেখিলে ভয় করে। খেলার কথা মনেও আসে না।

মৃন্ময়ী মাকে বলিল, “মা, আমাকে শ্বশুরবাড়ি রেখে আয়।”

এ দিকে, বিদায়কালীন পুত্রের বিষন্ন মুখ স্মরণ করিয়া অপূর্বর মার হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যায়। সে যে রাগ করিয়া বউকে বেহানের বাড়ি রাখিয়া আসিয়াছে ইহা তাঁহার মনে বড়োই বিঁধিতে লাগিল।

হেনকালে একদিন মাথায় কাপড় দিয়া মৃন্ময়ী ম্লানমুখে শাশুড়ির পায়ের কাছে পড়িয়া প্রণাম করিল। শাশুড়ি তৎক্ষণাৎ ছলছলনেত্রে তাহাকে বক্ষে চাপিয়া ধরিলেন। মুহূর্তের মধ্যে উভয়ের মিলন হইয়া গেল। শাশুড়ি বধূর মুখের দিকে চাহিয়া আশ্চর্য হইয়া গেলেন। সে মৃন্ময়ী আর নাই। এমন পরিবর্তন সাধারণত সকলের সম্ভব নহে। বৃহৎ পরিবর্তনের জন্য বৃহৎ বলের আবশ্যক।

শাশুড়ি স্থির করিয়াছিলেন, মৃন্ময়ীর দোষগুলি একটি একটি করিয়া সংশোধন করিবেন, কিন্তু আর-একজন অদৃশ্য সংশোধনকর্তা একটি অজ্ঞাত সংপে উপায় অবলম্বন করিয়া মৃন্ময়ীকে যেন নূতন জন্ম পরিগ্রহ করাইয়া দিলেন।

এখন শাশুড়িকেও মৃন্ময়ী বুঝিতে পারিল, শাশুড়িও মৃন্ময়ীকে চিনিতে পারিলেন; তরুর সহিত শাখাপ্রশাখার যেরূপ মিল, সমস্ত ঘরকন্না তেমনি পরস্পর অখণ্ডসম্মিলিত হইয়া গেল।

এই-যে একটি গম্ভীর স্নিগ্ধ বিশাল রমণীপ্রকৃতি মৃন্ময়ীর সমস্ত শরীরে ও সমস্ত অন্তরে রেখায় রেখায় ভরিয়া উঠিল, ইহাতে তাহাকে যেন বেদনা দিতে লাগিল। প্রথম আষাঢ়ের শ্যামসজল নবমেঘের মতো তাহার হৃদয়ে একটি অশ্রুপূর্ণ বিস্তীর্ণ অভিমানের সঞ্চার হইল। সেই অভিমান তাহার চোখের ছায়াময় সুদীর্ঘ পল্লবের উপর আর-একটি গভীরতর ছায়া নিক্ষেপ করিল। সে মনে মনে বলিতে লাগিল, “আমি আমাকে বুঝিতে পারি নাই বলিয়া তুমি আমাকে বুঝিলে না কেন। তুমি আমাকে শাস্তি দিলে না কেন। তোমার ইচ্ছানুসারে আমাকে চালনা করাইলে না কেন। আমি রাক্ষসী যখন তোমার সঙ্গে কলিকাতায় যাইতে চাহিলাম না, তুমি আমাকে জোর করিয়া ধরিয়া লইয়া গেলে না কেন। তুমি আমার কথা শুনিলে কেন, আমার অনুরোধ মানিলে কেন, আমার অবাধ্যতা সহিলে কেন।’

তাহার পর, অপূর্ব যেদিন প্রভাতে পুষ্করিণীতীরের নির্জন পথে তাহাকে বন্দী করিয়া কিছু না বলিয়া একবার কেবল তাহার মুখের দিকে চাহিয়াছিল, সেই পুষ্করিণী, সেই পথ, সেই তরুতল, সেই প্রভাতের রৌদ্র এবং সেই হৃদয়ভারাবনত গভীর দৃষ্টি তাহার মনে পড়িল এবং হঠাৎ সে তাহার সমস্ত অর্থ বুঝিতে পারিল। তাহার পর সেই বিদায়ের দিনের যে চুম্বন অপূর্বর মুখের দিকে অগ্রসর হইয়া ফিরিয়া আসিয়াছিল, সেই অসম্পূর্ণ চুম্বন এখন মরুমরীচিকাভিমুখী তৃষার্ত পাখির ন্যায় ক্রমাগত সেই অতীত অবসরের দিকে ধাবিত হইতে লাগিল, কিছুতেই তাহার আর পিপাসা মিটিল না। এখন থাকিয়া থাকিয়া মনে কেবল উদয় হয়, ‘আহা, অমুক সময়টিতে যদি এমন করিতাম, অমুক প্রশ্নের যদি এই উত্তর দিতাম, তখন যদি এমন হইত।’

অপূর্বর মনে এই বলিয়া ক্ষোভ জন্মিয়াছিল যে, ‘মৃন্ময়ী আমার সম্পূর্ণ পরিচয় পায় নাই।’ মৃন্ময়ীও আজ বসিয়া বসিয়া ভাবে, ‘তিনি আমাকে কী মনে করিলেন, কী বুঝিয়া গেলেন।’ অপূর্ব তাহাকে যে দুরন্ত চপল অবিবেচক নির্বোধ বালিকা বলিয়া জানিল, পরিপূর্ণ হৃদয়ামৃতধারায় প্রেমপিপাসা মিটাইতে সম রমণী বলিয়া পরিচয় পাইল না, ইহাতেই সে পরিতাপে লজ্জায় ধিক্কারে পীড়িত হইতে লাগিল। চুম্বনের এবং সোহাগের সে ঋণগুলি অপূর্বর মাথার বালিশের উপর পরিশোধ করিতে লাগিল। এমনি ভাবে কতদিন কাটিল।

অপূর্ব বলিয়া গিয়াছিল, ‘তুমি চিঠি না লিখিলে আমি বাড়ি ফিরিব না। মৃন্ময়ী তাহাই স্মরণ করিয়া একদিন ঘরে দ্বাররুদ্ধ করিয়া চিঠি লিখিতে বসিল। অপূর্ব তাহাকে যে সোনালি-পাড়-দেওয়া রঙিন কাগজ দিয়াছিল তাহাই বাহির করিয়া বসিয়া ভাবিতে লাগিল। খুব যত্ন করিয়া ধরিয়া লাইন বাঁকা করিয়া অঙ্গুলিতে কালি মাখিয়া অর ছোটো বড়ো করিয়া উপরে কোনো সম্বোধন না করিয়া একেবারে লিখিল, ‘তুমি আমাকে চিঠি লিখ না কেন। তুমি কেমন আছ, আর তুমি বাড়ি এসো।’ আর কী বলিবার আছে কিছুই ভাবিয়া পাইল না। আসল বক্তব্য কথা সবগুলিই বলা হইয়া গেল বটে, কিন্তু মনুষ্যসমাজে মনের ভাব আর-একটু বাহুল্য করিয়া প্রকাশ করা আবশ্যক। মৃন্ময়ীও তাহা বুঝিল; এইজন্য আরো অনেকণ ভাবিয়া ভাবিয়া আর কয়েকটি নূতন কথা যোগ করিয়া দিল – ‘এইবার তুমি আমাকে চিঠি লিখো, আর কেমন আছ লিখো, আর বাড়ি এসো, মা ভালো আছেন, বিশু পুঁটি ভালো আছে, কাল আমাদের কালো গোরুর বাছুর হয়েছে।’ এই বলিয়া চিঠি শেষ করিল। চিঠি লেফাফায় মুড়িয়া প্রত্যেক অক্ষরটির উপর একটি ফোঁটা করিয়া মনের ভালোবাসা দিয়া লিখিল, শ্রীযুক্ত বাবু অপূর্বকৃষ্ণ রায়। ভালোবাসা যতই দিক, তবু লাইন সোজা, অক্ষর সুছাঁদ এবং বানান শুদ্ধ হইল না।

লেফাফায় নামটুকু ব্যতীত আরো যে কিছু লেখা আবশ্যক মৃন্ময়ীর তাহা জানা ছিল না। পাছে শাশুড়ি অথবা আর-কাহারও দৃষ্টিপথে পড়ে, সেই লজ্জায় চিঠিখানি একটি বিশ্বস্ত দাসীর হাত দিয়া ডাকে পাঠাইয়া দিল।

বলাবাহুল্য, এ পত্রের কোনো ফল হইল না, অপূর্ব বাড়ি আসিল না।

অষ্টম পরিচ্ছেদ

মা দেখিলেন, ছুটি হইল তবু অপূর্ব বাড়ি আসিল না। মনে করিলেন এখনো সে তাঁহার উপর রাগ করিয়া আছে।

মৃন্ময়ীও স্থির করিল, অপূর্ব তাহার উপর বিরক্ত হইয়া আছে, তখন আপনার চিঠিখানা মনে করিয়া সে লজ্জায় মরিয়া যাইতে লাগিল। সে চিঠিখানা যে কত তুচ্ছ, তাহাতে যে কোনো কথাই লেখা হয় নাই, তাহার মনের ভাব যে কিছুই প্রকাশ করা হয় নাই, সেটা পাঠ করিয়া অপূর্ব যে মৃন্ময়ীকে আরো ছেলেমানুষ মনে করিতেছে, মনে মনে আরো অবজ্ঞা করিতেছে, ইহা ভাবিয়া সে শরবিদ্ধের ন্যায় অন্তরে অন্তরে ছট্ফট্ করিতে লাগিল। দাসীকে বার বার করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “সে চিঠিখানা তুই কি ডাকে দিয়ে এসেছিস।” দাসী তাহাকে সহস্রবার আশ্বাস দিয়া কহিল, “হাঁ গো, আমি নিজের হাতে বাক্সের মধ্যে ফেলে দিয়েছি, বাবু তা এতদিনে কোন্ কালে পেয়েছে।”

অবশেষে অপূর্বর মা একদিন মৃন্ময়ীকে ডাকিয়া কহিলেন, “বউমা, অপু অনেকদিন তো বাড়ি এল না, তাই মনে করছি, কলকাতায় গিয়ে তাকে দেখে আসি গে। তুমি সঙ্গে যাবে ?” মৃন্ময়ী সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়িল এবং ঘরের মধ্যে আসিয়া দ্বার রুদ্ধ করিয়া বিছানার উপর পড়িয়া বালিশখানা বুকের উপর চাপিয়া ধরিয়া হাসিয়া নড়িয়া-চড়িয়া মনের আবেগ উন্মুক্ত করিয়া দিল; তাহার পর ক্রমে গম্ভীর হইয়া, বিষন্ন হইয়া আশঙ্কায় পরিপূর্ণ হইয়া বসিয়া কাঁদিতে লাগিল।

অপূর্বকে কোনো খবর না দিয়া এই দুটি অনুতপ্তা রমণী তাহার প্রসন্নতা ভিক্ষা করিবার জন্য কলিকাতায় যাত্রা করিল। অপূর্বর মা সেখানে তাঁহার জামাইবাড়িতে গিয়া উঠিলেন।

সেদিন মৃন্ময়ীর পত্রের প্রত্যাশায় নিরাশ হইয়া সন্ধ্যাবেলায় অপূর্ব প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করিয়া নিজেই তাহাকে পত্র লিখিতে বসিয়াছে। কোনো কথাই পছন্দমত হইতেছে না। এমন একটা সম্বোধন খুঁজিতেছে যাহাতে ভালোবাসাও প্রকাশ হয় অথচ অভিমানও ব্যক্ত করে; কথা না পাইয়া মাতৃভাষার উপর অশ্রদ্ধা দৃঢ়তর হইতেছে। এমন সময় ভগ্নীপতির নিকট হইতে পত্র পাইল, ‘মা আসিয়াছেন, শীঘ্র আসিবে এবং রাত্রে এইখানেই আহারাদি করিবে। সংবাদ সমস্ত ভালো।’ – শেষ আশ্বাস সত্ত্বেও অপূর্ব অমঙ্গলশঙ্কায় বিমর্ষ হইয়া উঠিল। অবিলম্বে ভগ্নীর বাড়ি গিয়া উপস্থিত হইল।

সাক্ষাৎমাত্রই মাকে জিজ্ঞাসা করিল, “মা, সব ভালো তো ?”

মা কহিলেন, “সব ভালো। তুই ছুটিতে বাড়ি গেলি না, তাই আমি তোকে নিতে এসেছি।”

অপূর্ব কহিল, “সেজন্য এত কষ্ট করিয়া আসিবার কী আবশ্যক ছিল ; আইন পরীক্ষার পড়াশুনা-” ইত্যাদি।

আহারের সময় ভগ্নী জিজ্ঞাসা করিল, ‘দাদা, এবার বউকে তোমার সঙ্গে আনলে না কেন।”

দাদা গম্ভীরভাবে কহিতে লাগিল, “আইনের পড়াশুনা – ” ইত্যাদি।

ভগ্নীপতি হাসিয়া কহিল, “ও-সমস্ত মিথ্যা ওজর। আমাদের ভয়ে আনতে সাহস হয় না।”

ভগ্নী কহিল, “ভয়ংকর লোকটাই বটে। ছেলেমানুষ হঠাৎ দেখলে আচমকা আঁৎকে উঠতে পারে।”

এইভাবে হাস্যপরিহাস চলিতে লাগিল, কিন্তু অপূর্ব অত্যন্ত বিমর্ষ হইয়া রহিল। কোনো কথা তাহার ভালো লাগিতেছিল না। তাহার মনে হইতেছিল সেই যখন মা কলিকাতায় আসিলেন তখন মৃন্ময়ী ইচ্ছা করিলে অনায়াসে তাঁহার সহিত আসিতে পারিত। বোধ হয়, মা তাহাকে সঙ্গে আনিবার চেষ্টাও করিয়াছিলেন, কিন্তু সে সম্মত হয় নাই। এ সম্বন্ধে সংকোচবশত মাকে কোনো প্রশ্ন করিতে পারিল না – সমস্ত মানবজীবন এবং বিশ্বরচনাটা আগাগোড়া ভ্রান্তিসংকুল বলিয়া বোধ হইল। আহারান্তে প্রবলবেগে বাতাস উঠিয়া বিষম বৃষ্টি আরম্ভ হইল।

ভগ্নী কহিল, “দাদা, আজ আমাদের এখানেই থেকে যাও।”

দাদা কহিল, “না, বাড়ি যেতে হবে; আজ কাজ আছে।”

ভগ্নীপতি কহিল, “রাত্রে তোমার আবার এত কাজ কিসের। এখানে এক রাত্রি থেকে গেলে তোমার তো কারও কাছে জবাবদিহি করতে হবে না, তোমার ভাবনা কী।”

অনেক পীড়াপীড়ির পর বিস্তর অনিচ্ছা-সত্ত্বে অপূর্ব সে রাত্রি থাকিয়া যাইতে সম্মত হইল।

ভগ্নী কহিল, ‘দাদা, তোমাকে শ্রান্ত দেখাচ্ছে, তুমি আর দেরি করো না, চলো শুতে চলো।” অপূর্বরও সেই ইচ্ছা। শয্যাতলে অন্ধকারের মধ্যে একলা হইতে পারিলে বাঁচে, কথার উত্তর-প্রত্যুত্তর করিতে ভালো লাগিতেছে না।

শয়নগৃহের দ্বারে আসিয়া দেখিল ঘর অন্ধকার। ভগ্নী কহিল, “বাতাসে আলো নিবে গেছে দেখছি। তা, আলো এনে দেব কি, দাদা।”

অপূর্ব কহিল, “না, দরকার নেই, আমি রাত্রে আলো রাখি নে।”

ভগ্নী চলিয়া গেলে অপূর্ব অন্ধকারে সাবধানে খাটের অভিমুখে গেল। খাটে প্রবেশ করিতে উদ্যত হইতেছে এমন সময়ে হঠাৎ বলয়নিক্বণশব্দে একটি সুকোমল বাহুপাশ তাহাকে সুকঠিন বন্ধনে বাঁধিয়া ফেলিল এবং একটি পুষ্পপুটতুল্য ওষ্ঠাধর দস্যুর মতো আসিয়া পড়িয়া অবিরল অশ্রুজলসিক্ত আবেগপূর্ণ চুম্বনে তাহাকে বিস্ময়প্রকাশের অবসর দিল না। অপূর্ব প্রথমে চমকিয়া উঠিল, তাহার পর বুঝিতে পারিল, অনেক দিনের একটি হাস্যবাধায়-অসম্পন্ন চেষ্টা আজ অশ্রুজলধারায় সমাপ্ত হইল।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা ইতিহাস উপন্যাস গল্প জীবনী ও স্মৃতিকথা সৃজনশীল প্রকাশনা

লিস্টনিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ(১,২,৩,৪,৫,৬,৭,৮,৯,১০,১১,১২)

লিস্টনিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ

——————————ডঃ রমিত আজাদ
Listening to the Wind of Change

 

লিস্ট্‌নিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ -১

(সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও পতন পরবর্তী সময়ের উপর ভিত্তি করে একটি ধারাবাহিক উপন্যাস)

যুগে যুগে মানুষ স্বপ্ন দেখেছে আদর্শ সমাজের। সেই আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নানা যুগে মানুষ আঁকড়ে ধরেছে নানা দর্শনকে। ইতিহাসের ধারায় নয়-দশ হাজার বছর পূর্বে গড়ে ওঠা মানব সভ্যতা এ’ পর্যন্ত এসেছে নানা রকম ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দি্যে, রোম সাম্রাজ্যের উথ্থান-পতন, চার্চের অনুশাসনের প্রবল প্রতাপ ও রেনেঁসার মধ্য দিয়ে তার সমাপ্তি, পারস্য সাম্রাজ্যের উথ্থান-পতন, ইসলামী খিলাফতের দ্বিগীজ্বয় আবার তার দুর্বল হয়ে যাওয়া, এবং পরিশেষে শেষ প্রদীপ অটোমান সাম্রাজ্যেরও নিভে যাওয়ার পর, মাথাচারা দিয়ে উঠতে শুরু করে প্রোটেস্টান্ট দর্শনে বিশ্বাসী ইউরোপের ছোট ছোট দেশগুলো। গোটা এশিয়া, আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়ে উপনিবেশ স্থাপন করে সূচনা করল বিশ্বব্যপী লুন্ঠনের এক নব্য ইতিহাস। কিন্তু এই লুন্ঠনে লাভবান খোদ ইউরোপীয় চিন্তাবিদরাই অনুধাবন করতে শুরু করেছিলেন, এহেন একতরফা শোষণের অবসান হতে বাধ্য। এ্যাডল্‌ফ তিয়ের ও ফ্রাঁসোয়া গিজোর মত ফরাসী ঐতিহাসিকেরা শ্রেণী ভেদ ও শ্রেণী সংগ্রামের কথা লিখলেন। সব সমাজেই মোটামুটি দুটি শ্রেণী আছে, শোষক ও শোষিত, এবং এদের মধ্যে সংগ্রাম বাধবেই। ১৮৬৭ সালে জার্মান ইহুদী দার্শনিক কার্ল মার্কস পূর্বসুরীদের শ্রেণী বিভাজনের চিন্তাটা গ্রহন করে জন্ম দেন এক নতুন দর্শনের, যার নাম কম্যুনিজম। যেখানে আরো এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বললেন, সংগ্রামের মাধ্যমে শ্রেণী লোপ করাই সমাজ বিবর্তনের প্রধান পথ। পৃথিবীব্যাপী ঝড় তোলে তার লিখিত ‘ডাস ক্যাপিটাল’। নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে দিয়ে যায় এই দর্শন। শেষ পর্যন্ত একদল লোক আঁকড়ে ধরে এই দর্শনকে। তাদের বদ্ধমূল ধারণা হয়, এই দর্শনই পৃথিবী থেকে সব দুর্নীতি আর বৈষম্যের জঞ্জাল দূর করে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে আদর্শ সমাজ ব্যবস্থা। দেশে দেশে প্রতিস্ঠা হতে শুরু করে ‘কম্যুনিস্ট পার্টি’। মার্কস বলেছিলেন, “ইউরোপ ভুত দেখছে, কম্যুনিজমের ভুত।” ১৯১৭ সালের অক্টোবরে সেই ভুত হঠাৎ করে ঘাড়ে চেপে বসল রাশিয়ার। অনেকগুলো জাতি ও স্টেট নিয়ে গঠিত জারের রুশ সাম্রাজ্যের নাম রাতারাতি পাল্টে হয়ে গেল ‘সোভিয়েত ইউনিয়ন’। কলেবরে ইউরোপ এমনকি আফ্রিকা মাহাদেশের চাইতেও বড় এই বিশাল রাস্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে বসল ‘সোভিয়েত কম্যুনিস্ট পার্টি’। ১৯১৭ থেকে ১৯৮৪ প্রবল প্রতাপে শাসন করেছে এই রাজনৈতিক দলটি। শুধু নিজ দেশের অভ্যন্তরেই নয়, লৌহ পর্দায় ঘেরা ইউনিয়নের অভ্যন্তর থেকে সে জাল বিস্তার করে সমগ্র পৃথিবীব্যপী।

একের পর এক বিভিন্ন দেশে সফল হতে শুরু করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। ইউরোপের পূর্বাংশ ছেঁয়ে যায় এই আদর্শে বিশ্বাসীদের শাসনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরপরই কম্যুনিস্টরা জাঁকি্য়ে বসে গণচীনে। সেই সাথে এশিয়ার কয়েকটি দেশে। আফ্রিকাও বাদ থাকেনি। এমনকি আটলান্টিকের অথৈ জলরাশী পেরিয়ে সুদুর আমেরিকা মহাদেশেও ছড়িয়ে পড়ে এই দর্শন। এই দর্শন বিরোধী রাস্ট্রগুলোর নেতা প্রবল প্রতাপশালী মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের পেটের ভিতর দ্বীপ রাস্ট্র কিউবায় ক্ষমতা দখল করে নেয় কম্যুনিস্টরা। তালিকা থেকে পৃথিবীর যে কয়টি দেশ বাকি ছিল সেখানেও সক্রিয় হয়ে ওঠে বিপ্লবীরা। নানা রকম ঘাত-প্রতিঘাত, আঘাত-সংঘাত, কখনো নিরস্ত্র, কখনো সসস্ত্র আন্দোলনে উত্তাল ছিল ‘৬০ ও ‘৭০-এর দশকের বিশ্ব।

কম্যুনিস্টদের ভাষায় এটা ছিল শ্রেণী সংগ্রাম – ধনীক শ্রেণী বনাম সর্বহারা, মালিক বনাম শ্রমিক, শোষক বনাম শোষিত। গুটি কতক ধনীরা প্রবল শক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধরে আছে তাদের ধন সম্পদ, আর সর্বহারারা পঙ্গপালের মত ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে যেতে চাচ্ছে সেই সম্পদ। চলছে দু’পক্ষের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। এমনই মনে হয়েছিল দৃশ্যটা একপাশ থেকে।

পুঁজিবাদী দেশগুলোর নিরপেক্ষ মানুষদের মনে হয়েছিল শেষ পর্যন্ত পরাজিত হবে পুঁজিবাদ। আদর্শগত দিক থেকে কম্যুনিজমই সেরা। পুঁজিবাদী দেশগুলোকে একসময় কম্যুনিজম গ্রহণ করতেই হবে। ব্যাপার শুধু সময়ের। ঠিক সে সময়ই ঘটনা ঘটল বিপরীত দিক থেকে। ১৯৮৪ সালে বিশ্ববাসী পরিচিত হলো দুটি নতুন শব্দের সাথে ‘পেরেস্ত্রোইকা’ ও ‘গ্লাসনস্ত’। শব্দ দুটি রুশ যার অর্থ যথাক্রমে, ‘পুনর্গঠন’ ও ‘উন্মুক্ততা’। নতুন হাওয়া বইতে শুরু করেছে কম্যুনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নে। যে আদর্শকে তারা কেবল আঁকড়েই ধরে রাখেনি বরং সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে, তার কোথাও কোন ত্রুটি রয়েছে। যে ত্রুটির সংবাদ এতকাল কেউ পায়নি, তা আজ মৃদু কম্পনের মত অনুভূত হতে শুরু করেছে। সেই ত্রুটির সংশোধন প্রয়োজন, তা নইলে প্রবল ভূমিকম্পে সব ধ্বসে পড়েতে পারে।

তাই সেখানে গৃহিত হলো এই দু’টি নীতি। কিন্তু তাতেও কাজ হলো বলে মনে হয় না। কম্পনের মাত্রা বাড়তেই শুরু করল। ‘৮৪ থেকে ‘৯০ ঠিক ছয় বছরের মাথায় তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়ল এই এতগুলো বছরের প্রবল প্রতাপশালী সোভিয়েত ইউনিয়ন। ঠিক তার পরপর অনেক ঘটনাই ঘটল খুব দ্রুত। শান্ত-নির্জন সোভিয়েত ইউনিয়ন অশান্ত হয়ে উঠল। পরিবর্তনের ধাক্কায় পাল্টে গেল অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক রাস্ট্রগুলোও। পাল্টে গেল সমগ্র বিশ্ব। কি ঘটেছিল তখন? কি হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরে? সাধারণ মানুষের জীবন ধারা চিন্তা-চেতনায় কেমন প্রভাব পড়েছিল সেই সময়ের? কেমন করে তারা প্রত্যক্ষ করেছিল সেই সময়ের রাজনীতিকে? কেমন করে মোকাবেলা করেছিল এই অস্থিরতাকে? এই সবকিছু নিয়ে এই ধারাবাহিক উপন্যাস – ‘লিস্ট্‌নিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ’। সোভিয়েত ইউনিয়নের পরিবর্তন নিয়ে লেখা ও গাওয়া বিখ্যাত গানের গ্রুপ ‘স্করপিওন্‌স’-এর একটি গানের কলি থেকে এই নামটি নেয়া হয়েছে।

এখানে গল্পের নায়ক একজন বাংলাদেশী। যে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে গিয়েছে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নে। রাজনীতিতে তার আগ্রহ সামান্য। আর ঐ বয়সে কতটুকুই বা বোঝা যায়? হঠাৎ করে তার চোখের সামনেই ঘটে যেতে শুরু করল সবকিছু। আর সেও হয়ে উঠল ঐ ঘটনাবহুল সময়ের অংশ।

লিস্ট্নিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ – ২

পূব আকাশে উঠি উঠি করছে সূর্য। ভোরের সূর্য আমার দারুন ভালো লাগে। সেই সাথে ভালো লাগে ঐ সুনীল আকাশটাকে। হোস্টেলের রূমে আমার বিছানায় শুয়ে জানালা দিয়ে পুরো আকাশটাকেই দেখা যায়। সাপ্তাহিক ছুটির অলস দিনটিতে আমি বিছানায় শুয়ে দেখি আকাশে হরেক রঙের মেঘের খেলা। জানালা দিয়ে উঁকি দেয়া টুকরো আকাশটা কখনো পুরোটাই আশ্চর্য্য নীল, আবার একটু পরেই একদল সাদা মেঘ এসে ভীড় করে। ধীরে ধীরে তাদের আকার আকৃতি বদলায়, কখনো রঙও বদলায়। এইভাবে বদলাতে বদলাতে তারা ভেসে ভেসে দৃষ্টির বাইরে চলে যায়। আবার তাদের জায়গায় এসে দাঁড়ায় অন্য কোন মেঘের দল। ভোরের আকাশ আর দুপুরের আকাশ একরকম নয়।সদ্য উদিত সূর্যের বর্ণচ্ছটায় ভোরের মেঘের গায়ে লাল-গোলাপী ছোপ পড়ে। যেন লজ্জ্বরাঙা কিশোরীর গালে রক্ত ছলকে উঠেছে। দুপুর গড়াবার আগেই সেই রঙ হারিয়ে শ্বেত-শুভ্র হয়ে যায় সেই মেঘরাজী। বিকেল নাগাদ আবার সেই গোলাপী আভা ফিরে পায় সেই মেঘগুলো। তাদের পাশে পাশে দেখা যায় টুকরো টুকরো ছাই রঙা মেঘ। এই মেঘের রঙ পাল্টাপাল্টি দেখতে বেশ ভালো লাগে আমার। শুধু কি মেঘ? আকাশের রঙও বদলায়। আমি ভালো করে লক্ষ্য করে দেখেছি আকাশের ঐ নীল রঙও দিনের সময়ভেদে নানান ঔজ্জ্বল্যের হয়। দিনের শেষে সন্ধ্যা নাগাদ নীল ধীরে ধীরে ছাই রঙা, তারপর দিনটা ফুরিয়ে গেলে, গোধুলির ম্লান আলো উবে গিয়ে নিকষ কালো হয়ে, ঝকঝকে তারাগুলো বুকে ধরে রাতের রূপ ধারণ করে। ঐ অত অত উজ্জ্বল তারাগুলো মিটমিট করে জ্বলে। অরুন্ধুতি, কালপুরুষ, সপ্তর্ষিমন্ডল, ক্যসিওপিয়া সরে সরে গিয়ে নতুন দৃশ্যপট রচনা করে। কখনো পাহাড়ী ফুলের মিষ্টি গন্ধ এসে মনে আবেশ ছড়ায়।

সিলেটের প্রকৃতিক সৌন্দর্য্য অদ্ভুত। আমার কলেজটির আশেপাশে ছোটবড় পাহাড়ের সারি। মাঝে মাঝে সবুজ উপত্যকা। পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে ঝাঁকড়া সবুজ পাতাওয়ালা নানান জাতের বিটপী দাঁড়িয়ে আছে এখানে সেখানে। ক্যাম্পাসের পিছন দিয়ে কলকল করে বয়ে চলেছে পাহাড়ী ঝর্ণা মালিনীছড়া। দূরের খাসিয়া-জয়ন্তীয়া পাহাড়ের চূড়াগুলোকে দেখায় গাঢ় নীল। আর কাছেরগুলো উজ্জ্বল সবুজ। ঘাস, প্রান্তর আর পাহাড়ের গোড়ার সঙ্গমস্থলের কোথাও সবুজ কোথাও খোলা মাটি। আর বহু দূরে দিগন্তের একেবারে কাছাকাছি আকাশের গায়ে হেলান দি্যে থাকা ঘুমন্ত পাহাড়গুলোর সৌন্দর্য্য ভাষায় বর্ণনা করা যায়না।

সিলেটের আবহাওয়াও অদ্ভুত। এই রোদ তো এই মেঘ। ঝকঝকে আকাশে সোনালী সূর্য্য হাসছে, বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ কোথা থেকে উড়ে আসে কালো মেঘের দল। অল্পক্ষণের মধ্যেই ছেয়ে দিল নীল আকাশ। তারপর ঝমঝম করে শুরু হলো বৃষ্টি। ঝরছে তো ঝরছেই, ঝরছে তো ঝরছেই, আর থামার কোন নাম নেই। মনে হবে যেন অনন্তকাল আমরা এই বৃষ্টির মধ্যেই আছি। বৃষ্টির বড় বড় ফোটাগুলো পড়তে পড়তে যখন চারিদিক মূখরিত করে তোলে, তখন প্রকৃতির মাঝে এক অদ্ভুত সুর জাগে। সেই সুরের মূর্ছনায় মন উদাস হয়। মনে হয় যেন বৃষ্টির গান শুনছি।

তবে সারা বছরই এক রকম নয়, ছয়টি ঋতু ছয় রূপেই আসে। বারবার প্রকৃতির রঙ বদলায়। দু’য়েক সময় কাল বৈশাখী ঝড় ওঠে। ঝড়ের দোর্দন্ড প্রতাপে উপড়ে ফেলে কিছু অসহায় গাছ, দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে টিনের ঘর। উড়িয়ে নিয়ে যায় কোনরকমে টিকে থাকা দরিদ্রের বাঁশের বেড়া। প্রচন্ড বেগে বাতাস যখন শীষ কাটতে থাকে, তখন মজবুত দালানে বসেও বড় ভয় হয়। সেই শিষ কাটতে থাকা প্রতাপী বাতাসও একসময় শান্ত হয়ে আসে। প্রকৃতিতে আবার ফিরে আসে স্বস্তি ।

সিলেটে আর বেশীদিন নেই আমি। এইতো সামনেই এইচ এস সি পরীক্ষা। তারপর এই কলেজের পাট চুকিয়ে ঢাকা চলে যাব। অনেকগুলো বছর এখানে ছিলাম। চলে যাব ভাবতেই মনটা খারাপ লাগছে। সিলেটের এই কলেজটিকে আমি বড় বেশী ভালোবাসি। এই কলেজ ছেড়ে চলে যাব ভেবে মাঝে মাঝে কান্নাই পেয়ে যায়। এই কলেজের জন্য আমার মন খুব পুড়বে । সব চাইতে বেশী মিস করব এই জানালাটিকে, যার মধ্যে দিয়ে আমি প্রকৃতির রূপ বদলানো দেখতাম।

যা হয়েছে তা ভালোই হয়েছে,
যা হচ্ছে তা ভালোই হচ্ছে,
যা হবে তা ভালোই হবে।

তোমার কি হারিয়েছে – যে তুমি কাঁদছো?
তুমি কি নিয়ে এসেছিলে – যা তুমি হারিয়েছ?
তুমি কি সৃষ্টি করেছ – যা নষ্ট হয়ে গেছে?
তুমি যা নিয়েছ, এখান থেকেই নিয়েছ,

তোমার আজ যা আছে,
কাল তা অন্যকারো ছিল।
পরশু সেটা অন্যকারো হয়ে যাবে —
পরিবর্তনই সংসারের নিয়ম।

(উপরের কথাগুলো গীতার সারাংশ)


লিস্ট্নিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ – ৩

“রোমানকে আর দেশে পড়ানো ঠিক হবেনা”। রাতের খাবারের টেবিলে বসে বললেন আমার মা।
ঃ হু, আমিও এরকমই ভাবছিলাম।
সায় দিলেন আমার বাবা। বাবা-মার একমাত্র ছেলে আমি, খেতে খেতে চুপচাপ শুনছিলাম তাদের কথা। কথাগুলো ঠিক যেন আমার বিশ্বাস হতে চাইছিল না। এইচ, এস, সি, পরীক্ষা দিয়ে ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গায় ভর্তির জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কোচিং করছি। তখন ভর্তী পরিক্ষায় কম্পিটিশন ছিল ভীষণ। ছাত্রসংখ্যা লক্ষ লক্ষ অথচ সীটের সংখ্যা কয়েক হাজার হবে মাত্র। বুয়েট, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, আটটি মেডিক্যাল কলেজ, চারটি বি, আই, টি, ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চিটাগাং ও রাজশাহী চারটি বিশ্ববিদ্যালয় মোটামুটি এই ছিল সেই সময়ের উচ্চ শিক্ষার বিদ্যাপিঠ। এছাড়া একদল ছেলে ঝুকত সসস্ত্রবাহীনি ও মেরিন একাডেমির দিকে। বিশ্ববিদ্যালয় বলতে আমরা তখন পাবলিক বা সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ই বুঝতাম, বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ধারনাই সেই ১৯৮৮ সালে তৈরী হয়নি। একটি বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজের কথা উড়ো উড়ো শুনতে পাচ্ছিলাম, তবে আমি বা আমাদের বন্ধু-বান্ধবের কেউই ঐ মুখো হওয়ার কথা ভাবিইনি। প্রথমতঃ বিশাল টাকা-পয়সা খরচ করে পড়ার ব্যাপার, দ্বিতীয়তঃ ওখানে পড়াটা মোটেও প্রেস্টিজিয়াস মনে করিনি- ‘ভালো ছাত্ররা ঐসব হেজি-পেজি জায়গায় পড়বে কেন, এতে কোন সম্মান আছে? ওখানে পড়বে যারা কোথাও চান্স পাবেনা অথচ বাবার অঢেল টাকা।’ এই সব ভাবতাম । আমার টার্গেট ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ভালো সাবজেক্টে পড়ার। ভালো সাবজেক্ট বলতে আমরা পপুলার সাবজেক্ট বুঝতাম। ফিজিক্স, এ্যপ্লাইড ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ম্যাথ, বায়োকেমিস্ট্রি, সদ্য খোলা মাইক্রো বায়োলজী, বাণিজ্য অনুষদের ইকোনমিক্স, কলা অনুষদের ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস, ল, ইত্যাদি।পরবর্তি জীবনে বুঝেছি, সব সাবজেক্টই ভালো, খারাপ কোন সাবজেক্ট নেই। বাংলাদেশ দরিদ্র দেশ, এখানে মানুষ প্রতিদিন যেই সমস্যাটা সব চাইতে বেশি ফেস করে সেটা ম্যাটেরিয়াল প্রবলেম। তাই মানুষ এমন একটা সাবজেক্ট খোঁজে যেই সাবজেক্টটার মার্কেট ভ্যালু আছে, অর্থাৎ যেই সাবজেক্ট-এ পড়লে তার দ্রুত চাকুরী হবে ও ভালো অর্থ উপার্জন করতে পারবে। শুনেছি এককালে ইন্জিনিয়ারিং-এ পড়ার আগ্রহী ছাত্রের ভীষণ অভাব ছিল। সবাই চাইত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে, লক্ষ্য ক্ষমতাধর সি,এস,পি অফিসার হওয়া। যখনই মধ্যপ্রাচ্যে চাকুরীর ব্যবস্থা হলো, ইন্জিনিয়ারদের ভাগ্যের দুয়ার খুলে গেল। সেখানে চাকুরী করে অঢেল টাকা উপার্জন করতে শুরু করল তারা। নিজস্ব এলাকায় গড়ে তুলল তিনতলা-চারতলা সুরম্য অট্টালিকা। আশেপাশের লোকজনের চোখ কপালে উঠে গেল, এত কিছু! বাবা-মাদের লক্ষ্য হয়ে উঠল ছেলেকে ইন্জিনিয়ারিং অথবা ডাক্তারী পড়াবে। বাবা-মাদের সেই আকাঙ্খা সন্তানদের মধ্যেও সংক্রামিত হয়েছে। সে সময় একটা কথা মুখে মুখে ফিরত, বাবা তুমি ডাক্তার হবে না ইন্জিনিয়ার হবে? ডাক্তারদের উপার্জন এখনকার মত নির্লজ্জ্বভাবে না হলেও বরাবরই ভালো ছিল।

বিদেশে পড়তে যাওয়ার কথা কখনো ভাবিনি। ভাবার অবকাশ আসলে ছিল না। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান আমি, বিদেশে পড়ার সামর্থ্য কোথায়? বিদেশে তো পড়বে বড়লোকের ছেলেমেয়েরা। যেমন আমাদের ক্লাসের এহতেসাম ও সালমান ইতিমধ্যেই প্রস্ততি নিচ্ছিল আমেরিকায় পড়তে যাওয়ার। এহতেশাম খুব ধনী ব্যবসায়ীর ছেলে। সালমানের বাবা অনেক বড় ডাক্তার। টোফেল-মোফেল কিসব যেন করছিল। বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য এই সময়টা ছিল খুব টেনশনের। ঐ যে বলেছিলাম ছাত্রের তুলনায় সীট সংখ্যা খুবই কম। অনেকে আর্মির চাকরিতে ঝুকত এই কারণে যে পাশ করার পরপরই মাত্র দুবছরের ট্রেনিং শেষেই চাকুরী। অনেকেই আমাকে বলেছিল, “আরে রোমান বুদ্ধিমান হও, বাদ দাও তোমার উচ্চ শিক্ষা। আর্মিতে ঢুকে যাও, ঐসব উচ্চশিক্ষা-ফিক্ষার চাইতে এটাই এখন ভালো। একেবারে সোনার হরিণ।” কন্যাদায়গ্রস্ত পিতারাও বেশ খুঁজে বেড়াতো আর্মি অফিসার জামাই। পাড়ায় কোন ল্যাফটেন্যান্ট বা ক্যাপ্টেন থাকলে কন্যাদায়গ্রস্ত পিতামাতারা তাকে খুব তোয়াজ করত, উদ্দ্যেশ্য, যেন তাদের মেয়েটার দিকে তাকায়। এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। মীরপুরের এক পাড়ায়, এক বাড়ীর চালে আচার শুকাতে দিয়েছে বাড়ীর মা। ইয়াং ছেলেরা যা করে আর কি, এক ছেলে চুপে চুপে উঠেছে সেই আচার চুরি করতে। হঠাৎ মায়ের নজরে পড়ে গেল সখের চোর ছেলেটি। ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন সেই মা। “বেয়াদব ছেলেপেলে, আচার চুরি করে, এদের বাবা-মা কি এদের কিছু শেখায় না, …… ইত্যাদি ইত্যাদি।” অপরদিন ঐ বাড়ীরই আচার চুরি করতে উঠল পাড়ার আরেক ছেলে, ছেলেটি তখন বাংলাদেশ মিলিটারি এ্যাকাডেমী (বি,এম,এ)-তে ট্রেনিং নিচ্ছে, ছুটিতে বেড়াতে এসেছে (আর্মিতে চান্স পেয়ে এলাকার সবার কাছেই সে এখন পরিচিত)। এবার ঐ বাড়ীর মা-মেয়ে দুজনেরই নজরে পরল ছেলেটিকে, কিন্তু কেউই কিছু বলছেনা। মা এবার গাল-মন্দ তো দূরের কথা, মিটি মিটি হাসছেন। উদ্দেশ্য হলো যখনই ছেলেটির চোখে চোখ পড়বে তখনই, “বাবা তোমার আচার খাওয়ার সখ হয়েছে? এসো এসো..” – বলে প্লেটে তুলে দিয়ে খাওয়াবে।

আমি যে আর্মিতে যাওয়ার বিষয়টি একেবারেই ভাবিনি তা নয়। কিন্তু দোদুল্যমানতার মধ্যেও ছিলাম। জীবনে উচ্চশিক্ষারও প্রয়োজন আছে, কিন্তু আর্মিতে গেলে তো উচ্চশিক্ষা হবেনা। আবার অনেকে বলে, “সব চাইতে বেশী কম্পিটিশন তো ঐ আর্মিতেই, হাজারে একজন চান্স পায়। চেষ্টা করে দেখো রোমান তুমিতো মেধাবী, সহজেই চান্স পেয়ে পাবে। সুযোগ হাতছাড়া করোনা।” আবার ভাবছিলাম মেরিন এ্যকাডেমিতে গেলে কেমন হয়? টাকা-পয়সা নাকি ভালোই দেয়। আবার অনেকে বলে, “দরকার নাই, দরকার নাই, জাহাজে জাহাজে সাহরে-মহাসাগরে জীবন। মেরিনওয়ালাদের বৌ থাকেনা”। সত্যিই জীবনের এই পর্যায়ে এসে সিদ্ধান্ত নেয়াই কঠিন!

ঃওকে কোথায় পাঠাবে ঠিক করেছ?
মায়ের কথায় সম্বিৎ ফিরে পেলাম আমি।
ঃ ভাবছি, আমেরিকা-ইংল্যান্ডে তো আর পাঠাতে পারব না অনেক টাকা পয়সার ব্যাপার।
বললেন বাবা।
ঃ বাবা, রোমানকে বিদেশে পাঠাতে চাইছ কেন? দেশে পড়লে কি সমস্যা?
বললেন আমার বড় দুই বোনের মধ্যে যিনি ছোট, রিতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে অনার্স পড়ছেন।
ঃ বিদেশে পাঠানোই তো উচিৎ। ওদের পড়ালেখা তো অনেক উন্নত, অনেক কিছু শিখতে পারবে রোমান। অনেক বড় ডিগ্রী নিয়ে আসবে। বললেন সব চাইতে বড় বোন রীনা। সাংবাদিকতায় এম, এ, পাশ করে এখন ভালো চাকুরী করছেন।
ঃ দেশের অবস্থা দেখছিস মা। এরশাদ তো একটা দুষ্ট গ্রহ। ও আসার পর থেকেই এই দেশের উপর শনি ভর করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তো এখন আর বিদ্যাপিঠ নেই, ব্যাটেল ফিল্ড হয়ে উঠেছে। ছেলেমেয়েদের জীবনের কোন নিরাপত্তা নেই। এছাড়া ঘন ঘন এরশাদ ভ্যাকেশনের তোড়ে, সেশন জট যে অবস্থায় দাঁড়িয়েছে, তাতে চার বৎসরের মাস্টারস কোর্স শেষ করতে এখন দশ বৎসর লাগছে। অনেকেই উপহাস করে বলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তী হওয়া মানে দশ বৎসরের সশ্রম কারাদন্ড। না রোমানকে আমি এর মধ্যে ঠেলে দিতে চাইনা।
বললেন, মা।
ঃ মা, তুমি ঠিকই বলেছে। আপাতো একটু আগে পাশ করে গেল, তাই খুব একটা টের পায়নি। আর আমি ৮২ থেকে ৮৮ পুরো এরশাদের সময়টা কি কষ্টটাই না করছি। এই দেখ ছয় বছর হয়ে গেল এখনো মাস্টার্স শেষ হলোনা, দুদিন পরে পরেই এরশাদ ভ্যাকেশন। আর জীবনের নিরাপত্তা? তোমাদের মেয়েকে যে জীবিত দেখতে পাচ্ছ এটাই অনেক বেশী। তোমাদের তো বলিনি, ঐ দিন ইউনিভার্সিটিতে মিছিলের উপর গুলি চলে। আমার চোখের সামনে একটা ছেলের মাথায় গুলি লাগল, ওর মগজ ছিটকে পড়ল চারদিকে। আমি আর্তনাদ করে কোনক্রমে পালিয়ে বাঁচলাম। এই হলো ইউনিভার্সিটির হাল।

সকলে ভয়ার্ত চোখে তাকালো আপার দিকে।


লিস্ট্নিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ – পর্ব ৪

এই পথ দিয়ে আমি প্রায় প্রতিদিনই হেটে যাই। পথটা মোটামুটি নির্জন এবং সুন্দর। ঢাকা শহরের ভিতরের রাস্তাগুলোতে ফুটপাত সাধারণতঃ থাকেনা। কিন্তু এই রাস্তাটায় আছে। ফলে ঝট করে পিছন থেকে রিকশার গায়ের উপরে উঠে যাওয়া, অথবা সহসা গাড়ির ক্ষুদ্ধ হর্ণ শোনার ভয় নেই। আরেকটি বিষয় এই পথটির প্রতি আমার আকর্ষণ বাড়িয়েছে। সেটি হলো পথের একপাশে সারি সারি কাঠগোলাপ গাছের সৌন্দর্য্য, আর অদ্ভুত সুন্দর ফুলগুলোর মন মাতানো সৌরভ। কাঠগোলাপ ফুল বোধহয় একটু বেশী ঝরে। তাই পথ জুড়ে বিভিন্ন জায়গায় পরে থাকে ঝরা ফুল। মাঝে মাঝে দু’একটা ঝরা ফুল তুলে নিয়ে তার রুপ আর সৌরভে মন মাতাই। উঠতি বয়সী ছেলেদের জন্য পথটির আরেকটি আকর্ষণ আছে; পথটির একপাশে ভিকারুননিসা নুন স্কুল, আর আরেকপাশে মগবাজার বালিকা বিদ্যালয়।

বখাটে অনেক ছেলেই ছুটির সময় ঐ পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, স্কুল পড়ুয়া মেয়েদের দেখার জন্য। আমি রোমান অবশ্য এই কাজটি কখনোই করিনি। কারণ এলাকায় ভদ্র ছেলে হিসাবে আমার শুনাম আছে। কোনদিন যদি কেউ আমাকে ছুটির সময় ঐ পথের পাশে দেখে, তাহলে এতদিনের গড়া রেপুটেশনটা এক মুহূর্তেই গায়েব হয়ে যাবে।

বিকাল বেলাটা খুব সুন্দর। আমি লাঞ্চের পর আমাদের দু’বছর আগের কেনা ইস্টার্ন হাউজিং-এর এপার্টমেন্টের ছোট্ট রূমটায় শুয়ে শুয়ে গল্পের বই পড়ি। তারপর সূর্য হেলতে হেলতে পশ্চিমাকাশে অনেকটা ঢলে পড়লে, হিঙ্গুল শাহ সাহেবের মসজিদ থেকে মধুর সুরে আছরের আজান ভেসে আসলে বই বন্ধ করে আমার প্রিয় খদ্দেরের পান্জাবীটা পড়ে চলে যাই মসজিদে। আছরের নামাজ শেষ হলে, পরিচিত দু’একজনার সাথে টুকটাক কথা হত। আসলে পরিচিত তেমন কেউ নাই। এই সিদ্ধেশরী এলাকায় আমরা এসেছি মাত্র দু’বছর হয়। তাছাড়া আমি এই দু’বছরের বেশীরভাগ সময়ই ছিলাম সিলেটের কলেজে। এইচ, এস, সি, পরীক্ষা দিয়ে কলেজ ছেড়ে একবারে চলে এলাম এই কিছুদিন হয়।

মগবাজারের নিজেদের বাড়ীটা ভাড়া দিয়ে, এখানকার এ্যপার্টমেন্টে উঠে গিয়েছি। দেশে এপার্টমেন্ট কালচার শুরু হয়েছে মাত্র। বাবা যখন আমাদের অনেক পুরাতন একটা জমি বিক্রি করে আর কিছু জমানো টাকা মিলিয়ে এ্যপার্টমেন্টটি কিনলেন আমি তখন গা করিনি। কিনতু বাবা-মা যখন মগবাজারের পুরাতন নিজস্ব বাড়িটা ছেড়ে এ্যাপার্টমেন্টে উঠে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, খেপে উঠলেন আমার দাদীমা। বললেন
ঃ আপন বাড়ী রেখে কেউ অন্য বাড়িতে যায়?
হেসে উঠলেন বড় আপা, বললেন
ঃ ওটাও আপন বাড়ী।
ঃ তা হোক এই বাড়িতে তোরা জন্ম থেকে আছিস। কত সুখ স্মৃতি এই বাড়িতে।
ঃ ও বাড়িতেও অনেক সুখ স্মৃতি হবে।
এবার মুখ খুললেন ছোট আপা
ঃ নারে, দাদী ঠিকই বলেছে। নিজের বাড়ী রেখে যাওয়া ঠিক হবেনা।
মা বললেন,
ঃ ওটা খুব লাক্সারিয়াস। মর্ডান ফিটিংস, টাইল্‌সের বাথরুম, দামী মোজাইকের ফ্লোর, নেটের জানালা, আধুনিক কিচেন, চব্বিস ঘন্টা সিকিউরিটি গার্ড, এরকম ঢাকা শহরে আর নেইরে। দেখিস তোদের ভালো লাগবে।

ঃ হুঁ, হুঁ, ভালো লাগবে। সেখানে তো ঘরের সামনে বড় লন আছে, নারকেল, পেয়ারা, জামরুল আর আমগাছে ভরা বাগান আছে! খাটের নীচ ভরে তুমি ঝুনা নারকেল রাখবে! টিপ্পনি কাটলেন ছোট আপা।
মা চুপ করে রইলেন, কিছু বললেন না। কিন্তু আমরা সবাই জানি, মা যেই সিদ্ধান্ত নেন সেটাই হয়। একসময় আমরা ঠিকই উঠে এলাম এ্যাপার্টমেন্টে। বাড়ী বদলের সময় আমি অবশ্য ঢাকায় ছিলাম না। ছিলাম সিলেটে, আমার প্রিয় কলেজে। সেখানে থাকতেই শুনলাম বাড়ি বদলের কথা। তারপরের ভ্যাকেশনে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে সোজা চলে এলাম সিদ্ধেশরীর এ্যাপার্টমেন্টে।

এ্যাপার্টমেন্ট হাউজিং কমপ্লেক্সের কালচার একটু ভিন্ন মনে হলো। মানুষের সাথে মানুষের মেলামেশা কম। যে যার মত আসছে যাচ্ছে, কারো সাথে কারো কথাবার্তা নেই, সখ্যতা নেই। একদিক থেকে ভালোই, যে যার মতো চলে। অপরের পারিবারিক জীবনে উৎসুক্য, ব্যাক্তিগত জীবনে নাক গলানো ইত্যাদি একেবারেই নেই। আবার মনে হয়, মানুষে মানুষে সখ্যতা না থাকলে কেমন? এভাবে জীবন কি রোবটের মত হয়ে যায়না? তবে এখানে কিছু ভালো জিনিস দেখলাম। পুরো হাউজিংটা দেয়াল দিয়ে ঘেরা। ১৫ জন সিকিউরিটি গার্ড ২৪ ঘন্টা পাহাড়া দিচ্ছে। নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থা। ফ্ল্যাট ওউনারদের নিয়ে গঠিত হয়েছে মালিক সমিতি। তারা সবকিছু পরিচালনা করেন। পুরো হাউজিংটা খুব পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুশৃংখল।

ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা আলাদা কমনরূমের ব্যবস্থা আছে, লাইব্রেরীও আছে। এই সব বিষয় খুব পজেটিভ। এগুলো মগবাজারের ঐ গলিটিতে কল্পনাই করা যায়না। ওখানে নানা কিসিমের লোক থাকত। কোন কোন পরিবার ছিল শিক্ষিত আর কোন কোন পরিবার ছিল একেবারেই অশিক্ষিত। তাই মন মানসিকতায়ও পার্থক্য স্পষ্ট ছিল। একবার একটা ক্লাব করেছিল ইয়াং আর মুরুব্বীরা মিলে। ক্ষমতা আর নানান দ্বন্দে শেষ পর্যন্ত দুবছরের বেশী টিকাতে পারল না ক্লাব। বাবা অনেক চেষ্টা করেছিলেন ক্লাব টিকাতে। বলেছিলেন, ” এট লিস্ট আমাদের সন্তানদের কথা ভেবে, আসুন ক্লাবটা টিকিয়ে রাখি”। কিন্তু কাজ হয়নি। আসলে আমাদের দেশের মানুষ সহজে অন্য কাউকে ভালো কিছু করতে দেয়না।

১৯৮৬ সালের জুলাইয়ের দিকে আমরা নতুন এ্যাপার্টমেন্টটিতে আসি, ১৯৮৮ সালের জুলাইয়ের দিকে যখন আমি একবারে ঢাকা চলে এলাম তখন এখানে আমার পরিচিত কেউই ছিলনা। শুধু উপরের তলায় বুয়েটের ছাত্র এক সুদর্শন বড় ভাই ছাড়া। প্রথমটায় আমি ভেবেছিলাম, এখানে বোধহয় কেউ মিশুক না। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, বিষয়টা আসলে সেরকম নয়। আসলে সবাইই এখানে নতুন এসেছে। তাই সবাই সবার সাথে এখনো পরিচিত হয়ে উঠতে পারেনি। ধীরে ধীরে আমার দু’একজনার সাথে পরিচয় হতে শুরু করল। এদের মধ্যে একজন কাজল ভাই। আমার চাইতে বছর দুয়েকের বড়। খুব ভালো মানুষ।

এইচ, এস, সি পাশই যথেষ্ট নয়। ভর্তি পরীক্ষার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতির প্রয়োজন। সকলের পরামর্শে ভর্তি হয়ে গেলাম একটা কোচিং সেন্টারে। মুনলাইট কোচিং সেন্টার। মৌচাক মার্কেটের কাছেই। সেখানে পড়তে ভালোই লাগল, আমারই মত সবাই, ভর্তি যুদ্ধের যোদ্ধা। নতুন সব বন্ধু এবং বান্ধবী। বন্ধুদের সাথে জমিয়ে ফেললাম। আর মূল আগ্রহ ছিল বান্ধবীবের দিকে। এটা হওয়াটাই স্বাভাবিক। প্রথমতঃ আঠারো-উনিশ বছরের এটাই দোষ (অথবা গুন), দ্বীতিয়তঃ, এর আগে আমি কখনোই কো-এডুকেশনে পড়িনি। প্রতিদিনই নতুন নতুন বন্ধু এবং বান্ধবীরা ভর্তি হতো। বান্ধবীদের দিকে তাকিয়ে দেখতাম, কার সাথে জমানো যায়।

ঐ বয়সটাই এরকম। চোখ শুধু এদিক-ওদিক চলে যায়। রাস্তা-ঘাটে, মার্কেটে, নিজ এলাকায়, কোচিং-এ সবখানেই একই অবস্থা। ভাবতাম, আমি এমন হয়ে যাচ্ছি কেন? পরে জানলাম সব বন্ধুদেরই একই অবস্থা। এ প্রসঙ্গে একটা হাসির কথা মনে পড়ে গেল। একবার আমার এক বন্ধু মার্কেটে গিয়েছে। এক দোকানে গিয়েছে কি কিনতে। একটু পরেই ঐ দোকানে আমাদের বয়সী সুন্দরী এক তরুণী ঢুকল। তার রূপ-সৌন্দর্য্য দেখে, আমার বন্ধু তো মুগ্ধ। সে আর দোকান থেকে বের হয়না। দূর থেকে মেয়েটিকে দেখে। মেয়েটির সাথে তার মা ছিল। মেয়েটি কোন কথা বলছিল না। যা বলার মাই বলছিল। কেনাকাটা শেষ হলে, দোকানী যখন প্যকেট করতে গেল, মেয়েটি কর্কশ গলায় বলে উঠল, “একটা লড়ি দিয়া বাইন্দা দেন না।” ঐ কন্ঠ আর ঐ ভাষা শুনে আমার বন্ধুর মুগ্ধতা উবে গেল।

প্রথম প্রথম আমরা ছেলে-মেয়েরা আলাদা আলাদা বসতাম। একদিন একটা মেয়ে একটু লেটে এসে দেখলো মেয়েরা যেদিকটায় বসে সেদিকটা ফীলআপ হয়ে গেছে। ছেলেদের দিকটায় এখনো বেশ কিছু সীট খালি আছে। কিন্তু মেয়েটি জড়তা ভেঙে কিছতেই ছেলেদের সাথে বসতে পারছিল না। অনেক চাপাচাপি করে। মেযেদের দিকটাতেই বসল। আমাদের যারা পড়াতেন, তারা সবাইই ছিলেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমরা তাদের কখনো ভাইয়া কখনো স্যার ডাকতাম। সম্বোধনটা ক্লিয়ার করতে পারিনি। এরকম একজন ভাইয়া-স্যার ঢুকলেন। দু’একটা অংক করানোর পর লক্ষ্য করলেন মেয়েটি চাপাচাপি করে বসার কারণে ঐ বেঞ্চে সবার লিখতে অসুবিধা হচ্ছে। তিনি বললেন, “এরকম চাপাচাপি করে বসেছেন কেন? এইদিকে কোথাও এসে বসুন। আরে এতে লজ্জ্বার কিছু নাই। এখন তো আলাদা আলাদা বসেছেন, কয়েকমাস পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে তো পাশাপাশিই বসবেন।” উনার কথায় মেয়েটি হয়তো বিব্রত বোধ করল, কিন্তু আমরা খুব কৌতুক অনুভব করলাম।

আলাদা বসলেও, চুপিচুপি আমরা ওদেরকে দেখতাম। আর তাদের রূপ-সৌন্দর্যের বিশ্লেষণ করতাম। শায়লা ফর্সা ও সুন্দরী ছিল, ছাত্রীও ভালো ছিল। ফাউস্টিনা কালো ও ছোটখাট গড়নের ছিল, সুন্দরী নয় বলে কারো চোখ ওর দিকে পড়েনি, তবে ও খুব ভালো ছাত্রী ছিল। শায়লার সাথে ছিল সঞ্চিতা, শায়লার মত সুন্দরী না হলেও, অসুন্দরী নয়। রূপালী ছোটখাট গড়নের হলেও ভরাট শরীর, দেখতেও সুন্দরী। ওকে দেখে মনে হলো কোথায় যেন দেখেছি। একদিন ও আমাকে বলল, “তোমাকে কোথায় যেন দেখেছি”। এখন আমার মনে পড়ল কোথায় দেখেছি। বললাম আমরা একই হাউজিং কমপ্লেক্স-এ থাকি। “ও হ্যাঁ হ্যাঁ তাইতো”, চিৎকার করে উঠল রূপালী। সবার না হলেও বেশীরভাগের রূপ-সৌন্দর্যেই আমরা মুগ্ধ হতাম। সৌন্দর্য বলতে তখন মেইনলি মুখশ্রীটাই দেখতাম। ঐ বয়সে নারীদেহের বাঁকগুলোর দিকে নজর যেতনা।

কিছুদিনের মধ্যে আমাদের জড়তা ভেঙে গেল। এখন আমরা একে অপরের সাথে ফ্রীলি কথা বলি। পাশাপাশিও বসা শুরু করেছি। শিমুল নামের একটি মেয়ে, প্রাযই আমার পাশে এসে বসতে শুরু করল। শ্যামলা রঙের সুন্দর ফিগারের মেয়েটি মোটামুটি আকর্ষণীয়। প্রথম দিকে আমরা পড়ার আলাপটাই বেশী করতাম। তারপর এটা সেটা আলাপ শুরু হলো। একদিন শিমুল প্রশ্ন করল, “একটা হিন্দি সিনেমা খুব হিট করেছে দেখেছ?”
ঃকি নাম ছবিটির?
ঃ কেয়ামত সে কেয়ামত তাক।
ঃ ও হ্যাঁ, দেখেছি। আমীর খান আর জুহি চাওলা।
(সে সময়, ডীশ এ্যান্টেনা বা কেবল লাইন বলে কিছু ছিলনা। ভিডিও নামক যন্ত্রটিরও ব্যাপক প্রচলন হয়নি। খুব দাম ছিল বলে অল্প কিছু ঘরেই ছিল। কারো বাড়িতে ভিডিও আছে মানেই তারা ধনী। আমরা অবশ্য ধনী ছিলাম না, কিন্তু আমাদের ভাই-বোনদের অনেক পীড়াপীড়িতে বাবা একটা ভিডিও কিনেছিলেন। একসময় আমরা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো হলে গিয়ে সিনেমা দেখতাম। সিনেমা হলের পরিবেশ যথেষ্ট ভদ্র ছিল, এবং মূলতঃ শিক্ষিত মধ্যবিত্তরাই সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখত। ছবির মান যথেষ্ট ভালো ছিল। আমি এই কথা বলব না যে উন্নত দেশগুলোর মতোই ভালো ছিল। সদ্য স্বাধীন একটা দেশের কাছ থেকে কয়েক শত বছর ধরে স্বাধীন অথবা কখনোই পরাধীন হয়নি এমন সব দেশগুলোর মতো উন্নত সংস্কৃতি আশা করা যায়না। কিন্তু একথা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, প্রচেষ্টা ছিল। বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাস বেশ প্রাচীন এবং গৌরবময় । ঢাকার নবাব পরিবারের তরুনদের পৃষ্টপোষকতায় এদেশে প্রথম সিনেমা নির্মিত হয় সেই ১৯২৭ সনে, স্বল্পদৈর্ঘ্যের নির্বাক ছবি ‘সুকুমারি’ । প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য নির্বাক সিনেমা ‘দা লাস্ট কিস্’ মুক্তি পায় ১৯৩১ সনে । আর বাংলাদেশের প্রথম সবাক সিনেমা ‘মুখ ও মুখোশ’ মুক্তি পায় ১৯৫৭ সালে, আব্দুল জাব্বার খানের পরিচালনায় । সেই সময়ের ছবি তো আর আমার দেখা হয়নি, তবে ‘৭০-‘৮০-র দশকের ছবিগুলো আমি দেখেছি। কিছু ছবির স্মৃতি এখনও মনে পরে, সাড়েং বৌ (আবদুল্লা আল মামুন), ডুমুরের ফুল (শুভাস দত্ত), গোলাপী এখন ট্রেনে (আমজাদ হোসেন), কসাই (আমজাদ হোসেন), এমিলের গোয়েন্দা বাহীনি (বাদল রহমান), ছুটির ঘন্টা (আজিজুর রহমান), সীমানা পেরিয়ে (আলমগীর কবির), রূপালী সৈকতে (আলমগীর কবির), ডানপিটে ছেলেটি, ইত্যাদি। এর মধ্যে একবার (১৯৮০ সালে) ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভাল হলো বাংলাদেশে। হুমড়ি খেয়ে পড়ল দর্শকরা হলে। টিকিট কাটতে গিয়ে সেকি হুজ্জোত। কয়েক মাইল লম্বা লাইন। হলগুলোতে দর্শক গীজ গীজ করছিল। শুনেছি ফ্লোরে বসেও লোকে সিনেমা দেখেছে। আর আমরা যারা এত লাঠালাঠি করে টিকিট কাটতে পারিনি, তাদের খুব মন খারাপ হয়েছিল। এত ভালো ভালো ছবি দেখতে পারলাম না! কিন্তু মন খারাপ কয়েকদিন পরই দূর হয়ে গেল। সরকার ব্যবস্থা করে দিল। বিটিভিতেই সবগুলো সিনেমা দেখানো হবে। দেশব্যাপী মানুষের সেকি আনন্দ। সেই প্রথম আমরা দেখলাম সাড়া জাগানো ইন্দোনেশীয় ছবি ‘বাউ হাতি মামা’, চীনের ছবি ছাও হুয়া (লিটল ফ্লাওয়ার), ভারতীয় বাংলা ছবি ‘হীরক রাজার দেশে’, ইত্যাদি। ছবির জগতে আলোড়ন সৃষ্টি হলো। চিত্রপরিচালকরা ভাবতে লাগলেন, এই রকম আন্তর্জাতিক মানের ছবি আমাদেরকেও বানাতে হবে। রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল, খ্যাতিমান সব চিত্রপরিচালকদের মধ্যে। হঠাৎ করে কি হল, ৮২-৮৩-র পর বাংলা সিনেমার মান একেবারেই নীচে নেমে গেল। কি সব অশালীনতা ঢুকে গেল, আমাদের সিনেমায়। তারপর পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেখার মত ছবি রইল না। হলগুলো অশিক্ষিত নিম্নশ্রেণীর লোকদের সস্তা বিনোদনের জায়গা হলো। হতাশ হয়ে পড়লেন, তুখোড় আর্ট ফিল্মের নির্মাতারা। চিত্রপরিচালক আমজাদ হোসেনের নিজের মুখ থেকে শুনেছি, “বাবা, কি জমানা আসলো, আমাদের মত ডায়েরেক্টররা ভাত পায়না”!

চারিদিকে তখন হিন্দি ছবির জয়জয়কার। সবাই ঘরে বসে হিন্দি ছবি দেখে। ঘরে ঘরে, এখানে-সেখানে সেই হিন্দি ছবিরই আলাপ। সিনে পত্রিকাগুলোতেও, হিন্দি ছবি বিষয়ক আলোচনা ঠাই করে নিল। তার পাশাপাশি রয়েছে হিন্দি ছবির নায়িকাদের অর্ধনগ্ন ছবি।

ঃ কেয়ামত সে কেয়ামত তাক-এ একদম নতুন নায়ক-নায়িকা।
শিমুল বলল।
ঃ হ্যাঁ। খুব সুন্দর দুজনেই।
ঃ ভালোবাসার ছবি। কি যে হৃদয় কেড়ে নেয়!
আবেগ আপ্লুত কন্ঠে বলল শিমুল।

হৃদয়ের কথা যখন উঠল, আমি শীমুলের দিকে তাকালাম। ও কি আমার হৃদয় কেড়ে নিয়েছে? মেয়েটি সুন্দরী, আকর্ষণীয়া। কারো না কারো হৃদয়, হয়তো একদিন কেড়ে নেবে। ওর সাথে কথা বলতে ভালো লাগে, পাশে বসতে আরো বেশি ভালো লাগে। কিন্তু আমার মনে এখনো গভীর কোন দাগ ও কাটতে পারেনি। সেই দাগ ও কাটবে কি? আমার হঠাৎ লাবনীর কথা মনে পড়ল।

(মন কিযে চায় বলো
যারে দেখি লাগে ভাল
এ মন সেতো বাধা পড়ে না
কিযেনো কেন জানি না

কাছে এসে পাশে বসে কথা বলে যে
এমন বলে সে আমায় ভালবেসেছে
চোখে চোখে চোখ রেখে কথা বলেছে
বোঝাতে পারিনি তারে ভালবেসেছি
কি করে যায় সে বলা

আমি আজও শিখিনি

মন কিযে চায় বলো
যারে দেখি লাগে ভাল
এ মন সেতো বাধা পড়ে না
কিযেনো কেন জানি না

প্রেম ভরা মন নিয়ে চলেছি একা
ভাবি শুধু কবে পাব তার দেখা
কথা আছে জীবনে প্রেম আসে একবার
আমার জীবনে সে আসবে কবে আর
জীবনে প্রেম হবে কিনা

আমি তাও জানি না

মন কিযে চায় বলো
যারে দেখি লাগে ভাল
এ মন সেতো বাধা পড়ে না
কিযেনো কেন জানি না।)
– সেই সময়কার একটি জনপ্রিয় বাংলা গান

 


লিস্ট্নিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ – পর্ব ৫

আমার এক চাচাতো বোন আছে , ওর নাম লাবনী। চাচা আব্বার ছোট ভাই। খুব ধনী এবং খুব তিরিক্ষি মেজাজের মানুষ। আব্বা শান্তশিষ্ট মানুষ, তিরিক্ষি মেজাজের মানুষের সাথে তার বনিবনা হয়না। তাই চাচার সাথে তার সদ্ভাব নাই। আসলে আব্বা চাচাকে খুব ভালোবাসেন, বলেন, “ছোট্ট ভাইটাকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছি, কিন্তু ওর ঐ তিরিক্ষি মেজাজের কারণেই ওর সাথে ডিসটেন্স মেইনটেইন করতে হয়।” চাচার দুই মেয়ের মধ্যে ছোটটি লাবনী। আমার চাইতে তিন বৎসরের ছোট। ওর সাথে আমার একটা মধুর সম্পর্ক আছে। এটাকে কি প্রেম বলব? জানিনা। মুখ ফুটে তো কখনো কেউ কাউকে কিছু বলিনি। কথা যা হয়েছে সব তো চোখের ভাষাতেই হয়েছে। কথা বলাবলির খুব বেশী সুযোগ আমরা পাইওনি, এই জীবনে। আব্বা-চাচার বনিবনা না থাকায় ওদের বাড়িতে আমার বা আমাদের বাড়ীতে ওর যাওয়া আসা হয়না। ওর সাথে আমার দেখা হতো আমাদের অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের বাসায়। সেও কালে ভদ্রে, ঈদ বা শবেবরাত এই জাতীয় দিনগুলোতে। তাও গত ঈদে দেখাই হয়নি। আমি যদিও উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করেছিলাম।

তার আগের ঈদে ওকে দেখেছিলাম। ওর পড়নে ছিল বেগুনী রঙের সালোয়ার-কামিজ আর ঝালর লাগালো ক্রিম কালারের একটি ওড়না। ফর্সা রঙের লাবনীর গায়ের উপর এই পোষাকটি চমৎকার মানিয়েছিল। সুন্দর চপল দৃষ্টি, গভীর কালি চোখের অতল থেকে খুশির আভা বেরিয়ে আসছে। অমন ধারা চোখ যে কোন তরুণেরই মন মাতায়। এলোমেলো উড়ন্ত চুল, তার স্পনদিত দেহ যেন ফুলের পাঁপড়িতে আন্দোলন। হাতের আঙুলগুলো চাঁপা বর্ণের। ও যখন কথা বলে মনে হয় যেন সুরের মূর্ছনা উঠছে। লাবনীর মধুমিত লাবন্যিত মুখচ্ছবি বড় বেশী প্রীতিমাধুর্যপূর্ণ। বেশী লম্বা নয় তবে খাটোও নয়। বাঙালী মেয়ে হিসাবে পর্যাপ্ত উচ্চতার। দেহের বর্ণনা দিতে পারব না, কারণ ঐ কাঁচা বয়সে মেয়েদের দেহের বাঁকগুলোর দিকে নজর যেতনা, বিশেষতঃ যাকে মনে ধরেছে।

কোন একটা বইয়ে পড়েছিলাম, ফ্রান্সে প্রেম মানে হাস্যরসের বিষয়। ইল্যাংন্ডে প্রেম খুব সিরিয়াস ব্যাপার। আর আমাদের উপমহাদেশে প্রেম একটা ভয়ের ব্যাপার। প্রেমিক-প্রেমিকা সব সময়ই ভয়ে ভয়ে থাকে, যদি কেউ দেখে ফেলে, যদি কেউ জেনে যায়! আমিও তাই লাবনীর ব্যাপারে খুব সাবধান থাকতাম।

কিশোর বয়েসে আমি একটা পেইন্টিং দেখেছিলাম – একটি যুগল সমুদ্র সৈকতে হেটে বেড়াচ্ছে। সেই চিরন্তন নারী ও পুরুষ। নারীটির পড়নে চমৎকার একটি নীল শাড়ী। নীল সাগরের তীরে নীল শাড়ী পড়া রমনীটিকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল। মনে হচ্ছিল যেন সাগরের নীল আর শাড়ীর নীল মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। সেই থেকে আমি স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম যে, আমার প্রিয়তমাও এমনি নীল শাড়ি পড়ে আমার হাত ধরে নীল সাগরের তীরে হেটে বেড়াচ্ছে।

বিকাল বেলাটায় মাঝে মাঝে ছাদে বসে সময় কাটাতাম। আমাদের ছয়তলা ভবনের ছাদ থেকে আশেপাশের দৃশ্য ভালোই লাগত। উপর থেকে পৃথিবীটাকে খুব সুন্দর মনে হয়। সামান্য দূরে প্রকান্ড একটা উঁচুতলা বিল্ডিং নজরে পড়ত। ভালো করে নজর দিয়ে দেখেছি, ওখানে বিদেশীরা থাকে। বিল্ডিংটা খুব সুন্দর, প্রতিটি ফ্লোরে কয়েকটি করে এ্যপার্টমেন্ট। দূর থেকে ভালো দেখা না গেলেও মোটামুটি বোঝা যেত যে, সেই এ্যপার্টমেন্টগুলো খুব পরিপাটি। বিল্ডিংটার সামনে একটা সুইমিং পুল আছে। বড় আপাকে বললাম বিল্ডিংটার কথা। আপা বললেন ওটা ‘রাশান ট্রেড হাউস’। ও আচ্ছা, তাহলে ওরা রাশান। আমরা সাদা চামড়া দেখলে ইউজুয়ালী আমেরিকান বা বৃটিশ মনে করতাম। আসলে তো পুরো ইউরোপের মানুষই শ্বেতাঙ্গ।

ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সামনে দিয়ে ছুটির সময়টায় যাইনা। আগেই বলেছি বখাটেরা ঐ সময় স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। আমাকে ওখানে দেখলেই লোকে ভাববে, মেয়েদের দেখার জন্য দাঁড়িয়ে আছি। একদিন মা বললেন
ঃ যা, বার্গার কিনে নিয়ে আয়। বিকেলের নাস্তায় খাব।
বার্গার কাছেপিঠে পাওয়া যায় বেইলী রোডে। ওখানে যেতে হলে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সামনে দিয়েই যেতে হবে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম এখন স্কুল ছুটির সময়। তাছাড়া ঐ সময়টায় ঐ রাস্টায় প্রচন্ড জ্যাম হয়। গাড়ীর প্যাঁ-পুঁ হর্ন আমাদের বাসা থেকেই সোনা যায়। মিনিট পনের যাবৎ এই হর্ণও শুনতে পাচ্ছিলাম। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে ছুটির সময়। এখন ঐ পথ দিয়ে যাওয়া ঠিক হবেনা। মাকে বললাম
ঃ পরে গেলে হয়না?
ঃ পরে আবার কখন? এখনই সময়, যা।
মায়ের আদেশ। কি আর করা? টাকা নিয়ে বের হলাম। পথের মধ্যে গাড়ী, রিকসা, যানবাহনে ভরে বিশাল জ্যাম। পুরণো ঢাকা বাদ দিলে, ঢাকা শহরের অন্যান্য রাস্তা তো একরকম ফাঁকাই থাকে। কিন্তু স্কুল ছুটির সময় এই রাস্তয় আসলে মনে হবে, ঢাকা শহরের সব গাড়ী যেন এই রাস্তাতেই জমে আছে। হাটাও মুশকিল। চিকন ফুটপাত দিয়ে হাটতে লাগলাম। অনেক মেয়ে একা আর অনেক মেয়ে অভিভাবকের সাথে ঐ ফুটপাত দিয়ে হাটছে। দু’একজন আবার আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালো, ‘বখাটে নাকি!’ মুখভঙ্গিতে যাথাসম্ভব ভদ্রভাব ফুটিয়ে হাটতে লাগলাম। মাঝে মধ্যে দুএকজনের দিকে যে চোখ যায়নি তা নয়। যাওয়ারই কথা। বয়সের দোষ (অথবা গুন)! হঠাৎ গেটের দিকে চোখ গেল। চমকে উঠলাম! আবার ভালো করে তাকালাম। বুকটা ধুক করে উঠল। লাবনী! হ্যাঁ লাবনীই তো। ও এই স্কুলে পড়ে আমি জানতাম। কিন্তু এভাবে দেখা হয়ে যাবে ভাবিনি। এবার লাবনীরও চোখ পড়ল আমার দিকে। ওর চোখ দুটো ঝলমল করে উঠল। একটু সময়ের জন্য আমরা দুজনেই থেমে গেলাম। কিন্তু এভাবে থেমে থাকা তো যাবেনা। আমি সামনের দিকে হাটতে লাগলাম। লাবনীও আড়াআড়ি পথ ধরে এগিয়ে চলল। সেখানে হয়তো ওদের গাড়ীটা অপেক্ষা করছে। কিছুদূর গিয়ে আমি পিছনে ফিরে তাকালাম। লাবনীও ঘুরে তাকিয়েছে। আমার বুকের ধুকধুকানী আরো বেড়ে গেল। একটা বইয়ে পড়েছিলাম, মেয়েটিকে ভালোবাসেন বুঝবেন কি করে? যদি মেয়েটিকে দেখে আপনার বুক ধুকধুক করে ওঠে, তাহলে বুঝবেন আপনি মেয়েটিকে ভালোবাসেন। তবে কি লাবনীকে আমি ভালোবাসি?

একদিন মা বললেন,
ঃ যা, ইলেকট্রিক বিলটা দিয়ে আয়।
আকাশ থেকে পড়লাম। জীবনে কোনদিন ইলেকট্রিক বিল দেই নাই। কি করে বিল দিতে হয় তাও জানিনা। এগুলো কাজ তো বাবাই করতেন, মাঝে মাঝে মা করতেন। হঠাৎ আমার কাধে চাপানো!
ঃ হা করে দেখছিস কি? যা তাড়াতাড়ি, আগামীকাল লাস্ট ডেট। দেরী হলে পরে জরীমানা দিতে হবে।
ঃ জ্বি, মানে ইলেকট্রিক বিল তো আমি কখনো দেই নাই।
ঃ দিস নাই তাতে কি হয়েছে? এখন দিবি। বড় হয়েছিস কাজ শিখতে হবে না?
ঃ ও আচ্ছা। কি করতে হবে
অনিচ্ছা সত্ত্বেও বললাম।
ঃ মগবাজার চৌরাস্তার মোড়ে একটা ব্যাংক রয়েছে। ওখানে যাবি।
তারপর মা আমাকে বিস্তারিত বুঝিয়ে দিলেন।
আমাদের বাসা থেকে হেটেই মগবাজার চৌরাস্তায় যাওয়া যায়। হাটতে হাটতে চলে গেলাম। রাস্তা পার হওয়ার জন্য একপাশে দাঁড়িয়েছি। উদ্দ্যেশ্য ট্রাফিক সিগনালে লাল বাতি জ্বললে, গাড়ীগুলো যখন জেব্রা ক্রসিংয়ের পিছনে দাঁড়াবে তখন আমি নির্বিঘ্নে রাস্তা পার হব। লাল বাতি জ্বলার পর মনে হলো গাড়ীগুলো অতি অনিচ্ছা সত্ত্বে থামছে। তাও জেব্রা ক্রসিংয়ের পিছনে নয় উপরে, আবার কোন কোন গাড়ী অনেক সামনে প্রায় মোড়ের উপরে গিয়ে পরছে, ফলে অন্য রাস্তার গাড়ী চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাস্তায় পর্যাপ্ত পরিমানে ট্রাফিক পুলিশও নেই। মনে মনে ভাবলাম এমন অবস্থা কেন? একদিকে আমাদের চালকদের সচেতনতা নেই, তাই পথচারী এবং অন্য গাড়ীগুলোর কথা ভাবিনা, আবার সরকারও ঐ কিসিমের, দুইটি প্রধান সড়কের মিলনস্থলে কি কিছু ট্রাফিক পুলিশ বেশী রাখা যায়না? এতে জনগন যেমন উপকৃত হবে, তেমনি কর্মসংস্থানও হবে। একজন ট্রাফিক পুলিশ আমার মনোভাব বুঝতে পেরে, এগিয়ে এসে গাড়ীগুলোকে জেব্রা ক্রসিংয়ের পিছনে থামানোর চেস্টা করলেন। আমি তাকে ধন্যবাদ দিয়ে, একিয়ে বেকিয়ে রাস্তাটা পার হলাম।

দেশের এই এত বিশৃংখলা, মানুষের ঔদাসিন্য, এইসব দেখেশুনে মাঝে মাঝে রাগে অস্থির হয়ে যাই। কিন্তু এটা ঠিক না। রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন। আমার কলেজে রাহাত নামে এক জুনিয়র ভাই ছিল। ওকে দেখতাম সব সময় নীরব-নির্লিপ্ত। ওর এই বৈশিষ্ট্যটি সবারই চোখে পড়েছিল। কেমিস্ট্রির বেলাল হোসেন স্যার একবার ওকে জিজ্ঞেস করেই বসলেন, “রাহাত, তোমার এই ব্যাপারটা আমি বুঝিনা। তুমি সব সময়ই এত নির্লিপ্ত কেন? মানুষের মধ্যে উত্তেজনা থাকে, উৎকন্ঠা থাকে, উদ্বেগ থাকে, তোমার মধ্যে যেন এগুলো কিছুই নাই। তোমাকে রাগ করলেও তুমি শান্ত, তোমাকে ধমক দিলেও তুমি শান্ত, যেখানে অন্যেরা উদ্বিগ্ন সেখানেও তুমি চুপচাপ। ব্যাপারটা কি বলতো?” রাহাত মুচকি হেসে বলল, “সব সময় মাথা ঠান্ডা রাখবেন স্যার।”

ব্যাংকের ভিতরে ঢুকে দেখলাম ইলেকট্রিক বিল দেয়ার লাইনটা মোটামুটি দীর্ঘ। আধা ঘন্টা থেকে এক ঘন্টা সময় লেগে যাবে। যাহোক অসীম ধৈর্য নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে রইলাম। একটু পরে বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টির পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করল। তখন মনে হলো ভালোই হয়েছে, বৃষ্টি পড়ার আগে আগে চলে এসেছি। আর লাইনটা লম্বা হয়েও ভালো হয়েছে। যেভাবে বৃষ্টি শুরু হয়েছে তাতে খুব শীগগিরই থামার সম্ভাবনা নেই। ততক্ষণ এই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকাই ভালো। এর মধ্যে লাইনের সামনের দিকে একটা ঝগড়া শুরু হয়ে গেল। একজন হঠাৎ পাশের সোফা থেকে উঠে লাইনে ঢোকার চেষ্টা করল, তখন আরেকজন বলে উঠল, “আপনে আবার হঠাৎ কই থেইকা আইসা লাইনে ঢোকার চেষ্টা করতাছেন?”
ঃ কই থেইকা আবার কি? আমি তো এইহানেই আছিলাম।
ঃ কোনহানে আছিলেন আপনে?
ঃ এই সোফায় বইয়া আছিলাম।
ঃ ক্যা, বিল দিতে আইয়া সোফায় বইয়া থাকবেন ক্যান? লাইনে খাড়াইবেন।
ঃ আরে, আপনের আগে আইছি আমি। ঐ উনারে কইয়া, সোফায় গিয়া বইয়া আছিলাম।
ঃ আমরা, লাইনে খাড়াইয়া মরি, আর আপনে সোফায় বইয়া আরাম করেন!
ঃ আরে আমি কি, বাড়ীত যাইয়া ঘুমাইছি নাকি? আমি তো ব্যাংকের মধ্যেই আছিলাম।
ঝগড়া দেখতে মজাই লাগছিল। আবার ভাবছিলাম, আমাদের কালচার এত নীচু কেন? আমরা কি একে অপরের প্রতি সামান্যটুকুও সহনশীল হতে পারিনা?

হঠাৎ স্বচ্ছ কাঁচে ঘেরা ম্যানেজারের রূমটার দিকে নজর গেল। চাচা ঢুকেছেন ম্যানেজারের রূমে। ধনী ব্যক্তি, তাঁর হাটার চালেই অহংবোধ লক্ষ্যণীয়। ম্যানেজার উঠে দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান জানালেন। চাচা একটি সোফায় বসলেন। চাচার পিঠটা ছিল আমার দিকে, তাই আমাকে দেখতে পাননি। এবার আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। লাবনীদের দামী টয়োটা গাড়িটা চোখে পড়ল। এখন স্কুলে ভ্যাকেশন চলছে। ঐ গাড়ীতে লাবনীর থাকাটা বিচিত্র কিছু না। বুকটা ধুক করে উঠল। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, লাবনীর সাথে দেখা করতে হলে, বৃষ্টিতে ভিজতে হবে। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, ভিজব বৃষ্টিতে। তাও এই সুযোগ হাতছাড়া করব না। চাচা যদি দেখে ফেলে? ভীষণ গোলমাল লেগে যাবে। একটু অবদমিত হলাম। কিন্তু মনকে বোঝাতে পারলাম না। লাবনীর সাথে দেখা করতে হবেই। কোন বাধাই বাধা নয়। বৃষ্টিতে কাকভেজা, চাচার রক্তচক্ষু, সব তুচ্ছ, সব। আমার পিছনের লোকটিকে বললাম, “আমার জায়গাটা একটু দেখবেন দয়া করে, আমি এই আসছি।” বলে বাইরে বেরিয়ে এলাম।

বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে এগিয়ে গেলাম লাবণীদের গাড়ীটার দিকে। সাহস করে গাড়িটার দরজা টান দিয়ে খুলে ফেললাম। যা ভেবেছিলাম তাই, ভিতরে লাবণী বসে আছে। আমাকে দেখে বিস্মিত হলো ও, আবার একেবারেই অপ্রত্যাশিত কিছু পাওয়ায় ওর দুচোখে উপচে পড়ল খুশী। বিলাসবহুল গাড়ীর ভিতরে আরামদায়ক আসনে বসে অপলক আমার দিকে তাকিয়ে আছে লাবণী, আর প্রবল বর্ষণে ভিজে গাড়ীর দরজায় দাঁড়িয়ে আছি আমি। টুকটাক দুয়েকটি কথা বললাম আমরা। লাবণী বলল
ঃ তুমি!
ঃ অবাক হয়েছ?
ঃ হ্যাঁ, একটু।
ঃ আমিও। কাকতালীয়ভাবে ঘটে গেল।
ঃ কেমন আছো?
ঃ ভালো। তুমি?
ঃ ভালো।
ঃ স্কুল কেমন চলছে?
ঃ স্কুল তো বন্ধ।
ঃ ও, হ্যাঁ । মাঝে মাঝে তোমাকে দেখিতো, স্কুল ছুটির পরে।
ঃ তুমি সব সময় একটা পকেটে হাত দিয়ে থাক কেন?
ঃ পকেটে হাত দিয়ে থাকি নাকি? খেয়াল করিনি তো। তোমার পছন্দ না হলে আর পকেটে হাত দেবনা।
ঃ না তা বলছিনা। (হেসে ফেলল লাবণী)। তুমি কি করছ এখন?
ঃ এইচ, এস, সি পরীক্ষা শেষ। এখন তো ‘আল বেকার’।
ঃ ‘আল বেকার’ কি?
ঃ মানে কাজ কাম কিছু নাই আরকি। কোচিং করছি।
বাইরে প্রবল বর্ষণ তার মধ্যে খুশী আর লজ্জ্বার মাঝামাঝি আমাদের টুকরো টুকরো কথা। বাইরের মত আমাদের ভিতরেও কি বর্ষণ শুরু হয়েছে? আমাদের টুকটাক কথা দুয়েকটি শব্দ এক একটা টুকরো টুকরো সজল মেঘের মতো।

হঠাৎ খেয়াল হলো চাচার কথা। সহসা শকুণের মত চাচা উড়ে আসলে ভিষণ হইচই শুরু হয়ে যাবে। ছোঁ মেরে আমার কলজেটাও ছিড়ে নিতে পারে। তাড়াতাড়ি কথা বন্ধ করলাম। বললাম,
ঃ যাই। আবার কথা হবে।
ঃ আবার কথা! বিষন্ন হয়ে গেল লাবণীর কন্ঠ। কি জানি কবে হবে।
ঃ আমি তোমাকে টেলিফোন করব।
ঃ নাম্বার জানোতো?
ঃ তা জানি। আমার চাচার নাম্বার আমি জানব না?
ঃ আর চাচা! দুই ভাইয়ে কবে যে মিল হবে!
ঃ ঠিক আছে আমি যাই।
আরেকবার ওর দিকে তাকালাম। লাবণীর মিষ্টহাস্য অপরূপ মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে বড় ভালো লাগছে এই বর্ষণস্নাত আকাশ ও পৃথিবীটাকে। আমি কি পারিনা রূপকথার রাজকুমারের মত ওকে লুফে নিয়ে নীল আকাশে উধাও হয়ে যেতে?

ভিজে চুপচুপ হয়ে ব্যাংকে ঢুকলাম। লোকজন আমার দিকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকালো । তারা তো জানেনা এই বৃষ্টিতে ভিজে আমি যে কত অপার আনন্দ লাভ করেছি।

বাড়ী ফিরে ভাবলাম, ওকে টেলিফোন করব। টেলিফোন সেটটা হাতে নিয়ে আবার রেখে দিলাম। কি বলব ওকে আমি? ঐ একটি কথা যার সঠিকতা সম্পর্কে আমি নিজেই সন্দিহান। সেটা বলব কি?

(দুঃসাহসে বুক বেধে হিমশৃঙ্গে আরোহন করতে পারি,
যদি বল কন্টকাকীর্ণ ফুলও আনতে পারি,
কিন্তু বুকে পাথর বেঁধেও কোনদিন সরাসরি বলতে পারব না, “ভালোবাসি”।

লিস্টনিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ – পর্ব ৬

গতকাল রাত সাড়ে আটটার দিকে একটা ফোন এল।রিসিভার তুলতে ওপাশ থেকে মেয়েলী কন্ঠ ভেসে এলো –
ঃ এখানে শিউলি আছে?
ঃ শিউলী? কি করেন তিনি? (আমি অবাক হয়ে বললাম)
ঃ আমার নাম পারভীন, আমরা একসাথে অনার্স পরীক্ষা দিয়েছি।
ঃ আপনি কত নাম্বারে রিং করেছেন?
ঃ ৪০৫৭০৪
ঃ হ্যাঁ, নাম্বার তো ঠিকই আছে, কিন্তু এ নামে তো এখানে কেউ থাকেনা।
ঃ তাহলে কি ও আমাকে ভুল নাম্বার দিল!
ঃ হতে পারে।
ঃ কাল গিয়ে ওকে ধরব। কি করেন আপনি?
ঃ আমি আপনার ছোট। এবার এইচ, এস, সি, পরীক্ষা দিয়েছি।
ঃ হ্যাঁ, গলার ভয়েস শুনে বুঝতে পারছি। কোন কলেজ থেকে?
আমি কলেজের নামটা বললাম।
ঃ ভালো ছাত্র নিশ্চয়ই?
ঃ না, তেমন ভালো ছাত্র নয়।
ঃ আপনার নাম?
ঃ রোমান।
ঃ আচ্ছা রাখি তাহলে।
আমার মাথায় দুষ্টুমি বুদ্ধি খেলে গেল। বললাম
ঃ আপনার ফোন নাম্বার কত?
ঃ আমার? উঁ, আচ্ছা থাক, আমিই আপনাকে ফোন করব। কখন থাকেন আপনি?
ঃ আমাকে সকালে ও রাত্রে পাবেন।
ঃ আচ্ছা রাখি।

ফোনটা রেখে ভাবছিলাম মেয়েটা কে? কেন ফোন করেছিল? মেয়েটা কি আমাকে চেনে? আমাদের আশেপাশেই থাকে? নাকি কোচিং-এর কেউ? শিমুলকে তো ফোন নাম্বার দেইনি। অবশ্য দিলেও কিছু আসতো যেতো না। কিন্তু ও চায়নি তো? অবশ্য ফোন নাম্বার যোগার করাটা ব্যাপার না। কোচিং-য়ের অফিস থেকেই যোগার করা যায়। আমার বন্ধুদের কারো কাছ থেকেও নেয়া যায়। অতশত ভাবছিই বা কেন? মেয়েটার কন্ঠস্বর শিমুলের কন্ঠস্বরের মত মোটেও না। তাহলে? কে ও? নাহ্, আমি হয়তো ফ্যন্টাসি খুব বেশী করে ফেলছি। এমন হতে পারে ও আমাকে চেনেই না সত্যিই সে ভুল করেছে। তাহলে আবার ফোন করতে চাইল কেন? আজকাল এসব হয়। আমাকে সিনিয়ররা বলেছে। ছেলেমেয়েরা টেলিফোনে প্রেম করে। আমাদের সমাজ খুব বেশী রক্ষণশীল। তাই নারী-পুরুষ সম্পর্কে স্বাভাবিকতা নাই। ইয়াং বয়সের ছেলেমেয়েরা পরস্পরের সান্নিধ্যে আসতে চায়। কিন্তু সামাজিক বাধার কারণে এটা খুব কঠিন। মেয়েদের জন্য আরো বেশী। ছেলেরা যাও একটু গাঁ বাঁচিয়ে চলতে পারে। কিন্তু মেয়েদের বড় সমস্যা, একবার দুর্নাম হলে আর রক্ষা নেই। একদিকে তারুণ্যের চাহিদা, আরেকদিকে সমাজের রক্তচক্ষু, একেবারে শাঁখের করাত। তাই অনেকের কাছেই একমাত্র উপায় ঐ টেলিফোনটি। অনেক মেয়েই তাই মানসিক চাহিদা মেটাতে, টেলিফোনে কোন বন্ধু খুঁজে ফেরে। মনের মতো কাউকে খুঁজে পেলে টেলিফোনেই চলে প্রেমালাপ। কখনো কখনো সেটা সেক্স টকেও পরিণত হয়। আবার কখনো শালীণতার মধ্যেই থাকে। এভাবে অন্তত কিছুটা হলেও মনের ক্ষুধা মেটে।

রাতে একটি খুব সুন্দর স্বপ্ন দেখলাম। অপার নীল আকাশের নীচে, সবুজ টিলাময় একটি বিস্তির্ণ প্রান্তর, চারপাশে কোন ঘরবাড়ি নেই প্রকৃতির অপরূপ রূপ একেবারে দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। মায়ের নীচের মাটি ঢাকা পড়েছে ঘন তৃণদলে, আর এখানকার তৃণতরু এত সজল ও সবুজ যা সচরাচর চোখে পড়েনা। বিকেলের উষ্ণ রোদে শ্যামল উপত্যকা জুড়ে ফুটে থাকা ছোট ছোট ঘাসফুলগুলো কি মায়াই না রচনা করেছে। দূরে কোথাও উঁকি দিচ্ছে একঝাক সূর্যমুখী। চকিতে ছুটে গেল একটি চিত্রা হরিণ, কোন এক গাছের আড়াল থেকে বিরামহীন মধুর সুর মৃদুমন্দ বাতাসে ভাসিয়ে দিচ্ছিল একটি মায়াবী কোকিল । সেই মায়াময় পরিবেশে সহসা আবির্ভুত হলো একটি রুপকথার রাজকন্যার মত অনিন্দ্যসুন্দরী মেয়ে। মধুর মিষ্টি মুখ, কাধ পর্যন্ত নেমে আসা কোঁকড়ানো চুল, ভ্রুর নীচে পাখীর নীড়ের মত দুটো চোখ, অপরূপ রূপতনু! এই সব কিছু দেখে শিরায় শিরায় রক্ত ছলকে উঠল। ফুলকে ফুল বলতে দ্বিধা কোথায়? বললাম, পাহাড়ী গোলাপ, তুমি কি কেবলই ছবি, শুধু পটে আঁকা? মেয়েটি অনুরাগে ব্লাশ শুরু করল। আমি ধীরে ধীরে ওর দিকে এগিয়ে গেলাম, আমার হাতের পাঁচটি আঙুলের অগ্রভাগ ওর ঐ অপূর্ব মুখশ্রীর সাত রঙের স্পর্শ চায়।

হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। অস্বস্তিকর কিছু একটা ঘটছে। চকিতেই বুঝতে পারলাম, আমার খাটটা দুলছে। ভূমিকম্প! হ্যাঁ, ভূমিকম্পই তো! টলমল করে উঠল আমার আত্মা। ধরফর করে উঠে বসলাম। দৌড়ে এলেন মা। “রোমান, রোমান, ভূমিকম্প!” মাকে অত উত্তেজিত মনে না হলেও, আশংকার ছায়া পড়েছে মুখে। কি করব বুঝতে পারছিলাম না। দৌড় দেব? কোথায় দৌড় দেব? হাউজিং-এ সামনে কিছু ফাঁকা জায়গা আছে। ওখানে যাওয়া যায়। কিন্তু চারপাশে উঁচু উঁচু ছয়তলা দালান। ভাঙলে সব মাথার উপরেই পড়বে। আরেকটু সামনে রাস্তায় গেলে রক্ষা হতে পারে। ভিকারুন নিসা স্কুলের মাঠ আছে। খুব সকাল, ভোর ছয়টা হতে পারে। বাবা বাড়িতে নেই, পার্কে হাটতে গিয়েছেন। বড় আপা, ছোট আপা বাড়ীতে, কাজের মেয়েটিও আছে। সবাইকে নিয়ে দৌড়ে বাইরে চলে যাব কি? এই সব ভাবতে ভাবতেই দুলুনি বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু মনের আশংকা দূর হয়নি। ধাতস্থ হতে কিছুটা সময় লাগল। দিনটা ছিল ৬ই আগষ্ট, ১৯৮৮। এরপর কয়েকদিন মানুষের মুখে মুখে ছিল ভুমিকম্পের কথা।

আমার ভাগ্নে জাহিদ বলল, “আমি ঘর থেকে বের হওয়ার কথা ভাবিইনি, রাজারবাগের এই গলির মধ্যে কোথায় বের হবো? বের হয়েও কোন লাভ নেই। তাই ঘরেই ছিলাম, রাস্তায় না মরে ঘরেই মরা ভালো।

আমার ফুপাতো বোনের হাসবেন্ড দুলাভাই (বয়সে মুরুব্বী বাবার মতই বয়স) বললেন।
ঃ দেখতো রোমান যদি বড় কোন দুর্ঘটনা ঘটে যেত, তাহলে কারা বাঁচতো?
ঃ জ্বী কারো তো বাঁচার কথা নয় ঘরবাড়ী ভাঙলে তো সবাইই মারা যাবে।
ঃ না না, তোমার বাবার মত, আমার মতো অনেকেই সেদিন মর্নিং ওয়াক করতে বেড়িয়েছিল। তারা তো বেঁচে যেতেন।
মুরুব্বী মানুষ, উনার সাথে তর্ক করা ঠিক নয়। উনার মন রাখার জন্য বললাম
ঃ জ্বী ঠিক বলেছেন।
ঃ সুতরাং এখান থেকে শিক্ষণীয় হলো এই যে, খুব ভোরে উঠে মর্নিং ওয়াক করা উচিৎ।
পুরান আমলের মানুষ, সব কিছুর মধ্যেই শিক্ষণীয় কি আছে খোঁজে। আমি কোন তর্ক-বিতর্কে না গিয়ে আবারো মাথা নেড়ে সায় জানালাম।
কিন্তু আপা (উনার স্ত্রী) ছাড়লেন না। বললেন
ঃ ব্যাডায় বাইচ্চা থাকলে হইবে কি? ব্যাডার বউ পোলাপান সব মরবে!
দুলাভাইও নাছোড়বান্দা, বললেন
ঃ তারপরেও একটা পরিবারের সবাই মরে যাওয়ার চাইতে কেউ কেউ বেঁচে থাকা ভালো।

আমার মনে পড়ল কলেজে থাকাকালীন দুইটি ভুমিকম্পের কথা।প্রথমটি ঘটেছিল ১৯৮৬ সালে কয়েকদিন যাবৎ দিনের বেলায় শিয়াল ডাকছিল। রাতে শিয়ালের ডাক শুনে আমরা অভ্যস্ত ছিলাম। কিন্তু দিনের বেলায় শিয়ালের ডাক! অবাক হলাম। আমাদের ক্লাসের ইকরাম বলল
ঃ ভুমিকম্প হবে।
বুকটা ছাৎ করে উঠল। ওর কথার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলাম। এটা সংস্কার – মানুষের হাজার বছরের অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণের ফলাফল। কিন্তু ঐ কথা মন মানতে চাইছিল না। সংস্কারকে কুসংস্কার মনে করতে চাইছিলাম। কিন্তু দুয়েক দিন পর ঘটনাটি ঠিকই ঘটল।রাত প্রায় সাড়ে দশটার দিকে, যখন সবাই ঘুমাতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, এসময় হঠাৎ দালান কোঠা দুলে উঠল। পড়িমরি করে ছুট লাগালো সবাই। যে যেদিক দিয়ে পারে। যারা একতলায় ছিল তারা চট জলদি পাশের মাঠে নেমে গেল। আর যারা দোতলা তিনতলায় ছিল তারা বিশাল ছাত্রাবাসের তিনটি সিঁড়ি দিয়ে, লাফিয়ে ঝাপিয়ে যে যেভাবে পারে নামতে শুরু করল। কয়েক মিনিটের জন্য কারো হুঁশ বলতে কিছু ছিলনা।

দ্বিতীয়টি ঘটেছিল ১৯৮৮ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারী। আমার জীবনের ইতিহাসে এটাই সব চাইতে বড় ভূমিকম্প। এটি ছিল ১৯৮৬-র ভূমিকম্পের দ্বিগুন। এবারও আগের মতই দিনের বেলায় শিয়াল ডেকেছিল। পূর্ব অভিজ্ঞতার কারণে, কয়েকদিন যাবৎ আমাদের হৃদয়ও দুরু দুরু করছিল। এদিকে বেগ একটা কি সিনেমা দেখে এসে গল্প জুড়ে দিয়েছিল, নস্ট্রাডেমাস নামে এক জ্যোতিষী ছিল। দুনিয়ার সব চাইতে বড় জ্যোতিষী সে। পৃথিবীর ইতিহাস সম্পর্কে নানা ভবিষ্যদ্বানী করেছে কয়েক শত বছর আগেই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কথা বলেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা বলেছে, বলেছে হিটলারের কথা। সবই মিলে গিয়েছে। এখনও কিছু ভবিষ্যদ্বানী ফলা বাকী আছে, এর মধ্যে একটি হলো ১৯৮৮ সালে একটা বিশাল বড় ভূমিকম্প হবে। সেই ভূমিকম্পে নিউ ইয়র্ক সিটি ধ্বংস হয়ে যাবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। একদিকে দিনের বেলায় শিয়ালের ডাক, আরেক দিকে নস্ট্রাডেমাসের কাহিনী সব মিলিয়ে বেশ শংকিতই ছিলাম। সেই বিশাল ভূমিকম্পে নিউ ইয়র্ক না হয়ে আমাদের সিলেটই যদি শেষ হয়ে যায়! ঘটনা সত্যিই ঘটল। আমরা তখন ক্লাসরূমে বসে রাতের পড়ালেখা করছিলাম। এসময় দরজায় এসে দাঁড়ালো আমাদের ক্লাসের সব চাইতে চঞ্চল অথবা দুষ্টু ছেলে মাহবুব। ওকে দেখে চিন্তায় পড়ে গেলাম, এখনই এসে ডিস্টার্ব শুরু করবে। কিন্তু ও কিছুই না করে দরজায় দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে। হঠাৎ শুনি পিছনে দুপদাপ আওয়াজ। চকিতে কিছু বুঝতে পারলাম না। জন্মের পর থেকেই যুদ্ধের গল্প শুনেছি। সবাই পালাচ্ছে কেন! যুদ্ধ লেগে গিয়েছে নাকি! বুঝলাম না। যুদ্ধ লাগলে সবাই জানালা দিয়ে পালাবে। এ যে দেখছি সবাই দরজার দিকে ছুটছে। ঘটনার আকস্মিকতায় কিছুই বুঝতে পারলাম না। সবার দেখাদেখি আমিও ছুটলাম দরজার দিকে। করিডোরে পৌঁছে এহতেশামের উৎকন্ঠিত কন্ঠ শুনলাম, “ভূমিকম্প, ভূমিকম্প!” আমার আত্মা উড়ে গেল। একতলায় ক্লাস রূম, সিঁড়ি ভাঙার ঝামেলা রইল না। করিডোরের কংক্রিটের রেলিং ডিঙিয়ে মাঠে নেমে গেলাম। এই রেলিং লাফ না দিয়ে পার হতে পারার কথা না। কিন্তু সেদিন সেটা ডিঙিয়েই পার হলাম। কিন্তু জীবনের ভয়ে হিতাহিত জ্ঞানশূণ্য হয়ে যে জায়গায় নামলাম, কিছুক্ষণ পর লক্ষ্য করলাম তার তিন দিক দালান দিয়ে ঘেরা। এই একটি জায়গাই ছিল এরকম বদ্ধ, আর আমরা সেখানেই নামলাম! এখানে বিল্ডিং ভাঙলে আমাদের মাথায়ই পরবে। কিন্তু ঐ মুহূর্তে অন্য কোথাও যাওয়ার সময়ও ছিল না। মনে হচ্ছিল কয়েক সেকেন্ডেই দুনিয়া ওলট-পালট হয়ে যেতে পারে। যাহোক কিছুক্ষণ পর ভূমিকম্প শেষ হয়ে গিয়েছিল। পরে সংবাদ মাধ্যম মারফত জেনেছিলাম সেই ভূমিকম্পের স্থায়িত্বকাল ছিল ৩৮ সেকেন্ড।

মানুষ অথবা যেকোন প্রাণী নিজের প্রাণকে যে কতটা ভালোবাসে তা এ সমস্ত পরিস্থিতিতে বোঝা যায়। আবার মানুষের জান-জীবন, তিল তিল করে গড়ে তোলা ধন-দৌলত, অর্থ-বিত্ত, কীর্তি-খ্যাতি সব কিছু যে এক নিমিষেই ধুলিস্মাৎ হয়ে যেতে পারে এটাও সেই মুহূর্তে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেই ভয়াবহতার মধ্যে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, জীবন পদ্মপাতায় শিশির বিন্দু।

আমাদের ক্লাসের ক্লাসের সব চাইতে সাহসী দীর্ঘকায় ও শক্তিশালী বুলবুল একা এক রূমে থাকত। ও আমার রূমে এসে চুপিচুপি বলে, “রোমান আমার খুব ভয় লাগছে. তুই কি একটু আজ রাতে আমার সাথে ঘুমাবি?” “কেন?” অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম আমি। “আমার ভয় লাগছে”, প্রথমে আমি ভাবলাম ফাজলামো করছে। তারপর ওর ভয়ভীতির কথা মুখে শংকার ছাপ দেখে বুঝলাম, ফাজলামো না, সিরিয়াসলিই বলছে। আমি অবাকই হলাম আমার দ্বিগুন সাইজের একজন মানুষ, সাহসী হিসাবে যার খ্যাতি আছে, সেইই ভয়ে এত জড়সড় হয়ে আমার কাছে এসেছে, সাহস পাওয়ার জন্য। মায়াই লাগল। একজন মানুষ যখন বিপদে পড়ে আপনার কাছে আসে এর মানে সে আপনাকে ভরসা করছে। সেই সময় তাকে ফিরিয়ে দেয়া মানুষের কাজ না। আমি ওকে বললাম, “চল তোর রূমে যাই”।

পরদিন সকালে আবারো ফোন এলো। পরিস্থিতি আমার পক্ষে ছিল, বাড়িতে আমি ছাড়া আর কেউ ছিল না। বাবা আর বড় আপা অফিসে, ছোট আপা ইউনিভার্সিটিতে, মা কাজের মেয়েটিকে নিয়ে মার্কেটে গি্যেছেন।
ঃ হ্যালো, রোমান আছে?
ঃ বলছি। আপনি কে বলছেন?
ঃ ভয় পেলেন মনে হয়?
ঃ না, চিনতে পেরেছি। আপনি গতকালের উনিতো?
ঃ হ্যাঁ, গতকালের উনিই।
ঃ তারপর বলুন।
ঃ আচ্ছা, আমি না আপনাকে একটা মিথ্যা কথা বলেছি।
ঃ কি রকম?
ঃ বলব না থাক।
ঃ আরে বলুন না, বলে ফেলুন।
ঃ না, আপনি মাইন্ড করবেন।
ঃ না, আমি কখনো মাইন্ড করিনা।
ঃ আমি না মাত্র মেট্রিক দিলাম।
ঃ আচ্ছা, আমিও এরকম একটা সন্দেহ করছিলাম।
ঃ তাই?
ঃ হ্যাঁ, ভাবছিলাম নেক্সট টাইম ফোন করলে ইউনিভার্সিটি সম্পর্কে এমন একটা প্রশ্ন করব, দেখব আপনি উত্তর দিতে পারেন কিনা।
ঃ ওরে বাবা। জানেন কাল আমার খুব খারাপ লাগছিল। আমি কখনো মিথ্যা বলিনা।
ঃ নামটা কি ঠিক আছে? না ওটাও —-
ঃ না। নামটা ঠিক আছে।
ঃ আচ্ছা আপনার বাবা কি করেন?
ঃ তিনি সাংবাদিক।
ঃ আপনি কোথায় থাকেন?
ঃ ইস্টার্ন হাউজিং, সিদ্ধেশরীতে।
ঃ আপনার বাবা আমাদের কথা শুনছেন না?
ঃ বাবা তো অফিসে।
ঃ ও তাইতো। তাহলে মা, মা কি শুনছেন? না কি উনিও জব করেন।
ঃ মা এক সময় স্কুলে শিক্ষকতা করতেন, পাশাপাশি উনি একজন আর্টিস্ট, ছবি আঁকেন।
ঃ উনি কি আমাদের কথা শুনছেন?
ঃ না, উনি এখন বাসায় নেই। আর শুনলেও অসুবিধা নেই।
ঃ আমি ফোনে আপনাকে চাইলে দেবেন।
ঃ হ্যাঁ, দেবেন।
ঃ কিন্তু আমার মা দারুণ বদমেজাজী।
ঃ আপনারা কি রক্ষণশীল?
ঃ না তা নয়। আসলে আপনি ছেলে তো, তাই বোধহয় অসুবিধা হয়না।
ঃ না, তা বলতে পারব না। আসলে এখন তো বড়ই হয়ে গিয়েছি। আর আমার মা লিবারাল।
ঃ ও! তা কি করছিলেন?
ঃ বই পড়ছিলাম।
ঃ অবসর সময়ে কি শুধু বইই পড়েন?
ঃ বেশীরভাগ সময় তাই করি। আপনি কোন স্কুলে পড়তেন?
ঃ সিদ্ধেশরী।
ঃ এখন কোন কলেজে পড়েন?
ঃ একই কলেজ।
ঃ ও, আচ্ছা রাখি।

ফোনটি রেখে দিলাম। আসলে এত তাড়াতাড়ি রাখার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু কেমন যেন সংকোচ হচ্ছিল। মেয়েটিকে চিনিনা, জানিনা ওর সাথে টেলিফোনে দীর্ঘ সময় আলাপ করা কি ঠিক হবে? কি করব বুঝতে পারছি না। আমার জীবনে এই প্রথম এটা ঘটছে।

বিকালের দিকে আমিন, গিয়াস আর মোস্তাহিদ এলো আমাদের বাসায় বেড়াতে। আমিন আর গিয়াস তো ঢাকায়ই থাকে, আগেও কয়েকবার বাসায় এসেছে। মোস্তাহিদকে দেখে অবাক হলাম। ওর বাবা সরকারী চাকরী করেন। বর্তমানে যশোরে পোস্টেড। বললাম,
ঃ কিরে কবে ঢাকা আসলি?
ঃ দিন পনের হয়।
ঃ ও কোথায় আছিস?
ঃ তোর কাছাকাছিই। মগবাজারে।
ঃ বাহ্। কোন আত্মীয়ের বাসায়?
ঃ না।
ঃ আংকেল কি ঢাকায় ট্রান্সফার হয়ে গিয়েছে?
ঃ তাও না।
ঃ তাহলে কি? (একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম)
ঃ আরে ওতো নতুন হোস্টেল লাইফ শুরু করেছে। (বলল আমিন)
ঃ নতুন হোস্টেল লাইফ! বুঝলাম না।
ঃ রহস্যময় একটা মুচকি হাসি হাসল সুদর্শন মোস্তাহিদ।
ঃ হেয়ালী করিস না ঠিকমতো বল। (ধমক দিলাম ওকে।)
ঃ আমি কোচিং-এ ভর্তি হয়েছি।
ঃ ও কোচিং-এ। সেতো আমিও ভর্তি হয়েছি। এর সাথে হোস্টেলের সম্পর্ক কি?
ঃ এই কোচিংটার হোস্টেল আছে।
ঃ তাই নাকি? তুই কি ঐ হোস্টেলে উঠেছিস?
ঃ হ্যাঁ।
ঃ বাহ্, বেশ মজা তো। সিলেট ছেড়ে আসার পর থেকে আমার মন খারাপ থাকে। সেখানে বন্ধু-বান্ধব মিলে গল্প-গুজব, দুষ্টামি-বান্দরামি করে কত মজায় ছিলাম না? আর এখানে অভিভাবকের হাতে বন্দি।
ঃ আরে মন খারাপ করিস না। চট করে আমাদের হোস্টেলে চলে আসবি। বেশ আড্ডাবাজি করা যাবে। তোর ভালো লাগবে।
ঃ গুড আইডিয়া! তোর ওখানেই আড্ডাবাজী করব। চিনিয়ে দিস হোস্টেলটা।
ঃ আজই আয়।
ঃ না, আজ থাক। সন্ধ্যা হয়ে যাবে। আরেকদিন। তুই তো বাসা চিনে গেলি।আমি যেহেতু কাছেই আছি, ঝটপট চলে আসবি।

চার বন্ধুতে ভালো আড্ডাবাজী করলাম সারা বিকেল। আমাদের আমিন আবার কৌতুকের রাজা। সারা দুনিয়ার মজার মজার সব কৌতুক ওর ভান্ডারে আছে। ওকে ধরলাম,
ঃ বল লেটেস্ট কৌতুকটা বল।
ঃ লেটেস্ট কৌতুক? তবে শোন। – একটি প্লেনে উঠেছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ, রাশিয়ার গর্বাচভ, পাকিস্তানের জিয়াউল হক আর আমাদের খ্যাতিমান হ, ম, এরশাদ। ওদের সাথে উঠেছে এক বৃদ্ধ আর এক হিপি। হিপি যেমন হয় – ছেড়াভেরা কাপড়-চোপর লম্বা লম্বা চুল, সাথে একটা পিঠে ঝোলানো বিশাল ব্যাগ। প্লেন যখন আকাশে অনেক উপরে, এই সময়ে পাইলট ভয়াবহ ঘোষণা দিল, “ভাইসব, আমাদের প্লেনের চারটি ইন্জিনই বিকল হইয়া গিয়াছে। এখন বাঁচতে হলে আপনাদেরকে প্যারাসুট নিয়ে জাম্প করতে হবে। কিন্ত ছোটখাট একটা সমস্যা আছে। আপনারা সংখ্যায় ছয়জন, আর প্যারাসুট আছে পাঁচটা। একটা শর্ট। এখন আপনারাই ঠিক করেন কারা প্যারাসুট নিয়ে জাম্প করবেন আর কে প্লেনে থেকে যাবে। (অন্য কথায়, ঠিক করেন কে মরবে)। এই বলার সাথে সাথে জর্জ বুশ বললেন আমি পৃথিবীর সেরা দেশ ক্যাপিটালিস্ট শিবিরের নেতা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট, আমার উপর পুরো ক্যাপিটালিস্ট শিবির নির্ভর করছে, আমাকে বাঁচতেই হবে। এই বলেই কারো তোয়াক্কা না করেই একটা প্যারাসুট নিয়ে জাম্প করলেন। গর্বাচভ বললেন আমার উপর পরো কম্যুনিষ্ট ওয়ার্লড্ নির্ভরশীল, তার উপরে শুরু করেছি পেরেস্ত্রোইকা ও গ্লাস্তনস্ত নীতি, এইগুলো শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমাকে বাঁচতেই হবে। বলেই বুশের মতই কারো তোয়াক্কা না করেই একটা প্যারাসুট নিয়ে জাম্প করলেন। পাকিস্তানের জিয়াউল হক বলেন ইসলামিক রিপাবলিক মাত্র শুরু করলাম তার উপর মুসলিম পারমানবিক বোমা তৈরীও কমপ্লিট। এখন নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করব, আমার বেঁচে থাকা খুবই জরূরী। বলেই পূর্বের দুজনার মত একটা প্যারাসুট নিয়ে জাম্প করলেন। এবার আমাদের কবি এরশাদ সাহেবের পালা। তিনি অপরের লেখা স্বরচিত একটি কবিতা পাঠ করলেন – “নতুন বাংলাদেশ গড়ব মোরা, নতুন করে আজ শপথ নিলাম।” গরীব দেশের প্রেসিডেন্ট হয়েছি তাতে কি হয়েছে? নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে শপথ নিয়েছি তা বাস্তবায়ন করার জন্য আমাকে বেঁচে থাকতেই হবে। তা ছাড়া জন বাঁচালো ফরজও। বলেই তিনিও একটা প্যারাসুট নিয়ে জাম্প করলেন। বৃদ্ধ আর হিপি এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওদের কান্ডকারখানা দেখছিল। এবার বৃদ্ধ বলল, ” বাবা রথি-মহারথিরা তো সব যে যার মত নেমে গেল। বাকী রইলাম আমরা দুজন। প্যারাসুট মাত্র একটা। তা বাবা আমি তো বৃদ্ধ মানুষ। কদিন পর তো এম্নিই মারা যাব, তুমি ইয়াং, তোমার আরো অনেকদিন বাঁচা উচিৎ। তুমি বাবা লাস্ট প্যারাসুটটা নিয়ে জাম্প কর আমি প্লেনে থেকে যাই। হিপি বলল, “না দাদাভাই, আপনাকে প্লেনে থাকতে হবেনা। আমরা দুজনেই প্যারাসুট নিয়ে জাম্প করব, দুজনই বেঁচে যাব। বৃদ্ধ বলে তা কি করে সম্ভব? প্যরাসুটতো আছে মাত্র একটা। হিপি উত্তর দিল, “না, প্যারাসুট দুটা আছে।”
ঃ দ্বিতীয়টা আবার কোথা থেকে এলো?
ঃ আসেনি কোথাও থেকে। এখানেই ছিল।
ঃ বুঝলাম না।
ঃ দাদাভাই, জিয়াউল হক তাড়াহুড়োর মধ্যে ভুল করে প্যারাসুটের বদলে আমার ব্যাগটা নিয়ে লাফ দিয়েছে।
হাঃ, হাঃ, হাঃ – আমরা সবাই কোরাসে হাসলাম।

“সেনাপ্রধান থেকে সি, এম, এল, এ, তারপর সেখান থেকে রাষ্ট্রপতি। এভাবে ক্ষমতায় আসে জিয়াউল হক। আজ দশ বছর ধরে মার্শাল ল দিয়ে রেখেছে পাকিস্তানে।” বলল গিয়াস।
“একই পথ ধরেছে আমাদের এরশাদ, কবে যে এর শেষ হবে”। বলল মোস্তাহিদ।
“আরে শুনেছিস নাকি, এরশাদ সম্পর্কে একটি বিদেশী পত্রিকায় বেড়িয়েছে, ‘দ্যা রিচেস্ট প্রেসিডেন্ট ফ্রম দ্যা পুওরেস্ট কান্ট্রি’। বলল আমিন। “বলিস কি? এই হতদরিদ্র দেশের রাষ্ট্রপতি, পৃথিবীর সবচাইতে ধনী রাষ্ট্রপতি!” বলল গিয়াস। এবার আমি বললাম এরশাদের এই ধন সম্পদ উপার্জন নিয়ে একটা কৌতুক আছে। সবাই আমার দিকে তাকালো।
“বল বল তাড়াতাড়ি বল।” বলল আমিন।
“ফিলিপাইন সফরে গেল এরশাদ। প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক সেখানকার প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস। এত কিছু দেখে এরশাদ বলল, “ভাই তুমি এতো ধনী হলে কি করে?” মার্কোস বলল রহস্য জানতে চাও? চলো তোমাকে নিয়ে যাই। তারপর এরশাদকে নিয়ে হাজির করল একটি নদীর তীরে। “ঐ দেখো” বলল মার্কোস। “কি দেখব?” এরশাদের প্রশ্ন।
ঃ নদীর উপরের ব্রীজটি (মার্কোসের কথা)
ঃ ব্রীজটা তো কমপ্লিট হয়নি। অর্ধেক মাত্র।
ঃ আরে, এভাবেই তো ধনী হয়েছি।
বুঝে গেল এরশাদ, মার্কোসের রহস্য। কিছুকাল পর মার্কোস এলো বাংলাদেশে। এরশাদের অবস্থা আরো বিশাল। এই দেখে মার্কোসের চোখ তো ছানাবড়া।
ঃ ভাই তুমি এতো ধন০-সম্পদ কি করে করলে? (বলল মার্কোস)
ঃ চল তোমাকে দেখিয়ে নিয়ে আসি।
তারপর মার্কোসকে নিয়ে এরশাদ হাজির করল একটি নদীর তীরে। “ঐ দেখো” বলল এরশাদ। “কি দেখব?” প্রশ্ন মার্কোসের।
ঃ নদীর উপরে (এরশাদ বলল)
ঃ ওখানে তো কিছুই নাই। শুধু নদীর তীরে একটা ভিত্তিপ্রস্তর দেখতে পাচ্ছি।
ঃ আরে এভাবেই তো ধনী হয়েছি।
রহস্যময় হাসি হেসে বলল এরশাদ।
আরেক দফা কোরাসে হাসলাম আমরা।

এবার ইয়াং ছেলেদের স্বভাবসুলভ নারী বিষয়ক আলোচনা শুরু হলো।
ঃ তোদের হাউজিং-এ তো সুন্দরী সুন্দরী মেয়ে আছে। (বলল আমিন)
ঃ তা আছে। ধনীদের মেয়ে। কিছুটা সুন্দরীতো হবেই।
ঃ ইটিশ-পিটিশ করিস না ওদের সাথে?
ঃ মাত্র তো এলাম। ইটিশ-পিটিশের সময় পেলাম কোথায়?
ঃ তাওতো কথা। যাহোক সুন্দরী মেয়ে অনেক আছে। টাংকি মারার ভালো যায়গা।
ঃ আমাদের হোস্টেলেও আছে। (বলল মোস্তাহিদ)
ঃ তোদের হোস্টেলে আছে মানে! ছেলেমেয়ে একই হোস্টেলে থাকিস নাকি?
ঃ না, মানে হোস্টেলে না। হোস্টেলের সাথে একটা বাসা আছে, সেখানে।
ঃ ও। সে তো পাশের বাসায় কোন না কোন মেয়ে থাকতেই পারে।
ঃ আরে এই মেয়েটি একসেপশনাল।
ঃ কি রকম একসেপশনাল?
ঃ হোস্টেলের ছেলেরা ওর সাথে টাংকিবাজি করে। যেখানে অন্য মেয়েরা লজ্জ্বা পায় বা এড়িয়ে যায়, সেখানে এই মেয়েটি টাংকির উত্তর দেয়।
ঃ এত আবার ভিন্নরকম ঘটনা। যেতে হবে তোদের হোস্টেলে।

(মুছে যাওয়া দিন গুলি আমায় যে পিছু ডাকছে,
স্মৃতি যেন আমারই হৃদয়ের রঙে রঙে ছবি আঁকছে।
সে এক নতুন গানের দেশে, দিন গুলি ছিল যে মূখর কতো গানে,
সেই সুর বাজে যেন আমার কানে!
)

 

লিস্ট্নিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ – পর্ব ৭

কৌতুক বলা হয় হাস্যরসিকতার জন্য। কখনো কখনো তা ব্যবহার করা হয় মিস্রির ছুরি হিসাবে। কিন্তু সেই কৌতুক যখন বাস্তবে পরিণত হয় তখন বিস্মিতই হতে হয়, এবং দু’য়েক সময় খারাপই লাগে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হককে নিয়ে কয়েকদিন আগে যে কৌতুক করলাম, সেটাই যে বাস্তব হয়ে যাবে ভাবিনি। সকালের দিকে মগবাজার ওয়ারলেস মোড় থেকে মৌচাকের দিকে যাচ্ছিলাম। রাস্তার পাশে একটি দোকানে এক ভদ্রলোকের হাতে একটি ডেইলি নিউজপেপারে বড় বড় করে লেখা দেখলাম, ‘পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক নিহত’। আমি অবাক হয়ে এগিয়ে গিয়ে ঐ ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম, “পত্রিকাটি একটু দেখতে পারি? জিয়াউল হক কি সত্যি সত্যিই মারা গেছে?” ভদ্রলোক একটু অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন, মনে হলো সে বিস্মিত, মনে মনে হয়তো বলছে, ‘ইনি কি এতক্ষণ পরে জানলেন!’ আমি তাকে বললাম, “আমি সকালে পেপার না পড়েই ঘর থেকে বেরিয়েছি, জিয়াউল হক কিভাবে মারা গেল?” “বিমান দুর্ঘটনায়”, লোকটি উত্তর দিল। এবার আমার অবাক হওয়ার পালা। যেই কৌতুক আমরা উনাকে নিয়ে করলাম, সেটাই বাস্তব হলো!

পরবর্তিতে জানতে পারলাম যে, এক রহস্যজনক বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন দশ বছর ধরে প্রবল প্রতাপে পাকিস্তান শাসন করা প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হক। দিনটি ছিল ১৭ই আগস্ট ১৯৮৮ সাল। আমার মনে আছে ১৯৭৭ সালে তিনি প্রধান মন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ক্ষমতাচ্যুত করে, সামরিক শাসন জারি করেন। এটি ছিল পাকিস্তানের তৃতীয় সামরিক শাসন। সামরিক শাসন জারির কারণ হিসাবে উল্লেখ করা হয় ভুট্টোর শাসনামলে দেশব্যাপি ব্যপক বিশৃংখলা ও পরিশেষে একজন খ্যাতিমান বিরোধীদলীয় নেতার হত্যাকান্ড (যার সাথে ভুট্টোর জড়িত থাকার অভিযোগ শোনা যায়)। এভাবে অবসান ঘটে ভুট্টোর শাসনামলের, এবং তাকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর দু’বছরের মত তার বিচার হয়, এবং বিচারের রায়ে তার মৃত্যুদন্ড হয়। সেসময় অনেকেই তাকে মৃত্যুদন্ড মওকুফ করে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু জিয়াউল হক কারো কথা শোনেনি। জিয়াউল হক ভুট্টো সম্পর্কে বলেছিল, “বেজন্মাটাকে আমি ঝুলিয়ে ছাড়ব”।

পরিশেষে রাওয়ালপিন্ডির সেন্ট্রাল জেলে ১৯৭৯ সালের ৪ঠা এপ্রিল তার ফাঁসি হয়। সেই সময় বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় উঠলেও আমার মনে হয়েছিল উচিৎ শাস্তি হয়েছে তার। এই সেই ভুট্টো, যে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গনহত্যার মাস্টারমাইন্ড ছিল। ২৫শে মার্চের কালো রাত্রিতে ঘুমণ্ত নিরস্ত্র মানুষের উপর অতর্কিতে ঝাপিয়ে পড়া অপারেশন সার্চলাইট থেকে শুরু করে সারা বাংলাদেশে পুরো নয় মাস জুড়ে বিপুল হত্যাযজ্ঞের মূল পরিকল্পক ছিল এই ভুট্টো। এই নারকীয়তার আরেক নায়ক ইয়াহিয়া খানও অনেকগুলো বছর রোগভোগ করার পর মারা যায়। এত এত নিরাপরাধ মানুষ হত্যা করে তারা পার পায়নি। এই পৃথিবীতেই তারা অপকর্মের শাস্তি পেল।

যাহোক জিয়াউল হকের বিমান দুর্ঘটনাটি ছিল রহস্যজনক। সেখানে জিয়ার সাথে আরো ৩১ জন নিহত হয়। এদের মধ্যে প্রায় সবাই ছিল পাকিস্তানের টপ লেভেলের ব্যক্তি । অন্যতম ছিলেন Chairman Joint Chiefs of Staff Committee জেনারেল আখতার আবদুর রহমান । এছাড়া পাকিস্তানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত লুইস রাফেল ও পাকিস্তানে মার্কিন মিলিটারি এইড মিশনের প্রধান জেনারেল হারবার্ট ওয়াসমও নিহত হয়। জানা যায় যে, একটি সি-১৩০ বিমান উড্ডয়নের পরপরই কন্ট্রোল রূমের সাথে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে। তার কিছুক্ষণ পরই বিমানটি বিদ্ধস্ত হয়। সিনেট চেয়ারম্যান বৃদ্ধ গোলাম ইসহাক খান জাতীয় প্রচার মাধ্যমে শোক সংবাদটি প্রচার করেন। অনেকে বলে থাকেন এই গোলাম ইসহাক খান-ই ছিলেন জিয়াউল হকের শিক্ষাগুরু। পাকিস্তানকে ভুট্টোর হাত থেকে বাঁচাতে, তিনি এমন একজন জেনারেল খুঁজছিলেন যাকে দিয়ে মার্শাল ল কল করিয়ে ভুট্টোকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায়। পরিশেষে তিনি জিয়াউল হককে চুজ করেন এবং তাকে দিয়ে কাজটি করান। এই ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় পাকিস্তানের ব্যপক ক্ষতি সাধন হয়। বৃদ্ধ গোলাম ইসহাক খানকেই এই কঠিন সময় মোকাবেলার দায়িত্ব নিতে হয়। রহস্যজনক বিমান দুর্ঘটনাটির পিছনে বৃহৎ শক্তির হাত আছে বলে অনেকেই মনে করেন।কেউ কেউ খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেই দায়ী করেছে, আবার কেউ কেউ ভারত ও ইসরাইলকে দায়ী করেছে। বোর্ড অফ এনকোয়ারির রিপোর্টে বলা হয়, সম্ভবত বিমানের অভ্যন্তরে বিষাক্ত গ্যাস প্রয়োগ করে যাত্রী ও ক্রুদের অচেতন করা হয়, যার কারণে কোন মেডে সিগনালও আসেনি। আবার অনেকে বলে বিমানে শেষ মুহূর্তে তোলা আমের ঝুড়িতে বোমা ছিল, তার এক্সপ্লোশনেই দুর্ঘটনা ঘটে।

জিয়াউল হকের মৃত্যুর জন্য যেই দায়ী থাকুক না কেন। তার শাসনামলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের সুসম্পর্ক ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান নিজেই বলেছেন পাকিস্তান আমেরিকার একটি বিরাট মিত্র। এসময় আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে। আফগান মুজাহিদরা সোভিয়েত বাহিনীর সাথে যে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল তাতে সর্বান্তকরণ সাহায্য করে জিয়াউল হকের পাকিস্তান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। উপরন্তু জিয়ার শাসনামলেই পাকিস্তান পারমানবিক শক্তির অধিকারি হয়। এই পারমানবিক শক্তি অর্জনই জিয়ার কাল হয়েছে বলে অনেকে মনে করে। এদিকে জুলফিকার আলি ভুট্টোর কন্যা বেনজির ভুট্টোকে প্রতিক্রিয়া জানাতে বলা হলে, তিনি বলেন, “দীর্ঘ দশ বছর জিয়া দেশকে গণতন্ত্রহীন করে রেখেছিল, এখন তার অবসান হবে আশা করি। ভাবতেই পারছিনা যে, জিয়ার শাসনামল শেষ হয়েছে। যাহোক হায়াত-মউত উপরওয়ালার হাতে।” বেশ কয়েকদিন বাংলাদেশের মানুষের মুখে মুখে ফিরল, জিয়াউল হকের মৃত্যু কাহিনী।

সকাল নয়টার দিকে কলিং বেলের আওয়াজ শুনে দরজা খুললাম। দেখি মোস্তাহিদ দাঁড়িয়ে আছে। ওকে দেখে খুশী হয়ে গেলাম, বললাম
ঃ ওয়েল কাম, ওয়েল কাম। ভিতরে আয়।
ঃ না ভিতরে আসব না।
ঃ কেন? (অবাক হলাম)
ঃ তুই আয়।
ঃ কোথায়, আমাদের হোস্টেলে চল। অনেক ছেলেপেলে আছে। আড্ডা জমবে ভালো।
ঃ নট এ ব্যাড আইডিয়া। ঘরে বোরিং লাগছিল। ওখানে অনেক পোলাপান পাওয়া যাবে। চল যাই। ও হ্যাঁ, দাঁড়া আমিনকে ফোন করে দেই ওও চলে আসুক।
ঃ কোথায় আসবে ও?
ঃ মগবাজার মোড় বলে দেব। ওখান থেকে একসাথে যাব।
কাপড় পরে বেরিয়ে পরলাম ওর সাথে।

মগবাজার মোড় থেকে একটু ভিতরের দিকে ওদের হোস্টেলটা। আমার বাসা থেকে হাটা পথে দশ পনের মিনিট। রিকশা নিলে পাঁচ মিনিট। (ভি, আই, পি রোড তখন ছিল একটি, শাহবাগ থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত। আর সব রাস্তায়ই রিকশা চলত। ঐ রাস্তাটি খুব সম্ভবত: ১৯৮৬ সলে রিকশামুক্ত করা হয়, তখন জনগণ খুব খেপে গিয়েছিল চলাচলে অসুবিধা হয় বলে)। মোস্তাহিদদের হোস্টেলে পৌছে বেশ ভালোই লাগল। এটা মুলত চার তলা একটি রেসিডেন্সিয়াল বাসা। ওরা ভাড়া নিয়ে হোস্টেল বানিয়েছে। প্রত্যেকটা রুমে তিনজন করে স্টুডেন্ট থাকে। মোস্তাহিদদের রূমে ঢুকে দেখলাম আরো দুজন আমাদের বয়সী। মোস্তাহিদ ওদের সাথে সাথে পরিচয় করিয়ে দিল।
ঃ আমার বন্ধু আমিন আর রোমান। আর ওরা কামাল আর ইমতিয়াজ।
ইমতিয়াজ ছেলেটিকে খুব ভদ্র মনে হলো।
ঃ এখানে সবাই কি অন্য শহরের? (আমিন প্রশ্ন করল)।
ঃ আরে ব্যটা অন্য শহরের না হলে কি আর হোস্টেলে থাকে নাকি? (আমি বললাম)।
ঃ আমি ময়মনসিংহের। তবে ঢাকার আশ-পাশ থেকেও দু’একজন আছে। যেমন সাভার, ধামরাই, ইত্যাদি।
ঃ পরিবেশ ভালো তো?
ঃ না, পরিবেশ ভালো আছে। সুপারভাইজার সব সময় নজর রাখে।
ঃ তোমাদের কথা মোস্তাহিদ বলে সব সময়। সিলেটে একসাথে পড়তে। (বলল ইমতিয়াজ)
ঃ হ্যাঁ আমরা খুব ঘনিস্ট। সিলেটের কলেজে বেশ মজার জীবন কাটিয়েছি। কোচিং করছ? কোথায় ভর্তি হতে চাও?
ঃ সব জায়গায়ই পরীক্ষা দেব। তারপর যেখানে চান্স পাই। যেখানে ইচ্ছা সেখানেই পড়তে পারব, বাংলাদেশ কি সেই দেশ!
ঃ তা ঠিক। তারপরেও।
ঃ আমি পড়ালেখা করেছি সাধারণ কলেজে, তোমাদের মত নামীদামী ভালো কলেজে পড়তে পারিনি। তাই ইচ্ছা থাকলেও শেখার সুযোগ ছিল না।

ঃ তোমাকে খুব ভালো এবং ভদ্র মনে হচ্ছে ইমতিয়াজ। উপরওয়ালা তোমার মঙ্গল করবেন। আশা করি ভালো জায়গায় চান্স পেয়ে যাবে।
ঃ না তুমি বেশী বলছ। আরে জিয়াউল হক মারা গিয়েছে শুনেছ?
ঃ হ্যাঁ পেপারে পড়লাম।
ঃ মারল কে?
ঃ কে জানে? রাজনীতি বড় টাফ। আজ বাদশা, কাল ফকির, আজ জীবিত, কাল মৃত।
ঃ আমেরিকা নাকি মেরেছে?
ঃ জিয়াউল হক তো আমেরিকার বড় মিত্র ছিল। তাছাড়া আফগান ওয়ারে তো রাশিয়ার এ্যগেইনস্টে জিয়াউল হক ছিল আমেরিকার কী পার্সন।
ঃ পারমানবিক বোমা একটা কারণ হতে পারে।
ঃ পারমানবিক বোমা কি কারণ হবে?
ঃআমেরিকা কখনোই চায়নি যে একটা মুসলিম রাষ্ট্র পারমানবিক শক্তির অধিকারী হোক।
ঃ মুসলিমদের সাথে আমেরিকার শত্রুতা কিসের?
ঃ জানিনা। তবে তারা মুসলিমদের শক্তি বৃদ্ধি চায়না। ইজরাইলের কোন ভূমিকা থাকতে পারে।
ঃ পাকিস্তানের পারমানবিক বোমা আছে এরকম আনুষ্ঠানিক কোন ঘোষণা তো হয়নি।
ঃ সেতো ইন্ডিয়াও দেয়নি।
ঃ ইন্ডিয়ারও পারমানবিক বোমা আছে নাকি?
ঃ অবশ্যই আছে। অনেক আগে থেকেই আছে। তারা পারমানবিক বোমা তৈরীর পরিকল্পনা করে অনেক আগেই। তারপর বিভিন্নভাবে টেকনোলজী যোগার করতে শুরু করে।
১৯৪৬ সালের ২৪শে জুন জওহারলাল নেহেরু (ভারতের হবু প্রধানমন্ত্রী) ঘোষনা দেন
As long as the world is constituted as it is, every country will have to devise and use the latest devices for its protection. I have no doubt India will develop her scientific researches and I hope Indian scientists will use the atomic force for constructive purposes. But if India is threatened, she will inevitably try to defend herself by all means at her disposal

১৯৬২ সালের অক্টোবরে চীনের সাথে এক যুদ্ধে ভারত হিমালয়ে তার কিছু টেরিটোরি হারায়। যার ফলে ভারত পারমানবিক অস্ত্র সম্পর্কে সিরিয়াসলি ভাবতে শুরু করে।
নেহেরু ঘোষণা দিলেও বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধী তা বাস্তবায়ন করতে শুরু করে। টেকনোলজি তারা বিভিন্ন দেশ থেকে যোগার করে ভারী পানিটি যোগার করে কানাডা থেকে। ১৯৫৫ সালে কানাডা পাবলিকলি এ্যানাউন্স করে যে, তারা একটি হেইভি ওয়াটার রিএ্যাক্টর তৈরীতে ভারতকে সাহায্য করবে। ইন্দিরা গান্ধী কানাডা সরকারকে আশ্বাস দিয়েছিল যে এটা তারা পিস পারপাস-এ ব্যবহার করবে। কিণ্তু তিনি তা করেননি বরং অস্ত্র তৈরীতে ব্যবহার করেন। ফাইনালি ইজরাইলের সহায়তা নিয়ে পারমানবিক অস্ত্র তৈরী সম্পন্ন করে। ১৯৭৪ সালের ১৮ই মে রাজস্থানের পোখরানের মরুভূমিতে সেই বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে টেস্ট করা হয়।

ঃ ইস্রাইল হেল্প করেছে? ইজরাইলের পারমানবিক বোমা আছে নাকি? (বলল আমিন)।
আমি বললাম
ঃ আছে। ১৯৫৬ সালে মিশরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুল নাসের সুয়েজ খালকে জাতীয়করণ করলে। বৃটেন ও ফ্রান্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেসময় ফ্রান্স ইজরাইলকে মিশর আক্রমন করে সিনাই দখল করে নেয়ার পরামর্শ দেয়, যাতে এই ছলে ফ্রান্স ও বৃটেন মিশরে প্রবেশ করে সুয়েজ খালের পূর্ণ কর্তৃত্ব নিতে পারে। এর বিনিময়ে ফ্রান্স ইজরাইলকে পারমানবিক রিএ্যক্টর তৈরী করে দেবে। যাতে পরবর্তিতে ইজরায়েল পারমানবিক বোমা বানাতে পারে। ইজরাইল এর গুরুত্ব উপলদ্ধি করে ১৯৫৭ সালে প্যারিসে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। ইজরাইল ১৯৬৩ সালে উইপন টেস্ট করলেও পরিপূর্ণরূপে পারমানবিক শক্তির অধিকারী হয় ১৯৬৭ সালে, ছয়দিন ব্যাপি আরব-ইজরাইল যুদ্ধের পরপরই।

ঃ ইন্ডিয়া বানায়, পাকিস্তান বানালো, আর বাংলাদেশ? কবে পারমানবিক বোমা বানাবে বাংলাদেশ? (বলল কামাল)
সবাই হেসে উঠল।
ঃ ককটেল ককটেল আমরা ককটেল বানাই। (বলল আমিন)
আবারো হাসলাম সবাই। এই হাসতে হাসতে আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। আমরা কি চিরকাল পিছিয়েই থাকব? শৌর্যে বীর্যে মেরুদন্ড সোজা করে কি আমরা কি কখনোই মাথা তুলে দাঁড়াবো না? আমাদের জাতীয় কবিই তো লিখেছেন, ‘চির উন্নত মম শীর’।

ঃ পারমানবিক বোমা তৈরী করা ইসলামী দৃষ্টিকোন থেকে হালাল না হারাম? (কামাল প্রশ্ন করল)
ঃ আমার তো মনে হয় হারাম। বিদায় হজ্বের ভাষণে নবীজি (সঃ) বলেছিলেন – যুদ্ধে শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের হত্যা না করতে, নিরীহ পশু হত্যা না করতে এমন কি ফলাদি বৃক্ষও না কাটতে। এর মানে তো ম্যাসিভ ডেসট্রাকশন একেবারেই হারাম। পারমানবিক বোমা তো ম্যাসিভ ডেসট্রাকশনই করে। আর রেডিয়েশন তো খুবই খারাপ জিনিস। এটা মানব জাতির জন্য আশির্বাদ নয়, বরং অভিশাপ।

ঃ অভিশাপ। এই যে শুনি নিউক্লিয়ার পাওয়ার স্টেশন খুবই শক্তিশালী অনেক ইলেকট্রিসিটি প্রোডিউস করে, এগুলো কি তাহলে। ভালো না খারাপ? (বলল কামাল)
ঃ আপাততঃ ভালো মনে হলেও, আলটিমেটলি খারাপ। পদার্থবিজ্ঞানীরা কেবল ফিজিক্স নিয়েই আছে। তারা বায়োলজিতে মোটেও ইন্টারেসটেড নয়। এই পৃথিবীর ফ্লোরা আর ফাউনা নিয়ে তারা ভাবেই না। অথচ রেডিয়েশন ফ্লোরা আর ফাউনার ভীষণ ক্ষতি করে। (আমি বললাম)।

কামাল আর ইমতিয়াজ হা করে আমার পান্ডিত্য কথা শুনছিল। মোস্তাহিদ ওদের বলল,
ঃ অবাক হোসনা। রোমান আমাদের ক্লাসে ফিজিক্স-এর সব চাইতে ভালো ছাত্র। বিশ্বাস স্যারের একান্ত প্রিয়। তাছাড়া এস, এস, সি, তে ও ফিজিক্স-এ বোর্ড হাইয়েস্ট মার্কস পেয়েছিল। আমাদের ফার্স্ট বয়ও ওর কাছ থেকে ফিজিক্স বুঝে নেয়।
ঃ তাই বল। তা ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে কি ফিজিক্স নিয়েই পড়বে নাকি?
ঃ ইচ্ছা তো সেরকমই আছে। দেখি এখন চান্স পাই কিনা!
ঃ ঢাকা ইউনিভার্সিটি? ভালো মনে করেছিস, চল যাই ঢাকা ইউনিভার্সিটি ঘুরে আসি। (মোস্তাহিদ বলল)
ঃ কি করবি ওখানে গিয়ে? (বলল আমিন)
ঃ আরে ঘরে বসে বোর হয়ে গেছি। চল ঘুরে আসি।
ঃ ঘোরার তো আরো যায়গা আছে, পার্টিকুলারলি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতেই যেতে হবে কেন?
ঃ ভবিষ্যতে যেখানে পড়বি সেখানে যাবিনা?
ঃ হ্যাঁ, ভালো বলেছিস। চল যাই।
ঃ যাব তবে তার আগে একটু দেখতে চাই। (বলল আমিন)
ঃ কি দেখতে চাস? (বলল মোস্তাহিদ)
ঃ ঐ যে বলেছিলি না। তোদের হোস্টেলের পাশের বাসায় একটা মেয়ে থাকে সবার সাথে টাংকি মারে।
ঃ ও, আচ্ছা। দাড়া দেখি বারান্দায় আছে কিনা মেয়েটা ।
সবাই মিলে উকিঝুঁকি দিলাম।
ঃ না বারান্দা ফাঁকা, কেউ নেই। চল যাই।
একটু হতাশ হলাম আমরা। কিন্তু ক্ষণিকের জন্য। তারপরের মুহূর্তে হৈচৈ করে সবাই বেরিয়ে পড়লাম, ঢাকা ইউনিভার্সিটির উদ্দেশ্যে।

আণবিক আঘাতে,
হিরোসিমা কাঁদে,
বিপন্ন নাগাসাকি,
বিবেকের ডাকে,
এসো একসাথে,
বন্ধ করি বিশ্বে যুদ্ধ।

 

লিস্টনিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ ৮

বাইরে নেমে একটু চিন্তায় পড়লাম, কিভাবে যাব ঢাকা ইউনিভার্সিটি। মোস্তাহিদ বলল
ঃ চল, বাস ধরি।
ঃ এখান থেকে কোন বাস যায়, জানিনা। (আমি বললাম)
ঃ বাহ ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা, ঢাকার খোঁজ রাখেনা।
ঃ আহা ঢাকার খোঁজ তো রাখি, কিন্তু ঢাকার বাসের খোঁজ তো রাখিনা।
ঃ বড়লোক মানুষ, বাসের খোঁজের দরকার কি?
ঃ আরে সেটা কথা না। চলাফেরা তো মেইনলি রিকসায়ই করি। লং ডিসটেন্স হলে আব্বার ভাঙা গাড়ীটা আছেই।
ঃ ভাঙা না বলে পুরাতন বল। তোদের যখন গাড়ী ছিল, তখন তো মানুষের কাছে গাড়ী ছিল স্বপ্নের মত।
ঃ দোস্ত, তখন সততার মূল্য ছিল। সৎ টাকায় গাড়ি কেনা যেত। সম্মানজনক চাকুরী করে লোকে ভালো স্যালারী ড্র করতে পারত।
ঃ হ্যাঁ, শুনেছি বৃটিশ আমলে একজন সরকারী কর্মকর্তা বিলাসবহুল জীবন যাপন করতেন। তার কিছু বর্ণনা পেয়েছি, বাংলা সাহিত্যের অনন্যসাধারণ গ্রন্থ যাযাবরের দৃষ্টিপাতে।
ঃ এতো বৃটিশ আমলের কথা। এমনকি পাকিস্তান আমলেও সি, এস, পি, অফিসার, আর্মি অফিসার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রথিতযশা সাংবাদিক ইত্যাদি সম্মানী চাকুরীজিবিরা ভালো স্যালারি পেতেন। যা দিয়ে তারা তাদের স্ট্যাটাস মেইনটেইন করতে পারতেন। আর এখন স্যালারির যা অবস্থা, সংসারই চলেনা। এই প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ে গেল। কে যেন প্রবচন বলেছিল,”বাংলাদেশে সরকারী কর্মকর্তার বেতন, মেয়েদের মীনস্ পিরিয়ডের সাথে তুলনীয়, উভয় ক্ষেত্রেই একমাস অপেক্ষা করতে হয় এবং আসার পর চারদিনেই শেষ হয়ে যায়।”
হা হা হা!!! সবাই কোরাসে হাসলো ।
ঃ তারপরেও তো দেখি, ঢাকার রাস্তায় দামী দামী গাড়ির চলাচল শুরু হয়ে গি্যেছে। ঐ যে জীপের মত গাড়ীগুলো পাজেরো নাম। দিনদিনতো কেবল বাড়ছেই। কোথায় পায় এত এত টাকা?
ঃ এরশাদ শাসনামল দোস্ত। দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে দেশ। সৎ ভালো মানুষদের করুণ অবস্থা আর দুর্নিতীবাজরা পাজেরো জীপ হাকিয়ে বেড়াচ্ছে।
ঃ হ্যারে, গত ছয় বছর ধরে তো এই চিত্রই দেখছি। ঐদিন আমাকে এক দোকানদার ঠকানোর চেষ্টা করছিল। আমি ধরার পর আমাকে বলে, “আরে মন্ত্রী-মিনিষ্টাররাই চুরি করে, আমি আর ভালো থাইকা কি করমু?”।
ঃ মাছের একটা মড়ক শুরু হয়েছে। প্রথমে রোগটা হয় মাথায়, তারপর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে সারা শরীরে। আমাদের দেশের এখন হয়েছে ঐ অবস্থা।
ঃ কে এই এরশাদ?
ঃ তুই যতটুকু জানিস, আমিও ততটুকুই জানি। ১৯৮২ সালে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি জাস্টিস সাত্তারকে সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতায় আসে। সেনাপ্রধান হিসাবে সরাসরি সামরিক শাসন জারি করে। এর কিছুকাল পরে একটি প্রহসনমূলক নির্বাচনের পর রাষ্ট্রপতি হয়। এখনো ক্ষমতায় আছে।
ঃ এর বেশি কিছু জানা প্রয়োজন। তার অতীত, পেশাগত জীবনের কার্যক্রম, ভবিষ্যত পরিকল্পনা, ইত্যাদি। আচ্ছা এরশাদ কি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিল?
ঃ যতদূর জানি, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেনাই। ৭১-এর বিজয়ের পর যে সকল সেনা কর্মকর্তারা পাকিস্তান থেকে ফেরত এসেছিল এরশাদ তাদের একজন। যতদূর জানি তাদের মধ্যে সিনিয়র মোস্ট । শুনেছিলাম, কি কারণে যেন, তার চাকরীও খোয়া গিয়েছিল, পরে তার মামা রাজনীতিবিদ এম, কোরবান আলীকে ধরে চাকরী ফেরত পায়।
ঃ তাই নাকি? এম, কোরবান আলী তো এখন মন্ত্রী।
ঃ আচ্ছা তাকে সরানোর জন্য তো অনেক আন্দোলন হচ্ছে। কিন্তু কাজ তো কিছু হচ্ছেনা। আমরাও তো অনেক মিছিল মিটিং করলাম। (বলল ইমতিয়াজ)
ঃ এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর দেশের মানুষ মনে করেছিল, কঠোর শাসক ক্ষমতায় এসেছে, এবার দেশে শৃংখলা প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু কিছুদিন পরে জনগণ বুঝতে পারল যে তারা ভুল বুঝেছে। বাংলাদেশের জনগণ আরো একবার প্রতারিত হলো। শৃংখলা তো দূরের কথা বরং দুর্নীতিকে সে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। আমাদের দেশে যেকোন অপশক্তির বিরূদ্ধে একটি কাউন্টার ফোর্স হলো দেশের ছাত্রসমাজ। তারাই প্রথম নড়াচরা শুরু করল এই দুশাসনের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে ১৯৮৪ সালে যখন একটি উদ্ভট জাতীয় শিক্ষানীতি ঘোষিত হলো।
ঃ মজিদ খানের শিক্ষানীতি?
ঃ হ্যাঁ। ঐ মজিদ খানের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ ব্যপক আন্দোলন গড়ে তোলে। যতদূর মনে পড়ে ১৯৮৪ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারী, ছাত্রদের মিছিলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এরশাদের অনুগত বাহিনী। তাকে এই কাজে সহযোগীতা করেছিল জেনারেল আবদুর রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের উপর আক্রমণ চালায়, আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যারা। এমন ঘটনাও আছে যে শিক্ষকদের কক্ষে ঢুকেও লাঠিপেটা করা হয়, শিক্ষক তার আইডি কার্ড দেখানোর পরও লান্ছিত হন। কয়েকজন ছাত্রও নিহত হয়েছিল। এরপর একটা কথা মুখে মুখে ফিরেছিল আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ১৪ই ফেব্রুয়ারী।
ঃ ন্যাক্কারজনক!

ঃ যাহোক। এখন ঢাকা ইউনিভার্সিটি যাই কিভাবে। এখান থেকে বাস টেম্পো কিছু কি পাওয়া যাবেনা? (বলল মোস্তাহিদ)
ঃ দোস্ত, এরশাদের আমলে রাস্তা-ঘাট কিছু পাকা হয়েছে, পান্থ পথের মত দু’য়েকটা লিংক রোড হয়েছে একথা সত্য, কিন্তু ট্রান্সপোর্টের যে কোন উন্নতি হয়নি এটা আরো বেশী সত্য।
ঃ আন্ত নগর ট্রেন ব্যবস্থা তো এরশাদের করা।
ঃ হ্যাঁ, এই উদ্যোগটা ভালো। তাছাড়া ঢাকার বাইরে পাকা রাস্তা-ঘাটও অনেক নির্মাণ হয়েছে। কিন্তু ঢাকার অভ্যন্তরে ট্রান্সপোর্টের কোন উন্নতি হয়নি।
ঃ তাহলে বাস-টাস এগুলো বাদ দেই। রিকসায় উঠে যাই।
ঃ টাকা অনেক লাগবে। (বলল ইমতিয়াজ)
ঃ টাকা রোমান দেবে। ওর কাছে কিছু পাওনা আছে। (বলল মোস্তাহিদ)
ঃ আমার কাছে তোর টাকা পাওনা আছে! আকাশ থেকে পড়লাম আমি।
দুষ্টামির হাসি হাসল মোস্তাহিদ। তুই টিউশানি পেয়েছিস না? তোর ইনকাম তো ভালো। আমাদের কিছু খাওয়াবি না?
ঃ ও আচ্ছা এই কথা।
ঃ টুউশানি কর নাকি। (বলল কামাল)
ঃ হ্যাঁ, শুরু করেছি গতমাস থেকে।
ঃ কাকে পড়াও?
ঃ ভিকারুন নিসা স্কুলের একটি মেয়েকে।
ঃ মেয়েকে, খুব সুন্দরী নাকি? (বলল কামাল)
ঃ দুরো, ক্লাস এইটের মেয়ে। অনেক ছোট।
ঃ ও। হতাশ কন্ঠ কামালের।

রিকসা ঠিক করা হলো। একটিতে উঠল মোস্তাহিদ, কামাল আর আমিন। আরেকটিতে উঠলাম আমি আর ইমতিয়াজ। মগবাজার মোড় থেকে, রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনের পদ্মার পাশ দিয়ে মিন্টু রোড হয়ে ইউনিভার্সিটি যেতে যেতে কথা হচ্ছিল ইমতিয়াজের সাথে। আমি বললাম
ঃ এই যে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মা দেখছ, এখানে থেকেছিলেন কিংবদন্তীর মুষ্টিযোদ্ধা মোহম্মদ আলী।
ঃ তাই নাকি? তুমি দেখেছিলে?
ঃ হ্যাঁ। একবার দেখেছিলাম। ১৯৭৮ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারী মুষ্টিযোদ্ধা মোহম্মদ আলী সপরিবারে বাংলাদেশ সফর করেন। সে সময় বিশ্বব্যাপী তার সুনাম, তিন-তিনবার হেভিওয়েট বিশ্ব-চ্যাম্পিয়ন হয়ে খ্যাতির তুঙ্গে ছিলেন তিনি। বাংলাদেশের জনগণ তার প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা অনুভব করত, তিনি মুসলমান হয়েছিলেন বলে। এসময়, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাঁকে আমন্ত্রণ জানা বাংলাদেশ সফর করার। তিনি সানন্দে রাজী হন। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র, যেটির মাত্র উদ্ভব হয়েছে বিশ্ব মানচিত্রে। পৃথিবী যাকে ভালো করেই চেনেই না। ১৯৭৪ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী কিসিন্জারের বক্তব্যে বাংলাদেশ এসেছিল ‘বট্মলেস বাস্কেট’ হিসাবে। এরপর তার পরিচয় একটি হতদরিদ্র রাষ্ট্র হিসাবে। সেই দেশ সফর করতে রাজী হবেন মোহম্মদ আলীর মত জীবন্ত কিংবদন্তি তা কেউ ভাবতেই পারেনি। কিন্তু তিনি আমাদের রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণ রক্ষা করেছিলেন। তার অনিন্দসুন্দরী স্ত্রী ভেরোনিকাকে নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন। বাংলাদেশের মানুষ যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছিল।

এয়ারপোর্টে জনতার ঢল নেমেছিল তাঁকে দেখতে ও অভ্যর্থনা জানাতে। এয়ারপোর্ট থেকে নেমে খোলা জীপে করে যখন তিনি শহরের দিকে যাচ্ছিলেন চারিদিকে শুধু ধ্বনি উঠছিল, ‘ইয়া আলী, ইয়া আলী’। আমেরিকা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে, হতদরিদ্র বুভুক্ষ মানুষের একটি দেশে তার এতটা জনপ্রিয়তা দেখে তিনি নিজেও বিস্মিত হয়েছিলেন। তিন দিন তিনি বাংলাদেশে ছিলেন। সরকার তাকে আতিথেয়তার সর্বচ্চো করেছিলেন। তাকে কক্সবাজারে এক খন্ড জমিও উপহার দেয়া হয়। পুরো তিন দিন রেডিও-টিভিতে আলীর সম্মানে একটি গান বাজত, পুরোটা মনে নেই, যেটুকু মনে আছে, ‘ … আলী বলে আমি কালো পাহাড়, এসো লড়বে যদি,..।’ আলী যেখানেই যেতেন তার চারদিকে জনতার ঢল নামত। আমরা পুরো পরিবার একদিন গেলাম রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায়, যদি উনার দেখা পাই। সেখানে একজন পুলিশ দাঁড়িয়ে ছিল। উনাকে জিজ্ঞেস করলাম। পুলিস বললেন, “জ্বী উনি একটু পরেই আসবেন।” আমরা জিজ্ঞেস করলাম, “উনাকে দেখা যাবে?”, “জ্বী, আপনারা দাঁড়ান আসলেই দেখতে পাবেন”, সজ্জ্বন পুলিশটিকে বেশ তৃপ্ত মনে হলো এরকম একটা ভালো ডিউটি দিতে পেরে। পুলিশটি আবার বলল, “সকালে আসলে কথাও বলতে পারতেন।” আমরা অবাক হলাম, “কথাও বলা যেত?”, “হ্যাঁ উনি সকালে গেটের সামনে হাটাহাটি করেন, লোকজনের সাথে কথা বলেন”। এবার আমরা সত্যিই বিস্মিত হলাম। খ্যাতির শীর্ষে থাকা মানুষ নানা কারণেই সাধারণ মানুষের সাথে দেখা দিতে চান না, আর মোহম্মদ আলী ভবন ছেড়ে রাস্তায় বেড়িয়ে আসেন, লোকের সাথে কথাবলার জন্য! একটু পরে একটা গাড়ী আসল মুহূর্তে চারদিকে লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল। পুলিশটি বলল আপনারা একটু সরে দাঁড়ান গাড়ীটি ঢুকতে দিন। গাড়িটা একটু ধীরে ভিতরে প্রবেশ করল। আনন্দ ও বিস্ময় নিয়ে দেখলাম, ভিতরে বসে আছেন অতি বিনয়ী, কালোপাহাড়, বিশ্বখ্যাত মোহম্মদ আলী। চারিদিকে রব উঠল, ‘ইয়া আলী, ইয়া আলী’। দুয়েকজন ফুল ছুড়ে দিল আলীর গাড়িতে।

(অনেক কাল পরে, আমার এক প্যালেষ্টাইনি বন্ধু বলেছিল যে, সে মোহম্মদ আলীর জীবনির উপরে ডকুমেন্টারি ফিল্ম দেখেছে। সেখানে আলীর বাংলাদেশ সফরেকে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। বাংলাদেশ সফর শেষ করে তিনি মস্কো সফরে যান। লিওনিদ ব্রেজনেভের সাথে সাক্ষাৎ করান।)

আফ্রিকান-আমেরিকান বংশোদ্ভূত আলীর আসল নাম ক্যাসিয়াস মারসেলাস ক্লে। তিনি ১৯৪২ সালের ১৭ জানুয়ারি কেন্টাকির লুইভিলেতে জন্মগ্রহণ করেন।

বাবা ক্যাসিয়াস পোস্টার লিখতেন। মা ওডিসা ছিলেন গৃহিণী। তাদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন শেতাঙ্গ আমেরিকানদের ক্রীতদাস। চেষ্টা করেও জীবনে সেই দাগ মুছে ফেলতে পারেনি তার পরিবার। ১২ বছর বয়সে মোহম্মদ আলী ও তার বন্ধুরা, সাইকেলে চড়ে গিয়েছিলেন এক অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠান শেষে স্ট্যান্ডে ফিরে মোহম্মদ আলী দেখতে পেলেন তার সাইকেলটি চুরি হয়ে গিয়েছে। ক্রোধে ফেটে পড়েন তিনি। কলাম্বিয়া অডিটোরিয়ামের বেসমেন্টে যান পুলিশ অফিসার জো মার্টিনের কাছে নালিশ জানাতে। এই জো মার্টিন আবার কলাম্বিয়া জিমের বক্সিং কোচও ছিলেন। মোহম্মদ আলী জো মার্টিনকে বলেন, “যে আমার সাইকেল চুরি করেছে, তাকে মেরে তক্তা বানিয়ে দিতে ইচ্ছে হয়।” জো মার্টিন হেসে বলেন, “ফাইট করতে চাইলে, আগে ফাইট শিখতে হবে।” তার কয়েকদিন পরেই জো মার্টিনের জিমে বক্সিং শিখতে শুরু করলেন মোহম্মদ আলী । খুব ভালো ছাত্র ছিলেন আলী। দ্রুত শিখে নিয়েছিলেন মুষ্টিযুদ্ধের নিয়ম-কানুন। ১৯৬০ সালে সামার অলিম্পিকে সোনার মেডেল পান ১৮ বৎসর বয়স্ক মুহম্মদ আলী ।

মোহম্মদ আলী এমন একটা সময়ে জন্মেছিলেন যখন আমেরিকায় বর্ণবৈষম্য পুরোদমে চলছিল। কৃষ্ণাঙ্গরা ছিল. নির্যাতিত, অছুত। একবার এক শপে তিনি গি্যেছিলেন জামা কিনতে। একটি জামা পছন্দ হলে তিনি ট্রায়াল দিতে চাইলেন। কিন্তু ম্যানেজার কিছুতেই ট্রায়াল দিতে দেবেনা। একজন আলীকে চিনতে পেরে তার পরিচয় দিয়ে বলল, “ইনি বক্সার ১৯৬০ সালে সামার অলিম্পিকে সোনার মেডেল পেয়েছেন, আমেরিকার মুখ উজ্জ্বল করেছেন।” কিন্তু ম্যানেজার বলল, “তাতেও কাজ হবেনা। কোন নিগ্রোর চামড়ায় ঐ জামা লাগলে আর কোন শ্বেতাঙ্গ সেটা কিনতে চাইবে না।” এই বৈরী সামাজিক আবহাওয়ার মধ্যে থেকে তিনি যুদ্ধ করেন। যুদ্ধ করেন, অপরাপর মুষ্টিযোদ্ধাদের সাথে রিং-এ, এবং বর্ণবৈষম্যের মত সামাজিক কুপ্রথার সাথে সমাজে। আমেরিকায় প্রয়োজনের সময় প্রাপ্তবয়স্ক যে কোনো নাগরিককে বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেবার বিধান আছে- ‘ড্রাফট/ড্রাফটিং’ নামে যা পরিচিত। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় ড্রাফটিং পুরোমাত্রায় চালু ছিলো। মুষ্টিযোদ্ধা মোহম্মদ আলী ড্রাফটে যেতে অস্বীকার করেন। তিনি বলেছিলেন, “কোন ভিয়েতনামি কং আমাকে কখনোই নিগার বলেনি, কিন্তু আমার স্বদেশী শ্বেতাঙ্গ ভাইয়েরা আমাকে এই কথাটি বলেছে বহুবার”। ড্রাফটে যেতে অস্বীকার করার অপরাধে তাঁর বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপের খেতাব ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল। এই সব কিছুর সাথে সংগ্রাম করে তিনি শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করেছিলেন।

ঃ আচ্ছা মোহম্মদ আলী তো ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন তাই না?
ঃ হ্যাঁ, ১৯৬৪ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারী মোহম্মদ আলী বক্সিং করেন শক্তিমান সনি লিস্টনের সাথে। সনি লিস্টন ঘোষণা দিয়েছিল যে, খুব দ্রুতই ক্যাসিয়াস ক্লে-কে নক আউট করবে (মোহম্মদ আলীক-র পূর্ব নাম)। কিন্তু বাটারফ্লাই স্টাইলের মুষ্টিযোদ্ধা ক্যাসিয়াস ক্লে-কে ধরা তো দূরের কথা উল্টা এই মুষ্টিযুদ্ধে সনি লিস্টনই মারাত্মকভাবে আহত হয়, এবং ৭ম রাইন্ডেই পরাজিত হয়। এইভাবে তিনি হয়ে গেলেন হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন। এই জয়ের ঠিক একদিন পরেই তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। এবং ক্যাসিয়াস ক্লে থেকে মোহম্মদ আলী হন। এভাবে তার স্লেভ নামটি তিনি পরিত্যাগ করেন। এই পাবলিক এ্যানাউন্সমেন্টটি পাবলিক শুরুতে পছন্দ করেনি। এভাবে মোহম্মদ আলী ‘ন্যাশন অফ ইসলাম’ গ্রপটিতে যোগ দেন। গ্রুপটির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন এলিজা মোহাম্মদ।

এরপর আলী ভীষণ বিনয়ী হয়ে গেলেন। যেই আলী একসময় বলতেন “I am the greatest of all time!”. তিনি এখন বলতে শুরু করলেন I am the great and Allah is the greatest ।

(মোহম্মদ আলী ছিলেন সকল কৃষ্ণাঙ্গদের অনুপ্রেরণা। তার পথ ধরেই বারাক ওবামা আজকের এ্যামেরিকান রাষ্ট্রপতি।)

গল্প করতে করতে মিন্টো রোড পার হয়ে রমনা পার্কের পাশ ঘেষে চলে এলাম সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে। এখানে এসে রিকসা ছেড়ে দিলাম। উদ্দেশ্য, পার্কের ভিতর দিয়ে হেটে হেটে কলা ভবনে পৌঁছে যাব। ভিতরে ঢুকে সবার মন ভরে গেল। ঢাকা শহরে কোন এক সময় সবুজের ছোঁয়া ছিল। ইট-রডের প্রকান্ড দালান নয়, ছিল মধ্যবিত্তের ছোট ছোট টিনের ঘর আর উচ্চবিত্তের একতলা-দোতলা বাড়ী। মধ্যবিত্ত হোক উচ্চবিত্ত হোক সবার বাড়ির আঙিনায়ই ছিল বাগান। ছিল আম, জাম, পেয়ারা, জামরুল, নারকেল, শুপারি গাছের শোভা। সন্ধ্যার পরপর প্রায় সবগুলো বাড়ীতেই ভাসত হাসনাহেনা অথবা মালতিলতার সৌরভ। ৮৪-৮৫ সালের দিক থেকে হঠাৎ করেই সব উবে যেতে থাকে, ঝপঝপ করে ব্যাঙের ছাতার মত এখানে সেখানে অকপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠতে থাকে নিম্ন মানের বহুতল ভবন। যার যেখানেই সুযোগ হয়েছে গড়ে তুলেছে গায়ে গা ঘেসে বিধঘুটে সব অট্টালিকা। প্রয়োজন নেই বাগানের, চুলোয় যাক গাছপালা, চাই শুধু টাকা। এক একটা তলা ভাড়া হবে, আর আমি টাকার সাগরে ভাসব। একবারও ভাবিনি বিপন্ন পরিবেশের কথা, একবারও ভাবিনি বুক ভরে নিশ্বাস নেয়ার কথা, একবারও ভাবিনি আমাদের শিশুদের খেলার মাঠের কথা।

সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানটি সবুজের সমারোহ। সবুজ ঘাস আর ছোট-বড় নানান সবুজ বীথি। আর এই সবুজ পটভূমিকে অলংকৃত করেছে নানা রঙের ফুল। গাঁদা, কসমস, হরেক রঙের গোলাপ, আরো কত কি নাম না জানা ফুল। ঢালাই করা সরু পায়ে চলা পথগুলোর দুপাশে হাটু পর্যন্ত উঁচু ঝাউ গাছ তার সৌন্দর্য্যকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। শান্ত-নির্জন পরিবেশে মাঝে মাঝে পাখীর কাকলী শুনতে পাচ্ছি, হঠাৎ হঠাৎ ডানা ঝাপটে উড়ে যাচ্ছে দু’একটি বিহঙ্গ। মাথার উপরের উজ্জ্বল সূর্যটা, আর থোকায় থোকায় উড়ে যাওয়া সাদা মেঘগুলো পুরোপুরিই মানিয়ে গেছে এই উদ্দ্যানের সাথে। সব মিলিয়ে মনোরম নৈসর্গিক পরিবেশ।

রমনার ইতিহাস অনেক পুরাতন। সেই ১৬১০ সালে মোগল আমলে। এগারো শত বছরের পুরাতন ঢাকা শহরকে রাজধানী ঘোষণা করলেন মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর। ইসলাম খানকে পাঠালেন সুবেদার করে। নব্য রাজধানীতে সুবেদার ইসলাম খান গড়ে তুললেন বিশাল অঞ্চল জুড়ে এক নয়ানাভিরাম নগর অরণ্য বাগ-এ-বাদশাহী। এরই পরবর্তি নাম হয় রমনা। গড়ে উঠে দুটি অপূর্ব আবাসিক এলাকা মহল্লা চিশতিয়া ও মহল্লা সুজাতপুর।

টানা দুশো বছর ঢাকা ছিল বিশাল বাংলার রাজধানী ও প্রাণকেন্দ্র। দিনভর শোনা যেত বাদশাহ-সুলতানদের অশ্বারোহী সৈন্যদের জমকালো কুচকাওয়াজ ও দেশী-বিদেশী বণিকদের ব্যস্ততার গমগম শব্দ। ১৪১২ সালে দরবেশ শাহ আলী বাগদাদী ঢাকা আসেন, এবং এখানকার দরবেশ শাহ বাহারের শিষ্যত্ব গ্রহন করেন। যার টোম্ব এখনো আছে ঢাকার মিরপুরে। পর্তুগীজ ইতিহাসবিদ জাও দে বারোস ১৫৫০ সালে ঢাকার মানচিত্র স্থাপন করেন তার সুখ্যাত গ্রন্থ ‘ডিকেড্স অফ এশিয়ায়’। বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর প্রথম গভর্ণর উইলিয়াম হেজেস ১৬৮১ সালে ঢাকা এসে নগরীর সৌন্দর্যে মোহিত হয়েছিলেন। তার কাছে মনে হয়েছিল, এটি বাগান আর প্রাসাদের একটি অপূর্ব সুন্দর নগরী। ১৮ শতকের গোড়ার দিকে আর্মেনীয় ব্যবসায়ীরা পাট ও চামড়ার ব্যবসায় সাফল্য লাভ করলে, এখানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এক সময় রাজধানী স্থানান্তরিত হলো মুর্শিদাবাদে, তার কিছুকাল পরে পলাশির ট্রাজেডি, আর সেইসাথে বহুকালের জন্যে সদ্য স্থাপিত ইংরেজ নগরী কলকাতা দখল করে নিল ঢাকার স্থান। কালের স্রোতে ঢাকা হারালো তার গৌরব। রমনা হয়ে উঠল জঙ্গল। ধীরে ঢাকার এমনই শোচণীয় অবস্থা হলো যে, একসময় লেখক বঙ্কিমচন্দ্র কটাক্ষ করে বলল, “ঢাকাতে থাকে কেবল, কাক, কুকুর আর মুসলমান”।

ঢাকা তার হৃত গৌরব ফিরে পাবার একটা সুযোগ পেল ১৯০৫ সালে যখন ভাইসরয় লর্ড কার্জন ঢাকাকে নতুন প্রদেশ পূর্ব বাংলা ও আসামের রাজধানী ঘোষণা করলেন। কিন্তু ঢাকার আকাশে সৌভাগ্যের চাঁদ বেশিদিন রইল না। ১৯১১ সালে পূর্ব নির্ধারিত সিদ্ধান্ত বাতিল হয়ে, ঢাকা রাজধানীর মর্যাদা আর একবার হারায়।

১৮২৫ সালে ঢাকার বৃটিশ কালেক্টর মিঃ ডো রমনার পূণঃনির্মানের কাজ হাতে নেন। ডো-র নির্দেশে শ্রমিকরা কয়েক মাস ঘাম ঝরিয়ে সেখান থেকে জংলা ঝোপঝার পরিস্কার করে ও পরিত্যক্ত দালান, মনুমেন্ট ও টোম্বগুলো ভেঙে ফেলে। রেখে দেয়া হয় শুধু গ্রীক টোম্ব (যা বর্তমানে টি, এস, সি-র ভিতরে আছে), কালীমন্দির, ইরাণী বণিক শাহবাজ খান কর্তৃক ১৬৭৯ সালে নির্মিত শাহবাজ মসজিদ ও মীর জুমলা গেট (যা ঢাকা গেট নামেও খ্যাত)। এই রিনোভেটেড এলাকার নতুন নামকরণ হয় রমনা, এবং একে রেসকোর্স হিসাবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। রেসকোর্সের একপাশে গড়ে ওঠে বৃটিশ মিলিটারি ক্লাব। ঢাকার নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতায় ঘোড়দৌড় অতি দ্রুতই খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কাটাবনে একটি বিশাল আস্তাবলও তৈরী করা হয়। নবাবরা এখানে মনোরম বাগান গড়ে তোলেন এবং একটা অংশের নাম দেন শাহবাগ (বাদশাহী বাগান)।

এই রমনার একপাশে রয়েছে ঢাকা ক্লাব ও শিশু পার্ক (শিশুদের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা থেকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এটি নির্মান করেছিলেন), আরেক পাশে রয়েছে পুরাতন গভর্ণর হাউস (বর্তমানের হাইকোর্ট)। ঠিক তার পাশেই পরম শান্তিতে শুয়ে আছেন আমাদের জাতীয় নেতা শেরে বাংলা এ, কে, ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী। জাতি তাদের অবিস্মরণীয় অবদানের কথা স্মরণ রেখে, কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসাবে তাদের সমাধির উপর গড়ে তুলেছেন প্রকান্ড স্মৃতিসৌধ। আরেক পাশে ঘুমিয়ে আছেন বীর যোদ্ধা ও বিদ্রোহী কবি, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। এখানেই ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, “এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম”, এখানেই আত্মসমর্পন করেছিল পাক হানাদার বাহিনী, এখানেই ময়দান প্রকম্পিত হয়েছিল লক্ষ লক্ষ বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধার বিজয় উল্লাস জয় বাংলা ধ্বনিতে। এই রমনা ইতিহাসের পাতা উল্টে উল্টে মনে করিয়ে দেয় কয়েক শত বছরের গৌরব গাঁথা। কানপেতে যেন শুনতে পাই শেরে বাংলার ব্যঘ্র হুংকার, সোহ্‌রাওয়ার্দীর জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা, বিদ্রোহী কবির অগ্নিবীণার ঝংকার, বঙ্গবন্ধুর জ্বালাময়ী ভাষণ, পরাজিত নিয়াজির আত্মসমর্পনের দলিলে স্বাক্ষর দেয়ার খসখস শব্দ, আর হাজারো জনতার বিজয়োল্লাস।
(স্মৃতি ঝলমল সুনীল মাঠের কাছে,
পানি টলটল মেঘনা নদীর কাছে,
আমার অনেক ঋণ আছে, ঋণ আছে
বকের ডানায় ছাওয়া চরের কাছে,
চাঁদ জাগা বাঁশ বাগানের কাছে,
আমার অনেক ঋণ আছে, ঋণ আছে)

বিশ্বখ্যাত গায়িকা রূণা লায়লার গাওয়া এই গানটি একসময় আমার মনকে আপ্লুত করত, এখনো করে!

 

 লিস্টনিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ ৯

:দেখ দেখ এখান থেকে শিশু পার্কের ঐ নাগরদোলাটি কেমন সুন্দর দেখাচ্ছে।
: হ্যাঁ, বেশ সুন্দর লাগছে।
ঃ আচ্ছা আমিতো ঢাকার বাইরের, তাই তোমাদের ঢাকা সম্পর্কে আমার আইডিয়া কম। আমাকে ঐ শিশু পার্কটি সম্পর্কে কিছু বল।
: ভালো প্রশ্ন করেছ আমার হৃদয় জুড়ে রয়েছে ঐ শিশু পার্কটি ।
ঃ কি রকম?
ঃ ঢাকাতে একসময় শিশু পার্ক বলতে প্রায় কিছুই ছিল না। নয়াটোলাতে একটা জায়গা ছিল, তার নাম ছিল নয়াটোলা শিশু পার্ক।
ঃ কি ছিল ওখানে?
ঃ সেটাই বলতে চাচ্ছিলাম। প্রায় কিছুই ছিলনা। ছিল কয়েকটা দোলনা, কিছু ঢেকি, আর কয়েকটা লোহার গাছ। ওখানেই হুমড়ি খেয়ে পড়ত আশেপাশের শিশুরা। আমিও যেতাম। যদিও তখন জনসংখ্যা কম ছিল, তারপরেও । আশেপাশের এলাকার শিশুদের সংখ্যার তুলনায় ওটা ছিল এক চিলতে জমি। তুমি ভাবো, বিশাল বড় আবাসিক এলাকা মগবাজার যার আবার অনেকগুলো ভাগ আছে – মধুবাগ, নয়াটোলা, ওয়ারলেস কলোনী, পেয়ারাবাগ, দিলি রোড, শাহসাহেব বাড়ী, ইত্যাদি। এই বিশাল এলাকার জন্য মাত্র ঐ গুটিকতক মামুলি খেলনা নিয়ে, ঐ এক চিলতে জমির শিশু পার্ক!
ঃ হায় খোদা
ঃ শিশুদের ভীড় লেগেই থাকত। এক একটা দোলনার পিছনে বিশাল লাইন। মাঝে মধ্যে আবার এই নিয়ে ঝগড়া-ঝাটি মারামারিও লেগে যেত।
ঃ ওরকম পার্ক কি ঢাকা শহরে ঐ একটাই ছিল?
ঃ না। টুকরা টাকরা এরকম আরো কয়েকটি ছিল ঢাকা শহরে।
ঃ রমনা পার্কের ভিতরে, গুলিস্তানের আশেপাশে কোথায় যেন একটা ছিল
ঃ এই ছিল শিশুদের জন্য ব্যবস্থা!
ঃ হ্যাঁ, শিশুদের ভালো মন্দের কথা সম্ভবতঃ কারোই মনে হয়নি।
ঃ তাইতো মনে হয়। তারপরে কি হলো?
ঃ ১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতি হলেন জিয়াউর রহমান। তিনি অনুধাবন করতে পরেছিলেন যে, জাতির ভবিষ্যৎ হলো শিশুরা। যে কোন জাতি গঠন শিশুদেরকে দিয়েই শুরু করতে হবে। সেই উদ্দেশ্যেই তিনি বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেন। এক, শিশু একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন, দুই, দেশের প্রতিটি বৃহত্তর জেলায় একাডেমির শাখা স্থাপন করেন, তিন, শিশুদের সাংস্কৃতিক প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে নতুন কুঁড়ি নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন, যা বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচার হতো। পরবর্তিকালে অনেক সুখ্যাত শিল্পি ঐ নতুন কুঁড়িরই প্রডাক্ট, চার, সারাদেশে মেধাবী শিশু ছাত্রদের অনুপ্রেরণা দেয়ার লক্ষ্যে তাদের জন্য একটি সম্মেলনের আয়োজন করেন এবং সশরীরে সেখানে উপস্থিত হয়ে তাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করেন। সেই সম্মেলনে অংশগ্রহনকারী মেধাবী শিশুদের জন্য দিনটি ছিল স্মরণীয়, পাঁচ, মেধাবী শিশুদের (ধনী হোক দরিদ্র হোক) লালণের নিমিত্তে নির্মিত সামরিক মেরিট স্কুল ক্যাডেট কলেজের সংখ্যা চারটি থেকে আটটিতে উন্নিত করেন, ছয়, সুস্থ অর্থবহ ও উন্নত চলচিত্রের নির্মানের লক্ষ্যে তিনি রাষ্ট্রীয় অনুদানের ব্যবস্থা করেন। এই সময়ে বেশ কিছু ভালো ভালো শিশু চলচিত্র নির্মিত হয়, যেমন- ছুটির ঘন্টা, ডুমুরের ফুল, ডানপিটে ছেলেটি, অশিক্ষিত, এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী, ইত্যাদি,
ঃ আমার মনে আছে। সেই সময় বিটিভিতেও খুব সুন্দর সুন্দর শিশুতোষ অনুষ্ঠান হতো। এরমধ্যে একটি ধারাবাহিক নাটক ছিল, ‘রোজ রোজ’। প্রচন্ড জনপ্রিয় ছিল শিশুদের মধ্যে। আমরা হা করে গিলতাম।
ঃ হ্যাঁ। আমার মনে আছে। সাজিয়া, শিপলু, অরূপরা অভিনয় করেছিল। একটি শর্ট ফিল্মও হয়েছিল নাম মনে পড়ছে না। শক্তিমান অভিনেতা গোলাম মোস্তফা অভিনয় করেছিলেন।
ঃ সুবর্ণা মোস্তফার বাবা?
ঃ হ্যাঁ। ক্যামেলিয়া মোস্তফা, সুবর্ণা মোস্তফা দুই বোন। উনাদের একটা ছোট ভাই আছে সুমিত ইসমাইল মোস্তফা। এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী-তে শিশু শিল্পি হিসাবে অভিনয় করেছিল।
ঃ ইন্টারেস্টিং! তারপর ঐ ফিল্মটিতে কি ছিল?
ঃ ফিল্মটি ছিল শিশুদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগানোর একটা ফিল্ম। তার দুটি কথা মনে আছে। বালুর উপর ম্যাপ এঁকে এক শিশু বলছে – “এই এই এই বেশ, এইতো আমার বাংলাদেশ।” আরেকটা গান ছিল, ‘দেশকে ভালোবেসে, দেশকে ভালোবেসে বসে থাকলে চলবে নারে’।
ঃ চমৎকার তো গানটির কথা।

ঃ সাত, জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালকে বাংলাদেশ শিশু বর্ষ ঘোষণা করেন। পুরো বছর জুড়ে সারাদেশে নানা রকম কর্মকান্ড হয়। আর আট নম্বর হলো ঐ শিশু পার্কটি।
ঃ জিয়াউর রহমান তৈরী করেছেন!
ঃ হ্যাঁ। সেনাবাহিনীর চাকুরী জীবনে তিনি জার্মানীতে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। সেই সময় তিনি নিশ্চয়ই সেখানকার অত্যাধুনিক শিশু পার্কগুলো দেখেছিলেন। তাছাড়া রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়েও তিনি একাধিক দেশ সফর করেছিলেন এবং সেসব দেশের শিশুপ্রেম ভালোভাবে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি তাই ঢাকাতে একটি অত্যাধুনিক শিশু পার্ক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিলেন। যেই চাওয়া সেই কাজ, খুব দ্রুতই কাজ শেষ করে ১৯৭৯ সালে উদ্ধোধন করলেন ‘ঢাকা শিশু পার্ক’। হুমড়ি খেয়ে পড়ল শুধু শিশুরা নয় পুরো ঢাকা শহর। শিশু, কিশোর, যুবা এমনকি প্রৌঢ়-বৃদ্ধরাও বাদ যায়নি। আমাদের কল্পনাতেই ছিলনা এমন কিছু একেবারে বাস্তব রূপে ধরা দিল। জীবনে প্রথম যেদিন এই পার্কে এসেছিলাম আমার মনে আছ্বে। বাবা-মা, আপুরা, আমি, দাদীমা, আর আমাদের আরো কয়েকজন কাজিন সবাই এসেছিলাম। আব্বুর ভাঙা গাড়ীটাতে যতজন পারি উঠলাম, আর কয়েকজনকে রিকশায় তুলে নিয়ে এলেন আমাদের দূর সম্পর্কের এক মামা। পার্কে ঢুকেই আমার মনে হয়েছিল যেন রূপকথার জগতে এলাম।

ঃ এই পার্ক নিয়ে বাংলাদেশের প্রথম বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনাও আছে।
ঃ ও বাবা বিমান ছিনতাই! এই শিশু পার্ক নিয়ে? কি হয়েছিল বলতো?
ঃ এক পাগলাটে যুবক, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী একটি আভ্যন্তরীণ বিমান হাইজ্যাক করে খেলনা পিস্তল দিয়ে। তারপর পাইলটকে বাধ্য করে বিমানটি কলকাতায় নিয়ে যেতে।
ঃ কলকাতায় নিল?
ঃ কি আর করা? পাইলট তো আর বুঝতে পারেনি যে, সেটা খেলনা পিস্তল। যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে ছিনতাইকারীর কথাই শোনে। ছিনতাইকারীর কাছে তার দাবী শুনতে চাইলে সে বলে, “ঢাকার শিশু পার্কটি চরম বিলাসিতা, বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে এমন পার্কের প্রয়োজন নেই। আমি পার্কটি বন্ধ করার দাবী জানাচ্ছি”।

ঃ এত সুন্দর একটা পার্ক, যা দেখে শিশুরা আনন্দে ভাসছে সেটা সে বন্ধ করার দাবী জানালো!
ঃ এই একটা সমস্যা। আমরা কোন ভালো কিছুকে খুব সহজে গ্রহন করতে পারিনা।

শিশু পার্কটি পিছনে রেখে ধীরে ধীরে আমরা এগিয়ে গেলাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঐ গেটের দিকে যেখান থেকে বেরোলেই টি, এস, পাওয়া যাবে। কিছুদূর যাওয়ার পর তিন নেতার মাযারের সৌধটি চোখে পড়ল। তার পাশেই একটা খুব পুরাতন স্থাপনা দেখা গেল।
ঃ ওটা কিরে? (ইমতিয়াজ প্রশ্ন করল)
ঃ অনেক পুরাতন একটা মসজিদ। (বলল মোস্তাহিদ)
ঃ অনেক পুরাতন তা দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছে। কোন আমলর? ইতিহাস কি? রোমান কিছু জানো?
ঃ সামান্য জানি। (উত্তর দিলাম আমি) এটির নাম শাহবাজ মসজিদ। ইরানী বণিক হযরত শাহবাজ (রঃ) এই মসজিদটি রমনায় নির্মান করেছিলেন ১৬৭৯ সালে। তিনি একাধারে বণিক ও ধর্মপ্রান একজন মানুষ ছিলেন। তার জীবদ্দশায় তিনি এই মসজিদটি তৈরী করেন। সম্ভবত শ’তিনেক মুসল্লির নামাজের জায়গা হবে এই মসজিদে। এটি ঢাকার প্রাচীনতম নিদর্শনগুলোর মধ্যে একটি। হযরত শাহবাজ (রঃ) ঢাকাতেই ইন্তেকাল করেন এবং মসজিদ সংলগ্নই রয়েছে তাঁর মাযার শরীফ।
ঃ মসজিদটি কোন আমলে করা?
ঃ মোগল আমলে।
ঃ এই যে মোগল আমল, মোগল আমল করছিস, বাংলাদেশে কি সব সময়ই মোগল শাসন ছিল না কি?
ঃ সব সময় থাকার তো প্রশ্নই ওঠে না। প্রথম মোগল সম্রাট ছিলেন জহিরউদ্দিন মুহম্মদ বাবর (বাবুর) । তিনি ১৫২৬ সালের ২১শে এপ্রিল পাণিপথের যুদ্ধে ইব্রাহীম লোদিকে পরাজিত করে লোদি সাম্রাজ্য বা দিল্লির সুলতানাত অন্য কথায় ভারত উপমহাদেশ দখল করেন। সেই ছিল এই উপমহাদেশে মোগল সাম্রাজ্যের শুরু।
ঃ তখন কি বাংলা দিল্লির সুলতানাত-এর অধীনে ছিল না? সেই হিসাবে বাংলা কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাবুরের অধীনে আসে নাই?
ঃ না, বাংলায় তখন হুসেনশাহী যুগ চলছিল। হুসেনশাহীরা স্বাধীনভাবেই বাংলা শাসন করছিলেন।
ঃ কে তথন বাংলার সুলতান ছিলেন?
ঃ ১৪৯৩ সালে আলাউদ্দিন হুসেন শাহ বাংলার সিংহাসনে আরোহন করেন। ইতিপূর্বে বাংলায় কিছু পরিমানে বিশৃঙখলা বিরাজমান ছিল। আলাউদ্দিন হুসেন শাহ অসীম যোগ্যতার সাথে দায়িত্ব পালন করে দেশে শান্তি শৃখলা প্রতিষ্ঠা করেন।
ঃ কত বছর ছিলেন হুসেনশাহীরা?
ঃ ১৪৯৩ থেকে ১৫৩৮ সাল পর্যন্ত হুসেনশাহী বংশের চারজন সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ, নসরৎ শাহ, আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহ ও গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ বাংলাদেশ শাসন করেন।তাদের শাসনকালে শান্তি-শৃংখলা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সামরিক জীবনে সাফল্য ও বাঙালী প্রতিভার বহুমূখী বিকাশ সম্ভব হয়েছিল। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিশিষ্ট রূপ পরিগ্রহ করেছিল। ধর্মীয় সহিষ্ণুতার ফলে বাঙালী জীবনে নবজাগরণের সূচনা হয়েছিল। এই সময়ই বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটেছিল। তাই হুসেনশাহী যুগ বাংলার ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল যুগ।

ঃ বাবুরের সময় কোন সুলতান বাংলার ক্ষমতায় ছিলেন?
ঃ সুলতান নসরৎ শাহ। স্বাধীন সুলতান।
ঃ তার সাথে কি বাবুরের কোন যুদ্ধ হয়নাই? বাবুর কি বাংলা দখল করেনি?
ঃ ১৫২৬ সালে বাবুর ভারতের অধীশ্বর হলে বাংলার মুসলিম সাম্রাজ্যের জন্য বিপদ উপস্থিত হয়। লোদীর পক্ষের অনেক পলায়মান নেতা নসরৎ শাহের সাহায্যপ্রার্থী হয়। নসরৎ শাহ মানবতার খাতিরে তাদের আশ্রয় দেন। এদিকে ১৫২৭ সালে বাবুর ঘোগরা নদীর দিকেম অগ্রসর হন। তিনি মোল্লা মাজহার নামক এক দূতকে পাঠালেন নসরৎ শাহের কাছে, নসরৎ শাহের মনোভাব জানার জন্য। নসরৎ শাহ কোন স্পষ্ট উত্তর না দিয়ে মোল্লা মাজহারকে এক বৎসর নিজের দরবারে রেখে দিলেন। শেষ পর্যন্ত নসরৎ শাহ নিরপেক্ষতার পথ অবলম্বন করেন এবং নসরৎ শাহের পাল্টা দূত ১৫২৯ সালে বাবুরের দরবারে বহু উপঢৌকন নিয়ে হাজির হন। বাবুর নসরৎ শাহের নিরপেক্ষতায় সন্তষ্ট হলেন ও বাংলা আক্রমণের পরিকল্পনা ত্যাগ করলেন। ১৫৩০ সালে বাবুরের মৃত্যু হলে নসরৎ শাহ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন।

ঃ আচ্ছা বাবুর পুত্র হুমায়ুন কি বাংলা আক্রমন করেন নাই?
ঃ হুমায়ুন বাংলা আক্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন। তিনি বাংলা আক্রমণের উদ্যোগ নিলে, নসরৎ শাহ মোগল সাম্রাজ্যের অপর সীমান্তের শত্রূ গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহের সাথে মিত্রতা স্থাপনের উদ্দেশ্যে মালিক মরজানকে দূত হিসাবে পাঠান। বাহাদুর শাহ হুমায়ুনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আয়োজন করছিলেন। এই সংবাদ পেয়ে হুমায়ুন বাংলার বিরুদ্ধে আর অগ্রসর না হয়ে গুজরাট অভিমুখে যাত্রা করেন। নসরৎ শাহের আকস্মিক মৃত্যুতে বাংলা-গুজরাটের মৈত্রী পরিপূর্ণভাবে কার্যকরী হলেও নসরতের সময়পোযোগী কুটনীতি বাংলাকে আসন্ন যুদ্ধ হতে রক্ষা করল।
ঃ বাহ্! বেশ ভালো কূটনৈতিক চাল চেলেছিলেন তো নসরত শাহ। আচ্ছা, শুনেছি গুজরাটী জাতির সাথে নাকি আমাদের জাতির মিল আছে?
ঃ হ্যাঁ আছে তো। গুজরাটি ভাষার সাথেও আমাদের বাংলা ভাষার মিল আছে।
ঃ কি বলিস? দুই দেশ ভারতবর্ষের দুই প্রান্তে। তারপরেও মিল হলো কি করে? অস্বাভাবিকই তো মনে হচ্ছে।
ঃ আপাতঃদৃষ্টিতে অস্বাভাবিকই মনে হয় তবে ওটাই ফ্যাক্ট। অবশ্য এর ব্যাখ্যাও রয়েছে।
ঃ বলতো, ব্যাখ্যাটা কি।
ঃ আরেকদিন বলব। তবে এই মুহূর্তে বাবুরের একজন বিশ্বখ্যত পুর্বপুরুষ সম্পর্কে একটা মজার ঘটনা মনে পড়ল, ওইটা আগে বলি।
ঃ ইন্টারেস্টিং! বাবুরের বিশ্বখ্যত পুর্বপুরুষ? কে তিনি?
ঃ তৈমুর লং।
ঃ বলিস কি! তৈমুর লং বাবুরের পূর্বপুরুষ নাকি?
ঃ হ্যাঁ মায়ের দিক থেকে বাবরের পূর্বপুরুষ ছিলেন চেঙ্গিস খান, আর বাবার দিক থেকে বাবরের গ্রেট গ্রেট গ্রেট গ্র্যান্ডফাদার ছিলেন তৈমুর লং ।
ঃ ভেরি ইন্টারেস্টিং! কি হয়েছিল তৈমুর লং-এর? কি সেই মজাদার তথ্য?
ঃ তৈমুর লং-এর জন্ম ১৩৩৬ সালের ৮ই এপ্রিল কেশ নগরীর স্কারদু নামক শহরে, এর বর্তমান নাম শহর-ই-সবজ মানে সবুজ শহর। বর্তমান উজবেকিস্তান রাষ্ট্রের সমরকন্দ শহরের ৫০ মাইল দক্ষিণে এই শহর-ই-সবজ অবস্থিত। সেই সময় তা ছিল চাঘতাই খানশাহীর (Chagatai Khanate) অন্তর্ভুক্ত। তাঁর পিতা ছিলেন বারলাস উপজাতির ছোট মাপের ভূস্বামী। এই বারলাস হলো তুর্কী-মঙ্গোল উপজাতি, অথবা মূলতঃ মঙ্গোল উপজাতি যাকে পরবর্তিতে টার্কিফাই করা হয়েছিল। Gérard Chaliand-এর মতে তৈমুর মুসলমান ছিলেন। তৈমুরের মনে চেঙ্গিস খানের সাম্রাজ্যকে পুণঃপ্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস জাগে।
Skardu

তৈমুর ছিলেন একজন মিলিটারি জিনিয়াস এবং ট্যাক্টিশিয়ান, যা তাকে বিশ্বের সবচাইতে শক্তিশালী শাসকে পরিণত করে। তৈমুরের সৈন্যবাহিনী ছিল বিশ্বের ত্রাস। যে স্থানই জয় করত সেখানেই ধ্বংসযজ্ঞের প্রলয় তুলত। এই সৈন্যদলের হাতে ১৭ মিলিয়ন মানুষ নিহত হয়। যা ছিল সেই সময়ের পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার শতকরা পাঁচ ভাগ। হিটলারের আগমনের পূর্বে তৈমুরই ছিল বিশ্বের সবচাইতে বড় ত্রাস।

আবার এই তৈমুরই ছিলেন আর্ট ও কালচারের একজন বড় পৃষ্ঠপোষক। তিনি সমাজবিদ্যার (Sociology) প্রতিষ্ঠাতা ইবনে খলদুন ও পার্শী কবি হাফিজের মত মুসলিম পন্ডিতদের সংস্পর্শে আসেন।
১৩৬০ সালে তৈমুর সেনা অধ্যক্ষ হিসাবে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেন। পরবর্তিতে ১৩৬৯ সালে সমরকন্দের সিংহাসনে আরোহন করেন। সে সময় যেকোন শাসকই সিংহাসনে আরোহনের পর দ্বিগিজ্বয়ে বের হতেন, তৈমুরও তাই করেন। তার সৈন্যাপত্যের গুনে তিনি পশ্চিম ও উত্তর পশ্চিমে কাস্পিয়ান থেকে শুরু করে উরাল ও ভলগা পর্যন্ত, দক্ষিণ দক্ষিণ-পশ্চিমে পারশ্য, বাগদাদ, কারবালা ও ইরাকের কিয়দংশ দখল করেন। ১৩৯৮ সালে তৈমুর দিল্লি সুলতানাত আক্রমণ করেন। এবং কয়েকমাসের মধ্যে দিল্লি জয় করেন। এখানে তিনি এক লক্ষ যুদ্ধবন্দিকে হত্যা করেন। তিনি অটোমান সাম্রাজ্য, মিশর, সিরিয়া, আর্মেনিয়া, জর্জিয়া ইত্যাদি দেশেও সামরিক অভিযান চালান। সব জায়গাতেই ব্যপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয় ও অনেক জনপদ বিরান করে ফেলা হয়।
ঃ তার নামের শেষে লং থাকার অর্থ কি? এটা কি তার পদবী?
ঃ না। তার পদবী ছিল গুরগান, পুরো নাম তৈমুর গুরগান। এক যুদ্ধে আহত হয়ে পায়ে আঘাত পেয়ে তিনি খোঁড়া বা ল্যাংড়া হয়ে যান। সেই থেকে তাঁর নাম হয় তৈমুর লং অর্থাৎ ল্যাংড়া তৈমুর।
ঃ তৈমুর মারা গেল কবে?
ঃ তৈমুর চীন জয় করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তখন সেখানে রাজত্ব করছিল মিং ডাইনাস্টি। তিনি মিং-দের আক্রমণের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলেন, কিন্ত শির দরিয়া পর্যন্ত পৌছে ছাউনি স্থাপন করার পরপরই তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। বিশ্বজয়ী কঠোর শাসকের এটিই ছিল শেষ অভিযান। সেই ছাউনিতেই ১৪০৫ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারী তিনি দেহত্যাগ করেন।

তৈমুরের মৃত্যুর অনেকগুলো বছর পর। ১৯৪১ সালে তদানিন্তন সোভিয়েত সরকার সিদ্ধান্ত নিল যে, তৈমুরের মৃতদেহ তুলবে। উদ্দেশ্য, দেহাবশেষ থেকে তার সত্যিকারের চেহারার ছবি আঁকা। কোন কঙ্কাল বা দেহাবশেষ থেকে সেই ব্যক্তিটি জীবদ্দশায় দেখতে কেমন ছিল তার চিত্র অংকন করার বিজ্ঞানটি ইতিমধ্যেই সোভিয়েত ইউনিয়নে যথেষ্ট উন্নতি লাড করেছিল। এটা প্রথম করেছিলেন সোভিয়েত প্রত্নতত্ববিদ ও নৃবিজ্ঞানী মিখাইল গেরাসিমোভ (Soviet anthropologist Mikhail M. Gerasimov)। তিনি অতি যত্ন সহকারে অধ্যয়ন করে দুই শত জনেরও অধিক ব্যক্তির দেহাবশেষ থেকে তাদের চেহারা অংকন করেছিলেন।

সেই উপলক্ষে তদানিন্তন সোভিয়েত একনায়ক জোসেফ স্তালিন (ইউজেফ যুগাশভিলি) একটি টীম গঠন করেন যার নেতৃত্বে ছিলেন গেরাসিমোভ । কিন্ত এই মিশন করতে গিয়ে প্রথম যেই বিপত্তিটি ঘটল তাহলো তৈমুরকে যে ঠিক কোথায় দাফন করা হয়েছিল তা সঠিকভাবে কারোই জানা ছিলনা। তৈমুরের টোম্ব সম্পর্কে একাধিক শ্রতি ছিল। এটা খুব সম্ভবতঃ ইচ্ছাকৃতভাবেই করা হয়েছিল, যাতে তার টোম্ব কেউ খুঁজে না পায়। প্রথমে তারা এক জায়গায় যান। সেখানে খোড়াখুঁড়ি করে যা পেলেন তা হলো একটি শূণ্য কবর। তারপর তারা অন্য একটি জায়গায় যান। সেখানেও তৈমূরের টোম্ব থাকার সম্ভাবনা ছিল। এবারেও হতাশ হন গেরাসিমোভ ও তার নৃবিজ্ঞানী দল। এবার ইতিহাস একটু ঘাটাঘাটি করে মনযোগ দি্যে পড়ে, সমরকন্দের একটি জায়গা তারা চিহ্নিত করলেন, যেখানে তৈমুরের মৃতদেহ থাকার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। সেখানে তারা উপস্থিত হয়ে খোড়াখুঁড়ি শুরু করলেন এবার পূর্বের চাইতে বেশী আত্মবিশ্বাস নিয়ে। কিন্তু খোড়াখুঁড়ির শেষ হওয়ার পর আগের চাইতে আরো বেশী হতাশ হলেন নৃবিজ্ঞানীরা। আবারও পেলেন শূণ্য কবর। সন্ধ্যা নাগাদ ঘরে ফিরে গেলেন তারা। কি করবেন ঠিক বুঝতে পারছিলেন না। খোজাখুঁজি করার কিছুই বাকী রাখেননি তারা। আর কোন সম্ভাব্য জায়গা আছে বলেও মনে হয়না। আরেকবার ইতিহাস ঘাটলেন। না আর কোন জায়গা নেই, হলে এটাই হবে। কিন্তু এখানে তো তারা শূণ্য কবর পেয়েছেন! হঠাৎ বিদ্যুৎ খেলে গেল গেরাসিমোভের মাথায় – ‘আমরা থেমে গেলাম কেন? আরো গভীরে খুঁড়িনা। দেখিনা, কি আছে সেখানে।’

পরদিন তারা ফিরে গেলেন টোম্বে। নব উদ্যমে কাজ শুরু করলেন। খুঁড়তে খুঁড়তে আরো গভীরে গিয়ে আবিষ্কার করলেন, কিছু একটা আছে ওখানে। এবার ভারী কয়েকটি পাথরের পাটাতন নজরে পড়ল। স্পস্ট হলো যে, কবরটি কৌশলে নির্মিত। প্রথমে একটি ফাঁকা কবর তারপর আরো গভীরে কিছু আছে। ঐ পাটাতন সরালে কিছু একটা পাওয়া যেতে পারে। ওগুলো সরানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন, এরকম সময়ে গেরাসিমোভের কাছে সংবাদ এলো যে, আপনার সাথে তিন বুড়ো দেখা করতে চায়।

কিছুটা বিরক্ত, কিছুটা বিস্মিত হলেন গেরাসিমোভ, কে এলো আবার এই চূড়ান্ত সময়ে। সংবাদদাতা জানালেন, এটা খুব জরুরী, আপনাকে তাদের সাথে দেখা করতেই হবে। কাজ রেখে বাইরে বেরিয়ে এলেন তিনি। নিকটবর্তী একটি চাইখানা (মধ্য এশিয়ায় প্রচলিত বিশেষ ধরনের অতি জনপ্রিয় চায়ের ক্যাফে)-য় তাকে নিয়ে গেল সংবাদদাতা। সেখানে তিনজন বৃদ্ধ বসে আছে। সেই প্রাচীন কালের রূপকথার মত দেখতে তারা । আবার তিন বৃদ্ধ দেখতে ছিল একই রকম, যেন মায়ের পেটের তিন ভাই। তারা রুশ ভাষা জানত না। ফারসী ভাষায় কথা বলতে শুরু করল। অনুবাদক অনুবাদ করে দিল।
ঃ আপনারা কাজ বন্ধ করুন। তৈমুরের মৃতদেহ তুলবেন না। (বলল এক বৃদ্ধ)
ঃ কেন? (গেরাসিমোভ প্রশ্ন করলেন)
ঃ যেটা বলছি সেটা করুন। বাড়তি প্রশ্নের কি প্রয়োজন? (আরেক বৃদ্ধ বলল)
ঃ আমাদের মিশন আছে। কাজটা আমাদের করতে হবে।
ঃ মিশন বন্ধ রাখুন। কাজটা না করাই ভালো।
ঃ সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী স্বয়ং স্তালিন আমাদের পাঠিয়েছেন। মিশন শেষ না করে যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব না।
ঃ স্তালিন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নয়। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী উপরওয়ালা। স্তালিনের কথা না শুনলেও চলবে।
ঃ এই সোভিয়েত রাষ্ট্রে বসবাস করে জোসেফ স্তালিনের আদেশ অমান্য করার সাহস আমাদের নেই। তাছাড়া আমরা বিজ্ঞানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে যাচ্ছি।
ঃ বাদ দেন আপনার বিজ্ঞান। মানুষের কথা ভাবুন, পৃথিবীর কথা ভাবুন।
ঃ বুঝলাম না! আপনারাই বা এত জেদ ধরেছেন কেন? একটা সামান্য মৃতদেহ তুলব। এর সাথে মানুষ, পৃথিবী ইত্যাদির সম্পর্ক কি?
ঃ সামান্য মৃতদেহ নয়। এটি স্বয়ং তৈমুর লং-এর মৃতদেহ। আপনাদের স্তালিনের চাইতেও বহু বহু গুনে শক্তিধর ছিলেন তিনি। ভয়াবহ কিছু ঘটে যাওয়ার আগেই তাকে থামানো প্রয়োজন।
ঃ কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছেন আপনারা? কি ঘটতে পারে?
ঃ বাছা এই দেখ আমার হাতে বই। (গেরাসিমোভ তাকালেন বইটার দিকে, অতি প্রাচীন একটি বই, নিঁখুত হস্তলীপিতে আরবী লেখায় ভরা। বইয়ের একটি জায়গায় আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বললো শান্ত সৌম্য তৃতীয় বৃদ্ধটি) এই দেখ এখানে লেখা – তৈমুর লং-এর ঘুম ভাঙালে পৃথিবীতে এমন একটি রক্তাত ও ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হবে যা মানব জাতি ইতিপূর্বে কখনো দেখেনি।
ঃ কিযে বলেন! (পাগলের প্রলাপ ছাড়া আর কিছুই মনে হলোনা গেরাসিমোভের)
ঃ আমি দুঃখিত। আপনাদের কথা রাখা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। আপনারা যেতে পারেন আমার হাতে এখন অনেক কাজ। (বললেন গেরাসিমোভ )
তিক্ষ্ণ দৃষ্টিতে গেরাসিমোভের দিকে তাকালেন তারা। এরপর ফারসী ভাষায় গালমন্দ করতে শুরু করলেন গেরাসিমোভকে। দ্বিগুন বিরক্তিতে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন গেরাসিমোভ। গালমন্দ করতে করতে চলে গেল তিন বৃদ্ধ। যে উৎফুল্ল মনে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি তা আর রইল না। মেজাজটাই খিঁচড়ে গেল। দিনটি ছিল ১৯৪১ সালের ২০শে জুন।

(ভূতপূর্ব রুশ সাম্রাজ্যে চালু হয়েছে নতুন শাসন। জারকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করে নিয়েছে কম্যুনিস্টরা। কেবল রুশ সাম্রাজ্যই নয়, আশেপাশের পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোকেও প্রভাব বলয়ের মধ্যে নিয়ে এসেছে তারা। আত্মবিশ্বাস দিনদিনই বাড়ছে তাদের। স্বপ্ন দেখছে বিশ্ববিপ্লবের নামে সমগ্র পৃথিবী দখল করার। রহস্য, অতিন্দ্রিয়, অতিপ্রাকৃত কোন কিছুই বিশ্বাস করেনা তারা। বড় বেশী প্রাকটিকাল। মান্ধাতার আমলের পোষাক-আশাক পড়া, ফারসী ভাষা বলা, আনইমপ্রেসিভ ঐ তিন বৃদ্ধের আজগুবী কথায় কান দেবে সেই ধাতুতে গড়া নয় কম্যুনিস্টরা।)

ভিতরে ঢোকার সময় হঠাৎ টোম্বের গায়ে নজর পড়ল গেরাসিমোভের, গুর-ই-আমীর (তৈমুরের সমাধী)-এ ফারসী ও আরবী ভাষায় লেখা, “আমি যেদিন জাগব, সমগ্র পৃথিবী প্রকম্পিত হবে।” (“When I rise from the dead, the world shall tremble.”) বোগাস! ভাবলেন তিনি। ভিতরে গিয়ে আরো কিছু কাজের নির্দেশ দিলেন তিনি। পুরো কাজ শেষ হতে আরো দুদিন সময় লাগলো। অবশেষে ১৯৪১ সালের ২২শে জুন পাটাতনগুলি সরানো হলো আর সাথে সাথে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল বিজ্ঞানীদের। বহু প্রতিক্ষিত কফিন শুয়ে আছে সেখানে। পনের শতকের পৃথিবী কাঁপানো শাসক তৈমুর লং-এর কফিন। গভীর আগ্রহ নিয়ে কফিনের ডালা খুললেন তারা। পাঁচশত বছর আগে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়া, মহাশক্তিধর তৈমুরের নিথর-নীরব দেহ শুয়ে আছে। হঠাৎ মৃতদেহের পাশে কিছু একটার দিকে নজর গেল গেরাসিমোভের। একটি ফলকে সেখানে লেখা, “যেই আমার টোম্ব খুলুক না কেন, সে আমার চাইতেও ভয়াবহ এক টেরর-কে পৃথিবীতে ডেকে আনলো” (“Who ever opens my tomb, shall unleash an invader more terrible than I.) । কিছুটা ভুরু কুঞ্চিত হলো গেরাসিমোভের। একটু চিন্তিত মনে হলো তাকে।

ঃ স্যার কি ভাবছেন? (তরুণ এক বিজ্ঞানী প্রশ্ন করল তাকে)
ঃ উঁ। না কিছুনা।
ঃ বাইরে, কেউ কিছু বলেছে?
ঃ ব্যাপার না। (ছোট একটি শ্বাস ফেলে বললেন তিনি)
ঃ এখন কি কাজ হবে স্যার?
ঃ দেহটাকে আমার এপার্টমেন্টে নিয়ে চল। মুখচ্ছবি তৈরী করতে হবে আমাকে।
তাই করা হলো।

এপার্টমেন্টে নিয়ে গভীর মনযোগের সাথে কাজ শুরু করলেন তিনি। দারুন একটা সুযোগ হয়েছে তাঁর। ইতিহাসের খ্যতিমান এক ব্যাক্তির সত্যিকারের মুখচ্ছবি তৈরী করতে পারবেন তিনি। আঁকা বা কাল্পনিক ছবি নয়, একেবারে আসল। কাজ শেষ হলে পৃথিবীবাসী কেমন বাহবা দেবে তাকে! কিন্তু বাহবা পাওয়ার আগেই ঘটে গেল দুর্ঘটনা। সেই দিনই নাৎসী জার্মানী হামলা চালালো সোভিয়েত ইউনিয়নে, পৃথিবী প্রকম্পিত করা এই অপারেশনের নাম অপারেশন বারবারোসা (Nazi Germany launched Operation Barbarossa, its invasion of the U.S.S.R.)। হতবাক হয়ে গেলেন গেরাসিমোভ। টোম্বের গায়ের লেখাটি মনে পড়ল তার। ছুটে গেলেন ঘনিষ্ট বন্ধু ও এই মিশনে তার সঙ্গী ক্যামেরাম্যান মালিক কাউমোভার কাছে। খুলে বললেন সব। বন্ধু বললেন,
ঃ এরকমও হয়! বৃদ্ধ তিনজন তো তাহলে, সবার ভালোই চেয়েছিল।
ঃ কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। এটা কাকতালীয়ও হতে পারে।
ঃ খোঁজ করব ঐ তিন বৃদ্ধের?
ঃ কোথায় পাবে ওদের? আর বলবই বা কি?
ঃ তারপরেও চলো যাই।

সেই চাইখানায় আবার গেলেন গেরাসিমোভ ও মালিক কাউমোভা।
ঃ আচ্ছা, দুদিন আগে এখানে তিনজন বৃদ্ধ এসেছিল না? (চাইখানার দোকানীকে প্রশ্ন করলেন মালিক কাউমোভা)।
ঃ ঃ হ্যাঁ, আমি দেখেছি, আপনাদের সাথে কথা বলছিল তিন বৃদ্ধ (উত্তর দিন দোকানী)।
ঃ আপনি তো স্থানীয়, ওদের হদিস একটু দিতে পারবেন কি?
ঃ না কমরেড, আমি নিজেই একটু অবাক হচ্ছিলাম। ওদেরকে আমি ঐদিনই প্রথম দেখি এবং ঐদিন শেষ।
একই সাথে হতাশ ও বিস্মিত হলেন গেরাসিমোভ ও মালিক।
ওদের কথাই যদি ঠিক হয়, তাহলে সব দোষ তো আমারই। না, এই মুখ আমি দেখাতে পারব না। আচ্ছা আমরা যেখানে হন্যে হয়ে খুঁজে অনেক কষ্টে সন্ধান পেলাম তৈমুরের আসল টোম্বটি, সেখানে ওরা এই সব কিছু জানলো কি করে বলতো?
ঃ দুপাতা বিজ্ঞান পড়ে আমরা সব জেনে গিয়েছি মনে করি। বিজ্ঞানের বাইরেও তো অনেক কিছু থাকতে পারে।
ঃ ঠিক, এমনও হতে পারে, বংশ পরম্পরায়ে এই সিক্রেট রক্ষা করছিল কেউ। অথবা কোন গ্রন্থে গ্রন্থিত আছে সব, যা সিলেক্টিভ লোকদেরই পড়া আছে।
ঃ কি যেন লেখা ছিল ডালার ভিতরের ফলকটিতে?
ঃ “Who ever opens my tomb, shall unleash an invader more terrible than I.
ঃ পৃথিবী কি তাহলে নতুন টেররের পদভারে কাঁপছে?
ঃ এডলফ হিটলার। বিংশ শতাব্দির ত্রাস! তার ক্ষমতাশীন হওয়ার সাথে সাথেই অশনী সংকেত শুনতে পাচ্ছিল পৃথিবী। চুল ছিড়তে ইচ্ছে করছে। মনে হচ্ছে, আমার কারণেই ঘটল সব কিছু, তিন বৃদ্ধের অনুরোধ ও সাবধান বাণী, টোম্বের লেখা, কফিনের ভিতর ফলকের লেখা, কিছুই আমি গ্রাহ্য করলাম না।

ঃ থাক মন খারাপ করোনা। এখন পাপের প্রায়শ্চিত কর।
ঃ কি করে?
ঃ তৈমুরের দেহ তার টোম্বে ফিরিয়ে দাও। পুণরায় সমাহিত কর।
ঃ আর ওঁর মুখচ্ছবি? স্তালিন নিজে আমাকে পাঠালেন!
ঃ স্তালিনকে ফোন কর। পুরো ব্যপারটা খুলে বল। আশাকরি বুঝতে পারবে।
ঃ আরেক টেরর। কি জানি শোনে কিনা আমার কথা।

রাতের বেলায় গেরাসিমোভ ফোন করলেন স্তালিনকে। সব কিছু শুনে কি প্রতিক্রিয়া হলো তার বোঝা গেল না। শুধু বললেন, “আপনি মুখচ্ছবিটি তৈরী করুন” ।

একমনে কাজ করে গেলেন গেরাসিমোভ। এদিকে রাশিয়ার অভ্যন্তরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন ভয়াবহ রূপ ধারন করেছে। বিংশ শতকের ত্রাস হিটলার বাহিনীর কাছে একের পর এক ব্যাটেলে পরাজিত হচ্ছে সোভিয়েত বাহিনী। এদিকে মনের মধ্য থেকে খুতখুতানি কিছুতেই দূর করতে পারছেন না গেরাসিমোভ। সারাক্ষণ কেবল মনে হয়, এই শোচনীয়তার জন্য দায়ী কবর থেকে উথ্থিত তৈমুরের দেহ আর তিনি। কাজের গতি বাড়িয়ে দিলেন তিনি। অবশেষে তৈরী হলো তৈমুরের মুখচ্ছবি বিশ্ববাসী প্রথমবারের মতো দেখলো লৌহমানব (চাঘতাই ভাষায় তৈমুর শব্দের অর্থ লৌহ) তৈমুরের কঠোর মুখচ্ছবি। যুদ্ধ দিনদিন ভয়াবহ রূপ ধারন করতে শুরু করল, এক পর্যায়ে মালিক কাউমোভা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ঝুকোভ-এর সাথে সাক্ষাৎ করে, তাকে সব কিছু খুলে বললেন। তিনি ঝুকোভকে বোঝাতে সমর্থ হলেন যে তৈমুরের দেহ কবরে ফিরিয়ে দেয়া উচিৎ। অবশেষে তাই করা হলো। ১৯৪২ সালের ২০শে নভেম্বরে পূর্ণ মর্যাদায় ইসলামী রীতি অনুযায়ী তৈমুরের মৃতদেহ পুণরায় দাফন করা হয় গুর-ই-আমীর সমাধীতে (Gur-e-Amir Mausoleum)। ঠিক তার পরপরই স্তালিনগ্রাদ যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে এলো প্রথম আনন্দ সংবাদ – অপারেশন ইউরেনাস-এ হিটলার বাহিনীকে পরাস্ত করেছে সোভিয়েত বাহিনী। এটিই ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের টার্নিং পয়েন্ট।
যিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন, তার ঘুম ভাঙাতে হয়না।

চঞ্চলা হাওয়ারে,
ধীরে ধীরে চলরে
গুন গুন গুঞ্জনে ঘুম দিয়ে যারে
পরদেশী মেঘ রে, আর কোথা যাসনে
বন্ধু ঘুমিয়ে আছে,
দে ছায়া তারে,
বন্ধু ঘুমায় রে

লিস্টনিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ ১০

লিস্টনিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ ১০ (ক)
তৈমুর লং-এর মরদেহ উত্তোলনের শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনীটি এক নিশ্বাসে শুনলো সবাই।
ঃ অবিশ্বাস্য (বলল ইমতিয়াজ)
ঃ গায়ে কাটা দিয়ে উঠেছে (বলল মোস্তাহিদ)
ঃ আমার একটা প্রশ্ন আছে (বলল আমীন)
ঃ কি প্রশ্ন বল (বলল রোমান)
ঃ ওটা যে তৈমুর লং-এরই মরদেহ ছিল, তার প্রমান কি।
ঃ আরে রোমান তো বললই অনেক খোঁজাখুজি করে, অনেক বই-পত্র পড়ে তারপর খুঁজে বের করেছে ঐ সমাধীটি। (বলল মোস্তাহিদ)
ঃ না, আমার খটকা দূর হচ্ছে না, ওটা অন্য কারো মরদেহও হতে পারে।
ঃ প্রশ্নটা সঙ্গতই। (বলল রোমান) মিশনের বিজ্ঞানীদের মনেও প্রশ্নটা এসেছিল। তাই তারা শেষ ভেরিফিকেশনটাও করেছিলেন।
ঃ কি সেটা?
ঃ ঐ যে তৈমুর লং-এর নামের মধ্যেই আছে, তিনি ল্যংড়া ছিলেন। যে মরদেহটি তারা পেয়েছিলেন সেটাতো মুলত একটি কঙ্কাল ছিল, তার পায়ের দিকে বিজ্ঞানীরা ভালো করে তাকালেন, সেখানে স্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন ছিল। এভাবে বিজ্ঞানীরা পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, এটা তৈমুর লং-এরই কঙ্কাল।

ঃ এত লোক হত্যা করেছে! টেরর ছিল, ভয়াবহ টেরর!
ঃ আশ্চর্য্য যে তার মরদেহ উত্তোলনের সাথে সাথে আরেক টেররের পদভারে প্রকম্পিত হলো সারা বিশ্ব। (বলল মোস্তাহিদ)
ঃ এডলফ হিটলার। জার্মান রাষ্ট্রনায়ক। (বলল আমীন)
ঃ ভালো ছিল, না মন্দ ছিল? (প্রশ্ন করল ইমতিয়াজ)
ঃ ভালোই ছিল, ভালোই ছিল সবাই সাপোর্ট করে। (বলল মোস্তাহিদ)
ঃ এই কোন অর্থে ভালো ছিল রে? (প্রশ্ন করল আমীন)
ঃ সব অর্থেই। নিজের জাতি, মানে জার্মান জাতিকে ভালোবাসত। (বলল মোস্তাহিদ)
ঃ এই এতো এতো মানুষ মারল, তার কি হবে? (বলল আমীন)
ঃ মনের আনন্দে তো আর করেনি। বাধ্য হয়ে করেছে। (বলল ইমতিয়াজ)
ঃ কে বাধ্য করল? মানুষ মারতে আবার কেউ বাধ্য করে নাকি? (আবারও প্রশ্ন করল আমীন)
ঃ আরে বাবা, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানদের যেভাবে অপমান করাছিল ফ্রেন্চরা। আর যুদ্ধের পর কি পরিমান বোঝা আর অবমাননা চাপিয়ে দিয়েছিল জার্মানদের ঘাড়ে। মনে পড়ে ইতিহাসের শিক্ষক মাজহার স্যার পড়িয়েছিলেন? এত অপমান সহ্য করা যায়? এর ফলে জার্মানরা তো রীতিমতো অস্তিত্বহীন হয়ে যাচ্ছিল।
ঃ নিজের জাতিকে রক্ষা করতেই হয়তো, হিটলার এই পথ ধরেছিলেন। আমারতো মনে হয় ভালো লোকই ছিল। (বলল ইমতিয়াজ)
ঃ না, যে এতো মানুষ মারে, সে ভালো লোক না। আর তা ছাড়া বই-পত্রে তো লেখাই আছে হিটলার খারাপ লোক ছিল। কি বলিস রোমান? (বলল আমীন)

ঃ বলা মুশকিল। (চিন্তিত মুখে বলল রোমান)। ইতিহাস হলো বিজয়ীদের সম্পদ।
ঃ এর মানে কি? (বলল মোস্তাহিদ)
ঃ মানে ইতিহাস বিজয়ীরাই লেখে। তাই তারা তাদের মত করেই লেখে। বিজয়ীদের সেখানে ভালো মানুষ মহৎ মানুষ হিসাবে লেখা হয়। আর পরাজিতদের সেখানে খারাপ মানুষ হিসাবে দেখানো হয়। ইতিহাসে রাম হিরো রাবণ ভিলেন।
ঃ হ্যাঁ, বাংলার শিক্ষক শফিক রায়হান স্যার বলেছিলেন। রাবণকে রামায়ণে রাক্ষস হিসাবে দেখানো হয়েছে, আসলে তিনি রাক্ষস ছিলেন না, তার ছিল নান্দনিক চেতনাবোধ। কেবলমাত্র মানুষেরই থাকে নান্দনিক চেতনাবোধ। (বলল আমীন)
ঃ নান্দনিক চেতনাবোধ কিরে? (প্রশ্ন করল ইমতিয়াজ)
ঃ ও, ভারী শব্দ। আমরাও জানতাম না। শফিক রায়হান স্যার শিখিয়েছেন। (বলল রোমান)। ইংরেজীতে একে বলে Aesthetic Sense মানে সৌন্দর্য্যবোধ।
ঃ তুখোড় শিক্ষক এই শফিক রায়হান স্যার। উনার লেখা বই খুব ভালো মানের। (বলল আমীন)
ঃ তোদের কলেজের শিক্ষক? বই লিখেছেন নাকি? কই নাম শুনিনাই তো কখনো। (বলল ইমতিয়াজ)
ঃ নাম শোনার কথা নয় দোস্ত। লেখক থাকে দুই ধরনের জনপ্রিয় লেখক এবং উচ্চমার্গের লেখক। হুমায়ুন আহমেদের নাম তো শুনেছিস?
ঃ তা শুনব না? এত জনপ্রিয়! উনার লেখা অনেক বই পড়েছি। ইদানিং বিটিভিতে একটা ধারাবাহিক নাটক হচ্ছে হুমায়ুন আহমেদের ।
ঃ হাঃ হাঃ হাঃ ‘বহুব্রীহি’, ভালো জমিয়েছে। প্রতি অলটারনেট মঙ্গলবারে হয়, মিস করিনা। শুধু আমিনা, সারা বাংলাদেশেই ঐ এক ঘন্টা টিভি সেটের সামনে। (বলল আমীন)
ঃ হুমায়ুন আহমেদ জনপ্রিয় লেখক, আর শফিক রায়হান স্যার উচ্চ মার্গের লেখক।
ঃ ও আচ্ছা।

ঃ হিটলারের প্রসঙ্গ থেকে তো সরে আসলাম। কি যেন কথা হচ্ছিল হিটলার প্রসঙ্গে? (প্রশ্ন করল মোস্তাহিদ)
ঃ ঐ যে তুই বলছিলি হিটলার ভালো ছিল, আর আমি বলছিলাম খারাপ ছিল। (বলল আমীন)
ঃ আলবত ভালো ছিল। বদমাস ইহুদীগুলোকে কেমন পিটানো পিটিয়েছে দেখেছিস? ব্যাটাদের একটা শিক্ষা হয়েছে।
ঃ আচ্ছা, জার্মানদের গোলমাল ছিল ফ্রেন্চ, বৃটিশ এদের সাথে, হিটলার হঠাৎ ইহুদী পিটানো শুরু করল কেন? (প্রশ্ন করল ইমতিয়াজ)
ঃ রোমান কিছু বল। আমাদের ইতিহাসবিদ (ঠাট্টা করে মুচকি হাসলো মোস্তাহিদ)।
অন্য কেউ হলে ক্ষেপে যেত। কিন্তু রোমান জানে মোস্তাহিদ ওকে খুব ভালোবাসে। কলেজে যেকোন সমস্যায় যারা রোমানের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে মোস্তাহিদ তাদের একজন।

বলতে শুরু করল রোমান।
ঃ বিষয়টা আমার কাছেও ঘোলাটে। জার্মানীর সংঘাত যেখানে ফ্রান্স বা ইংল্যান্ডের সাথে, সেখানে ইহুদীদের উপর হঠাৎ ক্ষেপে গেল কেন হিটলার? তবে আমি আব্বার কাছ থেকে নিয়ে একটা বই পড়েছি। হিটলারের নিজের লেখা।
ঃ কি নাম বইটির?
ঃ মাইন কাম্প্ফ (Mein Kampf)।
ঃ জার্মান নাম মনে হচ্ছে, অর্থ কি?
ঃ My Struggle – আমার সংগ্রাম।
ঃ হিটলার নিজে লিখেছে?
ঃ হ্যাঁ।
ঃ বাংলায় অনুবাদ আছে?
ঃ না, আমি ইংরেজীতে পড়েছি। খুব কষ্ট হয়েছে। আব্বা বুঝতে হেল্প করেছে।
ঃ কি আছে ঐ বইতে?
ঃ অনেক কিছুই। হিটলার আত্মপক্ষ সমর্থন করে অনেক কিছু লিখেছে। আবার নিজের লাইফ হিস্ট্রিও কিছু লিখেছে।
ঃ ইন্টারেস্টিং, হিটলারের লেখা বই আছে জানতাম না। তাকে তো শুধু যুদ্ধবাজই মনে হয়েছে। (বলল আমীন)
ঃ সেখানে ইহুদী প্রসঙ্গ এসেছে?
ঃ হ্যাঁ, এসেছে। সেটাই বলতে চাচ্ছিলাম।
ঃ বল তাহলে। সবাই মনযোগ দিয়ে শুনি।
আবার শুরু করল রোমান।
বই লেখায় হিটলারের তেমন কোন আগ্রহ ছিলনা। তারপরেও তিনি বইটি লেখেন কয়েকটি কারণে। এ প্রসঙ্গে তিনি তার বইয়ে লিখেছেন
১ এপ্রিল ১৯২৪, মিউনিখ গণআদালতের বিচারে লেখ্ নদীর তীরবর্তী ল্যাণ্ডস্বার্গের দুর্গে আমার কারাজীবন শুরু হয়।…গত কয়েক বছরের অমানুষিক পরিশ্রমের পর, আমার ভাগ্যে একটি কাজ করার মত সময় এই প্রথম আসে। অনেক আগেই অনেকে আমাকে এই অনুরোধটি করেছে। আমি নিজেও ভেবেছি যে, আমাদের সংগ্রামের পক্ষে এর মূল্য অনেকখানি। সুতরাং এগুলো ভেবেই আমি বইটি লিখতে শুরু করি।…

…আমি জানি মুখের কথায় যত মানুষকে কাজ করানো যায়, লেখার মাধ্যমে তা’সম্ভব নয়। পৃথিবীতে সংঘটিত প্রতিটি সৎ এবং মহৎ সংগ্রাম জন্ম নিয়েছে মহৎ কোন বক্তার বক্তৃতা থেকে, কোন বড় লেখকের লেখা থেকে নয়। যাই হোক, মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের দৃঢ় হাতিয়ার হিসেবে লেখারও প্রয়োজন আছে।…
বইটির বিভিন্ন জায়গায় ছাড়া ছাড়া ভাবে ইহুদী প্রসঙ্গ এসেছে। যা যা তিনি লিখেছেন তার কিয়দংশ আমি তুলে ধরছি
হিটলার নিজেকে আর্য মনে করতেন। তার বইয়ের বিভিন্ন যায়গায় তিনি আর্যদেরকে পৃথিবীর সেরা জাতি হিসাবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে আর্যরা সৎ ও নিষ্ঠাবান। আর ইহুদীদের সম্পর্কে বলছেন।
ইহুদীরা জাতি হিসাবে আর্যদের সম্পুর্ণ বিপরীত। সারা পৃথিবীতে আর এমন একটি জাতিও নেই যাদের মধ্যে আত্মসংরক্ষণের প্রবৃত্তিটি এত প্রবল। যারা মনে করে তারা ইশ্বর প্রেরিত জাতি। পৃথিবীতে এমন কোন জাতি আছে হাজার বছরের মধ্যেও যে জাতির চরিত্র ও দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে কোন পরিবর্তন হয়নি। আর কোন জাতি সর্বাত্মকভাবে বিপ্লবে অংশগ্রহন করেছে? কিন্তু এত বিরাট পরিবর্তন সত্বেও ইহুদী জাতি যেখানে ছিল সেখানেই আছে। তাদের মনপ্রাণের কোন পরিবর্তন হয়নি। তাদের জাতিগত সংরক্ষণ ও বাঁচার প্রবৃত্তি এমনই দুর্মর।

ইহুদীদের বুদ্ধিগত কাঠামোটা হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে উঠেছে। আজকাল লোকে ইহুদীদের ধুর্ত বলে। অবশ্য একদিক দিয়ে ইহুদীরা বহু যুগ থেকে তাদের ধুর্তামীর পরিচয় দিয়ে আসছে। তাদের বুদ্ধিগত শক্তি ও চাতুর্যের কাঠামোটি তাদের কোন অন্তর্নিহিত বিবর্তনের ফল নয়, যুগে যুগে বাহিরের অভিজ্ঞতা ও ঘটনা থেকে যে বাস্তব শিক্ষা লাড করেছে, তার উপাদানেই গড়ে উঠেছে তার বুদ্ধিগত কাঠামোটি। মানুষের মন বা আত্মা পর পর ক্রমপর্যায়ের স্তরগুলো পার না হয়ে কখনো উপরে উঠতে পারেনা। উপরের যেকোন স্তরে উঠতে হলে আগে তার নিচের স্তরটি অতিক্রম করতে হবে। যে কোন সভ্যতার ক্ষেত্রে ব্যাপক অর্থে অতীতের একটি জ্ঞান আছে। মানুষের ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই তার সকল চিন্তা ভাবনার উদ্ভব হয়। যুগ যুগ ধরে সঞ্চিত পুন্জিভুত অভিজ্ঞতা থেকেই মানুষের অধিকতর চিন্তা ভাবনা গড়ে ওঠে। সভ্যতার সাধারণ স্তরের কাজ হলো মানুষকে এমন এক প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করা, যার উপর ভিত্তি করে সে সকলের সঙ্গে জাতীয় উন্নতির ও অগ্রগতির মান এগিয়ে নিয়ে চলতে পারে। যারা আজকের যুগের অগ্রগতিকে বুঝতে চায় ও সেই অগ্রগতিকে অব্যহত রাখতে চায়, তাদের কাছে এইসব জীবন জিজ্ঞাসা গুরুত্বপূর্ণ। গত শতাব্দির দ্বিতীয় দশকের কোন প্রতিভা সম্পন্ন মহাপুরুষ বা মণিষী সহসা তার কবর থেকে যদি উঠে আসেন, তিনি এ যুগের অগ্রগতির কথা কিছুই বুঝতে পারবেন না। অতীতের কোন প্রসিদ্ধ ব্যাক্তিকে এ যুগে এসে এ যুগের গতিপ্রকৃতি বুঝতে হলে তাকে অনেক প্রাথমিক জ্ঞান সঞ্চয় করতে হবে, যে জ্ঞান আজকের যুগের ছেলেরা আপনা থেকে খুব সহজভাবে পেয়ে যায়।

ইহুদী জাতির নিজস্ব কোন সভ্যতা ছিলনা। কেন ছিলনা তা আমি পরে বলব। যেসব সাংস্কৃতিক কৃতিত্ব বিভিন্ন দেশে চোখে দেখেছে বা হাতের কাছে পেয়েছে – সেইসব কৃতিত্বের দ্বারাই তারা তাদের এ বুদ্ধিবৃত্তিকে উন্নত করেছে। এর উল্টো ঘটনা কখনো দেখা যায়নি।

যদিও ইহুদীদের আত্মোন্নতির প্রকৃতি অন্যান্য জাতি থেকে আরো বেশী প্রবল এবং তাদের বুদ্ধিবৃত্তি অন্যান্য জাতির থেকে কিছুমাত্র কম নয়, তথাপি একটা দিক দিয়ে বড় রকমের একটা অভাব দ্বেখা যায় তাদের জাতীয় চরিত্রে। সাংস্কৃতিক উন্নতির জন্য যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশী দরকার সেই আদর্শবোধ তাদের একেবারেই নেই। ইহুদীদের মধ্যে দেখা যায় তাদের আত্মত্যাগের প্রবৃত্তিটা আত্মসংরক্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ব্যাক্তিগত স্বার্থপরতার উর্ধ্বে তারা উঠতে পারেনা কখনো। তাদের মধ্যে যে জাতীয় সংহতি দেখা যায় তা আদিম সঙ্গপ্রবনতা ছাড়া আর কিছু নয়। এটা উল্লেখযোগ্য যে যতদিন কোন বিপর্যয় তাদের জাতীয় অস্তিত্বকে বিপন্ন করে দেবার ভয় দেখায়, ততদিনই তারা পারস্পরিক নিরাপত্তার জন্য ঐক্যবদ্ধ ও সংহত থাকে। এই জাতীয় বিপর্যয়ই তাদের পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাবকে অপরিহার্য্য করে তোলে। একদল নেকড়ে যেমন একযোগে তাদের শিকারের বস্তুকে আক্রমন করার পর তাদের ক্ষুধা মিটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দল থেকে পৃথক হয়ে পড়ে, ইহুদীরাও ঠিক তাই করে।

ইহুদীরা ছাড়া যদি পৃথিবীতে অন্য কোন জাতি না থাকত তাহলে তারা নিজেরা মারামারি করে একে অন্যকে ধ্বংস করে ফেলতো।

ইহুদীরা সব সময় পরের রাজ্যে বসবাস করেছে, এবং আশেপাশের আরো কিছু রাজ্য দখল করে নিয়েছে। কিন্তু এইসব রাজ্যগুলোর মধ্যে তারা ধর্ম সম্প্রদায়ের মুখোস পরিয়ে তাদের একটা নিজস্ব রাষ্ট্র গড়ে তুলতো। যখন তারা উপযুক্ত প্রতিষ্ঠা লাড করে, তখন তারা সে মুখোস খুলে ফেলে আপন স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করত, তাদের এই রূপ দেখতে কেউ চায়নি।

যে জীবন ইহুদীরা যাপন করত, সে জীবন হলো পরগাছার জীবন। এইজন্য এক বিরাট মিথ্যার উপর গড়ে উঠেছিল ইহুদীদের জীবন। দার্শনিক শোপেন হাওয়ারের মতে ইহুদীরা বিরাট মিথ্যাবাদি।
লিস্টনিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ ১০ (খ)

ঃ তাহলে কি তুই বলতে চাস যে, সব ইহুদীই বিরাট মিথ্যাবাদি, ওরা সবাইই খারাপ? (অনেকটাই ক্ষুদ্ধ হয়ে প্রশ্ন করল আমীন)
ঃ আমি আবার কখন কি বললাম? (অধিকতর বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করল রোমান)
ঃ ঐ যে হিটলারের বইয়ের অংশ পড়ে শোনালি।
ঃ সেটাই তো বলছি। আমার কথা নয়, হিটলারের কথা।
ঃ আহা রোমান তো ইহুদীদের সম্পর্কে কোন মন্তব্য করেনি। ও হিটলারের বইয়ে কি লেখা আছে তাই বলছিল। (বলল মোস্তাহিদ)
ঃ ওর মনোভাব একই রকম কিনা সেটা জানতে চাচ্ছিলাম। (বলল আমীন)
ঃ আমার আবার কি মনোভাব হবে? আমি তো এই জীবনে কোন ইহুদী দেখিই নাই। ওদের সম্পর্কে জানতে হলে আমাকে বইয়ের আশ্রয় নেয়া ছাড়া আর কোন পথ নেই। (বলল রোমান)
ঃ বইতো নানা লোকে নানা রকম লেখে।
ঃ তাতো লেখেই। মানুষে মানুষে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য আছে, আবার অভিজ্ঞতারও পার্থক্য থাকে তাই লেখাও ভিন্নরকম হবে এটাই স্বাভাবিক।
ঃ চুপ করে থাকার চাইতে লেখা ভালো। (বলল ইমতিয়াজ) তাহলে সে তার অভিজ্ঞতাটা আর দশজনের সাথে শেয়ার করতে পারে। আমরাও অজানাটা জানলাম। এভাবে জাজ করা আরো সুবিধাজনক হয়।
ঃ আচ্ছা এই যে আমরা ইহুদীদের একতরফা দোষারোপ করে যাচ্ছি সেটা কেমন? তাদেরও তো নিজস্ব কিছু মতামত থাকতে পারে। (বলল আমীন)
ঃ থাকতেই পারে। একবার শুনেছিলাম সেরকম কিছু মন্তব্য, (বলল রোমান)
ঃ কোথায় শুনেছিলি? কি সেই মন্তব্য?
ঃ রেডিও বাংলাদেশের একটি নাটকে।৮২-৮৩ সালের দিকে শোনা । প্যালেস্টাইনে ইস্রাইলীরা বোম্বিং করলে সেখান থেকে প্রাণভয়ে প্যালেস্টাইনি পরিবারগুলো পালিয়ে যায়। এই সময়ে একজন প্যালেস্টাইনি শিশু হারিয়ে যায়। তার বাবা-মা অনেক খুঁজেও আর শিশুটির সন্ধান পায়নি। এদিকে সেই শিশুটিকে খুঁজে পেয়েছিল একটি ইহুদী পরিবার। তারা তাকে লালন-পালন করতে শুরু করে এবং প্যালেস্টাইনি পিতা-মাতার পুত্র একজন ইহুদী সন্তান হয়ে বড় হয়ে উঠতে শুরু করে। একসময় যুবকটি প্রাপ্ত বয়স্ক হয় ও যথানিয়মে ইস্রাইলী সৈন্যবাহিনীতে যোগ দেয়। সে নিজেকে একজন ইস্রাইলী ইহুদি বলেই জানে এবং তার পালক ইহুদী পিতা-মাতার মতই দৃষ্টিভঙ্গী ধারন করতে থাকে। হঠাৎ বিপত্তি ঘটে গেল। তার প্যালেস্টাইনি পিতা-মাতা কোন এক সোর্স থেকে জানতে পারল যে, তাদের পুত্র জীবিত আছে এবং সে এখন একজন ইস্রাইলী সৈন্য। তার তাদের পুত্রকে দেখতে চাওয়ার অনুমতি চাইলে সেই অনুমতি দেয়া হয়। ছেলেটির পিতামাতা তেলআবিবে তাদের পুত্রের সাথে দেখা করতে যান। সেই কথপোকথন ছিল অনবদ্য। এটাকে নরমাল কনভারসেশন না বলে তর্ক-বিতর্ক বলাই ভালো। সেখানে পুত্র নিয়েছিল ইস্রাইলীদের পক্ষ আর পিতা প্যালেস্টাইনিদের পক্ষ।
ঃ কি বলেছিল তারা?
ঃ সেটা আরেকদিন শোনা যাবে। আপাততঃ মেইন কাম্প্ফ-এর কথা শেষ করি। (বলল মোস্তাহিদ)। হ্যাঁ রোমান বলত, আর কি কি হিটলার লিখেছে ইহুদীদের সম্পর্কে?
ঃ শোন তাহলে।

যাতে অন্যের মধ্যে পরগাছা হয়ে থাকতে পারে সেইজন্য ইহুদীরা নিজেদের স্বরূপ প্রকাশ করত না। তারা জানতো ব্যাক্তিগতভাবে তারা যত বুদ্ধিমান হয়ে উঠবে ততোই তারা অপরকে ঠকাতে পারবে। তারা এতদূর মানুষকে প্রতারিত করতে সফল হতো যে তারা যে জাতির আশ্রয়ে থাকত তাদের এই ধারণা হতো যে তারা যে ইহুদীরা ফরাসী হতে পারে, আবার ইংরেজও হতে পারে। ওদের জাতিভেদ বলে কোন জিনিস নেই। ওদের সাথে তাদের একমাত্র অর্থ ছাড়া অন্য বিষয়ে কোন সার্থকতাই নেই। যে সমস্ত রাষ্ট্রের প্রশাসন যন্ত্রে কার্যরত লোকদের কোন ঐতিহাসিক কাল নেই, ইহুদীরা হলো সেই জাতের। ব্যাভেরিয়া সরকারের অনেক কর্মচারী জানেনা যে ইহূদীরা এক স্বতন্ত্র জাতি, তারা শুধু এক বিশেষ ধর্মমতের প্রতিনিধি মাত্র। কিন্তু ইহুদীদের পত্র-পত্রিকাগুলি একথা মানতেই চায়না। বহু প্রাচীন কালে ইহুদীরা সারা পৃথিবী পরিভ্রমণ করতে গিয়ে এমন সব উপায়ের আবিষ্কার করে যার দ্বারা তারা যেখানে থাকে সেখানকার মানুষের কাছ থেকে সহানুভূতিটুকু লাভ করে।

কিন্ত ধৈর্যের ক্ষেত্রেও ইহুদীরা পরের অনুকরন করেছে। তাদের ধর্ম ও সাংস্কৃতিক সকল ক্ষেত্র জুড়ে প্রসারিত হয়। ইহুদীদের চেতনা ও অনুভুতি হতে স্বতস্ফুর্তভাবে উড্ভুত কোন ধর্মবিশ্বাস গড়ে ওঠেনি। এই পার্থিব জীবন ও জগতের বাইরে এক মহাজীবনের প্রতি বিশ্বাস ছাড়া কোন ধর্মমতের বন্দনা সম্ভব নয়। ইহুদীদের ধর্মশাস্ত্রে এই মৃত্যুত্তীর্ণ মহাজীবনের কোন কথা লেখা নেই। তাতে শুধু এই পার্থিব জীবন যাপনের জন্য কতগুলি আচরণবিধি লেখা আছে।

ঃ বলিস কি ওদের ধর্মে পরকাল সম্পর্কে কোন কিছু লেখা নাই নাকি?
ঃ আমি বলতে পারব না। ওদের ধর্মগ্রন্থ পড়া নাই।
ঃ কি নাম ওদের ধর্মগ্রন্থের?
ঃ সঠিক জানিনা, তাওরাত হতে পারে।
ঃ কিনে পড়তে হবে। বইয়ের খনি নীলক্ষেতে পাওয়া যাবেনা?
ঃ খোঁজ নিয়েছিলাম, বাংলাদেশে নাই।
ঃ পৃথিবীর সেরা সেরা গ্রন্থগুলোর তো বাংলায় অনুবাদ থাকা উচিৎ।
ঃ এ উদ্দেশ্যেই, শেরে বাংলা এ, কে, ফজলুল হক বাংলা এ্যাকাডেমী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। একসময় কাজ অনেক হয়েছিলোও। কিন্তু বাংলা এ্যাকাডেমী এখন তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারছে না।
ঃ প্রাইভেট সেক্টরে করা যেতে পারে।
ঃ উহু, তা হবার নয়। সব কিছু প্রাইভেট সেক্টরে করা যায়না।
ঃ এরশাদ যে বলে।
ঃ চাচায় অনেক কিছুই বলে। নীতি নৈতিকতা বিবর্জিত এই ব্যক্তিটির কটা কথার মূল্য দেয়া যায়?
ঃ কেন এই যে বলে, প্রাইভেটাইজেশন হলে ভালো হবে এটা কি ঠিক না।
ঃ এটা ক্ষেত্র বিশেষের উপর নির্ভরশীল। অনেক ক্ষেত্রে প্রাইভেট সেক্টরের চাইতে সরকারী উদ্যোগের প্রয়োজন অনেক বেশী। শিক্ষা ক্ষেত্র এমন একটি ক্ষেত্র।
ঃ তাহলে এরশাদ চাচা এত ব্যাক্তি মালিকানা, ব্যাক্তি মালিকানা করছে কেন?
ঃ তার উদ্দেশ্য অসৎ। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো নাম মাত্র মূল্যে, তুলে দেবে তার চামচাদের হাতে। ফলে তার পদলেহনকারী একটা চামচা গ্রুপ তৈরী হবে, ফলস্বরূপ তার ক্ষমতা মজবুত হবে এই আরকি।
ঃ আরেব্বাস! এক কার্যক্রমের পিছনে কত জটিল-কুটিল থাকে!
ঃ আচ্ছা, বাদ দে। প্রাইভেটাইজেশন আরেকদিন আলাপ করা যাবে। হিটলারের কথা শেষ কর। (বলল মোস্তাহিদ)
ঃ শোন তাহলে। হিটলার আরো লিখেছে (আবার বলা শুরু করল রোমান)

ইহুদীদের ধর্ম শিক্ষার মূল কথা হলো এমন কতগুলো নীতি উপদেশ যার দ্বারা তারা তাদের জাতিগত রক্তের শুচিতা অক্ষুন্ন রেখে জগতের অন্যান্য জাতিদের সাথে মিশতে পারে। ইহুদী অ-উহুদীদের সাথে কিভাবে মেলামেশা করবে তার কথা সব বলা আছে। কিন্তু ইহুদীদের ধর্ম শিক্ষার মধ্যে কোন নীতিকথা নাই, আছে শুধু অর্থনীতির কথা। এই কারণে ইহুদীদের ধর্ম আর্যদের ধর্মের সম্পুর্ণ বিপরীত। এই কারণেই খ্রীষ্টধর্মের প্রবর্তক ইহুদী জাতি সম্পর্কে যথাযথ মূল্যায়ন করে এবং সমস্ত মানব জাতির শত্রু এই জাতিকে ইশ্বরের স্বর্গরাজ্য হতে বিতারিত করে। তার কারণ ইহুদীরা সবসময় ধর্মকে ব্যবসা ও কাজকারবারের কাজে নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করত। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে ইহুদী জাতির লোকেরা খৃষ্টকে ক্রুশবিদ্ধ করে, সেই খ্রীষ্টানরা পর্যন্ত ইহুদী জাতির লোকদের কাছে নির্বাচনের সময় ভোট ভিক্ষা করে। এমন কি নাস্তিক ইহুদী জাতির সঙ্গে রাষ্ট্রনৈতিক চুক্তি সম্পাদন করে সমগ্র খ্রীষ্টান জাতির বিশুদ্ধকরণ করে থাকে।

ইহুদীদের এই ধর্মগত ভন্ডামীর ওপর আরো অনেক মিথ্যা পরবর্তিকালে জমা হতে থাকে। এইসব মিথ্যার অন্যতম হলো ইহুদীদের ভাষা। ইহুদীদের কাছে ভাষা মানুষের মনের গভীর ভাব ও চিন্তা-চেতনার প্রকাশের মাধ্যম নয়। বরং ভাব ও ভাবনা ঢেকে রাখার উপায়মাত্র। ইহুদীরা যতদিন অন্য কোন জাতিকে জয় করতে না পারে, ততোদিন তাদের দেশে গিয়ে তাদের ভাষা রপ্ত করে।

ইহুদীজাতির সমগ্র অস্তিত্বটি যে মিথ্যায় ভরা তার প্রমাণ হলো ইহুদীদের ধর্মশাস্ত্র। কোন্ ধ্যানতন্ময়তা থেকে এই শাস্ত্রের উদ্ভব তা কেউ জানেনা। তবে এর থেকে ইহুদীদের ভাবধারা ও জাতীয় চরিত্রের অনেক বৈশিষ্টের কথা জানা যায়। তার সঙ্গে যে লক্ষ্যের দিকে তাদের সকল জাতীয় কর্মধারা প্রবাহিত হচ্ছে তাও জানা যায়। এমন কি তাদের সংবাদপত্রগুলোও এই শাস্ত্রের কোন মহত্ব স্বীকার করতে চায়না। যে মুহুর্তে বিশ্বের মানুষ এই শাস্ত্র হাতে পাবে তাতে কি আছে তা সব জানতে পারবে, সেই মুহুর্তে ইহুদী জাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এই পৃথিবী থেকে।

ঃ দোস্ত তোর কথাগুলো আমার কাছে ভালো লাগছে না। তুই কি এই বলতে চাস যে সব ইহুদী খারাপ।
ঃ আরে জ্বালা। আবারও একই সমস্যা। আমার কথা কোথায়? আমি তো হিটলারের কথা পড়ে শোনাচ্ছি। (বলল রোমান)
ঃ তুই যেরকম আগ্রহ নিয়ে পড়ে শোনাচ্ছিস, আমার মনে হয় তুইও একই মত পোষণ করিস।
ঃ এটা কেমন কথা হলো? ইহুদীদের সম্মন্ধে মত পোষণ করার মত অবস্থানেই তো আমি নেই।
ঃ না থাকার কি আছে!
ঃ আরে আমার এই জীবনে আমি কস্মিনকালেও কোন ইহুদীর সাথে সাক্ষাৎ তো দূরের কথা, চোখেও দেখিনি। তাহলে তাদের সম্পর্কে মত পোষণ করন কি করে বল?
ঃ না দেখলেও মত পোষণ করা যায়। বই-পত্র পড়ে।
ঃ হ্যাঁ, তা করা যেতে পারে। তবে ঐ একই ব্যাপার, এক্ষেত্রে অন্যের মতামতের উপর ভর করতে হয়। তবে মতামতের পার্থক্যও লক্ষ্য করা যায়।
ঃ মতের পার্থক্য হয় কেন?
ঃ এক একজন একেক দৃষ্টিভঙ্গী দি্যে দেখে। তাছাড়া সময় ও অভিজ্ঞতার পার্থক্যও থাকে।
ঃ আচ্ছা তুই আমার প্রশ্নের জবাব দে, সব ইহুদীই কি খারাপ?
ঃ তোকে তাহলে অন্যভাবে বলি, আমরা প্রায়ই কথাবার্তায় পাকিস্তানীদের শাপ-শাপান্ত করি। মূল কারণ একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধ। আবার ভারতীয়দের প্রতিও ঘৃণা বর্ষণ করি, কারণ – ফারাক্কা সহ বিভিন্ন নদীতে বাধ দিয়ে বাংলাদেশকে কারবালা বানানো, বর্ডার কিলিং, দাদাগিরী ইত্যাদি। তাহলে এখন কি একই প্রশ্ন জাগেনা, যে সব পাকিস্তানী বা সব ভারতীয়ই কি খারাপ?
ঃ হু কঠিন প্রশ্ন। পাকিস্তানীরা যুদ্ধের সময় ব্যপক নির্যাতন চালিয়েছে। নিরীহ-নিরাপরাধ মানুষদের হত্যা করেছে। ভারতীয়রা আমাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে কম করছে না। তাই বলে সব পাকিস্তানী তো আর এটা করেনি। অনেকের হয়তো এর সাথে কোন সম্পর্কই নেই। অনুরূপভাবে বাংলাদেশকে কারবালা বানানোর জন্য ভারতীয়দেরও সকলকে দায়ী করা যায়না।
ঃ এই মাত্র ভূমিষ্ঠ হলো যেই ইহুদী শিশুটি, অথবা একজন উদার মনের ইহুদী যিনি কোন প্রকার অপরাধের সাথেই জড়িত নন, তাকে কি খারাপ বলা যা্য?
ঃ ঠিকআছে রোমান তাহলে কি বলব? পাকিস্তানীরা ১৯৭১-এ বাংলাদেশ আক্রমণ করেছিল, না বলব পাকিস্তানীদের একটি অংশ ১৯৭১-এ বাংলাদেশ আক্রমণ করেছিল। অথবা ভারতীয়দের একটি অংশ বাংলাদেশকে কারবালা বানিয়েছে, সীমান্তে নিরাপরাধ মানুষ হত্যা করছে।
কিন্তু আমরা তো এভাবে বলিনা, আর বই-পত্রেও এভাবে লেখেনা।
ঃ আসলে যখন আমরা বলি পাকিস্তানী, ভারতীয় বা ইহুদী, তখন আমরা ওদের কম্যুনিটি বা জাতি সম্পর্কে এ্যজ এ হোল বলি।
ঃ তাহলে এ্যজ এ হোল ইহুদীদের সম্পর্কে কি বলব? ভালো না খারাপ?
ঃ যেভাবে নিরীহ ফিলিস্তিনিদের হত্যা করছে, বই-পত্রে তাদের সম্পর্কে যা পড়ছি এসবের ভিত্তিতে তো খারাপই বলতে হয়।

ঃ এরপর হিটলার আরো বলেছেন
ইহুদীজাতিকে ভালোভাবে জানতে হলে, কয়েক শতাব্দী আগে থেকে তাদের গতিবিধির কথা জানতে হবে। তাদের এই গতিবিধির ইতিহাসটিকে কয়েকটা স্তর বা পর্যায়ে ভাগ করে দেখালে ভালো হয়। হিটলার ক থেকে জ পর্যন্ত আটটি পয়েন্টে ভাগ করে তা তার বইয়ে বর্ণনা করেছেন।
ঃ কি সেই স্তরগুলো?
ঃ ক্ষুধা লেগেছে। ঐ দেখ চটপটির দোকান। আগে চটপটি খাই তারপর বলছি।
সবাই এগি্যে গেল চটপটির দোকানের দিকে

লিস্টনিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ ১০ (গ)

ঃ চটপটি একটা মজার খাবার তাইনা? (বেশ মজা করে খেতে খেতে বলল মোস্তাহিদ)
ঃ মজার তো নিঃসন্দেহে। তাই তো সবাই হুমড়ি খেয়ে পরি। তোকে চটপটি নিয়ে একটা মজার ঘটনা বলি। (বললাম আমি)
ঃ বান্ধবিকে নিয়ে চটপটি খেতে এসেছিলি, তারপর কি হয়েছিল তাই বলবি তো। (হাসতে হাসতে বলল আমীন)
ঃ বান্ধবি কোথায় পাবো আবার?
ঃ কেন ঐ যে তোর একটা কাজিন আছে।
ঃ আমার কাজিন? (একটু চিন্তায় পড়ে গেলাম। লাবণীর কথা ওরা জানে নাকি? না, নাও হতে পারে। হয়তো ফল্স মারছে। আমার মুখ থেকে কথা বের করার জন্য। সাবধান থাকতে হবে যাতে মুখ ফসকে আবার ওদের কিছু বলে না ফেলি) না, না কোন কাজিন-ফাজিন নেই।
ঃ তাহলে টিউশানি করিস যেই মেয়েটির। ওকে নিয়ে এসেছিলি?
ঃ কি যে বলিস! ও তো ছোট।
ঃ কত ছোট? (মুচকি হেসে বলল ইমতিয়াজ)
ঃ ক্লাস সিক্সে পড়ে।
ঃ ও তাহলে তো অনেক ছোট (হতাশ কন্ঠ আমীনের)।
ঃ কিরে হতাশ হয়ে গেলি নাকি? (এবার মৃদু হেসে বললাম আমি)
ঃ টিউশানি তোর, আমাদের হতাশ হওয়ার কি আছে? তারপরেও একটু বড় দেখে চুজ করতে পারিস না? এই আমাদের বয়সের কাছাকাছি। তুই না হলেও, আমরা না হয় একটু লাইন মারতাম।
ঃ তুই এরকম একটা টিউশানি খুঁজে এনে আমাকে দে।
ঃ আমি পারলে কি আর তোকে বলতাম। শোন মজার ঘটনা – আমি একবার এক মেয়ের প্রেমে পড়েছিলাম। কি করা যায়, কি করা যায়? কাছাকাছি এক সো কল্ড ফকিরের সন্ধান পেলাম। তাকে গিয়ে বলতে সে সাথে সাথেই অনেক কিছু ডিমান্ড করে বসল। সাত ঘাটের পানি চাইল, একটা কালো কুচকুচে ছাগল চাইল, ছাগলটির ছদকা বাবদ আরো কিছু টাকা চাইল, পরিশেষে বলল যে, মেয়েটির মাথার চুল লাগবে। তারপর সে মেয়েটিকে এমনভাবে মোহগ্রস্ত করে ফেলবে যে, মেয়েটি রাতদিন শুধু আমার পিছনে ঘুরঘুর করবে। আমার মেজাজ তো সপ্তমে উঠে গেল, আমি মুখের উপর ভন্ডটাকে বলেই দিলুম, “ব্যাটা, মাইয়ার চুলই যদি আমি যোগার করতে পারতাম, তাইলে কি আর তোর সাথে কনট্রাক্ট করি নাকি?”
হোঃ, হোঃ, হোঃ সবাই কোরাসে হাসলাম।

ঃ রোমানের চটপটির মজার ঘটনাটা তো শোনা হলোনা। বল রোমান (বলল মোস্তাহিদ)।
ঃ কাহিনী অনেক আগের। আমাদের জন্মেরও আগের। মার কাছ থেকে শুনেছি। আমার বড় খালা থাকেন ঢাকার বাইরে। একবার ঢাকায় বেড়াতে এলেন। সবাই বলল, ঢাকাতে একটা মজার খাবার আছে এর নাম চটপটি। বড় খালা বললেন, তাই নাকি খাওয়া তাহলে খেয়ে দেখি”। উনাকে কোথাও নিয়ে চটপটি খাওয়ানো হলো। সবার জন্যে এক প্লেট করে অর্ডার দেয়া হয়েছিল। খাওয়ার পর বড় খালাকে প্রশ্ন করা হলো, “আপা কেমন লাগলো?” তিনি বললেন, “বুঝি নাই, আর এক প্লেট দে”। খাওয়ানো হলো আরো এক প্লেট। দুই প্লেট চটপটি খেয়ে তিনি বললেন, “কি বলিস তোরা চটপটি, চটপটি , কোথায় আমি তো কোন মজা পেলাম না।”
হাঃ, হাঃ, হাঃ, আর এক দফা কোরাসে হাসলাম সবাই ।

ঃ টিউশানি নিয়ে একটা মজার ঘটনা বলি শোন (বলল আমীন)
ঃ বল
ঃ গল্প না কিন্ত, ঘটনাটা সত্যি। রামপুরার ওদিকের একটি মেসে থাকত সজল নামের একটি ছেলে। ছেলেটি শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতায় ছিল একজন ডিপ্লোমা ইন্জিনীয়ার। পাশাপাশি টিউশানিও করত। তো ও মেসের কাছাকাছি একটা বাসায় একটি মেয়েকে পড়াত। মেয়েটি তখন ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রী। তো যা হয় আরকি। দুজনাই ইয়াং। ধীরে ধীরে একে অপরের প্রেমে পড়ে গেল। শেষ পর্যন্ত মেয়ে তার বাবাকে জানালো, এই ছেলে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করবে না। বাবা তো কিছুতেই রাজী হয়না। একে তো মেয়ের বয়স কম। তার উপর ছেলেকে তার পছন্দ হয়নাই। ছেলে পুরো ইন্জিনীয়ার না, সাধারণ ডিপ্লোমা ইন্জিনীয়ার। তার উপর ছেলের লম্বা লম্বা চুল, জীনস্-এর প্যান্ট পড়ে। চোর-ছ্যাঁচড়ের মতো লাগে। সজল তার মেসের মুরুব্বীদের ধরল। “আপনারা একটু আমার পক্ষ থেকে প্রস্তাব নিয়ে যান, একটু বুঝিয়ে বলুন উনাকে।” যাহোক মেসের মুরুব্বীরা সদয় হয়ে মেয়ের বাবার কাছে গেলেন প্রস্তাব নিয়ে। মেয়ের বাবা বলে ছেলের লম্বা লম্বা চুল, চোর-ছ্যাঁচড়ের মতো লাগে। মেসের মুরুব্বীরা বুঝালেন, “না না ছেলে ভদ্র, কোন প্রকার চুরি ছ্যাচড়ামির মধ্যে নাই। লম্বা চুল, জীন্সের প্যান্ট এগুলো জাস্ট ইয়াং ছেলেদের ফ্যাশন আর কি। ও বিয়ের পর ঠিক হয়ে যাবে।” শেষ পর্যন্ত রাজী হতে বাধ্য হলেন মেয়ের বাবা। কথাবার্তা মোটামুটি ঠিক। বর-কনে দুজনাই খুশী। এবার কেবল অপেক্ষা বিয়ের। এদিকে এক জুম্মাবারে, জুম্মার নামাজে গিয়েছেন মেয়ের বাবা। কাছাকাছি থাকার কারণে ঐ একই মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়েছে ভাবী জামাতা। নামাজের শেষে বাইরে বেরিয়ে এসে ভাবী জামাতা দেখল তার স্যান্ডেল জায়গা মত নেই। এদিক-সেদিক খোঁজ করেও যখন স্যান্ডেলের খোঁজ পাওয়া গেলনা তখন সে নিশ্চিত হলো যে, তার স্যান্ডেল চুরি হয়ে গিয়েছে। মেজাজ খিচড়ে গেল তার। ভাবল আমার স্যান্ডেল যেমন চুরি হয়েছে, আমিও তেমনি আরেক জনার স্যান্ডেল নিয়ে যাব ব্যাস সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। পাশেই একটি ঝকঝকে নতুন স্যান্ডেল দেখতে পেয়ে ওটিই পড়ে নিল। এদিকে ঐ স্যান্ডেলটি ছিল তার ভাবী শ্বশুড়ের স্যান্ডেল। শ্বশুড় মহাশয় নামাজ শেষে বাইরে এসে তার স্যান্ডেল না পেয়ে ভীষণ হৈচৈ শুরু করে দিলেন।

ঃ দাড়া, দাড়া এটা তুই সত্যি ঘটনা বলছিস, না গল্প? (খটকা নিয়ে প্রশ্ন করল মোস্তাহিদ )
ঃ হাঃ, হাঃ, হাঃ এই সমস্যাটা সব সময়ই হয়। শুরুতেই বলে নেই যে এটা গল্প নয় সত্যি ঘটনা, তার পরেও ঘটনার এই জায়গায় এসে সবাই প্রশ্ন করে, এটা সত্যি ঘটনা কিনা।
বিস্মিত মোস্তাহিদ ও অন্যান্য সবাই বলল
ঃ আচ্ছা কনটিনিউ।
ঃ তারপর শ্বশুড় মহাশয়ের হৈচৈ-এ লোক জড় হয়ে গেল। তিনি গোয়ার্তুমি শুরু করলেন, খুঁজে বের করতেই হবে কে আমার স্যান্ডেল নিল। এদিকে ভাবী জামাতার কপালটা ঐদিন সত্যিই খারাপ ছিল। সে মসজিদের কাছেই দেয়ালে টাঙানো দৈনিক পত্রিকা পড়ছিল। শ্বশুড় মহাশয় খুঁজতে খুঁজতে ঐ পর্যন্ত এসে পেয়ে গেলেন তার স্যান্ডেল। “আরে হ্যাঁ, এই তো আমার স্যান্ডেল”। খেকিয়ে উঠলেন তিনি। এবং তিনি ও বাকী সকলে আবিস্কার করলেন যে, স্যান্ডেলটি তার ভাবী জামাতার পায়ে। হবু শ্বশুড় মহাশয় বললেন, “আমি যে বলেছিলাম, চোর-ছ্যাচড়, ভুল তো কিছু বলিনি, এই দেখেন চোখের সামনেই দেখেন”। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক ছেলেটি কিছু বলার কোন ভাষাও খুঁজে পেলনা। গোয়ার-গোবিন্দ মেয়ের বাবা শেষ পর্যন্ত বিয়েই ভেঙে দিল।

হাঃ, হাঃ, হাঃ, আরও এক দফা কোরাসে হাসলাম সবাই ।
ইমতিয়াজ বলল
ঃ নারে, ঘটনাটা দুঃখজনক। ছেলেটার জন্য খারাপই লাগছে।
ঃ এটা ওর কপালের দোষ বলতে হবে, না হলে এরকম কোইন্সিডেন্স হয়!
ঃ বেচারা ভালোবাসার মেয়েটিকে পেয়েও হারালো!

আচ্ছা রোমান এবার বল ইহুদীদের সম্পর্কে হিটলারের ঐ আটটি পয়েন্ট।
ঃ শোন তাহলে। আমি শুরু করলাম।
জার্মানিয়া নামে অভিহিত প্রথম কয়েকজন ইহুদী আসে রোম আক্রমণের সময়। তারা আসে বণিকের বেশে, আপন জাতীয়তা গোপন করে। ইহুদীরা যখন আর্যদের ঘনিষ্ট সম্পর্কে আসে একমাত্র তখনই তাদের কিছু উন্নতি দেখা যায়।

(ক) স্থায়ী বসতি হওয়া মাত্র ইহুদীরা সেখানে বণিকের বেশে উপস্থিত হয়। তারা তখন সাধারনত দুটি কারণে তাদের জাতীয় স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে সমর্থ হয়। প্রথমত তারা অন্যান্য জাতির ভাষা জানত না। একমাত্র ব্যবসাগত ব্যাপার ছাড়া আর কোন বিষয়ে কোন কথা বলতো না বা মিশত না কারো সঙ্গে। দ্বিতীয়ত তাদের স্বভাবটা ছলচাতুর্যে ভরা ছিল বলে কারো সঙ্গে মিল হতোনা তাদের।

(খ) ধীরে ধীরে তারা স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মতৎপরতায় অংশগ্রহণ করে। কিন্তু অর্থনীতির ক্ষেত্রে তারা কোন উৎপাদকের ভূমিকা গ্রহণ করেনি, গ্রহণ করে দালালের ভূমিকা। হাজার হাজার বছর ধরে ব্যবসা করা সত্বেও তাদের ব্যবসাগত চাতুর্য আর্যদের হার মানিয়ে দেয়। কারণ অর্থনীতির ক্ষেত্রেও আর্যরা সবসময় সততা মেনে চলত। কাজেই ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাপারটা যেন ইহুদীদের একচেটিয়া কারবারে পরিণত হয়। তাছাড়া তারা চড়া সুদে টাকা দিতে থাকে। ধার করা টাকায় সুদের প্রবর্তন তাদেরই কীর্তি। এই সুদ প্রথায় অন্তর্নীহিত জটিলতার কথাটা ভেবে দেখা হয়নি, সাময়িক সুবিধার জন্য এ প্রথা তখন মেনে নিয়েছিল সবাই।
ঃ আরে এতো সাংঘাতিক। আমাদের ইসলাম ধর্মেও তো সুদপ্রথার বিরোধিতার কথা বলা হয়েছে সেই ১৪০০ বছর আগে। (বলল মোস্তাহিদ)
ঃ হিটলার কি তবে কোরান-হাদিস পড়েছিল? (বলল আমীন)
ঃ আমার এক চাচা আছেন, ইকোনমিষ্ট। উনি প্রায়ই অর্থনীতিতে সুদ প্রথার নানা রকম ইমপ্যাক্ট-এর কথা বলে থাকেন আর বলেন ইসলাম ধর্ম ঠিকই বলেছে সুদ খাওয়া হারাম বা নিষিদ্ধ। (বলল ইমতিয়াজ )
আচ্ছা তারপর?
আবারো শুরু করলাম আমি।
(গ) এইভাবে ইহুদীরা ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলে নিজেদেরকে। ছোট বড় বিভিন্ন শহরের এক-একটা অংশে বসতি গড়ে ফেলে তারা। এক একটা রাষ্ট্রের মধ্যে গড়ে ওঠে এক একটা স্বতন্ত্র রাষ্ট্র। তারা ভাবে ব্যবসা বাণিজ্য ব্যাপারটাতে যেন একমাত্র তাদেরই অধিকার। আর এই অধিকার বশে প্রমত্ত হয়ে তারা স্বর্ণ সুযোগ নিতে থাকে।

(ঘ) ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একচেটিয়া আধিপত্য লাভ করলেও ইহুদীরা যুদ্ধের কারবারের জন্য হেয় হয়ে ওঠে জনগণের কাছে। ক্রমে ইহুদীরা ভুসম্পত্তি অর্থাৎ জমি জায়গা নিয়েও কেনাবেচা শুরু করে। তারা অনেক জমি কিনে কৃষকদের খাজনার বন্দোবস্ত করে বিলি করতে থাকে। যে কৃষক তাদের বেশি খাজনা দিত সেই কৃষক জমি চাষ করতে পারত। ইহুদীরা কিন্তু নিজেরা জমি চাষ করতে পারত না। তারা শুধু জমি নিয়ে ব্যবসা করত। ক্রমে ইহুদীদের অত্যাচার বেড়ে উঠলে ঋণগ্রস্ত জনগণ বিদ্রোহী হয়ে ওঠে তাদের বিরুদ্ধে। তৎক্ষনাৎ স্থানীয় অধিবাসীরা ইহুদীদের স্বরূপ বুঝতে পারে। তাদের সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। ইহুদীদের জাতীয় চরিত্রের বৈশিষ্ট্যগুলোকে তখন তারা খুঁটিয়ে দেখতে থাকে।

চরম দুরাবস্থার মধ্যে পড়ে জনগণ ক্রদ্ধ হয়ে ওঠে এবং ইহুদীদের বিষয় সম্পত্তি কেড়ে নেয়। তখন তারা ইহুদীদের মনে-প্রানে ঘৃণা করতে থাকে এবং তাদের দেশে ইহুদীদের উপস্থিতি বিপজ্জনক বলে ভাবতে শুরু করে।

(ঙ) ইহুদীরা এবার খোলাখুলিভাবে আপন স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করে। তারা সরকারকে হাত করে, তোষামোদ দ্বারা প্রশাসনের লোকজনদের বশিভুত করে টাকা উৎকোচ দ্বারা অনেক অসৎ কাজ করিয়ে নেয়। এইভাবে তারা শোষনের সুবিধা করে নেয়। ক্রুদ্ধ জনগণের রোষে পড়ে তারা একসময় বিতারিত হতে বাধ্য হলেও আবার তারা ফিরে আসে। আবার তারা সেই ঘৃণ্য ব্যবসা শুরু করে দরিদ্র জনগণকে শোষন করতে থাকে।
এ ব্যপারে ইহুদীরা যেন খুব বেশিদূর এগুতে না পারে তার জন্য আইন প্রনয়ন করে কোন ভুসম্পত্তির অধিকার হতে বঞ্চিত করা হয়।

(চ) রাজা মহারাজাদের শক্তি যতই বৃদ্ধি পেতে থাকে ইহুদীরা ততোই তাদের দিকে চলে। তাদের তোষামোদ করতে থাকে। তাদের কাছ থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ-সুবিধা লাভের চেষ্টা করে। মোটা মোটা টাকার বিনিময়ে রাজা-রাজরাও সেই সুবিধা দিতে থাকে। কিন্তু ধুর্ত ইহুদীরা রাজাদের যত টাকাই দিক, অল্প সময়ের মধ্যেই তারা কম শোষণ করে না। রাজাদের টাকার দরকার হলেই নতুন সুবিধা লাভের জন্যে ইহুদীরা আবার তাদের টাকা দিত। এইভাবে রক্তচোষা জোঁকের মত একধার থেকে সকল শ্রেণির লোককে শোষণ করতো তারা।

এই বিষয়ে জার্মান রাজাদের ভূমিকা ইহূদীদের মতই ছিল সমান ঘৃণ্য। তাদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই এতখানি উদ্ধত হয়ে ওঠে ইহুদীরা এবং তাদের জন্য জার্মান জনগণ ইহুদীদের শোষণ থেকে মুক্ত করতে পারছিল না নিজেদেরকে। পরে অবশ্য জার্মান রাজারা শয়তানদের কাছে নিজেদের বিক্রি করে বা চিনে নিয়ে তার প্রতিফল হাতে হাতে পায়। শয়তানদের প্রলোভনে তাদের দেশের জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে তা বুঝতে পারে।

(ছ) এইভাবে জার্মান রাজারা ইহুদীদের প্রলোভনে ধরা দিয়ে শ্রদ্ধা ও সম্মান হারিয়ে ফেলে। শ্রদ্ধা ও সম্মান লাভের পরিবর্তে তাদের ঘৃণা করতে থাকে দেশের জনগণ। কারণ রাজারা তাদের প্রজাদের স্বার্থ রক্ষা করতে সমর্থ তো হয়নি বরং প্রকারান্তেরে দেশের জনগণকে শোষণ করতে সাহায্য করত ইহুদীদেরকে। এদিকে চতুর ইহুদীরা বুঝতে পেরেছিল জার্মান রাজাদের পতন আসন্ন। অমিতব্যায়ী জার্মান রাজারা যে অর্থ অপব্যয় করে উড়িয়ে দিয়েছে, সেই অর্থ যোগারের জন্যে তাদের একজনকে ধরে নিজেদের উন্নতি ত্বরান্বিত করে তুলতো তারা। টাকা দিয়ে তারা বড় বড় সম্পদও লাভ করতে থাকে সমগ্র জার্মান সমাজ দূষিত হয়ে পড়ে ঘরে ও বাইরে।

(জ) এই সময় হঠাৎ এক রুপান্তর দেখা দেয় ইহুদীদের জগতে। এতোদিন তারা সবদিক থেকে তাদের জাতীয় স্বাতন্ত্র ও চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে চলছিল। কিন্তু এবার তারা খ্রীষ্টধর্ম গ্রহন করতে থাকে। খ্রীষ্টান চার্চের যাজকেরা এক নতুন মানব সন্তান লাভ করে।
এবার ইহুদীরা জার্মান ভাষা শিক্ষা করতে থাকে। কেন? কারণ তারা জার্মান রাজশক্তির পতন ঘটিয়েছে। এখন আর রাজাদের উপর নির্ভর করে থাকার উপায় নেই। সমাজের সর্বস্তরে অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করতে হলে ঐ দেশের নাগরিকত্ব অর্জন করতে হবে। সমাজের উপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হলে চাই ভাষাশিক্ষা। একদিন প্রাচীনকালে বিশ্বজয়ের ও বিশ্বশাসনের যে অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি তাদের গোচর হয়েছিল, তখন সেই সুযোগের অপূর্বক্ষণ এসে গেছে বলে মনে হয় তাদের।

ঃ আরেব্বাস এতো কিছু তো কোনদিনই জানতাম না। এ যে সাংঘাতিক। ইহুদীরা তো ভয়াবহ! (বলল মোস্তাহিদ)
ঃ হিটলার যা লিখেছে তা যদি সত্যি হয় তাহলে তো তাই বলতে হবে। (বলললাম আমি)
ঃ যেভাবে নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের মারে তাতে তো শয়তানের সাক্ষাৎ চেলা বলে মনে হয়। (বলল মোস্তাহিদ)
ঃ ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি বিশ্ব রাজনীতির এই কূটিলতা। (বলল আমীন)
ঃ আন্তর্জাতিক রাজনীতি এমনই জটিল। (বলললাম আমি)
ঃ আচ্ছা আমাদের দেশের প্রতি ইস্রাইলের রাজনীতি কেমন? (প্রশ্ন করল ইমতিয়াজ)
ঃ আমাদের সাথে তো কোন ডিপ্লোমেটিক রিলেশন নাই। আমাদের পাসপোর্টে দেখবে লেখা আছে All countries except Israel, Taiwan and South Africa। কিন্ত ওরা যা কূটিল কোননা কোন পথে আমাদের প্রতি কোন রাজনৈতিক পলিসি খাটাচ্ছে কিনা?
ঃ আমরা সাধারন মানুষ এতদূর বুঝতে পারিনা।
ঃ তোর বাবা তো নামী সাংবাদিক। উনাকে জিজ্ঞেস করনা।
ঃ হু জিজ্ঞেস করতে হবে বাবাকে।
ঃ ভারতের সাথে ওদের সম্পর্ক কেমন?
ঃ ভালোইতো মনে হয়। ঐযে বলেছিলাম না, ভারতকে পারমানবিক শক্তির অধিকারি হতে ইস্রাইলই সাহায্য করেছিল।
ঃ কেন করল সাহায্য?
ঃ বলা মুশকিল। মুসলিমদের এ্যাগেইনস্ট-এ হতে পারে।
ঃ কি রকম?
ঃ ভারতের দুই দিকে দুই মুসলিম রাষ্ট্র, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ।
ঃ আচ্ছা, হিটলারের লেখা পড়ে তো মনে হচ্ছে ইউরোপীয়ানরা ওদেকে ঘৃণা করে। তাই বুঝি হিটলার ওদেরকে ধোলাই দিয়েছে? (প্রশ্ন আমীনের) প্রশ্ন মোস্তাহিদের
ঃ হিটলারের আগে কেউ ধোলাই দিল না কেন? (প্রশ্ন মোস্তাহিদের)
ঃ দিয়েছে, হিটলারের আগেও ইউরোপে বহুবার ইহুদী নিধন হয়েছে। (বললাম আমি)
ঃ তাই নাকি?
ঃ হ্যাঁ, এই সময়ে ওদের একমাত্র আশ্রয়স্থল ছিল ইসলামী খিলাফত। যখনই ইউরোপে ওদের উপর আক্রমণ শুরু হতো সাথে সাথে ওরা ছুটে এসে আশ্রয় নিত ইসলামী খিলাফতের বুকে।
ঃ আশ্চর্য সেই মুসলমানদেরকেই আজ ওরা নির্বিচারে মারছে!
ঃ একেই বলে বেঈমান!!!

ঔপন্যাসিক এ জে কুইনেল একটা কথা বলেছিলেনঃ
“নৈরাজ্য যেখানে সর্বগ্রাসী, নৈতিকতা সেখানে পরাজিত সৈনিক..”

হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী, নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব;
ঘোর কুটিল পন্থ তার, লোভজটিল বন্ধ ॥
নূতন তব জন্ম লাগি কাতর যত প্রাণী–
কর’ ত্রাণ মহাপ্রাণ, আন’ অমৃতবাণী,
বিকশিত কর’ প্রেমপদ্ম চিরমধুনিষ্যন্দ।
শান্ত হে, মুক্ত হে, হে অনন্তপুণ্য,
করুণাঘন, ধরণীতল কর’ কলঙ্কশূন্য।

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ এই পর্বটি লিখতে আমি মিথিলা পাবলিকেশন্স কর্তৃক প্রকাশিত এডল্ফ হিটলার রচিত ‘মাইন কাম্প্ফ’ গ্রন্থের অনুবাদের সাহায্য নিয়েছি। প্রকাশক সোপান আহমেদ ও মিথিলা পাবলিকেশন্স-কে ধন্যবাদ।


লিস্টনিং টু দ্য উইন্ড অফ চেইঞ্জ ১১

রমনার সবুজ বুকে দাঁড়িয়ে চারদিকটাকে ছবির মত সুন্দর মনে হলো হঠাৎ। পায়ের নীচে ঘন সবুজ ঘাঁসে ছাওয়া তেপান্তর, ছোট-বড় হরেক রকমের সবুজ গাছে আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়া চতুর্দিক, তাদের কোন কোনটাতে ভাবী সন্তানের আগমনের ইঙ্গিত, অর্থাৎ ফুটে আছে মন কাড়া সব নানা রঙের ফুলের শোভা, সন্তান বরণ করবার জন্যেই বোধহয় ওগুলোর গোড়ায় জন্মানো সবুজ ঘাঁসের ওপর আল্পনা এঁকেছে ঝরা ফুলের পাঁপড়ি। আর মাথার উপরে উদাসী আকাশটি যেন নীল চাদোয়া, তার ঠিক মাঝখানটাতে একেবারে মাথার উপরেই গনগন করছে মাঝ দুপুরের ঝকঝকে সূর্যটা, এই অপরূপ শোভার মাঝে সদ্য কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্য প্রাপ্ত আমরা চারজন নিজেদেরকেই মনে করলাম শিল্পির তুলিতে আঁকা ছবি যেন।

যে বড় গাঁছটির নীচে আমরা বসে ছিলাম, সেটিতেও ফুটে আছে অদ্ভুত একটি ফুল। বেশ মিষ্টি একটা গন্ধ এবং দেখতেও বেশ সুন্দর। ফুলের লাল পাপড়ীর মধ্যেখানে নাগ বা সাপের মতো ফণা তুলে আছে হালকা গোলাপী হলুদে মিশ্র রং এর পুং কেশরের একগুচ্ছ ক্ষুদে পাপড়ী। ফুলটির প্রতি আমি দারুন ভাবে আকৃষ্ট হই। আকারে যেমন বড়, রূপে তেমনি নয়নাভিরাম, সৌরভে মনোহরা। শহরের ভিতর এমন গাছ সচরাচর চোখে পড়েনা। কি নাম গাছটার? বোঝার চেষ্টা করলাম। বুঝতে হলোনা, গাছটির গায়েই নাম লেখা আছে, ‘নাগলিঙ্গম’। এখন বুঝতে পারলাম, এর অপর নাম ‘নাগকেশর’। নামটা আমার খুব ভালো লাগে। নাগলিঙ্গম নামটি তামিল নাম এর বাংলা নামটিই নাগকেশর এই কিছুদিন আগেই আমাদের পারিবারিক পাঠাগারে একটি উপন্যাস পড়েছি, ‘নাগকেশরের দিনগুলি’। নামটি মোহনীয়, খুলে পড়লাম, ভালো লাগলো। রোমান্টিকতা ও সামান্য যৌনতার ছোঁয়া আছে এমন কাহিনী। আমার এই বয়সে যেমন ভালো লাগে, আরকি। এর ফল দেখতে কামানের গোলার মতো। সে কারণেই ইংরেজিতে এর নাম ক্যাননবল। নাগলিঙ্গমের আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকার উষ্ণ অঞ্চলে। বৈজ্ঞানিক নাম Couroupita guianensis। নাগলিঙ্গম আমাদের দেশে বেশ দুর্লভ। এখানে এর নাগলিঙ্গম নাম হয়েছিল সাপের ফণার মতো বাঁকানো পরাগচক্রের কারণে। নাগকেশরের ফল আমাজান বনের সামান জনগোষ্ঠীর এটি একটি প্রিয় খাবার । এর ফুল, পাতা এবং বাকলের নির্যাস ঔষধ হিসেবে বহুল প্রচলিত। এটি এনটিবায়েটিক, এনটিফাঙ্গাল এবং এনটিসেপটিক হিসেবে অনেকে ব্যবহার করে থাকেন। পেটের পীড়া দূরীকরণে এর ভূমিকা ব্যাপক। পাতা থেকে উৎপন্ন জুস ত্বকের সমস্যা দূরীকরণে খুবই কার্যকর। দক্ষিণ আমেরিকার সামানরা এর পাতা ম্যালেরিয়া রোগ নিরাময়ে ব্যবহার করে থাকে। বহুল গুণ সম্পূর্ণ এই উদ্ভিদের সংখ্যা এখন পৃথিবীতে খুবই কম।
উজ্জ্বল গোলাপি রঙের ফুল। পাপড়ি ছয়টি। বসন্তে যেমন শিমুল গাছতলা ঝরা ফুলে ভরে থাকে, নাগলিঙ্গমের তলাও তেমনি এর অজস্র পাপড়িতে ছেয়ে থাকে। প্রকাণ্ড বৃক্ষ। পাতা লম্বা, ডগা সুচালো। শাখার সঙ্গে প্রায় লেগে থাকে। নাগকেশরের সৌন্দর্য্যে এতটাই মুগ্ধ হলাম যে, মনে হলো, উজ্জ্বলতায় তরুরাজ্যে অনন্য নাগলিঙ্গম ছাড়া বড় কোনো বাগান পরিপূর্ণ হয় না সেই নাগকেশর গাছের নীচেই দাঁড়িয়ে আছি।

ঃ খুব সুন্দর গাছটা! তাইনা (আমীন বলল)
ঃ ফুলগুলো কি অদ্ভুত! (বলল মোস্তাহিদ)
ঃ আগে কখনো দেখিনি (ইমতিয়াজ বলল)
ঃ দেখার কথা না। এটা বিরল প্রজাতির গাছ। যতদূর জানি সারা শহরে খুব কমই আছে। (বললাম আমি)
ঃ সুন্দর গাছ দেখলে মনটা কেমন উদাস হয়ে যায়। (বলল ইমতিয়াজ) তোমাদের ঢাকা শহরে গাছ খুব একটা নেই। আমরা ময়মনসিংহে কিছু বেশি গাছ দেখি।
ঃ এরকম ছিলা না কিন্তু। (আমি বললাম) এক সময় ঢাকাতে অনেক গাছ ছিল। মানুষের বাড়িতে তো অবশ্যই, তার পাশাপাশি, মূল শহরেও গাছের কমতি ছিলনা। এই যে কাছের রাস্তাটি যার নাম এখন কাজী নজরুল ইসলাম এ্যাভিনিউ। এর মাঝখান দিয়ে ছিল চওড়া আইল্যান্ড, পুরো আইল্যান্ড জুড়ে ছিল সারি সারি কৃষ্ণচূড়া। মৌচাক থেকে রামপুরা পর্যন্ত রাস্তাটিও একই রকম ছিল। শেরাটন হোটেলের হোটেলের সামনেও ছিল কৃষ্ণচূড়ার সারি। সারা শহরে এত বেশী কৃষ্ণচূড়া গাছ ছিল যে এটাকে মাঝে মাঝে কৃষ্ণচূড়ার শহর বলা হতো।
ঃ এত এত গাছ সব গেল কোথায়? (প্রশ্ন করল ইমতিয়াজ)
ঃ এই শেরাটনের সামনে একটা বিশাল বড় গাছ ছিল না? আমার মনে আছে। কি হলো পরে গাছটার? (প্রশ্ন করল আমীন)

ঃ হ্যাঁ, ছিল। (একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম আমি)। সেটাই বলতে চাচ্ছিলাম আমি। গাছগুলো কাটা হয় ‘৭৮-‘৭৯ সালের দিকে।
ঃ কিন্তু কেন?
ঃ ঢাকা শহরে জনসংখ্যা বেড়ে যাচ্ছিল। রাস্তা চওড়া করার প্রয়োজন পড়ল। তাই আইল্যান্ড তুলে দিয়ে রাস্তাগুলো চওড়া করা হয়। সবুজ ঘাসের জায়গা দখল করে নিল, কালো পিচ।
ঃ এটা কি অন্য কোনভাবে করা যেত না? সিটি এক্সপানশন কি কেবল উর্ধ্বমূখী করতে হবে?
ঃ জানিনা, যারা করে তারা বলতে পারবে।
ঃ আর শেরাটনের সামনের গাছটি? ওটা কেটে তো রাস্তা চওড়া করা হয়নি, ওটার কি দোষ ছিল?
ঃ আসলে রাস্তা চওড়া করা একমাত্র কারণ নয়। আব্বা বলেছে প্রচ্ছন্ন আরো একটি কারণ ছিল।
ঃ কি সেটা?
ঃ সেই সময়ে কম্যুনিস্ট সন্ত্রাসীদের তৎপরতা বেড়ে যায়। এরা উঁচু গাছের উপরে বসে থাকত। ডানপন্থী শাসকদের গাড়িবহরে ঢিল মারত। কখনো সখনো অস্ত্র নিয়েও বসে থাকত। পরিস্থিতি ভয়ংকরই ছিল বলা যেতে পারে। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই অনেক স্ট্রাটেজিক জায়গায় গাছ কাটতে হয়েছে। শেরাটনের সামনে, কোনার দিকে, ঐ তিন রাস্তার মোড় যেখানে এখন একটি প্রপাত টাইপের ফোয়ারা দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে ছিল ঐ বিশাল গাছটি। পুরো মোড়টি ঢেকে রাখতো তার বিশাল গাছপালা, বিদেশীরা তো নিঃসন্দেহে আমরা বাংলাদেশীরাও ঐ গাছটির বিশালত্ব দেখে মুগ্ধ হতাম। সেই গাছটি হঠাৎ কাটা শুরু হলো। প্রকৃতি প্রেমিকরা অনেক প্রতিবাদ করেছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র মন কাড়া একটা কবিতাও লিখেছিল ঐ গাছটি নিয়ে। কিন্তু কোন কাজ হয়নি।
শেষ পর্যন্ত গাছটি কাটাই হয়েছিল। গাছটি বিশাল বলে কাটতে কয়েকদিন সময় লেগেছিল। আমার বুকে ঘটনাটি ক্ষত সৃষ্টি করেছে কারণ গাছটি কাটার দিন আমি সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কোন এক কারণে আব্বা ঐ দিন ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিল, আমি আব্বার সাথে ছিলাম। গাছ কাটা দেখে আব্বা সেখানে দাঁড়িয়ে পড়ল। আমরা দু’জন অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রকৃতিকে হত্যা করার ঐ দুঃখজনক ঘটনা প্রত্যক্ষ করছিলাম।
ঃ কি নাম ছিল গাছটির?
ঃ নাগকেশর।

এই দুঃখজনক ঘটনা শুনে সবই বিমর্ষ হয়ে গেল।
ঃ নাঃ! মনটাই খারাপ হয়ে গেল। (বলল মোস্তাহিদ)
ঃ তোদের মন ভালো করে দেই? (বলল আমীন)
ঃ কি করে? (বলল মোস্তাহিদ)
ঃ ঐ দেখ।
একটু সামনেই দুপাশে ঝাউ গাছের শোভা নিয়ে ঢালাই করা পার্কের পথ। ভর দুপুর বলে প্রায় খালি। হঠাৎ সেই পথ ধরে হেটে আসতে দেখলাম এক অপরূপা তরুণীকে।
সবাই এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। হলুদ রঙের ফ্যশনেবল সালোয়ার কামিস পড়া। এরকম সালোয়ার-কামিসের ডিজাইন আজকাল হিন্দী ফিল্মগুলোতে দেখা যায় বোম্বের নায়িকাদের পড়নে। মেয়েটির পায়ে বাহারি পেন্সিল হিল। কাট কাট শব্দ তুলে হেটে যাচ্ছে। এই কাট কাট শব্দ শুনলে যে কোন পুরুষেরই দৃষ্টি ঐ দিকে চলে যায়। আশেপাশের বাতাসে ঢেউ তুলে মেয়েটি উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে চলে গেল। খুব সম্ভবতঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকেই গেল। ওখানকার ছাত্রী হবে হয়তো। যতক্ষণ মেয়েটিকে দেখা যাচ্ছিল, আমরা দেখছিলাম, দূরে মেয়েটির মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত।

চাপা কৌতুকে চিকচিক করছে আমীনের চোখ।
ঃ তোদের একটা কৌতুক বলি? (বলল আমীন)
ঃ বল (বলল মোস্তাহিদ)
ঃ একবার সাদা জোব্বা পরিহিত, টুপি মাথায় তিন মোল্লা যাচ্ছে পথ দিয়ে, প্রথম জনের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, দ্বিতীয় জনার বয়স চল্লিশোর্ধ, আর তৃতীয় জন একেবারেই তরূণ বছর বিশেক বয়স। হঠাৎ অপরূপা এক অষ্টাদশী তরুণী গেল তাদের সামনে দিয়ে। তার রূপ সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়ে প্রথম মোল্লা বলল, “মাশাল্লাহ, মাশাল্লাহ”, দ্বিতীয় মোল্লা বলল, “সোবাহানাল্লাহ, সোবাহানাল্লাহ”, আর তরুণ মোল্লাটি বলল, “ইনশল্লাহ, ইনশল্লাহ”।
সবাই হেসে উঠলাম।
ঃ উহ্, খালি খালি মোল্লাদের বদনাম না? (ক্ষেপে গেল মোস্তাহিদ)
ঃ আহা এটা একটা কৌতুক মাত্র, তুই সিরিয়াসলি নিচ্ছিস কেন? (বলল ইমতিয়াজ)
ঃ খালি খালি না, তোদের মোল্লারা সব ঐ কিসিমেরই। (ঘাঁড় বাকিয়ে বলল আমীন)
ঃ হ্যাঁ, হ্যাঁ শুধু মোল্লাদের দোষ। আর আমরা? আমরা কি মেয়েটার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকিনি?
ঃ তা তো তাকিয়েছিই। (একটু দমে গিয়ে বলল আমীন)
ঃ তাহলে?
ঃ আরে এটা বয়সের দোষ। (বলল ইমতিয়াজ)
ঃ না, বয়সের গুন (বললাম আমি)
এবার সবাই হেসে উঠল। আসলেই তো সুন্দরী তরুণী সামনে দিয়ে গেলে তরুণরা তাকিয়ে দেখবে এটাই তো স্বাভাবিক।
ঃ তোদের মোল্লারা মাদ্রাসায়, ঘোড়ার ডিম পড়ে। (আবার একটু কটাক্ষ করল আমীন)
ঃ কেন ঘোড়ার ডিম কেন? আধ্যাত্মিক লেখাপড়াকে ঘোড়ার ডিম বলছিস কেন? (আবারও প্রতিবাদ মোস্তাহিদের)
ঃ ঘোড়ার ডিম না তো কি? ঐ পড়ে ঘোড়ার ঘাস কাটা ছাড়া আর কি করতে পারবে?
ঃ নামাজ-রোজা, মিলাদ শরীফ ধর্মীয় কাজ কর্মকে তোর কাছে ঘোড়ার ঘাস কাটা মনে হয়?
ঃ অবশ্যই ঘোড়ার ঘাস কাটা। উৎপাদনের সাথে এর কোন সম্পর্ক আছে? এই আমাদের মুসলমানগুলোর মাথার মধ্যে কেরা পোক আছে। এইজন্যই আরবগুলা জোব্বা পড়ে উটের পিঠে চড়ে মরুভূমীতে বেহুদা ঘুরে বেড়ায়, আর ইতিউতি তাকায় কোথায় কোন রমনি দেখা যায় যাতে তিসরি শাদি মোবারকটা করা যায়।

ঃ এই, এই এটা কিন্তু বেশী হয়ে গেল। (ক্ষেপে গেল মোস্তাহিদ)। আর ঐ আরবদের দ্বারে দ্বারে তোমরা বাঙালীরা ভিক্ষা কর।
ঃ (একটু দমে গেলেও উত্তর দিন আমীন) ভিক্ষা করতাম না। ওরাই ভিক্ষা করত শুধু তেল থাকাতেই বেঁচে গেছে। আর ঐ তেলের কারণেই শালারা আজ দাঁত কেলিয়ে হাসে।
ঃ আরে থামাও তো তোমাদের ঝগড়া। (বলল ইমতিয়াজ)। কই আরব আর কই মোল্লা এই সব নিয়ে আমরা বন্ধুরা বন্ধুরা ঝগড়া করছি।
ঃ উহ্। তেলের টাকায় তেল হয়েছে ওদের। (আবারও খেকিয়ে উঠল আমীন)। বল, তিন-চারটা বিয়ে করা ছাড়া, মুসলমানরা কোনকালে কোন অবদান রাখতে পেরেছে?
এবার আর থেমে থাকতে পারলাম না আমি। বললাম
ঃ নারে, আমীন। এমন ধারণা ঠিক না। মুসলমানরা মানব সভ্যতায় অনেক অবদানই রেখেছে।
এবার সবার দৃষ্টি গেল আমার দিকে। বিভিন্ন বিষয়ে জানার চেষ্টা করি বলে ওরা আমার কথা বরাবরই মনোযোগ দিয়ে শোনে।
ঃ বলত, বলত (উৎসাহ নিয়ে বলল মোস্তাহিদ)
আমি শুরু করালাম
ঃ আমাদের মানব সভ্যতার উন্নয়নে বেশ কয়েকটি যুগ এসেছে, এদের মধ্যে একটি হলো Islamic Golden Age – ইসলামের স্বর্ণ যুগ।
ঃ কবে থেকে শুরু হয়েছিল এটা?
ঃ ৬১০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে।
ঃ কিসের সাথে মিল আছে যেন সালটির?
ঃ আমাদের নবীজি (স) জন্মগ্রহন করেছিলেন ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে, আর নবুয়ত পেয়েছিলেন ৪০ বৎসর বয়সে। ৫৭০ যোগ ৪০ সর্বমোট ৬১০।
ঃ ও হ্যাঁ তাইতো! চমৎকার হিসাব। তারপর?

ঃ ইউরোপ তখন অন্ধকারে নিমজ্জিত। ক্যাথলিক চার্চের অনুশাসনে শ্বাসরূদ্ধকর পরিস্থিতি। চার্চ তখন সারা ইউরোপে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা বন্ধ করে দিয়েছে। এ সময়ে মানব জাতির ত্রাণকর্তা হিসাবে আবির্ভুত হন, আমাদের নবীজি (স)। তিনি এসেই সব চাইতে বেশী গুরুত্ব দিলেন লেখাপড়া ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায়। তোরা তো জানিস হেরার গুহায় অনেকগুলি বছরের ধ্যানমগ্নতা থেকে তিনি পেলেন ঐশী বাণী, পবিত্র কোরান। যার শুরুটাই হলো, “ইকরা —-“, মানে “পড়….”। তিনি বললেন, “জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমান নর ও নারীর জন্যে ফরজ।” যখন ইউরোপে নারী শিক্ষা নিষিদ্ধ ছিল, তখন নবীজি নারীদের বাধ্য করলেন শিক্ষা গ্রহন করতে।
ঃ ইউরোপে নারী শিক্ষা নিষিদ্ধ ছিল নাকি? (প্রশ্ন আমীনের)
ঃ ছিল তো।
ঃ তারপর বল (বলল মোস্তাহিদ)
ঃ নবীজি (স) আরো বললেন, “জ্ঞান অর্জন করতে হলে ……।
আমি শেষ করার আগেই সবাই সমস্বরে আমার সাথে গলা মিলালো
” প্রয়োজনে সুদূর চীন দেশে যাও”

ঃ হঠাৎ চীনের কথা বললেন কেন?
ঃ খুব সম্ভবত দুটি কারণে, এক, চীন তখন জ্ঞান-বিজ্ঞান চর