Categories
অনলাইন প্রকাশনা পরিবেশ ও বন

সুন্দরবন এতদিন আমাদের বাচিয়েছে কিন্তু এখন সুন্দরবনকে কে বাচাবে?

–দিনমজুর

প্রিয় সুন্দরবন বিপদে পড়েছে। কঠিন বিপদ। গাছপালা-পশুপাখি-মানুষ সহ তার যে জগৎটাকে সে এতদিন আগলে রেখেছে, সেই গোটা জগৎটার অস্তিত্বই হুমকীর মুখোমুখি। এমনিতেই প্রাকৃতিক ও মানব সৃষ্ট নানা দুর্বিপাকে সুন্দরবন অস্তিত্ব বিপন্ন,তার উপর এখন মড়ার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে যুক্ত হয়েছে ১৩২০ মেগাওয়াটের বিশাল এক কয়লা বিদুৎ প্রকল্প। সুন্দরবন থেকে মাত্র ১৪ কিমি দূরে। ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসির সাথে বিদুৎ কেন্দ্র স্থাপনের চুক্তিও হয়ে গেছে। এর আগে জমি অধিগ্রহন করে মাটি ভরাটের কাজ শুরু হয়ে গেছে। পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়ার আগেই। পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া যে শুধু সুন্দরবন কেন, কোন স্থানেই কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো একটি রেড ক্যাটাগরির স্থাপনা নির্মাণের কথা ভাবাই যায় না, আইন ও সমর্থন করে না।

যে ভারতীয় কোম্পানি এই বিদুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনা করবে, নিজ দেশ ভারতে হলে কিন্তু এইভাবে সুন্দরবনের এত কাছে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে পারতো না। ভারতের ওয়াল্ড লাইফ প্রটেকশান এক্ট অনুসারে কোন সংরক্ষতিত বনাঞ্চলের ১৫ কিমি এর মধ্যে কোন বিদুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা নিষেধ। ১ কিমি কিন্তু কম না, সুন্দরবন ধ্বংস করার জন্য এই ১ কিমিই যথেষ্ট। মালয়েশিয়ায় এই দূরত্ব ২০ কিমি। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে এইসবের কোন বালাই নাই। ভারতের মধ্য প্রদেশে এনটিপিসি কোম্পানিরই একই আকারের অর্থাৎ ১৩২০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে দেয় নাই ভারত সরকার কারণ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি আবাসিক এলাকার কাছে, দুই ফসলী জমির উপর অবস্থিত এবং যে নদীর পানি ব্যাবহার করবে সেই নদীতে পানির সংকট। অথচ বাংলাদেশে সুন্দরবনের পাশে বিদুৎ কেন্দ্রটি নিয়ে আপত্তি এর চেয়ে অনেক অনেক বেশি সিরিয়াস। যেমন:

১) কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন ১৪২ টন বিষাক্ত সালফার ডাইঅক্সাইড(SO2) ও ৮৫ টন বিষাক্ত নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড(NO2) নির্গত হবে যার ফলে পরিবেশ আইনে বেধে দেয়া পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকার সীমার(প্রতি ঘনমিটারে ৩০ মাইক্রোগ্রাম) তুলনায় এইসব বিষাক্ত গ্যাসের মাত্রা অনেক বেশি হবে(প্রতি ঘনমিটারে ৫৩ মাইক্রোগ্রামের বেশি) যার ফলে এসিড বৃষ্টি, শ্বাসতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি সহ গাছপালা জীবজন্তুর জীবন বিপন্ন হবে। অথচ জালিয়াতি করে সুন্দরবনকে পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকার বদলে ‘আবাসিক ও গ্রাম্য এলাকা’ হিসেবে দেখিয়ে বিষাক্ত গ্যাসের পরিমাণ নিরাপদ মাত্রার মধ্যেই থাকবে বলে প্রতারণা করা হচ্ছে।

২) সাড়ে চার বছর ধরে বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ কালে নির্মাণের মালামাল ও যন্ত্রপাতি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নদী পথে পরিবহন করার সময় বাড়তি নৌযান চলাচল, তেল নি:সরণ, শব্দদূষণ, আলো, বর্জ্য নি:সরণ, ড্রেজিং ইত্যাদির মাধ্যমে সুন্দরবনের ইকো সিস্টেম বিশেষ করে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, ডলফিন, ম্যানগ্রোভ বন ইত্যাদির উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে।

৩) কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বছরে ৪ ৭ লক্ষ ২০ হাজার টন কয়লা পুড়িয়ে ৭ লক্ষ ৫০ হাজার টন ফ্লাই অ্যাশ ও ২ লক্ষ টন বটম অ্যাশ উৎপাদিত হবে। এই ফ্লাই অ্যাশ, বটম অ্যাশ, তরল ঘনীভূতি ছাই বা স্লারি ইত্যাদি ব্যাপক মাত্রায় পরিবেশ দূষণ করে কারণ এতে বিভিন্ন ভারী ধাতু যেমন আর্সেনিক, পারদ, সীসা, নিকেল, ভ্যানাডিয়াম, বেরিলিয়াম, ব্যারিয়াম, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, সেলেনিয়াম, রেডিয়াম মিশে থাকে। এই দূষণকারী ছাই দিয়ে ১৪১৪ একর জমি ৬ মিটর উচু করা হবে। ফলে এই ছাই উড়ে, ছাই ধোয়া পানি চুইয়ে আশপাশের নদী খাল এবং আন্ডারগ্রউন্ড ওয়াটার টেবিল দূষিত করবে।

৪) কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের টারবাইন, জেনারেটর, কম্প্রেসার, পাম্প, কুলিং টাওয়ার, কয়লা উঠানো নামানো, পরিবহন ইত্যাদির কাজে ব্যাবহ্রত যন্ত্রপাতি ও যানবাহন থেকে ভয়াবহ শব্দ দূষণ হয়। বলা হয়েছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চারপাশে সবুজ বেষ্টনি তৈরী করে সুন্দরবনকে রক্ষা করা হবে। কিন্তু সবুজ বেষ্টনি বেড়ে উঠতে তো সময় লাগবে। ঐ কয় বছর শব্দ দুষণ প্রতিহত করা হবে কি ভাবে কিংবা সবুজ বেষ্টনির বাইরে যন্ত্রপাতি ওমালামাল পরিবহন, ড্রেজিং ইত্যাদি কাজের সময় যে শব্দ দূষণ হবে তার ক্ষতিকর প্রভাবে কিভাবে মোকাবিল করা হবে।

৫) প্ল্যান্ট পরিচালনার জন্য পশুর নদী থেকে ঘন্টায় ৯১৫০ ঘনমিটার পানি সংগ্রহ করা হবে এবং পরিশোধন করার পর পানি পশুর নদীতে ঘন্টায় ৫১৫০ ঘনমিটার হারে নির্গমন করা হবে। পরিশোধন করার কথা বলা হলেও বাস্তবে পরিশোধনের পরও পানিতে নানান রাসায়নিক ও অন্যন্যা দূষিত উপাদান থেকে যাওয়ার ঝুকি থাকেই। তাছাড়া নদী থেকে এই হারে পানি প্রত্যাহার, তারপর বিপুল বেগে পানি আবার নদীতে নির্গমন, নির্গমনকৃত পানির তাপমাত্রা ইত্যাদি নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ, পানির প্লবতা, পলি বহন ক্ষমতা, মৎস ও অন্যান্য প্রানী ও উদ্ভিদের জীবন চক্র ইত্যাদির উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়বেই যা নদী নালা খাল বিলের মাধ্যমে গোটা সুন্দরবনের জলজ বাস্তুসংস্থানের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।

৬) কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চিমনী থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাসের তাপমাত্রা হবে ১২৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস যা চারপাশের পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।

৭) বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য আমদানী করা কয়লা সুন্দরবনের মধ্য দিয়েই পরিবহন করা হবে। এ জন্য বছরে ৫৯ দিন কয়লা বড় জাহাজ এবং ২৩৬ দিন লাইটারেজ জাহাজ সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে কয়লার মতো দূষণ কারি কার্গো নিয়ে চলাচল করবে। ফলে কয়লা পরিবহন, উঠানো –নামানো, জাহাজের ঢেউ, নাব্যতা রক্ষার জন্য ড্রেজিং, জাহাজ থেকে নির্গত তরল কঠিন বিষাক্ত বর্জ্য, জাহাজ নি:সৃত তেল, দিন রাত জাহাজ চলাচলের শব্দ, জাহাজের সার্চ লাইট ইত্যাদি সুন্দরবনের স্বাভাবিক জীবন যাত্রা ও জীব বৈচিত্র বিনাশ করবে।

এগুলো আমাদের নিজেদের বানানো কথা না, প্রকল্পের কাজ শুরু করে দিয়ে তারপর প্রকল্প জায়েজ করার জন্য যে পরিবেশ সমীক্ষা বা ইআএ করা হয়েছে, শত জালিয়াতি করেও এইরকম ভয়ংকর ফলাফলগুলোকে ঢেকে রাখা যায় নি। অর্থনৈতিক বিবেচনাতেও বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি জাতীয় স্বার্থ বিরোধী। বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ না করেই চুক্তি করা হয়েছে। ইআইএ সমীক্ষাতে প্রাথমিক ভাবে যে দামের কথা বলা হয়েছে তা প্রায় ৯ টাকা প্রতি ইউনিট যা অনেক কুইক রেন্টালের চেয়ে বেশি। তাছাড়া ৫০:৫০ জয়েন্ট ভেঞ্চার চুক্তি বলা হলেও ৭০ ভাগ পুজি আসবে ভারতের এক্সিম ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে, বাকি ৩০ ভাগ এনটিপিসি ও পিডিবি সমান দুই ভাগ করে দেবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনাও এনটিপিসি করবে। এমনকি মুনাফার উপর থেকে করও মওকুফ করে দেয়া হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিবেচনাতেও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য কেন্দ্রটি সুফল বয়ে আনবে না।

যে সুন্দরবন আমাদেরকে আইলা সিডরের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা করেছে, কাঠ দিয়ে মাছ দিয়ে খাদ্য দিয়ে আমাদের বাচিয়ে রেখেছে, সে সুন্দরবন যে নিজেই এখন বিপন্ন, সেটা স্পষ্ট। সুন্দরবনকে ভালোবেসে অষ্টমাশ্চার্য বানানোর জন্য আমরা লাখ লাখ ভোট দিয়েছি, রাস্তায় নেমে ক্যাম্পেইন করেছি। আজ যখন আমাদের প্রিয় সেই সুন্দরবনের অস্তিত্বটাই বিপন্ন তখন কি আমরা সুন্দরবন বাচানোর জন্য প্রতিবাদ করব না? সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, বানর, ইরাবতি ডলফিন থেকে শুরু করে সুন্দরী বৃক্ষদের মিছিল সমাবেশ করার ক্ষমতা থাকলে এতদিনে তারা প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসত, সব কিছু অচল করে দিত। এদের হয়ে সুন্দরবন রক্ষার দ্বায়িত্ব এখন আমাদেরই বন্ধুগণ, চুক্তি কিন্তু হয়ে গেছে, সরকার কিন্তু কাজ শুরু করে দিয়েছে:

‘বাগানের চারা গাছ রে, ডেকে ডেকে বলি, ডেকে ডেকে বলি, রাস্তায় নেমে আয়।’

Categories
অনলাইন প্রকাশনা পরিবেশ ও বন

কী কী কারণে রামপালে বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা অত্যাবশ্যক

–অনিক

কী কী কারণে রামপালে বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা অত্যাবশ্যকঃ

কী কী কারণে রামপালে বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা অত্যাবশ্যক সে বিষয়ে আমার সীমিত জ্ঞানের আলোকে কিছু যুক্তি ও ব্যাখ্যা উপস্থাপন করলাম। এই প্রকল্প সুন্দরবনের মতো একটা সমৃদ্ধ বনাঞ্চল বিনষ্ট করার অপপ্রয়াশ ছাড়া আর কিছুই নয়। আর এতে শুধু সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্থ হবেনা বরং সমগ্র দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ বৈষম্যহীন হয়ে পড়বে। আমি মনে করি সরকার এবং এই প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি বিষয়টি নিয়ে পুনরায় ভাববেন।
১। প্রয়োজনীয় কাঁচামালঃ রামপালে যে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে সেই প্রকল্পের মূল কাঁচামাল “কয়লা”, যার পুরোটাই ভারত থেকে আমদানী করা হবে। দেশীয় সম্পদ ব্যবহারের কথা এই প্রকল্পে মোটেও বিবেচনা করা হয়নি। বাংলাদেশের যে অঞ্চলে অর্থাৎ “বড় পুকুরিয়া” এলাকায় প্রচুর কয়লা মজুদ আছে সেখানে এই বিদ্যুৎ প্রকল্প বাবস্তবায়নের কথাও বিবেচনা করা হয়নি। নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার না করে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে আমদানীকৃত কয়লার উপর নির্ভর করে প্রকল্প বাস্তবায়ন কতটা যুক্তিযুক্ত?

২। বৈদেশিক মুদ্রার অপচয়ঃ রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের মূল কাঁচামাল কয়লা এবং দেশের উত্তরাঞ্চলে প্রচুর কয়লা মজুদ থাকা সত্ত্বেও ভারত থেকে আমদানীকৃত কয়লার উপর নির্ভর করে এই প্রকল্প চালিত হবে। যে উন্নতমানের কয়লার কথা বলা হয়েছে তা ভারতের পশ্চিমবঙ্গে উৎপাদিত হয়না এবং তা সংগ্রহ করতে হবে দক্ষিণ ভারতের ময়ুরভঞ্জ বা বিশাখাপত্তম এলাকা থেকে যা মূল্যের দিক থেকে কখনোই সাশ্রয়ী হবেনা বরং দেশীয় কয়লার ব্যবহার বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ অনেক কমিয়ে দেবে। তাই প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অপচয় করে কয়লা আমদানীর মাধ্যমে রামপালে বিদ্যুৎ প্রকল্প শখে হাতি পোষার সামিল হবে। প্রবাসী বাংলাদেশীদের রেমিটেন্সের মাধ্যমে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার এহেন অপচয় একধরণের বিলাসিতা।
৩। আর্থিক ক্ষতি ও সময় বিবেচনাঃ আমদানীকৃত কাঁচামাল বা কয়লার উপর পূর্ণ নির্ভরতা, পরিবহন সংকট ও বন্দর ব্যবহার জটিলতা, সময়মত শিপমেন্ট এবং সুদূরপ্রসারী আমদানি জটিলতা সাথে মূল্যবৃদ্ধি, মৃদ্রিষ্ফীতির কথা বিবেচনা করলে প্রকল্পের উৎপাদন ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

৪। পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থাঃ রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা রেল ও সড়ক যোগাযোগের দিক থেকে তেমন উপযুক্ত নয়। বর্ষা মৌসুমে জলপথে কিছুটা সুবিধা হলেও সড়ক পথ স্যাঁতসেঁতে ও কর্দমাক্ত বিধায় যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটবে। শুষ্ক মৌসুমে জল পথেও পরিবহন সংকট দেখা দেবে।

৫। রিহ্যাবিলিটেশনঃ রামপাল এলাকায় জনবসতি অপেক্ষাকৃত কম তাই উচ্ছেদের ঝামেলা কম হলেও সেখানকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এই প্রকল্পের তেমন কোন ভূমিকা থাকবেনা বরং এখানে যারা কাজ করবে তাদের আবাসিক সুবিধা, যাতায়াত ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে বিশাল পরিমাণ জমি ক্ষতিগ্রস্থ হবে এবং প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।

৬। বায়ু দূষণঃ সাধারণত বায়ু দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে ধাবিত হয়। রামপাল প্রকল্প দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে নির্মাণ হচ্ছে বিধায় বঙ্গোপসাগরের দিক থেকে বাতাস দেশের উত্তর-পূর্ব, উত্তর-পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হবে। এই প্রকল্প থেকে নির্গত ধোঁয়া, সালফার-ডাই-অক্সাইড, কার্বণ-ডাই-অক্সাইড, তাপ তরঙ্গ এবং সূক্ষ্ম ছাই ও ধূলিকণা দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় ছড়িয়ে যাবে। ফলে শুধু সুন্দরবন নয় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সকল সবুজ বেষ্টনী ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এছাড়া সুন্দরবনের গাছপালা, জীবজন্তু, পশুপাখী, মানুষ, গবাদি পশু বায়ু দূষণে আক্রান্ত হবে এবং জীবকূলের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়বে। এতে জীববৈচিত্র ধ্বংশ হবে, প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হবে, পুরো ইকো-সিস্টেমের উপর প্রভাব পড়বে। আমরা এই দেশে চেরনোবিল বা ভূপালের মত দূষণ আক্রান্ত হতে চাইনা।

৭। জল দূষণঃ রামপাল প্রকল্পের ভয়াবহ থাবা সবচাইতে বেশী প্রভাবিত ও তরান্বিত করবে পানি দূষণকে। প্রকল্প এলাকাজুড়ে বিভিন্ন নদী, শাখা-নদী, হাওর, বিল- এমন কি অদূরেই রয়েছে বঙ্গোপসাগর। বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট থেকে নির্গত তরল বর্জ্য ভূ-পৃষ্ঠ ও ভূ-অভ্যন্তরের পানি স্তরে ও আশেপাশের নদী-খাল-বিলে ছড়িয়ে যাবে। ফলে এই এলাকার মাছ, জলজ উদ্ভিদ, জলজ প্রাণী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এই এলাকার বিশাল এলাকা জুড়ে যে চিংড়ি ঘের বা চিংড়ি উৎপাদন প্রকল্প রয়েছে তা ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তাছাড়া বর্ষা মৌসুমে এই অঞ্চলের দূষিত পানি বিভিন্ন নদীর মাধ্যমে প্রবাহিত হয়ে দেশের নদী-খাল-বিল ও হাওড়গুলোকে দূষিত করবে। উপরন্তু শুষ্ক মৌসুমে এই এলাকার পানি নদীর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলকে দূষিত করবে ফলে ইলিশসহ অন্যান্য মাছের ব্রিডিং ব্যহত হবে, মাছের সংখ্যা আশংকাজনক হারে কমে যাবে।

৮। তরল বর্জ্য পরিশোধন প্রক্রিয়া বা ট্রীটমেন্ট প্ল্যান্ট প্রতিস্থাপনের বিশাল ব্যয়ভারঃ রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে যে পরিমাণ বায়ু ও পানি দূষিত হবে তা শোধন করার মতো ব্যয়ভার বা প্রক্রিয়া দুঃসাহসিক চিন্তার সামিল এবং এই বিশাল ব্যয়ভার প্রকল্পে সংকুলান করা সম্ভব কিনা তা’ও ভেবে দেখবার বিষয়। তরল বর্জ্য পরিশোধনের ব্যবস্থা করা গেলেও বায়ু দূষণ কোনভাবেই সম্ভব নয়, বিশ্বের কোথাও তেমন নজির নেই। অনেক কথাই মুখে বলা সহজ কিন্তু বাস্তবে কতটা কঠিন তার জলজ্যান্ত উদাহরণ হাজারিবাগের ট্যানারী বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা এবং তুরাগ ও বুড়িগঙ্গার অব্যাহত দূষণ প্রক্রিয়া যার সুরাহা আজও সম্ভবপর হয়নি। এমনকি ওয়াসা তার ওয়াটার ট্রীটমেন্ট প্ল্যান্টের মাধ্যমে পানি শোধন ও সরবরাহে কতটা সফল তা আমরা সকলেই জানি। একটু চিন্তা করে দেখুন ১ লিটার দূষিত তেল সাগরের ৭৫০০ মেট্রিক লিটার পানিকে দূষিত করতে পারে আর তা পরিশোধনের খরচ মিলিয়ন ডলারের বেশী। সুতরাং রামপালের দুষিত বায়ু ও তরল বর্জ্য পরিশোধন কিভাবে সম্ভব আর এই শোধন প্রক্রিয়ার শেষে অবশিষ্ট তলানি বা উচ্ছিষ্ট বর্জ্য কোথায় ডাম্পিং করা হবে এবং সেটা ঐ এলাকার পরিবেশের জন্য নিরাপদ হবে কিনা সেটাও ভেবে দেখবার বিষয়।

৯। বন উজাড়, গ্রীন-হাউস এফেক্ট ও এসিড বৃষ্টির আশংকাঃ রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প সুন্দরবনের কাছাকাছি এলাকায় অবস্থিত আর সুন্দরবন হলো বিশ্বের অন্যতম সেরা ম্যানগ্রুভ ফরেস্ট। সুন্দরবনের ইকো-সিস্টেম, বায়ো-ডাইভারসিটি, ইকোলজিক্যাল ভ্যাল্যু বিশ্বব্যাপি সমাদৃত। সুন্দরবনের বিশাল বনাঞ্চলের কারণে বাংলাদেশ অনেকটাই গ্রীন-হাউস এফেক্ট ঝুঁকি থেকে মুক্ত, এসিড বৃষ্টির প্রকোপ রোধে সক্ষম। আর এই বনাঞ্চলের আশেপাশে এই ধরণের বিদ্যুৎ প্রকল্প শুধুই ঝুঁকিপূর্ণ নয় বরং পুরো ইকো-সিস্টেম বা প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট করার জন্য যথেষ্ট। এখনো যে কয়টি বিলুপ্তপ্রায় পশুপাখী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে টিকে আছে সেটাও চিরতরে ধ্বংশ হবে। মিঠা পানির কুমীরও থাকবেনা। কালক্রমে এর প্রভাব মানুষের উপর আসবেই। আমাদের সুস্থ হয়ে টিকে থাকার সম্ভাবনা কমে আসবে।

১০। অবকাঠামোগত নির্মাণ ও ভূমি ব্যবহারে সমস্যা, বৈদ্যুতিক পোল স্থাপন ও বৈদ্যুতিক তারের বিদ্যুৎ প্রবাহের ভয়াবহতাঃ রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা অপেক্ষাকৃত নীচু, অসমতল, বন্যা প্রবণ ও জলমগ্ন এলাকা হওয়ার কারণে অবকাঠামো নির্মাণ কাজে ব্যপক সমস্যার সৃষ্টি হবে। এলাকার আশেপাশে জলাভূমি থাকার কারণে মাটি ভরাটের প্রয়োজন হবে এবং এই মাটি সংগ্রহের জন্য ভূমি ব্যবহারে প্রভাব ফেলবে। বৈদ্যুতিক পোল ও বৈদ্যুতিক তার যে পথে বিস্তৃত হবে সেই এলাকার আশেপাশে পশুপাখীর বসতি বিনষ্ট হবে, অনেক গাছ কাটা পড়বে ফলে পশুপাখীর প্রজনন কমে আসবে। প্রকৃতি একটা ভারসাম্যহীন অবস্থায় বিরাজ করবে।

আরও অনেক বিষয় আছে যা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা ও বিশদ ব্যাখা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতামত ও বিশ্লেষণমূলক রিপোর্ট পর্যালোচনা করা আবশ্যক। একটা দেশ ও জাতির ভবিষ্যত চিন্তা করেই এমন ধরণের প্রকল্প হাতে নেয়া উচিৎ। আমাদের বিদ্যুতের প্রয়োজন আছে একথা সত্য তবে স্থান নির্ধারণে সতর্ক না হয়ে শুধুই আবেগের বশবর্তী হয়ে বা রাজনৈতিক চাপে কোন ভুল সিদ্ধান্ত একটা জাতির উপর চাপিয়ে দেয়া কোনভাবেই সমীচীন নয়। বরং দেশের উত্তারাঞ্চলে কথা “বড় পুকুরিয়া” বা তার আশেপাশের এলাকায় যেখানে কয়লার প্রাচুর্যতা আছে সেখানে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে একটা মহামূল্যবান বনাঞ্চল বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পায়। আমাদের সকলকেই বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে, লাভ ক্ষতির হিসেবটা নানাদিক থেকে নানাভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ টীম করে রিভিয়্যু করা যেতে পারে। তাতে প্রকল্পের কোন ক্ষতি হবেনা বরং জাতি উপকৃত হবে।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা আত্ম উন্নয়ন পরিবেশ ও বন সৃজনশীল প্রকাশনা

গুরুচন্ডালী-১: “প্রাত ভ্রমন, আমি ও কয়েকটি কাকতাড়ুয়া”

শিরোনামঃ গুরুচন্ডালী-১: “প্রাত ভ্রমন, আমি ও কয়েকটি কাকতাড়ুয়া”

উপ-শিরোনামঃ “আবারও প্রাতভ্রমন (জগিং) ও কিছু কথা (চলিত ও সাধুভাষায় লিখিত(গুরুচন্ডালী))

পূর্বে সামুতে ও টেকটিউনসে লিখিতাম কিন্তু সরকার যেইভাবে বাকরুদ্ধ করিয়া রাখিতে চাহিতেছে তাহাতে ফেসবুকে লিখা ছাড়া আর গতি নাই । তাই এইখানেই এখন থেকে লিখিব বলিয়া ঠিক করিলাম । তথাপি ইজি পাবলিশনসেও এর একখানা কপি প্রকাশ করিলাম ।

সকাল ৫ টায় ঘুম থেকে উঠিয়া দন্ত মাজন শেষে মা’কে বলিলাম, “দরজাটা বন্ধ করিয়া দাও, আমি প্রাতভ্রমনে যাইতেছি” । মা বলিলেন, “দেশের অবস্থা ভাল না এত সকালে জগিং না করিলে কি নয়? আবার তুই ইন্টারনেটে কি সব যা-তা লিখিস, না জানি কবে তোকে পুলিশ ধরিয়া লইয়া যায়” ।

মা জানেন আমি কারো বাধ্য নই, সেনানিবাসের মহাবিদ্যালয়ের(কলেজ) কঠোর নিয়মই আমাকে বশ করিতে পারে নাই আর মামুলি কয়েকটা পুলিশ কি করিবে ! হস্তে সময় কম কারন আগে আগে না বাহির হইলে পরে সুরজ খানা পূব গগনে উদিত হইলে আর রক্ষা নাই, প্রাতভ্রমন এইখানেই শেষ করিয়া বাসায় ফিরিতে হইবে নতুবা গা গরম হইয়া শরীরে পানিশূন্যতা তৈয়ার হইতে পারে ।

আমি বলিলাম, “পুলিশের তো আর কোন কাজকর্ম নাই আমার মতন একটা কানামাছিকে ধরিয়া নিয়া যাইবে, উহাদের কোন লাভ হইবে বলিয়া আমার ধারনা হয় না, যদিওবা ধরিয়া নিয়া যায় তাহা হইলে বড়জোড় কানামাছি কানামাছি খেলা ছাড়া আর কোন কিছু করিতে পারিবে বলিয়া মনে হয় না” । মা কিছুটা বিরক্ত হইয়া, “ঠিক আছে কথা না বাড়াইয়া সাবধানে যাস, গেটের চাবি তোর বাবার কাছে, নীচে মনে হয় ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ পাঠ করিতেছেন” । আমি বলিলাম, “না দরকার হইবে না, আমার কাছে একখানা চাবি আছে । তুমি ঠান্ডা পানি দিয়া দুইখানা রুটি তৈয়ার করিও আর একটা অর্ধ ভাঁজা (হাফ পোজ) ডিম রাখিও যদি শরীর ভাল বোধ করো, আমি প্রাতভ্রমন শেষে নাস্তা সারিব আর যদি শরীর অসুস্থবোধ করো তাহা হইলে বুয়াকে তৈয়ার করিতে বলিও” ।

 

বুয়ার তৈয়ারী খাবার আমি ইদানিং জোরপূর্বক গলাধকরণ করাৱবার চেষ্টা করিতেছি কারন আমি জমিদারের নাতি বৈকি । বশিরউদ্দিন খান (পরে সরকার নাম ধারন করেন) আমার বাবার নানা, যিনি ভাওয়াল(জয়দেবপুর ও গাজীপুর) রাজার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, নথিপত্র ঘাটিলে এখনও গাজীপুর আদালতের ভাওয়াল যাদুঘরে তাহার নাম ও প্রমান পাওয়া যাইবে । তাহার মেয়ে মোসাঃ হাছনা খানম কালীগঞ্জ জমিদার পচাব্দী গাজী’র ছেলে এম,এ, ওহাব সরকার(পরে মুনসী নাম ধারন করেন) এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন । পচাব্দী গাজী ও বশিরউদ্দিন সরকার উভয়ই বিভিন্ন পরগনায় ভাওয়াল রাজার নিকট হইতে জমিদারী পাইয়া ছিলেন এবং ওনারা আমার শ্রদ্ধেয় প্র-পিতামহদ্বয় । ব্রিটিশ আমলে জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হইলে আমার দাদাজান এম,এ,ওহাব সরকার, সরকারী ল্যান্ডলর্ড নিযুক্ত হন (বর্তমানে পূর্বাচল টাউন)। সরকারী কাজ করার দরুন তাহার নামের পরে সরকার যুক্ত হয় কিন্তু পরবর্তীতে মসজিদে ইমামতি করার কারনে তাহা পরিবর্তিত হইয়া মুনসী প্রচলিত হয় । মানুষের ধান ক্ষেতে ঘোড়া দৌড়ানোই তাহার সারাদিনের রুটিন ছিল কিন্তু পরে তিনি অনুতপ্ত হইয়া কলকাতা হইতে ডাক্তারী পড়িয়া মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন ।তাহার গুণকীর্তন করা আমার উদ্দেশ্য নহে বরং নিজের পরিচিতিও এইখানে তুলিবার ইচ্ছা ছিল না কিন্তু কেন বলিলাম তাহা বোধ করি নিচের বাক্যগুলি পাঠে বুঝিতে পারা যাইবে ।জমিদারের নাতি হইয়া জমিদারী দেখানো আমি পছন্দ করি না কিন্তু বলার উদ্দেশ্য হইতেছে জমিদাররা ছিল অত্যাচারী আবার অনেকে কথায় কথায় বলে আমার দাদা জমিদার ছিল কিন্তু বাস্তবিক কোন প্রমাণ দিতে বলিলে বলে অনেক জমি ছিল আমার দাদার তাই জমিদার কিন্তু জমিদারী আমলে সাধারণ কাহারও নিজের জমি ছিল বলিয়া আমার ধারনা নাই; সকল জমিই জমিদারদের ছিল আর বাকিরা তার ভোগ দখলের খাজনা দিত অতি উচ্চহারে, তাই জমিদার পরিচয় দিয়া নিজেকে বড় ভাবিবার কোন অবসর আমি পাই নাই কারন জমিদারগণ অতিব অত্যাচারী ছিলেন । অন্যদিকে যেহেতু আমাদের দেশে বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষই ব্যাবসা করিতে আসিত আবার অনেকে বিবাহ করিয়া থাকিয়া যাইত তাই বার জাতের রক্ত মিশিয়া আমাদিগকের রক্ত একখান ষান্ডার কিংবা জোঁকের রক্তে পরিনত হইয়াছে যাহার কারনে না চাইলেও মানুষকে কষ্ট দিতে স্বীয় রক্তবিন্দু গুলি টগবগ টগবগ করিতে থাকে ।

যাহা হোক মূল বিষয়ে আসা যাক,

বাসা হইতে ইজতেমা ময়দান খুব বেশি দূরবর্তী নহে । ইজতেমা ময়দান মোট ১৬০ একর জমি বা ৭০ লক্ষ বর্গফুটের এক বিশাল মাঠ, একপাশে উত্তরা আধুনিক শহর ও অন্যপাশে বাংলাদেশের প্রথম শিল্পনগরী টংগী(যাহার গোড়া পত্তন হয় ব্রিটিশ আমলের শেষের দিকে ); মধ্যিখানে কোলঘেঁষে বয়ে গেছে তুরাগ নদী যার ৩০ বছর পূর্বেকার নাম ছিল কহর দরিয়া । এই নদীতেই প্রাত ভ্রমন শেষে স্নান করিতেন এক সময়কার মহারানী সোনাবানু, তাহার কিছু ধ্বংসাবশেষ ও রুপকথা মানুষের মুখে এখনও শুনিতে পাওয়া যায় ।

হাটিতে লাগিলাম, অবশেষে ইজতেমার প্রধান গেইটে প্রবেশ করিলাম, পিচঢালা পথ সোজা মাঠ পর্যন্ত চলিয়া গেছে, একপাশে বাটা সু কোম্পানী লিমিটেড অন্যপাশে আশরাফ টেক্সটাইল মিলস, এক সময় এই প্রধান ইজতেমার রাস্তায় সারিবদ্ধ কড়ই গাছ ছিল পাশে ছিল আশরাফ টেক্সটাইলের পুকুর । দিনগুলি আজ কোথায় হারাইয়া গেল তাহাই ভাবিতে লাগিলাম, সেই পুকুরে কত গোসল করিয়াছি, মাঝে মাঝে দারোয়ানকে ফাকিঁ দিয়া বড়শির ছিপ ফেলিয়া কত মাছও ধরিয়াছি আর আজ সেইখানে এক সুবিশাল মার্কেট ‘আশরাফ সেতু’ । যাহাই হোক হাটিতে লাগিলাম কারন এই পিচঢালা পথে দৌড়ানো বোকামি হইবে কারন হোচট খাইলে পুরো রক্তারক্তি হইতে বাধ্য । সামনেই রাস্তাটা শেষ হইল, কিছু দাড়ি টুপির আর আরবের পোষাক পরিচ্ছদে ঢাকা বুজুর্গান চোখে আসিল, তাহারা মেছওয়াক করিতেছিল মনে হয় এইমাত্র নামাজ শেষ করিয়া মেছওয়াক করিতেছে । জানি না এই সত্য কথা টা লেখা ঠিক হইবে কিনা, ইহাদের ব্যাপারে?, ইহারা সর্বদা এইরূপ মেছওয়াক বা দন্তমাজন করিয়া থাকেন নিবারক নিম গাছ দিয়া কিন্তু তাহার পরও আমি দেখিয়াছি তাহাদের মধ্যে বেশিরভাগেরই মুখে দুর্গন্ধ, তাই তীব্র আতঁর জাতীয় সুগন্ধী মাখিয়া থাকেন সর্বক্ষণ; শাক দিয়া জ্যান্ত মাছ ঢাকিবার প্রয়াস আরকি । মেছওয়াক করা সুন্নত বৈকি কিন্তু তার মানে এ্ই না যে ব্রাশ আর টুথপেষ্ট ব্যাবহার করিলে তাহা সুন্নত হইবে না বা ব্রাশ ব্যাবহার করা হারাম । আসুন দেখি কেনই বা সুন্নত বলা যাইবে না, মহানবী(সাঃ) একজন অতি উচ্চ পর্যায়ের বিজ্ঞানী ছিলেন, তিনি মেছওয়াক করিতে বলিয়াছেন গাছের ডাল দিয়া আর আধুনিক সময়ে উহার সংস্করণ হইল ব্রাশ আর টুথপেষ্ট; যাহা মেছওয়াকেরই ভিন্নরুপ, এক হিসাবে বলিতে পারেন তিনি ব্রাশের আবিষ্কারক । কেহ যদি আযান দেওয়ার জন্য মাইক ব্যাবহার করিতে পারেন, মসজিদে আলোর জন্য বৈত্যুতিক বাতি আর আরামের জন্য পাখা বা এসি ব্যাবহার করিতে পারেন, দ্রুত যাতাওয়াতের জন্যে ঘোড়া না ব্যাবহার করিয়া যানবাহন ব্যাবহার করিতে পারেন, যোগাযোগের জন্য কবুতর ব্যাবহার না করিয়া মোবাইল ব্যাবহার করিতে পারেন, খড়ম না পরিয়া জুতা পরিতে পারেন, হজ্জ্বের জন্য উট ব্যাবহার না করিয়া উড়োজাহাজ ব্যাবহার করিতে পারেন তাহা হইলে কেন ব্রাশ ব্যাবহার করা যাইবে না?? যাই হোক কাহারো সাথে কুতর্কে যাইতে চাহি না । “ইহা যার যার বুঝ, দাড়ি ফেলিয়া রাখিয়াছে মোছ” । আবার আরেক ব্যাপার উপস্থিত হইল, মোছ বা গোফ রাখিব নাকি দাড়ি? আমাদের দেশের অনেকেই আমার সাথে একমত হইবেন না জানি তবে আমি দাড়ি বা গোফ এর ব্যাপারে বিশদ গবেষণা করিয়া দেখিয়াছি আরবদের হিংস্র মাংসাসী ও রাজকীয় প্রাণী হইতেছে সিংহ । সিংহের দাড়িসদৃশ কেশর থাকে যাহা পুরুষত্বের ধারক বলিয়া আরবে হাজার বছর ধরিয়া চলিয়া আসিতেছে । পূর্বে দাড়ি ছাড়া পুরুষদের লেজকাটা বানর বলিয়া ধারনা করা হইত । তাহলে আমাদের সংস্কৃতি কি বলে?? আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি ঘাটাইলে যা পাওয়া যাইবে তাহা হইল আমাদের সমগ্র বাংলাদেশেই এক সময় সবর্ত্র বিচরণ করিয়া বেড়াইত এখনকার রাজকীয় বাঘ রয়েল বেঙ্গল টাইগার, বলাবাহুল্য ইহাদের দাড়ি নাই তবে যেহেতু বিড়াল প্রজাতি তাই গোফ আছে যাহা হাজার বছর ধরিয়া আমাদের পুরুষগন পুরুষত্ব দেখাইবার জন্য গোফ রাখিয়া আসিতেছেন এই বাঘের গোফের অনুকরণে । আসলে দাড়ি বা গোফ কিংবা মেছওয়াক কোনটাই আমার উদ্দেশ্য নহে, যাহার যা করিতে মন চায় সে উহাই করুক তাতে অন্যের এত ভাবনার বিষয় কেন? যাহা হোক, হুজুরকে পাশ কাটাইয়া জগিং শুরু করিলাম । আমাকে দেখিয়া তাহার চোখমুখ কুঞ্চিত হইয়া গেল, হয়ত মনে মনে ভাবিতেছে, “ইহারা জাহান্নামের খড়ি, সাত সকালে নামাজ না পড়িয়া ইংরেজ ফিরীঙ্গীদের লেবাসে(পোষাকে) আসিয়াছে পবিত্র ময়দানে ফালাফালি করিতে” আমি অন্যদিকে চোখ ফিরাইয়া নিলাম কারন আমি নিয়মিত না হইলেও প্রায়শই নামাজ আদায় করি । যাহাই হোক, শ্লথ গতিতে দৌড়াইয়া নদীর তীরে কিছুক্ষণ থামিয়া আবার হাটিতে লাগিলাম । নদীর মিশকালো জল ও নাক ঝাঁঝালো গন্ধে নাসারন্ধ্র বন্ধ হইবার যোগাড় । দম বন্ধ করিয়া আবার হাটিতে লাগিলাম হঠাৎ লক্ষ্য করিলাম একজন মাঝি বা জেলে ডিঙ্গি নৌকা সমেত নদীর কিনারায় কি যেন করিতেছেন, ভাবিলাম এই জলে মাছ কিভাবে ধরিবে, মাছ তো দূরে থাকিবে এই নদীতে এখন ব্যাঙও পাইবে না, তাহা হইলে সে কি করিতেছে?? অত্যন্ত উৎসাহের সহিত নিকটে গেলাম, সে একজন মাঝি না তবে মহিলা মাঝি বা জেলে বলা যাবে কিনা বুঝিতে পারিলাম না কারন সে মাছ না ধরিয়া বিভিন্ন বোতল ও আবর্জনা কুড়াইতেছিল (ধরিতেছিল) । হয়ত ভবিষ্যতে তাহার নাম হইবে মাঝি বা জেলে কিন্তু সংজ্ঞা খানা বদলাইয়া এইরকম হইবে: জেলে ও মাঝির সংজ্ঞাঃ “যাহারা নৌকায় চড়িয়া খাল বিলে বা পুকুরে (পূর্বে নদী ছিল) পুনঃব্যাবহার করা যায় এমন সব আবর্জনা ছিপ বা জাল দিয়া ধরিয়া থাকেন উহাদের মাঝি বা জেলে বলা হয়, যেমন পদ্মা বিলের মাঝি বা জেলে, তুরাগ  খালের মাঝি বা জেলে কিংবা বুড়ীগঙ্গা পুকুরের মাঝি বা জেলে ইত্যাদি” ।

প্রাতভ্রমন আর কি করিব, মনখানা সাত সকালেই খারাপ হইয়া গেল, মহিলা মাঝি আমাকে দেখিয়া কিছুটা অপ্রস্তুত হইয়া বলিল, “কিছু বলিবা বাবাজি?” আমি উত্তর দিলাম, “না চাচী, দূর থাকিয়া দেখিয়া ভাবিয়াছিলাম আপনি মাছ ধরিতে ব্যস্ত কিন্তু কাছে আসিয়া যাহা দেখিলাম তাহা মানিয়া লইতে পারিতেছি না” ।

মহিলা উত্তর দিলেন, “কি আর করিব বাবাজি, এই দেশে কত গুলা কুত্তা আর শকুনের জাতেরে প্রতিবার ভোট দেই আর ক্ষমতায় আইলে গরীব মানুষের কথা, নদীগুলার কথা সব ভুইল্যা যায়” ।

আমি মাথা নাড়িয়া সায় দিলাম আর মুখে বললাম, “হুম্, আচ্ছা আপনি কাজ করেন আমি যাই”, বলে সামনে হাটতে থাকলাম ।

বিশাল মাঠ, দুবার চক্কর দিলাম আজকে, প্রায় ৫ থেকে ৬ কি.মি. হাটার সমান হবে । পূর্বপাশে সোর্ড ব্লেড ফ্যাক্টরী ও সোনাবানুর শেষ ধ্বংসাবশেষ, সম্মুখে হাটিতে থাকলাম, কিছু শালিক আর দাড় কাক সোর্ড ব্লেড ফ্যাক্টরীর ভিতরের কাঁঠাল গাছে বসিয়া ডাকিতেছে । ছোট বেলায় এই মাঠে কত অজানা পাখি দেখিয়াছি তাহার অনেকগুলো আর দেখি না, উহাদের মধ্যে ঘুঘু, বক, চিল, শঙ্খচিল, মাছরাঙা, দোয়েল, কোকিল আরো কত পাখি ছিল অনেকগুলার নাম জানিতাম না । আর এখন শুধুই কাক আর শালিক কিংবা চড়ুই; ভাবিতে ভীষণ কষ্ট লাগিল শৈশবে এই নদীতে ঝিনুক কুড়াইতাম মুক্তা পাওয়ার আশায় আজ ঝিনুক তো দূরে থাকিবে পানি টুকুও ধ্বংস হইয়াছে ।

তুরাগ নদীর এক সময়কার নাম ‘কহর দরিয়া’ ছিল বৈকি, তবে অনেকেই নদী, নদ আর দরিয়ার মধ্যে পার্থক্য বুঝিয়া উঠিতে পারে না, তাহাদের জন্য বলিতে হয় নদ বলতে বোঝায় যাহা হইতে দ্বীতিয় কোন স্রোত বা শাখা নদীর জন্ম হয় নাই যেমন ব্রহ্মপুত্র একটি নদ, অন্যদিকে নদী বলিতে বোঝায় যাহার থাকিয়া এক বা একাধিক নদ/নদীর জন্ম হইয়াছে যেমন পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ইত্যাদি, আবার যেসকল নদীতে বছরের সব ঋতুতে পানির স্রোত থাকে উহাদের দরিয়া বলা হইয়া থাকে । তবে ইহা নিয়া নানান মুনীষির নানান মতবিভেদ রহিয়াছে ।

বাংলাদেশে সর্বমোট ৮০০ এর উপরে নদ-নদী থাকিলেও ভারতের পানি চুরির কারণে তাহা ক্রমশ কমিতেছে । এই তুরাগ নদী এক সময় স্রোতস্বিনী ছিল সারা বছর তাই এর নাম ছিল কহর দরিয়া কিন্তু আজ নিথর কালো বিষের পেয়ালা মাত্র । ভারত আমাদের নদ/নদী গুলি যেইভাবে ধ্বংস করিয়া দিতেছে তাহার বিরুদ্ধে বর্তমানে বা অতীতে কোন রাজনীতিবিদ কিংবা মন্ত্রী আমলা কেহই কিছু করিতে পারিতেছেন না ।

মোটা অংকের টাকা খাইয়া অনেক পুলিশ কিংবা হর্তাকর্তারা দেদারসে দূষিত পানি আমাদের নদীতে ফালাইতে দ্বিধাবোধ করিতেছেন না, অন্যদিকে ভারত পানি বন্ধ দিয়া ৬৮ টা খাল খনন করিয়া পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা, বিহার ও অন্যান্য রাষ্ট্রে চাষভাষ করিয়া তাদের অর্থনীতি স্বচ্ছল করিতেছে বৈকি, এহেন সমস্যা যেনো কাহারও চক্ষুগোচর হয় না, বিশেষত গণমাধ্যম ও রাজনীতিবিদ’দের ।

কিছুদূর হাটিতেই একখানা তিলা-ঘুঘু চোখে পড়িল; বাটার সংরক্ষিত বনের ভিতরের এক দেবদারু গাছে । মনে কিছুটা আশার সঞ্চার হইল ভাবিলাম এখনও আমাদের ঘুরিয়া দাড়াইবার সুযোগ আছে, এই দেশের নদী, প্রাকৃতিক বন আর পশুপাখিদের বাঁচাইবার নিমিত্তে এখনও সময় আছে । জানি আপনারা বলিবেন, শুধুমাত্র একটা লেখা দিয়া আর কি হইবে, তবে আমি বলিব আর কিছু না হোক কিছু লোক যাহারা আমার লেখা অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে পাঠ করিয়াছেন তাহাদের কেউ কেউ যদি মনেপ্রাণে মাতৃভূমির পরিবেশ, নদ-নদী ও পশুপাখি বাচাইবার নিমিত্তে চিপস খাওয়ার পর উহার প্যাকেটটা ডাস্টবিনে ফেলে ইহাই-বা কম কিসের ।

তাহা ছাড়া আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ কলকারখানায় চাকুরী করেন বা করবেন অথবা কলকাখানার ব্যাবসা করেন বা করবেন; তখন আমার এই একখানা লেখা পড়িয়া থাকিলে অন্তত নদী বা পরিবেশ দূষিত হয় এইরূপ কর্ম হইতে বিরত থাকিবেন আশা করি এবং অন্য কাউকে করিতে দেখিলে তাহা ফিরাইবার চেষ্টা করিবেন, যাহাতে কয়েকটি কাক না সাজিয়া কাকতাড়ুয়া হইয়া সকল কাকনামের ধারক কুলাঙ্গারদের দেশ থাকিয়া তাড়াইতে পারি ।

পাঠককে অশেষ ধন্যবাদ।

——–সাকি বিল্লাহ্

 

Categories
অনলাইন প্রকাশনা গবেষণামূলক প্রকাশনা পরিবেশ ও বন

বিলুপ্তির পথে বাংলাদেশের হাতি

বাংলাদেশ বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম। আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা অনেক বেশি। তার পরও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে আছে আমাদের বন্য প্রাণী। যদিও সরকারিভাবে বলা হয়, আমাদের বনের পরিমাণ মোট আয়তনের ১৬ শতাংশ; কিন্তু গবেষণা গ্রন্থ ‘স্টোলেন ফরেস্ট’ থেকে জানা যায়, আসলে মাত্র ৬ শতাংশ বন কার্যকরভাবে টিকে আছে। তাও আবার বছরে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ হারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। বনের যখন এ করুণ অবস্থা, সে তুলনায় বন্য প্রাণীর সংখ্যা এখনো আশাব্যঞ্জক। বাংলাদেশের আবহাওয়া, বিশেষ করে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বায়ুর চাপ, ঋতুচক্র, পানি ও মাটির উপাদান বন্য প্রাণীর জন্য উপযোগী হওয়ায় ৫৬ হাজার বর্গমাইল আয়তনের ছোট এ দেশটি জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। জীববৈচিত্র্যের তালিকায় স্তন্যপায়ী হাতির উপস্থিতি বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে বিশেষ স্থান করে দিয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট নানা কারণে সারা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশেও জীববৈচিত্র্য এখন হুমকির মুখে। বাড়তে থাকা জনসংখ্যার চাপ, ব্যাপক হারে বন উজাড়, বন্য প্রাণী শিকার, নদীর নাব্যতা এবং ভারসাম্যহীন পরিবেশই বন্য প্রাণীকে বিপন্নতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আর এসব কারণে অন্য বহু প্রাণীর মতো বাংলাদেশে বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে হাতি। বাংলাদেশের বনাঞ্চলে হাতির সংখ্যা মাত্র ১৯৬ থেকে ২২৭টি। আর এদের বিচরণ দেশের ১১টি বন বিভাগে। একসময় ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রামে হাতি দেখতে পাওয়া যেত; কিন্তু হাতির সেই বিস্তীর্ণ বিচরণস্থল ক্রমেই সংকুচিত হয়ে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য জেলায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। আইইউসিএনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বন বিভাগের চট্টগ্রাম দক্ষিণ অঞ্চলে হাতি আছে ৩০ থেকে ৩৫টি, কক্সবাজার উত্তর ও দক্ষিণ বিভাগ মিলিয়ে আছে ৮২ থেকে ৯৩টি, বান্দরবানে আছে ১২ থেকে ১৫টি এবং লামা বিভাগে আছে ৩৫ থেকে ৪০টি। এ ছাড়া কক্সবাজার উত্তর বিভাগে আরো ৭ থেকে ৯টি এবং দক্ষিণ বিভাগে ৩০ থেকে ৩৫টি হাতি রয়েছে। আর অভিবাসী হাতির সংখ্যা ৮৪ থেকে ১০০টি। হাতি কমে যাওয়ার ৯টি কারণও আইইউসিএনের গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বনভূমি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া, খাদ্যাভাব, চলাচলের রাস্তা কমে যাওয়াসহ নানা কারণে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের হাতি। হাতি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার বড় কারণ হচ্ছে চোরা শিকারিদের অপতৎপরতা। ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত শুধু পার্বত্য বান্দরবান ও কক্সবাজারের ছয়টি উপজেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চলে দাঁত ও হাড়গোড়ের জন্য ৩২টি হাতি হত্যা করা হয়। ২০১০ সাল পর্যন্ত এই হত্যার তালিকা আরো দীর্ঘ হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। গহিন অরণ্যে ফাঁদ পেতে, বিষ খাইয়ে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারিরা হাতির দাঁত ও হাড় সংগ্রহ করে তা উচ্চমূল্যে বিদেশে পাচার করছে। বাংলাদেশের অনেক বন্য প্রাণী হারিয়ে গেছে। হারিয়ে যেতে বসেছে অনেক প্রাণী। হাতি এসব প্রাণীর মধ্যে প্রধানতম। আর নির্বিচার শিকার হাতি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার মূল কারণ। বাংলাদেশ হাতিসহ অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অনুকূল বিচরণ এলাকা হলেও বর্তমানে প্রাকৃতিক বনের এ প্রাণীগুলোর সবই দেশ থেকে নিদারুণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে শুরু করেছে। স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের এই সর্বনাশা বিলুপ্তি আমাদের পরিবেশ-প্রতিবেশ ব্যবস্থায় সৃষ্টি হতে চলেছে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির।
আজিজুর রহমান (কালেরকণ্ঠ)