Categories
অনলাইন প্রকাশনা উপন্যাস গল্প জীবনী ও স্মৃতিকথা বিনোদন ভয়ংকর(হরর) ভালবাসা/প্রণয়লীলা ভুতুরে গল্প সৃজনশীল প্রকাশনা

বিষন্ন বিরিওজা-৫,৬,৭,৮ ও ৯

—ডঃ রমিত আজাদ

বিষন্ন বিরিওজা – ৫

 

(পূর্ব প্রকাশিতের পর থেকে) :::::::: অন্যান্য (বিষন্ন বিরিওজা’র ১,২,৩ ও ৪ )পর্বগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন

বিকেল বেলাটায় আমার মনটা খুব বিষন্ন হয়ে ওঠে। আমি জানিনা কেন। সত্যিই জানিনা। ছেলেবেলার কোন ঘটনা কি এর সাথে জড়িত? আমি অনেক মনে করার চেষ্টা করেছি। কিছুতেই মনে করতে পারিনি। অবচেতন মনে কি কিছু রয়ে গেছে? কে জানে!

আগেই বলেছি যে আমার রূমটা ছিল অনেকটা ক্লাবের মত। দেশী-বিদেশী বহু বন্ধুরা আমার রূমে আসতো। ডরমিটরির বাইরে থেকেও আসতো। অথচ ঠিক বিকালটায় কেউই আসতো না। কেন? কে জানে! এটাও একটা আশ্চর্য্য ব্যাপার। সামারের দিনগুলোতে বাইরে কোথাও না বেরোলে আমি একাই থাকতাম। বই পড়তাম অথবা টিভি দেখতাম। কখনো কখনো
জানালায় দাঁড়িয়ে শিশুর মত ঘন নীল আকাশে মেঘের বর্ণচ্ছটা দেখতাম।

কোন কোন দিন খুব বেশী মন খারাপ হলে হুমায়ুন আহমেদের ‘ইরিনা’ পড়তাম। চমৎকার একটা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লিখেছেন উনি। উনার বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী সমগ্র – ১, আমি দেশ থেকে নিয়ে এসেছিলাম। বইটার ভূমিকায় উনি লিখেছিলেন, রাশিয়ান বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী পড়ে তিনি ভীষণ প্রভাবিত হয়ে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লেখার সিদ্ধান্ত নেন। রাশিয়ান বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী যে দুর্দান্ত সেটা আমি আগেও জানতাম। হুমায়ুন আহমেদের লেখা পড়ার আগেই আমি পড়েছিলাম ‘রুশ বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী’ নামে একটি বই। বেশ কয়েকটি গল্প ছিল সেখানে। বইয়ের প্রতিটি গল্পই অসাধারণ। আমি অভিভুত হয়ে গিয়েছিলাম। যাহোক সেগুলোর অনুকরণে লেখা হুমায়ুন আহমেদের লেখাগুলো, যেমন – ইরিনা, তোমাদের জন্য ভালোবাসা, তারা তিনজন, ইত্যাদি ভালোই হয়েছে। অনেকে উনার লেখার গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আমি সাধারণ পাঠক অত তত্বকথা বুঝিনা। হুমায়ুন আহমেদের লেখাগুলো পড়তে ভালো লাগে তাই পড়ি। উনার ‘সবাই গেছে বনে’ তো ভীষণ টাচি। বিদেশে আসার পর মনে হলো আমি ঐ গল্পের মধ্যেই প্রবেশ করেছি। মনে হয় আমেরিকার ফার্গোর মত ইউক্রেনের খারকভও বরফে আকন্ঠ ডুবে আছে। গল্পের নায়িকা চঞ্চল মালিশার মতো প্রজাপতির পাখায় উড়ে সব মেয়েরা আমার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

টুক টুক টুক। দরজায় নক করার শব্দ শুনতে পেলাম। এই পড়ন্ত বিকালে আমার রুমে কখনোই কেউ আসেনা। ভুল শুনছি নাতো? কান খাড়া করলাম। আবারো শুনলাম, টুক টুক টুক। নাহ্‌ ঠিকই আছে, শব্দটা আমার দরজায়ই। কেউ এসেছে। কে? সাশা? খালেদ? বাঙালীদের কেউ? যেই আসুক, ভালোই। গল্প করা যাবে। গল্প করে আমার বিষন্ন মনটা কিছুটা হলেও হালকা হবে।

দরজা খুলে সামনে যাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম, তাতে রীতিমতো অবাকই হলাম। যিনি ইতিপূর্বে আমার রূমে কখনোই আসেননি। এবং এর আগে তার সাথে আমার কুশল বিনিময় ছাড়া আর কোন আলাপই হয়নি। তার উপর তিনি পুরুষ নন, বরং একজন লাজুকলতা রমনী। রমনী বলা কি ঠিক হচ্ছে? সে তো নিতান্তই বালিকা, সদ্য যৌবনপ্রাপ্তা। মনে মনে আমি যার নাম দিয়েছিলাম, ‘বার্চ বনের প্রণরেনী’।

তাতিয়ানাঃ আমি কি ভিতরে আসতে পারি?
রিনরিনে মিস্টি কন্ঠ তাতিয়ানার। অনেকটাই বিস্মিত স্বরে বললাম

আমিঃ অবশ্যই, অবশ্যই।
তাতিয়ানাঃ অবশ্যই, অবশ্যই বলছো কিন্তু পথ তো ছেড়ে দিচ্ছ না।
আমিঃ ওহ্‌, সরি।
আমি দরজা থেকে সরে দাঁড়ালাম। লাস্যময়ী ভঙ্গিতে হেটে গিয়ে, লাবণ্য-লালিত মরালিনির ভঙ্গিতে ডিভানে গিয়ে বসলো তাতিয়ানা। আমি ডিভানে ওর পাশে না বসে, ওর থেকে সামান্য দূরত্বে একটা চেয়ারে বসলাম।

আমিঃ তোমার কি সাহায্যে আসতে পারি বলো?
তাতিয়ানাঃ তেমন কিছু না তোমার রূমে ‘প্রোস্তা মারিয়া’ দেখতে এসেছি। চোখে কৌতুক নাচিয়ে বললো তাতিয়ানা।

আমিঃ ও আচ্ছা। ঠিক আছে চ্যানেল চেইন্জ করে দিচ্ছি। দশ মিনিট পরে শুরু হবে বোধহয়।
তাতিয়ানাঃ দা, ইয়েসলি মোঝনা (ইয়েস প্লিজ)। (বলে ও মিস্টি করে হাসলো)।
‘প্রোস্তা মারিয়া’ একটি ল্যাটিন আমেরিকান টেলি সিরিয়াল। এখন বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে রাশিয়া ও ইউক্রেনে। এই সময়টাতে চারিদিকে খুব শুনসান থাকে, কারণ সবাই টিভি সেটের সামনে। বিশেষতঃ মেয়েরা।

‘প্রোস্তা মারিয়া’ একটি ভালোবাসার গল্প। মেক্সিকোর কাহিনী। সদ্য যৌবনপ্রাপ্তা তরুণী গ্রাম থেকে শহরে এসেছে ভাগ্যান্বেষণে। একটি বাড়িতে অনেকটাই পরিচারিকার কাজ নেয়, মারিয়া নামের মেয়েটি। তাঁর রূপ-সৌন্দর্য্য সরলতা এই সব কিছুতে মুগ্ধ হয়ে গৃহকর্তার তরুণ ছেলেটি মারিয়ার প্রেমে পড়ে যায়। ধীরে ধীরে তা গভীর সম্পর্কে রূপ নেয়। কিন্তু তাদের মধ্যে ছিল সামাজিক শ্রেণী বৈষম্যের ব্যারিয়ার। তাই তাদের সম্পর্ক কোন স্থায়ী পরিণতি বা হ্যাপী এন্ডের দিকে যেতে পারেনা। বরং এই সম্পর্কের কথা জানাজানি হয়ে গেলে মারিয়াকে সেই বাড়ি ছাড়তে হয়। কিন্তু ইতিমধ্যে তার গর্ভে এসেছে গৃহকর্তার তরুণ ছেলের সন্তান। বাইরে এসে মারিয়ার শুরু হলো কঠিন জীবন সংগ্রাম। ভালোবাসার কাছে পরাজিত কিন্তু প্রবল মনোবল সম্পন্ন সিঙ্গল মাদার মারিয়া এই সংগ্রামে বিজয়ী হয়। ‘প্রোস্তা মারিয়া (সাধারণ মারিয়া) থেকে সে হয়ে ওঠে অসাধারণ মারিয়া। এই নিয়েই মূলতঃ টেলি-সিরিয়ালটির কাহিনী। রাশিয়ানরা ফিল্ম জগতে বস্‌ হলেও, এই জাতীয় টেলি-সিরিয়াল তাদের দেশে প্রচলিত ছিলনা। তাছাড়া তাদের দেশের সমাজ জীবনের সাথে ল্যাটিন আমেরিকার সমাজ জীবন খাপ খায়না। কিন্তু তার পরেও এই আনইউজুয়াল সিরিয়ালটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এখানে। সবাই বেশ গোগ্রাসে গিলছে।

আমিঃ তোমার ‘প্রোস্তা মারিয়া’ ভালো লাগে?
তাতিয়ানাঃ হু, খুব ভালো লাগে। বাড়ীতে থাকতে একটা এপিসোডও মিস করি নাই। ডরমিটরিতে আসার পর দুয়েকটা মিস হয়ে গিয়েছে। আজ ভাবলাম তোমার কাছে যাই।

আমিঃ তোমার বাড়ি কোথায়?
তাতিয়ানাঃ গ্রামে, এখান থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে হবে।
আমিঃ তুমি গ্রামে থাকো?
তাতিয়ানাঃ হু, একদম গ্রামের মেয়ে। জানো গ্রামের মেয়েরা …………..।
কথা শেষ হওয়ার আগেই সিরিয়াল শুরু হয়ে গেল। আর তাতিয়ানার মনযোগ ঐদিকে চলে গেলো। আমি কফি বানাতে শুরু করলাম। দুকাপ কফি বানিয়ে ফোল্ডিং টেবিল খুলে, একটি কাপ ওর সামনে রাখলাম। ও আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে ধন্যবাদ জানালো। আমি কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে চুপচাপ ওকে দেখতে লাগলাম।

রাশিয়া-ইউক্রেনের মেয়েরা প্রায় সবাইই চোখ ধাঁধানো সুন্দরী হয়। তাতিয়ানা মেয়েটি সেই তুলনায় দেখতে তেমন সুন্দরী নয়।
অল্পবয়সী বলে একটা লাবণ্য আছে মাত্র। কাঁচা বয়সে নারী দেহের বাঁকগুলোর দিকে নজর যেতনা আমার, এখন যায়। তাতিয়ানা একমনে সিরিয়াল দেখছিলো। এই সুযোগে আমি ভালো করে ওকে দেখলাম। কাজটা কি এথিকাল? মনে হয় না। কিন্তু তারপরেও এটা ঘটে। পুরুষের চোখ নারীর দেহের বাঁকগুলোর দিকে বার বার চলে যায়। ওর পরনে ছিলো একটি লং স্কার্ট, আর টপস্‌। টাইট ফিট না, আবার ঢিলে-ঢালাও নয়। তাতিয়ানার শরীর পুরুষ্টু নয়, একে ভাদ্রের ভরা নদী বলা যাবেনা। হালকা গড়ন। তার দেহের বাঁকগুলো তেমন আকর্ষনীয় নয়। অল্প বয়সের কারণে স্বাভাবিক লাবণ্য থাকলেও ওর দেহের দীপ্তি সৌরভে মনে নেশা ধরানোর কিছু নেই।

হঠাৎ লুবনার কথা মনে হলো। লুবনার দেহের বাঁকগুলো কেমন? মনে করার চেষ্টা করলাম। না কিছুতেই মনে পড়ছে না। বুঝলাম মনে পড়ার কথাও না। লুবনাকে যখন দেশে রেখে এসেছি, তখন আমার কাঁচা বয়স ছিলো। ঐ বয়সে নারী দেহের বাঁকগুলোর দিকে নজর যেত না। বরং সবসময়ই মনে হয়েছে পূর্ণ রূপলালিত্যে ও যেন একটি প্রস্ফুটিত গোলাপ, একরাশ রজনীগন্ধার প্রশান্তি। আর লুবনাকে আমি ভালোবাসি। যাকে ভালোবাসি তাকে নিয়ে ওসব কথা ভাবা যায়না বোধহয়। অন্ততপক্ষে আমি কখনো ভাবিনি। ওকে আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখি। ও লুবনা, আমার লুবনা এটাই আমার কাছে সব। আর কোন কিছুই আমার কাছে কোন গুরুত্ব বহন করেনা।

ঐদিন টেলিসিরিয়াল দেখে ও চলে যায়। আর কোন কথা হয়নি। পরদিন বিকেলে আবারো যথারীতি আমার মন খুব খারাপ। বিশাল কাঁচের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আকাশে মেঘের খেলা দেখছিলাম। জানালার ডানপাশের বিরিওজা গাছটির পাতাগুলো গ্রীস্মের মাতাল বাতাসে তির তির করে কাঁপছিলো। কিছুটা দূরে ডরমিটরির একদল ছেলে মেয়ে ভলিবল খেলছিলো। সামারে এই একটা মজা, আউটডোর গেমস বেশ ভালো জমে। লেনা নামের একটি স্বাস্থ্যবতী সুন্দরী মেয়ে খুব ভালো খেলছিলো। ছেলেরাও পেরে উঠছিলো না। এই মেয়েটি সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে গত বছর যখন ও প্রথম ডরমিটরিতে আসে, ওর রূপের ঝলকানী দেখে অনেক পুরুষই নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। আমরা দর্শকরা আগ্রহ নিয়ে দেখছিলাম, শেষ পর্যন্ত মেয়েটিকে কে পায়। শেষমেশ যা হলো তাতে আমি হতাশই হয়েছিলাম। মেয়েটি অবশেষে ধরা দিয়েছিলো বিবাহিত একজন পুরুষের কাছে। তার সাথেই এখনো আছে। বিবাহিত পুরুষ আলেগ স্ত্রী নিয়ে আমাদের ডরমিটরিতেই থাকতো। প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর আলেগের স্ত্রী বাবার বাড়ী চলে গিয়েছিলো। আলেগ একা ডরমিটরিতে, সেই সময়েই লেনার সাথে আলেগের সম্পর্ক হয়। এরপর আর আলেগের স্ত্রীকে ডরমিটরিতে দেখিনি। লোকমুখে শুনছি তাদের মধ্যে ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে। আলেগ এখন লেনার সাথে লিভ টুগেদার করছে। সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে কি কি সব ঘটে! এসব দেখলে মন খারাপ হয়ে যায়।

টুক টুক টুক দরজায় নক করার শব্দ পেলাম। কে এলো এই ভর বিকেলে? দরজা খুলে দেখলাম গতকালকের তাতিয়ানা মুখে হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

তাতিয়ানাঃ কি হলো? আজও পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছো! ঢুকতে দেবেনা?
আমিঃ ও, হ্যাঁ, এসো এসো ভিতরে এসো। (অপ্রস্তুত হয়ে বললাম )।
গতকালের চাইতে কম জড়তা নিয়ে ও গিয়ে বসলো ডিভানে।
তাতিয়ানাঃ টিভি সেট অফ যে?
আমিঃ ও, না, মানে কিছু দেখছি না তো।
তাতিয়ানাঃ কি করো রূমে বসে বসে? বোর ফীল করোনা।
আমিঃ উঁ কিছুটা। মানে এখন কিছু করার নাই তো।
তাতিয়ানাঃ প্রোস্তা মারিয়া শুরু হতে আর পনের মিনিট বাকী। টিভি সেটটা অন করো।
আমিঃ ও হ্যাঁ, অন করছি। (আমি টিভি অন করলাম)
তাতিয়ানাঃ তোমার মন খারাপ মনে হচ্ছে?

আমি কৌতুক করার জন্য বললাম

আমিঃ মন খারাপ ছিলো তবে তোমাকে দেখে মন ভালো হয়ে গিয়েছে।
তাতিয়ানাঃ উঃ ফাজলামো না?
আমিঃ না, ফাজলামো হবে কেন? এমন সুন্দরী এক তরুনীকে দেখলে কোন ছেলের মন ভালো হয়না বলো?
মুহুর্তের মধ্যে ওর মুখে খুশীর ঝলক ছড়িয়ে পড়লো। কপট রাগ দেখিয়ে বললো
তাতিয়ানাঃ তুমি জোক করছো!
আমি ভাবলাম, এই মিথ্যে কথাটা বলা ঠিক হয়নি। ও সিরিয়াসলি নিলে তো কাজটা ভালো হবে না। পরমুহুর্তেই ভাবলাম। নাহ্ সিরিয়াসলি নেবেই বা কেন? দুদিনের মাত্র পরিচয়। তাছাড়া এদেশের মেয়েরা অত আবেগ প্রবন বলে মনে হয়না।

আমিঃ ইউনিভার্সিটিতে কেমন লাগছে?
তাতিয়ানাঃ ভালো।
আমিঃ কি ভালো?
তাতিয়ানাঃ সব ভালো।
আমিঃ তোমার বাড়ীর চাইতেও ভালো?
তাতিয়ানাঃ বাড়ী, না। মানে বাড়ী আর ডর্ম দুটা দুরকম। আমি আাসলে এর আগে ‘টেখ্‌নিকুমে’ পড়তাম। (টেখ্‌নিকুম হলো টেকনিকাল স্কুল যেখানে ক্লাস এইট শেষ করার পর ভর্তি হয় এবং তিন বছরের জন্য ভোকেশনাল ট্রেনিং ও পড়ালেখা করে। এটা শেষ করার পর একজন টেকনিশিয়ানের পেশায় যোগ দিতে পারে, আবার কেউ চাইলে ইউনিভার্সিটিতেও ভর্তি হতে পারে)

আমিঃ ও, কোথায় পড়তে।
তাতিয়ানাঃ এই খারকভেই। সালতাভকা এলাকায় আমার হোস্টেল ছিলো।
আমিঃ তাহলে তো তুমি খারকভে নতুন না।
তাতিয়ানাঃ না, নতুন না। কিন্তু ওখানকার হোস্টেলের পরিবেশ ভালো ছিল না। সেই হিসাবে এই ডরমিটরি অনেক সুন্দর।
আমিঃ কি খারাপ ছিলো ওখানে?
তাতিয়ানাঃ ওখানকার হোস্টেলে ম্যানেজমেন্ট খারাপ ছিল। কোন সিকিউরিটি ছিলো না। মাঝে মাঝে স্থানীয় লোকজন হোস্টেলে ঢুকে মেয়েদের ডিস্টার্বও করতো।
আমিঃ কি বলো? (আস্চর্য্য হয়ে বললাম আমি। অবশ্য এই জাতীয় কথাবার্তা আমি আগেও শুনেছি)।
তাতিয়ানাঃ হ্যাঁ, এরকমই। আমাদের দেশে তো মেয়েদের সম্মান বলে কিছু নেই!

আমি মনে মনে একটা দীর্গশ্বাস ফেললাম। দেশে থাকতে তথাকথিত প্রগতিশীলদের বক্তব্য শুনতাম। বাংলাদেশে মেয়েদের সম্মান বলে কিছু নাই। বাংলাদেশ তথা মুসলিম সমাজে নারীরা বন্দি। আর পাশ্চাত্যে নারীরা মুক্ত স্বাধীন। এখানে এসে চোখের সামনে যা দেখেছি ও দেখছি তার সাথে ঐ ধারণার কোন মিলই খুঁজে পাইনি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পট পরিবর্তনের পর পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। ইদানিং নারী একেবারেই এনজয়মেন্টের ইনস্ট্রুমন্ট হয়ে গিয়েছে। জায়গায় জায়গায় নাইট ক্লাব জেন্টেলম্যান্‌স ক্লাব খোলা হয়েছে। বৈধ-অবৈধ ব্রথেল খোলা হয়েছে। পর্নো পত্রিকায় দেশ ছেয়ে গেছে। এসব জায়গায় স্ট্রীপ শো থেকে শুরু করে নানা কর্মে মেয়েদের ব্যবহার করা হচ্ছে। পত্র-পত্রিকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ওপেনলি এইসব কাজে মেয়ে যোগারের বিজ্ঞাপন দেয়া হচ্ছে, ‘উচ্চ আয়ের সুযোগ আছে, কমপ্লেক্সহীন মেয়ে চাই’। এই কমপ্লেক্সহীন বলতে তারা কি বোঝাতে চাইছে? লজ্জাহীন, জড়তাহীন, নির্লজ্জ? তারা কি এই বোঝাতে চাইছে যে, লজ্জা-হায়া থাকা খারাপ, আনস্মার্টনেস? হায়রে!

আশ্চর্য দর্শন এই যে, মহিলা যখন
বিমানে বিমানবালা হয়ে মানুষের সেবা করে, তাদের সামনে ট্রে সাজিয়ে পরিবেশন করে এবং তাদের কামাসক্ত দৃষ্টিতে বিদ্ধ হয় তখন তা হয় ‘স্বাধীনতা’। পক্ষান্তরে সে যদি নিজের ঘরে নিজের জন্য, স্বামী ও সন্তানের জন্য, পিতামাতার জন্য খাবার রান্না করে তাহলে তা পরাধীনতা। এই আশ্চর্য দর্শনে নারীকে ভুলিয়ে বণিক সম্প্রদায় তাকে ব্যবহার করেছে বাণিজ্যিক স্বার্থে। তাকে বানানো হয়েছে প্রদর্শনীর বস্তু। সেলসগার্ল দরকার তো মহিলা হতে হবে, পণ্য বিক্রির প্রয়োজন তো মহিলারই বিক্রি করতে হবে। যেন তার রূপ- সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মানুষ পণ্য ক্রয় করে। তার প্রতিটি অঙ্গ খোলা বাজারের পণ্যে পরিণত হয়েছে। যে কোন মেলায় মেয়েদের ডেকোরেশন পিস হিসাবে দাঁড় করিয়ে রাখা হয় স্টলে। ইউরোপের কিছু কিছু এক্সিবিশনে তো একেবারে টু পিস পরিয়েও দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। ধনী বসের সেক্রেটারি হতে হবে সুন্দরী তরুনী, এমন কোনো বিজ্ঞাপন পাওয়া যাবে না, যাতে নারীর ছবি নেই। সেই সব ছবিতে নারীর পোষাক দিন দিনই সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছে। নারীকে পণ্য বানিয়ে নিজেরা অর্থ উপার্জন করছে। এর নাম দিয়েছে নারী স্বাধীনতা।

টেলিসিরিয়ালটি শেষ হওয়ার পর, গতকালের মত তাতিয়ানা সাথেসাথে উঠে গেল না। বুঝলাম ও আরো কিছু সময় বসতে চাইছে। বললাম

আমিঃ আর এক কাপ কফি খাই আমরা?
তাতিয়ানাঃ উ, না কফি না। কফি খেলাম তো। চা দিতে পারবে?
এমনভাবে বললো যেন আমরা অনেক দিনের বন্ধু। চা খেতে খেতে ও বললো

তাতিয়ানাঃ বাহ্‌, বেশ টেস্টি চা তো!
আমিঃ হ্যাঁ, আমাদের দেশের চা। আমি দেশ থেকে আনিয়েছি।
তাতিয়ানাঃ ও তাই। তোমাদের দেশে টেস্টি চা হয় আমি জানি।
আমিঃ কোথা থেকে জানলে?
তাতিয়ানাঃ জানি তো। ইন্ডিয়া, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা এসমস্ত দেশের চা খুব ভালো। আমাদের ক্রাসনাদার চা কোনরকম। আমার কাছে একেবারে পানসে লাগে। ইন্ডিয়ান চা আগে অনেক খেয়েছি। বাংলাদেশের চা এই প্রথম খেলাম।
ইত্যাদি আরো কিছু হালকা আলাপ-আলোচনার পর ও বিদায় নিলো।

পরদিন ক্লাস শেষে। ভাবলাম ডরমিটরিতে না গিয়ে একটু কোথাও ঘুরতে যাই। সামার ভ্যাকেশন তো কয়েকদিন আগে শেষ হয়ে গিয়ে এখন পুরো দমে ক্লাস শুরু হয়ে গিয়েছে। ভ্যাকেশন টাইমে যখন-তখন যেখানে-সেখানে বেড়ানো যেত। এখন তো নিজের ক্লাস রয়েছে, কারো রূমে যদি বেড়াতে যেতে চাই তারও ক্লাস আছে। তাই বিকেলটাই, বেড়ানোর জন্য ব্যবহার করতে হয়। যতদিন সামারের উষ্ণতা আছে, তারপর তো আবার ঠান্ডা শুরু যাবে তখন আর এত আরামে ঘোরাঘুরি করা যায়না। কোথায় যাব? কবীর ভাইদের ওখানে যাই। শহরের ঐ দিকটা আমার ভালো লাগে। তারপর হঠাৎ তাতিয়ানার কথা মনে হলো। মেয়েটা যদি, আমার রূমে এসে ফিরে যায়! বেচারী টেলিসিরিয়ালটা খুব পছন্দ করে। তারপর আবার ভাবলাম। ওর কথা ভেবে কি হবে? আমি আমার কথা ভাবি। ওর টিভি দেখা নিয়ে আমার চিন্তা কি, ও তো আর আমার বান্ধবী না। তারপর আবার মন খারাপ হলো, বান্ধবী-অবান্ধবীর ব্যপার না। জাস্ট মানুষ হিসাবে, মেয়েটা আশা নিয়ে টিভি দেখতে এলো, আর আমি রূমে নেই, ওর মন খারাপ হতে পারে। একটু দ্বিধা-দন্দ্বের মধ্যে পড়ে গেলাম। শেষ পর্যন্ত রূমে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

বাসস্ট্যান্ড থেকে নেমে আধা কিলোমিটারের মতো হেটে ডরমিটরিতে আসতে হয়। এই রাস্তাটা বেশ সুন্দর। আরো সামারে ঝাকড়া পাতায় ভরা গাছ-গাছালী। তার মধ্যে চোখ ধাঁধানো সব সুন্দরীরা নানা রকম বাহারী পোষাকে সজ্জ্বিত। কেউ মিনি স্কার্ট পড়া, কেউ টাইট প্যান্ট আর হাতা কাটা গেন্জী পড়া, কেউ কেউ হাফপ্যান্ট পড়াও আছে। একটি মেয়েকে দেখলাম লং স্কার্ট পড়া। মিশরের আহমেদের কথা মনে পড়লো। আমার সিনিয়র ফ্রেন্ড। উনি এখানে আন্ডারগ্রেড করেননি। দেশ থেকে পাশ করে, এখানে পি, এইচ, ডি, করতে এসেছেন। বেশ পরহেজগার। একদিন বললেন, ” আজ একটা মেয়েকে দেখলাম, উপরে গা ঢাকা সুন্দর টপস, নীচে লং স্কার্ট পড়া, আমি ভাবলাম বাহ্‌ বেশ তো মেয়েটি। কি সুন্দর পুরো গা ঢাকা কাপড় পড়েছে! তারপর মেয়েটি পিছন ফিরলে দেখলাম, স্কার্টটির পিছন দিকে প্রায় পুরোটাই কাটা। পায়ের প্রায় ৮০ পার্সেন্টই দেখা যাচ্ছে।” বেশ হাসি লেগেছিলো আহমেদের কথা শুনে।

রূমে এসে ভাতটাত খেয়ে একটা গল্পের বই নিয়ে শুয়ে শুয়ে পড়তে বসলাম। কিছুক্ষণ পড়ার পর। বাইরে হালকা আওয়াজ শুনতে পেলাম। ওরা ভলিবল খেলতে শুরু করেছে। যাক আমি বইটার মধ্যা ডুবে গেলাম। বইটা কিছুদিন আগে যোগার করেছি। কিছু ছোটগল্পের সমাহার। রবীন্দ্রনাথের লেখা কয়েকটি ছোটগল্প আছে। এরমধ্যে একটা ছিলো প্রেমের গল্প, একটি মেয়ের প্রতি একটি ছেলের আকুলি-বিকুলি মনের ভাবকে এত চমৎকার ভাষা মাধুর্য্য দিয়ে তিনি লিখেছেন। যা পড়ে মুগ্ধ হওয়া তো স্বাভাবিকই, উপরন্তু এই গল্প পড়ে যে কারোরই প্রেম করতে ইচ্ছে হবে। গল্পটা পড়ে মনে আবেশ ছড়িয়ে গেল। এরপর ঘড়ির দিকে তাকালাম। বিকাল ছয়টা। ওহ্‌ এসময় তো তাতিয়ানার আসার কথা। না ঠিক কথা বলে কিছু নেই। গত দুদিন এসেছিলো। তাই ভাবছিলাম আজও টিভি দেখতে আসবে হয়তো। আরো আধ ঘন্টা অপেক্ষা করলাম। না ও আসছে না। কি হলো? প্রোস্তা মারিয়া দেখবে না? একবার ভাবলাম, আমি টিভি সেটটা অন করি। একা একাই দেখি। তার পরমুহুর্তে আর ইচ্ছে হলোনা। টিভি আর অন করলাম না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওদের ভলিবল খেলা দেখলাম। ভরাট শরীর নিয়ে লেনা দৌড়াদৌড়ি করছে। ওর প্রেমিক বা হাফ-জামাইও খেলছে। কে জানে, জানালায় দাঁড়িয়ে অনেকেই হয়তো লেনাকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। যাক আমার অতশত চিন্তা করার দরকার নাই। ডিভানে বসে বসে আরো কয়েকটি ছোটগল্প পড়লাম। ইতিমধ্যে, উত্তর গোলার্ধের দীর্ঘ বিকেল গড়িয়ে অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। আমি জানালায় দাঁড়িয়ে সাঁঝের রঙের রঙিন আকাশ দেখতে লাগলাম। এখানে সামারে সাঁঝের আকাশে বাংলাদেশের আকাশের মতই নানা রঙের বর্ণচ্ছটা থাকে। এই সুন্দর দৃশ্যপট আমার দারুন লাগে। গানটা শোনার জন্য ক্যাসেট প্লেয়ারটা চালু করলাম। শুরু হলো, ‘সাঁঝের রঙের রঙিন আকাশ, সূর্যটা চায় যে বিদায়…।” কয়েকটা গানের পর শুরু হলো,

‘কি যেন শব্দ হতে ফিরে তাকালাম,
দেখি ঝড়ের বাতাস,
অকাল বাদলের একটু আভাস,
আমি পথ হারালাম একা ঘুরে ঘুরে,
তুমি তখন অনেক দূরে।
প্রতীক্ষা ছিলো সারা বিকেল জুড়ে,”

হঠাৎ মেজাজটা তিরিক্ষি হয়ে গেল। সে কি তাতিয়ানা আসে নাই বলে। আমি কি ওর জন্য প্রতীক্ষা করেছি? দুরো ওর জন্য প্রতীক্ষা করতে যাবো কোন দুঃখে, ও আমার বান্ধবী না, কিছু না, দেখতেও আকর্ষণিয় না। ওর কি প্রতিক্ষা করবো!

টুক টুক টুক। এই রাত নয়টার সময় আবার কে এলো? দরজা খুলে দেখি, তাতিয়ানা দাঁড়িয়ে আছে।

ভালোবাসা কাকে বলে?
আমার না যদি থাকে সুর, তোমার আছে তুমি তা দেবে,
তোমার গন্ধ হারা ফুল আমার কাছে সুরভী নেবে,
এরই নাম প্রেম, এরই নাম প্রেম,
জীবনে যা গৌরবও হয় মরণেও নেই পরাজয়,
চোখের স্মৃতির মণিদ্বীপ মনের আলোয় কভু কি নেভে?
এরই নাম প্রেম, এরই নাম প্রেম,
দুজনেই দুজনাতে মুগ্ধ, দুজনার রূপে কত সুন্দর,
দুজনার গীতালীর ছন্দে, তন্ময় দুজনার অন্তর,
এর কাছে স্বর্গ সুধার বেশী আছে মূল্য কি আর,
আমার দেবতা সেও তাই, প্রেমের কাঙাল পেয়েছি ভেবে,
এরই নাম প্রেম, এরই নাম প্রেম।

 

 

বিষণ্ন বিরিওজা – ৬

তাতিয়ানাঃ কই? আজও পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছো? ভিতরে ঢুকতে দাও।
আমিঃ ও হ্যাঁ হ্যাঁ, আসো ভিতরে আসো। (বিব্রত হয়ে বললাম আমি)
বিন্দুমাত্র জড়তাহীন, সাবলীল ভঙ্গিতে ডিভানে গিয়ে বসলো ও।

তাতিয়ানাঃ কি করো?
আমিঃ কিছুনা।
তাতিয়ানাঃ টিভি দেখছো? সেট তো অন করা আছে?
আমিঃ আঁ, হ্যাঁ, সেট অন করা আছে। জাস্ট অন আর কি। আমি মনোযোগ দিয়ে কিছু দেখছিলাম না।
তাতিয়ানাঃ একা একা খারাপ লাগেনা?
আমিঃ একা মানে, না। রূমে একা থাকতেই ভালো লাগে। রূমমেট না থাকাই ভালো। গত কয়েক বছর ধরে আমি একাই আছি। শুধু প্রথম বছর রূমমেট ছিল। নানা ঝামেলা হয়।
তাতিয়ানাঃ কি ঝামেলা হয়?
আমিঃ এই তো। একসাথে থাকার অনেক ঝামেলা। রান্নাবান্না, বাজারঘাট, মেস বিল, গেস্ট, বন্ধুবান্ধব, ঘুমের টাইম সবকিছু নিয়েই মিসম্যাচিং। সেই থেকে মনমালিন্য, ইত্যাদি। তার চাইতে একাই ভালো।
তাতিয়ানাঃ তোমার রূমমেইট কি রাতে মেয়ে নিয়ে আসতো? তারপর বলতো, “আজ রাতটা তুমি অন্য কোথাও কাটাও, আমি ওকে নিয়ে এখানে থাকবো”, এরকম?
তাতিয়ানার চোখে দুষ্টু হাসি চিকচিক করছে। আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। ভাবলাম ও হঠাৎ এরকম কথা বলছে কেন? কথা ঘোরানোর জন্য বললাম

আমিঃ আজ প্রোস্তা মারিয়া দেখতে এলেনা যে?
তাতিয়ানাঃ তুমি আমার জন্যে অপেক্ষা করেছিলে?
কি উত্তর দেব ঠিক বুঝতে পারছিলাম না।
আমিঃ না, মানে প্রতিদিনই তো আসো। তাছাড়া তুমি বলেছিলে, সিরিজটা তুমি পছন্দ করো, কোনো এপিসোড মিস করতে চাওনা।
তাতিয়ানাঃ মিস করিনি তো।
আমিঃ মানে?
রিনরিনে শব্দ করে মিষ্টি হেসে বললো
তাতিয়ানাঃ তুমি বোধহয় প্রোস্তা মারিয়া রেগুলার দেখোনা।
আমিঃ না সেরকম উৎসাহ নিয়ে তো কখনোই দেখিনি। তোমার সাথেই যা দেখা।
তাতিয়ানাঃ আমার সাথে তো মাত্র তিনদিন দেখলে। যাহোক, আজ মারিয়া দেখায় না।
আমিঃ মানে?
তাতিয়ানাঃ সপ্তাহে দুইদিন মারিয়া বন্ধ।
আমিঃ ও তাই? কি কি বারে বন্ধ?
তাতিয়ানাঃ আজ সোমবার, আর কাল মঙ্গলবার। বাকী পাঁচদিন চলে।
আমিঃ ও। তাহলে তো তুমি আমার এখানে দুইদিন আসবে না।
তাতিয়ানা আবারো চোখে কৌতুক নাচিয়ে বললো।
আমিঃ এই কনক্লুশন ড্র করছো কেন? আজতো মারিয়া দেখায়নি, কিন্তু আমি তো এসেছি।
আমিঃ ও, হ্যাঁ।
তাতিয়ানাঃ কি হ্যাঁ?
আমিঃ কিছুনা।
তাতিয়ানাঃ কিছুনা কি? কিছু কি বলতে চাইছিলে?
আমি ঠিক ধরতে পারছিলাম না, কথা কোনদিক থেকে কোনদিক চলে যায়। নাহ্, চিন্তাভাবনা না করে কথা বলা যাবেনা। প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য আমি বললাম
আমিঃ এসো কফি খাই।
তাতিয়ানাঃ তুমি ডিনার করেছো?
আমিঃ না।
তাতিয়ানাঃ তাহলে কফি কি খাবে? আগে ডিনার করো। রাত সাড়ে নয়টার মতো বাজে।
আমিঃ উঁ, ডিনার আমি একটু লেটেই করি, তুমি খাবে আমার সাথে?
তাতিয়ানাঃ এত রাতে কি খাবো? আমরা রাশানরা রাত আটটার মধ্যেই ডিনার সেরে ফেলি জানোনা?
আমিঃ তা জানি। কিন্তু তোমার সামনে একা একা খাই কি করে?
তাতিয়ানাঃ তাহলে আমি চলে যাই।
আমি একটা সংকটে পড়লাম। ওকে চলে যেতে বলি কি করে? এটা অভদ্রতা হবে, তাছাড়া কেন যেন ওর সাথে কথা বলতে ভালোও লাগছিলো। আবার ওর সামনে খাওয়াটাও তো ঠিক হবে না।
আমিঃ না থাক, আমি পরেই ডিনার করবো। এখন বরং কফি খাই।
তাতিয়ানাঃ তার চেয়ে তুমি বরং ডিনার করো। আমি যাই। তবে মন খারাপ করোনা। একেবারে যাচ্ছি না। ঠিক আধাঘন্টা পরে ফিরে আসছি। আশা করি ততোক্ষণে তোমার ডিনার করা হয়ে যাবে।
আমিঃ কষ্ট করে আসলে, আবার যাবে, আবার আসবে!
তাতিয়ানাঃ ভারি আশ্চর্য্য কথা! আমি কি শত কিলোমিটার দূর থেকে আসা যাওয়া করি নাকি? আমি তো এই ফ্লোরে তোমার পাশের রূমেই থাকি।
আমিঃ ও হ্যাঁ, তাইতো।
তাতিয়ানাঃ তাইইতো। থাকো, ডিনার করে আমি ফিরে আসলে পরে একসাথে কফি খাবো।
একটি লাস্যময় ভঙ্গিতে ডিভান থেকে উঠে, দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল তাতিয়ানা। আমি চোরা চোখে দেখলাম। মেয়েটি আর দশটা রাশান মেয়ের মত চোখ ধাঁধানো সুন্দরী নয় সত্য, কিন্তু মেয়ে তো। তাই মেয়েলী ভঙ্গিমা, দৃষ্টি, চলন, কথা বলার ধরন, ইত্যাদি আর দশটা মেয়ের মতই নজর কাড়া। অন্ততপক্ষে আমার কাছে তো তাই মনে হয়।
আমি গতকাল রান্না করে রাখা খাবার ফ্রীজ থেকে বের করে নিয়ে, গরম করার জন্য কিচেনের দিকে গেলাম। পিক আওয়ারে আট টা চুলাই বিজি হয়ে যায়, তবে এখন হবে না। তারপরেও একটা চুলা বিজি পেলাম। আমারই মতো কেউ হয়তো। একটা মাইক্রোওয়েভ ওভেন থাকলে ভালো হতো। দ্রুত গরম করা যেত। কিনে নেব নাকি একটা? পরক্ষণেই ভাবলাম, না দরকার নাই। মাইক্রোওয়েভ ওভেন ভালো জিনিস না। মাইক্রোওয়েভ ওভেনে গরম করা খাবার ক্ষতিকর হয়। ইলেকট্রোম্যগনেটিক ওয়েভ যে কি ক্ষতি করতে পারে নিজে ফিজিসিস্ট হয়ে আমি তা জানি। যে কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নে একসময় তা মার্কেট থেকে তুলে নেয়া হয়েছিলো।
ডিনার খেতে খেতে ভাবছি। আধঘন্টা পর আসবে বললো। আসতেই পারে। সত্যিই তো, শত মাইল দূর থেকে তো আর আসে না। দুটা রূম পরেই থাকে। ছেলেমেয়ে এক হোস্টেলে থাকার এই ইউরোপীয় সিস্টেমটায় আমি প্রথমে একটু ধাক্কা খেয়েছিলাম সত্য, কিন্তু সেই আমিই মাসখানেক পরে উপলদ্ধি করেছিলাম যে এটা ভালো। প্রথম যখন এই দেশে আসি, ল্যাংগুয়েজ কোর্সে আমরা বিশজন বাঙালী ছিলাম। আমাদের কিছু বাঙালী বন্ধু বলেছিলো, ” আরে সালা, হেভি সিস্টেম তো, ইউরোপে আইছি তো যত বেশী ফুর্তি করন যায়। পোলা-মাইয়া এক হোস্টেলে দিয়া তো দশ ডিগ্রী বেশী সুবিধা দিয়া দিল।” আমি অবশ্য সেই মতে বলছি না। বিষয়টার পজেটিভ দিক রয়েছে। আমাদের ব্যাচে নুরুন্নবী বলে একজন ছিল। নোয়াখালী বাড়ী। সেই কারণেই হয়তো একটু ধর্মভীরু। আমাদের মধ্যে ও সবচাইতে বেশী চঞ্চল ছিলো যদিও কিন্তু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে কোন গাফিলতি করতো না। ও একদিন বললো, “এই যে এখানে ছেলেমেয়ে এক হোস্টেলে থাকে এটা ভালো রে। নারী-পুরুষের মধ্যে যত বেশী দূরত্ব সৃস্টি করা হয়, পরস্পরকে বুঝতেও তত বেশী সমস্যা হয়। এই দূরত্ব কমিয়ে আনলেই বরং নারী-পুরুষ সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।” আমি বলেছিলাম, “এতে বেলেল্লাপনার সম্ভাবনা বেড়ে যায়না কি?” নুরুন্নবী বলেছিলো, “এখানে তো সবাই ম্যাচিউরড্, ভালো-মন্দের ফারাক তো সবাইই বোঝ. কিছু করলে নিজ দায়িত্বেই করবে”।

আমি ডিনার শেষ করে কফি তৈরীর জন্য ইলেকট্রিক কেট্লটা বসালাম। চিনি ও গুড়া কফির পটটা টেবিলের উপর রাখলাম। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালাম, দশটা পনের মিনিট বাজে। টুক, টুক, টুক, দরজায় নকের আওয়াজ। নিশ্চিত ছিলাম, এটা তাতিয়ানা। তাই নিজে দরজা না খুলে, একটু উচ্চস্বরে বললাম,
আমিঃ ইয়েস, কামইন।
কফির কাপ সাজানো নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম তাই দরজার দিকে তাকাইনি।
“রিমন”।
মেয়েলী কন্ঠের ডাক, তবে তাতিয়ানার কন্ঠস্বর নয়। আরে ঝামেলা! এত রাতে আবার কোন মেয়ে এলো! তাকিয়ে দেখি দাঁড়িয়ে আছে আমার ক্লাসমেট অপরূপ সুন্দরী ইরিনা।
আমি ওর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম।
ইরিনা, আমার আর কফি টেবিলের দিকে তাকিয়ে বললো,
ইরিনাঃ কেউ আসবে?
আমি কি উত্তর দেব বুঝতে পারছিলাম না।
আমিঃ বস ইরিনা।
ইরিনাঃ কফি খাওয়াবে।
আমি অনেকটাই অপ্রস্তুত। বুঝতে পারছি না কি বলবো। ইরিনা আয়েশী ভঙ্গিতে ডিভানে বসে গেল।
ইরিনাঃ খাওয়াও তাহলে কফি।
আমিঃ উঁ, হ্যা, ওয়েট, বানাচ্ছি।
এসময় খোলা দরজা দিয়ে গটগট করে ঢুকে গেল তাতিয়ানা। ওর হাতে কাগজের ছোট্ট একটা প্যাকেট। ভিতরে ঢুকে ডিভানে ইরিনাকে দেখে আর আমার হাতে কফির কাপ দেখে, বেশ অপ্রতিভ হয়ে গেল তাতিয়ানা, মনে হলো যেন একটা ধাক্কা খেয়েছে। তাতিয়ানা অনেকটা আহত ভঙ্গিতে বললো
তাতিয়ানাঃ আমি তাহলে যাই ।
আমি আরও সংকটাপন্ন হয়ে বললাম
আমিঃ না, না যাবে কেন? বসো।
তাতিয়ানাঃ না, মানে তোমরা কফি খাও তাহলে। আমি যাই।
ইরিনাকে দেখলাম বেশ কৌতুহলী হয়ে ওকে অবসার্ভ করছে।
আমিঃ না, তুমি বসো। আমরা তিনজনে মিলেই কফি খাবো।
তাতিয়ানা আমার দিকে কাগজের প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিলো।
আমিঃ কি এটা?
তাতিয়ানাঃ ফ্রেশ বিনের কফির গুড়া। এই মাত্র গুড়ো করে এনেছি।
আমিঃ ওহ্, দারুন তো! আই লাইক ইট।
তাতিয়ানাঃ লাইক ইট তো বলছো, কিন্তু খাও তো, সাধারণ কফি।
আমিঃ আরে এটাও তো বিন থেকে করা।
তাতিয়ানাঃ কি করে জানলে? গুড়া করার সময় তুমি ছিলে?
ইরিনাঃ এই কৌটার গুলোয় ভেজাল থাকে বলে অনেকে মনে করে, তাই অনেকে কফি বিন কিনে নিজের হাতে গুড়া করে খায়।
তাতিয়ানাঃ আর এটার টেস্টও বেশী।
আমিঃ ও। তাহলে আমি বানাই।
কফি বানানো হলে কফির খুব সুন্দর মিষ্টি গন্ধে ঘর ভরে গেল। আরও একটা মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছিলাম। কেউ একজন কড়া পারফিউম ব্যবহার করেছে হয় তাতিয়ানা নয়তো ইরিনা।
আমি লক্ষ্য করলাম ওরা দুজন নিজেদের মধ্যে কোন কথা বলছিলো না। টুকটাক দুএকটা কথা আমি বলছিলাম। আর তার ফাঁকে ফাঁকে ওরা দুজন দুজনকে দেখছিলো। কফি খাওয়া শেষ হলে। তাতিয়ানা বললো
তাতিয়ানাঃ আমি তাহলে যাই।
আমি কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না। আবার ইরিনা তখনো বসে আছে। যাওয়ার কথা মুখেই আনছে না। অবশেষে বললাম।
আমিঃ আচ্ছা যাও, ভালো থেক।
তাতিয়ানাঃ গুড নাইড।
সেকি হতাশ হয়ে বললাম জানিনা। তাতিয়ানা চলে যাওয়ার পর। চোখে কৌতুক নাচিয়ে ইরিনা বললো।

ইরিনাঃ মেয়েটি কে?
আমি শীতল কন্ঠস্বরে বললাম।
আমিঃ এই তো। এই ফ্লোরেই থাকে।
ইরিনাঃ কই আগে তো কখনো দেখি নাই।
আমিঃ ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্রী, মাত্র এসেছে।
ইরিনাঃ ও তাই বলো। (মুখে আরো কৌতুক এনে বললো) তোমাদের মধ্যে কি কিছু চলছে?
আমিঃ (বিরক্ত হয়ে বললাম) কি চলবে? মেয়েটা তো এই সেদিন এলো।
রিনরনে হেসে ইরিনা বললো।
ইরিনাঃ তুমি চিরকালের বোকাই রয়ে গেলে রিমন।

আমিঃ কেন?
ইরিনাঃ তোমাকে সেই ফার্স্ট ইয়ার থেকে দেখে আসছি। মেয়েদের মনের কথা বুঝতে পারো না।
আমিঃ এমন কথা বলছো কেন?
ইরিনাঃ তোমার রেগিনার কথা মনে আছে?
আমিঃ আছে। রেগিনা আবার কি হলো?
ইরিনাঃ রেগিনা কিন্তু তোমাকে ভীষণ পছন্দ করতো। অথচ তুমি সেটা ধরতেও পারোনি।

আমিঃ জানিনা।
ইরিনাঃ আকসানা তো তোমার পিছনে ঘুরে ঘুরে হয়রান হয়ে, অবশেষে রোমানকে বিয়ে করলো। আহা বেচারী! রিমনকে না পেয়ে রোমানকে পেল।
আকসানার কথা শুনে আমি একটু শক্ত হয়ে গেলাম। আকসানা এই হোস্টেলেই থাকতো। মাঝে মধ্যে আমার রুমে আসতো, চা খেয়েছি গল্প-গুজব হয়েছে। এর বেশী তো কিছু ছিলনা! দুবছর আগে ওর বিয়ে হয়ে শ্বশুড় বাড়ীর এ্যাপার্টমেন্টে উঠে গিয়েছে। আকসানা বাইরের শহরের, ছেলেটা খারকভেরই।

আমিঃ আকসানা তো কখনো কিছু বলেনি।
ইরিনাঃ সমস্যাটা তো ওখানেই। তোমার মতো ছেলে মেয়েদের মনের কথা বুঝতে পারেনা, তোমাকে বলতে হয়। মেয়েরা কি সব কিছু মুখ ফুটে বলতে পারে?
আমিঃ অনেকেই তো বলে।
ইরিনাঃ না অনেকেই না, কেউ কেউ বলে। সেই কেউ কেউ-এর দলে আকসানা ছিল না। তোমাদের দেশের মেয়েদের চাইতে আমাদের জড়তা হয়তো কম, তারপরেও আমরা মেয়ে কিন্তু।
আমিঃ আকসানা বললেই পারতো।
ইরিনাঃ তা হয়তো পারতো। কিন্তু তোমার দৃষ্টিতে শীতলতা দেখে আর কিছু বলতে চায়নি।
আমি বেশ বিব্রত হলাম। কথাবার্তা কেমন যেন হচ্ছে। হৃদয় ঘটিত বিষয় নিয়ে এমন আক্রমণাত্মক কথা আমাকে ইতিপূর্বে আর কেউ বলেনি। আকসানার বিষয়টা কখনো ঘুণা্ক্ষরেও টের পাইনি। তাছাড়া টের পেলেও যে কিছু হতো তাও তো না।

উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ইরিনা বললো।
ইরিনাঃ দেখো, এই মেয়েটিকে আবার নিরাশ করোনা যেন।
আমি কোন কিছু বলার কোন ভাষাই খুঁজে পেলাম না।

ইরিনাঃ আমি আসলে কফি খেতে আসিনি, তোমার কাছে এসেছিলাম ল্যাবের খাতাটা নিতে। গত ল্যাব ক্লাসে আমি এ্যাটেন্ড করতে পারিনি।

আমি তাড়াতাড়ি ওকে খাতাটা বের করে দিলাম। আপদ বিদায় হলে বাঁচি।
ইরিনা চলে যাবার পর, কিছু সময় বসে রইলাম। মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে ছিলো। ইরিনা যেসব কথা বললো, তাতে মেজাজ ঠিক থাকার কথা না। রেগিনা আমাদের দুবছরের সিনিয়র ছিলো। পাশ করে ওর সিটিতে চলে গেছে। এই ডরমিটরিতেই থাকতো। আমাকে তার ভালো লাগতো তাতো আমি জানতাম না। আকসানার বিষয়টাও জানতাম না। আসলে ওদের ব্যাপারে আমার আগ্রহ কিছু ছিল না। কিন্তু অন্যেরা কি জানতো? না জানলে ইরিনা এতো কথা বললো কি করে? সর্বনাশ!
যাকগে যা হয়েছে হয়েছে। আমি তো আর কিছু করি নাই। অনেক রাত হয়েছে ঘুমানোর প্রস্তুতি নেয়া দরকার। ডিভানটা খুলে বিছানাটা গুছালাম। শুতে যাব এমন সময় আবারো। টুক, টুক, টুক, দরজায় নক হলো। আবার কে এলো এত রাতে? এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেখলাম। খুব সুন্দর সেজেগুজে তাতিয়ানা দাঁড়িয়ে আছে।

তুমি না হয় রহিতে কাছে
কিছুক্ষণ আরো নাহয় রহিতে কাছে
আরো কিছু কথা নাহয় বলিতে মোরে
এই মধুক্ষণ মধুময় হয়ে নাহয় উঠিত ভরে।।
সুরে সুরভীতে নাহয় ভরিত বেলা
মোর এলো চুল লয়ে বাতাস করিত খেলা।
ব্যাকুল কত না বকুলের কুড়ি
রয়ে রয়ে যেত ঝরে
ওগো নাহয় রহিতে কাছে।।
কিছু দিয়ে নিয়ে ওগো মোর মনময়
সুন্দরতর হতো নাকি বলো
একটু ছোঁয়ার পরিচয়।
ভাবের লীলায় নাহয় ভরিত আঁখি
আমারে নাহয় আরো কাছে নিতে ডাকি।
নাহয় শোনাতে মরমের কথা
মোর দুটি হাত ধরে
ওগো নাহয় রহিতে কাছে।।

বিষণ্ন বিরিওজা – ৭

রাত এখন দশটার উপরে। আমি ঘুমানোর প্রস্ততি নিয়ে শুয়েই পরেছিলাম প্রায়। এসময় আমার দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে অপরূপ সাজগোজ করে আসা চপলমতি একটি তন্বী শ্বেতাঙ্গিনী তরুণী। আগে অনেকবারই ভেবেছি, মেয়েটি সুন্দরী নয়, কিন্তু এই মুহুর্তে প্রসাধনের গুন তাকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। চোখ ফেরানো গেলেও কয়েক মুহুর্তের জন্য চোখ আটকে যাবে নিঃসন্দেহে। মেয়েটিকে এত রাতে এই সাজে রূমে ঢুকতে দেয়া ঠিক হবে কি? আমার স্থবিরতা দেখে ও তার স্বভাবসুলভ মিষ্টি হসে বললো,

তাতিয়ানাঃ আবারো পথ আটকে আছো! ঢুকতে দেবেনা?
আমি আরেকবার ভাবলাম এত রাতে এই সাজে মেয়েটাকে ঢুকতে দিলে লোকে কি বলবে? পরক্ষণেই আবার নিজের চিন্তায় নিজেরই হাসি পেলো, আমি কি বাংলাদেশে বসে আছি? এই ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে নারী-পুরুষ অবাধ সম্পর্কের দেশে বসে আমি এই কথা ভাবছি। এখানে তো এটা চা-বিস্কুট খাওয়ার মতই একটা সাধারণ ঘটনা। এই মুহুর্তেই দেখা যাবে এই ডরমিটরিতে অনেকেই বান্ধবীকে নিয়ে শুয়ে পরেছে। বান্ধবীতো ভালো অনেক সময় দেখা যায় আজই পরিচয় হলো এমন কারো সাথেই অবলীলায় রাত কাটিয়ে দিচ্ছে। আমার তাহলে ওকে ঢুকতে দিতে সমস্যা কি? ভিতর থেকেও কোন একটি চালিকা শক্তি আমাকে বলছিলো, “আসুক না মেয়েটা”। মৃদু স্বরে, “এসো” বলে দরজা ছেড়ে দাড়ালাম।

নিভৃত রাতে আমার ঘরে উপস্থিত হয়েছে সেই মেয়েটি, মনে মনে যার নাম আমি দিয়েছিলাম বার্চ বনের প্রণরেনী।আমি আরেকটু ভালো করে তাতিয়ানার দিকে তাকালাম। ও পোষাক পাল্টে এসেছে। কিছুক্ষণ আগে ওর পরনে ছিল ট্রাউজার আর শার্ট। আর এখন ওর পরনে হাটুর উপরে তোলা স্কার্ট, তবে মিনি স্কার্ট নয়। আর টাইট টপস। এই পোষাক অনেকটাই আবেদন ফুটিয়ে তোলে। অবশ্য এখানে এটা স্বাভাবিক পোষাকই। শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম বলে ডিভানটা আমি ইতিমধ্যেই টেনে বেড বানিয়ে ফেলেছি। তার উপর বেডশীট ও ব্লাংকেটও ছড়ানো ছিলো। তাতিয়ানা প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলো, কোথায় বসবে। তারপর ডিভানেই বসে গেল। তবে পিঠ হেলান দেয়া যাবেনা বলে ও পায়ের উপর পা তুলে বসলো। স্কার্টের সাইজের কারণে এম্নিতেই হাটুর নীচের অংশ খোলা ছিলো, পা তুলে বসাতে আরো কিছুটা অনাবৃত হলো। ওর নীল চোখে ঘন কালো কাজল দিয়েছে। চোখের পাতার উপরে নীল ব্লাশন। কালোও নয় আবার সোনালীও নয় মাঝামাঝি একটা রঙের দীর্ঘ চুলগুলো পরিপাটি করে সাজানো। মুখে হালকা মেকআপের ছাপ। ঠোটে গোলাপী রঙের লিপস্টিক। সব কিছুই মানিয়েছে বেশ। মনে হচ্ছে প্রগলভা এই মেয়েটির ঠোট ভরা মধু, গাল ভরা লালিত্য। পুরুষ মনকে প্রলুদ্ধ করার জন্য যথেস্ট। হয়তো অনেককেই প্রলুদ্ধ করেছে। কে জানে কার কাছে ও ধরা দিয়েছে। নাকি কারো কাছেই ধরা দেয়নি?
তাতিয়ানাঃ কি দেখ?
আমি যদিও ওকেই দেখছিলাম। কিন্তু সেটা বলতে না চেয়ে বললাম,
আমিঃ দেখছি চাঁদটিকে।
তাতিয়ানা পাশ ফিরে তাকালো। সত্যিই জানালার বাইরে রাতের আকাশে এক ফালি চাঁদ দেখা যাচ্ছে। তার নীচে শহরের একাংশ। অসংখ্য বাতির তীব্র বিদ্যুৎ আলো জ্বলজ্বল করছে। সারি করে লাগানো গাছগুলি দাঁড়িয়ে আছে কালো মুর্তির মতো। আর তার সামনে বার্চ বনের প্রণরেনী। একে কি স্বপ্নপূরী আর তার রাজকন্যার সাথে তুলনা করবো?

তাতিয়ানাঃ (কপট অভিমান করে) চাঁদের মধ্যে দেখার কি আছে?
আমিঃ তোমাদের এই শীতপ্রধান দেশে তো সারা বছর চাঁদ দেখা যায়না। বছরের যে কয়মাস চাঁদ দেখা যায় সেই কয়মাস চাঁদটাকে খুব সুন্দর মনে হয়। দুর্লভের প্রতি বাড়তি আকর্ষণ আরকি।
তাতিয়ানাঃ উঁ, তুমি আছো চাঁদের সৌন্দর্য্য নিয়ে!
আমিঃ চাঁদকে ইর্ষা করোনা, ও অবুঝ।
তাতিয়ানাঃ কাব্য করছ? তুমি কি কবিতা লেখো?
আমিঃ লিখতাম একসময়।
তাতিয়ানাঃ (উৎফুল্ল হয়ে বললো)কবিতা লিখতে, বেশ তো! ছেড়ে দিলে কেন?
আমিঃ মনে হলো কিছু হচ্ছে না, নিম্নমান।
তাতিয়ানাঃ তাও লেখা উচিৎ ছিলো। ধীরে ধীরে মান বাড়তো। আচ্ছা আমাকে দেখাবে তোমার কবিতা।
আমিঃ তুমি কিছু বুঝবে নাতো। ওগুলোতো বাংলায় লেখা।

এরপর আমার দিকে হালকা কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,
তাতিয়ানাঃ ঐ মেয়েটি কি তোমার বান্ধবী?
আমিঃ কে?
তাতিয়ানাঃ যে মেয়েটি এসেছিলো।
আমিঃ বান্ধবী হলে তো রাতে থেকে যেত, চলে যেত না।
তাতিয়ানাঃ যাহ্, কি যে বলো!
আমিঃ না, জোক করলাম। ও আমার বান্ধবী নয় ক্লাসমেট

তাতিয়ানাঃ তোমার বান্ধবী আছে?
আমিঃ না।
তাতিয়ানাঃ ফাইনাল ইয়ারে পড়ো, এখনো না!
আমিঃ সেরকমই।
তাতিয়ানাঃ নাকি ছিলো, কাট-আপ হয়ে গিয়েছে?
আমিঃ না থাকলে কাট-আপ হবে কোত্থেকে?
তাতিয়ানা আমার চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকালো, তারপর চোখ নামিয়ে নিলো, তারপর আবার তাকিয়ে লাজুক কন্ঠে বললো,
তাতিয়ানাঃ বান্ধবী করতে ইচ্ছে হয়না?
আমি ঠিক কি উত্তর দেব বুঝতে না পেরে চুপ করে রইলাম।
তাতিয়ানা আবার বললো,

তাতিয়ানাঃ ইয়াং ছেলে বান্ধবী না থাকাটাই তো অস্বাভাবিক। (তারপর মুখ ফসকে বলে ফেলা কথাটায় বিব্রত হয়ে আবার বললো) না মানে এটা অবশ্য তোমার ব্যাপার।
আমি ওর সাথে কৌতুক করার জন্য বললাম।

আমিঃ কেউ তো তাকালো না আমার দিকে। তাই বেচারা এত নিঃসঙ্গ।
তাতিয়ানাঃ মনে তো হয়না, কেউ তাকায়নি। খুব সম্ভবতঃ তোমার দেখার চোখ নেই।
আমিঃ হ্যা, চোখে কিছুটা সমস্যা আছে বোধহয়।
তাতিয়ানাঃ ডরমিটরিতে তোমার রেপুটেশন আছে।
আমিঃ (অবাক হয়ে বললাম) কিসের রেপুটেশন?
তাতিয়ানাঃ সবাই বলে, তুমি খুব ভালো ।
আমিঃ ও বাবা এর মধ্যে সবার সাথে কথা বলে ফেলেছ!
তাতিয়ানাঃ (হেসে ফেললো তাতিয়ানা) সবাই না হলেও যে কয়জনার সাথে কথা হয়েছে, তারা তো তোমাকে ভালো বলেছে।
আমিঃ ওদের সাথে আবার আমার সম্পর্কে জানতে চাইলে কেন?
তাতিয়ানা হঠাৎ মাথা নীচু করে ফেললো। মনে হচ্ছিলো ও ঠিক কি উত্তর দেবে বুঝতে পারছিলো না। আমি প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য বললাম

আমিঃ তোমার বয়ফ্রেন্ড আছে তাতিয়ানা?
তাতিয়ানাঃ (অনেকটা আক্ষেপের স্বরে বললো) না।
আমিঃ ছিলো বোধহয়, তাই না?
তাতিয়ানাঃ (তাতিয়ানা আরেকটু খেদ টেনে বললো) ছিলো, সে ছিলো। এখন কেউ নেই।

এই মুহুর্তে ওকে আমার দুঃখী মনে হলো। বুঝলাম, তাতিয়ানার মন চিরকালের একজনকে খুঁজে ফিরছে। সেই সন্ধানী মনের তন্বি দেহটিকে কি নিরালায় ছুঁয়ে দেখবো? তাতিয়ানার বয়সটা এত কম, যেন সদ্য ফোটা একটি প্রস্ফুটিত ম্যাগনোলিয়া। হাতদুটো অধীর হয়ে উঠছে। ভাবলাম ওর সর্বাঙ্গে স্পর্শ বুলিয়ে তার তপ্ত মাধুর্য্য সমস্ত দেহমন দিয়ে অনুভব করি।
জানিনা আমার মনের কথা বুঝতে পারলো কিনা তাতিয়ানা।

তাতিয়ানাঃ কিছু বলবে?
আমিঃ তোমার ঘুম পাচ্ছেনা তাতিয়ানা?
তাতিয়ানাঃ তুমি ঘুমাবে?
আমিঃ হু, তুমি চলে গেলেই ঘুমাবো।
তাতিয়ানা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো, মুখের ভাব বলছে, “আমাকে তাড়িয়ে দিচ্ছ!”
অনেকটা আহত ব্যাথিত হয়ে তাতিয়ানা উঠে দাঁড়ালো।
তাতিয়ানাঃ আমি আজ যাই তাহলে?
আমিঃ আচ্ছা, কাল দেখা হবে।
যে ভঙ্গিতে ও দরজার দিকে হেটে গেল, তা বলছে, ‘আমার সাজ, পোষাক, প্রসাধন সবই বৃথা গেল।

তাতিয়ানা চলে যাবার পর আমিও কিছু সময় স্থবির বসে রইলাম। আমার জানালা গলে চাঁদের আলোর সাথে সাথে ডরমিটরির কোন রূম থেকে চাইকোভ্স্কীর সুর ভেসে এলো। বিমুর্ত এই সুর আনন্দ, বেদনা, হতাশা যে কোন মুহুর্তকেই অপরূপ করে তোলে। নারী-পুরুষের অন্তরঙ্গতায় এই সুর যেন এক অদ্ভুত আবেশ সৃষ্টি করে।

নয়ন ভরা জল গো তোমার, আচল ভরা ফুল,
ফুল নেব না অশ্রু নেব ভেবে হই আকুল।
মালা যখন গেঁথে ছিলে পাওয়ার সাধ যে জাগে,
মোর বিরহে কাঁদো যখন, আরো ভালো লাগে।

বিষণ্ন বিরিওজা – ৮

একটি পুরনো দিনের টুডোর ফোকস্ ভাগেন গাড়ীতে চড়ে যাচ্ছি আমি। যে রাস্তায় চল্‌ছি সেটা পাহাড়ি হতে পারে, বন্ধুর পথে প্রচন্ড ঝাঁকুনি খেতে খেতে যাচ্ছে গাড়িটি। কিছুদূর এগিয়ে যাবার পর ছোটখাট একটি টিলার পাশে এসে মোড় ঘোরালো ড্রাইভার। তার পরপরই রাস্তাটা নাক বরাবর, সোঁজা তীব্র গতিতে ছুটে চললো গাড়ী। হঠাৎ একটা অদ্ভুত সন্দেহ জাগলো আমার মনে। বাঁকের পর বাঁক ঘুরে মনে হলো একই পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে গাড়িটা। কেন? ভাবলাম ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করি। পরক্ষণেই মন থেকে বাতিল করে দিলাম চিন্তাটা। সহসা একটি বাঁকের কাছে এসে প্রচন্ড ঝাঁকুনি খেয়ে থেমে গেল গাড়িটা। ও ও ও ও ও……… পিলে কাঁপানো শব্দ করে পাহাড়, বন, নদী, সব দিক থেকে ধেয়ে এলো খাঁকি পোষাক পড়া একদল সসস্ত্র সৈন্য। ধক করে উঠল হৃৎপিন্ডটা। ড্রাইভারকে ডাকতে গিয়ে দেখলাম সিটে কেউ নেই, যেন ভোজবাজির মতো উধাও হয়ে গিয়েছে। এদিকে ক্রমশই এগিয়ে আসছে সৈন্যরা। বিপন্ন আমাকে ঐ মুহূর্তে একরাশ এলোমেলো দুশ্চিন্তা ঘিরে ধরলো, কারা ওরা? সৈন্য? কোন দেশের সৈন্য? আমার দিকে তেড়ে আসছে কেন? আমাকে মারতে চায়? আমাকে মেরে ওদের কি লাভ? ভাবতে ভাবতে ওরা আমার খুব কাছে চলে এলো, এত কাছে তারপরেও ওদের কারো মুখ দেখতে পাচ্ছিনা, মনে হচ্ছে ওদের মুখের জায়গাটা অদৃশ্য। কেন? কিন্তু এ মুহূর্তে চিন্তা করারও সময় নেই। আমাকে বাঁচতে হবে। দ্রুত গাড়ির দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে পড়লাম, দিকবিদিক জ্ঞানশূণ্য হয়ে ছুটতে লাগলাম। এতগুলো সৈন্যের সাথে আমি দৌড়ে পারব? তারপরেও ছুটছি, আমার পিছন পিছন ওরাও ছুটছে। ওদের থেকে অনেকটা দূরে চলে এসেছি, নিজেকে সামান্য নিরাপদ মনে হলো। হঠাৎ আমার সামনের মাঠ ফুরে বেরিয়ে এলো আরো কিছু সৈন্য । আমি সর্বশক্তি নিয়োগ করে ডান দিকে ছুটলাম । মনে হচ্ছে আমার চতুর্দিকেই বিপদ, কোথায় ছুটছি, কি করছি, কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। হঠাৎ বড় একটি গাছের সাথে ধাক্কা খেলাম। তারপর সব ফাঁকা। কেউ নেই। আমি মিটমিট করে চোখ খুললাম। জানালা গলে সোনালী রোদ আমার চোখে এসে পড়ছে। ভোর হয়ে গেছে। এতক্ষণ যা দেখছিলাম সব দুস্বপ্ন। আমার গায়ের স্লিপিং স্যুট ঘামে ভিজে চপচপ করছে। হৃৎপিন্ডের ধুকধুকানী এখনো আছে। আশ্চর্য্য! এই স্বপ্নটি আমিআগেও অনেকবার দেখেছি। একই স্বপ্ন বারবার দেখি কেন?

বিছানা ছেড়ে তখনো উঠতে পারিনি, আমার চোখের ঘুম ভেঙেছে কিন্তু শরীর তখনো ঘুমাচ্ছে। আরো কিছুক্ষণ শুয়ে রইলাম। গতরাতের কথা মনে পড়লো। তাতিয়ানার চলে যাওয়ার দৃশ্যটা মনে করে একটু ব্যাথিত হলাম। মেয়েটা কি মনে খুব দুঃখ পেয়েছে? কি জানি? কিন্তু আমি ঐ মুহূর্তে ওকে গ্রহণ করতে পারছিলাম না। অনেকগুলো আবেগ আমাকে ঘিরে ধরেছিলো। যদিও আমি অনেক দিন যাবৎ এদেশে আছি, কিন্তু এখনো আমি ওদের সাথে একাত্ম হতে পারিনি। আমি মদ খাইনা, তাই মদের আসরে আমার বসা হয়না। আর আমি ঐ আসরে বসে যদি না খাই, তাহলে ওরাও অস্বস্তি বোধ করে, তার থেকে না বসাই ভালো। যখন-তখন যেকোন মেয়ে নিয়ে ফুর্তি করিনা। নারী-পুরুষ সম্পর্কটাকে আমার কাছে অত্যন্ত সিরিয়াস বলে মনে হয় এখানে নিছক ফানের কিছু নেই। নারী-পুরুষ সম্পর্কটা হওয়া উচিৎ পবিত্র, যাকে ভালোবাসোনা তাকে শয্যাসঙ্গিনীও করা যায়না। বাংলাদেশী ও মুসলিম টাবুও বোধহয় আমার মধ্যে কাজ করছিলো কাল রাতে। এদেশে আসার পর অবাধ মেলামেশা করছে সব দেশের ছেলেমেয়েরাই। সেই তালিকায় বাংলাদেশীরাও পিছিয়ে নেই। কিন্তু আমি এখন পর্যন্ত কোন মেয়ের সাথেই সম্পর্কে যাইনি। ঐ বোধগুলো কাজ করে বলেই বোধহয়। আবারো লুবনার কথা মনে হলো। অনেকগুলো বছর ওকে দেখিনা!

ইউনিভার্সিটিতে আজকে চারটি ক্লাস আছে। সবগুলো ক্লাসই ইমপর্ট্যান্ট, কোনটাই মিস দেয়া যাবেনা। ব্রেকফাস্ট করতে বসলাম। চা, ডিম পোচ, বাটার মাখানো ব্রেড টোস্ট আর কিছু পিচ ফল, এই ছিলো খাদ্য তালিকা। খুব মামুলি! যাক, স্টুডেন্টের ব্রেকফাস্ট কি আর রাজকীয় হবে? হঠাৎ অনেক বছর আগে পত্রিকায় পড়া একটা ঘটনা মনে পড়ল, “একদিন শুক্রবার ভোরে প্রেসিডেন্ট জিয়া নাশতা খাচ্ছিলেন ।
আয়োজন সামান্য-
চারটা লাল আটার রুটি, দুই পিস বেগুন ভাজি, একটা সিদ্ধ ডিম !

জিয়ার সঙ্গে নাশতার টেবিলে বসেছেন তাঁর বন্ধু এবং সহযোদ্ধো জেনারেল মঞ্জুর ।
জেনারেল মঞ্জুর বিস্মিত হয়ে বললেন, এই আপনার নাশতা ?
প্রেসিডেন্ট জিয়া বললেন, হতদরিদ্র একটি দেশের প্রেক্ষিতে এই নাশতা কি যথেষ্ট না? ”

ব্রেকফাস্ট সারার পর ধীরে ধীরে হেটে হেটে বাসস্ট্যান্ডের দিকে গেলাম। মিনিট পাঁচেক বাসের জন্য দাঁড়িয়ে মনে হলো, নাহ্‌, হেটে হেটেই ইউনিভার্সিটিতে চলে যাই। আমাদের আশি বছরের বৃদ্ধ অংকের টিচার আগ্রানোভিচ যদি হেটে হেটে এখান থেকে ইউনিভার্সিটিতে যেতে পারেন টগবগে তরুণ হয়ে আমি পারব না? আতাকারা ইয়ারোশা থেকে জিরজিন্‌স্কি স্কোয়ার পর্যন্ত দুইকিলোমিটারের মত পথটা খুব মনোরম। বিশেষত সামারে। চার লেনের চওড়া পিচ ঢালা সড়কের দুপাশে ঢালাই করা চওড়া ফুটপাত। পথের দুপাশে চার সারিতে সুন্দর করে লাগানো বার্চের সারি। শীতকালে এই গাছগুলোতে কোন পাতা থাকেনা একেবারেই ন্যাড়া। আর গ্রীস্ম আসার সাথে সাথে দু’একদিনের মধ্যেই কার্টুন ছবির মত দ্রুত পাতা গজিয়ে বড় হয়ে পাতায় পাতায় ভরে ঝাঁকড়া হয়ে ওঠে, তখন আর বিশ্বাসই করতে ইচ্ছে হয়না যে, এই দুদিন আগেও তারা একদম ন্যাড়া ছিলো। এখন সেপ্টেম্বর মাস। ক্যালেন্ডারের হিসাবে ফল সিজন। গাছের পাতায় পাতায় হলুদ ছোপ সেই সিজনের আগমনী ধ্বনী জানাচ্ছে। আর কিছুদিন পর পাতাগুলো পুরোপুরি হলুদ হয়ে ঝরতে শুরু করবে। এজন্য ইউক্রেণীয় ভাষায় এই ঋতুর নাম ‘লিস্তাপাদ’, মানে ‘পাতাঝরা’। এদেশে জনসংখ্যা কম তাই রাস্তাঘাটে অসহনীয় ভীড় থাকেনা। মনোরম ফুটপাত দিয়ে আমি এবং আমার মত দুএকজন হেটে হেটে যাচ্ছিলো। বার্চের পাতায় একটানা ঝিরঝির শব্দ তুলে চলছে দক্ষিণা হাওয়া। তার মাঝে মাঝে কিছু কিছু টোপল গাছ। এই গাছগুলোতে গ্রীস্মকালে এক ধরনের তুলা হয় আর বাতাসে খসে সারা শহরময় উড়তে থাকে মনে হয় যেন গ্রীস্মের ভর দুপুরে তুষারপাত হচ্ছে। এই নিয়ে একটা গল্প প্রচলিত আছে, কোন এক জারের রাণী জারকে বললো, “আমি তুষারপাত খুব পছন্দ করি কিন্তু গ্রীস্ম ঋতুতে তুষারপাত হয়না, তুমি জার, আমার জন্যে গ্রীস্মে তুষারপাতের ব্যবস্থা করতে পারোনা?” রাণীর ভালোবাসায় সিক্ত রাজা ভেবে ভেবে তখন এই বুদ্ধি করলেন, দেশব্যাপি টপোল গাছ লাগিয়ে দিলেন, আর প্রখর রৌদ্রের গ্রীস্মেও তখন উড়ন্ত টুকরো টুকরো তুলাগুলো তুষারপাতের দৃশ্যের অবতারনা করলো। আহা ভালোবাসা! নারীর আবদার পুরুষকে কত কিছুই না করিয়ে ছাড়ে!

দিনের বেলাটা ইউনিভার্সিটির ক্লাসরূমেই কাটলো। আমাদের ক্লাসে আবার একটা ইন্টারেস্টিং ঘটনা চলছে। সের্গেই আর লেনার মধ্যে চলছে প্রেম। এদিকে আমাদেরই ক্লাসমেট ইয়াকোভ লেনার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। সের্গেই আর লেনা ক্লাসরূমে বসে পাশাপাশি, আর তার ঠিক পিছনেই বসে ইয়াকোভ। ভার্সিটির করিডোরে সের্গেই আর লেনা পাশাপাশি হেটে যায়, আর তাদের পিছনে পিছনে হাটে ইয়াকোভ। সাশা ঠাট্টা করে বলছিলো, “ভেরি ইন্টারেস্টিং, শুধু এই দৃশ্য দেখার জন্যই আমার ইউনিভার্সটিতে আসতে মজা লাগে।” বিকালে ক্লাস শেষ হলো। রূমে ফিরতে ইচ্ছা করছিলো না। তাতিয়ানার কথা মনে হলো। ও যদি আসে? না, আজ প্রোস্তা মারিয়া হবেনা। সুতরাং এই কারণে ও আাসবে না। আমি আর রুমে ফিরলাম না। আলেক্সিয়েভ্‌কা স্টুডেন্টস টাউনের ট্রলিবাসে চড়ে বসলাম। উদ্দেশ্য, কবীর ভাইয়ের রূমে যাব।

কবীর ভাইদের ডরমিটরির গেটেই দেখা হলো আশরাফ ভাইয়ের সাথে। সাথে একটি মেয়ে। মেয়ে বলা বোধহয় ঠিক হলো না, কারণ সে কিছুটা বয়স্ক। এ্যারাউন্ড থার্টি হবে। অবশ্য আশরাফ ভাইও ঐ বয়সীই। আমাকে দেখে আশরাফ ভাই একটু লাজুক হাসলেন।
আশরাফ ভাইঃ আমাদের ডরমিটরিতে বেড়াতে এসেছেন? ওয়েল কাম, ওয়েল কাম। কবীর উপরে আছে, চলে যান। আমি এই আসছি।
বুঝলাম মহিলাটিকে এগিয়ে দিতে যাচ্ছে।

কবীর ভাই আমাকে পেয়ে ভীষণ খুশী। কফি চড়িয়ে দিলেন। প্যাকেট খুলে তস্তরীতে বিস্কিট ছড়িয়ে দিলেন। দুটি আপেল স্লাইস করে কাটলেন। ঐ খেতে খেতে গল্প শুরু করলাম। এর মধ্যে উপর তলা থেকে শিশির ভাই এসে উপস্থিত হলেন। কিছুক্ষণ পর বিরাট বড় একটা তরমুজ নিয়ে আশরাফ ভাই ঢুকলেন।
আশরাফ ভাইঃ বাসস্ট্যান্ডে দেখলাম, বিক্রি হচ্ছে, নিয়ে এলাম। এখানকার তরমুজ তো খুব মিষ্টি হয়, আসুন সবাই মিলে মজা করে খাই।
কবীর ভাইঃ ক্লাস তো শুরু হয়ে গেল। কেমন চলছে দিনকাল?
আমিঃ হ্যাঁ, এতোদিন ভ্যাকেশন ছিলো, মজায় ছিলাম। এখন তো আবার ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল।
আশরাফ ভাইঃ নতুন ইয়ার শুরু, ডরমিটরিতে নতুনা মেয়েরা এসেছা না?
আমিঃ (মুচকি হেসে) তাতো এসেছেই। আপনার কি খবর?
আশরাফ ভাইয়ের আমাকে এড়ানোর কিছু নাই, কারণ একটু আগেই আমি তাকে একজনার সাথে দেখেছি। তিনি তাই খোলাখুলি বললেন,
আশরাফ ভাইঃ ঐ যে মহিলা একজনকে দেখলেন রঙ্গ-রস করতে এসেছিলো।
আমিঃ তা রঙ্গ-রস হলো?
কবীর ভাইঃ (টিপ্পনী কেটে) রঙ্গ হয়েছে রস হয়নি।
হাঃ হাঃ হাঃ করে সবাই কোরাসে হাসলাম। আশরাফ ভাই লজ্জা পেয়ে গেলেন।
আশরাফ ভাইঃ ও তো বয়স্ক। ডিভোর্সড লেডি, ছোট একটা মেয়ে আছে। আপনার ওখানে তো ফার্স্ট ইয়ারের ফ্রেস মেয়ে আসার কথা।
আমিঃ তা তো এসেছেই।
শিশির ভাইঃ ছেলেপেলেরা তো তাহলে বেশ রঙ্গ-রস করছে।
আশরাফ ভাইঃ ছেলেপেলেদের কথা বাদ দেন। রিমন ভাই কি রঙ্গ-রস করছেন তাই বলেন।
আমিঃ (আমি হতাশ সুরের ভান করে বললাম) আমি কিছুই করছি না।
শিশির ভাইঃ কি বলেন সুযোগ পেয়েও করছেন না?
আশরাফ ভাইঃ সুযোগ এসেছে?
আমিঃ (রহস্য করে বললাম) হু, একটা মেয়ে আছে।
আশরাফ ভাইঃ বলেন কি? ফার্স্ট ইয়ার?
আমিঃ ইয়েস।
আশরাফ ভাইঃ খুব সুন্দরী?
আমি (হতাশার ভঙ্গি করে) নাহ্‌! নিতান্তই অসুন্দরী।
কবীর ভাইঃ তা কি করে হয়? এদেশের সব মেয়েই তো সুন্দরী।
আমিঃ মাই ব্যাড লাক। যে দু’একটা অসুন্দরী আছে, মেয়েটি তার তালিকায়।
আশরাফ ভাইঃ রিমন ভাই কি মেয়েটিকে বাতিলের খাতায় লিখে রেখেছেন?
আমিঃ মেয়েটির জন্য কি আপনার মনে দরদ জাগছে?
আশরাফ ভাইঃ ওকে দেখিনিতো।
আমিঃ আসেন একদিন দেখে যান। পছন্দ হলে প্রোপোজ করবেন।
লাজুক হাসলেন আশরাফ ভাই।
আশরাফ ভাইঃ ঠিক আছে আসবো একদিন, দেখে যাবো। তারমধ্যে আপনি একটু দেখেশুনে রাখুন। দেখবেন অন্য কেউ যাতে আবার ট্রাম্প করে না ফেলে।
আমিঃ আরে আশরাফ ভাই ট্রাম্প করলেই বা অসুবিধা কি? ট্রাম্পের উপর দিয়ে আবার ওভার ট্রাম্প করা যায়।
হাঃ হাঃ হাঃ । সবাই আরেক দফা কোরাসে হাসলো।
গল্পে গল্পে কখন যে বেলা শেষ হয়ে গেছে টের পাইনি। হঠাৎ কবীর ভাইয়ের রূম থেকে দেখলাম দূরে টিলা আর বনের উপর অস্ত যাচ্ছে লাল সূর্যটা। ধীরে ধীরে খারকভ শহরের উপর নেমে আসছে ঘন অন্ধকার। দ্রুত উঠে পড়লাম।

ট্রলিবাসটি ছুটে চলছে আতাকারা ইয়ারোশার স্টুডেন্টস টাউনের দিকে মাঝখানে ছয়টি স্টপেজ। স্টপেজগুলেতে বাস থামলে যাত্রীরা ওঠানামা করছে। অন্ধকারে আর বাসের বিশাল কাঁচের জানালা গলে প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগ নাই। যা উপভোগ করা যায় তা হলো, রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া আর স্ট্রীট ল্যাম্পগুলোর তীব্র আলোর ঝলকানি। এদেশেই প্রথম নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট স্থাপিত হয়। অতি ক্ষুদ্র পরমাণুর ভিতরে নিহিত রয়েছে অপরিসীম শক্তি। মানুষ রপ্ত করেছে সেই শক্তি বের করে আনার কায়দা। কি করবে সেই শক্তি দিয়ে সেটা শাসকের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে। এই পৃথিবীতে পারমানবিক শক্তি ব্যবহারের প্রথম সিদ্ধান্তটি ছিল মানুষের বিরুদ্ধে। পরমানু থেকে প্রবল শক্তি বাইরে বের করে আনা সম্ভব এটা তখন অনেকেরই জানা হয়ে গেছে। সেই সময় পৃথিবী জুড়ে চলছিলো ভয়াবহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল। চলছে শক্তির লড়াই, কে করবে পৃথিবী শাসন? কে হবে বিশ্বের দন্ডমুন্ডের কর্তা? তাই জার্মানী, জাপান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইত্যাদি বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে চলছে প্রতিযোগিতা কে প্রথম অর্জন করতে পারবে পরমানু থেকে শক্তি বাইরে বের করে আনার প্রযুক্তি। সর্বপ্রথম এই প্রযুক্তি অর্জন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ব্যাস ব্রহ্মাস্র চলে এলো হাতে। আর যায় কোথায়। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো মার্কিন সরকার,জাপানী জনগণের বিরূদ্ধে ব্যবহার করা হবে এই ব্রহ্মাস্র। পরমাণুর প্রবল শক্তিতে ছাড়খার হয়ে যাবে জাপানী জনগণ। হাহাকার করে উঠলো বিজ্ঞানীদের অন্তরাত্মা। এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে তারা এই প্রযুক্তি অর্জনে দিবারাত্রি পরিশ্রম করেননি। বারংবার তারা আর্জি করেন, সরকার যেন কিছুতেই তা ধ্বংসাত্মক কাজে ব্যবহার না করে। তাদের শত অনুনয় সত্বেও, মানবজাতির এত বড় একটি অর্জন প্রথম ব্যবহার করা হলো মানবজাতির বিরুদ্ধেই। বিশ্ববাসী হতবাক হয়ে দেখলো হিরোসিমা আর নাগাসাকির তান্ডবলীলা। মুহুর্তেই ঝরে গিয়েছিলো এক লক্ষ চল্লিশ হাজার নিরিহ নিরাপরাধ প্রাণ। এই প্রযুক্তি অর্জনকারী দ্বিতীয় রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম সফল প্রয়োগ ছিলো শান্তিপূর্ণ কাজে। তারা প্রতিষ্ঠা করেছিলো পৃথিবীর প্রথম নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট। অল্পতেই পাওয়া যাচ্ছে অফুরন্ত বিদ্যুৎ শক্তি। তাই এনার্জি ক্রাইসিসের কোন ধারণাই এদেশে নাই। বরং নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে তারা পশ্চিম ইউরোপে বিদ্যুৎ রপ্তানীও করে থাকে।

ডরমিটরিতে ঢোকার পথে সাশার সাথে দেখা হলো।
সাশাঃ আরে রিমন, তুমি বাইরে ছিলে?
আমিঃ হ্যাঁ, আমাকে খুঁজছিলে?
সাশাঃ একবার গিয়েছিলাম তোমার রুমে। জাস্ট ঢুঁ মারা আরকি। কেমন আছো জানতে।
আমিঃ চল, রূমে যাই।
সাশাঃ না থাক। দেখা তো হলোই। এখন রাত হয়ে গিয়েছে।
সেই রাতে আমার রূমে আর কেউ আসলো না।

পরদিন ক্লাশ শেষ করে কোথাও না গিয়ে সরাসরি রূমে চলে এলাম। কেন? সে কি তাতিয়ানা যাতে আমার রূমে ‘প্রোস্তা মারিয়া’ দেখতে পারে সেজন্যই? কি জানি? যাহোক তাড়াতাড়ি লাঞ্চ শেষ করে, রূমটা একটু গোছগাছ করে নিলাম। টিভি সেটটা অন করে রাখলাম। সেখানে রাশিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর একটা ডকুমেন্টারী ফিল্ম চলছে। রাজনীতিতে আমার আগ্রহ প্রচন্ড। মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলাম। প্রি ও পোস্ট সোভিয়েত রাজনীতির উপর ডকুমেন্টারিটি। বেশ ইন্টারেস্টিং। এক পর্যায়ে জর্জিয়া প্রজাতন্ত্রের রাজধানী তিবিলিসির ১৯৮৯ সালের নয়ই এপ্রিল ট্রাজেডি দেখালো। সেখানে এন্টি-সোভিয়েত মুভমেন্টে সমাবেশ ও অনশনরত মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো কম্যুনিস্ট পার্টির তল্পিবাহক সোভিয়েত আর্মি। এই অনশনের ফুটেজ দেখে আমার আরেকটি ঘটনা মনে পড়লো। ১৯৮১ সালের গোঁড়ার দিককার কথা। আমি তখন নিতান্তই বালক। হঠাৎ পত্র-পত্রিকায় দেখলাম এক কিশোরকে নিয়ে ভীষণ হৈচৈ। লন্ডনের জেলে কয়েকজন আইরিশ কয়েদি আমরণ অনশন করছে। পত্র-পত্রিকায় খবর এটুকুই। আর একটু বিস্তারিত জানা গেল আরও দুদিন পর। আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির (আইআরএ) গ্রেপ্তারকৃত যে যোদ্ধারা অনশন করছিল তাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছেলেটির নাম ববি স্যান্ডস। বয়স মাত্র সতের! সেই সতের বছরের কিশোর অনশণ করছিল রাজবন্দী ঘোষণার দাবীতে! থ্যাচার সরকার তাদের গ্রেপ্তার করেছিল ‘সন্ত্রাসী’ বলে। তারা সেটি মানতে নারাজ। তাদের দাবী তারা আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির সদস্য, এবং ব্রিটেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতার দাবীতে। সুতরাং তারা রাজবন্দী কেন নয়? কিন্তু মার্গারেট থ্যাচার সরকার কিছুতেই ওই আইআরএ যোদ্ধাদের রাজবন্দীর মর্যাদা দেবেনা। টানা অনশন করতে করতে একসময় মৃত্যুবরণ করলেন ববি স্যান্ডস। ওই কিশোরের মৃত্যুর পর পরই সারা বিশ্বে এ নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। একের এর পর এক আরও কয়েকজন বন্দীর মৃত্যু হয়েছিল। ঐ রকম এক সুদর্শন কিশোরের সাদাকালো ছবি খবরের কাগজে দেখে আমি অনেকক্ষণ চোখ ফেরাতে পারিনি। একইসাথে ব্যাথিত ও অভিভুত হয়েছিলাম। ও তারুণ্য কি তোমার দুর্বার শক্তি কেমন অনায়াসেই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলে! কিন্তু লৌহমানবী খ্যাত থ্যাচারের লৌহহৃদয় তাতে এতটুকুও গলেনি। শেষ পর্যন্ত তাদের রাজবন্দীর ‘মর্যাদা’ দেয়া হয়নি।

ডকুমেন্টারী ফিল্মটা শেষ হওয়ার পর কিছু বিজ্ঞাপন হলো। এক সময় সোভিয়েত টিভিতে কোন বিজ্ঞাপন ছিল না। এখন বেশ চটকদার চটকদার রকমারী বিজ্ঞাপন হয়। বিজ্ঞাপন শেষে প্রোস্তা মারিয়া শুরু হলো। মারিয়া দেখায় আমার তেমন কোন আগ্রহ নেই তারপরেও আজ কেন জানিনা দেখতে শুরু করলাম। দশ মিনিট পার হয়ে গেল, ভাবলাম একটু চা খাওয়া যাক। ইলেকট্রিক কেট্লটা হাতে নিয়ে দেখলাম, খালি। পানি আনতে পাশের বাথরূমে যাওয়া প্রয়োজন। সেই উদ্দেশ্যে দরজা খুলতেই দেখলাম তাতিয়ানা দঁড়িয়ে আছে। নক করতে উদ্যত হচ্ছিলো। কেন জানিনা আমার মনটা খুশিতে ভরে উঠলো। আমি কি ওর জন্য অপেক্ষা করছিলাম? না, কখনোই না, আমার মন বলছে, না। তাহলে ওকে দেখে আমি খুশী হলাম কেন? আবার মন তীব্র প্রতিবাদ করে উঠলো। কিছুতেই আমি ওকে দেখে খুশী হইনি। ওকে দেখে খুশী হবো কেন? ও আমার কে?

আজ সাদাসিদা পোষাকে আছে ও। প্রসাধনও নেই কোন। ডিভানে বসে একমনে ‘প্রোস্তা মারিয়া’ দেখছে। ফিল্মের এক জায়গায় বিয়ের প্রসঙ্গ এসেছিলো। ছেলে নিজে মেয়ে পছন্দ করেছে, কিন্তু বাবা মা রাজী হচ্ছে না। কারণ মেয়ের পরিবারের অর্থনৈতিক স্ট্যাটাস ছেলের পরিবারের চাইতে অনেক নীচে। আমি এক সময় ভাবতাম এই কালচারটা কেবল ভারত উপমহাদেশের সমাজেই রয়েছে। পরে আমার আরব বন্ধুদের সাথে আলোচনা করে জেনেছিলাম, ওদের দেশেও একই ব্যাপার। একবার আমার এক সিরিয়ান বন্ধু, বললো, এবারের ছুটিতে ও দেশে গিয়ে এনগেজমেন্ট করে এসেছে। আমি ওকে অভিনন্দন জানিয়ে জানতে চাইলাম, “মেয়ে কেমন?” ও উত্তর দিলো, “আমাদের দেশে মেয়েকে যত না দেখা হয়, তার চাইতে বেশি দেখা হয় মেয়ের পরিবারকে”। ল্যাটিন আমেরিকান টেলে-সিরিয়ালগুলোর কল্যাণে জানলাম, ওখানেও একই অবস্থা। একবার মার্কিনী এক ফিল্মেও এই বিষয়টি দেখে বেশ অবাক হয়েছিলাম। রাশিয়াতে এই সমস্যাটি এখনো নেই। সমাজতন্ত্রের কল্যাণে, অর্থনৈতিকভাবে সবাই সমান হওয়াতে, এই সামাজিক স্তরজনিত সমস্যা কম ছিলো। তবে সুশিক্ষিত ভদ্র পরিবার ও নিম্নমানের পরিবার এই বিষয়টি আছে।

সিরিয়াল শেষ হলে তাতিয়ানা আমাকে প্রশ্ন করলো
তাতিয়ানাঃ তোমাদের দেশে বিয়ের পদ্ধতি কি? এ্যারেন্জড ম্যরেজ না লাভ ম্যারেজ?
আমিঃ দুটোই আছে। তোমাদের দেশে বিয়ের একটাই পদ্ধতি – নিজের পছন্দ বা ভালোবাসার বিয়ে।
তাতিয়ানাঃ হু। তবে আজকাল প্রচুর হিসেবের বিয়ে হচ্ছে।
আমিঃ হিসেবের বিয়ে মানে?
তাতিয়ানাঃ মানে ছেলে মেয়েরা হিসেব করে, এই বিয়েটা করে কতটুকু লাভ হবে।
আমিঃ তাই?
তাতিয়ানাঃ হ্যাঁ। এখন দেশের সমাজ কাঠামোর পরিবর্তন হয়েছে। ধনী-গরীব বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। তাই বিয়ের মধ্যেও টাকা-পয়সা ব্যাপারটা চলে এসেছে।
আমিঃ ও, জানতাম না।
তাতিয়ানাঃ মেয়েরা বিশেষতঃ টাকাওয়ালা ছেলে খোঁজে। তারপর সেরকম পেলে তাকে নানাভাবে জালে আটকানোর চেষ্টা করে।
আমিঃ তোমার কি মনে হয়? কোনটা ভালো, এ্যারেন্জড ম্যরেজ না লাভ ম্যারেজ?
তাতিয়ানাঃ নিজের পছন্দের বিয়ে হলেই ভালো কারণ সেটা ভালোবাসার বিয়ে, মনের মানুষটাকে নিয়েই তো ঘর বাঁধতে ইচ্ছা হয়।
আমিঃ তোমাদের দেশের অনেকেই একাধিক সম্পর্কের পর বিয়ে করে, সেই বিয়েটা কি আদৌ ভালোবাসার?
তাতিয়ানাঃ লুবোভ প্রিখোদিত ই উখোদিত।
আমিঃ মানে কি?
তাতিয়ানাঃ ভালোবাসা আসে আর যায়।
আমিঃ এটা কেমন কথা? ভালোবাসা কি এতোই ঠুনকো?
তাতিয়ানা হেসে ফেললো। গত পরশু রাতের ঘটনার পর থেকে এই পর্যন্ত ওকে খুব গম্ভীর দেখছিলাম। মুক্তোর মতো দাত বের করে এই হঠাৎ হাসির ঝলক খুব ভালো লাগলো। যেন অনেকক্ষণের গুমোট বাতাস উড়িয়ে নিয়ে গেল।
তাতিয়ানাঃ না। কথাটা আমাদের দেশে প্রচলিত আছে। অনেকে বলে আমি বিশ্বাস করিনা। ভালোবাসা ভালোবাসাই তা ঠুনকো হবে কেন?
আমিঃ তবে একটি বিষয় কি জানো? ভালোবাসলেই ঘর বাধা যায়না।
তাতিয়ানাঃ কেন?
আমিঃ অনেক সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, আইনগত জটিলতা থাকে।
তাতিয়ানাঃ ও। পৃথিবীতে কেন এতো জটিলতা বলতো? (ওর হতাশ কন্ঠ প্রকাশ পেল)
আমিঃ এ্যারেন্জড ম্যরেজের সুবিধা হলো, বিবাহোত্তর জীবনে টাকা একটা বড় ফ্যক্টর হয়ে দেখা দেয়, তাই সেটা নিশ্চিত করা জরুরী, বিয়ের আগে বিশাল আবেগ থাকে, কিন্তু বৈবাহিক জীবনের একটা পর্যায়ের পরে সেটা তিরোহিত হয়।
তাতিয়ানাঃ তুমি তাই মনে করো?
আমিঃ ঠিক বলতে পারবো না। আমার বাস্তব কোন অভিজ্ঞতা নেই তো। বই-পত্র, নাটক-নভেলে যা দেখি।
তাতিয়ানাঃ ভালোবাসা দিয়ে কি দুজন-দুজনের অভাবগুলোকে পুরণ করা যায়না?
আমিঃ জানিনা। যায় হয়তো। এই নিয়ে একটা গান আছে আমাদের ভাষায়।
তাতিয়ানাঃ কি গান? (ভীষণ উৎসাহিত হয়ে উঠে বললো তাতিয়ানা)
আমিঃ আমার না যদি থাকে সুর, তোমার আছে তুমি তা দেবে,
তোমার গন্ধ হারা ফুল আমার কাছে সুরভী নেবে,
এরই নাম প্রেম, এরই নাম প্রেম, ………………..।
তাতিয়ানাঃ (দ্বিগুন উৎসাহ নিয়ে) তোমার কাছে আছে গানটি? শোনাবে আমাকে। অনুবাদও করে দিও প্লিজ
আমি কিংবদন্তির বাঙালী গায়ক মান্না দে’-র গাওয়া গানটি চালিয়ে দিলাম।
” কি অদ্ভুত সুন্দর সুর” উচ্ছাস প্রকাশ করে। গভীর আবেগে তা শুনতে লাগলো বাংলাদেশ থেকে হাজার যোজন মাইল দূরে বসে থাকা এক ইউক্রেণীয় তরুণী।

আমার না যদি থাকে সুর, তোমার আছে তুমি তা দেবে,
তোমার গন্ধ হারা ফুল আমার কাছে সুরভী নেবে,
এরই নাম প্রেম, এরই নাম প্রেম,
জীবনে যা গৌরবও হয় মরণেও নেই পরাজয়,
চোখের স্মৃতির মণিদ্বীপ মনের আলোয় কভু কি নেভে?
এরই নাম প্রেম, এরই নাম প্রেম,
দুজনেই দুজনাতে মুগ্ধ, দুজনার রূপে কত সুন্দর,
দুজনার গীতালীর ছন্দে, তন্ময় দুজনার অন্তর,
এর কাছে স্বর্গ সুধার বেশী আছে মূল্য কি আর,
আমার দেবতা সেও তাই, প্রেমের কাঙাল পেয়েছি ভেবে,
এরই নাম প্রেম, এরই নাম প্রেম।

বিষণ্ন বিরিওজা – ৯

বাহ্ মেয়েটিতো সুন্দর!” বেশ উচ্ছসিত হয়ে বললেন আশরাফ ভাই। পাশে বসে মুচকি হাসলেন শিশির ভাই।
ডিভানের এক পাশে চুপচাপ বসে ছিলো তাতিয়ানা। ও বাংলা বোঝেনা তাই আমাদের সুবিধা হচ্ছিলো। এদেশে এটাকে অভদ্রতা মনে করা হয়, যখন ভিনদেশী একজন বা কয়েকজনার উপস্থিতিতে কেউ কেউ তার মাতৃভাষা বা এমন কোন ভাষায় কথা বলে যা সবাই বুঝতে পারেনা। কিন্তু আমরা বাঙালীরা অত ভদ্রতা বুঝিনা। সমানে অন্যদের সামনে বাংলায় কথা বলে যাচ্ছি। অন্যে যে আমার কথাটা বুঝতে পারছে না,সে বিব্রত বোধ করতে পারে, এটা চিন্তা না করে বরং এটার সুযোগই নেই বেশীর ভাগ সময়ে।

আশরাফ ভাই আর শিশির ভাই, আমার রুমে এসেছিলেন বেড়াতে। আধ ঘন্টা তক গল্প-গুজব করার পর এক পর্যায়ে তাতিয়ানা এসে ঢুকলো আমার রূমে। সাদা টপস আর কালো স্কার্ট পরিহিতা তাতিয়ানাকে আমার খুব সাদাসিদে মনে হচ্ছিলো। যার সম্বন্ধে আমি ইতিমধ্যেই উনাদেরকে বলেছি, ‘অসুন্দর’। সেই মেয়েটিকেই আশরাফ ভাই সুন্দরী আখ্যা দিলেন! আসলে পছন্দের রকমফের হয়।একবার রাশিয়ার ভ্লাদিমির শহরে বেড়াতে গিয়েছিলাম। একটি উঁচু টিলায় বসে শহরের বুক চিরে চলে যাওয়া ছোট একটি নদীর সৌন্দর্য্য উপভোগ করছিলাম। এসময় দুটি রুশ মেয়ে এগিয়ে এসে আমার পাশে বসা ভ্লাদিমিরে অধ্যয়নরত আমার বন্ধুটির সাথে কুশল বিনিময় করলো। দুজনাই ইউনিভার্সিটিতে সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী। এদের মধ্যে একজন ছিলো দীর্ঘাঙ্গী, প্যান্ট শার্ট পরা, অপরজন ছিলো মাঝারী গরনের, পরনে স্কার্ট। ওরা চলে যাওয়ার পর আমার বন্ধুটি বললো, “কেমন দেখলি ঐ মেয়েটিকে?”
আমিঃ কোন মেয়েটি?
বন্ধুঃ স্কার্ট পড়া মেয়েটি।
আমিঃ হাসিখুশী।
বন্ধুঃতা ঠিক আছে। কিন্তু দেখতে কেমন?
আমিঃ হু, মোটামুটি। (দায়সারা গোছের উত্তর দিলাম)
বন্ধুঃ সুন্দর না, তাইনা?
আমিঃ হ্যাঁ, তাই। এবার সত্যি কথাটা বললাম।
বন্ধুঃ অথচ, এক ইন্ডিয়ান ছেলে ওর জন্য পাগল। ছেলেটি খুব ভদ্র। মেয়েটিকে ভীষণ ভালোবাসে। মেয়েটির জন্য ও কেঁদেছে পর্যন্ত। ওর বক্তব্য, “এতো সুন্দর মেয়ে আমি জীবনে কখনো দেখিনি”।
আমি ভাবলাম, এজন্যই বোধহয় গান রচিত হয়েছে, ‘যার নয়নে যারে লাগে ভালো!’

আশরাফ ভাইরা চলে যাওয়ার পর আমি কিছুক্ষণ টিভি দেখলাম। কালকে একটা ক্লাস টেস্ট হবে, পড়তে ইচ্ছা করছিলো না। ফাইনাল ইয়ারে এসে আর ক্লাস টেস্টে কোন টেস্ট পাইনা। টিভিতে চলা এ্যমেরিকান ফিল্মটি বোগাস মনে হলো। সব এক ধাঁচের। ক্রাইম, খুন, গাড়ী ভাঙা, টাকা আর সেক্স। এই হলো এ্যামেরিকান ফিল্মের মাল-মশল্লা! কফি তেস্টা পেলো। ইলেকট্রিক কেটলটা অন করলাম।

টুক টুক টুক, তাতিয়ানা হতে পারে। আজকাল দিনে দুবারও আসে। যা ভেবেছিলাম তাই। তাতিয়ানাই। পোষাক পাল্টে এসেছে। পরনে হালকা খাটো সাদা শার্ট আর কালো রঙের মিনি স্কার্ট। যথারিতি সিডাকটিভ পোষাক। ও কি আমাকে সিডিউস করার জন্য এই পোষাক পড়েছে? বুঝিনা। হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। এখানে তো ঐ পোষাক স্বাভাবিক। এই মুহুর্তে করিডোরে অনেক মেয়েকেই ঐ পোষাকে দেখা যাবে।

আমিঃ বসো।
তাতিয়ানাঃ কি করছো?
আমিঃ কিছুনা। টিভি দেখার চেষ্টা করছিলাম। বোগাস এ্যামেরিকান ফিল্ম।
তাতিয়ানাঃ অন্য চ্যনেলে দেখো কি আছে।
আমিঃ মুড নাই।
তাতিয়ানাঃ তাহলে গান শোন।
আমিঃ গান? হ্যাঁ, গান শোনা যায়।
তাতিয়ানাঃ তাহলে চালাও।
আমিঃ ওকে
এই বলে আমি ক্যাসেট প্লেয়ারের সুইচ অন করতে গিয়ে থেমে গেলাম।
তাতিয়ানাঃ কি ব্যাপার?
আমিঃ না থাক।
তাতিয়ানাঃ কেন?
আমিঃ এখানে তুমি আছো।
তাতিয়ানাঃ আমি থাকাতে গান শুনতে অসুবিধা কি?
আমিঃ আমি তো বাংলা গান শুনি। তুমি তো বুঝবে না। শুধু শুধু বোর ফীল করবে।
তাতিয়ানাঃ ওহো, এই ব্যাপার! না তোমাদের গানের অর্থ আমি বুঝিনা সত্য, কিন্তু সুর খুব ভালো লাগে।
আমিঃ একটা গান শুনেই সুর ভালো লেগে গেল?
তাতিয়ানাঃ একটা গান? না একটা গান না। আমি আগেও তোমাদের দেশের গান অনেক শুনেছি।
আমি সরু চোখে ওর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম
আমিঃ আমার আগেও আরো কারো কাছে আমাদের গান শুনেছ নাকি?
তাতিয়ানাঃ (হেসে ফেললো) না, কারো কাছে নয়। আমি ইন্ডিয়ান ফিল্ম দেখি মাঝে মাঝে। সেখানে তো অনেক গান থাকে। গান ছাড়া তো কোন ফিল্ম করতে পারোনা তোমরা।
আমিঃ কোথায় দেখো ইন্ডিয়ান ফিল্ম?
তাতিয়ানাঃ টিভিতে তো দেখায়। তাছাড়া আাদের গ্রামের সিনেমা হলেও আসে মাঝে মাঝে।
আমিঃ ও।
তাতিয়ানাঃ আচ্ছা তোমাদের ফিল্মগুলো গান ছাড়া হয়না, না?
আমিঃ তুমি তো ইন্ডিয়ান ফিল্মের কথা বললে। আমি তো ইন্ডিয়ান না, বাংলাদেশী।
তাতিয়ানাঃ জানি তোমাদের ভিন্ন ভিন্ন দেশ, কিন্তু আমার কাছে তোমাদের একই রকম মনে হয়। ইন্ডিয়ান বাংলাদেশীতে পার্থক্য কি খুব বেশী?
আমিঃ কিছু পার্থক্য তো আছেই। তা নইলে আলাদা আলাদা দেশ হবে কেন?
তাতিয়ানাঃ সে বোধহয় আমাদের ইউক্রেন আর রাশিয়ার মতো।
আমিঃ হতে পারে। ফিল্মে গানের কথা যেটা বলছো, ওটা কিন্তু হিন্দি ছবির আগে বাংলা ফিল্মেই প্রথম এসেছে।
তাতিয়ানাঃ তাই?
আমিঃ যতদূর জানি, প্লে-ব্যাক বিষয়টি, মানে নেপথ্যে গায়ক-গায়িকা গান গাইবে, আর পর্দায় নায়ক-নায়িকা লীপ মিলাবে এই বিষয়টি পৃথিবীতেই প্রথম চালু করা হয় বাংলা সিনেমায়।
তাতিয়ানাঃ তাই? তোমাদের সিনেমায়?
আমিঃ হ্যাঁ, তবে তখন ফিল্ম ঢাকায় চিত্রায়িত হতোনা, হতো কোলকাতায়।
তাতিয়ানাঃ ইন্টারেস্টিং। আমাদের রুশ কিছু ছবিতেও তো প্লে-ব্যাক রয়েছে।
আমিঃ আমি দেখেছি। বিখ্যাত ছবি ‘কাভখাজকাইয়া প্লেননিত্সা’, ‘ইরোনিয়া সুদবি ইলি এস লিওগকিম পারোম’, ইত্যাদি ছবিগুলেতে প্লে-ব্যাক আছে।
তাতিয়ানাঃ তাইতো। তার মানে এটা আমরা তোমাদের কাছ থেকে শিখেছি?
আমিঃ তাইতো মনে হয়। বাই দ্য বাই। আমি কিন্তু তোমাদের টিভিতে একটা প্রোগ্রাম দেখেছিলাম, ‘সিনেমার গান’ নামে।
তাতিয়ানাঃ হ্যাঁ, এক সময় খুব জনপ্রিয় ছিলো ঐ প্রোগ্রাম।
আমিঃ আমাদের দেশেও ‘ছায়াছন্দ’ নামে ঐরকম একটি প্রোগ্রাম খুবই জনপ্রিয় ছিলো।
তাতিয়ানাঃ ইন্টারেস্টিং, দেখতে পারলে ভালো লাগতো।
আমিঃ দেখবে?
তাতিয়ানাঃ কিভাবে?
আমিঃ ভিডিও চালিয়ে দেই।
তাতিয়ানাঃ ক্যাসেট আছে?
আমিঃ আছে।
তাতিয়ানাঃ চালাও তাহলে।
আমি গীতমালার একটি ক্যাসেট হাতে নিলাম, এখানে কিছু বাংলা ও হিন্দি গান রয়েছে। ভিডিওটার কাছে গিয়ে বললাম

আমিঃ না আজ থাক
তাতিয়ানাঃ (অনেকটাই ক্ষিপ্ত হয়ে) আজ থাকবে কেন? আশা দিয়ে এভাবে নিরাশ করো! দিস ইজ ভেরি ব্যাড।
আমিঃ না, নিরাশ করতে চাচ্ছিনা। মানে আজ অনেক রাত হয়ে গেছে।
তাতিয়ানাঃ কি হয়েছে তাতে? আমি কি হাজার মাইল দূরে থাকি নাকি?
আমিঃ কাছেই থাকো (একটু দমে গিয়ে বললাম)
তাতিয়ানাঃ তোমার ফ্লোরেই তো থাকি। আর দুটো রূম পরে। গভীর রাত হলেই বা সমস্যা কি?
আমিঃ না, তার পরেও।
তাতিয়ানাঃ তার আবার পর কি? এখানে কি আমার বাবা-মা আছে যে, আমার ফিরতে দেরী হলে তাদের রাতে ঘুম হবে না? ডরমিটরিতে তো আমরাই রাজা।
ওর এতো মারমুখো কথায় আমি আর, বাধা দিতে পারলাম না। ভিডিওটা অন করে দিলাম। গীতমালা বা ছায়াছন্দ চলতে শুরু করলো। তাতিয়ানাকে দেখলাম বেশ মুগ্ধ হয়ে দেখছে।
তাতিয়ানাঃ আচ্ছা এখানে যেমন দেখায়, তোমাদের দেশে প্রেমিক-প্রেমিকা কি সত্যিই এমন নাচ-গান করে?
আমিঃ সব্বোনাশ! রাস্তা-ঘাটে এরকম নাচ গান করলে রক্ষে আছে?
তাতিয়ানাঃ কেন কেন, কি অসুবিধা?
আমিঃ পাবলিক ধাওয়া দেবে।
তাতিয়ানাঃ বুঝলাম না!
আমিঃ মানে এরকম হয়না। আমাদের কালচারে নেই। এটা কেবলই সিনেমা।
তাতিয়ানাঃ ও, স্বপ্নের জগৎ!
আমিঃ তবে তোমরা এদিক থেকে এগিয়ে আছো।
তাতিয়ানাঃ কি রকম?
আমিঃ তোমাদের এখানে ডিসকো-টেকা হয়। সেখানে নাচ-গান করো। প্রেমিক-প্রেমিকা একে অপরের সান্যিধ্যে এসে ক্লোজ ড্যান্স করতে পারো।
তাতিয়ানা মৃদু হেসে বললো
তাতিয়ানাঃ তুমি ডিসকোতে যাওনা?
আমিঃ খুব কম।
তাতিয়ানাঃ তোমাকে দেখিনি কখনো।
আমিঃ কম যাই, তাই দেখোনি।
তাতিয়ানা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে, একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বললো
তাতিয়ানাঃ চলোনা নেক্সট স্যটারডেতে যাই।
আমিও একটু চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লাম। কি উত্তর দেব। এই মেয়েটির সাথে আমি নিজেকে জড়াতে চাইনা। একটু থেমে ক্ষীণ স্বরে উত্তর দিলাম
আমিঃ দেখি।

ঐরাতে তাতিয়ানা আরো একঘন্টা আমার রূমে বসে সিনেমার গান শুনেছিলো। তারপর চলে যাওয়ার জন্য নড়েচড়ে বসে বললো
তাতিয়ানাঃ খুব রোমান্টিক, তোমাদের এই গানগুলো!
ও উঠে দাঁড়াতেই বাইরে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো।
তাতিয়ানাঃ বাহ্ বৃষ্টি! তোমাদের দেশে তো অনেক বৃষ্টি হয়, তাই না?
আমিঃ হ্যাঁ আমাদের দেশে ঝম-ঝম বর্ষা নামে। ঝিলের বুকে শাপলা ফোটে। উথাল-পাতাল জোছনায় ভরে যায় চারিদিক। হালের দুপাশে দিগন্তজোড়া ধান ক্ষেত, তার উপর দিয়ে হু হু করে বয়ে যায় দুরন্ত হাওয়া!

তাতিয়ানা গভীর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো, জানিনা ও কি ভাবছে।

তাতিয়ানা উঠে দাঁড়ালো। আমি ভাবলাম চলে যাবে তাই উঠে দাঁড়িয়েছে। আমিও উঠে দাঁড়াতে যাব, এসময় ও আবার বসে পড়লো।
তাতিয়ানাঃ কি ধরনের ফিল্ম পছন্দ কর তুমি?
আমিঃ সব রকমই।
তাতিয়ানাঃ তাই হয় নাকি?
আমিঃ কেন হবে না?
তাতিয়ানাঃ সবার কি সব পছন্দ হয়? এই ধর রঙ , তোমার কি সব রঙই পছন্দ?
আমিঃ না।
তাতিয়ানাঃ এই দেখো, কোন একটি বিশেষ রংয়ের প্রতিই তোমার দুর্বলতা রয়েছে।
আমিঃ না ঠিক তাও নয়। কোন একটি বিশেষ রংয়ের প্রতি নয়, কিছু কিছু রং ভালো লাগে। যেমন আকাশী, ম্যাজেন্টা, বেগুনী।
তাতিয়ানাঃ তাইতো বলছি, সব ভালো লাগতে পারেনা। ভালো হলেও না। আবার ধরো ফুল, ফুল সবই তো সুন্দর, তারপরেও নিশ্চয়ই কোন একটি ফুল তোমার বেশি ভালো লাগে?
আমিঃ হ্যাঁ, তবে আবারও সেই, একটি নয় কয়েকটি ফুল আমার ভালো লাগে।
তাতিয়ানাঃ কোন কোন ফুল ভালো লাগে তোমার?
আমিঃ আমার ভালো লাগার ফুলগুলো দিয়ে তোমার বাগান ভরিয়ে দিতে চাও নাকি?
তাতিয়ানাঃ যাহ্ (লজ্জ্বা পেয়ে গেল তাতিয়ানা)। এম্নিই জানতে চাইছি।
আমিঃ আমার যে ফুলগুলো ভালো লাগে, তার কিছু তোমাদের দেশে আছে, আর কিছু কেবল আমাদের দেশেই আছে।
তাতিয়ানাঃ তোমাদের দেশে বুঝি অনেক ফুল ফোটে?
আমিঃ হ্যাঁ, তাতো ফোটেই। ট্রপিকাল কান্ট্রি। আবহাওয়া ভালো।
তাতিয়ানাঃ তাহলে নিশ্চয়ই তোমাদের দেশ পুরোটাই ফুল দিয়ে সাজানো অদ্ভুত সুন্দর একটা দেশ।
এবার আমার দীর্ঘনিশ্বাস ফেলার পালা। আমার দেশ সাজালে-গোছালে অবশ্যই অদ্ভুত সুন্দর একটা দেশ হওয়ার কথা। কিন্ত বিধাতা আমাদের যা দিয়েছেন, তার কিছুই আমরা কাজে লাগাতে পারিনি! রুচিবোধ বলে তো কিছুই আমাদের নেই। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রতিটি শহর একেবারে ডাস্টবিন বানিয়ে রেখেছি। আর এদের সামান্য যা আছে, তাই দিয়েই এরা স্বর্গ রচনা করেছে।

তাতিয়ানাঃ কই বললে না তো তোমার কোন কোন ফুল ভালো লাগে?
আমিঃ আমার দেশের ফুলের মধ্যে, রজনীগন্ধা, কৃষ্ণচূড়া, বাগানবিলাস, কামিনী, কাঠ গোলাপ, অলকানন্দা, মাধবীলতা, ডালিয়া। তোমার দেশের মধ্যে যেগুলো আমার দেশেও পাওয়া যায়, লিলি, জেসমিন, গ্লাডিওলাস, ক্রিসেনথিমাম। যা তোমার দেশে পাওয়া যায় কিন্তু আমার দেশে নেই, যেমন কারনেশন, টিউলিপ।
তাতিয়ানাঃ ওরে বাব্বা! কোন ফুলই তো বাদ রাখলে না।
আমিঃ অনেকটা সেরকমই হয়ে গেল।
তাতিয়ানাঃ আসলে কি জানো?
আমিঃ কি?
তাতিয়ানাঃ তোমার মনটা খুব সুন্দর! সুন্দর মনের মানুষরা ফুল প্রিয় হয়।
আমিঃ তাই? (একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললাম আমি)
তাতিয়ানাঃ আমি প্রথম দিন যেদিন তোমার রূমে ঢুকেছি সেদিনই লক্ষ্য করেছি, তোমার ঘর ভরা ফুল। এখানে সেখানে ফুলদানী আর তাতে নানা রংয়ের ফুল। তোমার পর্দার প্রিন্টেও খুব সুন্দর ফুলের ছবি তোলা। ডিভানের কাভারটাও ছোট ছোট চমৎকার ফুলের প্রিন্ট।
আমিঃ থাক থাক আর বলতে হবেনা। প্রশংসা বেশি হয়ে যাচ্ছে।
তাতিয়ানা: তোমাদের দেশে গোলাপ নেই গোলাপের কথা বললে না যে?
আমিঃ ও, গোলাপ! আসলে গোলাপ খুব কমোন একটা ফুল। আমি একে অসুন্দর বলবো না। গোলাপ তো সুন্দরই। তবে খুব কমোন হওয়ায় বোধহয় এর প্রতি আসক্তি কমে গিয়েছে।
তাতিয়ানাঃ গোলাপের প্রতি আসক্তি কমিও না।
আমিঃ কেন?
তাতিয়ানাঃ প্রিয়জনকে গোলাপই উপহার দিতে হয়।
আমি হেসে ফেললাম।
আমিঃ আচ্ছা ঠিকআছে, কোনদিন প্রিয়জন হলে আমি গোলাপই উপহার দেব।
হঠাৎ খুব করুণ চোখে আমার দিকে তাকালো তাতিয়ানা। আমি একটি বিব্রত হয়ে গেলাম। ওর দৃষ্টি হঠাৎ বদলে গেলো কেন?
তাতিয়ানাঃ তারপর ফিল্ম? ফিল্ম সম্পর্কে তো কিছু বললে না?
আমিঃ তুমি বলো। তোমার কি ধরনের ফিল্ম ভালো লাগে?
তাতিয়ানাঃ উঁ, হরর মুভি ভালো লাগে। তবে সবচাইতে বেশি ভালো লাগে রোমান্টিক মুভি।
আমিঃ আমি সব মুভিই দেখি, তবে ক্লাসিকাল মুভিগুলো বেশী ভালো লাগে।
তাতিয়ানাঃ তোমার দেশে টিভিতে এ্যরোটিকা দেখায়?
আমিঃ না।
তাতিয়ানাঃ কেন?
আমিঃ মুসলমানদের দেশ। টিভিতে এ্যরোটিকা দেখানো আন এথিকাল মনে করা হয়।
তাতিয়ানাঃ আমাদের দেশেও এগুলো একসময় আন-এথিকাল মনে করা হতো। এখন আর কোন বাছ-বিচার নাই। সবই দেখায়।
আমিঃ হ্যাঁ ইদানিং সবকিছুই লাগামহীন হয়ে গেছে।
তাতিয়ানাঃ তোমার দেশে টিভিতে পর্নোগ্রাফি দেখায়?
আমিঃ এ্যরোটিকাই দেখায় না, পর্নো তো অনেক দূরের কথা।
তাতিয়ানাঃ ও তাইতো, এ্যরোটিকা না দেখালে পর্নোতো অনেক দূরের কথা। ভিডিওতে পর্নো দেখা আইনসিদ্ধ?
আমিঃ আইনসিদ্ধ না। তবে চলছে। এই বিষয়ে কোন কড়াকড়ি নেই।
তাতিয়ানাঃ তুমি দেশে থাকতে পর্নোগ্রাফি দেখেছ?
একটু ফাঁপড়ে পড়ে গেলাম, কি উত্তর দেব! মেয়েটা এমন প্রশ্ন করছে কেন?
তাতিয়ানাঃ উত্তর না দিতে চাইলে থাক।
দেখলাম ওর চোখে কৌতুক চিকচিক করছে।
——————– *** ———————————–

টুক টুক টুক দরজায় নক করার শব্দ। তাতিয়ানাই হবে। এখন ও ‘প্রোস্তা মারিয়া’ দেখা ছাড়াও দিনে কয়েকবার আসে। গল্পগুজব করে। আমিও এতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। ‘প্রোস্তা মারিয়া’ ছাড়া বাকী সময়টুকুতে ওর জন্য আর বিশেষভাবে অপেক্ষা করি না। বাইরে নিজের কোন কাজ থাকলে বের হয়ে যাই। এই সময় তাতিয়ানা আসলেও আমাকে না পেলে ফিরে যায়, আবার আসে।

আমি “কাম ইন বলে দরজার দিকে চোখ রাখলাম।” দরজা ঠেলে যে ভিতরে ঢুকলো সে তাতিয়ানা তো নয়ই, এমনকি আমার বন্ধু-বান্ধবদেরও কেউ নয়। দীর্ঘকায় একজন সুপুরুষ ঢুকলেন তাও ইউনিফর্ম পড়া। ইউনিফর্মটির দিকে লক্ষ্য করলাম। পুলিশের ইউনিফর্মও নয়, মিলিটারির ইউনিফর্মও নয়। তাহলে কার ইউনিফর্ম?

ইউনিফর্মধারীঃ স্দ্রাভস্তভুইচে (সুস্থ থাকুন)!
আমিঃ স্দ্রাভস্তভুইচে!
উনার পিছনে পিছনে ডরমিটরির কমান্ড্যন্ট ঢুকলো। এবার আমার মেজাজ একটু তিরিক্ষি হলো। কোন ঝামেলা পাকাতে এসেছে নাকি?
আমিঃ আপনি?
ইউনিফর্মধারীঃ (সরল হাসি হেসে বললেন) না, কিছুনা। জাস্ট দেখতে এসেছি।
আমিঃ কি দেখতে এসেছেন?
ইউনিফর্মধারীঃ সব ঠিক আছে কিনা।
আমি (আরও অবাক হয়ে) কি ঠিক আছে?
ইউনিফর্মধারীঃ আমি ফায়ার ব্রিগেডের লোক। এটা আমাদের দায়িত্ব।
এবার বুঝতে পারলাম। ফায়ার ব্রিগেডের ইন্সপেকটর। রুটিন চেক আপ-এ এসেছে। এখানে অনেক ভালো কিছু আছে। প্রতিটি বাড়ী নির্মিত হয় যথাযথ বিল্ডিং কোড মেনে। তাই এখানকার কন্সট্রাকশন বেশ নিরাপদ।
একটি বাড়ী নির্মানের সময় ফায়ার ব্রিগেডের অনুমোদনেরও প্রয়োজন পড়ে। তারপর ফায়ার ব্রিগেডের ইন্সপেক্টররা নিয়মিত পরিদর্শন করেন সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা? আগুন লেগে যাওয়ার মত ঝুঁকিপূর্ণ এমন কিছু থাকলে তা সাথে সাথে সরিয়ে ফেলেন বা সমাধানের ব্যবস্থা করেন। কেউ অগ্নি সংক্রান্ত আইন অমান্য করলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়। তবে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই জনগন নিজেদের প্রয়োজনেই সচেতনভাবে এইসব আইন মেনে চলে। আমি মনে মনে ভাবলাম। দেশে থাকতে বিল্ডিং কন্সট্রাকশনে ও ইন্সপেকশনে যে ফায়ার ব্রিগেডেরও যে ভূমিকা থাকে এটা জানতামই না। আর কখনো কোন ফায়ার ব্রিগেডের ইন্সপেকটরকে দেখি নাই বাসা বাড়ী ইন্সপেকশন করতে।
ইউনিফর্মধারীঃ না ঠিকই আছে। (বলে আর একবার সরল হাসি হাসলেন)
আমিঃ আপনাকে ধন্যবাদ।
ইউনিফর্মধারীঃ আপনার ফার্নিচারগুলো ঠিকঠাক মতো রাখা আছে। অতিরিক্ত দাহ্য কোন পদার্থও দেখছি না।
আমিঃ ও, ধন্যবাদ।
ইউনিফর্মধারীঃ ভালো কথা। আপনার রুমে কি রান্নার হিটার আছে?
আমিঃ না। রান্নার হিটার লাগবে কেন? ফ্লোরে তো দুইটা কিচেন আছে।
ইউনিফর্মধারীঃ ঠিক। কেউ যাতে রূমে রান্না না করে এইজন্যই এই ব্যবস্থা।
আমিঃ আর কিছু?
ইউনিফর্মধারীঃ না। ও আচ্ছা। আপনার রূমের ফায়ার এলার্মটা একটু চেক করি।
এখানে প্রত্যেকটা রূমেই ফায়ার এলার্ম থাকে। দুর্ঘটনা বশতঃ আগুন লেগে গেলে বা লাগার সম্ভাবনা দেখা গেলে সাথে সাথে এলার্ম বেজে ওঠে।

ইউনিফর্মধারীঃ না। সবই ঠিক আছে। ইউ আর এ গুড বয়।
আমি হাসলাম ।
বিল্ডিং কোড কথাটি দেশে থাকতে শুনেছি বলে মনে পড়েনা। আইনে আছে নিশ্চয়ই। তবে ব্যাপক জনগনের মধ্যে প্রচলিত নেই। গায়ে গা লাগানো ঘিন্জি দালান-কোঠা তো খুবই বিপজ্জনক। কিন্তু এই বিষয়ে সরকারি কোন পদক্ষেপের কথা কখনো শুনিনি। পুরোনো ঢাকার পর নতুন ঢাকাতেও একের পর এক ঘিন্জি এলাকা গড়ে উঠতে শুরু করেছে। অথচ কারো কোন ভ্রুক্ষেপই নেই। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় একবার ঢাকার রামপুরা, মগবাজার, মালিবাগ সহ বেশ কিছু এলাকায় বড় বড় চওড়া লিংক রোড ও অন্যান্য রাস্তা তৈরী করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছিলো। কিন্তু উনি শহীদ হওয়ার পর এই সব পরিকল্পনাও শহীদ হয়ে যায়। তখন কাজটা করা অনেক সহজ হতো, কারণ উঁচুতলা কোন ভবন তখন ঐ সব এলাকায় ছিলনা শতকরা নব্বই ভাগই ছিলো একতলা বা টিনের ঘর। এরপর এরশাদের শাসনামলে শহরের পরিবেশ, যোগাযোগ কোনকিছুর কোন সুদুরপ্রসারী চিন্তাভাবনা না করেই সরু রাস্তা, আঁকা-বাঁকা অলি-গলির পাশে ব্যঙের ছাতার মত গড়ে উঠতে থাকে বহুতল ভবন। পুকুর ভরাট করে কখনো অনুমতিহীন আর কখনো ঘুষ দিয়ে অনুমতি নিয়ে তৈরী করা হয় অট্টালিকা। এরকম বেশ কিছু দালান ধ্বসে পড়ারও সংবাদ পাওয়া যায়। এসবের দায়ভাগ কেউ নিয়েছে বলে শুনিনি। উদ্ধার তৎপরতায়ও সরকারের উৎসাহ ছিলোনা কোন। হায়রে আমার দেশ! মানুষের জীবনের কি কোন মূল্য নেই? নাকি ইকোনোমিক্সের ডিমান্ড-সাপ্লাই থিওরী কাজ করছে। মানুষের সাপ্লাই এত বেশী হয়ে গিয়েছে যে, মূল্য কমে গিয়েছে অনেক। রেসিডেন্সিয়াল এরিয়ায় একের পর এক গড়ে উঠেছে গার্মেন্টস থেকে শুরু করে নানা ধরনের মিল-কারখানা। উন্নত দেশগুলোতে যেখানে রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া, কমার্শিয়াল এরিয়া, ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়া ভিন্ন ভিন্ন, এবং অগ্র পশ্চাৎ অনেক চিন্তা ভাবনা করে এগুলো তৈরী করা হয়, সেখানে আমাদের দেশে হলো ডালে-চালে খিচুড়ী।

কোন একটি দুর্ঘটনায় উদ্ধার তৎপরতাও আশাব্যন্জক নয়। হঠাৎ আমার ফিলিপাইনের একটি মর্মান্তিক ঘটনার কথা মনে পড়লো। ১৯৮১ সালের ১৭ নভেম্বরের কথা। ফিলিপাইনের রাষ্ট্রক্ষমতায় তখন ছিলো জান্তা ফার্দিনান্দ মার্কোস। দেশের জনগণের কাছে যার কোন জনপ্রিয়তাই ছিলনা। তারপরেও বহাল তবিয়তে সিংহাসনে বসে ছিলো খুটির জোড়ে। একবার তার খ্যাতির লক্ষ্যে ভাবলেন, তাক লাগানো একটি ফিল্ম সেন্টার তৈরী করবেন তিনি। যথারীতি শুরু করলেন ব্যয়বহুল ‘ম্যানিলা চলচ্চিত্র কেন্দ্র’-এর নির্মাণ। নির্মাণ চলাকালীন সময়ে তিনি এবং তার রূপসী স্ত্রী ইমেল্দা মার্কোস কয়েকদফা নির্মাণ পরিকল্পনা পরিবর্তন করেন। এর ফলে একদিকে যেমন কাজে বারবার বাধা আসছিলো আবার সেই বাধা মেক-আপ করার জন্য আসন্ন ফিল্ম ফেস্টিভালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে লক্ষ্য করে বেধে দেয়া সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার জন্য তাড়াহুড়োও করা হচ্ছিলো প্রচুর। এসময় দুর্ভাগ্যবশত একটি scaffold ধ্বসে পড়ে, আর শ্রমিকরা পতিত হয় ভেজা সিমেন্টের মধ্যে যার উপরে ধ্বসে পড়েছিলো ভারী ভারী ইস্পাতের বার। অনেকেরই জীবন্ত কবর হয় ওখানে। বেঁচে থাকা অনেকেই ট্র্যাপ্টড হয়ে যায় । যেহেতু মৃতদেহ ও জীবিতদের উদ্ধার করতে যথেস্ট সময়ের প্রয়োজন ছিলো, তাই ইমেল্দা মার্কোস নির্দেশ দিলো, “উদ্ধার করার প্রয়োজন নেই, দেহগুলোকে সিমেন্ট দিয়ে ঢেকে দাও। কন্সট্রাকশন ওয়ার্ক চলুক।” এই দুর্ঘটনায় ১৬৯ জন মারা যায়। এবং তাদের দেহাবশেষ ঐ ইমারতেই রয়ে যায়। এই ভয়াবহতা ও নির্মমতার সংবাদ সকল ম্যানিলাবাসীই জানতো। কিন্তু প্রেসিডেন্ট মার্কোসের নির্দেশে ফিলিপিনি কোন সংবাদ মাধ্যেমেই তা প্রচারিত হয়নি। হায়রে নিস্ঠুরতা! স্বৈরাচার থাকলে যা হয় আরকি!!

ঐ অভিশপ্ত ভবনটির চারপাশ দিয়ে ভয়ে কেউ হাটতে চাইতো না। লোকে বলতো, নিহত হতভাগ্য শ্রমিকদের আত্মার দীর্ঘশ্বাস শোনা যায় ওখানে। পুরো ভবনের বাতাস ভারী হয়ে থাকে অকালে ঝরে পড়া অতৃপ্ত আত্মাদের চাপা কান্নার শব্দে। এর ফল অবশ্য ক্ষমতার দাপটে অন্ধ মার্কোস পরিবার পেয়েছিলো। কয়েক বৎসর পরে এই সাধারণ মানুষগুলোই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ক্ষমতা থেকে ফেলে দিয়েছিলো ফার্দিনান্দ মার্কোস ও ইমেল্দা মার্কোসকে। ক্ষমতার জোরে অনেকেই অনেক কিছু করে আর বেমালুম ভুলে যায় ইতিহাসের শিক্ষা যে, ‘ক্ষমতা চিরকাল থাকেনা’।

—————————————————– ***———————————————

টুক টুক টুক দরজায় নক করার শব্দ। তাতিয়ানাই হবে। এখন রাত নয়টা বাজে। এসময় আজকাল তাতিয়ানাই বেশী আসে। দরজা ঠেলে তাতিয়ানা ঢুকলো।

আমিঃ কেমন আছো?
তাতিয়ানাঃ (বিষন্ন কন্ঠে) বোরিং।
আমিঃ কেন বোরিং কেন?
তাতিয়ানাঃ (আবারও মন খারাপ করা গলায়) জীবনটাই বোধহয় বোরিং।
আসলে ও ভুল কিছু বলছে না। মাঝে মাঝে আমারও খুব বোরিং লাগে। কিন্তু ঐ কথা না বলে ওকে শান্তনাই দেয়া উচিৎ।
আমিঃ ডরমিটরিতে বোধহয় তোমার ভালো লাগছে না। কয়েকদিনের জন্য বাড়ীতে চলে যাও। গ্রামের শান্ত নির্জন পরিবেশে ভালো লাগবে।
তাতিয়ানাঃ বাড়ীতেও বোরিং!
আমিঃ বাড়ীতেও বোরিং?
তাতিয়ানাঃ তার উপরে অনেক কাজ।
আমিঃ কি কাজ?
তাতিয়ানাঃ (একটু ক্ষুদ্ধ হয়ে), অনেক।
আমিঃ যেমন।
তাতিয়ানাঃ যেমন, ঘরে দুইটা গরু আছে। দিনে দুইবার করে ওদের দুধ দোয়াতে হয়।
আমিঃ হাঃ, হাঃ, হাঃ, (আমি হেসে ফেললাম)। তাহলে তো অনেক কাজই বলতে হবে।
আমার সাথে সাথে তাতিয়ানাও লাজুক হাসলো।

তারপর ভাবলাম। মেয়েটির বোরিং লাগে কেন? লাগতেই পারে। আমারও তো মাঝে মাঝে ভীষণ বোরিং লাগে। মাঝে মাঝে এই জীবন তো অর্থহীনই মনে হয়। গতকাল রাতেও তো এমন হয়েছিলো। রাত বারোটার পর চুপচাপ ডরমিটরির বাইরে বেরিয়ে এসেছিলাম। ঠিক মাথার উপরে চাঁদ হাসছিলো। চাঁদটাকে খুব বিমর্ষ মনে হচ্ছিলো। আসলে চাঁদ নয় আমিই বিমর্ষ ছিলাম। বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক সাইফুল ইসলাম স্যারের কথা মনে পড়লো। উনি বলেছিলেন, “তোমার মনের অবস্থার মতই মনে হয় চারপাশের প্রকৃতিটাকে। যদি তুমি উৎফুল্ল থাকো, দিঘীর ঢেউয়ে চাঁদের খন্ড-বিখন্ড প্রতিফলন দেখে মনে হবে, ‘বাহ্! চাঁদটা কেমন হেসে কুটি কুটি যাচ্ছে’। আর তুমি যদি দুঃখ ভাড়াক্রান্ত থাকো, তোমার মনে হবে, ‘আমার দুঃখে চাঁদটা ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে’। গতরাতে আমিও এমনি বিষণ্ন হয়ে পড়েছিলাম। এ বিষাদ বোধহয় মানুষের চিরকালের চিরন্তন চিত্তবৃত্তি। যেমন উইলিয়াম শেক্সপীয়র প্রশ্ন করেছিলেন, “হোয়াই আই এ্যাম সো স্যাড?” মানুষের অক্ষমতা আর অপূর্ণতার বেদনাই কি এই বিষাদের কারণ?

ওহ্! এইতো উত্তর পেয়েছি। তাতিয়ানার কোন অপূর্ণতা রয়েছে। কি সেই অপূর্ণতা?

আমিঃ তাতিয়ানা, তোমার কি কোন অপূর্ণতা রয়েছে?
দপ করে জ্বলে উঠলো তাতিয়ানার দৃষ্টি।
তাতিয়ানাঃ কি অর্থে?
আমিঃ না, মানে তোমাকে মাঝে মাঝে খুব বিমর্ষ লাগে তাই।

দৃষ্টি নামিয়ে নিলো তাতিয়ানা। কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারলো না। একি সেই চিরন্তন নারী? ধ্যানস্তদ্ধ গভীর অরণ্যে, কম্পিত তারার তিমিরে আদিকাল থেকে কাকে যেন খুঁজে ফিরছে। সেই আকাঙ্খার নিবৃত্তি হবে কি কোন কালে? নাকি ঐ চাঁদের মতই বড় একাকী ও নিঃসঙ্গ রয়ে যাবে চিরকাল?


(চলবে)


বঁধু, মিটিলনা সাধ

বঁধু, মিটিলনা সাধ ভালোবাসিয়া তোমায়
তাই আবার বাসিতে ভালো আসিব ধরায়।
আবার বিরহে তব কাঁদিব
আবার প্রণয় ডোরে বাঁধিব
শুধু নিমেষেরি তরে আঁখি দুটি ভ’রে
তোমারে হেরিয়া ঝ’রে যাব অবেলায়।
যে গোধূলি-লগ্নে নববধূ হয় নারী
সেই গোধূলি-লগ্নে বঁধু দিল আমারে গেরুয়া শাড়ি
বঁধু আমার বিরহ তব গানে
সুর হয়ে কাঁদে প্রাণে প্রাণে
আমি নিজে নাহি ধরা দিয়ে
সকলের প্রেম নিয়ে দিনু তব পায়।।

 

 

Categories
অনলাইন প্রকাশনা জীবনী ও স্মৃতিকথা ভুতুরে গল্প সৃজনশীল প্রকাশনা

একটা ভূতের গল্প

একটা ভূতের গল্প

——–মুহম্মদ জাফর ইকবাল

আমি তখন ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি, হোস্টেলে থাকি। বাবা কুমিল্লার ডিএসপি, ঠাকুরপাড়ায় বিশাল দোতলা বাসা। বাসার সামনে মাঠ, পাশে পুকুর। হোস্টেলে থাকতে থাকতে যদি মন কেমন কেমন করে, তাহলে বিআরটিসির বাসে করে কুমিল্লায় বাসায় চলে আসি। এক-দুই দিন থেকে আবার ফিরে যাই।
সেরকমভাবে আমি হুট করে কুমিল্লা এসেছি, আমি একা নই, আমার সঙ্গে আমার কলেজের বেশ কয়েকজন বন্ধু আছে। আমার বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, বাসায় এসে দেখি সেও আছে। বাসায় অনেক মানুষ থাকলে যা হয় তাই হলো, সারা দিন গল্পগুজবে কেটে গেল। আমাদের বাসায় গল্পগুজব হলে ঘুরেফিরে সেটা ভূতের গল্পে গিয়ে জায়গা নেয়। আমার বাবার এসব ব্যাপারে খুব কৌতূহল, তাই বাসাভর্তি ভূত-প্রেত, জ্যোতিষচর্চা এসবের বই। আমরা সব ভাইবোন জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে হাত দেখেছি, প্ল্যানচেট করে চক্রে বসে ভূত নামিয়েছি। কাজেই এবারও গল্পগুজব ভূতের গল্পে আটকা পড়ে গেল। তখন আমার কলেজের বন্ধুরা বড় ভাই হুমায়ূন ভাইকে ধরে বসল, তাদের ভূত এনে দেখাতে হবে। হুমায়ূন আহমেদ রাজি হলো—ঠিক হলো রাত ১২টায় চক্রে বসা হবে।
সময় কাটানোর জন্য আমি আর আমার বন্ধুবান্ধব সেকেন্ড শো সিনেমা দেখতে গিয়েছি। আমরা যে খুব সিনেমার পোকা তা নয়, কিন্তু বড় ভাইয়ের উৎসাহে গিয়েছি, ভালো ছবি নাকি দেখাচ্ছে।
রাতে বাসায় ফেরার পর ভূত নামানোর জন্য আমরা চক্রে বসেছি। দোতলা বাসার নিচের তলায় কেউ থাকে না, সেখানে একটা বড় ঘর পরিষ্কার করা হয়েছে। মেঝেতে পরিষ্কার চাদর বিছানো হয়েছে, আমরা সবাই হাত-মুখ ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে গোল হয়ে বসেছি। বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ ঘরের চারকোনায় চারটা মোমবাতি জ্বালিয়ে দিল, মোমবাতির মৃদু আলোতে একটা ভৌতিক পরিবেশ চলে এসেছে। আমরা কেউ জোরে কথা বলছি না। হুমায়ূন আহমেদ আমাদের ফিসফিস করে নিয়মকানুন বলে দিল, ‘তোমরা কেউ ভয় পাবে না। প্রেতাত্মা যদি চলে আসে, আমাদের কারও ওপর সেটা ভর করবে। তার সঙ্গে শান্তভাবে কথা বলবে।’
আমার এক বন্ধু জিজ্ঞেস করল, ‘এসেছে কি না কেমন করে বুঝব?’
‘অনেকভাবে বোঝা যায়। হয়তো মোমবাতিগুলো নিভে যাবে। হয়তো ঘরে একটা তীব্র গন্ধ পাবে, ঘরটা শীতল হয়ে যাবে। হয়তো কেউ একজন থরথর করে কাঁপতে থাকবে।’
তার থমথমে গলার স্বর শুনেই আমাদের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়।
হুমায়ূন আহমেদ বলল, ‘তোমরা সবাই এখন পরকাল নিয়ে চিন্তা করো, মৃত কোনো মানুষের আত্মাকে আহ্বান করো।’
আমরা গোল হয়ে বসে অন্যের হাত ধরে মৃত মানুষের আত্মাকে আহ্বান করতে থাকি, ঘরের ভেতরে আমাদের নিঃশ্বাস ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। হঠাৎ একটা বিচিত্র ব্যাপার ঘটতে থাকে, মোমবাতিগুলো হঠাৎ করে নিভু নিভু হয়ে যায় আর একসঙ্গে সব মোমবাতি নিভে গেল।
বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ ফিসফিস করে বলল, ‘এসেছে! কেউ একজন এসেছে! কিছু একটা এসেছে। কেউ ভয় পাবে না।’
তখন ভয়ে হাত-পা আমাদের শরীরের ভেতর সেঁধিয়ে যাচ্ছে। আর কী আশ্চর্য, ঠিক তখন শুনতে পেলাম বাসার পাশে যে গাছ, সেই গাছের ডাল নড়তে শুরু করেছে, জানালার মাঝে গাছের ডালগুলো জীবন্ত প্রাণীর মতো হুটোপুটি খাচ্ছে। আমরা ভয় পেয়ে আর্তচিৎকার করে উঠি, ‘কী হচ্ছে? কিসের শব্দ?’
হুমায়ূন আহমেদ বলল, ‘চলো। বাইরে গিয়ে দেখি।’
আমাদের কারও বাইরে যাওয়ার সাহস নেই, তার পরেও হুমায়ূন আহমেদের পিছু পিছু বাইরে এলাম। আবছা অন্ধকার, কোথাও বাতাস নেই, তার মাঝে শুধু একটা গাছের ডাল জীবন্ত প্রাণীর মতো নড়ছে, হুটোপুটি খাচ্ছে। ভয়ে আতঙ্কে অস্থির হয়ে আমরা একজন আরেকজনকে ধরে কাঁপছি। বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ বলল, ‘ভয় পাবে না। কেউ ভয় পাবে না—হক ভাইকে ডেকে তুলে আনি।’
হক ভাইয়ের পুরো নাম আবদুল হক, বাবার অফিসের অর্ডারলি, বাসার সামনে ছোট একটা আলাদা টিনের ঘরে থাকেন। ধর্মভীরু মানুষ, কারও সাতেপাঁচে নেই। আমাদেরও মনে হলো, এই আতঙ্কময় মুহূর্তে তাঁকে ডেকে আনলে মন্দ হয় না, আমরা তাঁর ঘরের কাছে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিলাম আর সঙ্গে সঙ্গে একটা বিচিত্র ব্যাপার ঘটল। হক ভাই দরজা খুলে গুলির মতো বের হয়ে এলেন, গোঙাতে গোঙাতে এগিয়ে এলেন। আমরা ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছে হক ভাই, কী হয়েছে?’
হক ভাই কথা বলতে পারেন না, ভয়ে থরথর করে কাঁপছেন, অনেক কষ্ট করে বললেন, ‘আ আ আমার ঘরে…’
‘আপনার ঘরে কী?’
‘আমার ঘরে একটা মানুষ। ঘরের ছাদের সমান লম্বা। নিচু হয়ে তাকিয়ে আছে। হায় আল্লাহ!’
ঠিক তখন হঠাৎ করে গাছের ডাল ভয়ংকরভাবে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল, তারপর হঠাৎ চারদিক নীরব হয়ে গেল। হুমায়ূন আহমেদ কাঁপা গলায় বলল, ‘আমার মনে হয় একটা খারাপ প্রেতাত্মা চলে এসেছে, আমরা আর কিছু না করে এখানেই শেষ করে দিই।’
আমরা মাথা নাড়লাম, ‘হ্যাঁ। আর কিছু করার দরকার নেই।’
‘যার যার মতো গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। কাউকে কিছু বলার দরকার নেই।’
আমি ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ওপরে গেলাম, গরমের দিন। ফ্যান চালিয়ে ভাইবোনেরা মেঝেতে শুয়ে ঘুমিয়ে আছে। আমি গুটিসুটি মেরে তাদের দুই দিকে ঠেলে একটু জায়গা করে শুয়ে পড়লাম।
ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি আমাদের কাউকে চেনা যায় না। ভয়ে আতঙ্কে একেকজনের উদ্ভ্রান্ত চেহারা, উষ্কখুষ্ক চুল, চোখ গর্তে ঢুকে গেছে, রক্তশূন্য ফ্যাকাশে মুখ।
আমরা ঢাকায় ফিরে এলাম। আমার অন্য বন্ধুদের কথা জানি না, কিন্তু আমি পাকাপাকিভাবে ভীতু হয়ে গেলাম। রাতে ঘুমাতে পারি না, চোখ বন্ধ করলেই মনে হয় মাথার কাছে ছাদের সমান লম্বা একটা মানুষ তীব্র চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, চোখ দুটো ধকধক করে জ্বলছে।
যারা ভূতের গল্প শুনতে পছন্দ করে, তাদের জন্য বলছি, গল্পের বাকি অংশটুকু পড়ার প্রয়োজন নেই। এখন পর্যন্ত যেটুকু বলা হয়েছে, তার প্রতিটি অক্ষর সত্যি—অবিশ্বাস্য হতে পারে, কিন্তু সত্যি।

অনেক দিন পর বাসার সবার সঙ্গে কথা হচ্ছে, আমি কী একটা প্রসঙ্গে সহজ-সরল হক ভাইকে নিয়ে একটা কথা বলেছি। আমার মা মুখ টিপে হাসলেন, বললেন, ‘হক ভাইকে বেশি সহজ-সরল মনে হচ্ছে? অ্যাকটিং দেখে তো সেটা বলিসনি!’
‘অ্যাকটিং!’ আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কিসের অ্যাকটিং?’
তখন সবাই হি হি করে হাসতে শুরু করে। সেই ভয়ংকর ভৌতিক রাতটি ছিল হুমায়ূন আহমেদের নেতৃত্বে বাসার সবার সম্মিলিত একটা ষড়যন্ত্রের ঘটনা। আমাদের জোর করে সেকেন্ড শো সিনেমা দেখতে পাঠিয়ে বাসায় ব্যবস্থা করা হয়েছে। গাছের ডালের সঙ্গে দড়ি বেঁধে দোতলায় ভাইবোনেরা সেটা ধরে টেনে গাছ নড়িয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের পরিচালনায় হক ভাই অনবদ্য অভিনয় করেছেন।
আমি আমতা আমতা করে বললাম, ‘মোমবাতি? মোমবাতি কেমন করে নিভে গেল?’
হুমায়ূন আহমেদ হাসল, ‘খুবই সোজা। মোমবাতির সুতাটা কেটে রাখা হয়েছে। ঠিক সময়মতো নিভে গেছে।’
আমি হতবাক হয়ে হুমায়ূন আহমেদ আর তার বিশাল ষড়যন্ত্রীর দল আমার বাবা-মা ভাইবোনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
হুমায়ূন আহমেদের এ রকম গল্প একটি-দুটি নয়, শত শত! জীবনটা একঘেয়ে হলে সেটা মেনে নিতে হবে কে বলেছে? জীবনটাকে চোখের পলকে রঙিন করা যায়, চমকপ্রদ করা যায়—তার মতো সেটা কে পারত?
কেউ না।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা ভয়ংকর(হরর) ভুতুরে গল্প সৃজনশীল প্রকাশনা

ভুতংগম (পর্ব ০২)

ভুতংগম (পর্ব ০২)

—–সাকি বিল্লাহ্

আজ ৬ মাস হয়েছে পত্রিকা অফিসে আর যাইনি । সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি পিয়ন দরজার নীচ দিয়ে দুটি চিঠি দিয়ে গেছে । একটিতে লেখা “দেখা হবে নির্জনে, কথা হবে মনে মনে” প্রাপকে আমার নাম, ঠিকানা, কিন্তু প্রেরকের কোনো ঠিকানা দেয়া নেই । খুবই অবাক ব্যাপার । অন্যটা এসেছে “সূর্যের দিন” পত্রিকা অফিস থেকে । জরুরী যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে । প্রেরক, সম্পাদক সাহেব, “সূর্যের দিন” পত্রিকা । চিঠি দুইটি টেবিলের উপর রেখে বাথরুমে ঢুকে গেলাম ফ্রেশ হয়ে সোজা নাস্তার টেবিলে, বাবা নাস্তার টেবিলে অপেক্ষা করছেন তাই আর দেরী করলাম না । “তোমার পড়ালেখার কি খবর?” বাবা নাস্তা করতে করতে জিঞ্জেস করলেন । আমি উত্তর দিলাম “জ্বি ভালো, দুদিন ছুটি আছে তাই ভাবছি, নানুকে দেখে আসবো”, বাবা কোনো কথা বললেন না । শুধু আ্ওয়াজ করলেন “হুম” ।

নাস্তা সেরে ঠিক করলাম নানুকে দেখতে যাওয়ার আগে পত্রিকা অফিস হয়ে যাবো । সাথে কিছু টাকা, ব্যাগ, টর্চলাইট, সেভিং এর সরঞ্জাম, মোবাইল চার্জার, প্রয়োজনীয় আরো কিছু জিনিস নিয়ে নিলাম । সেবার শ্যামপুরে যাওয়ার সময় অনেক কিছুই সাথে ছিল না । তাই এবার মনে করে প্রয়োজনীয় সব জিনিস নিয়ে বাসা থেকে বের হলাম মগবাজার পত্রিকা অফিসের উদ্দেশ্যে । পত্রিকার সম্পাদক সাহেব অত্যন্ত বিরক্ত আমার উপর, আমি দীর্ঘদিন কোনো প্রকার যোগাযোগ রাখিনি । তবে আমার ফিচার শ্যামপুরের সেই ঘটনা নাকি ওনার কাছে খুব ভালো লেগেছে তাই তিনি আবার আমাকে ডেকেছেন । বিশেষত আমার বেতন খুব সামান্য তবে ফিচার জমা দেয়ার পর এককালীন বিশেষ একটা সম্মাননা ভাতা দেয়া হয় । আমার মনে হল আসলে আমার লেখা নয়, অদ্ভুদ ভুতুরে কোন সংবাদ সংগ্রহের জন্য উনি আমাকে ডেকেছেন । আমি জানি আমি ছাড়া আর কেউ এ ধরনের সংবাদ বা ফিচার সংগ্রহের জন্য রাজি হবে না । একবার ভাবলাম চাকুরীটা ছেড়ে দেই কিন্তু সম্পাদক সাহেব বিশেষত আমার উপর আশা করে আছেন তাই তাকে আর নিরাশ করলাম না । বললাম “নানুর বাসায় যাচ্ছি নরসিংদীতে, সেখানে কালীমন্দিরের কাছে শ্বশানঘাটে নাকি ভুতুরে সব ঘটনা ঘটে, যদি সময় পাই একবার যাব, অদ্ভুত ফিচারের জন্য” শুনে সম্পাদক সাহেব খুব খুশি হলেন বিদায় জানিয়ে প্রথমে বাসে পরে ট্রেনে ঘোড়াশাল পৌঁছলাম । সেখান থেকে অটোরিক্সায় সোজা নানুর বাড়িতে । নানু অনেক খুশি হলেন, দুদিন থাকবো শুনে । বাজার করার মতো কেউ নেই, তাই পাশের বাড়ির এক আত্মীয় সম্পর্কে মামা হয়, তাকে নিয়ে বাজারে গেলাম । তার নাম মোবারক, বয়সে আমার সমান হবে । নানু কে না বলে আমি মোবারক মামাকে সাথে নিয়ে রিকসায় বাজারে চলে এলাম । যাবার সময় অনেক ব্যাপারে মোবারক মামার সাথে কথা হল । কালীমন্দির, শ্বশানঘাট ও বাশঁ ঝাড়ের নীচে কবরস্থান নিয়েও অনেক কথা হল । রীতিমত গাঁ শিউরে উঠে সে গল্প শুনে । কিন্তু আমি প্রমানে বিশ্বাসী বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় এগুলো মানুষের ভ্রান্ত ধারনা । গল্প করতে করতে আবার রিকসা নিয়ে বাজার করে নানুর বাড়িতে চলে এলাম । তখন সবেমাত্র দুপুর ১২টা বেঁজেছে । মোবারক মামাকে বললাম আমি এখানে কেনো এসেছি । শুনে উনি হাসলেন । বললেন অহেতুক ঝামেলায় যাওয়ার দরকার কি ? বেড়াতে এসেছেন, কয়েকদিন আনন্দ করে যান ।

দুপুরে খাওয়ার সময় উনাকে আর খুঁজে পেলাম না । কিছুক্ষণ পর মোবারক মামা হাজির, আমি ওনাকে আমার চিঠিটা দেখালাম যেটাতে লেখা “দেখা হবে নির্জনে, কথা হবে মনে মনে” সে চিঠিটা দেখে “থ” হয়ে গেল, এই লেখাটা তো মনে হয় কোথাও দেখেছি । ওনার ধারনা এ লেখাটা উনি কোনো একটা কবরের উপর ফলকে দেখেছেন, তবে কোন কবরে তা আর এখন মনে করতে পারছেন না । কিন্তু কবরস্থানের নামটা তার নাম মনে আছে । আমি কিছুটা ভয় পেলাম কারণ এ ধরনের চিঠি আমাকে কোন মৃত মানুষের কবর থেকে পাঠিয়েছে তা ভেবে । তবে তা সামলে নিয়ে মোবারক মামাকে বললাম “মামা যদি কিছু মনে না করেন তাহলে কাল সকালে বা বিকেলে ওই কবরস্থানে একটু ঘুরে দেখতে চাই” , তিনি কিছুটা বিমর্ষভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন “আপনার কি মাথা খারাপ, ওখানে কেউ যায় নাকি? এখন তো মানুষ কবর দিতেও ওখানে যায় না, তবে যদি দিনের বেলাতে মানে সকালে যান তাহলে সাথে যেতে পারি” , আমি তার কথায় আশ্বস্ত হয়ে পরের দিন সকালে যাব মনস্থির করলাম ।

পরদিন সকালে নাস্তা সেরে বারান্দায় বসে অপেক্ষা করতে থাকলাম মোবারক মামার জন্য । নানুকে শুধু বললাম ঘুরতে যাচ্ছি, বিকেলেই চলে আসবো । নানু কিছু বললেন না, শুধু বললেন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরিস্ । মোবারক অনেক্ষণ পরে এসে উপস্থিত হল । বললাম এতক্ষণ দেরী হল কেন? ।, সে বলল, ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়েছে তাই । নানুকে বিদায় জানানোর সময় মোবারককে বললাম ভিতরে যেতে, নানুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য । সে বলল “উনি মুরুব্বী মানুষ আমাকে নাও চিনতে পারেন, অনেকদিন দেখেন নাতো আর অহেতুক দেরী করে লাভ কি, আমাদের আগে আগে ফিরতে হবে” , আমি আগেও লক্ষ্য করেছি মোবারক মামা নানুর সামনে যেতে চান না । কেন চান না বুঝতে পারলাম অনেক পরে । যাই হোক ঘর থেকে বের হলাম, দুপুরে খাওয়ার জন্য কিছু খাবার নিয়ে ব্যাগে রাখলাম, সাথে দুই লিটারের এক বোতল মিনারেল ওয়াটার । মোবারক মামাকে জিঞ্জেস করলাম রিকসা নিতে হবে কিনা ? মনে হল তিনি আমার কথায় বেশ মজা পেয়েছেন । তাই বঁত্রিশ দাঁত বের করে হাসছেন, বললেন “আপনার কি ধারনা পরিত্যক্ত একটা কবরস্থানে রিকসা বা গাড়ী যাওয়ার মনোরম রাস্তা থাকবে, হা…হা….হা..” , আমি কিছুটা বিব্রত হলাম, বললাম “ঠিক আছে চলেন যেভাবে যাওয়া যায়, যদি হেটে যেতে হয় তাহলে আমার কোন সমস্যা নেই” ।

আমরা হাটতে থাকলাম । আমার শরীর ক্লান্ত আর ঘামে ভিজে চুপসে গেছে সারা শরীর আর জামাকাপড়, তবুও হাটছি আর হাটছি । মোবারক এ গ্রামেরই ছেলে তাই হয়তো তার শরীর কোন ঘাম নেই । সে দিব্যি হেঁটে যাচ্ছে পথ চিনিয়ে চিনিয়ে । প্রায় দু ঘন্টামত হাটার পর জন-মানবহীন নীর্জন এক জঙ্গলে এসে পৌঁছলাম । বড় বড় গাছ আর লতাগুল্ম দিয়ে ঘেরা । সূর্যের আলো এখানে ঝিমিয়ে পড়েছে কিন্তু বেলা বাঁজে ১টা মাত্র । দিক ঠিক করা যাচ্ছে না তবে মোবারক মামার মনে হচ্ছে দিক ঠিক করতে কোন সমস্যা হচ্ছে না । আমি কিছুটা সাহস পেলাম এই ভেবে যে আমি একা নই, মোবারক মামা সাথে আছেন । আরো প্রায় ১ ঘন্টা হাটার পর একটা বিশাল বাঁশঝাড়ের সামনে এসে পৌঁছলাম । আমি দেখলাম এটাকে আসলে আগে বাঁশবাগান বলা হলেও এখন তা বাঁশঝাড় বা বাঁশের জঙ্গলে পরিনত হয়েছে । যে কেউ এখানে একা থাকলে ভয়ে তার অঞ্জান হওয়ার মত অবস্থা হবে । চারদিক ঘন লতাগুল্ম আর বাঁশের ঝোপঝাড় ।

মোবারক মামা আমাকে বললেন “এটাই সেই কবরস্থান এখানে অনেকগুলো কবর আছে তবে কোথায় যে আপনার সেই কথাটা লেখা আছে তা আমি বলতে পারবো না, আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে” আমি আশাহতের মত চারদিকে তাকালাম কারন এখানে কোন কবরই ভালোমত বোঝা যাচ্ছে না । ঝোপঝাড়ের কারনে সব ঢেকে গেছে । কিছুক্ষন পর মনে হল আমার পায়ের নীচে একটা কবর, আমি একটা কবরের উপর দাড়িয়ে আছি । ভয়ে আমার সারা শরীরে শিড়দাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল । সরে গিয়ে পাশে দাড়ালাম । দুপুর প্রায় আড়াইটা বাজে, ক্ষিদে পেয়েছে তাই ব্যাগ খুলে খাবার বের করলাম মোবারক মামাকে বললাম “আগে খেয়ে নিই, পরে কাজে নামব” , মনে হল তিনি আমার কথায় গুরু্ত্ব দিচ্ছেন না । অন্য দিকে বিমর্ষভাবে তাকিয়ে আছেন । কিছুক্ষণ পর আবার আমি বললাম । মোবারক মামা এবার শুনতে পেলেন, উত্তর দিলেন “আমার ক্ষিদে নেই” , আপনি খেয়ে নিন আমি একটু আসছি, বলে তিনি ঝোপের ভিতর চলে গেলেন । আমি খাওয়া সেরে অনেক্ষণ তাকে খুঁজলাম । নাম ধরে বেশ কয়েকবার ডাকলাম । ভাবলাম হয়ত সে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে । চলে যাওয়ার সময় হয়েছে, এখন প্রায় বেলা ৫টা বাঁজছে । সূর্য হেলে পড়াতে বাঁশঝাড়ের ভিতরে অন্ধকার নেমে এসেছে । আমি আমার টর্চলাইটটা বের করলাম ব্যাগ থেকে । অনেক খুঁজেও মোবারক মামাকে পেলাম না । তাই ঠিক করলাম বাড়ি ফিরে আসব, হাতে একটা মার্কার পেন আর একটা টর্চলাইট । মার্কার পেন দিয়ে বাশ কিংবা গাছে দাগ টেনে চিহ্ন দিচ্ছিলাম আর সামনে এগুচ্ছিলাম কিন্তু অন্ধকারে কিছুই ভালো দেখা যাচ্ছে না । চারদিক এখন ঘোর অন্ধকার তাই কিছুক্ষণ পরপর টর্চলাইট জ্বালাতে হচ্ছে । একটানা জ্বালালে ব্যাটারী শেষ হয়ে যেতে পারে । এভাবে এগুতে থাকলাম প্রায় আধঘন্টা । হঠাত পা ফসকে একটা গর্তে পড়ে গেলাম । চার দিক সমান ভাবে কাটা, চার দেয়ালে আমি আটকা পড়েছি, আমার আর বুঝতে বাকি রইল না আমি একটা কবরের ভিতরে আটকে গেছি ।

 

গর্তে মানে কবরের ভিতরে স্যাঁতস্যাঁতে কাঁদামাটি, সাধারণ কবরের চাইতে একটু বেশি গভীর ।  ভিতরে মশা আর কীটপতঙ্গের ছড়াছড়ি । বেশ ঝোপঝাড়ও আছে । কিছুতেই উপরে উঠতে পারলাম না । নিরুপায় হয়ে টর্চলাইট জ্বালালাম । টর্চলাইটের আলো প্রায় নিভু নিভু করছে, মনে হয় ব্যাটারির পাওয়ার শেষ হয়ে আসছে । একে তো চারদিক জনমানবহীন বনজঙ্গল তার উপর আবার ঘোর অন্ধকার । ভয়ে আমার শিড়দাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা হিমশীতল একটা অনুভূতি পা এর তলায় গিয়ে ঠেকল । কবরের ভিতরে আমি একা একজন জীবিত মানুষ ভেবে আমার ঘাম বেরিয়ে যাচ্ছিল । কিছুক্ষণ আগে একটা কিসের যেন ভৌতিক আওয়াঁজ শুনতে পেলাম ।

আমার গলা দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছে না, জোরে চিৎকার করলাম, “আমাকে বাচাঁও, আমি ভাঙ্গা কবরে পড়ে আটকে গেছি, আমাকে বাচাঁও” অনেক জোরে চিৎকার করলাম কিন্তু গলা দিয়ে শুধু ফ্যাঁসফ্যাঁস মৃদু আওয়াজ বের হল । নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনলাম মনে হচ্ছে । কেন যে এই জঙ্গলের কবরস্থানে এলাম, মোবারক মামাই বা কোথায় হারিয়ে গেল । নিজের হতবুদ্ধির জন্য নিজেকে ধিক্কার দিলাম । কত কাল যে এভাবে আটকে আছি আমি বলতে পারবো না, মনে হচ্ছে কয়েক হাজার বছর হবে আমি এখানে আটকে আছি । হঠাৎ সেই ভৌতিক শব্দটা আবার হল…হররর…রর..র..গর..ররররর..রর, এবার আরো জোরে আরো কাছে মনে হল । হঠাৎ নীল রং এর ৮-১০ টা চোখ কবরের উপর থেকে আমার দিকে তাকাল । আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে । রেডিয়ামের মত দপদপ করছে চোখগুলো, আমি বুঝতে পারলাম এগুলো শেয়াল, নিশাচর বলে রাতে চোখ এমন দেখাচ্ছে । মনে হচ্ছে ওরা আমার অবস্থা দেখে কিছুটা হতাশ কারণ আমি একটা কবরের ভিতরে আটকে, কিন্তু জীবিত । মৃত লাশের মাংস খাওয়ার জন্য ওরা এসেছিল । জীবিত মানুষের মাংস খাবে কিনা তা ঐ মুহুর্তে আমার ধারনা ছিলনা । তবে এই পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে আমাকে আগে থেকে কোন সতর্ক ব্যবস্থা নিতে হবে । তাই দোরী না করে ব্যাগ খুলে তা থেকে লাইটার টা খুঁজে বের করলাম, কবরের ভিতরের শুকনো আর ভেঁজা ডালপালা দিয়ে আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করলাম, কয়েকবার চেষ্টার পর আগুন ধরলো । আগুনের উজ্জ্বলতা আর ধোঁয়ায় শেয়াল গুলো কোথায় যেন পালিয়ে গেল । কবরের ভিতরে ধোঁয়ায় আমার কিছুটা সমস্যা হচ্ছিল, কিন্তু সহ্য করতেই হবে নইলে নির্ঘাত শেয়াল আমাকে জীবিত খুবলে খাবে । আগুন জ্বালাতে পেরে মনে অনেকটা সাহস ফিরে পেলাম কিন্তু কবরের ভিতরে বেশি ডালপালা নেই । যার কারণে মনে হচ্ছে না বেশিক্ষণ আগুন জ্বালাতে পারবো । হয়তো ১ ঘন্টা পর আগুন নিভে যাবে । আমি ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করলাম । নোকিয়া মোবাইল কিন্তু নেটওয়ার্কের কোন কভারেজ পাচ্ছে না । মোবাইলের অপশনে গিয়ে স্টপওয়াচ এ ৪৫ মিনিট দিয়ে অন করে দিলাম । কারণ যা করার এই সময়ের মধ্যেই করতে হবে, ৪৫ মিনিট পর আগুন নিভে যাবে । মোবাইলের টর্চ দিয়ে পরে রাস্তা খুঁজতে কাজে লাগবে তাই এখন মোবাইলের চার্জ টর্চ জ্বালিয়ে শেষ করা যাবে না । বিপদে মানুষের মাথা সঠিকভাবে কাজ করে না তাই বিপদকে জয় করার জন্য চাই মাথা ঠান্ডা রাখা । আমি চোখ বন্ধ করে আমার শৈশবের কিছু সুখ স্মৃতির কথা স্বরন করলাম, বাবা-মা, ভাই বোনদের কথা, বন্ধুদের কথা স্বরণ করলাম । আর মনে মনে ভাবলাম আমি মরবো না আমি অবশ্যই এখান থেকে বেঁচে ফিরবো । এভাবে দু-তিন মিনিট মনে মনে চিন্তা করলাম আর মনে সাহস ফিরে এলো । পকেটের মোবাইলটা বের করে দেখলাম আর ৪০ মিনিট বাকি আছে । প্রথমে ব্যাগ খুলে সব কিছু বের করলাম, পানির বোতলের সবটুকু পানিই প্রায় শেষ । টর্চলাইটের ব্যাটারির পাওয়ারও প্রায় ফুরিয়ে গেছে, ম্যাকগাইভার ছুড়ি, সানগ্লাস, টিফিন বক্স, কলম আর ডায়েরী ছাড়া তেমন কিছুই নেই, বাকি জিনিস গুলো কবরস্থানে আসার আগে নানুর বাসায় রেখে এসেছিলাম । প্যান্টের ডান পকেটে একটা লাইটার বাম পকেটে মোবাইল । সব কিছু বিভিন্ন পকেটে নেয়া হয়ে গেছে, কি করতে হবে তা আগে থেকেই ঠিক করে ফেললাম । ব্যাগ চিড়ে একটা দড়ির মত তৈরী করবো, সাথে জুতোর ফিতে দিয়ে যে দড়ি হবে সবগুলো গিঁট দিয়ে জোড়া লাগিয়ে পানির বোতল এ বেঁধে ছুড়ে মারবো বাহিরে যাতে কোন বাঁশঝাড়ে বা ঝোপঝাড়ে আটকে যায় । যেই চিন্তা সেই কাজ । দেরী না করে প্রথমেই জুতোর ফিতে খুলে ফেললাম, দুই ফিতা খুলে গিঁট দিয়ে জোড়া দিলাম, এরপর ছুড়ি দিয়ে ব্যাগটাকে চিড়ে চিকন মত অনেকগুলো অংশে ভাগ করে একইভাবে গিঁট দিয়ে দড়ি বানালাম । সব গুলো জোড়া দিয়ে প্রায় ১০ হাত লম্বা একটা দড়ি তৈরী হল । মোবাইলের স্টপওয়াচে দেখলাম আর মাত্র ২০ মিনিট বাকি আছে, বোতল দিয়ে বেঁধে অনেকবার চেষ্টা করলাম । বোতল প্রায় পানি শুন্য হালকা তাই ছুড়ে দিলেও তা দুরে যাচ্ছে না । কি করবো ভেবে পাচ্ছি না । হঠাৎ পায়ের জুতোর দিকে আমার চোখ গেল, আমি চট জলদি বোতল খুলে লম্বা দড়িটা জুতোর সাথে বাধঁলাম আর ছুড়ে দিলাম বাইরে । মনে হল কোন ঝোপের সাথে বা বাঁশঝাড়ের সাথেআটকে গেছে । দড়ি ধরে উঠতে গিয়ে দড়ি ছিড়ে ভিতরে পরে গেলাম । বাম হাতের কনুইয়ে বেশ চোট পেলাম । আমার ওজন নেয়ার জন্য দড়িটা যথেষ্ট শক্ত ছিল না । সকল আশা সাথে সাথে কর্পুরের মত উড়ে গেল । ভাবলাম আর কোন উপায় নেই । শুধু স্রষ্টাই এখন আমাকে বাঁচাতে পারেন । পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখলাম আর ১০ মিনিট বাকি আছে কিন্তু তার আগেই আগুন নিভে গেছে । চারদিকে মেঘের গর্জন, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে । মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে । আমি কবরের ভিতরে আটকে গেছি । বৃষ্টি হলে আমার অবস্থা কি হবে তা বুঝতে পারছি না । মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল আর কবরের পানিও বাড়তে থাকল । পানি বাড়তে বাড়তে আমার কোমড় পর্যন্ত হয়ে গেল । এতক্ষণ আমি ভয় পেয়েছিলাম বৃষ্টির জন্য কিন্তু এখন স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করতে থাকলাম যাতে বৃষ্টি আরও কিছুক্ষণ হয়, কারণ কবর পুরোপুরি পানিতে ভরে গেলে আমি সাতরে মাটিতে উঠে যেতে পারবো । বৃষ্টি হল প্রায় ৩ ঘন্টা মত, ঘড়ি নেই তাই সঠিক বলতে পারবো না । কবরটা পুরোপুরি পানিতে ভরে গেছে । আমি আর দেরী না করে হামাগুড়ি দিয়ে কোন রকমে উপরে উঠে এলাম । হাত পা প্রায় অবশ হয়ে এল । এতক্ষণ আমি সাতরে ছিলাম পানিতে ভেসে থাকার জন্য । পা দুটোর একটাতেও আর শক্তি পাচ্ছি না, তারপরও দাড়ালাম, এখান থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বের হতে হবে । জুতো জোড়ার একটা কবরের পানিতে ভাসছে অন্যটা বাঁশঝাড়ে আটকে আছে । জুতো দুটো পায়ে পরলাম, পকেট হাতরে মোবাইলটা বের করলাম, পানিতে ভিজে বন্ধ হয়ে আছে ।

ডান পকেটে লাইটারটা বের করলাম, আগুন জ্বালানোর চেষ্টা করলাম কিন্তু আগুন জ্বলছে না । মনে হচ্ছে ভেজা বা গ্যাস শেষ কিন্তু চকমকি পাথরের আলোর স্ফুলিঙ্গ বের হচ্ছে, অনেকটা ক্যামেরার ফ্লাশের আলোর মত । লাইটারের চকমকি পাথরের আলোর ঝলকানিতে অনেকটা আলো তৈরী হলে সবকিছু এক নজর দেখে কোন দিকে যাব তা ঠিক করে নিলাম । এভাবে ফ্লাশ করে করে আমি প্রায় ঘন্টা খানেক পর রাস্তা খুঁজে পেলাম ।

রাস্তা ধরে সোজা হাটতেই সামনে কিছু গ্রামবাসী হাতে হ্যারিকেন ও মশাল দেখতে পেলাম । পরে বুঝতে পারলাম ওরা আমাকেই খুঁজতে বের হয়েছিল । তাদের সাথে কয়েকজন পুলিশও ছিল । আমাকে নানু জ্বিজ্ঞেস করলেন কি হয়েছিল? আমি সব কিছু বিস্তর বর্নণা করলাম, শুনে গ্রামবাসী ও পুলিশ খুবই অবাক হলেন, কারণ মোবারক মামা নাকি ৩ বছর আগে গুম হয়েছিলেন । তার লাশ আজও পাওয়া যায়নি । তবে পুলিশ অনুসন্ধান চালাচ্ছে তার গুমের ব্যাপারে । আমি নিজেকে বিশ্বাস করতে পারলাম না । মোবারক মামা মৃত হলে আমার সাথে কথা বললেন কিভাবে আর ওনাকে নিয়ে আমি একটা কবরস্থানে ঘুরে বেরিয়েছি । আসলেই উনি মৃত তাই যতবারই নানুর সাথে দেখা করতে বলেছিলাম উনি রাজি হননি । ও.সি. সাহেবকে সব খুলে বললাম, শুনে তিনি হাসলেন কিনা বুঝতে পারলাম না ।

পরদিন সকালে ও.সি. সাহেব ও দুইজন কনস্টেবল সহ আমি যেখানটায় আটকা পরে ছিলাম সেখানে গেলাম । পাশে একটা কবরের ফলকে লেখা “দেখা হবে নির্জনে কথা হবে মনে মনে” আমি তার অর্থ কিছুই বুঝতে পারলাম না । তবে আমার অনুরোধে ও.সি. সাহেব গোয়েন্দা পুলিশ ও মেডিকেল অফিসার সহ ঐ কবরস্থানের ১০টি কবর খনন ও ময়না তদন্ত করেন এবং অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, তার একটি কবরের লাশ ছিল মোবারক মামার । তাকে সন্ত্রাসী খুনিরা গুমখুন করে এখানে কবর দিয়েছিল । আজ এত দিন পরেও ঘটনাটি মনে পড়লে আমার সারা শরীর কাঁটা দিয়ে উঠে হিমশীতল এক অনুভুতিতে, কারণ ঘটনাটি সত্যিই ঘটেছিল

Categories
অনলাইন প্রকাশনা ভয়ংকর(হরর) ভুতুরে গল্প সৃজনশীল প্রকাশনা

ভুতংগম (পর্ব ০১)

ভুতংগম (পর্ব ০১)

—-সাকি বিল্লাহ্

“হরিপ্রসাদের বাড়ি যাব, বলতে পারেন কোথায় ?” লোকটাকে প্রশ্ন করা বোধ হয় আমার উচিত হয়নি । আমার চেহারার দিকে অপলক দৃস্টি তার, মনে হচ্ছে চোখের মনি দপদপ করে জ্বলছে । যেন আমার ভাষা কোন ভিনগ্রহের এলিয়েনের ভাষা, বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে । আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম সেই একই প্রশ্ন “হরিপ্রসাদের বাড়ি যাব, রাস্তাটি কি এই দিকে? নাকি ঐদিকে?” আমি অংগুলি নির্দেশ করলাম ।শেষ ট্রেনটি স্টেশন থেকে ছেড়ে চলে গেল । এখন চারদিকে শুনশান নীরবতা । গাছের পাতা পরার শব্দ বেশ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে, চারদিক অন্ধকার অমাবস্যায় ঢেকে গেছে । বিদ্যুৎ নেই, কিছুক্ষণ আগেও দুজন গার্ড ছিল, এখন আর দেখা যাচ্ছে না, তারাও চলে গেছে কোথাও । উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম কিছুই বোঝা যাচ্ছে না । মনে কিছুটা ভয় ও সংশয় দেখা দিল, লোকটা কি তাহলে বোবা, নাকি কানে খাটো, নাকি পাগল । হবে হয়ত কোন একটা, না হলে কথার উত্তর দিচ্ছে না কেন, ফ্যালফ্যালিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে । কিছুক্ষণ পর আমাকে প্রায় অবাক করে দিয়ে লোকটা উত্তর দিল, “হরিপ্রসাদ কে আপনার কি দরকার?”

: আছে, দরকার না হলে কি এখানে আসা । তা আপনি কি ওনার কাছে একটু নিয়ে যেতে পারবেন ?

:পারব বৈকি, অবশ্যই পারবো, অবশ্যই পারবো ।

এই বলে লোকটা দাড়িয়ে বলল ঐ যে দেখছেন পাকুড় গাছটা, ঐখানের সবচাইতে বড় ডালটায় উনি থাকেন । তবে আমি কিন্তু কাছে যেতে পারব না । লোকটার শরীর থেকে গাঁজার উৎকট গন্ধ আসছিল । নেশার ঘোরে আবোল তাবোল বকছে বোধ হয় । নিরর্থক দাড়িয়ে থাকার কোনো মানে হয় না । আমাকে ভুলে গেলে চলবে না আমি একজন সাংবাদিক । অদ্ভুত ফিচারের জন্যই এ শ্যামপুর গ্রামে আসা । কিন্তু চারদিকের নীস্তব্ধতা ও ভুতুরে পরিবেশ সে আশাকে নিরাশা করবে তা হতে দেয়া যায় না । ভয়ের কাছে হার মানবো সে রকম ছেলে আমি নই । অনেক সাহস করে অন্ধকার রাস্তা ধরে হাটা শুরু করলাম ।

রাস্তার দুধারে ঝোঁপঝাড়ে ছেয়ে গেছে । দুপাশে ঘন জঙ্গল, আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেছে । জোনাকিরা শুধু মিটিমিটি জ্বলছে । আমি নিঃশব্দে হাটার চেষ্টা করলাম কিন্তু পায়ের নীচে খড়খড়ে শুকনো পাতার কচকচ শব্দ হতে লাগল । ক্রমেই মনের গহীনে ভয় দানা বেঁধে উঠল । ঝিঁঝিঁ পোকা থেমে থেমে ডেকে যাচ্ছে কানের কাছে ঝাঁ ঝাঁ শব্দ হচ্ছে । ভয়ে পা দুটি চলছে না, মনে হচ্ছে হাজারো মন পাথর বেঁধে রাখা হয়েছে পায়ে । হঠাৎ সম্পূর্ণ নীস্তব্ধতা ভেঙে, কে যেন ডাকল, “কে?, কে ওখানে? কে যাচ্ছে? ” , আমি নিজেকে সামলে নেয়ার চেষ্টা করে বললাম, “জ্বি, আমি ঢাকার ‘সূর্যের দিন পত্রিকা’ অফিস থেকে এসেছি, আমি একজন সাংবাদিক”, ভয়ে আমার বুক কাঁপছে । কাছে আসতে আসতে লোকটা বলল “বাবা তুমি এতরাতে একা একা কি করছো? আমি এখানকার চৌকিদার, কোথায় যাবে বল, আমি পৌঁছে দিয়ে আসি, যদি কিছু মনে না কর তাহলে আজ রাতটা আমার বাসায় থাকতে পারো । আমি অবশ্য একা মানুষ, তোমার ভয় লাগতে পারে ।” লোকটার কথায় আমার আত্মসম্মানে ঘা লাগল, আমি বললাম, “জ্বি আমি থাকতে পারবো আমার ভয় লাগবে না আর কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেব, আপনাকে দেখে মনে অনেকটা সাহস পাচ্ছি ।”

লোকটা পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে লাগল । অদ্ভুত তার হাটার ভঙ্গি । মনে হচ্ছে ক্রমশই সে মাটি থেকে উপরে উঠে যাচ্ছে, আবার মাটিতে নামছে । হাটতে হাটতে লোকটা প্রশ্ন করল, “আপনি যেন কোন পত্রিকা থেকে এসেছেন বললেন?”

: জ্বি আমি ত্রৈমাসিক পত্রিকা “সূর্যের দিন” থেকে এসেছি । নতুন পত্রিকা তো আপনি বোধ হয় চিনবেন না ।

:না না, চেনাইতো লাগছে । তা কি জন্য এসেছেন যেন? আমি আবার কোন কিছু মনে রাখতে পারি না ।

:অদ্ভুত কোন ফিচারের জন্য । আপনার কি মনে হয়, আমি এখানে কোন অদ্ভুত জিনিস খুঁজে পাবো?

:অদ্ভুত কোন জিনিস মানে অলৌকিক কিছু ?

: হ্যাঁ অবাস্তব কিছু, যা সাধারণত ঘটে না ।

: কি জানি পাবেন হয়তো । তবে আমার তাতে মাথা ব্যথা নেই । সারারাত পাহারা দেয়াই আমার কাজ । অন্য কিছু নিয়ে মাথা ঘামাই না ।

কথা বলতে বলতে চৌকিদার লোকটা ঝোপঝাড় ছেড়ে ঘন জঙ্গলের দিকে যেতে লাগলেন । অন্ধকারে তাকে অনুসরণ করতে কষ্ট হচ্ছিল। গহীন জঙ্গলের মাটি কিছুটা স্যাঁতস্যাঁতে থাকে । আমার পা কাঁদায় পুরো মাখামাখি অবস্থা । হাটতে বেগ পেতে হচ্ছে , কিন্তু চৌ্কিদার লোকটা দিব্যি হেটে সামনে চলে যাচ্ছে, কোন প্রকার সমস্যা হচ্ছে বলে মনে হয় না । অনেক দূর হাটার পর বিশাল এক বটগাছের সামনে চলে এল সে, আমাকে বলল, “এটাই আমার বাড়ি”।, আমি কোথাও কোন ঘরবাড়ির চিহ্ন দেখতে পেলাম না । তারপর সে বলল, “চলুন আমার বাড়িতে” এ পর্যায়ে লোকটার আকার ক্রমশই বড় হতে লাগল, এক পর্যায়ে সে আমার বাঁ হাতটা শক্ত করে ধরে হ্যাচকা টানে একেবারে গাছের মগডালে নিয়ে গেল । আমার পায়ের নীচে এক ধরনের শীতল স্রোত বয়ে গেল । লোকটার চোখগুলো ঝুলে পড়েছে, দাঁত গুলো ক্রমশই বড় হচ্ছে, জ্বিভ দিয়ে টসটস জল পড়ছে, আমার আর বুঝতে বাকি রইল না যে লোকটা আসলে ভুত । আমি প্রানপন চেষ্টা করছি বাঁ হতটা ছাড়ানোর জন্য । ক্রমশই লোকটার জ্বিভ বড় হতে লাগল এবং এক সময়ে তার জিভ দিয়ে আমাকে পেঁচিয়ে ফেলল । বিশাল মুখে পুরে ফেলার মত অবস্থা যখন, ঠিক তখনই আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এল । আমি অনেক কষ্টে পকেটে হাত ঢোকালাম, যদি কিছু পাওয়া যায় তাহলে অন্তত শেষ চেষ্টা করা যাবে । পকেট হাতরে আমার শখের একটি কলম পাওয়া গেল । কলমটা আমাকে একজন গিফট্ দিয়েছিল । আটশাট অবস্থায় কলমটার ক্যাপ পকেটেই ছিল । আমি কলমের সুচাঁলো দিকটা দিয়ে দ্রুত লোকটার মানে ভুতটার বাঁ চোখে একটা ঘা বসিয়ে দিলাম, আর অমনি সে আমাকে ছেড়ে দিল, আমি নীচে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেলাম । জ্ঞান ফেরার পর দেখি, আমি শ্যামপুর সরকারী হাসপতালে । ডাক্তার আমাকে বললেন সুরুজ নামে এক গ্রামবাসী আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন, সে বাইরে অপেক্ষা করছে । সুরুজ ও গ্রামবাসীদের ধারনা আমাকে ভুতে ধরে ছিল আর সে ভুত টা হচ্ছে এ গ্রামের মৃত এক চৌকিদার এর আত্মা, যে এখনো সবাইকে ভয় দেখায়, ভুত হিসেবে সবার কাছে আবির্ভুত হয় । কিন্তু ডাক্তার এর ধারনা আমি বিশেষত ভয় পেয়ে হ্যালুসিনেশন বা ইলুশন এ আক্রান্ত হয়েছিলাম ।একদিকে ডাক্তার অন্যদিকে গ্রামের সব মানুষ, কার কথা বিশ্বাস করবো বুঝতে পারছি না । গ্রামের এতগুলো মানুষের তো আর একসাথে হ্যালুসিনেশন হতে পারে না । তাই দেরী না করে বাইরে বের হয়ে এলাম, দেখলাম যে লোকটা রাতে ট্রেন প্লাটফর্ম এ বসে ঝিমুচ্ছিলো সেই লোকটাই আসলে সুরুজ । তাকে ধন্যবাদ দিলাম আর বেশি কিছু বললাম না ।শুধু জিজ্ঞেস করলাম ঢাকা যাওয়ার ট্রেন কয়টায়, তারপর সে দিনই ঢাকার ট্রেনে বাড়িতে এসে পড়ি । এরপর অনেক দিন আর পত্রিকা অফিসে যাওয়া হয়নি। কিন্তু বিষয়টা এখনও আমার কাছে পরিষ্কার নয়, আসলেই কি হ্যালুসিনেশন ছিল নাকি সত্যিকারের ভুত ??

Categories
অনলাইন প্রকাশনা ভয়ংকর(হরর) ভুতুরে গল্প সৃজনশীল প্রকাশনা

জনৈক ভুত বাবার সাক্ষাতকার

জনৈক ভুত বাবার সাক্ষাতকার

—সাকি বিল্লাহ্

 

ভুতের ব্যাপারে আমার বরাবরই একটা সন্দেহ ছিল “ভুত আছে বা নেই” , বিশেষ কৌতুহলের কারণে তাই বার বার ভুত বিষয়ে লিখেছি । আসলে ভুত নেই বিষয়ে যেমন হাজারটা প্রমান দেয়া যায় একইভাবে ভুত আছে এ ব্যাপারে হাজারটা প্রমান দেয়া যাবে । আমার দাদার বাড়ী গাজীপুরের পূর্বাচলে যা এখন ঢাকার পূর্বাচল টাউন নামে পরিচিত । বছরে দুই একবারের বেশি যাওয়া হয় না । যারা পূর্বাচল টাউনে কখনও গিয়েছেন তারা জানেন সবাই যেভাবে বলে সেরকম উন্নত নয় এ এলাকা । এখানে এখনও অনেক গ্রাম আছে যেখানে অনেক ভুত বা জ্বিন বাস করে । এখনও অনেক প্রেতসাধক আছে যারা চোখের নিমিষে আপনাকে কোনও অবিশ্বাস্য কিছু করে দেখাতে সক্ষম । এমনই এক ঘটনা ঘটেছিল আমার সাথে গতবছর গ্রীষ্মের সময় ।

প্রচন্ড গরমে উঠোনের এক পাশে সবাইকে নিয়ে গাছের নীচে বসে গল্প করছিলাম, চাচা চাচী, চাচাতো ভাই-বোন ও আমি । দাদা-দাদী মারা গেছেন প্রায় ১৫ বছর এর উপর হয়েছে । হঠাৎ গ্রামের এক মধ্যবয়েসী লোক উঠোনের এক পাশে দাড়িয়ে চাচাকে সালাম দেয় । উনার নাম সুশীলবাবু । পেশায় একজন মাছ ব্যাবসায়ী । চাচা ওনার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন । সুশীলবাবু মাছের ব্যাবসা করেন কিন্তু নিরামিষভোজী, ব্যাপারটা সত্যিই রহস্যজনক । গ্রামে ওনার আরেকটা পরিচয় আছে “প্রেতসাধক”, তবে ভয়ে কেউ সামনাসামনি এ কথা বলে না । লোকটার সাথে অনেক বিষয়ে কথা হল, এক পর্যায়ে আমি ভুত বিষয়ে জানতে চাইলে সে উত্তর না দিয়ে ব্যস্ততা দেখিয়ে উঠে পড়ে, বলে “যাই অনেক কাজ ফেলে এসেছি” ; তার এরকম আচড়ন আমার কৌতুহল আরো বাড়িয়ে দিল । বললাম “আজকে চলে যাচ্ছেন ঠিক আছে কিন্তু কালকে আবার আসবেন, আপনার সাথে আমার কথা আছে” ; তার মুখে কোনো উত্তর শোনা গেলনা । শুধু মৃদু হাসলেন । তার হাসির অর্থ বুঝতে পারলাম না, তিনি আসবেন নাকি আসবেন না ।

পরদিন সুশীলবাবুকে আর দেখা গেল না, আমি বেশিদিন থাকবো না তাই কৌতুহল মেটানোর জন্য আমি নিজেই তার বাসায় হাজির হলাম ।সুশীল বাবু প্রথমে বিরক্ত হলেও পরে বুঝতে পারলাম তিনি খুশি হয়েছেন আমি আসাতে । ওনাকে ভুত বিষয়ে আবারও একই প্রশ্ন করলাম “আপনি কি আমাকে ভুতের সাথে কথা বলিয়ে দিতে পারবেন?” সুশীলবাবু আবারও হাসলেন, তার হাসির রহস্য আমি বুঝতে পারলাম না । তাই বিরক্ত হয়ে বললাম, “দেখুন, না পারলে তো লজ্জার কিছু নাই, হাসির মানে কি?” সুবললেন “আপনার কথা শুনে হাসলাম, কারণ, মনে হচ্ছে গাছে পাকা আম ঝুলে আছে আর আপনি বলছেন আমটা পেরে দিতে । যদি সত্যি আপনার আগ্রহ থাকে তাহলে আমাকে ২ ঘন্টা সময় দিতে হবে আর মিষ্টি, দই, পান-সুপারি, জ্যান্ত মুরগী একটা অথবা মুরগীর পরিবর্তে দুইটা জ্যান্ত কবুতর বলি দিতে হবে ভুতবাবার সামনে”

-এত কিছু কেন” আমি জিজ্বেস করলাম ।

-ওনারা মেহমান । আমার বাসায় আসলে ওনাদের সমাদর না করলে পরের বার ডাকলেও আর আসবে না, তাই ।

যাই হোক আমাকে আজ ভুতের সাথে সাক্ষাৎ নিতেই হবে । বাজার থেকে সব কিছু কিনে দিলাম সুশীলবাবুকে । যথারীতি ৩ ঘন্টা পর সন্ধ্যায় সুশীলবাবুর বাসায় আমি ও আমার এক চাচাতো ভাইকে সাথে নিয়ে হাজির হলাম । সাথে কলম ও ডায়েরী, ভুত বাবার সাক্ষাৎ নেয়ার জন্য । সুশীলবাবু ধ্যানে বসে অনেক মন্ত্র পড়লেন, প্রায় ১ ঘন্টা মত হবে । ১ ঘন্টা পর ঘরের সব আলো নিভে গেল । ঘরের বাতাস ভারী হয়ে এল । সুশীলবাবু একটা মোমবাতিতে আগুন ধরিয়ে আমাদের সামনে রাখলেন । এক পাশে আমি, আমার চাচাতো ভাই অন্য পাশে সুশীলবাবু ও জনৈক ভুতবাবা । ভুতবাবাকে অন্ধকারে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না । তবে সুঠাম দেহের লম্বা বাবরি চুলের একজন ঠিক বোঝা যাচ্ছে । লম্বা লম্বা হাত পা, ভরাট কন্ঠে ভুতবাবা জিজ্বেস করলেন “আমাকে ডেকেছিস কেন?” আমি বললাম, “জ্বি আপনার একটা ছোট সাক্ষাতকার নেয়ার জন্যে, যদি বেয়াদবি না হয়, খুব বেশিক্ষণ লাগবে না । ভুতবাবা মনে হল ফিসফিস করে সুশীলবাবুর কানে কানে কি যেন বলছেন । সুশীলবাবু বললেন “ঠিক আছে বাবাজী বেশিক্ষণ সময় দিতে পারবেন না , উনার একটা প্রোগ্রাম আছে” ; আমি বললাম “না বেশিক্ষণ লাগবে না এই ধরেন ২০ কি ২৫ মিনিট, আমি আগে থেকেই প্রশ্ন লিখে এনেছি” ।

আমি আমার সাক্ষাতকার নেয়া শুরু করলাম । পাঠকের সুবিধার্তে সাক্ষাতকারটি হুবুহু তুলে ধরা হলঃ

জনৈক ভুতবাবার সাক্ষাতকার

সাক্ষাৎ গ্রহনকারী: সাকি বিল্লাহ্

সার্বিক সহযোগীতা ও ভুতবাবার সাথে সাক্ষাতের জন্য বিশেষভাবে ধন্যবাদ: সুশীলবাবুকে ।

-আপনাকে আমরা কি বলে ডাকবো?

-আমাকে তোমরা ভুতবাবা বলে বা বাবাজী বলে ডাকতে পারো ।

-আমরা কি আপনাকে সালাম দিব নাকি নমষ্কার দিব?

-ভুতদের আসলে কোন ধর্ম নাই, দুনিয়ার সব ভুত পরস্পর ভাই ভাই । তবে মানুষের যেহেতু ধর্ম আছে তাই যার যে ধর্ম সেই অনুযায়ী ডাকতে পারো । যেমন হিন্দু হলে নমস্কার, মুসলমান হলে সালাম দিতে পারো ।

-আসসালামু ওয়া আলাইকুম

-ওয়া আলাইকুম আসসালাম

-আপনার সম্পূর্ণ নাম কি ?

-হা—হা—-, ভুতদের কোনো নাম থাকে না, আমাদের বিভিন্ন জাত রয়েছে, যেমন মেছো ভুত, সরষে ভুত, কানা ভুত, মাথাকাটা ভুত, শাকচুন্নী ভুত, পেত্নী ভুত । তবে আমরা নামের জন্য ভুত প্রোটোকল ব্যাবহার করি, যেমন ধরো, ছোটভুত, মাঝারিভুত, বড়ভুত, আবার নীলভুত, লালভুত, কালো বা সাদাভুত, সব কিছু হিসেব করে আমাদের একটা ইউনিক আইডি দেয়া হয় । যেমন ধরো আমার আইডিঃ ভুতভুতং-সাদা-মাঝারি-গ-০১৭০ এটা আমাদের ভুত কল্যাণ সংস্থা থেকে দিয়ে দেয় ।

-খুবই সুন্দর নিয়ম । নামেই সব কিছু বোঝা যাচ্ছে ।

-হ্যাঁ । আমাদের বিশ্বকবি “ভুতকবিং-বড়-সাদা-র-০১৯০” তাই বলেছেন, “বৃক্ষ তোমার ফল কি নামে পরিচয়”

-কথাটা মনে হচ্ছে রবি ঠাকুরের কিন্তু কেমন একটু উল্টো পাল্টা লাগছে ।

-কথাতো উল্টোপাল্টা লাগবেই কারন এটা ওনারই লেখা বানী । কিন্তু উনি মরে ভুত হওয়ার পর ওনার নাম দেয়া হয়েছে “ভুতকবিং-বড়-সাদা-র-০১৯০” আর উনি ভুত হওয়ার পর থেকে কবিতা ও বাণীতে কিছু পরিবর্তন এনেছেন ।

-হুম্ । যাই হোক আপনার মাতাপিতার পরিচয়?

-মাতা ভুত হয়েছেন গত বছর কিন্তু পিতা এখনও জীবিত তাই ভুত হওয়ার ১নং শর্ত উনি এখনও পূরণ করতে পারেননি । তাছাড়া ভুত হওয়ার বেশ কিছু শর্ত আছে । এগুলো মানতে পারলে ভুত হওয়া যায় ।

-শর্তগুলো কি ব্যাখ্যা করা যাবে, দেশ ও জাতির ভবিষ্যত ভুতদের কথা চিন্তা করে ?

-আলবৎ যায় । আমাদের সংখ্যা বাড়াতে আমি যেকোন কাজ করত আগ্রহী । প্রধান প্রধান শর্তগুলো হচ্ছে একজন ভুত হতে হলেঃ

১/ যেকোনো মারাত্বক দুর্ঘটনায় মৃত হতে হবে মানে স্পট ডেথ ।

২/ হত্যা, গুমখুন হলে তার ১ বছর পর প্রাথমিক ভুত হিসেবে আবেদন করতে পারবে ।

৩/ নিবন্ধিত ভর্তি ফরম পূরণ করে ভুত সংগঠনের সদস্য হতে হবে ।

৪/ কমপক্ষে ১৫-২০ জন মানুষকে ভয় দেখাইয়া প্যান্টে বা কাপড়ে ইয়ে সারাইতে পারিলে ।

৫/ ভুতের ব্লগের নিয়মিত পাঠক হিসেবে পুরস্কৃত হইলে ।

ইত্যাদি..ইত্যাদি…..

-শর্তগুলো মানা খুবই কঠিন ব্যাপার । যাই হোক আপনার প্রিয় ফল?

-মাকালফল ।

-প্রিয় ফুল?

-সরষেফুল

-প্রিয় খাবার?

-চাঁদের আলোর সাথে কাঁচা ইলিশ মাছ ।

-প্রিয় রং?

-কালো, নিকষ কলো [হে…হে….]

-হাসলেন যে, কারন কি?

-হে…..হে… কালো ঘুট ঘুটে অন্ধকারেইতো মানুষদের বেশি ভয় দেখানো যায়, তাই ।

-হুম্–, প্রিয় ব্যক্তিত্ব?

-ঠাকুমা ।

-যদি কিছু মনে না করেন, ঠাকুমা আপনার প্রিয় ব্যক্তিত্ব কেন?

-কারন উনিই প্রথম আমাদের নিয়ে গল্প লিখেছেন “ঠাকুমার ঝুলি” ।

-বাংলাদেশে বর্তমানে মোট ভুতের সংখ্যা কত?

-এটা বলা খুবই কঠিন কারন প্রতিদিন যে হারে মানুষ গুমখন হচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে তাতে সংখ্যা বেড়েই চলছে । তবে সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে, ….হুম….ভুতভুতং…ভুতভুতং….প্রায় ৫১৯৮১৮২০ জন ভুত রয়েছেন ।

-খুবই ভয়ের কথা । এভাবে ভুত বাড়তে থাকলে এক সময় বাংলাদেশে শুধু ভুতেরা বাস করবে আর মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না ।

-তোমার আরো প্রশ্ন থাকলে করতে পারো । আমার তাড়া আছে । ভুত কল্যাণ সমিতির একটা অনুষ্ঠান আছে “ভুতনৃত্য” বেলী ড্যান্স, শেওড়া গাছের মগডালে । আমাকে সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে ওরা ইনভাইট করেছে ।

-আমি আপনাকে আর বেশিক্ষণ ধরে রাখবো না । শেষ দু-তিনটে প্রশ্ন, আপনাদের মানে ভুতদের দিনের বেলায় দেখা যায় না কেন?

-দিনের বেলায় আমরা ঘুমাই আর রাতের বেলায় কাজ করি কারন আমরা নিশাচর প্রাণী, তবে কিছু কিছু ভুত আছে যারা ওভার টাইম মানে দিনের বেলাতেও কাজ করে ।

-বুঝতে পেরেছি । আচ্ছা মানুষদের ভয় দেখিয়ে আপনাদের কি লাভ? মানুষ ও ভুত কি বন্ধু হতে পারে না?

-(উত্তেজিত হয়ে) না-আলবত না, ভুত ও মানুষ কখনও বন্ধু হতে দেয়া যায় না । তবে ইদানিং কিছু বাজে ভুত, যারা ভুত নামের কলঙ্ক, মানুষদের সাথে বন্ধুত্ব করছে যা কিনা ভুত এর অস্তিত্বের জন্য হুমকি স্বরুপ, এটা ঠিক না । ভেবে দেখো মানুষই আমাদের ভুত বানিয়েছে, তারপর আবার কিছু কিছু সন্নাসী ও কবিরাজগণ আমাদের বোতলে ভরে রাখতেও দিধা করে না । সেই মানুষ তো আমাদের বন্ধু হতে পারে না । আমি যাচ্ছি অন্য একদিন হয়ত দেখা হবে । বিদায় বৎস ।

মনে হল ভুতবাবা খুবই রাগ করেছেন এ ধরনের প্রশ্ন করাতে । তিনি তড়িঘড়ি করে চলে গেলেন, মোমবাতি নিভে গেল । সুশীলবাবু এবার হ্যারিকেন জ্বালালেন । বাইরে বৃষ্টি হবে হয়ত । চারদিকে নিঝুম অন্ধকার । বাড়ীতে চলে আসছি, রাস্তা এগিয়ে দিচ্ছেন সুশীলবাবু, তার হাতে হ্যারিকেন । বাড়ীর প্রায় কাছাকছি চলে এসেছি, সামনে পুকুরপাড়ের উল্টো দিকে একটা শেওড়া গাছ চোখে পড়ল । হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকানিতে এক ঝলক আলোয় মনে হল শেওড়া গাছের মগডালে একঝাক ভুত নৃত্য করছে, বেলী ড্যান্স, চারদিকে অনেক ভুতেরা বসে তা দেখছে আর মধ্যিখানে বসে আছেন প্রধান অতিথি জনাব ভুতবাবা ।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা ভয়ংকর(হরর) ভুতুরে গল্প সৃজনশীল প্রকাশনা

ভুত পোষা

ভুত পোষা

–সাকি বিল্লাহ্

তখন আমি ক্লাস ফাইভ এ পরতাম । আমাদের গ্রামের বাড়ির এক স্কুলে । স্কুলটি ছিল জমিদার আমলের, যার কারণে ক্লাসগুলোতে অনেক ফাঁকি দেওয়া যেত । যেমন নাম কল করার পর কেউ কেউ ভাঙ্গা জানালা দিয়ে পালিয়ে যেত । তাদের প্রধান ছিল শান্ত । নামে শান্ত হলেও আসলে সে কিন্তু শান্ত ছিল না, তাই ড্রিল টিচার প্রায়ই তাকে শাস্তি দিতেন আর ডাকতেন অশান্ত বলে । তাকে ভয় পেত না এরকম বুকের পাটা আমাদের কারও ছিল না, তাই পালিয়ে গেলেও কেউ ভয়ে বলত না ।

একদিন সে ক্লাসের সবাইকে বলল, আমি তোমাদের ভুতের বাচ্চা দেখাব । আমরা তো সবাই হেসেই খুন, ভুতের বাচ্চা হা…..হা…..হা… ; ক্লাসের সবাই হাসছে কিন্তু আমার হাসিটা মনে হয় একটু বেশি শব্দে হয়ে গিয়েছিল, তাই আর কাউকে লক্ষ্য না করে, শান্ত আমাকে ধমকের সুরে বলল, দেখ হাসবি না বলছি, এমন ঠেঙ্গানি দেব না যে নিজের নাম ভুলে যাবি । আমি আমার হাসি থামাতে না থামাতেই ক্লাসে টিচার চলে এলেন ।

এক এক করে যখন শেষ ঘণ্টা এলো তখন খবর পাওয়া গেল আমাদের শেষ ঘণ্টায় অন্য স্যার আসছেন । কারণটা অবশ্য জানা যায়নি । এমন সময় এলেন শফিক স্যার, তিনি যেমন মেজাজি তেমনি কড়া । তিনি বললেন আমি তোমাদের একটি অনুচ্ছেদ লিখতে দেব । আমরা তো পড়লাম মহা মুশকিলে, তিনি আবার কারো কথা শুনবেন না । কিছুক্ষণ পর তিনি লিখতে দিলেন “শিমুল গাছের প্রয়োজনীয়তা”। আমরা তো অবাক হঠাৎ করে শিমুল গাছ নিয়ে লেখা চাট্টিখানি কথা নয় । তাও আবার প্রয়োজনীয়তা । ক্লাসের ছাত্র হিসেবে আমি ছিলাম মধ্যম, তাই পাশের জনেরটা না দেখে উপায় ছিল না । দেখছি আর লিখছি, লিখছি আর দেখছি । এমন সময় পেছন থেকে স্যার আমার কানটা টেনে ধরলেন, আর রাগে গরগর করতে লাগলেন । তারপর অনেক চেষ্টা করেও বাঁচতে পারলাম না । স্যার তার বেত দিয়ে ধমাধম কয়েকটা বেত্রাঘাত করলেন । এরপর সারা ক্লাসে কান ধরে দাড়িয়ে থাকতে হল ।

ছুটি হয়ে গেলে সবাই হৈ হুল্লোড় করতে লাগল কিন্তু আমার মনটা খারাপ । আমার মনের অবস্থা দেখে শান্ত বলল চল্ তোকে ভুতের বাচ্চা কিনে দেব । তুই ইচ্ছা করলে বাড়িতে পুষতে পারবি, যা হুকুম দিবি তাই করে দেবে । আমি বললাম, তোর কি মথা খারাপ হয়েছে, এটা কি আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ যে,যা চাইব তা-ই পাব । শান্ত উত্তর দিল, কেন তোর বিশ্বাস হচ্ছে না? চল্ আমার সাথে । সে আমাকে এক প্রকার জোড় করেই নিয়ে গেল ।

যেতে যেতে এসে থামল আমাদের গ্রামের পুরনো এক মন্দিরে । এখানে নাকি আজ ভুতের মেলা হবে আর অনেক বাচ্চা ভুত এতে অংশ নিবে, ঠিক “নতুন কুড়ি” অনুষ্ঠানের মত এবং এ মেলা থেকে অনেক বাচ্চা ভুত হারিয়ে যাবে । আমরা সেই বাচ্চা ভুতদের একটি কীডন্যাফ করবো, বুঝলি? শান্ত বলল । আমি বললাম, না, বুঝি নাই । শান্ত উত্তর দিল, থাক তোর ওসব বুঝে কাজ নেই, এখন যা বলি তাই কর

-কি করব?

-আমার ব্যাগটা রাখ আর তুই এখানে দাড়িয়ে থাক । আমি যাব আর আসব ।

শান্ত আমাকে মন্দিরের বাইরের রাস্তায় দাড় করিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল ।

২.

প্রায় আধ ঘণ্টা হয়ে এলো তাও শান্ত ফিরছে না । কারণটা কি? নিজের চোখে দেখার জন্য মন্দিরের ভিতরে ঢুকে পড়লাম । অনেক পুরনো মন্দির, কেউ বোধ হয় এখানে আর আসে না । কিন্তু ভিতর থেকে ধুয়ার কুণ্ডলী বের হচ্ছে । ভিতরের এক কুঠুরি থেকে শব্দ আসছে গরর…র…র..হুশ…হুশ….যা…যা….ঢুক….ঢুক………. ভিতরে ঢুক । শব্দ শুনে কুঠুরিটা চিনতে কোন অসুবিধা হওয়ার কথা নয় কিন্তু ধোঁয়ায় চোখ জ্বলে যাচ্ছিল । কুঠুরিতে ঢুকতেই শান্ত আমাকে ইশারায় ওর মত চন্দ্রাসনে বসতে বলল । আমি তাই করলাম । দেখি ২ হাত লম্বা দাড়িওয়ালা আলখেল্লা পরা এক জন বুড়ো আমার সামনে বসে আছেন । তার সামনে একটি কৌটা থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে । আমি বললাম, আচ্ছা এখানে না “নতুন কুড়ি” হওয়ার কথা, ভুতের মেলা, বাচ্চা কিছু-ইতো দেখতে পাচ্ছি না । শান্ত ফিসফিসিয়ে বলল, হিস…সসস, একদম চুপ, পরে কথা হবে, দেখছিস না সাধু বাবা ধ্যানে বসেছেন ।

-আমি বললাম, কোথায়? তাকে তো আমি দিব্যি ঝিমুতে দেখছি ।

-শান্ত অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলল, ধ্যাৎ কি যে করিস না ধ্যানে বসেই ভুতের বাচ্চা কীডন্যাফ করতে হয় । কেন তুই জানিস না? তুই এভাবে ডিস্টার্ব করলে ভুতের বাচ্চা তো দূরে থাকুক পরে আমরাই ভুত হয়ে ফিরব ।

সাধু বাবা এবার মুখ খুললেন, চোপ বেত্তমিজ, না লায়েক, তোদের জন্য হাত ফসকে একটা বেরিয়ে গেল, দুটো ধরেছিলাম । এই নে, হাতের মুঠোয় ধরে রেখেছি, শিশি এনেছিস?

শান্ত বলল, জ্বি না, শিশি আনি নাই । মনে হল সাধু বাবা খুবই বিরক্ত হলেন, রাগান্বিত স্বরে তিনি বললেন, ভুত কিনতে আসছিস আর শিশি আনিস নাই মানে? এখন তোর মুখের মইধ্যে নিবি, বেয়াকুব? আমি বললাম, না ভুতবাবা ও মুখে নিতে রাজি হবে না কারণ, শুনছি ভুতেরা পেছাব করে দেয়, যদি মুখে নিলে ওর মুখে..মানে, বলছিলাম আমার কাছে পানির ফ্লাক্স আছে । শান্ত আমার কথায় প্রথমে রাগ করলেও পরে পানির ফ্লাক্স এর কথা শুনে রাগ দমে নিল । সাধু বাবা উত্তর দিলেন, ঠিক আছে পানির ফ্লাক্স দে, আপাতত এটাতেই রাখ আর আমি ভুতবাবা না, আমি সাধু বাবা । সাধুবাবা পানির ফ্লাক্স এ ভুতের বাচ্চাটা রাখলেন আর বললেন, এবার আমার মওকাটা দে, একশত পাঁচ টাকা চাইর আনা পাঁচ পাই আর শোন এটা হচ্ছে মেছো ভুতের বাচ্চা । তিন ভাইয়ের মধ্যে মেজ, এর এক চোখ কানা তাই সবাই একে কানাভুত বলে ডাকে । সকাল বিকাল পুকুরে বা নদীতে চুবিয়ে রাখলে এটা আপনা থেকেই মাছ ধরে খেতে পারবে । তবে আধ ঘণ্টার বেশি চুবিয়ে রাখলে এটা মাছ মানে মাছভুত হয়ে যাবে ।

শান্ত তার পকেট থেকে ৭০ টাকা বের করল । তার কাছে আর নেই তার মানে বাকিটা আমাকে দিতে হবে । কিন্তু চার আনা পাঁচ পাই কোথায় পাব । সাথে তো নেই, এদিকে সাধু বাবা বেকে বসলেন । অবশেষে ১৭০ টাকা দিয়ে তবে মুক্তি । বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় আটটা বাজতে চলল । শান্ত কানাভুত টাকে আমার কাছে দিয়ে বলল, দেখ তুই তো জানিস আমার বাবা ট্রাক চালায় তার মাথা সব সময় ঠিক থাকে না । মা মারা যাবার পর থেকে এমনটা হল । এটাকে মানে কানাভুতটাকে তুই যত্ন করে রাখিস । কথা শেষ হতে না হতে আমার বাড়ির গেটের সামনে এসে হাজির হলাম । শান্ত বিদায় নিয়ে চলে গেল । আমিও ভিতরে ঢুকলাম । ভিতরে ঢুকতেই ছোট বোন দৌড়ে এসে বলল, ভাইয়া এতক্ষণ কোথায় ছিলে? আজ তোমাকে দিয়ে.. কথা শেষ না হতেই বাঘের হুংকার, মানে আমার বাবা, কিরে স্কুল ছুটির পর এ তিন ঘণ্টা কোথায় ছিলি? তোকে দিয়ে আজ ঘুড়ি বানিয়ে আকাশে উড়াবো । মামা সামনেই ছিলেন, তিনি আমাদের সাথে থাকেন । তিনি বললেন, দুলাভাই ঘুড়ি বানানোর কাজটা না হয় আমিই করি । আপনি বরং ফ্লাশ লাইটের ব্যবস্থা করেন ।

-দেখ জালাল সব সময় ইয়ার্কি ভাল লাগে না, ছেলেটা যদি বদমায়েশ হয়ে যায় তখন আমার মুখে চুন কালি পড়বে সেটা কি তুমি চাও ?

-আহা দুলা ভাই চটছেন কেন? আপনি যান আমি সব দেখছি ।

এমন সময় এলেন মা, তিনি জালাল মামার কাছে আমাকে দিয়ে বাবাকে টেনে নিয়ে গেলেন ।

কিরে এতক্ষণ কোথায় ছিলি? পড়িস ক্লাস ফাইভে আর এ বয়সেই সেয়ানা হয়ে গেছিস, সিগারেট ধরেছিস নাকি? আফিম? অবশ্য গাঁজাও আজকাল খুব জনপ্রিয় । আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম কিন্তু মামা আমাকে থামিয়ে বললেন, যা টেবিলে ভাত রাখা আছে খেয়ে শুতে যা, কাল সকালে তোর সাথে কথা বলব ।

৩.

আমি কথা না বলে ভাত খেয়ে গেলাম বিছানায়, গিয়ে দেখি কে যেন আমার ব্যাগ খুলেছে । আমি ভীত গলায় কানাভুতকে ডাকলাম । কানাভুত… ও কানাভুত.., সাথে সাথে উত্তর এল, কিরে তুই তো আস্ত একটা গাড়ল, আমাকে এর ভিতর বন্দি করে রেখেছিস আবার ব্যাগটাও বন্ধ করে রেখেছিস, আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল, তাই বের হয়েছি । আমি বললাম ঠিক আছে আমার ভুল হয়েছে কিন্তু তুমি আমাকে তুই তুই করে বলছ কেন? আমি তো তোমার বন্ধু না, তাছাড়া ..

-তাছাড়া কি?

-তাছাড়া তোমরা হচ্ছ ভুত জাতি আর আমরা মানুষ ।

মুচকি হাসির শব্দ হল এবং কানাভুত বলল, তাতে কি হয়েছে, আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি তুইও ক্লাস ফাইভে পড়িস । একই ক্লাসে পড়লে কি বন্ধু হওয়া যায় না? কিন্তু তার আগে তুই বল আমাকে কেন বন্দি করে এনেছিস ? অবশ্য তিন কুলে আমার কেউ নাই, বাবা মা ভাই বোন সবাইকে কাচু মুন্সি তাবিজ করে মেরে ফেলেছে । এবার নতুন কুড়ি মানে ভুতের নতুন কুড়িতে বাদাম আর পানি বেচতে এসেছিলাম কিন্তু শয়তান কাচু মুন্সি আমাকে ধরে এই পানির বোতলে আটকে দিয়েছে । এখন তুই-ই বল এটা কি ঠিক হল? আমি বিরক্ত ভরে বললাম, না ঠিক হয় নাই, কিন্তু তুমি আমাকে তুই তুই করে বলছ কেন? ঘনিষ্ঠতা ছাড়া কেউ তুই তুকারি করলে আমার ভালো লাগে না, অনেক রাগ হয় ।

একবার আমাদের হেডস্যার আমাকে তুই করে বলেছিল বলে আমি দুদিন স্কুলে যাইনি, পরে অবশ্য বাবা হেডস্যার কে সব খুলে বলেছিলেন, তারপর থেকে হেডস্যার আমাকে তুমি করে বলেন । অথচ সামান্য একটা পুচকে ভুতের বাচ্চা কিনা আমাকে তুই করে বলছে । যাক কি আর করা ভুতের বাচ্চা বলে কথা । সহসা কানাভুত বলল, কিরে কোন কথা বলছিস না যে? তোর কি শরীর খারাপ নাকি আমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না? চল আজ থেকে আমরা দুজনে বন্ধু হয়ে যাই । আমি উত্তর দিলাম, তুই করে বললে আমার ভালো লাগে না, বন্ধু হব তবে.. ; ভুতের বাচ্চা বলল, তবে কি? তোকে তুই করে বলব না, এইতো? ঠিক আছে যা আজ থেকে তোকে আর তুই করে বলব না । এখন এক কাজ কর আমাকে এই বোতলের ভিতর থেকে বের করে দে । আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বললাম কেন..কেন?

-কেন আবার বাইরে বের হব । তোর সাথে খেলব, একই বিছানায় ঘুমাব, একসাথে খাব, স্কুলে যাব, আরও শুনবি?

-না..না..থাক আর শুনতে হবে না । কিন্তু তুমি যদি মুক্ত হয়ে চলে যাও আর না আসো । ধমকের সুরে কানাভুত বলল, কিযে বলিস, ভুত পুষতে এনেছিস আর এটা জানিস না যে ভুতেরা সমাজ ছেড়ে এলে আর সমাজে যেতে পারে না, তাছাড়া আমি আর তুই তো বন্ধু, বন্ধুকে ছেড়ে কি কখনও যাওয়া যায়, বল?

ঠিক এমন সময় আম্মা ও ঘর থেকে বললেন, কিরে কার সাথে কথা বলছিস । আমি তাড়াতাড়ি বাতি নিভিয়ে দিলাম কিন্তু ঘুম আসছে না । কারণ গল্পের ভুত নয়, বাস্তব ভুত আমার সাথে বাস করছে । হঠাৎ নাক ডাকার শব্দ শুনতে পেলাম, গরর…ররর…র.. হুস…স.. , নাক ডাকার শব্দ শুনে কিছুটা অবাক হলাম কারণ আমাদের বাড়িতে কেউ নাক ডাকে না । তখন বুঝতে পারলাম এটা কানাভুতের নাক ডাকার শব্দ । পরদিন ভুতের বাচ্চাকে মানে কানাভুতকে নিয়ে কি কি করব তা চিন্তা করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তা আর টের পাইনি । অবশ্য ঘুমিয়ে গেলে টের পাওয়া যায় না কি ভাবে ঘুম এল । একদিন বিছানায় শুয়েছি রাত ১০:৩০ মিনিট বাজছে, হঠাৎ মাথায় একটা চিন্তা হল মানুষ কি ভাবে ঘুমায়, ঘুম কিভাবে আসে, কেন ঘুম আসে, কখন আসে দেখতে কি রকম ইত্যাদি, ইত্যাদি । কিন্তু ১০:৩০ থেকে ১২:০০ বাজতে চলল, ঘুম আর আসে না । তারপর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি তা আর টের পাইনি ।

৪.

সকালে দেখি পানির ফ্লাক্স নেই । কোথায় গেল পানির ফ্লাক্স, খুঁজেও পেলাম না, মা কে জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন অঞ্জনা ধুতে নিয়ে গেছে । অঞ্জনা হচ্ছে আমাদের বাড়ির ম্যানেজার মানে কাজের মেয়ে । কাজের মেয়ে বলা আমাদের বাসায় নিষেধ, এটা আমার বাবার হুকুম, তাই আমি কারও সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় বলি ও হচ্ছে আমাদের বাড়ির ম্যানেজার । অদ্ভুত তার কাণ্ড কারখানা, একদিন তাকে কফি বানাতে বলায় সে কফি বানিয়ে তা ছাকনি দিয়ে ছাঁকছে কিন্তু কোন কফি দানা পাচ্ছে না বলে সেই খানেই মাথায় হাত দিয়ে বসে সূরা ইয়াসিন পড়ছে । প্রথম প্রথম যখন সে আমাদের বাড়িতে এসেছিল, একদিন সকাল বেলার ঘটনা, বারান্দায় একশ পাওয়ার এর বাতিকে সে ফু দিয়ে নেভানোর চেষ্টা করছে, নিভছে না বলে তাকে খুবই উৎকণ্ঠা মনে হল, আমাকে দেখে বলল, ভাইজান কুফি ডা মানে হারিকেন ডা নিভাইতে পারলাম না, অনেক বার ফু দিছি কিন্তু নিভে না, এহন কি লতে ধইরা টান দিমু? তার কথা শুনে আমি তো ‘থ’ হয়ে গেলাম কারণ লত বলতে সে বিদ্যুতের তার কে বোঝাচ্ছে । যাক্ এসব কথা কিন্তু চিন্তা হচ্ছে এখন আবার আমার পানির ফ্লাক্স মানে কানাভুত নিয়ে না জানি কি করছে । অঞ্জনা..এই অঞ্জনা..তুমি কি আমার পানির ফ্লাক্স ধরেছ? আমি জিজ্ঞেস করলাম । অঞ্জনা বলল, জ্বে ভাইজান, আম্মাজান কইল আইজ আফনের স্কুল বন্ধ তাই ধুইয়া দিতে ।

-কিন্তু কোথায় পানির ফ্লাক্স?

-জ্বে, ছাদে শুকাইতে দিছি ।

অঞ্জনা বসে বসে চিরুনি দিয়ে উকুন আনছে আর কটাস কটাস করে মারছে । দেখে আমার ঘেন্না লাগছে । মনে হয় যেন তার মাথা একটা উকুন সমুদ্র । তা থেকে হাজার বিলিয়ন উকুন মারলেও কমবে না । আচ্ছা একটা পরিসংখ্যান করলে কেমন হয়, যদি একজন মানুষের মাথায় ১০০টি উকুন থাকে তাহলে প্রতিদিন দশটা করে মারলে দশদিনে তা শেষ হবার কথা কিন্তু বাকি ৯০ টা হতে দৈনিক গড়ে ১০০০ টা ছোট উকুন মানে বেবী উকুন জন্ম নিচ্ছে, কাজেই যা করতে হবে তা হল সমূলে ধ্বংস করতে হবে । অর্থাৎ মাথার চুল ফেলে দিতে হবে বা উকুন নাশক শ্যাম্পু দিতে হবে । কিন্তু আমার চিন্তা হচ্ছে কানাভুত কে নিয়ে, নিশ্চয়ই সে ছাড়া পেয়ে উড়ে গেছে । হঠাৎ কানে কানে কে যেন বলল, কি রে কি ভাবছিস, আমি চলে যাইনি । আমি বললাম, কিন্তু তুমি তো চলে যেতে পারতে ।

-পারতাম কিন্তু যাইনি, কারণ শত হলেও তুই আমার বন্ধু । চল আমরা বাইরে থেকে ঘুরে আসি ।

-কিন্তু মা যদি বকা দেয়, এই সাত সকাল বেলা বাইরে বের হলে ।

-বকা দিবে না, চল্ ।

তারপর দুজনে মানে আমি ও কানাভুত গ্রামের এক পুরনো রাজ বাড়িতে ঘুরতে গেলাম । অনেক পুরনো প্রায় দুশো বছর আগের । কানাভুতের সাথে রাজ বাড়ির পুকুর ঘাটে বসে অনেক কথা হল, কানাভুত হঠাৎ বলল, জানিস এই রাজ বাড়িটা আমাদের ছিল ।

আমি স্তম্ভিত গলায় বললাম, কিভাবে? কানাভুত অনেক উৎসাহ নিয়ে বলল, কিভাবে? শুনবি? আমি আগ্রহ নিয়ে বললাম, হ্যাঁ, অবশ্যই শুনবো ।

-এই বাড়ির মোট সদস্য ছিল বারোজন তাদের মধ্যে আমার চারজন চাচা-চাচীও ছিলেন । আমি ছিলাম আমার বাবা মা’র ছোট ছেলে, দাদা অনেক আগেই মারা গিয়েছিলেন । দাদার নাম ছিল শায়েব উদ্দিন খান আর বাবা’র নাম ছিল নওয়াব উদ্দিন খান । চাচারা ধন সম্পত্তির লোভে আমাকে এবং আমার বাবা মা’কে বিষ খাইয়ে জঙ্গলে ফেলে দিয়েছিল । সেখানে আমাদের লাশ শেয়াল কুকুর আর শকুনেরা খুবলে খুবলে খেয়েছে । তারপর আমরা ভুত হয়ে গেছি এবং প্রতিজ্ঞা করেছিলাম মানুষদের শান্তিতে থাকতে দেব না ।

-মানুষ কি মরলে ভুত হয়ে যায়? আমি জিজ্ঞেস করলাম ।

-না, সব সময় হয় না । যখন তার আত্মা অতৃপ্ত থাকে এবং তাকে কবর দেয়া হয় না, তখন সে ভুত হয়ে যায় ।

ভয়ে আমার বুক ধুক্ ধুক্ করছে । আমি তারপরেও জিজ্ঞেস করলাম, তার পর কি হল?

-তারপর, এইতো কদিন আগে আমার বাবা মা’কে কাচু মুন্সি তাবিজ করে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলেছে । অবশ্য আমরা আমাদের চাচার বংশধরদের কাউকেই বাঁচতে দেইনি ।

-কিন্তু তুমি তো এখন ক্লাস ফাইভে পড়, এসব ভুতুরে ঝামেলায় যাওয়া কি ঠিক?

-না, ঠিক না । তবে …

-তবে কি?

-থাক না এসব কথা । আসল কথাইতো তোকে বলা হল না । আজ তোদের বাড়িতে সমরেশ বাবু আসবেন তোর নামে নালিশ করতে ।

-সমরেশ বাবু মানে আমাদের অংক স্যার । কিন্তু উনি আমার নামে নালিশ করবেন কেন?

-কারণ, তুই এবার অংকে ডাব্বা মেরেছিস ।

-কিন্তু আমি তো ইচ্ছে করে ডাব্বা মারিনি । পড়তে তো ভালো-ই লাগে, মুখস্থও হয় কিন্তু পরীক্ষার হলে গেলে সব ভুলে যাই ।

-হুম্ বুঝতে পেরেছি, চল্ বাড়িতে যাই । বাড়ি গিয়ে একটা উপায় বের করতে হবে ।

৫.

ড্রয়িংরুমে সমরেশ স্যার, বাবা, মামা, আমি ও কানাভুত । সমরেশ স্যার কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠে, দেখুন জালাল সাহেব পড়ালেখা ছাড়া আমাদের দেশে কোনো গতি নাই । সবাইকে শিক্ষিত করার জন্য সরকার কত কিছু করছে আর আপনার ভাগনে অংকে ডাবল জিরো পেয়েছে । আমি মাথা নিচু করে কানাভুতের সাথে কথা বলছিলাম । কানাভুত তুমি আমাকে বাঁচাও । হঠাৎ বাবা হুংকার দিলেন, কি রে, সমরেশ স্যার এটা কি বলছেন? মাথা নিচু কেন? আমার দিকে তাকিয়ে কথা বল, অংকে নাকি ডাবল জিরো পেয়েছিস? আমি ধীরে ধীরে মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দিলাম, হ্যাঁ, হঠাৎ সমরেশ স্যার এর কথাবার্তা কেমন যেন বদলে গেল । সমরেশ বাবু বললেন, আহা থাক্ না, এত ধমকা-ধমকির কি আছে, এবার ভালো নাম্বার পায়নি পরের বার পাবে । টমাস আলভা এডিসন বলেছেন, শুধু কয়েকটা পরীক্ষার খাতা কারও ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে না । তাছাড়া আইনস্টাইন, নিউটন, সবাই অংকে ফেল করেছিল । বাস্তব জীবনে তারা ভালো ছাত্র ছিল না ।

জালাল মামা এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন এবার তিনি বললেন, তার মানে বলতে চাচ্ছেন ও বড় হলে নিউটন, আইনস্টাইন হবে?

সমরেশ বাবু পরিস্থিতি সামলে উত্তর দিলেন, না ঠিক তা না, যদি কিছু মনে না করেন তাহলে আমি ওকে অংকটা পড়াতে চাই । অংকে কিভাবে ভালো রেজাল্ট করতে হয় তা আমি জানি । সমরেশ বাবু একটা শয়তানি হাসি দিয়ে আমার দিকে তাকালেন, যার অর্থ হাড্ডি আর মাংস আলাদা, হাড্ডি গার্জিয়ানের আর মাংস আমার । আমি বুঝতে পারলাম কপালে শনি লেগেছে । সমরেশ স্যার অনেক স্টুডেন্টকে মেরে অজ্ঞান করার রেকর্ড আছে তার । ছাত্রছাত্রীদের মেরে উনি একধরনের পৈশাচিক আনন্দ পান । তবে সব স্যার এক রকম না, এক্ষেত্রে ফয়সাল স্যার অনেক সহজ সরল আর ছাত্রছাত্রীদের অনেক যত্ন করে পড়ান । উনার কথা হচ্ছে স্টুডেন্টদের মারধর করা হচ্ছে মধ্যযুগের বর্বর কায়দা । এটা আধুনিক যুগ, এ যুগের ছাত্রছাত্রীরা শিখবে খেলার ছলে । যাই হোক সমরেশ স্যার চলে গেছেন, কাল থেকে উনি পড়াবেন । মনে হচ্ছে উনি স্কুল ছুটির পরপরই চলে আসবেন মানে বিকালে ঘুরতে যাওয়া বা খেলাধুলা বন্ধ । শুনে খুবই মন খারাপ হল । রাতের খাবার খাওয়ার পর বিছানায় শুয়ে ভাবতে লাগলাম কি করা যায়? এমন সময় কানাভুত বলল, কি রে, কি ভাবছিস? কাল থেকে খেলা বন্ধ এটা নিয়ে চিন্তা করছিস, তাই না?

-হ্যাঁ, তাই নিয়ে ভাবছি ।

-ভাবার কিছু নাই, আমি সমরেশ স্যার কে এমন ভয় দেখাব যে ভয়ে প্যান্টে হিসু করে দিবে । উনার ব্যবস্থা আমি করছি বলে কানাভুত কোথায় যেন চলে গেল । কানাভুত.. ও.. কানাভুত.., বার কয়েক ডেকেও কোনও সাড়া পেলাম না ।

পরদিন স্কুলে আর সমরেশ স্যার কে দেখা গেল না । বিকালে খবর এল স্যার এর জ্বর হয়েছে । তাই উনি আসতে পারবেন না । মনে হচ্ছে কানাভুত কিছু একটা করেছে, হয়তো ভয় দেখিয়েছে । পরীক্ষায় পাশ করার জন্য একবার তাবিজ এনে দিল কানাভুত । এরপর থেকে সব বিষয়ে ভাল রেজাল্ট হতে থাকল । রোল নং ৬০ থেকে সোজা ৭ হয়ে গেল । বাড়ির সবাই হতবাক । কিভাবে এত ভাল রেজাল্ট হল । জালাল মামা একদিন জিজ্ঞেস করলেন, কিরে স্যার ছাড়া এত ভালো রেজাল্ট করলি কিভাবে? আমি উত্তর দিলাম, এমনি । মামা বললেন, এমনি না, নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে । আমি মুখ ফসকে বলে ফেললাম, কানাভুত একটা তাবিজ এনে দিয়েছে । এটা শুনে জালাল মামা খুবই বিরক্ত হলেন, কারণ উনি একজন বিজ্ঞানী মানুষ । উনার নিজস্ব ল্যাব আছে । ভুত বিষয়ে কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নাই তাই উনি ভুত বিশ্বাস করেন না । উনি বললেন, তোর মানুষিক সমস্যা হচ্ছে, এটাকে বলে হ্যালুসিনেশন, তুই অদ্ভুত কিছু দেখছিস বা শুনতে পাচ্ছিস, এটা তোর উত্তপ্ত মস্তিষ্কের কল্পনা মাত্র । অথবা সিজোফ্রেনিয়া হতে পারে । আমি বললাম, না মামা,আমি সত্যি-ই ভুতের সাথে কথা বলেছি, ওর নাম কানাভুত, এক চোখ কানা তাই কানাভুত, যেমন কানা বগির ছা-এর একচোখ কানা ঠিক তেমন । ও অনেক ভালো ভুত, ওকে আমি পোষার জন্য এনেছি । মামা বিরক্ত হয়ে বলল, কি যাতা বকছিস, পোষার জন্য এনেছিস মানে?

-মানে ভুত পোষা, বাসায় এনে কোন ভুতকে পুষে রাখা । যদি বুনো ভুত হয় তাহলে পোষ মানবে না আর যদি গৃহপালিত ভুত হয় তাহলে পোষা যাবে । এটা গৃহপালিত ভুত ।

-মামা অত্যন্ত তাচ্ছিল্যভরে উত্তর দিলেন, আরে বোকা ভুত বলতে কিছু নাই । এই গুলা ফালতু কথা । কোথায় তোর ভুত ওকে ডাক, দুচারটে কথা বলি । হা….হা…. এগুলি অবাস্তব বিষয় ।

আমি অনেক চেষ্টা করেও মামার সাথে সামনা সামনি পরিচয় করিয়ে দিতে পারিনি । কানাভুত মামার সাথে কথা বলতে রাজি না, কারণ যারা ভুত বিশ্বাস করে না তাদের সাথে কানাভুতের কথা বলতে ভালো লাগে না । মনটা অপমানে আর রাগে গজগজ করতে লাগল । কানাভুতের উপর ভীষণ রাগ হল । মামা আমার অবস্থা দেখে বললেন, ঠিক আছে তুই যদি এমন কোন অস্বাভাবিক কাজ করে দিতে পারিস তাহলে ভাববো কানাভুত সত্যিই আছে । আমি বললাম, কি কাজ করতে হবে, বল?

-ধর আমি নদীতে যাব কালকে, আমার হাতের ঘড়িটা নদীতে ফেলে দেব, যদি কানাভুত সেটা পানির নীচ থেকে তুলে আনতে পারে, তাহলে আমি বিশ্বাস করব যে ভুত বলতে সত্যিই কিছু আছে ।

আমি বললাম ঠিক আছে । আগামীকাল তোমাকে আমি প্রমাণ দেব যে কানাভুত সত্যিই আছে । রাতে ফিসফিসিয়ে কথা বলতে গিয়ে ব্যাপারটা মা’র কাছে ধরা খেয়ে গেলাম । আমি ভুতের সাথে কথা বলি, বাবা জালাল মামাকে বললেন, ওর কি কোন সমস্যা হচ্ছে নাকি? জালাল মামা উত্তর দিলেন, আমি সব দেখছি, মনে হচ্ছে ওর সিজোফ্রেনিয়া হয়েছে তবে ঘাবড়ানোর কিছু নাই । আমার কাছে এর ঔষধ আছে, তাছাড়া আমার এক বন্ধুর বাবা মানসিক রোগের ডাক্তার ।

৬.

পরদিন বিকালে নদীতে মামা ও আমি আর কানাভুত । কানাভুত অদৃশ্য বলে তাকে দেখা যাচ্ছে না । ভুতেরা বায়বীয় পদার্থের তৈরি, হ্যালোজেন জাতীয় গ্যাস তাই ভেসে থাকতে পারে । অনেকটা টিউব লাইটের ভিতরের গ্যাসের মত আয়নাইজড হলে উজ্জ্বল সাদা দেখায় তবে ভুতের ক্ষেত্রে নীলাভ সাদা দেখায় । চাঁদনি রাতে খুব খেয়াল করলে ভুতদের অবয়ব দেখা যায় কারণ তখন তারা চাঁদের আলো খেয়ে আয়নাইজড থাকে । অবশ্য এ সব ধারনা সম্পূর্ণ আমার নিজের থেকে । ভুত নিয়ে ছোট থেকে অনেক গবেষণা করতে করতে আমি এ ধারনায় উপনীত হয়েছি যে ভুত আছে, হতে পারে তারা এলিয়েন অথবা প্রেতাত্মা ।

যাই হোক, কানাভুতের কথা আমি শুনতে পাচ্ছি কিন্তু জালাল মামা শুনতে পাচ্ছেন না, কে জানে হয়তো না শোনার ভান করে আছেন । অনেকটা আমাদের দেশের নীতি নির্ধারকদের মত, যখন কোন সাধারণ মানুষের সমস্যা হয় তখন তারা কানে শোনে না । হয়ত জালাল মামা বিজ্ঞানী মানুষ তাই শুধু কানে শুনে বা চোখে দেখে উনি ভুত বিশ্বাস করছেন না । উনি ওনার হাতের ঘড়ি টা পানিতে ছুড়ে ফেলে দিলেন, ঝপাং করে একটা শব্দ হল, তারপর ঘড়িটা পানিতে তলিয়ে গেল । আমার দিকে মৃদু হাসি দিয়ে বললেন, হে…হে…..এই বার আমার হাত ঘড়িটা ফেরত আনতে বল তোর কানাভুতকে, দেখি বেটা পারে কিনা ।

কিছুক্ষণ পর আমি আমার প্যান্টের ভিতর থেকে একটা ঘড়ি বের করে মামার হাতে দিলাম, এই যে তোমার ঘড়ি । মামা আমার হাতে তার ঘড়ি দেখে খুবই অবাক । তার মুখ শুকিয়ে গেল । তিনি ঘড়িটা নিয়ে সোজা বাসায় চলে এলেন, কোন কথা বললেন না । মনে হচ্ছে তার এখন বিশ্বাস হয়েছে । কিন্তু উনি এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না । এরপর ঐ দিন রাতেই উনার শরীরে জ্বর এলো । উনি অত্যন্ত বিমর্ষ হয়ে গেলেন । আমাকে ডেকে পাঠালেন তার রুমে । আমি উনার অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে গেলাম । মামা জিজ্ঞেস করলেন, তোর কি ধারনা ভুত সত্যিই আছে? আমি উত্তর দিলাম, জ্বি, অবশ্যই । ভুত আছে । অবশ্যই আছে । উনার শরীর ক্রমশ খারাপ হতে থাকল । ভাবলাম উনাকে সত্যি কথা টা বলি । নইলে উনি ধীরে ধীরে মারাও যেতে পারেন । তাই ৩/৪ দিন পর ওনার রুমে ডুকে বললাম, মামা, আমি তোমার সাথে মিথ্যা বলেছি । তোমার হাত ঘড়ি পানি থেকে তুলে আনা হয়নি । এটা বাবার ঘড়ি । জালাল মামা ও বাবা একই রকম ঘড়ি পড়তেন, মা কিনে দিয়েছিল । শুনে জালাল মামা পরক্ষণেই অনেক উজ্জীবিত হয়ে উঠলেন, হ্যাঁ তাই তো, এখন মনে পড়েছে, তুই যখন ঘড়িটা দিয়েছিলি তখন ওটা শুকনো ছিল । যদি পানির নীচে থেকে তুলে আনে তাহলে তো ওটা ভেজা থাকার কথা । আমি বললাম, কিন্তু মামা কানাভুত সত্যিই আছে, ও বলেছে ও তোমার সাথে কথা বলবে । তুমি মনোযোগ দিয়ে শুনলে তার কথা শুনতে পাবে ।

কানাভুতের সাথে মামার পরিচয় করিয়ে দিলাম । উনি এখন কানাভুতের ভক্ত । তবে উনার ধারনা উনি আমার মত মানুষিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তাই ভুতের সাথে কথা বলছেন । কানাভুত ওনাকেও একটা তাবিজ এনে দিয়েছে যাতে উনি বি,সি,এস ক্যাডার হতে পারেন । ১ বছর পর উনি বি,সি,এস ক্যাডার হয়ে ট্রেনিং শেষে আমাদের সাথে ও কানাভুতের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন । ওনার কথা হল, যদি কারো কোন সমস্যা না হয় তাহলে ভুত বিশ্বাসটা বিশেষত খারাপ না । ভুতের উপর বিশ্বাস যদি কারো পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো করে তোলে তাহলে সেই ভুতের সাথে কথাও বলা যেতে পারে ।

আমি ক্লাস সিক্সে উঠেছি আমার রোল নং এখন ১ ; পড়ালেখায় ব্যস্ত আমি এখন আর ভুতের সাথে কথা বলার সময় পাই না । কানাভুতের দায়িত্ব শেষ, তাই হয়ত সে চলে গেছে অচেনা কোন দেশে । হয়ত ছোট বেলার সেই ভুত আর ফিরে আসবে না কিন্তু ভুতের বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মাঝে যে দূরত্ব তা আরও কমিয়ে দিয়ে গেছে, যা আজও বর্তমান ।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা উপন্যাস গল্প জীবনী ও স্মৃতিকথা বিনোদন ভয়ংকর(হরর) ভালবাসা/প্রণয়লীলা ভুতুরে গল্প ভ্রমণ কাহিনী সৃজনশীল প্রকাশনা

বিষন্ন বিরিওজা-১, ২, ৩ ও ৪

বিষন্ন বিরিওজা

———————– ডঃ রমিত আজাদ

Birch_Tree_1

বিষন্ন বিরিওজা – ১
———————–

আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না, আমার কি হয়েছে। আমার কি ঘুম ভেঙেছে, নাকি আমি ঘুমিয়েই আছি? আমার মনে হলো আমি আধো ঘুম আধো জাগ্রত একটা অবস্থার মধ্যে আছি। আমার চোখ কি খোলা? ঠিক তা বুঝতে পারলাম না। আমার মনে হলো আমার চোখ আধো বন্ধ, আধো খোলা। একটু পরে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো আমার। একটা মেয়ের হাত আমার মুখের উপর। আমার কপালটা স্পর্শ করবে করবে এমন। আমি একটু ভালোভাবে চোখ মেলে দেখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু সেটা করতে পারলাম না। চোখ কিছুতেই পুরোপুরি খুলতে পারছিনা। হাতটি আমার মুখের উপর থেকে সরে গেল। আমি ভাবলাম এবার উঠে বসব। কিন্তু কিছুই করতে পারলাম না। যেমন ছিলাম তেমনি শুয়ে আছি। একটু পর আবার হাতটি ফিরে এলো। আবারো আমার কপাল স্পর্শ করবে করবে এমন। ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে, পাশ ফিরতে চাইলাম, তাহলে মেয়েটির পুরো শরীরটা দেখতে পাবো। নাহ্, আবারো কিছুই করতে পারছি না। কি অদ্ভুত! এমন হচ্ছে কেন?

যখন ঘুম পুরোপুরি ভাঙল তখন সকাল নয়টা বাজে। আমি একেবারে ঝরঝরে তরতাজা। ঘুমের মধ্যে কোন সমস্যা হয়েছে এমন অনুভূতিই শরীরে নেই। বিশাল কাঁচের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। গ্রীস্মের ঝকঝকে দিন। এই প্রচন্ড ঠান্ডা দেশের গ্রীস্মের দিনগুলি অদ্ভুত সুন্দর হয়। এমনই একটি সুন্দর আগস্ট মাসের দিন। বিছানায় উঠে বসলাম। স্মৃতিতে আবার ফিরে এলো ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক ঘটনাটি। কি ঘটেছিল? ঠান্ডা মাথায় পুরো ঘটনাটি মনে করার চেষ্টা করলাম। সব কিছুই স্পষ্ট মনে করতে পারলাম। কিন্তু তারপরেও বুঝতে পারলাম না, এটা স্বপ্ন ছিল কিনা। আমার মন বলছে এটা স্বপ্ন নয়। আমি খুব বেশী স্বপ্ন দেখি, স্বপ্নহীন রাত আমার জীবনে ছিল মাত্র একবার। স্বপ্নের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার সাথে আজকের ঘটে যাওয়া ঘটনার কোন মিল নেই। কার সাথে ডিসকাস করব এই বিষয়? সেই মুহূর্তে পাশে কেউ ছিলও না। ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস্ ডরমিটরির ঐ রূমটিতে আমি একাই থাকি।

বাংলাদেশী কারো সাথে ডিসকাস করার সুযোগ এই হোস্টেলে নেই। কারণ এখানে আমি একাই বাংলাদেশী । আমার হোস্টেলটি যেই এলাকায় তার নাম আতাকারা ইয়ারোশা স্ট্রীট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত এক চেক সৈন্যের নাম আতাকার ইয়ারোশ, তারই সম্মানে স্ট্রীটটির নাম। এটি মূলতঃ একটি স্টুডেন্টস টাউন। স্ট্রীটের দুপাশে ছোট-বড় নানা সাইজের হোস্টেল। ইউক্রেনের পুরাতন রাজধানী খারকভে এত বেশী ইউনিভার্সিটি, ইনস্টিটিউট রয়েছে যে এটাকে ছাত্রছাত্রীদের শহর বলা হয়। আমার হোস্টেলে না থাকলেও আশেপাশের বিভিন্ন হোস্টেলে দু’চারজন করে বাংলাদেশী রয়েছে। তাদের কারো সাথে গিয়ে ডিসকাস করা যেতে পারে।

যাকগে, আপাততঃ বাদ দেই। এত সুন্দর উষ্ণ রৌদ্রজ্জ্বল দিন। তার উপর ভ্যাকেশন চলছে। এত সুন্দর দিনটা মাটি করার দরকার নেই। হাতমুখ ধুয়ে, ব্ল্যাক কফি, অমলেট আর টোস্ট দিয়ে একটা চমৎকার ব্রেকফাস্ট সারলাম। এখন কি করা যায়? ঘরে বসে থাকব না অবশ্যই। সামারে ঘরে বসে থাকার মত বেরসিক আমি নই। বাইরে বের হতে হবে। জিনসের প্যান্টের সাথে মানানসই হালকা নীল রঙের একটা টি শার্ট পড়লাম। তারপর রূমে তালা দিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম বাইরে।

খারকভ শহরটি মস্কো বা কিয়েভ-এর তুলনায় সুন্দর না হলেও, ঢাকা বা দিল্লির তুলনায় অনেক অনেক সুন্দর। প্রতিটি রাস্তাই ম্যাকাডাম সড়ক। অর্থাৎ পিচ ঢালা গাড়ী চলার রা্স্তার দুপাশে চওড়া ফুটপাত। ফুটপাতের দুপাশে দুই সারি করে রাস্তার এপাশে ওপাশে চার সারিতে গাছ।বাংলাদেশ গাছের দেশ হওয়ার পরও শহরগুলো বৃক্ষহীন রুক্ষ, একেবারেই নেড়া। আর এখানে অল্প কিছু ভ্যারাইটির গাছ নিয়েই শহরগুলোকে ওরা করে তুলেছে গাছে গাছে ভরপুর। তবে এই গাছের সৌন্দর্য্য সারা বছর দেখার সুযোগ নেই। শীতমন্ডলীয় জলবায়ুর কারণে, বছরে প্রায় ছয়মাসই গাছগুলো থাকে পাতাশূণ্য। চিত্রকরদের আঁকা পত্রপল্লবহীন বৃক্ষরাজী যেমনটি আঁকা থাকে ক্যানভাসে ঠিক তেমনটিই এখানে বাস্তবে দেখা যায়। আর বাকী ছয়মাস উজ্জ্বল সবুজ পাতায় পাতায় ছেয়ে থাকা গাছগুলো ঢেকে ফেলে সমস্ত পথঘাট।

বরফ ঢাকা তুহীন শীতের পর এমন পত্রপল্লবের মায়া আর মৃদু মৃদু উষ্ণ হাওয়ার পরশ মনটাকে সারাক্ষণ ফুরফুরে রাখে। এটা ঘরে বসে থাকার সময় নয়, তাই ছেলে-বুড়ো, তরুণ-তরুনী সবাই বেরিয়ে আসে বাইরে। আমাদের তরুণদের এই সময়ের আরেকটি আকর্ষণ হলো, সংক্ষিপ্ত পোষাকের তরুনীরা। শীতকালে যে তাদের সংক্ষিপ্ত পোষাকে দেখা যায়না তা নয়, তবে সেটা ঘরের ভিতরে। আর সামারে বাইরেই দেখা যায় মিনি স্কার্ট, শর্টস ইত্যাদি পরিহিতা তরুনীদের। পুরুষ মানুষের নারীকায়ার প্রতি আকর্ষণ অস্বাভাবিক কিছু নয়। গ্রীস্মের ঘন সবুজ বৃক্ষরাজী, ফলের শোভা ও উষ্ণ হাওয়ার পাশাপাশি এটাও বেশ উপভোগ করি।
উদ্দেশ্যহীনভাবে কতক্ষণ ঘোরাঘুরি করে তারপর ক্যাফেতে ঢুকে এক কাপ কফি খেলাম। তারপর ভাবলাম কোথাও যাওয়া দরকার। কোথায় যাই? সকালের ঘটনাটি কারো সাথে শেয়ার করতে ইচ্ছে করছিল। শেষমেষ ঠিক করলাম নীলিমার কাছে যাব।

নীলিমা থাকে শহরের ভিতরেই আরেকটি স্টুডেন্টস টাউনে। আতাকারা ইয়ারোশা থেকে দশ-বারো কিলোমিটার দূরে হবে। জায়গাটির নাম ‘ৎেসলিনা গ্রাদস্কায়া’। ও পড়ে খারকভ স্টেট মেডিকেল ইনস্টিটিউশনে। উঠে গেলাম একটি ট্রলিবাসে। সোভিয়েত ইউনিয়নে যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই ভালো। ট্রান্সপোর্টের জন্য কখনো কাউকে কোন কষ্ট করতে হয়না। নানা ধরনের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট আছে। বাস, ট্রলিবাস, ট্রাম, মেট্রো ইত্যাদি ট্রান্সপোর্ট খুব ভালো সার্ভিস দেয়। তাও সামান্য খড়চায়। প্রথম দিকে তিন রুবলের একটা মান্থলি কার্ড কিনে নিলেই মাটির উপরের সব পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যাভার করা যেত। আর আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোসহ হলে পাঁচ রুবলের মত লাগত। এই রেট চলেছে বহু বছর। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর ভাড়া কিছুট বৃদ্ধি পেয়েছে সত্য, তারপরেও তেমন কিছু নয়। আর স্টুডেন্ট হিসাবে ৫০% ডিসকাউন্ট তো আছেই। মাসের শুরুতে একটা মান্থলি কার্ড কিনে নেই, তারপর সারা মাস যেখানে খুশী যাই। সালাম এই বিষয়ে পলিসি মেকারদের।

চলতে চলতে বেশ কয়েকটি স্টপেজ পার হয়ে টুয়েন্টি থার্ড অগাস্ট পার হয়ে দুটা রেসিডেন্সিয়াল এরিয়াকে কানেকটিং দুই লেনের একটি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল ট্রলিবাসটি। এখানে রাস্তার দুইধারে ফরেস্ট পার্ক । সেখানে সারি সারি লাগানো আছে, বিরিওজা গাছ। এই গাছটি ইউক্রেন, রাশিয়াতে খুব কমন। ঐ ফরেস্ট পার্ক এরিয়া পেরিয়ে অবশেষে ‘ৎেসলিনা গ্রাদস্কায়া’ স্টপেজে এসে থামলো। আরো কয়েকজনের সাথে আমইও সেখানে নেমে পড়লাম। কিছু খোলা জায়গা পেরিয়ে মেডিকেল ইনস্টিটিউটের ১০ নং হোস্টেলটিতে এসে পৌছুলাম। হোস্টেলের গেটে একজন বসে থাকে, রুশ ভাষায় তাকে ভাখতিওর বলে। সে কর্কশ গলায় বলল, ” তোমার স্টুডেন্ট আইডি কার্ডটা রেখে যাও”। এই দেশে এই একটা সমস্যা সমাজতন্ত্রের কল্যাণে বুরোক্রেসি এত হাই লেভেলে আছে যে, কেউ সামান্য একটু ক্ষমতা পএলএই সেটা শো না করে ছাড়েনা। ওর কাছে কার্ডটি রেখে, উপরে উঠে গেলাম। এখানকার বিল্ডিং কোড অনুযায়ী দালান পাঁচ তলার উপরে হলেই, লিফট রাখতে হবে। এই হোস্টেলটি সাত তলা। নীলিমা থাকে ছয় তলায়। আমি লিফট পারতপক্ষে কম ব্যবহার করার চেস্টা করি। আমি যখন ল্যংগুয়েজ কোর্সে ছিলাম, তখন একটি লিফট্ দুর্ঘটনায় ফাদেল নামে আমার সিরিয়ান এক বন্ধু মারা গিয়েছিল। ও ছিল বারো তলায়। লিফটের ভিতরে ওর সুটকেসটি ঢোকানোর পরপরই লিফটের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। ও তখন দরজা খোলার সুইচে বারংবার চাপ দিতে থাকে, এক পর্যায়ে দরজা খুলে যায়। ফাদেল নিশ্চিন্ত মনে লিফটে পা রাখে। আসলে লিফট তখন আর সেখানে ছিলনা। লিফট চলে গিয়েছিল উপরে। ম্যালফাংশন হয়ে লিফটের দরজা খুলে গিয়েছিল। পা দেয়ার সাথে সাথে ফাদেল বারো তলা থেকে নীচে পড়ে যায়। হাসপাতালে নিতে নিতেই ও মৃত্যুবরণ করে। ঘটনাটি আমার মনে গভীর দাগ কেটেছে। সেই থেকে আমি খুব সাবধানে লিফট ব্যবহার করি।

হেটে হেটে আমি ছয়তলায় উঠে গেলাম। ৬১০ নং রূমের সামনে এসে একটু সময় নিলাম। নীলিমা রূমে নাও থাকতে পারে। যদিও এখন ভ্যাকেশন চলছে, কিন্তু আমারই মতো হয়তো সামারের সুন্দর আবহাওয়া উপভোগ করতে বাইরে গিয়েছে। আবার রূমে থাকলেও, বয়ফ্রেন্ড নিয়ে বিজিও থাকতে পারে। নীলিমা কোলকাতার মেয়ে। ভারতীয় বাঙালী মেয়ে। অবশ্য ওকে দেখলে চট করে বোঝা যায়না যে, ও বাঙালী। ও শরীরে বড়সড়। গায়ের রং একটু বেশীই কালো। আবার ভারতীয় পোষাকেও ওকে আমি কখনো দেখিনি। প্যান্ট-শার্ট, স্কার্ট-টপস এই জাতীয় ইউরোপীয় বা আধুনিক পোষাক ব্যবহার করে। অনেকে ওকে আফ্রিকান বলে ভুল করে। এদিকে ওর বয়ফ্রেন্ডও আফ্রিকান। ওকে নিয়ে ভারতীয় কম্যুনিটিতে বদনামের অন্ত নেইঃ “মেয়েটার কোন কান্ডজ্ঞান নেই, শেষ পর্যন্ত একটা কালুর সাথে লাইন করল! শুধু কি লাইন? রীতিমত লীভ টুগেদার করে! না ভারতীয় মেয়েদের মান সম্মান আর কিছু রাখলো না!” নীলিমা অবশ্য পাল্টা কথা বলে, ” আহারে আমার ইন্ডিয়ান ছেলেরা! নিজেরা যে গন্ডায় গন্ডায় সাদা মেয়েদের সাথে রাত কাটাচ্ছ, লীভ টুগেদার করছ ওটা কিছু না! আর একটা ইন্ডিয়ান মেয়ে একটা আফ্রিকান ছেলের সাথে কিছু করলেই মান গেল? ওরা যদি লাইফ এনজয় করতে পারে, আমি পারব না?”

নীলিমা আমার ব্যাচমেইট। সেকেন্ড ইয়ার থেকেই ওর সাথে আমার পরিচয়। তখন থেকেই ভালো সম্পর্ক। আমি মাঝে মাঝে ওর রূমে যাই, ওও আমার রূমে আসে। কখনো একা, কখনো বয়ফ্রেন্ড নিয়ে। আমি ওর রূমের সামনে দাঁড়িয়ে ওর রূমের ভিতর গানের শব্দ শুনতে পেলাম। একটু কান খাড়া করলাম। মান্না দে’র গান বাজছে, ‘চাইনা পূণ্য করে স্বর্গে যেতে, ঐ স্বর্গকে ধরে ফেলি হাতের মুঠোয়, যদি একবার হাতখানি রাখো এহাতে’। বুঝলাম রূমে আছে। দরজায় মৃদু নক করলাম। দ্বিতীয়বার নক করার আগে একটু সময় নিলাম। তারপর আবার নক করলাম। সাথে সাথে দরজা খুলল নীলিমা।
নীলিমাঃ রিমন! আমি জানতাম এটা তুমি।
আমিঃ কি করে বুঝলে।
নীলিমাঃ তোমাকে কি আমি আজ প্রথম দেখলাম? এতগুলো বছর ধরে তোমাকে চিনি। তুমিই একমাত্র ছেলে যে প্রথমবার নক করে ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করে, দ্বিতীয়বার নক কর। অন্য ছেলেরা পরপর শুধু নক করতেই থাকে // এসো ভিতরে এসো।
ভিতরে ঢুকে একটা সোফা কাম বেডে বসলাম। এখানকার ডরমিটরিতে এই ফার্নিচারটি কমন। দিনের বেলা এটি গুটিয়ে রূমটিকে ড্রইংরুমের মত সাজিয়ে রাখা হয়, আবার রাতে খুলে বেড বানিয়ে ঘুমানো হয়।
আমিঃ তারপর, বংফিম কোথায়?
নীলিমাঃ নাই।
আমিঃ নাই মানে? (মনে মনে ভাবলাম, আবার ওদের কাট আপ হয়ে গেল কিনা)
নীলিমাঃ নাই, মানে নাই। এ্যংগোলা গিয়েছে। সামার ভ্যাকেশন কাটাতে।
আমিঃ ও আচ্ছা। তাই বুঝি বসে বসে বাংলা গান শোনা হচ্ছে?
নীলিমাঃ না না। বাংলা গান তো আমি ও থাকতেও শুনি। তোর খবর কি বল?
আমিঃ উঁ, খবর খারাপ না। ভালোই। তুই দেশে যাবিনা, ছুটি কাটাতে?
নীলিমাঃ নারে, এবছর যাওয়া হবেনা। টিকিটের দাম খুব বেড়েছে। তুই যাবি?
আমিঃ না আমিও ঐ একই কারণে যেতে পারছি না।
নীলিমাঃ কি যে হলো, এই ইকোনমিক ক্রাইসিসে। ভীষণ অর্থনৈতিক সমস্যা।
আমিঃ বংফিম তো ঠিকই যাচ্ছে!
নীলিমাঃ আরে ও তো আর বাপের টাকায় যায়না। ওরা এ্যংগোলিয়ানরা, সরকারের কাছ থেকে মোটা অংকের স্টাইপেন্ড পা্য। তাতেই রাজার হালে আছে।
আমিঃ বেশ ভালো দেশ তো!
নীলিমাঃ বলতে পারিস। আমাদের মতো না। দেশের ছাত্রছাত্রীদের কোন মাথাব্যাথা নেই।
আমিঃ এংগোলার প্রেসিডেন্টতো রাশিয়াতে পড়ালেখা করেছিল।
নীলিমাঃ জানি। সেই কারণেই হয়তো সিমপ্যাথিটা বেশি। দাঁড়া, চা করি। না কি কফি খাবি।

আমিঃ চা/কফি যে কোন একটা কিছু হলেই হবে। তা চায়ের সাথে কি টা থাকবে? না কি কোলকাতা স্টাইলে বলবি, “দাদা কি খেয়ে এসেছেন না কি গিয়ে খাবেন?”
একগাল হাসলো নীলিমা,
নীলিমাঃ ফাজলামো রাখ। সবাই একরকম না। আর তুই তো জানিস, আমরা চিটাগাং থেকে মাইগ্রেট করা। ইস্ট বেঙ্গলীরা কন্জুস হয়না।
আমিঃ তুই তো আর মাইগ্রেট করিস নি। তোর দাদা করেছিল। তোর জন্ম তো কন্জুসের দেশেই।
নীলিমাঃ তা হলেও, ফ্যামিলি ট্রেডিশন থেকেই যায়। আমাকে কখনো কন্জুসামী করতে দেখেছিস?
আমিঃ না, তা দেখিনি। বরাবরই উদার। তা আজকে কি উদারতা। দেখাবি বল।
নীলিমাঃ এই নে বিস্কিট। খুব টেস্টি। নারকেল মেশানো আছে।
আমিঃ বাহ! দে খাই।
চা খেতে খেতে প্রশ্ন করল নীলিমা।
নীলিমাঃ শ্তো নোভিন্কা (নতুন কি আছে)?
আমিঃ কি নতুন চাস?
নীলিমাঃ তোর তো কোনকালে কোন গার্ল ফ্রেন্ড ছিল না। হঠাৎ গার্ল ফ্রেন্ড যদি হয়, সেটা নতুন কিছু হতে পারে।
আমিঃ না সেরকম নতুন কিছু নাই। তবে একটা আশ্চর্য্য নতুন বিষয় আছে।
নীলিমাঃ আশ্চর্য্য নতুন বিষয়! কি সেটা?

আমি সকালের পুরো ঘটনাটা ওকে খুলে বললাম। শুনে কিছুক্ষণ ঝিম মেরে রইলো নীলিমা। তারপর ধীরে ধীরে বলল
নীলিমাঃ আমরা মেডিকেলের সিনিয়র কোর্সের ছাত্রী। আর দুয়েক বৎসর পরেই ডাক্তার হয়ে যাব। বিষয়টাকে মেডিকেল পয়েন্ট অব ভিউ থেকে দেখলেই ভালো হয়। তারপরেও আমার কাছে অন্যরকমই মনে হচ্ছে। তোকে কয়েকটা প্রশ্ন করি।
আমিঃ কর।
নীলিমাঃ তুই ক’দিন হলো ঐ রূমে এসেছিস?
আমিঃ আরে নতুন। এই ভ্যাকেশনেই।
নীলিমাঃ এর আগে তোর কখনো এরকম অভিজ্ঞতা হয়েছিল?
আমিঃ না।
নীলিমাঃ তুই একটু খোঁজ নে তো। ঐ রূমে আগে কারা কারা ছিল। যারা ছিল তাদের ওরকম কোন অভিজ্ঞতা আছে কিনা।রূমটাও একটু ভালো করে চেক করে দেখিস।

আমার ডরমিটরিতে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল। ফ্রীজ থেকে খাবার বের করে গরম করে নিয়ে খেতে খেতে টিভি সেটটা অন করলাম। প্রাইভেট চ্যানেলে একটা ম্যুভি চলছিল, ‘মিস্তিকা’ – রহস্যরোমাঞ্চ। হঠাৎ নীলিমার কথা মনে হলো – ‘রূমটাও একটু ভালো করে চেক করে দেখিস’। খাওয়া শেষ করে আমি একটু ভালো করে রূমটা দেখতে লাগলাম। রূমে শিফট হওয়ার সময় তো একেবারেই খালি ছিল। তেমন কোন কিছু তো থাকার কথা নয়। হঠাৎ দেয়ালে চোখ পড়ল। জানালার দিকে মুখ করে তাকালে ডান পাশের দেয়ালে ওয়াল পেপার হালকা ক্রীম কালারের উপর কালো আর মেরুন কালারের প্রিন্টের উপর কিছু একটা দেখলাম। ভালো করে দেখার জন্য কাছে এগিয়ে গেলাম। একটা ম্যাচের কাঠি, গাম দিয়ে ওয়াল পেপারে লগানো। ম্যাচের কাঠির রং আর ওয়াল পেপারের মূল রং একই রকম হওয়ায় চট করে চোখে পড়েনা। ম্যাচের কাঠিটার সাথে কি যেন। চোখ খুব কাছে নিয়ে দেখলাম একটা মেয়ের চুল কাঠিটা থেকে নীচের দিকে ঝুলছে। ওয়াল পেপার আর ম্যাচের কাঠির মাঝখানে চুলটা রেখে গাম দিয়ে লাগানো হয়েছে। চুলের রং দেখে বোঝা যাচ্ছে মেয়েটি স্বর্ণকেশিনী।

-birch-trees2-sunshine-in-the-green-forest

বিষন্ন বিরিওজা – ২
—————————-

কার চুল এটা? কে এই মেয়েটি? এই রূমেই কি থাকত মেয়েটি? নাকি কারো বান্ধবী ছিল? স্মৃতি হিসাবে চুলটি রেখে দিয়েছে? কি জানি! এরপর একটা ভয়াল ধারনা আমাকে ঘিরে ধরল, মেয়েটি কি বেঁচে আছে?

রূমে আমি একাই থাকি। বেশ ভয় ভয় করতে লাগলো। রাতটা কাটাবো কি করে তাই ভাবছি। ভয় কাটানোর জন্য রূমের বাইরে করিডোরে বেরিয়ে এলাম। এখন রাত বারোটার মত। কিন্তু ডরমিটরিতে এটা কোন রাত না। করিডোরে লোক চলাচল আছে। মিনি স্কার্ট পরিহিতা একটি মেয়েকে হেটে যেতে দেখলাম। বেশ সাজগোজ করেছে। এখানকার মেয়েরা সবাই খুব ফ্যাশনেবল, অতিরিক্ত সাজগোজটা স্বাভাবিক। কিন্তু মেয়েটাকে পরিচিত মনে হলোনা। আমাদের হোস্টেলের হলে চিনতাম। হোস্টেলে কারো কাছে এসেছে বোধহয়। সাজগোজ দেখে মনে হচ্ছে ডেটিং-এ এসেছে।

কিছুক্ষণ করিডোরে থেকে ভয় কিছুটা কাটলো। রূমে ফিরে গেলাম। টিভি সেট অন করাই ছিল। মিস্তিকা ছবিটি এখনও চলছে – একটি মেয়ে একটি অচেনা শহরে হারিয়ে গিয়েছে, সেখানে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটছে, এই নিয়ে ছবিটি। মনের এই অবস্থা নিয়ে ছবিটি আর দেখতে ভালো লাগছিল না। চ্যানেল চেইন্জ করলে হয়। নাহ্ একবারে সেটটি বন্ধই করে দিলাম। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম, ঘোর অন্ধকার। প্রথম পারমাণবিক পাওয়ার প্লান্ট প্রতিষ্ঠাকারী এই দেশটায়, বিদ্যুৎের সমস্যা হয়না। বরং রাশিয়ানরাই ইউরোপে বিদ্যুৎ রপ্তানী করে। ইউক্রেন বিদ্যুৎ রপ্তানী না করলেও তাদের নিজস্ব চাহিদা বেশ ভালোই মেটে। আমার জানালার বাইরে অন্ধকার থাকার কারণ ভিন্ন। বাইরে কিছুদূর পর্যন্ত কোন বিল্ডিং নেই। ঘন গাছপালা। তারা মধ্যে বিরিওজাই বেশি। আমার ঠিক জানালা বরাবরই সাত-আটটা বিরিওজা আছে।

আমি এম্নিতে সিগারেট খাইনা। মনের অস্বস্তিটা কাটানোর জন্য একটা সিগারেট খাব ঠিক করলাম। আলমারী খুলে মার্লবোরো সিগারেটের প্যকেটটা বের করলাম। এই সিগারেটটি এখানে খুব জনপ্রিয়। কিনে রেখেছি এক প্যকেট। হঠাৎ হঠাৎ খাই। সিগারেট ধরাতে গিয়ে দেখলাম লাইটারটা খুঁজে পাচ্ছিনা। কি করা যায়? কিচেনে গিয়ে দেখি। চুলা জ্বালানো থাকলে সিগারেট ধরানো যাবে।

ফ্লোরে দুটা কিচেন আছে। আমার রূমের কাছের কিচেনটির দিকে গেলাম। কিচেনে ঢুকেই একটা ধাক্কা খেলাম। কিছুক্ষণ আগে দেখা মিনিস্কার্ট পরিহিতা মেয়েটি ওখানে আরেকটি ছেলের সাথে আলিঙ্গনাবদ্ধ অবস্থায়। একে অপরের অধরসুধা পান করছে। ছেলেটি আমাদের ফ্যাকাল্টিরই থার্ড ইয়ারের ছাত্র – ইভান। সেই মুহুর্তে ওরা দুজন গভীর আবেগে একে অপরের সান্নিধ্য উপভোগ করছিল। এসময় আমার ওখানে থাকা মানে ওদের প্রাইভেসি নষ্ট করা। সিগারেট না ধরিয়েই বেরিয়ে এলাম।

করিডোরের অপর পাশের কিচেনটার দিকে এগিয়ে গেলাম। হঠাৎ উপর তলার সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো মেক্সিকোর খোসে। আমাকে দেখেই চিৎকার করে বলল, “আরে রিমন, কেমন আছো? দিনকাল কেমন যাচ্ছে? হা হা হা।” ওর কথার ধরন দেখেই বুঝলাম, মাত্রাতিরিক্ত শরাব পান করেছেন। এই খোসে এম্নিতে ভদ্রলোক, কিন্তু মদের এমনই গুন, যে ভদ্রকেও অভদ্র বানিয়ে ফেলে। এই মদখোরদের দেশে আসার পর থেকে ইসলাম ধর্মের একটি আইনের প্রতি আমার বিশেষ শ্রদ্ধাবোধ তৈরী হয়েছে -‘মদ খাওয়া হারাম’। পায়ে পায়ে সরে গেলাম। খোসে সম্পর্কে প্রচলিত আছে, মাতাল অবস্থায় সে ভয়াবহ হয়ে ওঠে। একবার কার সাথে যেন বেদম মারপিট করেছিল। নাহ সিগারেট ধরানো হলোনা। রূমে ফিরে এলাম।

রাতে ভালো ঘুম এল না। ঘুমটা বারবার ছিঁড়ে ছিঁড়ে যাচ্ছিল। একবার ঘুমের মধ্যেই স্বপ্ন দেখলাম। আবছা আবছা সব কিছু … কী একটা গাছ দেখতে পেলাম, গাছটার পাতা ছোট ছোট, সবুজ সুন্দর পাতাগুলো বাতাসে তিরতির করে কাঁপছিল।

সকালে ঘুম থেকে উঠলাম সাউন্ড স্লিপ হয়নি এমন ভাব নিয়ে। যাহোক হাতমুখ ধুয়ে নাস্তা করলাম। নাস্তায় চা খাওয়ার পরও, আবার এককাপ গরম ব্ল্যাক কফি বানালাম। এখানকার কফির স্বাদ ভালো। রিয়েল বীন কিনতে পাওয়া যায়। আমি সেটা ভাঙিয়ে কফি বানাই। খুব সুন্দর সুঘ্রানে মন ভরে যায়। ধুমায়িত কফির কাপটি হাতে নিয়ে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। হঠাৎ চোখে পড়ল জানালার বাইরে গাছগুলোর দিকে। আরে ঐতো কয়েকটি বিরিওজা গাছ! এই গাছই তো আজকে রাতে স্বপ্ন দেখেছি। প্রবল অস্বস্তি আমাকে ঘিরে ধরল। কিছু বইয়ে পড়েছিলাম, স্বপ্ন রঙিন হয়না, বরাবরই সাদাকালো। কিন্তু কথাটা আমি বিশ্বাস করিনা, আমি জীবনে বহু রঙিন স্বপ্ন দেখেছি। স্বপ্নে টকটকে লাল গোলাপ দেখেছি, হরেক রঙের বাহারী ফুল দেখেছি, নীল সাগরের ঢেউ দেখেছি, গতরাতেও তো সবুজ পাতা দেখলাম। কিন্তু বিষয়টা কি? বিরিওজা গাছ স্বপ্নে দেখব কেন? আবার ভাবলাম স্বপ্ন স্বপ্নই, কতকিছুই তো স্বপ্নে দেখা যায়। ফ্রয়েডের স্বপ্ন ব্যাখ্যার উপর একটা বই পড়েছিলাম। আমার অবচেতন মনে যা আছে সেটাই স্বপ্ন হয়ে ধরা দেয়। অভিজ্ঞতার বাইরে স্বপ্ন হয়না। হ্যা তাইতো, আমার জানালার বাইরে এই কয়েকদিন যাবৎ তো বিরিওজা দেখছি, তো স্বপ্নে বিরিওজা আসতেই পারে।

হঠাৎ চোখ পড়ল ওয়াল পেপারের গায়ে ম্যাচের কাঠি লাগানো সোনালী চুলটার দিকে। গতরাতে ভালোভাবে চোখে পড়েনি। ম্যাচের কাঠিটি ওখানে একা নয়। একটা চেয়ার টেনে ওটার উপরে উঠে, খুব কাছে গিয়ে দেখলাম, ম্যাচের কাঠিটির সাথেই খুব সুক্ষ একটা কঞ্চি, গাছের ডালের শেষ অগ্রভাগটি। ম্যাচের কাঠিটির সাইজে কেটে তার সাথে লাগানো। এটা বিরিওজা গাছের ডালের সুক্ষ কঞ্চি হতে পাড়ে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্থির হয়ে গেলাম। ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ পেলাম, এক ঝাক পায়রা বিরিওজা গাছগুলো থেকে গ্রীস্মের উজ্জ্বল নীল আকাশে উড়ে গেল। আমি চেয়ার থেকে পড়তে পড়তে সামলে নিলাম। আমার অস্বস্তি আরো ঘনিভুত হলো।

টুক টুক টুক। দরজায় নকের শব্দ হলো। কে আবার এলো? দরজা খুলে দেখলাম, সাশা কাস্তুচেনকা। আমার ক্লাসমেইট এই ছেলেটি খুব ভালো ও ভদ্র। কখনোই কাউকে মনে আঘাত দিয়ে কথা বলে না। আমাকে খুব পছন্দ করে। আমিও ওকে পছন্দ করি।
আমিঃ আরে আরে এসো।
আমার ডিভানটার উপরে বেশ ভদ্রভাবে বসলো সাশা।
সাশাঃ তারপরে কেমন আছো? নতুন রূমে কেমন লাগছে?
আমিঃ তুমিই তো হেল্প করলে ঐদিন, মাল টনাটানি করতে।
সাশাঃ আরে কিছুনা। বন্ধুকে যদি হেল্প করতে না পারি, তো কিসের বন্ধু।
আমিঃ তারপরেও তোমাকে আরেকবার ধন্যবাদ।
সাশাঃ বাদ দাও। তোমার কেমন কাটছে বলো? গতকাল একবার এসেছিলাম বিকালের দিকে। তুমি ছিলেনা বোধহয়।
আমিঃ না, ছিলাম না। ৎেসলিনা গ্রাদস্কায়ায় গিয়েছিলাম।
সাশাঃ তোমার বান্ধবীর কাছে?
আমিঃ আরে আরে আমার বান্ধবীর কাছে না, এ্যাংগোলার বংফিমের বান্ধবীর কাছে। আমার বন্ধু বলতে পারো।
সাশাঃ ওতো তোমার দেশী, তাই না?
আমিঃ না ঠিক দেশী নয়। ইন্ডিয়ান, আমি তো বাংলাদেশের।
সাশাঃ তোমরা একই ভাষায় কথা বলো দেখলাম!
আমিঃ হ্যাঁ ভাষা একই, তবে দেশ ভিন্ন।
সাশাঃ বুঝতে পেরেছি, ও ওয়েস্ট বেঙ্গলের তাইনা?
আমিঃ ঠিক ধরেছ।
সাশাঃ কি যেন নাম?
আমিঃ নীলিমা।
সাশাঃ মানে আছে কোন?
আমিঃ নীল আকাশ।
সাশাঃ সুন্দর নাম তো! মেয়েটা কিন্তু অত সুন্দর নয়। তবে বেশ স্মার্ট।
আমিঃ পছন্দ হয়েছে নাকি?
সাশাঃ নাহ। আমি ভাই তোমার মতই কাঠখোট্টা। কোন গার্ল ফ্রেন্ড-ট্রেন্ড নাই।
আমিঃ নাই কেন? রাশানদের মধ্যে এটা আনইউজুয়াল।
সাশাঃ আসলো না তো কেউ।
আমিঃ তুমি চ্যাম্পিয়ন ওয়েট লিফটার। পেটা শরীর, আলমারীর মত বিশাল, তোমার কাছেই তো আসার কথা।
সাশাঃ কি জানি হয়তো উল্টা ভয় পায়।
এরপর সাশা আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল।

সাশাঃ তোমার সব ঠিক আছে তো?
আমিঃ কেন?
সাশাঃ তোমাকে কেমন যেন মনে হচ্ছে। রাতে ঘুম ঠিকমতো হয়েছে তো?
আমি কিছুটা সময় চুপ করে থাকলাম। বুঝতে পারছি না কি বলব। আদৌ কিছু বলব কিনা। পাগল ঠাওরায় যদি।

সাশাঃ আরে সমস্যা হলে বল। বন্ধুর যদি কোন কাজে লাগতে পারি, আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করব।
আমি একটু দ্বিধা নিয়ে আস্তে আস্তে ওকে সব খুলে বললাম। সব কিছু শুনে ওও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। আমি তখন ভাবছি ও কি বলবে। এই কিছুদিন আগেও এদেশের মানুষজন সব নাস্তিক ছিল। এসব অতিপ্রাকৃত-ফ্রাকৃততে ওদের কোন বিশ্বাস ছিল না। যদিও এখন হুল্লোড় করে একের পর এক গীর্জা গড়ে তুলছে, তারপরেও কিছুটা রেশ তো রয়েই গেছে।

সাশাঃ অতিপ্রাকৃত কিছু হতে পারে।
আমিঃ তুমি অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস কর? তোমাদের দেশের মানুষ তো নাস্তিক ছিল।
সাশাঃ না, আমাদের দেশের মানুষ নাস্তিক ছিল না। আমাদের সরকার নাস্তিক ছিল। কম্যুনিস্টরা নাস্তিক হয়। প্রতিটি দেশের সরকারই তাদের নীতিটিকে জনগণের ঘাড়ে চাপাতে চায়। আমাদের দেশেও তাই ঘটেছিল। এর দ্বারা কেউ প্রভাবিত হয়েছিল, কেউ হয়নি।
আমিঃ তুমি কি বিশ্বাস কর?
সাশাঃ আমি একজন খ্রীস্টান। ভাববাদী দর্শনে বিশ্বাসী। আমি ব্যাক্তিগতভাবে মনে করি, প্রকৃতি যেমন আছে, তেমনি অতিপ্রাকৃতও রয়েছে।

আমিঃ এখন আমার বিষয়টার কি হবে তাই বলো?
আবার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সাশা বলল।
সাশাঃ দেখি কি করা যায়। বাদ দাও। চলো বেড়াতে যাই।
আমিঃ কোথায় যাবে?
সাশাঃ গ্রীস্মকালে বেড়ানোর একটা ভালো জায়গা আছে।
আমিঃ কি নাম জায়গাটার?
সাশাঃ নামটা কিছু না, জায়গাটার কথা বলছি।
আমিঃ কি জায়গা?
সাশাঃ প্লায়াঝ।
প্লায়াঝ-এর সরাসরি ইংরেজী মিনিংটা বীচ। যেকোন জলাধারের তীর যেখানে গ্রীস্মকালে মানুষ সানবাথ করে, বেড়ায়, ইত্যাদি।

আমিঃ প্লায়াঝ-এ, যাবে?
সাশাঃ আরে সুন্দরী মেয়েদের টু-পিসে দেখতে পাবে, এর চাইতে মজা আর কিসে আছে!
আমিঃ ভুল বলোনাই। চলো যাই।
আমরা দুজনে সাঁতারের পোষাক-আষাক সরন্জাম নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম।

আমাদের ডরমিটরি থেকে তিন-চার কিলোমিটার দূরে একটা লেক আছে। সেখানেই প্লায়াঝ। আমরা প্রথমে ট্রামে চড়লাম। তারপর নির্দিষ্ট স্টপেজে নেমে, কিছুদূর হাটতে হলো। মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ। এদিকটায় বিল্ডিং-টিল্ডিং কিছু নেই। একটা ফরেস্ট পার্কের ভিতর লেক। তারপরেও দুটা বাংলো টাইপ বাড়ী দেখলাম। একটার সামনে চেরী গাছে টসটসে চেরী ফল ধরে আছে। একটু রসনা তৃপ্তির প্রয়োজন অনুভব করলাম।
আমিঃ সাশা, দাঁড়াও।
সাশাঃ কি?
আমিঃ আসো চেরী খাই।
সাশাঃ এটা অন্য মানুষের গাছ।
আমিঃ কিসের অন্য মানুষের। দেখোনা রাস্তার উপরে।
সাশাঃ রাস্তার উপরে ঠিক আছে, তারপরেও মালিক থাকতে পারে। এই বাড়ীর সামনে যেহেতু, ওরাই হয়তো মালিক।
আমি ভালো করে আশপাশ দেখে নিলাম। নাহ্ কেউ নাই। থাকুক মালিক, আমরা এই সুযোগে চেরী খাব। কিশোর বয়সে পেয়ারা চুরীর মত একটা এ্যাডভেঞ্চার মাথায় চাপল। বেচারা সাশা অনিচ্ছা সত্বেও চেরী পারতে শুরু করল। দুজনে মিলে গাছ থেকে পারি আর খাই। টসটসে চেরীগুলো বেশ মজার। পাঁচ-ছয় মিনিট চেরী খেয়েছি, এমন সময় দরজা খোলার আওয়াজ পেলাম। এবার সাশা একটু অস্থির হয়ে গেল।

সাশাঃ চলো চলো তাড়াতাড়ি পালাই। কেউ এদিকে আসছে মনে হয়।
আমরা দ্রুত পা চালিয়ে। ওখান থেকে সরে পড়লাম। মুখে রয়ে গেল তাজা চেরীর স্বাদ।

প্লায়াঝে গিয়ে দেখলাম অনেক পরীর মেলা। কেউ ব্রুনেট, কেউ ব্লন্ড, কেউ রুসী। কেউ দীর্ঘাঙ্গী, কেউ মাঝারী গড়নের।বিস্ময়কর সুন্দরীরা টু-পিস পড়ে তাদের প্রগলভা ফিগার প্রদর্শন করছে প্লায়াঝে। অবশ্য প্রদর্শন করার উদ্দেশ্য তারা এখানে এসেছে এমন নয়। তারা এসেছে তুহীন শীতের পর গ্রীস্মের উজ্জ্বল দিনগুলিতে সোনারোদের উষ্ণতায় পুরো শরীর ভরিয়ে দিতে। এই সোনারোদের আদর পরশে তাদের শুভ্রতনু ধীরে ধীরে তাম্রবর্ণ ধারন করেবে। টুপি বা রূমাল দিয়ে মুখ ঢেকে অনকে পুরো শরীর বিছিয়ে দিয়েছে তপ্ত বালুর উপর। অনেকেই ঝাপিয়ে পড়ছে লেকের জলে। দাপাদাপি করে লেকের শান্ত নির্জন জল অস্থির করে তুলছে।

আমিঃ লেকটা মোটামুটি বড়, কোনদিকে যাব বলতো?
সাশাঃ হাটতে শুরু করি। হাটতে হাটতে যেখানে সবচাইতে সুন্দরী মেয়েদের দেখব, সেখানে থেমে যাব।
আমিঃ হা হা হা, ভালো বলেছ। পুরুষ মানুষের মনের কথা।

দুতিন ঘন্টা সাঁতার কেটে আর সানবাথ করে। ব্যাগ গুছিয়ে আমরা রওয়ানা দিলাম, ডরমিটরির উদ্দেশ্যে। ট্রামে উঠে আমি আর সাশা পাশাপাশি সীটে বসলাম। নিজেদের মধ্যে গল্পগুজব করছি, হঠাৎ লক্ষ্য করলাম আমাদের দুই সীট পরে আমাদের ডরমিটরির ইলেকট্রিসিয়ান ভাসিয়া বসে আছে। ভাসিয়া আমাদের ফ্যাকালটি থেকেই পাশ করছে। যখন পড়ত তখন আমাদের ডরমিটরিতেই থাকত। তারপর পাশ করার পর ডরমিটরির ইলেকট্রিসিয়ান হিসাবে থেকে যায়। একটা রূম পেয়েছে, ওখানেই থাকে বিয়ে-টিয়ে করেনি। বিশ বছর যাবৎ ডরমিটরিতে আছে।

সাশাঃ ট্রাম ফাঁকা আছে, চল ভাসিয়ার পাশে গিয়ে বসি।
আমিঃ ভাসিয়ার পাশে বসার দরকার কি?
সাশাঃ কথা আছে।
গিয়ে বসলাম ভাসিয়ার কাছে। আমাদের দেখে একগাল হাসল ভাসিয়া।
ভাসিয়াঃ আরে তোমরা দেখছি! কোথায় গিয়েছিলে? প্লায়াঝে?
আমিঃ হু, আর তুমি?
ভাসিয়েঃ আমি লেক ছাড়িয়ে আরো তিন স্টপেজ সামনে, একটা দালানে গিয়েছিলাম কাজে। তোমরা কেমন সময় কাটালে?
আমিঃ ভালো।
সাশাঃ তোমার সাথে কথা আছে ভাসিলি।
ভাসিয়াঃ কি কথা?
সাশাঃ তুমি তো বিশ বছর আমাদের ডরমিটরিতে আছি তাইনা?
আমিঃ হ্যাঁ, এই ফল সিজনে একুশ বৎসর হবে। হঠাৎ এ’ প্রশ্ন কেন?
সাশাঃ না একটা বিষয় জানতে চাই। তুমি কি ৩০৫ নং রূমটা সম্পর্কে কিছু জানো?
ভাসিয়াঃ ৩০৫ নং রূমে আবার কি হলো?
সাশাঃ না মানে, ঐ রূমে কারা কারা থাকত?
ভাসিয়াঃ কারা কারা থাকত মানে? এই একুশ বৎসরে তো কত লোকেই এলো-গেলো আমি সবার নাম মুখস্থ করে রেখেছি?
আমিঃ না মানে ওখানে কি অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছিল? কোন অঘটন?
ভাসিয়া কিছু সময় চুপ করে থেকে বলল,
ভাসিয়াঃ ওখানে অস্বাভাবিক কিছু ঘটেছে বলে তো মনে পড়েনা। কেউ তো বলে নি কখনো কিছু। তবে…..
সাশাঃ তবে কি?
ভাসিয়াঃ না, মানে, একটা মেয়ে..
আমিঃ একটা মেয়ে কি?
ভাসিয়াঃ আচ্ছা তোমাদের কি হয়েছে বলতো? হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?
সাশাঃ রিমন কয়েকদিন হলো ঐ রূমে শিফট করেছে।
ভাসিয়াঃ রিমন শিফট করেছে তাতে কি হয়েছে?
সাশা আর আমি দুজনেই চুপ করে রইলাম। কি বলব বুঝতে পারছি না। আমার অভিজ্ঞতা যদি ওকে বলি, আর ও যদি পাগল ঠাওরায়। ভাসিয়া আবার খুব কমন ফিগার। সবার সাথে খাতির। এরপর পুরো ডরমিটরি জেনে গেলে একটা হাসাহাসি পড়ে যাবে।

একটু চুপ থেকে ভাসিয়া নিজেই বলল।
ভসিয়াঃ রিমন কোন অস্বাভাবিক কিছু কি ঘটেছে?
আমিঃ না তেমন কিছু নয়।
ভাসিয়াঃ বুঝতে পেরেছি কিছু একটা তো ঘটেছেই। না বলতে চাইলে না বলো। তবে আমি যা বলছি শোন।
আমি ও সাশা অবাক হয়ে পরস্পরের দিকে তাকালাম।
ভাসিয়াঃ বছর সাতেক আগে, ওখানে পোলিশ একটা মেয়ে থাকত। মেয়েটির নাম ছিল মাগদা।
সাশাঃ ছিল মানে? মেয়েটি কি এখন আর ইউক্রেনে নাই?
ভাসিয়াঃ সেটাই বলছি। শুধু ইউক্রেনে না, মেয়েটি এই পৃথিবীতেই নেই।
ভাসিয়ার কথা শুনে আমাদের বিস্ময় আরো ঘণীভুত হলো।

ভাসিয়াঃ মাগদা পোল্যান্ড থেকে স্কলারশীপ নিয়ে এখানে পড়তে এসেছিল। দীর্ঘাঙ্গী সুশ্রী মেয়েটি ছিল স্বর্ণকেশীনী। সদালাপী হাসিখুশী এই মেয়েটি অনেকেরই চোখে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত মেয়েটির সম্পর্ক হয় মরোক্কোর আবদুর রাজ্জাকের সাথে। রাজ্জাক এখন আর নেই পাশ করে ফ্রান্সে চলে গেছে। মাগদা আর রাজ্জাক খুব সুন্দর একটা জুটি ছিল। দুজনই সুশ্রী দীর্ঘকায় আর উচ্ছল ছিল। ওরা ৩০৫ নং রূমেই লীভ টুগেদার করত। মাগ্দা বিরিওজা গাছ খুব পছন্দ করত। তাই বেছে বেছে ঐ রূমটি নিয়েছিল। লক্ষ্য করেছ নিশ্চয়ই, ঐ রূমের জানালার পাশেই কয়েকটি বিরিওজা গাছ আছে। একবার শীতের ছুটিতে মাগদা পোল্যান্ড গেল। সেখান থেকে আর ফিরে আসেনি। তারপর আমরা দুঃখজনক খবর পেলাম। মাগদা বন্ধু-বান্ধব নিয়ে পাহাড়ে গিয়েছিল আইস স্কী করতে। তারপর সেখানে হারিয়ে যায়। অনেক খুঁজেও ওকে পাওয়া যায়নি।
আমিঃ পাওয়া যায়নি মানে কি? বেমালুম গায়েব হয়ে গেল?
ভাসিয়াঃ আবদুর রাজ্জাক পাগলের মত হয়ে গিয়েছিল। ঐ বছর সামারে ওর পাশ করার কথা ছিল। মাগদা ছিল ওর দু’বছরের জুনিয়র। বেচারা মাগদার শোকে পরীক্ষা ঠিকমতো দিতে পারেনি। পরবর্তি সেমিস্টারে স্পেশাল ব্যবস্থা করে ওর ডিফেন্স এ্যারেন্জ করা হয়। তারপর রাজ্জাক ফ্রান্সে চলে গিয়েছে।
সাশাঃ মাগদার কি হয়েছিল?
ভাসিয়াঃ আমাদের ডরমিটরিতে আরেকটো পোলিশ মেয়ে ছিল, মাগদাদের শহরেরই। একবছর পরে ও জানিয়েছিল, উঁচু পাহাড়ে, বরফের মধ্যে মাগদার মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল, এক বৎসর পরে। আরেকটি স্কী টিম মৃতদেহটি আবিষ্কার করেছিল।
সাশাঃ ভয়াবহ। মানুষের জীবনে যে কখন দুর্যোগ নেমে আসে কেউ বলতে পারেনা।

আমিঃ বেচারা আবদুর রাজ্জাক! ভালোবাসার মানুষটিকে হারালো!
ভাসিয়াঃ এবার রিমনের কি হয়েছে বলো। হঠাৎ কেন এতো কিছু জানতে চাইলে?
আমি আবারও চুপ করে রইলাম। এদিকে কথা বলতে বলতে ট্রাম আমাদের স্টপেজে চলে এলো। আমি আর সাশা নামার প্রস্তুতি নিলাম। ভাসিয়া দেখলাম বসেই আছে।
আমিঃ ভাসিয়া তুমি নামবে না?
ভাসিয়াঃ না, আমি একটু বাজারের দিকে যাব।
আমিঃ ও। যাও তাহলে।
ভাসিয়াঃ তুমি কিন্তু বললে না কি হয়েছে।
আমরা নামতে নামতে ভাসিয়া বলল।
ভাসিয়াঃ ঐ ৩০৫ নং রূমে আমিও মাস তিনেক ছিলাম, পরে ছেড়ে দিয়েছি। আমি তখন ট্রামের একেবার দরজায়, নেমে যাব যাব, এই সময় ভাসিয়ার কথা শুনে ঘুরে তাকালাম।
আমিঃ কেন ছেড়ে দিলে কেন?
ভাসিয়াঃ অস্বস্তি লাগত। কি কি সব স্বপ্ন দেখতাম!

birch-tree3-walkway

বিষন্ন বিরিওজা – ৩
—————————-

বিকাল বেলাটা সাশা আমার রূমে কাটালো। আমরা চা নাস্তা খেয়ে গল্পগুজব করে কাটালাম। এদেশে সামারে বিকালটা ভীষণ লেংদি হয়। দশটার দিকে সূর্য ডুবি ডুবি করল। আমাদের হিসাবে এটাকেই সন্ধ্যা বলতে হয়। সেসময় সাশা বলল, “চল আমার রূমে গিয়ে ডিনারটা সেরে নেই। তাই করলাম।

নিরুদ্বিগ্নভাবেই ভাবেই কেটে গেল বিকাল আর সন্ধ্যাটা। সাশার রূম থেকে আমার রূমে ফিরে দরজাটা লক করে ঘুরতেই চোখ আটকে গেল দেয়ালে সাটা সেই চুলটার দিকে। সেই মেয়েটির চুল, পোলশার মেয়ে, মাগ্‌দা যার নাম ছিল। মেয়েটি এখন আর এই পৃথিবীতে নেই। মেয়েটির চুলটি আছে। হয়তো কোন এক আবেগময় মুহুর্তে মেয়েটি তার চুল, তার শরীরের একটা অংশ দেয়ালে গেথে দিয়েছিল। তার ভালোবাসার মানুষটির জন্য। ‘আমি না থাকি, আমার শরীরের একটা অংশ তোমার সাথে থাকবে’। ‘ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে’ – শরীরের মৃত্য হলেও আত্মার মৃত্যু হয়না। মানুষ মারা যাওয়ার পর তাকে সমাহিত করা হয় কেন? আবার হিন্দুরা পুড়িয়ে ফেলে। হিন্দু ফিলোসফি বলে, পঞ্চভুত থেকে মানুষের সৃষ্টি আবার যেন সেই পঞ্চভুতেই মিলিয়ে যায়। মুসলিম, ইহূদী আর খ্রীষ্টানরা সমাহিত করে। উদ্দেশ্য পুরো শরীরটিই যেন মৃত্তিকার অংশ হয়ে যায়। কিছুই যেন আর মাটির উপরে না থাকে। লেনিনের দেহ মমি করে রাখা হয়েছে, আজ সত্তুর বছরের উপর। নাস্তিক কম্যুনিস্টরা কাজটি করেছিল। এই নিয়ে এখন অনেক কথা হচ্ছে। ধর্মভীরুরা বলছে, এটা গ্রহনযোগ্য নয়, মৃত মানুষের দেহের স্থান মাটির উপরে নয়, মাটির নীচে। মাটির উপরে মৃতদেহ দীর্ঘকাল রাখলে তা অমঙ্গল বয়ে আনে। মৃত মেয়েটির শরীরের একটা অংশ, এখন আমার সামনে আছে। আমার রুমেই। সাথে সাথে কেমন একটা অস্বস্তি ঘিরে ধরল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম, সেখানে জমাট অন্ধকার। অকারণে গাটা ছমছম করতে লাগলো। অকারণই বা বলছি কেন? এই দুদিন যা ঘটেছে ও শুনেছি তাতে তো ভয় লাগার সুস্পষ্ট কারণই আছে। সাশাকে বললে অবশ্য আমার রূমে এসে ঘুমাতো, কিন্তু সেটা বলতে যাইনি। কেমন যেন নিজেকে কাপুরুষ মনে হয়। আবার আমি একা রুমই ভালোবাসি, তাতে প্রাইভেসি থাকে।

ভয়ভীতি দূর করে নিজের হেফাজত পাওয়ার একটাই পথ – মহান সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করা। তাই করলাম ওযু করে পাক-সাফ হয়ে এশার নামাজের সাথে আরো দুই রাকাত নামাজ পড়লাম। নামাজ পড়ার পর দোয়া করা, শুধু নিজের জন্য দোয়া করলে দোয়া কবুল হয়না, মৃত-জীবিত সবার জন্যই দোয়া করতে হয়, তাই করলাম।

ভয় বা অস্বস্তি যেটাই বলি, অনেকটাই কমে এলো। ডিভানটা খুলে বিছানা তৈরী করে গা এলিয়ে দিলাম। রূমের বাতিটা নিভিয়ে দিলাম। গাঢ় অন্ধকারে রুমটা ভরে গেল। রূমে একা থাকার কারণে এম্নিতেই একাকিত্ব বোধ করি, এখন আবারো অস্বস্তি চেপে বসলো আমার বুকে। নাহ্‌ এভাবে অন্ধকারে থাকা যাবেনা । টিভি সেটটা অন করে দিলাম। একেবারে অন্ধকার না হয়ে কিছুটা হলেও যেন আলো থাকে। শুয়ে শুয়ে টিভি দেখতে থাকলাম। পুরাতন রাশান টিভি, রিমোট সিস্টেম নাই, ভিতরে ভালভ্‌ এ্যারেন্জমেন্ট, খুব ভালো চলে। আমার আগে একজন বাঙালী ভাই ছয় বছর চালিয়েছিলেন, আমি গত চার বছর চালাচ্ছি। তারপরেও বেশ স্মুথ। ফিজিক্স ক্লাসে ডঃ ব্লেশেনকা বলেছিলেন, ভালভ্‌ এ্যারেন্জমেন্ট ইলেকট্রনিক্স ভারী হয় সত্য, কিন্তু টেকশই হয়। ভালো সার্ভিস দেয়। প্রাইভেট টিভি চ্যানেল ‘টনিস’ চলছিল। এটা খারকভ শহরের নিজস্ব চ্যানেল। এবং এটাই সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম প্রাইভেট টিভি চ্যানেল। একটি অ্যামেরিকান ফিল্ম চলছিলো। শুরুটাই হলো খুন দিয়ে, তারপর এই হত্যাকান্ডকে ঘিরে নানা কাহিনী। অ্যামেরিকান ফিল্মগুলোর ধরনই বোধহয় এরকম। খুন, সেক্স, টাকা এইগুলোই কাহিনীর উপকরণ। ভালো ছবি যে হয়না তা নয়, কিছু কিছু ছবি এককথায় দুর্দান্ত। কিন্তু বেশীরভাগেরই ঐ টাইপ। সেই তুলনায় রাশান ফিল্মগুলোর বেশীরভাগই অসাধারণ। বিশাল কাঁচের জানালার পর্দাটা খোলা ছিল। বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে, একবার ভাবলাম পর্দাটা টেনে দেই। আবার ভাবলাম, না থাক, পর্দা টেনে দিলে নিজেকে আরো বেশী বদ্ধ মনে হবে। বাইরের বিরিওজা গাছগুলোর উপরে দিনের বেলায় নীলাকাশ দেখা যায়। রাতের আকাশ নিঃসন্দেহে কালো। সেই অন্ধকারের বুক চিরে হঠাৎ আলো ফুটে উঠলো। এক বিন্দু আলো। ভুল দেখছি না তো? না ঠিকই দেখছি। একটি তারা খুব ধীরে ধীরে একপাশ থেকে আরেক পাশের দিকে যাচ্ছে।না অবাক হলা না, অলৌকিক কিছু নয়, একেবারেই লৌকিক। দেশে থাকতে একবার এরকম গতিশীল তারা দেখে অবাক হয়েছিলাম, ফিজিক্সের শিক্ষকও বলতে পারেননি। প্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপনকারী দেশে এসে এখন আমি জানি ওটা স্যাটেলাইট। নিজের মনে হাসলাম – জানা থাকলে স্বাভাবিক, আর অজানা অনেক কিছুকেই অনেক সময় অলৌকিক মনে হয়। বাইরের অন্ধকার, বিজ্ঞানের অনন্য উপহার টিভির হালকা আলো। সব মিলিয়ে আবছা আলো আধারী পরিবেশে ধীরে ধীরে আমার চোখে রাজ্যের ঘুম নেমে এলো।

একটা অস্পষ্ট আওয়াজ শুনে ঘুম ভেঙে গেল। চোখ মেলতে চেয়েও মেলতে পারলাম না। আমার কি ঘুম ভেঙেছে? এখন কটা বাজে? ঠাহর করার চেষ্টা করলাম ভোরের আলো ফুটেছে কি ফোটে নাই। আওয়াজটা আরেকটু স্পষ্ট হলো। ইলেকট্রিক ক্যাটল চলছে। কেউ কি ওটা চালিয়েছে?

গ্রীস্মের পাগল হাওয়ায় ঝিরঝিরে ভৌতিক শব্দ করছে বিরিওজার পাতা। মনে হলো জানালার বাইরে আলো নেই। তার মানে রাত। ধক করে উঠলো বুকটা। শুনেছি রাতের অন্ধকারেই অশুভ শক্তিরা ঘুরে বেড়ায়। ঢাকায় একবার ২১শে ফেব্রুয়ারীর মধ্যরাতে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলো। ব্যপক তদন্তের পর পুলিশ রিপোর্ট দিল, এটা অশভ শক্তির কাজ ছিল। এবং তারা ২১শে ফেব্রুয়ারীর মধ্যরাতের প্রোগ্রাম বাতিল করে, কেবলমাত্র ঐতিহ্যবাহী প্রভাত ফেরী দিয়েই অনুষ্ঠান শুরু করার সুপারিশ জানিয়েছিল।

মনে হলো ইলেকট্রিক ক্যাটলটা চালু করে কেউ ঘরের ভিতর হাটাহাটি করছে। আমার বুক দুরু দুরু করতে লাগলো। ঘাড় থেকে মেরুদন্ড বেয়ে শিরশির করে নিচের দিকে নেমে গেল ঠান্ডা ভয়ের স্রোত। সাহস সঞ্চয় করে ডাকতে শুরু করলাম, “কে? এখানে কে?” কিন্তু আমার গলা দিয়ে কোন স্বর বের হলো না। আমার ডাকার চেষ্টায় সব শব্দ থেমে গেল। এমনকি বিরিওজার পাতাগুলোও আর কাঁপছে না। নীরবতায় থমথম। আমার উৎকন্ঠা ক্রমেই বাড়ছে। আমি চোখ খোলার চেষ্টা করে কোন কাজ হলোনা, সামান্য খোলা দুটি চোখের পাতার দৃষ্টিপথে পিসিগুলো সব অস্পষ্ট করে দিচ্ছে। অন্ধকারের বুক চিরে ক্ষীণ আলোর আভাস, একি কোন আবছা ভৌতিক আলো। সবটাই কেমন অদ্ভুত আর রহস্যময় ঠেকলো আমার কাছে। এমনভাবে কত সময় পার হয়ে গেল কে জানে?

অনেক পরে পরিপূর্ণরূপে ঘুম ভাঙলো। ইতিমধ্যে রাত পেরিয়ে অন্ধকার কেটে গেছে। পূব আকাশে মেঘের বুকে সবে রঙের ছোপ লাগতে শুরু করেছে। কানে এসে বাজলো মোরগের ডাক। এদেশে আযানের ধ্বনি শোনা যায়না, গীর্জার ঘন্টাও বাজেনা। ভোর বেলা কর্কশ ডাকে ঘুম ভাঙিয়ে দেয় বলে মোরগের উপর ভীষণ রাগ হতো ঘুমকাতুরে আমার। আজ সে ডাক মধুবর্ষণ করলো আমার কানে। ঘুম ভাঙার সাথে সাথে দুঃস্বপ্নটা কেটে গেল। কে জানে সত্যিই স্বপ্ন ছিল কি-না!

নাহ্‌ এই ভৌতিক রূমে আর থাকা যাবেনা। অন্য কোন রূম খুঁজে নিতে হবে। ব্রেকফাস্ট করে হোস্টেলের কমান্ড্যন্ট-এর কাছে যাব। কমান্ড্যন্ট-এর কথা মনে হতেই মেজাজ খিচড়ে গেল। আমার বয়সী ইয়াং একটা মেয়ে। নাম স্ভেতা। গায়ে-গতরে বড়সড় বলে দেখলে বয়স্ক মনে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে ম্যাচিউরড ছেলেমেয়েরা থাকে, পিএইচডি স্টুডেন্টরাও থাকে, দু’একজন ইয়াং টিচারও থাকে। এখানে বয়স্ক দায়িত্বশীল কমান্ড্যন্ট থাকা উচিত। তা না করে দায়িত্ব দিয়েছে এই ছুকরীকে। আসলে ওর দাদা ছিল এর আগের কমান্ড্যন্ট। রিটায়ার করার আগে দাদাই ইউনিভার্সিটির রেক্টরকে রিকোয়েস্ট করে, নাতনিকে চাকরীটা পাইয়ে দেয়। এখন মেয়েটি ধরাকে সরা জ্ঞান করে কাউকে তোয়াক্কা করেনা। ঘুষ ছাড়া কাজ করেনা। আমাকে দুই চোখে দেখতে পারেনা। কারণ দুয়েকবার বাক-বিতন্ডা হয়েছে। এখন আমি গিয়ে রূম চেইন্জ করতে চাইলে রূম তো চেইন্জ করবেই না, উল্টা এই রূমেই পাকা-পোক্ত থাকার ব্যবস্থা করার চেস্টা করবে। আমাকে অন্য কাউকে দিয়ে কাজটা করতে হবে।

প্যালেস্টাইনের খালেদের কাছে গেলাম। ও আমার ক্লাসমেইট। ওর স্ত্রী আবার ইউক্রেণীয়। ইউনিভার্সিটিতেই কি একটা চাকরী করে যেন। লম্বা চওড়া সুদর্শন খালেদ একসময় লেডী কিলার ছিল। এম্নিতেই আরবরা দেখতে সুন্দর হয়। মেয়েদের ভাষ্য মতে (শুধু রুশ মেয়ে নয়, ইউরোপীয়, এশিয়, দক্ষিণ আমেরিকান সব মেয়েদের মুখেই শুনেছি, পৃথিবীর সব চাইতে সুন্দর পুরুষ হলো আরবরা। তাই সব দেশের মেয়েরাই আরবদের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য উদগ্রীব থাকত।) আরবরাও এই সুযোগের সদ্বব্যবহার করে বেশ। খালেদও করত। হঠাৎ করেই কি হলো, নাতাশা নামের বয়সে অনেক বড় মেয়েটির সাথে ঘর-সংসার করতে শুরু করলো। প্রথমে বিষয়টা বুঝতে পারিনি, পরে ওর দেশীদের মুখেই শুনলাম। খালেদের সাথে সম্পর্কের ফলে নাতাশা হঠাৎ প্রেগনেন্ট হয়ে যায়। এরপর থেকে খালেদ নাতাশার সাথে থাকতে শুরু করে। অল্প সময় পরে ফর্মাল বিয়েটাও সেরে নেয়। ওদের একটি কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। সিরিয়ার রাফাত বলল, “নাহ্‌, খালেদকে বাহবাই দেব, এরকম পরিস্থিতিতে ছেলেরা গাঁ বাচানোর চেষ্টা করে। খালেদ তা না করে নাতাশাকে বিয়ে করেছে, মেয়েটির পিতৃত্ব স্বীকার করে নিয়েছে। ওয়েল ডান!”

সেই খালেদকে গিয়ে বিষয়টা বুঝিয়ে বললাম। আমাদের কথার মাঝখানে নাতাশাও এলো। সব শুনে বলল, “ঠিক আছে কোন অসুবিধা নাই। তুমি আমার স্বামীর বন্ধু, আমি তোমাকে অবশ্যই হেল্প করব।”
আমিঃ কি করে?
নাতাশাঃ বারে! আমি তো এই স্টুডেন্ট টাউনের ডেপুটি ডিরেক্টর। আমি বললেই ডিরেক্টর তোমার সব ব্যবস্থা করে দেবে। স্ভেতার মত কমান্ড্যন্টরাতো সব আমাদের আন্ডারেই কাজ করে।
ধরে প্রাণ ফিরে পেলাম। কাজটা সহজেই হবে তাহলে। গুড!

বিকালের দিকে হোস্টেলের স্টুডেন্ট কমিটির প্রধান সের্গেই গারানঝা এলো।
গারানঝাঃ রিমন, শুনলাম রূম পাল্টাতে চাও?
আমিঃ চাই তো।
গারানঝাঃ স্ভেতা বাধা দিচ্ছে?
আমিঃ জানিনা। এখনো কিছু বলিনি। জানলে বাধা দিতেও পারে।
গারানঝাঃ না বাধা দিতে পারবে না। স্ভেতা কমান্ড্যন্ট হতে পারে, কিন্তু তোমাকে খাটো করে দেখলে হবেনা। তোমার একটা রাইট আছে। তুমি এখানে চার বছর ধরে আছো।
আমিঃ ঠিক। আমিও তাই মনে করি।
গারানঝাঃ চিন্তা করোনা। আমি আছি তোমার সাথে।
আমি মনে মনে ভাবলাম, ভালোই হলো আরেকজন পাওয়া গেল আমার পক্ষে। পরে জানতে পেরেছিলাম সের্গেই-এর সাথে স্ভেতার ঠান্ডা লড়াই চলছে। তারই রেশ ধরে সের্গেই এসেছে আমার সাথে সন্ধি করতে।

সের্গেই চলে যাওয়ার মিনিট বিশেক পর খালেদ এলো।
খালেদঃ ব্যাগ-ট্যাগ গোছাও।
আমিঃ কেন দেশে পাঠিয়ে দেবে নাকি? হা হা হা!!
খালেদঃ না দেশে না। অত ক্ষমতা এখনো হয়নি। আপাততঃ অন্য রূমে।
আমিঃ রিয়েলী।
খালেদঃ হ্যাঁ বন্ধু, আমার ওয়াইফ কল-কাঠি নেড়ে এসেছে। ডিরেক্টরের নির্দেশে স্ভেতা এখন তোমাকে অন্য রূম বরাদ্ধ করবে।
একটা প্রশান্তি বয়ে গেল আমার বুকে।
আমিঃ তোমাকে কি বলে যে ধন্যবাদ দেব!
খালেদঃ ধন্যবাদ দিতে হবেনা। আপাততঃ চা খাওয়াও এক কাপ।
তারপর ডিভানে গা এলিয়ে দিয়ে বলল।

খালেদঃ আরে বন্ধুর জন্য যদি এটুকুই করতে না পারলাম। তাহলে কিসের বন্ধু বল? তুমি আমি একই দেশের না হতে পারি। একই ধর্মের তো! মুসলমান-মুসলমান ভাই-ভাই। আমি প্যলেস্টাইনের মানুষ। আমাদের প্যলেস্টাইনের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের দরদের কথা আমি জানি।
আমিঃ ওহ্‌হো (খুশী ও কৃতজ্ঞতার হাসি হাসলাম আমি)।
চা বানাতে বানাতে বললাম, “তোমাদের ইয়াসির আরাফাতের সাথে তো আমাদের মরহুম প্রেসিডেন্ট ………।” কথা শেষ করতে পারলাম না।
খালেদঃ জিয়াউর রহমানের কথা বলছ তো? আমি জানি ইয়াসির আরাফাত ও জিয়াউর রহমান ঘনিষ্ট বন্ধু ছিল। অনেক ছবি দেখেছি, দেশে থাকতে। তখন কি ভাবতাম জানো?
আমিঃ কি?
খালেদঃ তোমাদের গরীব হলেও একটা দেশ আছে। আমাদের সেটাও নেই।
ওর কথা শুনে আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। বললাম
আমিঃ হবে হবে। একদিন তোমাদেরও দেশ হবে।
আমার মন খারাপটা খালেদ বুঝতে পারলো। তাই পরিবেশ পুনরায় হালকা করার জন্য বলল।
খালেদঃ বাদ দাও, দুই কাপ চা খাব, চিনি বেশী করে দেবে?
আমিঃ মিল্ক দেব?
খালেদঃ নাহ্‌, ইংলিশ টি আমি খাইনা।

খালেদ বসে থাকতে থাকতেই স্ভেতা এলো। প্রবল জ্বরে পড়েছে, এরকম টাইট মুখভঙ্গি নিয়ে বলল।
স্ভেতাঃ এই নাও চাবি, পাঁচতলায় ৮৮ নং রূম তোমার নামে বরাদ্ধ করা হয়েছে। এই রূম ছেড়ে দিয়ে চাবিটা আমার হাতে দিয়ে দিও। দুদিন সময় দিলাম।
আমার হাতে চাবি দিয়ে ঘুরে দাড়ানোর সময় মুখ বেকিয়ে বলল,
স্ভেতাঃ তোমার হাত অনেক দূর পর্যন্ত লম্বা রিমন। উপরওয়ালা তোমাকে দুটা জিনিস দিয়েছে, একটা হলো সৌভাগ্য আরেকটা হলো মাথা। এই দুয়ের কল্যাণে অনেক দূর যেতে পারবে তুমি।

স্ভেতা চলে যাওয়ার পর খালেদ অট্টহাস্য দিয়ে উঠলো।
খালেদঃ হা হা এই প্রথম ঘাট খেয়েছে ও। ঘুষ ছাড়া কোন কাজ করেনা। এখন বুঝবে সবার কাছ থেকে ঘুষ চলেনা।
আমিঃ তোমাকে আর নাতাশাকে ধন্যবাদ।
খালেদঃ আরে রাখো ক’বার ধন্যবাদ দেবে? এখন প্রস্তুতি নাও। কবে যাবে নতুন রূমে?
আমিঃ আজই যাবো। এই ভুতের রূমে আর নয়।
খালেদঃ ঠিক আছে আজই যাও। তোমাকে মাল টানতে হেল্প করব আমি।
আমিঃ আরে না না। তোমাকে কিছু করতে হবেনা। আমি ম্যনেজ করে নেব।
খালেদঃ কাউকে না কাউকে তো লাগবেই। আমি আসবো সমস্যা নেই। ডিনারের পরে করি কাজটা?
আমিঃ ওকে। প্রবলেম সলভ্ড, আমি এখন অন্য কথা ভাবছি।
খালেদঃ কি কথা?
আমিঃ আমি না হয় এখান থেকে রেহাই পেলাম। কিন্তু তারপর? এরপর এখানে কাকে পাঠাবে? যাকে পাঠাবে সেও যদি আমার মত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়?
খালেদঃ তা জানিনা। স্ভেতাকে এখানে পাঠাতে পারলে ভালো হতো। ভুতে যদি চেপে ধরত তাহলে ওর দুর্নীতি কমত।
হা হা হা সমস্বরে হেসে উঠলাম দু’জনেই।

স্যুটকেস গোছাতে শুরু করলাম। দ্রুত করতে হবে। আজ রাতটা কিছুতেই এখানে কাটাতে চাইনা। স্যুটকেস গোছাতে গোছাতে হঠাৎ স্যুটকেসের পকেটে আবিষ্কার করলাম জিনিসটা। একটা কার্ড সাইযের পলিথিনের প্যাকেট, তার ভেতরে পেচিয়ে রাখা একটি লম্বা কালো চুল। লুবনার চুল । বিদেশে আসার সময় এই উপহারটি ও আমার হাতে তুলে দিয়েছিল। সেই থেকে আমার সাথে আছে।

birch-tree4-walkwayবার্চ গাছের সারি

বিষন্ন বিরিওজা – ৪
—————————-

জানালা গলে আলো এসে চোখে পড়ল, নতুন রূমের প্রথম ভোরের আলো। ভোরের কচি রোদ এসে পড়েছে জানালার টবে রাখা রঙিন অর্কিডগুলোর গায়ে। অর্কিডগুলোর কোন কোনটায় রাতের ঝরে পড়া দুএকটা শিশিরবিন্দু এখনো লেগে আছে। সুর্যের সোনালী আলো প্রতিফলিত হয়ে রংধনুর সাত রং ঠিকরে দিচ্ছে ঐ শিশিরবিন্দুগুলো। খোলা জানালা দিয়ে বয়ে আসছে ঝিরঝিরে দক্ষিণা হাওয়া। দূরের আকাশে কিছুক্ষণ আগে উঠেছে গনগনে লাল সূর্যটা। গতরাতটা মোটেও আতঙ্কে কাটেনি, বরং ঘুম হয়েছে বেশ নির্বিঘ্ন। ফুরফুরে মন নিয়ে উঠেছি বলেই বোধহয় সূর্যটাকে এত সুন্দর মনে হলো।

এখানেও জানালার একপাশে কিছু গাছের পাতা চোখে পড়লো। ইন ফ্যাক্ট, পাতাগুলো জানালার উপর হুমরি খেয়ে পড়েছে, হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। কাছে এগিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম কি গাছ। যা ভেবেছিলাম তাই, একটি বড়সড় বিরিওজা গাছ। এই বিরিওজা গাছ কি আমার পিছু ছাড়বে না? মনে মনে অবশ্য খুশিই হয়েছি। জানালার বাইরে আকাশ অথবা গাছ না থাকলে মন ভালো লাগেনা। এই রুমটির জানালার বাইরে দুটাই আছে।

রূমটার নাম্বার ৮৮ । শুধু নাম্বার দিয়ে চলবে? শুধু নাম্বারে কেমন কাটখোট্টা মনে হয়। রূমটার একটা নাম থাকা দরকার। তাহলে বেশ কাব্যিক হবে। আমাদের কলেজের মাজহারুল হক স্যার এটা শিখিয়েছিলেন, কলেজের যে হোস্টেলের তিনি হাউস মাস্টার ছিলেন, তার প্রত্যেকটা রূমের একটা নাম দিয়েছিলেন। খুব সুন্দর সুন্দর নামে উনার হাউসটা একেবারে কাব্যিক হয়ে উঠেছিলো। আমারও সখ জাগলো এই রূমটির একটা নাম দেয়ার। কি নাম দেয়া যায়? বাস্তবতার সাথে মিল রেখে নামটা দেব? ঢাকায় একটা জায়গার নাম ভুতের গলি। শুনেছিলাম, কোন এক কালে নাকি সেখানে ভুতের উপদ্রব ছিল। আমার আগের রূমটার নাম ‘ভুতের রূম’ দিলে মোক্ষম হবে। এই রূমটার নাম ‘অভুতের রূম’ দিব? হাঃ, হাঃ, হাস্যকর মনে হবে। বাইরে বিরিওজা গাছ আছে, এর সাথে মিলিয়ে নাম দিয়ে ফেলি, ‘জানালার বাইরে বিরিওজা’, না বেশ বড় নাম হয়ে যায়। আরেকটু ছোট করা দরকার। এই কয়দিনের ভয়-ভীতি উৎকন্ঠার পর, এখন মনটা বেশ উৎফুল্ল মনে হচ্ছে। তাহলে নাম দিয়ে ফেলি – ‘উৎফুল্ল বিরিওজা’। খারাপ না আপাততঃ এই নামে চলবে, প্রয়োজন হলে পরে নাম পাল্টে ফেলা যাবে, এতো আর মানুষের নাম না যে পাল্টানো যাবেনা।

টুক টুক টুক। দরজায় নক করার শব্দ পেলাম। কে হতে পারে? এত সকালে! পরিচিত কেউই হওয়ার কথা। বিছানা ছেড়ে উঠে দরজা খুললাম। হাসি হাসি মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাশা কাসতুচেনকা।

সাশাঃ কি, কেমন ঘুম হলো?
আমিঃ সাউন্ড স্লীপ।
সাশাঃ খারাশো! এতা রাদুয়েত (ভালো, এটা আনন্দের ব্যাপার)।
আমিঃ আসো ভেতরে আসো।
সাশা ভিতরে ঢুকে একটা চেয়ারে বসলো। আমি ডিভানটা গুছানো শুরু করলাম।

আমিঃ ব্রেকফাস্ট করেছ?
সাশাঃ করেছি।
আমিঃ না করলে আমার সাথে কর।
সাশাঃ না না, আমি ব্রেকফাস্ট করেছি।
আমিঃ তাহলে আমার সাথে চা খাও।
সাশাঃ তা খাওয়া যেতে পারে। চা খাওয়ায় আমার কখনো অরুচী হয়না।
আমিঃ হু, হু, তোমাদের রাশানদের বেশীরভাগই বলে, ‘ভদকা খাওয়ায় আমার কখনো অরুচী হয়না’।
সাশাঃ হ্যাঁ, তা ঠিক। তবে আমি যেহেতু এ্যলকোহল খাইনা। সুতরাং ঐ কথা বলার সুযোগ নাই।
আমিঃ এ্যলকোহল শব্দটা কিন্তু আরবী।
সাশাঃ তাই নাকি?
আমিঃ হ্যাঁ। কোহল শব্দের সাথে আল আর্টিকেলটি ব্যবহৃত হয়েছে। পরবর্তিতে শব্দটি বিভিন্ন ভাষায় ঢুকে গিয়েছে। ইংরেজী ও তোমাদের ভাষায় যেমন।
সাশাঃ ইন্টারেস্টিং, জানতাম না।
আমিঃ তুমি কিন্ত বেশ একসেপ্‌শন।
সাশাঃ এ্যলকোহল পান করিনা বলে?
আমিঃ সেরকমই। তোমাদের মধ্যে তো এরকম নেই। কম পান করে এমন অনেককেই জানি। কিন্তু একেবারেই পান করেনা, এরকম তোমাকেই প্রথম দেখলাম।
সাশাঃ আমার বাবাও এ্যলকোহল পান করেন না।
আমিঃ বাহ্‌। যোগ্য পিতার যোগ্য সন্তান।
সাশাঃ অবশ্য আমার ছোটভাইটি পান-টান করে।
আমিঃ তোমার ছোটভাই আছে নাকি?
সাশাঃ আছে তো।
আমিঃ কোথায় থাকে?
সাশাঃ গ্রামেই। ওখানে কাজ করে।
আমিঃ পড়েনা?
সাশাঃ না। স্কুল শেষ করেছে। তারপর আর পড়েনি। চাকরীতে ঢুকে গেল।
আমিঃ হায়ার এডুকেশন নিলে ভালো হতোনা?
সাশাঃ আমি মনে করি ভালো হতো। ওতো মনে করেনা। চাকরীতে ঢুকে গেল। একটা মেয়ের সাথে প্রেম হয়েছে। বিয়ে করবে সামনের সামারে।
আমিঃ হায়ার এডুকেশন ছাড়া কি চাকরীতে ভালো বেতন হয়?
সাশাঃ তেমন পার্থক্য নেই। তুমিতো জানো, মাত্র সমাজতন্ত্রের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছি আমরা। সমাজতান্ত্রিক সমাজে শিক্ষিত আর অল্পশিক্ষিতদের মধ্যে বেতনের পার্থক্য কম। তাই কেবল মাত্র অর্থনৈতিক কারণে হায়ার এডুকেশনের দিকে ঝোঁক নাই কারো।
আমিঃ এতে তো সমাজের ক্ষতি হয়।
সাশাঃ তা তো হয়েছেই। তুমি কি ভাবো, এদেশের সবাই সমাজতন্ত্রকে সমর্থন করতো?
আমিঃ করতো না?
সাশাঃ অবশ্যই না। যেমন আমার দাদা করতেন না। কম্যুনিস্টদের দ্বারা নির্যাতিতও হয়েছিলেন আমার দাদা। আমরা পুরো পরিবার তাই সমাজতন্ত্র বিরোধী ছিলাম।
আমিঃ আশেপাশের লোকে জানতো?
সাশাঃ ওরেব্বাস! সে কথা ওপেনলি বলার কি আর জোঁ ছিল! টিকটিকির কোন অভাব ছিলনা তখন। জানলে পরে সোজা চৌদ্দ শিকের ভিতর নিয়ে ঢোকাতো কম্যুনিস্ট সরকার।
আমিঃ এখন তোমরা খুশী?
সাশাঃ অবশ্যই খুশী। এট লিস্ট, মন খুলে কথা বলতে পারছি। যাহোক বাদ দাও। দেখি তোমার রূমটার পজিশন কেমন।
সাশা এগিয়ে গেল জানালার দিকে। বাহ্‌! এখান থেকে ভিউটা তো চমৎকার! আমার রূমটাও এই সাইডে, কিন্ত দোতলা বলে কোন সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়না।
আমিঃ বসো, টেলিভিশন দেখো। আমি দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নেই। তারপর চা-নাশতা খাব।
সাশাঃ ওকে।
আমি অল্প সময়েই ফ্রেশ হয়ে নিলাম। দ্রুত ব্রেকফাস্ট আর চা রেডী করলাম। ব্রেকফাস্ট বলতে ডিমভাজী, ব্রেড, বাটার, স্মিতানা আর চা।
আমিঃ আয়োজন সামান্য। স্টুডেন্টস ব্রেকফাস্ট ।
সাশাঃ রিমন! আমি তোমার রুমে এই প্রথম? যা আছে ভালোই আছে। আমি কি এর চাইতে ভালো খাই? (একটু লাজুক হেসে বললো) তবে পরিমানে একটু বেশী খাই, আরকি।
আমিঃ তোমার এই বিশাল শরীরে (আমার তিনগুন হবে) বেশী খাবার তো লাগবেই।
সাশাঃ হা হা হা, তাঠিক।
আমিঃ তোমাদের ফুড প্রোডাক্টগুলো কিন্তু খুবই ভালো। আমাদের দেশে সব ভেজাল।
সাশাঃ কি বলো? ট্রপিকাল কান্ট্রিতে তো ফ্রেশ খাবার-দাবার থাকার কথা।
আমিঃ থাকার কথা, কিন্তু আমাদের গুনধর রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের কারণে, আমরা ভেজালের যুগে বসবাস করি।
সাশাঃ নট গুড।
আমিঃ এই যে বাটারটা দেখছ। এটার পুস্টিগুন অনেক বেশী, তাই এর রং গাঢ় হলুদ এমনকি অনেকটা কমলা রঙের। আমাদের দেশে বাটার ফ্যকাশে। তারপর এই স্মিতানা, এটা আমাদের দেশে নাইই।
সাশাঃ নাই মানে?
আমিঃ নাই মানে, নাই। আমি এই দেশে এসে প্রথম দেখলাম। আমাদের দেশে দই নামে কাছাকাছি একটা কিছু আছে, সেটা স্বাদ চমৎকার হলেও পুস্টিগুন তোমাদের স্মিতানার ধারে কাছেও না।
অনেকটা মর্মাহত ভঙ্গিতে চায়ে চুমুক দিলো সাশা।

টুক টুক টুক। আবারো দরজায় আবারো আওয়াজ। কামিং (বললাম আমি) দরজা খুলে ঢুকলো প্যালেস্টাইনের খালেদ ।

আমিঃ ওহহো, ওয়েল কাম, ওয়েল কাম।
খালেদঃ কেমন লাগছে নতুন রূম? নাকি ভুত তোমার পিছু পিছু এখানেও চলে এসেছে?
সাশাঃ হাঃ হ্‌ হাঃ! রিমনের প্রেমে পড়লে ভুত এখানেও চলে আসবে।
আমিঃ আপাততঃ মনে হচ্ছে প্রেমে পড়েনি। রাতে সাউন্ড স্লীপ হয়েছে।
সাশাঃ প্রেমে পড়লেই ভালো হতো। ভুতের সাথে প্রেম তো আর সচরাচর হয়না। একটা কাহিনীই হতো বটে!
আমিঃ হাঃ হাঃ হাঃ! ভালো বলেছ। তোমার প্রেমের খবর কি? ছোট ভাই প্রেম করে বিয়ে-শাদি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর তোমার এখন পর্যন্ত কোন গার্ল ফ্রেন্ডই নেই।
খালেদঃ কি বলো! সাশা তোমার গার্ল ফ্রেন্ড নেই! রেয়ার, রেয়ার, রাশানদের মধ্যে ভেরি রেয়ার কেস।
সাশাঃ তোমারও তো নেই রিমন। তোমার সাথে আমার কিন্তু বেশ মিল আছে। আমি মদ্যপান করিনা, তুমিও করোনা, আমার গার্ল ফ্রেন্ড নেই, তোমারও গার্ল ফ্রেন্ড নেই।
খালেদঃ হ্যাঁ, দুজনেই সহজ-সরল, সাদা মনের মানুষ। আমি অবশ্য তোমাদের মত না। স্বাভাবিক মানুষ, মদ খাই, গার্ল ফ্রেন্ড আছে।
আমিঃ গার্ল ফ্রেন্ড আবার বানিয়েছ নাকি?
খালেদঃ (লজ্জ্বা পয়ে) না, মানে, গার্ল ফ্রেন্ড ছিল, সে এখন স্ত্রী হয়ে গিয়েছে।
সাশাঃ স্ত্রী-র অজান্তে গোপনে আবার গার্ল ফ্রেন্ড-ট্রেন্ড বানাও নাই তো?
খালেদঃ না ভাই! বিয়ের পর ঐ অভ্যাস পরিত্যগ করেছি। এখন একান্ত পত্নিনিষ্ঠ ভদ্রলোক।
আমিঃ বাহ্‌, বেশ। এটাই ভালো।
খালেদঃ ভাবলাম, বিয়ের আগে যা হয়েছে হয়েছে। বিয়ের পর ক্লীন থাকবো।
সাশাঃ চা খাওয়া শেষ। চলো বাইরে বের হই।
খালেদঃ কোথায়?
আমিঃ এই আশেপাশেই।
খালেদঃ সুন্দরীদের খোঁজে?
সাশাঃ না জাস্ট ঘোরাফেরা আরকি।
খালেদঃ আর কত একা একা ঘোরাফেরা করবে, এবার জালে দু একটা আটকাও।
আমিঃ সাশা জাল ফেলতে পারেনা। সবাই কি আর জেলে! (কপট হাসি হাসলাম)।
খালেদঃ হু, আমাকে কটাক্ষ করা হচ্ছে। তা একসময় জাল ফেলেছি অনেক। এখন স্টপ, একদম স্টপ। এবার তোমাদের পালা। জাল ফেলতে না পারলে প্র্যাকটিস করো। আস্তে আস্তে রপ্ত হয়ে যাবে।
সাশাঃ মাছ যদি ধরা না দেয়?
খালেদঃ তোমরা অভিজ্ঞতাহীন। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। মাছ কিন্তু ধরা পড়ার জন্যই সাঁতরে বেড়ায়।
হাঃ হাঃ হাঃ, সবাই কোরাসে হাসলাম। এরপর আমরা বাইরে বের হলাম। খালেদ আমাদের সাথে এলো না। আমরা দুজনে ঘুরতে বের হলাম।

খারকভ শহরটি অনেক বড়। ৩১০ বর্গকিলোমিটার ক্ষেত্রফলের শহরটিতে মোট জনসংখ্যা দেড় মিলিয়ন। শহরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৬৫৪ সালে। এক সময় এটি সোভিয়ত ইউক্রনের রাজধানী ছিল। এখানে মোট ৬০ টি বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, ৩০ টি বিশ্ববিদ্যালয়, ৬ টি যাদুঘর, ৭ টি থিয়েটার ও ৮০ টি লাইব্রেরী রয়েছে। এত বেশী সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকার কারণে তরুণ-তরুণীদের সংখ্যাও এখানে অনেক, তাই একে তারুণ্যের শহরও বলা হয়। খারকভ শহরের আরেকটি খ্যাতি রয়েছে, বিশ্বের বৃহত্তম জেলখানা এখানে আছে।

সোভিয়েত শহরগুলোর রাস্তাগুলো অদ্ভুত সুন্দর। চওড়া রাস্তা তার দুপাশে গাছের চওড়া ফুটপাত। দুপাশের দুই ফুটপাতের পাশেই দুই সারিতে অর্থাৎ পুরো রাস্তায় মোট চার সারিতে গাছ। পথচারিরা নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে। ফলে পথও অত্যন্ত নিরাপদ। শহরের যোগাযোগের ব্যবস্থা সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যান্য শহরের মতই চমৎকার। মাটির উপরে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট হিসাবে চলছে বাস, ট্রলিবাস (বিদ্যুৎ চালিত), ট্রাম, আর মাটির নীচে রয়েছে ৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রো (সাবওয়ে), যার স্টেশন সংখ্যা ২৯ টি। যোগাযোগের খরচও খুব কম। কম্যুনিস্ট আমলে মাত্র তিন রুবল দিয়েই একটা মান্থলি কার্ড পাওয়া যেত, তাই দিয়ে আপার ও আন্ডারগ্রাউন্ড সকল পাবলিক ট্রান্সপোর্টে সারা মাস চলা যেত। এখন কিছুটা বেড়েছে তারপরেও খুবই কম। তাই আমরা মনের আনন্দে ঘুরতে পারি, যেখানে খুশী যেতে পারি।

আমি আর সাশা ঠিক করলাম আজকে মেট্রোতে চড়ে কয়েকটি স্টেশনে যাব, ঐ এলাকাগুলো ঘুরে ঘুরে দেখবো। সারাদিন ঘোরাঘুরি করলাম। বিভিন্ন মেট্রো স্টেশনে নামলাম। আশেপাশে ঘুরলাম। লাঞ্চ টাইমে একটা ক্যাফেতে বসে মুরগীর গ্রীল খেলাম। ইদানিং ক্যাফেগুলো ভালো চলতে শুরু করেছে। মাঝখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের ঠিক পরপর করুণ অবস্থা হয়েছিলো। কোথাও কোন ক্যাফে বা ক্যন্টিন ঠিকমতো কাজ করছিলো না। যাহোক ঘোরাঘুরি বেশ হলো। সন্ধ্যার দিকে মেট্রোতে চড়ে ডরমিটরির দিকে রওয়ানা হলাম। যেতে যেতে আলাপ হচ্ছিলো
আমিঃ আজ বেশ ঘোরাঘুরি হলো।
সাশাঃ হ্যাঁ, আমিও বেশ এনজয় করেছি। সাইট সিয়িং ভালো লেগেছে।
আমিঃ তুমি তো এদেশেরই, তোমার জন্য তো নতুন কিছু না।
সাশাঃ না ঠিক তা না। আমি এদেশের হলেও খারকভের না। আমি গ্রামের ছেলে। তাই খারকভে যা দেখছি তা তো আমার কাছে নতুনই।
আমিঃ সব চাইতে বেশী কি এনজয় করেছো?
সাশাঃ বলবো?
আমিঃ বলো।
সাশাঃ মেয়েদেরকে দেখা।
আমিঃ হাঃ হাঃ।
সাশাঃ কেন তুমি এনজয় করো নাই?
আমিঃ কেন এনজয় করব না? আমি তো তোমার মতই পুরুষ মানুষ। তাছাড়া যা সুন্দরী তোমার দেশের মেয়েরা। তার উপরে স্মার্ট, পোষাক-আশাক ফ্যাশনেবল।
সাশাঃ তারও উপরে এখন, সামার। মেয়েরা বেশ শর্ট ড্রেসে চলাফেরা করে। বেশীরভাগই তো মিনি স্কার্ট পড়া।
আমিঃ হু।
সাশাঃ হু কি? লক্ষ্য করোনাই?
আমিঃ চোখ যেহেতু আছে লক্ষ্য তো করবোই।
সাশাঃ হাঃ হাঃ, চলো নেমে যাই, আমাদের স্টেশন চলে এসেছে।

ডরমিটরিতে ফিরতে ফিরতে অন্ধকার হয়ে এলো। রূমে ফিরে এসে দেখলাম আমার রূমের সামনে অপু আর কবীর ভাই দাঁড়িয়ে আছে।
এই অপু ছেলেটাকে আমি ভীষণ অপছন্দ করি। ছেলেটা খারকভে থাকে কিন্তু পড়ালেখা কিছু করেনা। ওর বড়ভাই কার্তিক সিভিল ইন্জিনিয়ারিং পড়ে। ছোট ভাইকে এখানে নিয়ে এসেছে। দেশে সম্ভবত বখে যাচ্ছিল, কোন গতি করার জন্য এখানে এনেছে। এখানেও পড়ালেখা ও করতে পারছে না, পারার কথাও না, বাংলাদেশেই পারলো না, আর এই উন্নত দেশের পড়ালেখা বোঝার যোগ্যতা ওর কোথায় ঘটে কিছু থাকতে হবে তো।ও টুকটাক কাজটাজ কিছু করে। জিজ্ঞেস করলে বলে, “বিজনেস করি”। কি বিজনেস যে করে কে জানে। কয়েক বছর যাবৎ খারকভে এই সমস্যা হচ্ছে। একসময় ভালো ছাত্র ছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়নে স্কলারশীপ নিয়ে আসা সম্ভব ছিলনা। একেবারে ব্যতিক্রম কিছু যে ছিল না তা নয়। কম্যুনিস্ট পার্টি বা মিনিস্ট্রির মামা চাচার জোরেও দুএকজন এসেছিলো তারপরেও মিনিমাম একটা লেভেল ছিলো। এখন সেল্ফ ফাইনান্স বেসিসে পড়ালেখা চালু হওয়ায়, অনেক গরু-গাধাও প্রবেশ করছে। আবার কেউ কেউ দেশ থেকে শুধু এক বছরের টাকা নিয়ে এখানে আসে, আশা করে বাকী খরচ এখান থেকেই তুলতে পারে। যেটা আদতে সম্ভব হয়না। এবং ওদের শিক্ষা জীবনও ফার্স্ট ইয়ারেই শেষ হয়ে যায়।

কবীর ভাই বয়সে আমার বড়। কিন্তু পড়ালেখায় আমার জুনিয়র। দেশে থাকতে বাম রাজনীতি করতেন। রাজনীতিতে এতই বুদ হয়ে ছিলেন যে এইচ, এস, সি, পরীক্ষায় পেয়েছেন তৃতীয় বিভাগ। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ ছিল না। ইচ্ছাও ছিল বলে মনে হয়না। পড়ালেখা সব শিকেয় তুলে দিয়ে রাজনীতি করতেন। বাবার হোটেলে খেয়ে বনের মোষ তাড়াতেন। কোন এক নেতার দ্বারা সম্মোহিত হয়েছিলেন, যিনি তাদের বোঝাতে এইসব প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা কিছুনা। আসল পড়ালেখা হয় আমাদের লাইব্রেরীতে। কম্যুনিস্ট বিপ্লবের উপর পড়ালেখা হয় এখানে। তোমরা বিপ্লব করবে, সমাজ পরিবর্তন করবে, সেই বিষয়ে মনযোগ দিয়ে পড়ালেখা করবে আমাদের লাইব্রেরীতে। চোখে রঙিন স্বপ্ন নিয়ে কবীর ভাই ও তার বন্ধুরা সেই পড়ালেখা করতেন। এদিকে তাদের পুরাতন ক্লাসমেটরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রী কমপ্লিট করে, মাস্টার্স-এ ভর্তি হয়েছে। এসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটলো। সারা বিশ্বের বামপন্থীরা হতবাক হয়ে দেখলো, কেমন তাসের ঘরের মতো ভেঙে গেল তাদের আদর্শের প্রিয় রাস্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন। কবীর ভাইয়ের মত কর্মীরা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন – তাহলে কি এতকাল তারা যা বিশ্বাস করে এসেছেন সব ভুল? তাদের নেতারা কি তাদের সব ভুল শিখিয়েছে? নাকি তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই দাবার গুটির মত তাদের ব্যব হার করেছে? হায়রে যে বিপ্লবের জন্য আমরা সব কিছু বিসর্জন দিলাম, সেই বিপ্লবও হলোনা, আর নিজের তো কিছু হলোইনা।

অপু ও কবীর ভাই আমাকে দেখে উল্লসিত হয়ে উঠলো।
কবীর ভাইঃ কেমন আছেন?
অপুঃ অনেকক্ষণ যাবৎ অপেক্ষা করছি বস।
আমিঃ বাইরে গিয়েছিলাম। কেমন আছেন আপনারা?
কবীর ভাইঃ ভালো, আপনি কেমন আছেন?
অপুঃ আমি আছি কোনরকম। যে অবস্থা।
আমিঃ আসুন ভিতরে আসুন।

রূমের দরজা খুলে সবাই ভিতরে ঢুকলাম। উনারা ডিভানে বসলেন। আমি ইলেকট্রিক কেট্‌লে পানি চাপালাম, চা বানানোর জন্য।
স্রেফ আড্ডা দিতে উনারা এসেছেন, শুরু হলো নানা কথাবার্তা। আমরা বাংলাদেশীরা এক জায়গায় হলে রাজনীতির আলাপ না করে পারিনা।

কবীর ভাইঃ কি অবস্থা বলেন তো? এদেশের রাজনৈতিক অবস্থা কিরকম?
অপুঃ দুরো রাজনৈতিক অবস্থা! আপনি আছেন রাজনীতি নিয়ে। এদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ।
আমিঃ রাজনৈতিক অর্থনৈতিক দুটা অবস্থাই খারাপ।
কবীর ভাইঃ কম্যুনিস্টারা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পরিস্থিতি কেবল খারাপের দিকেই যাচ্ছে, তাইনা?
অপুঃ শুনেন কম্যুনিস্ট-ফমুনিস্ট না, অবস্থা এম্নিই খারাপ।
কবীর ভাই বিরক্ত দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালো। আসলে অপু নির্জ্ঞান একটা ছেলে। লিটারারী আলাপে ওর অংশগ্রহন বেমানান। কিন্তু ও ওর লিমিটেশন বোঝেনা। বুদ্ধিমান মানুষ সেই যে নিজের লিমিটেশন বোঝে। অপু বোকা তাই নিজের লিমিটেশন বোঝনা, উপরন্তু বুদ্ধিমান সাজার চেষ্টা করে।

আমিঃ আপনি কম্যুনিস্ট মানুষ, কম্যুনিস্টদের প্রতি আপনার সফ্‌ট কর্ণার থাকারই কথা। আসলে বিষয়টা বোধহয় সেখানে না।
কবীর ভাইঃ তাহলে কোথায়?
আমিঃ এদেশে এখনঝাই করাপশন। লুটতরাজ বেশী হচ্ছে।
কবীর ভাইঃ কে করছে লুটতরাজ? কি করে করছে?
আমিঃ ক্ষমতাসীনরাই লুটতরাজ করছে। তাদেরই সুযোগটা বেশী থাকে।
কবীর ভাইঃ কিভাবে করছে?
আমিঃ নানা পথে করছে। ক্ষমতাসীনরা বুদ্ধিমান হয়, পথঘাট তাদের জানা থাকে, অনেক সময় নিজেরাই পথ তৈরী করে নেয়।
কবীর ভাইঃ ডিটেইলস বলতে পারবেন?
আমিঃ আমি একজন সাধারণ ছাত্র, তাও বিদেশী, কতটুকুই আর বুঝি বলেন।
অপুঃ আরে, বাঙালী যত ছাত্র আছে খারকভে, এদের মধ্যে আপনার মাথায়ই কিছু মাল-মশল্লা আছে।
আমিঃ অপু আবার বেশী বলে ফেলছে। যাহোক, আমি যা বুঝি, লুটতরাজের একটা উপায় হচ্ছে প্রাইভেটাইজেশন।
কবীর ভাইঃ কম্যুনিজম যেহেতু নাই প্রাইভেটাইজেশন তো হবেই।
আমিঃ হ্যাঁ, এখানেই লুটতরাজের একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষমতাসীনরা, একটা বিশেষ কৌশলে সবকিছু নিজেদের নামেই করে নিচ্ছে।
কবীর ভাইঃ কিন্তু সেটা করছে কি করে?
আমিঃ অনেকটা আমাদের দেশের এরশাদী স্টাইলে।
কবীর ভাইঃ কি রকম?
আমিঃ এরশাদ যেমন বিজাতীয়করণের নামে রাষ্ট্রায়ত্ত অনেক প্রতিষ্ঠান নাম মাত্র মূল্যে তার চামচাদের হাতে তুলে দিয়েছিলো, সেরকম আরকি।

কবীর ভাই একটু বিমর্ষ হলেন। কিছু বলতে যাবেন এই সময় অপু বললো,

অপুঃ হা হা হা এরশাদ! এই এরশাদ বুঝলেন, যা করছে! কবীর ভাই আবারো বিরক্ত চোখে ওর দিকে তাকালেন। তবে এবার মনে হলো তিনি আক্রমণাত্মক কিছু বলবেন।

কবীর ভাইঃ কি, এরশাদ আবার কি হলো?
অপুঃ আরে এরশাদকে নিয়ে কত কাহিনী!
কবীর ভাইঃ কিসের আবার কাহিনী?
অপুঃ না, মানে কত কিছু শোনা যায়না?
কবীর ভাইঃ কি শোনা যায়?
অপুঃ ঐ যে নারী ঘটিত কত কিছু।
কবীর ভাই মনে হলো মনে মনে একটু ক্ষেপেই গিয়েছেন। কারণ অপু নিজেই ঐ চরিত্রের। সোভিয়েত ইউনিয়নে আসার পর থেকে, যত সব বাজারের মেয়েমানুষ নিয়ে ওর কেচ্ছা-কাহিনী। তার মুখেই আবার সমালোচনা শুনে কবীর ভাইয়ের মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে গেল।
কবীর ভাইঃ তা এরকম মানুষ কি কম আছে নাকি? (সরাসরি অপুকে আক্রমণ না করে ইনডায়েরেক্টলি বললেন)
অপুঃ না মানে অনেক কিছু সোনা যায় এরশাদ সম্পর্কে।
কবীর ভাইঃ তা এরকম মানুষ কি কম আছে?
অপুঃ কিন্তু এরকম করা তো ঠিক না।
(ভুতের মুখে রামনাম শুন মনে মনে আমিও বেশ কৌতুক অনুভব করলাম। এবং নীরবে শুনতে লাগলাম, তাদের কথপোকথন কোনদিকে যায়।)

কবীর ভাইঃ শুনেন অপু। এরশাদের কাছে মেয়েরা যাবেনা কেন বলুন? প্রথমতঃ এরশাদ অত্যন্ত ক্ষমতাবান একজন ব্যক্তি। দ্বিতীয়তঃ তিনি সুদর্শন। তৃতীয়তঃ তিনি অসম্ভব ধনী। সুতরাং তার কাছে মেয়েরা যাবেই। এই নিয়ে আপনার দুশ্চিন্তা না করলেও চলবে।
কবীর ভাইয়ের এরকম ঝটিকা আক্রমণে, অপু একেবারে হাবুগবু হয়ে গেল। তবু ওর ক্ষুদ্র মস্তিস্কে কবীর ভাইয়ের মিশ্রির ছুড়ি ধরতে পেরেছে কিনা সেটা হলো কথা।

পাঁচতলার ৮৮ নং রূমটা ভালোই লাগছে। এক সপ্তাহের মত হয়ে এলো ভুতের ভয় এতদিনে দূর হয়ে গেছে। সামার ভ্যাকেশন চলছে ক্লাস-ট্লাস কিছু নাই। দিনের বেলা বাইরে ঘোরাঘুরি করি। রাতে কিছু সময় টেলিভিশনে ফিল্ম দেখে আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে কাটে। সাশা আসে, খালেদ আসে, ইউরা আসে, মেক্সিকোর খোসে আসে, এঙ্গোলার দানিয়েল আসে, পেরুর মারিতা আর কলাম্বিয়ার খোরকে (ওরা দম্পতি) আসে। এরকম অনেকেই আসে। সবার সাথে বসে চা-টা খাই গল্প-গুজব করি, টেলিভিশন দেখি। আমার রুমটা একটা ক্লাবের মতই হয়ে গিয়েছে।

একদিন খুব ভোরে ছাদে কিসের যেন আওয়াজ শুনলাম। ঘুম ভেঙে গেল। প্রথম ধাক্কায় ভড়কে গিয়েছিলাম। আবারো ভুত নয়তো? ঘুমটা ভালোভাবে ভাঙার পর বুঝলাম, না ভুত-টুত না। সম্ভবত উপরে কেউ কিছু করছে। ছাদে তো ওঠা নিষেধ। তাছাড়া ছাদে ওঠার এক্সিটটা সবসময় বন্ধই থাকে। তাহলে বোধহয় কোন কাজটাজ চলছে। সামারে ডরমিটরিতে অনেক রকম মেরামতের কাজ চলে। কৌতুহল চেপে না রাখতে পেরে, হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে সিঁড়িঘরের দিকে গেলাম।

ডরমিটরির যে দুটো সিঁড়ি আমরা ব্যবহার করি সেগুলো পাঁচতলা পর্যন্ত। সিঁড়ি দুইটি ছাদ পর্যন্ত যায়নি। ইচ্ছাকৃতভাবেই করা হয়েছে, কারণ আইনতঃ ছাদে ওঠা নিষেধ। তাহলে কি ছাদে ওঠার কোন ব্যবস্থাই নেই? না, আছে। তার শেষ মাথায় একটা এক্সিট আছে। স্কয়ার সাইজ একটি দরজা এক্সিটটিকে আটকে রাখে। সবসময়ই দরজাটা তালাবদ্ধ থাকে। আজ আমি ঐ দিকে তাকিয়ে দেখলাম, কোন তালা নেই বরং দরজাটি খোলা, আর সেই ফাক গলে অঝোর ধারায় সোনালী রোদ ঝরে ঝরে পরে সিঁড়িঘরের আলো কয়েকগুন বাড়িয়ে দিয়েছে।খুব সিডাকটিভ মনে হলো। ভাবলাম উঠে যাই ছাদে। ছাদে ওঠা অনিয়ম, আইনে নাই, দুরো গুল্লি মারি আইনের। উঠব ছাদে, দেখবো, ডরমিটরির ছাদ থেকে চারপাশের দৃশ্যটা কেমন সুন্দর দেখা যায়। যেই ভাবা সেই কাজ। ঝটপট মই বেয়ে উঠে এক্সিটের ফাঁক গলে বেরিয়ে এলাম ছাদে।

বাহ্‌ বেশ সুন্দর তো! সামনে ছবির মত দৃশ্য। ডরমিটরির উত্তর দিকে অর্থাৎ ফ্রন্ট সাইডের একপাশে আছে একঝাক গাছপালা যার প্রথম দ্বিতীয় সারিতে আছে ঐ বিরিওজা গাছগুলো। তার পিছনে আছে আরো কিছু পাঁচতলা ডরমিটরি ও এ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং। তারও পিছনে হালকা দেখা যাচ্ছে লেকের দৃশ্য। ঐ লেকেই কয়েকদিন আগে বেড়াতে গিয়েছিলাম। আমার কাছে মনে হয় ওটাই খারকভের সব চাইতে মনোরম জায়গা। উঁচু-নীচু ছোট-ছোট টিলায় ভরা খারকভ শহর। লেকের পিছনে টিলার পিছনে হালকা বনের দৃশ্য চোখে পড়ে কেমন স্বপ্নিল মনে হয় দিগন্তকে। দক্ষিণ দিক অর্থাৎ যেদিকটায় আমার বর্তমান রূম, সেখানে ডরমিটরির ঠিক পিছন দিকটা খালি। আসলে ওখানে একটা আন্ডারগ্রাউন্ড গ্যারেজ রয়েছে। খারকভ শহরের পশ লোকজন ওখানে তাদের গাড়ী রাখেন। তার পিছনে সারি সারি এ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং। তবে দালান গুলো পর্যাপ্ত পরিমানে জায়গার ব্যবধান রেখে করা, ঢাকার মত গায়ের উপর গা এসে পরা দালানের মত না। দালানগুলোর ফাকে ফাকে রয়েছে বিভিন্ন রকম গাছের সারি। পূর্ব দিকেও অনুরূপ দৃশ্য, আর ঐ দিকটায় শহর অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত আমি জানি। পশ্চিম দিকে দেখা যাচ্ছে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত গীর্জা, কম্যুনিস্ট শাসনামলে এই গীর্জা ধ্বংস করা হয়েছে। নাস্তিক শাসক ইউজেফ স্তালিন (যোসেফ স্ট্যালিন)-এর নির্দেশে এটা করা হয়েছিল। ধর্মের প্রতি কি প্রবল আক্রোশ ছিল এই কম্যুনিস্টদের। আমি মাঝে মাঝে ভাবি এই কম্যুনিস্টরা বাক স্বাধীনতার পূর্ণ সুযোগ গ্রহন করে কিন্তু ক্ষমতার আসনে বসার সাথে সাথে প্রথম সুযোগেই তারা বাক স্বাধীনতাকে হরণ করে। এত আঘাতের পরেও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে অপূর্ব কারুকাজ করা গীর্জার চূড়াটা।

আমি আগে কখনো কবীর ভাইয়ের ডরমিটরিতে আসিনি। উনি অনেকবার বলেছিলেন। ঠিকানা দিয়েছেন কয়েকবার। আজ ঠিক করলাম কবীর ভাইয়ের ডরমিটরিতে যাবো। যেই ভাবা সেই কাজ। আতাকারা ইয়ারোশা থেকে ট্রলিবাসে উঠে গেলাম। শহর ও গাছপালার মনোরোম দৃশ্য দেখতে দেখতে দশটি স্টপেজ পর পৌঁছে গেলাম আলেকসিয়েভ্‌সকায়ার স্টুডেন্টস্‌ টাউনে। উনাদের ডরমিটরিটা হাই রাইজ। ১১ তলা। অনেকগুলো ব্লক। লিফটে করে আটতলায় উঠে গেলাম। আটটি রুমের মাঝখানে একটি কমন কিচেন আছে। ওখানে দেখলাম কবীর রান্না করছেন। আমাকে দেখে ছুটে এলেন তিনি।

কবীর ভাইঃ আরে রিমন ভাই দেখছি!
আমিঃ চলে এলাম।
কবীর ভাইঃ এযে মেঘ না চাইতে জল! কি সৌভাগ্য আমার!
আমিঃ আরে কি যে বলেন! আমরা সবাই সাধারণ মানুষ। কোনটা আপনার রুম?
কবীর ভাইঃ এই তো ডান পাশে চলুন।
রূমের ভিতরে ঢুকে দেখলাম, আশরাফ ভাই বসা। তিনিও এই ডরমিটরিতেই থাকেন। কবীর ভাইয়ের বন্ধু, একসাথেই পড়েন। আমাকে দেখে বললেন
আশরাফ ভাইঃ কি আস্চর্য্য!
আমিঃ আস্চর্য্যের কি হলো?
আশরাফ ভাইঃ ভাবছিলাম আজ একফাকে আপনার রুমে একটু যাব।
আমিঃ যাওয়া আর হলোনা, আমি নিজেই চলে এলাম।
আশরাফ ভাইঃ তাই তো দেখছি, আমাদের সৌভাগ্য!
কবীর ভাইঃ আমি ভাবতেই পারিনি যে, আপনি কখনো আমাদের রুমে আসবেন!
আমিঃ এটা বেশী হয়ে গেল কবীর ভাই। আমি কি মানুষ নই? বাহ্‌ আপনার জানালা দিয়ে বাইরের ভিউ খুব সুন্দরতো। বিল্ডিং-টিল্ডিং কিছুই তো নেই। শুধু বন আর টিলা। বেশতো!
কবীর ভাইঃ হ্যাঁ, এদিক থেকে এটাই খারকভের শেষ মাথা।
আমিঃ আমি জানতাম, এখন নিজের চোখে দেখলাম।
কবীর ভাইঃ আজ না খেয়ে যেতে পারবেন না। আপনার রুমে আমরা অনেক বার খেয়েছি। আজ আমাদের একটু খেদমত করার সুযোগ দিন।
আমিঃ আরে ওটা কিছু না। ঠিক আছে খেয়েই যাবো। আপনার রুমটা আমার ভালো লেগেছে।
কবীর ভাইঃ এভাবে একা একটা রুম আমার পাওয়ার কথা ছিল না। একা রুম পাওয়ার বুদ্ধিটা আপনিই কিন্তু আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন।
আমিঃ হু আমার মনে আছে।
আশরাফ ভাইঃ সুখে-দুঃখে আপনার পরামর্শই তো আমরা বরাবর পেয়েছি।
আমিঃ থাক, সেটা কিছুনা। এই বিদেশ বিভুঁয়ে আমরা যদি একে অপরের হাত ধরে হাত ধরে চলতে না পারি, তাহলে বাঁচবো কি করে।

রান্না-বান্নার আয়োজন শুরু হয়ে গেল। উপর তলায় শিশির ভাইকেও দাওয়াত দেয়া হলো। কবীর ভাইয়ের রূমে জমিয়ে আড্ডা বসালাম আমরা।
একটু পরে মিনহাজ ভাই এসে উপস্থিত। খারকভ কালচারাল ইনস্টিটিউটে পি, এইচ, ডি করেন। তিনি সোভিয়েতে আন্ডারগ্র্যাড করেননি। দেশে পড়ালেখা করেছেন চিটাগাং ইউনিভার্সিটিতে, এখানে পি, এইচ, ডি করতে এসেছেন, লাইব্রেরী সায়েন্সে। যারা সোভিয়েতে আন্ডারগ্রেড করেনি বাংলাদেশে করেছে, ইনাদের নিয়ে বেশ সমস্যা হয়। দেশে লেখাপড়ার মান নীচু হওয়ায়, এখানে এসে খাবি খায়। তিন বছরের জায়গায় ছয়-সাত বছর লাগে পি, এইচ, ডি করতে। মিনহাজ ভাইয়েরও একই অবস্থা, সাত বছর হয়ে গেল এখনো শেষ করতে পারছেন না। স্কলারশীপটাও জোগার করেছিলেন মিনিস্ট্রিতে কোন এক আত্মীয় ধরে। ঘুষ দিয়েছেন বলেও সোনা যায়। তবে কথা বলেন খুব বড় বড়। বাকপটুতায় ওস্তাদ। তার সাথে বসলে দুয়েক মিনিট পরেই রাজনীতির আলাপ জুড়ে দেন। চিটাগাং ইউনিভার্সিটিতে থাকাকালীন সময়ে কি কি রাজনীতি করে দেশোদ্ধার করেছেন। কোন হরতালের সময় কয়টা গাড়ী ভেঙেছেন, কোন নেতার সাথে তার কত পেয়ারের সম্পর্ক ইত্যাদি, ইত্যাদি। তথাকথিত প্রগতিশীলতার একটা ভান ধরেন।

আমাদের গল্পগুজব চলা কালে প্রিন্স ভাই এলো। বেশ ভদ্র। দাড়িওয়ালা পরহেজগার মানুষ। আমরা ঠাট্টা করে বলি, “বাবা নাম রেখেছে প্রিন্স আর আপনি হয়ে গেলেন মোল্লা। আবার খোঁজ নিলে হয়তো দেখা যাবে কারো বাবা হয়তো নাম রেখেছে মোল্লা, কিন্তু সে হয়ে গেছে প্রিন্স “। প্রিন্স ভাই হাসেন, কিছু বলে না। বুঝতে পারেন, আমরা ঠাট্টা করছি। প্রিন্স ভাই বয়সে মিনহাজ ভাইয়ের সমানই হবে। সেও দেশে পড়ালেখা করেছে । দু বছর হয় এখানে এসেছেন, তবে পড়তে আসেননি। কোন একটা ইনস্টিটিউটে নামমাত্র ভর্তি হয়ে আছেন, ভিসা ঠিক রাখার জন্যে। মূল উদ্দেশ্য ইউক্রেনকে ট্রান্‌জিট হিসাবে ব্যবহার করে জার্মানী বা ওয়েস্ট ইউরোপের কোন দেশে যাবেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হওয়ায়, স্রেফ ভাগ্যের অন্বেষণে, আজকাল অনেকেই এটা করছে। খারকভ শহরেই বিশ-পচিশজন এরকম বাংলাদেশী পাওয়া যাবে।

আমরা নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলাম। ছেলেরা একসাথে গল্প-গুজবে বসলে সাধারণতঃ দুটো টপিক সেখানে প্রাধান্য পায়, মেয়ে আর রাজনীতি। আমাদের এই আড্ডায় সিনিয়র-জুনিয়র একসাথে আছি তাই মেয়েমানুষ নিয়ে আলাপ করা সম্ভব না। সেকারণে রাজনীতিই প্রাধান্য পাচ্ছিলো।
মিনহাজ ভাই কথায় কথায় প্রগতিশিলতার ভাব দেখানোর জন্য ধর্মকে আক্রমণ করে কথা বলে উঠলেন। এতে পরহেজগার প্রিন্স ভাই একটু বিরক্ত হলেন
প্রিন্স ভাইঃ এভাবে কথা বলা তো ঠিক না। মানুষের আবেগ অনুভূতিকে সম্মান করা উচিৎ।
মিনহাজ ভাইঃ ফ্রীডম দরকার, ফ্রীডম
প্রিন্স ভাইঃ ফ্রীডম বলতে আপনি কি বোঝেন?
মিনহাজ ভাইঃ ফ্রীডম, আমার খুশী মত কাজ করতে পারা।
প্রিন্স ভাইঃ তাই? মনে করেন আপনি দাঁড়িয়ে আছেন, আমি আপনার পায়ের উপর একটা পারা দিলাম। আপনি প্রশ্ন করলেন, পায়ে পারা দিলেন কেন? আমি বললাম এটা আমার ফ্রীডম, আপনি কি মনে করেন যে আমি কাজটা ঠিক করেছি
মিনহাজ ভাইঃ (একটু আমতা আমতা করে) না না। ব্যপারটাতো ফিজিকাল। এখানে পুরোপরি ফ্রীডম দেয়া যায়না।
প্রিন্স ভাইঃ ও আচ্ছা এখন আপনি ফ্রীডমকে কনফাইনড্‌ করতে চাচ্ছেন। তাহলে কোন ফ্রীডম আপনি চান।
মিনহাজ ভাইঃ আমি ফ্রীডম অব স্পীচের কথা বলছি।
প্রিন্স ভাইঃ ফ্রীডম অব স্পীচ মানে কি? যা খুশী তাই বলতে পারা?
মিনহাজ ভাইঃ হ্যাঁ তাইতো।
প্রিন্স ভাইঃ যা খুশী তাই বলা কি ঠিক?
মিনহাজ ভাইঃ হ্যাঁ ঠিক
এবার প্রিন্স ভাই একটু আক্রমণাত্মক হয়ে বললো।
প্রিন্স ভাইঃ মাফ করবেন, আমি যদি বলি, আপনার বাবা একটা কুত্তার বাচ্চা ছিল, আর আপনার দাদা ছিল একটা শুয়োরের বাচ্চা, আর আপনার বৌ কি করতে জানেন?…………।
প্রিন্স ভাইকে মিনহাজ ভাই আর কথা শেষ করতে দিলেন না। চোখ-মুখ লাল করে ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন,
ঃ কি যাতা বলছেন?
প্রিন্স ভাইঃ বাহ্‌, আপনিইতো এলাউ করেছেন, ‘ফ্রীডম অব স্পীচ’!
উভয়ের এরকম আক্রমণাত্মক আচরণে আমরাও একটু হকচকিয়ে গেলাম, আবার না হাতাহাতি বেধে যায়। এরপর আমি একটু নরম সুরে বললাম।
আমিঃ শুনুন, মিনহাজ ভাই কালজয়ী লেখক লেভ তলস্তয় বলেছেন, ‘লিভিং ইন দ্যা সোসাইটি, উই কান্ট এনজয় এ্যাবসোলুট ফ্রীডম’।
এবার মিনহাজ ভাই উঠে দরজা খুলে গটগট করে বেরিয়ে গেলেন।

এরমধ্যে একদিন স্টুডেন্ট টাউনে অনেক নতুন ছেলেমেয়েদের দেখতে পেলাম। প্রতি বছরই এটা ঘটে। ইউক্রেণের বিভিন্ন জায়গা থেকে ছেলেমেয়েরা ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসে। আমাদের ডরমিটরিতেও অনেককে দেখলাম। সামারে বেশীরভাগ সময় ডরমিটরি খালিই থাকে যেহেতু ছুটি কাটাতে সবাই বাড়ী চলে যায়। কিন্তু দুতিনটা দিন ভর্তিচ্ছুদের কলকাকলীতে মুখর থাকে ডরমিটরি । এদের মধ্যে থেকে যারা কোয়ালিফাই করবে তাদেরকেই এখানে দেখা যাবে সেপ্টেম্বর থেকে।

সাশা এরমধ্যে সাতদিনের জন্য গ্রামের বাড়িতে গেল। আমাকে বললো, “যাবে নাকি আমার সাথে, চলো দেখে আসি আমাদের গ্রাম”। আমি বললাম এবার থাক, ” পরে যাব কোন একসময়”। ও ঘুরে এলো। আমার জন্য নিয়ে এলে এক ব্যাগ ফল, চেরি, ভিশনা, পেরসিক, স্লিভা, ইত্যাদি। চেরি ফলটা আমি খুব বেশী পছন্দ করি। সাশা শ অন্যান্য বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে বেশ মজা করে খেলাম। দেখতে দেখতে সামার ভ্যাকেশন শেষ হয়ে গেল।

এখানে ক্লাশ শুরু হয় পহেলা সেপ্টেম্বর। সারা ইউক্রেণ জুড়ে, স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। দিনটিকে নাম দিয়েছে ‘নলেজ ডে’। আমি এই দিনটাতে ক্লাশ মিস দেইনা। খুব এনজয় করি আমি দিনটা। সবচাইতে বেশী এনজয় করে যারা নতুন ভর্তি হয়েছে তারা। সদ্য স্কুল সমাপ্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেছে, বড় হয়ে গিয়েছে, সেই আনন্দ। নতুন জগত দেখার আনন্দ। সবচাইতে বেশী আনন্দ ঝিকিমিক করে ওঠে চোখের নতুন স্বপ্নে।

আমাদের ডরমিটরিতে স্টুডেন্ট সব ছুটি শেষে চলে এসেছে। আরও এসেছে নতুন ছাত্র-ছাত্রীরা। এই সময়টায় অনেক সিনিয়র ছাত্র বেশ তৎপর হয়ে ওঠে নতুন মেয়েদের সাথে খাতির জমাতে। রাফ ল্যগুয়েজে ওরা বলে ফ্রেশ গার্লস। ওদের মধ্যে উদ্যম থাকে কম না। ওরাও ছুটোছুটি শুরু করে ডিসকোতে যায়। এর ওর সাথে পরিচিত হয়। ধীরে ধীরে রূমে যাতায়াত শুরু হয়।

আমার উল্টা দিকের রুমে থাকে এ্যঙ্গোলার দানিয়েল। ছেলেটি খুব ভদ্র, তবে আলুর দোষ আছে। প্রায় সময়ই ওর রূমে নতুন নতুন মেয়ে দেখতে পাই। পহেলা সেপ্টেম্বরের পর প্রথম উইক এন্ড। বিকালের দিকে আমার রূমে কোন গেস্ট ছিলনা। বোরিং ফীল করছিলাম। ভাবলাম যাই একটু দানিয়েলের রূমে। দরজা নক করতেই ও দরজা খুলে আমাকে দেখেই বললো, “ওয়েলকাম, ওয়েলকাম”। আমি ভিতরে ঢুকে দেখলাম, নতুন একটি মেয়ে ওকে আগে কখনো দেখিনি। ভাবলাম এ আর এমন কি? দানিয়েলের রুমে তো প্রায়ই নতুন মেয়ে দেখা যায়। পরক্ষণেই মনে হলো। ময়েটা সেরকম নয়। খুব অল্প বয়স, এবং বেশ ভদ্র। নতুন ছাত্রী হবে বোধহয়। যা ভেবেছিলাম তাই। দানিয়েল আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলো, “তাতিয়ানা ও রিমন, রিমন ও তাতিয়ানা। নতুন ছাত্রী ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছে, আমাদের ডরমিটরিতেই রূম পেয়েছে “। ইউক্রেনীয় ললনা তাতিয়ানা ডাগর দুটি চোখ মেলে আমার দিকে তাকালো। পরক্ষণেই ও চোখ দুটি নামিয়ে নিল। একটি চঞ্চল হরিনী যেন হঠাৎ লজ্জ্বাবিধুর জড়োসড় হয়ে গেল। এদেশের মেয়েরা বেশ স্মার্ট, সাধারণত এমন করেনা। প্রথম দেখায়ই ও হঠাৎ কেন এমন লাজুকলতা হয়ে গেল? হঠাৎ কাব্য চলে এলো আমার মনে। ভাবলাম মেয়েটার একটা নাম দেয়া যাক। কি নাম দেয়া যায়? মেয়েটি বসেছিলো দানিয়েলের রূমের জানালার পাশে। ঠিক ওর পিছনেই ছিল এক সারি বিরিওজা গাছ। ইংরেজীতে এই গাছগুলোকে বার্চ গাছ বলে। সদ্য যৌবনা বালিকা বসে আছে, তার পিছনে বার্চ তরুর সারি, দৃশ্যটা খুব অপরূপ মনে হচ্ছিলো, তার সাথে মিল রেখে ওর নাম দিয়ে ফেললাম – বার্চ বনের প্রণরেনী।

বাকি পর্বগুলো (৫, ৬,৭,৮ ও ৯) পড়তে এখানে ক্লিক করুন