Categories
অনলাইন প্রকাশনা ইতিহাস রহস্য ও অপরাধ

মমিঃ এক বিস্ময় – ১

———————- ডঃ রমিত আজাদ

মানুষ প্রিয়জনকে ভালোবাসে। তাকে সারাক্ষণ কাছে পেতে চায়। তাকে হারাতে চায়না। কিন্তু এই প্রকৃতি জগৎ বড় নিষ্ঠুর। প্রিয়জনকে চিরকাল কাছে রাখার আকুতি যতই প্রবল হোক না কেন, প্রিয়জনকে না হারানোর বাসনা যতই তীব্র হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত তাকে হারাতেই হয়। সব রকন বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে যতই সে কাছে থাকুক না কেন, প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে একদিন না একদিন তাকে ধরা দিতে হয় মৃত্যুর কাছে। মানুষ মরণশীল জানি মৃত্যু অবধারিত জানি তারপরেও মন মানতে চায়না। তাই প্রিয়জনকে সমাধিস্ত করার পরও বারবার তার সমাধিতে যাই। অনুভব করতে চাই সে(তিনি) এখানেই আছে। ধরা যায়না, ছোঁয়া যায়না, দেখা যায়না, তারপরেও ভাবতে চাই সে(তিনি) আমার কাছেই আছে। আর মনে সুপ্ত বাসনা জাগে যদি তাকে দেখা যেত!

সম্ভবত এই অনুভূতি থেকেই পৃথিবী থেকে চলে যাওয়া প্রিয়জনের দেহকে চিরকাল সংরক্ষণ করে রাখার চিন্তা মানুষের মাথায় আসে। আর তা বাস্তবায়ন করার কৌশলও মানুষ আয়ত্ত করে ফেলে। সেই কৌশলই হলো মৃতদেহকে মমি করে ফেলা।

মমি শব্দটির বুৎপত্তি মূলত আরবী শব্দ mūmiya (مومياء) এবং ফারসী শব্দ mūm (wax, মোম) থেকে। এর মানে এমবাল্মড করে রাখা মৃতদেহ। মমি দুইভাবে হতে পারে, এক, প্রাকৃতিকভাবে (বিশেষত তুহীন ঠান্ডায় জমে যাওয়া মৃতদেহ), দুই, কৃত্রিমভাবে, নানা কৌশলে তৈরী করা হয় কৃত্রিম মমি।

চিনচরোদের মমি
মমি বলতে চোখের সামনে ভেসে ওঠে মিসরের মরুভূমি, পিরামিড আর ফারাও। ১৯২২ সালে ভ্যালি অব কিংসে হাওয়ার্ড কার্টার, লর্ড কারনার্ডনের খননকাজে ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিসরের তরুণ রাজা তুতোনখামেনের মমি আবিষ্কারের পর পৃথিবীজুড়ে দারুণ হৈচৈ পড়ে যায়। মমির সঙ্গে মিসরের নামটা এভাবে জড়িয়ে আছে_ যেন মিসরীয়রাই মমির প্রথম এবং একমাত্র কারিগর। এ ধারণা পুরোপুরি ভুল। মিসরীয়দের অনেক আগেই এই কৃতিত্ব পকেটে পুরেছিল যারা, তারা উত্তর চিলি এবং দক্ষিণ পেরুর চিনচরো। মিসরীয় সভ্যতা শুরুর এক হাজার বছর আগে চিনচরো সভ্যতা লুপ্ত হয়ে যায়। উষ্ণ ও পানিহীন পরিবেশে ১০ হাজার বছরের পুরনো নরদেহগুলো আজও অবিকৃত রয়েছে।

দক্ষিণ আমেরিকার ক্যামারোনাইস উপত্যকা থেকে পাওয়া একটি চিনচরো উপজাতির শিশুর মমিতে রেডিও কার্বন ডেটিং টেস্ট করে দেখা যায়, সে মমি তৈরি করা হয়েছে ৫ হাজার ৫০ পূর্বাব্দে, অর্থাৎ মিসরীয়দের থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগে! মিসরীয়রা মমি বানানোর কৌশল রপ্ত করেছিল তিন হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দে।

চিনচরোরা বসবাস করত সমুদ্রতীরে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে। তারা চাষাবাদ জানত না। তাদের খাদ্য ছিল শুধু সামুদ্রিক মাছ, সি-লায়নের মাংস। চিলির প্রাচীনতম মমির দেহের চারপাশে মিসরের মমির মতো মৃৎপাত্র, কাপড়-চোপড়, স্বর্ণালঙ্কার, অর্থকড়ি পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেছে মাছ ধরার সামগ্রীর মতো সাধারণ সব জিনিসপত্র। কিন্তু তাদের মমি তৈরির পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত উন্নত। চিনচরোরা বিশ্বাস করত মৃত্যুতেই শেষ নয়, তারপরও থাকে আর এক জীবন। এই বিশ্বাস থেকেই মমি তৈরির শুরু। মিসরীয়রা যেখানে মমি করার সময় ব্যবহার করত কোনো অজ্ঞাত রাসায়নিক, সেখানে চিনচরোরা অবলম্বন করত এক ‘ইকো ফ্রেন্ডলি’ পদ্ধতি।

মমি তৈরির আগে তারা মৃতের হাত-পা কেটে গরম ছাই ঘষে শুকিয়ে ছোট কাঠি আর ঘাসের বাঁধনে শরীর পুনর্গঠন করত। তারপর মাথার খুলির ভেতর ঘাস, চুল আর ছাই ভরে চামড়া লাগিয়ে দেওয়া হতো। ঠিক যেমনভাবে আজকাল জীবজন্তুর দেহ ‘স্টাফ’ করা হয়। মৃতের নিজস্ব চামড়া ছাড়াও সিল ও পেলিকানের চামড়ায় মৃতদেহ ঢেকে দেওয়া হতো। শেষে মুখ ও শরীরে ছাইয়ের প্রলেপ দিয়ে লাল-কালো রংয়ে সাজানো হতো মমি। মাথায় লম্বা চুলে এদের অনেক জীবন্ত লাগত। তারপর মূর্তিপূজার মতো ওই স্টাফ করা দেহকে সামনে বসিয়ে সারা হতো মৃতের পারলৌকিক কাজকর্ম। মমি তৈরির পরপরই সেগুলোকে মাটিতে পুঁতে ফেলা হতো না। কোনো কোনো মমির মুখে রঙের কয়েক রকমের প্রলেপ দেখা গেছে। কেন চিনচরো সভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে যায় তা স্পষ্ট নয়। তাদের অনেক ধর্মীয় আচার-আচরণ ইনকাদের ধর্মবিশ্বাসের মতো ছিল বলে গবেষকরা মনে করেন। চিনচরোদের মধ্যে উন্নত জীবনধারার প্রচলন ছিল এবং বিকশিত সভ্যতার প্রকাশ ঘটেছিল। সুনিপুণভাবে সংরক্ষিত এই মমিগুলোর নিদর্শন থেকে তা বুঝতে কষ্ট হয় না। কেন চিনচরো জনগোষ্ঠীর মধ্যে মমি তৈরির ধারণা জন্মায়, তার কারণ আজও অস্পষ্ট

৫০০ বছর আগের অক্ষত কিশোরী!
দক্ষিণ আমেরিকার সর্বোন্নত জাতি ছিলো ইনকারা। তাদের অতি উন্নত সভ্যতার সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে মাচুপিচু শহর। বর্তমান পেরু ও বলিভিয়ায় ছিলো তাদের বসবাস। অশেতাঙ্গ পেরুভিয়ান ও বলিভিয়ানরা তাদেরই উত্তর পুরুষ। এই ইনকারাও মমি তৈরীর কৌশল জানতো।
৫০০ বছর আগে মারা যাওয়া পেরুর বিস্ময়কর ইনকা সমপ্রদায়ের ১৫ বছর বয়সী বালিকা ‘ল্য দোঞ্চেলা’। এতকাল আগের বালিকার মৃতদেহ একেবারেই জীবন্ত মনে হয়। কিন্তু কিভাবে সম্ভব? ইতিহাস বলছে, শিশু-কিশোরদেরকে সৃষ্টিকর্তাদের উদ্দেশে বলি দেয়ার রেওয়াজ ছিল ইনকাদের। তারপর মারা যাওয়া শিশুদের স্রষ্টারই সম্মানে মমি করে রাখা হতো। ‘ল্য দোঞ্চেলা’ নামের এই বালিকার মমিটিকে ১৯৯৯ সালে বিস্ময়কর মাচুপিচু নগরীর লুলাইকো আগ্নেয়গিরির ৬,৭৩৯ মিটার (২২,১১০ ফুট) উঁচুতে আবিষ্কার করেন একজন আর্জেন্টাইন পেরুভিয়ান অভিযাত্রী। বিজ্ঞানী ও গবেষকরা বলেন, ল্য দোঞ্চেলার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এখনও অক্ষত রয়ে গেছে এবং মনে হচ্ছে সে কেবল কয়ে কসপ্তাহ আগে মারা গেছে। তার অক্ষত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দেখে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে কোন ঔষুধ বা নেশা জাতীয় দ্রব্য খাইয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। তবে, চুল পরীক্ষা করেই তার মৃত্যুর সময় নির্ণয় করেন গবেষকরা।

কিভাবে করা হতো মমি
মিসরীয়দের বিশ্বাস ছিল, মৃত্যুর পরও মানুষের জীবনের অস্তিত্ব থাকত। তাই তারা মৃত্যুর পর আত্মীয়-স্বজনের দেহকে আগুনে পোড়াত না বা স্বাভাবিক পদ্ধতিতে কবরস্থ করত না। যীশু খ্রিস্টের জন্মের প্রায় তিন হাজার বছর আগে তারা ভূগর্ভস্থ কক্ষে শায়িত অবস্থায় বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করে মৃতদেহকে কবরস্থ করত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মরুভূমির বুকেই মমি তৈরির মাধ্যমে মৃতদেহকে কবরস্থ করে সংরক্ষণ করত। সাধারণ মানুষের কবরের সঙ্গে বিশিষ্ট মানুষের কবরের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য পরিলক্ষিত হত। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কবরের ওপর পাথর গেঁথে গেঁথে পিরামিড তৈরি করে স্মৃতি রক্ষা করত। মৃতদেহকে অবিকৃত রাখতে মিসরীয়রা এক বিশেষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করত। একেই বলে মমি সংরক্ষণ পদ্ধতি। গোড়ার দিকে মমি সংরক্ষণ পদ্ধতিতে কিছু ত্রুটি থাকার জন্য মৃতদেহ দীর্ঘদিন অবিকৃত থাকত না। তাই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মমি তৈরির পদ্ধতির পরিবর্তন ঘটিয়ে মৃতদেহকে দীর্ঘদিন অবিকৃত রাখার ব্যবস্থা করা হত। মানুষের মৃত্যুর পর তার দেহ থেকে পচন ধরার সম্ভাবনা আছে এরকম কিছু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন_ পাকস্থলি, মস্তিষ্ক, ফুসফুস ও যকৃত প্রভৃতি অংশ কেটে বাদ দেওয়া হত। কেটে নেওয়া দেহের অংশগুলোকে চারটি বিশেষ বিশেষ পাত্রে রাসায়নিক পদার্থের মধ্যে ডুবিয়ে রাখা হত। পরে সেগুলোকে আবার মৃতদেহে রেখে দেওয়া হত। এবার শুকনো লবণ দিয়ে মৃতদেহটিকে শুকিয়ে নেওয়া হত। পেটের কাটা অংশ সেলাই করা হত সতর্কতার সঙ্গে_ যাতে ভেতরে বাতাস ঢুকতে না পারে। এবার এক গামলা পাইন গাছের বর্জ্য পদার্থ (আঠা) মৃতদেহের গায়ে লেপে ভালো করে ঘষেমেজে নেওয়া হত, তারপর লিনেন কাপড়ের চওড়া ফিতে জড়িয়ে মৃতদেহটিকে বেশ পুরু করে ফেলা হত। লিনেন কাপড় বায়ু নিরোধক। একটি ডালাযুক্ত কাঠের বাক্সে লিনেন কাপড়ে আপাদমস্তক মমিটিকে রাখা হত। এবার শুরু হত কবর খোঁড়ার কাজ।

সাধারণত কবরের চেয়ে এর আয়তন অনেক বেশি করা হত এতে অতিকায় কাঠের বাক্স সমেত মৃতদেহটিকে রাখতে হত, তার ওপর মৃতদেহের সঙ্গে তার জীবিতকালে যেসব বস্তু প্রিয় ছিল সেসব জিনিস কবরে দেওয়া হত। কারণ তাদের বিশ্বাস ছিল মৃত ব্যক্তির আত্মা পাখির আকৃতি ধারণ করে সারাদিন মনের সুখে এখানে-ওখানে উড়ে বেড়ায়। দিনের শেষে আত্মা আবার নিথর দেহে ফিরে আসে। তাই তাদের জন্য থালা, ঘটি-বাটি থেকে আসবাবপত্রাদি সবই দরকার। এরকম ধারণা থেকে জীবিত মানুষের কাছে যা কিছু অত্যাবশ্যকীয় সবই কবরের মধ্যে দিয়ে দেওয়া হত। এবার কবর চাপা দেওয়া হত। সামর্থ্য অনুযায়ী কবরের ওপর স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে আত্মজনকে স্মরণীয় করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হত
অপয়া মমি
মমিকে নিয়ে বেশ কিছু অবিশ্বাস্য সত্য ঘটনাও
রয়েছে । আসুন তার মধ্য থেকে কয়েকটা ঘটনা আমরা জানি ।
এক সময় মিশরে দুর্দান্ত প্রতাপশালী ফারাওদের বসবাস ছিল। যাদের আমরা বলি ফেরাউন জাতি।ফারাওদের মধ্যে তুতেম খামেনের নাম খুবই উল্লেখযোগ্য ।তিনি খুব অল্প বয়সে মারা গিয়েছিলেন।মৃত্যুর পর তার মৃতদেহ যথারীতি একটি সোনার কফিনে মুড়ে বহু মূল্যবান ধনরত্নসহ মমি করে রেখে দেওয়াহয় । ১৯২২ সালের ২৬ নভেম্বর প্রত্মতত্ত্ববীদ মি. হাওয়ার্ড, তার পার্টনার ও অর্থ জোগানদার কর্নারভান আবিষ্কার করেন ধনরত্ন , মণিমুক্তা খচিত ফারাও তুতেনের কফিন। সেটা ছিল পৃথিবী কাঁপানো এক ঘটনা । কিন্তু আসল ঘটনার উদ্ভব ঘটে এরপর থেকে ।তুতেন
খামেনের গুপ্তধন আবিষ্কারের ৫ মাসের মাথায় অর্থ জোগানদার কর্নারভানের
মৃত্যু হয় । কিভাবে বা কেন কর্নারভানের মৃত্যু হয় তা সম্পূর্ণ অজানা । সে কি কারণে মারা যায় ডাক্তাররাও তা নির্ণয় করতে ব্যর্থ হন। তার মৃত্যু আরেক বিস্ময়কর ঘটনার সৃষ্টি করে।যে মুহূর্তে তিনি মারা যান তখন মিশরের রাজধানী কায়রোর বাতি হঠাৎ নিভে শুধু তাই নয় , লন্ডনে তার পোষা কুকুরটিও একই সময় ছটফট করতে করতে মারাযায়। এরপর বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন, মমিটির গায়ে যেসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র ছিল , কর্নারভানের শরীরও ঠিক সে রকম ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র হয়ে গিয়ে ছিল। কিন্তু এর প্রধান আবিষ্কারক মি. হাওয়ার্ড ৭০ বছর বয়সে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেন।
খ্রিস্টপূর্ব একাদশ শতকে মিসরে আমেনরা নামে এক রাজ কুমারী মারা যান। তাকে যথা নিয়মে মমি করে সমাধিস্থ করা হয় । অনেক বছর পর ঊন বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে তার মমিটি কেনার জন্য চারজন ইংরেজ মিসরে আসেন এবং তারা রাজকুমারী আমেনরার মমিটি ক্রয় করেন। কিন্তু এর জন্যতাদের নিদারুণ দুর্ভাগ্য বরণ করতে হয়। মমিটি কিনে নিয়ে যাওয়ার সময় চারজনের মধ্যে একজন মরুভূমিতে ঝড়ের কবলে পড়ে মারা যান। তারপর ইংল্যান্ডে ফেরার পর তাদেরএকজন দেখেন তারসব সম্পত্তি কেউ একজন আত্মসাৎ করেছে ।অপরজন ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তার চাকরি চলে যায় । মমিটির পরবর্তীতে স্থান হয় ব্রিটিশ মিউজিয়ামে। কিন্তু যেই একবার মমিটিকে স্পর্শ করেছে তাকেই
কোনও না কোনও দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। এমন কি এক দর্শনার্থী যে কিনা কাপড় দিয়ে মমিটির মুখ পরিষ্কার করেছিল এক সপ্তাহের মধ্যে তার ছেলে মারা যায়। আর একবার এক ফটো সাংবাদিক মমিটির ছবি তুলেছিলেন। ছবিটি ডেভেলপ করে তিনি দেখেন রাজকুমারীরমুখের বদলে এক বীভৎস ও বিকৃত মুখ। সে রাতেই তিনি আত্মহত্যা করেন। এরপর মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ মমিটির প্রদর্শন বন্ধ করে দেন এবং এটি স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।পরের দিনই কর্মকর্তারা দেখেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার লাশ পড়ে আছে টেবিলের ওপর।
কিন্তু মানুষের শখ চিরন্তন। এত কিছুর পরও এক আমেরিকান পর্যটক মমিটি ক্রয় করেন এরপর স্বদেশে ফেরার জন্য নিউইয়র্ক গামী একটি জাহাজের কেবিন ভাড়া নেন। আর এ যাত্রাই ছিল সেই জাহাজটির প্রথম ও শেষ যাত্রা। কারণ যাত্রাপথেই জাহাজটি ডুবে যায় এবং এটিই ছিল বিশ্ব বিখ্যাত জাহাজ টাইটানিক।

নিজের চোখে দেখা মমিঃ
মস্কোর মিউজিয়ামে নিজের চোখে মমি দেখেছিলাম। খুব অবাক লাগছিলো, এই এত হাজার হাজার বছর ধরে একটা দেহকে কেমন সংরক্ষিত করে রাখা হয়েছে। এছাড়া আধুনিক যুগের মমি সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা ভ ই লেনিনের মমিটিও নিজের চোখে দেখেছি।

চীনেও মমি পাওয়া গিয়েছে
চীনেও কিছু মমি পাওয়া গিয়েছে। মমিগুলো পাওয়া যায় তারিম বেসিনে। সেখানে মমিগুলোর আভ্যন্তরিন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসহ (ঘিলু, পাকস্হলী, ইত্যাদি) পুরো দেহটিই ছিলো। মমিগুলোর বয়স ২৫০০ বছর। মমিগুলোর নাম তারিম মমি।
Xin Zhui (চীনা: 辛追) এছাড়াও লেডি ডাই হিসাবে পরিচিত, যিনি ছিলেন আচার্য Marquess Li Cang (利 苍) (ডি. 186 খ্রীষ্টপূর্ব-র)-এর স্ত্রী, Marquess হ্যান রাজবংশের সময় চাংসা-এর আচার্য । তার মৃতদেহের সংরক্ষিত মমি চাংসা শহরের কাছাকাছি পাওয়া যায় 1971 সালে । আশ্চর্য্যজনকভাবে মমিটির চামড়া নমনীয় এবং নরম ছিল. ব্যবহৃত কাপড় থেকে চিন্হও দৃশ্যমান। তার প্রত্যঙ্গগুলো নোয়ানো যেতে পারে, তার চুল তখনও ছিল সম্পূর্ণ অক্ষত। এমনকি শিরায় রক্তও পাওয়া গিয়েছে। এবং সমস্ত তার অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোও অক্ষত ছিল।

ইরানী মমি
১৯৯৩ সালের এক শীতকালে জানজান শহরের কাছে লম্বা চুল ও শশ্রুমন্ডিত একটি মমি পাওয়া যায়। পরবর্তিকালে আরও ছয়টি মমি পাওয়া গিয়েছে। গবেষণার পর জানা যায় যে প্রথম দেহটির বয়স ১৭০০ বৎসর। তিনিট দেহ খ্রীষ্টপূর্ব ২৪৭ সালের। আরেকটি দেহ খ্রীষ্টপূর্ব ৫৫০ সালের।
ইটালি মমি
ইটালিতে পাওয়া গিয়েছে প্রাকৃতিক মমি। একটি হিমবাহের বরফে জমে এই মমিটি তৈরী হয়। মমিটির বয়স ৫৩০০ বছর।

চেক রিপাবলিক, ইংল্যান্ড, ডেনমার্ক, জা্মানী প্রভৃতি দেশেও প্রাকৃতিক মমি পাওয়া গিয়েছে।

মৃতদেহকে মমিফাই করে রাখার এই পদ্ধতি ও রীতি অতি প্রাচীন হলেও, আধুনিক মানুষদের মনেও মমিফিকেশনের এই বাসনা জেগেছে। এইভাবে আধুনিক যুগেও শুরু হয়েছে মমিফিকেশন। শুরুটা ১৮৩০ সালের দিকে , চলছে এখনো। পরবর্তি পর্বে এই আধুনিক মমিগুলো নিয়ে আলোচনা করবো।

(চলবে)

তথ্যসুত্রঃ ১। ইন্টারনেটে পাওয়া বিভিন্ন আর্টিকেল, ২। সামহোয়ারইনব্লগে কিছু ব্লগারের আর্টিকেল, ৩। বিভিন্ন বই।
এই আর্টিকেলটি লেখার জন্য যাদের আর্টিকেলের সাহায্য নিয়েছি তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি।

Categories
অনলাইন প্রকাশনা কবিতা দুঃসাহসিক রহস্য ও অপরাধ সৃজনশীল প্রকাশনা

প্রেমে দ্রোহে গর্জে ওঠা সৈনিক আজ নিথর নীরব

প্রেমে দ্রোহে গর্জে ওঠা সৈনিক আজ নিথর নীরব
——————————- ডঃ রমিত আজাদ

প্রেমে দ্রোহে গর্জে ওঠা সৈনিক আজ নিথর নীরব,
ঘুমাও সৈনিক, ঘুমাও নীরবে, ঘুমাও,
আমি জেগে রব অবিরত নির্ঘুম,
আর অভিশাপ দেব ঐ সব পশুদের,
যাদের গভীর ষড়যন্ত্র
অকালে ঝরিয়েছে তোমাদের প্রাণ
মাথার খুলিতে মদ পান করেছে, যেসব নষ্ট মাতাল পশু,
হন্তারক কো্ন্‌ নতুন মীর্জাফর।

তোমার নির্ভীক নিশঙ্ক কন্ঠ আজ রুদ্ধ কেন সৈনিক?
তোমাদের জীবন্ত চোখে অনেক স্বপ্ন ছিলো,
তোমাদের অন্তিম বাসনাগুলো এক এক করে সাজালে,
বসন্তের ফুল হয়ে ফুটবে।
এমন বসন্তের আগুন রাঙা রঙ, মানুষের রক্তে রঙিন হলো!
আর মানুষের আলখেল্লার পিছনে দাঁড়িয়ে উল্লাস করেছে
হিংস্র পশুর রূপ, ভয়াবহ এক ষড়যন্ত্রের কোপানলে,
একি ষড়যন্ত্র না অঘোষিত কোন যুদ্ধ?

যে রমনী অলস অবসরে তোমার বাহুডোরে বন্দী হয়ে সুখ খুঁজে পেত,
সে আজ কলঙ্কের টিপ কপালে ধারন করে শিউরে উঠেছে
প্রিয় রমণীর তপ্তশ্বাসের উষ্ণতা আর নেই,
তোমার জন্য কাঁদে মেঘবতী নারী,
বৃষ্টি ঝরে ডাগর কালো চোখে!

হাহাকার করে উঠেছে,
ফুটপাতবাসী শীতার্ত কিশোর,
বয়সের ভারে ন্যুজ হয়ে যাওয়া বৃদ্ধ রহীম,
বুড়িগঙ্গার মাঝি ইয়াকুব মোল্লা,
মাদ্রাসার পরহেজগার শিক্ষক আবদুল করিম
শ্রমে ও ঘামে ঠেলে নেয়া জীবন,
বিপন্ন, বিদ্ধস্ত, জননী ও জন্মভূমি,
পৃথিবীর সব অস্ত্রাগার নিশ্চুপ রইলো,
সৈনিকের দক্ষ হাতে, কেবলই ছিলো শূণ্যতা,
হে কাপুরুষ, তুই নিরস্ত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরলি!

এক অন্তর্ভেদী চিৎকারে
আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে বলতে চাই,
তুমি কি আর জাগবে না সৈনিক?
দেখনা চেষ্টা করে,
যদি লিখতে পারো আরেকটি নির্মম কবিতা,
শিরায় শিরায় ধমনিতে ধমনিতে,
প্রবাহিত লাল রক্তে আর একবার জেগে উঠুক দ্রোহ!

আমার কন্ঠস্বর রুদ্ধ নয়,
কেবল চেপে ধরে আছে কে যেন!
দেখবি একদিন প্রবল শক্তিতে
সেই হাত ছাড়িয়ে নেব,
যদি শক্তি থাকে কারো
সেদিন আমাকে ফেরাস্‌।

(রক্তাক্ত বিডিআর বিদ্রোহের (পিলখানা হত্যাকাণ্ড) চতুর্থ বার্ষিকী আজ ২৫ ফেব্রুয়ারী, সেই নির্মম হত্যাকান্ডে নিহত সকল শহীদদের আমার এই কবিতাটি উৎসর্গ করলাম)