Thank You Doctor -1

Thank You Doctor -1

১৯৭৯ সালের কথা।
আমার তখন নয় বৎসর মাত্র বয়স। এখনকার আমাকে দেখে কি মনে হয় জানি না। তবে সেই সময়কার আমি ডানপিটেই ছিলাম।
গাছে চড়া আর দেয়াল বেয়ে উপড়ে ওঠায় আমার সমকক্ষ শিশু/কিশোর এলাকায় কম ছিলো। আরো একটি কাজ ভালো পারতাম, সেটা হলো
পাঁচ ইঞ্চি, দশ ইঞ্চি দেয়ালের উপর দিয়ে অনায়াসে দৌড়ে যাওয়া। আরেকটি নেশা ছিলো ঘুঁড়ি ওড়ানো ও ঘুঁড়ি ধরা।
ঢাকা শহরটা তখন ছিলো অনেকটা গ্রাম আর শহরের মিশ্রণের মত। সর্বত্রই ছিলো সবুজের ছোঁয়া।
হাইরাইজ বলতে ছিলো এগারো তলা উঁচু হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টাল ও মতিঝিলের টয়োটা বিল্ডিং। টিনের ঘরই ছিলো বেশী, আর কিছু দোতলা বিল্ডিং।
মগবাজারে আমার ডাক্তার ফুপুর আধুনিক বাড়ীটার তখন দোতলার কন্সট্রাকশন শেষ হয়ে তিনতলার কাজ চলছে। মনোলিট কন্সট্রাকশনে ইট গাঁথা দেয়াল তোলার পরে ছাদ ঢালাই দেয়া হয়।
ঐ তিনতলায় তখন দশ ফুট উঁচু সব দেয়াল তোলা হয়ে গিয়েছিলো, কিন্তু ছাদ ঢালাই বাকী ছিলো। আমি মাঝে মাঝে বেয়ে বেয়ে ঐ দশ ফুট উঁচু দেয়ালে উঠতাম। আশেপাশে তখন কোন তিনতলা বাড়ী না থাকায়, অনেক উঁচুতে বসে আকাশ-বাতাস দেখার একটা আলাদা মজা পেতাম। একদিন বিকালে ঐ দেয়ালের উপর বসে আছি। হঠাৎ দেখলাম, একটা কাটা ঘুঁড়ি ভাসছে। আর এই বাড়ীর ছাদের দিকেই ধেয়ে আসছে। ব্যাস! ঘুঁড়ি-প্রেমী আমাকে আর পায় কে? দশ ফুট উঁচু দশ ইঞ্চি দেয়ালের উপর দিয়ে দৌড়াতে লাগলাম কাটা ঘুঁড়ি ধরার উদ্দেশ্যে। উপরের দিকে তাকালে নীচে খেয়াল থাকে না। হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে পা হড়কে দেয়াল থেকে পড়ে গেলাম। মুহূর্তের মধ্যেই ফীল করলাম, পায়ের নীচে শূণ্যতা, আর আমি একটা পড়ন্তু বস্তু! ঐ পরিস্থিতিতে আর কিছুই করার থাকে না। এখনো শিউড়ে উঠি ঐ কয়েকটি মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করে! কয়েক সেকেন্ডের জন্য আধা জ্ঞান হারালাম। তারপর যা মনে করতে পারলাম যে, দুজন ছুটে এসেছেন; একজন বাড়ীর কেয়ার-টেকার ‘ন’ ভাই, আরেকজন বাড়ীর নির্মান শ্রমিক ইসলাম ভাই। আমি ইসলাম ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলাম, “আমার কি হয়েছে?” তিনি আমাকে বুকে জড়িয়ে বললেন, “থোতা ফাইট্টা গ্যাছে!” আমি বুঝলাম যে আমি সিরিয়াসলি আহত হয়েছি!

তারপর যা হলো, তা খুব দ্রুত। আমার বোঝার বা কিছু করার কোন শক্তি ছিলো না। আমার মাতৃতুল্য ফুপু ও বড় দুই বোন কাঁদতে কাঁদতে ছুটে এলেন। ‘ন’ ভাই, আমাকে কোলে নিয়ে ছুটে গেলেন একজন ভালো ডাক্তারের খোঁজে। ঢাকা শহরে তখন ভালো স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া খুব মুশকিল ছিলো! আর ঐ রকম ইমার্জেন্সিতে তো খুবই জটিল ছিলো! আমাদের পিছনে পিছনে ছুটলো পাড়ার সব শিশু/কিশোর, সেই সাথে ইয়াং কয়েকজন। এই একটা জিনিস আমাদের দেশে চিরকাল ছিলো এখনো আছে। সেটা হলো আশেপাশের বা দেশের মানুষের ভালোবাসা। সাহায্য করতে পারুক না পারুক পাশে এসে চেনা-অচেনা অনেকেই দাঁড়ায়। সকলে ছুটলো ভালো ডাক্তারের খোঁজে। নয়াটোলাতে আজিজ মেডিকেল ফার্মেসী নামে একটা ফার্মেসী ও ডাক্তারখানা ছিলো। সেখানে সবাই ছুটে গেলো আমাকে নিয়ে। তখন সম্ভবত ডাক্তার সাহেব চেম্বারে ছিলেন না। ওটা উনার রুগী দেখার সময়ও ছিলো না। কিন্তু তিনি আশেপাশেই কোথাও ছিলেন। উনাকে খবর দেয়ার সাথে সাথেই ছুটে এলেন। আমি যতদূর জানি তিনি অনেকটা দৌড়েই এসেছিলেন। তারপর আমাকে দ্রুত টেবিলে শুইয়ে দিলেন। কেউ একজন বললো, “সেলাই করতে হবে।” ডাক্তার সাহেব উনাকে ধমক দিলেন, “আপনারা কথা বলছেন কেন? ছেলে ঘাবড়ে যাবে! যা বলার আমি বলবো, আমাকে কাজ করতে দিন।”

নীল স্ট্রাইপের জামা পড়া মাঝ বয়সী ডাক্তার আঙ্কেলকে আমার এখনো মনে পড়ে। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কাজ করলেন তিনি। সেই সময়ের সর্বাধুনিক স্টিচ তিনি দিয়েছিলেন। পুরো কাজ করেছিলেন খুব যত্নের সাথে। আমার মনে হয়েছিলো, তিনি যেন নিজের ছেলের যত্ন নিচ্ছেন!

তারপর কিছুদিন অসুস্থ থাকার পর পরিবারের মুরুব্বীদের সেবা-শুশ্রূষা ও ভালোবাসায় আমি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠি। ন’ ভাই, ইসলাম ভাই, আমার মেজ ফুপু, বড় দুই বোন উনাদের অবদান ভোলার নয় অবশ্যই। পাশাপাশি আমি অজস্র ধন্যবাদ জানাই ঐ হৃদয়বান ও দক্ষ ডাক্তারকে। তিনি এখন কোথায় আছেন কেমন আছেন আমি জানি না। তবে সারাজীবন উনাকে দোয়া করবো।

Thank You Doctor

—————– ড. রমিত আজাদ

মন্তব্য করুন..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.